শেখ হাসিনার ভিশন ও মিশন

uttaran

“আশ্বিনের এক সোনালি রোদ্দুর ছড়ানো দুপুরে… টুঙ্গিপাড়ায় আমার জন্ম। গ্রামের ছায়ায় ঘেরা, মায়ায় ভরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ এবং সরল-সাধারণ জীবনের মাধুর্যের মধ্যদিয়ে আমি বড় হয়ে উঠি।… আমার শৈশবের স্বপ্ন-রঙিন দিনগুলো কেটেছে গ্রাম-বাংলার নরম পলিমাটিতে, বর্ষায় কাদা-পানিতে, শীতের মিষ্টি রোদ্দুরে, ঘাসফুল আর পাতায় পাতায় শিশিরের ঘ্রাণ নিয়ে, জোনাকজ্বলা অন্ধকারে ঝিঁঝির ডাক শুনে, তালতমালের ঝোপে বৈচি, দীঘির শাপলা আর শিউলি-বকুল কুড়িয়ে মালা গেঁথে, ধুলোমাটি মেখে, বর্ষায় ভিজে খেলা করে।”
শেখ হাসিনা, রচনা সমগ্র, প্রথম খ-, পৃ. ২৫-২৬

uttaranনূহ-উল-আলম লেনিন: জীবনের ৭১তম আশ্বিন পেরুবেন শেখ হাসিনা। ধুলোমাটি মাখা, বর্ষায় ভেজা এবং দেশবাসীর ভালোবাসায় সিক্ত ৭১টি ফুল দিয়ে তার বর্ণাঢ্য জীবনের মালা গাঁথা। কিন্তু ৭১টি ফুলের বেশ কয়েকটি রক্তাক্ত, দলিত-মথিত। আবার অনেকগুলো ফুলের সৌন্দর্য-সুষমা এবং সুঘ্রাণ কেবল বাংলাদেশই নয়, দেশ-মহাদেশের সীমান্ত ছাড়িয়ে সারাবিশ্বকে মুগ্ধ ও আমোদিত করেছে। বিশ্বের সেরা রাষ্ট্রনায়কদের শিরোপা তার মাথায়। তার শিরোপার উষ্ণীষে লেখা রয়েছে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’।
বিবিসি’র জরিপে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যেমন আখ্যায়িত করা হয়েছে ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ হিসেবে, তেমনি বাঙালির ইতিহাসের সবচেয়ে সফল, যোগ্য-দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শেখ হাসিনার নামটিও বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি উচ্চারিত হবে। পিতা-পুত্রী এবং দুজন স্বতন্ত্র মানুষ হলেও, বঙ্গবন্ধুর আরাধ্য এবং অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করে শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধু পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠেছেন। আমার কথাকে কেউ অতিশয়োক্তি মনে করতে পারেন। কিন্তু নির্মোহভাবে চিন্তা করলেই ইতিহাসের আর্শিতে আমার কথার সত্যতা ধরা পড়বে। এ-কথা তর্কাতীত যে বঙ্গবন্ধু একমেবাদ্বিতীয়ম। বঙ্গবন্ধুকে সবার ঊর্ধ্বেই ভাবতে হবে। রাষ্ট্রনায়ক, রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী হবেন অনেকেই। কিন্তু জাতির পিতা তো একজনই। বাংলাদেশের স্থপতি একজনই। বঙ্গবন্ধু কারও সাথে তুলনীয় নন। তবে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা তিন-দফায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থেকে যে কাজগুলো করেছেন, জীবিত থাকলে বঙ্গবন্ধু সেই কাজগুলোই অনেক আগে করতেন। আর বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন রূপায়ণে, তার প্রিয় দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং তার আরাধ্য ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তোলার বিশাল কর্মযজ্ঞ শেখ হাসিনা সম্পন্ন করে বাংলাদেশকে বিশ্বসভায় রোলমডেল হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর চিন্তাধারা বাস্তবায়ন করেছেন বলেই বঙ্গবন্ধুর সাথে মিলিয়ে পরস্পরের পরিপূরক বলেছি। দেশবাসী এখন শেখ হাসিনার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ছায়া দেখতে পান। সেটি কেবল সন্তান হিসেবে নয়, সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে।
একটি রাজনৈতিক পরিবারে শেখ হাসিনার জন্ম। ছাত্রজীবনে গভীরভাবে ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। কিন্তু জাতীয় রাজনীতিতে, যে পটভূমিতে তাকে আসতে হয়েছে, তা ছিল তার চিন্তার বাইরে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত না হলে, শেখ হাসিনাকে অপ্রস্তুত অবস্থায় ১৯৮১ সালে পুত্র-কন্যাদের ছেড়ে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং দলের দায়িত্বভার নিতে হতো না। শেখ হাসিনার জবানীতেই আমরা জানি, তিনি লিখেছেনÑ
“রাজনৈতিক পরিবারে আমার জন্ম। পিতা জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছি। একদিন যে আমাকেও তাঁর মতো রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে দেশ পরিচালনা করতে হবে ভাবিনি। সময়ের দাবি আমাকে এখানে এনে দাঁড় করিয়েছে। পিতার স্বপ্ন ছিল বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। আমি এই আদর্শ নিয়ে বিগত ২৮ বছর যাবত জনগণের সেবক হিসেবে রাজনীতি করে যাচ্ছি।”
Ñ শেখ হাসিনা, রচনা সমগ্র, দ্বিতীয় খ-ের প্রথম সংস্করণের ভূমিকা, ৩০ নভেম্বর, ২০০৯

এই লেখার পর আরও ১০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। পিতার আদর্শের পথ ধরে তার রাজনৈতিক জীবনের ৩৮ বছর পূর্ণ হয়েছে।
এই ৩৮ বছরের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার ভিশন ও মিশন কী ছিল? অনেকেই সরলীকরণ করে বলেন, পিতার হত্যার বিচার, তার মর্যাদা পুনরুদ্ধার এবং আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনাই ছিল শেখ হাসিনার ভিশন ও মিশন। নিঃসন্দেহে তার রাজনৈতিক পরিকল্পনা ও লক্ষ্যের মধ্যে এই অভীষ্টগুলো ছিল। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে, অপরাধীদের কয়েকজনের মৃত্যুদ- কার্যকর হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অর্থাৎ জাতির পিতার মর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। ১৯৯৬ সালেই আওয়ামী লীগকে পুনরায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। যদি এটুকুতেই শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভিশন সীমাবদ্ধ থাকত, তা হলে এই ভিশন বা লক্ষ্য অর্জিত হওয়ার পর তার আর রাজনীতিতে থাকার প্রয়োজন ছিল না। বস্তুত কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যই তিনি রাজনীতি করেন নি এবং করছেন না। রাজনীতি সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে :
“আমাদের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। ক্ষমতায় আরোহণের জন্য আমাদের দেশে সাধারণত রাজনৈতিক ইস্যুকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়ে থাকে। সমাজ সংস্কার বা অর্থনৈতিক কর্মকা-কে ইস্যু করা হয় না। রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে বিরোধী দল রাজনৈতিক ইস্যুর সন্ধানে অনেক সময় ব্যয় করেছে। অবশ্য এটা ঠিক যে, একটা পর্যায় পর্যন্ত এর প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজন ছিল ততদিন পর্যন্ত যতদিন গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা ছিল না।… আমি মনে করি, আমাদের রাজনীতির একটা পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রতিযোগিতা হতে হবে জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি। আন্দোলন হবে সমাজ সংস্কারের জন্য। আর এ উন্নয়ন মুষ্টিমেয় মানুষের জন্য নয়। এ উন্নয়ন অবশ্যই হতে হবে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য।”
Ñ বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নয়ন, শেখ হাসিনা, রচনা সমগ্র, ১ম খ-, পৃ. ২১১-২১৩

জননেত্রী শেখ হাসিনা তার বিভিন্ন লেখা ও বক্তৃতায় যে কথাগুলো বারবার উচ্চারণ করেছেন, তা হলোÑ (১) সকল মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো পূর্ণ করতে হবে; (২) প্রত্যেক কর্মক্ষম নাগরিকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা; (৩) প্রতিটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা; (৪) শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা প্রভৃতি নিশ্চিত করাই হবে রাজনীতির মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ বঞ্চিত মানুষের ওপর। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের বঞ্চনার অবসান ঘটানোই হবে রাজনীতির লক্ষ্য। আর এজন্য, তার ভাষায় :
“… সম্পদের সুষম বণ্টন প্রয়োজন। কেউ খাবে কেউ খাবে না তা হবে না। সকলের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। রাজনীতির মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে।
আমাদের দেশের জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য কর্মসূচি প্রয়োজন। আর্থ-সামাজিক কর্মসূচিকে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। রাজনীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে রাষ্ট্রের নাগরিকদের সুখ সুবিধা নিশ্চিত করা, শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা, সুস্থ সবল জাতি গঠন করা। রাজনীতি হতে হবে ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে। দেশকে আমরা কী দিতে পারলাম সেটাই একজন রাজনীতিবিদের চিন্তা-ভাবনা হতে হবে।… দেশকে গড়ে তোলা, মানুষের সুখ সমৃদ্ধি নিয়ে আসা, মানুষের জীবনের ন্যূনতম চাহিদা মিটানোÑ অর্থাৎ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে একটি সুন্দর সমাজ নির্মাণ, যেখানে মানুষ নিরাপদে চলবে, শান্তিতে ঘুমাবে।
আমাদের চিন্তা মানুষকে ঘিরে। দেশের মানুষের কল্যাণ সাধনেই আমরা নিবেদিত। মানুষের অসহায়ত্ত আমাদের পীড়া দেয়। তাই সামাজিক সমস্যা দূর করা এবং অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের মাধ্যমে এই ঘুণে ধরা সমাজ ভেঙে নতুন সমাজ গড়াÑ এমন একটি সমাজ, যেখানে থাকবে না শোষণ বঞ্চনা। সুখী সমৃদ্ধ দেশ গড়ার লক্ষ্যেই নতুন সমাজ গড়তে হবে।”
Ñ শেখ হাসিনা, রচনা সমগ্র, ১ম খ-, পৃ. ২১৩-২১৪

এ-কথাগুলো যে কেবল আপ্তবাক্য নয়, শেখ হাসিনা তিন-দফা রাষ্ট্র পরিচালনায় অর্থাৎ দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে বাস্তব কাজ দিয়ে তা প্রমাণ করেছেন।
শেখ হাসিনা এ-কথা ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছেন, কেবল চটকদার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা এবং বাগাড়ম্বর দিয়ে বেশিদিন জনগণের আস্থা ধরে রাখা সম্ভব নয়। যে মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের কথা তিনি বলেছেন, তা করতে হলে সম্পদ সৃষ্টি করতে হবে। সম্পদ না থাকলে সম্পদের সুষম বণ্টনের কথা অর্থহীন হয়ে পড়বে। খাদ্য ঘাটতি এবং খাদ্য আমদানিনির্ভর দেশে সর্বাগ্রে প্রয়োজন খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা। মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পর্যাপ্ত খাদ্য প্রয়োজন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে, তার প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলেই (১৯৯৬-২০০১) বাংলাদেশ খাদ্যে আত্মনির্ভরশীলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়। কিন্তু ২০০১ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় আসায় দেশ আবার খাদ্য উৎপাদনে পিছিয়ে পড়ে। খাদ্য উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হার ঋণাত্মক হয়ে দাঁড়ায়। ২০০৯ থেকে চলতি বছর পর্যন্ত, টানা ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে বাংলাদেশ এখন খাদ্যে আত্মনির্ভরশীল। প্রত্যেক মানুষের ন্যূনতম খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। ফলে ৪৪ শতাংশ থেকে চরম দারিদ্র্যসীমা ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক পরিবর্তনের যে কথা শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক দর্শনে বারবার উল্লেখ করেছিলেন, সেই উন্নয়ন অভিযাত্রায় বাংলাদেশ এখন নতুন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। স্বল্পোন্নত বা দরিদ্র দেশের লজ্জা ঘুচিয়ে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিশ্বব্যাংক। ১০ বছর আগে যেখানে বাংলাদেশের মাথাপ্রতি আয় ছিল ৪৫০-৫০০ ডালারে সীমাবদ্ধ, সেই মাথাপ্রতি আয় বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৮০০ ডলারের কোটা স্পর্শ করেছে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য ঘোষিত আছে। কিন্তু ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের কাতারে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৭ শতাংশ স্পর্শ করেছে। ১০ বছর আগের ২৮০০/৩০০০ মেগাওয়াট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১৮০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কর্মযজ্ঞের ভিতর দিয়ে বাংলাদেশ পারমাণবিক ক্লাবে যুক্ত হতে চলেছে। রপ্তানি আয় বিপুলভাবে বেড়েছে। বেড়েছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের হার। বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় ৩৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আর এসবের ফলেই সম্ভব হয়েছে বিশ্বব্যাংকের ও অন্যান্য দাতাগোষ্ঠীর ঋণ সাহায্য প্রত্যাখ্যান করে নিজস্ব তহবিল থেকে দেশের সর্ববৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প পদ্মাসেতুর নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া। শেখ হাসিনার দূরদর্শী এবং আত্মমর্যাদাশীল নেতৃত্বের দৃঢ় প্রত্যয়ী ভূমিকার জন্যই এই অসম্ভবকে সম্ভব করা যাচ্ছে। এক পদ্মাসেতু নির্মাণের সাফল্য বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্ভ্রমপূর্ণ অবস্থান এনে দিয়েছে। এখন আর কেউ বাংলাদেশকে পরনির্ভরশীল দেশ অথবা হেনরি কিসিঞ্জারের মতো ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলার ঔদ্ধত্য দেখাতে পারবে না। তৈরি পোশাক শিল্প, সিমেন্ট শিল্প, জাহাজ শিল্প, ঔষধ শিল্প এবং তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন সেবা খাতে বাংলাদেশের চমকপ্রদ উন্নয়ন, আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যের নতুন নতুন খাত সৃষ্টি করেছে। এটা অত্যন্ত শ্লাঘার বিষয় যে বাংলাদেশ মাছ, সবজি প্রভৃতি উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ ৫টি দেশের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আমরা গৌরবের সাথে বলতে পারছি, বাংলাদেশ মহাকাশ যুগে প্রবেশ করেছে। ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ এর মাধ্যমে বাংলাদেশ মহাকাশ পরিবারের সদস্য হয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব।
শেখ হাসিনার ভিশন, দেশের সামাজিক ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করা। তিনি এই ‘ঘুণে ধরা সমাজ ভেঙে নতুন সমাজ গড়ার’ প্রত্যয় ঘোষণা করেছিলেন। এই প্রত্যয় বা ২০০৯ সালের ‘দিনবদলের ইশতেহারে’ ঘোষিত ‘ভিশন-২০২১’, এখন আর রূপকল্পেই সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশের স্কুলে যাওয়ার বয়সী প্রতিটি শিশু এখন প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের হার ৫৫ শতাংশ এবং ছেলেদের ৪৫ শতাংশ। শতাব্দী প্রাচীন অজ্ঞানতার অন্ধকার ঘুচিয়ে এক নীরব সামাজিক পরিবর্তন সংঘটিত হচ্ছে;Ñ যা নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নের পূর্বশর্ত সৃষ্টি করছে। শিক্ষার হার দাঁড়িয়েছে ৭২ শতাংশ।
স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বিপুলভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে/ওয়ার্ডে কমিউনিটি হাসপাতালসহ সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা লাভের সুযোগ বৃদ্ধি, নতুন নতুন হাসপাতাল নির্মাণ এবং মানসম্পন্ন ঔষধ উৎপাদনে বাংলাদেশের অগ্রগতি এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আমাদের জনগোষ্ঠীর গড় আয়ুষ্কাল ৭১ বছরে উন্নীত হওয়া, দক্ষিণ এশিয়ায় শিশুমৃত্যু এবং মাতৃমৃত্যুর হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম। এসব পরিসংখ্যান ও সূচকই প্রমাণ করে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার উন্নয়ন-দর্শন কী বিপুল সাফল্য অর্জন করেছে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি অব্যাহত। তবে গরিব-মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ যত সহজে বাড়ানো যায়, উচ্চশিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ জ্যামিতিক হারে বাড়ানো যায় না। সেবা খাতে ঈর্ষণীয় উন্নতি, তথ্যপ্রযুক্তিতে উন্নতির ধারা বেগবান হলেও, শিল্পায়নের ক্ষেত্রে উন্নতির জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন। শেখ হাসিনা বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছেন। শিল্পায়ন ছাড়া প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান হবে না। সরকারের ধারাবাহিকতা থাকলে অচিরেই সেই লক্ষ্যও অর্জিত হবে। ছিন্নমূল গরিব মানুষের মাথা গুজবার ঠাঁই করে দেওয়ার জন্য গৃহীত প্রকল্পগুলো চলমান। সামগ্রিক মাথাপিছু আয়, সুষম বণ্টন এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করতে পারলে কোনো মানুষই গৃহহীন থাকবে না।
বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর সম্মানজনক সমাধান করেছে। শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমার নিষ্পত্তির মাধ্যমে সমুদ্রবিজয় একদিকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে সংহত করেছে, অন্যদিকে ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছে। ভারতের সাথে দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা স্থলসীমানা চুক্তি বাস্তবায়ন হয়েছে। আমাদের সাথে আর কোনো সীমানা বিরোধ নেই। আমাদের সীমান্তÑ শান্তির সীমান্ত।
বাংলাদেশে মিয়ানমার থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা ১০ লক্ষাধিক মানুষের স্রোত আমাদের উন্নয়ন অভিযাত্রাকে ব্যাহত করছে। জননেত্রী শেখ হাসিনা সর্বোচ্চ মানবিক দৃষ্টি নিয়ে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের এদেশে সাময়িকভাবে থাকার ব্যবস্থা করতে এগিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, আমরা আমাদের ‘খাদ্য ভাগ করে খাব’, তবুও এই মানুষগুলোকে জোর করে মৃত্যুপুরী মিয়ানমারে ঠেলে দেব না। শান্তিপূর্ণ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের তাদের মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি ও তার সরকার। তার এই ভূমিকা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। এজন্যই তাকে ‘মানবতার মা’ বলে পাশ্চাত্যের গণমাধ্যমে উচ্চ প্রশংসা করা হয়েছে।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তিনি অনেক সমস্যার জট খুলেছেন। পিতার নেতৃত্বে গৃহীত ’৭২-এর যে সংবিধান সামরিক শাসকরা যথেচ্ছভাবে পরিবর্তন ও কাটছাঁট করেছিল। দেশের সর্বোচ্চ আদালত তা অবৈধ ঘোষণা করেছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতীয় সংসদ সংবিধান (ত্রয়োদশ-পঞ্চদশ) সংশোধন করে দেশে ’৭২-এর সংবিধান ফিরিয়ে এনেছেন। দেশ পরিচালিত হচ্ছে জাতীয় চার মূলনীতি তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আদর্শ এবং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে। তিনি আমাদের দেশকে পাকিস্তানি ধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার হাত থেকে পুনরুদ্ধার করেছেন। একইসঙ্গে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছেন। জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেছেন।
’৭১ পেরুলেন শেখ হাসিনা। কিন্তু না চিন্তায় না শারীরিকভাবে কোনো বার্ধক্য বা জড়তা তাকে কাবু করতে পারেনি। বিপুল তার প্রাণশক্তি এবং কর্মক্ষমতা। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা ছাড়াও বহুবার তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। এখনও তিনি প্রাণ হাতে নিয়ে মাতৃভূমির দেওয়া দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। রাজনীতির বাইরে তার কার্যত কোনো ‘ব্যক্তিগত জীবন নেই’। দেশের জনগণ এবং আওয়ামী লীগই তার আত্মার আত্মীয়, ধ্যান, জ্ঞান এবং সর্বক্ষণের সহযাত্রী।
নিজেকে তিনি ‘আলোর পথযাত্রী’ বলেছেন। যথার্থই তিনি আলো হাতে আঁধারের যাত্রী। বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে অন্ধকারের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল, বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা সেই অন্ধকারের রাজত্বের অবসান ঘটিয়েছেন। আমরা, বাঙালি জাতি তার নেতৃত্বেই আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার ভিশন বা লক্ষ্য তিনি ঘোষণা করেছেন। ২০০৯ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে গড়ে তোলার রূপকল্প (ভিশন) ঘোষণা করেছিলেন। তার সেই ভিশন বিপুল জনসমর্থন নিয়ে তিনি বাস্তবায়িত করে চলেছেন। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার ভিশনও তিনি এবং নতুন প্রজন্ম নিঃসন্দেহে সাফল্যের পথে এগিয়ে নিতে সক্ষম হবেন। ১৯৮১ সালে যে ভিশন ও মিশন নিয়ে মাতৃভূমিতে ফিরে এসেছিলেন, সে মিশন তার সফল হয়েছে। সময়ের সাথে ভিশন পরিবর্তন হয়। এই পরিবর্তনের বিজ্ঞান বুঝেছেন বলেই শেখ হাসিনা সকল সংকট মোকাবিলা করে এগিয়ে যাচ্ছেন।
তার এই ৩৮ বছরের চলার পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। আশির দশকে, মাত্র ৩৫ বছর বয়সে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বভার গ্রহণের সময়, স্বাভাবিকভাবেই তার অভিজ্ঞতার ভা-ারটি সমৃদ্ধ ছিল না। তিনি বয়োজ্যেষ্ঠ এবং বঙ্গবন্ধুর সহকর্মী হিসেবে আস্থাভাজনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে দল পরিচালনার চেষ্টা করেন। কিন্তু তখনকার অনেক নেতা-ই ভেবেছিলেন, অনভিজ্ঞ এবং বয়োকনিষ্ঠ শেখ হাসিনাকে তারা হাতের পুতুল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু তারা ভুল ভেবেছিলেন। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার অভিজ্ঞতা কম থাকলেও তার ঋজু এবং আত্মমর্যাদাশীল ব্যক্তিত্বকে তারা খাটো করে দেখেছেন। যখন প্রয়োজন ছিল দলের মধ্যে ইস্পাতদৃঢ় ঐক্য, তখন দলের নেতৃত্বের একটি অংশ ছিল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নানামুখী চক্রান্তমূলক তৎপরতায় লিপ্ত। কৃত্রিমভাবে দলের মধ্যে ইস্যু সৃষ্টি করে দলে ভাঙন অনিবার্য করে তোলেন। প্রথমে মিজানুর রহমান চৌধুরী দল থেকে বেরিয়ে ‘মিজান আওয়ামী লীগ’ গঠন করেন, তারপর সিলেটের প্রবীণ নেতা দেওয়ান ফরিদ গাজী এবং মোফাফ্ফর হোসেন পল্টু স্বতন্ত্র আওয়ামী লীগ গঠন করেন। তবে সবচেয়ে বড় আঘাত আসে প্রয়াত আবদুর রাজ্জাকের দিক থেকে।
আশির দশকে দলের প্রভাবশালী সংগঠন ও নেতা দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। গড়ে তোলেন ‘বাকশাল’ নামে নতুন রাজনৈতিক দল। ছাত্রলীগকে ভেঙে দু-টুকরো করেন। অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলোতেও একই খেলা চলে। ফলে দলের ওপর বিরাট একটা ধাক্কা এসে পড়ে। এইসব ধাক্কা সামাল দিয়ে দলের ঐক্য ও সংহতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য শেখ হাসিনা পিতার মতোই চারণের বেশে দেশের প্রায় প্রতিটি উপজেলা-জেলা সফর করেন। ১৯৯১-এর নির্বাচনকালেই বাকশালের সংকট চূড়ান্ত রূপ নেয়। নির্বাচনের পর আবদুর রাজ্জাক ও মহিউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন অংশটি বাকশাল বিলুপ্ত করে দলে ফিরে আসেন। ঐক্যের প্রতীক জননেত্রী শেখ হাসিনা উদার ও সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ফিরে আসা নেতা-কর্মীদের অ্যাকোমেডেট করেন।
এরপর নব্বইয়ের দশকে ড. কামাল হোসেন দল থেকে বেরিয়ে গণফোরাম করেন। কিছু নেতাকর্মী বিভ্রান্ত হয়ে ড. কামালের পথ ধরেন। প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. মোহাম্মদ সেলিমও গোস্বা করে দল থেকে বেরিয়ে তৃণমূল আওয়ামী লীগ নামে স্বতন্ত্র দল করার ব্যর্থ চেষ্টা করেন।
১৯৯৬ সালের ১৪ জুনের নির্বাচনে দলকে ২১ বছর পর ক্ষমতায় নেওয়ার পর, স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আর কেউ মাথা তুলে দাঁড়াবে না; আর কোনো ষড়যন্ত্র হবে না। কিন্তু ২০০৭ সালের ১/১১-এর পরিবর্তনের ফলে জরুরি অবস্থা জারি ও ফখরুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পরও আমরা নতুন ষড়যন্ত্রের খেলা দেখতে পেলাম। একদিকে মহলবিশেষের মাইনাস টু ফর্মুলার নামে কার্যত শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে নির্বাসিত করা, অন্যদিকে আওয়ামী লীগকেও ভাঙার ষড়যন্ত্র চলে। শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারের আগেই ‘সংস্কারপন্থি’ বলে কথিত দলের চারজন সিনিয়র নেতা আমির হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ এবং সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পৃথক পৃথকভাবে কিন্তু অভিন্ন ভাষায় সংবাদ সম্মেলন করে দলের ‘সংস্কার’ দাবি করেন। এই নেতৃবৃন্দের অবিমৃশ্যকারী এই তৎপরতার সাথে উচ্চাভিলাষী সেনা কর্মকর্তা ও সেনা গোয়েন্দা সংস্থার যোগসাজশ ছিল বলে জানা যায়। যে কারণেই হোক, এই ঘটনা কার্যত শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি এক ধরনের অনাস্থা যেমন প্রকাশ পায়, তেমনি দলীয় ফোরামে সংস্কার প্রস্তাব না তুলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি তোলায় দলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির প্রয়াস হিসেবেই কর্মীদের কাছে প্রতিভাত হয়। কিন্তু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতা ও কর্মীরা ছিল জননেত্রী শেখ হাসিনার পেছনে প্রবলভাবে ঐক্যবদ্ধ ও সংহত। ফলে দল ভাঙার সকল প্রয়াশ ব্যর্থ হয়।
এভাবেই ঘরে বাইরের বহুমুখী ষড়যন্ত্র এবং চাপ মোকাবিলা করেই শেখ হাসিনা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে চোখের মণির মতো রক্ষা করে চলেছেন। কেবল রক্ষাই নয়, দলকে দেশের সবচেয়ে গণভিত্তিসম্পন্ন সর্ববৃহৎ অজেয় দলে পরিণত করেছেন।
বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো বর্তমানে জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় পরিচালনার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার বিকল্প কোনো নেতা নেই। মুসলমানপ্রধান দেশগুলোতে শেখ হাসিনাই একমাত্র সরকারপ্রধান যিনি অকুতোভয়ে সেকুলার গণতন্ত্রের পক্ষে সবচেয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে চলেছেন। জঙ্গিবাদ, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, জাতিগত বিদ্বেষ এবং শক্তি প্রদর্শনের হুমকিমুক্ত, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত এক শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তোলার প্রবক্তা হিসেবে জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের জননন্দিত প্রধানমন্ত্রীর শান্তি ফর্মুলা মানব জাতির সামনে নতুন আশাবাদ সৃষ্টি করেছে। তিনি এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও আস্থাভাজন বিশ্বনেত্রী।
’৭২-এ পদার্পণ এবং বিগত ৩৮ বছরের পথচলার অক্লান্ত সারথি শেখ হাসিনা বারবার নিজেকে অতিক্রম করেছেন। রবীন্দ্রনাথ যেমন তার সৃষ্টিকর্মে বারবার নিজেকে অতিক্রম করায় কখনোই পুরনো বা অচল হননি, তেমনি বাংলাদেশের উন্নয়নের রূপকার, রাজনীতির কুশলী শিল্পী এবং চিন্তক শেখ হাসিনাও রাজনৈতিক সৃজনশীলতায় বারবার নিজেকে অতিক্রম করে চলেছেন। সেজন্যই তার নেতৃত্ব কখনও পুরনো হয় না, সেকেলে হয় না। প্রিয় নেত্রী, প্রিয় সতীর্থ শেখ হাসিনা, জন্মদিনে আপনাকে ফুলেল শুভেচ্ছাÑ নমিত শ্রদ্ধা।

শ্রেণী:

টুকরো কথা টুকরো স্মৃতি

uttarann
uttarann

জননেত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

শেখ হাসিনা ও আমার কিছু স্মৃতি
* নাসিমা হক

uttaranবয়স যত বাড়তে থাকে ছেলেবেলার স্মৃতি তত মনে ভিড় করে আসে। সেই স্মৃতির সঙ্গে ভিড় করে আমার স্কুল আজিমপুর স্কুল (বর্তমানে আজিমপুর গভ. গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ) ও স্কুলের বন্ধুদের স্মৃতি। আমরা আজিমপুর গভর্নমেন্ট স্টাফ কোয়ার্টারে আসি ১৯৫৮ সালে। তারপরই আমি আজিমপুর স্কুলে ক্লাস ফোরে ভর্তি হই।
স্কুল কাছে হওয়ায় আমরা কখনও দলবেঁধে, কখনও একা হেঁটেই স্কুলে চলে যেতাম। স্কুলের সামনে বিশাল মাঠ। সে ছিল আমাদের আকর্ষণ। অবশ্য আজিমপুরে সব বাড়ির সামনেই ছিল বড় বড় মাঠ।
বন্ধুরা তখন যেমন ছিল তেমনি এখনও আমাকে ভীষণ টানে। আজকাল স্কুলের বন্ধুদের কোনো পুনর্মিলনী থাকলে সব প্রোগ্রাম বাদ দিয়ে হাজির হয়ে যাই। কখনও মিস করি না।
আমাদের বন্ধুদের অধিকাংশই নিজের নিজের পেশায় খুব সফল হয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে সফল, সার্থক হয়েছেন শেখ হাসিনা। হ্যাঁ, আমি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথা বলছি। শেখ হাসিনা আজিমপুর গার্লস হাইস্কুলে আসেন সম্ভবত ক্লাস সিক্সে। তার আগে ছিল নারী শিক্ষা মন্দিরে।
স্কুলের দিনগুলো আমাদের কেটেছে পড়াশোনার পাশাপাশি গল্পের বই পড়ে, আড্ডা দিয়ে আর দুষ্টুমি করে। হাসিনা সে-সময় অনেক দুরন্ত ছিলেন।
টিফিনের সময় স্কুলের মাঠে বসে দল বেঁধে আড্ডা দেওয়া ছিল আমাদের কাজ।
আমার মনে পড়ে ’৬২ সালে হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ডাকে আমরা একদিন স্কুল থেকে বেরিয়ে মিছিলে চলে গিয়েছিলাম।
সামরিক শাসক আইয়ুব খান দেশে মৌলিক গণতন্ত্র চালু করেছিল। আমাদের ‘সমাজপাঠ’ নামে একটি বইতে এসব পড়তে হতো। ক্লাস নাইনে সমাজপাঠ পরীক্ষার খাতায় প্রশ্নের উত্তর লিখতে গিয়ে হাসিনা ‘মৌলিক গণতন্ত্রে’র কঠোর সমালোচনা করে অনেক কিছু লিখে দিয়েছিলেন। হাসিনা যে খুবই দৃঢ়চেতা ছিলেন এ তারই প্রমাণ।
স্কুল থেকে খবর পেয়ে পরে তার গৃহশিক্ষককে এসে স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলতে হয়েছিল।
স্কুলের আরও স্মরণীয় ঘটনা হচ্ছে, ’৬৪ সালে আমাদের ওপর দায়িত্ব পড়েছিল স্কুলে ধর্মঘট করানোর ও পিকেটিং করার। ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলনের স্মরণে ঐ ধর্মঘট আহ্বান করা হয়েছিল। আমরা স্কুলের সামনে পিকেটিং করেছিলাম। ছাত্রীদের বলেছিলাম আজ স্কুলে ধর্মঘট, তোমরা ফিরে যাও। ছাত্রীরা অবশ্য আমাদের কথা শোনেনি। আমরা সফল হইনি। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষ বিষয়টা ভালোভাবে নেয়নি। শেখ হাসিনা, আমি, নাসিমুন আরা হক (মিনু), সুলতানা কামাল (লুলু), কাজল, হোসনে আরা বেগম (হেলেন)-সহ আমাদের মোট ১০ জনকে স্কুল কর্তৃপক্ষ শোকজ করেছিল। বাকিদের সকলের নাম এখন আর মনে নেই।
১৯৬৫ সালে এসএসসি পরীক্ষার ফর্ম পূরণ ইত্যাদি কাজে একদিন স্কুলে গিয়েছি। সে-সময় হাসিনা হঠাৎ বললেন চল্, সবাই আমাদের বাড়িতে যাই। ওর ভেতরে এমন স্বতঃস্ফূর্ততা ও আন্তরিকতা ছিল। আমরা সাতজনÑ হাসি, বেবী, হেলেন, বুড়ি, মর্জিনা, নাসেহা ও আমি হাসিনার সঙ্গে ওদের বাড়ি গেলাম। ৩২ নম্বরে। দুপুরে সেখানে ভাত খেলাম। বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আমাদের পরিবেশন করে খাওয়ালেন। শেখ রাসেল তখন ছোট্ট শিশু। বিছানায় শোয়া ছিল। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, পরে ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বেগম মুজিব ও শিশু রাসেলকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল দুর্বৃত্তরা।
সেদিন আমরা অনেক আড্ডা দিলাম, ছাদে ও বাগানে বেড়ালাম। ছাদে হাসিনা ওর কাকার ক্যামেরায় আমাদের ছবি তুললেন। সে ছবি আমার কাছে এখনও আছে।
এসএসসির পর আমাদের স্কুল পর্ব শেষ হলো। আমরা ভর্তি হলাম বকশীবাজারে গভ. ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজে (বর্তমান বদরুন্নেসা কলেজ)। এখানে শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলো। আমি ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে। আমরা পুরোপুরি সক্রিয়ভাবে জড়িত হয়ে পড়লাম।
তখন ছিল আইউব-বিরোধী তথা সামরিক শাসনবিরোধী উত্তাল ছাত্র আন্দোলনের সময়। আমি কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সাধারণ সম্পাদক (১৯৬৫-৬৬) নির্বাচিত হই। আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ছাত্রলীগের সাঈদা গাফফার। তখন কলেজ ছাত্র ইউনিয়ন খুবই শক্তিশালী ছিল।
আমাদের সময়ে আমরা কলেজে শহিদ মিনার নির্মাণ করেছিলাম। প্রিন্সিপাল তা পরের দিন ভেঙে দিয়েছিলেন।
পরের বছর ১৯৬৬ সাল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬-দফা ঘোষণা করেছেন। ৬-দফার পক্ষে সারাদেশে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। কলেজ ছাত্রী সংসদ নির্বাচনে সহ-সভানেত্রী পদে শেখ হাসিনা নির্বাচন করেন ও বিপুল ভোটে জয়ী হন।
হাসিনা ছিলেন অত্যন্ত মিশুক স্বভাবের এবং অত্যন্ত জনপ্রিয়। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আমাদের শামসুন্নাহার। আমাদের ছাত্র ইউনিয়নের বন্ধুরা অনেকেই শেখ হাসিনাকে ভোট দিয়েছিল।
শেখ হাসিনা দৃঢ়তা ও সাহসিকতার সঙ্গে সহ-সভানেত্রী হিসেবে ছাত্রী সংসদের কার্যক্রম পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আমাদের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো ছিল সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে, গণতন্ত্রের জন্য ছাত্রদের সংগ্রামে মুখর।
বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের লড়াইয়ে উত্তাল। প্রতিদিন ছিল সংগ্রাম ও মিছিলের কর্মসূচি। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে সমবেত হয়ে সেসব মিছিল শুরু হতো। কলেজ থেকে হেঁটে গিয়ে আমরা মধুর ক্যান্টিনে সভা-সমাবেশে বা শহিদ মিনারের মিছিলে যোগ দিতাম। সেই উত্তাল দিনগুলোতে এসব মিছিলে আমরা একসঙ্গে অনেক হেঁটেছি। আমরা ছিলাম মিছিলের সহযাত্রী।
এই সংগ্রামই পরে ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। তখন আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী।
তার রেশ ধরে ’৭০-এর নির্বাচন এবং পরে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। তারপর অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে শেখ হাসিনা প্রথমবার ১৯৯৬ সালে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
আজ ২০১৮ সালেও শেখ হাসিনা দেশের প্রধানমন্ত্রী, একটানা ১০ বছর ধরে দেশের কা-ারি। সারাবিশ্বে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে আমি আমার বন্ধু, আমাদের বন্ধু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ, সুস্থ ও কর্মময় জীবন এবং তার সুখ, শান্তি ও সাফল্য কামনা করি।
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্র এবং নারীনেত্রী

টুকরো কথার সামান্য ইতিকথা
* কাজী রোজী

uttaran2১৯৬৫ সাল, তোমার সাথে আমার সখ্যকাল। গভ. ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজ, কত কত বসন্ত চলে গেছে, বৈশাখ চলে গেছে, ছুঁয়ে গেছে রাজনীতির ঢেউ। বদলেছে দেশ কাল সময়ের প্রেক্ষাপট। প্রায় প্রায়ই সাক্ষাৎ হয়েছে আমাদেরÑ হয়েছে কুশলবিনিময়।
ভাব আর ভালোবাসার উচ্চারণগুলো এবং নান্দনিক শব্দগুলো কলেজের সীমানার কৃষ্ণচূড়ার ডালে আজও আছে অমøান স্মৃতিময় বিশ^াস ছুঁয়ে। বন্ধু, বেশিদিন আগের তো কথা নয়। এই তো সেদিন দারুণ ষাটের দশক, ’৬৫, ’৬৬, ’৬৭, ’৬৮, ’৬৯-এর আন্দোলনের দিন।
আমরা ক’জন সতীর্থ কলেজে শহিদ মিনার গড়ব ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলাম। কিন্তু প্রিন্সিপাল আপা বাঁধ সাধলেন। তিনি আটকে রাখলেন আমাদের কয়েকজন সতীর্থকে। বাইরে থেকে প্রতিবাদ উঠল সতীর্থদের ছেড়ে দিন, আমরা কাজ করব। তারপর আমরা মুক্তি পেয়েছিলাম এবং তোমার মনে পড়ে বন্ধু, আমরা আমাদের স্বপ্নের শহিদ মিনার গড়েছিলাম। শহিদ মিনার গড়ার এই সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন হাসিনা, মিনু ও জেলী প্রমুখ বন্ধুরা ।
একা একা বসে থাকা, একা একা কথা বলা, তোমার স্বভাবে সেটা ছিল না তা আমি জানি। তবুও এগিয়ে যাওয়া ফুরত নাÑ কথাও ফুরত নাÑ ক্যান্টিনে বসে আড্ডাও ফুরত না। ক্যান্টিনবয় মোহাম্মদ আলী আমাদের তাগিদ দিত ‘ঘণ্টা শেষ হয়েছে বাড়ি যান আফারা, আমি রুম পরিষ্কার করুম’। মনে পড়ে বন্ধু, সিঙ্গাড়াটুকু রেখে দিয়ে তুমি বলতে ‘চলো যাই, ওদের কাজ ওদেরকে করতে দিতে হবে’। আজও মনে পড়ে সেই দিনের কথা।
বন্ধু হাজার কথা বলা যায়, লক্ষ কথা বলা যায়, তবু কিছু কষ্টের কথা নীরবে নিভৃতে রয়ে যায়। সেই কষ্টগুলো অন্যরকম কষ্ট। ঝড়ের আলামত আছে ঝড় দেখা যায় না। ভিন্ন ভিন্ন রূপে তোলপাড় করে কুঠুরি হৃদয়, জানি বন্ধু। নির্যাতনের বেহালা বাদকও থেমে যায় আমাদের কাঁদিয়ে কাঁদিয়ে।
পৃথিবীতে কিন্তু এতটা এরকম কষ্ট সবার নেইÑ সবার হয় না। বারবার তোমার জীবনকে ধ্বংস করে দেবার এত অপচেষ্টা সবার থাকে না। এখন তুমি মানবতার মাতা। এখন তুমি উন্নয়নের রোলমডেল। শিশু নারী যুব-তরঙ্গের ভাষা বুঝে নিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছ। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুবিধা দেওয়ার জন্য ছুটে বেড়াচ্ছ তুমি দেশ এবং বিদেশের সর্বত্র। নৌকার হাল ধরে আওয়ামী লীগের পাল তুলে দেশের নির্বাচনের বিজয় গৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য অনবদ্য তোমার ভূমিকা। তুমি জন্ম-জন্মান্তরের অদম্য প্রতিভূ একজন। হাজার কথার বনলতা মনজুড়ে থাকলেও সব কথা বলা যায় না। আমরা যে ক’জন সতীর্থ বন্ধু ছিলাম সবাই এখন কে কোথায় জানি না। তবে টোকা দিলেই ঝরে যাব এরকম ফুল আমরা নই। আমরা এখন সব বুঝি, সব জানি, সব টের পাই। আমরা এখন বাংলার টেকসই নারীকুল।
লেখক : জাতীয় সংসদ সদস্য এবং বিশিষ্ট কবি

বঙ্গবন্ধু-কন্যাকে নিয়ে টুকরো স্মৃতি
* ডা. দীপু মনি

uttaran3বঙ্গবন্ধু-কন্যা তখন গৃহবন্দি ধানমন্ডি পাঁচ নম্বর সড়কের সুধাসদনে। ২০০৭-এর সম্ভবত জুনের শেষ সপ্তাহ তখন। দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রবেশাধিকার নেই সেই বাড়িতে। আত্মীয়-স্বজনরা দেখা করতে পারেন। আমি তখন সেই বাড়িতে প্রতিদিন যাই। যাই বঙ্গবন্ধু-কন্যার ব্যক্তিগত চিকিৎসক পরিচয়ে।
তার কিছুদিন আগেই একদিন হঠাৎ করেই আমাকে আটকে দেওয়া হয়েছিল তার বাড়ি থেকে দুই মোড় আগে পাঁচ নম্বর সড়কের মাথায়। প্রহরারত পুলিশ কিছুতেই যেতে দেবে না নেত্রীর কাছে। ওপরের নিষেধ আছে। শুধু আমাকে নয়, সবার জন্যই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য, বলেছিল পুলিশ। আমি ভেতরে নেত্রীকে ফোন করে জানালাম, ‘আপা, ঢুকতে দিচ্ছে না।’ নেত্রী অনুরোধ করতে বললেন তার নাম করে। শুনল না। বেশ কিছুক্ষণ এভাবেই চলল। এরই মধ্যে বৃষ্টি শুরু হলো। নেত্রীকে বললাম, ‘কিছুই তো শুনছে না, তবে কি চলে যাব আপা?’ নেত্রী এবার বললেন, ‘ওকে বলো, তুমি আমার ব্যক্তিগত চিকিৎসক। তোমাকে ঢুকতে না দিলে আমি এখনই বেরিয়ে আসছি রাস্তা পর্যন্ত।’ শুনেই তটস্থ হয়ে পুলিশ সদস্যটি খুবই অস্বস্তি নিয়ে বলল, ‘এই কথাটা তো আগে বললেই পারতেন। যান, ভেতরে যান। এরপর যখনই আসবেন, এই পরিচয়টাই দেবেন।’ সেই থেকেই সাথে সাদা অ্যাপ্রোন আর রক্তচাপ মাপার যন্ত্র ও স্টেথেস্কোপ নিয়ে রোজ সুধাসদনে আমার যাতায়াত। দুপুরের কাছাকাছি সময়ে গিয়ে নেত্রীর সাথে দুপুরের খাবার খেয়ে বিকেলের মধ্যে বেরিয়ে আসা, এই ছিল ১৬ জুলাই ২০০৭-এর ভোরে নেত্রী গ্রেফতার হবার আগের দিন পর্যন্ত প্রতিদিনের রুটিন।
প্রতিদিনের মতো সেদিনও গেছি সুধাসদনে। নিচতলায় শেখ জামাল ক্রীড়াচক্রের কর্তাব্যক্তি একজন দেখা করতে এসেছিলেন। তিনি চলে যাবার পর নিচতলায় বসেই কথা হচ্ছে। নেত্রী আমাদের রেলপথ নিয়ে কথা বলছেন। রেলপথের উন্নয়ন নিয়ে তার স্বপ্নের কথা বলে চলেছেন। কোথায় কোথায় রেলসেতু হবে, কোথায় ডাবল গেজ হবে, কোথায় নতুন রেলপথ হবেÑ এমনভাবে বলে চলেছেন যে তিনি যেন চোখের সামনেই সারাদেশের রেলপথের ছবিটি স্পষ্ট দেখছেন। তার স্বপ্ন আর পরিকল্পনার কথা শুনতে শুনতে আমি দু-চোখের পানি সামলাতে পারলাম না। রাগ আর কষ্টের অদ্ভুত মিশ্রণ। নেত্রী উৎকণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কাঁদছি কেন হঠাৎ করেই। রাগে-দুঃখে বললাম, ‘আপনাকে গৃহবন্দি করে রেখেছে। দুদিন বাদেই হয়তো গ্রেফতার করে জেলে নেবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহু বছর ক্ষমতায় থাকার পাঁয়তারা করছে। ঘরে-বাইরে শত্রুরা ষড়যন্ত্র করছে। আপনাকে মেরে ফেলবে সুযোগ পেলেই। আদৌ নির্বাচন হবে কি না, গণতন্ত্রে দেশ ফিরবে কি না বা ফিরলেও কত বছরে, তার কোনো হিসাব নেই। আর আপনি কি না বন্দিদশায় বসে বসে রেলপথের উন্নয়ন, সাধারণ মানুষের চলাচল আর দেশব্যাপী পণ্য পরিবহনের সুবিধার পরিকল্পনা করছেন। আপনাকে গ্রেফতার করবে না তো আর কাকে করবে?’ বলতে বলতে উত্তেজনায় চোখের পানি নাকের পানি একাকার।
নেত্রী সস্নেহে শান্ত অথচ খুব দৃঢ় স্বরে বললেন, ‘একটুও ভাববে না। ওরা আমার কিছুই করতে পারবে না। আমার দেশের জনগণ ওদের শাসন মানবে না। ওরা নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে। জনগণ আমাদের ভোট দেবে। আমরা সরকার গঠন করব। পরিকল্পনা সব তাই এখন থেকেই করে রাখছি, যেন দায়িত্ব পাবার পর সময় নষ্ট না করতে হয়।’ আমি অবাক হয়ে তার কথা শুনলাম। মনে পড়ল কর্নেল শওকত আলী চাচার কথা। ’৬৯-এ বঙ্গবন্ধু (তখনও এ উপাধিতে তিনি ভূষিত হননি) আগরতলা মামলায় তার সাথে আরও যারা অভিযুক্ত ছিলেন তাদের ফাঁসিতে ঝুলবার আশঙ্কার জবাবে বলেছিলেন, ‘ভাবিস না, জনগণ এ প্রহসনের বিচার মানবে না। আমাদের আন্দোলন করে মুক্ত করবে। তারপর নির্বাচন দিতে সরকার বাধ্য হবে। আমরা জিতব। আমাদের ক্ষমতায় যেতে দেবে না। যুদ্ধ হবে। আমরা স্বাধীন হব।’ আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। নেত্রীর কথাগুলো কি পিতার কথার মতোই সত্যে পরিণত হবে? কোন দৈববলে মানুষ এমন ভবিষ্যৎ দেখতে পারে? ইতিহাসবোধ আর মানুষকে বুঝতে পারার গভীরতা এবং আত্মবিশ্বাস কতটা জোরাল হলে কোনো নেতা বা নেত্রী এমন ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেন?
মনে পড়ে, চোখ বন্ধ করে স্রষ্টার কাছে নীরবে সেদিন প্রার্থনা করেছিলাম, পিতার মতোই বঙ্গবন্ধু-কন্যার কথাও যেন সত্যি হয়। আর শুকরিয়া আদায় করলাম আল্লাহর কাছে, এমন নেত্রীর কাছে থাকবার, তার স্নেহ পাবার, তার কাছে থেকে রাজনীতি শিখবার, তার কর্মী হিসেবে দেশের জন্য কাজ করবার সুযোগ তিনি দিয়েছেন আমাকে। আমি ধন্য।
লেখক : জাতীয় সংসদ সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্যতম       যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী

জন্মদিনে অফুরন্ত শুভেচ্ছা
*  সিমিন হোসেন রিমি

uttaran4প্রকৃতি এক অপার রহস্যের ভা-ার। সৌন্দর্যের অনন্ত এক লীলাভূমি। নীল আকাশ, উন্মুক্ত সাগর-মহাসাগর, পাহাড়-পর্বত, বনাঞ্চল, সবুজের অফুরন্ত সমারোহ। কী দারুণ শৃঙ্খলা প্রকৃতিতে। এই সমস্ত কিছুর মাঝেই পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে আছে প্রাণের অস্তিত্ব নানা রূপে, বর্ণে, আচ্ছাদনে। যেখানে মানুষ মূল ভূমিকায়। এই মানুষ তার জীবন গড়ে, সমাজ গড়ে, রাষ্ট্র গড়ে। কবি নজরুলের অমর লেখনীর ছন্দে সুর বেজে ওঠেÑ “খেলিছো এ বিশ্ব লয়ে বিরাটো শিশু আনমনে, খেলিছো…।”
এই ভাঙাগড়ার খেলায় যুগে যুগে, দেশে দেশে, ভিন্ন ভিন্ন সমাজে, অঞ্চল ভেদে প্রয়োজন হয় দক্ষ নাবিকের। যিনি শক্ত হাতে হাল ধরেন একটি সময়ের। সৃষ্টিকর্তা জানেন তিনি কখন কাকে দিয়ে কোন কাজটি করাবেন। কে হবে সেই নাবিক। তেমনি এক দক্ষ নাবিকের ভালোবাসার স্পর্শে আজ এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। শুভ জন্মদিন প্রিয় মানুষ, প্রিয় বোন শেখ হাসিনা।
রাত-দিনের কোনো ভেদাভেদ নেই। কাজ, কাজ, শুধু কাজ। ক্লান্তিহীন বিরামহীন কাজ। বাংলার অনন্য বীর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অমর আকাক্সক্ষা ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে দেশের কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন আমাদের বোন শেখ হাসিনা। এদেশের মানুষের সুখ-দুঃখ, সাফল্য-সৃষ্টি, উন্নয়ন-অর্জন সকল কিছুর সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছেন তিনি। তার দৃঢ় কর্মোদ্যোগী নেতৃত্বে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ আজ মাথা তুলে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হয়েছে। ১৬ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার বাংলাদেশে একটি মানুষও না খেয়ে থাকে না আজ। নিভৃত গ্রামের প্রান্তিক নারী আজ ঘর থেকে দুই পা বাড়ালে কমিউনিটি ক্লিনিকে পৌঁছে যায়। প্রয়োজনীয় ওষুধ পায়। দরিদ্র মানুষ আজ বিশ্বাস করার সাহস পায় ভবিষ্যতে সে আরও উন্নত জীবন পাবে। বিদ্যুতের আলোতে আলোকিত হয় অন্ধকার রাত। মানুষের জীবনের অতি প্রয়োজনীয় এই বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে ঘরে ঘরে। বিদ্যুতের এই আশাতীত কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। বাংলাদেশের মানুষ আরও অনেক বড় স্বপ্নের জাল বোনে।
আমি যতবার দেখি প্রিয় আপার মুখ, আনন্দ-বেদনার দোলাচালে আমার মন দৃষ্টি মেলে আকাশের সীমাহীন বিশালতায়। বিস্মিত হই আমি বারবার। রবীন্দ্রনাথে স্বস্তি মেলে। আশ্চর্য কয়েকটি শব্দÑ “অলৌকিক আনন্দের ভার বিধাতা যাহারে দেন, তার বক্ষে বেদনা অপার”। কী অসীম ধৈর্য দিয়ে প্রাণান্তকর নিদারুণ নিষ্ঠুর বেদনাকে পাথর চাপা দিয়ে প্রতিমুহূর্তে চেষ্টা করে চলেছেন তিনি। সকল মানুষের নিশ্চিন্ত সুখী আনন্দময় জীবন গড়ে তোলার প্রত্যাশায়। অঝর ধারার বেদনার নিজ অশ্রুকে আড়াল করে অন্যের অশ্রুমোচনে ক্লান্তিহীন তিনি। আমার কখনও মনে হয় ডিজনি সিরিজের ‘লায়ন কিং’য়ের সিংহ শাবক ‘সিম্বা’ তিনি। অপশক্তি আর নিকটজনের তীব্র ষড়যন্ত্রের মধ্যদিয়ে পিতার হত্যায় নির্বাসিত, বিতাড়িত সিম্বা। দেশজুড়ে চলতে থাকে অনাচার পিতার শারীরিক মৃত্যু হয়; কিন্তু ‘প্রমিজ ল্যান্ডের’ ভালো থাকার আকাক্সক্ষা, পিতার সেই আদর্শের মৃত্যু নেই। সময়ের ডাকে সাড়া দেয় সিংহ শাবক পিতার আশীর্বাদ স্বচ্ছ প্রতিবিম্ব হয়ে পথ নির্দেশ করে তাকে। জয়ী হয় সিম্বা। নতুন ভোরের আলোয় আলোকিত হয় দেশ।
শুভ জন্মদিন আপা। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, অফুরন্ত শুভকামনা।
লেখক : জাতীয় সংসদ সদস্য ও সমাজকর্মী
নোট : ছবি দুটি নাসিমা হকের সৌজন্যে প্রাপ্ত

শ্রেণী:

Posted on by 0 comment
09(C) copy

09(C) copy

শ্রেণী:

ইতিহাস রেখাচিত্র

Posted on by 0 comment
shPMc

shPMcশেখ ফজলুল করিম সেলিম, এমপি: আজ ১৫ আগস্ট। ’৭৫-এর এ দিনটিতে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। হত্যা করা হয়েছিল আবদুর রব সেরনিয়াবাতসহ তার পরিবারের সদস্যদের। সেই কালরাত্রিতে আরও হত্যা করা হয়েছিল বাংলার বাণীর প্রতিষ্ঠাতা অগ্রজ শেখ ফজলুল হক মণি ও আমার অন্তঃসত্ত্বা ভাবী শামসুন্নাহার আরজুকে। মণি ভাই ও ভাবীকে যখন হত্যা করা হয় তখন আমি তাদের পাশে ছিলাম। ঘাতকদের ব্রাশফায়ারে বুলেটবিদ্ধ মণি ভাই ও ভাবীর দেহ মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। আমি তাদের মাঝে লুটিয়ে পড়িÑ দেহের জামা কাপড় ভিজে যায়। স্বজন হারানোর সেই হৃদয় বিদারক মর্মান্তিক মুহূর্তের নৃশংস ঘটনার সময় আমি প্রাণে বেঁচে গেলেও সেই দুঃসহ স্মৃতি এতবছর পরও চোখের মণিকোঠায় ভেসে ওঠে। ঐ কালো অধ্যায় আজ কালের চাকায় ৪৩ বছর পিছনে কিন্তু স্মৃতির মিনারে ইতিহাসের সেই করুণ অধ্যায়টি চাক্ষুস অবলোকন এখনও আবছা হয়ে যায়নি। বরং যতদিন যাচ্ছে, মাস যাচ্ছে, আবার বছর ঘুরে ১৫ আগস্ট আসছে, ততই স্বজন হারানোর পাথরচাপা শোক শুধু অশ্রুতে নয়, স্মৃতির মিনারে অক্ষয় চিরঞ্জীব মহান মানুষগুলোর মৃত্যুর রক্তধারায় উষ্ণ স্রোতের স্পর্শের অনুভবের সেই শোক এখন শক্তির উৎস হয়ে উঠেছে। কী করে কীভাবে চোখের সামনে মণি ভাই ও ভাবীকে হত্যা করা হলো তার স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে মনে পড়ছে নিজেরও বাঁচার কথা ছিল না। কিন্তু সবচেয়ে বড় সত্য, সকল নির্মম ঘটনা ও কালো অধ্যায়ের একজন প্রত্যক্ষদর্শী হয়তো ইতিহাসের প্রয়োজনেই অলৌকিকভাবে বেঁচে যায়। সৌভাগ্য বলুন বা দুর্ভাগ্য আল্লাহতালারই ইচ্ছায় মণি ভাই ও ভাবীর রক্তধারা গায়ে মেখে ঐ দিনের জন্য আমিও বেঁচে আছি।
দুঃখ জাগানিয়া আগস্টের সেই কালরাতে মণি ভাই ও ভাবীকে হত্যার একটি চাক্ষুস বিবরণ জাতির কাছে পেশ করার জন্য ঐতিহাসিক দায়েই আজ আমি কলম ধরেছি। এই বিবরণ চোখে যা দেখেছি, তাই লিপিবদ্ধ করলাম। এখানে তথ্যের কোনো অপব্যাখ্যা নেই। থাকবেই-বা কেন, স্বজন হননের মর্মান্তিক দৃশ্যের কোনো ঘটনা যার ওপর দিয়ে যায় তা তো আর ভুলবার কথা নয়। আমৃত্যু ঐ দুঃস্বপ্নের স্মৃতি প্রতিমুহূর্তে নাড়া দেবেই। আমি এখানে ঘটনাটি শুধু বিবৃত করলাম, বিচারের দায় রইল দেশবাসীর কাছে।
১৩ নম্বর সড়কস্থ ধানমন্ডির একটি বাড়ি। মৃত্যুর দিন পর্যন্ত মণি ভাই এ-বাড়িতে ছিলেন। দোতলা বাড়ির সামনে এক চিলেতে উঠোন। ১৫ আগস্টের আগের দিন ১৪ আগস্ট সন্ধ্যা থেকেই বাড়ি লোকে লোকারণ্য। বিভিন্ন জেলার নেতৃবৃন্দ জড়ো হয়েছেন মণি ভাইয়ের সাথে দেখা করার জন্য। মণি ভাই তখন বাকশাল সেক্রেটারি। আমি এইদিন বিভিন্ন কাজকর্ম শেষ করে রাত ১১টার দিকে বাড়িতে ফিরি, তখন মণি ভাই ছিলেন না। তার জন্য অপেক্ষমাণ দূরদূরান্ত থেকে আগত নেতৃবৃন্দ ও কর্মীদের সাথে আলাপ-আলোচনা করছিলাম। মণি ভাই তখন অফিসেও ছিলেন না। রাত সাড়ে ১১টায় মণি ভাইয়ের গাড়ি এলো। কিন্তু উনি এলেন না। ড্রাইভার রহমান বলল, মণি ভাই ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে নেমে গিয়ে গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমার মা, বঙ্গবন্ধুর বুজি, তাকে সকালেই বঙ্গবন্ধু বাড়িতে নিয়ে গেছেন নিজ গাড়ি পাঠিয়ে। উনি তখনও ফিরেন নি।
রাত সাড়ে ১২টায় মাকে নিয়ে মণি ভাই এলেন। বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে তার বেডরুমে দুজনে অনেকক্ষণ একসঙ্গে ছিলেন। তখন ওখানে অন্য কেউ ছিলেন না। রাত বেশি হয়ে যাচ্ছে বলে এবং মা অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করে আছেন বলে মামি (বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী) বারবার তাড়া দিলেন বঙ্গবন্ধুকেÑ মণিকে ছেড়ে দাও; বুজি বসে আছেন। বঙ্গবন্ধু উঠে ডাইনিংরুমে গেলেন। বঙ্গবন্ধু মণি ভাইকে বললেন, মণি, বুজিকে নিয়ে আমার সঙ্গে চারটে খেয়ে যাও। বাড়ি ফিরতে দেরি হবে বলে মা ও মণি ভাই না খেয়েই চলে এলেন।
আজও ব্যথায় বুক মোচড় দেয়, মণি ভাইকে চারটে ভাত একসঙ্গে খেয়ে যাবার আমন্ত্রণই ছিল দুজনার মধ্যে শেষ কথা।
মণি ভাই মাকে সাথে নিয়ে যখন বাড়িতে ফিরলেন তখন আমি লনে। গাড়ি থেকে নেমে মা দোতলায় এলেন। আমি দেখলাম মণি ভাই ড্রইংরুমে চলে গেলেন। এখানে তিনি অপেক্ষমাণ নেতৃবৃন্দের সাথে মিনিট দশেক কথা বললেন। মণি ভাই তখন সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত ও অবসন্ন। কিন্তু চোখে আত্মপ্রত্যয়ের দৃষ্টি। সমবেত ব্যক্তিবর্গের উদ্দেশ্যে বললেন, কাল কথা বলব। বঙ্গবন্ধু আগামীকাল সকালে বিশ্ববিদ্যালয় যাবেন। ওখানে আমাকেও যেতে হবে। এরপরই সকলে চলে গেলেন। পৌনে ১টার দিকে মণি ভাই খেতে বসলেন মা ও ভাবীকে নিয়ে। খাওয়া-দাওয়ার পর আত্মজ পরশ-তাপসের ঘুমন্ত চোখে তাকিয়ে বেডরুমে ঢুকলেন। আমি তখন পাশের বেডরুমে ঘুমাতে গেলাম। মণি ভাই মিনিট তিনেক বাদে বেডরুম থেকে বেরিয়ে লাইব্রেরি রুমে ঢুকে বইপত্র ঘাটলেন। ঘুমাতে যাবার আগে বই পড়া আর সকালে উঠে জাতীয় দৈনিকগুলো পাঠ করা মণি ভাইয়ের নিত্যদিনের রুটিন। লাইব্রেরি রুম থেকে একটি বই বেছে নিয়ে বেডরুমে এলেন। বইটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ওপর লেখা একটি বিখ্যাত দলিল। নামÑ লাস্ট ব্যাটাল। বুকের ওপর বই মেলে ধরে শুয়ে শুয়ে তিনি এটা পড়ছিলেন। মণি ভাই একা জেগে যখন বিখ্যাত বইটি পড়ে যাচ্ছিলেন তখন বাড়ির সবাই ঘুমে নিমগ্ন, রাত্রির শেষ প্রহরে ঢাকা মহানগরীও ঘুমন্ত। ভোর ৫টা। ঘুম থেকে উঠে পড়লেন মণি ভাই। পরনে লুঙ্গি ও গেঞ্জি। নিচে নেমে এলেন দৈনিক কাগজগুলোর ওপর চোখ বুলানোর জন্য। হঠাৎ চোখ পড়ল বাইরের গেইট থেকে ২০/২৫ গজ দূরে একটি আর্মির গাড়ি। কাকভোরের আলো-আঁধারিতে কালো ইউনিফর্ম পরা আর্মির ল্যান্সার ফোর্সের এই দলটিকে দেখামাত্রই মণি ভাই আবার ত্বরিৎ গতিতে উপরে উঠে এলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় চিন্তিত তার মুখাবয়ব। কিন্তু একেবারেই বিচলিত হলেন না। ঐ সময় আমার স্ত্রী ফজরের নামাজ আদায়ের জন্য যায়। মণি ভাইয়ের চিন্তিত অবয়ব দেখে ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, মণি ভাই কী হয়েছে? মণি ভাই কোনো কথা বলেন না। তার চোয়াল শক্ত হলো। বেডরুমে ঢুকে ফোন করলেন। আকাক্সিক্ষত নম্বরে ডায়াল করে এনগেইজড টোন পেলেন। খুব সম্ভবত বঙ্গবন্ধুকেই ফোন করেছিলেন। এরপর ফের টেলিফোন রিসিভার তুলে ডায়াল করলেন। কিন্তু প্রত্যুত্তর নেই। এই সময় ফোন বেজে উঠল। মণি ভাই ধরলেন। অপর প্রান্ত ভেসে এলো সেরনিয়াবাত সাহেবের বাড়ি আক্রান্ত। ‘ফোন রাখো আমি দেখছি’। মণি ভাই ফোন ছেড়ে দিলেন। ঠিক এ সময়ে সেনাবাহিনীর ছয়-সাতজন লোক ভারী বুটের শব্দে সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠতে উঠতে চিৎকার শুরু করল; মণি সাহেব কোথায়, উনি আছেন? মণি ভাই দ্রুত বেডরুম থেকে বেরিয়ে এসে সামনের দিকে ছোট স্পেসের আগন্তুকদের মুখোমুখি হয়ে বললেন, এই আমি, কী হয়েছে? তেজী ও ভারী কণ্ঠের আওয়াজে আগন্তুকরা ইতস্তত। মণি ভাই আবার বললেন; কী হয়েছে বলুন। ওদের ভিতর থেকে একজন বলল, ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট। তখন উদ্বেগ ক্ষোভে জ্বলে উঠলেন মণি ভাই। বললেন, হোয়াই, কী অন্যায় করেছি আমি? মণি ভাইয়ের এই ক্ষুব্ধ কণ্ঠে ক্ষিপ্ত হয়ে একজন সঙ্গিন উঁচিয়ে মণি ভাইয়ের মাথায় আঘাত করল, চুলের মুঠি জাপটে ধরল। দৃশ্যটি দেখে আমার স্ত্রী আমাকে ডাকল। বলল, কি সাহস, কারা যেন মণি ভাইকে মারছে। চুলের মুঠি ধরে টানছে। দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে আমি বেরিয়ে এলাম। মণি ভাইয়ের চুলের মুঠি চেপে ধরা হাতটা ঝাপটা দিয়ে ছাড়ালাম। ভাবীও তখন বেডরুম থেকে বেরিয়ে এসে মণি ভাইয়ের ডান পাশে দাঁড়াল। আমি মণি ভাইয়ের বাম পাশে আর আমার পাশে আমার স্ত্রী। পরশ-তাপস দরজা সোজাসুজি বিছানায় ঘুমে শায়িত। অনুজ মারুফ তখন নিচে। ও গান পয়েন্টের মুখে। মণি ভাইয়ের চুল ছাড়িয়ে নেওয়ার পর ওদের একজন বলল, আমাদের সঙ্গে যেতে হবে, অ্যাগেইন রিপিট ইট, ইউ আর নাউ আন্ডার অ্যারেস্ট।
মণি ভাই বললেন, ঠিক আছে, আসছি। এ-কথা বলে একটু ঘুরে ঠিক যে মুহূর্তে তিনি জামা-কাপড় পাল্টানোর জন্য তার রুমের দিকে যেতে উদ্যত হয়েছেন ঠিক সেই মুহূর্তেই দু-গজ দূর থেকে শুরু হলো ব্রাশফায়ার, সামনের আড়াই বাই তিন ফুটের স্পেসের ওপর আমরা সবাই মেঝেতে লুটিয়ে পড়ি। মণি ভাই ও ভাবীর গায়ে বুলেট বিদ্ধ হয়। রক্ত ধারায় মেঝে লাল হয়ে যায়। আমার ও স্ত্রীর গায়ে লাগেনি। মণি ভাই ও ভাবীর রক্তধারায় আমার জামা-কাপড় রঞ্জিত হলো; ওরা আবার ফায়ার শুরু করল। এবারও লাগল না। আমার স্ত্রী দরজার আড়ালে ছিল। এরপর তাড়াহুড়ো করে আগন্তুক খুনিরা নিচে নেমে যায়। গুলির শব্দে পরশ-তাপস চিৎকার করে ওঠে। আমার স্ত্রী দৌড়ে ওদের কাছে ছুটে যায়। ওদের জড়িয়ে ধরে বলে, বাবা চিৎকার করে না, লক্ষ্মীটি চিৎকার করে না। ওরাও তখন কিছু বুঝল না। চাচির বুকের ওপর পড়ে ডুকরে চাপা কান্নায় ভেঙে পড়ল। একই সঙ্গে মাও চিৎকার করে তার রুম থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর মা অজ্ঞান হয়ে ঐ রক্তধারার ওপর লুটিয়ে পড়েন। এই চিৎকার শুনে খুনিরা আবার ব্রাশফায়ার করে। এই গুলি কারও গায়ে লাগেনি। ঘাতকরা চলে যাবার সময় বাড়ির চারপাশে ঘিরে ফেলে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ছিল। আমরা তখন মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে পরম করুণাময় আল্লাহতালার কাছে এই অবিচারের আরজি পেশ করলাম। ওদের গুলির ঝাঁকে সারাবাড়ি মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয়। খুনিরা অতঃপর চলে গেল। মা’র সাথে সাথে আমার বৃদ্ধ পিতা শেখ নুরুল হক ঘর থেকে বের হয়ে এসে এই করুণ অবস্থা দেখে তার বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ তিনি নিথর নিস্তব্ধ হয়ে থাকেন। তারপর মাকে জিজ্ঞেস করেন মণিকে কারা মারল? আমি বললাম আর্মি। এ-কথা শুনে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, কেন? আমি বললাম, জানি না। এরপর তিনি নির্বাক নিশ্চুপ হয়ে একদৃষ্টিতে মণি ভাইর লুটিয়ে পড়া দেহের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
এরপর রক্তাক্ত দেহ নিয়ে মেঝেতে উঠে মণি ভাইয়ের দিকে ঝুঁকে তাকালাম। মণি ভাই নিথর, নিস্পন্দ। ভাবীর দিকে চোখ ফেরালাম। তার ঠোঁট নড়ছে। যন্ত্রণার আর্তিতে বলে উঠলেনÑ আমার পেট ছিঁড়ে ফুঁড়ে গেছে। কোমরে শাড়িটির বাঁধন একটু হালকা করে দিন। আমার স্ত্রী কোমরের বাঁধন আলগা করে দেওয়ার পর ভাবী মেঝেতে এলিয়ে পড়লেন। তিনি বললেন, আমাকে বাঁচান, আমার দুটো বাচ্চা আছে। পরশ-তাপস তখন চাচির বুক থেকে মা-বাবার দেহের কাছে ছুটে এলো। ওরা করুণ আর্তিতে মা-বাবার মুখের কাছে মুখ রেখে কান্নায় ভেঙে পড়ল; মা কথা বলো, বাবা কথা বলো। নিচ থেকে ছোট ভাই মারুফ উপরে উঠে এলো। তার চোখ পাথরের মতো অনড়। আমি তাড়াতাড়ি ৩২ নম্বরে ফোন করলাম। কিন্তু লাইন পেলাম না। মারুফ চেষ্টা করে ফোনে শেখ জামালকে পেল। ওরা দুজন অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। মারুফ জামালকে জানাল, মণি ভাইকে মেরে ফেলেছে, ভাবী আহত। শোনার পরই জামালের উ™£ান্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো; দোস্ত রাখ। আমাদের বাড়িতেও গুলি হচ্ছে। এরপর মারুফ ফোন রেখে দেয়। এখনও বুঝতে পারছি না কি ঘটছে? আমি, মারুফ ও শাহাবুদ্দিন মণি ভাই ও ভাবীকে নিয়ে পিজিতে ছুটলাম। আমার গাড়িতে ছিলেন ভাবী। মারুফের গাড়িতে মণি ভাই। পথে মোস্তফা মোহসীন মণ্টুর দেখা পেয়ে মারুফ তাকে গাড়িতে তুলে নেয়। পিজির সামনেই দেখলাম আর্মি পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে। বাংলাদেশ বেতারের সামনেও আর্মি। ওদিকে যাওয়া মুশকিল। গাড়ি ঘুরিয়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসার সাথে সাথে পেছনে হর্নের শব্দ শুনলাম। ঐ গাড়িতে ছিলেন আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও তার পরিবারের সদস্যদের লাশ। ঐ গাড়িতেই ছিলেন রমনা থানার ওসি মি. আনোয়ার। তিনিও জানতেন না কি ঘটছে। মণি ভাইকে সাথে সাথে অক্সিজেন দেওয়া হলো। ভাবীকে নিয়ে যাওয়া হলো অন্য ওয়ার্ডে, ইমারজেন্সির বারান্দায় সেরনিয়াবাত সাহেবের ১১ বছরের গুলিবিদ্ধ কন্যা বেবী একটু একটু করে নড়ছে। ডাক্তারকে বললাম, একটু দেখুন। কিছু সময় পর সে আর বাঁচেনি। এই কিশোরীটিও আমার চোখের সামনে বলি হলো। আমি মণি ভাইয়ের কাছে ছুটে গেলাম তাড়াতাড়ি। ডাক্তার বললেন, উনি আপনার কে হন?Ñ
Ñ আমার ভাই।
Ñ দুঃখিত। অনেক চেষ্টা করেছি। বাঁচাতে পারলাম না। মণি ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ শুনে মুহূর্ত পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। আবার ছুটে গেলাম ভাবীর কী অবস্থা দেখতে। ধারণা ছিল ভাবী হয়তো বেঁচে যাবেন। কিন্তু তিনিও এই সুন্দর পৃথিবীতে অসুন্দরের হাতে বলি হয়ে পরপারে চলে গেলেন। মণি ভাইয়ের বুকে, মাংসে ও থুতনিতে ৩টি গুলির চিহ্ন ছিল। আর ভাবীর পেট ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল। তখনই বঙ্গবন্ধুর বাসা থেকে মেডিকেল কলেজে বুলেটবিদ্ধ কয়েকজন আহত লোক এলো। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর বাসার কাজের লোক আলতাফ ছিল। সে মারুফকে বললÑ ভাই সাহেবকে, কামাল ভাইকে, সবাইকে মেরে ফেলেছে। এ খবর মারুফ আমাকে বলার পর তখন আসল ব্যাপারটা বুঝতে পারি। এর কিছুক্ষণ পরেই হাসপাতাল আর্মি ঘেরাও করল। আমি বাসায় ফোন করে বললাম, তোমরা বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ো। পাশের বাসায় চলে যাও। ফোন করেই আমি, মারুফ ও শাহাবুদ্দিন হাসপাতালের তিনতলায় চলে গেলাম। তখন বাইরে হাজার হাজার মানুষের জমায়েত। এদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় কোনো চেনা মুখ দেখা গেল না। ওরা চিৎকার করে বলছেন, লাশ দিন আমরা মিছিল করব। পরে অবশ্য অস্ত্রের দাপটে মুহূর্তের মধ্যে এলাকাটি জনশূন্য হয়ে যায়। এরপর হাসপাতালে থাকা আমাদের পক্ষে নিরাপদ নয়। আমাদের গায়ের জামাকাপড়ে মণি ভাই ও ভাবীর দেহের রক্তের চিহ্ন। এভাবে বের হওয়া মুশকিল বিধায় চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. এসএম মনিরুল হক, নিউরো সার্জন ডা. কনক ও আরও কয়েকজন ডাক্তার খুব সতর্কতার সাথে আমাদের বের করে দেন। রক্তাক্ত জামাকাপড়গুলো খুলে ফেলে ওদের জামাকাপড় পরেই বের হয়েছিলাম।
বাড়িতে ফিরে দেখি বাড়ির লোকজন কেউই সরে যায়নি। আমরা তখন আরও উদ্বিগ্ন। আমাদের দেখেই পরশ ও তাপস কান্নায় ভেঙে পড়ল। ওরা বলল, চাচা, আমাদের মা-বাবা কোথায়? বাবার কাছে আমাদের নিয়ে যাও, মা-বাবাকে আমাদের কাছে এনে দাও। পরশের বয়স তখন পাঁচ। তাপসের সাড়ে তিন। এই অবোধ শিশু দুটির কথার জবাব সেদিন দিতে পারিনি। বুক থেকে একটি ভারী বাতাস কণ্ঠঅবধি এসে আটকা পড়েছিল।
আবার শুনলাম সেই একই চিৎকার, মণি সাহেব আছে? সামরিক উর্দিপরা একদল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ট্রুপ বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। আমি জবাব দিলাম, উনি নেই, হাসপাতালে। পুনরায় বলল, ছোটাছুটি করবেন না। আমরা দেখছি।
এরপর আমরা সেই বাড়িটি ত্যাগ করে পাশের একটি বাড়িতে চলে গেলাম। দূর থেকে দেখলাম আরেকটি সামরিক গাড়ি। কিছু আর্মি বাড়িতে ঢুকে কী যেন তল্লাশি করল এবং লুটপাট করতেও আর বাকি রাখল না। সেই কালরাত্রির রক্তবন্যার নীরব সাক্ষী হয়ে আজকের স্মৃতি রোমন্থন বড়ই কষ্টকর। সেই ভয়াল নৃশংস মুহূর্তের বিবরণ দিতে গিয়ে হৃদয়ে রক্তক্ষরণের বেদনা শুরু হয়।
তবুও লিখলাম ভাবি বংশধরদের জন্য। ১৫ আগস্টের কালরাতে হারিয়েছি অনেক আত্মার আত্মীয় ও রক্তের সম্পর্কে গড়া একগুচ্ছ মানুষকে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আমার মামি বেগম মুজিব, ছোট মামা শেখ আবু নাসের, মামাতো ভাই শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল ও কামাল-জামালের নবপরিণীতা বধূদ্বয় সুলতানা ও রোজী, আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও তার কন্যা এবং আমার ভাবী শামসুন্নাহার আরজু মণি, সেরনিয়াবাত সাহেবের ১১ বছরের কন্যা বেবী, ১০ বছরের পুত্র আরিফ, তার ভ্রাতুষ্পুত্র শহীদ সেরনিয়াবাত সাহেবের নাতনি বাবু আর বাংলার বাণীর প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মণিকে। আরও হারিয়েছি বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তা প্রহরী কর্নেল জামিলকে। তিনি ৩২ নম্বর বাড়ি আক্রান্ত হবার খবর শুনে বাধা দিতে গিয়ে শহিদ হন। এতগুলো মৃত্যুর, এতগুলো স্বজন হননের রক্তের বন্যায় আজ আপন সত্তা ও বিবেক ঘৃণার অনলে জ্বলে ওঠে। অশ্রু সে তো কবেই শুকিয়ে গিয়ে মরু হয়ে গেছে। তবুও প্রশ্ন থাকে। বিবেক ও গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল, মানবতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল যে কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা সরকার কী করে এত বড় একটা অন্যায় মেনে নিতে পারেন!
মণি ভাইয়ের সেই মৃত্যুকালীন জিজ্ঞাসাÑ ‘কী অন্যায় করেছি আমি’ এখনও আমার কানে বাজে। কানে বাজে ভাবীর সেই শেষ আর্তনাদÑ ‘আমাকে বাঁচান, আমার দুটো বাচ্চা আছে।’

[লেখাটি দৈনিক বাংলার বাণী থেকে সংগৃহীত]

শ্রেণী:

‘মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে’

Posted on by 0 comment

উত্তরণ ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশ হবে একটি শান্তির দেশ এবং আমরা কখনোই জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দেব না। কারণ সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদের কোনো জাতি ধর্ম নেই। এই ভুল পথে যাতে ছেলেমেয়েরা না যায় সেজন্য অভিভাবক, শিক্ষকসহ সকলকে নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য তিনি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি মাদকের ভয়াল ছোবল থেকে ছেলে-মেয়েদের রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রেখে উন্নয়নের ধারা বজায় রাখার পাশাপাশি দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে যেতে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) সদস্যদের প্রতি নির্দেশ দেন।
গত ৩ মে কুর্মিটোলা সদর দফতরে র‌্যাবের ১৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমি র‌্যাবকে অনুরোধ করব, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যেমন আমরা অভিযান চালিয়ে সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি তেমনি এখন মাদকের বিরুদ্ধেও এই অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মাদক যারা তৈরি করে, যারা বিক্রি করে, যারা পরিবহন করে এবং যারা সেবন করে সকলেই সমানভাবে দোষী। এটাই মাথায় রাখতে হবে এবং সেভাবেই যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। মাদকবিরোধী অভিযানে র‌্যাব ইতিমধ্যেই যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেছে। তিনি বলেন, আমাদের ছেলেমেয়েরা যাতে এর ছোবল থেকে দূরে থাকতে পারে তার ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে নিতে হবে।’ এ ব্যাপারে বিশেষভাবে ভূমিকা পালনের জন্য তিনি সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে বড় বড় অভিযানে র‌্যাবের সাফল্যের জন্য র‌্যাবের সদস্যদের ধন্যবাদ জানান এবং এই অভিযান অব্যাহত রাখারও নির্দেশ দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমন, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও মাদক উদ্ধার, চরমপন্থি দমন এবং ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনাসহ সকল ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে র‌্যাব অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। র‌্যাব অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সকলের আস্থা ও শ্রদ্ধা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, পবিত্র ইসলাম ধর্মের মূলধারা কোরআন ও হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা থেকে বিচ্যুতির কারণে উগ্র জঙ্গিবাদের উদ্ভব হয়েছে। এই জঙ্গিবাদীরা সাম্প্রদায়িকতা, সহিংসতা, অরাজকতা ও নাশকতামূলক কর্মকা-ের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে। কিন্তু র‌্যাব জঙ্গি দমনে অভাবনীয় সাফল্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে, যা সর্বমহলে সমাদৃত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম। কিন্তু আমরা দেখেছি এই ধর্মের নাম করে কিছু মানুষকে বিভ্রান্তির পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি আমাদের ভালো ঘরের উচ্চশিক্ষিত কোমলমতি ছেলেরাও এই বিভ্রান্তির বেড়াজালে পড়ে যায়। তিনি বলেন, মানুষ মারলে বেহেশতে যাওয়া যাবে এই বিভ্রান্তিতে পড়ে তারা দেশে যে অস্থিতিশীলতা এবং অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল তার বিরুদ্ধে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, বর্ডার গার্ড, গোয়েন্দা সংস্থা এবং র‌্যাব বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। এ অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখতে হবে।

শ্রেণী:

বাংলাদেশের শ্রমজীবী নারী

Posted on by 0 comment
5-7-2018 7-06-57 PM

5-7-2018 7-06-57 PMড. ইঞ্জিনিয়ার মাসুদা সিদ্দিক রোজী: পহেলা মে দিনটি পৃথিবীর অনেক দেশে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালিত হয়, যা মে দিবস নামেও পরিচিত। বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই এ দিনটিতে সরকারি ছুটি থাকে। ১৮৮৬ সালের মে মাসে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের ঐতিহাসিক আন্দোলন ও আত্মাহুতির এই দিন শ্রদ্ধার সাথে বিশ্বের প্রায় সব দেশে পালিত হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় দিবসটি পালন করা হয় না। আজকের এই লেখায় ১৮৮৬ সালে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন নিয়ে বলব। উনিশ শতকে কারখানা শ্রমিকরা সপ্তাহের ছয় দিনের প্রতিদিনই গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার অমানবিক পরিশ্রমই করত; কিন্তু তার বিপরীতে মিলত নগণ্য মজুরি। অনিরাপদ পরিবেশে রোগ-ব্যাধির আঘাতে মৃত্যুই ছিল নির্মম সাথী। তাদের পক্ষ হয়ে বলার মতো কেউ ছিল না তখন। ১৮০৭ সালে শ্রমিকরাই মজুরি না কেটে দৈনিক ৮ ঘণ্টা শ্রম নির্ধারণের প্রথম দাবি জানায়; কিন্তু কোনো শ্রমিক সংগঠন ছিল না বলে এই দাবি জোরাল করা যায় নি। এ সময় সমাজতন্ত্রের ধারণা শ্রমজীবী মানুষের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করতে থাকে। শ্রমিকরা বুঝতে পারেন। বণিক ও মালিক শ্রেণির এই রক্ত শোষণ নীতির বিরুদ্ধে তাদের সংগঠিত হতে হবে। ১৮৮০-৮১ সালের দিকে শ্রমিকরা প্রতিষ্ঠিত করেন Federation of Organized Trades and Laber Unions of the United States and Canada. ট্রেডস অ্যান্ড লেবার ইউনিয়ন’স এই সংঘের মাধ্যমে শ্রমিকরা সংগঠিত হয়ে শক্তি অর্জন করতে থাকে। ১৮৮৪ সালে সংঘটি ৮ ঘণ্টা দৈনিক মজুরি নির্ধারণের প্রস্তাব পাস করে এবং মালিক ও বণিক আওতাধীন সফল শ্রমিক সংগঠনকে এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য আহ্বান জানানো হয়। প্রথম দিকে অনেকেই একে অবাস্তব অভিলাষ, অতিসংস্কারে উচ্চাকাক্সক্ষা বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে; কিন্তু বণিক মালিক-শ্রেণির কোনো ধরনের সাড়া না পেয়ে শ্রমিকরা ধীরে ধীরে প্রতিবাদী ও প্রস্তাব বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে থাকে। এ সময় এলার্ম নামক একটি পত্রিকার কলামে একজন লিখেন, শ্রমিক ৮ ঘণ্টা কাজ করুক কিংবা ১৩ ঘণ্টাই করুক সে দাসই, যেন জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালে। শ্রমিক সংগঠনের সাথে বিভিন্ন সমাজতন্ত্রপন্থি দলও একাত্মতা জানায়। ১ মে’কে ঘিরে প্রতিবাদে-প্রতিরোধের আয়োজন চলতে থাকে। আর শিকাগো হয়ে ওঠে এই প্রতিবাদ-প্রতিরোধের কেন্দ্রস্থল।
১ মে এগিয়ে এলে মালিক বণিক-শ্রেণি অবধারিতভাবে ঐ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল। ১৮৭৭ সালে শ্রমিকরা একবার রেলপথ অবরোধ করলে পুলিশ ও ইউনাইটেড স্টেটস আর্মি তাদের ওপর বর্বর আক্রমণ চালায়। ঠিক একইভাবে ১ মে মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রস্তুতি নিতে পুলিশ ও জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা শিকাগো সরকারকে অস্ত্র সংগ্রহে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করে। ধর্মঘট আহ্বায়নকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য শিকাগো বাণিজ্যিক ক্লাব ইলিনয় প্রতিরক্ষা বাহিনীকে ২০০ ডলারের মেশিন গান কিনে দেয়। ১ মে সারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩ লাখ শ্রমিক তাদের কাজ ফেলে এদিন রাস্তায় নেমে আসে। শিকাগোতে শ্রমিক ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক কাজ ফেলে শহরের কেন্দ্রেস্থলে সমবেত হয়। অগ্নিগর্ভ বক্তৃতা, মিছিল-মিটিং, ধর্মঘট বিপ্লবী আন্দোলনের হুমকি সবকিছু মিলে ১ মে উত্তাল হয়ে ওঠে। পার্সন্স, জোয়ান মোসট, আগস্ট, স্পিজ লই লিং-সহ আরও অনেকেই শ্রমিকদের মাঝে পথিকৃত হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে আরও শ্রমিক কাজ ফেলে আন্দোলনে যোগ দেয়। আন্দোলকারী শ্রমিকদের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ। আন্দোলন চলতে থাকে। ৩ মে ১৮৮৬ সালে সন্ধ্যাবেলা হালকা বৃষ্টির মধ্যে শিকাগোর হে মার্কেট বাণিজ্যিক এলাকায় শ্রমিকগণ মিছিলের উদ্দেশে জড়ো হন। আগস্ট স্পিজ জড়ো হওয়া শ্রমিকদের উদ্দেশে কিছু কথা বলেছিলেন। হঠাৎ দূরে দাঁড়ানো পুলিশ দলের কাছে এক বোমার বিস্ফোরণ ঘটে, এতে এক পুলিশ নিহত হন এবং ১১ জন আহত হন। পরে আরও ছয়জন মারা যান। পুলিশ বাহিনীও শ্রমিকদের ওপর অতর্কিত হামলা শুরু করে, যা সাথে সাথেই রায়টের রূপ নেয়। রায়টে ১১ জন শ্রমিক শহিদ হন। পুলিশ হত্যা মামলা আগস্ট স্পিজ-সহ আটজনকে অভিযুক্ত করা হয়। এক প্রহসনমূলক বিচারের পর ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে ছয়জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। লুই লিং আগেই কারা অভ্যন্তরে আত্মহত্যা করেন, অন্য একজনের ১৫ বছরের কারাদ- হয়। ফাঁসির মঞ্চে আরোহণের আগে আগস্ট স্পিজ বলেছিলেন, আজ আমাদের এই নিঃশব্দতা তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে। ২৬ জুন ১৮৯৩ ইলিনয়ের গভর্নর অভিযুক্ত আটজনকে নিরপরাধ বলে ঘোষণা দেন এবং রায়টের হুকুম প্রদানকারী পুলিশের কর্মকা-কে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। আর অজ্ঞাত সেই বোমা বিস্ফোরণকারীর পরিচয় কখনই প্রকাশ পায়নি।
শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করার দাবি অফিসিয়াল স্বীকৃতি পায়। আর পহেলা মে বা মে দিবস প্রতিষ্ঠা পায় শ্রমিকদের দাবি আদায়ের দিন হিসেবে। পৃথিবীব্যাপী আজও তা পালিত হয়।
বাংলাদেশে প্রায় ৫ হাজারের মতো তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে। তৈরি পোশাক খাতে নারী শ্রমিকের সংখ্যা কমছে। নারী-পুরুষের বেতন বৈষম্য কমেনি। পুরুষের চেয়ে কম বেতন পাওয়া নারী শ্রমিক সংখ্যা কমে যাচ্ছে। নারী শ্রমিক ২০০ টাকা কম পান পুরুষ শ্রমিক থেকে। পোশাক শ্রমিকদের নতুন কাঠামো তৈরির জন্য মজুরি বোর্ড গঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিতে পোশাক শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ডিসেম্বরের আগেই শুরু হবে শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি। সকাল সাড়ে ৫টায় ঘুম থেকে উঠে কর্মক্ষেত্রে যায়। আসে রাতে ৯-১০টা সময়। ৭ হাজার টাকা বেতন হলে ৩-৪ হাজার টাকা বাড়ি ভাড়ায় চলে যায়। বাকি টাকায় অনেক কষ্টে মাস কাটে। এভাবেই চলে তাদের মানবেতর জীবন। ন্যূনতম মজুরি তারা ১৬ হাজার টাকা দাবি করেছে।
কুষ্টিয়ার খাজানগর জাঁতাকলে ১০ বছর ধরে কাজ করছেন কাঞ্চন বালা। তিনি জানেন না মে দিবস কী? শ্রম অধিকার কী? দেশের বৃহত্তম মোকামে কাজ করছেন ২০ হাজার শ্রমিক, বেশির ভাগই নারী শ্রমিক। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত হাড় ভাঙা খাটুনি খেটে যা মজুরি পান তা দিয়ে কোনোরকমে চলে সংসার। সাপ্তাহিত ছুটিতেও বিরাম নেই, দিনের কত ঘণ্টা কাজ করতে হয়, ন্যায্য মজুরি পাচ্ছেন কি নাÑ এসব প্রশ্ন অবান্তর। শ্রমিকদের জন্য আলাদা কোনো দিবস মানা তাদের কাছে বিলাসিতার মতো। তিনবেলা খাবার জুটানোই বড় কথা। কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদফতর কর্মকর্তারা চাতাল শ্রমিকদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার লক্ষ্যে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছে।
সবাইকে নিয়ে সুখে থাকার আশায় পরিবারের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য শত শত নারী শ্রমিক পাড়ি জমান মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরবে। তবে সেখানে যাওয়ার পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ না পাওয়ার পাশাপাশি গৃহকর্তাদের নির্যাতনের মুখে অনেকে কাজ ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন। অনেকেই আবার বাংলাদেশ দূতাবাসে আশ্রয় নেন। সৌদি আরবের রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস ও জেদ্দা কনসুলেটে গত ২২ এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ৩২ জন নারী শ্রমিক আশ্রয় নিয়েছেন। তবে প্রতিদিন বাড়ছে এ সংখ্যা। এর আগে গত ২৯ মার্চ থেকে এক মাসে দূতাবাসে আশ্রয় নেওয়া ৫০২ জন নারী শ্রমিককে দেশে পাঠানো হয়েছে বলে জানান সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের শ্রম কাউন্সিলর সরোয়ার আলম। নতুন করে আশ্রয় নেওয়া ২০৯ নারীর মধ্যে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনসুলেটে রয়েছে ৭৮ জন, বাকি ২৫০ জন রয়েছেন রিয়াদ দূতাবাসে। এসব নারী শ্রমিকদের অভিযোগ, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বৈধভাবে শ্রমিক হিসেবে বাংলাদেশের দালালরা যে কাজের কথা বলে তাদের সৌদি আরবে এনেছে, সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাদের কাজ দেওয়া হয়নি। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসে আশ্রয় নেওয়া কয়েকজন নারী বলেছে, তাদের কাউকে এসে হাসপাতালে নার্সের সহযোগিতা ও পিয়নের কথা বলা হলেও সেখানে যাওয়ার পর দেওয়া হয়েছে ক্লিনারের কাজ। আশ্রয় নেওয়া অধিকাংশই মূলত গৃহকর্মী, ঠিকমতো বেতন পেতেন না।
সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশে নারী শ্রমিকের নিরাপত্তার নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। যার মাধ্যমে অভিবাসী নারীদের বাসায় না রেখে বিভিন্ন হোস্টেলে রাখা হবে। সেখান থেকে তারা কাজে যাতায়াত করবে, যার ফলে নারী অভিবাসীদের ওপর নির্যাতনের সম্ভাবনা কমে আসবে বলে মনে করছে বাংলাদেশের অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা রামবো। সরকারি হিসাব অনুযায়ী গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৯ লাখ ৬০ হাজার শ্রমিক বিভিন্ন দেশে গেছে। তবে বেসরকারি সংস্থাগুলো বলছে, এর বেশি গিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশে সৌদি আরবে। এর বড় একটি অংশ নারী শ্রমিক। দেশে এখন নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে ব্যাপকাকারে নারী ঠিকা শ্রমিকরা কাজ করছে। এখানেও রয়েছে মজুরি বৈষম্য। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী অধিকার ও মজুরি সাম্য প্রতিষ্ঠা এখনও চ্যালেঞ্জের বিষয়।

শ্রেণী:

একাত্তরের সংগ্রামে অর্জিত দৃঢ়তা আপনার পদক্ষেপে প্রতিফলিত হয়েছে

Posted on by 0 comment
31

31উত্তরণ প্রতিবেদন: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে লেখা এক চিঠিতে তার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন, আপনার পদক্ষেপে বাংলাদেশের জনগণের চরিত্র ও দৃঢ়তা প্রতিফলিত হয়েছে, এটি তারা অর্জন করেছে ১৯৭১-এর কঠোর সংগ্রামের মাধ্যমে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিরাপদে ও স্বেচ্ছায় তাদের নিজ দেশে পাঠাতে তার দেশের চাপ অব্যাহত রাখার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্বস্ত করেছেন। ট্রাম্প তার চিঠিতে শেখ হাসিনাকে বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিরাপদে ও স্বেচ্ছায় তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের প্রতি চাপ অব্যাহত রাখবে। ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া ব্লুম বার্নিকাট গত ৩ মে বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিঠি প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন। খবর বাসসের।
বৈঠকের পরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের জানান, চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেন, এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন নেই যে, এই সংকট সৃষ্টির জন্য দায়ী মিয়ানমারকে অবশ্যই জবাবদিহিতা করতে হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মানবিক নেতৃত্বদানে অবদানের জন্য তার ভূয়সী প্রশংসা করেন উল্লেখ করে প্রেস সচিব জানান, ট্রাম্প বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে উদার মানবিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।’
নিজের লেখা চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেন, ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া একটি বিরাট বোঝা, তবে বিশ্ববাসী জানে বাংলাদেশের পদক্ষেপে হাজার হাজার জীবন রক্ষা পেয়েছে।
ট্রাম্প তার চিঠিতে নিজ দেশকে বিশ্বের বৃহত্তম মানবিক সহায়তাকারী দাতাদেশ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের সহযোগিতায় পাশে থাকবে।’
ট্রাম্প বলেন, আমি আশা করি বাংলাদেশ এই নেতৃত্ব অব্যাহত রাখবে, বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমের প্রাক্কালে ভূমিকা পালন করবেÑ যা গোটা বিশ্ব থেকে বাংলাদেশের জন্য সম্মান বয়ে আনবে।
প্রেস সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাকে পত্র দেওয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য মিয়ানমার সরকারের ওপর প্রচ- চাপ অব্যাহত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি পুনরায় আহ্বান জানান। শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার ১ লাখ রোহিঙ্গার জন্য অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে ভাষানচর নামের একটি দ্বীপ উন্নয়ন করছে। তিনি বলেন, কক্সবাজারে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা আশ্রয় নেওয়ায় স্থানীয় জনগণের জন্য দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং সেখানকার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, ইউএসএইড বিশ্বব্যাপী শরণার্থীদের সহায়তার জন্য কর্মসূচি নিয়ে থাকে। কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের সমস্যা লাঘবে ইউএন সিস্টেমের অধীনে ইউএসএইড কাজ করে যাচ্ছে।
বার্নিকাট বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে জানান, ইউএসএইড প্রেসিডেন্ট মার্ক গ্রিন এবং কার্টার সেন্টারের সিইও ও সাবেক রাষ্ট্রদূত ম্যারি এ্যান পিটার্স বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অবস্থা দেখতে খুব শিগগির বাংলাদেশ সফর করবেন।
মার্কিন দূত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন এবং গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড পাওয়ায় তাকে অভিনন্দন জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং তাদের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

শ্রেণী:

হালদা : দেশের বৃহৎ প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র

Posted on by 0 comment
5-7-2018 7-06-57 PM

5-7-2018 7-06-57 PMরাজিয়া সুলতানা : নদীমাতৃক বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে নদ-নদীর সংখ্যা প্রায় ৮০০। এর মধ্যে চট্টগ্রামের ছোট্ট একটি নদীর নাম হালদা। ৯৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এই নয়নাভিরাম নদীটি এশিয়ার বৃহৎ এবং একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র। যা প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। বিশ্বের একমাত্র জোয়ার-ভাটার নদী। যেখান থেকে সরাসরি কার্প জাতীয় মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা হয়। জাতীয় অর্থনীতিতে হালদার অবদান প্রায় বছরে ৮০০ কোটি টাকা, যা দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ৬ শতাংশ। চলতি বছর কার্প জাতীয় মাছের রেকর্ড পরিমাণ ডিম পাওয়া গেছে হালদা নদীতে। যা গত ১০ বছরের রেকর্ড অতিক্রম করেছে। প্রশাসনের এবং স্থানীয়দের সচেতন উদ্যোগের ফলে হালদা দীর্ঘ ‘ডিম খরা’ কাটিয়ে পুরনো রূপে ফিরেছে।
হালদা খালের উৎপত্তিস্থল চট্টগ্রামের মানিকছড়ি উপজেলার বাটনাতলী ইউনিয়নের পাহাড়ি গ্রাম সালদা। সালদার পাহাড়ি ঝরনা থেকে নেমে আসা ছড়া সালদা থেকে নামকরণ হয় হালদা। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার রামগড় পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে মানিকছড়ি, চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি, হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বুড়িশ্চরের নিকট কর্ণফুলী নদীতে পতিত হয়েছে। পানির উৎস মানিকছড়ি, ধুরং, বারমাসিয়া, মন্দাকিনী, লেলাং, বোয়ালিয়া, চানখালী, সর্ত্তা, কাগতিয়া, সোনাইখাল, পারাখালী, খাটাখালীসহ বেশ কিছু ছোট ছড়া। নদীটির গভীরতা স্থান বিশেষ ২৫ থেকে ৫০ ফুট। কর্ণফুলী নদীর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে। তবে দেশের উজান থেকে নামা অন্য কোনো বড় নদীর সঙ্গে এই নদীর কোনো মিল নেই। প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে এখনও এখানে টিকে আছে রুইসহ বিভিন্ন প্রজাতির কার্প জাতীয় মাছ।
সাধারণত বর্ষা মৌসুমের শুরুতে পূর্ণিমা-অমাবস্যা তিথিতে পাহাড়ি ঢলের পানির সঙ্গে বজ্রসহ প্রবল বর্ষণ হলে এবং নদীর পানির তাপমাত্রা অনুকূলে থাকলেই মা মাছ ডিম দেয়। ডিম ছাড়ার এই বিশেষ পরিবেশকে স্থানীয়রা ‘জো’ বলে। জো’র বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অমাবস্যা বা পূর্ণিমা হতে হবে এবং সেই সঙ্গে প্রচ- বজ্রপাতসহ বৃষ্টি। আবার বৃষ্টিপাত শুধু স্থানীয়ভাবে হলে হবে না, তা নদীর উজানেও হতে হবে। এসব শর্তে নদীতে পাহাড়ি ঢলের সৃষ্টি হয়। এতে পানি অত্যন্ত ঘোলা ও খরস্রোতা হয়ে ফেনাকারে প্রবাহিত হয়। জো-এর সর্বশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, নদীতে জোয়ার-ভাটা সৃষ্টি হওয়া। পূর্ণ জোয়ারের শেষে অথবা পূর্ণ ভাটার শেষে পানি যখন স্থির হয় তখনই কেবল মা মাছ ডিম ছাড়ে। আরও অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, মা মাছেরা ডিম ছাড়ার আগে পরীক্ষামূলকভাবে অল্প পরিমাণ ডিম ছাড়ে। যাকে বলা হয় নমুনা ডিম। নমুনা ডিম ছাড়ার পর মা মাছ যদি মনে করে নদীতে ডিম ছাড়ার অনুকূল পরিবেশ বিদ্যমান তবেই ডিম ছাড়ে। নচেৎ ডিম নিজের দেহের মধ্যে নষ্ট করে দেয়। এ কারণে ‘জো’ মা মাছ ও মাছের ডিম সংগ্রাহক উভয়পক্ষের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
হালদা নদী এবং নদীর পানির কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যা মা মাছকে ডিম ছাড়তে পরিবেশ সৃষ্টি করে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো ভৌতিক, রাসায়নিক ও জৈবিক। ভৌতিক কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে নদীর বাঁক এবং অনেকগুলো নিপাতিত পাহাড়ি ঝরনা বা ছড়া। প্রতিটি পতিত ছড়ার উজানে এক বা একাধিক বিল, নদীর গভীরতা, কম তাপমাত্রা, তীব্র খরস্রোত এবং অতি ঘোলাটে। রাসায়নিক কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে কম কন্ডাক্টিভিটি, সহনশীল দ্রবীভূত অক্সিজেন ইত্যাদি। জৈবিক কারণগুলো হচ্ছে বর্ষার সময় প্রথম বর্ষণের পর বিল থাকার কারণে এবং দু-কূলের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় নদীর পানিতে প্রচুর পরিমাণে জৈব উপাদান মিশ্রিত হয়। ফলে নদীর পানিতে পর্যাপ্ত খাদ্যের প্রাচুর্য থাকে। যা প্রজনন পূর্ব গোনাডের পরিপক্বতায় সাহায্য করে। এছাড়া অনেকগুলো পাহাড়ি ঝরনা বিধৌত হওয়ায় পানিতে প্রচুর ম্যাক্রো ও মাইক্রো পুষ্টি উপাদান থাকে। ফলে নদীতে পর্যাপ্ত খাদ্যাণুর সৃষ্টি হয়। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণেই হালদা নদী বাংলাদেশের অন্যান্য নদী থেকে আলাদা। হালদা নদীর বাঁকগুলোকে ‘অক্সবো’ বাঁক বলে। এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো পানির প্রচ- ঘূর্ণন। যার ফলে গভীর স্থানের সৃষ্টি হয়। স্থানীয়ভাবে গভীর স্থানগুলোকে ‘কুম’ বা ‘কুয়া’ বলা হয়। উজান হতে আসা বিভিন্ন পুষ্টি ও অন্যান্য পদার্থ কুমের মধ্যে এসে জমা হয়। ফলে পানি অতি ঘোলা হয়। মা মাছেরা কুমের মধ্যে আশ্রয় নেয় এবং ডিম ছাড়ে। প্রচ- পানির ঘূর্ণনে মা মাছ ডিম ছাড়ে আর বাবা মাছ ডিমের ওপর শুক্রাণু ছড়িয়ে দেয়। নদীর বাঁকে বাঁকে পানির উলট-পালটের কারণে ডিম এবং শুক্রাণু মিশ্রিত হয়, আমরা পাই নিষিক্ত ডিম।
মানুষও যেমন সব সময় নিয়ম মেনে কাজ করতে পারে নাÑ তেমনি এবার হালদায় পারেনি মাছও। এবার না ছিল পূর্ণিমা, না ছিল অমাবশ্যা। তারপরেও নানা কারণে দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র ‘রুপালি সম্পদের’ খনি বলে খ্যাত হালদা নদীতে ‘জো’ সৃষ্টি হয়েছে। মা মাছ পেয়েছে ডিম ছাড়ার অনুকূল পরিবেশ। ‘জো’ সৃষ্টির কারণ অবশ্য সাগরে ঘনিয়ে ওঠা ঝড়। যার ফলে প্রবল বর্ষণ, বজ্রপাতসহ পাহাড়ি ঢল আর জোয়ার-ভাটায় নদীর পানি ঘোলা হওয়া। ২০ এপ্রিল দুপুরে মা মাছ ‘নমুনা ডিম’ ছাড়ে। হালদা পাড়ে অপেক্ষা করতে থাকে জেলেরা। রাত দেড়টায় বজ্রসহ ভারী বর্ষণ শুরু হলে কার্প (কাতল, রুই, মৃগেল এবং কালিবাউশ) জাতীয় মা মাছ ডিম ছাড়া শুরু করে। রাত আড়াইটা থেকে ডিম সংগ্রহ শুরু করে জেলেরা। হালদার আংকুরিঘোনা, আজিমেরঘাট, গড়দুয়ারা, মার্দাশা, খলিফাঘোনা, নাপিতেরঘোনা, রামদাশ মুন্সিরহাট, বাড়িঘোনা এলাকা থেকে বেশি পরিমাণ ডিম সংগ্রহ করা হয়। এবার ৫ শতাধিক নৌকা দিয়ে ১ হাজারের অধিক জেলে ডিম সংগ্রহ করেছে। সরকারি হিসাবমতে, হালদা থেকে এ বছর ২২ হাজার ৬৮০ কেজি ডিম সংগ্রহ করা হয়েছে। যা থেকে ৩৭৮ কেজির মতো রেণু তৈরি হবে। এবং প্রতিকেজি রেণু থেকে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ পোনা হবে। প্রতিকেজি পোনার মূল্য আনুমানিক ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। ফলে এই খাত থেকে এবার অর্থনীতিতে যুক্ত হবে কয়েক হাজার কোটি টাকা। এর আগে ২০১৭ সালে ১ হাজার ৬৮০ কেজি, ২০১৬ সালে ৭২০ কেজি, ২০১৫ সালে ২ হাজার ৮০০ কেজি, ২০১৪ সালে ১৬ হাজার ৫০০ কেজি, ২০১৩ সালে ৪ হাজার ২০০ কেজি, ২০১২ সালে ২১ হাজার ২৪০ কেজি, ২০১১ সালে ১২ হাজার ৬০০ কেজি এবং ২০১০ সালে ৯ হাজার কেজি ডিম সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে হালদা থেকে ২০০৭ সালে ডিম সংগ্রহ হয়েছিল ২২ হাজার ৩১৪ কেজি। এছাড়া ২০০৯ সালে ডিম সংগ্রহ হয় ১৩ হাজার ২০০ কেজি। অবাক করার বিষয় ১৯৪৫ সালে হালদা থেকে সংগৃহীত ডিমের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫০০ কেজিÑ যা থেকে ৫ হাজার কেজি রেণু সংগ্রহ করা হয়েছিল। যা এখনও মাইলফলক হয়ে রয়েছে।
হালদা থেকে সংগ্রহ করা মাছের ডিমগুলো সনাতন পদ্ধতির। পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন হ্যাচারিতে বিশেষ প্রক্রিয়ায় রেণুকে পরিণত করা হয়। রূপান্তরিত রেণু স্থানীয়ভাবে তৈরি করা কূপে ছেড়ে দেওয়া হয়। সব ডিম থেকে রেণু উৎপন্ন হয় না। অনেক ডিম নষ্ট হয়ে যায়। রেণুগুলো ছোট ছোট পুকুরে ছেড়ে দিয়ে পোনায় পরিণত করা হয়। পরে এই পোনা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। অন্যান্য পোনার তুলনায় হালদার পোনার চাহিদা অনেকটা বেশি। কারণ হালদার এই পোনাগুলো দ্রুত বর্ধনশীল। প্রতিটি পোনার মাছ কয়েক সপ্তাহে এক কেজির ওপর ওজন হয়। তবে দাম কৃত্রিম পোনার চেয়ে অনেক বেশি। রেণুু পোনা থেকে উৎপাদিত হয় সুস্বাদু মাছ। দেশের মৎস্য খাতে হালদা চার ধাপে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখে। হালদায় বর্তমানে মাছ যে পরিমাণে ডিম ছাড়ে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ডিম ছাড়ে কাতলা মাছ। ১৮ থেকে ২০ কেজি ওজনের একটি কাতলা মাছ ডিম দেয় প্রায় ৪০ লাখ। প্রথম ধাপে ডিম থেকে রেণু বিক্রি করে, দ্বিতীয় ধাপে ধানী পোনা বিক্রি করে, তৃতীয় ধাপে আঙ্গুলী পোনা বিক্রি করে, চতুর্থ ধাপে এক বছর বয়সে মাছ হিসেবে বাজারজাত করে। প্রতিটি ধাপে প্রায় ৪০ শতাংশ পোনার মৃত্যু হয়। তারপরও একটি মাছ থেকে প্রতিবছর কয়েক কোটি টাকার মাছ উৎপাদন সম্ভব। এ কারণেই হালদার প্রতিটি মা মাছ একেকটি প্রাকৃতিক ‘উৎসের স্মারক’। তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, হালদায় একসময় প্রায় ৭২ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। কালক্রমে পাঙ্গাশ, ঘনি চাপিলা, কই, পুঁটি, বানী কোকসা, ঘর পুঁইয়া, গুইজ্জা, আইর, বুদ, বাইলাসহ অন্তত ১৫টি প্রজাতির মৎস্য প্রায় বিলুপ্তর পথে। একসময় হালদায় ২০-২৫ কেজি ওজনের কাতলা, ১২-১৫ কেজি ওজনের রুই এবং ৮-১০ কেজি ওজনের মৃগেল পাওয়া যেত, যা এখন কালেভদ্রে পাওয়া যায়।
এবার হালদা রক্ষায় দৃষ্টি দিয়েছে পরিবেশবান্ধব সরকার। এ উদ্যোগে প্রশাসন ও স্থানীয়রা সচেতন হয়েছেন। আর তাই স্বরূপে ফিরেছে হালদা। প্রশাসন অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি তৎপর ছিল। ফলে মা মাছ যেমন নিধন হয়নি, তেমনি ড্রেজার ও বালু উত্তোলন বন্ধ ছিল। মা মাছের জন্য ক্ষতিকর কোনো কর্মকা- হয়নি হালদায়। ২০১০ সাল হতে হালদা নদীর নাজিরহাট অংশ থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার এলাকায় মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। ডিম ছাড়ার অনুকূল সব পরিবেশ পেয়েছে মা মাছ। তাই এবার রেকর্ড ডিম ছেড়েছে মা মাছ। ডিম ছাড়ার পর মা মাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সুযোগে অতীতের মতো যাতে কেউ মা মাছ শিকার করতে না পারেÑ সেজন্য হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার নেতৃত্বে হালদা নদীতে টহল দেওয়া হয়েছে।
হালদা নদী কেবল প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ঐতিহ্যই নয়, যোগাযোগ, কৃষি ও পানি সম্পদেরও একটি বড় উৎস। যুগে যুগে হালদা নদী অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অর্থনৈতিক অবদান বিবেচনায় বেশ কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের জন্য হালদা নদী বাংলাদেশের জাতীয় মৎস্য প্রজনন ঐতিহ্যের দাবিদার। এছাড়া এটি ইউনেস্কোর শর্ত অনুযায়ী, বিশ্ব প্রাকৃতিক ঐতিহ্যেরও যোগ্যতা রাখে। কারণ তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, নদী থেকে পোনা আহরণের নজির থাকলেও হালদা ছাড়া বিশ্বের আর কোনো নদীতে এত বিপুল পরিমাণ ডিম আহরণের ইতিহাস নেই।
বর্তমান বিশ্বে মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান চর্তুথ। সুতরাং মাছ রপ্তানির একটি বড় খাত হতে পারে ছোট একটি নাম হালদা। কারণ চিংড়ি ও ইলিশ রপ্তানি হয়। পর্যায়ক্রমে রুই, কাতল, মৃগেল জাতীয় মাছও ব্যাপকহারে রপ্তানি করার উদ্যোগ নিচ্ছে আওয়ামী সরকার। অর্থাৎ মৎস্য সম্পদে দেশের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে হালদা নদীর ভূমিকা অনস্বীকার্য।

লেখক : পিএইচডি গবেষক, কৃষিবিদ, শিক্ষক এবং দেশকর্মী

শ্রেণী:

সোনালি আঁশ পাটের বহুমাত্রিক অভিষেক

Posted on by 0 comment
a

aরাজিয়া সুলতানা: বাঙালির ইতিহাস ও অর্থনীতির সঙ্গে মিশে আছে পাট। সেই পুরনো কথাÑ পাট বাংলাদেশের সোনালি আঁশ। একসময় এ দেশের ৮০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রাই অর্জন হয়েছে পাট থেকে। শস্য-শ্যামলা এই দেশের অর্থনীতি ও সমৃদ্ধির সাথে পাটের নিবিড় সম্পর্ক। পুরনো সেই পাটের সুদিন ফিরে আসছে বাংলাদেশের। ২০১০ সালে দেশি পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন, তা কাজে লাগিয়ে ৪টি নতুন জাতের পাট উদ্ভাবন করেছে। উৎপাদিত সেই পাটের আঁশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে সুতা। পাটের গুণগত মান বৃদ্ধির ফলে বহুমুখী উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্যান্ট, শার্ট, জামদানি, স্যান্ডেল, পলিব্যাগ, ঘর সাজানোর আসবাবের সঙ্গে মার্সিডিজ গাড়িতে পাটের ব্যবহারসহ প্রায় দুশতাধিক পাটজাত পণ্যের বাণিজ্যিক উৎপাদন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
১৮৫০ সালে এই অঞ্চলে মাত্র ১৭ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ হতো। মাত্র ৫০ বছরেই এ চিত্র পাল্টে গেছে। ১৯০০ সালে পাটের জমির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৫০ হাজার হেক্টর। বিশ্ববাজারে ব্রিটেনসহ ইউরোপিয়ান কোম্পানিগুলোর দানাদার খাদ্যশস্য চিনি, কফি, চা-সহ নানা পণ্যের বিক্রি বৃদ্ধি পায়। আর ওইসব পণ্যের মোড়ক হিসেবে বেড়েছিল পাটের চাহিদা। কিন্তু এ ধারা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৯১ সালে বিএনপি-জামাতের হাত ধরে সরকার গঠন করে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সঙ্গে একটি কালো চুক্তি করে। গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে দেশের লাখো লাখো শ্রমিককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। তাতে ১৯৯৩ সাল থেকে পাটকলগুলো একে একে বন্ধ করে দেয়। ফলে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বে যে আড়াই লাখ বেল পাট রপ্তানি হতো তা বন্ধ হয়ে যাবে। আর ঠিক তখনই ভারতের সঙ্গে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের চুক্তি হলো। চুক্তি অনুযায়ী ভারত তাদের সীমান্তে পাটকল তৈরি করবে আর ওই আড়াই লাখ বেল পাট রপ্তানি করার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশের পাটকল বন্ধ করার জন্য টাকা নিয়েছিল বিএনপি সরকারÑ আর ভারতকে পাটকল করার সুযোগ করে দিল ওয়ার্ল্ড ব্যাংক। পাটের বিশ্ববাজারে এমন অগ্রযাত্রা দেশের সরকারি পাটকলগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছিল বিএনপি-জামাতের নীল নকশায়।
আওয়ামী লীগ-জোট সরকার গঠনের পরপরই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কৃষিমুখীন অর্থনীতির মূলস্রোতে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত ‘সোনালি আঁশ’ উৎপাদন ও বিপণনের বাঁকে বাঁকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে পাট শিল্প। সূচিত হয়েছে পাটের নববিপ্লব। তাতে অবশ্য পাটও আমাদের সাহায্য করেছে, কারণ বাংলাদেশের জলবায়ু পাট উৎপাদনের জন্য খুবই উপযোগী। তাই বাংলাদেশের পাট বিশ্বের সেরা। বর্তমানে বাংলাদেশে ৮ লাখ ১৭ হাজার ৩৮৩ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হচ্ছে। দখল করে নিয়েছে পাট উৎপাদনে বিশ্বের দ্বিতীয় স্থান। সরকার নিয়েছে পাট বহুমুখীকরণের উদ্যোগ। অভিষেক হচ্ছে নিত্যনতুন পাট পণ্যের। এক টন পাট বিক্রি করলে যে লাভ হয়, তা দিয়ে পাটপণ্য বানিয়ে বিক্রি করলে লাভ হয় তার থেকে অনেক বেশি। পাট থেকে তৈরি হচ্ছে পোশাকÑ বিশেষ করে শীতের জন্য নানা ধরনের জ্যাকেট, শাড়ি, জামা, জুতা, স্যান্ডেল, ঘরের পর্দা, কুশন কাভার, টেবিল ম্যাট, টিস্যু বক্স, পলিথিন, সাইকেল, কার্পেট, চট, পাটের ব্যাগ, বস্তা, ঝুড়ি, বিভিন্ন ধরনের কাপড়, সুতা, তুলা, পর্দা, টেবিল ক্লথ, রানার, প্লেসমেট, কুশন কাভার, সোফার কাভার, কিচেন ওয়্যার, লন্ড্রি বাস্কেট, ফ্রুট বাস্কেট, স্টোরেজ প্রোডাক্ট, হ্যাঙ্গার, ক্রিসমাস ডেকোরেশন সামগ্রী, গার্ডেনিং প্রোডাক্ট, ফ্লোর কাভারিং প্রোডাক্ট, শপিং ও ফ্যাশনেবল প্রোডাক্ট, ঘর সাজানোর দ্রব্য, বিলাসসামগ্রীসহ বিভিন্ন পাটজাত পণ্য। পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৫টি দেশ ছাড়াও দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, ব্রাজিলসহ পৃথিবীর ১৮৮টি দেশে। বাংলাদেশের পাট এবং পাটজাত পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) পাট এবং পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে ৬৬ কোটি ১৮ লাখ মার্কিন ডলার; যা এই সময়ের কৌশলগত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১০ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ বেশি।
ইউরোপের বাজারে নিষিদ্ধ হচ্ছে সিনথেটিক পণ্য। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঘোষণা দিয়েছে, ২০১৯ সালের মধ্যে তাদের সদস্যভুক্ত সব দেশ পণ্যের মোড়ক ও বহনের জন্য প্লাস্টিক এবং কৃত্রিম আঁশজাত পণ্যের ব্যবহার বন্ধ করবে। যার ফলে বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে। আশা করা যাচ্ছে, বিশ্ববাজারের চাহিদা অনুযায়ী পরিকল্পনামাফিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরে পাটের রপ্তানি কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে।
পরিবেশবান্ধব ও নান্দনিকতার কারণে দেশের অভ্যন্তরেও চাল, গম-সহ বেশ কিছু পণ্য প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দেশেই তৈরি হয়েছে ২০ লাখ কাঁচা পাটের অভ্যন্তরীণ বাজার। তা ছাড়া সরকার চীনের প্রযুক্তি সহায়তা নিয়ে সরকারি পাটকলগুলোর মানোন্নয়ন করে দেশি পাট থেকে সুতার প্রধান কাঁচামাল ‘ভিসকস’ তৈরি করার পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে, যা পোশাক শিল্পকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে। অন্যদিকে দেশে তৈরি ডেনিম কাপড়ে ৫০ শতাংশই রয়েছে পাট এবং বাকি ৫০ শতাংশ কটন। গুণগত মানের দিক দিয়ে বর্তমানে বাজারে যে ধরনের ডেনিম কাপড় রয়েছে সেগুলোর চেয়ে এই কাপড়ের মান কোনো অংশে কম নয়। পরিবেশবান্ধবের দিক দিয়ে এগুলো অনেক ভালো। পাটের এখন জয়জয়কার অবস্থা, কারণ পাট এমনই একটি পণ্য যে বিশ্বের দামি মার্সিডিজ গাড়ি তৈরি করতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। তা ছাড়া তিন-চার বছর ধরে পাটের শোলা বা কাঠি আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন পাটপণ্য হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পাটকাঠি থেকে জ্বালানি হিসেবে চারকোল ও এর গুঁড়া থেকে ফটোকপি মেশিনের কালি তৈরি হচ্ছে। পাটখড়ির কার্বন মোবাইলের ব্যাটারি, প্রসাধনী, দাঁত পরিষ্কারের ওষুধ, কার্বন পেপার, কম্পিউটার ও ফটোকপিয়ারের কালি, আঁতশবাজি, ফেসওয়াশের উপকরণ, প্রসাধন পণ্যসহ বিভিন্ন জিনিস তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। আরও তৈরি হচ্ছে জুটজিও টেক্সটাইল, যা ব্যবহার করা হয় রাস্তাঘাট নির্মাণে, বাঁধ নির্মাণে। আগে ব্যবহার করা হতো সিনথেটিক টেক্সটাইল, বিদেশ থেকে আমদানি করা হতো, যা পরিবেশের জন্য খুবই খারাপ। পাটের ব্যবহার বাড়ানো গেলে এগুলো আর আমদানি করা লাগবে না। তাছাড়া পাট থেকে আমরা কম্পোজিট তৈরির কাজ হচ্ছে।
পাট থেকে পলিথিন তৈরি করেছে পরমাণু গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা। পরিবেশবান্ধব এই পলিথিন মাটিতে পচতে সময় নেবে দুই থেকে তিন মাস। বাংলাদেশে ২০০২ সালে আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে পলিথিনের ব্যবহার। বন ও পরিবেশ দফতরের হিসাবে, প্রতি মাসে ঢাকায় পলিথিনের ব্যবহার হয় ৪১ কোটি টাকার। আর বছরে গোটা পৃথিবীতে ব্যবহৃত ১ ট্রিলিয়ন পলিথিনের কারণে প্রায় ১১ লাখ প্রাণী হুমকির মুখে পড়ে। তাই প্রাণী রক্ষায় এই পরিবেশবান্ধব পলিথিন যে বড় কাজে আসবে তা বলাই যায়।
বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিতে পাট থেকে ডেনিম কাপড় তৈরিরও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রথমে পাট ও তুলার মিশ্রণে সুতা তৈরি হচ্ছে। সেই সুতা থেকে বানানো হচ্ছে ডেনিম কাপড়। উৎপাদিত কাপড় থেকে প্যান্ট, জ্যাকেট, শার্টের মতো পোশাক বানিয়ে রপ্তানি করা হবে। পাশাপাশি দেশের বেসরকারি খাতে কাপড় সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন (বিজেএমসি) ইতোমধ্যে পাট থেকে ডেনিম কাপড় উৎপাদন করেছে।
নতুন সংযোজন পাট পাতার চা। এই চায়ে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা মানবদেহের দুর্বল কোষে ফ্রি রেডিক্যালের ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলতে দেয় না। এতে ক্যানসারের সম্ভাবনা কমে যায়। এছাড়া রাসায়নিক বিষক্রিয়ার কারণে লিভার ড্যামেজ ও জন্ডিস প্রতিরোধে সক্ষম এই চা। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রেখে বার্ধক্যজনিত রোগ প্রতিরোধ করতে বয়োবৃদ্ধদের সাহায্য করে। এছাড়া আলসার ও ত্বকের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধিতেও কার্যকর পাটের চা।
এই যে পাটের বহুমুখীকরণ তার মূলে রয়েছে পাটের গুণগত মান বৃদ্ধি। এই মান বৃদ্ধির জন্য মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন সর্বজন স্বীকৃত শ্রদ্ধেয় যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের একদল বিজ্ঞানী ২০১০ সালে তোষা পাট, ২০১২ সালে ছত্রাক এবং ২০১৩ সালে দেশি পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করেন। পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট পাটের এই জীবনরহস্যকে (জিনোম সিকোয়েন্সিং) কাজে লাগিয়ে ৪টি নতুন জাত তৈরি করেছেন। রবি-১, রবি-২ এবং শশী-১, শশী-২। পাটের আঁশের মধ্যে সাধারণত ১২ থেকে ১৪ শতাংশ লিগনিন থাকে। প্রাথমিকভাবে নতুন জাতে লিগনিনের পরিমাণ কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এতে আঁশ নরম হচ্ছে। ফলে পাট দিয়ে জামদানি, শার্ট, প্যান্ট বা সমজাতীয় পোশাক প্রস্তুতের সুতা তৈরি হচ্ছে। নতুন জাতের পাটের আঁশ বৃদ্ধি ও লম্বার জন্য দায়ী দুটি জিনও শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। এসব জিন কাজে লাগিয়ে ভালো ও বেশি আঁশযুক্ত পাটের জাতও উদ্ভাবন করা যাবে।
দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে মোট ২২টি পাটকল চালু রয়েছে এবং বেসরকারি খাতে প্রায় ২০০ পাটকল আছে। দেশের প্রায় ৪ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাট খাতের ওপর নির্ভরশীল। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উদ্যোগ এবং নিরন্তর চেষ্টায় পাট ও পাটজাত পণ্যের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ক্রম বৃদ্ধি পাচ্ছে, বাড়ছে রপ্তানিরও পরিমাণ। কৃষকরা অন্য ফসলের তুলনায় পাট চাষে যাতে লাভবান হতে পারেÑ সেজন্য দেশের অভ্যন্তরে পাটের উৎপাদন বাড়াতে মানসম্মত বীজ সংগ্রহ করা হচ্ছে সরকারিভাবে। পাটপণ্য বৈচিত্র্যকরণে সরকারি পাটকলগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হচ্ছে।
পাট চাষিদের অক্লান্ত পরিশ্রম, প্রকৃতির অকৃপণ কৃপা, বিজ্ঞানীদের ঘাম ঝরানো প্রচেষ্টা ও আন্তর্জাতিক বাজারের বিপুল চাহিদার কল্যাণে পাটের সুদিন ফিরে আসছে অচিরেই। সোনালি আঁশের সোনালি দিন আবার ফিরেছে। এবারের জাতীয় পাট দিবসেÑ ‘সোনালি আঁশের সোনার দেশ, পাট পণ্যের বাংলাদেশ’ এই সেøাগান আরও বেশি প্রাণোদ্বীপ্ত হয়েছে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাটের জামদানি, হাতে পাটের ব্যাগ, পাটের তৈরি স্যান্ডেলে পাটময় উপস্থিতিতে। দেশ যদি ঠিক এভাবেই এগিয়ে যায়, তাহলে সেদিন আর বেশি দূরে নেইÑ যেদিন পাট ও পাটজাত পণ্যই হবে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস।

লেখক : পিএইচডি গবেষক, শিক্ষক, কৃষিবিদ এবং সমাজকর্মী

শ্রেণী:

বিশ্ব নারী দিবস : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

Posted on by 0 comment
a

aড. ইঞ্জি. মাসুদা সিদ্দিক রোজী: গত ৮ মার্চ ছিল বিশ্ব নারী দিবস। বিশ্ব নারী দিবসটি পালনের পিছনে রয়েছে এক অনন্য ইতিহাস। ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে একটি সুচ কারখানার মহিলা শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে মানবেতর জীবন ও ১২ ঘণ্টা কর্মদিবসের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। তাদের ওপর নেমে আসে পুলিশি নির্যাতন। ১৮৬০ সালে ঐ কারখানায় মহিলা শ্রমিকরা মহিলা শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন করে সাংগঠনিকভাবে আলোচনা চালিয়ে যেতে থাকে। ১৯০৮ সালে কর্মঘণ্টা, ভালো বেতন ও ভোট দেওয়ার দাবি নিয়ে নিউইয়র্ক সিটিতে মিছিল করে তারা। তারপর ১৯১০ সালের ৮ মার্চ কোপেনহেগেন শহরে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক মহিলা সম্মেলনে জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ক্লারা জেটকিন মে প্রতিবছর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের প্রস্তাব দেন। ১৯১১ সালে বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালিত হতে শুরু হয়। এই সম্মেলনে ১৭টি দেশের ১০০ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। সূচনায় দিবসটিকে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস’ হিসেবে পালন করা হতো। ১৯১৪ সালের পর থেকে দেশে দেশে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ হিসেবে এই দিনটি উদযাপিত হয়। জাতিসংঘে ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে সারাবিশ্বের রাষ্ট্রসমূহকে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের আহ্বান জানায়। বাংলাদেশে ১৯৯১ সালে প্রথম বছরের মতো এই দিবসটি পালন করা হয়।
ইসলাম ধর্মে নারীর ক্ষমতার গৌরবের ইতিহাস রয়েছে। বিবি খাদিজা যখন প্রথম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন তিনি কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন, দেশ-বিদেশও ঘুরতেন। ইসলাম ধর্মের জন্য যে জেহাদ ঘোষণা করেছেন, তিনি একজন নারী, সুমাইয়া। নবী করিম (সা.)-এর সাথে বিবি আয়েশা রণক্ষেত্রে যেতে তার পাশে পাশে থাকতেন, অনুপ্রেরণা দিতেন। ইসলাম ধর্ম পুরুষের পাশাপাশি নারীদের সমাজে সমান সুযোগ দিয়েছে, তাই ধর্মের নামে নারীদের পিছনে ফেলে রাখার সুযোগ নেই।
কারও মুখাপেক্ষী না হয়ে নারীদের কাজের মধ্য দিয়ে জায়গা করে নিতে হবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হতে পারতেন না যদি তার পাশে সেই মহীয়সী নারী বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব প্রতি মুহূর্তে না থাকতেন। এমনকি যিনি মৃত্যুতেও তার সঙ্গী হয়েছেন। সেই মহিয়সী নারীর প্রতি আমরা গভীর শ্রদ্ধা জানাই। জাতির পিতা একটা কথা বলতেন, ‘একজন মহিলা যদি নিজে উপার্জন করে তার আঁচলে যদি ১০ টাকাও নিয়ে ঘরে ফেরে তাহলে সেই পরিবারে তার একটা মূল্য হয়।’ ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ওপর পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারের যে অত্যাচার হয় সেই নির্যাতিতাদের যুদ্ধ-পরবর্তীতে পুনর্বাসন ও যথাযথ সম্মান দেন জাতির পিতা।
আর যে নারীর জন্য আজকে বাংলাদেশের নারীদের অগ্রযাত্রা এত দ্রুতগতিতে এগুচ্ছে আজকের বাংলাদেশের যে ক’জন মর্যাদাসম্পন্ন নারী আছেন। সেই নারীরা যার কাছে ঋণী, তিনি বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। মেয়েদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা, চাকরিতে কোটা পদ্ধতিসহ নারী উন্নয়নে শেখ হাসিনার পদক্ষেপ। জননেত্রী এ কথাগুলো সব সময় বলেন, ‘আমাদের কারও দিকে মুখাপেক্ষী হলে চলবে না। নিজেদের ভাগ্য নিজেদের গড়তে হবে। আত্মবিশ্বাস নিয়ে চলতে হবে, তবেই মর্যাদা পাওয়া যাবে। কেঁদে কেঁদে ফিরলে মর্যাদা কেউ হাতে তুলে দেবে না; বরং করুণা করে। আর করুণা ভিক্ষা নিয়ে মেয়েরা বাঁচতে পারে না। কাজেই নিজের মর্যাদা নিজেই অর্জন করতে হবে। নিজের কর্মের মধ্য দিয়ে, আত্মবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে চলতে হবে।’
সেজন্যই এবারের নারী দিবসের স্লোগান ছিলÑ ‘অধিকার মর্যাদায় নারী পুরুষ সমানে সমান’। আমাদের প্রধানমন্ত্রী নারীদের জন্য গাড়ির ড্রাইভার থেকে কম্পিউটারÑ সব ধরনের ট্রেনিংয়ের সুবিধা করেছেন। ইতোমধ্যে ৪টি বিভাগে মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট করে দিয়েছেন। ৪৬৭টি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, যেখানে মেয়েদের পড়াশোনার সুযোগ আছে। কারণ সব জায়গায় অ্যাডুকেশনের ব্যবস্থা আছে। ৪৯টি সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। এখানে ৩টা শুধু বিশেষভাবে মহিলাদের জন্য, বাকি জায়গায় ছেলেমেয়েরা উভয়ে পড়তে পারে। ৬৪টি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার আছে সেখান থেকে মেয়েরা ভাতা পাচ্ছে। প্রতিটি উপজেলায় একটি করে স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১০০টার কাজ চালু হয়ে গেছে। ৭০টি সরকারি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার। অর্থাৎ টিটিসি চালু আছে, এখানে ছেলেমেয়ে উভয়ে সুযোগ আছে। মেয়েদের জন্য বিশেষভাবে আলাদা ব্যবস্থা আছে। ঢাকা National Forensic DNA Profiling Labratory
এবং ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বিভাগীয় DNA Screening Labratory স্থাপন করা হয়েছে। জেলা স্বাস্থ্য ঈড়সঢ়ষবী-এ মোট ৬০টি One Stop Crisis Cell স্থাপন করা হয়েছে। তাছাড়া নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেল প্রতিটি বিভাগীয় শহরে ৯টি One Stop Crisis Center স্থাপিত হয়েছে। স্বল্পব্যয় কর্মজীবীদের জন্য ঢাকাসহ অন্যান্য জেলা শহরে ৮টি হোস্টেল স্থাপন করা হয়েছে। কর্মজীবী মহিলাদের (গার্মেন্ট শ্রমিকদের) ১২ তলা বিশিষ্ট হোস্টেল স্থাপিত হয়েছে। শহীদ শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিব একাডেমিসহ আরও ৬টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে মহিলা আসন ৫০ এবং সরাসরি নির্বাচিত আরও ২২ জন করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে মাননীয় স্পিকার, সংসদ নেতা, বিরোধীয় নেতা উপনেতা ৪টি উচ্চপদে মহিলা আছেন। নারীদের সুরক্ষার জন্য আইন প্রণয়ন, মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এসিড সন্ত্রাস, ইভটিজিং বন্ধের ব্যবস্থা নিয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধের বিশেষ আইন ২০০০-এ সরকার প্রথমবার এসেই প্রণয়ন করেছেন শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০৩ সংগঠিত হয়েছে। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ প্রণয়ন করা হয়েছে। পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন ২০১০ তৈরি করেছে। ডিএনএ আইন ২০১৪ প্রণয়ন হয়েছে, যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮ ও শিশু দিবাযতœ কেন্দ্র আইন ২০১৮ প্রণয়ন চূড়ান্ত পর্যায়ে। এখন বেশ কয়েকজন মহিলা Ambassador নিয়োগ আছে। খেলাধুলা, ব্যবসা সবক্ষেত্রে মহিলারা যেন স্থান পায় সেই ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। লেখাপড়ার জন্য মেয়েদের দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিনা বেতন, উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষক ৬০ শতাংশ মেয়ে এবং ৪০ শতাংশ ছেলেÑ এভাবে মেয়েদের কর্মব্যবস্থা করা হয়েছে। বাবা-মা যখন দেখবে মেয়ে লেখাপড়া শিখে অর্থ উপার্জন করছে, তখন আর বিয়ে দেওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করবে না।
১৯৯৬ সাল থেকে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও দুস্থ নারী ভাতা, মাতৃত্ব ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ও প্রতিবন্ধী ভাতাসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি চালু হয়েছে। হিজড়া ও বেদে সম্প্রদায়ের জন্য ৬০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হচ্ছে, চা-শ্রমিকদের অধিকাংশ নারী তাদের জন্য অনুদান ১০ কোটি থেকে বৃদ্ধি করে ১৫ কোটি টাকা করা হয়েছে।
একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের অধীনে ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মেয়েরা এখন এয়ারফোর্সের যুদ্ধবিমান চালায়। বিমান, হেলিকপ্টার, রেলগাড়িÑ সবক্ষেত্রে মেয়েরা জায়গা করে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এটিসি দায়িত্বে একজন মেয়েকেও স্থান দিয়েছে। মেয়েরা এখন আর পিছিয়ে নেই। যে দায়িত্ব দেওয়া যায় সেখানেই দক্ষতা দেখাতে পারছে। খেলাধুলায় ১৯৯৬ সালে প্রমিলা ফুটবল দল ভালো করেছিল। এখন বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টে ভালো খেলছে। ফুটবল, টেনিস, দাবা সবক্ষেত্রে খেলাধুলা একটা ভালো পরিবেশে এনে দিয়েছে তাদের। কোনো সমস্যাই নেই জাতীয় নারী ক্রিকেট দল ২০২০ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ক্রিকেটে খেলবে। মহিলা ফুটবল দল অনূর্ধ্ব-১৫, তারা ১৫ নারী চ্যাম্পিয়ানশিপে ভারতকে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে সমৃদ্ধ বাংলদেশ হিসেবে গড়ে তোলা এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সেই লক্ষে নারী-পুরুষ সকলে মিলে কাজ করতে পারলেই এ দেশ এগিয়ে যাবে। কাজেই সময় এখন নারীর উন্নয়নে, বদলে যাবে গ্রাম-শহর কর্মজীবন ধারা।

শ্রেণী: