সংবিধান ও বাজেট

Posted on by 0 comment
aa

aaমসিউর রহমান: ‘বাজেট’ শব্দটি বহুল ব্যবহৃত। ব্যক্তি, পরিবার, মুদি দোকান, বহুজাতিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানÑ সকলের নির্দিষ্ট সময়ের আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং আয়-ব্যয় নিয়ন্ত্রণের কৌশল বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়। সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব বোঝাতে সংবিধানে বাজেট শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি, ‘অনুমিত আয় ও ব্যয়’ বা ‘বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি’ ব্যবহার করা হয়েছে :
“প্রত্যেক অর্থ-বৎসর সম্পর্কে উক্ত বৎসরের জন্য সরকারের অনুমিত আয় ও ব্যয়-সংবলিত একটি বিবৃতি (এই ভাগে ‘বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি’ নামে অভিহিত) সংসদে উপস্থাপিত হইবে।” [পরিচ্ছেদ ৮৭(১)]
২. সংবিধান কতিপয় ব্যয়কে দায়যুক্ত শ্রেণিভুক্ত করেছে যথা : রাষ্ট্রপতির পারিশ্রমিক ও দপ্তর সংশ্লিষ্ট ব্যয়, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার, সুপ্রিমকোর্টের বিচারকগণ, সুদ, পরিশোধÑ তহবিলের দায় (সিংকিং ফান্ড), আদালত বা ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে রায়, ইত্যাদি বাবদ ব্যয়। দায়যুক্ত ব্যয়ের প্রস্তাব সংসদ আলোচনা করতে পারে, কিন্তু দায়যুক্ত ব্যয়ের দাবি ভোটে অনুমোদিত বা প্রত্যাখ্যান করা যায় না। [পরিচ্ছেদ ৮৮, ৮৯(১)] যে সকল প্রতিষ্ঠান সাধারণ বা দলীয় রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে রাখা হয়, সে সকল প্রতিষ্ঠানের ব্যয় ‘দায়যুক্ত শ্রেণিভুক্ত’।
৩. দায়যুক্ত নয় এমন সকল অন্যান্য মঞ্জুরি দাবি সংসদে বিতর্কের বিষয় এবং ভোটে অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করা যায়। সংসদ সরকার প্রস্তাবিত ‘মঞ্জুরি দাবি’ কমাতে পারে কিন্তু বাড়াবার অধিকার নাই। [পরিচ্ছেদ ৮৮, ৮৯(১ ও ২)]
৪. সরকারের রাজস্ব এবং প্রাপ্তির হিসাব সংসদ অনুমোদন করে না; আর্থিক বিবৃতিতে প্রস্তাবিত ব্যয়ের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সংস্থানের ব্যবস্থা আছে কি না বোঝাবার জন্য সরকারের আয়ের হিসাব দেয়া হয়। তবে রাজস্ব আহরণ বা কর-আরোপ সংক্রান্ত সকল বিষয় সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত হতে হয় :
“সংসদের কোনো আইনের দ্বারা বা কর্তৃত্ব ব্যতীত কোনো কর আরোপ বা সংগ্রহ করা যাইবে না।” [পরিচ্ছেদ ৮৩]
৫. কোনো অর্থ বিল অথবা সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রশ্ন জড়িত কোনো বিল রাষ্ট্রপতির সুপারিশ ছাড়া সংসদে উত্থাপন করা যায় না। তবে সংসদ প্রস্তাবিত কর হার হ্রাস করতে অথবা কর বিলোপ করতে পারেÑ সেজন্য রাষ্ট্রপতির অনুমোদন দরকার হয় না। দায়যুক্ত মঞ্জুরি দাবি ব্যতীত অন্যান্য মঞ্জুরি দাবি সংসদে উত্থাপনের জন্য রাষ্ট্রপতির পূর্বানুমতির প্রয়োজন, তবে সংসদ মঞ্জুরি দাবি (দায়যুক্ত দাবি বাদে) হ্রাস করতে বা প্রত্যাখ্যান করতে পারে। [পরিচ্ছেদ ৮২, ৮৯(২ ও ৩)]
৬. সংসদ কর্তৃক আইন পাস হবার পর তা অনুমোদনের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে উপস্থাপন করা হয়। রাষ্ট্রপতি ১৫ (পনেরো) দিনের মধ্যে আইন অনুমোদন করেন অথবা পর্যবেক্ষণসহ পুনর্বিবেচনার জন্য পাঠান, পুনর্বিবেচিত আইন পাঠাবার পর সাত দিনের মধ্যে সম্মতি দেবার বিধান বলবৎ আছে। অর্থ বিলের ওপর পর্যবেক্ষণ করা অথবা অনুমোদন প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নাই। [পরিচ্ছেদ ৮০]
৭. কোনো বিল মানিবিল কি না মাননীয় স্পিকার সে সম্পর্কে প্রত্যয়ন করেন; স্পিকারের প্রত্যয়নই চূড়ান্ত। সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত মানিবিলে অনুমোদন রাষ্ট্রপতির পক্ষে বাধ্যতামূলক; মানিবিল পর্যবেক্ষণসহ পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত দেবার ক্ষমতা তার নাই। [পরিচ্ছেদ ৮০(৩), ৮১(১, ২)]
৮. সংবিধান মানিবিলের বিবরণ ও সংজ্ঞা দিয়েছে : কর আরোপ, নিয়ন্ত্রণ, রদবদল, মওকুফ বা রহিতকরণ; সরকারের ঋণ গ্রহণ, গ্যারান্টি দেয়া, সরকারের আর্থিক দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে আইন সংশোধন; সংযুক্ত তহবিলের রক্ষণাবেক্ষণ, অর্থ জমা বা উত্তোলন, দায় আরোপ, দায় রদবদল বা বিলোপ; সংযুক্ত তহবিল বা প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাবের রক্ষণাবেক্ষণ, নিরীক্ষা ইত্যাদি। কিন্তু শুধু নিম্নোক্ত কারণে কোনো বিল অর্থবিল বলিয়া গণ্য নয় :
কোনো জরিমানা বা অন্য অর্থদ- আরোপ বা রদবদল, কিংবা লাইসেন্স-ফি বা কোনো কার্যের জন্য ফি বা উসুল আরোপ বা প্রদান কিংবা স্থানীয় উদ্দেশ্যসাধনকল্পে কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক কোনো কর আরোপ, নিয়ন্ত্রণ, রদবদল, মওকুফ বা রহিতকরণের বিধান করা হইয়াছে, কেবল এই কারণে কোনো বিল অর্থবিল বলিয়া গণ্য হইবে না। [পরিচ্ছেদ ৮১(২)]
৯. বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি ছাড়াও সংবিধান অপ্রত্যাশিত বা আকস্মিক পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য কিছু নমনীয় পদ্ধতির ব্যবস্থা করেছে। কোনো কর্ম বিভাগের (সার্ভিস) জন্য অপর্যাপ্ত ব্যয় অনুমোদিত হলে অথবা ব্যয়ের অনুমোদন না থাকলে, রাষ্ট্রপতি সম্পূরক ব্যয় অথবা অতিরিক্ত ব্যয়ের অনুমতি দিতে পারেন। ব্যয় অনুমোদনের সাধারণ নিয়ম অনুসরণ করে সম্পূরক বা অতিরিক্ত ব্যয় অনুমোদন করা হবে। [পরিচ্ছেদ ৯১] আমাদের বাজেট পদ্ধতিতে সম্পূরক ও অতিরিক্ত ব্যয়ের পার্থক্য করা হয় না। বৎসর শেষে, সকল অতিরিক্ত ব্যয় সম্পূরক ব্যয় হিসাবে সংসদে প্রস্তাব পেশ করা হয়।
১০. সম্পূরক বাজেট ও সংশোধিত বাজেটের মধ্যে পার্থক্য আছে। মূল বাজেটের অনুমোদিত ব্যয় এবং অতিরিক্ত অথবা সম্পূরক ব্যয় সম্পূরক বাজেটের অন্তর্ভুক্ত হয়; প্রকৃত ব্যয় মূল অনুমোদিত ব্যয়ের কম হলে তা পরিবর্তন করা হয় না। সংশোধিত বাজেটে হ্রাসকৃত ব্যয় ধরা হয়, তাই সংশোধিত বাজেট সম্পূরক বাজেট হতে ছোট হতে পারে।
১১. অর্থবছর শুরু হওয়ার আগে (১ জুলাই) আর্থিক বিবৃতি অনুমোদন বাধ্যতামূলক। কোনো কারণে যদি ঐ সময়ের মধ্যে আর্থিক বিবৃতি অনুমোদিত না হয়, তাহলে সংসদ প্রস্তাবিত ব্যয়ের আংশিক মঞ্জুরি দিতে পারে। উক্ত আংশিক মঞ্জুরি চূড়ান্ত মঞ্জুরির অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। [পরিচ্ছেদ ৯২(১)] ১৯৮০-এর দশকে সংসদ আনুমানিক তিন মাসের ব্যয়ের অগ্রিম মঞ্জুরি দিত; আগস্ট বা সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাজেট আলোচনা চলত। ১৯৯০-এর দশক হতে অগ্রিম মঞ্জুরি ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে; জুন মাসের মধ্যেই সম্পূরক বাজেট এবং নতুন বছরের বাজেট (১ জুলাই হতে কার্যকর) আলোচনা ও অনুমোদন সমাপ্ত হয়। যুক্তরাজ্য পার্লামেন্ট একবার অনুমোদিত বাজেটের ৫৬ শতাংশ অগ্রিম অনুমোদন দিয়েছিল।
১২. যদি এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয় যে, ব্যয়ের পরিমাণ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সরকার কোনো স্পষ্ট ধারণা করতে পারে না এবং মঞ্জুরি দাবির জন্য যে সকল তথ্য ও যুক্তি সাধারণত দেয়া হয় তা দেয়া সম্ভব হয় না, তাহলে সরকারের সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করে সংসদ নামমাত্র বা প্রতীকী ব্যয় অনুমোদন করতে পারে। তবে ঐ বৎসরের মধ্যে নির্ভরযোগ্য তথ্য উপস্থাপন করে প্রকৃত ব্যয় নিয়মানুগ করতে হয়। [পরিচ্ছেদ ৯২(১)(খ)]
১৩. সংসদ চলতি বছরের প্রয়োজন মিটাবার জন্য ব্যয় অনুমোদন করে। চলতি বছরের প্রয়োজন নয় এমন প্রয়োজন হলে সংসদ বিশেষ ব্যয় অনুমোদন করতে পারে। [পরিচ্ছেদ ৯২(গ)] এরূপ ব্যয়ের দৃষ্টান্ত অতি বিরল। লর্ড মে উল্লেখ করেছেন যে, যুক্তরাজ্য সংসদ একবার দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনকারী একজন স্পিকারের সম্মানার্থে মূর্তি স্থাপনের জন্য এরূপ ব্যয় অনুমোদন করেছিল। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ইরাক হতে প্রত্যাবর্তনকারী বাঙালিদের কাছ হতে ইরাকি দিনার কেনার জন্য এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল। এরূপ ব্যয় নিয়মিত ব্যয়ে পরিণত হয় না; নিয়মিত ব্যয় এবং এককালীন আকস্মিক ব্যয়ের পার্থক্য নির্ধারণের জন্য এই পদ্ধতি সহায়ক। [পরিচ্ছেদ ৯২(গ)] তবে সংস্কৃতি ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য সরকার যদি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মূর্তি স্থাপন কর্মসূচি গ্রহণ করে, তাহলে ঐ কর্মসূচি সাধারণ সেবা হিসেবে বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হবে।
১৪. সংসদ দুটি পর্বে সরকারি তহবিল হতে ব্যয় অনুমোদন করে। প্রথম পর্বে বিভিন্ন কর্ম বিভাগের জন্য বিবিধ প্রয়োজন মিটাবার জন্য (যথা : বেতন-ভাতা, ভ্রমণ, অফিস পরিচালনা ইত্যাদি) অনুমোদন দেয়া হয় এবং সর্বমোট ব্যয় অনুমোদিত হয়। দ্বিতীয় পর্বে সংযুক্ত তহবিল হতে অর্থ উত্তোলনের জন্য টাকার পরিমাণ নির্দিষ্ট করে আইন করা হয়। সরকার আইন দ্বারা নির্ধারিত অর্থ উত্তোলন এবং ব্যয় করতে পারে। [পরিচ্ছেদ ৯০]
১৫. সরকার কর্তৃক প্রাপ্ত সকল অর্থ সংযুক্ত তহবিল অথবা প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাবে জমা হয়। সংযুক্ত তহবিলে সংজ্ঞার বা বিবরণ নিম্নরূপ :
সরকার কর্তৃক প্রাপ্ত সকল রাজস্ব, সরকার কর্তৃক সংগৃহীত সকল ঋণ এবং কোনো ঋণ পরিশোধ হইতে সরকার কর্তৃক প্রাপ্ত সকল অর্থ একটি মাত্র তহবিলের অংশে পরিণত হইবে এবং তাহা “সংযুক্ত তহবিল” নামে অভিহিত হইবে। [পরিচ্ছেদ ৮৪(১)]
১৬. সরকারের কোনো কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠান সংযুক্ত তহবিলে জমা হবে না এমন কোনো টাকা পেলে তা প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাবে জমা হয় :
(ক) রাজস্ব কিংবা এই সংবিধানের ৮৪ অনুচ্ছেদের (১) দফার কারণে যেরূপ অর্থ সংযুক্ত তহবিলের অংশে পরিণত হইবে, তাহা ব্যতীত প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কিংবা প্রজাতন্ত্রের বিষয়াবলীর সহিত সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি কর্তৃক প্রাপ্ত বা ব্যক্তির নিকট জমা রহিয়াছে, এইরূপ সকল অর্থ; অথবা
(খ) যে কোনো মোকদ্দমা, বিষয়, হিসাব বা ব্যক্তি বাবদ যে কোনো আদালত কর্তৃক প্রাপ্ত বা আদালতের নিকট জমা রহিয়াছে, এইরূপ সকল অর্থ। [পরিচ্ছেদ ৮৬ (ক, খ)]
প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাবে অর্থ জমা বা উক্ত হিসাব হতে অর্থ উত্তোলন ও ব্যয় আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। প্রজাতন্ত্রের জমা অর্থ বাজেটে রাজস্ব প্রাপ্তি খাতে স্থানান্তর করে ব্যয় অনুমোদন করতে হয়। [পরিচ্ছেদ ৮৫]
১৭. প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাবের ধারণায় অস্পষ্টতা রয়েছে। প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাবে জমা অর্থের রক্ষণাবেক্ষণ দায়িত্ব সরকারের; কিন্তু প্রকৃত অর্থে সরকার এ অর্থের মালিক নয়। উদাহরণ : সরকারি কর্মকর্তারা সাধারণ ভবিষ্য তহবিলে টাকা জমা দেন, সরকার সমপরিমাণ টাকা অনুদান হিসাবে জমা করেন, এ টাকা ব্যবহারের জন্য সরকার নির্দিষ্ট হারে সুদ দেয়, যা ঐ ভবিষ্য তহবিলে জমা হয়। সরকারি কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ে সুদসহ সমুদয় অর্থ উত্তোলন করতে পারেন (নিজের জমা + সরকারের জমা + সরকারের দেয়া সুদ)। বিতর্কিত রাজস্ব সংক্রান্ত মোকদ্দমায় ১০% – ৫০% অগ্রিম জমা, মামলা-মোকদ্দমার ফাইন, ইত্যাদি রাজস্ব হিসাবে সংযুক্ত তহবিলে জমা হবে না প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাবে জমা হবে বিষয়টি বিশ্লেষণ ও স্পষ্ট হওয়া বাঞ্ছনীয়।
১৮. সংসদ যথাসময় বাজেট অনুমোদন না করতে পারলে রাষ্ট্রপতি একটি বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে উক্ত বৎসরের আর্থিক বিবৃতি অনধিক ৬০ দিন (অর্থাৎ ২/১২ = ১৬.১৬) ব্যয়ের অনুমতি দিতে পারে। [পরিচ্ছেদ ৯২(৩)] এ ব্যবস্থার রাজনৈতিক দিক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা নিয়ে মতপার্থক্য থাকলে, তা দূর করতে সময় লাগে। ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি না হলে, সংসদ ভেঙে যায় এবং ৯০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
১৯. সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় রাষ্ট্রপতি সরকারের ব্যয় নির্বাহের জন্য অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। [পরিচ্ছেদ ৯৩(৩)] উক্ত উপ-ধারায় রাজস্ব কর আরোপ সম্পর্কে কোনো উল্লেখ নাই, ফলে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। রাজস্ব আহরণ না হলে ব্যয় নির্বাহ সম্ভব নয়। [পরিচ্ছেদ ৮৩, পূর্বে উদ্ধৃত] দীর্ঘ সময় সামরিক শাসন বজায় থাকলে অধ্যাদেশ জারি করে কর আদায় করা হয়। অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে রাজস্ব আহরণের বৈধতা সম্পর্কে কোনো প্রামাণ্য মতামত/ব্যাখ্যা এখনও পাওয়া যায়নি।
২০. বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি অনুমোদনের জন্য নির্ধারিত নিয়ম-নীতির মধ্যে দায়বদ্ধতার মৌলিক বিধান খুঁজে পাওয়া যায়। সংসদে পর্যাপ্ত যুক্তি, তথ্য ও প্রাক্কলনসহ প্রস্তাব উপস্থাপন করতে হবে। যে সকল ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষে এ শর্ত মানা সম্ভব নয়, সংবিধান সে সকল ক্ষেত্রে ভোট অন অ্যাকাউন্ট, ভোট অন ক্রেডিট ইত্যাদি ব্যতিক্রম নির্দেশ করেছে। সংসদে যে দাবি উপস্থাপন করা হয় তা বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য হওয়া আবশ্যক। অতি রঞ্জিত প্রস্তাব সংবিধানের বিধির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যথা : আর্থিক কর্মকা- আকস্মিক কোনো বছর ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে অথবা অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল বা সীমিত থাকা সত্ত্বেও রাজস্ব ২০-২৫ ভাগ বৃদ্ধি পাবেÑ এ জাতীয় প্রাক্কলন বাস্তবানুগ নয়।
২১. বাজেটের কলেবর এবং বাস্তবায়ন যোগ্যতা নিয়ে অনেক মন্তব্য হয়েছে, যা সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিক মনে হয় না। গত কয়েক বছর ৬-৭ শতাংশ আর্থিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, ৫-৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতিসহ অভিহিত (নমিনাল) প্রবৃদ্ধির হার ১১-১৪ শতাংশ হয়েছে। রাজস্ব প্রশাসনের উন্নতির ফলে ৫-৬ পার্সেন্টেজ পয়েন্ট রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পেলে সর্বোচ্চ রাজস্ব বৃদ্ধি হবে ২০ শতাংশ। রাজস্বের অনুপাত ১১-১২ শতাংশ এবং ঘাটতি বাজেট ব্যয় প্রায় ৪.৫ শতাংশে স্থিতিশীল ছিল। বাজেটের কলেবর অর্থনৈতিক কর্মকা-ের সম্প্রসারণের সাথে সংগতিপূর্ণ; অতিমাত্রায় বাড়েনি বা হ্রাস পায়নি।

শ্রেণী:

বাংলাদেশের আলোকে সেক্যুলারিজম

Posted on by 0 comment
june2018

june2018আবুল মোমেন: একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সংবিধানের অন্যতম স্তম্ভ সেক্যুলারিজম নিয়ে বিতর্ক বরাবর ছিল, এখনও আছে। বর্তমানে সমাজ ক্রমেই ধর্মাশ্রয়ী হয়ে পড়ছে। তাতে এ বিতর্ক আর তেমনভাবে আলোচিত হয় না। কিন্তু বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজম অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত, আবার ধর্মও মানুষের অন্তরের বিশ্বাসের বিষয়, তাকে বাদ দেওয়া বা খর্ব করার প্রশ্ন ওঠে না। আধুনিক জীবন বাস্তব কারণেই সেক্যুলার, তাই ধর্ম, গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজমকে বুঝে নেওয়া আধুনিক মানুষের চেতনারই দায়। এ দায় থেকেই আমরা এ আলোচনাটি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি।
সেক্যুলারিজম গণতন্ত্রের মতোই পশ্চিম থেকে উদ্ভূত একটি ধারণা। এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে আজকাল ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে ইহজাগতিকতাই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। যদিও আমার মনে হয় ধর্মনিরপেক্ষতাই সেক্যুলারিজমের অধিকতর নিকটবর্তী শব্দ, তবুও এ নিয়েও সমস্যা আছে। একটি ধারণাকে একটিমাত্র শব্দে অনুবাদ করা কঠিন, কারণ ধারণার পেছনে থাকে ভাবনার ঐতিহ্য এবং সংশ্লিষ্ট নানান অনুষঙ্গ। ইহজাগতিকতা বা ধর্মনিরপেক্ষতা এ দুয়ের কোনোটিই এ দেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে স্বতন্ত্র দার্শনিক প্রত্যয় ও ধারণা হিসেবে চর্চা হয়নি। ফলে ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতা বলে প্রচার চালিয়ে নিন্দুকেরা সাধারণজনকে ভালোভাবে বিভ্রান্ত করতে পেরেছিল। এদিকে ইহজাগতিকতার বোধ এবং এর নানান অনুষঙ্গ ছাড়া কোনো মানবসমাজ তো বিকশিত হয় নি, বাঙালি সমাজও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু তাতেও দুটো বেশ বড় ফাঁড়া কাটানোর দায় এসে পড়েÑ এক. ইহজাগতিকতাকে মানুষ বস্তুতান্ত্রিকতা, এমনকি সুখবাদিতা বা ভোগবাদিতার সাথে গুলিয়ে ফেলতে পারে; দুই. ইহজগৎ শব্দের যেহেতু একটি পাল্টা বিপরীত শব্দ আছে পরজগৎ (ইহকাল-পরকালের মতো) তাই মানুষ ধরে নিতে পারে যে এ ধারণা পোষণ করার অর্থ পরজগৎ এবং সেই সূত্রে ধর্মকে অস্বীকার করা। এই ভক্তিবাদী বৈরাগ্যবাদী ধর্মরসে সিক্ত প্রধানত ধর্মভীরু মানুষের সমাজে ধারণা হিসেবে ইহজাগতিকতাকে নিয়ে মানুষ যে ফাঁপড়ে পড়বে এবং তাদের ভুল বোঝার সমূহ সম্ভাবনা যে থাকবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
ইংরেজি সেক্যুলার শব্দের বিপরীত পাল্টা শব্দ নেই। এর সহজ কারণ রাষ্ট্রসাধনার সাথে সাথে ধারাবাহিক নানা সংগ্রাম-সাধনার একপর্যায়ে গণতন্ত্রের আবশ্যিক অনুষঙ্গ হিসেবে এই প্রত্যয়টি তাদের মনে তৈরি হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠিকই খেয়াল করেছেন যে ভারতবর্ষে, বাংলাসহ, সমাজই প্রধান, রাষ্ট্র নয়; রাজা আর তার শাসন নিয়ে এ অঞ্চল বহুকাল মাথাই ঘামায় নি। তাদের শাসন-পালন বিষয়ক চিন্তা ঘুরপাক খেয়েছে সমাজ আর সমাজপতিদের নিয়ে। রাষ্ট্রশক্তির দখল নিয়ে সপ্তম শতাব্দীতে যখন মাৎস্যন্যায় চলেছিল কিংবা ১৭৫৭-তে যখন পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজ শক্তির কাছে নবাবের পরাজয়ে বাংলার ‘স্বাধীনতা’ বিপন্ন হচ্ছে তখনও সমাজ এতে নাক গলায় নি, আপন বৃত্তে নিবিষ্ট ছিল।
পশ্চিমে নানা প্রকারের দাসপ্রথা আর সামন্তপ্রথার দাপটে প্রজারা রাজার শাসনের চোটপাট ভালোই বুঝত। আর যখন খ্রিস্টধর্মের প্রসার ঘটল তখন চার্চ ও রাষ্ট্রশক্তি জুটি বেঁধে প্রজাসাধারণের ওপর কড়া শাসন চালিয়েছে। অধিকাংশ প্রজার জন্য তা নিপীড়ন ও শোষণেই পরিণত হয়েছিল। ইউরোপে ১১৮৪ থেকে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত ইনকুইজিশনের নামে হাজার হাজার মানুষকে পুড়িয়ে মারা হয় ধর্মের দোহাই দিয়ে। ফলে শোষণমুক্তির দায় তো তাদের নিতেই হয়েছে।
চুম্বকে এটুকু এখানে স্মরণ করতে পারি, চতুর্দশ শতাব্দী থেকে সমুদ্রপথে বাণিজ্যের প্রসার, ইউরোপ ভূখ-ে খনিজ সম্পদের সন্ধান লাভ, শিল্প উৎপাদনের সূত্রপাত ইউরোপে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনতে থাকে। এই সমৃদ্ধির প্রভাবে বাহ্য বস্তুগত পরিবর্তনের সাথে সাথে চিন্তার জগতেও আলোড়ন ওঠে। সঙ্গে সৃজনশীলতার জোয়ার আসে। বাণিজ্য বিপ্লবের অনুবর্তী হয়ে পরপর ঘটে গেল রেনেসাঁস ও রিফর্মেশন, ধর্মযুদ্ধের অবসান ঘটে এলো যুক্তিচর্চার কাল, তাকে অনুসরণ করল আলোকন বা এনলাইটেনমেন্ট। কত রকম ভাবনা ও ধারণার চর্চা করলেন বিজ্ঞানী ও দার্শনিকেরা যা ধর্মের সংশ্লিষ্টতা-মুক্ত উদারনৈতিক ও ইহজাগতিক জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্র-দর্শন তৈরিতে সাহায্য করেছে।
এনলাইটেনমেন্টের দার্শনিক, যেমন ভোলতেয়ার, রুশো ও হিউম বিরাজমান প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র ও গীর্জা, উভয় সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন এবং উভয়ের দিকে সমালোচনার তোপ দেগেছেন। বুঝতে অসুবিধা হয় না ভোলতেয়ার-রুশোদের চিন্তায় অনুপ্রাণিত ছিল বলেই ফরাসি বিপ্লব কেবল রাষ্ট্রকে নয় চার্চসহ গোটা পুরনো সমাজব্যবস্থাকেইÑ তাদের ভাষায় ancient regime  চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল। তখনকার মতো রাষ্ট্রবিপ্লব হিসেবে ব্যর্থ হলেও রাষ্ট্র, সমাজ, শিল্প, সাহিত্যসহ সর্বত্র আধুনিকায়নে এ বিপ্লবের প্রভাব হয়েছে সুদূরপ্রসারী।
ফ্রান্সের চার্চ (মূলত রোমান ক্যাথলিক চার্চ) বিপ্লবের ঝড় সামলে টিকে গেলেও ভূ-সম্পত্তির মালিকানাসহ দ্বিতীয় এস্টেটের মর্যাদাই হারায় নি শুধু, হয়ে পড়ে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন। এ ঘটনা থেকেই বলা যায়, ফরাসি দেশে সেক্যুলারিজমের সূত্রপাত হয়। আরও পরে ১৯০৫ সালে ফ্রান্সে গীর্জা ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণের যে আইন গৃহীত হয় তাতে রাষ্ট্রের কোনো ধর্মকে স্বীকৃতি দান বা অর্থ জোগানো নিষিদ্ধ করা হয়। সংবিধানে ফ্রান্সকে Laique প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়। ফরাসি এ শব্দটি ইংরেজি সেক্যুলারের অনুরূপ ভাবই বহন করে। সে অর্থে আদর্শ সরকার ও রাষ্ট্র ধর্মীয় বিষয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থান নেবে।
১৮০২ সালের নববর্ষের দিন টমাস জেফার্সন আমেরিকার সংবিধানের প্রথম সংশোধনী উদ্ধৃত করে লিখেছিলেন, I contemplate with sovereign reverence that act of the whole American people which declared that their legislature should ‘make no law respecting an establishment of religion, or prohibiting the free exercise thereof,’ thus building a wall of separation between Church and State. চার্চ ও রাষ্ট্রের মধ্যে দেয়াল তোলার কথা বলেছেন জেফার্সন।
গণতন্ত্রের সবলতা ও সার্থকতা যেহেতু সব নাগরিকের সমানাধিকারের ওপর নির্ভরশীল তাই রাষ্ট্র যেন কারও অধিকার, বিশেষত ধর্ম, ভাষা, বর্ণ, জাতি, মতামত ইত্যাদি নানা দিক থেকে যারা সংখ্যালঘু তাদের অধিকার ক্ষুণœ না করে, সেদিকে খেয়াল রাখা আবশ্যিক। সেদিক থেকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে সেক্যুলার হতেই হবে। হ্যারল্ড লাস্কি বলেছেন, “Secularism demands reason as its weapon”। ঠিকই, সমাজে যদি যুক্তির চর্চা না হয় তাহলে তার সেক্যুলার হওয়া অসম্ভব।
আমাদের দেশে ও সমাজে যুক্তি এবং তারই পরিপূরক বিজ্ঞান মনস্কতার চর্চা কতদূর এগিয়েছে সে আলোচনায় যাওয়ার আগে ভারতে সেক্যুলারিজম চর্চার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে একটু খোঁজখবর নেওয়া ভালো হবে বলে মনে হয়।
নেহেরু এবং গান্ধী ভারতবর্ষের স্বাধীনতা লাভ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়ে ওঠার ইতিহাসের দুই প্রতীক ও নায়ক। দুজনের একজন সংশয়বাদী, প্রায় নাস্তিক, অপরজনের জীবন-দর্শন, এমনকি রাজনৈতিক দর্শনেও ধর্ম কেন্দ্রীয় বিষয়। এ দুজনের একজন আধুনিক সেক্যুলার ভারতের জাতির জনক এবং অপরজন সেই রাষ্ট্রের স্থপতি। ভারতীয় সেক্যুলারিজম তাদের দুজনকেই ধারণ করবার চেষ্টা করেছে। এদের রাজনৈতিক সাথী খোদার খেদমতগার খান আবদুল গাফ্ফার খানের কথাও এ সূত্রে টানা যায়। মনে করা যেতে পারে ভারতীয় রাজনীতিবিদ এবং অনেকাংশে ভারতীয় এলিট শ্রেণি, সেক্যুলারিজম বলতে মনে করেছেন সরকার ও শাসনব্যবস্থা কোনো বিশেষ ধর্মের প্রতি দায়বদ্ধ হবে না। বরং ধর্মকে গ্রহণ ও সহনের মনোভাব থেকে রাষ্ট্র সব ধর্মের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কাজ করবে। উপমহাদেশে ধর্মসাম্প্রদায়িক শান্তিসহিষ্ণুতা রক্ষার গুরুত্ব রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক করার এজেন্ডার চেয়ে অনেক বেশি বলেই মনে করা হয়েছে সবসময়। ফলে অন্তর্নিহিত ভাব, প্রত্যয় ও শক্তি অনুধাবনের মাধ্যমে সেক্যুলারিজমকে বোঝার চেষ্টা এখানে হয়নি, বা হওয়া সম্ভব ছিল না, হয়তো তাই মোটা দাগে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার সাথে একে এক করে ফেলা হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা দরকার নেহেরুর আমলে কিন্তু ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে সেক্যুলার রাষ্ট্র হয়নি, হয়েছে তার কন্যা ইন্দিরার আমলে আমাদেরও পরে ১৯৭৬-এ সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে। অনেক ইউরোপীয় তাত্ত্বিক ভারতীয় সেক্যুলারজিমকে আলাদাভাবে দক্ষিণ এশীয় একটি বিশেষ ধারণা হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন, অনেকে আবার একে ছদ্ম সেক্যুলারিজম আখ্যা দিয়েছেন।
এ আলোচনা থেকে আমরা এটুকু বুঝতে পারি যে পশ্চিমের সেক্যুলারিজমের ধারণার সাথে এদিককার ধারণায় কিছু পার্থক্য ঘটেছে। এর প্রেক্ষাপট অনেক জটিল এবং বিস্তৃত, আমরা অতবড় আলোচনায় এখন যাব না।
আমরা লাস্কির মন্তব্য থেকে সেক্যুলারিজমের হাতিয়ার যে যুক্তি তা জেনেছি। এখন জানা দরকার আর কোনো হাতিয়ার কিংবা বৈশিষ্ট্য এর থাকতে পারে? ইংরেজ দার্শনিক জর্জ জ্যাকব হোলিয়োক (George Jacob Holyoake) সেক্যুলারিজমের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে-

“Secularism is a code of duty pertaining to this life, founded on considerations purely human, and intended mainly for those who find theology indefinite or inadequate, unreliable or unbelievable.”

এরপর হোলিয়োক সেক্যুলারিজমের ৩টি নীতির কথা বলেছেন. “The improvement of life by material means, 2. That science is the available Providence of man, 3. That it is good to do good. Whether there be other good or not, the good of the present life is good and it is good to seek that good.”
হোলিয়োকের সংজ্ঞার ভিত্তিতে সেক্যুলারিজমের বাংলা ইহজাগতিক করা খাটে বটে; কিন্তু তাতে বাঙালি এবং উপমহাদেশীয় মানসের খটকা দূর হবে বলে মনে হয় না।
এখন দেখা দরকার একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের আকাক্সক্ষা বারবার ব্যক্ত করে, এর জন্যে বহু ত্যাগ স্বীকার করে দীর্ঘ সংগ্রাম চালিয়ে, এই আকাক্সক্ষা থেকে মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে দেশ স্বাধীন করে, দীর্ঘ সংগ্রামমুখর আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচার উৎখাত করে দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করেও আমরা কেন সেক্যুলার নইÑ না রাষ্ট্রে না সমাজে। বরং ঐতিহ্যগতভাবে এ সমাজে যে সমন্বয়ধর্মী মানবতাবাদী ধারাগুলো ছিল দিনে দিনে সেগুলো স্তিমিত ও স্থবির হয়ে মৌলবাদের ধারা তৈরি ও পুষ্ট হয়েছে, এমনকি জঙ্গিবাদের দিকে ঝোঁকও দেখা দিয়েছে।
আমাদের সমাজে ভাব ও ভক্তিবাদের ঢেউ উঠেছে বারবার। বিশ্বাস ও সংস্কারের বেড়িও পুরনো বলে বেশ শক্ত তাদের শিকড়। এখানকার সংস্কৃত বিদ্যাপীঠে এককালে ন্যায়, নব্যন্যায়, ন্যায়বৈশেষিকের মতো লজিকের চর্চা হলেও তা সমাজে যুক্তিচর্চার পথ সুগম করতে পারে নি। বরং সমাজ চলেছে তার আপন মন্থর গতিতে ধর্মীয় সংস্কার ও বিশ্বাসের বেড়ি পায়ে। ভারতবর্ষে যখন স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয় তখনও সমাজকে যুক্তিবাদিতা ও বিজ্ঞানমনষ্ক করে তোলার প্রয়াসগুলো ছিল সীমিত। রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রয়াস ধর্ম ও সমাজের রক্ষণশীল দুর্গগুলো থেকে বাধার সম্মুখীন হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর জাগরণও সীমিত ছিল কলকাতা এবং বর্ণহিন্দু সমাজে। সমাজে ধর্ম-সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির প্রভাবমুক্ত ইহজাগতিক জীবন-ভাবনা, দর্শন, সংস্কৃতির এমন কোনো আন্দোলন বা চিন্তার ঢেউ ওঠে নি, যা নাগরিক জীবনকে সেক্যুলার ভাবনায় উদ্দীপ্ত করতে পারে। ধর্মীয় সংকীর্ণতা, রক্ষণশীলতা ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে হিন্দুসমাজে কিছু প্রতিবাদী কাজ হয়েছে বটে; কিন্তু তা সমাজকে সেক্যুলারিজমের মূল হাতিয়ার যুক্তির পথে আনার জন্য যথেষ্ট ছিল না। মুসলিম সমাজে আরও পরে ১৯২৬ সাল নাগাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক যে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন সূচিত হয়েছিল তাতে যুক্তির ঝা-া ঊর্ধ্বে তুলে ধরা হলেও রক্ষণশীল সমাজপতিদের দাপটে প্রায় অঙ্কুরেই তা থেমে যায়। তবে এর অন্তর্নিহিত শক্তি বোঝা যায় যখন দেখি এখনও এ আন্দোলন বাঙালি মুসলিম সমাজকে যুক্তির পথ ধরবার পথের দিশা দেয়।
কিন্তু পশ্চিমের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা, এমনকি একসময় সমাজতন্ত্রের জন্যে অঙ্গীকার ও আন্দোলনের জোয়ার চললেও, এমনকি স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাসহ অনেক অর্জন আমাদের হলেও, পুরনো আধাসামন্ত ধারার বিশ্বাস-সংস্কারের অচলায়তন থেকে সমাজকে আমরা মুক্ত করতে পারি নি। রাষ্ট্র নতুন হলেও সমাজের নবায়ন ঘটে নি। মুক্তিযুদ্ধ পুরনো রাষ্ট্র ভেঙে নতুন রাষ্ট্রের জন্ম দিতে পারলেও রাষ্ট্রবিপ্লব হিসেবে ব্যর্থ ফরাসি বিপ্লবের মতো পুরনো সমাজকে খতম করতে পারে নি। দেখা যাচ্ছে পুরনো সমাজ ভেঙে নতুন সমাজ পত্তন জরুরি, তা না হলে রাষ্ট্রের ভাঙা-গড়ায় যে প্রাপ্তি ঘটে তা রাষ্ট্রের ক্ষমতা-কাঠামোয় পরিবর্তন ঘটালেও সমাজসহ সামগ্রিকভাবে মৌলিক রূপান্তর ঘটাতে পারে না, যেটুকু ঘটে তা-ও টেকসই হয় না। বরং আমাদের দেশে দেখছি ঊনসত্তর বা একাত্তরের অমন গণজাগরণ সত্ত্বেও কত সহজেই ধর্মীয় পুনরুজ্জীবনবাদের ধাক্কা এসে স্থবির সমাজে লাগছে এবং সমাজ তাতে পিছু হটছে। সমাজপ্রগতি একেবারেই উপরিতলে বহিরঙ্গে পোশাকি চাকচিক্যের ফাঁদে আটকে পড়ছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে এত ভাঙাগড়া তোলপাড় হলেও পুরনো সমাজব্যবস্থাকে তার বিশ্বাস ও প্রথার সংস্কৃতি থেকে খুব বেশি টলানো যায় নি।
সেক্যুলারিজম এবং তার হাতিয়ার যুক্তি ও বিজ্ঞানমনস্কতার যথেষ্ট দুর্গতি এ সময়ে এ দেশে। পথের বাধা অনেকÑ পশ্চিমা কূটকৌশল ও আগ্রাসনের মুখে ইসলামি পুনরুজ্জীবনবাদ ও জঙ্গি মৌলবাদের উত্থান ও শক্তিবৃদ্ধি, আরব-বিশ্বের সাথে সাক্ষাৎ পরিচয়ের সূত্রে এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের আর্থিক সহায়তায় স্থানীয় মুসলিম সমাজের মধ্যে সাংস্কৃতিকভাবে ইসলামি ও আরবিকরণের ঝোঁক, ওয়াহাবি কট্টরপন্থার শক্তি বৃদ্ধি, আমাদের রাজনৈতিক এবং শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ব্যর্থতা ও দীনতা, দারিদ্র্য, বিশ্বায়নের দাপটে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক দিশাহীনতা, রাজনীতিসহ সর্বক্ষেত্রে যথোপযুক্ত নেতৃত্বের অভাব, মানসম্পন্ন সুশিক্ষার অভাব ইত্যাদি। একে বলা যায় তালগোল পাকানো জগাখিচুড়ি অবস্থা। তার ওপর পণ্যাসক্তি ও ভোগবাদিতার জোয়ারে পশ্চিমে এবং এখানে সর্বত্র আদর্শিক দারিদ্র্য প্রকট হয়ে উঠেছে। মানুষের অন্তর্নিহিত সৃজনশীল শক্তি অবহেলিত হচ্ছে। এর থেকে বেরিয়ে আমরা যে গণতান্ত্রিক মানবিক সহনশীল বিকাশমান সমাজে উত্তরণ চাইছি নিজেদের, সেটি আসলে এক ধরনের সেক্যুলার সমাজ। যেখানে একক নয় মানুষের বহু ও বৈচিত্র্যময় সত্তার প্রকাশ ঘটতে পারে। প্রশ্ন হলো কোন পথে কীভাবে আমরা এই সমাজে পৌঁছাতে পারব? আজ হয়তো আমরা সব পথের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতে যাব না। তবে সেক্যুলারিজমের গোড়ায় যেমন যুক্তি তেমনি তাতে উত্তরণের সোপান হলো শিক্ষা।
একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য চাই সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা। গত শতাব্দীর গোড়ার দিকে এ দেশের মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার করে ব্রিটিশ শাসকরা যে নিউ স্কিম ব্যবস্থা চালু করে তাতে কিছু সেক্যুলার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যেমনÑ ইংরেজি, বাংলা, ভূগোল, ইতিহাস ইত্যাদি। তাতে বাঙালি মুসলিম সমাজে কয়েক প্রজন্ম সেক্যুলার চিন্তার আধুনিক মানুষ তৈরি হয়েছিল।
পাশাপাশি তারা অনেকটাই ব্রিটিশ আদলে ইংরেজি শিক্ষার স্কুল ও পরে কলেজি শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে, যা এ দেশে পূর্ণাঙ্গ সেক্যুলার শিক্ষার আনুষ্ঠানিক সূচনা করে। এ শিক্ষা প্রবর্তনের পিছনে তাদের যে সীমিত লক্ষ্য ছিল তা আমরা জানি। মূলত জনসমাজ থেকে এই শিক্ষিত সম্প্রদায় বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকুক, সেটাই তারা চেয়েছিল। বাস্তবে ঘটেছেও তাই। ব্রিটিশ আমলে গ্রাম পর্যায়ে কিছু স্কুল প্রতিষ্ঠিত হলে তার সফল অংশ সাধারণত নগরে এসে ঔপনিবেশিক শাসকের অধীনে চাকরি করেছে, তুলনামূলকভাবে অসফল অংশ হয়তো গ্রামে থেকে সেখানে একটা নেতৃস্থানীয় তবে ক্ষুদ্র এবং অনেকটা জনবিচ্ছিন্ন সমাজ তৈরি করেছে। ১৯৪৭-এর দেশভাগের সময় হিন্দু-মুসলিম বৈরিতার তীব্রতায় আমাদের সমাজের বহুকালে গড়ে ওঠা সহনশীল মানবিক বাতাবরণ নষ্ট হতে থাকে, এ সময় মুসলিম আত্মপরিচয় ও ইসলামি পুনরুজ্জীবনের এষণাও নানাভাবে প্রকাশ পাচ্ছিল। এখানে একটু স্পষ্ট করে বলতে চাই, মূলত সমাজের বড় দুই ধর্মসম্প্রদায় হিন্দু ও মুসলিম মিলেই বাঙালি সমাজের ঐতিহ্যবাহী সমন্বয়ধর্মী মানবতার সংস্কৃতি দাঁড় করিয়েছিল। বর্ণ হিন্দু এবং আশরাফ মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভক্তির প্রণোদনা থাকলেও নিম্নবর্ণের বিপুল সংখ্যাধিক্যে গঠিত গ্রামসমাজে সমন্বয়ের ধারাটাই প্রধান ছিল। আমাদের রাষ্ট্রসাধনার রাজনীতিÑ কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, এমনকি বাম প্রগতিশীল ধারাÑ বাঙালি সমাজের এই স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও শক্তির জায়গাটি অনুধাবন করতে পারে নি। কীভাবে এই সম্ভাবনার বিকাশের পরিবর্তে রাজনীতির সূত্রেই দুই সম্প্রদায় দূরে সরে যাচ্ছে এবং সমাজ ও সংস্কৃতি থেকে নিরন্তর সমন্বয়ধর্মী মানবতার উপাদান ক্রমে বিলীন হয়ে পড়ছে তাও যথাসময়ে খেয়াল করা হয় নি। ফলে বাঙালির রাষ্ট্র-সাধনায় বাঙালি সমাজের একান্ত নিজস্ব যে প্রত্যয় সমন্বয়ধর্মী মানবতা তাকে এগিয়ে নেওয়ার কোনো চেষ্টাই করা হয় নি।
পাকিস্তানি অপশাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের একটা জোয়ার ঠিকই উঠেছিল। তাকে আমরা সেক্যুলার বলেও ভেবেছিলাম এবং সেই সূত্রেই রাষ্ট্রের চার মূলনীতির অন্যতম ঘোষিত হয় সেক্যুলারজিম বা ধর্মনিরপেক্ষতা। কিন্তু ক্রমেই আমরা টের পাচ্ছি কেবল রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজকে সেক্যুলার করা যায় না। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের রাজনীতি পাকশাসক বিরোধী ছিল বলেই উর্দুভাষী ও পাঞ্জাবি আধিপত্যের বিরুদ্ধে সেদিন বাঙালি হিসেবে একটা অবস্থান নিয়েছিল সবাই। ধর্ম, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও সংস্কৃতি সরাসরি প্রশ্নের সম্মুখীন হয় নি বা এ নিয়ে খুঁটিয়ে বিচার-বিশ্লেষণের প্রয়োজনও দেখা দেয় নি। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পঠন-পাঠনের যেটুকু বিস্তার ঘটেছিল তা চাকরি ও ইহজাগতিক ভাবনা-অভ্যাসে প্রভাব ফেললেও ধর্ম, বিশ্বাসসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক ও মননশীল জিজ্ঞাসা, বিতর্ক ও অনুসন্ধানের তেমন জন্ম দেয় নি।
ফলে নানা ঘটনায়Ñ স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ, পশ্চিমের যন্ত্রসভ্যতার নানা উপচারে অভ্যস্ততা, সব ধরনের যোগাযোগের ব্যাপক বিস্তৃতি, তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতিÑ সমাজের বহিরঙ্গে মানুষের জীবনাচরণে অনেক পরিবর্তন, ধর্মীয় চিহ্নলোপকারী সেক্যুলার পরিবর্তন ঘটলেও সমাজমানসে বড় ধরনের কোনো ভাবান্তর ঘটে নি। এখানে আমাদের শিক্ষার অন্তঃসারশূন্যতা যে কত ব্যাপক তা ফাঁস হয়ে যায়।
এ শিক্ষা ডিগ্রি, সনদ এবং কিছু বিদ্যাও দেয়; কিন্তু দেয় না প্রশ্ন করার সাহস ও ইচ্ছাশক্তি, অনুসন্ধিৎসা চরিতার্থ করার উদ্দীপনা, মৌলিক চিন্তার প্রবণতা ও পুষ্টি। বরং এই শিক্ষাব্যবস্থা শিশু ও শিক্ষার্থীর মধ্যে এসবের যে কুঁড়ি থাকে তাকেই প্রতি স্তরে গুঁড়িয়ে দেয়। তাই কি শিক্ষিত কি শিক্ষাবঞ্চিত সকলেই প্রায় বিনা প্রশ্নে প্রচলিত সব বিশ্বাস ও সংস্কার মেনে নিচ্ছে এখানে। বরং দেখা যায় শিক্ষিতরাই দলে দলে প্রশ্ন ছেড়ে অন্ধবিশ্বাসের পতাকার নিচে আত্মসমর্পণ করছে আজ। ধর্মের নামে যেসব সংস্কার ও সংস্কৃতি চলে আসছে তাকে প্রশ্ন করার সংস্কৃতি এখানে গড়ে ওঠেনি।Ñ সেক্যুলার শিক্ষার ইতিহাস ২০০ বছরের পুরনো হলেও।
এবারে ধর্মের একটু ভেতরের কথা বলি। ইসলামে ইজতিহাদ বা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিধান থাকলেও গত কয়েকশ বছর ধরে মুসলিম রাষ্ট্রের শাসক আর সর্বত্র মুসলিম সমাজের ধর্মীয় নেতাদের কর্তৃত্ববাদী ভূমিকার ফলে কোথাও থেকে এরকম মুক্ত আলোচনার খবর পাওয়া যায় না। ফলে সারাবিশ্বের প্রায় সকল মুসলিম সমাজ স্থবির হয়ে পড়েছে এবং স্থবিরতাজাত নানা বিকার ও সংকটে ভুগছে। তার ওপর এখন পশ্চিমের আগ্রাসী মুক্তবাজার অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের থাবার তলায় পড়ে সংকট আরও জটিল হচ্ছে ও বেড়ে চলেছে।
কথা হলো একটা সমাজের বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই, না দেখার ভান করে কোনো সিদ্ধান্তও দেওয়া যাবে না। আমার মনে হয় মুসলিম সমাজ কেবল যে পশ্চিমের সামরিক আগ্রাসনের শক্তি ও প্রমত্ততাকে ভয় পাচ্ছে তা নয়, ধ্রুপদী ও আধুনিক সকল শিল্পকলা, ঢালাওভাবে বিজ্ঞান ও দর্শন চিন্তাগুলোকেও ভয় ও সন্দেহের চোখে দেখে আসছে এবং প্রায় চর্চা ও বিশ্লেষণ ছাড়াই আগেভাগেই একতরফা নাকচ করে বসে থাকছে। ফলে মুসলিম সমাজ সেক্যুলার শিক্ষাটা নিচ্ছে নানা স্বাদের খাবারের পার্টিতে শুচিবায়ুগ্রস্ত বিধবার মতো কায়ক্লেশে গা (এক্ষেত্রে মন ও বিশ্বাস) বাঁচিয়ে। এভাবে বৈধব্য জীবন কাটানো হয়তো সম্ভব; কিন্তু বিকাশমান যৌবন ও জীবনের জন্যে তা পথ ও পাথেয় নয়।
বড় কথা হলো সমাজমানসের গভীরে বদ্ধমূল হয়ে যাচ্ছে ভয়, অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয় রক্ষার ব্যাকুলতা। এটা অসুস্থতা, মানসিক রোগ, সন্দেহ নেই। যা সে ভয় পাচ্ছে সেখানে তাকে একলা ছেড়ে দিলে হয়তো কাজ হবে না। এই ভীত মানসকে আশ্বস্ত করা দরকার। দরকার কোনোরূপ প্রশ্রয় না দিয়ে অভয় দেওয়া।
ইদানীংকালে সাংস্কৃতিক সেক্যুলার শিক্ষা বা Cultural secular education বলে একটা কথা চালু হয়েছে। এটা এ কারণেও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ যে মানুষ তো বাস করে মূলত একটি সাংস্কৃতিক আবহে। সেখানে ধর্ম একটি উপাদান; কিন্তু সাংস্কৃতিক রূপ ও তাৎপর্য স্থিত নয়, সংস্কৃতি সবসময় বহমান এবং তাই বলা যায় পরিবর্তমান, সংযোজন বিয়োজনের চলমান প্রক্রিয়ায় এসবের নবায়ন রূপান্তর চলতেই থাকে। ফলে শিক্ষাটা সাংস্কৃতিকভাবে এমনভাবে সমৃদ্ধ হওয়া দরকার যাতে নিজের সংস্কৃতির বহুমাত্রিকতা ও অন্যান্য সংস্কৃতির বৈচিত্র্য অনুধাবনেরও সামর্থ্য অর্জিত হয়। শিক্ষা তাই অন্য জাতির সাথে পরিচয় করানোর পাশাপাশি অন্য সংস্কৃতি, অন্যান্য ধর্ম, বিশ্ব ইতিহাস, বিজ্ঞানের মূল অর্জনসমূহ, দর্শনের কিছু বিষয়, বিশেষভাবে বিশ্বের নানা অঞ্চলের পুরাকাহিনির (mythology) সাথে পরিচয় করাবে। পরিচয় স্কুলেই ঘটতে হবে। স্কুলে ছাত্র কেবল পড়া ও পরীক্ষা দেওয়ার ছাত্র হবে না, (নাচ, গান, বিজ্ঞানের টেস্টসহ) দেখাশোনাসহ একটা জ্বলজ্যান্ত প্রাণবন্ত জিজ্ঞাসু মানুষ হবে। সকল ভয় থেকে সে যেন মুক্ত থাকে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। এই মানুষ তার জ্ঞান অর্জন করে নেবে, এবং তখন ধর্মও একটা বাধ্যবাধকতা না হয়ে চর্চা করে অর্জনের এবং তাই সত্যিকারের ভালোবাসার বিষয় হতে পারবে।
বিশ্বাসীর সেক্যুলারিজমকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা সামাজিক ধর্মপালনে সেক্যুলারিজমের আপত্তি নেই। বরং ইহজগৎটা অধিকতর মনোযোগ ও যতœ পেলে জীবন সুন্দর ও সার্থক হবে, তাতে পরকাল নিয়ে যারা ভাবিত তাদের লাভ বৈ ক্ষতি নেই। আর সেক্যুলার চেতনা জোরদার হলে ইহজগৎটা সুন্দর ও মানবিক হবেÑ তাতেও সর্বশেষ গন্তব্য হিসেবে স্বর্গে পৌঁছানোর সম্ভাবনাই বাড়ে! লাস্কির কথা দিয়ে শেষ করি, “ÒThe lights of heaven are not extinguished but their illumination seems more distant as the secular spirit grows.” বেহেস্ত একটু দূরবর্তী হওয়াই ভালো, খেটে অর্জন করতে হবে তো!

শ্রেণী:

নারীর ক্ষমতায়ন ও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগ

Posted on by 0 comment
june2018

june2018সিমিন হোসেন রিমি: ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগের পথ চলার শুরু। দীর্ঘ এই পথ চলায় আওয়ামী লীগ এঁকেছে নতুন নতুন পদচিহ্ন। গণমানুষের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে এই দল সংগ্রাম, ত্যাগ ও আদর্শ বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থেকে তৈরি করেছে অমোচনীয় দীপ্তিময় ইতিহাস। পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনের ধারায় ভয়ঙ্কর দারিদ্র্য, চরম বৈষম্যে ভরা সমাজকে দেখিয়েছে অর্থনৈতিক মুক্তি, রাজনৈতিক স্বাধিকারের স্বপ্ন। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সীমাহীন সংকট মোকাবিলা করতে করতে আওয়ামী লীগ পরিণত হয়েছে উদারপন্থি গণতান্ত্রিক দলে। এর নীতি, কর্মসূচি, সাংগঠনিক কাঠামো প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে এই দল গণমানুষের। এসব কিছুর পুরোভাগে থেকে যিনি মুক্তির কপোত ওড়ান, একের পর এক শৃঙ্খল ভেঙে এগিয়ে চলেন দৃঢ় পায়ে তিনি হয়ে ওঠেন সকলের বন্ধুÑ বঙ্গবন্ধু। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সম্মোহনী নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা আওয়ামী লীগের শ্রেষ্ঠ অর্জন। আওয়ামী লীগ এ দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৪৯ থেকে ২০১৮, আওয়ামী লীগ উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর আরও। এ দেশের মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, সাফল্য-সৃষ্টি, উন্নয়ন, অর্জনÑ সব কিছুর সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে এই দল। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠান জননেত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী, সাহসী কর্মোদ্যোগী নেতৃত্বে বিশ্বসভায় আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল।
আওয়ামী লীগের পথ চলা কখনোই মসৃণ ছিল না। রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে পদে পদে। কিন্তু নীতি-আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দলীয় কর্মসূচিতে সকল সময় প্রাধান্য পেয়েছে মানুষ। মানুষের সার্বিক কল্যাণ-চিন্তা। উঠে এসেছে সমাজের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম প্রয়োজন এবং বাস্তবায়নের পরিকল্পনা।
সমাজের প্রধান অনুষঙ্গ মানুষ। মানুষের দুই রকম আদল নারী এবং পুরুষ। কাউকে বাদ দিয়ে কেউ নয়। এ যেন সভ্যতার দুটি হাত। একটি হাত অকেজো হলে এক হাত অক্ষম বহু কিছুতে। দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নারীকে মর্যাদা দিয়েছে মানুষ হিসেবে একেবারে তার জন্মলগ্ন থেকেই। যার একটি সুন্দর উদাহরণ পাওয়া যায় ১৯৬৪ সালে পুনরুজ্জীবিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের খসড়া ম্যানিফেস্টোতে, সেখানে মৌলিক অধিকার অংশে বলা হয়েছেÑ “নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পাকিস্তানের প্রতিটি নাগরিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বীকৃত প্রতিটি মৌলিক অধিকার ভোগের অধিকারী। যথাÑ নাগরিকদের ধর্ম, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু জীবনযাপনের অধিকার ও সুযোগ প্রতিষ্ঠা করতে হইবে। সকল নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজনীয় খাদ্য, বাসস্থান, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ন্যায়সংগত উপায়ে উপার্জনের ব্যবস্থা থাকিতে হইবে। আইনের চোখে সকলে সমান বলিয়া পরিগণিত হইবে।” [সূত্র : আওয়ামী লীগ ১৯৪৯-১৯৭১, পৃষ্ঠা-৩২৩, শ্যামলী ঘোষ]
এই ম্যানিফেস্টোর শিক্ষা অংশে বলা হয়েছে, “পাকিস্তানের প্রত্যেক নাগরিকের শিক্ষার অধিকারের বাস্তব রূপ দানের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করিতে হইবে। মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এরূপ ব্যাপকভাবে প্রসারিত ও এরূপ সহজলভ্য ও সুলভ করিতে হইবে যাহাতে প্রতিটি দরিদ্র নাগরিকের ছেলেমেয়ে এই শিক্ষা লাভের সুযোগ গ্রহণ করিতে পারে। যুগের ও দেশের চাহিদানুসারে কারিগরি শিক্ষার ব্যাপক প্রসার করিতে হইবে, এই জন্য দেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের এবং বিদেশে ট্রেনিং প্রাপ্তির ব্যবস্থা করিতে হইবে।” [সূত্র : আওয়ামী লীগ ১৯৪৯-১৯৭১, পৃষ্ঠা-৩২৩, শ্যামলী ঘোষ]
আওয়ামী লীগ গতানুগতিক চিন্তার ঊর্ধ্বে উঠে নারীকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এগিয়ে নেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। যে চিন্তা সবকালেই আধুনিক, যৌক্তিক মানুষের চিন্তা। যে চিন্তায় মৌলিকত্বের আশ্বাস এবং নিশ্চয়তা মেলে। নারীকে অনগ্রসর রেখে সমাজ উন্নত হতে পারে না। নারী শিক্ষা লাভ করবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে। অর্থনৈতিক কর্মকা-ে অংশ নেবে, স্বাবলম্বী হবে। আওয়ামী লীগ শুরু থেকেই এক্ষেত্রে স্পষ্ট এবং অকপট।
এ কারণেই হয়তো আমরা দেখি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অঙ্গনে কখনও নেপথ্যে আবার কখনও প্রকাশ্যে নারীর বিশাল অবদান। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চড়াই-উৎরাই জীবনের ছায়াসঙ্গী ছিলেন তার আজন্ম সাথী বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব। স্বাধীনতার পূর্বে বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ কারাবাসের সময় তিনি হয়ে উঠেছিলেন অসংখ্য নেতাকর্মীর আশ্রয় ও ভরসাস্থল। নিজ পরিবারকে সুচারুরূপে পরিচালনা করা এবং একই সঙ্গে বহু কিছুতে আমৃত্যু তার ভূমিকা ছিল দৃঢ়তায় ভরা অনন্য।
প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই আওয়ামী লীগে নারীর অংশগ্রহণ ছিল। ভাষা আন্দোলনে যেসব ছাত্রী ও শিক্ষয়িত্রী অংশগ্রহণ করেছিলেন, পরবর্তীতে তাদের অনেকেই আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ব্যানারে ৯ জন নারী নেত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন। এদের মধ্যে আনোয়ারা বেগম, দৌলতুন্নেসা, নূরজাহান মুর্শিদ, বদরুন্নেসা আহমেদ, সেলিনা হোসেন এবং আমেনা বেগম পরবর্তীকালে জাতীয় আন্দোলনের মূলধারার নেত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
১৯৬৬ সালে ৬-দফা আন্দোলনের সময় যখন বঙ্গবন্ধুসহ দলের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ কারাগারে বন্দী, সেই সময় দলের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা আমেনা বেগম দলকে এগিয়ে নিতে বিশাল ভূমিকা রাখেন।
ষাটের দশকের এই পর্বে কারাগারে বন্দী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের স্ত্রী সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন রাজবন্দি সাহায্য কমিটি যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের ফলে বঙ্গবন্ধু বীরের বেশে মুক্তির দিশারি রূপে মুক্ত হলে শুধু আওয়ামী লীগ নয়, সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান যেন প্রাণ ফিরে পায়। বঙ্গবন্ধুর মনের গভীরে সুখী সমৃদ্ধশালী সোনার বাংলার চিত্র ছিল আঁকা, তাতে তিনি যুক্ত করেছিলেন প্রগতিশীল চিন্তার বিশিষ্ট নারীদের। ১৯৭১ সালে গৌরবময় আত্মত্যাগের মহান মুক্তিযুদ্ধে নারী সমাজের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের বিশেষভাবে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সময় কলকাতার সন্নিকটে গোবড়া ক্যাম্পে নারীদের প্রশিক্ষণের ও সংগঠিত করার কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন বেগম সাজেদা চৌধুরী। তার সাথে আরও অনেক নারী নেত্রী যুক্ত ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হন মিসেস বদরুন্নেসা আহমেদ, মিসেস নূরজাহান মুরশিদ।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নির্মমভাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশের ওপর নেমে আসে দুর্দিন। আড়াই মাস পর নভেম্বরের ৩ তারিখে হত্যা করা হয় জেলে বন্দী জাতীয় চার নেতা বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে। এরপর অবৈধ সামরিক শাসনের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকে সমস্ত রাজনৈতিক কর্মকা-। ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসের শেষ ভাগে আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে দলের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং মহিলাবিষয়ক সম্পাদিকা বেগম সাজেদা চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। এর তিন মাস পর বেগম সাজেদা চৌধুরীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে কারারুদ্ধ করা হয়।
এরপর ১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাসে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে সর্বসম্মতিক্রমে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে আহ্বায়ক করে ৪৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি সাংগঠনিক কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এই সম্মেলনে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন তার বক্তব্যে বলেন, আওয়ামী লীগ একটি আদর্শভিত্তিক সংগঠন। এ ধরনের সংগঠনের মৃত্যু নেই। তিনি আরও বলেন, জাতি আজ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বর্তমানে স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু ইতিহাস বিকৃত করা যায় না। শুধু রক্তপাত দিয়ে স্বাধীনতা আসে না। যদি তা হতো তাহলে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ সফল হতো। নেতৃত্ব ছাড়া স্বাধীনতা সংগ্রাম হয় না। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকেই স্বাধীনতা সংগ্রাম হয় এবং তা সফল হয়। [সূত্র : মূলধারার রাজনীতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল ১৯৪৯-২০১৬, পৃষ্ঠা-১৮৪-৮৫, হারুণ-অর-রশিদ]
সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন উল্কাবেগে ছুটে চলেন জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগকে নতুন জাগরণে সংগঠিত করতে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তিনি থাকেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ’৭৮ সালে কাউন্সিল অধিবেশনে তিনি তার সাংগঠনিক রিপোর্ট তুলে ধরেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন ৫৭টি সাংগঠনিক জেলার দলীয় কর্মী সমাবেশে তিনি যোগ দেন। তার বক্তব্যের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মাইক ব্যবহার এবং এটিকে আন্দোলনের শুরু হিসেবে বর্ণনা করা, বঙ্গবন্ধুকে মহান শিক্ষক হিসেবে আখ্যায়িত করা, আওয়ামী লীগকে গড়ে তুলতে বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ দিনের ত্যাগ ও সংগ্রাম, শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখসহ রাজনৈতিক সামাজিক প্রয়োজনীয় প্রায় সব বিষয়ের উল্লেখ করে নেতা-কর্মীদের ভবিষ্যৎ আন্দোলনের ইঙ্গিত দিয়ে সেজন্য মানসিক প্রস্তুতির আহ্বান জানান। [সূত্র : মূলধারার রাজনীতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল ১৯৪৯-২০১৬, পৃষ্ঠা-১৮৪-৮৫, হারুণ-অর-রশিদ]
১৯৮১ সানে ঐক্যের প্রতীক, উজ্জ্বল তারকা রূপে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে নিজ দেশে ফিরে এসে দলের হাল ধরেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো একটি দিক হলো, দলের দীর্ঘ পরিক্রমায় রাজনৈতিক সংকটকালে অনেক নেতা দল ছেড়েছেন, দলের বিরুদ্ধাচারণ করে দলকে বিপদে ফেলেছেন। কিন্তু এই বিপথগামীদের দলে কোনো নারী কখনোই ছিলেন না। আওয়ামী লীগের নারী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের দলের প্রতি ভালোবাসার এই নজির অনন্যই নয় শুধু, অনুকরণীয়ও বটে।
সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন স্বাধীনতার পূর্বে যেমন ভূমিকা রেখেছেন তেমনি পরবর্তীতে দলের ক্রান্তিকালে হাল ধরেছিলেন। দেশ ও দলের প্রতি ভালোবাসা ছিল তার জীবনের ধ্যান-ধারণা। আমৃত্যু একনিষ্ঠভাবে দলের সাথে জড়িয়ে ছিলেন। বেগম সাজেদা চৌধুরী দলের সুদিনে-দুর্দিনে দলকে করেছেন সংগঠিত। দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন, এখনও মিশে আছেন দলের সাথে। আইভি রহমান নারী নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল নাম। অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন নারীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে। তার সংগঠনের প্রতি ভালোবাসা ছিল অমলিন। প্রাণ উৎসর্গ করেছেন ঠাঁই নিয়েছেন হৃদয়ে। আরও আছে অসংখ্য উদাহরণ। প্রতিটি জেলা-উপজেলায় ছড়িয়ে আছেন নিবেদিত প্রাণ নারী। প্রতিকূল পরিবেশ, সামাজিক নানা ধরনের বৈষম্যকে ঠেলে আঁকড়ে আছেন দলের সাথে।
১৯৮১ সালে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর এক বৈরী পরিবেশে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাকে লড়াই করতে হয়েছে। একদিকে দলকে সুসংগঠিত করা অন্যদিকে সামরিক শাসনের শৃঙ্খলমুক্ত করে জনগণের ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার দুরূহ সংগ্রামে জীবনবাজি রেখে অকুতোভয় সংগ্রাম। এই সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রভাষায় অধিষ্ঠিত করেন তিনি।
বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, চার জাতীয় নেতার হত্যাকা-ের বিচার কার্যক্রম শুরু, গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠার মতো ঐতিহাসিক সাফল্যে উজ্জ্বল হয়ে আছে ১৯৯৬-২০০১-এর শাসনামল। তিনিই প্রথম ‘নারীনীতি’ প্রণয়ন করেন। পিতার নামের পাশাপাশি মায়ের নাম লেখার আইন কার্যকর করেন। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে, নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত একটানা প্রায় ১০ বছর জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের লজ্জা ঘুচিয়ে এখন উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জন করেছে। আওয়ামী লীগের এই তিনবারের শাসনামলে বাংলাদেশে নারীর অবস্থান মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। আমি বিস্তারিত বিবরণ না দিয়ে মাত্র কয়েকটি ক্ষেত্রের উল্লেখ করছিÑ
১. বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা ও জাতীয় সংসদের স্পিকার নারী।
২. সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীতে কেবল সাধারণ সৈনিক পদে নয়, উচ্চপদে এখন অসংখ্য নারী যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন।
৩. সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি নিম্ন আদালতের বিচারক, মন্ত্রণালয়ের সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, জেলা প্রশাসক পদে এবং রাষ্ট্রদূত পদে নিয়োজিত আছেন বহুসংখ্যক নারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদেও এই প্রথম নারী দায়িত্ব পেয়েছেন।
৪. সরকারি কাজে নিয়োজিত নারীর মাতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধি, শিশুর জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার, বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা প্রচলনের পাশাপাশি মাতৃমৃত্যুর হার দক্ষিণ এশিয়ার সর্বনিম্নে নামিয়ে আনা হয়েছে।
৫. নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ৪৫ থেকে ৫০-এ উন্নীত করেছে। ইউনিয়ন ও পৌরসভা স্থানীয় সরকারের সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন প্রথা চালু করেছে।
৬. দ্বিতীয়ত নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে বিনামূল্যে বই বিতরণ স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ এবং মেয়েদের উপবৃত্তি প্রচলনের ফলে বাংলাদেশে নারী শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রীদের হার-এ ছেলেদের ছাড়িয়ে গেছে মেয়েরা। প্রায় ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী এখন মেয়ে।
৭. খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-েও মেয়েরা সমানতালে এগিয়ে চলেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রমীলা ফুটবলাররা বয়সভিত্তিক আন্তর্জাতিক ফুটবলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বাংলাদেশের মেয়ে নিশাত মজুমদার এবং ওয়াসফিয়া নাজরীন এভারেস্ট জয় করেছেন।
৮. সমাজ ও রাষ্ট্রের এই পরিবর্তনের প্রভাব রাজনৈতিক দলেও প্রতিফলিত। ২০২১ সালের মধ্যে সকল রাজনৈতিক দলের কর্মকর্তা পর্যায়ে ৩৩ শতাংশ নারীকে নির্বাচিত করার বিধান রয়েছে রাজনৈতিক দলবিধিতে। এ মুহূর্তে ৩৩ শতাংশ না হলেও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সংসদসহ সকল স্তরে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দলের সভাপতিম-লী, সম্পাদকম-লী ও কার্যকরি সংসদে রয়েছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী। এই হার ২০ শতাংশের ওপরে।
৯. দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের নারীদের গড় আয়ুষ্কাল এখন সবচেয়ে বেশি।
১০. দেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ১ কোটি ৬০ লাখ ছাড়িয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ১৬ হাজার ছাড়িয়েছে। বিদেশে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত রয়েছে ৮২ হাজারের বেশি নারী। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধানতম ক্ষেত্র গার্মেন্টস খাতের ৮০ শতাংশ কর্মীই নারী। দেশের ৯০ শতাংশ ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবহারকারীও নারী। নানা প্রতিকূলতা, বাধা ডিঙিয়ে তার এখন কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলোতেও দিন দিন এই হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। নারীরা যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করে প্রমাণ করেছেন, কর্মগুণ বিচারে নারী-পুরুষের পার্থক্য বিচার করা এখন অবান্তর। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশে সামাজিক-অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতা সত্ত্বেও রাজনীতিতে, প্রশাসনে এবং কর্মবৃত্তে নারীর অশংগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই অমোঘ বাণী ‘বিশ্বের যা কিছু মহান, চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’Ñ এই উচ্চারণ এখন আর নিছক, স্বপ্ন-কল্পনা নয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতার প্রদর্শিত পথ এবং বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নারী-পুরুষের বৈষম্যমুক্ত এক উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে উঠছে।
এসব কিছু সম্ভব হয়েছে জননেত্রী শেখ হাসিনার পরিকল্পিত দৃঢ় নেতৃত্বের কারণে। জাতির পিতার অসমাপ্ত স্বপ্নকে বাস্তব সোনার বাংলা তথা দারিদ্র্যমুক্ত ক্ষুধামুক্ত উন্নত দেশের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। শুধু নারী নয় সকল মানুষের জন্য অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব জননেত্রী শেখ হাসিনা। প্রতিষ্ঠার প্রায় ৬৯ বছর পর আজও আওয়ামী লীগ অসামান্য জনপ্রিয়তা নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়ে দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।
শেষ করি জননেত্রী শেখ হাসিনার কথা দিয়েÑ “আমাদের লক্ষ্য আরও বিস্তৃত। সুদূর আগামীর বাংলাদেশ নিয়েই আমাদের সুদীর্ঘ পরিকল্পনা। তাই ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে আধুনিক শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও উন্নত দেশে পরিণত করতে চাই।” [সূত্র : মূলধারার রাজনীতি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল ১৯৪৯-২০১৬, পৃষ্ঠা-৪৫২-৪৫৫, হারুণ-অর-রশিদ]
লেখক : সংসদ সদস্য

শ্রেণী:

আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্র, কর্মসূচি ও লক্ষ্য

Posted on by 0 comment
june2018

june2018নূহ-উল-আলম লেনিন: মুসলিম লীগের বিশ্বাসঘাতকতা, অঙ্গীকার ভঙ্গ, দুঃশাসন এবং ভিন্নমতের কণ্ঠরোধের প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের জন্ম। জন্মলগ্নে, ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন আওয়ামী লীগের প্রথম সম্মেলনে গৃহীত খসড়া ঘোষণাপত্রে ‘মূল দাবি’তে বলা হয়েছিল, পাকিস্তানের দুই ইউনিটের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার, সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচন, গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করেছিল। সম্মেলনে গৃহীত ১২ দফাÑ
“১. পাকিস্তান একটি স্বাধীন-সার্বভৌম ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র হবে। পাকিস্তানের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হবে জনসাধারণ।
২. রাষ্ট্রে দুটি আঞ্চলিক ইউনিট থাকবেÑ পূর্ব ও পশ্চিম।
৩. অঞ্চলগুলো লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে। প্রতিরক্ষা-বৈদেশিক সম্পর্ক ও মুদ্রা ব্যবস্থা কেন্দ্রের হাতে থাকবে এবং অন্য সকল বিষয় ইউনিটগুলোর হাতে ন্যস্ত থাকবে।
৪. সরকারী পদাধিকারী ব্যক্তিরা কোন বিশেষ সুবিধা বা অধিকারভোগী হবেন না কিংবা প্রয়োজনাতিরিক্ত বেতন বা ভাতার অধিকারী হবেন না।
৫. সরকারী কর্মচারীরা সমালোচনার অধীন হবেন, কর্তব্য সম্পাদনে ব্যর্থতার জন্য তাদের পদচ্যুত করা যাবে এবং অপরাধের গুরুত্ব অনুসারে তাদের ছোটখাটো বা বড় রকমের সাজা দেয়া যাবে। আদালতে তারা কোন বিশেষ সুবিধার অধিকারী হবেন না। কিংবা আইনের চোখে তাদের প্রতি কোনরূপ পক্ষপাত প্রদর্শন করা হবে না।
৬. জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করবেনÑ যথা বাকস্বাধীনতা, দল গঠনের স্বাধীনতা, অবাধ গতিবিধি ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের অধিকার।
৭. সকল নাগরিকের যোগ্যতানুসারে বৃত্তি অবলম্বনের অধিকার থাকবে এবং তাদের যথাযোগ্য পারিশ্রমিক দেয়া হবে।
৮. সকল পুরুষ ও নারীর জন্য শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে।
৯. পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোতে সকল নাগরিকের যোগদানের অধিকার থাকবে। একটি বিশেষ বয়সসীমা পর্যন্ত সকলের জন্য সামরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নিজস্ব স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীর ইউনিট গঠন করা হবে।
১০. মৌলিক মানবিক অধিকারসমূহ দেয়া হবে এবং কোন অবস্থাতেই কাউকে বিনা বিচারে আটক রাখা হবে না। বিনা বিচারে কাউকে দ-দান বা নিধন করা হবে না।
১১. বিনা খেসারতে জমিদারী ও অন্য সকল মধ্যস্বত্ব বিলোপ করা হবে। সকল আবাদযোগ্য জমি পুনর্বণ্টন করা হবে।
১২. সকল জমি জাতীয়করণ করা হবে।”
সামাজিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে খসড়া ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছিল, ভূমি সংস্কার বিনা খেসারতে জমিদারি উচ্ছেদ এবং প্রকৃত কৃষকদের মধ্যে জমি বণ্টন, যৌথ খামার ও সমবায় ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সকল শিল্প-কারখানা জাতীয়করণ, শিল্প-কারখানা পরিচালনায় শ্রমিকদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ, শ্রমিকদের সন্তানদের বিনামূল্যে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা এবং তাদের ধর্মঘটের অধিকার প্রভৃতি।
এছাড়া দেশের শিল্পায়ন, শিক্ষার বিস্তার ও নারীর অধিকারের কথাও প্রথম ঘোষণাপত্রে লিপিবদ্ধ ছিল। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, প্রথম ঘোষণাপত্রের ২২ দফা আশু কর্মসূচির ১৮নং দফায় আওয়ামী লীগ ব্রিটিশ কমনওয়েলথের সাথে সম্পর্কোচ্ছেদ এবং ১৯নং দফায় “আগামী তিন মাসের ভিতরে জাতিসংঘ গণভোট দ্বারা কাশ্মীর সমস্যার সমাধান না করিলে পাকিস্তান কর্তৃক জাতিসংঘ ত্যাগ।”-এর ঘোষণা দিয়েছিল।
আওয়ামী লীগের প্রথম ঘোষণাপত্রের তাৎপর্য বুঝতে হলে প্রতিষ্ঠালগ্নের পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিবেশ, জনগণের মনস্তত্ত্ব এবং চেতনার স্তর এবং প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যেও ভাবাদর্শগত টানাপোড়েন সম্পর্কে ধারণা থাকা বাঞ্ছনীয়। প্রথম ঘোষণাপত্রে ঘোষিত খিলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা, ধর্মাশ্রিত রাজনৈতিক সেøাগানের আড়ালে বাঙালির অধিকার এবং এমন কী ‘পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রসংঘ’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বোঝা যাবে না।
আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে, মুসলিম লীগের গর্ভেই ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’র জন্ম। ১৯৪৯ সালে যারা স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল গঠন করেন, তারা প্রায় সবাই ছিলেন ১৯৪৭-এর আগের নিখিল ভারত তথা অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগের সদস্য। দেশভাগের আগেই, পাকিস্তান আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখনই বেঙ্গল মুসলিম লীগে রক্ষণশীল ও উদারনীতির অনুসারী দুটি অংশের মধ্যে সুস্পষ্ট বিভাজন সৃষ্টি হয়েছিল। উত্তর ভারতের অভিজাত ও প্রতিক্রিয়াশীল মুসলিম লীগ নেতারাই কার্যত দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দখল করেছিল। এদের আশীর্বাদপুষ্ট ছিল বেঙ্গল মুসলিম লীগের জমিদার, সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল অংশের প্রতিনিধিত্বকারী খাজা নাজিমুদ্দিন গ্রুপ। আর এর বিপরীতে ছিল অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের নেতৃত্বাধীন প্রগতিশীল এবং উদারপন্থি অংশ। ১৯৪৭ সালে এই অংশটিই সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে বাংলাভাগের বিরুদ্ধে ছিল। এই অংশটি তখন দলে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। বেঙ্গল মুসলিম লীগের অফিসিয়াল নেতৃত্ব ছিল সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। বেঙ্গল কংগ্রেসের নেতা শরৎবোস (নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর বড় ভাই) এবং প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতা কিরণ শঙ্কর রায় এবং মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম গ্রুপ বাংলাকে ভাগ না করে ‘অখ- সমাজতান্ত্রিক বাংলা’ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। তারা স্বাধীন অখ- বাংলার সংবিধানের একটা রূপরেখাও প্রণয়ন করেছিলেন। কিন্তু বেঙ্গল কংগ্রেসের হিন্দুত্ববাদী শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির নেতৃত্বে হিন্দু জমিদার, বড় ব্যবসায়ী, উচ্চবিত্ত, বর্ণহিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণি বাংলাভাগের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। মুসলিম লীগ ভারত ভাগ করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা তথা ভারত ভাগের আনুষ্ঠানিক দাবি নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করেছিলÑ এ কথা সত্য। কিন্তু রেডক্লিফ রোয়েদাদ অনুযায়ী বাংলাভাগের ব্যাপারে প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বঙ্গীয় আইনসভার কংগ্রেস দলীয় সদস্যগণ (কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টি) এবং কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি। ফলে যুক্ত বাংলা করার উদ্যোগ ভেস্তে যায়।
বাংলাভাগ ঠেকাতে না পারায় মুসলিম লীগের নেতৃত্ব ও সোহরাওয়ার্দী আবুল হাশিম গ্রুপের হাতছাড়া হয়ে যায়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব বাংলার (পূর্ব পাকিস্তান) প্রথম মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান খাজা নাজিমুদ্দিন। মুসলিম লীগে সোহরাওয়ার্দীর অনুসারীরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দলের নেতৃত্ব থেকেই বাদ পড়েন নি, তারা শাসক মুসলিম লীগের নির্যাতনের শিকারে পরিণত হন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই সোহরাওয়ার্দী অনুসারী মুসলিম লীগের নেতৃস্থানীয় সদস্যরা ১৫০ মোগলটুলিতে অফিস বা ক্যাম্প স্থাপন করেছিলেন। তারা মুসলিম লীগ কর্মী শিবির নাম দিয়ে এই অফিস চালু করেন। বস্তুত দেশভাগের পর এই কার্যালয়টিই হয়ে ওঠে অফিসিয়াল মুসলিম লীগের প্রতিপক্ষ এবং প্রগতিশীল অংশের আশ্রয়কেন্দ্র এবং সকল কর্মকা-ের কেন্দ্র।
আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানী তখন আসাম ত্যাগ করে ঢাকায় চলে আসেন। সিলেটকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার গণভোটে আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানীর ছিল উদ্যোগী ভূমিকা। অথচ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মওলানা ভাসানীকে নাজিমুদ্দিনের মুসলিম লীগ চরম উপেক্ষা করে। স্বাভাবিকভাবেই মওলানা ভাসানী ১৫০ মোগলটুলির মুসলিম লীগ কর্মীদের সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করতে শুরু করেন। পাকিস্তান সরকার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে পূর্ব পাকিস্তানে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে এবং তার প্রদেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী একদিকে পূর্ব বাংলা (বাংলাদেশ)-কে কার্যত তাদের উপনিবেশে পরিণত করে। জন্মলগ্ন থেকেই দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী, বাঙালিরা তাদের জাতিগত নিপীড়ন, আঞ্চলিক বৈষম্য, গণতন্ত্রহীনতা এবং ভাষা-সংস্কৃতির প্রশ্নে বঞ্চনার শিকারে পরিণত হয়। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ‘উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণার পটভূমিতে গড়ে ওঠে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন। জিন্নাহর ঢাকা সফরের প্রাক্কালে ছাত্র ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবসহ বহুসংখ্যক ছাত্র নেতা, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবীকে গ্রেফতার করা হয়। ’৪৮-এ সূচিত এই আন্দোলনই, ’৫২-এর ভাষা সংগ্রামে পরিণত হয়।
’৪৮-এর ভাষা আন্দোলন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারীদের আন্দোলন, খাদ্যের দাবিতে আন্দোলন, দ্রব্যমূল্য হ্রাসের আন্দোলন এবং জমিদারি প্রথা বাতিলের দাবিতে জনমত প্রভৃতির পটভূমিতে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ ক্রমেই জনবিচ্ছিন্ন হতে থাকে। একইসঙ্গে মুসলিম লীগ তীব্র দমননীতির আশ্রয় গ্রহণ করে। তারা আওয়ামী লীগের প্রতিবাদী অংশটিকে পাকিস্তান-বিরোধী, ইসলাম-বিরোধী এবং ভারতের দালাল হিসেবে মিথ্যা প্রচারণা চালায়। একই সময়ে কমিউনিস্ট পার্টিসহ অন্যান্য সেকুলার গণতান্ত্রিক দল ও বুদ্ধিজীবীদের ওপরও চালায় অত্যাচারের স্টিম রোলার। পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র দুই বছরের মধ্যেই এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যার ফলে দেশপ্রেমিক, উদার গণতন্ত্রী এবং সোহরাওয়ার্দীর অনুগত মুসলিম নেতা-কর্মীদের ঐ দলে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। টাঙ্গাইলের প্রাদেশিক পরিষদের শূন্য আসনে উপনির্বাচনে অফিসিয়াল মুসলিম লীগ প্রার্থীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে জয়লাভ করে স্বতন্ত্র (মুসলিম লীগ কর্মী) প্রার্থী শামসুল হক। টাঙ্গাইলের উপনির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর মুসলিম লীগ আর কোনো উপনির্বাচন দিতে সাহস পায়নি।
আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের আগে শাসক মুসলিম লীগের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে একটা কার্যকর বিরোধী দল গড়ে তোলার প্রশ্নে ব্যক্তিগত, সমমনাদের ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপ এবং বড় নেতাদের পর্যায়ে বহু মতবিনিময় ও আলাপ-আলোচনা হয়। গ্রেফতারের পূর্বে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীগণ নারায়ণগঞ্জের খান সাহেব ওসমান আলীর বাসভবনে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। বলা যেতে পারে খান সাহেব ওসমান আলীর বাড়িতেই আওয়ামী লীগের ‘ভ্রƒণ’ জন্ম নেয়।
১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন ঢাকার টিকাটুলির রোজ গার্ডেন প্রাঙ্গণে মুসলিম লীগের গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণ দেন মওলানা ভাসানী। এই সম্মেলন থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে নতুন রাজনৈতিক দল। দলের উদ্বোধনী অধিবেশনে শেরে বাংলা একে ফজলুল হকও উপস্থিত ছিলেন। কথা ছিল তিনিও আওয়ামী লীগে যোগদান করবেন। কিন্তু পরে তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।
সম্মেলনে ৪০ সদস্য বিশিষ্ট সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়। মওলানা ভাসানীকে সভাপতি ও শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। কারাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২৪ জুন সম্মেলন শেষে আরমানিটোলা মাঠে আওয়ামী লীগের প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতিত্ব করেন মওলানা ভাসানী।
আমরা আগেই বলেছি এই সম্মেলনে শামসুল হকের ১২-দফা মূল দাবি গৃহীত হয়। পরবর্তীতে খসড়া ম্যানিফেস্টো রচিত হয়।
ম্যানিফেস্টোতে তখনকার বাস্তবতায় ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অপপ্রচারের মুখ বন্ধ করার কৌশল হিসেবে। আওয়ামী লীগকে যাতে ইসলাম-বিরোধী, পাকিস্তান-বিরোধী এবং ভারতের দালাল হিসেবে প্রচার করেও জনগণকে বিভ্রান্ত করতে না পারে সে জন্য এই রক্ষণশীল এবং প্রগতিবিরোধী লক্ষ্য কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এই একই ম্যানিফেস্টোতেই আবার সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ঘোষিত হয়। সকল ধর্মের মানুষের সমান অধিকারের ঘোষণাও দেওয়া হয়।
নবগঠিত আওয়ামী লীগের নেতাদের ধারণা ছিল ব্রিটিশ কমনওয়েলথ-এর সদস্য থাকা মানে দেশের পূর্ণ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জিত না হওয়া। সে জন্যই কমনওয়েলথের প্রশ্নে সম্পর্কোচ্ছেদের ঘোষণা দেওয়া হয়। অন্যদিকে কাশ্মীর ইস্যুটি তখন পাকিস্তানের উভয় অংশের মানুষের কাছে খুবই আবেগ ও স্পর্শকাতর বিষয় ছিল। আওয়ামী লীগ তাই আগ বাড়িয়ে তিন মাসের আলটিমেটাম দিয়ে জাতিসংঘ ত্যাগের হুমকি দেয়। এসব দাবিই ছিল তখনকার বাস্তবতায় জনগণের মনোস্তত্ত্বকে তুষ্ট করার কৌশল।
তবে ম্যানিফেস্টোতে ভূমি সংস্কার ও বিনা খেসারতে জমিদারি উৎখাতের দাবিটি যথার্থ ছিল। কিন্তু যৌথ খামার ও জমির সমবণ্টন এবং সকল শিল্প-কারখানা জাতীয়করণ ও শ্রমিকদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে কারখানা পরিচালনার দাবিগুলো ছিল কিছুটা স্বপ্ন-কল্পনা বা ইউটোপিয়া।
আমার মতে, আওয়ামী লীগের জন্মলগ্নের প্রথম সম্মেলনের ১২-দফা মূল দাবিই ছিল এই দলটির গড়ে ওঠা ও বিকাশধারার মূল ভিত্তি।
মূল দাবির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হচ্ছে ২নং ও ৩নং দাবি অর্থাৎ, ২নং. “রাষ্ট্রের দুটি আঞ্চলিক ইউনিট থাকবে, পূর্ব ও পশ্চিম”, ৩নং “অঞ্চলগুলো লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে। প্রতিরক্ষা-বৈদেশিক সম্পর্ক ও মুদ্রাব্যবস্থা কেন্দ্রের হাতে থাকবে এবং অন্য সকল বিষয় ইউনিটগুলোর হাতে ন্যস্ত থাকবে” এবং ৯নং দাবি “পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোতে সকল নাগরিকের যোগদানের অধিকার থাকবে। একটি বিশেষ বয়সসীমা পর্যন্ত সকলের জন্য সামরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নিজস্ব স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীর ইউনিট গঠন করা হবে।” Ñ বলা যেতে পারে এই ৩টি দাবির মধ্যেই ৬-দফা দাবির বীজ উপ্ত ছিল।
১৯৫৩ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহার ঐতিহাসিক ২১-দফা প্রণয়ন করেছিল আওয়ামী লীগ। ২১-দফার ১নং দফায় প্রকৃতপক্ষে ২, ৩ ও ৯নং দফার মর্মবাণীই পুনরুচ্চারিত হয়েছে। ’৫৪-এর নির্বাচন বাংলার মানুষ মুসলিম লীগকে চূড়ান্তভাবে এবং ২১-দফা কর্মসূচির পক্ষে রায় দেয়। নানা প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, উত্থান-পতন ও চড়াই-উৎরাইয়ের ভেতর দিয়ে ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পূর্ব বাংলায় ও পাকিস্তানের কেন্দ্রে বেসামরিক, নির্বাচিত সরকারের ধারা অব্যাহত থাকে। ১৯৫৬-৫৮ এই দুই বছর পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগ সরকার এবং ১৯৫৬-৫৭ পাকিস্তানের কেন্দ্রে সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতায় ছিল। ’৫৪ থেকে ’৫৮ সালের যুক্তফ্রন্ট ও আওয়ামী লীগের শাসনামলে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা হয়, মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন বর্ধমান হাউসকে বাংলা একাডেমির কার্যালয়ে রূপান্তরিত করা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের নির্মাণকাজ শুরু করা হয়, চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন গঠনসহ বেশ কিছু গণমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হয়। সিদ্ধান্ত হয় এই সংবিধানের ভিত্তিতে অবিলম্বে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এছাড়া ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে প্রথমে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে আওয়ামী লীগের নামের সাথে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া তথা আওয়ামী লীগকে ধর্মনিরপেক্ষ দলে রূপান্তরিত করার প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। ৫৭ সদস্যের ওয়ার্কিং কমিটির ২৭ জন সদস্য খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। অবশ্য ১৯৫৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ সেক্যুলার দলে পরিণত হয়।
এই সময়ে আরও দুটি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা সংঘটিত হয়। ১৯৫৭ সালের ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারীতে আওয়ামী লীগের বিশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী উপস্থিত ছিলেন। মওলানা ভাসানী পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি। সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান। কাগমারী সম্মেলনে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে উত্থাপিত হয়। কিন্তু এই সম্মেলনেই মওলানা ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর মধ্যে তথা পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের মধ্যে প্রধানত পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে চূড়ান্ত মতপার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। কাগমারী সম্মেলনের এক মাসের মধ্যেই মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেন। ১৯৫৭ সালের ১৩ ও ১৪ জুন ঢাকায় আরমানিটোলা নিউ পিকচার হাউসে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। ভাসানী দল ত্যাগ করলেও আওয়ামী লীগ তাকে সভাপতির পদে বহাল রাখে। কিন্তু ভাসানী সাহেব তখন নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করার উদ্যোগ নেন। ১৯৫৭ সালের ২৫ ও ২৬ জুলাই এক নিখিল পাকিস্তানভিত্তিক সম্মেলনের মাধ্যমে মওলানা ভাসানী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নামে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল গঠন করেন।
ইতোমধ্যে পাকিস্তানে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের রাজনীতি চূড়ান্ত রূপলাভ করে। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর এক সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। প্রথমে ইস্কান্দার মির্জা এবং পরে ‘লৌহ মানব’ আইয়ুব খাঁ সামরিক শাসক হিসেবে আবির্ভূত হন। দীর্ঘ চার বছর (১৯৫৮-১৯৬২) সামরিক শাসন অব্যাহত থাকে। সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। চলে জেল জুলুম অত্যাচার। ১৯৬২ সালে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের ফলে সামরিক শাসন প্রত্যাহৃত হয়। আইয়ুব খাঁ ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ নামে সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র চালু করে। ১৯৬৪ সালের মার্চ মাসে আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত হয়।
পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রস্তাবে পূর্ব বাংলায় স্বায়ত্তশাসনের নিশ্চয়তা দান, পাকিস্তানের দুই অংশের সমান উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের অবসান, সামরিক দিক থেকে পূর্ব বাংলাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে গড়ে তোলা এবং ফেডারেল ধরনের পার্লামেন্টারি সরকার ব্যবস্থা চালুর দাবি উত্থাপিত হয়।
১৯৬৪ সালের ৬ জুন প্রকাশিত হয় পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের ১১-দফা খসড়া ম্যানিফেস্টো। এই ম্যানিফেস্টোতেও লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি উত্থাপিত হয়। এবারই প্রথম কেন্দ্রের হাতে মুদ্রা থাকার প্রস্তাবটি বাদ দেওয়া হয়।
১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর গোলটেবিল বৈঠকে ৬-দফা আলোচনার এজেন্ডাভুক্ত করতে চাইলে গোলটেবিল বৈঠক ভেস্তে যায়। লাহোরেই বঙ্গবন্ধু ৬-দফা দাবি প্রকাশ করেন।
৬-দফাকে বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তিসনদ হিসেবে ঘোষণা করেন। ১৯৪৯ সালের প্রতিষ্ঠালগ্নের যে তিন-দফা দাবির কথা আমরা ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছি, সেই তিন দফা, যুক্তফ্রন্টের ২১-দফা, ১৯৬৪ সালের ১১-দফা প্রভৃতি দাবিকে ভিত্তি করেই প্রণীত হয় ঐতিহাসিক ৬-দফা। জন্মলগ্নের স্বপ্ন ৬-দফায় আরও সুস্পষ্ট অবয়ব লাভ করে। ১৯৪৯-এ পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও মুদ্রাব্যবস্থা কেন্দ্রের হাতে রেখে অবশিষ্ট সকল ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে ন্যস্ত করার দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু আইউবের শাসনামলে দুই অংশের অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকট রূপ ধারণ করে। পূর্ব বাংলার অর্থে পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলা হয়। ১৯৬৫-এর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পূর্ব বাংলার নিরাপত্তাহীনতা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই বঙ্গবন্ধু ৬-দফা দাবিতে স্বায়ত্তশাসন বা ফেডারেল ধরনের সরকার ব্যবস্থার কথাই নয়, তিনি স্পষ্টভাবে দুই অর্থনীতি, দুই মুদ্রা, দুই রিজার্ভ ব্যাংকের কথা যেমন উপস্থাপন করেন; তেমনি পূর্ব বাংলায় নৌবাহিনী সদর দফতর এবং নিজস্ব মিলিশিয়া বাহিনী গড়ে তোলার কথা বলেন। কার্যত কেন্দ্রের হাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব আংশিক প্রতিরক্ষা ক্ষমতা রেখে পূর্ব বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি উত্থাপন করেন। ৬-দফা কার্যত প্রকারান্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবিতে পরিণত হয়।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ ৬-দফার পক্ষে গণভোট দাবি করেন। ৬-দফা তখন ছাত্রসমাজের ১১-দফার অন্তর্ভুক্ত। নির্বাচনী ইশতেহারে বঙ্গবন্ধু সে কথা উল্লেখ করেন। কিন্তু নির্বাচনী ইশতেহারে ও নির্বাচন উপলক্ষে প্রদত্ত ভাষণে তিনি বারবার বলেছেন, প্রাণের দাবি ৬-দফা হচ্ছে বাঙালির মুক্তির সনদ বা ম্যাগনাকার্টা। ’৭০-এর নির্বাচনকে তিনি তাই ৬-দফার পক্ষে ‘গণভোট’ হিসেবে উল্লেখ করেন। বাংলার মানুষ সেই ঐতিহাসিক গণভোটে যেমন ৬-দফার পক্ষে নিরঙ্কুশ রায় প্রদান করে তেমনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাদের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বরণ করে নেয়।
প্রবন্ধটি শেষ করব এ কথা বলে যে, সময়ের পরিবর্তনে, যেমন রাজনৈতিক আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে নানা পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, তেমিন অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের মানুষের চিন্তাধারা ও মন-মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে। পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক দ্বি-জাতিতত্ত্বের যে মোহজালে বাঙালি মুসলমান আচ্ছন্ন ছিল ভাষা-সংগ্রাম থেকে ৬-দফা, ১১-দফা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে সেই মোহজাল যেমন ছিন্ন হয়েছে, তেমনি তাদের বাঙালি আত্মপরিচয় নিয়ে নতুন চেতনার উন্মেষ হয়েছে। একইসঙ্গে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে তাদের আশা-আকাক্সক্ষা ও চেতনার স্তর নতুন উচ্চতায় বিকশিত হয়েছে। অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ, নিজেদের জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষার পাশাপাশি ‘সমাজতন্ত্রের’ প্রতিও এক ধরনের প্রত্যাশা বাঙালি জাতিকে উজ্জীবিত করেছে। ১৯৪৯ সালের প্রথম খসড়া ম্যানিফেস্টোতে তখনকার রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে ধর্মাশ্রিত নানা আপ্তবাক্য বলা হলেও, ঐ ম্যানিফেস্টোতেই প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল স্বশাসনের কথা, গণতন্ত্রের কথা, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের সম-অধিকার এবং শোষণমুক্ত সমাজ তথা সমাজতন্ত্রের কথা। ১৯৪৯ সালে রোপিত বীজটিই ’৭০ সালে মহীরুহে পরিণত হয়েছিল এবং ’৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে তা যৌক্তিক পরিণতি লাভ করেছিল।

শ্রেণী:

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গৌরবোজ্জ্বল ৬৯ বছর : ইতিহাসের রেখাচিত্র

Posted on by 0 comment
june2018

june2018রায়হান কবির * ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন। আহ্বায়ক : নঈমউদ্দিন আহমদ। স্থান : ফজলুল হক হল।
*  ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রথম ধর্মঘট। শেখ মুজিবুর রহমানসহ তৎকালীন ছাত্র নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার।
* ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ পূর্ব বাংলা সফরে এসে জিন্নাহর ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণা। ছাত্র নেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ ছাত্র নেতৃবৃন্দের এই ঘোষণার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ। এ বছর ১১ সেপ্টেম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানকে আবার আটক করা হয়। ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
* ১৯৪৯ : টাঙ্গাইল উপনির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী শামসুল হকের জয় লাভ। মুসলিম লীগ মনোনীত প্রার্থী পরাজিত। মুসলিম লীগে ভাঙনের সূত্রপাত।
* ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে নেতৃত্বদানের অভিযোগে ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ কয়েকজনকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার। এপ্রিলে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট করার কারণে শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হন।
* ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন ঢাকার কেএম দাশ লেনে অবস্থিত হুমায়ূন সাহেবের বাসভবন রোজ গার্ডেন প্রাঙ্গণে মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠিত। ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দলের আত্মপ্রকাশ। প্রথম সভাপতি মওলানা ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক। জেলে থাকা অবস্থায় এই দলের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান। জুন মাসের শেষের দিকে মুক্তি লাভ করেন।
* ১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খানের পূর্ব পাকিস্তান আগমনকে উপলক্ষ করে আওয়ামী মুসলিম লীগ ঢাকায় দুর্ভিক্ষবিরোধী মিছিল বের করে। এই মিছিলের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হন। এ সময় শেখ মুজিবুর রহমানের দুই বছর জেল হয়েছিল।
* ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন; কারাবন্দি শেখ মুজিবের নির্দেশনা। বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের সিদ্ধান্তে ছাত্রদের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ। রফিক, শফিক, বরকত, সালাম, জব্বারসহ অগণিত আন্দোলনকারী পুলিশের গুলিতে শহীদ।
* ১৯৫২ সালের ডিসেম্বরে লাহোরে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ ও পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক জিন্নাহ আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিনিধিদের যৌথ সম্মেলন। সম্মেলনে শর্তসাপেক্ষে দুই দল একীভূত হয়ে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়।
* ১৯৫৩ সালের ৩, ৪ ও ৫ জুলাই ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত।
* ১৯৫৩ সালের ১৪ ও ১৫ নভেম্বর ময়মনসিংহে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে যুক্তফ্রন্টে অংশগ্রহণ ও ২১-দফা অনুমোদন নিয়ে আলোচনা হয়।
* ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠন। আওয়ামী লীগের উদ্যোগে ২১-দফা প্রণয়ন। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়। সংখ্যা গরিষ্ঠ আসনে আওয়ামী লীগ জয়ী। ৩ এপ্রিল আওয়ামী লীগকে বাদ রেখে শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ। ১৫ মে আওয়ামী লীগসহ যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা সম্প্রসারিত। আদমজীতে দাঙ্গার অজুহাতে ৩০ মে ৯২(ক) ধারা জারি এবং যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বরখাস্ত। তীব্র দমননীতি।
*  ১৯৫৫ সালের ২১, ২২ ও ২৩ অক্টোবর ঢাকার সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হলে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত। এই কাউন্সিলে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দিয়ে অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ দল হিসেবে আওয়ামী লীগের আত্মপ্রকাশ।
*  ১৯৫৬ সালের ১৯ ও ২০ মে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে যথাসময়ে সাধারণ নির্বাচনের দাবি জানানো হয়।
ক্স ১৯৫৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পূর্ব বাংলায় আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভা গঠন। ১১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের কেন্দ্রে সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও রিপাবলিকান পার্টির কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠন।
* ১৯৫৭ সালের ৭-৮ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারীতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসন ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে দলে প্রকাশ্য মতবিরোধ। কাগমারী সম্মেলনের পর ১৯৫৭ সালের মার্চ মাসে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান। অন্যদিকে ১৯৫৭ সালের ১৩ ও ১৪ জুন ঢাকার শাবিস্তান হলে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল আহ্বান করা হয়। এই কাউন্সিলে ভাসানীর পদত্যাগপত্র নিয়ে আলোচনা হয়; কিন্তু গৃহীত হয় না। দল থেকে পদত্যাগ করলেও কাউন্সিল ভাসানীকেই সভাপতি করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়।
*  ১৯৫৭ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানে মার্শাল ল’ জারি। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ। শেখ মুজিবসহ নেতৃবৃন্দ গ্রেফতার। ২৭ অক্টোবর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জার অপসারণ, জেনারেল আইউব খানের ক্ষমতা দখল।
*  ১৯৫৯ সালের ৭ ডিসেম্বর শেখ মুজিবের মুক্তিলাভ। গোপনে সহকর্মীদের কাছে স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা প্রকাশ করেন শেখ মুজিব।
*  ষাটের দশকের শুরুতেই বাংলাদেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে ছাত্রলীগ নেতাদের গোপন নিউক্লিয়াস গঠন। শেখ মুজিবের অনুমোদন।
* ১৯৬১ রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনে সংস্কৃতিকর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের উদ্যোগ। রবীন্দ্রসংগীত প্রচারে সরকারের নিষেধাজ্ঞা। প্রতিবাদ-প্রতিরোধ।
*  ১৯৬২ সালে ছাত্রলীগ নেতৃত্বে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন। সোহরাওয়ার্দীর মুক্তি। সামরিক শাসন শিথিল। ১৯৬২ সালের ৪ অক্টোবর আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক দলগুলো আলাদাভাবে পুনরুজ্জীবিত না করার সিদ্ধান্ত। ‘ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’ (এনডিএফ) নামে একটি ঐক্যবদ্ধ জোট গড়ে ওঠে।
*  ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর লেবাননের রাজধানী বৈরুতে সোহরাওয়ার্দীর আকস্মিক মৃত্যুর পর এনডিএফ কার্যকারিতা হারায়। ১৯৬৪ সালের ২৫ ও ২৬ জানুয়ারি দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে অনুষ্ঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভা। এই সভায় দল পুনরুজ্জীবনের সিদ্ধান্ত। পুনরুজ্জীবিত দলে মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগিশ ও শেখ মুজিবুর রহমান যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে বহাল থাকেন। এনডিএফ-পন্থি নেতাদের আওয়ামী লীগ ত্যাগ।
* ১৯৬৪ সালের ৬, ৭ ও ৮ মার্চ ঢাকার হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগিশ ও শেখ মুজিবুর রহমান যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে বহাল থাকেন।
*  ১৯৬৪ সালে শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট-বিরোধী আন্দোলন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। দাঙ্গার বিরুদ্ধে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ব্যাপক গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। ইত্তেফাকে প্রকাশিত ১৬ জানুয়ারি ১৯৬৪ ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদ এবং দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির পক্ষ থেকে একই শিরোনামে একটি লিফলেট বিতরণ করা হয়Ñ যা সে সময় পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে ব্যাপক মানবিক আবেদন সৃষ্টি করে।
*  ১৯৬৪ সালে বুনিয়াদি গণতন্ত্রের নামে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি বা সম্মিলিত বিরোধী দলÑ ‘কপ’ গঠন। আইউব খানের বিরুদ্ধে মহম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতেমা জিন্নাহকে ‘কপ’-এর প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন। প্রতিনিধি পদে নির্বাচনে কপ প্রার্থীদের জয় লাভ; কিন্তু প্রেসিডেন্ট পদে পরোক্ষ নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহর পরাজয়। সর্বজনীন ভোটাধিকারের দাবি জোরদার।
*  ১৯৬৪ সালের ৫ জুন আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ‘দুই অর্থনীতি’ তত্ত্বের আলোকে ১১-দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১১-দফা দাবি কার্যত ভবিষ্যৎ ৬-দফা দাবিরই ভিত্তি রচনা করে।
*  ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ। পূর্ববাংলা অরক্ষিত ও পশ্চিমাঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন।
*  ১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তি সনদ ৬-দফা কর্মসূচি উত্থাপন করেন। ৬-দফা বিরোধিতা করে মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশের আওয়ামী লীগ ত্যাগ।
* ১৯৬৬ সালের ১৮, ১৯ ও ২০ মার্চ হোটেল ইডেনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ কাউন্সিলে ৬-দফা অনুমোদন। আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্ব শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি ও তাজউদ্দিন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত। সারা বাংলায় শেখ মুজিবুর রহমানের ঝটিকা সফর। একাধিকবার গ্রেফতার, মুক্তি আবার গ্রেফতার।
* ১৯৬৬ সালের ৮ মে আইউব সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে জামিন অযোগ্য নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করে। একই সাথে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদসহ সারাদেশে বিপুল সংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী গ্রেফতার।  ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ৬-দফা দাবিতে আওয়ামী লীগ দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করে। সর্বাত্মক হরতালে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশ অচল হয়ে পড়ে। পাশবিক হিং¯্রতা নিয়ে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হরতালে ঢাকার রাজপথ শ্রমিক-জনতার রক্তে রঞ্জিত হয়। শ্রমিক মনু মিয়াসহ কমপক্ষে ১০ জন নিহত হন।
*  ১৯৬৭ সালের ১৯ আগস্ট হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগের একটি কাউন্সিল অধিবেশন হয়। নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য নয়; বরং দলকে চাঙ্গা রাখার জন্যই এই কাউন্সিল ডাকা হয়েছিল। কাউন্সিল সর্বসম্মতিক্রমে ৬-দফায় প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে।
*  ১৯৬৭ সালের ২৭ আগস্ট ঢাকায় নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত। শেখ মুজিবুর রহমানকে সভাপতি এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে একটি নতুন কমিটি গঠিত।
*  ১৯৬৮ সালের ১৯ ও ২০ অক্টোবর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের দুদিনব্যাপী কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়।
*  ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি শেখ মুজিবকে প্রধান আসামি করে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব গং’ তথা আগরতলা মামলা দায়ের। শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে স্থানান্তর। বিচার শুরু।
*  আইউব-বিরোধী আন্দোলনের লক্ষ্যে ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে গঠিত হয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। সংগ্রাম পরিষদ ৬-দফা ভিত্তিক ১১-দফা দাবিনামা প্রণয়ন করে। সংগ্রাম পরিষদে ছিল ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া), ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন), এনএসএফ-এর একাংশ এবং ডাকসু।
* ১৯৬৯ সালের ১৭ জানুয়ারি ১১-দফা দাবিতে ছাত্র-গণ-আন্দোলনের শুরু। ২৪ জানুয়ারি গণ-অভ্যুত্থান। গণজাগরণের ব্যাপকতা। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ প্রভৃতি বিরোধী দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে গঠন করে ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি বা ডাক। তবে আন্দোলনের নেতৃত্ব থাকে ছাত্রসমাজের হাতে। ২২ ফেব্রুয়ারি নিঃশর্তভাবে কারাগার থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তিলাভ এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত ছাত্রজনতার বিশাল সমাবেশে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত।
* ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ আইউবের পতন। ইয়াহিয়ার ক্ষমতা গ্রহণ এবং পুনরায় মার্শাল ল’ জারি।
*  ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের ‘বাংলাদেশ’ নামকরণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
*  সামরিক শাসনের মধ্যেই পাকিস্তানে নির্বাচনের ঘোষণা। এলএফও জারি। আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত। ১৯৭০ সালের ৭ জুন বঙ্গবন্ধু নির্বাচনকে ৬-দফার পক্ষে ‘গণভোট’ বলে ঘোষণা করেন।
*  ১৯৭০ সালের ৪ ও ৫ জুন আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এই কাউন্সিলে ১ হাজার ১৩৮ কাউন্সিলর উপস্থিত ছিলেন। কাউন্সিলে সভাপতিত্ব করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই কাউন্সিলে আসন্ন সাধারণ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয় এবং ৬-দফা আদায়ের লক্ষ্যে নির্বাচনকে একটি গণভোট হিসেবে গ্রহণ করার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নেতা-কর্মীদের প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানান। কাউন্সিলে শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি ও তাজউদ্দিন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
* ১৯৭০ সালের ৬ জুন হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় এবং এই কাউন্সিলে শেখ মুজিবুর রহমানকে সভাপতি এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।
* ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত। পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদে নির্ধারিত ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আওয়ামী লীগের জয়লাভ। ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ৩১০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৮৭টি আসনে জয়লাভ। সংরক্ষিত ১০টি মহিলা আসনও পায় আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু স্বীকৃতি অর্জন। তিনি পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা নির্বাচিত।
* ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি বিশাল জনসভায় আওয়ামী লীগের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথবাক্য পাঠ করান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
* ১৯৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া কর্তৃক অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় পরিষদসভা স্থগিত ঘোষণা। প্রতিবাদে ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ এই ১-দফা দাবিতে উত্তাল বাংলাদেশ। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা উত্তোলন।
* ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ, পল্টনের জনসভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি জাতীয় সংগীত হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ৫ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সারা বাংলাদেশে পাঁচ দিনব্যাপী হরতাল পালন।
*  ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্সের জনসভায় বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে : ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ঘোষণা।
* বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রশাসন হাতে নিয়ে অসহযোগ আন্দোলন পরিচালনার জন্য ৩৫টি নির্দেশ জারি করেন। শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে আলোচনা করে নির্দেশাবলী প্রণয়ন করেন এবং তা বঙ্গবন্ধু অনুমোদন করেন।
*  ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে পূর্ব বাংলার সর্বত্র স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো হয়। এদিন সর্বত্র মুক্ত আকাশে পতপত করে উড়তে থাকে স্বাধীন সোনার বাংলার নতুন পতাকা। বাংলার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজ হাতে তার বাসভবনে বাংলাদেশের মানচিত্র-খচিত লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে দেন।
* ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনা ভেঙে যায়। ওই দিন রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পাকহানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের শুরু। সারাদেশে বাঙালির প্রতিরোধ যুদ্ধ।
*  ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ইপিআরের ওয়্যারলেস মারফত গোপনে ওই ঘোষণা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু পাকহানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধের নির্দেশ দেন।
*  ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এক সভায় মিলিত হন। বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঘোষণা। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর প্রবাসী সরকারের শপথ গ্রহণ। তারা ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ প্রণয়ন করেন, ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাকে অনুমোদন দেন এবং বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন করেন। গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী। বঙ্গবন্ধু সর্বাধিনায়ক।
*  ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আ¤্রকাননকে ‘মুজিবনগর’ (অস্থায়ী রাজধানী) ঘোষণা করে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালিত। জাতীয় সংগীত হিসেবে প্রথম ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি গাওয়া হয়।
*  ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ শেষে বাংলাদেশ ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনীর কাছে ৯৩ হাজার পাকবাহিনীর সদস্যের আত্মসমর্পণ। ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান এবং ৩ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জন। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় মুজিবনগর সরকার সদস্যদের ঢাকায় আগমন এবং দায়িত্ব গ্রহণ।
*  ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন।
* ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে নতুন সরকার গঠন করেন। শুরু হয় যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন।
*  ১৯৭২ সালের ৭ ও ৮ এপ্রিল স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে সর্বসম্মতিক্রমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন জিল্লুর রহমান।
*১৯৭৪ সালের ১৮, ১৯ ও ২০ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এই কাউন্সিলে এএইচএম কামারুজ্জামানকে আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং জিল্লুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যগণ দলের কর্মকর্তা পদে থাকতে পারবেন না বিধায় বঙ্গবন্ধু সভাপতির পদ ত্যাগ করেন। সৃষ্টি হয় গণতন্ত্র চর্চায় নতুন ঐতিহ্য।
*  ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি ঘোষণা করেন এবং জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করেন। গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’।
*  ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে সেনাবাহিনীর একটি বিচ্ছিন্ন অংশকে নিয়ে খুনি মোশতাক-রশিদ-ফারুক চক্রের অভ্যুত্থান এবং বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা। পাকিস্তানি ধারায় দেশকে ফিরিয়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র।
*  খুনি মোশতাক স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি, সামরিক আইন জারি, জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনী প্রধান। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার। ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি।
ক্স ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে হত্যা।
[আগামী সংখ্যায় সমাপ্ত]

শ্রেণী:

আওয়ামী লীগবিরোধী প্রচারের ৬ দশক ‘ঢেউয়ের ওপর দিয়ে যেন পালের নৌকো’

Posted on by 0 comment
june2018

শেখর দত্ত:

[প্রথম পর্ব : পাকিস্তানি আমল]
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালেjune2018র ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে ভ্রƒণ সৃষ্টি হয়; তারই জাতক হচ্ছে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন সৃষ্ট আওয়ামী লীগ। এই দলটির জন্ম যেমন আকস্মিক ব্যাপার ছিল না; ঠিক তেমনি জনবিচ্ছিন্ন কোনো ষড়যন্ত্র-চক্রান্তেরও অংশ ছিল না। পাকিস্তান যেভাবে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের ‘ভাগ কর শাসন কর’ নীতি সুকৌশলে প্রয়োগের পরিণতিতে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে অবৈজ্ঞানিক ও যান্ত্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তারই পরিণতিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ক্রমবিকাশের সাথে দলটির জন্ম ও বিকাশ অবিসম্ভাবী হয়ে ওঠে।
প্রসঙ্গত, পাকিস্তানের শাসক দল মুসলিম লীগের দুই প্রধান নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ ও লিয়াকত আলী খানের কেউই যে দুই অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান গঠিত হয়েছে, সেই অঞ্চলে জন্মগ্রহণকারী বাসিন্দা বা নেতা ছিলেন না। দুই অঞ্চলের তৃণমূলের দলীয় নেতা-কর্মী ও জনগণের সাথে তাদের প্রত্যক্ষ কোনো যোগাযোগ ছিল না। মুসলিম লীগ দলীয় সংগঠনের তৃণমূল থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন এ দুজন। সর্বোপরি পাকিস্তানের দুই অংশের ৫টি জাতি (বাঙালি, পাঠান, বালুচ, সিন্ধি ও পাঞ্জাবি)-কে ধর্মের ভিত্তিতে একত্র করে শাসন ও শোষণের মৃগয়াক্ষেত্র তৈরির প্রয়োজন ছিল। উল্লিখিত দুই কারণে সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী শাসনপদ্ধতি প্রবর্তন এবং শাসন ক্ষমতা সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়াটাই ছিল স্বাভাবিক।
এটা সকলেরই জানা যে স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অনুষঙ্গ হচ্ছে, বিরোধী দল-মতকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য দমন-পীড়ন ও অপপ্রচার-মিথ্যাপ্রচার এক সাথে চালানো। আসলে একটা হচ্ছে আরেকটার পরিপূরক এবং একটা বাড়লে অপরটাও বাড়ে। তবে সাধারণত প্রচার চলে আগে আগে আর নির্যাতন নিপীড়ন আসে ঠিক পিছন পিছন। বিরোধীরা ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’, ‘পাকিস্তানের শত্রু’, ‘ভারতীয় এজেন্ট’, পাকিস্তানকে ‘ভেঙে ফেলতে’ চাইছে, বাঙালা ভাষা ও সংস্কৃতি ‘হিন্দুয়ানি’ প্রভৃতি প্রচার পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরদিন থেকেই পাকিস্তানের শাসক-শোষক গোষ্ঠীর প্রচারের প্রধান বিষয় হয়ে যায়। শিশুকে ঘুম পাড়ানোর জন্য যেমন চাঁদ মামা বা মাসী পিসিকে নিয়ে গান গাওয়া হয় কিংবা মনে ভয় জাগিয়ে তাকে বশ করার জন্য যেমন জুজুর ভয় দেখানো হয়, তেমনি ‘শিশু পাকিস্তান’-এর সামনে রাখা হয় পবিত্র ধর্মের জিগির কিংবা ভারতীয় জুজু।
এই জিগির ও জুজু সামনে রেখেই পাকিস্তান আন্দোলনের তিন নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে নতুন দেশটিতে স্থায়ীভাবে বসবাস ও রাজনীতি করার ক্ষেত্রে নানাভাবে বাধা প্রদান করা হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির আগে পাকিস্তান প্রস্তাব থেকে ‘স্টেটস’ শব্দ কেটে ‘স্টেট’ করার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হককে ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করার ক্ষেত্রে অসুবিধা সৃষ্টি করা হয় এবং নতুন দল গঠনের উদ্যোগকে গু-া লেলিয়ে বানচাল করা হয়। ভারত বিভক্তির আগে যুক্ত বাংলার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ‘সংখ্যালঘুদের প্রতি ন্যায়বিচার ও ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে অধিক সম্পর্ক’ স্থাপনের অনুরোধ করায় সোহরাওয়ার্দীকে করাচিতে আইন ব্যবসা করতে দেওয়া হয় না এবং গণপরিষদে তার আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়। মওলানা ভাসানী নিপীড়িত কৃষক-জনতার পক্ষে কথা বলায় টাঙ্গাইল আসনের উপনির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেও ওই নির্বাচন বাতিল করে দেওয়া হয়।
পাকিস্তান আন্দোলনের প্রথম প্রজন্মের বাংলার এই তিন নেতাকে প্রথম থেকেই ‘শিশু রাষ্ট্র পাকিস্তান’কে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তকারী, বিভেদ সৃষ্টিকারী, ভারতের দালাল হিসেবে চিত্রিত করার প্রচেষ্টা চলে। ইতোমধ্যে জুজুর ভয় দেখিয়ে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে এক রাখার জিগির তুলে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে প্রতিষ্ঠা করার তৎপরতা শুরু হয়ে যায়।
প্রসঙ্গত, পাকিস্তান সৃষ্টির পর সেই অর্থে কোনো বিরোধী দল ছিল না। কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি দল হিসেবে থাকলেও সেই দলগুলোর লক্ষ-উদ্দেশ্য সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণ, যারা পাকিস্তান আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেই জনগণের চিন্তা-চেতনার সাথে সংগতিপূর্ণ ছিল না। কংগ্রেসকে মনে করা হতো হিন্দুদের দল। তাই দেখা যায় যে, ১৯৪৮ সালে ২৫ ফেব্রুয়ারি কংগ্রেস সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যখন বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি কেন্দ্রীয় আইন সভায় উত্থাপন করেন, তখন প্রস্তাবের পক্ষে কোনো মুসলিম সদস্য অবস্থান গ্রহণ করেন নি। আর কমিউনিস্ট পার্টি এমনিতেই ছিল ‘আল্লাহ না মানা’ দল। এই দলটি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দিনগুলোতে পাকিস্তানকে সমর্থন করলেও ১৯৪৮ সালের শুরুতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সুর মিলিয়ে ‘ইয়া আজাদী ঝুটা হ্যায়..’ সেøাগান তুললে জনগণ থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
এ অবস্থায় জনগণের চেতনার সাথে সংগতিপূর্ণ একটি বিরোধী দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। চলে নানা প্রচেষ্টা। কিন্তু তা অগ্রসর হয় না। এই অবস্থায় এগিয়ে আসে পাকিস্তান আন্দোলনের দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতাদের বড় এক অংশ। মুসলিম লীগের সাথে থাকলেও এই অংশটির মধ্যে মুক্তবুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রভাব ছিল। এই অংশটি নিজেদের সংগঠিত ও শক্তি বৃদ্ধির জন্য সদস্য সংগ্রহের লক্ষ্যে সদস্য ফরম চাইলে পাকিস্তানের শাসক ও শোষক গোষ্ঠীর পক্ষের মুসলিম লীগ নেতারা তা দিতে অস্বীকার করে। উল্লিখিত স্বৈরাচারী পদক্ষেপ গ্রহণ এবং অপপ্রচার ও মিথ্যা প্রচার, বিশেষভাবে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার তৎপরতা দৃশ্যমান হলে মুসলিম লীগবিরোধী ক্ষোভ দানা বেঁধে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠিত হয়।
পর্যবেক্ষণে এটা সুস্পষ্ট যে, যারা এই ছাত্র সংগঠনটি গঠন করেছিলেন তারা মুসলিম লীগের মধ্যে থাকলেও মুক্তচিন্তা ও অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনায় প্রভাবিত ছিলেন। এমন প্রভাব অস্বাভাবিক ছিল না। বাংলায় সাম্প্রদায়িক ও সংকীর্ণ চিন্তা-চেতনার বিপরীতে আবহমান কাল থেকেই অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তচিন্তার যে ধারা বহমান ছিল, তারই ধারাবাহিকতায় বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এই চেতনা তখন মুসলিম শব্দ ধারণ না করে দানা বেঁধে ওঠা সম্ভব ছিল না। ওই ছাত্র সংগঠনে তখন বাম ও কমিউনিস্ট ছাত্র নেতারাও যুক্ত ছিলেন। ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার পর ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের প্রতিবাদে আন্দোলন তীব্র ও ব্যাপক হয়ে ওঠে।
যার পরিণতিতে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ প্রদেশব্যাপী হরতাল পালিত হয়। হরতালের পর সরকারের প্রেসনোট ছিল এ রকম : ‘… সাধারণ ধর্মঘটকে কার্যকর করার জন্য আজ ঢাকাতে কিছু সংখ্যক অন্তর্ঘাতক এবং একদল ছাত্র ধর্মঘট করার চেষ্টা করে। শহরে সমস্ত মুসলিম এলাকা এবং অধিকাংশ অমুসলিম এলাকাগুলোতে ধর্মঘট পালন করতে অসম্মত হয়। শুধু কিছু মাত্র হিন্দু দোকানপাট বন্ধ রাখে।… মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে হতবুদ্ধিতা সৃষ্টি করে পাকিস্তানকে খর্ব করার উদ্দেশ্যে একটি গভীর ষড়যন্ত্র চলছে।’ ‘অন্তর্ঘাত’, ‘হিন্দু’, ‘বিভেদ’, ‘ষড়যন্ত্র’ প্রভৃতি শব্দগুলো বিবেচনায় নিলেই সুস্পষ্ট হবে, ধর্মপ্রাণ জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য তীব্র সাম্প্রদায়িক ও ভারতবিরোধী প্রচার তখন কতটা তীব্র করা হয়।
এখানে উল্লেখ্য যে, যান্ত্রিকভাবে দেশ ভাগ করে পাকিস্তান সৃষ্টির পরের বেশ কিছু সময় মূলত পূর্ব অবস্থানের কারণে ঢাকার সাথে কলকাতাকে কেন্দ্র করেও পূর্ব বাংলার রাজনীতি চালু ছিল। দৈনিক ইত্তেহাদ তখনও প্রকাশিত হতো কলকাতা থেকে। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অবস্থানের কারণে মুসলিম লীগ সরকার পূর্ব বাংলায় দৈনিক ইত্তেহাদ প্রবেশ নিষিদ্ধ রাখে। এদিকে জুনের প্রথম দিকে মুসলিম লীগ সরকার সোহরাওয়ার্দীকে জননিরাপত্তা আইনে ৬ মাসের জন্য পূর্ব বাংলায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। এককথায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে প্রচার বন্ধ রেখে এবং অন্দোলনকে দমন করে মুসলিম লীগ সরকার একতরফাভাবে নতুনভাবে জেগে ওঠা গণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে কার্যত জিহাদ ঘোষণা করে।
এই দিনগুলোতে পাকিস্তান সরকার ভারত বিরোধিতার জিগির তুলে কলকাতার পাটকলগুলোতে পাট রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। ফলে যে কৃষকরা ছিল পাকিস্তান আন্দোলনের প্রাণ তাদের জীবনে চরম দুর্দশা নেমে আসে এবং পূর্ব বাংলার অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। দুই পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। ফলে গ্রাম বাংলায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং তাদের পক্ষে কথা বলায় মওলানা ভাসানী রাজনীতিতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এদিকে শ্রমিক ও কর্মচারীরাও দুর্ভাগ্যের শিকার হয়। এ অবস্থায় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ধর্মঘট শুরু হয়। সাথে সাথে চলে তীব্র দমন-পীড়ন এবং গণতান্ত্রিক ও কমিউনিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে তীব্র অপপ্রচার। এসব আন্দোলনের ভেতর দিয়ে ছাত্র নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে সামনের সারিতে চলে আসেন।
একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, পাকিস্তান সৃষ্টির প্রথম থেকেই পূর্ব বাংলার জাতীয় অধিকার ও শ্রমজীবী জনগণের আন্দোলন একই ধারায় অগ্রসর হয় এবং ক্রমে জাতীয় রাজনীতির মূলধারা হিসেবে অবস্থান নিতে থাকে। এই মূলধারাকে ধারণ, রক্ষণ ও বাহনের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি রাজনৈতিক দলের। এই প্রয়োজনীয়তা থেকে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পূর্ব বাংলার জনগণের চিন্তা-চেতনা ও ক্ষোভ ধারণ করে এবং আশা-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম আওয়ামী লীগ। এখানে জাতির জন্য যে বিষয়টি সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তা হলো, প্রথম থেকেই পাকিস্তান আন্দোলনের তরুণ নেতা ও পরবর্তীতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অপপ্রচার-নির্যাতন ও আন্দোলন-সংগ্রামে পোড় খেয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনের মধ্যমণি হিসেবে অবস্থান নিতে শুরু করেন।
সংক্ষেপে উল্লিখিতভাবে পাকিস্তানের প্রথম দিনগুলো তথা আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগের ইতিহাস তুলে ধরা হলো দেশের বৃহত্তম ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ইতিহাস রচনার জন্য নয়, দমন-পীড়নের মধ্যে কীভাবে আওয়ামী লীগ বিকশিত হয়েছে সেজন্যও নয়; আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দেশের ডান ও প্রতিক্রিয়াশীল এবং উগ্রবামপন্থি মহল কোন ধরনের মিথ্যা ও অপপ্রচার করে এখন পর্যন্ত অগ্রসর হচ্ছে, তার একটা সংক্ষিপ্ত রূপরেখা তুলে ধরার জন্য। প্রকৃত বিচারে আওয়ামী লীগের ইতিহাস নির্যাতন-নিপীড়ন ও অপপ্রচার-মিথ্যা প্রচার মোকাবিলা করার ইতিহাস। রাজনীতিতে একটা চিরসত্য কথা রয়েছে যে, অভিজ্ঞতাই চলার পথের পাথেয়। এ দিকটি বিবেচনা করেই পাকিস্তানি আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ইস্যু সামনে নিয়ে আওয়ামী লীগবিরোধী প্রচারের স্বরূপ উদঘাটন করা হলো।

প্রতিষ্ঠালগ্নের সময়কাল
আওয়ামী লীগ জন্মলগ্নেই গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনের দাবি সম্বলিত ১২-দফা দাবি তুলে ধরে। এই দাবিনামা পাকিস্তানের শাসক-শোষক গোষ্ঠীর চক্ষুশূল হয় এবং টনক নাড়িয়ে দেয়। ‘সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হবে জনগণ’ এই ঘোষণা এবং কেবল ‘প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক সম্পর্ক ও মুদ্রা’ কেন্দ্রের হাতে রেখে স্বায়ত্তশাসনের দাবি কোনো রাজনৈতিক দল দাবি হিসেবে তুলে ধরবে, এমনটা মেনে নেওয়ার মতো অবস্থা তাদের ছিল না। তাই এই নবোজাত দলের বিরুদ্ধে শুরু হয় অপপ্রচার ও মিথ্যাপ্রচার। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের সাথে সুর মিলিয়ে বাঙালি জাতির কলঙ্ক পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন ১৯৪৯ সালের ৮ জুলাই বলেন যে, ‘আমরা জেনে-শুনে বৃহৎ বাংলা আন্দোলনের নেতাদের ষড়যন্ত্র চালিয়ে যেতে দিতে পারি না। কঠোর হস্তে ষড়যন্ত্র দমন করা হবে। আমি একটি নতুন দলের নাম শুনছি আজকাল। তারা হালে পাকিস্তান দরদি হয়েছেÑ আমরা জানি তারা কারা।’
বাংলায় পাকিস্তান আন্দোলনের নেতা হিসেবে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ক্ষমতার প্রশ্নে সোহরাওয়ার্দীই ছিলেন ক্ষমতাসীন নেতাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, তাই তাকে উদ্দেশ্য করেই এমন প্রচারণা চালানো হয়েছিল। পাকিস্তানের তৃতীয় স্বাধীনতা দিবস পালন অনুষ্ঠানে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান বাঙালির এই নেতাকে ‘পাকিস্তান ধ্বংস করার জন্য ভারতের লেলায়িত কুকুর’ হিসেবে বিষোদগার করেন। মুসলিম লীগের নেতারা এবং এমনকি প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান পর্যন্ত প্রকাশ্যে হুঙ্কার দিতে থাকেন, ‘শির কুচল দেঙ্গে।’ এই অপপ্রচার ও মিথ্যা প্রচার ও হুমকি-ধমকির জবাবে একটি পত্রিকা বের করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ১৯৪৯ সালের ১৫ আগস্ট প্রকাশিত হয় দৈনিক ইত্তেফাক। প্রথম থেকেই এই দৈনিকটি গণতন্ত্র ও বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রধান প্রচারক হিসেবে অপপ্রচার ও মিথ্যা প্রচারের মুখোশ উন্মোচন করতে থাকে। দৈনিক পত্রিকা ইত্তেফাকের ভূমিকা তাই আওয়ামী লীগ ও দেশের ইতিহাসে অনন্য ও অসাধারণ। এখন দিন পাল্টিয়েছে, সংবাদপত্রের ভূমিকা কি হবে তা নিয়ে নানা মত রয়েছে সত্য; কিন্তু এটাই বাস্তব যে, এখন আওয়ামী লীগের কোনো দৈনিক পত্রিকা নেই।
প্রতিষ্ঠার দিনগুলোতে ডান ও প্রতিক্রিয়াশীলদের অপপ্রচার-মিথ্যাপ্রচারের মধ্যে বাম ও কমিউনিস্টদের আওয়ামী লীগ সম্পর্কে অবস্থান ও প্রচার কেমন ছিল তা নিয়ে আলোচনা খুবই আগ্রহোদ্দীপক। ‘ঢাকা জেলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের অতীত যুগ’ বইতে প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা জ্ঞান চক্রবর্তী বাম ও কমিউনিস্ট নেতা-কর্মীদের দুই বিপরীত ধরনের মত সম্পর্কে লিখেছেনÑ
প্রথম মত : কমিউনিস্টরা ‘আওয়ামী লীগের মত সংগঠনগুলোর জন্ম প্রভৃতির মত ঘটনাগুলিকে প্রতিক্রিয়াশীলদের কারসাজি বলিয়াই মনে করিত।… সহজে তাহাদের সহিত কাজ করিতে রাজী হইতেন না।’
দ্বিতীয় মত : ১৯৫১ সালে প্রাদেশিক কমিটির বর্ধিত সভায় ‘পার্টির অতীত কার্যাবলীর ভুলভ্রান্তি নিয়া আলোচনা হয় এবং গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর সাথে একযোগে কাজ করিবার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।’
প্রসঙ্গত, প্রথম মত ছিল প্রবীণদের আর দ্বিতীয় মত তরুণদের। তরুণদের কারণে উল্লিখিত বর্ধিত সভার সিদ্ধান্ত তৃণমূলে কার্যকর করা সম্ভব হয় নি। তিনি লিখেছেনÑ ‘ওই বর্ধিত সভার পরে আওয়ামী মুসলিম লীগের সহযোগিতায় কাজ করিবার বিষয়টি নিয়া যখন কমরেডদের সাথে আলোচনা করা হয়, তখন নতুন কমরেডরা প্রায় সকলেই ইহা বাতিল করিয়া দেয়। কাজেই ইহা আর কার্যকরী করা সম্ভব হয় না।’ একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, তখন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাম ও কমিউনিস্ট মহলে উল্লিখিত দুই মতেরই অবস্থান রয়েছে। একপর্যায়ে তা রুশ-চীন ভাগাভাগিতে পরিণত হয়। রুশপন্থি বাম ও কমিউনিস্টরা সাধারণভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষে এবং চীনপন্থিরা সাধারণভাবে বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রচার চালায়। এখনও বাম ও কমিউনিস্টরা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত থাকলেও আওয়ামী লীগ সম্পর্কে অবস্থান ও প্রচার উপরোক্ত দুই ধারায় একই রকম রয়েছে।

বাহান্ন-এর ভাষা আন্দোলন
বাহান্নর ভাষা আন্দোলনে আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং পেশাজীবী ও সামাজিক সংগঠনের মধ্যে অভূতপূর্ব ঐক্য গড়ে ওঠে। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি হন আওয়ামী মুসলিম লীগ সভাপতি মওলানা ভাসানী। জেলে থেকেও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আন্দোলনের ওই দিনগুলোতে মুসলিম লীগের প্রচার কোন ধরনের ছিল, তা বুঝা যাবে ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র মিছিলে গুলি ও ছাত্র হত্যার পর আইনসভায় মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের বক্তৃতা বিবেচনায় নিলে। তিনি বলেন, ‘পুলিশ ঠিকই করেছে। উচ্ছৃঙ্খলতা দমনের জন্য পুলিশ। এর পিছনে হিন্দু কমিউনিস্টদের উসকানি আছে। তাদের নির্মূল করবরই।’ তখন ‘হিন্দুদের ভাষা বাংলা’ এই প্রচার জোরদার করার সাথে সাথে ‘পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভারতীয় এজেন্টরা’ এসে পাকিস্তান ভাঙা ও মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ করার জন্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে বলে প্রচার জোরদার করা হয়। আন্দোলনকারীদের ‘এজেন্ট ও প্রভোকেটর’ ও ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ আখ্যায়িত করে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ ও গু-াদের লেলিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সবই যায় বিফলে। শহিদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে মাতৃভাষা বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, এই আন্দোলনের ভেতর দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তার ভ্রƒণ বাংলা মায়ের গর্ভে সুদৃঢ়ভাবে অবস্থান নেয়। এই বিজয় মুসলিম লীগকে পূর্ব বাংলার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার সাথে সাথে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিতকে নাড়িয়ে দেয় এবং ক্রমে জেগে ওঠা বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধান আস্থাভাজন দল হিসেবে সামনে এসে দাঁড়ায় আওয়ামী লীগ।

চুয়ান্ন সালের নির্বাচন
ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে পূর্ব বাংলার জনগণের মধ্যে ক্ষোভের যে বহিঃপ্রকাশ ঘটে, তাতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুসলিম লীগ সরকার পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। ১৯৫৪ সালের ওই নির্বাচনে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে জোট-যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। জনসমর্থন ও সংগঠন শক্তির দিক থেকে এই জোটের প্রধান দল ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। নির্বাচন সামনে রেখে পূর্ব বাংলার জনগণের মধ্যে এই জোটের পক্ষে জাগরণ সৃষ্টি হয়। ফলে ভীত হয়ে মুসলিম লীগ নির্বাচনী প্রচারে আরও মারমুখী হয়ে ওঠে। সরকারি দলের নেতারা প্রচার করতে থাকে, যুক্তফ্রন্টকে ভোট দিলে ইসলাম ধর্ম বিপন্ন হবে, পাকিস্তান ভেঙে যবে, পূর্ব বাংলা ভারতের অংশ হয়ে যাবে, যুক্তফ্রন্ট ভারতের অর্থে নির্বাচন করছে, ভারতীয় এজেন্টরা কর্মী হয়ে কাজ করছে, আন্দোলনের নামে অরাজকতা সৃষ্টি করে যুক্তফ্রন্ট হিন্দু ভাষা ও সংস্কৃতি আমদানি করতে চাইছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কর্মসূচি নয়, সাম্প্রদায়িক ও ভারত-বিরোধী প্রচারই ছিল মুসলিম লীগের প্রধান বিষয়।
অপরদিকে যুক্তফ্রন্টের প্রচারে মুসলিম লীগ সরকারের দুঃশাসন, স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি অবহেলা, ভাষা আন্দোলনে ছাত্র হত্যা, দুর্নীতি, লবণ সংকট, শাসনতন্ত্র প্রদানে অনিহা, পূর্ব বাংলার প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণ প্রভৃতি তুলে ধরে। সর্বোপরি মুসলিম লীগের অপপ্রচার ও মিথ্যা প্রচারের জবাব দেওয়ার সাথে সাথে ২১-দফা কর্মসূচি তুলে ধরা হয়। আওয়ামী লীগের পত্রিকা দৈনিক ইত্তেফাক এই প্রচারে মুখ্য ভূমিকা পালন করে এবং পত্রিকাটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
এই নির্বাচনে মুসলিম লীগের কবর রচিত হয়। যুক্তফ্রন্ট ‘ব্যালট বাক্সে বিপ্লব’ ঘটিয়ে জয়যুক্ত হয়। জনগণের রায়ে আওয়ামী লীগ প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে বের হয়ে আসে। মুসলিম লীগের প্রচার বুমেরাং হয়ে যায়। দ্বিজাতিতত্ত্ব মুসলিম লীগ ও পাকিস্তানের প্রতি পূর্ব বাংলার মানুষের মোহভঙ্গ হয়। অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির উত্থান ঘটে। জাতীয় অধিকার ও মানুষের অধিকারের বিষয়গুলো এই নির্বাচনের ভেতর দিয়ে সামনে চলে আসে। এই নির্বাচনের ফলাফলের ভেতর দিয়ে এটা দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, পূর্ব বাংলার জনগণের নির্বাচনী মার্কা হচ্ছে নৌকা।

যুক্তফ্রন্ট আমল
মুসলিম লীগবিরোধী এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার ক্রমউত্থানের প্রেক্ষিতে বিজয়ী যুক্তফ্রন্ট সরকারকে সহ্য করার মতো অবস্থা কেন্দ্রীয় সরকারের ছিল না। শুরু হয় প্রাসাদ যড়যন্ত্র। প্রথমেই বাঙালি-অবাঙালি দাঙ্গা বাধিয়ে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির দায় প্রাদেশিক সরকারের ওপর ফেলা হয় এবং পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন করার জন্য সরকারে থেকে ভারতীয় এজেন্টরা কাজ করছে বলে প্রচারণা চালানো হয়। এ অবস্থায় মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক চিকিৎসার জন্য কলকাতা গেলে সেখানকার সম্বর্ধনা সভার বক্তৃতা নিয়ে অপপ্রচার তুঙ্গে তোলা হয়। শেরেবাংলাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী, ভারতের দালাল ও বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিত্রিত করার প্রয়াস চলে। সরকারের সাথে তখন গলা মেলায় সাম্রাজ্যবাদী প্রচারযন্ত্র। নিউইয়র্ক টাইমস সাক্ষাৎকার প্রচার করে লিখে শেরে বাংলা বলেছেন, পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন করা হবে তার প্রধান কাজ।
এরই মধ্যে জেল গেটে স্বতঃস্ফূর্ত জনতার এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে শেখ মুজিবকে জেল গেট ভাঙার দায়ে অভিযুক্ত করা হয় এবং তাকে ‘ভয়ানক বিপজ্জনক ব্যক্তি’, ‘দাঙ্গাবাজ’ ও ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রচার চালানো হয়। ভারত ও কমিউনিস্টবিরোধী প্রচার তখন তীব্রতর করা হয়। এসব প্রচারণা চালিয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার দুই মাস না যেতেই কেন্দ্রীয় সরকার ৯২(ক) ধারা জারি করে। জরুরি অবস্থা ঘোষিত হয়। প্রাদেশিক সরকার ভেঙে দিয়ে মন্ত্রী-নেতাদের গ্রেফতার করে। শেখ মুজিবকে মারাত্মক অস্ত্রসহ দাঙ্গাকারী হিসেবে গ্রেফতার এবং তাকে টার্গেট করে প্রচার জোরদার করা হয়।
এ পর্যায়ে মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্টের প্রধান দুই দল আওয়ামী মুসলিম লীগ ও কৃষক শ্রমিক পার্টি এবং দুই নেতা এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে সকল কর্মতৎপরতা ও প্রচার কেন্দ্রীভূত করে। এতে কেন্দ্রীয় সরকার সফল হয়। চলতে থাকে পূর্ব বাংলার ক্ষমতায় পালাবদলের খেলা। এসব স্বৈরাচারী অপতৎপরতা ও অপপ্রচারের লক্ষ্য ছিল পূর্ব বাংলায় নিজেদের বশংবদ সরকার প্রতিষ্ঠা করা।
এ সময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, ১৯৫৫ সালের অক্টোবরে আওয়ামী মুসলিম লীগ সম্মেলনের ভেতর দিয়ে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেয়। পূর্ব বাংলার গণমানুষের চেতনার সাথে সংগতিপূর্ণ ও সর্ববৃহৎ গণ-আস্থাসম্পন্ন রাজনৈতিক দলের এই সিদ্ধান্ত ছিল দ্বিজাতিতত্ত্বকে পূর্ব বাংলার জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যানের নামান্তর আর তাই যুগান্ত সৃষ্টিকারী। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভয় পেয়ে যায় মুসলিম লীগ সরকার এবং মওলানা ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর মধ্যে বিভেদ তথা আওয়ামী লীগকে বিভক্ত করার চক্রান্ত জোরদার হয়। জনমনে ও দলের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সোহরাওয়ার্দীকে বিতর্কিত ও বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য সব ফন্দি আঁটা হয়।
এদিকে সামরিক জোট সিয়াটো গঠনের পর পাকিস্তানকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক শাসনের মধ্যে ফেলে সাম্রাজ্যবাদের লেজুরে পরিণত করার অভিপ্রায়ে সাম্রাজ্যবাদী মহলও এই ষড়যন্ত্র-চক্রান্তে যোগ দেয়। পাকিস্তান আমলে এই সময়টা ছিল আসলে পূর্ব বাংলা ও আওয়ামী লীগের জন্য একদিকে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক এবং অপরদিকে এ থেকে শিক্ষা নিয়ে দলটি আরও অভিজ্ঞ ও পোক্ত হয়। গণপরিষদে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র প্রণয়ন তখন ছিল প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু। এ অবস্থায় শাসনতন্ত্রে ‘এক লোক এক ভোট নীতি’ কার্যকর করা সম্ভব বিবেচনায় আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর সাথে সমঝোতা করেন। কেননা অবস্থা পর্যবেক্ষণে তিনি মনে করতেন, এই নীতি যদি শাসনতন্ত্রে কার্যকর করা যায়, তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় পূর্ব বাংলার হাতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা চলে আসবে। পূর্ব বাংলায় আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেতা না থাকায় পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চিন্তা অস্বাভাবিক ছিল না। আর প্রাদেশিক পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে বিধায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে প্রাদেশিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে বলে তিনি বিবেচনা করতেন।
এই চিন্তা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে তিনি প্রথমে কেন্দ্রীয় সরকারের আইনমন্ত্রী ও পরে প্রধানমন্ত্রী হন। ক্ষমতায় বসেই তিনি জাতীয় পরিষদে যুক্ত নির্বাচন প্রথার পক্ষে বিল উত্থাপন করে বলেন যে, ‘মুসলিম জাতি ও পাকিস্তানি জাতিÑ সম্পূর্ণ পৃথক। মুসলমান জাতির ব্যাপ্তি পাকিস্তানের সীমারেখা ছাড়িয়ে যায়। পাকিস্তানি জাতি ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে।’ ওই সময়ে পাকিস্তানের ক্ষমতার কেন্দ্রে দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরুদ্ধে এটা ছিল প্রথম প্রতিবাদ। মুসলিম লীগ ও কৃষক শ্রমিক পার্টি এই বিল নিয়ে তীব্র আওয়ামী লীগবিরোধী প্রচারে নামে। তবুও জাতীয় পরিষদের যুক্ত নির্বাচন বিল পাস হয়। এদিকে পূর্ব বাংলায় ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জনস্বার্থে বহু কাজ করার উদ্যোগ নেয় এবং যুক্ত নির্বাচন প্রথা, পাকিস্তানের দুই অংশের বৈষম্য দূরীকরণ ও বিমাতাসুলভ আচরণের প্রশ্নে যেসব বক্তব্য রাখে, তা ছিল জনগণের চেতনাকে জাগ্রত করার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যবহ।
এসব ঘটনার ভেতর দিয়ে পাকিস্তানে প্রথম শাসনতন্ত্র গৃহীত হয় এবং ১৯৫৯ সালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়া হয়। এতদসত্ত্বেও পাকিস্তানের শাসক-শোষকগোষ্ঠী সেই সময় যা চেয়েছিল সেটাই হয়। সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানী বিভেদ সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগ ভেঙে যায় এবং মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাপ প্রতিষ্ঠা পায়। পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও সাম্রাজ্যবাদ প্রশ্নে জনগণ ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ব্যাপক ও তীব্র বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগ তখন শাঁখের করাতের মধ্যে পড়ে। একদিকে পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতি বিনষ্ট করার জন্য মুসলিম লীগের প্রচার আর অন্যদিকে বাম কমিউনিস্টদের স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে এবং সাম্রাজ্যবাদের সাথে আপসের বিরুদ্ধে প্রচার। এ সময়ে বাম ও কমিউনিস্টরা এবং আওয়ামী লীগ পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রচারে নামে। পাকিস্তানি আমলে এর চেয়ে বেশি পরস্পরের মুখোমুখি দুই পক্ষ আগে বা পরে আর হয়নি।
তবে তখনকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে এটাই স্পষ্ট যে, বিরুদ্ধ সব প্রচার সত্ত্বেও কোণঠাসা বা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি আওয়ামী লীগ ও দলের প্রতীক নৌকা। তাই দেখা যায়, ১৯৫৭ সালের প্রদেশিক পরিষদের উপনির্বাচনে সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা ও রংপুরের ৭টি আসনের মধ্যে ৬টিতেই আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। এসব ঘটনা প্রবাহে পাকিস্তানের শাসক-শোষকগোষ্ঠী প্রমাদ গোনে। তাই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ১৩ মাসের মাথায় সোহরাওয়ার্দীকে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অপসারণ করা হয়।
পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভেদ ও বিভ্রান্তির সুযোগে বিয়োগান্তক ও অনভিপ্রেত নানা ঘটনার ভেতর দিয়ে আসে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন। এই সময়কালে ঘটনাবলী ও সামরিক শাসন পূর্ব বাংলার জনগণের ওপর চেপে বসার ঘটনা পর্যালোচনা করলে বলা যায়, ওই সময়ে পূর্ব বাংলার প্রতি পাকিস্তানের শাসক ও শোষকগোষ্ঠীর স্বৈরাচারী, ঔপনিবেশিক মনোভাব ও কার্যকলাপের মুখোশ আরও ভালোভাবে উন্মোচিত হয়ে পড়ে। অনেক মূল্য দিয়ে হলেও পাকিস্তানের প্রতি মোহমুক্তি ঘটার ক্ষেত্রে এ অভিজ্ঞতার প্রয়োজন ছিল।
সামরিক শাসন
উল্লিখিত শাসনতন্ত্রের ভিত্তিতে ১৯৫৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হবে এমনটাই সরকার ঘোষণা দিয়েছিল। তবে নির্বাচন হলে পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগ জয়লাভ করবে এটা সুনিশ্চিত ছিল। তাই ওই নির্বাচন বানচাল করার জন্য ক্যু করা ভিন্ন পাকিস্তানের শাসক ও শোষকগোষ্ঠীর কাছে বিকল্প ছিল না। সামরিক শাসন জারি করেই তাই শাসনতন্ত্র বাতিল, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইন সভা ও সরকার বাতিল, সকল রাজনৈতিক দলকে বে-আইনি ও রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সামরিক সরকারের পক্ষ থেকে প্রচারে বলা হতে থাকেÑ
১. দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ক্ষমতার জন্য দ্বন্দ্ব-সংঘাত, বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি প্রভৃতির জন্য রাজনৈতিক দল ও নেতারা দায়ী।
২. কিছু রাজনীতিবিদ রক্তাক্ত বিপ্লবের কথা বলছে, আর এক দল বিদেশের সাথে আঁতাত করতে চাইছে।
৩. যে দল দেশকে প্রায় ধ্বংসের শেষ সীমায় নিয়ে গেছে, সেই বিশ^াসঘাতকরাই তাদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য নির্বাচনে জালিয়াতি করে জিততে চাইছিল।
৪. শাসনতন্ত্রে কতক ত্রুটি রয়ে গেছে, যা দূর না করলে দেশ বিভক্ত হয়ে যাবে।
৫. মুসলমানদের জন্য উপযুক্ত শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করা হবে।

প্রচারের ধরন থেকেই অনুধাবন করা যায়, টার্গেট পূর্ব বাংলা এবং আওয়ামী লীগ ও কমিউনিস্টরা। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, দেশকে ধ্বংস ও বিভক্ত করা, সাম্প্রদায়িকতা, ভারত বিরোধিতা, সংসদীয় গণতন্ত্র ও যুক্ত নির্বাচন প্রথার বিরোধিতা প্রভৃতির সাথে সামরিক শাসনের মধ্যে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার প্রভৃতির অভিযোগ পূর্ব বাংলার রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে তোলা হয়। এই প্রচারের সাথে নির্যাতন, বেত্রদ-, মিথ্যা মামলা, নিষেধাজ্ঞা, গ্রেফতার ও নানাবিধ নিপীড়ন আইনের শাসন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করে নির্বিবাদে চলতে থাকে। ঘোষিত হয় ‘নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্যতা সংক্রান্ত আদেশ (এবডো)’-সহ বিভিন্ন নিবর্তনমূলক আইন। ঘোষণায় বলা হয়, এবডো ঘোষিত রাজনীতিকদের দুর্নীতির অভিযোগ স্বীকার করে রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণের ঘোষণা দিতে হবে। রাজনীতিকরা ‘জঞ্জাল’ বলে প্রচার জোরদার করা হয়।
পাকিস্তানি শাসক ও শোষকগোষ্ঠীর প্রধান টার্গেট আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দীসহ প্রায় অর্ধশতক রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে এবডো দেওয়া হয় এবং মওলানা ভাসানী ও রাজনীতির মধ্যমণি শেখ মুজিবসহ বহু রাজনীতিককে গ্রেফতার করা হয়। এদিকে সরকার-বিরোধী প্রচার বন্ধ করার জন্য ইত্তেফাক সম্পাদক মানিক মিয়াকেও গ্রেফতার করা হয়। অব্যাহতভাবে এই প্রচার ও জেল-জুলুমের সাথে ‘মুসলমানদের জন্য উপযুক্ত শাসনতন্ত্র’ চালুর জন্য আইয়ুব খান ‘হ্যাঁ’ ভোট ‘না’ ভোটের সংস্কৃতি এবং এক লোক এক ভোট নীতি বাতিল করে মৌলিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করে। এ ব্যবস্থা বিরাজনীতিকরণের জন্যই করা হয়। গণতন্ত্রের নামে তা ছিল স্বৈরশাসন। এভাবে সামরিক কর্তা আইয়ুব খান সামরিক বেসামরিক আমলা ও পদলেহনকারী পেশাজীবী বুদ্ধিজীবীদের হাতে দেশের শাসনভার অর্পণ করে। সাম্রাজ্যবাদীরা এই ব্যবস্থার পক্ষে সর্বতোভাবে প্রচারে নামে। এসব প্রচার ও ব্যবস্থা গ্রহণ ছিল প্রকৃত বিচারে পাকিস্তানের ভাগ্যে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ারই নামান্তর।
আগামী সংখ্যায় সমাপ্ত

শ্রেণী:

নববর্ষ ও বাঙালি-জীবন

Posted on by 0 comment
a

aড. এম আবদুল আলীম: ০১
বাঙালির সবচেয়ে বড় সার্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক উৎসব বাংলা নববর্ষ। এই উৎসবের মাধ্যমে বাঙালি তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে মেলবন্ধন স্থাপন করে এবং জাতিসত্তার পরিচয়কে নতুন তাৎপর্যে উপলব্ধি করে। মূলত, বাংলা নববর্ষ বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনাকে শানিত করে স্বাধিকার সংগ্রাম বেগবান করেছে এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জনে শক্তি-সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছে। নববর্ষ কেবল বাহ্যিক অনুষ্ঠানাদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর মাধ্যমে বাঙালি তার জাতীয়তাবাদী চেতনায় শক্তি সঞ্চিত করে এবং নিজেদের আত্মপরিচয় ও শেকড়ের সন্ধানে ব্রতী হয়। শুধু তাই নয়, এর মাধ্যমে বাঙালির আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেও আসে প্রবল গতিবেগ।
নববর্ষ পুরনো বছরের ‘গ্লানি’ মুছে দিয়ে বাঙালি-জীবনে ওড়ায় ‘নূতনের কেতন’, চেতনায় বাজায় মহামিলনের সুর। ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী এবং সম্প্রদায়গত ভেদাভেদ দূর করে সকল বাঙালিকে মিলিত করে এক সম্প্রীতির মোহনায়। নববর্ষ এলে উৎসবের আমেজ আর নতুনের আবাহনে পুরো জাতি জেগে ওঠে। কী পল্লি, কী শহর সর্বত্রই প্রবাহিত হয় আনন্দের ফল্গুধারা। গ্রামে-গঞ্জে-নগরে বসে বৈশাখী মেলা; চলে উন্মুক্ত কনসার্ট, পানাহার, লাঠিখেলা, সার্কাস, পুতুলনাচ, হালখাতা; বসে পুঁথিপাঠ, বাউল-জারি-সারি-মুর্শিদী এবং কবিগানের আসর। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র রমনার বটমূলে ছায়ানটের হাজারো শিল্পী নেচে-গেয়ে বরণ করে নতুন বছরকে। প্রচার-মাধ্যমগুলো প্রচার করে বিচিত্র অনুষ্ঠান। জাতীয় দৈনিকগুলো প্রকাশ করে ক্রোড়পত্র। অশুভ শক্তির বিনাশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও চারুকলার ছাত্র-ছাত্রীরা বের করে মঙ্গল শোভাযাত্রা। নানা সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করে বিস্তারিত কর্মসূচি। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকেরা নিজেদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তুলে ধরে নব-উদ্দীপনায়। রাস্তাঘাট এবং বাড়ির আঙিনা সাজানো হয় আলপনার বর্ণিল রঙে। নতুন পোশাকে আর বিচিত্র সাজে রাস্তায় নেমে আসে অজস্র নর-নারী, যুবা-কিশোর-শিশু। পান্তা-ইলিশ, মুড়ি-মুড়কির ভোজে এবং বাউলের একতারার সুরে সৃষ্টি হয় মন মাতানো পরিবেশ।

০২
বাংলা নববর্ষ কীভাবে প্রবর্তিত হলো? এ সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের চোখ মেলতে হয় ইতিহাসের ঝরোকায়। ভারত-তত্ত্ববিদ আলবেরুনি ‘কিতাব উল হিন্দ’-এ (রচনাকাল আনুমানিক ১০৩০ খ্রিস্টাব্দ) ভারতবর্ষে প্রচলিত যেসব অব্দের (শ্রীহর্ষাব্দ, বিক্রমাব্দ, শকাব্দ, বলভাব্দ ও গুপ্তাব্দ) নাম উল্লেখ করেছেন, তাতে বঙ্গাব্দ নেই। বঙ্গাব্দ চালু হয় অনেক পরে, ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে, সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে। ‘আইন-ই-আকবরী’তে আছে : “আকবর বেশ কিছুদিন ধরে হিন্দুস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে দিন গণনার সমস্যাকে সহজ করে তোলার জন্য একটি নতুন বৎসর ও মাস গণনা পদ্ধতি প্রবর্তন করতে ইচ্ছা প্রকাশ করে আসছিলেন।… আমীর ফতই উল্লাহ শিরাজির প্রচেষ্টায় এই নতুন অব্দের প্রচলন হলো।… সিংহাসনে আরোহণের ২৫ দিন গত হলে, অর্থাৎ বুধবার, ২৮শে রবি-উস-সানি (১১ই মার্চ ১৫৫৬) তারিখে ভুবন আলোককারী ‘নতুন বর্ষের’ শুরু হয়েছিলো। এদিনটি ছিলো পারসিক বছরের নওরোজÑ ১লা ফরওরদিন, বিশ্বাস অনুযায়ী ঐদিন (অর্থাৎ ১১ই মার্চ) সূর্য মেষ রাশিতে প্রবেশ করতো।”
সম্রাট আকবর হিজরি সন অনুযায়ী খাজনা তুলতে গিয়ে দেখেন ফসল তোলার সময়ের সঙ্গে মিল রাখা কষ্টকর হচ্ছে। এজন্য তিনি হিজরি সনকে ভিত্তিমূল ধরে সৌরনিয়মে বছর গণনা শুরু করেন, প্রবর্তন করেন বাংলা সনের। চন্দ্রমাসগুলোকে পরিণত করেন সৌরমাসে। আকবর প্রবর্তিত এই সনের (তারিখ-ই-ইলাহি) আদর্শে বাংলা বিহার, উড়িষ্যা, দাক্ষিণাত্য ও বোম্বাই প্রদেশে আমলি, বিলায়তি ও বিভিন্ন ফসলি সন প্রচলিত হয়েছিল। অনেকে শশাঙ্ক ও হোসেন শাহের আমলে বঙ্গাব্দ প্রচলনের কথা বললেও, অধিকাংশ ঐতিহাসিক এবং গবেষক এ কৃতিত্বের মুকুট সম্রাট আকবরের শিরেই পরিয়েছেন।
সময়ের বিবর্তনে বাংলা সন-তারিখের হিসাবে কিছু সমস্যা দেখা দেয়। ১৯৫২ সালে জ্যোতিপদার্থবিদ ড. মেঘনাদ সাহা আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তিতে বাংলাসহ বিভিন্ন বর্ষপঞ্জির আমূল সংস্কারের প্রস্তাব দেন। তার সুপারিশকে মূলভিত্তি ধরে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ১৯৬৪ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র নেতৃত্বে বাংলা বর্ষপঞ্জি সংস্কারের ব্যবস্থা করে। স্বাধীনতার পর প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বাংলায় নোট লেখা এবং বাংলা স্বাক্ষর ও তারিখ প্রদান প্রথা প্রচলন করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এই রীতি অব্যাহত রাখেন। ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ সরকার শহীদুল্লাহ্ কমিটির সুপারিশের আলোকে সকল কাজকর্মে ইংরেজি সন-তারিখের পাশাপাশি বাংলা সন-তারিখ লেখার নির্দেশ দেন। পরে লিপইয়ারসহ কিছু জটিলতা দূরীকরণে বাংলা একাডেমি ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কিছু সংস্কার সাধিত হয়। এই কমিটি ১৯৯৫ সালের ১৯ আগস্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, প্রতিবছর ১ বৈশাখ হবে ১৪ এপ্রিল আর তারিখ পরিবর্তনের সময় হবে আন্তর্জাতিক রীতি অনুসারে রাত ১২.০০টায়। ১৪ এপ্রিল তথা ১ বৈশাখ এলেই বাঙালির প্রাণ বর্ষবরণের আনন্দে আপনা-আপনি নেচে ওঠে।

০৩
বাংলা নববর্ষ প্রসঙ্গে বলতে গেলে আসে দেশে দেশে কীভাবে নববর্ষ পালিত হয় সে-প্রসঙ্গ। ইতিহাস-পাঠে দেখা যায়, বহু প্রাচীনকাল থেকেই নববর্ষ বিভিন্ন জাতির সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে। সর্বপ্রথম নববর্ষ পালিত হয় মেসোপটোমিয়ায়, খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দে; তখন মার্চ, সেপ্টেম্বর কিংবা ডিসেম্বর মাস থেকে নববর্ষ গণনা করা হতো। খ্রিস্টীয় নববর্ষ চালু হয় ৪৬ খ্রিস্টপূর্ব অব্দে, জুলিয়াস সিজার যখন বাৎসরিক ক্যালেন্ডার পরিবর্তন করেন এবং জানুয়ারি মাসকেই প্রথম মাস হিসেবে ধার্য করেন। রাশিয়া, চীন, স্পেন ও ইরানে ঘটা করে নববর্ষ পালিত হতো। ইরানের নওরোজ মুসলিম শাসকদের হাত ধরে চলে আসে ভারতবর্ষে।
সম্রাট আকবর বাংলা সন প্রবর্তন করেন প্রজাদের কাছ থেকে বছর শেষে নির্দিষ্ট সময়ে খাজনা আদায় করার জন্য। ফসল তুলে আনন্দের সাথে খাজনা দেওয়ার রীতির সঙ্গে কালে কালে যুক্ত হয় নানা ঐহিক, দৈহিক এবং পারলৌকিক বিষয়। আগেকার দিনে চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত জমিদার-তালুকদারগণ ভূ-স্বামীর খাজনা শোধ করতেন। বছরের প্রথম দিন ভূ-স্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন এবং আয়োজন করতেন নানা অনুষ্ঠানের। পরে এসব অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক নানা আচার-বিশ্বাস, রীতি-নীতি ও আনন্দ-বিনোদনের উপাদান। কালক্রমে দিনটি হয়ে ওঠে শুভচিন্তা ও অনুভূতির পরিপূরক। লোকমেলা, পুণ্যাহ, হালখাতা, গাজনের গান, লাঠিখেলা, ঘোড়দৌড়, গানের আসর এসব যুক্ত হতে হতে নববর্ষ আজ বাঙালির অস্তিত্বের শক্তিদায়িনী উৎসবে পরিণত হয়েছে। নববর্ষ কেবল বাঙালির জীবনেই নয়, বাংলার প্রকৃতিতেও আনে নবসাজ। মৈমনসিংহ-গীতিকার কবি নববর্ষের প্রকৃতির নবরূপ দেখে উচ্চারণ করেছিলেন : ‘আইল নতুন বছর লইয়া নবসাজ,/কুঞ্জে ডাকে কোকিল-কেকা বনে গন্ধরাজ।’
বাংলা নববর্ষ বাঙালির সার্বজনীন জাতীয় সাংস্কৃতিক উৎসব হলেও এর সঙ্গে অর্থনীতির গভীর যোগসূত্র রয়েছে। কৃষিভিত্তিক সমাজে খাজনা প্রদানের সুবিধার্থে এর প্রচলন ঘটলেও, ধীরে ধীরে ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রসারের ফলে এতে যুক্ত হয় নতুন নতুন রীতি। পুরনো বছরের বকেয়া আদায় করতে গিয়ে হালখাতার প্রচলন হয়। হালখাতার বাইরে সামাজিক উৎসব হিসেবে নবববর্ষ পালনের শুরু উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে শেষ পর্যন্ত এখানে সুখ-দুঃখের ভাগাভাগিটা বড় হয়ে দেখা দেয়। পুণ্যাহ এবং লোকমেলার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। নিত্যব্যবহার্য পণ্যের পসার সাজাতে গিয়ে মেলায় যুক্ত হয়েছে পুতুলনাচ, জারি-সারি-বাউল গান, সার্কাস প্রভৃতি। বর্তমানে নববর্ষকে কেন্দ্র করে রাজধানীর শপিংমল এবং মফঃস্বল শহরের বিপণি-বিতানগুলোতে কেনাকাটার ধুম লেগে যায়। অর্থনীতির যোগসূত্রটা মুখ্য হলেও নববর্ষের সাংস্কৃতিক আবেদন সুদূরপ্রসারী, যা একসময় বাঙালি জাতিকে মুক্তির মোহনায় পৌঁছে দেয়। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নিজেদের শাসন পাকাপোক্ত করার হীনস্বার্থ চরিতার্থ করতে যতই বাঙালির ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির টুটি চেপে ধরেছে ততই নববর্ষ এসেছে শক্তি-সাহস ও উদ্দীপনার মূলমন্ত্র হয়ে।

০৪
বর্তমানে যতটা জাঁকজমপূর্ণ ও ব্যাপক পরিসরে নববর্ষ পালন করা হয় পঞ্চাশের দশকে সেটা তেমন ছিল না। তখন লেখক-শিল্পী মজলিস ও পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ নববর্ষ উপলক্ষ্যে আবৃত্তি, সংগীতানুষ্ঠান ও সাহিত্যসভা আয়োজন করত। সে আয়োজন ছিল ঘরোয়া পরিবেশে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ দিয়ে সকালে নবববর্ষ আবাহন প্রথম শুরু হয় ছায়ানটের উদ্যোগে; এবং তার শুরুটা হয়েছিল রমনার অশ্বত্থ তলায়। সন্জীদা খাতুন লিখেছেন : ‘ইংরেজি পঁয়ষট্টি সালের এপ্রিল অর্থাৎ তেরোশ’ বাহাত্তরের পয়লা বৈশাখে রমনার অশ্বত্থ গাছটির তলায় প্রথম খোলামেলা হলো বাংলা নবববর্ষের উৎসব।’ এরপর বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার পালে যতই হাওয়া লাগে ততই উৎসবমুখর হয় নববর্ষের আয়োজন। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে যে চেতনার উন্মেষ, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ ও বাঙালির চিরায়ত সাহিত্য-সংস্কৃতির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের ফলে তা ক্রমশ বেগবান হয়। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে জাতির মর্মমূলে শক্তি জুগিয়েছে বাংলা নববর্ষ। দেশ স্বাধীন হলে নববর্ষ উদযাপন আরও ব্যাপক পরিসরে শুরু হয়। ১৯৭২ সালে ‘পহেলা বৈশাখ’ জাতীয় পার্বণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। পরবর্তীকালে রমনার ছায়ানটের অনুষ্ঠান ছাড়াও রাজধানীতে ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বাংলা একাডেমি, চারুকলা ইনস্টিটিউট, নজরুল ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন নববর্ষকে পরিণত করেছে মহাউৎসবে। পল্লির নিভৃত কুটির থেকে গ্রাম-গঞ্জ, জেলা শহর, বিভাগীয় শহর ছাপিয়ে রাজধানীর সর্বত্র উপচে পড়ে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আনন্দ। বর্তমান সরকার নববর্ষ ভাতা চালু করে এ উৎসবে আরও প্রাণসঞ্চার করেছেন।
নববর্ষের উৎসব বেগবান হয়ে জাতীয় উৎসবে পরিণত দেখে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠী এর ওপর আঘাত হেনেছে বারবার। পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রযন্ত্র নানা ফন্দি-ফিকির করে নববর্ষ পালনে বাধা সৃষ্টি করলেও একুশ শতকের শুরুতে এসে মৌলবাদী শক্তি ছদ্মবেশে আঘাত হেনেছে। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা চালিয়ে ১০ জনকে হত্যা করা হয়, আহত হয় অগণিত মানুষ। কিন্তু তাতেও থামেনি বাঙালির প্রাণের উৎসব নববর্ষ পালন। বরং তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন গ্রাম থেকে শহর, শহর থেকে প্রবাস, যেখানেই বাঙালি আছে, সেখানেই সাড়ম্বরে পালিত হয় বাংলা নবববর্ষ। তবে এটাও বাস্তব যে, পহেলা বৈশাখের পর বাকি ৩৬৪ দিন আমরা বাংলা সন-তারিখ খুব একটা স্মরণে রাখি না।
কিন্তু তাতে কী? নববর্ষের সুদূরপ্রসারী আবেদন তো অস্বীকার করা যাবে না। আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে বাংলা নববর্ষ আনে নব-উদ্দীপনা। উৎসবে-আনন্দে নববর্ষ বাঙালি-জীবনে যে অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করেছে, তাতে বাঙালির জাতীয়তাবোধ ও সাংস্কৃতিক-সৌধের ভিত মজবুত হয়েছে। নববর্ষ আবারও এসেছে আমাদের মাঝে। নববর্ষের উষার আলো ও মঙ্গলবার্তায় জাতির ভাগ্যাকাশের সকল অন্ধকার দূরীভূত হবে। মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদী শক্তির চিরবিনাশ ঘটবে। উন্নত ও সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াব।
লেখক : গবেষক-প্রাবন্ধিক; সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

শ্রেণী:

বঙ্গবন্ধুর কারাগারের রোজনামচা

Posted on by 0 comment
4

(দ্বিতীয় অংশ)

4মুনতাসীর মামুন: সকালটা খবরের কাগজের জন্য হাপিত্যেশ করেন। বিশেষ করে ইত্তেফাক। কাগজ বা বই পড়ার ফাঁকে ফাঁকে বাগান করেন। সে বাগান এখন সংরক্ষণ করা হয়েছে। দুটি মুরগি ও একটি কবুতর পালেন। এই মুরগি, পায়রা ঘুরে বেড়ায়। দেখতে তার ভালো। একটি মুরগি রোগাক্রান্ত হলে নানারকম টোটকা দিয়ে তাকে বাঁচাবার চেষ্টা করেছেন, পারেন নি। খাবার খারাপ। মুখে খাবার রোচে না। তারপরও সময় যায় না। মনে হয় বিকেলে বসে রোজনামচা লিখতেন, আগেই লিখেছি যার কোনো উল্লেখ রোজনামচায় নেই। ১৮ জুন এ প্রসঙ্গে লিখছেনÑ “বহুদিন পর্যন্ত দুটি হলদে পাখিকে আমি খোঁজ করছি। ১৯৫৮-৫৯ সালে যখন ছিলাম এই জায়গাটিতে তখন প্রায়ই ১০টা-১১টার সময় আসত, আর আমগাছের এক শাখা হতে অন্য শাখায় ঘুরে বেড়াত। মাঝে মাঝে পোকা ধরে খেত। আজ ৪০ দিন এই জায়গায় আমি আছি। কিন্তু হলদে পাখি দুটি আসল না। ভাবলাম ওরা বোধহয় বেঁচে যে নেই অথবা অন্য কোথাও দূরে চলে গেছে। আর আসবে না। ওদের জন্য আমার খুব দুঃখই হলো। যখন ১৬ মাস এই ঘরটিতে একাকী থাকতাম তখন রোজই সকালবেলা লেখাপড়া বন্ধ করে বাইরে যেয়ে বসতাম ওদের দেখার জন্য। মনে হলো ওরা আমার ওপর অভিমান করে চলে গেছে।” [পৃ. ১০১-২]

এরি মধ্যে মানিক মিয়াকে জেলে আনা হয়েছে। ইত্তেফাক বন্ধ। এতে মুজিব ক্ষুব্ধ। তাঁর এই ক্ষোভ ক্রোধে পরিণত হচ্ছে ন্যাপ ও তার নেতাদের কথাবার্তার কারণে। মশিয়ুর রহমান বলছেন, সিআইএ পূর্ব পাকিস্তানে গ-গোল চালাচ্ছে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সিআইএ-এর কথায় চলছে। মশিয়ুর ভুলে গেছেন ন্যাপ আইয়ুব খানকে সমর্থন করছে আর ফিল্ড মার্শাল [স্বঘোষিত] সিআইএ-এর ওপর নির্ভরশীল। বঙ্গবন্ধু লিখছেন মশিয়ুর রহমান সম্পর্কে- “তিনি যখন ১৯৪৭-৫৭ সাল পর্যন্ত মুসলিম লীগের সদস্য ছিলেন, প্রত্যেকটা গণআন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য রংপুরে গু-া লেলাইয়া দিতেন। বাংলা ভাষার আন্দোলনকে ধ্বংস করার জন্য নিজে কর্মী ও ছাত্রদের উপর গু-ামি করার চেষ্টা করেছেন। ১৯৫৪ সালের মুসলিম লীগের টিকেট নিয়ে যখন জামানতের টাকা বাজেয়াপ্ত হয়েছিল তখন ১৯৫৬ সালে পৃথক নির্বাচন সমর্থন করে মুসলিম লীগের ঝা-া নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। সারাজীবন দলাদলির রাজনীতি করে বেড়াইয়াছেন, আবার রাতারাতি ১৯৫৭ সালে ‘প্রগতিবাদী’ হয়ে ন্যাপে যোগ দিয়াছেন। আর যারা এই স্বায়ত্তশাসন ও গণতন্ত্রের আন্দোলনের জন্য সারাজীবন অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করেছে এবং মামলার আসামি এবং রাজবন্দি হিসেবে বছরের পর বছর কারাগারে কাটাইয়াছে, তাদের সম্বন্ধে এই সমস্ত নীচ কথা উচ্চারণ করা তার পক্ষেই সম্ভবপর…।”
স্ববিরোধী মনে হতে পারে, কিন্তু মার্ক্সবাদী বা কমিউনিস্টরা যেমন সমাজতন্ত্র চেয়েছেন বঙ্গবন্ধুও তা চেয়েছেন। অনেক ওজনদার প-িতরা বলেছেন, ভারত এবং সোভিয়েতের কারণে সংবিধানের মূল নীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র যোগ হয়। গবেষণা না করা এইসব ওজনদাররা যদি জানতেন যে, বাংলাদেশের সংবিধানে যখন ধর্মনিরপেক্ষতা যুক্ত হয় তখন ভারতের সংবিধানে তা ছিল না। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের সংবিধানে ছিল কিনা সন্দেহ, তাহলে হয়ত এ ধরনের মন্তব্য করতেন না। সমাজতন্ত্রের কথা গত শতকের পঞ্চাশ দশক থেকেই বঙ্গবন্ধু বলছেন। তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে এ নিয়ে ভাষ্য আছে। ১৯৬৬ সালের ১৮ জুন তিনি লিখছেনÑ “একমাত্র সমাজতন্ত্র কায়েম করলে কারও কাছে এত হেয় হয়ে সাহায্য নিতে হতো না।” আমেরিকা থেকে পাকিস্তানের সাহায্য নেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এ মন্তব্য করেছিলেন। লিখেছেন তিনি, “পুঁজিপতিদের কাছে পাকিস্তানকে কি বন্ধক দেয়া হলো জীবনের তরে? মওলানা ভাসানী সাহেব কোথায়? কি বলেন? আইয়ুব সাহেবের হাতকে শক্তিশালী করে পুঁজিপতি ও সা¤্রাজ্যবাদীদের হাত থেকে বের করে এনে সোসালিস্ট ব্লকে যোগ দিতে তিনি নাকি সক্ষম হবেন! তাই তিনি আইয়ুব সাহেবের সমস্ত অগণতান্ত্রিক পন্থাকে সমর্থন করেছেন। আর আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য দলকে সা¤্রাজ্যবাদীদের দালাল বলে গালি দিয়েছেন। এখন তো প্রমাণ হয়ে গেছে মওলানা সাহেব ও তাঁহার দলের কিছু সংখ্যক লোক সা¤্রাজ্যবাদীদের দালালের দালালি করছেন।” [পৃ. ১০৪] (চলবে)

শ্রেণী:

মুজিবনগর দিবস প্রবন্ধ

Posted on by 0 comment
3

3মেহেরপুর পূর্ব-পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তবর্তী মহকুমা। ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের সময় কৃষ্ণনগর থেকে কেটে এই ছোট মহকুমাটির সৃষ্টি হয়। ভারত বিভাগের মূল নকশাকার স্যার র‌্যাডক্লিফের অপরিণামদর্শী আচরণ ও নানান খামখেয়ালিপনার এটি একটি উদাহরণ। কারণ মেহেরপুর ও কৃষ্ণনগরের মধ্যে কোনো প্রাকৃতিক সীমারেখা নেই। এই বৈশিষ্ট্যটি কয়েক যুগ পরে ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে মেহেরপুরের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হবে, সে কথায় পরে আসছি।

পাকিস্তান তথা পূর্ব পাকিস্তানের এই সীমান্তবর্তী ভূখ-ও ২৪ বছর পর ইতিহাসের স্রোতধারায় একাকার হয়ে গেল।
মেহেরপুর পলাশী যুদ্ধপ্রান্তর হতে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে যেখানে ১৭৫৭ সালে সিরাজ-উদ-দৌলাকে পরাজিত করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাজত্বের সূচনা হয়। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, পলাশীর যুদ্ধ মানব ইতিহাসের একটি সন্ধিক্ষণ এবং পশ্চিমা সভ্যতার বিকাশে সবচাইতে সুদূরপ্রসারী ঘটনা ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ব্রিটিশরা ভারত উপমহাদেশ পরিত্যাগের সময় হাজার মাইল দূরের দুটি ভূখ-কে এক দেশ বা পাকিস্তান হিসেবে জন্ম দিয়ে একটি অবাস্তব রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করে যায়।
১৯৭১-এর মার্চ মাসকে তাই ইতিহাসের শুদ্ধি অভিযানের সময় বললেও অত্যুক্তি হবে না।
পাকিস্তানি তথা পশ্চিম পাকিস্তানিদের তিন দশকের শঠতা, বঞ্চনা ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সুকৌশলে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানের অহিংস আন্দোলনে সারাদেশ যখন উত্তাল, মেহেরপুরও তখন এর ব্যতিক্রম ছিল না। ইতিহাসের এই যুগসন্ধিক্ষণে ছোট্ট নিভৃত এই সীমান্ত এলাকার মহকুমা প্রশাসক ছিলাম আমি।

প্রতিরোধ যুদ্ধ ও মুক্তাঞ্চল প্রতিষ্ঠা
২৬ মার্চ ভোরবেলা। মেহেরপুরকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। আমার কাছে মনে হলো সমস্ত জনতার মধ্যে এক অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে এবং প্রত্যেকে তার একক সত্তাকে বিসর্জন দিয়ে এক সম্মিলিত সত্তায় রূপান্তরিত হয়েছে। আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রেরণা এবং এর অবশ্যম্ভাবী শক্তি এই জনতার নব রূপান্তরিত সত্তার মধ্যে নিহিত ছিল। প্রতিটি লোক এবং প্রতিটি ছেলে আমার কাছে নতুনভাবে ধরা দিয়েছিল। গাঁয়ের বধূরা পর্যন্ত এই স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণে অঙ্গাঙ্গীভাবে একাত্মতা অনুভব করেছিল। সেই মুহূর্তে আমি যেন দিব্যচক্ষে পৃথিবীর বড় বড় বিপ্লবকে দেখতে পেলাম।
সমগ্র পরিস্থিতি মূল্যায়নের পর আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, আমাদের যে কোনো জায়গা থেকে অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করতে হবে। শুধুমাত্র ভারতই সেই সময় এ বিষয়ে আমাদের সাহায্য করতে পারে। দ্বিতীয়ত; ভারত-পাকিস্তানের ঐতিহাসিক বিরোধের পটভূমিকায় এটা স্পষ্ট ছিল যে বাংলাদেশে যে কোনো সামরিক বা গণ-অভ্যুত্থান হলে ভারতের সাহায্য পাওয়া যেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে আমি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে দুটি চিঠি পাঠাই।
প্রথম চিঠিটি পাঠানো হয়েছিল নদীয়া জেলা প্রশাসকের কাছে। একটা অনুলিপি পাঠাই লেফটেন্যান্ট কর্নেল চক্রবর্তীর (সিও, ৭৬ বিএসএফ, যা মেহেরপুর সীমান্তের ভারতে মোতায়েন ছিল) কাছে। দ্বিতীয় চিঠিটি আমি ভারতবর্ষের জনগণকে উদ্দেশ্য করে পাঠাই। দুটোতেই আমি আমার স্বাক্ষর এবং মহকুমা প্রশাসকের সিলমোহর ব্যবহার করি।
কর্নেল চক্রবর্তীর কাছে জানতে পারি যে চিঠিটা নদীয়ার জেলা প্রশাসক মি. মুখার্জীর কাছে লেখা। দিল্লিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনতিবিলম্বে প্রেরণ করা হয়েছিল এবং তারই ফলস্বরূপ ২৯ মার্চ আমি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণ পাই বেতাই বর্ডার পোস্টে সাক্ষাতের জন্য।
২৯ মার্চ আমি বেতাই বিওপি-তে উপস্থিত হই। নদীয়ার জেলা প্রশাসক এবং কর্নেল চক্রবর্তী আমাকে সাদরে গ্রহণ করেন এবং স্থানীয় বিএসএফের একটি ছোট দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। আমি এবং কর্নেল চক্রবর্তী গার্ড অব অনার পরিদর্শন করি। নদীয়ার জেলা প্রশাসক আমাকে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত হিসেবে অভিহিত করে মর্যাদা দেন।
আমাদের বৈঠক এক ঘণ্টাকাল স্থায়ী হয়। আপ্যায়নের মাধ্যমে মি. মুখার্জী আমাকে জানান যে আমার চিঠির উত্তরে ভারত সরকারের প্রতিক্রিয়া আমাকে শীঘ্রই জানানো হবে এবং তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নির্দেশের অপেক্ষা করছেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি আমাদের সংগ্রামে ভারতের জনগণের ও সরকারের সমর্থন জানান এবং সাহায্যের ব্যাপারে আশ্বাস দেন।
এর পরেই আমাকে খবর পাঠানো হয় যে আমি যেন ৩০ মার্চ চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে চেংখালী চেকপোস্টের অদূরে ভারতীয় বিওপি-তে কোনো একজন সামরিক অফিসারকে সঙ্গে নিয়ে দেখা করি আমাদের সামরিক প্রয়োজন সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করার জন্য। ইতোমধ্যে চুয়াডাঙ্গায় তদানীন্তন ইপিআরের উইং কমান্ডার মেজর ওসমানের সাথে আমার যোগাযোগ স্থাপিত হয়।
৩০ মার্চ সকালে মেহেরপুর থেকে ১৮ মাইল দূরে চুয়াডাঙ্গায় মেজর ওসমানের সাথে এ ব্যাপারে আলোচনা করতে যাই। চুয়াডাঙ্গায়, কুষ্টিয়ায় আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়ে অত্যন্ত ব্যস্ত থাকায় মেজর ওসমান পরামর্শ দেন যে আমি যেন আমার ছেলেবেলার বন্ধু এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ কমরেড-ইন-আর্মস মাহবুব উদ্দীন আহমেদকে (তদানীন্তন ঝিনাইদহের এসডিপিও) সাথে নিয়ে যাই। আমি মাহবুবের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করি। কিন্তু অল্প সময় পরে হঠাৎ সে মেজর ওসমানের চুয়াডাঙ্গা অফিসে আবির্ভূত হয়। মাহবুবকে আমি ভারতীয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবহিত করি এবং তাকে বলি ঐদিন সন্ধ্যায় ভারতের চেংখালী চেকপোস্ট বিওপি-তে যেতে হবে, কিছু সামরিক অস্ত্রশস্ত্র নিতে হবে। আর এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের সাথে বিশদ আলোচনা করতে তাকে বলি। আমি তখন অত্যধিক উত্তেজিত ছিলাম। লক্ষ করলাম মাহবুবও কম উত্তেজিত ছিল না। কারণ একটু পরেই বুঝতে পারলাম। মাহবুব আমাকে অদূরবর্তী একটি জিপের কাছে নিয়ে চলল এবং খুব গোপনে বলল (মেজর ওসমানও এ ঘটনা সম্বন্ধে অবহিত ছিলেন না) যে, ঐ জিপের ভিতরে দুজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বসে আছেনÑ তারা হচ্ছেন জনাব তাজউদ্দীন আহমদ এবং ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম। আমরা দুজনে জিপের ভেতরে প্রবেশ করলাম।
আলাপ-আলোচনার পর বুঝতে পারলাম তারা বিভিন্ন জনপদ ঘুরে ঝিনাইদহে এসেছেন এবং সেখান থেকে মাহবুব তাদের মেহেরপুরে নিয়ে আসে। উদ্দেশ্য তাদের যেন সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে পৌঁছানো যায়। তাজউদ্দীন আহমদ এবং আমীর-উল-ইসলামের সীমান্তের অপর দিকে যাবার ব্যবস্থা করা হবে আমার সহযোগিতায়। শর্ত একটা আমরা যাদের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি তাদের কাছে এ দুজনের পরিচয় গোপন রাখব। তারা জানতে চাইলে আমরা বলব, এ দুই ব্যক্তি আমাদের পরিচিত।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাক্ষাতের জন্য বিকেলে সীমান্তের উদ্দেশ্যে দুটো জিপে আমরা রওয়ানা দেই। পথে নানা রকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছিল। আমরা ব্যারিকেড সরিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলাম। আমাদের গাড়িতে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড্ডীয়মান। রাস্তার দুপাশে জনতা মুহুর্মুহু ‘জয় বাংলা’ সেøাগান দিয়ে আমাদের সম্বর্ধনা জানাচ্ছিল। দুটো জিপগাড়ি তাদের কাছে স্বাধীনতার শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছিল। এরা অনেকেই আমাদের চিনত। গ্রামবাসীরা বুঝতে পেরেছিল যে আমরা কোনো গোপন মহৎ সামরিক উদ্দেশ্যে সীমান্তে ঘোরাফেরা করছি। পথে পথে দেখতে পেলাম স্বতঃস্ফূর্ত জনতা প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, অস্ত্র বলতে ছিল হয়তো একটা-দুটো শটগান। তখনই এদের মধ্যে জন্ম নিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের নিউক্লিয়াস এবং আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম যে ভবিষ্যতে প্রস্তুতি, সামরিক প্রতিরোধ এবং সংঘর্ষে জনশক্তি এবং প্রেরণা এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অথচ দলবদ্ধ জনতাই জোগাবে।
সন্ধ্যার পরপর আমরা চেংখালী চেকপোস্টে পৌঁছলাম। ভারতীয় বিএসএফের একজন সিপাহির সহযোগিতায় আমরা বিওপি-তে পৌঁছলাম। আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন বিএসএফের মহাপরিচালক গোলক মজুমদার এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল চক্রবর্তী। আনুষঙ্গিক আলোচনার পর দুটো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলোÑ
১. আমাদের আগামীকাল থেকে সামরিক অস্ত্রশস্ত্র দেওয়া হবে এবং
২. ভারতীয় সামরিক কর্তৃপক্ষের সাথে আওয়ামী লীগের রাজনীতিবিদদের যোগাযোগ করিয়ে দিতে হবে এবং যথাসম্ভব প্রচেষ্টা চালাতে হবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের সাথে যোগাযোগ করার।
তখনও তারা জানতেন না যে আমাদের সাথে তাজউদ্দীন আহমদ এবং আমীর-উল-ইসলাম রয়েছেন।
আমি এবং মাহবুব নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে ঠিক করলাম যে, আমাদের সাথে তাজউদ্দীন আহমদ রয়েছেন তা গোলক মজুমদারকে জানাব এবং গোলক মজুমদারকে তা জানালাম। তিনি আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে তাড়াতাড়ি তাজউদ্দীন সাহেবকে তার কাছে নিয়ে আসতে বললেন। আমরা তাজউদ্দীন সাহেবকে তাঁর কাছে নিয়ে আসলাম। তারা একে অপরকে আন্তরিকভাবে করমর্দন এবং আলিঙ্গন করলেন। গোলক মজুমদার আমাদের বলেছিলেন যে কলকাতার দমদম বিমানবন্দরে একটি সামরিক জেট বিমান অপেক্ষা করছে। যদি কোনো নীতি-নির্ধারণী রাজনীতিবিদ আসেন তবে তাতে তক্ষুণি দিল্লিতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। হয়তো ঐ প্লেনেই তাজউদ্দীন আহমদ এবং আমীর-উল-ইসলাম দিল্লিতে গিয়েছিলেন।
দু-একদিনের মধ্যেই চুয়াডাঙ্গার সাথে মেহেরপুরের যোগাযোগ স্থাপিত হয় এবং আমি মেজর ওসমানের সাথে চুয়াডাঙ্গায় সাক্ষাৎ করি। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ-আলোচনার বিষয়বস্তু তাকে অবহিত করি। মেজর ওসমান আমাকে প্রয়োজনীয় সামরিক অস্ত্রসম্ভার সম্বন্ধে ধারণা দেন।
চুয়াডাঙ্গাতে ইতোমধ্যে কিছু সিদ্ধান্ত এবং কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিলÑ
১. ইপিআর উইং হেড কোয়ার্টার চুয়াডাঙ্গা এবং তার অধীনস্ত সমস্ত বিওপি-তে সকল অবাঙালি ইপিআর-কে নিরস্ত্র করা;
২. কুষ্টিয়া জেলায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মোতায়েন সম্বন্ধে বিশদ খবরাখবর সংগ্রহ করা;
৩. কুষ্টিয়ার উপর একটা আক্রমণের পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়ন করা।
এই মিশনের জনশক্তি জোগাবে একদিকে ইপিআর, অন্যদিকে আনসার, মুজাহিদ এবং সাধারণ ছাত্র-জনতা। আক্রমণ এবং অবরোধ মোটামুটি ত্রিমুখী হবে। একদিকে মাহবুব উদ্দীন আহমেদ ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া রাস্তা অবরোধ করবেন এবং মেহেরপুর থেকে ইপিআর, আনসার, মুজাহিদদের একটি দল কুষ্টিয়া অভিমুখে অগ্রসর হবে। অপরদিকে প্রাগপুর-ভেড়ামারা-কুষ্টিয়া থেকে ইপিআর বাহিনী কুষ্টিয়া অভিমুখে অগ্রসর হবে। এই সম্মিলিত বাহিনীর নেতৃত্ব দেবেন ক্যাপ্টেন আজম চৌধুরী।
প্রথমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে এই আক্রমণ ২৯ মার্চ ভোর ৫টার সময় শুরু করা হবে। পরে এই সিদ্ধান্ত ২৪ ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়া হয়।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অনধিক দুই কোম্পানি সৈন্য কুষ্টিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো পাহারা দিচ্ছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, রেকি এবং সাপোর্ট ব্যাটালিয়নের একটা অংশ ছিল। এদের ফায়ার পাওয়ার, মোবিলিটি এবং কমিউনিকেশন পাকিস্তানের অন্যান্য সাধারণ পদাতিক ব্যাটালিয়নের চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
শহরের উপকণ্ঠে, অনেকটা অবরোধের মতো প্রথমে মুক্তিবাহিনীকে ‘যার মধ্যে ইপিআররা ছিলেন মূল শক্তি’ মোতায়েন করা হয়। আমাদের অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে ছিল পুরনো ৩০৩ রাইফেল এবং কিছু পুরনো এসএমজি। ইপিআর ছাড়া আনসার এবং মুজাহিদের কাছে ১০ রাউন্ড বা অনূর্ধ্ব ২০ রাউন্ডের মতো গুলি ছিল।
৩০ মার্চ সকালে অবরোধের স্থানগুলো থেকে যুগপৎ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অবস্থানের ওপর অতর্কিতে গুলিবর্ষণ শুরু করা হয় এবং সাথে সাথে আমাদের প্রত্যেকটি অবস্থানের পেছনে সমবেত হাজার হাজার লোক গগনবিদারী আওয়াজে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি তোলে এবং সেøাগান দিতে দিতে মুক্তিযোদ্ধারা অগ্রসর হতে থাকে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এই অতর্কিত আক্রমণে, জনতার এই আকাশফাটা চিৎকারে এবং রাইফেল ছাড়াও কিছু স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের আওয়াজে দিশেহারা এবং ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। এটা তাদের কল্পনাতীত ছিল যে বাঙালি ইপিআর জওয়ানরা ঐ অল্প সময়ের মধ্যে নিজেদের সংগঠিত করে সুসজ্জিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অবস্থানের ওপর আক্রমণ করার দুঃসাহস করবে।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিক্ষিপ্ত দলগুলো এই আক্রমণের মুখে তাদের কুষ্টিয়া সেনাবাহিনীর সদর দফতরের দিকে পিছিয়ে পড়তে থাকে। তাদের এই পশ্চাদপসরণে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ও মনোবল দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জন্য এই আক্রমণ ছিল সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিজনক। কারণ, তারা বুঝতে পারেনি কারা কোথা থেকে তাদের ওপর এই আক্রমণ চালাচ্ছে এবং কেন?
এই পশ্চাদপসরণই তাদের জন্য কাল হলো। কারণ প্রত্যেকটা ঘটনার সাথে সাথে তাদের মনোবল ভেঙে যাচ্ছিল এবং আমাদের মনোবল উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এভাবে যুদ্ধ সারাদিন চলতে থাকে। সন্ধ্যার দিকে শত্রুপক্ষ অবস্থান থেকে পুল আউট করে কুষ্টিয়া জেলা স্কুল এবং সার্কিট হাউসে একত্রিত হতে থাকে। এটাই তাদের জন্য কাল হয়। আমরাও তাদের দিকে অগ্রসর হতে থাকি। আমাদের অবরোধ তিন দিক থেকে এসে জেলা স্কুল এবং সার্কিট হাউস ঘিরে ফেলে, যদিও তখন পর্যন্ত কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ রাস্তার কয়েক মাইল জনশক্তির অভাবে আমাদের আয়ত্তাধীন ছিল না। পরে অবশ্য আমরা এই দল থেকে বন্দী লেফটেন্যান্ট আতাউল্লার কাছ থেকে জানতে পারি যে, মেজর শোয়েব এবং অন্যান্য অফিসাররা রি-ইনফোর্সমেন্টের জন্য বারবার অনুরোধ জানাচ্ছিলেন যশোর সেনাবাহিনীকে। কিন্তু যশোর সেনানিবাস তাদের কোনো সাহায্যের আশ্বাস দিচ্ছিল না। এতে তথাকথিত দুর্ধর্ষ ২৭ বেলুচ সেনাবাহিনী একেবারে ইঁদুরের মতো হয়ে যায় এবং পালাবার পথ খুঁজতে শুরু করে। ৩১ মার্চ থেকে তারা পলায়ন করতে শুরু করে।

স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের শপথ অনুষ্ঠান
মেহেরপুরের কোনো এক স্থানে বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণের প্রস্তাবের কথা আমরা এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের দিকে জানতে পারি। তাই আমরা তাজউদ্দীন আহমদ ও আমীর-উল-ইসলামের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখি এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য গভীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করতে থাকি। এই সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আমাদের প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেদ করে এগিয়ে আসছে। এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে শত্রুবাহিনীর প্রচ- আক্রমণের মুখে আমরা পশ্চাদপসরণ শুরু করি। ওদের সৈন্যসংখ্যা আমাদের তুলনায় অনেক বেশি। আমাদের রণকৌশলগত পশ্চাদপসরণ ছিল প্রথম পর্যায়ের যুদ্ধ অনিবার্য পরাজয়েরই সূচনামাত্র।
১২ এপ্রিলÑ দিনের পর দিন মরণপণ যুদ্ধের পরও আমরা যখন কোনো স্বীকৃতি পাচ্ছি না, তখন আমাদের মনোবল ভাঙতে শুরু করে। একটা পর্যায় পর্যন্ত মানুষের মনোবল অক্ষুণœ থাকে। যুদ্ধক্ষেত্রে অনেকগুলো ব্যর্থতা আমাদের যোদ্ধাদের মনেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। এমন এক সংকটজনক দিনে আমি খবর পেলাম, বাংলাদেশ সরকার ১৬ কিংবা ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করবে। তার আগেই আমি প্রাথমিক ব্যবস্থাদি সম্পন্ন করে ফেলেছিলাম। ৩টি বিষয়ের ভিত্তিতে আমাদের স্থান নির্ধারণের কাজ করতে হয়েছেÑ
১. শত্রুর অবস্থান থেকে দূরত্ব বজায় রাখা;
২. ভারতীয় এলাকা থেকে সহজ যাতায়াতের সুযোগ থাকা এবং
৩. শত্রুর সম্ভাব্য বিমান আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য ছদ্মাবরণ থাকা।
১৬ এপ্রিল মাহবুব ও আমি চূড়ান্ত ব্যবস্থা সম্পন্ন করার জন্য নির্দিষ্ট স্থানের দিকে যাত্রা করি। তখন ছিল অত্যন্ত সংকটজনক সময়। আমাদের বাহিনীর পশ্চাদপসরণের খবর পাচ্ছি। অগ্রবর্তী এলাকার সাথে আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। আমাদের সেনারা বিচ্ছিন্ন হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে পরিণত হয়ে বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। মেজর ওসমান তখন আমাদের বাহিনীর প্রধান। তার সদর ঘাঁটি মেহেরপুরে সরিয়ে এনেছেন। মেজর ওসমান ভীষণ ব্যস্ত এবং চিন্তান্বিত। পাকিস্তানি বাহিনী একের পর এক আমাদের প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেদ করে এগিয়ে আসছে। আমরা তখনও জনতাম না আর কতদিন মাতৃভূমির বুকে আমাদের শেষ ঘাঁটি টিকিয়ে রাখতে পারব।

১৭ এপ্রিল
নীরব আম্রকুঞ্জ। সমবেত গ্রামের মানুষ। অতীতে এখানে কোনো অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ হয়নি। আমরাও অনুষ্ঠানের কথা গোপন করে রেখেছিলাম। গ্রামের মানুষের শূন্য দৃষ্টির ভাষা আমি বুঝতে পেরেছি। তারা যেন এক অঘটন ঘটতে দেখছেÑ বিস্ময়াবিষ্ট, নিষ্পলক। মেহেরপুরের নীরব নিস্তব্ধ আম্রকানন। ভাগ্যের লিখনে আজ তা ঐতিহাসিক এক ঘটনার জন্য প্রস্তুত।
সকালেই মাহবুব ও আমি আমার জিপে করে এখানে উপস্থিত হই। কয়েক দিন অনাহারে-অর্ধাহারে থাকার পর কিছু খাদ্যের জন্য লালায়িত ছিলাম। সীমান্ত ফাঁড়ির আনসার ও মুজাহিদরা তাদের উদ্বৃত্ত খাবার থেকে কিছু ডাল-ভাত আমাদের বেড়ে দেয়। আমরা গোগ্রাসে তা শেষ করি। ঘুরে-ফিরে সাদামাটা আয়োজনের কিছু তদারকিও করি।
বেশ কয়েক দিন ধরে মাঝে মাঝে বৃষ্টি হচ্ছিল। গত রাতে মুষলধারায় বৃষ্টি হয়। ভারত সীমান্ত থেকে কয়েকশ গজ পূর্বে বৈদ্যনাথতলার সীমান্ত ফাঁড়ির পাশের আমবাগান। সকালের বৃষ্টি বিধৌত রৌদ্রস্নাত আমবাগানটি যেন এক মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য প্রস্তুত হয়েছিল। আশপাশেও আরও অনেক আমবাগান। আমবাগানের বিস্তৃত চাঁদোয়ার নিচে পুরনো ধরিত্রী পুনরুজ্জীবিত। ফাঁকে ফাঁকে সূর্যরশ্মি সকালে খেলায় ব্যস্ত। একটা মঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে নিতান্তই সাদামাটা। সামনে কয়েক সারি কাঠের চেয়ার। আশপাশের গ্রাম থেকে এবং কিছু সীমান্তের ওপারের ভারত থেকেও আনা হয়েছে। ১০টা-১১টার দিকে একটা গাড়ির বহরে বৈদ্যনাথতলা সরবে জীবন্ত হয়ে ওঠে। ভারত ও বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমের অনেক প্রতিনিধিও সেই বহরে ছিলেন।
এই নিভৃত গ্রামে আমি ও মাহবুব তাদের অভ্যর্থনা জানাই ও মঞ্চে নিয়ে যাই। অনুষ্ঠানের শুরুতে কোরআন, বাইবেল ও গীতা থেকে পাঠ করা হয়। পাশে খ্রিস্টান মিশন থাকায় বাইবেল পাঠের লোক সহজেই পাওয়া যায়। অধ্যাপক ইউসুফ আলী স্বাধীনতার ঘোষণা পড়ে শোনান। সংক্ষিপ্ত এই ঘোষণায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর হাতে বাঙালির নির্যাতন, প্রবঞ্চনা ও আত্মত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরা হয়। সেই সাথে সরকার গঠন ও দায়িত্ব সম্পর্কে বিবরণ দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য মন্ত্রীর নাম ঘোষণা করা হয়। রাষ্ট্রপতির অবর্তমানে উপ-রাষ্ট্রপতি তার দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানানো হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সরকারের এই ঘোষণা শুনতে শুনতে আমি রোমাঞ্চিত হয়ে উঠি ইতিহাসের সাক্ষী হতে পেরে।
এরপর অধ্যাপক ইউসুফ আলী প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার অন্যদের শপথবাক্য পাঠ করান।
স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন করেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। স্থানীয় লোকজনদের নিয়ে একটি দল জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ পরিবেশন করে। এ সময় জাতীয় পতাকাকে অভিবাদন জানায় মাহবুবের নেতৃত্বে স্থানীয় আনসার-মুজাহিদদের ছোট্ট একটি দল। এখানে বলে রাখা দরকার মেজর ওসমান চৌধুরীর নেতৃত্বে ইপিআরের একটি দলের গার্ড অব অনার দেওয়ার কথা ছিল। অনুষ্ঠান শুরুর আগে তারা পৌঁছতে না পারায় আমি তাৎক্ষণিকভাবে একটি বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করি। পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ায় এসব অনুষ্ঠান পরিচালনার অভিজ্ঞতা মাহবুবের ছিল। আমি তাকে অনুরোধ করি উপস্থিত আনসার-মুজাহিদদের নিয়ে গার্ড অব অনার দেওয়ার একটি অনুশীলন করার জন্য। মাহবুব তাৎক্ষণিকভাবে সম্মত হয়ে প্রস্তুতি নেয়। অত জৌলুসপূর্ণ না হলেও আনসার-মুজাহিদদের এ ধরনের প্রশিক্ষণ ছিল। যদিও তাদের পোশাক-আশাক ছিল নিতান্ত সাধারণ ও মলিন। কিন্তু এই ঐতিহাসিক সুযোগের আনন্দে তারাও উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠেন।
মাহবুব গার্ড অব অনার প্রদান করলে সৈয়দ নজরুল ইসলাম সালাম গ্রহণ করেন এবং গার্ড পরিদর্শন করেন। মঞ্চে ফেরত আসার পর আমি উপ-রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে অন্যান্য উপস্থিত সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। এরপর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ভাষণ দিলেন। শেষ ভাষণটি ছিল উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের।
দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের সাংবাদিকসহ অন্যরা অনুষ্ঠানটি ধারণ করেন। সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানটি দু-ঘণ্টার মতো স্থায়ী ছিল। অনুষ্ঠান শেষে সবাই আবার গাড়িতে উঠে পড়লে গাড়ির বহর যে পথে এসেছিল সে পথেই ভারতের দিকে ফিরে যায়।
রূপকথার সোনার কাঠি-রূপার কাঠির ছোঁয়ায় হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠেছিল এই জনপদ। সবাই চলে যাওয়ার পর আবার সুনসান নীরবতা। ঐতিহাসিক ঘটনার আকস্মিকতায় অনেকেই হতবাক। ১০০ কিলোমিটার দূরে পলাশীর প্রান্তরে হৃত স্বাধীনতা ও পরবর্তী বিকৃত ইতিহাসের শুদ্ধি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল।
তাজউদ্দীন আহমদ তার বক্তৃতায় ঘোষণা দেনÑ এই জনপদের নাম হবে মুজিবনগর।
[ঈষৎ সংক্ষেপিত]

শ্রেণী:

এতিমদের টাকাও গিলে খেয়েছে তারা

খালেদা পরিবারের লুটপাটের কাহিনি-২

১৯৯৩ সালের ৪ ডিসেম্বর (চেক নম্বর ৪৮৮২৪০১) টাকা তুলে বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার দাড়াইল মৌজায় ১৭টি দলিল মূলে ২ দশমিক ৭৯ একর জমি ক্রয় দেখানো হয়। যে জমি খালেদা পুত্র তারেক ও কোকোর নামে ক্রয় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

খালেদা পরিবারের লুটপাটের কাহিনি-২

খালেদা পরিবারের লুটপাটের কাহিনি-২

রায়হান কবির: বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহল; শুধু রাজনৈতিক মহলই নয়, বাংলাদেশের মানুষের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দটি বোধহয় ‘দুর্নীতি’! একদিকে এতিমের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘিরে ‘দুর্নীতি’ শব্দটি উচ্চারিত হচ্ছে মানুষের মুখে মুখে। অন্যদিকে একের পর এক আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় খালেদা জিয়া ও তার পুত্রদের বিভিন্ন দেশে অর্থপাচারের খবর প্রকাশিত হওয়ায় ‘দুর্নীতি’ শব্দটির সাথে খালেদা পরিবার ও বিএনপির একেবারে মাখামাখি অবস্থা। দুর্নীতির নতুন সমার্থক হয়ে উঠেছেÑ ‘বিএনপি, খালেদা, তারেক, কোকো’।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বিএনপি নেত্রী খালেদা, তার পুত্র তারেক রহমান ও পরিবারের অর্থপাচার কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হয়েছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে খালেদা জিয়া ও তার পুত্রদের অর্থপাচারের খবর মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। খালেদা পরিবারের বেলজিয়ামে ৭৫০ মিলিয়ন ডলার, মালয়েশিয়ায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার, দুবাইয়ে কয়েক মিলিয়ন ডলার মূল্যের বাড়ি, সৌদি আরবে মার্কেটসহ বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির খবর মিডিয়ায় এসেছে। বিশ্বের শীর্ষ দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক পরিবারের তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে খালেদা জিয়া পরিবার। নির্বাসিত বা পলাতক রাজনীতিবিদদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবৈধ সম্পদের মালিক হলেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক জিয়া। বিএনপি নেত্রীর পুত্রদের দুর্নীতি আদালতে প্রমাণিতও হয়েছে। সিঙ্গাপুরের আদালতেও খালেদা জিয়ার পুত্রদের দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছে। সিঙ্গাপুরের আদালতের সহায়তায় তাদের দুর্নীতির অর্থ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তারেক রহমান জিয়াউর রহমানের বহুল প্রচারিত ভাঙা সুটকেস ও ছেঁড়া গেঞ্জি কল্পকাহিনি ছাপিয়ে দৃশ্যমান আয়-উপার্জনের বাইরে অবস্থানরত দুস্থ ব্যক্তি ও পরিবার হিসেবে রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত বিধবা ভাতা আর সন্তানদের শিক্ষা সহায়কী এবং আবাসনের সুবিধা নিয়ে যে পরিবারের যাত্রা শুরু হয়েছিল সেই পরিবারের প্রধান বেগম খালেদা জিয়া ও তার পুত্রদের বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ ধনী হয়ে উঠলেন কীভাবে?

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে এতিমদের অর্থ আত্মসাৎ
১৯৯১-৯৬ সময়কালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন সময় প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে খালেদা জিয়ার পক্ষে সোনালী ব্যাংকের রমনা শাখায় ‘প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল’ নামে একটি সঞ্চয়ী হিসাব খোলা হয়। যার চলতি হিসাব নম্বর ৫৪১৬। ওই অ্যাকাউন্টে ১৯৯১ সালের ৯ জুন এক সৌদি দাতার পাঠানো ইউনাইটেড সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংকের ডিডি নম্বর ১৫৩৩৬৭৯৭০ মূলে ১২ লাখ ৫৫ হাজার ইউএস ডলার, যার মূল্য তৎকালীন বৈদেশিক মুদ্রাবিনিময়ে বাংলাদেশি টাকায় ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ২১৬ টাকা অনুদান হিসেবে জমা হয়। ১৯৯১ সালের ৯ জুন থেকে ১৯৯৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খালেদা জিয়া সোনালী ব্যাংকের ওই অ্যাকাউন্টে জমাকৃত এই অর্থ কোনো এতিমখানায় দান করেন নি। এ সময়ের মধ্যে তারেক রহমান তার ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো ও জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট গঠন করেন।
১৯৯৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নাম নিবন্ধন করা হয়। যার ঠিকানা হিসেবে সেনানিবাসের ৩নং শহীদ মঈনুল রোডের বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করা হয়। ১৯৯৩ সালের ১৩ নভেম্বর খালেদা জিয়ার পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের সোনালী ব্যাংকের রমনা শাখার তৎকালীন হিসাব নম্বর ৫৪১৬-এ জমা থাকা অনুদানের মধ্যে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের একই ব্যাংকের গুলশানের নিউনর্থ সার্কেল শাখার এসটিডি হিসাব নম্বর-৭ মূলে হিসাব নম্বর ৭১০৫৪১৬৪-এ ট্রান্সফার করা হয়। ‘প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল’-এর নামে আসা অর্থ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে ট্রান্সফার করাটা ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
১৯৯৩ সালের ৪ ডিসেম্বর (চেক নম্বর ৪৮৮২৪০১) টাকা তুলে বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার দাড়াইল মৌজায় ১৭টি দলিল মূলে ২ দশমিক ৭৯ একর জমি ক্রয় দেখানো হয়। যে জমি খালেদা পুত্র তারেক ও কোকোর নামে ক্রয় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতিমের নামে আসা অর্থ দিয়ে বগুড়ায় জমি ক্রয়, তারেক-কোকোর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা, ব্যক্তি নামে খোলা এফডিআর হিসাবে অর্থ ট্রান্সফারসহ অংসখ্য অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। এমন কী এতিমের নামে আসা অর্থ খালেদা জিয়ার দুই সন্তান ও ঘনিষ্ঠজনদের অ্যাকাউন্টে ঘোরাফেরা করলেও এবং সেই অর্থ দিয়ে তারেক-কোকোর নামে জমি ক্রয় করা হলেও আশ্চার্য বিষয় হলোÑ কোথাও জিয়া এতিমখানার অস্তিত্ব আজ অবদি পাওয়া যায়নি। কিংবা এতিম শিশুদের কল্যাণে একটি কানাকড়িও ব্যয় করা হয়নি।
যার ফলে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা দায়ের করে দুদক। এতিমদের সহায়তা করার উদ্দেশে একটি বিদেশি ব্যাংক থেকে আসা ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ এনে এই মামলা দায়ের করা হয়।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে খালেদা জিয়ার অবৈধ লেনদেন
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, ২০০৫ সালে কাকরাইলে সুরাইয়া খানমের কাছ থেকে ‘শহীদ জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’-এর নামে ৪২ কাঠা জমি কেনা হয়। কিন্তু জমির দামের চেয়ে অতিরিক্ত ১ কোটি ২৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা জমির মালিককে দেওয়া হয়েছে বলে কাগজপত্রে দেখানো হয়, যার কোনো বৈধ উৎস ট্রাস্ট দেখাতে পারেনি। জমির মালিককে দেওয়া ওই অর্থ ছাড়াও ট্রাস্টের নামে মোট ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
২০১১ সালের ৮ আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁও থানায় এই মামলাটি করে দুদক। ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ওই মামলার অন্য আসামিরা হলেনÑ খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, হারিছের তখনকার সহকারী একান্ত সচিব ও বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান।

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি
চীনা প্রতিষ্ঠান কনসোর্টিয়াম অব চায়না ন্যাশনাল মেশিনারিজ ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনের (সিএমসি) সঙ্গে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি করার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের প্রায় ১৫৮ কোটি ৭১ লাখ টাকার ক্ষতি সাধন করেন বেগম খালেদার সরকার। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া এবং তার মন্ত্রিসভার ১০ সদস্যসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি মামলা করা হয়। ওই বছরের ৫ অক্টোবর ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে দুদক। মামলাটির কার্যক্রম দীর্ঘদিন উচ্চ আদালতে স্থগিত থাকলেও গত বছর ২৮ মার্চ স্থগিতাদেশ তুলে নেন উচ্চ আদালত। তবে এই মামলাটির অভিযোগ গঠন হয়নি এখনও। একাধিকবার পিছিয়েছে অভিযোগ গঠনের শুনানি।

গ্যাটকো দুর্নীতি
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর দুদকের উপ-পরিচালক গোলাম শাহরিয়ার চৌধুরী গ্যাটকো দুর্নীতি মামলাটি করেন। এতে খালেদা জিয়া, তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোসহ ১৩ জনকে মামলার এজাহারে আসামি করা হয়। মামলা হওয়ার পরদিনই খালেদা ও কোকোকে গ্রেফতার করা হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর মামলাটি অন্তর্ভুক্ত করা হয় জরুরি ক্ষমতা আইনে। পরের বছর ১৩ মে খালেদা জিয়াসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে এই মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
এতে বলা হয়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গ্যাটকোকে ঢাকার কমলাপুর আইসিডি ও চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের কাজ পাইয়ে দিয়ে রাষ্ট্রের ১৪ কোটি ৫৬ লাখ ৩৭ হাজার ৬১৬ টাকার ক্ষতি করেছেন। উচ্চ আদালতে স্থগিত থাকার পর ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে বিচারিক আদালতে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এই মামলায় আগামী ৪ মার্চ অভিযোগ গঠনের শুনানি আছে।

নাইকো দুর্নীতি
ক্ষমতার অপব্যবহার করে ৩টি গ্যাসক্ষেত্র পরিত্যক্ত দেখিয়ে কানাডীয় কোম্পানি নাইকোর হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমে আসামিরা রাষ্ট্রের প্রায় ১৩ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার ক্ষতি করেছেন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামাত জোট সরকার। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গ্রেফতার হওয়ার পর ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর তেজগাঁও থানায় নাইকো দুর্নীতি মামলা করে দুদক। পরের বছর ৫ মে খালেদা জিয়া ও দলের নেতা মওদুদ আহমদসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। দীর্ঘ স্থগিতাদেশ শেষে ২০১৭ সালের ২৩ মার্চ মামলাটির বিচার শুরুর আদেশ দেন উচ্চ আদালত। গত ১৫ জানুয়ারি এই মামলা থেকে খালেদা জিয়ার অব্যাহতি চেয়ে আবেদন জানানো হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি এই আবেদনের ওপর শুনানি হয়।
খালেদা পরিবার ও হাওয়া ভবনের দুর্নীতির কয়েকটি নমুনা-
হ প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের ‘হাওয়া ভবন’কে রাষ্ট্রক্ষমতার প্যারালাল কেন্দ্রে এবং হাওয়া ভবনকে ঘুষ পার্সেন্টেজ দেওয়াকে অঘোষিত নিয়মে পরিণত করা।
হ খালেদা জিয়ার মালয়েশিয়ায় অর্থপাচার : বাগেরহাটের বিএনপি সাংসদ এমএ সেলিমের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মেসার্স সিলভার লাইনস-এর মালয়েশিয়ায় অবস্থানকারী বাঙালি এজেন্ট বাদলুর রহমানের মাধ্যমে তারেক জিয়া ২০০৪ সালের বিভিন্ন সময়ে মালয়েশিয়ায় বিপুল অর্থপাচার করে। তারেকের ব্যবসায়িক পার্টনার গিয়াসউদ্দিন আল মামুন তাকে সহায়তা করে। পরে ঐ অর্থ মালয়েশিয়া সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়। ওই অর্থ ছাড় করানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশের তৎকালীন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আদিলুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ায় প্রেরণ করেন। আদিলুর রহমান কুয়ালালামপুরে আইনজীবী নিয়োগ করে মামলা পরিচালনা করেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও অবৈধভাবে প্রেরিত হওয়ার কারণে ওই অর্থ মালয়েশিয়ার আদালত ছাড় করার অনুমতি দেয়নি।
হ টিএন্ডটির মোবাইল ফোন প্রকল্পে প্রধানমন্ত্রীর কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান এবং অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের পুত্রের দুর্নীতি : উক্ত প্রকল্পের জন্য ‘একনেক’ প্রথমে ৪৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করে। কিন্তু বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই এই বরাদ্দ প্রস্তাব দ্বিগুণ করার প্রচেষ্টা করা হয়। বিষয়টি ক্রয় সংক্রান্ত ক্যাবিনেট কমিটিতে তিনবার উত্থাপিত হলেও একনেকের অনুমোদন না থাকায় এ পর্যায়ে ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়নি। এর কিছুদিন পর খোদ প্রধানমন্ত্রী খালেদার নিজস্ব উদ্যোগে প্রকল্পটি পুনরায় একনেক সভায় উপস্থাপন করা হলে এক লাফে প্রকল্প ব্যয় ৪৩৫ কোটি থেকে ৭০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান ‘সিমেন্স কোম্পানির’ পক্ষে ওকালতির কারণে ওই বে-আইনি বরাদ্দ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অনুমোদন করেন। অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের পুত্র একই প্রকল্পে চীনা কোম্পানি ঐটডঊখ-এর পক্ষে তদ্বির করেছিলেন।
হ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং : কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার হস্তক্ষেপে তার পুত্র আরাফাত রহমানকে চট্টগ্রাম বন্দর ও কমলাপুর আইসিডি’তে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
হ সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বোন খুরশীদ জাহান হক (চকলেট)-এর পুত্র তাহসিন আকতার হক ও খালেদা জিয়ার ভাই মেজর (অব.) সাঈদ ইস্কান্দারকে ঢাকা বিমান বন্দরের কাছে সরকারি জমিতে দুটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও পেট্রল পাম্প করতে দিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। ‘মামা-ভাগিনা’ পাম্প হিসেবে পরিচিত এ দুটি পাম্পের জমি অবৈধভাবে বরাদ্দের অভিযোগ রয়েছে।
হ বিএনপি-জামাত জোট আমলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সকল গাড়ির সার্ভিস করানো হতো খালেদা জিয়ার বোন খুরশীদ জাহান হকের ছেলের তাহসিন আকতার হকের অটোস্ক্যান সার্ভিস সেন্টার থেকে।
হ তারেক রহমান ও সাঈদ ইস্কান্দারের মালিকানাধীন ‘ড্যান্ডি ডাইং’ কোম্পানির মুনাফা লুটের স্বার্থে পুলিশের পোশাক ও ব্যাজ পরিবর্তন করার অভিযোগ রয়েছে।
হ খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানের মালিকানাধীন ‘কোকো লঞ্চ’ কোম্পানির আইনকানুন ও নিয়মনীতি বিরোধী স্বেচ্ছাচারী কর্মকা-ে নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা হুমকির সম্মুখীন হয়েছিল। ২০০৩ সালের ৮ জুলাই খামখেয়ালিপনার জন্য কোনো লঞ্চের ৮০০ যাত্রীকে প্রাণ দিতে হয়। কিন্তু এজন্য কোম্পানির বিরুদ্ধে তখন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
হ অলিখিত চুক্তির মাধ্যমে তারেক রহমানের ‘খাম্বা লিমিটেড’ পল্লী বিদ্যুৎ ও পিডিবির সকল কংক্রিটের খুঁটি সরবরাহের একচেটিয়া ব্যবসা হাতিয়ে নিতেন।
হ জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে ২৫০ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ লোপাটের অভিযোগও রয়েছে।

শ্রেণী: