মানুষের উন্নত জীবন নিশ্চিত করাই আমার কাম্য

11-6-2018 6-03-34 PM

11-6-2018 6-03-34 PMউত্তরণ প্রতিবেদনঃ আমার জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছি বাংলার মানুষের জন্য। বাংলার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা, বাংলার মানুষের উন্নত জীবন দেয়া এটাই আমার কাম্য। বারবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছি। ২১ আগস্ট খুনি খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক জিয়া গ্রেনেড হামলা করে আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। আইভি রহমানসহ ২৪ জনকে হত্যা করেছে। আল্লাহর রহমত আমি বেঁচে গেছি। ওরা কি করেছে : বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসী দেশ করেছে। বারবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন করেছে। মানি লন্ডারিং করেছে। বিএনপি বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস সৃষ্টি করে দেশে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। ওরা বাংলাদেশের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে। তার একটাই কারণ, তারা স্বাধীনতায় বিশ^াস করে না। তারা মানুষের উন্নতিতে বিশ^াস করে না। খালেদা জিয়া এতিমের টাকা চুরি করে, এতিমদের না দিয়ে নিজে আত্মসাৎ করে। যে কারণে আজ সাজা ভোগ করছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে না। আবারও নৌকায় ভোট চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নৌকা জয়লাভ করলে মানুষ সুখী-সমৃদ্ধশালী হয়ে বিশে^র বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। আমরা দেশের উন্নয়ন করেছি। আমার তো জীবনের চাওয়া-পাওয়া নেই। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আমার পিতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান, আমার মা বেগম ফজিলাতুন্নেছা, আমার ভাই শেখ জামাল, শেখ কামাল ও ছোট্ট শিশু রাসেলকেসহ আমার পরিবারের সকলকে হত্যা করেছে। আমার আত্মীয়-স্বজনকে হত্যা করেছে। আমি বিদেশে ছিলাম বিধায় বেঁচে গেছি। সব হারিয়েছি। স্বজন হারিয়ে ছয় বছর দেশের বাইরে ছিলাম। দেশে এসে সারাদেশে ঘুরেছি, দেখেছি মানুষের দুঃখ-দুর্দশা। বাংলার মানুষের পেটে খাবার ছিল না। পরনে ছিল ছেঁড়া কাপড়। মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না। ঘরের চালা দিয়ে পানি পড়ত। রাস্তার পাশে পড়ে থাকত। আপনাদের মাঝেই খুঁজে পাই আমার হারানো স্বজনদের। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যখনই আপনারা নৌকায় ভোট দিয়েছেন তখনই দেশ উন্নত হয়েছে। যখনই ক্ষমতায় এসেছি। তখনই বাংলার মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে কাজ করেছি। আমার বাবা এদেশ স্বাধীন করেছেন। তিনি মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে কাজ করেছেন। আমার বাবা চেয়েছেন এদেশের মানুষ সুখে-শান্তিতে থাকুক। আমিও বাবার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করছি। মানুষ সুন্দর থাকবে যেটা ছিল আমার বাবার আকাক্সক্ষা। সেই আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে কাজ করছি। জঙ্গি, সন্ত্রাস ও মাদকের স্থান বাংলাদেশে হবে না। ইতোমধ্যে আমরা জঙ্গি দমনে সক্ষম হয়েছি। প্রতিটি উপজেলায় মিনি স্টেডিয়াম করা হবে, যাতে যুবক ও শিক্ষার্থীরা মাদক ও সন্ত্রাসে জড়িয়ে না পড়ে। খেলাধুলা করে শিক্ষার্থীরা ও যুবসমাজ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সকলকে লেখাপড়া শিখতে হবে। লেখাপড়ার বিকল্প নেই। লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হয়ে বিশে^র দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পার।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষিণাঞ্চল ছিল অবহেলিত। ক্ষমতায় আসার পর দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন করেছি। দেশের দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে এ অঞ্চলেই। আমরা আরেকটি দ্বীপ খুঁজছি। সেখানে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তুলব। সমুদ্রসম্পদ কাজে লাগানো হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পটুয়াখালী পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২৭ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৩টায় আকাশপথে বরগুনার তালতলীর জনসভা মঞ্চে আসেন এবং বরগুনার বিভিন্ন উপজেলার ২১টি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রী জনসভা মঞ্চে উপস্থিত হলে লাখো জনতা করতালির মাধ্যমে তাকে অভিবাদন জানান। এ সময় জনসভা মাঠে এক আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। মানুষ প্রধানমন্ত্রীকে সানন্দচিত্রে স্বাগত জানান। উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন শেষে তালতলী উপজেলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আয়োজিত তালতলী সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠের বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। দুপুর গড়াতেই জনসভা মাঠ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। জনসভা মাঠসহ উপজেলা শহরের সর্বত্র মানুষে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। আজকের জনসভা তালতলীর ইতিহাসে ঐতিহাসিক জনসভা। এত লোক তালতলীর ইতিহাসে কোনো জনসভায় হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী জনসভায় ভাষণের পূর্বে বরগুনা সদর হাসপাতাল ৫০ শয্যা            থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ, বরগুনা জেলা গ্রন্থাগার, বরগুনা পুলিশ লাইনের মহিলা ব্যারাক, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের হোস্টেল নির্মাণ,                 ঘূর্ণিঝড়, বরগুনা সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিস, ডৌয়াতলা ইউনিয়ন                   ভূমি অফিস, বুড়িরচর ইউনিয়ন ভূমি অফিস, হোসনাবাদ ইউনিয়ন ভূমি অফিস, সিডর ও আইলায় উপকূলীয় এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ                 বাঁধ পুনর্বাসন, বরগুনা-বাকেরগঞ্জ-কাঠালতলী-পাদ্রীশিবপুর-সুবিদখালী সড়ক, হাজারবিঘা-কামরাবাদ-পুরাকাটা ফেরিঘাট সড়কের চেইনেজ ও আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ, বরগুনা সদরের গৌড়িচন্না ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন, বামনা উপজেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন, বেতাগী উপজেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন, বেতাগী উপজেলার বদনাখালী খালের ওপর গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ, তালতলী উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন, বামনা উপজেলা পরিষদ ভবন, আমতলী থানা ভবন, আমতলী ইউনুস আলী খান কলেজের চতুর্থ তলা একাডেমি ভবন কাম সাইক্লোন শেল্টার, এম বালিয়াতলী ডিএন কলেজের চতুর্থ তলা একাডেমিক ভবন কাম সাইক্লোন শেল্টার, সৈয়দ ফজলুল হক ডিগ্রি কলেজের চতুর্থ তলা একাডেমিক ভবন কাম সাইক্লোন শেল্টার, তালতলী প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্র, তালতলী ও বামনা উপজেলায় একটি বাড়ি একটি খামার ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক ভবনের উদ্বোধন করেছেন।
বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক সম্পাদক মো. গোলাম সরোয়ার টুকুর উপস্থাপনায় সভায় বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এমপি, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এমপি, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এমপি, সাবেক চিফ হুইপ আলহাজ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এমপি, নৌ পরিবহনমন্ত্রী মো. শাজাহান খান এমপি, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক সম্পাদক কৃষিবিদ আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম এমপি, তালুকদার মো. ইউনুস এমপি, অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এমপি, অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন, অধ্যক্ষ শাহ আলম, ইসহাক আলী খান পান্না, বরগুনা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসেন, বরগুনা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আলহাজ জাহাঙ্গীর কবির, তালতলী উপজেলার আওয়ামী লীগ সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক জোমাদ্দার, তালতলী উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মো. তৌফিকুজ্জামান তনু।

শ্রেণী:

মিলিটারি দিয়ে পাহাড়ের সমস্যার সমাধান হবে না : প্রধানমন্ত্রী

উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাটি রাজনৈতিক সমস্যা। রাজনৈতিক সমস্যাটিকে রাজনৈতিকভাবে মীমাংসা করতে হবে। মিলিটারি দিয়ে এর সমাধান হবে না। রাজধানীর বেইলি রোডে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্সের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে গত ২৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী এ-কথা বলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক সম্প্রীতি অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই অঞ্চলে আর কোনো সংঘাত নয়, যেন শান্তি বজায় থাকে। এই শান্তির পথ ধরে আসবে প্রগতি। প্রগতির পথ ধরে আসবে সমৃদ্ধি এবং সমৃদ্ধির মাধ্যমে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে উঠবে। তিনি বলেন, দেশ স্বাধীনের পর মাত্র সাড়ে তিন বছর জাতির পিতা দেশ শাসনের সময় পেয়েছেন। এই সময়কালে তিনি তিনবার পার্বত্য চট্টগ্রামে এসেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে তিনি আলাদা বোর্ড গঠন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জাতির পিতাকে হত্যার পর আর তা অগ্রগতির মুখ দেখেনি। শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা হত্যাকা-ের পরপরই ১৯৭৬ সালে এই এলাকা সংঘাতময় হয়ে ওঠে। ২০ বছর ধরে এই এলাকা ছিল অবহেলিত।
আমি ভাবলাম এরা আমার দেশের নাগরিক। সুতরাং এদের অবহেলিত রাখা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ১৯৭০ সালে চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘোরার। সব জায়গায় আমি ঘুরেছি। বাছালং যাওয়ার চেষ্টা করি, ছোট হরিণ্যা, বড় হরিণ্যা ঘুরেছি। আমি দেখেছি পার্বত্য চট্টগ্রামের নৈসর্গিক সৌন্দর্য। এখানকার মানুষগুলো সহজ-সরল। সে জায়গায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলতে পারে না। শেখ হাসিনা বলেন, আমরা এসে কমিটি করি। তৃতীয় পক্ষের সমঝোতা ছাড়া শান্তিচুক্তি করি। শুধু শান্তিচুক্তি নয়, শান্তিচুক্তির পাশাপাশি ১৮ অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করে। আমরা তাদের চাকরি ও পুনর্বাসন করি। তারা যে দাবি করেছে সে দাবি অনুযায়ী ভারত থেকে আসা শরণার্থীদের পুনর্বাসন করি। তিনি বলেন, আমরা অধিকাংশ শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করেছি। কিছু চুক্তি চলমান আছে। রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, আবাসিক স্কুল, হাসপাতাল মোবাইল ফোনের ব্যবস্থা করেছি। যেসব জায়গায় বিদ্যুৎ পৌঁছানো যায়নি আমরা সেসব জায়গায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছি। কোটা বাতিল করা হলেও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রার্থীরা সরকারি চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে সবসময় অগ্রাধিকার পাবেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যদিও আমরা কোটা প্রত্যাহার করেছি। তারপরও আমার নির্দেশ আছে পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে বলে দিয়েছি, পার্বত্য অঞ্চল বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, পাহাড়ি হোক, সমতল ভূমি হোক, সেখানে যে প্রার্থী থাকবে; তারা সবসময় অগ্রাধিকার পাবে। ‘এটা আমরা ব্যবস্থা করে দিচ্ছি এবং করে দেব; সেটা আপনাদের আমরা কথা দিতে পারি।’ প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে পার্বত্য এলাকার উন্নয়নে তার সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের কার্যপরিধি ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ১৯৭৬ সালে জারি করা ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড অধ্যাদেশ’ বাতিল করে ২০১৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম বোর্ড আইন প্রণয়ন করা হয়। এতে পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন কার্যক্রমে আরও গতি সঞ্চারিত হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আর কোনো সংঘাত নয়। আমরা পাহাড়ে শান্তিচুক্তি করেছি। সে শান্তি যেন বজায় থাকে। শান্তির পথ ধরেই সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারেন।’ জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমাকে উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান যে জায়গা চেয়েছেন; রাঙ্গামাটিতে আমরা সেই বিশাল জায়গা, যেটা ছিল গণপূর্ত বিভাগের, সেটাও তাদের আমরা দিয়ে দিয়েছি। আমরা আশা করি, আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের ওপর একটা প্রকল্প তৈরি করবেন। সেখানে আঞ্চলিক পরিষদের অফিস থেকে শুরু করে, আবাসিক থেকে শুরু করে যা যা দরকার; সবকিছু নিয়ে একটা প্রকল্প তৈরি করে দেবেন, যেটা আমরা বাস্তবায়ন করব।’ বীর বাহাদুর উশৈসিং বলেন, ‘হতাশ হওয়ার কারণ নেই। শেখ হাসিনা থাকলে সমস্যার সমাধান হবে।’
অনুষ্ঠানে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী মোশাররফ হোসেন এমপি, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ এমপি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী এমপি বক্তব্য রাখেন। স্বাগত বক্তব্য দেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নুরুল আমিন।

শ্রেণী:

‘একজন ছিলেন সাহিত্যের কবি, অন্যজন রাজনীতির’

Posted on by 0 comment
6-5-2018 6-02-48 PM
6-5-2018 6-02-48 PM

শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে এবং গণতন্ত্র, নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের উন্নয়নে অসাধারণ ভূমিকা রাখার জন্য সম্মান জানানো হলো শেখ হাসিনাকে। –কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ডি-লিট ডিগ্রি গ্রহণকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

উত্তরণ ডেস্ক: গত ২৬ মে পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলে বিশ্ববিদ্যালয়টির বিশেষ সমাবর্তনে শেখ হাসিনাকে সম্মানসূচক এই ডিগ্রি দেওয়া হয়। এই ডিগ্রি দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সাধন চক্রবর্তী বলেন, শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে এবং গণতন্ত্র, নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের উন্নয়নে অসাধারণ ভূমিকা রাখার জন্য সম্মান জানানো হলো শেখ হাসিনাকে। ভারতে বাংলাদেশের জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকীর দিনে তার নামে প্রতিষ্ঠিত নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া হলো ডি-লিট ডিগ্রি।
অনুষ্ঠানে বক্তব্যে শেখ হাসিনা নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়ে তাকে দেওয়া এ সম্মান ‘সমগ্র বাঙালি জাতিকে উৎসর্গ’ করার ঘোষণা দেন। ‘এই সম্মান শুধু আমার নয়, এ সম্মান বাংলাদেশের জনগণের।’
জাতীয় কবির ১১৯তম জন্মবার্ষিকীর দিনে ভারতে তার নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেওয়া হলো সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি।
শেখ হাসিনা বলেন, আমার জন্য আজকের দিনটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ এ কারণে যে, কবির জন্মদিন উপলক্ষে আমি তার জন্মভূমিতে আসতে পেরেছি এবং তারই নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব লিটারেচার (ডি-লিট)’ ডিগ্রি প্রদান করা হলো।
বিশেষ সমাবর্তন ও ডি-লিট প্রদান অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ এমপি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী এমপি, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, গওহর রিজভী, তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ও উপস্থিত ছিলেন এ অনুষ্ঠানে।
অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, কবি নজরুল, যিনি সব সময় আমাদের চেতনায় জাগ্রত থাকেন, কারণ আমাদের বাংলা সাহিত্যের আকাশে নতুনের কেতন উড়িয়ে ধূমকেতুর মতো ছিল বিদ্রোহী কবির আগমন এবং বাংলা সাহিত্যে তিনি সোনার ফসলে ভরিয়ে গেছেন।
তিনি শুধু যে কবি ছিলেন তা নয়, তিনি ঔপন্যাসিক, গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী, সংগীত পরিচালক, নাট্যকার, নাট্যাভিনেতা, সাংবাদিক, সম্পাদক এবং সৈনিকÑ কোথায় না তার বিচরণ ছিল। কবি নজরুল ছিলেন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী।
হামদ-নাতের মাধ্যমে ইসলাম ধর্ম এবং শ্যামা সংগীত, কীর্তন বৈষ্ণব গীতি রচনা করে হিন্দুধর্মের মানুষের কাছে যাওয়ার বিরল প্রতিভা কবি নজরুলের ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলা ভাগ হতে পারে; কিন্তু নজরুল-রবীন্দ্রনাথ ভাগ হয় নাই। সকলেই দুই বাংলার।
এ সময় অন্নদাশঙ্কর রায়ের কবিতার উদ্ধৃতি করে তিনি বলেন, ‘ভুল হয়ে গেছে বিলকুল/সবকিছু ভাগ হয়ে গেছে/ভাগ হয়নি কো নজরুল।’
‘সত্যিই নজরুল ভাগ হয়নি’ বলেন শেখ হাসিনা।
মুক্তিযুদ্ধ ও আওয়ামী লীগের ‘জয় বাংলা’ সেøাগান নজরুলের কবিতা থেকে নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
বঙ্গবন্ধুর তরুণ বয়সে নজরুলের সঙ্গে পরিচয় এবং নজরুল সাহিত্য দ্বারা বঙ্গবন্ধুর উদ্বুদ্ধ হওয়ার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘একজন ছিলেন সাহিত্যের কবি, আর অন্যজন ছিলেন রাজনীতির কবি।’
দুজনই অসাম্প্রদায়িক ও শোষণ-বঞ্চনাহীন সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
কবি নজরুল অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী ছিলেন। সেই চেতনায় আমরা বাংলাদেশকে গড়ে তুলছি।
শেখ হাসিনা সমাবর্তনে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করার আহ্বান জানান।
সকালে কলকাতা থেকে বিমানে দুর্গাপুরের কাজী নজরুল বিমানবন্দরে পৌঁছান শেখ হাসিনা। সেখান থেকে সড়কপথে দুপুরে আসানসোলের কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছলে তাকে স্বাগত জানান উপাচার্য সাধন চক্রবর্তী। এরপর শুরু হয় বিশেষ সমাবর্তন ও ডি-লিট প্রদান অনুষ্ঠান।
ডি-লিট ডিগ্রি লাভ করায় প্রধানমন্ত্রীকে আওয়ামী লীগের অভিনন্দন
পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলের কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব লিটারেচার (ডি-লিট)’ ডিগ্রি লাভ করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছে আওয়ামী লীগ।
গণতন্ত্র, নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন থেকে জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য ডি-লিট ডিগ্রি লাভ করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দলের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কল্যাণকর নেতৃত্বে উন্নয়ন সমৃদ্ধি ও শান্তির স্নিগ্ধ কলরবে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
গত ২৭ মে এক বিবৃতিতে শেখ হাসিনাকে বাঙালির স্বপ্ন জয়ের কা-ারি হিসেবে আখ্যায়িত করে ওবায়দুল কাদের বলেন, জাতীয় কবির ১১৯তম জন্মজয়ন্তীতে তারই নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডিগ্রি লাভ বাংলাদেশের জন্য গৌরব ও মর্যাদার অনন্য মাইলফলক।
তিনি বলেন, নবজাগরণের অগ্নি-গিরি-গর্ভের মতো জননেত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে এ দেশের মানুষের প্রাণপ্রদীপ মুক্তির অগ্নিস্পর্শে প্রজ্বলিত হওয়ায় স্বৈরশাসনের অবসান ঘটেছে। তারই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু-কন্যা দেশরতœ শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে গণতন্ত্র ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অর্জিত হয়েছে অভাবনীয় সাফল্য। সকল ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের অর্জন আজ বিশ্বসভায় রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত। বিবৃতিতে ওবায়দুল কাদের পশ্চিমবঙ্গের ‘কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়’-এর আচার্য, উপাচার্য, শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।

শ্রেণী:

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রদত্ত বক্তব্য

Posted on by 0 comment
1

1আমি গত ১৫ থেকে ১৬ই এপ্রিল সৌদি আরবে একটি সামরিক মহড়া ও ১৭ থেকে ২২-এ এপ্রিল লন্ডনে কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করি এবং ২৬ থেকে ২৯-এ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়া সফর করি। এই তিন সফর পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি।

সৌদি আরব সফর
সৌদি বাদশার আমন্ত্রণে ২৩-দেশের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের অংশগ্রহণে Gulf Shield-One শীর্ষক যৌথ সামরিক মহড়ার সমাপনী অনুষ্ঠান ও কুচকাওয়াজে অংশ নেওয়ার জন্য আমি গত ১৫ই এপ্রিল দাম্মামে যাই।
সৌদি আরবের Eastern Province-এর আল জুবাইল-এ ১৬ই এপ্রিল এ কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ১৮ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল এ মহড়ায় অংশ নেয়।
আমিসহ অনুষ্ঠানে যোগদানকারী অন্যান্য রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের সৌদি বাদশাহ স্বাগত জানান। এ সময় আমি সৌদি বাদশাহ এবং অনুষ্ঠানে যোগদানকারী অন্যান্য রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করি।
লন্ডনে কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগদান
১৬ই এপ্রিল সন্ধ্যায় সৌদি সরকারের বিশেষ বিমানে আমি দাম্মাম থেকে লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা হই।
লন্ডনে আমি ১৭ থেকে ২১-এ এপ্রিল ২৫তম কমনওয়েলথ সরকার প্রধানগণের শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করি। বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
৫৩টি সদস্য রাষ্ট্রের অংশগ্রহণসহ ৪৬টি রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানগণ এবারের কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন।
পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় কমনওয়েলথ কর্তৃক গৃহীত উদ্যোগের সুফল সকল মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে এবারের সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিলÒTowards A Common Future। এতে ৪টি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। এগুলো হলো
1. A Fairer Future;
2. A More Sustainable Future;
3. A More Prosperous Future Ges
4. A More Secure Future.
এ ৪টি বিষয়ের আওতায় শীর্ষ সম্মেলনে গণতন্ত্রের বিকাশ, মানবাধিকার, আইনের শাসন সুসংহতকরণসহ বিভিন্ন বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে।
সম্মেলন শেষে আমরা সদস্য দেশসমূহের সরকার প্রধানগণ একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি তথা Leader’s Statement প্রদান করি।
BREXIT এবং এর ফলশ্রুতিতে কমনওয়েলথ-এর মধ্যে সদস্য রাষ্ট্রসমূহ বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের নতুন করে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সন্ধানের প্রয়াসের প্রেক্ষাপটে এবারের শীর্ষ সম্মেলন ছিল আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষ গুরুত্ববহ।
সম্মেলনের বিভিন্ন সেশনে আমি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত প্রশমন ও অভিযোজনের প্রযুক্তি আদান-প্রদান, জলবায়ু অর্থায়ন, সহনশীলতা এবং দক্ষতা উন্নয়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রকে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার খাত হিসেবে উল্লেখ করি।
জলবায়ু পরিবর্তনে দায়বদ্ধতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং এ কারণে উদ্ভূত অভিবাসন সমস্যার প্রতি নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।
এ প্রসঙ্গে আমি মহামান্য রানির সম্মানে রয়েল সোসাইটি কর্তৃক উৎসর্গীকৃত Queen’s Commonwealth Canopy (QCC) প্রজেক্টে ঠাকুরগাঁয়ের পীরগঞ্জে অবস্থিত আমার সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত সংরক্ষিত ক্ষুদ্র এক শালবনকে সংযুক্ত করার মাধ্যমে বাংলাদেশের যোগদানের ঘোষণা দেই।
নারীর ক্ষমতায়নে গৃহীত বাংলাদেশ সরকারের নানাবিধ পদক্ষেপ ও সাফল্যের চিত্রও আমার বক্তব্যে তুলে ধরি। আমি কমনওয়েলথকে আরও কার্যকর এবং উন্নয়নমুখী একটি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্যে এর প্রয়োজনীয় পুনর্গঠন ও সংস্কারের ব্যাপারে নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।
সম্মেলনে গৃহীত ব্লু ইকোনমি সংক্রান্ত Commonwealth Blue Charter বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে Blue Champion-এ পরিণত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করি।
Commonwealth Women’s Forum-এর একটি বিশেষ সেশনে ১৭ই এপ্রিল আমি ‘Educate To Empower’ শীর্ষক প্রতিপাদ্য বিষয়ে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করি।
এতে বাংলাদেশে নারীর উন্নয়ন, সর্বক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এবং ক্ষমতায়ন, উন্নয়নে নারীর ভূমিকা ইত্যাদি বিষয়ে বাংলাদেশের অর্জন ও দৃষ্টান্ত তুলে ধরি।
মূল সম্মেলনের পাশাপাশি একাধিক পার্শ্ব ইভেন্টে আমি অংশগ্রহণ করি। যুক্তরাজ্যের মর্যাদাপূর্ণ থিংকট্যাঙ্ক  Overseas Development Institute (ODI) আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে “BangladeshÕs development story : policy, progress and prospects” বিষয়ের ওপর মূল বক্তব্য প্রদান করি।
আমি আমার বক্তব্যে আমাদের সরকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রার বিশদ চিত্র তুলে ধরি। এ ছাড়াও Commonwealth Business Forum (CBF) আয়োজিত Asian Leaders Roundtable : Can Asia keep growing? শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদান করি।
এতে আমি বিদ্যমান সম্ভাবনাময় তরুণ ও কর্মক্ষম শ্রমশক্তি, প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য এবং সুবিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারের সুযোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে সমৃদ্ধশালী ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করি।
একই ফোরাম আয়োজিত Heads of Government Roundtable with Senior Business Leaders শীর্ষক আরেকটি গোলটেবিল বৈঠকেও আমি অংশ নিই।
ফোরামটির উভয় সভায় আমি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার জন্য বিদেশি উদ্যোক্তাদের আমন্ত্রণ জানাই।
এছাড়াও ২১-এ এপ্রিল রয়েল কমনওয়েলথ সোসাইটির আমন্ত্রণে ব্রিটেনের রানির জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত শীর্ষ পর্যায়ের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেই।
এবারের কমনওয়েলথ ইশতেহারে দুটি অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে যেখানে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে প্রশংসার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ এবং তা নিরসনে কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
সেই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে টেকসই প্রত্যাবর্তনের ওপর গুরুত্ব আরোপসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের জবাবদিহিতা ও স্বাধীন অনুসন্ধানের ওপরও তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এবারের শীর্ষ সম্মেলনে এটি বাংলাদেশের একটি কূটনৈতিক সাফল্য।
সম্মেলনের সাইডলাইনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জনাব নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে এক বৈঠকে মিলিত হই। বৈঠকে কমনওয়েলথ সংশ্লিষ্ট ও রোহিঙ্গা সমস্যা ছাড়াও দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে আলোচনা হয়।
এছাড়াও সরকার প্রধানগণের একান্ত বৈঠককালে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোসহ বেশ কয়েকজন সরকারপ্রধানের সঙ্গে আমার সংক্ষিপ্ত মতবিনিময় হয়।
তারা বাংলাদেশের অব্যাহত অগ্রযাত্রার প্রশংসা করেন। তারা রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানের জন্য আমার সরকারের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং এ বিষয়ে জোরালো সমর্থনদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন।
২১-এ এপ্রিল আমি লন্ডনস্থ বাংলাদেশ কমিউনিটি’র একটি অনুষ্ঠানে যোগদান করি।
কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক যুব নেতা, উদ্যোক্তা এবং সমাজকর্মী অংশ নেন।

অস্ট্রেলিয়া সফর
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী জনাব ম্যালকম টার্নবুলের আমন্ত্রণে আমি ২৬ থেকে ২৮-এ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়া সফর করি। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অনুষ্ঠিত Global Summit of Women-2018 সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য তিনি আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ এবং কয়েকজন নারী রাজনীতিবিদ ও নারী ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ আমার সফরসঙ্গী ছিলেন।
২৭-এ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী Julie Bishop এবং ভিয়েতনামের ভাইস প্রেসিডেন্টDang Thi Ngoc Thinh আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
২৭ তারিখ সন্ধ্যায় সিডনির ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে এক জমকালো অনুষ্ঠানে আমাকে “Global WomenÕs Leadership Award-2018″ প্রদান করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এনজিও ‘Global Summit of Women’ বাংলাদেশ এবং সমগ্র এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নারী শিক্ষার প্রসার এবং নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে অগ্রণী ভূমিকা পালনের স্বীকৃতি-স্বরূপ আমাকে এই আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রদান করে।
‘Global Summit of Women’ এর প্রেসিডেন্ট মিজ আইরিন নাতিভিদাদ আমার হাতে পুরস্কার তুলে দেন। তিনি তার বক্তব্যে নারীর ক্ষমতায়ন, ডিজিটাল টেকনোলজি এবং নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা প্রদানের জন্য ভূয়সী প্রশংসা করেন।
বাংলাদেশ প্রায় ১১ লাখ বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিককে আশ্রয় প্রদানের মাধ্যমে মানবিক নেতৃত্বের যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা বিশ্ব নেতৃবৃন্দের জন্য অনুকরণীয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পুরস্কার প্রদানের সময় সম্মেলন কেন্দ্রে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় ১ হাজার নারী প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। তারা দাঁড়িয়ে এবং করতালির মাধ্যমে আমার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন।
পুরস্কার প্রদানের আগে একটি ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হয়, যাতে আমার রাজনৈতিক জীবন, নারী উন্নয়নে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন তুলে ধরা হয়।
আমি আমার বক্তব্যে বিশ্বের সমগ্র নারী জাতির প্রতি Global WomenÕs Leadership Award-2018 উৎসর্গ করি। নারীর ক্ষমতা কাজে লাগাতে ও তাদের সহযোগিতা ও অধিকার তুলে ধরতে একটি নতুন বৈশ্বিক জোট গঠনের আহ্বান জানাই।
নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসামান্য অবদান ও গৃহীত উদ্যোগসমূহের কথা উল্লেখ করি।
আমি বিশ্বে নারীর অধিকার আদায়ে চার দফা প্রস্তাব তুলে ধরি। এগুলো হচ্ছেÑ
১. নারীর সক্ষমতা নিয়ে প্রচলিত যে ধারণা সমাজে রয়েছে, তা ভাঙতে হবে।
২. যারা আজও অভুক্ত থাকছেন, যারা স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না, যারা কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন এবং সহিংসতার শিকার হচ্ছেনÑ এ ধরনের প্রান্তিক অবস্থানে থাকা নারীদের কাছে পৌঁছতে হবে।
৩. নারীদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে তাদের সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্য ঝুঁকি হ্রাস করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এবং
৪. জীবন ও জীবিকার সমস্ত ক্ষেত্রে নারীদের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে হবে।
সফরের দ্বিতীয় দিন ২৮-এ এপ্রিল সকালে আমি ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটি পরিদর্শন করি। সেখানে স্থাপিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্যে পুষ্পস্তবক অর্পণ করি।
সেখানে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আমি অস্ট্রেলিয়ার সেরা জ্ঞান আহরণের সুযোগ গ্রহণের জন্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানাই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সভাপতি প্রফেসর বার্নি গ্লোভার আমাকে ১৯৭৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রানমন্ত্রী অ্যাডওয়ার্ড গফ হুইটলামের বাংলাদেশ সফরকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তোলা কিছু দুর্লভ আলোকচিত্র প্রদান করেন।
অ্যাডওয়ার্ড হুইটলাম ১৯৭১ সালে সংসদে বিরোধী দলে থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অস্ট্রেলিয়া সরকারের সমর্থন আদায়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
ঐদিন বিকেলে আমি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুলের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হই। বৈঠকে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে চলমান সংকট ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে তার সরকারের বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
আমি রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় দেওয়া এবং গৃহীত পদক্ষেপসমূহ টার্নবুলকে অবহিত করি।
বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয় এবং এক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির উপায় খুঁজে বের করতে আমরা উভয়ে সম্মত হই। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে অস্ট্রেলিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি বিষয়ে আলোচনা হয়।
আমি তাকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানালে তিনি তা গ্রহণ করেন। পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে সুবিধাজনক সময়ে এ সফর অনুষ্ঠিত হবে।
এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের Royal Melbourne Institute of Technology (RMIT) বিশ্ববিদ্যালয়ের Deputy Pro-Vice Chancellor Professor Geoffrey Stokes আমার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
একই দিন সন্ধ্যায় আমি অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসকারী বাংলাদেশিদের আয়োজনে এক নাগরিক সম্বর্ধনায় যোগ দেই।
অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের অন্যতম বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র। উন্নত বিশ্ব থেকে অস্ট্রেলিয়া সর্বপ্রথম ১৯৭২ সালের ৩১-এ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। জাতীয় ও আঞ্চলিক ইস্যুতে দুদেশের অভিন্ন অবস্থান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে গভীরতর করেছে। আমার এ সফর দুদেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এই ৩টি সফর অনুষ্ঠিত হয়। সবগুলোই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই সফরগুলোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হয়েছে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

সবাইকে ধন্যবাদ।
খোদা হাফেজ।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু
বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
২ মে ২০১৮।

শ্রেণী:

বিএনপি ‘নাকে খত’ দিয়েই নির্বাচনে আসবে

Posted on by 0 comment
55

55উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে আগাম নির্বাচন এবং বিএনপির সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে সংলাপের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, তার সরকার এমন কোনো দৈন্যদশায় পড়েনি যে আগাম নির্বাচন দিতে হবে আর আগামী নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আলোচনার কোনো প্রয়োজন নেই। কোন দল নির্বাচনে এলো কি এলো না সেটি সম্পূর্ণই সেই দলটির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। নির্বাচন করতে চাইলে আসবে, নইলে আসবে না। এ ব্যাপারে সরকারের কিছু করণীয় নেই। তবে গতবার বিএনপি যে ভুল করেছে আমার মনে হয় এবার তা করবে না। বিএনপি নাকে খত দিয়েই এবার নির্বাচনে আসবে।
গত ৭ ডিসেম্বর বিকেলে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে একাধিক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। আগামী নির্বাচনেও তার দলের বিজয়ের ব্যাপারে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা স্বাধীনতার সপক্ষের রাজনীতি করে, জনগণের কল্যাণে কাজ করে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়, আমরা চাই তারাই ক্ষমতায় আসুক। কোনো যুদ্ধাপরাধী, স্বাধীনতাবিরোধী, দুর্নীতিবাজ, বিদেশে অর্থ পাচারকারী, জঙ্গিবাদ সৃষ্টিকারী খুনিদের দল ক্ষমতায় এলে দেশ আবারও ধ্বংস হয়ে যাবে। যারা বর্তমান উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত রাখতে পারবে, দেশকে আর পেছনের দিকে টানবে না, আমরা চাই তারাই নির্বাচিত হবে। দেশের জনগণও এটাই চায়। তাই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, বর্তমান উন্নয়ন ও সফলতার গতিধারা অব্যাহত রাখতে দেশের জনগণ আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগকেই ভোট দেবে। আগামীতে আমরা আরও নতুন নতুন আসনে বিজয়ী হব বলেই আমরা দৃঢ় বিশ্বাস।
প্রধানমন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, এবার কেউ নির্বাচনে না এসে আগুনসন্ত্রাস করলে জনগণই তার জবাব দেবে। জনগণই ব্যবস্থা নেবে। সৌদি আরবে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচার সংক্রান্ত বিশ্বের গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, দেশের মানুষই এর বিচার করবে আর দেশের প্রচলিত আইনানুযায়ীও তার বিচার হওয়া উচিত। অবশ্যই তার বিচার হবে আর সাজাপ্রাপ্ত আসামি তারেক রহমানকে দেশে ফেরত আনতেও ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। একদিন না একদিন তারেক রহমানকেও আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
সম্প্রতি তার কম্বোডিয়া সফর সম্পর্কে বিভিন্ন দিক তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হলেও প্রায় এক ঘণ্টার প্রশ্নোত্তর পর্বে দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আগামী নির্বাচন, জিয়া পরিবারে বিদেশে অর্থ পাচার, বিএনপির সঙ্গে সংলাপ, রোহিঙ্গা ইস্যু, ফিলিস্তিন নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তসহ নানা বিষয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমের সম্পাদক প্রধানদের নানা প্রশ্নের সাবলীলভাবেই উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী। সংবাদ সম্মেলন মঞ্চে ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এমপি। এছাড়া সেখানে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, সরকারের মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এ প্রসঙ্গে গত নির্বাচনের আগে নির্বাচনে নিয়ে আসতে বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করে গণভবনে দাওয়াত প্রদানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, একবার তার (খালেদা জিয়া) সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে আমন্ত্রণ জানিয়ে যে ঝাড়ি খেয়েছি, যে অপমানিত হয়েছি। আর তেমন ঝাড়ি খাওয়ার বা অপমানিত হওয়ার ইচ্ছে নেই। যাদের মধ্যে সামান্যতম ভদ্রতাজ্ঞানটুকু নেই, তাদের সঙ্গে আলোচনা করার কথা বলেন কোন মুখে। আমার ওপর আপনারা এত জুলুম করেন কেন? ছেলের মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী হয়েও তার (খালেদা জিয়া) সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু দরজায় তালা বন্ধ করে দিয়ে আমাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পকেট গেট দিয়েও ঢুকতে দেয়নি। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছে। তারপরও দেশের স্বার্থে আর বঙ্গবন্ধুর কন্যা বলেই তাদের সঙ্গে কথা বলার উদ্যোগ নিয়েছিলাম।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, জিয়াউর রহমানকে মেজর থেকে মেজর জেনারেল বানিয়েছেন আমার বাবা (বঙ্গবন্ধু)। বউ (খালেদা জিয়া) উনি প্রায়শই আমাদের বাড়িতে আসতেন। আমাদের বাসার নিচে মোড়া পেতে বসে থাকতেন। তাকে (জিয়াউর রহমান) অনেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক বলেন! অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে উনি যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতি করার সুযোগ দিয়েছেন, নিষিদ্ধ জামায়াতে ইসলামীসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারের পথ বন্ধ করে দিয়ে খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেছেন। এটাই কী তার (জিয়াউর রহমান) বহুদলীয় রাজনীতি? প্রতিদিন রাতে কার্ফু দিয়ে দেশ চালানোকে বহুদলীয় গণতন্ত্র বলে?
খালেদা জিয়ারই ক্ষমা চাওয়া উচিত : ‘শেখ হাসিনাকে ক্ষমা করে দিয়েছি’Ñ সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার এমন মন্তব্য সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাকে কেন ক্ষমা করবে? আমি কী করেছি? বরং উনার (খালেদা জিয়া) উল্টো মাফ চাওয়া উচিত। আসলে উনি কি ক্ষমা করেছেন, না ক্ষমা চেয়েছেনÑ এ ক্ষমার বিষয়টি স্পষ্ট নয়। তার উচিত দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়া। আমি কোনো অপরাধ করেছি না-কি যে আমাকে ক্ষমা করতে হবে?
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্ষমতায় থাকতে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া, সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টারসহ অসংখ্য মানুষকে হত্যা করিয়েছেন। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আমি বেঁচে গিয়েছিলাম, এর জন্য কী আমাকে ক্ষমা করেছেন? ওই হামলায় আমি প্রাণে রক্ষা পেলেও আইভি রহমানসহ ২২ নেতাকর্মী নিহত হয়েছে। এ জন্য বরং খালেদা জিয়ারই জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত।
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদার বিরুদ্ধে যে মামলা তা আমাদের সরকার দেয়নি; বরং আমার বিরুদ্ধে তো বিএনপি এক ডজন মামলা দিয়েছে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যারা মামলা দিয়েছে সেই মঈনুদ্দিন-ফখরুদ্দীনরা তো তাদেরই নিজেদের লোক। খালেদা জিয়াই ৯ জনকে ডিঙ্গিয়ে মঈন-উ আহমদকে সেনাপ্রধান করেছিলেন, জাতিসংঘ থেকে এনে ফখরুদ্দীন আহমদকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর করেছিলেন। তারাই তো এই মামলা করেছেন।
তিনি বলেন, এই মামলা থেকে তার (খালেদা জিয়া) পলায়নপর নীতি আপনারা তা দেখেছেন। ১৫০ বার মামলার স্ট্রে নিয়েছেন, ২২-২৩ বার মামলা বন্ধ করতে রিট করেছেন আর কোর্টে যাওয়া নিয়েও তা-ব হয়েছে। এর আগে উনি হাজিরা দেওয়ার সময় আওয়ামী লীগের এমপি ছবি বিশ্বাসের গাড়ি ভাঙচুর করেছে, আগুন দিয়েছেন। এবার পুলিশের গাড়িতে আগুন দিয়েছেন। যখনই উনি বেরুচ্ছেন তখনই একটা না একটা ঘটনা ঘটাচ্ছেন। এর আগে নির্বাচন ঠেকানোর নামে শত শত মানুষকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে হত্যা করেছেন। এ জন্য খালেদা জিয়ারই উচিত দেশবাসীর সামনে ক্ষমা চাওয়া।
অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীরা দেশকে ৩০ বছর পিছিয়ে দিয়েছে : অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার ৪৬ বছরের মধ্যে ৩০ বছরই দেশের মানুষ ছিল অবহেলিত, বঞ্চিত আর এই ৩০ বছরই ছিল হত্যা-ক্যু-ষড়যন্ত্রের রাজনীতি, দুর্নীতি-দুঃশাসন, বিদেশে অর্থ পাচার, জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস-খুন আর ভোট কারচুপির ইতিহাস। ত্রিশটা বছর দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার মাত্র আট বছরে দেশের যে উন্নয়ন করেছে তা কেউ করতে পারেনি। একমাত্র আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই দেশের মানুষের জন্য কাজ করে এটা আমরা প্রমাণ করেছি।
শত ফুল ফুটতে দিন : আসন্ন নির্বাচনে সারাদেশে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থিতা সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শত ফুল ফুটতে দিন, এটা রাজনৈতিক তাদের অধিকার। তবে সব থেকে যেটা ভালো ফুল সেটাই আমরা বেছে নেব। সময় হলেই সবাই তা দেখতে পারবেন আর আওয়ামী লীগ একটা বড় রাজনৈতিক দল। মনোনয়ন চাওয়া তাদের রাজনৈতিক অধিকার। নির্বাচনী হাওয়া বইয়ে যাওয়া ভালো। দেশের মানুষ গণতন্ত্রের সুবাতাস গ্রহণ করেছে, নির্বাচনী হাওয়া বয়ে যাওয়া মানেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারই একটি বড় প্রমাণ।

শ্রেণী:

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ৫ দফা

Posted on by 0 comment
25
25

আমার হৃদয় আজ দুঃখে ভারাক্রান্ত। কেননা আমার চোখে বারবার ভেসে উঠছে ক্ষুধার্ত, ভীত-সন্ত্রস্ত এবং নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের মুখচ্ছবি। আমি মাত্র কয়েকদিন আগেই আমার দেশে আশ্রয় নেওয়া কয়েক লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে দেখা করে এসেছি, যারা ‘জাতিগত নিধনে’র শিকার হয়ে আজ নিজ দেশ থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
জনাব সভাপতি,
আসসালামু আলাইকুম এবং এড়ড়ফ অভঃবৎহড়ড়হ / ঊাবহরহম.
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় আমি আপনাকে আন্তরিক ও উষ্ণ অভিনন্দন জানাচ্ছি। আপনার দায়িত্ব পালনে আমার প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছি। মানবকল্যাণ, শান্তি ও টেকসই ধরিত্রী আপনার এই তিন প্রাধিকারের প্রতি আমার অকুণ্ঠ সমর্থন জ্ঞাপন করছি।
জনাব সভাপতি, সাধারণ পরিষদের এই মহান অধিবেশনে বক্তব্য দিতে আমি চতুর্দশবারের মতো উপস্থিত হয়েছি। তবে আমার হৃদয় আজ দুঃখে ভারাক্রান্ত। কেননা আমার চোখে বারবার ভেসে উঠছে ক্ষুধার্ত, ভীত-সন্ত্রস্ত এবং নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের মুখচ্ছবি। আমি মাত্র কয়েকদিন আগেই আমার দেশে আশ্রয় নেওয়া কয়েক লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে দেখা করে এসেছি, যারা ‘জাতিগত নিধনে’র শিকার হয়ে আজ নিজ দেশ থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত। অথচ তারা হাজার বছরেরও অধিক সময় যাবত মিয়ানমারে বসবাস করে আসছেন।
এদের দুঃখ-দুর্দশা আমি গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারি। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট আমার বাবা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার পর আমি আমার ছোট বোনকে নিয়ে ছয় বছর উদ্বাস্তু জীবন কাটিয়েছি।
১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের হয়ে প্রথমবারের মতো এখানে ভাষণ দেয়ার সময় এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শান্তি ও ন্যায়বিচারের পক্ষে তার অঙ্গীকারের কথা বলে গেছেন।
সেই ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেছিলেন, ‘এমন এক বিশ্বব্যবস্থা গঠনে বাঙালি জাতি উৎসর্গীকৃত, যে ব্যবস্থায় সকল মানুষের শান্তি ও ন্যায়বিচার লাভের আকাক্সক্ষা প্রতিফলিত হবে। এবং আমি জানি আমাদের এ প্রতিজ্ঞা গ্রহণের মধ্যে আমাদের লাখ লাখ শহীদের বিদেহী আত্মার স্মৃতি নিহিত রয়েছে।’
জনাব সভাপতি, আমরা এই মুহূর্তে নিজ ভূখ- হতে জোরপূর্বক বিতাড়িত ৮ লাখেরও অধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় ও সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছি। আপনারা সকলেই জানেন যে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান নৃশংসতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ফলে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে অবস্থার ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে। এই নৃশংসতার হাত থেকে বাঁচার জন্য প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। আন্তর্জাতিক আভিবাসন সংস্থার তথ্যমতে গত তিন সপ্তাহে ৪ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত যাওয়া ঠেকানোর জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সীমানা বরাবর স্থলমাইন পুঁতে রাখছে। এতে আমরা ভীষণভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। এসব মানুষ যাতে নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারেন এখনই তার ব্যবস্থা করতে হবে।
একই সঙ্গে আমি সব ধরনের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করছি। এ বিষয়ে আমাদের সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি মেনে চলে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সহিংসতা বন্ধে এবং ঐ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করায় আমি নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রসমূহ ও জাতিসংঘের মহাসচিবকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আমি জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানাচ্ছি। এ প্রসঙ্গে আমি কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করছিÑ
প্রথমত, অনতিবিলম্বে এবং চিরতরে মিয়ানমারে সহিংসতা ও ‘জাতিগত নিধন’ নিঃশর্তে বন্ধ করা;
দ্বিতীয়ত, অনতিবিলম্বে মিয়ানমারে জাতিসংঘের মহাসচিবের নিজস্ব একটি অনুসন্ধানী দল (ঋধপঃ ঋরহফরহম গরংংরড়হ) প্রেরণ করা;
তৃতীয়ত, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান করা এবং এ লক্ষ্যে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সুরক্ষা বলয় (ংধভব ুড়হবং) গড়ে তোলা;
চতুর্থত, রাখাইন রাজ্য হতে জোরপূর্বক বিতাড়িত সকল রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে তাদের নিজ ঘরবাড়িতে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা;
পঞ্চমত, কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালার নিঃশর্ত, পূর্ণ এবং দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
জনাব সভাপতি, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ ভয়াবহতম গণহত্যার শিকার হয়। ৯ মাসব্যাপী চলা মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ৩০ লাখ নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে এবং ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি করেছে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ এবং রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে চিহ্নিত ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীকে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে তারা এই হত্যাযজ্ঞ চালায়। বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করতে তারা দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের নৃশংসভাবে হত্যা করে।
গণহত্যার শিকার শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সম্প্রতি ২৫শে মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। মূলত ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতেই ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে তারা এই গণহত্যার সূচনা করেছিল।
এই গণহত্যার সঙ্গে জড়িত মূল অভিযুক্তদের আমরা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি করেছি।
বিশ্বের কোথাও যাতে কখনই আর এ ধরনের জঘন্য অপরাধ সংঘটিত না হয় সেজন্য আমি বিশ্ব সম্প্রদায়কে সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি। আমি বিশ্বাস করি, ’৭১-এর গণহত্যাসহ সকল ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আমাদের এ লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জনাব সভাপতি, স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই আমরা শান্তিকেন্দ্রিক অভ্যন্তরীণ এবং পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে চলেছি। এ উপলব্ধি থেকেই সাধারণ পরিষদে ২০০০ সাল থেকে প্রতিবছর ‘শান্তির সংস্কৃতি’ (পঁষঃঁৎব ড়ভ ঢ়বধপব) শীর্ষক প্রস্তাব পেশ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সর্বদা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করা এবং ভ্রাতৃপ্রতীম ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে সব ধরনের বৈষম্য এবং শত্রুতা নিরসনের জন্য আমি সকলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
আমরা আশা করি, শান্তিবিনির্মাণে জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকা অব্যাহত থাকবে। এ লক্ষ্যে ‘অব্যাহত শান্তি’র জন্য অর্থায়ন বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছ থেকে আমরা সাহসী এবং উদ্ভাবনমূলক প্রস্তাব প্রত্যাশা করছি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ‘জাতিসংঘ শান্তিবিনির্মাণ তহবিলে’ আমি ১ লাখ মার্কিন ডলার প্রতীকী অনুদান প্রদানের ঘোষণা দিচ্ছি।
জনাব সভাপতি, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অন্যতম সেনা ও পুলিশ সদস্য প্রদানকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তি মিশনসমূহের কার্যকারিতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা সমুন্নত রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে।
এক্ষেত্রে আমরা আমাদের নিজস্ব প্রস্তুতি এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া বজায় রেখে চলছি। যে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক অঙ্গীকার প্রদান, শান্তিরক্ষীদের প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি এবং অধিক সংখ্যায় নারী শান্তিরক্ষী মোতায়েনে আমরা সদাপ্রস্তুত রয়েছি।
এ প্রেক্ষাপটে ‘যৌন নিপীড়ন’ সংক্রান্ত যে কোনো অভিযোগের বিষয়ে আমরা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি মেনে চলি। আমাদের এই নীতির প্রতিফলন হিসেবে আমরা জাতিসংঘ মহাসচিব কর্তৃক প্রস্তাবিত ‘যৌন নিপীড়ন’ সংক্রান্ত ঠড়ষঁহঃধৎু ঈড়সঢ়ধপঃ-এ সমর্থন প্রদান করেছি। ‘যৌন নিপীড়ন’ সংক্রান্ত সমস্যা মোকাবিলায় আমি মহাসচিবের ‘সার্কেল অব লিডারশিপ’-এর প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ।
এছাড়া, এ বিষয়ে গঠিত ‘ভিকটিম সাপোর্ট তহবিলে’ প্রতীকী অনুদান হিসেবে আমি ১ লাখ মার্কিন ডলার অনুদানের ঘোষণা দিচ্ছি।
জনাব সভাপতি, সন্ত্রাসবাদ এবং সহিংস জঙ্গিবাদ শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। একজন সন্ত্রাসীর কোনো ধর্ম, বর্ণ বা গোত্র নেই। আমি নিজে বেশ কয়েকবার সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছি। সে হিসেবে আমি সন্ত্রাসের শিকার মানুষের প্রতি আমার সহানুভূতি প্রকাশ করছি। আমি মনে করি তাদের সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।
আমরা ধর্মের নামে যে কোনো সহিংস জঙ্গিবাদের নিন্দা জানাই। সহিংস জঙ্গিবাদ বিস্তার রোধে তৃণমূল পর্যায়ে আমরা পরিবার, নারী, যুবসমাজ, গণমাধ্যম এবং ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করেছি। বৈশ্বিক এ সমস্যা মোকাবেলায় আমার প্রস্তাব হচ্ছেÑ
এক. সন্ত্রাসীদের অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে হবে;
দুই. সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে এবং
তিন. শান্তিপূর্ণ উপায়ে আন্তর্জাতিক বিবাদ মীমাংসা করতে হবে।
অর্থ পাচার, সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন এবং অন্যান্য আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘবদ্ধ অপরাধের ক্ষেত্রে সাইবার জগৎ থেকে উদ্ভূত হুমকি মোকাবিলা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে আমি জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
জনাব সভাপতি, বাংলাদেশ নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং নিয়মিত অভিবাসনকে উৎসাহিত করে। এষড়নধষ ঈড়সঢ়ধপঃ ড়হ ংধভব ড়ৎফবৎষু ধহফ ৎবমঁষধৎ সরমৎধঃরড়হ-এর মাধ্যমে একটি সুস্থ ধারার অভিবাসন-কাঠামো তৈরির জন্য গত বছর আমরা একটি প্রস্তাব পেশ করেছি।
আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে, এ প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে আজ অভিবাসন এবং উদ্বাস্তু সংক্রান্ত ঈড়সঢ়ধপঃ গঠনের বিষয়ে জাতিসংঘে আলোচনা চলছে।
জনাব সভাপতি, জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্যারিস চুক্তির বাস্তবায়নে আমরা আশাবাদী। জাতীয় পর্যায়ে জলবায়ু সংবেদনশীলতার দিকে লক্ষ্য রেখে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় আমরা কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার এবং সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে ‘ব্লু ইকনোমি’র সম্ভাবনার প্রতি আমরা আস্থাশীল।
বাংলাদেশ বন্যা এবং অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবিলায় দৃষ্টান্তমূলক সাফল্য দেখিয়েছে।  খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে আমরা শস্য-নিবিড়করণ প্রযুক্তি এবং বন্যা-প্রতিরোধী ফসলের জাত উদ্ভাবন করেছি। এ বছর বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে যে ব্যাপক বন্যা আঘাত হেনেছে আমরা তা সফলভাবে মোকাবিলা করেছি।
পানি বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের প্যানেলের সদস্য হিসেবে আমি এ সংক্রান্ত ‘সমন্বিত কর্ম-পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার প্রদান করছি। ২০১৫ সালের মধ্যে আমরা আমাদের ৮৭ শতাংশ নাগরিকের জন্য নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করেছি। ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ জনগণকে নিরাপদ পানি সরবরাহের আওতায় আনা হবে।
জনাব সভাপতি, আমরা মনে করি শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের জন্য দারিদ্র্য, ক্ষুধা, নিরক্ষরতা এবং বেকারত্ব দূর করা অত্যন্ত জরুরি।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ। এক্ষেত্রে আমাদের সরকার সমাজের সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার নীতি গ্রহণ করেছে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম-আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে রূপান্তরের যে রূপকল্প আমরা হাতে নিয়েছি, এসডিজি তারই পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে।
মূলত এসডিজি গ্রহণের অনেক আগে থেকেই আমরা বেশকিছু কর্মসূচি এবং সামাজিক নীতি বাস্তবায়ন শুরু করেছি যা পরবর্তীকালে এসডিজি’তেও প্রতিফলিত হয়েছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে : একটি বাড়ি একটি খামার, কমিউনিটি ক্লিনিক, আশ্রয়ণ প্রকল্প, ডিজিটাল বাংলাদেশ, শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি, নারীর ক্ষমতায়ন, সবার জন্য শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বিনিয়োগ ও উন্নয়ন।
এসডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি এবং অঙ্গীকারের বিষয়গুলো আমরা এ বছর জাতিসংঘে ‘ভলান্টারি ন্যাশনাল রিভিউ’-এর মাধ্যমে তুলে ধরেছি।
জনাব সভাপতি, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে ৩২.১ বিলিয়ন ডলার। দারিদ্র্যের হার ১৯৯১ সালের ৫৬.৭ শতাংশ হতে কমে বর্তমানে ২৩.২ শতাংশ হয়েছে।
মাথাপিছু আয় ২০০৫-০৬ অর্থবছরের ৫৪৩ মার্কিন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ১ হাজার ৬০২ মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মানুষের গড় আয়ু ৭২ বছরে উন্নীত হয়েছে। এ সকল সূচক মূলত আমাদের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন পরিকল্পনার বাস্তবায়নকেই নির্দেশ করে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং সকলের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে আমরা সারাদেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছি।
ব্যাপকভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় আমরা সমাজের সবচেয়ে অসহায় ব্যক্তি যেমন বয়স্ক ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী, পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারী এবং আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্তদের সহায়তা করছি। শারীরিক এবং মানসিক প্রতিবন্ধীদের সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অটিজমসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধকতায় আক্রান্তদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের জন্য ১০৩টি সেবাকেন্দ্র এবং ৩২টি মোবাইল থেরাপি ভ্যান কাজ করছে।
তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সারাদেশে সাড়ে ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা হাসপাতাল হতে মোবাইল ফোন ও ওয়েব ক্যামেরার মাধ্যমে স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিটি গ্রামে একটি করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। দেশের ৩৮ হাজার ৩৩১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল এবং মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হয়েছে। যুবসমাজকে কারিগরি এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
জনাব সভাপতি, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে আমাদের যুবসমাজ মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। আমরা এমন একটি পরিবেশ তৈরির জন্য কাজ করছি যেখানে তারা যুগোপযোগী শিক্ষা গ্রহণ করে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে এবং প্রকৃত অর্থেই বিশ্ব নাগরিকে পরিণত হবে।
আমি অত্যন্ত আনন্দের সাথে ঘোষণা করতে চাই যে, এ বছরের মধ্যেই আমরা প্রথমবারের মতো বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাকাশে উৎক্ষেপণ করার পরিকল্পনা নিয়েছি।
জনাব সভাপতি, সবশেষে আমি বলতে চাই, আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই। আমরা অর্থনৈতিক উন্নতি চাই, মানব ধ্বংস নয় মানবকল্যাণ চাই। এটাই হোক আমাদের সকলের লক্ষ্য।

খোদা হাফেজ
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু
বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭

শ্রেণী:

‘রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করব’

Posted on by 0 comment
9

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, মানুষ মানুষের জন্য। বিপন্ন মানুষকে আশ্রয় দেওয়া যে কোনো মানুষের দায়িত্ব। রোহিঙ্গারা মানবেতর জীবনযাপন করছিল। মিয়ানমার যেভাবে অত্যাচার চালাচ্ছিল, তাতে স্বাভাবিকভাবেই তাদের আশ্রয় দিতে হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশের ভূমিকার কারণেই মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট বিশ্ববাসীর মনোযোগ পেয়েছে। এ সংকট নিরসনে এখন বিশ্বব্যাপী নানা আলোচনা চলছে। আশ্রয় যখন দিয়েছি, তখন তাদের ভালোভাবে রেখে সম্মানের সঙ্গে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা নেব। জাতিসংঘ সফর শেষে দেশে ফেরার পর গত ৭ অক্টোবর সকালে ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি। রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিকতা প্রদর্শনের পাশাপাশি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বক্তৃতায় এই সংকটের প্রতি বিশ্ববাসীর মনোযোগ আকর্ষণ করায় শেখ হাসিনাকে এই সংবর্ধনা দেওয়া হয়। রোহিঙ্গা সংকটে সাহসী সিদ্ধান্ত ও উদার মনের পরিচয় দেওয়ায় দেশে ফিরে সংবর্ধনায় সিক্ত হন শেখ হাসিনা। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, মানুষ মানুষের জন্য। বিপন্ন মানুষকে আশ্রয় দেওয়া যে কোনো মানুষের দায়িত্ব। রোহিঙ্গারা মানবেতর জীবনযাপন করছিল। মিয়ানমার যেভাবে অত্যাচার চালাচ্ছিল, তাতে স্বাভাবিকভাবেই তাদের আশ্রয় দিতে হয়েছিল। বাংলাদেশের মানুষ মানবতা দেখিয়েছে। আমরা কারও সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করিনি। তবে যারা সহযোগিতা করেছেন, তাদের ধন্যবাদ। শেখ হাসিনা বলেন, অসহায় এই মানুষগুলোর জন্য তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলামÑ যদি প্রয়োজন হয়, একবেলা খাব এবং আরেক বেলার খাবার তাদেরকে ভাগ করে দেব। বাংলাদেশ যদি এই উদ্যোগ না নিত, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও এতটা দৃষ্টি কাড়ত না। তার বোন শেখ রেহানার উদ্ধৃতি দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সে বলেছিল, ১৬ কোটি লোককে ভাত খাওয়াচ্ছ, আর ৭-৮ লাখ মানুষকে খাওয়াতে পারবা না! এই কথাটা আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল। এছাড়া নেতাকর্মীরাও মানবিক দিক বিবেচনায় পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। সব মিলিয়ে আমরা পেরেছি। তিনি বলেন, জাতির পিতা আমাদেরকে শিখিয়েছেন, মানুষকে সহায়তা করতে। যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেই, তার চেয়েও বড় বিষয় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া। আর সেই সিদ্ধান্ত যখন সঠিক হয়, সে সময়ই সফলতা পায়। সবার সমর্থন পাই। রোহিঙ্গা ইস্যুটিও ঠিক তেমনি। প্রশাসনের সর্বস্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং বাংলাদেশের মানুষের রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের আত্মবিশ্বাস আছে বলেই আমরা এই চ্যালেঞ্জটা নিয়েছি। সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ভাসানচরে পুনর্বাসন করার ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, এখন তারা যেভাবে আছে, সেভাবে থাকতে পারে না। আমি যাওয়ার আগেই নেভিকে টাকা দিয়ে গিয়েছিলাম। ভাসানচরে দুটি সাইক্লোন সেন্টার ও আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। নোয়াখালীর লোকজন বলে ঠেঙ্গারচর, আর চিটাগাংয়ে বলে ভাসানচর। যেহেতু, এরা ভাসমান, তাই আমি বললাম, ভাসানচর নামটাই থাকুক। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে আন্তর্জাতিকভাবে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির সফলতার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন,  10-bআন্তর্জাতিকভাবে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। তারা (রোহিঙ্গা) যেন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করতে পারে, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। রোহিঙ্গা সংকটের মধ্যে মিয়ানমারের প্ররোচনায় বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য নিরাপত্তা বাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মূল পরিস্থিতি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে ওই সময় মিয়ানমার নানাভাবে উসকানি দিয়েছে। মিয়ানমারের উসকানিতে যাতে পা দেওয়া না হয়, এ জন্য সেনাবাহিনীকে সতর্ক করেছি। মিয়ানমারকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা এমন একটা ভাব দেখাল, যেন যুদ্ধই বেধে যাবে। উসকানি দেওয়া এবং এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাইল, যেন বিশ্ব অন্যদিকে দৃষ্টি ফেরাবে। তখন আমি ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবেলার কথা বলি। আমার নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত যেন কোনো কিছুতে না জড়াই, সে কথাও বলি। অন্যদিকে রোহিঙ্গারা যারা আসছেন, তাদের সহযোগিতায় যা যা দরকার তাই করতে থাকি। অনুষ্ঠানে পদ্মাসেতু প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজেদের টাকায় পদ্মাসেতু করতে পেরে দুর্নীতির কথা বলে যে অপমান করা হয়েছে, তার জবাব দিতে পেরেছি। বিশ্বব্যাংক আগে অপপ্রচার করেছে; কিন্তু তারা কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। এখন তাদের দুর্নীতি অনুসন্ধানের তদন্ত দলের প্রধান ব্যক্তির বিরুদ্ধে হাজার হাজার পৃষ্ঠার নথি বেরোচ্ছে। সত্যের জয় তাৎক্ষণিক হয় না। মিথ্যার জয় তাৎক্ষণিক। একপর্যায়ে গিয়ে সত্যের জয় হয়। আমাদের জয় হয়েছে। বাংলাদেশকে হেয় করতে চেয়েছিল। পারেনি। দুর্নীতির কথা বলে ওই সময় বিশ্বব্যাংকের তদন্তের নামে মানসিক অত্যাচার করেছে। আমাদের বিশ্বাস ছিল দুর্নীতি হয়নি। বিমানবন্দর থেকে গণভবন পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষের ঢল জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদান শেষে দেশে ফেরা উপলক্ষে বিমানবন্দরে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের শীর্ষ নেতা এবং বিশিষ্টজনদের পাশাপাশি রাজপথে হাজারো নেতাকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। ৭ অক্টোবর ৯টা ২৫ মিনিটে বিজি-০০২ ভিভিআইপি ফ্লাইটে করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। বিমান থেকে নামার পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। এরপর প্রধানমন্ত্রী ভিভিআইপি টার্মিনাল লাউঞ্জে আসেন। সেখানে প্রথমে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা শেখ হাসিনাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এরপর ১৪ দল ও বিশিষ্ট নাগরিকদের পক্ষ থেকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। একে একে 10-aপ্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান শিক্ষক সমাজ, ক্রীড়াবিদ, গণমাধ্যম, শিল্পী-কবি সাহিত্যিক ও ব্যবসায়ীরা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা, আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, শিক্ষক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক ও যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বক্তব্য দেন। সকাল সাড়ে ১০টায় প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর বিমানবন্দর ছেড়ে গণভবনের উদ্দেশে রওনা হয়। গণভবনে যাওয়ার পথে রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার নেতাকর্মী ফুল ছিটিয়ে, হাত নেড়ে ও স্লোগান দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান। প্রধানমন্ত্রীও হাত নেড়ে শুভেচ্ছা গ্রহণ করেন। সকাল থেকে ঢাকঢোল বাজিয়ে বর্ণিল ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে রাস্তার দুই পাশে অবস্থান নেন আওয়ামী লীগ, এর সহযোগী সংগঠনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রধানমন্ত্রীকে গণসংবর্ধনা জানানো উপলক্ষে বিমানবন্দর থেকে গণভবন পর্যন্ত সড়কসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ বর্ণিল সাজে সাজানো হয়েছিল।

শ্রেণী:

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

Posted on by 0 comment
25

25উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৬ মে কক্সবাজারে দেশের সর্ববৃহৎ মেরিন ড্রাইভ উদ্বোধন করেছেন। কক্সবাজারের কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্রের পাড় দিয়ে চলে যাওয়া এই ৮০ কিমি দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের সড়ক পথটি চার-লেন করার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের অর্থনীতিতে কক্সবাজারের গুরুত্ব বিবেচনায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কটিও চার-লেন করার ঘোষণা দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই মেরিন ড্রাইভওয়ে ’৭৫-এর পর থেকে দীর্ঘদিন অবহেলিত কক্সবাজারের সৌন্দর্য অবলোকনে শুধু পর্যটকদের আকর্ষণই করবে না; বরং এ অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ৫ দশমিক ৫ মিটার প্রশস্ত এই মেরিন ড্রাইভটি নির্ধারিত সময়ের ১৪ মাস আগেই নির্মাণকাজ শেষ করে। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক বক্তৃতা করেন। স্বাগত বক্তৃতা করেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব এমএন সিদ্দিক। অনুষ্ঠানে সংসদ সদসবৃন্দ, তিন বাহিনী প্রধানগণ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও আমন্ত্রিত অতিথিবর্গসহ সরকারের সামরিক ও বেসামরিক পদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে একটি আন্তর্জাতিকমানের বিমানবন্দর হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে কক্সবাজারের পর্যটন এলাকার সম্প্রসারণ এবং উন্নয়নের নানা পরিকল্পনার কথাও তার ভাষণে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কক্সবাজার এয়ারপোর্টে যাতে প্রতিসপ্তাহে ঢাকা থেকে অন্তত একটা ফ্লাইট আসতে পারে আপাতত সেই ব্যবস্থাটা আমরা করে দিচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কক্সবাজার বিমানবন্দরটিকে একটি আধুনিক-উন্নত বিমানবন্দর হিসেবেই গড়ে তোলা হবে। সেই প্রকল্পও আমরা শুরু করেছি। আপাতত একটি টার্মিনাল ভবন থেকে শুরু করে সবকিছুর কাজ আমরা শুরু করব। তিনি বলেন, আর যেসব মানুষ এ এলাকায় থাকতÑ আপনারা জানেন, প্রায় ৪ হাজারের মতো মানুষ তাদের জন্য আমরা আলাদাভাবে নদীর (কর্ণফুলী) ওপারে আমরা ঘরবাড়ি ও ফ্লাট তৈরি করে দিচ্ছি। এদের অধিকাংশই শুঁটকি তৈরি করেন, শুঁটকি বিক্রি করেন। তাদের জন্য সেখানে শুঁটকির হাটও করে দেওয়া হবে। শুঁটকি মাছ শুকানোসহ তাদের বাসস্থানেরও জায়গা করে দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে সেই উন্নয়নের কাজও চলছে এবং নদীর ওপরে শীঘ্রই ব্রিজ বানানো হবে। এখানকার মানুষগুলোকে সেখানে পুনর্বাসনের পাশাপাশি আমরা বিমানবন্দরের জন্য নতুন টার্মিনাল ভবন নির্মাণ করব এবং রানওয়েটাকেও আরও প্রশস্ত ও দীর্ঘ করা হবে। এটা যেহেতু আন্তর্জাতিক এয়ার রুটে পড়ে তাই ভবিষ্যতে যে কোনো দেশ থেকে এখানে এসে যেন বিমান রিফ্যুয়েলিং করতে পারে তার ব্যবস্থাও করা হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, এই মেরিন ড্রাইভ নির্মাণের জন্য আমাদের সেনাবাহিনী যে কষ্ট করেছে, তারা সেই ২০১০ সালে যখন কাজ শুরু করল, এখানে কাজ করতে গেলে তো ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করেই কাজ করতে হয়। এখানে কাজ করতে গিয়েই পাহাড় ধসে মাটিচাপা পড়ে আমাদের সেনাবাহিনীর ছয় সদস্য জীবন দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২১ বছর পর দেশসেবার সুযোগ লাভের পর থেকেই আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি সার্বিকভাবে দেশের উন্নয়নের জন্য। তিনি বলেন, কক্সবাজার সবসময়ই অবহেলিত ছিল, এত সুন্দর আমাদের একটা সমুদ্র সৈকত। সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এবং দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ আসে। কাজেই এ অঞ্চলটাকে আরও সুন্দরভাবে ও আকর্ষণীয়ভাবে গড়ে তোলাটা আমাদের কর্তব্য বলেই আমরা মনে করি।

শ্রেণী:

সুষম বণ্টন না হওয়াও পানি সংকটের অন্যতম কারণ

33
33

বুদাপেস্ট সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

উত্তরণ প্রতিবেদন : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বজুড়ে পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাত দফা প্রস্তাব তুলে ধরে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এখনই উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ণ ও অপরিকল্পিত শিল্পায়নের এই সময়ে পানির কারণে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে এবং রাষ্ট্রের ভেতরে বৈষম্য ও বিভেদ তীব্রতর হচ্ছে। কাজেই পানির সুরক্ষা, সংরক্ষণ ও এর সদ্ব্যবহারের ওপর সমষ্টিগতভাবে নজর দিতে হবে আর পানি নিরাপত্তাই এই পৃথিবীর মানুষের মর্যাদাপূর্ণ ও মঙ্গলময় জীবনের নিশ্চয়তা দিতে পারে। সেই লক্ষ্য অর্জনে আমাদের অবশ্যই একসাথে কাজ করতে হবে, আর তা এ মুহূর্ত থেকেই। এক্ষেত্রে নিজেদের ভূমিকা পালন করতে বাংলাদেশ অঙ্গীকারাবদ্ধ।
গত ২৮ নভেম্বর হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে গঠিত পানিবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের প্যানেলের সদস্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রার পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সংক্রান্ত লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের করণীয় নির্ধারণ এবং প্যারিসে জলবায়ু চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত পানি সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ বুদাপেস্টের তিন দিনের এই সম্মেলনের মূল লক্ষ্য।
পানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত বৈশ্বিক উদ্যোগের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি সঠিক নিয়মে ভাগাভাগির বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভাটির দেশের মানুষের জীবনযাত্রায় এর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। পানির অভাব কিন্তু পানি সংকটের মূল কারণ নয়। পানির সুষম বণ্টনও এই সংকটের একটি কারণ। তবে তিনি স্বীকার করেন, আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ভাগাভাগি একটি ‘জটিল বিষয়’।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সংস্কৃতি, ধ্যান-ধারণা ও জীবনযাত্রার প্রধান অংশজুড়ে আছে পানি। পানির সুরক্ষা, সংরক্ষণের ওপর সমষ্টিগতভাবে নজর দিতে হবে। তাতে কেবল পানি নিয়েই বৈষম্য দূর হবে না, সমাজে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে। কেননা বিশ্বে অনেক উত্তেজনা ও সংঘাতের মূলে রয়েছে এই পানি। ৭টি এজেন্ডাম তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে পানিবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের প্যানেলে গৃহীত লক্ষ্য অর্জনে কার্যক্রমভিত্তিক এই এজেন্ডা সহায়ক হতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের অবশ্যই একসাথে (পানি ব্যবস্থাপনায়) কাজ করতে হবে এবং এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। এই কাজের জন্য ভূমিকা পালন করতে বাংলাদেশ অঙ্গীকারাবদ্ধ।
পানিকে রাষ্ট্রের সব নীতি ও কাজে অগ্রাধিকার দিতে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের প্রতি আহ্বান জানানোর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাত দফা প্রস্তাব সম্মেলনে তুলে ধরেন। প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে এজেন্ডা ২০৩০-এ টেকসই উন্নয়ন ও পানির মাধ্যমে যে আন্তঃসম্পর্কের কথা বলা হয়েছে, সেই অনুযায়ী জাতীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে যে কোনো উন্নয়ন প্রচেষ্টার আলোচনায় পানি বিষয়ও থাকতে হবে, বিশ্বের লাখ লাখ মানুষের সুপেয় পানি ও ন্যূনতম পয়ঃনিষ্কাশন চাহিদা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, কারণ পানির যে সরবরাহ রয়েছে তা পর্যাপ্ত ও নিরাপদ নয়। এক্ষেত্রে সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশ, বিশেষ করে দরিদ্র, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তার তৃতীয় দফা প্রস্তাব তুলে ধরে বলেন, যেসব দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে, তাদের সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে পানির কারণে। কাজেই পানি সংক্রান্ত দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিযোজন প্রক্রিয়াকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে। চতুর্থত, পানি আজকের এই সংকটের অপ্রতুলতার জন্য নয়, সুষম বণ্টনের অভাবে তৈরি হয়েছে। এর একটি স্থায়ী ও টেকসই সমাধান হতে পারে আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ব্যবস্থাপনা। পঞ্চমত, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য পানি জরুরি। আমাদের অবশ্যই কম পানি লাগে এমন ফসল এবং পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে হবে। ষষ্ঠত, যেসব উদ্যোগ একটি দেশকে পথ দেখাচ্ছে তা অন্যদের সাথে অবশ্যই বিনিময় করতে হবে, যাতে পানি সম্পদের যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিত করতে জ্ঞান, ক্ষমতা, দক্ষতা ও কৌশলের উন্নয়ন ঘটানো যায়। সর্বশেষ সপ্তম দফা প্রস্তাব তুলে ধরে তিনি বলেন, পানি সংক্রান্ত লক্ষ্য পূরণে অর্থায়নের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পানি বিষয়ে গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য একটি আন্তর্জাতিক তহবিল গড়ে তুলতে হবে এবং এর সুফল সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
পানিকে সামাজিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং পরিবেশের ভারসাম্যের মৌল ভিত্তি হিসেবে বর্ণনা করে এই সম্মেলনের আয়োজন করায় হাঙ্গেরি সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের দর্শন, সংস্কৃতি, জীবন ও জীবিকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে পানি। আর এমন এক দেশ এই পানি সম্মেলনের আয়োজন করেছে, সেই হাঙ্গেরি পানি নিরাপত্তার জন্য বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। ২০১৩ সালের বুদাপেস্ট পানি সম্মেলনই পানি নিয়ে এসডিজির ধারণাগত ভিত্তি দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নিরাপদ পানির জন্য এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা ইতোমধ্যে পূরণ এবং ৬৫ শতাংশ মানুষের জন্য উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা নিশ্চিত করার তথ্য বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরে বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে সকলের জন্য সুপেয় পানি এবং মোট জনসংখ্যার অন্তত ৯০ শতাংশের জন্য উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর।
শেখ হাসিনা আরও বলেন, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার ধারাবাহিক পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং বাংলাদেশের সতর্কতা ব্যবস্থা, ঘূর্ণিঝড়, আশ্রয়কেন্দ্র ও সমুদ্র উপকূলে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার উদ্যোগ বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেন, বর্ষায় পানির আধিক্য এবং শুকনো মৌসুমে খরার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এই সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে কারণ বাংলাদেশের ভূ-উপরিস্থ পানির ৯২ শতাংশের উৎপত্তিস্থল সীমান্তের বাইরে। তিনি বলেন, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন একটি জটিল বিষয়। বাংলাদেশ গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে দুই দশক আগে ভারতের সাথে একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করেছে। পানি বিষয়ে বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতাও সঠিক পথেই এগোচ্ছে।
পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে ‘সাসটেইনেবল ওয়াটার সলিউশন এক্সপো’ পরিদর্শন করেন।
প্রধানমন্ত্রীর সাথে হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্টের বৈঠক
বাংলাদেশে চিকিৎসা, প্রযুক্তি ও কৃষি বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন বৃত্তি কর্মসূচি প্রবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছেন হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট ড. জানোস আদের। তার এই প্রস্তাবে বাংলাদেশের সাথে সহযোগিতার নতুন দ্বার উন্মোচন হলো। গত ২৮ নভেম্বর সান্দর প্যালেসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বৈঠকে হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট ড. জানোস আদের এই প্রস্তাব দেন।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর আরবান এই বৃত্তি কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। এ ছাড়া প্রেসিডেন্ট আদের মৎস্য চাষ (পিসিকালচার) এবং জলজ উদ্ভিদ ও জীবজন্তুর বংশ বিস্তারের (একুয়াকালচার) ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারকে সহযোগিতা করবেন। আদের বলেন, পানি পরিশোধন ও বন্যা আক্রান্ত এলাকায় বাংলাদেশকে সহায়তা করতে চায় হাঙ্গেরি।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, এই প্রস্তাবে হাঙ্গেরির সাথে সহযোগিতার নতুন দরজা উন্মোচিত হলো। এম শহীদুল হক বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী প্রেসিডেন্ট প্যালেসে পৌঁছলে হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট ড. জানোস আদের এসে তাকে আন্তরিক অভ্যর্থনা জানান। তিনি বলেন, বৈঠকে হাঙ্গেরির সাথে সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে, বাংলাদেশের সাথে হাঙ্গেরি নতুন কিছু করতে আগ্রহী।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে হাঙ্গেরির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীনতার পর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে একটি নতুন মাত্রা গড়ে উঠতে শুরু করেছিল। কিন্তু হঠাৎ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর এই সম্পর্ক ভেঙে যায় এবং আমরা সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে এসেছি। পররাষ্ট্র সচিব বলেন, একজন বিশ্বনেতা হিসেবে পানি সমস্যা নিয়ে হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রভাব ও দুর্যোগ এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার মতো অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
প্রেসিডেন্ট আদের সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ঠেকাতে বাংলাদেশের প্রস্তুতি এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় তার সরকারের সম্ভাব্য সহায়তার বিষয়ে জানতে চান। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে বাংলাদেশের ঝুঁকি এবং সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা ২ মিটার বেড়ে গেলে ২ থেকে আড়াই কোটি লোকের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কিত বিভিন্ন গবেষণার কথা উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী সবুজ বেষ্টনি প্রকল্প, বনায়ন কর্মসূচি ও বাস্তুচ্যুত লোকজনের জন্য উঁচু ভূমিতে বাড়িঘর নির্মাণসহ জলবায়ু সহিষ্ণু তহবিলের আওতায় বাংলাদেশের বিভিন্ন উদ্ভাবনী স্কিমের ব্যাপারে হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্টকে ব্রিফ করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব প্রকল্প সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জনে হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানালে তিনি তা গ্রহণ করেন এবং তার সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
হাঙ্গেরির জাতীয় বীরদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৯ নভেম্বর সিটি পার্কের ‘হিরোস-স্কয়ার’-এ হাঙ্গেরির জাতীয় বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে হাঙ্গেরি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রাণোৎসর্গকারী বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। প্রধানমন্ত্রী এ সময় সেখানে সম্মান প্রদর্শনের স্মারক হিসেবে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করেন।
ঢাকা-বুদাপেস্টের মধ্যে ৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর
বাংলাদেশ ও হাঙ্গেরি কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা তথা বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে। ২৯ নভেম্বর সকালে হাঙ্গেরির পার্লামেন্ট ভবনে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে এই চুক্তিগুলো স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

শ্রেণী:

কোনো হত্যাকারীই রেহাই পাবে না

Posted on by 0 comment
03

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারি

03উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গুপ্তহত্যাকারীদের দমনে দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করে বলেছেন, সম্প্রতি দেশে জঙ্গি কর্মকা- এবং একের পর এক গুপ্তহত্যার পেছনে বিএনপি-জামাতের যোগসূত্রতা রয়েছে। যারা প্রকাশ্যে মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে তারাই কৌশল পাল্টে এখন মানুষ হত্যা করছে। আমরা যখন যা বলি, কোনো অমূলক কথা বলি না। একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না, আমি ‘হেড অব দ্য গবর্নমেন্ট’ (সরকারপ্রধান)। আমার কাছে নিশ্চয়ই তথ্য আছে। সব তথ্য হয়তো তদন্তের স্বার্থে প্রকাশ করা যাবে না; কিন্তু আমি অমূলক কথা বলি না।
গুপ্তহত্যাকারীদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জঙ্গি-সন্ত্রাসী ও গুপ্তহত্যাকারীরা যে দলেরই হোক, আমাদের হাত থেকে রেহাই পাবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ আমাদের গোয়েন্দারা তৎপর রয়েছেন। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট, দেশের অগ্রযাত্রা ব্যাহত এবং দেশ এগিয়ে যাচ্ছে যারা চায় নাÑ তাদেরই নীলনকশা অনুযায়ী এসব ঘটনা ঘটছে। দেশবাসীর কাছে আমার উদাত্ত আহ্বানÑ যেভাবে মানুষ পুড়িয়ে হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে আপনারা গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, ঠিক তেমনিভাবে গুপ্তহত্যা-নাশকতাকারী ও তাদের মদদদাতাদের খুঁজে বের করে পুলিশের হাতে সোপর্দ করুন। কেননা দেশের জনগণ সচেতন হলে ষড়যন্ত্রকারীরা কোনোদিনই তাদের নীলনকশা বাস্তবায়ন করতে পারবে না। গত ৮ জুন দুপুরে গণভবনে আয়োজিত জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর বুলগেরিয়া, জাপান ও সৌদি আরব সফর নিয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। লিখিত বক্তব্যের পর গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নগুলো ছিল মূলত দেশে সাম্প্রতিক গুপ্তহত্যা, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সহিংসতা, বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ নানা প্রসঙ্গে। তবে সবচেয়ে বেশি কথা হয় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একের পর এক গুপ্তহত্যা নিয়ে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সাথে মূল মঞ্চে উপস্থিত ছিলেনÑ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এমপি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এমপি, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এমপি, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি। এ সময় সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা, সংসদ সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করতেই পরিকল্পিতভাবে টার্গেট কিলিং করা হচ্ছে। তবে সরকার বসে নেই, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর আছে। তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই গুপ্তহত্যাকারীদের ধরা হচ্ছে এবং এর সাথে দুটি রাজনৈতিক দলের জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের যোগসূত্র রয়েছে। এগুলো তারা খুব পরিকল্পিত ঘটাচ্ছে। আমরা এটা কখনই মেনে নেব না। এ ধরনের পরিকল্পনা বাংলাদেশে স্থান পাবে না। বাংলাদেশে সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান সুদৃঢ়।
এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী গুপ্তহত্যায় বিএনপি-জামাতের জড়িত থাকার কথা ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, গুপ্তহত্যার বিষয়ে আপনারা নিজেরা চিন্তা করে দেখেন, কারা টার্গেট কিলিং করছে? কারা বলেÑ গুলি কর, বৃষ্টির মতো গুলি কর, বাঁচলে গাজী, মরলে শহীদ। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা মিসকিন না, সম্ভাবনাময় জাতি। যার ম্যাজিক হচ্ছে জনগণ এবং জনগণের ভালোবাসা, বিশ্বাস ও আস্থার আন্তরিকতা। আমাকে নিয়ে কে কী লিখল, কে কী আমাকে দিল বা বিশ্ব তালিকায় আমাকে কী মার্কিং দিল, সেটা আমার কাছে বড় কিছু নয়। আমার দেশের মানুষ ভালো থাকলেই এটা আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।
সরকারপ্রধান হিসেবে তথ্য নিয়েই কথা বলি : গুপ্তহত্যার পর রাজনৈতিক উদ্দেশে কোনো দলের ওপর দায় চাপালে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে কিনাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্নকর্তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, মনে রাখবেন আমি যখন যে কথাটা বলি, তখন কোনো অমূলক কথা বলি না। একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না, আমি ‘হেড অব দ্য গবর্নমেন্ট’ (সরকারপ্রধান)। আমার কাছে নিশ্চয়ই তথ্য আছে। তারা যদি জানে জঙ্গি কারা, সেই তথ্যটা দয়া করে আমাদের দিয়ে দিতে বলেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা যখন একজন আসামিকে ধরি, সমস্ত ক্লু বিশ্লেষণ করেই ধরি। টেলিফোন নম্বরসহ সকল কিছু মিলিয়ে ধরি। আর যখন তার পরিচয়ের সূত্রটা পাই, এতেই আমরা যোগসূত্রটা পাই। তিনি আরও বলেন, আমরা কিন্তু বসে নেই। যারা মনে করেন আমরা রাজনৈতিক হিসেবে এটা বলছি, আর অন্যদিকে জঙ্গিরা পার পেয়ে যাচ্ছেÑ তা হলে পার পেয়ে যাওয়া জঙ্গিরা কারা? তাদের নাম-ঠিকানা পরিচয় যদি জেনে থাকেন, তা হলে তারা আমাদের দয়া করে জানান। জঙ্গি জঙ্গিই। তারা যে দলেরই হোক, আমাদের কাছ থেকে রেহাই পাবে না। এটুকু আশ্বাস আমি দিতে পারি।
গুপ্তহত্যাসহ বিভিন্ন নাশকতামূলক ঘটনায় কোনো না কোনোভাবে বিএনপি-জামাতের যোগসূত্র রয়েছে উল্লেখ করে জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, যেহেতু এসব জঙ্গি তৎপরতা বাংলাদেশে আমরা সব সময় দেখেছি। যারা এ ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে কোনো না কোনোভাবে এদের যোগসূত্র রয়েছে। অন্তত দুটি রাজনৈতিক দলের (বিএনপি ও জামাত) সাথে তো যোগসূত্র আছেই। এখন এই রাজনৈতিক দল দুটিকে যারা বাঁচাতে চায়, রক্ষা করতে চায়, তাদের অপকর্মগুলো ঢাকতে চায়Ñ তারাই এ ধরনের প্রশ্ন ওঠায়। আমি যদি এ কথা বলি, তার কী জবাব আছে তাদের কাছে পাল্টা প্রশ্ন রাখেন প্রধানমন্ত্রী।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারের আমলে জঙ্গি তৎপরতার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ১৯৭১ সালে যারা মানুষ হত্যা করেছে, আমরা যখন এদের বিচার শুরু করলামÑ তখন কী বলা হয়েছে? ২০০১ সালে যখন বাংলা ভাইয়ের সৃষ্টি হলো তখন কী বলা হয়েছে? তখন কারা বলেছিল? তখন কারা পুলিশ প্রহরা দিয়ে ওই সমস্ত জঙ্গিদের মিছিল করিয়েছে? আপনারা (সাংবাদিক) এত তাড়াতাড়ি ভুলে যান কীভাবে? আর যারা আজকে এ কথা বলছে তারাও এত তাড়াতাড়ি কীভাবে ভুলে যায়? তিনি আরও প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেন, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করার পর কারা তাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে? কারা লাখো শহীদের হাতে রঞ্জিত পতাকা তুলে দিয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের হাতে? ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার খুনিদের কারা ইনডেমনিটি জারি করে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়েছে? আসুন সব যোগসূত্র খুুঁজুন। যারা আত্মস্বীকৃত খুনিদের চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করতে পারে, তাদের সম্পর্কে এত ভালো ধারণা করার কি কোনো যৌক্তিকতা আছেÑ আমি এটা বুঝি না।
তাকে হত্যার লক্ষ্যে কোটালীপাড়ায় বোমা পুঁতে রাখার ঘটনাসহ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, এসব হামলার পর তারা (বিএনপি-জামাত) কী বলেছে? কিন্তু আজকে তদন্তের পর কী বেরিয়েছে? আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যাকা-ের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তদন্ত করে বের করা হলো কারা খুনি? তারা কী বিএনপি-জামাত করে না? এসব ঘটনা একটার সাথে অপরটার যোগসূত্রগুলো বিশ্লেষণ করলেই স্পষ্ট হবে সবটির সাথেই ওই দুটি দলের যোগসূত্রতা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ করে হত্যা প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও ষড়যন্ত্র চলেছে। আমার ছেলে জয় কী অপরাধ করেছে? এফবিআই অফিসারকে টাকা দিয়ে কিনে ফেলল, ওই টাকা কোথা থেকে এলো? এই টাকা কে বহন করেছে? কারা দিয়েছে বা কারা বৈঠক করেছে, কারা চিঠি দিয়েছে? এটা তো আমরা নয়, আমেরিকাই বের করেছে। আমেরিকার তদন্তেই বেরিয়ে এসেছে কারা কারা এর সাথে জড়িত। কারা এই ষড়যন্ত্র করছে। বিএনপি নেতারা করেছে। তাই গুপ্তহত্যার সাথে আমরা যাদের যোগসূত্রতা পাই; সেটা কি মিথ্যা। তিনি বলেন, যারা প্রকাশ্যে মানুষ খুন করতে পারে, পুড়িয়ে মানুষ মারতে পারে, তারা এর সাথে যুক্ত হবে নাÑ এ ধারণাটা কোথা থেকে আসে? আমারও সেটাই প্রশ্ন। তার মানে এ ধরনের একটি সন্ত্রাসী-জঙ্গিবাদী পার্টিকে বাংলাদেশে জীবিত রেখেই দিতে হবে! আর বাংলাদেশের মানুষকে সব সময় একটা আশঙ্কার মধ্যে রাখতে হবে! প্রশ্ন করে তিনি বলেন, কাজেই আমি যখন যে কথাটা বলি, এটা মনে রাখবেন কখনও কোনো অমূলক কথা বলি না। একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না আমি সরকারপ্রধান। আমার কাছে নিশ্চয়ই তথ্য আছে। হয়তো সব তথ্য সব সময় তদন্তের স্বার্থে প্রচার বা প্রকাশ করা যাবে না। কিন্তু সূত্রটা জানা যায়। সূত্র ধরেই আমরা কথা বলি। কাজেই যারা এ ধরনের কথা বলেন, তারা প্রকৃত জঙ্গিদের বাঁচাতে চান, রক্ষা করতে চান এবং জঙ্গিবাদী কর্মকা-কে উৎসাহিত করতে চান।
মানুষ ভালো থাকলেই এটা আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার : ‘বিশ্ব নারী নেতৃত্বের তালিকায় অগ্রগতি’ প্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি রাজনীতি করি বাংলাদেশের জনগণের জন্য। আমার দেশের মানুষ তাদের জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারলেই আমার জীবনের সার্থকতা। আমি জীবনে কোনোদিন মার্কিং (সংখ্যা) নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করি না। চিন্তা করবও না। কী পেলাম, আর কী পেলাম না; ওগুলো নিয়ে আমার চিন্তা-ভাবনা নেই। দেশের জনগণকে কী দিতে পারলামÑ সেটাই আমার কাছে বড়।
তিনি বলেন, কে আমাকে মার্কিং দিচ্ছে, কী দিচ্ছেÑ এটা আমার ভাবার বিষয় না। দেশকে কতটুকু আমরা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারলাম, উন্নত করতে পারলাম, জাতি হিসেবে বিশ্বে আমরা কতটুকু সম্মান পেলামÑ সেটাই বড় কথা। তিনি আরও বলেন, এই দেশ আমরা স্বাধীন করেছি লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে। তাই যখন এই দেশকে কেউ অবহেলার চোখে দেখে সেটাই আমার জন্য কষ্টের ছিল। সেজন্য আমাদের কষ্ট ছিল, আমরা কারও কাছে হাত পাতব না। কারও কাছে ভিক্ষা চাইব না। আমরা মাথা উঁচু করে চলব। আমরা নিজের পায়ে দাঁড়াব। যেটা জাতির পিতা বলতেন সব সময়।
এ সময় জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের স্মতিচারণ করতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আজকে আমার সবচেয়ে বেশি আনন্দ লাগে যখন জি-৭ গেলাম প্রত্যেকটা ক্ষমতাধর দেশের রাষ্ট্রপ্রধান জানতে চান, তারা এসে বলেন, বাংলাদেশ কীভাবে এগিয়ে গেল? এটা তো একেবারে মিরাকল (অলৌকিক)। এর ম্যাজিকটা কী? জবাবে আমি বলেছি, ম্যাজিক একটাই জনগণ। জনগণের ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং আস্থা আর আন্তরিকতা সাথে জনগণের জন্য কাজ করা। কারণ আমি নিজের স্বার্থের জন্য রাজনীতি করি না। রাজনীতি করি বাংলাদেশের মানুষ যাতে একটু ভালো থাকে, উন্নত থাকে। তাই দেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নতি করতে পারছি, তারা ভালো আছে।
রাজনীতির প্রয়োজনে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ আনাচে-কানাচে ঘোরার অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তখন-যখন মানুষের কাছে গেছি, মানুষ হাত পেতেছে, খাবার চেয়েছে। পেটের ভাতের জন্য আকুতি করেছে। রাস্তাঘাট কিছু নেই, ধানক্ষেতের আল দিয়ে হেঁটে গেছি হাঁটু পানি দিয়ে। তখন মানুষকে লক্ষ্য করেছি, জানার চেষ্টা করেছি মানুষ কী চায়? তাই যখনই সরকারে এসেছি চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশের মানুষ পরনের বস্ত্র পাচ্ছে কিনা? তার পায়ে এক জোড়া স্যান্ডেল আছে কিনা? সে একবেলা থেকে দুবেলা খেতে পারছে কিনা? প্রত্যেকটা ধাপে ধাপে আমরা ওই জিনিসগুলো সেভাবে পরিকল্পনা নিয়েছি। পরিকল্পনা অনুযায়ীই পদক্ষেপ নিয়েছি।
তিনি বলেন, একটা রাজনৈতিক দল হিসেবে যদি নিজস্ব পরিকল্পনা, চিন্তা-ভাবনা না থাকে বা ভবিষ্যৎ সুনির্দিষ্ট প্লান না থাকেÑ তা হলে এত দ্রুত উন্নত করা যায় না। আমরা দল হিসেবে সেভাবেই পেপার করেছি, সেভাবেই আমরা প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ে ধাপে ধাপে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। আজকে দেশ যেমন এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের মানুষও সম্মান পাচ্ছে। এটাই আমার বড় পাওয়া। মাটি-মানুষের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা কাজ করছি। এটা ম্যাজিকও না, কিছু না। এটা হলো মানুষের প্রতি ভালোবাসা, তাদের প্রতি দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যবোধ। কারণ আমার বাবা করে গেছেন। তার কাছ থেকেই শিখেছি।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোন পত্রিকা আমাকে নিয়ে কী লিখল, না লিখলÑ ওই নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। ওটা নিয়ে চিন্তা করলে তো ওটা নিয়ে থাকতে হয়। বায়োডাটা (জীবন বৃত্তান্ত) পাঠাতে হবে। নাম পাঠাতে হবে। ওর পেছনে কেন আমি ফালতু খরচ করব। তার চেয়ে ওটা দিয়ে দেশে দুইটা মানুষের ঘর করে দেব। কিংবা কাজের ব্যবস্থা করে দেব। সেটাই আমার বড় পাওয়া। কত প্রস্তাব আসে। তা দরকার কী আমার। আমার দেশের মানুষ ভালো থাকলেই এটা আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।
বিদেশিদের কাছে ‘আমরাই’ মিথ্যা বলি : বিদেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা বাংলাদেশ নিয়ে প্রশংসা করে কিন্তু সেই দেশেরই এদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতরা বাংলাদেশ নিয়ে নেতিবাচক কথা বলেনÑ এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে যারা (কূটনীতিক) এমন কিছু বলে এটার জন্য নিজের (দেশের) লোকরাই দায়ী। কারণ অনেকেই দূতাবাসে যান, কোনো পার্টিতে যান। দু-চার পেগ খান, তারপর বেতালা হয়ে নানা কথা বলেন। এ রকম ঘটনাও হয়। তিনি বলেন, বাঙালিদের স্বভাব হচ্ছে পরচর্চা করা, নিজের নিন্দা করা। এটা করতে গিয়ে তারা নিজের দেশকেই হেয় করেন।
প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, আমরা দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছি কেন? আমাদের দেশটাকে বিশ্বের কাছে একটা সম্মানজনক অবস্থায় নিয়ে আসার জন্য। আর সেখানে আমাদের ভেতর থেকে কেউ দেশে এটা হয়নি, ওটা হয়নি, ওটা হতে পারত বলে বেড়ান। অথচ তারা (বিদেশি কূটনীতিক) যখন প্রশংসা শুরু করেন তখন আমরা করি তার উল্টোটা। তখন তো তারাও উল্টোটা শুরু করবে। এটাই তো বাস্তবতাÑ যোগ করেন তিনি।
এ সময় সাংবাদিক শফিক রেহমানের নাম উল্লেখ না করে শেখ হাসিনা বলেন, হয়তো দেখা গেল কেউ একজন জঘন্য কাজের সাথে জড়িত। হয়তো তাকে আমরা গ্রেফতার করলাম। তখন আপনারা (সাংবাদিক) তাকেই বাহ্বা দিয়ে গেলেন! কিন্তু সে কি কাজটি করতে যাচ্ছিল, সেটা সম্পর্কে আপনাদের কোনো অনুভূতি বা উপলব্ধি আছে সেটা আমি দেখতে পাই না। এখানকার একজন ব্যক্তিও যে অপরাধ করতে পারে তখন সেটা আর আপনারা দেখতে পারেন না। এ ধরনের ঘটনাও ঘটে। সেটাও তো আমরা দেখেছি।
কাজেই এখানে যারা বিদেশি কূটনীতিকদের সাথে কথা বলেন, তাদের তো একটু সংযত, সতর্ক বা সাবধান হয়ে কথা বলা উচিত উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, বাংলাদেশ যে উন্নত হচ্ছে, এটা তো একটা দেখাতে বা বলতে পারতেন। অবশ্য বাঙালির স্বভাবজাতভাবে পরনিন্দা করতে পছন্দ করে। তবে পবিত্র রমজান মাসে তো কেউ মিথ্যা কথা বলবেন না, এটাই আশা করি। তিনি বলেন, আমরা দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছি দেশের উন্নয়নের জন্য। এখন আমরা মিসকিন না। আমরা একটা সম্ভাবনাময় জাতি। এটা সবাইকে মনে রেখে মাথা উঁচু করে চলতে হবে। এ ধারণাটিই মাথায় রেখে চলতে হবে। আমরা সেভাবেই কাজ করে যাচ্ছি।
মক্কা-মদিনা রক্ষায় প্রয়োজনে সামরিক সহযোগিতা : সন্ত্রাসবিরোধী সৌদি জোটে বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগের চেয়ে সৌদি আরবের অবস্থানের গুণগত পরিবর্তন হয়েছে। শুধু সেখানে লোক পাঠানো নয়, সৌদি আরব বাংলাদেশে এখন বিনিয়োগে আগ্রহী। আর মনে রাখতে হবে সৌদি বাদশাহ শুধু বাদশাহ নয়, পবিত্র মক্কা ও মদিনা শরিফের গার্ডিয়ানও (অভিভাবক)। তারা যে সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থান নিয়েছে, তাতে আমরাও সম্মতি দিয়েছি। মুসলিম অধ্যুষিত ৪০টি দেশ এ ব্যাপারে একত্রিত হয়েছে। সে দেশে পবিত্র কাবা শরিফ, নবীজী (স.)-র রওজাসহ অনেক পবিত্র স্থাপনা রয়েছে। এগুলোর নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সাথে ভাবছি। সৌদি আরব এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা চাইলে আমরা তা করতে প্রস্তুত। এমনকি সামরিক সহিযোগিতা চাইলেও আমরা তা দেব। ইতোমধ্যে আমাদের সেনাপ্রধান সৌদি আরব ঘুরে এসেছেন। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের যেকোনো দেশের সাথে সহযোগিতামূলক অবস্থান নিতে পারে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলামে সন্ত্রাসের কোনো স্থান নেই। একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিনই শেষ বিচারের মালিক। বিচারের ভার মানুষকে তিনি দেননি। তাই ধর্মের নামে যারা মানুষ খুন করছে প্রকৃত অর্থে তারা ইসলামেই বিশ্বাস করে না। হাতেগোনা মুষ্টিমেয় কিছু গোষ্ঠী ধর্মের নামে মানুষ হত্যা করে পুরো মুসলিম ধর্মকেই কলুষিত করছে।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী ধর্মপ্রাণ মুসলমান, ধর্ম প্রচারক ও মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিমদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, তাদের পরিবারের কোনো সদস্য জঙ্গিবাদের পথে যাচ্ছে কিনা, সেটা দেখাও তাদের কর্তব্য। মানুষের মধ্যে এই চেতনাটা জাগ্রত করতে হবে। আর দেশের মানুষের প্রতি আমার আহ্বান, যেভাবে মানুষ পুড়িয়ে মারা হত্যাকারীদের যেমন প্রতিরোধ করেছেন, ঠিক তেমনিভাবে গুপ্তহত্যাকারী ও নাশকতাকারীদের খুঁজে বের করে পুলিশের হাতে সোপর্দ করুন। দেশের জনগণ সচেতন হলে ষড়যন্ত্রকারীরা কোনোদিনই তাদের নীলনকশা বাস্তবায়ন করতে পারবে না।
বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সবাই বিস্মিত হয়েছে : জাপান, সৌদি আরব ও বুলগেরিয়া সফরে দেশগুলোর নেতাসহ বিশ্বনেতাদের সাথে আলোচনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, পরপর ৩টি সফর আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেকটি সফরে বাংলাদেশের অনেক অর্জন আছে। তিনি বলেন, এই ৩টি সফরে যেসব নেতাদের সাথে আলোচনা হয়েছে, সেই বিশ্বনেতাদের সবাই বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাদের অবাক করেছে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ওপরে থাকাটা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সৌদি আরব সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ ছিল। সফরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আলোচনায় সৌদি সরকার বাংলাদেশ থেকে দক্ষ-অদক্ষ বিভিন্ন পেশাজীবী শ্রমিক নেবে বলে জানিয়েছে। সৌদি ব্যবসায়ীরাও বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, বুলগেরিয়া সফরে দেশটির সোফিয়ায় ‘গ্লোবাল উইমেন লিডার্স ফোরামে’ বাংলাদেশের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। ফোরামে বাংলাদেশে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতায়নে সরকারের নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেসব পদক্ষেপ তুমুল প্রশংসিত হয়েছে ফোরামে।
জাপান সফর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেখানে জি-৭ অর্থাৎ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ৭টি দেশের প্রতিনিধির সাথে আলোচনা হয়েছে। তারা সবাই বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রশংসা করেছেন।

শ্রেণী: