বাংলাদেশের দুই বন্ধু পরলোকে

utta

সাইদ আহমেদ বাবু:

uttaঅটল বিহারী বাজপেয়ী
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী চলে গেলেন না ফেরার দেশে। খুব স্বাভাবিকভাবেই ভারতসহ গোটা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। গত ১৬ আগস্ট বিকেল ৫টা ৫ মিনিটে মৃত্যু হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভারতরতœ অটল বিহারী বাজপেয়ীর। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। ১৭ আগস্ট দিল্লির স্মৃতিস্থল শ্মশানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। চোখের পানিতে অটলজিকে বিদায় জানায় লাখ লাখ মানুষ।
প্রায় চার দশকের এই সংসদ সদস্য ছিলেন ভারতের প্রথম অকংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রী যিনি পুরো পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করেছিলেন। ১৯৯৬ সালে তিনি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। এরপর ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হন। প্রথম দফায় ১৩ দিন, দ্বিতীয় দফায় ১৩ মাস ও পরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পুরো মেয়াদ úূর্ণ করেন। প-িত জওহরলাল নেহ্রুর পর তিনিই প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যিনি পরপর দুবারের জন্য জনাদেশ পেয়ে এই পদে আসীন হন। বাজপেয়ী লোকসভায় ৯ বার নির্বাচিত হন এবং রাজ্যসভায় দুবার নির্বাচিত হন। তার ভাষণ এতটাই জোরদার ছিল, যা প্রভাবিত করেছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহ্রুকেও।
আর্য সমাজের যুব শাখা আর্য কুমার সভা থেকে সমাজসেবায় অংশ নেওয়া শুরু বাজপেয়ীর। ১৯৪৪ সালে তিনি আর্য সমাজের সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন। এসবের মাঝে ১৯৩৯ সালে আরএসএসে যোগ দেন তিনি। ১৯৪৭ সালে পূর্ণ সময়ের আরএসএস কর্মী হন বাজপেয়ী। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মধ্যদিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলন তথা রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় বাজপেয়ীর। সেই সময়ে ২৩ দিন গ্রেফতার করে রাখা হয়েছিল বাজপেয়ী ও তার দাদা প্রেমকে। পরে মুচলেখা শর্তে ছাড়া পান। ৩০ জানুয়ারি ১৯৪৮। নাথুরাম গডসের হাতে গান্ধীর হত্যার পর দেশজুড়ে নিষিদ্ধ করা হয় আরএসএস-কে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জনসংঘে যোগ দেন বাজপেয়ী। দীনদয়াল উপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর জনসংঘের দায়িত্ব নেন অটল বিহারী বাজপেয়ী। সঙ্গে ছিলেন বন্ধু লালকৃষ্ণ আদভানি।
১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থার সময়ে গ্রেফতার হন বাজপেয়ী। ১৯৭৭ সালে ছাড়া পাওয়ার পরে জয়প্রকাশ নারায়ণের আহ্বানে কংগ্রেসবিরোধী জোট, যা জনতা পার্টি নামে পরিচিত ছিল, তাতে জনসংঘ নিয়ে বাজপেয়ী যোগ দেন। ১৯৭৭ সালে লোকসভা নির্বাচনে জিতে জনতা পার্টি জোটের সরকার হলে প্রধানমন্ত্রী হন মোরারজি দেশাই। পররাষ্ট্রমন্ত্রী নির্বাচিত হন অটল বিহারী বাজপেয়ী। প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘের মঞ্চে হিন্দিতে ভাষণ দেন তিনি। ১৯৭৯ সালে জনতা পার্টির সরকার পড়ে গেলেও ততদিনে বাজপেয়ী নিজেকে জাতীয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন।
১৯৮০ সালে আরএসএস’র প্রচারক বাজপেয়ী দীর্ঘদিনের বন্ধু লালকৃষ্ণ আদভানি, ভৈরো সিং শেখাওয়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিজেপি তৈরি করেন। তিনি হন বিজেপির প্রথম সভাপতি।
১৯৮৪ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজেপি মাত্র দুটি লোকসভা আসনে জয়ী হন। তবুও সংসদে কংগ্রেসের বিরোধী নেতা বলতে সবার আগে বাজপেয়ীর নাম লোকের মুখে মুখে ঘুরত। ধীরে ধীরে অযোধ্যা ও রাম জন্মভূমি ইস্যুকে হাতিয়ার করে রাজনৈতিকভাবে সারাদেশে বিজেপি ছড়িয়ে যায়। ১৯৯৫ সালে গুজরাট ও মহারাষ্ট্রে জয়ের পরে বিজেপি অনেক শক্তিশালী হয়ে যায়।
১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের ঝুঁকি দেখা দিয়েছিল। দুই পরমাণু অস্ত্রধর দেশের মধ্যে যুদ্ধ আরও ভয়ঙ্কর হতে পারত। হয়নি। কারণ পাকিস্তানের সামরিক ঘাঁটিতে বোমা হামলার অনুমতি দেননি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী।
১৯৯৯ সালে পুনরায় লোকসভা নির্বাচন হয়। কারগিল যুদ্ধ ও পোখরানে পরমাণু নিরীক্ষণের পরের এই ভোটে বিজেপি ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ৩০৩টি আসনে জেতে। ১৯৯৯ সালের অক্টোবর মাসে বাজপেয়ী তৃতীয়বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৪ সাল পর্যন্ত পূর্ণ সময়কাল সরকার চালানো হয়। আটের দশকে তার দুই সাংসদের দল আজ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে দিল্লির মসনদে। গোটা ভারতের ২১টি রাজ্যের ক্ষমতায় বিজেপি। এমন দিনের ভবিষ্যদ্বাণী সেই কবে করে গিয়েছেন বাজপেয়ী। বলেছিলেন, ‘অন্ধেরা ছাটেগা, কমল খিলেগা।’
অটল বিহারী বাজপেয়ী, জাতীয় রাজনীতির আঙিনার সর্বাপেক্ষা শালীন, শিষ্টাচারে বিশ্বাসী, প্রজ্ঞাবান, সুবক্তার নাম। বাজপেয়ীজির উদারতা, বহুত্ববাদী মানসিকতা, কবিত্ব, প্রশাসনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক বোধ, সাংগঠনিক দাপট এ মুহূর্তে প্রায় কিংবদন্তি।
আরএসএসের বীজমন্ত্রই সারাজীবন জপে এসেছেন বাজপেয়ী। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেই হিন্দুবাদী রাষ্ট্রদর্শনকেই সার্বজনীন রূপ দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন, নিজের ইমেজকে এতটুকুও কালিমালিপ্ত না করে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের জন্য তিনি আজীবন অবিবাহিত থাকা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কানপুরে পড়াশোনা করেছিলেন মি. বাজপেয়ী। তারপরে আইন পড়েছেন।
গুজরাট গণহত্যার পর গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে রাজধর্ম পালনের পরামর্শ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী। বলেছিলেন ভারত যদি ধর্মনিরপেক্ষ না হয়, তাহলে ভারত ভারতই নয়। ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এ উক্তি স্মরণীয়। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৯২। উন্মত্ত সংঘ সেবকদের হাতে ধ্বংস হয়ে গেল বাবরি মসজিদ। দেশজুড়ে শুরু হয়ে গেলে দাঙ্গা। প্রাণ গেল অসংখ্য নিরীহ মানুষের। বাবরি মসজিদের ধ্বংস করার সেদিনের কা- কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী। সেই ঘটনার জন্য গোটা দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন তিনি। দশকের পর দশক ধরে তিনি বিশেষ শ্রদ্ধাভাজন এক নেতা হিসেবে পরিগণিত হয়েছেন, তার উদার দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে বিন্দুমাত্র আপসে যে তিনি রাজি নন, এই বার্তা ছড়িয়ে যায় গোটা দেশে।
২০১৫ সালে ভারত সরকার অটল বিহারী বাজপেয়ীকে ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ সম্মান ভারতরতœ সম্মানে ভূষিত করে। ১৯৯২ সালে তিনি পদ্মবিভূষণ পান। এছাড়া ১৯৯৪ সালে লোকমান্য তিলক পুরস্কার, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা পুরস্কারের মতো বহু দেশি-বিদেশি সম্মাননা তিনি পেয়েছেন।
বাজপেয়ী বরাবরই এক অজাতশত্রু, ঘোর রাজনৈতিক বৈরিতা ছিল যে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে, ’৭১-এর যুদ্ধে ভারতের অভূতপূর্ব বিজয়ের পর সেই ইন্দিরাকেই সংসদে দাঁড়িয়ে ‘মা দুর্গা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন অটল বিহারী বাজপেয়ী। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বরে ভারতীয় পার্লামেন্টে তখনকার বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে অটল বিহারী বাজপেয়ী বলেছিলেন, দেরিতে হলেও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে একটি সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আমাদের সামনে ইতিহাস বদলের প্রক্রিয়া চলছে। নিয়তি এই সংসদ এবং দেশকে এমন মহান কাজে রেখেছে, যেখানে আমরা শুধু মুক্তিসংগ্রামে জীবন দিচ্ছি না; বরং ইতিহাসকে একটি পরিণতির দিকে নিতে চেষ্টা করছি। বাংলাদেশে নিজেদের সংগ্রামের জন্য লড়াই করা মানুষ এবং আমাদের রক্ত একসঙ্গে বইছে। এই রক্ত এমন সম্পর্ক তৈরি করবে, যা কোনোভাবে ভাঙবে না। কোনো ধরনের কূটনীতির শিকার হবে না। বিরোধী দলনেতা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সম্পৃক্ততাকে সম্পূর্ণ সমর্থন করেছিলেন এ মানুষটি।
জনজীবনে শ্রী বাজপেয়ীর উত্থান, একই সঙ্গে তার রাজনৈতিক বিচক্ষণতা এবং ভারতীয় গণতন্ত্রের মহিমাতেই তা সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে তাকে বাংলাদেশের একজন মহান বন্ধু হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

কফি আনান
জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান আর নেই। ৮০ বছর বয়সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন এই নোবেলজয়ী। অল্প কিছুদিন ধরে অসুস্থ হয়ে সুইজারল্যান্ডে ছিলেন তিনি। কফি আনান ছিলেন সারাবিশ্বের। জীবনভর তিনি শান্তির জন্য কাজ করে গেছেন।
১৯৩৮ সালের এপ্রিলে ঘানার কুমাসির এক অভিজাত পরিবারে জন্ম কফি আনানের। বাবা ছিলেন প্রাদেশিক গভর্নর। এক যমজ বোনও ছিল তার। প্রথমে মিনেসোটার কলেজে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা। পরে জেনেভায় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে পড়েন। তারও পরে ম্যাসাচুসেটসের ম্যানেজমেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তরে পড়াশোনা। ফরাসি, ইংরেজিসহ অনেকগুলো ভাষায় দক্ষ ছিলেন আনান। ১৯৬২ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জে যোগ দেন তিনি, ওয়ার্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজেশনে। দু-পক্ষের তিন সন্তান রয়েছে আনানের।
কফি আনান জাতিসংঘের সপ্তম মহাসচিব ছিলেন। প্রথম আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে ১৯৯৭ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে ওই দায়িত্ব পালন করেন তিনি। কর্মী হিসেবে জাতিসংঘে যোগ দিয়ে তিনিই প্রথম সংস্থাটির শীর্ষ পদে আসীন। অবসরের পর তিনি সিরিয়া বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ দূত হিসেবে কাজ করেন। তার নেতৃত্বেই আলোচনার মাধ্যমে সিরিয়ায় সাড়ে সাত বছরের গৃহযুদ্ধের ইতি টানার চেষ্টা করা হচ্ছিল।
শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়পরায়ণ বিশ্ব প্রতিষ্ঠায় জীবনভর সংগ্রাম করেছেন তিনি। যেখানেই দুর্ভোগ বা মানবিক আর্তি সেখানেই ছুটে গেছেন তিনি। গভীর সমবেদনা ও সমানুভূতিতে হৃদয় ছুঁয়েছেন বহু মানুষের। নিজের বদলে অন্যদের কথাই আগে ভেবেছেন তিনি, যা করেছেন তার সবকিছুই দ্যুতি ছড়িয়েছে সত্যিকারের মমতা, আন্তরিকতা আর মেধার।
বিশ্ব সংস্থাটির সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য ও মানবাধিকার ইস্যুগুলো অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য ২০০১ সালে আনান ও জাতিসংঘকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। ২০০১ সালে নোবেল পুরস্কারজয়ী কফি আনান মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান নিয়েও কাজ করছিলেন।
অনেকভাবেই কফি আনান ছিলেন জাতিসংঘ। বিভিন্ন পদমর্যাদার মধ্যদিয়ে তিনি সংস্থাটির নেতৃত্ব পর্যায়ে এসে নতুন সহস্রাব্দে তুলনাবিহীন সম্মান ও দৃঢ়তার সঙ্গে এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেনÑ এক বিবৃতিতে বলেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।
আফ্রিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাত অবসানে কয়েক দশক ধরে প্রচেষ্টা চালানোর পর তার জীবনাবসান হলো। রাখাইন রাজ্য পরিস্থিতিকে ‘মানবাধিকার সংকট’ বলল কফি আনান কমিশন। ২০০৭ সালে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বৈশ্বিক নেতাদের গ্রুপ দ্য এলডারস’র প্রতিষ্ঠা হলে এর সদস্য হন কফি আনান। ২০১৩ সালে ওই গ্রুপের চেয়ারম্যান হন তিনি।
ইরাকে মার্কিন অভিযানের সময় বিপক্ষে অবস্থান নেয় সংস্থাটি। ওই অভিযানকে ‘অবৈধ’ অভিযান বলে বর্ণনা করেছিলেন মি. আনান।
কফি আনানের ভাষায় তার সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল ‘সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ নির্ধারণÑ দারিদ্র্য আর শিশুমৃত্যু কমাতে বিশ্বব্যাপী প্রথম এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তিনি ছিলেন বৈশ্বিক কূটনীতিক ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ। সমসাময়িক বিশ্বের উজ্জ্বল এই নক্ষত্রের বিদায়ে শোক জানিয়েছেন জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস, মানবাধিকার কমিশনার জায়েদ রা’দ আল হোসেনসহ বিশ্বের প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দ।
নোবেল জয়ের বছরে বাংলাদেশে এসেছিলেন, এবার রোহিঙ্গাদের দেখার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন, কিন্তু… ইরাকযুদ্ধের শুরু থেকেই কফি আনান নামটি খ্যাতি পায় বিশ্বজুড়ে। যুদ্ধ বন্ধে দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে দৌড়ঝাঁপসহ নানা পদক্ষেপ ছিল তার। তখন তিনি জাতিসংঘের প্রধান নির্বাহী।
নোবেল জয়ের বছরেই তিনি বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। জাতিসংঘের কোনো প্রধান নির্বাহীর এটি ছিল তৃতীয় বাংলাদেশ সফর। কফি আনানের সফরের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে আরও দুজন মহাসচিব বান কি মুন (২০০৮ ও ২০১১) এবং বর্তমান মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সফর করেছেন।
২০১৬ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের বর্বরতার মাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং বাংলাদেশে তাদের প্রবেশে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছিলেন কফি আনান। তিনি অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ এবং রাখাইন রাজ্যের উপদ্রুত এলাকাগুলোতে জাতিসংঘ, মানবিক সহায়তা সংস্থা এবং গণমাধ্যমের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বানও জানিয়েছেন।
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে নিউইয়র্কে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বৈঠক করেন কফি আনানের সঙ্গে। সেখানে ২০১৬ সাল থেকে রাখাইনে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে মানবিক ভূমিকা রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রশংসা করেন ড. আনান।
৮০ বছরে জীবনাবসানে কফি আনান যে পৃথিবী হতে বিদায় নিলেন, সেই পৃথিবীতে এই গণতান্ত্রিক রীতি, সম্মেলক কাজ করার দৃষ্টান্ত, শান্তভাবে অন্যপক্ষের যুক্তি শুনবার বহু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা ও সমষ্টিগত অপারগতা সত্ত্বেও, বিশ্বময় সম্মেলক সক্রিয়তার লক্ষ্যটি যে অনর্থক নয়, সেই বিশ্বাস তিনি আবারও ফিরিয়ে আনলেন। এই ‘অসম্ভব’কে সম্ভব করার জন্য দরকার ছিল যথার্থ নেতৃত্বগুণ। আনানের মধ্যে তা ছিল। ২০১৩ সালে কফি আনান ‘দ্য এলডার্স’-এর চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। এ সংগঠনটি বিশ্বের প্রবীণ রাজনীতিকদের একটি সংগঠন, যারা বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে। ২০০৭ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

শ্রেণী:

‘নেওয়াজ শরিফ ও কন্যা মরিয়ম নির্বাচনে অযোগ্য’

Posted on by 0 comment
8-6-2018 7-32-05 PM
8-6-2018 7-32-05 PM

পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা : নিশ্চিত কারাবাস জেনেও দেশে ফেরা

সাইদ আহমেদ বাবু: ব্রিটিশরা ১৯৪৭ সালে ভারতকে বিভক্ত করে ১৪ আগস্ট পাকিস্তানকে এবং ১৫ আগস্ট ভারতকে স্বাধীনতা প্রদান করেছিল। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের স্থপতি মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু হয় আর ১৯৫১ সালে রাওয়ালপিন্ডির জনসভায় প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান বক্তৃতা প্রদান করার সময় আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সেনাবাহিনীর জেনারেলদের নিয়ন্ত্রণে এবং সে-দেশের মানুষ সামরিক এবং বেসামরিক দুর্নীতিবাজ আমলাদের হাতে বন্দী। দেশটির মানুষের ভাগ্য তাদের নিজের হাতে নয়।
বহুল আলোচিত পানামা পেপার কেলেঙ্কারিতে ফাঁস হওয়া দুর্নীতি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ও তার কন্যা মরিয়ম নওয়াজ। ৬৭ বছর বয়সী নওয়াজ শরিফকে ২০১৭ সালের জুলাইয়ে দেশটির সুপ্রিমকোর্ট প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অযোগ্য ঘোষণা করার পর তিনি পদত্যাগ করেন। তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত-আয় বহির্ভূত হিসাব দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়।
এখন তিনি ও তার মেয়ে মরিয়ম জেলে বন্দী। অ্যাকাউন্টিবিলিটি কোর্ট তাকে ১০ বছরের সাজা প্রদান করেছে। একই সঙ্গে তাকে ১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারও জরিমানা করা হয়। একই রায়ে তার মেয়ে মরিয়ম নওয়াজকে সাত বছর ও মরিয়মের স্বামী ক্যাপ্টেন সফদারকে এক বছর কারাদ- দেওয়া হয়েছে। অ্যাকাউন্টিবিলিটি কোর্ট রাজনীতিবিদদের শায়েস্তা করার জন্য সৃষ্টি করেছিল জেনারেল জিয়াউল হক। এই জেনারেল জিয়াউল হকই জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ফাঁসিতে ঝুঁলিয়েছিলেন ১৯৭৯ সালে। পাকিস্তানের ইতিহাসে দীর্ঘ সময় সেনাশাসন থাকার ফলে সেখানে গড়ে উঠেছে একটি সেনা-অনুগত সিভিল-সমাজ এবং অনুগত জনগোষ্ঠী যারা রাজনৈতিক দলের চেয়ে সেনাশাসন পাকিস্তানের জন্য অধিক উপযুক্ত মনে করে। এছাড়া রয়েছে সেনা-অনুগত কিছু রাজনৈতিক দল।
আশা-নিরাশা, সফলতা-ব্যর্থতা উত্থান-পতন, সুখ-দুঃখ নিয়ে জীবনের গলিপথ। রাজনীতির এই মাঠে কেউ মহানায়ক হন আবার একই ব্যক্তি পরিণত হন খলনায়কে। পাকিস্তানের নওয়াজ শরিফ এমনই একজন। ২০১৭-এর ২৮ জুলাই নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে সুপ্রিমকোর্টের রায়ের মাধ্যমে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করে মেয়াদপূর্ণের ১০ মাস আগে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। তবে তিনিই পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নন, যাকে কোর্টের রায়ে ক্ষমতা ছাড়তে হলো। পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) ইউসুফ রাজা গিলানি দেশটির ইতিহাসের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, আদালতের আদেশে যাকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হয়েছিল।
কখনও গুপ্তহত্যা, কখনও গৃহবন্দি, কখনও মৃত্যুদ-, কখনও বিমান দুর্ঘটনা। পাক-রাজনীতিবিদদের জীবনটাই ঘটনাবহুল। মৃত্যুদ- হয়েছিল জুলফিকার আলি ভুট্টোর, রহস্যজনক বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল জেনারেল জিয়াউল হকের, আততায়ীর গুলি ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল বেনজির ভুট্টোকে, এ মুহূর্তে দেশের বাইরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন মুশাররফ। সেই অমোঘ নিয়তির শিকার সাবেক পাক-প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এবং তার পরিবারও। তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ উত্থান-পতন।
১৯৪৯ সালে লাহোর কাশ্মীরি শিল্পপতি পরিবারে জন্ম নওয়াজ শরিফের। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে স্নাতক, তারপরই পারিবারিক ইস্পাত ব্যবসায় যোগদান। ১৯৭৬ সালে পারিবারিক ব্যবসা নওয়াজের রাষ্ট্রায়ত্তকরণ করে জুলফিকার আলি ভুট্টো সরকার। তখনই তিনি যোগদান করেন পাকিস্তান মুসলিম লীগে। ভুট্টো ও শরিফ পরিবারের বিবাদের সেই শুরু। ১৯৮১ সালে পাক-পাঞ্জাবের অর্থমন্ত্রী হিসেবে কাজ শুরু। চার বছরের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী ও নিজের দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নওয়াজ) প্রতিষ্ঠা। ১৯৯০ সালে প্রথমবারের জন্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত পাকিস্তানের দুর্নীতিবাজ প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ সেনবাহিনীর সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ১৯৯৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত হন। সেনাবাহিনী কোর্ট ব্যবহার করে তাকে গ্রেফতার করে ছিনতাই ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয় এবং দুর্নীতির দায়ে আজীবন রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করে। পরে সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় কারাদ- থেকে বেঁচে গিয়ে নওয়াজ শরিফ পরিবারের ৪০ সদস্যসহ ১০ বছরের নির্বাসনে যান।
একই সঙ্গে ২০০৭ সালে সুচতুর নওয়াজ পাকিস্তানের অন্যতম ধনী ব্যক্তি হওয়ায় সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যকে ম্যানেজ করে দেশে ফিরে আসতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে তিনি ২০১৩ সালে আবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলে সেনাবাহিনীর পক্ষে এটা মেনে নেওয়া কঠিন ছিল। ফলে অনেকে এটা মনে করতে শুরু করেন যে কোর্টকে ব্যবহার করে, সেনাবাহিনীই আসলে নওয়াজকে সরিয়ে দিয়েছে তাদের পছন্দের কাউকে অথবা নিজেরাই ক্ষমতায় আসার জন্য।
পাকিস্তান মুসলিম লীগ-প্রধান নওয়াজ শরিফ তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। নির্বাচনে জিতে কিন্তু কোনোবারই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। এবারের মেয়াদ নিয়ে তিনি পাকিস্তানের ১৫তম প্রধানমন্ত্রী, যারা কেউ মেয়াদ শেষ করতে পারেন নি। তিনি সেনাবাহিনীর ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে ভারতের সঙ্গে বিরোধ মিটাতে চেয়েছেন বারবার। এবার তাকে চিরজনমের মতো অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। ৭০ বছর বয়সী রাষ্ট্রটি এ পর্যন্ত ৩৪ বছর শাসন করেছে রাজনীতিবিদরা আর ৩৬ বছর শাসন করেছে দেশটির জেনারেলরা। মাত্র দুবার নির্বাচিত দল সরকারের মেয়াদ পূর্ণ করতে পেরেছিল। পাকিস্তানের দেশরক্ষার বিষয় এবং পররাষ্ট্রবিষয়ক কর্মকা- প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে সেনাবাহিনী।
১৯৭১-পরবর্তী পাকিস্তানের ইতিহাসে কোনো সামরিক শাসকই আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হননি। পিপলস পার্টি, মুসলিম লীগসহ সবাই সেখানে সেনাশাসকদের দেখানো পথেই হেঁটেছেন এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে যতটা সম্ভব আপস করেই ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছেন। যখনই আপসরফায় বনিবনা হয়নি তখনই সেনাবাহিনী সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে নিয়েছে। ফলে, যখনই কোনো বেসামরিক শাসককে তারা পছন্দ করেনি নির্দ্বিধায় তাদের সরিয়ে দিয়েছে। জনগণ এবং সিভিল সমাজের একটা বড় অংশও তাদের এ কাজে সমর্থন জানিয়েছে।
পাকিস্তান জাতীয় সংসদে আসন সংখ্যা ৩৪২, যেখানে ২৭২টি সাধারণ এবং ৭০টি আসন নারী এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের জন্য রিজার্ভ রয়েছে। আসনের মধ্যে আবার পাঞ্জাব প্রদেশে ১৭৪টি, সিন্ধু প্রদেশে ৭৫টি, পাখতুনখাওয়া প্রদেশে ৪৮টি, বেলুচিস্তান প্রদেশে ১২টি আর কেন্দ্রীয় রাজধানীতে ৩টি। পাঞ্জাব সর্ববৃহত্তম প্রদেশ এবং এ প্রদেশে আসন সংখ্যাও বেশি। নওয়াজ শরিফ পাঞ্জাবের লোক। তিনি জেনারেল জিয়াউল হকের সময় পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। আসলে জেনারেল জিয়াউল হকই তাকে রাজনীতিতে এনেছিলেন। নওয়াজেরা পাকিস্তানের অন্যতম ধনাঢ্য পরিবার। ইত্তেফাক ফাউন্ডারির মালিক। তারা সারাবিশ্বে বিভিন্ন মেশিন সাপ্লাই করে থাকে।
বিবিসি জানিয়েছে, এর আগে নওয়াজ শরিফ বলেছেন, ‘একটা সময় ছিল যখন আমরা পাকিস্তানকে বলতাম একটি রাষ্ট্রের মধ্যে আরেকটি রাষ্ট্র, এখন বলা হয় একটি রাষ্ট্রের ওপরে আরেকটি রাষ্ট্র।’
এই রায়ের ফলে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের আগে পাকিস্তান মুসলিম লিগ (এন) বড় রকমের ধাক্কা খেল।
নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টের দেওয়া রায়টি কি কোর্টের স্বাধীন ইচ্ছার প্রতিফলন না-কি সেনাসদর দফতরের ইচ্ছার প্রতিফলন তা বলার সময় এখনও আসেনি।
রায়ের পরই সাংবাদিক বৈঠকে নওয়াজ বলেন, রাজনৈতিকভাবে আমাকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্যই এসব হচ্ছে। দুর্নীতির দায়ে ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পর লন্ডনে চিকিৎসাধীন ক্যানসারে আক্রান্ত স্ত্রীর থেকে বিদায় নিয়ে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। লন্ডনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এদিকে রায়ের পর এক প্রতিক্রিয়ায় দিনটিকে ‘কালোদিন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন তার ভাই ও পাকিস্তান মুসলিম লীগ (এন) সভাপতি শাহবাজ শরিফ। পাকিস্তান মুসলিম লীগ (এন) এ রায় প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে এই রায়ের মধ্যদিয়ে নতুন পাকিস্তানের জন্ম হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ প্রধান ইমরান খান।
এদিকে, এই রায়কে আবারও চ্যালেঞ্জ জানানো হবে নওয়াজের পরিবারের পক্ষ থেকে। আগামী উচ্চ আদালতে এই রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করবে তারা।
দেশে ফিরে গ্রেফতার হলেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও মুসলিম লীগ (এন) নেতা নওয়াজ শরিফ। তার সাথে তার মেয়ে মরিয়ম নেওয়াজও গ্রেফতার হন। লন্ডন থেকে রওয়ানা দিয়ে আবুধাবী হয়ে ২ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট দেরিতে লাহোরের আল্লামা ইকবাল বিমানবন্দরে তারা পৌঁছান। সেখানে পৌঁছানোর পরপরই দেশটির ‘ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিবিলিটি ব্যুরো (এনএবি)’ তাদের দুজনকে আটক করে এবং তাদের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। এরপর তাদের একটি ব্যক্তিগত বিমানে করে ইসলামাবাদ বিমানবন্দরে প্রেরণ করা হয়। দুজনেই দুর্নীতি মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি।
নওয়াজ শরিফকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরের সামনে জড়ো হয় নওয়াজের হাজারে সমর্থক। তারা নওয়াজকে সিংহ নামে সম্বোধন করে সেøাগান দিতে থাকে। তারা ঘোষণা দিয়ে রেখেছিল তারা নওয়াজকে সাথে নিয়ে শোভাযাত্রা করবেন। তবে নওয়াজ গ্রেফতার হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের কন্যা মরিয়ম নওয়াজ আবুধাবি বিমানবন্দর থেকে টুইটারে একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন। ৪৮ সেকেন্ডে এই ভিডিও-তে দেখা যায় নওয়াজ শরিফ দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলছেন, সরাসরি জেলে চলে যাবেন জেনেও দেশের জনগণের জন্য তিনি পাকিস্তান ফিরে আসছেন। তিনি ভিডিও-তে উল্লেখ করেছেন, তার এই ত্যাগ স্বীকার পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। এ ধরনের সুযোগ আগামীতে আর নাও আসতে পারে। তিনি বলেন, চলুন আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে পাকিস্তানের ভাগ্য গড়ে তুলি। তিনি আরও বলেন, নওয়াজ শরিফ ইসলামাবাদ থেকে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন।
সত্যি কথা স্বীকার করলে তৃতীয় বিশ্বের মধ্যে পাকিস্তানই দুর্নীতির মহারাষ্ট্র তবুও জনগণের ভোটের রায়কে সম্মান জানিয়ে ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) রাজনৈতিক দলকে আর একবার বিশ্ববাসী দেখবে তারা কতখানি গণতন্ত্রমনা।

শ্রেণী:

বহুল প্রতীক্ষিত ট্রাম্প-কিম বৈঠক বিশ্ববাসীর স্বাগত

Posted on by 0 comment
7-4-2018 5-55-18 PM

7-4-2018 5-55-18 PMসাইদ আহমেদ বাবু: কিছুদিন আগেও মনে হচ্ছিল, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আমেরিকার যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। সকল জল্পনা-কল্পনার অবসানের পর অবশেষে গত ১২ জুন সিঙ্গাপুরের স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় এই ঐতিহাসিক বৈঠক শুরু হয়। উত্তর কোরিয়ার নেতা ও কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যে এটিই প্রথম বৈঠক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং-দিনের শুরুটা হলো দুই নেতার ঐতিহাসিক করমর্দনের মাধ্যমে। দুই নেতা যখন পরস্পরের দিকে করর্মদনের জন্য এগিয়ে যায়, বিশ্ববাসী তখন অধীর আগ্রহে এই বিরল দৃশ্য অবলোকন করে।

এ বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল, ওয়াশিংটন ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে আনা ও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির সম্ভাব্য সমাপ্তি নিয়ে আলোচনা।
ট্রাম্প ও কিম শীর্ষ বৈঠকের পর একটি চুক্তিতে সই করেছেন যাতে বলা হয়েছে, দুদেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য জনগণের ইচ্ছার ভিত্তিতে নতুন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা হবে। অন্যদিকে, কোরিয়া উপদ্বীপকে পরিপূর্ণ পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের জন্য উত্তর কোরিয়া এ চুক্তিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে যৌথ সামরিক মহড়া চালিয়ে আসছিল, যা উত্তর কেরিয়াকে ক্রমশ ক্ষুব্ধ করে তুলছিল। এ মহড়াকে উত্তর কোরিয়ার ওপর সামরিক আগ্রাসনের প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হতো। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের পর এক সংবাদ সম্মেলনে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ার অবসান ঘটানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, কোরীয় উপদ্বীপের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াকে নির্বিঘœ করতে ব্যয়বহুল ও খুবই উসকানিমূলক মহড়ার অবসান ঘটানো হবে।

এই সমঝোতাপত্রে আমেরিকা এবং উত্তর কোরিয়ার মধ্যে নতুন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। সিঙ্গাপুরের বিলাসবহুল হোটেল ক্যাপেলায় সেই একান্ত বৈঠকের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, আমার বিশ্বাস, আমেরিকা ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে উঠবে। উত্তর কোরিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে শিগগিরই পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের পথে হাঁটা হবে বলে আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন কিম। তবে উত্তর কোরিয়ার ওপর থেকে এখনই মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হচ্ছে না বলেই জানান। উত্তর কোরিয়ার সর্বাধিনায়ক কিম বলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের এই প্রক্রিয়া সহজ ছিল না। তারপরেও সমস্ত সংকট কাটিয়ে যে তারা আলোচনায় বসেছেন, তাতে তিনি খুশি। তাদের মধ্যে কথা হয়েছে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে। দুই নেতার একান্ত বৈঠক শেষে দুদেশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠক হয়। পারমাণবিক অস্ত্র থেকে শুরু করে দুদেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলেন ট্রাম্প ও কিম।

ট্রাম্প বলেছেন, চুক্তিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও বেশ সুসংহত। এটি স্বাক্ষর করতে পেরে সম্মানিত বোধ করেছেন বলেও জানান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। আর উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম বলেছেন, তারা একটি ঐতিহাসিক বৈঠক করেছেন ও অতীতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বৈঠককে সম্ভাবনাময় উল্লেখ করে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান।
চুক্তিতে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কিম। যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়া নতুনভাবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থাপনে উদ্যোগী হবে, যাতে দুই দেশের মানুষের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও উন্নতির বিষয়টি প্রতিফলিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও কোরিয়া যুদ্ধবন্দিদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভূমিকা রাখবে। এরই মধ্যে যেসব যুদ্ধবন্দি চিহ্নিত হয়েছেন তাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুতই শুরু হবে।

উত্তর কোরিয়া প্রসঙ্গে এ সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বলেন, অবিশ্বাস্য একটি দেশ হিসেবে নিজেদের প্রকাশ করার সম্ভাবনা আছে তাদের। কিমের সঙ্গে আমার বৈঠক আন্তরিক, গঠনমূলক ও খোলামেলা ছিল। পরিবর্তন আসলেই সম্ভব। কিম এরই মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার মূল ঘাঁটি ধ্বংস শুরু করছেন। কিমের প্রশংসা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, কিম খুবই প্রতিভাবান। তিনি খুব কম বয়সে একটি দেশের ক্ষমতায় এসেছেন এবং কঠোরভাবে দেশ পরিচালনা করেন। অপেক্ষাকৃত সংক্ষেপে মানবাধিকার সংক্রান্ত বিষয়েও কিমের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
উত্তর কোরিয়ার যুদ্ধবন্দি মার্কিন সেনাসদস্যদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, এ বিষয়ে আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছি এবং আশানুরূপ উত্তর পেয়েছি।
সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, আমরা যখন পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হব, তখন উত্তর কোরিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে। আমি আসলে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে চাই। তবে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়া এই পদক্ষেপ নিতে চাই না।

দ্বিতীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বৈঠকে কিমের সঙ্গে তার শীর্ষ পরামর্শকরা উপস্থিত ছিলেন। তারা হলেনÑ পিয়ংইয়ংয়ের শীর্ষ কূটনীতিক কিম ওং কোল, উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রি ওং হো, কোরিয়ার ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান রি সু ওং। আর ট্রাম্পের সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও, নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন, হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ জন কেলি।
তবে, শুরুও শুরু থাকে। সেই যুক্তিতে, আশায় বুক বাঁধাই বোধকরি এখন বিশ্বের কর্তব্য। ওয়াশিংটন-পিয়ংইয়ং যে মুখোমুখি বসতে পারবে, কয়েক মাস আগে পর্যন্ত এটা নেহাত কল্পকথা ছিল। সেই অভাবিত ঘটনা যে শেষ পর্যন্ত ঘটল, কম কথা নয়। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের সক্রিয় প্রচেষ্টা ছাড়া এটি সম্ভব হত না। বিশেষ করে সিঙ্গাপুর সরকারের বিরাট কৃতিত্ব : দক্ষিণ-পূর্ব চীন সমুদ্র অঞ্চলে শান্তি রক্ষা ও আন্তর্জাতিক স্থিতি বজায় রাখবার লক্ষ্যে এই অসম্ভবকে সম্ভব করা। এমন অসাধারণ কূটনৈতিক প্রয়াস প্রমাণ করে, শুভ সংকল্পে কত কী হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সংবাদ সম্মেলন শুরু হওয়ার আগে সাংবাদিকদের চার মিনিটের একটি ভিডিও দেখানো হয়। এটি খুবই অস্বাভাবিক একটি ঘটনা। ভিডিওটি ছিল কোরীয় এবং ইংরেজি ভাষায়। সংবাদ সম্মেলনে মি. ট্রাম্প বলেছেন যে এই ভিডিওটি তিনি কিম জং-আনকে দেখিয়েছেন।
উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সই হওয়া চুক্তি হয়তো আমেরিকা মানবে না, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানসহ অনেক দেশের সঙ্গে আমেরিকা যা করেছে এক্ষেত্রেও তাই করতে পারে। ইরানের প্রেস টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন আমেরিকার খ্যাতিমান রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাইকেল জোন্স। শেষ পর্যন্ত তার এই আশা বাস্তবায়িত হয় কি না, সে কথা ভবিষ্যৎই বলতে পারবে। তবে আপাতত কোরীয় উপদ্বীপে ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কা কমেছে, পৃথিবীর সব মানুষই তাকে স্বাগত জানাচ্ছে।

শ্রেণী:

মালয়েশিয়ায় নির্বাচনে মাহাথিরের অভূতপূর্ব জয়

Posted on by 0 comment
june2018

june2018সাইদ আহমেদ বাবু: মালয়েশিয়ায় গত ৯ মে অনুষ্ঠিত ১৪তম সাধারণ নির্বাচনে দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ ক্ষমতাসীন জোট বারিসান ন্যাশনাল (বিএন)-কে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী পদে শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ নির্বাচিত নেতা হিসেবে ইতিহাস গড়লেন মাহাথির মোহাম্মদ। ১৯৫৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের পর থেকে রাজনৈতিক জোট বারিসান ন্যাশনাল (বিএন) ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মালয়েশিয়ার শাসনক্ষমতায় থেকেছে। মাহাথির মোহাম্মদ অতীতেও প্রধানমন্ত্রীর এবং বারিসান ন্যাশনাল প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২২ বছর তিনি ক্ষমতায় ছিলেন। ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত। ২০০৩-এ তিনি ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান।
যে মাহাথির মোহাম্মদের হাত ধরে মালয়েশিয়া আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের এক অনন্য নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেই ব্যক্তির হাত ধরে দেশটিতে ঘটে গেল আরেক বিপ্লব। সুদীর্ঘ ৬০ বছরের শাসক-জোটের পতন ঘটালেন তিনি। নির্বাচনে প্রমাণিত হলো যে কারও ‘সৎ কর্ম, মহৎ কর্ম কখনও হারিয়ে যায় না’। মাহাথিরকেও হারিয়ে যেতে দেয়নি মালয়েশিয়ার জনগণ তার কাজের জন্য। তাকে আবার প্রধানমন্ত্রী করেছে তারা। সততা, সৎ চিন্তা, বুদ্ধিদীপ্ত মানসিকতা এবং নেতৃত্বের প্রগাঢ়তার কারণে মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়ার সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন।
শুধু বৈশ্বিক অঙ্গনেই নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিবাচক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার সারথি হিসেবে, দক্ষ প্রশাসক হিসেবে এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক নেতা হিসেবে মাহাথির মোহাম্মদের প্রথিতযশা ভূমিকা অগ্রগণ্য। ব্যক্তিগত কারিশমা, জনগণের নিকট জবাবদিহিতা, রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা তথা আধুনিক ও উন্নত রাষ্ট্রের মননশীলতার পতাকাবাহী ব্যক্তিক সমীক্ষায় অন্য যে কোনো প্রার্থীর চেয়ে মাহাথিরের জনপ্রিয়তা ছিল তুলনামূলকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। মালয়েশিয়ার নির্বাচনে মাহাথির মোহাম্মদই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাপকাঠি হিসেবে কাজ করেছেন। ব্যক্তি মাহাথির যেখানে নির্বাচনে জয়লাভের ক্ষেত্রে ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছেন, সেখানে দলের ভূমিকা কিয়দংশ হলেও গৌণ ছিল। কারণ, মাহাথির যে দলের হয়ে দীর্ঘ ২২ বছর দেশ শাসন করেছিলেন সেই দলের বিরুদ্ধে এবং তার সাবেক শিষ্যের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত কারিশমা দেখিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। সুতরাং বলা চলে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম সফল রাষ্ট্রনায়ক মাহাথির মোহাম্মদকে মালয়েশিয়ার জনগণ পুনরায় রাজনীতিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং দেশ পরিচালনার দায়িত্বও প্রদান করেছেন দেশের কল্যাণার্থে। পাশাপাশি, মালয়েশিয়ায় যে দুর্নীতি এবং অরাজকতার সংস্কৃতি বিরাজ করেছিল তার থেকে পরিত্রাণের জন্য মালয়েশিয়ার জনগণ নানাবিধ উপায় কিংবা প্রক্রিয়ার অনুসন্ধান করেছিল। অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার শেষে মালয়েশিয়ার জনগণ ব্যালট বাক্সকেই বেছে নেয় প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের মাধ্যম হিসেবে এবং সেখানে তাদের প্রিয় মানুষ মাহাথির মোহাম্মদকে নির্বাচিত করে রাষ্ট্রক্ষমতায় এনেছেন মালয়েশিয়ার জনগণ পরবর্তী সরকার পরিচালনার জন্য।

যেভাবে বদলে দিলেন মালয়েশিয়াকে
মালয়েশিয়ার আমূল পরিবর্তনে শুরু থেকেই স্বপ্ন দেখেছেন মাহাথির। ক্ষমতায় এসে একের পর এক পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি বাস্তবায়নও করেছেন সেগুলো। দেশটির ২০২০ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিক কর্মসূচিও তার ঘোষণা করা ছিল। মাহাথির শাসনামলের গুরুত্বপূর্ণ দিকÑ
মালয়েশিয়ার সকল মুসলিমদের জন্য ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন তিনি। মালয়েশিয়ানদের শিক্ষার ৯৫ শতাংশ খরচ সরকার বহন করে। এই নীতি চালু হয় মাহাথিরের আমল থেকে। আশির দশকে গৃহীত ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট পলিসি বাস্তবায়ন করা শুরু করেন তিনি। ফলাফল এই যে, ১৯৯২ সালে নিজ দেশের সবাইকে কর্মসংস্থান দিয়ে উল্টো আরও ৮ লাখ বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ দেয় মালয়েশিয়া। একই বছর শুধু যুক্তরাষ্ট্র আর ভারতেই ৬৫০ কোটি ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি করে। পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার নির্মাণ, সমুদ্র থেকে ৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমি উদ্ধার, অত্যাধুনিক এয়ারপোর্ট তৈরি, একাধিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, হাইওয়ে নির্মাণসহ তার অসংখ্য উদ্যোগ সফল হয়েছে। ১৯৯০ সালেই বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছাড়িয়ে যায় ৮ শতাংশের বেশি। ১৯৮২ সালে থাকা মালয়েশিয়ার ২৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ জিডিপি ২০০২ সালে এসে দাঁড়ায় ৯৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।
অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলোর তালিকার তলানীতে থাকা মালয়েশিয়াকে নিয়ে আসেন তালিকার ১৪তম স্থানে। ব্যক্তিজীবনে মাহাথির ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। তিনি একাই যে স্বপ্ন দেখেছেন এমনটা নয়। পুরো জাতিকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন তিনি। চীনা, মালয়ী, তামিলসহ বিভিন্ন জাতিতে বিভক্ত মালয়েশিয়াকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসতে সক্ষম হন তিনি।
মূলত দুর্নীতির অভিযোগেই নাজিব রাজাকের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলেন মালয়েশিয়ার সাধারণ ভোটাররা। এরই প্রতিফলন দেখা গেছে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে। অভূতপূর্ব এক বিজয়ের মধ্য দিয়ে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন নাজিব রাজাকেরই রাজনৈতিক গুরু বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মাহাথির মোহাম্মদ। নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে ভোটার ও প্রতিপক্ষের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল ওয়ান মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট বারহাদের (ওয়ানএমডিবি) অর্থ, তিনি ও তার পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও সহযোগীরা মিলে ওই তহবিল থেকে কয়েকশ কোটি ডলার হাতিয়ে নিয়েছেন। বর্তমানে নাজিব রাজাকের দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। নানা অভিযোগে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হচ্ছেন তিনি। যদিও তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করে চলেছেন নাজিব রাজাক।
ভগ্নদশায় পড়ে যাওয়া মালয়েশিয়ার অর্থনীতিকে মেরামতের পথ খুঁজছেন মাহাথির মোহাম্মদ। তার দাবি, পূর্বতন সরকার বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ার পর থেকেই দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই আরও খারাপের পথে গেছে।
মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, নাজিব রাজাকের আমলে এমন অনেক বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে যার জন্য ব্যয় করতে হয়েছে হাজার হাজার কোটি ডলার। একের পর এক ব্যয়বহুল মেগা প্রজেক্ট। হয়েছে সীমাহীন দুর্নীতি। বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার কোটি রিঙ্গিতে (২৭ হাজার ৪০০ কোটি ডলার), যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৮০ শতাংশ। সব মিলিয়ে দেউলিয়াত্বের পথে মালয়েশিয়া। এ অবস্থায় ৯২ বছর বয়সে নির্বাচনে জয়লাভের মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়ার হাল ধরলেন মাহাথির মোহাম্মদ।
আসন্ন দেউলিয়াত্বকে ঠেকাতে রীতিমতো মরিয়া হয়ে উঠেছেন মালয়েশিয়ার নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কুয়ালালামপুর থেকে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত নির্মিতব্য একটি হাইস্পিড রেলওয়ে প্রকল্প বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে ঘোষণা দিয়েছেন পূর্বসূরি নাজিব রাজাকের আমলে নেওয়া সব মেগা প্রকল্প পুনরায় যাচাইয়ের। সাক্ষাৎকারে ‘অপ্রয়োজনীয়’ সব অবকাঠামো প্রকল্প বাতিলের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন মালয়েশিয়ার নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে ব্যয় সংকোচনের পদক্ষেপ হিসেবে কয়েক হাজার সরকারি কর্মচারীকেও চাকরিচ্যুত করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। নিজ দেশকে ‘দেউলিয়া হিসেবে ঘোষণা করার পথ রুদ্ধ করতেই’ এত বড় পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, এ মুহূর্তে যেসব বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তার মধ্যে অন্যতম হলো মালয়েশিয়ার আর্থিক পরিস্থিতি।
মালয়েশিয়ার জনগণ মহাসড়কে যান চলাচলে টোল হ্রাস, জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দান এবং গুডস অ্যান্ড সার্ভিস ট্যাক্স (জিএসটি) বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছিলেন অনেক দিন ধরেই। এতে সায় দিয়ে এসব দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মাহাথির মোহাম্মদ। এতে মালয়েশিয়া সরকারের বার্ষিক রাজস্ব কমবে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ, যা দেশটির এ বছরের মোট রাজস্ব আয়ের এক-পঞ্চমাংশ। এতে কিছুটা প্রতিকূলে পড়তে পারেন তার সরকার। তবে এ প্রসঙ্গে মাহাথিরের বক্তব্য হলো, গণতন্ত্র মানেই পরিবর্তন ও সার্বক্ষণিক চাপ। কখনও কখনও আমাদের সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের বদলে জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণের দিকেই বেশি মনোযোগ দিতে হয়।
কুয়ালালামপুর-সিঙ্গাপুর হাইস্পিড রেলওয়ে নির্মাণ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষর হয় ২০১৬ সালে। ৩৭০ কিলোমিটার (২১৭ মাইল) দীর্ঘ রেলপথটির নির্মাণকাজ শেষ করার জন্য অনুমিত সময় ধরা হয়েছিল ২০২৬ সাল পর্যন্ত। কুয়ালালামপুর-সিঙ্গাপুর হাইস্পিড রেলওয়ের ওপর নজর ছিল বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠানেরই। মূলত ‘দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার’ ঝুঁকি এড়াতেই প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান মাহাথির মোহাম্মদ। সাক্ষাৎকারে তিনি আরও জানান, তার পূর্বসূরি নাজিব রাজাকের আমলে মালয়েশিয়ার মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১ লাখ কোটি রিঙ্গিত ছাড়িয়ে যায়। ওই সময় যেসব প্রকল্প বাস্তবায়নে চুক্তি সই হয়েছিল, তার সবই পুনরায় খতিয়ে দেখবেন তিনি।
মাহাথির মোহাম্মদ জানান, এরই মধ্যে চীনা অর্থায়নে মালয়েশিয়ার পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে নির্মিতব্য এক রেল লিংক প্রকল্প নিয়ে পুনরায় দরকষাকষি করবে তার সরকার। মূলত চুক্তির ‘অসম’ বিষয়গুলো দূর করতেই এ দরকষাকষি করতে চাইছেন তিনি। ওই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। ভবিষ্যতে ক্ষমতার এ ধরনের অপব্যবহার ও গোটা সিস্টেম একজনের কুক্ষিগত হয়ে পড়ার পথকে রুদ্ধ করতে সংসদীয় ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর ঘোষণা দিয়েছেন মাহাথির মোহাম্মদ। তিনি বলেন, এটা কোনো লুটেরা সরকার হবে না। অবশ্যই এ দেশ আরও অনেক বেশি গণতান্ত্রিক হয়ে উঠবে।

শ্রেণী:

‘সবার জন্য গড়ব অভিন্ন ভবিষ্যৎ’

Posted on by 0 comment
33
33

কমনওয়েলথ সম্মেলনে শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ ভূমিকা

রাজিব পারভেজ: ‘টুওয়ার্ডস এ কমন ফিউচার’ প্রতিপাদ্য নিয়ে শুরু হওয়া কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দিতে গত ১৬ এপ্রিল লন্ডন পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীসহ ৫৩টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান অংশ নেন এ সম্মেলনে। এবারে সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য গড়ব একই ভবিষ্যৎ’। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক সহযোগিতার অন্যতম পুরনো সংস্থা কমনওয়েলথ। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো না কোনো সময়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শাসনে থাকা দেশগুলোই এই সংস্থার সদস্য। ১৯৩১ সালে ওয়েস্টমিনস্টার সংবিধি বলে গ্রেট ব্রিটেন, আইরিশ ফ্রি স্টেট (বর্তমানে আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্র), কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার সমন্বয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কমনওয়েলথ গঠিত হয়। বর্তমানে বিশ্বের ৫৪টি স্বাধীন রাষ্ট্র কমনওয়েলথের অন্তর্ভুক্ত।
এবারের কমনওয়েলথ সম্মেলনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সফলতা রোহিঙ্গা ইস্যুতে জোটভুক্ত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের ঐকমতে নিয়ে আসা। যুক্তরাজ্য সফরে প্রধানমন্ত্রী কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগদান ছাড়াও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। পাশাপাশি ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে-সহ বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতে মিলিত হন। গত জাতিসংঘ সম্মেলনের মতো কমনওয়েলথ সম্মেলনেও নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরব ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ফলাফল হিসেবে কমনওয়েলথের লন্ডন ঘোষণায় গুরুত্ব পায় রোহিঙ্গা সংকট। ঘোষণার ৫০ অনুচ্ছেদে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহারে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী অপরাধীদের স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করারও তাগিদ দেয় কমনওয়েলথ।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে পাশে থাকার ঘোষণা
রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রশংসা করে এ ইস্যুতে পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে কমনওয়েলথ সদস্যভুক্ত দেশগুলো। ২৪০ কোটি জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী কমনওয়েলথভুক্ত ৫৩ দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের এ সম্মেলনে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহারে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী অপরাধীদের স্বাধীন তদন্ত প্রক্রিয়ায় বিচারের ব্যাপারে বাংলাদেশ থেকে উত্থাপিত একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও সম্মানের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমিতে টেকসই প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ তৈরির জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি জোরাল দাবিও উঠেছে।

এশিয়ার প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত চান প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কমনওয়েলথ সচিবালয় পরিচালনা পর্যালোচনায় উচ্চ পর্যায়ের গ্রুপে এশিয়ার দেশসমূহ থেকে প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের সদস্য রাষ্ট্র অন্তর্ভুক্ত করে এই গ্রুপটিকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করার পরামর্শ দিয়েছেন। শেখ হাসিনা বলেন, কমনওয়েলথের কর্মকা- এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সচিবালয়ের জ্ঞান ও বিশেষজ্ঞ দক্ষতাকে আমরা মূল্য দেই। আমরা মনে করি, সঠিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মতামতও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্যই গ্রুপে কমনওয়েলথের বিভিন্ন অঞ্চলের সদস্য রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে এই রাষ্ট্রসংঘকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করতে হবে। শেখ হাসিনা উইন্ডসর ক্যাসেলে সিএইচওজিএম রিট্রিটে কমনওয়েলথ নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন পারস্পরিক আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে মতবিনিময়কালে এ কথা বলেন। রিট্রিটে উচ্চ পর্যায়ের গ্রুপের সম্প্রসারণ, অর্থায়ন ও কমনওয়েলথ সচিবালয় গভর্ন্যান্স এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়।

সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান
সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন কমনওয়েলথ নেতারা। লন্ডনে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের শীর্ষ সম্মেলনের (সিএইচওজিএম) ঘোষণায় জোটের ৫৩ নেতা সাইবার অপরাধ বন্ধে একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছেন। এ ঘোষণা সাইবার নিরাপত্তা সহযোগিতা বিষয়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এবং ভৌগোলিক দিক থেকে আন্তঃসরকারের একটি বলিষ্ঠ প্রতিশ্রুতি। কমনওয়েলথ সেক্রেটারি জেনারেল প্যাট্রিসিয়া স্কটল্যান্ড বলেন, সাইবার স্পেস আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। কমনওয়েলথ সদস্য রাষ্ট্রসমূহ জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায় যে কোনো সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে পৃথক কিংবা সম্মিলিতভাবে পদক্ষেপ নিতে পারবে।

শেখ হাসিনা-তেরেসা মে আলোচনা
কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে। লন্ডনের কনফারেন্স মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত শেষ সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছেন কমনওয়েলথের নেতারা।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসায় জাস্টিন ট্রুডো
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় দৃঢ়তার সঙ্গে নেতৃত্ব দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। ২৫তম কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনের প্রথম নির্বাহী অধিবেশনে বক্তৃতাকালে এই প্রশংসা করেন। জাস্টিন ট্রুডো বলেন, ‘রোহিঙ্গা শরণার্থী সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দক্ষ নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন। কমনওয়েলথ নেতৃবৃন্দকে অবশ্যই তাকে সমর্থন দিতে হবে।’ কমনওয়েলথ মহাসচিবের রিপোর্ট উপস্থাপনের পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে আলোচনার জন্য ফ্লোর উন্মুক্ত করে দেন। এ সময় ফ্লোর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করেন জাস্টিন ট্রুডো।

শেখ হাসিনা-মোদি বৈঠক
যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ২৫তম কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের শীর্ষ সম্মেলনের (সিএইচওজিএম) সাইডলাইনে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্নিষ্ট নানা বিষয়ে কথা বলেন।  সর্বশেষ গত বছরের এপ্রিলে ভারত সফরে মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আবারও তার ভারত সফরের কথা রয়েছে।

বাণিজ্য প্রসারে প্রধানমন্ত্রীর ৭-দফা প্রস্তাব
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তঃকমনওয়েলথ ব্যবসা, বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনা উন্নয়নের জন্য ৭-দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। তিনি বাণিজ্য প্রশাসন আরও উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ করে তুলতে কমনওয়েলথ দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। ‘বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের প্রসারে কমনওয়েলথের ভূমিকা’ শীর্ষক এক বৈঠকে তিনি ওই প্রস্তাব উত্থাপন করে এ আহ্বান জানান। শেখ হাসিনা বলেন, আমরা অবশ্যই বাণিজ্য প্রশাসন উন্মুক্ত, আইনভিত্তিক, স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায্যতা নিশ্চিত করব। তিনি বলেন, আন্তঃকমনওয়েলথ বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবনার লক্ষ্যে দেশগুলোকে অবশ্যই অভিন্ন সুযোগ-সুবিধা জোরদার করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী এ লক্ষ্যে ৭-দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এগুলো হলোÑ
১. সদস্য রাষ্ট্রগুলোর শিল্প-সম্ভাবনা ও উৎপাদনশীলতার খাতভিত্তিক সমীক্ষা, ২. ছড়িয়ে থাকা বিনিয়োগ সম্ভাবনাসহ অভিন্ন বিনিয়োগ নীতি, নির্দেশনা ও কৌশল গ্রহণ, ৩. বাণিজ্য সহায়ক সুযোগ-সুবিধার উন্নয়ন এবং পিটিএ ও এফটিএ’র অশুল্ক বাধা কমিয়ে আনা, ৪. সেবা বাণিজ্যের জন্য উদার শাসন এবং স্বতন্ত্র পেশার সেবা সুবিধার জন্য খোলাবাজার চালু, ৫. প্রকৃত ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ যাতায়াত এবং সরকারি ও বেসরকারি ক্যাটাগরিতে নির্দিষ্ট লোকদের জন্য ভিসা সহজীকরণ, ৬. অবকাঠামো এবং যোগাযোগ প্রকল্প গ্রহণ ও ৭. এসএমই এবং ব্লু ইকোনমি খাতসহ উৎকৃষ্ট কেন্দ্র এবং প্রতিষ্ঠানের সহায়তা এবং উন্নয়ন, আরএন্ডডি, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য তহবিল গঠন।

কমনওয়েলথে সংস্কারের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর
ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীন হওয়া দেশগুলোর সংস্থা কমনওয়েলথের সচিবালয়সহ এর বিভিন্ন কার্যক্রম ও ভূমিকার আমূল সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সদস্য দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও প্রত্যাশা পূরণে এই সংস্কার অপরিহার্য বলে মনে করেন তিনি। লন্ডনে ল্যানক্যাস্টার হাউসে কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের শীর্ষ সম্মেলনে এই প্রস্তাব দেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা কমনওয়েলথের ব্যাপক সংস্কারের জন্য বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি গ্রুপ (ইপিজি) গঠনের সুপারিশ করছি। কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের সম্মেলনে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য সংস্থার সচিবালয়ের সংস্কার প্রয়োজন।

আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ঐকমত্য
যুক্তরাজ্যের বাকিংহাম প্রাসাদে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সরকার প্রধানদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উপস্থিত অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা এ সময় তারা বিগত দিনের সাফল্য ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং বৈশ্বিক ও কমনওয়েলথের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ঐকমত্য পোষণ করেছেন। এখানেই পরবর্তী কমনওয়েলথ প্রধান হিসেবে প্রিন্স চার্লসের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন কমনওয়েলথ নেতারা। এর মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটেছে সংস্থাটির এবারের শীর্ষ সম্মেলনের। সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে রানি এলিজাবেথ কমনওয়েলথের প্রধানের পদ ছেড়ে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করার পর ব্রিটিশ সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকার প্রিন্স চার্লসকে এ পদে বসানো হচ্ছে।

শ্রেণী:

ত্রিপুরার উন্নয়নে কাজ করবে বিজেপির তরুণ তুর্কী বিপ্লব দেব

Posted on by 0 comment
4-5-2018 7-25-46 PM

4-5-2018 7-25-46 PMসাইদ আহমেদ বাবু:১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা অর্জন করলে, কংগ্রেস দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে জাতীয় কংগ্রেস নেতৃত্ব দান করেছিল। বর্তমানে কংগ্রেস দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল দুটির একটি, অন্য দলটি হলো ভারতীয় জনতা পার্টি। এটি বিশ্বের বৃহত্তম ও অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক সংগঠন। ২০১৪ সালের হিসাব অনুসারে, ভারতের সংসদ ও রাজ্য বিধানসভাগুলোর প্রতিনিধি সংখ্যার দিক থেকে বিজেপি এখন ভারতের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। প্রাথমিক সদস্যপদের দিক থেকে এটি বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। বিজেপি একটি দক্ষিণপন্থি রাজনৈতিক দল। বিজেপির জন্ম হিন্দু মহাসভার গর্ভে, প্রথমে দলটির নাম ছিল জনসংঘ, এখন হয়েছে বিজেপি। শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী এর প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থার পর জনসংঘ একাধিক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মিশে জনতা পার্টি গঠন করে। ভারতীয় জনসংঘ থেকে ভারতীয় জনতা পার্টি তথা বিজেপি তৈরি করেন, যা বর্তমানে ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় রয়েছে।
বিজেপি-কে বলা হয় সংঘ পরিবার পরিচালিত দল। ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদ ও মৌলবাদের শক্তিশালী রেজিমেন্টেড সংগঠনের নাম হচ্ছে ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ’ বা আরএসএস। বিজেপির নেতৃত্ব এবং নীতি-নির্ধারণ করে আরএসএস। কংগ্রেস ভারতের স্বাধীনতা চেয়েছিল বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে সবাইকে নিয়ে। কিন্তু আরএসএস বলতে থাকে, ভারতীয় সংস্কৃতি ও হিন্দু সংস্কৃতি সমার্থক। ভারতীয় জাতীয়তাকে হিন্দু জাতীয়তা হতে হবে। বিজেপি দক্ষিণ ভারত আর পূর্ব ভারতে দুর্বল ছিল। এখন দেখা যাচ্ছে সেখানেও তাদের বিজয় নিশান।
বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাজ্য ভারতের ত্রিপুরায় ২৫ বছরের বাম দুর্গের পতন ঘটিয়ে বিধানসভা নির্বাচনে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি। এ রাজ্যে মোট আসন ৬০টি। এর মধ্যে ৫৯টিতে নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনে ৪৩টি আসনে জয় পেয়েছে বিজেপি। বামফ্রন্ট পেয়েছে ১৬টি আসন। পশ্চিমবঙ্গে পতন ঘটার পরও ত্রিপুরায় লাল পতাকা উড্ডীন রেখেছিলেন মানিক সরকার; এবার বিজেপির কাছে সেই দুর্গ হাতছাড়া হলো বামদের। রাজ্যটিতে আগের নির্বাচনেও বিজেপি দলের কোনো অবস্থান ছিল না।
মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার নিজের আসন ধরে রাখতে পারলেও তার মন্ত্রিসভার বেশিরভাগ সদস্যেরই ভরাডুবি হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দুর্নীতি রোধে ব্যর্থতা এবং আসামে বিজেপির উত্থানই মানিক সরকারের ভরাডুবির কারণ।
সৎ, নির্লোভ ভাবমূর্তির মানিক সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতায় যেতে অর্থ ও গ্ল্যামারের তুমুল প্রদর্শনী ছিল বিজেপির পদ্মফুল মার্কাধারীদের। সেই হিসাবে এবার তাদের এই উত্থান উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজনীতিতে বড়সড় প্রভাব পড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সীমান্ত-লাগোয়া ও বাংলা ভাষাভাষি অধ্যুষিত এই রাজ্যের দখল নেওয়ার জন্য কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার যে উত্তেজনার পারদ ছড়িয়েছিল তাতে আজ সুফল মিলেছে। ত্রিপুরা রাজ্যের মানুষ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে।
রাজ্যের মাত্র দুটিতে দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিল বামপন্থিরা। বিজেপির কোয়ালিশন জোটের মারপ্যাঁচে হেরেছে বামরা। তা নিয়ে বাম রাজনীতিতে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ, ভারতের ত্রিপুরায় নিজেদের এমন ভরাডুবির কোনো কারণই খুঁজে পাচ্ছে না বামপন্থিরা।
এদিকে দলের পরাজয়ে কোনোভাবেই মানিক লালকে দোষতে পারছেন না দলের নেতাকর্মীরা। মানিক লাল ভারতের ইতিহাসে অন্যতম সৎ ব্যক্তিত্ব। শুধু তাই নয়, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিএম নেতা মানিক সরকার পরপর চারবার মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন কেবল তার সততা আর মানবপ্রেমের জোরে। বামফ্রন্টের ২৫ বছরের শাসনক্ষমতার ২০ বছরই ত্রিপুরা শাসিত হয়েছে তার নেতৃত্বে। তার সততা নিয়ে বিরোধীদের মনেও কোনো প্রশ্ন নেই। ত্রিপুরায় বিদ্রোহীদের তৎপরতা নিরসন আর শিক্ষার হার বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে তার হাত ধরে। তবুও কেন ক্ষমতা ছাড়তে হলো বামফ্রন্টকে?
১. বামপন্থিদের পরাজয়ের কারণ হিসেবে দলটির দুর্বলতা নয়; বরং বিজেপির অ্যাডভান্স নির্বাচনী প্রচারণাকেই দায়ী করছে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো। বিশেষ করে নির্বাচনী প্রচারণাকালে বিজেপি হিন্দুদের ভোট টানার পাশাপাশি খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদেরও মনোযোগের কেন্দ্রে চলে আসে।
২. মানিক সরকারের অন্যতম শক্তি ছিল রাজ্যের সংখ্যাগুরু বাঙালি ভাষাভাষির ভোটার। তবে বিজেপি বাঙালিদের সরকারি চাকরির সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি সপ্তম পে-কমিশন বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়। মানিকের বাম সরকার কর্মচারীদের জন্য চতুর্থ পে-কমিশনে বেতন দিয়ে আসছে।
৩. ত্রিপুরার এই নির্বাচনে কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি আঞ্চলিক দল আদিবাসী পিপলস ফ্রন্ট অব ত্রিপুরার (আইপিটিএফ) সঙ্গে নির্বাচনী জোট বাঁধে। ত্রিপুরার সংগঠনটি আদিবাসীদের জন্য পৃথক রাজ্যের দাবি করে থাকে। ত্রিপুরার আদিবাসীদের এই গোষ্ঠীটি-ই মূলত বামদের হারিয়ে দিয়েছে। জানা যায়, ত্রিপুরায় আদিবাসী জনসংখ্যা ৩১ শতাংশ। আর বিধানসভা নির্বাচনে আদিবাসীদের জন্য ২০টি আসন সংরক্ষিত রয়েছে। বিজেপির এই জোট একটি সফল নির্বাচনী কৌশল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
৪. এসব নির্বাচনে বিজেপি উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়নের পুরস্কার তুলে নিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে রেলপথ ও সড়কপথ উন্নয়নে ব্যাপক প্রকল্প গ্রহণ করেছে বিজেপি। এর পাশাপাশি বিজেপির মতাদর্শিক অভিভাবক আরএসএস তাদের ‘ব্যাপক জনসংযোগ’ উদ্যোগের মাধ্যমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জনতাকে বিজেপির বিষয়ে সচেতন করে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
৫. বিজেপি তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশের ভোট পেয়েছে এবার। এদের শিক্ষা-দীক্ষা রয়েছে; কিন্তু হাতে কোনো কাজ নেই। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা এ রাজ্যে প্রায় ৫ লাখ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ত্রিপুরায় প্রচারে গিয়ে, স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন তরুণদের হাতে কাজ দেওয়ার। বিজেপির পক্ষে এবং বামফ্রন্টের বিপক্ষে এটা একটা বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ত্রিপুরা বিজয়ের পর নিজের ভাষণের তারুণ্যের জয়গান করেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। গর্ব করে বলেছেন, ত্রিপুরায় বিজেপির বেশিরভাগ বিধায়কই তরুণ। তরুণদের নিয়ে যখন একের পর এক শৃঙ্গ জয় করছে গেরুয়া শিবির, তখন বার্ধক্যের ভারে জরাজীর্ণ রাজ্যের সিপিআইএম। দলের তরুণ নেতাদের দায়িত্ব না নিলে আগামী প্রজন্ম উঠে আসবে কীভাবে? সে প্রশ্নও উঠছে।

ত্রিপুরায় বিজিপির জয়ের নেপথ্যে কে এই বিপ্লব দেব
ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের বয়স ৪৮। বিপ্লবের আদি বাড়ি বাংলাদেশের চাঁদপুর কচুয়ায়। উপজেলার মেঘদাইর গ্রামের হিরুধন দেব ও মিনা রানী দেবের একমাত্র ছেলে তিনি। ১৯৭১ সালে বাবা-মা’র সঙ্গে ত্রিপুরায় চলে যান। এরপর সেখানেই স্থায়ী বাসিন্দা হন। তবে বিপ্লবের অনেক আত্মীয়স্বজন এখনও কচুয়ায় বসবাস করেন। তার আপন চাচা প্রাণধন দেব এখন কচুয়া উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ত্রিপুরার নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব শপথ নেওয়ার কিছুক্ষণ আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করেছেন। এ সময় তিনি বাংলাদেশের সহযোগিতা চান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তাকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ত্রিপুরার জনগণের নানা ধরনের সহযোগিতার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন।
শপথের পর ত্রিপুরার জনগণকে উন্নয়নের নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিপ্লব। তিনি বলেন, ত্রিপুরাবাসীকে আমি ভালোবাসি। কমিউনিস্ট ও মানিক সরকারকেও ভালোবাসি। কিন্তু আমি হতাশ হয়েছি যে, তারা (সিপিআই-এম) অনেক সময় পেলেও রাজ্যের উন্নয়নে সম্পদের সদ্ব্যবহার করেনি। আমি ত্রিপুরাবাসীর উন্নয়নের জন্য রাজনীতি করব।

শ্রেণী:

মালদ্বীপ জলের তলে আগুন

Posted on by 0 comment
3-4-2018 7-54-33 PM

3-4-2018 7-54-33 PMসাইদ আহমেদ বাবুঃ মালদ্বীপ ভারত মহাসাগরের স্বর্গ হিসেবে খ্যাত একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্র। এর রাজধানীর নাম মালে। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক জোট সার্ক-এর সদস্য। অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি এ দেশ বিশ্বের সবচেয়ে নিচু দেশ। পর্যটনের জন্য বিখ্যাত এ দেশের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সর্বোচ্চ উচ্চতা মাত্র ২ দশমিক ৩ মিটার এবং গড় উচ্চতা মাত্র ১ দশমিক ৫ মিটার। ১ হাজার ২০০-এরও বেশি ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত মালদ্বীপ।
মালদ্বীপ নামটি সম্ভবত ‘মালে দিভেহী রাজ্য’ হতে উদ্ভূত, যার অর্থ হলো মালে অধিকৃত দ্বীপরাষ্ট্র। মালদ্বীপের মূল আকর্ষণ হলো এর সরল, শান্ত ও মনোরম পরিবেশ, আদিম সমুদ্র সৈকত ও ক্রান্তীয় প্রবাল প্রাচীর। এখানকার সমুদ্রের রং অতি পরিষ্কার, পানির রং নীল, বালির রং সাদা।
মালদ্বীপের ইতিহাস ও ঐতিহ্য খুবই প্রাচীন। দ্বাদশ শতক থেকেই মালদ্বীপে মুসলিম শাসন। ১১৮৩ খ্রিস্টাব্দে ইবনে বতুতা মালদ্বীপ ভ্রমণ করেছিলেন। ১১৫৩-১৯৫৩ অবধি (৮০০ বছর) ৯২ জন সুলতান নিরবচ্ছিন্নভাবে শাসন করেন দ্বীপটি। বিভিন্ন সময়ে পর্তুগিজ ও ব্রিটিশরা পর্যটক হিসেবে, কখনও কখনও বাণিজ্য কুঠি স্থাপন, কখনও ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের জন্য এখানে আসে। ১৯৬৫ সালের ২৬ জুলাই মালদ্বীপ ব্রিটিশদের কাছ থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে এবং ১৯৬৮ সালে সালতানাতে মালদ্বীপ থেকে রিপাবলিক মালদ্বীপে পরিণত হয়।
মাত্র ২৯৮ বর্গকিলোমিটারের মালদ্বীপের জনসংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার। বিদেশিসহ এখানে প্রায় ৫ লাখ লোক বসবাস করেন।
ইসলাম মালদ্বীপের রাষ্ট্রীয় ধর্ম। ২০০৮ সালের সংবিধানের ৯ ধারার ডি অনুচ্ছেদের একটি সংশোধনীতে বলা হয়, কোনো অমুসলিম মালদ্বীপের নাগরিকত্ব পাবে না। ১২তম শতাব্দীতে এই দ্বীপটি বৌদ্ধ ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত হয়। সম্পূর্ণ ইসলাম ধর্মে প্রবেশ করে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী কার্যকরভাবে সবাই মুসলমান। মরক্কোর পরিব্রাজক ইবনে বতুতার মতে, মালদ্বীপে ইসলাম এসেছে এক মুসলিম পরিব্রাজকের দ্বারা, যিনি মরক্কো থেকে এসেছিলেন।
সময়কাল তখন ১১৪০ সাল। রাষ্ট্রের সকলেই ছিল মূর্তিপূজক। কোনো মুসলমান ছিল না। দেশটিতে ১১৯০টি ক্ষুদ্র প্রবাল দ্বীপ রয়েছে। শান্ত, সুন্দর, নৈসর্গিক প্রকৃতির মালদ্বীপের রাজনৈতিক প্রকৃতি অনেক দিন ধরে অশান্ত। সম্প্রতি উত্তপ্ত পরিস্থিতির এমন বিস্ফোরণ ঘটেছে যে, কোনো কোনো ভাষ্যকার রূপকার্থে বলেছেন, ‘মালদ্বীপের চারদিকে পানি, পানির মধ্যে আগুন।’
মালদ্বীপেও বাংলাদেশের মতো ২০০৮ সালে জাতীয় নির্বাচন হয়, যাতে ‘ব্যালট বিপ্লবে’ মালদ্বীপের ইতিহাসের সর্বপ্রথম বহুদলীয় নির্বাচনে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে জয়ী হন রাষ্ট্রপতি পদে মোহাম্মদ নাশিদ। সে দেশে প্রেসিডেন্ট যুগপৎ রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, অর্থাৎ অনেক ক্ষমতাবান। তিনি হারিয়েছিলেন মামুন আবদুল গাইয়ুমের মতো প্রবীণ নেতাকে, যিনি একটানা ৩০ বছর প্রতাপের সাথে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। নাশিদকে মনে করা হতো ‘পরিবর্তনের দিশারি,’ যিনি এই দ্বীপপুঞ্জে গণতন্ত্রের পূর্ণতা প্রদান করবেন। নাশিদ পরিবর্তনের প্রবক্তা হিসেবে বিশেষ ইমেজের অধিকারী ছিলেন। জনগণের সংগত প্রত্যাশা ছিল, তিনি গণতন্ত্রকে বিকশিত এবং সুশাসন কায়েম করবেন। বাস্তবে ব্যর্থতা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, দমনপীড়ন, সংবিধান লঙ্ঘন প্রভৃতি কারণে জনগণ শুধু হতাশ নয়, প্রচ- ক্ষুব্ধ। নাশিদ আধুনিক ও প্রগতিশীল মালদ্বীপ গড়তে গিয়ে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ হয়ে জনগণের বিশ্বাস ও মূল্যবোধে আঘাত হেনেছেন। একটার পর একটা কারণ যোগ হয়ে মানুষের হতাশা ও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে বৃদ্ধি পেয়েছে রাজনৈতিক উত্তাব-উত্তেজনা। এক্ষেত্রে ধর্ম একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মালদ্বীপের শত ভাগ মানুষ মুসলিম। সম্প্রতি জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনপ্রধান নাভি পিল্লই সফরে এসে অহেতুক এর সমালোচনা করলেন। ফলে জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয় এবং নাশিদবিরোধী আন্দোলন আরও তুঙ্গে ওঠে। মালদ্বীপের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম তো বটেই, যে কটি দেশের জাতীয় পতাকা ইসলামের প্রতীক নতুন চাঁদ শোভিত, মালদ্বীপ তাদের এর ধাক্কায় নাশিদের পতন ঘটেছে ক্ষমতার মসনদ থেকে। ক্রমবর্ধমান গণবিক্ষোভে বহু প্রত্যাশার প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছেন। দেশটিতে সংকট অব্যাহত থাকায় জাতীয় জীবনে অনিশ্চয়তার কালো ছায়া পড়েছে।
মালদ্বীপের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুবই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রেসিডেন্ট নাশিদের বিরুদ্ধে শুধু বিরোধী দলগুলোর নয়, জনগণের বিরাট অংশেরও অভিযোগ ছিল দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, সংবিধান লঙ্ঘন, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, প্রশাসনিক অনিয়ম ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার। দেশের অবস্থা চরম অস্থিতিশীল হয়ে দাঁড়ায় মালদ্বীপের অপরাধ আদালতের প্রধান বিচারপতি আবদুল্লাহ মোহাম্মদের অন্যায় গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে।
২০১১ সালে এক বিতর্কিত নির্বাচনে নাশিদের বিরুদ্ধে ৫৮ বছর বয়সী ইয়ামিন জয়লাভ করেন। এরপর তার মেয়াদে মালদ্বীপ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, গোলযোগ ও দুর্নীতিতে ডুবে যায়। পর্যটন স্বর্গ হিসেবে পরিচিত দ্বীপ রাষ্ট্রটিতে চরম রাজনৈতিক সংকটের শুরু হয় ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথমে।
দেশটির বিরোধী জোট দুঃশাসন, অধিকার হরণ ও নজিরবিহীন দুর্নীতির অভিযোগে প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিনকে অপসারণ চেয়ে রিট করলে ১ ফেব্রুয়ারি মালদ্বীপের সুপ্রিমকোর্ট এ নির্দেশ দিয়েছেন। সর্বোচ্চ বিরোধী জোটের প্রেসিডেন্টকে অপসারণের অনুরোধে সাড়া না দিয়ে সন্ত্রাসবাদে জড়িত থাকার অভিযোগে কারাদ-াদেশ পাওয়া বিরোধী ৯ জন রাজনৈতিক নেতাকে মুক্তি দেওয়ার আদেশ দেন। তাদের মধ্যে বিদেশে স্বেচ্ছানির্বাসনে থাকা দেশটিতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদও রয়েছেন। প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন এক বিচারককে গ্রেফতারির নির্দেশ দেওয়ায় ২০১৫ সালে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন নাশিদ। এরপর তার ১৩ বছরের কারাদ- হয়, যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই একই দিন সর্বোচ্চ আদালত প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের দল থেকে বহিষ্কৃত ১২ আইনপ্রণেতাকেও স্বপদে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেন। এই ১২ আইনপ্রণেতার ওপর থেকে বহিষ্কারাদেশ ফিরিয়ে নেওয়া হলে মালদ্বীপের ৮৫ সদস্যের আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাবে সরকারি দল। তবে সম্প্রতি বিরোধী ১২ আইনপ্রণেতার ওপর থেকে বহিষ্কারাদেশ ফিরিয়ে নেওয়ার আদেশ প্রত্যাহার করে নেন সুপ্রিমকোর্ট।
সুপ্রিমকোর্টের ওই আদেশের পর থেকেই দেশটিতে আদালতের এই আদেশের জেরে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে ৫ ফেব্রুয়ারি মালদ্বীপের সরকার-আদালত দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। এর জেরে ৬ ফেব্রুয়ারি ১৫ দিনের জরুরি অবস্থা জারি করেন প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ­ইয়ামিন। জরুরি অবস্থার মেয়াদও শেষ হয়েছে সম্প্রতি। কিন্তু প্রেসিডেন্টের চাওয়ায় জরুরি অবস্থার মেয়াদ আরও এক মাস বাড়িয়েছে পার্লামেন্ট।
মালদ্বীপে চলমান সংকট মোকাবেলায় ভারত সেখানে সেনাবাহিনী পাঠালে, দেশটির পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর হবে বলে হুমকি দিয়েছে চীন। ভারতের কাছে সামরিক হস্থক্ষেপ চেয়েছিলেন মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাসিদ। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, কানাডাসহ জাতিসংঘ প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জরুরি অবস্থা তুলে নিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে।
কূটনৈতিক এবং ভূরাজনীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বের কারণে ভারত, আমিরিকা ও চীন তারা মালদ্বীপে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন নিজ নিজ স্বার্থেই। মালদ্বীপ ঐতিহ্যগতভাবে ভারতের প্রভাব বলয়ে অবস্থিত। ১৯৮৮ সালে একদল ভাড়াটে সৈন্য মালদ্বীপে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করলে ভারত হস্তক্ষেপ করে ও সরকার রক্ষা পায়। ভারতের সমর্থন সাবেক শক্তমানব মামুন আবদুল কাইয়ুমকে তিন দশকেরও বেশি ক্ষমতায় থাকতে সাহায্য করে। পরবর্তী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদও ভারতের সমর্থন লাভ করেন।
ইয়ামিন নাশিদের অনেক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থ বাতিল করেন। তিনি বিরোধী সকল গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিককে জেলে বা নির্বাসনে পাঠিয়েছেন। তার সরকার মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সমাবেশের অধিকার খর্ব করে। সরকারবিরোধী খবর প্রকাশের জন্য সাংবাদিক ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের বিপুল জরিমানার বিধান করেছে।
রাজনৈতিক সংকটে পড়া মালদ্বীপে চলছে জরুরি অবস্থা। এর মাঝে পূর্ব ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করেছে চীনের ১১টি যুদ্ধজাহাজ। সব মিলিয়ে দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপের অবস্থা এখন আরও সংকটে। এদিকে মালদ্বীপে জরুরি অবস্থা দীর্ঘায়িত না করার আহ্বান জানিয়েছে ভারত।
রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না মালদ্বীপে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগের পর সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা চেয়েছেন। এদিকে, দ্বিবার্ষিক নৌমহড়ায় অংশ নেওয়ার জন্য ভারতের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে মালদ্বীপ।
রাজনৈতিক মতভেদ ও বিতর্ক থাকবে; বিভিন্ন দলের মাঝে দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতা থাকবে। তবে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে মালদ্বীপকে। ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ চায়, মালদ্বীপে শান্তি-সম্প্রীতি বিরাজ করুক।

 

শ্রেণী:

দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধা দূর, অগ্রগতি অর্জনই মূল লক্ষ্য

Posted on by 0 comment
3-4-2018 7-16-48 PM

3-4-2018 7-16-48 PMরাজীব পারভেজ: আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (ইফাদ) প্রেসিডেন্ট গিলবার্ট ফাউসন হোউংবোর আমন্ত্রণে রোমে সংস্থাটির ৪১তম গভর্নিং কাউন্সিলে যোগ দিতে এবং পোপ ফ্রান্সিসের আমন্ত্রণে ভ্যাটিকান সিটি সফরে গত ১১ ফেব্রুয়ারি ইতালির রাজধানী রোম সফর করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইফাদের ৪১তম গভর্নিং কাউন্সিলের উদ্বোধনী সেশনে অংশ নিয়ে মূল বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। সফরে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের মধ্যে ৯২.৪ ডলারের ঋণ চুক্তি সই হয়। এ চুক্তির আওতায় দেশের উত্তর-পূর্বের ছয় জেলার গ্রামীণ পিছিয়ে পড়া মানুষের অবকাঠামো ও বাজার উন্নয়ন করা হবে। রোমে ইতালি আওয়ামী লীগ আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তার সরকারের কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন।

ইফাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী
ইফাদ সদর দফতরে সভার উদ্বোধনী অধিবেশনে মূল বক্তব্যে দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূর করতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগের জন্য উন্নয়ন-সহযোগীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, আমরা বিশ্বাস করি, স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ একটি প্রধান বিবেচ্য বিষয় এবং বিশ্বব্যাপী অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা ছাড়া এটি অর্জন করা যাবে না। অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘ফ্র্যাজিলিটি টু লং টার্ম রেজিলিয়েন্স : ইনভেস্ট ইন সাসটেইনেবল রুরাল ইকোনমি’। বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূরীকরণে উন্নয়ন-সহযোগীদের আরও একটু উদার হতে হবে। বাংলাদেশ ও উন্নয়ন-সহযোগীদের মধ্যে সহায়তা অব্যাহত থাকার ব্যাপারে আশা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, অগ্রগতির এই ধারা অব্যাহত রাখতে ইফাদ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আমাদের প্রত্যাশা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা স্থাপন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অর্জন করা যাবে না। গ্রামীণ সামাজিক ও জলবায়ুগত স্থিতিশীলতার উন্নয়নে ব্যাপকভিত্তিক টেকসই গ্রামীণ অর্থনীতি প্রয়োজন। তিনি টেকসই গ্রামীণ অর্থনীতি তৈরিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদিভাবে স্থিতিশীলতা আনার আহ্বান জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের জনসংখ্যা ৯ বিলিয়ন (৯০০ কোটি) ছাড়িয়ে যাবে এবং এর অর্ধেক হবে মধ্যবিত্ত। এর ফলে বিশ্বের আবাদি জমি, বনভূমি ও পানির ওপর প্রচ- চাপ পড়বে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে অনেক দেশের আবাদি জমি ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে আমরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হব। শেখ হাসিনা বলেন, ২০৫০ সালে বিশ্বের খাদ্য চাহিদা ২০০৬ সালের অবস্থান থেকে অন্তত ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে এবং খাদ্যমূল্য বেড়ে ৮৪ শতাংশ দাঁড়াতে পারে। তিনি আরও বলেন, আমরা কীভাবে এ ধরনের বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করব? আমি আপনাদের আমার দেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কৃষি প্রবৃদ্ধির কথা তুলে ধরব, যা বৈশ্বিক পর্যায়ে মানব উন্নয়নে অন্যান্য দেশ গ্রহণ করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রথমে আমি আপনাদের বলব, প্রতিবছর জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের কারণে দেশে খাদ্য সংকট ও খাদ্য উৎপাদন হ্রাসের যে কোনো সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশি জনগণ স্বাভাবিকভাবে সক্ষম। সংকটের মোকাবিলায় বাংলাদেশিরা আস্থার সঙ্গে শক্তভাবে লড়াই করে সমস্যার সমাধান ও সংকট কাটিয়ে উঠতে বিকল্প উপায় গ্রহণের মাধ্যমে সফলতা অর্জন করে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রায় এক দশক ধরে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং চলতি বছর অসময়ে বারবার বন্যায় অপ্রত্যাশিতভাবে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। এ ঘাটতি মোকাবিলায় গ্রাহকদের কাছে পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে সঙ্গে সঙ্গেই খাদ্য আমদানি নীতি গ্রহণ করা হয়।
শেখ হাসিনা বলেন, গ্রামাঞ্চলে কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে নাÑ এই চ্যালেঞ্জই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের জনসংখ্যার প্রায় ৭২ শতাংশ গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে এবং ৪৩ শতাংশ কৃষি খাতে শ্রমজীবী হিসেবে কাজ করে; যারা দেশের জিডিপিতে ১৫ শতাংশ অবদান রাখছে। গ্রামীণ অকৃষি খাতের কর্মীর সংখ্যা ৪০ শতাংশ, যারা গ্রামীণ আয়ের ৫০ শতাংশের বেশি আয় করে। কাজেই অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই গ্রামীণ রূপান্তরই দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধা দূর করা ও কাউকে পেছনে ফেলে না রাখার লক্ষ্য অর্জনের মূল শক্তি।’

বাংলাদেশ-ইফাদ ঋণচুক্তি
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ৬টি জেলার দুস্থ মানুষের অবকাঠামো ও বাজার উন্নয়নে ইফাদের সঙ্গে ৯ কোটির বেশি মার্কিন ডলারের ঋণচুক্তি করেছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে ইফাদ সদর দফতরে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৬টি জেলার দুস্থ জনগণের অবকাঠামোগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং তথ্যসংক্রান্ত একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। জেলাগুলো হচ্ছে পঞ্চগড়, দিনাজপুর, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও জামালপুর। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এতে এই জেলাগুলোর ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ উপকৃত হবে। প্রকল্পের মূল ব্যয়ের ৬ কোটি ৩২ লাখ ৫০ হাজার ডলার ঋণ এবং ১২ লাখ ৫০ হাজার ডলার অনুদান হিসেবে দেবে ইফাদ। বাকি ২ কোটি ৭৯ লাখ ডলার বাংলাদেশ সরকার দেবে।

শ্রেণী:

দু’বছরে প্রত্যাবাসন : মিয়ানমার ফেরত নেবে রোহিঙ্গাদের

উত্তরণ প্রতিবেদন: বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের আগামী দুই বছরের মধ্যে ফেরত নেবে মিয়ানমার। প্রতিদিন ৩০০ রোহিঙ্গা নাগরিককে ফেরত নেবে দেশটি। গত ১৬ জানুয়ারি নেপিডোয় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সম্পন্ন হওয়া ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট চুক্তিতে (মাঠ পর্যায়ের বাস্তব ব্যবস্থা) এসব বলা হয়েছে। মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক শেষে এ চুক্তি সই হয়।
বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক এবং মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থো নিজ নিজ দেশের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন। এর আগে ১৫ জানুয়ারি সারাদিন যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম সভায় ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট নিয়ে আলোচনা হয়।
১৬ জানুয়ারি মিয়ানমারে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট চুক্তি চূড়ান্ত করা হয়েছে। রোহিঙ্গারা যাতে আর বাংলাদেশে আসতে না পারে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে মিয়ানমার সম্মত হয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশে ট্রানজিট ক্যাম্প হবে ৫টি এবং মিয়ানমারে অভ্যর্থনা ক্যাম্প হবে দুটি। বাংলাদেশ থেকে নিয়ে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের লা পো থং নামক একটি জায়গায় অস্থায়ীভাবে রাখা হবে। তারপর বাড়িঘর সংস্কার করে তাদের সেখানে পাঠানো হবে।
এতে আরও বলা হয়, সহিংসতায় যেসব শিশু অনাথ হয়েছে এবং বাংলাদেশে যাদের জন্ম হয়েছে তাদেরও এই অ্যারেঞ্জমেন্টের আওতায় ফেরত পাঠানো হবে। এজন্য দুটি টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হবে। একটি রোহিঙ্গাদের যাচাই-বাছাইয়ের জন্য এবং অন্যটি প্রত্যাবাসনের জন্য।
দুই দেশের মধ্যে ১৬ জানুয়ারি সই হওয়া চুক্তির বিষয়ে মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমান গণমাধ্যমকে বলেছেন, আমরা একটি ভালো চুক্তি করেছি, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। আমরা বলেছি যখন থেকে প্রত্যাবাসন শুরু হবে তার দুই বছরের মধ্যে প্রেফারেবলি শেষ হবে। এটি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে এবং মিয়ানমার এ প্রস্তাবে রাজি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা প্রস্তাব করেছিলাম প্রতিসপ্তাহে ১৫ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরত পাঠাব। কিন্তু তারা ওই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। তারা নিজেরা রোহিঙ্গাদের জন্য কিছু ব্যবস্থা করেছে। ফলে প্রাথমিক অবস্থায় প্রতিদিন ৩০০ করে রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে রাজি হয়েছে মিয়ানমার। পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে পর্যালোচনা করে এই সংখ্যা বাড়ানো হবে।
রাষ্ট্রদূত জানান, এ ব্যবস্থার অধীনে একটি পরিবারকে একটি ইউনিট হিসেবে গণ্য করা হবে অর্থাৎ একটি ফরমে পুরো পরিবারের তথ্য থাকবে এবং মিয়ানমার এটি গ্রহণ করবে। ফলে প্রক্রিয়াটি সহজ হবে। এছাড়া জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থাকে বাংলাদেশ কাজে লাগাবে এবং মিয়ানমার তাদের সময়মতো আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে।
নেপিডোতে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক। আর মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দেশটির পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থো। বৈঠকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়। ১৫ জানুয়ারি দিনভর আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষ কোনো সমাধানে আসতে পারেনি। তবে ১৬ জানুয়ারি সকালে আবারও উভয়পক্ষের মধ্যে বৈঠক শুরু হয়। বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের প্রতিনিধি দল ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট চুক্তি সই করে।
নেপিডোর বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ১৪ সদস্যের প্রতিনিধি দল যোগ দেয়। এই প্রতিনিধি দলে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল মান্নান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবু বকর ছিদ্দীক, কক্সবাজারের ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (শরণার্থী) মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মনিরুল ইসলাম আখন্দ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিভাগের মহাপরিচালক মনজুরুল করিম খান চৌধুরী প্রমুখ রয়েছেন। এছাড়া মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমানও যোগ দেন।
রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে গত ১৯ ডিসেম্বর যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠিত হয়। যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ দুই দেশের প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যে সব ধরনের উদ্যোগ নেবে। গত ২৩ নভেম্বর নেপিডোয় উভয় দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির আলোকে এই ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠিত হয়।
রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যে ঢাকায় এক বৈঠকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়। এই যৌথ গ্রুপ রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন শুরু করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ নেবে। দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিবের নেতৃত্বে ১৫ জন করে সদস্য নিয়ে মোট ৩০ সদস্যের এই গ্রুপ গঠন করা হয়।
রাখাইনে নতুন করে সেনা অভিযান শুরুর পর এ পর্যন্ত সাড়ে ৬ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। মিয়ানমারে নিপীড়নের মুখে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে আরও প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা। সেনাবাহিনী অভিযান এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে শরণার্থীদের ফেরত নিতে সম্মত হয় মিয়ানমার। রোহিঙ্গাদের ঘরে ফেরার পথ তৈরি করতে গত ২৩ নভেম্বর নেপিডোয় দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

শ্রেণী:

অকৃত্রিম বন্ধু প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফর

26

26ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি গত ১৬ জানুয়ারি পাঁচ দিনের সফরে ঢাকা আসেন। এই সফরে তিনি পেয়েছেন সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় প্রটোকল। সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। আওয়ামী লীগ প্রণব মুখার্জির এই সফরকে ইতিবাচকভাবে দেখছে এবং মনে করছে এর ফলে সরকার ও আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ওপরও এই সফর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ভারতের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বাংলাদেশ সফর করেছিলেন প্রণব মুখার্জি। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন শেষেও তিনি প্রথম ঢাকায় আসেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রতিটি রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ তিনি ওয়াকিবহাল। প্রণব মুখার্জি নিখিল ভারত বঙ্গ সম্মেলনের ১০ বছর ধরে সভাপতি ছিলেন। নিখিল ভারত বঙ্গ সম্মেলন ও ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ ১৫ থেকে ১৭ জানুয়ারি যৌথভাবে ঢাকায় আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনে আয়োজন করে। মূলত, এই সম্মেলনে সমাপনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি ঢাকায় আসেন। বাংলা একাডেমিতে আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্যও রাখেন তিনি। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে গিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এবারের সফরে তিনি বন্দরনগরী চট্টগ্রামে যান। মাস্টারদা সূর্য সেনের জন্মভিটা পরিদর্শন করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি-লিট ডিগ্রি গ্রহণ করেন ও বক্তব্য দেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতে বঙ্গবন্ধুকে সর্বকালের সংগ্রামী নেতা বলে অভিহিত করেন। বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশের এগিয়ে চলার প্রশংসা করেন। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে বর্ণনা করেন। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অর্থনীতির সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন তার সামনে। নিপীড়নের মুখে বাংলাদেশে চলে আসা মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার কথাও প্রধানমন্ত্রী তাকে বলেন।
সফরের দ্বিতীয় দিন সকালে ধানমন্ডিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন প্রণব। বঙ্গবন্ধু জাদুঘর পরিদর্শনে গিয়ে সেখানকার শোক বইয়ে প্রণব লিখেন, ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে আসার সুযোগ পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, যিনি স্বাধীনতার সংগ্রামে বাংলাদেশের মানুষকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে এই বাড়িতেই তাকে হত্যা করা হয়। এখান থেকেই মার্চে একটি নতুন জাতি সৃষ্টির ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। আমি সর্বকালের এই সাহসী নেতার প্রতি সালাম জানাই, শ্রদ্ধা জানাই সব শহীদদের প্রতি। এর পরে বিকেলে বাংলা একাডেমিতে আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি।
সফরের তৃতীয় দিনে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সেখানে তাকে দেওয়া হয় সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি। অনুষ্ঠানে ডিগ্রি গ্রহণ করে তিনি বলেন, মানুষের অধিকার আদায়ের একমাত্র শাসনব্যবস্থা সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এটা বিশ্বস্বীকৃত। এর মাধ্যমেই দেশের জনগণ ভোট প্রদান করে তাদের নেতৃত্ব নির্বাচন করে। এর থেকে জনপ্রিয় শাসনব্যবস্থা আর নেই। তারপরও বারবার এই শাসন ব্যবস্থা ব্যাহত করার চেষ্টা করেছে কেউ কেউ। কোনো রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সৈন্যরা ব্যারাক থেকে বের হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিল?
উপমহাদেশের রাজনৈতিক হত্যাকা-ের ইতিহাস প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে সপরিবারে নিহত হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এটি বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি বড় আঘাত। এ রকম আঘাত আমরা ভারতের স্বাধীনতা লাভের কয়েক মাসের মাথায় পেয়েছিলাম ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীকে হারানোর মাধ্যমে। একটা নতুন দেশ সবে স্বাধীনতা পেয়েছে। অসংখ্য সমস্যা, দেশ গড়ার সমস্যা, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সমস্যা, দারিদ্র্য দূর করার সমস্যা, বেকারত্ব দূর করার সমস্যা। সেই সমস্যার সঙ্গে সঙ্গেই একটা জাতিকে তার জন্মলগ্নের মুহূর্তেই প্রায় সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হলো।
বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার বিষয়ে ভারতের সাবেক এই রাষ্ট্রপতি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রটি সবচেয়ে বড় মাইনের চাকরির জন্য না ছুটে, উপাচার্যকে এসে বলবে আমি গবেষণা করতে চাই। সরকারের দায়িত্ব একজন গবেষককে উপযুক্ত সম্মানি দেওয়া। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা এই পরিবেশটা তৈরি করতে পারব না, ততক্ষণ পর্যন্ত শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা যাবে না। শিক্ষার্থীদের মোটা মাইনের চাকরি দিয়ে পরিবার উপকৃত হতে পারে; কিন্তু সার্বিকভাবে দেশ কতটা উপকৃত হচ্ছে সেদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নজর দিতে হবে। তিনি বাংলা ভাষা ও মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বলেন, পৃথিবীর একটি বৃহৎ জনসংখ্যা এই ভাষায় কথা বলে। পৃথিবীতে খুব বেশি দেশে এমন কোনো নজির নেই যে ভাষার জন্য বা সংস্কৃতির জন্য প্রাণ ত্যাগ করছেন। একটি স্বাধীন স্বত্বার মূল ভিত্তিগুলো হচ্ছে ভাষা, সংস্কৃতি, তার ইতিহাস, তার ঐতিহ্য। আর এই সামগ্রিক ও মানবিক পরিপ্রেক্ষিতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে একটি নতুন জাতি। তারা ৯ মাস সংগ্রাম করে বিশ্ব মানচিত্রে একটি স্থান দখল করে নিয়েছে।
বর্তমানে দেশের উন্নয়নের কথা উল্লেখ করে প্রণব মুখার্জি বলেন, ‘কয়েক সপ্তাহ আগে ইন্টারন্যাশনাল বোর্ড অব রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইজউ) তাদের রিপোর্টে বাংলাদেশকে অন্যতম এগিয়ে যাওয়া দেশ বলেছে। যাদের জাতীয় আয় কয়েক বছরে ৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে। সামাজিক খাতে অপুষ্টি দূরীকরণ, নারী শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, উচ্চ শিক্ষার সম্প্রসারণ সম্ভব হয়েছে। এই মাটিতে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করছি গণতন্ত্রের মাধ্যমে একটি দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।
প্রণব মুখার্জি এর আগে ২০১৩ ও ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ ছিল বাংলাদেশে ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এই বাঙালি রাজনীতিক। মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাকে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা দেওয়া হয়। সেই সফরের কথাও এবার স্মরণ করেন একসময়ের এই কংগ্রেস নেতা। তবে এবার প্রণব মুখার্জি রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঢাকা সফর না করলেও, তাকে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হয়েছে।
গত বছর এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লি সফরকালে রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারা সে সময় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গৃহীত সিদ্ধান্ত ও পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। তখন শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সর্বান্তকরণে সমর্থনদানের জন্য প্রণব মুখার্জিকে ধন্যবাদ জানান। তারা দুজনেই ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর শেখ হাসিনার ভারতে নির্বাসিত জীবনে তাদের দুই পরিবারের স্মৃতিচারণ করেন। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়া এবং দুদেশের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও দৃঢ় ভিত্তিদানের জন্য অব্যাহত উদ্যোগ গ্রহণে শেখ হাসিনার প্রশংসা করেন।
বাংলাদেশের প্রথম সরকারকে ভারতের সমর্থনদানের বিষয়ে ১৯৭১ সালের ১৫ জুন ভারতের রাজ্যসভায় প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন প্রণব মুখার্জি। ভারতের ত্রয়োদশ এবং প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি কংগ্রেস দলের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ভারতের অর্থ, পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।

ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো’র ঢাকা সফর
৩ দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে গত ২৭ জানুয়ারি ঢাকায় আসেন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো। এই সফরে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দেখতে যান উইদোদো। সেখানে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলার পর এই সংকট নিরসনে বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দেন তিনি। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জন্য সাহায্য চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণাও দেন উইদোদো। তিনি সফরকালে অংশ নেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের নৈশভোজে, বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। সাভারে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এছাড়া জাতির জনকের স্মৃতিবিজড়িত বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরও পরিদর্শন করেন।
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো ও শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বিষয়ক ৫টি চুক্তি এবং সমঝোতা স্বাক্ষর হয়েছে। চুক্তিতে বাংলাদেশের পরারাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী ও ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদি ছাড়াও দুদেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বাক্ষর করেন। দুদেশের মধ্যে অগ্রাধিকার বাণিজ্য সুবিধা সংক্রান্ত চুক্তি, দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে নিয়মিত বৈঠক আয়োজনে সমঝোতা, মৎস্যসম্পদ আহরণ সংক্রান্ত বিষয়ে যৌথ সম্মতিপত্র, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) টার্মিনালে অবকাঠামো উন্নয়ন ও এ সংক্রান্ত বিষয়ে দুটি সমঝোতা স্মারক সই হয়।
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো বলেছেন, রোহিঙ্গাদের প্রতি ইন্দোনেশিয়ার সরকার ও জনগণের আন্তরিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শেষ না হওয়া পর্যন্ত ত্রাণ, চিকিৎসা, মানবিক সহায়তাসহ সার্বিক সহযোগিতা করা হবে। উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের থাইংখালী জামতলি রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শনকালে তিনি এ কথা বলেন। মিয়ানমার সামরিক জান্তার নির্যাতনের শিকার হয়ে এ দেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও মানবিক সেবা প্রদানের জন্য তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূয়সি প্রশংসা করে বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বে তিনি একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এ সময় ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের কাছ থেকে রাখাইনে সহিংসতার বিবরণ শুনে বিচলিত বোধ করেন। তিনি রোহিঙ্গাদের চিকিৎসাসেবার খোঁজখবর নেন। এর আগে জোকো উইদোদো ইন্দোনেশিয়া সরকারের অর্থায়নে স্থাপিত মেডিকেল ক্যাম্প, স্কুল, ত্রাণকেন্দ্র এবং বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা পরিদর্শন করেন। এর আগে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় ও জরুরি সহায়তা দিয়ে যে ভূমিকা বাংলাদেশ রেখেছে, তার প্রতি সংহতি জানিয়ে গত সেপ্টেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদিকে বাংলাদেশে পাঠিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট উইদোদো।

শ্রেণী: