জননী ও পুত্রেরা

Posted on by 0 comment
41

41খালিদ মারুফ: ধরে নেই এই গল্প প্রকল্পের প্রধান দুটি চরিত্রের নাম রফিক ও শফিক। তারা একই মায়ের গর্ভজাত, এমনকি তারা যমজ। তিন মিনিটের ব্যবধানে মায়ের জরায়ু ফুঁড়ে তারা ভূমিষ্ট হয়েছিল ধরণীর দিকে মুখ রেখে, অন্যেরা যেভাবে জন্মায়। প্রথমে রফিক, তারপর শফিক। তবে কে যে আগে আর কে পরে সেটা নিয়ে আঁতুড়ঘরের ধাত্রীদের মধ্যে কিঞ্চিৎ সন্দেহ থাকলেও বাড়ন্ত সময়টাতে যখন রফিক শফিকের চেয়ে হৃষ্টপুষ্ট হয়ে উঠল তখন সবাই নিশ্চিত হলো যে, রফিকই বড়। তারা তাদের মায়ের গর্ভে এসেছিল সেই মহা খুনের বছরটিতে। তাই হয়তো তাদের জন্মের পর আর দেশে খুন-খারাবি থামে নাই। তবে ছোটবেলা থেকে তারা এতটাই শান্তশিষ্ট যে তাদের নিয়ে সেই নাবালক অবস্থার দুশ্চিন্তাগ্রস্ত সময়গুলি পাড়ি দেবার পর তাদের মায়ের আর বিশেষ দুশ্চিন্তা হয় নাই। এবং এরই ধারাবাহিকতায় বিয়ের বয়েস কিছুটা পেরিয়ে গেলেও তাদের বিবাহ নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্যও হয় নাই। এ নিয়ে মহল্লার লোকেরা যখন তাদের মায়ের কাছে প্রশ্ন রেখেছে, ‘কি! রফিক-শফিকের মা, ছেলেদের কি বিয়ে-শাদি করাবা না?’ তখন তাদের মা মুখটাকে কিছুটা ডানে কিংবা বাঁয়ে ঘুরিয়ে নরম স্বরে জবাব দিয়েছে, ‘পাত্রী মেলা ভার।’ তা ছাড়া যেহেতু তারা যমজ তাই সবার মত হলো তাদের বিবাহটাও হওয়া চাই একই সাথে।
গত বছর তাদের মাকে এই দুরারোগ্য ব্যাধিটাতে পেয়ে বসবার আগে চুনকুটিয়ার কাজি বাড়ির আকরাম কাজির জ্যেষ্ঠ কন্যাটিকে তার মা অনেকটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও শুধুমাত্র মেয়েটার রূপ-গুণের কথা মাথায় রেখে রফিকের জন্য চূড়ান্ত করে রেখেছে। রণজিৎ কর্মকারের দোকান থেকে তার মায়ের একটা স্মৃতিবহ পুরনো আংটিকে ঘষে ধুয়ে তার ওপর আরবি আলিফ-লাম-মীম অক্ষর তিনটি খোদাই করে বিরাট একঝুড়ি পান আর বারো প্যাকেট মিষ্টি সহযোগে তাদের বংশের লোকেরা গিয়ে সেই আংটি পরিয়ে এসেছিল মেয়েটার মধ্যমায়। কেননা হাসি মুখের শ্যাম সুন্দরী সেই কনের অনামিকায় আংটিটা খুবই ঢলঢলে হয়ে যাচ্ছিল। পক্ষান্তরে মধ্যমায় সেটা মানিয়ে গিয়েছিল দারুণভাবে। কথা ছিল দ্রুতই শফিকের জন্য কন্যা নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ করে একসাথে মহাসমারোহে তাদের দুই সহোদরের বিবাহ হবে। আর এই অবসরে ছয় মাস বাকি থাকা ¯œাতক চূড়ান্ত পর্বের পরীক্ষা সম্পন্ন করে নেবে মেয়েটা। যেহেতু শফিকের জন্য কন্যা এখনও নির্বাচন করা যায় নাই, তাই রফিকের প্রচ- ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সে সেদিন চুনকুটিয়ার সেই বাড়িতে যায় নাই।
বারো মাসই কাঠের বাটওয়ালা ছাতা বহনকারী তাদের এক দূরাত্মীয়, মেয়েটার একটা ছবি সরবরাহ করেছিল রফিককে। এই যুগে এমন আকারের ছবি পাওয়া দুষ্কর। ছবি দেখে রফিকের শৈশবে লুকিয়ে পড়া একশ বছর আগেকার উপন্যাসের নায়িকাদের কথা মনে পড়েছিল। এটা নিজে তোলা নিজের ছবি নয়। স্টুডিওতে গিয়ে তোলা ছবি। পাসপোর্ট মাপের নয়, আবার সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের ভিউকার্ড সাইজেরও নয়। নিমতলির মোড়ে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যার সময় যখন মাঝবয়েসি ছাতাওয়ালা দূরাত্মীয় লোকটা ছবিটা হস্তান্তর করছিল। রফিক তখন মধ্য কার্তিকের আধা শীত আধা গরমেও ঘেমে গায়ে থাকা মোটা কাপড়ের শার্টটাকে ভিজিয়ে ফেলেছিল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে রফিক যখন বুঝতে পারল ছবিটা তার বুক পকেটে রাখা সংগত হবে না, তখন সে সেটাকে দ্রুতই হাতের চাপে ফেলে মাঝামাঝিতে একটা ভাঁজ দিয়ে মানিব্যাগের প্রধান পকেটটাতে রেখে সোজা ফিরে গিয়েছিল নিজের ঘরে। যাবার সময় তার মনে হয়েছিল ছবিটাকে ওইভাবে ভাঁজ করে মানিব্যাগে রাখা ঠিক হয় নাই। প্রাণহীন কাগুজে ফটোগ্রাফটাকে একটা সচেতন সত্তা বলে মনে হচ্ছিল তার। সে একবার ভাবলো মানিব্যাগটা হাতে নিয়ে হাঁটতে থাকবে, পরক্ষণেই তার মনে হলো কেউ যদি হাতে মানিব্যাগ দেখে জিজ্ঞেস করে বসে, ‘কিরে রফিক! মানিব্যাগে কী?’ তা হলে একটা বিব্রতকর কা- ঘটে যেতে পারে, সেই ভাবনা থেকে মানিব্যাগে যাতে খুব বেশি চাপ না লাগে সেজন্য রফিক তাঁর পাছার মাংসপি-কে যতটা সম্ভব নরম করে দ্রুতই ঘরে ফিরে গেল।
ঘরে ফিরে সে দেখল তার সহোদর শফিক এই অসময়ে খাটের কোণে শুয়ে আছে। কী এক সংকট থেকে রফিক ছবিটা হাতে নিয়ে দেখা থেকে বিরত হলো। মনে হলো ছবিটাকে কোনোক্রমে বের করে টেবিলের নিচে কোনো একটা বইয়ের মধ্যে রেখে দেবে সে। সেটাও করল না। শফিকের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো সে জেগেও থাকতে পারে তাই ছবিটাকে সে মানিব্যাগে রেখেই হাত-মুখ ধুয়ে নিল। তারপর ধাতস্থ হয়ে সে যখন বুঝল শফিকের কাছে বিষয়টা গোপন না করলেও চলে, তখন তার মায়ের ঘর থেকে ডাক পড়ল। তার মায়ের পীড়া ক্রমশ বেড়ে চলছে। তাদের মা এতখানি প্রৌঢ়া নন, তবে কলজে পচা রোগে পড়ার পর থেকে সে বুড়িয়ে গেছে। প্রতিদিনই তার কান্তিময় মুখ থেকে লাবণ্য খসে গিয়ে বলিরেখা স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। মায়ের ঘরে ঢুকে রফিক তাঁর মাকে পেল ঘুমন্ত অবস্থায়। ঘুমন্ত মায়ের দিকে তাকিয়ে নির্বাক কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বায়েজীদ বোস্তামীর শিক্ষাকে মাথায় রেখে পায়ে পায়ে মায়ের শিয়রে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল দীর্ঘক্ষণ। তবে সারারাত নয়। ফিরে এসে শফিকের পাশে ঘুমিয়ে সে ‘সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। শফিকের জন্য কন্যাও ঠিক হবে আর সুস্থ হয়ে উঠবে তাদের মাও এবং তারপর…।’ এইসব সুখস্বপ্ন দেখতে দেখতে সে ঘুমিয়ে পড়ল। তৎপরবর্তী দিনগুলো অর্থাৎ মধ্য কার্তিক থেকে মাঘের শেষ পর্যন্ত তারা তাদের মাকে নিয়ে অনবরত রাজধানীর সব বড় বড় ডাক্তার বৈদ্য আর দূর-দূরান্তের ওঝার বাড়িতে ছুটে যেতে লাগল। এই সংকটকালে চাপা পড়ে গেল রফিক-শফিকের বিবাহের আয়োজনও।
সবাই জেনে গেছে এই কলজে পচা রোগে মানুষ কিছুতেই আর বেঁচে থাকে না, তিন মাস-চার মাস অধিক ছয় মাস। এই দিনগুলোতে তারা যেখানেই যায় সবাই জানিয়ে দেয়, ‘তোমাদের মা আর কিছুতেই বাঁচবেন না।’ তারপর রফিক-শফিক বিয়ে শিকেয় তুলে মাকে সারিয়ে তোলবার যুদ্ধে অবতীর্ণ হলো। ইত্যবসরে পিজি হাসপাতালের সবচেয়ে প্রবীণ ডাক্তারদের সমন্বয়ে গঠিত বোর্ডও তাদের জানিয়ে দেয়: মানুষের পচা কলজে সারিয়ে তোলা কিংবা উপড়ে সেখানে নতুন কলজে প্রতিস্থাপন বিদ্যা এখনও তাদের অজ্ঞেয়।
মাঘের শেষে এসে তারা জানতে পারে বুড়িগঙ্গার ওই পারের মুখ ঢেকে রাখা সেই তান্ত্রিক, যাদুকর ও চিকিৎসকের কথা। ক্যানসারকেও সে সারিয়ে তোলে নিজের আবিষ্কৃত চিকিৎসায়। তার খবর রফিক-শফিকের কানে এসে পৌঁছায় সেই কনকনে ঠা-ার রাতটিতে। রাতটা কোনোভাবে কেটে যেতেই কুয়াশা মাথায় করে তারা বুড়িগঙ্গা পাড়ি দিয়ে এপারে এসে তান্ত্রিককে খুঁজতে থাকে। সারাদিন খোঁজাখুঁজির পর, পুনরায় কুয়াশা এসে চারপাশের আলোকে ম্লান করে দেবার কিছুক্ষণ পূর্বে, শাঁখারি বাজারের রাস্তাটার সামনে, জগন্নাথ কলেজের দেয়াল ঘেঁষে নানারকম বন্যপ্রাণীর শরীর নানা কসরতে পুড়িয়ে ছাই কিংবা তেলে পরিণত করা নানা মরণব্যাধির দাওয়াই বেচতে থাকা অবস্থায় তারা সেই তান্ত্রিককে দেখতে পায়। তান্ত্রিক ও চিকিৎসক সেই স্বল্পালোকে পেতলের হাতলওয়ালা ছোট ধারাল ছোরাটা দিয়ে সকলের সামনে চাঁনখারপুল থেকে যাওয়া এক ভাঙারি ব্যবসায়ীর পিঠ থেকে ফুলে সুপারির মতো হয়ে ওঠা টিউমারটাকে কেটে হাতে নিয়ে সমবেতদের প্রদর্শন করে। তারপর সেটা তার ধাতব বাটিটার মধ্যে জমে থাকা লাল জারকে টুপ করে ছেড়ে দেয়। সবাই বিস্ফোরিত নেত্রে সেই দৃশ্য দেখতে থাকে। রফিক-শফিক দুই ভাই সামনে এসে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায়। তারা দেখে, যে লোকটার পিঠ থেকে এইমাত্র সকলের সামনে টিউমারটা কেটে নেওয়া হলো সে নির্বিকার ভঙিতেই বসে আছে। এমন কি তান্ত্রিক তাকে প্রশ্ন করে, ‘কি! ব্যথা পেয়েছো?’ নির্বিকার ধুলোমাখা মুখটা উত্তর দেয়, ‘না’। রক্ত বেরুতে থাকা জায়গাটাতে সে তখন একদলা পিচ্ছিল ভেষজ ঘষে দিতে দিতে আবার প্রশ্ন করে, ‘কি! ব্যথা করছে?’ দাঁতে দাঁত চেপে ভাঙারি ব্যবসায়ী বলে, ‘না। একদমই না।’ হাতে রক্তমাখা ছুরিটা নিয়ে এবার সে দর্শক সারির সামনে চলে আসে। ‘কী! আর কী দেখতে চান?’ বলে হুঙ্কার দিয়ে অতৃপ্তদের লজ্জা ভেঙে দেয়। অতৃপ্তরা মানিব্যাগে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে থাকে। প্রথমে লজ্জা ভাঙা একজন মুঠোয় চেপে রাখা দুমড়ানো অথচ চকচকে লাল পঞ্চাশ টাকার একটি নোট তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘আমায় দিন এক শিশি।’ অতৃপ্ত লোকটা যতটা সম্ভব অনুচ্চস্বরে বলে কথাটা। যাদুকর চিকিৎসক বিকট চিৎকারে একটি শিশি তার হাতে পৌঁছে দিতে দিতে সেই তেলের ব্যবহার বিধি ঘোষণা করে, ‘সকালে ঘুম থেকে উঠে শিশ্ন ফোলা থাকা অবস্থায় একবার শুধু মালিশ করে নিতে পারলেই হলো, বাকিটা বোঝা যাবে সেইদিন রাতেই।’ রফিক-শফিক দুই ভাই কিয়ৎক্ষণের জন্য নিজের পীড়িত মাকে ভুলে তাদের সমাগত বিবাহের রাতটি নিয়ে ঈষৎ চিন্তিত হয়ে পড়ে। পরক্ষণেই দুই ভাই পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিয়ে যাদুকরের চিকিৎসার আসর শেষ হবার অপেক্ষা করে। যতেœ পাতা মাদুরের ওপর সার করে রাখা শিশিগুলো একটা একটা করে শেষ হয়ে গেলে যাদুকর চিকিৎসক হাত তুলে সবাইকে বিদায় জানায়। যাদের ভাগ্যে আজ আর শিশি জুটলো না তাদের পরবর্তী কোনো একদিনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওপরের দিকে হাতজোড় করে মাথাটাকে সম্পূর্ণই গায়ের চাদরে ঢেকে নেয়।
সবাই বিদায় হয়। সে চোখ খুলে তখনও তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যমজদের দেখতে পায়। সে ভেবেছিল সবাই চলে গেছে, তাই মুখ তুলবার সময় মুখের কাপড় আর ঠিক করে নাই। রফিক-শফিক তার অনাবৃত মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে লোকটার নাক নাই। নাকের বদলে সেখানে রয়েছে গাঢ় অন্ধকারময় একটি গর্ত। হয়তো গর্তটার শেষ দিকে নিঃশ^াস ছাড়বার মতো রন্ধ্র রয়েছে এক বা একাধিক, তবে সে রন্ধ্র রফিক কিংবা শফিক কারও চোখেই পড়ে না। তারা চোখ নামিয়ে নিলে সে তার বাক্স-পেটরাগুলো গুছিয়ে নিতে নিতে রফিক-শফিকের কাছে তাদের মতলব জানতে চায়। প্রায় হাতজোড় করা ভঙ্গিমায় তারা তাকে জানায়, কোনো বিশেষ মতলব নয়; বরং এক কঠিনতম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে তারা এসেছে তার কাছে। তারা তাদের মায়ের কলজে পচা রোগ এবং ইতোপূর্বে নেওয়া সকল ব্যর্থ চিকিৎসার বর্ণনা দেয়। নাকহীন তান্ত্রিক এবার তার বাক্স-পেটরার ওপর চড়ে পা ছড়িয়ে আরাম করে বসে বলে, ‘এই রোগেরও চিকিৎসা আছে।’ এমনকি তা আরোগ্য হতে পারে তার তৈরি তেলেই। রফিক-শফিক আনন্দ আর আশায় নিজেদের পায়ের শক্তি হারিয়ে ধপ করে বসে পড়ে চিকিৎসকের পায়ের কাছে। এক সাথে চারটি হাত ওপরে তুলে সমস্বরে বলতে থাকে, ‘দিন! সেই তেলের শিশিটা আমাদের দিন!’ যাদুকর চিকিৎসক মুখের কাপড় সরিয়ে তাদের দিকে ঝুঁকে এসে বলে, সে তেল প্রস্তুত করা কিছুটা কষ্টসাধ্য, যমজেরা আবারও সমস্বরে ‘কেন? কীভাবে? কী দিয়ে? কী পুড়িয়ে বানায় সে তেল আমাদের বলুন। আমরাই যোগাড় করে দেব সেইসব। যত দূরবর্তী আর কষ্টসাধ্যই হোক না কেন মায়ের কলজে পচা রোগ সারাবার জন্য আমাদের সেখানে যেতেই হবে। বলুন আপনার কী চাই?’ যাদুকর আবার নিজের নাকহীন বীভৎস মুখ উন্মুক্ত করে তাদের দিকে ঝুঁকে এসে বলে, ‘শান্ত হও!’ সেই তেল বানাবার অধিকাংশ উপাদানই আমার কাছে রয়েছে, কেবল একটি উপাদান হলেই তেল তৈরিতে আর কোনো বাধা থাকছে না, যমজেরা এবার কাতর স্বরে বলে, ‘কী? কী সেটা? বলুন আমাদের।’
‘যা প্রয়োজন সেটা হলো : জীবিত মানুষের দেহের এক টুকরো ঝলসানো প্রত্যঙ্গ, হাত কিংবা পা হলেই বেশি সুবিধা হয়।’ বলে সে অদৃশ্য নাসারন্ধ্র থেকে তপ্ত নিশ^াস ছুড়ে দেয় যমজদের মুখে। যমজেরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে একমুহূর্তে ভেবে নেয়, এটা বাঘিনীর দুধ কিংবা দুধরাজের মাথার মণি নয় তাই এটা নিশ্চয় এমন কঠিন কিছুও নয়। যাদুকর তার অস্থাবরের ঝোলাটা কাঁধে তুলে নিতে নিতে বলে, ‘সেটা জোগাড় হলেই চলে এসো, আমি তোমাদের মায়ের কলজে পচা রোগের দাওয়াই তৈরি করে দেব।’
রফিক-শফিক দুই ভাই অনুজ্জ্বল ল্যাম্পপোস্টের আলোয় রিকশার ফাঁক গলে যাদুকরের হারিয়ে যাওয়া দেখে উৎফুল্ল বদনে হাওয়ার গতিতে দুর্গন্ধযুক্ত বুড়িগঙ্গার পাড়ে এসে দাঁড়ায়। বুড়িগঙ্গার ওপর দিয়ে আসা গাঢ় শীতল বাতাসে নৌকোর জন্য অপেক্ষা করে। স্বল্প বিরতিতেই তারা একটি নৌকোর ছেড়ে যাবার তোড়জোড় লক্ষ করে সেটাতে চড়ে দাঁড়ায়। নৌকোয় দাঁড়িয়ে তারা সোজা উত্তর দিকে তাকিয়ে প্রথমে পানি শোধনাগারের সুউচ্চ বুরুজটা দেখতে পায়। তারা বুরুজের ঠিক পেছনে পাঁচ দিন বয়েসি লাজুক চাঁদটাকে লুকিয়ে থাকতে দেখে। চোখ নামিয়ে যমজেরা বুড়িগঙ্গার পীত বর্ণের বুকে চাঁদের ছায়া দেখতে চায়। তারা চাঁদের কোনো ছায়া বুড়িগঙ্গার ওপরে খুঁজে পায় না; বরং বুড়িগঙ্গার ওপর তারা ধোঁয়ার উড়াউড়ি দেখে। যমজেরা হাই তোলে একসাথে, তাদের মুখগহ্বর থেকেও গাঢ় ধোঁয়া বেরিয়ে যায়, তাদের মনে পড়ে প্রতিদিনই শীত তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে। তীরে এসে পাটনি নৌকোটাকে ঘুরিয়ে নোঙর করে বৈঠা পায়ে চেপে দুই হাতে আরোহীদের দেওয়া পয়সা মিলিয়ে নিতে থাকে। রফিক-শফিক নামে সবার শেষে। নামার সময় হঠাৎই পাটনির পায়ের তলায় আটকে রাখা বৈঠাটা নড়েচড়ে ওঠে। পাটনি সতর্ক হয়ে সেটাকে সামলে নিতে বাম হাতটা নিচে নামায়। তাদের সামনে থাকে কেবল তার মেলে রাখা শীর্ণ ডান হাতখানা। যমজেরা লোভের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেই হাতখানার দিকে। বৈঠা সামলে পাটনি দু’হাত মুক্ত করে তর্জনী নাড়িয়ে বিরক্তি প্রকাশ করে, ‘কী দ্যাখতাছেন? ট্যাকাডা দিয়া নামেন! উফ্! ঠা-ায় জইমা যাইতাছি।’ বলে তাদের দিক থেকে দৃষ্টি ফেরায়। রফিক-শফিকেরা তার হাতের তলায় দুটি ধাতব মুদ্রা রেখে নেমে আসে। বাড়িতে ফেরার হাঁটা রাস্তায় তারা গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকে। কেউ কোনো কথা বলে না কারও সাথে। ফিরে এসে ঘুমন্ত অথবা অচেতন মায়ের শিয়রে অবনত বদনে দাঁড়িয়ে থাকে দীর্ঘক্ষণ। তারপর নিজেদের ঘরে ফিরে তলিয়ে যায় গভীর ঘুমে।
ঝলসানো মানব প্রত্যঙ্গের সন্ধানে এদিক-সেদিক এমনকি দিগি¦দিক ঘুরে ঘুরে তাদের দিন কেটে যেতে থাকে। যদিও তান্ত্রিকের চাওয়া হলো জীবিত মানুষের ঝলসানো প্রত্যঙ্গ, তবু তারা একদিন সকালে চিতাখোলা মহাশ্মশানে এসে দাঁড়ায়, সকাল থেকে প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা শ্মশানের ফাঁকা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দূর আকাশে চিল আর শকুনের উড়ে যাওয়া দেখে। উলুধ্বনি দিয়ে বাঁশের খাটিয়ায় চড়ে কোনো লাশ তখনও এসে পৌঁছায় না। শফিক অধৈর্য হয়ে ওঠে। বলে, ‘চলো আমরা চলে যাই, তুমি কি বুঝতে পারছো না প্রতিদিন মরার মতো এত হিন্দু আর নেই আমাদের কেরানীগঞ্জে?’ রফিক বুঝতে পারে। তবুও সে আরও কিছুটা সময়, অন্তত সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চায়। এবং সন্ধ্যায় যখন তারা ফিরে আসার উপক্রম করে, তখন লাশবাহী একটি ফ্রিজার ভ্যান হুইসেল বাজিয়ে শ্মশানের উঁচু-নিচু প্রান্তরে ঢুকে পড়ে বালিতে আটকে যায়। মাত্র চার-পাঁচজন লোক এসেছে লাশটা নিয়ে। তাদের পোশাক দেখে বোঝা যায় না তারা কোন ধর্মের আর উলুধ্বনির তো প্রশ্নই আসে না। যারা এসেছে তারা নিশ্চয়ই মৃতের আত্মীয়-স্বজন এমনকি ছেলে-পুলেও হতে পারে। যদিও রফিক-শফিক কেউই তাদের মুখে স্বজন হারাবার বেদনা দেখতে পায় না। দ্রুতই ফ্রিজার ভ্যানের দরজা খুলে তারা লাশটাকে টেনে নামায়। সচকিত হয়ে যমজেরা তাদের দিকে এগিয়ে আসে, ডানে-বাঁয়ে তারা কোনো স্তূপাকার কাঠ-খড়ি কিংবা এমন কোনো দাহ্য দেখতে পায় না। কাপড়ে জড়ানো লাশটাকে নিয়ে আসা স্বজনেরা শ্মশানের শেষ প্রান্তে নতুন ওঠা পলেস্তারাহীন ইটের ছোট দালানটার দিকে ধরাধরি করে নিয়ে যেতে থাকে। রফিক-শফিকও দূরত্ব বজায় রেখে তাদের পেছন পেছন এগিয়ে যায়। নতুন দালানটার একপাল্লার স্টিলের দরজাটা খুলে গামছা কাঁধে একজন প্রৌঢ় বেরিয়ে আসেন। সমাগতদের অভ্যর্থনাসূচক নমস্কারে তোলা তার হাত দুটির কাঁপুনি চোখে পড়ে রফিক-শফিকের। তারা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে, প্রৌঢ় লোকটা ইটের গায়ে লাগানো সুইচ টিপে দেয়। জ্বলে ওঠে হলুদ আলো। আর সামনে বেকারির চুল্লির মতো একটা চুল্লির দরজা খুলে সেখান থেকে লাশের চেয়ে কিঞ্চিৎ বড় আকারের একটি ট্রে বেরিয়ে আসে। সবাই মিলে ট্রের ওপর তুলে দেয় শবদেহটাকে। প্রৌঢ় আবার সুইচ টিপে দেয়। ট্রেটা ঢুকে যায় চুল্লির পেটে। লাশের সাথে আসা এক মাঝবয়েসির চোখে এবার অশ্রু টলটল করে। একজন তার পিঠে হাত রাখে। এরই মধ্যে প্রৌঢ় চুল্লির পেছনে গিয়ে আবার ফিরে আসে। হাতে করে নিয়ে আসে একটি অ্যালুমিনিয়ামের ছোট পাত্র। চোখ টলটল করতে থাকা লোকটা পাত্রটা হাতে নিয়ে ভালো করে পাত্রের ভেতরে তাকিয়ে বলে, ‘একি! এ যে কেবল ছাই, আমার পিতার নাড়িভুঁড়ির অংশ কোথায়? কী দিয়ে আমরা তাঁর আত্মাকে মুক্ত করব?’ প্রৌঢ় জবাব দেয়, ‘বাবাজি, এ ব্যবস্থায় ছাই ছাড়া অন্য কিছু পাবে না, এটাই নাও, এগুলোই বরং ঢেলে দিও দূষিত বুড়িগঙ্গায়, আমি তোমার পিতার মুক্তির জন্য প্রার্থনা করব।’ বলে দক্ষিণার জন্য তার কম্পিত হাত দুটো প্রসারিত করে। শফিক আরও বিরক্ত হয়ে রফিকের বাহু ধরে টেনে বের করে আনে। গজগজ করে বলতে থাকে, ‘কেন আমরা এখানে সময় নষ্ট করছি? আমাদের প্রয়োজন জীবিত মানুষের প্রত্যঙ্গ, চাইলে আমরা সেটা নিজেরাও ঝলসে নিতে পারি। চলো এখানে আর সময়ক্ষেপণ নয়।’ হতাশ রফিক সহোদরের পায়ের গতির সাথে পা মিলিয়ে রাস্তায় উঠে আসে। সন্ধ্যা নেমে গেছে। আলোও জ্বলে গেছে চারদিকে। হাঁটতে হাঁটতে তারা তাদের বাড়ির রাস্তা ছাড়িয়ে চুনকুটিয়ার মোড়ে এসে থামে। কোথাও বসবে বলে একটি যুৎসই জায়গার জন্য এদিক-ওদিক তাকাতে থাকে।
‘আরে মিয়া, আপনাদের যে কোনো খবরই নাই!’ রফিকের অদেখা বাগদত্তার ছবি সরবরাহকারী দূরাত্মীয় তার ডান হাতের ছাতাটা বাঁ-হাতে নিয়ে ‘কি সৌভাগ্য আমার! আপনাদের দুই ভাইকে পেয়ে গেলাম একই সাথে, সবই তার ইচ্ছে। চলেন! চলেন! রাস্তার ওপাশে চলেন!’ বলে একটি চায়ের দোকান নির্দেশ করে শফিকের হাত ধরে রাস্তা পার হতে থাকে। দোকানের বেঞ্চে এক সারিতে পাশাপাশি বসে নিজেই চায়ের ফরমাশ দিয়ে বলে চলে, ‘ছোট ভাইয়ের জন্য কন্যা চূড়ান্ত হয় নাই বুঝি, চিন্তা করবেন না দ্রুতই হয়ে যাবে। আর আপনাদের ঘরের হবু লক্ষ্মীর তো পরীক্ষা শেষ হইছে। তাড়াতাড়িই সে ফিরবে চট্টগ্রাম থেকে। ফিরলে আর দেরি কইরেন না, জানেনই তো! শুভ কাজে দেরি করতে নেই।’ এই কথা বলে সে তার দুই পাশে বসা দুই ভাইয়ের দিকে তাকায়, তাদের চোখে মুখে কোনো চাঞ্চল্য নেই দেখে একটু যেন দমে যায় লোকটা, ‘ভাই কোনো সমস্যা?’ হ্যাঁ! সমস্যা বলে রফিক তাকে তাদের সমস্যার একটি নাতিদীর্ঘ বিবরণ দেয়। সব শুনে ছাতার বাটে দু’হাত রেখে বিজ্ঞচিত নীরবতা শেষ করে দূরাত্মীয় বলে ওঠে, ‘ভাববেন না! একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে, কাল আবার আইসেন এইখানে, এই সময়ে, দেখি কী রাস্তা বের করতে পারি!’
পরদিন সকালবেলা রফিক-শফিক ঘুমন্ত থাকতেই ছাতাওয়ালা দূরাত্মীয় হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে তাদের ঘরে। টেনে দুই ভাইকেই বিছানা থেকে তোলে। ‘আরে মিয়া আপনারা দেখি নিশ্চিন্তে ঘুমাইতেছেন, ওই দিকে আপনাদের চিন্তায় আমি সারারাত ঘুমাইতে পারি নাই। শফিককে সরিয়ে খাটের ওপর বসে পড়ে সেও। টিভিটার দিকে চেয়ে বলে, ‘আরে আপনাদের ঘরে তো টিভিও আছে দেখতেছি, তয় টিভিটুভি আপনারা খুব একটা দেখেন না মনে হয়, যাই হোক উপায় আমি খুঁজে বাইর করছি, জীবন্ত মানুষের ঝলসানো প্রত্যঙ্গ পেতে আপনাদের আর যেখানে-সেখানে ঘুরতে হবে না, আমি একটা ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি, ঠিকঠাক তার কাছে গিয়ে ঘটনাটা বুঝিয়ে বললেই কিছু টাকার বিনিময়ে সেই ব্যবস্থা করে দিবে।’ এইসব বলে সে মানুষের মাংসখেকো খোরশেদ ডোমের ঠিকানা বাতলে দেয় তাদের। ঘুম থেকে ধড়ফড় করে উঠে যমজদের ধাতস্ত হতে সময় লাগে। চোখ রগড়ে তারা পুনরায় খোরশেদ ডোমের ঠিকানা ভালো করে বাতলে নেয়। দূরাত্মীয় তাড়া দেয়, ‘দেরি করবেন না, এক্ষুণি রওনা হন, আশা করি আজকের সন্ধ্যার আগেই আপনারা পেয়ে যাবেন আপনাদের মায়ের কাক্সিক্ষত দাওয়াইয়ের প্রধান উপাদান, রওনা হন! রওনা হন!’ বলে সে আবার তার ছাতাটাকে হাতবদল করে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যায়। রফিক-শফিক তড়িঘড়ি করে হাত-মুখ ধুয়ে নিয়ে অভুক্ত পেটেই বেরিয়ে পড়ে। তবে সকালে বেরুলেও রাস্তার দীর্ঘ জ্যাম পাড়ি দিয়ে ঢাকার প্রধান লাশকাটা ঘর খুঁজে পেতে তাদের দুপুর হয়ে যায়।
সেখানে পৌঁছে তারা দেখে, লাশকাটা ঘরের বিশাল দরজার দুইপাশে বিষণœ শোককাতর মানুষেরা বসে আছে লম্বা সারি করে। হয়তো তারা অপেক্ষায় আছে কাটাছেঁড়া গলিত অর্ধগলিত প্রিয়জনের মরদেহ গ্রহণের অপেক্ষায়। লাশকাটা ঘরের সামনে, আশপাশের লোকজনের কাছে তারা খুঁজতে থাকে মানুষখেকো খোরশেদ ডোমকে। কেউ বলে চিনি না, কেউ বলে ‘আছে হয়তো আশপাশে, খুঁজলে পাবেন, খুঁজে দেখেন।’ বেলা বাড়তে বাড়তে এবার গড়িয়ে যাবার উপক্রম, খোরশেদ ডোমকে তবু তারা খুঁজে পায় না। সেই সময়ে ত্রাতা হয়ে আসে এক চপল কিশোর, নিজ থেকেই জানতে চায়, ‘কী? খোরশেদেরে খুঁজেন ক্যান? তামাক লাগবো? লাগলে আমারে কন আইনা দিতাছি।’ রফিক-শফিক তাদের মোলায়েম কণ্ঠকে আরও কোমল করে জানায়, ‘না! তামাক নয় তাদের খোরশেদকেই দরকার।’ ‘আইচ্ছা বুচ্ছি বুচ্ছি, আইয়েন, আমার লগে আইয়েন!’ বলে কিশোর তাদের দুই ভাইকে নিয়ে যায় পানির মোটরওয়ালা গুদামঘরে। অন্ধকার ঘরের দরজায় কিছুক্ষণ করাঘাত করতেই পিঠের সাথে লেগে থাকা পেট নিয়ে শীর্ণকায় খোরশেদ দরজা খুলে দেয়। ‘মামা, এই দুইজন সেই সক্কাল থেইকা তোমারে বিসরাইতাছে।’ বিরক্ত খোরশেদ ভ্রু কুঞ্চিত করে বলে, ‘না, মাল নাই, বিসরাইয়া লাভ নাই, আপনেরা যান গা!’ বলে দরজা লাগানোর উপক্রম করতেই রফিক-শফিক তাকে ঠেলে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে সেই গুদামঘরে। ঘরের বোটকা গন্ধের দিকে খেয়াল না দিয়ে তারা খোরশেদের হাত চেপে ধরে। বলে, ‘শুনুন, আপনি আমাদের একজন অতি প্রিয় ভাই। আমাদের একটা বিহিত করে দিন, আমরা যতটা সম্ভব আপনাকে খুশি করে দেব।’ খোরশেদ কিছুটা নরম হয়ে নিজের কাঁচাপাকা দাড়িগুলো ভালোরকম চুলকে নিয়ে তাদের বসতে বলে, যমজেরা বসলে এবার সে একে একে তামাক সাজবার সকল উপাদান বের করে তামাক সাজতে থাকে। হাতের তলায় তামাকের দলা নিয়ে একটা কৌটা থেকে তর্জনীর মাথায় লাল পুডিংয়ের মতো বস্তু লাগিয়ে সেটা তামাকে মেখে হাতের তলায় পিষতে থাকে, মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে, ‘কন তো এইডা কী দিলাম?’ যমজেরা উত্তর দেয় ‘জানি না ভাই’ শব্দ করে হেসে খোরশেদ জানায়, ‘এইডা হইলো পেরেম কইরা বিষ খাইয়া মরা এক ছেরির হাডের ভিতরের রক্ত। চিপড়াইয়া বাইর করছি। এইডাতে নেশাডা জমে ভালা।’ বলে সবগুলো ধাপ একে একে শেষ করে জ্বলন্ত কলকিটায় বিকট টান দেয় খোরশেদ ডোম। টানের প্রচ-তায় কলকির মুখের আগুন লাফিয়ে জ্বলে উঠে ঘর আলো করে দেয়। খোরশেদ ডোমের গলার সবগুলো শিরা-উপশিরা জেগে ওঠে একসাথে। ইটখোলার চুল্লির মতো ধোঁয়া ছাড়ে খোরশেদ, একই প্রক্রিয়ায় বিরতিহীন আরও কয়েকটা টান দেয় সে। তারপর কালসিটে পড়া হাতের তালুতে কলকে উপুড় করে ভালো করে পরখ করে নেয় তামাকের কোনো কনা পুড়তে বাকি রয়ে গেল কিনা।
শান্ত হয়ে খোরশেদ এবার বলে, ‘চিন্তা কইরেন না, আইজকাই ব্যবস্থা কইরা দিমু। আগে হইলে একটু দেরি লাগতে পারতো, তয় অক্ষণ আর দেরি হইবো না। পোড়া লাশ আইতাছে সোতের লাহান। পেত্তেকদিন একশ দুইশ একটার থেইকা হাত কিংবা পাও একটা কাইটা বাইর কইরা দিমুনি, রফিক বলে ভাই আমাদের তো জীবন্ত মানুষের প্রত্যঙ্গ চাই।’ ‘অসুবিধা নাই, তয় টেকা কিন্তু যেইডা কইছেন ওইডাই দিতে হইবো কম হইলে চলবো না। শ্যাষ রাইতে কুমিল্লায় বাস পুড়ছে বিরাট একখান। অল্প কয়ডা বাদ দিলে প্রায় সবগুলানই মরছে শুনছি। আমার লগে যাইবেন, দরজার বাইরে খাড়াইয়া থাকবেন, আমি ভিতর থেইকা ডাক দিলে আপনেরাও ভিতরে যাইবেন। আমি খোরশেদ হারাম খাই না। আপনাগোরে দেহাইয়া জ্যান্ত শইল থেইকাই কাইটা দিমু। লইয়া যাইবেন।’ ‘আচ্ছা। তাই হবে! তাই হবে!’ বলে যমজেরা সায় দেয়। খোরশেদ আবার বলে, ‘দরজার এক্কেরে সামনে থাইকেন, আমি ভিতরের থেইকা ডাক দিলে আপনাগোর য্যান ঢুকতে দেরি না অয়।’ আর শুনেন, ‘লগে একটা ব্যাগ রাইখেন। লুকাইয়া নিতে অইবো। মরা হউক আর জ্যাতা। মাইনসের হাত-পাও। তা কি দেহাইতে দেহাইতে লইয়া যাইবেন?’ খোরশেদের গলায় এবার কতকটা যেন হুকুম ছড়িয়ে পড়ে। যমজেরা আবারও ‘তাই হবে, তাই হবে’ বলে সায় দেয়।Ñ ‘এইবার বাইরাইয়া গিয়া লাশকাটা ঘরের সামনে খাড়ান।’
রফিক-শফিক বেরিয়ে এসে লাশকাটা ঘরের সামনের দোকানগুলোতে একটি ব্যাগ খুঁজতে থাকে। সকল দোকানিই তাদের পাউরুটি ঝুলিয়ে রাখা স্বচ্ছ পলিথিন দেখিয়ে বলে ‘চাইলে এর একটা নিতে পারেন।’ ওতে তাদের চলবে না। তাদের চাই এমন ব্যাগ যা দেখে বোঝার উপায় থাকবে না ব্যাগের ভেতর কী আছে। খুঁজতে খুঁজতে তারা একটি কাগজের হাতল ছিঁড়ে যাওয়া চাররঙা শপিং ব্যাগ পেয়ে যায় রাস্তার ওপর। ধুলো ঝেড়ে সেটাকেই হাতে নিয়ে তারা এসে দাঁড়ায় অপেক্ষমাণদের সামনে প্রায় দরজা লাগোয়া জায়গাটাতে। এমন জায়গায় দাঁড়াতেই খেকিয়ে ওঠে একজন, ‘কি! লাশ নিতে আইছেন? সইরা খাড়ান, আগে আমগো লাশ পরে আপনাগোর। লাশ বাইর করন এত সোজা না। গত পরশু সন্ধ্যায় যাত্রাবাড়িতে পুইড়া মরছে। টেকা দিয়া আইজ দুইদিন এইহানে বইসা আছি লাশের খোঁজ নাই। সইরা খাড়ান মিয়া। আগে আমগোর লাশ পরে, অন্য কতা।’ ‘না মানে লাশ নয় আমরা আসলে, আমতা আমতা করতে থাকা রফিকের ওপর লোকটা আবারও খেকিয়ে উঠতে চায়। শফিক মধ্যস্থতা করে জানিয়ে দেয় ভেতর থেকে কেউ একজন তাদের ডেকে নেবে। এক মুহূর্তের কাজ। তারা কোনো লাশ গ্রহণ করতে আসে নাই। এবার লোকটা বলে ‘তাইলে অন্য কতা, বহেন বহেন, আমগো লগে বহেন।’ সেইখানে তাদের সাথে বসে রফিক-শফিকের সময় কাটতে থাকে। আধাঘণ্টা একঘণ্টা করে দুই ঘণ্টা কেটে যায়। দরজায় একটু শব্দ হতেই নড়েচড়ে বসে রফিক-শফিক। লোকটা তাদের বলে ‘লাভ নাই, এমন কথা সবাইরেই দেয় ওরা, তয় রাহে না।’ সূর্যের ক্ষীণ আলোয় তাদের সামনে এতক্ষণ ধরে থাকা নারিকেল গাছটির পাতার ছায়ার নড়াচড়া হালকা হয়ে যেতে থাকে। তারা বুঝতে পারে দিনের আলো ফুরিয়ে এসেছে। তাদের পীড়িত মায়ের কথা মনে পড়ে। তারা আরও অধৈর্য হয়ে মাঘের শেষ দিককার এই বিকেলেও ঘেমে উঠতে থাকে।
হঠাৎ কচ করে আওয়াজ হয়ে তাদের পেছনের দরজাটা ঈষৎ ফাঁকা হয়ে যায়। খোরশেদ তার পোড়া চেহারাটা বের করে চোখের ইশারায় তাদের ডেকে নেয়। যমজেরা ভেতরে ঢুকে তীব্র ঠা-া অনুভব করে। বিরাট ঘরের দুইপাশে বড় বড় আলমারি। তাদের চোখে-মুখে ভয় খেলে যায়। খোরশেদ কথা বলে, চারকোনা বদ্ধ ঘরে তার কথা প্রতিধ্বনিত হয়। ‘আর কইয়েন না, সামনে তো যান নাই, দ্যাখলে বুঝতেন, কী পরিমাণ বডি আইছে! সব পোড়া, মরা গুলানরে টাইন্যা টাইন্যা এতক্ষণ ধইরা আলমারিতে পুরাইছি। আর জ্যান্ত টাইন্যা লাশ ঘরে আনা কী এত সোজা। হ্যাগোর সব আত্মীয়-স্বজন আইসা পড়ছে। পুলিশ, সাংবাদিক আরও কত কী!’ বলতে বলতে সে খাটিয়ার ওপর সাদা কাপড়ে ঢেকে রাখা একটা ঝলসানো শরীরের কাছে নিয়ে যায় তাদের।Ñ ‘তয় আপনাগোর কপাল ভালা। এই বেডির খোঁজ লইতে এহনও কেউ আহে নাই। ডাক্তারেও বুঝছে কিছুক্ষণের মদ্যেই মরবো। তাই হ্যার দিকে আর চোউখ দেয় নাই। সুযোগ বুইঝা আমি টাইন্যা লইয়া আয়া পড়ছি।’
হিমঘরে রফিক তার সহোদর শফিকের হিম হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকায়। চাকাওয়ালা লোহার খাটে শোয়ানো মেয়েটার চুলগুলো ঝুলে পড়ে মেঝে ছুয়ে আছে। আগুন তার শরীর পোড়ালেও চুলগুলো কী এক রহস্যবলে অক্ষত রয়ে গেছে। তাদের দুই ভাইয়ের জন্য তাদের মা এমন লম্বা চুলের মেয়েই খুঁজে বেড়াচ্ছিল। চুনকুটিয়ার কাজি বাড়ির মেয়েটার চুলও নাকি এমনই লম্বা ছিল বলে জেনেছিল রফিক। এসব ভাবনার সময় নয় এখন। খোরশেদ তার চকচকে ধারাল ছুরিটা হাতে দাঁড়িয়েছে খাটের ওপর পাশে, ‘কন, হাত দিমু, না পাও?’ বলে মেয়েটার ঢেকে রাখা মুখের কাপড় টেনে সরিয়ে ফেলে। পুড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়া মুখের দিকে এক নজর তাকিয়ে দুই ভাই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ‘কী? আপনেরা ভাবতাছেন মরা? মরা না, জ্যান্তই আছে,’ বলে খোরশেদ টান দিয়ে ঢেকে রাখা কাপড়টা মেয়েটার বুকের নিচ পর্যন্ত নামিয়ে আনে। ‘কী? দেখতাছেন না, বুক যে ওঠা-নামা করতাছে?’ দুই ভাই তবুও বাকরুদ্ধ। পুড়ে ঝলসে গেলেও কুমারীর বুকের ঔদার্য্য ম্লান হয় নাই এতটুকু। ফুটে থাকা পোড়া বাম স্তনটির নিচে ছুরি দিয়ে খোঁচা মেরে খোরশেদ বলে, ‘দেহেন মিয়া, কেমনে রক্ত বাইরায়, মরার শৈল দিয়া রক্ত এমনে বাইরায় না, বিশ^াস না করলে রক্ত হাতে মাইখা দেহেন এক্কেবারে গরম।’ খোরশেদ সে রক্ত নিজের হাতে মেখে স্বল্পালোকিত ঘরে হাত উপরে তুলে দেখায়, ‘ব্যাগ লইছেন তো’। নিঃশব্দে শফিক তার হাতে থাকা ব্যাগ উঁচিয়ে ধরে, ‘এই ব্যাগে হইবো না। হাত পাও পুড়ছে বেশি, পোড়া জায়গা দিয়া এহনও রস পড়তাছে।’ ‘আইচ্ছা’ বলে খোরশেদ কাপড়ের নিচে হাত দিয়ে মেয়েটার পরনে থাকা পোড়া পা’জামার কিয়দংশ ছিঁড়ে নেয়। ‘আপনাগোরে ডাইন হাতটাই দেই, আর আমি লই বাঁয়ের ডা। মাইনষের মাংসের স্বাদই আলাদা। আর এই বয়েসি মায়া মানুষ হইলে তো আর কতা নাই। ভাইবেন না আমি কাঁচা খাই। ভালো কইরা রাইন্দা মাসে এক-দুইবার খাই। তয় কোত্থেইকা য্যান মাইনসে আইজ কাইল জাইনা যাইতাছে। খোরশেদ ডোমে নাকি মানুষ খায়, হি! হি! হুনেন নাই আপনেরা?’ এইসব বলার অবসরে খোরশেদ ডোম তার অর্জিত দক্ষতায় নির্বিকার মুখে পা’জামার অর্ধপোড়া সাদা কাপড়ে চেপে কনুই থেকে মেয়েটার ডান হাতটা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ‘দ্যান ব্যাগটা দ্যান’ বলে হাত বাড়িয়ে ব্যাগটা নিয়ে কর্তিত হাতটা সেটার মধ্যে পুরে দিতে দিতে বলে, ‘সইরা খাড়ান, প্লেট বাইয়া রক্ত নামতাছে, গায়ে মাখবো, এই মাইয়ার শইলে এত রক্ত কেন?’ বলে নিজেই ওপাস থেকে সরে খাটের এপাশে তাদের সামনে এসে মুখে দারুণ হাসি ফুটিয়ে বলে, ‘দ্যান ট্যাকাটা দ্যান।’ রফিক-শফিক তাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিমতো সবগুলো টাকা তার হাতে দিয়ে দ্রুতই বেরিয়ে পড়ে।
এবার তাদের খুঁজে বের করতে হবে সেই তান্ত্রিককে। বাইরে বেরিয়ে দেখে সন্ধ্যা নেমে গেছে। লাশঘরের সামনের জায়গাটা হেঁটে পাড়ি দিয়ে তারা নাজিমুদ্দিন রোডে এসে দাঁড়ায়। রিকশার পেছনে রিকশা, গাড়ির বাম্পারে গাড়ি লেগে স্তব্ধ হয়ে আছে সমগ্র রাস্তা, যতদূর চোখ যায়। রিকশার ফাঁক গলে রাস্তাটা পাড়ি দিয়ে তারা হাঁটতে থাকে দুরন্ত গতিতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা পৌঁছে যায় সেদিনের সেই জায়গায়। শাঁখারি বাজার রাস্তার মুখে জগন্নাথ কলেজের দেয়াল ঘেঁষে তান্ত্রিকের আজকের মজমাটা জমে উঠেছে আরও বৃহৎ পরিসরে। তাকে ঘিরে টাকার বৃষ্টি নামিয়েছে জড়ো হওয়া অতৃপ্তের দল। প্রত্যেকের চাই একটা করে শিশি, সকলেরই চাই। নুয়ে পড়া শিশ্ন তাদের জাগাতেই হবে। আজ রাতের মধ্যেই। ভিড় ঠেলে ব্যাগ হাতে রফিক-শফিক সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তান্ত্রিকের চোখে চোখ পড়ে তাদের। তান্ত্রিকের কথার গতি কমে যায়। আজ আর শিশি বিক্রি হবে না বলে সজোরে তালি বাজিয়ে সেদিনের মতো সকলকে বিদায় নিতে বলে সে। তার হুকুমে জায়গাটা ফাঁকা হয়ে যায় দ্রুতই। সবাই চলে গেলে তান্ত্রিক মুখের কাপড় সরিয়ে তাদের হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে নেয় নিজের হাতে। ঘুরে রাস্তার দিকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে ব্যাগের ভেতর হাত দিয়ে সে বুঝতে পারে, যমজেরা সঠিক জিনিসই নিয়ে এসেছে। ‘চলো, সামনেই আমার আস্তানা, বেশিক্ষণ লাগবে না, আমি সব কিছু প্রস্তুত করে রেখেছি। এটার জন্যই ছিল আমাদের অপেক্ষা। চলো! আর অপেক্ষা নেই’ বলে তার ঝোলাটাকে কাঁধে নিয়ে সে হাঁটতে থাকে। পীড়াগ্রস্ত জননীর যমজ পুত্রেরাও হাঁটতে থাকে তার পেছনে। নদীর ধারে এক ঝুপড়িতে ঢুকে পড়ে তান্ত্রিক। তারাও ঢুকে পড়ে, ঝুপড়ির মধ্যে এক বৃহদাকার কাঠের বাক্সের ওপর ঝোলা নামিয়ে তাদের দিকে পেছন ফিরে খুটখাট শব্দ করে কী যেন করতে থাকে। রফিক-শফিক বুঝতে পারে তাদের দাওয়াই তৈরি হচ্ছে, কাজের মাঝে পেছনে না ফিরেই তান্ত্রিক কাগজে মুড়ে ছোট্ট একটা কী যেন রফিকের হাতে দিয়ে বলে, ‘এটা রাখ!’ রফিক তার প্যান্টের ঝুল পকেটে গুঁজে রাখে সেটা। স্বল্পক্ষণেই দাওয়াই তৈরি শেষ হয়। মুখের দিকে লম্বা, একটি মাঝারি আকৃতির শিশি তান্ত্রিক তাদের হাতে দিয়ে বলে, ‘আর কোনো অসুবিধা নাই, এই রক্তবর্ণ তেলের দুটি ফোঁটা তোমাদের মায়ের কানের ফুটো দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিতে পারলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমাদের মা আগের মতোই হাঁটবে, চলবে, হাসবে, রান্না করবে, ঠিক আগের মতোই, যাও দেরি করো না!’
রফিক-শফিক তান্ত্রিকের পায়ের ধুলো হাতে নিয়ে মাথায় মেখে, হাওয়ার গতিতে বুড়িগঙ্গা পাড়ি দিয়ে মায়ের শিয়রে এসে দাঁড়ায়। মনে মনে বলতে থাকে, ‘আর কোনো অসুবিধা নাই।’ ‘মা’ ‘মা’ বলে দুটি ছোট্ট ডাক দিতেই তাদের মা সাড়া দেয়, শিয়র থেকে তারা খাটের পাশে এসে দাঁড়ায়। ধরাধরি করে তারা তাদের মাকে তুলে বসায়। রফিক খাটে উঠে মায়ের পেছনে বসে নিজের স্ফীত বক্ষকে দেয়াল করে সেখানে মায়ের পিঠ ঠেকিয়ে কাঁধ ধরে বসে। শফিক এবার দাওয়াইয়ের শিশির ছিপি খোলে। ঘরময় এক অপরিচিত গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তাদের মা চোখ খোলে। এদিক-ওদিক তাকায়, কথা বলে, ‘আমার প্রিয় পুত্রেরা, তোমাদেরকে আমি এই ঘরেই প্রসব করেছিলাম, আজ তোমাদের আঁতুড়কালীন গন্ধ এই ঘরে আবার ফিরে এসেছে।’ রফিক ছিপি খোলা শিশির মুখ উপুড় করে মায়ের মাথাটা কাত করে ধরে এক ফোঁটা তেল কানের ছিদ্র বরাবর ঢেলে দেয়, প্রথমে ডান কান তারপর বাম কান, মুহূর্তে তাদের মা যেন খানিকটা সজীব হয়ে ওঠে।
‘আমার পুত্রেরা, তোমরা কি তোমাদের মায়ের বুক বেয়ে নামা শাল দুধের ঘ্রাণ কিংবা স্বাদ স্মরণ করতে পারবে?’ রফিক-শফিক মাথা নেড়ে জানিয়ে দেয়, না! তাদের মা বলে, ‘আমি পারছি, শাল দুধের গন্ধ আমার সারা শরীরে, আমার আবার জন্মাবার সময় হয়েছে। আমি আমার মায়ের শরীরের গন্ধ পাচ্ছি’ বলতে বলতেই মায়ের কান, নাক-মুখ দিয়ে রক্তের ধারা বেয়ে নামে। এ দৃশ্য দেখে রফিক-শফিক খেই হারিয়ে ফেলে। কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। শফিক মনে করিয়ে দেয়, তান্ত্রিক আরও কী একটা ছোট জিনিস কাগজে মুড়ে রফিকের হাতে দিয়েছিল, রফিক পকেট হাতড়ে সেটা বের করে। মুড়ে রাখা কাগজ খুললে তাঁর হাতের তালুতে একটা আংটি চকচক করে ওঠে, তার মা বলে, ‘কী ওটা? আমার হাতে দাও!’ হাতে নিয়ে মা সেটা তার ঘোলা চোখ দিয়ে দেখতে থাকে, বলে ‘চিনতে পারছো? এই তো সেই আংটি যা বিবাহের সময়ে আমার মা আমার অনামিকায় পরিয়ে দিয়েছিল।’ তাদের মা আর কোনো কথা বলে না। হাতের মুষ্টি শক্ত করে এক হাতে শফিকের তর্জনি অন্য হাতে আংটিটা নিয়ে হেলান দিয়ে থাকা তার অপর পুত্রের বুকের ডানপাশে মাথা বাঁকিয়ে নিঃসাড় হয়ে পড়ে।

শ্রেণী:

রক্তফুলের বরণডালা

Posted on by 0 comment
49

49সেলিনা হোসেন: কবি রাশেদ মুস্তাফা এখন দিল্লিতে।
এর আগে কোনো উপলক্ষে ওর দিল্লি আসা হয়নি। প্রথমবার আসার আনন্দ নিয়ে প্রাণভরে দিল্লির বাতাস বুকে ঢোকাচ্ছে। স্বাধীনতার আঠাশ বছর পেরিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ওর বয়স ছিল দুই বছর। বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। বছর তিনেক আগে মারা গেছেন। বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ার সময় কবিতা লেখা শুরু করেছিল। এখন ভাবে ওর সামনে কবিতা লেখার সুদিন। দুটো বই প্রকাশিত হয়েছে, পাঠকের কাছে ওর কবিতা পৌঁছেছে। সমালোচকদের কাছ থেকে প্রশংসা পেয়েছে। বন্ধুরা বলে, লেখা ছাড়িস না। দাঁড়াতে পারবি। বেশি সময় লাগবে না। এসব শুনলে রাশেদের বুকের ভেতর গুঞ্জন ছড়ায়।
প্রিয়তি বলে, তোমার কবিতায় আমি নিজেকে খুঁজে পাই। নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করি। এই জন্যই তোমার সঙ্গে আমার প্রেম। আগে কবিতা পড়েছি, তারপরে ভালোলাগা…
সেদিন প্রিয়তির কথায় উৎফুল্ল হয়ে রাশেদ বলেছিল, তোমার ভালোবাসায় আমার কবিতা লেখা নন্দিত হয়েছে প্রিয়তি।
কবিতা নিয়েই ভালোবাসার সম্পর্ক বছর গড়িয়েছে। দুজনের দিন ভালোই কাটছে।
রাশেদ দুদিন আগে দিল্লির সার্ক রাইটার্স ফাউন্ডেশন থেকে সাহিত্য উৎসবে অংশগ্রহণ করার আমন্ত্রণ পেয়েছে। ই-মেইলটা পড়ে প্রিয়তি নানাভাবে নিজের খুশির কথা জানিয়েছে। একগুচ্ছ গোলাপও রাশেদের হাতে তুলে দিয়েছে। বলেছে, লাল গোলাপের রং আর সৌরভ তোমার জীবনজুড়ে থাকুক।
- শুধু আমার? রং আর সৌরভ তুমি নেবে না?
- নেব তো। বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত কি করে বলি যে নিলাম? ধৈর্য ধরো।
- ধৈর্য ধরা আমার শেষ। আমি তোমার ভালোবাসার দেয়ালে ছবি এঁকে শেষ করেছি। দ্বিতীয় চিন্তা নেই।
- ঠিক আছে, কবিতাই হোক আমাদের ভালোবাসার কুঠুরি। চলো আমরা তোমার দিল্লি যাওয়ার আমন্ত্রণ উদযাপন করি।
দুজনে রেস্তোরাঁয় ঢোকে।
রাশেদ জানে এই উৎসবে দেশের অনেকেই যোগ দিয়েছে। তাদের কাছ থেকে নানা গল্প শুনতে পায়। ও জানে এই ফাউন্ডেশন পাঞ্জাবি ভাষার লেখক অজিত কৌরের উদ্যোগ। প্রতিবছর তিনি একের বেশি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এখন তার প্রতিষ্ঠান সার্ক কালচারাল সেন্টারের এপেক্স বডি। সাউথ এশিয়ার লেখকদের জন্য তিনি একটি বড় জায়গা তৈরি করেছেন। এবারের সম্মেলন হচ্ছে মার্চ মাসে। ওপেনিং সেশন হবে ছাব্বিশে মার্চ। রাশেদ ওর লেখা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কবিতার অনুবাদ করিয়েছে। প্রেমের কবিতা আছে। অন্য কবিতাও লিখছে যেখানে দেশ আর মানুষে কথা আছে। এভাবে ও নিজেকে গুছিয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে ওর মনে হচ্ছে ও একজন পূর্ণ কবি। জীবনের জলছবি আঁকার সাধনায় নিমগ্ন।
ও ঢাকা থেকে কলকাতা পর্যন্ত বাসে এসেছে। কলকাতা থেকে দিল্লিতে এসেছে ট্রেনে। যাত্রার আনন্দও ওকে সুখের জোয়ারে ভাসিয়েছে। ট্রেন যাত্রার বাড়তি আনন্দ ছিল হিমাদ্রি গুহর সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়া। হিমাদ্রি কবি। দিল্লির সার্ক রাইটার্স সম্মেলনে সেও যাচ্ছে। পাশাপাশি সিটে বসার কারণে দুজনের কবি পরিচয়ের আকস্মিকতা দুজনকে উচ্ছ্বসিত করে। একই সীমান্তের ভিন্ন দেশ, একই ভাষায় কবিতা লেখা। দিল্লিতে গিয়ে অন্য ভাষার কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে পরিচয় হবে। রাশেদের মনে হয় ওর পরিচয়ের সীমানা বাড়বে। এ এক দারুণ যাত্রা। এ সময় প্রিয়তি যদি কাছে থাকত, তা হলে সময়টা অন্যরকম হতো। প্রিয়তি কবিতা লেখে না কিন্তু বোঝার ক্ষমতা অসাধারণ।
রেলস্টেশন থেকে ট্যাক্সি নিয়ে দুজনে উঠে পড়ে। ওরা অরবিন্দ আশ্রমে যাবে। আয়োজকরা সেখানে তাদের থাকার ব্যবস্থা করেছে। দিল্লি শহরের চারদিকে তাকিয়ে রাশেদের মনে খুশির উচ্ছ্বাস। হিমাদ্রিকে জিজ্ঞেস করে, তুমি কতবার দিল্লিতে এসেছ?
- অনেক অনেকবার। গুনে রাখিনি। এ তো আমার দেশ। আমার শহর।
- এই শহরের চারদিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে এটা আমার ইতিহাসের সময়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।
- হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। তোমাদের মুক্তিযুদ্ধ আমার স্মৃতিতে আছে। আমার বাবা শরণার্থীদের জন্য পুরো নয় মাস কাজ করেছেন।
- সত্যি! তোমার সঙ্গে পরিচিত হয়ে আমার খুব গর্ব হচ্ছে হিমাদ্রি। তুমি আর আমি সারাজীবন বন্ধু থাকব।
- হ্যাঁ তাই হবে। আমিও তোমাকে মনে রাখব। আমাদের রবিশঙ্কর তোমাদের শরণার্থীদের জন্য নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ারে কনসার্টের আয়োজন করেছিলেন।
রাশেদ ওর হাত চেপে ধরে বলে, আমি এখন এসব কিছু জানি। সবকিছুই আমার যুদ্ধের ইতিহাস। আজ দিল্লির রাস্তায় যেতে যেতে মনে হচ্ছে এই শহর ইন্দিরা গান্ধীর শহর।
হিমাদ্রি হা-হা করে হাসে। রেড সিগনালে দাঁড়িয়ে ছিল বলে ট্যাক্সি ড্রাইভার ঘাড় ঘুরিয়ে ওদের দিকে তাকায়। কথা বলে না। মৃদু হাসে। মনে হয় ওদের হাসি-আনন্দ তাকেও ছুঁয়েছে। লোকটি বাংলা ভাষার লোক না। হিমাদ্রি তার সঙ্গে হিন্দিতে কথা বলেছে। রাশেদ বুঝতে পারে যে মানুষ তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে মানুষের আবেগের সঙ্গী হয়, এই মুহূর্তে ট্যাক্সি ড্রাইভার তেমন সঙ্গী। ও আবার বলে, আমাদের স্বাধীনতার প্রাণপ্রিয় মানুষ শেখ মুজিবকে আমি দেখিনি। কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে দিল্লি তারও শহর। পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তিনি লন্ডন হয়ে দিল্লিতে এসেছিলেন। ভাষণ দিয়েছিলেন। একদিনের জন্য হলেও দিল্লি বঙ্গবন্ধুর শহর হয়েছিল।
হিমাদ্রি আবার হা-হা করে হাসে।
- একাত্তর সালে তোমাদের মুক্তিযুদ্ধ আমাদেরও যুদ্ধ ছিল। আমি ছোট ছিলাম, কিন্তু স্মৃতিতে অনেক কিছু ভাসে। বাবা-মা শরণার্থী মানুষদের বাড়িতে রাখতেন। সব ধরনের সহযোগিতা করতেন। দুজনকে কখনো টায়ার্ড হতে দেখিনি।
- কলকাতা হয়ে তো আমি দেশে ফিরব। তখন তোমার বাবা-মাকে সালাম করব। হাত দিয়ে সালাম না, তাদের পায়ে আমার মাথা ঠেকাব।
- বাবা-মাকে তুমি তোমার দেশেই দেখতে পাবে।
- তাই? তাঁরা বেড়াতে আসবেন? ভালোই হবে।
- না, বেড়াতে যাবেন না। আমার বাবাকে মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা দেয়া হবে। তোমাদের সরকার মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতাকারীদের যে সম্মাননা দিচ্ছে সে সম্মাননা গ্রহণ করার জন্য বাবাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
- হুররে, দারুণ খবর। তুমিও আসবে বন্ধু। তোমার জন্য আমি একটা কবিতা পাঠের আসর বসাব।
হিমাদ্রি আবার হাসে। হাসতে হাসতে বলে, ছোটবেলায় তোমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের দু-তিনটে গান আমার মুখস্ত ছিল।
- তা হলে দুজনে মিলে একটা গানের একটুখানি গাইÑ
- কোনটা? পুরোটা তো এতদিনে আর মুখস্ত নেই Ñ
- এ গানটা গাই ‘সাড়ে সাত কোটি মানুষের আর একটি নাম/মুজিবর মুজিবর মুজিবর/সাড়ে সাত কোটি প্রশ্নের
জবাব পেয়ে গেলাম। জয় বাংলা, জয় মুজিবর, জয় বাংলা জয় মুজিবর’ Ñ।
- দারুণ হবে। হিমাদ্রি নিজের মুঠিতে রাশেদের হাত নিয়ে গুনগুন শুরু করে।
রাশেদ মৃদুস্বরে বলে, আমরা তো সুর ঠিক রেখে গাইতে পারব না।
- আমরা কি শিল্পী নাকি যে সুর ঠিক রেখে গাইতে পারব? আমরা গান গেয়ে ইতিহাসের একটি বিশেষ সময়কে স্মরণ করছি।
- ঠিক। ঠিক বন্ধু। চলো গাই।
দুজনের কণ্ঠে ছড়াতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের গান। দুটো লাইনই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে গাইতে থাকে। রাশেদের মনে হয় ওদের কণ্ঠস্বর থেকে দিল্লির বাতাসে মিশে যাচ্ছে মুজিবুর নাম। এ এক বিরল অভিজ্ঞতা। যে যুদ্ধের সময়ের কথা ওর জানা নেই, সে সময় আশ্চর্য জীবন্ত এখন ওর সামনে। ও চারদিকে তাকায়। বুকের ভেতরের উচ্ছ্বাস টুংটাং শব্দে ধ্বনিত হয়। ওর বুকের ভেতর মগ্নতার আবরণে আচ্ছাদিত হয়। একটি একটি কবিতার চরণ জমতে থাকে করোটিতে। কিন্তু ব্যাগে রাখা ল্যাপটপে সেটা পঙ্ক্তির আকার পায় না। ভাবে, এমন শব্দ বুকেই থাকুক হৃদয়ের অংশ হয়ে।
একসময় দুজনের কণ্ঠের গান থেমে যায়। দুজনে দুজনের দিকে তাকায়। হিমাদ্রি মৃদুস্বরে বলে, তোমাদের যুদ্ধের গল্পটা ছিল আমার শৈশবের। ভাবিনি ছোটবেলার গল্পের সঙ্গে তোমার আমার বন্ধুত্ব হবে। আসলে আমি যে ঘটনাকে গল্প বলছি সেটি আর এক দেশের স্বাধীনতার যুদ্ধের ইতিহাস। সে দেশের সঙ্গে আমাদের সীমান্তের সংযোগ আছে।
হিমাদ্রি একটু থামে। রাশেদ কিছু বলে না। ওর কথা শোনার জন্য কান পেতে রাখে। হিমাদ্রি বলে, আমি কলকাতার মানুষ। গড়িয়াহাটায় আমাদের বাড়ি। একটি অনুষ্ঠানে পরিচিত হই শাওন্তীর সঙ্গে। ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে পাস করে রবীন্দ্রভারতী বিশ^বিদ্যালয়ে পিএইচডি করছে। মাঝে মধ্যে আমাদের বেশ আড্ডা জমে। নানা বিষয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিষয় উঠে আসে। অনেকের সঙ্গে আড্ডায় কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করলে শাওন্তী খুব মনোযোগ দিয়ে শোনে। আক্ষেপ করে বলত, কেন যে আমার মুক্তিযুদ্ধের পরে জন্ম হলো। সেই সময়ের কথা শুনলে আমার গৌরব হয়। আবার দুঃখও হয় যখন ভাবি আমার কেন যুদ্ধ করার বয়স ছিল না।
কথা শেষ করে হিমাদ্রি হাসতে হাসতে বলে, স্বাধীনতার স্বপ্ন মানুষের বুকের ভেতর এমনই থাকে।
রাশেদ গুনগুনিয়ে বলে, ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’Ñ
হিমাদ্রি রাশেদের দিকে সরাসারি তাকিয়ে বলে, তোমার সঙ্গে এই গান আমারও গাইতে ইচ্ছে করছে। আমাদের পরিবার তোমাদের মুক্তিযুদ্ধের পরিবার হয়েছিল। প্রতিদিন কত মানুষ যে বাসায় আসত তার ঠিক ছিল না। বাবা-মা তাদের দেখাশোনা করেছেন। আমার বয়সী একটি ছেলের কথা আমার এখনও মনে আছে। সীমান্ত পার হওয়ার সময় পাকিস্তান আর্মির গুলিতে ওর বাবা মারা গিয়েছিল। আমাদের বাড়িতে যে কয়দিন ছিল আমি ওর কান্না ফুরোতে দেখিনি। ওর সঙ্গে খেলার জন্য হাত ধরে টানলে ও আরও জোরে জোরে কাঁদত। তিন-চার দিন পরে বাবা ওদেরকে শরণার্থী শিবিরে দিয়ে আসে। আমি বড় হওয়ার পরে কয়েকবার ভেবেছি যে ওকে খুঁজতে বাংলাদেশে যাব। বাবা বলেন, কোথায় খুঁজবি? ভেবে দেখ ওদের এক কোটি শরণার্থীর মধ্যে ও একজন। খুঁজে পাওয়া কি সহজ কথা! তাই তো, আমি বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকতাম। ভাবতাম, যুদ্ধ সময়ের আবেগ কত বিচিত্র হতে পারে আমি তার প্রমাণ।
- ঠিক বলেছো। কোটি কোটি মানুষের স্বপ্নের স্বাধীনতা সহজ কথা নয়।
- এই সাহিত্য সম্মেলনে আমি কয়েকবার এসেছি। এবার তোমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে যেতে পারছি। এটা আমার বড়ই ভাগ্যের ব্যাপার। জানো, গত দু-চার বছর ধরে আমি ভাবছি আমার শৈশবের স্মৃতি এখন আমার কবিতায় মানুষের অধিকারের পক্ষে লড়াকু হাতিয়ার।
আবার হাসে হিমাদ্রি। বাইরের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করে বলে, ওই দেখ দিল্লির বিখ্যাত জামে মসজিদ। এই মসজিদের সঙ্গে আমাদের কবি মীর্জা গালিবের স্মৃতি আছে।
রাশেদ নিজের কণ্ঠে ধ্বনিত করে কবির নাম। বলে, গালিব। গালিব। দুশো বছরের বেশি সময় ধরে আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন।
- গালিবের অনেক কবিতা আমার মুখস্ত আছে।
- আমারও আছে। তোমার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব জমবে মনে হচ্ছে। আমাদের চিন্তার সংলগ্নতা আছে।
- সংলগ্নতা! বেশ শব্দ। মনে রাখব।
- এবারের সম্মেলনে আমি আমার চিন্তার সংলগ্নতার কবি-বন্ধু খুঁজব। তারপর সাউথ এশিয়ার কবি বন্ধুদের নিয়ে রাখী-উৎসব করব।
- ঠিক আছে, আজ আমি তোমার হাতে লাল সুতো বেঁধে দেব। বন্ধুত্ব বেঁচে থাকার দিন পর্যন্ত থাকবে।
- তোমাকে আমার শুভেচ্ছা বন্ধু।
- আমাদের বন্ধুত্বের লাল সুতো হবে কবিতার পঙ্ক্তি। আমার বর্ণমালার অধিকারের কথা বলব। আমরা অধিকারের চেতনা সাউথ এশিয়ার মানুষের কাছে নিয়ে যাব।
হিমাদ্রি হাসতে হাসতে বলে, এই সম্মেলনে যারা আসবে তাদের সবার কাছে এই কথা বলব।
রাশেদ জোরালে কণ্ঠে বলে, আমি তো প্রথমবার এলাম, এরপর থেকে আমিও শব্দের বারুদ ছড়াব। কাছে টানব সার্ক দেশের লেখকদের। তোমার হাসির শব্দও আমার কাছে বারুদের শব্দ।
হিমাদ্রি হাসতে শুরু করলে রাশেদ হাসে। দুজনের হাসির রেশ শেষ হতে না হতেই ট্যাক্সি এসে থামে অরবিন্দ আশ্রমের গেটে। ট্যাক্সি ছেড়ে গেটে ঢুকতেই রাশেদের চোখ জুড়িয়ে যায়। বলে, বাহ চমৎকার আশ্রম। গাছ আর পাখিতে মন ভরে যাচ্ছে।
হিমাদ্রি সায় দেয়। ঘনঘন মাথা নেড়ে বলে, এই আশ্রম আমার খুব প্রিয় জায়গা। ভেতরে ঢুকলে দেখতে পাবে এর বিভিন্ন গাছের সৌন্দর্য অন্যরকম। আরও আছে ময়ূরের চলাচল, আছে পাখিদের কুজন। তবে খেতে হবে নিরামিষ। এখানে মাছ মাংস রান্না হয় না।
- তিন দিন মাছ মাংস না খেলে কিছু এসে যাবে না। থাকার আনন্দই আমার কাছে প্রধান।
হিমাদ্রি ওর ঘাড়ে হাত রাখে। রাশেদ বলে, এতকিছুর মধ্যে সবার সঙ্গে বেশ সময় কাটবে।
- দিল্লি শহর দেখবে না?
- হ্যাঁ, তা তো দেখবই। গান্ধিজীর স্মৃতিসৌধে যাব। কবি গালিবের কাছে যাব।
হিমাদ্রি ভুরু উঁচু করে কৌতুকের ভঙ্গিতে বলে, কবির কাছে যাবে? জিজ্ঞেস করবে নাকি কেমন আছেন কবি ভাই?
- মনে করো তেমন একটা কিছু।
- তুমি প্রেমে পড়েছো রাশেদ?
- আমি যাকে ভালোবাসি তার নাম প্রিয়তি। কবিতা বোঝায় ওর জুড়ি নেই। দারুণ মেয়ে।
- তুমি ভাগ্যবান। আমি তোমাকে ঈর্ষা করি। আমি একজনকে ভালোবেসেছিলাম। ও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। এখন আমি মনে করি কবিতার সঙ্গে আমার প্রেম। নারীর প্রেমের দরকার নেই।
- নিজেকে সান্ত¡না দিচ্ছ?
- যদি তুমি তা মনে করো তা হলে তাই করছি।
হাসতে হাসতে দুজনে আশ্রমের ভেতরে ঢোকে। শিমুল গাছের নিচ দিয়ে সামনে যায়। দুজনের জন্য দুটো ঘর বরাদ্দ হয়েছে দোতলায়। দুজনে যার যার ঘরে চলে যায়। রাশেদের ঘরের জানালার পাশে ফুটে আছে লাল রঙের ফুল। গাছটি লতাঝোপ। রাশেদ নিজের মনে কবিতার পঙ্ক্তি আওড়ায়। ভাবে, একটি সিম কিনে মোবাইল ফোন চালু করবে। কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে বিকেলে ক্যান্টিনে চায়ের খোঁজে যায়। ঘরে তেমন কেউ নেই। চায়ের কাপ নিয়ে টেবিলে বসলে পাশের টেবিল থেকে পাকিস্তানের কবি হামিদ আলি বলে, আপনি কি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন?
- হ্যাঁ, আমি রাশেদ মুস্তাফা। কবিতা লিখি।
- আমিও কবিতা লিখি। আমার নাম হামিদ আলি। আপনি কি আগে এই সম্মেলনে এসেছেন?
- না, এবারই প্রথম।
- আমি আরও তিনবার এসেছি। এই লিটারেরি ফেস্টিভেল আমি খুব এনজয় করি।
কথা বলতে বলতে হামিদ আলি রাশেদের টেবিলে এসে মুখোমুখি বসে। চায়ের কাপের বাকি চা এক চুমুকে শেষ করে। দু’হাত টেবিলের ওপর রেখে বলে, আগামীকাল ছাব্বিশে মার্চ। আপনাদের স্বাধীনতা দিবস। ওপেনিং সেশনে আমাকে কিছু বলতে বলা হয়েছে। আমি ঠিক করেছি আমি বাংলাদেশের লেখকদের স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানাব। বক্তৃতার শেষে পাকিস্তান সরকারকে আহ্বান জানাব বাংলাদেশে গণহত্যা করার জন্য ক্ষমা চাইতে।
- তাই কি? রাশেদ দুচোখ বিস্ফারিত করে তাকায়।
- হ্যাঁ আমি নিজের দেশেও একথা বলি। আমি ইসলামাবাদে একটি দৈনিক পত্রিকায় কাজ করি। অমি বিশ^াস করি কবিদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়।
- তুমি আমার বন্ধু।
হামিদের হাত জড়িয়ে ধরে রাশেদ। দুজনে চা শেষ করে গেটের সামনে এসে দাঁড়ায়।
- তুমি কি কোথাও যাবে?
- হ্যাঁ, মোবাইলের জন্য একটি সিম কিনতে যাব।
- চলো, আমরা হেঁটে আসি। এ রাস্তার নাম বেগমপুর। বেশ নিরিবিলি। আমার হাঁটতে ভালোলাগে।
রাশেদের মনে হয় হামিদের হাতের উষ্ণতা ওকে জড়িয়ে রেখেছে। ওর সামনে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভেসে ওঠে। গণহত্যার কালরাত ওকে পীড়িত করে। নয় মাসের জনযুদ্ধ ওর স্বাধীনতা অর্জনকে গৌরাবান্বিত করে। ওর সামনে দাঁড়ানো হামিদ আলি ওর জানা মুক্তিযুদ্ধের ভিন্ন ইতিহাস হয়ে ওঠে। হামিদ আলি গণমানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই। হামিদ আলি গণহত্যার প্রতিবাদ। হামিদ আলি স্বাধীনতাকে দেয়া গৌরবের স্যালুট।
হামিদ আলি ওর হাতে মৃদু চাপ দিয়ে বলে, কি ভাবছ? আমি বাংলাদেশে গিয়েছি। ওখানেও আমার কথা বলেছি। নিষ্ঠুর গণহত্যার বিরুদ্ধে আমি কথা বলে যাব। কবিতা আমার শিল্পের লড়াই। যে কোনো জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতার যুদ্ধকে আমি নিজের গৌরবের জায়গা ভাবি। স্বাধীনতা কি সহজ কথা!
ওহ, শব্দ করে দুহাত উপরে তোলে রাশেদ। মনে হয় ওর সামনে লক্ষ শহীদের মুখ ভেসে উঠছে। বিশেষ করে তাদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে যাদের ও ছবিতে দেখেছে। রাশেদ দু’হাতে চোখের পানি মোছে।
হামিদ তাকিয়ে বলে, চোখে পানি কেন?
- শহীদদের স্মরণ করছি। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ের স্বাধীনতা তো।
- হুঁ, শব্দ করে হামিদ আলি গুনগুনিয়ে কবিতা আওড়ায়। নিজের কবিতা কিনা, তা ওকে আর জিজ্ঞেস করা হয় না রাশেদের। শুধু ওর মুখে উর্দু ভাষার শব্দরাজি শুনে একুশে ফেব্রুয়ারির কথা মনে হয়। মাতৃভাষার জন্য লড়াই। রাশেদ ভাবে হামিদ আলির দেশের চেয়ে ওদের গৌরবের জায়গা অনেক বড়। ওর বুকের ভেতর খুশির উচ্ছ্বাস গড়ায়। মনে হয় একছুটে গিয়ে দিল্লির মাঝে বয়ে যাওয়া যমুনা নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়াতে। কিন্তু হবে না। কাল ইন্ডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে সম্মেলনের উদ্বোধন অনুষ্ঠান হবে। এবার ওর যমুনা নদী হয় তো দেখা হবে না। আবার এলে যমুনার পাড়ে গিয়ে দাঁড়াবে। বলবে, আমি বাংলাদেশের যমুনা নদীর পানি এনে তোমার গায়ে ছিটিয়ে দেব দিল্লির যমুনাÑ এর মধ্যে তৈরি হবে আমার কবিতা।
দুজনে গিয়ে মোবাইলের সিম কিনে ফিরে এলে গেটের কাছেই দেখা হয় হিমাদ্রির সঙ্গে। ও দুপুরে খেয়ে কোথাও গিয়েছিল, ফিরে এসেছে পড়ন্ত বিকেলে। চারদিকে নরম রোদের ছায়া বিছিয়ে আছে। দূরে তাকালে দেখা যায় অরবিন্দ আশ্রমের দেয়ালে লেজ ঝুলিয়ে বসে আছে ময়ূর। তিনজনই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। হামিদ আলি মৃদু হেসে বলে, এটা আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য। আমি এত কাছ থেকে ময়ূর দেখিনি।
রাশেদ উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে, কাল দিনের প্রথম আলোয় আমি ময়ূরটাকে দেখব।
হিমাদ্রি সায় দেয়, আমিও দেখব। দারুণ লাগছে।
আমিও দেখব।
হামিদ আলি একসঙ্গে যুক্ত হলে হিমাদ্রিকে ওর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় রাশেদ। বলে, হামিদ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু।
হিমাদ্রি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়।
মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু কীভাবে? যুদ্ধের তো আঠাশ বছর পেরিয়ে গেছে।
তখন আমি ছোট ছিলাম। আমি বাংলাদেশের এখনকার বন্ধু। পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে গণহত্যা করেছে তার জন্য ক্ষমা চাইতে বলি।
হিমাদ্রি গলা উঁচিয়ে বলে, সে সময়ে আমিও ছোট ছিলাম। কিন্তু আমার বাবা-মা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন। বিশেষ করে শরণার্থীদের জন্য তারা নিজেদের বাড়ির দরজা খুলে রেখেছিলেন। কত যে মানুষ আমি দেখেছিলাম।
- বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার কথা আমি জানি। ছোটবেলায় আব্বার কাছ থেকে জেনেছি। বড় হয়ে ইতিহাস পড়েছি।
হুররে কবিতার বন্ধুত্বে মুক্তিযুদ্ধ। চলো যাই, আমি তোমাদের মিষ্টি খাওয়াব।
রাশেদ দুজনের হাত ধরে। নিজের মুঠিতে দুজনকে এক করে।
হিমাদ্রি হাসতে হাসতে বলে, আমাকে দুটো মিষ্টি বেশি দেবে।
- কেন? তোমাকে বেশি কেন?
- যুদ্ধের সময় আমরা ওদের বন্ধু ছিলাম।
হামিদ আলির কণ্ঠস্বর বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়। বলে, তোমরা বন্ধু থাকতে পেরেছিলে। কারণ তোমার দেশের সরকার আর সাধারণ মানুষ এক ছিল। আমার বাবা যখন গণহত্যার প্রতিবাদ করেছিল, তখন আমার বাবার মতো অনেকের পাশে পঁচানব্বই ভাগ সাধারণ মানুষ পাশে ছিল না। সরকার তো ছিল হত্যাকারী।
হিমাদ্রি হিম হয়ে যায়। হামিদের দিকে সরাসরি তাকাতে পারে না। বুঝতে পারে ওদের লড়াই ছিল অনেক কঠিন।
হামিদ আলি অপরূপ ময়ূরের ওপর থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে ওদের দিকে সরাসরি তাকায়। বলে, আমাদের বাবাদের মতো লোকদের লড়াই ছিল নিজেদের মানবিক চেতনা নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। তারা প্রমাণ করতে চেয়েছিল একটি দেশের আপামর মানুষ খারাপ হতে পারে না। গোটা জাতি হত্যাকারী নয়।
রাশেদ আর হিমাদ্রি নিজেদের না-জানা এক ভিন্ন ইতিহাসের পৃষ্ঠার সামনে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে। রাশেদের মনে হয় কবি হামিদ আলির কণ্ঠস্বর দিল্লির যমুনা নদীর ¯্রােতে ছড়াচ্ছে বিশ্বময়। এক বিপুল সত্যের ¯্রােত ওদের চারপাশে। দুজনে নিজেদের অজান্তে পরস্পরের হাত ধরে। হাতের মুঠি শক্ত হয়। ভেসে আসে কবি হামিদ আলির কণ্ঠস্বর, আমার বাবার মতো অনেককে ওরা বিশ্বাসঘাতক বলতো। পরে কেউ কেউ দেশ ছেড়ে চলে গেছেন।
রাশেদ আর হিমাদ্রির অস্ফুট উচ্চারণ, বিশ্বাসঘাতক!
হামিদ আলি মাথা ঝাঁকায়।
অরবিন্দ আশ্রমের গাছপালার মাথায়, আকাশ-বাতাসে উড়তে থাকে কবিতার শব্দরাজি। রাশেদের মনে হয় মুক্তিযুদ্ধের এটা এক অন্যরকম গল্প। বাতাসে উড়ে যাওয়া শব্দরাজি টেনে রাশেদের বুকের ভেতর গল্পের অনুভব জমে থাকে।
পরদিন ইন্ডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে শুরু হয় সাহিত্য সম্মেলন। হামিদ আলি কবিতা পড়ার আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যার জন্য বাংলাদেশের মানুষের কাছে মাফ চায়। করতালিতে মুখরিত হয় মিলনায়তন। হিমাদ্রি তালি বাজিয়ে বলে, মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননা নেয়ার সময় বাবা ঢাকায় যাবে। আমিও যাব। হামিদ তোমার অতিথি হবে রাশেদ। তুমি ওকে নিমন্ত্রণ কর। আমরা তিনজনে সাভার স্মৃতিসৌধে ফুল দিতে যাব।
- অবশ্যই নিমন্ত্রণ করব। সাহিত্য সম্মেলনে এসে আমি যে দুই বন্ধু পেলাম তারা আমার মুক্তিযুদ্ধের কবিতা। একদমই অন্যরকম কবিতা।
রাশেদ দু’হাতে চোখের পানি মোছে।
ইন্ডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারের বাতাসে উড়ে যায় শব্দরাজি। ওই শব্দ ঠোঁটে নিয়েছে অরবিন্দ আশ্রমের পেখম মেলে রাখা ময়ূর। রাশেদ ভাবে, ও আর একটি একাত্তরের সময়ে আছে। ও পৌঁছে যায় নিউইয়র্কের মেডিসন স্কয়ারে। রবিশঙ্কর আর জর্জ হ্যারিসন আয়োজিত কনসার্ট ফর বাংলাদেশে গলা মেলায়। কনসার্টের শব্দরাজি মৌমাছির গুঞ্জন নিয়ে বুকের ভেতরে ঢুকছে।
মিলনায়তনে তখনও করতালি চলছে।
রাশেদের মনে হয় মুক্তিযুদ্ধের শহীদের রক্তফুল উপস্থিত সবার করতলের বরণডালায় জমা হয়েছে। কবিতার শব্দরাজি শোভিত হয়ে উঠছে বরণডালার ফুলে। ওর সামনে একাত্তর ফিরে আসে। বিকেলে কবিতা পড়ার জন্য ওর নাম ঘোষণা করা হয়। রাশেদ স্টেজের সিঁড়িতে পা রেখে নিজেকে বলে, আজ আমার আর এক শুরু। ভালোবাসার প্রিয়তি, তোমার জন্য কবিতা বলতে বলতে মঞ্চে উঠছিÑ বরণডালার রক্তফুলে ভালোবাসার স্বপ্নকুঁড়ি। আমরা দুজন সাজাই এখন একাত্তরের নতুন দিন।
কবিতা পড়া শেষ হলে আবার করতালিতে মুখরিত হয় মিলনায়তন। নিচে নেমে এলে হামিদ আলি বলে, তুমি এ সময়ের একাত্তর। ভালো লেগেছে তোমার কবিতা। হিমাদ্রি মৃদু হেসে বলে, দারুণ লিখেছ। কবি তো সময়ের একজন। তুমিই তোমার জাগিয়ে রাখা একাত্তর।
রাশেদ চারদিকে তাকায়। এখন প্রিয়তির সঙ্গে প্রেমই ওর একাত্তর। নতুন অনুভবে জীবনের নতুন মানে খোঁজা।

শ্রেণী:

কনে দেখা আলো

Posted on by 0 comment
25

তারপর এখন উঠতে হবে, নতুবা এসি বাসটা মিস্করবো, আর ঘামতে ঘামতে বনানী পৌঁছানো, অসম্ভব! পাবলিক সার্ভিসে চেহারাই তো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

25আঁখি সিদ্দিকা: জানলার ওপারে আজ আকাশটা একটু বেশি নীল লাগছে, মাঝে লুকিয়ে থাকা গোলাপি রংটুকু ফুটতে গিয়েও আড়াল হয়ে যাচ্ছে পাশের বাসার পেয়ারা গাছের পাতায়। সারাদিনের ক্লান্তিটুকু পঙ্খীরাজের কাছে গঁচে দিয়ে আবার বেরিয়ে পড়া সন্ধ্যার আগে। সন্ধ্যা হতে এখনও খানিকটা বাকি, এই আলোটাকে মা কনে দেখা আলো বলতো, বলতো সৌমের জন্য বৌ দেখবো এই আলোয়। শুনেছি ফটোগ্রাফারদের জন্য এই আলোটা বিশেষ উপাদেয়। সেদিন কেন্দ্রের ছাদে জাহিদ ভাই বলছিলেন, তার এক রুমমেট ছবি তুলতো, শুক্রবার দুপুরে খেয়ে তারা ঘুমিয়েছে, হঠাৎ তার বন্ধু খালি গায়ে, লুঙ্গি পরে ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে দৌড়, জানালা দিয়ে গেঞ্জি ছুড়ে দিয়েছিল, তারপর কোথায় গেছিল, ফিরে আসলে বোঝা গেল, সে আসলে ছুটেছিল আলোর পিছে। অদ্ভুত সব ছবি তুলেছিল, আলোর খেলায়। এই একলা আকাশের রঙের খেলা দেখা ছাড়া এই আলোর বিশেষ কোনো দিক কি আছে, আমার? ক্যাম্পাস ছাড়ার কয়েকদিন আগে নোট নেবার জন্য অধীশা ডেকেছিল পাবলিক লাইব্রেরিতে, ওর জন্য প্রায় দু’ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর ও এসে যখন ক্যাফেটরিয়ার নাম জানা ঝাঁকড়া পাতাওয়ালা গাছটার সামনের টুলটাতে বসে পড়ল, হঠাৎই আলোটা ওর ঘামমুখে এসে চিকচিক করে উঠল, আমি কি সেদিন ওকে অন্যরকমভাবে দেখেছিলাম, আজও রক্তে কেমন ঢেউ ওঠে? অধীশা কি সেদিন কিছু বুঝেছিল? বুঝতে বুঝতেই ক্যাম্পাস ছাড়ার সময় হয়ে গেল, তারপর।
তারপর এখন উঠতে হবে, নতুবা এসি বাসটা মিস্করবো, আর ঘামতে ঘামতে বনানী পৌঁছানো, অসম্ভব! পাবলিক সার্ভিসে চেহারাই তো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সকালের আমি’র অফিস ড্রেস আর সন্ধ্যার আমি’র অফিস ড্রেসেই আমি বদলে যাই অনেকটা। সরকারি চাকুরে আর অ্যাম্বাসি চাকুরের পার্থক্যটা অনেকটা কেনডি আর পেপারমিল চকলেটের পার্থক্যের মতো। রেডি হয়ে নামতেই সিকিউরিটির কমন ডায়ালগ, স্যার, লিফট নষ্ট। ভালো ছিল কখন, ক্যান ওঠনের সময় তো ভালোই ছিল, বলেই একগাল হাসি। এই লোকটাকে এই হাসিটার জন্য কিছু বলতে পারি না। রোজ বারোতলা হেঁটে নামো না হয় ওঠো, সকালে মর্নিংওয়াক না করলেও চলে। ম্যানেজারকে কমপ্লেন করেও কোনো লাভ নেই। যে তেলী, সেই লিয়াকত আলী। এত কম ভাড়ায় দক্ষিণমুখো বড় জানালাওয়ালা ফ্লাট পাওয়াও মুশকিল। আর পঙ্খীরাজকে ছেড়ে যাওয়া? যেদিন এলাম সেদিনই তন্বি জানালাটার নাম দিয়েছিল পঙ্খীরাজ। ঘরগুলোতে তন্বি যেন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। নামতে নামতে হাসি এলো, আজ কি ওই আলোটার জন্য মনটা এত ফুরফুরে লাগছে। রোজ প্রায় ট্রাফিক জ্যামে আলোটাকে আটকে থাকতে হয় কোনো ইলেকট্রিক তারে নতুনা কোনো বাসের মাথায়, বা কোনো বাড়ির ছাদে।
ফিরতে ফিরতে রোজ প্রায় বারোটা বাজে, যদিও অফিসের গাড়ি পৌঁছে দিয়ে যায়। যাওয়ার সময় ইচ্ছে করেই গাড়ি নেই না। একটু ঢিলেঢালাভাবে অফিস যাওয়াটা বেশ উপভোগ করি আমি। আজ কি যাব একবার ওর কাছে? না, আজ না, অনেক রাত হয়ে গেছে, উজ্জ্বল ভাই কি মনে করবেন?
এত রাতে আবার কোথায়? আর যাওয়া কি ঠিক হবে? কেন যাব? কি করতে পারব আমি? শনিবার কি একবার যাব? ওর সাথে প্রথম দেখাও তো শনিবারেই। শনিবার চারটা থেকে অফিস। সকালের অফিসের অফ ডে থাকায় দুপুরের সেশনই নিয়েছিলাম। অফিসের গাড়িও ছিল না সেদিন, ছুটি হয়ে গেল তাড়াতাড়ি। মাস তিনেক আগের কথা। আমেরিকার হাইকমিশনার আসা উপলক্ষে সব গাড়ি রিজার্ভ। তখন নির্বাচন নিয়ে খুব তোলপাড় দেশে। নিরাপত্তা দরজার এপার-ওপার কোথাও নেই। বাসায় যেতে ইচ্ছে করল না, তন্বি তার বেশ কিছুদিন আগেই চলে গেছে বেলজিয়ামে ওর নতুন বন্ধুর সাথে। আমি হাঁটতে হাঁটতে বনানী রেললাইন ক্রস করে ডানে ঘুরব, এমন সময় মনে হলো আদনানের কথা, ও বলেছিল, এখানে কোথাও ওরা থাকে, নিয়েও যেতে চেয়েছিল। শরীরটাও কেমন লাগছে, কখনও তো যায়নি, কি হবে গেলে? আরে পাপ-পুণ্য কে এত হিসাব করে? আদনানকে একটা ফোন করব? না, তা হলে ও বুঝে যাবে আমি এসব পাড়ায় যাই। মনে পড়ল ফাইনালের আগে ফিল্ডওয়ার্ক করেছিলাম লালমাটিয়ার উৎসে। উৎসে রোজি ছিল ওদের প্রধান। ভাইয়া ভাইয়া ডেকে অস্থির হতো, উৎস ওদের জন্য একটা পুনর্বাসন করেছিল, নিজ হাতে ওরা দেশি খাবার রান্না করে বিক্রি করত, কাস্টমার হতো অনেক। কিন্তু বেশিদিন চলেনি কি এক অজানা কারণে। পরে যে যার পথে চলে গিয়েছিল, রোজি মাঝে মাঝে ফোন করে ওর খবর বলত, কখনও আগ বাড়িয়ে ফোন করা হয়নি। ওর কথা মনে পড়তেই মোবাইল ঘেটে ফোন দিলাম, জেগেই ছিল, পাশে অনেক মেয়ের হাসির শব্দ। কি ভাইয়া, এত রাইতে রোজির কথা মনে পড়ল, আইজ জীবনের প্রথম ফোন দিলেন, বলেন, কি কামে লাগতে পারি? আমি ওকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে যতটুকু বলা যায়, বললাম, ওর বলা ঠিকানামতো গেলাম, রাত তখন প্রায় ৮টা হবে। রোজি গলির মোড়েই দাঁড়িয়েছিল, দেখেই আঁতকে উঠে বলল, আরে ভাইয়া আপনি তো পুরাই পাল্টি গেছেন, হিরো আর কি? চলেন চলেন। কি ধরনের মাল লাগবো? বলেন দেখি। আমি রোজির সামনে অপ্রতিভ হয়ে চুপ করে রইলাম। প্রসাধনীর গন্ধে দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়। এখান থেকে ওখান থেকে পিলপিল করে মেয়েরা বের হচ্ছে, কেউ কেউ এক একজনকে কোমর জড়িয়ে ছোট ছোট ঘরের দরজা দিয়ে ঢুকছে, বের হচ্ছে। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ, খোলার শব্দ উভয়ই ক্যাচক্যাচ। পুরনো বাড়ি। কোথাও কোথাও প্লাস্টার খুলে ঝুলে পড়ছে বালি। ভাইয়া, কি ভাবেন, বলেন তাড়াতাড়ি। এই বারান্দায় এইভাবে খাড়াইয়া থাকা যাইবো না। মুখ ফসকে বের হয়ে গেল, সুন্দর, আর তুমিই তো ভালো বুঝবা। এইটা কইছেন কামের কথা। আমার চয়েজমতো দিবো তো? ঠিক আছে। একটি মেয়ে এগিয়ে আসলো দুলতে দুলতে, বললো, আইজ আমি কারোর পাই নাই। প্লিজ, আমি নিয়া যাই, বলেই আমার হাতে টান মারলো। রোজিও আমাকে হেঁচকা টানে হাত ধরে হনহন করে এগিয়ে যেতে যেতে বললো, সর্মাগী, সারাক্ষণ খাই খাই। পশ্চিম দিকে শেষ মাথার একবারে কোণের ঘরে আস্তে আস্তে দরজায় দুবার কড়া নাড়লো, কুসুম আমি রোজি, দরজাটা ভেজানোই ছিল, ঘরে ঢুকতেই একটা গন্ধ নাকে আসলো, জেসমিন পাউডার বোধহয়। রোজি কুসুমকে দেখিয়ে বললো, এসএসসি পাস, শিক্ষিত বলেই আপনার জন্য এরই আমার পছন্দ। কুসুম এইডা আমার ভাই, আলাদা কেয়ার নিবি। বলেই রোজি বেরিয়ে গেল, মেয়েটি একটি কথাও বললো না। ঘরের ভেতর জিনিস বলতে একটা খাট, লাল রঙের একটা চাদর, টেবিলের ওপর টিভি, একটা সিডি প্লেয়ার, একটি ঘোলা আয়নার ড্রেসিং টেবিল, টেবিলের ওপর কিছু প্রসাধনী। মেয়েটি খাটের এক কোণে বসে ছিল, আমি কাছে যেতেই বললো দরজার সিটকিনি খোলা, আমি লাগিয়ে দিয়ে পাশে বসলাম। আমার শরীরে তীব্র ইচ্ছাটা এখানকার গলির মোড়েই বাতাসে মিইয়ে গেছে। কিন্তু এসে পড়েছি, কি আর করা সময়টা পার করে যেতে হবে। নতুন অভিজ্ঞতাও কম নয়।
Ñ তোমার নাম তো কুসুম। মেয়েটি ঘাড় নাড়লো।
Ñ তুমি কথা বলতে পারো না, ঘাড় নেড়েই হ্যাঁ বললো।
Ñ এই লাইনে নতুন? আবারও? ঘাড় নাড়ছো?
Ñ এবার কথা বললো, কাজ করেন, আমি রেডি। বলেই বুকের ওপর থেকে শাড়ির আঁচলটা সরিয়ে ফেললো, নিটোল, সুন্দর গড়ন।
শ্যামলা মুখে সাদা পাউডারে মায়াবী ভাবটা কমে যায়নি এতটুকু।
Ñ আমি জানতে চাইলাম, কি কাজ? বললো, যে কাজে আসছেন।
ভাষায়ও সাবলীল। কুসুমের প্রতি আমার আগ্রহ বেড়ে গেল, ওকে পড়তে ইচ্ছে করলো।
Ñ আমি বললাম, কাজ তো করছিই।
Ñ ও বললো, না, আপনি যে কাজে আসছেন।
Ñ কুসুম আমি যে কাজে আসছি, তা করছি, তুমি শাড়ির আঁচলটা উঠাও আমার অস্বস্তি হচ্ছে।
Ñ এই লাইনে ওই শব্দগুলো নাই। এখানে অস্বস্তি নাই, সবই স্বস্তি। শান্তির জন্যই তো আসেন আপনারা।
হঠাৎ মনে পড়ে গেল, আমারে দুদ- শান্তি দিয়েছিল নাটরের বনলতা সেন। তবে কি জীবনানন্দের বনলতা সেন কি কোনো এক কুসুম?
Ñ কুসুম তোমার বাড়ি কোথায়?
Ñ সেইটা জেনে আপনার কি হবে?
Ñ শোনো কুসুম এখন তুমি আমার, আমি যা বলবো, তাই তুমি করবে, আর আমি যা জানতে চাইবো তুমিই তাই উত্তর দেবে।
Ñ ও মাথা নিচু করলো, বললো কুষ্টিয়া।
Ñ কুষ্টিয়া কোথায়?
Ñ জৈনতলা।
Ñ তুমি কি করে এখানে এলে? কেনই বা এলে?
Ñ ও আবারো চুপ করে রইলো।
Ñ আমি বললাম, কুসুম আমি তোমার সাথে গল্প করবো, এটাই আমার কাজ।
Ñ ও বলতে শুরু করেছিল।
Ñ কিন্তু দরজায় কড়া নাড়া, রোজি চিৎকার করছে, ভাইয়া টাকা লাগবো না আইজ যান, পুলিশের রেইড হতে পারে আইজকে।
Ñ আমি কুসুমের হাতে টাকা গুঁজে দিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম।
ফেরার পথে কুসুমের বড় বড় দুচোখের কোলে মুক্তোর মতো ঝুলেছিল পানি। বাসায় ফিরে সারারাত ঘুমোতে পারি নাই। বারবার কুসুমের চোখ, মলিন অথচ মায়া ছড়ানো মুখটা মনে পড়ছিল। ওইদিন হঠাৎই তন্বিকে স্বপ্ন দেখেছিলাম, হো হো করে আসছে, বলছে কি আমাকে ব্লেম করেছিলে, এখন যে তুমি একটা চরিত্রহীন। আমি চরিত্রহীনতার সংজ্ঞা জানি না। মাথা কাজ করছে না। ঘুম ভেঙে পানি খেয়ে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম, তন্বিকে খুব মনে পড়ছিল, তন্বির জিদ, একগুয়েমি শেষে ফ্রেঞ্চ শিখতে গিয়ে বেলজিয়াম ছেলেটার প্রেমে পড়া। চলে গেল দুবছর হতে না হতে। মা, বড়পু খুব আদর করে বৌ করে এনেছিল তন্বিকে।
সারাদিন অফিসের চাপে ভুলে গেলাম কুসুমকে। পরের শনিবার আবার গেলাম। তারপর আবার। পরপর চার শনিবারেই ওকে জানা হলো অনেকটা। সেই একই রকম জানালার দিকে কোনাকুনি মুখ করে বসে থাকা। বলে যাচ্ছিল ওর কথা।
বাবা পোস্ট অফিসে কাজ করতো। মা আর দুভাই নিয়ে সাজানো সংসার। ওই সবার বড় ছিল। স্কুলে পড়ার পাশাপাশি হাতের কাজ শিখেছিল কুসুম। গায়ের রং চাপা থাকার কারণে মা-বাবা চিন্তা করতো খুব, কালো মেয়ে কীভাবে বিয়ে দেবে। কিন্তু দশম শ্রেণিতেই প্রেম হয় শফিকের সাথে। বাপ-মা মেনে নেবে না, শফিকের বাপ-মারও একি অবস্থা। ঝড়-জলে এসএসসি পাস করলেও আর দেরি করার উপায় ছিল না ওদের। কুষ্টিয়া সদরে এসে কাজী অফিসে কলমা পড়ে বিয়ে করে ওরা, তারপর পাড়ি দেয় ঢাকায়। কোনোরকমে গ্রাম সম্পর্কীয় কাকার বদলৌতে ওরা কাজ পায় গার্মেন্টসে। গাজীপুরেই থাকতে শুরু করে। দিনগুলো কষ্টে দুঃখে ভালোই কাটছিল, চার বছরের মাথায় ঘরে একজন নতুন অতিথিই এলো, ওরা নাম রেখেছিল তিশা। তিশাকে নিয়ে একদিন ওরা দুজন মার্কেটে গেছে, তিশা তখন কোলে, গার্মেন্টসের এক মাস্তান বড় ভাইয়ের চোখ ছিল কুসুমের দিকে। সেদিন ওদের ডেকে নিয় যায় সুপারভাইজারের বাড়ি, মিথ্যা কথা বলে। তারপর শফিককে বেঁধে রেখে কুসুমকে ওরা কয়েকজন ভোগ করে উপর্যুপরি। শফিককে মেয়েসহ ছেড়ে দিলেও কুসুমকে ছাড়ে না। পরদিন থানায় শফিক জানালে শফিককে মার্ডার কেসের আসামি করে জেলে পাঠায় ওরা। এই গল্পগুলো শুনতে আমি রোজ শনিবার যেতে থাকি, কেমন টান অনুভব করি, কুসুমের জন্য। দুমাস পরে মনে হলো কুসুমের জন্য তো কখনও কিছু নিয়ে যাই নি। আজ কিছু নেবো। রোজিও বোঝে আমি ওর সাথে গল্প করি, তাই ঘণ্টা হিসেবে রেট খুব কম রাখে। আর মাঝে মধ্যে খাবার নিয়ে যাই। কুসুম কেমন উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে, বুকটা যেন খালি হয়ে আসে, হুহু করে বাতাস আসা-যাওয়া করে। গত মাসে প্রথম শনিবার অফিস শেষ না করেই বেরিয়ে গেলাম, ঘুরছি শপিংমলে কি কিনবো কি কিনবো, কিছুই বুঝতে পারছি না। হঠাৎ তন্বির কথা মনে হলো, ওকে জন্মদিনে কি দেবো জানতে চাইলে, বলেছিল, নূপুর দিও এবার আমাকে; কিন্তু তার আগেই।
হ্যাঁ, নূপুর কিনবো, আমি তো ভালো বুঝি না। কলিগ মৌকে ফোন করলাম, মিথ্যা বলতে হলো, বললাম বোনের জন্মদিন নূপুর কিনবো কোথা থেকে, ও আড়ং-এর কথা বললো। বেশ সময় নিয়ে নূপুর কিনে, চলে এলাম কুসুমের কাছে। কুসুমকে আজ কৃষ্ণকলির মতো লাগছে, ন্যাচারাল। আজ কোনো পাউডারের ছটা নেই, সাজ নেই। মিঠেকালো অপূর্ব সুন্দর এক মানসী আমার সামনে বসে আছে। আমি দরজার সিটকিনি তুলে দিলাম। কুসুম একটু আঁতকে উঠে বললো।
Ñ আজ বুঝি কাজ করবেন?
Ñ আরে আমি কি রোজ আকাজ করি?
ও হাসলো যেন বেলি ফুল ফুটে উঠলো।
Ñ কুসুম আজ তোমার জন্য আমি একটা উপহার এনেছি, তুমি নেবে?
Ñ কুসুম অপ্রস্তুত তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ, তারপর আস্তে আস্তে বললো, নেবো।
Ñ বললাম, না হাতে দেবো না, আমি নিজ হাতে পরিয়ে দেবো।
Ñ ঠিক আছে দিন বলে আমার দিকে তাকলো।
Ñ তোমার পা দুটো বের করো, নইলে কীভাবে পরাবো? বলতে বলতে প্যাকেট খুলে নূপুর জোড়া বের করে ওর দিকে তাকালাম।
Ñ ও মুখে হাত দিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো,
Ñ কি হয়েছে কুসুম? ওকে আমি জড়িয়ে ধরতে গিয়ে থেমে গেলাম, কি হলোটা কি?
পা বের করো, ও বের করছে না দেখে ওর শাড়ির নিচ থেকে আমি টেনে বের করতে চাইলাম, একি পা কোথায়?
একটা পায়ের অর্ধেক আমার হাতে এলো, আরেকটি পা নেই। আঁতকে সরে গেলাম।
Ñ ওর হাত চাঁপা মুখ আমি উঁচু করে ধরে চিৎকার করলাম, কুসুম একি? আমাকে বলো… কুসুমের কান্নার ধমকে খাট নয় পুরো ঘর কেঁপে উঠলো, কুসুম বলো। আমাকে বলো। ওর চোখ মুছিয়ে, ওকে বুকে জড়িয়ে আদর করে বললাম, কুসুম আমায় বলো। কি হয়েছে তোমার? কেন লুকিয়ে ছিলে আমার কাছে?
কুসুমের বড় বড় চোখ দিয়ে তখনও পানি ঝরছে, তবে উথাল অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে মিইয়ে এসেছে।
ও সেদিন যা বলেছিল, তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। তবুও শুনেছিলাম, কুসুমের জন্য সেদিন শফিকও নূপুর কিনেছিল। ওদের ম্যারেজ ডে ছিল। শফিককে জেলে নেবার পর কুসুমকে ওরা ছেড়ে দিলেও কুসুম সুস্থ থাকেনি। এক প্রকার মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিল। তিশার দেখাশোনার ভার নেয় পাশের ঘরের নানী, যিনি রোজির মা। শফিকের যাবজ্জীবন হয়েছিল। কুসুম ওই অবস্থাতেই রেললাইনের পাশে বসে থাকতো, এটা ওটা কুড়িয়ে খেতো। কোনো এক ফিরতি ট্রেনে ওর অ্যাকসিডেন্ট হয়, এবং তাতেই ওর পা হারায়, পা হারিয়ে সরকারি হাসপাতালে প্রায় চার বছর চিকিৎসার পর সুস্থ হয় কুসুম। চিকিৎসায় ধীরে ধীরে কুসুমের মানসিক অবস্থাও ভালো হয়। তিশাকে খোঁজে, শফিককে খোঁজে। তিশাকে নিয়ে গেছে তিশার দাদা-বাড়ির লোকেরা। আর শফিক এখনও ফেরেনি জেল থেকে।
তারপর রোজির সহযোগিতায় কুসুমের জায়গা হয়, কুড়িলের এই গলির মোড়ের প্লাস্টারহীন বাড়িতে। কুসুম আর ফিরে যেতে পারে না ওর নিজের বাড়ি। কুসুমের আসল নাম কুসুম ছিল না, তৃপ্তি বিশ্বাস।
ব্রাহ্মণের মেয়ে মুসলমান ছেলেকে বিয়ে করে মুসলিম হয়েছিল, ধর্ম ছাড়া, কূল ছাড়া তৃপ্তি স্বামীর কাছে তাহেরা থাকলেও পরে হয়েছিল কুসুম। সেই নূপুর রাখেনি কুসুম, আমায় বলেছিল, আপনি আর আমার কাছে আসবেন না।
কুসুম কি শফিকের জন্য আজও অপেক্ষা করে? আমার জানা হয়নি। সেদিনের সব মেয়েগুলি আমার দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। ওদের কি ধারণা হয়েছিল আজও আমি জানি না। কেবল রোজি এগিয়ে এসে বলেছিল, এই যে ভাইয়া, আপনার সব টাকা, আপনাকে ঠকানোর কোনো ইচ্ছা নাই। আমি সেই সন্ধ্যা হবার আগের আলোটা পেরিয়ে এসেছিলাম কুসুমকে পেছনে ফেলে।
গাড়ির এফএম-এ মাত্র মান্নাদে’র ‘আমি তোমার প্রেমের যোগ্য তো নই’ গানটি শেষ হতেই উজ্জ্বল ভাই বলে উঠলো, কি ব্যাপার সৌম কোথায় হারিয়ে গেলেন? ঘুমিয়ে পড়লেন না-কি? বাবুল আপনাকে ডাকছে, বাসায় চলে এসেছেন তো?
Ñ না ! উজ্জ্বল ভাই, যা জ্যাম ছিল, একটু চোখটা লেগে আসছিল।
Ñ ওকে গুড নাইট। বাসার গেটে নামিয়ে দিয়ে গাড়িটা হুস করে বেরিয়ে গেল। সিকিউরিটি গার্ড জামাল পিটপিট করে তাকিয়ে বললো,
Ñ ভাইয়া, শরীর খারাপ না-কি?
নিজ থেকেই লিফটের সুইচ বাটনটা জামাল প্রেস করে দিল। দরজার তালা খুলে অন্ধকারে খুঁজতে লাগলাম সন্ধ্যার আলোটুকুন…

শ্রেণী:

আষাঢ়-এর তৃতীয় দিন…

Posted on by 0 comment
45

ব্রাসেলসের বর্ষা-বিধৌত এই একটানা একঘেয়েমিতে। সকাল সকাল ভিনদেশের বর্ষণ-সংগীত শুনে প্রথম প্রতিক্রিয়া হলোÑ আরে, এ যে একেবারে আমাদের বর্ষার মতন! সেটা অবশ্যি বলেছি টাইমিংটা মিলে যাওয়াতে।

45মালেকা পারভীন: বাংলা বারো মাসের নাম এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলতে পারলেও জর্জিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে তা ঠিক কবে থেকে শুরু হয়, আমি নিশ্চিত, পহেলা বৈশাখ ছাড়া আর কোনোটাই আপনি সঠিকভাবে বলতে পারবেন না। বুকে হাত দিয়ে বলুন, পারবেন? তাও পারতেন না যদি চৌদ্দ আর পনের এপ্রিলের ঝামেলাটা অনেক ঝুট-ঝামেলার পর ওইভাবে না মিটিয়ে ফেলা হতো। মিটিয়ে ফেলাতে ভালোই হয়েছে। বাঙালিত্ব প্রমাণের ন্যূনতম ট্রিকটা আপনার হাতের মুঠোয় চলে এসেছে না বলে সোজা জিবের আগায় সদা প্রস্তুত আছে বলা যায়। অনায়াসে।
তবে আমি আপনার থেকে এক ধাপ এগিয়ে আছি। না, বলছি না যে আমি বলতে পারব ইংরেজি প্রতিমাসের মাঝামাঝি ঠিক কোন তারিখে (চৌদ্দ, পনের নাকি ষোল) বাংলা মাসগুলোর একেকটার প্রথম দিন শুরু হয়। অনেকবার খাতা-কলম ব্যবহার করে মুখে-মগজে মুখস্থ করতে চেয়েছি। সফলতা ধরা দেয়নি বুড়ো মস্তিষ্কের ‘গ্রে সেলগুলো’ তাদের কর্মদক্ষতা দেখাতে পারেনি বলে। তাই বলে হাল ছেড়ে দিইনি একেবারে। বাঙাল হয়ে জন্মেছি, অথচ বারোটা বাংলা মাসের দিনক্ষণ বলতে পারব নাÑ এটা কোনো কাজের কথা নয়, মশায়। নিজেকেই বলি। আর তার সামান্য চেষ্টা হিসেবে আমি আষাঢ়স্য প্রথম দিবসের জন্য নির্ধারিত জর্জিয়ান ক্যালেন্ডারের তারিখটা ভালো করে জেনে নিয়েছি। তাই আমার আশপাশের সবাই যখন জ্যৈষ্ঠের চাঁদিফাটা গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে বলতে থাকে, কবে যে বৃষ্টি নামবে, আর কেউ কেউ দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘায়িত করে এই ভেবে, কবে যে ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’ গানটা কেউ গুনগুনিয়ে উঠবে, আমি তখন খানিকটা ভাব দেখিয়ে বলি, ক্ষান্ত দিন, জনাবে আলা, জুনের পনের তারিখটা তো আগে আসতে দিন। তারপর না হয় ওইসব গান-ফান-বাজনা-বাদ্যির আসর-টাসর বসানো যাবে…
আজ আষাঢ়-এর তৃতীয় দিন এখানে এই ব্রাসেলসে। সকালে অফিসে আসার সময় দেখেছি, আবহাওয়া ভীষণ মনমরা। ডিজমাল ওয়েদার অ্যাট ইটস পিনাকল। এ অবশ্য এ শহরের জন্য নতুন কিছু না। পারলে সারাক্ষণই মুখ বেজার করে রাখে। ধনীর দুলালীর আদুরেপনা আর কি! একটা সময় এমন অবিরল ঝিরঝির ধারায় বৃষ্টি ঝরতে লাগলো যে সেই একহারা বৃষ্টি-ঝরা দেখতে অফিস-রুমের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে গেলাম। চুপচাপ, একা একা, শুধু নিজেকে নিয়ে। আর নির্নিমেষে এই বারি-পতন দেখতে দেখতে একসাথে একটার পর একটা কত যে কথা, কত রকমের স্মৃতি যে এই বেচারির মনে পড়ে গেলো! মনের জানালার আবছা ক্রুশ-কাটা পর্দায় ভেসে উঠলো কিছু মনে থাকাÑ বেশিরভাগ ভুলে যাওয়া মানুষের মুখ-নাম-পরিচয়, আর কত কত জায়গার ছবি আর দৃশ্যাবলি যেখানে আমি কখনও কোনো এক হারিয়ে ফেলা আর কখনও খুঁজে না পাওয়া সময়ের কাছে জমা রেখে এসেছি আমার লাজুক পায়ের নরম-কঠিন চিহ্ন সকল। সেই জায়গাগুলো আরও অনেক কিছুর সাথে মিশে গেছে রূপসা নদীর রুপালি ঢেউ হয়ে, সান্তাহার স্টেশনের ট্রেন লাইনের পাথর-বিছানো সমান্তরালে, কোনো এক সবুজ ধান ক্ষেতের সিঁথিকাটা আইল ধরে, আরেক নাম-না-জানা গোরস্তানের (গোরস্তানের কি বিশেষ কোনো নাম থাকে?) ভেতর গজিয়ে ওঠা রহস্যময়ী সূর্যমুখী গাছটার সবুজ পাতায় আর হলুদ পাপড়িদলে, বিটিভির নাটক দেখার আনন্দ-আয়োজনে আর এরকম অসংখ্য পরতে পরতে ‘মায়া-মমতায় জড়াজড়ি করি’ থাকা সাদাকালো ছবি-ভর্তি অ্যালবামের মাঝে থেকে যখন-তখন ইলেক্ট্রিসিটি চলে যাওয়ার ঘোর অন্ধকারে!
যাক, থাক ওসব মন-উচাটন আকুলি-বিকুলিপনা। বরং ফিরে আসি আজ আষাঢ়স্য তৃতীয় দিবসে। ব্রাসেলসের বর্ষা-বিধৌত এই একটানা একঘেয়েমিতে। সকাল সকাল ভিনদেশের বর্ষণ-সংগীত শুনে প্রথম প্রতিক্রিয়া হলোÑ আরে, এ যে একেবারে আমাদের বর্ষার মতন! সেটা অবশ্যি বলেছি টাইমিংটা মিলে যাওয়াতে। বলতেই হচ্ছে, স্থান-কাল ভেদে বৃষ্টি তার নিজস্ব চরিত্র ধারণ করে। আমি এমনটাই দেখেছি। আপনিও দেখেছেন। মনে করার চেষ্টা করে দেখুন। আচ্ছা, মনে করুন, লন্ডন-এর ছিঁদকাদুনে ছিপছিপে বৃষ্টির কথা। সেখানকার বৃষ্টির এমন বিশ্রী চেহারা যে কাব্য করা আর সাহিত্য সাধনা দূরে থাক, বিরক্তিতে রীতিমতো আপনার হাত কামড়াতে ইচ্ছে করবে আমার মতন। আমি জানি, কারণ আমার এমনটা হয়েছে। দু-একবার হাত নয় অবশ্য, আঙুল কামড়েছি, যারপরনাই বিরক্তিতে ত্যক্ত হয়ে… কিছু করার নাই, কোথাও যাওয়ার নাই… শুধু জানালার পাশে বসে নীরবে বৃষ্টির পতন দেখে যাওয়া আর অহেতুক আলসেমিতে ঢুলে পড়া অথচ হাতে জমে আছে কত কাজ… এমন যে তার কায়াশ্রী তাকে না যায় ধরা, না যায় ছোঁয়া। অথচ দেখুন, কেমন তার যন্ত্রণার মাত্রা! অসহ্য!
অথচ আমার একজন প্রিয় কলাম লেখক-সাংবাদিক ভাই বেশ আয়েশ করে বলেন, আমার এই ব্লিক অ্যান্ড বিষণœ ওয়েদারই ভালো লাগে ভীষণ। কেমন একটা মনমরা মগ্নতায় অবশ হয়ে থাকে চারপাশের সবকিছু। এরকমই ভালো লাগে আমার। সব সময়। আরও ভালো লাগে এমন অদ্ভুত মিসটেরিয়াস মেলানকলি মোমেন্টসে এক মাগ ধোঁয়া ওঠা গরম কফি হাতে নিয়ে জানালার পাশে রকিং চেয়ারটায় বসে বাইরে অন্ধকারে অপলক তাকিয়ে থাকতে। ব্যাপারটা একবার তোমার কল্পনার ক্যানভাসে তুলে নাও, দেখবে কেমন এক নামহীন ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে গেছে তোমার সারাটা মনোজগৎ! কেমন এক সুতীব্র বিহ্বলতায় আচ্ছন্ন আর অবশ হয়ে গেছে তোমার সমগ্র অস্তিত্বের চারপাশ!
আপনি এত সুন্দর ইংরেজি লেখেন, আর এখন দেখছি, না মানে শুনছি, বাংলাতেও কম যান না… আমার কথা শুনে তার বিদগ্ধ কপাল সামান্য কুঁচকে গেল। যদিও মুখের স্মিত হাসিটি অমলিন।
হুম, তুমি একবার ওই দৃশ্যপটটা ক্যানভাসে তুলে নাও, তোমার মনের ক্যানভাসে, ইজেলটা বাম হাতে শক্ত করে ধরে এবার আঁকতে থাকো, যা যা তোমার ভাবতে ইচ্ছে করে। প্রায় সময় এমন বৃষ্টি-ধোয়া মেঘলা দিনে আমার ভেতরে একরকম তোলপাড় হয়, আলোড়ন ওঠে… নীরব শব্দহীন সে তোলপাড়Ñ অথচ আমার ভেতরটা কেমন দুমড়ে-মুচড়ে যায়! আচ্ছা, বলতো, এটা কি আমার কোনো রোম্যান্টিক ভাবালুতা? তোমার ভাবীর এমন অভিযোগ প্রায় শুনতে হয় আমাকে। কিন্তু কি জানো, বৃষ্টি-ছোঁয়া একেকটা অন্ধকার দিন আমাকে যে কী ভীষণ ভালো লাগায় মোহমুগ্ধ করে রাখে! আমি তোমাকে ঠিক উপযুক্ত কোনো ভাষায় তা ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে বলতে পারব না। ইনফ্যাক্ট, যে এটার অনুভবের ভেতর দিয়ে না গেছে, তাকে ঠিক কথার মারপ্যাঁচে তা কখনোই বোঝানো সম্ভব না… আর সেরকম একটা কবি-মনও থাকতে হয়, কি বলো?
প্রশ্নের মতো কিছু একটা আমার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে সাংবাদিক ভাই কেমন এক ঘোরলাগা ভাবনায় চুপ মেরে গেলেন, সম্ভবত আরও কিছু বলার জন্য মনে মনে খানিকটা গুছিয়ে নিতে। আর আমি এটাও জানি, তিনি আমার কাছ থেকে কোনো উত্তর শুনতে চাননি। যেহেতু আমার মতো ধৈর্যশীল শ্রোতা সবসময় তার কাছে আসে না, তিনি তাই তার মনের আগলটাই আজ খুলে দিয়েছেন আমার সামনে। কেননা, কোনো এক কথার ফাঁকে তিনি একবার বলে উঠেছিলেন, সবাই তো কেবল নিজের কথা বলতে চায়। শোনার লোকের সংখ্যা হাতেগোনা। কেমন একটা প্যারাডক্স, দেখো! আমাদের দুটা কান আর একটা মুখ, অথচ এগুলোর ব্যবহার ঠিক বিপরীত সূত্র মেনে।
কিন্তু আমার ধৈর্যও একসময় বিদ্রোহ করতে চায়। মনে মনে বলিÑ আপনিও তো কম যাচ্ছেন না। যে বিষয়ের সমালোচনা করছেন, সেই একি দোষে আপনি নিজেও দুষ্ট। আমাদের সমস্যাটা তো এখানেই। আমার এই সত্যি কথাগুলো তাকে বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আমার বরাবরের যে চেপে যাওয়া স্বভাব, আমি চুপ করে থাকি। ব্যাপারটা তিনি খেয়াল করেন।
তুমি আমার কথায় বিরক্ত হচ্ছো না তো? স্যরি, এই বৃষ্টি-ভাবালুতায় এমনভাবে পেয়ে বসলো আর তোমার মতো এমন একজন মনোযোগী নীরব শ্রোতা পেয়ে গেলাম যে চারপাশের সবকিছুই যেন ভুলে গেলাম। আচ্ছা, বাদ দাও। এবার তোমার কথা বলো। তোমার টেক্সট করা ওই কবিতাটা কিন্তু আমার এখনও বেশ মনে আছে। মনে পড়ছে না? যেখানে তুমি এক ঘন বর্ষণের রাতে ট্র্যাফিক জ্যামে আটকা পড়ে গেলে আর ওই সময় তোমার অস্তিত্বটাকে তুলনা করতে চাইলে হঠাৎ গর্তে আটকা পড়ে যাওয়া একটা ইঁদুরের সাথে যে বের হওয়ার কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছে না। ফ্যান্টাস্টিক! অসাধারণ! তুমি কবিতাটা চালিয়ে যাও, ঠিক আছে?
তার কথা কিছুতেই শেষ হতে চায় না। আমাকে কিছু বলার জন্য বারবার বললেও আমি কিছুতেই তার কাছ থেকে সেই মওকা আদায় করতে পারি না। নিজেকে আমার সত্যি সত্যি তখন ওই ইঁদুরটার মতো অসহায় লাগে। আমি একটু পিটপিট করে তার দিকে তাকাইÑ আমাকে একটু বলার সুযোগ দিন আর না হলে বিদায় বলে যাই? অথচ আমারও বলার ছিল, আমি নিজেও বৃষ্টি-কাতর একজন মানুষ। আর বৃষ্টি বা বর্ষাকে রোমান্টিকতার চূড়ান্ত শিখরে নিয়ে গিয়েছেন যে কবিগুরু তার প্রতি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই আমি হঠাৎ করে অসহিষ্ণু হয়ে উঠি। যেন আমি ভীষণই বিরক্ত প্রয়োজনের অতিরিক্ত এই বর্ষা-বয়নে। চটজলদি হুমায়ূন আহমেদের কথাও আমার মনে পড়ে যায়। আরও অনেক কিছুই মনে পড়ে যায়। তেইশ বছর আগে কোনো এক বিভাগীয় শহরে ঝুম বৃষ্টি নামা জুন মাসের এক সিক্ত দুপুরের কথা। কলেজ-পোস্ট অফিসের এক চিলতে বারান্দায় গাদাগাদি করে দাঁড়ানো অনেক ছেলেমেয়ের ভিড়ে শুধু একজনকেই ভালো লেগে যাওয়া আর বৃষ্টি শেষ হওয়া মাত্র ভেজা বাতাসের সুরভির সাথে পলকে তার উধাও হয়ে যাওয়া। পেছনে ফেলে যাওয়া এক দীর্ঘশ্বাসের মেঘ-মল্লার। চিরদিনের জন্য।
যা হোক, বর্ষা-বন্দনায় সংক্রামিত আমার নিজেকে আমি সামলে নিলাম আর বরষণ-¯œাত বিষণœ আবহাওয়ার মাঝে সকল আনন্দ খুঁজে পাওয়া সাংবাদিক ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালাম। আমার পরিকল্পনা ব্যর্থ হলো। কারণ তিনি পরম মমতায় আমার সামনে বাড়িয়ে দিয়েছেন এক মাগ ধোঁয়া ওঠা গরম কফির সুচতুর প্রলোভন। অবিকল তার বর্ণনার মতন। নিজ হাতে কফি মেশিন থেকে বানানো সেই কফির মন এলোমেলো করা সুবাস আমার নাকে সুড়সুড়ি দিয়ে যায়। আর আমি কিছুতেই এই ট্যানটালাইজিং টেম্পটেশন থেকে নিজেকে রক্ষা করার সহজলভ্য কোনো উপায় খুঁজে পাই না আমার চারপাশে। নিজেকে এ সময় মমের ‘লাঞ্চন’ গল্পের সেই অমানানসই চরিত্রটির মতো মনে হয়, যাকে এক অজ্ঞাত কারণে কখনই আমার নায়িকা বলতে ইচ্ছে হয় না।
একবারে আমার কেবল এক মাগ কফিই ভালো লাগে… ভাই। এর সাথে আর অন্য কিছু না। না বিস্কুট, না বাদাম। আমার একটু ঢং করে বলতে সাধ হয় যখন দেখি সাংবাদিক ভাই উপুড় হয়ে টেবিলের ড্রয়ার খুলে তার ফুড স্টকে আমাকে অফার করার মতো কিছু আছে কি-না তা খোঁজার চেষ্টা করছেন। আমি মুখে যদিও কিছুই বলি না; কিন্তু তিনি আমার মনোভাব পড়ে ফেলেন এবং আবার সোজা হয়ে বসে তার লম্বা মাগটা টেবিল থেকে হাত বাড়িয়ে টেনে নেন।
দেখো, ওই মেঘ-মেদুরকাল-নীলাভ শান্ত আকাশটার দিকে তাকাও আর তোমার সম্পূর্ণ দৃষ্টিটা মেলে দিয়ে ভাবতে চেষ্টা করো ছোপ ছোপ কালি ছিটানো নীল রঙে ডোবানো মেঘগুলো একেকটা কিসব কবিতা বলে যায়… কীসব কবিতা… আহ্!
আহ্, মরি, মরি… সাংবাদিক ভাইয়ের অফিসে এসেছিলাম কুশলবিনিময়ের ছুতায় দুমাস আগে জমা দেওয়া আমার লেখাটার ব্যাপারে খোঁজ নিতে। এখন বৃষ্টি-শিকলে আটকা পড়ে কী করিÑ কোথায় পালাই অবস্থা। তিনি আমার মনের হাল বোঝার ধারেকাছেও যেতে চাইলেন না। তার মতো করে বলে যাচ্ছিলেন যা যা তার মনের রাস্তায় মিছিল করে আসছিল প্রজাপতি-রঙিন অথবা দাবার বোর্ডের সাদাকালো ছক আঁকা জ্যামিতিক রেখার ছাতা মাথায়…
আমি শুনছিলাম, আর শুনছিলাম, আর ভাবছিলাম দেবো নাকি একবার মনের পাখনাটা মেলে? ওই যে ব্রাসেলসের কর্মস্থলে কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে যেমন যেমন বৃষ্টি-ভাবনা এসে আমার মনের জানালায় ভিড় করে সেসব আনন্দের বর্ণমালা… কিছুটা শেয়ার করি তার সাথে, যদি সুযোগ পাই। হয়তো ভালোই লাগবে তার। হয়তো না। তারপরও বলি। এই মনোটোনাস মনোলগের মিজারি থেকে অ্যাট লিস্ট মুক্তি পাওয়া দরকার…
আমি এপাশ ফিরে দেয়ালের দিকে মুখ করে তাকাই আর আমার আচরণ যেন হঠাৎ কেমন এক অদ্ভুত চেহারা ধারণ করে! জানিনা কেন, ব্রাসেলসের বিরহী আকাশের সময়ে-অসময়ে মুখ কালো করে কান্না-ঝরানো বৃষ্টির ওপর একপ্রস্থ রাগ এসে জমা হয় আর আমি বলতে থাকি, হয়তো মনে মনে, অথচ দেখুন, আমাদের দেশের বৃষ্টি দেখুন… কেমন মনকাড়া ভঙ্গিমায় সমস্ত চরাচরজুড়ে মোহনীয় মায়া ছড়িয়ে ঝলমলে রিমঝিম করতে করতে ছলাত ছলাত করতে করতে কলকল টলমল করতে করতে তার রাজসিক আগমন। দু-কূল ছাপিয়ে নিজে তো নীপবনে নৃত্য করবেই, সাথে আপনাকেও নাচিয়ে ছাড়বে… সোনার চাঁদবদনী তুমি নাচো তো দেখি! সেই বৃষ্টিÑ সংগীতের মাঝে মাঝে যদি আবার গুরুগম্ভীর মেঘ-রাজ ডেকে ওঠেন, বাজিয়ে দেন বজ্রস্বরে তার তীক্ষè কণ্ঠÑ নিনাদ, তা হলে আপনার বর্ষা-উদযাপন সম্পূর্ণ হলো ষোল কলায়।
আর ইউরোপের বৃষ্টির এমন হাস্যকর একই সাথে বিরক্তি-উৎপাদক চেহারা যে আপনি তা দেখে নিজেই লজ্জা পেয়ে মুখ লুকাতে ব্যস্ত হয়ে যাবেন। যাবেন না, বলছেন? যখন বৃষ্টির বদলে আপনার মাথায় পাতা ছাতার ওপর একরাশ ঘ্যানঘ্যানানো অসহ্যপনা ঝরে পড়বে আর শরীরে এক ধরনের ব্যাখ্যাতীত চিটচিটে অনুভূতির অস্বস্তি টের পাবেন, তখনই বুঝতে পারবেন ইউরোপের বৃষ্টি-বেদন কতটা… যাহ্ আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। আর এমন যে এমন, কোনো শব্দ নেই, কোনো আওয়াজ নেই… শুধু ঝরছে আর ঝরছে আর ঝরছে। আপনি তাকে দিব্য চোখে দেখছেন, আপনার পরনের কাপড়ও অল্পস্বল্প ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে সে যে এসেছিল তার চিহ্নস্বরূপ, অথচ কুহেলি মরীচীকার মতো থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ কোনো বৃষ্টি হলো যদি তারে আপনার মতো করে কাছে না পেলাম? যদি তারে নাই পাইকো আপনার মতো করে, তাহলে কি কিছু পাওয়া হয়? ধ্যাৎ!
আজ অবশ্য ব্রাসেলস-এর বৃষ্টি সামান্য ভেল্কি দেখালো। না, ঠিক, দেখালো না, শোনালো। মুহূর্তের জন্য কিছু একটা শুনিয়ে দিলো… ওই ধরুন গিয়ে ইউরোপিয়ান মেঘের ডাক। খুবই ভদ্র কায়দায়, পাছে কেউ যাতে শুনে না ফেলে এমন ভাবে চুপিসারে! আমিও শুনতে পেতাম না যদি আমার কান অমন খাড়া না থাকত। আমি তো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে এই ইউরোপিয়ান বৃষ্টির ভেলকিবাজি দেখছিলাম একটু সতর্ক চোখ-কান মেলে-খুলে। দেখতে চেয়েছিলাম নতুন করে, আমাদের বর্ষার যাদুময় সৌন্দর্যের কাছে তা ঘেঁষতে পারে কিনা। পারবে না, কখনোই না। প্রশ্নই আসে না। তবে এর আগে আর একদিন ওই ডাক শুনেছিলাম বেশ ভয়ঙ্করভাবেই। এখানে আসার পর সেবারই প্রথম এমনটা হলো। বেশ চমকে উঠেছিলাম দফায় দফায় ওরকম গর্জন শুনে। আসলে এখানে এই ব্রাসেলসে বৃষ্টির একটানা নিরানন্দ নিঃশব্দ ধারাবাহিক পতন দেখে দেখে চোখ যতটা সয়ে গেছে, অমন হুঙ্কার শুনে তো এই বেচারা কানজোড়া অভ্যস্ত নয়। সে কারণেই ওরকম হতভম্ব দশা। শুধু আমার না, যাদের সাথেই বিষয়টা নিয়ে কথা বলেছি, যারা অর্থাৎ আমার আশেপাশে ঘুরঘুর করতে থাকা দেশি ভাই-ব্রাদার, প্রত্যেকেই একই কথা বলেছে। বুঝতে পারছেন তো, এই বৈদেশেও আমরা বৃষ্টি নিয়ে বিশদ আলোচনা করার অবকাশ পাই।
আর বৃষ্টি-বিলাসী আমার প্রিয় সাংবাদিক ভাই কোথায় গেলেন, জানেন? কফি খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে আমি তাকে বলতে চেয়েছিলাম কদিন আগে এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করা মমের অসাধারণ ‘রেইন’ গল্পটার কথা। কিছু তর্কবিতর্কের সুযোগ ছিল। সাবডিউড প্যাশন আর উচ্চকিত নৈতিকতা নিয়ে একটা দারুণ আড্ডার সূচনা হতে পারত। তারপর তা বেড়ে প্রসারিত হতো ই-মেইল আর টেক্সট মেসেজে… ইশ, এমন একটা জমজমাট সাহিত্যিক আসর শুরু করেও শেষ করতে পারলাম না। মনে হলো, মনে হলো এর জন্য ওই বেহায়া বৃষ্টিটাই দায়ী। কারণ তা আমাকে এমনভাবে ভিজিয়ে দিয়েছিল যে সাংবাদিক ভাইয়ের সামনে ভদ্র-সভ্যভাবে বসে থাকাই দায় হয়ে উঠেছিল। আমার ভীষণ আড়ষ্ট লাগছিল যে! আর তা ছাড়া মিস থম্পসনের মতো এত দুর্বিনীত দুঃসাহসের বর্ষণও আমার ওপর কখনও অকৃপণভাবে ঝরে পড়েনি। আমি যে আমার মধ্যে গুটিয়ে থাকা এক চিরকালের শুঁয়োপোকা যে কেবল একছিটে বৃষ্টির আলতো পরশেই মিইয়ে যায়, চুপসে যায় লজ্জাবতী লাজুকলতার সরলতায়… তা না হলে হয়তো…

শ্রেণী:

যুধিষ্ঠিরের কুকুর

34

ঠিক ঐ জায়গাটায় সারাক্ষণ শুয়ে থাকে। হয়তো ঘুমায়। কিংবা চোখ বুজে ঝিমায়। হয়তো উঠে দাঁড়ানোর শক্তি পায় না বলে মাথাটা বুকে গুঁজে সারাক্ষণ ওভাবে পড়ে থাকে। গায়ে মশা-মাছি বসলেও নড়েচড়ে না। গাড়ির তীক্ষè হর্নেও সচকিত হয় না।

34স্বকৃত নোমান: যুধিষ্ঠির বললেন, এই কুকুর আমার ভক্ত, একেও আমার সঙ্গে নিতে ইচ্ছা করি। ইন্দ্র বললেন, যার কুকুর থাকে সে স্বর্গে যেতে পারে না। যুধিষ্ঠির বললেন, নিজের সুখের জন্য আমি এই কুকুরকে ত্যাগ করতে পারি না।
মহাভারত। মহাপ্রস্থানিকপর্ব

খামারবাড়ি মোড়ে নেমে ইন্দিরা রোড ধরে ফার্মগেটের দিকে হাঁটা ধরলে দেখা যাবে একটা কাঁচাবাজার। বাজারের ঠিক মাঝখানে ফুটপাথের ছোট্ট ঐ বটগাছটার নিচে রাস্তার ওপর সিটি কর্পোরেশনের ডাস্টবিনের কাছে দেখা যাবে মোটাসোটা একটা কুকুর শুয়ে। এমন স্বাস্থ্যবান কুকুর শহরে খুব কমই দেখা যায়। ডাস্টবিনের উচ্ছিষ্ট খেয়ে খেয়ে হয়তো শরীরটার এই কন্ডিশন করেছে। হয়তো সে অলস। খাবারের জন্য সারাক্ষণ ছুটে বেড়ানো পোষায় না তার। কিংবা এমনও হতে পারে, তার শরীরে দুরারোগ্য কোনো ব্যাধি বাসা বেঁধেছে। নইলে এমন বেখাপ্পা টাইপের মোটা হবে কেন। খেলে কি এত মোটা হয়? বাজারে আরও যেসব কুকুর আছে তারা কি কম খায়? তারা তো তার মতো এত মোটা নয়।
ঠিক ঐ জায়গাটায় সারাক্ষণ শুয়ে থাকে। হয়তো ঘুমায়। কিংবা চোখ বুজে ঝিমায়। হয়তো উঠে দাঁড়ানোর শক্তি পায় না বলে মাথাটা বুকে গুঁজে সারাক্ষণ ওভাবে পড়ে থাকে। গায়ে মশা-মাছি বসলেও নড়েচড়ে না। গাড়ির তীক্ষè হর্নেও সচকিত হয় না। এসব নাগরিক কোলাহলে সে অভ্যস্ত। মাঝে মধ্যে ডাস্টবিনের উচ্ছিষ্ট নিয়ে কুকুরের দলের কামড়াকামড়ি লেগে গেলে মাথাটা তুলে এক পলক দেখে নেয়, তারপর যথারীতি বুকের কাছে মাথাটা গুঁজে নেয়। ভাবে, এ আর এমন কী। এমন কামড়াকামড়ি তো প্রায়ই লাগে। বাজারের অন্য কুকুরগুলো তার ধারেকাছে ঘেঁষে না খুব একটা। তার সঙ্গে মেশে না। কেউ তাকে ঘাঁটায়ও না। মাঝে মধ্যে কেউ কেউ এসে তার গা শোঁকে। মরে গেছে না বেঁচে আছে হয়তো বোঝার চেষ্টা করে। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ে, হাই তোলে, গা চুলকায়। তারপর ধীরপায়ে চলে যায়।
কুকুরটি খায় কখন কেউ দেখে না। সারাদিনে আদৌ কিছু খায় কিনা কেউ জানে না। সে তো মানুষ নয়। ফুটপাথে আর পার্কে যেসব মানুষ থাকে তাদের খাওয়া না-খাওয়া নিয়েই তো কারও মাথাব্যথা নেই। সে তো তুচ্ছ একটা কুকুর, তার খাওয়া না-খাওয়া কেউ কি আর খেয়ালে রাখে? হয়তো সে খায়। রাতে বাজারের উল্টোদিকের সানমুন রেস্টুরেন্টের যে উচ্ছিষ্ট ডাস্টবিনে জমা হয়, শেষ রাতে, অন্য কুকুরেরা যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন সে ধীরেসুস্থে উঠে পেট ভরে খেয়ে নেয়। সারাদিন আর কিছু খায় না। প্রয়োজন পড়ে না। কোনো কোনো রাত আবার না খেয়েই কাটিয়ে দেয়। বিশেষত বৃষ্টির রাতগুলোতে। বেদখল যাত্রী ছাউনির বেঞ্চিটার নিচে সারারাত বেঘোরে ঘুমায়। বৃষ্টি থামলে আবার আগের জায়গায় এসে শুয়ে পড়ে। এক শোয়াতেই দিন কাবার।
একটা কুকুর দিনের পর দিন একই জায়গায় শুয়ে থাকার ব্যাপারটা কেউ ঠিক খেয়াল করেনি। হয়তো করেছে। কিন্তু এ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। এটা কি মাথা ঘামানোর মতো ব্যাপার? মানুষের কত কাজ, কত ব্যস্ততা। দিন-রাত মানুষ ছুটছে… ছুটছে। একটা কুকুরের ভালো-মন্দ নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো সময় কোথায়।
ঘামায় শুধু একজন, বটগাছের নিচে ফুটপাথের এক পাশে বসা কাশিরাম মুচি। রোজ ভোরে বাক্স-পেটরা ঝাড়মোছ দিতে দিতে কুকুরটির দিকে তাকিয়ে সে বলে, কী খবর মোটকু? আছিস কেমন? কুকুরটি তখন কান দুটো নাড়া দেয়। মাথাটা তুলে একবার ঘেউ করে ওঠে। ওটাই তার সাড়া। তারপর আবার মাথাটা গুঁজে নেয়। কেউ সারাদিন মোটকু মোটকু বলে মুখে ফেনা তুলে ফেললেও মাথাটি আর তুলবে না। বহুদিন ধরে কাশিরামের ঐ জিজ্ঞাসাটা শুনতে শুনতে সে অভ্যস্ত। কথাটা তার কানে গেলেই বুঝতে পারে গলাটা কার। সাড়া দেওয়াটা তখন তার কর্তব্য হয়ে পড়ে। আর রোজ রোজ ঐ কথা দুটি বলাটা কাশিরামের অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে। একদিন জিজ্ঞেস না করলে তার মনে হয় দিনটা আজ ভালো যাবে না। কাস্টমার জুটবে না। পুলিশের ঠ্যাঙানি খাবে।
দিনের বেশিরভাগ সময় কাশিরামের চোখ দুটো বলতে গেলে কুকুরটার ওপরই থাকে। শহরের ব্যস্ততম এলাকা ইন্দিরা রোড। কাস্টমার লেগেই থাকে, নাক চুলকানোরও ফুরসত নেই। বেশিরভাগই স্যু। স্যান্ডেল খুব কমই আসে। এলেও সেই পালিশের কাজ। সেলাই-টেলাই দিতে হয় না তেমন। ঢাকা শহরে বড় লোকদের কারবার, কে আসে ছেঁড়া জুতো নিয়ে। জুতোয় ব্রাশ করতে করতে কাশিরামের হাত আর মাথা সমানতালে দোলে, আর চোখ দুটো স্থির হয়ে থাকে কুকুরটার দিকে। ব্রাশ করার সময় কুকুরটার দিকে তাকিয়ে থাকাটাও তার অভ্যাস হয়ে গেছে। নিজের অজান্তেই চোখ দুটো ওদিকে চলে যায়। অন্যদিকে ফেরালেও মুহূর্তে আবার আগের জায়গায় এসে স্থির হয়। তাকিয়ে থাকতে থাকতে প্রায়ই যুধিষ্ঠিরের কুকুরের কথা মনে পড়ে তার। ছোটবেলায় মাস্টারের মুখে শুনেছিল যুধিষ্ঠিরের কুকুরের কথা। এখনও স্পষ্ট মনে আছে।
রাতে বাসায় ফেরার জন্য যখন বাক্স-পেটরা গোছায়, শেষবারের মতো কুকুরটার দিকে তাকায় কাশিরাম। তখন বলতে ইচ্ছে করে, কীরে মোটকু, খাবি না? মাঝে মধ্যে বলেও। কুকুরটা তখন সাড়া দেয় না। কেন দেয় না? কাশিরামের চলে যাওয়াটা হয়তো সে মেনে নিতে পারে না। তাই অভিমান করে থাকে।
কুকুরটার প্রতি কাশিরামের মনে আসলে এক ধরনের মায়া জন্মে গেছে। জন্মানোটাই স্বাভাবিক। কতদিন ধরে দেখছে। কতদিন একসঙ্গে আছে। একসঙ্গেই তো। ফুটপাথের বটতলা থেকে ডাস্টবিনের কতটুকুই বা দূরত্ব। বছর তিন আগে সে যখন এই বটতলায় বাক্স-পেটরা নিয়ে বসে, তখন থেকেই কুকুরটাকে দেখছে। তখন বয়স কম ছিল কুকুরটার। স্বাস্থ্যও এমন ছিল না। তেলতেলে টানটান শরীর। সারাবাজার দাপিয়ে বেড়াত। কামড়াকামড়িতে বাজারের অন্য কুকুরগুলো তার সঙ্গে পেরে উঠত না। সারাক্ষণ কেবল খাই খাই করত। জিবটা বের করে রাখত হরদম। খাবারের বাছবিচার ছিল না। খাওয়ার উপযোগী সামনে যা পেত তা-ই মুখে তুলে নিত। আর কতক্ষণ পরপর ডাস্টবিনটার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে এক ঠ্যাং তুলে মূত্রথলিটা খালি করত। হেগেও দিত মাঝে মধ্যে। কাশিরামের তখন রাগ উঠত খুব। মনে পড়ে যেত শৈশবে স্কুলমাস্টারের মুখে শোনা ইন্দ্রের সেই বাণীÑ যার কুকুর থাকে সে স্বর্গে যেতে পারে না। ঘৃণায় তখন তার নাক-চোখ-মুখ কুঁচকে যেত। সামনে পুরনো স্যান্ডেল-জুতো যা পেত কুকুরটার উদ্দেশে ছুড়ে মারত। শালা বেজন্মা! হাগার আর জায়গা পেলি না! একদিন তো আস্ত হাতুড়িটা ছুড়ে মারল মাথা বরাবর। কুকুরটা কুঁইকুঁই করে ছুট দিল রাস্তার উল্টোদিকে। অল্পের জন্য বাসের চাকার নিচে পড়ল না। স্প্রিডব্রেকারটা না থাকলে চ্যাপ্টা হয়ে যেত নিমেষে। তারপর বেশ কদিন কুকুরটাকে আর দেখা গেল না। কাশিরাম ভাবল, মরেটরে গেল নাকি! না মনে হয়। কুকুরের প্রাণ, এত সহজে কি মরবে! ভয়ে হয়তো এলাকা ছেড়েছে। কিংবা বাজারেই আছে, ভয়ে কাশিরামের আশপাশ ঘেঁষছে না।
কদিন পর সানমুন রেস্টুরেন্ট থেকে নাস্তা করে ফেরার পথে কাশিরাম দেখল, রাস্তার উল্টোদিকের ফুটপাথে দুটো কুকুর পাছার সঙ্গে পাছা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে। জিব বের করে দিয়ে হাঁপাচ্ছে। চোখে ভীতির ছাপ। ভালো করে ঠাওর করে দেখল কাশিরাম, দুটোর একটি ঐ কুকুরটা, যার মাথায় সে হাতুড়ি ছুড়ে মেরেছিল। দ্রুত সে চোখ সরিয়ে নিল। চারদিকে তাকিয়ে দেখল তাকে কেউ দেখছে কিনা। ভারী লজ্জার ব্যাপার। কুকুর হলে কী হবে, ব্যাপারটা তো মানুষের মতোই। এমন একটা ন্যাকেড দৃশ্যের দিকে সে তাকিয়ে, লোকে দেখলে কী ভাববে তাকে। মুখে হাসির একটা রেখা ফুটিয়ে দ্রুত সে নিজের জায়গায় এসে বসে পড়ল। কিন্তু চাইলেই কি চোখ ফিরিয়ে রাখা যায়? রাস্তার লোকজন ঐ দৃশ্যের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে। প্যান্ট-শ্যুট আর টাই পরা এক ভদ্রলোক তো ওদিকে তাকিয়ে হাঁটতে গিয়ে এক বাদামঅলার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যেতে লেগেছিল। অল্পের জন্য পড়েনি। তা ছাড়া স্কুল ছুটি হয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা বাড়ি ফিরছে। তাদেরও চোখও এড়াচ্ছে না দৃশ্যটি। লেগুনার পুচকে কন্ডাক্টররা হুই-হাই করে মজা লুটছে।
কাশিরামের মাথায় তখন রাগ ওঠে। শালা কুত্তার বাচ্চা কুত্তারা লাগানোর আর জায়গা পেল না। পেছন থেকে এক সবজিঅলা বলে উঠল, সিটি কর্পোরেশন কী ছিঁড়তাছে বইসা বইসা। কুত্তাগুলো মারার ব্যবস্থা করে না ক্যান? কথাটা শুনে কাশিরামের রাগ গেল আরও চড়ে। কোত্থেকে একটা বাঁশের টুকরো কুড়িয়ে এনে এক ছুটে রাস্তা পার হয়ে কুকুরটার মাথায় মারল জোরসে বাড়ি। কিন্তু বাড়িটা মাথায় লাগল না, লাগল জায়গামতো, দুই পাছার ঠিক মাঝ বরাবর। দীর্ঘ সময়ের গিট্টু এক বাড়িতেই গেল ছুটে। মুক্তি পেয়ে সুখক্লান্ত প্রাণী দুটো দুদিকে ছুট লাগাল।
ডাস্টবিনটার কাছে কুকুরটা আসন নেওয়ার বছরখানেক পরের কথা। দেশজুড়ে তখন সন্ত্রাসীদের টার্গেট কিলিং চলছে। আজ এখানে তো কাল ওখানে। দেশের উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম রঞ্জিত হতে লাগল রক্তে। লেখক, প্রকাশক, শিক্ষক, ইমাম, বিদেশি, পুরোহিত, যাজক চাপাতির বলি হতে লাগল। জনসমাগমে মানুষের কল্লা ফেলে দিচ্ছে ঘাতক, কেউ এগিয়ে আসছে না আক্রান্তকে বাঁচাতে। কে চায় চাপাতির বলি হতে। কে চায় ঘাতকদের টার্গেট হতে। পুলিশের সামনে লাশ ফেলে দিচ্ছে, হামলা হচ্ছে খোদ পুলিশের ওপরও, আর পাবলিক তো পাবলিক।
সেদিন সকালে কুকুরটা ছিল সানমুন রেস্টুরেন্টের সামনে। মানুষের গাদাগাদি রেস্টুরেন্টের ভেতরে। ম্যাসিয়ার নাশতা দিয়ে কুলিয়ে উঠছে না। সকাল আটটা। অফিসের সময় হয়ে আসছে। সবাই ব্যস্ত। নাশতার জন্য ম্যাসিয়ারকে তাড়ার পর তাড়া দিচ্ছে কাস্টমাররা। গ্যাসের চুলার নিচে বসে নেহারির হাড্ডি চিবুচ্ছিল কুকুরটা। রেস্টুরেন্টে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকতে গিয়ে এক কাস্টমারের চোখ আটকে গেল সেদিকে। নাক-মুখ কুঁচকে স্বগতোক্তি করল, বিচ্ছিরি পরিবেশ। ম্যানেজারের কান এড়াল না কথাটা। কুকুরটা দেখে তার মেজাজও গেল চড়ে। চেয়ার থেকে ওঠে সিঙ্গারা ভাজার লম্বা ডাঁটঅলা চাকনিটা হাতে নিয়ে কুকুরটাকে দিল ধাওয়া। হাড্ডিটা ফেলে এক ছুটে রাস্তায় উঠে এলো কুকুরটা। তখন, ফুটপাথে যে লোকটা চিতই পিঠা বেচে, চুলা থেকে একটা জ্বলন্ত লাকড়ি বের করে ছুড়ে মারল তার দিকে। লক্ষচ্যুত হলো। হবে না? কুকুর বড় সেয়ানা প্রাণী। পিঠাঅলার হাতটা ওপরে উঠতে দেখেই সে দিল ছুট। লাকড়িটা পড়ল গিয়ে এক পথচারীর পায়ের কাছে।
আর ওদিকে তখন হুলুস্থূল। খামারবাড়ি মোড়ের দিক থেকে একটা লোক ছুটছে ফার্মগেটের দিকে। পরনে প্যান্ট, গায়ে সাদা গেঞ্জি, পায়ে চামড়ার স্যান্ডেল। তাকে ধাওয়া করছে দুই তরুণ। একজনের মুখে চাপদাড়ি, পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি। আরেকজনের ক্লিনশেভ মুখ, পরনে প্যান্ট-শার্ট। দুজনের পিঠে দুটো কালো ব্যাগ। দুজনের হাতেই ধারালো চাপাতি। বাক্স-পেটরা ঝাড়মোছ দিচ্ছিল কাশিরাম। তরুণ সূর্যের আলোয় চাপাতিটা চিকিয়ে উঠতে দেখে বুকটা ধপ করে উঠল তার। কদিন আগেও পাবনায় এক পুরোহিতকে গলা কেটে মেরেছে। রামকৃষ্ণ মিশনের প্রধান পুরোহিতকেও হুমকি পাঠিয়েছে। বাক্স-পেটরা ফেলে সেও দিল ছুট। পথচারীরা যে যেদিকে পারছে ছুটে পালাচ্ছে। রাস্তার মোড়ে ডিউটিরত কনস্টেবলটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়েছে। সবজিঅলা, মুরগিঅলা, মুদিঅলা, পানঅলা, সিগারেটঅলা, পিঠাঅলা, বাদামঅলা আর চানাচুরঅলারাও পালাচ্ছে।
ছুটতে ছুটতে লোকটা যখন ডাস্টবিনটার সামনে এলো, পেছন থেকে দুই চাপাতিঅলার একজন তার ঘাড়ে মারল এক কোপ। ঘাড়ে না লেগে কোপটা লাগল পিঠে। কুকুরটা তখন বটগাছের অদূরে যাত্রী ছাউনির বেঞ্চিটার তলায়। সহসা তুমুল শব্দে ঘেউ ঘেউ করতে করতে বিজলির গতিতে ছুটে এলো অকুস্থলে। তাকে ছুটে আসতে দেখে দুই চাপাতিধারীর একজন ছুট লাগাল রাস্তার উল্টোদিকে। আক্রান্তের ঘাড় লক্ষ্য করে ততক্ষণে দ্বিতীয় কোপটা চালিয়ে দিল আরেকজন। ধড়-মু-ু আলাদা হয়ে যেত, যদি না চাপাতিধারীর পা-টা কামড়ে ধরত কুকুরটা। আক্রান্ত লোকটি মুখ থুবড়ে পড়ে গেল রাস্তায়। রক্তে ভিজে যেতে লাগল তার সাদা গেঞ্জি। কুকুরের কবল থেকে ছাড়া পেতে চাপাতিটা ঘাতক চালিয়ে দিল কুকুরটার পিঠে। কিন্তু কোপটা পড়ল গিয়ে মাটিতে। পা ফসকে উপুড় হয়ে পড়ে গেল সে। চাপাতিটা ছিটকে পড়ল হাত থেকে। কুকুরটা তখন তার বুকে চড়ে বসে কামড়ে ধরল তার থুতনিটা। কুকুরটাকে এক ঝটকায় বুক থেকে সরিয়ে দ্রুত ওঠে বসল ঘাতক। এবার কুকুরটা কামড়ে ধরল তার পা। দু-হাতে ভর দিয়ে দাঁড়াল ঘাতক। তারপর দিল ছুট। কুকুরটা গলাফাটানো শব্দে ঘেউ ঘেউ করতে করতে তার পেছনে ছুটতে লাগল।
ফার্মগেট ওভারব্রিজের কাছে গিয়ে কুকুরটা থামে। ঘাতককে খোঁজে। পায় না। ওদিকে তো মানুষ আর মানুষ। ঘাতক মিশে গেছে মানুষের ভিড়ে। কুকুরটা এক ছুটে আবার আহত রক্তাক্ত লোকটার কাছে ফিরে এলো। লোকটা তখনও মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। মরেনি। পলায়নরত পথচারীরা এবার থামে। এগিয়ে আসতে থাকে অকুস্থলের দিকে। বটগাছের আড়াল থেকে কাশিরামও বেরোয়। সবজিঅলা, মুরগিঅলা, মুদিঅলা, পানঅলা, সিগারেটঅলা, পিঠাঅলা, বাদামঅলা আর চানাচুরঅলারাও এগিয়ে আসতে থাকে।
খানিকের মধ্যে আহত লোকটার চারদিকে লেগে গেল মানুষের ভিড়। এক পথচারী পকেট থেকে মোবাইল বের করে আহতের ছবি তুলে নিল ঝটপট। রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে ছুটে এলো কনস্টেবলও। তার আনকোরা পোশাক অথবা হাতের জালিবেতটা দেখে কিনা কে জানে, হঠাৎ ঘেউ ঘেউ করে উঠল কুকুরটা। কনস্টেবল বেতটা উঁচিয়ে তাকে শাসাল। তাতে আরও জোরে ঘেউ ঘেউ করতে লাগল কুকুরটা।
মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে ক্রমে। কুকুরটা তখন ডাস্টবিনের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে, পুব দিকে ফিরে, জনতার দিকে বাঁ ঠ্যাংটি উঁচু করে পেশাব করতে লাগল। ছরছর শব্দে সে মূত্রথলি খালি করতে থাকে। তার পেশাবের বেগ পেয়েছে খুব।

শ্রেণী:

নদী, শ্রাবণী ও মফস্বল বৃত্তান্ত

Posted on by 0 comment
42

আমার হঠাৎ ‘সোনারকাঠি-রূপারকাঠি’ রূপকথার রাজকন্যার কথা মনে পড়ে। রুনি যে রাজকন্যা এটা তাকে দেখলেই অনুধাবন করা যায়। কিন্তু তাই বলে সোনারকাঠি-রূপারকাঠি বদল ছাড়া তার যে ঘুমও ভাঙে নাÑ এটা কি করে সম্ভব?

42পাপড়ি রহমান: ফুটে-ওঠা-ভোর দেখতে দেখতে আমি রুনিদের বাড়িতে পৌঁছে যাই। অনেকদিন বাদে কোনো মফস্বলী-সকাল আমাকে রীতিমতো ঘোরগ্রস্ত করে ফেলেছিল। শান্ত-নীরব-সমাহিত ওই সকালের ভিতর দিয়ে আমাদের অটোরিকশা ধীরে-সুস্থে, প্রায় নিঃশব্দে চলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সেটা ছিল একেবারেই অসম্ভব। থ্রি-হুইলের ওই যান থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের মতো একটানা শব্দ সরিয়ে ফেলা যায় নি। আমি সে চেষ্টাও করিনি। বরং ধোঁয়াটে-আলোর ভিতর আমি সত্যিকার অর্থেই মফস্বলী-সকাল দেখায় মগ্ন ছিলাম। আমার এই একাগ্র-মগ্নতাকে গাঢ় করে তুলেছিল রাতের বৃষ্টিপাতে সতেজ হয়ে থাকা রাস্তাগুলো। এঁকে-বেঁকে-যাওয়া পিচঢালা কালো-রাস্তা। ধুলাবালি শূন্য ভেজা-রাস্তা। চড়াই-উৎরাই কম। কোনো কোনো রাস্তার বাঁক পেরুনোর আগেই মনে হচ্ছিল যেন কোনো নদী! নিস্তরঙ্গ-কালো-নদী। যে নদীতে ঢেউ নাই। জলের কোলাহল নেই। কোনোরকম উত্তেজনা নাই। যেন-বা কালো দুধের ওপর ঘন-কালো সর পড়ে আছে। অথচ ওই কালো রাস্তার ধারে আমি সত্যিই এক নদী বয়ে যেতে দেখেছিলাম। বিস্তৃত সেই নদী। আর শ্রাবণের নদী মানেই উন্মত্ত। যৌবন লুটিয়ে দেবার বাসনায় মঞ্জুরিত। তীব্র কামুক আহ্বানে গতি হারা।
ওই যৌবন-মত্ত-নদী বইছিল পথগুলোর ধার ঘেঁষেই। তবুও আমি মতিচ্ছন্নতায় আক্রান্ত হলাম। পূর্বরাতের বৃষ্টিজলে বাসীভাবে ভিজে-থাকা রাস্তাগুলোকেই আমার নদী বলে মনে হলো। নদীটাকে রাস্তা ভেবে আমাদের অটোরিকশা যদি ওই পথে ধাবিত হতো! কিংবা চালককেও যদি আমার মতন মতিচ্ছন্নতায় পেয়ে বসত? আর সে অটোরিকশার গতি ঘুরিয়ে দিত? তা হলে বিপদ ছিল। সর্বোচ্চ বিপদ। ভাগ্যিস, সে তা করে নাই।
কেউ অন্যের মনের-ভাবনা দেখতে পায় না। পাশাপাশি বসে বা হেঁটে বা শুয়ে থেকেও কেউ অন্যের মনোজগত দেখতে পায় না। এটা আমার ওই সময়ই মনে হয়েছিল। এবং আমি স্বস্তি পেয়েছিলাম। অবশ্য আমিও তাদের মনোজগত দেখতে পাচ্ছিলাম না। এক ধরনের স্বস্তি নিয়ে আমি তাকিয়েছিলাম রুনির দিকে। রুনি আমার ইশকুল-কালের বন্ধু। শুধু রুনি নয়, আমি অটোরিকশা-চালকের দিকেও তাকিয়েছিলাম। এমনকি রুনিদের বাড়ির কেয়ারটেকার মাহবুবের দিকেও।
মাহবুব বসেছে অটোচালকের পাশাপাশি। রুনির পূর্বপুরুষ জমিদার ছিল বিধায় এই বিভাজন। রাজা আর প্রজার সারি এক নয়। আমার পাশে বসে থাকা নীলরক্তধারী-রাজকন্যা-রুনিÑ তবে কি আমিও রাজা সারির?
এ প্রশ্ন হারিয়ে গিয়ে রুনির মনোজগত আমাকে আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু তা দেখার কোনো উপায়ই আমার জানা ছিল না।
পেছনের সিটে আমি আর রুনি পাশাপাশি। সামনে মাহবুব আর চালক পাশাপাশি। আমাদের চারজনের মাঝে কোনো কাপড়ের পর্দা টানা নাই। চালক আর যাত্রীর বিভাজন স্টিলের গরাদ দিয়ে। যা দেখলেই চোর আর পুলিশের কথা মনে পড়ে। কে এখানে পুলিশ আর কে চোর? উত্তর যা-ই হোক আমরা এখানে কেউ কারও মন পড়তে পারছি না। অথচ চারজনের গন্তব্য একই দিকে।
মাহবুব আমাদের রিসিভ করার জন্য বাস-টার্মিনালে ছিল। পূর্বরাতের ঝড়-জলে সেও হয়তো ভিজেছিল। তাই যদি না-হবে জলের ছিটেফোঁটা কেন তার শরীরে লেগে আছে?
মাহবুব যখন বাসের পেট থেকে আমাদের লাগেজ টেনে আনে, আমি জলচিহ্ন দেখছিলাম। তার পরনের প্যান্টের পায়ের অংশটা ভেজা। পায়ের স্যান্ডেলটাও ভেজা-মলিন দেখাচ্ছিল। এসব নিশ্চয়ই বৃষ্টিপাতের বাসীজলের কারবার।
তখনও আমরা অটোতে চড়ি নাই। আর নদীর সাক্ষাৎ পাই নাই। পেলে হয়তো আমি অন্যকিছু ভাবতাম। রাস্তার বদলে মাহবুবকে না ঠিক মাহবুব নয়, মাহবুবের পায়ের পাতাগুলোকেই আমার নদী মনে হতে পারত। অথচ আমি দিব্যি দেখেছিলাম কালো-পায়ের-পাতায় টলটলে-জল!
কোনো কোনো মানুষের জল-ভেজা-পা শাপলা-ফুলের মতো দেখায়। সতেজ ও পবিত্র। সুগন্ধিযুক্ত। সব শাপলায় তেমন সুগন্ধ থাকে না। যে শাপলাফুল তারাকৃতি হয় তাতে সুগন্ধ বেশি থাকে। আর যেসব শাপলারা ভোর-ভোর ফুটে ওঠে। রোদ্দুরের সামান্য কিরণেই মেলে-রাখা পাপড়িগুলো গুটিয়ে ফেলে। অথচ ফুটন্ত অবস্থায় জলের ঢেউদের হালকা-সুবাসে আমোদিত করে রাখে। ওই ফুলের আমি মনে মনে নাম দিয়েছি তারাশাপলা। লাগেজ-টানার-সময় মাহবুবের ভেজা-পা দেখে আমার তারাশাপলার কথা মনে পড়েছিল। হতে পারে মফস্বলী-ভোরের-শ্রী আর নীরবতায় আমি মুগ্ধ ছিলাম। ফলে আমার ভাবনায় ফুল-পাখি-প্রজাপতিরা উড়ে এসেছিল।
অটো এসে থামে রুনিদের বাড়ির গেটে। আমি আর রুনি নামি। মাহবুব ফের লাগেজ টানে অথবা ভাড়া মেটায়। আমাদের সামনের বদ্ধ গেট হঠাৎ খুলে যায়। আমি বুঝতে পারি না কে খুলল গেট? না-কি আগেই খোলা ছিল? আমি তখন নদী-রাস্তা-তারাশাপলার বিভ্রান্তিতে। অথবা পদযুগলের ঘাপলায়। মাহবুব তখনও অটোর ভাড়া মেটায়।
বাড়ির ভিতর পা দিয়েই আমার মনে পড়ে যায় আলিবাবা আর চল্লিশ চোর। সেই মন্ত্র চিচিং-ফাঁক। রুনি তো চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল, তা হলে গেটটা খুলল কে? না-কি প্রায় মুখস্থ হয়ে যাওয়া মন্ত্রটি আমিই আওড়ে ছিলাম? কিন্তু রুনিদের বাড়িতে এই প্রথমবার এলাম আমিÑ ওদের মন্ত্র আমি কীভাবে জানব?
নদী আর জল-ভেজা-পথ, তারাশাপলার সৌরভ, বৃষ্টি¯œাত-পদযুগলের মতো ফের আমি রহস্যের ভিতর তালগোল পাকাই।
যাবতীয় বদ্ধ-দুয়ার খোলার-মন্ত্র কী একই না-কি? চিচিং ফাঁক!
গেটের ভিতরে এক টুকরো লন। তাতে বিছিয়ে থাকা সবুজ-ঘাস সাদাটে দেখায়। সকালের আলো এখনও ম্লান। সূর্যের শিশুদাঁত সবে হেসেছে। হয়তো ঘাসেদের রং বদলানো এই আলোতেই সহজ। কিন্তু আমি এগিয়ে গিয়ে দেখি ঘাসের রং সাদাটে অন্য কারণে। অজস্র পাকা-জামরুল ঘাসের ওপর বিছিয়ে রয়েছে। বাঁদুরের দঙ্গল রাতভর খাওয়া-আধাখাওয়া-আস্ত জামরুল এন্তার ফেলেছে।
লন পেরিয়ে ঘরের দরোজায় যেতে যেতে আলো যেন প্রায় নিভে আসে। মেঘ করলো না-কি ফের? ভেবে আমি ওপরে তাকাই। এক বিশাল বৃক্ষপাতা ঢেলে দাঁড়িয়ে আছে। সেও ফলবতী। এই বৃক্ষ আমি চিনিÑ বিলম্বী!
জামরুল আর বিলম্বীর সাথে ঝুলে আছে কামরাঙা। ঘরের দরোজা সাদা-রঙে-ডুবানো। এবং এই দরোজাও পূর্ববৎ খুলে গেলে আমার ফের মনে পড়েÑ
চিচিং ফাঁক!
খুব অনায়াসে ঘরে প্রবেশ করি আমি। ২০০ বছরের প্রাচীন এক গৃহ। সময় ও ধূলিতে অনুজ্জ্বল-হয়ে-পড়া আসবাবে পরিপূর্ণ!
পারস্য-গালিচার ওপর আলবোলার নল হাতে বসে আছে সুন্দরী-নর্তকী। ওই সালংকারা নর্তকী যেন এক্ষুণি গেয়ে উঠবেÑ পিয়া ঘর আনা। ঝাড়বাতির আলোতে ঝলসে উঠবে তার পরনের ঘাঘরা। ঝমঝমিয়ে বেজে উঠবে পায়ের ঘুঙুর। নৃত্যের তালে-তালে খুলে যাবে নাকের কুন্দনের নথ। আর ঝরে পড়বে খোঁপার তাজাফুল। অথবা ফুলেদের পাপড়ি।

০২
তরজার বেড়ার ঘরে টিনের চৌচালা। সবই সাদা রঙে ডুবানো। সুরকি আর চুনের গুঁড়ার মিশ্রণের ওপর নিপুণভাবে প্রলেপ দেওয়া। ফলে বাইরের উত্তাপ ঘরের ভিতরে কম প্রবেশ করে। চৌচালা-চালের কড়ি-বরগা অনেক উঁচুতে উঠে টিনের আচ্ছাদন নিয়েছে। ওপর থেকে নেমে আসা ভাঁপ-তাপও উঁচুতেই ঝুলে থাকে। প্রায় মরচে-ধরা বৈদ্যুতিক পাখার হাওয়ায় ওই ভাঁপ-তাপ মেঝেতে নামাতে পারে না। মেঝের ওপর প্লাস্টিক-ম্যাট বিছানো। বিবর্ণ-রং ও ভঙ্গুর-চেহারা আড়াল করার প্রয়াস। কিংবা হতে পারে প্রাচীন-জীবনকে নতুনের সাথে একাকার করে রাখা।
মোদ্দাকথা ঘরটা বেশ প্রশস্ত ও আরামদায়ক। এবং আমার পছন্দ হয়ে গেল। বহু পুরাতন আমলের খাট, তাতে নরম বিছানা। খাটের পাশ দিয়ে পার্সিয়ান খাটপোষ পেতে রাখা।
রুনি আর আমার একই বিছানা। যদিও আমি শোওয়া-শোওয়ি শেয়ার করতে পারি না; কিন্তু রুনির বাড়িতে এসে মেনে নিলাম। এর কারণও পেয়ে গেলামÑ এক. এই বাড়িতে দ্বিতীয় কোনো শোবার ঘর নাই। পেছনের ঘরগুলো কেয়ারটেকার মাহবুবের দখলে। দুই. রুনি এতটাই গুটিয়ে-শুটিয়ে ঘুমায় যে, আমার পাশে কেউ ঘুমাচ্ছে এটা বুঝা যায় না। এটা রুনির অভ্যাস না আভিজাত্য ঠিক ধরতে পারলাম না। অবশ্য অভ্যাসই কালক্রমে আভিজাত্যের অংশ হয়ে ওঠে।
খাটের পায়ের দিকে দেয়াল-ঘেঁষে ড্রেসিং-টেবিল। আর বহু পুরাতন কয়েকটা সোফা এদিক-সেদিক পেতে রাখা। সোফার গদিগুলো খটখটে। দুইটা পুরাতন স্টিলের-দেরাজ। এরাও সাদা রঙে ভরপুর।
মাহবুবের বউ তফুরার সারাক্ষণ তদারকিতে আমাদের দীর্ঘ-পথের ক্লান্তি উবে গেল। এই দম্পতির চারজন ছেলেমেয়ে। বড় মেয়েটার বয়স তের কি চৌদ্দ। নাম মাহি। বয়সের তুলনায় বাড়ন্ত গড়ন। আমার আর রুনির ফুটফরমায়েশের জন্য মাহি ছায়ার মতো লেগে রইল।
খাটের ওপর ঝকঝকে বিছানা। বালিশ-চাদর-বেডকভার। এত ঝাড়া-মোছা সত্ত্বেও ঘর থেকে পুরাতনী গন্ধটা বিলীন হয় নাই।
পারস্য-গালিচার ওপর স্থির বসে-থাকা নারীটির দিকে তাকিয়েও আমি তেমনই ভেবেছি। ধুলা পড়ে ওই নারীটির চেহারাও যেন ধুলাকার হয়ে গেছে। প্রাচীন-ঘর, আসবাব, কুশন-কভার, ঝালর-দেয়া-পর্দা। অথবা বেডকভার জুড়ে সময়ের-ধূলি-পড়া আবছা-গন্ধ! যা আমাকে নতুন কোনো অভিজ্ঞতার ভিতর ছুড়ে ফেলছিল। রুনি আমার মনোভাব বুঝার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তার সম্মুখে আমি ছিলাম নির্বিকার।
আমাদের শোবার ঘরের ভিতরেই বাথরুম। বেশ বড়সড়। প্রাচীন আমলের কমোড। ¯œানের জন্য চৌকোণাকৃতি জায়গা। তাতে জল আটকানোর ব্যবস্থা। একপাশে পুরাতনী বেসিন। বেসিনের ভেতরটা গভীর। রীতিমতো কুঁজো হয়ে মুখ ধুতে হয়। মরচে-ধরা জলকল। ও থেকে কীভাবে জল বেরোয়? আমি বিস্মিত হই।
তফুরা বেশ পরিশ্রমী। বেডকভার তুলে বিছানা ভালো করে ঝেড়েমুছে দেয়। ক্লান্তিতে আমি শুয়ে পড়ি। বিছানায় শুয়ে ওপরে তাকালে দেখিÑ চালটা যে টিনের তা বুঝার উপায় নাই। সাদা-মোটা-কাগজ দিয়ে পুরো ঘরটাই আবৃত। ঘুমের ভিতর ঢুকতে-ঢুকতে আমার মনে হয়Ñ টাঙানো কোনো সাদা-তাঁবুর তলায় শান্ত-¯িœগ্ধ-বিছানায় আমরা ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছি।
হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে যায়। এখন রাত কত? আমি বুঝতে পারি না। ঘরের ভিতর কালো-জালের-মতো অন্ধকার ছড়িয়ে রয়েছে। নতুন জায়গা বলে আমি পূর্ব-পশ্চিমও বুঝতে পারি না। কিন্তু এটুকু বুঝতে পারিÑ রুনি অঘোরে ঘুমুচ্ছে। ওর আপাদমস্তক কোনো কিছুতে ঢেকে রাখা। ফলে ও নারী না পুরুষ সেটিও অনুমান করার উপায় নাই।
তীব্র অন্ধকার খানিকটা চোখে সয়ে এলে আমি ফের রুনির দিকে তাকাই। ওর কোনো নড়াচড়া নাই। যেন কোনো শবদেহ পাশে শুয়ে আছে।
শবদেহ পাশে নিয়েই আমি হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়ার কারণ খুঁজি। কিন্তু কিছুই স্পষ্ট করে মনে করতে পারি না। তবুও এটা খেয়াল হয় যে, কোনো বিকট শব্দেই আমার ঘুম ভেঙেছে। এবং এটা ভাবার পরক্ষণেই আমি ফের ধুমধাম আওয়াজ শুনতে পাই। কিসের শব্দ বুঝতে পারি না। কিন্তু এটা বুঝতে পারি ঘরের চাল বেয়ে শব্দ নিচে নামছে। ভয়ে আমি কানের ওপর বালিশ চেপে ধরি। কিন্তু আরও জোরে শব্দ হতে থাকে।
গহীন-অন্ধকারের ভিতর শুয়ে-শুয়ে আমি শব্দ এড়ানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করি। এতকিছুর পরও রুনির ঘুম ভাঙে না। সে মৃতবৎ শুয়ে থাকে। আর আমি ভয়ের ভিতর সমর্পিত থাকি। আমার সমস্ত শরীর কুলকুল ঘামে ভিজে ওঠে। আমিও কি তবে রুনির মতো মারা যাচ্ছি?
ওই অন্ধকার রাত্রি কখন যে ভোরের দরজা খুলে দেয়Ñ আমি টের পাই না। বেশ বেলায় ঘুম ভাঙলে দেখি রুনি তখনও মরে আছে। ফের বিকট শব্দ হয়। এবং আমার অতি কাছেই। আমি তাকিয়ে দেখি এক বিড়াল।
বিড়াল আমার কাছে চিরকাল ভয়ের উৎস। ছোটকালেই আমরা জানতাম, বিড়াল শতরূপী হয়। যাকে বিড়াল মনে করছি সে আদতে অন্যকিছু। বিড়ালের বেশ ধরে এসেছে। সদ্য দেখা-পাওয়া বিড়ালের সঙ্গে আমার আই কনট্যাক্ট হয়। সে চোখ সরায় না। আমিও চোখ সরাই না। সে কি বিড়াল না বাঘ? তার গায়ে ঘিয়ে আর হলদে ডোরা। আর সে বেশ স্বাস্থ্যবান।
এই ঘরের দরোজা-জানালা সব বন্ধÑ সে ঢুকলো কীভাবে? কিন্তু সে যেমনি এসেছিল তেমনই হাওয়া হয়ে যায়। দিনের আলোতেও আমি ফের ভয় পেতে থাকি।
আমার অ্যালান পোর বিড়ালের কথা মনে পড়ে। আশ্চর্য! ভীতু মনে কত কী যে উদয় হয়। বিদেশি ওই বিড়ালের সঙ্গে বাংলাদেশি বিড়ালকে তুলনা করার কোনো মানে আছে?
বিড়ালটা কখন জানি হাওয়া হয়ে যায়। আর রুনি সামান্য নড়ে ওঠে। গ্রীষ্মকালে সামান্য হাওয়া বইলে নিমপাতা যেভাবে নড়ে ওঠেÑ সেভাবে। আচ্ছা, রুনি কি বিছানায় শোয়ামাত্রই মরে যায়? আর রোদ্দুর চড়তা হলে জীবন ফিরে পায়?
আমার হঠাৎ ‘সোনারকাঠি-রূপারকাঠি’ রূপকথার রাজকন্যার কথা মনে পড়ে। রুনি যে রাজকন্যা এটা তাকে দেখলেই অনুধাবন করা যায়। কিন্তু তাই বলে সোনারকাঠি-রূপারকাঠি বদল ছাড়া তার যে ঘুমও ভাঙে নাÑ এটা কি করে সম্ভব?
রুনি কথা বলে ওঠেÑ ‘কি রেÑ যা ঘুমাইলি রাতভর। একটুও নড়িস নাই।’
শুনে আমি অবাক হয়ে যাই।
আমি যেমন গত রাতে রুনিকে মরে যেতে দেখেছি, সেও কি আমাকে তেমনই দেখেছে?
বাথরুমে ঢুকে আমি দরজা বন্ধ করি। এতে করে রুনি ঘরের ভিতর আটকা পড়ে যায়। এ ঘরের বাসিন্দাদের কেউ বাথরুমে গেলে এভাবেই যেতে হয়। তফুরা যে দরজা দিয়ে ঢুকবে সেটাও বন্ধ রয়েছে।
পুরাতন মডেলের কমোড। পুরাতন কল। এমনকি কলের তলায় পেতে রাখা বদনাটাও বহু পুরাতন। রং-জ্বলা-নিষ্প্রভ। আমার বামপাশের দেয়ালে একটা ক্যালেন্ডার ঝুলছে। জুলাই মাস, ১৯৯৫। আমি চমকে উঠি। জুলাই মাস! তার মানে গত ২০ বছরে এই বাড়িতে কোনো নতুন বছর ঢুকে নাই।
এই বাড়িতে কেউ থাকে না তেমন তো নয়! মাহবুব আর তফুরা বাস করে। ওদের বাচ্চাকাচ্চা। বিদেশ থেকে রুনি আসে। ওর বোন ও ভাইও আসে। তা হলে ১৯৯৫ সাল কেন বাথরুমে ঝুলে আছে? এসব ভাবনার ভিতর আমি কল ছাড়ি। দীর্ঘকাল পর জলের সরু ধারা নামে। আয়রনের আধিক্য হেতু কফিরঙা জল। নাকি রক্ত! আমার শরীর হিম হয়ে আসে। আমি তড়িঘড়ি বদনা হাতে নিতেই ভয়ে কেঁপে উঠি। ধাতব স্পর্শের বদলে নরম ও কোমল অনুভূতিÑ একটা ডোরকাটা বিড়াল শুয়ে আছে। আর আমি তার পিঠে হাত রেখেছি!
০৩
রুনিদের প্রাচীন ঘরটার জানালা গলিয়ে দুদ্দাড় করে মেঘ ঢুকে পড়ে। ফলে ঘরের ভিতরটা ধোঁয়া-ধোঁয়া আর শীতল। বাতি-না জ্বালানো পর্যন্ত কিছুই স্পষ্ট দেখা যায় না। ওই মেঘকক্ষের ভিতর আমি চুপচাপ বসে থাকি। জানালার বাইরের অবিশ্রাম বৃষ্টি আমাকে অবাক করে দেয়। এই শহরে বড় অদ্ভুতভাবে জল ঝরে।
ঝরছে তো ঝরছেই। অক্লান্ত এই ঝরে পড়া। জামরুলগুলো জলে ভিজে টসটসা। পাতাগুলো জলমগ্ন। বিলম্বী গাছটাও অবিরাম ভিজছে। ভিজতে ভিজতে তার বাকল কালচে হয়ে উঠেছে। জলের ঝাপটায় ভিজে একসা কামরাঙা গাছটি। এন্তার বেগুনি-বর্ণ-ফুল ভেসে যাচ্ছে বৃষ্টি-¯্রােতে। বৃষ্টির প্রবহমান জলে ফুলরাশি ভাসতে দেখে আমার নদীর কথা মনে পড়ে। ফুলনদী! আহা! জলধারা ক্ষীণ হলেও এ তো নদী-ই। ফুলনদীÑ নইলে এত ফুল এর জলে ভেসে যায় কেন?
তুমুল তুফান আর বৃষ্টি। প্রচ- ঝড়ো-হাওয়া। আসমান ভেঙে পড়ছে জলধারা। থইথই শ্রাবণে আমি গৃহবন্দি। অটোরিকশায় আসার পথে নদীতে আমি জল উথলে উঠতে দেখেছিলাম। জল-ভরন্ত নদী আমাকে বলে দিয়েছিল ভরা-শাওন। নইলে ওই নদীকে অমন সোমত্ত দেখাত না! ভরা-বর্ষার সমস্ত চিহ্নই ফুটে রয়েছে এই শহরে। মাহবুবের জল-ভেজা-পা আর পিচরাস্তার ওপর গড়িয়ে যাওয়া বৃষ্টির দাগ।
রুনিদের জানলায় বসলেই আমি যেন ওই নদীটাকে দেখতে পাই। টিনের-চালে বৃষ্টির-ফোঁটা সংগীত-মুখর হয়ে ওঠে। জল-কণারা জানালার ফিনফিন পর্দায় মুক্তদানার মতো ঝুলে থাকে। মেঘ-থমথমে ঘরের ভিতর আমি হঠাৎ আরও দুটো দেরাজ দেখতে পাই। সাদা-রঙে-চুবানো। এই দুটো কেন আগে দেখিনি?
তফুরাকে জিজ্ঞেস করলে বলেÑ ‘খালাম্মা, এইহানে তো পানির পাম্প।’
ঘরের ভিতর পানির পাম্প! হতেই পারে। ২০০ বৎসর পূর্বে পানির পাম্প ঘরে রাখাই স্বাভাবিক।
ওই দিনও আমি রাতভর ঘুমাতে পারি না। বিদঘুটে শব্দরা আমাকে জাগিয়ে রাখে। হয়তো অ্যালান পোর বিড়ালেরা দলবেঁধে আসে। রুনির শবদেহ তেমনই নিঃসাড়। ভোরের দিকে তন্দ্রার ভিতর থেকে আমি হঠাৎ জেগে উঠে।
খাটের পাশে ড্রেসিং টেবিলের ওপর সুরকি-চুন-বালি আর কাঠের টুকরা ধসে পড়েছে। আমি অবাক হয়ে দেখিÑ ওই সুরকি আর চুনের স্তূপের নিচে এক বিড়াল লেজ নাড়ছে। কালো আর শাদাতে ডোরাকাটা। এই বিড়ালটিকে আমি আগে দেখিনি। তফুরা ছুটে আসে। মাহবুবও। ওদের মেয়ে মাহি। ওরা ভয়ার্ত মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। আমি ওদের চুপসানো মুখাবয়ব দেখি। ঘরের চাল দেখি। তাঁবুর মতো করে টানিয়ে দেয়া মোটা-কাগজটা একদিকে ঝুলে পড়েছে। হয়তো ওই পথেই সুরকি-চুন-বালি-কাঠের স্তূপ নেমেছে।
রুনিকে বিড়াল দেখার কথা বলতেই ও হা হা করে হেসে ওঠে।
‘এটা বিড়ালের কাজ। ঘরের চাল ভেঙে এই চুন-সুরকি-বিড়ালই ফেলেছে।’
বিড়াল কীভাবে অত উঁচু থেকে পড়ার পরও বেঁচে থাকে? আমার বোধগম্য হয় না। রুনিকে বলতেই সে বলেÑ
‘কি যে বলিস না! বিড়ালের হাড্ডি। ওরা সহজে মরে না।’
ওই ভাঙা-আবর্জনাতে আমি সিমেন্টের প্লাস্টারের অংশও দেখেছি। যদি ওসবই আমার বা রুনির মাথার ওপর পড়ত?
তফুরা আর মাহি ওইসব ধস ঝাঁট দিয়ে তুলে নিয়ে যায়। আমি হঠাৎ তাকিয়ে দেখি তফুরার পা-দুটো ভেজা-ভেজা দেখাচ্ছে। যেন সে এক্ষুণি পা ধুয়ে এসেছে।
তফুরার পদযুগলকে তারা-শাপলার মতো দেখায়। আমার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় আবছা-সুঘ্রাণ পাই।
ওই দিনের দুর্ঘটনার পর আমি রুনিদের বাড়ির সর্বত্র বিড়াল দেখি। যখন ডাইনিংয়ে খেতে বসি আমার পায়ের কাছে বিড়াল চলাফেরা করে। বাঘের মতো ডোরাকাটা বিড়াল। তফুরা উঁকিঝুঁকি দিয়ে বলেÑ
‘কই খালাম্মাÑবিড়ালউড়াল কিচ্ছু নাই।’
শ্রাবণ-মাসের বৃষ্টি ফের ঘন হয়ে নামে। বৃষ্টির পর্দা ভেদ করে আমি বিলম্বী গাছটাকেও আর দেখতে পাই না। এমনকি জামরুলের পত্র-শাখাও অস্পষ্ট দেখায়।
মেঘের বড়সড় চাঙর ঝুলে থাকে রুনিদের জানালায়। সেই ধূপছায়া রঙের ভিতর দিয়ে আমি আলোর ছিটেফোঁটাও দেখি না।
টিনের চালে ছোট-বড় নানারকম ফোঁটায় বৃষ্টির সংগীত বেজে চলে। আর মেঘের শরীরে মেঘ ঘনায়। বিজলী চমকালে আমি দেখি, রুনিদের চাল থেকে চুন-সুরকি-কাঠের টুকরা খুলে পড়ছে। চুন-সুরকির স্তূপ জমে ওঠে। আর সেখান থেকে এক বিড়াল মুখ বের করে ডেকে ওঠে!
গাছপালা-বাড়িঘর যাবতীয় কাঁপিয়ে কাছেপিঠেই কোথাও বাজ পড়ে। কিন্তু ওই বিড়াল আমাকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রাখে যে, আমি অন্যদিকে মনোযোগী হই না। ফলে রুনিদের প্রাচীন ঘরটা ধসে পড়ার শব্দও আমার কানে আসে না। হয়তো ওটা বাজ পড়ার শব্দও হতে পারে।
ঝড়ো-হাওয়া প্রচ- দাপট নিয়ে মেঘেদের ঘনঘন ডেকে আনে আর বিজলী চমকায় দুই চক্ষু অন্ধ করে দিয়ে। আমি রুনিকে ডাকার চেষ্টা করি; কিন্তু পারি না। আমার গলা ফুটে কোনো শব্দ বেরোয় না। আমি শুধু অনুভব করি, পানির পাম্প দিয়ে অসংখ্য বিড়াল ওঠানামা করছে। আর বিড়ালদের পদশব্দে একটা প্রাচীন বাড়ি ভেঙে পড়ছে।
আমার হঠাৎ মনে পড়েÑ আমি বিড়ালদের নিয়ে না-ভেবে ওই নদী নিয়ে ভাবতে পারতাম। রুনিদের বাড়িতে আসার সময় যে বরফ-গলা-নদী দেখেছিলাম। আদতে ওটা ছিল একটা সংকেত। আর নদীটা ছিল মুক্তিযুদ্ধে শহীদ লেখক জহির রায়হানের নদী। আমি যদি একবার ওই নদীর কথা রুনিকে বলতাম। মাত্র একবার! ‘বরফ গলা নদীর’ দৃশ্যাবলি নিয়েও যদি একটিবার কথা বলতাম দুজন! তা হলে হয়তো এই ঝড়-জলের তা-ব আমরা এড়াতে পারতাম। আমাদের নিশ্চিত অথচ অপঘাত-মৃত্যুও হয়তো আটকাতে পারতাম। দুঃখের বিষয়, বিদেশি বিড়ালদের নিয়ে আমরা এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে, ওই নদীর কথা একেবারেই স্মরণ হয় নাই।
ফের তুমুল ঝড় আর বৃষ্টিতে আক্রান্ত হলে আমার আর রুনির যুগপৎ মনে পড়েÑ নদীটার নাম ছিল ‘বরফ গলা নদী’। মফস্বলের নদীগুলোর এমন আজগুবি নামই হয়!

শ্রেণী:

ঘাস কবুতর ও শেখ মুজিব

41

41ইমরুল ইউসুফ : সিঁড়ি বেয়ে রক্ত গড়াতে গড়াতে সবুজ ঘাসের গোড়ায় জমা হতে থাকে। কিন্তু এক জায়গায় বেশিক্ষণ থেমে থাকে না। রক্ত গড়াতে থাকে। ঘাসের গোড়ায় গোড়ায় জড়িয়ে যেতে থাকে রক্ত। ঘাসগুলো তখন কেমন জানি অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। দম বন্ধ হয়ে যেতে লাগল। গড়িয়ে আসা জিনিসটি কেমন জানি ভারী ভারী। আঠা আঠা, চটচটে। রংটাও কেমন জানি। খুবই অচেনা। আগে কখনও এমন কিছু গড়িয়ে ঘাসের গোড়ায় যায় নি। ঘাসের ওপরে পড়েনি। ঘাস চেনে পানি। সেই পানি তরল, নরম, রংহীন। কিন্তু কী যে শক্তি সেই পানিতে। পানির ছোঁয়া পেয়েই ঘাসগুলো তরতাজা হয়ে ওঠে। আনন্দে মাথা উঁচিয়ে উঁচিয়ে আকাশ দেখতে থাকে। বাতাসের ছোঁয়া পেতে থাকে। দুলতে থাকে দোলকের মতো।
একটি কবুতর পেখম মেলে দুলতে দুলতে নিচে নেমে আসে। দেখে লাল রঙের কিছু একটা গড়িয়ে আসছে তার দিকে। দূর থেকে অনেকটা সাপের মতো দেখা যাচ্ছে। ওটা কি সাপ? না! তারপরও কবুতরটি এক পা দু পা করে পিছন দিকে পেছাতে থাকে। আর রক্তের ধারা এগিয়ে যেতে থাকে তার দিকে। এখন মুখোমুখি রক্তের ধারা ও কবুতর। কবুতরটি বাকবাকুম করে ডাকতে থাকে। উড়ে উড়ে সেখানে ঘুরতে থাকে। দেখতে থাকে রক্তের বয়ে যাওয়া। কোথায় যাচ্ছে রক্ত? এই মুহূর্তে কী করা উচিত কবুতরটি ভেবে পায় না। শুধু উড়তে থাকে।
উড়তে উড়তে বসে একটি গাছের ডালে। ওটাকে গাছের ডাল বলা যাবে না। বলা ভালো পাতা। কবুতরটি একটি পেঁপে গাছে বসেছে। গাছটি তার অতি প্রিয় একজন মানুষের লাগানো। মানুষটি অসম্ভব পেঁপে ভক্ত। সকালের নাস্তায় পাতলা রুটির সঙ্গে পাঁচফোড়ন দেওয়া পেঁপের সবজি। আর কিছুই লাগে না তার। আর পাকা পেঁপে তার কাছে অমৃত। এজন্য বাড়ির দেয়ালের পাশ দিয়ে তিনি অনেক পেঁপে গাছ লাগিয়েছেন। শুধু কি পেঁপে গাছ। কত গাছ যে তিনি লাগিয়েছেন তার কোনো হিসাব নেই। ফলের গাছ। ফুলের গাছ। ঔষধি গাছ। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কবুতরটি বঙ্গবন্ধুকে ভীষণ পছন্দ করে। শুধু কি ওই কবুতরটি? না, এই বাড়ির প্রত্যেকটি কবুতরের কাছে তিনি খুব প্রিয় একজন মানুষ। প্রত্যেকটি গাছের কাছেও তিনি অতি প্রিয়।
কবুতর দলের প্রিয় মানুষটি এখনই আসবেন। হাত উঁচিয়ে ছিটিয়ে দেবেন খাবার। তিনি মোটা ফ্রেমের চশমার ভিতর দিয়ে দেখতে থাকবেন কবুতরদের খাবার দৃশ্য। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে একে অপরের গায়ে মুখ ঘষে নেওয়ার দৃশ্য। একজোড়া কপোতের ডিগবাজি খাওয়ার প্রতিযোগিতা। কিংবা কান পেতে শুনবেন বাকবাকুম বাকবাকুম ডাক। কবুতরগুলো ভীষণ অস্থির হয়ে উঠেছে মানুষটির জন্য। একে অপরের দিকে তাকিয়ে ডাকাডাকি করছে। কবুতরের খোপের মধ্য দিয়ে মুখ বাড়িয়ে তাকাচ্ছে এদিক-ওদিক। কই, তিনি তো আসছেন না। একটি কবুতর বলল, আসবেন। এখনই আসবেন। কেবল তো ভোর হলো। ওনার হয়তো এখনও ঘুমই ভাঙেনি। ঘুম ভাঙলেই তিনি আমাদের কাছে আসবেন। খাবার দেবেন।
সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও কেউ তাদের খাবার দিতে আসে না। বাড়তে থাকে কবুতরদের অস্থিরতা। ক্ষুধায় পেট চো চো করতে থাকে। আর সহ্য করতে না পেরে প্রায় সব কবুতর ওড়াউড়ি শুরু করে। খাবার খুঁজতে থাকে। সেই সাথে খুঁজতে থাকে প্রিয় মানুষটিকে। কিন্তু না, কোথাও নেই প্রিয় সেই মানুষটি। তিনতলা বাড়ির আশপাশে একজনও চেনা মানুষ নেই। সবাই তাদের কাছে অচেনা। সবার পরনে কালো পোশাক। হাতে অস্ত্র। মানুষগুলো এখানে দাঁড়িয়ে কী করে? একটি কবুতর বলে, আরে চল চল আর দেখতে হবে না। দেখছিস না ওদের হতে অস্ত্র। ওই অস্ত্রের একটি ফায়ারই যথেষ্ট। আমাদের আর বাঁচতে হবে না। এই কথা বলেই কবুতর দল বাড়ির পিছন দিকটায় চলে যায়।
বাড়ির ঠিক পিছন দিকটায় একটি রান্নাঘর। কবুতরের ঘরটি ঠিক ওই রান্নাঘরের পাশেই। কবুতরাগুলো ভাবেÑ ওই রান্নাঘরে যদি ঢোকা যেত তা হলে কিছু না কিছু খাবার পাওয়া যেত। এই ভেবে কবুতরগুলো উড়ে রান্নাঘরের দরজার সামনে আসে। দেখে দরজা বন্ধ। কবুতরগুলো হতাশ হয়ে সামনের দিকে হাঁটতে থাকে। সামনে একটু এগিয়ে ডান হাতে গাড়ি রাখার ঘর। এর ঠিক বাম হাতে চিকন রাস্তা। ওই রাস্তা ধরে সোজা সামনের দিকে পা বাড়ালে বাইরে বের হওয়ার পথ। রাস্তার দুপাশে সবুজ লকলকে ঘাস। বিভিন্ন ফুলের গাছ। কবুতরগুলো ঘাসের মধ্যে খাবার খুঁজতে থাকে। দু-একটি দানা খুঁজে পেয়ে তাদের সেকি আনন্দ!
এই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। একটি কবুতর এমনভাবে বিকট শব্দ করে ওঠে যে বাকি সবাই ভয় পেয়ে যায়। ওড়াউড়ি শুরু করে। বলে, এখানেও রক্ত! বাড়ির চারদিকে এত রক্ত কেন? লাল লাল খাবলা খাবলা রক্ত। বেশ কিছু সময় আগে যে রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছিল সব। সেই রক্তের ধারা থেমে গেছে এখন। একটি কবুতর বলে, এটি আমি সেই সকালে বাড়ির সামনের দিকে দেখেছি। এখানেও দেখছি সেই রক্ত। কিন্তু জমাট বাঁধা। এমন অবস্থা দেখে কবুতরগুলো ভয়ে উড়ে আরেটু সামনের দিকে যায়। দেখে আরও কিছু অচেনা মানুষ। তারা একজন দুজন তিনজন… অনেক মৃত মানুষকে বাড়ির ভিতর থেকে টেনে টেনে বের করছে। সবার শরীরে রক্ত। কাপড় রক্তে ভিজে জবজব করছে। চেহারা বিকৃত, মলিন। তবে ভীষণ শান্ত। এর মধ্যে একজন মানুষকে তাদের খুব চেনা। সেই সকাল থেকে এই মানুষটিকেই তারা খুঁজছে। কিন্তু মানুষটা যে শুয়ে আছেন। এই মানুষটিকে তারা কখনই শুয়ে থাকতে দেখে নি। তার সমস্ত শরীর ভিজে গেছে রক্তে। পরনের সাদা-কালো চেকের লুঙ্গি। গায়ের সাদা গেঞ্জি ও পাঞ্জাবি। কালো রঙের সিগারেটের পাইপ, দিয়াশলাই। সবই রক্তে ভেজা।
এমন দৃশ্য দেখে কবুতরগুলোর চোখও ভিজে ওঠে। চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। এগিয়ে যেতে থাকে বঙ্গবন্ধুর দিকে। কিন্তু অচেনা সেই মানুষগুলো তাদের সামনের দিকে যেতে দেয় না। হাত পা ছুড়ে, বন্দুকের নল উঁচিয়ে হই হই করে তাড়িয়ে দেয়। তারা বেশি দূরে যায় না। গাছের ডালে বসে দেখতে থাকে। শান্ত সৌম্য ওই মানুষটির বাম হাতটা বুকের ওপর ভাঁজ করা। ১৮টি গুলির আঘাতে তার বুক, পেট, পা, হাত ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। একটি গুলি লেগেছে তার মাথার ঠিক পিছনে। ৯টি গুলি চক্রাকারে বিদ্ধ হয়েছে বুকের ঠিক নিচে। একটি বুলেট ডান হাতে তর্জনীতে লাগার ফলে আঙুলটি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে চামড়ার সাথে ঝুলে আছে। লম্বা চওড়া ওই মানুষটিকে নিয়েই সবাই যেন একটু বেশি ব্যস্ত। সবার চোখে-মুখে ভয়। যেন মৃত এই মানুষটি এখনই উঠে দাঁড়াবে। হুঙ্কার দিয়ে বলবে, এখানে কী চাও?
মৃত ওই মানুটিকে নিয়ে কিসের এত ভয় ওদের? আসলে কী চায় তারা। বোধহয় বঙ্গবন্ধুকে লুকিয়ে রাখতে চায়। এখান থেকে সরিয়ে দূরে কোথাও নিয়ে যেতে চায়। তা না হলে বড় একটি বাক্স আনা হলো কেন? ভাবতে থাকে কবুতরগুলো। দেখে ওই বাক্সের মধ্যে তাদের প্রিয় মানুষটিকে রাখার চেষ্টা হচ্ছে। সাত-আটজন মানুষ কিছুতেই যেন লাশটি বাক্সে তুলতে পারছে না। লাশটি কেবলই তাদের হাত থেকে সরে সরে যাচ্ছে। একবার মাথার দিকটি ঝুলে যাচ্ছে। আরেকবার ঝুলে যাচ্ছে মাজার দিকটি। আবার কখনও পায়ের দিকটি। একটি দেশের জন্মদাতার লাশ তো একটু ভারীই হবে। অনেক কষ্টে দুমড়ে-মুচড়ে লাশটি ভরে ফেলা হলো ওই বাক্সে। বাক্সের ওপরের অংশ ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো। তারপর কোণায় কোণায় ঠোকা হলো কয়েকটি পেরেক। কফিনে পেরেক ঠোকার শব্দে কবুতরগুলো কেঁপে কেঁপে উঠল। যেন তাদের মাথা থেতলে দেওয়া হচ্ছে পাথরের সাথে।
কফিনের সাথে সাথে কবুতরগুলোও যাচ্ছে। একবার ডানে। একবার বামে। খোলা উঠোন পেরিয়ে রাস্তা। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি গাড়ি। এর মধ্য থেকে একটি গাড়িতে তোলা হলো তাদের প্রিয় মানুষটিকে। কফিন থেকে তখনও টপটপ করে রক্ত পড়ছে। রক্ত গড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। ঘাসে ঘাসে। সবুজে সবুজে। সারা বাংলাদেশে।
লেখক : সহ-পরিচালক, বাংলা একাডেমি

শ্রেণী:

আর্নিলা ও আমাবুড়ি

50

একদিন গভীর রাতে মুক্তিবাহিনী মাইন ফুটিয়ে উড়িয়ে দিল নাগলা ব্রিজ। দুপক্ষের তুমুল গোলাগুলি হলো। মুক্তিবাহিনীর কাছে টিকতে পারল না রাজাকার। জিপ নিয়ে উল্টো পথে পালিয়ে গেল মিলিটারি। পাকবাহিনীর যোগাযোগের পথ বন্ধ হলো।

50ঝর্ণা রহমান: এপ্রিলের দুপুরের তাতানো রোদ্দুরে এক চিলতে নালার মতো খালটির পানি একেবারে তপ্ত হয়ে আছে। এই খালটি না-কি একসময় ছিল দর্ষা নদীর শাখা। সে কোন আমলে তা জানে না আর্নিলা। কালে কালে নদী শুকিয়ে খাল, এখন খাল শুকিয়ে নালা।
আজ উপবাসে আছে আর্নিলা। খুব ক্লান্ত লাগছে। রোদে গরম হয়ে উঠেছে মাথা। বাঁ দিকের কুঁচকে যাওয়া চোখ আর গালের পোড়া চামড়াটা যেন আগুনের ছুরি দিয়ে চিরে দিচ্ছে কেউÑ এমন চিড়বিড় করে জ্বলে। তারপরেও চোখ বুঁজে একবার নিলীনার মুখটা স্মরণ করে আর্নিলা। তালের শাঁসের মতো মুখ। সব সময় মুখটাকে মনে হতো জলে ভেজা। টলটলে। এবারের উপবাস নিলীনার জন্য পরম প্রার্থনায় উৎসর্গ করেছে আর্নিলা। চোখের কোণাটা একটু জ্বলে ওঠে। ওড়নার প্রান্ত দিয়ে ডান চোখটা চেপে ধরে আর্নিলা। গরম এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। গলিত বাঁ চোখটা দিয়ে এমনিতেই মাঝে মাঝে ঘন রস নেমে আসে। তার কোনো অনুভূতি টের পায় না আর্নিলা। শুধু মুছতে গিয়ে বখাটে হিরুর শুয়োরের মতো ছুঁচালো ঠোঁট ঠেলে বেরিয়ে আসা হিংস্র চেহারাটা মনে পড়ে। অথচ এই চেহারাটাই একদিন ভালো লেগেছিল আর্নিলার।
আজ শুক্রবার। মাঝখানে আর একটা দিন আছে রোববার আসতে।
এই রোববারটি পুণ্য রোববার। ইস্টার সানডে। প্রভু যিশুর পুনরুত্থান দিবস। বিস্তর কাজ জমে আছে বাড়িতে। মা একা একা সব সামাল দিতে পারে না। রোববার চার্চে যেতে হবে। সেদিন ফাদার নিকোলাস ওদেরকে বাইবেল থেকে সদাপ্রভু ঈশ্বরের বাণী পড়ে শোনাবেন। শোনাবেন প্রভু যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করার কাহিনি। তারপর শোনাবেন কেমন করে মানুষের মঙ্গলের জন্য ত্রাণকর্তা যিশু মৃত্যুর ঘুম ভেঙে কবর থেকে উঠে এলেন।
দু’কান ভরে মহান যিশুর কাহিনি আর ধর্মীয় বাণী শুনে শুনে ওরা সবাই মাথা দোলাবে। বুকে ক্রস এঁকে ফিস ফিস করে বলে উঠবে, প্রভু আমাদের দয়া করো। আকাশ আর মাটির ঐশ্বর্যকে আমাদের জীবনে সত্য করে তোলো। আমাদের কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করো। আর ঝু-ু-বুড়ো কেউ তখন মাথা দোলাতে দোলাতে আপন মনে বিড় বিড় করে বলবে সাংসাবেক-সাংসাবেক-সাংসাবেক। গাছের ফাঁক দিয়ে আকাশে তাকিয়ে টাটারা রাবুগা, সালজং, চোরাবুদিÑ এসব আদি দেবতার নাম জপতে থাকবেন বুড়িরা। এ দেবতাদের কেউ বিশ্বজগতের ¯্রষ্টা, কেউ সূর্য-দেবতা, কেউ ফসলের রক্ষাকর্তা। আর্নিলা আকাশে মুখ তুলে গনগনে সূর্যের দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে বলে, হেই সালজং, এত রাগ কেন তোর? সব জ্বালাইয়া দিবি না-কি হ্যাঁ?
পা থেকে বুনো ঘাসের চপ্পল জোড়া খুলে নিয়ে খালের পানিতে পা রাখে আর্নিলা। রোদ্দুরে তাতানো পানি। তার পরেও ক্লান্ত ক্ষুধার্ত শরীরে শুকনো পায়ে পানির ছোঁয়া ভালো লাগে আর্নিলার।
আর্নিলাকে সবাই কাটছাট করে ডাকে নিলা। তবে ১৯ বছর আগে ব্যাপ্টিস্ট মিশনের ফাদারের দীক্ষা প্রদানের সময় নামকরণ খাতায় ওর পুরো নাম লেখা আছে। আর সপ্তম শ্রেণির পর পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেলেও, এখনও স্কুলের খাতায় আছে ফাদার রবার্টের দেওয়া নিলার পুরো নামÑ আর্নিলা আগাথা চাম্বুগং। চাম্বুগং আর্নিলার মায়ের পদবি। আর্নিলার মা পার্মিলা চাম্বুগং ছিল বলেই ওরা কটি প্রাণী যেন এখনও বেঁচে বর্তে আছে। নইলে ওদের আদি ধর্ম ‘সাংসাবেক’ বা আদি বুলি ‘আচিক ভাষা’র মতো ওরাও কবে হারিয়ে যেত। হালুয়াঘাটের গাজীর ভিটা গ্রামে অনল ছিশিম-এর বউ পার্মিলা চাম্বুগং-এর দুখানা মাটির কুটির বসানো এই ছোট্ট জংলাঝুপি বাড়িটির অস্তিত্বও আর থাকত নাÑ ওটার নাম-নিশানা বদলে ভিন্ন চেহারার বাড়ি হয়ে যেত। যেমন বদলে গেছে সুবোধ অনাদি আর ডেভিডের বাড়ি। ওগুলো এখন রংচঙা টিনের ঘর, নকশি দেয়াল, পাকা উঠোন নিয়ে পিকনিক স্পট হয়েছে।
কিন্তু ভিটাবাড়িটি আঁকড়ে ধরে রাখতে পারলেও বাড়ির হালটে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী পুরনো নাগেশ্বর গাছটিকে রাখতে পারেন নি পার্মিলা। বেঁচে দিতে হয়েছে। অনেক টাকার দরকার ছিল। আর্নিলার চিকিৎসার খরচ, হিরুর নামে মামলা করার খরচÑ অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যও তো টাকা লাগে! পার্মিলা চাম্বুগংÑ মুক্তিযোদ্ধা সোমেনের ভগ্নিÑ তাকে তো বসে থাকলে চলবে না! যুদ্ধে নামতে হয় পার্মিলাকে।
আর আর্নিলা? সে হলো সোমেনের ভাগ্নী। মামাকে দেখেনি আর্নিলা। কিন্তু চামড়ার তলায় অনুভব করে তার রক্তের তাপ। যুদ্ধ তো তাকেও করতে হবে! মা মেয়ে দুজনই যুদ্ধ করেছে। মুখের এক পাশ বিকৃত হলেও সুস্থ হয়ে উঠেছে আর্নিলা। আর আদালতের বিচারে সাত বছরের জেল হয়েছে হিরুর।
হিরুর বাপ মকসেদ ব্যাপারির চোরাই মাদকের ব্যবসা। বনের গাছ কেটে কাঠ পাচারের বাণিজ্য।
বিস্তর টাকা হিরুর পকেটেও। হিরু গলায় রুমাল বাঁধে। কড়া সেন্ট মাখে। থুতনির তলায় এক গোছা দাড়ি। হাতে অষ্টধাতুর বালা আর গলায় পরে রুপার চেন। হিরুকে দেখায় হিরোর মতোই।
স্কুলে যাওয়া আসার পথে এক-একদিন সাইকেল চালিয়ে সাঁৎ করে আর্নিলার সামনে চলে আসত পাশের গাঁয়ের যুবক হিরু। স্কুলে যাবার পথে পকেট থেকে সে কোনো দিন আর্নিলাকে বের করে দিত এক মুঠো বকুল ফুল, কোনোদিন বুট ভাজা বা মিষ্টি পান। মাঝে মাঝে নিজের সাইকেলটাও চালাতে দিত। বেশ মজা লাগত আর্নিলার। ভালোই লাগত হিরু দাদাকে।
একদিন হিরু সাইকেল চড়িয়ে স্কুলে পৌঁছে দেবার নাম করে একটা পুরনো মন্দিরে নিয়ে তোলে আর্নিলাকে। হিরুর সাথে বেশিক্ষণ লড়াই চালিয়ে যেতে পারে না কিশোরী আর্নিলা। হাত-পা ঠেসে ধরে মুখে রুমাল গুঁজে দিয়ে আর্নিলার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হিরু। তবে একসময় বিধ্বস্ত আর্নিলাকে আর একবার দুহাতে জড়িয়ে ধরে মোবাইল ফোনে ছবি তোলার কসরৎ চালানোর সময় হাতের কাছে কুড়িয়ে পাওয়া একটা ইট দিয়ে শরীরের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে হিরুর মাথায় একটা মোক্ষম ছ্যাঁচা দিতে পেরেছিল আর্নিলা। তারপর দ্রুত হিরুর সাইকেলটা চালিয়েই ফিরে এসেছিল। গির্জার পশ্চিম দিকের জঙ্গলে নেমে সাইকেল ফেলে সোজা বাড়ি চলে এসেছিল।
ঘটনা শুনে পার্মিলা মেয়েকে কাহাইলের ছিয়া দিয়ে চোরা মার মেরেছিল।
নাক টিপলে দুধ গলে তোর এত বড় সাহস!
ভালো করে বুনি-ওঠেনি-মেয়ে পিরীত করতে যায় ড্যাকরা ছোঁড়ার লগে। তাও নিজের সমাজের নয়।
কিন্তু আর্নিলার কী দোষ! ছোট মেয়ে। সরল মনে হিরুর সাথে গেছে।
তবে আর্নিলার বাপ ঘরের চালা থেকে ট্যাঁটা খুলে নিয়ে লাফিয়ে উঠেছিল। খতম করে দেবে শুয়োরের বাচ্চাকে। চেয়েছিল থানায় গিয়ে নালিশ করতে। কিন্তু পার্মিলা কিছুই করতে দেয়নি। চুপ করে যাও। মেয়ের বাপ চেপে যাক এসব। মেয়ে এখনও রজঃস্বলা হয়নি। তাই অন্য কোনো ভয় নেই। তবে ঘটনা সমাজে জানাজানি হলে মেয়েকে কোচ দিয়ে গেঁথে ফেলা হবে।
পার্মিলার কথা না শুনে উপায় নেই। বুড়ো শাশুড়ি পরমনির মাথা ঠিক নেই। পার্মিলাই এই সংসারের ‘নকনা’।
শরীর একটু সেরে উঠলে আবার স্কুলে যাওয়া শুরু করেছিল আর্নিলা। একদিন পথ রোধ করে দাঁড়াল হিরু। সেদিন হিরু সাইকেলে নয়, মোটরসাইকেলে। এক পা প্যাডেলে আর এক পা মাটিতে ঠেকিয়ে রেখে দাঁড়ায়। হিরুর মাথা চাঁছা ছোলা। একপাশে গভীর ত্যারছা দাগ। সেলাইয়ের দাঁত কেলিয়ে আছে চামড়ার ওপরে। ভয়ঙ্কর দেখায় হিরুকে। প্যান্টের পকেট থেকে আস্তে-ধীরে বের করে আনে নতুন এক উপহার। ‘তোর লেইগা নয়া গিফট’ বলে হিরু বাতাসে হিস হিস করে নাচায় হাত। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আর্নিলার সবুজ চাঁদের মতো গোলাকার শ্যামল মুখের চামড়ায় ছিটকে পড়ে তরল আগুন।
খাল পেরিয়ে আবার চপ্পল জোড়া পায়ে পরে নেয় আর্নিলা। ধানের খড় আর বুনো ঘাস দিয়ে তৈরি চপ্পল। পাহাড়ি বুনো ফল রোদে শুকিয়ে গুঁড়ো করে জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় নানারকম রং। রঙের চাকতিও থাকে। শুকনো খড়কুটো বা ঘাস সেই রঙে চুবিয়ে জ্বাল দিয়ে আবার রোদে শুকানো হয়। এরপর রঙিন খড়কুটো দিয়ে নকশা করে বোনা হয় চপ্পল, হ্যাট, ব্যাগÑ নানারকম শৌখিন সামগ্রী। আর্নিলা এসব হাতের কাজে খুব পটু। স্থানীয় বাজারে হ্যান্ডিক্রাফটসের দোকানগুলোতে আর্নিলা তার হাতে বানানো জিনিসপত্র দিয়ে আসে। চপ্পলগুলোই ভালো বিক্রি হয়।
আর্নিলার ভেজা পায়ের পাতায় লাল টুকটুকে ঘাসের চপ্পল ফুলের মতো ফুটফুটে দেখায়।
সূর্যপুর বাজার থেকে গাজীর ভিটা তক যাওয়া-আসা করতে গিয়ে আজ যেন একেবারে জিভ বেরিয়ে যাচ্ছে। বড় কড়া নিদাঘ। সকালে কাঁচকলা আর মেন্দা পাতার ঝোল দিয়ে একমুঠো বাসি ভাত খেয়েছে। সারাদিনে আর কোনো খাবার খাওয়া যাবে না। একবারে খাবে সন্ধ্যার পর। যাই হোক, তবুও দীপক চিরানের সাথে দেখা করে কথা বলে আসতে পেরেছে, তার জন্য এখন ক্লান্তিটাকে আর ক্লান্তি মনে হচ্ছে না।
হালুয়াঘাটে প্রথমবারের মতো গারো সংস্কৃতি মেলা হতে যাচ্ছে। রাংরাপাড়া ট্রাইবাল সেন্টার এই মেলার আয়োজন করবে। মেলায় দীপকের হস্তশিল্পের স্টলে আর্নিলাও তার কিছু হাতের কাজ রাখবে। দীপক শুধু রাজিই হয়নি, ওকে খুব উৎসাহও দিয়েছে। লেগে থাকো নিলা। কাজ করো। তোমার কাজ খুব ভালো। দীপকের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে ওঠে। মেলা শুরু হতে আরও দুসপ্তাহ। এর মাঝে আর্নিলা চপ্পল ব্যাগ টুপি এসব ছাড়াও আরও নতুন কিছু জিনিসপত্র বানিয়ে ফেলতে চায়। মেলা শেষ হলে নিজের বাড়িতেই তার তৈরি জিনিসের একটা বিক্রয়কেন্দ্র খুলতে চায়। কিছু টাকা জমলে পরে বাজারে একটা দোকান করারও চিন্তা আছে।
আর্নিলা আরও অনেক কিছু করতে চায়। পড়াশোনাটা আবার শুরু করতে চায়। আবার স্কুলে ভর্তি হতে চায়। স্কুলের পড়া শেষ করে কলেজে পড়তে চায় আর্নিলা। গ্রামে গারো শিশুদের জন্য একটা পাঠশালা খুলতে চায়। ছোট বোন মারিয়াকে শহরের ভালো স্কুলে ভর্তি করাতে চায়। পাহাড়িদের অধিকার রক্ষার জন্য লড়াই করবে আর্নিলা। নিজের ভাষাÑ আচিক ভাষা রক্ষা করতে চায়। গারোদের আদি ভাষার গান ছড়া প্রবাদ এসবও সংগ্রহ করবে।
আমাবুড়িÑ আর্নিলার নানী, যার বয়স প্রায় ৮৫ বছর, মাঝে মধ্যে আদি ভাষায় বিড়বিড় করে কথা বলে ওঠে। বাড়িতে কেউ আর পুরোপুরি পাহাড়ি ভাষায় কথা বলে না। বেশির ভাগ বাংলা ভাষাই বলে। নয় মেশানো। আর্নিলা আচিক ভাষাটা জানেও না। প্রাইমারি স্কুলে টুকটাক কিছু শব্দ শিখেছিল, সেটুকুই। আমাবুড়ির কথাগুলো টুকে রাখে ও। কখনও মায়ের কাছ থেকে শুনে লিখে রাখে প্রবাদ প্রবচন ছড়া আর গান।
দাদা-দাদি নেই আর্নিলার। অনেক আগেই তারা গত হয়েছেন। দাদা-দাদি বেঁচে থাকলে এখন আর্নিলা ওদের ‘আচ্চু’ আর ‘আম্বি’ বলেই ডাকত। নিজের ভাষাটাকে মরে যেতে দেওয়া যাবে না। আর্নিলা আচিক ভাষাকে বাঁচিয়ে তুলতে চায়। নিজেকেও বাঁচিয়ে তুলতে চায়। গলিত চোখ আর পোড়া গালটাকে মনে রেখেই।
এসব চাওয়া আর্নিলার মাথার ভেতর খোপে খোপে ঠেসে ভরা আছে। কোনটা দিয়ে শুরু করবে সেটা অবশ্য বুঝতে পারছে না। যেটাই শুরু করবে তার জন্য পয়সা লাগবে। পয়সা কে দেবে? নুনভাতের পয়সা জোগাড় করতেই ওর মায়ের জান বেরিয়ে যায়। আগে তো বেঁচে থাকতে হবে। তারপর না লেখাপড়া আর মাথার খোপে ঢুকিয়ে রাখা ইচ্ছেগুলোকে বের করে আনা! কাজেই আর্নিলাকে লড়াই করতে হবে দশ হাতে। পয়সা রোজগারের কাজও করতে হবে।
আর্নিলার সহপাঠী আগ্নেস রিছিল, আঁখি রুরাম, লিনেত রেমা, সংগীতা রেমা, ক্যাথারিন, ডলি, রোজÑ এরা কেউই স্কুলের শেষ চৌকাঠ ডিঙোতে পারেনি। কোনোমতে প্রাইমারির গ-ি পেরিয়ে অথবা না পেরিয়ে ওরা সবাই শহরে চলে গেছে। বেশির ভাগই বিউটি পার্লারে কাজ নিয়েছে। কেউ কেউ সেলস গার্ল নয় তো ধনীর বাড়িতে গৃহকর্মী। কিন্তু আর্নিলাকে কে বিউটি পার্লারে কাজ দেবে? এই বিকৃত চেহারা নিয়ে কোথায় যাবে আর্নিলা?
হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে কুলুঙ্গিতে রাখা হাত-আয়না আছড়ে ভেঙে ফেলেছিল আর্নিলা।
কাটা ছাগলের মতো গড়াগড়ি দিয়ে কেঁদেছিল। এখন শুধু আর্নিলার মুখ দেখে পানাপুকুরের জল। পানাপুকুরের জলে এখন নিলীনা আর চামেলির মুখও ছোট ছোট ঢেউয়ের টুকরোর সাথে ভেসে ভেসে আসে। আবার হারিয়ে যায়।
নিলীনা, ছোট বোন নিলীনার ফুলের মতো মুখটা ভেসে ওঠে চোখে। কোথায় হারিয়ে গেলি নিলী!
আর চামেলি! চামেলি কি পার্মিলা চাম্বুগং-এর কোল থেকে ছিটকে পড়ল আর এক রাজ্যে! সবার ছোট মারিয়া এখনও অনেক ছোট। আর্নিলা ছাড়া ওকে কে মানুষ করে তুলবে? মারিয়া বড় হয়ে উঠলে কি সেও হারিয়ে যাবে কোনো পাহাড়ের আড়ালে?
দুশ্চিন্তায় মাথাটা টিপটিপ করে আর্নিলার। আপাতত বাড়ি গিয়ে শরীরটা জলে ভেজাতে হবে।
অখিল বুড়োর বাড়িটা পেরিয়ে ওদের বাড়ির সীমানায় শিমুল গাছটার কাছে আসতেই আমাবুড়ির চেঁচানি শুনতে পায় আর্নিলা। নিত্যদিনের একই জপমালা জপে যাচ্ছে আমাবুড়িÑ
‘দামাল মজাবামু মি চা আ? আঙা দো বে এন মু মি চা আ।’
উস্কু খুস্কু চুল বুড়ির। হাতের কাছে একটা টিনের খালি থালা। তাই ঢং ঢং বাজায় আর ছন্দে ছন্দে চেঁচিয়ে মরে বুড়িÑ ‘দামাল মজা বামু মিচা আ…’
বুড়ির থালাপেটানো শব্দে ওদের বাড়িটাকে মনে হতে থাকে দুগ্গা মাতার মন্দির। সারাক্ষণ কাসরঘণ্টা বাজছে। ঢংমি ঢংমি ঢংমি। ভাতঢং ভাতঢং ভাতঢং…। পাগলি বুড়ি। আমাবুড়িকে লোকে এখন মিচা বুড়ি বা ভেতো বুড়ি বলে ডাকে। সারাদিনে তার মুখে ঐ এক কথা।
Ñ ‘আজ কী দিয়ে ভাত খেয়েছো?’
Ñ ‘আমি মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খেয়েছি।’
আর্নিলা মাঝে মাঝে খেপে ওঠে নানীর ওপর। হেই আমাবুড়ি, রোজ জোটে না বলে দুটা রসুনের কোয়া, খাইতে হয় নুনমরিচের বাটা, কে তোকে মুরগির মাংস দিয়া ভাত খাওয়ায়, হ্যাঁ?
ফোকলা দাঁতে হাসে বুড়ি। কিলবিল করে আঙ্গুলগুলো চোখের সামনে নাড়াচাড়া করে। নখের কোণাগুলো খোঁটে। নখদর্পণে কী দেখে বুড়ি! মুঠো খুলে গন্ধ শোঁকে। মনে হয় মুঠোর ভেতর লুকানো আছে চন্দনের টুকরো। তারপর ঘচঘচ করে উকুন ভরা মাথা চুলকাতে চুলকাতে বিড় বিড় করেÑ
‘আঙা দো বে এন মু মি চা আ।’
ভাত। ভাতের স্বপ্নই সারাক্ষণ দেখে বুড়ি।
মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খেতে খুব ভালোবাসতো বুড়ির একমাত্র ছেলে সোমেন। সোমেন চাম্বুগং। কিন্তু অভাবের সংসারে মুরগির মাংস দিয়ে রোজ কে ভাত দেবে? রোজই খেতে হয় টকপাতা নয় মেন্দাশাক, বাঁশের কোড় কিংবা শুঁটকি আর বেগুন পোড়া।
একাত্তরে জুলাইয়ের দিকে একদিন খেতে বসে মুরগির মাংস চাইল সোমেন। ভালো করে পেট ভরে তাকে ভাত খেতে হবে। জোয়ান পেটটা তো ভরাতে হবে। নইলে কাজ করবে কী করে? আজ জবর কাজ আছে তার।
হুহ কাজ! কাজ আবার কী সোমেনের? সারাদিন তো পাহাড়ে জঙ্গলে টইটই। বনের মোষ তাড়ানো। কাজ কী তা জানা আছে। গজ গজ করেন পরমনি। পাতে দেন গমের রুটির সাথে মরিচে মাখানো গাছ আলু দিয়ে চ্যাপা শুঁটকির চচ্চড়ি। রাগে থালা উল্টে ফেলে উঠে গেল সোমেন।
পার্মিলার বয়স তখন তেরো কি চৌদ্দ। ‘দাদা দাদা’ চেঁচাতে চেঁচাতে সে খানিক সোমেনের পিছু পিছু দৌড়ে এলো। ম্রংপাড়ার বাঁশের বনের ঘন ঝোপটার ভেতর দিয়ে জিংলা ঘেরা অন্ধকার সরু পথটায় সোমেনের লাল ফতুয়া পরা দেহটা ঢুকে গেলে পার্মিলা ডাক ছেড়ে কেঁদে ওঠে। আর পার্মিলাকে অবাক করে দিয়ে ভুচ্চুৎ করে বেরিয়ে এসেছিল সোমেন। চোখ ঘুরিয়ে মাথায় ঝাঁকুনি তুলে বলেছিল, ‘ঘর যা পার্মি। দিনকাল ভালো না। আমি পরে আইমু। চিন্তা করিস না।’
তারপর কয়েক দিন সোমেনের খবর নেই। তা নিয়ে পরিবারের কেউ মাথা ঘামায় না।
সোমেন অমনই। গোঁয়ার একরোখা। কাহাইলের ছিয়া পাঁই পাঁই ঘুরিয়ে বলত সব মেলিটারির মাথা ছাতু কইরা দিমু। তখন ফুলপুর হালুয়াঘাট সড়ক দিয়ে মাঝে মাঝেই আশপাশের এলাকায় মিলিটারি চলে আসত। বাজারগুলোতে হামলা চালাত। রাজাকারদের সহায়তায় ওদের প্রয়োজনীয় নানা জিনিসপত্র নিয়ে যেত সীমান্ত ফাঁড়িগুলোতে। গ্রামের ভেতরে ঢুকে পড়ত। মেয়ে বউরা সামনে পড়লে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে তুলত জিপে আর নয়তো বন্দুক তুলে গুলি। অসীম রিছিলের নতুন বিয়ে করা বউ চন্দনা আর কিশোরী বোন পূর্ণিমাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় পথ আগলে দাঁড়িয়েছিল অসীমের বুড়ি মা আর বিধবা পিসি। ফলে গর্জে উঠেছিল ওদের অস্ত্রগুলো আর গোবরলেপা তকতকে উঠোনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকল ৪টি রক্তাক্ত নারী দেহ।
সীমান্ত থেকে পাকসৈন্যদের হালুয়াঘাট সড়কে আসতে নাগলা ব্রিজ পেরিয়ে আসতে হতো।
তাই পালা করে নাগলা ব্রিজে পাহারা দিত পাকবাহিনী আর রাজাকারের দল।
একদিন গভীর রাতে মুক্তিবাহিনী মাইন ফুটিয়ে উড়িয়ে দিল নাগলা ব্রিজ। দুপক্ষের তুমুল গোলাগুলি হলো। মুক্তিবাহিনীর কাছে টিকতে পারল না রাজাকার। জিপ নিয়ে উল্টো পথে পালিয়ে গেল মিলিটারি। পাকবাহিনীর যোগাযোগের পথ বন্ধ হলো। কিন্তু দুসপ্তাহ পরে অসীম আর সোমেনের লাশ ভেসে এলো ভোগলা নদীতে। গুলিতে সোমেনের মাথাটা ছাতু হয়ে গিয়েছিল আর অসীমের পেট খুলে বেরিয়ে এসেছিল আঁতের পোটলা। লোকে বলে নাগলা ব্রিজের যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীরা রাজাকারদের অবস্থান জানার জন্য প্রথমে স্থানীয় যুবকদের সাথে কথাবার্তা বলেছিলেন। সেই দলে ওরা দুজনও ছিল।
অসীমের জন্য শোক করারও কেউ নেই।
সোমেনের শোকে ধীরে ধীরে পাগল হয়ে গেল আর্নিলার আমাবুড়ি পরমনি চাম্বুগং। মায়ের কাছে সোমেন মামুর যুদ্ধের গল্প শোনে আর্নিলা। আমাবুড়িটার জন্য ওর বুকের খোড়লে কেমন এক দলা বাতাস ধাক্কা মারতে থাকে। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে আর্নিলা তার নানীকে এই-ই দেখে আসছে। দিনমান মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে থালা পেটায় আর মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খাওয়ার জপ্না জপে।
আর্নিলা আমাবুড়ির সামনে মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসে। আমাবুড়ির বয়স কত? সারামুখে অজ¯্র বলিরেখা। খসখসে দুমড়ানো-মুচড়ানো কাগজের মতো মুখ। খাঁজে খাঁজে ঘাম জমে আছে। ক্লান্ত। জীর্ণ-শীর্ণ। তার সামনে একটা মাটির ঘটে পানি। কাত হয়ে পড়ে আছে। বাটিতে অড়হড় ডাল মেশানো খুদের ঝাল চাপড়ি। আমাবুড়ি তা ছুঁয়েও দেখেনি। তার ওপর বাতাসে উড়ে এসে পড়েছে ঝরাপাতা। মুরগি ট্যাক ট্যাক করছে চারপাশে। আমাবুড়ির শনের মতো সাদা জটবাঁধা চুলের ওপরেও ঝরাপাতা মরা ডাল। ছেঁড়া ময়লা ঢলঢলে একটা ব্লাউজ। তার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসেছে বিশীর্ণ স্তন। শুকনো কলার ফাতরার মতো আমাবুড়ির বুক দুটোও বাতাসে ঝরে পড়বে যেন।
আর্নিলার মনটা ছলকে ওঠে। আহা!
চুল থেকে ঝরাপাতা সাফ করে দিতে দিতে বলে, ‘নানী ঘরে আইয়ো। ভাত দেবো তোমারে।’
উদাস তাকিয়ে তাকে বুড়ি। আর্নিলা আবার মাথায় হাত বোলায়Ñ ‘আমাবুড়ি, মিচা আ?’
এবার নড়েচড়ে ওঠে বুড়ি। থালা বাজায়। মুরগির মাংস! ভাত!
হ্যাঁ, তাই দেয়া হবে। উঠোনে ঘুরে বেড়ানো মোরগ-মুরগির দল থেকে একটাকে ধরে আজ আমাবুড়ির জন্য রান্না করে দেবে আর্নিলা।
মা কোথায়? মাকে ডাকে আর্নিলা।
‘ম্যায়া, এট্টা মুরগি ধরো ম্যায়া। আমাবুড়ি আইজকা মাংস দিয়া ভাত খাইবো।’
মাকে দেখা গেল রান্নাঘরে ধেনো মদ বানানো নিয়ে ব্যস্ত। পার্মিলার রোজগারের একমাত্র উপায়।
কয়েকটা হাঁড়িতে চোলাই-এর পাতনা দেয়া হয়েছে। গরম ভাতে ধেনো পিঠার গুঁড়ো ঢেলে দিয়ে রান্না করার পরে ঠা-া পানি মিশিয়ে হাঁড়িতে ভরে মুখ বন্ধ করে পাতনা দিয়ে রাখতে হয় চার-পাঁচ দিন। ভাত গেঁজে উঠে সরষের তেলের মতো পাতলা তরল রসে পরিণত হবে। সেটা ছেঁকে নিলেই হয়ে গেল ধেনো। আগে আর্নিলার বাপই তৈরি করত ধেনো। হাঁড়ি খুলে বিক্রিবাট্টার আগে নিজেই পেট ভাসিয়ে খেয়ে নিত। বাড়িতে না থাকলেও ধেনোর পিছনে ছুটত বাজারের শুঁড়িখানায়। খেয়ে টং হয়ে খিঁচ ধরে থাকত বাবা। তার বাদে বাড়ি এসে ঠ্যাঙাতো বউকে। চাল নেই কেন। নুন নেই কেন। ধেনো নেই কেন। ছেলে নেই কেন। কাম নেই কেন। পয়সা নেই কেন। সব নেই আর সব কেনর জন্য মাতাল অনল ছিশিমের ধাতানি খেতে হবে তার বউ পার্মিলা চাম্বুগংকে।
মারধোর খেয়ে কেঁদে কেটে আবার পার্মিলাই উঠোনো দু পা ছড়িয়ে বসে-থাকা অভুক্ত অ¯œাত সোয়ামিটাকে টেনে তুলত। মাটির চাড়ে তুলে রাখা পানি এনে ঢেলে দিত মাথায়। খাবারের সানকি তুলে দিত হাতে।
পচানি খেয়ে খেয়ে লোকটার লিভার গেল পচে। বছর পাঁচেক আগে একদিন পেট ফেটে মরে গেল আর্নিলার বাপ অনল ছিশিম। পার্মিলার চারপাশ থেকে ধেয়ে এলো আঁধার। এখন কে সংসার দেখে, কে করে চাষবাস। আয়-উপার্জনের পথ কী। পার্মিলার কোলে তখন এক বছরের মেয়ে মারিয়া। তার আগে আর্নিলার পিঠাপিঠি আরও দুই মেয়ে চামেলি আর নিলীনা। এই চার মেয়ে নিয়ে পার্মিলা কী করে সব সামাল দেয়।
আর্নিলা দেখেছে তার মা কী করে সব একা হাতে সামাল দিয়েছে। কী করে দিনমান মারিয়াকে পিঠে বেঁধে মা কখনও গরুর জাবনা গুলেছে, ধেনো মদের জন্য চাল গুঁড়ো করছে। তিতপাতা আর ফল মিশিয়ে আদা কুচি দিয়ে চাকা চাকা পিঠা বানিয়ে রোদে শুকিয়ে রাখছে। তারপর ধান কুটে বের করছে চাল। চাল জ্বাল দিয়ে ভেঙে দিচ্ছে পিঠার গুঁড়ো। চুলার দাউ দাউ আগুনে পার্মিলা চাম্বুগং-এর ঘর্মাক্ত মুখ তামার প্রতিমার মতো লালচে আভায় জ্বলজ্বল করতে থাকে।
এই দেখা গেল পার্মিলাকে রান্নাঘরে, আবার চলে গেছে পুকুরে, বাড়ির পালানে, গোয়ালে, আথালে। আবার পিঠ থেকে শিশুকন্যাকে নামিয়ে তার পাগলী মাকেই আর একজন শিশুর মতো বুকে আগলে ঘর থেকে বের করে এনে বসিয়ে দিচ্ছে পেয়ারাতলায়। মুখে তুলে দিচ্ছে খাবার। মাকে তখন আর্নিলার কাছে মনে হতো মাতা মেরী। এক বছরের পিতৃহীন শিশুকন্যাও যেমন, তেমনি ৮০ বছরের বৃদ্ধ জননীও। মা সবাইকেই যেন পরম আদরে শিশু যেসাসের মতোই কোলে তুলে নেন।
আর্নিলাও মায়ের হাতের দুপাশে জুড়ে দেয় নিজের দুটো হাত।
উঠোনের পাশে এক চিলতে জায়গায় বেগুন আর মরিচের চারা লাগায়।
গরু নিয়ে মাঠে খোঁটা বেঁধে দেয়। ধেনোর চাল গুঁড়ো করে। বাজার করে। মাছ ধরে। ছোট বোনটাকে দুলিয়ে দুলিয়ে ঘুম পাড়ানি গান করেÑ
‘কই নন কই কই
ককবিচি চানাদে কই
সিরু বিচি চানাদে কই কই
বাবা গোড়া রাবানো কই কই
বাবা লারু রাবানো কই কই…’
বোনটি ঘুমো ঘুমো, তা হলে তোকে মুরগির ডিম খেতে দেব, শালিকের ডিম খেতে দেব। বাবা তোর জন্য ঘোড়া নিয়ে আসবে, বাবা তোর জন্য নাড়– নিয়ে আসবে।
শেষ দুলাইন এখন আর গায় না আর্নিলা। বাবাই নেই। কে আনবে ঘোড়া আর নাড়–!
রাত জেগে হারিকেন জ্বালিয়ে একটা খাতায় নিজের ভাষার এই গান তুলে রাখে। পুরনো বইগুলো আবার পড়ে। স্কুলের বইয়ের পড়াগুলো সব বাংলায়ই। জাতীয় পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত বই-ই পড়তে হয় ওদের। নইলে স্কুলের পড়া শেষ করে ওরা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবে না। চাকরি করতে পারবে না।
আচিক মান্দি ভাষায় তো এ দেশে কোনো চাকরি নেই। রবিন স্যারের কথা খুব মনে করে আর্নিলা। তিনি বলতেন, আমরা ব্যবহার না করলে, সংরক্ষণ না করলে একদিন এই ভাষার কোনো নাম-নিশানাই থাকবে না। কিন্তু কীভাবে ভাষার সংরক্ষণ করবে আর্নিলা তা জানে না।
স্কুলে পড়াকালীন রবিন স্যার ছোট ছোট শব্দ শিখিয়ে দিতেনÑ বল, ‘চি’। আচিক-এর ‘চি’। ‘চি’ মানে জল। ‘রংক্রেক’ মানে নুড়ি পাথর। জলের নিচে থাকে। ‘সালজং’ হলো সূর্য। ‘মিত্তে সালজং’ হলো সুরুজ দেওতা। সারাদিন কিরণ দেয়। নদীর জল সুরুজ দেওতা রঙিলা আলো দিয়ে ঝলমলে করে তোলে নদীর ঢেউ। শিমুল গাছগুলোতে লাল লাল ফুল ফুটিয়ে তোলে। মাঠে মাঠে ফসলের শীষ বের করে আনে। আর ‘জাজং’Ñ মাখন মাখা গোল ময়দার চাকতির মতো চানÑ আলো দেয় রাত্তিরে। হেরিকেন লাগে না। খ-খ করে ‘বোপ্পা’। মানে চারপাশের গাছপালা। প্রকৃতি। সেই চান্নি রাতে ‘আদুরী’তে বাতাসের ধাক্কা দিয়ে সুর তোলে বনের দেবতা। ‘আদুরী’ হলো গিয়ে মইষের শিঙের বাঁশি। কী সুন্দর সুন্দর ক্যাথা!
Ñ ‘মা, হাচ্চিক ক্যাথা আমরা কই না ক্যান রে আমা?’
মা বিরক্ত মুখে মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে বলেন, ‘তুই বুঝবি সেই ভাষা?’
কেন বুঝবে না আর্নিলা। বললেই বোঝে।
বাইরে কে বুঝবে? বাজারে বুঝবে? দোকানে? স্কুলে? রাস্তায়? গীর্জায়? আপিসে ব্যাংকে হাসপাতালে? ওসব জায়গায় চলে পাহাড়ি ভাষা? আছে পাহাড়ি? পাহাড়িরা, গারোরা সব পাহাড়ের তলায় চাপা পড়ে গেছে। হুই উত্তরে আকাশ খামচে ধরে দাঁড়িয়ে আছে গারো পাহাড়। ওকে নড়ানো যাবে না। ওর সাথে ক্যাথা বল গিয়ে। এখন সর।
Ñ ‘আমি কইতে চাই মা। আচিক মান্দি। মান্দি ক্যাথা।’
মা আর্নিলার মুখের দিকে কেমন এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন।
বিড়বিড় করে বলেনÑ
‘সোনা দংজা রুপা দংজা চিং নি দো
জাং খো রায়ে খাদংসনা মানসজা
বসু গ্রিমচিং বিবাল গাবজক।’
আমাদের সোনা রুপা কিছু নেই, আমাদের হাতে কিছু নেই। কিছু দিতে পারিনি তোমাদের… তারপরে যেন কী… ভুলে গেছি রে নীলা। ভুলে গেছি গানটা…
আর্নিলা মুহূর্তেই কণ্ঠে তুলে নেয় গান। ‘সোনা দংজা রুপা দংজা…’ সোনারুপার মাদুলির মতো তার গলা জড়িয়ে থাকুক এই হাচিক ক্যাথা। ভুলবে না। আর্নিলা ভুলে যেতে দেবে না। ভুলে যেতে দেবে না তার গলিত বাঁ চোখটিকে। ভুলে যেতে দেবে না নিলীনাকে। ভুলে যেতে দেবে না সোমেন মামুকে। ধরে রাখবে তার ‘আমা’কে  আর আমাবুড়িকে।
গীর্জা থেকে বনের ভেতরের আড়াআড়ি পথ ধরে হেঁটে আসে গাজীর ভিটা গাঁয়ের গারো সম্প্রদায়ের ছোট একটি দল। ইস্টার রোববারের উৎসব আজ। এ গাঁয়ের শ’দেড়েক গারো পরিবার আজ উৎসবে মেতে উঠবে। ৪০ দিন উপবাস গেছে ওদের। সকালে নিরামিষ, অল্প ভাত, নয় তো ফল দিয়ে হালকা নাশতা আর রাতে ভরপেট ভাত খেয়ে এই উপবাস। গীর্জায় ফাদার নিকোলাস এসেছিলেন আজ। বাইবেল পড়ে শুনিয়েছেন। লুক আর যোহনের পাঠ ব্যাখ্যা করেছেন। যিশু মানুষের মুক্তি চেয়েছেন। মানুষের কল্যাণ কাজ বাকি রেখে তার মৃত্যু হতে পারে না। তাই ক্রুশে বিদ্ধ দেহ থেকে বেরিয়ে যাওয়া আত্মা আবার তার দেহে প্রবেশ করে। তিনি পুনরায় উঠে দাঁড়ান।
মানুষও পারে, মানুষের পরম ইচ্ছেগুলোরও মৃত্যু হয় না। তা থেকে যায় মনের গভীরে। তাকে বাঁচিয়ে তোলা যায়। চেষ্টা করলে হয়।
আর্নিলা ছোট বোন মারিয়ার হাত ধরে হাঁটে। মা প্রতিবেশী দিদির সাথে গল্প করতে করতে পেছনে আসে। আগে ওরা চার বোন একসাথে বনের ভেতর দিয়ে হৈচৈ করতে করতে বাড়ি ফিরত। আজ চামেলি আর নিলীনা নেই।
নিলীনা একেবারেই নেই।
চামেলি আছে দূরে। ঢাকায় এক বাসায় কাজ করে। মহিলা একটি পোশাকের দোকান চালান। চামেলি বাসার কাজের পাশাপাশি সেই দোকানে কাজ করে। সুন্দর জামাকাপড় গায়ে দেয়। চেহারাও সুন্দর হয়েছে চামেলির।
চামেলির কাছাকাছিই একটি বিউটি পার্লারে কাজ করত নিলীনা। অল্প বেতন। খাটনি ছিল বেশি। ১০ ঘণ্টা খাটতে হতো পার্লারে। কোনো থামাথামি নেই। পার্লারের মালিক মহিলা ছিল খা-ারনি। রক্তঘাম সব চেটেপুটে নিত ওদের। নিলীনাও চাচ্ছিল চামেলির সাথে ওই দোকানে কাজ করতে। কথাবার্তাও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তার আগেই একদিন বিকেলে পুলিশ এসে নিলীনাসহ পার্লারের মেয়েদের ধরে নিয়ে গেল থানায়। মালকিনসহ। গোপন খবর পেয়েছে সেই পার্লারে অনৈতিক কাজ করা হয়।
থানায় গিয়ে মালকিন খানিক চেঁচামেচি করলেন। এখানে সেখানে ফোন করলেন। কিছু বক্তব্য লেখালেখি করলেন। তারপর গাড়ি হাঁকিয়ে বের হয়ে এলেন। নিলীনাসহ ওরা চারজন মেয়ে থেকে গেল থানাহাজতে। মালকিন বলেলেন, শিগগিরই ছাড়িয়ে নেবেন। তার শত্রুরা ভুয়া খবর রটিয়েছে। সব ঠিক হয়ে যাবে। তবে কিছু টাকা-পয়সা লাগবে।
রাত্তিরে মদ গিলে হাজতঘরে দুই পুলিশ এলো। নিলীনার গলায় ওড়না পেঁচিয়ে টেনে দাঁড় করায়। কোমরের বেল্ট আলগা করে গায়ের জামা খুলে ফেলে দুজন।
পার্লারের কাজটা আজ রাত্তিরে এখানে সেরে দিয়ে যাও সোনারা। মাগনা না। পয়সা দেব।
শজারুর চোখের মতো ওদের চোখ জ্বলজ্বল করে।
নিলীনার চিৎকার শুনে কেউ এগিয়ে আসেনি। চারদিন পরে ছাড়া পেয়েছিল নিলীনা। গাঁয়ে চলে এসেছিল। দিন-রাত ঘরে মুখ গুঁজে পড়ে থাকত। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিল। নিলীনার ফুলের মতো সুন্দর চেহারাটা দিনে দিনে ফ্যাকাশে হয়ে যেতে লাগল। তারপর একদিন খেতে বসে থালার ওপরে পেট উল্টে উগরে দিল সব।
পার্মিলা চাম্বুগং সেদিন পাগলের মতো আলুথালু চুলে ছুটে বাইরে গিয়ে দুহাতে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে চিৎকার করেছে।
‘হে আসমানের দেবতা, আমার মাথার ওপর এক খ- বিষের মেঘ নিয়ে এসে তাতে বাজ হানো। ওই মেঘ ফেটে বিষ ঝরুক বিষ। আমি তা পান করি। হে আদি অরণ্য, গারো পাহাড়ের জংলারাজা, আমাকে জড়িয়ে নাও বিষলতায়। আমার ফুল ফুল মেয়েগুলোকে আর বিষে বিষে জর্জরিত করো না।’
কিন্তু নীলিনা ঠিক চিনে নেয়ে জঙ্গলের বিষলতা। মুখে নিয়ে চিবিয়ে খেয়ে নিয়েছিল। নিথর দেহ পড়েছিল রান্নাঘরের দাওয়ায়। ঠিক যেন নীল জারুলের একখানা ফুটন্ত ডাল কেউ এক কোপে কেটে এনে ফেলে গেছে পার্মিলার আঙিনায়।
নিলীনার মৃত্যুর পর পাড়া প্রতিবেশী চামেলিকে শহর থেকে নিয়ে আসতে বলেছিল।
কিন্তু রাজি হয়নি চামেলি। গ্রামে গিয়ে কী করবে চামেলি। দিদি আর্নিলার মতো অত খাটনি সে খাটতে পারবে না। অত কিছু নিয়ে ভাবতেও তার ইচ্ছে করে না। তার মালকিন ভালো মানুষ। বলেছে, দোকানের কাজ শিখে নিলে ভবিষ্যতে নিজেই একটা বুটিক শপ দিতে পারবে।
ধাই ধাই করে মাথায় বেড়ে উঠেছে চামেলি। কানে ঝোলানো-দুল, গলায় পাথরের হার পরে খোঁপায় শামুকের মালা জড়িয়ে চামেলি একটা ঝলমলে ফুলছাপের ফতুয়া গায়ে দিয়ে যখন দোকানের আয়নায় নিজেকে দেখে, তখন নিজেকে আর গাজির ভিটা গ্রামের ছোট ছোট মাটির কুটির ছাওয়া গারো পল্লীর পার্মিলা চাম্বুগং-এর নাকচ্যাপটা হাঁড়িমুখো মেয়ে বলে মনে হয় না। মনে মনে গোপন আশা আছে, একদিন লাক্স সাবানের বিউটি কনটেস্টে যাবে। ফোন করে মাঝে মাঝে। শহুরে ভাষায় কথা বলে। ইংরেজি শব্দও লাগায়। বদলে গেছে চামেলি।
মা মাঝে মাঝে ধাপ ধাপ দম ছাড়ে। আর্নিলার মনে হয়, থাক, চামেলি চামেলির মতোই থাক। হয়তো ও জীবনের একটা পথ খুঁজে পাবে।
আমাবুড়ির পাতে মুরগির রানটা তুলে দেয় আর্নিলা।
গরম ভাত থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে।
কুমড়ো পাতায় মুড়ে ‘জাগুয়া নাখাম’-এর ভাপা করেছেন পার্মিলা। মায়ের পাতের কিনারে কালচে সবুজ রঙের পাতামোড়া ভাপাটি যতেœ বসিয়ে দেন পার্মিলা।
Ñ ‘খাও মা। তোমার মতন বানাইতে পারি নাই। তুমি পছন্দ করো। আমার হাতে বানানো চ্যাপা শুঁটকি মা। জাংলার পাতা। ছ্যাচা রসুনের কোয়া আর পিঁয়াজকলি আর লাল মরিচের লগে দুইখান ‘জাগুয়া নাখাম’-এর বাটনা। কৌরা ত্যাল দিয়া আগে একটা মাখ দিয়া নিছি মা। তোমারে দেখতাম। কি সুবাস উঠত!’
মা পাশে বসে গুন গুন করে কথা বলেন। ‘মা, নীলা তোমার লেইগা মুরগি রানছে। ভাত খাও মা।’
আর্নিলা থালাটি নানীর কোলের কাছে বসিয়ে দেয়।
বিশীর্ণ কালচে রগ মোচড়ানো হাতের আঙ্গুলগুলো থরথর করে কাঁপে পরমনি চাম্বুগং-এর। মুক্তিযোদ্ধা সোমেনের মা। আর্নিলার নানীÑ আমাবুড়ি।
আমাবুড়ি! আদরভরা কণ্ঠে ডাকে আর্নিলা। ঢলঢলে ব্লাউজখানা আমাবুড়ির কাঁধের ওপর তুলে দেয়।
Ñ ‘খাও আমাবুড়ি। ভাত। মুরগির মাংস দিয়া ভাত! দো বে এন মি!’
মুরগির রানটা তুলে নেন আমাবুড়ি। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখেন। হঠাৎ রানের টুকরাটা মশালের মতো তুলে ধরেন মাথার ওপরে। বিড়বিড় করে কান্নাবিকৃত গলায় বলে ওঠেন। ‘সোমেন, সোমেন! দো বে এন মি চা আ…।’
আমাবুড়ি। মুক্তিযোদ্ধা সোমেনের আমা। যোদ্ধাজননী পরমনি চাম্বুগং। পাতলা ছোট্ট একটা দেহ। জড়িয়ে ধরে আর্নিলা। বুড়ি হাউমাউ করে কাঁদে। ‘আঙা নাংখো নামিন নাম্নিকা।’ আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি!
Ñ ‘কাকে বলছে? কারে নানী? কারে ভালোবাসো?’
Ñ ‘আমারে? আমার মুখ পোড়া। আমি অপয়া। ভালোবাসো আমারে আমাবুড়ি?’
বুড়ি কাঁদে। আর্নিলাও কাঁদে। ডান চোখ ভিজে ওঠে। রোদে পোড়া শুকনো গাল বেয়ে একটা গরম ফোঁটা নেমে আসে। বাম গালের চামড়ায় যেন তপ্ত ছুরি চিলিক দিয়ে ওঠে। ধারালো ছুরির তীক্ষè ডগায় চিরে যেতে থাকে বুঝি ওর ১৯ বছরের যৌবনরাঙা চামড়া। অজ¯্র বলিরেখা জমতে থাকে বুঝি আর্নিলার রৌদ্রতপ্ত কপালে। পোড়া গালের চামড়ায়। আমাবুড়ির শুভ্র চুলের আঁশ তুলো ফুলের মতো উড়ে আসে আর্নিলার মাথায় মুখে। যেন বা আর্নিলা নিজেই আমাবুড়ি। যেন সে বয়সিনী পরমনি।
আর্নিলা ছোট্ট মারিয়ার মতোই কোলে জড়িয়ে তুলে নেয় আমাবুড়ির গুটিয়ে যাওয়া পাতলা দেহখানা।
‘আঙা নাংখো নামিন না¤িœকা। আমাবুড়ি, আঙা নাংখো নামিন না¤িœকা।’ আমিও তোমাকে খুব ভালোবাসি।

শ্রেণী:

যখন শরীর দুজনের

49

49নুসরাত নীলা: ‘বাহির হয়ে এসো তুমি যে আছো অন্তরে।’
উঁচু ভলিউমে বাজছে। ল্যাপটপের সাথে দুইটা তার। একটা সাউন্ড বক্সের দিকে গেছে আর একটা থেকে ল্যাপটপ তার জেগে থাকার রসদ নিচ্ছে। ওয়াইফাই অন। ফেসবুক পাতা খোলা। কাকে যেন ডাকছে ঈশানাÑ এসো এসো আমার ঘরে এসো। আবার শুধরে দিয়ে বলছে, না না, কেন আসবে, এসো নাÑ আমি দারুণ আছি। দারুণ থাকার পরে আবার নিজেকেই জিজ্ঞেস করে, কেন আছিÑ এ থাকার কী মানে। মনে মনে ঠিক করে, আজ যাব, যেতেই হবে আমাকে। কোনো পিছুটান আর রুখতে পারবে না ঈশানা নিশ্চিত। তা-ও তো কয়েক ঘণ্টা হয়ে গেল। রিপ্লাই আসে নি এখনও। অনেক আগে সে অনলাইন ছিল। ফেসবুক দেখাচ্ছে এগার ঘণ্টা! একটাই ভুল হয়েছে সেল নম্বর নেয়া হয় নি। ঈশানা স্ক্রল করে করে ঘুরছে। ইনবক্স দেখছে। আরও অনেকেই আছে। না কারও জন্য মন টানছে না। যার জন্য টানছে আশ্চর্যজনকভাবে আজ সে হাওয়া! অনেক দিন এমন হয়েছে লগ ইন করে তাকে সবুজ বাতি হয়ে জ্বলতে দেখেই সে তাড়াহুড়োয় অফ লাইনে গেছে! প্রতিদিন এগুলো শুনতেও ভালো লাগে না। কবি মানুষ। তাই তার কথা কবিতা সব সময় রেডি। নারীরা নিজের রূপ- যৌবন নিয়ে শুনতে চায় খুব সত্য। কিন্তু এই রূপ যৌবনের কী দাম যে একটা পুরুষকে বাঁধতে পারে না! আবার একই রূপ আরেক পুরুষ যাচে! সত্য তো এই সেই পুরুষও যেচেই নিয়েছিল। কিন্তু মধুপ সে কলিরÑ তাই রইল না। রইল না আবার কী কথাÑ রইল তো, বাড়ি রইল, গাড়ি রইল, সোনা-গহনা অই যে টেবিলে সাজানো সুস্বাদু খাবার সবই তো রইল। সে রইল না তার সব কিছু তো রইল! কাল সে মরে গেলে কে বলবে, সে আসলে ছিল নাÑ আহা আহা বেচারা কত কিছু রেখে গেছে বউটার জন্য, দিনরাত কত পরিশ্রমই না করেছে এগুলো গোছাতে! হো হো করে হাসলো ঈশানা। সত্যিই বউয়ের জন্যই তো সব! দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালোÑ প্লেনটা উড়ছে এখনও। সে যাচ্ছে স্বর্গে আর ঈশানা কিনা তার মৃত্যু নিয়ে ভাবছে! যাহ্ স্বর্গ বললে কেমন মনে হয় মৃত্যুর পর স্বর্গে যাচ্ছে সে! আবারও অট্টহাসি দিল ঈশানা। থাক আজ তাকে নিয়ে আর না ভাবুক ঈশানা। প্রতিদিন তো তাকে নিয়েই ভেবে ভেবে গেল। কূল-কিনারা মিলল না কিছুই। দেরাজ খুলে দেখল অনেকগুলো না পরা শাড়ি জমা হয়ে আছে। শাড়ি পড়তে অনেক সময় লাগবে। কিন্তু কোথায় যাবে এখনও ঠিক হয় নি। যাবে এটুকু শুধু নিশ্চিত। সে বলেছিল, আপনাকে শাড়িতে আরও সুন্দর দেখাবে। ফেসবুকে কোনো শাড়ি পরা ছবি নেই। সবই পাশ্চাত্যের ঢং-এ। সে বলে এগুলোও সুন্দর তবে বাঙালি নারী মানেই কল্পনায় শাড়ি আসে! বলেছিল, ‘একদিন আপনি শাড়ি পরে আসুন আমি আপনার খোঁপায় লাল ঝোপা রঙ্গন গুঁজে দেব! আচ্ছা আপনার কি নেলপলিশ পরতে ভালোলাগে? আপনি চোখ বুঁজে থাকবেন আমি আপনার নখ রাঙাবো! শরীরের একটা আলাদা এই ছোট্ট দুনিয়া কেমন নানা রঙে নেয়ে উঠবেÑ পায়েও পরাব, অবশ্য আলতা দিলে আরও ভালো দেখাবে মনে হয়।’ সেদিন হঠাৎ মনে পড়ল স্কুল ছেড়ে কলেজে উঠে একদিন হিন্দু বধূর মতো খুব সখে সেজেছিল। তার একটা ছবিও হয়তো কোথাও রয়ে গেছেÑ খুঁজলে পাওয়া যাবে। পা ভরা আলতা। পুকুরে সেই পা ডুবিয়ে কলসি হাতে ঘাটের দিকে চেয়ে আছে। সময়গুলো সুন্দর বয়ে গেছে সে সময়। অবশ্য বিষের বোঝাতো সে অনেক আগে থেকেই বইছিল! ঝুপ ঝুপ করে অনেকগুলো শাড়ি পড়ে গেল নিচে। কুড়িয়ে নিতে গিয়েই শুনল গান ছাপিয়ে ম্যাসেজ টোন বেজে উঠেছে। নিজের লেখাটা আগে পড়ল। ‘সশরীরে হাজির হতে চাই, মুগ্ধতার রেশ কতটুকু এরপরেও রয়ে যায়Ñ দেখব।’ প্রথমে উত্তর এসেছে একটা হাসির ইমো। তারপর লিখেছে, ‘মুড অফ না শাহী হেরেম আর ভালো লাগছে না? আসুন। কতক্ষণ লাগবে, শাড়ি পরবেন?’ তারপর ঠিকানা লেখা। ঈশানা লিখল, একটু সময় লাগবে, সিল্ক না সুতি বুঝতে পারছি না। ওপাশ থেকে উত্তর এলো, ‘একটা লাল টিপ দিবেন। আমি রঙ্গন খুঁজতে যাচ্ছি।’ ঈশানা লিখলো, আসছি। ওপাশ থেকে এলো, ওয়েটিং। তারপর তিনটা হার্ট ইমো। শাড়ি হাতেই অনেকক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে থাকল ঈশানা। একবার বাথরুমে গেল সেখানে কিছুক্ষণ থমকালো। শরীরটা ভার ভার লাগছে। শুয়ে পড়তে ইচ্ছে হলো। অহেতুক এতক্ষণ সেসব ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য তড়পাচ্ছিল! মনের জোর নেই ঈশানা। বলল নিজেকে। শুয়েও পড়ল। এ অর্থহীন, খুব খারাপ হবে। একটা মানুষের অহেতুক স্বপ্ন ভঙ্গ। ভালোবাসা ছাড়া শরীর মেলে? আবার ঈশানা শরীর মেলাতে চাইলে সে যদি বলে, ভালোবাসা চাই। মনে মনে বলল, চাইলে চাইবে। তারপর ভেসে যাব, ডুবে যাব। সুখের তেপান্তরে নয়তো দুখের ঝড়ো হাওয়ায়। ঘড়িতে এখন তিন ঘণ্টা পার হয়েছে। প্লেন ল্যান্ড করেছে মনে হয়। বলেছে, সিম নিয়েই ফোন দেবে। ঈশানা চেঁচাল, মেকি মেকি, সব মেকি। বিশ্বাস ভঙ্গকারীর মুখে অনুরক্ততার একটা বাক্য শুনতেও ভালো লাগে না। তড়াক করে বিছানা ছেড়ে উঠে আবার চেঁচাল, যাব না কেন, যাব। আমি পারব। কাউকে ডুবিয়ে আমাকে ভেসে থাকতে হবেই। কিংবা এই ভেসে থাকার অর্থহীনতাকে প্রমাণ করে ডুবে যেতে হবে। মস্ত এক টিপ কপালে দিল। মাঝখানে সিঁথি কেটেছে। বেশি উড়লে এক ফাঁকে চুলগুলো বেঁধে নেবে। রূপার চুল কাঁটাটা ব্যাগে ভরে নিল। আর কানে পরল একটা রূপার ঝুমকা। ল্যাপটপটা অফ করল। দরজার কাছে পৌঁছালে ড্রাইভার দৌড়ে এলোÑ ভাবি গাড়ি নিবেন না? নাÑ ছোট্ট করে বলল ঈশানা। এত অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে! আয়নায় নিজেকে দেখে মনটা ভালো হয়ে গেছে। হিসাব করল, কতদিন দেখে নি সেÑ তাও কয়েক বছর! আবার তাকে নিয়ে ভাবনা! তার সমস্ত ভাবনায় কেন সে এমন উছলে ওঠে! ‘ঈশানা’Ñ ডাকল নিজেকে, ‘শোনো ঈশানা, পুরনো বসন্ত চলে গেছেÑ এক ডালে বারবার এক কোকিল ডাকে না। সে পারলে তুমিও পারবে, বলো নিজেকে।’ ঈশানা আজ পারবে। ঈশানা আজ পেরেই ছাড়বে। মনে মনে শক্ত ঈশানা এরপর একটা বাসে চড়ে বসল। কিন্তু তারপর ঈশানার কী হলো কে জানে, বারবার বিব্রত হতে চাইল তার ঠোঁট, বলতে, ড্রাইভার বাস থামান, আমি নেমে যাব। ভিন্ন আর এক আত্মা গুড়গুড় করে উঠল মেঘের মতোÑ ঈশানা কেন যাচ্ছ? তুমি পারবে? তোমার বিশ্বাস? সব খোয়ালেÑ এ শ্রেফ গোয়ার্তুমি। তুমি শরীফ না। এতদিন নিজেকে বলে এসেছ শরীফের শিক্ষা আর তোমার শিক্ষা ভিন্ন, এই শিক্ষা তুমি নিজেই বলেছ, তোমার পরিবার তোমাকে দেয় নি, তুমি দিনে দিনে নিজ থেকে অর্জন করেছ! ঈশানা বলল, বিশ্বাস যখন কারও বাপের সম্পত্তি না, সেই তো বলেছেÑ এই ক্ষতবিক্ষত হতে হতে দেখি না একবার বিশ্বাস ভাঙার আনন্দ কেমন! এরপর খুব রেগে গেল ঈশানা। কেন পারব নাÑ এই যন্ত্রণা কেউ বুঝবে? কেউ না। ভালোবেসে মানুষ বিশ্বাস ভাঙে। বিশ্বাস ভাঙার কী এত আনন্দ! আর আজ? সেই গুড়গুড় জানতে চাইলÑ কী আজ? এই যে আজ সে পাশে বসিয়ে নিয়ে গেল কাউকে। কেমন করে নিশ্চিত হলেÑ সে তো বলেছে অফিসের কাজ! আমি জানি, আমি জানি সব। আমার চেয়ে বেশি কেউ জানে না। কী জানো। অইযে খোলা বুক, কেঁপে উঠল সে! খোলা বুক? হুম। তার সামনে দাঁড়ানো যে মানুষটা। আমি তাকে খুব ভালো বাসতাম। কত তার হাত ধরে হেঁটেছি! পৃথিবীর পথে অইতো আমার হাঁটার শুরু! সে যখন এমন করল…! জীবনের সমস্ত বিষয়কেই দুইরকম দৃষ্টিতে দেখা উচিত ঈশানা। তুমি খুব একচোখা! কিন্তু এ চোখের সামনেই কেন এত কিছু পড়ে যায় বল? হয়তো তুমি অভাগা বলে। হয়তো তুমি একবার দেখে ফেলার পরে বারবার দেখতে চাও বলে। তুমি প্রমাণ চাও। ভালোবাসার কোনো প্রমাণ হয় না। সেই সব স্মৃতি আমার বিশ্বাস নড়বড়ে করে দিয়েছিল। মানছি, তবু তুমি পুরুষই যাচলে দেখ! এখনো তাই করছো! তুমি নিশ্চিত জান না সে কাউকে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ তুমি সেই শোধ নিতে আর একটা পুরুষকে চাইছো! আমি নিশ্চিত নইÑ কিন্তু পুরুষ এমনই। আমি তার কিছু ব্যক্তিগত কাগজ পড়ে ফেলেছিলাম। এরপর আর বিশ্বাস করার প্রশ্নই আসে না। পাঁচ মাস বিছানায় পড়ে ছিলাম; অসুস্থ, সে সময় সে-মানছি তার প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজন কি আমার ছিল না, আমার নেই? কই আমি তো আর কারও বিছানায় উঠে যাচ্ছি না! ও, তা হলে তুমি বলতে চাও তোমার প্রয়োজন মিটছে না বলেই বারবার ঠেলে তাকে এর তার বিছানায় তুলে দিচ্ছ যেন তোমার আর কোনো বিছানায় ওঠা সহজ হয়? না, না এমনটা কখনোই না। তুমি এভাবে ভেবো না। আমি খুব সহজভাবে তার সঙ্গে জীবনটা শুরু করেছিলাম। একটা ক্ষতে ভরা শৈশব-কৈশোর বয়ে নিচ্ছিলাম এ সত্য। কিন্তু আমি দম নিয়েছিলাম এইখানে এসে। মনে হয়েছিল কত দীর্ঘ দিন-রাত বারবার জীবনের বিচিত্র অলিগলি থেকে ধেয়ে আসা দুর্বোধ্য ধোঁয়া কেটে যে শহরে পৌঁছাব বলে একের পর স্টেশন বদলেছিলামÑ নিশ্চিত হয়েছিলাম আমি আমার গন্তব্যে পৌঁছে গেছি; আমার যাত্রা শেষ হয়েছে। কিন্তু না, একদিন আবার ধেয়ে এলো ঝড়। বুবস মানে জানি না তখনও। নেটে এই শব্দটা খুব চলছে তখন। ঘুরতে ঘুরতে চোখে এসে পড়ল বিশাল বুক খোলা ছবিটার নিচে তার কমেন্ট। বমি উগড়ে এলো। এ কী! কেন? তারপর আঁতিপাঁতি করে খুঁজলাম চতুর্দিক। কত ছল, কত নোংরা দিয়ে আমার সেই সবুজ পৃথিবী ভরে গেল। ফিরে যাওয়ার পথ কই? এ তো কানামাছি, গোল্লাছুট নয় যে যা খেলব না বলে-চলে গেলাম। সামনে পথ বাড়াব? পেছন খাঁমচে ধরে। আবার ঠিক দিন যে যায় না তা নয়, যায়। ধুকে ধুকে। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ আমার সব এক রঙে রাঙা! কেন এমন করলে? কেন এত খুঁজতে গেলে? যেটুকু জেনেছিলে তারপরই থেমে যেতে। তোমার নিজের জন্য নিজের বেঁচে থাকা জরুরি ছিল। জানো না সব মানুষেরই একটা গোপন জগৎ থাকেÑ এরপর আর তুমি কী করে বাঁচবে বলো? আমি তো বেঁচে নেই। নিঃশ্বাসটাই কেবল পড়ছে। ভালোবাসার পরীক্ষায় হেরে গেছি আমি! তার প্রতিটা আচরণ আমার জঘন্য লাগে। মনে হয় আমি আড়াল হলেই সে দাঁড়িয়ে পড়ে একটা খোলা বুকের সামনে! আমি তাই বুক লুকিয়ে রাখি। আমি তাই শরীর লুকিয়ে রাখি। আমার খুব কষ্ট হয়। সেই কোন কালের স্মৃতি হয়তো আমাকে উসকে দিয়েছিল আর একটা খোলা বুক খুঁজে পেতে। এবং কী আশ্চর্য দেখ আমি বারবার তাই খুঁজে পেয়েছি! ঈশানা, ঈশানা-কে যেন খুব দূর থেকে ডাকলÑ ঈশানা এখন তো তুমি অনেক বড় হয়ে গেছ। অই স্মৃতিটার পক্ষে একটা ভালো যুক্তি দাঁড় করাও না। পৃথিবীর সব পুরুষ তার সঙ্গীর আড়ালে খোলা বুকের সামনে দাঁড়ায় না। তুমি এমনটা খুঁজে পেতে চেয়েছ বলেই পেয়েছ। তোমার ভেতর পুরুষকে একটা কদর্য রূপ দেবার প্রবণতা সেই ছোট্ট কালেই গড়ে তুলেছিলে। মনে পড়ে যে পুরুষটাকে তুমি বিয়ে করতে চেয়েছিলে খুব করে আমি নিশ্চিত পেলে তাকেও তুমি এমন কদর্যতায় আঁকতে! মোটেই না। আমি নিশ্চিত। মনে আছে তোমার? একদিন পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে সে একটা মেয়ের বুকের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, দেখ মেয়েটা বুকের কাপড় আলগা করেছে কেমন! তুমি এখনও সেই স্মৃতি ভাবো। কেন সে তোমাকে পাশে রেখেও অন্য নারীর বুকের দিকে চেয়েছিল এই প্রশ্ন এখনও তোমার ভেতর রয়ে গেছে! আর তুমি কখনোই তাকে তোমার বুক খুলে দেখাও নি। সেই কদর্য স্মৃতি তোমাকে বলেছিল বুক লুকিয়ে ফেলতে। জীবনে একবার যে তোমরা খুব কাছাকাছি এসেছিলে সেদিনও তুমি ব্যথায় ককিয়ে উঠেছিলে, যেন তুমি পাপ করছোÑ কারণ তোমার স্মৃতি তোমাকে বলেছিলে ওগুলো পাপ। কে জানে আজ ভেবে দেখ সেদিন যদি তুমি এটাকে পাপ না ভাবতে আজ হয়তো তোমরা একসাথে থাকতে। আমি নিশ্চিত আজ তুমি তাকে জিজ্ঞেস করো, সে বলবে সেই প্রত্যাখ্যান তার ভেতর দ্বিধা তৈরি করেছিল! হয়তো এর যে একটা বিশাল শূন্যতা ছিল তার ভেতর গলে সে বেরিয়ে গিয়েছিল। পুরুষের আদিমতাকে তোমার মানতে হবে, বুঝলে ঈশানা। ঈশানা। ঈশানা শুনছো আমার কথা? পুরুষের আদিমতা, বুঝলে? ঈশানা একটু কেঁপে উঠল। তারপর দেখল সামনের দেয়ালে একটা পোট্রেটÑ দুটো হাঁস সঙ্গমের জন্য প্রস্তুত। একটা টিকটিকি দ্রুত দৌড়ে সেটার আড়ালে লুকিয়ে গেল! আঙ্গুল তুলে দেখাল ঈশানাÑ রঙ্গন! ডাক্তার ফুলদানিটা দেখলেন। তোমার প্রিয় ফুলÑ প্রথম দিনেই বলেছিলে। তোমার ভালো লাগবে ভেবে সাজিয়েছি। এরপর ঈশানা চোখ মেলে ঘরটা দেখল। বলল, আমার অন্য কোথাও যাবার কথা ছিল! কোথায়? ডাক্তার প্রশ্ন করলেন ঠিকই উত্তর নিলেন না। বললেন, আজ আমাদের সিটিং। আমি তোমাকে রিমাইন্ড দিয়েছি। তুমি বললে তুমি তৈরি হচ্ছো। খুব সম্ভবত তখন তুমি কোনো শাড়ি খুঁজছিলে। ঈশানা বলল, না অন্য কোথাও। তারপর একটু থেমে বলল, এটা খুব সহজ নয় ডাক্তারÑ পুরুষের আদিমতাকে বোঝা। কারণ আমি পুরুষ নই। আমি যুক্তি দিয়ে যতটা বুঝি আবেগ দিয়ে তার চেয়ে বেশি। প্রতিদিন সে ভালো আর সে ভালো না এই বিচার করার জ্বালা আপনি বুঝবেন না। সবাই ভাবে আমি এই সম্পর্কটা থেকে নিষ্কৃতি পেতে চাই তাই বারবার সে ভালো না ভালো না বলে চেঁচাই। তাকে ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়, কখনও যতটা উদ্দেশ্য নিজেকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানো। তার প্রতি আমার যে ঘৃণা তা আর একটা পুরুষের দিকে প্রেম হয়ে বয়ে যেতে চাইছে। ঘৃণা আর প্রেম খুব পাশাপাশি থাকে, জানেন তো। যখন দেখি না সে ভালোÑ নিজেকে বলি আমিও ভালো থাকতে চাই। তার ভালো থাকা তার জন্য যতটা জরুরি আমার জন্য তার চেয়ে বেশি। আর যেটা বলছিলেন, হ্যাঁ সেই প্রত্যাখ্যান ওর ভেতর দ্বিধা তৈরি করেছিল সত্য; কিন্তু আমাকে তা বিচিত্র প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। তা হলে কি আমি ধরে নেব, শরীর ছাড়া আমাকে কেউ ভালোবাসবে না? সমর্পণে আমার হাত আর ফাঁকা থাকবে না? কিন্তু কী হলোÑ সময় আমাকে বুঝিয়ে দিল শরীর দিয়েও কোনো পুরুষকে ধরে রাখা যায় না! যে থাকতে চায় সে কারণ ছাড়াই থাকে। আমি সেদিনটা ভাবতে পারি খুব। আমি ছুটে যাচ্ছি এক শহর থেকে আরেক শহরে। কেন? কারণ আমি হাত খুঁজে পেয়েছি। একটা সুনসান গলি। গলির মোড়ের দোকানে গান বাজছে। আমার পায়ে হলুদ এক জোড়া জুতো। জুতোটা এত সুন্দর! সে বলল, এটা বাইরে রাখা যাবে না! খুব ক্ষিপ্রতায় তুলে ঘরের খাবারের টেবিলের তলে লুকিয়ে ফেলল সেটা। ভেতরে যখন গেলাম সমস্ত ফাঁকি! ঘর এত অন্ধকার। অথচ সে বলেছিল তার ঘর আলো দিয়ে ভরা। বলেছিল সব সময় সে তার ঘর গুছিয়ে রাখে। দেখলাম চারপাশে ছড়ানো ময়লা! একটা এটাচ বাথ আছে, সেটাই সে ব্যবহার করে। বাথরুমটা নোংরা আর মাকড়শার জালে ভরা। যখন বললাম কই বলেছিলে এটাই তুমি ব্যবহার করো। সে বলল, হ্যাঁ করি তো। আমি দেখলাম এটার লাইট কাটা। অনেকদিন এখানে আলো জ্বলেনি! সব কিছু কেমন করে মিথ্যে হয়ে যায়Ñ এক এই শরীর পাওয়ার জন্য এত ছল! তাকে বোঝাতামÑ দেখ আমি এমন নই। সে বলত, হ্যাঁ সেটাই; তুমি তো কেবল উদারতা দেখিয়ে যাচ্ছÑ আমিই খারাপ! তারপর একদিন ফাঁকা রাস্তায় ছেড়ে চলে গেল। তাকে বোঝান গেল না উদারতা নাÑ আমি ভালোবাসা নিয়ে এসেছি। রাগে এতটাই জ্বলছিল তার পায়ের একটা জুতো ছিঁড়ে গেছিলÑ সে সেটা ছুড়ে দিয়ে হেঁটে খোঁড়াতে খোঁড়াতে চলে গেল! পেছন ফিরে আর দেখল না। তার জানতেও ইচ্ছে হলো না আমি এবার কীভাবে পৌঁছাব! এই যে এতদূর এলাম সব হাঁটা মিথ্যে! একটা মেয়ে এক খোলা বুক দেখেছিল। হ্যাঁ সেও বুঝেছিল তারও শরীর আছে। কিন্তু সে শরীর সে তুলে রেখেছিল সময়ের জন্য। তার কাছে সত্যের ব্যবচ্ছেদকারীর দাম ছিল না। এ তার অসুস্থতা? হ্যাঁ, আপনি বলবেন অসুস্থতা। আপনি বলবেন, পুরুষের আদিমতা! কিন্তু ঈশানা তুমি নিজেই বলছো তোমার ভেতরে যে ঘৃণা তার বিপরীতেই রয়েছে ভালোবাসা। আর সেটা অবশ্যই পুরুষের জন্য। না। ভালোবাসা নেই। এখানে কেউ ভালোবাসে না। কারণ আমি যেখানেই যাই আমাকে ওই যোনি বলেই ভাবা হবে। আমি একটি মাংস পি-। এর বেশি কিছু না। কিন্তু ডাক্তার, যদি পুরুষের আদিমতাকেই বুঝতে হয় তবে নারীরটা নয় কেন? নারী হিসেবে হাওয়াই আগে আদমকে প্রলুব্ধ করেছিল এবং তারা দুজনেই এরপর একসাথে নিজেদের নগ্নতা সম্পর্কে সচেতন হয়েছিল। শরীর পুরুষের একার ছিল না। একার এখনও নেই। কিন্তু আপনি কি বলতে চাইবেন আমি নষ্ট হয়ে গেছি? পচে গেছি? আলুথালু হয়ে গেছি? তবে একই রূপ কেন অন্যজন যাচে? কাকে বলে তবে পুরুষের আদিমতা? ডাক্তার চেয়ে আছেন ঈশানার মুখে। বললেন, কী বলতে চাও তুমি? কিছুই না। দৃঢ় হয়ে উঠল ঈশানার কণ্ঠ। রগগুলো ফুলে উঠল গলার। চোখের পাতা নিশ্চল হয়ে রইল কিছুক্ষণÑ পড়ল না। বলল, শুধু এটুকুই, আমার অন্য কোথাও যাওয়ার কথা ছিল। যাই নি। তার অর্থ এই না আমি কখনও যাব না। আমি চাই এভাবে একইভাবে একটি কোনো পুরুষ এসে আপনাকে বলুক, নারীর আদিমতা নিয়ে! আমি এখানে আপনাকে নিশ্চিত করে বলতে পারি এই লজ্জা যার যার! পুরুষের একার, নারীর একার। আর একটা কথা ভালোবাসা এখনও খুব মিষ্টি শব্দ ডাক্তার। যে এর নাগাল পায় সেই খুব সুখি।

শ্রেণী:

জয় বাংলা

Posted on by 0 comment
41

গভীর নিস্তব্ধতা নেমে আসে কিছু সময়ের জন্যে।  এবার ভারী বুটের আঘাত।দরজা নেহি খোলো তো গুলি চালাতে বাধ্য হবো। বলেই ধুম ধুম করে দরজায় লাথি পড়তে থাকে।

41আনিস রহমান: বাড়িটি ভারী সুন্দর। দেখতেই চোখ কাড়ে। দোতলা, অনেকটা পুরনো ছাদের। তবে অভিজাত দেখতে। এ পাড়াটিও তাই। অভিজাত সব পরিবারের বসবাস। ডেভেলপারদের আনাগোনা এখনও শুরু হয়নি তেমন। তাই প্রায় সবগুলো বাড়িই এখনও তাদের বনেদি ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে। অধিকাংশ বাড়ি দোতলা অবধি। তিনতলা-চারতলা চোখে পড়ে না বললেই চলে। কদাচিৎ কেউ কোনো ফ্লোর ভাড়া দেয়। তাও নিজেদের মধ্যে। বার বাড়ির কিংবা অপরিচিত কেউ ভাড়া পেয়েছে এমন নজির নেই।
দোতলা বাড়িটি চারজনের সংসার। তবে ঠিকে ঝি, বাধা ঝি, দারোয়ান মালি ড্রাইভার মিলে সাত-আটজনের বাস। বাড়ির গেট ছুঁয়ে বেড়ে উঠেছে বগনভেলিয়ার ঝাড়। ঝাপানো গাছটি। টানা বারান্দা অনেকখানি ঢেকে রেখেছে হাওয়া মিঠাই রঙের ফুলগুলো। উত্তরের শেষ প্রান্তে গোটা কয়েক সুপুরি গাছ জড়াজড়ি করে আছে। ওদের পাশ ফুঁড়েই আকাশে মাথা তুলেছে কয়েকটা রয়েল পামের চারা। ওদের জড়িয়ে আছে মানিপ্ল্যান্টের ঢাউস সব পাতা। তার আশপাশে বৃত্তাকারে এবং দেয়াল ঘেঁষে সার করে রাখা গোলাপের টব। সাদা-কালো হলুদ, লাল, কমলা অনেক পদের গোলাপ দিয়ে সাজানো টবগুলো। বাহারে সব গোলাপ রং ছড়িয়ে। দারুণ এক বিভার সৃষ্টি করেছে বাড়ির সামনে ছোট্ট চাতালজুড়ে। বাড়ির দেয়ালে মিষ্টি রঙের ডিসটেম্পার। ¯িœগ্ধভাব দেয়ালজুড়ে।
পেছনে পরপর কয়েকটি নারকেল গাছ। বাড়ির সামনে-পেছনে দু কোণায় দুটো আম গাছ। গাছ দুটো এখনও প্রৌঢ়ত্বে পা দেয়নি। তারুণ্যের লাবণ্য গাছের পাতা-ডাল সবকিছুতে। তারপরও বাড়িটি যেন কী এক শূন্যতায় ভরা। সারাদিনেও কোনো লোকের আনাগোনা নেই। বাধা ঝি কামরুন বেলা শুরুতেই নিচের কন্টেইনারে রাতের বাসি-পচা থেকে শুরু করে করে আনাজ-সবজি ও ডিমের খোসা সব ঢেলে যায়। ঠিকে ঝিটাকে দেখা যায় দুপুর নাগাদ ছাদে উঠতে। কাচা কাপড়গুলো রোদে মেলে দেয় তখন। কখনও কখনও পামেলা ওঠে ছাদে। এ বাড়ির বড় মেয়ে ও। কোনো একটা কাপড় কেচে দুহাতে মেলে ধরে ছাদময় ঘুরতে থাকে। সামনে যায় পেছনে যায়। ডানে যায়, বাঁয়ে যায়। আর আনমনে তাকায় এদিক-ওদিক। চোখ দুটো ওর বড় রুক্ষ। যখন তাকায় দৃষ্টিতে রাজ্যির বিরক্তি। মুখে হাসি নেই। কথা নেই কারও সঙ্গে। ওদিকে কাপড়টা একইভাবে ঝুলতে থাকে দুহাতের আঙুলের চাপ খেয়ে। একেক জায়গায় যায়। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। ফের ঘুরে ঘুরে আরেক জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়। এভাবে মনের খেয়ালে কখন কোন তার জায়গা হবে কাপড়টির তা কেবল পামেলাই জানে। কখনও চালনে শুকোতে দেওয়া ধনে, চালের গুঁড়ো নেড়েচেড়ে দেয়। কখনও জায়গা সরিয়ে দেয় কী মনে করে। যেন স্থবির একখ- মেঘ ওর চোখেমুখে। বোধের জায়গায় বিরাট শূন্যতা।
মাঝে-সাঝে বাদ যায়। এছাড়া প্রায় সবদিনই রিনি হাসানকে দেখা যায় ছাদে। সাধারণত শেষ বেলায় ছাদে ওঠে ও। এসেই গোটাকয়েক কাপড় তার থেকে তুলে নিয়ে ওর কাঁধেই চাপায়। অন্য কাপড়গুলোর দিকে মন নেই। কেন ওই কাপড়গুলো তুললো, কেন অন্যগুলো তারেই ঝুল খাচ্ছে তার কোনো অর্থ কেউ দাঁড় করাতে পারেনি।
গোটাকয়েক কাপড় কাঁধে চাপিয়েই নিচে নেমে যায় না রিনি। দূরের আকাশে তাকিয়ে থাকে। তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ। কোনো গাড়ির কর্কশ হর্ন, কাকের বিরক্তি করা ডাক। কিংবা মানুষের কোলাহল। না হয় কখনও কামরুন এসে ডাক না দেওয়া পর্যন্ত ঠায় দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রিনি। দূরের আকাশে কী খোঁজে কে জানে। আনমনে কিভাবে কেউ বলতে পারে না। শরীরও যে ভেঙে পড়েছে তা-ও নয়। তবে শরীর না ভাঙলেও মনটা যে ভেঙে গেছে তা বোঝা যায়। রিনি হাসানের গায়ের রং, দুধে আলতা নয়, হলুদও না। একেবারে গোলাপি বলতে যা বোঝায় তাই। চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে। কপালে বলি রেখা। মাথার চুলে সাদাপাটই বেশি। কাপড় কেমন আলুথালু হয়ে জড়িয়ে থাকে গায়ে। কখনও আঁচল লুটোয় মাটিতে। এ সময়ে কখনও পামেলাও উঠে আসে ছাদে। বরাবরই সে এসে পেছনে কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়ায়। আশপাশের বাড়িতে তাকায়। কিন্তু চোখে কোনো কৌতূহল থাকে না ওর। কিংবা চঞ্চলতা। অর্থহীন চাউনি একেবারে। তখন রিনি এসে দাঁড়ায় কখনও ওর পাশে। কখনও মেয়েটার কাঁধে হাত রাখে। কখনও চুলে হাত বুলোয়। কখনও বুকে জড়িয়ে নেয় পামেলাকে। তারপরও সারা অবয়বজুড়ে ওর কী যেন নেই কী এক হাহাকার। এমনি তৃষ্ণা নিয়ে চাতক পাখির মতো আকাশের দিকে যখন তাকিয়ে থাকে রিনি তখনই হঠাৎ গলা চড়িয়ে চেঁচাতে থাকে রূপক। একমাত্র ছেলে রিনির। বয়েস পঁয়তাল্লিশ। পামেলা ওর পিঠেপিঠি।
দুহাত তুলে কখনও দুহাত ভাঁজ করে হাতের পেশিগুলো শক্ত করে গলা চড়িয়ে রূপক বলে আমি হিমালয়ে যাব। কখনও, আমি বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করবো। সুন্দরবনে যাব। কে কে যাবি আয়। বলে হাঃ হাঃ করে হাসতে থাকে।
ওর হাসি দেখে অন্যরাও হাসে। ভিড় করে ওকে ঘিরে। রূপকদা আমিও যাবো তোমার সঙ্গে। আমার বন্দুক আছে। দোনলা।
আমার দাদুও বন্দুক দিয়ে হাতি মেরেছে, বাঘ মেরেছে। তা-ও যে-সে বাঘ নয়, রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বলে, হুম করে শব্দ করে নিলয়। পাশের বাড়ির ছেলে ও। ওর হুম শব্দ যেন হালুম হয়ে বাজে সবার কানে।
রূপক এদিক-ওদিক তাকায় চকিতে। হালুম! হালুম! বাঘ এসেছে। বাঘ!
বন্দুক। দোনলা বন্দুক! বন্দুক কোথায়? রূপকের কণ্ঠে বিস্ময় একই সঙ্গে অস্থিরতা। কিন্তু কথাগুলো যখন ও আওড়ায় তখন চোখের ফাঁদ বড় হয়ে যায় ওর। মণি দুটো কোণায় এসে কেমন তেরচা হয়ে সেধিয়ে যায় ভেতরে। এ সময় অস্বাভাবিক ঠেকে ওকে। কেউ কিছু বলে না। কিন্তু পাশের বাড়ির দারোয়ান দেলোয়ার একেবারে চুপ থাকতে পারে না। ওর ট্যারা চোখের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে, কী সোন্দর পোলাডা, চোক্ষের ফাই চাইলেই খালি মনে হয় ওর অসুখ। অন্য সময় জোয়ান তাগড়া ব্যাডা। খোদার কী বাইল! বলে বড় করে নিঃশ্বাস ছাড়ে দেলোয়ার।
এমনি সময় রূপক ফের চেঁচিয়ে ওঠে। দোনলা বন্দুক। আমি মিলিটারি। হাঃ হাঃ হাঃ লেফট রাইট, লেফট রাইট। ঠিকই এক জায়গায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে লেফট রাইট করতে থাকে রূপক। ওকে দেখে মানুষের জটলা আরও বড় হয়। কখনও কারও কারও টিপ্পনিকাটা দেখে রিনি বড় করে নিঃশ্বাস ছাড়ে। বেলকোনিতে হাত রেখে মাথা বাড়িয়ে ডাক দেয়Ñ রূপক, বাবা ঘরে চলে এসো, চা খাবে। চলে এসো বাবা।
রূপক মায়ের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কিছু সময়। শেষে চা, চা হবে মা! চোখে-মুখে তখন আনন্দ ঝরে পড়ে ওর। তেমনি লেফট রাইট, লেফট রাইট করতে করতে চলে যায় ঘরে।
কখনও পাশের বাড়ির বুয়াকে দেখে ডাক দেয়। এই জুলেখা!
- আমার নাম জুলেখা না!
- তুমি জুলেখা না!
- আমি পরিবিবি!
- পরি! তুমি ও বাড়ি কাজ করো?
- হ।
- ওরা তোমাকে মারে?
- মারব ক্যা, আমি চোর না ডাকাইত!
- তবে আদর করে?
- হ।
- বেশ ভালো করে খেতে দেয়!
- খাইতে খাইতে পেট ফাইট্টা যায় আর কী!
- বেতন কত দেয়!
পরিবিবি দাঁত কেলিয়ে হাসে। দুহাতের দশ আঙুল দেখিয়ে বলে ১০ হাজার! ১০ হাজার! বেশ ভালো, বেশ ভালো।
মালি লালচানের সঙ্গে ওর খুনসুটি লেগেই থোকে। ও যখন একমনে নিড়ানি দিচ্ছে টবে, আগাছা পরিষ্কার করছে। কিংবা জল ঢালছে ফুল গাছে। তখন গুটি গুটি পেছনে এসে দাঁড়ায় রূপক। তারপর পিঠে আলতো টোকা দিয়েÑ এই কী হচ্ছে?
- অয় নাই অবে!
- অবে কি! বলো হবে!
- অই অইলে।
- কি হবে?
- ছাও!
- ছাও! অমন চাষাদের মতো কথা বলছো কেন?
- আমি তো চাষাই!
- বাজে বকো না লালচান!
বলেই মালির কানের লতিতে চটাং করে এক টোকা বাজিয়ে হেঃ হেঃ করে হাসি ছড়িয়ে কেটে পড়ে রূপক।
হালে ওর মুখে লেফট রাইট লেফট রাইট তেমন শোনা যায় না। বোলচালে কিছু পরিবর্তন এসেছে। এখন শুধু হরতাল নিয়ে মেতে আছে ও। হরতাল! হরতাল! আজ হরতাল। হরতাল হবে তো! হরতাল? হরতাল হবে? কি বলেন? ভাই স…ব, ভাই… সব হরতাল! হরতাল!
এরপরই আবার উল্টো সুর, হরতাল মানি না মানি না। আবার কখনও হরতাল হতে হবে! হতে হবে! হবে তো? হরতাল? কথাগুলো মানেহীন। ছন্নছাড়া। অসংলগ্ন এবং খাপছাড়া। তবু ভালোলাগে। কথা বলছে ও। অন্যরা হাসুক। টিপ্পনি কাটুক। ‘রিনি কটেজের’ কারও তাতে কিছু যায় আসে না। অন্তত ওর জগৎ নিয়ে ও তো ভালো আছে! এটুকুই ওদের সান্ত¡না। না হলে যখন ও কাঁদে খুব সকালে এবং রাতে, তখন মনে হয় ও বাড়িতে কেউ মারা গেছে। কিংবা ওকে ধরে কেউ পেটাচ্ছে। শুধু পেটন! মনে হবে যেন, এক্ষুণি অজ্ঞান হয়ে পড়বে। কখনও মনে হয় তীব্র কোনো যন্ত্রণায় ওর ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে। সে কী চিৎকার। সে কী কান্নার ব্যাকুলতা!

বেলা বাড়ার পর উঃ আঃ করে করে গোটা বাড়ি চষে বেড়াবে। আর শুধু উঃ আঃ, উঃ আঃ করে দু’হাত ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে ওপর-নিচ করবে। দেখে কখনও মনে হবে, ছেলের মুখ ঝালে পুড়ে যাচ্ছে। কখনও মনে হবে গা জ্বলে যাচ্ছে। কিন্তু প্রকাশ করতে পারছে না। অগ্নিদহন সারা শরীরজুড়ে। এমনি যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে একসময় ছাদে উঠে আসে রূপক। যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে হতে সারাছাদ ছুটে বেড়ায়। একসময় শান্ত হয়ে ঘরে ফিরে আসে। কখনও মাথা চেপে ধরে শুয়ে থাকে একটা চৌকিতে। ঘরে ওর জন্যে আলাদা খাট রাখা আছে। রোজ ঝাট দেওয়া হয় খাটে। দুদিন পরপর চাদর বদলে দেওয়া হয়। তারপরও কেন যেন খাট ছেড়ে চৌকিতেই শুয়ে থাকে ও। বোধহয় চৌকিতেই শুতে ভালো লাগে ওর। কিন্তু ভালো লাগে, তাই বা বলি কী করে! মাথাটা যেভাবে দুহাতে চেপে এপাশ-ওপাশ করতে থাকে, কখনও ডান হাতের কনুইয়ের ভাঁজে বাঁ হাতের কনুই দিয়ে চেপে ধরে মাথা। যেন অসহ্য কোনো যন্ত্রণা মুখ বুজে সয়ে যাচ্ছে ও। অনেকক্ষণ আর কোনো শব্দ নেই ওর। একসময় নিস্তেজ হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
পড়ন্ত বিকেলে কখনও শেষ বিকেলে বেরিয়ে আসে ও ঘর থেকে। কখনও ছোট্ট চাতালটুকুতে, কখনও গেটের সামনে কখনও বা রাস্তার বাঁ-পাশ ধরে পায়চারি করতে থাকে রূপক। একসময় হঠাৎ বলে ওঠে হরতাল! হরতাল! হরতাল হবে তো! কি বলেন?
ইদানীং হরতাল প্রসঙ্গেই বলছে শুধু। আগে বাঘের কথা। বাঘের দুধ খাওয়ার কথাই বলতো বেশি। কিন্তু প্রজন্ম চত্বরে যখন থেকে মানুষের সমাবেশ হচ্ছে, তখন থেকেই ওর বোল পাল্টে যায়। এখন হরতালের কথা বলে। কখনও বলে ও, তোমার আমার ঠিকানা… তারপর থেমে গিয়ে এদিক-ওদিক তাকায়। একে-ওকে জিজ্ঞেস করে ঠিাকানা তো হারিয়ে ফেললাম! ঠিকানাটা কেউ বলতে পারো? ঠি…কা-না!
তখন কেউ ধরিয়ে দেয়, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’। অমনি গলা চড়িয়ে বলতে থাকে, পদ্মা মেঘনা যমুনা।
কখনও তুমি কে আমি কে বলেই থেমে যায়। আশপাশে তাকায়। অন্যমনস্কভাবে পা চালিয়ে পোড়োবাড়ির মতো ধসেপড়া বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। ওখানে এক দঙ্গল ছেলেপুলে ক্রিকেট খেলছে। ওদের থেকে দাঁত উঁচু লম্বাটে মুখের ছেলেটাকে ডেকে বলে— এই ছোড়া বলতো তুই কে?
- বাঙালি।
- ওরা?
- ওরাও বাঙালি।
- সাবই তোরা বাঙালি? সত্যি বলছিস তো!
- আমরা মিথ্যে বলি না।
তাই তো, তাই তো। বেশ কবার তাই তো তাই তো করে ফের গলা চড়ায় রূপক। তুমি কে, আমি কে, ছেলেগুলো কোরাসে চেঁচিয়ে ওঠে বাঙালি! বাঙালি!
তুমি কে? আমি কে? তুমি কে! আমি কে! এমনটি বলতে বলতে গলা নেমে আসে ওর। হঠাৎ গলা চড়িয়ে ফের বলে জয় বাংলা! জয় বাংলা! বেশ ক’বার ‘জয় বাংলা বলে থামে ও। এদিক-ওদিক তাকায়। একে-ওকে ডাকে। জয় বাংলা বলছো না কেন? তোমরা গিয়েছিলে? জয় বাংলার ওখানে গিয়েছিলে? বেলা পড়ে এলো, কখন যাবে! আমিও যাবো! তোমার আমার ঠিকানা! একসময় গলা নেমে আসে খাদে। বিড়বিড় করে কী যেন বলে! তারপর গলা চড়িয়ে মা মা করে ডাকতে থাকে রূপক।
মা ছাদের কার্নিশে এসে দাঁড়ায়।
- কি হয়েছে বাবা!
- জয় বাংলা শোনোনি জয় বাংলা!
- শুনেছি বাবা!
- যাবে না? জয় বাংলার ওখানে যাবে না মা!
- যাবো বাবা অবশ্যই যাবো।
- যাবো কি নেমে এসো এক্ষণি নেমে এসো।
রিনি হাসানের মুখ হাসিতে ঝলমল করে ওঠে। দেরি না করে একরকম ছুটে নেমে আসে নিচে। রূপক মায়ের কাছ ঘেঁষে দাঁড়ায়। পা থেকে মাথা অবধি কী যেন পরখ করে তীক্ষè চোখে। বেশ ক’বার এমনি করে শেষে মায়ের চোখে চোখ রেখে বলে তুমি জয় বাংলা দেখতে যাবে না?
যাবো তো! রিকশা কর।
রূপক কিছু বলে না। ফের মাকে দেখে। পরখ করে তীক্ষè চোখে। তারপর প্যান্টের দু-পকেটে দুহাত ঢুকিয়ে, কখনও আবার বুকে দু-হাত বেঁধে জায়গা বদল করে বেশ ক’বার। একসময় শূন্যে তাকায়। হাত-পা নাড়াচাড়া করতে থাকে অস্থিরভাবে। মাকে ঘুরে ঘুরে দেখে ফের।
- কী দেখছিস যাবি না জয় বাংলায়?
রূপক মুখে রা করে না। ভাবলেশহীন চোখে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ কী মনে করে যেন মা নিজের দিকে তাকায়। তারপর আঃ হাঃ চু… চু… করে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায়। জয় বাংলায় যাবো অথচ এখনো বাসার কাপড়রই বদল করিনি। কী যে মনভুলো হয়েছি! বলেই দ্রুত সিঁড়ি ভাঙতে থাকে মা।
খানিকবাদেই পাটভাঙা আকাশ-রঙের একটা শাড়ি পরে আসে রিনি।
মাকে দেখেই জয় বাংলা, জয় বাংলা, তুমি কে, আমি কে বাঙালি বাঙালি বলে কবার চক্কর দেয় মাকে ঘিরে। মা হেসে আলতো করে রূপকের পিঠে একটা কিল বসিয়ে দেয়।
রূপক রাস্তায় এসে রিকশা ডাকে, এই রিকশা যাবে! জয় বাংলায়! জয় বাংলা চেনো না? তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা! লেফট রাইটের মতো তালে তালে পা তোলে আর সেøাগান মুখে। আশপাশের লোকজন জড়ো হয়।
রূপকদা জয় বাংলায় যাবে! এই রিকশা শাহবাগ নিয়ে চল।
দুটো রিকশা পরপর চলতে থাকে। একটিতে রূপক আর ওর মা। পেছনেরটায় মালি আর দারোয়ান। কখন মাথায় ওর কি খেলে! তাই সাবধানের মার নেই। এ ভেবে ওরাও চলেছে সঙ্গে। পথে খ- খ- মিছিল। আমি কে তুমি কে তোমার আমার ঠিকানা। সব সেøাগানের সঙ্গে তাল মেলায় রূপক। ওর চোখেমুখে মুগ্ধতা, আলোর উদ্ভাসন। কখনও ফিরে ফিরে ওদের রিকশা দেখে, তোমাদের ভালো লাগছে তো? উত্তরে ওরা কী বলল ওদিকে খেয়াল নেই। একমনে জয় বাংলা জয় বাংলা বলে সেøাগান দিতে থাকে ও। কোথাও বাবার কাঁধে চড়ে কোথাও বৃত্তাকার মানুষের ভিড়ে এই এত্তটুকুন বাচ্চারা সেøাগান দিচ্ছে গলা চড়িয়ে। কারও কারও শরীর বেঁকে যাচ্ছে সেøাগান দিতে গিয়ে! বিস্ময়ে অভিভূত দুটি চোখ বারবার দেখে ওদের। দুচোখ ভরে দেখে হাঁটু সমান ছেলেপুলেদের। এ দেখে দুঠোঁট নড়ে ওঠে মায়ের। চোখ ভেজা, কে বলবে ওর মাথায় গোল আছে। কেমন চনমনে! কি সুন্দর করে সেøাগান দিচ্ছে। কখনও অন্যের সেøাগানে জোগান দিচ্ছে। ছেলেটার আমার চোখেমুখে কী আনন্দ! প্রজন্ম তোমরা বেঁচে থাকো। অন্তত আমার ছেলের জন্য তোমরা বেঁচে থাকো অনন্তকাল!
একসময় ফিরে আসে ওরা। রূপকের মাথায় লাল সবুজ কাপড়ের ফেট্টি বাঁধা। মা একটা টি-শার্টও কিনে দিয়েছে। বুকে লাল সূর্য। তাতে লেখা ‘রাজাকারের বিচার চাই’। বাড়ি ফিরে নতুন সেøাগান রূপকের কণ্ঠে- বিচার হবে বিচার হবে। রাজাকারের বিচার হবে। ফাঁসি চাই ফাঁসি চাই রাজাকারের ফাঁসি চাই! বলছে আর পায়চারি করছে। মাঝে মাঝে দুহাত তুলে আরও বেশি প্রতিবাদী চেতনার প্রকাশ ঘটাচ্ছে রূপক।
তখনই হুইল চেয়ারে করে যাচ্ছিল জেবুন খালা। ওকে দেখে থামলো। হাতে অনেকগুলো মোম। তার থেকে তিনটে মোম দিল রূপককে। রূপক বোকার মতো তাকিয়ে থাকে।
জ্বালতে হবে, ঠিক সন্ধ্যে ৭টায় জ্বালতে হবে। আমিও জ্বালাবো! বলেই হাতে মুঠো করা মোমগুলো দেখায় রূপককে।
- জ্বালবো! আগুন দিয়ে?
- আগুন দিয়ে জ্বালবে।
আগুন দিয়ে জ্বালতে হবে। আগুন দিয়ে! বলে পায়ে পায়ে তাল মেলাতে থাকে রূপক। জেবুন খালার ক্লান্ত শরীর। তারপরও একগাল হাসি ছড়িয়ে হাত নেড়ে বিদায় নেয় রূপকের কাছ থেকে।
ওদের তিন বাড়ি পরেই জেবুন খালার বাসা। অনেকদিন হলো ক্যানসারে ভুগছে। অনেকটা পয়সার ওপর বেঁচে আছে বলা যায়।
১০ নম্বর ক্যামো চলছে ওর। তবু হুইল চেয়ারে করে বেরিয়ে এসেছে। মোমবাতি কিনবে বলে। প্রজন্ম চত্বরের ডাকে আজ সন্ধ্যায় আলো নিভিয়ে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করা হবে সারা দেশজুড়ে। আলোর বিভায় দেশ থেকে সব আঁধার দূর হয়ে যাক, সব অমানিশা হারিয়ে যাক চিরতরেÑ এ প্রত্যাশায়। সুতরাং এর সাথে না থাকলে কি হয়? তাই কাজের ঝিটাকে অনেক বলে-কয়ে রাজি করিয়েছে।
- দাদাবাবু জানলে ভীষণ রাগ করবে দিদি!
- ও নিয়ে তুই ভাবিসনে মিনাক্ষী।
- তুমি যা করচো না দিদি। দাদাভাই জানলে আমার ধড়ে আর মাথা থাকবে না।
এই এক ঝকমারি মিনাক্ষীকে নিয়ে। চা-বাগানের মেয়ে ও। মায়ের দেখভাল এবং সেবার জন্যে বাগান থেকে পাঠিয়েছে শ্যামা। ওর স্বামী জিকু চা-বাগানের ম্যানেজার। মিনাক্ষীকে পাঠিয়ে শ্যামা ফোন করেছিল, জানো মা মিনাক্ষী ভারী লক্ষ্মী মেয়ে। কাজে কামে দারুণ পটু। আমার বাংলোতে সবদিক ও-ই সামলায়। যখন যেভাবে যা বলবে, ঠিক তা তা করবে, একটুও নড়চড় হবে না।
এখন জেবুন দেখছে শ্যামা যা বলেছে তার চেয়ে কয়েক ধাপ বেশি ও। অসম্ভব দায়িত্ববোধ মেয়েটির। বিশ্বস্তও বটে। সুতরাং যেভাবে নির্দেশ দিয়ে গেছে দাদাবাবু, তার ১৯-২০ হবার জোটি নেই। এখন জেবুন বললেই ওকে নিয়ে পথে পথে ঘুরবে, দোকানে যাবে তা ভাববার কোনো কারণ নেই। কিন্তু আজ ঘাইঘুই করে শেষে একরকম রাজি হয়েছে দিদিকে নিয়ে বাইরে আসতে। না এসে উপায় কী? টিভি চ্যানেলে দিদি এখন আর অন্য কোনো অনুষ্ঠান দেখে না। কেবল শাহবাগে মন পড়ে থাকে ওর।
- জয় বাংলা! জয় বাংলা!
- আমি কে? তুমি কে? বাঙালি।
- রাজাকারের ফাঁসি চাই! ফাঁসি চাই।
শুনে শুনে জেবুন খালাও চুপ থাকতে পারে না। খাটে বসে নিজেও বিড়বিড় করে সেøাগান দেয়। ক্লান্ত শরীর। তবু উত্তেজনায় দুহাত তুলে জয় বাংলা জয় বাংলা বলে কখনও। কখনও বলতে বলতে অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকে। তখন মিনাক্ষী তোয়ালে দিয়ে দুচোখ মুছে দেয় জেবুনের।
- ওভাবে কাঁদছো কেন দিদি?
- সেলিনার কথা মনে পড়ছে।
পরে জেনেছে মিনাক্ষী সেলিনার কথা। সাংবাদিক ছিল। সংবাদপত্রে কাজ করত। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী তাকে হত্যা করেছে। সময়ের প্রলেপ পড়ে একসময় বোনের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল জেবুন। মাঝে মধ্যে আবছা করে মনে পড়ত ধূসর কোনো ছবির মতো। বিশেষ করে পিঠেপিঠি দুবোনের একসঙ্গে একটি ছবি আছে ওর ঘরে। অনেকদিন পরপর ছবিটি যখন মুছতে নেয় জেবুন, তখন অপলকে তাকিয়ে অনেক সুদূর থেকে সেলিনাকে ছুঁতে চেষ্টা করে। কিন্তু পারেনি। বারবার চেষ্টা করেও ছুঁতে পারেনি ওকে। শেষে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে যেখানকার ছবি সেখানেই রেখে দিত। কিন্তু প্রজšে§র ডাকে এখন যেন সেলিনা এ ঘরেই ঘুরঘুর করছে। জেবুনও ওর ঘাতকদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার। তাই আজ শুধু নিজের জন্যেই মোম কিনে আনেনি ও। অনেককেই দু-তিনটে করে মোম বিলিয়েছে। বলেছে সময়মতো জ্বালতে ভুলো না যেন।
প্রজন্মকে ঘিরে জেবুনের এমনি তরতাজা ভাব দেখে শরীফ হক অবাক হয়। অবাক হয় ওর ছেলেমেয়েরাও। শরীফ হাসতে হাসতে বলে, তোদের মায়ের আর ক্যামো-ট্যামো লাগবে না। প্রজšে§র ডাকে দেখবি একদিন ও ঠিকই সুস্থ হয়ে গেছে। স্বামীর কথায় বিষণœ জেবুনের মুখেও হাসি ফোটে।
- কথাটা মিথ্যে বলোনি। এখন মনে হয় রাজাকারগুলোর বিচার না হওয়া পর্যন্ত আর মরছি না।
- এ কথায় সবাই হো হো করে হেসে ওঠে।
আসলেই তাই! বলতে গেলে এতদিন জেবুন খালা বিছানা থেকে উঠতেই পারেনি। বিশেষ করে নতুন ক্যামো যখন শুরু হয় তার কয়েকদিন বড্ড নাজুক হয়ে পড়ে ওর শরীর। অথচ এখন সবকিছু কেমন পাল্টে গেছে। কখন ক্যামো শুরু হলো আর শেষ হলো বোঝাই যায় না। টিভি থেকে একেবারেই চোখ সরে না ওর। আর শরীর একটু ভালো থাকলে তো কথাই নেই, খাটে গা সেটে একটার পর একটা চ্যানেল ঘোরাতে থাকে। কোথাও আরও নতুন কোনো খবর আছে কিনা, রাজাকারের পরাজয়ের খবর। প্রজন্মের জাগরণের খবর। নতুন নতুন মিছিলের খবর। মানুষ কেমন করে ধেয়ে আসছে সারাবাংলা থেকে সে খবরÑশুনতে একেবারে মুখিয়ে থাকে। সেøাগানে মুখরিত শাহবাগ চত্বরের ছবি যখন ভেসে ওঠে টিভি পর্দায়। খালার মুখ তখন উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে পবিত্র এক আলোর ছোঁয়ায়। স্বপ্নময়, প্রত্যাশা জাগানিয়া সে আলোয় একসময় ভিজে আসে তার হৃদয়। নেমে আসে হৃদয়ের ক্ষত ফুঁড়ে জলধারা। দুচোখ ছাপিয়ে সে ধারা নেমে আসে দুগাল বেয়ে। সে জল আড়াল করে না খালা। মুছেও নেয় না অগোচরে। তখন একমনে তাকিয়ে থাকে ছবিটার দিকে। গত ৪০ বছর ধরে এ ছবিটাকে আগলে রেখেছে খালা। যখন যেখানে গেছে ছবিটা কখনও হাতছাড়া করেনি। তার রুমে একেবারে চোখের সামনে ছবিটা টাঙিয়ে রেখেছে। হালে ছবিটা যেন কথা কয় খালার সঙ্গে। হাঁটে ঘরময়। মাথার কাছে এসে বসে। কখনও মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। খালার কষ্ট দেখে কাঁদেও ছবিটা। কখনও আবেগ আর ধরে রাখতে পারে না খালা। বলে, সেলিনা ছবি হয়েই আমার ঘরে কতকাল। কিন্তু ওকে যেন ভুলেই গিয়েছিলাম। শুধু ছবি হয়েই ফ্রেমে বন্দী ছিল। ওর কোনো জাগতিক অস্তিত্ব ছিল না আমার কাছে। কিন্তু রাজাকারের ফাঁসি চেয়ে অসংখ্য মানুষের ঢেউ সব নীরবতা যেন ভেঙে খান খান করে দিয়ে গেছে। সে স্মৃতি মনে হলে এখনও হিম হয়ে আসে বুক।
এক কালো রাত্রিরে দরজায় নক। প্রথমে মৃদু শব্দ। বাড়ির সবাই তখন শোওয়ার আয়োজন করছে। এমন সময় সেই শব্দ। সবাই একে একে দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়। এবার ধুম ধুম শব্দ!
- দরজা খোল দাও।
- কে তোমরা? বাবার কণ্ঠ।
গভীর নিস্তব্ধতা নেমে আসে কিছু সময়ের জন্যে। এবার ভারী বুটের আঘাত।
- দরজা নেহি খোলো তো গুলি চালাতে বাধ্য হবো।
বলেই ধুম ধুম করে দরজায় লাথি পড়তে থাকে। ভারী বুটের লাথি। ভারী সে শব্দ! শেষে বাবা বাধ্য হয়ে দরজা খুলে দেয়। অমনি হুড়মুড় করে কয়েকজন আর্মি ঘরে ঢুকে পড়ে। ওদের পেছন পেছন কজন তরুণ। বাঙালি ওরা! ওদের মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা। ওদেরই একজনের হাতে সেলিনার একটি পাসপোর্ট সাইজের ছবি। ছবিটা এক আর্মির দিকে বাড়িয়ে দেয় এক তরুণ। আর্মি একরকম ছোঁ মেরে ছবিটা হাতে তুলে নেয়। বেশ কবারে ছবিটার দিকে চোখ বুলোয়। তারপর বাবাকে দেখিয়ে :
- একে চেন?
- বাবা চুপ।
- কি বলছি, একে চেন?
- জ্বি।
- ও তোমার কী হয়।
- মেয়ে।
- ও কোথায়?
- বাড়ি নেই।
- তোম ঝুট বলতা হ্যায়।
- হাম সাচ্ বল্রাহু।
তারপর সব আর্মিদের উদ্দেশে বলল, বাড়ি সার্চ করো। অমনি ধুমধাপ করে ছড়িয়ে পড়লো আর্মিরা বাড়িময়। একসময় বুকে স্টেনগান ঠেকিয়ে বের করে আনে সেলিনাকে। ও আর জেবুন, তখন একই সঙ্গে বাথরুমে লুকিয়েছিল। ছবির সঙ্গে সেলিনার চেহারা মিলে যেতেই তার বুকে স্টেনগান ঠেকালোÑ কোনো চালাকি করার চেষ্টা করো না। বেরিয়ে আস। যেন হিম হিম কণ্ঠ। কেটে কেটে বেরুচ্ছে গলা চিরে। চোখে রক্তাভা। ঘামের ঘন ফুটকি খানসেনাদের মুখে। ও মুখের দিকে তাকাতেই ওদের শরীরের রক্ত জমাট হয়ে যায় মুহূর্তেই। ফ্যাকাশে সেলিনার মুখটি আজও চোখে ঠাঁই করে আছে জেবুনের। নীরবে বেরিয়ে আসে ও বাথরুম থেকে। পা চালাবার আগে চকিতে একবার সেলিনা তাকিয়েছিল জেবুনের দিকে। বড্ড রহস্যময় ছিল সে দৃষ্টি। অনেক না বলা কথা যেন জমে ছিল সে চোখে। জেবুন কাঁদতেও ভুলে গিয়েছিল তখন। গলা যেন চেপে ধরেছিল ওরা লোহার মতো শক্ত হাতে। সেলিনা সে যে বেরিয়ে গেল। আর ফিরে আসেনি। ও বেরিয়ে যাবার কিছুক্ষণ পরেই গুলির শব্দ শুনেছিল ওরা। শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল অনেকেই। মগবাজারসহ আশপাশের সব তল্লাটে খুঁজে দেখলো সবাই কিন্তু কোথাও কোনো লাশ দেখতে পেল না। এরপর অনেক খোঁজাখুঁজি। কিন্তু সেলিনাকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না কোথাও। সাংবাদিক সেলিনা মুক্তিযুদ্ধের খবর ছাপতে ছাপতে একসময় যে ও নিজেই খবর হয়ে যাবে তা কে জানতো?
বড় করে নিঃশ্বাস ছাড়ে জেবুন। সেলিনা নিখোঁজ হবার কদিন পর থেকে লাগাতার একটি স্বপ্ন দেখেছিল জেবুন। স্বপ্নটি অদ্ভুত ও রহস্যময়। গভীর রাতে ফোন আসতো সেলিনার। ও বলতো, কারা যেন আমাকে আটকে রেখেছে। আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের কেউ ওরা কিন্তু পরিচয় দেয়নি ও। বলছিল, ওরা শুধু টাকার জন্যে চাপ দিচ্ছে। ওর কাছে নাকি অনেক টাকা পাবে। সে টাকা পেলেই ওকে ছেড়ে দেবে। আরও কী যেন বলতে চায় ও। তখনই রিসিভারটা ওর হাত থেকে কেড়ে নেয় কেউ। স্বপ্নে একই কথা জানিয়ে আরও কয়েকবার ফোন করেছিল সেলিনা। আজও দিব্যি ওর সে কণ্ঠ কানে বাজে জেবুনের। একবার স্বপ্নে ও ফোন নম্বরও দিয়েছিল। সে নম্বরে ফোন করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বন্ধ। এ কেমন স্বপ্ন! তবে কী সেলিনা বেঁচে আছে কোথাও? বেঁচে থাকলে ৪০ বছরেও কি একবারও আসতো না। যেখানেই থাকুক না কেন, খুঁজে পেতে ঠিকই চলে আসতো। কিন্তু এমন অদ্ভুত এক স্বপ্ন কেন যে দেখলো, এর মানেই বা কি? তা অনেকদিন তাড়া করে ফিরেছে জেবুনকে। বাসার সবাইকেও ভাবিয়েছে সে স্বপ্ন। এরপর অনেক দিন পর আজ আবার গভীরভাবে মনে এসে নাড়া দিচ্ছে সেলিনা।
মানুষ কত স্বার্থপর হয়। ভেবে নিজেকে বড্ড ছোট মনে হচ্ছে জেবুনের। পিঠেপিঠি দুবোন। ছোট ছিল সেলিনা। দিনভর কেবল এ ওর সঙ্গে খুনসুটি করে কাটাত। অথচ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ও কেমন মলিন হয়ে গেল। স্মৃতি হয়ে গেল। একসময় সে স্মৃতি হারিয়ে গেল অনেক দূরে কোথাও। কত কত দিন মনে হয়নি সেলিনাকে। অথচ এখন মনে হচ্ছে ও এ ঘরেই ঘুরছে। পায়চারী করছে। বেলকোনিতে দাঁড়িয়ে দূরের আকাশ দেখছে।
সত্যি বলতে কী সেলিনা অনেক বছর পর ফের স্বপ্নে দেখা দিচ্ছে। বলছে শাহবাগ চত্বরে চলে আয় বুবু। আমি আছি। কখনও বলে, আর্ট ইনস্টিটিউটের পুকুর পাড়ে বসে আছি বুবু। বটগাছ না কি একটা গাছ আছে। বড্ড ঝাপানো। তারই ছায়ায় বসে আছি। কখনও আবার দেখে, ওর মাথার কাছে দাঁড়িয়ে। মাঝে মাঝে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে জেবুনের মাথায়। বলছে, বুবু তোর মাথার অমন লম্বা চুলগুলো গেল কোথায়। এ কী হাল তোর শরীরের। শুকিয়ে কাঠ! বিছানার সঙ্গে সেটে গেছিস একেবারে!
জেবুন মিটিমিটি হাসে। বেঁচে আছি এই তো বেশি। বোধহয় তোর অপেক্ষাতেই এখনও চোখ মেলে চাইছি!

মাঝে মাঝে বড্ড ভয় হয়। ঘরে-বারান্দায় কোনো মানুষের অস্তিত্ব দেখা যায় না। কিন্তু মনে হয় কোনো এক ছায়া। চোখ ফেরাতেই সরে যায় আচমকা। অনেকদিনই এমনটি হয়েছে। ছায়া দেখে অলুক্ষুণে নানা চিন্তা জেবুনের মাথায় ভিড় করে। বোধহয় মৃত্যু ওকে সহসাই কাছে ডাকবে। তবে কী ওটা যমেরই ছায়া! অদ্ভুত এ ছায়ার কথা হাসানকেও বলেছে, মনে হয় আমি আর বাঁচবো না। সময় ফুরিয়ে এসেছে। ছেলেমেয়েদের দেখো। আমি চলে যাবার পর তুমিই ওদের মা-বাবা দুই-ই। বুকে আগলে রেখো।
তারপর খুনসুটি করে বলে, তোমাদের পুরুষদের তো আবার বিশ্বাস নেই! আমি চোখ বুজতেই তুমি হয়তো হাতে মেহদি পরতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। দুষ্টু এক হাসি তখন জেবুনের চোখেমুখে।
হাসান প্রথমে একটু বিরক্ত হয়। পরে কাছে বসে নরম কণ্ঠে বলে তুমি হেরে যাবে আমাদের কখনও তা মনে হয় না। এতদূর সংগ্রাম করে যখন এসেছো তখন জয় তোমার নিশ্চিত।
এরপর থেকে যেন ছায়াটি আর দেখে না জেবুন। তবে কেন যেন সেলিনার উপস্থিতি গভীরভাবে টের পায়। মনে হয় ছায়াটা সেলিনারই। এখন ও পুরো অবয়বে আসছে। ঘুরছে। কেবল দেখা দিচ্ছে না। এমনি ভাবনায় যখন মগ্ন তখন বাইরে কোথাও কোলাহল শুনে পায়ে পায়ে বেলকোনিতে এসে দাঁড়ায় জেবুন। দেখে রূপক একটা দড়ি হাতে। দড়ির মাথা গোল করে ফাঁসির চিহ্ন এঁকেছে। বলে, দড়ি নেবে ফাঁসির দড়ি। ২০ টাকা। তারপর দুহাতে তালি বাজিয়ে ডাকে, এই শোনো তোমরা ফাঁসি দেবে না। রাজাকারের ফাঁসি। বলে ফের দড়ির মাথা গোল করে গলা ছাড়ে, দড়ি নেবে ফাঁসির দড়ি। ২০ টাকা।
বেলকোনি থেকে জেবুন খালা বেশখানিক সময় দেখে রূপকের কা-। ওর কাছে বেশ আমুদে মনে হয় ব্যাপারটি।
- রূপক আমাকে একটা দড়ি দে।
- ফাঁসির দড়ি! ফাঁসির দড়ি! কুড়ি টাকা।
- তা তো বুঝলাম। আমাকে একটা দে। একটু পরেই টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছি।
- ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই। তুমি ফাঁসি দেবে। দড়ি নেবে! দড়ি দড়ি ফাঁসির দড়ি কুড়ি টাকা।
খালার দিকে আর খেয়াল নেই রূপকের। পোড়ো বাড়িটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সেই ছেলেগুলো আজও ক্রিকেট খেলছে। রূপক সোজা গিয়ে ক্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে পড়ে। ছেলেগুলো হতভম্ব। রূপক দড়ি ঝোলাতে ঝোলাতে বলে জয় বাংলা। জয় বাংলা। অমন সময় দস্তগির কাকু চেঁচিয়ে ওঠে। বেলকোনিতে দাঁড়িয়ে ছেলেপুলেদের ক্রিকেট খেলা দেখছিল ও।
- এবার বুঝেছি জয় বাংলা বুলি ওরা কোত্থেকে শিখেছে! ওই স্ক্রাউন্ডেলগুলো বস্তাপচা এ বুলি এতদিন পর আমদানি করেছে কবর থেকে। তাই আবার বাড়ি বাড়ি বয়ে এনে মার্কেটিং করছেন তিনি। তাই তো এখন ছক্কা মারলে জয় বাংলা। কট হলে জয় বাংলা। বোল্ড আউট; জয় বাংলা। কদিন বাদে দেখবো খেতে বসে জয় বাংলা। ভালো মাছ কিনে জয় বাংলা। যত্তসব পি-ি চটকানো ব্যাপার। এই রূপক তোমাকে সাফ বলে দিচ্ছি নিজের মাথায় গোল বাধিয়েছো, এখন ছেলেপুলেদের মাথা খারাপ করো না। এই মন্টি, বান্টি, পূর্ণ তোমরা ঘরে যাও। ঐ পাগলের সঙ্গে আর দেখেছি তো মাথা ভেঙে দেবো।
ছেলেপুলেরা সুড় সুড় করে সরে পড়ে। রূপক দড়িটা ঝোলাতে ঝোলাতে পাগল! পাগল পেলে কোথায় তোমরা। পাগলেরও ফাঁসি হবে! তবে রাজাকারের ফাঁসি হবে না। ফাঁসি হবে তো!
অমনি একদঙ্গল ছেলে সমস্বরে বলে ওঠে, ফাঁসি হবে রূপকদা। রাজাকারের ফাঁসি হবে। ওরা দূর থেকে খেয়াল করছিল সব। যদি দস্তগির ব্যাটা খুব বেশি চোটপাট নেয় তখন রুখে দাঁড়াবে ওরা। বোধহয় আঁচ করতে পেরে আর তেমন মাতেনি দস্তগির।
দস্তগিরকে দেখিয়ে বলে এ রাজাকারেরও ফাঁসি হবে। আগে আর পরে। ওরও ফাঁসি হবে। পরে হবে পরে!

- হ্যাঁ ও ছোট রাজাকার। তাই পরে হবে। আগে হবে বড় রাজাকারদের।
- পাড়ার ছেলেগুলো বোধহয় সাপের পাঁচ পা দেখেছে। মুরুব্বিদের সঙ্গেও কেমন গলা উঁচিয়ে কথা বলছে। এই ছেলেরা। মুরুব্বিদের সঙ্গে কি করে কথা বলতে হয় তা কি তোমাদের মা-বাবা শেখায়নি?
খানিকটা তেড়িয়া গোছের ছেলে তরুণ, তা বড়দের সঙ্গে কেমন করে কথা বলতে হবে তা শিখিয়েছে কিন্তু রাজাকারের সঙ্গে কি করে কথা কইতে হয় তা তো শেখায়নি!
- রাজাকার! কে রাজাকার? খুব বাড় বেড়েছে। একেবারে জিভ টেনে নিয়ে আসবো।
- রাজাকারের বড় গলা! শালাকে ধর ধর।
অনেকে হইহই করে ওঠে। কেউ কেউ আবার পথ আগলায় ওদের। এ ফাঁকে দস্তগির মাথায় টুপি পরাতে পরাতে পেছনের গলি ধরে কোথায় যেন পা বাড়ায়।
জেবুনের শরীর আজ আরও ভালো ঠেকছে। তাই হুইল চেয়ারে করে শাহবাগ অবধি ঘুরে এসেছে। এই এত্তটুকুন ছেলেমেয়ে কেমন করে সেøাগান দিচ্ছে ভেবে অবাক হতে হয়। এসব গল্পই করছিলেন জেবুনখালা রিনি হাসানের সঙ্গে। রিনি নতুন আরেকটি ৭১ দেখবো বলেই হয়তো এখনও বেঁচে আছিরে। গেটের ধারে হুইল চেয়ারে বসে জেবুন খালা। রিনি দাঁড়িয়ে ছাদরে কার্নিশ ঘেঁষে। ওপর-নিচে কথা হচ্ছে। তা রূপককে দেখছি না যে রিনি!
- ও শাহবাগ গিয়েছে।
- একা!
- না দারোয়ান আছে। পাড়ার ছেলেরাও সঙ্গে গেছে।
- ওকে এখন বেশ স্বাভাবিক মনে হয়! কেমন করে সারা দিন ফাঁসি চায় রাজাকারের। আমি শুনি ঘরে শুয়ে শুয়ে। কখনও দেখি ওকে জানালা গলে। দেখি ওর সেøাগানে ও ডুবে আছে, দেখে ভারী ভালো লাগে। দেখে মনে হয় পূর্ণ স্বাভাবিক ও। কোনো গোল-টোল নেই মাথায়।
রিনির মুখ আনন্দে ভরে ওঠে। বলে, জেবুন তুমিও দিব্যি সেরে উঠছো দেখছি। কে বলে তোমার ক্যানসার! ক্যামো চলছে একটার পর একটা! শরীর না কুলোলে শাহবাগ অবধি কেউ যায় এই শরীর নিয়ে! তুমি যে এত হ্যাপা সামলে এসেছো দেখে মনেই হয় না।
রিনি আশীর্বাদ করো রাজাকারদের বিচারটা যেন দেখে যেতে পারি। তা হলে পরপারে গিয়ে সেলিনাকে অন্তত বলতে পারব তোর ঘাতকদের বিচার হয়েছে!
রাতে জেবুন ফের স্বপ্নে দেখে সেলিনাকে। মাথা গোল করে মোটা এক ফাঁসির দড়ি পরিয়ে দিচ্ছে এক যুবককে। যার মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরনে। স্বপ্নটা দেখে অনেক সময় আর দুচোখ এক করতে পারেনি জেবুন।
এদিকে কেন যেন খুব ভোরেই রূপক পথে নেমে এসেছে। জয় বাংলা! জয় বাংলা! জয় বাংলা হবে তো! হ্যালো হ্যালো এই যে জয় বাংলা হবে?
লোকটা মুচকি হেসে বলে হবে! হবে! আলবাৎ হবে!
তোমার আমার ঠিকানা? পথচারী অনেকেই জড়ো হয়েছে ততক্ষণে। তাদের কে যেন বলে, পদ্মা মেঘনা যমুনা!
যমুনা! যমুনা আমাদের ঠিকানা মা! মা! গলা ছেড়ে ডাকতে থাকে রূপক।
মায়ের কেন যেন ভালো ঘুম হয়নি রাতে। রূপকের বাবা সারারাত পায়চারি করছিল শুধু। এমনিতেই মানুষটা কেমন চুপসে গেছে অনেক দিন! মুখে রা সরে না বললেই হয়। সব সময় আনমনা থাকে। তার ওপর আজকাল রূপক রাজাকারদের নিয়ে কেন এত হইচই করছে তা ওকে ভাবিয়ে তুলেছে। জঙ্গিরা তো মারার সময় বাছ-বিচার করবে না। কার মাথায় গোল আছে কার মাথায় নেই তা যাচাই করবে না। যাকে টার্গেট করবে ঠিকই প্রাণ খুইয়ে ছাড়বে।
অমনি রূপকের কণ্ঠ শুনে মা-বাবা দুজনেই বরান্দায় এসে দাঁড়ায়।
- মা যমুনায় আমাদের ঠিকানা। যমুনা কোথায় মা। আমাদের যেতে হবে বাবা। যমুনায় যেতে হবে!
- যাবো বাবা যাবো! তুমি ঘরে এসে তৈরি হয়ে নাও।
- যমুনায় যাবো আমরা। আমাদের ঠিকানা যমুনা।
তারপর জয় বাংলা বলতে বলতে ঘরে চলে আসে রূপক। পথচারীদের অনেকেই ভিড় করেছে ততক্ষণে। ওদের বেশিরভাগ প্রাতভ্রমণ সেরে ফিরেছে। তাদের মধ্যে দস্তগিরও আছে। এর-ওর কথার ফাঁকে একসময় ঠাঁই করে নেয় সেও।
শাহবাগ শাহবাগ শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা। নাতিরা সেদিন খুব করে ধরলো নিয়ে যেতে। আজ না কাল করে কাটিয়েছি। সেদিন আর ছাড় দিল না, বলল, যে করেই হোক আজ নিয়ে যেতে হবে। অগত্যা গেলাম। চারদিকে শুধু সেøাগান। মিছিলের পর মিছিল জোয়ারের পানির মতো ধেয়ে আসছে মিছিল। যেন আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাবে! খরস্রোতা পানির মতো জোর সে মিছিলে! অগত্যা নিরাপদ এক কোণে জায়গা নিয়ে দেখছিলাম শুধু মানুষ আর মানুষ! স্রোতের মতো ধেয়ে আসছে। দেখতে দেখতে একসময় দেখি আমিও ওদের একজন হয়ে গেলাম।
- একজন হয়ে গেলাম মানে! কে যেন জানতে চায়।
মানে… মানে…। কথা জড়িয়ে যায় দস্তগিরের। আবেগে ভারী হয়ে আসে ওর কণ্ঠ। আসলে… আসলে… মানে… একসময় দেখি আমিও হাত তুলে বলছি জয় বাংলা! জয় বাংলা! মনে হলো একাত্তুরের দিনগুলোতে ফিরে গেছি আবার। ওই স্পিরিট আমাদের সবাইকে তাড়া করে ফিরছে। তা না-হলে আমিও কেন…
বলতে বলতে দুচোখ বেয়ে জল গড়াতে থাকে দস্তগিরের। সে জল ছুঁয়ে যায়, ভিজিয়ে যায় আশপাশের আরও অনেককে।

শ্রেণী: