ডেথ সার্টিফিকেট

49

49খালিদ মারুফ: মিসেস অবন্তী গুহ, বয়স ঊনপঞ্চাশ।
কাছে-দূরে থেমে থেমে গুলির আওয়াজের মধ্যে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে সকালের কাছাকাছি সময়ে এসে সিদ্ধান্ত নিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে জমানো তার স্বামীর প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাগুলো যত দ্রুত সম্ভব তুলে ফেলবেন। তুলে ফেলবেন ইস্টার্ন ফেডারেল ইন্স্যুরেন্সের বীমার টাকাটাও। বেঁচে দিবেন তাদের যৌথ জীবনের বহু স্মৃতিবিজড়িত প্রথম ও একমাত্র পারিবারিক বাহন; কালো মরিস মাইনরটিও। কার্যত শহরে নির্বিচার গণহত্যা শুরুর প্রথম রাতটির পর থেকেই তিনি পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তার পঞ্চদশবর্ষীয়া কন্যাটিকে নিয়ে। মরিস মাইনরটি পড়ে আছে তার স্বামীর নামে বরাদ্দকৃত এবং বর্তমানে পরিত্যক্ত বাড়িটির গ্যারাজে। পালিয়ে বেড়াচ্ছে তার ড্রাইভারও। সুতরাং অধ্যাপক মহোদয়ের স্মৃতিবিজড়িত ঐ গাড়ি এখন তার নিকট একটি বোঝা, তাই সেটাকে বেঁচে দেওয়াই শ্রেয় বলে মনে হচ্ছে। স্বামীর প্রভিডেন্ট ফান্ড, বীমা ও গাড়ি বিক্রির টাকা দিয়ে তিনি ঠিক করতে চান তা এখনও স্থীর করেন নি। ইতোমধ্যেই তার বিদেশি বন্ধুদের পাঠানো কয়েকটি সহমর্মিতামূলক চিঠি তার হাতে এসে পৌঁছেছে, সেইসব চিঠিতে সহমর্মিতা জানানোর পাশাপাশি দুজন বিলেতি বন্ধু তাকে দেশত্যাগ করে সেখানে গিয়ে আশ্রয় নেবার জন্য অনুরোধও করেছেন। এবং সেক্ষেত্রে সেখানে তার চাকরিপ্রাপ্তিসহ অন্যান্য সুবিধা-অসুবিধার বিষয়টিও সে বা তারা দেখবেন বলে চিঠিতে মিসেস গুহকে আশ্বস্ত করেছেন। তবে এই মুহূর্তে তিনি চাইলেও দেশত্যাগ করতে পারবেন না; কেননা মার্চের মাঝামাঝি তিনি তার ও তার কন্যার পাসপোর্ট দুটি নবীকরণের জন্য জমা দিয়েছিলেন। যা আর ফেরত পাননি।
বেশ কিছুদিন হয় মিসেস গুহ কন্যাটিকে মিশনারি-চালিত এতিমখানায় তুলে দিয়ে নিজে এসে আশ্রয় নিয়েছেন একই মিশনারি দ্বারা পরিচালিত হাসপাতালটিতে। প্রথম কিছুদিন তিনি উচ্চ রক্তচাপজনিত রোগের রোগী হিসেবে হাসপাতালের তিন তলায় ভেতরের দিকের একটি কেবিনে অবস্থান করছিলেন। একটু সুস্থ হবার পর, হাসপাতালের পরিচালক সিস্টার ফারাহ রোজারিও’র সাথে কথা বলে হাসপাতালের লাইব্রেরিটার দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে তিন তলার কেবিন ছেড়ে নেমে এসেছেন নিচতলায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে তার নিরাপত্তার স্বার্থে বাইরে বেরোনোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। তবে সকাল হলে, শেষ রাতে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রস্তুত হয়ে একটি কালো শাড়িতে শরীর আবৃত করে মাথার ঘোমটা যতটা সম্ভব টেনে নামিয়ে টহলরত মিলিটারিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে দশটা বাজবার কিছুক্ষণ পূর্বেই তিনি হাজির হন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ভবনে। ভয়ে-আতঙ্কে মুখ শুকিয়ে থাকা ছাত্রবিহীন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী যথাসাধ্য অফিস চালিয়ে যাচ্ছেন। নিচতলা থেকে খোঁজ নিয়ে মিসেস গুহ সোজা উঠে এলেন তিন তলায় অবস্থিত রেজিস্ট্রার মহোদয়ের দফতরে। রেজিস্ট্রার মহোদয় তার দফতরেই ছিলেন। ফাঁকা দফতরের দরজায় নামানো পর্দা টেনে ভেতরে ঢুকে নিজের পরিচয় দিতেই রেজিস্ট্রার মহোদয় তাকে চিনতে পেরে বসতে বললেন এবং তার জন্য কমলা রঙের এক কাপ কফিরও ব্যবস্থা করলেন। মিসেস গুহ তার সামনে রেখে যাওয়া কফির পেয়ালায় পরপর দুটি চুমুক দিয়ে তার এখানে আসবার মূল কারণটি রেজিস্ট্রার মহোদয়কে জানালেন।
রেজিস্ট্রার মহোদয় খানিকটা আশ্চর্য হবার ভঙ্গিতে নাকের ওপর নেমে আসা রিমলেস মোটা চশমাটিকে ঠেলে ওপরে তুলে মিসেস গুহ’র দিকে ঝুঁকে এসে বললেন, ‘কী বলছেন? অধ্যাপক গুহ এখনও কাজে যোগ দেন নি! তিনি কি আর চাকরি করতে চান না? সরকার তো বলেই দিয়েছে যারা কাজে যোগ দিতে চায় তারা নির্দ্বিধায় যোগ দিতে পারে, তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’
রেজিস্ট্রার মহোদয়ের কথা শেষ হলে, মিসেস গুহ তাকে বললেন, ‘অধ্যাপক গুহ আর কাজে যোগ দিবেন না। যোগ দিতে পারবেনও না, কেননা তিনি মারা গেছেন।’ রেজিস্ট্রার মহোদয় তার গোঁফ ও চশমায় অবিশ্বাস ফুটিয়ে বললেন, ‘কী বলছেন! আমরা তো জানি অধ্যাপক গুহ পালিয়ে গেছেন। পালিয়ে তিনি আগরতলা চলে গেছেন।’
‘Ñ না। তিনি পালান নি। পালাতে চানও নি। তিনি মারা গেছেন। সেই রাতে তার মতো অন্য আটজন অধ্যাপকের মতোই। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার হিসেবে আপনার সেটা জানা থাকা উচিত ছিল।’ মিসেস গুহ শেষ বাক্যটি ছুড়ে দেওয়ার পর রেজিস্ট্রার মহোদয়ের গোঁফ ও চশমাওয়ালা মুখে পুনরায় একটি ছোট্ট পরিবর্তন দেখা যায়। তিনি তার সামনে ঠা-া হয়ে আসা কমলা রঙের কফিতে একটি দীর্ঘ চুমুক দিয়ে খানিকটা পিছিয়ে নতুন তোয়ালে ঢাকা চেয়ারটিতে হেলান দিয়ে বসে বলেলন, ‘আচ্ছা। তবে চাইলেই তো আর প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা আপনি তুলে নিতে পারবেন না। আমার যতদূর জানা আছে, অধ্যাপক গুহ তার প্রভিডেন্ট ফান্ডের জন্য কোনো উত্তরাধিকার মনোনীত করে যাননি। যদিও আইন অনুযায়ী স্ত্রী হিসেবে আপনার সেটা পাবার অধিকার রয়েছে। সেক্ষেত্রে আপনাকে প্রথমত জমা দিতে হবে সাকসেশন সার্টিফিকেট, তারপর মিটিয়ে আসতে হবে অধ্যাপক গুহ-র নিকট বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল দেনা-পাওনা। সর্বোপরি জমা দিতে হবে তার ডেথ সার্টিফিকেট।’
মিসেস গুহ রেজিস্ট্রার মহোদয়ের সকল কথাই মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপর বললেন, ‘অধ্যাপক গুহ-র সকল দেনা-পাওনার হিসেব আমাকে দিন, আমি মিটিয়ে দিচ্ছি।’ রেজিস্ট্রার মহোদয় তাকে জানালেন, ‘এসব কিছুর হিসাব পেতে আপনাকে যেতে হবে প্রধান হিসাবরক্ষকের কার্যালয়ে।’ মিসেস গুহ-ও ততক্ষণে ঠা-া হয়ে যাওয়া কমলা রঙের কফিতে শেষ চুমুকটি দিয়ে রেজিস্ট্রার মহোদয়কে ধন্যবাদ জানিয়ে নিচে নেমে গেলেন প্রধান হিসাবরক্ষকের কক্ষে। কর্মহীন হিসাবরক্ষক তার সুবিশাল হিসাবের খাতাটি উন্মুক্তাবস্থায় সামনে রেখে তাকিয়ে ছিলেন জানালার দিকে। জানালার লোহার সিকের ফাঁক গলে হয়তো তার দৃষ্টি তখন আরও দূরে; কোনো আপাত নিরাপদ গ্রাম-জনপদে, যেখানে তিনি রেখে এসেছেন প্রিয় স্ত্রী ও সন্তানদের।
মিসেস গুহ একটি ছোট্ট কাশি দিয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলেন। হিসাবরক্ষক তাকে বসতে বলে সামনের খাতাটা বন্ধ করে পেছনের কাঠের আলমারি খুলে বের করলেন অমনই আরেকটি খাতা। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টে খাতার মাঝামাঝি তিনি পেয়ে গেলেন অধ্যাপক গুহকে। চোখ তুলে বললেন, ‘ছেষট্টি সালে অধ্যাপক গুহ তার চাকরির বিপরীতে লোন নিয়ে বিলেত গিয়েছিলেন, লোনের পরিমাণ আট হাজার টাকা, এ পর্যন্ত শোধ হয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার, বাকি আছে দুই হাজার পাঁচশত টাকা। আর অধ্যাপক গুহ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে পাবেন কেবল মার্চ মাসের বেতনটা।’
মিসেস অবন্তী গুহর মনে আছে সে কথা। অধ্যাপক গুহ নিজের পয়সায় ডক্টরেট করতে বিলেত গিয়েছিলেন, আর লোনটা নেওয়া হয়েছিল সেই সময়। মিসেস গুহ প্রস্তুত হয়েই এসেছিলেন। ব্যাগ হাতড়ে নিজের চেক বইটি বের করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে আড়াই হাজার টাকার একটি ক্রস চেক লিখে, তুলে দিলেন হিসাবরক্ষকের হাতে। চেকটা হাত বাড়িয়ে নিতে নিতে হিসাবরক্ষক আগ বাড়িয়ে তাকে বললেন, ‘সাকসেশন সার্টিফিকেট পেতে অধ্যাপক গুহর ট্যাক্স ক্লিয়ারেন্স প্রয়োজন হবে। আপনি আরেক দিন আসুন, আমি তার বেতন বিবরণী করিয়ে রাখব। তার আগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অধ্যাপক গুহর নামে বরাদ্দকৃত বাড়িটা বুঝিয়ে দিতে হবে আপনাকে। সে বাড়ির পাঁচটি ফ্যান, একটি টেলিফোন ফেরত দিতে হবে এবং ভাঙা দরজা ও পানির কলগুলো মেরামত করিয়ে দিতে হবে।’ হিসাবরক্ষক মহোদয়ের শেষ কথাগুলো মিসেস গুহকে কিছুটা উত্তেজিত করে তুলল, কেননা সেদিনের পর তিনি আর সে বাড়িতে যাননি, যেতে পারেন নি। ফ্যান-টেলিফোন-পানির কলের কী হয়েছে তা তিনি জানেন না, জানেন কেবল ভাঙা দরজার কথা; যেগুলো ভেঙে ছিটকে গিয়েছিল মিলিটারির রাইফেল ও ক্রমাগত বুটের ঘায়ে। যার দায়িত্ব কিছুতেই সে ঘরের বাসিন্দাদের ওপর বর্তায় নাÑ কথাগুলো যতটা সম্ভব নরম সুরে হিসাবরক্ষক মহোদয়কে জানালেন তিনি। তবে হিসাবরক্ষক মহোদয় তার এ ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হলেন কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত না হয়েই তিনি তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে রেজিস্ট্রার ভবন থেকে দ্রুত নেমে গেলেন।
রেজিস্ট্রার ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে ডানে-বাঁয়ে ভালো করে দেখে নিলেন রাস্তাটা, তারপর লম্বা পা ফেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাঁকা চত্বরটা পাড়ি দিয়ে সোজা উপস্থিত হলেন লাইব্রেরিতে। ছাত্র-শিক্ষকে মুখরিত হয়ে থাকা লাইব্রেরিটা আজ অস্বাভাবিক রকম ফাঁকা। হিসাবরক্ষক সাহেবের মতোই সমান আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তা মুখে নিয়ে পুরাতন খবরের কাগজ পড়তে থাকা লাইব্রেরিয়ান মুখ তুলে তাকালেন মিসেস গুহর দিকে, তারপর খাতাপত্র ঘেটে বিভিন্ন সময়ে অধ্যাপক গুহর নেওয়া বইগুলোর একটি নাতিদীর্ঘ তালিকা তুলে দিলেন তার হাতে। তালিকাটি হাতে নিয়ে মিসেস গুহর মনে হলো এগুলো ফেরত দেওয়া সম্ভব। কেননা অধ্যাপক গুহ তার প্রয়োজনীয় বইপত্রসমূহ কোথায় রাখতেন তা তার জানা আছে।
লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে এবার তিনি এলেন অধ্যাপক গুহর বিভাগে; যেখানে তিনি পড়াতেন। যে কক্ষটিতে অধ্যাপক গুহ বসতেন তা এখন তালাবদ্ধ। কোনো ছাত্র নেই সেখানে, অধ্যাপকদের অধিকাংশ কক্ষই তালাবদ্ধ। একজন এসিসটেন্ট ও একজন এসোসিয়েটকে তিনি দেখলেন সেমিনার কক্ষে বসে গল্প করতে। তারা মিসেস গুহকে দেখে গাল হা করলেন এবং জানালেন, তারাও জানে অধ্যাপক গুহ পালিয়ে আগরতলা চলে গেছেন। এই এতদিন পর, অধ্যাপক গুহর দুজন অপেক্ষাকৃত তরুণ সহকর্মীর একযোগে হা হয়ে ওঠা মুখের দিকে তাকিয়ে মিসেস গুহর শুষ্ক ঠোঁটের প্রান্তে একটু হাসি ফুটে উঠল। সেমিনার থেকে চাবি নিয়ে মিসেস গুহ নিজেই খুললেন অধ্যাপকের কক্ষের তালা। পেছনের বড় জানালাটি বন্ধই আছে, বন্ধ করা আছে ফ্যান ও লাইট। তবু যেন কক্ষটি ধুলোয় আচ্ছন্ন। বন্ধ জানালা না খুলে লাইট জ্বালিয়ে টেবিলে-আলমারিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বইগুলো থেকে লাইব্রেরিয়ানের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী বেশ কয়েকটি বই তিনি সেখানেই পেয়ে গেলেন। বইগুলো ব্যাগে ঢুকিয়ে কক্ষটিকে পুনরায় তালাবদ্ধ করে চাবিটি বুঝিয়ে দিয়ে তিনি রওনা হলেন তাদের ফেলে যাওয়া বাসভবনের দিকে।
বিশ্ববিদ্যায়ের প্রধান রাস্তাটায় উঠে একটি গা ছমছমে অনুভূতির মুখোমুখি হলেন তিনি, কেননা সেখান দিয়ে তখন মিলিটারির তিনটি সাঁজোয়া যান সারিবদ্ধভাবে চলে যাচ্ছে উত্তর দিকে তবে গাড়িগুলো ততক্ষণে বেশ কিছুদূর চলে গেছে এবং সেগুলো চলেই গেল। মিসেস গুহ কিছুটা ভারমুক্ত হয়ে ঢুকে পড়লেন হোস্টেলের সীমানায়। শিক্ষকদের আবাসিক ভবনগুলোর দিকে যেতে পাড়ি দিতে হয় বড় মাঠটি। সেটা পেরিয়ে যেতে যেতে তার চোখ পড়ল মাঠের শেষ দিকে, যেখানে সে রাতে হত্যার শিকার ছাত্র-শিক্ষকদের মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। মিসেস গুহ দেখলেন, লাশগুলো মাটিচাপা দেওয়া জায়গাটির ওপর ইতোমধ্যেই ফুলের চাষ শুরু হয়েছে। এবং ততদিনে পঁচে যাওয়া লাশগুলো থেকে তৈরি হওয়া জৈব সারে আরও বেশি উর্বর হয়ে ওঠা মাটির ওপর তরতর করে বেড়ে উঠেছে গাঁদা ও গোলাপের চারাগুলো যদিও এখনও ওগুলিতে ফুল আসেনি। কর্মরত মালিরা দূর থেকে তাকে চিনতে পারল এবং তাদের মধ্য থেকে বুড়িয়ে কুঁজো হয়ে আসা রতন মালি দ্রুতপায়ে এগিয়ে এসে গড় হয়ে মিসেস গুহকে প্রণাম করলেন, তারপর উঠে গিয়ে কয়েক থোকা রঙ্গন ছিড়ে, ‘মা ফুলগুলো নিন’Ñ বলে তুলে দিলেন মিসেস গুহর হাতে। তার চলমান জীবনের এমনতর সময়ে ফুলের উপযোগিতা কি তা ঠিক বুঝে উঠতে না পারলেও মিসেস গুহ হাত পেতে ফুলগুলিকে গ্রহণ করলেন।
হাত ভরা থোকা-থোকা রঙ্গন নিয়ে পরিত্যক্ত বাড়িটির সমানে কোমর সমান উঁচু লোহার নিরাপত্তা বেষ্টনি ঠেলে সোজা ওপরে উঠে গেলেন। সিঁড়ি দিয়ে উঠবার সময় পায়ের নিচে মিসেস গুহ গড়িয়ে যাওয়া শুকনো রক্তের দাগ দেখলেন তবে সে রক্ত দিয়ে কোনো গন্ধ উদগীরিত হচ্ছে না। রক্ত মাড়িয়ে ওপরে উঠতে উঠতে তার মনে হলো : এগুলো পরিসংখ্যানের ঐ অধ্যাপক ও সেই রাতে তার ঘরে অবস্থানরত অপর তিনজন পুরুষের শরীর থেকে বেরুনো রক্ত, যাদের ঘর থেকে টেনে বের করে সিঁড়ির ওপর এনে গুলি করা হয়েছিল। বাসার নিচে গুলি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা অবস্থা থেকে তুলে আনতে আনতে অধ্যাপক গুহর শরীরের ছুটন্ত রক্তধারাটি অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল, সুতরাং সিঁড়ির ওপর ছড়িয়ে থাকা রক্ত তার নয়। ভাঙা দরজা দিয়ে ঢুকে মিসেস গুহর প্রথমেই চোখ গেল বসবার ঘরের ছাতের দিকে, একটি ফ্যান তখনও সেখানে ঝুলতে দেখে তিনি কিছুটা আশ্বস্ত হলেন এবং একে একে সবগুলো কক্ষের ফ্যানগুলোই অক্ষত অবস্থায় ঝুলতে দেখলেন। ততক্ষণে অধ্যাপক গুহর কর্মহীন ড্রাইভারটি তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। হয়তো সে আশেপাশেই ঘুরছিল, মালিদের কাছে মিসেস গুহর আগমনের খবর পেয়ে এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। মিসেস গুহ তাকে ফ্যানগুলো খুলে নিয়ে যেভাবে হোক রেজিস্ট্রার ভবনে পৌঁছে দেবার নির্দেশ দিলেন। তারপর ঢুকলেন অধ্যাপক গুহর কক্ষে, একসাথে থাকাকালীন যে ঘরটিতে তিনি খুব কমই ঢুকতেন। সংসারবোধ ততটা তীব্র না হলেও স্ত্রী-কন্যার প্রতি অধ্যাপক গুহর ভালোবাসায় কোনো কমতি ছিল না। সেজন্যই তার মগ্নতায় কখনও ব্যাঘাত ঘটাতে চাইতেন না মিসেস গুহ। অধ্যাপক গুহর বেতের ছাউনিওয়ালা ইজি চেয়ারটির ওপর দিয়ে গড়িয়ে যাওয়া রক্ত সিঁড়িতে ছড়িয়ে থাকা রক্তের মতোই শুকিয়ে লেপ্টে আছে। সেদিকে বিশেষ না তাকিয়ে ইতোমধ্যে কয়েক দফা ভাঙচুর ও লুটের শিকার হওয়া অগোছালো ঘরটি হাতড়ে লাইব্রেরি থেকে আনা বইগুলোর আরও কয়েকটি সেখানে খুঁজে পেলেন। তবে তন্ন-তন্ন করে খুঁজেও ওয়েবস্টারের দুটি খ-ের কোনো হদিস করতে পারলেন না। নিরাশ্রয় হয়ে যাবার পর মিসেস গুহ প্রথমে আশ্রয় নিয়েছিলেন অন্য একটি হাসপাতালে। তবে কিছুদিন পর ঐ হাসপাতালের স্বত্বাধিকারীর পালিয়ে গিয়ে প্রবাসী সরকারে যোগ দেওয়ার খবর রেডিওতে প্রচার হবার পরদিন থেকে সেটা এখন আলবদরের হেডকোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। হয়তো সেই জায়গায় খুঁজলে ওয়েবস্টারের খ- দুটি পাওয়া যেতে পারে। তবে তা অসম্ভব। তিনি ঘর ছেড়ে বারান্দা দিয়ে ঘুরে নিচে নামলেন। বারান্দায় পড়ে থাকা ফুলের টবগুলোর দিকে দৃষ্টি গেল তার। তিনি দেখলেন, অজ্ঞাত কারণে অধ্যাপক গুহর প্রিয় বোগেনভেলিয়ার চারাটি তখনও বেঁচে আছে। বাকিগুলো শুকিয়ে কাঠ। এবং নিচে নামতে নামতে তার মনে হলো মালির দেওয়া রঙ্গনের থোকাগুলো তিনি ফেলে এসেছেন অধ্যাপক গুহর প্রিয় ইজি চেয়ারটার ওপর।
মিসেস গুহ আবার লাইব্রেরিতে এলেন। খুঁজে পাওয়া বইগুলো লাইব্রেরিয়ানের হাতে দিয়ে জানালেন, ‘ওয়েবস্টার দুটো খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং যাবেও না।’ লাইব্রেরিয়ান তাকে বললেন, ‘সেক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ হিসেবে আপনাকে পুরো চৌদ্দ খ-ের দাম দিতে হবে।’ লাইব্রেরিয়ানের দেওয়া চরম অস্বস্তিকর ক্ষতিপূরণের দাবি শুনে তার দ্বারা যতটা সম্ভব বচসা চালিয়ে তিনি স্থান ত্যাগ করলেন।
তারপর তার মনে হলো সাকসেশন সার্টিফিকেটের কথা। দাঁড়িয়ে তিনি একদ- ভেবে নিলেন, এই কাজে ঠিক কে তাকে সাহায্য করতে পারবে। তার স্বামীর বন্ধু, ইংরেজি পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক জনাব গণি সাহেবের কথা মনে হলো তারÑ যার স্ত্রী ব্যক্তিগত পর্যায়ে মিসেস গুহর বন্ধু হন; সিদ্ধান্ত নিলেন তার দ্বারস্থ হবেন। হেঁটে বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ি দিয়ে পেট্রল পাম্পটির সামনে এসে বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়া এক প্রবীণ রিকশাওয়ালার রিকশায় চেপে তিনি এলেন সাংবাদিক গণি সাহেবের বাসায়। গণি সাহেবের স্ত্রীর সাথে অসংখ্য দুর্দশার কথা ভাগাভাগি করে তিনি তার আসল কথাটি পাড়লেন। মিসেস গণি টেলিফোন তুলে শহরের অভিজাত ও নিরাপদ এলাকায় বসবাসরত এক ডাকসাইটে ব্যারিস্টারকে ফোন করলেন। কথা শেষে জানালেন, সাকসেশন সার্টিফিকেট পাওয়া সম্ভব। অধ্যাপক গুহর ট্যাক্স পরিশোধ করে এগারোশত টাকার স্ট্যাম্প ও ছয়শত টাকা ফিস জমা দিলে সাকসেশন সার্টিফিকেট হয়ে যাবে। মিসেস গুহ, মিসেস গণির সাথে আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে বিদায় নিলেন।
দুদিন পর, একই রকম উৎকণ্ঠা বুকে নিয়ে লম্বা ঘোমটা টেনে তিনি হাজির হলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাত নম্বর ওয়ার্ডে। পায়ে পায়ে হেঁটে গিয়ে দাঁড়ালেন দুই নম্বর বেডটির শিয়রে; যেটি তখন ফাঁকা। এবং বেডটির গায়ে তখনও সাঁটানো আছে ‘বুলেট ইনজুরড’ লেখা কাগজের লেবেলটি। বুঝতে পারলেন, অধ্যাপক গুহর পর ছয় মাস কেটে গেলেও এই বেডে কোনো রোগী ভর্তি করা হয়নি; হয়তো রোগীর স্বল্পতার কারণেই। ওয়ার্ডে কর্তব্যরত নার্সদের সাথে কথা বলে জানলেন, সে সময় যে চিকিৎসকÑ অধ্যাপক গুহর শরীরে তিন দিনব্যাপী ব্যর্থ চিকিৎসা চালিয়েছিলেন তাকে বদলি করা হয়েছে। ভারতী নামের এক নার্স তাকে চিনতে পেরে নিয়ে গেলেন নতুন দায়িত্ব পাওয়া চিকিৎসকের কাছে। নতুন চিকিৎসক প্রথমেই জানতে চাইলেন, তখন কেন ডেথ সার্টিফিকেট নেওয়া হয়নি? মিসেস গুহ তাকে জানালেন, তিনি ডেথ সার্টিফিকেট চেয়েছিলেন, তবে তাকে তা দেওয়া হয়নি। কেন দেওয়া হয়নি তা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরই জানবার কথা। শুধু তখন নয়, পরেও দু-একবার মিসেস গুহ তার স্বামীর ডেথ সার্টিফিকেট চাইতে এসেছেন। একজন চিকিৎসক তাকে জানিয়েছিলেন, ডেথ সার্টিফিকেট প্রস্তুত করা হয়েছে, তবে যিনি স্বাক্ষর করবেন তিনি উপস্থিত নেই।
নতুন চিকিৎসক একটু নড়েচড়ে বসলেন। তারপর বললেন, ‘তাকে যেখানে সমাহিত করা হয়েছে সেখান থেকে কোনো সার্টিফিকেট কিংবা মানি রিসিপ্ট পেয়েছিলেন কি না?’ মিসেস গুহ বললেন, ‘তাকে কোথাও সমাহিত করা হয়নি। কেননা সেই মুহূর্তে হাসপাতাল থেকে একটি মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে পোড়াবার মতো পরিস্থিতি ছিল না। তাছাড়া, চেতন থাকা অবস্থায় অধ্যাপক গুহ চেয়েছিলেন তার লাশটা যেন মেডিকেলের ছাত্রদের ব্যবহারের জন্য দিয়ে দেওয়া হয়। আমি তার এমন ইচ্ছার কথা সেই ডাক্তারকে জানিয়েছিলাম, তবে তিনি অধ্যাপক গুহর এমনতর ইচ্ছার অনুকূলে কোনো লিখিত দলিল না থাকায় সে বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবেন না বলে আমাকে জানিয়েছিলেন।’ চিকিৎসক একটু পিছিয়ে বসে তাকালেন নার্স ভারতীর দিকে, ভারতী মিনমিনে গলায় তার কর্তাকে যা জানালো তা এরূপ : অধ্যাপক গুহর লাশটা দুদিন যাবৎ বারান্দায় একটি স্ট্রেচারের ওপর পড়ে ছিল। এবং গুলি খেয়ে মরা ইপিআর ও অন্যান্য কিছু লাশের সাথে তারা ‘বাবু’র লাশটাও আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের গাড়িতে তুলে দিয়ে চেয়েছিল। তবে মিলিটারি প্রহরার ভেতর দিয়ে একটি ধুতি জড়ানো লাশ বয়ে নেবার ঝুঁকি তারা নিতে রাজি হয়নি। এবং নদীর ওপার থেকে বিপদসংকুুল পথ পাড়ি দিয়ে তারপর দিন ভারতী আর হাসপাতালে আসতে পারেনি এবং একদিন পরে কাজে যোগ দিয়ে ভারতী বারান্দার সেই স্ট্রেচারটিকে ফাঁকা দেখতে পায়।
কর্তব্যরত চিকিৎসক এবার যেন খানিকটা আন্তরিক হয়ে উঠলেন। তিনি মিসেস গুহকে সাথে নিয়ে হিমঘরে প্রবেশ করলেন এবং বিরাট সব লোহার আলমারির দেরাজ খুলে একটা একটা করে লাশের মুখ মিসেস গুহকে দেখালেন। মিসেস গুহ দেরাজে আটকানো লাশগুলোর কোনোটির সাথে নিজের স্বামীর মুখের আদল মেলাতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলেন নতুন চিকিৎসকের কক্ষে। নতুন চিকিৎসক তার কণ্ঠে আশ্বস্তের স্বর ফুটিয়ে মিসেস গুহকে বললেন, ‘আপনি আগামীকাল একবার আসুন।’
তারপর দিন সকালে মিসেস গুহ হাসপাতালে না গিয়ে গেলেন ট্যাক্স অফিসে এবং অধ্যাপক গুহর বকেয়া ট্যাক্স মিটিয়ে রিটার্ন স্লিপ পেতে পেতে বিকেল হয়ে পড়ায় তিনি ফিরে গেলেন তার বর্তমান আশ্রয়; মিশনারি হাসপাতালের নিচতলার আলোহীন কক্ষটিতে। পরদিন সকালে সাত নম্বর ওয়ার্ডে এসে ভারতীকে না পেয়ে সোজা ঢুকে গেলেন সেই ডাক্তারের কক্ষে। ডাক্তার তার সিটেই অবস্থান করছিলেন, মনে হলো তিনি অধ্যাপক গুহর ডেথ সার্টিফিকেটটা হাতে নিয়েই বসে আছেন। বাড়িয়ে দেওয়া কাগজটা হাতে নিয়ে মিসেস গুহ একটি তৃপ্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন। যাক, অবশেষে এটা অন্তত প্রমাণ করা গেল যে, অধ্যাপক গুহ পালিয়ে যাননি, তিনি মারা গেছেন। ডাক্তারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে মিসেস গুহ বেরিয়ে এসে দাঁড়ালেন দুই নম্বর বেডটির পাশে। সেখানে তখনও ‘বুলেট ইনজুরড’ লেখা কাগজটি ঝুলে আছে। ততক্ষণে বেড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে নার্স ভারতী তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ভারতীর মুখের ওপর থেকে দৃষ্টি নামিয়ে মিসেস গুহ এবার চোখ দিলেন তার হাতে ধরা ‘মৃত্যুর প্রমাণপত্র’টির ওপর। সেখানে নাম, পিতার নাম, ঠিকানা, বয়স, ভর্তির তারিখ ও সময়, মৃত্যুর তারিখ ও সময় যথাযথ লেখা থাকলেও কারণ হিসেবে লেখা আছে, ‘নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্টে ভুগে মৃত্যু।’

শ্রেণী:

একটি মুখের হাসির জন্য

Posted on by 0 comment
8-1-2017 9-07-49 PM

ইমদাদুল হক মিলন:

8-1-2017 9-07-49 PMআপনে আসছেন কই থিকা?
বারবাড়ির সামনে দুটো জামগাছ। জামগাছের গা ঘেঁষে পাটখড়ির বেড়া। বারবাড়ির সঙ্গে ভেতর বাড়ি আলাদা করার জন্য এই ব্যবস্থা।
শিরিন দাঁড়িয়ে আছে বেড়ার সামনে। অচেনা মানুষের গলা শুনে মাথায় ঘোমটা দিয়েছিল। এখন একপলক মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে অকারণেই ঘোমটা আরেকটু টেনেটুনে ঠিক করল।
সকাল দশটা-এগারোটার রোদ বেশ ভালোই তেজালো হয়েছে। জামগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়েও গরম খুব একটা কম লাগছিল না ইউসুফের। কিন্তু গরমের তোয়াক্কা করল না সে। হাসিমুখে বলল, আমি এসেছি ঢাকা থেকে।
চান কারে?
এটা নাসিরের বাড়ি না? মুক্তিযোদ্ধা নাসির হোসেন? স্বাধীনতার পরপর শুনেছিলাম এলাকার সবাই তাকে নাসির কমান্ডার নামে চেনে। যদিও সে কমান্ডার ছিল না। ছিল সাধারণ একজন মুক্তিযোদ্ধা।
ইউসুফের কথা শুনে ফ্যাল ফ্যাল করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল শিরিন। কোনো রকমে বলল, আপনে এত কথা জানলেন কেমনে?
আমরা একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। মানে সহযোদ্ধা ছিলাম। যদিও নাসির বয়সে আমার চে’ ছোট। মুক্তিযুদ্ধের সময় একুশ-বাইশ বছর বয়স ছিল। দুর্দান্ত সাহসী, টগবগে দুর্ধর্ষ ধরনের তরুণ। মৃত্যুভয় কাকে বলে জানত না। গোয়ালিমান্দ্রার অপারেশনে দারুণ সাহস দেখিয়েছিল নাসির। যে কোনো অপারেশনে যেতে একপায়ে খাড়া। নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেছে দু-তিনবার। লোকে নাসিরকে কমান্ডার বলত, আসলে কমান্ডার ছিলাম আমি। আমার নাম ইউসুফ, ইউসুফ মির্জা।
নামটা শুনে আপাদমস্তক কেঁপে উঠল শিরিন, দিশেহারা হলো। কন কী? আপনে ইউসুফ ভাই? আপনের কথা কত শুনছি তার কাছে। আসেন ভিতরে আসেন।
শিরিনের পিছু পিছু ভেতর বাড়িতে ঢুকল ইউসুফ।
বাড়িটি অতি দীনদরিদ্র ধরনের। দোচালা জীর্ণ একখানা টিনের ঘর, রান্নাচালা আর একচিলতে উঠোন। উঠোনের একপাশে ভাঙাচোরা হাঁস-মুরগির খোঁয়াড়ের লাগোয়া পাতিলেবুর ঝাড়। 8-1-2017 9-07-40 PMরান্নাচালার ওদিকটায় লাউ কুমড়ো শসা ঝিঙের মাচান। দোচালা ঘরটার পেছনে দু-তিনটে আম আর একটা তেঁতুল গাছ। গাছগুলো জড়াজড়ি করে আছে বলে বাড়িটা বেশ ছায়াময়। উঠোনের একটা দিকে শুধু রোদ পড়েছে। সেই রোদে তারে শুকাতে দেয়া হয়েছে বারো-তেরো বছর বয়সী একটি মেয়ের ছিটকাপড়ের জামা। কয়েকটা হাঁস-মুরগি চরছে ওদিকপানে।
বাড়ি দেখে মনটা খারাপ হলো ইউসুফের।
শিরিন তখন ঘরে ঢুকে হাতলঅলা পুরনো একখানা চেয়ার এনেছে। উঠোনের ছায়ায় চেয়ার রেখে বলল, বসেন।
চেয়ারে বসতে বসতে ইউসুফ বলল, কিন্তু পাগলটা কোথায়? ইস কতদিন পর দেখা হবে! আটাশ-ঊনত্রিশ বছর তো হবেই! স্বাধীনতার পরপর প্রায়ই দেখা হতো। তখনও যুদ্ধের উন্মাদনা কাটেনি, অস্ত্রটস্ত্র জমা দেই নি। তারপর আস্তে আস্তে ঠা-া হয়ে গেল সব। আমরা একেকজন ভেসে গেলাম একেক দিকে। নাসির বিক্রমপুরের ছেলে, সে চলে এলো বিক্রমপুরে, গ্রামেই সেটেল করল। আমি চলে গেলাম ইংল্যান্ডে। বিয়েশাদি করে লন্ডনে থেকে গেলাম। দেশে দু-চারবার আসা হয়েছে; কিন্তু পুরনো বন্ধুদের কারও সঙ্গেই তেমন যোগাযোগ, দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি।
ইউসুফ একটু থামল। শিরিনের মুখের দিকে তাকাল। এবার আমি দেশে এসেছি এই একটাই উদ্দেশে। পুরনো সব বন্ধুকে খুঁজে খুঁজে বের করব, তাদের সঙ্গে দেখা করব। বয়স হয়ে যাচ্ছে, থাকি বিদেশে, কোনোদিন হার্ট অ্যাটাক-ফেটাকে শেষ হয়ে যাব, এই জীবনে কারও সঙ্গে আর দেখাই হবে না।
শাড়ির আঁচল দাঁতে কামড়ে মাটির দিকে তাকিয়ে আছে শিরিন। ইউসুফ তার দিকে তাকাল না। পকেট থেকে সিগ্রেটের প্যাকেট আর লাইটার বের করে সিগ্রেট ধরাতে ধরাতে বলল, নাসির যে বাড়ি নেই তা আমি বুঝেছি। কোথায় গেছে বলতে পারবেন? একটু যদি খবর দেয়া যায়…
কথা শেষ না করে শিরিনের দিকে তাকিয়েছে ইউসুফ, তাকিয়ে বুকে কী রকম একটা ধাক্কা খেল। সিগ্রেটে টান দিতে ভুলে গেল, চোখে পলক ফেলতে ভুলে গেল।
মুখ নিচু করা শিরিনের চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে।
যা বোঝার বুঝে গেল ইউসুফ। শিরিনের দিকে তাকিয়ে পাথর হয়ে বসে রইল। ফাঁকা শূন্য গলায় একসময় বলল, কবে?
আঁচলে চোখ মুছে শিরিন বলল, আইজ দেড় বচ্ছর।
ও আমার চে’ কত ছোট! এই বয়সেই…
কথা শেষ করে উদাস হয়ে গেল ইউসুফ। খানিক আগের উচ্ছ্বল আবেগে ভর্তি কথা বলতে পছন্দ করা মানুষটি যেন আর নেই। এখন যে বসে আছে শিরিনের সামনে সে যেন অন্য কেউ। হতাশ ম্লান, আচমকা শোকে পাথর হওয়া একজন মানুষ।
একসময় বুক কাঁপিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ইউসুফ। কত আশা করে এবার দেশে এসেছিলাম, সবার সঙ্গে দেখা করব। নাসিরের বাড়ি বিক্রমপুরের কোন গ্রামে তা বেশ ভালোই জানা ছিল, যুদ্ধের সময় একবার এসেছিলাম। এতগুলো বছর কেটে গেছে, সবকিছু একেবারেই বদলে গেছে, তারপরও বাড়ি চিনতে ভুল হয়নি। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই আসতে পেরেছি। নিজের স্মৃতিশক্তির ওপর একটা পরীক্ষা নিচ্ছিলাম যে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করে দেখি নাসিরের বাড়িটা বের করতে পারি কি-না। পারলাম ঠিকই; কিন্তু যার জন্য আসা সে-ই নেই।
আঁচলে আবার চোখ মুছল শিরিন, নাক টানল।
আনমনা ভঙ্গিতে সিগ্রেটে টান দিয়ে ইউসুফ বলল, কী হয়েছিল?
লানছে ক্যানসার হইছিল। বেদম সিগ্রেট খাইত। ক্যানসার ধরা পড়নের পরও থামে নাই।
কাজ কী করত?
আমগ গেরামের পেরাইমারি ইসকুলের মাস্টার আছিল।
ততক্ষণে দুজন মানুষই কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে, কথাবার্তার আড়ষ্টতা কেটে গেছে শিরিনের। থমথমে গলায় বলল, বহুত কষ্ট পাইয়া মরছে। ক্যানসারের চিকিস্যায় বেদম টেকা লাগে। এত টেকা আমরা পামু কই? ইসকুলের ফান্ড থিকা টেকা দিছে, ছাত্র-ছাত্রীরা চান্দা কইরা টেকা দিছে, তাও তেমুন চিকিস্যা করাইতে পারি নাই।
এই ধরনের অসুখে কিছু অবশ্য করারও থাকে না।
হাতের সিগ্রেট শেষ হয়ে গিয়েছিল, পায়ের সামনে ফেলে জুতো দিয়ে ডলে ডলে নেভাল ইউসুফ। শিরিন বলল, নিজে তো মরছেই আমগও মাইরা থুইয়া গেছে।
কথাটা বুঝতে পারল না ইউসুফ। শিরিনের মুখের দিকে তাকাল।
শিরিন বলল, এমতেই গরিব মানুষ আমরা, জমাজমি যা অল্পবিস্তর আছিল হেই হগল বেবাক গেছে তার চিকিস্যায়। সরকারি ইসকুলের মাস্টারগ আইজকাইল ভালো অবস্তা। তারা মইরা গেলে সরকার থিকা ভালো টেকাই পায়। আমরাও পাইছি। হেই হগল বেবাগ গেছে দেনা শোধ করতে। অহন আমরা পথের ফকির। কিচ্ছু নাই। খালি এই বাড়িডা, ভাঙাচুরা ঘরডা।
আপনার সংসার তা হলে চলে কী করে?
কোনো রকমে চলে। একজন মাত্র দেওর আমার, সে থাকে ঢাকায়। সে মাসে মাসে কিছু টেকা দেয়। দুই ভাই আছে, তারা দেয় কিছু। বইনরা দেয় যহন যা পারে। আমগ বিক্রমপুর হইল ধনী মাইনষের দেশ। তয় আমগ আত্মীয়-স্বজন কেঐ ধনী না। বেবাকতেই গরিব। কে কারে টানব, কন? দূরের আত্মীয় বড়লোক যারা আছে তারা কেঐ খবর লয় না। সাহাইয্যের লেইগা গেলে কুত্তা-বিলাইয়ের লাহান খেদাইয়া দেয়।
বাড়ির দশা দেখে আর শিরিনের কথাবার্তা শুনে নাসিরের ফেলে যাওয়া সংসারের অবস্থাটা পুরোপুরিই বুঝেছে ইউসুফ। বুঝে মন খুবই খারাপ হয়েছে তার। আহা কী অসহায়, হতদরিদ্র সংসার এক মুক্তিযোদ্ধার! হয়তো এরকম দশা আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধার সংসারের। কে তাদের খবর রাখে!
গাছপালার দিকে তাকিয়ে ম্লান গলায় ইউসুফ বলল, আপনাদের বাচ্চাকাচ্চা?
একটা মাইয়া। অহনও ছোড। তেরো-চৌদ্দ বচ্ছর বয়স।
এত কম বয়সী মেয়ে…
কথাটা শুনে শিরিন একটু লজ্জা পেল। মাথা নিচু করে বলল, আমগ বিয়া হইছিল দেরিতে। বিয়ার দুই বচ্ছর পর একটা পোলা হইয়া মরল। তার চাইর-পাঁচ বচ্ছর পর হইল মাইয়াটা।
কোথায় সে? তাকে যে দেখছি না!
ইসকুলে গেছে। দোফরে আইসা পড়ব। আইজ হাফ ইসকুল।
নাম কী মেয়েটার? কোন ক্লাসে পড়ে?
নাম হইল দোয়েল। পড়ে কেলাস সেভেনে।
দোয়েল নামটা শুনে খুব ভালো লাগল ইউসুফের। মুগ্ধ গলায় বলল, বাহ্। খুব সুন্দর নাম তো! দোয়েল। বাংলাদেশের জাতীয় পাখির নাম। নিশ্চয় নাসির রেখেছিল!
হ সে-ই রাখছে। বহুত আদর করতো মাইয়াটারে। মাইয়াটা আছিল তার জান।
অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে কথা বলতে বলতে শিরিন বোধহয় একটু ক্লান্ত হয়েছে। ঘরের লেপাপোছা পৈঠায় নরম ভঙ্গিতে বসল। আপনে আইছেন এতুক্ষুণ হইল, এককাপ চাও আপনেরে খাওয়াইতে পারলাম না। ঘরে চাপাতা চিনি কিচ্ছু নাই।
ইউসুফ ব্যস্ত গলায় বলল, আমাকে নিয়ে ভাববেন না। চায়ের অভ্যাস তেমন নেই আমার।
তয় দোফরে কইলাম ভাত খাইয়া যাওন লাগব। কই মাছ দিয়া ভাত খাওয়াইতে পারুম। তিন-চাইরডা কই মাছ জিয়াইন্না আছে।
এমন আন্তরিক গলায় কথাটা বলল শিরিন, শুনে আবেগে বুকটা ভরে গেল ইউসুফের। এই তো চিরকালীন বাঙালি নারী। অতিথির সেবায় দরিদ্র সংসারের সবচাইতে মূল্যবান সম্পদও ব্যয় করতে পারে। দু-চারটা কই মাছ আর একজন মানুষের একবেলার ভাত কি কম মূল্যবান এই সংসারে!
ইউসুফ মুগ্ধ গলায় বলল, আপনি এতটা আন্তরিকতা নিয়ে বলেছেন তাতেই আমি খুশি। ভাত খাব না। আর কিছুক্ষণ বসেই চলে যাব।
ইউসুফ আবার একটা সিগ্রেট ধরাল।
শিরিন বলল, ভাই, আপনের ছেলেমেয়ে কয়জন?
দুটো ছেলে এক মেয়ে। মেয়েটা ছোট। ছোট মানে দোয়েলের চে’ অনেক বড়। ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। এ বছরই বিয়ে দেব ভাবছি।
শুনে মন খারাপ করা গলায় শিরিন বলল, আমার মাইয়াটারে তো মনে হয় বিয়াই দিতে পারুম না।
ইউসুফ চমকাল। কেন?
মাইয়াটার কপাল খারাপ। এমতেই গরিব ঘরের মাইয়া, বাপ নাই। তার ওপরে আইজ চাইর মাস ডাইন গালে একটা টিউমার হইছে।
কী?
হ। পয়লা পয়লা ছোডই আছিল জিনিসটা, দিনে দিনে বড় হইছে। অহন মুরগির আন্ডার সমান।
বলেন কী? ডাক্তার দেখান নাই?
ভালো ডাক্তার কই থিকা দেখামু কন? আমগ গেরামের কাশেম ডাক্তাররে দেহাইছি। সে কয় এই হগল চিকিস্যা দ্যাশগেরামে হয় না। টাউনে নিয়া অপরেশন করান লাগব। অপরেশনে অনেক টেকা লাগব। এত টেকা আমি কই পামু কন?
ইউসুফ চুপ করে রইল।
শিরিন বলল, আমার মাইয়াডা অর নামের লাহানই আছিল। দোয়েল পাখির লাহান স্বভাব। এক মিনিট থির হইয়া থাকতে পারত না। এইমিহি যাইতাছে ওইমিহি যাইতাছে। কথায় কথায় খিলখিল কইরা হাসতাছে। টিউমার হওনের পর মাইয়াডা আমার বদলাইয়া গেছে। দৌড়াদৌড়ি ছটফটানি বন্ধ হইয়া গেছে, হাসি বন্ধ হইয়া গেছে। মাইয়াডা আর অহন হাসেই না। টিউমারের বেদনায় রাইত দোফরে উইঠা মাঝে মাঝে কান্দে। ইসকুলে যায় ওড়না দিয়া মুখ ঢাইকা। টিউমারডা য্যান কেঐ দেখতে না পায়।
কথা বলতে বলতে আবার চোখে পানি আসে শিরিনের। চোখ মুছতে মুছতে সে বলল, কাশেম ডাক্তার কইছে অপরেশন না করলে এই টিউমার থিকা ক্যানসার হইতে পারে। ক্যানসার হইলে বাপের লাহান মাইয়াডাও যাইব।
প্রথমে নাসিরের মৃত্যুর কথা শুনে বুকে এক ধাক্কা খেয়েছে ইউসুফ, এখন দোয়েলের কথা শুনে আরেক ধাক্কা খেল। বুকটা হু হু করতে লাগল তার। এতকাল পর এ কোন দুঃখ হতাশার মধ্যে এসে পড়ল সে! কী স্বপ্ন দেখে এসেছিল, কী হলো তার পরিণতি!
না এই দুঃখ-কষ্টের মধ্যে থাকতে আর ভালো লাগছে না। যত দ্রুত সম্ভব এখান থেকে সরে পড়তে পারলেই ভালো।
আচমকাই যেন তারপর উঠে দাঁড়াল ইউসুফ। আমি তা হলে আসি এখন।
ইউসুফের আচরণে বেশ অবাক হলো শিরিন। সেও উঠে দাঁড়াল। আর একটু বসবেন না? বসেন আরেকটু। মাইয়াটা আসুক। বাপের মুখে কত গল্প শুনছে আপনের। আপনেরে দেখলে খুব খুশি হইব।
ইউসুফ বিনীত গলায় বলল, না। আমার সময় নেই। তা ছাড়া ওইটুকু মেয়ের ওই কষ্টের মুখ আমি দেখতেও চাই না। নাসিরের মৃত্যুর কথা শুনে যে দুঃখ পেয়েছি সেই দুঃখ সামলাতে পারব কিন্তু দোয়েলের মুখ দেখে যে দুঃখ পাব তা সামলাতে পারব না। সে আসার আগেই চলে যেতে চাই।
পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল ইউসুফ। গুনে গুনে পাঁচশ’ টাকার দশটা নোট মুঠো করে দিল শিরিনের হাতে। এখানে পাঁচ হাজার টাকা আছে। এটা রাখুন। দোয়েলের চিকিৎসা করাবেন।
একসঙ্গে এতগুলো টাকা অনেকদিন চোখে দেখেনি শিরিন, সে বেশ দিশেহারা হলো। প্রথমে চোখ দুটো চঞ্চল হলো তার, তারপর পানিতে ভরে গেল। কান্নাকাতর কৃতজ্ঞ গলায় বলল, আল্লায় আপনের ভালো করুক ভাই। আল্লায় আপনের ভালো করুক।
ইউসুফ আর কোনো কথা বলল না। হন হন করে হেঁটে বারবাড়ির দিকে চলে গেল।

দুই
আজ শুক্রবার।
দোয়েলের স্কুল নেই। যেদিন স্কুল না থাকে দোয়েল একটু বেলা করে ওঠে। আজও তাই উঠেছে। উঠে হাত-মুখ ধুয়ে বই নিয়ে বসেনি, বেতের সাজিতে মুড়ি আর ছোট্ট একটা আখিগুড়ের টুকরো নিয়ে বসেছে। দরজার সামনে বসে উদাস হয়ে গুড়-মুড়ি খাচ্ছে।
গাছপালার ফাঁক-ফোকড় দিয়ে সকালবেলার রোদ এসে পড়েছে উঠোনে। সেই রোদে হাঁস-মুরগিগুলো খুদকুড়ো খাচ্ছে। শিরিন ব্যস্ত হয়েছে সংসারের কাজে। এইমাত্র উঠোন ঝাড় দিয়ে রান্নাঘরের দিকে গেল। দুদিন ধরে মনটা একটু ভালো শিরিনের। স্বামীর বন্ধু ইউসুফ মির্জা আসার পর, সে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে যাওয়ার পর থেকে শরীরের গতি যেন বেড়ে গেছে তার। হয়তো মেয়েটার অপারেশনের একটা কিছু ব্যবস্থা এবার করা যাবে। কাশেম ডাক্তারের কাছে গিয়েও কথাও বলে এসেছে কাল। এই টাকায় হবে না, টাকা আরও লাগবে। সেই টাকা কীভাবে জোগাড় করা যায়, গ্রামের কাকে কাকে ধরলে, কোন আত্মীয়র কাছে গেলে টাকা দু-চারশ’ করে পাওয়া যাবে এইসব ভেবেছে কাল অনেক রাত পর্যন্ত। সবমিলিয়ে দশ-বিশ জন লোকও যদি পাশে দাঁড়ায়, টাকা যা উঠবে, কাজ হয়ে যাবে। ওই যে কথায় আছে না, দশের লাঠি একের বোঝা।
আর যদি এভাবে না হয় তা হলে আর একটা বুদ্ধি আছে। এই বুদ্ধিটাও কাশেম ডাক্তারই দিয়েছেন। ঢাকার দৈনিক পত্রিকাগুলোর চিঠিপত্র কলামে ‘আমার মেয়ের মুখের হাসি ফিরিয়ে দিন’ বা এই জাতীয় শিরোনাম দিয়ে কয়েকটা চিঠি লিখতে হবে। পাঁচ-দশটা চিঠি লিখলে দুয়েকটা চিঠি ছাপা হবেই। সেই চিঠি পড়ে দেশের দয়াবান মানুষরা কেউ না কেউ এগিয়ে আসবে দোয়েলকে সাহায্য করতে। এইভাবে অনেক অসহায় মানুষের উপকার হয়। তা ছাড়া মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে শুনলে আর কেউ না হোক মুক্তিযোদ্ধারা অন্তত সাহায্য করবেন। দেশে বিত্তবান মুক্তিযোদ্ধাও তো কম নেই।
আশ্চর্য ব্যাপার, গত চার মাসে এইসব বুদ্ধি কারও মাথায় আসেনি। ইউসুফ মির্জা এসে যেন ঘোরতর অন্ধকারে মোমের আলো জ্বেলে দিয়ে গেলেন। এখন চারদিকে হয়তো আরও একটা দুটো করে আলো জ্বলে উঠবে।
আহা, সেই মানুষটার সঙ্গে দোয়েলের দেখা হয়নি। সে স্কুল থেকে ফেরার আগেই চলে গেছেন তিনি। বাবার মুখে কত গল্প একদিন শুনেছে এই মানুষের, তাদের বাড়ি এসে ঘুরেও গেলেন এত বছর পর, দোয়েলকে না দেখেই তার চিকিৎসার জন্য অতগুলো টাকা দিয়ে গেলেন অথচ দোয়েলের সঙ্গে তার দেখাই হলো না। হয়তো কোনোদিন হবেও না। কারণ তিনি বাংলাদেশে থাকেনই না।
আজকের সকালটা এসব ভেবেই কাটিয়েছে দোয়েল। তারপর ভেবেছে টিউমারের কথা। যদি টাকা জোগাড় করে সত্যি সত্যি অপারেশন করা যায়, তা হলে একদমই আগের মতো হয়ে যাবে তার মুখ। আগের মতো খিলখিল করে হাসতে পারবে, কথা বলতে পারবে। মুখে কোনো দাগ থাকবে না, মুখটা হয়ে যাবে আগের মতো নিখুঁত সুন্দর। যে কেউ সেই মুখ দেখে বলবে, বাহ্ কী সুন্দর চেহারা মেয়েটির! কী মিষ্টি মুখ!
নাকি অপারেশনের দাগ থেকে যাবে গালে! টিউমার থাকবে না ঠিকই, টিউমারের চিহ্ন, কাটা দাগ থেকে যাবে!
তা হলে আর লাভ হলো কী? মুখে বড় একটা খুুঁত তো তার থেকেই গেল?
আবার একটা ভয়ের কথাও বলেছেন কাশেম ডাক্তার। এই ধরনের টিউমার থেকে অনেক সময় ক্যানসার হয়। যদি তেমন হয় তা হলে আর মুখের দাগ হাসিটাসি নিয়ে ভেবে কী লাভ! ক্যানসার হলে বাঁচার আশা নেই। বাবার মতো ধুঁকে ধুঁকে মরতে হবে।
এসব ভেবে বিষণœ মুখে বারবাড়ির দিকে এসেছে দোয়েল, লম্বা চওড়া, সুন্দর পোশাক জুতো পরা একজন ¯িœগ্ধ মুখের মানুষ এসে দাঁড়াল তার সামনে। মানুষটার হাতে সুন্দর একটা শপিংব্যাগ, ব্যাগের ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে বেশ দামি ধরনের কয়েকটি প্যাকেট। দেখে বোঝা যায় খাবারের প্যাকেট। বিদেশি বিসকিট চকলেট এসব হবে। আর মানুষটার গা থেকে কেমন একটা বাবা বাবা গন্ধ আসছিল।
বাইরের যে কোনো মানুষের সামনে দোয়েল এখন তার মুখটা ঢেকে রাখে। মুখের ওই বিশ্রী টিউমার সে কাউকে দেখাতে চায় না। হঠাৎ লম্বা হয়ে ওঠা টিংটিংয়ে মেয়েটির ওড়না ব্যবহারের দরকার হয় না, তবু মুখ ঢাকার জন্য ওড়না পরে সে।
গলার কাছে ওড়না এখনও আছে কিন্তু মুখ ঢাকার কথা মনে হলো না দোয়েলের। দুঃখী বিষণœ মুখে মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইল।
সেই মানুষটিও দোয়েলের মতো করেই তাকিয়েছিল তার দিকে। তবে কয়েক মুহূর্ত মাত্র। তারপরই হাসিমুখে মায়াবী গলায় কথা বলে উঠল, তোমাকে চিনতে আমার ভুল হয়নি। তুমিই দোয়েল। দোয়েল ছাড়া এত সুন্দর, মিষ্টিমুখ আর কোনো মেয়ের হবে!
বলেই গভীর মমতায় দোয়েলের চিবুকের কাছটা ধরল। সেদিন তোমার সঙ্গে দেখা না করে চলে গেছি, দুটো দিন এজন্য কষ্ট পেয়েছি। সে কারণেই আবার এলাম।
রান্নাঘরের দিক থেকে ইউসুফের গলা বুঝি শুনতে পেয়েছিল শিরিন, আঁচলে হাত মুছতে মুছতে এগিয়ে এলো। ইউসুফকে দেখে মাথায় ঘোমটা দিল। ব্যস্ত গলায় বলল, আপনে আসলেন কখন?
একহাত দোয়েলকে জড়িয়ে ধরে ইউসুফ বলল, এই তো এক্ষুণি।
আসেন, আসেন।
সেদিনকার মতো আজও ছুটে গিয়ে ঘর থেকে চেয়ার আনল শিরিন। আঁচলে চেয়ার মুছে বলল, বসেন ভাই, বসেন।
চেয়ারে বসে শপিংব্যাগটা দোয়েলের হাতে দিল ইউসুফ। এটা তোমার জন্য। এখানে মজার মজার বিসকিট চকলেট ক্যান্ডি আছে। এগুলো ঘরে রেখে এসো।
কিন্তু মানুষটার কাছ থেকে সরে যেতে ইচ্ছে করছে না দোয়েলের। কেমন যেন লাগছে। মনে হচ্ছে অনেকদিন পর দূর কোনো পরদেশ থেকে যেন ফিরে এসেছেন বাবা। চোখের আড়াল হলেই বুঝি দোয়েলকে ছেড়ে আবার উধাও হয়ে যাবেন।
তবু ঘরে গিয়ে চৌকির ওপর শপিংব্যাগটা রেখে এলো দোয়েল। কাছে আসতেই তাকে বুকের কাছে টেনে নিল ইউসুফ। গভীর মমতায় আঙ্গুলের ডগায় আলতো করে ছুঁয়ে দিল তার টিউমারটা। বিশাল এক ভরসা দেয়া গলায় বলল, এ এমন কিছু টিউমার না! সামান্যই। ছোট্ট একটা অপারেশন লাগবে।
ইউসুফের এই কথাটা যেন শুনতে পেল না শিরিন। বলল, আইজ কইলাম ভাত না খাইয়া যাইতে পারবেন না। আমি অহনই ভাত চড়াইতাছি। কই মাছ চাইরটা আছে।
ইউসুফ ¯িœগ্ধ মুখে বলল, তা না হয় খেলাম। কিন্তু আপনি যদি রান্নাবান্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে যান তা হলে কথা বলব কখন? আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।
শিরিন কথা বলবার আগেই দোয়েল বলল, তাইলে চেরটা রান্ধনঘরের সামনে লইয়া যাই। মায় রানল আর আপনে কথা কইলেন।
দোয়েলের কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেল ইউসুফ। বাহ্! এই মেয়ে তো খুব সার্প। ভাবী, আপনি সব গোছগাছ করে বসুন, আমি চেয়ার নিয়ে ওখানে আসব। এই ফাঁকে দোয়েলের সঙ্গে একটু গল্প করি।
আচ্ছা।
শিরিন ব্যস্তভঙ্গিতে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
ইউসুফ আবার হাসিমুখে তাকাল দোয়েলের দিকে। আমি কি তোমার সামনে একটা সিগ্রেট খেতে পারি মা?
দোয়েল মাথা নাড়ল।
সিগ্রেটের গন্ধে তোমার খারাপ লাগবে না তো?
না। বাবায় অনেক সিগারেট খাইত। বাড়িত থাকলে সবসময় থাকতাম বাবার লগে লগে। বাবার সিগারেটের গন্ধ আমার ভালো লাগত। বাতাসে সিগারেটের গন্ধ পাইলেই আমি বুঝতাম বাবায় আসতাছে।
ইউসুফ কথা বলল না। পকেট থেকে সিগ্রেট বের করে ধরাল। তারপর আচমকা বলল, আমি সেদিন ইচ্ছা করেই তোমার সঙ্গে দেখা করে যাই নি, জানো?
দোয়েল অবাক হলো। ক্যান?
আমি যে তোমার জন্য কিছু নিয়ে আসিনি। একদম খালি হাতে এসেছিলাম, এজন্য।
কিন্তু আপনের জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে। রাত্রে অনেকক্ষণ ঘুম আসে নাই। খালি আপনের কথা চিন্তা করছি। বাবার কাছে আপনের কথা শুনছি তো! আপনেরে খুব দেখতে ইচ্ছা করছিল।
সিগ্রেটে টান দিয়ে ইউসুফ বলল, ভাবীর মুখে তোমার নাম শুনে তোমাকেও খুব দেখার ইচ্ছা হয়েছিল আমার। যে মেয়ের নাম দোয়েল, তাকে না দেখে আমি যাব কেন? কিন্তু যখনই তোমার টিউমারের কথা শুনলাম, মনটা এত খারাপ হলো। ফুলের মতো একটি মেয়ের মুখে টিউমার! টিউমারের জন্য সে হাসতে পারছে না, এসব ভেবে কষ্ট পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল তোমার মুখটা আমি সহ্য করতে পারব না, আমার বুকটা ফেটে যাবে। অত কষ্ট পাওয়ার চে’ তোমাকে না দেখে চলে যাওয়াই ভালো।
ইউসুফ আবার সিগ্রেটে টান দিল। কিন্তু যেতে যেতে আমি তোমার কথা খুব ভাবলাম। তোমার বাবার কথা ভাবলাম, নিজের কথা ভাবলাম। আমরা মুক্তিযোদ্ধা। দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছি। কত বড় অপারেশনে যোগ দিয়েছি, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছি। আর আজ ছোট্ট একটা মেয়ের বিপদের কথা জেনেও আমি তার সঙ্গে দেখা না করে পালিয়ে যাচ্ছি! এসব ভেবে নিজের ওপর খুব রাগ হলো, জানো? নিজেকে কাপুরুষের মতো মনে হলো। অথচ আমি তো তা নই, আমি তো একজন মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে আমি পালিয়ে যাব কেন?
ইউসুফের কথার অনেকটাই বুঝতে পারছিল না দোয়েল। কিন্তু তার খুব ভালো লাগছিল শুনতে। অপলক চোখে ইউসুফের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল সে।
সিগ্রেটে টান দিয়ে, উঠোনের হাওয়ায় ধোঁয়া ছেড়ে ইউসুফ বলল, এজন্য ঢাকায় ফিরে গিয়ে বড় বড় কয়েকটি হাসপাতালে যোগাযোগ করলাম আমি, কয়েকজন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বললাম। ভাবীর মুখে তোমার টিউমারের কথা যতটা শুনেছি ততটাই বললাম তাদের।
তার টিউমারের ব্যাপারে ঢাকার বড় ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলেছে ইউসুফ, হাসপাতালে কথা বলেছে শুনেই বিষণœ মুখটা উজ্জ্বল হলো দোয়েলের। গভীর আগ্রহের গলায় বলল, ডাক্তাররা কী কইল?
বড় ডাক্তাররা রোগী না দেখে কিছু বলেন না। তবু আমার মুখ থেকে যতটা শুনেছেন, বললেন, এটা তেমন সিরিয়াস কিছু ব্যাপার না।
একটু থামল ইউসুফ। সিগ্রেটে টান দিল। তোমাদের বাড়ি থেকে ফিরে গিয়ে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালের সঙ্গে যখন কথা বলছি, ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলছি, তখন আমার কী মনে হচ্ছিল জানো, মনে হচ্ছিল আমি যেন একাত্তর সালে ফিরে গেছি। আমাকে যেন একটা যুদ্ধে নামতে হবে। আমি যেন সেই যুদ্ধের রসদ জোগাড় করছি।
বলেই সরল মুখ করে হাসল ইউসুফ। তোমাকে এসব বলতে খুব ভালো লাগছে।
সিগ্রেটে শেষটান দিয়ে পায়ের কাছে ফেলল ইউসুফ। জুতোয় ডলে সিগ্রেট নেভাল। বলল, তারপর বুঝলে মা, যুদ্ধের পুরো প্রিপারেশন নিয়ে তোমাদের বাড়ি এলাম।
মুখটা একটু ঝুঁকিয়ে দোয়েলের কানের কাছে নিয়ে গেল ইউসুফ। কেন এসেছি জানো? তোমাকে নিয়ে যেতে। তোমাকে নিয়ে যাওয়া মানেই যুদ্ধটা আমি শুরু করলাম।
দোয়েল অবাক গলায় বলল, কোথায় নিয়া যাইবেন আমারে?
ঢাকায়। হাসপাতাল রেডি করে এসেছি, ডাক্তার রেডি করে এসেছি। আজ ঢাকায় পৌঁছেই সেই হাসপাতালে নিয়ে যাব তোমাকে। ডাক্তাররা আগে তোমার টিউমার পরীক্ষা করবেন। তারপর অপারেশন।
শুনে আনন্দ উত্তেজনায় বুক ভরে গেল দোয়েলের। ইচ্ছে হলো এখনই রান্নাঘরে দৌড়ে গিয়ে খবরটা মাকে দিয়ে আসে। তা করল না দোয়েল। উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, অপারেশন করলে পুরা ভালো হইয়া যামু আমি?
হ্যাঁ। পুরো ভালো হয়ে যাবে।
আগের মতো হাসতে পারুম?
অবশ্যই পারবে।
মুখে কোনো দাগ থাকব না?
না, একটুও দাগ থাকবে না। কারণ তোমাকে করা হবে বেশ দামি অপারেশন। কসমেটিক সার্জারি। কসমেটিক সার্জারিতে কোনো দাগ থাকে না। অপারেশনের পর মুখ দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না যে তোমার মুখে একটা টিউমার ছিল।
এবার নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না দোয়েল। দৌড়ে মা’র কাছে গেল। জোয়ার জলের মতো কলকল করে মুহূর্তে ইউসুফের মুখে শোনা সব কথা বলে দিল।
শিরিন তখন চুলোয় ভাত বসিয়ে কই মাছ কুটতে বসেছে। সব শুনে গভীর আনন্দে স্তব্ধ হয়ে গেল। কাজ করতে ভুলে গেল।
দোয়েল ততক্ষণে আবার ছুটে এসেছে ইউসুফের কাছে। ভয় মেশানো উত্তেজিত গলায় বলল, অপরেশন করলে ব্যথা পামু না আমি?
দুহাতে দোয়েলকে বুকের কাছে টেনে আনল ইউসুফ। না, একটুও ব্যথা পাবে না। তুমি তো টেরই পাবে না অপারেশানটা কখন হলো। আচ্ছা শোনো, তুমি কি ইনজেকশনে ভয় পাও?
মুখের মজাদার ভঙ্গি করে দোয়েল বলল, না। একবার পা মচকাইয়া গেছিল। তখন বাবায় কাশেম ডাক্তারের কাছে নিয়া ইনজেকশন দেওয়াইয়া আনছিল। একটুও ব্যথা পাই নাই। খালি মনে হইল একটা পিঁপড়ার কামড়।
তা হলে তো কথাই নাই। অপারেশনের আগে একটা ইনজেকশন দেবে তোমাকে। তুমি ঘুমিয়ে পড়বে। ঘুম থেকে উঠে দেখবে টিউমারটা নেই। তুমি সেই আগের দোয়েল হয়ে গেছ।
শুনে কী যে মুগ্ধ হলো মেয়েটি! হাসার চেষ্টা করল কিন্তু স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাসতে পারল না। দেখে বুকটা হুহু করে উঠল ইউসুফের। হয়তো কষ্টটা কাটাবার জন্যই উঠে দাঁড়াল সে। বলল, কী হলো দোয়েল, তোমার জন্য যে এত খাবার আনলাম, খাচ্ছ না কেন?
পরে খামু নে।
না এক্ষুণি খাও। যাও, প্যাকেট খুলে দেখ যেটা ভালো লাগে নিয়ে এসো। তুমি খাবে আর ভাবীর সঙ্গে কথা বলব আমি।
তাইলে চেয়ারটা আমি রান্ধনঘরের সামনে নিয়া দেই?
তুমি দেবে কেন? আমিই তো নিতে পারি। কিন্তু চেয়ার এখন নেব না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলব।
আইচ্ছা।
দোয়েল ঘরে ঢোকার পর ইউসুফ এলো রান্নাঘরের সামনে। শিরিনকে বলল, মেয়ের মুখে তো সবই শুনেছেন। তবু আবার বলি, আপনাদের দুজনকে আমি ঢাকায় নিয়ে যেতে চাই। দোয়েলের চিকিৎসাটা করাতে চাই।
শুনে আবেগে কথা বলতে পারল না শিরিন। মাছ কুটতে কুটতে ইউসুফের দিকে তাকাল। গভীর কৃতজ্ঞতায় চোখ দুটো ছলছল করছে তার। কোনো রকমে বলল, কী কমু ভাই, কন! খালি এটুকু কইতে পারি, আপনে মানুষ না, আপনে ফেরেশতা।
ইউসুফ কিছু বলবার আগেই ওয়েফার ধরনের লম্বা দুটো বিসকিট হাতে দোয়েল এসে দাঁড়াল তার পাশে। কামড়ে কামড়ে বিসকিট খেতে লাগল। খাওয়ার ভঙ্গি দেখে বোঝা যাচ্ছিল স্বাভাবিক মানুষের মতো খেতে পারছে না সে। অসুবিধা হচ্ছে।
একপলক দোয়েলকে দেখে শিরিনের দিকে তাকাল ইউসুফ। ভাত খেয়েই রওনা দিতে চাই। আপনি সেইভাবে ব্যবস্থা করুন ভাবী।
দোয়েলকে বলল, কাপড় চোপড় গুছিয়ে নাও। আজই ঢাকায় নিয়ে যাব তোমাদেরকে। এখান থেকে সরাসরি হাসপাতালে।
শুনে শিরিন এবং দোয়েল দুজনেই দিশেহারা হলো।
শিরিন বলল, আইজই যাওন লাগব! তা হলে এই দিকে কী ব্যবস্থা করুম? বাড়িঘর হাঁস-মুরগি এইসব কে দেখব?
ইউসুফ বলল, পাড়া-প্রতিবেশী কাউকে বলুন। একজন এমন কাউকে যদি পাওয়া যায়, যতদিন দরকার বাড়িতে থাকল। তার খাওয়া খরচের টাকা আমি দিয়ে যাব।
দোয়েল লাফিয়ে উঠে বলল, ওমা, হাসু ফুপুরে থুইয়া যাও। তার তো কোনো বাড়িঘর নাই, সংসার নাই। এহেকদিন এহেক বাড়িতে থাকে। অহন আছে বেপারি বাড়িতে। আমি গিয়া তারে ডাইকা লইয়াহি। টেকা দিলেই দেখবা খুশি হইয়া থাকব।
শিরিন কথা বলবার আগেই ইউসুফ বলল, যাও মা, ডেকে নিয়ে এসো।

তিন
দুপুরের পরপর বাড়ি থেকে বেরুল তিনজন মানুষ।
হাসুকে বাড়িতে রেখে বেশ সহজেই সব ব্যবস্থা করা গেছে। মহিলাকে পাঁচশ’ টাকা দিয়ে এসেছে ইউসুফ। ওতেই মহাখুশি সে। তাছাড়া ঘরে চাল ডাল যা আছে একজন মানুষের বেশ কিছুদিন চলবে। ততদিনে দোয়েলের অপারেশন করিয়ে ফিরে আসতে পারবে শিরিন।
গ্রামের পথে দোয়েলের হাত ধরে হাঁটছে ইউসুফ। দোয়েল শিরিনের জামা-কাপড়ের ছেঁড়াখোড়া রেকসিনের ব্যাগটা তার হাতে। বেশভূষার সঙ্গে ব্যাগটা একদমই মানাচ্ছে না। কিন্তু ওসবের তোয়াক্কা করছে না ইউসুফ। উচ্ছ্বসিত গলায় দোয়েলের সঙ্গে কথা বলছে। তোমাদেরকে নিয়ে আরও অনেক প্ল্যান আছে আমার। উত্তরায় আমার একটা ছয়তলা বাড়ি আছে। নিচে গাড়ি রাখার জায়গা আর পাঁচতলায় দশটা ফ্ল্যাট। ন’টা ভাড়া দেয়া, একটা আমার জন্য। দেশে এলে ওই ফ্ল্যাটটায় আমি থাকি। অপারেশনের পর তুমি আর তোমার মা থাকবে আমার ফ্ল্যাটে। বাড়ি ভাড়ার টাকা থেকে তোমাদের খরচ দেয়া হবে। আমি সব ব্যবস্থা করব। উত্তরায় অনেক ভালো ভালো স্কুল আছে। সেখানকার একটা স্কুলে ভর্তি করে দেব তোমাকে। এই মুহূর্ত থেকে তোমাদের দুজনের দায়িত্ব আমার।
ইউসুফ এবং দোয়েলের পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে এসব কথা শুনছিল শিরিন, চোখে পানি আসছিল তার।
বড় রাস্তায় একটা মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে আছে। ইউসুফকে দেখেই ব্যস্ত ভঙ্গিতে নেমে এলো ড্রাইভার। হাত থেকে ব্যাগটা নিল।
দোয়েল উত্তেজিত গলায় বলল, আমরা এই গাড়িতে কইরা যামু?
হ্যাঁ। গাড়িটা আমারই।
তারপর শিরিনের দিকে তাকিয়ে বলল, উঠুন ভাবী।
মাইক্রোবাসের পেছন দিককার সিটে বসল শিরিন, সামনের দিকে দোয়েল আর ইউসুফ। গাড়ি যখন চলতে শুরু করেছে, ইউসুফ বলল, জানো দোয়েল, এই মুহূর্তে যুদ্ধের সময়কার একটা গানের কথা খুব মনে পড়ছে আমার।
আনন্দে বিভোর হওয়া গলায় দোয়েল বলল, কোন গান?
‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি
মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি।’
এই গানটা আমি জানি। বাবার মুখে কত শুনছি।
আলতো করে দোয়েলের গালটা একটু ছুঁয়ে দিল ইউসুফ। আজ এতকাল পর মনে হচ্ছে আর একটা যুদ্ধ যেন তোমাকে নিয়ে শুরু করলাম। তোমার মুখের হাসি ফিরিয়ে দেয়ার যুদ্ধ। আগের যুদ্ধটার মতো এই যুদ্ধেও জয় আমাদের সুনিশ্চিত।

শ্রেণী:

এইটা আমার নিজের গল্প

Posted on by 0 comment
33

বাবা-মা মারা যাওয়ার পর আমাদের সেই ঘোর বিপদের দিনে, দুঃসময়ে আমার বাবার ভাইরা মানে আমার বাবার রক্ত পানি করা টাকায় মানুষ হওয়া চাচারা ‘টিনের চশমা’ পরে দারুণ উদাস হয়ে গেলে আমার নানা আর আমার নানি, আমার চার খালা, আমার চার মামারা আমাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন।

33মাহবুব রেজা: আমার দু বছরের বড় ছিল রুমি।
কয়েকদিন ধরে ওকে খুব মনে পড়ছে আমার।
কত স্মৃতি আমাদের!
ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে বেড়ে উঠেছি আমি আর রুমি। একসঙ্গে খেলাধুলা। এক স্কুলে পড়াশোনা। স্কুলের নাম নারিন্দা গভ. হাই স্কুল।
বাবা-মা মারা যাওয়ার পর আমরা ছয় ভাই, এক বোন নানাবাড়ি চলে এলাম।
আজিমপুর কলোনি। দুই নম্বর বিল্ডিং। বি নম্বর ফ্ল্যাট। আমাদের বিল্ডিংয়ের পেছনে চায়না বিল্ডিং। আজিমপুর কলোনি থেকে আমি আর রুমি দুই ভাই একসঙ্গে বাসে চেপে ফুলবাড়িয়া নামতাম, তারপর সেখান থেকে হেঁটে হেঁটে নবাবপুর, টিপু সুলতান রোড, যোগিনগর, বনগ্রাম, রেঙ্কিন স্ট্রিট ঘুরে ঘুরে স্কুলে যেতাম।
দুই ভাই মিলে কত গল্প করতাম।
কত কথা যে বলত রুমি!
স্কুল ফাঁকি দিয়ে রুমি আমাকে প্রথম গুলিস্তান হলে বাংলা সিনেমা দেখিয়েছিল। সিনেমার নাম সঙ্গিনী। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর আমাদের সেই ঘোর বিপদের দিনে, দুঃসময়ে আমার বাবার ভাইরা মানে আমার বাবার রক্ত পানি করা টাকায় মানুষ হওয়া চাচারা ‘টিনের চশমা’ পরে দারুণ উদাস হয়ে গেলে আমার নানা আর আমার নানি, আমার চার খালা, আমার চার মামারা আমাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন।
আমাদের পাশে ছায়ার মতো লেগে রইলেন।
আমার খালারা, আমার মামারা নিজেরা কষ্ট করে, নিজেদের খাবার আমাদের মুখে তুলে দিয়েছিলেন। আমাদের নিদারুণ কষ্টের দিনে তারা আমাদের সব উজাড় করে দিয়েছিলেন।
নানার বড় সংসার।
তারপর আমরা একেক ভাই একেক আত্মীয়ের বাসায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রইলাম।
তখন আমাদের অনেক অভাব।
তখন আমাদের অনেক অনটন।
তখন আমাদের অনেক দুঃসময়।
আমরা ভাইরা একেক জায়গায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে আমাদের খুব একটা দেখা-সাক্ষাৎ হতো না। আমাদের তখন দেখা হতো কালে-ভদ্রে, ঈদ-টিদে।
সেই সব উৎসবে যখন আমাদের দেখা হতো তখন কেন যেন আমরা নিজেদের মধ্যে খুব একটা কথাবার্তা চালাচালি করতাম না। আমরা ভাইরা তখন কথা বলে সময় নষ্ট না করে একেকজন একেকজনের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতাম।
বড় ভাই পড়াশোনার চেয়ে টিউশনিতে বেশি ব্যস্ত থাকত। কীভাবে দুটো বাড়তি পয়সা আয় করে ছোট ভাইদের দাবি মেটানো যায়। মেজ ভাইও টুকটাক কন্ট্রাক্টরির কাজ করে বড় ভাইকে সাহায্য করতে সচেষ্ট।
আমাদের তখন দুর্দিন।
আমাদের তখন হাহাকার।
১৯৮৪ সাল।
রুমি তখন কলেজে।
কি ঝলমলে সুন্দর দেখতে ছিল আমার ভাইটা!
ঝাঁকড়া চুল। পাকা গমের মতো গায়ের রং।
আমার বাবা-মার খুব নাকি আদরের ছিল রুমি!
একদিন কাউকে কিছু না বলে, একা একা অভিমান করে আমার ভাইটা হুট করে মরে গেল। আমি তখন আমার বড় খালার বাসায় থাকি। এক সকালে আমার মেজ ভাই ফ্যাঁকাসে মুখ নিয়ে খালার বাড়ি এসে আমাকে রিকশায় তুলে নিয়ে সোজা চলে গেল ঢাকা মেডিকেলে। পুরোটা রাস্তাজুড়ে আমার মেজ ভাই আমার সঙ্গে কোনো কথা বলল না। শীতের সকাল। ঠা-া বাতাস শরীরে এসে বুঝিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল।
আমি কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এই সাতসকালে কেন মেডিকেলে?
জীবনে সেই আমার প্রথম আর শেষবারের মতো মর্গে যাওয়া।
ঠা-া মেঝেতে আমার বাবা-মার বড় আদরের সন্তান অবহেলায়-অযতেœ পড়ে আছে মর্গের ঠা-া মেঝেতে। রুমি শুয়ে কি আমাদের ওপর রাগ আর অভিমান করে এখানে এভাবে, এমন করে শুয়ে আছে? রুমির পাশে স্তূপ করে রাখা কয়েকটি দেব শিশু। ওদের শরীর কেমন নীল হয়ে আছে। আমি রুমিকে যত না দেখছিলাম তার চেয়ে বেশি বেশি চোখ আমার চলে যাচ্ছিল শিশুগুলোর দিকে। আমার মেজ ভাই পাগলের মতো কেঁদে যাচ্ছিল আর বলছিল, ‘রুমি রে তুই এইটা কি করলি? তুই এইটা কি করলি?’
আমার ঝাপসা দৃষ্টিতে রুমি আর দেব শিশুগুলো মিলেমিশে একাকার।
আহা রে!
আহা রে!
আহা রে!
আহা রে!
সেই সকালে আমি অভিশাপ দিয়েছিলাম নিজেকে।
আমাদের অভাবকে।
আমাদের দুঃসময়কে।
আমাদের দুর্দিনকে।
আমাদের হাহাকারকে।
আমাদের দীর্ঘ নিঃশ্বাসকে।
সেই সকালে আমি আরও অভিশাপ দিয়েছিলাম আমাদের এই রকমভাবে বেঁচে থাকাকে।
এভাবে বেঁচে থাকাকে কি কেউ বেঁচে থাকা বলে!

শ্রেণী:

জননী ও পুত্রেরা

Posted on by 0 comment
41

41খালিদ মারুফ: ধরে নেই এই গল্প প্রকল্পের প্রধান দুটি চরিত্রের নাম রফিক ও শফিক। তারা একই মায়ের গর্ভজাত, এমনকি তারা যমজ। তিন মিনিটের ব্যবধানে মায়ের জরায়ু ফুঁড়ে তারা ভূমিষ্ট হয়েছিল ধরণীর দিকে মুখ রেখে, অন্যেরা যেভাবে জন্মায়। প্রথমে রফিক, তারপর শফিক। তবে কে যে আগে আর কে পরে সেটা নিয়ে আঁতুড়ঘরের ধাত্রীদের মধ্যে কিঞ্চিৎ সন্দেহ থাকলেও বাড়ন্ত সময়টাতে যখন রফিক শফিকের চেয়ে হৃষ্টপুষ্ট হয়ে উঠল তখন সবাই নিশ্চিত হলো যে, রফিকই বড়। তারা তাদের মায়ের গর্ভে এসেছিল সেই মহা খুনের বছরটিতে। তাই হয়তো তাদের জন্মের পর আর দেশে খুন-খারাবি থামে নাই। তবে ছোটবেলা থেকে তারা এতটাই শান্তশিষ্ট যে তাদের নিয়ে সেই নাবালক অবস্থার দুশ্চিন্তাগ্রস্ত সময়গুলি পাড়ি দেবার পর তাদের মায়ের আর বিশেষ দুশ্চিন্তা হয় নাই। এবং এরই ধারাবাহিকতায় বিয়ের বয়েস কিছুটা পেরিয়ে গেলেও তাদের বিবাহ নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্যও হয় নাই। এ নিয়ে মহল্লার লোকেরা যখন তাদের মায়ের কাছে প্রশ্ন রেখেছে, ‘কি! রফিক-শফিকের মা, ছেলেদের কি বিয়ে-শাদি করাবা না?’ তখন তাদের মা মুখটাকে কিছুটা ডানে কিংবা বাঁয়ে ঘুরিয়ে নরম স্বরে জবাব দিয়েছে, ‘পাত্রী মেলা ভার।’ তা ছাড়া যেহেতু তারা যমজ তাই সবার মত হলো তাদের বিবাহটাও হওয়া চাই একই সাথে।
গত বছর তাদের মাকে এই দুরারোগ্য ব্যাধিটাতে পেয়ে বসবার আগে চুনকুটিয়ার কাজি বাড়ির আকরাম কাজির জ্যেষ্ঠ কন্যাটিকে তার মা অনেকটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও শুধুমাত্র মেয়েটার রূপ-গুণের কথা মাথায় রেখে রফিকের জন্য চূড়ান্ত করে রেখেছে। রণজিৎ কর্মকারের দোকান থেকে তার মায়ের একটা স্মৃতিবহ পুরনো আংটিকে ঘষে ধুয়ে তার ওপর আরবি আলিফ-লাম-মীম অক্ষর তিনটি খোদাই করে বিরাট একঝুড়ি পান আর বারো প্যাকেট মিষ্টি সহযোগে তাদের বংশের লোকেরা গিয়ে সেই আংটি পরিয়ে এসেছিল মেয়েটার মধ্যমায়। কেননা হাসি মুখের শ্যাম সুন্দরী সেই কনের অনামিকায় আংটিটা খুবই ঢলঢলে হয়ে যাচ্ছিল। পক্ষান্তরে মধ্যমায় সেটা মানিয়ে গিয়েছিল দারুণভাবে। কথা ছিল দ্রুতই শফিকের জন্য কন্যা নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ করে একসাথে মহাসমারোহে তাদের দুই সহোদরের বিবাহ হবে। আর এই অবসরে ছয় মাস বাকি থাকা ¯œাতক চূড়ান্ত পর্বের পরীক্ষা সম্পন্ন করে নেবে মেয়েটা। যেহেতু শফিকের জন্য কন্যা এখনও নির্বাচন করা যায় নাই, তাই রফিকের প্রচ- ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সে সেদিন চুনকুটিয়ার সেই বাড়িতে যায় নাই।
বারো মাসই কাঠের বাটওয়ালা ছাতা বহনকারী তাদের এক দূরাত্মীয়, মেয়েটার একটা ছবি সরবরাহ করেছিল রফিককে। এই যুগে এমন আকারের ছবি পাওয়া দুষ্কর। ছবি দেখে রফিকের শৈশবে লুকিয়ে পড়া একশ বছর আগেকার উপন্যাসের নায়িকাদের কথা মনে পড়েছিল। এটা নিজে তোলা নিজের ছবি নয়। স্টুডিওতে গিয়ে তোলা ছবি। পাসপোর্ট মাপের নয়, আবার সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের ভিউকার্ড সাইজেরও নয়। নিমতলির মোড়ে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যার সময় যখন মাঝবয়েসি ছাতাওয়ালা দূরাত্মীয় লোকটা ছবিটা হস্তান্তর করছিল। রফিক তখন মধ্য কার্তিকের আধা শীত আধা গরমেও ঘেমে গায়ে থাকা মোটা কাপড়ের শার্টটাকে ভিজিয়ে ফেলেছিল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে রফিক যখন বুঝতে পারল ছবিটা তার বুক পকেটে রাখা সংগত হবে না, তখন সে সেটাকে দ্রুতই হাতের চাপে ফেলে মাঝামাঝিতে একটা ভাঁজ দিয়ে মানিব্যাগের প্রধান পকেটটাতে রেখে সোজা ফিরে গিয়েছিল নিজের ঘরে। যাবার সময় তার মনে হয়েছিল ছবিটাকে ওইভাবে ভাঁজ করে মানিব্যাগে রাখা ঠিক হয় নাই। প্রাণহীন কাগুজে ফটোগ্রাফটাকে একটা সচেতন সত্তা বলে মনে হচ্ছিল তার। সে একবার ভাবলো মানিব্যাগটা হাতে নিয়ে হাঁটতে থাকবে, পরক্ষণেই তার মনে হলো কেউ যদি হাতে মানিব্যাগ দেখে জিজ্ঞেস করে বসে, ‘কিরে রফিক! মানিব্যাগে কী?’ তা হলে একটা বিব্রতকর কা- ঘটে যেতে পারে, সেই ভাবনা থেকে মানিব্যাগে যাতে খুব বেশি চাপ না লাগে সেজন্য রফিক তাঁর পাছার মাংসপি-কে যতটা সম্ভব নরম করে দ্রুতই ঘরে ফিরে গেল।
ঘরে ফিরে সে দেখল তার সহোদর শফিক এই অসময়ে খাটের কোণে শুয়ে আছে। কী এক সংকট থেকে রফিক ছবিটা হাতে নিয়ে দেখা থেকে বিরত হলো। মনে হলো ছবিটাকে কোনোক্রমে বের করে টেবিলের নিচে কোনো একটা বইয়ের মধ্যে রেখে দেবে সে। সেটাও করল না। শফিকের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো সে জেগেও থাকতে পারে তাই ছবিটাকে সে মানিব্যাগে রেখেই হাত-মুখ ধুয়ে নিল। তারপর ধাতস্থ হয়ে সে যখন বুঝল শফিকের কাছে বিষয়টা গোপন না করলেও চলে, তখন তার মায়ের ঘর থেকে ডাক পড়ল। তার মায়ের পীড়া ক্রমশ বেড়ে চলছে। তাদের মা এতখানি প্রৌঢ়া নন, তবে কলজে পচা রোগে পড়ার পর থেকে সে বুড়িয়ে গেছে। প্রতিদিনই তার কান্তিময় মুখ থেকে লাবণ্য খসে গিয়ে বলিরেখা স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। মায়ের ঘরে ঢুকে রফিক তাঁর মাকে পেল ঘুমন্ত অবস্থায়। ঘুমন্ত মায়ের দিকে তাকিয়ে নির্বাক কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বায়েজীদ বোস্তামীর শিক্ষাকে মাথায় রেখে পায়ে পায়ে মায়ের শিয়রে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল দীর্ঘক্ষণ। তবে সারারাত নয়। ফিরে এসে শফিকের পাশে ঘুমিয়ে সে ‘সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। শফিকের জন্য কন্যাও ঠিক হবে আর সুস্থ হয়ে উঠবে তাদের মাও এবং তারপর…।’ এইসব সুখস্বপ্ন দেখতে দেখতে সে ঘুমিয়ে পড়ল। তৎপরবর্তী দিনগুলো অর্থাৎ মধ্য কার্তিক থেকে মাঘের শেষ পর্যন্ত তারা তাদের মাকে নিয়ে অনবরত রাজধানীর সব বড় বড় ডাক্তার বৈদ্য আর দূর-দূরান্তের ওঝার বাড়িতে ছুটে যেতে লাগল। এই সংকটকালে চাপা পড়ে গেল রফিক-শফিকের বিবাহের আয়োজনও।
সবাই জেনে গেছে এই কলজে পচা রোগে মানুষ কিছুতেই আর বেঁচে থাকে না, তিন মাস-চার মাস অধিক ছয় মাস। এই দিনগুলোতে তারা যেখানেই যায় সবাই জানিয়ে দেয়, ‘তোমাদের মা আর কিছুতেই বাঁচবেন না।’ তারপর রফিক-শফিক বিয়ে শিকেয় তুলে মাকে সারিয়ে তোলবার যুদ্ধে অবতীর্ণ হলো। ইত্যবসরে পিজি হাসপাতালের সবচেয়ে প্রবীণ ডাক্তারদের সমন্বয়ে গঠিত বোর্ডও তাদের জানিয়ে দেয়: মানুষের পচা কলজে সারিয়ে তোলা কিংবা উপড়ে সেখানে নতুন কলজে প্রতিস্থাপন বিদ্যা এখনও তাদের অজ্ঞেয়।
মাঘের শেষে এসে তারা জানতে পারে বুড়িগঙ্গার ওই পারের মুখ ঢেকে রাখা সেই তান্ত্রিক, যাদুকর ও চিকিৎসকের কথা। ক্যানসারকেও সে সারিয়ে তোলে নিজের আবিষ্কৃত চিকিৎসায়। তার খবর রফিক-শফিকের কানে এসে পৌঁছায় সেই কনকনে ঠা-ার রাতটিতে। রাতটা কোনোভাবে কেটে যেতেই কুয়াশা মাথায় করে তারা বুড়িগঙ্গা পাড়ি দিয়ে এপারে এসে তান্ত্রিককে খুঁজতে থাকে। সারাদিন খোঁজাখুঁজির পর, পুনরায় কুয়াশা এসে চারপাশের আলোকে ম্লান করে দেবার কিছুক্ষণ পূর্বে, শাঁখারি বাজারের রাস্তাটার সামনে, জগন্নাথ কলেজের দেয়াল ঘেঁষে নানারকম বন্যপ্রাণীর শরীর নানা কসরতে পুড়িয়ে ছাই কিংবা তেলে পরিণত করা নানা মরণব্যাধির দাওয়াই বেচতে থাকা অবস্থায় তারা সেই তান্ত্রিককে দেখতে পায়। তান্ত্রিক ও চিকিৎসক সেই স্বল্পালোকে পেতলের হাতলওয়ালা ছোট ধারাল ছোরাটা দিয়ে সকলের সামনে চাঁনখারপুল থেকে যাওয়া এক ভাঙারি ব্যবসায়ীর পিঠ থেকে ফুলে সুপারির মতো হয়ে ওঠা টিউমারটাকে কেটে হাতে নিয়ে সমবেতদের প্রদর্শন করে। তারপর সেটা তার ধাতব বাটিটার মধ্যে জমে থাকা লাল জারকে টুপ করে ছেড়ে দেয়। সবাই বিস্ফোরিত নেত্রে সেই দৃশ্য দেখতে থাকে। রফিক-শফিক দুই ভাই সামনে এসে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায়। তারা দেখে, যে লোকটার পিঠ থেকে এইমাত্র সকলের সামনে টিউমারটা কেটে নেওয়া হলো সে নির্বিকার ভঙিতেই বসে আছে। এমন কি তান্ত্রিক তাকে প্রশ্ন করে, ‘কি! ব্যথা পেয়েছো?’ নির্বিকার ধুলোমাখা মুখটা উত্তর দেয়, ‘না’। রক্ত বেরুতে থাকা জায়গাটাতে সে তখন একদলা পিচ্ছিল ভেষজ ঘষে দিতে দিতে আবার প্রশ্ন করে, ‘কি! ব্যথা করছে?’ দাঁতে দাঁত চেপে ভাঙারি ব্যবসায়ী বলে, ‘না। একদমই না।’ হাতে রক্তমাখা ছুরিটা নিয়ে এবার সে দর্শক সারির সামনে চলে আসে। ‘কী! আর কী দেখতে চান?’ বলে হুঙ্কার দিয়ে অতৃপ্তদের লজ্জা ভেঙে দেয়। অতৃপ্তরা মানিব্যাগে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে থাকে। প্রথমে লজ্জা ভাঙা একজন মুঠোয় চেপে রাখা দুমড়ানো অথচ চকচকে লাল পঞ্চাশ টাকার একটি নোট তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘আমায় দিন এক শিশি।’ অতৃপ্ত লোকটা যতটা সম্ভব অনুচ্চস্বরে বলে কথাটা। যাদুকর চিকিৎসক বিকট চিৎকারে একটি শিশি তার হাতে পৌঁছে দিতে দিতে সেই তেলের ব্যবহার বিধি ঘোষণা করে, ‘সকালে ঘুম থেকে উঠে শিশ্ন ফোলা থাকা অবস্থায় একবার শুধু মালিশ করে নিতে পারলেই হলো, বাকিটা বোঝা যাবে সেইদিন রাতেই।’ রফিক-শফিক দুই ভাই কিয়ৎক্ষণের জন্য নিজের পীড়িত মাকে ভুলে তাদের সমাগত বিবাহের রাতটি নিয়ে ঈষৎ চিন্তিত হয়ে পড়ে। পরক্ষণেই দুই ভাই পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিয়ে যাদুকরের চিকিৎসার আসর শেষ হবার অপেক্ষা করে। যতেœ পাতা মাদুরের ওপর সার করে রাখা শিশিগুলো একটা একটা করে শেষ হয়ে গেলে যাদুকর চিকিৎসক হাত তুলে সবাইকে বিদায় জানায়। যাদের ভাগ্যে আজ আর শিশি জুটলো না তাদের পরবর্তী কোনো একদিনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওপরের দিকে হাতজোড় করে মাথাটাকে সম্পূর্ণই গায়ের চাদরে ঢেকে নেয়।
সবাই বিদায় হয়। সে চোখ খুলে তখনও তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যমজদের দেখতে পায়। সে ভেবেছিল সবাই চলে গেছে, তাই মুখ তুলবার সময় মুখের কাপড় আর ঠিক করে নাই। রফিক-শফিক তার অনাবৃত মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে লোকটার নাক নাই। নাকের বদলে সেখানে রয়েছে গাঢ় অন্ধকারময় একটি গর্ত। হয়তো গর্তটার শেষ দিকে নিঃশ^াস ছাড়বার মতো রন্ধ্র রয়েছে এক বা একাধিক, তবে সে রন্ধ্র রফিক কিংবা শফিক কারও চোখেই পড়ে না। তারা চোখ নামিয়ে নিলে সে তার বাক্স-পেটরাগুলো গুছিয়ে নিতে নিতে রফিক-শফিকের কাছে তাদের মতলব জানতে চায়। প্রায় হাতজোড় করা ভঙ্গিমায় তারা তাকে জানায়, কোনো বিশেষ মতলব নয়; বরং এক কঠিনতম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে তারা এসেছে তার কাছে। তারা তাদের মায়ের কলজে পচা রোগ এবং ইতোপূর্বে নেওয়া সকল ব্যর্থ চিকিৎসার বর্ণনা দেয়। নাকহীন তান্ত্রিক এবার তার বাক্স-পেটরার ওপর চড়ে পা ছড়িয়ে আরাম করে বসে বলে, ‘এই রোগেরও চিকিৎসা আছে।’ এমনকি তা আরোগ্য হতে পারে তার তৈরি তেলেই। রফিক-শফিক আনন্দ আর আশায় নিজেদের পায়ের শক্তি হারিয়ে ধপ করে বসে পড়ে চিকিৎসকের পায়ের কাছে। এক সাথে চারটি হাত ওপরে তুলে সমস্বরে বলতে থাকে, ‘দিন! সেই তেলের শিশিটা আমাদের দিন!’ যাদুকর চিকিৎসক মুখের কাপড় সরিয়ে তাদের দিকে ঝুঁকে এসে বলে, সে তেল প্রস্তুত করা কিছুটা কষ্টসাধ্য, যমজেরা আবারও সমস্বরে ‘কেন? কীভাবে? কী দিয়ে? কী পুড়িয়ে বানায় সে তেল আমাদের বলুন। আমরাই যোগাড় করে দেব সেইসব। যত দূরবর্তী আর কষ্টসাধ্যই হোক না কেন মায়ের কলজে পচা রোগ সারাবার জন্য আমাদের সেখানে যেতেই হবে। বলুন আপনার কী চাই?’ যাদুকর আবার নিজের নাকহীন বীভৎস মুখ উন্মুক্ত করে তাদের দিকে ঝুঁকে এসে বলে, ‘শান্ত হও!’ সেই তেল বানাবার অধিকাংশ উপাদানই আমার কাছে রয়েছে, কেবল একটি উপাদান হলেই তেল তৈরিতে আর কোনো বাধা থাকছে না, যমজেরা এবার কাতর স্বরে বলে, ‘কী? কী সেটা? বলুন আমাদের।’
‘যা প্রয়োজন সেটা হলো : জীবিত মানুষের দেহের এক টুকরো ঝলসানো প্রত্যঙ্গ, হাত কিংবা পা হলেই বেশি সুবিধা হয়।’ বলে সে অদৃশ্য নাসারন্ধ্র থেকে তপ্ত নিশ^াস ছুড়ে দেয় যমজদের মুখে। যমজেরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে একমুহূর্তে ভেবে নেয়, এটা বাঘিনীর দুধ কিংবা দুধরাজের মাথার মণি নয় তাই এটা নিশ্চয় এমন কঠিন কিছুও নয়। যাদুকর তার অস্থাবরের ঝোলাটা কাঁধে তুলে নিতে নিতে বলে, ‘সেটা জোগাড় হলেই চলে এসো, আমি তোমাদের মায়ের কলজে পচা রোগের দাওয়াই তৈরি করে দেব।’
রফিক-শফিক দুই ভাই অনুজ্জ্বল ল্যাম্পপোস্টের আলোয় রিকশার ফাঁক গলে যাদুকরের হারিয়ে যাওয়া দেখে উৎফুল্ল বদনে হাওয়ার গতিতে দুর্গন্ধযুক্ত বুড়িগঙ্গার পাড়ে এসে দাঁড়ায়। বুড়িগঙ্গার ওপর দিয়ে আসা গাঢ় শীতল বাতাসে নৌকোর জন্য অপেক্ষা করে। স্বল্প বিরতিতেই তারা একটি নৌকোর ছেড়ে যাবার তোড়জোড় লক্ষ করে সেটাতে চড়ে দাঁড়ায়। নৌকোয় দাঁড়িয়ে তারা সোজা উত্তর দিকে তাকিয়ে প্রথমে পানি শোধনাগারের সুউচ্চ বুরুজটা দেখতে পায়। তারা বুরুজের ঠিক পেছনে পাঁচ দিন বয়েসি লাজুক চাঁদটাকে লুকিয়ে থাকতে দেখে। চোখ নামিয়ে যমজেরা বুড়িগঙ্গার পীত বর্ণের বুকে চাঁদের ছায়া দেখতে চায়। তারা চাঁদের কোনো ছায়া বুড়িগঙ্গার ওপরে খুঁজে পায় না; বরং বুড়িগঙ্গার ওপর তারা ধোঁয়ার উড়াউড়ি দেখে। যমজেরা হাই তোলে একসাথে, তাদের মুখগহ্বর থেকেও গাঢ় ধোঁয়া বেরিয়ে যায়, তাদের মনে পড়ে প্রতিদিনই শীত তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে। তীরে এসে পাটনি নৌকোটাকে ঘুরিয়ে নোঙর করে বৈঠা পায়ে চেপে দুই হাতে আরোহীদের দেওয়া পয়সা মিলিয়ে নিতে থাকে। রফিক-শফিক নামে সবার শেষে। নামার সময় হঠাৎই পাটনির পায়ের তলায় আটকে রাখা বৈঠাটা নড়েচড়ে ওঠে। পাটনি সতর্ক হয়ে সেটাকে সামলে নিতে বাম হাতটা নিচে নামায়। তাদের সামনে থাকে কেবল তার মেলে রাখা শীর্ণ ডান হাতখানা। যমজেরা লোভের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেই হাতখানার দিকে। বৈঠা সামলে পাটনি দু’হাত মুক্ত করে তর্জনী নাড়িয়ে বিরক্তি প্রকাশ করে, ‘কী দ্যাখতাছেন? ট্যাকাডা দিয়া নামেন! উফ্! ঠা-ায় জইমা যাইতাছি।’ বলে তাদের দিক থেকে দৃষ্টি ফেরায়। রফিক-শফিকেরা তার হাতের তলায় দুটি ধাতব মুদ্রা রেখে নেমে আসে। বাড়িতে ফেরার হাঁটা রাস্তায় তারা গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকে। কেউ কোনো কথা বলে না কারও সাথে। ফিরে এসে ঘুমন্ত অথবা অচেতন মায়ের শিয়রে অবনত বদনে দাঁড়িয়ে থাকে দীর্ঘক্ষণ। তারপর নিজেদের ঘরে ফিরে তলিয়ে যায় গভীর ঘুমে।
ঝলসানো মানব প্রত্যঙ্গের সন্ধানে এদিক-সেদিক এমনকি দিগি¦দিক ঘুরে ঘুরে তাদের দিন কেটে যেতে থাকে। যদিও তান্ত্রিকের চাওয়া হলো জীবিত মানুষের ঝলসানো প্রত্যঙ্গ, তবু তারা একদিন সকালে চিতাখোলা মহাশ্মশানে এসে দাঁড়ায়, সকাল থেকে প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা শ্মশানের ফাঁকা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দূর আকাশে চিল আর শকুনের উড়ে যাওয়া দেখে। উলুধ্বনি দিয়ে বাঁশের খাটিয়ায় চড়ে কোনো লাশ তখনও এসে পৌঁছায় না। শফিক অধৈর্য হয়ে ওঠে। বলে, ‘চলো আমরা চলে যাই, তুমি কি বুঝতে পারছো না প্রতিদিন মরার মতো এত হিন্দু আর নেই আমাদের কেরানীগঞ্জে?’ রফিক বুঝতে পারে। তবুও সে আরও কিছুটা সময়, অন্তত সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চায়। এবং সন্ধ্যায় যখন তারা ফিরে আসার উপক্রম করে, তখন লাশবাহী একটি ফ্রিজার ভ্যান হুইসেল বাজিয়ে শ্মশানের উঁচু-নিচু প্রান্তরে ঢুকে পড়ে বালিতে আটকে যায়। মাত্র চার-পাঁচজন লোক এসেছে লাশটা নিয়ে। তাদের পোশাক দেখে বোঝা যায় না তারা কোন ধর্মের আর উলুধ্বনির তো প্রশ্নই আসে না। যারা এসেছে তারা নিশ্চয়ই মৃতের আত্মীয়-স্বজন এমনকি ছেলে-পুলেও হতে পারে। যদিও রফিক-শফিক কেউই তাদের মুখে স্বজন হারাবার বেদনা দেখতে পায় না। দ্রুতই ফ্রিজার ভ্যানের দরজা খুলে তারা লাশটাকে টেনে নামায়। সচকিত হয়ে যমজেরা তাদের দিকে এগিয়ে আসে, ডানে-বাঁয়ে তারা কোনো স্তূপাকার কাঠ-খড়ি কিংবা এমন কোনো দাহ্য দেখতে পায় না। কাপড়ে জড়ানো লাশটাকে নিয়ে আসা স্বজনেরা শ্মশানের শেষ প্রান্তে নতুন ওঠা পলেস্তারাহীন ইটের ছোট দালানটার দিকে ধরাধরি করে নিয়ে যেতে থাকে। রফিক-শফিকও দূরত্ব বজায় রেখে তাদের পেছন পেছন এগিয়ে যায়। নতুন দালানটার একপাল্লার স্টিলের দরজাটা খুলে গামছা কাঁধে একজন প্রৌঢ় বেরিয়ে আসেন। সমাগতদের অভ্যর্থনাসূচক নমস্কারে তোলা তার হাত দুটির কাঁপুনি চোখে পড়ে রফিক-শফিকের। তারা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে, প্রৌঢ় লোকটা ইটের গায়ে লাগানো সুইচ টিপে দেয়। জ্বলে ওঠে হলুদ আলো। আর সামনে বেকারির চুল্লির মতো একটা চুল্লির দরজা খুলে সেখান থেকে লাশের চেয়ে কিঞ্চিৎ বড় আকারের একটি ট্রে বেরিয়ে আসে। সবাই মিলে ট্রের ওপর তুলে দেয় শবদেহটাকে। প্রৌঢ় আবার সুইচ টিপে দেয়। ট্রেটা ঢুকে যায় চুল্লির পেটে। লাশের সাথে আসা এক মাঝবয়েসির চোখে এবার অশ্রু টলটল করে। একজন তার পিঠে হাত রাখে। এরই মধ্যে প্রৌঢ় চুল্লির পেছনে গিয়ে আবার ফিরে আসে। হাতে করে নিয়ে আসে একটি অ্যালুমিনিয়ামের ছোট পাত্র। চোখ টলটল করতে থাকা লোকটা পাত্রটা হাতে নিয়ে ভালো করে পাত্রের ভেতরে তাকিয়ে বলে, ‘একি! এ যে কেবল ছাই, আমার পিতার নাড়িভুঁড়ির অংশ কোথায়? কী দিয়ে আমরা তাঁর আত্মাকে মুক্ত করব?’ প্রৌঢ় জবাব দেয়, ‘বাবাজি, এ ব্যবস্থায় ছাই ছাড়া অন্য কিছু পাবে না, এটাই নাও, এগুলোই বরং ঢেলে দিও দূষিত বুড়িগঙ্গায়, আমি তোমার পিতার মুক্তির জন্য প্রার্থনা করব।’ বলে দক্ষিণার জন্য তার কম্পিত হাত দুটো প্রসারিত করে। শফিক আরও বিরক্ত হয়ে রফিকের বাহু ধরে টেনে বের করে আনে। গজগজ করে বলতে থাকে, ‘কেন আমরা এখানে সময় নষ্ট করছি? আমাদের প্রয়োজন জীবিত মানুষের প্রত্যঙ্গ, চাইলে আমরা সেটা নিজেরাও ঝলসে নিতে পারি। চলো এখানে আর সময়ক্ষেপণ নয়।’ হতাশ রফিক সহোদরের পায়ের গতির সাথে পা মিলিয়ে রাস্তায় উঠে আসে। সন্ধ্যা নেমে গেছে। আলোও জ্বলে গেছে চারদিকে। হাঁটতে হাঁটতে তারা তাদের বাড়ির রাস্তা ছাড়িয়ে চুনকুটিয়ার মোড়ে এসে থামে। কোথাও বসবে বলে একটি যুৎসই জায়গার জন্য এদিক-ওদিক তাকাতে থাকে।
‘আরে মিয়া, আপনাদের যে কোনো খবরই নাই!’ রফিকের অদেখা বাগদত্তার ছবি সরবরাহকারী দূরাত্মীয় তার ডান হাতের ছাতাটা বাঁ-হাতে নিয়ে ‘কি সৌভাগ্য আমার! আপনাদের দুই ভাইকে পেয়ে গেলাম একই সাথে, সবই তার ইচ্ছে। চলেন! চলেন! রাস্তার ওপাশে চলেন!’ বলে একটি চায়ের দোকান নির্দেশ করে শফিকের হাত ধরে রাস্তা পার হতে থাকে। দোকানের বেঞ্চে এক সারিতে পাশাপাশি বসে নিজেই চায়ের ফরমাশ দিয়ে বলে চলে, ‘ছোট ভাইয়ের জন্য কন্যা চূড়ান্ত হয় নাই বুঝি, চিন্তা করবেন না দ্রুতই হয়ে যাবে। আর আপনাদের ঘরের হবু লক্ষ্মীর তো পরীক্ষা শেষ হইছে। তাড়াতাড়িই সে ফিরবে চট্টগ্রাম থেকে। ফিরলে আর দেরি কইরেন না, জানেনই তো! শুভ কাজে দেরি করতে নেই।’ এই কথা বলে সে তার দুই পাশে বসা দুই ভাইয়ের দিকে তাকায়, তাদের চোখে মুখে কোনো চাঞ্চল্য নেই দেখে একটু যেন দমে যায় লোকটা, ‘ভাই কোনো সমস্যা?’ হ্যাঁ! সমস্যা বলে রফিক তাকে তাদের সমস্যার একটি নাতিদীর্ঘ বিবরণ দেয়। সব শুনে ছাতার বাটে দু’হাত রেখে বিজ্ঞচিত নীরবতা শেষ করে দূরাত্মীয় বলে ওঠে, ‘ভাববেন না! একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে, কাল আবার আইসেন এইখানে, এই সময়ে, দেখি কী রাস্তা বের করতে পারি!’
পরদিন সকালবেলা রফিক-শফিক ঘুমন্ত থাকতেই ছাতাওয়ালা দূরাত্মীয় হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে তাদের ঘরে। টেনে দুই ভাইকেই বিছানা থেকে তোলে। ‘আরে মিয়া আপনারা দেখি নিশ্চিন্তে ঘুমাইতেছেন, ওই দিকে আপনাদের চিন্তায় আমি সারারাত ঘুমাইতে পারি নাই। শফিককে সরিয়ে খাটের ওপর বসে পড়ে সেও। টিভিটার দিকে চেয়ে বলে, ‘আরে আপনাদের ঘরে তো টিভিও আছে দেখতেছি, তয় টিভিটুভি আপনারা খুব একটা দেখেন না মনে হয়, যাই হোক উপায় আমি খুঁজে বাইর করছি, জীবন্ত মানুষের ঝলসানো প্রত্যঙ্গ পেতে আপনাদের আর যেখানে-সেখানে ঘুরতে হবে না, আমি একটা ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি, ঠিকঠাক তার কাছে গিয়ে ঘটনাটা বুঝিয়ে বললেই কিছু টাকার বিনিময়ে সেই ব্যবস্থা করে দিবে।’ এইসব বলে সে মানুষের মাংসখেকো খোরশেদ ডোমের ঠিকানা বাতলে দেয় তাদের। ঘুম থেকে ধড়ফড় করে উঠে যমজদের ধাতস্ত হতে সময় লাগে। চোখ রগড়ে তারা পুনরায় খোরশেদ ডোমের ঠিকানা ভালো করে বাতলে নেয়। দূরাত্মীয় তাড়া দেয়, ‘দেরি করবেন না, এক্ষুণি রওনা হন, আশা করি আজকের সন্ধ্যার আগেই আপনারা পেয়ে যাবেন আপনাদের মায়ের কাক্সিক্ষত দাওয়াইয়ের প্রধান উপাদান, রওনা হন! রওনা হন!’ বলে সে আবার তার ছাতাটাকে হাতবদল করে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যায়। রফিক-শফিক তড়িঘড়ি করে হাত-মুখ ধুয়ে নিয়ে অভুক্ত পেটেই বেরিয়ে পড়ে। তবে সকালে বেরুলেও রাস্তার দীর্ঘ জ্যাম পাড়ি দিয়ে ঢাকার প্রধান লাশকাটা ঘর খুঁজে পেতে তাদের দুপুর হয়ে যায়।
সেখানে পৌঁছে তারা দেখে, লাশকাটা ঘরের বিশাল দরজার দুইপাশে বিষণœ শোককাতর মানুষেরা বসে আছে লম্বা সারি করে। হয়তো তারা অপেক্ষায় আছে কাটাছেঁড়া গলিত অর্ধগলিত প্রিয়জনের মরদেহ গ্রহণের অপেক্ষায়। লাশকাটা ঘরের সামনে, আশপাশের লোকজনের কাছে তারা খুঁজতে থাকে মানুষখেকো খোরশেদ ডোমকে। কেউ বলে চিনি না, কেউ বলে ‘আছে হয়তো আশপাশে, খুঁজলে পাবেন, খুঁজে দেখেন।’ বেলা বাড়তে বাড়তে এবার গড়িয়ে যাবার উপক্রম, খোরশেদ ডোমকে তবু তারা খুঁজে পায় না। সেই সময়ে ত্রাতা হয়ে আসে এক চপল কিশোর, নিজ থেকেই জানতে চায়, ‘কী? খোরশেদেরে খুঁজেন ক্যান? তামাক লাগবো? লাগলে আমারে কন আইনা দিতাছি।’ রফিক-শফিক তাদের মোলায়েম কণ্ঠকে আরও কোমল করে জানায়, ‘না! তামাক নয় তাদের খোরশেদকেই দরকার।’ ‘আইচ্ছা বুচ্ছি বুচ্ছি, আইয়েন, আমার লগে আইয়েন!’ বলে কিশোর তাদের দুই ভাইকে নিয়ে যায় পানির মোটরওয়ালা গুদামঘরে। অন্ধকার ঘরের দরজায় কিছুক্ষণ করাঘাত করতেই পিঠের সাথে লেগে থাকা পেট নিয়ে শীর্ণকায় খোরশেদ দরজা খুলে দেয়। ‘মামা, এই দুইজন সেই সক্কাল থেইকা তোমারে বিসরাইতাছে।’ বিরক্ত খোরশেদ ভ্রু কুঞ্চিত করে বলে, ‘না, মাল নাই, বিসরাইয়া লাভ নাই, আপনেরা যান গা!’ বলে দরজা লাগানোর উপক্রম করতেই রফিক-শফিক তাকে ঠেলে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে সেই গুদামঘরে। ঘরের বোটকা গন্ধের দিকে খেয়াল না দিয়ে তারা খোরশেদের হাত চেপে ধরে। বলে, ‘শুনুন, আপনি আমাদের একজন অতি প্রিয় ভাই। আমাদের একটা বিহিত করে দিন, আমরা যতটা সম্ভব আপনাকে খুশি করে দেব।’ খোরশেদ কিছুটা নরম হয়ে নিজের কাঁচাপাকা দাড়িগুলো ভালোরকম চুলকে নিয়ে তাদের বসতে বলে, যমজেরা বসলে এবার সে একে একে তামাক সাজবার সকল উপাদান বের করে তামাক সাজতে থাকে। হাতের তলায় তামাকের দলা নিয়ে একটা কৌটা থেকে তর্জনীর মাথায় লাল পুডিংয়ের মতো বস্তু লাগিয়ে সেটা তামাকে মেখে হাতের তলায় পিষতে থাকে, মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে, ‘কন তো এইডা কী দিলাম?’ যমজেরা উত্তর দেয় ‘জানি না ভাই’ শব্দ করে হেসে খোরশেদ জানায়, ‘এইডা হইলো পেরেম কইরা বিষ খাইয়া মরা এক ছেরির হাডের ভিতরের রক্ত। চিপড়াইয়া বাইর করছি। এইডাতে নেশাডা জমে ভালা।’ বলে সবগুলো ধাপ একে একে শেষ করে জ্বলন্ত কলকিটায় বিকট টান দেয় খোরশেদ ডোম। টানের প্রচ-তায় কলকির মুখের আগুন লাফিয়ে জ্বলে উঠে ঘর আলো করে দেয়। খোরশেদ ডোমের গলার সবগুলো শিরা-উপশিরা জেগে ওঠে একসাথে। ইটখোলার চুল্লির মতো ধোঁয়া ছাড়ে খোরশেদ, একই প্রক্রিয়ায় বিরতিহীন আরও কয়েকটা টান দেয় সে। তারপর কালসিটে পড়া হাতের তালুতে কলকে উপুড় করে ভালো করে পরখ করে নেয় তামাকের কোনো কনা পুড়তে বাকি রয়ে গেল কিনা।
শান্ত হয়ে খোরশেদ এবার বলে, ‘চিন্তা কইরেন না, আইজকাই ব্যবস্থা কইরা দিমু। আগে হইলে একটু দেরি লাগতে পারতো, তয় অক্ষণ আর দেরি হইবো না। পোড়া লাশ আইতাছে সোতের লাহান। পেত্তেকদিন একশ দুইশ একটার থেইকা হাত কিংবা পাও একটা কাইটা বাইর কইরা দিমুনি, রফিক বলে ভাই আমাদের তো জীবন্ত মানুষের প্রত্যঙ্গ চাই।’ ‘অসুবিধা নাই, তয় টেকা কিন্তু যেইডা কইছেন ওইডাই দিতে হইবো কম হইলে চলবো না। শ্যাষ রাইতে কুমিল্লায় বাস পুড়ছে বিরাট একখান। অল্প কয়ডা বাদ দিলে প্রায় সবগুলানই মরছে শুনছি। আমার লগে যাইবেন, দরজার বাইরে খাড়াইয়া থাকবেন, আমি ভিতর থেইকা ডাক দিলে আপনেরাও ভিতরে যাইবেন। আমি খোরশেদ হারাম খাই না। আপনাগোরে দেহাইয়া জ্যান্ত শইল থেইকাই কাইটা দিমু। লইয়া যাইবেন।’ ‘আচ্ছা। তাই হবে! তাই হবে!’ বলে যমজেরা সায় দেয়। খোরশেদ আবার বলে, ‘দরজার এক্কেরে সামনে থাইকেন, আমি ভিতরের থেইকা ডাক দিলে আপনাগোর য্যান ঢুকতে দেরি না অয়।’ আর শুনেন, ‘লগে একটা ব্যাগ রাইখেন। লুকাইয়া নিতে অইবো। মরা হউক আর জ্যাতা। মাইনসের হাত-পাও। তা কি দেহাইতে দেহাইতে লইয়া যাইবেন?’ খোরশেদের গলায় এবার কতকটা যেন হুকুম ছড়িয়ে পড়ে। যমজেরা আবারও ‘তাই হবে, তাই হবে’ বলে সায় দেয়।Ñ ‘এইবার বাইরাইয়া গিয়া লাশকাটা ঘরের সামনে খাড়ান।’
রফিক-শফিক বেরিয়ে এসে লাশকাটা ঘরের সামনের দোকানগুলোতে একটি ব্যাগ খুঁজতে থাকে। সকল দোকানিই তাদের পাউরুটি ঝুলিয়ে রাখা স্বচ্ছ পলিথিন দেখিয়ে বলে ‘চাইলে এর একটা নিতে পারেন।’ ওতে তাদের চলবে না। তাদের চাই এমন ব্যাগ যা দেখে বোঝার উপায় থাকবে না ব্যাগের ভেতর কী আছে। খুঁজতে খুঁজতে তারা একটি কাগজের হাতল ছিঁড়ে যাওয়া চাররঙা শপিং ব্যাগ পেয়ে যায় রাস্তার ওপর। ধুলো ঝেড়ে সেটাকেই হাতে নিয়ে তারা এসে দাঁড়ায় অপেক্ষমাণদের সামনে প্রায় দরজা লাগোয়া জায়গাটাতে। এমন জায়গায় দাঁড়াতেই খেকিয়ে ওঠে একজন, ‘কি! লাশ নিতে আইছেন? সইরা খাড়ান, আগে আমগো লাশ পরে আপনাগোর। লাশ বাইর করন এত সোজা না। গত পরশু সন্ধ্যায় যাত্রাবাড়িতে পুইড়া মরছে। টেকা দিয়া আইজ দুইদিন এইহানে বইসা আছি লাশের খোঁজ নাই। সইরা খাড়ান মিয়া। আগে আমগোর লাশ পরে, অন্য কতা।’ ‘না মানে লাশ নয় আমরা আসলে, আমতা আমতা করতে থাকা রফিকের ওপর লোকটা আবারও খেকিয়ে উঠতে চায়। শফিক মধ্যস্থতা করে জানিয়ে দেয় ভেতর থেকে কেউ একজন তাদের ডেকে নেবে। এক মুহূর্তের কাজ। তারা কোনো লাশ গ্রহণ করতে আসে নাই। এবার লোকটা বলে ‘তাইলে অন্য কতা, বহেন বহেন, আমগো লগে বহেন।’ সেইখানে তাদের সাথে বসে রফিক-শফিকের সময় কাটতে থাকে। আধাঘণ্টা একঘণ্টা করে দুই ঘণ্টা কেটে যায়। দরজায় একটু শব্দ হতেই নড়েচড়ে বসে রফিক-শফিক। লোকটা তাদের বলে ‘লাভ নাই, এমন কথা সবাইরেই দেয় ওরা, তয় রাহে না।’ সূর্যের ক্ষীণ আলোয় তাদের সামনে এতক্ষণ ধরে থাকা নারিকেল গাছটির পাতার ছায়ার নড়াচড়া হালকা হয়ে যেতে থাকে। তারা বুঝতে পারে দিনের আলো ফুরিয়ে এসেছে। তাদের পীড়িত মায়ের কথা মনে পড়ে। তারা আরও অধৈর্য হয়ে মাঘের শেষ দিককার এই বিকেলেও ঘেমে উঠতে থাকে।
হঠাৎ কচ করে আওয়াজ হয়ে তাদের পেছনের দরজাটা ঈষৎ ফাঁকা হয়ে যায়। খোরশেদ তার পোড়া চেহারাটা বের করে চোখের ইশারায় তাদের ডেকে নেয়। যমজেরা ভেতরে ঢুকে তীব্র ঠা-া অনুভব করে। বিরাট ঘরের দুইপাশে বড় বড় আলমারি। তাদের চোখে-মুখে ভয় খেলে যায়। খোরশেদ কথা বলে, চারকোনা বদ্ধ ঘরে তার কথা প্রতিধ্বনিত হয়। ‘আর কইয়েন না, সামনে তো যান নাই, দ্যাখলে বুঝতেন, কী পরিমাণ বডি আইছে! সব পোড়া, মরা গুলানরে টাইন্যা টাইন্যা এতক্ষণ ধইরা আলমারিতে পুরাইছি। আর জ্যান্ত টাইন্যা লাশ ঘরে আনা কী এত সোজা। হ্যাগোর সব আত্মীয়-স্বজন আইসা পড়ছে। পুলিশ, সাংবাদিক আরও কত কী!’ বলতে বলতে সে খাটিয়ার ওপর সাদা কাপড়ে ঢেকে রাখা একটা ঝলসানো শরীরের কাছে নিয়ে যায় তাদের।Ñ ‘তয় আপনাগোর কপাল ভালা। এই বেডির খোঁজ লইতে এহনও কেউ আহে নাই। ডাক্তারেও বুঝছে কিছুক্ষণের মদ্যেই মরবো। তাই হ্যার দিকে আর চোউখ দেয় নাই। সুযোগ বুইঝা আমি টাইন্যা লইয়া আয়া পড়ছি।’
হিমঘরে রফিক তার সহোদর শফিকের হিম হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকায়। চাকাওয়ালা লোহার খাটে শোয়ানো মেয়েটার চুলগুলো ঝুলে পড়ে মেঝে ছুয়ে আছে। আগুন তার শরীর পোড়ালেও চুলগুলো কী এক রহস্যবলে অক্ষত রয়ে গেছে। তাদের দুই ভাইয়ের জন্য তাদের মা এমন লম্বা চুলের মেয়েই খুঁজে বেড়াচ্ছিল। চুনকুটিয়ার কাজি বাড়ির মেয়েটার চুলও নাকি এমনই লম্বা ছিল বলে জেনেছিল রফিক। এসব ভাবনার সময় নয় এখন। খোরশেদ তার চকচকে ধারাল ছুরিটা হাতে দাঁড়িয়েছে খাটের ওপর পাশে, ‘কন, হাত দিমু, না পাও?’ বলে মেয়েটার ঢেকে রাখা মুখের কাপড় টেনে সরিয়ে ফেলে। পুড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়া মুখের দিকে এক নজর তাকিয়ে দুই ভাই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ‘কী? আপনেরা ভাবতাছেন মরা? মরা না, জ্যান্তই আছে,’ বলে খোরশেদ টান দিয়ে ঢেকে রাখা কাপড়টা মেয়েটার বুকের নিচ পর্যন্ত নামিয়ে আনে। ‘কী? দেখতাছেন না, বুক যে ওঠা-নামা করতাছে?’ দুই ভাই তবুও বাকরুদ্ধ। পুড়ে ঝলসে গেলেও কুমারীর বুকের ঔদার্য্য ম্লান হয় নাই এতটুকু। ফুটে থাকা পোড়া বাম স্তনটির নিচে ছুরি দিয়ে খোঁচা মেরে খোরশেদ বলে, ‘দেহেন মিয়া, কেমনে রক্ত বাইরায়, মরার শৈল দিয়া রক্ত এমনে বাইরায় না, বিশ^াস না করলে রক্ত হাতে মাইখা দেহেন এক্কেবারে গরম।’ খোরশেদ সে রক্ত নিজের হাতে মেখে স্বল্পালোকিত ঘরে হাত উপরে তুলে দেখায়, ‘ব্যাগ লইছেন তো’। নিঃশব্দে শফিক তার হাতে থাকা ব্যাগ উঁচিয়ে ধরে, ‘এই ব্যাগে হইবো না। হাত পাও পুড়ছে বেশি, পোড়া জায়গা দিয়া এহনও রস পড়তাছে।’ ‘আইচ্ছা’ বলে খোরশেদ কাপড়ের নিচে হাত দিয়ে মেয়েটার পরনে থাকা পোড়া পা’জামার কিয়দংশ ছিঁড়ে নেয়। ‘আপনাগোরে ডাইন হাতটাই দেই, আর আমি লই বাঁয়ের ডা। মাইনষের মাংসের স্বাদই আলাদা। আর এই বয়েসি মায়া মানুষ হইলে তো আর কতা নাই। ভাইবেন না আমি কাঁচা খাই। ভালো কইরা রাইন্দা মাসে এক-দুইবার খাই। তয় কোত্থেইকা য্যান মাইনসে আইজ কাইল জাইনা যাইতাছে। খোরশেদ ডোমে নাকি মানুষ খায়, হি! হি! হুনেন নাই আপনেরা?’ এইসব বলার অবসরে খোরশেদ ডোম তার অর্জিত দক্ষতায় নির্বিকার মুখে পা’জামার অর্ধপোড়া সাদা কাপড়ে চেপে কনুই থেকে মেয়েটার ডান হাতটা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ‘দ্যান ব্যাগটা দ্যান’ বলে হাত বাড়িয়ে ব্যাগটা নিয়ে কর্তিত হাতটা সেটার মধ্যে পুরে দিতে দিতে বলে, ‘সইরা খাড়ান, প্লেট বাইয়া রক্ত নামতাছে, গায়ে মাখবো, এই মাইয়ার শইলে এত রক্ত কেন?’ বলে নিজেই ওপাস থেকে সরে খাটের এপাশে তাদের সামনে এসে মুখে দারুণ হাসি ফুটিয়ে বলে, ‘দ্যান ট্যাকাটা দ্যান।’ রফিক-শফিক তাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিমতো সবগুলো টাকা তার হাতে দিয়ে দ্রুতই বেরিয়ে পড়ে।
এবার তাদের খুঁজে বের করতে হবে সেই তান্ত্রিককে। বাইরে বেরিয়ে দেখে সন্ধ্যা নেমে গেছে। লাশঘরের সামনের জায়গাটা হেঁটে পাড়ি দিয়ে তারা নাজিমুদ্দিন রোডে এসে দাঁড়ায়। রিকশার পেছনে রিকশা, গাড়ির বাম্পারে গাড়ি লেগে স্তব্ধ হয়ে আছে সমগ্র রাস্তা, যতদূর চোখ যায়। রিকশার ফাঁক গলে রাস্তাটা পাড়ি দিয়ে তারা হাঁটতে থাকে দুরন্ত গতিতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা পৌঁছে যায় সেদিনের সেই জায়গায়। শাঁখারি বাজার রাস্তার মুখে জগন্নাথ কলেজের দেয়াল ঘেঁষে তান্ত্রিকের আজকের মজমাটা জমে উঠেছে আরও বৃহৎ পরিসরে। তাকে ঘিরে টাকার বৃষ্টি নামিয়েছে জড়ো হওয়া অতৃপ্তের দল। প্রত্যেকের চাই একটা করে শিশি, সকলেরই চাই। নুয়ে পড়া শিশ্ন তাদের জাগাতেই হবে। আজ রাতের মধ্যেই। ভিড় ঠেলে ব্যাগ হাতে রফিক-শফিক সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তান্ত্রিকের চোখে চোখ পড়ে তাদের। তান্ত্রিকের কথার গতি কমে যায়। আজ আর শিশি বিক্রি হবে না বলে সজোরে তালি বাজিয়ে সেদিনের মতো সকলকে বিদায় নিতে বলে সে। তার হুকুমে জায়গাটা ফাঁকা হয়ে যায় দ্রুতই। সবাই চলে গেলে তান্ত্রিক মুখের কাপড় সরিয়ে তাদের হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে নেয় নিজের হাতে। ঘুরে রাস্তার দিকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে ব্যাগের ভেতর হাত দিয়ে সে বুঝতে পারে, যমজেরা সঠিক জিনিসই নিয়ে এসেছে। ‘চলো, সামনেই আমার আস্তানা, বেশিক্ষণ লাগবে না, আমি সব কিছু প্রস্তুত করে রেখেছি। এটার জন্যই ছিল আমাদের অপেক্ষা। চলো! আর অপেক্ষা নেই’ বলে তার ঝোলাটাকে কাঁধে নিয়ে সে হাঁটতে থাকে। পীড়াগ্রস্ত জননীর যমজ পুত্রেরাও হাঁটতে থাকে তার পেছনে। নদীর ধারে এক ঝুপড়িতে ঢুকে পড়ে তান্ত্রিক। তারাও ঢুকে পড়ে, ঝুপড়ির মধ্যে এক বৃহদাকার কাঠের বাক্সের ওপর ঝোলা নামিয়ে তাদের দিকে পেছন ফিরে খুটখাট শব্দ করে কী যেন করতে থাকে। রফিক-শফিক বুঝতে পারে তাদের দাওয়াই তৈরি হচ্ছে, কাজের মাঝে পেছনে না ফিরেই তান্ত্রিক কাগজে মুড়ে ছোট্ট একটা কী যেন রফিকের হাতে দিয়ে বলে, ‘এটা রাখ!’ রফিক তার প্যান্টের ঝুল পকেটে গুঁজে রাখে সেটা। স্বল্পক্ষণেই দাওয়াই তৈরি শেষ হয়। মুখের দিকে লম্বা, একটি মাঝারি আকৃতির শিশি তান্ত্রিক তাদের হাতে দিয়ে বলে, ‘আর কোনো অসুবিধা নাই, এই রক্তবর্ণ তেলের দুটি ফোঁটা তোমাদের মায়ের কানের ফুটো দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিতে পারলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমাদের মা আগের মতোই হাঁটবে, চলবে, হাসবে, রান্না করবে, ঠিক আগের মতোই, যাও দেরি করো না!’
রফিক-শফিক তান্ত্রিকের পায়ের ধুলো হাতে নিয়ে মাথায় মেখে, হাওয়ার গতিতে বুড়িগঙ্গা পাড়ি দিয়ে মায়ের শিয়রে এসে দাঁড়ায়। মনে মনে বলতে থাকে, ‘আর কোনো অসুবিধা নাই।’ ‘মা’ ‘মা’ বলে দুটি ছোট্ট ডাক দিতেই তাদের মা সাড়া দেয়, শিয়র থেকে তারা খাটের পাশে এসে দাঁড়ায়। ধরাধরি করে তারা তাদের মাকে তুলে বসায়। রফিক খাটে উঠে মায়ের পেছনে বসে নিজের স্ফীত বক্ষকে দেয়াল করে সেখানে মায়ের পিঠ ঠেকিয়ে কাঁধ ধরে বসে। শফিক এবার দাওয়াইয়ের শিশির ছিপি খোলে। ঘরময় এক অপরিচিত গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তাদের মা চোখ খোলে। এদিক-ওদিক তাকায়, কথা বলে, ‘আমার প্রিয় পুত্রেরা, তোমাদেরকে আমি এই ঘরেই প্রসব করেছিলাম, আজ তোমাদের আঁতুড়কালীন গন্ধ এই ঘরে আবার ফিরে এসেছে।’ রফিক ছিপি খোলা শিশির মুখ উপুড় করে মায়ের মাথাটা কাত করে ধরে এক ফোঁটা তেল কানের ছিদ্র বরাবর ঢেলে দেয়, প্রথমে ডান কান তারপর বাম কান, মুহূর্তে তাদের মা যেন খানিকটা সজীব হয়ে ওঠে।
‘আমার পুত্রেরা, তোমরা কি তোমাদের মায়ের বুক বেয়ে নামা শাল দুধের ঘ্রাণ কিংবা স্বাদ স্মরণ করতে পারবে?’ রফিক-শফিক মাথা নেড়ে জানিয়ে দেয়, না! তাদের মা বলে, ‘আমি পারছি, শাল দুধের গন্ধ আমার সারা শরীরে, আমার আবার জন্মাবার সময় হয়েছে। আমি আমার মায়ের শরীরের গন্ধ পাচ্ছি’ বলতে বলতেই মায়ের কান, নাক-মুখ দিয়ে রক্তের ধারা বেয়ে নামে। এ দৃশ্য দেখে রফিক-শফিক খেই হারিয়ে ফেলে। কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। শফিক মনে করিয়ে দেয়, তান্ত্রিক আরও কী একটা ছোট জিনিস কাগজে মুড়ে রফিকের হাতে দিয়েছিল, রফিক পকেট হাতড়ে সেটা বের করে। মুড়ে রাখা কাগজ খুললে তাঁর হাতের তালুতে একটা আংটি চকচক করে ওঠে, তার মা বলে, ‘কী ওটা? আমার হাতে দাও!’ হাতে নিয়ে মা সেটা তার ঘোলা চোখ দিয়ে দেখতে থাকে, বলে ‘চিনতে পারছো? এই তো সেই আংটি যা বিবাহের সময়ে আমার মা আমার অনামিকায় পরিয়ে দিয়েছিল।’ তাদের মা আর কোনো কথা বলে না। হাতের মুষ্টি শক্ত করে এক হাতে শফিকের তর্জনি অন্য হাতে আংটিটা নিয়ে হেলান দিয়ে থাকা তার অপর পুত্রের বুকের ডানপাশে মাথা বাঁকিয়ে নিঃসাড় হয়ে পড়ে।

শ্রেণী:

রক্তফুলের বরণডালা

Posted on by 0 comment
49

49সেলিনা হোসেন: কবি রাশেদ মুস্তাফা এখন দিল্লিতে।
এর আগে কোনো উপলক্ষে ওর দিল্লি আসা হয়নি। প্রথমবার আসার আনন্দ নিয়ে প্রাণভরে দিল্লির বাতাস বুকে ঢোকাচ্ছে। স্বাধীনতার আঠাশ বছর পেরিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ওর বয়স ছিল দুই বছর। বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। বছর তিনেক আগে মারা গেছেন। বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ার সময় কবিতা লেখা শুরু করেছিল। এখন ভাবে ওর সামনে কবিতা লেখার সুদিন। দুটো বই প্রকাশিত হয়েছে, পাঠকের কাছে ওর কবিতা পৌঁছেছে। সমালোচকদের কাছ থেকে প্রশংসা পেয়েছে। বন্ধুরা বলে, লেখা ছাড়িস না। দাঁড়াতে পারবি। বেশি সময় লাগবে না। এসব শুনলে রাশেদের বুকের ভেতর গুঞ্জন ছড়ায়।
প্রিয়তি বলে, তোমার কবিতায় আমি নিজেকে খুঁজে পাই। নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করি। এই জন্যই তোমার সঙ্গে আমার প্রেম। আগে কবিতা পড়েছি, তারপরে ভালোলাগা…
সেদিন প্রিয়তির কথায় উৎফুল্ল হয়ে রাশেদ বলেছিল, তোমার ভালোবাসায় আমার কবিতা লেখা নন্দিত হয়েছে প্রিয়তি।
কবিতা নিয়েই ভালোবাসার সম্পর্ক বছর গড়িয়েছে। দুজনের দিন ভালোই কাটছে।
রাশেদ দুদিন আগে দিল্লির সার্ক রাইটার্স ফাউন্ডেশন থেকে সাহিত্য উৎসবে অংশগ্রহণ করার আমন্ত্রণ পেয়েছে। ই-মেইলটা পড়ে প্রিয়তি নানাভাবে নিজের খুশির কথা জানিয়েছে। একগুচ্ছ গোলাপও রাশেদের হাতে তুলে দিয়েছে। বলেছে, লাল গোলাপের রং আর সৌরভ তোমার জীবনজুড়ে থাকুক।
- শুধু আমার? রং আর সৌরভ তুমি নেবে না?
- নেব তো। বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত কি করে বলি যে নিলাম? ধৈর্য ধরো।
- ধৈর্য ধরা আমার শেষ। আমি তোমার ভালোবাসার দেয়ালে ছবি এঁকে শেষ করেছি। দ্বিতীয় চিন্তা নেই।
- ঠিক আছে, কবিতাই হোক আমাদের ভালোবাসার কুঠুরি। চলো আমরা তোমার দিল্লি যাওয়ার আমন্ত্রণ উদযাপন করি।
দুজনে রেস্তোরাঁয় ঢোকে।
রাশেদ জানে এই উৎসবে দেশের অনেকেই যোগ দিয়েছে। তাদের কাছ থেকে নানা গল্প শুনতে পায়। ও জানে এই ফাউন্ডেশন পাঞ্জাবি ভাষার লেখক অজিত কৌরের উদ্যোগ। প্রতিবছর তিনি একের বেশি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এখন তার প্রতিষ্ঠান সার্ক কালচারাল সেন্টারের এপেক্স বডি। সাউথ এশিয়ার লেখকদের জন্য তিনি একটি বড় জায়গা তৈরি করেছেন। এবারের সম্মেলন হচ্ছে মার্চ মাসে। ওপেনিং সেশন হবে ছাব্বিশে মার্চ। রাশেদ ওর লেখা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কবিতার অনুবাদ করিয়েছে। প্রেমের কবিতা আছে। অন্য কবিতাও লিখছে যেখানে দেশ আর মানুষে কথা আছে। এভাবে ও নিজেকে গুছিয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে ওর মনে হচ্ছে ও একজন পূর্ণ কবি। জীবনের জলছবি আঁকার সাধনায় নিমগ্ন।
ও ঢাকা থেকে কলকাতা পর্যন্ত বাসে এসেছে। কলকাতা থেকে দিল্লিতে এসেছে ট্রেনে। যাত্রার আনন্দও ওকে সুখের জোয়ারে ভাসিয়েছে। ট্রেন যাত্রার বাড়তি আনন্দ ছিল হিমাদ্রি গুহর সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়া। হিমাদ্রি কবি। দিল্লির সার্ক রাইটার্স সম্মেলনে সেও যাচ্ছে। পাশাপাশি সিটে বসার কারণে দুজনের কবি পরিচয়ের আকস্মিকতা দুজনকে উচ্ছ্বসিত করে। একই সীমান্তের ভিন্ন দেশ, একই ভাষায় কবিতা লেখা। দিল্লিতে গিয়ে অন্য ভাষার কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে পরিচয় হবে। রাশেদের মনে হয় ওর পরিচয়ের সীমানা বাড়বে। এ এক দারুণ যাত্রা। এ সময় প্রিয়তি যদি কাছে থাকত, তা হলে সময়টা অন্যরকম হতো। প্রিয়তি কবিতা লেখে না কিন্তু বোঝার ক্ষমতা অসাধারণ।
রেলস্টেশন থেকে ট্যাক্সি নিয়ে দুজনে উঠে পড়ে। ওরা অরবিন্দ আশ্রমে যাবে। আয়োজকরা সেখানে তাদের থাকার ব্যবস্থা করেছে। দিল্লি শহরের চারদিকে তাকিয়ে রাশেদের মনে খুশির উচ্ছ্বাস। হিমাদ্রিকে জিজ্ঞেস করে, তুমি কতবার দিল্লিতে এসেছ?
- অনেক অনেকবার। গুনে রাখিনি। এ তো আমার দেশ। আমার শহর।
- এই শহরের চারদিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে এটা আমার ইতিহাসের সময়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।
- হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। তোমাদের মুক্তিযুদ্ধ আমার স্মৃতিতে আছে। আমার বাবা শরণার্থীদের জন্য পুরো নয় মাস কাজ করেছেন।
- সত্যি! তোমার সঙ্গে পরিচিত হয়ে আমার খুব গর্ব হচ্ছে হিমাদ্রি। তুমি আর আমি সারাজীবন বন্ধু থাকব।
- হ্যাঁ তাই হবে। আমিও তোমাকে মনে রাখব। আমাদের রবিশঙ্কর তোমাদের শরণার্থীদের জন্য নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ারে কনসার্টের আয়োজন করেছিলেন।
রাশেদ ওর হাত চেপে ধরে বলে, আমি এখন এসব কিছু জানি। সবকিছুই আমার যুদ্ধের ইতিহাস। আজ দিল্লির রাস্তায় যেতে যেতে মনে হচ্ছে এই শহর ইন্দিরা গান্ধীর শহর।
হিমাদ্রি হা-হা করে হাসে। রেড সিগনালে দাঁড়িয়ে ছিল বলে ট্যাক্সি ড্রাইভার ঘাড় ঘুরিয়ে ওদের দিকে তাকায়। কথা বলে না। মৃদু হাসে। মনে হয় ওদের হাসি-আনন্দ তাকেও ছুঁয়েছে। লোকটি বাংলা ভাষার লোক না। হিমাদ্রি তার সঙ্গে হিন্দিতে কথা বলেছে। রাশেদ বুঝতে পারে যে মানুষ তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে মানুষের আবেগের সঙ্গী হয়, এই মুহূর্তে ট্যাক্সি ড্রাইভার তেমন সঙ্গী। ও আবার বলে, আমাদের স্বাধীনতার প্রাণপ্রিয় মানুষ শেখ মুজিবকে আমি দেখিনি। কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে দিল্লি তারও শহর। পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তিনি লন্ডন হয়ে দিল্লিতে এসেছিলেন। ভাষণ দিয়েছিলেন। একদিনের জন্য হলেও দিল্লি বঙ্গবন্ধুর শহর হয়েছিল।
হিমাদ্রি আবার হা-হা করে হাসে।
- একাত্তর সালে তোমাদের মুক্তিযুদ্ধ আমাদেরও যুদ্ধ ছিল। আমি ছোট ছিলাম, কিন্তু স্মৃতিতে অনেক কিছু ভাসে। বাবা-মা শরণার্থী মানুষদের বাড়িতে রাখতেন। সব ধরনের সহযোগিতা করতেন। দুজনকে কখনো টায়ার্ড হতে দেখিনি।
- কলকাতা হয়ে তো আমি দেশে ফিরব। তখন তোমার বাবা-মাকে সালাম করব। হাত দিয়ে সালাম না, তাদের পায়ে আমার মাথা ঠেকাব।
- বাবা-মাকে তুমি তোমার দেশেই দেখতে পাবে।
- তাই? তাঁরা বেড়াতে আসবেন? ভালোই হবে।
- না, বেড়াতে যাবেন না। আমার বাবাকে মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা দেয়া হবে। তোমাদের সরকার মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতাকারীদের যে সম্মাননা দিচ্ছে সে সম্মাননা গ্রহণ করার জন্য বাবাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
- হুররে, দারুণ খবর। তুমিও আসবে বন্ধু। তোমার জন্য আমি একটা কবিতা পাঠের আসর বসাব।
হিমাদ্রি আবার হাসে। হাসতে হাসতে বলে, ছোটবেলায় তোমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের দু-তিনটে গান আমার মুখস্ত ছিল।
- তা হলে দুজনে মিলে একটা গানের একটুখানি গাইÑ
- কোনটা? পুরোটা তো এতদিনে আর মুখস্ত নেই Ñ
- এ গানটা গাই ‘সাড়ে সাত কোটি মানুষের আর একটি নাম/মুজিবর মুজিবর মুজিবর/সাড়ে সাত কোটি প্রশ্নের
জবাব পেয়ে গেলাম। জয় বাংলা, জয় মুজিবর, জয় বাংলা জয় মুজিবর’ Ñ।
- দারুণ হবে। হিমাদ্রি নিজের মুঠিতে রাশেদের হাত নিয়ে গুনগুন শুরু করে।
রাশেদ মৃদুস্বরে বলে, আমরা তো সুর ঠিক রেখে গাইতে পারব না।
- আমরা কি শিল্পী নাকি যে সুর ঠিক রেখে গাইতে পারব? আমরা গান গেয়ে ইতিহাসের একটি বিশেষ সময়কে স্মরণ করছি।
- ঠিক। ঠিক বন্ধু। চলো গাই।
দুজনের কণ্ঠে ছড়াতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের গান। দুটো লাইনই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে গাইতে থাকে। রাশেদের মনে হয় ওদের কণ্ঠস্বর থেকে দিল্লির বাতাসে মিশে যাচ্ছে মুজিবুর নাম। এ এক বিরল অভিজ্ঞতা। যে যুদ্ধের সময়ের কথা ওর জানা নেই, সে সময় আশ্চর্য জীবন্ত এখন ওর সামনে। ও চারদিকে তাকায়। বুকের ভেতরের উচ্ছ্বাস টুংটাং শব্দে ধ্বনিত হয়। ওর বুকের ভেতর মগ্নতার আবরণে আচ্ছাদিত হয়। একটি একটি কবিতার চরণ জমতে থাকে করোটিতে। কিন্তু ব্যাগে রাখা ল্যাপটপে সেটা পঙ্ক্তির আকার পায় না। ভাবে, এমন শব্দ বুকেই থাকুক হৃদয়ের অংশ হয়ে।
একসময় দুজনের কণ্ঠের গান থেমে যায়। দুজনে দুজনের দিকে তাকায়। হিমাদ্রি মৃদুস্বরে বলে, তোমাদের যুদ্ধের গল্পটা ছিল আমার শৈশবের। ভাবিনি ছোটবেলার গল্পের সঙ্গে তোমার আমার বন্ধুত্ব হবে। আসলে আমি যে ঘটনাকে গল্প বলছি সেটি আর এক দেশের স্বাধীনতার যুদ্ধের ইতিহাস। সে দেশের সঙ্গে আমাদের সীমান্তের সংযোগ আছে।
হিমাদ্রি একটু থামে। রাশেদ কিছু বলে না। ওর কথা শোনার জন্য কান পেতে রাখে। হিমাদ্রি বলে, আমি কলকাতার মানুষ। গড়িয়াহাটায় আমাদের বাড়ি। একটি অনুষ্ঠানে পরিচিত হই শাওন্তীর সঙ্গে। ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে পাস করে রবীন্দ্রভারতী বিশ^বিদ্যালয়ে পিএইচডি করছে। মাঝে মধ্যে আমাদের বেশ আড্ডা জমে। নানা বিষয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিষয় উঠে আসে। অনেকের সঙ্গে আড্ডায় কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করলে শাওন্তী খুব মনোযোগ দিয়ে শোনে। আক্ষেপ করে বলত, কেন যে আমার মুক্তিযুদ্ধের পরে জন্ম হলো। সেই সময়ের কথা শুনলে আমার গৌরব হয়। আবার দুঃখও হয় যখন ভাবি আমার কেন যুদ্ধ করার বয়স ছিল না।
কথা শেষ করে হিমাদ্রি হাসতে হাসতে বলে, স্বাধীনতার স্বপ্ন মানুষের বুকের ভেতর এমনই থাকে।
রাশেদ গুনগুনিয়ে বলে, ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’Ñ
হিমাদ্রি রাশেদের দিকে সরাসারি তাকিয়ে বলে, তোমার সঙ্গে এই গান আমারও গাইতে ইচ্ছে করছে। আমাদের পরিবার তোমাদের মুক্তিযুদ্ধের পরিবার হয়েছিল। প্রতিদিন কত মানুষ যে বাসায় আসত তার ঠিক ছিল না। বাবা-মা তাদের দেখাশোনা করেছেন। আমার বয়সী একটি ছেলের কথা আমার এখনও মনে আছে। সীমান্ত পার হওয়ার সময় পাকিস্তান আর্মির গুলিতে ওর বাবা মারা গিয়েছিল। আমাদের বাড়িতে যে কয়দিন ছিল আমি ওর কান্না ফুরোতে দেখিনি। ওর সঙ্গে খেলার জন্য হাত ধরে টানলে ও আরও জোরে জোরে কাঁদত। তিন-চার দিন পরে বাবা ওদেরকে শরণার্থী শিবিরে দিয়ে আসে। আমি বড় হওয়ার পরে কয়েকবার ভেবেছি যে ওকে খুঁজতে বাংলাদেশে যাব। বাবা বলেন, কোথায় খুঁজবি? ভেবে দেখ ওদের এক কোটি শরণার্থীর মধ্যে ও একজন। খুঁজে পাওয়া কি সহজ কথা! তাই তো, আমি বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকতাম। ভাবতাম, যুদ্ধ সময়ের আবেগ কত বিচিত্র হতে পারে আমি তার প্রমাণ।
- ঠিক বলেছো। কোটি কোটি মানুষের স্বপ্নের স্বাধীনতা সহজ কথা নয়।
- এই সাহিত্য সম্মেলনে আমি কয়েকবার এসেছি। এবার তোমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে যেতে পারছি। এটা আমার বড়ই ভাগ্যের ব্যাপার। জানো, গত দু-চার বছর ধরে আমি ভাবছি আমার শৈশবের স্মৃতি এখন আমার কবিতায় মানুষের অধিকারের পক্ষে লড়াকু হাতিয়ার।
আবার হাসে হিমাদ্রি। বাইরের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করে বলে, ওই দেখ দিল্লির বিখ্যাত জামে মসজিদ। এই মসজিদের সঙ্গে আমাদের কবি মীর্জা গালিবের স্মৃতি আছে।
রাশেদ নিজের কণ্ঠে ধ্বনিত করে কবির নাম। বলে, গালিব। গালিব। দুশো বছরের বেশি সময় ধরে আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন।
- গালিবের অনেক কবিতা আমার মুখস্ত আছে।
- আমারও আছে। তোমার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব জমবে মনে হচ্ছে। আমাদের চিন্তার সংলগ্নতা আছে।
- সংলগ্নতা! বেশ শব্দ। মনে রাখব।
- এবারের সম্মেলনে আমি আমার চিন্তার সংলগ্নতার কবি-বন্ধু খুঁজব। তারপর সাউথ এশিয়ার কবি বন্ধুদের নিয়ে রাখী-উৎসব করব।
- ঠিক আছে, আজ আমি তোমার হাতে লাল সুতো বেঁধে দেব। বন্ধুত্ব বেঁচে থাকার দিন পর্যন্ত থাকবে।
- তোমাকে আমার শুভেচ্ছা বন্ধু।
- আমাদের বন্ধুত্বের লাল সুতো হবে কবিতার পঙ্ক্তি। আমার বর্ণমালার অধিকারের কথা বলব। আমরা অধিকারের চেতনা সাউথ এশিয়ার মানুষের কাছে নিয়ে যাব।
হিমাদ্রি হাসতে হাসতে বলে, এই সম্মেলনে যারা আসবে তাদের সবার কাছে এই কথা বলব।
রাশেদ জোরালে কণ্ঠে বলে, আমি তো প্রথমবার এলাম, এরপর থেকে আমিও শব্দের বারুদ ছড়াব। কাছে টানব সার্ক দেশের লেখকদের। তোমার হাসির শব্দও আমার কাছে বারুদের শব্দ।
হিমাদ্রি হাসতে শুরু করলে রাশেদ হাসে। দুজনের হাসির রেশ শেষ হতে না হতেই ট্যাক্সি এসে থামে অরবিন্দ আশ্রমের গেটে। ট্যাক্সি ছেড়ে গেটে ঢুকতেই রাশেদের চোখ জুড়িয়ে যায়। বলে, বাহ চমৎকার আশ্রম। গাছ আর পাখিতে মন ভরে যাচ্ছে।
হিমাদ্রি সায় দেয়। ঘনঘন মাথা নেড়ে বলে, এই আশ্রম আমার খুব প্রিয় জায়গা। ভেতরে ঢুকলে দেখতে পাবে এর বিভিন্ন গাছের সৌন্দর্য অন্যরকম। আরও আছে ময়ূরের চলাচল, আছে পাখিদের কুজন। তবে খেতে হবে নিরামিষ। এখানে মাছ মাংস রান্না হয় না।
- তিন দিন মাছ মাংস না খেলে কিছু এসে যাবে না। থাকার আনন্দই আমার কাছে প্রধান।
হিমাদ্রি ওর ঘাড়ে হাত রাখে। রাশেদ বলে, এতকিছুর মধ্যে সবার সঙ্গে বেশ সময় কাটবে।
- দিল্লি শহর দেখবে না?
- হ্যাঁ, তা তো দেখবই। গান্ধিজীর স্মৃতিসৌধে যাব। কবি গালিবের কাছে যাব।
হিমাদ্রি ভুরু উঁচু করে কৌতুকের ভঙ্গিতে বলে, কবির কাছে যাবে? জিজ্ঞেস করবে নাকি কেমন আছেন কবি ভাই?
- মনে করো তেমন একটা কিছু।
- তুমি প্রেমে পড়েছো রাশেদ?
- আমি যাকে ভালোবাসি তার নাম প্রিয়তি। কবিতা বোঝায় ওর জুড়ি নেই। দারুণ মেয়ে।
- তুমি ভাগ্যবান। আমি তোমাকে ঈর্ষা করি। আমি একজনকে ভালোবেসেছিলাম। ও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। এখন আমি মনে করি কবিতার সঙ্গে আমার প্রেম। নারীর প্রেমের দরকার নেই।
- নিজেকে সান্ত¡না দিচ্ছ?
- যদি তুমি তা মনে করো তা হলে তাই করছি।
হাসতে হাসতে দুজনে আশ্রমের ভেতরে ঢোকে। শিমুল গাছের নিচ দিয়ে সামনে যায়। দুজনের জন্য দুটো ঘর বরাদ্দ হয়েছে দোতলায়। দুজনে যার যার ঘরে চলে যায়। রাশেদের ঘরের জানালার পাশে ফুটে আছে লাল রঙের ফুল। গাছটি লতাঝোপ। রাশেদ নিজের মনে কবিতার পঙ্ক্তি আওড়ায়। ভাবে, একটি সিম কিনে মোবাইল ফোন চালু করবে। কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে বিকেলে ক্যান্টিনে চায়ের খোঁজে যায়। ঘরে তেমন কেউ নেই। চায়ের কাপ নিয়ে টেবিলে বসলে পাশের টেবিল থেকে পাকিস্তানের কবি হামিদ আলি বলে, আপনি কি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন?
- হ্যাঁ, আমি রাশেদ মুস্তাফা। কবিতা লিখি।
- আমিও কবিতা লিখি। আমার নাম হামিদ আলি। আপনি কি আগে এই সম্মেলনে এসেছেন?
- না, এবারই প্রথম।
- আমি আরও তিনবার এসেছি। এই লিটারেরি ফেস্টিভেল আমি খুব এনজয় করি।
কথা বলতে বলতে হামিদ আলি রাশেদের টেবিলে এসে মুখোমুখি বসে। চায়ের কাপের বাকি চা এক চুমুকে শেষ করে। দু’হাত টেবিলের ওপর রেখে বলে, আগামীকাল ছাব্বিশে মার্চ। আপনাদের স্বাধীনতা দিবস। ওপেনিং সেশনে আমাকে কিছু বলতে বলা হয়েছে। আমি ঠিক করেছি আমি বাংলাদেশের লেখকদের স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানাব। বক্তৃতার শেষে পাকিস্তান সরকারকে আহ্বান জানাব বাংলাদেশে গণহত্যা করার জন্য ক্ষমা চাইতে।
- তাই কি? রাশেদ দুচোখ বিস্ফারিত করে তাকায়।
- হ্যাঁ আমি নিজের দেশেও একথা বলি। আমি ইসলামাবাদে একটি দৈনিক পত্রিকায় কাজ করি। অমি বিশ^াস করি কবিদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়।
- তুমি আমার বন্ধু।
হামিদের হাত জড়িয়ে ধরে রাশেদ। দুজনে চা শেষ করে গেটের সামনে এসে দাঁড়ায়।
- তুমি কি কোথাও যাবে?
- হ্যাঁ, মোবাইলের জন্য একটি সিম কিনতে যাব।
- চলো, আমরা হেঁটে আসি। এ রাস্তার নাম বেগমপুর। বেশ নিরিবিলি। আমার হাঁটতে ভালোলাগে।
রাশেদের মনে হয় হামিদের হাতের উষ্ণতা ওকে জড়িয়ে রেখেছে। ওর সামনে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভেসে ওঠে। গণহত্যার কালরাত ওকে পীড়িত করে। নয় মাসের জনযুদ্ধ ওর স্বাধীনতা অর্জনকে গৌরাবান্বিত করে। ওর সামনে দাঁড়ানো হামিদ আলি ওর জানা মুক্তিযুদ্ধের ভিন্ন ইতিহাস হয়ে ওঠে। হামিদ আলি গণমানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই। হামিদ আলি গণহত্যার প্রতিবাদ। হামিদ আলি স্বাধীনতাকে দেয়া গৌরবের স্যালুট।
হামিদ আলি ওর হাতে মৃদু চাপ দিয়ে বলে, কি ভাবছ? আমি বাংলাদেশে গিয়েছি। ওখানেও আমার কথা বলেছি। নিষ্ঠুর গণহত্যার বিরুদ্ধে আমি কথা বলে যাব। কবিতা আমার শিল্পের লড়াই। যে কোনো জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতার যুদ্ধকে আমি নিজের গৌরবের জায়গা ভাবি। স্বাধীনতা কি সহজ কথা!
ওহ, শব্দ করে দুহাত উপরে তোলে রাশেদ। মনে হয় ওর সামনে লক্ষ শহীদের মুখ ভেসে উঠছে। বিশেষ করে তাদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে যাদের ও ছবিতে দেখেছে। রাশেদ দু’হাতে চোখের পানি মোছে।
হামিদ তাকিয়ে বলে, চোখে পানি কেন?
- শহীদদের স্মরণ করছি। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ের স্বাধীনতা তো।
- হুঁ, শব্দ করে হামিদ আলি গুনগুনিয়ে কবিতা আওড়ায়। নিজের কবিতা কিনা, তা ওকে আর জিজ্ঞেস করা হয় না রাশেদের। শুধু ওর মুখে উর্দু ভাষার শব্দরাজি শুনে একুশে ফেব্রুয়ারির কথা মনে হয়। মাতৃভাষার জন্য লড়াই। রাশেদ ভাবে হামিদ আলির দেশের চেয়ে ওদের গৌরবের জায়গা অনেক বড়। ওর বুকের ভেতর খুশির উচ্ছ্বাস গড়ায়। মনে হয় একছুটে গিয়ে দিল্লির মাঝে বয়ে যাওয়া যমুনা নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়াতে। কিন্তু হবে না। কাল ইন্ডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে সম্মেলনের উদ্বোধন অনুষ্ঠান হবে। এবার ওর যমুনা নদী হয় তো দেখা হবে না। আবার এলে যমুনার পাড়ে গিয়ে দাঁড়াবে। বলবে, আমি বাংলাদেশের যমুনা নদীর পানি এনে তোমার গায়ে ছিটিয়ে দেব দিল্লির যমুনাÑ এর মধ্যে তৈরি হবে আমার কবিতা।
দুজনে গিয়ে মোবাইলের সিম কিনে ফিরে এলে গেটের কাছেই দেখা হয় হিমাদ্রির সঙ্গে। ও দুপুরে খেয়ে কোথাও গিয়েছিল, ফিরে এসেছে পড়ন্ত বিকেলে। চারদিকে নরম রোদের ছায়া বিছিয়ে আছে। দূরে তাকালে দেখা যায় অরবিন্দ আশ্রমের দেয়ালে লেজ ঝুলিয়ে বসে আছে ময়ূর। তিনজনই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। হামিদ আলি মৃদু হেসে বলে, এটা আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য। আমি এত কাছ থেকে ময়ূর দেখিনি।
রাশেদ উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে, কাল দিনের প্রথম আলোয় আমি ময়ূরটাকে দেখব।
হিমাদ্রি সায় দেয়, আমিও দেখব। দারুণ লাগছে।
আমিও দেখব।
হামিদ আলি একসঙ্গে যুক্ত হলে হিমাদ্রিকে ওর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় রাশেদ। বলে, হামিদ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু।
হিমাদ্রি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়।
মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু কীভাবে? যুদ্ধের তো আঠাশ বছর পেরিয়ে গেছে।
তখন আমি ছোট ছিলাম। আমি বাংলাদেশের এখনকার বন্ধু। পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে গণহত্যা করেছে তার জন্য ক্ষমা চাইতে বলি।
হিমাদ্রি গলা উঁচিয়ে বলে, সে সময়ে আমিও ছোট ছিলাম। কিন্তু আমার বাবা-মা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন। বিশেষ করে শরণার্থীদের জন্য তারা নিজেদের বাড়ির দরজা খুলে রেখেছিলেন। কত যে মানুষ আমি দেখেছিলাম।
- বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার কথা আমি জানি। ছোটবেলায় আব্বার কাছ থেকে জেনেছি। বড় হয়ে ইতিহাস পড়েছি।
হুররে কবিতার বন্ধুত্বে মুক্তিযুদ্ধ। চলো যাই, আমি তোমাদের মিষ্টি খাওয়াব।
রাশেদ দুজনের হাত ধরে। নিজের মুঠিতে দুজনকে এক করে।
হিমাদ্রি হাসতে হাসতে বলে, আমাকে দুটো মিষ্টি বেশি দেবে।
- কেন? তোমাকে বেশি কেন?
- যুদ্ধের সময় আমরা ওদের বন্ধু ছিলাম।
হামিদ আলির কণ্ঠস্বর বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়। বলে, তোমরা বন্ধু থাকতে পেরেছিলে। কারণ তোমার দেশের সরকার আর সাধারণ মানুষ এক ছিল। আমার বাবা যখন গণহত্যার প্রতিবাদ করেছিল, তখন আমার বাবার মতো অনেকের পাশে পঁচানব্বই ভাগ সাধারণ মানুষ পাশে ছিল না। সরকার তো ছিল হত্যাকারী।
হিমাদ্রি হিম হয়ে যায়। হামিদের দিকে সরাসরি তাকাতে পারে না। বুঝতে পারে ওদের লড়াই ছিল অনেক কঠিন।
হামিদ আলি অপরূপ ময়ূরের ওপর থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে ওদের দিকে সরাসরি তাকায়। বলে, আমাদের বাবাদের মতো লোকদের লড়াই ছিল নিজেদের মানবিক চেতনা নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। তারা প্রমাণ করতে চেয়েছিল একটি দেশের আপামর মানুষ খারাপ হতে পারে না। গোটা জাতি হত্যাকারী নয়।
রাশেদ আর হিমাদ্রি নিজেদের না-জানা এক ভিন্ন ইতিহাসের পৃষ্ঠার সামনে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে। রাশেদের মনে হয় কবি হামিদ আলির কণ্ঠস্বর দিল্লির যমুনা নদীর ¯্রােতে ছড়াচ্ছে বিশ্বময়। এক বিপুল সত্যের ¯্রােত ওদের চারপাশে। দুজনে নিজেদের অজান্তে পরস্পরের হাত ধরে। হাতের মুঠি শক্ত হয়। ভেসে আসে কবি হামিদ আলির কণ্ঠস্বর, আমার বাবার মতো অনেককে ওরা বিশ্বাসঘাতক বলতো। পরে কেউ কেউ দেশ ছেড়ে চলে গেছেন।
রাশেদ আর হিমাদ্রির অস্ফুট উচ্চারণ, বিশ্বাসঘাতক!
হামিদ আলি মাথা ঝাঁকায়।
অরবিন্দ আশ্রমের গাছপালার মাথায়, আকাশ-বাতাসে উড়তে থাকে কবিতার শব্দরাজি। রাশেদের মনে হয় মুক্তিযুদ্ধের এটা এক অন্যরকম গল্প। বাতাসে উড়ে যাওয়া শব্দরাজি টেনে রাশেদের বুকের ভেতর গল্পের অনুভব জমে থাকে।
পরদিন ইন্ডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে শুরু হয় সাহিত্য সম্মেলন। হামিদ আলি কবিতা পড়ার আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যার জন্য বাংলাদেশের মানুষের কাছে মাফ চায়। করতালিতে মুখরিত হয় মিলনায়তন। হিমাদ্রি তালি বাজিয়ে বলে, মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননা নেয়ার সময় বাবা ঢাকায় যাবে। আমিও যাব। হামিদ তোমার অতিথি হবে রাশেদ। তুমি ওকে নিমন্ত্রণ কর। আমরা তিনজনে সাভার স্মৃতিসৌধে ফুল দিতে যাব।
- অবশ্যই নিমন্ত্রণ করব। সাহিত্য সম্মেলনে এসে আমি যে দুই বন্ধু পেলাম তারা আমার মুক্তিযুদ্ধের কবিতা। একদমই অন্যরকম কবিতা।
রাশেদ দু’হাতে চোখের পানি মোছে।
ইন্ডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারের বাতাসে উড়ে যায় শব্দরাজি। ওই শব্দ ঠোঁটে নিয়েছে অরবিন্দ আশ্রমের পেখম মেলে রাখা ময়ূর। রাশেদ ভাবে, ও আর একটি একাত্তরের সময়ে আছে। ও পৌঁছে যায় নিউইয়র্কের মেডিসন স্কয়ারে। রবিশঙ্কর আর জর্জ হ্যারিসন আয়োজিত কনসার্ট ফর বাংলাদেশে গলা মেলায়। কনসার্টের শব্দরাজি মৌমাছির গুঞ্জন নিয়ে বুকের ভেতরে ঢুকছে।
মিলনায়তনে তখনও করতালি চলছে।
রাশেদের মনে হয় মুক্তিযুদ্ধের শহীদের রক্তফুল উপস্থিত সবার করতলের বরণডালায় জমা হয়েছে। কবিতার শব্দরাজি শোভিত হয়ে উঠছে বরণডালার ফুলে। ওর সামনে একাত্তর ফিরে আসে। বিকেলে কবিতা পড়ার জন্য ওর নাম ঘোষণা করা হয়। রাশেদ স্টেজের সিঁড়িতে পা রেখে নিজেকে বলে, আজ আমার আর এক শুরু। ভালোবাসার প্রিয়তি, তোমার জন্য কবিতা বলতে বলতে মঞ্চে উঠছিÑ বরণডালার রক্তফুলে ভালোবাসার স্বপ্নকুঁড়ি। আমরা দুজন সাজাই এখন একাত্তরের নতুন দিন।
কবিতা পড়া শেষ হলে আবার করতালিতে মুখরিত হয় মিলনায়তন। নিচে নেমে এলে হামিদ আলি বলে, তুমি এ সময়ের একাত্তর। ভালো লেগেছে তোমার কবিতা। হিমাদ্রি মৃদু হেসে বলে, দারুণ লিখেছ। কবি তো সময়ের একজন। তুমিই তোমার জাগিয়ে রাখা একাত্তর।
রাশেদ চারদিকে তাকায়। এখন প্রিয়তির সঙ্গে প্রেমই ওর একাত্তর। নতুন অনুভবে জীবনের নতুন মানে খোঁজা।

শ্রেণী:

কনে দেখা আলো

Posted on by 0 comment
25

তারপর এখন উঠতে হবে, নতুবা এসি বাসটা মিস্করবো, আর ঘামতে ঘামতে বনানী পৌঁছানো, অসম্ভব! পাবলিক সার্ভিসে চেহারাই তো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

25আঁখি সিদ্দিকা: জানলার ওপারে আজ আকাশটা একটু বেশি নীল লাগছে, মাঝে লুকিয়ে থাকা গোলাপি রংটুকু ফুটতে গিয়েও আড়াল হয়ে যাচ্ছে পাশের বাসার পেয়ারা গাছের পাতায়। সারাদিনের ক্লান্তিটুকু পঙ্খীরাজের কাছে গঁচে দিয়ে আবার বেরিয়ে পড়া সন্ধ্যার আগে। সন্ধ্যা হতে এখনও খানিকটা বাকি, এই আলোটাকে মা কনে দেখা আলো বলতো, বলতো সৌমের জন্য বৌ দেখবো এই আলোয়। শুনেছি ফটোগ্রাফারদের জন্য এই আলোটা বিশেষ উপাদেয়। সেদিন কেন্দ্রের ছাদে জাহিদ ভাই বলছিলেন, তার এক রুমমেট ছবি তুলতো, শুক্রবার দুপুরে খেয়ে তারা ঘুমিয়েছে, হঠাৎ তার বন্ধু খালি গায়ে, লুঙ্গি পরে ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে দৌড়, জানালা দিয়ে গেঞ্জি ছুড়ে দিয়েছিল, তারপর কোথায় গেছিল, ফিরে আসলে বোঝা গেল, সে আসলে ছুটেছিল আলোর পিছে। অদ্ভুত সব ছবি তুলেছিল, আলোর খেলায়। এই একলা আকাশের রঙের খেলা দেখা ছাড়া এই আলোর বিশেষ কোনো দিক কি আছে, আমার? ক্যাম্পাস ছাড়ার কয়েকদিন আগে নোট নেবার জন্য অধীশা ডেকেছিল পাবলিক লাইব্রেরিতে, ওর জন্য প্রায় দু’ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর ও এসে যখন ক্যাফেটরিয়ার নাম জানা ঝাঁকড়া পাতাওয়ালা গাছটার সামনের টুলটাতে বসে পড়ল, হঠাৎই আলোটা ওর ঘামমুখে এসে চিকচিক করে উঠল, আমি কি সেদিন ওকে অন্যরকমভাবে দেখেছিলাম, আজও রক্তে কেমন ঢেউ ওঠে? অধীশা কি সেদিন কিছু বুঝেছিল? বুঝতে বুঝতেই ক্যাম্পাস ছাড়ার সময় হয়ে গেল, তারপর।
তারপর এখন উঠতে হবে, নতুবা এসি বাসটা মিস্করবো, আর ঘামতে ঘামতে বনানী পৌঁছানো, অসম্ভব! পাবলিক সার্ভিসে চেহারাই তো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সকালের আমি’র অফিস ড্রেস আর সন্ধ্যার আমি’র অফিস ড্রেসেই আমি বদলে যাই অনেকটা। সরকারি চাকুরে আর অ্যাম্বাসি চাকুরের পার্থক্যটা অনেকটা কেনডি আর পেপারমিল চকলেটের পার্থক্যের মতো। রেডি হয়ে নামতেই সিকিউরিটির কমন ডায়ালগ, স্যার, লিফট নষ্ট। ভালো ছিল কখন, ক্যান ওঠনের সময় তো ভালোই ছিল, বলেই একগাল হাসি। এই লোকটাকে এই হাসিটার জন্য কিছু বলতে পারি না। রোজ বারোতলা হেঁটে নামো না হয় ওঠো, সকালে মর্নিংওয়াক না করলেও চলে। ম্যানেজারকে কমপ্লেন করেও কোনো লাভ নেই। যে তেলী, সেই লিয়াকত আলী। এত কম ভাড়ায় দক্ষিণমুখো বড় জানালাওয়ালা ফ্লাট পাওয়াও মুশকিল। আর পঙ্খীরাজকে ছেড়ে যাওয়া? যেদিন এলাম সেদিনই তন্বি জানালাটার নাম দিয়েছিল পঙ্খীরাজ। ঘরগুলোতে তন্বি যেন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। নামতে নামতে হাসি এলো, আজ কি ওই আলোটার জন্য মনটা এত ফুরফুরে লাগছে। রোজ প্রায় ট্রাফিক জ্যামে আলোটাকে আটকে থাকতে হয় কোনো ইলেকট্রিক তারে নতুনা কোনো বাসের মাথায়, বা কোনো বাড়ির ছাদে।
ফিরতে ফিরতে রোজ প্রায় বারোটা বাজে, যদিও অফিসের গাড়ি পৌঁছে দিয়ে যায়। যাওয়ার সময় ইচ্ছে করেই গাড়ি নেই না। একটু ঢিলেঢালাভাবে অফিস যাওয়াটা বেশ উপভোগ করি আমি। আজ কি যাব একবার ওর কাছে? না, আজ না, অনেক রাত হয়ে গেছে, উজ্জ্বল ভাই কি মনে করবেন?
এত রাতে আবার কোথায়? আর যাওয়া কি ঠিক হবে? কেন যাব? কি করতে পারব আমি? শনিবার কি একবার যাব? ওর সাথে প্রথম দেখাও তো শনিবারেই। শনিবার চারটা থেকে অফিস। সকালের অফিসের অফ ডে থাকায় দুপুরের সেশনই নিয়েছিলাম। অফিসের গাড়িও ছিল না সেদিন, ছুটি হয়ে গেল তাড়াতাড়ি। মাস তিনেক আগের কথা। আমেরিকার হাইকমিশনার আসা উপলক্ষে সব গাড়ি রিজার্ভ। তখন নির্বাচন নিয়ে খুব তোলপাড় দেশে। নিরাপত্তা দরজার এপার-ওপার কোথাও নেই। বাসায় যেতে ইচ্ছে করল না, তন্বি তার বেশ কিছুদিন আগেই চলে গেছে বেলজিয়ামে ওর নতুন বন্ধুর সাথে। আমি হাঁটতে হাঁটতে বনানী রেললাইন ক্রস করে ডানে ঘুরব, এমন সময় মনে হলো আদনানের কথা, ও বলেছিল, এখানে কোথাও ওরা থাকে, নিয়েও যেতে চেয়েছিল। শরীরটাও কেমন লাগছে, কখনও তো যায়নি, কি হবে গেলে? আরে পাপ-পুণ্য কে এত হিসাব করে? আদনানকে একটা ফোন করব? না, তা হলে ও বুঝে যাবে আমি এসব পাড়ায় যাই। মনে পড়ল ফাইনালের আগে ফিল্ডওয়ার্ক করেছিলাম লালমাটিয়ার উৎসে। উৎসে রোজি ছিল ওদের প্রধান। ভাইয়া ভাইয়া ডেকে অস্থির হতো, উৎস ওদের জন্য একটা পুনর্বাসন করেছিল, নিজ হাতে ওরা দেশি খাবার রান্না করে বিক্রি করত, কাস্টমার হতো অনেক। কিন্তু বেশিদিন চলেনি কি এক অজানা কারণে। পরে যে যার পথে চলে গিয়েছিল, রোজি মাঝে মাঝে ফোন করে ওর খবর বলত, কখনও আগ বাড়িয়ে ফোন করা হয়নি। ওর কথা মনে পড়তেই মোবাইল ঘেটে ফোন দিলাম, জেগেই ছিল, পাশে অনেক মেয়ের হাসির শব্দ। কি ভাইয়া, এত রাইতে রোজির কথা মনে পড়ল, আইজ জীবনের প্রথম ফোন দিলেন, বলেন, কি কামে লাগতে পারি? আমি ওকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে যতটুকু বলা যায়, বললাম, ওর বলা ঠিকানামতো গেলাম, রাত তখন প্রায় ৮টা হবে। রোজি গলির মোড়েই দাঁড়িয়েছিল, দেখেই আঁতকে উঠে বলল, আরে ভাইয়া আপনি তো পুরাই পাল্টি গেছেন, হিরো আর কি? চলেন চলেন। কি ধরনের মাল লাগবো? বলেন দেখি। আমি রোজির সামনে অপ্রতিভ হয়ে চুপ করে রইলাম। প্রসাধনীর গন্ধে দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়। এখান থেকে ওখান থেকে পিলপিল করে মেয়েরা বের হচ্ছে, কেউ কেউ এক একজনকে কোমর জড়িয়ে ছোট ছোট ঘরের দরজা দিয়ে ঢুকছে, বের হচ্ছে। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ, খোলার শব্দ উভয়ই ক্যাচক্যাচ। পুরনো বাড়ি। কোথাও কোথাও প্লাস্টার খুলে ঝুলে পড়ছে বালি। ভাইয়া, কি ভাবেন, বলেন তাড়াতাড়ি। এই বারান্দায় এইভাবে খাড়াইয়া থাকা যাইবো না। মুখ ফসকে বের হয়ে গেল, সুন্দর, আর তুমিই তো ভালো বুঝবা। এইটা কইছেন কামের কথা। আমার চয়েজমতো দিবো তো? ঠিক আছে। একটি মেয়ে এগিয়ে আসলো দুলতে দুলতে, বললো, আইজ আমি কারোর পাই নাই। প্লিজ, আমি নিয়া যাই, বলেই আমার হাতে টান মারলো। রোজিও আমাকে হেঁচকা টানে হাত ধরে হনহন করে এগিয়ে যেতে যেতে বললো, সর্মাগী, সারাক্ষণ খাই খাই। পশ্চিম দিকে শেষ মাথার একবারে কোণের ঘরে আস্তে আস্তে দরজায় দুবার কড়া নাড়লো, কুসুম আমি রোজি, দরজাটা ভেজানোই ছিল, ঘরে ঢুকতেই একটা গন্ধ নাকে আসলো, জেসমিন পাউডার বোধহয়। রোজি কুসুমকে দেখিয়ে বললো, এসএসসি পাস, শিক্ষিত বলেই আপনার জন্য এরই আমার পছন্দ। কুসুম এইডা আমার ভাই, আলাদা কেয়ার নিবি। বলেই রোজি বেরিয়ে গেল, মেয়েটি একটি কথাও বললো না। ঘরের ভেতর জিনিস বলতে একটা খাট, লাল রঙের একটা চাদর, টেবিলের ওপর টিভি, একটা সিডি প্লেয়ার, একটি ঘোলা আয়নার ড্রেসিং টেবিল, টেবিলের ওপর কিছু প্রসাধনী। মেয়েটি খাটের এক কোণে বসে ছিল, আমি কাছে যেতেই বললো দরজার সিটকিনি খোলা, আমি লাগিয়ে দিয়ে পাশে বসলাম। আমার শরীরে তীব্র ইচ্ছাটা এখানকার গলির মোড়েই বাতাসে মিইয়ে গেছে। কিন্তু এসে পড়েছি, কি আর করা সময়টা পার করে যেতে হবে। নতুন অভিজ্ঞতাও কম নয়।
Ñ তোমার নাম তো কুসুম। মেয়েটি ঘাড় নাড়লো।
Ñ তুমি কথা বলতে পারো না, ঘাড় নেড়েই হ্যাঁ বললো।
Ñ এই লাইনে নতুন? আবারও? ঘাড় নাড়ছো?
Ñ এবার কথা বললো, কাজ করেন, আমি রেডি। বলেই বুকের ওপর থেকে শাড়ির আঁচলটা সরিয়ে ফেললো, নিটোল, সুন্দর গড়ন।
শ্যামলা মুখে সাদা পাউডারে মায়াবী ভাবটা কমে যায়নি এতটুকু।
Ñ আমি জানতে চাইলাম, কি কাজ? বললো, যে কাজে আসছেন।
ভাষায়ও সাবলীল। কুসুমের প্রতি আমার আগ্রহ বেড়ে গেল, ওকে পড়তে ইচ্ছে করলো।
Ñ আমি বললাম, কাজ তো করছিই।
Ñ ও বললো, না, আপনি যে কাজে আসছেন।
Ñ কুসুম আমি যে কাজে আসছি, তা করছি, তুমি শাড়ির আঁচলটা উঠাও আমার অস্বস্তি হচ্ছে।
Ñ এই লাইনে ওই শব্দগুলো নাই। এখানে অস্বস্তি নাই, সবই স্বস্তি। শান্তির জন্যই তো আসেন আপনারা।
হঠাৎ মনে পড়ে গেল, আমারে দুদ- শান্তি দিয়েছিল নাটরের বনলতা সেন। তবে কি জীবনানন্দের বনলতা সেন কি কোনো এক কুসুম?
Ñ কুসুম তোমার বাড়ি কোথায়?
Ñ সেইটা জেনে আপনার কি হবে?
Ñ শোনো কুসুম এখন তুমি আমার, আমি যা বলবো, তাই তুমি করবে, আর আমি যা জানতে চাইবো তুমিই তাই উত্তর দেবে।
Ñ ও মাথা নিচু করলো, বললো কুষ্টিয়া।
Ñ কুষ্টিয়া কোথায়?
Ñ জৈনতলা।
Ñ তুমি কি করে এখানে এলে? কেনই বা এলে?
Ñ ও আবারো চুপ করে রইলো।
Ñ আমি বললাম, কুসুম আমি তোমার সাথে গল্প করবো, এটাই আমার কাজ।
Ñ ও বলতে শুরু করেছিল।
Ñ কিন্তু দরজায় কড়া নাড়া, রোজি চিৎকার করছে, ভাইয়া টাকা লাগবো না আইজ যান, পুলিশের রেইড হতে পারে আইজকে।
Ñ আমি কুসুমের হাতে টাকা গুঁজে দিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম।
ফেরার পথে কুসুমের বড় বড় দুচোখের কোলে মুক্তোর মতো ঝুলেছিল পানি। বাসায় ফিরে সারারাত ঘুমোতে পারি নাই। বারবার কুসুমের চোখ, মলিন অথচ মায়া ছড়ানো মুখটা মনে পড়ছিল। ওইদিন হঠাৎই তন্বিকে স্বপ্ন দেখেছিলাম, হো হো করে আসছে, বলছে কি আমাকে ব্লেম করেছিলে, এখন যে তুমি একটা চরিত্রহীন। আমি চরিত্রহীনতার সংজ্ঞা জানি না। মাথা কাজ করছে না। ঘুম ভেঙে পানি খেয়ে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম, তন্বিকে খুব মনে পড়ছিল, তন্বির জিদ, একগুয়েমি শেষে ফ্রেঞ্চ শিখতে গিয়ে বেলজিয়াম ছেলেটার প্রেমে পড়া। চলে গেল দুবছর হতে না হতে। মা, বড়পু খুব আদর করে বৌ করে এনেছিল তন্বিকে।
সারাদিন অফিসের চাপে ভুলে গেলাম কুসুমকে। পরের শনিবার আবার গেলাম। তারপর আবার। পরপর চার শনিবারেই ওকে জানা হলো অনেকটা। সেই একই রকম জানালার দিকে কোনাকুনি মুখ করে বসে থাকা। বলে যাচ্ছিল ওর কথা।
বাবা পোস্ট অফিসে কাজ করতো। মা আর দুভাই নিয়ে সাজানো সংসার। ওই সবার বড় ছিল। স্কুলে পড়ার পাশাপাশি হাতের কাজ শিখেছিল কুসুম। গায়ের রং চাপা থাকার কারণে মা-বাবা চিন্তা করতো খুব, কালো মেয়ে কীভাবে বিয়ে দেবে। কিন্তু দশম শ্রেণিতেই প্রেম হয় শফিকের সাথে। বাপ-মা মেনে নেবে না, শফিকের বাপ-মারও একি অবস্থা। ঝড়-জলে এসএসসি পাস করলেও আর দেরি করার উপায় ছিল না ওদের। কুষ্টিয়া সদরে এসে কাজী অফিসে কলমা পড়ে বিয়ে করে ওরা, তারপর পাড়ি দেয় ঢাকায়। কোনোরকমে গ্রাম সম্পর্কীয় কাকার বদলৌতে ওরা কাজ পায় গার্মেন্টসে। গাজীপুরেই থাকতে শুরু করে। দিনগুলো কষ্টে দুঃখে ভালোই কাটছিল, চার বছরের মাথায় ঘরে একজন নতুন অতিথিই এলো, ওরা নাম রেখেছিল তিশা। তিশাকে নিয়ে একদিন ওরা দুজন মার্কেটে গেছে, তিশা তখন কোলে, গার্মেন্টসের এক মাস্তান বড় ভাইয়ের চোখ ছিল কুসুমের দিকে। সেদিন ওদের ডেকে নিয় যায় সুপারভাইজারের বাড়ি, মিথ্যা কথা বলে। তারপর শফিককে বেঁধে রেখে কুসুমকে ওরা কয়েকজন ভোগ করে উপর্যুপরি। শফিককে মেয়েসহ ছেড়ে দিলেও কুসুমকে ছাড়ে না। পরদিন থানায় শফিক জানালে শফিককে মার্ডার কেসের আসামি করে জেলে পাঠায় ওরা। এই গল্পগুলো শুনতে আমি রোজ শনিবার যেতে থাকি, কেমন টান অনুভব করি, কুসুমের জন্য। দুমাস পরে মনে হলো কুসুমের জন্য তো কখনও কিছু নিয়ে যাই নি। আজ কিছু নেবো। রোজিও বোঝে আমি ওর সাথে গল্প করি, তাই ঘণ্টা হিসেবে রেট খুব কম রাখে। আর মাঝে মধ্যে খাবার নিয়ে যাই। কুসুম কেমন উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে, বুকটা যেন খালি হয়ে আসে, হুহু করে বাতাস আসা-যাওয়া করে। গত মাসে প্রথম শনিবার অফিস শেষ না করেই বেরিয়ে গেলাম, ঘুরছি শপিংমলে কি কিনবো কি কিনবো, কিছুই বুঝতে পারছি না। হঠাৎ তন্বির কথা মনে হলো, ওকে জন্মদিনে কি দেবো জানতে চাইলে, বলেছিল, নূপুর দিও এবার আমাকে; কিন্তু তার আগেই।
হ্যাঁ, নূপুর কিনবো, আমি তো ভালো বুঝি না। কলিগ মৌকে ফোন করলাম, মিথ্যা বলতে হলো, বললাম বোনের জন্মদিন নূপুর কিনবো কোথা থেকে, ও আড়ং-এর কথা বললো। বেশ সময় নিয়ে নূপুর কিনে, চলে এলাম কুসুমের কাছে। কুসুমকে আজ কৃষ্ণকলির মতো লাগছে, ন্যাচারাল। আজ কোনো পাউডারের ছটা নেই, সাজ নেই। মিঠেকালো অপূর্ব সুন্দর এক মানসী আমার সামনে বসে আছে। আমি দরজার সিটকিনি তুলে দিলাম। কুসুম একটু আঁতকে উঠে বললো।
Ñ আজ বুঝি কাজ করবেন?
Ñ আরে আমি কি রোজ আকাজ করি?
ও হাসলো যেন বেলি ফুল ফুটে উঠলো।
Ñ কুসুম আজ তোমার জন্য আমি একটা উপহার এনেছি, তুমি নেবে?
Ñ কুসুম অপ্রস্তুত তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ, তারপর আস্তে আস্তে বললো, নেবো।
Ñ বললাম, না হাতে দেবো না, আমি নিজ হাতে পরিয়ে দেবো।
Ñ ঠিক আছে দিন বলে আমার দিকে তাকলো।
Ñ তোমার পা দুটো বের করো, নইলে কীভাবে পরাবো? বলতে বলতে প্যাকেট খুলে নূপুর জোড়া বের করে ওর দিকে তাকালাম।
Ñ ও মুখে হাত দিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো,
Ñ কি হয়েছে কুসুম? ওকে আমি জড়িয়ে ধরতে গিয়ে থেমে গেলাম, কি হলোটা কি?
পা বের করো, ও বের করছে না দেখে ওর শাড়ির নিচ থেকে আমি টেনে বের করতে চাইলাম, একি পা কোথায়?
একটা পায়ের অর্ধেক আমার হাতে এলো, আরেকটি পা নেই। আঁতকে সরে গেলাম।
Ñ ওর হাত চাঁপা মুখ আমি উঁচু করে ধরে চিৎকার করলাম, কুসুম একি? আমাকে বলো… কুসুমের কান্নার ধমকে খাট নয় পুরো ঘর কেঁপে উঠলো, কুসুম বলো। আমাকে বলো। ওর চোখ মুছিয়ে, ওকে বুকে জড়িয়ে আদর করে বললাম, কুসুম আমায় বলো। কি হয়েছে তোমার? কেন লুকিয়ে ছিলে আমার কাছে?
কুসুমের বড় বড় চোখ দিয়ে তখনও পানি ঝরছে, তবে উথাল অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে মিইয়ে এসেছে।
ও সেদিন যা বলেছিল, তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। তবুও শুনেছিলাম, কুসুমের জন্য সেদিন শফিকও নূপুর কিনেছিল। ওদের ম্যারেজ ডে ছিল। শফিককে জেলে নেবার পর কুসুমকে ওরা ছেড়ে দিলেও কুসুম সুস্থ থাকেনি। এক প্রকার মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিল। তিশার দেখাশোনার ভার নেয় পাশের ঘরের নানী, যিনি রোজির মা। শফিকের যাবজ্জীবন হয়েছিল। কুসুম ওই অবস্থাতেই রেললাইনের পাশে বসে থাকতো, এটা ওটা কুড়িয়ে খেতো। কোনো এক ফিরতি ট্রেনে ওর অ্যাকসিডেন্ট হয়, এবং তাতেই ওর পা হারায়, পা হারিয়ে সরকারি হাসপাতালে প্রায় চার বছর চিকিৎসার পর সুস্থ হয় কুসুম। চিকিৎসায় ধীরে ধীরে কুসুমের মানসিক অবস্থাও ভালো হয়। তিশাকে খোঁজে, শফিককে খোঁজে। তিশাকে নিয়ে গেছে তিশার দাদা-বাড়ির লোকেরা। আর শফিক এখনও ফেরেনি জেল থেকে।
তারপর রোজির সহযোগিতায় কুসুমের জায়গা হয়, কুড়িলের এই গলির মোড়ের প্লাস্টারহীন বাড়িতে। কুসুম আর ফিরে যেতে পারে না ওর নিজের বাড়ি। কুসুমের আসল নাম কুসুম ছিল না, তৃপ্তি বিশ্বাস।
ব্রাহ্মণের মেয়ে মুসলমান ছেলেকে বিয়ে করে মুসলিম হয়েছিল, ধর্ম ছাড়া, কূল ছাড়া তৃপ্তি স্বামীর কাছে তাহেরা থাকলেও পরে হয়েছিল কুসুম। সেই নূপুর রাখেনি কুসুম, আমায় বলেছিল, আপনি আর আমার কাছে আসবেন না।
কুসুম কি শফিকের জন্য আজও অপেক্ষা করে? আমার জানা হয়নি। সেদিনের সব মেয়েগুলি আমার দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। ওদের কি ধারণা হয়েছিল আজও আমি জানি না। কেবল রোজি এগিয়ে এসে বলেছিল, এই যে ভাইয়া, আপনার সব টাকা, আপনাকে ঠকানোর কোনো ইচ্ছা নাই। আমি সেই সন্ধ্যা হবার আগের আলোটা পেরিয়ে এসেছিলাম কুসুমকে পেছনে ফেলে।
গাড়ির এফএম-এ মাত্র মান্নাদে’র ‘আমি তোমার প্রেমের যোগ্য তো নই’ গানটি শেষ হতেই উজ্জ্বল ভাই বলে উঠলো, কি ব্যাপার সৌম কোথায় হারিয়ে গেলেন? ঘুমিয়ে পড়লেন না-কি? বাবুল আপনাকে ডাকছে, বাসায় চলে এসেছেন তো?
Ñ না ! উজ্জ্বল ভাই, যা জ্যাম ছিল, একটু চোখটা লেগে আসছিল।
Ñ ওকে গুড নাইট। বাসার গেটে নামিয়ে দিয়ে গাড়িটা হুস করে বেরিয়ে গেল। সিকিউরিটি গার্ড জামাল পিটপিট করে তাকিয়ে বললো,
Ñ ভাইয়া, শরীর খারাপ না-কি?
নিজ থেকেই লিফটের সুইচ বাটনটা জামাল প্রেস করে দিল। দরজার তালা খুলে অন্ধকারে খুঁজতে লাগলাম সন্ধ্যার আলোটুকুন…

শ্রেণী:

আষাঢ়-এর তৃতীয় দিন…

Posted on by 0 comment
45

ব্রাসেলসের বর্ষা-বিধৌত এই একটানা একঘেয়েমিতে। সকাল সকাল ভিনদেশের বর্ষণ-সংগীত শুনে প্রথম প্রতিক্রিয়া হলোÑ আরে, এ যে একেবারে আমাদের বর্ষার মতন! সেটা অবশ্যি বলেছি টাইমিংটা মিলে যাওয়াতে।

45মালেকা পারভীন: বাংলা বারো মাসের নাম এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলতে পারলেও জর্জিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে তা ঠিক কবে থেকে শুরু হয়, আমি নিশ্চিত, পহেলা বৈশাখ ছাড়া আর কোনোটাই আপনি সঠিকভাবে বলতে পারবেন না। বুকে হাত দিয়ে বলুন, পারবেন? তাও পারতেন না যদি চৌদ্দ আর পনের এপ্রিলের ঝামেলাটা অনেক ঝুট-ঝামেলার পর ওইভাবে না মিটিয়ে ফেলা হতো। মিটিয়ে ফেলাতে ভালোই হয়েছে। বাঙালিত্ব প্রমাণের ন্যূনতম ট্রিকটা আপনার হাতের মুঠোয় চলে এসেছে না বলে সোজা জিবের আগায় সদা প্রস্তুত আছে বলা যায়। অনায়াসে।
তবে আমি আপনার থেকে এক ধাপ এগিয়ে আছি। না, বলছি না যে আমি বলতে পারব ইংরেজি প্রতিমাসের মাঝামাঝি ঠিক কোন তারিখে (চৌদ্দ, পনের নাকি ষোল) বাংলা মাসগুলোর একেকটার প্রথম দিন শুরু হয়। অনেকবার খাতা-কলম ব্যবহার করে মুখে-মগজে মুখস্থ করতে চেয়েছি। সফলতা ধরা দেয়নি বুড়ো মস্তিষ্কের ‘গ্রে সেলগুলো’ তাদের কর্মদক্ষতা দেখাতে পারেনি বলে। তাই বলে হাল ছেড়ে দিইনি একেবারে। বাঙাল হয়ে জন্মেছি, অথচ বারোটা বাংলা মাসের দিনক্ষণ বলতে পারব নাÑ এটা কোনো কাজের কথা নয়, মশায়। নিজেকেই বলি। আর তার সামান্য চেষ্টা হিসেবে আমি আষাঢ়স্য প্রথম দিবসের জন্য নির্ধারিত জর্জিয়ান ক্যালেন্ডারের তারিখটা ভালো করে জেনে নিয়েছি। তাই আমার আশপাশের সবাই যখন জ্যৈষ্ঠের চাঁদিফাটা গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে বলতে থাকে, কবে যে বৃষ্টি নামবে, আর কেউ কেউ দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘায়িত করে এই ভেবে, কবে যে ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’ গানটা কেউ গুনগুনিয়ে উঠবে, আমি তখন খানিকটা ভাব দেখিয়ে বলি, ক্ষান্ত দিন, জনাবে আলা, জুনের পনের তারিখটা তো আগে আসতে দিন। তারপর না হয় ওইসব গান-ফান-বাজনা-বাদ্যির আসর-টাসর বসানো যাবে…
আজ আষাঢ়-এর তৃতীয় দিন এখানে এই ব্রাসেলসে। সকালে অফিসে আসার সময় দেখেছি, আবহাওয়া ভীষণ মনমরা। ডিজমাল ওয়েদার অ্যাট ইটস পিনাকল। এ অবশ্য এ শহরের জন্য নতুন কিছু না। পারলে সারাক্ষণই মুখ বেজার করে রাখে। ধনীর দুলালীর আদুরেপনা আর কি! একটা সময় এমন অবিরল ঝিরঝির ধারায় বৃষ্টি ঝরতে লাগলো যে সেই একহারা বৃষ্টি-ঝরা দেখতে অফিস-রুমের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে গেলাম। চুপচাপ, একা একা, শুধু নিজেকে নিয়ে। আর নির্নিমেষে এই বারি-পতন দেখতে দেখতে একসাথে একটার পর একটা কত যে কথা, কত রকমের স্মৃতি যে এই বেচারির মনে পড়ে গেলো! মনের জানালার আবছা ক্রুশ-কাটা পর্দায় ভেসে উঠলো কিছু মনে থাকাÑ বেশিরভাগ ভুলে যাওয়া মানুষের মুখ-নাম-পরিচয়, আর কত কত জায়গার ছবি আর দৃশ্যাবলি যেখানে আমি কখনও কোনো এক হারিয়ে ফেলা আর কখনও খুঁজে না পাওয়া সময়ের কাছে জমা রেখে এসেছি আমার লাজুক পায়ের নরম-কঠিন চিহ্ন সকল। সেই জায়গাগুলো আরও অনেক কিছুর সাথে মিশে গেছে রূপসা নদীর রুপালি ঢেউ হয়ে, সান্তাহার স্টেশনের ট্রেন লাইনের পাথর-বিছানো সমান্তরালে, কোনো এক সবুজ ধান ক্ষেতের সিঁথিকাটা আইল ধরে, আরেক নাম-না-জানা গোরস্তানের (গোরস্তানের কি বিশেষ কোনো নাম থাকে?) ভেতর গজিয়ে ওঠা রহস্যময়ী সূর্যমুখী গাছটার সবুজ পাতায় আর হলুদ পাপড়িদলে, বিটিভির নাটক দেখার আনন্দ-আয়োজনে আর এরকম অসংখ্য পরতে পরতে ‘মায়া-মমতায় জড়াজড়ি করি’ থাকা সাদাকালো ছবি-ভর্তি অ্যালবামের মাঝে থেকে যখন-তখন ইলেক্ট্রিসিটি চলে যাওয়ার ঘোর অন্ধকারে!
যাক, থাক ওসব মন-উচাটন আকুলি-বিকুলিপনা। বরং ফিরে আসি আজ আষাঢ়স্য তৃতীয় দিবসে। ব্রাসেলসের বর্ষা-বিধৌত এই একটানা একঘেয়েমিতে। সকাল সকাল ভিনদেশের বর্ষণ-সংগীত শুনে প্রথম প্রতিক্রিয়া হলোÑ আরে, এ যে একেবারে আমাদের বর্ষার মতন! সেটা অবশ্যি বলেছি টাইমিংটা মিলে যাওয়াতে। বলতেই হচ্ছে, স্থান-কাল ভেদে বৃষ্টি তার নিজস্ব চরিত্র ধারণ করে। আমি এমনটাই দেখেছি। আপনিও দেখেছেন। মনে করার চেষ্টা করে দেখুন। আচ্ছা, মনে করুন, লন্ডন-এর ছিঁদকাদুনে ছিপছিপে বৃষ্টির কথা। সেখানকার বৃষ্টির এমন বিশ্রী চেহারা যে কাব্য করা আর সাহিত্য সাধনা দূরে থাক, বিরক্তিতে রীতিমতো আপনার হাত কামড়াতে ইচ্ছে করবে আমার মতন। আমি জানি, কারণ আমার এমনটা হয়েছে। দু-একবার হাত নয় অবশ্য, আঙুল কামড়েছি, যারপরনাই বিরক্তিতে ত্যক্ত হয়ে… কিছু করার নাই, কোথাও যাওয়ার নাই… শুধু জানালার পাশে বসে নীরবে বৃষ্টির পতন দেখে যাওয়া আর অহেতুক আলসেমিতে ঢুলে পড়া অথচ হাতে জমে আছে কত কাজ… এমন যে তার কায়াশ্রী তাকে না যায় ধরা, না যায় ছোঁয়া। অথচ দেখুন, কেমন তার যন্ত্রণার মাত্রা! অসহ্য!
অথচ আমার একজন প্রিয় কলাম লেখক-সাংবাদিক ভাই বেশ আয়েশ করে বলেন, আমার এই ব্লিক অ্যান্ড বিষণœ ওয়েদারই ভালো লাগে ভীষণ। কেমন একটা মনমরা মগ্নতায় অবশ হয়ে থাকে চারপাশের সবকিছু। এরকমই ভালো লাগে আমার। সব সময়। আরও ভালো লাগে এমন অদ্ভুত মিসটেরিয়াস মেলানকলি মোমেন্টসে এক মাগ ধোঁয়া ওঠা গরম কফি হাতে নিয়ে জানালার পাশে রকিং চেয়ারটায় বসে বাইরে অন্ধকারে অপলক তাকিয়ে থাকতে। ব্যাপারটা একবার তোমার কল্পনার ক্যানভাসে তুলে নাও, দেখবে কেমন এক নামহীন ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে গেছে তোমার সারাটা মনোজগৎ! কেমন এক সুতীব্র বিহ্বলতায় আচ্ছন্ন আর অবশ হয়ে গেছে তোমার সমগ্র অস্তিত্বের চারপাশ!
আপনি এত সুন্দর ইংরেজি লেখেন, আর এখন দেখছি, না মানে শুনছি, বাংলাতেও কম যান না… আমার কথা শুনে তার বিদগ্ধ কপাল সামান্য কুঁচকে গেল। যদিও মুখের স্মিত হাসিটি অমলিন।
হুম, তুমি একবার ওই দৃশ্যপটটা ক্যানভাসে তুলে নাও, তোমার মনের ক্যানভাসে, ইজেলটা বাম হাতে শক্ত করে ধরে এবার আঁকতে থাকো, যা যা তোমার ভাবতে ইচ্ছে করে। প্রায় সময় এমন বৃষ্টি-ধোয়া মেঘলা দিনে আমার ভেতরে একরকম তোলপাড় হয়, আলোড়ন ওঠে… নীরব শব্দহীন সে তোলপাড়Ñ অথচ আমার ভেতরটা কেমন দুমড়ে-মুচড়ে যায়! আচ্ছা, বলতো, এটা কি আমার কোনো রোম্যান্টিক ভাবালুতা? তোমার ভাবীর এমন অভিযোগ প্রায় শুনতে হয় আমাকে। কিন্তু কি জানো, বৃষ্টি-ছোঁয়া একেকটা অন্ধকার দিন আমাকে যে কী ভীষণ ভালো লাগায় মোহমুগ্ধ করে রাখে! আমি তোমাকে ঠিক উপযুক্ত কোনো ভাষায় তা ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে বলতে পারব না। ইনফ্যাক্ট, যে এটার অনুভবের ভেতর দিয়ে না গেছে, তাকে ঠিক কথার মারপ্যাঁচে তা কখনোই বোঝানো সম্ভব না… আর সেরকম একটা কবি-মনও থাকতে হয়, কি বলো?
প্রশ্নের মতো কিছু একটা আমার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে সাংবাদিক ভাই কেমন এক ঘোরলাগা ভাবনায় চুপ মেরে গেলেন, সম্ভবত আরও কিছু বলার জন্য মনে মনে খানিকটা গুছিয়ে নিতে। আর আমি এটাও জানি, তিনি আমার কাছ থেকে কোনো উত্তর শুনতে চাননি। যেহেতু আমার মতো ধৈর্যশীল শ্রোতা সবসময় তার কাছে আসে না, তিনি তাই তার মনের আগলটাই আজ খুলে দিয়েছেন আমার সামনে। কেননা, কোনো এক কথার ফাঁকে তিনি একবার বলে উঠেছিলেন, সবাই তো কেবল নিজের কথা বলতে চায়। শোনার লোকের সংখ্যা হাতেগোনা। কেমন একটা প্যারাডক্স, দেখো! আমাদের দুটা কান আর একটা মুখ, অথচ এগুলোর ব্যবহার ঠিক বিপরীত সূত্র মেনে।
কিন্তু আমার ধৈর্যও একসময় বিদ্রোহ করতে চায়। মনে মনে বলিÑ আপনিও তো কম যাচ্ছেন না। যে বিষয়ের সমালোচনা করছেন, সেই একি দোষে আপনি নিজেও দুষ্ট। আমাদের সমস্যাটা তো এখানেই। আমার এই সত্যি কথাগুলো তাকে বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আমার বরাবরের যে চেপে যাওয়া স্বভাব, আমি চুপ করে থাকি। ব্যাপারটা তিনি খেয়াল করেন।
তুমি আমার কথায় বিরক্ত হচ্ছো না তো? স্যরি, এই বৃষ্টি-ভাবালুতায় এমনভাবে পেয়ে বসলো আর তোমার মতো এমন একজন মনোযোগী নীরব শ্রোতা পেয়ে গেলাম যে চারপাশের সবকিছুই যেন ভুলে গেলাম। আচ্ছা, বাদ দাও। এবার তোমার কথা বলো। তোমার টেক্সট করা ওই কবিতাটা কিন্তু আমার এখনও বেশ মনে আছে। মনে পড়ছে না? যেখানে তুমি এক ঘন বর্ষণের রাতে ট্র্যাফিক জ্যামে আটকা পড়ে গেলে আর ওই সময় তোমার অস্তিত্বটাকে তুলনা করতে চাইলে হঠাৎ গর্তে আটকা পড়ে যাওয়া একটা ইঁদুরের সাথে যে বের হওয়ার কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছে না। ফ্যান্টাস্টিক! অসাধারণ! তুমি কবিতাটা চালিয়ে যাও, ঠিক আছে?
তার কথা কিছুতেই শেষ হতে চায় না। আমাকে কিছু বলার জন্য বারবার বললেও আমি কিছুতেই তার কাছ থেকে সেই মওকা আদায় করতে পারি না। নিজেকে আমার সত্যি সত্যি তখন ওই ইঁদুরটার মতো অসহায় লাগে। আমি একটু পিটপিট করে তার দিকে তাকাইÑ আমাকে একটু বলার সুযোগ দিন আর না হলে বিদায় বলে যাই? অথচ আমারও বলার ছিল, আমি নিজেও বৃষ্টি-কাতর একজন মানুষ। আর বৃষ্টি বা বর্ষাকে রোমান্টিকতার চূড়ান্ত শিখরে নিয়ে গিয়েছেন যে কবিগুরু তার প্রতি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই আমি হঠাৎ করে অসহিষ্ণু হয়ে উঠি। যেন আমি ভীষণই বিরক্ত প্রয়োজনের অতিরিক্ত এই বর্ষা-বয়নে। চটজলদি হুমায়ূন আহমেদের কথাও আমার মনে পড়ে যায়। আরও অনেক কিছুই মনে পড়ে যায়। তেইশ বছর আগে কোনো এক বিভাগীয় শহরে ঝুম বৃষ্টি নামা জুন মাসের এক সিক্ত দুপুরের কথা। কলেজ-পোস্ট অফিসের এক চিলতে বারান্দায় গাদাগাদি করে দাঁড়ানো অনেক ছেলেমেয়ের ভিড়ে শুধু একজনকেই ভালো লেগে যাওয়া আর বৃষ্টি শেষ হওয়া মাত্র ভেজা বাতাসের সুরভির সাথে পলকে তার উধাও হয়ে যাওয়া। পেছনে ফেলে যাওয়া এক দীর্ঘশ্বাসের মেঘ-মল্লার। চিরদিনের জন্য।
যা হোক, বর্ষা-বন্দনায় সংক্রামিত আমার নিজেকে আমি সামলে নিলাম আর বরষণ-¯œাত বিষণœ আবহাওয়ার মাঝে সকল আনন্দ খুঁজে পাওয়া সাংবাদিক ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালাম। আমার পরিকল্পনা ব্যর্থ হলো। কারণ তিনি পরম মমতায় আমার সামনে বাড়িয়ে দিয়েছেন এক মাগ ধোঁয়া ওঠা গরম কফির সুচতুর প্রলোভন। অবিকল তার বর্ণনার মতন। নিজ হাতে কফি মেশিন থেকে বানানো সেই কফির মন এলোমেলো করা সুবাস আমার নাকে সুড়সুড়ি দিয়ে যায়। আর আমি কিছুতেই এই ট্যানটালাইজিং টেম্পটেশন থেকে নিজেকে রক্ষা করার সহজলভ্য কোনো উপায় খুঁজে পাই না আমার চারপাশে। নিজেকে এ সময় মমের ‘লাঞ্চন’ গল্পের সেই অমানানসই চরিত্রটির মতো মনে হয়, যাকে এক অজ্ঞাত কারণে কখনই আমার নায়িকা বলতে ইচ্ছে হয় না।
একবারে আমার কেবল এক মাগ কফিই ভালো লাগে… ভাই। এর সাথে আর অন্য কিছু না। না বিস্কুট, না বাদাম। আমার একটু ঢং করে বলতে সাধ হয় যখন দেখি সাংবাদিক ভাই উপুড় হয়ে টেবিলের ড্রয়ার খুলে তার ফুড স্টকে আমাকে অফার করার মতো কিছু আছে কি-না তা খোঁজার চেষ্টা করছেন। আমি মুখে যদিও কিছুই বলি না; কিন্তু তিনি আমার মনোভাব পড়ে ফেলেন এবং আবার সোজা হয়ে বসে তার লম্বা মাগটা টেবিল থেকে হাত বাড়িয়ে টেনে নেন।
দেখো, ওই মেঘ-মেদুরকাল-নীলাভ শান্ত আকাশটার দিকে তাকাও আর তোমার সম্পূর্ণ দৃষ্টিটা মেলে দিয়ে ভাবতে চেষ্টা করো ছোপ ছোপ কালি ছিটানো নীল রঙে ডোবানো মেঘগুলো একেকটা কিসব কবিতা বলে যায়… কীসব কবিতা… আহ্!
আহ্, মরি, মরি… সাংবাদিক ভাইয়ের অফিসে এসেছিলাম কুশলবিনিময়ের ছুতায় দুমাস আগে জমা দেওয়া আমার লেখাটার ব্যাপারে খোঁজ নিতে। এখন বৃষ্টি-শিকলে আটকা পড়ে কী করিÑ কোথায় পালাই অবস্থা। তিনি আমার মনের হাল বোঝার ধারেকাছেও যেতে চাইলেন না। তার মতো করে বলে যাচ্ছিলেন যা যা তার মনের রাস্তায় মিছিল করে আসছিল প্রজাপতি-রঙিন অথবা দাবার বোর্ডের সাদাকালো ছক আঁকা জ্যামিতিক রেখার ছাতা মাথায়…
আমি শুনছিলাম, আর শুনছিলাম, আর ভাবছিলাম দেবো নাকি একবার মনের পাখনাটা মেলে? ওই যে ব্রাসেলসের কর্মস্থলে কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে যেমন যেমন বৃষ্টি-ভাবনা এসে আমার মনের জানালায় ভিড় করে সেসব আনন্দের বর্ণমালা… কিছুটা শেয়ার করি তার সাথে, যদি সুযোগ পাই। হয়তো ভালোই লাগবে তার। হয়তো না। তারপরও বলি। এই মনোটোনাস মনোলগের মিজারি থেকে অ্যাট লিস্ট মুক্তি পাওয়া দরকার…
আমি এপাশ ফিরে দেয়ালের দিকে মুখ করে তাকাই আর আমার আচরণ যেন হঠাৎ কেমন এক অদ্ভুত চেহারা ধারণ করে! জানিনা কেন, ব্রাসেলসের বিরহী আকাশের সময়ে-অসময়ে মুখ কালো করে কান্না-ঝরানো বৃষ্টির ওপর একপ্রস্থ রাগ এসে জমা হয় আর আমি বলতে থাকি, হয়তো মনে মনে, অথচ দেখুন, আমাদের দেশের বৃষ্টি দেখুন… কেমন মনকাড়া ভঙ্গিমায় সমস্ত চরাচরজুড়ে মোহনীয় মায়া ছড়িয়ে ঝলমলে রিমঝিম করতে করতে ছলাত ছলাত করতে করতে কলকল টলমল করতে করতে তার রাজসিক আগমন। দু-কূল ছাপিয়ে নিজে তো নীপবনে নৃত্য করবেই, সাথে আপনাকেও নাচিয়ে ছাড়বে… সোনার চাঁদবদনী তুমি নাচো তো দেখি! সেই বৃষ্টিÑ সংগীতের মাঝে মাঝে যদি আবার গুরুগম্ভীর মেঘ-রাজ ডেকে ওঠেন, বাজিয়ে দেন বজ্রস্বরে তার তীক্ষè কণ্ঠÑ নিনাদ, তা হলে আপনার বর্ষা-উদযাপন সম্পূর্ণ হলো ষোল কলায়।
আর ইউরোপের বৃষ্টির এমন হাস্যকর একই সাথে বিরক্তি-উৎপাদক চেহারা যে আপনি তা দেখে নিজেই লজ্জা পেয়ে মুখ লুকাতে ব্যস্ত হয়ে যাবেন। যাবেন না, বলছেন? যখন বৃষ্টির বদলে আপনার মাথায় পাতা ছাতার ওপর একরাশ ঘ্যানঘ্যানানো অসহ্যপনা ঝরে পড়বে আর শরীরে এক ধরনের ব্যাখ্যাতীত চিটচিটে অনুভূতির অস্বস্তি টের পাবেন, তখনই বুঝতে পারবেন ইউরোপের বৃষ্টি-বেদন কতটা… যাহ্ আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। আর এমন যে এমন, কোনো শব্দ নেই, কোনো আওয়াজ নেই… শুধু ঝরছে আর ঝরছে আর ঝরছে। আপনি তাকে দিব্য চোখে দেখছেন, আপনার পরনের কাপড়ও অল্পস্বল্প ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে সে যে এসেছিল তার চিহ্নস্বরূপ, অথচ কুহেলি মরীচীকার মতো থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ কোনো বৃষ্টি হলো যদি তারে আপনার মতো করে কাছে না পেলাম? যদি তারে নাই পাইকো আপনার মতো করে, তাহলে কি কিছু পাওয়া হয়? ধ্যাৎ!
আজ অবশ্য ব্রাসেলস-এর বৃষ্টি সামান্য ভেল্কি দেখালো। না, ঠিক, দেখালো না, শোনালো। মুহূর্তের জন্য কিছু একটা শুনিয়ে দিলো… ওই ধরুন গিয়ে ইউরোপিয়ান মেঘের ডাক। খুবই ভদ্র কায়দায়, পাছে কেউ যাতে শুনে না ফেলে এমন ভাবে চুপিসারে! আমিও শুনতে পেতাম না যদি আমার কান অমন খাড়া না থাকত। আমি তো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে এই ইউরোপিয়ান বৃষ্টির ভেলকিবাজি দেখছিলাম একটু সতর্ক চোখ-কান মেলে-খুলে। দেখতে চেয়েছিলাম নতুন করে, আমাদের বর্ষার যাদুময় সৌন্দর্যের কাছে তা ঘেঁষতে পারে কিনা। পারবে না, কখনোই না। প্রশ্নই আসে না। তবে এর আগে আর একদিন ওই ডাক শুনেছিলাম বেশ ভয়ঙ্করভাবেই। এখানে আসার পর সেবারই প্রথম এমনটা হলো। বেশ চমকে উঠেছিলাম দফায় দফায় ওরকম গর্জন শুনে। আসলে এখানে এই ব্রাসেলসে বৃষ্টির একটানা নিরানন্দ নিঃশব্দ ধারাবাহিক পতন দেখে দেখে চোখ যতটা সয়ে গেছে, অমন হুঙ্কার শুনে তো এই বেচারা কানজোড়া অভ্যস্ত নয়। সে কারণেই ওরকম হতভম্ব দশা। শুধু আমার না, যাদের সাথেই বিষয়টা নিয়ে কথা বলেছি, যারা অর্থাৎ আমার আশেপাশে ঘুরঘুর করতে থাকা দেশি ভাই-ব্রাদার, প্রত্যেকেই একই কথা বলেছে। বুঝতে পারছেন তো, এই বৈদেশেও আমরা বৃষ্টি নিয়ে বিশদ আলোচনা করার অবকাশ পাই।
আর বৃষ্টি-বিলাসী আমার প্রিয় সাংবাদিক ভাই কোথায় গেলেন, জানেন? কফি খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে আমি তাকে বলতে চেয়েছিলাম কদিন আগে এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করা মমের অসাধারণ ‘রেইন’ গল্পটার কথা। কিছু তর্কবিতর্কের সুযোগ ছিল। সাবডিউড প্যাশন আর উচ্চকিত নৈতিকতা নিয়ে একটা দারুণ আড্ডার সূচনা হতে পারত। তারপর তা বেড়ে প্রসারিত হতো ই-মেইল আর টেক্সট মেসেজে… ইশ, এমন একটা জমজমাট সাহিত্যিক আসর শুরু করেও শেষ করতে পারলাম না। মনে হলো, মনে হলো এর জন্য ওই বেহায়া বৃষ্টিটাই দায়ী। কারণ তা আমাকে এমনভাবে ভিজিয়ে দিয়েছিল যে সাংবাদিক ভাইয়ের সামনে ভদ্র-সভ্যভাবে বসে থাকাই দায় হয়ে উঠেছিল। আমার ভীষণ আড়ষ্ট লাগছিল যে! আর তা ছাড়া মিস থম্পসনের মতো এত দুর্বিনীত দুঃসাহসের বর্ষণও আমার ওপর কখনও অকৃপণভাবে ঝরে পড়েনি। আমি যে আমার মধ্যে গুটিয়ে থাকা এক চিরকালের শুঁয়োপোকা যে কেবল একছিটে বৃষ্টির আলতো পরশেই মিইয়ে যায়, চুপসে যায় লজ্জাবতী লাজুকলতার সরলতায়… তা না হলে হয়তো…

শ্রেণী:

যুধিষ্ঠিরের কুকুর

34

ঠিক ঐ জায়গাটায় সারাক্ষণ শুয়ে থাকে। হয়তো ঘুমায়। কিংবা চোখ বুজে ঝিমায়। হয়তো উঠে দাঁড়ানোর শক্তি পায় না বলে মাথাটা বুকে গুঁজে সারাক্ষণ ওভাবে পড়ে থাকে। গায়ে মশা-মাছি বসলেও নড়েচড়ে না। গাড়ির তীক্ষè হর্নেও সচকিত হয় না।

34স্বকৃত নোমান: যুধিষ্ঠির বললেন, এই কুকুর আমার ভক্ত, একেও আমার সঙ্গে নিতে ইচ্ছা করি। ইন্দ্র বললেন, যার কুকুর থাকে সে স্বর্গে যেতে পারে না। যুধিষ্ঠির বললেন, নিজের সুখের জন্য আমি এই কুকুরকে ত্যাগ করতে পারি না।
মহাভারত। মহাপ্রস্থানিকপর্ব

খামারবাড়ি মোড়ে নেমে ইন্দিরা রোড ধরে ফার্মগেটের দিকে হাঁটা ধরলে দেখা যাবে একটা কাঁচাবাজার। বাজারের ঠিক মাঝখানে ফুটপাথের ছোট্ট ঐ বটগাছটার নিচে রাস্তার ওপর সিটি কর্পোরেশনের ডাস্টবিনের কাছে দেখা যাবে মোটাসোটা একটা কুকুর শুয়ে। এমন স্বাস্থ্যবান কুকুর শহরে খুব কমই দেখা যায়। ডাস্টবিনের উচ্ছিষ্ট খেয়ে খেয়ে হয়তো শরীরটার এই কন্ডিশন করেছে। হয়তো সে অলস। খাবারের জন্য সারাক্ষণ ছুটে বেড়ানো পোষায় না তার। কিংবা এমনও হতে পারে, তার শরীরে দুরারোগ্য কোনো ব্যাধি বাসা বেঁধেছে। নইলে এমন বেখাপ্পা টাইপের মোটা হবে কেন। খেলে কি এত মোটা হয়? বাজারে আরও যেসব কুকুর আছে তারা কি কম খায়? তারা তো তার মতো এত মোটা নয়।
ঠিক ঐ জায়গাটায় সারাক্ষণ শুয়ে থাকে। হয়তো ঘুমায়। কিংবা চোখ বুজে ঝিমায়। হয়তো উঠে দাঁড়ানোর শক্তি পায় না বলে মাথাটা বুকে গুঁজে সারাক্ষণ ওভাবে পড়ে থাকে। গায়ে মশা-মাছি বসলেও নড়েচড়ে না। গাড়ির তীক্ষè হর্নেও সচকিত হয় না। এসব নাগরিক কোলাহলে সে অভ্যস্ত। মাঝে মধ্যে ডাস্টবিনের উচ্ছিষ্ট নিয়ে কুকুরের দলের কামড়াকামড়ি লেগে গেলে মাথাটা তুলে এক পলক দেখে নেয়, তারপর যথারীতি বুকের কাছে মাথাটা গুঁজে নেয়। ভাবে, এ আর এমন কী। এমন কামড়াকামড়ি তো প্রায়ই লাগে। বাজারের অন্য কুকুরগুলো তার ধারেকাছে ঘেঁষে না খুব একটা। তার সঙ্গে মেশে না। কেউ তাকে ঘাঁটায়ও না। মাঝে মধ্যে কেউ কেউ এসে তার গা শোঁকে। মরে গেছে না বেঁচে আছে হয়তো বোঝার চেষ্টা করে। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ে, হাই তোলে, গা চুলকায়। তারপর ধীরপায়ে চলে যায়।
কুকুরটি খায় কখন কেউ দেখে না। সারাদিনে আদৌ কিছু খায় কিনা কেউ জানে না। সে তো মানুষ নয়। ফুটপাথে আর পার্কে যেসব মানুষ থাকে তাদের খাওয়া না-খাওয়া নিয়েই তো কারও মাথাব্যথা নেই। সে তো তুচ্ছ একটা কুকুর, তার খাওয়া না-খাওয়া কেউ কি আর খেয়ালে রাখে? হয়তো সে খায়। রাতে বাজারের উল্টোদিকের সানমুন রেস্টুরেন্টের যে উচ্ছিষ্ট ডাস্টবিনে জমা হয়, শেষ রাতে, অন্য কুকুরেরা যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন সে ধীরেসুস্থে উঠে পেট ভরে খেয়ে নেয়। সারাদিন আর কিছু খায় না। প্রয়োজন পড়ে না। কোনো কোনো রাত আবার না খেয়েই কাটিয়ে দেয়। বিশেষত বৃষ্টির রাতগুলোতে। বেদখল যাত্রী ছাউনির বেঞ্চিটার নিচে সারারাত বেঘোরে ঘুমায়। বৃষ্টি থামলে আবার আগের জায়গায় এসে শুয়ে পড়ে। এক শোয়াতেই দিন কাবার।
একটা কুকুর দিনের পর দিন একই জায়গায় শুয়ে থাকার ব্যাপারটা কেউ ঠিক খেয়াল করেনি। হয়তো করেছে। কিন্তু এ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। এটা কি মাথা ঘামানোর মতো ব্যাপার? মানুষের কত কাজ, কত ব্যস্ততা। দিন-রাত মানুষ ছুটছে… ছুটছে। একটা কুকুরের ভালো-মন্দ নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো সময় কোথায়।
ঘামায় শুধু একজন, বটগাছের নিচে ফুটপাথের এক পাশে বসা কাশিরাম মুচি। রোজ ভোরে বাক্স-পেটরা ঝাড়মোছ দিতে দিতে কুকুরটির দিকে তাকিয়ে সে বলে, কী খবর মোটকু? আছিস কেমন? কুকুরটি তখন কান দুটো নাড়া দেয়। মাথাটা তুলে একবার ঘেউ করে ওঠে। ওটাই তার সাড়া। তারপর আবার মাথাটা গুঁজে নেয়। কেউ সারাদিন মোটকু মোটকু বলে মুখে ফেনা তুলে ফেললেও মাথাটি আর তুলবে না। বহুদিন ধরে কাশিরামের ঐ জিজ্ঞাসাটা শুনতে শুনতে সে অভ্যস্ত। কথাটা তার কানে গেলেই বুঝতে পারে গলাটা কার। সাড়া দেওয়াটা তখন তার কর্তব্য হয়ে পড়ে। আর রোজ রোজ ঐ কথা দুটি বলাটা কাশিরামের অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে। একদিন জিজ্ঞেস না করলে তার মনে হয় দিনটা আজ ভালো যাবে না। কাস্টমার জুটবে না। পুলিশের ঠ্যাঙানি খাবে।
দিনের বেশিরভাগ সময় কাশিরামের চোখ দুটো বলতে গেলে কুকুরটার ওপরই থাকে। শহরের ব্যস্ততম এলাকা ইন্দিরা রোড। কাস্টমার লেগেই থাকে, নাক চুলকানোরও ফুরসত নেই। বেশিরভাগই স্যু। স্যান্ডেল খুব কমই আসে। এলেও সেই পালিশের কাজ। সেলাই-টেলাই দিতে হয় না তেমন। ঢাকা শহরে বড় লোকদের কারবার, কে আসে ছেঁড়া জুতো নিয়ে। জুতোয় ব্রাশ করতে করতে কাশিরামের হাত আর মাথা সমানতালে দোলে, আর চোখ দুটো স্থির হয়ে থাকে কুকুরটার দিকে। ব্রাশ করার সময় কুকুরটার দিকে তাকিয়ে থাকাটাও তার অভ্যাস হয়ে গেছে। নিজের অজান্তেই চোখ দুটো ওদিকে চলে যায়। অন্যদিকে ফেরালেও মুহূর্তে আবার আগের জায়গায় এসে স্থির হয়। তাকিয়ে থাকতে থাকতে প্রায়ই যুধিষ্ঠিরের কুকুরের কথা মনে পড়ে তার। ছোটবেলায় মাস্টারের মুখে শুনেছিল যুধিষ্ঠিরের কুকুরের কথা। এখনও স্পষ্ট মনে আছে।
রাতে বাসায় ফেরার জন্য যখন বাক্স-পেটরা গোছায়, শেষবারের মতো কুকুরটার দিকে তাকায় কাশিরাম। তখন বলতে ইচ্ছে করে, কীরে মোটকু, খাবি না? মাঝে মধ্যে বলেও। কুকুরটা তখন সাড়া দেয় না। কেন দেয় না? কাশিরামের চলে যাওয়াটা হয়তো সে মেনে নিতে পারে না। তাই অভিমান করে থাকে।
কুকুরটার প্রতি কাশিরামের মনে আসলে এক ধরনের মায়া জন্মে গেছে। জন্মানোটাই স্বাভাবিক। কতদিন ধরে দেখছে। কতদিন একসঙ্গে আছে। একসঙ্গেই তো। ফুটপাথের বটতলা থেকে ডাস্টবিনের কতটুকুই বা দূরত্ব। বছর তিন আগে সে যখন এই বটতলায় বাক্স-পেটরা নিয়ে বসে, তখন থেকেই কুকুরটাকে দেখছে। তখন বয়স কম ছিল কুকুরটার। স্বাস্থ্যও এমন ছিল না। তেলতেলে টানটান শরীর। সারাবাজার দাপিয়ে বেড়াত। কামড়াকামড়িতে বাজারের অন্য কুকুরগুলো তার সঙ্গে পেরে উঠত না। সারাক্ষণ কেবল খাই খাই করত। জিবটা বের করে রাখত হরদম। খাবারের বাছবিচার ছিল না। খাওয়ার উপযোগী সামনে যা পেত তা-ই মুখে তুলে নিত। আর কতক্ষণ পরপর ডাস্টবিনটার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে এক ঠ্যাং তুলে মূত্রথলিটা খালি করত। হেগেও দিত মাঝে মধ্যে। কাশিরামের তখন রাগ উঠত খুব। মনে পড়ে যেত শৈশবে স্কুলমাস্টারের মুখে শোনা ইন্দ্রের সেই বাণীÑ যার কুকুর থাকে সে স্বর্গে যেতে পারে না। ঘৃণায় তখন তার নাক-চোখ-মুখ কুঁচকে যেত। সামনে পুরনো স্যান্ডেল-জুতো যা পেত কুকুরটার উদ্দেশে ছুড়ে মারত। শালা বেজন্মা! হাগার আর জায়গা পেলি না! একদিন তো আস্ত হাতুড়িটা ছুড়ে মারল মাথা বরাবর। কুকুরটা কুঁইকুঁই করে ছুট দিল রাস্তার উল্টোদিকে। অল্পের জন্য বাসের চাকার নিচে পড়ল না। স্প্রিডব্রেকারটা না থাকলে চ্যাপ্টা হয়ে যেত নিমেষে। তারপর বেশ কদিন কুকুরটাকে আর দেখা গেল না। কাশিরাম ভাবল, মরেটরে গেল নাকি! না মনে হয়। কুকুরের প্রাণ, এত সহজে কি মরবে! ভয়ে হয়তো এলাকা ছেড়েছে। কিংবা বাজারেই আছে, ভয়ে কাশিরামের আশপাশ ঘেঁষছে না।
কদিন পর সানমুন রেস্টুরেন্ট থেকে নাস্তা করে ফেরার পথে কাশিরাম দেখল, রাস্তার উল্টোদিকের ফুটপাথে দুটো কুকুর পাছার সঙ্গে পাছা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে। জিব বের করে দিয়ে হাঁপাচ্ছে। চোখে ভীতির ছাপ। ভালো করে ঠাওর করে দেখল কাশিরাম, দুটোর একটি ঐ কুকুরটা, যার মাথায় সে হাতুড়ি ছুড়ে মেরেছিল। দ্রুত সে চোখ সরিয়ে নিল। চারদিকে তাকিয়ে দেখল তাকে কেউ দেখছে কিনা। ভারী লজ্জার ব্যাপার। কুকুর হলে কী হবে, ব্যাপারটা তো মানুষের মতোই। এমন একটা ন্যাকেড দৃশ্যের দিকে সে তাকিয়ে, লোকে দেখলে কী ভাববে তাকে। মুখে হাসির একটা রেখা ফুটিয়ে দ্রুত সে নিজের জায়গায় এসে বসে পড়ল। কিন্তু চাইলেই কি চোখ ফিরিয়ে রাখা যায়? রাস্তার লোকজন ঐ দৃশ্যের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে। প্যান্ট-শ্যুট আর টাই পরা এক ভদ্রলোক তো ওদিকে তাকিয়ে হাঁটতে গিয়ে এক বাদামঅলার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যেতে লেগেছিল। অল্পের জন্য পড়েনি। তা ছাড়া স্কুল ছুটি হয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা বাড়ি ফিরছে। তাদেরও চোখও এড়াচ্ছে না দৃশ্যটি। লেগুনার পুচকে কন্ডাক্টররা হুই-হাই করে মজা লুটছে।
কাশিরামের মাথায় তখন রাগ ওঠে। শালা কুত্তার বাচ্চা কুত্তারা লাগানোর আর জায়গা পেল না। পেছন থেকে এক সবজিঅলা বলে উঠল, সিটি কর্পোরেশন কী ছিঁড়তাছে বইসা বইসা। কুত্তাগুলো মারার ব্যবস্থা করে না ক্যান? কথাটা শুনে কাশিরামের রাগ গেল আরও চড়ে। কোত্থেকে একটা বাঁশের টুকরো কুড়িয়ে এনে এক ছুটে রাস্তা পার হয়ে কুকুরটার মাথায় মারল জোরসে বাড়ি। কিন্তু বাড়িটা মাথায় লাগল না, লাগল জায়গামতো, দুই পাছার ঠিক মাঝ বরাবর। দীর্ঘ সময়ের গিট্টু এক বাড়িতেই গেল ছুটে। মুক্তি পেয়ে সুখক্লান্ত প্রাণী দুটো দুদিকে ছুট লাগাল।
ডাস্টবিনটার কাছে কুকুরটা আসন নেওয়ার বছরখানেক পরের কথা। দেশজুড়ে তখন সন্ত্রাসীদের টার্গেট কিলিং চলছে। আজ এখানে তো কাল ওখানে। দেশের উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম রঞ্জিত হতে লাগল রক্তে। লেখক, প্রকাশক, শিক্ষক, ইমাম, বিদেশি, পুরোহিত, যাজক চাপাতির বলি হতে লাগল। জনসমাগমে মানুষের কল্লা ফেলে দিচ্ছে ঘাতক, কেউ এগিয়ে আসছে না আক্রান্তকে বাঁচাতে। কে চায় চাপাতির বলি হতে। কে চায় ঘাতকদের টার্গেট হতে। পুলিশের সামনে লাশ ফেলে দিচ্ছে, হামলা হচ্ছে খোদ পুলিশের ওপরও, আর পাবলিক তো পাবলিক।
সেদিন সকালে কুকুরটা ছিল সানমুন রেস্টুরেন্টের সামনে। মানুষের গাদাগাদি রেস্টুরেন্টের ভেতরে। ম্যাসিয়ার নাশতা দিয়ে কুলিয়ে উঠছে না। সকাল আটটা। অফিসের সময় হয়ে আসছে। সবাই ব্যস্ত। নাশতার জন্য ম্যাসিয়ারকে তাড়ার পর তাড়া দিচ্ছে কাস্টমাররা। গ্যাসের চুলার নিচে বসে নেহারির হাড্ডি চিবুচ্ছিল কুকুরটা। রেস্টুরেন্টে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকতে গিয়ে এক কাস্টমারের চোখ আটকে গেল সেদিকে। নাক-মুখ কুঁচকে স্বগতোক্তি করল, বিচ্ছিরি পরিবেশ। ম্যানেজারের কান এড়াল না কথাটা। কুকুরটা দেখে তার মেজাজও গেল চড়ে। চেয়ার থেকে ওঠে সিঙ্গারা ভাজার লম্বা ডাঁটঅলা চাকনিটা হাতে নিয়ে কুকুরটাকে দিল ধাওয়া। হাড্ডিটা ফেলে এক ছুটে রাস্তায় উঠে এলো কুকুরটা। তখন, ফুটপাথে যে লোকটা চিতই পিঠা বেচে, চুলা থেকে একটা জ্বলন্ত লাকড়ি বের করে ছুড়ে মারল তার দিকে। লক্ষচ্যুত হলো। হবে না? কুকুর বড় সেয়ানা প্রাণী। পিঠাঅলার হাতটা ওপরে উঠতে দেখেই সে দিল ছুট। লাকড়িটা পড়ল গিয়ে এক পথচারীর পায়ের কাছে।
আর ওদিকে তখন হুলুস্থূল। খামারবাড়ি মোড়ের দিক থেকে একটা লোক ছুটছে ফার্মগেটের দিকে। পরনে প্যান্ট, গায়ে সাদা গেঞ্জি, পায়ে চামড়ার স্যান্ডেল। তাকে ধাওয়া করছে দুই তরুণ। একজনের মুখে চাপদাড়ি, পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি। আরেকজনের ক্লিনশেভ মুখ, পরনে প্যান্ট-শার্ট। দুজনের পিঠে দুটো কালো ব্যাগ। দুজনের হাতেই ধারালো চাপাতি। বাক্স-পেটরা ঝাড়মোছ দিচ্ছিল কাশিরাম। তরুণ সূর্যের আলোয় চাপাতিটা চিকিয়ে উঠতে দেখে বুকটা ধপ করে উঠল তার। কদিন আগেও পাবনায় এক পুরোহিতকে গলা কেটে মেরেছে। রামকৃষ্ণ মিশনের প্রধান পুরোহিতকেও হুমকি পাঠিয়েছে। বাক্স-পেটরা ফেলে সেও দিল ছুট। পথচারীরা যে যেদিকে পারছে ছুটে পালাচ্ছে। রাস্তার মোড়ে ডিউটিরত কনস্টেবলটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়েছে। সবজিঅলা, মুরগিঅলা, মুদিঅলা, পানঅলা, সিগারেটঅলা, পিঠাঅলা, বাদামঅলা আর চানাচুরঅলারাও পালাচ্ছে।
ছুটতে ছুটতে লোকটা যখন ডাস্টবিনটার সামনে এলো, পেছন থেকে দুই চাপাতিঅলার একজন তার ঘাড়ে মারল এক কোপ। ঘাড়ে না লেগে কোপটা লাগল পিঠে। কুকুরটা তখন বটগাছের অদূরে যাত্রী ছাউনির বেঞ্চিটার তলায়। সহসা তুমুল শব্দে ঘেউ ঘেউ করতে করতে বিজলির গতিতে ছুটে এলো অকুস্থলে। তাকে ছুটে আসতে দেখে দুই চাপাতিধারীর একজন ছুট লাগাল রাস্তার উল্টোদিকে। আক্রান্তের ঘাড় লক্ষ্য করে ততক্ষণে দ্বিতীয় কোপটা চালিয়ে দিল আরেকজন। ধড়-মু-ু আলাদা হয়ে যেত, যদি না চাপাতিধারীর পা-টা কামড়ে ধরত কুকুরটা। আক্রান্ত লোকটি মুখ থুবড়ে পড়ে গেল রাস্তায়। রক্তে ভিজে যেতে লাগল তার সাদা গেঞ্জি। কুকুরের কবল থেকে ছাড়া পেতে চাপাতিটা ঘাতক চালিয়ে দিল কুকুরটার পিঠে। কিন্তু কোপটা পড়ল গিয়ে মাটিতে। পা ফসকে উপুড় হয়ে পড়ে গেল সে। চাপাতিটা ছিটকে পড়ল হাত থেকে। কুকুরটা তখন তার বুকে চড়ে বসে কামড়ে ধরল তার থুতনিটা। কুকুরটাকে এক ঝটকায় বুক থেকে সরিয়ে দ্রুত ওঠে বসল ঘাতক। এবার কুকুরটা কামড়ে ধরল তার পা। দু-হাতে ভর দিয়ে দাঁড়াল ঘাতক। তারপর দিল ছুট। কুকুরটা গলাফাটানো শব্দে ঘেউ ঘেউ করতে করতে তার পেছনে ছুটতে লাগল।
ফার্মগেট ওভারব্রিজের কাছে গিয়ে কুকুরটা থামে। ঘাতককে খোঁজে। পায় না। ওদিকে তো মানুষ আর মানুষ। ঘাতক মিশে গেছে মানুষের ভিড়ে। কুকুরটা এক ছুটে আবার আহত রক্তাক্ত লোকটার কাছে ফিরে এলো। লোকটা তখনও মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। মরেনি। পলায়নরত পথচারীরা এবার থামে। এগিয়ে আসতে থাকে অকুস্থলের দিকে। বটগাছের আড়াল থেকে কাশিরামও বেরোয়। সবজিঅলা, মুরগিঅলা, মুদিঅলা, পানঅলা, সিগারেটঅলা, পিঠাঅলা, বাদামঅলা আর চানাচুরঅলারাও এগিয়ে আসতে থাকে।
খানিকের মধ্যে আহত লোকটার চারদিকে লেগে গেল মানুষের ভিড়। এক পথচারী পকেট থেকে মোবাইল বের করে আহতের ছবি তুলে নিল ঝটপট। রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে ছুটে এলো কনস্টেবলও। তার আনকোরা পোশাক অথবা হাতের জালিবেতটা দেখে কিনা কে জানে, হঠাৎ ঘেউ ঘেউ করে উঠল কুকুরটা। কনস্টেবল বেতটা উঁচিয়ে তাকে শাসাল। তাতে আরও জোরে ঘেউ ঘেউ করতে লাগল কুকুরটা।
মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে ক্রমে। কুকুরটা তখন ডাস্টবিনের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে, পুব দিকে ফিরে, জনতার দিকে বাঁ ঠ্যাংটি উঁচু করে পেশাব করতে লাগল। ছরছর শব্দে সে মূত্রথলি খালি করতে থাকে। তার পেশাবের বেগ পেয়েছে খুব।

শ্রেণী:

নদী, শ্রাবণী ও মফস্বল বৃত্তান্ত

Posted on by 0 comment
42

আমার হঠাৎ ‘সোনারকাঠি-রূপারকাঠি’ রূপকথার রাজকন্যার কথা মনে পড়ে। রুনি যে রাজকন্যা এটা তাকে দেখলেই অনুধাবন করা যায়। কিন্তু তাই বলে সোনারকাঠি-রূপারকাঠি বদল ছাড়া তার যে ঘুমও ভাঙে নাÑ এটা কি করে সম্ভব?

42পাপড়ি রহমান: ফুটে-ওঠা-ভোর দেখতে দেখতে আমি রুনিদের বাড়িতে পৌঁছে যাই। অনেকদিন বাদে কোনো মফস্বলী-সকাল আমাকে রীতিমতো ঘোরগ্রস্ত করে ফেলেছিল। শান্ত-নীরব-সমাহিত ওই সকালের ভিতর দিয়ে আমাদের অটোরিকশা ধীরে-সুস্থে, প্রায় নিঃশব্দে চলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সেটা ছিল একেবারেই অসম্ভব। থ্রি-হুইলের ওই যান থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের মতো একটানা শব্দ সরিয়ে ফেলা যায় নি। আমি সে চেষ্টাও করিনি। বরং ধোঁয়াটে-আলোর ভিতর আমি সত্যিকার অর্থেই মফস্বলী-সকাল দেখায় মগ্ন ছিলাম। আমার এই একাগ্র-মগ্নতাকে গাঢ় করে তুলেছিল রাতের বৃষ্টিপাতে সতেজ হয়ে থাকা রাস্তাগুলো। এঁকে-বেঁকে-যাওয়া পিচঢালা কালো-রাস্তা। ধুলাবালি শূন্য ভেজা-রাস্তা। চড়াই-উৎরাই কম। কোনো কোনো রাস্তার বাঁক পেরুনোর আগেই মনে হচ্ছিল যেন কোনো নদী! নিস্তরঙ্গ-কালো-নদী। যে নদীতে ঢেউ নাই। জলের কোলাহল নেই। কোনোরকম উত্তেজনা নাই। যেন-বা কালো দুধের ওপর ঘন-কালো সর পড়ে আছে। অথচ ওই কালো রাস্তার ধারে আমি সত্যিই এক নদী বয়ে যেতে দেখেছিলাম। বিস্তৃত সেই নদী। আর শ্রাবণের নদী মানেই উন্মত্ত। যৌবন লুটিয়ে দেবার বাসনায় মঞ্জুরিত। তীব্র কামুক আহ্বানে গতি হারা।
ওই যৌবন-মত্ত-নদী বইছিল পথগুলোর ধার ঘেঁষেই। তবুও আমি মতিচ্ছন্নতায় আক্রান্ত হলাম। পূর্বরাতের বৃষ্টিজলে বাসীভাবে ভিজে-থাকা রাস্তাগুলোকেই আমার নদী বলে মনে হলো। নদীটাকে রাস্তা ভেবে আমাদের অটোরিকশা যদি ওই পথে ধাবিত হতো! কিংবা চালককেও যদি আমার মতন মতিচ্ছন্নতায় পেয়ে বসত? আর সে অটোরিকশার গতি ঘুরিয়ে দিত? তা হলে বিপদ ছিল। সর্বোচ্চ বিপদ। ভাগ্যিস, সে তা করে নাই।
কেউ অন্যের মনের-ভাবনা দেখতে পায় না। পাশাপাশি বসে বা হেঁটে বা শুয়ে থেকেও কেউ অন্যের মনোজগত দেখতে পায় না। এটা আমার ওই সময়ই মনে হয়েছিল। এবং আমি স্বস্তি পেয়েছিলাম। অবশ্য আমিও তাদের মনোজগত দেখতে পাচ্ছিলাম না। এক ধরনের স্বস্তি নিয়ে আমি তাকিয়েছিলাম রুনির দিকে। রুনি আমার ইশকুল-কালের বন্ধু। শুধু রুনি নয়, আমি অটোরিকশা-চালকের দিকেও তাকিয়েছিলাম। এমনকি রুনিদের বাড়ির কেয়ারটেকার মাহবুবের দিকেও।
মাহবুব বসেছে অটোচালকের পাশাপাশি। রুনির পূর্বপুরুষ জমিদার ছিল বিধায় এই বিভাজন। রাজা আর প্রজার সারি এক নয়। আমার পাশে বসে থাকা নীলরক্তধারী-রাজকন্যা-রুনিÑ তবে কি আমিও রাজা সারির?
এ প্রশ্ন হারিয়ে গিয়ে রুনির মনোজগত আমাকে আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু তা দেখার কোনো উপায়ই আমার জানা ছিল না।
পেছনের সিটে আমি আর রুনি পাশাপাশি। সামনে মাহবুব আর চালক পাশাপাশি। আমাদের চারজনের মাঝে কোনো কাপড়ের পর্দা টানা নাই। চালক আর যাত্রীর বিভাজন স্টিলের গরাদ দিয়ে। যা দেখলেই চোর আর পুলিশের কথা মনে পড়ে। কে এখানে পুলিশ আর কে চোর? উত্তর যা-ই হোক আমরা এখানে কেউ কারও মন পড়তে পারছি না। অথচ চারজনের গন্তব্য একই দিকে।
মাহবুব আমাদের রিসিভ করার জন্য বাস-টার্মিনালে ছিল। পূর্বরাতের ঝড়-জলে সেও হয়তো ভিজেছিল। তাই যদি না-হবে জলের ছিটেফোঁটা কেন তার শরীরে লেগে আছে?
মাহবুব যখন বাসের পেট থেকে আমাদের লাগেজ টেনে আনে, আমি জলচিহ্ন দেখছিলাম। তার পরনের প্যান্টের পায়ের অংশটা ভেজা। পায়ের স্যান্ডেলটাও ভেজা-মলিন দেখাচ্ছিল। এসব নিশ্চয়ই বৃষ্টিপাতের বাসীজলের কারবার।
তখনও আমরা অটোতে চড়ি নাই। আর নদীর সাক্ষাৎ পাই নাই। পেলে হয়তো আমি অন্যকিছু ভাবতাম। রাস্তার বদলে মাহবুবকে না ঠিক মাহবুব নয়, মাহবুবের পায়ের পাতাগুলোকেই আমার নদী মনে হতে পারত। অথচ আমি দিব্যি দেখেছিলাম কালো-পায়ের-পাতায় টলটলে-জল!
কোনো কোনো মানুষের জল-ভেজা-পা শাপলা-ফুলের মতো দেখায়। সতেজ ও পবিত্র। সুগন্ধিযুক্ত। সব শাপলায় তেমন সুগন্ধ থাকে না। যে শাপলাফুল তারাকৃতি হয় তাতে সুগন্ধ বেশি থাকে। আর যেসব শাপলারা ভোর-ভোর ফুটে ওঠে। রোদ্দুরের সামান্য কিরণেই মেলে-রাখা পাপড়িগুলো গুটিয়ে ফেলে। অথচ ফুটন্ত অবস্থায় জলের ঢেউদের হালকা-সুবাসে আমোদিত করে রাখে। ওই ফুলের আমি মনে মনে নাম দিয়েছি তারাশাপলা। লাগেজ-টানার-সময় মাহবুবের ভেজা-পা দেখে আমার তারাশাপলার কথা মনে পড়েছিল। হতে পারে মফস্বলী-ভোরের-শ্রী আর নীরবতায় আমি মুগ্ধ ছিলাম। ফলে আমার ভাবনায় ফুল-পাখি-প্রজাপতিরা উড়ে এসেছিল।
অটো এসে থামে রুনিদের বাড়ির গেটে। আমি আর রুনি নামি। মাহবুব ফের লাগেজ টানে অথবা ভাড়া মেটায়। আমাদের সামনের বদ্ধ গেট হঠাৎ খুলে যায়। আমি বুঝতে পারি না কে খুলল গেট? না-কি আগেই খোলা ছিল? আমি তখন নদী-রাস্তা-তারাশাপলার বিভ্রান্তিতে। অথবা পদযুগলের ঘাপলায়। মাহবুব তখনও অটোর ভাড়া মেটায়।
বাড়ির ভিতর পা দিয়েই আমার মনে পড়ে যায় আলিবাবা আর চল্লিশ চোর। সেই মন্ত্র চিচিং-ফাঁক। রুনি তো চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল, তা হলে গেটটা খুলল কে? না-কি প্রায় মুখস্থ হয়ে যাওয়া মন্ত্রটি আমিই আওড়ে ছিলাম? কিন্তু রুনিদের বাড়িতে এই প্রথমবার এলাম আমিÑ ওদের মন্ত্র আমি কীভাবে জানব?
নদী আর জল-ভেজা-পথ, তারাশাপলার সৌরভ, বৃষ্টি¯œাত-পদযুগলের মতো ফের আমি রহস্যের ভিতর তালগোল পাকাই।
যাবতীয় বদ্ধ-দুয়ার খোলার-মন্ত্র কী একই না-কি? চিচিং ফাঁক!
গেটের ভিতরে এক টুকরো লন। তাতে বিছিয়ে থাকা সবুজ-ঘাস সাদাটে দেখায়। সকালের আলো এখনও ম্লান। সূর্যের শিশুদাঁত সবে হেসেছে। হয়তো ঘাসেদের রং বদলানো এই আলোতেই সহজ। কিন্তু আমি এগিয়ে গিয়ে দেখি ঘাসের রং সাদাটে অন্য কারণে। অজস্র পাকা-জামরুল ঘাসের ওপর বিছিয়ে রয়েছে। বাঁদুরের দঙ্গল রাতভর খাওয়া-আধাখাওয়া-আস্ত জামরুল এন্তার ফেলেছে।
লন পেরিয়ে ঘরের দরোজায় যেতে যেতে আলো যেন প্রায় নিভে আসে। মেঘ করলো না-কি ফের? ভেবে আমি ওপরে তাকাই। এক বিশাল বৃক্ষপাতা ঢেলে দাঁড়িয়ে আছে। সেও ফলবতী। এই বৃক্ষ আমি চিনিÑ বিলম্বী!
জামরুল আর বিলম্বীর সাথে ঝুলে আছে কামরাঙা। ঘরের দরোজা সাদা-রঙে-ডুবানো। এবং এই দরোজাও পূর্ববৎ খুলে গেলে আমার ফের মনে পড়েÑ
চিচিং ফাঁক!
খুব অনায়াসে ঘরে প্রবেশ করি আমি। ২০০ বছরের প্রাচীন এক গৃহ। সময় ও ধূলিতে অনুজ্জ্বল-হয়ে-পড়া আসবাবে পরিপূর্ণ!
পারস্য-গালিচার ওপর আলবোলার নল হাতে বসে আছে সুন্দরী-নর্তকী। ওই সালংকারা নর্তকী যেন এক্ষুণি গেয়ে উঠবেÑ পিয়া ঘর আনা। ঝাড়বাতির আলোতে ঝলসে উঠবে তার পরনের ঘাঘরা। ঝমঝমিয়ে বেজে উঠবে পায়ের ঘুঙুর। নৃত্যের তালে-তালে খুলে যাবে নাকের কুন্দনের নথ। আর ঝরে পড়বে খোঁপার তাজাফুল। অথবা ফুলেদের পাপড়ি।

০২
তরজার বেড়ার ঘরে টিনের চৌচালা। সবই সাদা রঙে ডুবানো। সুরকি আর চুনের গুঁড়ার মিশ্রণের ওপর নিপুণভাবে প্রলেপ দেওয়া। ফলে বাইরের উত্তাপ ঘরের ভিতরে কম প্রবেশ করে। চৌচালা-চালের কড়ি-বরগা অনেক উঁচুতে উঠে টিনের আচ্ছাদন নিয়েছে। ওপর থেকে নেমে আসা ভাঁপ-তাপও উঁচুতেই ঝুলে থাকে। প্রায় মরচে-ধরা বৈদ্যুতিক পাখার হাওয়ায় ওই ভাঁপ-তাপ মেঝেতে নামাতে পারে না। মেঝের ওপর প্লাস্টিক-ম্যাট বিছানো। বিবর্ণ-রং ও ভঙ্গুর-চেহারা আড়াল করার প্রয়াস। কিংবা হতে পারে প্রাচীন-জীবনকে নতুনের সাথে একাকার করে রাখা।
মোদ্দাকথা ঘরটা বেশ প্রশস্ত ও আরামদায়ক। এবং আমার পছন্দ হয়ে গেল। বহু পুরাতন আমলের খাট, তাতে নরম বিছানা। খাটের পাশ দিয়ে পার্সিয়ান খাটপোষ পেতে রাখা।
রুনি আর আমার একই বিছানা। যদিও আমি শোওয়া-শোওয়ি শেয়ার করতে পারি না; কিন্তু রুনির বাড়িতে এসে মেনে নিলাম। এর কারণও পেয়ে গেলামÑ এক. এই বাড়িতে দ্বিতীয় কোনো শোবার ঘর নাই। পেছনের ঘরগুলো কেয়ারটেকার মাহবুবের দখলে। দুই. রুনি এতটাই গুটিয়ে-শুটিয়ে ঘুমায় যে, আমার পাশে কেউ ঘুমাচ্ছে এটা বুঝা যায় না। এটা রুনির অভ্যাস না আভিজাত্য ঠিক ধরতে পারলাম না। অবশ্য অভ্যাসই কালক্রমে আভিজাত্যের অংশ হয়ে ওঠে।
খাটের পায়ের দিকে দেয়াল-ঘেঁষে ড্রেসিং-টেবিল। আর বহু পুরাতন কয়েকটা সোফা এদিক-সেদিক পেতে রাখা। সোফার গদিগুলো খটখটে। দুইটা পুরাতন স্টিলের-দেরাজ। এরাও সাদা রঙে ভরপুর।
মাহবুবের বউ তফুরার সারাক্ষণ তদারকিতে আমাদের দীর্ঘ-পথের ক্লান্তি উবে গেল। এই দম্পতির চারজন ছেলেমেয়ে। বড় মেয়েটার বয়স তের কি চৌদ্দ। নাম মাহি। বয়সের তুলনায় বাড়ন্ত গড়ন। আমার আর রুনির ফুটফরমায়েশের জন্য মাহি ছায়ার মতো লেগে রইল।
খাটের ওপর ঝকঝকে বিছানা। বালিশ-চাদর-বেডকভার। এত ঝাড়া-মোছা সত্ত্বেও ঘর থেকে পুরাতনী গন্ধটা বিলীন হয় নাই।
পারস্য-গালিচার ওপর স্থির বসে-থাকা নারীটির দিকে তাকিয়েও আমি তেমনই ভেবেছি। ধুলা পড়ে ওই নারীটির চেহারাও যেন ধুলাকার হয়ে গেছে। প্রাচীন-ঘর, আসবাব, কুশন-কভার, ঝালর-দেয়া-পর্দা। অথবা বেডকভার জুড়ে সময়ের-ধূলি-পড়া আবছা-গন্ধ! যা আমাকে নতুন কোনো অভিজ্ঞতার ভিতর ছুড়ে ফেলছিল। রুনি আমার মনোভাব বুঝার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তার সম্মুখে আমি ছিলাম নির্বিকার।
আমাদের শোবার ঘরের ভিতরেই বাথরুম। বেশ বড়সড়। প্রাচীন আমলের কমোড। ¯œানের জন্য চৌকোণাকৃতি জায়গা। তাতে জল আটকানোর ব্যবস্থা। একপাশে পুরাতনী বেসিন। বেসিনের ভেতরটা গভীর। রীতিমতো কুঁজো হয়ে মুখ ধুতে হয়। মরচে-ধরা জলকল। ও থেকে কীভাবে জল বেরোয়? আমি বিস্মিত হই।
তফুরা বেশ পরিশ্রমী। বেডকভার তুলে বিছানা ভালো করে ঝেড়েমুছে দেয়। ক্লান্তিতে আমি শুয়ে পড়ি। বিছানায় শুয়ে ওপরে তাকালে দেখিÑ চালটা যে টিনের তা বুঝার উপায় নাই। সাদা-মোটা-কাগজ দিয়ে পুরো ঘরটাই আবৃত। ঘুমের ভিতর ঢুকতে-ঢুকতে আমার মনে হয়Ñ টাঙানো কোনো সাদা-তাঁবুর তলায় শান্ত-¯িœগ্ধ-বিছানায় আমরা ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছি।
হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে যায়। এখন রাত কত? আমি বুঝতে পারি না। ঘরের ভিতর কালো-জালের-মতো অন্ধকার ছড়িয়ে রয়েছে। নতুন জায়গা বলে আমি পূর্ব-পশ্চিমও বুঝতে পারি না। কিন্তু এটুকু বুঝতে পারিÑ রুনি অঘোরে ঘুমুচ্ছে। ওর আপাদমস্তক কোনো কিছুতে ঢেকে রাখা। ফলে ও নারী না পুরুষ সেটিও অনুমান করার উপায় নাই।
তীব্র অন্ধকার খানিকটা চোখে সয়ে এলে আমি ফের রুনির দিকে তাকাই। ওর কোনো নড়াচড়া নাই। যেন কোনো শবদেহ পাশে শুয়ে আছে।
শবদেহ পাশে নিয়েই আমি হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়ার কারণ খুঁজি। কিন্তু কিছুই স্পষ্ট করে মনে করতে পারি না। তবুও এটা খেয়াল হয় যে, কোনো বিকট শব্দেই আমার ঘুম ভেঙেছে। এবং এটা ভাবার পরক্ষণেই আমি ফের ধুমধাম আওয়াজ শুনতে পাই। কিসের শব্দ বুঝতে পারি না। কিন্তু এটা বুঝতে পারি ঘরের চাল বেয়ে শব্দ নিচে নামছে। ভয়ে আমি কানের ওপর বালিশ চেপে ধরি। কিন্তু আরও জোরে শব্দ হতে থাকে।
গহীন-অন্ধকারের ভিতর শুয়ে-শুয়ে আমি শব্দ এড়ানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করি। এতকিছুর পরও রুনির ঘুম ভাঙে না। সে মৃতবৎ শুয়ে থাকে। আর আমি ভয়ের ভিতর সমর্পিত থাকি। আমার সমস্ত শরীর কুলকুল ঘামে ভিজে ওঠে। আমিও কি তবে রুনির মতো মারা যাচ্ছি?
ওই অন্ধকার রাত্রি কখন যে ভোরের দরজা খুলে দেয়Ñ আমি টের পাই না। বেশ বেলায় ঘুম ভাঙলে দেখি রুনি তখনও মরে আছে। ফের বিকট শব্দ হয়। এবং আমার অতি কাছেই। আমি তাকিয়ে দেখি এক বিড়াল।
বিড়াল আমার কাছে চিরকাল ভয়ের উৎস। ছোটকালেই আমরা জানতাম, বিড়াল শতরূপী হয়। যাকে বিড়াল মনে করছি সে আদতে অন্যকিছু। বিড়ালের বেশ ধরে এসেছে। সদ্য দেখা-পাওয়া বিড়ালের সঙ্গে আমার আই কনট্যাক্ট হয়। সে চোখ সরায় না। আমিও চোখ সরাই না। সে কি বিড়াল না বাঘ? তার গায়ে ঘিয়ে আর হলদে ডোরা। আর সে বেশ স্বাস্থ্যবান।
এই ঘরের দরোজা-জানালা সব বন্ধÑ সে ঢুকলো কীভাবে? কিন্তু সে যেমনি এসেছিল তেমনই হাওয়া হয়ে যায়। দিনের আলোতেও আমি ফের ভয় পেতে থাকি।
আমার অ্যালান পোর বিড়ালের কথা মনে পড়ে। আশ্চর্য! ভীতু মনে কত কী যে উদয় হয়। বিদেশি ওই বিড়ালের সঙ্গে বাংলাদেশি বিড়ালকে তুলনা করার কোনো মানে আছে?
বিড়ালটা কখন জানি হাওয়া হয়ে যায়। আর রুনি সামান্য নড়ে ওঠে। গ্রীষ্মকালে সামান্য হাওয়া বইলে নিমপাতা যেভাবে নড়ে ওঠেÑ সেভাবে। আচ্ছা, রুনি কি বিছানায় শোয়ামাত্রই মরে যায়? আর রোদ্দুর চড়তা হলে জীবন ফিরে পায়?
আমার হঠাৎ ‘সোনারকাঠি-রূপারকাঠি’ রূপকথার রাজকন্যার কথা মনে পড়ে। রুনি যে রাজকন্যা এটা তাকে দেখলেই অনুধাবন করা যায়। কিন্তু তাই বলে সোনারকাঠি-রূপারকাঠি বদল ছাড়া তার যে ঘুমও ভাঙে নাÑ এটা কি করে সম্ভব?
রুনি কথা বলে ওঠেÑ ‘কি রেÑ যা ঘুমাইলি রাতভর। একটুও নড়িস নাই।’
শুনে আমি অবাক হয়ে যাই।
আমি যেমন গত রাতে রুনিকে মরে যেতে দেখেছি, সেও কি আমাকে তেমনই দেখেছে?
বাথরুমে ঢুকে আমি দরজা বন্ধ করি। এতে করে রুনি ঘরের ভিতর আটকা পড়ে যায়। এ ঘরের বাসিন্দাদের কেউ বাথরুমে গেলে এভাবেই যেতে হয়। তফুরা যে দরজা দিয়ে ঢুকবে সেটাও বন্ধ রয়েছে।
পুরাতন মডেলের কমোড। পুরাতন কল। এমনকি কলের তলায় পেতে রাখা বদনাটাও বহু পুরাতন। রং-জ্বলা-নিষ্প্রভ। আমার বামপাশের দেয়ালে একটা ক্যালেন্ডার ঝুলছে। জুলাই মাস, ১৯৯৫। আমি চমকে উঠি। জুলাই মাস! তার মানে গত ২০ বছরে এই বাড়িতে কোনো নতুন বছর ঢুকে নাই।
এই বাড়িতে কেউ থাকে না তেমন তো নয়! মাহবুব আর তফুরা বাস করে। ওদের বাচ্চাকাচ্চা। বিদেশ থেকে রুনি আসে। ওর বোন ও ভাইও আসে। তা হলে ১৯৯৫ সাল কেন বাথরুমে ঝুলে আছে? এসব ভাবনার ভিতর আমি কল ছাড়ি। দীর্ঘকাল পর জলের সরু ধারা নামে। আয়রনের আধিক্য হেতু কফিরঙা জল। নাকি রক্ত! আমার শরীর হিম হয়ে আসে। আমি তড়িঘড়ি বদনা হাতে নিতেই ভয়ে কেঁপে উঠি। ধাতব স্পর্শের বদলে নরম ও কোমল অনুভূতিÑ একটা ডোরকাটা বিড়াল শুয়ে আছে। আর আমি তার পিঠে হাত রেখেছি!
০৩
রুনিদের প্রাচীন ঘরটার জানালা গলিয়ে দুদ্দাড় করে মেঘ ঢুকে পড়ে। ফলে ঘরের ভিতরটা ধোঁয়া-ধোঁয়া আর শীতল। বাতি-না জ্বালানো পর্যন্ত কিছুই স্পষ্ট দেখা যায় না। ওই মেঘকক্ষের ভিতর আমি চুপচাপ বসে থাকি। জানালার বাইরের অবিশ্রাম বৃষ্টি আমাকে অবাক করে দেয়। এই শহরে বড় অদ্ভুতভাবে জল ঝরে।
ঝরছে তো ঝরছেই। অক্লান্ত এই ঝরে পড়া। জামরুলগুলো জলে ভিজে টসটসা। পাতাগুলো জলমগ্ন। বিলম্বী গাছটাও অবিরাম ভিজছে। ভিজতে ভিজতে তার বাকল কালচে হয়ে উঠেছে। জলের ঝাপটায় ভিজে একসা কামরাঙা গাছটি। এন্তার বেগুনি-বর্ণ-ফুল ভেসে যাচ্ছে বৃষ্টি-¯্রােতে। বৃষ্টির প্রবহমান জলে ফুলরাশি ভাসতে দেখে আমার নদীর কথা মনে পড়ে। ফুলনদী! আহা! জলধারা ক্ষীণ হলেও এ তো নদী-ই। ফুলনদীÑ নইলে এত ফুল এর জলে ভেসে যায় কেন?
তুমুল তুফান আর বৃষ্টি। প্রচ- ঝড়ো-হাওয়া। আসমান ভেঙে পড়ছে জলধারা। থইথই শ্রাবণে আমি গৃহবন্দি। অটোরিকশায় আসার পথে নদীতে আমি জল উথলে উঠতে দেখেছিলাম। জল-ভরন্ত নদী আমাকে বলে দিয়েছিল ভরা-শাওন। নইলে ওই নদীকে অমন সোমত্ত দেখাত না! ভরা-বর্ষার সমস্ত চিহ্নই ফুটে রয়েছে এই শহরে। মাহবুবের জল-ভেজা-পা আর পিচরাস্তার ওপর গড়িয়ে যাওয়া বৃষ্টির দাগ।
রুনিদের জানলায় বসলেই আমি যেন ওই নদীটাকে দেখতে পাই। টিনের-চালে বৃষ্টির-ফোঁটা সংগীত-মুখর হয়ে ওঠে। জল-কণারা জানালার ফিনফিন পর্দায় মুক্তদানার মতো ঝুলে থাকে। মেঘ-থমথমে ঘরের ভিতর আমি হঠাৎ আরও দুটো দেরাজ দেখতে পাই। সাদা-রঙে-চুবানো। এই দুটো কেন আগে দেখিনি?
তফুরাকে জিজ্ঞেস করলে বলেÑ ‘খালাম্মা, এইহানে তো পানির পাম্প।’
ঘরের ভিতর পানির পাম্প! হতেই পারে। ২০০ বৎসর পূর্বে পানির পাম্প ঘরে রাখাই স্বাভাবিক।
ওই দিনও আমি রাতভর ঘুমাতে পারি না। বিদঘুটে শব্দরা আমাকে জাগিয়ে রাখে। হয়তো অ্যালান পোর বিড়ালেরা দলবেঁধে আসে। রুনির শবদেহ তেমনই নিঃসাড়। ভোরের দিকে তন্দ্রার ভিতর থেকে আমি হঠাৎ জেগে উঠে।
খাটের পাশে ড্রেসিং টেবিলের ওপর সুরকি-চুন-বালি আর কাঠের টুকরা ধসে পড়েছে। আমি অবাক হয়ে দেখিÑ ওই সুরকি আর চুনের স্তূপের নিচে এক বিড়াল লেজ নাড়ছে। কালো আর শাদাতে ডোরাকাটা। এই বিড়ালটিকে আমি আগে দেখিনি। তফুরা ছুটে আসে। মাহবুবও। ওদের মেয়ে মাহি। ওরা ভয়ার্ত মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। আমি ওদের চুপসানো মুখাবয়ব দেখি। ঘরের চাল দেখি। তাঁবুর মতো করে টানিয়ে দেয়া মোটা-কাগজটা একদিকে ঝুলে পড়েছে। হয়তো ওই পথেই সুরকি-চুন-বালি-কাঠের স্তূপ নেমেছে।
রুনিকে বিড়াল দেখার কথা বলতেই ও হা হা করে হেসে ওঠে।
‘এটা বিড়ালের কাজ। ঘরের চাল ভেঙে এই চুন-সুরকি-বিড়ালই ফেলেছে।’
বিড়াল কীভাবে অত উঁচু থেকে পড়ার পরও বেঁচে থাকে? আমার বোধগম্য হয় না। রুনিকে বলতেই সে বলেÑ
‘কি যে বলিস না! বিড়ালের হাড্ডি। ওরা সহজে মরে না।’
ওই ভাঙা-আবর্জনাতে আমি সিমেন্টের প্লাস্টারের অংশও দেখেছি। যদি ওসবই আমার বা রুনির মাথার ওপর পড়ত?
তফুরা আর মাহি ওইসব ধস ঝাঁট দিয়ে তুলে নিয়ে যায়। আমি হঠাৎ তাকিয়ে দেখি তফুরার পা-দুটো ভেজা-ভেজা দেখাচ্ছে। যেন সে এক্ষুণি পা ধুয়ে এসেছে।
তফুরার পদযুগলকে তারা-শাপলার মতো দেখায়। আমার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় আবছা-সুঘ্রাণ পাই।
ওই দিনের দুর্ঘটনার পর আমি রুনিদের বাড়ির সর্বত্র বিড়াল দেখি। যখন ডাইনিংয়ে খেতে বসি আমার পায়ের কাছে বিড়াল চলাফেরা করে। বাঘের মতো ডোরাকাটা বিড়াল। তফুরা উঁকিঝুঁকি দিয়ে বলেÑ
‘কই খালাম্মাÑবিড়ালউড়াল কিচ্ছু নাই।’
শ্রাবণ-মাসের বৃষ্টি ফের ঘন হয়ে নামে। বৃষ্টির পর্দা ভেদ করে আমি বিলম্বী গাছটাকেও আর দেখতে পাই না। এমনকি জামরুলের পত্র-শাখাও অস্পষ্ট দেখায়।
মেঘের বড়সড় চাঙর ঝুলে থাকে রুনিদের জানালায়। সেই ধূপছায়া রঙের ভিতর দিয়ে আমি আলোর ছিটেফোঁটাও দেখি না।
টিনের চালে ছোট-বড় নানারকম ফোঁটায় বৃষ্টির সংগীত বেজে চলে। আর মেঘের শরীরে মেঘ ঘনায়। বিজলী চমকালে আমি দেখি, রুনিদের চাল থেকে চুন-সুরকি-কাঠের টুকরা খুলে পড়ছে। চুন-সুরকির স্তূপ জমে ওঠে। আর সেখান থেকে এক বিড়াল মুখ বের করে ডেকে ওঠে!
গাছপালা-বাড়িঘর যাবতীয় কাঁপিয়ে কাছেপিঠেই কোথাও বাজ পড়ে। কিন্তু ওই বিড়াল আমাকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রাখে যে, আমি অন্যদিকে মনোযোগী হই না। ফলে রুনিদের প্রাচীন ঘরটা ধসে পড়ার শব্দও আমার কানে আসে না। হয়তো ওটা বাজ পড়ার শব্দও হতে পারে।
ঝড়ো-হাওয়া প্রচ- দাপট নিয়ে মেঘেদের ঘনঘন ডেকে আনে আর বিজলী চমকায় দুই চক্ষু অন্ধ করে দিয়ে। আমি রুনিকে ডাকার চেষ্টা করি; কিন্তু পারি না। আমার গলা ফুটে কোনো শব্দ বেরোয় না। আমি শুধু অনুভব করি, পানির পাম্প দিয়ে অসংখ্য বিড়াল ওঠানামা করছে। আর বিড়ালদের পদশব্দে একটা প্রাচীন বাড়ি ভেঙে পড়ছে।
আমার হঠাৎ মনে পড়েÑ আমি বিড়ালদের নিয়ে না-ভেবে ওই নদী নিয়ে ভাবতে পারতাম। রুনিদের বাড়িতে আসার সময় যে বরফ-গলা-নদী দেখেছিলাম। আদতে ওটা ছিল একটা সংকেত। আর নদীটা ছিল মুক্তিযুদ্ধে শহীদ লেখক জহির রায়হানের নদী। আমি যদি একবার ওই নদীর কথা রুনিকে বলতাম। মাত্র একবার! ‘বরফ গলা নদীর’ দৃশ্যাবলি নিয়েও যদি একটিবার কথা বলতাম দুজন! তা হলে হয়তো এই ঝড়-জলের তা-ব আমরা এড়াতে পারতাম। আমাদের নিশ্চিত অথচ অপঘাত-মৃত্যুও হয়তো আটকাতে পারতাম। দুঃখের বিষয়, বিদেশি বিড়ালদের নিয়ে আমরা এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে, ওই নদীর কথা একেবারেই স্মরণ হয় নাই।
ফের তুমুল ঝড় আর বৃষ্টিতে আক্রান্ত হলে আমার আর রুনির যুগপৎ মনে পড়েÑ নদীটার নাম ছিল ‘বরফ গলা নদী’। মফস্বলের নদীগুলোর এমন আজগুবি নামই হয়!

শ্রেণী:

ঘাস কবুতর ও শেখ মুজিব

41

41ইমরুল ইউসুফ : সিঁড়ি বেয়ে রক্ত গড়াতে গড়াতে সবুজ ঘাসের গোড়ায় জমা হতে থাকে। কিন্তু এক জায়গায় বেশিক্ষণ থেমে থাকে না। রক্ত গড়াতে থাকে। ঘাসের গোড়ায় গোড়ায় জড়িয়ে যেতে থাকে রক্ত। ঘাসগুলো তখন কেমন জানি অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। দম বন্ধ হয়ে যেতে লাগল। গড়িয়ে আসা জিনিসটি কেমন জানি ভারী ভারী। আঠা আঠা, চটচটে। রংটাও কেমন জানি। খুবই অচেনা। আগে কখনও এমন কিছু গড়িয়ে ঘাসের গোড়ায় যায় নি। ঘাসের ওপরে পড়েনি। ঘাস চেনে পানি। সেই পানি তরল, নরম, রংহীন। কিন্তু কী যে শক্তি সেই পানিতে। পানির ছোঁয়া পেয়েই ঘাসগুলো তরতাজা হয়ে ওঠে। আনন্দে মাথা উঁচিয়ে উঁচিয়ে আকাশ দেখতে থাকে। বাতাসের ছোঁয়া পেতে থাকে। দুলতে থাকে দোলকের মতো।
একটি কবুতর পেখম মেলে দুলতে দুলতে নিচে নেমে আসে। দেখে লাল রঙের কিছু একটা গড়িয়ে আসছে তার দিকে। দূর থেকে অনেকটা সাপের মতো দেখা যাচ্ছে। ওটা কি সাপ? না! তারপরও কবুতরটি এক পা দু পা করে পিছন দিকে পেছাতে থাকে। আর রক্তের ধারা এগিয়ে যেতে থাকে তার দিকে। এখন মুখোমুখি রক্তের ধারা ও কবুতর। কবুতরটি বাকবাকুম করে ডাকতে থাকে। উড়ে উড়ে সেখানে ঘুরতে থাকে। দেখতে থাকে রক্তের বয়ে যাওয়া। কোথায় যাচ্ছে রক্ত? এই মুহূর্তে কী করা উচিত কবুতরটি ভেবে পায় না। শুধু উড়তে থাকে।
উড়তে উড়তে বসে একটি গাছের ডালে। ওটাকে গাছের ডাল বলা যাবে না। বলা ভালো পাতা। কবুতরটি একটি পেঁপে গাছে বসেছে। গাছটি তার অতি প্রিয় একজন মানুষের লাগানো। মানুষটি অসম্ভব পেঁপে ভক্ত। সকালের নাস্তায় পাতলা রুটির সঙ্গে পাঁচফোড়ন দেওয়া পেঁপের সবজি। আর কিছুই লাগে না তার। আর পাকা পেঁপে তার কাছে অমৃত। এজন্য বাড়ির দেয়ালের পাশ দিয়ে তিনি অনেক পেঁপে গাছ লাগিয়েছেন। শুধু কি পেঁপে গাছ। কত গাছ যে তিনি লাগিয়েছেন তার কোনো হিসাব নেই। ফলের গাছ। ফুলের গাছ। ঔষধি গাছ। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কবুতরটি বঙ্গবন্ধুকে ভীষণ পছন্দ করে। শুধু কি ওই কবুতরটি? না, এই বাড়ির প্রত্যেকটি কবুতরের কাছে তিনি খুব প্রিয় একজন মানুষ। প্রত্যেকটি গাছের কাছেও তিনি অতি প্রিয়।
কবুতর দলের প্রিয় মানুষটি এখনই আসবেন। হাত উঁচিয়ে ছিটিয়ে দেবেন খাবার। তিনি মোটা ফ্রেমের চশমার ভিতর দিয়ে দেখতে থাকবেন কবুতরদের খাবার দৃশ্য। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে একে অপরের গায়ে মুখ ঘষে নেওয়ার দৃশ্য। একজোড়া কপোতের ডিগবাজি খাওয়ার প্রতিযোগিতা। কিংবা কান পেতে শুনবেন বাকবাকুম বাকবাকুম ডাক। কবুতরগুলো ভীষণ অস্থির হয়ে উঠেছে মানুষটির জন্য। একে অপরের দিকে তাকিয়ে ডাকাডাকি করছে। কবুতরের খোপের মধ্য দিয়ে মুখ বাড়িয়ে তাকাচ্ছে এদিক-ওদিক। কই, তিনি তো আসছেন না। একটি কবুতর বলল, আসবেন। এখনই আসবেন। কেবল তো ভোর হলো। ওনার হয়তো এখনও ঘুমই ভাঙেনি। ঘুম ভাঙলেই তিনি আমাদের কাছে আসবেন। খাবার দেবেন।
সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও কেউ তাদের খাবার দিতে আসে না। বাড়তে থাকে কবুতরদের অস্থিরতা। ক্ষুধায় পেট চো চো করতে থাকে। আর সহ্য করতে না পেরে প্রায় সব কবুতর ওড়াউড়ি শুরু করে। খাবার খুঁজতে থাকে। সেই সাথে খুঁজতে থাকে প্রিয় মানুষটিকে। কিন্তু না, কোথাও নেই প্রিয় সেই মানুষটি। তিনতলা বাড়ির আশপাশে একজনও চেনা মানুষ নেই। সবাই তাদের কাছে অচেনা। সবার পরনে কালো পোশাক। হাতে অস্ত্র। মানুষগুলো এখানে দাঁড়িয়ে কী করে? একটি কবুতর বলে, আরে চল চল আর দেখতে হবে না। দেখছিস না ওদের হতে অস্ত্র। ওই অস্ত্রের একটি ফায়ারই যথেষ্ট। আমাদের আর বাঁচতে হবে না। এই কথা বলেই কবুতর দল বাড়ির পিছন দিকটায় চলে যায়।
বাড়ির ঠিক পিছন দিকটায় একটি রান্নাঘর। কবুতরের ঘরটি ঠিক ওই রান্নাঘরের পাশেই। কবুতরাগুলো ভাবেÑ ওই রান্নাঘরে যদি ঢোকা যেত তা হলে কিছু না কিছু খাবার পাওয়া যেত। এই ভেবে কবুতরগুলো উড়ে রান্নাঘরের দরজার সামনে আসে। দেখে দরজা বন্ধ। কবুতরগুলো হতাশ হয়ে সামনের দিকে হাঁটতে থাকে। সামনে একটু এগিয়ে ডান হাতে গাড়ি রাখার ঘর। এর ঠিক বাম হাতে চিকন রাস্তা। ওই রাস্তা ধরে সোজা সামনের দিকে পা বাড়ালে বাইরে বের হওয়ার পথ। রাস্তার দুপাশে সবুজ লকলকে ঘাস। বিভিন্ন ফুলের গাছ। কবুতরগুলো ঘাসের মধ্যে খাবার খুঁজতে থাকে। দু-একটি দানা খুঁজে পেয়ে তাদের সেকি আনন্দ!
এই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। একটি কবুতর এমনভাবে বিকট শব্দ করে ওঠে যে বাকি সবাই ভয় পেয়ে যায়। ওড়াউড়ি শুরু করে। বলে, এখানেও রক্ত! বাড়ির চারদিকে এত রক্ত কেন? লাল লাল খাবলা খাবলা রক্ত। বেশ কিছু সময় আগে যে রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছিল সব। সেই রক্তের ধারা থেমে গেছে এখন। একটি কবুতর বলে, এটি আমি সেই সকালে বাড়ির সামনের দিকে দেখেছি। এখানেও দেখছি সেই রক্ত। কিন্তু জমাট বাঁধা। এমন অবস্থা দেখে কবুতরগুলো ভয়ে উড়ে আরেটু সামনের দিকে যায়। দেখে আরও কিছু অচেনা মানুষ। তারা একজন দুজন তিনজন… অনেক মৃত মানুষকে বাড়ির ভিতর থেকে টেনে টেনে বের করছে। সবার শরীরে রক্ত। কাপড় রক্তে ভিজে জবজব করছে। চেহারা বিকৃত, মলিন। তবে ভীষণ শান্ত। এর মধ্যে একজন মানুষকে তাদের খুব চেনা। সেই সকাল থেকে এই মানুষটিকেই তারা খুঁজছে। কিন্তু মানুষটা যে শুয়ে আছেন। এই মানুষটিকে তারা কখনই শুয়ে থাকতে দেখে নি। তার সমস্ত শরীর ভিজে গেছে রক্তে। পরনের সাদা-কালো চেকের লুঙ্গি। গায়ের সাদা গেঞ্জি ও পাঞ্জাবি। কালো রঙের সিগারেটের পাইপ, দিয়াশলাই। সবই রক্তে ভেজা।
এমন দৃশ্য দেখে কবুতরগুলোর চোখও ভিজে ওঠে। চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। এগিয়ে যেতে থাকে বঙ্গবন্ধুর দিকে। কিন্তু অচেনা সেই মানুষগুলো তাদের সামনের দিকে যেতে দেয় না। হাত পা ছুড়ে, বন্দুকের নল উঁচিয়ে হই হই করে তাড়িয়ে দেয়। তারা বেশি দূরে যায় না। গাছের ডালে বসে দেখতে থাকে। শান্ত সৌম্য ওই মানুষটির বাম হাতটা বুকের ওপর ভাঁজ করা। ১৮টি গুলির আঘাতে তার বুক, পেট, পা, হাত ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। একটি গুলি লেগেছে তার মাথার ঠিক পিছনে। ৯টি গুলি চক্রাকারে বিদ্ধ হয়েছে বুকের ঠিক নিচে। একটি বুলেট ডান হাতে তর্জনীতে লাগার ফলে আঙুলটি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে চামড়ার সাথে ঝুলে আছে। লম্বা চওড়া ওই মানুষটিকে নিয়েই সবাই যেন একটু বেশি ব্যস্ত। সবার চোখে-মুখে ভয়। যেন মৃত এই মানুষটি এখনই উঠে দাঁড়াবে। হুঙ্কার দিয়ে বলবে, এখানে কী চাও?
মৃত ওই মানুটিকে নিয়ে কিসের এত ভয় ওদের? আসলে কী চায় তারা। বোধহয় বঙ্গবন্ধুকে লুকিয়ে রাখতে চায়। এখান থেকে সরিয়ে দূরে কোথাও নিয়ে যেতে চায়। তা না হলে বড় একটি বাক্স আনা হলো কেন? ভাবতে থাকে কবুতরগুলো। দেখে ওই বাক্সের মধ্যে তাদের প্রিয় মানুষটিকে রাখার চেষ্টা হচ্ছে। সাত-আটজন মানুষ কিছুতেই যেন লাশটি বাক্সে তুলতে পারছে না। লাশটি কেবলই তাদের হাত থেকে সরে সরে যাচ্ছে। একবার মাথার দিকটি ঝুলে যাচ্ছে। আরেকবার ঝুলে যাচ্ছে মাজার দিকটি। আবার কখনও পায়ের দিকটি। একটি দেশের জন্মদাতার লাশ তো একটু ভারীই হবে। অনেক কষ্টে দুমড়ে-মুচড়ে লাশটি ভরে ফেলা হলো ওই বাক্সে। বাক্সের ওপরের অংশ ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো। তারপর কোণায় কোণায় ঠোকা হলো কয়েকটি পেরেক। কফিনে পেরেক ঠোকার শব্দে কবুতরগুলো কেঁপে কেঁপে উঠল। যেন তাদের মাথা থেতলে দেওয়া হচ্ছে পাথরের সাথে।
কফিনের সাথে সাথে কবুতরগুলোও যাচ্ছে। একবার ডানে। একবার বামে। খোলা উঠোন পেরিয়ে রাস্তা। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি গাড়ি। এর মধ্য থেকে একটি গাড়িতে তোলা হলো তাদের প্রিয় মানুষটিকে। কফিন থেকে তখনও টপটপ করে রক্ত পড়ছে। রক্ত গড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। ঘাসে ঘাসে। সবুজে সবুজে। সারা বাংলাদেশে।
লেখক : সহ-পরিচালক, বাংলা একাডেমি

শ্রেণী: