রক্ত পালক

Posted on by 0 comment
8-6-2018 7-49-20 PM

8-6-2018 7-49-20 PMআনিস রহমান: ট্যামা ম-লের বুক ধড়াস ধড়াস করে উঠছে আর নামছে। যেন শাটার মিস্ত্রির হাঁতুড়ি। একবার উঠছে। একবার নামছে ধড়াম করে। কখনও মনে হয় বুকটা হাঁপরের মতো ফুলে উঠছে। আবার চিমসে যাচ্ছে মুহূর্তে। আসলে ঠিক কী হচ্ছে ওর বুকের ভেতরে তা ও কেন ওর বাবাও যদি এসে ভেতরে সেঁধিয়ে যায় তাহলেও কিছু বুঝতে পারবে কি না সন্দেহ। তবে একথা ঠিক, ট্যামা যে কিছু বুঝতে পারছে না। কাউকে বোঝাতে পারছে না। বলতেও পারছে না কিছু। যাকে বলা যায়।
ট্যামা ম-ল মানে ত্রিমোহিনী ম-ল। বুঝ হতেই দেখে ওর মাথায় ঢাউস এক বোঝা। বয়েস যত বেড়েছে। বোঝার আকারও তত বেড়েছে। একসময় ও ছিল বাবার পেছন পেছন। একসময় বলা নেই কওয়া নেই বাবা সামনে থেকে সটকে পড়ল। সটকে পড়ল মানে টসকে পড়ল জীবন থেকে। হঠাৎ বড্ড একা হয়ে পড়ল ট্যামা। নিঃসঙ্গতা এত ভারী, এত ক্লান্তিকর আর আতঙ্কময় হতে পারে তা আগে কখনও উপলব্ধি করতে পারেনি। সে উপলব্ধি আজ যেন ওকে নতুন করে চেপে ধরেছে। কিন্তু যে আতঙ্ক কিংবা নিঃসঙ্গতার স্বরূপ কেমন তা সবটুকু অবয়ব নিয়ে তাকে ধরা দিচ্ছে না। বিমূর্ত এক অবয়ব কিংবা কিছু আঁচড় না হয় কোনো এক অজানা স্কেচের অবয়বে সে যন্ত্রণা ওকে পোড়াচ্ছে। আঁচড়াচ্ছে ক্ষত-বিক্ষত করছে।
তখন ওরা থাকতো ধোলাইখালের ঢালে। ছোট্ট ডেরা মতো ঘর। ঝুপড়ি যাকে বলে। পাশাপাশি দুটো ঘর। শরীর কুঁজো করে ঢুকতে হয়। তেমনি কুঁজো হয়ে বেরোতে হয় ঢেরা থেকে। একটিতে মা-বাবা। অন্যটিতে ছিল ওদের চার ভাই-বোনের আবাস। বাবার এমনি পালিয়ে যাওয়া কিংবা পলায়নপর মনোবৃত্তি মায়েরও বুঝি পছন্দ হয়নি। তাই বছর দু না পেরোতেই বাবার পথে মা-ও পা বাড়ালো। ভাই-বোনদের দেখভালের সবটুকু দায়িত্ব কেমন করে যেন ওর ঘাড়ে চেপে বসল। বাড়তি আরেক বোঝা নিয়ে ওর কেবলই মনে হয় বাবার কাঁধের বোঝাটা ওর কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে তবে বাবা চোখ বুজেছে। কখনও মনে হয় কোনো এক মামদো ভূত ওর ঘাড়ে চেপে বসেছে আজীবনের জন্যে। বিশেষ করে ওর দুচোখ যখন মেটে চুলোর ধোঁয়ায় লালচে হয়ে উঠতো রান্নার সময়, কিংবা কখনও জল ঝরতো অঝোর ধারায়, তারপরও আগুনের পাত্তা মিলতো না চুলোর গাড্ডায়Ñ তখন মনে হতো খালের ওপারে বসে বসে বাবা-মা দুজনে তামাসা দেখছে আর মিটিমিটি হাসছে। ছেলেকে নাস্তানাবুদ হতে দেখে। আর ভাবছে ছেলে ওদের লায়েক হবে কবে!
খালপাড়ে ট্যামার আবাস থাকলেও ওদের রোজকার পথ ছিল শ্যামবাজার থেকে ঠাঁটারীবাজার। পাইকারিপাড়া থেকে সবজির বোঝা নিয়ে ঠাঁটারীবাজারের বিভিন্ন মোকামে পৌঁছে দিত। মুটেগিরিতেই জীবন পার হয়ে গেল তার। একসময় বোঝার ভার এতটাই বাড়িয়ে নিল যে ঘাড় কাৎ হয়ে যেত। পা তুলতে পারতো না বোঝার ভাড়ে। কেবল রাবারের চপ্পল জড়ানো পা দুটি রাস্তার সিমেন্টের সঙ্গে ঘষ্টাতে ঘষ্টাতে পথ কাটতো। খস্। খস্। খস্।
জায়গায় জায়গায় ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বুড়িগঙ্গার মুখে চড়া পড়ায় একসময় ধোলাইখালের জলে বেশ টান দেখা দিল। তখন জলের রংও পাল্টে যেতে লাগলো দিনকে দিন। উৎকট গন্ধ সে জলে। অগত্যা ডেরা গুটিয়ে গে-ারিয়ায় চলে এলো। নতুন আবাস গড়ল রেললাইনের ধারে। কিন্তু এখানে যে এত গুমোট রাজনীতি জট পাকিয়েছিল, তা আগে জানা ছিল না ট্যামা ম-লের। রাজনীতির ঘুঁটির চালে হেরে এবং জটিল জালে জড়িয়ে খুব অল্পদিনেই উচ্ছেদ হলো ট্যামার সংসার। ট্যামার রোজগার থেকে ওদের যদি খাঁই মেটাতে যায় তাহলে সংসার চলে না। আর সংসার চালাতে গেলে ওদের মানে দখলদারদের খাঁই মেটাতে পারে না। উপায়ন্তর না পেয়ে একসময় স্টেশনের প্লাটফরমেই রাতে বিছানা পেতে শোওয়ার বন্দোবস্ত করে নেয় ওরা। তিন ভাইবোনকে ট্রেনে জল বিক্রির কাজ ধরিয়ে দিল। সে কাজের নাটাইয়ের টানে কে যে কখন কোন মাঠে ছিটকে পড়লো তার সন্ধান আর ট্যামাকে করতে হয়নি।
জেলা মিলনায়তনের গা ঘেঁষে যে জলের ট্যাংক দাঁড়িয়ে আছে। তা অনেক পুরনো। আবলুশ কালো স্টিলের তৈরি। সে ট্যাঙ্কের ছায়ায় টুকরির ওপর বীড়া, আর বীড়ার ওপর ওর মাথা এলিয়ে দিয়ে এক দুপুরে ঘুমিয়ে পড়ল ট্যামা। যখন ওর ঘুম ভাঙলো তখন ভরসন্ধ্যা। অসংখ্য বানর আর টিয়ে পাখির কিচিরমিচির ট্যাঙ্কির তল্লাটে। বেশ কয়েকটি বানর ওকে ঘিরে আছে চারদিক থেকে। যদিও নিরাপদ দূরত্বে ওরা বসে। চোখে বিস্ময়। বিস্ময়ভরা চোখে দেখছে আগুন্তককে। বারবার দুহাতে চোখ কচলাচ্ছে। কচলানো হলে ফের বড়বড় চোখে ট্যামাকে যেন যাচাই করছে ওরা। তবে বানরগুলোর কেউই হামলা কিংবা কোনোরকম ঝামেলা পাকাতে আসেনি। আসেনি বলেই ভরসা পেল। নিশ্চিত হলো অন্তত ওরা কোনো ক্ষতি ওর করবে না। সেদিন ওর একা শরীরটা টেনেহিঁচড়ে দূরে কোথাও নিয়ে যেতেও কেন যেন আর মন থেকে সাড়া পেল না। পাইপের পাশে গজিয়ে ওঠা আধমরা দুব্বাঘাসের ওপর থেকে শরীরটা কোনোরকম সরিয়ে নিয়ে পাম্প হাউসের বারান্দায় নিয়ে ঠেকালো। একটি মাত্র শরীর। একটি মাত্র জীবন। তার জন্যে আর কত ভুঁই প্রয়োজন। কোনোরকম শরীরটা কাৎ করতে পারলেই হলো। ভাবে ট্যামা। ভাবনা-মতো শরীর ওর ঠিকই জায়গা করে নিল বারান্দায়। এক সন্ধ্যায় কবির ডেকে বলল, আমি তো একা মানুষ। যদি থাকতো চাও থাকতে পার। তার জন্যে তেমন একটা বেগ পেতে হয়নি। ভেতরটায় আলো আঁধারিময়। তবে রাতে গাঢ় অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ে নিবিড়ভাবে। অবশ্য এখানে বাতাস খেলে সবসময়। নদী থেকে উঠে আসা টাটকা বাতাস। ভেজা ভেজা আবেশও ছড়িয়ে সে বাতাসে। সে বাতাস ট্যাঙ্কির ছায়ার সান্নিধ্যে এসে আরও নির্মল আরও শীতল এবং হিমেল একটা ভাব নিয়ে খেলে বেড়ায় ট্যাঙ্কির তলায় ও চারপাশে। কিন্তু মনে একটুও স্বস্তি নেই ট্যামার। জমাট এক কষ্ট বুকজুড়ে। মন শুধু আনচান করে ভাইবোনগুলোর জন্যে। পথ চলতে চোখ রেখেছে অনেকদিন। খোঁজ পায়নি। অনেককে জিজ্ঞেস করেছে। খোঁজ মেলেনি। এখন আপাত নিঃসঙ্গ শরীরটা এলিয়ে দিলেও ভাইবোনগুলো ঠিকই ওর অন্তরের ভেতর থেকে ঘাঁই মারতে থাকে সদলবলে। সেই ঘাঁইয়ের আঘাত সইতে সইতে কখন যে ওর নিঃসঙ্গ শরীর ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে তা কখনোই আঁচ করতে পারে না ট্যামা ম-ল। কেবল বানরের কিচকিচ আর পাখির ট্যাঁও ট্যাঁও ডাকে ঘুম ভাঙে ওর। ঘুম ভাঙতেই ভাইবোনগুলো যেন কোথায় চলে যায় পাখির দলবলের সঙ্গে। তখন শূন্য বুকে যেমনি ধড়াম ধড়াম শব্দ ওঠে আজও তেমনি এক শূন্যতা নির্দয়ভাবে কামড়ে ধরেছে ওকে। কী এক অজানা আশঙ্কায় জিভ ওর শুকিয়ে যাচ্ছে বারবার। বুকের ভেতর পীড়ন হচ্ছে ভীষণরকম। ভাইবোনরা চলে যাওয়ার পর শূন্য বুকের হাহাকারের সঙ্গে এ হাহাকারের অদ্ভুত এক মিল রয়েছে। মা-বাবা মরে যাওয়ার পর বুকটি যেমনি শ্মশান শ্মশান মনে হতো ওর। কেবল ছাই কেবল পোড়া গন্ধ ওকে অস্থির করে তুলতো। আজও সেই শ্মশান যেন ওর বুকের ভেতর। চিতা জ্বলছে দাউ দাউ করে। ওর শ্মশান বুকের পোড়া গন্ধের জন্যে কিনা সামনের … ?
রাস্তা আজ বড্ড শুনশান। নিশ্চুপ। তেমনি নিশ্চুপ জলের ট্যাংকের বানরগুলো, পাখিগুলো। আজ বেলা হলেও ওরা কেন যেন চুপ মেরে আছে ঠিক বুঝতে পারে না ট্যামা। অথচ ওরা সব দিব্যি জেগে আছে। যেমনি জেগে থাকে অন্যদিন। কিন্তু পার্থক্য শুধু নীরবতা। বেজায়রকম নীরব। কোনো উচ্ছলতা নেই। দৌড়ঝাপ নেই। ছিটেফোটা দুষ্টুমিও নেই। কেবল মাঝেমাঝে বানরগুলো কান চুলকোচ্ছে। পা চুলকোচ্ছে আনমনে। কখনো পা সোজা করে শরীর সটান খাড়া করে দাঁড়িয়ে পড়ছে। তখন লেজও ওদের খাড়া হয়ে যায়। এছাড়া বাড়তি কোনো চাঞ্চল্য নেই। কেমন যেন হাই তুলে ফের চুপ মেরে যায়। পাখিগুলো মাঝে মাঝে জায়গায় বসেই পাখসাট করছে। কখনো ছোট ছোট লাফ দিয়ে এদিক-ওদিক যাচ্ছে। কিন্তু মুখে কোনো রা নেই। শরীরে নেই কোনো চাঞ্চল্য। ওদের আচরণের এমনি পরিবর্তন চোখে পড়ে ঠিকই, তবে বুঝে উঠতে পারে না এর নেপথ্য কারণ। যেমনি বুঝতে পারে না ওর বুকের ভেতর কেন বইছে ঝড়ো হাওয়া। কেন শ্মশানের অত দহন।
এ যন্ত্রণার ভার ও বইছে গতকাল সন্ধ্যা থেকেই। পাহাড় থেকে নেমে আসা পেল্লায় এক পাথর বুঝি ওর বুকে চেপে বসেছে। পাথরে খাঁজ কাটা। একটু ঘষা পেলেই জ্বলে ওঠে বুক অসহ্য এক যন্ত্রণায়। তখন সবেমাত্র জলের ট্যাংকের পশ্চিমের মোটা পাইপটার ওপর এসে বসেছে। তার আগে শেষ বোঝা নামিয়ে দিয়ে ফিরেছে কেবল। ক্লান্তি ওর সারাশরীরে। ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে আছে গাঁয়ের ছেড়া গ্যাঞ্জিটা। তখন ওর চোখ যায় পশ্চিমাকাশে।
সূর্য ডুবে গেছে অনেকক্ষণ। কিন্তু টকটকে লাল রক্তে যেন ভেসে যাচ্ছে পশ্চিমাকাশ। তাজা রক্তের ধারা যেন ছড়িয়ে পড়েছে সারা আকাশজুড়ে। রক্তের ধারা টুপটাপ টুপটাপ করে একটু পরেই বুঝি ঝরে পড়বে আকাশ থেকে। অমন রক্তাক্ত আকাশ দেখে ভীষণ রকম চমকে ওঠে ট্যামা। কোনো ভাগাড় থেকে উড়ে আসা শুকুন এই মাত্তর ওর বুক খামচে ধরেছে। নির্বাক হয়ে অনেকটা সময় ধরে তাকিয়ে থাকে ট্যামা। একাত্তরের আকাশ না? বিড়বিড় করে ওঠে ট্যামার ঠোঁট। পঁচিশে মার্চের সন্ধ্যায় এমনি রক্তভেজা আকাশ দেখেছিল ট্যামা। সে রাতেই পাকিস্তানি সেনারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ঢাকার পথে-ঘাটে। অলিতে-গলিতে। দালানে-বস্তিতে। টার্গেট শুধু বাঙালি। যেখানেই পেয়েছে সেখানেই হত্যা করে। হাজারে হাজারে মানুষ নিশ্চিহ্ন করে দিল কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। কত বস্তি ওর চোখের সামনে পুড়েছে। ছাই হয়ে গেছে মানুষশুদ্ধ। তার চাক্ষুষ সাক্ষী সে তো নিজেই। এরপর ৯ মাস ধরে ওরা কেবল হত্যা করেছে আর রক্ত ঝরিয়েছে। দেশজুড়ে। যেখানেই বাঙালি পেয়েছে সেখানেই ওদের অস্ত্র রক্ত ঝরিয়েছে। ওর মত মুটে-মজুররাও রক্ষা পায়নি। ট্যামা যে এখনও বেঁচে আছে তা আজও ওর কাছে এক বিস্ময়। সে রক্তের ধারা যেন ফের আকাশ ছাড়িয়ে উঠেছে। এ সূর্যের আলো না। এ রক্তের নদী। এ নদীকে চেনে ট্যামা। এ রক্ত দেখে এক বুক হিম করা ভয় নিয়ে গতরাতে ছেঁড়া কাঁথায় পা এলিয়ে দিয়েছিল ও। কিন্তু সে রক্ত ওর পিছু ছাড়েনি। খানিক আগে মনে হয় গত সন্ধ্যায় যে রক্ত গড়াতে গড়াতে ওর পিঠের নিচে এসে জমা হয়েছে। সে ধারার সঙ্গে মিলেমিশে আরও নতুন নতুন ধারায় রক্ত আসছে। সে রক্তের ভেজা আভাস ওর ঘুম কেড়ে নিল এক ঝটকায়। এবং সবকিছু কেন যেন অদ্ভুত রকম বদলে যাচ্ছে। যে বদলে যাওয়ায় কোনো আনন্দ নেই। কেবল ভয়। কেবল আতঙ্ক। কেবল নিঃসঙ্গতা, কেবল রহস্য শুধু হাঁসফাঁস করছে মোটা গুঁই সাপের মতো।
ট্যামার আশ্রয় এ ট্যাংকের তলায় আলো বাতাসের খেলা থাকলেও ট্যাঙ্কির গায়ের রং তো কালো।  নিকষ কালো বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই। এমনিতেই স্টিলের তৈরি। তার ওপর অনেক কালের পুরনো। বিকট আকারে দেখতে। তাকালেই গা শিউরে ওঠে। কেবল বানরের লাফ-ঝাঁপ আর টিয়ে পাখির ট্যাঁ ট্যাঁ শব্দ আছে বলে জায়গাটা ভৌতিক কিংবা আতঙ্কময় কিছু মনে হয় না। প্রাণের এক কোলাহল সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখে জল ট্যাঙ্কের ছায়া তার চারপাশ। ওদিকে পাঁচিল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে অগুনতি নারকেল গাছ। বাতাস খেলে পাতার গায়ে গায়ে। বাতাস দোলে পাতার ভাঁজে ভাঁজে। বাতাস পেয়ে পাতারা আনন্দে খেলা করে। যে আনন্দ ট্যামাকেও ছুঁয়ে যায়। আনন্দ চোখে আশপাশে তাকায় ও আনন্দের যেন শেষ নেই। সকালে ঘুম ভাঙে ওদের ডাকাডাকি, চ্যাঁচামেচিতে। ভাটি সন্ধ্যায় যখন ট্যাংকের আশ্রয়ে ফেরে তখনও ওদের কিচিরমিচির। যেন ট্যামাকে দেখেই ওদের সবটুকু আনন্দ ঝরে পড়ছে। অথচ আজ সকালটায় সব উল্টো। সে আনন্দের কোনো রেশ নেই। খাঁখাঁ চারদিক বিরান সবকিছু। ঝরাপাতার মর্মর। শুকনো পাতার খসখসে শব্দে পথ ভা-ার করুণ সুর। সব তাতেই কী ভীষণ শূন্যতা। মাঝেমধ্যে একটা-দুটো টিয়ের পাখসাঁটের শব্দ কানে আসে। কিন্তু কোনো ডাকাডাকি নেই। বানরগুলোও দু-একবার কিচকিচ করে উঠলেও। কণ্ঠে বিষণœতার সুর। হয়তো বেসুরো কোনো কান্না আর সবদিনের মতো সকালের সেই উল্লাস যেন কোথাও মাটিচাপা পড়েছে।
ট্যাঙ্কির পাশ ধরে বেশ চওড়া একটা রাস্তা চলে গেছে। এখানে এসে রাস্তটি অর্ধচন্দ্রাকৃতির মতো বাঁক নিয়েছে। রাস্তার ওপারেই নদী। নদী এখানে বাঁক নিয়েছে। সে বাঁক ধরেই রাস্তা চলে গেছে দূরে। রাস্তার ওপারেই বালুর গদি, ইটের মোকাম। এবং ঢালজুড়ে পাজা করে ইট সাজিয়ে রাখা হয়েছে। থাকথাক ইট। তারপরেই নদী, নদীজুড়ে অসংখ্য নৌকো। মহাজনী নৌকো। গয়না নৌকো ছাড়াও খেয়াঘাটে পারাপারের লোকজনের ভিড় লেগে থাকে কাকভোর থেকে রাত অবধি। জলের ট্যাংক বাঁয়ে রেখে খানিক এগোলেই খেয়াঘাটের চারদিকে প্রাণচাঞ্চল্যের উদোম হাওয়া। সে হাওয়ায় মন ছুটে যায় নদী ছাড়িয়ে ওপারে। ঢেউ ছুঁয়ে ছুঁয়ে অনেক দূরে। নৌকোর গায়ে নৌকো লেগে আছে। গলুইয়ের গায়ে গলুই খেয়া তরী ভরে যাচ্ছে মুহূর্তে। চড়াৎ চড়াৎ করে বৈঠা পড়ছে। আর নৌকো এগোচ্ছে মাঝ নদী বরাবর। শূন্য স্থানে নতুন নৌকো এসে ভিড়ছে। ফের যাত্রী বোঝাই হয়ে সরে যাচ্ছে সে নৌকো। মানুষের নানা কর্মের যজ্ঞ চলে এ ঘাটে। অথচ সেখানে আজ কেমন এক গুমোট নিস্তব্ধতা।
আর্মেনিয়ান গির্জা আছে কাছে। সেখানেও আজ ভোরে ঘণ্টা পড়েছে কি না ঠিক ঠিক মনে করতে পারছে না ট্যামা ম-ল। পাদ্রীদের আনাগোনাও চোখে পড়ছে না একেবারে।
দীর্ঘদিন ধরে মুটেগিরি করতে করতে ট্যামার ঘাড় বসে গেছে ভেতর দিকে। বাঁ দিকে বাঁকা হয়ে থাকে ঘাড়। সোজা করে রাখা বড্ড কষ্টকর। আজ সে ঘাড় সোজা করে বারবার রাস্তার দিকে তাকাতে চেষ্টা করে ট্যামা। সমস্ত নীরবতা ভেঙেচুরে হঠাৎ একটা নেড়ি কুকুর লম্বা কুঁই দিয়ে ডেকে ওঠে। যেন কী এক কষ্টে কুকুরের বুক ভেঙে আসছেÑ ‘মরার কুত্তা আর ডাক দেওয়ার সময় পাইলি না। ট্যাংকির তলায় আইসেই তোকে মরতি হবে… যা… যা। হুস হুস…’ এমনি নানা শব্দে কুকুরটিকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে ট্যামা। যদিও কুকুরটি আর একটিবারও ডাকেনি কিংবা ডাকার চেষ্টা করেনি। তারপরও কী এক আতঙ্কে ও কুকুরটাকে তাড়িয়ে নিশ্চিন্ত হতে চায়। দুদ- নির্ভাবনায় কাটাতে চায়। কিন্তু কুকুরটির সেদিকে কোনো ভ্রƒক্ষেপ নেই। কেবল পিটপিট করে তাকাচ্ছে আর লেজ নাড়ছে। ওর চোখে মুখে গভীর মেঘের ছায়া। না-কি চোখের কোণে জল!
ত্রিমোহিনী ম-ল নামটি একটু বড়সড় এবং ডাকার জন্যে একটু খটোমটো বটে। তাই বাবা ওকে ডাকতো ত্রিমো-ত্রিমো বলে। মুখে মুখে সে নাম তিমো হয়ে গেল। পরে ওর শরীর কুঁজো হয়ে ঘাড়টা এক পাশে কাঁৎ হয়ে বসে গেলে এবং শেষে কেমন করে ঝড়ে উপড়ানো গাছের গুঁড়ির মতো বেঁকে গেল। তখন তিমো কখন যেন ট্যামা হয়ে গেল। সেই ট্যামা ম-লের বুকে আজ যেন শূন্যতার হাহাকার। ট্যাসে যাওয়া ঘাড়টাকে কখনও উঁচিয়ে, কখনও ঘুরিয়ে বারবার রাস্তার দিকে তাকানোর চেষ্টা করে। আজ বুঝি ট্যামা ওর বসে যাওয়া ঘাড়টিকে ঠিকই টেনে তুলবে। মাঝে মাঝে ঘাড়টাকে চাড়ি দিয়ে চোখ-মুখ ওপর দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তখন মনে হয় নির্ঘাৎ আজ ট্যামা ম-ল ওর বেসাইজ ঘাড়টাকে সাইজে নিয়ে আসবে। ও যেন আজ মরীয়া ওর ট্যামা নামটা ছেঁটে ফেলতে। আসলে কে বুঝবে ওর যন্ত্রণা। একটা আগুনের গোল্লা যেন ওর বুকের ভেতর গড়াগড়ি খাচ্ছে সেই কাকভোর থেকে। এ যন্ত্রণাটাই ওকে আর ঘুমোতে দিল না।
পাম্প হাউসের বারান্দার এক কোণে ওর ছোটমতো এক বাক্স রাখা আছে। কেরোসিন কাঠের বাক্স। বাক্সের কোণায় কাগজে মোড়ানো গুলের কৌটো থেকে বড় করে তিন আঙুলের চিমটিতে এক দলা গুল নিয়ে নিচের ঠোঁট ফাঁক করে সেখানে পরম যতেœ বসিয়ে দিচ্ছিল। আর দুটো চোখের মণি নব্বুই ডিগ্রি কোণায় রেখে বাইরে কী যেন দেখছিল। সামনে বড় একটা গেট। আশপাশ সব পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। তখনই খেয়াল করল দু-তিনটে আর্মি পিকআপ সাঁই সাঁই করে চলে গেল। মেশিনগান তাক করা কাছে। খানিক পরেই একটা কনভয় এসে থামল ট্যাংকির গেটে। নেমেই গেটের তালা ধরে ঝনঝন করে আওয়াজ করতে থাকে এক আর্মি। তর সইছিল না একটুও।
“গেট খোল। গেট খোল।” বলে ঝন ঝন করে ফের আওয়াজ। মাঝে মাঝে বুট দিয়ে শেকলে বাঁধা গেটের দুপাল্লার মাঝখানে লাথি মারছে। কবির তখনও ঘুমোচ্ছে। পাম্পম্যানের দায়িত্বে ও। কিন্তু ওর কোনো সাড়া নেই। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে দুজন আর্মি গেটের চৌকো খোপে পা রেখে গেট টপকাতে যাচ্ছিল। তখনই ট্যামাকে দেখে এক জোরসে ধমক লাগাল আর্মিÑ এই ব্যাটা কি দেখছ। চোখ তো চোখ। চোখের খোল বার কইরা ফালামু। গেট খোল গেট খোল। ট্যামা কোনোরকম ঠোঁট চেপে দৌড়ে আসে গেটের সামনে।
এই শালা কানে শুনছ না। কখন থেইকা হল্লা করতাছি। গেট খুলস না কেন। মতলব তো ভালো ঠেকতাছে না। এই ন্যাটা কাছে আয়। তোর কানপট্টি বরাবর একটা থাপ্পড় পড়লেই তখন ঠিকই শুনবি। বয়রা সাজো? সব বয়রামি কবুতরের লাহান পতপত করে উইড়া পালাবে। ট্যামা ওদের ধমকে গেটের আরও কাছে আসে।
উফঃ শালায় তো নেশা করছে। সারাশরীরে মুখে গাঞ্জার গন্ধ। গেট খোল। গেট খোল। তামাশা দেখো খাড়াইয়া খাড়াইয়া। আইজ তোর নেশার দাঁত তুইলা ফালামু।
ট্যামার পুরো শরীর স্প্রিংয়ের মতো কাঁপছে। আ-মা-র কাছে চা-বি নাই। আমি নেশাও করি নাই।
Ñ নেশার খবর পরে লবো আগে বল্ তালা মারছে কে?
Ñ পাম্পের মানুষ।
Ñ তুই তবে কেডা।
Ñ আমি পোজা বাই। এইহানে রাইত এট্টু আশ্রয় পাই।
Ñ তার মানে তুই ওয়াসার কেউ না।
Ñ না স্যার। এট্টুহানি মাথা গুঁইজা থাকি। ঘরবাড়ি নাই।
Ñ তুই সরকারের লোক না হয়ে সরকারি জায়গায় থাকস? শেখ তার ঘরবাড়ি দেয় নাই! তোর আইজকা খবর আছে বলেই টপাটপ গেট পেরিয়ে ভেতরে লাফিয়ে পড়ল ওরা। নেমেই কে একজন হাত ঘুরিয়ে এক চড় কষালো ট্যামার গালে। এমনিতেই ছোটখাটো শরীর। সেভাবে খাওয়াও জোটে না আজকাল। তখন চড়ের ধকল আর সামলাতে না পেরে পাঁচ-সাত হাত দূরে গিয়ে ছিটকে পড়ে ও। এমনিতেই গুলের রস জমেছিল মুখে। সে রস বিজলের মতো ওর সারামুখে ছড়িয়ে পড়ে। এবার ওর কোমর বরাবর লাথি দেয়ার জন্যে যেই পা তুলেছে এক আর্মি, তখনই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসতে দেখে একজন লোককে। বয়েস পঁয়ত্রিশ। গায়ে সান্ডোগেঞ্জি। শত চেষ্টায়ও লুঙ্গির গিঁট খুলে যাচ্ছে বারবার। পায়ে রাবারের চপ্পল। ওকে আসতে দেখে পা নামিয়ে নেয় আর্মি। কাছে আসতেইÑ
তুই কে?
আমি কবির, পাম্পম্যান। কান্না আর ফোঁসফোঁস শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দে অদ্ভুত এক শব্দ হচ্ছিল কবিরের নাক ও মুখ গলে।
বলতে না বলতেই ওর কান বরাবর এক থাপ্পড় এসে পড়ে। দুই মণ ওজনের থাপ্পড় যাকে বলে। হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে কবির। দাঁত বসে যায় ওর জিভে। কলকল করে রক্ত বেরুতে থাকে ওর মুখ গলে।
এতক্ষণ গেট খুললি না ক্যান। কোন মাগীর সঙ্গে ফস্টিনস্টি করছিলি?
স্যার আমি অনেক রাতে শুই। এত বড় ট্যাঙ্কি ভরা হইলে তবে শুইতে যাই। অনেক ভোরে পানি ছাড়তে হয়।
আজকে পানি ছাড়ছত?
অহনও টাইম অয় নাই। পনর মিনিট লেট আছে।
লেটের খেতাপুরি। এহনি পানি ছাড়। শেখের যুগ শেষ। মনে রাখবি কেউ যেন পানির জন্য কষ্ট না পায়। যদি শুনি কেউ পানি পায় নাই তবে তর খবর আছে। বলেই বন্দুকের নল ওর বুকে তাক করে। ভয়ে আতঙ্কে ছড়ছড় করে পেশাব করে দেয় কবির।
এ দেখে আর্মিগুলো হো হো করে হেসে ওঠে। প্রাণ খোলা সে হাসি। যেন পাকআর্মিদের প্রেতাত্মা ওদের বুকে বসে আছে।
যা এবার গেট খোল। বলে ঘাড় ধরে গেটের দিকে ঠেলে দেয় কবিরকে। কবিরের কোমরে বাধা কায়তনের সঙ্গে ইয়াবড় এক চাবির ঝোপা। চেনা চাবিটা খুঁজে পেতে আজ যেন ও কেনো বারবার খেই হারিয়ে ফেলছে। একটার পর একটা চাবি ধরে। হাতে নেয়। তালা খোলার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না।
এটা-না
ওটা-না
তৃতীয়টা-না
পরেরটা-না
তার পরেরটা-না
আরও একটা-না।
না, চাবি কোনোটাই ফিট করছে না। তালাও খুলছে না। এক আর্মি এবার দাঁত কিড়মিড় করে পেছন থেকে এক লাথি কষায় কবিরের পাছায়। আচমকা লাথিতে ওর মুখ গেটের লোহায় থেতলে যায়। মুহূর্তে কপাল ট্যামা হয়ে ওঠে। এবার নাক দিয়েও রক্ত ঝরতে থাকে। নিজেকে ধাতস্ত করে বড্ড করুণ দৃষ্টিতে একবার তাকায় কবির। এবার ঠিকই মিলে যায় চাবি। “শালার হারামখোর। এগুলারে কেমনে শায়েস্তা করতে অয় দেখলেন? অহন ঠিকই চাবি বার হয়। আসলেই মাইরের উপরে অসুধ নাই।” বলেই সহকর্মীদের দিকে তাকিয়ে বিদঘুটে এক হাসিতে ওর ঠোঁট ভরে ওঠে। সে হাসি দেখে তখন ট্যামার মনে হয় মানুষকে ভয় দেখানোর জন্যে এমন হাসি শেখাতে বুঝি ওদের ট্রেনিং দেয়া হয়। কী হাসি রে বাপ, আত্মা খাঁচা ছাইড়া যাওনের জোগাড়!
গেট খুলতেই আর্মিগুলো কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে ফের ফিরে আসে। কাছে ডাকে ট্যামাকে। তারপর পাছায় হালকামত এক লাথি ঝেড়ে কান ধরে বাইরে নিয়ে যায় ওকে। দূর থেকেই কবিরকে উদ্দেশ্য করে বলে, এই নাটা যেন আর ভিতরে না ঢুকে। যদি ঢুকছে তোর খবর আছে। মনে রাখিস এইডা সরকারি জায়গা। আবোল তাবোল কাউরে ঢুকাবি তো জানে মাইরা ফালামু। আর মনে রাখবি মানুষের যাতে পানির জন্য কোনো কষ্ট না হয়। যদি খবর পাই মানুষ পানির জন্য কষ্ট পাইতাছে, তাহলে বুঝুম তুই মুজিবের দালাল। তখন মুজিবের যে পরিণতি সেই একই পরিণতি হইবে তোরও।
গেটের বাইরে গিয়ে রাস্তায় কুকুরের মতো দাবড়াতে দাবড়াতে অনেক দূর তাড়িয়ে দিয়ে আসে ট্যামাকে। রাস্তায় মানুষজন নেই বললেই চলে। আরো কয়েকটা আর্মির জিপ সামনে পেছনে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে। তবে জিপগুলো শূন্য। আর্মিরা নেই। কোথাও গিয়েছে হয়তো।
সুড়কির টিলার ওপর একটা ছাতা তখনও মেলে আছে। জরিনা ও সখিনা দুবোনে মিলে এখানে ইট ভেঙে খোয়া বানায়। রোদকে আড়াল করার জন্য খোয়ার মাঝখানে এক বাঁশের লগি পুতে তার সঙ্গে ছাতি বেঁধে রাখে। কিন্তু গত রাতে ওরা কেন যেন ছাতিটা নিতে ভুলে গেছে। ছাতির ছায়ায় গিয়ে বসে থাকে ট্যামা। থাপ্পড় খেয়ে তখনও ওর মাথা হেলদোল করছে। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে। তবু কোথাও একটু জলের দেখা নেই।
অনেকটা সময় ঝিম মেরে থাকে ট্যামা। একে একে সে খানিক আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো মনে করছে। তখনও সবকিছু স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে ওর। মুজিবের যুগ শেষ! ‘কী কয় হালার পুতেরা।’
কাউকে যে জিজ্ঞেস করবে কিছু এমন কাউকে চোখে পড়ছে না। আলু, পেঁয়াজ, আদা, কুমড়োর বড় বড় মোকামগুলো সব বন্ধ। এমনকি চান মিয়ার হোটেলটাও আজ খোলেনি। তবে হোটেলটার পেছনে কারিগররা সব থাকে ম্যাস ভাড়া করে। ওদিকে যাবে কী একবার! কিন্তু আশপাশে তাকাতেই ওর চোখ ছোট হয়ে আসে। বুক শুকিয়ে তেজপাতা। তখনও একটি কনভয়, একটা জিপ দাঁড়িয়ে। হঠাৎ ভেতর দিকের বিভিন্ন বাসাবাড়ি থেকে বেশকিছু লোকজন ধরে নিয়ে আসে ওরা। বয়েস সবার বিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে। কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখে ওদের কনভয়ের সামনে। এরপর আরও কয়েকজনকে ধরে এনে সবাইকে সারবেঁধে কনভয়ে তোলে। তোলা শেষ হলে ঝুমঝুম শব্দ করে কনভয় চলে যায় বাঁকের আড়ালে কোথাও।
‘একাত্তরে পাকসেনারা গেলগা তয় এরা কারা? পাকসেনাগো মতোই তো হম্বিতম্বি করলো। নাকি পাকসেনাগো ভূত আইল?’ বিড়বিড় করে স্বগোক্তি করে ট্যামা ম-ল। কী কইল হালারা, শেখের বেটার যুগ না-কি শেষ। মাত্থা খারাপ। নেশা করছে না তো! ঢাকা ভার্সিটির ময়দানে না আজ শেখ বেটার ভাষণ দেওনের কতা। রাতের শেষ বোঝাটা নামিয়ে ফেরার সময় ঠাটারি বাজারে পার্টি অফিসের সামনে দেখেছে অনেক লোকের হল্লা। তাদের অনেকের মুখে শুনেছে। আরও শুনছে ‘দুইডা বোমা নাকি ফুটছে গুলিস্তানে না কোনহানে। কানে ঠাডা পড়ার মতো শব্দ। তব্দা লাইগা গেছে কান।’
কখন যেন আর্মির গাড়ির দুটো চলে গেছে। এখন আর্মির কোনো গাড়ি আর দেখা যাচ্ছে কোথাও। এ ফাঁকে ইটখোলা থেকে রাস্তায় উঠে আসে ট্যামা ম-ল। তখনই দেখে গেটের ওপারে বেশ খানিকটা দূরে কবির দাঁড়িয়ে। ঠোঁটমুখ ফুলে আলু। ট্যামাকে দেখেই ও একবার আকাশের দিকে হাত তোলে আবার দুহাত নেড়ে কী যেন বোঝাতে চেষ্টা করছে। একবার দুহাত ওর বুকে ঠেকায়। আবার সে হাত ঝাড়তে থাকে। ভেজা হাতের জল যেভাবে ঝেড়ে ফেলে, ঠিক সেভাবেই।
ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় ট্যামার। ‘অর্ধেক তো মইরেই গেছি। আর অর্ধেক মরতে কতক্ষণ, না হয় মইরেই যাব।’ বলেই এক দৌড়ে জলের ট্যাঙ্কের গেটের সামনে এসে দাঁড়ায় ট্যামা। তখনও বেশ কিছুটা দূরে কবির দাঁড়িয়ে। ও চোরা দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক একবার তাকিয়ে একরকম কুঁজো হয়ে গেটের কাছে চলে আসে। কপালে ওর পুরু বলিরেখা। চোখের মণি দুটোয় বড় অস্থিরতা। ও কাছে এসে ফিসফিস করে বলে, বঙ্গবন্ধু নাই! কণ্ঠ কেঁপে ওঠে, কেঁদে ওঠে ওর।
‘পাগলের কতা নাকি!’ ট্যামার কণ্ঠে বিস্ময়। ‘বঙ্গবন্ধুর গাঁয়ে টোকা দিবার ক্ষমতা আছে এমন বাপের পুতের জন্ম অহনও বাংলাদেশে অয় নাই।’ ট্যামার গলায় অদ্ভুত এক ঝাঁজ ফুটে ওঠে। ‘তুই অহনও স্বপ্নে আছত ট্যামাÑ বঙ্গবন্ধু নাই। মাইরা ফালাইছে।’
কেডায় কইল তরে?
রেডিও তে?
রেডিও তে? কী কইল!
শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। আরও কত কী? বারবার কইতাছে। ডালিম নামে এক মেজর এট্টু পরপরই কইতাছে। ট্যামার তখন ইচ্ছে হলো কবিরের ঘরে গিয়ে শোনে খবরটা। কিন্তু গেটে আরও কয়েকটা পেল্লায় সাইজের তালা ঝুলতে দেখে চুপ মেরে যায় ট্যামা। ওর বুক তখন হাঁপরের মতো উঠছে নামছে। ওর খেয়াল হয় পাশের ইশকুলের গেটেও তালা। অন্যদিন এ সময়ে মেয়েদের হৈচৈয়ে রাস্তায় কানপাতা দায়। সেসঙ্গে রিকশা, ঠেলা, ঘোড়াগাড়ির জ্যাম। বেলের টুংটাং। ঘোড়ার চিঁহি চিঁহি ডাক। সহিশের অশ্লীল খিস্তি। সবকিছু মিলিয়ে এ জায়গাটায় জগাখিচুড়ি পাকিয়ে থাকে সেই সকাল থেকে।
না আজ কোনো ভিড় নেই। কোনো রিকশা নেই। গেট খোলা নেই ইশকুলের। দারোয়ানটাকেও দেখছে না কোথাও। সবকিছু কেমন উল্টোপাল্টা লাগছে। তবে কী…। ট্যামা আর দেরি করে না। চাঁন মিয়ার হোটেলের পাশের গলি ধরে ভেতরে চলে যায়। সেখানে গিয়ে দেখে ম্যাসের সবাই রেডিও ঘিরে কান পেতে কী যেন শুনছে। “আমি মেজর ডালিম বলছি। স্বৈরচারী সরকার শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে…” ট্যামা চুপ করে বসে পড়ে মেঝেতে। দু-হাঁটুর ফাঁকে মাথা গুঁজে গুমরে গুমরে কাঁদতে থাকে। ওর কান্নায় গভীর এক বিষণœতা ঘরের সবাইকে যেন চেপে ধরে।
বিকেলে নদী পাড়ে এসে বসে ট্যামা। একমনে ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। চুক! চুক! চুক! চুক! শব্দে ঢেউয়ের পরে ঢেউ চলে যেতে থাকে ভাটির দিকে। ঢৈউয়ের এ শব্দ ভীষণ চেনা ওর। কেমন একটা ছন্দ খুঁজে পায় ও। কখনও মনে হয় ঢেউগুলো কী যেন কথা কয়ে কয়ে যাচ্ছে। অথচ আজ সে শব্দে কী এক কান্নার সুর বাজে। অনেকক্ষণ খেয়াল করেছে ট্যামা। করুণ রাগিণী বাজছে নদীর জলে। একমনে সে ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে হয় ট্যামার, জলের রং লাল। শুধু লাল নয়। রক্ত লাল! একটু আগেও জল ছিল ঘোলা। পরে এখন ফিকে রং ছিল একসময়। গভীর লাল আবির যেন ছড়িয়ে পড়েছে সে জলে। রক্ত না তো! বারবার চোখ কচলায় ট্যামা। ফের জলের দিকে চোখ রাখে। নাহ লাল। উৎকট লাল রং জলের। চোখ ভুল দেখছে না তো। হঠাৎ কী মনে করে আকাশের দিকে তাকায় ও। পশ্চিমাকাশে সূর্য এখনও বেশ উপরে। নামতে আরও বেশ খানিকটা সময় নেবে। খেয়াল করে আজকের আকাশ এখনও সেভাবে রক্তিম হয়নি। যেমনটি হয়েছিল গত সন্ধ্যায়। তাহলে আজ জল এত রাঙা কেন? ট্যামা আজলা ভরে জল হাতে নেয়। কিন্তু সে জলে কোনো রক্তের ছোঁয়া নেই। ফের নদীর জলে তাকায়। কী অসহনীয় রক্তিম সে জল। বড্ড পবিত্র,  নির্মোহ আর নিরাশক্ত মনে হয় সে রক্ত ধারা। রক্তের মধ্যে কোনো অভিমানের ছায়া নেই। এমনটিই ঘটবে। এভাবেই বুঝি পুরস্কৃত করবে দুখিনি বাংলার দুখি বাঙালিরা, তাই কোনো বিস্ময় নেই সে রক্তের ধারায়। এ রক্তের প্রবহমানতা চলবে অনন্তকাল ধরে।
পুরো শরীরে বড় রকমের এক ঝাঁকুনি খায় ট্যামা। কী মনে করে চারদিকে খুব বড় বড় চোখ করে তাকায় ও। না কোথাও একটিও নৌকো নেই। কার্গোগুলো স্থবির হয়ে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেছে কী এক অজানা আশঙ্কায়। একটি লঞ্চেরও ভেঁপু বাজেনি আজ সারাদিন। বুকের মধ্যে ভয়ানক এক শূন্যতা অনুভব করে ট্যামা। উঁইয়ের ঢিবির মতো খসখসে কী যেন ওর অন্তরের গভীরে মাথা তুলছে একটু একটু করে। ওই ঢিবির আড়ালে চাপা পড়ে ওর শ্বাস-প্রশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছে।
এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে যায় ট্যামা। একছুটে জলের ট্যাঙ্কের গেটের সামনে চলে আসে কী মনে করে। কত দিনের পুরনো ঠাঁই। ছিন্ন করা কী এত সহজ। মা গেল। বাবা গেল। ভাইবোনগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেল একসময়। সেই থেকে একা মানুষটির সঙ্গে এই জলের ট্যাংকের গাঁটছড়া। তা তো আজকের কথা নয়। বিয়ে থা করেনি বলে জীবন থেমে আছে ওর মধ্যেই। তা না হলে বউ ছেলে-মেয়ে নিয়ে সংসার এক চাতাল সমান বড় হয়ে যেত। একটি মাত্র জীবন। তাই তেমন আর নাড়াচাড়ার প্রয়োজন পড়েনি। বিশেষ করে ট্যাংকের এ আশ্রয়, এ জল এর ছায়া এবং এর বানর আর টিয়ে পাখির সঙ্গে ওর দীর্ঘদিনের যে সখ্যতা তা ওই মিলিটারির বেটাদের এক ধমকেই শেষ হয়ে যাবে? ট্যামা ট্যাংকের ভেতরের দিকের পাঁচিল কালো কালো মোটা সব পাইপ, সবই তো আগের মতোই আছে। কিন্তু কোনো চাঞ্চল্য নেই। নিথর, নীরব, বিমর্ষ ওরা। যেন ওদের রক্তেমাংসে গড়া কোনো শরীর নয়। মাটির গড়া প্রতীমা সব বসে আছে থাকে থাকে। টিয়েগুলোরও একই দশা। কিংকর্তব্যবিমূঢ় ওরা। কিংবা ভেতরে প্রাণ নেই। উড়তে বোধহয় ভুলে গেছে জনমের মতো।
গেটের শিক ধরে অনেক সময় অপলকে তাকিয়ে থাকে জলের ট্যাঙ্কের দিকে। একসময় ফিস ফিস করে বলে, বান্দর, ক-তো, শেখের বেটা বাইচে আছে না মইরে গেছে। বানরগুলোর কোনো সাড়া নেই। একেবারে মৌন। চুপচাপ।
ও-টিয়া, ক-তো, শেখের বেটা বাইচে আছে না মইরে গেছে। টিয়ারাও নিঃশব্দ। কোনো সাড়া মেলে না ওদের কাছ থেকে।
‘শেখের বেটারে মারি ফেলবে এমন বুকের পাটা কার? শেখের বুক হচ্ছি গে পাহাড়ের লাহান। ও বুকে বুলেট ঢোকে না। ফিরে আসবি সমান গতিতে। ওর বুকে কেউ বুলেট ঢোকানোর চেষ্টা কইরলে সে বুলেট উল্টো তার বুকে এইসে বিঁধবে। এ কথা জানে। হ¹লে জানে। সারা দেশজোড়া মানুষ জানে। তারপরও কার বেটার সাহস হবে শেখের বুকে গুলি করে। পাকসেনারা সাহস করেনি যারে গুলি কইরতে। আইউব পারে নাই। ইয়াহিয়াও পারে নাই। কব্বর খুঁইড়াও পারে নাই তারে গুল্লি করতে। সেই শেখের বেটারে অহন গুল্লি করবো কোন খানকির পুত। সেই বেজন্মার পুতের জন্ম অয় নাই অহনও বাংলাদেশে। কি টিয়া হাছা কইলাম না মিছা? কতা ঠিক কি না টিয়া? এবারও টিয়ারা নীরব।
কি বান্দর? আমার কথায় কি বিশ্বাস অয় না। অয় না বিশ্বাস? বানরগুলোও নীরব। একইরকম মৌনতার ধ্যানে ওরা মগ্ন।
বানরের কাছ থেকে, টিয়ার কাছ থেকে কোনোরকম সাড়া না পেয়ে, জেদ ধরে যায় ওর মনে, ওরে পুঙ্গির পুতেরা, কতা কস্ না ক্যান্! তবে কী আমি মিছে কথা বইলছি। তখনই সাঁই করে একটা মিলিটারি জিপ চলে গেল উত্তরে। কেমন খ্যাপাটে গাড়িটার চালচলন। যেন পাগল হয়ে ছুটছে। দ্বিগবিদিক জ্ঞানহারা হয়ে ছুটছে। সে শব্দে পেছন ফিরে তাকাতেই ওর চোখ থমকে যায়। বুক কেঁপে ওঠে অজানা কোনো আশঙ্কায়।
রক্তাক্ত আকাশ। পশ্চিমে তাকালে শুধু রক্তের ঢেউ চোখে পড়ে। প্রতিদিনই সূর্য ডোবে। কিন্তু ডুবন্ত সূর্য কখনও এভাবে রক্ত ছড়ায় না। গতকাল আর আজ যা ঘটল তার সঙ্গে একাত্তরের ২৫ মার্চ সন্ধ্যার সূর্য ডোবার এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পায় ট্যামা। একাত্তুরের সন্ধ্যায় যেমনি রক্তগঙ্গার ছবি মিছে হয়নি। ঠিকই রাতে রক্ত ঝরেছে হাজার হাজার মানুষের। আজও কেন যেন মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি রক্ত ঝরার আলামত এটা। তবে কী শেখের বেটা ঠিকই মাটি নিয়েছে। চোখে বইজে ফেলেছে? কোনোভাবেই বিশ্বাস হয় না। এ সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু লোককে পথ চলতে দেখা যায়। কেউ কেউ পায়চারি করছে উদাসভবে। দু-একজন জটলা পাকালেও গাড়ির শব্দ পেলেই এদিক-ওদিক ছড়িয়ে যাচ্ছে। কেউ হারিয়ে যাচ্ছে এঁদো গলির কোনো অন্ধকারে। তখনই কবির এসে এক ফাঁকে জানিয়ে যায়, আসলেই বঙ্গবন্ধু নাই।
কেমতে বুঝলি।
আকাশবানি থেইকাও কইছে।
আকাশবানিডা আবার কী?
ভারতের রেডিও স্টেশনের নাম। সরকারি রেডিও। অগো কথা মিছা না। না জাইনা তারা খবর দেয় নাই।
ট্যামা ট্যাংকের পাঁচিলের গায়ে ঠেস দিয়ে বসে পড়ে। দুহাতে কপাল চেপে ধরে বসে থাকে অনেকক্ষণ। অস্ফুটে বলতে থাকে, ‘এতক্ষণ ভাবছিলাম সব যেন মিছা হয়। ডালিম মিছা অয়। মিলিটারির জিপ মিছা অয়। রেডিওর কথা মিছা অয়। অহন আর কোনো ভরসায় কমু শেখের বেটা মরে নাই। কবির কইল, আকাশবাণী মিছা কথা কয় না।’
ওর চোখ গলে জল ঝরেছে অনেকটা সময় ধরে। ট্যামা একটুর জন্যেও ওর কান্নার কণ্ঠ চেপে ধরার চেষ্টা করেনি। সব বাঁধন আলগা করে দিয়ে দলা দলা কান্নাদের জল হয়ে বেরিয়ে যাবার পথ তৈরি করে রেখেছে ট্যামা। সে ধারায় বুকের পাষাণ অনেকটা যেন নেমে গেছে। বেশ হাল্কা বোধ হচ্ছে এখন নিজেকে। ওর দুচোখের তলায় জলের ধারা শুকিয়ে খসখসে কেমন এক দাগ পড়েছে। পথের ওপারে অপলকে তাকিয়ে থাকে ট্যামা। গভীর এক ধ্যানে ডুবে আছে ও। হঠাৎ মনে হয় মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে নদীর পাড়ে। কখনও আবার মনে হয় মানুষটা পায়চারি করছে। মুখে পাইপ। গভীর চিন্তায় মগ্ন। ট্যামা বারকয়েক চোখ কচলায়। ভুল দেখছে না তো! কিন্তু না তেমনই দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। শাদা পাঞ্জাবি পরা।
ট্যামার ভেতর থেকে সব অর্গল যেন খসে পড়ে। কথার খেই হারিয়ে ফেলে। ‘শেখের বেটা শেখ। আপনে কই যাইবেন আমাগ রাইখা। আপনি কি খালি দেশের নেতা! আপনে আমাগও নেতা। আপনে এই এলাকার এমপি। আমাগ ভোটে নির্বাচিত হইছেন। আমরা আপনারে ভোট দিয়া এমপি বানাইছি। আপনে আর যাবেন কই। এই নদী এই বালু মহাল, এই ইটের ভাটা, পাজা পাজা ইট সবই তো আপনার। অগো মালিকেরা সবাই আপনেরে ভোট দিছে। পাস করাইছে। আপনি এই এলাকার এমপি। ভুইলা গেলে তো চইলবে না।’
এ জীবনে তিন-তিনবার শেখের বেটার ভাষণ একেবারে কাছ থেকে শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল ট্যামার। একবার ৭ মার্চ, রেসকোর্স ময়দানে। একবার ’৭০ সালের নির্বাচনের সময় ধুপখোলার মাঠে। আরেকবার ’৭৪ সালে বানের সময়। দেশের বাড়িতে। ত্রাণ দিতে গিয়েছিল ওদের গ্রামে। আর একটা ভাষণ শুনেছে রেডিওতে। সত্তুরের নির্বাচনের আগে। জাতির উদ্দেশে নির্বাচনের আগে শেষ ভাষণ। সেসব স্মৃতি মনে করে ট্যামা বলে, ‘বাঘের বাচ্চাডারে মাইরা ফালাইল! বাঙালি হইয়া বাঙালির সিংহডারে মাইরে ফালাইল! অই হারামখোরের পুতেরা, তোদের বুকটা একটুও কাঁপে নাই! নির্ঘাৎ অজ্ঞান কইরে তারপর গুলি করিছে শুয়রের ঘরের শুয়ররা। সিংহ, বাঘ, চিতা, নেকড়ে সবটারে এক কইরলে যে শক্তি অইবে, এক শেখে তার চেয়ে বেশি শক্তি রাখে। এ কথা কাজী মতিন কইছে। বাস্তুহারা লীগের নেতা কাজী মতিন। বঙ্গবন্ধু ওরে রেডিও বিবিসি কইয়ে ডাকতো! হেই বাগডার বুকের সামনে খাড়াইয়া ওর গায়ে গুলি করা অত সহজ কাম না!’
হঠাৎ তার এ কথার প্রতিধ্বনি শুনতে পায় ট্যামা ম-ল। সিংহের মতো গর্জন করে কে যেন বলছে, ‘কঠিন কাজটাই খুব সহজেই করতে পেরেছে ওরা। তুমি বিশ্বাস করবে কি না জানি না। ওরা আমার বুক বরাবরই গুলি করেছে। আমার বুক ঝাঁঝরা হয়ে গেছে বাঙালির বুলেটের আঘাতে। ওরা পেরেছে। খুব সহজেই ওরা আমার বুকে গুলি চালাতে পেরেছে ট্যামা।’ হঠাৎ ও সম্বিৎ ফিরে পায়।
একরকম কুঁজো হয়ে ছুটতে ছুটতে রাস্তার ওপারে যায়। না কেউ নেই। কোথাও কেউ নেই। এমনি সিংহ কণ্ঠে দেয়া শেখের বেটার ভাষণের কথা ছেঁড়া ছেঁড়া হয়ে কানে ভাসে ট্যামার। “কৃষকদের প্রভুরা সকল সহায় সম্পত্তি আর সম্পদের মালিক। সব সুবিধা তারা ভোগ কইত্তেছে। অগো সহায় সম্পত্তি শুধুই বাইত্তেছে। আর অসহায় দরিদ্র কৃষক দিনদিন আরও দরিদ্র হইত্তেছে। বাঁচার তাগিদে তারা অহন গ্রাম ছাইড়ে শহরে চলি আইসতেছে।” মিছা তো কয়নাই। একটা কথাও তো মিছা কয় নাই শেখের পুত। বাংলার মীর জাফরদের তো শেখের বেটা তো ঠিকই চিনতে পাইরেছিল। তাইলে এতবড় ষড়যন্ত্রের ডিনামাইট কারা পুঁইতেছিল তা কেন ধইরতে পারলে না মুজিবর। আমাগ এমপি তুমি। তোমার কণ্ঠের সে কী তেজ। মাটি কাঁইপে ওঠে। কান ফাইটে ওঠে। তুমিই তো বইলেছিলে রেডিওর ভাষণে, বাংলার মীরজাফরদের কথা। তুমিই তো বইলেছিলে মীরজাফরদের কারণে আইজ আমাদের গায়ে কাপড় নাই। থালায় ভাত নাই। মাথার ওপর আশ্রয় নাই। তাই তো খালের ধারে রেলের ধারে থেইকা উচ্ছেদ হইলাম। অহন পানির ট্যাংক থেইকা, সরকারি জায়গা থেইকাও উচ্ছেদ হইলাম। আশ্রয় তো আর পাইলাম না শেখের বেটা। এখন তুই যে চইলে গেলি, তাইলে আশ্রয়ডা আর কেডায় দিবে। কার দিকে আর পথ চাইয়ে থাকব। তুই তো ভরসা ছিলি। তুই তো ঠিকই কইলি বাংলার ইতিহাস মানে সিরাজদ্দৌলা বনাম মীরজাফরের ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস দুখিমানুষ বনাম মোনেমখাঁদের ইতিহাস। রেডিওতে কইছিলি। মনে আছে তোর? শুনছি তুই কারওরে ভুলস না। একবার দেখলে তার নাম। বদনখানি ঠিকই চিনতে পারস। আমরাও তোর ভাষণের কতা ভুলি নাই। ভুলি ক্যামনে। আমাগ প্রাণের কতা ভুলা যায়!
তাহলে তুই কেনে এমন ভুল করলি শেখের বেটা। শত্রু চিনাও তারে পুষলি। দুধ-কলা দি পুষলি। অহন তো ছোবল মারল ঠিকই। আশ্রয় ছিল না বইলে আমার তো কোনো দুঃখ ছিল না কখনও। কোনো অভিযোগ তো ছিল না! একা মানুষ। ট্যাংকির ছায়ায় খারাপ তো আছিলাম না। টিয়া, বান্দর এরা আমার সন্তানের মতো। আমারে ওরা দেইখা রাখতো। চোখে চোখে রাখতো সবসময়। আমিও অগো মায়া করি। অগো হৃদয়ডা অনেক বড়। অনেক অনেক বড় তোমার মীরজাফর আর মোনেমখাঁদের মতো বাঙালিদের চেইয়ে। ওরা অই ট্যাঙ্কির ওপরে থাকে না। অগো আত্মার লগে আমার আত্মার বাধি ফালাইছে, ওরা আমার আত্মীয়। সন্ধ্যা হলি পরে ওরা আমার জন্য পথ চাইয়ে থাহে। আমি ঠিকই বুঝতে পারি। ট্যাংকির ভেতরে পা রাখতেই আমি বুঝি ওদের মনের কথা। ওরা খুশিতে মুহূর্তে চিঁচি ট্যাঁ ট্যাঁ করে এতবড় ট্যাংকি ডারে মাথায় তুইলে ছাড়ে। প্রেম! গভীর এক প্রেম আমার সঙ্গে ওদের। কিন্তু বাঙালির প্রেমে যে অনেক বিষ ছিল তা আমরা না জানলেও তুমি তো ঠিকই জেইনেছিলে মুজিব। তারপরও…।
বলে দু-হাতে বুক চাপড়াতে থাকে ট্যামা। বাঁধনছেঁড়া কষ্ট। বুক যেন ভেঙে পড়বে এক্ষুণি। অনেকে ওকে জাপটে ধরে। অনেকে আশ্বস্ত করে মাথায় হাত বুলিয়ে। কেউ বলে মিলিটারি আসতেছে। গুলি করবে ট্যামা। তোর বুক বরাবর গুলি করবে। এ কথায় আরও বুক চিতিয়ে দাঁড়ায় ও। এবার দুহাত প্রসারিত করে বুক উঁচিয়ে দাঁড়ায় ট্যামা। ঘাড়টা কাৎ হয়ে থাকে। সে ঘাড়টাকে সোজা করার চেষ্টা করে বারবার। আর কেমন এক খিঁচানি দিয়ে বলে, ডাকো তোমার মিলিটারি। দেখি কয়ডা গুলি কইরতে পারে। গুলিতেও শান্তি কিন্তু মীরজাফরদের এই বিজয়, মোনেমখাঁদের এই উল্লাস আমি সহ্য কইরতে পাইতেছি না। কোনোভাবেই পাইতেছি না। মৃত্যু চাই। মৃত্যু পরোয়ানা হাতে ওরে তোরা কেউ আয় না আমার কাছে। দেরি কচ্ছিস কেন। মৃত্যু বড় সহজ। এই দেশে মৃত্যু বড় সহজ। যুদ্ধে মানুষ মরেছে। আন্দোলনে মরেছে। এখন মরেছে শেখের বেটা নিজেই। তফাৎ কেবল একটাই। ওরা মইরেছে পাকসেনাদের হাতে। শেখ মইরেছে বাংলা সেনাদের হাতে। ওর দুঃখী বাংলার পোলাপানের হাতেই।
ও মুরুব্বিরা, ও দাদারা মীরজাফরের এই দেশে, মোনেমখানের এই দেশে আমার আত্মা কেন যেন আর শান্তি পাচ্ছে না। আমি শান্তির দেশে যাব। আমার নেতার কাছে যাব। আমার এমপির কাছে যাব। নির্বাচনের কালে গলা ফাটাইয়া কত ক্যানভাস কইরেছি। মিছিল কইরেছি আমর নেতার জন্য ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’। বলেই দুহাত তুলে নাচাতে নাচাতে মাথাটা হঠাৎ ঢলে পড়ে ওর। এ খবর ওর প্রিয় টিয়ে পাখিরা, ওর প্রিয় বানরেরা জানে কি না কে জানে। তবে ওদের জীবনযাপনে যে বধিরতা, মৌনতা আর শূন্যতা নেমে এসেছে তা বোধহয় অনেক অনেক দিন বিমর্ষ করে রাখবে এই জলের ট্যাংকের তল্লাট। এর ছায়া এর আশপাশ। লঞ্চের ভেঁপুতে ওদের চিত্তে কোনো চাঞ্চল্য আর জাগবে কি না কে জানে। যদিও জাগে সে অনেক অনেক দিন পরে। যেদিন মানুষ বলবে একদেশে আছিল এক শেখের বেটা। শেখ মুজিব ওর নাম। পাহাড়ের লাহান। দুখি বাংলার জন্য জীবন দিয়েছিল। পঞ্চান্ন বছরের জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন জেল খেটেছিল। তবু আপস করে নাই মীরজাফরদের সঙ্গে। কবির শোনে ট্যামা যেন বলছে :
লোকে আরও বলবে মৃত্যুর পরও ওর আত্মা যায় নাই। সাত আসমান উপরে যায় নাই। সাত আসমান কী, এক আসমানেও উঠে নাই। মাটিতেই আছে। ট্যাকের ঝোপে, খালে-বিলে, মাটিতে। পাহাড়ের পাথরের খাঁজে খাঁজে, ঝোপঝাড়ে, চরের বালুতে, আলু গাছের লতা-পাতায়, গাঙশালিকের গর্তে কোথায় সে নাই?  এত বছর পরও ওর আত্মা ঘোরে ধানের সবুজ বিচালি ছুঁয়ে। নদীর জলে সাঁতার কাটে। নৌকা বায়। লাঙল চষে। আর দুখি মানুষদের দেখে চোখের জল ফেলে। মুজিব যাবে কোণে। বাংলার মাটি ওরে ছাইড়বে না। কোনোদিনই ছাইড়বে না কবির। চোখ বুজলি ওরে দেখতি পাবি। চোখ খুললি পরে ওরে দেখতি পাবি। তবে যে সে চোখে দেখলি পরে তারে দেখা যাবে না। প্রেমের চোখে দেখতি হবে। ভালোবাসার চোখে দেখতি হবে। তোরা তো জানস না, প্রেম আর ভালোবাসা দিয়াই শেখের শরীর, ওর রক্ত গইড়েছে খোদায়। গুল্লি মাইরা শরীর মারা যায়, দেহ ফেলা যায়। কিন্তু প্রেম-ভালোবাসারে তুমি গুল্লি করবা কেমনে। নিরাকার ভালোবাসার কোন অঙ্গে অদেখা প্রেমের কোন শরীরে গুল্লি করবা! বুকে প্রেম শরীরে ভালোবাসা জড়াইয়া শেখ ঠিকই এই বাংলার জলে, মাটিতে, আকাশে, পাখির নীড়ে, পাখির নরম ডানার ভিড়ে।

শ্রেণী:

তিন বিল্লি গেলাম দিল্লি

Posted on by 0 comment
8-6-2018 7-38-41 PM

8-6-2018 7-38-41 PMনিয়ামত শাহ: রম্য রচনার প্রতীকী প্রয়োজনে আমরা তিনজন হয়ে গেলাম তিন বিল্লি। ক’দিন আগে গিয়েছিলাম দিল্লি।
কেন? কেন? প-িতি ভাষায় ‘কার্যকারণ কী’?
শুঁটকি। শুঁটকি। বাংলাদেশে আমরা ২০০৭ সনের ১১ জানুয়ারি থেকে ডাইরেক্ট শুঁটকি থেকে বঞ্চিত। এই শুঁটকি পাওয়ার জন্য কত কী যে করলাম। কত ম্যাঁওয়াও। কত ঘ্যাঁওয়াও। নখদন্ত। আঁচড়। হ্যাঁচোর প্যাঁচোর। মনুষ্যভাষায় আগুনে বোমা, জ্বালাও পোড়াও, অবরোধ, চালক-যাত্রী আগুনে পুড়ে খাক করে দেয়া। আরও কত কী। বিদেশি দূত বিল্লি, স্বদেশী ‘সুশীল’ মার্জার, মিডিয়া টাইকুন ভেলকি। তবু হায় মেলেনি শুঁটকি।
২০০৮। ২০১৪। শুঁটকি মিলল না অনেক ম্যাঁওয়াও কাইজার পরও। পদ্মাসেতু আটকাবার সব ফন্দিফিকিরও ফক্কিকার হয়ে গেল। আমাদের গোত্রপ্রধানা বললেন, পদ্মাসেতুতে কেউ উঠবেন না। ওটা জোড়াতালি দিয়ে বানানো। ভেঙে পড়বে। একেবারে একটি সেতু কোনো জোড়া না লাগিয়ে তৈরি করবার নির্মাণ বিজ্ঞান পৃথিবীতে কোথাও নেই। তাই বিশ্ববিজ্ঞানীরা মুচকি হাসেন। হাসুক।
এখন চাই শুঁটকি। যে করেই হোক শুঁটকি চাই। ২০১৮-১৯ এর পর্বে আমাদের যে ক্ষমতা নামক শুঁটকি ছাড়া কোনো উপায় নেই। আর পারি না।
আমাদের দেশি-বিদেশি ‘চিন্তাপুকুর’ মহামতিবৃন্দ এক হলেন। এখন কী করা যায়। সবশেষে এই ঠিক হলো দিল্লির মহাবিল্লিরা আমাদের দেশের শুঁটকি ব্যাপারটিতে যেহেতু একটা কিছু, অতএব সেই দিল্লিওয়ালা মহাবিল্লিদের দিল ভিজানো ছাড়া গতি নেই। ‘চিন্তাপুকুররা’ অনেক ভেবেচিন্তে আমাদের তিন বিল্লিকেই দিল্লিতে হাজিরা-নজরানা দেবার জন্য ঠিক করলেন।
হায় হায় কী করি! কী করি!! কেননা শুঁটকির আন্তর্জাতিক আর আঞ্চলিক হিসাবে আমরা যে অনেক জট পাকিয়ে ফেলেছি। একসময় বলেছি এদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাসিন্দাদের আজান, নামাজ, কোরআন কিছুই থাকবে না যদি শুঁটকির তহবিলদারি আমাদের হাতে না থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চলে যাবে দিল্লির হাতে।
২০০১ সনে শুঁটকির তহবিলদারি আমাদের হাতে তুলে দিতে দিল্লিও অনেক আশা করে যোগ দিয়েছিল পশ্চিমা মহা মহা বিল্লিদের সাথে। গ্যাস দেবার কথা দিয়েও হিম্মত হলো না আমাদের। বরং দিল্লিরাজকে আউলা-ঝাউলা করতে জাহাজে-ট্রাকে করে বিপুল অস্ত্র সেঁধিয়ে দিলাম ওদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। তদুপরি ওদের দেশের একজন সর্বদলীয় গণ্যমান্য রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মোলাকাত করার দিন-তারিখ-সময় অনেক আগে থেকেই ঠিক করার পরও তুচ্ছ অজুহাতে দেখা করলাম না। কূটনৈতিক ভাষা কী জানি না, এ যে এক বিশাল থাপ্পড়সম। কার বুদ্ধিতে গোত্রপ্রধান এমন অকা-টা করলেন, সেই ‘চিন্তাপুকুরে’ কারা কারা হাবুডুবু খেতেন তখন জানি না। সেই যে আমাদের মুখ পুড়ল, আর ভবি ভুলল না। ২০১৪ সালে শুঁটকির গন্ধ পেয়ে পেয়েও হঠাৎ পপাত ধরণীতল।
এইসব পটভূমি তো সবারই জানা। দিল্লির পিঠ-চাপড়ানিতে ২০০১ সনে শুঁটকি-মহাজন হয়েও ‘বেইমানি’ করার দায়ে পড়েছি এই বেকায়দায়। এখন আমরা মুখপোড়া বিল্লি প্রজাতি। ‘চিন্তাপুকুর’ ক’জনা বললেন, বাস্তব মেনে নিতে হবে। অতএব পোড়ামুখের লজ্জা নিয়েই রওনা হলাম দিল্লি।
পোড়ামুখে ঘষামাজা পেইন্ট মেকাপ করে অবশেষে হাজির হলাম দিল্লির মহাম্যাঁওয়াওদের নানা দফতরে। সামনের পদযুগলকে হাতজোড় করে আমরা তিনজনই একযোগে মৃদু মিউঁ মিউঁ মিনতিতে ভেসে গেলাম। শুঁটকি চাই। যে করেই হোক আপনাদের মন পেতে চাই। এই দেখুন সামনের ডান পায়ে বাঁ কান ধরি, বাঁ পায়ে ডান কান ধরি। ভুল হয়ে গেছে। বেয়াদবি করেছি। শুঁটকি পেয়েও বেইমানি করেছি। আপনাদের মহামান্যকে অপমান করেছি।
দিল্লিওয়ালারা অতঃপর বললেন : তোমাদের ওখানে কে শুঁটকির ভার পেল না পেল তা আমাদের ব্যাপার নয়। কিন্তু শুঁটকি পেয়েই যে তোমরা আমাদের স্বার্থে আঁচড় কাটো সেখানেই তো বড় গ্যাঞ্জাম। যে আঁচড় কেটেছ তার দাগ শুকাতে দাও। আমাদের পড়শির সাথে গোপন লেনদেন আর নয়। এবং ধৈর্য ধরো। ধৈর্য ধরো। সবুরে শুঁটকি মেলে।
কাকুতি মিনতি করলাম। আর কতাসবুর করিব, হে মহাম্যাঁওয়াও জন, আর কত? সহিতে পারিতেছি না। গোত্রপ্রধান কারাগারে। ইহার একটি হিল্লা করুন। গোত্র যুবরাজ আজ শরণার্থী হইয়া লন্ডনে নানাবিধ লণ্ঠন জ্বালাইতে জ্বালাইতে অধীর অস্থির হইয়া পড়িয়াছে। দেশে খুন খারাবি আগুনের মামলা সামলাইতে সামলাইতে হাজার হাজার আমাদের অনুসারীরা দম ফেলিবার ফুরসৎ পাইতেছে না।
দিল্লিওয়ালারা কহিলেন, ভাবিয়া করিও কাজ। করিয়া ভাবিলে দ্রুত সমাধান হইবে না। দেশি-বিদেশি যাহাদের তালে নাচিয়াছ, তাহাদের কাছে নারিকেল মার্কা শুঁটকির সন্ধান করিতে পার। তবে শুনো, আগের দুনিয়া নাই। আগের হিসাব নাই। তোমরা দুনিয়ার বড় বড় হিসাববিদ ভাড়া করো। অধীর হইও না। জঙ্গি দিয়া আমাদের নিরাপত্তাকে উসকাইও না। ভালা হইয়া যাও। অতঃপর আমরা ভাবিব। তোমাদের গোত্রপ্রধানা কারাগারে? আর তোমরা? প্রতিপক্ষকে ঝাড়ে বংশে ১৯৭৫ সনে শেষ করিয়াছ। ২০০৪ সনে অবশিষ্টদের শেষ করিবার নৃশংস কারবার করিয়াছ। তোমরা তোমাদের ইতিহাসের মহত্তম ব্যক্তির মৃত্যুদিনকে তোমাদের গোত্রপ্রধানার মিথ্যা জন্মদিন বানাইয়াছ। শুঁটকির তহবিলদারি পাইয়া বেসামাল হইয়া গিয়াছ।
অতঃপর আমরা কী করিলাম জানেন হে পাঠক।
দিল্লির দরবারে আমরা ভেউ ভেউ কাঁদিলাম, অশ্রুপাত করিলাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অবশেষে উহারা আমাদের পৃষ্ঠদেশ চাপড়াইয়া দিল সান্ত¦নার ভঙ্গিতে।
আর তুষ্ট সেই পৃষ্ঠদেশ তিনটি দেশে ফিরে ‘চিন্তাপুকুর’দের দেখালাম। ওরা দেখলাম চিন্তাকে গভীরতর করতে পুকুরে নতুন করে ড্রেজিং যন্ত্রপাতি নামিয়ে দিল।
এই হলো আমাদের দিল্লি সফরনামার ইতিবৃত্তান্ত।

বি. দ্র. : ১৯৫৪ সনে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের মঞ্চে গাওয়া গীতটির একাংশ স্মরণ করুন :
সকল খোপের কইতর (কবুতর) খাইয়া,
চলছে বিড়াল হজ্বে ধাইয়া।

শ্রেণী:

রুটি ও মাতৃভূমির কুরসিনামা

Posted on by 0 comment
aa

aaআলমগীর রেজা চৌধুরী: ঘুটঘুটে অন্ধকার। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ওর ছায়া দীর্ঘ হয়। বিপরীত দিক থেকে হেঁটে আসে একটা নেড়ে কুকুর। শরীরে দগদগে ঘা, লোমগুলো উঠে গেছে। মুখ দিয়ে লালা পড়ছে। কুকুরের ছায়াও দীর্ঘ হচ্ছে। কারফিউর মতো নির্জন রাস্তায় ওর চলার শব্দ কুকুরটির শব্দ ‘ঘেউ’ ছাড়া শব্দহীন সরণিতে এগোতে থাকে। ওর ছায়া অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। এখন অন্ধকার। বিকট শব্দে শম্ভূগঞ্জ ব্রিজ দিয়ে ট্রেন ছুটে যায়। আজ আকাশে তারার মেলা বসেছে। কালপুরুষ বেশ বীরদর্পে পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সপ্তর্ষীম-ল সুখেই মিটমিট করছে। ওর কিছুই মনে পড়ে না। বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া ক্লান্ত হোমোসেপিয়েন। দূরে শম্ভূগঞ্জের গায়ে অন্ধকার। কোনো পিদিমের আলো জ্বলে না। হেঁসেলের ধোঁয়া নজরে আসে না। এত তাড়াতাড়ি সব ঘুমিয়ে গেল!
এত শান্ত গ্রাম! ধনচে গাছ আড়াল করে জল বরাবর চোখ বুলাতে থাকে ও। কতক্ষণ। কৃষি বিশ্বদ্যিালয়ের দিকে সিগনাল দিচ্ছে নীলাভ আলো। বলাশপুরের দিকে কনভয় ছুটে চলার বিকট শব্দ ভেসে আসে। প্রায় এক ঘণ্টা জেগে ওঠা চরের মধ্যে বসে আছে। সাহেব কোয়াটার, সার্কিট হাউসসহ নদীর পাড় ঘেঁষে সারি সারি বাংকার। কামানসহ অন্যান্য ভারী অস্ত্র নাক বরাবর তাক করা।
একটা টুস শব্দের সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার গুলি ছুটে আসবে। ও ঘড়ির দিকে তাকায়। আট সতের। হঠাৎ ওর মনে পড়ে, হাতে কাপড়ে পেচানো আগ্নেয়াস্ত্র অত্যন্ত মারাত্মক। এটা হাতে নিয়ে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় হেঁটে আসা ঠিক হয়নি। এসকে হাসপাতালের কাছে ছোট একটা ট্রুপস অ্যামবুস করেছে। নদীপথে এসে যেন বটতলার এই বিপদসংকুল রাস্তায় সরাসরি ঢুকে গেরিলা আক্রমণ করতে না পারে। পেছন দিক থেকে কেউ ‘হল্ট’ বললেই ধরা পড়ে যেত। নইলে গোলাগুলির মধ্যে পরে বেঘোরে প্রাণ হারানো ছাড়া উপায় ছিল না। হঠাৎ করে ওর গায়ের লোম কঁাঁটা দিয়ে ওঠে। শিড়দাঁড়ায় বয়ে গেল শৈত্যের হলকা। এই বোকামিটা করা ঠিক হয়নি। কমান্ডারকে বলা যাবে না। জাবেদকে বলা যাবে। কিন্তু এখনও আসেনি। আদৌ আসবে কি না! তারও ঠিক নেই। আসলে না হয় প্ল্যানমাফিক এগোনো যাবে। না এলে? আবার এতটা পথ মাড়িয়ে কমান্ডারের নাগাল পাওয়া দুষ্কর। সকালের দিকে দুবলাকান্দা পুলিশ ফাঁড়ি আক্রমণ করার কথা। সিগারেটের তৃষ্ণায় কণ্ঠ কাঁপছে। জ্বালানোর উপায় নেই। নিñিদ্র অন্ধকারে হঠাৎ আলো ভয়ঙ্কর। সহজে টার্গেট করে। ছুটে আসে একঝাঁক মেশিনগানের গুলি। ওরা প্রশিক্ষিত। মিস হয় কম। নান্দিয়াপাড়ার সৈয়দ আলী এভাবেই ঝাঁঝরা হয়েছিল। তারপর সবাই সতর্ক। অন্ধকারে মিশে থাকতে হবে। আলোতে নয়।
জুন মাসের গুমোট গরমে ঘামছে ও। আবার আকাশের দিকে তাকায়। তারার মেলা। কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকারে নক্ষত্রের মুখ জ্বলজ্বল করছে। তৃষ্ণা পেয়েছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এখান থেকে ২০০ গজ দূরে ব্রহ্মপুত্র কলকল করে বয়ে যাচ্ছে। ভারী বর্ষণ হলে গারো পাহাড়ের ঢলে ব্রহ্মপুত্রে জোয়ার বইবে। ও এখানে বসে জাবেদের জন্য অপেক্ষা করছে, তাও তলিয়ে যাবে অথৈ জলে। স্রোতের কলকল ধ্বনি, বাঁকে বাঁকে ঘূর্ণনের গোত্তা মেরে দু’কূলে ভাঙনের গান গেয়ে বয়ে যাবে। ট্রিগার ধরে অত্যন্ত সন্তর্পণে ও ব্রহ্মপুত্রের দিকে এগিয়ে যায়। জলের কিনারায় অস্ত্র রেখে আজলা ভরে পানি পান করে। শীতল পানি নাকে-মুখে ছিটকা মারে। আবার সেই ধনচে গাছের ঢিবির কাছে এসে জাবেদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।
ঘড়িতে এখন পৌনে ৯টা। জাবেদের পাত্তা নেই। জাবেদ না এলে ওর করণীয় কী? ইত্যাকার ভাবে। হ্যান্ডব্যাগে দুটো গ্রেনেড আছে। যা বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য ওদের মিশন। জাবেদ এলেই কাজটা সম্পন্ন করার ভাবনা করা যেত। মশা, ডাঁশ, ওলা পোকার বিস্তর উৎপাত। নাকে-মুখে হিচকা পড়ছে। তারপরও ও স্থির বসে থাকে। রাত পোকাদের গুঞ্জরণে পৃথিবীকে শব্দহীন করে দিয়েছে।
মাস তিনেক আগেও অন্ধকারকে ভয় ছিল। সাপের ভয়, ভূতের ভয়, মানুষের ভয় মিলিয়ে আঁধার আতঙ্কের মধ্যে যার পৃথিবী, সেই কি না চার মাইল অন্ধকার মাড়িয়ে কেওয়াটখালী পাষাণবেদী বাঁয়ে রেখে এখন ব্রহ্মপুত্রের চর ভেসে ওঠা ধনচে বনে আশ্রয় নিয়েছে একা। একাকী। ভয় শব্দটা এখন ওর মধ্যে বিরাজ করে না।
বরঞ্চ উন্মত্ত হিংস্রতা বসতি গেড়েছে। ওর হাতে স্টেনগানের মতো মারাত্মক মারণাস্ত্র। যার প্রতিটি কার্তুজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক একটি মানুষের প্রাণ। না, ও মানুষ হত্যা করতে চায় না। জীবনকে তুল্যমূল্য করে পশু হত্যা করতে চায়। যারা অন্ধকারে ঝাঁপিয়ে পড়ে সবুজ প্রান্তরজুড়ে রক্তের হলি খেলায় মেতে উঠেছে, তাদের সঙ্গে ফয়সালা না করে ফিরে যাবার পথ নেই। মৃত্যু নইলে স্বাধীনতা। নিরীহ পিতামাতা থেকে অবোধ কিশোর হত্যা করে যারা, তাদের জন্য কোনো অনুকম্পা নয়। ওকে কোনো অনুকম্পা করেনি। হাজার হাজার পাকিস্তানি আর্মি এই চর পর্যন্ত ছুটে আসছে। হায়েনার মতো দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে এই শ্যামল প্রান্তরজুড়ে।
হঠাৎ ওর মনে পড়ে, ‘এ দেশের শ্যামল রং রমণীর সুনাম শুনেছি।’ ও ঈষৎ মুচকি হাসে। কবি, রমণীরা সব সম্ভ্রম রক্ষায় পালিয়ে বেড়াচ্ছে, এসব খবর কি রাখেন? দরকার কি? এই সুন্দর তো তোমার। মহাকাব্যিক দার্শনিকতা। আহারে শ্যামল রমণী! মাতৃকূল। তোমার জন্য বিরল এই প্রান্তরে ট্রিগারে আঙ্গুল রেখে অপেক্ষা করছি। একটি বুলেট নাক বরাবর ছুটে যাবে। আবার আরেকটি বুলেট আমার দিকে ফিরে আসবে। কী চমৎকার! তুমি ভাবতে পারো? রক্তের মহাজন সেজে বসে আছি।
ঠিক এ সময় ক্ষীণ পদশব্দ। ও মাটির সঙ্গে দেহ মিশিয়ে অপেক্ষা করে। জাবেদ না অন্য কেউ? ঢিবিটার অতি কাছে হেঁটে যায় জাবেদ। জলের সঙ্গে ওর দেহের ছায়া মিলিয়ে ডাক দেয়, ‘পুটটুস’। থমকে দাঁড়ায় জাবেদ। তড়িৎ উত্তর দেয়, ‘টুকু’।
কাছে এসে ধপাস করে ধনচে গাছে পিঠ রেখে শুয়ে পরে। ক্ষীণ কণ্ঠে বলে, ‘জানে বেঁচে গেছি, প্রায় জীবনটা গেছিলো।’ টুকু উত্তর দেয়, ‘আমারও। বোকামি করে ফেলেছিলাম। আমিও।’
টুকু ঘড়ির দিকে তাকায়। প্রায় ১০টার কাছাকাছি। ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে।
‘আমার ক্ষুধা পেয়েছে।’
‘তোর জন্য রুটি এনেছি।’
‘দে।’
জাবেদ কার্তুজের ব্যাগ থেকে একখ- বনরুটি বের করে দেয়।
কোনো কিছু জিজ্ঞাসা না করে টুকু রুটি খেতে খেতে জলের নিকট হামাগুঁড়ি দিয়ে এগোতে থাকে। ক’ আজলা জল খেয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করে। যেন কতকাল ধরে ও এখানে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রস্রাব শেষ হতে চায় না। জলের গায়ে দু-একটা নক্ষত্র। তার আলোয় মাছ কিলবিল করে।
জাবেদ ডাক দেয়, ‘টুকু’।
ডাকও যেন শব্দহীন। জাবেদের কণ্ঠ ভরা সত্ত্বেও ওর কণ্ঠ রাতের পাখির ডাকের মতো শোনায়। টুকু বুঝতে পারে। এই বুঝতে পারার বয়স দু-মাস হয়নি। টুকু আবার হামাগুঁড়ি দিয়ে জাবেদের কাছে ফিরে আসে।
‘এখন?’ টুকু প্রশ্ন করে।
‘অপেক্ষা।’
‘কার জন্য?’
‘মতি ভাই আসবে।’
‘কখন?’
‘জানি না।’
ধনচে গাছে গায়ের শার্ট বিছিয়ে স্টেন জাপটে ধরে টুকু বলে, ‘আমার ঘুম পাচ্ছে।’
‘তুই ঘুমা। আমি অপেক্ষা করি।’
‘শত্রু এলে তুই একা কি করবি?’
‘গুলি করতে করতে ব্রহ্মপুত্রের জলে হারিয়ে যাবো।’
‘ওরা আসবে না। ভীতু। রাজাকাররাও আসবে না। ওরা ভয় পায়। ওরা নিরীহ মানুষ হত্যা করে। মুক্তিযোদ্ধার নাগাল পায় না।’
‘তা ঠিক।’
ঠিক এক মিনিটের ভেতর টুকু ঘুমিয়ে যায়। ওলাপোকা একটানা ডেকে যাচ্ছে। দূরে কোথাও শেয়ালের হুক্কাহুয়া ভেসে আসছে। শম্ভূগঞ্জের ব্রিজের পাশেই পাষাণবেদি। এখন শেয়াল-কুকুরের মহোচ্ছব চলছে। গুলিবিদ্ধ বঙ্গসন্তানের নাড়িভুঁড়ি নিয়ে ওরা মহাসুখে আছে। তাই রাতের নিস্তব্ধতা খানখান করে ডেকে ওঠে। ওটুকুই। এ নিয়ে জাবেদ ভাবতে চায় না। প্ল্যান করে এগোতে হবে। কমান্ডার যেভাবে বলেছেন, সেভাবেই। চুল পরিমাণ এদিক-সেদিক হবার জো নেই। ভুলটা করেছিল ও। মণিকাকে খুঁজতে যাওয়া ঠিক হয়নি। দিনমজুরের কেমোফ্লেক্স ঠিক ছিল। কিন্তু কাপড়ের ব্যাগে রাখা স্টেনগান-কার্তুজ-ব্যাগ অত্যন্ত বিপজ্জনক। চ্যালেন্স করলেই আটকে যেত। ধরা পড়লেই নির্ঘাত মৃত্যু। সশস্ত্র শত্রুকে কেউ বাঁচিয়ে রাখে না। ও নিজেও রাখবে না।
বড় সড়ক ক্রস করে গলির মাথায় দাঁড়ায়। তখন এদিকটায় বিদ্যুৎ ছিল না। গতকাল কেওয়াটখালি পাওয়ার স্টেশনে হামলা হয়েছে। ভয়ঙ্কর রকেট ল্যান্সার দিয়ে হামলা। তিনটা ইউনিটের মধ্যে একটা পুরোপুরি বিধ্বস্ত। শহরে লোডশেডিং চলছে।
গলি পেরিয়ে মণিকাদের বাড়ির আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে ছিল কতক্ষণ। ঘুটঘুটে অন্ধকার। ভেতরে জনমনিষ্যির আঁচ পাওয়া যায়। অনেকটা বেদিশার মতো মণিকার বাবা অ্যাডভোকেট ত্রৈলঙ্গর গোস্বামী বাড়ির টপ-বারান্দায় উঠে আসে। সতর্ক পদক্ষেপ, নিশব্দ পদচারণা, সজাগ কান শুধুই অশুভ ইঙ্গিত করতে থাকে। তারপরও মণিকার পড়ার রুমের বদ্ধ জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ইতিউতি ভাবতে থাকে। ভেতরের মানুষগুলোর কণ্ঠস্বর অচেনা। গোস্বামী কাকা তো না! অন্য কেউ। নারীকণ্ঠ আছে। মণিকা বা মাসীমার নয়। অন্য কারও।
নানারকম চিন্তা মাথায় কাজ করতে থাকে। হিসাব মতে মণিকাদের থাকার কথা নয়। পঁচিশ মার্চ ক্র্যাক ডাউনের পরপর ওরা এ বাসা থেকে সটকে পরেছে। শহরে দুবার বিমান হামলার পর গোস্বামী কাকা মণিকাদের আর এ শহরে রাখা নিরাপদ মনে করেনি। এখানে মনে হয়, তার সিদ্ধান্ত সঠিক। এ দেশে আর মানুষ বাস করতে পারে না। দখলদার দস্যু আর ফুঁসে ওঠা রাগী যুবকের মুক্তির ‘জয় বাংলা’র গেরিলা।
তারপরও কেন যে মণিকাকে খুঁজতে এলো, তা ও নিজেই জানে না। কেষ্টপুর দিয়ে পাস হওয়ার কথা ছিল। পুরবী’র দুলাল ভাইয়ের কাছ থেকে গ্রেনেড নিয়ে চর ধরে টুকুর কাছে পৌঁছানোর কথা।
‘এ বাড়ির মালিক ইন্ডিয়ায় গেছে গা। আমরার দহলে আছে। বাড়ি আমাগো। পাকিস্তান সরকার লেইক্কা দেব।’
ওর মনে হয় মণিকাদের বাড়ি বেদখল হয়ে গেছে। মণিকার সঙ্গে আর দেখা হবে না। ভাবতে ভাবতে নারকেল গাছের আড়ালে আবার চলে আসে। ঠিক এ সময় বিদ্যুৎ এলো। দু-একটা বাতি জ্বললেও ল্যাম্পপোস্ট প্রায় ৩০০ গজ দূরে। এদিকে অন্ধকার ছেয়ে আছে। খুব সহজে বের হয়ে যাওয়া যাবে। ঠিক এ সময়ে জিপ ছুটে এলো গলির মুখ থেকে। ধামধাম করে ওপাশের আমগাছের গোড়ায় দুজন পাক আর্মি নেমে আসে। পেছন থেকে দুজন রাজাকার। মুখ বাঁধা প্রায় বিবস্ত্র এক নারী, রাজাকাররা ওকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। দ্রুততায় গোস্বামী কাকার টপ-বারান্দায় উঠে যায় ওরা। অনেকটা টেনে-হেঁচড়ে মেয়েটাকে জাপটে ধরে ডাক দেয়, ‘মানিক স্যার আইছে।’ খুঁট করে দরজা খোলার শব্দ হয়। ওরা ঢোকার পরে আবার দরজা বন্ধ হয়ে যায়। ও নারকেল গাছ আড়াল করে স্টেনগান লোড করে, অপেক্ষায় থাকে। জিপ একলা আম গাছের গোড়া বরাবর। বের হওয়ার উপায় নেই। জিপে ফৌজি থাকতে পারে। ঘড়ির কাঁটা এক সেকেন্ড করে এগিয়ে যেতে থাকে। দু-একবার ঐ নারীর আর্তনাদ শুনেছে। তারপর থেকে অপেক্ষা করছে। ওর কিছুই শুনতে ইচ্ছে করে না।
ওই কাতর নারীর কথাও মনে হয় না। অপেক্ষা করে। অপেক্ষারত জিপটা নিথর। ড্রাইভারসহ হয়তো গোস্বামী কাকার বাসায়। ও অপেক্ষা করে। ওরা চারজন, অভাগী নারী, বাড়ির দখলদার। মোট ছয়জন। ও ভাবে লোডেড কার্তুজ ২৮টা। এক ম্যাগাজিন একস্ট্রা। ৩টা গ্রেনেড। দুঃখী নারীকে বাদ দেয়। ওর বেঁচে থাকবার দরকার নেই। ও এই পৃথিবীতে সব অধিকার খুইয়েছে। ব্রাশফায়ারে মরে গেলে ক্ষতি কি? বাকি পাঁচজনকে অন্ধকারের এত নিকট থেকে…। সাত-পাঁচ ভাবে। সাহস হারাতে থাকে। একটু এদিক-সেদিক হলেই বিপদ। মৌডালের ঝোঁপ পেছনে রেখে উঠে দাঁড়ায়। এদিক দিয়ে দ্রুত বেরোবার পথ আছে। মসজিদের পাশ ঘেঁষে ধানক্ষেত দিয়ে বড় রাস্তা ক্রস করে বেরিয়েই নদীর পাড়। ধনচের আড়ালে আড়ালে টুকুর কাছে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। টুকু অপেক্ষা করছে। হঠাৎ করে ওর ভয়ানক সিগারেটের তৃষ্ণা পায়। মণিকাকে মনে পড়ে। এম কলেজে মণিকা ওর সহপাঠী। কলেজ থেকে পূজাতে দল বেঁধে এ বাড়িতে এসেছে। হৈচৈ করে বাড়ি মাতিয়েছে। গোস্বামী কাকা বেশ শিক্ষিত মানুষ। কন্যার বন্ধুদের প্রতি স্পষ্ট পক্ষপাত দেখিয়েছে। মণিকা সাদামাটা তরুণী। বুদ্ধিদীপ্ত ক্লাসের সবাই মণিকাকে মনে রাখতে চায়। অথচ আজ মণিকা কি জানে, কি ভয়ঙ্কর সময়ের মুখোমুখি ও। ওর বিছানায় ধর্ষিত হচ্ছে বঙ্গললনা। একজন অপেক্ষা করছে মৃত্যুর ওপারে। ওর মনে হয় ক্যাচ করে বেয়নেট ঢুকিয়ে দিল। দরজা খুলে টপ-বারান্দায় এসে দাঁড়াল চারজন। একজনের হাতে সিগারেট। ‘আচ্ছা হ্যায়, মান্তা হ্যায়’ এই জাতীয় বাতচিতের মধ্যে ও স্পষ্ট দেখতে পায়। ও অপেক্ষা করে। ট্রিগারে আঙুল। আরও একজনের জন্য অপেক্ষা করে। সে বেঁচে থাকার অধিকার হারিয়েছে। ও অপেক্ষা করে। ঠিক এ সময় পঞ্চম লোকটি বের হয়।
‘পা-মুখ বাইন্ধা আইলাম।’
ঠিক এ মুহূর্তে আঙুলে চাপ পরে। ঠা-ঠা শব্দ চারদিক প্রকম্পিত করে তোলে। ধপাধপ ৫টি দাঁতাল গোস্বামী কাকার টপ-বারান্দায় লুটিয়ে পড়ে। ও ১০ সেকেন্ড অপেক্ষা করে। তারপর মৌডাল আড়াল করে অন্ধকারে মিশে যায়। বড় রাস্তায় কনভয় ছুটিয়ে পাকসেনারা এদিকে আসছে। ও তখন দড়াইখাল পেরিয়ে বলাশপুর পৌঁছে গেছে। এ সময় একবার মনে হয়েছিল স্টেশন কোয়ার্টারে শোয়েব সিদ্দিকীর বাসার কথা। ওর বাবা গার্ড সাহেব। স্টেশন সংলগ্ন কলোনিতে থাকে। বড় ছেলে শোয়েব সিদ্দিকী এপ্রিল থেকে লাপাত্তা। শোয়েব ওর বন্ধু। সবাই জানে। প্রয়োজনে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ আছে। পুত্র শোকার্ত ওর মায়ের মুখ মনে পড়ায় কষ্ট পায়, কি জবাব দেবে?
তারপর অনেক কাঠখড় পেরিয়ে টুকুকে আবিষ্কার করা। টুকু এখন ঘুমুচ্ছে। স্টেনের ম্যাগাজিন খুলে পরিষ্কার করে। এই ম্যাগাজিনের ১৪ কার্তুজ পাঁচ দানব খেয়ে ফেলেছে। মনে মনে হাসে। আহারে বেচারারা!
এখনও এক ম্যাগাজিনসহ ১৪টা কার্তুজ আছে। গ্রেনেড আছে ৩টা। ও এখন মতি ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করবে। ঘড়ির দিকে তাকায় ১১টা ২৭। দূরে শম্ভূগঞ্জের চটকলে অসংখ্য বাতি জ্বলছে। জলের রেখায় বাতির ঝিলিক।
ওর মনে হয়, এতক্ষণের মধ্যে লাশগুলোসহ ওই নারীকে আরেক জিপে তুলে নিয়ে গেছে। অথবা সহযোগী হিসেবে বেয়নেটের খোঁচায় হৃদপি- এখন এফোঁড়-ওফোঁড়। তাহলে কেউ বাঁচতে পারেনি! পূর্বাপর ঘটনাটি ভাবতে থাকে জাবেদ। এক ইস্টু পাঁচ। মুচকি হাসে। পাঁচ ডেড বডি দেখে কি প্রতিক্রিয়া দাঁতালদের। পাগলা কুত্তা! ভাবনার মধ্যে মণিকাকে মনে পড়ে, পড়বেই তো। মণিকার জন্য। প্রিয় মণিকা, তোমার বিছানায় ধর্ষিত নারীর প্রতিশোধ নিয়েছি। তুমি কি খুশি হও নি? আমি এখন মাতৃভূমির সৈনিক। মাতৃভূমির কন্যা-জায়া-জননীর জন্য…।
মশা-ডাঁশ ছেঁকে ধরেছে। টুকু মাঝে মাঝে হাত নাড়ছে। শরীর ক্লান্ত। তারপরও তন্দ্রা আসছে না। জাবেদের মনের মাঝে তড়পাতে থাকে। হুটহাট ৫টি গুলিবিদ্ধ মানুষ গোস্বামী কাকার টপ-বারান্দায় পড়ে গেছে। ওর জন্য এ এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। এত কাছ থেকে শত্রু নিধনের আনন্দই আলাদা। ওর বুক ভরে উদ্বেলিত আনন্দ। প্রকাশ করতে পারে না। টুকুকে বলা যেত। টুকু ঘুমাচ্ছে। সড়সড় শব্দে দু-একটা শেয়াল শন খেতে ঢুকে পড়ে। হুক্কাহুয়া ডেকে ওঠে। জাবেদ শুধু কান খাড়া করে থাকে, কখন মতি ভাই আসবে? ওর হঠাৎ করে আজিজুল হক স্যারের কথা মনে পড়ে। স্যার এম কলেজে বাংলা পড়ান। অসাধারণ বাগ্মী।
রবীন্দ্রনাথের শত শত কবিতা তার মুখস্ত। কি তার উচ্চারণ! সুমিষ্ট। এখনও কানে লেগে আছে। তার সঙ্গে শেষ ক্লাস ১৩ জানুয়ারি। এরপর আর দেখা হয়নি। উত্তাল বাংলাদেশ। হঠাৎ করে মণিকার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘এই মেয়ে, নাজিম হিকমতের নাম জানো?’
মণিকা অসহায়ের মতো মাথা নাড়ে।
‘তুরস্কের কবি। মাতৃভূমির প্রতি ইঞ্চি মাটির প্রতি দায়বদ্ধ সচকিত কণ্ঠস্বর। কবিতা লেখার অপরাধে জেল-জুলুমসহ মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত কবি। ভ্রাম্যমাণ জীবন নিয়ে শুধু মাতৃভূমিকেই মনে রেখেছে। নারীর চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছে, ‘তুমি আমার কোমল প্রাণ মৌমাছি, চোখ তোমার মধুর মতো মিষ্টি।’ লিখেছে, ‘দড়ির একপ্রান্তে মৃত্যু, সে মৃত্যু আমার কাম্য নয়। তুমি জানো, জল্লাদের লোমশ হাত যদি আমার গলায় ফাঁসির দড়ি পরায় নাজিমের নীল চোখে ওরা ব্যথায় খুঁজে ফিরবে ভয়।’ তারপর স্যার ক্লাস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন নির্ধারিত সময়ের আগে।
মণিকা কি মাতৃভূমির স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে? ও কি জানে ওর বন্ধুরা প্রতি মুহূর্ত মৃত্যুর সঙ্গে আলিঙ্গন করছে। ওর শান্ত, নির্লিপ্ত স্বভাবের জন্য মণিকা ভাবতেই পারে ওর পক্ষে যুদ্ধফ্রন্টে হামাগুঁড়ি দেওয়া সম্ভব নয়। আহা! মণিকা, তুমি জানবে না শত্রু নিধনের মধ্যে কি অসীম আনন্দ জড়িয়ে আছে। আসলে মণিকাকে কিছুই বলা হয়নি। সুযোগ কোথায়? আর বললেই বা কি হতো?
মণিকার মুখাবয়বে কে যেন একটি সবুজ চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। ঘড়ির দিকে তাকায়। রাত পৌনে ১টা। মতি ভাই আসেনি। অপেক্ষা করছে। শান্ত নির্জন রাতের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে জাবেদের মনে হয়, এ পৃথিবীতে এত ক্রন্দন কেন? এ সময়ে ঘোর ভাঙে। তাকাতেই চোখের মণিতে নক্ষত্রের ঝিলিক খেলে যায়। আরমোড়া ভেঙে হামাগুঁড়ি দিয়ে জলের দিকে এগিয়ে যায়। আজলা ভরে জল খায়। নাকে-মুখে জলের ছিটা দেয়। জাবেদের কাছে গিয়ে বলে, ‘মতি ভাইয়ের কি খবর?’
‘আসেনি। সংবাদহীন।’
‘তাহলে?’
‘অপেক্ষা।’
‘মাঝরাত।’
‘অপেক্ষা।’
‘কি ভাবছো?’
‘কিছুই না। ভাবতে চাই না।’
‘খুব শিগগির অপেরেশন শেষ করতে হবে।’
‘জানি।’
‘হাতে সময় আছে।’
‘এতক্ষণ অপেক্ষা করা বিপজ্জনক।’
সুনসান নীরবতা। ওলাপোকা ডাকছে। তারপর ওদের আর কিছুই মনে নেই। ঘুমের অতলে হারিয়ে যায়।
জাবেদের ঘুম ভাঙে শেষ প্রহরের একটু আগে। আকাশের গায়ে তখনও নক্ষত্রের মুখ। তড়িঘড়ি করে টুকুকে ডাকে।
‘ওঠ। মতি ভাই আসেনি। একটু পরে সকাল হবে।’
টুকু আতঙ্কিত কণ্ঠে বলে, ‘উপায়!’
‘মতি ভাই ছাড়াই প্ল্যানমাফিক আক্রমণ করতে হবে।’
‘সম্ভব!’
‘ভয় পাস?’
‘না।’
‘তাহলে আমার পিছে পিছে আয়।’
জাবেদ স্টেনগান হাতে পেছনে ধনচে গাছ রেখে উঠে দাঁড়ায়। অন্ধকারে সতর্ক দৃষ্টি রেখে সামনে পা বাড়ায়।
টুকু জাবেদকে অনুস্মরণ করে। জাবেদ খুব পথ হাঁটে। অনেকটা তেলেসমাতির মতো জুবলিঘাট বরাবর ব্রহ্মপুত্রের পাড় ঘেঁষে মন্দিরের ভিমের আড়ালে এসে দাঁড়ায়। টুকুর দিকে গ্রেনেডের ব্যাগ এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘রুটি আছে। খেয়ে নে। গ্রেনেডগুলো দে। চার্জ করার পরে এক মিনিট অপেক্ষা করবি। ফিরে না এলে কিছুই ভাববি না। কমান্ডার তোর জন্য অপেক্ষা করবে। হিঙ্গানগর রাজাকার ক্যাম্প…’
টুকু কিছু বুঝে ওঠার আগেই অন্ধকারে হেঁটে গেল জাবেদ। রুটি মুখে দিতেই বিকট শব্দে পরপর ৩টা গ্রেনেড ফাটার ভয়াবহ ভয় নিয়ে শেষ রাতে জেগে উঠল। সাইরেন বাজছে। পটাপট গুলির শব্দ ভেসে আসছে। এই আতঙ্কিত সময়ের মধ্যে ১-২ করে ৩ মিনিট অপেক্ষা করে। তারপর দুর্দান্ত গেরিলা কায়দায় ধনচে ক্ষেত পেরিয়ে ব্রহ্মপুত্রের জলে মিশে যায়। ঠিক এ সময় বড় মসজিদ থেকে ভেসে আসছে, ‘কল্যাণের জন্য এসো।’

পাদটীকা
পরদিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এমআর আকতার মুকুল চরমপত্র পড়ে, “আমাদের ময়মনসিংয়ের বিচ্ছুরা কলেজ রোডে ব্রাশফায়ারে পাঁচজন, জুবলী ঘাটে গ্রেনেড দিয়া পাকসেনারে খতম। হা হা হা। এর মধ্যে আবার দু’জন জন্মের দুশমন, জন্মভূমির কুলাঙ্গার রাজাকার আছে। কে বা কারা এই সফল গেরিলা আক্রমণ করেছে, কেউ জানে না। খালি গেরিলা টুকুর বরাত দিয়া মিয়া চাঁদ কমান্ডার জানায়, মাতৃভূমির যোগ্য সন্তান জাবেদ শহীদ হয়েছেন, ইন্না … রাজেউন।”

শ্রেণী:

দলছুট

Posted on by 0 comment
5-7-2018 7-06-57 PM

5-7-2018 7-06-57 PMফরিদুর রহমান : অনেক দূরে এলএমজি’র একটানা ঠা-ঠাÑ শব্দে ঘুম ভেঙে যায় মুনতাসিরের। একটা ঘোরের মধ্যে থেকে জেগে উঠে ভাবতে চেষ্টা করে সে কি আসলেই ঘুমিয়ে পড়েছিল, না-কি তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল! অন্ধকারের মধ্যে ডাইনে-বাঁয়ে হাত বাড়িয়ে বুঝতে চেষ্টা করে সে এখন কোথায়। বন তুলশি বা কানসিসার মতো নরম গাছপালা ছাড়াও ডান দিকে আকন্দ আটিশ্বরের হালকা ঝোপ-জঙ্গল হাতে ঠেকে। বাঁ হাতে ধরা এসএমজিটা কাছেই ভেজা মাটিতে ঘাসের মধ্যে পড়ে আছে। দু-পায়ের তলায় বালিমাটি আর ঠা-া জল-কাদার আভাস পায়। মুনতাসির বুঝতে পারে মুখটা নরম কাদামাটির মধ্যে গুঁজে রেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল সে। বাঁ হাতের তলায় একটা কাঁটা গাছের খোঁচা থেকে বাঁচবার জন্যে পাশ ফিরে শোবার চেষ্টা করতেই পাঁজরের ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে সব মনে পড়ে যায় তার।
রাত সাড়ে আটটার দিকে নারায়ণপুর ক্যাম্পে হাঁসের ডিম দিয়ে ভাত খেয়ে আটজনের ছোট্ট দলটি দশটা থেকে সাড়ে দশটার মধ্যে দিয়ালা সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছিল। আগেভাগে বর্ডারে পৌঁছে যাওয়ায় দিয়ালার শরণার্থী শিবিরের কাছে টং দোকানে টিমটিমে হেরিক্যানের আলোয় বসে চা খেয়েছিল ওদের কয়েকজন। তখনই জানতে পারে গত এক সপ্তাহে দুবার সীমান্তের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল পাকিস্তানি বাহিনী। প্রথমবারে কোনো ঘটনা ঘটেনি। দ্বিতীয়বার দূর থেকে শরণার্থী শিবিরে গুলি চালিয়েছে। দিনের বেলায় তেমন লোকজন না থাকলেও গুলিতে দুবলহাটি কুমারপাড়ার বৃদ্ধ বৃন্দাবন পাল শিবিরের মধ্যেই মারা গেছেন। এছাড়া তাহমিনা নামে দশ-বারো বছর বয়সের এক কিশোরীর পায়ে গুলি লেগেছিল, তাকে বালুরঘাটে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
মুনতাসিরের বুকের মধ্যে হঠাৎই ছ্যাঁত করে ওঠে। জানতে চায়, ‘মেয়েটার কী হয়েছে শেষ পর্যন্ত? বাঁচবে তো?’
‘কুনু খারাপ খবোর তো পাওয়া যায়নিÑ আল্লাহ বাঁচালে মোনে কয় ব্যাঁচে যাবে।’
বাঁশের অস্থায়ী মাচায় অন্ধকারের মধ্যে বসে থাকা বয়স্ক একজন জানান। আবুল কালাম কোলের ওপর স্টেনগান রেখে এক কোণায় বসেছিল। সে পরামর্শ দেয়। ‘তোমরাই বর্ডারের কাছে না থ্যাকে আরও ভিতরে সরে গেলেই তো পারিন।’
‘চেষ্টা করে দেখিছিÑ সরকারি জায়গা জুমি, ইস্কুল ঘর, পকর পাড় সব আগেই দখোল হ্যয়ে গেছে। সতীশ সরকারের একটা পুরানা চাতাল আর চক্রবত্তিঘেরে আমের বাগান পড়েই আছেÑ কিন্তুক দিবার চায় না।’
‘ইন্ডিয়ানরাও একোন বিরক্তরে বাÑ আর কতো ম্যানষেক জায়গা দিবে!’ অনেকক্ষণ চুপ থাকার পরে শ্বেতশুভ্র চুলদাঁড়িওয়ালা একজন নিজে থেকেই ভারতীয়দের মনোভাব ব্যক্ত করেন।
ছয় গ্লাস চায়ের দাম হয়েছিল ষাট নয়া। মন্টুভাই চায়ের দাম দিতে গেলে দোকানি নিতে চায় না, ‘তোমাঘেরে পয়সা দ্যাওয়া ল্যাগবে না। তাড়াতাড়ি দ্যাশ স্বাধীন করিন, বাড়িত ফিরে যাবার প্যাল্লেই হামরা বাঁচি।’
‘হামাকেরে তো চেষ্টার কুনু ত্রুটি নাই চাচাÑ দোয়া ক্যরেন।’ দলনেতা সিরাজ ভাই উঠে পড়লে দলের সকলেই একে একে উঠে পড়ে।
বৃদ্ধ লোকটি দোয়া পড়ে সবার উদ্দেশে বাতাসে ফুঁ দিয়ে বলে, ‘ফি আমানিল্লাহÑ জয় বাংলা।’
সীমানা পিলার পার হবার খানিক পরেই সীতহার গ্রামের অনাবাদী জমি জঙ্গল পেরিয়ে দু-তিনজন পাশাপাশি হাঁটতে পারে এমন পায়ে চলা পথের নিশানা পাওয়া যায়। ওরা আটজন আলপথের ডাইনে বাঁশে দুপাশে চারজন চারজন করে ভাগ হয়ে একটু আগেপিছে চলতে শুরু করে। গেরিলা দলের কখনোই এক লাইনে অথবা পাশাপাশি হাঁটার নিয়ম নেই। ট্রেনিং-ক্যাম্পের শিক্ষাগুলো যুদ্ধের মাঠে ঠিকঠাক মেনে না চলার কারণে বেশ কয়েকটা বড় দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। সিরাজ ভাই এসব ব্যাপারে ভীষণ কড়া। রাতের অন্ধকারেও সীতহারের আদিবাসী ছেলে মহিম মুরমু এখানকার পথঘাট ঠিক ঠাহর করতে পারে। তারপরেও কেমন করে যে এ্যাম্বুশে পড়ে গেল ওরা মুনতাসিরের মাথায় ঢোকে না।
রাইকালিপুর হাট থেকে দলটা তখনও আধা মাইল উত্তরে। মূল রাস্তা ধরে না এগিয়ে ওরা সড়কের পশ্চিম দিকে খাঁড়ির ঢালু পাড় ধরে ঝোপঝাড় পেরিয়ে খুব সাবধানে এগোতে থাকে। মাঝে মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার ঠিরিরি শব্দ আর দূরে কোনো পরিত্যক্ত বাড়ির উঠানে বেওয়ারিশ কুকুরের কান্না ছাড়া চারিদিকে শুনশান নীরবতা। আবছা আলো-আঁধারির মধ্যেই সিরাজ ভাইয়ের ইশারা পেয়ে পাড় ধরে ওরা তিন কিংবা চারজন হামাগুঁড়ি দিয়ে রাস্তায় উঠে আসে। সঙ্গে সঙ্গেই সারারাতের নৈঃশব্দ ভেঙে দিয়ে ঠা-ঠাÑ ঠা-ঠাÑ করে একসাথে অনন্ত গোটা দুই-তিনেক এলএমজি থেকে শুরু হয়ে এক নাগাড়ে গুলিবর্ষণ। মুনতাসির সম্ভবত উঠে দাঁড়াতে গিয়েছিল। গুলির শব্দের সঙ্গেই সে মাটিতে শুয়ে পড়ে তারপর দ্রুত গড়িয়ে খাড়ির দিকে নেমে যায়। বাঁ পাঁজরের নিচে চিনচিনে ব্যথার জায়গাটায় হাত দিতেই খানিকটা গরম তরল পদার্থ হাতে লাগে। হঠাৎ ওদের অবস্থান থেকে বিশ-পঁচিশ গজ সামনে আলোর ঝলকানির সাথে প্রচ- বিস্ফোরণের শব্দ। দলের কেউ কি এগিয়ে গিয়ে গ্রেনেড চার্জ করেছিল! এরপর আর কিছু মনে করতে পারে না মুনতাসির।
বাড়ি থেকে একরকম পালিয়েই আসতে হয়েছিল তাকে। বাবা সরকারি কর্মকর্তা। চাকুরি ক্ষেত্রে নানাভাবে বঞ্চিত অপমানিত মানুষটি মনেপ্রাণে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। কিন্তু ক্ষণেক্ষণেই মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তি সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে ওঠেন।
‘কি জানি বাপু! কবে কোন দিন দেশ স্বাধীন হবে সেই ভরসায় না থেকে চাকরিতে যোগ দেওয়ায় বোধহয় ঠিক হবেÑ তোর কি মনে হয়?’
যাকে প্রশ্ন করা সেই মুনতাসির কোনো উত্তর দেয় না, সে মনে মনেই পালাবার পরিকল্পনা করে। বুঝতে পারে সারাজীবন দশটা-পাঁচটা অফিস করে অভ্যস্ত বাবা একমাসেই হাঁপিয়ে উঠেছেন। মা চান ছেলেরা যুদ্ধে যাক, কিন্তু নিজের একমাত্র ছেলেকে যুদ্ধের মতো ভয়ঙ্কর বিপদের মধ্যে ঠেলে দিতে বুক কেঁপে ওঠে। অগত্যা ছোট বোনের সাথে কথা বলে মুনতাসির। ইনিয়ে-বিনিয়ে অনেক কথা বলার পরে বলে, ‘মনে কর আমি যদি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে আর ফিরে না আসি তাহলে তুই কি করবি?’
গত অক্টোবরে দশ পেরিয়ে এগারোতে পড়েছে তাহসিনা। ভাইয়ের মুখের দিকে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে তারপরে বলে, ‘তুমি কি বলো ভাইজান। তুমি না আসলে আমি তো কাইন্দা জারেজার হয়ে যাব!’ এবারে বিস্মিত হবার পালা মুনতাসিরের। ‘এই কথা তুই কোথায় পেলি?’
‘কোন কথা ভাইজান?’
‘এই যে কাইন্দা জারেজার…?’
ক্যান সেই দিন তুমি শোননি, দাদি পুঁথি পড়ে শোনাচ্ছিল…।’ এরপর সে নিজেই সুর করে বড় ভাইকে কয়েক লাইন শুনিয়ে দেয়।
‘লাখে লাখে মানুষ মরে, পলায় বেশুমারÑ পয়মাল হইল বসতভিটা আগুনে ছারখার
চারিদিকে শোকের মাতম দুনিয়া আন্ধারÑ ভাইয়ের শোকে বোনে হইল কাইন্দা জারেজার।’
মুনতাসিরের বুক ঠেলে কান্না এসে গলার কাছে দলা পাকিয়ে যায়। তার মনে হয় চিৎকার করে কাঁদতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু একজন প্রশিক্ষিত গেরিলা হিসেবে সে জানে এ সময় সামান্যতম শব্দ করাও বিপজ্জনক। শত্রুরা কাছাকাছি কোথাও ওতপেতে আছে কি না কে জানে! সে যে দলছুট হয়ে পড়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মাথাটা ঝিমঝিম করছে, পিপাসায় গলা শুকিয়ে কাঠ। একটু পানি খেতে পারলে ভালো হতো। গড়িয়ে খাড়ির দিকে নেমে গেলে হয়তো পানি পাওয়া যাবে। কিন্তু নড়াচড়া করতে মোটেও ইচ্ছে করছে না। একই জায়গায় চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশে তাকিয়ে উত্তর দক্ষিণ আন্দাজ করতে চেষ্টা করে। আশ্বিনের মাস শেষ হতে যাচ্ছে। কোথাও কোনো মেঘ নেই; কিন্তু ধ্রুবতারাটাও চোখে পড়ে না। একটা দিকচিহ্ন পেলে যত কষ্টই হোক ধীরে ধীরে উত্তরে সীমান্তের দিকে সরে যাওয়া যেত।
এলাকার মানুষ হলেও এ দিকের রাস্তাঘাট, খালবিল, এমনি হাট বাজারের সাথেও মুনতাসিরের তেমন পরিচয় নেই। ঢাকায় ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার আগে পর্যন্ত বাবার সরকারি চাকরির সূত্রে সারাদেশে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। ছুটিছাটায় বাড়িতে এসেছে পাঁচ-সাত দিনের জন্য। এবারে যুদ্ধ শুরু হবার পরে গ্রামে মাস খানেক কাটিয়ে একদিন বর্ডার পার হয়ে সোজা রিক্রুটমেন্ট ক্যাম্পে। দেশের ভূগোল ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই শুরু হয়ে গেছে সেই ভৌগোলিক ভূখ- রক্ষার লড়াই। সীতাহার, তারুলিয়া আর রাইকালিপুর হাটের নাম জানা ছিল। সাদা কাগজে পেন্সিল দিয়ে আঁকা ম্যাপ দেখে পুরো টার্গেট এলাকা সম্পর্কে একটা ধারণা পাবার চেষ্টাও করেছে। কিন্তু এখন এই অন্ধকার রাতে গুলিবিদ্ধ আহত শরীরটাকে টেনে কোন পথে এগোবে সে!
দিয়ালা সীমান্ত থেকে যে পথটুকু তারা পাড়ি দিয়েছিল সেই পথ এবং হাঁটর গতি হিসাব করলে খাঁড়ির এই জায়গাটা রাইকালিপুর হাট থেকে আধ মাইল উত্তরে তারুলিয়া গ্রামের মাঝামাঝি। গ্রামটা বেশ বড়, কয়েক ঘর সম্পন্ন কৃষকের বসত ছিল এখানে। এখন না-কি বাড়ি বলতে কিছু মাটির দেয়াল, চাল কিংবা খুঁটির পোড়া বাঁশ, পরিত্যক্ত ঢেঁকি, লাঙ্গল আর মাটির ভাঙাচোরা হাড়ি কলসি। দরজা কপাট টিনের চাল লুটপাট হয়ে গেছে অনেক আগেই। তারুলিয়ার উত্তরে সীতাহার গ্রামে ঢুকতেই খ্রিস্টান মিশনারিদের গির্জা। সীতাহার গির্জার চূড়ায় বিশাল ক্রুশচিহ্ন অনেক দূর থেকে দেখা যায়। গ্রামের আদিবাসি খ্রিস্টানদের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিলেও কেন যে বিধর্মী নাসারাদের এই উপাসনালয় এখন পর্যন্ত টিকিয়ে রেখেছে তা পাকিস্তানিরাই ভালো বলতে পারবে। ক্রুশটা চোখে পড়লে খাড়ির পাড় ধরে ক্রলিং করে গির্জা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলে বাঁকি পথটুকু হেঁটেও যাওয়া যেতে পারে। সীমান্তের গা ঘেঁষে ছড়িয়ে থাকা পরিত্যক্ত গ্রামগুলোতে টহল দিতে সাহস পায় না পাকিস্তানিরা।
পাঁজরের নিচে যেখানে গুলি লেগেছে কোমর থেকে গামছা খুলে সেখানে পেঁচিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলে মুনতাসির। এমনিতেই যথেষ্ট রক্তক্ষরণ হয়েছে। শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে। এ সময় মনোবল হারিয়ে ফেললে হয় এখানেই ঝোপঝাড়ের মধ্যে মরে পড়ে থাকতে হবে আর না হলে ধরা পড়তে হবে শত্রুর হাতে। ডান দিকে কাত হয়ে গুটিশুটি মেরে শুয়ে মুনতাসির একটা লম্বা নিঃশ্বাস ছাড়ে। ওরা সবাই কি এতক্ষণে ক্যাম্পে ফিরে গেছে! দলছুট ছেলেটার কথা কেউ মনে করেনি, মরে পড়ে থাকলে লাশটাও তো খুঁজে দেখার চেষ্টা করতে পারত। যুদ্ধ বড় নিষ্ঠুর খেলা। এখানে কেউ কারও বন্ধু নয়Ñ আর মুনতাসির তো এখানে এমনিতেই দলছুট। তাকে বাদ দিলে আর সবার ছাত্রজীবন শেষ। সবচেয়ে বেশি লেখাপড়া জানা মানুষ সিরাজ ভাই ইন্টারমিডিয়েট পাস করে আক্কেলপুর বাজারে ছিট কাপড়ের দোকান দিয়েছিলেন। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই সব পুড়ে ছাই। দুই নিজামের একজন কালা নিজাম সাইকেল মেকার, অন্যজন ধলা নিজাম ম্যাট্রিক পাস করে মঙ্গলবাড়ি হাটের একটি ধানভাঙা কলের ম্যানেজার। এসএসসি পাস দ্বিতীয়জন কামরুল, খবরের কাগজের এজেন্সি চালায়। নিজে মালিক, নিজেই হকার। মাঝ মাঝে ঘুমের মধ্যেও হাঁক দেয়, ‘দৈনিক আজাদ, ইত্তেফাক, সংবাদ, অবজারভার, দৈনিক পাকিস্তান…’ দেশ দুনিয়ার খবর সামান্য যেটুকু সেই রাখে। দলে প্রায় সবাই কৃষক পরিবার থেকে এলেও আবুল কালাম, মন্টু ভাই এবং মহিম মুরমু সরাসারি মাঠেই কাজ করত। তবে এদের কারোরই রাজনীতি নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। সবার একমাত্র ভাবনা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করতে হবে।
ক্যাম্পে মুনতাসিরের সংক্ষিপ্ত নাম ছিল মুন। কামরুল খুব সমীহ করে ডাকতো ‘চাঁদভাই’। সেই কামরুলও কি একবার তার খোঁজ করবে না! রাতটা কি শুক্লপক্ষ না কৃষ্ণপক্ষ! যা-ই হোক আকাশের চাঁদ তারা সবাই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এখন কোনোভাবেই পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।
রাত বোধহয় ধীরে ধীরে ফরসা হয়ে আসছে। বেশ দূরে, সম্ভবত দক্ষিণ-পূর্ব দিকে গ্রামের আভাস দেখা যায়। আশপাশের ঝোপঝাড়গুলোও এখন অনেকটাই স্পষ্ট। হাতের কাছে পড়ে থাকা এসএমজিতে পরম যতেœ হাত বোলায় মুনতাসির। এইখানে মরে পড়ে থাকলে অস্ত্রটাও খোয়া যাবে। দলে সবচেয়ে ভারী অস্ত্র বলতে তো দুটি সাব-মেশিনগান। একটা সিরাজ ভাই আর একটা মুনতাসিরের কাছে। বাকি ছয়জনের হাতে দুটি স্টেনগান আর চারটি থ্রি-নট-থ্রি। এ ছাড়া প্রত্যেকের কোমরে গোঁজা দুটি করে হ্যান্ডগ্রেনেড। পাকিস্তানি আর্মির টহলদল কিংবা সেতু কালভার্ট পাহারা দেওয়া রাজাকার ক্যাম্পে হামলা চালাবার জন্য এসব যথেষ্ট। কিন্তু এভাবে ফুটফাট গুলি চালিয়ে আর কতদিন! স্টেনগানগুলোকে খেলনা মনে হয় মুনতাসিরের। সাব মেশিনগানের রেঞ্জও এমন কিছু বেশি নয়। পঞ্চাশ গজের বাইর হলে টার্গেট তো মিস করেই, তাছাড়া পাকিস্তানি শয়তানগুলা যে হেলমেট মাথায় দেয় সেই হেলমেটে লাগলেও গুলি না-কি ছিটকে বেরিয়ে যায়। তার চেয়ে বরং থ্রি-নট-থ্রি ভালো। টার্গেটে হিট করতে পারলে জান নিয়ে পালাবার উপায় নেই।
খাড়ির উপরের রাস্তা পেরিয়ে গাছপালার ফাঁকে আকাশ ক্রমেই লাল হয়ে উঠছে। তাহলে এই দিকটাই তো পূর্ব দিক। বাঁ দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আবছা আলোয় কুয়াশার আবরণ ভেদ করে চোখে পড়ে সীতাহার গির্জার মাথায় সাদা পাথরের ক্রশ। মাত্র আধা মাইল দূরে গির্জা চত্বরে ক্রুশেবিদ্ধ যিশু যেনো তার জন্যেই অপেক্ষা করছেন। নতুন করে সাহসী হয়ে ওঠে মুনতাসির। এবারে ক্রলিং-এর প্রস্তুতি হিসাবে নিজের দিকে একবার ফিরে তাকায় সে। সবুজ ঘাসের উপরে লেগে থাকা চাপ চাপ রক্ত দেখে তার কোনো ভাবান্তর হয় না। নিজেই নিজেকে বলে ‘বুকের রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করা’ বোধহয় একেই বলে। বাঁ পাঁজরের রক্তভেজা জায়গাটা আরেকটু শক্ত করে বেঁধে নেয়। তারপর অতি সাবধানে নিঃশব্দে উঠে বসে। নাÑ ঘন ঝোপঝাড়ের আড়ালে রাস্তার ওপার থেকে দেখার কোনো উপায় নেই।
হঠাৎ সে খেয়াল করে একদল পিঁপড়া সারিবদ্ধভাবে তার বাঁ পায়ের ওপর দিয়ে কোথায় যেনো চলে যাচ্ছে। মানুষটা যে এখনও বেঁচে আছে সে ব্যাপারে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। পিঁপড়াদের ঝেড়ে ফেলতে একটা হাত তুলেই ফেলেছিল, পরক্ষণেই সে ভাবে, আহা থাকÑ আমার দেশের পিঁপড়া! সামনেই শীত আসছে হয়তো তাই খাবারের খোঁজে দল বেঁধে বেরিয়েছে। ওদের মেরে কি লাভ!
দূরে পরিত্যক্ত পোড়া বাড়িঘর আর কয়েকটা শিমুল শিরিষ গাছের ফাঁকে বিশাল একটা সূর্য আকাশজুড়ে আলোর আভাস ছড়িয়ে ক্রমেই আরও উপরে উঠে আসে। অপলক তাকিয়ে থাকে মুনতাসির। স্বাধীন বাংলাদেশে এমন একটি অসাধারণ সূর্যোদয় দেখবার জন্যে তাকে বাঁচতেই হবে! বুকের কাছে দুহাতে এসএমজিটা আঁকড়ে ধরে শ্বেতশুভ্র ক্রশ বরাবর ক্রলিং শুরু করে মুনতাসির।

শ্রেণী:

যুদ্ধের খেলা

Posted on by 0 comment
3-4-2018 8-12-42 PM

3-4-2018 8-12-42 PMইমরুল ইউসুফঃ স্যার, আমাদের স্কুল কবে খুলবে? আমার এই কথা শুনে স্যার চোখ থেকে চশমাটা খুললেন। তারপর লম্বা একটা শ্বাস ছাড়লেন। বললেন, সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এই অবস্থায় স্কুল চালানো যায় না। কবে স্কুল খুলবে তাও জানি না। কারণ এখন পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময়। যার কাছে যা আছে তাই নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময়। যুদ্ধ কী স্যার? বলল, মনি। যুদ্ধ মানে সংগ্রাম, লড়াই। শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই। এ লড়াইয়ে জেতা মোটেও সহজ নয়। এটা একটা খেলা। বুদ্ধি করে যে ভালো খেলবে সেই জিতবে। শোনো, এ সময় তোমরা খুব সাবধানে থাকবে। দরকার ছাড়া বাইরে যাবে না। এই কথা বলে স্যার বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলেন।
স্যার চলে যাওয়ার পর আমি সুরুজ ও মনি স্কুলের মাঠে এসে বসলাম। ভাবতে লাগলাম কী করা যায়। এমন সময় সুুরুজ বলল, আমরাও তো যুদ্ধে যেতে পারি।
মনি বলল, না ভাই আমার মা কিছুতেই যেতে দেবে না। আর আমরা তো বন্দুক চালাতে জানি না। বোমা ছুড়তে জানি না। কীভাবে শত্রুর মোকাবিলা করতে হয় তাও জানি না। আমরা কীভবে যুদ্ধ করব?
মনির এই কথা শুনে আমার হেড স্যারের কথা মনে পড়ল। বললাম, স্যারের কথা শুনিস নি। যুদ্ধ একটা খেলা। বুদ্ধি করে এই খেলা খেলতে হয়। এই খেলা যে ভালো খেলবে সে-ই জিতবে। সুরুজ, মনি শোন। কোনো অস্ত্র ছাড়াই আমরা যুদ্ধ করব। স্কুল খোলার জন্য যুদ্ধ করব। যুদ্ধ করব রাস্তাঘাটে শান্তিতে চলার জন্য। দেশ বাঁচানোর জন্য।
সুরুজের বড় ভাই মারা গেছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে সুমন শহিদ হয়েছে। অনেক কষ্ট করেও মুক্তিযোদ্ধারা তাকে বাঁচাতে পারেনি। খবরটা এলো এই মাত্র। খবর শুনে সুরুজ কাঁদতে লাগল। আমরা তাকে কাঁদতে নিষেধ করলাম। বললাম, সুরুজ বাড়ি চল।
আগুন আগুন। মনিদের বাড়িতে আগুন লেগেছে। এমন চিৎকার শুনে কাটাখালী গ্রামের মানুষ জেগে উঠল। অন্ধকার গ্রাম আগুনের শিখায় আলোকিত হয়ে উঠল। আগুন দেখে বাইরে বের হতে চাইলাম। কিন্তু মা বের হতে দিলেন না।
বললেন, খবরদার বাইরে বের হবি না। এমন সময় আমার বাবা ঘরে ঢুকলেন। বললেন, খান সেনারা মনিদের বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। মনির বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে। ওদের এখন খুব বিপদ।
মনিদের বিপদ। কথাটা শুনেই আমার বুক কেঁপে উঠল। বন্ধুকে সাহায্য করার জন্য ছটফট করতে লাগল। কিন্তু কথাটা বাবকে বলতে সাহস হলো না। অবশেষে বাবাই কথাটা বললেন। ‘এই রাতে ওরা কোথায় যাবে। যাই ওদের আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসি।’
কথাটা শুনে আমার খুব ভালো লাগল। কিছু সময়ের মধ্যে মনি ও তার স্বজনরা আমাদের বাড়িতে এলো। কিন্তু তাদের ভয় কাটল না। গ্রামে পাকহানাদার বাহিনী ঢুকে পড়েছে। এই খবর মুহূর্তেই আশপাশের গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ে। ভয়ে অনেকে গ্রাম ছেড়ে পালাতে থাকে। কিন্তু মুক্তিসেনারা পালায় না। আমরা পালাই না। কীভাবে খান সেনাদের ঘায়েল করা যায় সে কথাই ভাবতে থাকি।
হঠাৎ আমার মাথায় একটি বুদ্ধি আসে। মনিকে সুরুজদের বাড়িতে পাঠাই। সুরুজকে স্কুলের মাঠে আসতে বলি। আমরা তিনজন যখন এক জায়গায় হই তখন দুপুর। রাস্তায় একজনও মানুষ নেই। স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের হই-চই নেই। স্কুলটি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। বড় বড় গাছগুলো চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
আর চুপ করে না থেকে আমরা কথা বলা শুরু করলাম। পাকসেনাদের দেখা মাত্রই আমরা কী করব তা আলোচনা করে ঠিক করলাম। এজন্য দরকারি জিনিস কীভাবে জোগাড় করব সেও ঠিক করে ফেললাম। সিদ্ধান্ত নিলাম দরকারি জিনিসগুলো সবসময় আমাদের কাছে থাকবে। কারণ যে কোনো সময় পাকসেনারা আমাদের গ্রামেও ঢুকতে পারে।
একদিন হাঁটতে হাঁটতে আমরা বাড়িতে ফিরছি। এমন সময় আমরা দুজন পাকসেনা দেখতে পেলাম। তাদের যে এত তাড়াতাড়ি পেয়ে যাব, আমরা ভাবতেই পারিনি। দেখলাম তারা আমাদের দিকে গট গট করে এগিয়ে আসছে। পায়ে বুট জুতা। গায়ে খাকি রঙের পোশাক। হাতে বন্দুক। মুখে মোটা গোঁফ। চোখ দুটি গোলগোল। মাথায় হেলমেট। এর ঠিক পেছনেই একজন রাজাকার। গায়ে লম্বা জামা। মাথায় টুপি। মুখে দাড়ি। মায়ের বলা গল্পের সঙ্গে তাদের চেহারার হুবহু মিল।
‘হাঁ করে কী দেখছিস? ওরা তো এসে গেল’। মনি বলল। আমি বললাম, মনি সুরুজ তোরা ঝোপের মধ্যে ঢুকে পড়। সময়মতো সব কাজ করবি। দেখিস ভুল হয় না যেন।
দুই পাকসেনা আমার কাছাকাছি আসতেই আমি উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লাম মাটিতে। মুখ দিয়ে গোঙানির মতো শব্দ করতে লাগলাম। আমার খুব পেট ব্যথা করছে, এমন ভান করতে লাগলাম। ‘আমার পেটের নিচে কিছু দিন। আমার পেটের নিচে কিছু দিন।’ এই কথা বলতে লাগলাম।
আমার ছটফটানি দেখে পাকসেনারা দৌড়ে আমার কাছে এলো। মুখ নিচু করে আমাকে দেখতে লাগল।
‘এ লেড়কা তুমকো কেয়া হুয়া’ একজন সেনা বলল। আমি এই কথা শুনে আরও জোরে গোঙাতে লাগলাম। আমি এমন ভাব করতে লাগলাম যে, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমার কষ্ট দেখে ওদের একটু মায়া হলো। আমার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। হঠাৎ ঝোপের আড়াল থেকে মনি ও সুরুজ বের হয়ে এলো। পকেট থেকে তামাক পোড়ার গুঁড়া বের করল। তারপর দুই পাকসেনার চোখে মুখে ছুঁড়ে মারল। তামাকের গন্ধে দুই পাকসেনা কাশতে লাগল। হাঁচি দিতে লাগল। এমন সময় মনি ও সুরুজ আবার তামাক পোড়া ছুড়ল। তামাকের গন্ধে তারা দুজন ঝটপট করে উঠে দাঁড়াল। এ কয়ো হো গেয়া, এ কয়ো হো গেয়া। বদমাস ছোকড়াকা এ মুঝছে কেয়া কর দিয়া।’ এই কথা বলতে বলতে তারা আরও বেশি হাঁচি দিতে লাগল। তামাকের গন্ধে ছটফট করতে করতে তারা তাদের কাঁধ থেকে রাইফেল ফেলে দিল। তারপর চোখ মুখ ডলতে ডলতে পুকুরে ঝাঁপ দিল।
তাদের এমন কা- দেখে আশপাশ থেকে লোকজন ছুটে এলো। পুকুর পাড়ে দুই পাকসেনাকে ঘিরে ধরল। দুই শয়তানকে আজ আমরা কিছুতেই ছাড়ব না। এ কথা বলতে লাগল। কেউ কেউ আবার আনন্দ করতে লাগল মনি, সুরুজ ও আমাকে নিয়ে।
এমন সময় আমাদের স্কুলের হেড স্যার এলেন। রাইফেল দুটি হাতে তুলে নিলেন। আমাদের তিনজনকে কাছে ডাকলেন। ‘তো কি এমন করেছিস যে ওরা রাইফেল ফেলে পানিতে গিয়ে পড়ল?’ বললেন স্যার।
‘চোখে মুখে তামাক পোড়ার গুঁড়া দিয়েছি স্যার’ মনি বলল। ‘এত তামাক পোড়া তোরা কোথায় পেলি?’ স্যার বললেন। আমি বললাম, চুরি করেছি। আমরা সুরুজের দাদা-দাদির আর মনির নানার পান খাওয়ার তামাক চুরি করেছি। তারপর ওই তামাক শয়তান দুটির মুখে ছুঁড়ে মেরছি। আজ আমরা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা করেছি স্যার। এ যুদ্ধে আমরা জিতেছি স্যার।
এই কথা শুনে স্যার আমার মাথায় হাত রাখলেন। বললেন, তোরা আজ যে কাজ করেছিস তাতে দেশ শত্রুমুক্ত হবেই।

লেখক : সহ-পরিচালক, বাংলা একাডেমি

শ্রেণী:

জলেরা কাঁদছে

33

33ঘাটে এসে নৌকা ভেড়েÑ অমাবস্যা। ঘুটঘুটে রাত। আকাশে মেঘের ভিড়। চারদিকে কুঁচুটে অন্ধকার। চর্টের আলো জ্বেলে, হ্যারিকেন হাতে নিয়ে অনেকে এসে ভিড় করে ঘাটে। এর-ওর হাত ধরে আলোয় পথ চিনে সাবধানে প্রথমে গলুইয়ের মুখে তারপর কাঠের পুরু তক্তার ওপর পা রাখে ডা. হাফিজ। চাল বেয়ে উঠোনে উঠতেই হাঁপ ধরে যায় ওর। বুক হাঁপরের মতো ওঠানামা করে। বিরক্তি ওর কণ্ঠে, আর পারি না! বলেই কোমরের দু-কাঁখে হাত রেখে খানিক ডানে হেলে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখেমুখে বড্ড ক্লান্তি আর আকাশের মেঘ যেন ছায়া ফেলেছে সে মুখে। তখুনি উত্তুরে জঙ্গলে কী এক পাখি ডেকে ওঠে খরখরে গলায়। চারপাশ হিস্ হিস্ করে ওঠে সে কণ্ঠে। গায়ে কাঁটা দেয়, বুকের রক্ত হিম হয়ে আসে। ফাতেমা খানিক সময় স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন আনমনা হয়ে যায়। মুখে রা সরে না। বুকে কেমন যেন কাঁপুনি ধরে। মুহূর্তে নানা চিন্তা এসে ভিড় করে। তোমার শরীর কি খুব খারাপ লাগছে?
ডা. হাফিজ মাথা নেড়ে না বললেও মুখ জুড়ে কেমন যেন যন্ত্রণার ছাপ। ফাতেমা আর দেরি না করে হাত ধরে স্বামীর, একটু একটু করে পা বাড়াও। কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে!
ঘাটের পাশে পুবের উঠোনজুড়ে এক থেকে আলো অনেকক্ষণ ধরে স্থির হয়ে আছে। সে আলো ঘিরে অনেক মানুষের জটলা। ডাক্তারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভিড় ছেড়ে একে একে উঠে আসে সাদেক, মজনু, দলু এমনি আরও অনেকে। ওদের মনেও উৎকণ্ঠা কাজ করে। কাহা! শইলডা বালা? মুখটা কেমন ব্যাজার ব্যাজার লাগতাছে। খাড়ই থাকলে অইব! ঘরে যান। কোমবেলা থাইক্যা বার অইছেন? অহন রাইত কত! আমনে কাহা এহনও কেমনে যে টিইক্যা আছেন ভাবলে মাতাডা ঠাইট ঘুরনা মারে। সলুর কথা ওর কানে গেল কি না বোঝা গেল না। আনমনা ডা. হাফিজ ওদের কথার কোনো উত্তর না দিয়ে ফাতেমার হাত ধরে একটু একটু করে পা বাড়াতে বাড়াতে বলে, জয় বাংলার খবর কী?
Ñ কাহা! আর কইয়েন না। পাক-আর্মি বহরে বহরে মারা পড়তাছে। এইভাবে যুদি মুক্তিরা লড়তে পারে, তাইলে কাহা চিন্তা কইরেন না, খুব জলদি দেশ স্বাধীন অইব।
ডা. হাফিজ মুখে মৃদুহাসি ছড়িয়ে বলে, তর স্বাধীন হইতে হইতে আমি আর বাঁচুম?
Ñ কী যে কন কাহা। লাশে-গাছে আমাদের যে দেহডা এই দেহের ভিতরে ঘুণে ধরবো এইডা ভাবলেন কী কইর‌্যা? আমরা এমনের আডুর বয়সী। অহনি রোগে-জারে ভাইঙ্গ্যা পড়ছি। আমনার বয়েসে আমগো হাড্ডি-গুড্ডিরও খোঁজ থাকবো না কয়বরে। আমনে তো তালগাছের মতো কেমনু খাড়া অইয়া আছেন! আমগো মতো দুই-চাইরডারে অহনও ইডালডা দশ হাত দূরে নিয়া ফালাইতে পারবেন।
এ কথা শেষ না হতেই ভেতরের উঠোন থেকে অনেকগুলো মানুষের হাসির শব্দ কানে আসে ওদের। ডা. হাফিজ একটু বিচলিত হয়ে বলে, জয়বাংলা রেডিও শুইন্যা অমন হাসে ক্যা? রাজাকার শুনলে অহনি খবর দিবো মিলিটারিরে। রেডিও জুড়ে উঠোনে অনেকে বসে কান পেতে স্বাধীন বাংলা বেতারের অনুষ্ঠান শুনছে। সন্ধ্যার খবর শেষ হয়ে এখন চলছে চরমপত্র। একসময় ডা. হাফিজের ঘরেই সন্ধ্যার এই আসর বসতো। খুব আগ্রহ নিয়ে অনুষ্ঠানটি শুনতো ডাক্তার। উপুড় হয়ে গায়ে গা মিলিয়ে রেডিওর গায়ে কান লাগিয়ে পুরো অনুষ্ঠান গোগ্রাসে গিলতো। কিন্তু আজ কয়েক মাস হলো সে আয়োজনে ভাটা পড়েছে। ডাক্তারের বয়েস পড়তির দিকে হলেও চিন্তা-চেতনা মননে আর তারুণ্যে এখনও বিশ বছরের। পঁচিশে মার্চ রাতে যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লো লোকবল নিয়ে তা কেবল ওকেই মানায়। তারুণ্যে খলবলে মানুষটা আজ অমন নেতিয়ে পড়েছে কেন? রেডিওতে কান থাকলেও মনে অশান্তি ছুঁয়ে যায় অনেকেরই। কারও কারও মনোযোগে ছেদ পড়ে বারবার।
পঁচিশে মার্চ রাতে হঠাৎ খবর এলো ঢাকা ম্যাসাকার হয়ে গেছে। কোনো মানুষ বেঁচে আছে কি না সন্দেহ। শুধু আঘুন আর আগুন ঢাকা জুড়ে। জ্যান্ত কোনো মানুষ দেখা যায়নি পথে-ঘাটে। শুধু আর্মির কনভয় আর ট্যাংক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শহরময়। এ খবর ওয়্যারলেসে থানায় আসতেই মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে থানা সদর ছাপিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামে। তখনই ডা. হাফিজ সবাইকে ডেকে দলেবলে ভারি হয়ে দৌড়োতে থাকে রেললাইনের দিকে। আয়রে তোরা আয়! সড়কের পাড়ে আয়! রেললাইন না তুলতে পারলে জানে কেউ বাঁচবি না। পাক আর্মি আইতাছে বগি ভইর‌্যা ভইর‌্যা।
কথা বলে আর দৌড়াতে থাকে হাফিজ। গলা যদ্দুর সম্ভব চড়িয়ে ডেকে যায় ও। ওর পেছন পেছন অসংখ্য মানুষ দা, শাবল, খুন্তি, কুড়–ল আরও যার যা আছে তাই নিয়ে রেললাইনের দিকে দৌড়াতে থাকে। একসময় হেইও হেইও করে রেললাইন উপড়ে ফেলতে থাকে তারা। সিøপারের কাঠে আগুন ধরিয়ে দেয়। লাইনগুলো কাঁধে বয়ে নিয়ে দূরের বিলে ছুড়ে ফেলতে থাকে আর জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু মুখে মুখে।
অসংখ্য কণ্ঠো মুখে দা-দুড়োলের শব্দের পাশাপাশি হেইও হেইও ধ্বনি আর জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান মুখে নিয়ে সবাই যেন জিকির করছে। এইক ধ্বনিতে রেললাইন ধরে মাইলের পর মাইল মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে ডা. হাফিজের কণ্ঠ অনুসরণ করে কেউ কেউ গলা চড়িয়ে বলে, বাঁচবি না-রে বাঁচবি না। হ¹লে আয়। পা চালাইয়া আয়। রেললাইন তুইল্যা কটকটি খাবি কেরে আয়। সময় নাইরে সময় নাই…। মিলিটারি আইলোরে মিলিটারি। পাকসেনারা আইলোরে পাকসেনারা। অফান্ডে মারা পড়বিরে মারা পড়বি। আয় রে… সময় নাই…।
সফলভাবে রেললাইন তোলার নেতৃত্ব দিয়েছিল সেদিন ডা. হাফিজ। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ মাইলের পর মাইল তুলে ফেলেছিল ওরা। এরপরে আর কখনও তাকে সুস্থির দেখা যায়নি। কী করে পাক আর্মিদের নিধন থেকে এ এলাকার মানুষদের রক্ষা করা যায়, কী করে মুক্তিযুদ্ধে পাঠানোর মতো ছেলেদের উদ্বুদ্ধ করা যায়, এ নিয়ে সারাক্ষণ তার ছুটোছুটি। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে গ্রামে চলে এসেছে ও। আজ বছর পাঁচ হবে। সেই থেকে এ-গ্রাম সে-গ্রাম, দূরের গ্রামে রোগী দেখে বেড়ায়। তাই চেনা-পরিচয়ের গ-ি ওর ছোট নয়, যতই দিন গেছে বরং এ গ-ি কেবলই বেড়েছে। দূর মূল্লকেও ওর শুভার্থী-শুভাকাক্সক্ষীর অভাব নেই।
যুদ্ধের এই সংকটকালে মানুষের আরও কাছাকাছি কী করে থাকা যায়, মানুষের মনে কী করে উদ্দীপনা জাগিয়ে রাখা যায় সে নিয়ে তার চিন্তা-উৎকণ্ঠা আর ব্যাকুলতার শেষ নেই। এমনি উচাটন মন নিয়ে যখন ও ছুটে বেড়াচ্ছে গ্রামে-গ্রামে, তখনই এক সন্ধ্যায় ফোরকান দফাদার এসে খবর দিল, ডাক্তার কাহা কই? থানা ক্যাম্পে যাওন লাগবো। আর্মি অফিসার সালাম দিচ্ছে। জরুরি কথা আছে। কাহার লগে। আমারে কইছে জরুরকে যাকে আর আয়েঙ্গে। বলিয়ে উসকো সাথ জরুর বাত হ্যায়! অহন ভাত না লুঠি, কি খাইব কেডা জানে! বলেই দফাদার চলে যেতেই থানার ওসি তার এক বিশ্বস্ত লোক পাঠায় খবর দিয়ে যে করেই হোক রাতের মধ্যে না-হয় খুব ভোরে বাড়ি ছেড়ে যেন চলে যায় ডা. হাফিজ। ওকে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান করবে বলে পাক অফিসার ঠিক করেছে।
ডা. হাফিজের জনপ্রিয়তাই বুঝি তার কাল হলো। অসংখ্য মানুষ তার প্রতি অনুগত, বিশ্বস্ত এ খবর পাক আর্মিদের কাছে চাপা থাকেনি। ঠিকই খবর পৌঁছে গেছে জায়গায় জায়গায়। জনপ্রিয় এই মানুষটিকে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান করার জন্যে উঠে-পড়ে লেগেছে ওরা। বাড়ির লোকজন ওসির পরামর্শমতো ভোরে আজানের আগেই ডাক্তারকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। এ-গ্রাম সে-গ্রাম পেরিয়ে সুদূর অজ এক গ্রামে ঝোপঝাড়ের ভিড়ে ওর আশ্রয় তৈরি করা হয়। ঝোপ না বলে জঙ্গল বলাই ভালো। তিন মাথা উঁচু অসংখ্য গাছের ভিড়ে ঝোপঝাড়ে মিলেমিশে আদিম এক পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে আছে। সে সঙ্গে আছে ইঁদুর-বেজি-বাগডাস-গুইসাপ ছাড়াও গা হিম করা আরও কতসব প্রাণীকুলের আবাস। তার পাশেই ঝাঁপানো অসম্ভব উঁচু এক বটগাছ। দৈর্ঘ্য-েপ্রস্থে এক-দেড় মাইল জায়গাজুড়ে বটের ঝুরি নেমেছে। মাটির বুকে মোটা মোটা সব শেকড় জেগে আছে অজগরের মতো। গাছের ওপারেই দিঘি। দিঘির চারপাশ এমনি ঝোপঝাড় আর জঙ্গলে পুরু হয়ে আছে। পুরু ছায়ায় ঘেরা দিঘির চারদিক। সে ছায়ায় দিঘির জলও কেমন কালচে দেখায়। তাকালে ভয় হয়। তেমনি নিঃসীম পোড়ো জায়গায় রেখে আসা হলো ডা. হাফিজকে। সন্ধ্যা অবধি সেখানেই শোয়া বসা খাওয়া সবই চলে ওর। সন্ধ্যায় একদল মানুষের ভিড় লুকিয়ে লুকিয়ে বাড়ি এসে পৌঁছে ডা. হাফিজ। কোনোরকম রাতটা পার করে অন্ধকার থাকতেই আবার পথে বেরিয়ে পড়ে। একসময় হারিয়ে যায় সেই ঝোপের ভিড়ে। এভাবে কয়েক মাস চলার পর যখন বানের জল এসে ডুবিয়ে দিচ্ছিল চারপাশ, পথ-ঘাট। তখন পাশের এক কবরস্থানে জায়গা হলো ওর। সেখানেও ঘন জঙ্গল আর অনেক দিনের পুরনো একটি মসজিদের পাশে গোটা কয়েক কবর। বাঁধানো। এর মধ্যে তিনটে কবর আছে অস্বাভাবিক লম্বা। দীর্ঘদেহী মানুষের কবর। একেবারে পাথরে ঢালাই করা। তারপর ধাপে ধাপে নিচে নেমে চওড়া হয়ে গেছে। অনেকগুলো পাথরের খড়ম আছে কবরের পাশে ছড়িয়ে। মসজিদ কবর আর খড়মগুলো গায়েবি ইশারায় মাটি ভেদ করে উঠেছে অনেক বছর হলো। দীর্ঘ কবরগুলো বাদে অন্য কবরের গায়ে পুরু শ্যাওলা জমে কেমন এক আদিম ও ভৌতিক আবহ গড়ে উঠেছে চারদিকে। সেখানেই একটি কবর ঘেঁষে লুকিয়ে থাকে ডা. হাফিজ। সন্ধ্যার পর ডিঙ্গি নৌকো করে নিয়ে আসে বাড়ির লোকজন। আবার একইভাবে ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ডিঙ্গি করে গোরস্তানে রেখে আসে তাকে। এ নিয়ে বিড়ম্বনার শেষ নেই। অনেক সময় দুপুরে যখন বাটি ভরে গামছায় বেঁধে ওর জন্যে খাবার পাঠানো হয়, প্রায়ই তা অনুসরণ করে অচেনা কজন লোক। একেক সময় একেক লোককে দেখেছে নৌকো করে ওদের বাড়ির আশপাশে নিচু এলাকায় ঘোরাঘুরি করতে। এমনি করে পুরো বর্ষায় ডিঙ্গি করে সকালে যায় ফিরে আসে রাতে ডা. হাফিজ। আজ সাত মাস একই রুটিন চলছে। ক্রমেই বিরক্তি আর বিতৃষ্ণা ওর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। কেন যেন গত কদিন ধরে একমই যেতে ইচ্ছে করছিল না ওর। কেবল গাইগুঁই, কেবল এড়িয়ে চলার চেষ্টা। কিন্তু বাড়ির লোকজন ওর প্রাণের কথা চিন্তা করে জোর করে নিয়ে যায়, দিয়ে আসে নির্বাসনে।
রোজ চলছে এমনি ধকল, উৎকণ্ঠা আর আতঙ্ক। অনেকদিন বিশ্রাম পায়নি বুড়োটে এ শরীর। তাই আজ ডা. হাফিজের শরীরের অমন খয়াটে ভাব দেখে ফাতেমার বেশ দুশ্চিন্তা হয়। একটা মানুষ আজ এতটা মাস ধরে এমন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কতদিন আর সয়! শরীর তো মানুষের। বয়সও তো একেবারে কম হয়নি। তাকে নিয়ে আর্মিদের কেন যে এত শখ তা বোঝে না ফাতেমা। ওর দুশ্চিন্তা দেখে ডা. হাফিজ বলে, মরে গেলে মরে যাব, আমি আর একদিনও যাব না ওই জঙ্গলে। কোনোদিন সাপের কামড়েও তো মরে যেতে পারি, তার আগে আর্মিদের হাতে মরলেও শহিদ হবো। অন্তত মানুষ জানবে যে ওদের প্রলোভন আর প্ররোচনায় পা না-দেয়ায় ডা. হাফিজকে হত্যা করেছে পাক আর্মিরা। এ মৃত্যু গৌরবের। হারাবার কিছু নেই।
সে রাতে শোবার আগে নামাজ পড়ে কেন যেন ভীষণ কান্নাকাটি করে ডা. হাফিজ। একাগ্র মনে অনেক ঘোরের মধ্যে ডুবে ছিল যেন। স্বাধীনতা দেখার জন্যে তীব্র ব্যাকুলতা ছিল তার কণ্ঠে। সে ব্যাকুলতা, সে প্রত্যাশা আর স্বপ্নেরা প্রার্থনায় ঝরে ঝরে পড়ে কথা হয়ে। বাংলার স্বাধীনতা না দেখে যেন তার মৃত্যু না হয়। ব্যাকুল হয়ে করুণ সুরে মন থেকে যতদূর সম্ভব নতজানু হয়ে এ প্রার্থনা আওড়ে ছিল বারবার। মানুষের এ কষ্ট, ধ্বংস, হত্যা আর রক্ত আর দেখতে পারছি না খোদা। নারীদের লাঞ্ছনা আর সহ্য করতে পারছি না খোদা। শেষ কথা ছিল জালেমদের হাত থেকে বাংলাকে মুক্ত কর খোদা নানাভাবে, নানা ভঙ্গিমায়, নানা আকুতি নিয়ে এ কথাটি বারবার বলেছিল ডা. হাফিজ। আর ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপত্তা। তাদের জীবন রক্ষার তাগিদ। এবং স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনে যেন ওরা বীরের মতো লড়ে যেতে পারে সে প্রার্থনা। প্রার্থনায় একে একে এমনি কথাগুলো তাওড়ে যাচ্ছিল ডা. হাফিজ। আর বুক তার ভেসে যাচ্ছিল চোখের ধারায়। কান্নার ঢেউ তার বুক নিংড়ে উঠে আসছিল অন্তরের গভীর থেকে। দীর্ঘ সময় ধরে এ প্রার্থনায় গভীরভাবে মগ্ন ছিল সে। প্রার্থনার প্রতিটি বাণী বারবার আওড়েও যেন তার তৃপ্তি আসছিল না মনে। প্রার্থনা শেষে উঠোনে পায়চারি করে জুলহাসকে ডাকলো একবার; আর কোনো খবর আছে জুলহাস!
জুলহাস শুয়ে পড়েছিল। তড়িঘড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। না কাহা, তাজা খবর ওই একগই। মাইন ফুইট্টা পাক সেনার ট্রাক উইড়া গেছে।
আর কোনো খবর পাস নাই তাইলে? এরপর বিড়বিড় করে কী যেন বলে ডা. হাফিজ। উঠানজুড়ে পায়চারি করে অনেক সময় ধরে। তখন কেন যেন বারবার আকাশ দেখছিল।
রাত তখন বেশ গভীর। ফাতেমার কেবলই মনে হচ্ছে জলে বৈঠার শব্দ। অনেকগুলো বৈঠা একের পর এক উঠছে-নামছে। আর হুপ হুপ শব্দ উঠছে ভরা বর্ষার জলে। সে শব্দে ফাতেমার বুক দুরু দুরু কেঁপে ওঠে। বিছানায় আর গা রাখতে পারছিল না এক মুহূর্তের জন্যে। একসময় পায়ে পায়ে উঠে আসে ও। ঘরের এক কোণে টিমটিম করে জ্বলছে হ্যারিকেন। মৃদু আলো হ্যারিকেনের আশপাশে। হ্যারিকেনের আলোয় ফাতেমার শরীরের দীর্ঘ ছায়া সারাঘরে ছড়িয়ে পড়ে। আচমকা সে ছায়া দেখে নিজের ভেতরেই কেমন যেন কুঁকড়ে যায় ফাতেমা। ভয় কাজ করে ওর। পুরো ঘরজুড়ে নিজেকে ছড়িয়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় ফাতেমা। পাল্লা সামান্য ফাঁক করে বাইরে দেখার চেষ্টা করে। ঘুটঘুটে অন্ধকার যেন গিলে খেয়ে আছে সবকিছু। অন্ধকারের মধ্যে আরও গাঢ় আরও গভীর অন্ধকার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গাছগুলো। কোনটুক জল আর কোনটুক মাটি, বোঝাই যায় না। অনেকটা সময় চোখ রেখে কোনো নৌকা দূরে থাক কারও বাড়ির একটি কোষা নাও কিংবা কোন্দাও দেখল না ফাতেমা। তবে বৈঠার ছপ ছপ শব্দ কিসের! কোত্থেকে আসে এ শব্দ। বুঝতে চেষ্টা করে। চোখ রেখে কান পেতে ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করে ব্যাপারটি। একসময় দরজার খিল এঁটে খাটের কাছে এসে দাঁড়ায় ফাতেমা। বাঁ হাতে হ্যারিকেনটা তুলে ধরে ওপরে। একে একে ঘুমন্ত মানুষগুলোর মুখ দেখে ও। যুদ্ধের সময় নাতিরা দেশে এসেছে। এসেছে ছেলেমেয়ে সবাই। কার মুখ থেকে লাল ঝরছে। কার গলা কে বেড় দিয়ে আঁকড়ে ধরেছে, কার পিসি চেপেছে, তা নড়চড় দেখলেই বোঝে ফাতেমা। এমনি করে ছোট-বড় সবাইকে দেখে স্বামীর পাশে এসে দাঁড়াতেই বুক ধক্ করে ওঠে ওর। দু-পায়েরই হাঁট ভাঁজ করা। তবে এক পা খাড়া। আরেক পা ইলয়ে আছে। দু-হাত বুকের ওপর সমান্তরাল রাখা। মুখ বেশ উজ্জ্বল। চোখ দুটো বুজে আছে। যেন পরম তৃপ্তির একটা ভাব। সারাটা দিনই বুকে না-কি ব্যথা হয়েছে। কিন্তু ওই জঙ্গল থেকে আর খবর পাঠায় কীভাবে। তাই ব্যথা সয়েই জঙ্গলবাস করে এসেছে। কিন্তু রাতে শোবার আগে ব্যথাটা না-কি ফের বেড়েছে। চারদিকে ধু-ধু জল। জল ছড়িয়ে নানা জায়গায় পাকসেনাদের পাহারা। যখন তখন স্পিডবোটে এসে হাজির হয় ওরা। সামান্য সন্দেহ হলেই গুলি চালিয়ে দেয়। ঝোপেঝাড়ে উঁচু সড়কে পাহারায় আছে রাজাকার। তখন কোত্থেকে ডাক্তার আনবে দূরের এই গ্রামে। ডাক্তার হাফিজ নিজের ডিসপেনসারির ইমার্জেন্সি ওষুধ থেকে কী একটা ওষুধ খেয়ে নিল। তারপরও চোখে-মুখে অসহ্য এক যন্ত্রণার ছাপ ছিল ওর। কিন্তু এখন যেন পরম শান্তি আর তৃপ্তি নিয়ে ঘুমোচ্ছে। কোনো যন্ত্রণা নেই বুঝি শরীরে। বুকের খুব গভীর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ফাতেমার। কিন্তু পেট উঠছে নামছে কই? শ্বাস-প্রশ্বাসের কোনো নমুনা তো চোখে পড়ছে না। তবে কী ভুল দেখছে চোখ। এক লাফে খাটে উঠে বসে ও। ডা. হাফিজের পাশে বসে ও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। না, কোনো ওঠানামা তো চোখে পড়ছে না। বুকে হাত দেয়। কোনো ধুকপুক নেই। চোখের পাতা খোলার চেষ্টা করে, পারে না। পায়ে হাত দিতেই ঠা-া কিসের অস্তিত্ব ওর হাতে ঠেকে। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার দিয়ে ডা. হাফিজের বুকের ওপর আছড়ে পড়ে ফাতেমা।
সে চিৎকার ঘর ছাড়িয়ে উঠোন, উঠোন ছাড়িয়ে পাশের ঘর আর উঠোন, তারপর এ-বাড়ি ও-বাড়ি, ছাড়া বাড়ি, পুব বাড়ি, পশ্চিম বাড়ি ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তে। এবার সত্যি সত্যি অগুনতি নৌকো ছপ ছপ বৈঠা ফেলে ডাক্তার বাড়ির দিকে ছুটে আসতে থাকে। সেসব নৌকা থেকে বেশ কটি নৌকা আবার চলে গেছে দূরের আত্মীয়-স্বজনদের খবর দিতে ভিন গাঁয়ে।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার বাড়ি ভিড় বাড়ে মানুষের। উপচেপড়া ভিড়। সে ভিড়ে একসময় এসে যুক্ত হয়Ñ হাশিম, নূর আলি, মাকসুদ আর লতিফ। ওরা এলাকায় রাজাকার সদস্য। হাশিম প্লাটুন কমান্ডার। হিংস্র কুকুরের চেয়ে ভয়াবহ তাদের আচরণ। ওদের নৃশংসতার খবর শুনে যে কারও বুক হিম হয়ে আসে। মানবতার ‘ম’ নেই ওদের আচরণে চিন্তায় কাজেকর্মে। নৃশংসতার দিক থেকে অনেক সময় ওদের ভূমিকা পাকহানাদারদের চেয়েও কম না। কোনো জনমে ওরা বাঙালি ছিল কি না সংশয় আছে মানুষের মনে। ওদের দেখে মানুষজন এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করতে থাকে। কেউ ভেতর বাড়ি কেউ আড়ালে চলে যেতে থাকে। মুহূর্তে সামনের উঠোনের ভিড় হালকা হয়ে আসে রাজাকারদের ভয়ে! প্রবীণদের কয়েকজন এগিয়ে যায় ওদের কাছে। বাঁ হাতে রাইফেলের পুরো শরীর আর ডান হাতের আঙুল ট্রিগারে আছে কমান্ডার :
Ñ এইহানে এত ভিড় ক্যা গো।
Ñ মানুষ মারা গেছে গো।
Ñ কেডায়?
Ñ ডাক্তারে!
Ñ মানে হাফিজ ডাক্তার!
Ñ হ্যারে খুঁজতে খুঁজতে আমগো চোখখু দুইডা আন্ধা হওনের যোগাড়। এই চুদির পুতে এফি আইলো কহন মরতে।
Ñ একটু ভাইভ্যা কথা কইয়েন পিসি সাব। উনি একজন সম্মানিত মানুষ ছিলেন। এখন মৃত। মরা মাইন্যেরে গাইল পাড়েন ক্যা। নিজেও তো মরবেন একদিন! হেই ভাওমত কতা কইয়েন!
সঙ্গে সঙ্গে দুই রাজাকার রাইফেল তাক করে ওদের দিকে। কথা বাড়ইলে গুলি মারুম। দেশবেচইন্যা পুংগির পুতেরা সব এইহানে জোট বানছে। জলদি জলদি বিদায় কর হগলরে, এত মানু এক ফাই থাওন যাইব না। যে যেমতে আইছে খালি বিদায় করেন। হাফিজ ডাক্তার, হেই মরলি তো মরলি, আমগো ঘুম হারাম কইরা তবে মরলি। মাইন্যের কাতারে তরে হিসাব করণও হারাম। জাহান্নামের আগুন।
একসময় অগুনতি নৌকা ছুটে চলে ডা. হাফিজের লাশ নিয়ে। চারদিকে উঁচু মাটি নেই কোথাও। সব ডুবে আছে জলে। তাই এতদিন পুরনো যে কবরস্থানে লুকিয়ে ছিল ও। সেখানেই কবর দেয়ার কথা ভেবে রেখেছে বাড়ির লোকজন! ওদিকেই মানুষ চলেছে নৌকা নিয়ে। অগুনতি নৌকা এসে দরগার মসজিদের ঘাটে ভিড় করে। রাজাকার বাহিনিও আসে ওদের সঙ্গে। আরও কজন রাজাকার মসজিদ লাগোয়া চা-স্টলে অপেক্ষা করছিল। ওরা তাড়া দেয়। চালাইয়া কাম সারেন। দেরি করণের কোনো ভাও নাই! কিন্তু গোর দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। কবলের জল যত সেঁচে ততই নতুন জল ওঠে। প্রায় হাঁটু অবধি জল কবরে। জায়গাটি বেশ উঁচু। পুরনো সব কবর চারদিকে। বাঁধানো কবরগুলোর দেয়াল শ্যাওলায় ঢেকে আছে। কোনোটার পলেস্তারা খসে গেছে অনেকদিন। ইটের ফাঁকে ফাঁকে লতানো গাছ বেরিয়ে আছে। কোনো কোনো কবরের গায়ে মৃতের নাম লেখা থাকলেও তা আজ বিলুপ্তির ঠিকানায়। এমনি এক প্রাচীন কবরেও জল আর জল। সেচে কুলোতে পারছে না তিন তিনজন মানুষ। এদিকে রাজাকররা বারবার তাগাদা দিচ্ছে দাফন সেরে ভিড় কমানোর জন্যে। ওদের বাস্তবতা বুঝিয়ে বললে বলে, এইডা কী মানুষ বড়! লেপতোষক জাজিম লাগবো। মরা লাশ আর মরা গরুর মাঝে ফারাক আছে কুনো। গরুরে যদি পানিতে ভাসান দেওয়া যায়। তয় মরা মানুরে আডা পানির মাঝে শোয়াইতে কী এমুন অসুবিধা। রাজাকার নূর আলি কথাগুলো বলে তাকায় আশপাশের মানুষের দিকে। দেখে কেউ কোনো প্রতিবাদ করছে কি না। কথার ঘায়ে ডাক্তারের শীতল শরীর ক্ষত-বিক্ষত করে যেতে পারলেই যেন যত সুখ। ডাক্তার অইলো দোজখের খড়ি। কই হেরে দিয়া আগুন জ্বালাইব খোদায় আর পাগল গুলান হেরে মাতায় রাখব না বুকে রাখব হুশ করতে পারে না। আল্লার ভাও বুঝলে তো জাহান্নামের খড়ি অইয়া মরে নাÑ নাওজুবিল্লা মিন…। আবারও তাকায় রাজাকারগুলো। না কেউ মুখ খুলছে না। আসলে ওদের মুখের সামনে কে মুখ খুলবে!
রাজাকারগুলো ফের তাড়া দেয়, চালাইয়া কাম সারেন গো চালাইয়া! পরে কিন্তু খান সাবরা আইলে গুল্লি করা ছাড়া উপায় থাকব না। আন্ধা-গুন্ধা যেমনে পারমু গুল্লি ছাড়–ম। আমাগো ভালা মানু পাইয়া হিসাবেই আনতাছ না গো। চোখটা পাল্ডি দিমু তহন বুঝবা কত ধানে কত চাইল। এমন ডা. হাফিজরে কুত্তা দিয়া খাওনের কতা। বেইমান পাক দেশের দুসমন হের লেইগ্যা আবার দাফন। আবার ঘণ্টায় ঘণ্টায় সময় দেওয়ন। কী মামাবাড়ির আবদার? অই নুরু, মকসু পারলে গিয়া ডাক্তারের লাশ এট্টু মুইত্যা দিয়ায়। মাইন্যের মুত দিয়াই হেরে গোসল দেওনের কাম। হেয় হেইডারই কাবিল! বলেই হাসু একটা ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করে! লোকজনের একটু ছুটোছুটি দেখে ভীষণ আনন্দ হয় ওর। অন্য রাজাকারদের চোখেমুখেও তৃপ্তির আভা!
একসময় দাফন শেষ হলে সবাইকে তাড়া করে ঘাটে নিয়ে দাঁড়া করায় রাজাকারগুলো। হুইসেলের পর হুইসেল বাজিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে ওরা। শোনেন, একেক নাও একেক ফাই যাইব। সব নাও এক ফাই যাইতো পারবো না। একটা নাও পুবে যাইবে তার দশ মিনিট বাদে আরেক নাও খাড়া পশ্চিমে। নাও বাইবা। আর দল পাকাইবা তা অইবো না! বলেই রাজাকারটা গুড়–ম গুড়–ম দু রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে। মুহূর্তে ভয়ার্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয় আশাপাশে। ঠিকই দশ মিনিটের আগে একটা নৌকাও যেতে দিচ্ছে না। সব মানুষ জড়ো হয়ে আছে ঘাটে। ঘাটের পাড়ে। ওরা নিরস্ত্র। রাজাকারদের হাতে অস্ত্র। যে কোনো সময় যে কারও বুকে গুলি চালিয়ে দিলেও কারও বলার কিছু নেই, ওরা সব পারে। ভেবে মানুষগুলোর মুখ শুকিযে আমচুর। চোখেমুখে হতাশা কখনও আতঙ্ক। শেষে লাশ গোর দিতে এসে ওরাই বুঝি লাশ হতে যাচ্ছে। একসময় ভিড় হালকা হয়ে এলে রাজাকারদের নৌকো তরতর করে এগিয়ে যায় থানা সদরের দিকে।
ডাক্তার হাফিজের গুণগ্রাহীর অভাব নেই। চিকিৎসা দিয়ে সেবা করবে বলে যে অবসরের পর ঢাকা শহর ছেড়ে গ্রামে চলে আসে, তার শুভাকাক্সক্ষীর তো অভাব হতে পারে না। যে রোগী ওষুধ কিনতে পারে না তাকে ওষুধ দেয় নিজের ডিসপেনসারি থেকে বিনে পয়সায়। তখন তার চল্লিশায় মানুষ তো হবেই। মানুষের ওপর মানুষ। চারদিকে থই থই জল। আর জল ছাপিয়ে আসছে মানুষ ডাক্তার বাড়িতে। থই থই মানুষ বাড়িজুড়েÑ যেন কোনো দ্বীপের হাটে মানুষের ভিড়। দ্বীপের চারপাশে জল আর জল। দুপুরের আগখানে সে ভিড় উপচে পড়বে যেন। নৌকোর সারি। তার সঙ্গে আছে কোষা, কোন্দা, ভেলা কতকী জলবাহন মানুষ আসছে। যেদিক তাকাও মানুষ। এমনিতে জল আর যুদ্ধ মানুষেকে ঘরবন্দি করে রেখেছে। সুযোগ নেই যখন তখন ঘরের বাইরে যাবার। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এ এক মোক্ষম সুযোগ যেন। মৃতের সৎকার অনুষ্ঠান। সেখানে কোনো ভয় নেই। তার সঙ্গে অনেকের ঘরে খাবার জুটছে না ঠিকমতো। বর্ষায় ফসল নেই। খাবার নেই। কাজও নেই, যুদ্ধ চলছে দেশে। সে সঙ্গে ডাক্তারের প্রতি ভালোবাসা। সব মিলিয়ে মানুষ আসছে। বেশুমার আসছে। আয়োজকদেরও এ নিয়ে ভাবনা নেই। ডা. হাফিজের চল্লিশায় মানুষ আসবে না তো কার ওখানে আসবে? এমনকি ধারণা সবার। সে পরিকল্পনা নিয়েই চুলো বেঁধেছে উঠোনজুড়ে। হাঁড়ি চড়িয়েছে এক দুই তিন… গুনে শেষ করা যায় না। নদীর ওপার থেকেও হাড়ি জোগাড় করা হয়েছে লোক পাঠিয়ে।
দুপুর যখন একটু হেলছে। ছায়ারা একটু একটু করে বড় হচ্ছে। প্রথম ব্যাচে লাইন ধরে মানুষ বসেছে উঠোনজুড়ে। কুকুর আর কাকের উৎসব চারদিকে। তখনই তিন তিনটে হেলিকপ্টার পত পত পত করে উড়ে এলো তিন দিক থেকে। একটা হেলিকপ্টার অনেক নিচে নেমে এলো। ওপর থেকে ইশারা দিল নোকজনকে সরে যেতে। উঠোন ছেড়ে মানুষ ছড়িয়ে পড়তেই হেলিকপ্টারটা নেমে আসে। ল্যান্ডিং করে উঠোনে। কপ্টারের পাখার প্রচ- ঘূর্ণিতে মানুষের শরীরে কাঁপন ধরে যাবার জোগাড়। গায়ের কাপড় উড়ে যাবে যেন। একসময় পাখা শান্ত হতেই সাত-আটজন পাকসেনা স্টেনগান, এলএমজি এমনি অত্যাধুনিক অস্ত্র তাক করে নেমে আসে লাইন ধরে। মেজর রুশদিকে ঘিরে অন্য সৈন্যরা দাঁড়িয়ে পড়ে। সবার চোখেমুখে বাঘের হিংস্রতা। চোখ ফেটে পড়বে যেন ক্রোধে। রক্ত জমাট বেঁধে আছে সবকটি চোখের মণিতে। মেজর রুশদি গর্জে ওঠে,
Ñ ইধার কায়া হো রাহা হ্যায়? ইত্না আদমি কিউ?
যাদের মুখে দাড়ি আছে পাঞ্জাবি পরনে মাথায় টুপি অর্থাৎ দেখতে মৌলভি গোছের। বোঝা যায় ওরা মুসলমান, এমনি পাঁচ-ছ’জন মরুব্বি এগিয়ে যায়। মুরুব্বিরাও দেখতে পাঞ্জাবিদের মতো। লম্বায় ছ-ফুট প্রত্যেকেই। এদের মধ্যে প্রথমে এগিয়ে গেল রফি হক, তার পেছনে রিয়াজ। এরপর করিম ব্যাপারি ও তার ছেলে জামাল। ফের কর্কশ কণ্ঠে কঁকিয়ে ওঠে মেজর রুশদি। কেয়া হুয়া? কোই বাত নেহি কারনে হো? আসলে সবাই দীর্ঘদেহী হলেও কারও মুখ থেকে কথা সরছে না। আতঙ্ক তো আছেই, তার ওপর ভাবছে ওরা উর্দুতে বললে হয়তো কোনো বিপদ হবে না। কিন্তু উর্দুতো আর ওরা তেমন জানে না। ছোটবেলায় মাদ্রাসায় এক-আধুটা পড়েছে। তার ওপর মিলিটারি সামনে। বন্দুক তাক করা, তাই মুখে কিছু উঠছেও না এখন।
Ñ কেয়া বাথ হ্যায়, খামোশ কিউ হু? ইধার ক্যোয় মুক্তি কা ট্রেনিং হো রাহা হ্যায়? ইয়ে কেয়া তুম লগোকা মুক্তিকা ট্রেনিং ক্যাম্প হ্যায়? শা…লা কো বাচ্ছে!
Ñ ইয়ে এক মসুলিম ক্যা ঘর হ্যায়। ইধার এক মুরদা কা চেহলাম হো রাহা হ্যায়।
Ñ কিয়া মুরদা?
Ñ এক আদমি ইন্তেকাল ফরমাইয়ে উসকো চেহলাম।
Ñ কসিকা চেহলাম হ্যায়!
Ñ এক ডক্টর! বহুত পরহেজগার অর সাচ্চা মুসলমান হো। লোগেকে বহুত কাম আতে হে। ডক্তারকা ইন্তেকাল হো গেয়া, উনকা চেহলাম।
Ñ কিসকা চেহলাম?
Ñ ডক্টর সাবকো!
Ñ ডক্টর সাব! নাম কিয়া থা?
Ñ ডক্তটর হাফিজ!
ডাক্তার হাফিজ! সাচ্চা মুসলমান থে? ইয়াকিন নেহি আতা! বলেই ঠাস করে এক চড় কষায় রফি হকের গালে। অপ্রস্তুত রফি। অত বড় শরীর সামলাতে পারে না। হেলে যায় শরীর। উয়ো সাচ্চা মুসলমান থা? উয়ো মালাউন থা, উতো মুক্তি লোগোকা সাথ বেতাথা; ইনকে চারপুস্ত মালাউন হ্যায়। উয়ো ইন্ডিয়ান সরকারকে এজেন্ট থা। অর তুম উনকো সাচ্চা মুসলমান কা নাম দে রেহে হো। তুম শালা নিমকহারাম। ঝুটে! বলেই হাঁটু বরাবার লাথি ঝাড়ে মেজর। এবার হুমড়ি খেয়ে পড়ে রফি। রিয়াজ দু-হাত করজোড়ে অসহায় হয়ে বলল, উনকো মারিয়া মাত, উয়ো চিটার হ্যায়, হেড টিচার! উ বহাত খানদানি আদমি হ্যায়!
Ñ কেয়া বোলা তম উ চিটার হ্যায়?
Ñ হ্যাঁ ইয়ে আদমি টিচার হ্যায় হেড টিচার।
Ñ নেহি, উ, টিচার নেহি, উ চিটার হ্যায়। তুম বাঙালি লোগো মে টিচার, ডাক্তার, জার্নালিস্ট সবকে সব বেইমান, নিমকহারাম, মুসলমান কে দুশমন হো!
তুম ভি শালা দালাল, উন লোগোকে বারে মে, বাত কারণে আয়ে হো। বলেই রফিকের নাক বরাবর এক ঘুষি মারে মেজর। মুহূর্তে কলকলিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে নাক গলিয়ে। তুমলোক সবকে সব ঝুটে হো। তুম লোগোকে সারছেগাও তাত্ ঝুট হি ঝুট, তোম লোক কা পাকিস্তান কে হারামকে অওলাদ হো।
ওদের তুলনায় জামানের বয়স কিছুটা কম। ওর হাত নিশপিস করে। বড় দুই মামার গায়ে এভাবে হাত তোলায় দারুণ যন্ত্রণায় পুড়ছে ও। বিবেকের কাছে ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে। একবার নিজের হাতের দিকে তাকায়। একবার আকাশের দিকে তাকায়। আকাশে একটা হেলিকপ্টার তখনও চক্কর দিচ্ছে। আরেকটা চলে গেছে কখন যেন। জামান তড়িঘড়ি জল নিয়ে রিয়াজের নাকে ছিটাতে থাকে।
Ñ ইয়ে পাহলোয়ান, তুমকে কিসমে বোলা পানি দেনে কে লিয়ে। তোমকা মুক্তি হো? গর্জে ওঠে মেজর রুশদি।
Ñ নেহি, ইয়ে আদমি গভ. অফিসার হ্যায়, ব্যাংক কে ম্যানেজার।
Ñ কেয়া বোলা তুম মে, ব্যাংক ম্যানেজার! শালা বেইমান কা বাচ্চা, খাতারনাক তুমলোক খ্যাতে হো পোহেনাতে হো পাকিস্তানক্যা, অর ইন্ডিয়াকো রুপিয়া ভেস্তে হো, শুয়োর কা বাচ্চা, তোমলোক সবকেসব ঝুঁটে মাক্কার। বলেই রফির পাছায় লাথি ঝাড়ে জোরসে। রক্তাক্ত মুখ নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে ও উঠোনে।
এবার করিম ব্যাপারি এগিয়ে যায়। মেজর সাব, ইধার সব মুসলমান হ্যায়। আপ ভি তো মুসলিম হ্যায়! ইয়া এক মুসলমান আদমি কা চেহেলাম চালরাহা হ্যায়। আপকো কোই গলদ ফাহেমি হুয়া হ্যায়। ইধার কোই পাকিস্তান কো দুশমন নেহি হ্যায়। আপ খামোখা সবকো দারা রেহে হ্যায়। খোদা কো লিয়ে আপলোক সামঝিয়ে ইধার সব সাচ্চা মুসলমান হ্যায়। আপলোক জুলুম করনা বান্ধ কি জিএ।
Ñ কেয়া বোলা তুম মে, জুলুম!
Ñ কিসকো তুম জুলুম কারনা বলতে হো? তুম মুক্তিলোক হামলোগোকো তাংকাররোহে হো, আমলোগোকো ক্যাম্প জ্বালারেহে হো, হামলোগোকে গাড়ি জ্বালালেহে হো, এক কে বাদ এক ক্ষতিকাররেহে হো অর সাচ্চা মুসলমানলোগোকো তুম জানছে মাররেহে হো? এরপর চোখে ইঙ্গিত করে সিপাহীদের বলল, ইয়ে সাচ্চা মুসলমানলোগোকো থোরা খেল দিখা দো। ওর ইঙ্গিত পেয়ে আর্মিরা করিমকে ফুটবল বানিয়ে খেলতে থাকে। এক লাথিতে এদিকে ফেলে তো আরেক লাথিতে ওদিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে।
জামান এবার এগিয়ে যায়। ওকে কাছে আসতে দেখে মেজর চুকচুক করে ওঠে! পাহলোয়ান সাব তুম কিউ ইধার আ রেহে হো, কুচ বলনেকা হেয়?
Ñ ইয়ে আদমি মেরা আব্বু হ্যায়। আপলোক কিউ সব লোগোকে সামনে উনকো বেইজ্জত করর‌্যাহে হেয়। আব্বু এক সাচ্চা মুসলমান হ্যায়, পাচ ওয়াকত নামাজ কোরান পারতেহো।
Ñ পাহলোয়ান সাব ইধার আও। তুম কিয়া মুক্তি হো!
করিম ব্যাপারি ছ-ফুটের বেশি লম্বা। ফর্সা। চাপ দাড়ি নাভি ছাড়িয়ে পড়েছে। দিঘল চোখ। সে চেবাখে পবিত্র এক আলো। তারই অবিকল জামান। কেবল ওর মুখে দাড়ি নেই। ওকে ফের কাছে ডাকে ইধার আও পাহলোয়ান। তুম মুক্তি হ্যায়?
Ñ নেহি সাব! ম্যায় বিজনেস কারতে হ্যায়।
Ñ বিজনেস! কিসকে বিজনেস?
Ñ মেরা খুদকা পাট কা বিজনেস হ্যায়!
জুট! ঠোঁট কামড়ে মাটিতে জোরে একটা ঠেকা দিল বুট জুতো দিয়ে। ঠকাস করে শব্দ হতেই চমকে ওঠে অনেকেই।
Ñ ইধার তো সবলোক কো গাদ্দার হ্যায়। ইস সময় তুম পাকিস্তান ম্যা জুট না ভেস্কে তুম ইন্ডিয়ামে ভেসরেহে হো। মালাউন লোগো কে সাত দোস্তি বারারেহে হো!
Ñ নেহি সাহাব! যুদ্ধ কে লিয়ে সব কামকাজ বন্ধ হ্যায়।
Ñ কে বোলা তুমি মে যুদ্ধ! কাঁহা দেখা তুম মে যুদ্ধ!
Ñ যুদ্ধ ক্যা মতলব ওয়্যার? তোতলাতে থাকে জামান!
Ñ ওয়্যার! তুম কাঁহা দেখা? পুরা বাঙ্গাল মুল্লুক মে শান্তি হ্যায়। আর তুম লোক মালাউন কে সাত মিলকে যুদ্ধ যুদ্ধ বলকে, তামাম জাঁহা মে আগুয়া ফ্যায়লা রাহো হো। সাচ বাদ ইয়ে তো কি হ্যায় তুমলোক ইন্ডিয়াকা এজেন্ট হো। অর ইন্ডিয়াকে লিয়ে কাম কাররাহে হো। মুচকি হেসে তোমরা কাপড়া ওঠাও।
Ñ ম্যায় সাচ্চা মুসলমান মেরা খাতনা হুয়া হ্যায়। ক্ষোভে, ক্রোধে, ভয়ে রীতিমতো কাঁপতে থাকে জামান।
Ñ পাহেলে পাঞ্জাবি কা হতা গোটাও।
জামান পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে ওপরে তোলে। কনুইয়ের ভাঁজ হাত দিয়ে ঘষে ঘষে দেখে মেজর। এরপর ফের লুঙ্গি তুলতে বলে! জামান অবাক হয়ে তাকায়! ভাবে সত্যি সত্যি ওর লিঙ্গ দেখতে চাচ্ছে মেজর সাব! তাই বাধ সাধে ও, হাম সাচ্ বাদ বল রাহা হে, মেরা খাৎনা হুয়া হ্যা! মেজর একটু মুচকি হেসে বলে, না না, হাঁটুকা ওপার মে তোলো।
জামান হাঁটু অবধি লুঙ্গি তোলে। হাঁটুর ভাঁজে খসখসে পুরু চামড়া বারবার হাতে ঘষে দেখে মেজর। সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছে কি না তার প্রমাণ খোঁজে হাঁটু-কুনুইয়ের ভাঁজে-ভাঁজে। এরপর পাঞ্জাবি খুলতে বললে তা-ও খুলে দেখায় জামান। ওঠো ঠিক হ্যায়।
বাড়িজুড়ে থই থই মানুষ, উপচে পড়া মানুষ হলেও সবাই মুখে কলুপ এঁটেছে। কারও মুখে কথা নেই। নীরব দর্শক সবাই। শুনশান নীরবতা চারদিকে। এত মানুষের ভিড়ে এমন নিঃসীম নীরবতা নেমে আসে কেমন করে। যেন ভুতুড়ে বাড়ি এটা। জনমানব শূন্য। এমনিতে উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিমে যতদূর জলাভূমি, নামাভূমি বিল আর হাওড় আছে, সবখানে লাশ আর লাশ। যুদ্ধের শুরু থেকে এ এক নিত্যকার চিত্র। লাশর ওপর লাশ। নদীতে ভেসে যাচ্ছে লাশ। নারী পুরুষ শিশুর লাশ আর লাশ। গরু ভেড়া ছাগল এমনি কত মড়া ভেসে যাচ্ছে গলিত অর্ধগলিত, উলঙ্গ, চোখহীন, অঙ্গহীন অসংখ্য লাশ ভাসছে। লাশ জমে আছে স্তূপ হয়ে অনেকগুলো আবার বাঁশের চালির মতো দড়ি দিয়ে পাশাপাশি বাঁধা। ওদের হাত বাঁধা। চোখ বাঁধা। লাশের সারি নদীর স্রোত ধরে নেমে যাচ্ছে ভাটির টানে। লাশ ঠুকরে ঠুকরে মাংস খেয়ে মাছেরাও এখন ক্লান্ত।
সেসব লাশের ওপর নজর পড়েছে চিল শকুন আর কাকের। দিনভর এরা উড়ে বেড়ায় চালায় নামার ভূমিতে জমে থাকা বর্ষার জলের ওপর। মাছের দিকেও ওদের দৃষ্টি। যখন তখন ছোঁ মেরে মাছ তুলে নিচ্ছে জলের গভীর থেকে। তাই দিনভর ডাক্তার বাড়ির সামনের খোলা প্রাঙ্গণে জলের ওপর কাকের ডাক, চিলের কান্না আর শুকনের কুঁই কুঁই ডাক। আজ ওদের ভিড় আরও বেড়েছে। ওদের ডাক আরও চড়া সুরে বাজছে খোলা চাতালজুড়ে। অনেকগুলো গরু কাটা হয়েছে। কাটা হয়েছে খাসি। মুরগিও ধড়ফড় করে নীরব হয়ে গেছে চিরতরে অসংখ্য। সুতরাং ভুঁড়ি ভোজের আয়োজন শুধু আজ ডাক্তারবাড়ি জুড়ে নয়, সে আনন্দ কাক ছিল, শকুন আর কুকুরদের প্রাণেও ছড়িয়েছে। ডাকাডাকি আর কলরব চারদিকে মুখর করে রেখেছে ওরা। কিন্তু পাকসেনারা আসার পর ডাক্তারবাড়ির শ্মশান নীরবতা ওদেরও যেন ছুঁয়ে গেছে পলে পলে। ছুঁয়ে যাচ্ছে সারাবাড়ির আতঙ্ক আর নিঃশব্দতাকেও। সবদার বাড়ির জঙ্গলে উঁচু বাঁশঝাড়ে কয়েকটা শকুন দিনভর কোঁকাচ্ছিল। কাঁদছিল যেন শিশুর মতো। সেই শকুনগুলো যেন হঠাৎ সব ডাক ভুলে গেছে। ভুলে গেছে ওড়াউড়ি। মাঝেমাঝে গলা উঁচিয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল। ফের স্থির। একই চিত্র নুরুদের তালগাছের মাথায় বসে থাকা শকুনগুলোর বেলায়ও। চিলেরা দু’ডানা ছড়িয়ে কেবল দিঘল ছায়ায় ঢেকে দিচ্ছে জল। কোনো ডাকাডাকি নেই। শিকারের পাঁয়তারা নেই। ওড়ার কোনো ছন্দ নেই। গতি নেই কেবল দু’ডানা ছড়িয়ে সমান্তরাল উড়ে চলেছে। অনেকদূর চলে গিয়ে ফের ফিরে আসছে। কেমন হাহাকার যেন ওদের আচরণে উড়ে যাওয়ার মাঝেÑ সবখানে। গোরু খাসির বর্জ্য পড়ে আছে পেছনে এক পরিত্যক্ত ঘাটে। কিন্তু সেখানে মুখ দেয়ার, খুঁটে দেখার কোনো আগ্রহ নেই চিল আর কাকেদের। বিশেষ করে কুকুরগুলো হঠাৎ হঠাৎ সমস্বরে কুঁই কুঁই করে ডেকে উঠছে প্রলম্বিত সুরে। তখন বেহাগের করুণ সুর যেন চারদিকের সকল অস্তিত্বকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। অনেকগুলো নেড়ি কুকুর দূরে বসে লেজ নাড়ছে কেবল। চোখে পিটুটি না জল ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। এমনিতে ভরা বর্ষায় খাবার না পেয়ে দূরে কোথাও যেতে না পেরে কুকুরগুলোর ত্রাহী ত্রাহী অবস্থা। তারপরও খাবারের প্রতি আজ ওদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। বরং মনে হচ্ছে বর্জ্যগুলো পাহারা দিচ্ছে বিশ্বস্ততার সঙ্গে। সবখানে গাঢ় এক নীরবতা। সব উদ্দাম, উচ্ছলতা আর প্রগলভতা হারিয়ে ওরা যেন দিকশূন্য। কিংবা চরিত্র শূন্য হয়ে ওরা ভুলে গেছে কেন এসেছে এ পৃথিবীতে। কী তার কাজ। কি তার ভূমিকা। তার আচরণই বা কী। নীরব নিশ্চয়ল গতিহীন গতিহারা পথভুলো হয়ে যেন ওরা পাক খাচ্ছে এখানে-ওখানে। নিঃশব্দে। নিঃসীম নীরবে।
মেজরের ইশারায় পাকসেনাদের সবকটি মাথা কাছাকাছি হয়। কী যেন শলাপরামর্শ করে। তারপর সব লোকজনদের বলে লাইন করে দাঁড়াতে। তখন মনির খান তাদের আপ্যায়নের অনুরোধ জানায়।
তোমাদের জন্য সবাই না খেয়ে আছে। তোমরা আমাদের সঙ্গে খেলে আমরা খুশি হবো এটা মুসলমানের অনুষ্ঠান!
Ñ ফের তুম খুদ কো মুসলমান বোল বেহে হো। তুম কোই ভি মুসলমান নেহি হ্যায়। তুমলোক মালাউনকা বাচ্চা হো!
বলেই সবাইকে লাইন ধরতে বলে। তার আগে রফি, রিয়াজসহ প্রথম পাঁচজনকে আলাদা করে লাইন করে দাঁড় করায়। এরপর শয়ে শয়ে মানুষের লাইন। ওরা আটজন আর্মি দুদিকে গেটের মতো দাঁড়িয়েছে। ওদের মাঝখান দিয়ে একজন একজন করে পার হচ্ছে। খুব কাছ থেকে দেখছে সবাইকে। যাচাই করছে তীক্ষè চোখে। তারপর যাকে সন্দেহ হচ্ছে তাকে আলাদা করে লাইনে দাঁড় করাচ্ছে। এমনি করে বাছাই পর্ব শেষ হতে হতে সন্ধ্যা উৎরে যায়। এরই মধ্যে আরও একটা হেলিকপ্টার আসে। দুটো হলিকপ্টার থেকে সার্চলাইট ফেলা হয় উঠোনে। এমনি করে আগের পাঁচজনসহ আরও ষোলোজনকে এক লাইনে দাঁড় করায়। এবার একুশজনকে বলে, ইজি হয়ে দাঁড়াও। মার্চ করো। মার্চ করতে করতে পশ্চিম বাড়ির ঘাটে এনে দাঁড় করায় ওদের। ঘাটের ডান পাশে ঢিবি মতো উঁচু জায়গা। ওখানে এ বাড়ির মসজিদ আর মক্তব।
মসজিদ দেখিয়ে করিম ব্যাপারি বলে,
Ñ তোম লোগোকো ইয়েকিন নেহি আতা হ্যায় তো চালো মাসজিদ মে চলো। তোমলোক দোখমে উধার আমপারা হ্যায়, কোরান মজিদ হ্যায়। সব বাচ্ছে লোক ইধার আকে কোরান মজিদ পাড়তে হ্যায়। নামাজ পাড়তে হ্যায়।
Ñ রাখদো তোমারা কোরান! ওয়াক্ত আনেসে দেখ লেংগে।
এ ঘাটটি পশ্চিম উঠোনের পাড়ে বাঁধা হয়েছে। খেজুর গাছ, তালগাছ আর মোটা মোটা সব গাছের গুঁড়ি ফেলে ঘাটটি তৈরি। এমনি আরেকটি ঘাট আছে পুববাড়ির শেষে। বর্ষার জলে স্নান করা ধোয়া-মোছার সব কাজ চলে এ ঘাটে। সময়ে নৌকো কোষা ডিঙ্গি এসে ভেড়ে।
ওদের সঙ্গে সঙ্গে হেলিকপ্টার দুটোও চলে আসে ঘাটের কাছে। সার্চলাইট মাঝে মাঝে জ্বালছে আবার নিভিয়ে দিচ্ছে। হেলিকপ্টারের বাতাসে জলে তোলপাড়। বেশ বড় বড় ঢেউ উঠছে। ঢেউ এসে মাথা কুটছে ঘাটে। উঠোনের পাড়ে পাড়ে। কখনও লাইটের আলোয় অনেকদূর চোখে পড়ে। ধু-ধু জল চারদিকে। কপ্টারের বাতাস যদ্দুর যাচ্ছে কেবল ঢেউ আর ঢেউ। একুশজন মানুষ কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না। নিশ্চয় মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। কী বলছে ওদের মন, পড়া যাচ্ছে না। পাকসেনাদের মতিগতিও বোঝা যাচ্ছে না। কেন এত মানুষ থেকে ওদেরকে বাছাই করল, কেন লাইন করে ওদের নিয়ে এলো। কেন দাঁড় করিয়ে রাখছে। কী করতে চায় কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। পিনপতন নীরবতা চারদিকে। ওদের পেছন পেছন আসা মানুষেরা কেউ কাছে যেতে পারছে না। আবার না বলা পর্যন্ত এ স্থান ছেড়ে যাওয়াও নিষেধ। তাই সবাই দূর থেকে দেখছে সব। ওদের কণ্ঠ শুকিয়ে কাঠ। চোখ পাথরের মতো খরখরে আর স্থির। চোখে-মুখে আতঙ্ক। শরীরে রক্ত নিশ্চল, জমে আছে যেন। ভেতর বাড়িতে কারা যেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সে কান্না থামাতে কেউ কেউ আবার ফিসফিসিয়ে বোঝাচ্ছে। সব মিলিয়ে এক গুমোট আবহ। তখনই এক হুজুর কোষায় চড়ে ঘাটে এসে ওঠে। তাকে দেখামাত্র কাছে ডাকে মেজর।
Ñ তুম কিয়া চ্যাতে হো।
Ñ ম্যায় ইস মসজিদকা মোয়াজ্জেম হো। মাগরিবকা ওয়াকতা হুয়া হ্যায়। ম্যায় আজান দুংগা।
Ñ আজান! কাফের লোগোকা আজান দিয়া? তোমলোগোকা কিসকা নামাজ। তামাশা কাররেহে হো। গোলি মার দেঙ্গে শালা।
মোয়াজ্জিন আর কথা না বাড়িয়ে যন্ত্রের মতো স্থির হয়ে যায় মুহূর্তে।
Ñ ইধার আও, অর ইধার-ওধার মাত দেখো সিধে সামনে যাও!
মোয়াজ্জিন পড়িমরি করে ভেতর বাড়ির দিকে ছুট দেয়। এবার একে একে ঘাটের দিকে নামিয়ে আনে একুশজনকে। এক লাইনে জায়গা হয় না সবার।
দুসরা লাইন কোরো। দুসরা লাইন। এক সৈনিকের আদেশে ওরা তালগাছ, খেজুর গাছের গুঁড়িতে দু-লাইনে দাঁড়ায়। তখন হেলিকপ্টারের সার্চলাইট বেশ কবার জ্বলে-নেভে। হঠাৎ দূরের মানুষগুলোকে তাড়া দেয় পাকসেনারা। জমে থাকা মানুষেরা আরও দূরে সরে গেলে হঠাৎ মেজর বাদে বাকি সাত আর্মি মুহূর্তে ব্রাশফায়ারে কাঁপিয়ে তোলে পুরো তল্লাট। কিছু মানুষের তীব্র আর্তনাদ মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে যায়। কিছু মানুষ কোঁকাতে থাকে তীব্র যন্ত্রণায়। কার মুখ থেকে যেন পানির জন্যে আকুতি ফোটে। কিন্তু ঠিক বোঝা যায় না। বোঝা গেলেও কিছু করার নেই। সীমার বনে গেছে সবাই। পাথরের মতো কঠিন। এছাড়া আর কোনো পথ নেই! একুশটি মানুষের রক্তে একাকার হয়ে যায় ঘাটের জল। কালচে জলে এখন লালচে আভা। গভীর সংবেদনশীল এক রং এসে যেন মেশে সে জলে। পানি পানি বলে এতক্ষণ কোঁকাচ্ছিল, কাতর সে কণ্ঠও একসময় নীরব হয়ে আসে। তখনই দূর থেকে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি। তবে হেলিকপ্টারের তীব্র কর্কশ শব্দে সে ধ্বনি হারিয়ে যায়। শেষবারের মতো লাশগুলো ফের যাচাই করে দেখে পাকসেনারা। কোনো লাশের বুকে বুট দিয়ে চেপে ধরে। কোনোটার মাথায় কিক মারে জোরসে। কারও পেটের ওপর লাফাতে থাকে। শেষে এক হাবিলদার বলে, সব কে সব খতম হো যায়া স্যার। থ্যাঙ্কু, বলে তৃপ্তির হাসি হাসে মেজর। এবার একটু একটু করে দুটো কপ্টারই নেমে আসে নিচে। ল্যান্ডিং করে না। ওপর থেকে মই নামিয়ে দেয় নিচে। তরতর করে দুভাগে ভাগ হয়ে পাকসেনারা উঠে যায় ওপরে। কপ্টারের আলোয় যদ্দুর চোখ যায়, শুধু রক্ত আর রক্ত, ভরা বর্ষার জলে। লালচে জল ঢেউ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে, ঘাটে এসে আছড়ে পড়ে কী এক কষ্টে। কপ্টারের পাখার বাতাসে জলের বুকে মুধু তোলপাড়। জলে শুধু রক্তের কাঁপন! কাঁপা কাঁপা জল! কাঁপা কাঁপা ঢেউ এসে বারবার মাথা কুটছিল ঘাটে। ফের তলিয়ে পড়ছিল গড়িয়ে পড়ছিল কালচে রক্ত ধারা।
হঠাৎ যখন একঝাঁক গুলির শব্দে একুশটি প্রাণ ঝরে পড়ল অকালে। তখন সব নীরবতা ভেঙে রাতের অন্ধকার খান খান করে সব মগ্নতা ছাপিয়ে চিল-শকুনেরা সরব হয়। কিন্তু এ ডাক কান্নার চেয়ে ভয়ঙ্কর। এ ওড়া, ডানা ঝাপটানো কেমন ভৌতিক আর পৈশাচিক। দীঘল পাখার ছায়ায় অনেকদূর ঢেকে যায়। যেন বুকের খাঁজ ভেঙে ভেঙে ভেতরে সেধিয়ে যাচ্ছে সে কান্না। পাখিদের ভৌতিক ছায়া সারা শরীরে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। কান্না ওদের থামে না। প্রহরের পর প্রহর কেটে যায়। ওরা কেঁদেই চলেছে রাতের নীরবতাকে ছাপিয়ে। সেসব কান্নার সঙ্গে মিলে যখন শকুনেরাও কান্না জুড়ে দেয়, তখন মনে হয় বর্ষার ধু-ধু জল, জলের গভীরে লুকিয়ে থাকা মাছ, শ্যাওলা, কচুরিপানা, গাছের পাতা, গাছের কা-, গাছের ছায়া স-ব সব কিছু এক গভীর শোকে একাকার হয়ে মিশে যাচ্ছে অন্ধকারে।
প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা, অস্তিত্বের সঙ্গে একাকার হয়ে যাওয়াÑ এসব অনুষঙ্গের এমনই যন্ত্রণা অনেকের মনে এত গভীর ছায়া ফেলে যে, মুখে কোনো কথা সরে না তাদের। সোলেমান নীরবে লাশগুলো দেখছিল তন্ময় হয়ে। চুলো খোঁড়া থেকে খড়ি চেলা করা, মাংস কাটা সর্বকাজের সঙ্গে গতকাল থেকে জড়িয়েছিল সোলেমান। রফির কথামতো সব করছিল ও অথচ সেই মানুষটা এখন নীরব। ওর তাজা রক্ত জলের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে একটু একটু করে। বিড়বিড় করে বলে, খবিশ, পাষ-! পশুপাখিরও দয়া মায়া আছে। কেমন তড়পাইতাছে বুক ফাটতাছে বুঝি। কে কয় পশুপাখি বেবুঝ, সব বুঝে হেরা। বেজন্মাগুলির তাও নাই। পশুর চাইতে অধম এরা। খাড়ার উপরে এককুড়ি একটা মানুষরে লাশ বানাইয়া দিল। এত মাডি কই, গোর দিব ক্যামনে! মহা দুঃশ্চিন্ত কাজ করে সোলেমানের মনে।
একুশটি শরীর এর ওর ওপর পড়ে আছে। কোনোটা অর্ধেক ডুবে আছে জলে। কোনোটা ভাসছে। ততক্ষণে অনেকগুলো হ্যারিকেন আর হ্যাজাক বাতির আলো এসে ভিড় করেছে ঘাটে। কিন্তু গভীর কষ্টের ভিড়ে সে আলো ম্লান হয়ে যায় মুহূর্তে। অনেক মানুষের ভিড় সেখানে। ওরাও জানে না কেন এসে দাঁড়িয়েছে এই অবেলায় ঘাটে। দূর থেকে, বহুদূর থেকে শুধু কেঁপে কেঁপে রক্তজল আসছে। কালচে লাল সে জলে ভাসছে একুশটি লাশ। জলগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে কী এক ভালোবাসায় যেন ভিজিয়ে দিচ্ছে একুশটি শরীর। ঢেউগুলো কেঁপে কেঁপে কী এক যন্ত্রণায় যেন ভেঙে পড়ছে বারবার!

শ্রেণী:

একটি গল্পের অপমৃত্যু!

Posted on by 0 comment
41

41অঞ্জন আচার্য: নিতান্ত একটা সুখী সমাপ্তি ঘটতে পারতো আমার জীবনে। যেমনটা ঘটে রূপকথার গল্পে : ‘অবশেষে রাজা-রানি সুখে-শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিলো’। কিন্তু বিধি বাম। সেই কপাল নিয়েই জন্মাই নি যে! আমি বড়ো কপালে বিশ্বাসী মেয়ে। কিংবা বলা যায়, ওই সুখী পরিণতি কি আমি আদৌ চেয়েছি কখনও? আর সবার মতোই আমার বেড়ে ওঠা। টানাপড়েন সংসারের মধ্যবিত্ত ঘরের সাদামাটা জীবন আমার। লেখাপড়ায় বলতে গেলে অনেকটা বুদ্ধদেব বসুর মতো; সহজাতভাবেই মেধাবী। স্কুলের গ-ি পেরিয়ে গেছি অনায়াসে বন্ধুদের ঈর্ষার কারণ হয়ে। কলেজেও তাই, বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠেও সেই একই দশা। হঠাৎ এ সময় এসে আর অনেকের মতো আমার জীবনের বাঁক-বদল হয়। শুরুতে এমনটা অনুভব করিনি। মনে করার মতো তেমন কারণও ছিল না। খুব ছোট্টবেলা থেকেই নিজের রূপের বর্ণনা শুনতে শুনতে ভেতরে ভেতরে অহঙ্কারী হয়ে উঠেছি কবে, টেরই পাই নি। অথচ স্বভাবে আমি নিরহঙ্কারী। আমাকে জেনেছে যে খুব কাছ থেকে, অনুভব করেছে নিবিড়ভাবে, সে-ই জানে, আমি মানুষটা নারকেলের মতো। বাইরে মরুভূমি, ভেতরে অথৈ সাগর।
যা-ই হোক, অরুণাভ এলো। পাল্টে গেল আমার প্রতিদিনের ছকবাঁধা জীবন। নিয়ত তাকে প্রত্যাখ্যান একদিন আমাকে শেখালো ভালোবাসা কাকে বলে। বর্ণমালার মতো অরুণাভ শেখাল কী করে ভালোবাসতে হয়। জীবনে সেই প্রথমবার জানলামÑ ভালোবাসাও শেখার বিষয়; যেমনটা একদিন হারমোনিয়ামের রিড চেপে শিখেছিলাম গান। তবে এর আগেও সেই নরম অনুভূতি বুদবুদ করেছিল আমার মনের কুয়োয়। সেটা একান্ত একপেশে, নিজস্ব গোপনে। সেসব অতীত। ডায়েরির পাতার ভাঁজে যেমন শুকনো পাতা থাকে কিংবা গোলাপের পাপড়ি, অতীতের সেই দিনগুলো আজও রাখা আছে আমার ডায়েরির ভাঁজে ভাঁজে। কারণ, আমার অতীত কখনও ধূসর হয় না। এক এক করে স্মৃতি হয়ে ধরে দেয় এক একটা দিনে, নয়তো নির্ঘুম রাতে। তবে আজ যে সংকটের ভেতর দিয়ে আমি যাচ্ছি, তা কাউকেই বলতে পারছি না। না আমার কোনো বন্ধুকে, না কোনো স্বজনকে।
অরুণাভকে আমি আর ভালোবাসতে পারছি না। তাকে দেখলে বরং বড্ড করুণা হয় আজকাল। ছেলেটা পাগলের মতো এখনও ভালোবেসে যাচ্ছে আমাকে। অথচ কবেই ছিঁড়ে গেছে আমাদের ভেতরকার তানপুরার তারটি। দুজনার হাতে ধরা থার্মোমিটারটি হাত ফসকে কবে কখন মাটিতে পড়ে ভেঙে গেছে, পারদ তার ছিটকে পড়েছে এদিক-ওদিকÑ দুজনার কেউ তা টের পাইনি। এই পুরুষবাদী সমাজে হয়তো এতে করে সবাই আমাকেই মন্দ বলবে। পুরো দোষটা চাপিয়ে দেবে আমারই ওপর। আমার পরিবার, আমার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সবাই আমাকে ছিঃ ছিঃ করবে। ঘেন্নায় মুখ ঘুরিয়ে নেবে। হয়তো সবাই বলবে, তবে কেন এই মিছে স্বপ্ন-স্বপ্ন খেলা? গ্রিক একটা মিথের কাহিনি আজকাল বড়ো মনে পড়ে। ভালোবাসার চোখে কোনো নারী-পুরুষ যদি একে অপরের দিকে তাকায় তবে স্বর্গে একটি শিশুর নামকরণ করা হয়। আমাদের সেই শিশুর জন্ম আজ থেকে পাঁচ বছর আগে। আজ তার স্কুলে পড়ার বয়স। অথচ জানি, তার জন্ম কখনোই হবে না এই পৃথিবীতে। এ হওয়ার নয়। কেননা, আমি আর অরুণাভকে ভালোবাসি না। অনেক চেষ্টা করেও পারছি না। আমি যাকে আজ ভালোবাসি, তাকে কোনোদিনই পাওয়ার নয়। তবুও তাকে ভালোবাসি। সমাজ-সংসার-ধর্ম বলে কথা! আমার ও অরুণাভের প্রেম পর্বে যে মানুষটির ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি, সেই শুভ্র মামাকে আমি ভালোবাসি। মায়ের মেসতুতো ভাইটিই আজ আমার কাক্সিক্ষত প্রেমিক পুরুষ। দিন শেষে আমি যে একজন নিতান্ত মানুষ। ভালোবাসার কাঙ্গাল!
শুভ্র মামা আমাকে ভালোবাসে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি। কিন্তু আমি তো সেই ভালোবাসা চাই না। আমি চাই তার কাছ থেকে অরুণাভের মতো কিছু। অথচ তা পাওয়ার নয়। সমাজ আমাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে শিখিয়েছে মামা-সম্পর্কের কাউকে ভালোবাসার বাঁধনে বাঁধতে নেই। আমি বাঁধছিও না। ছেড়ে দিয়েছি নিজেকে। সমুদ্রে ভাসিয়েছি একা ডিঙি নৌকো। কেবল মনে মনে ভেসে যাচ্ছি, ভালোবেসে যাচ্ছি। এইটুকু অধিকার তো আমার আছে, না-কি?
আজ মামা আমাদের বাড়িতে এসেছিল তার বিয়ের নিমন্ত্রণ করতে। আমি মামার দিকে তাকিয়েছিলাম। মামাও আমায় দেখে ¯েœহের হাসি হেসে বললÑ ‘তোর পড়াশোনা কেমন চলছে রে মৃদু?’ আমি আমার নামের মতো মৃদু হেসে ছোট্ট করে বললামÑ ভালোই। কথাটি বলার সঙ্গে সঙ্গে কেন জানি হঠাৎ আমার খুব কান্না পেল। দু-হাতে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করল মামাকে। মামার বুকে মুখ রেখে খুব কাঁদতে ইচ্ছে করল। কেন এমনটা অনুভূত হলো, ঠিক জানি না। দোতলার বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে আমি শুভ্র মামার চলে যাওয়া দেখলাম। শুভ্র মামা হেঁটে যাচ্ছে। রাস্তা পেরিয়ে বড় রাস্তায়। পেছন থেকে মামাকে খুব ডাকতে ইচ্ছে করছিল। এমনিতেই। আরেকটিবার মুখখানা খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল তার। কিন্তু ডাকিনি। কিংবা সাহস হয়নি। শুনেছি, পেছন থেকে ডাকা না-কি অমঙ্গল। আমি তো আর শুভ্র মামার কোনো অমঙ্গল চাইতে পারি না।

শ্রেণী:

ডেথ সার্টিফিকেট

49

49খালিদ মারুফ: মিসেস অবন্তী গুহ, বয়স ঊনপঞ্চাশ।
কাছে-দূরে থেমে থেমে গুলির আওয়াজের মধ্যে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে সকালের কাছাকাছি সময়ে এসে সিদ্ধান্ত নিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে জমানো তার স্বামীর প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাগুলো যত দ্রুত সম্ভব তুলে ফেলবেন। তুলে ফেলবেন ইস্টার্ন ফেডারেল ইন্স্যুরেন্সের বীমার টাকাটাও। বেঁচে দিবেন তাদের যৌথ জীবনের বহু স্মৃতিবিজড়িত প্রথম ও একমাত্র পারিবারিক বাহন; কালো মরিস মাইনরটিও। কার্যত শহরে নির্বিচার গণহত্যা শুরুর প্রথম রাতটির পর থেকেই তিনি পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তার পঞ্চদশবর্ষীয়া কন্যাটিকে নিয়ে। মরিস মাইনরটি পড়ে আছে তার স্বামীর নামে বরাদ্দকৃত এবং বর্তমানে পরিত্যক্ত বাড়িটির গ্যারাজে। পালিয়ে বেড়াচ্ছে তার ড্রাইভারও। সুতরাং অধ্যাপক মহোদয়ের স্মৃতিবিজড়িত ঐ গাড়ি এখন তার নিকট একটি বোঝা, তাই সেটাকে বেঁচে দেওয়াই শ্রেয় বলে মনে হচ্ছে। স্বামীর প্রভিডেন্ট ফান্ড, বীমা ও গাড়ি বিক্রির টাকা দিয়ে তিনি ঠিক করতে চান তা এখনও স্থীর করেন নি। ইতোমধ্যেই তার বিদেশি বন্ধুদের পাঠানো কয়েকটি সহমর্মিতামূলক চিঠি তার হাতে এসে পৌঁছেছে, সেইসব চিঠিতে সহমর্মিতা জানানোর পাশাপাশি দুজন বিলেতি বন্ধু তাকে দেশত্যাগ করে সেখানে গিয়ে আশ্রয় নেবার জন্য অনুরোধও করেছেন। এবং সেক্ষেত্রে সেখানে তার চাকরিপ্রাপ্তিসহ অন্যান্য সুবিধা-অসুবিধার বিষয়টিও সে বা তারা দেখবেন বলে চিঠিতে মিসেস গুহকে আশ্বস্ত করেছেন। তবে এই মুহূর্তে তিনি চাইলেও দেশত্যাগ করতে পারবেন না; কেননা মার্চের মাঝামাঝি তিনি তার ও তার কন্যার পাসপোর্ট দুটি নবীকরণের জন্য জমা দিয়েছিলেন। যা আর ফেরত পাননি।
বেশ কিছুদিন হয় মিসেস গুহ কন্যাটিকে মিশনারি-চালিত এতিমখানায় তুলে দিয়ে নিজে এসে আশ্রয় নিয়েছেন একই মিশনারি দ্বারা পরিচালিত হাসপাতালটিতে। প্রথম কিছুদিন তিনি উচ্চ রক্তচাপজনিত রোগের রোগী হিসেবে হাসপাতালের তিন তলায় ভেতরের দিকের একটি কেবিনে অবস্থান করছিলেন। একটু সুস্থ হবার পর, হাসপাতালের পরিচালক সিস্টার ফারাহ রোজারিও’র সাথে কথা বলে হাসপাতালের লাইব্রেরিটার দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে তিন তলার কেবিন ছেড়ে নেমে এসেছেন নিচতলায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে তার নিরাপত্তার স্বার্থে বাইরে বেরোনোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। তবে সকাল হলে, শেষ রাতে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রস্তুত হয়ে একটি কালো শাড়িতে শরীর আবৃত করে মাথার ঘোমটা যতটা সম্ভব টেনে নামিয়ে টহলরত মিলিটারিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে দশটা বাজবার কিছুক্ষণ পূর্বেই তিনি হাজির হন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ভবনে। ভয়ে-আতঙ্কে মুখ শুকিয়ে থাকা ছাত্রবিহীন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী যথাসাধ্য অফিস চালিয়ে যাচ্ছেন। নিচতলা থেকে খোঁজ নিয়ে মিসেস গুহ সোজা উঠে এলেন তিন তলায় অবস্থিত রেজিস্ট্রার মহোদয়ের দফতরে। রেজিস্ট্রার মহোদয় তার দফতরেই ছিলেন। ফাঁকা দফতরের দরজায় নামানো পর্দা টেনে ভেতরে ঢুকে নিজের পরিচয় দিতেই রেজিস্ট্রার মহোদয় তাকে চিনতে পেরে বসতে বললেন এবং তার জন্য কমলা রঙের এক কাপ কফিরও ব্যবস্থা করলেন। মিসেস গুহ তার সামনে রেখে যাওয়া কফির পেয়ালায় পরপর দুটি চুমুক দিয়ে তার এখানে আসবার মূল কারণটি রেজিস্ট্রার মহোদয়কে জানালেন।
রেজিস্ট্রার মহোদয় খানিকটা আশ্চর্য হবার ভঙ্গিতে নাকের ওপর নেমে আসা রিমলেস মোটা চশমাটিকে ঠেলে ওপরে তুলে মিসেস গুহ’র দিকে ঝুঁকে এসে বললেন, ‘কী বলছেন? অধ্যাপক গুহ এখনও কাজে যোগ দেন নি! তিনি কি আর চাকরি করতে চান না? সরকার তো বলেই দিয়েছে যারা কাজে যোগ দিতে চায় তারা নির্দ্বিধায় যোগ দিতে পারে, তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’
রেজিস্ট্রার মহোদয়ের কথা শেষ হলে, মিসেস গুহ তাকে বললেন, ‘অধ্যাপক গুহ আর কাজে যোগ দিবেন না। যোগ দিতে পারবেনও না, কেননা তিনি মারা গেছেন।’ রেজিস্ট্রার মহোদয় তার গোঁফ ও চশমায় অবিশ্বাস ফুটিয়ে বললেন, ‘কী বলছেন! আমরা তো জানি অধ্যাপক গুহ পালিয়ে গেছেন। পালিয়ে তিনি আগরতলা চলে গেছেন।’
‘Ñ না। তিনি পালান নি। পালাতে চানও নি। তিনি মারা গেছেন। সেই রাতে তার মতো অন্য আটজন অধ্যাপকের মতোই। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার হিসেবে আপনার সেটা জানা থাকা উচিত ছিল।’ মিসেস গুহ শেষ বাক্যটি ছুড়ে দেওয়ার পর রেজিস্ট্রার মহোদয়ের গোঁফ ও চশমাওয়ালা মুখে পুনরায় একটি ছোট্ট পরিবর্তন দেখা যায়। তিনি তার সামনে ঠা-া হয়ে আসা কমলা রঙের কফিতে একটি দীর্ঘ চুমুক দিয়ে খানিকটা পিছিয়ে নতুন তোয়ালে ঢাকা চেয়ারটিতে হেলান দিয়ে বসে বলেলন, ‘আচ্ছা। তবে চাইলেই তো আর প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা আপনি তুলে নিতে পারবেন না। আমার যতদূর জানা আছে, অধ্যাপক গুহ তার প্রভিডেন্ট ফান্ডের জন্য কোনো উত্তরাধিকার মনোনীত করে যাননি। যদিও আইন অনুযায়ী স্ত্রী হিসেবে আপনার সেটা পাবার অধিকার রয়েছে। সেক্ষেত্রে আপনাকে প্রথমত জমা দিতে হবে সাকসেশন সার্টিফিকেট, তারপর মিটিয়ে আসতে হবে অধ্যাপক গুহ-র নিকট বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল দেনা-পাওনা। সর্বোপরি জমা দিতে হবে তার ডেথ সার্টিফিকেট।’
মিসেস গুহ রেজিস্ট্রার মহোদয়ের সকল কথাই মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপর বললেন, ‘অধ্যাপক গুহ-র সকল দেনা-পাওনার হিসেব আমাকে দিন, আমি মিটিয়ে দিচ্ছি।’ রেজিস্ট্রার মহোদয় তাকে জানালেন, ‘এসব কিছুর হিসাব পেতে আপনাকে যেতে হবে প্রধান হিসাবরক্ষকের কার্যালয়ে।’ মিসেস গুহ-ও ততক্ষণে ঠা-া হয়ে যাওয়া কমলা রঙের কফিতে শেষ চুমুকটি দিয়ে রেজিস্ট্রার মহোদয়কে ধন্যবাদ জানিয়ে নিচে নেমে গেলেন প্রধান হিসাবরক্ষকের কক্ষে। কর্মহীন হিসাবরক্ষক তার সুবিশাল হিসাবের খাতাটি উন্মুক্তাবস্থায় সামনে রেখে তাকিয়ে ছিলেন জানালার দিকে। জানালার লোহার সিকের ফাঁক গলে হয়তো তার দৃষ্টি তখন আরও দূরে; কোনো আপাত নিরাপদ গ্রাম-জনপদে, যেখানে তিনি রেখে এসেছেন প্রিয় স্ত্রী ও সন্তানদের।
মিসেস গুহ একটি ছোট্ট কাশি দিয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলেন। হিসাবরক্ষক তাকে বসতে বলে সামনের খাতাটা বন্ধ করে পেছনের কাঠের আলমারি খুলে বের করলেন অমনই আরেকটি খাতা। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টে খাতার মাঝামাঝি তিনি পেয়ে গেলেন অধ্যাপক গুহকে। চোখ তুলে বললেন, ‘ছেষট্টি সালে অধ্যাপক গুহ তার চাকরির বিপরীতে লোন নিয়ে বিলেত গিয়েছিলেন, লোনের পরিমাণ আট হাজার টাকা, এ পর্যন্ত শোধ হয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার, বাকি আছে দুই হাজার পাঁচশত টাকা। আর অধ্যাপক গুহ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে পাবেন কেবল মার্চ মাসের বেতনটা।’
মিসেস অবন্তী গুহর মনে আছে সে কথা। অধ্যাপক গুহ নিজের পয়সায় ডক্টরেট করতে বিলেত গিয়েছিলেন, আর লোনটা নেওয়া হয়েছিল সেই সময়। মিসেস গুহ প্রস্তুত হয়েই এসেছিলেন। ব্যাগ হাতড়ে নিজের চেক বইটি বের করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে আড়াই হাজার টাকার একটি ক্রস চেক লিখে, তুলে দিলেন হিসাবরক্ষকের হাতে। চেকটা হাত বাড়িয়ে নিতে নিতে হিসাবরক্ষক আগ বাড়িয়ে তাকে বললেন, ‘সাকসেশন সার্টিফিকেট পেতে অধ্যাপক গুহর ট্যাক্স ক্লিয়ারেন্স প্রয়োজন হবে। আপনি আরেক দিন আসুন, আমি তার বেতন বিবরণী করিয়ে রাখব। তার আগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অধ্যাপক গুহর নামে বরাদ্দকৃত বাড়িটা বুঝিয়ে দিতে হবে আপনাকে। সে বাড়ির পাঁচটি ফ্যান, একটি টেলিফোন ফেরত দিতে হবে এবং ভাঙা দরজা ও পানির কলগুলো মেরামত করিয়ে দিতে হবে।’ হিসাবরক্ষক মহোদয়ের শেষ কথাগুলো মিসেস গুহকে কিছুটা উত্তেজিত করে তুলল, কেননা সেদিনের পর তিনি আর সে বাড়িতে যাননি, যেতে পারেন নি। ফ্যান-টেলিফোন-পানির কলের কী হয়েছে তা তিনি জানেন না, জানেন কেবল ভাঙা দরজার কথা; যেগুলো ভেঙে ছিটকে গিয়েছিল মিলিটারির রাইফেল ও ক্রমাগত বুটের ঘায়ে। যার দায়িত্ব কিছুতেই সে ঘরের বাসিন্দাদের ওপর বর্তায় নাÑ কথাগুলো যতটা সম্ভব নরম সুরে হিসাবরক্ষক মহোদয়কে জানালেন তিনি। তবে হিসাবরক্ষক মহোদয় তার এ ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হলেন কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত না হয়েই তিনি তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে রেজিস্ট্রার ভবন থেকে দ্রুত নেমে গেলেন।
রেজিস্ট্রার ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে ডানে-বাঁয়ে ভালো করে দেখে নিলেন রাস্তাটা, তারপর লম্বা পা ফেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাঁকা চত্বরটা পাড়ি দিয়ে সোজা উপস্থিত হলেন লাইব্রেরিতে। ছাত্র-শিক্ষকে মুখরিত হয়ে থাকা লাইব্রেরিটা আজ অস্বাভাবিক রকম ফাঁকা। হিসাবরক্ষক সাহেবের মতোই সমান আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তা মুখে নিয়ে পুরাতন খবরের কাগজ পড়তে থাকা লাইব্রেরিয়ান মুখ তুলে তাকালেন মিসেস গুহর দিকে, তারপর খাতাপত্র ঘেটে বিভিন্ন সময়ে অধ্যাপক গুহর নেওয়া বইগুলোর একটি নাতিদীর্ঘ তালিকা তুলে দিলেন তার হাতে। তালিকাটি হাতে নিয়ে মিসেস গুহর মনে হলো এগুলো ফেরত দেওয়া সম্ভব। কেননা অধ্যাপক গুহ তার প্রয়োজনীয় বইপত্রসমূহ কোথায় রাখতেন তা তার জানা আছে।
লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে এবার তিনি এলেন অধ্যাপক গুহর বিভাগে; যেখানে তিনি পড়াতেন। যে কক্ষটিতে অধ্যাপক গুহ বসতেন তা এখন তালাবদ্ধ। কোনো ছাত্র নেই সেখানে, অধ্যাপকদের অধিকাংশ কক্ষই তালাবদ্ধ। একজন এসিসটেন্ট ও একজন এসোসিয়েটকে তিনি দেখলেন সেমিনার কক্ষে বসে গল্প করতে। তারা মিসেস গুহকে দেখে গাল হা করলেন এবং জানালেন, তারাও জানে অধ্যাপক গুহ পালিয়ে আগরতলা চলে গেছেন। এই এতদিন পর, অধ্যাপক গুহর দুজন অপেক্ষাকৃত তরুণ সহকর্মীর একযোগে হা হয়ে ওঠা মুখের দিকে তাকিয়ে মিসেস গুহর শুষ্ক ঠোঁটের প্রান্তে একটু হাসি ফুটে উঠল। সেমিনার থেকে চাবি নিয়ে মিসেস গুহ নিজেই খুললেন অধ্যাপকের কক্ষের তালা। পেছনের বড় জানালাটি বন্ধই আছে, বন্ধ করা আছে ফ্যান ও লাইট। তবু যেন কক্ষটি ধুলোয় আচ্ছন্ন। বন্ধ জানালা না খুলে লাইট জ্বালিয়ে টেবিলে-আলমারিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বইগুলো থেকে লাইব্রেরিয়ানের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী বেশ কয়েকটি বই তিনি সেখানেই পেয়ে গেলেন। বইগুলো ব্যাগে ঢুকিয়ে কক্ষটিকে পুনরায় তালাবদ্ধ করে চাবিটি বুঝিয়ে দিয়ে তিনি রওনা হলেন তাদের ফেলে যাওয়া বাসভবনের দিকে।
বিশ্ববিদ্যায়ের প্রধান রাস্তাটায় উঠে একটি গা ছমছমে অনুভূতির মুখোমুখি হলেন তিনি, কেননা সেখান দিয়ে তখন মিলিটারির তিনটি সাঁজোয়া যান সারিবদ্ধভাবে চলে যাচ্ছে উত্তর দিকে তবে গাড়িগুলো ততক্ষণে বেশ কিছুদূর চলে গেছে এবং সেগুলো চলেই গেল। মিসেস গুহ কিছুটা ভারমুক্ত হয়ে ঢুকে পড়লেন হোস্টেলের সীমানায়। শিক্ষকদের আবাসিক ভবনগুলোর দিকে যেতে পাড়ি দিতে হয় বড় মাঠটি। সেটা পেরিয়ে যেতে যেতে তার চোখ পড়ল মাঠের শেষ দিকে, যেখানে সে রাতে হত্যার শিকার ছাত্র-শিক্ষকদের মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। মিসেস গুহ দেখলেন, লাশগুলো মাটিচাপা দেওয়া জায়গাটির ওপর ইতোমধ্যেই ফুলের চাষ শুরু হয়েছে। এবং ততদিনে পঁচে যাওয়া লাশগুলো থেকে তৈরি হওয়া জৈব সারে আরও বেশি উর্বর হয়ে ওঠা মাটির ওপর তরতর করে বেড়ে উঠেছে গাঁদা ও গোলাপের চারাগুলো যদিও এখনও ওগুলিতে ফুল আসেনি। কর্মরত মালিরা দূর থেকে তাকে চিনতে পারল এবং তাদের মধ্য থেকে বুড়িয়ে কুঁজো হয়ে আসা রতন মালি দ্রুতপায়ে এগিয়ে এসে গড় হয়ে মিসেস গুহকে প্রণাম করলেন, তারপর উঠে গিয়ে কয়েক থোকা রঙ্গন ছিড়ে, ‘মা ফুলগুলো নিন’Ñ বলে তুলে দিলেন মিসেস গুহর হাতে। তার চলমান জীবনের এমনতর সময়ে ফুলের উপযোগিতা কি তা ঠিক বুঝে উঠতে না পারলেও মিসেস গুহ হাত পেতে ফুলগুলিকে গ্রহণ করলেন।
হাত ভরা থোকা-থোকা রঙ্গন নিয়ে পরিত্যক্ত বাড়িটির সমানে কোমর সমান উঁচু লোহার নিরাপত্তা বেষ্টনি ঠেলে সোজা ওপরে উঠে গেলেন। সিঁড়ি দিয়ে উঠবার সময় পায়ের নিচে মিসেস গুহ গড়িয়ে যাওয়া শুকনো রক্তের দাগ দেখলেন তবে সে রক্ত দিয়ে কোনো গন্ধ উদগীরিত হচ্ছে না। রক্ত মাড়িয়ে ওপরে উঠতে উঠতে তার মনে হলো : এগুলো পরিসংখ্যানের ঐ অধ্যাপক ও সেই রাতে তার ঘরে অবস্থানরত অপর তিনজন পুরুষের শরীর থেকে বেরুনো রক্ত, যাদের ঘর থেকে টেনে বের করে সিঁড়ির ওপর এনে গুলি করা হয়েছিল। বাসার নিচে গুলি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা অবস্থা থেকে তুলে আনতে আনতে অধ্যাপক গুহর শরীরের ছুটন্ত রক্তধারাটি অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল, সুতরাং সিঁড়ির ওপর ছড়িয়ে থাকা রক্ত তার নয়। ভাঙা দরজা দিয়ে ঢুকে মিসেস গুহর প্রথমেই চোখ গেল বসবার ঘরের ছাতের দিকে, একটি ফ্যান তখনও সেখানে ঝুলতে দেখে তিনি কিছুটা আশ্বস্ত হলেন এবং একে একে সবগুলো কক্ষের ফ্যানগুলোই অক্ষত অবস্থায় ঝুলতে দেখলেন। ততক্ষণে অধ্যাপক গুহর কর্মহীন ড্রাইভারটি তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। হয়তো সে আশেপাশেই ঘুরছিল, মালিদের কাছে মিসেস গুহর আগমনের খবর পেয়ে এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। মিসেস গুহ তাকে ফ্যানগুলো খুলে নিয়ে যেভাবে হোক রেজিস্ট্রার ভবনে পৌঁছে দেবার নির্দেশ দিলেন। তারপর ঢুকলেন অধ্যাপক গুহর কক্ষে, একসাথে থাকাকালীন যে ঘরটিতে তিনি খুব কমই ঢুকতেন। সংসারবোধ ততটা তীব্র না হলেও স্ত্রী-কন্যার প্রতি অধ্যাপক গুহর ভালোবাসায় কোনো কমতি ছিল না। সেজন্যই তার মগ্নতায় কখনও ব্যাঘাত ঘটাতে চাইতেন না মিসেস গুহ। অধ্যাপক গুহর বেতের ছাউনিওয়ালা ইজি চেয়ারটির ওপর দিয়ে গড়িয়ে যাওয়া রক্ত সিঁড়িতে ছড়িয়ে থাকা রক্তের মতোই শুকিয়ে লেপ্টে আছে। সেদিকে বিশেষ না তাকিয়ে ইতোমধ্যে কয়েক দফা ভাঙচুর ও লুটের শিকার হওয়া অগোছালো ঘরটি হাতড়ে লাইব্রেরি থেকে আনা বইগুলোর আরও কয়েকটি সেখানে খুঁজে পেলেন। তবে তন্ন-তন্ন করে খুঁজেও ওয়েবস্টারের দুটি খ-ের কোনো হদিস করতে পারলেন না। নিরাশ্রয় হয়ে যাবার পর মিসেস গুহ প্রথমে আশ্রয় নিয়েছিলেন অন্য একটি হাসপাতালে। তবে কিছুদিন পর ঐ হাসপাতালের স্বত্বাধিকারীর পালিয়ে গিয়ে প্রবাসী সরকারে যোগ দেওয়ার খবর রেডিওতে প্রচার হবার পরদিন থেকে সেটা এখন আলবদরের হেডকোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। হয়তো সেই জায়গায় খুঁজলে ওয়েবস্টারের খ- দুটি পাওয়া যেতে পারে। তবে তা অসম্ভব। তিনি ঘর ছেড়ে বারান্দা দিয়ে ঘুরে নিচে নামলেন। বারান্দায় পড়ে থাকা ফুলের টবগুলোর দিকে দৃষ্টি গেল তার। তিনি দেখলেন, অজ্ঞাত কারণে অধ্যাপক গুহর প্রিয় বোগেনভেলিয়ার চারাটি তখনও বেঁচে আছে। বাকিগুলো শুকিয়ে কাঠ। এবং নিচে নামতে নামতে তার মনে হলো মালির দেওয়া রঙ্গনের থোকাগুলো তিনি ফেলে এসেছেন অধ্যাপক গুহর প্রিয় ইজি চেয়ারটার ওপর।
মিসেস গুহ আবার লাইব্রেরিতে এলেন। খুঁজে পাওয়া বইগুলো লাইব্রেরিয়ানের হাতে দিয়ে জানালেন, ‘ওয়েবস্টার দুটো খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং যাবেও না।’ লাইব্রেরিয়ান তাকে বললেন, ‘সেক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ হিসেবে আপনাকে পুরো চৌদ্দ খ-ের দাম দিতে হবে।’ লাইব্রেরিয়ানের দেওয়া চরম অস্বস্তিকর ক্ষতিপূরণের দাবি শুনে তার দ্বারা যতটা সম্ভব বচসা চালিয়ে তিনি স্থান ত্যাগ করলেন।
তারপর তার মনে হলো সাকসেশন সার্টিফিকেটের কথা। দাঁড়িয়ে তিনি একদ- ভেবে নিলেন, এই কাজে ঠিক কে তাকে সাহায্য করতে পারবে। তার স্বামীর বন্ধু, ইংরেজি পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক জনাব গণি সাহেবের কথা মনে হলো তারÑ যার স্ত্রী ব্যক্তিগত পর্যায়ে মিসেস গুহর বন্ধু হন; সিদ্ধান্ত নিলেন তার দ্বারস্থ হবেন। হেঁটে বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ি দিয়ে পেট্রল পাম্পটির সামনে এসে বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়া এক প্রবীণ রিকশাওয়ালার রিকশায় চেপে তিনি এলেন সাংবাদিক গণি সাহেবের বাসায়। গণি সাহেবের স্ত্রীর সাথে অসংখ্য দুর্দশার কথা ভাগাভাগি করে তিনি তার আসল কথাটি পাড়লেন। মিসেস গণি টেলিফোন তুলে শহরের অভিজাত ও নিরাপদ এলাকায় বসবাসরত এক ডাকসাইটে ব্যারিস্টারকে ফোন করলেন। কথা শেষে জানালেন, সাকসেশন সার্টিফিকেট পাওয়া সম্ভব। অধ্যাপক গুহর ট্যাক্স পরিশোধ করে এগারোশত টাকার স্ট্যাম্প ও ছয়শত টাকা ফিস জমা দিলে সাকসেশন সার্টিফিকেট হয়ে যাবে। মিসেস গুহ, মিসেস গণির সাথে আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে বিদায় নিলেন।
দুদিন পর, একই রকম উৎকণ্ঠা বুকে নিয়ে লম্বা ঘোমটা টেনে তিনি হাজির হলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাত নম্বর ওয়ার্ডে। পায়ে পায়ে হেঁটে গিয়ে দাঁড়ালেন দুই নম্বর বেডটির শিয়রে; যেটি তখন ফাঁকা। এবং বেডটির গায়ে তখনও সাঁটানো আছে ‘বুলেট ইনজুরড’ লেখা কাগজের লেবেলটি। বুঝতে পারলেন, অধ্যাপক গুহর পর ছয় মাস কেটে গেলেও এই বেডে কোনো রোগী ভর্তি করা হয়নি; হয়তো রোগীর স্বল্পতার কারণেই। ওয়ার্ডে কর্তব্যরত নার্সদের সাথে কথা বলে জানলেন, সে সময় যে চিকিৎসকÑ অধ্যাপক গুহর শরীরে তিন দিনব্যাপী ব্যর্থ চিকিৎসা চালিয়েছিলেন তাকে বদলি করা হয়েছে। ভারতী নামের এক নার্স তাকে চিনতে পেরে নিয়ে গেলেন নতুন দায়িত্ব পাওয়া চিকিৎসকের কাছে। নতুন চিকিৎসক প্রথমেই জানতে চাইলেন, তখন কেন ডেথ সার্টিফিকেট নেওয়া হয়নি? মিসেস গুহ তাকে জানালেন, তিনি ডেথ সার্টিফিকেট চেয়েছিলেন, তবে তাকে তা দেওয়া হয়নি। কেন দেওয়া হয়নি তা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরই জানবার কথা। শুধু তখন নয়, পরেও দু-একবার মিসেস গুহ তার স্বামীর ডেথ সার্টিফিকেট চাইতে এসেছেন। একজন চিকিৎসক তাকে জানিয়েছিলেন, ডেথ সার্টিফিকেট প্রস্তুত করা হয়েছে, তবে যিনি স্বাক্ষর করবেন তিনি উপস্থিত নেই।
নতুন চিকিৎসক একটু নড়েচড়ে বসলেন। তারপর বললেন, ‘তাকে যেখানে সমাহিত করা হয়েছে সেখান থেকে কোনো সার্টিফিকেট কিংবা মানি রিসিপ্ট পেয়েছিলেন কি না?’ মিসেস গুহ বললেন, ‘তাকে কোথাও সমাহিত করা হয়নি। কেননা সেই মুহূর্তে হাসপাতাল থেকে একটি মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে পোড়াবার মতো পরিস্থিতি ছিল না। তাছাড়া, চেতন থাকা অবস্থায় অধ্যাপক গুহ চেয়েছিলেন তার লাশটা যেন মেডিকেলের ছাত্রদের ব্যবহারের জন্য দিয়ে দেওয়া হয়। আমি তার এমন ইচ্ছার কথা সেই ডাক্তারকে জানিয়েছিলাম, তবে তিনি অধ্যাপক গুহর এমনতর ইচ্ছার অনুকূলে কোনো লিখিত দলিল না থাকায় সে বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবেন না বলে আমাকে জানিয়েছিলেন।’ চিকিৎসক একটু পিছিয়ে বসে তাকালেন নার্স ভারতীর দিকে, ভারতী মিনমিনে গলায় তার কর্তাকে যা জানালো তা এরূপ : অধ্যাপক গুহর লাশটা দুদিন যাবৎ বারান্দায় একটি স্ট্রেচারের ওপর পড়ে ছিল। এবং গুলি খেয়ে মরা ইপিআর ও অন্যান্য কিছু লাশের সাথে তারা ‘বাবু’র লাশটাও আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের গাড়িতে তুলে দিয়ে চেয়েছিল। তবে মিলিটারি প্রহরার ভেতর দিয়ে একটি ধুতি জড়ানো লাশ বয়ে নেবার ঝুঁকি তারা নিতে রাজি হয়নি। এবং নদীর ওপার থেকে বিপদসংকুুল পথ পাড়ি দিয়ে তারপর দিন ভারতী আর হাসপাতালে আসতে পারেনি এবং একদিন পরে কাজে যোগ দিয়ে ভারতী বারান্দার সেই স্ট্রেচারটিকে ফাঁকা দেখতে পায়।
কর্তব্যরত চিকিৎসক এবার যেন খানিকটা আন্তরিক হয়ে উঠলেন। তিনি মিসেস গুহকে সাথে নিয়ে হিমঘরে প্রবেশ করলেন এবং বিরাট সব লোহার আলমারির দেরাজ খুলে একটা একটা করে লাশের মুখ মিসেস গুহকে দেখালেন। মিসেস গুহ দেরাজে আটকানো লাশগুলোর কোনোটির সাথে নিজের স্বামীর মুখের আদল মেলাতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলেন নতুন চিকিৎসকের কক্ষে। নতুন চিকিৎসক তার কণ্ঠে আশ্বস্তের স্বর ফুটিয়ে মিসেস গুহকে বললেন, ‘আপনি আগামীকাল একবার আসুন।’
তারপর দিন সকালে মিসেস গুহ হাসপাতালে না গিয়ে গেলেন ট্যাক্স অফিসে এবং অধ্যাপক গুহর বকেয়া ট্যাক্স মিটিয়ে রিটার্ন স্লিপ পেতে পেতে বিকেল হয়ে পড়ায় তিনি ফিরে গেলেন তার বর্তমান আশ্রয়; মিশনারি হাসপাতালের নিচতলার আলোহীন কক্ষটিতে। পরদিন সকালে সাত নম্বর ওয়ার্ডে এসে ভারতীকে না পেয়ে সোজা ঢুকে গেলেন সেই ডাক্তারের কক্ষে। ডাক্তার তার সিটেই অবস্থান করছিলেন, মনে হলো তিনি অধ্যাপক গুহর ডেথ সার্টিফিকেটটা হাতে নিয়েই বসে আছেন। বাড়িয়ে দেওয়া কাগজটা হাতে নিয়ে মিসেস গুহ একটি তৃপ্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন। যাক, অবশেষে এটা অন্তত প্রমাণ করা গেল যে, অধ্যাপক গুহ পালিয়ে যাননি, তিনি মারা গেছেন। ডাক্তারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে মিসেস গুহ বেরিয়ে এসে দাঁড়ালেন দুই নম্বর বেডটির পাশে। সেখানে তখনও ‘বুলেট ইনজুরড’ লেখা কাগজটি ঝুলে আছে। ততক্ষণে বেড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে নার্স ভারতী তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ভারতীর মুখের ওপর থেকে দৃষ্টি নামিয়ে মিসেস গুহ এবার চোখ দিলেন তার হাতে ধরা ‘মৃত্যুর প্রমাণপত্র’টির ওপর। সেখানে নাম, পিতার নাম, ঠিকানা, বয়স, ভর্তির তারিখ ও সময়, মৃত্যুর তারিখ ও সময় যথাযথ লেখা থাকলেও কারণ হিসেবে লেখা আছে, ‘নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্টে ভুগে মৃত্যু।’

শ্রেণী:

একটি মুখের হাসির জন্য

Posted on by 0 comment
8-1-2017 9-07-49 PM

ইমদাদুল হক মিলন:

8-1-2017 9-07-49 PMআপনে আসছেন কই থিকা?
বারবাড়ির সামনে দুটো জামগাছ। জামগাছের গা ঘেঁষে পাটখড়ির বেড়া। বারবাড়ির সঙ্গে ভেতর বাড়ি আলাদা করার জন্য এই ব্যবস্থা।
শিরিন দাঁড়িয়ে আছে বেড়ার সামনে। অচেনা মানুষের গলা শুনে মাথায় ঘোমটা দিয়েছিল। এখন একপলক মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে অকারণেই ঘোমটা আরেকটু টেনেটুনে ঠিক করল।
সকাল দশটা-এগারোটার রোদ বেশ ভালোই তেজালো হয়েছে। জামগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়েও গরম খুব একটা কম লাগছিল না ইউসুফের। কিন্তু গরমের তোয়াক্কা করল না সে। হাসিমুখে বলল, আমি এসেছি ঢাকা থেকে।
চান কারে?
এটা নাসিরের বাড়ি না? মুক্তিযোদ্ধা নাসির হোসেন? স্বাধীনতার পরপর শুনেছিলাম এলাকার সবাই তাকে নাসির কমান্ডার নামে চেনে। যদিও সে কমান্ডার ছিল না। ছিল সাধারণ একজন মুক্তিযোদ্ধা।
ইউসুফের কথা শুনে ফ্যাল ফ্যাল করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল শিরিন। কোনো রকমে বলল, আপনে এত কথা জানলেন কেমনে?
আমরা একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। মানে সহযোদ্ধা ছিলাম। যদিও নাসির বয়সে আমার চে’ ছোট। মুক্তিযুদ্ধের সময় একুশ-বাইশ বছর বয়স ছিল। দুর্দান্ত সাহসী, টগবগে দুর্ধর্ষ ধরনের তরুণ। মৃত্যুভয় কাকে বলে জানত না। গোয়ালিমান্দ্রার অপারেশনে দারুণ সাহস দেখিয়েছিল নাসির। যে কোনো অপারেশনে যেতে একপায়ে খাড়া। নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেছে দু-তিনবার। লোকে নাসিরকে কমান্ডার বলত, আসলে কমান্ডার ছিলাম আমি। আমার নাম ইউসুফ, ইউসুফ মির্জা।
নামটা শুনে আপাদমস্তক কেঁপে উঠল শিরিন, দিশেহারা হলো। কন কী? আপনে ইউসুফ ভাই? আপনের কথা কত শুনছি তার কাছে। আসেন ভিতরে আসেন।
শিরিনের পিছু পিছু ভেতর বাড়িতে ঢুকল ইউসুফ।
বাড়িটি অতি দীনদরিদ্র ধরনের। দোচালা জীর্ণ একখানা টিনের ঘর, রান্নাচালা আর একচিলতে উঠোন। উঠোনের একপাশে ভাঙাচোরা হাঁস-মুরগির খোঁয়াড়ের লাগোয়া পাতিলেবুর ঝাড়। 8-1-2017 9-07-40 PMরান্নাচালার ওদিকটায় লাউ কুমড়ো শসা ঝিঙের মাচান। দোচালা ঘরটার পেছনে দু-তিনটে আম আর একটা তেঁতুল গাছ। গাছগুলো জড়াজড়ি করে আছে বলে বাড়িটা বেশ ছায়াময়। উঠোনের একটা দিকে শুধু রোদ পড়েছে। সেই রোদে তারে শুকাতে দেয়া হয়েছে বারো-তেরো বছর বয়সী একটি মেয়ের ছিটকাপড়ের জামা। কয়েকটা হাঁস-মুরগি চরছে ওদিকপানে।
বাড়ি দেখে মনটা খারাপ হলো ইউসুফের।
শিরিন তখন ঘরে ঢুকে হাতলঅলা পুরনো একখানা চেয়ার এনেছে। উঠোনের ছায়ায় চেয়ার রেখে বলল, বসেন।
চেয়ারে বসতে বসতে ইউসুফ বলল, কিন্তু পাগলটা কোথায়? ইস কতদিন পর দেখা হবে! আটাশ-ঊনত্রিশ বছর তো হবেই! স্বাধীনতার পরপর প্রায়ই দেখা হতো। তখনও যুদ্ধের উন্মাদনা কাটেনি, অস্ত্রটস্ত্র জমা দেই নি। তারপর আস্তে আস্তে ঠা-া হয়ে গেল সব। আমরা একেকজন ভেসে গেলাম একেক দিকে। নাসির বিক্রমপুরের ছেলে, সে চলে এলো বিক্রমপুরে, গ্রামেই সেটেল করল। আমি চলে গেলাম ইংল্যান্ডে। বিয়েশাদি করে লন্ডনে থেকে গেলাম। দেশে দু-চারবার আসা হয়েছে; কিন্তু পুরনো বন্ধুদের কারও সঙ্গেই তেমন যোগাযোগ, দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি।
ইউসুফ একটু থামল। শিরিনের মুখের দিকে তাকাল। এবার আমি দেশে এসেছি এই একটাই উদ্দেশে। পুরনো সব বন্ধুকে খুঁজে খুঁজে বের করব, তাদের সঙ্গে দেখা করব। বয়স হয়ে যাচ্ছে, থাকি বিদেশে, কোনোদিন হার্ট অ্যাটাক-ফেটাকে শেষ হয়ে যাব, এই জীবনে কারও সঙ্গে আর দেখাই হবে না।
শাড়ির আঁচল দাঁতে কামড়ে মাটির দিকে তাকিয়ে আছে শিরিন। ইউসুফ তার দিকে তাকাল না। পকেট থেকে সিগ্রেটের প্যাকেট আর লাইটার বের করে সিগ্রেট ধরাতে ধরাতে বলল, নাসির যে বাড়ি নেই তা আমি বুঝেছি। কোথায় গেছে বলতে পারবেন? একটু যদি খবর দেয়া যায়…
কথা শেষ না করে শিরিনের দিকে তাকিয়েছে ইউসুফ, তাকিয়ে বুকে কী রকম একটা ধাক্কা খেল। সিগ্রেটে টান দিতে ভুলে গেল, চোখে পলক ফেলতে ভুলে গেল।
মুখ নিচু করা শিরিনের চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে।
যা বোঝার বুঝে গেল ইউসুফ। শিরিনের দিকে তাকিয়ে পাথর হয়ে বসে রইল। ফাঁকা শূন্য গলায় একসময় বলল, কবে?
আঁচলে চোখ মুছে শিরিন বলল, আইজ দেড় বচ্ছর।
ও আমার চে’ কত ছোট! এই বয়সেই…
কথা শেষ করে উদাস হয়ে গেল ইউসুফ। খানিক আগের উচ্ছ্বল আবেগে ভর্তি কথা বলতে পছন্দ করা মানুষটি যেন আর নেই। এখন যে বসে আছে শিরিনের সামনে সে যেন অন্য কেউ। হতাশ ম্লান, আচমকা শোকে পাথর হওয়া একজন মানুষ।
একসময় বুক কাঁপিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ইউসুফ। কত আশা করে এবার দেশে এসেছিলাম, সবার সঙ্গে দেখা করব। নাসিরের বাড়ি বিক্রমপুরের কোন গ্রামে তা বেশ ভালোই জানা ছিল, যুদ্ধের সময় একবার এসেছিলাম। এতগুলো বছর কেটে গেছে, সবকিছু একেবারেই বদলে গেছে, তারপরও বাড়ি চিনতে ভুল হয়নি। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই আসতে পেরেছি। নিজের স্মৃতিশক্তির ওপর একটা পরীক্ষা নিচ্ছিলাম যে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করে দেখি নাসিরের বাড়িটা বের করতে পারি কি-না। পারলাম ঠিকই; কিন্তু যার জন্য আসা সে-ই নেই।
আঁচলে আবার চোখ মুছল শিরিন, নাক টানল।
আনমনা ভঙ্গিতে সিগ্রেটে টান দিয়ে ইউসুফ বলল, কী হয়েছিল?
লানছে ক্যানসার হইছিল। বেদম সিগ্রেট খাইত। ক্যানসার ধরা পড়নের পরও থামে নাই।
কাজ কী করত?
আমগ গেরামের পেরাইমারি ইসকুলের মাস্টার আছিল।
ততক্ষণে দুজন মানুষই কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে, কথাবার্তার আড়ষ্টতা কেটে গেছে শিরিনের। থমথমে গলায় বলল, বহুত কষ্ট পাইয়া মরছে। ক্যানসারের চিকিস্যায় বেদম টেকা লাগে। এত টেকা আমরা পামু কই? ইসকুলের ফান্ড থিকা টেকা দিছে, ছাত্র-ছাত্রীরা চান্দা কইরা টেকা দিছে, তাও তেমুন চিকিস্যা করাইতে পারি নাই।
এই ধরনের অসুখে কিছু অবশ্য করারও থাকে না।
হাতের সিগ্রেট শেষ হয়ে গিয়েছিল, পায়ের সামনে ফেলে জুতো দিয়ে ডলে ডলে নেভাল ইউসুফ। শিরিন বলল, নিজে তো মরছেই আমগও মাইরা থুইয়া গেছে।
কথাটা বুঝতে পারল না ইউসুফ। শিরিনের মুখের দিকে তাকাল।
শিরিন বলল, এমতেই গরিব মানুষ আমরা, জমাজমি যা অল্পবিস্তর আছিল হেই হগল বেবাক গেছে তার চিকিস্যায়। সরকারি ইসকুলের মাস্টারগ আইজকাইল ভালো অবস্তা। তারা মইরা গেলে সরকার থিকা ভালো টেকাই পায়। আমরাও পাইছি। হেই হগল বেবাগ গেছে দেনা শোধ করতে। অহন আমরা পথের ফকির। কিচ্ছু নাই। খালি এই বাড়িডা, ভাঙাচুরা ঘরডা।
আপনার সংসার তা হলে চলে কী করে?
কোনো রকমে চলে। একজন মাত্র দেওর আমার, সে থাকে ঢাকায়। সে মাসে মাসে কিছু টেকা দেয়। দুই ভাই আছে, তারা দেয় কিছু। বইনরা দেয় যহন যা পারে। আমগ বিক্রমপুর হইল ধনী মাইনষের দেশ। তয় আমগ আত্মীয়-স্বজন কেঐ ধনী না। বেবাকতেই গরিব। কে কারে টানব, কন? দূরের আত্মীয় বড়লোক যারা আছে তারা কেঐ খবর লয় না। সাহাইয্যের লেইগা গেলে কুত্তা-বিলাইয়ের লাহান খেদাইয়া দেয়।
বাড়ির দশা দেখে আর শিরিনের কথাবার্তা শুনে নাসিরের ফেলে যাওয়া সংসারের অবস্থাটা পুরোপুরিই বুঝেছে ইউসুফ। বুঝে মন খুবই খারাপ হয়েছে তার। আহা কী অসহায়, হতদরিদ্র সংসার এক মুক্তিযোদ্ধার! হয়তো এরকম দশা আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধার সংসারের। কে তাদের খবর রাখে!
গাছপালার দিকে তাকিয়ে ম্লান গলায় ইউসুফ বলল, আপনাদের বাচ্চাকাচ্চা?
একটা মাইয়া। অহনও ছোড। তেরো-চৌদ্দ বচ্ছর বয়স।
এত কম বয়সী মেয়ে…
কথাটা শুনে শিরিন একটু লজ্জা পেল। মাথা নিচু করে বলল, আমগ বিয়া হইছিল দেরিতে। বিয়ার দুই বচ্ছর পর একটা পোলা হইয়া মরল। তার চাইর-পাঁচ বচ্ছর পর হইল মাইয়াটা।
কোথায় সে? তাকে যে দেখছি না!
ইসকুলে গেছে। দোফরে আইসা পড়ব। আইজ হাফ ইসকুল।
নাম কী মেয়েটার? কোন ক্লাসে পড়ে?
নাম হইল দোয়েল। পড়ে কেলাস সেভেনে।
দোয়েল নামটা শুনে খুব ভালো লাগল ইউসুফের। মুগ্ধ গলায় বলল, বাহ্। খুব সুন্দর নাম তো! দোয়েল। বাংলাদেশের জাতীয় পাখির নাম। নিশ্চয় নাসির রেখেছিল!
হ সে-ই রাখছে। বহুত আদর করতো মাইয়াটারে। মাইয়াটা আছিল তার জান।
অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে কথা বলতে বলতে শিরিন বোধহয় একটু ক্লান্ত হয়েছে। ঘরের লেপাপোছা পৈঠায় নরম ভঙ্গিতে বসল। আপনে আইছেন এতুক্ষুণ হইল, এককাপ চাও আপনেরে খাওয়াইতে পারলাম না। ঘরে চাপাতা চিনি কিচ্ছু নাই।
ইউসুফ ব্যস্ত গলায় বলল, আমাকে নিয়ে ভাববেন না। চায়ের অভ্যাস তেমন নেই আমার।
তয় দোফরে কইলাম ভাত খাইয়া যাওন লাগব। কই মাছ দিয়া ভাত খাওয়াইতে পারুম। তিন-চাইরডা কই মাছ জিয়াইন্না আছে।
এমন আন্তরিক গলায় কথাটা বলল শিরিন, শুনে আবেগে বুকটা ভরে গেল ইউসুফের। এই তো চিরকালীন বাঙালি নারী। অতিথির সেবায় দরিদ্র সংসারের সবচাইতে মূল্যবান সম্পদও ব্যয় করতে পারে। দু-চারটা কই মাছ আর একজন মানুষের একবেলার ভাত কি কম মূল্যবান এই সংসারে!
ইউসুফ মুগ্ধ গলায় বলল, আপনি এতটা আন্তরিকতা নিয়ে বলেছেন তাতেই আমি খুশি। ভাত খাব না। আর কিছুক্ষণ বসেই চলে যাব।
ইউসুফ আবার একটা সিগ্রেট ধরাল।
শিরিন বলল, ভাই, আপনের ছেলেমেয়ে কয়জন?
দুটো ছেলে এক মেয়ে। মেয়েটা ছোট। ছোট মানে দোয়েলের চে’ অনেক বড়। ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। এ বছরই বিয়ে দেব ভাবছি।
শুনে মন খারাপ করা গলায় শিরিন বলল, আমার মাইয়াটারে তো মনে হয় বিয়াই দিতে পারুম না।
ইউসুফ চমকাল। কেন?
মাইয়াটার কপাল খারাপ। এমতেই গরিব ঘরের মাইয়া, বাপ নাই। তার ওপরে আইজ চাইর মাস ডাইন গালে একটা টিউমার হইছে।
কী?
হ। পয়লা পয়লা ছোডই আছিল জিনিসটা, দিনে দিনে বড় হইছে। অহন মুরগির আন্ডার সমান।
বলেন কী? ডাক্তার দেখান নাই?
ভালো ডাক্তার কই থিকা দেখামু কন? আমগ গেরামের কাশেম ডাক্তাররে দেহাইছি। সে কয় এই হগল চিকিস্যা দ্যাশগেরামে হয় না। টাউনে নিয়া অপরেশন করান লাগব। অপরেশনে অনেক টেকা লাগব। এত টেকা আমি কই পামু কন?
ইউসুফ চুপ করে রইল।
শিরিন বলল, আমার মাইয়াডা অর নামের লাহানই আছিল। দোয়েল পাখির লাহান স্বভাব। এক মিনিট থির হইয়া থাকতে পারত না। এইমিহি যাইতাছে ওইমিহি যাইতাছে। কথায় কথায় খিলখিল কইরা হাসতাছে। টিউমার হওনের পর মাইয়াডা আমার বদলাইয়া গেছে। দৌড়াদৌড়ি ছটফটানি বন্ধ হইয়া গেছে, হাসি বন্ধ হইয়া গেছে। মাইয়াডা আর অহন হাসেই না। টিউমারের বেদনায় রাইত দোফরে উইঠা মাঝে মাঝে কান্দে। ইসকুলে যায় ওড়না দিয়া মুখ ঢাইকা। টিউমারডা য্যান কেঐ দেখতে না পায়।
কথা বলতে বলতে আবার চোখে পানি আসে শিরিনের। চোখ মুছতে মুছতে সে বলল, কাশেম ডাক্তার কইছে অপরেশন না করলে এই টিউমার থিকা ক্যানসার হইতে পারে। ক্যানসার হইলে বাপের লাহান মাইয়াডাও যাইব।
প্রথমে নাসিরের মৃত্যুর কথা শুনে বুকে এক ধাক্কা খেয়েছে ইউসুফ, এখন দোয়েলের কথা শুনে আরেক ধাক্কা খেল। বুকটা হু হু করতে লাগল তার। এতকাল পর এ কোন দুঃখ হতাশার মধ্যে এসে পড়ল সে! কী স্বপ্ন দেখে এসেছিল, কী হলো তার পরিণতি!
না এই দুঃখ-কষ্টের মধ্যে থাকতে আর ভালো লাগছে না। যত দ্রুত সম্ভব এখান থেকে সরে পড়তে পারলেই ভালো।
আচমকাই যেন তারপর উঠে দাঁড়াল ইউসুফ। আমি তা হলে আসি এখন।
ইউসুফের আচরণে বেশ অবাক হলো শিরিন। সেও উঠে দাঁড়াল। আর একটু বসবেন না? বসেন আরেকটু। মাইয়াটা আসুক। বাপের মুখে কত গল্প শুনছে আপনের। আপনেরে দেখলে খুব খুশি হইব।
ইউসুফ বিনীত গলায় বলল, না। আমার সময় নেই। তা ছাড়া ওইটুকু মেয়ের ওই কষ্টের মুখ আমি দেখতেও চাই না। নাসিরের মৃত্যুর কথা শুনে যে দুঃখ পেয়েছি সেই দুঃখ সামলাতে পারব কিন্তু দোয়েলের মুখ দেখে যে দুঃখ পাব তা সামলাতে পারব না। সে আসার আগেই চলে যেতে চাই।
পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল ইউসুফ। গুনে গুনে পাঁচশ’ টাকার দশটা নোট মুঠো করে দিল শিরিনের হাতে। এখানে পাঁচ হাজার টাকা আছে। এটা রাখুন। দোয়েলের চিকিৎসা করাবেন।
একসঙ্গে এতগুলো টাকা অনেকদিন চোখে দেখেনি শিরিন, সে বেশ দিশেহারা হলো। প্রথমে চোখ দুটো চঞ্চল হলো তার, তারপর পানিতে ভরে গেল। কান্নাকাতর কৃতজ্ঞ গলায় বলল, আল্লায় আপনের ভালো করুক ভাই। আল্লায় আপনের ভালো করুক।
ইউসুফ আর কোনো কথা বলল না। হন হন করে হেঁটে বারবাড়ির দিকে চলে গেল।

দুই
আজ শুক্রবার।
দোয়েলের স্কুল নেই। যেদিন স্কুল না থাকে দোয়েল একটু বেলা করে ওঠে। আজও তাই উঠেছে। উঠে হাত-মুখ ধুয়ে বই নিয়ে বসেনি, বেতের সাজিতে মুড়ি আর ছোট্ট একটা আখিগুড়ের টুকরো নিয়ে বসেছে। দরজার সামনে বসে উদাস হয়ে গুড়-মুড়ি খাচ্ছে।
গাছপালার ফাঁক-ফোকড় দিয়ে সকালবেলার রোদ এসে পড়েছে উঠোনে। সেই রোদে হাঁস-মুরগিগুলো খুদকুড়ো খাচ্ছে। শিরিন ব্যস্ত হয়েছে সংসারের কাজে। এইমাত্র উঠোন ঝাড় দিয়ে রান্নাঘরের দিকে গেল। দুদিন ধরে মনটা একটু ভালো শিরিনের। স্বামীর বন্ধু ইউসুফ মির্জা আসার পর, সে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে যাওয়ার পর থেকে শরীরের গতি যেন বেড়ে গেছে তার। হয়তো মেয়েটার অপারেশনের একটা কিছু ব্যবস্থা এবার করা যাবে। কাশেম ডাক্তারের কাছে গিয়েও কথাও বলে এসেছে কাল। এই টাকায় হবে না, টাকা আরও লাগবে। সেই টাকা কীভাবে জোগাড় করা যায়, গ্রামের কাকে কাকে ধরলে, কোন আত্মীয়র কাছে গেলে টাকা দু-চারশ’ করে পাওয়া যাবে এইসব ভেবেছে কাল অনেক রাত পর্যন্ত। সবমিলিয়ে দশ-বিশ জন লোকও যদি পাশে দাঁড়ায়, টাকা যা উঠবে, কাজ হয়ে যাবে। ওই যে কথায় আছে না, দশের লাঠি একের বোঝা।
আর যদি এভাবে না হয় তা হলে আর একটা বুদ্ধি আছে। এই বুদ্ধিটাও কাশেম ডাক্তারই দিয়েছেন। ঢাকার দৈনিক পত্রিকাগুলোর চিঠিপত্র কলামে ‘আমার মেয়ের মুখের হাসি ফিরিয়ে দিন’ বা এই জাতীয় শিরোনাম দিয়ে কয়েকটা চিঠি লিখতে হবে। পাঁচ-দশটা চিঠি লিখলে দুয়েকটা চিঠি ছাপা হবেই। সেই চিঠি পড়ে দেশের দয়াবান মানুষরা কেউ না কেউ এগিয়ে আসবে দোয়েলকে সাহায্য করতে। এইভাবে অনেক অসহায় মানুষের উপকার হয়। তা ছাড়া মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে শুনলে আর কেউ না হোক মুক্তিযোদ্ধারা অন্তত সাহায্য করবেন। দেশে বিত্তবান মুক্তিযোদ্ধাও তো কম নেই।
আশ্চর্য ব্যাপার, গত চার মাসে এইসব বুদ্ধি কারও মাথায় আসেনি। ইউসুফ মির্জা এসে যেন ঘোরতর অন্ধকারে মোমের আলো জ্বেলে দিয়ে গেলেন। এখন চারদিকে হয়তো আরও একটা দুটো করে আলো জ্বলে উঠবে।
আহা, সেই মানুষটার সঙ্গে দোয়েলের দেখা হয়নি। সে স্কুল থেকে ফেরার আগেই চলে গেছেন তিনি। বাবার মুখে কত গল্প একদিন শুনেছে এই মানুষের, তাদের বাড়ি এসে ঘুরেও গেলেন এত বছর পর, দোয়েলকে না দেখেই তার চিকিৎসার জন্য অতগুলো টাকা দিয়ে গেলেন অথচ দোয়েলের সঙ্গে তার দেখাই হলো না। হয়তো কোনোদিন হবেও না। কারণ তিনি বাংলাদেশে থাকেনই না।
আজকের সকালটা এসব ভেবেই কাটিয়েছে দোয়েল। তারপর ভেবেছে টিউমারের কথা। যদি টাকা জোগাড় করে সত্যি সত্যি অপারেশন করা যায়, তা হলে একদমই আগের মতো হয়ে যাবে তার মুখ। আগের মতো খিলখিল করে হাসতে পারবে, কথা বলতে পারবে। মুখে কোনো দাগ থাকবে না, মুখটা হয়ে যাবে আগের মতো নিখুঁত সুন্দর। যে কেউ সেই মুখ দেখে বলবে, বাহ্ কী সুন্দর চেহারা মেয়েটির! কী মিষ্টি মুখ!
নাকি অপারেশনের দাগ থেকে যাবে গালে! টিউমার থাকবে না ঠিকই, টিউমারের চিহ্ন, কাটা দাগ থেকে যাবে!
তা হলে আর লাভ হলো কী? মুখে বড় একটা খুুঁত তো তার থেকেই গেল?
আবার একটা ভয়ের কথাও বলেছেন কাশেম ডাক্তার। এই ধরনের টিউমার থেকে অনেক সময় ক্যানসার হয়। যদি তেমন হয় তা হলে আর মুখের দাগ হাসিটাসি নিয়ে ভেবে কী লাভ! ক্যানসার হলে বাঁচার আশা নেই। বাবার মতো ধুঁকে ধুঁকে মরতে হবে।
এসব ভেবে বিষণœ মুখে বারবাড়ির দিকে এসেছে দোয়েল, লম্বা চওড়া, সুন্দর পোশাক জুতো পরা একজন ¯িœগ্ধ মুখের মানুষ এসে দাঁড়াল তার সামনে। মানুষটার হাতে সুন্দর একটা শপিংব্যাগ, ব্যাগের ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে বেশ দামি ধরনের কয়েকটি প্যাকেট। দেখে বোঝা যায় খাবারের প্যাকেট। বিদেশি বিসকিট চকলেট এসব হবে। আর মানুষটার গা থেকে কেমন একটা বাবা বাবা গন্ধ আসছিল।
বাইরের যে কোনো মানুষের সামনে দোয়েল এখন তার মুখটা ঢেকে রাখে। মুখের ওই বিশ্রী টিউমার সে কাউকে দেখাতে চায় না। হঠাৎ লম্বা হয়ে ওঠা টিংটিংয়ে মেয়েটির ওড়না ব্যবহারের দরকার হয় না, তবু মুখ ঢাকার জন্য ওড়না পরে সে।
গলার কাছে ওড়না এখনও আছে কিন্তু মুখ ঢাকার কথা মনে হলো না দোয়েলের। দুঃখী বিষণœ মুখে মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইল।
সেই মানুষটিও দোয়েলের মতো করেই তাকিয়েছিল তার দিকে। তবে কয়েক মুহূর্ত মাত্র। তারপরই হাসিমুখে মায়াবী গলায় কথা বলে উঠল, তোমাকে চিনতে আমার ভুল হয়নি। তুমিই দোয়েল। দোয়েল ছাড়া এত সুন্দর, মিষ্টিমুখ আর কোনো মেয়ের হবে!
বলেই গভীর মমতায় দোয়েলের চিবুকের কাছটা ধরল। সেদিন তোমার সঙ্গে দেখা না করে চলে গেছি, দুটো দিন এজন্য কষ্ট পেয়েছি। সে কারণেই আবার এলাম।
রান্নাঘরের দিক থেকে ইউসুফের গলা বুঝি শুনতে পেয়েছিল শিরিন, আঁচলে হাত মুছতে মুছতে এগিয়ে এলো। ইউসুফকে দেখে মাথায় ঘোমটা দিল। ব্যস্ত গলায় বলল, আপনে আসলেন কখন?
একহাত দোয়েলকে জড়িয়ে ধরে ইউসুফ বলল, এই তো এক্ষুণি।
আসেন, আসেন।
সেদিনকার মতো আজও ছুটে গিয়ে ঘর থেকে চেয়ার আনল শিরিন। আঁচলে চেয়ার মুছে বলল, বসেন ভাই, বসেন।
চেয়ারে বসে শপিংব্যাগটা দোয়েলের হাতে দিল ইউসুফ। এটা তোমার জন্য। এখানে মজার মজার বিসকিট চকলেট ক্যান্ডি আছে। এগুলো ঘরে রেখে এসো।
কিন্তু মানুষটার কাছ থেকে সরে যেতে ইচ্ছে করছে না দোয়েলের। কেমন যেন লাগছে। মনে হচ্ছে অনেকদিন পর দূর কোনো পরদেশ থেকে যেন ফিরে এসেছেন বাবা। চোখের আড়াল হলেই বুঝি দোয়েলকে ছেড়ে আবার উধাও হয়ে যাবেন।
তবু ঘরে গিয়ে চৌকির ওপর শপিংব্যাগটা রেখে এলো দোয়েল। কাছে আসতেই তাকে বুকের কাছে টেনে নিল ইউসুফ। গভীর মমতায় আঙ্গুলের ডগায় আলতো করে ছুঁয়ে দিল তার টিউমারটা। বিশাল এক ভরসা দেয়া গলায় বলল, এ এমন কিছু টিউমার না! সামান্যই। ছোট্ট একটা অপারেশন লাগবে।
ইউসুফের এই কথাটা যেন শুনতে পেল না শিরিন। বলল, আইজ কইলাম ভাত না খাইয়া যাইতে পারবেন না। আমি অহনই ভাত চড়াইতাছি। কই মাছ চাইরটা আছে।
ইউসুফ ¯িœগ্ধ মুখে বলল, তা না হয় খেলাম। কিন্তু আপনি যদি রান্নাবান্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে যান তা হলে কথা বলব কখন? আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।
শিরিন কথা বলবার আগেই দোয়েল বলল, তাইলে চেরটা রান্ধনঘরের সামনে লইয়া যাই। মায় রানল আর আপনে কথা কইলেন।
দোয়েলের কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেল ইউসুফ। বাহ্! এই মেয়ে তো খুব সার্প। ভাবী, আপনি সব গোছগাছ করে বসুন, আমি চেয়ার নিয়ে ওখানে আসব। এই ফাঁকে দোয়েলের সঙ্গে একটু গল্প করি।
আচ্ছা।
শিরিন ব্যস্তভঙ্গিতে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
ইউসুফ আবার হাসিমুখে তাকাল দোয়েলের দিকে। আমি কি তোমার সামনে একটা সিগ্রেট খেতে পারি মা?
দোয়েল মাথা নাড়ল।
সিগ্রেটের গন্ধে তোমার খারাপ লাগবে না তো?
না। বাবায় অনেক সিগারেট খাইত। বাড়িত থাকলে সবসময় থাকতাম বাবার লগে লগে। বাবার সিগারেটের গন্ধ আমার ভালো লাগত। বাতাসে সিগারেটের গন্ধ পাইলেই আমি বুঝতাম বাবায় আসতাছে।
ইউসুফ কথা বলল না। পকেট থেকে সিগ্রেট বের করে ধরাল। তারপর আচমকা বলল, আমি সেদিন ইচ্ছা করেই তোমার সঙ্গে দেখা করে যাই নি, জানো?
দোয়েল অবাক হলো। ক্যান?
আমি যে তোমার জন্য কিছু নিয়ে আসিনি। একদম খালি হাতে এসেছিলাম, এজন্য।
কিন্তু আপনের জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে। রাত্রে অনেকক্ষণ ঘুম আসে নাই। খালি আপনের কথা চিন্তা করছি। বাবার কাছে আপনের কথা শুনছি তো! আপনেরে খুব দেখতে ইচ্ছা করছিল।
সিগ্রেটে টান দিয়ে ইউসুফ বলল, ভাবীর মুখে তোমার নাম শুনে তোমাকেও খুব দেখার ইচ্ছা হয়েছিল আমার। যে মেয়ের নাম দোয়েল, তাকে না দেখে আমি যাব কেন? কিন্তু যখনই তোমার টিউমারের কথা শুনলাম, মনটা এত খারাপ হলো। ফুলের মতো একটি মেয়ের মুখে টিউমার! টিউমারের জন্য সে হাসতে পারছে না, এসব ভেবে কষ্ট পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল তোমার মুখটা আমি সহ্য করতে পারব না, আমার বুকটা ফেটে যাবে। অত কষ্ট পাওয়ার চে’ তোমাকে না দেখে চলে যাওয়াই ভালো।
ইউসুফ আবার সিগ্রেটে টান দিল। কিন্তু যেতে যেতে আমি তোমার কথা খুব ভাবলাম। তোমার বাবার কথা ভাবলাম, নিজের কথা ভাবলাম। আমরা মুক্তিযোদ্ধা। দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছি। কত বড় অপারেশনে যোগ দিয়েছি, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছি। আর আজ ছোট্ট একটা মেয়ের বিপদের কথা জেনেও আমি তার সঙ্গে দেখা না করে পালিয়ে যাচ্ছি! এসব ভেবে নিজের ওপর খুব রাগ হলো, জানো? নিজেকে কাপুরুষের মতো মনে হলো। অথচ আমি তো তা নই, আমি তো একজন মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে আমি পালিয়ে যাব কেন?
ইউসুফের কথার অনেকটাই বুঝতে পারছিল না দোয়েল। কিন্তু তার খুব ভালো লাগছিল শুনতে। অপলক চোখে ইউসুফের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল সে।
সিগ্রেটে টান দিয়ে, উঠোনের হাওয়ায় ধোঁয়া ছেড়ে ইউসুফ বলল, এজন্য ঢাকায় ফিরে গিয়ে বড় বড় কয়েকটি হাসপাতালে যোগাযোগ করলাম আমি, কয়েকজন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বললাম। ভাবীর মুখে তোমার টিউমারের কথা যতটা শুনেছি ততটাই বললাম তাদের।
তার টিউমারের ব্যাপারে ঢাকার বড় ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলেছে ইউসুফ, হাসপাতালে কথা বলেছে শুনেই বিষণœ মুখটা উজ্জ্বল হলো দোয়েলের। গভীর আগ্রহের গলায় বলল, ডাক্তাররা কী কইল?
বড় ডাক্তাররা রোগী না দেখে কিছু বলেন না। তবু আমার মুখ থেকে যতটা শুনেছেন, বললেন, এটা তেমন সিরিয়াস কিছু ব্যাপার না।
একটু থামল ইউসুফ। সিগ্রেটে টান দিল। তোমাদের বাড়ি থেকে ফিরে গিয়ে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালের সঙ্গে যখন কথা বলছি, ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলছি, তখন আমার কী মনে হচ্ছিল জানো, মনে হচ্ছিল আমি যেন একাত্তর সালে ফিরে গেছি। আমাকে যেন একটা যুদ্ধে নামতে হবে। আমি যেন সেই যুদ্ধের রসদ জোগাড় করছি।
বলেই সরল মুখ করে হাসল ইউসুফ। তোমাকে এসব বলতে খুব ভালো লাগছে।
সিগ্রেটে শেষটান দিয়ে পায়ের কাছে ফেলল ইউসুফ। জুতোয় ডলে সিগ্রেট নেভাল। বলল, তারপর বুঝলে মা, যুদ্ধের পুরো প্রিপারেশন নিয়ে তোমাদের বাড়ি এলাম।
মুখটা একটু ঝুঁকিয়ে দোয়েলের কানের কাছে নিয়ে গেল ইউসুফ। কেন এসেছি জানো? তোমাকে নিয়ে যেতে। তোমাকে নিয়ে যাওয়া মানেই যুদ্ধটা আমি শুরু করলাম।
দোয়েল অবাক গলায় বলল, কোথায় নিয়া যাইবেন আমারে?
ঢাকায়। হাসপাতাল রেডি করে এসেছি, ডাক্তার রেডি করে এসেছি। আজ ঢাকায় পৌঁছেই সেই হাসপাতালে নিয়ে যাব তোমাকে। ডাক্তাররা আগে তোমার টিউমার পরীক্ষা করবেন। তারপর অপারেশন।
শুনে আনন্দ উত্তেজনায় বুক ভরে গেল দোয়েলের। ইচ্ছে হলো এখনই রান্নাঘরে দৌড়ে গিয়ে খবরটা মাকে দিয়ে আসে। তা করল না দোয়েল। উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, অপারেশন করলে পুরা ভালো হইয়া যামু আমি?
হ্যাঁ। পুরো ভালো হয়ে যাবে।
আগের মতো হাসতে পারুম?
অবশ্যই পারবে।
মুখে কোনো দাগ থাকব না?
না, একটুও দাগ থাকবে না। কারণ তোমাকে করা হবে বেশ দামি অপারেশন। কসমেটিক সার্জারি। কসমেটিক সার্জারিতে কোনো দাগ থাকে না। অপারেশনের পর মুখ দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না যে তোমার মুখে একটা টিউমার ছিল।
এবার নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না দোয়েল। দৌড়ে মা’র কাছে গেল। জোয়ার জলের মতো কলকল করে মুহূর্তে ইউসুফের মুখে শোনা সব কথা বলে দিল।
শিরিন তখন চুলোয় ভাত বসিয়ে কই মাছ কুটতে বসেছে। সব শুনে গভীর আনন্দে স্তব্ধ হয়ে গেল। কাজ করতে ভুলে গেল।
দোয়েল ততক্ষণে আবার ছুটে এসেছে ইউসুফের কাছে। ভয় মেশানো উত্তেজিত গলায় বলল, অপরেশন করলে ব্যথা পামু না আমি?
দুহাতে দোয়েলকে বুকের কাছে টেনে আনল ইউসুফ। না, একটুও ব্যথা পাবে না। তুমি তো টেরই পাবে না অপারেশানটা কখন হলো। আচ্ছা শোনো, তুমি কি ইনজেকশনে ভয় পাও?
মুখের মজাদার ভঙ্গি করে দোয়েল বলল, না। একবার পা মচকাইয়া গেছিল। তখন বাবায় কাশেম ডাক্তারের কাছে নিয়া ইনজেকশন দেওয়াইয়া আনছিল। একটুও ব্যথা পাই নাই। খালি মনে হইল একটা পিঁপড়ার কামড়।
তা হলে তো কথাই নাই। অপারেশনের আগে একটা ইনজেকশন দেবে তোমাকে। তুমি ঘুমিয়ে পড়বে। ঘুম থেকে উঠে দেখবে টিউমারটা নেই। তুমি সেই আগের দোয়েল হয়ে গেছ।
শুনে কী যে মুগ্ধ হলো মেয়েটি! হাসার চেষ্টা করল কিন্তু স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাসতে পারল না। দেখে বুকটা হুহু করে উঠল ইউসুফের। হয়তো কষ্টটা কাটাবার জন্যই উঠে দাঁড়াল সে। বলল, কী হলো দোয়েল, তোমার জন্য যে এত খাবার আনলাম, খাচ্ছ না কেন?
পরে খামু নে।
না এক্ষুণি খাও। যাও, প্যাকেট খুলে দেখ যেটা ভালো লাগে নিয়ে এসো। তুমি খাবে আর ভাবীর সঙ্গে কথা বলব আমি।
তাইলে চেয়ারটা আমি রান্ধনঘরের সামনে নিয়া দেই?
তুমি দেবে কেন? আমিই তো নিতে পারি। কিন্তু চেয়ার এখন নেব না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলব।
আইচ্ছা।
দোয়েল ঘরে ঢোকার পর ইউসুফ এলো রান্নাঘরের সামনে। শিরিনকে বলল, মেয়ের মুখে তো সবই শুনেছেন। তবু আবার বলি, আপনাদের দুজনকে আমি ঢাকায় নিয়ে যেতে চাই। দোয়েলের চিকিৎসাটা করাতে চাই।
শুনে আবেগে কথা বলতে পারল না শিরিন। মাছ কুটতে কুটতে ইউসুফের দিকে তাকাল। গভীর কৃতজ্ঞতায় চোখ দুটো ছলছল করছে তার। কোনো রকমে বলল, কী কমু ভাই, কন! খালি এটুকু কইতে পারি, আপনে মানুষ না, আপনে ফেরেশতা।
ইউসুফ কিছু বলবার আগেই ওয়েফার ধরনের লম্বা দুটো বিসকিট হাতে দোয়েল এসে দাঁড়াল তার পাশে। কামড়ে কামড়ে বিসকিট খেতে লাগল। খাওয়ার ভঙ্গি দেখে বোঝা যাচ্ছিল স্বাভাবিক মানুষের মতো খেতে পারছে না সে। অসুবিধা হচ্ছে।
একপলক দোয়েলকে দেখে শিরিনের দিকে তাকাল ইউসুফ। ভাত খেয়েই রওনা দিতে চাই। আপনি সেইভাবে ব্যবস্থা করুন ভাবী।
দোয়েলকে বলল, কাপড় চোপড় গুছিয়ে নাও। আজই ঢাকায় নিয়ে যাব তোমাদেরকে। এখান থেকে সরাসরি হাসপাতালে।
শুনে শিরিন এবং দোয়েল দুজনেই দিশেহারা হলো।
শিরিন বলল, আইজই যাওন লাগব! তা হলে এই দিকে কী ব্যবস্থা করুম? বাড়িঘর হাঁস-মুরগি এইসব কে দেখব?
ইউসুফ বলল, পাড়া-প্রতিবেশী কাউকে বলুন। একজন এমন কাউকে যদি পাওয়া যায়, যতদিন দরকার বাড়িতে থাকল। তার খাওয়া খরচের টাকা আমি দিয়ে যাব।
দোয়েল লাফিয়ে উঠে বলল, ওমা, হাসু ফুপুরে থুইয়া যাও। তার তো কোনো বাড়িঘর নাই, সংসার নাই। এহেকদিন এহেক বাড়িতে থাকে। অহন আছে বেপারি বাড়িতে। আমি গিয়া তারে ডাইকা লইয়াহি। টেকা দিলেই দেখবা খুশি হইয়া থাকব।
শিরিন কথা বলবার আগেই ইউসুফ বলল, যাও মা, ডেকে নিয়ে এসো।

তিন
দুপুরের পরপর বাড়ি থেকে বেরুল তিনজন মানুষ।
হাসুকে বাড়িতে রেখে বেশ সহজেই সব ব্যবস্থা করা গেছে। মহিলাকে পাঁচশ’ টাকা দিয়ে এসেছে ইউসুফ। ওতেই মহাখুশি সে। তাছাড়া ঘরে চাল ডাল যা আছে একজন মানুষের বেশ কিছুদিন চলবে। ততদিনে দোয়েলের অপারেশন করিয়ে ফিরে আসতে পারবে শিরিন।
গ্রামের পথে দোয়েলের হাত ধরে হাঁটছে ইউসুফ। দোয়েল শিরিনের জামা-কাপড়ের ছেঁড়াখোড়া রেকসিনের ব্যাগটা তার হাতে। বেশভূষার সঙ্গে ব্যাগটা একদমই মানাচ্ছে না। কিন্তু ওসবের তোয়াক্কা করছে না ইউসুফ। উচ্ছ্বসিত গলায় দোয়েলের সঙ্গে কথা বলছে। তোমাদেরকে নিয়ে আরও অনেক প্ল্যান আছে আমার। উত্তরায় আমার একটা ছয়তলা বাড়ি আছে। নিচে গাড়ি রাখার জায়গা আর পাঁচতলায় দশটা ফ্ল্যাট। ন’টা ভাড়া দেয়া, একটা আমার জন্য। দেশে এলে ওই ফ্ল্যাটটায় আমি থাকি। অপারেশনের পর তুমি আর তোমার মা থাকবে আমার ফ্ল্যাটে। বাড়ি ভাড়ার টাকা থেকে তোমাদের খরচ দেয়া হবে। আমি সব ব্যবস্থা করব। উত্তরায় অনেক ভালো ভালো স্কুল আছে। সেখানকার একটা স্কুলে ভর্তি করে দেব তোমাকে। এই মুহূর্ত থেকে তোমাদের দুজনের দায়িত্ব আমার।
ইউসুফ এবং দোয়েলের পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে এসব কথা শুনছিল শিরিন, চোখে পানি আসছিল তার।
বড় রাস্তায় একটা মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে আছে। ইউসুফকে দেখেই ব্যস্ত ভঙ্গিতে নেমে এলো ড্রাইভার। হাত থেকে ব্যাগটা নিল।
দোয়েল উত্তেজিত গলায় বলল, আমরা এই গাড়িতে কইরা যামু?
হ্যাঁ। গাড়িটা আমারই।
তারপর শিরিনের দিকে তাকিয়ে বলল, উঠুন ভাবী।
মাইক্রোবাসের পেছন দিককার সিটে বসল শিরিন, সামনের দিকে দোয়েল আর ইউসুফ। গাড়ি যখন চলতে শুরু করেছে, ইউসুফ বলল, জানো দোয়েল, এই মুহূর্তে যুদ্ধের সময়কার একটা গানের কথা খুব মনে পড়ছে আমার।
আনন্দে বিভোর হওয়া গলায় দোয়েল বলল, কোন গান?
‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি
মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি।’
এই গানটা আমি জানি। বাবার মুখে কত শুনছি।
আলতো করে দোয়েলের গালটা একটু ছুঁয়ে দিল ইউসুফ। আজ এতকাল পর মনে হচ্ছে আর একটা যুদ্ধ যেন তোমাকে নিয়ে শুরু করলাম। তোমার মুখের হাসি ফিরিয়ে দেয়ার যুদ্ধ। আগের যুদ্ধটার মতো এই যুদ্ধেও জয় আমাদের সুনিশ্চিত।

শ্রেণী:

এইটা আমার নিজের গল্প

Posted on by 0 comment
33

বাবা-মা মারা যাওয়ার পর আমাদের সেই ঘোর বিপদের দিনে, দুঃসময়ে আমার বাবার ভাইরা মানে আমার বাবার রক্ত পানি করা টাকায় মানুষ হওয়া চাচারা ‘টিনের চশমা’ পরে দারুণ উদাস হয়ে গেলে আমার নানা আর আমার নানি, আমার চার খালা, আমার চার মামারা আমাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন।

33মাহবুব রেজা: আমার দু বছরের বড় ছিল রুমি।
কয়েকদিন ধরে ওকে খুব মনে পড়ছে আমার।
কত স্মৃতি আমাদের!
ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে বেড়ে উঠেছি আমি আর রুমি। একসঙ্গে খেলাধুলা। এক স্কুলে পড়াশোনা। স্কুলের নাম নারিন্দা গভ. হাই স্কুল।
বাবা-মা মারা যাওয়ার পর আমরা ছয় ভাই, এক বোন নানাবাড়ি চলে এলাম।
আজিমপুর কলোনি। দুই নম্বর বিল্ডিং। বি নম্বর ফ্ল্যাট। আমাদের বিল্ডিংয়ের পেছনে চায়না বিল্ডিং। আজিমপুর কলোনি থেকে আমি আর রুমি দুই ভাই একসঙ্গে বাসে চেপে ফুলবাড়িয়া নামতাম, তারপর সেখান থেকে হেঁটে হেঁটে নবাবপুর, টিপু সুলতান রোড, যোগিনগর, বনগ্রাম, রেঙ্কিন স্ট্রিট ঘুরে ঘুরে স্কুলে যেতাম।
দুই ভাই মিলে কত গল্প করতাম।
কত কথা যে বলত রুমি!
স্কুল ফাঁকি দিয়ে রুমি আমাকে প্রথম গুলিস্তান হলে বাংলা সিনেমা দেখিয়েছিল। সিনেমার নাম সঙ্গিনী। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর আমাদের সেই ঘোর বিপদের দিনে, দুঃসময়ে আমার বাবার ভাইরা মানে আমার বাবার রক্ত পানি করা টাকায় মানুষ হওয়া চাচারা ‘টিনের চশমা’ পরে দারুণ উদাস হয়ে গেলে আমার নানা আর আমার নানি, আমার চার খালা, আমার চার মামারা আমাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন।
আমাদের পাশে ছায়ার মতো লেগে রইলেন।
আমার খালারা, আমার মামারা নিজেরা কষ্ট করে, নিজেদের খাবার আমাদের মুখে তুলে দিয়েছিলেন। আমাদের নিদারুণ কষ্টের দিনে তারা আমাদের সব উজাড় করে দিয়েছিলেন।
নানার বড় সংসার।
তারপর আমরা একেক ভাই একেক আত্মীয়ের বাসায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রইলাম।
তখন আমাদের অনেক অভাব।
তখন আমাদের অনেক অনটন।
তখন আমাদের অনেক দুঃসময়।
আমরা ভাইরা একেক জায়গায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে আমাদের খুব একটা দেখা-সাক্ষাৎ হতো না। আমাদের তখন দেখা হতো কালে-ভদ্রে, ঈদ-টিদে।
সেই সব উৎসবে যখন আমাদের দেখা হতো তখন কেন যেন আমরা নিজেদের মধ্যে খুব একটা কথাবার্তা চালাচালি করতাম না। আমরা ভাইরা তখন কথা বলে সময় নষ্ট না করে একেকজন একেকজনের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতাম।
বড় ভাই পড়াশোনার চেয়ে টিউশনিতে বেশি ব্যস্ত থাকত। কীভাবে দুটো বাড়তি পয়সা আয় করে ছোট ভাইদের দাবি মেটানো যায়। মেজ ভাইও টুকটাক কন্ট্রাক্টরির কাজ করে বড় ভাইকে সাহায্য করতে সচেষ্ট।
আমাদের তখন দুর্দিন।
আমাদের তখন হাহাকার।
১৯৮৪ সাল।
রুমি তখন কলেজে।
কি ঝলমলে সুন্দর দেখতে ছিল আমার ভাইটা!
ঝাঁকড়া চুল। পাকা গমের মতো গায়ের রং।
আমার বাবা-মার খুব নাকি আদরের ছিল রুমি!
একদিন কাউকে কিছু না বলে, একা একা অভিমান করে আমার ভাইটা হুট করে মরে গেল। আমি তখন আমার বড় খালার বাসায় থাকি। এক সকালে আমার মেজ ভাই ফ্যাঁকাসে মুখ নিয়ে খালার বাড়ি এসে আমাকে রিকশায় তুলে নিয়ে সোজা চলে গেল ঢাকা মেডিকেলে। পুরোটা রাস্তাজুড়ে আমার মেজ ভাই আমার সঙ্গে কোনো কথা বলল না। শীতের সকাল। ঠা-া বাতাস শরীরে এসে বুঝিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল।
আমি কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এই সাতসকালে কেন মেডিকেলে?
জীবনে সেই আমার প্রথম আর শেষবারের মতো মর্গে যাওয়া।
ঠা-া মেঝেতে আমার বাবা-মার বড় আদরের সন্তান অবহেলায়-অযতেœ পড়ে আছে মর্গের ঠা-া মেঝেতে। রুমি শুয়ে কি আমাদের ওপর রাগ আর অভিমান করে এখানে এভাবে, এমন করে শুয়ে আছে? রুমির পাশে স্তূপ করে রাখা কয়েকটি দেব শিশু। ওদের শরীর কেমন নীল হয়ে আছে। আমি রুমিকে যত না দেখছিলাম তার চেয়ে বেশি বেশি চোখ আমার চলে যাচ্ছিল শিশুগুলোর দিকে। আমার মেজ ভাই পাগলের মতো কেঁদে যাচ্ছিল আর বলছিল, ‘রুমি রে তুই এইটা কি করলি? তুই এইটা কি করলি?’
আমার ঝাপসা দৃষ্টিতে রুমি আর দেব শিশুগুলো মিলেমিশে একাকার।
আহা রে!
আহা রে!
আহা রে!
আহা রে!
সেই সকালে আমি অভিশাপ দিয়েছিলাম নিজেকে।
আমাদের অভাবকে।
আমাদের দুঃসময়কে।
আমাদের দুর্দিনকে।
আমাদের হাহাকারকে।
আমাদের দীর্ঘ নিঃশ্বাসকে।
সেই সকালে আমি আরও অভিশাপ দিয়েছিলাম আমাদের এই রকমভাবে বেঁচে থাকাকে।
এভাবে বেঁচে থাকাকে কি কেউ বেঁচে থাকা বলে!

শ্রেণী: