চলচ্চিত্রের উদ্ভব ও বিকাশ

Posted on by 0 comment
7

7নূহ-উল-আলম লেনিন:  বিশ্ব ইতিহাসে চলচ্চিত্র ১২১ বছর অতিক্রম করেছে। চলচ্ছবি (Motion Picture) ধারণ করার ক্যামেরা আবিষ্কৃত হয় ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে। মানুষ ও প্রকৃতির বা যে কোনো অবজেক্টের স্থিরচিত্র ধারণ করার ক্যামেরা আবিষ্কৃত হয়েছিল আরও আগে। কিন্তু স্থিরচিত্র দিয়ে আমাদের চোখের সামনে চলমান জীবন বা কোনো বস্তুর গতিময় অস্তিত্বকে জীবন্ত তুলে ধরা সম্ভব ছিল না। গতিময় বা চলিষ্ণু দৃশ্যাবলীকে ধারণ করার জন্য Motion Picture আবিষ্কার পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে।
‘চলচ্ছবি’-র ক্যামেরা আবিষ্কার হলেও তার সময়সীমা ছিল মাত্র এক মিনিট। ছবিটিতে মানুষ প্রকৃতি বা বস্তুর নড়াচড়া ও কর্মকা- ধারণ করা গেলেও সেগুলো ছিল নিঃশব্দ। পরবর্তীতে রিল আকারে প্রতি মিনিটকে পরস্পর সংযুক্ত করে ছবির দৈর্ঘ্য ইচ্ছেমতো প্রলম্বিত হয়। রিল সিস্টেমের অন্তর্ভুক্ত এক মিনিটের এই শব্দবিহীন বা নির্বাক চলচ্চিত্রের ধারাবাহিকতা ছিল ১৯২৭ সাল পর্যন্ত। উন্নত প্রযুক্তি এবং যন্ত্র-কৌশল আবিষ্কারের ভেতর দিয়ে প্রকৃতপক্ষে আধুনিক সবাক চলচ্চিত্র বা সিনেমার অগ্রযাত্রা শুরু হয় তখনই।
চলচ্চিত্রকে বিনোদনের মাধ্যম এবং শিল্প (Industry) হয়ে উঠতেও অনেকগুলো পর্যায় পার হতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম চলচ্চিত্র স্টুডিও নির্মিত হয় ১৮৯৭ সালে। প্রথম স্থায়ী সিনেমা হল চালু হয় যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরে ১৯০৫ সালে। সেখানে প্রদর্শিত সিনেমাটির নাম ‘The Nickelodeon’। হাঁটি হাঁটি পা পা করে ১৯১৪ সালের মধ্যে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শন স্থায়ী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে যায়। সিনেমা ক্রমশ একটি লাভজনক শিল্পে রূপান্তরিত হয়।
সূচনায় সিনেমার জগৎ যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও অচিরেই ঔপনিবেশিক ভারতেও সিনেমা প্রদর্শন এবং চিত্র নির্মাণ শুরু হয়।
সেই উনিশ শতকের শেষ দশকের দ্বিতীয়ার্ধে (১৮৯৭-৯৮) ভারতের কলকাতা ও বোম্বে শহরে চলচ্চিত্র প্রদর্শন এবং ক্যামেরার কাজ শুরু হয়। কেবল বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নয়, সমগ্র আফ্রো-এশীয় অঞ্চলেই আমাদের মানিকগঞ্জের বগজুরি গ্রামের হীরালাল সেন ছিলেন প্রথম পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্রকার। তিনি ছিলেন একাধারে প্রথম মোশন পিকচার ক্যামেরাম্যান, চলচ্চিত্র নির্মাতা, প্রযোজক, প্রদর্শক, আমদানিকারক, চলচ্চিত্র সংগঠক এবং শিক্ষক। ১৮৯৮ সালেই তার নির্মিত এবং আমদানিকৃত ছায়াছবি কলকাতায় এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শিত হয়। তিনিই প্রথম উপমহাদেশে বিজ্ঞাপনচিত্র, রাজনৈতিক চলচ্চিত্র, কাহিনিচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র, তথ্যচিত্র এবং সংবাদচিত্রের জনক। বাংলা চলচ্চিত্রের এবং উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রকার হিসেবে তিনি চির-স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে দেশভাগের আগে থেকেই বিভিন্ন হলে সিনেমা প্রদর্শন চলছিল। পর্যলোচনা করলে এদেশে চলচ্চিত্র নির্মাণের শুরুর পর্বটিকে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম পর্বে, ১৯২৭ সালে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রয়াস ছিল ঢাকার নবাব পরিবারের কয়েকজন তরুণের উদ্যোগে। জগন্নাথ কলেজের শরীরচর্চা শিক্ষক অম্বুজ প্রসন্ন গুপ্তকে দেওয়া হয় ছবি নির্মাণের দায়িত্ব। ছবিটির নাম সুকুমারী। ১৯২৮ সালে ছবিটি প্রদর্শিত হয়। অম্বুজ কুমার গুপ্তের নির্মিত দ্বিতীয় ছবি ‘দ্য লাস্ট কিস’ বা ‘শেষ চুম্বন’। প্রদর্শিত হয় ১৯৩১ সালে ‘মুকুল সিনেমা হলে’। তারপর দীর্ঘ বিরতি। বাণিজ্যিক বা অন্যভাবে ঢাকায় আর ছবি নির্মাণ হয়নি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালে জিন্নাহ ঢাকা সফরে এলে তার সফরের ওপর একটি তথ্যচিত্র ‘ইন আওয়ার অব মিডস্ট’ তৈরি করেন নাজির আহমেদ। ১৯৫৪ সালে তিনি আরেকটি প্রামাণ্য চিত্র ‘সালামত’ তৈরি করেন। অতঃপর ১৯৫৬ সাল থেকে শুরু হয় কাহিনিচিত্র নির্মাণ। এটি ছিল ঢাকায় চলচ্চিত্র নির্মাণের দ্বিতীয় পর্ব, যা আজও অব্যাহত আছে। আবদুল জব্বার খানের ‘মুখ ও মুখোশ’ বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় নির্মিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র। ছবিটি ১৯৫৬ সালে মুক্তি পায়। তবে এই চলচ্চিত্রটির এডিটিং ও অন্যান্য স্টুডিও সুযোগ-সুবিধার জন্য নির্ভর করতে হয় লাহোরের ওপর। আওয়ামী লীগ সরকার ও শেখ মুজিবের উদ্যোগে ১৯৫৭ সালে ঢাকায় প্রথম ‘পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (ইপিএফডিসি)’ নামে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ফিল্ম স্টুডিও স্থাপিত হয়। এর ফলে ষাটের দশকজুড়ে ঢাকা-কেন্দ্রিক বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণ দ্রুত বিকশিত হয়।
ষাটের দশক উপমহাদেশে বাংলা চলচ্চিত্রের ‘স্বর্ণযুগ’ বলা যেতে পারে। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের আগে পর্যন্ত, ভারতীয় বাংলা ও হিন্দি ছায়াছবি এখানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যাপকভাবে প্রদর্শিত হতো। পশ্চিমবঙ্গ, ভারতে যেমন, তেমনি তৎকালীন পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তানেও উত্তম-সুচিত্রা, সৌমিত্র-অপর্ণা, বিশ্বজিৎ-সাবিত্রী (অন্য কেউও হতে পারে) জুটি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। বাংলাদেশেও শুরুটা আশাপ্রদ ছিল। এখানে সপরিবারে দেখার মতো বাণিজ্যিক কাহিনিচিত্র তৈরি হতে থাকে। তখনকার বাস্তবতায় এখানেও শক্তিমান অভিনেতা-অভিনেত্রীদের জনপ্রিয় জুটি গড়ে ওঠে। শিল্পমানের দিক থেকেও বাংলাদেশের ছবি ফেলনা ছিল না। প্রতিভাবান সব চলচ্চিত্র নির্মাতার আবির্ভাব হয়েছিল। উচ্চশিক্ষিত, পরিশীলিত রুচি এবং বৈদগ্ধ্যের অধিকারী বিখ্যাত সব চলচ্চিত্র নির্মাতাÑ আব্দুল জব্বার খান, ফতেহ লোহানী, সালাহউদ্দিন, এহতেশাম, জহির রায়হান, কলিম শরাফী, সুভাষ দত্ত, বেবী ইসলাম, মহীউদ্দিন, মুস্তাফিজ, কাজী জহির, খান আতাউর রহমান প্রমুখ বাংলা চলচ্চিত্রের একটা চমৎকার ঐতিহ্য গড়ে তোলেন।

শ্রেণী:

মে দিবসের ইতিহাস

Posted on by 0 comment
4

4মহান মে দিবস। বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সংহতি এবং উৎসবের দিন। মে দিবসের পেছনে রয়েছে শ্রমিক-শ্রেণির আত্মদান ও বিরোচিত সংগ্রামের ইতিহাস। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে ইউরোপে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে শিল্প-বিপ্লবের সূচনা হয়। সেটি ছিল পুঁজিবাদী বিকাশের প্রাথমিক যুগ। তখন শ্রমিকদের কাজের কোনো শ্রমঘণ্টা নির্ধারিত ছিল না। তাদের ছিল না ন্যূনতম মজুরির নিশ্চয়তা। শ্রম-দাসত্বের নিগড়ে তাদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হতো। একজন শ্রমিককে প্রতিদিন ১৮ ঘণ্টা একটানা অমানবিক পরিশ্রমের কাজ করতে হতো।
ইউরোপ বিশেষত ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শ্রমিক-শ্রেণি নানাভাবে এই অমানবিক শ্রম-দাসত্বের তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকে। সদ্য কৃষি জমি থেকে উঠে আসা এই নবজাত শ্রমিকরা তাদের দুর্দশার জন্য প্রথমে যন্ত্রকেই দায়ী মনে করত। তারা তাদের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ নিরসনের জন্য বিভিন্ন কল-কারখানার যন্ত্র ভাঙতে শুরু করে। মেশিন বা যন্ত্র ভাঙলে অধিকার আদায় তো দূরের কথা, শ্রমিকরা নিজেরাই কর্মচ্যুত হয়, উল্টো কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। অগ্রসর চিন্তার বুদ্ধিজীবী এবং শ্রমিক সংগঠকরা বিক্ষুব্ধ শ্রমিক শ্রেণিকে এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে মুক্ত করার পাশাপাশি তাদের অধিকার আদায়ের জন্য নতুন ধরনের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সূচনা করেন। এই পটভূমিতে অসংগঠিতভাবেই অনধিক ১০ ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণ ও অন্যান্য দাবিতে কয়লা খনি শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন শুরু করে। ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে পেনসেলভেনিয়ার ধর্মঘটী কয়লা খনি শ্রমিকদের সাথে সেনা সদস্যদের সংঘর্ষে ১০ শ্রমিক নিহত হন। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরে উল্লিখিত অনধিক ১০ ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণের দাবিতে শ্রমিকদের একটি মিছিল বের হয়। মিছিলটি শহরের কেন্দ্রস্থল হে মার্কেটের কাছে পৌঁছলে সৈনিকরা বাধা দেয় এবং সংঘর্ষ বেধে যায়। সৈনিকদের গুলিতে বহুসংখ্যক শ্রমিক নিহত ও আহত হন। শ্রমিকদের রক্তে ভেজা শার্ট নিয়ে মিছিল এগিয়ে চলে। আন্দোলন আরও তীব্র রূপ ধারণ করে। শ্রমিকদের রক্তে রঞ্জিত শার্ট লাল পতাকায় রূপান্তরিত হয়। ধর্মঘট ও প্রতিবাদ মিছিল চলে ৫ মে পর্যন্ত। ইতোমধ্যে ৩ মে ছয়জন এবং ৫ মে আরও চারজন শ্রমিক পুলিশের গুলিতে নিহত হন। গ্রেফতার হন শত শত শ্রমিক। পরবর্তীকালে তাদের চারজনকে মৃত্যুদ- এবং কারাদ- দেওয়া হয়।
১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবারের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সেন্ট লুইস শ্রমিক সম্মেলনে কাজের সময় ৮ ঘণ্টা নির্ধারণের দাবিতে ‘মে দিবস’ পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নামে খ্যাত কমিউনিস্ট ও সমাজতন্ত্রীদের প্যারিস সম্মেলন ১ মে তারিখটিকে দেশে দেশে শ্রমিক-শ্রেণির আন্তর্জাতিক সংহতি দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়।
রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত না হলেও ১৮৯০ সাল থেকে ইউরোপের দেশে দেশে শ্রমিক-শ্রেণি ১ মে ‘মে দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে। রুশ বিপ্লব, পশ্চিমা দেশগুলোতে সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার সম্প্রসারণের ফলে প্রথমে গুটিকয়েক দেশ ১ মে-কে শ্রমিক দিবস হিসেবে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘ ১ মে-কে সর্বজনীন শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। অতঃপর অনেক দেশে এই দিনটিকে রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণা করা হয়। মজার বিষয় হলো মার্কিন দেশের শ্রমিকদের রক্তে রঞ্জিত এই দিনটিকে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক লেবার ডে (মে দিবস হিসেবে সমধিক পরিচিত) ঘোষণা করলেও খোদ আমেরিকা মে দিবসের স্বীকৃতি দেয় নি। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবার লেবার ডে হিসেবে পালন করা হয়। পাকিস্তান আমলে এই ভূখ-ে মে দিবসের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ছিল না। কেবল ১৯৫৬ ও ৫৭ সালে পূর্ব বাংলার শাসক আওয়ামী লীগ সরকার ১ মে সরকারি ছুটি হিসেবে ঘোষণা করেছিল। কিন্তু ১৯৫৭ সালে আইউব খা সামরিক আইন জারি করার পর মে দিবসের ছুটি বাতিল করে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু প্রথম মে দিবসকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন।
নূহ-উল-আলম লেনিন

শ্রেণী:

খুলাফা-ই-রাশিদীন, খলিফা ও খিলাফত

Posted on by 0 comment
54

54নূহ-উল-আলম লেনিন : খলিফা শব্দের আভিধানিক অর্থ A successor; a lientanant; a Vicegerant or a deputy. শব্দটি পবিত্র কোরআনে হযরত আদম (আ.) সম্পর্কে ব্যবহৃত হয়েছে সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে।
সুরা ২, বাকারা : ৩০
আর (স্মরণ কর) যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বললেন, “আমি প্রতিনিধি সৃষ্টি করেছি, ‘তারা বলল, ‘আপনি কি সেখানে এমন কাউকেও সৃষ্টি করবেন যে অশান্তি ঘটাবে ও রক্তপাত করবে। অথচ আমরাই তো আপনার সপ্রশংসা মহিমা কীর্তন ও পবিত্রতা ঘোষণা করি।…
সুরা ৩৮, স্বোয়াদ : ২৬
“হে দাউদ আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি, অতএব তুমি লোকদের মধ্যে সুবিচার কর…।”
ইসলামের ইতিহাসে খলিফা বলতে বুঝানো হয়েছে মহানবী হযরত মুহম্মদ (স.)-এর উত্তরাধিকারীকে, যার হাতে ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার বেসামরিক, সামরিক এবং ধর্মীয় বিধিবিধান প্রয়োগের সর্বময় ক্ষমতা। খলিফা ইসলামি আইনের রক্ষক, সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী। তিনি একাধারে শাসক এবং মুসলিম সমাজের ইমাম বা ধর্মীয় নেতা। খলিফা কোরআন ও হাদিসের আলোকে দেশ শাসন, প্রজাপালন এবং ধর্মীয় কৃত্যসমূহ সম্পাদনের জন্য দায়িত্ববান। হযরত আবু বকর (রা.) ও অন্য সাহাবাদের মতে খলিফা হবেন (হযরত মুহম্মদ (স.)-এর পরিবারের বাইরের) কোরাইশ বংশ থেকে। হযরত আলী (রা.)-র অনুসারীদের মত ছিল খলিফা হবেন হযরত মুহম্মদ (স.)-এর পরিবারের সদস্যদের মধ্য থেকে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য আইএস নামক জঙ্গি সংগঠন যে মতবাদ প্রচার করছে তার সারবত্তা বুঝতে হলে খিলাফত সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা বাঞ্ছনীয়।
হযরত মুহম্মদ (স.) মদিনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ১০ বছর অবস্থান করার পর ৬৩২ খ্রিস্টাব্দের ৮ জুন মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর রাষ্ট্রের কর্ণধার কে হবেন, তেমন কাউকে তিনি ঠিক করে যান নি। এ বিষয়ে হযরত মুহম্মদ (স.)-এর কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশ ছিল না। আরবের ঐতিহ্যগত প্রথা অনুযায়ী গোত্রীয় প্রধানদের পদ বংশানুক্রমিক ছিল না। হযরত মুহম্মদ (স.)-এর মৃত্যুর পর আনসারগণ একত্র মিলিত হয়ে তাদের মধ্য থেকে একজনকে মদিনার শাসক মনোনীত করার উদ্যোগ নেয়। তাদের দাবি ছিল যেহেতু তারাই হযরত মুহম্মদ (স.) এবং তার সহযাত্রী শরণার্থী অর্থাৎ মুহাজিবদের মদিনায় স্থান দিয়েছে, মদিনায় ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠা করেছে, সে কারণে তাদের মধ্য থেকেই মদিনার শাসনকর্তা নিয়োগ করতে হবে। তারা সা’দ ইবনে উবায়দা নামে একজন খজরজকে নেতা নির্বাচনের জন্য পছন্দও করেছিল। আনসারদের এই উদ্যোগের কথা শুনে হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত উমর (রা.) অনৈক্য ও বিভেদের আশঙ্কা করে আনসারদের সভাস্থলে হাজির হন। আনসারদের যুক্তি মেনে নিয়েও আবু বকর (রা.) তাদের বুঝালেন যে, এখানে কেবল মদিনার শাসক নিয়োগ হবে না, সমগ্র আরবের জন্য, সকল গোত্রের গ্রহণযোগ্য একজনকে শাসনকর্তা নিয়োগ করতে হবে। এ প্রশ্নে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা, বাগ্বিত-া এবং যুক্তি পাল্টাযুক্তি চলতে থাকল। এক পর্যায়ে কুরাইশদের মধ্য থেকে একজনকে শাসনকর্তা নিয়োগের প্রশ্নে ঐকমত্য হয়। স্বাভাবিকভাবেই বয়োজ্যেষ্ঠ এবং হযরত মুহম্মদ (স.)-এর বিশ্বস্ত সাহাবা, যাকে তিনি তার অসুস্থতার সময় নামাজে ইমামতি করতে দিয়েছিলেন, সেই হযরত আবু বকর (রা.)-কেই তারা খলিফা এবং ইমাম হিসেবে নির্বাচিত করে। সবাই তার আনুগত্য মেনে নেয়।
এভাবে হযরত মুহম্মদের (স.) মৃত্যুর পর খিলাফতের যাত্রা শুরু হয়। হযরত আবু বকর (রা.)-এর পর হযরত উমর, হযরত উসমান (রা.) এবং হযরত আলী (রা.) খলিফার দায়িত্ব পান। এই চার খলিফার মধ্যে আবু বকর (রা.) ছাড়া অন্য তিনজনই আততায়ীর হাতে নিহত হন। ইসলামের ইতিহাসে এই চারজন খলিফার শাসনকালকেই ‘খুলাফা-ই-রাশিদীনের’ যুগ বলা হয়। খুলাফা-ই-রাশিদীনের অর্থ সত্য পথে পরিচালিত খলিফাগণ। “ওরা সবাই হযরত মুহম্মদ (স.)-এর নিকটতম ও প্রিয়তম সাহাবা ছিলেন এবং তারই শিক্ষা ও আদর্শ এঁদেরকে সরাসরিভাবে প্রভাবিত করেছিল এবং তাঁরই প্রদর্শিত পথে এঁরা শাসনকার্য পরিচালনা করেছিলেন। সেই জন্যই এঁদেরকে খুলাফা-ই-রাশিদীন বা সত্য পথে পরিচালিত খলিফা বলা হয়।” (ড. মফীজুল্লাহ কবীর, ইসলাম ও খিলাফত)
তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান গণী (রা.) আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার পাঁচ দিন পর হযরত আলী (রা.) অনিচ্ছা সত্ত্বেও খলিফার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দামেস্কের প্রাদেশিক শাসক মু’আবিয়া (রা.) ছাড়া অন্য সবাই আলী (রা.)-র আনুগত্য মেনে নেন। মু’আবিয়া (রা.) উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের বিচার দাবি করেন। মু’আবিয়া (রা.) ও আলী (রা.)-র বিরোধ শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে পর্যবসিত হয়।
আলী (রা.) ও মু’আবিয়া (রা.)-র মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা হলেও শেষ পর্যন্ত চতুর মু’আবিয়া (রা.) আলী (রা.)-র প্রতি আনুগত্য প্রকাশে অস্বীকৃতি জানায়। আলী (রা.) মদিনা হতে কুফায় রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। এদিকে মু’আবিয়া (রা.) নিজেকে খলিফা হিসেবে দাবি জানায়। তবে আলী (রা.)-র জীবিতাবস্থায় সে প্রকাশ্যে নিজেকে খলিফা বলতে সাহস পায় নি। ৬৬১ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে খারিজি সম্প্রদায়ের তিনজন ঘাতক কুফায় আলী (রা.)-কে, দামাস্কাসে মু’আবিয়া (রা.)-কে এবং ফুসকাতে আমর (রা.)-কে একই দিনে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। আমর ওই দিন অসুস্থ থাকায় মসজিদে না আসায় হত্যা চক্রান্ত থেকে বেঁচে যান। আলী কুফায় এবং মু’আবিয়া (রা.) দামাস্কাসে আক্রান্ত হন। মু’আবিয়া (রা.) আহত হন। কিন্তু আলী (রা.) কুফার মসজিদে নিহত হন। আলীর (রা.) মৃত্যুর পর জ্যেষ্ঠপুত্র হাসান (রা.) খলিফা ঘোষিত হয়। কিন্তু স্বল্প দিনের মধ্যেই হাসান বিষ প্রয়োগে নিহত হন।
এদিকে মু’আবিয়া (রা.) সুস্থ হয়ে উঠে ৬৬১ খ্রিস্টাব্দে নিজেকে সমগ্র মুসলিম জগতের খলিফা ঘোষণা করেন। শুরু হয় বংশগত উমাইয়া শাসন। অন্যদিকে আলী (রা.)-র মৃত্যুর মধ্য দিয়ে খুলাফা-ই-রাশিদীনের অবসান ঘটে। তবে ইতোমধ্যে মুসলিম সমাজ সুন্নী ও শিয়া মতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। শিয়ারা সুন্নী শাসকদের খলিফা এবং তাদের ইমাম হিসেবে অস্বীকৃতি জানায়। শিয়াদের ওপর চরম নির্যাতন সত্ত্বেও শিয়া মুসলমানগণ হযরত আলী (রা.)-র বংশধর ১২ জন ইমামকে তাদের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে কয়েক শতাব্দীব্যাপী অনুসরণ করেছে।
৬৬১ থেকে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ১২৬১ বছর দামাস্কাস, বাগদাদ, কায়রো, কর্ডোভা ও কনস্টান্টিনিপল্স-এ আরব-অনারব বিভিন্ন বংশের নামে যে খিলাফত চালু ছিল, তা আসলে ছিল বংশগত রাজতন্ত্র।
নি¤েœ বিভিন্ন খিলাফতের শাসনকাল উল্লেখ করা হলোÑ
১. খুলাফা-ই-রাশিদীন ৬৩২-৬৬০ খ্রি. মদিনা Ñ কুফা
২. উমাইয়া বংশ (দামাস্কাস) ৬৬১-৭৪৯ খ্রি.
৩. আব্বাসীয় বংশ (বাগদাদ) ৭৫০-১২৪০ খ্রি.
৪. ফাতেমি (কায়রো) ৯১০-১১৭১ খ্রি. (শিয়া অনুসারী)
৫. স্পেনের খিলাফত (কর্ডোভা ও গ্রানাডা) ৭৫৫-১৪৯২ খ্রি.
৬. ওসমানীয় (অটোমান) (কনস্টান্টিনিপল্স) ১২৯৯-১৯২২ খ্রি.

উল্লিখিত চিত্র থেকে স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে উমাইয়া খিলাফতের পর মুসলিম বিশ্বে বস্তুত একক শাসনকেন্দ্র ও খিলাফত ছিল না। আব্বাসীয়, ফাতেমাইড এবং স্পেনীয় খিলাফত সমান্তরালভাবে চালু ছিল। তেমনি অটোমান সা¤্রাজ্য বা খিলাফত (১২৯৯-১৯২২) বিদ্যমান থাকা অবস্থায়ই কর্ডোভা ও গ্রানাডার পতনের পূর্ব পর্যন্ত স্পেনীয় খিলাফত (৭৫৫-১৪৯২ খ্রি.) ও স্বাধীনভাবে তাদের অধিকৃত রাজ্য শাসন করেছে। ইতোমধ্যে অন্যান্য খিলাফতের পতন ঘটলেও একমাত্র অটোমান খিলাফত বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত টিকে ছিল। কিন্তু অটোমান শাসকরা প্রথম থেকেই নিজেদের ‘সুলতান’ হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। ইসলামের আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের জন্যই কেবল নিজেদের ‘খলিফা’ বলে সা¤্রাজ্য শাসন করেছেন।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ইসলামি বিশ্ব উমাইয়াদের পর আর কখনোই এক কেন্দ্রের শাসনাধীন বা খিলাফতের অধীন ছিল না। মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া, পূর্ব আফ্রিকা, তুরস্ক ও স্পেনে যখন নানা বংশের তথাকথিত খিলাফত চালু ছিল, তখন অবিভক্ত ভারতে সুলতানি আমল ও মোগল আমলের শাসকরা নিজেদের রাজা-বাদশাহ হিসেবেই বংশানুক্রমিক শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। দূরপ্রাচ্যেÑ ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় কোনো খিলাফত ছিল না। সেখানেও ছোট-বড় রাজা-বাদশাদের শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল।
সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় পরাধীন ভারতবর্ষে যখন মুসলমানরা হিন্দুদের সঙ্গে নিয়ে (খিলাফত কমিটি ও কংগ্রেসের ঐক্য) অটোমান খিলাফত রক্ষার আন্দোলনে জান কবুল আন্দোলনে রত, তখন খোদ তুরস্কের জনগণ কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে খিলাফতের অবসান ঘটাতে ব্যস্ত।
উনিশ শতকে আরব উপদ্বীপে মৌলবাদী ওয়াহাবি মতাদর্শবাদের অনুসারী গোষ্ঠীটি বর্তমান সৌদি পরিবারকে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসতে সাহায্য করে। ওয়াহাবিরা যতই আদি ইসলামে ফিরে যাওয়ার ফতোয়া দিক না কেন, তারা নিজেরা খুলাফা-ই-রাশিদীন বা খিলাফত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা না করে বরং সৌদি আরবে বংশগত রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করে। এখনও সৌদি রাজ পরিবার ও সৌদি আরবের জনগণ ওহাবি মতাদর্শ অনুসরণ করছে।
উপরোক্ত ঐতিহাসিক তথ্য বিচার করে এ কথা দ্বিধাহীনভাবে বলা যায়, বর্তমানে ইরাক-সিরিয়ায় যুদ্ধরত আইএস জঙ্গিরা যে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে, তার সাথে ইসলামি খিলাফতের কোনো সম্পর্ক নেই।

শ্রেণী:

অসহযোগ আন্দোলন

Posted on by 0 comment
3-7-2017 4-08-45 PM

3-7-2017 4-08-45 PMঅসহযোগ আন্দোলনরে প্রবক্তা ভারতরে স্বাধীনতা সংগ্রামরে প্রাণপুরুষ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। ১৯২০ সালে শুরু হয়ে এই আন্দোলন ১৯২২ সাল র্পযন্ত চলছেলি। ব্রটিশি শাসকদরে রাজনতৈকি, প্রশাসনকি, আইন-আদালতসহ সবদকি থকেে র্বজন করা, ব্রটিশি পণ্য, ব্রটিশি সরকার অনুমোদতি শক্ষিাপ্রতষ্ঠিান ও ব্রটিশিরে দওেয়া খতোব র্বজন, ব্রটিশি প্রর্বততি আইনসভা, স্থানীয় সরকার থকেে পদত্যাগ এবং সকল প্রকার খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দওেয়া প্রভৃতরি মাধ্যমে ব্রটিশি সরকারকে অচল এবং অর্কাযকর করে দওেয়া ছলি এই আন্দোলনরে কৌশল। আর এই অসহযোগরে লক্ষ্য ছলি ‘স্বরাজ’ প্রতষ্ঠিা এবং চূড়ান্তভাবে ভারতরে স্বাধীনতা। গান্ধীজি পরচিালতি এই অহংিস অসহযোগ আন্দোলন শষে র্পযন্ত লক্ষ্য র্অজনে র্ব্যথ হয়।
তবে ১৯৭১ সালে ভন্নি পটভূমতিে ভন্নি রাষ্ট্রে পরচিালতি অন্য এক অসহযোগ আন্দোলন সর্ম্পূণ বজিয় র্অজন করছেলি। ১৯৭১ সালরে ১ র্মাচ পাকস্তিানরে সামরকি শাসক জনোরলে ইয়াহয়িা খান ৩ র্মাচ আহূত জাতীয় পরষিদরে সভা স্থগতি ঘোষণার পটভূমতিে বঙ্গবন্ধু শখে মুজবিুর রহমান ৭ র্মাচ থকেে পাকস্তিান সরকাররে বরিুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন ঘোষণা করনে। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে এই অসহযোগে তৎকালীন ‘র্পূব পাকস্তিান’ে পাকস্তিান সরকার প্রকৃতই অর্কাযকর হয়ে পড়।ে ক্যান্টনমন্টে এবং সনোবাহনিী ছাড়া পাকস্তিান সরকাররে অন্য কোথাও কোনো র্কতৃত্ব ছলি না। দশে চলছেে বঙ্গবন্ধুর নর্দিশে।ে দশেরে বসোমরকি প্রশাসন, ব্যাংক-বীমা, পরবিহন, স্কুল-কলজে-বশ্বিবদ্যিালয়সহ বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগরে নর্দিশেে চলছে।ে ২৬ র্মাচ আনুষ্ঠানকি স্বাধীনতা ঘোষণার র্পূব র্পযন্ত দশে পরচিালতি হয়ছেে বঙ্গবন্ধু তথা আওয়ামী লীগরে ৩৫টি ঘোষণা ও নর্দিশেনার ভত্তিতি।ে বঙ্গবন্ধু ঘোষতি অসহযোগ আন্দোলনরে ফলে পাকস্তিানি সামরকি জান্তার শাসন অর্কাযকর হয়ে পড়লে ২৫ র্মাচ রাতে নরিস্ত্র বাঙালি জাতরি ওপর পাকস্তিানরে সশস্ত্র বাহনিী ঝাঁপয়িে পড়।ে বঙ্গবন্ধু গ্রফেতাররে র্পূব মুর্হূতে ২৬ র্মাচ প্রথম প্রহরে বাংলাদশেরে আনুষ্ঠানকি স্বাধীনতা ঘোষণা করনে এবং সমগ্র জাতকিে পাকস্তিানি হানাদার বাহনিীর বরিুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার আহ্বান জানান। শুরু হয় মহান মুক্তযিুদ্ধ। পরণিততিে ৯ মাসরে মুক্তযিুদ্ধে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন র্সাবভৌম বাংলাদশেরে।
মহাত্মা গান্ধী পরচিালতি অসহযোগ আন্দোলনরে ফলে স্বরাজ বা স্বাধীনতা র্অজতি না হলওে অসহযোগ আন্দোলন ভারতরে স্বাধীনতা সংগ্রামে একটি মাইলফলক হয়ে আছ।ে ১৯১৯ সালে ব্রটিশি সরকার ভারতরে শাসন ব্যবস্থার সংস্কাররে নামে ভারত শাসন আইন প্রর্বতন কর।ে ভারত শাসন আইনরে বরিুদ্ধে ভারতবাসীর প্রতবিাদ আন্দোলন দমনরে উদ্দশ্যেে জারি করা হয় রাউলাট অ্যাক্ট। এই আইনরে ফলে স্বাধীনতা সংগ্রামীদরে ওপর অত্যাচার-নর্যিাতন আরও তীব্রতর হয়ে ওঠ।ে ১৯১৯ সালে পাঞ্জাবরে জালয়িানওয়ালাবাগে ঘটে নৃশংস হত্যাকা-। রাউলাট অ্যাক্ট ও জালয়িানওয়ালাবাগরে হত্যাকা-রে বরিুদ্ধে ভারতব্যাপী তীব্র গণ-আন্দোলন গড়ে ওঠ।ে গাজীর ‘সত্যাগ্রহ’ আন্দোলনরে ডাকে সমগ্র ভারতর্বষে অভূতর্পূব উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। ১৯১৯ সালইে খলিাফত আন্দোলনরে সর্মথনে গান্ধীজি খলিাফত ও অসহযোগ আন্দোলনকে এক পতাকার নচিে ঐক্যবদ্ধ করনে। কংগ্রসেরে নতেৃত্বে ভারতরে জাতীয় আন্দোলনরে সাথে খলিাফতরে দাবকিে যুক্ত করা হয়। খলিাফত আন্দোলনরে সূত্রে গান্ধীজি অসহযোগ শব্দটি উদ্ভাবন করনে।
১৯২০ সালরে ২ আগস্ট অসহযোগ আন্দোলনরে সূত্রপাত হয়। ১৯২০ সালরে ডসিম্বেরে নাগপুরে কংগ্রসেরে র্বাষকি অধবিশেনে করমচাঁদ গান্ধী ঘোষণা করনে এক বছররে মধ্যে স্বরাজ পাওয়া যাব।ে তার এই ঘোষণা বপিুল উদ্দীপনা সৃষ্টি কর।ে দলরে গঠনতন্ত্র পরর্বিতন করে কংগ্রসে সদস্যদরে খাদরি বস্ত্র ও গান্ধী টুপি পরধিান বাধ্যতামূলক করা হয়। চরকা-খদ্দর, মাদক র্বজন, অস্পৃশ্যতা পরহিার ও হন্দিু-মুসলমানরে ঐক্যরে র্কমসূচি গ্রহণ করা হয়। আন্দোলনরে একর্পযায়ে সরকার খলিাফত ও অসহযোগী স্বচ্ছোসবেক সংগঠনকে বআেইনি ঘোষণা কর।ে ৩০ হাজার নর-নারী গ্রফেতার হন। আন্দোলন তীব্র থকেে তীব্রতর হয়। ১৯২১ সালরে ২১ জুলাই করাচতিে অনুষ্ঠতি নখিলি ভারত খলিাফত সম্মলেন থকেে ঘোষণা করা হয়, কংগ্রসেরে আসন্ন আহমদোবাদ অধবিশেনরে আগে সরকার দাবি না মনেে নলিে ‘স্বাধীন ভারত প্রজাতন্ত্র’ ঘোষতি হব।ে ১৯২২ সালরে ১ ফব্রেুয়ারি গান্ধী ভারতরে ভাইসরয় র্লড রডেংিকে এক চরমপত্রে এক সপ্তাহরে মধ্যে সরকার মনোভঙ্গি পরর্বিতন না করলে তনিি ‘খাজনা’ বন্ধ করার আন্দোলন শুরু করবনে। কন্তিু এর মাত্র তনি দনি পর ১৯২২ সালরে ৪ ফব্রেুয়ারি বহিাররে গোরখপুর জলোর চৌরচিৌরায় উত্তজেতি জনতা একটি থানা আক্রমণ করে আগুন লাগয়িে দয়ে। ২১ জন পুলশি ও একজন সাব-ইন্সপক্টের অগ্নদিগ্ধ হয়ে মারা যান। এই সংবাদ পাওয়ার পর গান্ধী আন্দোলন আর ‘অহংিস’ থাকছে না মনে করে একক সদ্ধিান্তে অসহযোগ আন্দোলন স্থগতি ঘোষণা করনে। এদকিে ১৯২৩ সালরে ২৯ অক্টোবর তুরস্করে জাতীয় আন্দোলনরে নতো কামাল আতার্তুক খলিাফতরে অবসান ঘটয়িে তুরস্ককে র্ধমনরিপক্ষে রাষ্ট্র হসিবেে ঘোষণা করনে। চৌরচিৌরার ঘটনায় আন্দোলন স্থগতি রাখার পর এমনতিইে ভারতব্যাপী প্রবল হতাশা দখো দয়ে, আন্দোলনটি মুখ থুবড়ে পড়।ে তুরস্কে খলিাফতরে অবসানরে পর খলিাফত আন্দোলন যমেন স্তমিতি হয়ে যায়, তমেনি ১৯২৪ সালরে দকিে ভারতরে বভিন্নি প্রদশেরে কোথাও কোথাও বচ্ছিন্নিভাবে চলা অসহযোগ আন্দোলনটকিে শষে র্পযন্ত প্রত্যাহার করে নওেয়া হয়।
ম  নূহ-উল-আলম লনেনি

শ্রেণী:

আইএস ও খিলাফত

36

36একবিংশ শতাব্দীর উষালগ্নে ইসলামি পুনরুত্থানের (জরারাধষরংস) সমস্যা একটি মাত্র মুসলিম প্রধান দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশে মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ বা ধর্মীয় চরমপন্থা এবং রাজনৈতিক ইসলামের সমস্যা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি একটি আন্তর্জাতিক প্রপঞ্চ। জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বের দ্বিতীয় প্রধান জনগোষ্ঠীর অনুসৃত ধর্ম ইসলাম। বর্তমানে বিশ্বে মুসলমান জনসংখ্যা ১.৬ বিলিয়ন। পৃথিবীর মোট মুসলমান জনসংখ্যার ৬২ শতাংশ বাস করে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে। পৃথিবীর ৫৬টি দেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। এ ছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ না হলেও ভারত হচ্ছে মুসলিম জনসংখ্যার দিক থেকে তৃতীয় স্থানে। এ রকম বেশ কিছু দেশে মুসলমানরা সংখ্যালঘু হলেও তাদের অবস্থান দ্বিতীয় স্থানে। সংখ্যার দিক থেকেও তারা উল্লেখযোগ্য। ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং ভারতের মোট মুসলমান জনসংখ্যার পরিমাণ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশসমূহের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। এশিয়া ও আফ্রিকা মুসলমান প্রধান দেশগুলোর মধ্যে ধর্মভিত্তিক ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে রয়েছে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান ও সুদান। বর্তমানে মুসলমান প্রধান দেশগুলোর কোনো কোনোটিতে ইসলামি জঙ্গি ও সন্ত্রাসী সংগঠনের তৎপরতা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এটা একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্রের কাজ। মুসলমান প্রধান দেশগুলোয় ইসলামের নাম করে বিভেদ ও সন্ত্রাসী কর্মকা- পরিচালনা এবং এসব দেশের স্থিতিশীলতা নষ্টের পেছনে পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদী মহলের উসকানি রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। সর্বশেষ খিলাফত প্রতিষ্ঠার নামে আইএসআইএসের উত্থান নতুন প্রপঞ্চ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
এ কথা সবাই জানে যে, আফগান সীমান্ত থেকে বহু দূরে পাকিস্তানের এবোটাবাদ শহরের গোপন আস্তানায় হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী ও জঙ্গি সংগঠন আল-কায়দার নেতা ওসামা বিন লাদেনকে জীবন্ত গ্রেফতার করে মার্কিনীরা হত্যা করে। ২০১১ সালের ২ মে তার মরদেহ অজানা সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে তার চিহ্ন মুছে দেয়।
ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার ভেতর দিয়ে দৃশ্যত আল-কায়দা এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের হার্টকোর ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকেই আমরা জঙ্গিবাদ-মৌলবাদের সবচেয়ে পশ্চাৎপদ ও রক্ষণশীল অভিপ্রকাশ দেখতে পাই যুদ্ধ বিধ্বস্ত ইরাক ও সিরিয়ায়। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে তুরস্কে ওসমানিয়া (অটোমান) খিলাফতের অবসানের পর এবার কেবল পাকিস্তান বা ইরানের মতো ইসলামি রাষ্ট্র নয়, ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে সিরিয়া ও ইরাকের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত আইএসআইএস বা ইসলামিক স্টেট প্রতিষ্ঠাকামীদের দখলে। এটা একটা অভিনব ঘটনা।
অতীতে আয়েতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইরানি বিপ্লবে খিলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ছিল না। তারা ইরানকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেছে। খিলাফত প্রতিষ্ঠার ধারণা আল-কায়দার থাকলেও তালেবানি রাজত্বকালেও আফগানিস্তানে খিলাফত প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়নি। এমনকি ‘আরব বসন্তের’ উপজাত মিসরের ইতিহাসের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা মোহাম্মদ মুরসি বা তার দলও খিলাফত ঘোষণার কথা বলে নি। ব্রাদারহুড ইসলামি অনুশাসন ও কট্টর গোড়ানীতি গ্রহণ করলেও মধ্যযুগীয় সামন্ত্রতান্ত্রিক ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠার আওয়াজ তোলে নি।
ইরাক ও সিরিয়ার বেশির ভাগ রক্তপাতের হোতা অতি উগ্র হিং¯্র সন্ত্রাসী গ্রুপ নিজেদের Islamic State of Iraq and al-sham (Syria) তথা ISIS পরিচয় দিয়ে ইরাক ও সিরিয়ার তৈল সমৃদ্ধ বিরাট এলাকা দখল করে নেয়। তারা ইরাকে আবার খিলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা করে।
প্রকৃতপক্ষে আইএসআইএস আল-কায়দার ফর্মুলা গ্রহণ করে বিরাট এক সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলে। তবে আল-কায়দা ও মুসলিম ব্রাদারহুডের ব্যর্থতার পটভূমিতে ২০১৪ সালের ২৯ জুন আইএসআইএস আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামিক রাষ্ট্র ও খিলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। আবু বকর আল-বাগদাদীকে খলিফা তথা রাষ্ট্রপ্রধান এবং আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই এই ঘোষণা সমগ্র ইসলামিক জগতে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে।
আইএসআইএস বা তথাকথিত ইসলামি খিলাফত ইরাক ও সিরিয়ার যেসব অঞ্চল দখল করেছিল তার আয়তন প্রায় ৩৫ হাজার বর্গমাইল, যা প্রায় জর্ডানের সমান। সেখানে বসবাস করত মোটামুটি ৮ মিলিয়ন বা ৮০ লাখ মানুষ। আইএসআইএসের রয়েছে ৩৫ হাজার যুদ্ধবাজ জিহাদি। (সূত্র : নিউজ উইক, ৬ নভেম্বর, ২০১৪, http : //www.newsweek.com/2014/11/14)
আইএসের সন্ত্রাসীরা অধিকৃত অঞ্চলে এক মধ্যযুগীয় বর্বর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। তারা কার্যত শরিয়া আইনের নামে চরম ফ্যাসিবাদী ও মানবাধিকারের পরিপন্থী শাস্তির বিধান, দাসশ্রমের প্রচলন, নারীদের ওপর পাশবিক গণধর্ষণ ও প্রচ- নির্যাতনমূলক কর্মকা- চালাচ্ছে। ইরাকের কয়েকটি তৈলক্ষেত্র দখল করে সস্তায় অপরিশোধিত তেল বিক্রি করে যে অর্থ সংগ্রহ করছে, তাই দিয়ে অস্ত্র সংগ্রহ এবং খিলাফতের বাহিনী পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০১৫-১৬ এর মধ্যে সিরিয়ায় রাশিয়া এবং ইরাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আইএসআইএস-বিরোধী বেশ কয়েকটি নির্মূল অভিযান পরিচালনা করে। এসব অভিযানের ফলে আইএসআইএসের দখল থেকে বেশ কয়েকটি বড় বড় শহর এবং অঞ্চল পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। ফলে তাদের দখলিকৃত খিলাফতের আয়তন সংকোচিত হয়ে আসছে।
আইএসের অনুসারীরা হচ্ছে সুন্নী মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে উগ্র ‘সালাফি’ মতাদর্শের অনুসারী জিহাদি। এই সালাফি জিহাদিরাই নিজেদের হযরত মুহম্মদ (সঃ) এবং সপ্তম শতাব্দীর আদি খিলাফতের অনুসারী মনে করে। তারা আধুনিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে কঠোর শরিয়া আইন প্রবর্তন এবং তাদের খিলাফতের ভাবধারা সর্বত্র বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাচ্ছে।
আইএসআইএসের উত্থানের পেছনের কার্যকারণ সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমরা দেখতে পাই, এটিও কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ইরাকে সাদ্দাম-বিরোধী মার্কিন অভিযান, দখলদারিত্ব এবং গৃহযুদ্ধের সময়ই একদার সেকুলার এই দেশটিতে উগ্রপন্থার জন্ম নেয়। স্বঘোষিত খলিফা আবু বকর আল বাগদাদী মার্কিন দখলদারিত্বের আমলেই একটি শিয়া-বিরোধী জিহাদি গোষ্ঠী গড়ে তোলেন এবং জঙ্গি তৎপরতার জন্য মার্কিন সেনাদের হাতে বন্দী হন। বন্দী শিবিরেই তার সাথে আল-কায়দার যোগাযোগ গড়ে ওঠে। যেমন, ওসামা বিন লাদেন ও আল-কায়দা গড়ে তোলার পেছনে মার্কিনী ইন্ধন ছিল, তেমনি আইএসআইএস সৃষ্টির পেছনেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা এবং মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদের অন্তর্ঘাতমূলক স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ থাকাও বিচিত্র নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প অন্য প্রার্থী ডেমোক্র্যাট দলের একসময়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারির মধ্যপ্রাচ্য নীতির সমালোচনা প্রসঙ্গে আইএসআইএস সৃষ্টির সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার কথা প্রকারান্তরে ফাঁস করে দিয়েছেন।
বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতার পেছনেও আইএসআইএসের ভূমিকা রয়েছে বলে পশ্চিমা দেশগুলো বারবার বলে আসছে। এমনকি আইএসআইএসের অনলাইন থেকেও একাধিক জঙ্গি হামলার দায় স্বীকার করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশে আইএসআইএসের তৎপরতার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। সরকার সুস্পষ্টভাবে বলেছে, বাংলাদেশের সর্বশেষ জঙ্গি হামলাগুলোর পেছনে রয়েছে নয়া জেএমবি নামক স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা জঙ্গি সংগঠনের। প্রকৃতপক্ষে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ ও অন্যান্য মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে অতীতের আল-কায়দা নেটওয়ার্কের মতোই আইএসআইএসের নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে বলে পশ্চিমা দেশগুলো প্রচার চালাচ্ছে। ওই প্রচারণার সত্যতা যাচাই সাপেক্ষ। তবে আইএসআইএস সৃষ্টির সাথে যদি যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা থেকে থাকে, তা হলে তারা যে (মার্কিনীরা) এসব দেশে আইএসআইএস রপ্তানির চেষ্টা করবে, সেটাই স্বাভাবিক। বিশ্বব্যাপী মুসলমান অধ্যুষিত দেশগুলোতে যদি অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির কোনো পাঁয়তারা যুক্তরাষ্ট্র করে, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।

নূহ-উল-আলম লেনিন

শ্রেণী:

দুই অর্থনীতির তত্ত্ব

35

স্ 35বাভাবিক কারণেই বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা, এমনকি অনেক বিদ্বজ্জনও ‘দুই অর্থনীতি’ তত্ত্ব সম্পর্কে তেমন অবহিত নন। দুই অর্থনীতির তত্ত্ব উৎসারিত হয়েছে গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি, তৎকালীন পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের পরিপ্রেক্ষিতে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। বেলুচিস্তান, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু এবং পশ্চিম পাঞ্জাবকে নিয়ে পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চল এবং ১ হাজার মাইল দূরবর্তী বাংলাকে ভাগ করে পূর্ববঙ্গকে নিয়ে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল গঠিত হয়। পরে এই দুটি অঞ্চল পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান নামে পরিচিতি লাভ করে। নতুন রাষ্ট্রের রাজধানী স্থাপিত হয় সিন্ধু প্রদেশের করাচিতে। পরে অবশ্য রাজধানী স্থানান্তরিত হয় ইসলামাবাদে।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মলগ্নের বৈশিষ্ট্য ছিল, আয়তনে পশ্চিম পাকিস্তান ছিল ৩ লাখ বর্গমাইলের ওপর। আর পূর্ব পাকিস্তানের আয়তন ছিল মাত্র ৫৬ হাজার বর্গমাইল। পক্ষান্তরে পূর্ব বাংলার জনসংখ্যা ছিল ৪ কোটি আর পশ্চিম পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল ৩ কোটি। অর্থাৎ পূর্ব বাংলা ছিল পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আবাসস্থল। পাকিস্তানের জন্মলগ্নে এবং পরের এক দশকজুড়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার হার বেশি ছিল। বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ আয় করত পূর্ব পাকিস্তান। জিডিপি (৫২ শতাংশ) এবং মাথাপ্রতি আয়ের দিক থেকেও পূর্ব বাংলা এগিয়ে ছিল।
কিন্তু তা সত্ত্বেও পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলাকে তার ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করে ‘নতুন ধরনের’ উপনিবেশে পরিণত করে। পূর্ব বাংলার আয় ও অর্থ দিয়ে গড়ে তোলা হয় পশ্চিম পাকিস্তান। সশস্ত্র বাহিনী, সরকারি চাকরি, বৈদেশিক বাণিজ্যের আয় এবং পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচারসহ অকল্পনীয় আঞ্চলিক বৈষম্য সৃষ্টি হয়।
১৯৫৬ সালে সামরিক বাহিনী, বিমান বাহিনী ও নৌবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে ৬০০ জন ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি এবং নি¤œপদস্থ অফিসার পদে মাত্র ৬০ জন ছিল বাঙালি। স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীতে বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব ছিল যথাক্রমে ৫ শতাংশ, ১০ শতাংশ এবং ১৬ শতাংশ। অন্যদিকে ১৯৫২ সালে অসামরিক প্রশাসনে পাকিস্তানের ৯৩ সচিবের মধ্যে সবাই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের। ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় চাকরিতে পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যা ছিল ৪২ হাজার আর পূর্ব পাকিস্তানের মাত্র ২ হাজার ১০০ জন। পশ্চিম পাকিস্তানি সরকারি কর্মকর্তাদের মোট বেতন ছিল ১১ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা পেত মাত্র ৬৫ লাখ টাকা। ১৯৪৯-৫০ সালে উভয় প্রদেশের বৈষম্যের মাত্রা ছিল ১৯ শতাংশ, যা ১৯৬৫-৬৬ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৫৫ শতাংশে। ১৯৪৭-৬৬ সালের মধ্যে যে বৈদেশিক সাহায্য দেশের উন্নয়নে ব্যয় তার মধ্যে পূর্ব-পাকিস্তানের অংশ ছিল মাত্র ৩৪ শতাংশ। ব্যাংক, বীমা, শিল্প-কারখানার মালিকানা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ এককভাবে পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে ছিল। পূর্ব পাকিস্তান ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের কাঁচামাল এবং মূলধনের জোগানদাতা।
দুটি সারণির সাহায্যে বৈষম্যের চিত্র দেখানো হয়েছে।
বঞ্চনা ও বৈষম্যের এই ভয়ঙ্কর বাস্তবতা এবং পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশকে উপনিবেশ হিসেবে শাসন-শোষণের পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নীতিই দুই অর্থনীতি তত্ত্বের জন্ম দেয়।
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন যখন আওয়ামী লীগ গঠিত হয়, তখন প্রণীত দলের প্রথম কর্মসূচিতে এবং ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট ২১-দফা দাবিতেও পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি উত্থাপন করা হয়। কিন্তু সেসব দাবিতে প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক নীতি এবং মুদ্রা ব্যবস্থা কেন্দ্রের হাতে রাখার প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের মাথায় সকল প্রকার নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে যখন দুই অঞ্চলের মধ্যে পর্বতপ্রমাণ বৈষম্য সৃষ্টি এবং পূর্ব বাংলাকে বঞ্চিত করে পশ্চিম পাকিস্তানকে গড়ে তোলার কাজ চলতে থাকে, তখন থেকেই আঞ্চলিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলায় রাজনৈতিক দলগুলো এবং বুদ্ধিজীবীগণ প্রতিবাদে সোচ্চার হতে থাকেন। ষাটের দশকের শুরু থেকেই বুদ্ধিজীবী এবং উচ্চপদস্থ কয়েকজন বাঙালি আমলা পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের বৈষম্য নিরসনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের দুই অংশের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনসহ দুই অঞ্চলের জন্য দুটি পৃথক মুদ্রা ব্যবস্থার প্রচলন, বৈদেশিক বাণিজ্যের কর্তৃত্ব প্রদেশের হাতে ন্যস্ত করা এবং পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে অর্থপাচার বন্ধের দাবি উত্থাপন করেন। দুই অর্থনীতির ধারণা অনেকেই পোষণ করেছেন এবং যার যার মতো ব্যাখ্যা করেছেন। বস্তুত, দুই অর্থনীতির তত্ত্ব এককভাবে কোনো ব্যক্তি উদ্ভাবন করেন নি। সূচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমার্স ফ্যাকাল্টির প্রফেসর এএফএম আতোয়ার রহমান, প্রফেসর নূরুল ইসলাম 36এবং পরে ১৯৬১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর লাহোরে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের তরুণ অধ্যাপক ড. রেহমান সোবহান সূত্রাকারে ‘দুই অর্থনীতি’ তত্ত্ব তুলে ধরেন। কেন্দ্রীয় সরকারের বাঙালি আমলা রুহুল কুদ্দুস, আহমদ ফজলুর রহমান ও পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য প্রফেসর আখলাকুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, মোজাফ্ফর আহমেদ চৌধুরী প্রমুখ যেমন দুই অর্থনীতির ধারণাকে স্পষ্ট করে তোলেন, তেমনি রাজনৈতিক অঙ্গনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বপ্রথম দুই অর্থনীতির ধারণাকে পূর্ণাঙ্গ করেন এবং সূত্রাকারে ৬-দফার দাবিতে অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি এই দাবিকে জাতীয় দাবিতে পরিণত করেন।
১৯৬৪ সালের ৫ জুন আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদে শেখ মুজিবুর রহমান ১১-দফা দাবি উত্থাপন করেন। ১১-দফা নিয়ে দলে তুমুল বিতর্ক হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও সর্বসম্মতিক্রমে ১১-দফা গৃহীত হয়। ১১-দফা হচ্ছে পরবর্তী ৬-দফা দাবির ভিত্তি। এই ১১-দফায় ১নং দাবিতে দেশে ফেডারেল পদ্ধতির সরকার চালু, ৭নং দাবিতে, ‘পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন কায়েমের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক মুদ্রা ব্যবস্থাসহ পৃথক অর্থনীতি প্রণয়ন’, ৮নং-এ সকল প্রদেশের জন্য পৃথক বৈদেশিক বাণিজ্যনীতি প্রণয়ন এবং ৯নং-এ ‘বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব-নিকাশ ও আয়-ব্যয়ের পূর্ণ অধিকার প্রদেশের হাতে ন্যস্তকরণের দাবি উত্থাপন করা হয়। প্রকৃতপক্ষে ১১-দফা দাবিতেই প্রথম দুই অর্থনীতির ধারণাটিকে রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে সামনে আনা হয়। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান লাহোরে বিরোধী দলগুলোর আহূত বৈঠকে তার বিখ্যাত ৬-দফা দাবি উত্থাপন করেন। ৬-দফা আলোচ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত না করায় সেই সর্বদলীয় বৈঠক ভেঙে যায়।
ঐতিহাসিক ৬-দফা দাবিতে দুই অর্থনীতির ফরমুলা আরও সুনির্দিষ্ট সূত্রাকারে উত্থাপন করা হয়।
৬-দফার ২নং দফায় ফেডারেল সরকারের হাতে কেবল প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি রাখা হয়। ৩, ৪ ও ৫নং দাবিগুলোতে সহজে বিনিময়যোগ্য দুটি পৃথক মুদ্রা দুই অঞ্চলে চালু করা, পৃথক রাজস্ব ও মুদ্রানীতি গ্রহণ, প্রদেশের হাতে করারোপ ও রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষমতা ন্যস্ত করা, বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য দুটি পৃথক বৈদেশিক বিনিময় মুদ্রার ব্যবস্থা, যে প্রদেশ যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করবে, তার কর্তৃত্ব প্রদেশের হাতে ন্যস্ত করা এবং এক প্রদেশ থেকে (অর্থাৎ পূর্ব বাংলা থেকে) অন্য প্রদেশে (পশ্চিম পাকিস্তানে) মুদ্রা পাচার বন্ধের সাংবিধানিক গ্যারান্টির ব্যবস্থা করার দাবি করা।
৬-দফা একাধারে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন বা স্বশাসনের দাবি, অন্যদিকে এক দেশ দুই অর্থনীতিরও প্রবক্তা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী স্বাভাবিকভাবেই এই দাবিকে পাকিস্তানের মৃত্যু পরোয়ানা মনে করেছে। আবার পৃথক অর্থনীতি না করলে কেবল প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন পেলেও পূর্ব বাংলার ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ শাসন এবং ঔপনিবেশিক প্রভুত্বের অবসান ঘটানো সম্ভব ছিল না। বস্তুত, ৬-দফার ব্যানারে দুই অর্থনীতির তত্ত্ব, আসলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ম্যাগনাকার্টা। দুই অর্থনীতির মাধ্যমে যেমন পাকিস্তানের ঐক্য রক্ষা অসম্ভব ছিল, তেমনি দুই অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনের একমাত্র পথ ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা।
নূহ-উল-আলম লেনিন

শ্রেণী:

১৭ সেপ্টেম্বর ‘শিক্ষা দিবস’

22

22বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর একটি অনন্য দিন। আত্মদানে গৌরবোজ্জ্বল এই দিনটি বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ ‘শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে। কেবল শিক্ষার দাবিতে এমন রক্তক্ষয়ী এবং বিপুল আন্দোলন এ দেশে আর কখনও হয়নি।
১৯৬২ সালটি ছিল আন্দোলনমুখর এক অগ্নিগর্ভ বছর। ১৯৬১ সালের ডিসেম্বর মাসেই আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ও তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত গোপন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মণি সিংহ ও খোকা রায়-এর মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের মধ্যে আইউব খাঁর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। কথা ছিল ১৯৬২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসেই আন্দোলনের সূচনা হবে।
কিন্তু ১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি পাকিস্তানের এককালের প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের কর্ণধার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে করাচিতে গ্রেফতার করে আইউবের পুলিশ। সোহরাওয়ার্দীর গ্রেফতারের পরিপ্রেক্ষিতে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা না করেই সোহরাওয়ার্দীর মুক্তি ও চার বছরের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ আন্দোলনের সূচনা করে। আন্দোলনের মূল সংগঠক ছিল ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন। ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়ে তীব্র দমননীতির মধ্যেও এই আন্দোলন মার্চ মাস পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। মাঝে দমন-পীড়নের জন্য কিছুটা স্তিমিত হলেও এপ্রিল থেকে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র ইস্যুতে আবার ছাত্রসমাজ মাঠে নামে।
এসব আন্দোলনের ফলে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ‘ফিল্ড মার্শাল’ আইউব খান পিছু হটতে বাধ্য হন। ১৯৬২ সালের ৮ জুন পাকিস্তানে ৪৪ মাস স্থায়ী সামরিক আইন প্রত্যাহার হয়। বিরোধী দলগুলোর বিরোধিতা সত্ত্বেও একটি সংবিধান জারি, পরোক্ষ ভোটে (ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের ভোটে) জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের মাধ্যমে আইউব খানের বেসামরিক শাসন সুদৃঢ় করা হয়।
এই পটভূমিতে ১৯৬২ সালের আগস্ট মাস থেকে ছাত্রসমাজ আবার ‘শরীফ শিক্ষা কমিশন’-এর বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ঢাকা কলেজে। দ্বিতীয়ত, এটিই একমাত্র ছাত্র আন্দোলন, যা ছাত্র সংগঠনগুলোর পূর্ব পরিকল্পনা, তাদের উদ্যোগে বা তাদের নেতৃত্বে শুরু হয় নি। সরকার শরীফ কমিশন বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণের, বিশেষত তিন বছরের ডিগ্রি কোর্স চালু এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে অতিরিক্ত ইংরেজি চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে প্রথমে ঢাকা কলেজের, পরে দেশের বিভিন্ন অংশের কলেজ-ছাত্ররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সভা-সমাবেশ, প্রতিবাদী মিছিল ইত্যাদি করতে থাকে। বৃহৎ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দের ধারণা ছিল, কেবল শিক্ষার ইস্যুতে বড় কোনো আন্দোলনে ছাত্রসমাজের সাড়া পাওয়া যাবে না। অতীতে জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যুর সাথে ছাত্রদের দাবি-দাওয়া জুড়ে দিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলার অভিজ্ঞতাকেই তারা প্রাধান্য দিয়েছিলেন। কিন্তু সাধারণ ছাত্ররা তাদের এই ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে। আন্দোলনরত ছাত্রদের মধ্যে প্রথমে ‘ডিগ্রি স্টুডেন্টস ফোরাম’ নামে এবং পরে ‘ইস্ট পাকিস্তান স্টুডেন্টস ফোরাম’ নামে দলমতের ঊর্ধ্বে সাধারণ ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ প্লাটফরম গড়ে ওঠে। প্রথমে কলেজ-ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ১৫ আগস্ট থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত আমতলায় ছাত্র সমাবেশের ভেতর দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজও এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে শুরু করে।
ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ আন্দোলনের বিস্তৃতি এবং তীব্রতা উপলব্ধি করে শিক্ষার দাবিতেই এই আন্দোলনকে আরও সুসংগঠিত এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে আনার জন্য ঐকমত্যে পৌঁছান। এবার তাদের উদ্যোগে গড়ে ওঠে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’।
ছাত্রসমাজ বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে তিন বছরের ডিগ্রি কোর্স বাতিল বা ইংরেজির বোঝা কমানোর মতো দাবি রেখেই মূল দাবি হিসেবে শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিলের দাবিটিকে সামনে আনেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯৫৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর আইউব খাঁ শিক্ষা সংস্কারের লক্ষ্যে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে তার এককালের শিক্ষক এবং পশ্চিম পাকিস্তানের শিক্ষা সচিব এসএম শরিফকে চেয়ারম্যান করে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। এই কমিশন ১৯৫৯ সালের ২৬ আগস্ট তার অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট পেশ করেন। দীর্ঘদিন পর ১৯৬২ সালে চূড়ান্ত রিপোর্ট ছাপিয়ে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা হয়।
সম্পূর্ণ গণবিরোধী এবং প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্রের এই রিপোর্ট কেবল শিক্ষা সংকোচনের দলিলই ছিল না, এই রিপোর্টের অনেক সুপারিশ বাংলা ভাষা এবং বাঙালি জাতিসত্তার মর্মমূলে আঘাত হেনেছিল। রিপোর্টের মূল কয়েকটি সুপারিশ ও অভিমতের মধ্যে ছিলÑ
ক্স শিক্ষা নাগরিকের জন্মগত অধিকার নয়। শিক্ষা একটি উত্তম ব্যয়বহুল বিনিয়োগ।
ক্স অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা অবাস্তব এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়।
ক্স ষষ্ঠ থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক।
ক্স ডিগ্রি কোর্স হবে তিন বছর মেয়াদি।
ক্স সমগ্র পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের বোধগম্যতার জন্য উর্দুকে জনগণের ভাষায় পরিণত করা। কোরআনের ভাষা আরবি লিপিতে উর্দুর মতো বাংলাও লেখা যেতে পারে। তবে চূড়ান্ত সুপারিশে বলা হয়, বাংলা ও উর্দু লিপি সংস্কার করে রোমান হরফে বাংলা এবং উর্দু লেখা।
শরীফ কমিশনের এসব গণবিরোধী এবং চরম প্রতিক্রিয়াশীল সুপারিশ বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ এবং শিক্ষিত নাগরিক মধ্যবিত্তের মধ্যে তীব্র ঘৃণার সঞ্চার করে। ছাত্রসমাজ শরীফ কমিশন বাতিলের দাবি উত্থাপন করলে তা সামগ্রিকভাবে জনগণের বিপুল সমর্থন পায়। আন্দোলন সংগঠিত ও মিলিটেন্ট রূপ নেয়।
১৫ আগস্ট থেকে আন্দোলনে বাঁধ ভাঙা জোয়ারের সৃষ্টি হয়। একের পর এক ধর্মঘট সমাবেশের কর্মসূচি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেমন অচলাবস্থার সৃষ্টি করে, তেমনি ক্রমেই এই আন্দোলনের শ্রমজীবী ও পেশাজীবী বিভিন্ন স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ, আন্দোলনটিকে ‘গণ-আন্দোলনে’ রূপান্তরিত করে। ১০ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ের সামনে অবস্থানের ঘোষণা দেওয়া হয়। সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১০ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি বাতিলর করে। তবে তার পরিবর্তে ১৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করে।
১০ সেপ্টেম্বর সরকার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে কারাগার থেকে মুক্তি দেয়। সরকারের প্রত্যাশা ছিল সোহরাওয়ার্দী মুক্ত হলে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়বে। কিন্তু এই আশা-দুরাশায় পরিণত হয়।
১৭ সেপ্টেম্বর সারাদেশে অভূতপূর্ব হরতাল ও ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। রাজপথে নেমে আসে রাজধানী ঢাকার লক্ষ লক্ষ মানুষ। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশকে সহায়তা করার জন্য ইপিআর ও সেনাবাহিনী নামায়। ছাত্র-জনতার বিশাল জঙ্গি মিছিল হাইকোর্ট পার হয়ে আবদুল গণি রোডে (সচিবালয়ের কাছে) প্রবেশ করতেই মিছিলের ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণ করা হয়। পুলিশের গুলিতে তাৎক্ষণিকভাবে নিহত হন বাবুল এবং বাস কন্ডাক্টর মোস্তফা। গৃহভৃত্য ওয়াজিউল্লাহ গুরুতর আহত হয় এবং সে ১৮ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। ১৭ সেপ্টেম্বর কার্যত ছাত্রসমাজের অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। ঐ দিনের বিক্ষোভ মিছিলে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণই প্রধান হয়ে ওঠে।
১৭ সেপ্টেম্বরের হত্যাকা-ের বিরুদ্ধে প্রচ- দমন-পীড়ন ও প্রতিকূলতার মধ্যেও ছাত্রসমাজ আন্দোলন অব্যাহত রাখে। একপর্যায়ে সরকার নমনীয় হতে বাধ্য হয়। ছাত্রসমাজ ও আন্দোলনকারী জনগণের পক্ষে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর গোলাম ফারুকের সাথে আলোচনায় বসেন। ২৪ সেপ্টেম্বর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পাকিস্তানের ইতিহাসে সর্বপ্রথম পল্টন ময়দানে জনসভা আহ্বান করে। ঐ জনসভা থেকে সরকারের প্রতি ‘চরমপত্র’ দেওয়া হয়।
ইতোমধ্যে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে গভর্নর গোলাম ফারুকের কয়েক দফা বৈঠক হয়। ছাত্রসমাজের এই ‘চরমপত্র’ দেওয়ার তিন দিন পর, সরকার শরীফ কমিশন রিপোর্ট স্থগিত ঘোষণা করে। ডিগ্রি কোর্সের ছাত্রদের, যাদের দুই বছর অতিক্রান্ত হয়েছিল এবং তৃতীয় বর্ষে উঠেছিল তাদের বিনা পরীক্ষায় সবাইকে পাস ঘোষণা করা হয়। গ্রেফতারকৃত ছাত্রদের মুক্তি দেওয়া হয়।
অবশেষে বিজয়ের ভেতর দিয়ে বাষট্টির গৌরবোজ্জ্বল ছাত্র আন্দোলনের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে। ১৯৬৩ সাল থেকে ছাত্রসমাজ ১৭ সেপ্টেম্বর দিনটিকে প্রতিবছর ‘শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়। স্বাধীনতার আগে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে শিক্ষা দিবস পালিত হতো। স্বাধীনতার পর দিনটি ধীরে ধীরে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাচ্ছে।

নূহ-উল-আলম লেনিন

শ্রেণী:

বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা সমাজে; সাহিত্যে ও সংস্কৃতিতে

Posted on by 0 comment

‘সাম্প্রদায়িকতা’ ও ‘মৌলবাদ’ প্রপঞ্চ দুটি বাঙালির সমাজ ও সাহিত্যের প্রভাবশালী অনুষঙ্গ। যুগে যুগে এ অনুষঙ্গগুলো সমাজ ও সভ্যতার দুষ্টক্ষতরূপে আবির্ভূত হয়েছে। একেক যুগের মানুষের জীবনে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ একেকভাবে কাজ করেছে। বাঙালি সমাজে এর উদ্ভব, বিকাশ ও প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বহুমাত্রিক প্রবণতা ও ক্রিয়াকর্মের মধ্য দিয়ে বাঙালি সমাজে এর প্রভাব পড়েছে। এক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি নানা ভাবধারা, চিন্তাচেতনা ও রাষ্ট্রনৈতিক নানা প্রপঞ্চ কাজ করেছে। তবে একটি কথা সত্য যে, সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ কখনোই বাঙালির মূলচেতনা ও ভাবধারাকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি। এর বিপরীতে অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতাবাদী চেতনা বাঙালি জীবন ও তার অগ্রযাত্রার পথকে প্রসারিত করেছে।
সমাজ ও জীবনের অনুষঙ্গ হিসেবে বাঙালির শিল্প-সাহিত্যে-সংস্কৃতিতেও সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের প্রভাব পড়েছে। বস্তুত প্রাচীন কাল থেকে বাঙালি জীবনে ধর্মের বাতাবরণে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বীজ উপ্ত হয়েছে। সমাজ, রাষ্ট্রকাঠামোর বিকাশ ও পরিবর্তনশীলতার সাথে সংগতি রেখে বিভিন্ন যুগে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের প্রকাশভঙ্গিতে কিছু পার্থক্য পরিলক্ষিত হলেও মূলত ধর্মকে কেন্দ্র করে এর মূল ক্রিয়াকর্ম পরিচালিত হয়েছে। মানুষের অন্ধ ধর্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে সমাজ ও রাষ্ট্রের উচ্চকোটির ব্যক্তি-মানুষ, গোষ্ঠী ও ক্ষমতাসীন অথবা রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতি প্রলুব্ধ এলিট শ্রেণিটি তাদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য ধর্মকে বেছে নিয়েছে। সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিষবাষ্প ছড়িয়েছে।
বাঙালি সমাজে প্রধানত হিন্দু ও ইসলামি মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর কর্মকা- বেশি ক্রিয়াশীল ছিল এবং এখনও আছে। বৌদ্ধ ধর্মে মূলানুগত্য বেশি দিন টেকেনি। যে ধর্মে ঈশ্বর-ভাবনা প্রায় অনুপস্থিত ছিল, সেখানে খোদ গৌতম বুদ্ধকেই ভগবান বুদ্ধে পরিণত করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে অসংখ্য দেবদেবীর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। ফলে গৌতম বুদ্ধ প্রবর্তিত বৌদ্ধধর্ম মূলানুগত্য হারিয়ে নতুন নতুন মতাদর্শ ও আচার-আচরণ সংযোজিত হয়েছে। বৌদ্ধধর্মে এক ধরনের মতান্ধতা-কুসংস্কার প্রকটিত হলেও ‘মৌলবাদিতা’ সৃষ্টির অবকাশ পায়নি। এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের মানুষের ওপর চড়াও হয়েছে ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে। এ কথা হিন্দু-মুসলমানের ব্যাপারে যতটা খাটে, বৌদ্ধদের ব্যাপারে ততখানি খাটে না। তবে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলমানদের ক্ষেত্রে সর্বজনীন সত্য হলো এই যে, স্ব স্ব ধর্মের অর্থাৎ একই ধর্মের বিভিন্ন উপসম্প্রদায় ও গোষ্ঠীর মধ্যেও সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও হানাহানি ঘটেছে।
সাহিত্য সমাজ ও জীবনের প্রতিচ্ছবি। মানুষের প্রাত্যহিক জীবন ও সামাজিক কর্মকা-গুলো, সাহিত্যেও প্রতিফলিত হয়। প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা ও রক্ষণশীলতার বেশ দৃষ্টিগ্রাহ্য প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদে সাম্প্রদায়িকতার প্রকাশ না ঘটলেও বৌদ্ধধর্মের বিভিন্ন উপসম্প্রদায়ের মধ্যেকার বিভাজন স্পষ্টরূপে প্রতিভাত হতে দেখা যায়। ধর্মান্ধ বৌদ্ধদের সাধনার বিচিত্র পদ্ধতি চর্যাপদে নানাভাবে রূপায়িত হয়েছে। হিন্দু মৌলবাদী গোষ্ঠীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ বৌদ্ধদের হাঁফ ছেড়ে বাঁচার উল্লাসধ্বনি শোনা যায় রামাই প-িতের শূন্যপুরাণের মধ্যে। এখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ও পরে নবাগত ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের অত্যাচারের কথাও স্থান পেয়েছে। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে বিভিন্ন কবির কাব্যে বিভিন্নভাবে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায় ও মৌলবাদী গোষ্ঠীর বিরোধ-বিসম্বাদের চিত্র যেমন প্রতিফলিত হয়েছে, তেমনি দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে মিলন ও সংশ্লেষণের অভিপ্রকাশও লক্ষ করা যাবে। বিভিন্ন মঙ্গলকাব্য, পুঁথিসাহিত্য, চৈতন্য জীবনীসাহিত্য প্রভৃতির মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা ও রক্ষণশীল চেতনার প্রকাশ লক্ষ করা যায়। আবার আমাদের লোকসাহিত্যে, গীতি-কাব্য, বাউল সংগীতে এবং বৈষ্ণব সাহিত্যে অভিন্ন মানবিক ও বাঙালি চেতনার সুস্পষ্ট প্রকাশও কারও দৃষ্টি এড়াবে না।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের প্রকাশ ঘটেছে আরও ব্যাপক ও গভীরভাবে। ইতিহাসের উত্থান-পতনের ধারাবাহিকতায় এক ধর্মাবলম্বীদের দ্বারা অন্য ধর্মাবলম্বীরা অত্যাচারিত হয়েছে। আধুনিক যুগে ইতিহাসের অনুসন্ধান করতে গিয়ে অনেক প্রতিভাবান লেখক প্রকারান্তরে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদকে উসকে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে মূলত ভারতবর্ষের দুই প্রধান ধর্ম-সম্প্রদায় হিন্দু ও মুসলমানরা একে অপরের মধ্যে বিষোদ্গারের মাধ্যম হিসেবে সাহিত্যকে বেছে নিয়েছে।
সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদকে রাজনৈতিক দানবরূপে আবির্ভূত হতে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছে ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী। তারা শাসনক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী ও কুক্ষিগত করতে গিয়ে একেক সময় একেক সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি আনুকূল্য পোষণ করেছেন এবং সাম্প্রদায়িক সংকট ঘনীভূত করেছেন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা, যেমনÑ প্রবন্ধ, উপন্যাস, নাটক, ছোট গল্প প্রভৃতির মধ্যে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী চেতনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
ভারতীয় তথা বাঙালি সমাজে সাম্প্রদায়িকতার মনস্তত্ত্ব সৃষ্টির একটি অদ্ভুত উপাদান হচ্ছে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যকার যুক্তিহীন আবেগ, স্পর্শকাতরতা এবং পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস, সন্দেহ-সংশয়। একজন হিন্দু বা মুসলমান যদি স্ব স্ব ধর্মের কোনো ঐতিহাসিক চরিত্রের বা ঘটনার অথবা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের নিন্দা বা প্রশংসা করেন, তখন কিন্তু কেউ কাউকে সাম্প্রদায়িক বলে গালি দেয় না। কোনো মুসলমান আকবর বা আওরঙ্গজেবের সমালোচনা করলে তাকে কেউ সাম্প্রদায়িক বলবে না। কিন্তু বিদ্বিষ্ট না হয়ে, সত্যের অপলাপ না করেও যদি একই সমালোচনা হিন্দু ব্যক্তিবিশেষ (তিনি কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিক যা-ই হোন) করেন তা হলে মুসলমানরা তাকে সাম্প্রদায়িক বলে তুলোধুনো করবেন। একই কথা হিন্দুর ক্ষেত্রেও সত্য। অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ বা ঘৃণার মনোভাব পোষণ না করেও কোনো নিষ্ঠাবান ধার্মিক যদি স্বধর্মের গৌরব প্রকাশ ও প্রশংসা করেন তাকে আমরা সাম্প্রদায়িক বলতে পারি না। যেমনটি ঘটেছে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের ক্ষেত্রে।
ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরোধ রাজনৈতিক চরিত্রলাভ করে ইংরেজ শাসকদের প্রত্যক্ষ উসকানির ফলে। একপর্যায়ে সাম্প্রদায়িক মতপার্থক্য থেকে শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও কলহবিবাদ। সাম্প্রদায়িক চেতনার চূড়ান্ত প্রকাশ লক্ষ করা যায় ১৯৪৭ সালের ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির ফলে। এ সময় সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদী উন্মাদনায় অনেক কবি, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক লেখনী ধারণ করেন। ইসলামি তমদ্দুন, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের প্রচার করতে গিয়ে এবং পাকিস্তানকে ইসলামি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্ররূপে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে এক শ্রেণির কবি-সাহিত্যিক উঠে-পড়ে লাগলেন। কিন্তু সাময়িকভাবে মুসলমানদের বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হলেও এই সাম্প্রদায়িক ধারাটি কখনোই মূলধারা হয়ে উঠতে পারে নি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতিসত্তার অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চেতনা নতুন গতিময়তা অর্জন করে। শাসকশ্রেণির রবীন্দ্র-বিরোধী, বাঙালি সাহিত্য-সংস্কৃতি বিরোধী এবং ইসলামিকরণের ষড়যন্ত্র-বিরোধী সংগ্রাম এবং বাঙালির জাতীয় জাগরণ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবল আবেগ বাঙালির সমাজ ও সাহিত্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনাকেই দৃঢ়মূল করে। বিকশিত হয় বাঙালির সেকুলার বা অসাম্প্রদায়িক জাতি-চেতনা এবং জাতি-রাষ্ট্র গঠনের সংগঠিত আন্দোলন।
বাঙালি সমাজ, বাংলা সাহিত্য তথা বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিশ্লেষণে প্রাসঙ্গিকভাবে এসে যায় পুঁজিবাদী পরাশক্তিগুলোর ক্রিয়াকর্মের কথা। সা¤্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থে বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী রাষ্ট্র ও গোষ্ঠীর জন্ম দিয়েছে। সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতন ও ¯œায়ুযুদ্ধের অবসানের পর একমেরু নতুন বিশ্বব্যবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একপাক্ষিক কর্তৃত্ব মৌলবাদী শক্তির উত্থানের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদারিত্ব ঠেকাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সহযোগিতায় এবং সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের রক্ষণশীল দেশগুলোর অর্থানুকুল্যে তালেবান সন্ত্রাসীদের গড়ে তোলে। বিন লাদেন ও তার আল-কায়দা গোষ্ঠীও সোভিয়েত-বিরোধী জিহাদে যুক্তরাষ্ট্রের মদদ পেয়েছে। কেবল আফগানিস্তান নয়, পাকিস্তান, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলো তাদের অর্থে জন্ম দিয়েছে একাধিক সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী ও জঙ্গিগোষ্ঠী। অনেক সময় এই জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো পরাশক্তিসমূহের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর তাদের টনক নড়ে। এরপর আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্বের সামরিক অভিযানের পর মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের তৎপরতা সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়ে।
সোভিয়েত-বিরোধী জিহাদের সময়ে শুরু হয়ে আফগানিস্তানে তালেবানি ট্রেনিং গ্রহণ করে অনেক মুজাহিদ দেশে ফিরে আসে এবং বিভিন্ন মাদ্রাসাকে তাদের কর্মকা-ের নিরাপদ স্থানরূপে বেছে নেয়। শুধু তাই নয়, ‘আমরা হবো তালেবান, বাংলা হবে আফগান’ এমন স্লোগান তুলতেও তারা দ্বিধাবোধ করেনি। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে এই জঙ্গিগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাপক শক্তি অর্জন করে। এরা মিত্র হিসেবে খুঁজে পায় ভারতবর্ষের মৌলবাদী শক্তির পুরনো সংগঠন জামাতে ইসলামকে। সাংগঠনিক ও জঙ্গি কার্যক্রম চালানোর জন্য তারা নামে-বেনামে নানা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে প্রচুর অর্থ উপার্জন করে। একদিনে বাংলাদেশের প্রায় সবক’টি জেলায় বোমা ফাটিয়ে তারা তাদের শক্তির জানান দেয়। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকা- ও প্রগতিশীল চিন্তার বাহকদের তারা নিজেদের প্রতিপক্ষ মনে করে তাদের হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। এককথায় বাংলাদেশ হয়ে ওঠে মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির অভয়ারণ্য। এই সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী গোষ্ঠীর মদদপুষ্ট এক শ্রেণির লেখক ও বুদ্ধিজীবী লেখনী ধারণ করেন। তাদের সাহিত্যে ঘটে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের প্রভাব।
আমরা আগেই বলেছি, সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ বাঙালি সমাজ ও বাংলা সাহিত্যে নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করলেও মূল বাঙালি জনগোষ্ঠীকে ও বাংলা সাহিত্য-বাঙালি সংস্কৃতিকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি। প্রাচীনকাল থেকেই অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল ধারাকে বাঙালি সমাজ ও এখানকার সাহিত্যিকগণ লালন করেছেন। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, সম্প্রদায়Ñ সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে তারা মানবতার জয়গান গেয়েছেন। চ-ীদাস, নানক, কবীর, দাদু, লালন শাহ এরা সবাই অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথাই তাদের সাধনার মাধ্যমে প্রচার করেছেন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান সাহিত্যিকেরা সবার ওপরে মানবতাকে স্থান দিয়েছেন। ধর্মীয় উন্মাদনায় ভারত-পাকিস্তান নামের রাষ্ট্র তৈরি হলেও বাঙালিরা লালন করেছে অসাম্প্রদায়িকতাকে। সেজন্য ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে এসে তারা জন্ম দিয়েছে অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশের মূলধারার কবি-সাহিত্যিকগণ মানবতাবাদী ধারাকে তাদের সাহিত্যে স্থান দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে ধারণ করে অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, মানবতাবাদী ভাবধারা প্রকাশে তারা লেখনী সঞ্চালন করে যাচ্ছেন। হুমায়ুন আজাদের মতো লেখকসহ অনেক প্রগতিশীল অধ্যাপক, প্রকাশক, ব্লগার এবং সংস্কৃতিকর্মী জঙ্গিগোষ্ঠীর হিং¯্র আক্রমণের শিকার হয়েছেন; জীবন দিয়েছেন। হিন্দু পুরোহিত, বৌদ্ধ ভিক্ষু ও খ্রিস্টান যাজক যেমন আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন তেমনি মুসলমান মুসল্লিরাও বাদ যান নি। জঙ্গিদের হাতে নিহত হয়েছেন বিদেশি নাগরিক এবং নিরপরাধ সাধারণ মানুষ। কিন্তু এতে করেও বাঙালি জাতিকে ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদিতার ফাঁদে ফেলা যায় নি। বাঙালি জাতির অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক চৈতন্যই তাকে সংশ্লেষণের ধারায় পুষ্ট করেছে। এই সংশ্লেষণ এবং অসাম্প্রদায়িকতাই হচ্ছে বাঙালির মূল চেতনা এবং বাংলা সাহিত্যের মূলধারা।

নূহ-উল-আলম লেনিন

শ্রেণী:

বাংলা মুদ্রণশিল্প ও প্রকাশনার স্বাধীনতা প্রসঙ্গ

Posted on by 0 comment
45

45ফ্রিডম বা স্বাধীনতা শব্দটি অর্থব্যঞ্জনার দিক থেকে বহুমাত্রিক। চিন্তার স্বাধীনতা (Freedom of Thought) কোনো শর্তাধীন নয়। কিন্তু চিন্তা যখন অভিব্যক্ত বা প্রকাশিত হবে তখন তা শর্তাধীন। আপনি যা খুশি, যেমন খুশি চিন্তা করতে পারেন। কিন্তু এই চিন্তা যেমন তেমনভাবে প্রকাশ করা যাবে না। প্রকাশের আগে ভাবতে হবে প্রকাশিত বিষয়ের সামাজিক উপযোগিতা ও প্রাসঙ্গিকতা। দ্বিতীয়ত; ভাবতে হবে পাঠক-শ্রোতার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া এবং তৃতীয়ত; প্রকাশ মাধ্যম, প্রকাশের ভাব, ভাষা ও শৈলীর কথা। এক্ষেত্রে লেখক-চিন্তক নিজেই এক ধরনের সেল্ফ সেন্সরশিপ আরোপ করেন। অর্থাৎ, চিন্তাটি প্রকাশকালেই শর্তাধীন হয়ে পড়ে। সবচেয়ে আধুনিক, গণতান্ত্রিক এবং খোলামেলা সমাজেও এই সেল্ফ সেন্সরশিপ কার্যকর।
আলোকিত শতাব্দী বলে কথিত ইউরোপে অষ্টাদশ শতকে মুদ্রণযন্ত্র ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, এর অনুষঙ্গ ভাববিপ্লব, পুঁজিবাদের উদ্ভব, শিক্ষার বিস্তার এবং ভোক্তা হিসেবে শিক্ষিত এলিট শ্রেণির বিকাশ, সংবাদপত্র ও গ্রন্থ প্রকাশনাকে নতুন পর্যায়ে উন্নীত করে। মুদ্রিত গ্রন্থ ও সংবাদপত্র ক্রমশ ‘পণ্য’ হয়ে ওঠে এবং প্রকাশনা ভ্রুণাবস্থা থেকে ‘শিল্প’ (Industry) হওয়ার পথে পা বাড়ায়।
বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশে আমাদের আরও ‘শতবর্ষ’ অপেক্ষা করতে হয়। অষ্টাদশ শতক ইউরোপে বিভাসিত শতাব্দী হিসেবে চিহ্নিত হলেও, আমাদের জাতীয় ইতিহাসে ওই শতাব্দী চিহ্নিত হয়ে আছে লজ্জা, গ্লানি ও আত্মবলোপের শতাব্দী হিসেবে। অষ্টাদশ শতকে বহিরাগত ইংরেজরা আমাদের ‘মধ্যযুগীয়’ এশিয়াটিক ‘স্বাধীনতা’ ছিনিয়ে নিয়ে ‘আধুনিক’ ইউরোপের পরাধীনতার শৃঙ্খল পরিয়ে দেয়। কিন্তু আমাদের প্রকৃত আধুনিকতার উত্তরণ শুরু হয় শতবর্ষ পরে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে। ইউরোপের সাথে আপেক্ষিক সাদৃশ্য চোখে পড়বে কলকাতা-কেন্দ্রিক মুৎসুদ্দি এন্টারপ্রিনিউর শ্রেণির পাশাপাশি মধ্যবিত্ত শ্রেণির গড়ে ওঠার মধ্যে। শ্রীরামপুর মিশনারিদের হাত ধরে আধুনিক বাংলা গদ্যের হাঁটি হাঁটি পা পা যাত্রা শুরু। ১৮০০ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা, ১৮০১ সালে ফোর্ট উইলিয়ামে বাংলা বিভাগ চালু হওয়া এবং ১৮০৯ সালে পাদ্রী চার্লস উইলকিসের পৃষ্ঠপোষকতায় পঞ্চানন কর্মকারের মুদ্রণোপযোগী কাঠখোদাই বাংলা লিপিমালা তৈরির ভেতর দিয়ে বাংলা মুদ্রণ শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। ১৮১৮ সালের এপ্রিলে প্রথমে শ্রীরামপুর মিশন থেকে বাংলা ভাষায় প্রথম সাময়িকপত্র ‘দিগদর্শন’ এবং কিছুদিন পর ‘সমাচার দর্পণ’ প্রকাশিত হয়। একই বছর গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় বাঙালি প্রকাশিত প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বাঙ্গাল গেজেট’ প্রকাশিত হয়।
পরাধীন ভারতে প্রথম মুদ্রিত সংবাদপত্র অবশ্য ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত। ১৭৮০ সালের ২৯ জানুয়ারি অগাস্টাস হিকি প্রকাশ করেন Bengal Gazette ev Calcutta General Advertise। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিষয়টিকে সুনজরে দেখে নি। বেসরকারি ইংরেজ মালিকানার এই সংবাদপত্রটি কোম্পানি সরকারের দেশ শাসনে নানাবিধ অসংগতির সমালোচনা করার ১৭৯৯ সালে লর্ড ওয়েলেস্লি ভারতবর্ষে প্রথম সেন্সর প্রথা চালু করেন।
উপমহাদেশে এই প্রথম প্রকাশনার স্বাধীনতায় রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের শুরু। ১৮১৮ সালে বাংলা সাময়িকপত্র দিগদর্শন প্রকাশের বছর লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস সেন্সরশিপ তুলে নেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তা আরও কঠোর বিধিনিষেধসহ পুনঃপ্রচলন করা হয়।
মুদ্রণযন্ত্র মানব মনীষার বিকাশে একটা বিপ্লব সংঘটিত করে। ইউরোপের শতবর্ষ পরে শুরু হলেও মুদ্রণ শিল্প বাঙালি রেনেসাঁর অনুষঙ্গ হয়ে পড়ে। অন্যভাবে বলা যায়, মুদ্রণযন্ত্র ভারতীয় বা বাংলার রেনেসাঁর অন্যতম প্রধান অনুঘটক। উনিশ শতকে যে ভাববিপ্লব, নিঃসন্দেহে তার প্রধান বাহন ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত সংবাদপত্র, কবিতা, উপন্যাস ও প্রবন্ধ। এক কথায় সাহিত্য। বলা হয়ে থাকে বাংলা সাময়িকপত্র প্রকাশের দুবছর আগেই, ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দে গঙ্গা কিশোর ভট্টাচার্য ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্য সম্পাদনা করেন এবং কলকাতার Ferris and Companyথেকে ছাপিয়ে প্রকাশ করেন। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই বাংলা গ্রন্থের প্রকাশনাÑ উত্তরণকাল অতিক্রম করে। প্রকাশনা একটা শিল্প হিসেবে গড়ে ওঠার পথে পা’ বাড়ায়।
বাঙালি মনীষার বহুমুখী সৃজনশীলতার বাহন হয়ে ওঠে প্রকাশনা শিল্প। বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতোই সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় বিপুল প্রাণাবেগ ও মননশীলতার সংযোগে প্রকাশিত হতে থাকে কাব্য, মহাকাব্য, প্রহসন, নাটক, উপন্যাস এবং প্রবন্ধ।
এই মহৎ কর্মযজ্ঞে তৎকালীন পূর্ব বাংলা, আজকের বাংলাদেশও শামিল হয়। ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে রংপুর থেকে প্রকাশিত ‘রঙগপুর বার্তাবহ’ দিয়ে শুরু হলেও পূর্ব বাংলার মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্পের পত্তন হয় কার্যত ঢাকা শহরে, ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে। ঢাকা প্রেস নামক মুদ্রণালয় থেকে সাপ্তাহিক The Dacca News পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে এখানে প্রকাশনা শিল্পের যাত্রা শুরু হয়।
বাংলা প্রকাশনার পথটি নিষ্কণ্টক ছিল না। সেন্সরশিপের কথা আগেই বলেছি। উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় সংগ্রাম যত বেগবান হয়েছে, সেন্সরশিপ ততই কঠোর হয়েছে। কেবল সেন্সরশিপ দিয়েই নয়, উপনিবেশবাদ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে সৃজনশীল সাহিত্যের সংগ্রামী ভূমিকা যত তীব্র হয়েছে, ব্রিটিশ সরকার ততই তা দমনে খড়গহস্ত হয়েছে। ‘ভারত রক্ষা’ আইনসহ নানান কালাকানুন দিয়ে মুক্তচিন্তা, বাক-ব্যাক্তি ও প্রকাশনার স্বাধীনতাকে শৃঙ্খলিত করার প্রয়াস চলতে থাকে। প্রকাশিত বই বাজেয়াপ্ত করা, বে-আইনি বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেই তার ক্ষান্ত থাকে নি। লেখা, মুদ্রণ ও প্রকাশনার অপরাধে সংশ্লিষ্টদের নানা মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হতে থাকে।
ঔপনিবেশিক যুগে ঢাকা একটি জেলা শহর থাকায় এখানে প্রকাশনা শিল্পের বিকাশ ছিল সীমাবদ্ধ। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানীর মর্যাদা পায় ঢাকা। দেশভাগের অন্য নেতিবাচক ফলাফল যাই হোক, প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকা হয়ে ওঠে বাঙালি জাতিসত্তার নবজাগরণের আরেক কেন্দ্র।
উনিশ শতকের বাঙালি রেনেসাঁ বা বাংলার নবজাগরণ ছিল খ-িত। বাঙালি মুসলমান ছিল ঐ রেনেসাঁর বাইরে। কিন্তু ১৯৪৭-এর পর রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে পূর্ব বাংলার বিকাশোন্মুখ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, আরও স্পষ্ট করেই বলা যায়, মুসলমান মধ্যবিত্ত নতুন এক রেনেসাঁর সূত্রপাত করে।
পাকিস্তানি শাসন (১৯৪৭-১৯৭১) ছিল পূর্ব বাংলা, আজকের বাংলাদেশের ওপর চেপে বসা এক ধরনের ঔপনিবেশিক শাসন। ১৯৪৮ ও ১৯৫২ ভাষা সংগ্রামের ভেতর দিয়ে কেবল রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠাই নয়, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্পকলাসহ বাঙালি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অচলায়তন ভেঙে মুক্তধারার সৃষ্টি হয়। শিল্প সাহিত্যের এই মুক্তধারাই বাঙালি মধ্যবিত্তের মানস গঠনে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। এই নবজাগরণ বা রেনেসাঁর অনিবার্য পরিণতি স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়।
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আগে প্রকাশনার স্বাধীনতা নানা বিধি-নিষেধের বেড়াজালে আবদ্ধ ছিল। গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ, সেকুলারিজম এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের অভীপ্সা অনুপস্থিত ছিল বলে পাকিস্তানি শাসনামলে চিন্তার স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং প্রকাশনার স্বাধীনতা নিয়েও আমাদের নিরন্তর সংগ্রাম করতে হয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা এই দৃশ্যপট বদলে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শিক্ষার বিকাশ, একুশের বইমেলা, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে একাধিক সরকারি সংস্থার মাধ্যমে সৃজনশীল সাহিত্য ও গবেষণার বিভিন্ন শাখার গ্রন্থ ক্রয় এবং অন্যান্যভাবে প্রদেয় রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পকে নতুন পর্যায়ে উন্নীত করেছে। প্রকাশনা শিল্পের প্রধান পৃষ্ঠপোষক এখন বিশাল এক পাঠক-শ্রেণি। এই মধ্যবিত্ত পাঠক তথা ভোক্তা-শ্রেণির ক্রমোস্ফীতির কারণে আমাদের সনাতন বাংলাবাজার-কেন্দ্রিক ক্ষুদ্র প্রকাশনা ব্যবসাটি এখন কর্পোরেট শিল্পে উত্তরণের মতো সাবালক হয়ে উঠেছে।
প্রকাশনার স্বাধীনতা বাংলাদেশে প্রায় নিরঙ্কুশ। আমাদের দেশে অতীতের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৩ সালে প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেনশনস অর্ডিন্যান্স-এর মতো একটা নিয়ন্ত্রক আইন থাকলেও, ঔপনিবেশিক আমলের মতো এই আইনটি প্রকাশনার স্বাধীনতাকে কোনোভাবেই খর্ব করেনি। এটাকে কোনোমতেই কালাকানুন বলা যাবে না। সর্বোপরি আমাদের সংবিধানে ৩৯ অনুচ্ছেদে ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা’ দেওয়া হয়েছে, যা প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা এবং Freedom of Press-কে নিশ্চিত করেছে।
শিক্ষার বিপুল প্রসার, শক্তিশালী মধ্যবিত্ত ও এলিট শ্রেণির উদ্ভব, নগরায়ন, জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকারের একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণের বহুমুখী উদ্যোগ, বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সংস্কৃতির চর্চা, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বাতাবরণ এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের আনুকূল্য বাংলাদেশে প্রকাশনার স্বাধীনতাকে যেমন অর্থবহ করে তুলছে, তেমনি এই শিল্পের জন্য খুলে দিচ্ছে অমিত সম্ভাবনার দুয়ার। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।

নূহ-উল-আলম লেনিন

শ্রেণী:

জিহাদ

Posted on by 0 comment
45

45আরবি জিহাদ শব্দটি ‘জহদ’ ধাতু হতে উৎপন্ন। ক্রিয়াপদে ‘জহদ’ অর্থ চেষ্টা করা/করিল এবং পরিশ্রম করা/করিল। আর ‘জাহদ’ অর্থ সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা, অধ্যবসায় সহকারে কাজ ও সংগ্রাম করা/করিল। ব্যুৎপত্তিগতভাবে ‘জিহাদ’ শব্দের সাথে অস্ত্র বা যুদ্ধ অবিচ্ছেদ্য অথবা সমার্থক নয়।
জিহাদ শব্দটির রয়েছে বহুমাত্রিক অর্থ ব্যঞ্জনা। Dictionary of Islam (Thomas Patrick Hughes, Page-243 ) কোষ গ্রন্থে Jihad-এর অর্থ করা হয়েছে ‘An effort or a striving.’
কেউ কেউ অবশ্য ‘জিহাদ’কে ধর্মযুদ্ধের সমার্থক বলে ব্যাখ্যা করেছেন। ‘ধর্মযুদ্ধ’ প্রত্যয়টিকেও তার পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিচ্ছিন্ন করে যারা আক্ষরিক অর্থে ব্যাখ্যা করেন, তারা ‘ধর্মযুদ্ধের’ স্বরূপ ও ‘জিহাদের’ অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বুঝতে অক্ষম বলে অনেক ইসলামি প-িত মনে করেন।
জিহাদের বিকৃত এবং খ-িত ব্যাখ্যা বিশ্বব্যাপী মৌলবাদী-জঙ্গিবাদী উত্থানের যেমন অন্যতম অনুঘটক, তেমনি শান্তির ধর্ম ইসলামকে অসহিষ্ণু, রক্তপাত এবং অশান্তির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার অপপ্রয়াস বলে মনে করা হয়। পবিত্র কোরআনে শক্তি প্রয়োগ বোঝাতে ভিন্ন ভিন্ন শব্দ রয়েছে। কোরআনে ব্যবহৃত ‘জিহাদ’ অর্থ যথাসাধ্য পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও ত্যাগের মাধ্যমে আল্লাহর আদিষ্ট জীবন-পন্থা অনুসরণ করাই বুঝতে হবে। (সংক্ষিপ্ত ইসলামি বিশ্বকোষ, ১ম খ-, পৃষ্ঠা-৪০৩)।
পবিত্র কোরআন শরিফে অনন্ত ২৩ বার জিহাদ শব্দের উল্লেখ রয়েছে।
হজরত মোহাম্মদ (স.)-এর জীবিতকালে আরব উপদ্বীপে যেসব ইসলাম-বিদ্বেষী ভিন্নধর্মী, পৌত্তলিক এবং গোত্র ইসলাম ধর্ম প্রচারে বাধা দিয়েছে অথবা নবদীক্ষিত মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য সশস্ত্র আক্রমণ করেছে, তাদের হাত থেকে আত্মরক্ষা করা এবং ইসলাম ধর্মকে সুরক্ষার জন্য বিশ্বাসীদের প্রতি জিহাদের আহ্বান জানানো হয়। এই জিহাদে যারা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশগ্রহণ করে তাদের বলা হয় মুজাহিদ। কিন্তু মহানবী হজরত মোহাম্মদ (স.)-এর মতে, এটা হচ্ছে ‘ছোট জিহাদ’।
মনে রাখতে হবে, হজরত মোহাম্মদ (স.)-এর মদিনায় আগমনের (হিজরত) পরই কেবল প্রথম ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু কোরআনের বিভিন্ন সুরা ও আয়াত নাজেল হতে শুরু হয় হজরত মোহাম্মদ (স.) মক্কায় থাকতেই। মক্কায় যেসব সুরা প্রত্যাদেশ রূপে অবতীর্ণ বা নাজেল হয়, পবিত্র কোরআনের সেসব সুরাকে বলা হয় মক্কী সুরা। মক্কায় অবতীর্ণ আয়াতে, যেখানে জিহাদের উল্লেখ আছে, সেখানে কাফেরদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ অর্থে এই শব্দের ব্যবহার হয়নি। মানুষের ভিতরের অসৎ চিন্তা, হিংসা-বিদ্বেষ ও পশু প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সচেতন সংগ্রাম এবং সৎকর্ম সাধন, অধ্যবসায় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও নৈকট্য লাভের চেষ্টাকেই ‘বড় জিহাদ’ বলা হয়েছে।
এক যুদ্ধ অভিযান থেকে ফিরে এসে হজরত মোহাম্মদ (স.) বলেছিলেন, ‘আমরা ছোট জিহাদ (অস্ত্রযুদ্ধ) থেকে এখন বড় জিহাদে (প্রবৃত্তির সাথে যুদ্ধে) ফিরে এসেছি।’ কোরআন শরিফে বলা হয়েছে, ‘তোমরা কাফিরদের আনুগত্য করিও না, বরং ইহার (কোরআনের) সাহায্যে তাহাদের সহিত বড় জেহাদ করিয়া যাও’ (২৫:৫২)। এখানে উল্লিখিত জিহাদের অস্ত্র কোরআনে বিবৃত যুক্তি ও প্রজ্ঞা; এই অর্থে জিহাদ শব্দের ব্যবহারও লক্ষণীয় : ‘তোমরা প্রভুর পথের দিকে আহ্বান কর প্রজ্ঞা ও সদুপদেশের মাধ্যমে এবং প্রকৃষ্টতর উপায়ে তাদের সাথে বিতর্ক কর’ (১৬:২৫)।
জিহাদ যে একটি বহুমাত্রিক প্রত্যয় তা আরও স্পষ্ট হয় বিভিন্ন হাদিস থেকে। হজরত মোহাম্মদ (স.) বলেছেন, ‘অত্যাচারী শাসকের মুখের ওপর হক-কথা বলা কঠিনতম জিহাদ-তিরমিজি। অন্য এক হাদিসে আছে : “এক ব্যক্তি রাসুলাল্লাহ (স.)-এর নিকট আসিয়া জেহাদের জন্য অনুমতি প্রার্থনা করিল। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন : তোমার মাতা-পিতা জীবিত আছেন? সে বলিল : হ্যাঁ, আছেন। তিনি বলিলেন : তবে তাহাদের সম্বন্ধে জেহাদ করÑ অর্থাৎ তোমার পিতা-মাতার নিকট ফিরিয়া যাও এবং তাহাদের সহিত উত্তম ব্যবহার কর।” বর্ণনা করেছেন হজরত আবদুল্লাহ বিন আমর (বোখারি, মোসলেমÑ সংক্ষিপ্ত ইসলামি বিশ্বকোষ দ্রষ্টব্য)।
কোরআনে কাফেরদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের অনুমতি বা নির্দেশের ক্ষেত্রে সাধারণত ‘কিতাল’ শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। যেমনÑ যাহারা ঈমান আনে তাহারা আল্লাহর নামে যুদ্ধ করে (কাতেলুন); যাহারা কুফরের পক্ষাবলম্বন করে তাহারা ‘তাগুত’ অর্থাৎ আল্লাহ-বিরোধী শক্তির পক্ষে যুদ্ধ করে। সুতরাং, যুদ্ধ কর শয়তানের বন্ধুগণের বিরুদ্ধে (৪:৭৬)। কোরআনে সর্বপ্রথম যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হয়েছে যে আয়াতে সেখানেও ‘জিহাদ’ শব্দ ব্যবহার করা হয় নি, ব্যবহৃত হয়েছে ‘কিতাল’ শব্দ (২২:৩৯)। সুরা হজের ৩৯ আয়াতে বলা হয়েছে : ‘যাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হইতেছে তাহাদিগকে (আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধ করিবার) অনুমতি দেওয়া হইল, কারণ তাহাদের ওপর জুলুম করা হইতেছে এবং নিশ্চয় আল্লাহ তাহাদিগকে সাহায্য করিতে পূর্ণ ক্ষমতাবান।’ যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোতে ‘কিতাল’ ও ‘কাতল’Ñ এ দুটি শব্দের ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এমনকি অমুসলিমদের সাথে যুদ্ধ সংক্রান্ত আলোচনায় ‘অভিযান’ ‘বহির্গমন’ ইত্যাদি শব্দের উল্লেখ আছে। জিহাদ নেই (৯:৩৮, ৩৯, ৪২)।
হজরত মোহাম্মদ (স.) যেসব যুদ্ধ অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাকে ‘গাজওয়া’ আখ্যা দেওয়া হয়। গাজওয়া থেকে ‘গাজি’ শব্দ এসেছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, বিধর্মী বা কাফেরদের বিরুদ্ধে সকল যুদ্ধকেই ‘জিহাদ’ বলা হয়নি। জিহাদের প্রকৃত মর্মবাণী হচ্ছে বিশ্বাসী প্রতিটি মানুষের ভেতরের লোভ, লালসা, হিংসা, বিদ্বেষ, পাশবিক প্রবৃত্তি এবং দুর্বলতা থেকে নিজেকে মুক্ত করা, শুদ্ধ করা এবং উচ্চতর নৈতিক গুণাবলী অর্জন করার জন্য নিরন্তর আত্মসংগ্রাম। এই জিহাদ হচ্ছে নিজেকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সংগ্রাম। এই জিহাদ হচ্ছে আত্মশুদ্ধির সংগ্রাম। এই জিহাদ হচ্ছে অহিংস, শান্তিপূর্ণ এবং ¯্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের সর্বশ্রেষ্ঠ পথ।
ইসলামের ইতিহাসের অপব্যাখ্যাকারী এবং ক্ষমতালিপ্সু কোনো শাসক নিজেদের অসৎ উদ্দেশ্যে জিহাদের বিকৃত ব্যাখ্যা করেছেন। খোলফায়ে রাশেদীন-এর সময় অথবা পরবর্তীকালে মুসলমানদের সা¤্রাজ্য বিস্তারের সময় অসংখ্য যুদ্ধ-বিগ্রহ হয়েছে। এসব যুদ্ধ যেমন ভিন্ন ধর্মাবলম্বী জনপদের শাসকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছে, তেমনি এক মুসলমান শাসক অন্য মুসলমান শাসকের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। ইসলামের ইতিহাসে এর কোনোটিকেই ‘ধর্মযুদ্ধ’ বা ‘জিহাদ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। তবে কোনো কোনো ধর্মান্ধ বা মতলববাজ মুসলিম রাজা-বাদশা বা উচ্চাকাক্সক্ষী যুদ্ধবাজ সামরিক নেতা অন্য রাষ্ট্র দখলে তার অধীনস্ত সৈনিকদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য, যুদ্ধের ব্যয় মিটানোর উদ্দেশ্যে প্রজাদের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য এবং আক্রমণকারী হিসেবে অন্যায়যুদ্ধকে ‘ন্যায়যুদ্ধ’ হিসেবে বৈধতা দান করার জন্য ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে পরিচালিত যুদ্ধকে ‘জিহাদ’ হিসেবে চালাবার চেষ্টা করেছে।
যেমনটি করেছে ইউরোপের আক্রমণকারী খ্রিস্টান শাসকরা। তারা জেরুজালেম দখল এবং মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়া মাইনরের মুসলিম শাসিত রাজ্যগুলো দখল করার জন্য ২০০ বছর ব্যাপী পরিচালিত যুদ্ধকে ‘ক্রুসেড’ বা ‘ধর্মযুদ্ধ’ আখ্যা দিয়েছিল। এই ২০০ বছরের ক্রুসেডের বিরুদ্ধে একবার মাত্র সুলতান সালাহউদ্দিন জিহাদের ডাক দিয়েছিলেন। দ্বিতীয়বার জিহাদের ব্যাপক ব্যবহার হয় সতের শতকের শেষ দিকে, পশ্চিম আফ্রিকায় সেনেগাম্বিয়া অঞ্চলে। দাস ব্যবসার বিরুদ্ধে সুফি নেতাদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই জিহাদ (১৬৭৭) সপ্তদশ শতকে এসে, ৮০ বছর পর উল্টো প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে দাস সংগ্রহের হিংসাত্মক যুদ্ধে পরিণত হয়। তৃতীয়বার জিহাদের ডাক দেন ওয়াহাবি মতবাদের প্রবক্তা মুহাম্মদ ইবন আবদুল ওয়াহাব (১৭০৩-১৭৯২)। সশস্ত্র সংগ্রাম হিসেবে চতুর্থবার জিহাদ ঘটেছিল সুদানে। সেখানকার উপনিবেশ-বিরোধী নেতা মহম্মদ আহমেদ (১৮৪৪-১৮৮৫) নিজেকে আল মাহাদি বা ত্রাণকর্তা হিসেবে ঘোষণা করে তুর্কি-মিসরীয় শাসকদের বিরুদ্ধে সুদানের মানুষকে লড়াইয়ের ডাক দেন। এ ছাড়া আরও কিছু ছোটখাটো জিহাদের চেষ্টা হলেও গত শতাব্দীর আশির দশকে আফগানযুদ্ধকে কেন্দ্র করেই সর্বশেষ ‘জিহাদের’ আওয়াজ শোনা যায়। এই জিহাদের ভাবাদর্শগত নেতা হলেন সৌদি আরবের বাসিন্দা বিন লাদেন ও তার আল-কায়দা সংগঠন। আফগানিস্তানের তালিবান (অর্থ ছাত্র) শাসকরা জিহাদের অধ্যাত্ম চেতনাকে হিংসা ও সন্ত্রাস দিয়ে প্রতিস্থাপিত করে। তালিবানদের পৃষ্ঠপোষক ছিল পাকিস্তান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পরে মার্কিনীরা তালিবান শাসন উৎখাত করে।
সমকালীন বিশ্বে জিহাদের হিং¯্রাশ্রয়ী বিকৃত ব্যাখ্যার উৎস হচ্ছে অষ্টাদশ শতকের আরব-উপদ্বীপের ওয়াহাবি মতবাদ। ওয়াহাবি মতে, ১৪০০ বছর আগের মূলানুগ ইসলামে ফিরে যাওয়া, আক্ষরিক অর্থে কঠোরভাবে শরিয়া আইন মেনে চলা, ভিন্নমতাবলম্বীদের (মুসলমান হলেও) নিশ্চিহ্ন করা, সর্বোপরি সর্বপ্রকার কুফরি মতবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র ধর্মযুদ্ধ বা জিহাদ করা সুন্নী মতাবলম্বী সকল মুসলমানের জন্য ফরজ। ওয়াহাবি মতানুসারে ‘শিয়া’ মতবাদ ইসলাম বিরুদ্ধ এবং দুশমন।
ওয়াহাবি মতবাদেরই আধুনিক সংস্করণ হচ্ছে মওদুদী মতবাদ এবং মিসরের হাসান আল বান্না ও সাঈদ কুতুব (মিসরে গত শতাব্দীতে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিষ্ঠাতা দুজনকেই ভিন্ন ভিন্ন সময়ে মৃত্যুদ- দেয় মিসর সরকার)। উপমহাদেশে ১৯৪১ সালে জামায়াতে ইসলামি হিন্দ্ প্রতিষ্ঠা করে এই মৌলবাদী মতবাদকে রাজনৈতিক সংগ্রামের হাতিয়ারে পরিণত করেন মওলানা আবুল আলা মওদুদী। জামাত ও মওদুদী ১৯৫৩ সালে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উসকানি দিয়ে বিপুল সংখ্যক কাদিয়ানিকে হত্যা করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশেও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে জামায়াতে ইসলামি গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যা সংঘটিত করে। জামায়াতে ইসলামি জিহাদের বিকৃত ব্যাখ্যা করে বর্তমানেও তরুণদের হত্যা-সন্ত্রাসে সংগঠিত করছে। ব্রিটেনে গঠিত হিযবুত তাহরীর বর্তমানে বিশ্বব্যাপী শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে জিহাদের আহ্বান নিয়ে তাদের সন্ত্রাসী কর্মকা-ে সংগঠিত করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে আইএস, আফ্রিকায় বোকাহেরু এবং পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ প্রভৃতি দেশে নানা নামে গঠিত জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো ‘জিহাদের’ নামে রক্তপাত ও সন্ত্রাসী কর্মকা- পরিচালনা করছে। কিন্তু এরা সবাই জিহাদের মর্মবাণীর বিকৃত ও খ-িত ব্যাখ্যা হাজির করে বিশ্বব্যাপী বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। শান্তির ধর্ম ইসলামের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করছে।

নূহ-উল-আলম লেনিন

শ্রেণী: