ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়ন-সাফল্যে আওয়ামী লীগের অর্জন

Posted on by 0 comment
june2018

june2018আরিফ সোহেল : ক্রীড়াবান্ধব আওয়ামী লীগ সরকার যখনই ক্ষমতায়, তখনই এ দেশের ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়ন-অগ্রগতি-সমৃদ্ধি রচিত হয়েছে। অর্জিত হয়েছে সাড়া জাগানিয়া সাফল্য। ক্রিকেট-ফুটবল-হকি-শুটিং-ভারোত্তোলন-আরচারি-সাঁতার-ভলিবলের আন্তর্জাতিক আসর থেকে লেগেছে বাঙালি জাতির মাথায় গৌরবের পালক। জাতির পিতার মতো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও খেলা-পাগল। সময়-সুযোগ পেলেই ছুটে যান স্টেডিয়ামে। অনুপ্রাণিত করেন খেলোয়াড়দের। সাকিব যখন বিশ্ব মাতিয়ে দেন, মাবিয়া-শাকিলরা যখন লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে দিয়ে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেন না; তখন মায়ের মমতায় তাদের ফোন করে অনুপ্রাণিত করেন প্রধানমন্ত্রী।
দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্রীড়াঙ্গনকে সমুন্নত রাখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুতিবব্ধ। হয়তো তাইÑ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ গঠনের রূপকল্প-২০২১ ও রূপকল্প-২০৪১-এ ক্রীড়াঙ্গনকে আলাদা মর্যাদার জায়গায় রেখেছেন। তার কারণও রয়েছেÑ ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়ন-সাফল্যে প্রশংসিত হয়েছে শেখ হাসিনা সরকার। সেই প্রশংসা এসেছে কখনও ক্রিকেট বিশ্বকাপে, কখনও কিশোর মেয়েদের ফুটবলে, কখনও এশিয়ান গেমস বা কমনওয়েলথ গেমসের আসর থেকে।
আন্তর্জাতিক আসর আয়োজনেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুনাম-সুখ্যাতি বিশ্বময় ছড়িয়ে রয়েছে। বিশ্বকাপ, এশিয়া কাপ এবং টোয়েন্টি২০ বিশ্বকাপ সার্বিকভাবে সাফল্যম-িত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আইসিসি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। এসএ গেমস উদ্ভাসন আয়োজন ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। দারুণ এবং সফল আয়োজনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক রোলার স্কেটিং, আরচারি, হকি, ভলিবলের নীতি-নির্ধারকরাও।

একই পথের যাত্রী
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়েই সর্বস্তরের মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ৩০ লাখ শহিদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ মুক্ত করেছে পরাধীনতার শৃঙ্খল। পৃথিবীর মানচিত্রে বাঙালি জাতি খুঁজে পেয়েছে আপন ঠিকানা। স্বপ্নদ্রষ্টা জাতির পিতার নিজ হাতেই স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে খেলার জন্য অবকাঠামো নির্মাণ এবং ক্রীড়াঙ্গনকে সচল রাখতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। বঙ্গবন্ধু যেহেতু ছোটবেলা থেকে খেলাধুলায় পারদর্শী ছিলেন। ছিলেন পুরোদস্তুর ক্রীড়াবিদ। খেলতেন ফুটবল স্কুল জীবনেই। তাই দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই তিনি বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। স্মৃতির অ্যালবাম বলছেÑ ১৯৭২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা স্টেডিয়ামে প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচের কথা। ম্যাচে অংশ নেয় রাষ্ট্রপতি একাদশ ও মুজিবনগর একাদশ। এই ম্যাচটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ফুটবল ম্যাচ। মুজিবনগর একাদশে খেলেছেন স্বাধীন বাংলার ফুটবলাররা। বঙ্গবন্ধু ম্যাচের উদ্বোধন করেন তিনি। ১৯৭৫ সালের বিয়োগান্তক উপখ্যান, পরবর্তীতে নানা সরকারের আসা-যাওয়া। কিন্তু ক্রীড়াঙ্গনে সুবাতাস আর আসেনি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ক্রীড়াঙ্গনের প্রতি আত্মনিবেদন করেন।

ক্রীড়া অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন
একদিকে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে সাফল্য ছুঁয়ে দেখা; অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকার আমলেই স্টেডিয়াম-মাঠ-গ্যালারিসহ অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুচিন্তিত পরামর্শ-নির্দেশনায় বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনও রূপায়িত হয়েছে উন্নয়ন ও অগ্রগতির রোল মডেলে। একদিকে সরকারি অর্থায়ন-উদ্যোগে পুরনো স্টেডিয়াম সংস্কার; অন্যদিকে প্রতিনিয়ত নতুন স্টেডিয়াম বিনির্মাণের প্রকল্প ও কর্মসূচি গ্রহণ ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। আওয়ামী সরকার আমলেই ৫টি জাতীয় স্টেডিয়াম, ৪টি বিভাগীয় স্টেডিয়াম, ৬২টি জেলা স্টেডিয়াম এবং থানা পর্যায়ে ৫টি স্টেডিয়াম নির্মাণ হয়েছে। নির্মাণ ও সংস্কার মিলিয়ে ঢাকাসহ সারাদেশে ৩২টি জিমনেসিয়াম, ২০টি সুইমিংপুল, ৭টি ইনডোর স্টেডিয়াম এবং ৪টি মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স, ৫টি পূর্ণাঙ্গ ক্রীড়া কমপ্লেক্স, একটি করে হ্যান্ডবল, বক্সিং, ভলিবল ও কাবাডি, শেখ রাসেল রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সে তৈরি হচ্ছে আগামীদিনের তারকারা। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যু হিসেবে শের-ই-বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়াম, চট্টগ্রাম জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম, ফতুল্লা খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়াম, সিলেট বিভাগীয় স্টেডিয়াম, খুলনা শেখ আবু নাসের স্টেডিয়াম ক্রিকেট বিশ্বে প্রশংসিত হচ্ছে। সর্বশেষ দুরন্ত গতিতে চলছে ৪৯০টি উপজেলা পর্যায়ে মিনি স্টেডিয়াম বিনির্মাণের কাজ। ইতোমধ্যে সরকার ১৩১টি মিনি স্টেডিয়ামের অবকাঠামো নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। নতুন অর্থবছরে বাকি স্টেডিয়ামের কাজ সম্পাদনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া গত অর্থবছরে শুরু হয়েছে ৪টি নতুন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ। এই ৪টি নতুন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হচ্ছেÑ
১. ঢাকার পূর্বাচলে ৩৭.৫ একর জমির ওপর ৬৫ হাজার দর্শক আসন সম্পন্ন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম;
২. কক্সবাজারে ৪৯.২ একর জায়গায় শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম এবং ক্রীড়া কমপ্লেক্স;
৩. মানিকগঞ্জে ২৫ একর জমির ওপর আন্তর্জাতিকমানের ক্রিকেট স্টেডিয়াম এবং
৪. ক্রীড়া পরিষদের নতুন ভবন নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক ভলিবল টুর্নামেন্ট
বঙ্গবন্ধু সিনিয়র মেনস সেন্ট্রাল জোন আন্তর্জাতিক ভলিবল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল স্বাগতিক বাংলাদেশ। ২৭ ডিসেম্বর ২০১৬ অনুষ্ঠিত পাঁচ জাতির এই আসরের ফাইনালে কিরগিজস্তানকে ৩-০ সেটে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে জাবির-রাশেদরা উড়িয়েছে লাল-সবুজের পতাকা। কিন্তু ২০১৮ সালে বাংলাদেশ হয়েছে রানার্সআপ। এবার ফাইনালে বাংলাদেশকে ৩-১ সেটে পরাজিত করে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক ভলিবল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তুর্কেমেনিস্তান।

এএইচএফ কাপ হকিতে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ
হংকংয়ে এএইচএফ কাপ হকিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। ২৭ নভেম্বর ২০১৭ ফাইনালে জিমি-আশরাফুলরা শ্রীলংকাকে    ৩-০ গোলের ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো শিরোপা জিতেছে। এর আগে ২০০৮ সালে সিঙ্গাপুর ও ২০১২ সালে থাইল্যান্ডে শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ। পরবর্তীতে বিশ্বকাপের নির্ধারণী আসরেও বাংলাদেশ তৃতীয় হয়েছে। যার মানে বাংলাদেশের যুব দল বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাচ্ছে।

চতুর্থ রোলবল বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট
ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশে বসেছিল রোলার স্কেটিংয়ের চতুর্থ রোলবল বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট-২০১৭। আসরে পাঁচ মহাদেশের ৫৫টি দেশ অংশ নিয়েছে। এই আসরকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম কমপ্লেক্সে জাতীয় রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক এই আসরের বিজয়ী দলকে শিরোপা তুলে দিয়েছেন। বাংলাদেশ আসরে চতুর্থ হয়ে দারুণ চমক সৃষ্টি করেছে।

তৃণমূলে প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো দেশব্যাপী তৃণমূলে প্রতিভাবান খেলোয়াড় বাছাইয়ের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০১৭ সালে। এই কর্মসূচির জন্য সরকার ১৫ কোটি ১০ লাখ টাকা অর্থ বরাদ্দ দিয়েছিল। এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি থেকে ৩১টি ক্রীড়া ফেডারেশন খুঁজে নিয়েছে তাদের আগামী দিনের তারকা। তৃণমূলে এই কর্মসূচি ক্রীড়াঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। প্রতিভা অন্বেষণে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো দীর্ঘদিন সরকারের কাছে অর্থ বরাদ্দ চেয়ে আসছিল। চলতি বছরও তৃণমূলে প্রতিভা অন্বেষণের কর্মসূচি শুরু হতে যাচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গমাতা শিশু-কিশোর ফুটবল
প্রাথমিক স্কুল পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গমাতা গোল্ডকাপের আয়োজন সারাদেশের শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বাংলাদেশের প্রমীলা ফুটবলের আজকের দীপ্ত পদচারণায় এই টুর্নামেন্টের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিয়মিতই বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টে উপস্থিত থাকেন এবং বিজয়ীদের পুরস্কৃত করেন। বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপে ৬৩ হাজার ৫০৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১০ লাখ ৭৯ হাজার ৬৫৩ ফুটবলার অংশ নেন। আর বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব গোল্ডকাপে ৬৩ হাজার ৪৩১টি বিদ্যালয়ের ১০ লাখ ৭৮ হাজার ৩২৭  ফুটবলার অংশ নেন। বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের নামে দেশব্যাপী ফুটবল টুর্নামেন্ট বাংলাদেশে ক্ষুদে ফুটবলার তৈরির ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। শুধু রাজধানী নয়, জেলা, উপজেলা, গ্রাম পর্যায়েও এই টুর্নামেন্ট এখন আলোচনার শীর্ষে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে মেয়েদের বয়সভিত্তিক ফুটবল দল। এই দলটি ওঠে এসেছে বঙ্গবন্ধু বঙ্গমাতা ফুটবল আসর থেকে।

১২তম সাউথ এশিয়া গেমস
ভারতের গোয়ায় অনুষ্ঠিত সাউথ এশিয়া গেমসে এবার ৪টি স্বর্ণ জিতে পঞ্চম স্থান অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এই ৪টি স্বর্ণ জিতেছেন তিন অ্যাথলেট। দুই মেয়ে মাবিয়া আক্তার সীমান্ত ও মাহফুজা খাতুন শিলা এবং শুটার শাকিল আহমেদ। ভারোত্তোলন থেকে প্রথম স্বর্ণ এনেছেন মাবিয়া, এরপর সাঁতার থেকে বাকি দুটি স্বর্ণ জিতেছেন মাহফুজা খাতুন শিলা। বাংলাদেশের অ্যাথলেটরা ৪টি স্বর্ণ ছাড়াও ১৫ রৌপ্য এবং ৫৬ তাম্রপদক জিতেছেন।

গোল্ডকোস্ট কমনওয়েলথ গেমস
বাকি এবং শাকিল এবার অস্ট্রেলিয়ায় আয়োজিত গোল্ডকোস্ট কমনওয়েলথ গেমসে শুটিংয়ে দুটি পদক জিতেছে। অস্ট্রেলিয়ার গোল্ডকোস্ট কমনওয়েলথ গেমসে একক কীর্তিগাথার সুললিত সুর বাজিয়েছেন গাজীপুরের ছেলে ২৮ বছরের আবদুল্লাহ হেল বাকি। এই সাহসী শুটার কমনওয়েলথ গেমসে ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে রৌপ্যপদক জিতেছেন। এছাড়া শাকিলের পিস্তল থেকেও বাংলাদেশ অর্জন করেছে ৫০ মিটার এয়ার রাইফেলে রৌপ্য।

ক্রিকেটের গৌরবময় অধ্যায়
ক্রিকেট এখন বাংলাদেশের অহঙ্কারের প্রতীক। বিশ্ব ক্রিকেটে নিত্যনতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছেন তামিম-সাকিব-মাশরাফি এবং মুস্তাফিজরা। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুবার সিরিজ জয় করে। সবচেয়ে বড় ঘটনা পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করা। সর্বশেষ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডসহ ৩টি দেশের বিপক্ষে জয় তুলে নিয়ে বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে। ২০১৬ সালে পাকিস্তান-শ্রীলংকাকে হারিয়ে বাংলাদেশের অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপ ক্রিকেটে রানার্সআপ হয়েছে মাশরাফিরা। ভারতে অনুষ্ঠিত টোয়েন্টি২০ বিশ্বকাপে সুপার এইটে ওঠে বাংলাদেশ। দেশে আফগানিস্তানের বিপক্ষে জিতে টানা ৬ সিরিজ জয়ের রূপকথা সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ। ২০১৬ সালের অক্টোবরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ ড্র করে বাংলাদেশ। এই ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক অভিষেকও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে। প্রথম টেস্ট বাংলাদেশে তার উদ্বোধকও শেখ হাসিনা। বিশ্বকাপ ক্রিকেট আয়োজনও হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার আমলে। এ দেশে খেলে গেছে মেসির আর্জেন্টিনা-সুপার ঈগল নাইজেরিয়া; তাও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক সচ্ছিদার কারণে।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস উদযাপন
২০১৭ সালে ‘শান্তি ও উন্নয়নের জন্য ক্রীড়া’ এই সেøাগানকে সামনে রেখে প্রথমবারের মতো উদযাপিত হয়েছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ক্রীড়া দিবসের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ক্রীড়াকে সবার কাছে জনপ্রিয় করার জন্য; সবাইকে ক্রীড়ায় মনোনিবেশ করার জন্য এই দিবসটি পালন করা হয়েছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমানতালে ২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশও ৬ এপ্রিল আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস পালন করে আসছে। এই দিবসের গুরুত্ব অন্যান্য বছরের তুলনায় বৃদ্ধি পায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে ৬ এপ্রিলকে জাতীয় ক্রীড়া দিবস ঘোষণা করার পর। চলতি বছরও ৬ এপ্রিল উৎসব রাঙানো একটি দিন পালন করেছে ক্রীড়া সংশ্লিষ্টরা। ক্রীড়া দিবস পালন করেছে উৎসবমুখর আয়োজনের মধ্য দিয়ে।

প্রথম জাতীয় যুব গেমস
বাংলাদেশে প্রথমবাবের মতো আয়োজন করা হয়েছে বাংলাদেশ যুব গেমস। প্রায় পাঁচ মাসব্যাপী এই আয়োজনকে ঘিরে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। সারাদেশের হাজার হাজার তৃণমূলের প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদ খুঁজে পাওয়া গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই আয়োজনে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে উঠতি বয়সী তারকাদের প্রাণিত করেছেন। একেবারে উপজেলা পর্যায় থেকেই এই আসরের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল। এই আসর থেকে আগামী দিনের সম্ভাবনাময় ক্রীড়াবিদ উঠে আসবে।

পিতা-আত্মজায় যেখানে মিলেমিশে একাকার
দেশপ্রধান বঙ্গবন্ধু নিজে উপস্থিত থেকে অনুপ্রাণিত করেছেন খেলোয়াড়দের। বিভিন্ন আসরে খেলোয়াড়রা দেশত্যাগের প্রাক্কালে তাদের উজ্জীবিত করতে জাতির পিতা মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয় দলের বিদায়ক্ষণে গণভবনে ডেকে কুশলবিনিময় করতেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও পিতার পথ অনুসরণ করেছেন। ২০১৭ সালে বিশ্বকাপের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগের আগে গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। পাকিস্তানের বিপক্ষে স্মরণীয় বিজয় উদযাপনের শুভক্ষণেই প্রধানমন্ত্রী ক্রিকেটারদের সম্বর্ধিত করেছেন। আইসিসি বিশ্বকাপ ২০১৫ আসরে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের চোখ ধাঁধানো সাফল্যের পাশাপাশি পাকিস্তান ক্রিকেট দলের বিপক্ষে ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জনের ভূয়সী প্রশংসা করে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলকে ২ কোটি টাকা পুরস্কার দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আইসিসি চ্যাম্পিয়ন দলকে দিয়ে শুরু করে আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় ক্রীড়াঙ্গনে সাফল্য অর্জন করা সব ক্রীড়াবিদকেই ক্ষেত্রবিশেষে জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি, নগদ টাকায় পুরস্কৃত করেছেন প্রধানমন্ত্রী।  তিনি ফুটবলের টানে অনেকবার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ছুটে গেছেন। খেলোয়াড়দের সঙ্গে ছবি তুলেছেন। বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপে, ঘরোয়া ফুটবল আসরেও প্রধানমন্ত্রীকে দেখা গেছে।
ক্রিকেট ফুটবল থেকে শুরু গ্রামের হারিয়ে যাওয়া বউচি খেলার কথাও প্রধানমন্ত্রী মনে রাখছেন। তুলনামূলক বিচার করে সমানভাবেই খেয়াল রাখছেন। ক্রীড়াঙ্গনের সব অর্জনের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের এই কাকতালীয় সম্পৃক্ততা যে কারোর কাছেই ঈর্ষণীয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোন খেলোয়াড় কেমন খেলছে, কাকে কি দিতে, কাদের দিয়ে ক্রীড়াঙ্গনের উন্নতি হবে, ক্রীড়াঙ্গনের জন্য কত বাজেট রাখা উচিতÑ তার সব হিসাবই রাখেন। সেই কারণেÑ যখনই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, তখনই ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়ন-অর্জনের জয় জয়কার।

শ্রেণী:

বাকী ও শাকিল উড়াল লাল-সবুজের পতাকা

Posted on by 0 comment
5-7-2018 7-06-57 PM

5-7-2018 7-06-57 PMআরিফ সোহেল : ১. দলীয় ইভেন্টে নয়; বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে একক ইভেন্টে। বারবার এই চিরায়ত সত্যটি উচ্চারিত হয়েছে।
২. অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড; নিদেনপক্ষে ভারতের মতো দেশ ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে যেভাবে চিন্তা করেÑ সেখানে ব্যক্তিগত ইভেন্টই হতে পারে বাংলাদেশের স্বীকৃতি অর্জনের উৎস্যমূল।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটা প্রমাণিত হচ্ছেÑ হয়েছে বারবার। সর্বশেষে কমনওয়েলথ গেমসেও এই সত্য প্রমাণিত করেছেন শুটার বাকী ও শাকিল। কিন্তু তারপরও একক ইভেন্টে টেকসই প্রয়োগ ও কার্যকরী উদ্যোগ নিয়ে কারোর মাথাব্যথা নেই। বরং ক্রিকেট ফুটবলের মতো দলীয় ইভেন্ট নিয়েই ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো মাতম-উন্মাদনা চলছেÑ অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে চলবে। ঘুরেফিরে মনে হয়েছে একক নৈপুণ্যের ইভেন্টেই বাংলাদেশের সম্ভাবনার দুয়ার অবারিত। কেউÑ ওই ‘দল দল’ করে মরছেও না। বরং তারা দলের ভেতরে থাকা একক কারিশমাকে যতœসহকারে গুরুত্ব দিচ্ছেন। সাঁতারু মোশাররফ হোসেন, ব্রজেন দাশ, শুটার আতিক-নিনি, স্প্রিন্টার শাহ আলমের সঙ্গে হালের জুনিয়র দাবাড়– ফাহাদ, ভারোত্তোলনের সীমান্ত এবং বাকী-শাকিলরা একক নৈপুণ্যে বিশ্বকে বিস্মিত করার সুযোগ পেয়েছেনÑ পাচ্ছেন। অস্ট্রেলিয়ার গোল্ডকোস্টে বেজে উঠেছে একক কীর্তিগাথার সুললিত সুর। কমনওয়েথল গেমসে গাজীপুরের ছেলে ২৮ বছরের আবদুল্লাহ হেল বাকী এবং খুলনার শাকিল আহমেদ আবারও প্রমাণ করেছেনÑ ক্রিকেট-ফুটবল বাদে বাংলাদেশের অর্জন একক ইভেন্ট থেকেই বেশি। এই সাহসী শুটারদ্বয়ের একজন বাকী কমনওয়েলথ গেমসে ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে; অন্যজন শাকিল ৫০ মিটার পিস্তলে জিতেছেন রৌপ্যপদক। কমনওয়েলথে এটা বাকীর দ্বিতীয় রৌপ্যপদক অর্জনের মাইলফলক হলেও শাকিলের প্রথম। গ্লাসগোতে কমনওয়েলথ গেমসের ২০তম আসরে রৌপ্য জিতেছিলেন বাংলাদেশের সপ্রতিভ মেধাবী শুটার বাকী।
কমনওয়েলথে গল্পের শুরু বাকীকে দিয়ে। চলছে ৮ এপ্রিল ২০১৮ কমওয়েলথের ১০ মিটার রাইলের শিরোপা নির্ধারণী শেষ শটের প্রস্তুতি। উত্তেজনা পারদ তখন আকাশ ছুঁইছুঁই। টপ স্কোরার হওয়ার স্বপ্ন নয়Ñ বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের আবদুল্লাহ হেল বাকী। স্বর্ণ জিততে শেষ শটে প্রয়োজন ১০.১। আগের শটে ১০.২ স্কোর করা বাকী তখন ইনডোরে বাজির ঘোড়া। স্মিথ হাসিমাখা প্রাণোচ্ছ্বল মুখের বাকী তখন ছুটছিলেন দুর্দান্ত গতিতে। ধ্যান-জ্ঞানে নিমগ্ন বাকী ছুড়লেন গুলি। কিন্তু তাতে স্কোর ৯.৭। স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার ড্যান স্যাম্পনের কাছে অল্পের জন্য স্বর্ণ হাতছাড়া হয়েছে বাকীর। সবমিলিয়ে স্যাম্পসনের ২৪৫, আর বাকীর ২৪৪.৭। ২০০২ সালে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে কথা ফ্রেমে ভেসে উঠছিল। এই ১০ মিটার এয়ার রাইফেল ইভেন্টেই স্বর্ণ জিতেছিলেন তরুণ আসিফ। দেশ পেয়েছিল স্বর্ণখচিত গৌরবময় সম্মাননা। স্মৃতির সুবিস্তীর্ণ আকাশে তখন ভেসে উঠছিল শুটার আতিকুর রহমান ও আবদুস সাত্তার নিনির মুখও। কারণ ১৯৯০ সালে কমনওয়েলথ গেমসে দেশের হয়ে প্রথম স্বর্ণ জয় করেছিলেন ওই শুটার জুটিই।
অলিম্পিকের পর কমনওয়েলথ গেমস বিশ্বের অন্যতম ঐহিত্যবাহী আসর। এবার ৭৭টি দেশ অংশ নিচ্ছে আসরে। সেখানে শুটার বাকীর কিংবা শাকিলের দ্বিতীয় হওয়া অহম করার মতো গৌরবের। গোল্ডকোস্ট কমনওয়েলথ গেমসের ২১তম আসরে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম পদকও এসেছে আবদুল্লাহ হেল বাকীর রাইফেলের গোলা থেকেই। আর এক পিস্তলে গুলিতে শাকিল উড়িয়েছে জাতীয় পতাকা।
১০ মিটার এয়ার রাইফেলের কোয়ালিফাইং রাউন্ডে ৬১৬.০ স্কোর করে বাকী ফাইনালে ওঠার পর থেকেই স্পট লাইটে ছিলেন। ২৪ রাউন্ডের খেলায় বেশ কয়েকবার শীর্ষে ছিলেন আবদুল্লাহ হেল বাকী। ১৬তম রাউন্ডে থেকেই শুরু হয় ত্রিমুখী লড়াই। সেখানে শামিল হয়েছেন কখনও অস্ট্রেলিয়ান স্যাম্পসন, কখনও ভারতের রাভি কুমার। শীর্ষ নিয়ে জটিল হাড্ডাাড্ডি হচ্ছিল বাকীর সঙ্গে তাদের। ২১তম রাউন্ড শেষে ২০৪.৬ পয়েন্ট নিয়ে ছিটকে পড়েছেন ভারতের রাভি কুমার। তারপর আরও লড়াই। কিন্তু শেষ লড়াইয়ে হেরে গেলেন বাকী। মিডিয়ার মুখোমুখি বাকী বলেছেনÑ ‘স্বর্ণের একদম কাছে থেকে ফিরে এসেছি, একটা দারুণ সুযোগ ছিল। কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল না। তারপরও আমি সন্তুষ্ট।’ তিনি আরও বলেছেনÑ ‘শুরুতে আমি কোনো চাপে ছিলাম না। শেষ শটেও আমার লিড ছিল, ১০.১ করতে পারলেও হয়তো জিতে যেতাম। তবে যা হয়নি, তা নিয়ে আর ভাবছি না।’
২০০৮ সালে ইসলামাবাদ সাফ গেমসে দলগত ইভেন্টে প্রথম অংশ নিয়েই স্বর্ণপদক জিতে বাকী দৃষ্টি কেড়েছিলেন সংগঠকদের। পরের প্রায় ৯ বছর আন্তর্জাতিক আঙিনায় অর্জনের খড়ায় পুড়ে কাঠ হয়েছিলেন বাকী। এই দীর্ঘ সময়ে সৃষ্টি হয়েছিল বেজায় হতাশা। কিন্তু ভেঙে পড়েন নি। ভেতরের প্রবল ইচ্ছে; অধ্যবসায় ২০১৭ সালে ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে আবার জেগে ওঠেন। বাকী-দিশার সঙ্গে জুটিবদ্ধ হয়ে স্বর্ণ জিতে নিজেকে ফিরে পেয়েছেন। আজারবাইজানের বাকুতে অনুষ্ঠিত চতুর্থ ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে ১০ মিটার এয়ার রাইফেলের মিশ্র দলগত ইভেন্টে আবদুল্লাহ হেল বাকি ও সৈয়দা আতকিয়া হাসান দিশা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশকে স্বর্ণ এনে দিয়ে গৌরবান্বিত করেন।
কমনওয়েলথ গেমসে গোল্ডকোস্টের বেলমন্ট শুটিং সেন্টারে বাকীর পর ছেলেদের ৫০ মিটার পিস্তলে বাংলাদেশকে রুপা উপহার দিয়েছেন শুটার শাকিল আহমেদ। এর আগে ২০১৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে এই ইভেন্টে স্বর্ণ জিতেছিলেন তিনি। বাকীর হাত ধরে প্রথম স্বর্ণ জয়ের পর বড় মঞ্চে আরেকটি ইতিহাস গড়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শুটার শাকিল।
বাংলাদেশকে দ্বিতীয় পদক তুলে দেওয়া খুলনার তরুণ শাকিল ফাইনালে ২২০.৫ স্কোর করে রুপা জিতেছেন। ২২৭.২ পয়েন্ট পেয়ে গেমস রেকর্ড গড়ে স্বর্ণ জয় করেছেন অস্ট্রেলিয়ার ড্যানিয়েল রেফাকোলি। আর এই ইভেন্টে ব্রোঞ্জ জিতেছেন ভারতের ওমপ্রকাশ মিথারওয়াল। ওমপ্রকাশের স্কোর ২০১.১। এর আগে ১০ মিটার এয়ার পিস্তলে অংশ নিয়েছিলেন শাকিল। কিন্তু সেখানে খুব বেশি ভালো করতে পারেন নি। ফাইনালে উঠলেও ষষ্ঠ হয়ে প্রতিযোগিতা শেষ করেন।
শাকিল বাছাইয়ে ৫৪৫ স্কোর গড়ে চতুর্থ হয়ে ফাইনালে ওঠেন। পঞ্চম শট পর্যন্ত ৪৫.৯ স্কোর নিয়ে পঞ্চম স্থানে ছিলেন। ১২ শট পর উঠে আসেন তৃতীয় স্থানে। ১৮ শট পরও ১৬৫.৮ স্কোর নিয়ে তৃতীয় স্থানেই ছিলেন। যদিও স্বর্ণজয়ী রেফাকোলি শাকিলের চেয়ে বরাবরই এগিয়ে ছিলেন। শেষ ২ শটে আগে রেফাকোলির স্কোর ছিল ২০৮.৭, সেখানে শাকিলের ছিল ২০২.২। শেষ শটে স্বর্ণজয়ী রেফাকোলি মেরেছেন ৯.২। আর শাকিল ৮.৭ পয়েন্ট নিয়ে জিতছেন রুপা।
শাকিলকে দিয়েই পিস্তলে নবযুগের সূচনা দেখেছে বাংলাদেশ। রাইফেলের চেয়ে পিস্তলের গুলি তুলনামূলক ব্যয়বহুল। এ জন্য অতীতে পিস্তলের অনুশীলন হতো কম। সাফল্যও সেভাবে ধরা দেয়নি। কিন্তু এবার ফেডারেশন ও সেনাবাহিনী অনুশীলনে কার্পণ্য করেনি। বাংলাদেশকে ১৯৯০ অকল্যান্ড কমনওয়েলথ গেমসে ১০ মিটার এয়ার পিস্তলে স্বর্ণ এনে দিয়েছিলেন আতিকুর রহমান ও আবদুস সাত্তার নিনি। এরপর থেকে পিস্তল ইভেন্ট কখনও আলোচনায় ছিল না। শাকিলের হাত ধরে পিস্তলে আন্তর্জাতিক সাফল্য নতুন স্বপ্নদুয়ার উন্মোচিত করছে। কারণ এসএ গেমসেও শাকিল জিতেছিলেন স্বর্ণ। এবার জিতেছেন কমনওয়েলথ গেমসে।
কমনওয়েলথ গেমসে এবারের আসরে বাংলাদেশের ৩০ জন অ্যাথলেট ১০টি ইভেন্টে অংশ নিয়েছে। তবে পদক জয়ের আশা প্রবল ছিল কেবল শুটিংয়েই। সেই শুটিং থেকেই কমনওয়েলথ গেমসের দুটি রৌপ্যপদক জিতেছেন আবদুল্লাহ হেল বাকী ও শাকিল আহমেদ। কমওনওয়েলথ গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মার্চপাস্টে জাতীয় পতাকাও ছিল এই রৌপ্যজয়ী আবদুল্লাহ হেল বাকীর হাতেই। তার পাশেই ছিলেন শুটার শাকিল। তাদের রাইফেল-পিস্তলে উড়েছে লাল-সবুজের পতাকা।
কমনওয়েলথ গেমস এবং এসএ গেমসে পদকজয়ী বাকী ও শাকিলের চোখ এখনও তাক করে আছে বড় কিছুর আশায়। এবার নিশ্চয় বাকীর রাইফেল আর শাকিলের পিস্তল অলিম্পিকেও লাল-সবুজের পতাকার মেলে ধরার বড় স্বপ্নে বিভোর।

শ্রেণী:

হেরেও শ্রীলংকা জয় বাংলাদেশের

Posted on by 0 comment
4-5-2018 7-25-46 PM

4-5-2018 7-25-46 PMআরিফ সোহেল: এমন হার অবশ্যই গৌরবেরÑ এমন বাক্যে কেউ আহত হবেন না। কারণ ফাইনালে ১৬৬ রানের পর ভারতের মতো দলকে জিততে বিশ্ব রেকর্ড করতে হয়েছে। শেষ বলে ছক্কায় বাংলাদেশের নিশ্চিত জয় নিশ্চিত ছিনিয়ে নিয়েছে।
নিদাহাস ট্রফির চকচকে ট্রফিটা নাইবা ছুঁয়ে দেখতে পেরেছেন সাকিব-মুশফিক-মাহমুদউল্লাহরা। কিন্তু তারপরও বলতে দ্বিধা নেই বাঙালির জাতীয় জীবনের গৌরবের স্বাধীনতার মাস মার্চে দুর্দান্ত লড়াইয়ে বিশ্ব ক্রিকেটপ্রেমীদের মন ছুঁয়ে দেখেছেন।
বাংলাদেশের ঘরের মাঠে ত্রিদেশীয় সিরিজের ব্যর্থতার সঙ্গে যোগ হয়েছিল শ্রীলংকার বিপক্ষে টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি সিরিজের হার। ক্রিকেট যেভাবে চলছিলÑ তাতে দলের তথা ক্রিকেটপ্রেমী বাঙালির মানসিক অবস্থা ছিল বিধ্বস্ত। নিদাহাস ট্রফিতে বাংলাদেশের শুরুটা ছিল বেজায় শঙ্কার। বাড়তি দুর্ভাগ্য যোগ হয়েছিল অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের চোট; অনুপস্থিতি। সেই অবস্থা থেকে স্বাগতিক শ্রীলংকার বিপক্ষে দুটি দুর্দান্ত জয়; ফাইনালে ওঠাÑ রীতিমতো ভীতি ছড়িয়েছিল টপ-টু-বটম ব্যাটিং শক্তির ভারতীয় শিবিরে। ফাইনালে বাংলাদেশের মোটামুটি ব্যাটিংয়ের পর হাওয়া উড়তে থাকা ভারতকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন মুস্তাফিজ-রুবেল-সাকিবরা। এমন হারে মান যায়নি। ক্রিকেটপ্রেমীরা গর্বই করছেন বীর বাঙালিদের নিয়ে। পরাক্রমশালী ভারত সঙ্গে কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামের গ্যালারি-ভর্তি দর্শকের বিপক্ষেও লড়াই করতে হয়েছে বাংলাদেশকে। কারণ ফাইনালে না উঠতে পারার বেদনা।
আন অফিসিয়াল সেমিফাইনালে ২১৫ প্লাস রান করেও শেষ পর্যন্ত মাহমুদউল্লাহর বিস্ময়কর বীরত্বের কাছে শ্রীলংকা হেরেছিল। মাহমুদউল্লাহ ছক্কা মেরে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করেছিলেন। ঠিক সেভাবেই ভারতে দিনেশ কার্তিক বাংলাদেশকে কাঁদিয়েছে ওভার বাউন্ডারিতে। ভারতীয় দলের ড্রেসিংরুমকে শেষ বল পর্যন্ত উৎকণ্ঠায় রেখেছিল বাংলাদেশ। সত্যিকার অর্থেই ১৮ মার্চ দিন শেষে জিতেছে ক্রিকেটই। এ নিয়ে ৫টি ফাইনালের ট্রফি হাতছাড়া হয়েছে বাংলাদেশের।
ফাইনাল ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল রোমাঞ্চকর। এক মুহূর্তে মনে হয়েছে ভারতই জিতবে, পরের মুহূর্তেই বাংলাদেশ। সেটি বাংলাদেশের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন মোস্তাফিজ। শেষ ৩ ওভারে ৩৫ রান দরকার ছিল ভারতের। মোস্তাফিজের প্রথম ৪ বলই ডট, পরের বলে ১ রান। শেষ বলে আউট মনীষ পান্ডে। কিন্তু রুবেলের ৩ বলেই আবারও ভারত ফেভারিট! প্রথম বলেই ছক্কা, পরের বলে চার, আবার ছক্কা! ১২ বলে ৩৪ রান থেকে ৯ বলে ১৮ রানের দূরত্বে ভারত। রুবেলের করা ১৯তম ওভারে ভারত তুলে নিয়েছিল ২২ রান। শেষ ওভারে মাত্র ১২ রান লাগবে ভারতের। শ্রীলংকার বিপক্ষে বাংলাদেশের ঠিক ১২ রানই দরকার ছিল। শেষ ওভারে সৌমের প্রথম বলটা ওয়াইড। ৬ বলে ১১ রান। ডট, ১। ৪ বলে ১০ রান! আবারও ১, ৩ বলে ৯ রান। চতুর্থ বলে দুর্ভাগ্যক্রমে ৪, ২ বলে ৫ রান। পরের বলে আউট। আর শেষ বলে ৫ রান দরকার ভারতের। কার্তিকের এক ছক্কায় শেষ হয়ে গেল! ৮ বলে ২৯ রানের এক ইনিংসে বাংলাদেশের সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল।
ব্যাটিংয়ে সুবিধে হয়নি বাংলাদেশের। সেখানে আলাদা ছিলেন সাব্বির রহমান। তার ওপর মাহমুদউল্লাহর ২১। পাওয়ার প্লেতে মাত্র ১১ বল আর ৬ রানের মধ্যে ৩ উইকেট হারিয়ে ফেলার ধাক্কাটা যে বাংলাদেশকে অনেক পিছিয়ে দিয়েছিল। ৩৩ রানে ৩ উইকেট হারানোর পর মুশফিক-সাব্বিরের ৩৫ রানের জুটিটা ধাক্কা সামলেছিল। কিন্তু এই ৩৫ রান তুলতে ৩১ বল লাগিয়ে ফেলায় ১০ ওভারে মাত্র ৬৮ রান তুলতে পেরেছিল বাংলাদেশ। আউট হওয়ার আগে সাব্বির ৭ চার ও ৪ ছক্কার ৫০ বলে করেছেন ৭৭ রানে। তবে শেষ ওভারে মিরাজের (১৯) কল্যাণে বাংলাদেশ স্পর্শ করেছিল ১৬৬ রান।
২০১২ সালে এশিয়া কাপের ফাইনালে উঠে শেষ পর্যন্ত ২ রানের দুঃখজনক হার সঙ্গী হয় বাংলাদেশের। এর আগে ২০০৯ সালে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে জয়ের সুবাস পেয়েও শ্রীলংকার কাছে হেরে গিয়েছিল তারা। ২০১৬ এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টি ও সর্বশেষ গত জানুয়ারিতে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের ফাইনালে হেরেছে বাংলাদেশ।

বর্ণিল আয়োজনে শেষ হলো প্রথম যুব গেমস
বর্ণিল আয়োজন আনন্দ-উৎসবের মাঝে শেষ হয়েছে প্রথম জাতীয় যুব গেমস। অনূর্ধ্ব-১৭ বছর বয়সী প্রতিযোগীদের নিয়ে আয়োজিত জাতীয় যুব গেমস ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল সারাদেশে। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের লড়াই শেষে গেমসের চূড়ান্ত পর্ব হয়েছে রাজধানী ঢাকায় বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। আগামী দিনের প্রতিভাময়ী ক্রীড়াবিদ খুঁজে বের করতে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের এই বৃহৎ ক্রীড়াযজ্ঞে প্রায় অর্ধ লক্ষ ক্রীড়াবিদ, প্রশিক্ষক এবং সংগঠকের অংশগ্রহণে সারাদেশে যুব জাগরণের বার্তা দিয়েছে। চার মাসব্যাপী এই আসরের ৩টি পর্বে মেতেছিল পুরো দেশ। জেলা এবং বিভাগীয় পর্বের সফল আয়োজন শেষে রাজধানী ঢাকাতে শেষ হলো আসরটি। আট বিভাগের অংশগ্রহণে চূড়ান্ত পর্বে পদকের লড়াইয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে রাজশাহী। খুলনা হয়েছে রানার্সআপ। চ্যাম্পিয়ন এবং রানার্সআপ দল পেয়েছে বিশেষ ট্রফি।
দেশের খেলাধুলায় নতুন সংযোজন যুব গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ক্রীড়াবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১০ মার্চ সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে তার আসন গ্রহণের পর জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল আনুষ্ঠানিকতা। ডিজে শো, ডিসিপ্লিনের ক্রীড়াবিদের মার্চপাস্ট, ডিসপ্লে বোর্ডে প্রদর্শিত হয় বাংলাদেশের খেলাধুলার বিভিন্ন সাফল্য নিয়ে একটি প্রামাণ্য চিত্র, লেজার শো, গীতি নৃত্যানুষ্ঠান, বর্ণিল আতশবাজি ভিন্ন আমেজ সৃষ্টি করে।
প্রথম যুব গেমস আয়োজনের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এখানে অনেকেই হয়তো প্রথম রাজধানীতে এসেছে। খেলাধুলার মাধ্যমে একদিন অলিম্পিকে খেলার সুযোগ পাবে। খেলাধুলায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। খেলাধুলা শৃঙ্খলাবোধ শেখায়, অধ্যবসায় শেখায়, দায়িত্ববোধ তৈরি করে, কর্তব্যপরায়ণতা শেখায়। পড়ার সঙ্গে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা একান্ত প্রয়োজন। ক্রীড়াপ্রেমী প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করেন, ক্রিকেটে একদিন বিশ্বকাপ জিতবে বাংলাদেশ। খেলাধুলায় নারীরাও পিছিয়ে নেই। বয়সভিত্তিক নারী ফুটবলের সাফল্য, বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটারদের বিশ্বকাপে খেলা তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকার খেলাধুলার প্রসারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দেশীয় খেলার চর্চার জন্যও নজর দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা পর্যায় মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, তার পরিবার খেলাধুলার সঙ্গে সব সময় সম্পৃক্ত ছিল।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রেখেছেন বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সেনাপ্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক। বক্তব্য  রেখেছেন গেমসের সাংগঠনিক কমিটির চেয়ারম্যান ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি, ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী শ্রী বীরেন শিকদার এমপি। উপস্থিত ছিলেন বিওএ-র মহাসচিব সৈয়দ শাহেদ রেজা, সহ-সভাপতি বশির আহমেদ মামুন, উপ-মহাসচিব আসাদুজ্জামান কোহিনুর ও কোষাধ্যক্ষ কাজী রাজিবউদ্দিন আহমেদ চপল।
আসরের শুরু হয়েছিল গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ভবিষ্যতের ক্রীড়াবিদ খুঁজে বের করার মিশন সামনে রেখে। ২৩ হাজার ২১০ জন অংশ নিয়েছেন জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে। ২ হাজার ৬৬০ জন ক্রীড়াবিদ উঠে এসেছিলেন চূড়ান্ত পর্বে। শেষ পর্বে ১৫৯টি ইভেন্টে ১ হাজার ১১২টি পদকের জন্য লড়াই করেছেন তারা। অ্যাথলেটিকস, সাঁতার, ফুটবল, কাবাডি, বাস্কেটবল, ভলিবল, হ্যান্ডবল, হকি, টেবিল টেনিস, ভারোত্তোলন, কুস্তি, উশু, শুটিং, আরচারি, ব্যাডমিন্টন, বক্সিং, দাবা, জুডো, কারাতে, তায়কোয়ান্দো ও স্কোয়াশে ৩৪০টি স্বর্ণ, ৩৪০টি রৌপ্য এবং ৪৩২টি ব্রোঞ্জ পদকের জন্য লড়েছেন তারা।
সমাপনী অনুষ্ঠানেও ছিল নানা আয়োজন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ১৬ মার্চ যুব গেমসের সমাপনী ঘোষণা করেন। সমাপনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিওএ-র সভাপতি ও সেনাপ্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদার এমপি। এ সময় বিওএ-র মহাসচিব সৈয়দ শাহেদ রেজা উপস্থিত ছিলেন।
যুব গেমস আয়োজনের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। এই গেমস থেকে আমরা পেয়েছি এমন কিছু প্রতিভাবান খেলোয়াড়, যারা ভবিষ্যতে দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনবে।

শ্রেণী:

বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদদের মুক্তিযুদ্ধ

Posted on by 0 comment

আরিফ সোহেলঃ পাকিস্তানিদের অনাহূত বাড়াবাড়ি মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ অনিবার্য­­ হয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের দামামায় এই অঞ্চলের মানুষ ক্ষোভের অনলে জ্বলতে থাকে। তার প্রতিফলন দেখা যায় খেলার মাঠেও। একাত্তর সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা স্টেডিয়ামে চার দিনের ম্যাচ চলছিল পাকিস্তান এবং কমনওয়েলথ একাদশের মধ্যে। ১ মার্চ ম্যাচের শেষ দিন দর্শকরা খেলা উপভোগ করছিল। ঠিক সেই সময়ে বেতারে দুপুর ১টার খবরে বলা হয়, ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে দিয়েছে। জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের ওই অধিবেশনে সরকার গঠন করার কথা ছিল। অধিবেশন স্থগিত করায় বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষ। স্বাধিকারের চেতনায় অনুপ্রাণিত ঢাকা স্টেডিয়ামের দর্শকরা মুহূর্তেই প্রতিবাদ হিসেবে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা পুড়িয়ে দেয়।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র যেমন সাংস্কৃতিক কর্মকা- করে প্রতিদিন একটু একটু করে এগিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশকে; তেমনি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলও বাংলাদেশের বিজয়ে অনুঘটক হিসেবে ভাগিদার ও দাবিদার। ফুটবলারদের সঙ্গে ক্রীড়াবিদরা তাল মিলিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন। মিছিলে, মিটিংয়ে, আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার পাশাপাশি অনেক ক্রীড়াবিদ খেলার মাঠ থেকে সরাসরি সশস্ত্রযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। লড়াই করেছেন জীবন বাজি রেখে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেনÑ ক্রিকেটার ও সংগঠক শেখ কামাল, ফুটবলার মেজর (অব.) হাফিজ, নূরুন্নবী, মাসুদ ওমর, হকির হাবিবুল, বাস্কেটবলের কাজী কামাল, কুস্তিগীর খসরু, ভলিবলের কবীর, সাঁতারু এরশাদন্নবী প্রমুখ। খেলার মাঠের মতো যুদ্ধের মাঠেও তারা দেখিয়েছেন অসম সাহসিকতা।
স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন লড়াকু মুক্তিযোদ্ধা ক্রিকেটার জুয়েল, ফুটবলার মজিবর, সারোয়ার, কুটু মনি, বাবুল, সোহরাওয়ার্দী, বাবুল, মিজান, অ্যাথলেট মিরাজ, তপন চৌধুরী, শাহেদ আলী, দাবার ক্বাসেদ, সাদিক, হকির মীরু প্রমুখ। প্রাণ দিয়েছেন দৈনিক অবজারভার পত্রিকার ক্রীড়া সম্পাদক ও ক্রীড়া সংগঠক আবদুল মান্নান লাড়–, আজাদ বয়েজ ক্লাবের নিবেদিতপ্রাণ ক্রিকেট সংগঠক মুশতাক, নোয়াখালীর ক্রীড়া সংগঠক ভুলু প্রমুখ।
বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রামাণ্য দলিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রমানের ৭ মার্চের ভাষণের পর বিপ্লবী বাঙালিরা আর বসে থাকেন নি। পরিস্থিতি অনুধাবণ করেই জাতির পিতা গর্জে ওঠেনÑ “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” পিতার এই আহ্বানের পর সর্বস্তরের মানুষ মাঠে নেমে পড়ে। ৯ মাসের আন্দোলন-সংগ্রাম, সর্বোপরি রক্ত আর মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশ। মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কত কতজনের আত্মত্যাগ। প্রিয়তম সম্পদ জীবনকে মরণের পথে নিয়ে যাওয়া; কিংবা ফিরে আসা সব নাম তো আর আলোচনায় উঠে আসে না। বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে ক্রীড়াঙ্গনের জানা-অজানা অনেক সাহসী যোদ্ধাই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কেউবা একাকী বেছে নেন জীবনবাজি রেখে বন্ধুর পথ। আবার কেউবা লড়াইয়ে ময়দান কাঁপিয়েছেন সম্মিলিত উদ্যোগ নিয়েÑ স্বাধীন বাংলা ফুটবল তেমন একটি। খেলোয়াড়ি জীবনে প্যাটেল ফুটবলার হলেও হকি ক্রিকেটে নাম লিখিয়েছেন।
এই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন সাইদুর রহমান প্যাটেল। তার সাহস, তার বিচক্ষণতা, তার দূরদর্শিতা আলোকিত করেছে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি যে ভূমিকা রেখেছেন, তা ইতিহাস হয়ে আছে। যে কারণে ক্রীড়াঙ্গন ও রাজনীতির অঙ্গনে তিনি আলাদা একটি অবস্থান গড়ে নিয়েছেন।
ঢাকার সন্তান সাইদুর রহমান প্যাটেল শৈশব থেকেই ছিলেন দুরন্ত স্বভাবের। গলিতে বন্ধু-বান্ধবরা মিলে ফুটবল খেলার পাশাপাশি সাঁতার, হাইজাম্প, দাড়িয়াবান্ধা, এক্কাদোক্কা, ক্যারমÑ সব ধরনের খেলাতেই মন ছিল প্যাটেলের। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অন্যতম সংগঠক প্যাটেল নিজে খেলেছেন। আবার এই খেলাকে সংগঠিত করার কারিগর হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে বাঙালির মুক্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে অনেক ঝুঁকি নিতে হয়েছে। সেই স্মৃতি আজও অম্লান।
ক্রীড়ার সঙ্গে নাড়ির সম্পর্ক থাকলেও প্যাটেল রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন অল্প বয়সেই। ইস্পাতদৃঢ় মনের অধিকারী। রাজনীতির সূত্রেই জাতির পিতার জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের সঙ্গেও পরিচয় হয়। এই পরিচয়ের রেশ ধরে পরবর্তীকালে কামালের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। যা আজও তিনি সগৌরবে বলে বেড়ান। ১৯৬৯ সালের মার্চে ঢাকা স্টেডিয়ামে পাকিস্তান এবং ইংল্যান্ডের মধ্যে টেস্ট ম্যাচ চলাকালে গ্যালারিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিসহ অন্যান্য স্লোগান দেওয়ার কারণে স্টেডিয়াম থেকে বের হওয়ার সময় খেলোয়াড় শিরু ও প্যাটেলকে গ্রেফতার করে রমনা থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জনসভায় সবচেয়ে বড় মিছিল নিয়ে যোগ দেন প্যাটেলরা। মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার প্রেরণা সেখান থেকেই। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতে পাড়ি দিয়েছেন ৩১ মার্চ রাতে। আর ভারত যাওয়া পরপরই খেলাধুলার মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য আর্থিক খাত খুঁজে বের করার স্বপ্ন দেখেন; স্বপ্ন দেখেন একটি ফুটবল দল গঠনের। সেই চিন্তা থেকে ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে মুজিবনগর সরকারের দফতরে যান। সেখানে কামরুজ্জামান, ইউসুফ আলী ও শামসুল হক অবস্থান করছিলেন। কামরুজ্জামানসহ তাদের সঙ্গে আলোচনার পর ফুটবল দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
দেশের জন্য কিছু একটা করার সুযোগ তিনি কাজে লাগিয়েছেন। খেলোয়াড় সংগ্রহ করার জন্য মঈন সিনহাকে ঢাকা পাঠানো হয়। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল সংক্রান্ত নিউজ প্রচারের জন্য স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গিয়ে দেখা পান অভিনেতা হাসান ইমাম ও আলী যাকেরের সঙ্গে। তারা তা প্রচারের আশ্বাস দেন। একে একে যুক্ত হন ফুটবলার আশরাফ, আলী ঈমাম, প্রতাপ শঙ্কর হাজরা, নূরুন্নবী, মোহাম্মদ মহসীন, মুজিবর রহমান, শাহজাহান, লালু আইনুল, কায়কোবাদ, অমলেশ, সালাউদ্দিন, এনায়েত, লুৎফরের মতো ফুটবলার। তাদের নিয়ে পূর্ণাঙ্গ একটি দল গড়ে ওঠে। পৃথিবীর ইতিহাসে স্বাধীন বাংলা ফুটবল এক অনন্য অসাধারণ মর্যাদার আসনে বসেছে। এই দলটি ভারতে ১৬টি ম্যাচ খেলেছে। সরকারের কোষাগারে ৫ লাখ টাকাও জমা দিয়েছে। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সবাই এক একটা ইতিহাস এবং কীর্তিগাঁথা; এটা আমাদের অজানা নয়।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে প্যাটেল শর্ট ট্রেনিং নিয়েছেন ভারতে। চতুর্থ বেঙ্গলের সিলেটবাসী সুবেদার শামসু, সুবেদার মোহাম্মদ আলী, সুবেদার মান্নান আমাদের ট্রেনিং দিয়েছেন। প্রথম অপারেশন ছিল বেশ উৎসাহব্যঞ্জক। পাকিস্তানি আর্মির বেইজ কনস্তালা ক্যাম্প। কিছুটা দূরে সম্ভবত সূর্যনগর গ্রামে ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর একটি ক্যাম্প। আক্রমণের ফলে ওখানে একজন অফিসারসহ ১১ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়।
এই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের বাইরে নামিদামি খেলোয়াড়রা ছাড়া বাংলাদেশের অসংখ্য ক্রীড়াবিদ মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অস্ত্র হাতে লড়াই করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম জাতির পিতার বড় ছেলে শেখ কামালের বন্ধু তানভির মাজাহার তান্না। তিনি ছিলেন একজন নামকরা ক্রিকেটারও। তাকে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ম্যানেজার করা হয়।
শুধু সাঁতারু বললে অবশ্য কম বলা হয়, অরুণ নন্দী ছিলেন সাঁতারু মুক্তিযোদ্ধা। না, রণাঙ্গনে সশস্ত্র যুদ্ধ তিনি করেননি। একাত্তরে নেমেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার লড়াইয়ে। কলকাতার এক সুইমিং পুলকেই বেছে নিয়েছিলেন যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে। যুদ্ধে নেমে গড়েছিলেন দূরপাল্লার সাঁতারে নতুন বিশ্বরেকর্ড। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন জনমত গঠনের জন্য কলকাতার কলেজ স্কয়ার ট্যাঙ্কে ৯০ ঘণ্টা ৫ মিনিট সাঁতার কেটে বিশ্ব রেকর্ড করেন অরুণ নন্দী। হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষের উপস্থিতিতে তিনি ভেঙে দেন যুক্তরাষ্ট্রের বিসি মুরের রেকর্ড।
দেশ মাতৃকার প্রয়োজনে হকি স্টিক তুলে রেখে ঢাকাইয়া মোহাম্মদ হাফিজ উল্লাহ ভারতে ট্রেনিং নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন মুক্তিযুদ্ধে। ইয়ুথ পাকিস্তান দলের এই হকি খেলোয়াড় যুদ্ধকালীন সময়ে সেকেন্ড ওয়ার ফোর্সের মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে নাম লিখিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা মুহম্মদ মুজিবর রহমান হকি এবং ফুটবল ছেড়ে যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। ভাষা আন্দোলন নিজ চোখে দেখা মুজিবর এখন সামাজিক উন্নয়ন সঙ্গে সম্পৃক্ত। ঝাকড়া চুলের মোহাম্মদ সোহবার আহমেদ ফুটবলের মাঠের দাপুটে খেলোয়াড়ি জীবন ছেড়ে অস্ত্র হাতে যোগ দিয়েছেন মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে। কুমিল্লার সোহবার ছিলেন জাতির পিতার মেঝো ছেলে শেখ জামালের বন্ধু। তিনি তার সময়ের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হিসেবে জায়গা করে নিয়েছিলেন। খেলেছেন আবাহনীতেও। কানাডা প্রবাসী এই ফুটবলারের চোখেমুখে এখনও মুক্তিযুদ্ধে ইতিহাস জ্বলজ্বল করে ভাসে। মজিদুল ইসলাম মনিকে একাধারে ফুটবলার, ক্রিকেটার, হকি এবং অ্যাথলেট বিবেচনা করা যায়। দশম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালেই পাবনার মনি দেশকে শত্রুমুক্ত করার সংগ্রামে যোগ দিয়েছেন। ভারতে ট্রেনিং শেষে তিনি পাবনাসহ আশপাশের একার মুক্তিযুদ্ধে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছেন। সাঁতারু পরিচয়েই এখনও মোহাম্মদ সোলায়মান ক্রীড়াঙ্গনে পরিচিত। মুন্সিগঞ্জের এই সাঁতারু সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের অগ্রসেনানী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। সত্তর-আশির দশকে সোলায়মান বাংলাদেশের গর্ব হিসেবেই বিবেচিত হতেন। সাঁতারে পাকিস্তান আমলে তিনি কয়েকটি ইভেন্টে স্বর্ণ জিতেছেন। পিরোজপুরের ভা-ারিয়ার মুজিবুর রহমান এখনও ক্রীড়াঙ্গনের গ-ি ছাড়িয়ে যেতে পারেন নি। ভারোত্তোলন ফেডারেশনের নির্বাহী কমিটির সদস্য মুজিবুর রহমান একজন স্বনামধন্য কোচ হিসেবে সমাদৃত। মুক্তিযুদ্ধে তার যোগদান ছিল সময়ের দাবি। ২৬ মার্চ কালরাত্রির দিন তিনি ঢাকার কয়েকটি রাস্তায় গাছ ফেলে বন্ধ রাখার চেষ্টা করেন। ট্রেনিং শেষে তিনি পিরোজপুরে বিভিন্ন অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া ক্রিকেটার শওকুতর রহমান চিনু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লু এবং বঙ্গবন্ধু নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনকারী ক্রীড়াবিদ মহিউদ্দিন আহমেদ সাঁতার, অ্যাথলেট, বক্সার হিসেবে তার সময়ের অন্যতম সেরা ক্রীড়াবিদ। মুন্সিগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক মহিউদ্দিন জাতির পিতার বিশ্বস্ত এবং অনুগত ছিলেন। তিনি ঐতিহ্যবাহী বিক্রমপুর এবং ফরিদপুরের কয়েকটি অঞ্চলে সরাসরি যুদ্ধ করেছেন। জুডোর হাসান উজ জামান মনি, বঙ্গবন্ধু ঘনিষ্ঠ সহচর ক্রিকেট পিচের বাংলাদেশের প্রথম অফ-কাটার মেজর (অব.) শাফায়ত জামিল, ফুটবলার তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সামরিক কর্মকতা এবং ফুটবলার খোন্দকার মো. নূরুন্নবী, মাঝারি এবং দূরপাল্লার অপ্রতিরোধ্য দৌড়বিদ সিলেটের মোস্তাক আহমেদ, ফুটবল মাঠের চিরচেনা রেফারি আবদুল আজিজ, হকি দুর্দান্ত স্টোর ফরোয়ার্ড পুরান ঢাকার ইলিয়াস তালুকদার নাঈম, মানিকগঞ্জ থেকে ওঠে আসা পোলভোল্টের একেএম মিরাজউদ্দিন, টাঙ্গাইলের চৌকস ফুটবলার মাহমুদ পারভেজ জুয়েল, যশোর থেকে আলোতে আসা কুস্তির টাইগার আবদুল জলিল, বঙ্গবন্ধু সচিব ও ফুটবলার নুরুল ইসলাম অনু, ব্ল্যাকবেল্ট জুডোকার ঢাকাইয়া আওলাদ হোসেনসহ বাংলাদেশের অনেক জানা অজানা ক্রীড়াবিদ স্বাধীন বাংলাদেশে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন।
আমাদের রক্তে রঞ্জিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুধু এ দেশেরই গৌরব নয়, এটা বিলীয়মান বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা একটি ঘটনা এবং একুশ শতকের হাতে তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে তথা নবপ্রজন্মের জন্য সময়ের দুঃসাহসী চিত্র, যা বিশ্বের সব শ্রেণির সংগ্রামী মানুষের জন্য হয়ে থাকবে আগামীর প্রেরণা। আর তার অংশীদার হয়ে আছেন বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ ক্রীড়াবিদরা।

শ্রেণী:

শিরোপা অধরাই থেকে গেল বাংলাদেশের

49

49আরিফ সোহেল: এ গল্পটাও মিলে গেল এক কাতারে। ফাইনালে অপয়া বাংলাদেশ; ফাইনাল মানে সোনার হরিণ। দুয়ারে দাঁড়ানো সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বারবার। ত্রিদেশীয় ক্রিকেটেও স্বপ্নভঙ্গ। সেই বেদনায় নীল ক্রিকেট বাংলাদেশ। অথচ কী অসাধারণই না শুরু করেছিলেন তামিম-মুশফিক-মাশরাফি-মুস্তাফিজ-রুবেলরা। প্রথম ম্যাচে জিম্বাবুয়ে, দ্বিতীয় ম্যাচে হাতুরুর শ্রীলংকাকে হাতুরি পেটার পর গ্রুপের তৃতীয় ম্যাচে জিম্বাবুয়েকে গুঁড়িয়ে-উড়িয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু শিরোপা অধরাই রয়ে গেল।
ফাইনালের ড্রেস রিহার্সেলে বাজে হারের পর পাল্টে যায় দৃশ্যপট। পাখির ডানায় উড়তে থাকা বাংলাদেশ ধাক্কা খায়। প্রথম ম্যাচের হারের কষ্ট ভুলে শ্রীলংকা বাংলাদেশকে অলআউট করে ৮২ রানে। এই প্রতিশোধÑ ক্রিকেটপ্রেমীদের নতুনভাবে প্রাণিত করেছিল। ফাইনালে আগেই ফাড়া কেটে গেছেÑ এই ভাবনায় আশার প্রদীপ জ্বেলেছিল। চেপে বসা ‘ফাইনালের জুজু’ মনে হচ্ছিল উধাও। আর ফাইনালের হিসাবটাও ছিল নাগালের মধ্যেই। ২২২ রানের টার্গেট। কারণ বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচে ৩২০ রান তুলেছিল শ্রীলংকার বিপক্ষে। বিস্ময়করভাবে ফাইনালে বাংলাদেশ মাত্র ১৪২ রানে ‘এক’ উইকেট হাতে [সাকিব চোট পেয়ে মাঠ ছেড়েছিল] রেখে অল আউট। কষ্টকর পরাজয় ৭৯ রানে। এই ম্যাচেও অসাধারণ ব্যাটিং করেছেন মাহমুদউল্লাহ (৭২)। লড়াই করেছেন একাই। প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশের বিপক্ষে ১৬৩ রানে হারের পর দুই ম্যাচে জয় হাতুরু সিংহের ঘাম দিয়ে ঝড় সেরেছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের ভাগ্যে আবারও লেখা হয়ে গেল ‘ফাইনাল’ অভাগা। বাংলাদেশের সাকিব ছিল না বটে; তারপরও প্রলম্বিত ব্যাটিং লাইনআপ নিয়ে এমন টার্গেটকে অধরা ভাবার অবকাশ ছিল না। যদিও ‘গামিনী মার্কা’ উইকেট নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা ছিল। গ্রুপ পর্যায়ের শেষ ম্যাচে বাংলাদেশের আন্ডার ১০০ রানই তা উসকে দিয়েছিল। ফাইনাল শেষে তাই ঘুরে-ফিরে পুরনো কথাই মনে হয়েছে যারা ক্রিকেটের নানা হিসাব সমীকরণ মাথায় নিয়ে বসে থাকেনÑ দিব্যি বলে দেন ফাইনাল ম্যাচটাই আমাদের ‘ফাইনাল’ করে দিচ্ছে বারবার!
মনে করুনÑ ২০০৯ সালের ত্রিদেশীয় সিরিজের কথা। কিংবা ২০১২ ও ২০১৬ সালের এশিয়া কাপের ফাইনালের ফ্রেমবন্দি ছবি। ঠিক তেমন দৃশ্যপটই ২৭ জানুয়ারি ২০১৮ সালের ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনাল। চার চারটা সিরিজের ফাইনালে জয়ের দেখা পায়নি বাংলাদেশ। এবারও ট্রফির লড়াইয়ে হোঁচট খেয়েছে বাংলাদেশ। সঙ্গে সাকিবের চোট বাংলাদেশের জন্য হয়ে উঠেছে বাড়তি বিড়ম্বনা।
অবশ্য ত্রিদেশীয় ক্রিকেটের ভাগ্যে সিঁকে একবার খুলেছিল বাংলাদেশের ২০০৭ বিশ্বকাপের আগে কানাডা-বারমুডাকে নিয়ে ছোট মাপের সিরিজে ট্রফি ছুঁয়ে দেখে। আর বাকি সব ফাইনালে বাংলাদেশকে ফাইনাল করে দিয়েছে প্রতিপক্ষ দলগুলো। এর মধ্যে প্রতিপক্ষ হিসেবে বাংলাদেশ শ্রীলংকাকে পেয়েছে দুবার। ভারত এবং পাকিস্তানও রয়েছে ফাইনালের হিসাবে।
২০০৯ সালে বাংলাদেশ অনুষ্ঠিত হওয়া ফাইনালে বাংলাদেশ ১৫২ রান পুঁজি নিয়েও শ্রীলংকাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। মাত্র ৬ রানে তুলে নিয়েছিল শ্রীলংকার ৫ উইকেট। অথচ সেই ম্যাচও এক দুর্দান্ত সাঙ্গাকারা সাঙ্গ করে দিয়েছেন একাই। আর শেষ দিকে ম্যাচে মুরালির দুর্ধর্ষ ব্যাটিংয়ের কাছে হেরেছিল নিশ্চিত ম্যাচ বাংলাদেশ। ‘কুফা’ সেখান থেকেই লেগেছিল। ৬/৫-এর পর সাঙ্গাকেও (৫৯) থামানো হয়েছিল। দলের ছিল ১১৪/৮। অথচ সেই ম্যাচে মাহরুফের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ের সঙ্গে মুরালি বনে গেছেন হার্ডহিটার। মাত্র ১৬ বলে ২ ছক্কায় মুরালি করেছিলেন ৩৩ রান। সেখানেই ম্যাচ হেরেছে বাংলাদেশ।
২০১২ সালে এশিয়া কাপে ধরাছোঁয়ার মধ্যে থাকা ফাইনালটা বাংলাদেশ অকারণেই খুইয়েছে। গ্রুপ পর্বে ভারত-শ্রীলংকাকে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিল বাংলাদেশ। সেখানে পাকিস্তানকে রীতিমতো হারের ঘোরাটোপে বেঁধেও ফেলেছিল। আবারও ফাইনাল; আবারও ভাগ্যদেবীর মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার গল্প। পাকিস্তানের করা ২৩৬ রানের পিছু দামাল ঘোড়া ছুটিয়েও ব্যর্থ হয়েছিল সাকিব-তামিমরা। মাশরাফি-মাহমুদউল্লাহর ২৮ রানের পার্টনারশিপে জয় দেখছিল বাংলাদেশ। মাশরাফির ৯ বলে ১৮ রানের ইনিংসটি ছিল চোখ ধাঁধানো। তার আউটের পর মাহমুদউল্লাহ আর ঘোড়া বাঁচাতে পারেন নি। বাংলাদেশ হেরেছে ২ রানে। শেষ বলে জয়ের জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ৪ রান।
ফাইনালে উঠতে বাংলাদেশ ২০১৬ সালে এশিয়া কাপে পাকিস্তান-শ্রীলংকাকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। ফরমেটটা ছিল অবশ্য টি-টোয়েন্টির। ফাইনাল এবং যথারীতি হারের গল্প। বাংলাদেশের ১২০ রানের পুুঁজি হেসে-খেলে জিতেছে ভারত ক্রিকেটপ্রেমীদের কাঁদিয়ে।
সময় পাল্টে ২০১৮ সাল। কিন্তু গল্প এবারও স্থির একবিন্দুতে। হারের বৃত্তবন্দি ফাইনাল। অথচ ফাইনালে ২২২ রানের টার্গেট দেখে গ্যালারির দর্শকদের আনন্দ-উৎসবে রং বাড়ছিল। দুর্দান্ত রুবেলের বোলিং, মাশরাফি-মুস্তাফিজ বিস্ময়ের পরও কিন্তু ধারা-কাছে যেতে পারেনি বাংলাদেশ। মিরপুরের উইকেট অনুযায়ী এই লক্ষ্য অসম্ভব ছিল না মোটেও।
ব্যাটিংয়ে নেমে ইনিংসের পঞ্চম ওভারেই ১১ রানে চামিরার বলে ধনঞ্জয়ার হাতে ধরা পড়েন তামিম ইকবাল। সাকিব নেই জানার পর; তামিমের এভাবে চলে যাওয়া একটু চাপেই পড়ে বাংলাদেশ। বিপদটা আরও বাড়িয়েছেন নবম ওভারে মোহাম্মদ মিঠুন রান আউট হয়ে। পরের ওভারে চামারার দ্বিতীয় শিকার হয়েছেন সাব্বির রহমান। ২২/৩; ঠিক এখান থেকে মুশফিক-মাহমুদ উল্লাহর ব্যাটে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল বাংলাদেশ। এই জুটিতে স্বপ্ন দেখছিল টিম বাংলাদেশ। কিন্তু তাও বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। দলীয় ৮০ রানে অযথাই ধনঞ্জয়ার বলে সুইপ করতে গিয়ে স্লিপে উপল থারাঙ্গার হাতে তালুবন্দি হয়েছেন মুশফিক (২২)। এখান থেকে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি বাংলাদেশ। শেষ পর্যন্ত ১৪২ রানে রান আউট বাংলাদেশ। মাহমুদ উল্লাহ একাই লড়াই করেছেন; আর দেখেছেন অন্যপ্রান্তে ব্যাট হাতে আসা, মলিন বদনে ফিরে যাওয়া।
বাংলাদেশ খেলেছে; দেখতে দেখতে এমন কেটে গেছে হোম অব ক্রিকেট গ্রাউন্ডের ৯ বছর। অনুষ্ঠিত ৪টি টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠেও শিরোপা স্পর্শ করতে পারেনি বাংলাদেশ। এই আক্ষেপ কতদিন বয়ে বেড়াবে কারোর জানা নেই। চলতি ত্রিদেশীয় সিরিজটি ঘিরে স্বপ্ন ডালাপালা ছড়িয়ে বেশ। টানা তিন ম্যাচে জয়ে তা আর বাঁধ মানছিল না। তবে কীÑ এমন জয়ই কাল হয়েছে বাংলাদেশের। শেষ দুই ম্যাচে তাই নেমে এলো মহাবিপত্তি। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে বাজেভাবে হেরে জেগে ওঠার তাগিদও কাজে লাগেনি ফাইনালে। ধারণাÑ সাকিবের অপ্রত্যাশিত চোট মানসিকভাবে দলকে অবশ্যই প্রভাবিত করেছে। ফাইনাল শেষে মাশরাফি তা স্বীকার করেন নি। স্বাভাবিকভাবে দলের সেরা খেলোয়াড় না থাকলে একটু বাড়তি চাপ থাকেই। বিষয়টি নিয়ে ড্রেসিংরুমে আমরা আলোচনাও করেছি, সাকিব ব্যাটিংয়ে নেইÑ এটা মাথার মধ্যে কাউকে না আনতে। কারণ ২২২ তাড়া করার মতো ব্যাটসম্যান আমাদের ছিল। মাহমুদউল্লাহ যেভাবে খেলছিল, মুশফিক যদি আরেকটু বড় করত হয়তো-বা সম্ভব ছিল। প্রথম উইকেট পড়ার পর আরেকটু ধরে খেলা উচিত ছিল। এতটা অ্যাটাকিং মুডে না গিয়ে একটু ধরে খেললে ভালো হতো।
মাশরাফি যাই বলুকÑ সাকিব থাকা-না থাকায় অনেক পার্থক্য। সাকিব ২২ গজে কী করবেন, সেটির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার দলে থাকা মানে দলের আত্মবিশ্বাসের পারদটা উঁচুতে থাকা। ১০ জনের দল হয়েও ম্যাচটা মুঠোয় পুরতে টপ অর্ডার, মিডল অর্ডারের ব্যাটসম্যানদের দুর্দান্ত ব্যাটিং করতে হতো। মাহমুদউল্লাহ বাদে তা কেউ করতে পারেন নি। ভরসা ছিল মাহমুদউল্লাহর ওপরও। কারণ ২০১১ বিশ্বকাপে চট্টগ্রামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে, কার্ডিফে ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেও মাহমুদউল্লাহ শেষ পর্যন্ত টিকে থেকে বাংলাদেশকে জিতিয়েছেন। কিন্তু ত্রিদেশীয় আসরের ফাইনালে তা হয়নি।
ক্রিকেট গল্পের শিরোনাম কখনও উল্লাস-উদ্বেলে ভেসে উঠতে পারে। আবার কখনও দুঃখের কথামালায় সাজানো হতে পারে। এখানে এক ফুলে মালা হয় না। হয়তো ফুলের সমাহারে কোনো বিশেষ ফুলকে বৃত্তীয়-কেন্দ্রীয় আসনে রাখা অনিবার্য হতে পারে। সেখানে ফুলরাজা হয়ে শোভা পান কখনও দলের সেরা স্কোরার, কখনও সেরা বোলার। ফাইটার মাহমুদউল্লার ফুলরাজা হওয়ার সুযোগ হয়েও হয়নি। হয়তো ফাইনাল বলেই তা হয়নি। ২০১২ সালে এশিয়া কাপের ফাইনালেও মাহমুদউল্লাহ পারেন নিÑ পারলেন না এবারও। ফাইনালে হারের বৃত্ত ভাঙতে এবারও পারল না বাংলাদেশ।

শ্রেণী:

কিশোরীদের সাফের শিরোপা উপহার

Posted on by 0 comment
57

57আরিফ সোহেল: বছরজুড়ে জাতীয় দলের ছেলে ফুটবলার একরকম বসেই ছিল। পতাকা ছিল মেয়েদের হাতেই। থাইল্যান্ডে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপের মূল পর্বে জিততে না পারলেও দুরন্ত পারফরমেন্স করেছে মেয়েরা। আর বিজয়ের মাসে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়েছে মারিয়া-তহুরা-মার্জিয়ারা। প্রথমবারের মতো ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছে কিশোরীরা।
বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত চার দলের কিশোরী সাফের প্রতিটি ম্যাচেই দুর্দান্ত খেলেছে বাংলাদেশ। রাউন্ড রবিন লিগে ভারত, ভুটান ও নেপালকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে কিশোরীরা। শিরোপা নির্ধারণী লড়াইয়ে ভারতকে ১-০ গোলে হারিয়েছে অপরাজিত থাকা বাংলাদেশ। ডিফেন্ডার শামসুন্নাহারের একমাত্র গোলে ভারতকে হারিয়ে সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ আসরে বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছে মারিয়া-মার্জিয়ারা।
আসরের উদ্বোধনী ম্যাচে নেপালকে ৬-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর লিগের দ্বিতীয় ম্যাচে ভুটানের বিপক্ষে মার্জিয়ারা জিতেছে ৩-০ ব্যবধানে। লিগের শেষ ম্যাচে ভারতকে ৩-০ ব্যবধানে হারিয়ে বাংলাদেশ চমক সৃষ্টি করেছিল। লিগের তিন ম্যাচের আর ফাইনাল মিলিয়ে প্রতিপক্ষকে মোট ১৩টি গোল দিয়েছে। মেয়েদের বাঁধিয়ে রাখার মতো পারফর্মে ‘অন্যরকম’ বাংলাদেশ খুঁজে পেয়েছে ফুটবলপ্রেমীরা। বিজয়ের মাসে এমন অর্জনে গৌরবময় মাইলফলক স্পর্শ করা মারিয়া-মার্জিয়ারা ‘শিরোপা’ উৎসর্গ করেছে সদ্যপ্রয়াত সাবিনাকে।

শ্রেণী:

মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন

57

57আরিফ সোহেল: বিজয়ের মাস। এ মাসেই স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের। জাতির পিতার নির্দেশে এ দেশের লাখো লাখো মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সেখানে পিছিয়ে থাকেন নি ক্রীড়াবিদ-সংগঠকরা। তারাও স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা রেখে ইতিহাসের স্মারকগ্রন্থে রক্তাক্ষরে বাঁধিয়ে রেখেছেন তাদের নাম। এ দেশের বীরোচিত ক্রীড়াবিদরা যে অবদান রেখেছেন, তা ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। এ কথায় বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ নামের একটি দেশের অভ্যুদয় ঘটার পেছনে তাদের আত্মত্যাগ ও গৌরবময় অবদানের কোনো তুলনা হয় না।
বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ নামের সবুজ-শ্যামল দেশটির অভ্যুদয় ঘটে অনেক মানুষের সংগ্রাম, বীরত্ব আর আত্মত্যাগে। আমরা একটা মানচিত্র ও জাতীয় পতাকা পেয়েছি অনেক স্বেদ, রক্ত ও আত্মত্যাগ বিনিময়ে। এ দেশের প্রায় প্রতিটি মানুষকে স্পর্শ করে একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রাম। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে এমন সুসময় আর আসে নি। এমন দুঃসময় কখনও আসে নি। ইতিহাসের সেই শ্রেষ্ঠ সময়ে বাঙালি হয়ে ওঠে অজেয় ও অপরাজেয়। নিপীড়িত-বঞ্চিত-লাঞ্ছিত বাঙালি ঘুম থেকে জেগে ওঠে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে। তার উদাত্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাঙালিরা জীবনপণ ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে।
এক্ষেত্রে ক্রীড়াবিদরা মোটেও পিছিয়ে ছিলেন না। স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের রয়েছে অবিস্মরণীয় ভূমিকা। মিছিলে, মিটিংয়ে, আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার পাশাপাশি অনেক ক্রীড়াবিদ খেলার মাঠ থেকে সরাসরি সশস্ত্রযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। লড়াই করেন জীবন বাজি রেখে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেনÑ ফুটবলার মেজর (অব.) হাফিজ, নূরুন্নবী, ইনু, প্যাটেল, শিরু, ক্রিকেটার তান্না, শেখ কামাল, মাসুদ ওমর, হকির হাবিবুল, হাফিজউল্লাহ, বাস্কেটবলের কাজী কামাল, কুস্তিগীর খসরু, ভলিবলের কবীর, সাঁতারু এরশাদন্নবী প্রমুখ। খেলার মাঠের মতো যুদ্ধের মাঠেও তারা দেখিয়েছেন অসম সাহসিকতা।
স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন লড়াকু মুক্তিযোদ্ধা ক্রিকেটার জুয়েল, ফুটবলার মজিবর, সারোয়ার, কুটু মনি, বাবুল, সোহরাওয়ার্দী, বাবুল, মিজান, অ্যাথলেট মিরাজ, তপন চৌধুরী, শাহেদ আলী, দাবার ক্বাসেদ, সাদিক, হকির মীরু প্রমুখ। প্রাণ দিয়েছেন দৈনিক অবজারভার পত্রিকার ক্রীড়া সম্পাদক ও ক্রীড়া সংগঠক আবদুল মান্নান লাড়– ভাই, আজাদ বয়েজ ক্লাবের নিবেদিতপ্রাণ ক্রিকেট সংগঠক মুশতাক, নোয়াখালীর ক্রীড়া সংগঠক ভুলু প্রমুখ।
পাকিস্তান আমলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রের মতো বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনও ছিল উপেক্ষিত। এ অঞ্চলের ক্রীড়াবিদরা যাতে তাদের প্রতিভা বিকাশের মাধ্যমে সাফ্যল্যের দুয়ারে পৌঁছতে না পারে, সে জন্য কূটকৌশলের আশ্রয় নেওয়া হতো। তাদের তাচ্ছিল্য ও পক্ষপাতিত্বের অন্যতম দৃষ্টান্ত হলো ক্রীড়াক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দ। জনসংখ্যার অনুপাতে বাজেট বরাদ্দের কথা থাকলেও এক্ষেত্রে চরম বৈষম্য প্রদর্শন করা হয়। ফলে পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পাওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানের ক্রীড়াঙ্গন খুব বেশি এগিয়ে যেতে পারে নি। তারপরও যারা শত উপেক্ষা, অবহেলা ও বঞ্চনা ছাপিয়ে ব্যক্তিগত নৈপুণ্য ও ক্রীড়াশৈলী দেখিয়ে সাফল্য দেখালেও তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ ও স্বীকৃতি দেওয়া হতো না। কিংবদন্তি সাঁতারু ব্রজেন দাস ১৯৫৬ সালের অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অলিম্পিক গেমসে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন প্রধান দাবিদার। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই তাকে সুযোগ দেওয়া হয়নি। তার পরিবর্তে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সাঁতারু পাঠানো হয়। সেই আপেক্ষ থেকেই অনুপ্রাণিত ব্রজেন দাস ছয়বার ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে  ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। এক কথায় শুধু সাঁতার নয়; এ অঞ্চলের ক্রীড়াবিদরা যাতে পাদপ্রদীপের আলোয় উঠে আসতে না পারে, পাকিস্তানিরা সর্বদা সেই চেষ্টাই করত।
মুক্তি সংগ্রামের দামামায় এই অঞ্চলের মানুষ ক্ষোভের অনলে জ্বলতে থাকে। তার প্রতিফলন দেখা যায় খেলার মাঠেও। একাত্তর সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা স্টেডিয়ামে চার দিনের ক্রিকেট ম্যাচ হচ্ছিল পাকিস্তান এবং কমনওয়েলথ একাদশের মধ্যে। ম্যাচের শেষ দিন ১ মার্চ দর্শকরা খেলা উপভোগ করার সময় বেতারে দুপুর ১টার খবরে বলা হয়, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান স্থগিত করে দিয়েছেন জাতীয় পরিষদ অধিবেশন। ওই অধিবেশনে সরকার গঠন করার কথা ছিল জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের। অধিবেশন স্থগিত করার অর্থ ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভোটে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বাংলার মানুষের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের গড়িমসি করা। স্বাধিকারের চেতনায় ঢাকা স্টেডিয়ামের দর্শকরা মুহূর্তেই স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে এবং পুড়িয়ে দেয় পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা।
মহৎপ্রাণ এই ক্রীড়াবিদরা স্মরণীয় হয়ে আছেন বাংলাদেশের ইতিহাসে। এই বীর ও সাহসী মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি এক ভিন্নধর্মী ভূমিকায় উজ্জ্বল হয়ে আছেন একদল মহান ক্রীড়াবিদ। একাত্তরের সেই উত্তাল সময়ে, দেশের অস্বাভাবিক অবস্থাকে বিদেশি পর্যটক ও সাংবাদিকদের কাছে স্বাভাবিক বুঝাতে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ঢাকায় ‘আগা খান গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট’ আয়োজনের ঘোষণা দেয়। পাকিস্তানিদের এই কৌশলের পাল্টা চ্যালেঞ্জ হিসেবে এবং মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে বিশ্ব জনমত ও তহবিল গড়ে তোলার জন্য ভারতের মাটিতে খেলা অনুষ্ঠানকে একটি মিশন হিসেবে নিয়ে ১৯৭১ সালের জুন মাসে গঠন করা হয় ‘বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি’। বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতির উদ্যোগে প্রতিবেশী ভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শনী ফুটবল খেলেন বাংলার দামাল ফুটবলাররা। তাদের চোখে ছিল অন্যরকম স্বপ্ন। বুকে ছিল বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশের প্রতি অপার ভালোবাসা। ফুটবল খেলার মাধ্যমে তারা গড়ে তোলেন অভূতপূর্ব জাগরণ। স্বাধীনতার মহান মন্ত্রে উজ্জীবিত মুক্তিকামী এই ফুটবলারদের খেলা দেখার জন্য মাঠে দর্শকদের বাঁধ ভাঙা জোয়ার নামে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে গড়ে ওঠে জনমত। খেলা থেকে অর্জিত অর্থ জমা দেওয়া হয় প্রবাসী সরকারের তহবিলে। ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’ বিশে^র ক্রীড়া ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। সাঁতারু কানাইলাল শর্মা এবং অরুণ নন্দী একটানা সাঁতার কেটে বিশ্বরেকর্ড গড়ে দারুণ সাড়া জাগাতে সক্ষম হন। এ থেকে অর্জিত অর্থ জমা দেওয়া হয় মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে। মুক্তিযুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আয়োজিত হতো ক্রিকেট ম্যাচসহ অন্যান্য খেলা। খেলাকে যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার করা যায়,  বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত বিরল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বপক্ষে ব্যাপক জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে ক্রীড়াবিদদের অত্যুজ্জ্বল ভূমিকা চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। স্বাধীনতা সংগ্রামে যেসব ক্রীড়াবিদ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বীরোচিত ও গৌরবোজ্জ্বল অবদান রেখেছেন, তাদের কথা জাতি কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করে।
আমাদের রক্তে রঞ্জিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুধু এ দেশেরই গৌরব নয়, এটা বিলীয়মান বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা একটি ঘটনা এবং একুশ শতকের হাতে তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে তথা নবপ্রজন্মের জন্য সময়ের দুঃসাহসী চিত্র, যা বিশ্বের সব শ্রেণির সংগ্রামী মানুষের জন্য হয়ে থাকবে আগামীর প্রেরণা। আর তার অংশীদার হয়ে আছেন বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ ক্রীড়াবিদরা।

শ্রেণী:

যুব গেমসের লোগো ও মাসকট উন্মোচন

58

58কেটে গেছে স্বাধীন বাংলাদেশের ৪৬ বছর। ‘যুব গেমস’Ñ বিষয়টি আলোচনায় উঠে এলেও বাংলাদেশে এ ধরনের আয়োজনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অবশেষে ‘চল যাই এক সাথে আজ ঘরের বাহিরে, খেলার মাঠে খেলব সবাই নতুন জোয়ারে’Ñ এই থিম সঙ সামনে রেখে বাংলাদেশে যুব গেমসের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে।
শুরুতেই উন্মোচন করা হয়েছে গেমসের লোগো ও মাসকট। ২৯ অক্টোবর বর্ণাঢ্য আয়োজনে বাংলাদেশ যুব গেমস ২০১৮-এর পথচলা শুরু হয়েছে প্রধান অতিথি অর্থমন্ত্রী এবং যুব গেমসের সাংগঠনিক কমিটির চেয়ারম্যান আবুল মাল আবদুল মুুহিত এমপির হাত ধরে। তিনি বাটন টিপে লোগো ও মাসকটের উন্মোচন করেছেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশনের সভাপতি, সেনাপ্রধান এবং যুব গেমসের প্রধান নির্বাহী জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক স্বাগত বক্তব্য রেখেছেন। এ সময়ে আরও উপস্থিত ছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এমপি, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী শ্রী বীরেন শিকদার এমপি, যুবও ক্রীড়াবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, মন্ত্রী পরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম, বাংলাদেশ বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশনের মহাসচিব সৈয়দ শাহেদ রেজা।
সারাদেশ থেকে মেধাবী ক্রীড়াবিদ খোঁজার টার্গেট নিয়ে প্রথমবারের মতো যুব গেমস আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে বিওএ। শুরু হবে জেলা পর্যায়ে। পরবর্তীতে বিভাগীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে গেমস সম্পন্ন হবে। আগামী ১৮ ডিসেম্বর ৭ দিনব্যাপী ৬৪টি জেলায় খেলা শুরু হবে। ৬ জানুয়ারি থেকে ১০ দিনব্যাপী শুরু হবে বিভাগীয় পর্যায়ের খেলা।  সবশেষে ২০১৮ সালের মার্চে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।
অনূর্ধ্ব-১৭ বছরের ক্রীড়াবিদদের নিয়ে বাংলাদেশ যুব গেমসে থাকছে মোট ২১টি ডিসিপ্লিন। ডিসিপ্লিনগুলো হচ্ছে- ফুটবল, ভলিবল, বাস্কেটবল, হকি, কাবাডি, হ্যান্ডবল, অ্যাথলেটিক্স, সাঁতার, ব্যাডমিন্টন, শুটিং, টেবিল টেনিস, স্কোয়াশ, কারাতে, তায়কোয়ানডো, কুস্তি, জুডো, উশু, ভারোত্তোলন, বক্সিং, আরচারি ও দাবা।

শ্রেণী:

এশিয়া কাপ হকিতে সরাসরি খেলবে বাংলাদেশ

57

স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ৩-১ গোলে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশ শেষভাগে এক মিনিটের ব্যবধানে ২ গোল করে ৩-৩ সমতায় ফিরেছিল। এরপর পেনাল্টি শুট আউটে ৪-৩ গোলে বাংলাদেশ জয় পেয়েছে। যে জয়ে নিশ্চিত হয়েছে বাংলাদেশের ষষ্ঠ স্থান। নিশ্চিত হয়েছে আগামী এশিয়া কাপে সরাসরি খেলাও।

57আরিফ সোহেল: ক্রিকেটে এর চেয়ে বাজে সময় সম্প্রতি আসেনি। দেশের মাটিতে বর্ণিল বাংলাদেশ দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে চরমভাবে হোয়াইটওয়াশ। এই সিরিজ হারার মধ্যে যে ‘ভালো’ খেলার ন্যূনতম নমুনাও দেখা যায়নি। টেস্ট, ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টির সব ম্যাচেই প্রতিরোধহীন হার সমালোচকদের কথা পালে হাওয়া লাগিয়েছে। তবে অনেকেই বুঝে-না বুঝে; আবেগে তারা বকেই যাচ্ছেন। ঠিক তাদের জন্য একটি তথ্য না দিলেই নয়, দক্ষিণ আফ্রিকা বলে কথা নয়, দেশের মাটিতে জিম্বাবুয়েও বড় হতে পারে। অর্থাৎ প্রায় সব দলই ঘরের মাঠে বাঘÑ এটা নতুন নয়।
দেশের মাটিতে বাংলাদেশ কম যায়নি। ফলে দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশের গো-হারে ক্রিকেটীয় অভিধানে নতুন শব্দ নয়। দক্ষিণ আফ্রিকা ঠিক আগের দুই সিরিজে প্রথম অস্ট্রেলিয়া এবং পরে শ্রীলংকাকে উড়িয়ে দিয়েছিল। শ্রীলংকাকে টেস্টে ৩-০, ওয়ানডে ৫-০ এবং ২-১ ব্যবধানে টি-টোয়েন্টি সিরিজে হারিয়েছিল। আগের সিরিজে অস্ট্রেলিয়াকে ওয়ানডেতে ৫-০ এবং ২-১ ব্যবধানে টি-টোয়েন্টি সিরিজে নাকাল করেছিল। এটা অনেকেই শিবের গীত হিসেবেও বলতে পারেন। বাংলাদেশের বিমর্ষ পরাজয়ের সাথে অন্যদের হারের ফিরিস্তি দিয়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের কষ্ট আপাতত প্রশমিত করা। এই সফরে মুশফিকের সেঞ্চুরি, তামিম-মুস্তাফিজের ইনজুরির সাথে সাকিবের সব ম্যাচে না থাকা নিয়েও গল্প থাকবে। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের ক্রিকেট গল্পকে এ মুহূর্তে ছুটি দেওয়াই ভালো। কারণ সামনেই ধুন্ধুমার বিপিএল।
ঘরের মাঠে ৩২ বছর পর এশিয়ান কাপ হকি। উত্তেজনা চরমেই ছিল। কিন্তু সেখানেও মন্দের ভালো ছাড়া গল্প নেই। ৮ দলের আসরে বাংলাদেশ ষষ্ঠ। স্বপ্ন ছিল ৫-এ থাকা। ছিল ’৮৫ সালে পাকিস্তানের কাছে ন্যূনতম ব্যবধানে হারার প্রতিশোধ-প্রতিরোধের স্বপ্ন। ঘুমিয়ে দেখা সেই স্বপ্ন; স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় নীল হয়ে গেছে। আসরে ফাইনালে ওঠা ভারতই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মালয়েশিয়াকে ২-১ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে।
১১ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছিল ১০ এশিয়া কাপ হকি। এই আসরকে সামনে রেখে প্রায় ২৫ কোটি টাকা ফ্লাডলাইট এবং মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামের সংস্কারের জন্য ব্যয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ক্রীড়াবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই আসর আয়োজনের সামগ্রিক ব্যয়ের জন্য ২.২৫ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় ১,৮৬,৯১,৮৭৫ টাকা প্রদান করেছিলেন।
১২ দিনের এই ক্রীড়া মহাযজ্ঞে ভারত প্রায় ১০ বছর পর আবার এশিয়া কাপ হকির চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এর আগে ২০০৩ ও ২০০৭ সালে ঘরের মাঠে শেষবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ভারত।
ফাইনাল শেষে প্রধান অতিথি বাংলাদেশ সরকারের সড়ক ও সেতুমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপি বিজয়ীদের পুরস্কৃত করেছে। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ড. বীরেন শিকদার এমপি, যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয় এমপি এবং এশিয়ান হকি ফেডারেশনের প্রধান নির্বাহী তৈয়ব ইকরাম এবং ফেডারেশনের সভাপতি ও বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল আবু এসরার।
৩২ বছর পর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপ হকিতে গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচে বাংলাদেশের অসহায় আত্মসমর্পণে উৎসব আবহ ফিকে হয়ে গেছে। তবে স্থান নির্ধারণী ম্যাচে চীনের বিপক্ষে অসাধারণ জয়ের পর আবার আনন্দমুখর হয়ে উঠেছিল মওলানা ভাসানী স্টেডিয়াম। কারণ গ্রুপের টানা তিন ম্যাচে পাকিস্তান, ভারত ও জাপানের বিপক্ষে ৭-০, ৭-০ এবং ৩-১ হেরেছিল বাংলাদেশ। স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ৩-১ গোলে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশ শেষভাগে এক মিনিটের ব্যবধানে ২ গোল করে ৩-৩ সমতায় ফিরেছিল। এরপর পেনাল্টি শুট আউটে ৪-৩ গোলে বাংলাদেশ জয় পেয়েছে। যে জয়ে নিশ্চিত হয়েছে বাংলাদেশের ষষ্ঠ স্থান। নিশ্চিত হয়েছে আগামী এশিয়া কাপে সরাসরি খেলাও।

শ্রেণী:

সেই ফুটবলই উৎসব-রঙিন

Posted on by 0 comment
57

57আরিফ সোহেল: ফুটবলে উৎসবের গ-িটা ক্রমে ছোট হয়ে পড়ছে বাংলাদেশে। জমে উঠছে না ঘরোয়া আয়োজনও। চলছে দর্শকদের বিপুল খরা। ঠিক সেই সময়েই ফুটবলে কিছুটা হলেও প্রাণের সঞ্চার করেছে অনূর্ধ্ব-১৮ সাফ মিশনে বাংলাদেশ দল। ভারত, মালদ্বীপ, ভুটানের বিপক্ষে জয় তুলে নিয়ে রানার্সআপ বাংলাদেশ। সমান পয়েন্ট নিয়েও নেপাল জিতেছে আসরের শিরোপা। চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলেও ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে আসরের স্পটলাইটে জ্বলজ্বল করছে জাফর ইকবালের নাম।
ভুটানের রাজধানী থিম্পুর চ্যাংলিমিথাং স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ শেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে স্বাগতিক দলকে ২-০ গোলে হারিয়ে যখন শিরোপার গন্ধ পাচ্ছিল; পরের ম্যাচে ভারত নেপালে হেরে যাওয়ায় তা হাওয়ায় মিইয়ে গেছে। চার দলের আসরে তিন জয়ে ৯ পয়েন্ট বাংলাদেশের। নেপালও অর্জন করেছিল ৯। কিন্তু হেড টু হেডের সরল সমীকরণের ফাঁদে পড়ে নেপালের কাছেই শিরোপা ছেড়ে দিতে হয়েছে জাফরদের।
বলতে দ্বিধা নেইÑ ধুঁকতে থাকা জাতীয় দলের ব্যর্থতা আর হতাশায় উল্টোপিঠে যুব ফুটবলাররা নতুন স্বপ্নের জয়গান গেয়েছেন। অনূর্ধ্ব-১৮ সাফে শিরোপা জেতা হয়নি; কিন্তু ভারতের বিপক্ষে ৩-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও জয়; মালদ্বীপ, ভুটানকে হারানোÑ এসবই নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে ফুটবলপ্রেমীদের।
58আসরের অন্যতম নাম জাফর ইকবাল। গোল করতে না পারা, ফিনিসিংয়ের অভাব যখন দেশের স্ট্রাইকারদের নিত্যসঙ্গী, তখন ৫ গোল করে সর্বোচ্চ স্কোরার এই ফুটবলার। তার নৈপুণ্যেই বাংলাদেশের ফুটবলের ডালপালা মেলেছে স্বপ্ন। সাফ ফুটবলের পর এবার টার্গেট এএফসি চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাই। ৩১ অক্টোবর থেকে শুরু হতে যাওয়া এএফসি অনূর্ধ্ব-১৯ বি-গ্রুপের বাছাইয়ে, শ্রীলংকা মালদ্বীপকে নিয়ে খুব ভাবনা না থাকলেও কঠিন পরীক্ষায় পড়তে হবে উজবেকিস্তান, স্বাগতিক তাজিকিস্তানের মতো শক্তিধরদের বিপক্ষে। অনূর্ধ্ব-১৮ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ বাংলাদেশকে দিয়েছে বড় কিছু। এই টুর্নামেন্ট ফুটবল নিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখায় বাতিঘর হয়ে দেখা দিয়েছে। যেখানে বাংলাদেশের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হচ্ছে জাফর ইকবালরা!

এশিয়া কাপ হকির জমজমাট আয়োজন
মওলানা হকি স্টেডিয়ামে বসেছে ফ্লাড লাইট। সেই আলোতেই এবার বসছে ১০তম পুরুষ এশিয়া কাপ হকি। ১৯৮৫ সালে প্রথম ও শেষবার বাংলাদেশে হকির এশিয়া কাপ আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ। এই আসরে সবচেয়ে পিছিয়ে জিমি-চয়নদের দল। তাই টার্গেট ¯্রফে ভালো খেলা। এই আসরকে ঘিরে জমকালো সমাপণী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে আট জাতির এই আসরে উপস্থিত থাকছেন ক্রীড়াবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ক্যালেন্ডারের হিসাব বলছে, ৩২ বছর পর এশিয়া কাপ হকির আসর বসতে যাচ্ছে বাংলাদেশে। ১১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া এই আসরকে ঘিরে মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামে ব্যাপক সংস্কার হয়েছে। কোচ মাহবুব হারুনের অধীনে অনুশীলনে বেজায় ব্যস্ত রাসেল মাহমুদ জিমি, মামুনুর রহমান চয়নরা। ঘরের মাঠে নিজেদের উজাড় করা পারফরমেন্সে আসরটিকে স্মরণীয় করে রাখার পণ বাংলাদেশ হকি দলের। টুর্নামেন্টে টার্গেট ষষ্ঠ স্থান। এশিয়া কাপে খেলতে কোয়ালিফাইং রাউন্ড পেরুতে হচ্ছে বাংলাদেশের। একসময় বাংলাদেশ সরাসরি খেলতো এশিয়া কাপে। এবার আসরে এশিয়া কাপে ষষ্ঠ হতে পারলে কোয়ালিফাইং রাউন্ডে খেলার প্রয়োজন হবে না বাংলাদেশের।
আসরের মেয়াদ ১২ দিন; ১১-২২ অক্টোবর। অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপে বাংলাদেশ খেলছে ‘এ’ গ্রুপে। সেখানে প্রতিপক্ষ ভারত, জাপান ও পাকিস্তান। ‘বি’ গ্রুপে খেলবে মালয়েশিয়া, কোরিয়া, চীন ও ওমান।
এশিয়া কাপ হকির জন্য বাংলাদেশের চূড়ান্ত দলÑ রাসেল মাহমুদ জিমি (অধিনায়ক), পুস্কর ক্ষিসা মিমো (সহকারী অধিনায়ক), অসিম গোপ, আবু সাইদ নিপ্পন, আশরাফুল ইসলাম, খোরশেদুর রহমান, ফরহাদ আহমেদ সিটুল, রেজাউল করিম বাবু, ইমরান হাসান পিন্টু, মামুনুর রহমান চয়ন, রুম্মান সরকার, নাইম উদ্দিন, হাসান যুবায়ের নিলয়, সারোয়ার হোসেন, কামরুজ্জামান রানা, মিলন হোসেন, মাইনুল ইসলাম কৌশিক ও আরশাদ হোসেন।
ফুটবলে নতুন স্বপ্নে সুবাতাস, এশিয়া কাপ হকির রাজসিক আয়োজনের সৌরথের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশ দলের হারের অপ্রত্যাশিত কান্নাচোখ, ময়মনসিংহের কলসিন্দুর নারী ফুটবলার সাবিনা আক্তারের অকাল মৃত্যু ক্রীড়াঙ্গনের উৎসবের বাতায়নে বেদনার কালো ছায়া টেনে দিয়েছে।

শ্রেণী: