বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গৌরবোজ্জ্বল ৬৯ বছর : ইতিহাসের রেখাচিত্র

Posted on by 0 comment
8-6-2018 6-42-50 PM

8-6-2018 6-42-50 PMরায়হান কবির:

(পূর্ব প্রকাশের পর)
# ১৯৮৬ সালের ১০ জুলাই সংসদ অধিবেশন বসলেও সামরিক আইন বহাল থাকে। সামরিক আইন বহাল রেখেই ১৯৮৬-এর ১৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিন ধার্য করা হয়। সামরিক শাসকরা বিরোধী দলগুলোর হরতাল, সমাবেশ এবং জনগণের অংশগ্রহণের তোয়াক্কা না করেই গায়ের জোরে ১৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠান করে। ১ নভেম্বর সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী উত্থাপন করা হয় জাতীয় সংসদে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দল সপ্তম সংশোধনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সংসদে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে। বিরোধিতার মুখেও ১০ নভেম্বর সপ্তম সংশোধনী পাস করা হয়। সপ্তম সংশোধনীর দ্বারা ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে জারিকৃত সকল সামরিক ফরমান, আদেশ, অধ্যাদেশ এবং শাসকদের সকল কৃতকর্ম ‘বৈধতা’ অর্জন করে।
# ১৯৮৬-এর ১০ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক আইন প্রত্যাহারের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
# ১৯৮৭ সালের ১, ২ ও ৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের চতুর্দশ জাতীয় কাউন্সিল। কাউন্সিলে সর্বসম্মতিক্রমে শেখ হাসিনাকে সভাপতি ও সাজেদা চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কার্যনির্বাহী সংসদ গঠিত হয়।
# ১৯৮৭ সালের ২৮ অক্টোবর দুই বিরোধী নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যে বৈঠক হয়। ১৫ দল, ৭ দল এবং ইতোমধ্যে গড়ে ওঠা ৫-দলীয় বাম জোট যুগপৎ আন্দোলনের ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছায়। ১০ নভেম্বর বিরোধী দলগুলোর উদ্যোগে ঢাকা অভিযানের কর্মসূচি নেওয়া হয়। সরকার কর্মসূচি ঠেকাতে ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু ১০ নভেম্বর ঢাকার সকল প্রবেশ পথ সরকার বন্ধ করে দিলেও হাজার হাজার মানুষ ঢাকায় সমবেত হয়। সেদিন পুলিশের গুলিবর্ষণে ঢাকার জিরো পয়েন্টের কাছে শরীরে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরতন্ত্র নিপাত যাক’ লিখে বিক্ষোভরত যুবলীগ কর্মী নূর হোসেন ও কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর থেকে আসা সিপিবি-র কর্মী আমিনুল হুদা টিটু নিহত হয়। সরকার শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে ১১ নভেম্বর গৃহে অন্তরীণ করে এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে ব্যাপক ধরপাকড় করে। বিরোধী দলের আহ্বানে ১১ থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত অর্ধদিবস এবং ২১ নভেম্বর থেকে একটানা ৪৮ ঘণ্টার হরতাল বাংলাদেশকে অচল করে দেয়। ২৭ নভেম্বর জেনারেল এরশাদ সারাদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন।
# ১৯৮৮-এর ২৪ জানুয়ারি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চট্টগ্রামে ১৫ দলের মিছিলে পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলিতে ৯ জন নিহত হয়। ১৯৮৮ সালের ২৩ মার্চ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত ছোট-বড় প্রায় সকল দল এই নির্বাচন বর্জন করে।
# ১৯৮৮ সালের ১২ এপ্রিল ১৯৮৭-এর ২৭ নভেম্বর জারিকৃত জরুরি আইন প্রত্যাহার করা হয়। ১৯৮৮ সালের ৭ জুন জাতীয় সংসদে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী বিল পাস করে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১০ জুলাই পাস করা হয় নবম সংবিধান সংশোধনী।
# ১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট শেখ হাসিনার প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে তার বাসভবনে ফ্রিডম পার্টির দুষ্কৃতিকারীরা হামলা চালায়। সমগ্র দেশে এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
# ১৯৯০ সালের ৫ জুন শেখ হাসিনা অবিলম্বে এরশাদের পদত্যাগ দাবি করেন এবং নতুন করে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের আহ্বান জানান। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দল (৮ দল) আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়। ১৯৯০-এর ১০ অক্টোবর বিরোধী জোট ও দলগুলোর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে পুলিশের গুলিবর্ষণে ৫ জন নিহত হয়।
# ১৯৯০ সালের ১৯ নভেম্বর ১৫, ৭ ও ৫ দল অর্থাৎ তিন জোট এরশাদের পদত্যাগ এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখে ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি ফর্মুলা, যা ‘তিন জোটের রূপরেখা’ হিসেবে পরিচিত ঘোষণা করে।
# ১৯৯০-এর ২৪ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর অব্যাহত ছাত্র ধর্মঘট, পেশাজীবীদের আন্দোলন, হরতাল-সমাবেশ-প্রতিবাদের মুখে শাসকগোষ্ঠী মরিয়া আঘাত হানে। ২৭ নভেম্বর বিএমএ নেতা ডা. শামসুল আলম মিলনকে এরশাদের সন্ত্রাসী গু-ারা গুলি করে হত্যা করে। এই দিন বিকেলে শেখ হাসিনাকে আটক করে গৃহবন্দি রাখা হয়। ৪ ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকায় অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টি হয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ লক্ষ লক্ষ মানুষ রাজপথে নেমে আসে। শেখ হাসিনা ১৫ দলের সমাবেশ থেকে ‘এই মুহূর্তে এরশাদের পদত্যাগ’ দাবি করেন। জেনারেল এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দেন। ৫ ডিসেম্বর তিন জোটপ্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাব করেন। অবশেষে তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী ৬ ডিসেম্বর এরশাদ বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। অবসান ঘটে দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরশাসনের।
# ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে পঞ্চম জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী জোটভুক্ত দলগুলো ৯৯টি আসন লাভ করে। বিএনপি পায় ১৪২টি আসন। তারপরও সরকার গঠনে বিএনপিকে জামাতের ১৮ সদস্যের সমর্থন নিতে হয়।
# ১৯৯১ সালের ৩১ জুলাই আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বাধীন বাকশাল আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, ১৪ আগস্ট থেকে তা কার্যকর হয়। অন্যদিকে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে দলের অভ্যন্তরে আবার উপদলীয় কর্মকা- শুরু হয়। ১৯৯২ সালের ২১ জুন ড. কামাল হোসেন ৪৮ সদস্য বিশিষ্ট ‘গণতান্ত্রিক ফোরাম’ গঠন করেন। এই গণতান্ত্রিক ফোরামই ১৯৯৩ সালের ২৩ আগস্ট ‘গণফোরাম’ নামে রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়।
# ১৯৯২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি গোলাম আযম ও তার সহযোগীদের বিচারের লক্ষ্যে জাহানারা ইমামকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয় জাতীয় সমন্বয় কমিটি। ১৫ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লক্ষ মানুষের সমাবেশে গণ-আদালতের এজলাস বসিয়ে যুদ্ধাপরাধের জন্য গোলাম আযমের ফাঁসির রায় ঘোষণা করা হয়। শেখ হাসিনা একে জনতার বিজয় বলে অভিহিত করেন। কবি সুফিয়া কামাল, জাহানারা ইমাম ও শেখ হাসিনা এক মঞ্চ থেকে গোলাম আযমের ফাঁসির রায় কার্যকর করার দাবিতে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের আহ্বান জানান। সরকার জাহানারা ইমামসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে।
# ১৯৯২ সালের ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলের দ্বিতীয় দিন ২০ সেপ্টেম্বর নতুন অর্থনৈতিক নীতিমালার আলোকে দলের ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্রের সংশোধনী সর্বসম্মতিতে গৃহীত হয়। ওই দিন রাত ৮টায় কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ ও জেলা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক সমন্বয়ে গঠিত সাবজেক কমিটি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের রুদ্ধদ্বার কক্ষে বৈঠক বসে এবং শেখ হাসিনাকে সর্বসম্মতভাবে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। এরপর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন প্রশ্নে দীর্ঘক্ষণ আলোচনার পর ২১ সেপ্টেম্বর ভোর পৌনে ৪টায় জিল্লুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে কাউন্সিল।
# ১৯৯৪ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোহাম্মদ হানিফ মেয়র পদে জয়লাভ করেন। কিন্তু সরকার-দলীয় পরাজিত কমিশনার প্রার্থীর ব্রাশফায়ারে ওই দিন ঢাকার লালবাগে ৬ আওয়ামী লীগ কর্মী-সমর্থক নিহত হন।
# মিরপুর ও মাগুরা উপনির্বাচনে বিএনপির ভোট ডাকাতি ও কারচুপির পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার’-এর অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি উত্থাপন করে। বিরোধী দলগুলো এই দাবি সমর্থন জানায়। গড়ে ওঠে আন্দোলন।
# ১৯৯৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনা উত্তরবঙ্গে গণ-সংযোগের জন্য ট্রেন অভিযাত্রা শুরু করেন। ২৩ সেপ্টেম্বর ঈশ্বরদী ও নাটোরে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ, বোমাবাজি, হামলা ও সন্ত্রাসী তা-ব চালায় বিএনপি ক্যাডাররা। ৬ ডিসেম্বর সংসদের বিরোধী দলগুলো পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়। ২৮ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ থেকে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামাত ও এনডিপি দলীয় সংসদ সদস্যগণ একযোগে পদত্যাগ করেন।
#১৯৯৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগের বিশেষ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়।
#১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপি কর্তৃক একদলীয় ভোটারবিহীন নির্বাচন। তীব্র গণ-আন্দোলনের মুখে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে খালেদা সরকার পদত্যাগ করে। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর।
#১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আওয়ামী লীগ মোট ভোটের ৩৭.৫৩ শতাংশ ভোট ও ১৪৬টি আসন পায়। বিএনপি পায় ৩৩.৪০ শতাংশ ভোট ও ১১৬টি আসন। জাতীয় পার্টি পায় ১৫.৯৯ শতাংশ ভোট ও ৩২টি আসন এবং জামাত পায় ৮.৫৭ শতাংশ ভোট ও ৩টি আসন। বামফ্রন্ট কোনো আসন পায়নি, ভোট পায় ০.৪২ শতাংশ। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ জনগণের রায় নিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে। ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা দিবসে শেখ হাসিনা জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করেন।

১৯৯৬-২০০১ আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামল
বিএনপি আমলের খাদ্য উৎপাদন ১ কোটি ৮০ লাখ টন থেকে ২ কোটি ৬৯ লাখ টনে উন্নীতকরণ। খাদ্যে আত্মনির্ভরশীলতার পথে দেশ। শেখ হাসিনার জাতিসংঘের ‘সেরেস’ পুরস্কার অর্জন।
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের সাথে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি সম্পাদিত। পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়।
পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রাতৃঘাতী হানাহানি বন্ধ। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর। শেখ হাসিনার ইউনেস্কোর হুফে বয়েনি শান্তি পুরস্কার লাভ।
যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণকাজ সম্পন্ন।
নারীর ক্ষমতায়ন। স্থানীয় সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন প্রথা চালু। পিতার সাথে মাতার নাম লেখা বাধ্যতামূলক করা।
প্রবৃদ্ধির হার ৬.৪ শতাংশে উন্নীতকরণ এবং মুদ্রাস্ফীতি ১.৪৯ শতাংশে নামিয়ে আনা। ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ।
১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা দান করে।
# ১৯৯৭ সালের ৬ ও ৭ মে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিল শেখ হাসিনাকে সভাপতি ও জিল্লুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক পুনর্নির্বাচিত করে।
# ২০০০ সালের ২৩ জুন পল্টন ময়দানে আওয়ামী লীগের বিশেষ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়।
# ২০০১-০৬, ১ অক্টোবর কারচুপির নির্বাচন। বিএনপি-জামাত জোটের ক্ষমতা দখল। হত্যা, নির্যাতন, দুর্নীতি ও দুঃশাসনের কালো অধ্যায়।
# ২০০২ সালের ২৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল। শেখ হাসিনা সভাপতি হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন। সাধারণ সম্পাদক হন মো. আবদুল জলিল এমপি।
# ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা। আইভি রহমানসহ ২৪ নেতাকর্মী নিহত। শেখ হাসিনার কানের পর্দা ফেটে গিয়ে আহত।
# ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী দলের আন্দোলনের মুখে বিএনপি-জামাতের নীলনকশার নির্বাচন বাতিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্বঘোষিত প্রধানের পদ থেকে ইয়াজউদ্দিনের পদত্যাগ। জরুরি অবস্থা ঘোষণা।
ড. ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বে নতুন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্বভার গ্রহণ।
শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে অপসারণের উদ্দেশ্যে মাইনাস টু ফর্মুলা প্রদান।
১৬ জুলাই, ২০০৭-এ জননেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার।
বিএনপিতে সংস্কারবাদীদের ভিন্ন কমিটি গঠন। আওয়ামী লীগে সংস্কারবাদীরা কোণঠাসা।
# ২০০৮ : গণ-আন্দোলনের মুখে মাইনাস টু ফর্মুলা ব্যর্থ। শেখ হাসিনাকে মুক্তিদান। ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত। ৩০০টির মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের ২৬৪টি আসন লাভ।
#২০০৯ সালের ২৪ জুলাই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অষ্টাদশ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে। কাউন্সিলে পরিবর্তিত বাস্তবতার আলোকে নতুন ঘোষণাপত্র গ্রহণ করা হয়। কাউন্সিলে শেখ হাসিনা সভাপতি এবং সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
# বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পর ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার দ-প্রাপ্ত আসামির মৃত্যুদ- কার্যকর। জাতি হয় কলঙ্কমুক্ত।
#২০১২ সালের ২৯ ডিসেম্বর দলের আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে শেখ হাসিনা সভাপতি এবং সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
# ২০০৯-১৪ জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকারের সময়কালে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার কর্মযজ্ঞ শুরু হয়। সবগুলো সূচকেই এগিয়ে যায় বাংলাদেশ।
# ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয় লাভ করে আওয়ামী লীগ। তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন জননেত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৯ থেকে ২০১৬ বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বের এ সময়কালে দুর্বারগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
#২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত তিন মেয়র প্রার্থী নির্বাচিত হন।
# ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের যাত্রা শুরু হয়। এ পর্যন্ত দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত ২৬৫টি পৌরসভার মধ্যে নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগ মনোনীত ২০২ প্রার্থী জয়লাভ করেন।
# ২০১৬ সালে ৬ ধাপে দেশের ৪ হাজার ১০৪টি ইউনিয়ন পরিষদে প্রথমবার দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ৬৬৭টি ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান পদে নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী বিজয় লাভ করে।
# ২০১৬ সালের ২২ ও ২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে জননেত্রী শেখ হাসিনা সভাপতি এবং ওবায়দুল কাদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন। এই কাউন্সিলের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য সংখ্যা ৭১ থেকে ৮১-তে উন্নীত করা হয়। একইভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্যান্য শাখার কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য সংখ্যাও বৃদ্ধি করা হয় এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ড গঠনসহ বেশ কিছু সংশোধনী ও নতুন ধারা সংযোজিত হয়।
# ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী  ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভি বিপুল ভোটে জয়লাভ করে।
# ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর জেলাপরিষদ চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হয় জেলে পরিষদ নির্বাচন। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
# ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থ।
# ২০১৭ সালের ২০ মে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে অনুষ্ঠিত হয়।
# ২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবর ‘জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো)’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কোর ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল হেরিটেজ রেজিস্টার’ বা বিশ্ব ঐতিহ্যের দলিল হিসেবে ঘোষণা করে।
# ২০১৮ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের স্বীকৃতি অর্জন করে বাংলাদেশ।
# ২০১৮ সালের ২৭ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ‘গ্লোবাল সামিট অন উইমেন’ প্রদানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনাকে ‘গ্লোবাল লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করে।
# ১১ মে শুক্রবার (বাংলাদেশ সময়) দিবাগত রাত ২টা ১৪ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মহাকাশ কেন্দ্র ‘স্পেস-এক্স’ থেকে নিজস্ব উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট’ উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে স্যাটেলাইট যুগে প্রবেশ করে বাংলাদেশ।
# ২৬ মে কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৯তম জন্মজয়ন্তীতে পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলের ‘কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব লিটারেচার (ডি-লিট)’ প্রদান করে।  গণতন্ত্র, নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন থেকে জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এ সম্মাননা প্রদান করে ‘কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়’।
[সমাপ্ত]

শ্রেণী:

শেষের সেদিনে মুখোমুখি যারা

Posted on by 0 comment
shPMc

shPMcজাফর ওয়াজেদ: ছিলেন তিনি ক্ষণজন্মা পুরুষ। হিমালয়ের চেয়ে উঁচু যার ব্যক্তিত্ব ও সাহস। নিজ জাতিকেও করে তুলেছিলেন সাহসী যোদ্ধা। স্বাধীন দেশে ষড়যন্ত্রকারীরা শান্তিতে দেশ পরিচালনা করতে দেয়নি। কেমন কেটেছে শেষের দিনগুলো? রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শেষের দিনগুলো কেমন ছিল? ঘাতকের নিঃশ্বাস কি তিনি অনুভব করতে পেরেছিলেন? ‘নাগিণীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস’; যিনি নিজেই জনসভায় আবৃত্তি করতেন, তিনি কি টের পাবার সময়টুকু পেয়েছিলেন যে ঘাতকরা যে কোনো সময়, যে কোনো মুহূর্তেই আঘাত হানবে? বিশ্বাস তো ছিল তার প্রখর যে, কোনো বাঙালি তাকে হত্যা দূরে থাক, আঘাত করার মতো মানসিকতা রাখে না। ভেবেছিলেন ‘সাড়ে সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালী করে, মানুষ করো নি’র বিপরীতে তার বাঙালি মানুষে পরিণত হয়েছে; সুতরাং মনুষ্যবিবর্জিত কোনো কর্মকা- বাঙালি করবেÑ এ ছিল ভাবনার জগতে অস্পৃশ্য। অথচ বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ঘাতকরা তখনও ‘শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস’ করে অস্ত্র শানিয়ে যাচ্ছে ষড়যন্ত্রের নানা ঘুঁটি পাকিয়ে। দেশজুড়ে নানারকম অস্থিরতা, অরাজকতার যে ডালপালা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, তা নিরসনের পদক্ষেপগুলো দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। তার প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল শান্তির পরিবেশ সৃষ্টির। আর এই সময়টাতে তিনি দ্রব্যমূল্যকে নিয়ে এসেছিলেন নিয়ন্ত্রণে। সবকিছু সুনসান হয়ে ওঠার মুহূর্তগুলো ধরা দিতে থাকে ক্রমশ।
শেষের দিনগুলোতে খুনিদের সহযোগী, পরামর্শকরাও দেখা-সাক্ষাৎ করেছেন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। তারা কি ঘটনাপূর্ব ‘রেকি’ করছিলেন না-কি সবটাই দাফতরিক কাজ ছিল, তা স্পষ্ট হয় পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে সেনাবাহিনীর কতিপয় বিপথগামী সদস্য। এই হত্যা পরিস্থিতি সৃষ্টির নেপথ্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে জড়িত ছিল দেশি-বিদেশি অনেক কুশীলব। সেসব ক্রমশ প্রকাশিত হয় এখনও। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে। কিন্তু হত্যার ষড়যন্ত্র আজও সম্পূর্ণ ও সঠিকভাবে অনুদ্ঘাটিত।
১৯৭৫ সালের ১ আগস্ট হতে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত দু-সপ্তাহের দিনগুলোতে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু কাটিয়েছিলেন খুবই ব্যস্ত সময়। সরকারি কর্মসূচির বাইরেও গঠিত নতুন দল বাকশালের পূর্ণাঙ্গ ‘সেট আপ’ তৈরিতেও ছিলেন ব্যস্ত। পাশাপাশি খুনিরাও ছিল অপতৎপরতায় শশব্যস্ত।
রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের ১৪ দিনের সরকারি কর্মসূচির তালিকা পর্যালোচনা করলে বিস্ময় জাগে যে, শেষের সেই দিনগুলোতে ব্যস্ততার মাঝেও কেটেছে রাষ্ট্রনায়কের বিচিত্র মানুষের সংস্পর্শে। নেতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল এমন লোকজন ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও শেষ দিনগুলোতে তাকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে দিয়েছে, এমনটা নয়। নানামুখী চাপ তার স্কন্ধজুড়ে তখন।
বিস্ময় বাড়ে যে, বঙ্গবন্ধুর এই সময়ের সাক্ষাৎপ্রার্থী, যারা নেতার সান্নিধ্য পেতে ভিড় করেছিলেন তাদের অনেককেই দেখা গেছে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতের পর তার খুনি ও শত্রুদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ ও হাতে হাত মেলাতে, দখলদার সরকারের মন্ত্রী হতে। ছিল যারা তার পারিষদ। আরও বিস্ময় জাগায় যে, বঙ্গবন্ধুর হত্যার সঙ্গে যেসব দেশ বা তার রাষ্ট্রদূতরা নানাভাবে জড়িত তা ক্রমশ প্রকাশিত হচ্ছে এই একুশ শতকে এসেও। ফাঁস হচ্ছে ষড়যন্ত্রের নানাবিধ জাল। দেখা যায়, শেষের দিনগুলোতে তাদের কয়েকজন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, কথা বলেছেন। তারা রাষ্ট্রপতি মুজিবের মানসিক অবস্থা বুঝতে দেখা করেছিলেন সম্ভবত। অনুমান করা যায়, তাদের এই সাক্ষাৎ বঙ্গবন্ধুর ভেতরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে ‘ঝোপ বুঝে কোপ মারার’ মতোই ছিল হয়তো।
কর্মসূচি ছিল ১৫ আগস্ট সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বঙ্গবন্ধুর। তার একদিন আগে ১৩ আগস্ট রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। ১৫ আগস্টের ১০ দিন আগে ৫ আগস্ট দেখা করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইএ বোস্টার। সর্বশেষ সাক্ষাৎপ্রার্থী ছিলেন ১৪ আগস্ট সাংসদ অধ্যাপক আজরা আলী, যিনি ১৫ আগস্ট মোশতাকের পার্শ্বচর হয়ে যান। এমনকি খুনিদের পক্ষে সাফাই গেয়ে অন্য সাংসদদের মোশতাকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের জন্য চাপ প্রয়োগ করতেন। পরবর্তীতে তিনি মোশতাকের দল ডেমোক্র্যাটিক লীগও করেন। প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী নুরুল ইসলাম চৌধুরী সর্বাধিক সাক্ষাৎ করেছেন একা বা তিন বাহিনী-প্রধানকে নিয়ে পৃথকভাবে।
রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের দৈনন্দিন সরকারি কর্মসূচিতে নজর দিলে দেখা যায়, সাক্ষাৎপ্রার্থীরা সাক্ষাৎকালে বেশি সময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন, তা নয়। ১৫ হতে ২৫ মিনিট সময়কাল তারা অতিবাহিত করেন। স্বল্প সময়ে তারা কি হাসিল করেছেন তা স্পষ্ট হয় তাদের পরবর্তী কার্যক্রমে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কর্মরত অনেকেই পরে খুনিদের সঙ্গে হাতও মেলায়। সর্বশেষ দিন ১৪ আগস্টের তালিকা হতে পেছনের দিকে গেলে ভেসে আসে অনেক নাম, যাদের স্বরূপ উন্মোচিত হয় ১৫ আগস্টের পর।
১৪ আগস্টের তালিকায় দেখা যায় দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং হির বিশেষ দূত সাক্ষাৎ করেন। সকাল ১০টায় নৌবাহিনী প্রধান দেখা করেন, যিনি ১৫ আগস্ট সকালে বেতারে গিয়ে মোশতাকের প্রতি আনুগত্যের ঘোষণা দেন অন্য বাহিনী-প্রধানদের সঙ্গে। ওই দিন সকাল সাড়ে ১০টায় খুনিদের অন্যতম সহযোগী বেতার ও তথ্য প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুর এবং সকাল ১১টায় প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী চট্টগ্রামের পটিয়ার নুরুল ইসলাম চৌধুরী ও বিমানবাহিনীর প্রধান এ কে খোন্দকার দেখা করেন। তাদের এই সাক্ষাতের ১৮ ঘণ্টা পর বঙ্গবন্ধু খুন হন। বিমানবাহিনী প্রধান ১৫ আগস্ট সকালে মোশতাকের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন। প্রতিমন্ত্রী পরে মোশতাকের মন্ত্রী হন। সকাল সাড়ে ১১টায় দেখা করেন জাতীয় লীগ সভাপতি আতাউর রহমান খানের দুই কন্যা। এদের জামাতারা এবং সহোদররা পরে বিএনপিতে যোগ দেয়। বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বোস প্রফেসর ড. আবদুল মতিন চৌধুরী দেখা করে পরদিন সমাবর্তন আয়োজন সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুকে অবহিত করেন। সন্ধ্যা ৬টায় শিক্ষামন্ত্রী প্রফেসর মোজাফফর আহমদ চৌধুরী ও শিক্ষা সচিব সাক্ষাৎ করেন। ড. মোজাফফর পরে জিয়ারও শিক্ষা উপদেষ্টা হয়েছিলেন। সর্বশেষ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সাক্ষাৎ করেন সংসদ সদস্য অধ্যাপক আজরা আলী এবং শ্রীমতি সুপ্রভা মাঝি। আজরা আলী মোশতাকের ডেমোক্র্যাটিক লীগের নেত্রী হয়েছিলেন। সুপ্রভা সম্পর্কে পরে কিছু জানা যায়নি। অনুমান করা যায়, আজরা আলী সেদিন বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে হয়তো এমন তথ্য নিয়েছেন, যা হত্যাকারীদের পরিকল্পনায় কাজে লেগেছে। ১৩ আগস্ট ছিল বুধবার। সকাল ১১টায় যুক্তরাষ্ট্রে নবনিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এমআর সিদ্দিকী বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় চাঁদপুরের এমপি এমএ রব সাক্ষাৎ করেন।
মঙ্গলবার ১২ আগস্ট সকাল ১০টায় সাক্ষাৎ করেন অর্থমন্ত্রী ড. আজিজুর রহমান মল্লিক, যিনি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী কর্নেল ফারুকুর রহমানের সম্পর্কে আপন খালু এবং মোশতাকের অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিন দিন পর ১৫ আগস্ট সন্ধ্যায় শপথ নেন যখন বঙ্গবন্ধুর লাশ সিঁড়িতে। সন্ধ্যা ৬টায় দেখা করেন সফররত কমনওয়েলথ সেক্রেটারি অধ্যাপক এএফ হোসেন, যিনি পাকিস্তানি।
শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলী ১১ আগস্ট সোমবার সকাল ১১টায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বাকশালের অঙ্গ সংগঠন জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি ছিলেন। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠকারী। এই সাক্ষাতের চার দিন পর তিনি মোশতাকের মন্ত্রী হন। পরে জিয়াউর রহমানেরও শিক্ষামন্ত্রী হয়েছিলেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সাক্ষাৎ করেন কর্মকমিশনের সদস্য আযহারুল ইসলাম।
রোববার ১০ আগস্ট ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন। পাকিস্তান জামানা হতে এই ছুটি বহাল ছিল। এরশাদ যুগে রোববার ছুটি বাতিল হয়। ৯ আগস্ট শনিবার বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার স্থানীয় প্রতিনিধি ড. স্যাম স্ট্রিট সকাল ১০টায় সাক্ষাৎ করেন। আর সকাল ১১টায় প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী নুরুল ইসলাম চৌধুরী ও সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহ। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সন্ধ্যা ৬টায় বাকশালের সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান ও কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যসহ অন্যরা সাক্ষাৎ করেন। এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর বাকশাল নেতাদের প্রতি শেষ ভাষণ। সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় অ্যাটর্নি জেনারেল দেখা করেন।
৮ আগস্ট ছিল শুক্রবার। সকাল ১০টায় প্রথম ও দ্বিতীয় কর্মকমিশনের চেয়ারম্যানদ্বয় দেখা করেন। সকাল সাড়ে ১০টায় রেল প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ আলতাফ হোসেন এবং সাড়ে ১১টায় পানি, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী মোমিনউদ্দিন আহমদ সাক্ষাৎ করেন। এরা দুজন পরে মোশতাকের মন্ত্রী হন। সৈয়দ আলতাফ ছিলেন ন্যাপ (মুজাফফর) নেতা।
৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টায় সুইজারল্যান্ডের নয়া রাষ্ট্রদূত পরিচয়পত্র পেশ করেন বঙ্গবন্ধুর কাছে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে ‘প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ডে’ রূপান্তর করার যে স্বপ্ন দেখেন, তা ব্যক্ত করেন। পরদিন সংবাদপত্রে তা ছাপা হয়। সকাল সাড়ে ১০টায় প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী নুরুল ইসলাম চৌধুরী, ১১টায় বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজী সাক্ষাৎ করেন। এরা দুজনে পরে মোশতাকের মন্ত্রী হন। বেলা ১২টায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন বিদেশ সফরের প্রাক্কালে সাক্ষাৎ করেন, যা ছিল শেষ সাক্ষাৎ। এই দিন বিকেল সাড়ে ৫টায় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার সমর সেন সাক্ষাৎ করেন। এই সাক্ষাৎকালে মিস্টার সেন সতর্ক করেছিলেন বঙ্গবন্ধুকে নানা ষড়যন্ত্র সম্পর্কে। প্রতিক্রিয়াশীল চক্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বলে তাদের কাছে তথ্য ছিল। সন্ধ্যা ৬টায় জাতীয় কৃষক লীগ কেন্দ্রীয় সদস্য আবদুল আওয়াল এবং ৬টা ১০ মিনিটে কাজী মোজাম্মেল হক এমপি সাক্ষাৎ করেন।
৬ আগস্ট বুধবার দুপুর ১২টায় শ্রমমন্ত্রী জহুর আহমদ চৌধুরী এবং ১২টা ১০ মিনিটে সংস্কৃতি, তথ্য ও বেতারমন্ত্রী কোরবান আলী ও প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুর এবং সচিব মতিউল ইসলাম দেখা করেন।
৫ আগস্ট মঙ্গলবার সকাল ১০টায় সাক্ষাৎ করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইএ বোস্টার। বোস্টার জানতেন খুনিদের তৎপরতা। তিনি শেখ মুজিবকে ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক করেন নি। বরং ঘটনার অনুচক্র হিসেবে তার ভূমিকা পরে প্রকাশিত হচ্ছে, হবে। হত্যাকা- সংঘটিত করার নেপথ্যে তার ভূমিকার কথা সর্বজনবিদিত। সাড়ে ১০টায় সাক্ষাৎ করেন শিল্পমন্ত্রী। বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে সিলেটের সাংসদ মোহাম্মদ ইলিয়াস, কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী ও গিয়াসউদ্দিন চৌধুরী সাক্ষাৎ করেন। এই তিন সাংসদের কেউই মোশতাককে সমর্থন করেন নি; না করায় মানিক চৌধুরীকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হয়। এদিন সন্ধ্যা ৬টায় ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার শামসুর রহমান বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন এবং গাইডলাইন নেন। ২০ আগস্ট তিনি মোশতাক সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সাক্ষাৎ করেন বেতারের ডিজি আশরাফুজ্জামান খান।
৪ আগস্ট সোমবার। সকাল ১০টায় দেখা করেন পাকিস্তান ফেরত মেজর জেনারেল মাজেদুল হক। ঢাকায় আসার আগের দিনও পাকিস্তান সরকারের অধীনে চাকরি করেছেন। ঢাকায় স্ক্রিনিং বোর্ড তাকে বাদ দেয়। কিন্তু তদবিরে সফল হয়ে সেনাবাহিনীর চাকরি ফিরে পান। পরে জিয়া-খালেদার মন্ত্রী হন। এই দিন বিকেল সাড়ে ৫টায় মোয়াজ্জেম আহমদ চৌধুরী, সন্ধ্যা ৬টায় জাতীয় কৃষক লীগ নেতা রহমত আলী এমপি সাক্ষাৎ করেন। তিনি মোশতাকের ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ’ কর্মসূচির কর্ণধার ছিলেন। সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে মস্কোতে নিয়োগপ্রাপ্ত বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত শামসুল হক সাক্ষাৎ করেন।
২ আগস্ট শনিবার সকাল পৌনে ১০টায় উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত ইয়াং ফপ দেখা করেন। সাড়ে ১০টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর কফিলুদ্দিন মাহমুদ, সন্ধ্যা ৬টায় সাবেক এমসিএ মোশাররফ হোসেন চৌধুরী এবং সোয়া ৬টায় সিলেটের মোস্তফা শহীদ এমপি সাক্ষাৎ করেন।
১ আগস্ট শুক্রবার দুপুর ১টায় প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী নুরুল ইসলাম চৌধুরী এবং দুপুর দেড়টায় পাহাড়ি নেতা মংপ্রু সাইন সাক্ষাৎ করেন।
রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের এই সরকারি কর্মসূচির বাইরেও অনেক অনির্ধারিত কর্মসূচি থাকত। নির্ধারিত তালিকার বাইরেও অনেক সাক্ষাৎপ্রার্থী আসত। সাধারণত তিনি কাউকে ফিরিয়ে দিতেন না। বাসায়ও দর্শনার্থীর ভিড় থেকেই যেত এবং এটা ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফেরার পর হতেই।
বঙ্গবন্ধুর দৈনন্দিন কর্মসূচির যে বিবরণী পাওয়া যায়, তাতে একাধারে বাংলা, খ্রিস্টীয় ও আরবি সন তারিখ মাসের উল্লেখ থাকত। সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের সময়ও।
১ থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত সময়কালে দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি সাক্ষাৎ করেছেন প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী নুরুল ইসলাম চৌধুরী, যিনি মোশতাকের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন ও দায়িত্ব পালন করেন। আর এই মন্ত্রীর অধীনে সশস্ত্র বাহিনীর বিপথগামী একাংশ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল। হত্যার ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটিত হলে অনেক ঘটনা, ব্যক্তিবিশেষের ভূমিকা সবই প্রকাশিত হতো। কিন্তু সে কাজটি আজও হয়নি। বর্তমান সরকার দেশ, জাতির স্বার্থে হত্যা-ষড়যন্ত্রের ইতিহাস প্রকাশ করতে পারে।

শ্রেণী:

আওয়ামী লীগবিরোধী প্রচারের ৬ দশক ‘ঢেউয়ের ওপর দিয়ে যেন পালের নৌকো’

Posted on by 0 comment
aa

aaশেখর দত্ত:

(পূর্ব প্রকাশের পর)
সামরিক শাসনবিরোধী সংগ্রাম : ১৯৬২ সাল
১৯৬০ সালের শুরুতেই মৌলিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়া হ্যাঁ ভোট না ভোট করে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট হয়ে ভাবলেন, ক্ষমতাকে আরও নিরঙ্কুশ পাকাপোক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী করতে হবে। এই লক্ষ্যে তিনি একদিকে পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা সংস্কৃতিকে ধ্বংস করা, শিক্ষাব্যবস্থাকে কায়েমি স্বার্থে ঢেলে সাজানো প্রভৃতির সাথে আওয়ামী লীগ ও কমিউনিস্ট পার্টি এবং ছাত্র আন্দোলন ও সংগঠনকে দমন-পীড়ন ও অপপ্রচারের মাধ্যমে নস্যাৎ করা ষড়যন্ত্র-চক্রান্তে মেতে ওঠে।
প্রসঙ্গত, ভাষা আন্দোলন থেকে সামরিক শাসন পর্যন্ত সময়কালে আওয়ামী লীগের সাথে বাম ও কমিউনিস্টদের রাজনীতির বিভিন্ন প্রশ্নে বিভেদ, আওয়ামী লীগ বিভক্ত হয়ে ন্যাপের সৃষ্টি এবং পরস্পর কাদা ছোড়াছুড়ি হলেও মূলত নবোত্থিত বাঙালি জাতীয়তাবাদী শক্তি ও বাম কমিউনিস্টরা একত্রেই পাকিস্তানের শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামের মাঠে ছিল। এ কারণ ছাড়াও কমিউনিস্ট নেতারা ছিল মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ের। তাই কমিউনিস্ট বিরোধী প্রচারের সাথে হিন্দুবিরোধী প্রচার করে দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষদের বিভ্রান্ত করা সহজ ছিল। তাই দুই দলকে টার্গেট করে সামরিক সরকার অগ্রসর হয়।
নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হয়েই আইয়ুব খান ‘ব্যুরো অব ন্যাশনাল রিকনস্ট্রাকশন-বিএনআর’ ও ‘পাকিস্তান লেখক শিবির’ নামে দুটো সংস্থা গঠন করে। এই দুই সংগঠনের কাজ হয়ে দাঁড়ায় বুদ্ধিজীবীদের টোপ দিয়ে সংগঠিত করে পাকিস্তানি তমুদ্দুন ও মৌলিক গণতন্ত্রের পক্ষে এবং নবোত্থিত বাঙালি জাতীয়তাবাদকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করা এবং কমিউনিস্ট জুজুর ভয় দেখিয়ে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করে জনগণকে সেনাশাসনের পক্ষে রাখা। এ সময়ে উর্দু-বাংলার সংমিশ্রণে রোমান হরফে নতুন ভাষা ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’ এবং জাতীয় শিক্ষা কমিশন কীভাবে পাকিস্তানকে রক্ষা করার সহায়ক হবে, তা নিয়ে প্রচার জোরদার করা হয়। পরোক্ষ সামরিক শাসনের তীব্র দমন-পীড়ন, বাক-ব্যক্তি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাহীন অবস্থার মধ্যে তখন প্রচার হতে থাকে আইয়ুব খান আল্লাহ-এর প্রেরিত পুরুষ, রাজনীতিকদের হাত থেকে পাকিস্তানকে রক্ষা করতে তিনি পাকিস্তানের রাজনীতিতে ও ক্ষমতায় এসেছেন।
এতসব করেও সেনাশাসক আইয়ুব খান গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বাধিকার আন্দোলনকে গলা টিপে হত্যা করতে পারল না। ১৯৬১ সালে প্রথমে একুশে ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবস এবং পরে এপ্রিল-মে মাসে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনকে কেন্দ্র করে আবারও আন্দোলন-সংগ্রাম জেগে ওঠে। ফলে শুরু হয় বাংলা ভাষা ও রবীন্দ্রবিরোধী প্রচারণা এবং হুমকি-ধমকি। কবিগুরুকে ‘মুসলিমবিদ্বেষী হিন্দু’ এবং তার সাহিত্য ও সংগীত ‘বিজাতীয়’, ‘ইসলাম তথা পাকিস্তানের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ববিরোধী’, তাকে নিয়ে মাতামাতির অর্থ ‘অখ- রাম রাজত্ব প্রতিষ্ঠার’ তৎপরতা এবং মুসলমানদের জন্য তা ‘হারাম’ ও ‘নিশ্চিত মৃত্যু’ প্রভৃতি বলে প্রচার জোরদার করা হয়।
একপর্যায়ে গণজাগরণের ভয়ে ভীত হয়ে সেনাশাসক আইয়ুব খান ১৯৬২ সালে শুরুতে ক্ষমতার রাজনীতিতে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করে। সাথে সাথেই তিনি ‘রাষ্ট্রবিরোধী কাজে লিপ্ত’, ‘কখনও পাকিস্তানের অস্তিত্বকে স্বীকার করেননি’, ‘পূর্ব বাংলাকে বিচ্ছিন্ন করা প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন’, ‘ঘৃণা ছড়াচ্ছেন’, ‘বিদেশি চরদের সাথে তার যোগাযোগ রয়েছে’ প্রভৃতি ধরনের প্রচার সামনে আনা হয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো সরকার একদিকে প্রচার করতে থাকে তিনি ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী আবার অন্যদিকে প্রচার করতে থাকে যে, সোহরাওয়ার্দী পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে ‘গোপন সেল’ প্রতিষ্ঠা করছেন। বলাই বাহুল্য যদি বিচ্ছিন্নতাবাদীই হবেন তবে দুই পাকিস্তানে গোপন সেল প্রতিষ্ঠা করতে গেলেন কেন? বাস্তবে তিনি কখনও গোপন কাজের সাথে জড়িত ছিলেন না এবং এই শব্দ দুটি ছিল গোপন কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবুও এটা বলার কারণ হলো, গণতান্ত্রিক ও জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে কমিউনিস্টদের কারসাজি হিসেবে চিহ্নিত করে সোহরাওয়ার্দী ও আওয়ামী লীগকে গণবিচ্ছিন্ন করা।
ইতোমধ্যে সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করার সাথে সাথে সামরিক শাসনের মধ্যেই শুরু হয়ে যায় ছাত্র আন্দোলন। সাথে সাথেই আইয়ুব খান সাংবাদিকদের কাছে বলেন যে, ‘কলকাতা পূর্ব পাকিস্তানকে তার পশ্চাৎভূমি বানাতে চায়’, ‘প্রকৃত হুমকি আসছে কলকাতা ও আগরতলার কমিউনিস্টদের কাছ থেকে’ ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রবাদ বলে, বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো অথবা ঢিল দিলে পাটকেল খেতে হয়। এই দিনগুলোতে পূর্ব বাংলার রাজনীতির মধ্যমণি শেখ মুজিব ‘স্বাধীন বাংলা’ নিয়ে তৎপরতা শুরু করেন এবং এ বিষয়টি নিয়ে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে নিয়ে কমিউনিস্ট নেতা মণি সিংহ ও খোকা রায়ের সাথে গোপনে কয়েকবার আলোচনা করেন। এসব বৈঠকেই গণতন্ত্র ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দুই পার্টির মধ্যে আন্দোলন-সংগ্রাম প্রশ্নে সমঝোতা হয়। এই সমঝোতাই নানা চড়াই-উৎরাইয়ের ভেতর দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের দিকে অগ্রসর হয়। এই আন্দোলনের ভেতর দিয়ে সোহরাওয়ার্দী জেল থেকে মুক্তিলাভ করেন। পরবর্তীতে সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট স্থগিত করা হয়।
এভাবে আন্দোলনের বিজয় সূচিত হলেও সেনাশাসক আইয়ুব খান ১৯৬২ সালেই মোনায়েম খানকে পূর্ব পাকিস্তনের গভর্নর নিয়োগ করেন। তখন থেকেই শুরু হয় আইয়ুব-মোনায়েমের যুগ, যা কালিমাময় অধ্যায় হিসেবে আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে পুলিশ ও গু-াবাহিনী দিয়ে আন্দোলন দমন, বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ, দলীয়করণ, দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িক ও অন্ধ ভারতবিরোধী প্রচার ছিল এই আমলের বৈশিষ্ট্য।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে জনতার জাগরণ : ১৯৬৪ সাল
১৯৬৩ সালে পূর্ব বাংলায় আন্দোলন ছিল স্তিমিত। এ অবস্থায় ডিসেম্বরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু হলে আওয়ামী লীগে সোহরাওয়ার্দী যুগের পরিসমাপ্তি ঘটে এবং শেখ মুজিব যুগের আর্বিভাব ঘটে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দী ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এনডিএফ)-এর মাধ্যমে গণতন্ত্রের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পক্ষপতি ছিলেন। কিন্তু সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পরপরই শেখ মুজিব ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত করেন এবং গণতন্ত্র ও পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনকে একসূত্রে গ্রথিত করে সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে অগ্রসর হন। যা পূর্ব বাংলার জনগণের আন্দোলন-সংগ্রামে যুগান্ত সৃষ্টিকারী মোড় পরিবর্তনের সূচনা করে।
তবে ১৯৬৪ সালের শুরুটা ছিল পূর্ব বাংলার জনগণের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। ভারতের কাশ্মীরে হযরত বাল মসজিদ থেকে মহানবীর স্মৃতিবিজড়িত সংরক্ষিত দাড়ি চুরি হলে প্রথমে ভারতের বিভিন্ন স্থানে আর পরে পূর্ব পাকিস্তানের খুলনা, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গায় হিন্দু-মুসলমান ভ্রাতৃঘাতি দাঙ্গা লেগে যায়। সরকার প্রকাশ্যভাবে এতে উসকানি দেয় এবং সহযোগিতা করে। এই সময় পাকিস্তান সরকার ‘হিন্দু কাফেরদের’ বিরুদ্ধে প্রচারণা তুঙ্গে তোলে। বর্বরতা ও নৃশংসতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে।
এ সময়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার কাজে আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ এবং ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী সমাজ এগিয়ে আসে। বাম ছাত্র সংগঠন প্রথম থেকেই দাঙ্গা প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। গঠিত হয় দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি। এই কমিটি সরকারি মদদে দাঙ্গা ও সাম্প্রদায়িক প্রচারণার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে ‘পূর্ব বাংলা রুখিয়া দাঁড়াও’। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দাঙ্গা থামাতে এবং এই সেøাগান সামনে আনার ক্ষেত্রে শেখ মুজিবের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।
ইতোমধ্যে শুরু হয়ে যায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তোড়জোড়। সরকারি দল কনভেনশন মুসলিম লীগের প্রার্থী হন সেনাশাসক আইয়ুব খান আর সম্মিলিত বিরোধী দল (কপ)-এর প্রার্থী হন পাকিস্তানের ‘জাতির পিতার’ বোন ফাতেমা জিন্নাহ। নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারের পক্ষ থেকে ভারতবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক প্রচারণা তুঙ্গে তোলা হয়। ফাতেমা জিন্নাহকে ভোট দেওয়া মানে ভারতের দালাল পূর্ব বাংলায় শেখ মুজিবকে এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে আবদুল গফফার খান (সীমান্ত গান্ধী)-কে ভোট দেওয়া হবে বলে প্রচার তীব্র করা হয়।
ভারতীয় টাকা-পয়সা ও মদদেই ইসলামি রাষ্ট্র পাকিস্তানে ইসলামকে অবমাননা করার জন্য মহিলা প্রার্থী দেওয়া হয়েছে বলে বিষোদগার চলতে থাকে। মহিলাকে ভোট দেওয়া ধর্মীয় দৃষ্টিতে ‘হারাম’ এবং বাঙালি মুসলমানদের ‘নিচু জাত’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। পূর্ব বাংলার জনগণকে অসম্মান ও হেয় প্রতিপন্ন করতে আইয়ুব খান পল্টন ময়দানের জনসভায় জনগণকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করেন। ফলশ্রুতিতে তার প্রতি জুতা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এই দিনগুলোতে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে উপর্যুপরি ‘রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা’ দেওয়া হতে থাকে। উল্লিখিত ধরনের অপপ্রচার, দমন-পীড়ন ও কারচুপির নির্বাচনে পূর্ব বাংলার জনগণের জাগরণ সত্ত্বেও ফাতেমা জিন্নাহ্ পরাজিত হন। তবে এই পরাজয় গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বাধিকারের আন্দোলনকে নতুন পথের সন্ধান দেয়।

৬-দফা আন্দোলন ও আগরতলা মামলা
১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সরকারের ধারণা ছিল, এর ফলে পূর্ব বাংলার জনসাধারণের মধ্যে ভারত-বিরোধী ও সাম্প্রদায়িক মনোভাব জোরদার হবে এবং অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রভাব ক্ষুণœ হবে। কিন্তু ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক দলগুলোর সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও যুদ্ধোন্মদনার প্রচারণা সত্ত্বেও ফল হয় উল্টো। ‘পূর্ব পাকিস্তান অরক্ষিত কেন?’ সেøাগান নিয়ে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এগিয়ে আসে এবং অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নবপর্যায়ে উত্থানের পথ খুঁজে পায়।
যুদ্ধের পরপর আওয়ামী নেতা শেখ মুজিব বাঙালির ‘মুক্তি সনদ’ ৬-দফা ঘোষণা করেন। সাথে সাথে গণতন্ত্র ও স্বাধিকার আন্দোলন নবপর্যায়ে উন্নীত হয়। আইয়ুব-মোনায়েম চক্র ৬-দফা উত্থাপনকারীদের পাকিস্তানের ‘স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের শত্রু’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। প্রচার করা হয় যে, ৬-দফা ‘হিন্দু আধিপত্যাধীন যুক্ত বাংলা গঠনের ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত ছাড়া আর কিছু নয়’ এবং তা বাস্তবায়িত হলে ‘মুসলমানেরা বর্ণ হিন্দুদের গোলামে’ পরিণত হবে। মোনায়েম খান বলেন, ‘আমি যতদিন গভর্নর থাকব, ততদিন শেখ মুজিবকে জেলে পচতে হবে।’ এদিকে ৬-দফা জনপ্রিয় হতে থাকলে শেখ মুজিবকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ আখ্যায়িত করে জেলে নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়ের করা হয়।
এ অবস্থায় ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক দলগুলো সরকারের সাথে সুর মিলিয়ে ৬-দফা, শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে থাকে। এখানে উল্লেখ্য যে, এই দিনগুলোতে বাম কমিউনিস্টদের মধ্যে রুশ-চীন দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে প্রকাশ্য রূপ নেয়। রুশপন্থিরা ৬-দফা ও আওয়ামী লীগের পক্ষে এবং চীনপন্থিরা বিপক্ষে অবস্থান নেয়। রুশপন্থি অংশের বক্তব্য ছিল : ৬-দফা পূর্ণাঙ্গ নয়। তবুও এই দাবি নিয়ে আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নিতে হবে এবং শ্রমিক কৃষকের দাবি ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দাবি যুক্ত করে আন্দোলনকে অগ্রসর করে নিতে হবে। আর চীনপন্থিদের বক্তব্য ছিল : বাঙালি-অবাঙালি পুঁজিপতিদের বিরোধের ফল হচ্ছে ৬-দফা। এটা সিআইএ প্রণীত। তাই ৬-দফাকে তারা সমর্থন না করে বিরোধিতা করে তীব্র অপপ্রচারে নামে। মওলানা ভাসানী জনসভায় বলতে থাকেন যে, ‘সিআইএ ৬-দফা রচনা করে আমাদের বোকা ছেলেদের হাতে তা তুলে দিয়েছে।… ৬-দফায় এ দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের কোনো লাভ হবে না।’ চীনপন্থিরা তখন ‘ডোন্ট ডিস্টার্ব আইয়ুব’ এই সেøাগান নিয়ে অগ্রসর হয়।
এ অবস্থায় রক্তস্নাত ৭ জুনকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, তাতে রুশপন্থিরা ছাড়া আর কোনো দল তখন আওয়ামী লীগের সাথে ছিল না। ইতোমধ্যে ১৯৬৭ সালের এপ্রিল মাসে আওয়ামী লীগও বিভক্ত হয়ে যায় এবং বিভক্ত অংশ পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টে যোগ দিয়ে ৬-দফা, শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। পূর্ব বাংলার রাজনৈতিকদের মধ্যে বিভেদ ও ৬-দফা বিরোধিতার সুযোগে দমন-পীড়ন, অপপ্রচার ও হুমকি-ধমকি চালিয়ে পরিস্থিতিকে নিজেদের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করে আইয়ুব-মোনায়েম চক্র। তবে তা সম্ভব ছিল না। একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা শহিদ দিবস পালন, এপ্রিলে নবরূপে বাংলা নববর্ষ পালন, মে মাসে রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী পালন, মে দিবস পালন এবং দুই অর্থনীতি তথা বৈষম্য নিয়ে প্রচার প্রভৃতির ভেতর দিয়ে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন আবারও মাথা তুলে দাঁড়াতে থাকে। এ অবস্থায় শঙ্কিত হয়ে তীব্র রবীন্দ্রবিরোধী প্রচার জোরদার করা হয় এবং রেডিওতে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়। সরকারের পক্ষ থেকে কবিগুরুকে হেয় প্রতিপন্ন করে প্রচার করা হয় যে, পহেলা বৈশাখ ও রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপনের নামে ‘বিদেশি সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে ইসলামি জীবনাদর্শের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তানের মূলে আঘাত’ হানা হচ্ছে।
এই পটভূমিতে ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে শেখ মুজিবকে প্রধান আসামি করে সরকার ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়ের করে। এই মামলা প্রদানের সাথে সাথে পূর্ব বাংলায় রাজনৈতিক মেরুকরণ হয় এবং রুশপন্থি গোপন কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ (মোজাফফর) ও ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক দল ৬-দফা পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে না। এ বছরে বিরোধী অবস্থান সত্ত্বেও ১৯৬৮ সালের ৭ জুন পালনের মধ্য দিয়ে ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) ‘ডোন্ট ডিস্টার্ব আইয়ুব’ এই নীতি থেকে সরে আসতে শুরু করে। এদিকে আগরতলা মামলার কৌঁসুলি হিসেবে ৬-দফাবিরোধী অ্যাডভোকেট নেতাদের যোগদান বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে অগ্রসর হতে সহায়তা করে। এদিকে স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের ভিত্তি পশ্চিম পাকিস্তানেও সরকারবিরোধী ক্ষোভ দানা বেঁধে উঠতে থাকে। ইতোমধ্যে জুলফিকার আলী ভুট্টো সরকারি দল থেকে বের হয়ে এসে ভারতবিরোধী উন্মাদনা জোরদার করে ‘পাকিস্তান পিপলস পার্টি’ গঠন করে। শুরুতেই এই দল পশ্চিম পাকিস্তানে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে পূর্ব পাকিস্তানে সমর্থন পায় না।

ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান
১৯৬৯ সালের শুরুতেই গঠিত হয় ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া), ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) ও এনএসএফের ভুট্টোপন্থি অংশ নিয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এবং ১১-দফা প্রণীত হয়। রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে গঠন করে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিষদ (ডাক)। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকে আন্দোলন ক্রমেই দানা বেঁধে উঠতে থাকে এবং আসাদ-মতিউরসহ শহিদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে ২৪ জানুয়ারি আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। গণ-অভ্যুত্থান শুরু হওয়ার পর থেকে সরকার হুমকি-ধমকির সাথে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন’, ‘পাকিস্তানকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র’, ‘ভারতের কারসাজি’, ‘কমিউনিস্টদের চক্রান্ত’, ‘কমিউনিজমের বিপদ’ প্রভৃতি ভাঙা রেকর্ডের মতো প্রচার করতে থাকে। কিন্তু ওই প্রচার কিছু দালাল ও অন্ধ মানুষ বাদে বাঙালিদের মধ্যে কোনো প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয় না।
গণ-অভ্যুত্থানের জোয়ারে এই সময় পাকিস্তানি শাসক ও শোষকরা কোণঠাসা ও ভীত হয়ে পড়ে। আইয়ুব খান মাথা নত করে ‘দায়িত্বশীল’ বিরোধী দলের নেতাদের সাথে শাসনতন্ত্র বিষয়ে ফয়সালার জন্য গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান করে। ‘দায়িত্বশীল’ শব্দটা উচ্চারিত হয়েছিল শেখ মুজিবকে গোলটেবিল আলোচনা থেকে বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। গণ-অভ্যুত্থান এগিয়ে যায় এবং সরকার আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবকে মুক্তি দেয়। গণজাগরণের ভেতর দিয়ে শেখ মুজিব পূর্ব বাংলার অবিসংবাদিত নেতা রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যান। ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে ডাকসুর সহ-সভাপতি তোফায়েল আহমেদ রেসকোর্সের ময়দানে সদ্য কারামুক্ত নেতার গণসম্বর্ধনা সমাবেশে তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেন। গোলটেবিলে যোগ দিতে শেখ মুজিব যখন পশ্চিম পাকিস্তান যান, তখন সেখানে বিপুল সম্বর্ধনা পান এবং সেøাগান উচ্চারিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান’ এসেছে।
এই দিনগুলোতে বিশেষত বামপন্থি মহলে এমন প্রচার জোরদার হয় যে, শেখ মুজিব পাকিস্তানি শাসক-শোষকগোষ্ঠী তথা ক্ষমতাসীনদের সাথে আপস করবেন এবং ১১-দফা সম্পর্কে নিশ্চুপ থাকবেন। এসব গুজব মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এদিকে সম্বর্ধনা সভার জমায়েত এবং জনগণের আক্রমণাত্মক মনোভাবকে শান্ত এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য রেডিও পাকিস্তানে শেখ মুজিবের শান্তির বাণী প্রচার করা হতে থাকে। আইয়ুব-মোনায়েম চক্র ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এই প্রচার ছিল ‘ঠেলার নাম বাবাজি’র সমতুল্য। গোলটেবিলে যোগ দিতে শেখ মুজিব যখন পশ্চিম পাকিস্তান যান, তখন সেখানে বিপুল সম্বর্ধনা লাভ করেন এবং সেøাগান উচ্চারিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান’ এসেছে।
প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান আহূত গোলটেবিল বৈঠক যে ব্যর্থ হবে, তা আগেই অনুমান করা গিয়েছিল। কেননা ডাক-এ অন্তর্ভুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর শাসনতান্ত্রিক প্রশ্নে একমত হওয়া সম্ভব ছিল না। আওয়ামী লীগ ও ন্যাপের সাথে ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক দক্ষিণপন্থি দলগুলোর মতামতের পার্থক্য ছিল আকাশ-পাতাল। আর পিপলস পার্টির নেতা ভুট্টো ও চীনপন্থি ন্যাপ নেতা মওলানা ভাসানী গোলটেবিল বৈঠক বয়কট করেন। মওলানা ভাসানী তখন পশ্চিম পাকিস্তান গেলে ভুট্টোর সমর্থকরা বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানায় এবং ‘ভাসানী-ভুট্টো ভাই ভাই’ সেøাগান তোলে। গোলটেবিলের বাইরে থেকে দুই নেতাই গরম গরম কথা বলতে থাকেন। এই সময়ে জামায়াতে ইসলাম ও চীনপন্থি ন্যাপ মুখোমুখি দাঁড়ায় এবং পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে থাকে।
চরম প্রতিক্রিয়াশীল জামায়াত নেতা মওলানা মওদুদী বলেন যে, ‘সমাজতন্ত্র শব্দ উচ্চারণ করিলে জিহ্বা কাটিয়া ফেলা হইবে।’ আর মওলানা ভাসানী বাঙালির স্বাধিকারের প্রশ্নে বাড়তি কথা বলে ‘জ্বালাও-পোড়াও’, ‘ঘেরাও’, ‘মার-কাট’ প্রভৃতি ধরনের বক্তব্য দিতে থাকলে এবং ভুট্টো গোলটেবিলের বিরুদ্ধে কথা বলতে থাকলে পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে ওঠে। মওলানা ভাসানী জামাতের বিরুদ্ধে ‘গৃহযুদ্ধের’ আহ্বান জানায়। এর মধ্যে গ্রামাঞ্চলে বিডি সদস্যদের পদত্যাগ, শ্রমিকাঞ্চলে ঘেরাও প্রভৃতির ভেতর দিয়ে এক ধরনের বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়। এসবই ছিল নতুন করে সামরিক শাসন আনার নীলনকশা। ইতোমধ্যে প্রথমে ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘যদি তিনি (মওলানা ভাসানী) সত্যি সত্যিই ১১-দফা সমর্থন করেন, তাহলে তার গোলটেবিলে যাওয়া উচিত এবং শেখ মুজিবের সঙ্গে মিলে ১১-দফা তোলা উচিত।’ একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে তার একসময়ের নেতা সম্পর্কে বলেন, ‘মওলানা ভাসানীর কথাবার্তার মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নাই। তাই তাঁর রাজনীতি ত্যাগ করা উচিত। তাঁর বয়স এখন ৮৬ হইয়াছে।’
এদিকে গোলটেবিল ব্যর্থ হয়ে যায়। আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন এবং জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা দখল করে সামরিক আইন জারি করেন। বিদায় ভাষণে আইয়ুব খান মূলত বলেন যে, ‘দুই পাকিস্তানের কোনো ভবিষ্যৎ নাই। পূর্বাঞ্চল কয়েক বছর টিকে থাকবে আর পশ্চিম পাকিস্তান কোনো রকমে টিকে থাকবে।… আমরা আশা করি, কোনো যাদু সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা থেকে আমাদের রক্ষা করবে।’ বিদায় বেলায় অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আইয়ুব খানের এই ভবিষ্যৎবাণী ছিল যথাযথ। আসলে দ্বিজাতিভিত্তিক কৃত্রিম রাষ্ট্র পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখার জন্য কোনো যাদুর কাঠি কারও কাছেই ছিল না। তবে কয়েক বছর নয়, দুই বছরের মধ্যেই শুরু হয়ে যায় পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন করার জন্য সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। তবে এর জন্য প্রয়োজন ছিল জনগণের ম্যান্ডেট।

সত্তরের নির্বাচন
সত্তরের নির্বাচনের আগে দুই পাকিস্তানের অবস্থা ছিল দুই রকম। পূর্বাঞ্চলে জনমত ছিল একতরফাভাবে আওয়ামী লীগের অনুকূলে আর পশ্চিমাঞ্চলে অনেকটাই ভুট্টোর অনুকূলে। ১৯৬৯ সালের ডিসেম্বরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের নাম ‘বাংলাদেশ’ রাখার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। সেই দিনগুলোতে নির্বাচন সামনে রেখে জনমতের প্রবল জোয়ারে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ তথা জাতীয় মূলধারা-বিরোধী প্রচার দানা বেঁধে উঠতে সক্ষম হয়নি। এমনকি কাউন্সিল মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলাম, নেজামে ইসলাম, পিডিপি একত্র হয়ে ‘ইসলাম পছন্দ ঐক্যজোট’ গঠন করলেও নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন দিতে ব্যর্থ হয় এবং ঐক্যজোট ভেঙে যায়। এ অবস্থায় চীনপন্থি বাম কমিউনিস্টরা ও ন্যাপ প্রধান ভাসানী ‘ভোটের আগে ভাত চাই’, ‘ভোটের বাক্সে লাথি মার, সমাজতন্ত্র কায়েম কর’ প্রভৃতি উগ্রবাম সেøাগান দিয়ে মাঠে নামে এবং উগ্র বক্তৃতা-বিবৃতি দিতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি ‘আসাম ব্যতীত পাকিস্তানের মানচিত্র অসম্পূর্ণ’ ঘোষণা দিয়ে ভারত-বিরোধী প্রচারণা শুরু করেন।
ইতোমধ্যে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়। ফলে আবারও ক্ষোভ-বিক্ষোভ দানা বেঁধে উঠতে থাকে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে স্বৈরশাসক ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালের ৫ অক্টোবর জাতীয় পরিষদ নির্বাচন ও ২২ অক্টোবর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের তারিখ এবং নির্বাচনের আইনগত কাঠামো-এলএফও ঘোষণা করেন। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণাকে জনগণ স্বাগত জানালেও এলএফও-এর আইনগত নানা দিক বিশেষত শাসনতন্ত্রে ‘ইসলামি আদর্শ রক্ষা করা হবে’ এবং ‘পাকিস্তান ইসলামি প্রজাতন্ত্র বলে অভিহিত হবে’ প্রভৃতি সব কথা পূর্ব বাংলার জনগণের চিন্তা-চেতনা ও দাবি-দাওয়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ এলএফও সংশোধনের আহ্বান জানায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এলএফও নিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার পক্ষে ছিলেন না। তবে তিনি দলীয় ফোরামে বলেন, ‘নির্বাচন সমাপ্ত হলে আমি এলএফও টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলবো।’ তিনি তখন জনগণের প্রতি আস্থা ও বিশ^াস রেখে দ্রুত নির্বাচন চাইছিলেন। কেননা পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের পক্ষে নিরঙ্কুশ গণজাগরণ প্রত্যক্ষ করে পাকিস্তানের শাসক ও শোষকগোষ্ঠী এবং দক্ষিণপন্থি ও প্রতিক্রিয়াশীল দলগুলোর পক্ষ থেকে ভেতরে ভেতরে নির্বাচন বানচাল বা পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছিল।
এ সময়ে ‘নির্বাচনের পরিবেশ নেই’ বলে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। এরই মধ্যে বন্যার অজুহাত দেখিয়ে ইয়াহিয়া খান একতরফাভাবে নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করেন। ঘোষিত হয় যে, ৭ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদ ও ১৯ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ডান ও দক্ষিণপন্থি দলগুলো তারিখ পরিবর্তনকে স্বাগত জানালেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেন যে, যদি ডিসেম্বরে নির্বাচন না হয় তাহলে তিনি দুর্বার গণ-আন্দোলন গড়ে তুলবেন। ১২ নভেম্বর দক্ষিণাঞ্চলে স্মরণকালে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় হলে সরকার আবারও নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনের প্রচেষ্টা নেয়। কেবল দক্ষিণপন্থিরাই নয়, ন্যাপ (মোজাফফর) পর্যন্ত এই পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নেয়। নির্বাচন বয়কটের পক্ষে অবস্থান করেও চীনপন্থি বাম কমিউনিস্টদের নিয়ে মওলানা ভাসানী ‘ভোটের আগে ভাত চাই’ সেøাগান তুলে নির্বাচন পিছানোর পক্ষে দাঁড়ান।
এ পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, নির্বাচন নিয়ে যদি কোনো খেলা শুরু হয়, তাহলে তা আগুন নিয়ে খেলার শামিল হবে। সার্বিক বিচারে বলা যায়, সেই সময়ে সব ধরনের প্রতিকূলতা ও প্রচার মোকাবিলা করে সত্তরের ডিসেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার সংগ্রামে আওয়ামী লীগ ছিল একা। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করে ৩০০ আসনের জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। বাঙালি জনগণের এই বিজয়ে পাকিস্তানের শাসক-শোষকগোষ্ঠীর মাথায় কার্যত আকাশ ভেঙে পড়ে।

অসহযোগ আন্দোলন
নির্বাচনে বিজয়ের সাথে সাথে পাকিস্তানের শাসক-শোষকগোষ্ঠী ও তাদের পূর্ব পাকিস্তানের দালালরা চক্রান্ত চালানোর সাথে সাথে এমন প্রচার শুরু করে, যাতে আওয়ামী লীগ ৬-দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনা না করতে পারে। ক্ষমতায় না বসতে দেওয়ারও চক্রান্ত চলতে থাকে। পাবনায় এমপি রফিক আহমদকে রাতের অন্ধকারে খুন করে হত্যার রাজনীতির ইঙ্গিত দেওয়া হয়। বিজয়ের পরপরই তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ৬-দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচিত হবে এবং দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। এটা সহ্য করার মতো অবস্থা পাকিস্তানের শোষক-শাসকগোষ্ঠীর ছিল না। এদিকে পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা, তাই তার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। এ নিয়ে শুরু হয় বাকবিত-া। সংকট গভীর হতে থাকে।
এ সময়ে ইয়াহিয়া খান এলএফও এবং ইসলাম ও পাকিস্তানের অখ-তা অক্ষুণœ রাখার বিষয়টি সামনে আনেন। ভুট্টো বলেন, তার দলের সহযোগিতা ছাড়া অন্য দল কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনা কিংবা শাসনতন্ত্র রচনা করতে পারবে না। শেখ মুজিব ৬-দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ও ১১-দফা বাস্তবায়নের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেন। এ সময়ে মওলানা ভাসানী টাঙ্গাইলের সন্তোষে সম্মেলন আহ্বান করেন এবং ওই সম্মেলনে তাকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিতে চীনপন্থি বাম কমিউনিস্ট নেতারা ছাড়াও আতাউর রহমান খান, শাহ আজিজুর রহমান, আমেনা বেগম প্রমুখরা ছিলেন। সেখানে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। দেশের মানুষ এই ঘোষণাকে আমল দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিল না। জনগণ তাকিয়েছিল বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দিকে।
এ দিনগুলোতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে আখ্যায়িত করার প্রচেষ্টা চলে এবং হত্যা বা ভয়ভীতি দেখিয়ে নত করার জন্য ৬-দফা ও ১১-দফা থেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়। পরিস্থিতি বুঝে তিনি ইয়াহিয়ার পিন্ডিতে যাওয়ার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন। চলতে থাকে ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত। সাথে ভারত-বিরোধী প্রচার। ৩০ জানুয়ারি ‘গঙ্গা’ নামের একটি যাত্রীসহ বিমান কাশ্মীরী মুজাহিদীনরা হাইজ্যাক করে লাহোরে নিয়ে যায়। যাত্রী ও ক্রুদের জিম্মি করে বন্দী মুজাহিদীনদের মুক্তি দাবি করা হয়। ভারত সরকার দাবি অগ্রাহ্য করায় বিমানটি বোমার আঘাতে উড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন যে, ‘লাহোরে হাইজ্যাককৃত ভারতীয় বিমানটি ধ্বংস করা হয়েছে শুনে বিস্মিত হয়েছি। আমি ঘটনার তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।’ ওই বিবৃতিতে তিনি স্বার্থন্বেষীদের শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরোধিতা ও ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত সম্পর্কে জনগণকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান।
এসব প্রচার ও ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের ধারাবাহিকতায় ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। ২ মার্চ ঢাকায় অর্ধদিবস, ৩ মার্চ সারাদেশে পূর্ণ হরতাল ও ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণসমাবেশ আহ্বান করা হয়। এ কর্মসূচি পালনের সময় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, প্রেসিডেন্ট ও সামরিক আইন প্রধান হিসেবে ‘আমি পরিপূর্ণ ও নিরঙ্কুশভাবে পাকিস্তানের অখ-তা’ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইতোমধ্যে তিনি নরমপন্থি এসএম আহাসানকে সরিয়ে প্রথমে লে. সাহেজাদা ইয়াকুব ও পরে গরমপন্থি জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও সামরিক আইন প্রশাসক নিয়োগ করেন। সংবাদপত্রের ওপর সেন্সরশিপ চালু হয়।
তবে চাপে পড়ে ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ঘোষণা করার পর দেশবাসী বুঝে নেয় স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে। তারপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া কিংবা এ দুজনের সাথে জুলফিকার আলী ভুট্টোর যে আলোচনা হয়, তা ব্যর্থ হওয়া ভিন্ন অন্য উপায় ছিল না। ইতোমধ্যে ২৩ মার্চ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে স্বাধীন দেশের পতাকা ওড়ানো হয় এবং উত্তোলনকালে কবিগুরুর ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ গানটি গাওয়া হয়। শুরু হয়ে যায় অস্ত্র ট্রেনিং। এসব ঘটনার ভেতর দিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রটির কবর রচিত হয় এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
পাকিস্তানি আমলে বাঙালি জাতি ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের শাসক-শোষকগোষ্ঠী ও এ দেশীয় দালালদের অপপ্রচার ও মিথ্যাপ্রচার বিবেচনায় নিলে রাখাল বালকের সেই ‘বাঘ এসেছে, বাঘ এসেছে’ গল্পের কথা মনে পড়ে। পূর্ব বাংলার মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ বহু আশা-আকাক্সক্ষা ও স্বপ্ন নিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। শেষ পর্যায়ে তাদের সাথে সাধারণভাবে হিন্দু তফসিল সম্প্রদায়ের মানুষও সমর্থন জুগিয়েছিল। কিন্তু প্রথম থেকেই গণতন্ত্র ও বাঙালি জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার ন্যায্য দাবির আন্দোলনকে শাসক-শোষকগোষ্ঠী ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আখ্যায়িত করে। ‘বাঘ আসছে, বাঘ আসছে’ বলতে বলতে যেমন একদিন সত্যিই বাঘ চলে আসে এবং মিথ্যাবাদী রাখাল বালককে খেয়ে ফেলে, তেমনি মাত্র ২৩ বছরে ‘সাধের পাকিস্তান’কে রয়েল বেঙ্গল টাইগার খেয়ে ফেলে। এই নিবন্ধের দ্বিতীয় পর্ব বাংলাদেশ আমলে আওয়ামী লীগবিরোধী প্রচার বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে, সেই মিথ্যাবাদী রাখাল যেন ভূত হয়ে জাতির ঘাড়ে এখনও চেপে আছে।

শ্রেণী:

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গৌরবোজ্জ্বল ৬৯ বছর : সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক ইতিহাস

Posted on by 0 comment
aa

aaরায়হান কবির: (পূর্ব প্রকাশের পর)
* ১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই রাজনৈতিক দল বিধি জারি করা হয়। প্রচ- ও হিং¯্র দমননীতির শিকার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এই সীমিত গণতান্ত্রিক সুযোগ গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। দল পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে ২৫ আগস্ট ঢাকায় দলের সাবেক কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদসহ নেতৃবৃন্দের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২৫ আগস্টের বর্ধিত সভায় আরও সিদ্ধান্ত হয় দলের পূর্ণাঙ্গ কাউন্সিল সাপেক্ষে ১৯৭৫ সালের ৬ জুন পর্যন্ত যে কার্যনির্বাহী সংসদ ছিল সেটিই সংগঠনের কাজ চালিয়ে যাবে। ১৯৭৪ সালে গঠিত নির্বাহী সংসদের সভাপতি এএইচএম কামারুজ্জামান ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ নিহত হন। সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ তখন কারাবন্দি। এমতাবস্থায় সিনিয়র সহ-সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও মহিলাবিষয়ক সম্পাদক সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হয়।
* ১৯৭৭ সালের ৩ ও ৪ এপ্রিল ঢাকার হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে দলীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত। কাউন্সিলে ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন সম্ভব হয় নি। সিদ্ধান্ত হয় আপাতত পূর্ণাঙ্গ কমিটি না করে একটি সাংগঠনিক কমিটি গঠন করা হবে। সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিনকে আহ্বায়ক করে ১০ দিনের মধ্যে ৪৪ সদস্য বিশিষ্ট সাংগঠনিক কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষণার দায়িত্ব দেওয়া হয়। জোহরা তাজউদ্দিন ১৫ এপ্রিল সাংগঠনিক কমিটির সদস্যগণের নাম ঘোষণা করেন।
* ১৯৭৭ সালের ৩০ মে জিয়া তার ক্ষমতাকে বৈধতার ছাপ মারার জন্য দেশব্যাপী গণভোটের আয়োজন করেন। আওয়ামী লীগ গণভোট বর্জন করে।
* ১৯৭৮ সালের ৩, ৪ ও ৫ এপ্রিল তিন দিনব্যাপী আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। আবদুল মালেক উকিলকে সভাপতি ও আবদুর রাজ্জাককে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটি গঠন করা হয়।
* ১৯৭৮ সালের ২৩ নভেম্বর হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগের বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে পাল্টা আওয়ামী লীগ গঠনের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলে গণতান্ত্রিক আন্দোলন বেগবান করতে ভূমিকা রাখে ওই কাউন্সিল।
* ১৯৮১ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে তিন দিনব্যাপী আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এই কাউন্সিলে দলে নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ এবং দলকে অধিকতর শক্তিশালী ও সংহত করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। আবদুর রাজ্জাক সাধারণ সম্পাদক পুনর্নির্বাচিত হন। এই কাউন্সিলেই প্রথম গঠনতন্ত্র সংশোধন করে সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারক ‘সভাপতিম-লী’ গঠিত হয়।
* ১৯৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
* ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর সদস্যদের হাতে জিয়া নিহত। ১৫ নভেম্বর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শেখ হাসিনার ব্যাপক জনসংযোগ।
* ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ জেনারেল এরশাদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখল।
* ১৯৮৩ সালের ১১ জানুয়ারি কুখ্যাত রাজাকার আবদুল মান্নান আহূত ‘জমিয়াতুল মোদাররেসিন’ নামক মাদ্রাসা শিক্ষকদের এক সমাবেশে জেনারেল এরশাদ ২১শে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস ও শহীদ মিনার সম্পর্কে ধৃষ্টতাপূর্ণ কটূক্তি করেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৩০ জানুয়ারি ১৫টি রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধভাবে মহান ২১শে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ১৫ দলীয় ঐক্য জোট।
* ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে মৌন মিছিল করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি প্রদানের কর্মসূচিতে পুলিশের গুলিতে জয়নাল, জাফর, কাঞ্চন, মোজাম্মেল ও দীপালি সাহা প্রমুখ পাঁচ ছাত্র নিহত হয়। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাসহ ১৫ দলের নেতৃবৃন্দ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটে যান। ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে বন্দর নগরী চট্টগ্রামে হরতাল পালিত হয়।
* ১৫ ফেব্রুয়ারি ড. কামাল হোসেনের বাসভবনে বৈঠকরত অবস্থায় সেনাবাহিনী আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনা, আবদুস সামাদ আজাদ, আবদুল মান্নান, ড. কামাল হোসেন, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, আবদুল জলিল, বেগম মতিয়া চৌধুরী, মহিউদ্দিন আহমেদ, মো. রহমত আলী, ডা. এসএ মালেক, গোলাম আকবর চৌধুরী, সাহারা খাতুন, অধ্যাপক মানিক গোমেজ, সিপিবি-র মোহাম্মদ ফরহাদ, মঞ্জুরুল আহসান খান, একতা পার্টির সৈয়দ আলতাফ হোসেন, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, সাম্যবাদী দলের দীলিপ বড়–য়া ও বাসদের খালেকুজ্জামান প্রমুখ ১৫ দলের নেতাদের গ্রেফতার করে। ওই দিন সন্ধ্যা থেকে সান্ধ্য আইন বলবৎ করা হয়।
সারাদেশে সৃষ্ট উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশেই ঐক্যবদ্ধভাবে ২১শে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস পালিত হয়। ১৫ দলের উদ্যোগে রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিটি সর্বজনীন দাবিতে পরিণত হয়। জনমতের চাপে অবশেষে ১ মার্চ ১৯৮৩ শেখ হাসিনাসহ গ্রেফতারকৃত ২৭ নেতা মুক্তি লাভ করেন।
* ১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল থেকে ঘরোয়া রাজনীতির অনুমতি দেওয়া হয় এবং ১৪ নভেম্বর দেশে প্রকাশ্য রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হয়। ১৯৮৩ সাল থেকেই সামরিক শাসন ও স্বৈরতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনকে অভিন্ন লক্ষ্যে এবং অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে যুগপৎ আন্দোলনের ধারায় সংগঠিত করার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ উদ্যোগী ভূমিকা পালন করে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৫ দল ও বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত সাতদলীয় জোট দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর একটি অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচি প্রণয়ন করতে সক্ষম হয়। ১৯৮৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর উভয় জোটের সর্বসম্মত ৫-দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
* ১৯৮৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্র মিছিলের ওপর ট্রাক চালিয়ে হত্যা করা হয় সেলিম-দেলোয়ার নামে দুই ছাত্রলীগ কর্মীকে। ১ মার্চ আদমজীতে শ্রমিক নেতা তাজুলকে এবং ২৭ সেপ্টেম্বর হরতালের দিন কালীগঞ্জে সাবেক এমপি ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিনকে সরকারি জনদলের গু-াবাহিনী লেলিয়ে দিয়ে হত্যা করা হয়। ১৪ অক্টোবর মানিক মিয়া এভিনিউতে ১৫ দলের উদ্যোগে স্মরণকালের বৃহত্তম মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। মহসমাবেশ থেকে ১৫ দল ২১-দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে।
* বিরোধী দলের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মুখে একবার উপজেলা নির্বাচন তারিখ ও সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেও পিছিয়ে আসতে বাধ্য হন এরশাদ। পরে সামরিক আইনের কড়াকড়ি পুনর্বহাল, রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ বন্ধ ঘোষণা এবং রাজনৈতিক নেতাদের আটক রেখে ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ এরশাদ তার ১৮-দফা কর্মসূচির পক্ষে গণভোট অনুষ্ঠান করেন।
* ১৯৮৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে ঘরোয়া রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। পর্যায়ক্রমে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে প্রকাশ্য সভা-সমাবেশের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।
* ১৯৮৬ সালের ৭ মে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে ১৫ দল ও সাত দলের মধ্যে ঐকমত্য হয়। সিদ্ধান্ত হয় সামরিক শাসন অবসানের মূল লক্ষ্য হাসিলের উদ্দেশ্য সামনে রেখে দুই জোট ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে। ১৫ দল ১৮০টি আসনে এবং সাত দল ১২০টি আসনে প্রার্থী দিয়ে জাতীয় পার্টিকে মোকাবিলা করবে বলে ঐকমত্য হয়। কিন্তু হঠাৎই রহস্যজনক কারণে সাত দল নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়। ১৫ দলের অন্তর্ভুক্ত ওয়ার্কার্স পার্টি, বাসদ, শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল, সাম্যবাদী দলও নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকার কথা ঘোষণা করে। ১৫ দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তে অটল থাকে।
(আগামী সংখ্যায় সমাপ্ত)

শ্রেণী:

বঙ্গবন্ধুর কারাগারের রোজনামচা

Posted on by 0 comment
aa

aaমুনতাসীর মামুন

(শেষ অংশ)
ভিয়েতনাম সম্পর্কে একই সময় লিখেছেন-
“রাশিয়া উত্তর ভিয়েতনাম সরকারকে সামরিক সাহায্য প্রেরণের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। রাশিয়া পূর্ব থেকেই অনেক সাহায্য দিয়াছে। আমেরিকানরা যতই নিজেকে শক্তিশালী মনে করুন, রাশিয়া যখন হ্যানয় সরকারকে সাহায্য করতে আরম্ভ করেছে তখন যুদ্ধে জয়লাভ কখনই করতে পারবে না। এর পরিণতিও ভয়াবহ হবে। একমাত্র সমাধান হলো তাদের ভিয়েতনাম থেকে চলে আসা। ভিয়েতনামের জনসাধারণ নিজেদের পথ নিজেরাই বেছে নিবে।” [পৃ. ১৬০]
পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যেই তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী সফল হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গেই আলোচনা করা যেতে পারে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিয়ে, যে কথা আগেও উল্লেখ করেছি। পাকিস্তান ইসলামিক রিপাবলিক। অনেক দেশ তা নয়। তাহলে পাকিস্তানে শান্তি নেই, অন্য দেশে আছে কেন? এই মৌলিক প্রশ্ন তিনি বারবার তুলেছেন। ডিআইজি ধর্মভীরু। তার সঙ্গে আলাপ করতে এসেছেন। তিনি ধর্মকথা আলোচনা শুরু করলেন। শেখ মুজিব বললেনÑ
“ইসলামের কথা আলোচনা করে কি লাভ? পাকিস্তানের নাম তো ইসলামিক রিপাবলিক রাখা হয়েছে। দেখুন না ‘ইসলামের’ আদর্শ চারিদিকে কায়েমের ধাক্কায় ঘুষ, অত্যাচার, জুলুম, বেইনসাফি, মিথ্যাচার, শোষণ এমনভাবে বেড়ে চলেছে যে যারা আল্লায় বিশ্বাস করে না, তারাও নিশ্চয় হাসবে আমাদের অবস্থা দেখে। দেখুন না রাশিয়ায় যেখানে ধর্ম বিশ্বাস করে না সেখানে সমাজতন্ত্র কায়েম করতে চেষ্টা করছে, ঘুষ, শোষণ, বন্ধ হয়ে গিয়েছে। মানুষের বাঁচবার অধিকার স্বীকার করেছে।”
“গ্রেট বৃটেনে দেখুন, ন্যায়ের রাজ্য কায়েম করেছে। বেকার থাকলে সরকার থেকে ভাতা দেয়া হয়Ñ যে পর্যন্ত কাজের বন্দোবস্ত না করতে পারে।… অন্যায়ভাবে কাহাকেও কারাগারে বন্দি করতে পারে না।” [পৃ. ১৬২]
বলাই বাহুল্য এসব মৌলিক প্রশ্নের উত্তর ধর্মভিরু পুলিশ অফিসার দিতে পারেন নি।
আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক মোহাম্মদ মাহমুদউল্লাহকে গ্রেফতার করা হয়। মুজিব মন্তব্য করেছেন, মাহমুদউল্লাহ নিরীহ, খালি অফিসের কাজ করেন, রাজনৈতিক বাক-বিত-ায়ও অংশগ্রহণ করেন না। আফসোস করেছেন। অন্যদিকে ১৯৬৬-৬৭ সালের আমদানি নীতি ঘোষণা হয়েছে। এর ফলে “পূর্ব বাংলার ক্ষুদ্র শিল্পপতিরাও এবার চরম আঘাত খেতে বাধ্য করবে।” এই আমদানি নীতি তাকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। তিনি লেখেন [১৬ জুলাই]Ñ
“জেলের মধ্যে বসে এ কথা চিন্তা করে লাভ কি? যার সারাটা শরীরে ঘা, তার আবার ব্যথা কিসের! গোলামের জাত গোলামি কর। আমি কারাগারে আমার বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ‘আয়াসেই’ আছি! ভয় নাই, মাহমুদ আলি, জাকির হোসেন, মোনায়েম খান, আব্দুস সবুর খান, মহম্মদ আলী এরকম অনেকেই বাংলার মাটিতে পূর্বেও জন্মেছে, ভবিষ্যতেও জন্মাবে।” [পৃ. ১৬৪]
বর্তমান রাজনীতিবিদদের দেখলে এ কথা কত সত্য বলেই না মনে হয়।
ন্যাপ ও মওলানা ভাসানী সম্পর্কে প্রায়ই নানা নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন বঙ্গবন্ধু। এবং সে সমালোচনা করেছেন নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। এসব সমালোচনার মাঝে তিনি একটি কথা বলেছেন, যা মনে করি, রাজনীতির মূলমন্ত্র হওয়া উচিত। যারা প্রগতিশীল রাজনীতি করেন অন্তত তাদের ক্ষেত্রে। হেফাজতের প্রতি বর্তমান আওয়ামী লীগের নমিত নীতির এ কারণেই আমরা সমালোচনা করি। মনে হয় বঙ্গবন্ধু থাকলে তিনিও করতেন। তিনি যা মনে করতেন (১৯৬৬) তা হলো, ৬-দফা মেনে নিলে সবার সঙ্গে ঐক্য করা যেতে পারে এবং শত বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও এক্ষেত্রে আপস করেন নি। এখন হয়েছে উল্টোটা। হেফাজতের নীতি মেনে রাজনীতি করতে হবে। হওয়া উচিত ছিল, হেফাজত যদি রাষ্ট্রীয় চার নীতি মানে তাহলেই তাদের দাবি বিবেচনা করা যাবে। বঙ্গবন্ধু লিখেছেনÑ
“মানুষকে আমি ধোঁকা দিতে চাই না। আদর্শে মিল না থাকলে ভবিষ্যতে আবার নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ দেখা দিতে বাধ্য। সেদিকটা গভীরভাবে ভাবতে হবে।… যারা আন্দোলনের সময় এগিয়ে আসে নাই তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ এক হয়ে কাজ করতে পারে না।” (পৃ. ১৬৮)
বাকশাল গঠনের সময় এ কথাই তিনি মনে করেছিলেন।
এখানে তিনি আওয়ামী লীগ ভেঙে ন্যাপ হওয়ার কারণ বলেছেন। বর্তমানে এ বিষয়ে যেসব ন্যারেটিভ এটি তার বিপরীত। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের একগুঁয়েমির কারণে, বিশেষ করে বৈদেশিক নীতির প্রশ্নে ভাঙন দেখা দেয়। বঙ্গবন্ধু বলছেন, “ওয়ার্কিং কমিটির সভায় বৈদেশিক নীতি নিয়ে কোনো প্রস্তাব পাশ হয়নি। ভাসানী বললেন, না হয়েছে এবং তাকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধু এ দাবিকে ‘অসত্য’ বলেছেন। গুলিস্তান ও নিউ পিকচার্স হাউসে যে সম্মেলন হয় সেখানে ‘স্বায়ত্তশাসনের কোনো প্রশ্নই ওঠেনি।’ ভাসানী ৮৩৪টি ভোটের মধ্যে ৪৩ ভোট পেয়েছিলেন।” মুজিব লিখেছেনÑ
“আওয়ামী লীগ ভেঙে যখন ন্যাপ করা হলো, তখন বৈদেশিক নীতির উপরই হয়েছিল বলে এতদিন মওলানা সাহেব বলতেন, এবার নতুন কথা শুনলাম। কিছুদিন বেঁচে থাকলে অনেক নতুন কথাই তিনি শোনাবেন। যেমন, তিনি কোনোদিনই মওলানা পাশ করেন নাই তবুও মওলানা সাহেব না বললে বেজার হন।
ন্যাপ কেন হয়েছিল? আদর্শের জন্য নয়। মওলানা সাহেবের মধ্যে পরশ্রীকাতরতা খুব বেশি। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের জনপ্রিয়তা সহ্য করতে পারেন নাই এবং তাঁর মধ্যে এতো ঈর্ষা দেখা দেয় যে, গোপনে ইস্কান্দার মির্জার সঙ্গে হাত মিলাতেও তাঁর বিবেকে বাধে নাই। তিনি মির্জা সাহেবকে মিশরের নাসের করতে চেয়েছিলেন।”
এটি বঙ্গবন্ধুর ভাষ্য। ন্যাপ একেবারে আদর্শের কারণে হয়নি তা ঠিক নয়। আদর্শগত পার্থক্য কর্মীদের মধ্যে নিশ্চয় হয়েছিল। তবে, এ বিষয়টি আরও গবেষণার দাবি রাখে। কারণ, যারা ন্যাপ করেছেন তাদের ভাষ্য ভিন্ন।
রাজনীতিবিদদের মধ্যে ব্যক্তিত্বে দ্বন্দ্ব নতুন নয়। সোহরাওয়ার্দীকে মধ্য ডানের মতাদর্শীরা নেতা মনে করতেন। ভাসানীর মধ্যে পরস্পর বিরোধিতা ছিল প্রচুর। কখনও ডান, কখনও মধ্য ডান, কখনও বামপন্থার পক্ষে বলতেন। সোহরাওয়ার্দী, ফজলুল হক ও ভাসানী তখন বর্ষীয়ান নেতা। তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকা স্বাভাবিক এবং সেই দ্বন্দ্ব রাজনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল, অভিঘাত হেনেছিল তাও নয়। ১৯৭০ সালের আগে যখন শেখ মুজিবের উত্থান শুরু হয়েছে তখন তার অগ্রজ নেতারা আবুল মনসুর আহমদ, ইয়ার মোহাম্মদ খান বা আতোয়ার রহমান মেনে নিতে পারেন না। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশভাবে জয়লাভ করলে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতায় পরিণত হন। কিন্তু তার একটি গুণ ছিলÑ তার সহকর্মী এবং সমাজের পেশাজীবীদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। তাতের মতামত নিতেন। সহায়তা নিতেন। রাজনৈতিক কর্মসূচি নিজের মতো নিতেন। এজন্য সমসাময়িককালে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল বেশি।
এরপর ১৯৬৭ সালের ৩১ মে পর্যন্ত লেখা রোজনামচা পাওয়া গেছে। এ রোজনামচায় দেখি, তিনি ক্রমেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। পরিবারে আর্থিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কিন্তু তার স্ত্রী বলছেন, চিন্তা নেই। সব সমস্যার সমাধান হবে। ছেলে-মেয়েদের জন্য চিন্তা লাগছে। বিশেষ করে রাসেলের জন্যÑ
“ ‘৮ ফেব্রুয়ারি ২ বছরের ছেলেটা এসে বলে, আব্বা বালি চালো’। কি উত্তর ওকে আমি দিব। ওকে ভোলাতে চেষ্টা করলাম ও তা বোঝে না আমি কারাবন্দি। ওকে বললাম, ‘তোমার মার বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো।’ ও কি বুঝতে চায়! কি করে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটা ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্ত করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে। দুঃখ আমার লেগেছে। শত হলেও আমি তো মানুষ আর ওর জন্মদাতা।” [পৃ. ২৪৯]
বাইরে রাজনীতিতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা চলছে বিডিএম করে। এর উদ্যোক্তারা চান আওয়ামী লীগ এতে যোগ দিক। বঙ্গবন্ধু রাজি নন। এরি মধ্যে তার মামলার শুনানি হয়। কিন্তু জামিন হয় না। অন্যান্য কারাগার থেকে তার ‘বন্ধু’ মোস্তাক ও অনুজ কর্মীরা ঢাকা জেলে স্থানান্তরিত হয়েছেন। তাদের অনেকে ২০ সেলে থাকে। ফলে তার সঙ্গে দেখা হয়। তাস খেলে, বই পড়ে, তাদের সঙ্গে গল্প করে দিন কাটান কিন্তু মন পড়ে থাকে ৬-দফার দিকে।
এদিকে আইয়ুব খান এসেছেন ঢাকায়। তাকে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে বিপুলভাবে। লেখেন বঙ্গবন্ধুÑ
“পূর্ব বাংলার মাটিতে বিশ্বাসঘাতক অনেক পয়দা হয়েছে, আরো হবে, এদের সংখ্যাও কম না। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকদের স্থান কোথায় এরা দেখেও দেখে না! বিশেষ করে একদল বুদ্ধিজীবী যেভাবে পূর্ব বাংলার সঙ্গে বেঈমানী করছে তা দেখে আশ্চর্য হতে হয়।
সামান্য পদের বা অর্থের লোভে পূর্ব বাংলাকে যেভাবে শোষণ করার সুযোগ দিতেছে দুনিয়ার অন্য কোথাও এটা দেখা যায় না। ছয় কোটি লোক আজ আস্তে আস্তে ভিখিরি হতে চলেছে। এরা এদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের কথাও চিন্তা করেন না।”
শেখ মুজিবের বড় গুণ ছিল তার অগ্রজ বা সমসাময়িকদের প্রকাশ্যে কখনও অপমান করেন নি। ভাসানীর বিরুদ্ধে অনেক তিক্ত কথা ডায়েরিতে লিখেছেন কিন্তু প্রকাশ্যে তাকে শুধু সম্মান নয় সহায়তাও করেছেন। ফজলুল হকের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু ফজলুল হকের মৃত্যুবার্ষিকী উপলেক্ষে লিখেছেনÑ
“যখন তিনি ঢাকায় মারা যান সেদিনও আমি জেলে ছিলাম। হক সাহেব ছিলেন পূর্ব বাংলার মাটির মানুষ এবং পূর্ব বাংলার মনের মানুষ। মানুষ তাঁহাকে ভালোবাসতো ও ভালোবাসে। যতদিন বাংলার মাটি থাকবে বাঙালি তাঁকে ভালোবাসবে। শেরে বাংলার মতো নেতা যুগ যুগ পরে দুই একজন জন্মগ্রহণ করে।” [পৃ. ২৩১]
ফজলুল হকের আত্মবিশ্লেষণের তিনি উদ্ধৃতি দিয়েছেন। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ তাকে বোঝার জন্য। ফজলুল হক বলেছেন তিনি রোমান্টিক। স্বতঃস্ফূর্তভাবে সব সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এ কারণে ক্ষমতার শীর্ষে উঠেছেন, পতনও হয়েছে। কিন্তু কোনো আফসোস নেই। বঙ্গবন্ধু এই উদ্ধৃতি কোথায় পেয়েছেন তা উল্লেখ করেননি, কিন্তু আগে আমি এর উল্লেখ কখনও দেখিনি। তাই এর পুরোটা উল্লেখ করছি এ কারণে যে, ভারতবর্ষের একজন বড় মাপের রাজনীতিবিদের নিজের উক্তি নিজের সম্পর্কে। ফজলুল হক এর শিরোনাম দিয়েছেনÑ সেলফ অ্যানালাইসিস। লিখেছেন
“ÒIn my stormy and chequred life chance has played more than her fair part. The fault has been my own. Never at any time have I tried to be the complete master of my own fate. The strongest impulse of the moment has governed all my actions. When chance has raised me to dazzling height, I have received her gifts without stretched hands. When she has cast me down from my high pinnacle. I have accepted her buffets without complaint. I have my hours of pinnacle and regret. I am introspective enough to take an interest in the examination of my own conscience. But this self analysis has always been ditched. It has never been morbid. It has neither aided nor impeded the fluctuations of my varied career. It has availed me nothing in the external struggle which man wages on behalf of himself against himself. Disappointments have not cured me of ineradicable romanticism. If at times I am sorry for something I have done, remorsearails me only for the things I have left undone..”
১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি গভীর রাতে শেখ মুজিবকে জানানো হয় তিনি মুক্ত। এতে তিনি অবাক হয়েছিলেন কারণ তার বিরুদ্ধে বেশ কটি মামলা ছিল। তার মনে হয়েছিল এর মধ্যে কিছু একটা আছে। কারণ, ঈদের নামাজের সময় তার সঙ্গে কয়েকজনের দেখা হয়েছিল। তাদের একজন চট্টগ্রামের কর্মী তাকে জানিয়েছিলেন, পুলিশ তাকে ২১ আটকে রেখে অত্যাচার করেছে, পা ভেঙে দিয়েছে। তিনি বলেছিলেন, খালি মুজিবের নাম জড়াবার জন্য তার ওপর অত্যাচার করা হয়েছে। অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে যে কাগজ দিয়েছে তাতেই তিনি সই করে দিয়েছেন। আরেকদিন কামাল উদ্দিনও জানালেন, তাকে অসম্ভব অত্যাচার করেছে। “আমার শরীর পচাইয়া দিয়েছে। সোজাভাবে শুয়ে থাকতে পারি না। পায়খানার রাস্তায় কি ঢুকিয়ে দিয়েছে যন্ত্রণায় অস্থির। এই দেখুন জ্বলন্ত সিগারেট দিয়ে জায়গায় জায়গায় পোড়াইয়া দিয়েছে। আপনার নাম লেখাইয়া নিয়েছে আমার কাছ থেকে যদিও অনেক বলেছি, শেখ মুজিবের সঙ্গে আমার পরিচয় নাই।”
এই সময় কাগজে দেখেন রুহুল কুদ্দুস, আহমদ ফজলুর রহমানসহ ২৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সুতরাং, আন্দাজ করছিলেন তাকে আবার দেশদ্রোহের কোনো মামলায় জড়ানো হবে। দেখা গেল তার অনুমানই ঠিক। জেলগেট থেকে বেরুবার সঙ্গে সঙ্গেই সেনাবাহিনী তাকে গ্রেফতার করল, সেনা আইনের আওতায়। ক্যান্টনমেন্টে তাকে অফিসার্স মেসে এনে রাখা হলো।
শুরু হলো ‘শেখ মুজিবুর রহমান বনাম রাষ্ট্র’ মামলা। পাকিস্তানিরা নাম দিলÑ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ইসলামাবাদ ষড়যন্ত্র মামলা।
এই সময় বেগম মুজিব তাকে ৩২০ পৃষ্ঠার একটি খাতা পাঠান। তিনি মাত্র ৫২ পৃষ্ঠা লেখেন। মামলা শুরু হওয়ার সময় খাতাটি তাকে দেয়া হয়েছিল। এটি তার লেখা শেষ খাতা।
এখানে শেখ মুজিবুর বন্দী জীবনের কথা লিখেছেন। এখানেও মিলিটারি কনফাইনমেন্ট। শুধু তাই নয় সঙ্গে সবসময় থাকতেন একজন পাকিস্তানি অফিসার। কথা বলা নিষেধ। খাবার ছিল সব সময় রুটি আর মাংস। শরীর ছিল তার অসুস্থ। তার ওপর এই খাবার। ঘরের দরজা জানালা বন্ধ। জানালার কাচ লাল রং করা। সন্ধ্যার পর আলো নিভিয়ে মেস এরিয়ার (যেখানে তাকে রাখা হয়েছিল) বাইরে একটা রাস্তায় হাঁটতে তাকে নেয়া হতো। সঙ্গে সেনা পাহারা। একসময় মনে হলো, তারা তাকে যে কোনো সময় গুলি করে মেরে ফেলতে পারে। অজুহাত দেয়া হবে, পালাবার সময় গুলি করা হয়েছে। তারপর থেকে তিনি বললেন, মেস এরিয়ার বাইরে তিনি হাঁটতে যাবেন না। পরবর্তীকালে সার্জেন্ট জহুরুল হককে এ অজুহাতে গুলি করে হত্যা করা হয়।
মাঝে মাঝে দু’একজন অফিসার তাকে ইন্টারগেশন করতে আসতেন। তাদের ভাবসাব দেখে বঙ্গবন্ধু লিখেছিলেনÑ
“কিছু সংখ্যক অতি উৎসাহী সামরিক কর্মচারী একদম পাগল হয়ে গেছে বলে মনে হয়। বিরাট কিছু একটা হয়ে গেছে। দেশকে রক্ষা করার সমস্ত দায়িত্বই যেন তাদের ওপরই পড়েছে। একটু গন্ধ পেলেই হলো, আর যায় কোথায়Ñ একদম লাফাইয়া পড়ে অত্যাচার করার জন্য। তাদের ধারণা পূর্ব বাংলার জনসাধারণের সকলেই রাষ্ট্রদ্রোহী। বুদ্ধি আক্কেল সব কিছু পশ্চিম বাংলা থেকে চালান হয়ে ঢাকায় আসে। তাদের ভাবসাব দেখে মনে হয় পূর্ব বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য টাকা-পয়সা জমি-জমা হিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত। দুই একজন আমাকে কথায় কথায় বলেছে, এখনো বাঙালিরা হিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত এবং তাদের ওপরই নির্ভরশীল। কিন্তু কোথায় যে হিন্দুদের কর্তৃত্ব আমার জানা নেই। বর্ণ হিন্দুরা প্রায় সকলেই পূর্ব বাংলা ছেড়ে চলে গেছে, কিছু সংখ্যক নিম্নবর্ণের হিন্দু আছে। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় প্রত্যেকটা কর্মচারীর ধারণা পূর্ব বাংলার লোক হিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত।” (পৃ. ২৬৬)
এ মনোভাব থেকে পাকিস্তানিরা গত ৭০ বছর মুক্ত হয়নি। আসলে, আমরাই বেশি মোহগ্রস্ত ছিলাম ধর্মের নামে বাসভূমি করার এবং পাকিস্তানিদের সঙ্গে থাকার। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কিন্তু এক বছরের মাথায় তার সেই মোহ কেটে গিয়েছিল। তার সমসাময়িকদের সেই মোহ থেকে বেরুতে সময় লেগেছিল। ১৯৯৮-৯৯ সালে, পাকিস্তানের উচ্চপর্যায়ের নীতি-নির্ধারকদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সেখানে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট লেঘারি, প্রধানমন্ত্রী বেনজীর ভুট্টো থেকে নিয়াজীও ছিলেন। উপর্যুক্ত ধারণা থেকে তারা তখনও মুক্ত হননি। বর্তমান রাজনীতি বিশ্লেষণ করলেও দেখব, বেশ কটি রাজনৈতিক দল এখনও বাংলাদেশে পাকিস্তানের প্রতি অনুরক্ত, যদিও পাকিস্তান তাদের বিবেচনা করে ভৃত্য হিসেবে।
বঙ্গবন্ধুর খাবারের প্রচ- অসুবিধা হচ্ছিল। জেলে থাকতেই আমাশয় আক্রান্ত হয়েছিলেন। একজন বাঙালি বাবুর্চির কথা বলেছিলেন। তারা রাজি হয়নি। “তাদের কথা, সিকিউরিটির জন্য বাঙালি বাবুর্চি রাখা যায় না। একটা আশ্চর্য ব্যাপার আমার চোখে পড়ল।… বাঙালিদের তারা ব্যবহার করতে প্রস্তুত, কিন্তু বিশ্বাস করতে রাজি নয়। আর বিশ্বাস করেও না। সকলকেই সন্দেহ করে। তাদের ধারণা প্রায় সকলেই নাকি আমার ভক্ত। মনে মনে সকলেই নাকি আলাদা হতে চায়।” (পৃ. ২৬৬)
এখানেই বিবরণ শেষ। যদি শেষ অবধি তিনি লিখতে পারতেন তাহলে আমাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের একটি ভাষ্য পেতাম। আগরতলা মামলা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু কখনও কিছু বলেন নি। এটি ঠিক, এদের অনেকের সঙ্গে প্রথম দিকে তার যোগাযোগ হয়েছিল কিন্তু তিনি এদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন নি। শুধু সেনাদের দ্বারা গঠিত গ্রুপ সরকার উৎখাত করতে পারবে এটি তিনি বিশ্বাসও করেন নি এবং সেনাদের বিশ্বাসের কারণটাও পাননি। তবে, যারা যুক্ত ছিলেন ওই ধরনের পরিকল্পনায় তাদের অশ্রদ্ধা করার কোনো কারণ নেই; কিন্তু ওই ধরনের পরিকল্পনা ছিল অবাস্তব। পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়েছিল রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার আশায় কিন্তু তা বুমেরাং হয়ে গিয়েছিল। কারণ, অন্তিমে এই মামলা গণ-অভ্যুত্থানে ভেসে গিয়েছিল, শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গবন্ধুতে পরিণত হয়েছিলেন, তার কিছুদিন পর জাতির জনকে। বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়ে আমরা মুগ্ধ হয়েছিলাম। ধরে নিতে পারি, ১৯২০ থেকে ১৯৫৪ প্রায় ৩৪ বছরের জীবন কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। ‘কারাগারের রোজনামচা’ ১৯৬৬-১৯৬৮ সালের। মাঝখানের ১২ বছর বাদ। তারপরও বলা যাবে এ দুটি গ্রন্থ থেকে তার বেড়ে ওঠা, রাজনৈতিক জীবন, রাজনীতির দর্শন সম্পর্কে একটি ধারণা মেলে। কারণ, ১৯৬৯-১৯৭৫ সালে তিনি তার সেই রাজনীতির দর্শন বা বিশ্বাস অনুযায়ীই কাজ করেছিলেন।
কারাগারের রোজনামচায় তিনি পাকিস্তান সম্পর্কে তার ধারণা স্পষ্ট করেছেন। পাকিস্তান সম্পর্কে তার কোনো মোহ ছিল না। জালেমের শাসন হিসেবেই নিয়েছিলেন। এর বিপরীতে তার মনে হয়েছিল ৬-দফাই বাঙালির মুক্তির সনদ। ৬-দফা এবং একে কার্যকর করার প্রক্রিয়া ছাড়া আর কোনো চিন্তা তার ছিল না এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে এর পরিপ্রেক্ষিতেই বিচার করেছেন। তিনি তার সঙ্গেই জোটে আগ্রহী যিনি ৬-দফায় বিশ্বাস করেন। ন্যাপ তখন প্রধান বিরোধী দল। মওলানা ভাসানী এর নেতা। ভাসানী এবং ন্যাপ নেতাদের আইয়ুব তোষণনীতি তিনি পছন্দ করেন নি। এর সমালোচনা করেছেন বারবার।
পুরো রোজনামচায় গরিব বাঙালির প্রতি তার ভালোবাসাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। বাঙালি যারা ৬-দফা বিশ্বাস করে না তাদের প্রতি দুঃখিত হয়েছেন। গরিবদের প্রতি ভালোবাসার কারণেই সমাজতন্ত্রের প্রতি তার পক্ষপাত ছিল। আর অসাম্প্রদায়িক মনোভাব তার সব সময়ই ছিল।
১৯৬৬ সালে দেশে বসে খাবারের অভাবের কথা শুনছিলেন। জেলে এক রক্ষী বলছিলেন, দেশে বোধহয় কচু গাছও নেই। লিখেছেন তিনিÑ
“বললাম, এই তো আইয়ুব খান সাহেবের উন্নয়ন কাজের নমুনা, মোনায়েম খাঁ সাহেবের ভাষায় চাউলের অভাব হবে না, গুদামে যথেষ্ট আছে। যে দেশের মা ছেলে বিক্রি করে পেটের দায়ে, যে দেশের মেয়েরা ইজ্জত দিয়ে পেট বাঁচায়, সে দেশও স্বাধীন এবং সভ্য দেশ। গুটি কয়েক লোকের সম্পদ গড়লেই জাতীয় সম্পদ গড়া হয় বলে যারা গর্ব করে তাদের সম্বন্ধে কি-ই বা বলব!”
আমাদের দেশে উন্নয়নের মডেল সাধারণ এ রকমই মনে করা হয়। এখন উন্নয়ন দৃশ্যমান, দারিদ্র্য হ্রাস পাচ্ছে, কিন্তু একই সঙ্গে বলতে হয় সম্পদ গুটিকয় মানুষের হাতেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে এবং এই সম্পদের একটি বড় অংশ লুট করা। বাংলাদেশে যে পরিমাণ খেলাপি ঋণ তা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে তা ভাগ করে নিয়েছে ৪০-৫০ জন। এই অবস্থা বেশিদিন চললে সামাজিক বিস্ফোরণ ঘটার সম্ভাবনা থেকে যায়।
এর বিপরীতে লিখেছেন বঙ্গবন্ধু “বাঙালি জাতটা এত নিরীহ, না খেয়ে মরে যায় কিন্তু খেতে আজও শিখে নাই। আর ভবিষ্যতেও খাবে সে আশা করা ভুল।” [২.১৫৩] ’৪২-এর মন্বন্তরের সময় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও তার গল্পে এ কথাই লিখেছিলেন। এ বৈশিষ্ট্যের জন্য এখনও এ দেশে দৃশ্যমান লুটেরারা সব সময় বেঁচে যায়, তাদের রক্ষা করা হয়।
স্বদেশী আন্দোলনকারী, আগেই লিখেছি এবং কমিউনিস্ট নেতা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছাড়া বাঙালি ও বাংলার [বাংলাদেশ] জন্য এত ত্যাগ কেউ করেন নি। কিন্তু, আশ্চর্য এই যে, এইসব ত্যাগী মানুষের স্মৃতি সবাই বিস্মৃত হয়। এই ত্যাগের বিনিময়ে যারা ক্ষমতায় আসেন তারাই তার (বা তাদের) স্মৃতি অবলেপনে মগ্ন থাকেন। ১৯৪৭ পর্যন্ত এ দেশে যত বিপ্লবী প্রাণ দিয়েছেন তাদের অধিকাংশের স্মৃতি আমরা ধরে রাখিনি। ১৯৪৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশ স্বাধীন ও জিয়া-এরশাদের মতো জোট আইয়ুব খাঁদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত রাখার জন্য যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তারা খুব কমই মূল্যায়িত হয়েছেন। ধরা যাক, ১৯৬৯ সালের শহীদ মতিউরের কথা। সেই কিশোর গুলি খাওয়াতে ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলন নতুন মাত্রা লাভ করে। সাহিত্যিক সাংবাদিক ফয়েজ আহমদের উদ্যোগে গুলিস্তান থেকে বঙ্গভবন পর্যন্ত সবুজ চত্বরটির নামকরণ করা হয় ‘মতিউর শিশু পার্ক’। আজ সে সবুজ চত্বরটি ক্ষতবিক্ষত এবং সেই নামটিও উধাও। এমন কী বঙ্গবন্ধু পর্যন্ত ‘বন্ধু’ মোশতাককে যতটা গুরুত্ব বা মূল্যায়ন করেছেন, মুক্তিযুদ্ধ যারা চালিয়েছেন তাদের তেমন গুরুত্ব দেননি। মূল্যায়ন করেন নি এবং এর ফল কী হয়েছে তা সবারই জানা। জানি না, বাঙালি আদৌ তার এই বৈশিষ্ট্য থেকে মুক্ত হতে পারবে কি না। যেমন, লিখেছিলেন বঙ্গবন্ধু, পরশ্রীকাতরতা শব্দটি একমাত্র বাংলা ভাষার অভিধানেই আছে, অন্য কোনো ভাষায় নেই।
শেখ হাসিনা অত্যন্ত মমতায় এ পা-ুলিপিগুলো সংরক্ষণ করেছিলেন এবং প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কারাগারের রোজনামচায়, বঙ্গবন্ধুর পা-ুলিপির মূল ভাষা রক্ষা করা হয়েছে। তিনি বক্তৃতা যেমন মিশ্র ভাষায় দিতেন, পা-ুলিপিও রচিত হয়েছে সেই মিশ্র ভাষায়। এতে বরং বঙ্গবন্ধুকেÑ যাকে আমরা দেখেছি, তাকে খুঁজে পাওয়া যায়। শেখ হাসিনা ও তার সম্পাদকীয় টিমকে অভিনন্দনÑ এ রকম সুমুদ্রিত গ্রন্থটি বাঙালিদের উপহার দেয়ার জন্য।

শ্রেণী:

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে শান্তি ও সম্প্রীতি অর্জনে অগ্রগতি, প্রতিবন্ধকতা ও করণীয়

Posted on by 0 comment
aa

aaড. নূহ-উল-আলম লেনিন:

পূর্বকথা
আজকের সেমিনারের শিরোনাম ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে শান্তি ও সম্প্রীতি অর্জনে প্রতিবন্ধকতা ও করণীয়’। আমি কোনো ব্যাখ্যা না করেই বলব, সেমিনারের শিরোনাম ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে শান্তি ও সম্প্রীতি অর্জনে অগ্রগতি, প্রতিবন্ধকতা ও করণীয়’ হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন কোনো যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে না বা এ অঞ্চলটি এখন আর শান্তিচুক্তি-পূর্ব আশির দশকের রক্তাক্ত উপত্যকা নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের আমলে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি সম্পাদন ও বিদ্রোহীদের আনুষ্ঠানিক অস্ত্র সমর্পণের ভেতর দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে দীর্ঘ দুই দশকের রক্তপাত ও সংঘাতের অবসান হয়েছে। বিপুল সংখ্যক (প্রায় ৬৪ হাজার) চাকমা উদ্বাস্তুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং তাদের পুনর্বাসন, অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন, সর্বোপরি গত দুই দশকে শান্তিচুক্তির অধিকাংশ ধারার বাস্তবায়নের পর পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে স্থায়ী শান্তির ভিত্তি রচিত হয়েছে। এ কারণেই আমি সেমিনারের শিরোনামকে সম্প্রসারিত করাকে যথার্থ বলে মনে করি।
না, আমি পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের শান্তির প্রশ্নটিকে সরলীকরণ করে দেখছি না। যুদ্ধাবস্থা/গৃহযুদ্ধের অবসান এবং পার্বত্য অঞ্চলে সংবিধানের আওতায় স্বশাসনের একটা ঐতিহ্য গড়ে উঠলেও, বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে এখনও পাহাড়ে অনাকাক্সিক্ষত সন্ত্রাসী কর্মকা- ঘটছে। দ্বিতীয়ত; পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষাক্ষেত্রে এবং জনগণের জীবনমানের দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধিত হওয়া সত্ত্বেও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থার সংকট সৃষ্টির পরিকল্পিত অপতৎপরতা বন্ধ হয়নি। আমি বিষয়টির এই জটিলতা তথা ডায়নামিকসকে বিবেচনায় রেখেই শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন এবং অসম্পূর্ণ করণীয় সম্পর্কে আলোপাত করব।

ঐতিহাসিক পটভূমি
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে শান্তির প্রশ্নটি কোনো একাডেমিক আলোচনার বিষয় নয়। এটি একটি বাস্তব রাজনৈতিক সমস্যা। এই সমস্যার রয়েছে ঐতিহাসিক পটভূমি এবং রক্তাক্ত ইতিহাস। এ কথা আমরা সবাই জানি, পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যা আকস্মিকভাবে দেখা দেয়নি। পার্বত্য অঞ্চলের জনগণের নৃতাত্ত্বিক, ভাষা ও সংস্কৃতি, ধর্ম এবং জীবনধারা বাংলাদেশের সমভূমি অঞ্চলের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মতো নয়। তাদের সমস্যার প্রকৃতিও আলাদা। আমি প্রাক-ঔপনিবেশিক আমলের ইতিহাস সম্পর্কে বলছি না। মনে রাখতে হবে, ১৭৫৭ সালে পলাশীর পরাজয়ের পরপরই কিন্তু পুরো বাংলা ইংরাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রত্যক্ষ শাসনাধীন হয়নি। তবে পলাশী যুদ্ধের পর মীরজাফরকে হটিয়ে বাংলার নবাবী দখল করেন মীরকাশিম। তার ক্ষমতা দখলে ইংরেজরা সহায়তা করায় ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দের ১৫ অক্টোবর মীরকাশিম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে উপহার হিসেবে চট্টগ্রাম দান করে। বস্তুত; ১৭৬০ থেকেই চট্টগ্রাম (পার্বত্য চট্টগ্রামসহ) ইংরেজ কোম্পানির প্রত্যক্ষ শাসনাধীন হয়। ১০০ বছর শাসনের পর ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ শাসকরা চট্টগ্রামকে দুই ভাগে বিভক্ত করে। পার্বত্য চট্টগ্রাম তখন থেকে স্বতন্ত্র জেলার মর্যাদা লাভ করে। তবে লুসাই পাহাড় ইংরেজ অধিকারে আসার পর ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে জেলার মর্যাদা থেকে মহকুমায় নামিয়ে আনা হয়। ১৯০০ সালে পুনরায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার মর্যাদা ফিরে পায়।
১৮৮১ সালের ১ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামকে ৩টি সার্কেলে চাকমা, মোং ও বোমং সার্কেলে বিভক্ত করে। পরবর্তীকালে প্রতিটি সার্কেলকে অনেকগুলো মৌজায় ভাগ করা হয়।
১৮৮১ সালে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ফ্রন্টিয়ার পুলিশ অ্যাক্ট’ চালু করে পাহাড়িদের সমন্বয়ে স্বতন্ত্র স্থানীয় পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা হয়।
১৯০০ সালের ১ মে ব্রিটিশ সরকার বহুল পরিচিত পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০ (Chittagong Hill Tracts Regulation 1900 Act) জারি করে। পরবর্তীকালে বহুবার এই আইন সংশোধিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আইনের অন্তর্নিহিত কতিপয় ধারা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জন্য চরম অবমাননাকর ও প্রতিক্রিয়াশীল হওয়া সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি নেতৃবৃন্দ কিন্তু ওই এলাকার ভূমিতে তাদের অধিকারসহ পাহাড়ি জাতিসত্তাগুলোর সংস্কৃতি ও স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণে ১৯০০ সালের শাসনবিধিকে রক্ষাকবচ হিসেবে মনে করেন।
১৯০০ সালের আইন ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের সাথে সংগতিপূর্ণ করে পুনর্বিন্যস্ত করা হয়। ১৯০০ সালের আইন সংশোধিত হলেও এবং পার্বত্য জনগোষ্ঠীকে সমতলের জাতীয় সংগ্রামের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হলেও এই আইন পার্বত্য চট্টগ্রামে অ-উপজাতীয়দের অভিবাসনের প্রবল স্রোতকে বহুলাংশে রোধ করতে সক্ষম হয়।

পাকিস্তান আমল
পার্বত্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে গত শতাব্দীর গোড়া থেকেই স্বাতন্ত্র্যবোধের চেতনা সাংগঠনিক রূপ নিতে থাকে। দেশভাগ ও রেডক্লিফ রোয়েদাদের ফলে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে দেশভাগের আগে পার্বত্য জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী চাকমা রাজা ও উপজাতীয় নেতৃবৃন্দ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেন। স্মর্তব্য যে, এই চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় ও মারমা রাজাসহ উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের অনেকেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠারও বিরোধিতা করেন। যদিও ‘ত্রিপুরা’ উপজাতি ও মানিকছড়ির মোং প্রু সাইন চৌধুরীসহ অনেক উপজাতীয় তরুণ এবং নেতৃবৃন্দ মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করে।
চাকমা ও উপজাতীয়দের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে দুই সামরিক শাসক শাস্তিযোগ্য অপরাধ মনে করে।
পাকিস্তানের সামরিক একনায়ক, চরম সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন জেনারেল আইউব খান উপজাতীয়দের পাকিস্তান থেকে বিতাড়নের গোপন অভিলাষে ১৯৫৮ সালে কাপ্তাই বিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নেয়। কৃত্রিমভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিপুল এলাকায় বাঁধ দিয়ে জলাধার বা লেক তৈরি করা হয়। ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ শেষ হওয়ার পরিণতিতে ১ লাখ পাহাড়ি মানুষ বাস্তুভিটা ও জমিহারা হয়ে পড়ে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট চাষযোগ্য জমির ৫৬.০৬ শতাংশ, অর্থাৎ ৫৪ হাজার একর জমি পানিতে তলিয়ে যায়। পুরনো রাঙ্গামাটি শহর চিরদিনের মতো কাপ্তাই হ্রদের পানিতে ডুবে যায়। ৫৪ হাজার একর প্রথম শ্রেণির জমির পরিবর্তে উদ্বাস্তুদের বনাঞ্চল থেকে ১ হাজার একর জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। বিপুল সংখ্যক (প্রায় লক্ষাধিক) চাকমা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। এমন কী আইউব খাঁ পার্বত্য চট্টগ্রামের (১৯০০ সালের আইনে) উপজাতীয় এলাকার মর্যাদাটুকু ছিনিয়ে নেয় ১৯৬৩ সালে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি অভিবাসন শুরু হয়। ১৯৪৭ সালে যেখানে উপজাতি ও অ-উপজাতি জনসংখ্যার অনুপাত ছিল যথাক্রমে ৯৭ শতাংশ ও অনূর্ধ্ব ৩ শতাংশ, ১৯৭০ সালে সেটা বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৮৫ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ।
স্বাধীনতাত্তোর কালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ত্রিদিব রায়কে পদচ্যুত করে দেবাশীষ রায়কে চাকমা রাজা হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি চাকমা, ম্রোং-সহ পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীকে জাতীয় মূলধারার সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। কোনোরকম প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা থেকে বাঙালিদের বিরত করেন।
পক্ষান্তরে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা, তাদের ভূমি দখল, স্বশাসনের আকাক্সক্ষা প্রভৃতি ইস্যুকে পুঁজি করে ১৯৭৩-এ সংসদ সদস্য নির্বাচিত মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা মাওবাদী ভাবাদর্শে প্রভাবিত হয়ে ‘জু¤œ জাতীয়তাবাদের’ সেøাগান তোলেন। ১৯৭২ সালে তিনি জনসংহতি সমিতি নামে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৯৭৩ সালে গঠিত হয় জনসংহতি সমিতির সামরিক শাখা শান্তিবাহিনী।
জনসংহতি সমিতিকে আত্মঘাতী হানাহানি ও রক্তপাতের পথ থেকে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের পথে এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু। এমএন রায় বঙ্গবন্ধু গঠিত বাকশাল কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রাঙ্গামাটি সফরে গিয়ে সর্বপ্রথম উপজাতীয় জনগোষ্ঠীকে ‘জাতীয় সংখ্যালঘু’ হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অধিকার তাদের সংস্কৃতি, জাতিসত্তাগত স্বাতন্ত্র্য এবং জীবনধারাকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন।

অশান্তির জনক জিয়াউর রহমান
কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর পার্বত্য চট্টগ্রামের দৃশ্যপট বদলে যায়। সেনাশাসক জিয়াউর রহমান তার পূর্বতন প্রভু আইউব খানের ইসলামি ভাবাদর্শ এবং প্রতিহিংসা পরায়ণতা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হন। পার্বত্য সমস্যার শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের পথে না গিয়ে সামরিক শক্তি দিয়ে এবং একইসঙ্গে জাতিগত সংকীর্ণতা দিয়ে পার্বত্য জনগোষ্ঠীর কণ্ঠরোধ করার পথ গ্রহণ করেন। একদিকে সেনাবাহিনীকে পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর কায়দায় উপজাতীয় জনগোষ্ঠীকে দমন করার কাজে ব্যবহার, অন্যদিকে সমতল থেকে লাখ লাখ বাঙালিকে পার্বত্য অঞ্চলে অভিবাসী হিসেবে এনে জবরদস্তি করে উপজাতীয়দের জমি-ভিটেমাটি থেকে উৎখাত এবং অ-উপজাতীয়দের বসতি গড়ে তোলেন। ‘১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের সভাপতিত্বে এক গোপন বৈঠকে ৩০ হাজার বাঙালি পরিবারকে পার্বত্য অঞ্চলে পুনর্বাসিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং এর জন্য ৬৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। ১৯৮১ সালে ১ লাখ বাঙালি পরিবারকে ৫ একর জমি ও নগদ ৩ হাজার ৬০০ টাকা দিয়ে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসিত বাঙালির সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লক্ষাধিক। ১৯৭৪ সালে পাহাড়ি-বাঙালি জনসংখ্যার অনুপাত যেখানে যথাক্রমে ৭৩ শতাংশ এবং ২৪ শতাংশ ছিল, ১৯৮১ সেই অনুপাত এসে দাঁড়ায় ৬০ শতাংশ এবং ৪০ শতাংশে। জিয়াউর রহমানের এই নীতি পাহাড়ি বাঙালিদের মধ্যে সংখ্যাগত ভারসাম্য আনতে সক্ষম হলেও পাহাড়িদের সশস্ত্র আন্দোলন বা ইনসার্জেন্সি বন্ধ করতে পারেনি। বরং তা আরও ব্যাপক ও তীব্র করে তোলে।’ [জুম পাহাড়ে শান্তির ঝরণাধারা : ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি, সম্পাদক নূহ-উল-আলম লেনিন, পৃ. ৩৫]
এই ছিল পাহাড়ে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি এবং শান্তিবাহিনী কর্তৃক ‘শান্তি’ বিনষ্টের প্রেক্ষাপট। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর, এমএন লারমা আত্মগোপনে চলে যান। সেনাশাসকরা জাতিগত নিপীড়নের এবং সামরিক সমাধানের পথ গ্রহণ করে। জনসংহতি সমিতি ও শান্তিবাহিনীও সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নেয়। দুই দশক ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে অনবরত রক্তক্ষরণ হতে থাকে। বাংলাদেশের এক-দশমাংশ এলাকাজুড়ে ইনসার্জেন্সি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। যুদ্ধাবস্থা ও গৃহযুদ্ধের ফলে ৬৫ হাজারের বেশি বাংলাদেশের নাগরিক, চাকমা শরণার্থী ভারতের ত্রিপুরায় আশ্রয় গ্রহণ করে। ২০ বছরব্যাপী এই সহিংসতায় প্রতিদিন বাংলাদেশের ১ কোটি টাকা ব্যয় হতে থাকে। সশস্ত্র সংঘাতে বাঙালি, উপজাতীয়, সেনা সদস্য ও শান্তিবাহিনীর সম্মিলিত নিহত ও আহতের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। লাখ লাখ টাকার সম্পদ ধ্বংস হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিণত হয় মৃত্যু উপত্যকায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত হয়।

জননেত্রী শেখ হাসিনার শান্তি উদ্যোগ : শান্তিচুক্তি সম্পাদন
১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা নির্বাচনে জয়লাভ করেন। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের ঘোষণা দেন। রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার দেড় বছরের মাথায় সম্পাদিত হয় ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি। দেশে তো বটেই, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই চুক্তি বিপুল প্রশংসা অর্জন করে। জননেত্রী শেখ হাসিনা শান্তি স্থাপনে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করায় ইউনেস্কো জাতিসংঘের সবচেয়ে সম্মানজনক ‘হুফে বয়েনি’ পিস অ্যাওয়ার্ডে তাকে ভূষিত করে। দীর্ঘ দুই দশকের রক্তপাতের অবসান হয়। শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র যোদ্ধারা আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। শান্তিবাহিনী ভেঙে দেওয়া হয়। ভারতে আশ্রিত ৬৪ হাজার শরণার্থী মাতৃভূমিতে ফিরে আসে। তাদের পুনর্বাসনের জন্য শান্তিচুক্তির অঙ্গীকার মোতাবেক পরিবার পিছু ৫০ হাজার নগদ টাকা এবং ঘরবাড়ির ব্যবস্থা করা হয়।
প্রসঙ্গত একটা কথা স্মর্তব্য। নিশ্চয়ই আমরা ভুলে যাইনি, সে সময়ের বিরোধী দল বিএনপি এবং তাদের মিত্র জামাতসহ সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির কী ধরনের তীব্র বিরোধিতা করেছিল। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করতে গিয়ে এ কথাও বলেছিলেন যে, ‘শান্তিচুক্তি হলে ফেনী পর্যন্ত ভারতের দখলে চলে যাবে।’ শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর শান্তিবাহিনীর প্রথম আনুষ্ঠানিক অস্ত্র সমর্পণের দিনটিতেও বিএনপি-জামাত জোট পার্বত্য চট্টগ্রামে হরতাল আহ্বান করেছিল। পার্বত্য অঞ্চলে অভিবাসী বাঙালি জনগোষ্ঠীকে সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত উগ্রতার দিকে ঠেলে দিয়ে তারা পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এখনও এই অপশক্তি পার্বত্য অঞ্চলে অশান্তি ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য গোপনে ও প্রকাশ্যে বহুমুখী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে অর্জিত সাফল্য
শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পর দুই দশক পেরিয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে শান্তিচুক্তি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে। শান্তিচুক্তি সম্পাদনের এই প্রায় ২১ বছরের মধ্যে বিএনপি-জামাত জোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় থেকেছে প্রায় সাড়ে সাত বছর। ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল সাড়ে তিন বছর। ২০০১ সালের অক্টোবরে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর পাঁচ বছর বিএনপি-জামাত জোট ও ইয়াজউদ্দিন-ফখরুদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার সাত বছর ক্ষমতায় ছিল। স্বভাবতই এই দুটি সরকার শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে আগ্রহী ছিল না। ফলে ২১ বছরের সাড়ে সাত বছরই জাতীয় জীবন থেকে অপচিত হয়। শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন পিছিয়ে যায়।
এই অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও এখন নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে, শতভাগ না হলেও শান্তিচুক্তির সিংহভাগ বাস্তবায়িত হয়েছে। সাধারণভাবে পাহাড়ে শান্তি বিরাজ করছে। যুদ্ধ, হিংসা ও রক্তপাত বন্ধ হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বক্তৃতা প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘শান্তিচুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে। ১৫টি ধারা আংশিক এবং ৯টি ধারা বাস্তবায়নাধীন আছে।’ শান্তিচুক্তির একটি প্রধান শর্ত ছিল শান্তিবাহিনীর অস্ত্র সমর্পণ এবং অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পগুলো প্রত্যাহার করে নেওয়া। শান্তিবাহিনী অস্ত্র সমর্পণ করেছে বটে, তবে জনসংহতি সমিতির একাংশের বিরোধিতা এবং তাদের মধ্যে ইউপিডিএফ নামে নতুন সশস্ত্র গ্রুপের উত্থানের ফলে কিছু কিছু সন্ত্রাসীর হাতে অস্ত্র রয়ে গেছে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘২৫২টি অস্থায়ী ক্যাম্পের মধ্যে গত ১৭ বছরে ২৩৮টি ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। বাকিগুলোও ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে।’
পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী এবং টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রধান ইস্যু হচ্ছে ভূমি সমস্যার সমাধান। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ১৯৯৯ থেকে এ পর্যন্ত ৫টি ভূমি কমিশন গঠন করা হয়েছে। গভীর জটিল এবং স্পর্শকাতর এই ভূমি সমস্যার সমাধানে অপ্রত্যাশিতভাবে বেশ সময় লাগছে। পার্বত্য অঞ্চলের ভূমি মালিকানার ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য, কৃষিব্যবস্থা এবং সমাজ সংগঠনের স্বরূপ অনুধাবন করতে না পারলে এই সমস্যার জট সকলের বোধগম্য হবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঔপনিবেশিক যুগে বলা হতো খধহফ ড়ভ এড়ফ। সমতলের মতো পাহাড়ে যেমন কোনো ভূমি জরিপ এবং জমির মালিখানার রেকর্ড হয়নি, তেমনি জুমচাষে অভ্যস্ত জনগোষ্ঠীর ঘন ঘন চাষাবাদ এলাকা ও বসতি পরিবর্তনের ফলে স্থায়ী ভূমি মালিকানার ধারণাটিও সেখানে ঐতিহাসিকভাবে গড়ে ওঠেনি। বরং ভূমির ওপর ব্যক্তিগত স্বত্বের পরিবর্তে পার্বত্য অঞ্চলে গোত্রীয় বা কমিউনিটি মালিকানার একটি প্রাক-সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
কিন্তু কালের বিবর্তনে বর্তমানে এই প্রিমিটিভ ব্যবস্থাটি সমকালীন বাস্তবতার সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। চুক্তির একটি বড় অনুষঙ্গ হচ্ছে, এই ব্যবস্থার পরিবর্তন করে পার্বত্য অঞ্চলের জমির ওপর ভূমিপুত্রদের ব্যক্তিগত-পারিবারিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য স্থির করা। এ উদ্দেশ্যে প্রণীত হয় ‘ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০০১’। ইতোমধ্যে সকল পক্ষের সম্মতিতে এই আইনের কতিপয় সংশোধনীও গৃহীত হয়েছে। আইনটি এখন ‘ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধিত) আইন-২০১৬’ বলে অভিহিত হবে। এখন এই আইনের ভিত্তিতে প্রাসঙ্গিক বিধিমালা প্রণয়নের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন। ভূমির ওপর স্থানীয় উপজাতীয় জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভূমি জরিপের কর্মসূচিও গ্রহণ করা হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ এবং ৩টি পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠিত হয়েছে। সরকার পর্যায়ক্রমে আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদসমূহের হাতে চুক্তি মোতাবেক স্থিরিকৃত বিষয়াবলী হন্তান্তর করা হয়েছে এবং হচ্ছে। চুক্তির অঙ্গীকার অনুযায়ী ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দের মতো পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের অধীনে স্থানীয় পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ভূমি, বন ও পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়াবলিও পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের কাছে ন্যস্ত করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। আশা করা যায়, উল্লিখিত বিষয়ে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মনে আস্থার সংকট থাকবে না।
অনেক আগেই পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আলাদা মন্ত্রণালয় গঠিত হয়েছে। একজন মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী ও উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর ভেতর থেকে নিয়োগ করা হয়ে থাকে। এই পদক্ষেপ সংবিধানের আওতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পরিবীক্ষণ কমিটি করে দিয়েছেন।
গত দুই দশকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিপুল উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ চলছে। তিন পার্বত্য জেলায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দুর্গম পার্বত্য এলাকায় রাস্তাঘাট নির্মাণ, তিন জেলায় তথ্যপ্রযুক্তির (মোবাইল ফোন) ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি, রাঙ্গামাটিতে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা, ১৭৬টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও সংস্কার, আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, কৃষি পণ্যভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের প্রসার, পর্যটন শিল্পের নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি, বিভিন্ন নৃ-জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি এবং জীবনধারা সংরক্ষণের উদ্যোগসহ বহুমুখী উন্নয়নমূলক কর্মকা- এগিয়ে চলেছে। শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে পার্বত্য অঞ্চলের তরুণ-তরুণীদের জন্য কোটা সংরক্ষণের ফলে ইতোমধ্যে সরকারের বিভিন্ন স্তরে, উচ্চপদে উপজাতীয়গণ নিয়োগ পাচ্ছেন।
পার্বত্য জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র জাতিসত্তাগত সাংবিধানিক স্বীকৃতি, বাংলাদেশে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য সাধন এবং ক্ষুদ্র নৃ-জাতিগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার পথে ঐতিহাসিক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর ২৩(ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।” পূর্বে ধারণা ছিল ইউনিটারি রাষ্ট্রব্যবস্থায় উপজাতি ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার স্বাতন্ত্র্য রক্ষার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার এই ভ্রান্ত ধারণার অপনোদন করেছেন।

aaকতিপয় প্রতিবন্ধকতা ও করণীয় প্রসঙ্গে
এতসব অগ্রগতি ও সাফল্যের পথ যে কুসুমাস্তীর্ণ নয়, ভুক্তভোগী সকলেই তা অবগত আছেন। আজকের সেমিনারে পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ও সম্প্রীতি অর্জনে প্রতিবন্ধকতা ও করণীয় সম্পর্কের বিষয়টি ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে আনা হয়েছে। এ ব্যাপারে আমার ধারণাসমূহ ইতোমধ্যে আমি স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছি। আমি মনে করি, পার্বত্য চট্টগ্রামে মূলগতভাবে শান্তি স্থাপিত হয়েছে, যুদ্ধাবস্থার অবসান এবং রক্তপাত বন্ধ হয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত এবং অগ্রগতির ধারা অব্যাহত আছে। কিন্তু তারপরও শান্তি, সম্প্রীতি এবং চুক্তি বাস্তবায়নে কিছু প্রতিবন্ধকতার প্রশ্নটি অবান্তর নয়।
প্রথমত; শান্তির কথাই ধরা যাক। ২১ বছর আগে পার্বত্য অঞ্চলে অশান্তি এবং রক্তপাতের জন্য দুটি প্রতিপক্ষ ছিল। কিন্তু ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি সম্পাদন ও জনসংহতি সমিতির সামরিক উইং শান্তিবাহিনীর অস্ত্র সমর্পণের ভেতর দিয়ে এখন আর ইনসার্জেন্সি যেমন নেই, তেমনি রাষ্ট্র ও পার্বত্য জনগোষ্ঠী আর পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়। শান্তিচুক্তি সম্পাদন হওয়ায় জনসংহতি সমিতি এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্র কার্যত একপক্ষে পরিণত হয়েছে। কিন্তু তারপরও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পার্বত্য অঞ্চলে বিশেষত খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি জেলায় বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে কিছু সহিংস ঘটনা ঘটেছে। তবে সহিংসতা রাষ্ট্র বনাম অন্যদের মধ্যে নয়। সহিংসতার কারণ জনসংহতি সমিতির যে অংশটি অস্ত্র পরিত্যাগ করেনি তারা এবং ইউপিডিএফ নামক বিভ্রান্ত ও বৈরী গোষ্ঠীটির সন্ত্রাসী কর্মকা-। এই সংঘাতও মূলত নিজেদের মধ্যে। এখানে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সেনাবাহিনী কারও প্রতিপক্ষ নয়।
প্রশ্ন হচ্ছে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর পরস্পরবিরোধী অংশের এই অন্তর্দলীয় সহিংস তৎপরতা এবং শান্তি বিঘিœত করার অপচেষ্টার দায় কার? পার্বত্য অঞ্চলের জনগণের সামগ্রিক কল্যাণ, শান্তি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে এ ব্যাপারে জনসংহতি সমিতি ও অন্যান্য আঞ্চলিক দলকেই সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা, অস্ত্র ও সহিংসতা পরিহার এবং শান্তিচুক্তির প্রতি শর্তহীন আনুগত্যই পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ী ও টেকসই শান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি করতে পারে।
দ্বিতীয়ত; আমরা এ কথাও বিস্মৃত হই না যে, পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়ন ব্যাহত করার মতো উসকানিদাতার অভাব আছে। অ-উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি কৃত্রিম দরদ দেখাতে গিয়ে বিএনপি-জামাত জোট ও উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো যে এখানে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে না, এ কথা কেউ হলফ করে বলতে পারবে না। এ ব্যাপারে অভিবাসী বাঙালি জনগোষ্ঠীকে বিভ্রান্ত ও প্ররোচিত করার সকল অপচেষ্টাকে কঠোর হাতে দমন করতে হবে এবং তাদের মধ্যে সম্প্রীতির মনোভাব গড়ে তোলার জন্য একদিকে সরকারের, রাজনৈতিক দলগুলোর এবং অন্যদিকে উপজাতীয় ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।
তৃতীয়ত; আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, দেশের বাইরে থেকেও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো খোদ উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর ভিতরে সহিংসতার উসকানি দিতে পারে। বাইরে থেকে অস্ত্র-অর্থ দিয়ে তারা উপজাতীয় জনগোষ্ঠী এবং অ-উপজাতীয়দের ভেতরে সশস্ত্র গ্রুপ গড়ে তোলা, সংঘাতে প্ররোচিত করা এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণœ এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিরোধী তৎপরতা চালাতে পারে। এদের ব্যাপারে সবাইকে সমভাবে সতর্ক থাকতে হবে।
চতুর্থত; শান্তিচুক্তির অবশিষ্ট ধারাগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। পারস্পরিক অবিশ্বাস ও আস্থার সংকট দূর করতে না পারলে, যে ‘ক্ষত’ সৃষ্টি হয়েছে, তা সারানো যাবে না। আমি মনে করি, এ ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার ও দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী বাস্তবায়নাধীন ও প্রক্রিয়াধীন ১৫ + ৯টি ধারার সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে হবে। সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে কেউ যেন প্রশ্ন তুলতে না পারে।
বস্তুত; ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির প্রশ্নটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী ও টেকসই সমাধানই হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের মর্মবাণী।
পঞ্চমত; পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোকে আরও সক্রিয় এবং দায়িত্বশীল করে তুলতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী অবশিষ্ট যে বিষয়গুলো পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের হাতে ন্যস্ত করার কথা, তা সম্পন্ন করা হলে এ নিয়ে অহেতুক অসন্তোষ ছড়ানো এবং আস্থাহীনতা সৃষ্টির প্রয়াস বন্ধ হবে। মনে রাখতে হবে, সমস্যা জিইয়ে রাখলে আখেরে তা কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না।
এই ৫টি মূল করণীয় ছাড়াও আরও কিছু ছোটখাটো সমস্যা আছে যেগুলোর সমাধান শান্তি ও সম্প্রীতি অর্জনের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সহায়ক হবে।

শান্তি ও সম্প্রীতির পক্ষে সহায়ক আরও কিছু পদক্ষেপ
ক. পার্বত্য অঞ্চলে চাষাবাদ, বাগান সৃষ্টি ও শিল্পের নামে একদল ভূমিদস্যু সরকারের খাসজমি এবং উপজাতীয় জনগণের বসতভিটা ও জমি দখল করে নিচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। আমি ব্যক্তিগতভাবেও জানি অবৈধ দখলদাররা ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে উপজাতীয়দের জমি-ঘরবাড়ি গ্রাস করছে। ফলে অনেকেই দেশান্তরি হচ্ছে। এই বে-আইনি অপতৎপরতা বন্ধ করতে হবে।
খ. পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত আচরণ এবং সরকারের নীতি বাস্তবায়নে তাদের সততা ও দক্ষতা আস্থার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য অপরিহার্য। বহিরাগত ঔপনিবেশিক শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের জনগণের হৃদয়-মন জয় করা যাবে না। বরং মনে রাখা দরকার উপজাতি ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষগুলো এ দেশেরই মানুষ, আমরা তাদের প্রভু নই। তাদের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করতে পারলে অনেক কাজ সহজ হয়ে যাবে।
গ. পার্বত্য অঞ্চলে রয়েছে বহুপাক্ষিক অথরিটি বা কর্তৃপক্ষ। এক্ষেত্রে সমন্বয়ের অভাব, সমস্যার সৃষ্টি করে। পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, সেনা কর্তৃপক্ষ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন পরিষদÑ প্রভৃতির মধ্যে কাজের সমন্বয় থাকা অপরিহার্য।
ঘ. পাবর্ত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য স্বতন্ত্র উন্নয়ন বোর্ড আছে। তবে পর্যটন শিল্পসহ এই অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়নের কথা একসময় আলোচিত হয়েছে। আমি সম্যক জানি না, এ ব্যাপারে আলাদা কোনো অগ্রগতি আছে কি নেই।
ঙ. কর্ণফুলি পেপার মিলটি পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এটি আমাদের জাতীয় সম্পদ। বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সাথে এটি জড়িত। রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের এই পেপার মিলটি পুনরায় চালু করতে পারলে একদিকে যেমন অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে, অন্যদিকে আমাদের সংবাদপত্র শিল্প ও পুস্তক শিল্পের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। একইসঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলে বন-সংরক্ষণ ও বনায়নের ধারা বেগবান করতে হবে।
চ. পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট’-এর একটি শাখা পার্বত্য অঞ্চলে স্থাপন করা যেতে পারে। অনেক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব মৌখিক ভাষা থাকলেও তাদের বর্ণমালা নেই। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের মতামত ও পছন্দের ভিত্তিতে লিপি বা বর্ণমালা প্রচলন, অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার ব্যবস্থা এবং তাদের জীবনধারার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণÑ সামগ্রিকভাবে পাহাড়িদের মধ্যে বাংলাদেশের মূলধারার জনগণের সাথে সম্প্রীতি, বন্ধুত্ব ও সংহতিবোধ বাড়াতে সহায়ক হবে।
ছ. পার্বত্য জনগণের জীবনধারা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভাস, লোক সংস্কৃতি এবং তাদের আধুনিক জীবনধারায় উত্তরণের লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি ইনস্টিটিউট ও গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।

‘সবার উপরে মানুষ সত্য’
শেষ করতে চাই এ কথা বলে যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম যেমন বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তেমনি উপজাতীয়, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও নৃ-গোষ্ঠীও বাংলাদেশের অবিচ্ছিন্ন মানবসত্তা। আমাদের সংবিধানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ‘মানবসত্তাকে সর্বোচ্চ’ স্থান দেওয়া হয়েছে। বাঙালি জাতি তার ঐতিহ্যগত ধর্ম সহিষ্ণুতা, সংশ্লেষণের ধারা এবং ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’Ñ এই বোধ থেকে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে অর্থপূর্ণ মেলবন্ধন রচনা করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। একইভাবে বাংলাদেশের বড়-ছোট সকল জাতিসত্তা, সকল ধর্মানুসারী এবং সংস্কৃতির মানুষ প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের পীঠস্থান হিসেবে গড়ে তুলবেÑ এটাই আমাদের সবার প্রত্যাশা।

শ্রেণী:

সংবিধান ও বাজেট

Posted on by 0 comment
aa

aaমসিউর রহমান: ‘বাজেট’ শব্দটি বহুল ব্যবহৃত। ব্যক্তি, পরিবার, মুদি দোকান, বহুজাতিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানÑ সকলের নির্দিষ্ট সময়ের আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং আয়-ব্যয় নিয়ন্ত্রণের কৌশল বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়। সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব বোঝাতে সংবিধানে বাজেট শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি, ‘অনুমিত আয় ও ব্যয়’ বা ‘বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি’ ব্যবহার করা হয়েছে :
“প্রত্যেক অর্থ-বৎসর সম্পর্কে উক্ত বৎসরের জন্য সরকারের অনুমিত আয় ও ব্যয়-সংবলিত একটি বিবৃতি (এই ভাগে ‘বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি’ নামে অভিহিত) সংসদে উপস্থাপিত হইবে।” [পরিচ্ছেদ ৮৭(১)]
২. সংবিধান কতিপয় ব্যয়কে দায়যুক্ত শ্রেণিভুক্ত করেছে যথা : রাষ্ট্রপতির পারিশ্রমিক ও দপ্তর সংশ্লিষ্ট ব্যয়, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার, সুপ্রিমকোর্টের বিচারকগণ, সুদ, পরিশোধÑ তহবিলের দায় (সিংকিং ফান্ড), আদালত বা ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে রায়, ইত্যাদি বাবদ ব্যয়। দায়যুক্ত ব্যয়ের প্রস্তাব সংসদ আলোচনা করতে পারে, কিন্তু দায়যুক্ত ব্যয়ের দাবি ভোটে অনুমোদিত বা প্রত্যাখ্যান করা যায় না। [পরিচ্ছেদ ৮৮, ৮৯(১)] যে সকল প্রতিষ্ঠান সাধারণ বা দলীয় রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে রাখা হয়, সে সকল প্রতিষ্ঠানের ব্যয় ‘দায়যুক্ত শ্রেণিভুক্ত’।
৩. দায়যুক্ত নয় এমন সকল অন্যান্য মঞ্জুরি দাবি সংসদে বিতর্কের বিষয় এবং ভোটে অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করা যায়। সংসদ সরকার প্রস্তাবিত ‘মঞ্জুরি দাবি’ কমাতে পারে কিন্তু বাড়াবার অধিকার নাই। [পরিচ্ছেদ ৮৮, ৮৯(১ ও ২)]
৪. সরকারের রাজস্ব এবং প্রাপ্তির হিসাব সংসদ অনুমোদন করে না; আর্থিক বিবৃতিতে প্রস্তাবিত ব্যয়ের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সংস্থানের ব্যবস্থা আছে কি না বোঝাবার জন্য সরকারের আয়ের হিসাব দেয়া হয়। তবে রাজস্ব আহরণ বা কর-আরোপ সংক্রান্ত সকল বিষয় সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত হতে হয় :
“সংসদের কোনো আইনের দ্বারা বা কর্তৃত্ব ব্যতীত কোনো কর আরোপ বা সংগ্রহ করা যাইবে না।” [পরিচ্ছেদ ৮৩]
৫. কোনো অর্থ বিল অথবা সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রশ্ন জড়িত কোনো বিল রাষ্ট্রপতির সুপারিশ ছাড়া সংসদে উত্থাপন করা যায় না। তবে সংসদ প্রস্তাবিত কর হার হ্রাস করতে অথবা কর বিলোপ করতে পারেÑ সেজন্য রাষ্ট্রপতির অনুমোদন দরকার হয় না। দায়যুক্ত মঞ্জুরি দাবি ব্যতীত অন্যান্য মঞ্জুরি দাবি সংসদে উত্থাপনের জন্য রাষ্ট্রপতির পূর্বানুমতির প্রয়োজন, তবে সংসদ মঞ্জুরি দাবি (দায়যুক্ত দাবি বাদে) হ্রাস করতে বা প্রত্যাখ্যান করতে পারে। [পরিচ্ছেদ ৮২, ৮৯(২ ও ৩)]
৬. সংসদ কর্তৃক আইন পাস হবার পর তা অনুমোদনের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে উপস্থাপন করা হয়। রাষ্ট্রপতি ১৫ (পনেরো) দিনের মধ্যে আইন অনুমোদন করেন অথবা পর্যবেক্ষণসহ পুনর্বিবেচনার জন্য পাঠান, পুনর্বিবেচিত আইন পাঠাবার পর সাত দিনের মধ্যে সম্মতি দেবার বিধান বলবৎ আছে। অর্থ বিলের ওপর পর্যবেক্ষণ করা অথবা অনুমোদন প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নাই। [পরিচ্ছেদ ৮০]
৭. কোনো বিল মানিবিল কি না মাননীয় স্পিকার সে সম্পর্কে প্রত্যয়ন করেন; স্পিকারের প্রত্যয়নই চূড়ান্ত। সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত মানিবিলে অনুমোদন রাষ্ট্রপতির পক্ষে বাধ্যতামূলক; মানিবিল পর্যবেক্ষণসহ পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত দেবার ক্ষমতা তার নাই। [পরিচ্ছেদ ৮০(৩), ৮১(১, ২)]
৮. সংবিধান মানিবিলের বিবরণ ও সংজ্ঞা দিয়েছে : কর আরোপ, নিয়ন্ত্রণ, রদবদল, মওকুফ বা রহিতকরণ; সরকারের ঋণ গ্রহণ, গ্যারান্টি দেয়া, সরকারের আর্থিক দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে আইন সংশোধন; সংযুক্ত তহবিলের রক্ষণাবেক্ষণ, অর্থ জমা বা উত্তোলন, দায় আরোপ, দায় রদবদল বা বিলোপ; সংযুক্ত তহবিল বা প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাবের রক্ষণাবেক্ষণ, নিরীক্ষা ইত্যাদি। কিন্তু শুধু নিম্নোক্ত কারণে কোনো বিল অর্থবিল বলিয়া গণ্য নয় :
কোনো জরিমানা বা অন্য অর্থদ- আরোপ বা রদবদল, কিংবা লাইসেন্স-ফি বা কোনো কার্যের জন্য ফি বা উসুল আরোপ বা প্রদান কিংবা স্থানীয় উদ্দেশ্যসাধনকল্পে কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক কোনো কর আরোপ, নিয়ন্ত্রণ, রদবদল, মওকুফ বা রহিতকরণের বিধান করা হইয়াছে, কেবল এই কারণে কোনো বিল অর্থবিল বলিয়া গণ্য হইবে না। [পরিচ্ছেদ ৮১(২)]
৯. বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি ছাড়াও সংবিধান অপ্রত্যাশিত বা আকস্মিক পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য কিছু নমনীয় পদ্ধতির ব্যবস্থা করেছে। কোনো কর্ম বিভাগের (সার্ভিস) জন্য অপর্যাপ্ত ব্যয় অনুমোদিত হলে অথবা ব্যয়ের অনুমোদন না থাকলে, রাষ্ট্রপতি সম্পূরক ব্যয় অথবা অতিরিক্ত ব্যয়ের অনুমতি দিতে পারেন। ব্যয় অনুমোদনের সাধারণ নিয়ম অনুসরণ করে সম্পূরক বা অতিরিক্ত ব্যয় অনুমোদন করা হবে। [পরিচ্ছেদ ৯১] আমাদের বাজেট পদ্ধতিতে সম্পূরক ও অতিরিক্ত ব্যয়ের পার্থক্য করা হয় না। বৎসর শেষে, সকল অতিরিক্ত ব্যয় সম্পূরক ব্যয় হিসাবে সংসদে প্রস্তাব পেশ করা হয়।
১০. সম্পূরক বাজেট ও সংশোধিত বাজেটের মধ্যে পার্থক্য আছে। মূল বাজেটের অনুমোদিত ব্যয় এবং অতিরিক্ত অথবা সম্পূরক ব্যয় সম্পূরক বাজেটের অন্তর্ভুক্ত হয়; প্রকৃত ব্যয় মূল অনুমোদিত ব্যয়ের কম হলে তা পরিবর্তন করা হয় না। সংশোধিত বাজেটে হ্রাসকৃত ব্যয় ধরা হয়, তাই সংশোধিত বাজেট সম্পূরক বাজেট হতে ছোট হতে পারে।
১১. অর্থবছর শুরু হওয়ার আগে (১ জুলাই) আর্থিক বিবৃতি অনুমোদন বাধ্যতামূলক। কোনো কারণে যদি ঐ সময়ের মধ্যে আর্থিক বিবৃতি অনুমোদিত না হয়, তাহলে সংসদ প্রস্তাবিত ব্যয়ের আংশিক মঞ্জুরি দিতে পারে। উক্ত আংশিক মঞ্জুরি চূড়ান্ত মঞ্জুরির অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। [পরিচ্ছেদ ৯২(১)] ১৯৮০-এর দশকে সংসদ আনুমানিক তিন মাসের ব্যয়ের অগ্রিম মঞ্জুরি দিত; আগস্ট বা সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাজেট আলোচনা চলত। ১৯৯০-এর দশক হতে অগ্রিম মঞ্জুরি ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে; জুন মাসের মধ্যেই সম্পূরক বাজেট এবং নতুন বছরের বাজেট (১ জুলাই হতে কার্যকর) আলোচনা ও অনুমোদন সমাপ্ত হয়। যুক্তরাজ্য পার্লামেন্ট একবার অনুমোদিত বাজেটের ৫৬ শতাংশ অগ্রিম অনুমোদন দিয়েছিল।
১২. যদি এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয় যে, ব্যয়ের পরিমাণ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সরকার কোনো স্পষ্ট ধারণা করতে পারে না এবং মঞ্জুরি দাবির জন্য যে সকল তথ্য ও যুক্তি সাধারণত দেয়া হয় তা দেয়া সম্ভব হয় না, তাহলে সরকারের সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করে সংসদ নামমাত্র বা প্রতীকী ব্যয় অনুমোদন করতে পারে। তবে ঐ বৎসরের মধ্যে নির্ভরযোগ্য তথ্য উপস্থাপন করে প্রকৃত ব্যয় নিয়মানুগ করতে হয়। [পরিচ্ছেদ ৯২(১)(খ)]
১৩. সংসদ চলতি বছরের প্রয়োজন মিটাবার জন্য ব্যয় অনুমোদন করে। চলতি বছরের প্রয়োজন নয় এমন প্রয়োজন হলে সংসদ বিশেষ ব্যয় অনুমোদন করতে পারে। [পরিচ্ছেদ ৯২(গ)] এরূপ ব্যয়ের দৃষ্টান্ত অতি বিরল। লর্ড মে উল্লেখ করেছেন যে, যুক্তরাজ্য সংসদ একবার দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনকারী একজন স্পিকারের সম্মানার্থে মূর্তি স্থাপনের জন্য এরূপ ব্যয় অনুমোদন করেছিল। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ইরাক হতে প্রত্যাবর্তনকারী বাঙালিদের কাছ হতে ইরাকি দিনার কেনার জন্য এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল। এরূপ ব্যয় নিয়মিত ব্যয়ে পরিণত হয় না; নিয়মিত ব্যয় এবং এককালীন আকস্মিক ব্যয়ের পার্থক্য নির্ধারণের জন্য এই পদ্ধতি সহায়ক। [পরিচ্ছেদ ৯২(গ)] তবে সংস্কৃতি ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য সরকার যদি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মূর্তি স্থাপন কর্মসূচি গ্রহণ করে, তাহলে ঐ কর্মসূচি সাধারণ সেবা হিসেবে বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হবে।
১৪. সংসদ দুটি পর্বে সরকারি তহবিল হতে ব্যয় অনুমোদন করে। প্রথম পর্বে বিভিন্ন কর্ম বিভাগের জন্য বিবিধ প্রয়োজন মিটাবার জন্য (যথা : বেতন-ভাতা, ভ্রমণ, অফিস পরিচালনা ইত্যাদি) অনুমোদন দেয়া হয় এবং সর্বমোট ব্যয় অনুমোদিত হয়। দ্বিতীয় পর্বে সংযুক্ত তহবিল হতে অর্থ উত্তোলনের জন্য টাকার পরিমাণ নির্দিষ্ট করে আইন করা হয়। সরকার আইন দ্বারা নির্ধারিত অর্থ উত্তোলন এবং ব্যয় করতে পারে। [পরিচ্ছেদ ৯০]
১৫. সরকার কর্তৃক প্রাপ্ত সকল অর্থ সংযুক্ত তহবিল অথবা প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাবে জমা হয়। সংযুক্ত তহবিলে সংজ্ঞার বা বিবরণ নিম্নরূপ :
সরকার কর্তৃক প্রাপ্ত সকল রাজস্ব, সরকার কর্তৃক সংগৃহীত সকল ঋণ এবং কোনো ঋণ পরিশোধ হইতে সরকার কর্তৃক প্রাপ্ত সকল অর্থ একটি মাত্র তহবিলের অংশে পরিণত হইবে এবং তাহা “সংযুক্ত তহবিল” নামে অভিহিত হইবে। [পরিচ্ছেদ ৮৪(১)]
১৬. সরকারের কোনো কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠান সংযুক্ত তহবিলে জমা হবে না এমন কোনো টাকা পেলে তা প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাবে জমা হয় :
(ক) রাজস্ব কিংবা এই সংবিধানের ৮৪ অনুচ্ছেদের (১) দফার কারণে যেরূপ অর্থ সংযুক্ত তহবিলের অংশে পরিণত হইবে, তাহা ব্যতীত প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কিংবা প্রজাতন্ত্রের বিষয়াবলীর সহিত সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি কর্তৃক প্রাপ্ত বা ব্যক্তির নিকট জমা রহিয়াছে, এইরূপ সকল অর্থ; অথবা
(খ) যে কোনো মোকদ্দমা, বিষয়, হিসাব বা ব্যক্তি বাবদ যে কোনো আদালত কর্তৃক প্রাপ্ত বা আদালতের নিকট জমা রহিয়াছে, এইরূপ সকল অর্থ। [পরিচ্ছেদ ৮৬ (ক, খ)]
প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাবে অর্থ জমা বা উক্ত হিসাব হতে অর্থ উত্তোলন ও ব্যয় আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। প্রজাতন্ত্রের জমা অর্থ বাজেটে রাজস্ব প্রাপ্তি খাতে স্থানান্তর করে ব্যয় অনুমোদন করতে হয়। [পরিচ্ছেদ ৮৫]
১৭. প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাবের ধারণায় অস্পষ্টতা রয়েছে। প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাবে জমা অর্থের রক্ষণাবেক্ষণ দায়িত্ব সরকারের; কিন্তু প্রকৃত অর্থে সরকার এ অর্থের মালিক নয়। উদাহরণ : সরকারি কর্মকর্তারা সাধারণ ভবিষ্য তহবিলে টাকা জমা দেন, সরকার সমপরিমাণ টাকা অনুদান হিসাবে জমা করেন, এ টাকা ব্যবহারের জন্য সরকার নির্দিষ্ট হারে সুদ দেয়, যা ঐ ভবিষ্য তহবিলে জমা হয়। সরকারি কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ে সুদসহ সমুদয় অর্থ উত্তোলন করতে পারেন (নিজের জমা + সরকারের জমা + সরকারের দেয়া সুদ)। বিতর্কিত রাজস্ব সংক্রান্ত মোকদ্দমায় ১০% – ৫০% অগ্রিম জমা, মামলা-মোকদ্দমার ফাইন, ইত্যাদি রাজস্ব হিসাবে সংযুক্ত তহবিলে জমা হবে না প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাবে জমা হবে বিষয়টি বিশ্লেষণ ও স্পষ্ট হওয়া বাঞ্ছনীয়।
১৮. সংসদ যথাসময় বাজেট অনুমোদন না করতে পারলে রাষ্ট্রপতি একটি বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে উক্ত বৎসরের আর্থিক বিবৃতি অনধিক ৬০ দিন (অর্থাৎ ২/১২ = ১৬.১৬) ব্যয়ের অনুমতি দিতে পারে। [পরিচ্ছেদ ৯২(৩)] এ ব্যবস্থার রাজনৈতিক দিক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা নিয়ে মতপার্থক্য থাকলে, তা দূর করতে সময় লাগে। ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি না হলে, সংসদ ভেঙে যায় এবং ৯০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
১৯. সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় রাষ্ট্রপতি সরকারের ব্যয় নির্বাহের জন্য অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। [পরিচ্ছেদ ৯৩(৩)] উক্ত উপ-ধারায় রাজস্ব কর আরোপ সম্পর্কে কোনো উল্লেখ নাই, ফলে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। রাজস্ব আহরণ না হলে ব্যয় নির্বাহ সম্ভব নয়। [পরিচ্ছেদ ৮৩, পূর্বে উদ্ধৃত] দীর্ঘ সময় সামরিক শাসন বজায় থাকলে অধ্যাদেশ জারি করে কর আদায় করা হয়। অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে রাজস্ব আহরণের বৈধতা সম্পর্কে কোনো প্রামাণ্য মতামত/ব্যাখ্যা এখনও পাওয়া যায়নি।
২০. বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি অনুমোদনের জন্য নির্ধারিত নিয়ম-নীতির মধ্যে দায়বদ্ধতার মৌলিক বিধান খুঁজে পাওয়া যায়। সংসদে পর্যাপ্ত যুক্তি, তথ্য ও প্রাক্কলনসহ প্রস্তাব উপস্থাপন করতে হবে। যে সকল ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষে এ শর্ত মানা সম্ভব নয়, সংবিধান সে সকল ক্ষেত্রে ভোট অন অ্যাকাউন্ট, ভোট অন ক্রেডিট ইত্যাদি ব্যতিক্রম নির্দেশ করেছে। সংসদে যে দাবি উপস্থাপন করা হয় তা বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য হওয়া আবশ্যক। অতি রঞ্জিত প্রস্তাব সংবিধানের বিধির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যথা : আর্থিক কর্মকা- আকস্মিক কোনো বছর ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে অথবা অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল বা সীমিত থাকা সত্ত্বেও রাজস্ব ২০-২৫ ভাগ বৃদ্ধি পাবেÑ এ জাতীয় প্রাক্কলন বাস্তবানুগ নয়।
২১. বাজেটের কলেবর এবং বাস্তবায়ন যোগ্যতা নিয়ে অনেক মন্তব্য হয়েছে, যা সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিক মনে হয় না। গত কয়েক বছর ৬-৭ শতাংশ আর্থিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, ৫-৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতিসহ অভিহিত (নমিনাল) প্রবৃদ্ধির হার ১১-১৪ শতাংশ হয়েছে। রাজস্ব প্রশাসনের উন্নতির ফলে ৫-৬ পার্সেন্টেজ পয়েন্ট রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পেলে সর্বোচ্চ রাজস্ব বৃদ্ধি হবে ২০ শতাংশ। রাজস্বের অনুপাত ১১-১২ শতাংশ এবং ঘাটতি বাজেট ব্যয় প্রায় ৪.৫ শতাংশে স্থিতিশীল ছিল। বাজেটের কলেবর অর্থনৈতিক কর্মকা-ের সম্প্রসারণের সাথে সংগতিপূর্ণ; অতিমাত্রায় বাড়েনি বা হ্রাস পায়নি।

শ্রেণী:

বাংলাদেশের আলোকে সেক্যুলারিজম

Posted on by 0 comment
june2018

june2018আবুল মোমেন: একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সংবিধানের অন্যতম স্তম্ভ সেক্যুলারিজম নিয়ে বিতর্ক বরাবর ছিল, এখনও আছে। বর্তমানে সমাজ ক্রমেই ধর্মাশ্রয়ী হয়ে পড়ছে। তাতে এ বিতর্ক আর তেমনভাবে আলোচিত হয় না। কিন্তু বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজম অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত, আবার ধর্মও মানুষের অন্তরের বিশ্বাসের বিষয়, তাকে বাদ দেওয়া বা খর্ব করার প্রশ্ন ওঠে না। আধুনিক জীবন বাস্তব কারণেই সেক্যুলার, তাই ধর্ম, গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজমকে বুঝে নেওয়া আধুনিক মানুষের চেতনারই দায়। এ দায় থেকেই আমরা এ আলোচনাটি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি।
সেক্যুলারিজম গণতন্ত্রের মতোই পশ্চিম থেকে উদ্ভূত একটি ধারণা। এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে আজকাল ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে ইহজাগতিকতাই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। যদিও আমার মনে হয় ধর্মনিরপেক্ষতাই সেক্যুলারিজমের অধিকতর নিকটবর্তী শব্দ, তবুও এ নিয়েও সমস্যা আছে। একটি ধারণাকে একটিমাত্র শব্দে অনুবাদ করা কঠিন, কারণ ধারণার পেছনে থাকে ভাবনার ঐতিহ্য এবং সংশ্লিষ্ট নানান অনুষঙ্গ। ইহজাগতিকতা বা ধর্মনিরপেক্ষতা এ দুয়ের কোনোটিই এ দেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে স্বতন্ত্র দার্শনিক প্রত্যয় ও ধারণা হিসেবে চর্চা হয়নি। ফলে ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতা বলে প্রচার চালিয়ে নিন্দুকেরা সাধারণজনকে ভালোভাবে বিভ্রান্ত করতে পেরেছিল। এদিকে ইহজাগতিকতার বোধ এবং এর নানান অনুষঙ্গ ছাড়া কোনো মানবসমাজ তো বিকশিত হয় নি, বাঙালি সমাজও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু তাতেও দুটো বেশ বড় ফাঁড়া কাটানোর দায় এসে পড়েÑ এক. ইহজাগতিকতাকে মানুষ বস্তুতান্ত্রিকতা, এমনকি সুখবাদিতা বা ভোগবাদিতার সাথে গুলিয়ে ফেলতে পারে; দুই. ইহজগৎ শব্দের যেহেতু একটি পাল্টা বিপরীত শব্দ আছে পরজগৎ (ইহকাল-পরকালের মতো) তাই মানুষ ধরে নিতে পারে যে এ ধারণা পোষণ করার অর্থ পরজগৎ এবং সেই সূত্রে ধর্মকে অস্বীকার করা। এই ভক্তিবাদী বৈরাগ্যবাদী ধর্মরসে সিক্ত প্রধানত ধর্মভীরু মানুষের সমাজে ধারণা হিসেবে ইহজাগতিকতাকে নিয়ে মানুষ যে ফাঁপড়ে পড়বে এবং তাদের ভুল বোঝার সমূহ সম্ভাবনা যে থাকবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
ইংরেজি সেক্যুলার শব্দের বিপরীত পাল্টা শব্দ নেই। এর সহজ কারণ রাষ্ট্রসাধনার সাথে সাথে ধারাবাহিক নানা সংগ্রাম-সাধনার একপর্যায়ে গণতন্ত্রের আবশ্যিক অনুষঙ্গ হিসেবে এই প্রত্যয়টি তাদের মনে তৈরি হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠিকই খেয়াল করেছেন যে ভারতবর্ষে, বাংলাসহ, সমাজই প্রধান, রাষ্ট্র নয়; রাজা আর তার শাসন নিয়ে এ অঞ্চল বহুকাল মাথাই ঘামায় নি। তাদের শাসন-পালন বিষয়ক চিন্তা ঘুরপাক খেয়েছে সমাজ আর সমাজপতিদের নিয়ে। রাষ্ট্রশক্তির দখল নিয়ে সপ্তম শতাব্দীতে যখন মাৎস্যন্যায় চলেছিল কিংবা ১৭৫৭-তে যখন পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজ শক্তির কাছে নবাবের পরাজয়ে বাংলার ‘স্বাধীনতা’ বিপন্ন হচ্ছে তখনও সমাজ এতে নাক গলায় নি, আপন বৃত্তে নিবিষ্ট ছিল।
পশ্চিমে নানা প্রকারের দাসপ্রথা আর সামন্তপ্রথার দাপটে প্রজারা রাজার শাসনের চোটপাট ভালোই বুঝত। আর যখন খ্রিস্টধর্মের প্রসার ঘটল তখন চার্চ ও রাষ্ট্রশক্তি জুটি বেঁধে প্রজাসাধারণের ওপর কড়া শাসন চালিয়েছে। অধিকাংশ প্রজার জন্য তা নিপীড়ন ও শোষণেই পরিণত হয়েছিল। ইউরোপে ১১৮৪ থেকে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত ইনকুইজিশনের নামে হাজার হাজার মানুষকে পুড়িয়ে মারা হয় ধর্মের দোহাই দিয়ে। ফলে শোষণমুক্তির দায় তো তাদের নিতেই হয়েছে।
চুম্বকে এটুকু এখানে স্মরণ করতে পারি, চতুর্দশ শতাব্দী থেকে সমুদ্রপথে বাণিজ্যের প্রসার, ইউরোপ ভূখ-ে খনিজ সম্পদের সন্ধান লাভ, শিল্প উৎপাদনের সূত্রপাত ইউরোপে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনতে থাকে। এই সমৃদ্ধির প্রভাবে বাহ্য বস্তুগত পরিবর্তনের সাথে সাথে চিন্তার জগতেও আলোড়ন ওঠে। সঙ্গে সৃজনশীলতার জোয়ার আসে। বাণিজ্য বিপ্লবের অনুবর্তী হয়ে পরপর ঘটে গেল রেনেসাঁস ও রিফর্মেশন, ধর্মযুদ্ধের অবসান ঘটে এলো যুক্তিচর্চার কাল, তাকে অনুসরণ করল আলোকন বা এনলাইটেনমেন্ট। কত রকম ভাবনা ও ধারণার চর্চা করলেন বিজ্ঞানী ও দার্শনিকেরা যা ধর্মের সংশ্লিষ্টতা-মুক্ত উদারনৈতিক ও ইহজাগতিক জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্র-দর্শন তৈরিতে সাহায্য করেছে।
এনলাইটেনমেন্টের দার্শনিক, যেমন ভোলতেয়ার, রুশো ও হিউম বিরাজমান প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র ও গীর্জা, উভয় সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন এবং উভয়ের দিকে সমালোচনার তোপ দেগেছেন। বুঝতে অসুবিধা হয় না ভোলতেয়ার-রুশোদের চিন্তায় অনুপ্রাণিত ছিল বলেই ফরাসি বিপ্লব কেবল রাষ্ট্রকে নয় চার্চসহ গোটা পুরনো সমাজব্যবস্থাকেইÑ তাদের ভাষায় ancient regime  চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল। তখনকার মতো রাষ্ট্রবিপ্লব হিসেবে ব্যর্থ হলেও রাষ্ট্র, সমাজ, শিল্প, সাহিত্যসহ সর্বত্র আধুনিকায়নে এ বিপ্লবের প্রভাব হয়েছে সুদূরপ্রসারী।
ফ্রান্সের চার্চ (মূলত রোমান ক্যাথলিক চার্চ) বিপ্লবের ঝড় সামলে টিকে গেলেও ভূ-সম্পত্তির মালিকানাসহ দ্বিতীয় এস্টেটের মর্যাদাই হারায় নি শুধু, হয়ে পড়ে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন। এ ঘটনা থেকেই বলা যায়, ফরাসি দেশে সেক্যুলারিজমের সূত্রপাত হয়। আরও পরে ১৯০৫ সালে ফ্রান্সে গীর্জা ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণের যে আইন গৃহীত হয় তাতে রাষ্ট্রের কোনো ধর্মকে স্বীকৃতি দান বা অর্থ জোগানো নিষিদ্ধ করা হয়। সংবিধানে ফ্রান্সকে Laique প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়। ফরাসি এ শব্দটি ইংরেজি সেক্যুলারের অনুরূপ ভাবই বহন করে। সে অর্থে আদর্শ সরকার ও রাষ্ট্র ধর্মীয় বিষয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থান নেবে।
১৮০২ সালের নববর্ষের দিন টমাস জেফার্সন আমেরিকার সংবিধানের প্রথম সংশোধনী উদ্ধৃত করে লিখেছিলেন, I contemplate with sovereign reverence that act of the whole American people which declared that their legislature should ‘make no law respecting an establishment of religion, or prohibiting the free exercise thereof,’ thus building a wall of separation between Church and State. চার্চ ও রাষ্ট্রের মধ্যে দেয়াল তোলার কথা বলেছেন জেফার্সন।
গণতন্ত্রের সবলতা ও সার্থকতা যেহেতু সব নাগরিকের সমানাধিকারের ওপর নির্ভরশীল তাই রাষ্ট্র যেন কারও অধিকার, বিশেষত ধর্ম, ভাষা, বর্ণ, জাতি, মতামত ইত্যাদি নানা দিক থেকে যারা সংখ্যালঘু তাদের অধিকার ক্ষুণœ না করে, সেদিকে খেয়াল রাখা আবশ্যিক। সেদিক থেকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে সেক্যুলার হতেই হবে। হ্যারল্ড লাস্কি বলেছেন, “Secularism demands reason as its weapon”। ঠিকই, সমাজে যদি যুক্তির চর্চা না হয় তাহলে তার সেক্যুলার হওয়া অসম্ভব।
আমাদের দেশে ও সমাজে যুক্তি এবং তারই পরিপূরক বিজ্ঞান মনস্কতার চর্চা কতদূর এগিয়েছে সে আলোচনায় যাওয়ার আগে ভারতে সেক্যুলারিজম চর্চার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে একটু খোঁজখবর নেওয়া ভালো হবে বলে মনে হয়।
নেহেরু এবং গান্ধী ভারতবর্ষের স্বাধীনতা লাভ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়ে ওঠার ইতিহাসের দুই প্রতীক ও নায়ক। দুজনের একজন সংশয়বাদী, প্রায় নাস্তিক, অপরজনের জীবন-দর্শন, এমনকি রাজনৈতিক দর্শনেও ধর্ম কেন্দ্রীয় বিষয়। এ দুজনের একজন আধুনিক সেক্যুলার ভারতের জাতির জনক এবং অপরজন সেই রাষ্ট্রের স্থপতি। ভারতীয় সেক্যুলারিজম তাদের দুজনকেই ধারণ করবার চেষ্টা করেছে। এদের রাজনৈতিক সাথী খোদার খেদমতগার খান আবদুল গাফ্ফার খানের কথাও এ সূত্রে টানা যায়। মনে করা যেতে পারে ভারতীয় রাজনীতিবিদ এবং অনেকাংশে ভারতীয় এলিট শ্রেণি, সেক্যুলারিজম বলতে মনে করেছেন সরকার ও শাসনব্যবস্থা কোনো বিশেষ ধর্মের প্রতি দায়বদ্ধ হবে না। বরং ধর্মকে গ্রহণ ও সহনের মনোভাব থেকে রাষ্ট্র সব ধর্মের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কাজ করবে। উপমহাদেশে ধর্মসাম্প্রদায়িক শান্তিসহিষ্ণুতা রক্ষার গুরুত্ব রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক করার এজেন্ডার চেয়ে অনেক বেশি বলেই মনে করা হয়েছে সবসময়। ফলে অন্তর্নিহিত ভাব, প্রত্যয় ও শক্তি অনুধাবনের মাধ্যমে সেক্যুলারিজমকে বোঝার চেষ্টা এখানে হয়নি, বা হওয়া সম্ভব ছিল না, হয়তো তাই মোটা দাগে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার সাথে একে এক করে ফেলা হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা দরকার নেহেরুর আমলে কিন্তু ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে সেক্যুলার রাষ্ট্র হয়নি, হয়েছে তার কন্যা ইন্দিরার আমলে আমাদেরও পরে ১৯৭৬-এ সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে। অনেক ইউরোপীয় তাত্ত্বিক ভারতীয় সেক্যুলারজিমকে আলাদাভাবে দক্ষিণ এশীয় একটি বিশেষ ধারণা হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন, অনেকে আবার একে ছদ্ম সেক্যুলারিজম আখ্যা দিয়েছেন।
এ আলোচনা থেকে আমরা এটুকু বুঝতে পারি যে পশ্চিমের সেক্যুলারিজমের ধারণার সাথে এদিককার ধারণায় কিছু পার্থক্য ঘটেছে। এর প্রেক্ষাপট অনেক জটিল এবং বিস্তৃত, আমরা অতবড় আলোচনায় এখন যাব না।
আমরা লাস্কির মন্তব্য থেকে সেক্যুলারিজমের হাতিয়ার যে যুক্তি তা জেনেছি। এখন জানা দরকার আর কোনো হাতিয়ার কিংবা বৈশিষ্ট্য এর থাকতে পারে? ইংরেজ দার্শনিক জর্জ জ্যাকব হোলিয়োক (George Jacob Holyoake) সেক্যুলারিজমের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে-

“Secularism is a code of duty pertaining to this life, founded on considerations purely human, and intended mainly for those who find theology indefinite or inadequate, unreliable or unbelievable.”

এরপর হোলিয়োক সেক্যুলারিজমের ৩টি নীতির কথা বলেছেন. “The improvement of life by material means, 2. That science is the available Providence of man, 3. That it is good to do good. Whether there be other good or not, the good of the present life is good and it is good to seek that good.”
হোলিয়োকের সংজ্ঞার ভিত্তিতে সেক্যুলারিজমের বাংলা ইহজাগতিক করা খাটে বটে; কিন্তু তাতে বাঙালি এবং উপমহাদেশীয় মানসের খটকা দূর হবে বলে মনে হয় না।
এখন দেখা দরকার একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের আকাক্সক্ষা বারবার ব্যক্ত করে, এর জন্যে বহু ত্যাগ স্বীকার করে দীর্ঘ সংগ্রাম চালিয়ে, এই আকাক্সক্ষা থেকে মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে দেশ স্বাধীন করে, দীর্ঘ সংগ্রামমুখর আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচার উৎখাত করে দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করেও আমরা কেন সেক্যুলার নইÑ না রাষ্ট্রে না সমাজে। বরং ঐতিহ্যগতভাবে এ সমাজে যে সমন্বয়ধর্মী মানবতাবাদী ধারাগুলো ছিল দিনে দিনে সেগুলো স্তিমিত ও স্থবির হয়ে মৌলবাদের ধারা তৈরি ও পুষ্ট হয়েছে, এমনকি জঙ্গিবাদের দিকে ঝোঁকও দেখা দিয়েছে।
আমাদের সমাজে ভাব ও ভক্তিবাদের ঢেউ উঠেছে বারবার। বিশ্বাস ও সংস্কারের বেড়িও পুরনো বলে বেশ শক্ত তাদের শিকড়। এখানকার সংস্কৃত বিদ্যাপীঠে এককালে ন্যায়, নব্যন্যায়, ন্যায়বৈশেষিকের মতো লজিকের চর্চা হলেও তা সমাজে যুক্তিচর্চার পথ সুগম করতে পারে নি। বরং সমাজ চলেছে তার আপন মন্থর গতিতে ধর্মীয় সংস্কার ও বিশ্বাসের বেড়ি পায়ে। ভারতবর্ষে যখন স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয় তখনও সমাজকে যুক্তিবাদিতা ও বিজ্ঞানমনষ্ক করে তোলার প্রয়াসগুলো ছিল সীমিত। রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রয়াস ধর্ম ও সমাজের রক্ষণশীল দুর্গগুলো থেকে বাধার সম্মুখীন হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর জাগরণও সীমিত ছিল কলকাতা এবং বর্ণহিন্দু সমাজে। সমাজে ধর্ম-সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির প্রভাবমুক্ত ইহজাগতিক জীবন-ভাবনা, দর্শন, সংস্কৃতির এমন কোনো আন্দোলন বা চিন্তার ঢেউ ওঠে নি, যা নাগরিক জীবনকে সেক্যুলার ভাবনায় উদ্দীপ্ত করতে পারে। ধর্মীয় সংকীর্ণতা, রক্ষণশীলতা ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে হিন্দুসমাজে কিছু প্রতিবাদী কাজ হয়েছে বটে; কিন্তু তা সমাজকে সেক্যুলারিজমের মূল হাতিয়ার যুক্তির পথে আনার জন্য যথেষ্ট ছিল না। মুসলিম সমাজে আরও পরে ১৯২৬ সাল নাগাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক যে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন সূচিত হয়েছিল তাতে যুক্তির ঝা-া ঊর্ধ্বে তুলে ধরা হলেও রক্ষণশীল সমাজপতিদের দাপটে প্রায় অঙ্কুরেই তা থেমে যায়। তবে এর অন্তর্নিহিত শক্তি বোঝা যায় যখন দেখি এখনও এ আন্দোলন বাঙালি মুসলিম সমাজকে যুক্তির পথ ধরবার পথের দিশা দেয়।
কিন্তু পশ্চিমের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা, এমনকি একসময় সমাজতন্ত্রের জন্যে অঙ্গীকার ও আন্দোলনের জোয়ার চললেও, এমনকি স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাসহ অনেক অর্জন আমাদের হলেও, পুরনো আধাসামন্ত ধারার বিশ্বাস-সংস্কারের অচলায়তন থেকে সমাজকে আমরা মুক্ত করতে পারি নি। রাষ্ট্র নতুন হলেও সমাজের নবায়ন ঘটে নি। মুক্তিযুদ্ধ পুরনো রাষ্ট্র ভেঙে নতুন রাষ্ট্রের জন্ম দিতে পারলেও রাষ্ট্রবিপ্লব হিসেবে ব্যর্থ ফরাসি বিপ্লবের মতো পুরনো সমাজকে খতম করতে পারে নি। দেখা যাচ্ছে পুরনো সমাজ ভেঙে নতুন সমাজ পত্তন জরুরি, তা না হলে রাষ্ট্রের ভাঙা-গড়ায় যে প্রাপ্তি ঘটে তা রাষ্ট্রের ক্ষমতা-কাঠামোয় পরিবর্তন ঘটালেও সমাজসহ সামগ্রিকভাবে মৌলিক রূপান্তর ঘটাতে পারে না, যেটুকু ঘটে তা-ও টেকসই হয় না। বরং আমাদের দেশে দেখছি ঊনসত্তর বা একাত্তরের অমন গণজাগরণ সত্ত্বেও কত সহজেই ধর্মীয় পুনরুজ্জীবনবাদের ধাক্কা এসে স্থবির সমাজে লাগছে এবং সমাজ তাতে পিছু হটছে। সমাজপ্রগতি একেবারেই উপরিতলে বহিরঙ্গে পোশাকি চাকচিক্যের ফাঁদে আটকে পড়ছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে এত ভাঙাগড়া তোলপাড় হলেও পুরনো সমাজব্যবস্থাকে তার বিশ্বাস ও প্রথার সংস্কৃতি থেকে খুব বেশি টলানো যায় নি।
সেক্যুলারিজম এবং তার হাতিয়ার যুক্তি ও বিজ্ঞানমনস্কতার যথেষ্ট দুর্গতি এ সময়ে এ দেশে। পথের বাধা অনেকÑ পশ্চিমা কূটকৌশল ও আগ্রাসনের মুখে ইসলামি পুনরুজ্জীবনবাদ ও জঙ্গি মৌলবাদের উত্থান ও শক্তিবৃদ্ধি, আরব-বিশ্বের সাথে সাক্ষাৎ পরিচয়ের সূত্রে এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের আর্থিক সহায়তায় স্থানীয় মুসলিম সমাজের মধ্যে সাংস্কৃতিকভাবে ইসলামি ও আরবিকরণের ঝোঁক, ওয়াহাবি কট্টরপন্থার শক্তি বৃদ্ধি, আমাদের রাজনৈতিক এবং শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ব্যর্থতা ও দীনতা, দারিদ্র্য, বিশ্বায়নের দাপটে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক দিশাহীনতা, রাজনীতিসহ সর্বক্ষেত্রে যথোপযুক্ত নেতৃত্বের অভাব, মানসম্পন্ন সুশিক্ষার অভাব ইত্যাদি। একে বলা যায় তালগোল পাকানো জগাখিচুড়ি অবস্থা। তার ওপর পণ্যাসক্তি ও ভোগবাদিতার জোয়ারে পশ্চিমে এবং এখানে সর্বত্র আদর্শিক দারিদ্র্য প্রকট হয়ে উঠেছে। মানুষের অন্তর্নিহিত সৃজনশীল শক্তি অবহেলিত হচ্ছে। এর থেকে বেরিয়ে আমরা যে গণতান্ত্রিক মানবিক সহনশীল বিকাশমান সমাজে উত্তরণ চাইছি নিজেদের, সেটি আসলে এক ধরনের সেক্যুলার সমাজ। যেখানে একক নয় মানুষের বহু ও বৈচিত্র্যময় সত্তার প্রকাশ ঘটতে পারে। প্রশ্ন হলো কোন পথে কীভাবে আমরা এই সমাজে পৌঁছাতে পারব? আজ হয়তো আমরা সব পথের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতে যাব না। তবে সেক্যুলারিজমের গোড়ায় যেমন যুক্তি তেমনি তাতে উত্তরণের সোপান হলো শিক্ষা।
একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য চাই সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা। গত শতাব্দীর গোড়ার দিকে এ দেশের মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার করে ব্রিটিশ শাসকরা যে নিউ স্কিম ব্যবস্থা চালু করে তাতে কিছু সেক্যুলার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যেমনÑ ইংরেজি, বাংলা, ভূগোল, ইতিহাস ইত্যাদি। তাতে বাঙালি মুসলিম সমাজে কয়েক প্রজন্ম সেক্যুলার চিন্তার আধুনিক মানুষ তৈরি হয়েছিল।
পাশাপাশি তারা অনেকটাই ব্রিটিশ আদলে ইংরেজি শিক্ষার স্কুল ও পরে কলেজি শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে, যা এ দেশে পূর্ণাঙ্গ সেক্যুলার শিক্ষার আনুষ্ঠানিক সূচনা করে। এ শিক্ষা প্রবর্তনের পিছনে তাদের যে সীমিত লক্ষ্য ছিল তা আমরা জানি। মূলত জনসমাজ থেকে এই শিক্ষিত সম্প্রদায় বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকুক, সেটাই তারা চেয়েছিল। বাস্তবে ঘটেছেও তাই। ব্রিটিশ আমলে গ্রাম পর্যায়ে কিছু স্কুল প্রতিষ্ঠিত হলে তার সফল অংশ সাধারণত নগরে এসে ঔপনিবেশিক শাসকের অধীনে চাকরি করেছে, তুলনামূলকভাবে অসফল অংশ হয়তো গ্রামে থেকে সেখানে একটা নেতৃস্থানীয় তবে ক্ষুদ্র এবং অনেকটা জনবিচ্ছিন্ন সমাজ তৈরি করেছে। ১৯৪৭-এর দেশভাগের সময় হিন্দু-মুসলিম বৈরিতার তীব্রতায় আমাদের সমাজের বহুকালে গড়ে ওঠা সহনশীল মানবিক বাতাবরণ নষ্ট হতে থাকে, এ সময় মুসলিম আত্মপরিচয় ও ইসলামি পুনরুজ্জীবনের এষণাও নানাভাবে প্রকাশ পাচ্ছিল। এখানে একটু স্পষ্ট করে বলতে চাই, মূলত সমাজের বড় দুই ধর্মসম্প্রদায় হিন্দু ও মুসলিম মিলেই বাঙালি সমাজের ঐতিহ্যবাহী সমন্বয়ধর্মী মানবতার সংস্কৃতি দাঁড় করিয়েছিল। বর্ণ হিন্দু এবং আশরাফ মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভক্তির প্রণোদনা থাকলেও নিম্নবর্ণের বিপুল সংখ্যাধিক্যে গঠিত গ্রামসমাজে সমন্বয়ের ধারাটাই প্রধান ছিল। আমাদের রাষ্ট্রসাধনার রাজনীতিÑ কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, এমনকি বাম প্রগতিশীল ধারাÑ বাঙালি সমাজের এই স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও শক্তির জায়গাটি অনুধাবন করতে পারে নি। কীভাবে এই সম্ভাবনার বিকাশের পরিবর্তে রাজনীতির সূত্রেই দুই সম্প্রদায় দূরে সরে যাচ্ছে এবং সমাজ ও সংস্কৃতি থেকে নিরন্তর সমন্বয়ধর্মী মানবতার উপাদান ক্রমে বিলীন হয়ে পড়ছে তাও যথাসময়ে খেয়াল করা হয় নি। ফলে বাঙালির রাষ্ট্র-সাধনায় বাঙালি সমাজের একান্ত নিজস্ব যে প্রত্যয় সমন্বয়ধর্মী মানবতা তাকে এগিয়ে নেওয়ার কোনো চেষ্টাই করা হয় নি।
পাকিস্তানি অপশাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের একটা জোয়ার ঠিকই উঠেছিল। তাকে আমরা সেক্যুলার বলেও ভেবেছিলাম এবং সেই সূত্রেই রাষ্ট্রের চার মূলনীতির অন্যতম ঘোষিত হয় সেক্যুলারজিম বা ধর্মনিরপেক্ষতা। কিন্তু ক্রমেই আমরা টের পাচ্ছি কেবল রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজকে সেক্যুলার করা যায় না। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের রাজনীতি পাকশাসক বিরোধী ছিল বলেই উর্দুভাষী ও পাঞ্জাবি আধিপত্যের বিরুদ্ধে সেদিন বাঙালি হিসেবে একটা অবস্থান নিয়েছিল সবাই। ধর্ম, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও সংস্কৃতি সরাসরি প্রশ্নের সম্মুখীন হয় নি বা এ নিয়ে খুঁটিয়ে বিচার-বিশ্লেষণের প্রয়োজনও দেখা দেয় নি। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পঠন-পাঠনের যেটুকু বিস্তার ঘটেছিল তা চাকরি ও ইহজাগতিক ভাবনা-অভ্যাসে প্রভাব ফেললেও ধর্ম, বিশ্বাসসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক ও মননশীল জিজ্ঞাসা, বিতর্ক ও অনুসন্ধানের তেমন জন্ম দেয় নি।
ফলে নানা ঘটনায়Ñ স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ, পশ্চিমের যন্ত্রসভ্যতার নানা উপচারে অভ্যস্ততা, সব ধরনের যোগাযোগের ব্যাপক বিস্তৃতি, তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতিÑ সমাজের বহিরঙ্গে মানুষের জীবনাচরণে অনেক পরিবর্তন, ধর্মীয় চিহ্নলোপকারী সেক্যুলার পরিবর্তন ঘটলেও সমাজমানসে বড় ধরনের কোনো ভাবান্তর ঘটে নি। এখানে আমাদের শিক্ষার অন্তঃসারশূন্যতা যে কত ব্যাপক তা ফাঁস হয়ে যায়।
এ শিক্ষা ডিগ্রি, সনদ এবং কিছু বিদ্যাও দেয়; কিন্তু দেয় না প্রশ্ন করার সাহস ও ইচ্ছাশক্তি, অনুসন্ধিৎসা চরিতার্থ করার উদ্দীপনা, মৌলিক চিন্তার প্রবণতা ও পুষ্টি। বরং এই শিক্ষাব্যবস্থা শিশু ও শিক্ষার্থীর মধ্যে এসবের যে কুঁড়ি থাকে তাকেই প্রতি স্তরে গুঁড়িয়ে দেয়। তাই কি শিক্ষিত কি শিক্ষাবঞ্চিত সকলেই প্রায় বিনা প্রশ্নে প্রচলিত সব বিশ্বাস ও সংস্কার মেনে নিচ্ছে এখানে। বরং দেখা যায় শিক্ষিতরাই দলে দলে প্রশ্ন ছেড়ে অন্ধবিশ্বাসের পতাকার নিচে আত্মসমর্পণ করছে আজ। ধর্মের নামে যেসব সংস্কার ও সংস্কৃতি চলে আসছে তাকে প্রশ্ন করার সংস্কৃতি এখানে গড়ে ওঠেনি।Ñ সেক্যুলার শিক্ষার ইতিহাস ২০০ বছরের পুরনো হলেও।
এবারে ধর্মের একটু ভেতরের কথা বলি। ইসলামে ইজতিহাদ বা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিধান থাকলেও গত কয়েকশ বছর ধরে মুসলিম রাষ্ট্রের শাসক আর সর্বত্র মুসলিম সমাজের ধর্মীয় নেতাদের কর্তৃত্ববাদী ভূমিকার ফলে কোথাও থেকে এরকম মুক্ত আলোচনার খবর পাওয়া যায় না। ফলে সারাবিশ্বের প্রায় সকল মুসলিম সমাজ স্থবির হয়ে পড়েছে এবং স্থবিরতাজাত নানা বিকার ও সংকটে ভুগছে। তার ওপর এখন পশ্চিমের আগ্রাসী মুক্তবাজার অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের থাবার তলায় পড়ে সংকট আরও জটিল হচ্ছে ও বেড়ে চলেছে।
কথা হলো একটা সমাজের বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই, না দেখার ভান করে কোনো সিদ্ধান্তও দেওয়া যাবে না। আমার মনে হয় মুসলিম সমাজ কেবল যে পশ্চিমের সামরিক আগ্রাসনের শক্তি ও প্রমত্ততাকে ভয় পাচ্ছে তা নয়, ধ্রুপদী ও আধুনিক সকল শিল্পকলা, ঢালাওভাবে বিজ্ঞান ও দর্শন চিন্তাগুলোকেও ভয় ও সন্দেহের চোখে দেখে আসছে এবং প্রায় চর্চা ও বিশ্লেষণ ছাড়াই আগেভাগেই একতরফা নাকচ করে বসে থাকছে। ফলে মুসলিম সমাজ সেক্যুলার শিক্ষাটা নিচ্ছে নানা স্বাদের খাবারের পার্টিতে শুচিবায়ুগ্রস্ত বিধবার মতো কায়ক্লেশে গা (এক্ষেত্রে মন ও বিশ্বাস) বাঁচিয়ে। এভাবে বৈধব্য জীবন কাটানো হয়তো সম্ভব; কিন্তু বিকাশমান যৌবন ও জীবনের জন্যে তা পথ ও পাথেয় নয়।
বড় কথা হলো সমাজমানসের গভীরে বদ্ধমূল হয়ে যাচ্ছে ভয়, অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয় রক্ষার ব্যাকুলতা। এটা অসুস্থতা, মানসিক রোগ, সন্দেহ নেই। যা সে ভয় পাচ্ছে সেখানে তাকে একলা ছেড়ে দিলে হয়তো কাজ হবে না। এই ভীত মানসকে আশ্বস্ত করা দরকার। দরকার কোনোরূপ প্রশ্রয় না দিয়ে অভয় দেওয়া।
ইদানীংকালে সাংস্কৃতিক সেক্যুলার শিক্ষা বা Cultural secular education বলে একটা কথা চালু হয়েছে। এটা এ কারণেও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ যে মানুষ তো বাস করে মূলত একটি সাংস্কৃতিক আবহে। সেখানে ধর্ম একটি উপাদান; কিন্তু সাংস্কৃতিক রূপ ও তাৎপর্য স্থিত নয়, সংস্কৃতি সবসময় বহমান এবং তাই বলা যায় পরিবর্তমান, সংযোজন বিয়োজনের চলমান প্রক্রিয়ায় এসবের নবায়ন রূপান্তর চলতেই থাকে। ফলে শিক্ষাটা সাংস্কৃতিকভাবে এমনভাবে সমৃদ্ধ হওয়া দরকার যাতে নিজের সংস্কৃতির বহুমাত্রিকতা ও অন্যান্য সংস্কৃতির বৈচিত্র্য অনুধাবনেরও সামর্থ্য অর্জিত হয়। শিক্ষা তাই অন্য জাতির সাথে পরিচয় করানোর পাশাপাশি অন্য সংস্কৃতি, অন্যান্য ধর্ম, বিশ্ব ইতিহাস, বিজ্ঞানের মূল অর্জনসমূহ, দর্শনের কিছু বিষয়, বিশেষভাবে বিশ্বের নানা অঞ্চলের পুরাকাহিনির (mythology) সাথে পরিচয় করাবে। পরিচয় স্কুলেই ঘটতে হবে। স্কুলে ছাত্র কেবল পড়া ও পরীক্ষা দেওয়ার ছাত্র হবে না, (নাচ, গান, বিজ্ঞানের টেস্টসহ) দেখাশোনাসহ একটা জ্বলজ্যান্ত প্রাণবন্ত জিজ্ঞাসু মানুষ হবে। সকল ভয় থেকে সে যেন মুক্ত থাকে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। এই মানুষ তার জ্ঞান অর্জন করে নেবে, এবং তখন ধর্মও একটা বাধ্যবাধকতা না হয়ে চর্চা করে অর্জনের এবং তাই সত্যিকারের ভালোবাসার বিষয় হতে পারবে।
বিশ্বাসীর সেক্যুলারিজমকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা সামাজিক ধর্মপালনে সেক্যুলারিজমের আপত্তি নেই। বরং ইহজগৎটা অধিকতর মনোযোগ ও যতœ পেলে জীবন সুন্দর ও সার্থক হবে, তাতে পরকাল নিয়ে যারা ভাবিত তাদের লাভ বৈ ক্ষতি নেই। আর সেক্যুলার চেতনা জোরদার হলে ইহজগৎটা সুন্দর ও মানবিক হবেÑ তাতেও সর্বশেষ গন্তব্য হিসেবে স্বর্গে পৌঁছানোর সম্ভাবনাই বাড়ে! লাস্কির কথা দিয়ে শেষ করি, “ÒThe lights of heaven are not extinguished but their illumination seems more distant as the secular spirit grows.” বেহেস্ত একটু দূরবর্তী হওয়াই ভালো, খেটে অর্জন করতে হবে তো!

শ্রেণী:

নারীর ক্ষমতায়ন ও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগ

Posted on by 0 comment
june2018

june2018সিমিন হোসেন রিমি: ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগের পথ চলার শুরু। দীর্ঘ এই পথ চলায় আওয়ামী লীগ এঁকেছে নতুন নতুন পদচিহ্ন। গণমানুষের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে এই দল সংগ্রাম, ত্যাগ ও আদর্শ বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থেকে তৈরি করেছে অমোচনীয় দীপ্তিময় ইতিহাস। পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনের ধারায় ভয়ঙ্কর দারিদ্র্য, চরম বৈষম্যে ভরা সমাজকে দেখিয়েছে অর্থনৈতিক মুক্তি, রাজনৈতিক স্বাধিকারের স্বপ্ন। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সীমাহীন সংকট মোকাবিলা করতে করতে আওয়ামী লীগ পরিণত হয়েছে উদারপন্থি গণতান্ত্রিক দলে। এর নীতি, কর্মসূচি, সাংগঠনিক কাঠামো প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে এই দল গণমানুষের। এসব কিছুর পুরোভাগে থেকে যিনি মুক্তির কপোত ওড়ান, একের পর এক শৃঙ্খল ভেঙে এগিয়ে চলেন দৃঢ় পায়ে তিনি হয়ে ওঠেন সকলের বন্ধুÑ বঙ্গবন্ধু। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সম্মোহনী নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা আওয়ামী লীগের শ্রেষ্ঠ অর্জন। আওয়ামী লীগ এ দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৪৯ থেকে ২০১৮, আওয়ামী লীগ উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর আরও। এ দেশের মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, সাফল্য-সৃষ্টি, উন্নয়ন, অর্জনÑ সব কিছুর সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে এই দল। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠান জননেত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী, সাহসী কর্মোদ্যোগী নেতৃত্বে বিশ্বসভায় আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল।
আওয়ামী লীগের পথ চলা কখনোই মসৃণ ছিল না। রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে পদে পদে। কিন্তু নীতি-আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দলীয় কর্মসূচিতে সকল সময় প্রাধান্য পেয়েছে মানুষ। মানুষের সার্বিক কল্যাণ-চিন্তা। উঠে এসেছে সমাজের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম প্রয়োজন এবং বাস্তবায়নের পরিকল্পনা।
সমাজের প্রধান অনুষঙ্গ মানুষ। মানুষের দুই রকম আদল নারী এবং পুরুষ। কাউকে বাদ দিয়ে কেউ নয়। এ যেন সভ্যতার দুটি হাত। একটি হাত অকেজো হলে এক হাত অক্ষম বহু কিছুতে। দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নারীকে মর্যাদা দিয়েছে মানুষ হিসেবে একেবারে তার জন্মলগ্ন থেকেই। যার একটি সুন্দর উদাহরণ পাওয়া যায় ১৯৬৪ সালে পুনরুজ্জীবিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের খসড়া ম্যানিফেস্টোতে, সেখানে মৌলিক অধিকার অংশে বলা হয়েছেÑ “নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পাকিস্তানের প্রতিটি নাগরিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বীকৃত প্রতিটি মৌলিক অধিকার ভোগের অধিকারী। যথাÑ নাগরিকদের ধর্ম, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু জীবনযাপনের অধিকার ও সুযোগ প্রতিষ্ঠা করতে হইবে। সকল নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজনীয় খাদ্য, বাসস্থান, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ন্যায়সংগত উপায়ে উপার্জনের ব্যবস্থা থাকিতে হইবে। আইনের চোখে সকলে সমান বলিয়া পরিগণিত হইবে।” [সূত্র : আওয়ামী লীগ ১৯৪৯-১৯৭১, পৃষ্ঠা-৩২৩, শ্যামলী ঘোষ]
এই ম্যানিফেস্টোর শিক্ষা অংশে বলা হয়েছে, “পাকিস্তানের প্রত্যেক নাগরিকের শিক্ষার অধিকারের বাস্তব রূপ দানের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করিতে হইবে। মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এরূপ ব্যাপকভাবে প্রসারিত ও এরূপ সহজলভ্য ও সুলভ করিতে হইবে যাহাতে প্রতিটি দরিদ্র নাগরিকের ছেলেমেয়ে এই শিক্ষা লাভের সুযোগ গ্রহণ করিতে পারে। যুগের ও দেশের চাহিদানুসারে কারিগরি শিক্ষার ব্যাপক প্রসার করিতে হইবে, এই জন্য দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের এবং বিদেশে ট্রেনিং প্রাপ্তির ব্যবস্থা করিতে হইবে।” [সূত্র : আওয়ামী লীগ ১৯৪৯-১৯৭১, পৃষ্ঠা-৩২৩, শ্যামলী ঘোষ]
আওয়ামী লীগ গতানুগতিক চিন্তার ঊর্ধ্বে উঠে নারীকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এগিয়ে নেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। যে চিন্তা সবকালেই আধুনিক, যৌক্তিক মানুষের চিন্তা। যে চিন্তায় মৌলিকত্বের আশ্বাস এবং নিশ্চয়তা মেলে। নারীকে অনগ্রসর রেখে সমাজ উন্নত হতে পারে না। নারী শিক্ষা লাভ করবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে। অর্থনৈতিক কর্মকা-ে অংশ নেবে, স্বাবলম্বী হবে। আওয়ামী লীগ শুরু থেকেই এক্ষেত্রে স্পষ্ট এবং অকপট।
এ কারণেই হয়তো আমরা দেখি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অঙ্গনে কখনও নেপথ্যে আবার কখনও প্রকাশ্যে নারীর বিশাল অবদান। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চড়াই-উৎরাই জীবনের ছায়াসঙ্গী ছিলেন তার আজন্ম সাথী বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব। স্বাধীনতার পূর্বে বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ কারাবাসের সময় তিনি হয়ে উঠেছিলেন অসংখ্য নেতাকর্মীর আশ্রয় ও ভরসাস্থল। নিজ পরিবারকে সুচারুরূপে পরিচালনা করা এবং একই সঙ্গে বহু কিছুতে আমৃত্যু তার ভূমিকা ছিল দৃঢ়তায় ভরা অনন্য।
প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই আওয়ামী লীগে নারীর অংশগ্রহণ ছিল। ভাষা আন্দোলনে যেসব ছাত্রী ও শিক্ষয়িত্রী অংশগ্রহণ করেছিলেন, পরবর্তীতে তাদের অনেকেই আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ব্যানারে ৯ জন নারী নেত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন। এদের মধ্যে আনোয়ারা বেগম, দৌলতুন্নেসা, নূরজাহান মুর্শিদ, বদরুন্নেসা আহমেদ, সেলিনা হোসেন এবং আমেনা বেগম পরবর্তীকালে জাতীয় আন্দোলনের মূলধারার নেত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
১৯৬৬ সালে ৬-দফা আন্দোলনের সময় যখন বঙ্গবন্ধুসহ দলের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ কারাগারে বন্দী, সেই সময় দলের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা আমেনা বেগম দলকে এগিয়ে নিতে বিশাল ভূমিকা রাখেন।
ষাটের দশকের এই পর্বে কারাগারে বন্দী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের স্ত্রী সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন রাজবন্দি সাহায্য কমিটি যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের ফলে বঙ্গবন্ধু বীরের বেশে মুক্তির দিশারি রূপে মুক্ত হলে শুধু আওয়ামী লীগ নয়, সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান যেন প্রাণ ফিরে পায়। বঙ্গবন্ধুর মনের গভীরে সুখী সমৃদ্ধশালী সোনার বাংলার চিত্র ছিল আঁকা, তাতে তিনি যুক্ত করেছিলেন প্রগতিশীল চিন্তার বিশিষ্ট নারীদের। ১৯৭১ সালে গৌরবময় আত্মত্যাগের মহান মুক্তিযুদ্ধে নারী সমাজের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের বিশেষভাবে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সময় কলকাতার সন্নিকটে গোবড়া ক্যাম্পে নারীদের প্রশিক্ষণের ও সংগঠিত করার কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন বেগম সাজেদা চৌধুরী। তার সাথে আরও অনেক নারী নেত্রী যুক্ত ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হন মিসেস বদরুন্নেসা আহমেদ, মিসেস নূরজাহান মুরশিদ।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নির্মমভাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশের ওপর নেমে আসে দুর্দিন। আড়াই মাস পর নভেম্বরের ৩ তারিখে হত্যা করা হয় জেলে বন্দী জাতীয় চার নেতা বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে। এরপর অবৈধ সামরিক শাসনের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকে সমস্ত রাজনৈতিক কর্মকা-। ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসের শেষ ভাগে আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে দলের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং মহিলাবিষয়ক সম্পাদিকা বেগম সাজেদা চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। এর তিন মাস পর বেগম সাজেদা চৌধুরীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে কারারুদ্ধ করা হয়।
এরপর ১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাসে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে সর্বসম্মতিক্রমে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে আহ্বায়ক করে ৪৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি সাংগঠনিক কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এই সম্মেলনে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন তার বক্তব্যে বলেন, আওয়ামী লীগ একটি আদর্শভিত্তিক সংগঠন। এ ধরনের সংগঠনের মৃত্যু নেই। তিনি আরও বলেন, জাতি আজ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বর্তমানে স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু ইতিহাস বিকৃত করা যায় না। শুধু রক্তপাত দিয়ে স্বাধীনতা আসে না। যদি তা হতো তাহলে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ সফল হতো। নেতৃত্ব ছাড়া স্বাধীনতা সংগ্রাম হয় না। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকেই স্বাধীনতা সংগ্রাম হয় এবং তা সফল হয়। [সূত্র : মূলধারার রাজনীতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল ১৯৪৯-২০১৬, পৃষ্ঠা-১৮৪-৮৫, হারুণ-অর-রশিদ]
সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন উল্কাবেগে ছুটে চলেন জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগকে নতুন জাগরণে সংগঠিত করতে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তিনি থাকেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ’৭৮ সালে কাউন্সিল অধিবেশনে তিনি তার সাংগঠনিক রিপোর্ট তুলে ধরেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন ৫৭টি সাংগঠনিক জেলার দলীয় কর্মী সমাবেশে তিনি যোগ দেন। তার বক্তব্যের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মাইক ব্যবহার এবং এটিকে আন্দোলনের শুরু হিসেবে বর্ণনা করা, বঙ্গবন্ধুকে মহান শিক্ষক হিসেবে আখ্যায়িত করা, আওয়ামী লীগকে গড়ে তুলতে বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ দিনের ত্যাগ ও সংগ্রাম, শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখসহ রাজনৈতিক সামাজিক প্রয়োজনীয় প্রায় সব বিষয়ের উল্লেখ করে নেতা-কর্মীদের ভবিষ্যৎ আন্দোলনের ইঙ্গিত দিয়ে সেজন্য মানসিক প্রস্তুতির আহ্বান জানান। [সূত্র : মূলধারার রাজনীতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল ১৯৪৯-২০১৬, পৃষ্ঠা-১৮৪-৮৫, হারুণ-অর-রশিদ]
১৯৮১ সানে ঐক্যের প্রতীক, উজ্জ্বল তারকা রূপে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে নিজ দেশে ফিরে এসে দলের হাল ধরেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো একটি দিক হলো, দলের দীর্ঘ পরিক্রমায় রাজনৈতিক সংকটকালে অনেক নেতা দল ছেড়েছেন, দলের বিরুদ্ধাচারণ করে দলকে বিপদে ফেলেছেন। কিন্তু এই বিপথগামীদের দলে কোনো নারী কখনোই ছিলেন না। আওয়ামী লীগের নারী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের দলের প্রতি ভালোবাসার এই নজির অনন্যই নয় শুধু, অনুকরণীয়ও বটে।
সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন স্বাধীনতার পূর্বে যেমন ভূমিকা রেখেছেন তেমনি পরবর্তীতে দলের ক্রান্তিকালে হাল ধরেছিলেন। দেশ ও দলের প্রতি ভালোবাসা ছিল তার জীবনের ধ্যান-ধারণা। আমৃত্যু একনিষ্ঠভাবে দলের সাথে জড়িয়ে ছিলেন। বেগম সাজেদা চৌধুরী দলের সুদিনে-দুর্দিনে দলকে করেছেন সংগঠিত। দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন, এখনও মিশে আছেন দলের সাথে। আইভি রহমান নারী নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল নাম। অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন নারীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে। তার সংগঠনের প্রতি ভালোবাসা ছিল অমলিন। প্রাণ উৎসর্গ করেছেন ঠাঁই নিয়েছেন হৃদয়ে। আরও আছে অসংখ্য উদাহরণ। প্রতিটি জেলা-উপজেলায় ছড়িয়ে আছেন নিবেদিত প্রাণ নারী। প্রতিকূল পরিবেশ, সামাজিক নানা ধরনের বৈষম্যকে ঠেলে আঁকড়ে আছেন দলের সাথে।
১৯৮১ সালে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর এক বৈরী পরিবেশে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাকে লড়াই করতে হয়েছে। একদিকে দলকে সুসংগঠিত করা অন্যদিকে সামরিক শাসনের শৃঙ্খলমুক্ত করে জনগণের ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার দুরূহ সংগ্রামে জীবনবাজি রেখে অকুতোভয় সংগ্রাম। এই সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রভাষায় অধিষ্ঠিত করেন তিনি।
বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, চার জাতীয় নেতার হত্যাকা-ের বিচার কার্যক্রম শুরু, গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার মতো ঐতিহাসিক সাফল্যে উজ্জ্বল হয়ে আছে ১৯৯৬-২০০১-এর শাসনামল। তিনিই প্রথম ‘নারীনীতি’ প্রণয়ন করেন। পিতার নামের পাশাপাশি মায়ের নাম লেখার আইন কার্যকর করেন। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে, নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত একটানা প্রায় ১০ বছর জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের লজ্জা ঘুচিয়ে এখন উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জন করেছে। আওয়ামী লীগের এই তিনবারের শাসনামলে বাংলাদেশে নারীর অবস্থান মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। আমি বিস্তারিত বিবরণ না দিয়ে মাত্র কয়েকটি ক্ষেত্রের উল্লেখ করছিÑ
১. বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা ও জাতীয় সংসদের স্পিকার নারী।
২. সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীতে কেবল সাধারণ সৈনিক পদে নয়, উচ্চপদে এখন অসংখ্য নারী যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন।
৩. সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি নিম্ন আদালতের বিচারক, মন্ত্রণালয়ের সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, জেলা প্রশাসক পদে এবং রাষ্ট্রদূত পদে নিয়োজিত আছেন বহুসংখ্যক নারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদেও এই প্রথম নারী দায়িত্ব পেয়েছেন।
৪. সরকারি কাজে নিয়োজিত নারীর মাতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধি, শিশুর জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার, বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা প্রচলনের পাশাপাশি মাতৃমৃত্যুর হার দক্ষিণ এশিয়ার সর্বনিম্নে নামিয়ে আনা হয়েছে।
৫. নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ৪৫ থেকে ৫০-এ উন্নীত করেছে। ইউনিয়ন ও পৌরসভা স্থানীয় সরকারের সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন প্রথা চালু করেছে।
৬. দ্বিতীয়ত নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে বিনামূল্যে বই বিতরণ স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ এবং মেয়েদের উপবৃত্তি প্রচলনের ফলে বাংলাদেশে নারী শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রীদের হার-এ ছেলেদের ছাড়িয়ে গেছে মেয়েরা। প্রায় ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী এখন মেয়ে।
৭. খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-েও মেয়েরা সমানতালে এগিয়ে চলেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রমীলা ফুটবলাররা বয়সভিত্তিক আন্তর্জাতিক ফুটবলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বাংলাদেশের মেয়ে নিশাত মজুমদার এবং ওয়াসফিয়া নাজরীন এভারেস্ট জয় করেছেন।
৮. সমাজ ও রাষ্ট্রের এই পরিবর্তনের প্রভাব রাজনৈতিক দলেও প্রতিফলিত। ২০২১ সালের মধ্যে সকল রাজনৈতিক দলের কর্মকর্তা পর্যায়ে ৩৩ শতাংশ নারীকে নির্বাচিত করার বিধান রয়েছে রাজনৈতিক দলবিধিতে। এ মুহূর্তে ৩৩ শতাংশ না হলেও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সংসদসহ সকল স্তরে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দলের সভাপতিম-লী, সম্পাদকম-লী ও কার্যকরি সংসদে রয়েছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী। এই হার ২০ শতাংশের ওপরে।
৯. দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের নারীদের গড় আয়ুষ্কাল এখন সবচেয়ে বেশি।
১০. দেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ১ কোটি ৬০ লাখ ছাড়িয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ১৬ হাজার ছাড়িয়েছে। বিদেশে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত রয়েছে ৮২ হাজারের বেশি নারী। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধানতম ক্ষেত্র গার্মেন্টস খাতের ৮০ শতাংশ কর্মীই নারী। দেশের ৯০ শতাংশ ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবহারকারীও নারী। নানা প্রতিকূলতা, বাধা ডিঙিয়ে তার এখন কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলোতেও দিন দিন এই হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। নারীরা যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করে প্রমাণ করেছেন, কর্মগুণ বিচারে নারী-পুরুষের পার্থক্য বিচার করা এখন অবান্তর। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশে সামাজিক-অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতা সত্ত্বেও রাজনীতিতে, প্রশাসনে এবং কর্মবৃত্তে নারীর অশংগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই অমোঘ বাণী ‘বিশ্বের যা কিছু মহান, চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’Ñ এই উচ্চারণ এখন আর নিছক, স্বপ্ন-কল্পনা নয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতার প্রদর্শিত পথ এবং বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নারী-পুরুষের বৈষম্যমুক্ত এক উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে উঠছে।
এসব কিছু সম্ভব হয়েছে জননেত্রী শেখ হাসিনার পরিকল্পিত দৃঢ় নেতৃত্বের কারণে। জাতির পিতার অসমাপ্ত স্বপ্নকে বাস্তব সোনার বাংলা তথা দারিদ্র্যমুক্ত ক্ষুধামুক্ত উন্নত দেশের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। শুধু নারী নয় সকল মানুষের জন্য অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব জননেত্রী শেখ হাসিনা। প্রতিষ্ঠার প্রায় ৬৯ বছর পর আজও আওয়ামী লীগ অসামান্য জনপ্রিয়তা নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়ে দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।
শেষ করি জননেত্রী শেখ হাসিনার কথা দিয়েÑ “আমাদের লক্ষ্য আরও বিস্তৃত। সুদূর আগামীর বাংলাদেশ নিয়েই আমাদের সুদীর্ঘ পরিকল্পনা। তাই ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে আধুনিক শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও উন্নত দেশে পরিণত করতে চাই।” [সূত্র : মূলধারার রাজনীতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল ১৯৪৯-২০১৬, পৃষ্ঠা-৪৫২-৪৫৫, হারুণ-অর-রশিদ]
লেখক : সংসদ সদস্য

শ্রেণী:

আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্র, কর্মসূচি ও লক্ষ্য

Posted on by 0 comment
june2018

june2018নূহ-উল-আলম লেনিন: মুসলিম লীগের বিশ্বাসঘাতকতা, অঙ্গীকার ভঙ্গ, দুঃশাসন এবং ভিন্নমতের কণ্ঠরোধের প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের জন্ম। জন্মলগ্নে, ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন আওয়ামী লীগের প্রথম সম্মেলনে গৃহীত খসড়া ঘোষণাপত্রে ‘মূল দাবি’তে বলা হয়েছিল, পাকিস্তানের দুই ইউনিটের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার, সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচন, গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করেছিল। সম্মেলনে গৃহীত ১২ দফাÑ
“১. পাকিস্তান একটি স্বাধীন-সার্বভৌম ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র হবে। পাকিস্তানের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হবে জনসাধারণ।
২. রাষ্ট্রে দুটি আঞ্চলিক ইউনিট থাকবেÑ পূর্ব ও পশ্চিম।
৩. অঞ্চলগুলো লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে। প্রতিরক্ষা-বৈদেশিক সম্পর্ক ও মুদ্রা ব্যবস্থা কেন্দ্রের হাতে থাকবে এবং অন্য সকল বিষয় ইউনিটগুলোর হাতে ন্যস্ত থাকবে।
৪. সরকারী পদাধিকারী ব্যক্তিরা কোন বিশেষ সুবিধা বা অধিকারভোগী হবেন না কিংবা প্রয়োজনাতিরিক্ত বেতন বা ভাতার অধিকারী হবেন না।
৫. সরকারী কর্মচারীরা সমালোচনার অধীন হবেন, কর্তব্য সম্পাদনে ব্যর্থতার জন্য তাদের পদচ্যুত করা যাবে এবং অপরাধের গুরুত্ব অনুসারে তাদের ছোটখাটো বা বড় রকমের সাজা দেয়া যাবে। আদালতে তারা কোন বিশেষ সুবিধার অধিকারী হবেন না। কিংবা আইনের চোখে তাদের প্রতি কোনরূপ পক্ষপাত প্রদর্শন করা হবে না।
৬. জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করবেনÑ যথা বাকস্বাধীনতা, দল গঠনের স্বাধীনতা, অবাধ গতিবিধি ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের অধিকার।
৭. সকল নাগরিকের যোগ্যতানুসারে বৃত্তি অবলম্বনের অধিকার থাকবে এবং তাদের যথাযোগ্য পারিশ্রমিক দেয়া হবে।
৮. সকল পুরুষ ও নারীর জন্য শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে।
৯. পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোতে সকল নাগরিকের যোগদানের অধিকার থাকবে। একটি বিশেষ বয়সসীমা পর্যন্ত সকলের জন্য সামরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নিজস্ব স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীর ইউনিট গঠন করা হবে।
১০. মৌলিক মানবিক অধিকারসমূহ দেয়া হবে এবং কোন অবস্থাতেই কাউকে বিনা বিচারে আটক রাখা হবে না। বিনা বিচারে কাউকে দ-দান বা নিধন করা হবে না।
১১. বিনা খেসারতে জমিদারী ও অন্য সকল মধ্যস্বত্ব বিলোপ করা হবে। সকল আবাদযোগ্য জমি পুনর্বণ্টন করা হবে।
১২. সকল জমি জাতীয়করণ করা হবে।”
সামাজিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে খসড়া ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছিল, ভূমি সংস্কার বিনা খেসারতে জমিদারি উচ্ছেদ এবং প্রকৃত কৃষকদের মধ্যে জমি বণ্টন, যৌথ খামার ও সমবায় ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সকল শিল্প-কারখানা জাতীয়করণ, শিল্প-কারখানা পরিচালনায় শ্রমিকদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ, শ্রমিকদের সন্তানদের বিনামূল্যে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা এবং তাদের ধর্মঘটের অধিকার প্রভৃতি।
এছাড়া দেশের শিল্পায়ন, শিক্ষার বিস্তার ও নারীর অধিকারের কথাও প্রথম ঘোষণাপত্রে লিপিবদ্ধ ছিল। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, প্রথম ঘোষণাপত্রের ২২ দফা আশু কর্মসূচির ১৮নং দফায় আওয়ামী লীগ ব্রিটিশ কমনওয়েলথের সাথে সম্পর্কোচ্ছেদ এবং ১৯নং দফায় “আগামী তিন মাসের ভিতরে জাতিসংঘ গণভোট দ্বারা কাশ্মীর সমস্যার সমাধান না করিলে পাকিস্তান কর্তৃক জাতিসংঘ ত্যাগ।”-এর ঘোষণা দিয়েছিল।
আওয়ামী লীগের প্রথম ঘোষণাপত্রের তাৎপর্য বুঝতে হলে প্রতিষ্ঠালগ্নের পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিবেশ, জনগণের মনস্তত্ত্ব এবং চেতনার স্তর এবং প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যেও ভাবাদর্শগত টানাপোড়েন সম্পর্কে ধারণা থাকা বাঞ্ছনীয়। প্রথম ঘোষণাপত্রে ঘোষিত খিলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা, ধর্মাশ্রিত রাজনৈতিক সেøাগানের আড়ালে বাঙালির অধিকার এবং এমন কী ‘পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রসংঘ’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বোঝা যাবে না।
আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে, মুসলিম লীগের গর্ভেই ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’র জন্ম। ১৯৪৯ সালে যারা স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল গঠন করেন, তারা প্রায় সবাই ছিলেন ১৯৪৭-এর আগের নিখিল ভারত তথা অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগের সদস্য। দেশভাগের আগেই, পাকিস্তান আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখনই বেঙ্গল মুসলিম লীগে রক্ষণশীল ও উদারনীতির অনুসারী দুটি অংশের মধ্যে সুস্পষ্ট বিভাজন সৃষ্টি হয়েছিল। উত্তর ভারতের অভিজাত ও প্রতিক্রিয়াশীল মুসলিম লীগ নেতারাই কার্যত দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দখল করেছিল। এদের আশীর্বাদপুষ্ট ছিল বেঙ্গল মুসলিম লীগের জমিদার, সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল অংশের প্রতিনিধিত্বকারী খাজা নাজিমুদ্দিন গ্রুপ। আর এর বিপরীতে ছিল অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের নেতৃত্বাধীন প্রগতিশীল এবং উদারপন্থি অংশ। ১৯৪৭ সালে এই অংশটিই সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে বাংলাভাগের বিরুদ্ধে ছিল। এই অংশটি তখন দলে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। বেঙ্গল মুসলিম লীগের অফিসিয়াল নেতৃত্ব ছিল সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। বেঙ্গল কংগ্রেসের নেতা শরৎবোস (নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর বড় ভাই) এবং প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতা কিরণ শঙ্কর রায় এবং মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম গ্রুপ বাংলাকে ভাগ না করে ‘অখ- সমাজতান্ত্রিক বাংলা’ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। তারা স্বাধীন অখ- বাংলার সংবিধানের একটা রূপরেখাও প্রণয়ন করেছিলেন। কিন্তু বেঙ্গল কংগ্রেসের হিন্দুত্ববাদী শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির নেতৃত্বে হিন্দু জমিদার, বড় ব্যবসায়ী, উচ্চবিত্ত, বর্ণহিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণি বাংলাভাগের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। মুসলিম লীগ ভারত ভাগ করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা তথা ভারত ভাগের আনুষ্ঠানিক দাবি নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করেছিলÑ এ কথা সত্য। কিন্তু রেডক্লিফ রোয়েদাদ অনুযায়ী বাংলাভাগের ব্যাপারে প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বঙ্গীয় আইনসভার কংগ্রেস দলীয় সদস্যগণ (কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টি) এবং কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি। ফলে যুক্ত বাংলা করার উদ্যোগ ভেস্তে যায়।
বাংলাভাগ ঠেকাতে না পারায় মুসলিম লীগের নেতৃত্ব ও সোহরাওয়ার্দী আবুল হাশিম গ্রুপের হাতছাড়া হয়ে যায়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব বাংলার (পূর্ব পাকিস্তান) প্রথম মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান খাজা নাজিমুদ্দিন। মুসলিম লীগে সোহরাওয়ার্দীর অনুসারীরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দলের নেতৃত্ব থেকেই বাদ পড়েন নি, তারা শাসক মুসলিম লীগের নির্যাতনের শিকারে পরিণত হন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই সোহরাওয়ার্দী অনুসারী মুসলিম লীগের নেতৃস্থানীয় সদস্যরা ১৫০ মোগলটুলিতে অফিস বা ক্যাম্প স্থাপন করেছিলেন। তারা মুসলিম লীগ কর্মী শিবির নাম দিয়ে এই অফিস চালু করেন। বস্তুত দেশভাগের পর এই কার্যালয়টিই হয়ে ওঠে অফিসিয়াল মুসলিম লীগের প্রতিপক্ষ এবং প্রগতিশীল অংশের আশ্রয়কেন্দ্র এবং সকল কর্মকা-ের কেন্দ্র।
আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানী তখন আসাম ত্যাগ করে ঢাকায় চলে আসেন। সিলেটকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার গণভোটে আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানীর ছিল উদ্যোগী ভূমিকা। অথচ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মওলানা ভাসানীকে নাজিমুদ্দিনের মুসলিম লীগ চরম উপেক্ষা করে। স্বাভাবিকভাবেই মওলানা ভাসানী ১৫০ মোগলটুলির মুসলিম লীগ কর্মীদের সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করতে শুরু করেন। পাকিস্তান সরকার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে পূর্ব পাকিস্তানে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে এবং তার প্রদেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী একদিকে পূর্ব বাংলা (বাংলাদেশ)-কে কার্যত তাদের উপনিবেশে পরিণত করে। জন্মলগ্ন থেকেই দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী, বাঙালিরা তাদের জাতিগত নিপীড়ন, আঞ্চলিক বৈষম্য, গণতন্ত্রহীনতা এবং ভাষা-সংস্কৃতির প্রশ্নে বঞ্চনার শিকারে পরিণত হয়। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ‘উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণার পটভূমিতে গড়ে ওঠে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন। জিন্নাহর ঢাকা সফরের প্রাক্কালে ছাত্র ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবসহ বহুসংখ্যক ছাত্র নেতা, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবীকে গ্রেফতার করা হয়। ’৪৮-এ সূচিত এই আন্দোলনই, ’৫২-এর ভাষা সংগ্রামে পরিণত হয়।
’৪৮-এর ভাষা আন্দোলন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারীদের আন্দোলন, খাদ্যের দাবিতে আন্দোলন, দ্রব্যমূল্য হ্রাসের আন্দোলন এবং জমিদারি প্রথা বাতিলের দাবিতে জনমত প্রভৃতির পটভূমিতে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ ক্রমেই জনবিচ্ছিন্ন হতে থাকে। একইসঙ্গে মুসলিম লীগ তীব্র দমননীতির আশ্রয় গ্রহণ করে। তারা আওয়ামী লীগের প্রতিবাদী অংশটিকে পাকিস্তান-বিরোধী, ইসলাম-বিরোধী এবং ভারতের দালাল হিসেবে মিথ্যা প্রচারণা চালায়। একই সময়ে কমিউনিস্ট পার্টিসহ অন্যান্য সেকুলার গণতান্ত্রিক দল ও বুদ্ধিজীবীদের ওপরও চালায় অত্যাচারের স্টিম রোলার। পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র দুই বছরের মধ্যেই এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যার ফলে দেশপ্রেমিক, উদার গণতন্ত্রী এবং সোহরাওয়ার্দীর অনুগত মুসলিম নেতা-কর্মীদের ঐ দলে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। টাঙ্গাইলের প্রাদেশিক পরিষদের শূন্য আসনে উপনির্বাচনে অফিসিয়াল মুসলিম লীগ প্রার্থীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে জয়লাভ করে স্বতন্ত্র (মুসলিম লীগ কর্মী) প্রার্থী শামসুল হক। টাঙ্গাইলের উপনির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর মুসলিম লীগ আর কোনো উপনির্বাচন দিতে সাহস পায়নি।
আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের আগে শাসক মুসলিম লীগের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে একটা কার্যকর বিরোধী দল গড়ে তোলার প্রশ্নে ব্যক্তিগত, সমমনাদের ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপ এবং বড় নেতাদের পর্যায়ে বহু মতবিনিময় ও আলাপ-আলোচনা হয়। গ্রেফতারের পূর্বে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীগণ নারায়ণগঞ্জের খান সাহেব ওসমান আলীর বাসভবনে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। বলা যেতে পারে খান সাহেব ওসমান আলীর বাড়িতেই আওয়ামী লীগের ‘ভ্রƒণ’ জন্ম নেয়।
১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন ঢাকার টিকাটুলির রোজ গার্ডেন প্রাঙ্গণে মুসলিম লীগের গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণ দেন মওলানা ভাসানী। এই সম্মেলন থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে নতুন রাজনৈতিক দল। দলের উদ্বোধনী অধিবেশনে শেরে বাংলা একে ফজলুল হকও উপস্থিত ছিলেন। কথা ছিল তিনিও আওয়ামী লীগে যোগদান করবেন। কিন্তু পরে তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।
সম্মেলনে ৪০ সদস্য বিশিষ্ট সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়। মওলানা ভাসানীকে সভাপতি ও শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। কারাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২৪ জুন সম্মেলন শেষে আরমানিটোলা মাঠে আওয়ামী লীগের প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতিত্ব করেন মওলানা ভাসানী।
আমরা আগেই বলেছি এই সম্মেলনে শামসুল হকের ১২-দফা মূল দাবি গৃহীত হয়। পরবর্তীতে খসড়া ম্যানিফেস্টো রচিত হয়।
ম্যানিফেস্টোতে তখনকার বাস্তবতায় ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অপপ্রচারের মুখ বন্ধ করার কৌশল হিসেবে। আওয়ামী লীগকে যাতে ইসলাম-বিরোধী, পাকিস্তান-বিরোধী এবং ভারতের দালাল হিসেবে প্রচার করেও জনগণকে বিভ্রান্ত করতে না পারে সে জন্য এই রক্ষণশীল এবং প্রগতিবিরোধী লক্ষ্য কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এই একই ম্যানিফেস্টোতেই আবার সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ঘোষিত হয়। সকল ধর্মের মানুষের সমান অধিকারের ঘোষণাও দেওয়া হয়।
নবগঠিত আওয়ামী লীগের নেতাদের ধারণা ছিল ব্রিটিশ কমনওয়েলথ-এর সদস্য থাকা মানে দেশের পূর্ণ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জিত না হওয়া। সে জন্যই কমনওয়েলথের প্রশ্নে সম্পর্কোচ্ছেদের ঘোষণা দেওয়া হয়। অন্যদিকে কাশ্মীর ইস্যুটি তখন পাকিস্তানের উভয় অংশের মানুষের কাছে খুবই আবেগ ও স্পর্শকাতর বিষয় ছিল। আওয়ামী লীগ তাই আগ বাড়িয়ে তিন মাসের আলটিমেটাম দিয়ে জাতিসংঘ ত্যাগের হুমকি দেয়। এসব দাবিই ছিল তখনকার বাস্তবতায় জনগণের মনোস্তত্ত্বকে তুষ্ট করার কৌশল।
তবে ম্যানিফেস্টোতে ভূমি সংস্কার ও বিনা খেসারতে জমিদারি উৎখাতের দাবিটি যথার্থ ছিল। কিন্তু যৌথ খামার ও জমির সমবণ্টন এবং সকল শিল্প-কারখানা জাতীয়করণ ও শ্রমিকদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে কারখানা পরিচালনার দাবিগুলো ছিল কিছুটা স্বপ্ন-কল্পনা বা ইউটোপিয়া।
আমার মতে, আওয়ামী লীগের জন্মলগ্নের প্রথম সম্মেলনের ১২-দফা মূল দাবিই ছিল এই দলটির গড়ে ওঠা ও বিকাশধারার মূল ভিত্তি।
মূল দাবির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হচ্ছে ২নং ও ৩নং দাবি অর্থাৎ, ২নং. “রাষ্ট্রের দুটি আঞ্চলিক ইউনিট থাকবে, পূর্ব ও পশ্চিম”, ৩নং “অঞ্চলগুলো লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে। প্রতিরক্ষা-বৈদেশিক সম্পর্ক ও মুদ্রাব্যবস্থা কেন্দ্রের হাতে থাকবে এবং অন্য সকল বিষয় ইউনিটগুলোর হাতে ন্যস্ত থাকবে” এবং ৯নং দাবি “পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোতে সকল নাগরিকের যোগদানের অধিকার থাকবে। একটি বিশেষ বয়সসীমা পর্যন্ত সকলের জন্য সামরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নিজস্ব স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীর ইউনিট গঠন করা হবে।” Ñ বলা যেতে পারে এই ৩টি দাবির মধ্যেই ৬-দফা দাবির বীজ উপ্ত ছিল।
১৯৫৩ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহার ঐতিহাসিক ২১-দফা প্রণয়ন করেছিল আওয়ামী লীগ। ২১-দফার ১নং দফায় প্রকৃতপক্ষে ২, ৩ ও ৯নং দফার মর্মবাণীই পুনরুচ্চারিত হয়েছে। ’৫৪-এর নির্বাচন বাংলার মানুষ মুসলিম লীগকে চূড়ান্তভাবে এবং ২১-দফা কর্মসূচির পক্ষে রায় দেয়। নানা প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, উত্থান-পতন ও চড়াই-উৎরাইয়ের ভেতর দিয়ে ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পূর্ব বাংলায় ও পাকিস্তানের কেন্দ্রে বেসামরিক, নির্বাচিত সরকারের ধারা অব্যাহত থাকে। ১৯৫৬-৫৮ এই দুই বছর পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগ সরকার এবং ১৯৫৬-৫৭ পাকিস্তানের কেন্দ্রে সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতায় ছিল। ’৫৪ থেকে ’৫৮ সালের যুক্তফ্রন্ট ও আওয়ামী লীগের শাসনামলে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা হয়, মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন বর্ধমান হাউসকে বাংলা একাডেমির কার্যালয়ে রূপান্তরিত করা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের নির্মাণকাজ শুরু করা হয়, চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন গঠনসহ বেশ কিছু গণমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হয়। সিদ্ধান্ত হয় এই সংবিধানের ভিত্তিতে অবিলম্বে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এছাড়া ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে প্রথমে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে আওয়ামী লীগের নামের সাথে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া তথা আওয়ামী লীগকে ধর্মনিরপেক্ষ দলে রূপান্তরিত করার প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। ৫৭ সদস্যের ওয়ার্কিং কমিটির ২৭ জন সদস্য খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। অবশ্য ১৯৫৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ সেক্যুলার দলে পরিণত হয়।
এই সময়ে আরও দুটি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা সংঘটিত হয়। ১৯৫৭ সালের ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারীতে আওয়ামী লীগের বিশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী উপস্থিত ছিলেন। মওলানা ভাসানী পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি। সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান। কাগমারী সম্মেলনে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে উত্থাপিত হয়। কিন্তু এই সম্মেলনেই মওলানা ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর মধ্যে তথা পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের মধ্যে প্রধানত পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে চূড়ান্ত মতপার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। কাগমারী সম্মেলনের এক মাসের মধ্যেই মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেন। ১৯৫৭ সালের ১৩ ও ১৪ জুন ঢাকায় আরমানিটোলা নিউ পিকচার হাউসে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। ভাসানী দল ত্যাগ করলেও আওয়ামী লীগ তাকে সভাপতির পদে বহাল রাখে। কিন্তু ভাসানী সাহেব তখন নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করার উদ্যোগ নেন। ১৯৫৭ সালের ২৫ ও ২৬ জুলাই এক নিখিল পাকিস্তানভিত্তিক সম্মেলনের মাধ্যমে মওলানা ভাসানী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নামে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল গঠন করেন।
ইতোমধ্যে পাকিস্তানে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের রাজনীতি চূড়ান্ত রূপলাভ করে। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর এক সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। প্রথমে ইস্কান্দার মির্জা এবং পরে ‘লৌহ মানব’ আইয়ুব খাঁ সামরিক শাসক হিসেবে আবির্ভূত হন। দীর্ঘ চার বছর (১৯৫৮-১৯৬২) সামরিক শাসন অব্যাহত থাকে। সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। চলে জেল জুলুম অত্যাচার। ১৯৬২ সালে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের ফলে সামরিক শাসন প্রত্যাহৃত হয়। আইয়ুব খাঁ ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ নামে সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র চালু করে। ১৯৬৪ সালের মার্চ মাসে আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত হয়।
পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রস্তাবে পূর্ব বাংলায় স্বায়ত্তশাসনের নিশ্চয়তা দান, পাকিস্তানের দুই অংশের সমান উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের অবসান, সামরিক দিক থেকে পূর্ব বাংলাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে গড়ে তোলা এবং ফেডারেল ধরনের পার্লামেন্টারি সরকার ব্যবস্থা চালুর দাবি উত্থাপিত হয়।
১৯৬৪ সালের ৬ জুন প্রকাশিত হয় পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের ১১-দফা খসড়া ম্যানিফেস্টো। এই ম্যানিফেস্টোতেও লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি উত্থাপিত হয়। এবারই প্রথম কেন্দ্রের হাতে মুদ্রা থাকার প্রস্তাবটি বাদ দেওয়া হয়।
১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর গোলটেবিল বৈঠকে ৬-দফা আলোচনার এজেন্ডাভুক্ত করতে চাইলে গোলটেবিল বৈঠক ভেস্তে যায়। লাহোরেই বঙ্গবন্ধু ৬-দফা দাবি প্রকাশ করেন।
৬-দফাকে বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তিসনদ হিসেবে ঘোষণা করেন। ১৯৪৯ সালের প্রতিষ্ঠালগ্নের যে তিন-দফা দাবির কথা আমরা ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছি, সেই তিন দফা, যুক্তফ্রন্টের ২১-দফা, ১৯৬৪ সালের ১১-দফা প্রভৃতি দাবিকে ভিত্তি করেই প্রণীত হয় ঐতিহাসিক ৬-দফা। জন্মলগ্নের স্বপ্ন ৬-দফায় আরও সুস্পষ্ট অবয়ব লাভ করে। ১৯৪৯-এ পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও মুদ্রাব্যবস্থা কেন্দ্রের হাতে রেখে অবশিষ্ট সকল ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে ন্যস্ত করার দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু আইউবের শাসনামলে দুই অংশের অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকট রূপ ধারণ করে। পূর্ব বাংলার অর্থে পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলা হয়। ১৯৬৫-এর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পূর্ব বাংলার নিরাপত্তাহীনতা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই বঙ্গবন্ধু ৬-দফা দাবিতে স্বায়ত্তশাসন বা ফেডারেল ধরনের সরকার ব্যবস্থার কথাই নয়, তিনি স্পষ্টভাবে দুই অর্থনীতি, দুই মুদ্রা, দুই রিজার্ভ ব্যাংকের কথা যেমন উপস্থাপন করেন; তেমনি পূর্ব বাংলায় নৌবাহিনী সদর দফতর এবং নিজস্ব মিলিশিয়া বাহিনী গড়ে তোলার কথা বলেন। কার্যত কেন্দ্রের হাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব আংশিক প্রতিরক্ষা ক্ষমতা রেখে পূর্ব বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি উত্থাপন করেন। ৬-দফা কার্যত প্রকারান্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবিতে পরিণত হয়।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ ৬-দফার পক্ষে গণভোট দাবি করেন। ৬-দফা তখন ছাত্রসমাজের ১১-দফার অন্তর্ভুক্ত। নির্বাচনী ইশতেহারে বঙ্গবন্ধু সে কথা উল্লেখ করেন। কিন্তু নির্বাচনী ইশতেহারে ও নির্বাচন উপলক্ষে প্রদত্ত ভাষণে তিনি বারবার বলেছেন, প্রাণের দাবি ৬-দফা হচ্ছে বাঙালির মুক্তির সনদ বা ম্যাগনাকার্টা। ’৭০-এর নির্বাচনকে তিনি তাই ৬-দফার পক্ষে ‘গণভোট’ হিসেবে উল্লেখ করেন। বাংলার মানুষ সেই ঐতিহাসিক গণভোটে যেমন ৬-দফার পক্ষে নিরঙ্কুশ রায় প্রদান করে তেমনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাদের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বরণ করে নেয়।
প্রবন্ধটি শেষ করব এ কথা বলে যে, সময়ের পরিবর্তনে, যেমন রাজনৈতিক আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে নানা পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, তেমিন অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের মানুষের চিন্তাধারা ও মন-মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে। পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক দ্বি-জাতিতত্ত্বের যে মোহজালে বাঙালি মুসলমান আচ্ছন্ন ছিল ভাষা-সংগ্রাম থেকে ৬-দফা, ১১-দফা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে সেই মোহজাল যেমন ছিন্ন হয়েছে, তেমনি তাদের বাঙালি আত্মপরিচয় নিয়ে নতুন চেতনার উন্মেষ হয়েছে। একইসঙ্গে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে তাদের আশা-আকাক্সক্ষা ও চেতনার স্তর নতুন উচ্চতায় বিকশিত হয়েছে। অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ, নিজেদের জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষার পাশাপাশি ‘সমাজতন্ত্রের’ প্রতিও এক ধরনের প্রত্যাশা বাঙালি জাতিকে উজ্জীবিত করেছে। ১৯৪৯ সালের প্রথম খসড়া ম্যানিফেস্টোতে তখনকার রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে ধর্মাশ্রিত নানা আপ্তবাক্য বলা হলেও, ঐ ম্যানিফেস্টোতেই প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল স্বশাসনের কথা, গণতন্ত্রের কথা, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের সম-অধিকার এবং শোষণমুক্ত সমাজ তথা সমাজতন্ত্রের কথা। ১৯৪৯ সালে রোপিত বীজটিই ’৭০ সালে মহীরুহে পরিণত হয়েছিল এবং ’৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে তা যৌক্তিক পরিণতি লাভ করেছিল।

শ্রেণী: