Blog Archives

নারীদের জীবনযাত্রার চালচিত্র

Posted on by 0 comment

Mfdউত্তরা ইপিজেড: জাহাঙ্গীর আলম সরকার: বাংলাদেশের উত্তর জনপদের একটি জেলার নাম নীলফামারী। যেখানে অবস্থিত উত্তরা ইপিজেড। জননেত্রী শেখ হাসিনা নীলফামারীর সাধারণ মানুষের অভাব, মঙ্গা দূর করে নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ২০০১ সালে উত্তরা ইপিজেড প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৮ বছর পর নীলফামারীর নারীদের জীবন মানে কী রকম পরিবর্তন ঘটেছে সে বিষয়টি এই লেখার উপজীব্য। বিগত প্রায় দুই দশকে নীলফামারীর নারীদের জীবনে এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। এখানে নারীরা ক্ষমতায়িত হওয়ার পাশাপাশি আধুনিক সুযোগ-সুবিধাগুলো গ্রহণ করতে শুরু করেছে। উত্তরা ইপিজেড প্রতিষ্ঠার পূর্বে নীলফামারীতে অধিকাংশ নারীরা পরিবারের বোঝা হিসেবে পরিগণিত হতো। তারা চিহ্নিত হতো অতিরিক্ত হিসেবে। শুধু তাই নয়, বরং তাচ্ছিল্যের শিকার হতো প্রতিনিয়ত।
নীলফামারীতে ইতোমধ্যে নারী জীবনের এই দীর্ঘ স্থিতাবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। ইপিজেডসহ নানা শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় নীলফামারীর আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের পাশাপাশি এ অঞ্চলের নারীদের ক্ষমতায়িত করা সম্ভব হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, গত এক দশক ধরে নীলফামারীর সমাজে রাজনৈতিক এবং আর্থ-সামাজিক অধিকার অর্জনের জন্য যে প্রচেষ্টা চলছে, নারীমুক্তি অর্জন তার অন্যতম। শেইলা রাওবোথাম বলেছেন, ‘নারীর ইতিহাস ছিল লুকিয়ে’; কিন্তু সাম্প্রতিককালে নারী ক্রমশ সবক্ষেত্রেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছেন (দি পলিটিক্যাল রিডার ইন জেন্ডার স্টাডিজ ১৯৯৪:১)। ইদানীং নীলফামারীর প্রান্তিক এলাকাতেও এর প্রভাব ব্যাপকভাবে অনুভূত হচ্ছে। নীলফামারীতে নারীরা এখন আর ঘরে বসে নেই; বরং দলবল নিয়ে ছুটছে। সকালবেলা নারীদের ছুটে চলার দীর্ঘ লাইন দেখে সেটি সহজেই অনুমান করা যায়।
উত্তরা ইপিজেড বদলে দিচ্ছে নীলফামারীর নারীদের জীবনের চালচিত্র। এখানে বর্তমানে কর্মসংস্থান প্রায় ৩২ হাজার নারী-পুরুষের। বিগত ১০ বছরে নীলফামারীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে উত্তরা ইপিজেড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় এ অঞ্চল থেকে মঙ্গা দূর হয়েছে। উত্তরা ইপিজেড ও পার্শ্ববর্তী এলাকার জনগণের আগে দৈনিক গড় উপার্জন ছিল ৪০ টাকা বা তার নিচে। কিন্তু ইপিজেড স্থাপনের ফলে এ এলাকার মানুষের বর্তমান দৈনিক গড় উপার্জন ২৮০-৩২০ টাকায় পৌঁছেছে। এখানে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে মজুরি-ভাতা বাবদ প্রতিমাসে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতে অন্যান্য ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ইপিজেডের সার্বিক কর্মকা- বৃদ্ধি পাওয়ায় ইপিজেড সংলগ্ন এলাকায় বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পাশাপাশি প্রচুর বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন গড়ে উঠছে। গত দুই দশকে বাংলাদেশের সামাজিক অবকাঠামোর প্রতিটি স্তরে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, যেখানে বেঁচে থাকার জন্য আর নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির লক্ষে মানুষকে একাধিক পন্থায় উপার্জনের পথ অনুসন্ধানে নিরন্তর ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে।
হিমালয়ের পাদদেশের সমতল ভূমির মানুষগুলোর একাংশের বসবাস কৃষিনির্ভর নীলফামারীতে। অনাদিকাল থেকে কৃষিনির্ভর নীলফামারী সম্প্রতি শিল্পায়নের দিকে ঝুকেছে। ফলে কৃষিনির্ভর নীলফামারীর অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা সংযোজন হয়েছে। সংগত কারণেই নীলফামারীর অর্থনীতি বদলে যাচ্ছে। বিষয়টি অর্থনীতির হলেও এর প্রতিক্রিয়া শুধু অর্থনীতির ভাবুক মহলে সীমাবদ্ধ নেই। থাকার কথাও নয়। কেননা যে কোনো সমাজে অর্থনীতি হচ্ছে সমাজের মূলভিত্তি। নীলফামারীও এর ব্যতিক্রম নয়। এই মূলভিত্তিকে কোনো পরিবর্তন অবশ্যই আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও চিন্তাচেতনার উপরি কাঠামোতে প্রভাব ফেলবে। নীলফামারীর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় তা-ই ঘটেছে। বর্তমানে নীলফামারী জেলার বদলে যাওয়া অর্থনীতি জানান দিচ্ছে অতীতের মঙ্গাপীড়িত নীলফামারী এখন একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দিকে ধাবমান।
নীলফামারী জেলার অর্থনীতির এই ইতিবাচক পরিবর্তন নীলফামারীর সমাজের প্রচলিত অন্যান্য ক্ষেত্রের ওপর প্রভাব ফেলেছে। এই জেলায় সব শ্রেণি বা পেশার মানুষই ভালো বা মন্দভাবে প্রভাবিত হয়েছে, এমনকি শিল্প সংস্কৃতির চিন্তায়ও পড়েছে মুক্তবাজারের ছায়া। যে কবি এতদিন শুধু পৃথিবীর রূপ, রং বা প্রিয়ার সৌন্দর্য নিয়ে কাব্য রচনা করতেন, তিনিও আজ অর্থনীতি নিয়ে লিখতে শুরু করেছেন, ব্যবসায়ীরা নতুন করে হিসাব মেলানোর চেষ্টা করছেন, রাজনীতিবিদরা নতুন উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। ফলে আলোচ্য নিবন্ধের উদ্দেশ্য নীলফামারীর অর্থনীতিতে ও নারীজীবনে উত্তরা ইপিজেডের প্রভাব। উত্তরা ইপিজেড নীলফামারী জেলার অর্থনীতিতে নতুন এক মাত্রা সংযোজন করার পাশাপাশি নীলফামারীর নারীদের জীবনে গুণগত পরিবর্তন আনতে পেরেছে। এখন নারীরা ঘর থেকে বেরিয়ে অফিসে বসে কাজ করছে, পরিবারের জন্য বাড়তি আয় রোজগার করছে। এখন তারা কর্মব্যস্ত দিন কাটায়।
প্রতিদিন সকালে নীলফামারীতে হাজার হাজার নারী সাইকেল ও ভ্যানে উত্তরা ইপিজেডের দিকে ছুটে চলে। এই নারীদের কাজে আসার চিত্রই বলে দেয় নীলফামারীর নারীরা এখন আর পরনির্ভরশীল নয়। নীলফামারীর অর্ধেক জনগোষ্ঠী, যারা অনাদিকাল থেকেই শুধুমাত্র সংসারের কাজ করেছেন মজুরি ছাড়াই। সেই নারীরাই আজ প্রতিমাসে রোজগার করছেন। নারীদের এই রোজগার পরিবারের শিশুদের উন্নত ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে কাজ করে যাচ্ছে। নারীরা উপার্জনক্ষম হওয়ায় পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারছেন। ফলে নীলফামারীতে একটি জেন্ডারবান্ধব শক্তিশালী কাঠামো সৃষ্টি হচ্ছে। এটাই হচ্ছে বদলে যাওয়া নীলফামারীর বর্তমান চিত্র।
অথচ মাত্র দুই যুগ পূর্বেও এখানকার নারীরা বাড়ির বাইরে বের হতো না। পরপুরুষের সাথে কথা বলত না। উন্নয়নে নীলফামারীর নারীরা আজ উত্তরা ইপিজেডে কাজ করছেন, ফলে বদলে যাচ্ছে এখানকার জীবনধারা। এই বদলে যাওয়ার মধ্যে একটি ইতিবাচক বার্তা রয়েছে। ধীরে ধীরে নারীর ক্ষমতায়নে নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেড রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। পিছিয়ে পড়া এ অঞ্চলের মেয়েরা কাজের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থার পরিবর্তনের সুযোগ পেয়েছে। নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি তারা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
উত্তরা ইপিজেড নীলফামারীর নারীর জীবনের চালচিত্র বদলে দেওয়ার পাশাপাশি বদলে দিচ্ছে নীলফামারীর কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে। এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করে নীলফামারীর হাজার হাজার নারী ও পুরুষ নিজেদের খারাপ দিন বদলাতে পেরেছে, ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পেরেছে। এভাবে জননেত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে হাজার হাজার নারীর ভাগ্যের পরিবর্তনের পাশাপাশি নীলফামারীর অর্থনীতির একটি ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। আর এই পরিবর্তনটি ঘটছে নীরবে।

Category:

বাংলাদেশ

Posted on by 0 comment

পেট্রল পাম্প থেকে বেরিয়ে গাড়ি ছুটতে শুরু করল আবার। রিয়াজের চোখে ভাসছে সন্ন্যাসীর দিঘির দৃশ্যাবলি। মসজিদের ঘাটলায় মুসল্লিদের অজু, জালাভিটায় দুই কৃষকের জল সেচা, বৌদ্ধবিহার, গেরুয়া চীবরের ভিক্ষু, বাবা জল্লাশাহর মাজার, বুড়ো খাদেম, ঘোষপাড়া, শুকোতে দেওয়া জাল, মন্দির, শ্মশান, দিঘির ঘাটে ছেলে-মেয়েদের ডুবসাঁতার, কোমরজলে দাঁড়িয়ে লোকটার সূর্যপ্রণাম।

Mfdস্বকৃত নোমান: বাবার মৃত্যুর প্রায় সতেরো বছর পর হঠাৎ একদিন রিয়াজের মনে পড়ে গেল সেসব বিকেলের কথা, নানাবাড়ি থেকে ফেরার পথে ট্রেনের জানালা দিয়ে তার বাবা প্রায়ই সন্ন্যাসীর দিঘির দিকে তর্জনির ইশারা করে বলত, ‘দেখ দেখ বাবা, ঐ দেখা যায় বাংলাদেশ।’ জানালা দিয়ে মাথাটা বের করে প্রতিবারই দিঘিটার দিকে তাকাত রিয়াজ। ততক্ষণ তাকিয়ে থাকত, যতক্ষণ না দিঘিটা গাছগাছালির আড়াল হয়ে পড়ত।
তখন তো তার বয়স কম। পাঠ্যপুস্তকে পড়ছে, আমাদের দেশের নাম বাংলাদেশ। হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানসহ নানা জাতি-গোষ্ঠীর বসবাস এই দেশে। আমরা সবাই মিলেমিশে থাকি। এই দেশে ছয় ঋতু। শাপলা আমাদের জাতীয় ফুল। দোয়েল আমাদের জাতীয় পাখি ইত্যাদি ইত্যাদি। সে ভাবতো, পাঠ্যপুস্তকে যে বাংলাদেশের কথা লেখা আছে সেই দেশটা বুঝি ঐ সন্ন্যাসীর দিঘির পাড়েই অবস্থিত। ক্লাস ফাইভ-সিক্সে ওঠার পরও দিঘিটাকেই সে বাংলাদেশ মনে করত। এইট-নাইনে পড়ার সময়ও কোথাও ‘বাংলাদেশ’ লেখা দেখলেই তার চোখে ভেসে উঠত সেই বিশাল দিঘি।
যখন বুঝতে শিখল বাংলাদেশের আয়তন ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া পর্যন্ত এই দেশের বিস্তার, তখন তার বাবা বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে জিজ্ঞেস করতে পারত, প্রতিবারই নানাবাড়ি থেকে ফেরার পথে বাবা কেন ঐ দিঘিটার দিকে আঙুল তুলে কথাটি বলতো।
সেসব রঙিন বিকেলের কথা সে ভুলেই গিয়েছিল। প্রায় কুড়ি বছর ধরে সে ঢাকায়। গ্রামে যাওয়া হয় না খুব একটা। যাবে কার কাছে? বাবা-মা তো সেই কবেই মরেছে, বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে, ভাইয়েরাও দেশ-বিদেশে চাকরি-বাকরি নিয়ে ব্যস্ত। বাড়িতে আছে শুধু এক চাচা। তার সঙ্গেও বহুদিন যোগাযোগ নেই। ব্যস্ত নগরীর ব্যস্ত মানুষ সে। প্রায় দশ বছর চাকরি করে নিজে একটা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়েছে। ওটা নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত, মাসে মাসে দেশ-বিদেশ করতে হয়, গ্রামের বাড়ির কথা তেমন মনে পড়ে না। পড়লেও সেসব বিকেলের কথা পড়ে না। অসংখ্য স্মৃতির নিচে চাপা পড়ে গেছে সেসব বিকেলের স্মৃতি। মনে হয়তো পড়েছে। কিন্তু সেদিনের মতো অত তীব্রভাবে পড়েনি। স্মৃতিটা তাকে এতটা আকুল, এতটা কাতর করেনি।
সেদিন তার ইচ্ছে হলো শৈশবের সেই হারানো রঙিন বিকেলগুলো দেখতে যাবে। মনতলা স্টেশনে নেমে কাটা ধানের মাঠ পেরিয়ে দিঘিটার কাছে গিয়ে দাঁড়াবে। কেন বাবা দিঘিটা দেখিয়ে ঐ কথাটি বলত, বোঝার চেষ্টা করবে। সময় থাকলে গ্রামে গিয়ে বাবা-মায়ের কবর জেয়ারত করে আসবে। বাবার প্রতি তেমন টান ছিল না তার। পুলিশের চাকরি ছিল বাবার। বছরের বেশিরভাগ সময় বাড়ির বাইরে থাকতে হতো। সংসার সামলাতো মা। বাবার মৃত্যুর পর তেমন কাঁদে-টাঁদেওনি রিয়াজ। এখনও যে বাবার স্মৃতি খুব একটা মনে পড়ে, তা নয়।
পরদিন ভোরে রওনা হয়ে গেল। ছেলেটার পরীক্ষা, কানিজা ব্যস্ত ছেলেকে নিয়ে, নইলে তাদেরও সঙ্গে নিতে পারত। ছেলেকে স্কুলে নিতে হবে, তাই ড্রাইভারকেও নিতে চায়নি। কানিজা বলল, লংড্রাইভে যাচ্ছ, ড্রাইভারকে নিয়ে যাও। আমরা সিএনজি অটোরিকশায় যাতায়াত করতে পারব।
বেলা এগারোটা নাগাদ জেলা শহরে পৌঁছে গেল রিয়াজ। ভেবেছিল গাড়িটি শহরের কোথাও রেখে শৈশবের সেই লোকাল ট্রেনে চড়ে মনতলা স্টেশনে যাবে। তার খেয়ালেই ছিল না অব্যাহত লোকসানের অজুহাতে রেলপথটি সেই কবে বন্ধ করে দিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। অগত্যা গাড়ি নিয়েই যেতে হলো।
জেলা শহর থেকে মনতলা এক ঘণ্টার পথ। দুপুর বারোটা নাগাদ পৌঁছে গেল। স্টেশনটি আগের মতো নেই। যাত্রী বিশ্রামাগার এবং টিকিট কাউন্টারের লাল দালানটিতে শ্যাওলা ধরেছে, প্লাটফর্মের ইটগুলোতে ঘাস গজিয়েছে। এখানে-ওখানে গোবর, নাদি। রেললাইনগুলোও জংয়ে ধরে লাল, কাঠের সিøপারগুলো চুরি হয়ে গেছে, যেগুলো আছে পচে গলে মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। লোহার সাইনবোর্ডটির ‘মনতলা স্টেশন’ লেখাটি মুছে গেছে। বাংলা সিনেমা এবং বার্ষিক ওয়াজ ও দোয়ার মাহফিলের কয়েকটি পোস্টার সাঁটা সেখানে। চারদিকে কেমন ভুতুড়ে শূন্যতা। স্টেশনের পেছনে শুকিয়ে যাওয়া খালটার ওপারে মনতলা বাজার। সারাক্ষণ সরগরম। কিন্তু স্টেশনের দিকে লোকজন আসে না তেমন।
সন্ন্যাসীর দিঘি যাওয়ার একটা কাঁচা রাস্তা আছে স্টেশনের উত্তরে। কাঁচা হলেও গাড়ি চলাচলের মতো। কিন্তু গাড়ি নিল না রিয়াজ। প্লাটফর্মের কাছে পার্ক করে রেখে ড্রাইভারকে নিয়ে মাঠে নামল। নাড়া মাড়িয়ে, মাটির ছোট ছোট চাঙড় গুঁড়িয়ে দুজন সন্ন্যাসীর দিঘির উদ্দেশে হাঁটে। ড্রাইভার তো মহাবিরক্ত। হবে না? মাথার ওপর চৈত্রের গনগনে সূর্য, ঘামে শার্ট-প্যান্ট ভিজে যাচ্ছে। কে জানত তার স্যার এমন কা- করবে। জানলে একটা ছাতা সে অবশ্যই নিয়ে আসতো। সারাক্ষণ গাড়ির এসিতে থাকা মানুষের কি এমন কড়া রোদ সহ্য হয়?
তারা যখন সন্ন্যাসীর দিঘির পুবপাড়ের মস্ত কাঁঠাল গাছটার তলায় দাঁড়াল, একটা বাজতে তখন দশ মিনিট বাকি। রিয়াজের কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে দরদর, তবে চোখেমুখে মুগ্ধতা। দিঘি এত বড় হতে পারে তার জানা ছিল না। কখনও দেখেনি। দৈর্ঘ্য-েপ্রস্তে প্রায় দেড় মাইল তো হবেই। চারদিকটা চক্কর দিতে গেলে এক ঘণ্টায় কুলোবে না। উত্তর তীরে ধানের জালাভিটা। দুই কৃষক দোলনা সেচনি দিয়ে জালাভিটায় জল সেচছে। উত্তর-পূর্ব কোণে মোল্লাপাড়া, প্রায় চল্লিশ গিরি মুসলমানের বসতি। ঐ কোণায় একটা শানবাঁধানো ঘাট। ঘাটের কাছেই প্রাচীন কালের মসজিদ। গাছগাছালির ফাঁকে গম্বুজগুলো দেখা যাচ্ছে। মসজিদের মাইকটা বেজে উঠল। আজান হাঁকা শুরু করল মুয়াজ্জিন। মুসল্লিরা অজু করতে ঘাটলায় নামছে।
কাঁঠালতলা থেকে হাঁটতে হাঁটতে তারা মসজিদের শানবাঁধানো ঘাটের কাছে এলো। ড্রাইভার নামাজি। ক্বাজা করে না এক ওয়াক্তও। ঘাটলায় নেমে অজু করে মসজিদে ঢুকে গেল সে। ধর্মকর্মে মতি নেই রিয়াজের। দুই ঈদ, শবেবরাত ও শবেকদরের রাত ছাড়া মসজিদে যাওয়া হয়ে ওঠে না। ঘাটলায় নেমে ভালো করে হাত-মুখ ধুয়ে উত্তরের পাড় ধরে সে দিঘির উত্তর-পশ্চিম কোণায় গেল। ওদিকে পশ্চিমপাড়া। বৌদ্ধপাড়াও বলে কেউ কেউ। প্রায় কুড়ি গিরি বৌদ্ধের বসতি। গোটা উপজেলায় এছাড়া আর কোনো বৌদ্ধবসতি নেই। দিঘির ঐ কোণায় একটা বৌদ্ধমন্দির। দুই ভিক্ষু স্নানে এসেছে ঘাটে। খালি পা, মু-ানো মাথা, গায়ে গেরুয়া চীবর। তাদের সঙ্গে কথা বলে মন্দিরে ঢুকল সে। পুরনো মন্দির। ভেতরে গৌতম বুদ্ধের একটা পেতলের মূর্তি। বারান্দায় একটা কাঠের চেয়ারে বসে এক ভিক্ষু হাতপাখার বাতাস করছে। তার সঙ্গে খানিকক্ষণ কথা বলে মন্দিরটা দেখেটেখে বেরিয়ে এলো রিয়াজ।
দিঘির পাড়ে উঠে দক্ষিণে নজর করে দেখল জমিনের মাঠে গরু-ছাগল চরছে। ছাতা মাথায় কৃষকেরা দূরদূরান্ত থেকে ফিরছে। পশ্চিম পাড় ধরে সে হাঁটা ধরল দিঘির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণার দিকে, যেখানে মস্ত একটা শিরীষগাছ। গাছটার তলায় বাবা জল্লাশাহর মাজার। শৈশবে বাবার মুখে কত শুনেছে জল্লাশাহ দরবেশের নাম। বাবা তার ভক্ত ছিল। ছুটিছাটায় বাড়ি এলে জল্লাশাহর মাজারে ঘুরে যেত। জল্লাশাহ ইন্তেকাল করেছেন বহু বছর আগে, রিয়াজের জন্মেরও আগে। জীবৎকালে সারাক্ষণ ঐ শিরীষতলায় বসে থাকতেন। দূর-দূরান্ত থেকে চাল-ডাল-হাঁস-মুরগি ইত্যাদি হাদিয়া তোহফা নিয়ে ভক্ত-শিষ্যরা আসত। তার ইন্তেকালের পর ভক্তের সংখ্যা আরও বেড়েছে। বাড়বে না? এই যে শত বছর ধরে শিরীষগাছটা বেঁচে, এটা কার কেরামতি? সন্ন্যাসীর দিঘির জল যে কখনও শুকায় না, এটাই-বা কার কেরামতি? পূর্ণিমা রাতে দিঘির বিশাল বিশাল মাছেরা যে লাফ-ঝাঁপ মেরে ডাঙায় উঠতে চায়, এটা কার ইশারা? বড় কামেল পীর জল্লাশাহ। তারা ইশারা ছাড়া এই তল্লাটে কিছুই ঘটে না।
শিরীষগাছটার নিচু শাখাগুলো লাল সুতোয় ঢাকা। ভক্ত-শিষ্যরা এলে সুতো বেঁধে যায়। তাদের বিশ্বাস, এই ইচ্ছেপূরণ গাছে সুতো বাঁধলে ইচ্ছে পূরণ হয়। জল্লাশাহর পাকা কবরটা লালসালুতে ঢাকা। সালুর ওপর লম্বা দুটো কাগজের ফুল। মাজারের বারান্দায় পাকা মেঝেতে বসে হাওয়া খাচ্ছে বুড়ো খাদেম। তার হাতে পাঁচশ টাকার একটা নোট দিল রিয়াজ। চিকচিক করে উঠল খাদেমের মুখখানা। ইতস্তত বলল, ‘আমাকে নয়, দানবাক্সে ফেলুন।’ রিয়াজ বলল, ‘এটা আপনি রাখুন। দানবাক্সে আমি দিচ্ছি।’
ততক্ষণে নামাজ শেষ করে মাজারের শিরীষতলায় পৌঁছেছে ড্রাইভার। তাকে নিয়ে দিঘির দক্ষিণে ঘোষপাড়ার দিকে হাঁটা ধরল রিয়াজ। ঘোষপাড়া, কিন্তু বাস জেলে-মালোদের। প্রায় পঁচিশ গিরি হিন্দু জেলে-মালো, মাছ ধরাই যাদের পেশা। পাড়ার এখানে-ওখানে বড় বড় জাল শুকাতে দেওয়া। পাড়ার পেছনে মা রক্ষা কালীমন্দির। মন্দিরের বাঁয়ে ঘোষপাড়ার শ্মশান। দিঘির দক্ষিণ-পূর্ব কোণায় স্নানঘাট। স্নান করতে কেউ ঘাটে যাচ্ছে, কেউ স্নান সেরে ফিরছে। একদল ছেলেমেয়ে সাঁতার কাটছে দিঘিতে। ঘাটে তিন মহিলা কাপড় কাঁচছে। গামছা কাঁধে স্নান করতে নেমেছে মাঝবয়সী দুটি লোক। কোমরজলে দাঁড়িয়ে একটা লোক জলশুদ্ধির মন্ত্র পড়ছে। এক কোষ জল নিয়ে গঙ্গা, যমুনা, গোদাবরী, সরস্বতী, নর্মদা, সিন্ধু, কাবেরী… এই সপ্ত পবিত্র নদীদেবীকে আহ্বান করে জলকে শুদ্ধ করে মাথায় দিয়ে তীর্থস্নানের ফল নিল। তারপর দুই হাত জোড় করে প্রাণের উৎস সূর্যকে প্রণাম করল। লোকটার সূর্যপ্রণামের দৃশ্য দেখার সময় রিয়াজের চোখ গেল উত্তর-পূর্ব কোণায় প্রাচীন মসজিদে গম্বুজের চূড়ায়। একটা লোহার পাত চকচক করছে রোদে।
এইসব দৃশ্য দেখতে দেখতে আবার কাঁঠালতলায় ফিরে এলো তারা। কাঁঠাল গাছটার উত্তরে মুসলমানদের গোরস্তান। খাঁ-খাঁ শূন্যতা। একটা গুইসাপ দিঘি থেকে উঠে গোরস্তানের বাঁশঝাড়ে ঢুকছে। ড্রাইভারের চোখ গোরস্তানের দিকে স্থির। গোরস্তান দেখে হয়তো মরহুম বাবা-মা বা আত্মীয়-স্বজনের কথা মনে পড়ে গেছে। চোখ দুটো কেমন উদাস।
রিয়াজের সারাশরীর ভিজে গেছে ঘামে। কাঁঠালতলায় একটা বাঁশের মাচায় বসে বাবার কথা ভাবছে সে। বাবার সেই কথাটা কানে ভাসছে, ‘ঐ দেখা যায় বাংলাদেশ।’ এত বছর পরেও বুঝে উঠতে পারছে না বাবা কেন দিঘিটা দেখিয়ে এই কথাটি বলতো।
কাটা ধানের মাঠ ধরে আবার তারা স্টেশনে পৌঁছল। মনতলা স্টেশন থেকে রিয়াজের গ্রামের বাড়ির দূরত্ব প্রায় আট মাইল। রাস্তা পাকা হয়েছে এখন, পৌঁছতে কুড়ি মিনিটের বেশি লাগবে না। চাচাকে ফোন করে বলেছে বাড়ি যাবে। বারবার ফোন দিচ্ছে চাচা। ভাতিজার জন্য বাজার থেকে গরুর মাংস নিয়েছে, ঘরের পালা মোরগ জবাই দিয়ে রোস্ট করেছে, পুকুরে জাল মেরে তেলাপিয়া মাছ তুলেছে। বারোটায় রান্নাবাড়া শেষ করে তার অপেক্ষায় বসে আছে চাচি।
খাওয়া-দাওয়া সারতে সারতে প্রায় সাড়ে চারটা বেজে গেল। রিয়াজ চেয়েছিল আজই ঢাকায় ফিরে যাবে। গ্রামকে সে ভালোবাসে, কিন্তু গ্রামে এসে থাকতে পারে না। সবচেয়ে বেশি অসুবিধায় পড়তে হয় টয়লেট নিয়ে। গ্রামের টয়লেটে তার পোষায় না। মনে হয় সাতবার গোসল করলেও শরীরটা পবিত্র হবে না। একবার রাজশাহীতে এক বন্ধুর বাড়ি গিয়ে এক রাত ছিল। রাতে পায়খানার বেগ পেলে লেট্টিনে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বেগটা হাওয়া! চাচা বলল, ঘরের পেছনে বাথরুম আছে, গত বছর টাইল্স বসিয়েছি, তোর কোনো অসুবিধা হবে না, একটা রাত থেকে যা বাবা।
থেকে গেল রিয়াজ। প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত চাচা-চাচি আর চাচাতো ভাই-বোনদের সঙ্গে গল্প করে ঘুমাতে গেল। বিছানায় শুতে যাওয়ার আগে সেগুন কাঠের আলমিরাটা দেখে শৈশবটা হানা দিল অতর্কিতে। তার বাবার স্মৃতিধন্য আলমিরা। বাবা তার বইপুস্তকগুলো এটাতে রাখত। মা চাইত সংসারের টুকিটাকি জিনিসপত্র রাখতে, বাবা দিত না। বলতো, এটা বই রাখার জন্য বানিয়েছি, বই ছাড়া আর কিছু রাখা যাবে না।
আলমিরাটার উপরের তাকে কয়েকটা বই এখনও আছে। কাচের দরজাটা খুলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ভারতবর্ষ’ বইখানা হাতে নিল রিয়াজ। ধুলো-ময়লা ঝেড়ে চুমু খেয়ে কপালে ঠেকাল। চোখ থেকে গড়িয়ে পড়তে লাগল বেদনার অশ্রু। বইটাতে লেগে আছে বাবার হাতের পরশ। যেন সে বাবাকে স্পর্শ করছে। বাবার ঘ্রাণ ঝাপটা দিচ্ছে নাকে। বইটা বুকে চেপে ধরে সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
ভোরে ঘুম থেকে উঠে দ্বিতীয়বার বাবা-মায়ের কবর জেয়ারত করল। চাচি তার জন্য পাকন, পাটিসাপটা আর নারকেলি পিঠা বানিয়েছে। কতদিন খায় না এসব পিঠা! পালা-পার্বনে রাত জেগে তার মা এসব পিঠা বানাতো। যেন মায়ের হাতের ছোঁয়া লেগে আছে পিঠাগুলাতে। সে চোখ মুছতে মুছতে খায়। তার কাঁন্না দেখে তার চাচা কাঁদে, চাচিও কাঁদে। বিদায়ের সময় চাচাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদল রিয়াজ। বয়স হয়েছে চাচার, কদিন বাঁচবে ঠিক নেই। আর কি কখনও দেখা হবে? চাচিকে কদমবুচি করল। চাচি তার মাথায় মায়ার হাত বুলিয়ে দিল। তারপর গাড়িতে উঠে বসল সে। গাড়িটা যখন রাস্তার বাঁকে পৌঁছল, পেছনে তাকিয়ে দেখল তখনও হাত নাড়ছে তার চাচা-চাচি। বুকটা হু-হু করে উঠল তার। মনতলা বাজার পৌঁছা পর্যন্ত অশ্রু থামল না।
ছুটির দিন। মহাসড়কে যানবাহনের সংখ্যা কম। রাস্তা ফাঁকা পেয়ে ঝড়ের বেগ তুলল ড্রাইভার। সিটে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল রিয়াজ। প্রায় আধাঘণ্টা ঘুমাল। আরও ঘুমাত, যদি না ড্রাইবার ডাকত। পেট্রল পাম্প থেকে তেল নিতে হবে, টাকা দরকার।
পেট্রল পাম্প থেকে বেরিয়ে গাড়ি ছুটতে শুরু করল আবার। রিয়াজের চোখে ভাসছে সন্ন্যাসীর দিঘির দৃশ্যাবলি। মসজিদের ঘাটলায় মুসল্লিদের অজু, জালাভিটায় দুই কৃষকের জল সেচা, বৌদ্ধবিহার, গেরুয়া চীবরের ভিক্ষু, বাবা জল্লাশাহর মাজার, বুড়ো খাদেম, ঘোষপাড়া, শুকোতে দেওয়া জাল, মন্দির, শ্মশান, দিঘির ঘাটে ছেলে-মেয়েদের ডুবসাঁতার, কোমরজলে দাঁড়িয়ে লোকটার সূর্যপ্রণাম।
এই দৃশ্যাবলির ফাঁকে ফাঁকে ভেসে ওঠে বাবার মুখখানা, তার উত্তোলিত আঙুলখানা। অঙুলি নির্দেশ করে বাবা বলছে, ‘দেখ দেখ বাবা, ঐ দেখা যায় বাংলাদেশ।’ কেন বলতো বাবা কথাটা? সত্যি সত্যি বলতো, না-কি তার সঙ্গে দুষ্টুমি করতো? এতটা বছর কেটে গেল, এত বড় হলো রিয়াজ, অথচ বাবার কথাটি এখনও বুঝতে পারল না। কে জানে কী রহস্য লুকিয়ে কথাটায়।
পাশের সিটে রাখা ‘ভারতবর্ষ’ বইটি হাতে নিল রিয়াজ। বাবার স্মৃতিধন্য বইটি সে ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছে। যতœ করে রাখবে। কালি-ময়লায় বিবর্ণ হয়ে পড়েছে। একটা টিস্যু দিয়ে বইটা আরেক দফা মুছে পাতা উল্টাল। কয়েক পাতা পড়ে আবার পাতা উল্টালে ‘বিজয়া-সম্মিলন’ প্রবন্ধটির একটা জায়গায় চোখ আটকে গেল। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘চিত্তকে প্রসারিত করো। যে চাষি চাষ করিয়া এতক্ষণ ঘরে ফিরিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, যে রাখাল ধেনুদলকে গোষ্ঠগৃহে এতক্ষণ ফিরাইয়া আনিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, শঙ্খমুখরিত দেবালয়ে যে পূজার্থী আগত হইয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, অস্তসূর্যের দিকে মুখ ফিরাইয়া যে মুসলমান নামাজ পড়িয়া উঠিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো। আজ সায়াহ্নে গঙ্গার শাখা-প্রশাখা বাহিয়া ব্রহ্মপুত্রের কূল-উপকূল দিয়া একবার বাংলাদেশের পূর্বে পশ্চিমে আপন অন্তরের আলিঙ্গন বিস্তার করিয়া দাও…।’
লেখাটা পড়া শেষ করে বাইরে তাকাল রিয়াজ। রৌদ্রতাপে পুড়ছে প্রকৃতি। গাড়ি ছুটছে শাঁই শাঁই। দৃশ্যের পর দৃশ্য মুছে যাচ্ছে। তার চোখে-মুখে বিচলিত ভাব জেগে উঠল হঠাৎ। শ্বাস-প্রশ্বাস ঘন হয়ে উঠতে লাগল। বাবার সেই কথাটির অর্থ সে খুঁজে পেয়েছে। চোখের সামনে আবার ভেসে উঠছে সন্ন্যাসীর দিঘির চারপাশের সেই দৃশ্যাবলি। কল্পচোখে সে দেখতে পায়, তর্জনীর ঈশারায় তার বাবা তাকে বলছে, ‘দেখ দেখ বাবা, ঐ দেখা যায় বাংলাদেশ।’

Category:

অশুভ রাজনৈতিক চর্চা করে বিএনপির পরিত্রাণ মিলবে না

Posted on by 0 comment

Mfdআশরাফ সিদ্দিকী বিটু: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা টানা চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। দেশে নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকার আরেকটি নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করল, যা সাংবিধানিকভাবে স্বতঃসিদ্ধ। নির্বাচন নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র হয়েছে, যা দেশবাসী নানাভাবে প্রত্যক্ষ করেছে। বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা নিয়ে নানা ধরনের বক্তব্য প্রদান করেছে, শেষমেশ ড. কামাল হোসেন, জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা কয়েকটি দল নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কামাল সাহেবদের দাবিকে সম্মান জানিয়ে সংলাপে অংশ নিয়েছেন এবং গণভবনে নিমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের সকল কথা শুনেছেন। ড. কামাল ও বিএনপি নেতৃবৃন্দের দাবির কারণে পুনরায় তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচনের তারিখ ৩০ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়।
বিএনপি নির্বাচনে তাদের দলীয় প্রার্থিতা বাছাই প্রক্রিয়ায় ব্যাপকভাবে মনোনয়ন বাণিজ্য করেছে। মনোনয়ন নিয়ে দলের ভিতরে-বাইরে বিক্ষোভ হয়েছে, দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়েছে। এতে দলের নেতাকর্মীসহ কয়েকজন সাংবাদিকও আহত হয়েছে। বিদেশে আমাদের দূতাবাসে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ফরম জমা দিতে গেছেন এবং মনোনয়ন না পেয়ে দূতাবাসের সামনেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। দ-িত অপরাধী তারেক রহমান বিদেশে বসে স্কাইপের মাধ্যমে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। প্রায় ৯০০-এর মতো প্রার্থীকে বিএনপি প্রাথমিকভাবে মনোনয়ন দিয়েছিল, পরে অনেকে আবার আদালতে দারস্থ হয়ে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ পেয়েছে। কারণ দল ঠিক করে দিতে পারেনি কে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেল। জাতি বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে নানা নাটকীয়তা দেখেছে। পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মূলত জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে চলা বিএনপির সাথে ঐক্য করে; যেখানে ২০ জনের বেশি যুদ্ধাপরাধী বা তাদের বংশধররা বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচন করে। এ বিষয়ে নৈতিক স্খলনের দায় ড. কামাল হোসেনরা এড়াতে পারেন না। এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করায় সাংবাদিকদের দেখে নেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন। ঐক্যফ্রন্ট জাতির সামনে ভালো কিছু উপস্থাপন করতেই পারেনি; বরং দ-িত অপরাধীকে নেতা মেনে নেওয়া, যুদ্ধাপরাধী ও তাদের বংশধরদের মনোনয়ন প্রদান এবং জামাতকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেওয়ার মাধ্যমে দেশবাসীর সামনে নানাবিধভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছেন; কিন্তু সদুত্তর দিতে পারেনি। তবে জামাত, জঙ্গি মদদদাতা, বিদেশে অর্থপাচারকারী, যুদ্ধাপরাধী, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলায় দ-িত আসামির আত্মীয়-পরিজনদের ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার সুযোগ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা-বিরোধীদের আবারও এদেশের রাজনীতিতে সুযোগ করে দেওয়ার ব্যবস্থাই করে দিয়েছে। সেই বৃত্ত থেকে ড. কামাল হোসেনরা আর বের হতে পারেন নি। নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির ইশতেহারে চাকরিতে প্রবেশের কোনো বয়সসীমা থাকবে না। বিশ্বের কোথাও এমন ব্যবস্থা আছে কি যে সরকারি চাকরিতে প্রবেশে কোনো বয়সসীমা থাকবে না? এমন প্রস্তাব হাস্যকর এবং দেশকে পিছিয়ে দেওয়ার নামান্তর মাত্র। ড. কামাল হোসেন আর বিএনপির ঐক্য আসলে পরিণত হয় স্বাধীনতা-বিরোধী, যুদ্ধাপরাধী, দ-িত আসামি এবং দলছুটদের ঐক্যে, যেখানে নীতিকথার আড়ালে অশুভ শক্তির উত্থান ঘটানোই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
বহু নীতিকথা বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্ট কপচিয়েছে; আসলে নীতিবিবর্জিতদের সামনে আনার চেষ্টা করেছেন এবং শেষতক তারা ব্যর্থ হয়েছেন। পাশাপাশি ২২ জামাত নেতাকে নির্বাচন করার সুযোগ দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে প্রতারণা করেছেন। নির্বাচনের আগে ড. কামাল সাহেবরা যেসব দাবি তুলেছিল সেগুলো সংবিধানসম্মত ছিল না এবং সংসদে নারী আসন ১৫ থেকে ১০ শতাংশে কমানোর দাবি খুব দূরভিসন্ধিমূলক ছিল।
বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নানাভাবে চেয়েছে নির্বাচনকে দেশে-বিদেশে প্রশ্নবিদ্ধ করে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করতে। কিন্তু বিএনপি-জামাত-ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন ঘিরে বহু অপকর্মে লিপ্ত ছিল। অথচ ড. কামাল হোসেন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, জামাতের নেতারা বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন পাবেন জানলে ঐক্যফ্রন্টের দায়িত্ব নিতেন না। এ-কথার মধ্য দিয়ে ড. কামাল যে সত্যের কাছে পরাজিত তা স্বীকার করলেন। ড. কামালরা ঐক্যের নামে গণতন্ত্র ও উন্নয়নকে ব্যাহত করতে চেয়েছে।
শরীয়তপুর-৩ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী তারেকের সাবেক এপিএস মিয়া নূরুদ্দীন আহম্মেদ অপুর প্রতিষ্ঠান আমেনা এন্টারপ্রাইজে অভিযান চালিয়ে কোম্পানির এক কর্মকর্তাসহ দুজনকে ৮ কোটি টাকা ও ১০ কোটি টাকার চেকসহ গ্রেফতার করেছিল র‌্যাব। পাশাপাশি পার্শ¦বর্তী বিতর্কিত একটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সাথে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতার ফোনালাপ থেকে ষড়যন্ত্রের বিষয়টি পরিষ্কার হয়। ওই গোয়েন্দা সংস্থার সাথে বিএনপির সখ্য বিএনপির জন্মলগ্ন থেকেই। স্যোশাল মিডিয়াতে গুজব ছড়ানোর জন্য ছাত্রশিবিরের আটজন আটক হয়েছিল।
এখানে উল্লেখ করতে চাই, জামাতের রাজনীতি রক্ষা ও বিশ্বে জামাতের পক্ষে জনমত গড়তে ২০১৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জামাতের পক্ষে ‘হাচ ব্ল্যাকওয়েল স্ট্র্যাটেজিস এলএলসি’র সঙ্গে চুক্তি করেছেন ‘অর্গানাইজেশন ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিস’-এর মো. জিয়াউল ইসলাম। ২০১৮-এর সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৯-এর সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত জামাতের পক্ষে তদবিরের জন্য ‘হাচ ব্ল্যাকওয়েল স্ট্র্যাটেজিস এলএলসি’ ১ লাখ ৩২ হাজার মার্কিন ডলার পাবে। এমনকি ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টাও করেছিল বিএনপি; কিন্তু ব্যর্থ হয়। নির্বাচন দেশে আর যোগাযোগ করে সহযোগিতা কামনা করে ভারতের কাছেÑ এই হলো বিএনপির চরিত্র। ধানের শীষে ভোট দিলে খালেদা জিয়া মুক্তি পাবে, যুদ্ধাপরাধী সাঈদী মুক্তি পাবেÑ এই বার্তার মাধ্যমে আইন লঙ্ঘন করেছে বিএনপি-জামাত। এমন বহু উদাহরণ দেওয়া যাবে যেসব থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় যে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনকে বানচাল করতে চেয়েছে।
বিএনপির গত এক দশকের রাজনীতি ও কর্মকা- বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জোট সরকারের অপকর্ম-জঙ্গি মদদ-বিদেশে অর্থপাচার, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, নির্বাচনে জয়ী হতে নীল নকশা করে ১ কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটার বানানোÑ এমন বহু অপকর্মের কারণে দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ব্যাহত হয়ে আসে বিতর্কিত সেনা সমর্থিত এক/এগারো-এর সরকার, যারা সময়মতো নির্বাচন দিতে ব্যর্থ হয়ে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে প্রায় দুই বছর পর নির্বাচন দেয়। সেই নির্বাচনে বিএনপি-জামাত জোটের ভয়াবহ ভরাডুবি হয়। এরপর থেকে বিএনপি-জামাত জোট আরও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। সংসদে গিয়ে খিস্তিখেউর করে। বিএনপি নেত্রী নবম সংসদে মাত্র ১০-১২ দিন উপস্থিত ছিলেন। বিএনপি নেত্রীসহ দলের সবাই সরাসরি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধে নেমে পড়ে। খালেদা জিয়া যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির জন্য জনসভায় বক্তব্য রাখেন। বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে নানা কথা বলে এবং কর্মসূচি দেয়। যুদ্ধাপরাধীদের রায়ের দিন হরতাল ডাকত। জামাত এই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করতে বিদেশে লবিস্ট নিয়োগ করে। যুদ্ধপরাধীদের রক্ষায় মত্ত হয়ে যেন মরণ কামড় দিতে ২০১৩ সাল থেকে দেশে সহিংসতা শুরু করে বিএনপি-জামাত। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে টানা অবরোধ দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করে। বাসে-ট্রাকে-রেলে আগুন দেয়। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সামনে কোরআন শরিফ পোড়ায়। দেশের বিভিন্ন স্থানে শহিদ মিনারে আগুন লাগায় ও ভাঙচুর করে। নির্বাচনের পরও টানা ১০০ দিন তারা সারাদেশে অবরোধের নামে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যায়। যার পরিণতিতে বিএনপি আরও জনবিচ্ছিন্ন হয়। রাজনীতিতে তাদের পিছনের দিকে হাঁটা চলতে থাকে দ্রুতগতিতে। মানুষের সামনে নিজেদের উপস্থাপনের সুযোগ তারা নষ্ট করে। উল্টো দেশের অগ্রযাত্রাকে তারা ব্যাহত করতে চায়। মানুষের জীবন বিপন্ন করে তাদের হীনস্বার্থ হাসিল করতে গিয়ে এহেন কোনো অপকর্ম নেই যে বিএনপি করেনি। পরিফল হলো আজকের এই ব্যর্থতার পাহাড় যেখানে নেতাকর্মী সবাই হতাশ। মানুষের সামনে নতজানু। এতিমের টাকা আত্মসাৎ ও দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়া জেলে। বিএনপির কিছুই করণীয় নেই। কারণ দলের শীর্ষ নেতৃত্ব আকণ্ঠ দুর্নীতি ও অপকর্মে নিমজ্জিত থাকলে নেতাকর্মীরা হতাশ হবেই। মাথায় পচন ধরলে যে-অবস্থা হয় সে-অবস্থা এখন বিএনপির।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামাতের হারের অনেক কারণ রয়েছে। এই পরাজয় বিএনপির দিশেহারা অবস্থাকে তীব্রভাবে প্রকাশ করছে। নির্বাচনে প্রমাণ হয়েছে দলের তৃণমূলের সাথে কেন্দ্রের মতানৈক্য অনেক। শীর্ষ নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ। লন্ডন থেকে এক বার্তা আসে আর জেলখানা থেকে আরেক বার্তা আসে। নির্বাচনে যে কয়টি মাত্র আসনে বিএনপি জয়লাভ করেছে, সেসব প্রার্থীরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ না নিয়ে আরও অপরিপক্বতার পরিচয় দিচ্ছে। গণতন্ত্রে বিশ্বাসী হলে তাদের সংসদে গিয়ে কথা বলা উচিত। কিন্তু সংসদে না গেলে জনগণের কাছে তারা অতীতের মতো প্রত্যাখ্যাত হবে। মূলত দলের ভিতরে ও বাইরে দীর্ঘদিন ধরে চলা অচলাবস্থার কারণে এই ব্যর্থ-দিশেহারা অবস্থা আরও প্রলম্বিত হবে। নেতৃত্বের সংকট এখন প্রকট ও প্রবল, যা থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথ বিএনপিই খোলা রাখেনি। খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে নিজেকে না শুধরালে পরিণত কী হবে তা সহজেই অনুমেয়!
ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতে চলে, ইতিহাসের মুখোমুখি হতে যারা ভয় পায় তাদের পরিণতি ভয়াবহ। সামনের সময় আরও কঠিন সেখানে ব্যর্থ ও পঙ্কিল মতাদর্শ এবং অশুভ রাজনীতির চর্চাকে কেউ সাধুবাদ জানাবে না।

Category:

পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী তালিকা

Posted on by 0 comment

Mfdরায়হান কবির:

প্রথম ধাপের নির্বাচন
১০ মার্চ ২০১৯ (৮৭টি উপজেলা)
পঞ্চগড় : পঞ্চগড় সদর – মো. আমিরুল ইসলাম, তেঁতুলিয়া – কাজী মাহামুদুর রহমান, দেবীগঞ্জ – মো. হাসনাৎ জামান চৌধুরী (জর্জ), বোদা – মো. ফারুক আলম, আটোয়ারি – মো. তৌহিদুল ইসলাম।
নীলফামারী : নীলফামারী সদর – শাহিদ মাহমুদ, ডোমার – তোফায়েল আহমেদ, সৈয়দপুর – মো. তবিবুল ইসলাম (বীর মুক্তিযোদ্ধা), কিশোরগঞ্জ – মো. জাকির হোসেন বাবুল, জলঢাকা – মো. আনছার আলী (মিন্টু)।
লালমনিরহাট : লালমনিরহাট সদর – মো. নজরুল হক পটোয়ারী ভোলা, পাটগ্রাম – মো. রুহুল আমিন বাবুল, হাতীবান্ধা – মো. লিয়াকত হোসেন, আদিতমারী – মো. রফিকুল আলম, কালীগঞ্জ – মাহবুবুজ্জামান আহমেদ।
কুড়িগ্রাম : নাগেশ^রী – মোস্তফা জামান, উলিপুর – মো. গোলাম হোসেন মন্টু, চিলমারী – শওকত আলী সরকার, রৌমারী – মো. মজিবুর রহমান, ভুরুঙ্গামারী – মো. নুরুন্নবী চৌধুরী, রাজারহাট – আবু নুর মো. আক্তারুজ্জামান, ফুলবাড়ী – মো. আতাউর রহমান, রাজিবপুর – মো. শফিউল আলম, কুড়িগ্রাম সদর – আমান উদ্দিন আহমেদ।
জয়পুরহাট : জয়পুরহাট সদর – এসএম সোলায়মান আলী, পাঁচবিবি – মো. মনিরুল শহিদ ম-ল, আক্কেলপুর – মো. মোকছেদ আলী ম-ল, কালাই- মো. মিনফুজুর রহমান, ক্ষেতলাল -মো. মোস্তাকিম ম-ল।
রাজশাহী : পবা – মো. মুনসুর রহমান, তানোর – মো. লুৎফর হায়দার রশীদ, পুঠিয়া – মো. জিএম হিরা বাচ্চু, দূর্গাপুর – মো. নজরুল ইসলাম, বাঘা – মো. লায়েব উদ্দীন, গোদাগাড়ী – জাহাঙ্গীর আলম, চারঘাট – মো. ফকরুল ইসলাম, মোহনপুর – মো. আব্দুস সালাম, বাগমারা – অনিল কুমার সরকার।
নাটোর : নাটোর সদর – মো. শরিফুল ইসলাম রমজান, গুরুদাসপুর – মো. জাহিদুল ইসলাম, বাগাতিপাড়া – মো. সেকেন্দার রহমান, সিংড়া – মো. শফিকুল ইসলাম, বড়াইগ্রাম – মো. সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী, লালপুর – মো. ইসাহাক আলী।
সিরাজগঞ্জ : সিরাজগঞ্জ সদর – মোহাম্মদ রিয়াজ উদ্দিন, চৌহালী – মো. ফারুক হোসেন, কাজীপুর – মো. খলিলুর রহমান সিরাজী, রায়গঞ্জ – ইমরুল হোসেন তাং, উল্লাপাড়া – মো. শফিকুল ইসলাম, শাহজাদপুর – মো. আজাদ রহমান, বেলকুচি – মো. আলী আকন্দ, তাড়াশ – সঞ্জিত কুমার কর্মকার।
জামালপুর : জামালপুর সদর – মোহাম্মদ আবুল হোসেন, বকশীগঞ্জ – একেএম সাইফুল ইসলাম, দেওয়ানগঞ্জ – মো. আবুল কালাম আজাদ, মেলান্দহ – মো. কামরুজ্জামান, মাদারগঞ্জ – মো. ওবায়দুর রহমান বেলাল, সরিষাবাড়ী – মো. গিয়াস উদ্দিন পাঠান, ইসলামপুর – এসএম জামাল আব্দুন নাছের।
নেত্রকোনা : নেত্রকোনা সদর – মো. তফসির উদ্দিন খান, খালিয়াজুরী – গোলাম কিবরিয়ার জব্বার, দূর্গাপুর – মোহাম্মদ এমদাদুল হক খান, মোহনগঞ্জ – মো. শহীদ ইকবাল, বারহাট্টা – মো. গোলাম রসুল তালুকদার, কলমাকান্দা – মো. আব্দুল খালেক, মদন – মো. হাবিবুর রহমান, পূর্বধলা – জাহিদুল ইসলাম সুজন, কেন্দুয়া – মো. নুরুল ইসলাম।
হবিগঞ্জ : হবিগঞ্জ সদর – মো. মশিউর রহমান শামীম, নবীগঞ্জ – মো. আলমগীর চৌধুরী, লাখাই – মো. মুশফিউল আলম আজাদ, বাহুবল – মো. আব্দুল হাই, মাধবপুর – আলহাজ আতিকুর রহমান, চুনারুঘাট – মো. আব্দুল কাদির লস্কর, আজমিরীগঞ্জ – মো. মর্ত্তুজা হাসান, বানিয়াচং – মো. আবুল কাশেম চৌধুরী।
সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জ সদর – মো. খায়রুল হুদা, জামালগঞ্জ – মো. ইউসুফ আল আজাদ, শাল্লা – চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মাহমুদ, বিশ্বম্ভরপুর – মো. রফিকুল ইসলাম তালুকদার, ধর্মপাশা – শামীম আহমেদ মুরাদ, ছাতক – মো. ফজলুর রহমান, দোয়ারাবাজার – আব্দুর রহিম, দিরাই – প্রদীপ রায়, তাহিরপুর – করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবলু, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ – মো. আবুল কালাম।

দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচন
১৮ মার্চ ২০১৯ (১২৯টি উপজেলা)
ঠাকুরগাঁও : ঠাকুরগাঁও সদর – অরুনাংশু দত্ত টিটো, পীরগঞ্জ – মো. আখতারুল ইসলাম, রাণীশংকৈল – মো. সইদুল হক, হরিপুর – মো. জিয়াউল হাসান, বালিয়াডাঙ্গী – মো. আহসান হাবীব বুলবুল।
রংপুর : পীরগাছা – আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ মিলন, তারাগঞ্জ – মো. আনিছুর রহমান, বদরগঞ্জ – মো. ফজলে রাব্বি, কাউনিয়া – আনোয়ারুল ইসলাম, পীরগঞ্জ – নূর মোহাম্মদ ম-ল, গংগাচড়া – মো. রুহুল আমিন।
গাইবান্ধা : গাইবান্ধা সদর – মো. পিয়ারুল ইসলাম, সাদুল্লাপুর – মো. সাহারিয়া খাঁন, গোবিন্দগঞ্জ – মো. আব্দুল লতিফ প্রধান, ফুলছড়ি – জিএম সেলিম পারভেজ, সাঘাটা – এসএম সামশীল আরেফিন, পলাশবাড়ী – একেএম মোকছেদ চৌধুরী।
দিনাজপুর : দিনাজপুর সদর – ইমদাদ সরকার, কাহারোল – একেএম ফারুক, বিরল – একেএম মোস্তাফিজুর রহমান, বোচাগঞ্জ – মো. আফছার আলী, চিরিরবন্দর – মো. আহসানুল হক, ফুলবাড়ী – মো. আতাউর রহমান মিল্টন, বিরামপুর – মো. খায়রুল আলম, হাকিমপুর – মো. হারুন উর রশিদ, বীরগঞ্জ – মো. আমিনুল ইসলাম, নবাবগঞ্জ – মো. আতাউর রহমান, পার্বতীপুর – মো. হাফিজুল ইসলাম প্রামাণিক, খানসামা – মো. সফিউল আযম চৌধুরী, ঘোড়াঘাট – মো. আব্দুর রাফে খন্দকার।
বগুড়া : বগুড়া সদর – মো. আবু সুফিয়ান, নন্দীগ্রাম – মো. রেজাউল আশরাফ, সারিয়াকান্দি – অধ্যক্ষ মুহম্মদ মুনজিল আলী সরকার, আদমদীঘি – মো. সিরাজুল ইসলাম খান রাজু, দুপচাঁচিয়া – মো. মিজানুর রহমান খান, ধুনট – মো. আব্দুল হাই (খোকন), শাজাহানপুর – মো. সোহরাব হোসেন, শেরপুর – মো. মজিবর রহমান মজনু, শিবগঞ্জ – মো. আজিজুল হক, কাহালু – মো. আব্দুল মান্নান, গাবতলী – রফি নেওয়াজ খান, সোনাতলা – মো. মিনহাদুজ্জামান লীটন।
নওগাঁ : নওগাঁ সদর – মো. রফিকুল ইসলাম (রফিক), আত্রাই – মো. এবাদুর রহমান প্রামাণিক, নিয়ামতপুর – ফরিদ আহমেদ, সাপাহার – মো. শামছুল আলম শাহ্্ চৌধুরী, পোরশা – মো. আনোয়ারুল ইসলাম, ধামইরহাট – মো. আজাহার আলী, বদলগাছী – মো. আবু খালেদ বুলু, রাণীনগর – মো. আনোয়ার হোসেন, মহাদেবপুর – মো. আহসান হাবীব, পতœীতলা – মো. আব্দুল গাফ্ফার, মান্দা – মো. জসিম উদ্দীন।
পাবনা : পাবনা সদর – মো. মোশারোফ হোসেন, আটঘরিয়া – মো. মোবারক হোসেন, বেড়া – মো. আব্দুল কাদের, ভাঙ্গুড়া – মো. বাকি বিল্লাহ, চাটমোহর – সাখাওয়াত হোসেন সাখো, ঈশ^রদী – মো. নুরুজ্জামান বিশ্বাস, সাঁথিয়া – মো. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, সুজানগর – শাহীনুজ্জামান, ফরিদপুর – মো. খলিলুর রহমান সরকার।
ফরিদপুর : ফরিদপুর সদর – মোহা. আব্দুর রাজ্জাক মোল্লা, বোয়ালমারী – এমএম মোশাররফ হোসেন, চরভদ্রাসন – মো. কাউছার, সদরপুর – এইচএম শায়েদীদ গামাল লিপু, সালথা – মো. দেলোয়ার হোসেন, আলফাডাঙ্গা – এসএম আকরাম হোসেন, মধুখালী – মির্জা মনিরুজ্জামান বাচ্চু, নগরকান্দা – মো. মনিরুজ্জামান সরদার, ভাঙ্গা – মো. জাকির হোসেন মিয়া।
সিলেট : সিলেট সদর – আশফাক আহমেদ, বিশ^নাথ – মো. নুনু মিয়া, দক্ষিণ সুরমা – মো. আবু জাহিদ, ফেঞ্চুগঞ্জ – শাহ মুজিবুর রহমান জকন, বালাগঞ্জ – মো. মোস্তকুর রহমান, কোম্পানীগঞ্জ – মো. জাহাঙ্গীর আলম, গোয়াইনঘাট – মো. গোলাম কিবরিয়া হেলাল, জৈন্তাপুর – লিয়াকত আলী, কানাইঘাট – আব্দুল মোমিন চৌধুরী, জকিগঞ্জ – মো. লোকমান উদ্দিন চৌধুরী, গোলাপগঞ্জ – ইকবাল আহমদ চৌধুরী, বিয়ানীবাজার – আতাউর রহমান খান।
মৌলভীবাজার : বড়লেখা – মো. রফিকুল ইসলাম, জুড়ী – গুলশান আরা মিলি, কুলাউড়া – মো. কামরুল ইসলাম, রাজনগর – মো. আছকির খান, মৌলভীবাজার সদর – মো. কামাল হোসেন, কমলগঞ্জ – মো. রফিকুর রহমান, শ্রীমঙ্গল – রনধীর কুমার দেব।
নোয়াখালী : হাতিয়া – মো. মাহবুব মোর্শেদ।
চট্টগ্রাম : সন্দ্বীপ – মো. শাহজাহান, সীতাকু- – এসএম আল মামুন, রাঙ্গুনিয়া – খলিলুর রহমান চৌধুরী, ফটিকছড়ি – মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন, মীরসরাই – মো. জসিম উদ্দিন, রাউজান – একেএম এহেছানুল হায়দর চৌধুরী, হাটহাজারী – এসএম রাশেদুল আলম।
রাঙ্গামাটি : কাউখালী – মো. সামশু দোহা চৌধুরী, রাঙ্গামাটি সদর – মো. শহীদুজ্জামান মহসীন, রাজস্থলী – উবাচ মারমা, লংগদু – মো. আবদুল বারেক সরকার, বিলাইছড়ি – জয় সেন তঞ্চঙ্গ্যা, কাপ্তাই – মো. মফিজুল হক, বরকল – সবির কুমার চাকমা, জুড়াছড়ি – রুপ কুমার চাকমা, বাঘাইছড়ি – মো. ফয়েজ আহমেদ।
খাগড়াছড়ি : খাগড়াছড়ি সদর – মো. শানে আলম, মানিকছড়ি – মো. জয়নাল আবেদীন, লক্ষ্মীছড়ি – বাবুল চৌধুরী, দীঘিনালা – মো. কাশেম, মহালছড়ি – ক্যজাই মার্মা, পানছড়ি – বিজয় কুমার দেব, মাটিরাঙ্গা – মো. রফিকুল ইসলাম, রামগড় – বিশ্ব প্রদীপ কুমার কারবারী।
বান্দরবান : বান্দরবান সদর – একেএম জাহাঙ্গীর, রোয়াংছড়ি – চহাইমং মারমা, আলীকদম – জামাল উদ্দীন, থানছি – থোয়াই হলা মং মারমা, লামা – মো. মোস্তফা জামাল, রুমা – উহলাচিং মার্মা, নাইক্ষ্যংছড়ি – মেহাম্মদ শফিউল্লাহ্্।
কক্সবাজার : চকরিয়া – গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী।

তৃতীয় ধাপের নির্বাচন
২৪ মার্চ ২০১৯ (১২৭টি উপজেলা)
রংপুর : রংপুর সদর – মোছা. নাছিমা জামান (ববি), মিঠাপুকুর – মো. জাকির হোসেন সরকার।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ : ভোলাহাট – মো. রাব্বুল হোসেন, গোমস্তাপুর – মো. হুমায়ুন রেজা, নাচোল – মোহা. আব্দুল কাদের, শিবগঞ্জ – সৈয়দ নজরুল ইসলাম।
মেহেরপুর : মেহেরপুর সদর – মো. ইয়ারুল ইসলাম, মুজিবনগর – মো. জিয়াউদ্দিন বিশ^াস, গাংনী – এমএ খালেক।
কুষ্টিয়া : কুষ্টিয়া সদর – মো. আতাউর রহমান, ভেড়ামারা – মো. আক্তারুজ্জামান মিঠু, কুমারখালী – মো. আব্দুল মান্নান খান, মিরপুর – মো. কামারুল আরেফিন, খোকসা – মো. সদর উদ্দিন খান, দৌলতপুর – এজাজ আহমেদ মামুন।
চুয়াডাঙ্গা : চুয়াডাঙ্গা সদর – মো. আশাদুল হক বিশ্বাস, আলমডাঙ্গা – মো. জিল্লুর রহমান, দামুড়হুদা – মো. সিরাজুল আলম (ঝন্টু), জীবননগর – আবু মো. আব্দুল লতিফ অমল।
ঝিনাইদহ : ঝিনাইদহ সদর – মো. আব্দুর রশীদ, শৈলকুপা – মো. নায়েব আলী জোয়ার্দ্দার, হরিণাকু-ু – মো. মশিউর রহমান জোয়ার্দ্দার, কালীগঞ্জ – মো. জাহাঙ্গীর সিদ্দিক।
মাগুরা : মহম্মদপুর – মো. আ. মান্নান, মাগুরা সদর – মো. আবু নাসির বাবলু, শ্রীপুর – পঙ্কজ কুমার সাহা, শালিখা – শ্যামল কুমার দে।
নড়াইল : নড়াইল সদর – মো. নিজামউদ্দিন খান নিলু, কালিয়া – কৃষ্ণ পদ ঘোষ, লোহাগড়া – মো. রাশিদুল বাসার (ডলার)।
সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরা সদর – মো. আসাদুজ্জামান বাবু, আশাশুনি – এবি এমডি মোস্তাকিম, শ্যামনগর – এসএম আতাউল হক, কালিগঞ্জ – শেখ আতাউর রহমান, কলারোয়া – ফিরোজ আহম্মেদ স্বপন, তালা – ঘোষ সনৎ কুমার, দেবহাটা – মো. আ. গনি।
বরিশাল : বরিশাল সদর – সাইদুর রহমান রিন্টু, বাকেরগঞ্জ – মোহাম্মদ শামসুল আলম, বাবুগঞ্জ – কাজী ইমদাদুল হক, বানারীপাড়া – মো. গোলাম ফারুক, উজিরপুর – আব্দুল মজিদ সিকদার (বাচ্চু), গৌরনদী – সৈয়দা মনিরুন নাহার মেরী, আগৈলঝাড়া – আব্দুর রইচ সেরনিয়াবাত, মুলাদী – মো. তারিকুল হাসান খান মিঠু, হিজলা – সুলতান মাহমুদ।
ঝালকাঠী : ঝালকাঠী সদর – খান আরিফুর রহমান, নলছিটি – মো. সিদ্দিকুর রহমান, রাজাপুর – মো. মনিরউজ্জামান, কাঁঠালিয়া – মো. এমাদুল হক।
ভোলা : বোরহান উদ্দিন – আবুল কালাম।
শেরপুর : নালিতাবাড়ী – মো. মোশারফ হোসেন, শ্রীবরদী – মো. আশরাফ হোসেন খোকা, ঝিনাইগাতী – এসএম আব্দুল্লাহেল ওয়ারেজ নাইম।
মাদারীপুর : শিবচর – মো. শামসুদ্দিন খান, কালকিনি – মীর গোলাম ফারুক, রাজৈর – মো. আ. মোতালেব মিয়া।
শরীয়তপুর : শরীয়তপুর সদর – মো. আবুল হাসেম তপাদার, জাজিরা – মোবারাক আলী সিকদার, নড়িয়া – একেএম ইসমাইল হক, ভেদরগঞ্জ – মো. হুমায়ুন কবীর, ডামুড্যা – মো. আলমগীর, গোসাইরহাট – সৈয়দ নাসির উদ্দিন।
রাজবাড়ী : রাজবাড়ী সদর – মো. সফিকুল ইসলাম, বালিয়াকান্দি – মো. আবুল কালাম আজাদ, গোয়ালন্দ – মো. নুরুল ইসলাম, পাংশা – একেএম শফিকুল মোরশেদ।
মানিকগঞ্জ : মানিকগঞ্জ সদর – মো. ইসরাফিল হোসেন, দৌলতপুর – মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম রাজা, ঘিওর – মো. হাবিবুর রহমান, শিবালয় – রেজাউর রহমান খান, হরিরামপুর – দেওয়ান সাইদুর রহমান, সাটুরিয়া – আব্দুল মজিদ ফটো, সিঙ্গাইর – মো. শহিদুর রহমান।
গাজীপুর : গাজীপুর – মো. আমানত হোসেন খান, কালিয়াকৈর – মো. রেজাউল করিম, শ্রীপুর – আলহাজ মো. আ. জলিল, কালীগঞ্জ – মো. মোয়াজ্জেম হোসেন।
নরসিংদী : নরসিংদী সদর – আফতাব উদ্দিন ভূঞা, পলাশ – সৈয়দ জাবেদ হোসেন, শিবপুর – মো. হারুনুর রশীদ খান, মনোহরদী – মো. সাইফুল ইসলাম খান, বেলাবো – মোহাম্মদ সমসের জামান ভূঞা, রায়পুরা – মিজানুর রহমান।
কিশোরগঞ্জ : কিশোরগঞ্জ সদর – সাকাউদ্দিন আহাম্মদ রাজন, হোসেনপুর – মো. শাহ জাহান পারভেজ, কটিয়াদি – তানিয়া সুলতানা, পাকুন্দিয়া – মো. রফিকুল ইসলাম (রেনু), তাড়াইল – মো. আজিজুল হক, করিমগঞ্জ – মো. নাসিরুল ইসলাম খান, ইটনা – চৌধুরী কামরুল হাসান, মিঠামইন – আছিয়া আলম, অষ্টগ্রাম – শহীদুল ইসলাম, নিকলী – কারার সাইফুল ইসলাম, বাজিতপুর – ছারওয়ার আলম, কুলিয়ারচর – ইয়াছির মিয়া, ভৈরব – মো. সায়দুল্লাহ্ মিয়া।
চাঁদপুর : চাঁদপুর সদর – মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম দেওয়ান, কচুয়া – মো. শাহজাহান, মতলব উত্তর – এমএ কুদ্দুস, মতলব দক্ষিণ – এএইচএম গিয়াস উদ্দিন, ফরিদগঞ্জ – মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম, হাজীগঞ্জ – গাজী মাঈনুদ্দিন, শাহরাস্তি – ফরিদ উল্যাহ চৌধুরী।
লক্ষ্মীপুর : লক্ষ্মীপুর সদর – আবুল কাশেম চৌধুরী, রামগঞ্জ – মনির হোসেন চৌধুরী, রায়পুর – মামুনুর রশিদ, কমলনগর – রেবেকা বেগম, রামগতি – আবদুল ওয়াহেদ।
চট্টগ্রাম : বোয়ালখালী -মো. নুরুল আলম, পটিয়া- মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী, আনোয়ারা- তৌহিদুল হক চৌধুরী, চন্দনাইশ- একেএম নাজিম উদ্দিন, লোহাগাড়া- খোরশেদ আলম চৌধুরী, বাঁশখালী- চৌধুরী মোহাম্মদ গালিব সাদলী।
কক্সবাজার : কক্সবাজার সদর – কায়সারুল হক জুয়েল, পেকুয়া -আবুল কাশেম, কুতুবদিয়া- মো. ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী, মহেশখালী – মোহাম্মদ হোছাইন ইবরাহীম, রামু- রিয়াজ উল আলম, উখিয়া- হামিদুল হক চৌধুরী, টেকনাফ- মোহাম্মদ আলী।

চতুর্থ ধাপের নির্বাচন
৩১ মার্চ ২০১৯ (১২২টি উপজেলা)
যশোর : যশোর সদর – মো. শাহীন চাকলাদার, ঝিকরগাছা – মোহাম্মদ আলী, চৌগাছা – মো. মোস্তানিছুর রহমান, বাঘারপাড়া – মো. হাসান আলী, অভয়নগর – শাহ ফরিদ জাহাঙ্গীর, মনিরামপুর – নাজমা খানম, কেশবপুর – এইচএম আমির হোসেন, শার্শা – সিরাজুল হক।
খুলনা : রূপসা – মো. কামাল উদ্দীন, তেরখাদা – মো. সরফুদ্দিন বিশ্বাস বাচ্চু, দিঘলিয়া – খান নজরুল ইসলাম, বটিয়াঘাটা – মো. আশরাফুল আলম খান, দাকোপ – এসএম আবুল হোসেন, পাইকগাছা – গাজী মোহাম্মদ আলী, কয়রা – জিএম মোহসিন রেজা, ডুমুরিয়া – মো. মোস্তফা সরোয়ার, ফুলতলা – শেখ আকরাম হোসেন।
বাগেরহাট : রামপাল – সেখ মোয়াজ্জেম হোসেন, মোল্লাহাট – শাহীনুল আলম ছানা, চিতলমারী – অশোক কুমার বড়াল, বাগেরহাট সদর – সরদার নাসির উদ্দিন, কচুয়া – এসএম মাহাফুজুর রহমান, ফকিরহাট – স্বপন কুমার দাশ, মোংলা – আবু তাহের হাওলাদার, মোড়েলগঞ্জ – মো. শাহ-ই-আলম বাচ্চু, শরণখোলা – কামাল উদ্দিন আকন।
পটুয়াখালী : পটুয়াখালী সদর – মো. গোলাম সরোয়ার, মির্জাগঞ্জ – গাজী আতহার উদ্দিন আহম্মেদ, দুমকী – হারুন-অর-রশীদ হাওলাদার, বাউফল – আবদুল মোতালেব হাওলাদার, দশমিনা – মো. আব্দুল আজীজ, গলাচিপা – মুহম্মদ সাহিন, কলাপাড়া – এসএম রাকিবুল আহসান।
ভোলা : ভোলা সদর – মো. মোশারফ হোসেন, দৌলতখান – মনজুর আলম খান, লালমোহন – গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, তজুমদ্দিন – মো. ফজলুল হক, চরফ্যাশন – মো. জয়নাল আবেদীন, মনপুরা – শেলিনা আকতার।
বরগুনা : বরগুনা সদর – শাহ্ মোহাম্মদ ওয়ালি উল্লাহ্, আমতলী – জিএম দেলোয়ার, বেতাগী – মো. মাকসুদুর রহমান (ফোরকান), বামনা – মো. সাইতুল ইসলাম লিটু, পাথরঘাটা – মো. আলমগীর হোসেন।
পিরোজপুর : পিরোজপুর সদর – মো. মজিবুর রহমান, ইন্দুরকানী – এম মতিউর রহমান, মঠবাড়িয়া – হোসাইন মোসারেফ সাকু, ভা-ারিয়া – মো. মিরাজুল ইসলাম, কাউখালী – কাজী রুহিয়া বেগম, নেছারাবাদ – এসএম মুইদুল ইসলাম, নাজিরপুর – অমূল্য রঞ্জন হালদার।
টাঙ্গাইল : ধনবাড়ী – মো. হারুনার রশিদ, মধুপুর – মো. ছরোয়ার আলম খান আবু, গোপালপুর – মো. ইউনুস ইসলাম তালুকদার, ভুঞাপুর – মো. আব্দুল হালিম, ঘাটাইল – মো. শহিদুল ইসলাম লেবু, কালিহাতী – মো. মোজহারুল ইসলাম তালুকদার, টাঙ্গাইল সদর – শাহ্ জাহান আনছারী, দেলদুয়ার – মো. ফজলুল হক, নাগরপুর – মো. কুদরত আলী, মির্জাপুর – মীর এনায়েত হোসেন মন্টু, বাসাইল – মো. মতিয়ার রহমান, সখিপুর – জুলফিকার হায়দার কামাল।
ঢাকা : নবাবগঞ্জ – আব্দুল বাতেন মিয়া, দোহার – মো. আলমগীর হোসেন, কেরানীগঞ্জ – শাহীন আহমেদ, ধামরাই – অধ্যাপক মো. মিজানুর রহমান মিজান, সাভার – মঞ্জুরুল    আলম রাজিব।
মুন্সীগঞ্জ : মুন্সীগঞ্জ সদর – আনিছউজ্জামান, টঙ্গিবাড়ী – ইঞ্জিনিয়ার কাজী আবদুল ওয়াহিদ, লৌহজং – মো. ওসমান গনী তালুকদার, শ্রীনগর – মো. তোফাজ্জল হোসেন, সিরাজদিখান – মহিউদ্দিন আহমেদ, গজারিয়া – আমিরুল ইসলাম।
নারায়ণগঞ্জ : সোনারগাঁ – মো. মোশারফ হোসেন, আড়াইহাজার – মুজাহিদুর রহমান হেলো সরকার, রূপগঞ্জ – মো. শাহজাহান ভূঁইয়া।
ময়মনসিংহ : হালুয়াঘাট – মাহমুদুল হক সায়েম, ধোবাউড়া – প্রিয়তোষ চন্দ্র বিশ্বাস, ফুলপুর – মোহাম্মদ হাবিবুুর রহমান, গৌরীপুর – বিধুভূষণ দাস, ময়মনসিংহ সদর – আশরাফ হোসাইন, মুক্তাগাছা – মো. বিল্লাল হোসেন সরকার, ফুলবাড়ীয়া – মো. আব্দুল মালেক সরকার, ত্রিশাল – মো. ইকবাল হুসেন, ঈশ্বরগঞ্জ – মাহমুদ হাসান সুমন, নান্দাইল – আ. মালেক চৌধুরী, গফরগাঁও – কায়সার আহাম্মদ, ভালুকা – মো. গোলাম মোস্তফা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া : ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর – মো. জাহাংগীর আলম, সরাইল – মো. শফিকুর রহমান, নাসিরনগর – রাফি উদ্দিন আহম্মদ, আখাউড়া – আবুল কাশেম ভূঁইয়া, আশুগঞ্জ – মো. হানিফ মুন্সী, নবীনগর – কাজী জহির উদ্দিন সিদ্দিক, কসবা – মো. রাশেদুল কাওসার ভূঁইয়া।
নোয়াখালী : সুবর্ণচর – এএইচএম খায়রুল আনম চৌধুরী, কবিরহাট – কামরুন নাহার শিউলী, কোম্পানীগঞ্জ – মোহাম্মদ শাহাব উদ্দিন, চাটখিল – মো. বিল্লাল চৌধুরী, সোনাইমুড়ী – খন্দকার আর আমিন, সেনবাগ – জাফর আহাম্মদ চৌধুরী, বেগমগঞ্জ – ওমর ফারুক বাদশা।
ফেনী : ফেনী সদর – আবদুর রহমান (বি.কম), দাগণভূঁঞা – মো. দিদারুল কবির, ফুলগাজী – মো. আব্দুল আলিম, সোনাগাজী – জহির উদ্দিন মাহমুদ (লিপটন), ছাগলনাইয়া – মেজবাউল হায়দার চৌধুরী, পরশুরামপুর – কামাল উদ্দিন।
কুমিল্লা : চান্দিনা – তপন বক্সী, মেঘনা – মো. সাইফুল্লাহ মিয়া রতন শিকদার, হোমনা – রেহানা বেগম, মুরাদনগর – আহসানুল আলম কিশোর, লাকসাম – মো. ইউনুছ ভূঁইয়া, দেবিদ্বার – মো. জয়নুল আবেদীন, তিতাস – মো. শাহিনুল ইসলাম, বুড়িচং – আবুল হাসেম খান, নাঙ্গলকোট – মো. সামছুউদ্দিন (কালু), চৌদ্দগ্রাম – আবদুস ছোবহান ভূঁইয়া, মনোহরগঞ্জ – মোহাম্মদ জাকির হোসেন, ব্রাহ্মণপাড়া – মো. জাহাঙ্গীর খান চৌধুরী, বরুড়া – এএনএম মইনুল ইসলাম।

 

Category:

ঢাকা উত্তরে নবনির্বাচিত মেয়র আতিকুল ইসলাম

Posted on by 0 comment

Mfdউত্তরণ প্রতিবেদন: ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র পদের উপনির্বাচনে বিশাল ব্যবধানে জয় পেয়েছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আতিকুল ইসলাম।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র পদে উপনির্বাচন, দুটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে উপনির্বাচন ও নতুন ১৮টি ওয়ার্ডের সাধারণ নির্বাচন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) নতুন ১৮টি ওয়ার্ডের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। চরম বৈরী আবহাওয়া থাকা সত্ত্বেও ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেন। অত্যন্ত অবাধ সুষ্ঠু পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র পদে নৌকা প্রতীক নিয়ে আতিকুল পেয়েছেন ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৩০২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জাতীয় পার্টির শাফিন আহমেদ লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৫২ হাজার ৪২৯ ভোট। নির্বাচনে অন্য প্রার্থীদের মধ্যে ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মো. আনিসুর রহমান দেওয়ান আম প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৮ হাজার ৬৯৫ ভোট, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক পার্টির শাহীন খান বাঘ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৮ হাজার ৫৬০ ভোট ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আব্দুর রহিম টেবিল ঘড়ি প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ১৪ হাজার ৪০ ভোট।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির এই নির্বাচনে ৩২৩ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। উত্তরের সম্প্রসারিত ১৮টি ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১১৬ জন ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৪৫ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে যুক্ত হওয়া নতুন ১৮ ওয়ার্ডের প্রথম নির্বাচনে ১৮ জন সাধারণ কাউন্সিলর ও ৬ জন সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন।

ঢাকা উত্তরে কাউন্সিলর পদে নির্বাচিত হলেন যারা
৩৭ নম্বর ওয়ার্ডে মো. জাহাঙ্গীর আলম ঠেলাগাড়ি প্রতীক নিয়ে ৮ হাজার ২৩৪ ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মো. এমদাদুল হক পেয়েছেন ৩ হাজার ৫৬১ ভোট (লাটিম)। ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডে শেখ সেলিম ৫ হাজার ১৪৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন (লাটিম), তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম পেয়েছেন ২ হাজার ৬১২ ভোট (ব্যাডমিন্টন র‌্যাকেট)। ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডে ঠেলাগাড়ি প্রতীক নিয়ে মো. শফিকুল ইসলাম ৪ হাজার ৫৬৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ফরিদ আহমেদ পেয়েছেন ৪ হাজার ২৪৫ ভোট (ঘুড়ি)। ৪০ নম্বর ওয়ার্ডে বিজয়ী হয়েছেন নজরুল ইসলাম ঢালি (রেডিও)।
৪১ নম্বর ওয়ার্ডে মো. শফিকুল ইসলাম ৩ হাজার ২১২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন (ঠেলাগাড়ি প্রতীকে)। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মো. আবদুল্লাহ খান পেয়েছেন ২ হাজার ৯০০ ভোট (রেডিও)। ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে ফারুক আহম্মেদ ৭ হাজার ৯৭৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন (ঘড়ি)। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মো. আবদুর রহিম শেখ সৈকত পেয়েছেন ২৩৮ ভোট (ঠেলাগাড়ি)। ৪৩ নম্বর বিজয়ী হয়েছেন ওয়ার্ডে হেলাল উদ্দিন (লাটিম)। ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডে মো. শফিকুল (শফিক) ৮ হাজার ৭৪৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন (ঠেলাগাড়ি)। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মো. কামালউদ্দিন পেয়েছেন ২ হাজার ৬৮১ ভোট (ঘুড়ি)। ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডে জয়নাল আবেদিন (ঠেলাগাড়ি)। ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডে ৩ হাজার ৭৩৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন মো. সাইদুর রহমান সরকার (ঝুড়ি প্রতীকে)। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আলহাজ জামাল উদ্দিন আহমেদ পেয়েছেন ২ হাজার ৬৬০ ভোট (টিফিন ক্যারিয়ার)। ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডে ঝুড়ি প্রতীক নিয়ে মোতালেব মিয়া ৬ হাজার ৬৪১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মো. খায়রুল আলম পেয়েছেন ১ হাজার ৯৯৫ ভোট (ঘুড়ি)। ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডে মাসুদুর রহমান দেওয়ান ৫ হাজার ৭৯৩ ভোট (ঠেলাগাড়ি) পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এসএম তোফাজ্জল হোসেন (লাটিম) পেয়েছেন ৫ হাজার ৬৭৭ ভোট। ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডে ঘুড়ি প্রতীকে মো. আনিছুর রহমান নাঈম ৯ হাজার ৩৮ পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মো. সফিউদ্দিন মোল্লা পেয়েছেন ২ হাজার ৯৬৯ ভোট (ট্রাক্টর)। ৫০ নম্বর ওয়ার্ডে বিজয়ী হয়েছেন ডিএম শামীম (লাটিম)। ৫১ নম্বর ওয়ার্ডে মোহাম্মদ শরীফুর রহমান ২ হাজার ৯২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন (ব্যাডমিন্টন র‌্যাকেট)। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মো. মামুন সরকার পেয়েছেন ১ হাজার ১০৬ ভোট (মিষ্টি কুমড়া)।
৫২ নম্বর ওয়ার্ডে মো. ফরিদ আহমেদ বিজয়ী হয়েছেন ২ হাজার ৫৭ ভোট পেয়েছেন (লাটিম)। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মো. ইব্রাহীম গনি পেয়েছেন ২ হাজার ২৮ ভোট (ব্যাডমিন্টন র‌্যাকেট)।
৫৩ নম্বর ওয়ার্ডে মো. নাসির উদ্দিন ৭ হাজার ৮৫০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন (ঘুড়ি)। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মো. ফিরোজ আলম পেয়েছেন ৩ হাজার ৮৬৩ ভোট (লাটিম)।
৫৪ নম্বর ওয়ার্ডে জাহাঙ্গীর হোসেন ৩ হাজার ৮৭৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন (ঝুড়ি)। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মো. মজিবুর পেয়েছেন ২ হাজার ২ ভোট (কাঁটা চামচ)।
১৩ নম্বর সংরক্ষিত ওয়ার্ডে বিজয়ী হয়েছেন মোসা. মাহফুজা ইসলাম। তার প্রাপ্ত ভোট ১৩ হাজার ৫৩২ (জিপ গাড়ি)। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নিলুফার ইয়াসমিন ইতি পেয়েছেন ১১ হাজার ৯৪০ ভোট (আনারস)।
১৪ নম্বর সংরক্ষিত ওয়ার্ডে কামরুন নাহার (চশমা) ৮ হাজার ৭৫৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মোসা. নাজমা সুলতানা পেয়েছেন ৮ হাজার ৫৭৯ ভোট (আনারস)।
১৫ নম্বর সংরক্ষিত ওয়ার্ডে সোনিয়া সুলতানা রুনা ৭ হাজার ৭৯৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন (আনারস)। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সেলিনা আক্তার পেয়েছেন ৬ হাজার ১৯৭ ভোট (ডলফিন)।
১৬ নম্বর সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ইলোরা পারভীন ১০ হাজার ৪৯২ ভোটে বিজয়ী হয়েছেন (বেহালা)। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ফাতেমা খাতুন পেয়েছেন ৮ হাজার ২৩১ ভোট (বই)।
১৭ নম্বর সংরক্ষিত ওয়ার্ডে জাকিয়া সুলতানা ১০ হাজার ৩৪০ ভোটে বিজয়ী হয়েছেন (চশমা)। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আবেদা আক্তার পেয়েছেন ৭ হাজার ১২১ ভোট (বই)।
১৮ নম্বর সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে কমলা রানী মুক্তা জিপ গাড়ি প্রতীকে ১০ হাজার ৭০৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মোছা. জুলিয়া আক্তার বই প্রতীকে পেয়েছেন ৮ হাজার ৯৫০ ভোট।

ঢাকা দক্ষিণে কাউন্সিলর নির্বাচিত হলেন যারাÑ
সাধারণ ১৮টি ওয়ার্ডে বেসরকারি ফলাফলে নির্বাচিত কাউন্সিলর হলেনÑ ৫৮ নম্বর ওয়ার্ডে শফিকুর রহমান সাইজু ঠেলাগাড়ি, ৫৯ নম্বর ওয়ার্ডে টাক্টর প্রতীকে আকাশ কুমার ভৌমিক, ৬০ নম্বর ওয়ার্ডে কাঁটা চামচ নিয়ে আনোয়ার মজুমদার। ৫৮, ৫৯ ও ৬০ নম্বর নিয়ে গঠিত ২৫ নম্বর সংরক্ষিত নারী আসনে চশমা প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হয়েছেন সুলতানা আহমেদ।
৬১ নম্বর ওয়ার্ডে জুম্মন মিয়া ৪ হাজার ৩১৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন, ৬২ নম্বর ওয়ার্ডে মোশতাক আহমদ ৭ হাজার ৬০৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন এবং ৬৩ নম্বর ওয়ার্ডে ৬ হাজার ২৭২ ভোট পেয়ে জয়ী হন শফিকুল ইসলাম। ৬১, ৬২ ও ৬৩ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে সংরক্ষিত ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে ২৩ হাজার ৩৩৩ ভোট পেয়ে জয়ী হন ফুলবানু পলি।
৬৪ নম্বর ওয়ার্ডে ৪ হাজার ৪৪৪ ভোট পেয়ে মাসুদুর রহমান মোল্লা, ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডে ৭ হাজার ৭১৭ ভোট পেয়ে শামসুদ্দিন ভুইয়া এবং ৬৬ নম্বর ওয়ার্ডে নূর উদ্দিন মিয়া ৫ হাজার ১৪৪ ভোট পেয়ে জয়ী হন। ৬৪, ৬৫ ও ৬৬ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত সংরক্ষিত ২৩ নম্বর ওয়ার্ডে ৯ হাজার ৬০৭ ভোট পেয়ে জয়ী হন মনিরা চৌধুরী।
৬৭ নম্বর ওয়ার্ডে ৪ হাজার ৭৬ ভোট পেয়ে মো. ইব্রাহিম, ৬৮ নম্বর ওয়ার্ডে ৫ হাজার ৬৫৩ ভোট পেয়ে মাহমুদ হাসান পলিন, ৬৯ নম্বর ওয়ার্ডে ৪ হাজার ৫৮৮ ভোট পেয়ে হাবিবুর রহমান জয়ী হন। ৬৭, ৬৮ ও ৬৯ নম্বর ওয়ার্ডে সংরক্ষিত ২২ ওয়ার্ডে ১৮ হাজার ১২৩ ভোট পেয়ে হোসনে আরা শাহীন জয়ী হন।
৭০ নম্বর ওয়ার্ডে ৫ হাজার ৫১৯ ভোট পেয়ে আতিকুর, ৭১ নম্বর ওয়ার্ডে ৩ হাজার ৫২৮ ভোট পেয়ে খায়রুজ্জামান, ৭২ নম্বর ওয়ার্ডে ২ হাজার ৩১৩ ভোট পেয়ে শফিকুল আলম শাহীন জয়ী হন। ৭০, ৭১ ও ৭২ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত সংরক্ষিত ২১ নম্বর ওয়ার্ডে ৭ হাজার ৫৩৭ ভোট পেয়ে জয়ি হন রোকসানা আক্তার।
৭৪ নম্বর ওয়ার্ডে ২ হাজার ২৬৫ ভোট পেয়ে আবুল কালাম আজাদ, ৭৩ নম্বর ওয়ার্ডে ৩ হাজার ১২৪ ভোট পেয়ে শফিকুল ইসলাম এবং ৭৫ নম্বর ওয়ার্ডে ২ হাজার ৯৬১ ভোট পেয়ে তোফাজ্জল জয়ী হন। ৭৩, ৭৪ ও ৭৫ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত সংরক্ষিত ২০ নম্বর ওয়ার্ডে ৮ হাজার ১৯৩ ভোট পেয়ে জয়ী হন নাসরিন আহমেদ।

Category:

একাদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনে আওয়ামী লীগের নারী সদস্যদের তালিকা

Posted on by 0 comment

06 copy07 copy

Category:

দেশের নদ-নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা

2-6-2019 8-44-36 PMউত্তরণ প্রতিবেদন: নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, মানুষের জীবন-জীবিকা নদীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানব জাতি টিকে থাকার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে নদী। নাব্য সংকট ও বেদখলের হাত থেকে নদী রক্ষা করা না গেলে বাংলাদেশ তথা মানব জাতি সংকটে পড়তে বাধ্য। নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সরকার আইন প্রণয়ন করে নদীকে বেদখলের হাত থেকে রক্ষার চেষ্টা করছে। নদী রক্ষায় আন্তর্জাতিকভাবে জাগরণ শুরু হয়েছে। এখন সবারই ভাবনাÑ পরিবেশের জন্য নদী রক্ষা করতে হবে।
রায়ে হাইকোর্ট তুরাগ নদকে লিগ্যাল পারসন (আইনগত ব্যক্তি) ঘোষণা করে বলেন, অবৈধ দখলদাররা প্রতিনিয়তই কম-বেশি নদী দখল করছে। অবৈধ স্থাপনা তৈরি করায় সংকুচিত হয়ে পড়ছে নদী। এসব বিষয় বিবেচনা করে তুরাগ নদকে লিগ্যাল/জুরিসটিক পারসন হিসেবে ঘোষণা করা হলো।
বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ৩০ জানুয়ারি নদী নিয়ে এক রায়ে এই পর্যবেক্ষণ দেন। মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইট অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) করা রিট মামলায় এই রায় দেওয়া হচ্ছে। আদালত ৩০ জানুয়ারি রায় দেওয়া শুরু করেছেন। নদী রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়ে ৩১ জানুয়ারি অবশিষ্ট রায় ঘোষণা করা হয়। ৩০ জানুয়ারি আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ।
গাজীপুরের তুরাগ নদের টঙ্গী কামারপাড়া সেতুর দুই পাশে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দখল করাকে কেন্দ্র করে এইচআরপিবি’র করা এক রিট আবেদনে জারি করা রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে এই রায় দেওয়া হচ্ছে। ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি হাইকোর্ট একই এলাকায় তুরাগ নদ ভরাট ও সব ধরনের স্থাপনা নির্মাণ বন্ধের নির্দেশ দেন। পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্তে তুরাগ দখলদারদের নাম ও ৩৬টি অবৈধ স্থাপনার তালিকা উঠে আসে। এরপর তুরাগ নদের টঙ্গী কামারপাড়া সেতুর দুই পাশে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দখলে থাকা ৩০টি স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দেন। যদিও আপিল বিভাগ গত বছরের ১৪ জানুয়ারি এক আদেশে স্থাপনা উচ্ছেদে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করেন।
নদী রক্ষায় বিভিন্ন দেশের আদালতের দেওয়া রায়ের উদাহরণ দিয়ে হাইকোর্ট বলেন, ‘আমাদের দেশের সব নদীকে রক্ষা করার সময় এসেছে। যদি তা না করতে পারি তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
রায়ে বলা হয়, ঢাকার চারপাশে বহমান চার নদী রক্ষায় এর আগে আদালত থেকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া না হলে এত দিনে বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর হয়তো বহুতল ভবন দেখা যেত। অথবা তুরাগ নদে অবৈধ দখলদারদের হাউজিং এস্টেট থাকত।
আদালত আক্ষেপ করে বলেন, এত রায় ও নির্দেশনার পরও তা সঠিকভাবে বাস্তবায়নে বিবাদীরা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আদালতের নির্দেশনা সঠিকভাবে প্রতিপালন হলে তুরাগ নদ রক্ষায় হাইকোর্টে আরেকটি মামলা করতে হতো না।
আদালত বলেন, ‘শুধু যে তুরাগ নদই আক্রান্ত তা নয়; গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনাসহ দেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ৪৫০টি নদ-নদীও অবৈধ দখলদারদের দ্বারা আক্রান্ত। এখন এসব নদী রক্ষায় আমরা (আদালত) কি হাজারখানেক মামলা করার ব্যাপারে উৎসাহ/অনুমতি দেব? না-কি অবৈধ দখলের হাত থেকে সব নদী রক্ষায় এই মামলা ধরে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেব? যে নির্দেশনার আলোকে নদী দখলমুক্ত করার মামলা আর আদালতের সামনে আসবে না?’

Category:

স্বাধীনতার প্রতীক নৌকার বিজয় সুনিশ্চিত

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা উপলক্ষে দেশরতœ শেখ হাসিনার ভাষণ

PMআসসালামু আলাইকুম।
আপনাদের সবাইকে বিজয়ের মাসের শুভেচ্ছা।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাইকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। টেলিভিশন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহায়তায় দেশবাসী এবং দেশের বাইরে যারা এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, তাদেরও শুভেচ্ছা ও আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। স্মরণ করছি ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর জেলখানায় নিহত জাতীয় চারনেতাÑ সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপটেন এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে। শ্রদ্ধা জানাচ্ছি মহান মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লাখ শহিদ এবং দু-লাখ নির্যাতিত মা-বোনকে। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং শহিদ পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানাচ্ছি। মুক্তিযোদ্ধাদের জানাচ্ছি সালাম।
আমি গভীর বেদনার সঙ্গে স্মরণ করছি ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের ঘৃণ্য হত্যাকা-ের শিকার আমার মা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, আমার তিন ভাইÑ ক্যাপ্টেন শেখ কামাল, লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল ও ১০ বছরের শেখ রাসেল, কামাল ও জামালের নবপরিণীতা স্ত্রী সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর সহোদর শেখ নাসের, বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব ব্রিগেডিয়ার জামিলসহ সেই রাতের সকল শহিদকে।
আজকের দিনে আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এ উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক, গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশসহ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা নেতৃবৃন্দকে। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য যারা অকাতরে জীবন দিয়েছেন সেই ভাষা-শহিদদের প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।
স্মরণ করছি, ২০০৪ সালের ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলায় নিহত আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানসহ ২২ নেতাকর্মীকে।
স্মরণ করছি ২০০১ সালের পর বিএনপি-জামাত জোটের সন্ত্রাসীদের হাতে নির্মম হত্যাকা-ের শিকার সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া, আওয়ামী লীগ নেতা আহসানউল্লাহ মাস্টার, মঞ্জুরুল ইমাম, মমতাজউদ্দিনসহ ২১ হাজার নেতাকর্মীকে।
২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালে এবং ২০১৫ সালের ৪ঠা জানুয়ারি থেকে বিএনপি-জামাত জোট পরিচালিত অগ্নিসন্ত্রাস ও সহিংসতায় যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। আমি নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং আহতদের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। সেলিম, দেলোয়ার, নূর হোসেন, বাবুল, ফাত্তাহ, রাউফুন বসুনিয়াসহ স্বৈরাচার-বিরোধী এবং ভাত ও ভোটের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সকল শহিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

প্রিয় দেশবাসী,
২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার টানা ১০ বছর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে বিপুলভাবে বিজয়ী করে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির পিতার জন্মশতবার্র্ষিকীকে লক্ষ্য করে আমরা নির্বাচনী ইশতেহার রূপকল্প-২০২১ ঘোষণা করেছিলাম। যার মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটিয়ে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা।
২০১৪ সালে দশম নির্বাচনের আগে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করে রূপকল্প ২০৪১ ঘোষণা করেছিলাম। আপনারা ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো সরকার পরিচালনার ম্যান্ডেট দিয়ে সেই রূপকল্প বাস্তবায়নের কর্মযজ্ঞকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। সাফল্যের সবটুকু আপনাদের অবদান।

সুধী,
আজকের বাংলাদেশ আর্থিক দিক থেকে যেমন শক্তিশালী, তেমনি মানসিকতার দিক থেকে অনেক বলীয়ান। ছোটখাটো অভিঘাত বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারবে না।
২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা দিয়েছে। ২০১৮ সালের মার্চ মাসে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উন্নীত করেছে।
মাথাপিছু আয় ২০০৬ সালের ৫৪৩ ডলার থেকে বেড়ে ১ হাজার ৭৫১ ডলারে উন্নীত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩ বিলিয়ন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৩৩ বিলিয়ন ডলারের ওপর। দারিদ্র্যের হার ২০০৬ সালের ৪১.৫ শতাংশ থেকে ২১.৮ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচকে বিশ্বের শীর্ষ ৫টি দেশের একটি আজ বাংলাদেশ। বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশের জিডিপি-র আকার প্রায় ৫ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ৪ লাখ ৮২ হাজার কোটি থেকে প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুসারে ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বের মধ্যে ৩১তম। এইচবিএসসি’র প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৬তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হবে।
২০০৫-০৬ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ৬১ হাজার কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজেটের পরিমাণ প্রায় ৭.৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা।
২০০৫-০৬ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল মাত্র ১০.৫২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৩৬.৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০২১ সাল নাগাদ ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।

প্রিয় দেশবাসী,
বাংলাদেশ ভূ-খ-ের যা কিছু মহৎ অর্জন ও প্রাপ্তি, সবকিছু অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অভিষিক্ত করা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধিকার এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম, সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে মহান স্বাধীনতা অর্জন, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে স্বৈরাচার উৎখাত এবং ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার আগে তিনি মাত্র সাড়ে তিন বছর রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়েছিলেন।
শূন্য কোষাগার, বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ-ব্যবস্থা, বন্ধ কল-কারখানা নিয়ে জাতির পিতা পথচলা শুরু করেছিলেন। ১ কোটি শরণার্থীকে দেশে ফিরিয়ে এনে তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা ছিল এক দুরূহ কাজ। তার ওপর শুরু হয় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। এসব প্রতিবন্ধকতা এবং ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে মাত্র সাড়ে তিন বছরে দেশকে অনেকটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছিলেন। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকাভুক্ত হয়েছিল। আর তখনই দেশের অগ্রযাত্রাকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়।
তার হত্যার পর ১৯৭৫-পরবর্তী শাসকেরা বাংলাদেশকে পরনির্ভরশীল, ভিক্ষুকের দেশে পরিণত করেছিল।
১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল। এ-সময়ে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের পরিচিতি ছিল বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ হিসেবে। বাংলাদেশ মানেই ছিল বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, কঙ্কালসার মানুষের দেশ।
২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে ১২ই জুনের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। ২১ বছর পর আবার বাংলাদেশের মানুষ মুক্তির স্বাদ পায়, জনগণের সরকার পায়।
১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল। এই পাঁচ বছর ছিল বাংলাদেশের মানুষের জন্য স্বর্ণযুগ। আর্থ-সামাজিক খাতে দেশ অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করে। এ-সময় আমরা পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি এবং ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা নদীর পানি চুক্তি স্বাক্ষর করি। যমুনা নদীর উপর বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণ করি এবং খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করি।
এছাড়া, কৃষকদের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করি। দুস্থ অসহায় মানুষের জন্য দুস্থ ভাতা, স্বামী পরিত্যক্তা ও বিধবা মহিলাদের জন্য ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বয়স্কদের জন্য শান্তি নিবাস, আশ্রয়হীনদের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প ইত্যাদি কর্মসূচি চালু করি।
২০০১ সালের ষড়যন্ত্রমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে পরাজিত করা হয়। ২০০১-পরবর্তী পাঁচ বছর ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এদেশের সাধারণ মানুষের জন্য এক বিভীষিকাময় সময়। হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে জনজীবন ছিল অতিষ্ঠ। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া, সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টার, খুলনার অ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল ইমাম, নাটোরের মমতাজ উদ্দিনসহ ২১ হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়। হাওয়া ভবন তৈরি করে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট এবং বিদেশে পাচার করা হয়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাভাই, জেএমবি, হরকাতুল জিহাদসহ নানা জঙ্গিগোষ্ঠী সৃষ্টি করা হয়। যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠান, রমনার বটমূলে বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান, নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগ অফিস এবং পল্টনে সিপিবি-র সভায় বোমা হামলা, সিলেটে ব্রিটিশ হামকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী, সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান ও আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে বোমা হামলা করে হত্যা চেষ্টা, ২০০৫ সালের ১৭ই আগস্ট সারাদেশে প্রায় ৫০০ স্থানে একযোগে বোমা হামলা, একই বছর গাজীপুরে বার ভবনে বোমা মেরে ১০ জন হত্যা, শরীয়তপুরে দুই বিচারক হত্যাসহ সারাদেশে অসংখ্য সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে এসব জঙ্গিগোষ্ঠী।
২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট বিএনপি-জামাত জোট সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় আওয়ামী লীগের র‌্যালিতে নৃশংস গ্রেনেড হামলা চালোনো হয়। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রাণে রক্ষা পেলেও মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিরীহ মানুষ নিহত হয় এবং ৫০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়। আহতদের অনেকেই এখনও শরীরে অসংখ্য স্পিøন্টার নিয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় জীবনযাপন করছেন।

প্রিয় দেশবাসী,
একাদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে আমরা আবারও ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ সেøাগান সংবলিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আমরা আমাদের ইশতেহার এমনভাবে তৈরি করেছি, যাতে আমরা তা বাস্তবায়ন করতে পারি। একইসঙ্গে ২০০৮ এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনাগুলোর ধারাবাহিকতা ২০১৮-এর নির্বাচনী ইশতেহারেও রক্ষিত হয়েছে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী ইশতেহার পুস্তিকারে প্রকাশ করা হয়েছে। এখানে এই স্বল্প সময়ে তা সবিস্তারে তুলে ধরা সম্ভব নয়। আমি সংক্ষিপ্তাকারে কয়েকটি বিষয় আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি।

৩.১ গণতন্ত্র, নির্বাচন ও কার্যকর সংসদ
বিগত ১০ বছরে জাতীয় সংসদই ছিল সকল রাষ্ট্রীয় কর্মকা-ের কেন্দ্রবিন্দু। আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের চলমান প্রক্রিয়াকে আরও জোরদার করব।
সংসদকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একইসঙ্গে মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, গণমাধ্যম, বিচার বিভাগকে আরও শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

৩.২ আইনের শাসন ও মানবাধিকার সুরক্ষা
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দেশে আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে। বিচার বিভাগের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিচারক নিয়োগের পদ্ধতির স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ, বিচারকদের জন্য যৌক্তিক বেতন কাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণ, গ্রাম আদালত প্রতিষ্ঠা, বিরোধ নিরসনে বিকল্প পদ্ধতির ব্যবহার, প্রতি জেলায় লিগ্যাল এইড স্থাপনসহ বিচারকদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কাজ এগিয়ে চলছে। আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের বিচার, জাতীয় চার নেতার হত্যার বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচার, বিডিআর হত্যাকা-ের বিচার করেছি এবং গ্রেফতারকৃত দ-িতদের বিচারের রায় কার্যকর করা হয়েছে। নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠনের সুযোগ পেলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংরক্ষণ ও মর্যাদা সমুন্নত রেখে প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় ও সাহায্য সহায়তা লাভের সুযোগ-সুবিধা অবারিত করা হবে। সর্বজনীন মানবাধিকার সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে কোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করা করা হবে। মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা এবং কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।

৩.৩ দক্ষ, সেবামুখী ও জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন
প্রশাসনের সর্বস্তরে ই-গভর্নেন্স চালু করা হয়েছে এবং জনসেবা সম্পর্কিত তথ্য প্রদানের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘তথ্য অধিকার আইন-২০০৯’ কার্যকর করা হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং সম্মানজনকভাবে জীবনধারণের জন্য বেতন-ভাতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে। একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ দুর্নীতিমুক্ত দেশপ্রেমিক গণমুখী প্রশাসনিক-ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ অব্যাহত থাকবে। প্রশাসনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, ন্যায়-পরায়ণতা এবং জনসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হবে।

৩.৪ জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গড়ে তোলা
পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গত ১০ বছরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ, পিবিআই, ট্যুরিস্ট পুলিশ, নৌ পুলিশ, স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন, রংপুর রেঞ্জ, রংপুর আরআরএফ, ময়মনসিংহ রেঞ্জ, দুটি র‌্যাব ব্যাটালিয়ন, সাইবার পুলিশ এবং গাজীপুর ও রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ, এন্টি টেররিজম ইউনিট এবং কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট গঠন করা হয়েছে। নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পেলে আগামী পাঁচ বছরে জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে জনবল নিয়োগ করা হবে।

৩.৫ দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ
জঙ্গিবাদ, মাদক এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করব। দুর্নীতি প্রতিরোধে দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হবে। আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তি চালুর মাধ্যমে দুর্নীতির পরিধি ক্রমান্বয়ে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হবে।

৩.৬ সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও মাদক নির্মূল
জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির প্রতি আমাদের দৃঢ় অবস্থান অব্যাহত থাকবে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলদারি বন্ধে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হবে।
৩.৭ স্থানীয় সরকার : জনগণের ক্ষমতায়ন
ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পরিষদসহ পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনকে শক্তিশালী করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করা হবে। আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে অধিকতর আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রদান করা হবে। নাগরিক সুযোগ-সুবিধা উন্নত ও প্রসারিত করার জন্য সরকারের সাহায্য ও উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। নগর ও শহরে ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, পরিকল্পিত উন্নয়ন এবং নগর ব্যবস্থাপনায় অধিকতর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনগণের অধিকতর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।

৩.৮ সামষ্টিক অর্থনীতি : উচ্চ আয়, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন
আগামী পাঁচ বছরে জিডিপি ১০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনকালে বাংলাদেশ হবে মধ্যম আয়ের দেশ। ২০৩০ সালে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে ৫ হাজার ৪৭৯ ডলারেরও বেশি। ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হিসেবে বিশে^র বুকে মাথা তুলে দাঁড়াবে বাংলাদেশ। দারিদ্র্যের হার নেমে আসবে শূন্যের কোঠায়।

৩.৯ অবকাঠামো উন্নয়নে বৃহৎ প্রকল্প (মেগা প্রজেক্ট)
দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১০টি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এগুলো হচ্ছেÑ পদ্মাসেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দর, ঢাকা মাস-র‌্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্প, এলএনজি টার্মিনাল, মহেষখালী-মাতারবাড়ি সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম, পায়রা সমুদ্রবন্দর, পদ্মাসেতু রেল সংযোগ এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন স্থাপন। আওয়ামী লীগ এসব মেগা প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে দৃঢ়সংকল্প। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। পায়রা বন্দরের পরিপূর্ণ উন্নয়নের কাজ চলমান রয়েছে। সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর, রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এলএনজি টার্মিনাল বাস্তবায়িত হয়েছে। ইতোমধ্যে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে।

৩.১০ ‘আমার গ্রাম Ñ আমার শহর’ : প্রতিটি গ্রামে আধুনিক
নগর সুবিধা সম্প্রসারণ
আমরা নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে প্রতিটি গ্রামকে শহরে উন্নীত করার কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করব। শহরের সুবিধা গ্রামে পৌঁছে দিব। আগামী পাঁচ বছরে দেশের প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাবে। পাকা সড়কের মাধ্যমে সকল গ্রামকে জেলা/উপজেলা শহরের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। ছেলে-মেয়েদের উন্নত পরিবেশে লেখাপড়ার সুযোগ তৈরি করা হবে। সুপেয় পানি এবং উন্নতমানের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। সুস্থ বিনোদন এবং খেলাধুলার জন্য অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। কর্মসংস্থানের জন্য জেলা/উপজেলায় কল-কারখানা গড়ে তোলা হবে। ইন্টারনেট/তথ্যপ্রযুক্তি সর্বত্র পৌঁছে যাবে।

৩.১১ তরুণ যুবসমাজ : ‘তারুণ্যের শক্তি Ñ বাংলাদেশের সমৃদ্ধি’
‘সোনার বাংলা’র স্বপ্ন বাস্তবায়ন ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রধানতম শক্তি হচ্ছে যুবশক্তি। দেশের এই যুবগোষ্ঠীকে সুসংগঠিত, সুশৃঙ্খল এবং উৎপাদনমুখী শক্তিতে রূপান্তরের লক্ষ্য অর্জনে আওয়ামী লীগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি উপজেলায় প্রসারিত করা হবে। প্রতিটি উপজেলায় ‘যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ স্থাপন করা হবে। জাতীয় পর্যায়ে স্বল্প, মধ্যম ও উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের তথ্য সম্বলিত একটি ইন্টিগ্রেটেড ডাটাবেইজ তৈরি করা হবে। তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা ও আত্মকর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে বিনা জামানতে ও সহজ শর্তে জনপ্রতি ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা ইতোমধ্যে প্রদান করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই সুবিধা আরও বিস্তৃত করা হবে।
তরুণদের সুস্থ বিনোদনের জন্য প্রতিটি উপজেলায় গড়ে তোলা হবে একটি করে ‘যুব বিনোদন কেন্দ্র’। প্রতিটি জেলায় একটি করে ‘যুব স্পোর্টস কমপ্লেক্স’ গড়ে তোলা হবে।
নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারলে আমরা আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি ২৮ লাখ কর্মসৃজনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। প্রতি উপজেলা থেকে প্রতিবছর গড়ে ১ হাজার যুব/যুব মহিলাকে বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।

৩.১২ নারীর ক্ষমতায়ন
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ‘জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ’ এবং রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর। নারীর প্রতি সকল বৈষম্যমূলক আচরণ/প্রথা বিলোপ করা হবে। বাল্যবিবাহ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হবে। কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান মজুরি নিশ্চিত করা হবে। নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে আলাদা ব্যাংকিং ও ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।

৩.১৩ দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য হ্রাস
বর্তমানে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় ৪ কোটি ৯২ লাখ মানুষ বিভিন্ন প্রকার আর্থিক সহযোগিতা পাচ্ছেন। আগামী পাঁচ বছরে এই সংখ্যা দ্বিগুণ করা হবে এবং সকলের ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হবে। দারিদ্র্যের হার ১২.৩ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। প্রতিটি পরিবারে অন্তত একজনের নিয়মিত রোজগার নিশ্চিত করা হবে। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকবে। সহজ শর্তে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে আয়বর্ধকমূলক কর্মকা-ে সম্পৃক্ত করা হবে।

৩.১৪ কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি : খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে নিশ্চয়তা
বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের অভূতপূর্ব সাফল্য বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে।
কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের সফল ধারা অব্যাহত রাখা হবে। কৃষি উপকরণের ওপর ভর্তুকি অব্যাহত রাখা হবে। কৃষি যন্ত্রপাতি সুলভ ও সহজপ্রাপ্য করা হবে। কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা হবে। ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কৃষিপণ্যের দক্ষ সাপ্লাই চেন/ভ্যালু চেইন গড়ে তোলা হবে। কৃষি গবেষণায় বাজেট বরাদ্দ আরও বাড়ানো হবে।
ছোট ও মাঝারি আকারের দুগ্ধ ও পোল্ট্রি খামার প্রতিষ্ঠা এবং মৎস্য চাষের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রয়োজনমতো ভর্তুকি, প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও নীতি সহায়তা বৃদ্ধি করা হবে।

৩.১৫ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
২০০৯ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৪,৯০০ মেগাওয়াট আর দৈনিক সরবরাহ ছিল ৩,২০০ মেগাওয়াট। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২০,৪০০ মেগাওয়াট। ২০২০ সালের মধ্যে সকলের জন্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা হবে। ২০২৩ সালের মধ্যে ২৮,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এবং ৫,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হবে।

৩.১৬ শিল্প উন্নয়ন
কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে আমরা শ্রমঘন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উন্নয়নে জোর দিয়ে যাচ্ছি। সারাদেশে ১০০টি সরকারি ও বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। এ পর্যন্ত ৮৯টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে এবং ১৪টির কাজ এগিয়ে চলছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো আনুমানিক অতিরিক্ত ৪০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় বৃদ্ধি করবে এবং প্রায় ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হবে। পাটজাত পণ্যের রপ্তানিতে আর্থিক প্রণোদনা অব্যাহত রাখা হবে। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতকে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে। পদ্মাসেতুর দুই পাড়ে আধুনিক শিল্পনগরী গড়ে তোলা হবে। প্রতিটি বিভাগীয় শহরে আইটি শিল্প পার্ক স্থাপন করা হবে এবং এসব শিল্প পার্কে আগামী পাঁচ বছরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

৩.১৭ শ্রমিক কল্যাণ ও শ্রমনীতি
৪৩টি শিল্প খাতের মধ্যে ৪০টি খাতের শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ২০০৮ সালের ১ হাজার ৬০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৮ হাজার টাকা করা হয়েছে। নারী ও পুরুষ শ্রমিকদের বেতন বৈষম্য দূর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। শিল্প শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষা করা হবে। নারী শ্রমিকদের জন্য চার মাসের বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি বাস্তবায়ন করা হবে। শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা, বাসস্থান, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও চিত্ত বিনোদনের ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। শ্রমিক, হতদরিদ্র এবং গ্রামীণ ভূমিহীন ক্ষেতমজুরদের জন্য রেশনিং প্রথা চালু করা হবে।

৩.১৮ শিক্ষা
আমরা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছি। ২০১০ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত সর্বমোট ২৬০ কোটি ৮৫ লাখ ৯১ হাজার বই বিতরণ করা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় একটি করে টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হবে। ইতোমধ্যে ১০০টি উপজেলায় এ ধরনের ইনস্টিটিউট স্থাপনের কাজ চলছে। শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে। শিক্ষার মান উন্নয়নে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। সকল গ্রামে, আধা মফস্বল শহরে এবং শহরের নিম্নবিত্তের স্কুলসমূহে পর্যায়ক্রমে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু করা হবে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত উপবৃত্তি প্রদান অব্যাহত থাকবে। মাদ্রাসা শিক্ষাকে মূলধারার শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হচ্ছে। কওমী মাদ্রাসার দাওয়ারে হাদিস ডিগ্রিকে মাস্টার্সের সমমর্যাদা দেওয়া হয়েছে। নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষায় শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে প্রয়োজনীয় বই বিনামূল্যে বিতরণ করা হবে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণের বেতন গ্রেডসহ শিক্ষা খাতের কিছু কিছু ক্ষেত্রে যে বৈষম্য রয়ে গেছে, তা ন্যায্যতার ভিত্তিতে নিরসন করা হবে।

৩.১৯ স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার কল্যাণ
বর্তমানে সারাদেশে ১৬ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে গ্রামীণ জনগণকে স্বাস্থ্যসেবা এবং ৩০ প্রকার ঔষধ বিনামূল্যে দেওয়া হয়। মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু এখন ২০০৯ সালের ৬৬.৮ বছর হতে ৭২.৮ বছরে উন্নীত হয়েছে। এক বছরের নিচে ও ৬৫ বছরের ওপরে সকল নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হবে। সকল বিভাগীয় শহরে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর ভবনসহ সকল সুবিধা পর্যায়ক্রমে আধুনিকীকরণ করা হবে।

৩.২০ যোগাযোগ
বিগত ১০ বছরে যোগাযোগ খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এ-সময়ে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার মহাসড়ক মজবুত, সম্প্রসারণ, সংস্কার বা কার্পেটিং করেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ, নবীনগর-চন্দ্রাসহ এ পর্যন্ত প্রায় ৪২০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক চার-লেন বা তদূর্ধ্ব লেনে উন্নীত করা হয়েছে। কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ করা হয়েছে। ৯১৪টি সেতু, ৩ হাজার ৯৭৭টি কালভার্ট নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৫২ হাজার ২৮০ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন করা হয়। এছাড়া, ৭৫ হাজার ৭৭৩ কিলোমিটার পাকা সড়ক ও ৩১ হাজার ৬৩৭ মিটার ব্রিজ/কালভার্ট রক্ষণাবেক্ষণ বা পুনর্বাসন করা হয়। ৩ লাখ ১ হাজার ৩৪১ মিটার ব্রিজ/কালভার্ট নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ করা হয়।
ঢাকা মহানগরীর যোগাযোগ-ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের উদ্দেশ্যে ঢাকা মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের আওতায় মেট্রোরেল বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশের নির্মাণকাজ ২০১৯ সালের ডিসেম্বর এবং বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত অংশ পরের বছর ডিসেম্বর মাসের মধ্যে শেষ হবে। তৃতীয় পর্যায়ে পল্লবী থেকে উত্তরা পর্যন্ত ৪.৭ কিলোমিটার অংশ চালু হবে ২০২২ সালে।
হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে নারায়ণগঞ্জের কুতুবখালী পর্যন্ত ৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ চার-লেন বিশিষ্ট প্রথম ঢাকা এলিভেটড এক্সপ্রেসওয়ে ৩টি পর্বে নির্মিত হচ্ছে।
বিমানবন্দর থেকে আশুলিয়া হয়ে চন্দ্রা পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ আরেকটি এলিভেটেড এক্সপ্র্রেসওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া, ইস্ট-ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নামে সাভারের হেমায়েতপুর হতে নারায়ণগঞ্জের মদনপুর পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ঢাকা ও বিভাগীয় শহরের মধ্যে বুলেট ট্রেন চালু করা হবে। দেশের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোকে আধুনিকায়ন করা হবে।
আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ খনন করা হবে। ঢাকার চারপাশের ৪টি নদী এবং খালগুলোকে খননের মাধ্যমে নদী তীরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হবে। একটি নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ করা হবে। বিদ্যমান আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীণ বিমান বন্দরগুলোর আধুনিকায়ন ত্বরান্বিত করা হবে। রাজধানীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আধুনিক বাস সার্ভিস চালু করা হবে। মহাসড়কের পাশে অবস্থিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য আন্ডারপাস/ওভারপাস নির্মাণ করা হবে। উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করার জন্য যমুনা নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণ করা হবে।
৩.২১ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণ : তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি
৫ হাজার ৭৩৭টি ডিজিটাল সেন্টার এবং ৮ হাজার ২০০টি ই-পোস্ট অফিসের মাধ্যমে জনগণকে ২০০ ধরনের ডিজিটাল সেবা প্রদান করা হচ্ছে। ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত অপটিক্যাল ফাইবার সম্প্রসারণ করা হয়েছে। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রবেশ করেছে মহাকাশ বিজ্ঞানের যুগে। জনগণের ভোটে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে আমরা ২০২১-২৩ সালের মধ্যে ফাইভ-জি চালু করব। ইন্টারনেট ও মোবাইল ব্যবহারের মূল্য যুক্তিসংগত পর্যায়ে নামিয়ে আনা হবে।

৩.২২ সমুদ্র বিজয় : ব্লু-ইকোনমি Ñ উন্নয়নের দিগন্ত উন্মোচন
মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তির ফলে বাংলাদেশের সমুদ্রভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকা-, সামুদ্রিক পর্যটন শিল্প ইত্যাদি খাতে কর্মসংস্থানের অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। আমরা দায়িত্ব পেলে সমুদ্র সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার সুনিশ্চিত করব।

৩.২৩ জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সুরক্ষা
২০০৯ সালে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশলপত্র ও কর্মপরিকল্পনা তৈরি করি এবং এর আওতায় ১৪৫টি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করার লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডে’ বরাদ্দ আরও বাড়ানো হবে। উৎপাদনশীল বনের আয়তন ২০১৫ সালের ১৩.১৪ শতাংশ হতে ২০ শতাংশে উন্নীতকরণ করা হবে।

৩.২৪ শিশু কল্যাণ
আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। শিশুশ্রম বন্ধ করার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা সুদৃঢ় সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বৃত্তি ও নানাবিধ কর্মকা- উন্নত ও প্রসারিত করা হবে। পথশিশুদের পুনর্বাসন ও নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা, হতদরিদ্র ও ছিন্নমূল শিশুদের জন্য শিশুসদন প্রতিষ্ঠা এবং বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি বৃত্তিমূলক শিক্ষাদানের ব্যবস্থা উন্নত ও প্রসারিত করা হবে।

৩.২৫ প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ কল্যাণ
প্রতিবন্ধী সকল শিশুর সুস্বাস্থ্য, শিক্ষা, মর্যাদা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা হবে। প্রতিবন্ধী মানুষের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চলাফেরা, যোগাযোগ, চিকিৎসা সহজ করা এবং তাদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রবীণদের জন্য সম্ভাব্য ক্ষেত্রে আয় সৃষ্টিকারী কার্যক্রম গ্রহণ, প্রবীণদের বিষয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

৩.২৬ মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন
মুক্তিযোদ্ধাদের বার্ধক্যকালীন ভরণ-পোষণ, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান এবং ষাট ও তদূর্ধ্ব বয়সের সকল মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মানিত নাগরিক হিসেবে রেল, বাস ও লঞ্চে বিনামূল্যে চলাচলের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এসব কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
দেশের সর্বত্র মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষা, ইতিহাস বিকৃতি রোধ এবং প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার জন্য বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধকালীন বধ্যভূমি ও গণকবর চিহ্নিতকরণ, শহিদদের নাম-পরিচয় সংগ্রহ এবং স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হবে।

৩.২৭ ধর্ম ও সংস্কৃতি
সংবিধান অনুযায়ী সকল নাগরিকের স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের অধিকার সুনিশ্চিত করা হবে। ধর্ম যার যার, উৎসব সবারÑ এই নীতি সমুন্নত রাখা হবে। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাংলাদেশের সমাজ গড়ে তোলা হবে।
কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন করা হবে না। সারাদেশে ৫৬০টি মসজিদ-কাম-ইসলামি কালচারাল সেন্টার নির্মাণ করা হচ্ছে।
বাঙালি সংস্কৃতির অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশে আওয়ামী লীগ সরকারের অনুসৃত নীতি ও কর্মপরিকল্পনা অব্যাহত থাকবে। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, চারু ও কারুকলা, সংগীত, যাত্রা, নাটক, চলচ্চিত্র এবং সৃজনশীল প্রকাশনাসহ শিল্পের সব শাখার ক্রমাগত উৎকর্ষ সাধন ও চর্চার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করার জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো হবে।

৩.২৮ ক্রীড়া
বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের বর্তমান গৌরবোজ্জ্বল অবস্থানকে আরও সৃদৃঢ় করার পাশাপাশি ফুটবল, হকিসহ অন্যান্য খেলাধুলাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। ক্রীড়া ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ সুবিধার সম্প্রসারণে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রতিটি উপজেলায় মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হবে।

৩.২৯ ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও
অনুন্নত সম্প্রদায়
পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির যেসব ধারা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি, সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভূমিতে প্রকৃত স্বত্বাধিকারীদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে। জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন করা হবে। সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃ-জাতিগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্যমূলক সকল প্রকার আইন ও ব্যবস্থার অবসান করা হবে।

৩.৩০ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও অবাধ তথ্যপ্রবাহ
মিথ্যা তথ্য প্রচার ও অনাকাক্সিক্ষত গুজব নিরসনে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করা হবে। সামাজিক দায়বদ্ধতাসমৃদ্ধ সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যম উন্নয়নে সহায়তা প্রদান করা হবে।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা চর্চায় সাংবাদিকদের উৎসাহ প্রদান ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পেশাগত দায়িত্ব পালনে সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। গণমাধ্যমবান্ধব আইন করা হবে। সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে কোনো আইনের অপপ্রয়োগ হবে না।

৩.৩১ প্রতিরক্ষা : নিরাপত্তা সার্বভৌমত্ব ও অখ-তা সুরক্ষা
আমরা ফোর্সেস গোল-২০৩০ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করছি। সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীতে আধুনিক সমরাস্ত্র, যানবাহন এবং প্রযুক্তির সম্মিলন ঘটানো ছাড়াও সেনাসদস্যদের দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সিলেট, রামু (কক্সবাজার) ও বরিশালে ৩টি ক্যান্টনমেন্ট প্রতিষ্ঠা, ৩টি পদাতিক ডিভিশন ও পদ্মাসেতু কম্পোজিট ব্রিগেডসহ বহু ইউনিট গঠন করা হয়েছে।
আমরা নির্বাচিত হলে সশস্ত্র বাহিনীকে সকল বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখার যে নীতি গ্রহণ করেছি, তা অব্যাহত থাকবে। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী আধুনিকায়নের চলমান প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

৩.৩২ পররাষ্ট্র
বিগত ১০ বছরে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়েছে। ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’Ñ বঙ্গবন্ধু প্রবর্তিত এই নীতির আলোকে আমরা আমাদের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করছি। আমরা মিয়ানমার এবং ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করেছি। ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ছিটমহলবাসীর ৬৮ বছরের বন্দিত্ব জীবনের অবসান হয়েছে।
আমরা নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে ভারতের সঙ্গে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতাসহ সকলক্ষেত্রে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা হবে। বাংলাদেশের ভূখ-ে জঙ্গিবাদ, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী কোনো শক্তিকে প্রশ্রয় না দেওয়ার নীতি অব্যাহত থাকবে। গত বছর মিয়ানমারে নির্যাতনের মুখে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। আমরা মানবিক কারণে তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছি। বাংলাদেশের এই মানবিক সিদ্ধান্ত বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রশংসা কুড়িয়েছে। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য দ্বিপাক্ষিকভাবে আলোচনা ছাড়াও জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে আমরা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

৩.৩৩ এনজিও
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ স্বশাসিতভাবে তাদের নিজস্ব বিধিমোতাবেক পরিচালিত হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান/বিভাগ স্থানীয় সরকারের সাথে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বেচ্ছামূলক সমন্বয় জোরদার করা হবে।

৪. এমডিজি অর্জন এবং এসডিজি (টেকসই উন্নয়ন) বাস্তবায়ন কৌশল (২০১৬-৩০)
দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নির্মূল, নারী-পুরুষ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস এবং মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়নÑ এই ৪টি এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ বিশেষ সাফল্য অর্জন করে প্রশংসিত হয়েছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করা হবে।

৫. ব-দ্বীপ বা ডেল্টা পরিকল্পনা-২১০০
জলবায়ুর ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে কাক্সিক্ষত উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য ‘বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০’ শতবর্ষের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনাটি ২০৩০ সালের মধ্যে আমাদের মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি সমৃদ্ধ দেশের মর্যাদা অর্জন করতে সহায়ক হবে। ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ সাল নাগাদ স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাসমূহের সমন্বয়ের যোগসূত্র সৃষ্টি করবে।

প্রিয় দেশবাসী,
আমরা কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী। আমাদের এবারের অঙ্গীকার আমরা টেকসই বিনিয়োগ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করব।
এটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেলে জনগণ কিছু পায়। সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা ও সমৃদ্ধির সকল সুযোগ ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়। মানুষ মাত্রই ভুল হয়। কাজ করতে গিয়ে আমার বা আমার সহকর্মীদেরও ভুল-ভ্রান্তি হয়ে থাকতে পারে। আমি নিজের এবং দলের পক্ষ থেকে আমাদের ভুল-ভ্রান্তিগুলো ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখার জন্য দেশবাসীর প্রতি সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাচ্ছি। আমি কথা দিচ্ছি, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা আরও সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করব। জাতির পিতার কাক্সিক্ষত ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতামুক্ত অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলব।

প্রিয় দেশবাসী,
আমার ব্যক্তিগত কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। বাবা-মা-ভাই, আত্মীয়-পরিজনকে হারিয়ে আমি রাজনীতি করছি শুধু জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য; এদেশের মানুষের কল্যাণের জন্য।
এদেশের সাধারণ মানুষ যাতে ভালোভাবে বাঁচতে পারেন, উন্নত-সমৃদ্ধ জীবনের অধিকারী হতে পারেনÑ তা বাস্তবায়ন করাই আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।
আগামী ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী আমরা সাড়ম্বরে পালন করব। বাঙালি জাতির এই দুই মাহেন্দ্রক্ষণ সামনে রেখে মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগই পারবে দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে। স্বাধীনতা-বিরোধী কোনো শক্তি এ সময় রাষ্ট্র-ক্ষমতায় থাকলে তা হবে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গ্লানিকর। তাই দেশবাসীর প্রতি আকুল আবেদন, আগামী ৩০ তারিখে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আবার আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করুন। আপনারা নৌকায় ভোট দিন, আমরা আপনাদের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি দিব।
৪৭ বছর আগে ১৯৭১ সালে ৯ মাসের সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে বাঙালি জাতি চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছিল। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের ৩০ তারিখে ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে বাঙালি জাতি এবার স্বাধীনতার প্রতীক নৌকার বিজয় ছিনিয়ে আনবেÑ এ বিশ্বাস আমার আছে। বিজয় আমাদের সুনিশ্চিত, ইনশাআল্লাহ।
সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের সহায় হোন।

খোদা হাফেজ।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু
বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

Category:

ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশে অপুষ্টির হার কম

11-6-2018 5-44-26 PMউত্তরণ ডেস্ক: বিশ্বের উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর সুষম উন্নয়ন সূচকে প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে অনেক এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। মানবসম্পদ উন্নয়নে এগিয়ে থাকার পর এবার ক্ষুধা দূর করার ক্ষেত্রেও ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়েছে বাংলাদেশ। ক্ষুধা দূরীকরণে গত বছরের তুলনায় দুই ধাপ অগ্রগতি হয়েছে বাংলাদেশের। বিশ্বের ১১৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ এবার ৮৬তম, যা গত বছর ছিল ৮৮তম। বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক ২০১৮-তে এই তথ্য মিলেছে। যৌথভাবে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা কনসার্ন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ও জার্মানভিত্তিক সংস্থা হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড। সম্প্রতি প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে ক্ষুধার সংজ্ঞা নির্ধারণে ৪টি সূচককে আমলে নেওয়া হয়েছে। অপুষ্টি, খর্বাকৃতি শিশুর সংখ্যা, কৃশকায় বা শীর্ণকায় শিশু ও শিশুমৃত্যুর হার। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় তিন ধাপ পিছিয়েছে ভারত; গত বছর ভারতের অবস্থান ছিল ১০০ নম্বরে, এবার ১০৩ নম্বরে। ভারতের চেয়েও তিন ধাপ পেছনে ১০৬ নম্বরে রয়েছে পাকিস্তান। দেশটি গত তিন বছর ধরে একই অবস্থানে রয়েছে। তবে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে নেপাল (৭২), মিয়ানমার (৬৮) ও শ্রীলংকা (৬৭)। এবার সূচকে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে থাকা তিন দেশ হলোÑ বেলারুশ, বসনিয়া ও চিলি। সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে মধ্য আফ্রিকা ও ইয়েমেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন সামাজিক সূচকে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ুও এ দুটি দেশের চেয়ে বেশি। মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু, স্কুলে পাঠ গ্রহণ এসব খাতে বাংলাদেশ বেশ এগিয়ে গেছে। তবে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে মাথাপিছু গড় আয় বাংলাদেশের অনেক কম। বাংলাদেশের মানুষ ভারত ও পাকিস্তানের মানুষের চেয়ে গড়ে বেশি দিন বাঁচে। মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু এখন ৭২ দশমিক ৮ বছর। গড় আয়ু ভারতে ৬৮ দশমিক ৮ বছর ও পাকিস্তানে ৬৬ দশমিক ৬ বছর। নবজাতক-মৃত্যু ও পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসেও এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। ১ হাজার জীবিত শিশু জন্মগ্রহণ করলে বাংলাদেশে ২৮ দশমিক ২ জন নবজাতক মারা যায়। ভারত ও পাকিস্তানে এই সংখ্যা যথাক্রমে ৩৪ দশমিক ৬ এবং ৬৪ দশমিক ২। একইভাবে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে ও বাংলাদেশ ভালো করেছে। বাংলাদেশে ১ হাজার জীবিত শিশুর মধ্যে পাঁচ বছর বয়স হওয়ার আগেই ৩৪ দশমিক ২ জন মারা যায়। পাকিস্তানে তা দ্বিগুণের বেশি, ৭৮ দশমিক ৮ জন। আর ভারতে ৪৩ জন। সন্তান প্রসবজনিত মাতৃমৃত্যু হারে অবশ্য তিন দেশই কাছাকাছি অবস্থানে। বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে পিছিয়ে, পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। বাংলাদেশে প্রতি ১ লাখ গর্ভবতী মায়ের মধ্যে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে গড়ে ১৭৬ জন মারা যান। ভারত ও পাকিস্তানে এই সংখ্যা যথাক্রমে ১৭৪ ও ১৭৮। বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার অবশ্য এখন ৭২ দশমিক ৮ শতাংশ। ভারতে তা ৬৯ দশমিক ৯ শতাংশ ও পাকিস্তানে ৫৭ শতাংশ। অথচ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে বাংলাদেশ শিক্ষা খাতে ওই দুটি দেশের চেয়ে কম খরচ করে। নারীর ক্ষমতায়নেও এগিয়ে বাংলাদেশ।
ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশে সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বেশি। বাংলাদেশে সংসদে যত আসন আছে, এর মধ্যে ২০ দশমিক ৩ শতাংশই নারী প্রতিনিধি। পাকিস্তানে তা ২০ শতাংশ এবং ভারতে ১১ দশমিক ৬ শতাংশ। তাছাড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বিদ্যমান মান বিবেচনা করলে বাংলাদেশের শিশুরা ভারত ও পাকিস্তানের শিশুদের চেয়ে বেশি উৎপাদনশীল হবে। বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের মানবসম্পদ সূচকে এই চিত্র পাওয়া গেছে। এই সূচক অনুযায়ী, ১৫৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১০৬তম। ভারত ও পাকিস্তান যথাক্রমে ১১৫ ও ১৩৪তম। ইন্দোনেশিয়ার বালিতে চলমান বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) যৌথ বার্ষিক সভায় বিশ্বব্যাংক এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বিশ্বব্যাংক বলেছে, মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশ ভালো করেছে। আরও ভালো করার সুযোগ আছে। কেননা, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় এগিয়ে থাকলেও অন্যদেশগুলো আরও অনেক ভালো করছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার, শিশুদের স্কুলে পাঠ গ্রহণের সময়কাল, শিক্ষারমান, প্রাপ্তবয়স্কদের অন্তত ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকা এবং শিশুদের সঠিক আকারে বেড়ে ওঠাসহ বেশ কয়েকটি সূচক দিয়ে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। আদর্শ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধা পেলে একটি শিশু প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে শতভাগ উৎপাদনশীলতা দেখাতে পারে। কিন্তু নিজ নিজ দেশে ভিন্ন ভিন্ন মানের সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী বেড়ে ওঠে শিশুরা। তাই সবাই সমানভাবে শত ভাগ উৎপাদনশীলতা দেখাতে পারে না। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের একজন শিশু বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা পেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গড়ে ৪৮ শতাংশ উৎপাদনশীলতা দেখাতে পারবে। আদর্শ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধা পেলে তারা শতভাগ কর্মদক্ষতা দেখাতে পারত, সেখানে তারা অর্ধেকের কম দেখাতে পারবে। অন্যদিকে ভারত ও পাকিস্তান এক্ষেত্রে আরও পিছিয়ে। ভারতের শিশুরা ৪৪ শতাংশ ও পাকিস্তানের শিশুরা ৩৯ শতাংশ কর্মদক্ষতা দেখাতে পারবে।

Category:

জেলহত্যার বেদনাবিধুর স্মৃতি

শেষ পর্যন্ত একজন জেল বাসিন্দা জনাব তাজউদ্দীনকে জানালেন যে, জেলের বাইরে খুব গুজব, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বলে পাঠিয়েছেন যে, বিশিষ্ট নেতাদের জীবিত রেখে ক্যু-গ্রুপের লোকেরা ভুল করেছে এবং যত শীঘ্র সম্ভব তাদেরকে শেষ করে দেয়া উচিত।

PMবি. বি. বিশ্বাস: মাঝে মাঝে গুজব শোনা যেত যে, নেতৃস্থানীয় কয়েকজনকে বিশেষ করে জনাব তাজউদ্দীনকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র চলছে। জনাব তাজউদ্দীনের কানেও সে কথা পৌঁছেছিল। কিন্তু তবুও তাকে নির্বিকার দেখা গেল। নিয়মিত শরীরচর্চা এবং মাঠে প্রত্যহ তিন ঘণ্টা করে কাজ করেই চলেছেন।
শেষ পর্যন্ত একজন জেল বাসিন্দা জনাব তাজউদ্দীনকে জানালেন যে, জেলের বাইরে খুব গুজব, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বলে পাঠিয়েছেন যে, বিশিষ্ট নেতাদের জীবিত রেখে ক্যু-গ্রুপের লোকেরা ভুল করেছে এবং যত শীঘ্র সম্ভব তাদেরকে শেষ করে দেয়া উচিত। পাছে যিনি এ খবর তাকে দিয়েছেন তিনি চিহ্নিত হয়ে যান। এজন্য বেগম তাজউদ্দীন দেখা করে যাওয়ার পরই তিনি ব্যাপারটি প্রকাশ করেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সবাই মনে করলেন যে, বেগম তাজউদ্দীন এ খবর দিয়ে গেছেন। এতখানি সুবিবেচনা তার ছিল।
১ নম্বর কামরার লোকদের কাছে পরে শুনেছি যে, এ খবর শোনার পর তিনি কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু তার ব্যবহারে বা কথাবার্তায় অবশ্য আমরা তা বুঝতে পারিনি। নিয়মিত দাবা খেলা চলছিল। জোর আত্মবিশ্বাস তার ছিল যে, এভাবে বন্দিজীবন বেশিদিন তাকে কাটাতে হবে না। সবসময় আমাদেরকে অনুরূপ আশ্বাসও তিনি দিতেন।
মাঠ পরিষ্কার করার কাজ প্রায় শেষ হয়ে গেছে। অজস্র ইটের টুকরা মাটির সঙ্গে মিশে ছিল। নিজের হাতে কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ে কাঁচি দিয়ে সেগুলি প্রায় সব পরিষ্কার করে ফেলেছেন। তিন-চারবার করে একেক জায়গা থেকে আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়েছে। এখন ঘাস লাগানোর পালা।
২ নভেম্বর বেলা ১১টার দিকে আমার জন্য অফিস কল এলো। ওইদিন ছিল রোববার। অফিস কলের কী কারণ থাকতে পারে চিন্তা করতে করতে পাহারাদারের সঙ্গে জেল অফিসে ঢুকলাম, শুনলাম জেলার ডেকেছেন।
জেলারের কামরায় ঢুকে দেখলাম, আরও চারজন লোক সেখানে বসা। তাদের কাউকেই আমি চিনি না। আমাকে কেন ডেকেছেন জিজ্ঞাসা করায় জেলার বললেন যে, তিনি দুঃখিত, আমাকে ঠিক ডাকেন নি। ডেকেছেন সিভিল সার্জন মি. সাহাকে। কিন্তু সাথে সাথে তিনি উপস্থিত অপরিচিত লোকদের কাছে আমার পরিচয় জানিয়ে দিলেন। ওই লোকগুলি খুব তীক্ষè দৃষ্টিতে আমাকে দেখলেন। সাথে সাথে ফিরে আসলাম।
একটু দুশ্চিন্তায় পড়লাম। যে কাগজের টুকরা পাহারাদার নিয়ে এসেছিল তাতে আমার নাম পরিষ্কারভাবে লেখা। আমাকে না ডাকলে আমার পরিচয়ই বা ওই লোকগুলির কাছে দেয়ার কি আবশ্যকতা! ওই লোকগুলিই বা তীক্ষèভাবে আমাকে দেখল কেন! সবই আমার কাছে হেঁয়ালির মতো মনে হলো। নতুন জেলে ফিরে এসে দেখি জনাব তাজউদ্দীন বাইরে একটু ফাঁকা জায়গায় চেয়ারে বসে আছেন। খুব গরম। তদুপরি তিনি প্রায় ঘণ্টা তিনেক কঠোর পরিশ্রম করেছেন বলে সম্ভবত বাইরের হাওয়ায় বিশ্রাম করছেন। জেলগেটের ঘটনার কথা বললাম। তিনি হেসে উঁড়িয়ে দিলেন। বললেন, ও কিছুই নয়।
তখন আমাদের পুরনো রান্নাঘরটির টিনের চালে নতুন টিন দেয়ার তোড়জোড় চলছে। বাইরে রান্নার চুলো বানানো হবে। বাবুর্চিরা তাই মাঠ থেকে মাটি নিয়ে চুল্লি বানানো শুরু করেছে। জনাব তাজউদ্দীন ক্ষেপে উঠলেন। বাবুর্চিদের খুব গালিগালাজ করলেন। তিনি এত পরিশ্রম করে ইটের টুকরা ফেলে দিয়ে সুন্দর মাটি বের করেছেন, তা কি বাবুর্চিদের সুবিধার জন্য? তিনি কি তাদের বাপের চাকর ইত্যাদি। বস্তুত আমাদের ঘরের পশ্চিম দিকে আরও একটা মাঠ আছে। বাবুর্চিরা ইচ্ছা                   করলে সেখান থেকে অনায়াসে মাটি আনতে পারত। কিন্তু পরিশ্রম না করে একদম কাছের মাঠ থেকে মাটি নেয়াকেই     তারা বেশি পছন্দ করেছিল।
দুপুরে কিছুক্ষণ জনাব তাজউদ্দীনের সঙ্গে দাবাও খেললাম। তাকে যেন সামান্য অন্যমনস্ক মনে হলো। দুপুরে খাওয়ার পর ব্রিজ খেলতে বসলে জনাব কামারুজ্জামান আমাদের কাছে এসে কিছুক্ষণ বসলেন। তাস খেলতে আহ্বান জানালাম। কিন্তু না খেলে কিছুক্ষণ শুধু দেখবার কথাই বললেন। কিছুক্ষণ পর চলে গেলেন তিনি। জেলখানায় আসার পর থেকেই রাতে ভালো ঘুম হচ্ছিল না। প্রথমত এখানে অত্যধিক গরম। এক কামরায় প্রায় ২০ জন লোক থাকি। দক্ষিণ দিকে বড় বড় লাগানো দরজা ঠিকই; কিন্তু উত্তর দিকে ছোট একটা ভেন্টিলেটর ছাড়া আর কিছুই নেই। হাওয়া তাই ভেতরে ঢোকে না। তদুপরি আমাদের কামরার সামনেই সমান্তরালভাবে একটা সেলের দালান। দ্বিতীয়ত পারিপার্শ্বিকতায় সম্পূর্ণ পরিবর্তন। এ মানসিক দুশ্চিন্তাও অন্য এক কারণ। এ ত্রিবিধ কারণে স্বভাবত ঘুম না হওয়ারই কথা।
বিশেষ করে প্রথম বেশ কিছুদিন গরমে অসহ্য কষ্ট পেয়েছি। দীর্ঘ ১৮ বছরের অভ্যাস পায়জামা পরে শোয়া। পায়জামা পরার জন্য গরম আরও বেশি লাগত। তাই বাসা থেকে লুঙ্গি আনিয়েছি। দীর্ঘদিন পর লুঙ্গি পরে অনেকটা আরাম পেলাম। তুলনামূলকভাবে গরমও কম লাগল।
ঘুম কম হয় বলে মাঝে মাঝে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমাতাম। ভেলিয়াম-৫ আমার পক্ষে খুব সুবিধাজনক ছিল। ২ নভেম্বর রাত ১১টার দিকে একটা ভেলিয়াম খেয়ে ঘুমিয়ে গেলাম।
হঠাৎ পাগলা ঘণ্টির আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। জেলখানায় কোনোরকম গোলযোগ বাধলেই জেল কর্তৃপক্ষ পাগলা ঘণ্টি বাজিয়ে দেয়। জেলে কোনো লোক হয় পালিয়ে গেছে অথবা কোথাও জেলবাসীদের মধ্যে মারামারি লেগেছেÑ এ ধরনের অস্বাভাবিক কিছু ঘটলেই পাগলা ঘণ্টি বাজানো হয়। কিছুক্ষণ পরই প্রজ্বলিত মশাল নিয়ে জেল পুলিশ দৌড়াদৌড়ি করে ঘুরে বেড়ায়। তারপর আসে লাঠি নিয়ে দল বেঁধে। দরকার হলে লাঠিপেটাও করা হয়। পাগলা ঘণ্টার পর সবসময়ই হুইসেল বাজতে থাকে। সব ঠিকঠাক হয়ে গেলে আবার সব নিস্তব্ধ হয়ে যায়। ওইদিন রাত প্রায় ৩.৩০ মিনিটের সময় পাগলা ঘণ্টি বাজল। সাথে সাথে হুইসেলও বাজা শুরু হয়ে গেল। কিন্তু ৪.১৫ মিনিটের মধ্যেও মশাল নিয়ে কোনো লোক এলো না। বাঁশি সমানে বেজেই চলল। আমরা খুব আতঙ্কিত হলাম। ঘরের সামনে দিয়ে যেসব জেল পুলিশ যাতায়াত করছিল, তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও বিশেষ কিছু বোঝা গেল না।
একজন জেল পুলিশ বলল যে, সে জেলগেট দিয়ে ঢোকার সময় ডিআইজির গাড়ি গেটে দেখে এসেছে। তার অনুমান, অতর্কিত পরিদর্শনে আসার জন্যই পাগলা ঘণ্টি বেজেছে। আমরা উদ্বেগের সঙ্গে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
ঘুমের ওষুধের ক্রিয়া তখনও আছে। একটু ঝিমিয়ে পড়েছিলাম। হুড়মুড় করে কতকগুলো লোক আমাদের কামরায় ঢোকার শব্দে তন্দ্রা টুটে গেল। দেখি ১ নম্বর কামরার সকলেই আমাদের কামরায় ঢুকেছেন। কেবল নেই জনাব তাজউদ্দীন ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম। সকলেই দেখলাম ভয়ে কাঁপছেন।
কে একজন বাইরে থেকে বললেন, মনসুর আলী সাহেব আসুন, মনসুর আলী সাহেব!
ততক্ষণে বিছানার ওপরে উঠে বসেছি। দেখি, জনাব মনসুর আলী তাড়াতাড়ি একটা পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে ফালতু মোতালিবকে বলে একটা তসবি হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। ক্ষীণ আলোয় তার চেহারা মলিনই দেখলাম। তাকে দেখার ভাগ্য আর কখনও হয়নি আমার। আমি মনে করলাম হয়তো বা রাজনৈতিক সমাধানকল্পে আলোচনা করার জন্য জনাব মনসুর আলীকে ১ নম্বর কামরায় নিয়ে গেছে। আমি আমার অভিমত ব্যক্তও করলাম। জনাব শেখ আব্দুল আজিজ রাগতভাবে বললেন যে, ঘটনা অন্যরূপ। আমি চুপ করে গেলাম।
আমরা রুদ্ধশ্বাসে পরবর্তী ভবিতব্যের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। সমস্ত কামরা নিস্তব্ধ, নিথর। প্রত্যেকের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। জনাব মনসুর আলীকে আমাদের কামরা থেকে নিয়ে যাওয়ার পর দু’মিনিট কালও অতিক্রান্ত হয়নি, হঠাৎ সমস্ত ঘর ঝনঝন শব্দে কেঁপে উঠল। এত কাছে থেকে আগে কখনও এমন আধুনিক সমর-অস্ত্রের গুলির আওয়াজ শুনিনি। কে যেন বলে ফেলল, ‘সব শেষ হয়ে গেল। সবাইকে মেরে ফেলেছে।’ দিশেহারার মতো আমরা দৌড়ে উত্তর পাশের বারান্দায় চলে গেলাম। বাইরে থেকে গুলি করলে এখানে অনেকটা নিরাপদ।
জনাব আজাহারউদ্দিন আহমদ প্রাক্তন এমপিএ এমন বেখেয়ালভাবে বিছানা ছেড়ে দৌড় দিয়েছিলেন যে, মশারিসহ তিনি দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে কাঁধের মাংস খানিকটা ছিঁড়ে ফেললেন। জনাব ফরিদ উদ্দিন আহমদ খাবার রাখার জন্য কোণের দিকে যে চৌকিটি ছিল তার নিচে ঢুকে গেলেন। সামনের দিকে মুড়ির টিন ও বাক্স এমনভাবে রাখা যে, বাইরে থেকে বোঝাই যাবে না যে, এর পেছনে কোনো লোক থাকতে পারে। আমি স্রেফ মাটিতে বসে ভগবানকে ডাকা আরম্ভ করলাম। সবাই যার যার নিজস্বভাবে ভগবানকে ডাকা আরম্ভ করলাম। আমরা সবাই ধরে নিলাম যে, জীবন আমাদেরও             শেষ হয়ে যাবে।
এসব অস্ত্র সম্বন্ধে অভিজ্ঞ জনাব সাইদুর রহমান প্যাটেল বললেন যে, শব্দটা স্টেনগানের এবং একসঙ্গে অন্তত দুটো স্টেনগান দুটো চেম্বার খালি করেছে। অনেক দিন পরে ওই ঘরে ঢুকে ঘরের দেয়ালের গায়ে প্রায় ৫০টা বুলেটের দাগ দেখেছি।
১ নম্বর কামরার জনাব দেলওয়ার হোসেনের কাছে শুনলাম, অনেকক্ষণ একটানা বাঁশি বাজার পর হঠাৎ ওই কামরার বারান্দার তালা খোলার শব্দ শুনে সবাই আতঙ্কিত হলেন। ২ নম্বর তালা খুলে ঘরের দরজাও খোলা হলো। সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত। হঠাৎই একজন সুবেদার বলে উঠলেনÑ ‘আপনারা সকলে বেরিয়ে যান রুম থেকে। রুমে শুধু সৈয়দ সাহেব ও তাজউদ্দীন সাহেব থাকবেন।’ সকলে বেরিয়ে আসলেন। ছাত্রনেতা জনাব আব্দুল কুদ্দুস মাখনের শরীরে জ্বর ছিল। তাই তিনি গায়ে দেবার জন্য একটা চাদর খুঁজছিলেন এবং সে কারণে একটু দেরিও হচ্ছিল। কে একজন বলে উঠলেন, ‘ভেতরে কে আছে ধরে নিয়ে আয়।’
সবার অলক্ষ্যে জনাব তাজউদ্দীনও বেরিয়ে আসছিলেন। কিন্তু তিন নম্বর কামরার সামনে থেকে তাকে ফিরিয়ে নেয়া হয়। সম্ভবত তিনি বুঝে ছিলেন, যে খবর তিনি পেয়েছিলেন, তা সত্যে পরিণত হতে যাচ্ছে। তাই একবার শেষ চেষ্টা করছিলেন। যদি ভিড়ের মধ্যে ৩ নম্বর কামরায় ঢুকে পড়া যায়। বিধি বাম। তা আর হলো না। তাকে ফিরে যেতে হলো সেই ১ নম্বর কামরায় যেখানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম একা বসে ছিলেন। ২ নম্বর কামরার একজন বললেন যে, জনাব মনসুর আলীকে নিয়ে যাওয়ার সময় সেখান থেকে জনাব কামারুজ্জামানকে নিয়ে যাওয়া হয় ১ নম্বর কামরায়। দরজার বাহির থেকে কে নাকি বলছিলেন, ‘কামারুজ্জামান, কামারুজ্জামানকে নিয়ে আস।’
কে একজন বললেন যে, তিনি শুনছিলেন, জনাব মনসুর আলীকে যখন ১ নম্বর কামরার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে মারার জন্য নিয়ে যাচ্ছেন। আমি তো সেদিনও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলাম।’ জনাব কামারুজ্জামানকে যখন কামরা থেকে বেরিয়ে আসতে বলা হয়, তখন তিনি জায়নামাজের ওপর নামাজ পড়ছিলেন। পাগলা ঘণ্টা পড়ার পর প্রায় সকলেই যে যার নিজস্বভাবে ভগবানকে ডাকছিলেন।  ২ নম্বর কামরার কে যেন বলছিলেন যে, গুলি হওয়ার পর দুজনের মুখ থেকে কাতর শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। একজন ‘আল্লাহ আল্লাহ’ বলছিলেন আরেকজন ‘মা মা’ বলছিলেন।
সামনে সেলের মধ্যে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে যিনি ১ নম্বর কামরার বরাবর সামনে থাকতেন, সম্ভবত তিনি বলেছিলেন যে, গুলিতে জনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং জনাব কামারুজ্জামান সাথে সাথে মারা যান। তবে জনাব তাজউদ্দীন এবং জনাব মনসুর আলী বেঁচে ছিলেন। গুলির আওয়াজ আমরা শুনি প্রায় ৪.২০ মিনিটের সময়। তার পরপরই ফজরের নামাজের জন্য আজান পড়ে। সেলের লোকেরা বলছিলেন, কালো কালো পোশাক পরা লোকগুলি গুলি করে চলে যাওয়ার প্রায় ১৫-২০ মিনিট পর অর্থাৎ ফজরের নামাজের পর আর একদল এসে বেয়োনেটে চার্জ করে সবাইকে। বেয়োনেট চার্জ করার পর অবশ্য আর কেউ বেঁচেছিলেন না। অনেকদিন পরে ওই ঘরের মেঝে এবং দেয়ালে বেয়োনেট চার্জের অনেক দাগ দেখেছি। ৩ নভেম্বর ভোরের দিকে একজন পাহারাদার এসে সংক্ষেপে জানিয়ে দিয়ে গেল, চারজনের মৃতদেহ ঘরের মধ্যে রয়েছে এবং রক্ত বারান্দা হয়ে সামনের ড্রেনে গড়িয়ে পড়ছে।
বেগম তাজউদ্দীন শনিবার দেখা করে গিয়েছিলেন। অসময়ের একটা কাঁঠালও দিয়ে গিয়েছিলেন। ডায়াবেটিসের রোগী হওয়া সত্ত্বেও জনাব তাজউদ্দীন রোববার সন্ধ্যার পর কাঁঠাল খেয়েছিলেন এবং কামরার সকলকেই খাইয়েছিলেন। যা কিছু বাড়ি থেকে আনত তিনি সবাইকে খাইয়ে তবে নিজে খেতেন। ওই দিন রাতে তিনি বেশ কিছুক্ষণ কোরআন শরিফ পড়েছিলেন।
২ নম্বর কামরার একজনের নিকট শুনলাম, জনাব কামারুজ্জামান ওই দিন মানসিক চঞ্চলতায় ভুগছিলেন। বেশ কয়েকবার বলেছেন, তাকে বোধহয় হত্যা করা হবে। জনাব তাজউদ্দীনের নিকট হত্যার কথা শোনার পর তিনি ওই গুজবে সত্যই বিশ্বাস করেছিলেন। চেয়ারম্যান জিম্মৎ আলীর গায়ের রং ছিল মিশমিশে কালো। ওই রাতে জনাব কামারুজ্জামান পাউডার দিয়ে চেয়ারম্যানকে সাজিয়ে অনেকক্ষণ আমোদ-ফুর্তি করেছিলেন।
২ নম্বর কামরার আরেকজনের কাছে শুনলাম, কালো পোশাক পরিহিত লোকেরা স্টেনগান প্রস্তুত করে ১ নম্বর কামরায় ঢুকলে জনাব তাজউদ্দীন বলে উঠেছিলেন, ‘একি করছেন! একি করছেন!’ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী জনাব তাজউদ্দীন ভাবতে পারেন নি ঘাতকের অস্ত্রে কারাগারে অসহায় অবস্থায় তার জীবনাবসান হবে। একটা অধ্যায় শেষ হয়ে গেল। স্বাধীনতা সংগ্রামে বৃহত্তম অবদান যাদের ছিল সেই চারজন নেতাকে আজ জীবন দিতে হলো কয়েকজন অপরিণামদর্শী সুযোগ সন্ধানী ঘাতকের হাতে। বাংলাদেশের কত বড় ক্ষতি হয়ে গেল কেউ বুঝল না। দেশবাসীকে তিলে তিলে মর্মে মর্মে অনুভব করতে হবে এ ক্ষতি। গোটা জাতিকে এর মাসুল দিতে হবে। বাঙালিকে কাঁদতে হবে। স্বাধীন বাংলার শেষ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে পেছন থেকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেছিল মোহাম্মদী বেগ। এই মোহাম্মদী বেগই ছোটবেলায় নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার সঙ্গে একই মায়ের বুকের দুধ খেয়ে বড় হয়েছিলেন।
নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার মৃত্যুর পূর্বে শুধু বলেছিলেন, ‘মোহাম্মদী বেগ, তুমি!’ জুলিয়াস সিজারকে শেষ পর্যন্ত বন্ধু সহকর্মী ব্রুটাস অসি দিয়ে যখন আঘাত করেছিল, তখন তিনিও বলেছিলেন, ‘ণড়ঁ ঃড়ড় ইৎঁঃঁং!’ জানি না, নিহত চার নেতার মধ্যে অনুরূপ কেউ বলেছিলেন কি না তাদের ঘাতকদের সম্বন্ধে। নিষ্ঠুর গুপ্তহত্যার তদন্ত একদিন নিশ্চয়ই হবে। বিচারও হয়তো বা হবে। কিন্তু ফিরে আসবে না অমূল্য ৪টি প্রাণ আর কোনোদিন। এ ক্ষতি কত বড় বাঙালি একদিন বুঝবে। এ ক্ষতি অপূরণীয়। ৩ এবং ৪ নভেম্বর সারাক্ষণ আমাদের কামরার মধ্যে তালাবদ্ধ করে রাখা হলো। সমস্ত নতুন জেল নিশ্চুপ, নিথর। শুধু মাঝে মাঝে তালা খুলে আমাদের খাবার দিয়ে যায়।
৪ তারিখে সকালের দিকে খবর পেলাম, মৃতদেহগুলি একটু ধোয়া-মোছা করে বাইরের বারান্দায় রাখা হয়েছে। ঘরটা পরিষ্কার করারও শব্দ পেলাম। আমাদের কামরার জানালা দিয়ে ১ নম্বর কামরার সামনের রক্ত মাখা কাপড়-চোপড়ও দেখা গেল। শুনলাম, এডিসি এবং এসপি এসে দেখে গেছেন। ঘরের এবং মৃতদেহগুলির ফটোও নিয়েছেন। ময়নাতদন্ত হয়ে গেল। ৪ তারিখে সন্ধ্যার দিকে বরফ ভাঙার আওয়াজ এবং বাক্স তৈরির শব্দও পেলাম। বাকি থাকল শুধু কবর দেয়া।
জেল কর্তৃপক্ষকে আবেদন জানালাম মৃতদেহগুলি দেখার এবং শ্রদ্ধা জানানোর অনুমতি চেয়ে। একবার মনে হলো হয়তো বা অনুমতি পাওয়া যাবে। কিন্তু হলো না। রাত ১১টার দিকে মৃতদেহগুলি বাক্সবন্দি করে জেলগেটের দিকে নিয়ে গেল।
মুজিবনগরে একসঙ্গে কাজ করেছি দীর্ঘ ছয় মাস। জেলখানায়ও অনেকদিন একসঙ্গে কাটিয়েছে। সুখ-দুঃখ সমানভাবে ভোগ করেছি। সকলে যেন এক পরিবারভুক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। একের দুঃখে অন্যজন শুনিয়েছেন সান্ত¦নার বাণী। মাত্র ২০ হাত দূরে থাকা সত্ত্বেও আজ শোনাতে পারলাম না বিদায়ের বাণী, জানাতে পারলাম না শ্রদ্ধার্ঘ। এ যে কত বড় মর্মান্তিক, ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। প্রাণস্পন্দন যেন থেমে গেছে আমাদের। গুমরে ফিরছে বোবা কান্না। ৩ নভেম্বর অনেকবার খবর দিয়েও জেল প্রশাসনের কোনো অফিসারকে আমরা পেলাম না। এতগুলি লোক অসহায়ের মতো নতুন জেলের মধ্যে কি অপরিসীম মর্মযাতনা ভোগ করেছি, একবার কেউ খোঁজ নিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করেন নি। অথচ আমাদের নিরাপত্তা রক্ষার জন্যই এদের চাকরি।
রাত ৩টার দিকে হঠাৎ আমাদের কামরার দরজা খোলার শব্দ পেলাম। সারারাত কেউ ঘুমাই নি। আলো নিভিয়ে সকলেই চুপচাপ জানালার কাছে বসাÑ মৃত্যুডাক কখন আসে। জেল পুলিশের একজন একবার ঘরের বাতি জ্বালাতেও বললেন। কিন্তু কারও উঠবার ক্ষমতা ছিল না। বাতিও জ্বালানো হলো না, দরজা খোলার শব্দে সকলেই সচকিত হয়ে উঠলেনÑ আবার কোন যমদূতের আবির্ভাব! না, ঘাতক নয়। জেলার নিজে তার অধঃস্তন কয়েকজন কর্মচারী নিয়ে হাজির। দুরু দুরু বক্ষে সকলেই অপেক্ষা করছি। কিন্তু ২ নম্বর তালা খোলা হলো না। আমরাও একটু আশ্বস্ত হলাম। হঠাৎ ‘সামাদ সাহেব’ ‘সামাদ সাহেব’ বলে একটা আওয়াজ পেলাম। আবার সকলের হৃদকম্পন শুরু হলো। কিন্তু না। জেলার সামাদ সাহেবের সঙ্গে বিশেষ করে একটু কথা বলতে চান।
আমরা কেমন আছি জানতে চাওয়ায় সকলেই হতবাক হয়ে গেলাম। এত খবর দেয়ার পরও প্রায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যাকে পাওয়া যায়নি, তিনি রাত ৩টায় আমাদের খোঁজখবর নিতে আসবেনÑ এটা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছে। তিনি জানালেন যে, ২ নম্বর ক্যু ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ সামরিক বাহিনীর অধিনায়ক হয়েছেন। নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীতও করেছেন। ১৫ আগস্ট তারিখের ক্যু-দলের সকলেই বাংলাদেশ ত্যাগ করে হংকংয়ের দিকে চলে গেছেন। একটা কিছু হয়েছে, আমরা ওইদিন ভোরের দিকেই অনুমান করেছি। প্রায় এক ঘণ্টার মতো সারাক্ষণ মিগ উড়েছে। কেউ কেউ মিগকে সোজা ডাইভ দিতেও দেখেছেন। বুঝলাম, চূড়ান্ত খেলা তখনই হয়েছে।
পরবর্তীকালে বিমানবাহিনীর কয়েকজন অফিসারের কাছে শুনেছি ওই দিনের ঘটনার কথা। তারা সেদিন অংশগ্রহণ করেছিলেন বলেই কোর্ট মার্শাল করে তাদের শাস্তি দেয়া হয়েছে। ২ নভেম্বর রাত ১২টার পরই ‘ক্যু’ দলটাকে জেনারেল খালেদ মোশাররফের দলের লোকেরা ঘিরে ফেলে। কিন্তু ট্যাঙ্ক তাদের দখলে থাকার দরুন কব্জার মধ্যে আনা যায় না। শেষ পর্যন্ত ৩ নভেম্বর ভোরে মিগ-এর সাহায্যে বোম্বিং করার ভয় দেখালে তারা আত্মসমর্পণ করে। তবে একটা শর্তে, তাদের সকলকেই সপরিবারে নিরাপদে দেশ ত্যাগ করার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। শর্ত মোতাবেক ৩ তারিখ রাত ১০-১১টার দিকে তাদের দেশ ত্যাগ করার সুযোগ করে দেয়া হয়।
কেউ কেউ মনে করলেন, আমাদের মুক্তির লগ্ন সমাগত। জেল কর্তৃপক্ষের দেখা মেলাও ওই মতের সমর্থন করে। ইতোমধ্যেই আমরা বুঝে ফেলেছি, জেল কর্তৃপক্ষের আচরণ আমাদের ভবিষ্যতের মানযন্ত্র। যখন জেল কর্তৃপক্ষকে স্বাভাবিক সহানুভূতিসম্পন্ন দেখেছি তখনই বুঝেছি জেলের বাইরে এমন কিছু চলছে যা আমাদের পক্ষে শুভ। জেল কর্তৃপক্ষকে অহেতুক নির্দয় দেখলে এর উল্টোটাই আমরা ধরে নেই। জেল প্রশাসন যেন স্রোতের শেওলা। জল যেদিকে চলে শেওলাও সেদিকেই চলে। হাওয়ার সাথে চলে বলেই এর একটা নাম আমরা জেল বাসিন্দারা দিয়েছি ‘বাতাসী’। ৪ নভেম্বর রাত ১১টায় মৃতদেহগুলি জেলগেটে নিয়ে গেলে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো। এত কাছে থেকেও শেষবারের মতো একবার দেখতে পারলাম না। ওই রাতেই সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দীন সাহেবের মৃতদেহ তাদের আত্মীয়-স্বজনরা বাসায় নিয়ে গেল। মনসুর আলী এবং কামারুজ্জামান সাহেবের মৃতদেহ পরের দিন সকালে তাদের দেশের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার হয়েছে বলে খবর পেলাম। আরও খবর পাওয়া গেল, সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দীন সাহেবের জন্য বায়তুল মোকাররমে গায়েবি জানাজা হওয়ার সর্ববিধ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। অজস্র লোকও সেখানে জমা হয়েছিল। কিন্তু মৃতদেহ আসলো না, আসলো সামরিক বাহিনীর হুমকি। সবাইকে ভয় দেখানো হলো যে, স্থান ত্যাগ না করলে গুলি করা হবে। ভগ্নমনে একে একে সবাই চলে গেলেন। সামরিক বাহিনীর লোকেরাই ওই দুজনের লাশ বনানীতে কবর দিলেন।
৫ নভেম্বর ভোর থেকে তাজউদ্দীন সাহেবের বাড়িতে হাজার হাজার লোকের ভিড় হয় তাদের প্রিয় নেতাকে শেষবারের মতো একপলক দেখার জন্য। ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর ঢাকা বিমানবন্দরে অনুরূপ ভিড় হয়েছিল যখন মুজিবনগর হতে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার প্রথমবারের মতো ঢাকায় আসে। সেদিন তিনি এসেছিলেন বিজয়ীর বেশে আপন দেশে। আজ তিনি চলে গেলেন বিজয়ীর বেশে অজানা গন্তব্যে। আর তাকে দেখা যাবে না কোনোখানে।
[সংকলিত]

Category: