মালদ্বীপ জলের তলে আগুন

Posted on by 0 comment
3-4-2018 7-54-33 PM

3-4-2018 7-54-33 PMসাইদ আহমেদ বাবুঃ মালদ্বীপ ভারত মহাসাগরের স্বর্গ হিসেবে খ্যাত একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্র। এর রাজধানীর নাম মালে। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক জোট সার্ক-এর সদস্য। অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি এ দেশ বিশ্বের সবচেয়ে নিচু দেশ। পর্যটনের জন্য বিখ্যাত এ দেশের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সর্বোচ্চ উচ্চতা মাত্র ২ দশমিক ৩ মিটার এবং গড় উচ্চতা মাত্র ১ দশমিক ৫ মিটার। ১ হাজার ২০০-এরও বেশি ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত মালদ্বীপ।
মালদ্বীপ নামটি সম্ভবত ‘মালে দিভেহী রাজ্য’ হতে উদ্ভূত, যার অর্থ হলো মালে অধিকৃত দ্বীপরাষ্ট্র। মালদ্বীপের মূল আকর্ষণ হলো এর সরল, শান্ত ও মনোরম পরিবেশ, আদিম সমুদ্র সৈকত ও ক্রান্তীয় প্রবাল প্রাচীর। এখানকার সমুদ্রের রং অতি পরিষ্কার, পানির রং নীল, বালির রং সাদা।
মালদ্বীপের ইতিহাস ও ঐতিহ্য খুবই প্রাচীন। দ্বাদশ শতক থেকেই মালদ্বীপে মুসলিম শাসন। ১১৮৩ খ্রিস্টাব্দে ইবনে বতুতা মালদ্বীপ ভ্রমণ করেছিলেন। ১১৫৩-১৯৫৩ অবধি (৮০০ বছর) ৯২ জন সুলতান নিরবচ্ছিন্নভাবে শাসন করেন দ্বীপটি। বিভিন্ন সময়ে পর্তুগিজ ও ব্রিটিশরা পর্যটক হিসেবে, কখনও কখনও বাণিজ্য কুঠি স্থাপন, কখনও ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের জন্য এখানে আসে। ১৯৬৫ সালের ২৬ জুলাই মালদ্বীপ ব্রিটিশদের কাছ থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে এবং ১৯৬৮ সালে সালতানাতে মালদ্বীপ থেকে রিপাবলিক মালদ্বীপে পরিণত হয়।
মাত্র ২৯৮ বর্গকিলোমিটারের মালদ্বীপের জনসংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার। বিদেশিসহ এখানে প্রায় ৫ লাখ লোক বসবাস করেন।
ইসলাম মালদ্বীপের রাষ্ট্রীয় ধর্ম। ২০০৮ সালের সংবিধানের ৯ ধারার ডি অনুচ্ছেদের একটি সংশোধনীতে বলা হয়, কোনো অমুসলিম মালদ্বীপের নাগরিকত্ব পাবে না। ১২তম শতাব্দীতে এই দ্বীপটি বৌদ্ধ ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত হয়। সম্পূর্ণ ইসলাম ধর্মে প্রবেশ করে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী কার্যকরভাবে সবাই মুসলমান। মরক্কোর পরিব্রাজক ইবনে বতুতার মতে, মালদ্বীপে ইসলাম এসেছে এক মুসলিম পরিব্রাজকের দ্বারা, যিনি মরক্কো থেকে এসেছিলেন।
সময়কাল তখন ১১৪০ সাল। রাষ্ট্রের সকলেই ছিল মূর্তিপূজক। কোনো মুসলমান ছিল না। দেশটিতে ১১৯০টি ক্ষুদ্র প্রবাল দ্বীপ রয়েছে। শান্ত, সুন্দর, নৈসর্গিক প্রকৃতির মালদ্বীপের রাজনৈতিক প্রকৃতি অনেক দিন ধরে অশান্ত। সম্প্রতি উত্তপ্ত পরিস্থিতির এমন বিস্ফোরণ ঘটেছে যে, কোনো কোনো ভাষ্যকার রূপকার্থে বলেছেন, ‘মালদ্বীপের চারদিকে পানি, পানির মধ্যে আগুন।’
মালদ্বীপেও বাংলাদেশের মতো ২০০৮ সালে জাতীয় নির্বাচন হয়, যাতে ‘ব্যালট বিপ্লবে’ মালদ্বীপের ইতিহাসের সর্বপ্রথম বহুদলীয় নির্বাচনে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে জয়ী হন রাষ্ট্রপতি পদে মোহাম্মদ নাশিদ। সে দেশে প্রেসিডেন্ট যুগপৎ রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, অর্থাৎ অনেক ক্ষমতাবান। তিনি হারিয়েছিলেন মামুন আবদুল গাইয়ুমের মতো প্রবীণ নেতাকে, যিনি একটানা ৩০ বছর প্রতাপের সাথে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। নাশিদকে মনে করা হতো ‘পরিবর্তনের দিশারি,’ যিনি এই দ্বীপপুঞ্জে গণতন্ত্রের পূর্ণতা প্রদান করবেন। নাশিদ পরিবর্তনের প্রবক্তা হিসেবে বিশেষ ইমেজের অধিকারী ছিলেন। জনগণের সংগত প্রত্যাশা ছিল, তিনি গণতন্ত্রকে বিকশিত এবং সুশাসন কায়েম করবেন। বাস্তবে ব্যর্থতা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, দমনপীড়ন, সংবিধান লঙ্ঘন প্রভৃতি কারণে জনগণ শুধু হতাশ নয়, প্রচ- ক্ষুব্ধ। নাশিদ আধুনিক ও প্রগতিশীল মালদ্বীপ গড়তে গিয়ে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ হয়ে জনগণের বিশ্বাস ও মূল্যবোধে আঘাত হেনেছেন। একটার পর একটা কারণ যোগ হয়ে মানুষের হতাশা ও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে বৃদ্ধি পেয়েছে রাজনৈতিক উত্তাব-উত্তেজনা। এক্ষেত্রে ধর্ম একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মালদ্বীপের শত ভাগ মানুষ মুসলিম। সম্প্রতি জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনপ্রধান নাভি পিল্লই সফরে এসে অহেতুক এর সমালোচনা করলেন। ফলে জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয় এবং নাশিদবিরোধী আন্দোলন আরও তুঙ্গে ওঠে। মালদ্বীপের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম তো বটেই, যে কটি দেশের জাতীয় পতাকা ইসলামের প্রতীক নতুন চাঁদ শোভিত, মালদ্বীপ তাদের এর ধাক্কায় নাশিদের পতন ঘটেছে ক্ষমতার মসনদ থেকে। ক্রমবর্ধমান গণবিক্ষোভে বহু প্রত্যাশার প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছেন। দেশটিতে সংকট অব্যাহত থাকায় জাতীয় জীবনে অনিশ্চয়তার কালো ছায়া পড়েছে।
মালদ্বীপের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুবই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রেসিডেন্ট নাশিদের বিরুদ্ধে শুধু বিরোধী দলগুলোর নয়, জনগণের বিরাট অংশেরও অভিযোগ ছিল দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, সংবিধান লঙ্ঘন, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, প্রশাসনিক অনিয়ম ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার। দেশের অবস্থা চরম অস্থিতিশীল হয়ে দাঁড়ায় মালদ্বীপের অপরাধ আদালতের প্রধান বিচারপতি আবদুল্লাহ মোহাম্মদের অন্যায় গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে।
২০১১ সালে এক বিতর্কিত নির্বাচনে নাশিদের বিরুদ্ধে ৫৮ বছর বয়সী ইয়ামিন জয়লাভ করেন। এরপর তার মেয়াদে মালদ্বীপ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, গোলযোগ ও দুর্নীতিতে ডুবে যায়। পর্যটন স্বর্গ হিসেবে পরিচিত দ্বীপ রাষ্ট্রটিতে চরম রাজনৈতিক সংকটের শুরু হয় ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথমে।
দেশটির বিরোধী জোট দুঃশাসন, অধিকার হরণ ও নজিরবিহীন দুর্নীতির অভিযোগে প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিনকে অপসারণ চেয়ে রিট করলে ১ ফেব্রুয়ারি মালদ্বীপের সুপ্রিমকোর্ট এ নির্দেশ দিয়েছেন। সর্বোচ্চ বিরোধী জোটের প্রেসিডেন্টকে অপসারণের অনুরোধে সাড়া না দিয়ে সন্ত্রাসবাদে জড়িত থাকার অভিযোগে কারাদ-াদেশ পাওয়া বিরোধী ৯ জন রাজনৈতিক নেতাকে মুক্তি দেওয়ার আদেশ দেন। তাদের মধ্যে বিদেশে স্বেচ্ছানির্বাসনে থাকা দেশটিতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদও রয়েছেন। প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন এক বিচারককে গ্রেফতারির নির্দেশ দেওয়ায় ২০১৫ সালে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন নাশিদ। এরপর তার ১৩ বছরের কারাদ- হয়, যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই একই দিন সর্বোচ্চ আদালত প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের দল থেকে বহিষ্কৃত ১২ আইনপ্রণেতাকেও স্বপদে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেন। এই ১২ আইনপ্রণেতার ওপর থেকে বহিষ্কারাদেশ ফিরিয়ে নেওয়া হলে মালদ্বীপের ৮৫ সদস্যের আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাবে সরকারি দল। তবে সম্প্রতি বিরোধী ১২ আইনপ্রণেতার ওপর থেকে বহিষ্কারাদেশ ফিরিয়ে নেওয়ার আদেশ প্রত্যাহার করে নেন সুপ্রিমকোর্ট।
সুপ্রিমকোর্টের ওই আদেশের পর থেকেই দেশটিতে আদালতের এই আদেশের জেরে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে ৫ ফেব্রুয়ারি মালদ্বীপের সরকার-আদালত দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। এর জেরে ৬ ফেব্রুয়ারি ১৫ দিনের জরুরি অবস্থা জারি করেন প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ­ইয়ামিন। জরুরি অবস্থার মেয়াদও শেষ হয়েছে সম্প্রতি। কিন্তু প্রেসিডেন্টের চাওয়ায় জরুরি অবস্থার মেয়াদ আরও এক মাস বাড়িয়েছে পার্লামেন্ট।
মালদ্বীপে চলমান সংকট মোকাবেলায় ভারত সেখানে সেনাবাহিনী পাঠালে, দেশটির পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর হবে বলে হুমকি দিয়েছে চীন। ভারতের কাছে সামরিক হস্থক্ষেপ চেয়েছিলেন মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাসিদ। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, কানাডাসহ জাতিসংঘ প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জরুরি অবস্থা তুলে নিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে।
কূটনৈতিক এবং ভূরাজনীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বের কারণে ভারত, আমিরিকা ও চীন তারা মালদ্বীপে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন নিজ নিজ স্বার্থেই। মালদ্বীপ ঐতিহ্যগতভাবে ভারতের প্রভাব বলয়ে অবস্থিত। ১৯৮৮ সালে একদল ভাড়াটে সৈন্য মালদ্বীপে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করলে ভারত হস্তক্ষেপ করে ও সরকার রক্ষা পায়। ভারতের সমর্থন সাবেক শক্তমানব মামুন আবদুল কাইয়ুমকে তিন দশকেরও বেশি ক্ষমতায় থাকতে সাহায্য করে। পরবর্তী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদও ভারতের সমর্থন লাভ করেন।
ইয়ামিন নাশিদের অনেক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থ বাতিল করেন। তিনি বিরোধী সকল গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিককে জেলে বা নির্বাসনে পাঠিয়েছেন। তার সরকার মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সমাবেশের অধিকার খর্ব করে। সরকারবিরোধী খবর প্রকাশের জন্য সাংবাদিক ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের বিপুল জরিমানার বিধান করেছে।
রাজনৈতিক সংকটে পড়া মালদ্বীপে চলছে জরুরি অবস্থা। এর মাঝে পূর্ব ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করেছে চীনের ১১টি যুদ্ধজাহাজ। সব মিলিয়ে দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপের অবস্থা এখন আরও সংকটে। এদিকে মালদ্বীপে জরুরি অবস্থা দীর্ঘায়িত না করার আহ্বান জানিয়েছে ভারত।
রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না মালদ্বীপে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগের পর সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা চেয়েছেন। এদিকে, দ্বিবার্ষিক নৌমহড়ায় অংশ নেওয়ার জন্য ভারতের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে মালদ্বীপ।
রাজনৈতিক মতভেদ ও বিতর্ক থাকবে; বিভিন্ন দলের মাঝে দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতা থাকবে। তবে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে মালদ্বীপকে। ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ চায়, মালদ্বীপে শান্তি-সম্প্রীতি বিরাজ করুক।

 

শ্রেণী:

দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধা দূর, অগ্রগতি অর্জনই মূল লক্ষ্য

Posted on by 0 comment
3-4-2018 7-16-48 PM

3-4-2018 7-16-48 PMরাজীব পারভেজ: আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (ইফাদ) প্রেসিডেন্ট গিলবার্ট ফাউসন হোউংবোর আমন্ত্রণে রোমে সংস্থাটির ৪১তম গভর্নিং কাউন্সিলে যোগ দিতে এবং পোপ ফ্রান্সিসের আমন্ত্রণে ভ্যাটিকান সিটি সফরে গত ১১ ফেব্রুয়ারি ইতালির রাজধানী রোম সফর করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইফাদের ৪১তম গভর্নিং কাউন্সিলের উদ্বোধনী সেশনে অংশ নিয়ে মূল বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। সফরে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের মধ্যে ৯২.৪ ডলারের ঋণ চুক্তি সই হয়। এ চুক্তির আওতায় দেশের উত্তর-পূর্বের ছয় জেলার গ্রামীণ পিছিয়ে পড়া মানুষের অবকাঠামো ও বাজার উন্নয়ন করা হবে। রোমে ইতালি আওয়ামী লীগ আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তার সরকারের কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন।

ইফাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী
ইফাদ সদর দফতরে সভার উদ্বোধনী অধিবেশনে মূল বক্তব্যে দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূর করতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগের জন্য উন্নয়ন-সহযোগীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, আমরা বিশ্বাস করি, স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ একটি প্রধান বিবেচ্য বিষয় এবং বিশ্বব্যাপী অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা ছাড়া এটি অর্জন করা যাবে না। অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘ফ্র্যাজিলিটি টু লং টার্ম রেজিলিয়েন্স : ইনভেস্ট ইন সাসটেইনেবল রুরাল ইকোনমি’। বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূরীকরণে উন্নয়ন-সহযোগীদের আরও একটু উদার হতে হবে। বাংলাদেশ ও উন্নয়ন-সহযোগীদের মধ্যে সহায়তা অব্যাহত থাকার ব্যাপারে আশা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, অগ্রগতির এই ধারা অব্যাহত রাখতে ইফাদ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আমাদের প্রত্যাশা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা স্থাপন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অর্জন করা যাবে না। গ্রামীণ সামাজিক ও জলবায়ুগত স্থিতিশীলতার উন্নয়নে ব্যাপকভিত্তিক টেকসই গ্রামীণ অর্থনীতি প্রয়োজন। তিনি টেকসই গ্রামীণ অর্থনীতি তৈরিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদিভাবে স্থিতিশীলতা আনার আহ্বান জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের জনসংখ্যা ৯ বিলিয়ন (৯০০ কোটি) ছাড়িয়ে যাবে এবং এর অর্ধেক হবে মধ্যবিত্ত। এর ফলে বিশ্বের আবাদি জমি, বনভূমি ও পানির ওপর প্রচ- চাপ পড়বে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে অনেক দেশের আবাদি জমি ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে আমরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হব। শেখ হাসিনা বলেন, ২০৫০ সালে বিশ্বের খাদ্য চাহিদা ২০০৬ সালের অবস্থান থেকে অন্তত ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে এবং খাদ্যমূল্য বেড়ে ৮৪ শতাংশ দাঁড়াতে পারে। তিনি আরও বলেন, আমরা কীভাবে এ ধরনের বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করব? আমি আপনাদের আমার দেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কৃষি প্রবৃদ্ধির কথা তুলে ধরব, যা বৈশ্বিক পর্যায়ে মানব উন্নয়নে অন্যান্য দেশ গ্রহণ করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রথমে আমি আপনাদের বলব, প্রতিবছর জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের কারণে দেশে খাদ্য সংকট ও খাদ্য উৎপাদন হ্রাসের যে কোনো সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশি জনগণ স্বাভাবিকভাবে সক্ষম। সংকটের মোকাবিলায় বাংলাদেশিরা আস্থার সঙ্গে শক্তভাবে লড়াই করে সমস্যার সমাধান ও সংকট কাটিয়ে উঠতে বিকল্প উপায় গ্রহণের মাধ্যমে সফলতা অর্জন করে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রায় এক দশক ধরে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং চলতি বছর অসময়ে বারবার বন্যায় অপ্রত্যাশিতভাবে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। এ ঘাটতি মোকাবিলায় গ্রাহকদের কাছে পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে সঙ্গে সঙ্গেই খাদ্য আমদানি নীতি গ্রহণ করা হয়।
শেখ হাসিনা বলেন, গ্রামাঞ্চলে কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে নাÑ এই চ্যালেঞ্জই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের জনসংখ্যার প্রায় ৭২ শতাংশ গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে এবং ৪৩ শতাংশ কৃষি খাতে শ্রমজীবী হিসেবে কাজ করে; যারা দেশের জিডিপিতে ১৫ শতাংশ অবদান রাখছে। গ্রামীণ অকৃষি খাতের কর্মীর সংখ্যা ৪০ শতাংশ, যারা গ্রামীণ আয়ের ৫০ শতাংশের বেশি আয় করে। কাজেই অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই গ্রামীণ রূপান্তরই দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধা দূর করা ও কাউকে পেছনে ফেলে না রাখার লক্ষ্য অর্জনের মূল শক্তি।’

বাংলাদেশ-ইফাদ ঋণচুক্তি
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ৬টি জেলার দুস্থ মানুষের অবকাঠামো ও বাজার উন্নয়নে ইফাদের সঙ্গে ৯ কোটির বেশি মার্কিন ডলারের ঋণচুক্তি করেছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে ইফাদ সদর দফতরে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৬টি জেলার দুস্থ জনগণের অবকাঠামোগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং তথ্যসংক্রান্ত একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। জেলাগুলো হচ্ছে পঞ্চগড়, দিনাজপুর, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও জামালপুর। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এতে এই জেলাগুলোর ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ উপকৃত হবে। প্রকল্পের মূল ব্যয়ের ৬ কোটি ৩২ লাখ ৫০ হাজার ডলার ঋণ এবং ১২ লাখ ৫০ হাজার ডলার অনুদান হিসেবে দেবে ইফাদ। বাকি ২ কোটি ৭৯ লাখ ডলার বাংলাদেশ সরকার দেবে।

শ্রেণী:

দু’বছরে প্রত্যাবাসন : মিয়ানমার ফেরত নেবে রোহিঙ্গাদের

উত্তরণ প্রতিবেদন: বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের আগামী দুই বছরের মধ্যে ফেরত নেবে মিয়ানমার। প্রতিদিন ৩০০ রোহিঙ্গা নাগরিককে ফেরত নেবে দেশটি। গত ১৬ জানুয়ারি নেপিডোয় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সম্পন্ন হওয়া ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট চুক্তিতে (মাঠ পর্যায়ের বাস্তব ব্যবস্থা) এসব বলা হয়েছে। মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক শেষে এ চুক্তি সই হয়।
বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক এবং মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থো নিজ নিজ দেশের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন। এর আগে ১৫ জানুয়ারি সারাদিন যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম সভায় ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট নিয়ে আলোচনা হয়।
১৬ জানুয়ারি মিয়ানমারে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট চুক্তি চূড়ান্ত করা হয়েছে। রোহিঙ্গারা যাতে আর বাংলাদেশে আসতে না পারে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে মিয়ানমার সম্মত হয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশে ট্রানজিট ক্যাম্প হবে ৫টি এবং মিয়ানমারে অভ্যর্থনা ক্যাম্প হবে দুটি। বাংলাদেশ থেকে নিয়ে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের লা পো থং নামক একটি জায়গায় অস্থায়ীভাবে রাখা হবে। তারপর বাড়িঘর সংস্কার করে তাদের সেখানে পাঠানো হবে।
এতে আরও বলা হয়, সহিংসতায় যেসব শিশু অনাথ হয়েছে এবং বাংলাদেশে যাদের জন্ম হয়েছে তাদেরও এই অ্যারেঞ্জমেন্টের আওতায় ফেরত পাঠানো হবে। এজন্য দুটি টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হবে। একটি রোহিঙ্গাদের যাচাই-বাছাইয়ের জন্য এবং অন্যটি প্রত্যাবাসনের জন্য।
দুই দেশের মধ্যে ১৬ জানুয়ারি সই হওয়া চুক্তির বিষয়ে মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমান গণমাধ্যমকে বলেছেন, আমরা একটি ভালো চুক্তি করেছি, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। আমরা বলেছি যখন থেকে প্রত্যাবাসন শুরু হবে তার দুই বছরের মধ্যে প্রেফারেবলি শেষ হবে। এটি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে এবং মিয়ানমার এ প্রস্তাবে রাজি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা প্রস্তাব করেছিলাম প্রতিসপ্তাহে ১৫ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরত পাঠাব। কিন্তু তারা ওই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। তারা নিজেরা রোহিঙ্গাদের জন্য কিছু ব্যবস্থা করেছে। ফলে প্রাথমিক অবস্থায় প্রতিদিন ৩০০ করে রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে রাজি হয়েছে মিয়ানমার। পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে পর্যালোচনা করে এই সংখ্যা বাড়ানো হবে।
রাষ্ট্রদূত জানান, এ ব্যবস্থার অধীনে একটি পরিবারকে একটি ইউনিট হিসেবে গণ্য করা হবে অর্থাৎ একটি ফরমে পুরো পরিবারের তথ্য থাকবে এবং মিয়ানমার এটি গ্রহণ করবে। ফলে প্রক্রিয়াটি সহজ হবে। এছাড়া জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থাকে বাংলাদেশ কাজে লাগাবে এবং মিয়ানমার তাদের সময়মতো আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে।
নেপিডোতে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক। আর মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দেশটির পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থো। বৈঠকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়। ১৫ জানুয়ারি দিনভর আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষ কোনো সমাধানে আসতে পারেনি। তবে ১৬ জানুয়ারি সকালে আবারও উভয়পক্ষের মধ্যে বৈঠক শুরু হয়। বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের প্রতিনিধি দল ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট চুক্তি সই করে।
নেপিডোর বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ১৪ সদস্যের প্রতিনিধি দল যোগ দেয়। এই প্রতিনিধি দলে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল মান্নান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবু বকর ছিদ্দীক, কক্সবাজারের ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (শরণার্থী) মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মনিরুল ইসলাম আখন্দ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিভাগের মহাপরিচালক মনজুরুল করিম খান চৌধুরী প্রমুখ রয়েছেন। এছাড়া মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমানও যোগ দেন।
রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে গত ১৯ ডিসেম্বর যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠিত হয়। যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ দুই দেশের প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যে সব ধরনের উদ্যোগ নেবে। গত ২৩ নভেম্বর নেপিডোয় উভয় দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির আলোকে এই ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠিত হয়।
রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যে ঢাকায় এক বৈঠকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়। এই যৌথ গ্রুপ রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন শুরু করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ নেবে। দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিবের নেতৃত্বে ১৫ জন করে সদস্য নিয়ে মোট ৩০ সদস্যের এই গ্রুপ গঠন করা হয়।
রাখাইনে নতুন করে সেনা অভিযান শুরুর পর এ পর্যন্ত সাড়ে ৬ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। মিয়ানমারে নিপীড়নের মুখে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে আরও প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা। সেনাবাহিনী অভিযান এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে শরণার্থীদের ফেরত নিতে সম্মত হয় মিয়ানমার। রোহিঙ্গাদের ঘরে ফেরার পথ তৈরি করতে গত ২৩ নভেম্বর নেপিডোয় দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

শ্রেণী:

অকৃত্রিম বন্ধু প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফর

26

26ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি গত ১৬ জানুয়ারি পাঁচ দিনের সফরে ঢাকা আসেন। এই সফরে তিনি পেয়েছেন সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় প্রটোকল। সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। আওয়ামী লীগ প্রণব মুখার্জির এই সফরকে ইতিবাচকভাবে দেখছে এবং মনে করছে এর ফলে সরকার ও আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ওপরও এই সফর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ভারতের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বাংলাদেশ সফর করেছিলেন প্রণব মুখার্জি। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন শেষেও তিনি প্রথম ঢাকায় আসেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রতিটি রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ তিনি ওয়াকিবহাল। প্রণব মুখার্জি নিখিল ভারত বঙ্গ সম্মেলনের ১০ বছর ধরে সভাপতি ছিলেন। নিখিল ভারত বঙ্গ সম্মেলন ও ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ ১৫ থেকে ১৭ জানুয়ারি যৌথভাবে ঢাকায় আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনে আয়োজন করে। মূলত, এই সম্মেলনে সমাপনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি ঢাকায় আসেন। বাংলা একাডেমিতে আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্যও রাখেন তিনি। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে গিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এবারের সফরে তিনি বন্দরনগরী চট্টগ্রামে যান। মাস্টারদা সূর্য সেনের জন্মভিটা পরিদর্শন করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি-লিট ডিগ্রি গ্রহণ করেন ও বক্তব্য দেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতে বঙ্গবন্ধুকে সর্বকালের সংগ্রামী নেতা বলে অভিহিত করেন। বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশের এগিয়ে চলার প্রশংসা করেন। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে বর্ণনা করেন। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অর্থনীতির সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন তার সামনে। নিপীড়নের মুখে বাংলাদেশে চলে আসা মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার কথাও প্রধানমন্ত্রী তাকে বলেন।
সফরের দ্বিতীয় দিন সকালে ধানমন্ডিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন প্রণব। বঙ্গবন্ধু জাদুঘর পরিদর্শনে গিয়ে সেখানকার শোক বইয়ে প্রণব লিখেন, ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে আসার সুযোগ পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, যিনি স্বাধীনতার সংগ্রামে বাংলাদেশের মানুষকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে এই বাড়িতেই তাকে হত্যা করা হয়। এখান থেকেই মার্চে একটি নতুন জাতি সৃষ্টির ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। আমি সর্বকালের এই সাহসী নেতার প্রতি সালাম জানাই, শ্রদ্ধা জানাই সব শহীদদের প্রতি। এর পরে বিকেলে বাংলা একাডেমিতে আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি।
সফরের তৃতীয় দিনে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সেখানে তাকে দেওয়া হয় সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি। অনুষ্ঠানে ডিগ্রি গ্রহণ করে তিনি বলেন, মানুষের অধিকার আদায়ের একমাত্র শাসনব্যবস্থা সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এটা বিশ্বস্বীকৃত। এর মাধ্যমেই দেশের জনগণ ভোট প্রদান করে তাদের নেতৃত্ব নির্বাচন করে। এর থেকে জনপ্রিয় শাসনব্যবস্থা আর নেই। তারপরও বারবার এই শাসন ব্যবস্থা ব্যাহত করার চেষ্টা করেছে কেউ কেউ। কোনো রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সৈন্যরা ব্যারাক থেকে বের হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিল?
উপমহাদেশের রাজনৈতিক হত্যাকা-ের ইতিহাস প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে সপরিবারে নিহত হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এটি বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি বড় আঘাত। এ রকম আঘাত আমরা ভারতের স্বাধীনতা লাভের কয়েক মাসের মাথায় পেয়েছিলাম ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীকে হারানোর মাধ্যমে। একটা নতুন দেশ সবে স্বাধীনতা পেয়েছে। অসংখ্য সমস্যা, দেশ গড়ার সমস্যা, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সমস্যা, দারিদ্র্য দূর করার সমস্যা, বেকারত্ব দূর করার সমস্যা। সেই সমস্যার সঙ্গে সঙ্গেই একটা জাতিকে তার জন্মলগ্নের মুহূর্তেই প্রায় সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হলো।
বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার বিষয়ে ভারতের সাবেক এই রাষ্ট্রপতি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রটি সবচেয়ে বড় মাইনের চাকরির জন্য না ছুটে, উপাচার্যকে এসে বলবে আমি গবেষণা করতে চাই। সরকারের দায়িত্ব একজন গবেষককে উপযুক্ত সম্মানি দেওয়া। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা এই পরিবেশটা তৈরি করতে পারব না, ততক্ষণ পর্যন্ত শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা যাবে না। শিক্ষার্থীদের মোটা মাইনের চাকরি দিয়ে পরিবার উপকৃত হতে পারে; কিন্তু সার্বিকভাবে দেশ কতটা উপকৃত হচ্ছে সেদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নজর দিতে হবে। তিনি বাংলা ভাষা ও মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বলেন, পৃথিবীর একটি বৃহৎ জনসংখ্যা এই ভাষায় কথা বলে। পৃথিবীতে খুব বেশি দেশে এমন কোনো নজির নেই যে ভাষার জন্য বা সংস্কৃতির জন্য প্রাণ ত্যাগ করছেন। একটি স্বাধীন স্বত্বার মূল ভিত্তিগুলো হচ্ছে ভাষা, সংস্কৃতি, তার ইতিহাস, তার ঐতিহ্য। আর এই সামগ্রিক ও মানবিক পরিপ্রেক্ষিতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে একটি নতুন জাতি। তারা ৯ মাস সংগ্রাম করে বিশ্ব মানচিত্রে একটি স্থান দখল করে নিয়েছে।
বর্তমানে দেশের উন্নয়নের কথা উল্লেখ করে প্রণব মুখার্জি বলেন, ‘কয়েক সপ্তাহ আগে ইন্টারন্যাশনাল বোর্ড অব রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইজউ) তাদের রিপোর্টে বাংলাদেশকে অন্যতম এগিয়ে যাওয়া দেশ বলেছে। যাদের জাতীয় আয় কয়েক বছরে ৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে। সামাজিক খাতে অপুষ্টি দূরীকরণ, নারী শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, উচ্চ শিক্ষার সম্প্রসারণ সম্ভব হয়েছে। এই মাটিতে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করছি গণতন্ত্রের মাধ্যমে একটি দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।
প্রণব মুখার্জি এর আগে ২০১৩ ও ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ ছিল বাংলাদেশে ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এই বাঙালি রাজনীতিক। মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাকে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা দেওয়া হয়। সেই সফরের কথাও এবার স্মরণ করেন একসময়ের এই কংগ্রেস নেতা। তবে এবার প্রণব মুখার্জি রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঢাকা সফর না করলেও, তাকে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হয়েছে।
গত বছর এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লি সফরকালে রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারা সে সময় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গৃহীত সিদ্ধান্ত ও পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। তখন শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সর্বান্তকরণে সমর্থনদানের জন্য প্রণব মুখার্জিকে ধন্যবাদ জানান। তারা দুজনেই ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর শেখ হাসিনার ভারতে নির্বাসিত জীবনে তাদের দুই পরিবারের স্মৃতিচারণ করেন। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়া এবং দুদেশের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও দৃঢ় ভিত্তিদানের জন্য অব্যাহত উদ্যোগ গ্রহণে শেখ হাসিনার প্রশংসা করেন।
বাংলাদেশের প্রথম সরকারকে ভারতের সমর্থনদানের বিষয়ে ১৯৭১ সালের ১৫ জুন ভারতের রাজ্যসভায় প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন প্রণব মুখার্জি। ভারতের ত্রয়োদশ এবং প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি কংগ্রেস দলের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ভারতের অর্থ, পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।

ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো’র ঢাকা সফর
৩ দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে গত ২৭ জানুয়ারি ঢাকায় আসেন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো। এই সফরে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দেখতে যান উইদোদো। সেখানে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলার পর এই সংকট নিরসনে বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দেন তিনি। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জন্য সাহায্য চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণাও দেন উইদোদো। তিনি সফরকালে অংশ নেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের নৈশভোজে, বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। সাভারে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এছাড়া জাতির জনকের স্মৃতিবিজড়িত বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরও পরিদর্শন করেন।
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো ও শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বিষয়ক ৫টি চুক্তি এবং সমঝোতা স্বাক্ষর হয়েছে। চুক্তিতে বাংলাদেশের পরারাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী ও ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদি ছাড়াও দুদেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বাক্ষর করেন। দুদেশের মধ্যে অগ্রাধিকার বাণিজ্য সুবিধা সংক্রান্ত চুক্তি, দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে নিয়মিত বৈঠক আয়োজনে সমঝোতা, মৎস্যসম্পদ আহরণ সংক্রান্ত বিষয়ে যৌথ সম্মতিপত্র, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) টার্মিনালে অবকাঠামো উন্নয়ন ও এ সংক্রান্ত বিষয়ে দুটি সমঝোতা স্মারক সই হয়।
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো বলেছেন, রোহিঙ্গাদের প্রতি ইন্দোনেশিয়ার সরকার ও জনগণের আন্তরিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শেষ না হওয়া পর্যন্ত ত্রাণ, চিকিৎসা, মানবিক সহায়তাসহ সার্বিক সহযোগিতা করা হবে। উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের থাইংখালী জামতলি রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শনকালে তিনি এ কথা বলেন। মিয়ানমার সামরিক জান্তার নির্যাতনের শিকার হয়ে এ দেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও মানবিক সেবা প্রদানের জন্য তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূয়সি প্রশংসা করে বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বে তিনি একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এ সময় ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের কাছ থেকে রাখাইনে সহিংসতার বিবরণ শুনে বিচলিত বোধ করেন। তিনি রোহিঙ্গাদের চিকিৎসাসেবার খোঁজখবর নেন। এর আগে জোকো উইদোদো ইন্দোনেশিয়া সরকারের অর্থায়নে স্থাপিত মেডিকেল ক্যাম্প, স্কুল, ত্রাণকেন্দ্র এবং বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা পরিদর্শন করেন। এর আগে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় ও জরুরি সহায়তা দিয়ে যে ভূমিকা বাংলাদেশ রেখেছে, তার প্রতি সংহতি জানিয়ে গত সেপ্টেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদিকে বাংলাদেশে পাঠিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট উইদোদো।

শ্রেণী:

বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী: ফোর্সেস গোল ২০৩০-এর লক্ষ্য পানে

30

30মুফরাত রাহিন: ‘মারো কেন? বাবুকে নালিশ দিবো কিন্তু!’Ñ কথাটি বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার প্রখ্যাত ‘মতিচূর’ গ্রন্থ থেকে নেওয়া। কথাটি তাচ্ছিল্যের সাথে বলেছিলেন লেখিকা। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, এভাবে মার খাওয়া যদি প্রতিরোধ না করা হয় তবে মার খেয়েই যেতে হবে।
বাংলার বাঘ বলে খ্যাত শেরে বাংলা একে ফজলুল হক যখন ছোটবেলা নদীতে সাঁতার কাটতে যেতেন, তখন উনার মা চিন্তিত থাকতেন আর মানা করতেন নদীতে নামতে, তাতে কুমির আছে বলে। সে সময় ফজলুল হক বলতেন, ‘মা আমরা যদি নদীতে না নামি, তাহলে কুমির তাড়াবো কি করে?’ কুমির তাড়ানো বলতে সে সময়ের দখলদার ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ইতিহাস সাক্ষী, যুগে যুগে প্রত্যেক জাতি নিজেদের অধিকার, ন্যায্য দাবি আদায় এবং তা রক্ষার জন্য যুদ্ধ করে এসেছে। যুদ্ধ মানব সভ্যতার সাথেই জড়িত।
বাংলাদেশ। একটি স্বপ্নের নাম। কোটি কোটি বাঙালির স্বপ্নের দেশ। বিশ্বে বাঙালি জাতির একমাত্র স্বাধীন রাষ্ট্র। ১৯৭১ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বীর বাঙালি সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু উনার দূরদৃষ্টিতে বুঝতে পেরেছিলেন স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে তা রক্ষা করা কঠিন। শত্রুদের ষড়যন্ত্র থেমে নেই। তাই দেশ রক্ষায় গঠন করেন সশস্ত্র বাহিনী এবং এর উন্নয়নে যথেষ্ট গুরুত্ব দেন। মিসর থেকে নিয়ে আসেন ৪৪টি ট্যাংক, সংগ্রহ করেন যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ প্রভৃতি। বাহিনীর সদস্যদের জন্য ব্যবস্থা করেন উন্নত প্রশিক্ষণের।
কিন্তু ’৭৫-এর বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকা-ের পর থেমে যায় সশস্ত্র বাহিনীর অগ্রযাত্রা। পিছিয়ে পড়ে উন্নয়ন।
১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা, গণতন্ত্রের মানস কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বাবার মতোই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেত্রী। তিনিও গুরুত্ব দিলেন সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়নে। শুরু হলো বাহিনীর অগ্রযাত্রা। একে একে সংগ্রহ করে দিলেন ফ্রিগেট, মিগ-২৯ এর মতো অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জামাদি।
কিন্তু দেশ রক্ষার উন্নয়নের কারণে শত্রুদের ষড়যন্ত্রের শিকার হলেন তিনি। আবারও থেমে গেল সশস্ত্র বাহিনীর অগ্রযাত্রা ২০০১ থেকে। চুরির মহাউৎসবে মেতে উঠল ২০০১ সালের ষড়যন্ত্রের সরকার। দেশ রক্ষার তাগিদে জনগণের টাকায় কেনা মিগ-২৯ গোপনে বিক্রি করে নিজেদের পকেট ভরতে চাইল। শত্রুতাবশত নৌবাহিনীর ফ্রিগেট ডিকমিশিং করে বসিয়ে রাখল।
২০০৮ সালে জনগণের ভালোবাসা নিয়ে, সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে ভূমিধস বিজয় নিয়ে ফিরে এলেন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়ে। উনার শক্তিশালী সাহসী নেতৃত্বে আবার পুরোদমে শুরু হলো সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন। তিনি প্রণয়ন করলেন যুগোপযোগী পরিকল্পনা ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’।
‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর আলোকে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী হয়ে উঠছে দক্ষ, চৌকষ, আধুনিক শক্তিশালী মেধাবী সশস্ত্র বাহিনী।
নি¤েœ ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর কিছু দিক তুলে ধরা হলোÑ
ফোর্সেস গোল ২০৩০ (ঋড়ৎপবং এড়ধষ ২০৩০) হলো বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সশস্ত্র বাহিনীর আকার বৃদ্ধি, আধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম সংগ্রহ ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রশিক্ষণ প্রদান। পরিকল্পনায় দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের ওপর জোর দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

ক্রয় তালিকা
ফোর্সেস গোল ২০৩০ অনুসারে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ২০১০ সাল থেকে ক্রয়কৃত সমরাস্ত্রের তালিকাÑ

সেনাবাহিনী
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ব্যবহার করে নোরা বি-৫২কে২ এসপিএইচ; ৪৪টি এমবিটি ২০০০ ট্যাংক; ১৮টি নোরা বি-৫২ স্বয়ংক্রিয় কামান; ৩৬টি ডব্লিউএস-২২ মাল্টিপল রকেট লঞ্চার সিস্টেম; ৬৩৫টি বিটিআর-৮০ এপিসি; ২২টি অটোকার কোবরা এলএভি; ২ রেজিমেন্ট এফএম-৯০ স্বল্পপাল্লার বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; কিউডব্লিউ-২ কাঁধে বহনযোগ্য বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; এফএন-৬ কাঁধে বহনযোগ্য বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৯কে১১৫-২ মেতিস-এম; মেতিস-এম ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; পিফ-৯৮ ট্যাংক বিধ্বংসী রকেট; এসএলসি-২ ওয়েপন লোকেটিং রাডার; দুটি ইউরোকপ্টার এএস৩৬৫ ডাউফিন হেলিকপ্টার; ৬টি এমআই-১৭১এসএইচ হেলিকপ্টার; একটি সি-২৯৫ডব্লিউ পরিবহন বিমান; ৩৬টি ব্রামোর সি৪আই মনুষ্যবিহীন আকাশযান; ১০০টি ট্রাই শার্ক স্পিডবোট; একটি টাইপ সি কমান্ড ভেসেল।

নৌ-বাহিনী
দুটি টাইপ ০৩৫জি ডুবোজাহাজ; দুটি টাইপ ০৫৩এইচ২ ফ্রিগেট; দুটি হ্যামিল্টন ক্লাস ফ্রিগেট; ৪টি টাইপ ০৫৬ কর্ভেট; ৪টি দুর্জয় ক্লাস পেট্রোল ভেসেল; ৫টি পদ্মা ক্লাস পেট্রোল ভেসেল; একটি তেলবাহী ট্যাংকার; দুটি ডরনিয়ার ডিও-২২৮এনজি মেরিটাইম টহল বিমান; দুটি এডব্লিউ-১০৯ হেলিকপ্টার।

বিমান বাহিনী
১৬টি এফ-৭ যুদ্ধবিমান; ১৬টি ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ বিমান; ৯টি কে-৮ প্রশিক্ষণ বিমান; ১১টি পিটি-৬ প্রাথমিক প্রশিক্ষণ বিমান; ৩টি এল-৪১০ পরিবহন প্রশিক্ষণ বিমান; ১৬টি এমআই-১৭১এসএইচ হেলিকপ্টার; দুটি এডব্লিউ-১৩৯ হেলিকপ্টার; ৫ ব্যাটারি এফএম-৯০ স্বল্পপাল্লার বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; জেএইচ-১৬ রাডার; জেওয়াই-১১বি রাডার; ওয়াইএলসি-২ রাডার; ওয়াইএলসি-৬ রাডার; সেলেক্স আরএটি-৩১ডি রাডার।
সাংগঠনিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন
সেনাবাহিনী : সিলেটে ১৭ পদাতিক ডিভিশন প্রতিষ্ঠা; কক্সবাজারে ১০ পদাতিক ডিভিশন প্রতিষ্ঠা; পদ্মাসেতুর পাশে ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড প্রতিষ্ঠা; পদাতিক বাহিনীকে ব্যালাস্টিক হেলমেট, কেভলার বুলেট প্রুফ জ্যাকেট, নাইট ভিশন গগলস, আই প্রোটেক্টিভ গিয়ার, জিপিএস ডিভাইস, উন্নত যোগাযোগ যন্ত্র ও বিডি-০৮ অ্যাসল্ট রাইফেল দ্বারা সজ্জিত করা।
নৌ-বাহিনী : নৌবাহিনীর উড্ডয়ন শাখা প্রতিষ্ঠা; নৌবাহিনীর ডুবোজাহাজ শাখা প্রতিষ্ঠা; কক্সবাজারের পেকুয়ায় বানৌজা শেখ হাসিনা নামক ডুবোজাহাজ ঘাঁটি স্থাপন।
বিমান বাহিনী : ঢাকায় বঙ্গবন্ধু বিমান ঘাঁটি স্থাপন; কক্সবাজারে বিমান ঘাঁটি স্থাপন; বিমান বাহিনীতে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র শাখা প্রতিষ্ঠা।
দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প : বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানা; বিডি-০৮ অ্যাসল্ট রাইফেল প্রস্তুতকরণ; বিডি-০৮ লাইট মেশিন গান প্রস্তুতকরণ; গ্রেন-৮৪ বিডি গ্রেনেড তৈরি; কামান ও মর্টারের শেল তৈরি; ৬০ মিমি ও ৮২মিমি মর্টার; এফএন-১৬ ঈগল ম্যানপ্যাড।
বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি : অরুনিমা বলীয়ান ট্রাক সংযোজন; খুলনা শিপইয়ার্ড; পদ্মা ক্লাস পেট্রোল ভেসেল নির্মাণ; দুর্জয় ক্লাস পেট্রোল ভেসেল নির্মাণ; ল্যান্ডিং ক্রাফট ইউটিলিটি নির্মাণ; ল্যান্ডিং ক্রাফট ট্যাংক নির্মাণ; হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ জাহাজ নির্মাণ।
নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড : ল্যান্ডিং ক্রাফট ট্যাংক নির্মাণ; স্পিডবোট নির্মাণ; আনন্দ শিপইয়ার্ড; তেলবাহী জাহাজ নির্মাণ; বঙ্গবন্ধু অ্যারোনটিকাল সেন্টার সম্পাদনা; এফ-৭ যুদ্ধবিমানের ওভারহোলিং; এমআই-১৭ হেলিকপ্টার।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সেনাবাহিনী : সেনাবাহিনীকে উত্তর, দক্ষিণ ও কেন্দ্রীয় কোরে ভাগ করা; পটুয়াখালীর লেবুখালীতে পদাতিক ডিভিশন স্থাপন; কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে রিভারাইন ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেড স্থাপন; দুই রেজিমেন্ট ট্যাংক ক্রয়; দূরপাল্লার ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয়।
নৌ-বাহিনী : দুটি ফ্রিগেট ক্রয়; ৬টি টাইপ-০৫৬ কর্ভেট ক্রয়; ৪টি দুর্জয় ক্লাস পেট্রোল ভেসেল ক্রয়; পটুয়াখালীতে বানৌজা শেরে বাংলা নামক সর্ববৃহৎ নৌঘাঁটি স্থাপন; দুটি ডুবোজাহাজ বিধ্বংসী হেলিকপ্টার ক্রয়; দুটি সামুদ্রিক টহল বিমান ক্রয়।
বিমান বাহিনী : এক ব্যাটারি মধ্যম পাল্লার বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয়; মনুষ্যবিহীন আকাশযান ক্রয়; ৮টি মাল্টিরোল কম্ব্যাট এয়ারক্রাফট ক্রয়; এমআই-১৭১ এসএইচ হেলিকপ্টার ক্রয়; দুটি এডব্লিউ-১৩৯ হেলিকপ্টার ক্রয়; দুটি এডব্লিউ-১১৯ হেলিকপ্টার ক্রয়। [তথ্য সূত্র : ফোর্সেস গোল-২০৩০, উইকিপিডিয়া]
উল্লেখ্য হচ্ছে, ঐতিহ্য অনুযায়ী কোনো দেশের সশস্ত্র বাহিনীই তাদের পরিকল্পনার সব প্রকাশ করে না। মূল পরিকল্পনার ক্ষুদ্র অংশই প্রকাশ করে আর সিংহভাগ গোপন রাখে। অর্থাৎ বলা যায়, উপরে উল্লিখিত পরিকল্পনা থেকে আরও কয়েকগুণ বেশি শক্তিশালী, দক্ষ, চৌকষ, মেধাবী সশস্ত্র বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী। সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়ন ধারার এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার সব সময়ই প্রয়োজন।

শ্রেণী:

‘মোল্লারা ঈশ্বরের মতো আচরণ করছে’

53

মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে, দুর্নীতির প্রতিবাদে, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, নিম্ন মজুরি, বৈষম্য, মুদ্রাস্ফীতি, অভিযোগ তুলে গত বছরের ২০১৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। দাবি ছিল, যে দেশে মানুষ কাজ পাচ্ছে না, সে দেশের সরকার আঞ্চলিক সংঘর্ষ থামাতে এক বিপুল ব্যয়ভার বহন করছে কেন? 

53সাইদ আহমেদ বাবু; বিশ্ব রাজনীতিতে ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে ইরান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরান মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে। বিশ্ব বাণিজ্যের বিরাট একটা অংশ ইরান প্রভাবিত অঞ্চল দিয়ে হয়ে থাকে। তাই ইরান ভৌগোলিক দিক থেকে বিশ্ব শক্তিগুলোর কাছে কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। বাণিজ্যিক পথ ও গ্যাস পাইপলাইনের জন্য দক্ষিণ এশিয়াতেও ইরান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবার চোখ এখন ইরানের দিকে। গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে দেশটির দ্বিতীয় জনবহুল শহর মাশহাদ শহরে বিক্ষোভের প্রথম স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছিল। এরপর তা দেশটির পশ্চিমে কারমেনশাহ এবং দক্ষিণে বন্দর আব্বাসে ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানী তেহরানে এর হাওয়া লাগে। এই প্রতিবাদ ২০০৯ সালের সবুজ আন্দোলন থেকে আলাদা, যেটিতে সংস্কারপন্থি নাগরিকরা নির্বাচনে কারচুপির প্রতিবাদে রাজপথে নেমে এসেছিল। এটি ১৯৯৯-এর তেহরানে সংঘটিত ছাত্র বিক্ষোভ থেকেও আলাদা, যে আন্দোলন হয়েছিল সংস্কারপন্থি পত্রিকা সালামের বন্ধের প্রতিবাদে।
ইরানের হাসান রৌহানি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি জনগণের আকাক্সক্ষা বৃদ্ধি পায় যখন তারা ২০১৫ সালে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ এবং জাতিসংঘের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি করে। রৌহানি বলেছিলেন, পারমাণবিক চুক্তি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে আকর্ষিত করবে কিন্তু পারমাণবিক চুক্তির পরও অবস্থার কোনো পরির্বতন হয়নি। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ট্রাম্পের নেতৃত্বে পারমাণবিক অবরোধ আরও জোরদার করেছে। ট্রাম্পের এই বিরাগভাজন হওয়ার জন্য বিভিন্ন উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানকে ইরানের অভ্যন্তরে বিনিয়োগের আগ্রহকে বিনষ্ট করে দিয়েছে। ২০১৩-তে ক্ষমতায় এসে ব্যাপক অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন রৌহানি। কিন্তু অভিযোগ, গত চার বছরে রৌহানির কথা কাজে লাগেনি। ইরানের জনগণের যে সরকারি সাহায্য প্রয়োজন ছিল তার বেশিরভাগই পূরণ হয়নি।
গত ২০১৭-এর ডিসেম্বরের প্রথম দিকে রৌহানির সরকার তার বাজেটের বিস্তারিত অংশ জনসম্মুখে প্রকাশ করে। রৌহানির বাজেটের ভালো দিকগুলো ম্লান হয়ে যায় যখন জনগণ দেখতে পেল যে একটা বিশাল অঙ্কের অর্থ যাচ্ছে মোল্লা নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানে। এর স্বরাষ্ট্রনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতি উভয়ই তেল রাজস্বের ওপর নির্ভরশীল (লেবানিজ রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এবং সিরিয়ার সরকারের প্রতি সমর্থনের ব্যাপারগুলোসহ)। মুদ্রাস্ফীতি ঠেকাতে সরকার ইতোমধ্যে জ্বালানি এবং রুটির ওপর ভর্তুকী বাতিল করেছে। এসব কারণে সাম্প্রতিক সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। রৌহানির মুদ্রাস্ফীতি ঠেকানোর নীতি ইরানি শ্রমিকশ্রেণি এবং নিম্ন মধ্যবিত্তদের ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছে। প্রত্যাশামাফিক কোনো অগ্রগতি সাধারণ জীবনে হয়নি, যা হতাশায় তৈরি করেছে জনসাধারণকে মাঠে নামিয়েছে।
মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে, দুর্নীতির প্রতিবাদে, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, নিম্ন মজুরি, বৈষম্য, মুদ্রাস্ফীতি, অভিযোগ তুলে গত বছরের ২০১৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। দাবি ছিল, যে দেশে মানুষ কাজ পাচ্ছে না, সে দেশের সরকার আঞ্চলিক সংঘর্ষ থামাতে এক বিপুল ব্যয়ভার বহন করছে কেন? সরকারের কাছে জবাবদিহি দাবি করে শুরুতে পথে নেমেছিল সাধারণ জনগণ। সেই আন্দোলনের পিছনে না ছিল কোনো রাজনৈতিক দলের কলকাঠি, না মিছিলের সামনে ছিল কোনো পরিচিত নেতার নেতৃত্ব।
ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মাশাদ থেকেই বিক্ষোভ শুরু হয়। হাজার হাজার মানুষ ইরানের অধিকাংশ এলাকায় সরকারবিরোধী এ আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন এবং দেশটির নতুন নতুন শহরে বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। মাশহাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ থেকে ৫২ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করায় দ্রুতই সেটি সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়। পরে তা ইরানের আরও অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিকভাবে অর্থনৈতিক সংকট এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই বিক্ষোভের সূচনা হলেও এরই মধ্যে তা রাজনৈতিক সমাবেশে পরিণত হয়েছে।
রাজধানী তেহরানসহ দেশটির বড় বড় শহর ছাড়াও বেশ কিছু স্থানে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিসহ ইসলামি বিপ্লবের নেতাদের পদত্যাগ ও তাদের ‘নিপাত’ যাওয়ার দাবিতে স্লোগান দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন শহরে খামেনির ছবিও পুড়িয়ে দিচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা। দেশটির এমন সব প্রদেশে বিক্ষোভের সূত্রপাত, যা একসময় বর্তমান সরকারের ঘাঁটি হিসেবেই পরিচিত ছিল। কিন্তু সেখানকার বাসিন্দা, বিশেষ করে তরুণেরা রাস্তায় নেমে আসে। বিক্ষোভ হয়েছে ধর্মীয় নেতাদের আবাসস্থল হিসেবে খ্যাত কোম শহরেও। বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য হচ্ছে জনগণ ভিক্ষা করছে, মোল্লারা ‘ঈশ্বরের মতো আচরণ করছে’ একপর্যায়ে এই অসন্তোষ সরকারবিরোধী বিক্ষোভে পরিণত হয়। বিক্ষোভ শুরুর পরই যথারীতি পশ্চিমা গণমাধ্যম এই আন্দোলনকে সমর্থন করে সংবাদ প্রকাশ করেছে। এবং এই বিক্ষোভকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা ও নারী অধিকার আদায়ের আন্দোলন বলে মূল্যায়িত করেছে। এর সঙ্গে ইরানি বংশোদ্ভূত প্রবাসীদের একটি বড় অংশই বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গা থেকে যোগ দিয়েছে।
ইরানের ৮০টির বেশি শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভে হাজারো মানুষ অংশ নিয়েছে। বিক্ষোভকালে ২২ জন প্রাণ হারিয়েছে। গ্রেফতার হয়েছে হাজারো বিক্ষোভকারী। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। এবার যে প্রতিবাদের ঢেউ ইরানে উঠেছে তা কোনো রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য নয়। তা আসলে ইরানে যে সংকটগুলো সৃষ্টি হয়েছে তার বিরুদ্ধে। এই বিদ্রোহ হচ্ছে বেকারত্ব, বঞ্চনা আর নৈরাশ্যের বিরুদ্ধে। যে স্লোগানগুলো ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দেওয়া হচ্ছে তা উঠতি তারুণ্যনির্ভর জনসমষ্টির মৌলিক চাহিদা মেটাতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির ব্যর্থতাকেই নির্দেশ করছে। কারখানাগুলোতে এবং তেল প্রকল্পগুলোতে শ্রমিক-শ্রেণি বিক্ষোভরত রয়েছে। তার সাথে যোগ দিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবীরা এবং ব্যাংক সংকটে অর্থ হারিয়েছে এমন ব্যক্তিরা। প্রকৃত অর্থে এই বিদ্রোহ হচ্ছে শ্রমিক-শ্রেণি এবং নি¤œ মধ্যবিত্তের যারা তাদের জীবনমান নিচে নামতে দেখছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, তারা কষ্টে আছে। অন্যদিকে, ধনিক এলিট-শ্রেণি সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। তারা দেশে কিংবা দেশের বাইরে গিয়ে ভোগ-বিলাসিতা করছে।
ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়ায় বিক্ষোভ সংগঠিত করার অভিযোগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে নিষিদ্ধ করেছে দেশটির সরকার। মিডিয়াকে দৃঢ়ভাবে নিয়ন্ত্রিত রাখা হয় ৩৮ বছর আগে ইসলামি বিপ্লব করা মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে।
বিশেষভাবে বললে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য সাধারণ ইরানিদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে। অথচ দেশটির এলিট-শ্রেণিকে বিলাসী জীবনযাপন করতে দেখা যায়।
অনেকে আবার এই বিক্ষোভের কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন ইরানের বিতর্কিত পররাষ্ট্রনীতিকে। বলছেন, আঞ্চলিক দ্বন্দ্বে ইরান ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করেই এই অসন্তোষ। আরেক দল বলছেন, সৌদি জোটের আরোপিত অবরোধের কারণে ইরানের জনগণের জীবনযাত্রা প্রভাবিত হয়ে তৈরি হয়েছে এই বিক্ষোভের পটভূমি। রুহানির অর্থনৈতিক কারণ জনগণের মনে যে চাপা রোষ ছিল, বিক্ষোভে সেটাই প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। আবার অন্যদিকে, দেশটিতে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন পরিস্থিতির উন্নতি হয় নি। তাই একদিকে তৈরি হয়েছে আর্থ-সামাজিক অসন্তোষ। আরেকদিকে রাজনৈতিক অসন্তোষ। প্রেসিডেন্ট রুহানি অবশেষে হুঁশিয়ারির পাশপাশি ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নাগরিকদের উদ্বিগ্নতার কথা স্বীকার করেছেন যে, ২০০৯ সালে বিপুল সংখ্যক সমাবেশে প্রতিবাদ বিক্ষোভের প্রেক্ষিতে সমস্যাগুলো সমাধানের প্রয়োজন ছিল। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধ্বংসাত্মক আচরণ থেকে বিরত থাকতে সতর্ক করা হয়েছে। ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল রহমান রাহমানী ফাজলি বলেন, যারাই জনগণের সম্পদ নষ্ট করবে বা আইনভঙ্গ করবে, তাদের নিজের আচরণের মূল্য দিতে হবে। এর আগে দেওয়া এক সতর্ক বার্তায় তিনি নাগরিকদের বে-আইনি জটলা পাকাতে বারণ করেন।
হাজার হাজার লোক রাস্তায় নেমেছে। আবার বহু লোক সরকারকে রক্ষার জন্যও রাস্তায় নেমেছে। এটি ইরানের জন্য সংকটকাল। শ্রমিক-শ্রেণির এই বিক্ষোভের ফলে দেশটির সরকার চাপে রয়েছে। বিক্ষোভকারীদের বিদেশের এজেন্ট বলে গালি দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ইরানি দেশপ্রেম খুবই দৃঢ়। ইরানিরা হোয়াইট হাউস থেকে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে না; কিন্তু তারা ভবিষ্যতের নিরাপত্তা না পেলে ক্ষান্তও হবে না। বিবিসি জানিয়েছে, দেশটির বিভিন্ন প্রান্তের মূলত তরুণ ও পুরুষ বিক্ষোভকারীরা সরাসরি দেশ থেকে মোল্লাতন্ত্রের উচ্ছেদে ডাক দিচ্ছেন। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধসহ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ও এর প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারও চাইছেন তারা। বিভিন্ন শহরে খামিনির ছবিও পুড়িয়ে দিচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা।
পরিস্থিতি এখন যে দিকেই যাক না কেন, মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতার জন্য ইরানের স্থিতিশীলতা জরুরি। এই স্থিতিশীলতা যদি বিঘিœত হয়, তাহলে তা গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে যাবে। এতে জঙ্গি-সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরও উৎসাহিত হবে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এখনও উত্তপ্ত। ইরানের বিক্ষোভ তাতে নতুন একটি মাত্রা যোগ করল।
অনেক বিশ্লেষক এবারের বিক্ষোভকে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের প্রতিবিপ্লব হিসেবে দেখতে চাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত এই বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা সেরকম না হলেও তাদের স্লোগানগুলো কিন্তু ওইসব বিশ্লেষকে শঙ্কিত করেছে। মোল্লাতন্ত্রী ইরানি ক্ষমতাসীন সরকারের নানা ব্যর্থতার বিরুদ্ধে তরুণ সমাজ ও জনগণের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশকেই তথাকথিত বিশ্লেষকগণ ‘প্রতিবিপ্লব’ হিসেবে চিহ্নিত করতে চাচ্ছেন। আমাদের কাছে এটা স্পষ্ট অসংগঠিত ও অরাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর এই স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ কোনো প্রতি বিপ্লবের প্রকাশ নয়; বরং স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক আশা-আকাক্সক্ষারই বহিঃপ্রকাশ।

শ্রেণী:

প্যারিস অন প্লানেট সম্মেলন

Posted on by 0 comment
43

43সাইদ আহমেদ বাবু: পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার লক্ষ্যে ২০১৫ সালে প্যারিসে একটি চুক্তিতে পৌঁছায় সারাবিশ্ব। ২০০৯-এ ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে যা সম্ভব হয়নি। উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্রিন হাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর দায় কোন দেশ কতটা নেবে, সেই প্রশ্নে কোপেনহেগেনের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন ভেস্তে গিয়েছিল। পারল প্যারিস। ১৯৬টি দেশ ১৩ দিন ধরে প্যারিস জলবায়ু সম্মেলন ২০১৭ আলোচনা করে সামনে নিয়ে এলো এক চূড়ান্ত খসড়া। যাতে বলা হলো, পৃথিবীর তাপমাত্রা যেন বর্তমানের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি না বাড়ে সেটি নিশ্চিত করাই হোক বিশ্বের লক্ষ্য। তবে সকলের ইচ্ছে উষ্ণায়নকে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমায় বেঁধে রাখা। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এজন্য যথেষ্ট অনুদান দেওয়া ও পাঁচ বছর অন্তর উষ্ণায়নের পরিস্থিতি বারবার দেখার কথাও বলা রয়েছে খসড়ায়। ১৯৫টি দেশের প্রতিনিধি এ সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন। সব দেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন। সবাই মোটামুটি একটা মতৈক্যে পৌঁছাতে পেরেছে। মনে হয়, সবাই বুঝতে পেরেছে এ ছাড়া কোনো উপায় নেই। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন কম-বেশি সবাইকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। জাতিসংঘের মহাসচিব বলেছেন ‘মনুমেন্টাল সাকসেস’Ñ এ কথার একটা গুরুত্ব আছে। প্রতিটি দেশের বিভিন্ন প্রকার ধ্যান-ধারণা, মত-পথ ছিল। সবাইকে মতৈক্যে আনা সত্যি একটা কঠিন কাজ। বাংলাদেশের দাবি ছিল বেশি অর্থ পাওয়ার। এই শতাব্দীতে যেন তাপমাত্রা না বাড়ে, তাপমাত্রার বৃদ্ধি যেন দেড় ডিগ্রিতে সীমাবদ্ধ থাকে। শিল্পোন্নত দেশের কার্বন নিঃসরণের ফলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। সে জন্য আমরা ক্ষতিপূরণ চাই।
উষ্ণায়ন থেকে বিশ্বকে বাঁচাতে এটাই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক খসড়ায়, যাতে সায় দিয়েছে ভারত, চীন এবং জি-৭৭ গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলোও। কার্বন নির্গমনের প্রশ্নে উন্নত বনাম উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রচেষ্টায় এই প্রথম মধ্যপন্থা দেখাল প্যারিসের সম্মেলন। ১৩ দিনের মাথায় এখানে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন ফঁব পেশ করলেন খসড়া প্রস্তাব। আহ্বান জানালেন খনিজ তেল ও কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্রিন হাউস গ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা এবং বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে রোধ করা এই ‘ঐতিহাসিক’ খসড়া গ্রহণ করুক প্রতিটি দেশ।
তবে শুধু ভারত, বাংলাদেশ, চীন বা সৌদি নয়, পৃথিবীকে বাঁচাতে পৃথিবীর প্রতিটি দেশকেই এগিয়ে আসতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন ওলাঁদ। তিনি জানান, এ রিপোর্টের পরিকল্পনা দেশগুলো গ্রহণ করলে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণে অনেকটাই রোধ করা যাবে। আর তা না হলে পুনরায় ব্যর্থ হবে পৃথিবীকে বাঁচানোর এই উদ্যোগ। ২০০৯ সালে কোপেনহাগেনের জলবায়ু সম্মেলন ভেস্তে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ওলাঁদ বলেন, ইতিহাসের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধ থাকতে হবে।
জলবায়ুর পরিবর্তন ঠেকাতে এই খসড়াই যে এ মুহূর্তে একমাত্র আশার আলো তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন বান কি মুনও। তার কথায়, কোটি কোটি মানুষ আমাদের দিকে তাকিয়ে। জাতীয় স্বার্থের খাতিরেই এবার আমাদের বিশ্বজুড়ে এক হওয়ার সময় এসেছে। প্যারিস চুক্তির ভিন্নতা অন্য চুক্তিগুলোর চেয়ে প্যারিস চুক্তির প্রধান পার্থক্য হচ্ছে এর সময়কাল বেশি। এতে ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আর ২০২০ সালের মধ্যে চুক্তিতে অনুমোদন দেওয়া দেশগুলোকে কার্বন নির্গমন নির্দিষ্ট সীমায় নামাতে হবে।
এই চুক্তির ভিত্তিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অর্থ ও প্রযুক্তি দিয়ে সাহায্য করবে ধনী দেশগুলো। বাংলাদেশ ছিল জি-৭৭ গ্রুপে। এ ছাড়া অন্যান্য গ্রুপের মধ্যে রয়েছে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর গ্রুপ, শিল্পোন্নত দেশগুলোর গ্রুপ, দ্বীপরাষ্ট্রের গ্রুপ ইত্যাদি। বাংলাদেশ জি-৭৭ গ্রুপের মাধ্যমে মতামত তুলে ধরেছে। কোপেনহেগেনে আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের তাপমাত্রা যেন দেড় ডিগ্রির বেশি বৃদ্ধি না পায় সেই প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্যারিস চুক্তিতে বিষয়টি বিভিন্নভাবে এসেছে। এটা আমাদের একটা সফলতা বলা যেতে পারে। ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের আওতায় জলবায়ু সনদ তৈরি হয়। বাংলাদেশসহ ১৯৫টি দেশ এতে স্বাক্ষর করে। এই সনদের কার্যক্রমকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য ১৯৯৭ সালে আরেকটা সনদ তৈরি হয়, একে কিয়োটো প্রটোকল বলে। এখানেও বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করে। কিয়োটো প্রটোকলে পৃথিবীর জন্য কিছু কল্যাণকর বিষয় ছিল।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের দাবিতে যে আন্দোলন, তাতে এই পরিবর্তনের জন্য বিশ্বের ধনী দেশগুলোকেই দায়ী করা হয়েছে। এই পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব বেশি পড়ছে দরিদ্র দেশগুলোয়। ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (ইউএনএফসিসিসি) এই বৈষম্যের বিষয়টি স্বীকার করে নেয়।
বিশ্বের ১৮৮টি দেশের ঐকমত্যে ২০১৫ সালে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ১২ ডিসেম্বর ২০১৭ প্যারিসের এলিসি প্রাসাদে এই সম্মেলনে মিলিত হন বিশ্ব নেতারা। সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম ও জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস অংশ নিয়েছেন। প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে বিশ্ব নেতারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি এমন পর্যায়ে বেঁধে রাখার উদ্যোগে নেওয়া হবে, যাতে তা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি না হয়।
ফ্রান্সের প্যারিসে ওয়ান প্লানেট সামিটে নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলতে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রত্যাশা করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় উন্নত দেশগুলোর দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের তাগিদ দিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নত দেশগুলোর প্রতি আমি আহ্বান জানাতে চাই, জলবায়ু সংকটে সুবিচার প্রতিষ্ঠা এবং ইতিহাসের দায় মেটাতে তারা যেন তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করেন। কেবল যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আমরা এই পৃথিবীকে নিরাপদ করতে পারি।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জলবায়ু প্রশ্নে আমাদের যৌথ অঙ্গীকার ও উদ্যোগ শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং সমৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা রাখবে, সাম্য প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে। প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলায় উদ্যোগ গ্রহণে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর নেতৃত্বশীল ভূমিকার প্রশংসা করেন শেখ হাসিনা। গত সেপ্টেম্বরে ফ্রান্সের উদ্যোগে জাতিসংঘে ‘গ্লোবাল প্যাক্ট ফর দ্য এনভায়রনমেন্ট’ চালুর কথা উল্লেখ করেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। অথচ এ ভয়াবহ আপদের জন্য বাংলাদেশ দায়ী নয়। আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমরা প্রতিরোধ ও অভিযোজনের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা করে যাচ্ছি। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে আমাদের টেকসই উন্নয়ন কৌশলে এটিকে মূল ধারায় রাখা হয়েছে।
এই সম্মেলন থেকে শেখ হাসিনা বনায়ন কর্মসূচির মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে ২ শতাংশ বনাঞ্চল বৃদ্ধি করে বিদ্যমান ২২ থেকে ২৪ শতাংশে উন্নীতে ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, দেশের মোট আয়তনের ২২ শতাংশ বনভূমিকে আগামী পাঁচ বছরে ২৪ শতাংশে নিয়ে যেতে সরকার প্রয়োজনীয় বনায়ন কর্মসূচি নেবে। ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য ও বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন সংরক্ষণে ৫ কোটি সাড়ে ৭ লাখ ডলারের প্রকল্প হাতে নেওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশের জিডিপির ১ শতাংশ ব্যয় হওয়ার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের কৃষিকে আমরা জলবায়ু সহিষ্ণু করছি। আমরা শহরে পানি সরবরাহে ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে কাজ করছি।
সহিংসতার মুখে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে চলে আসতে বাধ্য হওয়া রোহিঙ্গাদের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিপুল সংখ্যক জনগণকে আশ্রয় দিতে গিয়ে দেশের উপকূল অঞ্চলের জলবায়ু অভিযোজনের বিষয়টি ‘বিরাট’ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের ১০ লাখের বেশি নাগরিক আশ্রয় নেওয়ায় বাংলাদেশ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। মানবিক দিক বিবেচনা করে কক্সবাজারে ১ হাজার ৭৮৩ একর বনভূমিতে এসব বাস্তুচ্যুত মানুষকে আমরা আশ্রয় দিয়েছি। প্রলম্বিত এই উদ্বাস্তু সমস্যা ওই অঞ্চলে আমাদের বন ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এ পরিস্থিতিতে সেখানে পরিবেশ সুরক্ষা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে পড়েছে।
এ শীর্ষ সম্মেলনে ১০০ বিশ্ব নেতাসহ বেসরকারি সংগঠন, ফাউন্ডেশন এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রায় ২ হাজার প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নে তার অঙ্গীকারের কথা পুনরায় উল্লেখ করেন এবং জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রনের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন।

শ্রেণী:

সৌদি আরব হবে মডারেট ইসলামি রাষ্ট্র

29

29সাইদ আহমেদ বাবু: পশ্চিম এশিয়ার সবচেয়ে বড় আরব দেশ সৌদি আরব। ইসলাম ধর্মের সূতিকাগার। মক্কা ও মদিনা বিশ্বের কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র নগরী। এ দুটি শহরই সৌদি আরবে অবস্থিত। ইসলামের প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবে সৌদি আরব বিশ্বে অদ্বিতীয়। আধুনিক সৌদি আরব প্রতিষ্ঠায় বর্তমান সৌদি রাজবংশ মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
১৮৮০ সালের পূর্বে সে সময়ের আরবীয়দের মধ্যে ছিল সত্যের উজ্জীবিত আদর্শ, নিয়মনীতি, সাম্য, মৈত্রীর এক অভিনব কানুন-শৃঙ্খলার বিস্ময়কর পরিবেশ। আরবীয়দের আদর্শের জাগরণের সৌরভে সুশোভিত হয় সারাবিশ্ব। তারাই ছিল সারা মুসলিম বিশ্বের পরিচালক ও সংস্কারক। কেননা, তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার সংবিধান রচনা হয়েছিল হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর আলোকিত সত্যের আদর্শ থেকে এবং তিনি কোরআন-সুন্নাহর আলোকে তার উম্মতগণকে ইসলামি শরীয়ত শিক্ষা দিয়েছেন সারা আরব ভূ-খ-ে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সাম্রাজ্যবাদের তল্পিবহনের পুরস্কার স্বরূপ ক্ষমতাসীন সৌদি বংশ ‘জাজিরাতুল আরব’ আরব উপদ্বীপের অধিকাংশ অঞ্চলে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। ১৮ শতকে রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ বিন সৌদের নাম থেকে এ নামটি এসেছে। আল সৌদ ৩টি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে গেছে। এগুলো যথাক্রমে প্রথম সৌদি রাষ্ট্র, দ্বিতীয় সৌদি রাষ্ট্র ও আধুনিক সৌদি আরব। প্রথমত; সৌদি রাষ্ট্রকে ওয়াহাবিবাদের বিস্তার হিসেবে ধরা হয়। দ্বিতীয়ত; সৌদি রাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ের কারণে চিহ্নিত হয়। আধুনিক সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাবশালী।
মুহাম্মদ বিন সৌদ তার পুত্র আবদুল আজিজের সাথে মুহাম্মদ বিন ওয়াহাবের মেয়ের বিয়ে দেন। এভাবেই সৌদ পরিবার ও ওয়াহাবী মতবাদের মিলনযাত্রা শুরু হয়। ১৭৬৫ সালে মুহাম্মদ বিন সৌদের মৃত্যু হলে তার ছেলে আবদুল আজিজ দিরিয়ায় ক্ষমতাসীন হন। ১৯৩০ সালের পর সৌদিতে ক্ষমতায় আসেন আবদুল আজিজ। পরবর্তীকালে তারই ছয় ছেলে একে একে সৌদির রাজ্যপাট সামলান। এ প্রজম্মের শেষ রাজা হলেন সালমান বিন আবদুল আজিজ। তিনি এবার সৌদির শাসনভার ৩২ বয়সী মোহাম্মদ বিন সালমানের হাতে তুলে দিতে চলেছেন। সেদিক থেকে এ ঘটনা তাৎপর্যপূর্ণ বটে। কেননা ৬৪ বছর পর এই প্রথম এক প্রজম্ম থেকে আরেক প্রজম্ম ক্ষমতা হস্তান্তরিত হতে চলেছে।
সৌদি আরবের বর্তমান প্রজম্ম শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশ গমণকারী। ১ লাখ ৮৯ হাজার ২৭১ সৌদি নাগরিক দেশের বাইরে অবস্থান করছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী, তাদের পরিবারের সদস্য (সন্তান, স্ত্রী বা গৃহস্থালি সদস্য)। সৌদিতে শিক্ষার হার ৯৫ শতাংশ, তন্মধ্যে পুরুষ ৮৪ শতাংশ, মহিলা ৭০.৮০ শতাংশ। সৌদি আরবের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। সৌদি পরিচয় বহনকারী প্রায় সবাই মুসলমান। ভাষা আরবি, তবে আরবির পাশাপাশি বর্তমানে ব্যাপক হারে ইংরেজির ব্যবহার লক্ষণীয়।
সৌদি কাউন্সিল অব ইকোনমিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাফেয়ার্সের প্রধান মোহাম্মদ বিন সালমান ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে দেশটির অর্থনৈতিক সংস্কারের পরিকল্পনা প্রকাশ করেন।

কে এই মোহাম্মদ বিন সালমান
১৯৮৫ সালের ৩১ আগস্ট যুবরাজ বিন সালমানের জন্ম। মা ফাহদাহ বিনতে ফালাহ বিন সুলতান তৎকালীন প্রিন্স সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের তৃতীয় স্ত্রী। রাজধানী রিয়াদের কিং সৌদ ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক হওয়ার পর বিন সালমান সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। ২০১৫ সালের আগে সৌদি আরবের বাইরে খুব কম লোকই প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের নাম শুনেছিল। ওই বছর তার বাবা সালমান বিন আবদুল আজিজ বাদশাহর সিংহাসনে আরোহণ করেন। সেই থেকে নানা তৎপরতার মধ্য দিয়ে ৩১ বছর বয়সী প্রিন্স বিন সালমান বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন।
সৌদি আরবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের জন্য প্রকাশিত তার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, যা ভিশন ২০৩০ নামে পরিচিত। ২০৩০ সালকে লক্ষ্য করে তেল-নির্ভরতা কাটিয়ে, পদ্ধতিগত দুর্নীতি থেকে মুক্তি এবং ধর্মীয় কট্টরপন্থা থেকে একটি মডারেট সমাজে দেশকে উত্তরণের প্রতিজ্ঞা করেন। তিনি অতি দ্রততার সাথে সৌদি সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে চান। নতুন এই যুবরাজ সৌদিদের কাছে অন্যতম একটি রোল মডেল হয়ে উঠছেন। ‘মিশন-২০৩০’ সালের মৌলিক উদ্দেশ্য হলো দেশের ভিতরে বাইরের বিনিয়োগ নিয়ে আসা। বাইরে থেকে বিনিয়োগ আনতে গেলেই দেশটিকে কট্টর রূপ থেকে উদার রূপের দিকে যেতে হবে। সৌদি আরবের যুব সম্প্রদায়ের তারুণ্যকে অর্থনীতির প্রগতিতে সংযুক্ত করা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষিত করে তোলা সৌদির প্রিন্সের স্বপ্ন। যুবরাজ সালমান দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অনুধাবন করে ২০১৬ সালে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। দেশটির খরচের বড় একটি খাত হলো সৌদি নাগরিকের বিদেশ ভ্রমণ, বিশেষ করে পাশ্চাত্যের নানান আধুনিক সুবিধা উপভোগ করার জন্য দেশটির যুবসমাজের বড় একটি অংশ প্রতিবছর ঝাঁকে ঝাঁকে ইউরোপ ও আমেরিকায় পাড়ি দেয়। এতে রাষ্ট্রটির বিশাল অঙ্কের টাকা খরচ হয়। ক্রাউন প্রিন্স দেশের ভিতরেই বিনোদন ব্যবস্থার আয়োজন করতে পদক্ষেপ নিচ্ছেন। সিনেমা হলসহ নানা বিনোদন কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প খুব দ্রুতই এগিয়ে যাচ্ছে।
সালমান বলেন, তিনি স্বপ্ন দেখেন ‘সংবিধান ও ইসলামের সাথে সহনশীল অবস্থান রেখে আধুনিক পদ্ধতির জীবন তৈরি করা।’ ২০৩০-এর অধীনে ২০২০ সালের মধ্যে সৌদি আরবে সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের জন্য ৪৫০টির বেশি নিবন্ধিত অপেশাদার ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হবে। এদিকে দেশটির বিনোদন ক্ষেত্র গড়ে তোলার জন্য বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ তহবিল রয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি গড়তে এই তহবিল ব্যবহার করা হবে। যে এন্টারপ্রাইজ গড়ে তোলা হচ্ছে তাতে আড়াই বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে, এতে হাজার হাজার মানুষের চাকরির সুযোগও সৃষ্টি হবে। সৌদি আরবের মতো রক্ষণশীল দেশের নাগরিকরা যেন কিছুটা হলেও আনন্দ বিনোদনের সুযোগ পায় তা নিয়েও এর আগে ভেবেছে কর্তৃপক্ষ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছে এবং চলচ্চিত্র প্রদর্শনের সুযোগও দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সৌদি আরবের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। যার প্রভাব শুধু দেশটির জন্য নয়, বিশ্ব রাজনীতিতেও ব্যাপক সাড়া পড়বে। ৩২ বছর বয়সী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান নতুন সামাজিক চুক্তির কথা বলছেন, যেখানে আগের মতো স্থবির আমলাতন্ত্র থাকবে না। তেলের বাজারে যাই হোক না কেন, যেখানে থাকবে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাময় বেগবান অর্থনীতি। তিনি ৫০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে একটি প্রযুক্তিনির্ভর শহর স্থাপনের পরিকল্পনা কথা বলছেন, তেলভিত্তিক অর্থনীতির একটি দেশ থেকে সৌদি আরবকে একটি বহুমুখী অর্থনীতির দেশে রূপান্তরের পরিকল্পনাও তিনি তুলে ধরেছেন।
বৈচিত্র্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে সমানুপাতিক হারে ইউটিউবে সৌদি নারীদের এগিয়ে আসা হোক সৌদি আরবের প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান দেশটির আমূল এই পরিবর্তনের অন্যতম কারিগর এবং সামনের দিক নেতৃত্ব দিচ্ছেন। টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে দেশটিতে দীর্ঘ সময়ের জন্য পরিবর্তন আসা শুরু হয়েছে। সৌদি নারীরা রাজধানী রিয়াদ, জেদ্দা ও দাম্মামের ৩টি স্টেডিয়ামে খেলা দেখার সুযোগ পাবেন। সৌদি নারীদের আগামী বছর থেকে গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়ার পর স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখার অনুমতি মেলে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রীদের মোবাইল ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সৌদি আরবকে উদারপন্থি দেশে পরিণত করার জন্য যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের চলমান সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে এসব পরিবর্তন। ইসলামে সর্বপ্রধান দেশ সৌদি আরবে ধর্মীয় নিয়ম ও রক্ষণশীল নীতি এভাবেই ক্রমশ বদলে যাচ্ছে। দেশটিতে সম্প্রতি দেশের মহিলাদের জন্য আইন শিথিল করা হয়েছে। সৌদি আরবে এখন থেকে মহিলারাও ফতোয়া জারি করতে পারবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির শুরা কাউন্সিল। পূর্ববর্তী নারীনীতি পরিবর্তন করে নারীদের শিক্ষা, স্ব^াস্থ্যসেবা, বিয়ে, বিদেশ ভ্রমণ, সরকারি চাকরি এবং ব্যবসায়ে অংশগ্রহণে উদারতার পক্ষে নীতিমালা প্রণীত হয়েছে। সরকারি চাকরিজীবী নারীদের অংশগ্রহণ ২২ থেকে ৩০ শতাংশে উত্তীর্ণ করা সৌদি আরবের ২০৩০ সালের লক্ষ্যের মধ্যে একটি। এ বছরের ১২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে সৌদি আরবের পৌরসভা নির্বাচন। এই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন এবং প্রার্থী হবেন সৌদি নারীরা।
সম্প্রতি দেশটির যুবরাজ সালমান জানান, উত্তর-পশ্চিমের উপকূলে বিলাসবহুল রিসোর্ট বানাবেন। আর সেই উপকূলে চলাফেরা ও পোশাকে নারীরা থাকবেন স্বাধীন। মি. সালমান বলেন, সৌদি আরব একটি মধ্যপন্থি ইসলামিক দেশ হবে যেখানে সব ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা থাকবে। ৫০টি দ্বীপকে বিশেষভাবে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সেখানকার আল-মদিনা প্রদেশের মাদাইন সালেহ নামের প্রতœতাত্ত্বিক অঞ্চলটিও পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হবে। সবচেয়ে উচ্চাকাক্সক্ষী কিছু প্রকল্পের মধ্যে লোহিত সাগরও আছে। একটি মেগাসিটি তৈরি হতে চলেছে সৌদি আরব। ২৬ হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে মিসর আর জর্ডান অবধি বিস্তৃত। সেখানে থাকবে না শরিয়া আইন, কর্তৃত্ব থাকবে সৌদি আরবের এখতিয়ারে। থাকবে আধুনিক পরিকাঠামো, খোলামেলা পরিবেশ, বিনোদনের সম্ভার। এক কথায় পৃথিবীর উন্নত দেশের যে কোনো একটি উন্নত চকচকে শহরের মতোই একটা শহর, উপকূলীয় এলাকাকে পর্যটনের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সারাবিশ্বের পর্যটকরাই এদিকে আকৃষ্ট হবেন। যেখানে বিনিয়োগ আসতে পারে অবাধে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য প্রয়োজন উদার অভ্যন্তরীণ নীতিমালা, সেখানে ইসলামি শরিয়া আইন অনুপযোগী, তবে মূল নীতিমালা থাকবে অটুট। ব্যবসায় অংশীদারিত্বে নারীদেরও মূল্যায়ন করা হবে এবং হচ্ছে। দুর্নীতিমুক্ত প্রসারিত, মুক্ত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন সৌদি প্রশাসন।
সৌদি যুবরাজের উদ্যোগে বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং উদ্যোগকারীদের নিয়ে যে বাণিজ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে, সালমান দুর্নীতি দমন করে বৈদেশিক কালাকানুন অনুযায়ী বাণিজ্যনীতি প্রণয়ন এবং প্রয়োগ করার সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা ব্যক্ত করেন এবং দুর্নীতির বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধেও সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য একটি কমিশনও তৈরি করেন। কমিশনের মূল লক্ষ্য ছিল জনতার অর্থ যাতে অপচয় না হয়, তা দেখা। দুর্নীতিগ্রস্তদের শাস্তি দেওয়া এবং যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। সৌদি আরবে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে আটক করা হয়েছে দেশটির বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিকে। আটকদের মধ্যে রয়েছেন রাজ পরিবারের সদস্য, মন্ত্রীরাও। তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে দেখানোর মতো বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। এ বিষয়ে সৌদি আরবের দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান খালিদ বিন আবদুল মোহসেন আল-মেহাইসেন জানান, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনি শক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। এই ধরপাকড়ের প্রতি সৌদি আরবের ধর্মীয় নেতারা সমর্থন জানিয়েছেন। দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাদের কাউন্সিল এক টুইট বার্তায় বলেছে, দুর্নীতি দমন অভিযান সৌদি আরবের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। যে ডিক্রিবলে কমিশন গঠন করা হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে, ‘দুর্নীতির মূলোৎপাটন এবং দুর্নীতিবাজদের জবাবদিহির আওতায় আনা না গেলে আমাদের দেশ টিকে থাকতে পারবে না।’ সৌদি আরবে সম্প্রতি দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে আটক হওয়া ব্যক্তিদের শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন দেশটির কর্মকর্তারা। কথিত দুর্নীতির অভিযোগে আটক রাজপরিবারের সদস্য ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের তারা বলেছেন, সরকারকে নগদ অর্থ দিয়ে তারা মুক্তি পেতে পারেন।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদনকারী দেশটির রাজনীতি বর্তমানে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই শুদ্ধি অভিযানের সাফল্যের ওপরই নির্ভর করছে যুবরাজ মোহাম্মদের দেশ শাসনের সক্ষমতার বিষয়টি। তিনি মনে করেন, গুণগত পরিবর্তন আনা না গেলে সৌদি অর্থনীতি সমস্যার চোরাবালিতে নিমজ্জিত হবে, যা উসকে দিতে পারে অস্থিরতাকে। নতুন ক্রাউন প্রিন্স ‘ভিশন-২০৩০’ সালের মধ্যে যেসব পরিবর্তন আনতে চাইছেন, সেটি দেশটির ধর্মীয় গোষ্ঠীসহ রাজপরিবারের ভিতরের সদস্যদেরও প্রতিক্রিয়াশীল করে তুলতে পারে। এমতাবস্থায় এটি সহজেই বলা যায়, দেশীয় কিংবা আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট যা-ই হোক, নতুন ক্রাউন প্রিন্সকে সাবধানে পা ফেলতে হবে। পুরো প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে সামনে এগোতে হবে। যুবরাজের এসব কার্যাবলি লৌহ প্রাচীরের সীমানা অতিক্রম করে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকমহলে প্রবল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। সৌদি আরবের সাধারণ মানুষ এমনিতেই রাজনৈতিক অধিকারবঞ্চিত। তারা আরও বেশি নিপীড়ন, হয়রানি ও মিথ্যাচারের কবলে নিপতিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সৌদি আরব গোটা মুসলিম বিশ্বের কাছে একটি সম্মানীয় অবস্থানে রয়েছে। একজন যুবরাজের সিদ্ধান্ত এবং অন্যায্য পদক্ষেপের কারণে সাধারণ মানুষ যেন জিম্মি না হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। অবিলম্বে ইসলামের পবিত্র ভূমিতে শান্তির বারতা প্রতিষ্ঠিত হোকÑ এই আমাদের প্রার্থনা।

শ্রেণী:

‘বিশ্বের অর্থনৈতিক সামরিক কেন্দ্রবিন্দু হবে চীন’

44

44উত্তরণ ডেস্ক: চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, বিশ্বের অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হবে চীন। তিনি বলেছেন, চীন এখন নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। তিনি চীনকে আধুনিক সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে গড়ারও অঙ্গীকার করেন। গত ১৮ অক্টোবর চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ১৯তম কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে শি জিনপিং এসব কথা বলেন।
বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে দেওয়া বক্তব্যে শি জিনপিং বলেন, চীন নতুন যুগে প্রবেশ করেছে, কারণ দেশটি এখন বিশ্বমঞ্চের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। নিজস্ব সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে চীন যেভাবে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতি লাভ করেছে তাতে অন্য দেশও এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারে বলে মনে করেন শি। কিন্তু চীন অন্য কোনো দেশের আদর্শকে গ্রহণ করবে না বলেও উল্লেখ করেন চীনা প্রেসিডেন্ট। এই কংগ্রেসের মাধ্যমে শি জিনপিং আরও পাঁচ বছর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হচ্ছেন বলেই মনে করা হচ্ছে। তিনি অনেক ক্ষমতাও পাবেন। পার্টির সাধারণ সম্পাদক শি পার্টির প্রধান হতে পারেন। প্রতি পাঁচ বছরে একবার এই কংগ্রেস বসে। এবারের কংগ্রেসে ৩ হাজারের বেশি প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছে। কংগ্রেস শেষ হওয়ার পরই কমিউনিস্ট পার্টির পলিট ব্যুরো স্ট্যান্ডিং কমিটি গঠিত হবে। এই কমিটিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।
২০৫০ সালের মধ্যে চীন বিশ্বের সেরা শক্তিধর দেশ হয়ে উঠবে জানিয়ে প্রেসিডেন্ট বলেন, পশ্চিমা ধাঁচে গণতন্ত্র ফেরানোর কোনো আগ্রহ চীনের নেই। স্বাধীনতার দাবিতে বেশ কয়েকটি প্রদেশে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, কঠোর হাতে তা দমন করা হবে।
শি বলেন, বিশ্বের নতুন সামরিক বিপ্লব উন্নয়নের প্রবণতা ও জাতীয় নিরাপত্তার চাহিদা মেটাতে চীনা বাহিনীর ২০২০ সাল নাগাদ মোটামুটি অস্ত্রের আধুনিকায়ন বাস্তবায়ন নিশ্চিত হবে, তথ্যায়ন নির্মাণ কাজের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হবে, কৌশলগত সামর্থ্য উন্নতি হবে। সামরিক তত্ত্ব বাহিনীর সাংগঠনিক আকার, সামরিক ব্যক্তি আর অস্ত্র ও সরঞ্জাম এই ৪টি ক্ষেত্রে আধুনিকায়ন এগিয়ে যাবে যাতে ২০৩৫ সালে মোটামুটি প্রতিরক্ষা বাহিনীর আধুনিকায়ন সম্ভব হবে। এ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় বিশ্বের প্রথম শ্রেণির বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হবে। শি জিনপিং দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্গীকার করে বলেন, দুর্নীতি করে কেউ রেহাই পাবে না। চীন মানব ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে উল্লেখ করে শি বলেন, চীনা নেতৃত্বকে খাটো করে এমন কোনো বৈদেশিক রাজনৈতিক নীতি গ্রহণ করা হবে না।

শ্রেণী:

পূর্ব এশিয়া ভূ-রাজনীতির চলমান উত্তেজনা

Posted on by 0 comment
59

59সাইদ আহমেদ বাবু: পূর্ব এশিয়া হলো এশিয়া মহাদেশের একটি অংশ। পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল বিশ্বের ভূ-রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করে থাকে। এটি এশিয়া মহাদেশ ও আমেরিকা মহাদেশের সংযোগস্থল বিধায় বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।
চীন পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দেশ। আয়তনের দিক থেকে এটি পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র। এর জনসংখ্যা প্রায় ১.৩ বিলিয়ন। এটি পূর্ব এশিয়ার একটি রাষ্ট্র। এর উত্তরে রয়েছে মঙ্গোলিয়া, রাশিয়া। উত্তর-পশ্চিমে কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান। পশ্চিমে তাজিকিস্তান, পাকিস্তান। দক্ষিণ-পশ্চিমে ভারত। দক্ষিণে নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, লাওস ও ভিয়েতনাম। পূর্বে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইওয়ান অবস্থিত। চীনের সাথে মোট ১৪টি রাষ্ট্রের সীমান্ত রয়েছে।
বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ার জলসীমায় রাজত্ব করেছে, তার বিশাল নৌবহর এমনভাবে এখানকার জলসীমা দাপিয়ে বেড়িয়েছে যে মনে হতো, তার রাশ টানার মতো কেউ নেই।
বৈশ্বিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশই হয় সমুদ্রপথে। ফলে সব দেশই চায়, আন্তর্জাতিক জলসীমায় তাদের চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত হোক। হ্যাঁ, বহুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কার্যত সমুদ্রপথে বৈশ্বিক যোগাযোগের পাহারাদারের কাজ করছে। একসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন নৌ-শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাতে তারা সফল হয়নি।
নতুন এক নৌ-শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন এই আন্তর্জাতিক সমুদ্রব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে উল্টে দিচ্ছে। চীন তার মহাদেশীয় প্রতিবেশীদের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী, তার নৌ-শক্তিও ক্রমেই বাড়ছে, আবার তার হাতে বিপুল পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র রয়েছে। এই বলে বলীয়ান হয়ে চীন পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ জলপথে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি সংকুচিত করেছে। হলুদ সমুদ্র (Yellow Sea) থেকে পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনী তার আশপাশের সমুদ্রসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌশক্তির উপস্থিতিকে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
দক্ষিণ চীন সাগরে চীন কৃত্রিম দ্বীপ বানিয়ে সামরিক স্থাপনার এক ছড়ানো-ছিটানো নেটওয়ার্ক ও বিমানঘাঁটি গড়ে তুলেছে। চীন পরবর্তীকালে এই ঘাঁটিকে সামরিক আক্রমণ শুরু করার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের একটি অংশ সামরিক শক্তি প্রয়োগের পক্ষপাতী, বেইজিংয়ের নৌ-শক্তি প্রদর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে তারা আরও আগ্রাসী অবস্থান নেবে। কিন্তু তারা যে চীনের সৃষ্ট কৃত্রিম দ্বীপের কাছাকাছি নজরদারি করার জন্য জাহাজ পাঠিয়েছে, তাতে দ্বন্দ্ব-সংঘাত আরও বাড়তে পারে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের লক্ষ্যে দক্ষিণ চীন সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলসহ ভারত মহাসাগরের ওপর দিয়ে অবাধ ও নিরাপদ সংযোগ পথ স্থাপনের জন্য এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ক বিস্তারের উদ্যোগ নিয়েছে এবং নিজের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছে।
চীনের জন্য প্রশান্ত মহাসাগরে প্রবেশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, উত্তর-পূর্বে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের সমন্বিত একটা বেষ্টনী এবং দক্ষিণে মালাক্কা প্রণালি, যেখানে চীনের কোনো প্রভাব নেই ও আসিয়ান (অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ ইস্ট এশিয়াা নেশন্স) দেশসমূহের অবস্থান, যে দেশগুলো চীনের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখলেও আমেরিকার বন্ধুত্বকে প্রাধান্য দেয়। এই বাধা উপেক্ষা করে প্রশান্ত মহাসাগরে প্রবেশের জন্য চীন উত্তর কোরিয়ার ‘রাজীন’ সমুদ্রবন্দর, যা পুরো বছর বরফমুক্ত থাকে, তার আধুনিকায়ন করছে। ভারত মহাসাগরে প্রবেশের বিকল্প হিসেবে পাকিস্তানের বেলুচিস্থানে ‘গোয়াদার’ সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে। যাতে প্রয়োজন হলে সড়কপথে পাকিস্তান হয়ে ‘গোয়াদার’ বন্দরের মাধ্যমে চীনের বাণিজ্য উপকরণ পার্সিয়ান গালফ, লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খাল এবং দক্ষিণে আফ্রিকা মহাদেশের দেশসমূহে পৌঁছতে পারে।
দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থিত চীনের দ্বীপ ‘হাইনানে’ তারা বড় সামরিক স্থাপনা গড়ে তুলছে। চীনের এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আমেরিকা ২০২০ সালের মধ্যে তার সামরিক শক্তি বিশেষ করে নেভাল ফোর্সের ৬০ শতাংশ মোতায়েন করার ঘোষণা দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার উত্তর মাথায় অবস্থিত ডারউইন বন্দরে আমেরিকা ২ হাজার ৫০০ মেরিন সেনা নতুনভাবে মোতায়েন করছে। এই অঞ্চলে চায়না রুখো নীতির আওতায় আমেরিকার কাছে ভারত ও ইন্দোনেশিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যবর্তী জায়গায় বিশাল দেশ ইন্দোনেশিয়া। দক্ষিণ চীন সাগরের দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের সাথে চীনের দ্বন্দ্ব বহু দিনের পুরনো। এই অঞ্চলে আমেরিকার প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তারের যে চাবিকাঠি তার মূল ভিত্তি হচ্ছে জাপান। জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপে আমেরিকার বড় সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। কোরিয়ান পেনিনসোলা এবং তাইওয়ান প্রণালিতে যে কোনো সংকটে ওকিনাওয়া সামরিক ঘাঁটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দক্ষিণ চীন সাগরের সেনকাকু দ্বীপের মালিকানা নিয়ে সম্প্রতি চীন-জাপান সম্পর্কে নতুন করে চিড় ধরছে। তবে চীনের সামরিক বাহিনীর ক্রমবর্ধমান ব্যাপক প্রসার, বিস্তার ও আধুনিকায়নের উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে এ অঞ্চলের সব রাষ্ট্রেরই সন্দেহ এবং ভয় আছে। আঞ্চলিক রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণে এ অঞ্চলের বেশিরভাগ দেশের অবস্থান যে অন্যদিকে তা চীনের উপলব্ধিতে আছে।
কোরিয়া দ্বীপ রাষ্ট্রটি উত্তর ও দক্ষিণ এই দুটি ভাগে বিভক্ত। এই দুটি রাষ্ট্র পূর্ব এশিয়ায় অবস্থিত। কোরিয়া দ্বীপটি উত্তর-পশ্চিমে চীন দ্বারা আবদ্ধ। আর উত্তর-পূর্বে রাশিয়া দ্বারা আবদ্ধ এবং কোরিয়া প্রণালি দ্বারা জাপান থেকে পৃথক। দক্ষিণে-পূর্ব চীন সাগর দ্বারা তাইওয়ান থেকে বিভক্ত। এই দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক ক্ষমতাধর দেশ এবং এই দেশটির ওপর চীনের প্রভাব বেশি।
উত্তাল বিশ্ব রাজনীতির পরিম-লে সমাজতান্ত্রিক ও মার্কসবাদী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ কমিউনিস্ট শাসিত উত্তর কোরিয়া এখন আলোচনার খোরাকে পরিণত হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার প্রতিপক্ষ অর্থাৎ মহাশক্তিধর রাষ্ট্রবর্গ দেশটির কর্মকা-ে উৎকণ্ঠিত।
একের পর এক পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে উত্তর কোরিয়া বিশ্ব দরবারে জানান দিচ্ছে যে, বৃহৎ শক্তিবর্গ যদি মারণাস্ত্র নির্মাণ করতে পারেÑ তাহলে আমরা কেন তা পারব না। তারা জানিয়ে দিচ্ছে শত্রুর কাছে মাথানত করার ন্যূনতম সুযোগ উত্তর কোরিয়ার নেই। বিশ্বব্যাপী নতুন করে যুদ্ধের দামামা শোনা যাচ্ছে। চলছে রণ-হুঙ্কার। একদিকে পরাশক্তি ও বিশ্ব মোড়ল আমেরিকা, অন্যদিকে নব্য পারমাণবিক শক্তিধর উত্তর কোরিয়া। বাকযুদ্ধ শেষ পর্যন্ত বাকযুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এখনও বিষয়টি বাকযুদ্ধ মনে হলেও পরিস্থিতি খারাপের দিকে মোড় নিচ্ছে বলে অনেকের ধারণা।
উত্তর কোরিয়ায় জ্বালানি ও খাদ্য সংকট রয়েছে। তারপরও দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় উত্তর কোরিয়া একাট্টা। দেশটির এক পাশে শক্তিধর প্রতিপক্ষ দক্ষিণ কোরিয়া এবং অন্যদিকে রয়েছে শক্তিশালী জাপান। এ দুই শক্তিকে মোকাবেলা করার জন্য উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক ও হাইড্রোজেন বোমাসহ আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ সম্পন্ন করেছে। এরই মধ্যে আমেরিকা তার মিত্র জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে নিয়ে সামরিক মহড়া অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়াকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে গিয়ে উল্টো বিপাকে পড়েছে। অর্থাৎ, পীত সাগরে মিত্র দেশের সমন্বয়ে সামরিক মহড়ার আগে পরে উত্তর কোরিয়া তার উদ্ভাবিত মারণাস্ত্রের পরীক্ষা অব্যাহত রেখে শত্রুপক্ষকে হুঁশিয়ারি প্রদান করছে।
চীন ও রাশিয়া মনে করে যে, উত্তর কোরিয়ার মাধ্যমে আমেরিকা, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে যুদ্ধ আতঙ্কে ব্যস্ত রাখতে চায়। আমেরিকাসহ তার মিত্ররা ভালো করে জানে উত্তর কোরিয়াকে চটালে এর পরিণতি হবে খুবই ভয়াবহ। তাই উত্তর কোরিয়ার হাঁকডাক নীরবে হজম করে যাচ্ছে মার্কিন মিত্ররা।
কারণ উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রভা-ার রয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতেও উত্তর কোরিয়া অনেকদূর এগিয়েছে। এখন আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রহর গুনছে। ১২৫টি সাবমেরিন বহর, সেনা ও গোলন্দাজ ডিভিশনের পাশাপাশি বিমান বাহিনীর দক্ষতাও চোখে পড়ার মতো।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নিতে তার দেশ ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত’ রয়েছে। দুদেশের মধ্যে যখন বাকবিত-া চরম আকার ধারণ করেছে তখন ট্রাম্প যুদ্ধ-প্রস্তুতির কথা বললেন।
ট্রাম্প সামরিক শক্তি প্রয়োগের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, আমরা দ্বিতীয় অপশনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং আমরা যদি তা বেছে নিই তাহলে তা হবে ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক। যদি আমাদের সামরিক ব্যবস্থা নিতে হয় তাহলে উত্তর কোরিয়াকে ধ্বংস করে ছাড়ব।
২০০৬-এর পর এ নিয়ে দেশটির ওপর অষ্টমবারের মতো অবরোধের প্রস্তাব আনা হলো।
যদিও পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি থেকে পিয়ং ইয়ং-কে বিরত রাখা সম্ভব হয়নি। কয়লা, সীসা, তৈরি পোশাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী এবারের অবরোধের তালিকায় রয়েছে।
নিরাপত্তা পরিষদে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে আনা অবরোধের প্রস্তাবের পক্ষে পড়েছে ১৫ ভোট, আর বিপক্ষে একটিও না।
যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে অবরোধ জারির জন্যে এই বৈঠকের আহ্বান জানায় আর তাতে রাশিয়া এবং উত্তর কোরিয়ার মিত্র দেশ চীনও সম্মতি জানালো।
পিয়ং ইয়ং সম্প্রতি যে পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে তা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা। আর ক্রমাগতই তারা যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানার বিষয়ে হুমকি দিয়ে আসছিল।
কোরীয় উপদ্বীপে আপাতত যুদ্ধের কোনো সম্ভাবনা দেখা না গেলেও উভয় পক্ষের হুমকি-পাল্টা হুমকি প্রত্যক্ষ করবে বিশ্ববাসী।
জাপান হলো পূর্ব এশিয়ার একটি দ্বীপরাষ্ট্র। এটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত। এটি জাপান সাগর, চীন, উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া এবং রাশিয়ার পূর্বে অবস্থিত। জাপানের উত্তর-পূর্বে চীন সাগর এবং দক্ষিণে তাইওয়ান অবস্থিত। জাপানের বৃহৎ ৪টি দ্বীপ হলোÑ হনসু, হোক্কাইডো, কিনসু এবং শিকোকো। জাপানের জনসংখ্যা প্রায় ১৩০ মিলিয়ন এবং জাপান বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ।
মার্কিন জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান জেনারেল জোসেফ ডানফোর্ড মনে করেন, রাশিয়াকে হটিয়ে ২০২৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চীন সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দেখা দেবে। এ সময় তিনি বলেন, ২০২৫ সালের মধ্যে সম্ভবত চীন হবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ৩টি বড় সামরিক হুমকি হলোÑ রাশিয়া, চীন ও উত্তর কোরিয়া।
এ মুহূর্তে চীন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রদর্শনের সামর্থ্য খর্ব করা এবং মিত্র দেশগুলোকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
চীনের সাথে চলতি বছর এই দুটি দেশের যথাক্রমে দক্ষিণ চীন সাগর ও ডোকলাম উপত্যকায় ভূখ- নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। গত বছর আফ্রিকার জিবুতিতে চীন প্রথমবারের মতো তার বৈদেশিক সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব আফ্রিকায় আরও এক ডজন এমন ঘাঁটি স্থাপনের চিন্তা-ভাবনা চলছে বলে জানা গেছে।

শ্রেণী: