বিএনপি ‘নাকে খত’ দিয়েই নির্বাচনে আসবে

Posted on by 0 comment
55

55উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে আগাম নির্বাচন এবং বিএনপির সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে সংলাপের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, তার সরকার এমন কোনো দৈন্যদশায় পড়েনি যে আগাম নির্বাচন দিতে হবে আর আগামী নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আলোচনার কোনো প্রয়োজন নেই। কোন দল নির্বাচনে এলো কি এলো না সেটি সম্পূর্ণই সেই দলটির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। নির্বাচন করতে চাইলে আসবে, নইলে আসবে না। এ ব্যাপারে সরকারের কিছু করণীয় নেই। তবে গতবার বিএনপি যে ভুল করেছে আমার মনে হয় এবার তা করবে না। বিএনপি নাকে খত দিয়েই এবার নির্বাচনে আসবে।
গত ৭ ডিসেম্বর বিকেলে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে একাধিক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। আগামী নির্বাচনেও তার দলের বিজয়ের ব্যাপারে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা স্বাধীনতার সপক্ষের রাজনীতি করে, জনগণের কল্যাণে কাজ করে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়, আমরা চাই তারাই ক্ষমতায় আসুক। কোনো যুদ্ধাপরাধী, স্বাধীনতাবিরোধী, দুর্নীতিবাজ, বিদেশে অর্থ পাচারকারী, জঙ্গিবাদ সৃষ্টিকারী খুনিদের দল ক্ষমতায় এলে দেশ আবারও ধ্বংস হয়ে যাবে। যারা বর্তমান উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত রাখতে পারবে, দেশকে আর পেছনের দিকে টানবে না, আমরা চাই তারাই নির্বাচিত হবে। দেশের জনগণও এটাই চায়। তাই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, বর্তমান উন্নয়ন ও সফলতার গতিধারা অব্যাহত রাখতে দেশের জনগণ আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগকেই ভোট দেবে। আগামীতে আমরা আরও নতুন নতুন আসনে বিজয়ী হব বলেই আমরা দৃঢ় বিশ্বাস।
প্রধানমন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, এবার কেউ নির্বাচনে না এসে আগুনসন্ত্রাস করলে জনগণই তার জবাব দেবে। জনগণই ব্যবস্থা নেবে। সৌদি আরবে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচার সংক্রান্ত বিশ্বের গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, দেশের মানুষই এর বিচার করবে আর দেশের প্রচলিত আইনানুযায়ীও তার বিচার হওয়া উচিত। অবশ্যই তার বিচার হবে আর সাজাপ্রাপ্ত আসামি তারেক রহমানকে দেশে ফেরত আনতেও ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। একদিন না একদিন তারেক রহমানকেও আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
সম্প্রতি তার কম্বোডিয়া সফর সম্পর্কে বিভিন্ন দিক তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হলেও প্রায় এক ঘণ্টার প্রশ্নোত্তর পর্বে দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আগামী নির্বাচন, জিয়া পরিবারে বিদেশে অর্থ পাচার, বিএনপির সঙ্গে সংলাপ, রোহিঙ্গা ইস্যু, ফিলিস্তিন নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তসহ নানা বিষয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমের সম্পাদক প্রধানদের নানা প্রশ্নের সাবলীলভাবেই উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী। সংবাদ সম্মেলন মঞ্চে ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এমপি। এছাড়া সেখানে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, সরকারের মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এ প্রসঙ্গে গত নির্বাচনের আগে নির্বাচনে নিয়ে আসতে বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করে গণভবনে দাওয়াত প্রদানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, একবার তার (খালেদা জিয়া) সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে আমন্ত্রণ জানিয়ে যে ঝাড়ি খেয়েছি, যে অপমানিত হয়েছি। আর তেমন ঝাড়ি খাওয়ার বা অপমানিত হওয়ার ইচ্ছে নেই। যাদের মধ্যে সামান্যতম ভদ্রতাজ্ঞানটুকু নেই, তাদের সঙ্গে আলোচনা করার কথা বলেন কোন মুখে। আমার ওপর আপনারা এত জুলুম করেন কেন? ছেলের মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী হয়েও তার (খালেদা জিয়া) সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু দরজায় তালা বন্ধ করে দিয়ে আমাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পকেট গেট দিয়েও ঢুকতে দেয়নি। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছে। তারপরও দেশের স্বার্থে আর বঙ্গবন্ধুর কন্যা বলেই তাদের সঙ্গে কথা বলার উদ্যোগ নিয়েছিলাম।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, জিয়াউর রহমানকে মেজর থেকে মেজর জেনারেল বানিয়েছেন আমার বাবা (বঙ্গবন্ধু)। বউ (খালেদা জিয়া) উনি প্রায়শই আমাদের বাড়িতে আসতেন। আমাদের বাসার নিচে মোড়া পেতে বসে থাকতেন। তাকে (জিয়াউর রহমান) অনেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক বলেন! অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে উনি যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতি করার সুযোগ দিয়েছেন, নিষিদ্ধ জামায়াতে ইসলামীসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচারের পথ বন্ধ করে দিয়ে খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেছেন। এটাই কী তার (জিয়াউর রহমান) বহুদলীয় রাজনীতি? প্রতিদিন রাতে কার্ফু দিয়ে দেশ চালানোকে বহুদলীয় গণতন্ত্র বলে?
খালেদা জিয়ারই ক্ষমা চাওয়া উচিত : ‘শেখ হাসিনাকে ক্ষমা করে দিয়েছি’Ñ সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার এমন মন্তব্য সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাকে কেন ক্ষমা করবে? আমি কী করেছি? বরং উনার (খালেদা জিয়া) উল্টো মাফ চাওয়া উচিত। আসলে উনি কি ক্ষমা করেছেন, না ক্ষমা চেয়েছেনÑ এ ক্ষমার বিষয়টি স্পষ্ট নয়। তার উচিত দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়া। আমি কোনো অপরাধ করেছি না-কি যে আমাকে ক্ষমা করতে হবে?
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্ষমতায় থাকতে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া, সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টারসহ অসংখ্য মানুষকে হত্যা করিয়েছেন। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আমি বেঁচে গিয়েছিলাম, এর জন্য কী আমাকে ক্ষমা করেছেন? ওই হামলায় আমি প্রাণে রক্ষা পেলেও আইভি রহমানসহ ২২ নেতাকর্মী নিহত হয়েছে। এ জন্য বরং খালেদা জিয়ারই জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত।
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদার বিরুদ্ধে যে মামলা তা আমাদের সরকার দেয়নি; বরং আমার বিরুদ্ধে তো বিএনপি এক ডজন মামলা দিয়েছে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যারা মামলা দিয়েছে সেই মঈনুদ্দিন-ফখরুদ্দীনরা তো তাদেরই নিজেদের লোক। খালেদা জিয়াই ৯ জনকে ডিঙ্গিয়ে মঈন-উ আহমদকে সেনাপ্রধান করেছিলেন, জাতিসংঘ থেকে এনে ফখরুদ্দীন আহমদকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর করেছিলেন। তারাই তো এই মামলা করেছেন।
তিনি বলেন, এই মামলা থেকে তার (খালেদা জিয়া) পলায়নপর নীতি আপনারা তা দেখেছেন। ১৫০ বার মামলার স্ট্রে নিয়েছেন, ২২-২৩ বার মামলা বন্ধ করতে রিট করেছেন আর কোর্টে যাওয়া নিয়েও তা-ব হয়েছে। এর আগে উনি হাজিরা দেওয়ার সময় আওয়ামী লীগের এমপি ছবি বিশ্বাসের গাড়ি ভাঙচুর করেছে, আগুন দিয়েছেন। এবার পুলিশের গাড়িতে আগুন দিয়েছেন। যখনই উনি বেরুচ্ছেন তখনই একটা না একটা ঘটনা ঘটাচ্ছেন। এর আগে নির্বাচন ঠেকানোর নামে শত শত মানুষকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে হত্যা করেছেন। এ জন্য খালেদা জিয়ারই উচিত দেশবাসীর সামনে ক্ষমা চাওয়া।
অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীরা দেশকে ৩০ বছর পিছিয়ে দিয়েছে : অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার ৪৬ বছরের মধ্যে ৩০ বছরই দেশের মানুষ ছিল অবহেলিত, বঞ্চিত আর এই ৩০ বছরই ছিল হত্যা-ক্যু-ষড়যন্ত্রের রাজনীতি, দুর্নীতি-দুঃশাসন, বিদেশে অর্থ পাচার, জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস-খুন আর ভোট কারচুপির ইতিহাস। ত্রিশটা বছর দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার মাত্র আট বছরে দেশের যে উন্নয়ন করেছে তা কেউ করতে পারেনি। একমাত্র আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই দেশের মানুষের জন্য কাজ করে এটা আমরা প্রমাণ করেছি।
শত ফুল ফুটতে দিন : আসন্ন নির্বাচনে সারাদেশে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থিতা সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শত ফুল ফুটতে দিন, এটা রাজনৈতিক তাদের অধিকার। তবে সব থেকে যেটা ভালো ফুল সেটাই আমরা বেছে নেব। সময় হলেই সবাই তা দেখতে পারবেন আর আওয়ামী লীগ একটা বড় রাজনৈতিক দল। মনোনয়ন চাওয়া তাদের রাজনৈতিক অধিকার। নির্বাচনী হাওয়া বইয়ে যাওয়া ভালো। দেশের মানুষ গণতন্ত্রের সুবাতাস গ্রহণ করেছে, নির্বাচনী হাওয়া বয়ে যাওয়া মানেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারই একটি বড় প্রমাণ।

শ্রেণী:

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ৫ দফা

Posted on by 0 comment
25
25

আমার হৃদয় আজ দুঃখে ভারাক্রান্ত। কেননা আমার চোখে বারবার ভেসে উঠছে ক্ষুধার্ত, ভীত-সন্ত্রস্ত এবং নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের মুখচ্ছবি। আমি মাত্র কয়েকদিন আগেই আমার দেশে আশ্রয় নেওয়া কয়েক লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে দেখা করে এসেছি, যারা ‘জাতিগত নিধনে’র শিকার হয়ে আজ নিজ দেশ থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
জনাব সভাপতি,
আসসালামু আলাইকুম এবং এড়ড়ফ অভঃবৎহড়ড়হ / ঊাবহরহম.
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় আমি আপনাকে আন্তরিক ও উষ্ণ অভিনন্দন জানাচ্ছি। আপনার দায়িত্ব পালনে আমার প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছি। মানবকল্যাণ, শান্তি ও টেকসই ধরিত্রী আপনার এই তিন প্রাধিকারের প্রতি আমার অকুণ্ঠ সমর্থন জ্ঞাপন করছি।
জনাব সভাপতি, সাধারণ পরিষদের এই মহান অধিবেশনে বক্তব্য দিতে আমি চতুর্দশবারের মতো উপস্থিত হয়েছি। তবে আমার হৃদয় আজ দুঃখে ভারাক্রান্ত। কেননা আমার চোখে বারবার ভেসে উঠছে ক্ষুধার্ত, ভীত-সন্ত্রস্ত এবং নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের মুখচ্ছবি। আমি মাত্র কয়েকদিন আগেই আমার দেশে আশ্রয় নেওয়া কয়েক লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে দেখা করে এসেছি, যারা ‘জাতিগত নিধনে’র শিকার হয়ে আজ নিজ দেশ থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত। অথচ তারা হাজার বছরেরও অধিক সময় যাবত মিয়ানমারে বসবাস করে আসছেন।
এদের দুঃখ-দুর্দশা আমি গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারি। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট আমার বাবা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার পর আমি আমার ছোট বোনকে নিয়ে ছয় বছর উদ্বাস্তু জীবন কাটিয়েছি।
১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের হয়ে প্রথমবারের মতো এখানে ভাষণ দেয়ার সময় এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শান্তি ও ন্যায়বিচারের পক্ষে তার অঙ্গীকারের কথা বলে গেছেন।
সেই ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেছিলেন, ‘এমন এক বিশ্বব্যবস্থা গঠনে বাঙালি জাতি উৎসর্গীকৃত, যে ব্যবস্থায় সকল মানুষের শান্তি ও ন্যায়বিচার লাভের আকাক্সক্ষা প্রতিফলিত হবে। এবং আমি জানি আমাদের এ প্রতিজ্ঞা গ্রহণের মধ্যে আমাদের লাখ লাখ শহীদের বিদেহী আত্মার স্মৃতি নিহিত রয়েছে।’
জনাব সভাপতি, আমরা এই মুহূর্তে নিজ ভূখ- হতে জোরপূর্বক বিতাড়িত ৮ লাখেরও অধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় ও সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছি। আপনারা সকলেই জানেন যে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান নৃশংসতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ফলে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে অবস্থার ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে। এই নৃশংসতার হাত থেকে বাঁচার জন্য প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। আন্তর্জাতিক আভিবাসন সংস্থার তথ্যমতে গত তিন সপ্তাহে ৪ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত যাওয়া ঠেকানোর জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সীমানা বরাবর স্থলমাইন পুঁতে রাখছে। এতে আমরা ভীষণভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। এসব মানুষ যাতে নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারেন এখনই তার ব্যবস্থা করতে হবে।
একই সঙ্গে আমি সব ধরনের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করছি। এ বিষয়ে আমাদের সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি মেনে চলে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সহিংসতা বন্ধে এবং ঐ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করায় আমি নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রসমূহ ও জাতিসংঘের মহাসচিবকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আমি জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আহ্বান জানাচ্ছি। এ প্রসঙ্গে আমি কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করছিÑ
প্রথমত, অনতিবিলম্বে এবং চিরতরে মিয়ানমারে সহিংসতা ও ‘জাতিগত নিধন’ নিঃশর্তে বন্ধ করা;
দ্বিতীয়ত, অনতিবিলম্বে মিয়ানমারে জাতিসংঘের মহাসচিবের নিজস্ব একটি অনুসন্ধানী দল (ঋধপঃ ঋরহফরহম গরংংরড়হ) প্রেরণ করা;
তৃতীয়ত, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান করা এবং এ লক্ষ্যে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সুরক্ষা বলয় (ংধভব ুড়হবং) গড়ে তোলা;
চতুর্থত, রাখাইন রাজ্য হতে জোরপূর্বক বিতাড়িত সকল রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে তাদের নিজ ঘরবাড়িতে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা;
পঞ্চমত, কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালার নিঃশর্ত, পূর্ণ এবং দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
জনাব সভাপতি, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ ভয়াবহতম গণহত্যার শিকার হয়। ৯ মাসব্যাপী চলা মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ৩০ লাখ নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে এবং ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি করেছে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ এবং রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে চিহ্নিত ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীকে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে তারা এই হত্যাযজ্ঞ চালায়। বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করতে তারা দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের নৃশংসভাবে হত্যা করে।
গণহত্যার শিকার শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সম্প্রতি ২৫শে মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। মূলত ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতেই ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে তারা এই গণহত্যার সূচনা করেছিল।
এই গণহত্যার সঙ্গে জড়িত মূল অভিযুক্তদের আমরা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি করেছি।
বিশ্বের কোথাও যাতে কখনই আর এ ধরনের জঘন্য অপরাধ সংঘটিত না হয় সেজন্য আমি বিশ্ব সম্প্রদায়কে সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি। আমি বিশ্বাস করি, ’৭১-এর গণহত্যাসহ সকল ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আমাদের এ লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জনাব সভাপতি, স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই আমরা শান্তিকেন্দ্রিক অভ্যন্তরীণ এবং পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে চলেছি। এ উপলব্ধি থেকেই সাধারণ পরিষদে ২০০০ সাল থেকে প্রতিবছর ‘শান্তির সংস্কৃতি’ (পঁষঃঁৎব ড়ভ ঢ়বধপব) শীর্ষক প্রস্তাব পেশ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সর্বদা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করা এবং ভ্রাতৃপ্রতীম ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে সব ধরনের বৈষম্য এবং শত্রুতা নিরসনের জন্য আমি সকলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
আমরা আশা করি, শান্তিবিনির্মাণে জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকা অব্যাহত থাকবে। এ লক্ষ্যে ‘অব্যাহত শান্তি’র জন্য অর্থায়ন বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছ থেকে আমরা সাহসী এবং উদ্ভাবনমূলক প্রস্তাব প্রত্যাশা করছি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ‘জাতিসংঘ শান্তিবিনির্মাণ তহবিলে’ আমি ১ লাখ মার্কিন ডলার প্রতীকী অনুদান প্রদানের ঘোষণা দিচ্ছি।
জনাব সভাপতি, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অন্যতম সেনা ও পুলিশ সদস্য প্রদানকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তি মিশনসমূহের কার্যকারিতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা সমুন্নত রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে।
এক্ষেত্রে আমরা আমাদের নিজস্ব প্রস্তুতি এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া বজায় রেখে চলছি। যে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক অঙ্গীকার প্রদান, শান্তিরক্ষীদের প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি এবং অধিক সংখ্যায় নারী শান্তিরক্ষী মোতায়েনে আমরা সদাপ্রস্তুত রয়েছি।
এ প্রেক্ষাপটে ‘যৌন নিপীড়ন’ সংক্রান্ত যে কোনো অভিযোগের বিষয়ে আমরা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি মেনে চলি। আমাদের এই নীতির প্রতিফলন হিসেবে আমরা জাতিসংঘ মহাসচিব কর্তৃক প্রস্তাবিত ‘যৌন নিপীড়ন’ সংক্রান্ত ঠড়ষঁহঃধৎু ঈড়সঢ়ধপঃ-এ সমর্থন প্রদান করেছি। ‘যৌন নিপীড়ন’ সংক্রান্ত সমস্যা মোকাবিলায় আমি মহাসচিবের ‘সার্কেল অব লিডারশিপ’-এর প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ।
এছাড়া, এ বিষয়ে গঠিত ‘ভিকটিম সাপোর্ট তহবিলে’ প্রতীকী অনুদান হিসেবে আমি ১ লাখ মার্কিন ডলার অনুদানের ঘোষণা দিচ্ছি।
জনাব সভাপতি, সন্ত্রাসবাদ এবং সহিংস জঙ্গিবাদ শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। একজন সন্ত্রাসীর কোনো ধর্ম, বর্ণ বা গোত্র নেই। আমি নিজে বেশ কয়েকবার সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছি। সে হিসেবে আমি সন্ত্রাসের শিকার মানুষের প্রতি আমার সহানুভূতি প্রকাশ করছি। আমি মনে করি তাদের সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।
আমরা ধর্মের নামে যে কোনো সহিংস জঙ্গিবাদের নিন্দা জানাই। সহিংস জঙ্গিবাদ বিস্তার রোধে তৃণমূল পর্যায়ে আমরা পরিবার, নারী, যুবসমাজ, গণমাধ্যম এবং ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করেছি। বৈশ্বিক এ সমস্যা মোকাবেলায় আমার প্রস্তাব হচ্ছেÑ
এক. সন্ত্রাসীদের অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে হবে;
দুই. সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে এবং
তিন. শান্তিপূর্ণ উপায়ে আন্তর্জাতিক বিবাদ মীমাংসা করতে হবে।
অর্থ পাচার, সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন এবং অন্যান্য আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘবদ্ধ অপরাধের ক্ষেত্রে সাইবার জগৎ থেকে উদ্ভূত হুমকি মোকাবিলা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে আমি জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
জনাব সভাপতি, বাংলাদেশ নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং নিয়মিত অভিবাসনকে উৎসাহিত করে। এষড়নধষ ঈড়সঢ়ধপঃ ড়হ ংধভব ড়ৎফবৎষু ধহফ ৎবমঁষধৎ সরমৎধঃরড়হ-এর মাধ্যমে একটি সুস্থ ধারার অভিবাসন-কাঠামো তৈরির জন্য গত বছর আমরা একটি প্রস্তাব পেশ করেছি।
আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে, এ প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে আজ অভিবাসন এবং উদ্বাস্তু সংক্রান্ত ঈড়সঢ়ধপঃ গঠনের বিষয়ে জাতিসংঘে আলোচনা চলছে।
জনাব সভাপতি, জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্যারিস চুক্তির বাস্তবায়নে আমরা আশাবাদী। জাতীয় পর্যায়ে জলবায়ু সংবেদনশীলতার দিকে লক্ষ্য রেখে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় আমরা কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার এবং সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে ‘ব্লু ইকনোমি’র সম্ভাবনার প্রতি আমরা আস্থাশীল।
বাংলাদেশ বন্যা এবং অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবিলায় দৃষ্টান্তমূলক সাফল্য দেখিয়েছে।  খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে আমরা শস্য-নিবিড়করণ প্রযুক্তি এবং বন্যা-প্রতিরোধী ফসলের জাত উদ্ভাবন করেছি। এ বছর বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে যে ব্যাপক বন্যা আঘাত হেনেছে আমরা তা সফলভাবে মোকাবিলা করেছি।
পানি বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের প্যানেলের সদস্য হিসেবে আমি এ সংক্রান্ত ‘সমন্বিত কর্ম-পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার প্রদান করছি। ২০১৫ সালের মধ্যে আমরা আমাদের ৮৭ শতাংশ নাগরিকের জন্য নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করেছি। ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ জনগণকে নিরাপদ পানি সরবরাহের আওতায় আনা হবে।
জনাব সভাপতি, আমরা মনে করি শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের জন্য দারিদ্র্য, ক্ষুধা, নিরক্ষরতা এবং বেকারত্ব দূর করা অত্যন্ত জরুরি।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ। এক্ষেত্রে আমাদের সরকার সমাজের সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার নীতি গ্রহণ করেছে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম-আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে রূপান্তরের যে রূপকল্প আমরা হাতে নিয়েছি, এসডিজি তারই পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে।
মূলত এসডিজি গ্রহণের অনেক আগে থেকেই আমরা বেশকিছু কর্মসূচি এবং সামাজিক নীতি বাস্তবায়ন শুরু করেছি যা পরবর্তীকালে এসডিজি’তেও প্রতিফলিত হয়েছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে : একটি বাড়ি একটি খামার, কমিউনিটি ক্লিনিক, আশ্রয়ণ প্রকল্প, ডিজিটাল বাংলাদেশ, শিক্ষা সহায়তা কর্মসূচি, নারীর ক্ষমতায়ন, সবার জন্য শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বিনিয়োগ ও উন্নয়ন।
এসডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি এবং অঙ্গীকারের বিষয়গুলো আমরা এ বছর জাতিসংঘে ‘ভলান্টারি ন্যাশনাল রিভিউ’-এর মাধ্যমে তুলে ধরেছি।
জনাব সভাপতি, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে ৩২.১ বিলিয়ন ডলার। দারিদ্র্যের হার ১৯৯১ সালের ৫৬.৭ শতাংশ হতে কমে বর্তমানে ২৩.২ শতাংশ হয়েছে।
মাথাপিছু আয় ২০০৫-০৬ অর্থবছরের ৫৪৩ মার্কিন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ১ হাজার ৬০২ মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মানুষের গড় আয়ু ৭২ বছরে উন্নীত হয়েছে। এ সকল সূচক মূলত আমাদের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন পরিকল্পনার বাস্তবায়নকেই নির্দেশ করে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং সকলের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে আমরা সারাদেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছি।
ব্যাপকভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় আমরা সমাজের সবচেয়ে অসহায় ব্যক্তি যেমন বয়স্ক ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী, পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারী এবং আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্তদের সহায়তা করছি। শারীরিক এবং মানসিক প্রতিবন্ধীদের সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অটিজমসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধকতায় আক্রান্তদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের জন্য ১০৩টি সেবাকেন্দ্র এবং ৩২টি মোবাইল থেরাপি ভ্যান কাজ করছে।
তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সারাদেশে সাড়ে ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা হাসপাতাল হতে মোবাইল ফোন ও ওয়েব ক্যামেরার মাধ্যমে স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিটি গ্রামে একটি করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। দেশের ৩৮ হাজার ৩৩১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল এবং মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হয়েছে। যুবসমাজকে কারিগরি এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
জনাব সভাপতি, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে আমাদের যুবসমাজ মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। আমরা এমন একটি পরিবেশ তৈরির জন্য কাজ করছি যেখানে তারা যুগোপযোগী শিক্ষা গ্রহণ করে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে এবং প্রকৃত অর্থেই বিশ্ব নাগরিকে পরিণত হবে।
আমি অত্যন্ত আনন্দের সাথে ঘোষণা করতে চাই যে, এ বছরের মধ্যেই আমরা প্রথমবারের মতো বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাকাশে উৎক্ষেপণ করার পরিকল্পনা নিয়েছি।
জনাব সভাপতি, সবশেষে আমি বলতে চাই, আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই। আমরা অর্থনৈতিক উন্নতি চাই, মানব ধ্বংস নয় মানবকল্যাণ চাই। এটাই হোক আমাদের সকলের লক্ষ্য।

খোদা হাফেজ
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু
বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭

শ্রেণী:

‘রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করব’

Posted on by 0 comment
9

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, মানুষ মানুষের জন্য। বিপন্ন মানুষকে আশ্রয় দেওয়া যে কোনো মানুষের দায়িত্ব। রোহিঙ্গারা মানবেতর জীবনযাপন করছিল। মিয়ানমার যেভাবে অত্যাচার চালাচ্ছিল, তাতে স্বাভাবিকভাবেই তাদের আশ্রয় দিতে হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশের ভূমিকার কারণেই মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট বিশ্ববাসীর মনোযোগ পেয়েছে। এ সংকট নিরসনে এখন বিশ্বব্যাপী নানা আলোচনা চলছে। আশ্রয় যখন দিয়েছি, তখন তাদের ভালোভাবে রেখে সম্মানের সঙ্গে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা নেব। জাতিসংঘ সফর শেষে দেশে ফেরার পর গত ৭ অক্টোবর সকালে ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি। রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিকতা প্রদর্শনের পাশাপাশি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বক্তৃতায় এই সংকটের প্রতি বিশ্ববাসীর মনোযোগ আকর্ষণ করায় শেখ হাসিনাকে এই সংবর্ধনা দেওয়া হয়। রোহিঙ্গা সংকটে সাহসী সিদ্ধান্ত ও উদার মনের পরিচয় দেওয়ায় দেশে ফিরে সংবর্ধনায় সিক্ত হন শেখ হাসিনা। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, মানুষ মানুষের জন্য। বিপন্ন মানুষকে আশ্রয় দেওয়া যে কোনো মানুষের দায়িত্ব। রোহিঙ্গারা মানবেতর জীবনযাপন করছিল। মিয়ানমার যেভাবে অত্যাচার চালাচ্ছিল, তাতে স্বাভাবিকভাবেই তাদের আশ্রয় দিতে হয়েছিল। বাংলাদেশের মানুষ মানবতা দেখিয়েছে। আমরা কারও সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করিনি। তবে যারা সহযোগিতা করেছেন, তাদের ধন্যবাদ। শেখ হাসিনা বলেন, অসহায় এই মানুষগুলোর জন্য তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলামÑ যদি প্রয়োজন হয়, একবেলা খাব এবং আরেক বেলার খাবার তাদেরকে ভাগ করে দেব। বাংলাদেশ যদি এই উদ্যোগ না নিত, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও এতটা দৃষ্টি কাড়ত না। তার বোন শেখ রেহানার উদ্ধৃতি দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সে বলেছিল, ১৬ কোটি লোককে ভাত খাওয়াচ্ছ, আর ৭-৮ লাখ মানুষকে খাওয়াতে পারবা না! এই কথাটা আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল। এছাড়া নেতাকর্মীরাও মানবিক দিক বিবেচনায় পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। সব মিলিয়ে আমরা পেরেছি। তিনি বলেন, জাতির পিতা আমাদেরকে শিখিয়েছেন, মানুষকে সহায়তা করতে। যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেই, তার চেয়েও বড় বিষয় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া। আর সেই সিদ্ধান্ত যখন সঠিক হয়, সে সময়ই সফলতা পায়। সবার সমর্থন পাই। রোহিঙ্গা ইস্যুটিও ঠিক তেমনি। প্রশাসনের সর্বস্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং বাংলাদেশের মানুষের রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের আত্মবিশ্বাস আছে বলেই আমরা এই চ্যালেঞ্জটা নিয়েছি। সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ভাসানচরে পুনর্বাসন করার ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, এখন তারা যেভাবে আছে, সেভাবে থাকতে পারে না। আমি যাওয়ার আগেই নেভিকে টাকা দিয়ে গিয়েছিলাম। ভাসানচরে দুটি সাইক্লোন সেন্টার ও আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। নোয়াখালীর লোকজন বলে ঠেঙ্গারচর, আর চিটাগাংয়ে বলে ভাসানচর। যেহেতু, এরা ভাসমান, তাই আমি বললাম, ভাসানচর নামটাই থাকুক। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে আন্তর্জাতিকভাবে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির সফলতার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন,  10-bআন্তর্জাতিকভাবে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। তারা (রোহিঙ্গা) যেন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করতে পারে, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। রোহিঙ্গা সংকটের মধ্যে মিয়ানমারের প্ররোচনায় বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য নিরাপত্তা বাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মূল পরিস্থিতি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে ওই সময় মিয়ানমার নানাভাবে উসকানি দিয়েছে। মিয়ানমারের উসকানিতে যাতে পা দেওয়া না হয়, এ জন্য সেনাবাহিনীকে সতর্ক করেছি। মিয়ানমারকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা এমন একটা ভাব দেখাল, যেন যুদ্ধই বেধে যাবে। উসকানি দেওয়া এবং এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাইল, যেন বিশ্ব অন্যদিকে দৃষ্টি ফেরাবে। তখন আমি ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবেলার কথা বলি। আমার নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত যেন কোনো কিছুতে না জড়াই, সে কথাও বলি। অন্যদিকে রোহিঙ্গারা যারা আসছেন, তাদের সহযোগিতায় যা যা দরকার তাই করতে থাকি। অনুষ্ঠানে পদ্মাসেতু প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজেদের টাকায় পদ্মাসেতু করতে পেরে দুর্নীতির কথা বলে যে অপমান করা হয়েছে, তার জবাব দিতে পেরেছি। বিশ্বব্যাংক আগে অপপ্রচার করেছে; কিন্তু তারা কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। এখন তাদের দুর্নীতি অনুসন্ধানের তদন্ত দলের প্রধান ব্যক্তির বিরুদ্ধে হাজার হাজার পৃষ্ঠার নথি বেরোচ্ছে। সত্যের জয় তাৎক্ষণিক হয় না। মিথ্যার জয় তাৎক্ষণিক। একপর্যায়ে গিয়ে সত্যের জয় হয়। আমাদের জয় হয়েছে। বাংলাদেশকে হেয় করতে চেয়েছিল। পারেনি। দুর্নীতির কথা বলে ওই সময় বিশ্বব্যাংকের তদন্তের নামে মানসিক অত্যাচার করেছে। আমাদের বিশ্বাস ছিল দুর্নীতি হয়নি। বিমানবন্দর থেকে গণভবন পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষের ঢল জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদান শেষে দেশে ফেরা উপলক্ষে বিমানবন্দরে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের শীর্ষ নেতা এবং বিশিষ্টজনদের পাশাপাশি রাজপথে হাজারো নেতাকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। ৭ অক্টোবর ৯টা ২৫ মিনিটে বিজি-০০২ ভিভিআইপি ফ্লাইটে করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। বিমান থেকে নামার পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। এরপর প্রধানমন্ত্রী ভিভিআইপি টার্মিনাল লাউঞ্জে আসেন। সেখানে প্রথমে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা শেখ হাসিনাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এরপর ১৪ দল ও বিশিষ্ট নাগরিকদের পক্ষ থেকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। একে একে 10-aপ্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান শিক্ষক সমাজ, ক্রীড়াবিদ, গণমাধ্যম, শিল্পী-কবি সাহিত্যিক ও ব্যবসায়ীরা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা, আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, শিক্ষক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক ও যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বক্তব্য দেন। সকাল সাড়ে ১০টায় প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর বিমানবন্দর ছেড়ে গণভবনের উদ্দেশে রওনা হয়। গণভবনে যাওয়ার পথে রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার নেতাকর্মী ফুল ছিটিয়ে, হাত নেড়ে ও স্লোগান দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান। প্রধানমন্ত্রীও হাত নেড়ে শুভেচ্ছা গ্রহণ করেন। সকাল থেকে ঢাকঢোল বাজিয়ে বর্ণিল ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে রাস্তার দুই পাশে অবস্থান নেন আওয়ামী লীগ, এর সহযোগী সংগঠনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রধানমন্ত্রীকে গণসংবর্ধনা জানানো উপলক্ষে বিমানবন্দর থেকে গণভবন পর্যন্ত সড়কসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ বর্ণিল সাজে সাজানো হয়েছিল।

শ্রেণী:

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

Posted on by 0 comment
25

25উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৬ মে কক্সবাজারে দেশের সর্ববৃহৎ মেরিন ড্রাইভ উদ্বোধন করেছেন। কক্সবাজারের কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্রের পাড় দিয়ে চলে যাওয়া এই ৮০ কিমি দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের সড়ক পথটি চার-লেন করার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের অর্থনীতিতে কক্সবাজারের গুরুত্ব বিবেচনায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কটিও চার-লেন করার ঘোষণা দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই মেরিন ড্রাইভওয়ে ’৭৫-এর পর থেকে দীর্ঘদিন অবহেলিত কক্সবাজারের সৌন্দর্য অবলোকনে শুধু পর্যটকদের আকর্ষণই করবে না; বরং এ অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ৫ দশমিক ৫ মিটার প্রশস্ত এই মেরিন ড্রাইভটি নির্ধারিত সময়ের ১৪ মাস আগেই নির্মাণকাজ শেষ করে। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক বক্তৃতা করেন। স্বাগত বক্তৃতা করেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব এমএন সিদ্দিক। অনুষ্ঠানে সংসদ সদসবৃন্দ, তিন বাহিনী প্রধানগণ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও আমন্ত্রিত অতিথিবর্গসহ সরকারের সামরিক ও বেসামরিক পদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে একটি আন্তর্জাতিকমানের বিমানবন্দর হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে কক্সবাজারের পর্যটন এলাকার সম্প্রসারণ এবং উন্নয়নের নানা পরিকল্পনার কথাও তার ভাষণে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কক্সবাজার এয়ারপোর্টে যাতে প্রতিসপ্তাহে ঢাকা থেকে অন্তত একটা ফ্লাইট আসতে পারে আপাতত সেই ব্যবস্থাটা আমরা করে দিচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কক্সবাজার বিমানবন্দরটিকে একটি আধুনিক-উন্নত বিমানবন্দর হিসেবেই গড়ে তোলা হবে। সেই প্রকল্পও আমরা শুরু করেছি। আপাতত একটি টার্মিনাল ভবন থেকে শুরু করে সবকিছুর কাজ আমরা শুরু করব। তিনি বলেন, আর যেসব মানুষ এ এলাকায় থাকতÑ আপনারা জানেন, প্রায় ৪ হাজারের মতো মানুষ তাদের জন্য আমরা আলাদাভাবে নদীর (কর্ণফুলী) ওপারে আমরা ঘরবাড়ি ও ফ্লাট তৈরি করে দিচ্ছি। এদের অধিকাংশই শুঁটকি তৈরি করেন, শুঁটকি বিক্রি করেন। তাদের জন্য সেখানে শুঁটকির হাটও করে দেওয়া হবে। শুঁটকি মাছ শুকানোসহ তাদের বাসস্থানেরও জায়গা করে দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে সেই উন্নয়নের কাজও চলছে এবং নদীর ওপরে শীঘ্রই ব্রিজ বানানো হবে। এখানকার মানুষগুলোকে সেখানে পুনর্বাসনের পাশাপাশি আমরা বিমানবন্দরের জন্য নতুন টার্মিনাল ভবন নির্মাণ করব এবং রানওয়েটাকেও আরও প্রশস্ত ও দীর্ঘ করা হবে। এটা যেহেতু আন্তর্জাতিক এয়ার রুটে পড়ে তাই ভবিষ্যতে যে কোনো দেশ থেকে এখানে এসে যেন বিমান রিফ্যুয়েলিং করতে পারে তার ব্যবস্থাও করা হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, এই মেরিন ড্রাইভ নির্মাণের জন্য আমাদের সেনাবাহিনী যে কষ্ট করেছে, তারা সেই ২০১০ সালে যখন কাজ শুরু করল, এখানে কাজ করতে গেলে তো ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করেই কাজ করতে হয়। এখানে কাজ করতে গিয়েই পাহাড় ধসে মাটিচাপা পড়ে আমাদের সেনাবাহিনীর ছয় সদস্য জীবন দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২১ বছর পর দেশসেবার সুযোগ লাভের পর থেকেই আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি সার্বিকভাবে দেশের উন্নয়নের জন্য। তিনি বলেন, কক্সবাজার সবসময়ই অবহেলিত ছিল, এত সুন্দর আমাদের একটা সমুদ্র সৈকত। সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এবং দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ আসে। কাজেই এ অঞ্চলটাকে আরও সুন্দরভাবে ও আকর্ষণীয়ভাবে গড়ে তোলাটা আমাদের কর্তব্য বলেই আমরা মনে করি।

শ্রেণী:

সুষম বণ্টন না হওয়াও পানি সংকটের অন্যতম কারণ

33
33

বুদাপেস্ট সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

উত্তরণ প্রতিবেদন : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বজুড়ে পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাত দফা প্রস্তাব তুলে ধরে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এখনই উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ণ ও অপরিকল্পিত শিল্পায়নের এই সময়ে পানির কারণে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে এবং রাষ্ট্রের ভেতরে বৈষম্য ও বিভেদ তীব্রতর হচ্ছে। কাজেই পানির সুরক্ষা, সংরক্ষণ ও এর সদ্ব্যবহারের ওপর সমষ্টিগতভাবে নজর দিতে হবে আর পানি নিরাপত্তাই এই পৃথিবীর মানুষের মর্যাদাপূর্ণ ও মঙ্গলময় জীবনের নিশ্চয়তা দিতে পারে। সেই লক্ষ্য অর্জনে আমাদের অবশ্যই একসাথে কাজ করতে হবে, আর তা এ মুহূর্ত থেকেই। এক্ষেত্রে নিজেদের ভূমিকা পালন করতে বাংলাদেশ অঙ্গীকারাবদ্ধ।
গত ২৮ নভেম্বর হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে গঠিত পানিবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের প্যানেলের সদস্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রার পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সংক্রান্ত লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের করণীয় নির্ধারণ এবং প্যারিসে জলবায়ু চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত পানি সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ বুদাপেস্টের তিন দিনের এই সম্মেলনের মূল লক্ষ্য।
পানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত বৈশ্বিক উদ্যোগের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি সঠিক নিয়মে ভাগাভাগির বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভাটির দেশের মানুষের জীবনযাত্রায় এর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। পানির অভাব কিন্তু পানি সংকটের মূল কারণ নয়। পানির সুষম বণ্টনও এই সংকটের একটি কারণ। তবে তিনি স্বীকার করেন, আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ভাগাভাগি একটি ‘জটিল বিষয়’।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সংস্কৃতি, ধ্যান-ধারণা ও জীবনযাত্রার প্রধান অংশজুড়ে আছে পানি। পানির সুরক্ষা, সংরক্ষণের ওপর সমষ্টিগতভাবে নজর দিতে হবে। তাতে কেবল পানি নিয়েই বৈষম্য দূর হবে না, সমাজে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে। কেননা বিশ্বে অনেক উত্তেজনা ও সংঘাতের মূলে রয়েছে এই পানি। ৭টি এজেন্ডাম তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে পানিবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের প্যানেলে গৃহীত লক্ষ্য অর্জনে কার্যক্রমভিত্তিক এই এজেন্ডা সহায়ক হতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের অবশ্যই একসাথে (পানি ব্যবস্থাপনায়) কাজ করতে হবে এবং এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। এই কাজের জন্য ভূমিকা পালন করতে বাংলাদেশ অঙ্গীকারাবদ্ধ।
পানিকে রাষ্ট্রের সব নীতি ও কাজে অগ্রাধিকার দিতে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের প্রতি আহ্বান জানানোর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাত দফা প্রস্তাব সম্মেলনে তুলে ধরেন। প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে এজেন্ডা ২০৩০-এ টেকসই উন্নয়ন ও পানির মাধ্যমে যে আন্তঃসম্পর্কের কথা বলা হয়েছে, সেই অনুযায়ী জাতীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে যে কোনো উন্নয়ন প্রচেষ্টার আলোচনায় পানি বিষয়ও থাকতে হবে, বিশ্বের লাখ লাখ মানুষের সুপেয় পানি ও ন্যূনতম পয়ঃনিষ্কাশন চাহিদা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, কারণ পানির যে সরবরাহ রয়েছে তা পর্যাপ্ত ও নিরাপদ নয়। এক্ষেত্রে সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশ, বিশেষ করে দরিদ্র, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তার তৃতীয় দফা প্রস্তাব তুলে ধরে বলেন, যেসব দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে, তাদের সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে পানির কারণে। কাজেই পানি সংক্রান্ত দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিযোজন প্রক্রিয়াকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে। চতুর্থত, পানি আজকের এই সংকটের অপ্রতুলতার জন্য নয়, সুষম বণ্টনের অভাবে তৈরি হয়েছে। এর একটি স্থায়ী ও টেকসই সমাধান হতে পারে আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ব্যবস্থাপনা। পঞ্চমত, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য পানি জরুরি। আমাদের অবশ্যই কম পানি লাগে এমন ফসল এবং পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে হবে। ষষ্ঠত, যেসব উদ্যোগ একটি দেশকে পথ দেখাচ্ছে তা অন্যদের সাথে অবশ্যই বিনিময় করতে হবে, যাতে পানি সম্পদের যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিত করতে জ্ঞান, ক্ষমতা, দক্ষতা ও কৌশলের উন্নয়ন ঘটানো যায়। সর্বশেষ সপ্তম দফা প্রস্তাব তুলে ধরে তিনি বলেন, পানি সংক্রান্ত লক্ষ্য পূরণে অর্থায়নের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পানি বিষয়ে গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য একটি আন্তর্জাতিক তহবিল গড়ে তুলতে হবে এবং এর সুফল সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
পানিকে সামাজিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং পরিবেশের ভারসাম্যের মৌল ভিত্তি হিসেবে বর্ণনা করে এই সম্মেলনের আয়োজন করায় হাঙ্গেরি সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের দর্শন, সংস্কৃতি, জীবন ও জীবিকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে পানি। আর এমন এক দেশ এই পানি সম্মেলনের আয়োজন করেছে, সেই হাঙ্গেরি পানি নিরাপত্তার জন্য বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। ২০১৩ সালের বুদাপেস্ট পানি সম্মেলনই পানি নিয়ে এসডিজির ধারণাগত ভিত্তি দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নিরাপদ পানির জন্য এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা ইতোমধ্যে পূরণ এবং ৬৫ শতাংশ মানুষের জন্য উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা নিশ্চিত করার তথ্য বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরে বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে সকলের জন্য সুপেয় পানি এবং মোট জনসংখ্যার অন্তত ৯০ শতাংশের জন্য উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর।
শেখ হাসিনা আরও বলেন, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার ধারাবাহিক পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং বাংলাদেশের সতর্কতা ব্যবস্থা, ঘূর্ণিঝড়, আশ্রয়কেন্দ্র ও সমুদ্র উপকূলে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার উদ্যোগ বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেন, বর্ষায় পানির আধিক্য এবং শুকনো মৌসুমে খরার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এই সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে কারণ বাংলাদেশের ভূ-উপরিস্থ পানির ৯২ শতাংশের উৎপত্তিস্থল সীমান্তের বাইরে। তিনি বলেন, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন একটি জটিল বিষয়। বাংলাদেশ গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে দুই দশক আগে ভারতের সাথে একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করেছে। পানি বিষয়ে বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতাও সঠিক পথেই এগোচ্ছে।
পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে ‘সাসটেইনেবল ওয়াটার সলিউশন এক্সপো’ পরিদর্শন করেন।
প্রধানমন্ত্রীর সাথে হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্টের বৈঠক
বাংলাদেশে চিকিৎসা, প্রযুক্তি ও কৃষি বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন বৃত্তি কর্মসূচি প্রবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছেন হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট ড. জানোস আদের। তার এই প্রস্তাবে বাংলাদেশের সাথে সহযোগিতার নতুন দ্বার উন্মোচন হলো। গত ২৮ নভেম্বর সান্দর প্যালেসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বৈঠকে হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট ড. জানোস আদের এই প্রস্তাব দেন।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর আরবান এই বৃত্তি কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। এ ছাড়া প্রেসিডেন্ট আদের মৎস্য চাষ (পিসিকালচার) এবং জলজ উদ্ভিদ ও জীবজন্তুর বংশ বিস্তারের (একুয়াকালচার) ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারকে সহযোগিতা করবেন। আদের বলেন, পানি পরিশোধন ও বন্যা আক্রান্ত এলাকায় বাংলাদেশকে সহায়তা করতে চায় হাঙ্গেরি।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, এই প্রস্তাবে হাঙ্গেরির সাথে সহযোগিতার নতুন দরজা উন্মোচিত হলো। এম শহীদুল হক বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী প্রেসিডেন্ট প্যালেসে পৌঁছলে হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট ড. জানোস আদের এসে তাকে আন্তরিক অভ্যর্থনা জানান। তিনি বলেন, বৈঠকে হাঙ্গেরির সাথে সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে, বাংলাদেশের সাথে হাঙ্গেরি নতুন কিছু করতে আগ্রহী।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে হাঙ্গেরির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীনতার পর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে একটি নতুন মাত্রা গড়ে উঠতে শুরু করেছিল। কিন্তু হঠাৎ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর এই সম্পর্ক ভেঙে যায় এবং আমরা সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে এসেছি। পররাষ্ট্র সচিব বলেন, একজন বিশ্বনেতা হিসেবে পানি সমস্যা নিয়ে হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রভাব ও দুর্যোগ এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার মতো অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
প্রেসিডেন্ট আদের সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ঠেকাতে বাংলাদেশের প্রস্তুতি এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় তার সরকারের সম্ভাব্য সহায়তার বিষয়ে জানতে চান। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে বাংলাদেশের ঝুঁকি এবং সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা ২ মিটার বেড়ে গেলে ২ থেকে আড়াই কোটি লোকের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কিত বিভিন্ন গবেষণার কথা উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী সবুজ বেষ্টনি প্রকল্প, বনায়ন কর্মসূচি ও বাস্তুচ্যুত লোকজনের জন্য উঁচু ভূমিতে বাড়িঘর নির্মাণসহ জলবায়ু সহিষ্ণু তহবিলের আওতায় বাংলাদেশের বিভিন্ন উদ্ভাবনী স্কিমের ব্যাপারে হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্টকে ব্রিফ করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব প্রকল্প সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জনে হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানালে তিনি তা গ্রহণ করেন এবং তার সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
হাঙ্গেরির জাতীয় বীরদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৯ নভেম্বর সিটি পার্কের ‘হিরোস-স্কয়ার’-এ হাঙ্গেরির জাতীয় বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে হাঙ্গেরি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রাণোৎসর্গকারী বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। প্রধানমন্ত্রী এ সময় সেখানে সম্মান প্রদর্শনের স্মারক হিসেবে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করেন।
ঢাকা-বুদাপেস্টের মধ্যে ৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর
বাংলাদেশ ও হাঙ্গেরি কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা তথা বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে। ২৯ নভেম্বর সকালে হাঙ্গেরির পার্লামেন্ট ভবনে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে এই চুক্তিগুলো স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

শ্রেণী:

কোনো হত্যাকারীই রেহাই পাবে না

Posted on by 0 comment
03

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারি

03উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গুপ্তহত্যাকারীদের দমনে দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করে বলেছেন, সম্প্রতি দেশে জঙ্গি কর্মকা- এবং একের পর এক গুপ্তহত্যার পেছনে বিএনপি-জামাতের যোগসূত্রতা রয়েছে। যারা প্রকাশ্যে মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে তারাই কৌশল পাল্টে এখন মানুষ হত্যা করছে। আমরা যখন যা বলি, কোনো অমূলক কথা বলি না। একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না, আমি ‘হেড অব দ্য গবর্নমেন্ট’ (সরকারপ্রধান)। আমার কাছে নিশ্চয়ই তথ্য আছে। সব তথ্য হয়তো তদন্তের স্বার্থে প্রকাশ করা যাবে না; কিন্তু আমি অমূলক কথা বলি না।
গুপ্তহত্যাকারীদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জঙ্গি-সন্ত্রাসী ও গুপ্তহত্যাকারীরা যে দলেরই হোক, আমাদের হাত থেকে রেহাই পাবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ আমাদের গোয়েন্দারা তৎপর রয়েছেন। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট, দেশের অগ্রযাত্রা ব্যাহত এবং দেশ এগিয়ে যাচ্ছে যারা চায় নাÑ তাদেরই নীলনকশা অনুযায়ী এসব ঘটনা ঘটছে। দেশবাসীর কাছে আমার উদাত্ত আহ্বানÑ যেভাবে মানুষ পুড়িয়ে হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে আপনারা গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, ঠিক তেমনিভাবে গুপ্তহত্যা-নাশকতাকারী ও তাদের মদদদাতাদের খুঁজে বের করে পুলিশের হাতে সোপর্দ করুন। কেননা দেশের জনগণ সচেতন হলে ষড়যন্ত্রকারীরা কোনোদিনই তাদের নীলনকশা বাস্তবায়ন করতে পারবে না। গত ৮ জুন দুপুরে গণভবনে আয়োজিত জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর বুলগেরিয়া, জাপান ও সৌদি আরব সফর নিয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। লিখিত বক্তব্যের পর গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নগুলো ছিল মূলত দেশে সাম্প্রতিক গুপ্তহত্যা, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সহিংসতা, বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ নানা প্রসঙ্গে। তবে সবচেয়ে বেশি কথা হয় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একের পর এক গুপ্তহত্যা নিয়ে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সাথে মূল মঞ্চে উপস্থিত ছিলেনÑ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এমপি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এমপি, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এমপি, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি। এ সময় সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা, সংসদ সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করতেই পরিকল্পিতভাবে টার্গেট কিলিং করা হচ্ছে। তবে সরকার বসে নেই, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর আছে। তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই গুপ্তহত্যাকারীদের ধরা হচ্ছে এবং এর সাথে দুটি রাজনৈতিক দলের জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের যোগসূত্র রয়েছে। এগুলো তারা খুব পরিকল্পিত ঘটাচ্ছে। আমরা এটা কখনই মেনে নেব না। এ ধরনের পরিকল্পনা বাংলাদেশে স্থান পাবে না। বাংলাদেশে সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান সুদৃঢ়।
এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী গুপ্তহত্যায় বিএনপি-জামাতের জড়িত থাকার কথা ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, গুপ্তহত্যার বিষয়ে আপনারা নিজেরা চিন্তা করে দেখেন, কারা টার্গেট কিলিং করছে? কারা বলেÑ গুলি কর, বৃষ্টির মতো গুলি কর, বাঁচলে গাজী, মরলে শহীদ। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা মিসকিন না, সম্ভাবনাময় জাতি। যার ম্যাজিক হচ্ছে জনগণ এবং জনগণের ভালোবাসা, বিশ্বাস ও আস্থার আন্তরিকতা। আমাকে নিয়ে কে কী লিখল, কে কী আমাকে দিল বা বিশ্ব তালিকায় আমাকে কী মার্কিং দিল, সেটা আমার কাছে বড় কিছু নয়। আমার দেশের মানুষ ভালো থাকলেই এটা আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।
সরকারপ্রধান হিসেবে তথ্য নিয়েই কথা বলি : গুপ্তহত্যার পর রাজনৈতিক উদ্দেশে কোনো দলের ওপর দায় চাপালে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে কিনাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্নকর্তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, মনে রাখবেন আমি যখন যে কথাটা বলি, তখন কোনো অমূলক কথা বলি না। একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না, আমি ‘হেড অব দ্য গবর্নমেন্ট’ (সরকারপ্রধান)। আমার কাছে নিশ্চয়ই তথ্য আছে। তারা যদি জানে জঙ্গি কারা, সেই তথ্যটা দয়া করে আমাদের দিয়ে দিতে বলেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা যখন একজন আসামিকে ধরি, সমস্ত ক্লু বিশ্লেষণ করেই ধরি। টেলিফোন নম্বরসহ সকল কিছু মিলিয়ে ধরি। আর যখন তার পরিচয়ের সূত্রটা পাই, এতেই আমরা যোগসূত্রটা পাই। তিনি আরও বলেন, আমরা কিন্তু বসে নেই। যারা মনে করেন আমরা রাজনৈতিক হিসেবে এটা বলছি, আর অন্যদিকে জঙ্গিরা পার পেয়ে যাচ্ছেÑ তা হলে পার পেয়ে যাওয়া জঙ্গিরা কারা? তাদের নাম-ঠিকানা পরিচয় যদি জেনে থাকেন, তা হলে তারা আমাদের দয়া করে জানান। জঙ্গি জঙ্গিই। তারা যে দলেরই হোক, আমাদের কাছ থেকে রেহাই পাবে না। এটুকু আশ্বাস আমি দিতে পারি।
গুপ্তহত্যাসহ বিভিন্ন নাশকতামূলক ঘটনায় কোনো না কোনোভাবে বিএনপি-জামাতের যোগসূত্র রয়েছে উল্লেখ করে জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, যেহেতু এসব জঙ্গি তৎপরতা বাংলাদেশে আমরা সব সময় দেখেছি। যারা এ ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে কোনো না কোনোভাবে এদের যোগসূত্র রয়েছে। অন্তত দুটি রাজনৈতিক দলের (বিএনপি ও জামাত) সাথে তো যোগসূত্র আছেই। এখন এই রাজনৈতিক দল দুটিকে যারা বাঁচাতে চায়, রক্ষা করতে চায়, তাদের অপকর্মগুলো ঢাকতে চায়Ñ তারাই এ ধরনের প্রশ্ন ওঠায়। আমি যদি এ কথা বলি, তার কী জবাব আছে তাদের কাছে পাল্টা প্রশ্ন রাখেন প্রধানমন্ত্রী।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারের আমলে জঙ্গি তৎপরতার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ১৯৭১ সালে যারা মানুষ হত্যা করেছে, আমরা যখন এদের বিচার শুরু করলামÑ তখন কী বলা হয়েছে? ২০০১ সালে যখন বাংলা ভাইয়ের সৃষ্টি হলো তখন কী বলা হয়েছে? তখন কারা বলেছিল? তখন কারা পুলিশ প্রহরা দিয়ে ওই সমস্ত জঙ্গিদের মিছিল করিয়েছে? আপনারা (সাংবাদিক) এত তাড়াতাড়ি ভুলে যান কীভাবে? আর যারা আজকে এ কথা বলছে তারাও এত তাড়াতাড়ি কীভাবে ভুলে যায়? তিনি আরও প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেন, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করার পর কারা তাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে? কারা লাখো শহীদের হাতে রঞ্জিত পতাকা তুলে দিয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের হাতে? ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার খুনিদের কারা ইনডেমনিটি জারি করে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়েছে? আসুন সব যোগসূত্র খুুঁজুন। যারা আত্মস্বীকৃত খুনিদের চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করতে পারে, তাদের সম্পর্কে এত ভালো ধারণা করার কি কোনো যৌক্তিকতা আছেÑ আমি এটা বুঝি না।
তাকে হত্যার লক্ষ্যে কোটালীপাড়ায় বোমা পুঁতে রাখার ঘটনাসহ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, এসব হামলার পর তারা (বিএনপি-জামাত) কী বলেছে? কিন্তু আজকে তদন্তের পর কী বেরিয়েছে? আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যাকা-ের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তদন্ত করে বের করা হলো কারা খুনি? তারা কী বিএনপি-জামাত করে না? এসব ঘটনা একটার সাথে অপরটার যোগসূত্রগুলো বিশ্লেষণ করলেই স্পষ্ট হবে সবটির সাথেই ওই দুটি দলের যোগসূত্রতা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ করে হত্যা প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও ষড়যন্ত্র চলেছে। আমার ছেলে জয় কী অপরাধ করেছে? এফবিআই অফিসারকে টাকা দিয়ে কিনে ফেলল, ওই টাকা কোথা থেকে এলো? এই টাকা কে বহন করেছে? কারা দিয়েছে বা কারা বৈঠক করেছে, কারা চিঠি দিয়েছে? এটা তো আমরা নয়, আমেরিকাই বের করেছে। আমেরিকার তদন্তেই বেরিয়ে এসেছে কারা কারা এর সাথে জড়িত। কারা এই ষড়যন্ত্র করছে। বিএনপি নেতারা করেছে। তাই গুপ্তহত্যার সাথে আমরা যাদের যোগসূত্রতা পাই; সেটা কি মিথ্যা। তিনি বলেন, যারা প্রকাশ্যে মানুষ খুন করতে পারে, পুড়িয়ে মানুষ মারতে পারে, তারা এর সাথে যুক্ত হবে নাÑ এ ধারণাটা কোথা থেকে আসে? আমারও সেটাই প্রশ্ন। তার মানে এ ধরনের একটি সন্ত্রাসী-জঙ্গিবাদী পার্টিকে বাংলাদেশে জীবিত রেখেই দিতে হবে! আর বাংলাদেশের মানুষকে সব সময় একটা আশঙ্কার মধ্যে রাখতে হবে! প্রশ্ন করে তিনি বলেন, কাজেই আমি যখন যে কথাটা বলি, এটা মনে রাখবেন কখনও কোনো অমূলক কথা বলি না। একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না আমি সরকারপ্রধান। আমার কাছে নিশ্চয়ই তথ্য আছে। হয়তো সব তথ্য সব সময় তদন্তের স্বার্থে প্রচার বা প্রকাশ করা যাবে না। কিন্তু সূত্রটা জানা যায়। সূত্র ধরেই আমরা কথা বলি। কাজেই যারা এ ধরনের কথা বলেন, তারা প্রকৃত জঙ্গিদের বাঁচাতে চান, রক্ষা করতে চান এবং জঙ্গিবাদী কর্মকা-কে উৎসাহিত করতে চান।
মানুষ ভালো থাকলেই এটা আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার : ‘বিশ্ব নারী নেতৃত্বের তালিকায় অগ্রগতি’ প্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি রাজনীতি করি বাংলাদেশের জনগণের জন্য। আমার দেশের মানুষ তাদের জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারলেই আমার জীবনের সার্থকতা। আমি জীবনে কোনোদিন মার্কিং (সংখ্যা) নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করি না। চিন্তা করবও না। কী পেলাম, আর কী পেলাম না; ওগুলো নিয়ে আমার চিন্তা-ভাবনা নেই। দেশের জনগণকে কী দিতে পারলামÑ সেটাই আমার কাছে বড়।
তিনি বলেন, কে আমাকে মার্কিং দিচ্ছে, কী দিচ্ছেÑ এটা আমার ভাবার বিষয় না। দেশকে কতটুকু আমরা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারলাম, উন্নত করতে পারলাম, জাতি হিসেবে বিশ্বে আমরা কতটুকু সম্মান পেলামÑ সেটাই বড় কথা। তিনি আরও বলেন, এই দেশ আমরা স্বাধীন করেছি লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে। তাই যখন এই দেশকে কেউ অবহেলার চোখে দেখে সেটাই আমার জন্য কষ্টের ছিল। সেজন্য আমাদের কষ্ট ছিল, আমরা কারও কাছে হাত পাতব না। কারও কাছে ভিক্ষা চাইব না। আমরা মাথা উঁচু করে চলব। আমরা নিজের পায়ে দাঁড়াব। যেটা জাতির পিতা বলতেন সব সময়।
এ সময় জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের স্মতিচারণ করতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আজকে আমার সবচেয়ে বেশি আনন্দ লাগে যখন জি-৭ গেলাম প্রত্যেকটা ক্ষমতাধর দেশের রাষ্ট্রপ্রধান জানতে চান, তারা এসে বলেন, বাংলাদেশ কীভাবে এগিয়ে গেল? এটা তো একেবারে মিরাকল (অলৌকিক)। এর ম্যাজিকটা কী? জবাবে আমি বলেছি, ম্যাজিক একটাই জনগণ। জনগণের ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং আস্থা আর আন্তরিকতা সাথে জনগণের জন্য কাজ করা। কারণ আমি নিজের স্বার্থের জন্য রাজনীতি করি না। রাজনীতি করি বাংলাদেশের মানুষ যাতে একটু ভালো থাকে, উন্নত থাকে। তাই দেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নতি করতে পারছি, তারা ভালো আছে।
রাজনীতির প্রয়োজনে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ আনাচে-কানাচে ঘোরার অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তখন-যখন মানুষের কাছে গেছি, মানুষ হাত পেতেছে, খাবার চেয়েছে। পেটের ভাতের জন্য আকুতি করেছে। রাস্তাঘাট কিছু নেই, ধানক্ষেতের আল দিয়ে হেঁটে গেছি হাঁটু পানি দিয়ে। তখন মানুষকে লক্ষ্য করেছি, জানার চেষ্টা করেছি মানুষ কী চায়? তাই যখনই সরকারে এসেছি চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশের মানুষ পরনের বস্ত্র পাচ্ছে কিনা? তার পায়ে এক জোড়া স্যান্ডেল আছে কিনা? সে একবেলা থেকে দুবেলা খেতে পারছে কিনা? প্রত্যেকটা ধাপে ধাপে আমরা ওই জিনিসগুলো সেভাবে পরিকল্পনা নিয়েছি। পরিকল্পনা অনুযায়ীই পদক্ষেপ নিয়েছি।
তিনি বলেন, একটা রাজনৈতিক দল হিসেবে যদি নিজস্ব পরিকল্পনা, চিন্তা-ভাবনা না থাকে বা ভবিষ্যৎ সুনির্দিষ্ট প্লান না থাকেÑ তা হলে এত দ্রুত উন্নত করা যায় না। আমরা দল হিসেবে সেভাবেই পেপার করেছি, সেভাবেই আমরা প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ে ধাপে ধাপে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। আজকে দেশ যেমন এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের মানুষও সম্মান পাচ্ছে। এটাই আমার বড় পাওয়া। মাটি-মানুষের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা কাজ করছি। এটা ম্যাজিকও না, কিছু না। এটা হলো মানুষের প্রতি ভালোবাসা, তাদের প্রতি দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যবোধ। কারণ আমার বাবা করে গেছেন। তার কাছ থেকেই শিখেছি।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোন পত্রিকা আমাকে নিয়ে কী লিখল, না লিখলÑ ওই নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। ওটা নিয়ে চিন্তা করলে তো ওটা নিয়ে থাকতে হয়। বায়োডাটা (জীবন বৃত্তান্ত) পাঠাতে হবে। নাম পাঠাতে হবে। ওর পেছনে কেন আমি ফালতু খরচ করব। তার চেয়ে ওটা দিয়ে দেশে দুইটা মানুষের ঘর করে দেব। কিংবা কাজের ব্যবস্থা করে দেব। সেটাই আমার বড় পাওয়া। কত প্রস্তাব আসে। তা দরকার কী আমার। আমার দেশের মানুষ ভালো থাকলেই এটা আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।
বিদেশিদের কাছে ‘আমরাই’ মিথ্যা বলি : বিদেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা বাংলাদেশ নিয়ে প্রশংসা করে কিন্তু সেই দেশেরই এদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতরা বাংলাদেশ নিয়ে নেতিবাচক কথা বলেনÑ এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে যারা (কূটনীতিক) এমন কিছু বলে এটার জন্য নিজের (দেশের) লোকরাই দায়ী। কারণ অনেকেই দূতাবাসে যান, কোনো পার্টিতে যান। দু-চার পেগ খান, তারপর বেতালা হয়ে নানা কথা বলেন। এ রকম ঘটনাও হয়। তিনি বলেন, বাঙালিদের স্বভাব হচ্ছে পরচর্চা করা, নিজের নিন্দা করা। এটা করতে গিয়ে তারা নিজের দেশকেই হেয় করেন।
প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, আমরা দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছি কেন? আমাদের দেশটাকে বিশ্বের কাছে একটা সম্মানজনক অবস্থায় নিয়ে আসার জন্য। আর সেখানে আমাদের ভেতর থেকে কেউ দেশে এটা হয়নি, ওটা হয়নি, ওটা হতে পারত বলে বেড়ান। অথচ তারা (বিদেশি কূটনীতিক) যখন প্রশংসা শুরু করেন তখন আমরা করি তার উল্টোটা। তখন তো তারাও উল্টোটা শুরু করবে। এটাই তো বাস্তবতাÑ যোগ করেন তিনি।
এ সময় সাংবাদিক শফিক রেহমানের নাম উল্লেখ না করে শেখ হাসিনা বলেন, হয়তো দেখা গেল কেউ একজন জঘন্য কাজের সাথে জড়িত। হয়তো তাকে আমরা গ্রেফতার করলাম। তখন আপনারা (সাংবাদিক) তাকেই বাহ্বা দিয়ে গেলেন! কিন্তু সে কি কাজটি করতে যাচ্ছিল, সেটা সম্পর্কে আপনাদের কোনো অনুভূতি বা উপলব্ধি আছে সেটা আমি দেখতে পাই না। এখানকার একজন ব্যক্তিও যে অপরাধ করতে পারে তখন সেটা আর আপনারা দেখতে পারেন না। এ ধরনের ঘটনাও ঘটে। সেটাও তো আমরা দেখেছি।
কাজেই এখানে যারা বিদেশি কূটনীতিকদের সাথে কথা বলেন, তাদের তো একটু সংযত, সতর্ক বা সাবধান হয়ে কথা বলা উচিত উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, বাংলাদেশ যে উন্নত হচ্ছে, এটা তো একটা দেখাতে বা বলতে পারতেন। অবশ্য বাঙালির স্বভাবজাতভাবে পরনিন্দা করতে পছন্দ করে। তবে পবিত্র রমজান মাসে তো কেউ মিথ্যা কথা বলবেন না, এটাই আশা করি। তিনি বলেন, আমরা দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছি দেশের উন্নয়নের জন্য। এখন আমরা মিসকিন না। আমরা একটা সম্ভাবনাময় জাতি। এটা সবাইকে মনে রেখে মাথা উঁচু করে চলতে হবে। এ ধারণাটিই মাথায় রেখে চলতে হবে। আমরা সেভাবেই কাজ করে যাচ্ছি।
মক্কা-মদিনা রক্ষায় প্রয়োজনে সামরিক সহযোগিতা : সন্ত্রাসবিরোধী সৌদি জোটে বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগের চেয়ে সৌদি আরবের অবস্থানের গুণগত পরিবর্তন হয়েছে। শুধু সেখানে লোক পাঠানো নয়, সৌদি আরব বাংলাদেশে এখন বিনিয়োগে আগ্রহী। আর মনে রাখতে হবে সৌদি বাদশাহ শুধু বাদশাহ নয়, পবিত্র মক্কা ও মদিনা শরিফের গার্ডিয়ানও (অভিভাবক)। তারা যে সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থান নিয়েছে, তাতে আমরাও সম্মতি দিয়েছি। মুসলিম অধ্যুষিত ৪০টি দেশ এ ব্যাপারে একত্রিত হয়েছে। সে দেশে পবিত্র কাবা শরিফ, নবীজী (স.)-র রওজাসহ অনেক পবিত্র স্থাপনা রয়েছে। এগুলোর নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সাথে ভাবছি। সৌদি আরব এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা চাইলে আমরা তা করতে প্রস্তুত। এমনকি সামরিক সহিযোগিতা চাইলেও আমরা তা দেব। ইতোমধ্যে আমাদের সেনাপ্রধান সৌদি আরব ঘুরে এসেছেন। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের যেকোনো দেশের সাথে সহযোগিতামূলক অবস্থান নিতে পারে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলামে সন্ত্রাসের কোনো স্থান নেই। একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিনই শেষ বিচারের মালিক। বিচারের ভার মানুষকে তিনি দেননি। তাই ধর্মের নামে যারা মানুষ খুন করছে প্রকৃত অর্থে তারা ইসলামেই বিশ্বাস করে না। হাতেগোনা মুষ্টিমেয় কিছু গোষ্ঠী ধর্মের নামে মানুষ হত্যা করে পুরো মুসলিম ধর্মকেই কলুষিত করছে।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী ধর্মপ্রাণ মুসলমান, ধর্ম প্রচারক ও মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিমদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, তাদের পরিবারের কোনো সদস্য জঙ্গিবাদের পথে যাচ্ছে কিনা, সেটা দেখাও তাদের কর্তব্য। মানুষের মধ্যে এই চেতনাটা জাগ্রত করতে হবে। আর দেশের মানুষের প্রতি আমার আহ্বান, যেভাবে মানুষ পুড়িয়ে মারা হত্যাকারীদের যেমন প্রতিরোধ করেছেন, ঠিক তেমনিভাবে গুপ্তহত্যাকারী ও নাশকতাকারীদের খুঁজে বের করে পুলিশের হাতে সোপর্দ করুন। দেশের জনগণ সচেতন হলে ষড়যন্ত্রকারীরা কোনোদিনই তাদের নীলনকশা বাস্তবায়ন করতে পারবে না।
বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সবাই বিস্মিত হয়েছে : জাপান, সৌদি আরব ও বুলগেরিয়া সফরে দেশগুলোর নেতাসহ বিশ্বনেতাদের সাথে আলোচনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, পরপর ৩টি সফর আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেকটি সফরে বাংলাদেশের অনেক অর্জন আছে। তিনি বলেন, এই ৩টি সফরে যেসব নেতাদের সাথে আলোচনা হয়েছে, সেই বিশ্বনেতাদের সবাই বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাদের অবাক করেছে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ওপরে থাকাটা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সৌদি আরব সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ ছিল। সফরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আলোচনায় সৌদি সরকার বাংলাদেশ থেকে দক্ষ-অদক্ষ বিভিন্ন পেশাজীবী শ্রমিক নেবে বলে জানিয়েছে। সৌদি ব্যবসায়ীরাও বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, বুলগেরিয়া সফরে দেশটির সোফিয়ায় ‘গ্লোবাল উইমেন লিডার্স ফোরামে’ বাংলাদেশের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। ফোরামে বাংলাদেশে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতায়নে সরকারের নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেসব পদক্ষেপ তুমুল প্রশংসিত হয়েছে ফোরামে।
জাপান সফর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেখানে জি-৭ অর্থাৎ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ৭টি দেশের প্রতিনিধির সাথে আলোচনা হয়েছে। তারা সবাই বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রশংসা করেছেন।

শ্রেণী:

নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় সব বাধা ভাঙব

Posted on by 0 comment
09

09উত্তরণ ডেস্ক: সমাজ ও রাষ্ট্রের সব পর্যায়ে নারী-পুরুষের সমতা আনতে সব বাধা দূর করার অঙ্গীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ১৮ মে বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়ায় গ্লোবাল উইমেন লিডারস ফোরামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই অঙ্গীকার করেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতিসংঘ সংস্থা ইউনিসেফের মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারীর ক্ষমতায়নে তার নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে বলেন, নারী ও পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠায় যত প্রতিবন্ধকতা আছে, সব দূর করার অঙ্গীকার রয়েছে আমার। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশকে দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশই সম্ভবত একমাত্র দেশ যেখানে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা, সংসদ উপনেতা, বিরোধীদলীয় নেতা ও স্পিকার নারী। দেশের বর্তমান সংসদে ৭০ নারী সদস্যের উপস্থিতির কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এই সংখ্যা মোট সংসদ সদস্যের ২০ শতাংশ। ২০২০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের সব পর্যায়ের কমিটিতে ৩০ শতাংশ নারী সদস্য থাকার বিষয়ে বাধ্যবাধকতা আরোপের বিষয়টি বৈশ্বিক এই সম্মেলনে তুলে ধরেন তিনি।
এ ছাড়া স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে নারী ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচন, তৃণমূলে ইউনিয়ন পরিষদে নারীদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের কথাও বলেন তিনি। নারী শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় তার সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করা হয়েছে, প্রাথমিক থেকে ¯œাতকোত্তর পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৭২ লাখ শিক্ষার্থী বিভিন্ন ধরনের বৃত্তি পাচ্ছে।
এ ছাড়া প্রাথমিক পর্যায়ে ৬০ শতাংশ নারী শিক্ষক এবং দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের জন্য বিনামূল্যে খাবার চালুও শিক্ষায় লৈঙ্গিক সমতা আনতে ভূমিকা রাখছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। মায়ের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির দিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশজুড়ে হাসপাতালের পাশাপাশি সাড়ে ১৬ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সন্তান প্রসব নিরাপদ এবং মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবায় মাতৃস্বাস্থ্য ভাউচার স্কিম চালু করার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক খাতে নারীর ভূমিকা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমান বিশ্বে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে, যেখানকার প্রায় ৪৫ লাখ শ্রমিকের ৮৫ শতাংশই নারী। তিনি বলেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, কূটনীতি, জঙ্গি বিমান পরিচালনা ও শীর্ষ উদ্যোক্তাদের মধ্যেও রয়েছেন নারী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়েও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে তারা। এভাবে বাংলাদেশে নারীরা সত্যিকার অর্থে বাধা ভাঙছে এবং জাতি গঠনে এখন সক্রিয় উন্নয়ন নিয়ামকে পরিণত হয়েছে। অনেক অর্জন সত্ত্বেও এখনও নারীর প্রতি সহিংসতা, বাল্যবিয়ে এবং নারী ও মেয়েশিশু পাচার প্রতিরোধে পুরোপুরি সাফল্য আসেনি বলে স্বীকার করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নারী ও মেয়েশিশুর জন্য নিরাপদ পরিবেশ, তাদের যথাযথ শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন এবং সামাজিক পরিবর্তনের নিয়ামক হিসেবে গড়ে তুলতে ক্ষমতায়নের জন্য যেসব চ্যালেঞ্জ তা মোকাবিলায় একযোগে কাজ করার জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। ‘আমরা পারব’Ñ নিজের এই স্লোগানে সবাইকে কণ্ঠ মেলানোর আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বুলগেরিয়ার প্রেসিডেন্ট রোজেন প্লেভনেলিয়েভসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।

শ্রেণী:

কৃষক বাঁচাতে সরকার সব করবে

Posted on by 0 comment
33
33

কৃষক লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

‘বর্গাচাষিদের বিনা জামানতে ঋণ প্রদানের বিষয় তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এক্ষেত্রেও অনেকে বিরোধিতা করে বলেছিল, বিনা জামানতে ঋণ দিলে তা ফেরত পাওয়া যাবে না।’

উত্তরণ ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাঙালি জাতি বীরের জাতি। বাংলাদেশের মানুষ বুকের তাজা রক্ত ঢেলে এদেশকে স্বাধীন করেছে। তাই এদেশের মানুষকে নিয়ে কেউ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করলে অন্য কেউ সহ্য করলেও আমি করব না। আমরা ভিক্ষা নিয়ে কিংবা হাত পেতে মাথানত করে চলব না। নিজেরা স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আত্মনির্ভরশীল হয়েই বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে চলবÑ এটাই হচ্ছে আমাদের লক্ষ্য।
গত ১৯ এপ্রিল রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বাংলাদেশ কৃষক লীগের ৪৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় দেশকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, পৃথিবীর মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যে, বিশ্বমন্দার মধ্যেও প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপর রাখতে সক্ষম হয়েছে। জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নের কারণেই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখন ৭ শতাংশ অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশের এমন উন্নতি দেখে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করে। কিন্তু আমি বলি বিস্ময় নয়, ধারাবাহিক সঠিক পরিকল্পনা, মানুষের প্রতি কর্তব্যবোধ-দায়িত্ব, দেশপ্রেম ও আদর্শ নিয়ে আমরা কাজ করছি বলেই দেশের এমন অগ্রগতি হয়েছে।
সারাদেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যথেচ্ছ কৃষি জমির অপব্যবহার রোধে আমরা সারাদেশে এসব বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছি। সেখানে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে। কাউকে আর যত্রতত্র শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ আমরা দেব না। আর এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণকে বেশি উৎসাহিত করা হবে। কৃষকদের সবচেয়ে সম্মান দেওয়া উচিত উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশের ১৬ কোটি মানুষের খাদ্যের জোগান দিচ্ছে আমাদের কৃষকরা। তারা মানুষের ক্ষুধার জ্বালা নিবারণ করছে। তাই দেশের কৃষকদের আমাদের মাথায় তুলে রাখা উচিত। কৃষকরা হলেন আমাদের প্রাণ। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের অর্থনীতির মূল ভিত্তিই হচ্ছে কৃষি। আমাদের দেশের অর্থনীতিও কৃষিনির্ভর। তাই কৃষককে বাঁচাতে এবং কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সরকার থেকে যা যা করার তার সবই করছে সরকার, ভবিষ্যতেও করা হবে। তিনি মাঠ পর্যায় থেকে কৃষকদের সুযোগ-সুবিধার তথ্য সংগ্রহের জন্য কৃষক লীগের নেতৃবৃন্দকে নির্দেশ দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার আগে আমরা ঘোষণা দিয়েছিলাম, ক্ষমতায় গেলে আমরা কৃষকদের ভর্তুকি দেব। তখন বিশ্বব্যাংকসহ দাতা সংস্থাগুলো হুমকি দিয়েছিল ভর্তুকি দিলে তারা সাহায্য দেবে না। আমি তখন সাফ জানিয়ে দিয়েছিলাম, সাহায্য না দিলেও আমরা নিজেদের অর্থে কৃষকদের ভর্তুকি দেব।
বর্গাচাষিদের বিনা জামানতে ঋণ প্রদানের বিষয় তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এক্ষেত্রেও অনেকে বিরোধিতা করে বলেছিল, বিনা জামানতে ঋণ দিলে তা ফেরত পাওয়া যাবে না। তখন আমি বলেছিলাম অনেক বড় বড় লোক ঋণ নিয়ে ফেরত দেন না কিন্তু আমাদের কৃষক সমাজ কখনও বেইমানি করবে না। আমাদের সময় কৃষককে ঋণ পেতে ব্যাংকে যেতে হয় না, কৃষকদের কাছেই ঋণ দিতে ব্যাংক যায়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বেলুন ও শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। প্রধান অতিথি শেখ হাসিনাকে কৃষক লীগের সভাপতি মোতাহার হোসেন মোল্লা ও সাধারণ সম্পাদক খন্দকার শামসুল হক রেজা ক্রেস্ট এবং সমীর কুমার চন্দ্র চন্দ ও সাখাওয়াত হোসেন সুইট কৃষক লীগের নিয়মিত প্রকাশনা ‘কৃষকের কণ্ঠ’ প্রদান করেন। পুরো অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন কৃষক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ সমীর চন্দ্র চন্দ। দেশি শাক-সবজি, ফুল ও ফল দিয়ে মূলমঞ্চ সাজানো হয়েছিল। হলরুমের বাইরেও ছিল দেশীয় বিভিন্ন ফলমূলের গাছ। কৃষক লীগ সভাপতি মোতাহার হোসেন মোল্লার সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী এমপি, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এমপি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এমপি, কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক ড. আবদুর রাজ্জাক এমপি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এমপি, সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার শামসুল হক রেজা প্রমুখ।
কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এমপি বলেন, সকল ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত অদম্য সাহসিকতার সাথে মোকাবিলা করেই শেখ হাসিনা দেশকে সবদিক থেকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এমপি বলেন, ১৬ কোটির বাংলাদেশ আজ খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ।

শ্রেণী:

শেখ হাসিনার বৈশ্বিক নেতৃত্ব

Posted on by 0 comment
09

বিশ্বশান্তি ও উন্নয়ন প্রসঙ্গ

‘দেশ ও বিশ্বপরিম-লে শেখ হাসিনা আজ গণতন্ত্র, উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও শান্তির প্রতীক। তারই নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতিসংঘে অনেকগুলো প্রস্তাব আনে, যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানবকল্যাণ, টেকসই উন্নয়ন এবং সকল জাতিসত্তার অব্যাহত উন্নয়ন ও মুক্তি।’

09ড. আব্দুল মোমেন: প্রাণঘাতী যুদ্ধ-বিগ্রহ আর অযুত মানুষের হত্যাযজ্ঞের ওপর দাঁড়িয়ে শান্তির অন্বেষায় ১৯৪৫ সালে যে বিশ্ব সংস্থাটির জন্ম, সেই জাতিসংঘ পরিপূর্ণারূপে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় সফল হয়েছে কি-না তা এখনও বিশ্বজুড়ে একটি আলোচ্য বিষয়। তবুও সাবেক মহাসচিব দ্যাগ হ্যামার্শ্যল্ড-এর ভাষায় বলতে হয়, ‘জাতিসংঘ আমাদের স্বর্গে নিতে না পারলেও নরক থেকে দূরে রাখতে সমর্থ হয়েছে।’ পৃথিবীর নানা অঞ্চলের সংঘাতপূর্ণ বিষয় ও সমস্যার ওপর আলোচনা, বিতর্ক ও সংলাপ যেমন জাতিসংঘ আয়োজন করে চলেছে, তেমনি সংস্থাটি অন্তত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এই পর্যন্ত ঠেকিয়ে রাখতে সমর্থ হয়েছেÑ এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। আশার কথা হচ্ছে, এই যে জাতিসংঘের নিরলস প্রয়াসের কারণেই আজ পৃথিবীতে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার কমেছে, প্রসূতি মায়েরা অধিক হারে সুস্থ সন্তানের জন্ম দিচ্ছে, লাখ লাখ শিশু স্কুলে যাচ্ছে এবং কোটি কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধার ভয়াল চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। তবে এই অর্জন সম্ভব হতো না, যদি বৈশ্বিক নেতৃত্বের গতিশীলতা, দৃঢ়সংকল্প ও প্রয়াস না থাকতÑ যারা স্ব-স্ব দেশের জনগণের জীবনমান উন্নয়নে এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে ইস্পাত কঠিন সংকল্প নিয়ে কাজ করেছেন এবং এখনও করে চলেছেন। তেমনি এক নেতৃত্ব জাতিসংঘের স্বীকৃৃতিসহ সারা পৃথিবীতে সুশাসনের জন্য নিজের দেশের সম্মান ও গৌরব বৃদ্ধি করেছেন। নিজের দেশসহ সারা পৃথিবীতেই নিরাপত্তা, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্তি এবং স্থিতিশীল উন্নয়নের জন্য এই নেতৃত্ব বিশ্বসভায় অগ্রসর অবস্থান নিশ্চিত করেছেন। সেই নেতৃত্ব আর কেউ নন, বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিম-লেও আজ ন্যায় ও সুশাসন এবং উন্নয়নের প্রতীক বলে খোদ জাতিসংঘই বলছে বাংলাদেশ ও দেশটির নেতা শেখ হাসিনার কথা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন সুশাসন ও মানবতার প্রতি বাংলাদেশের নেতা শেখ হাসিনার এই সংকল্প? কেন তিনি নিজের দেশের মানুষ এবং বিশ্বের জন্য দারিদ্র্য দূরীকরণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লিপ্ত? কেন তিনি বৈষম্যহীন এবং সকলের অংশগ্রহণমূলক, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত একটি ‘সোনার বাংলা’ গঠনের স্বপ্নে বিভোর? কেন তিনি জাতিসংঘের নেতৃত্বে বিশ্বে সন্ত্রাস ও ধর্মীয় উগ্রবাদমুক্ত পৃথিবী উপহার দিতে প্রয়াসী? কেন তিনি নিজের দেশ এবং পৃথিবীর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় এতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ? জাতি, লিঙ্গ, ধর্ম, বর্ণ এবং দেশের সীমারেখা নির্বিশেষে কেন তিনি একটি সহনশীল ও নিরাপদ বিশ্ব গঠনে জাতিসংঘকে অকুণ্ঠ সহযোগিতা প্রদান করে যাচ্ছেন? কেন দৃঢ়ভাবে জাতিসংঘ সনদের আলোকে আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং বহুমাত্রিক কূটনৈতিক তৎপরতার প্রতি এতটা আস্থাশীল হয়ে বৈশ্বিক শান্তির পতাকা বয়ে বেড়াতে তিনি সদা তৎপর? এ প্রশ্নগুলো গভীরভাবে ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে।
শেখ হাসিনা এমন একটি সমাজের মানুষ যেখানে সুদূর অতীত থেকেই, ১৪৯২ সালে কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার বা ষোড়শ শতাব্দীর ইউরোপীয় শিল্প বিপ্লবেরও আগে, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ছিল। কবি চ-ীদাসের ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’, কিংবা কাজী নজরুল ইসলামের ‘গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’Ñ এসব লেখায় আমরা সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য পাই। চ-ীদাসের এ দর্শনতত্ত্ব বাঙালির মনন ও মানসের এতটাই গভীরে প্রোথিত যে তা শতাব্দীর পর শতাব্দী উচ্চারিত হয়েছে। মানবতাই সবার ঊর্ধ্বেÑ তেমনি এক আলোকিত পরিম-ল থেকে উঠে এসেছেন শেখ হাসিনা। তিনি এমন এক পরিবার থেকে এসেছেন, দেশ ও মানবতার জন্য আত্মত্যাগ যাদের অপরিসীম। তার পিতা সারাটা জীবন অতিবাহিত করে গেছেন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে। গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের জন্য যাকে জেল খাটতে হয়েছে জীবনের দীর্ঘ সময়। তিনি চেয়েছিলেন একটি শোষণমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র যেখানে সকলের জন্য সমানাধিকার, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-চিকিৎসা-শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে। তার স্বপ্ন ছিল এমন একটি দেশ যার মূল ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, শান্তি-সমৃদ্ধি এবং জননিরাপত্তা; যেখানে থাকবে না ক্ষুধা-দারিদ্র্য, শোষণ এবং অবিচার। এহেন একটি শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের প্রত্যয়ে যখন বঙ্গবন্ধু আত্মনিয়োগ করেছেন তার সদ্য-স্বাধীন বাংলাদেশে, ঠিক তখনই ১৯৭৫ সালে তাকে সপরিবারে হত্যা করে পরাজিত পাকিস্তানিদের দোসর এদেশীয় ঘাতকচক্র। ওই ভয়াল হত্যাকা-ে শেখ হাসিনা কেবল তার পিতাকেই নয়, হারান পরিবারের প্রায় সব সদস্যকে; এমনকি তার ৯ বছরের ছোট্ট শিশু ভাইকেও রেহাই দেয়নি খুনিরা। শুধু তিনি নিজে এবং তার ছোট বোন বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান।
মানুষের জন্য শেখ হাসিনার জীবনসংগ্রাম এখানেই শেষ নয়, তিনি এ পর্যন্ত ২৩ বার প্রাণঘাতী হামলার শিকার হয়েছেন। প্রতিটি হামলার ক্ষেত্রেই তার প্রিয় রাজনৈতিক সহকর্মীদের অনেকেই নিহত বা আহত হয়েছেন; নয় তো পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। পরিবারের সবাইকে হারিয়ে, প্রিয় সহযোদ্ধাদের হারিয়েও শেখ হাসিনা দমে যাননি। তার লড়াই-সংগ্রাম চলছে। সারাবিশ্বে আর কোনো দেশে এমন একজন নেতা খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি নিজের সর্বস্ব হারিয়েও দেশের আপামর জনগণের ভোট ও ভাতের অধিকার এবং একটি উন্নত-সুন্দর জীবন প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি নিয়ত সংগ্রাম করে চলেছেন। দেশে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-চিকিৎসা-শিক্ষাসহ সকল মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অবিচল থেকে তিনি কাজ করে চলেছেন নিরন্তর।
এতে সন্দেহের কোনো অবকাশই নেই যে দেশ ও বিশ্বপরিম-লে শেখ হাসিনা আজ গণতন্ত্র, উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও শান্তির প্রতীক। তারই নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতিসংঘে অনেকগুলো প্রস্তাব আনে, যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানবকল্যাণ, টেকসই উন্নয়ন এবং সকল জাতিসত্তার অব্যাহত উন্নয়ন ও মুক্তি। উদাহরণস্বরূপ, তারই নেতৃত্বে ও তারই আনীত প্রস্তাবের কারণে জাতিসংঘে আজ ‘উন্নয়নের অধিকার’ একটি মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশের সভাপতিত্বে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ১৩২৫ নম্বর প্রস্তাবের কল্যাণে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা ও শান্তি বিনির্মাণের প্রতিটি পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের নেতা শেখ হাসিনার কল্যাণেই আজ জাতিসংঘে ‘শান্তির সংস্কৃতি’ বা ‘ঈঁষঃঁৎব ড়ভ চবধপব’ চালু হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী জোরালভাবে অনুসৃত হচ্ছে।
কেন এই শান্তির সংস্কৃতি এতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক? এর মূলনীতি হচ্ছে এমন একটি আবহ সৃষ্টি করা যার মাধ্যমে পরমত সহিষ্ণুতা এবং অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত করা যায়Ñ জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা এবং নৃ-গোষ্ঠীগত পরিচয় নির্বিশেষে। কেননা, শান্তির সংস্কৃতি বিশ্বাস করে যে, অসহিষ্ণুতা এবং ঘৃণা থেকেই সর্বপ্রকার বিরোধ, সহিংসতা ও যুদ্ধের উৎপত্তি। তাই সকলের মাঝে যদি পারস্পরিক সহিষ্ণুতা এবং শ্রদ্ধাবোধ সৃজন করা যায়, তা হলেই আমরা যুদ্ধহীন ও সংঘাতমুক্ত এক পৃথিবী গড়তে পারব। তা হলেই সম্ভব হবে স্থায়ী উন্নতি, সমৃদ্ধি ও শান্তি অর্জনÑ জাতিসংঘের মূল লক্ষ্যও তাই। আশার কথা এই যে বাংলাদেশের নেতা শেখ হাসিনা অনুসৃত শান্তির সংস্কৃতি আজ বিশ্বজুড়ে, সকল জাতির মাঝেই ব্যাপকভাবে অনুভূত হচ্ছে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশ আজ সর্বোচ্চ সৈন্যদাতা রাষ্ট্র। যুদ্ধ আক্রান্ত রাষ্ট্রে যাতে সাধারণ মানুষ এবং শান্তিরক্ষীরা সুরক্ষিত থাকে সে বিষয়ে শেখ হাসিনা বদ্ধপরিকর। বিশ্বে তিনিই একমাত্র নেতা যিনি এমনকি বড়দিনের ছুটির মাঝেও জাতিসংঘ মহাসচিবের অনুরোধে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শান্তিরক্ষী প্রেরণের নির্দেশনা দিয়েছেন। শান্তিরক্ষী প্রেরণে তিনি কখনোই কার্পণ্য করেননি। এটি কোনো বিস্ময়ের ব্যাপার নয় যে ১ লাখ ৩৮ হাজার শান্তিরক্ষী বাহিনীর সমন্বয়ে জাতিসংঘ সারা পৃথিবীতে শান্তি রক্ষা করতে সমর্থ হচ্ছে যেসব সৈন্যের অনেকেই তাদের জীবনের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেছেন। তারা প্রকৃত অর্থেই শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কারের দাবিদার।
শেখ হাসিনার সফল নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতিসংঘে দুটি যুগান্তকারী প্রস্তাব আনে ২০১২ সালে, যা  সর্বসম্মতিক্রমে বিশ্বসভায় গৃহীত হয়। এর প্রথমটি ছিল অটিজম ও প্রতিবন্ধী শিশুদের অধিকার সংক্রান্ত, আর দ্বিতীয়টি জনগণের ক্ষমতায়ন সংক্রান্ত। তিনি বিশ্বাস করেন, সবারই অংশগ্রহণের সমান সুযোগ রয়েছে, কারোরই বাদ পড়ার কথা নয়। মানবতা ও উন্নয়নে সবাই নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী অবদান রাখতে পারে। তাই অটিজমে আক্রান্ত এবং প্রতিবন্ধী শিশুদের জীবন যন্ত্রণা ও বঞ্চনার বিষয়টি যখন তার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেন উত্থাপন করেন, বাংলাদেশ দ্রুত এ বিষয়টি বিশ্বসভায় উত্থাপন করে এবং বিশ্বনেতৃত্বের দৃষ্টি আকর্ষণ ও সমর্থন আদায় করে।
অটিজম এবং প্রতিবন্ধিতা সংক্রান্ত অনেকগুলো বড় বড় সভা আহ্বান করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতিসংঘ এবং তার সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সামনে বিষয়টি উত্থাপিত হওয়ার পরপরই মহাসচিব তা সাধারণ পরিষদে সেগুলো প্রস্তাবিত ও অনুমোদিত হয় এবং সদস্য রাষ্ট্রসহ সবকটি জাতিসংঘ সংস্থার কর্মকা-ে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়। এক্ষেত্রে বৈশ্বিক নেতৃত্বটি অবশ্যই বাংলাদেশের এবং দেশটির নেতা শেখ হাসিনার।
বিগত ৪০ বছরের জাতীয় ও বৈশ্বিক রাজনীতির অভিজ্ঞতা থেকে শেখ হাসিনা জানেন যে সামনের দিনগুলোতে বিশ্বের প্রধানতম চ্যালেঞ্জগুলো হবে জলবায়ু পরিবর্তন, বেকারত্ব, আর্থিক সংকট, দীর্ঘস্থায়ী ক্ষুধা ও দারিদ্র্য এবং এগুলো থেকে উদ্ভূত হাজারও সমস্যা। তাই তিনি বিশ্বাস করেন এই চ্যালেঞ্জগুলো তখনই মানুষ অতিক্রম করতে সক্ষম হবে যখন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা যাবে। একেই তিনি বলছেন জনগণের ক্ষমতায়ন। এটি সম্ভব হলে সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী শক্তি, সক্ষমতা এবং কার্যকরিতার সাথে মানুষ কাজ করতে পারবে, ফলে সবাই সমভাবে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অবদান রাখতে পারবে। তাই জনগণের ক্ষমতায়নের প্রতি তিনি এতটা গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে জনগণকে ক্ষমতায়িত করা যাবে? বিষয়টিকে তিনি ৬টি আন্তঃসংযুক্ত চলকের দ্বারা বিশ্লেষণ করেছেনÑ প্রথমত; মানুষের ক্ষমতায়ন হবে চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্তি সম্ভব হলে, দ্বিতীয়ত; তাদের ক্ষমতায়ন সম্ভব হবে প্রয়োজনীয় দক্ষতা, কারিগরি জ্ঞান ও মানসম্মত শিক্ষাদানের মাধ্যমে যাতে করে তারা নিজেরাই কর্মসংস্থান বা উপযুক্ত চাকরির ব্যবস্থা করে স্বাবলম্বী হবে, তৃতীয়ত; তাদের ক্ষমতায়ন সম্ভব হতে পারে বৈষম্য ও বঞ্চনার অবসানের মাধ্যমে, চতুর্থত; সন্ত্রাস নির্মূল করে একটি নিরাপদ জীবন নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়ন করা যাবে, পঞ্চমত; এতদিন যারা উন্নয়ন ও মূল জীবনধারার বাইরে ছিল, তাদের অন্তর্ভুক্ত করে ক্ষমতায়ন করা যাবে এবং সর্বোপরি, তাদের ক্ষমতায়ন সম্ভব হবে ভোটাধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে ও শাসন ব্যবস্থায় সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে।
শেখ হাসিনার ‘জনগণের ক্ষমতায়ন’ ধারণাটি জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনসসহ সদস্য রাষ্ট্রসমূহের নেতৃবৃন্দের মধ্যেও অনুরণিত হয়েছে। ২০১২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত ‘রিও+২০ বিশ্ব সম্মেলনে’ বিশ্ব নেতৃবৃন্দ ‘যেমন ভবিষ্যৎ চাই’ শীর্ষক দলিল গ্রহণ করেন যার মধ্যে শেখ হাসিনা প্রণীত জনগণের ক্ষমতায়ন নীতিমালা এবং তার সাথে জড়িত আদর্শ অনুসৃত হয়। উক্ত সম্মেলনে দারিদ্র্য দূরীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়, যার মূল ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে সকলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতা অর্জন। সম্প্রতি জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত প্রস্তাব যা, ‘20130 Agenda for Sustainable WorldÕ বা ÔSDGs’ নামে পরিচিত সেটির মূল ভিত্তিই ছিল রিও+২০ তে অনুসৃত শেখ হাসিনার জনগণের ক্ষমতায়ন তত্ত্ব। বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা জাতিসংঘে গ্রহণ করেন ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, যার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের যথার্থভাবেই শেখ হাসিনা প্রণীত জনগণের ক্ষমতায়ন নীতিমালার আলোকে সবার অন্তর্ভুক্তি, মানসম্মত শিক্ষা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দারিদ্র্য দূরীকরণ, জনগণের অংশগ্রহণ, আইনের শাসন, সুশাসন ইত্যাদি নির্ধারিত হয়।
তার গতিশীল নেতৃত্বে জাতিসংঘে বাংলাদেশ কর্তৃক উত্থাপিত প্রতিটি বিষয়ই এসডিজি-র ১৭টি লক্ষ্য এবং ১৬৯টি উদ্দেশের মাঝে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, অভিবাসন ও উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ও লিঙ্গ-সমতা, শুল্কমুক্ত কোটামুক্ত বাজার প্রবেশাধিকার, জলসম্পদের আন্তঃদেশীয় ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য, নীল অর্থনীতি (সাগর ও মহাসাগর), বিশ্ব আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকতর অংশগ্রহণের সুযোগ, শান্তি ও স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, পারস্পরিক সহযোগিতা, এলডিসি ইস্যু ইত্যাদি।
জাতিসংঘের সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে অবিস্মরণীয় অগ্রগতি, তা মূলত সম্ভব হয়েছে দেশটির নেতা শেখ হাসিনার উন্নয়ন চিন্তা এবং জনগণের মুক্তির লক্ষ্যে তার অবিচল প্রতিজ্ঞার কারণেই। সম্পদের ব্যাপক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কেবল নেতৃত্বের বিচক্ষণতা, দৃঢ়তা এবং সঠিক দিক-নির্দেশনার কারণেই বাংলাদেশ এই লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে। এককালে যে দেশকে বলা হয়েছিল ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ (Bottomless Basket), যার ‘সফল হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই’ বিশ্ব মোড়লেরা দেখেনি, সেই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আজ ৬.৩ শতাংশ, তাও আবার এক নাগাড়ে সাত বছর ধরে। চরম দারিদ্র্য ১৯৯১ সালে যেখানে ছিল ৫৭.৮ শতাংশ, ২০১৫ সালে তা কমে এসেছে ২২.৪ শতাংশেরও নিচে। একই সাথে নবজাত শিশু মৃত্যুর হার ৭৩ শতাংশ কমিয়ে আনতে পেরেছে বাংলাদেশ। বিশ্বের সর্বাধিক জনঅধ্যুষিত ও স্বল্প আয়তনের এক দেশের জন্য এই সাফল্য একেবারে কম নয়।  আর এই অর্জন সম্ভব হয়েছে কেবল শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বের কারণেই।
দেশের অভ্যন্তরে ব্যাপক বিরোধিতা এবং নানান প্রতিবন্ধকতার মধ্যও শেখ হাসিনা তার দৃঢ় ও আপসহীন সিদ্ধান্তের দ্বারা দেশকে উন্নয়নের পথে যেভাবে পরিচালিত করেছেন, তার কল্যাণেই বাংলাদেশ খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে, অথচ পূর্বে দীর্ঘ সময় ধরে দেশটি ছিল খাদ্য ঘাটতির মধ্যে। এই ব্যাপক পরিবর্তনের জন্য শেখ হাসিনা এবং তার দেশবাসী বিশ্বসভায় সাধুবাদ পেতেই পারেন। আর তারই প্রমাণ আমরা দেখি যখন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলেন, বাংলাদেশ হচ্ছে ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নের মডেল’ এবং ‘নারীর ক্ষমতায়নের উজ্জ্বল নক্ষত্র’। আমেরিকার প্রভাবশালী ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের ভাষায় বাংলাদেশ হচ্ছে ‘দক্ষিণ এশিয়ার আলোকবর্তিকা’ আর গোল্ডম্যান শ্যাক্স তাদের গ্লোবাল অবস্থানে বাংলাদেশকে এন-১১ তে উন্নীত করেছে, যার অর্থ হচ্ছে ১১টি অগ্রসরমান অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ।
দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম প্রধান দেশের সুনাম অর্জন করেছে। বিশ্ব নেতৃবৃন্দ শেখ হাসিনার নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে একাধিক পদকে ভূষিত করেছে, যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষমাত্রা অর্জনের জন্য এমডিজি-৪ পুরস্কার (২০১০)। সাউথ-সাউথ পুরস্কারে তিনি ভূষিত হন ২০১৩ সালে, দেশজুড়ে ১৩ হাজার ৮০০ কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং ৪ হাজার ৫০১টি ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে জনগণকে সফলভাবে ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রযুক্তির সংযোগের আওতায় নিয়ে আসার স্বীকৃতিস্বরূপ। ২০১৪ সালে তাকে সাউথ-সাউথ লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয় বিশ্বের দক্ষিণের দেশগুলোতে নেতৃত্বের দূরদর্শিতার স্বাক্ষর হিসেবে। ২০১৫ সালে তিনি জাতিসংঘ কর্তৃক দুটি পুরস্কারে ভূষিত হন, এগুলো হচ্ছেÑ জলবায়ু পরিবর্তনে প্রভাব মোকাবিলায় সফলতার জন্য ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ পুরস্কার এবং টেলিযোগাযোগ খাতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন সংস্থার পুরস্কার বা ‘আইটিইউ অ্যাওয়ার্ড’।
২০০০ সালে যখন জাতিসংঘে সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) ঘোষণা প্রদান করা হয় তখন শেখ হাসিনা বাংলাদেশের নেতা হিসেবে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আবার ২০১৫ সালে যখন ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জনের লক্ষ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা (এসডিজি) হয় তখনও তিনি বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘে নেতৃত্বদান করেন। তিনি বিশ্বের একমাত্র নেতা যিনি জাতিসংঘের উন্নয়ন সংক্রান্ত এ দুই মাইলফলক ঘোষণার সময় নিজের দেশের নেতা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তার দেশ সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হবে মর্মে ২০০০ সালের সম্মেলনে তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রতিশ্রুতি দেন বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সামনে। সেই প্রতিশ্রুতি তিনি রক্ষা করেছেন। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম সেই যে সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পেরেছে। ২০১৫ সালের সম্মেলনে আবার যখন বিশ্ব নেতৃবৃন্দ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেন (যা ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জন করতে হবে) তখন শেখ হাসিনা বিশ্বসভায় এই প্রতিশ্রুতি দেন যে তার দেশ এই লক্ষ্যমাত্রাও যথাসময়ে পূরণ করবে। শুধুু সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকেন নি তিনি, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্য আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশে রূপান্তরের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে তারই স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনের লক্ষ্যে কাজ করছেন তারই সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী ও বিশ্বনেত্রী শেখ হাসিনা। এ হবে এমন এক বাংলাদেশ যেখানে সবাই পাবে সমানাধিকার, ন্যায়বিচার এবং সুষম উন্নয়নের সুযোগ। যেখানে সমৃদ্ধি ও শান্তির মাঝে বাস করবে দেশের প্রতিটি মানুষ। সেই স্বপ্নই দেখেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।
সাউথ-সাউথ দেশগুলোর অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিধি ক্রমেই বাড়ছে। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিমাণ ২ গুণ বেশি বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের এক বিশাল বাজারে পরিণত হবে এ দেশগুলো। তা সত্ত্বেও এ দেশগুলোর পূর্ণ সম্ভাবনা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য এ দেশগুলোর প্রতিবছর ৫ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করতে হবে। বর্তমানে বৈদেশিক সাহায্য স্কিমের আওতায় উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্রসমূহ বছরে ১৩৮ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়ে থাকে যার মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে যায় মাত্র ৩৮ থেকে ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য অর্থ পর্যাপ্ত নয়। সাউথ-সাউথ দেশগুলোর অমিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোার জন্য এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অগ্রগতি যথাযথভাবে তদারকি ও মূল্যায়নের জন্য বাংলাদেশ সাউথ-সাউথ দেশগুলোর অর্থ ও উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রীদের একটি ফোরাম গঠনের প্রস্তাব করেছে, যা আন্তর্জাতিক মহল কর্তৃক সমর্থিত হয়েছে। সম্প্রতি চীন সাউথ-সাউথ সহযোগিতার জন্য ১ বিলিয়ন ডলারেরও

‘আধুনিক বিশ্বে বাংলাদেশ আরও একটি কারণে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করছে, তা হলোÑ একটি শক্ত, সৃজনশীল ও পরিশ্রমী অভিবাসী শ্রমিকদের দেশ হিসেবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আজ বাংলাদেশের প্রায় ৯০ লাখ প্রবাসী নাগরিক রয়েছেন যারা কঠোর পরিশ্রম বাংলাদেশের বিভিন্ন বন্ধু রাষ্ট্রসমূহের অবকাঠামো উন্নয়নে অবদান রাখছেন, তাদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করছেন।’

বেশি অনুদানের ঘোষণা দিয়েছে।
শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো কর্তৃক ২১ ফেব্রুয়ারি মহান ভাষা শহীদ দিবসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সক্ষম হয়। এ কথা আজ সারাবিশ্ব জানে যে, ১৯৫২ সালে মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বাংলাদেশের জনগণ তাদের বুকের রক্ত দিয়েছে। সেই আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘ পৃথিবীর সব জাতির মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার প্রয়াসে সেই দিনটিকে জাতিসংঘ সম্মানিত করেছে, যা আজ বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সব দেশে পালিত হচ্ছে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ আইনের শাসনে প্রতিষ্ঠার অনন্য নজির স্থাপন করেছে। দীর্ঘদিন ধরে বিরোধপূর্ণ সমুদ্রসীমা নিয়ে প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের সাথে যে দ্বন্দ্ব চলে আসছিল সেই বিষয়ে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সমুদ্র-আইন সংক্রান্ত ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার যে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত তিনি গ্রহণ করেন, তারই ফলস্বরূপ বাংলাদেশ তার সমুদ্রসীমার ওপর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। অন্যদিকে প্রতিবেশী দুই রাষ্ট্র ভারত এবং মিয়ানমারও তাদের আইনগত ন্যায্য পাওনা পেয়েছে। কোনো সংঘাত বা যুদ্ধ ছাড়াই এহেন বিরোধ নিষ্পত্তির ঘটনা পৃথিবীতে বিরল।
শেখ হাসিনার শাসনের প্রথম মেয়াদে (১৯৯৬-২০০১) বাংলাদেশে কয়েকটি যুগান্তকারী ঘটনা ঘটে। এর প্রথমটি ছিল ভারতের সাথে দীর্ঘদিনের সমস্যা গঙ্গা নদীর পানির বণ্টনের ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর। এর মাধ্যমে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ গঙ্গা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে সক্ষম হয় বাংলাদেশ। দ্বিতীয় যে ঐতিহাসিক ঘটনা সেই সময়ে ঘটে সেটি হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর। যে সমস্যার আবর্তে সন্দেহ ও অবিশ্বাসের দোলাচলে সেই সময় পর্যন্ত ২৫ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল, রাষ্ট্রনায়কোচিত পদক্ষেপ নিয়ে শেখ হাসিনা সেই দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের অবসান ঘটান বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে। পৃথিবীর সাম্প্রতিক ইতিহাসে শান্তি প্রতিষ্ঠার এমন নজির বিরল। মার্কিন কংগ্রেস এবং বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এই সাহসী দুই চুক্তির জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও সাহসী নেতৃত্বের ভূয়সী প্রসংশা করেছে। সম্প্রতি কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনা, রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও প্রশাসনিক কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে ভারতের সাথে অর্ধশতক ধরে ঝুলে থাকা ছিটমহল সমস্যার সমাধান করেছেন ৬৮ বছর আগের ‘সীমান্ত নির্ধারণ চুক্তি’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে। ফলে গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার পেয়েছে দীর্ঘদিন ভাগ্যবিড়ম্বিত থাকা উভয় দেশের ছিটমহলবাসী। প্রকৃত অর্থেই শেখ হাসিনা শান্তি ও স্থিতিশীলতার মূর্ত প্রতীকে পরিণত হয়েছেন দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের জন্য। আশার আলোকবর্তিকা হয়ে তিনি আবির্ভূত হয়েছেন বিশ্বের শত কোটি নিপীড়িত মানবতার জন্য।
আধুনিক বিশ্বে বাংলাদেশ আরও একটি কারণে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করছে, তা হলোÑ একটি শক্ত, সৃজনশীল ও পরিশ্রমী অভিবাসী শ্রমিকদের দেশ হিসেবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আজ বাংলাদেশের প্রায় ৯০ লাখ প্রবাসী নাগরিক রয়েছেন যারা কঠোর পরিশ্রম বাংলাদেশের বিভিন্ন বন্ধু রাষ্ট্রসমূহের অবকাঠামো উন্নয়নে অবদান রাখছেন, তাদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করছেন। একই সাথে নিজেদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা স্বদেশে পাঠিয়ে তারা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে রাখছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তবে এসব প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনে থাকে অজ¯্র দুঃখগাঁথা, বঞ্চনা আর প্রতারণা কাহিনি। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা নিজেদের ন্যায্য বেতনটুকু থেকেও বঞ্চিত হন। অথচ এই প্রবাসীরাই মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে কি অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছেন বিদেশের মাটিতে। আবার আজ তারা সেই বিদেশে থেকেও নিজের দেশকে সমৃদ্ধ ও উন্নয়নের শিখরে নিয়ে যেতে রাখছেন ব্যাপক অবদান। সহ¯্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে প্রবাসীদের আয় রেখেছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। দেশে বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি। ৯০ লাখ প্রবাসী শ্রমিকের ওপর দেশের প্রায় ৩৩ শতাংশ মানুষ নির্ভর করে, যাদের সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ।  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এই অভিবাসী শ্রমিক এবং বিদেশে অবস্থানরত দক্ষ বাংলাদেশি পেশাজীবীদের স্বীকৃতি প্রদান করেছে; তাদের সুরক্ষা এবং দেশে তাদের বিশেষ সম্মানের ব্যবস্থা করেছে এবং তাদের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য গ্রহণ করেছ নানামুখী পদক্ষেপ। প্রবাসে তাদের সমস্যা সমাধানে নিদের দেশের সরকারি প্রতিনিধি/কূটনীতিকদের যেমন তিনি নির্দেশনা দিচ্ছেন ঠিক তেমনি বিশ্বসভায় তিনি এই দাবি তুলেছেন যে প্রবাসী শ্রমিকদের কল্যাণে হোস্ট কান্ট্রি বা শ্রমিকদের অবস্থানকারী রাষ্ট্রের দায়িত্ব অনেক। তাদেরই এটি নিশ্চিত করা কর্তব্য যাতে তাদের দেশে প্রবাসী শ্রমিকদের কেউ শোষণ, নির্যাতন বা কোনোরকম বৈষম্য বা বঞ্চনার শিকার হতে না হয়। একই সাথে উন্নত দেশগুলোরও এ বিষয়ে যতœবান হওয়া উচিত যাতে তাদের দেশে কর্মরত বিদেশি শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষিত হয় এবং সেই সব সংগ্রামী শ্রমজীবী জনতা যেন কোনো প্রকার শোষণ, নির্যাতন বা প্রতারণার শিকার না হন।
দেশে এবং বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের অধিকার আদায়ে এতটা সোচ্চার এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কণ্ঠস্বর হতে পারে বলেই হয়তো বাংলাদেশ গত ৬টি বছরের জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনে এবং বিভিন্ন কমিটিসমূহের নির্বাচনে জয়লাভ করে নির্বাচিত হয়েছে। বস্তুত, এ সময়ের মধ্যে কোনো আন্তর্জাতিক নির্বাচনেই বাংলাদেশ পরাজিত হয়নি; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রসমূহ বাংলাদেশের কথা ভেবে, বাংলাদেশ নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে ওইসব নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে নিজেদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারও করে নিয়েছে। বাংলাদেশের নেতা শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহ তথা বিশ্ব নেতৃত্বের আস্থা এবং প্রগাঢ় ভরসারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে এসব আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে।
জাতিসংঘের সেকেন্ড কমিটির চেয়ার হিসেবে অধিকাংশ বিতর্কেই বাংলাদেশ সকল সদস্যকে মতৈক্যে নিয়ে আসতে পেরেছে। পিস বিল্ডিং কমিটি (পিবিসি) বা অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইসিওএসওসি) চেয়ার হিসেবে বিশ্বব্যাংকে জাতিসংঘ কমিটিসমূহের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করাতে সক্ষম হয় বাংলাদেশে। সাউথ-সাউথ কো-অপারেশনের চেয়ার হিসেবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে বাধাসমূহ ও করণীয় চিহ্নিতকরণে বাংলাদেশ নেতৃস্থানীয় ভূমিকা গ্রহণ করে। জাতিসংঘের ব্যুরো সদস্য এবং এলডিসি গ্রুপের চেয়ার হিসেবে ইস্তাম্বুল কর্মপরিকল্পনা (আইপিএও) প্রণয়নে বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা রাখে; শুধু তাই নয়, জাতিসংঘের বিভিন্ন ফান্ড যেমন ইউনিসেফ, ইউএনডিপি, ইউএন উইমেন, জাতিসংঘ জনসংখ্যা কমিশন ইত্যাদির চেয়ার হিসেবে ওইসব অঙ্গ সংগঠনের কর্মপরিকল্পনায় ইস্তাম্বুল কর্মপরিকল্পনা অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্যতম ভূমিকা পালন করে।
সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ সংক্রান্ত জাতিসংঘ কমিটির ফ্যাসিলিটেটর হিসেবে ২০১০ সালে বাংলাদেশ উক্ত কমিটির প্রস্তাব সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মতৈক্যের অর্জনে সফল হয়। ‘মানবপাচার প্রতিরোধ সংক্রান্ত জাতিসংঘের বন্ধু’ রাষ্ট্রসমূহের সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের প্রস্তাব পাসের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। মানবপাচার প্রতিরোধ ও অবসানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সাহসের সাথে উটের জকি ও দাস হিসেবে শিশুদের ব্যবহারের বিরুদ্ধে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের মাঝে সোচ্চার জনমত গড়ে তোলেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে পাচার হয়ে যাওয়া বাংলাদেশি শিশুদের উদ্ধারের নির্দেশ দেন ও তাদের উদ্ধার পরবর্তী পুনর্বাসনের পদক্ষেপ সংক্রান্ত সার্ক সম্মেলনে ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতিসংঘের ‘ফ্রেন্ডস অব মিডিয়েশন’, ‘ফ্রেন্ডস অব ইনএ্যলিনেবল্ রাইটস অব প্যালেস্টাইন’, ‘ফ্রেন্ডস অব নো ফুড ওয়েস্ট, নো ফুড লস’ ইত্যাদি ভূমিকায় মানবতার মর্যাদা রক্ষা এবং জাতিসংঘ সদনের লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
বস্তুতপক্ষে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতিসংঘে একটি অত্যন্ত সম্মানজনক সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে এবং বর্তমানে ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ হিসেবে জাতিসংঘ কর্তৃক বাংলাদেশকেই চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। কেবল সর্বোচ্চ সৈন্য প্রেরণকারী দেশ হিসেবেই নয়, সক্ষমতার সাথে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাকারী দেশ হিসেবেও বাংলাদেশের সুনাম আজ জাতিসংঘে ব্যাপক। জাতিসংঘের ‘হি অ্যান্ড শী’ প্রোগ্রামের চ্যাম্পিয়ন হিসেবেও বাংলাদেশের নাম চলে আসে সবার আগে। জাতিসংঘ মহাসচিবের ‘শিক্ষাই সর্বাগ্র’ শীর্ষক প্রকল্পে এবং মহাসচিবের স্বাস্থ্যরক্ষা সংক্রান্ত উদ্যোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে গণ্য করা হয়। মহাসচিবের নেতৃত্বে শান্তিরক্ষী নিয়োগ সংক্রান্ত সিনিয়র পরামর্শক কমিটির সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষীদের নীল হেলমেট প্রদানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা সংক্রান্ত আঞ্চলিক রিভিউ কমিটির ঢাকা কনফারেন্সের আয়োজন করে বাংলাদেশ, ২০১৪ সালে এবং সদস্য রাষ্ট্রসমূহের শান্তিরক্ষীদের প্রশিক্ষণ দান করে। প্রতি ১০ শান্তিরক্ষীর মধ্যে একজন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ নারী শান্তিরক্ষীদের জন্য নীল হেলমেট, বর্ম ও তলোয়ার চালানো এবং পুলিশের একটি নারী ইউনিট বসানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
জলবাযু পরিবর্তন মোকাবিলার ক্ষেত্রে জাতিসংঘে অত্যন্ত সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অপূরণীয় ক্ষতি ও চ্যালেঞ্জকে বিশ্ববাসীর সামনে যথার্থভাবে তুলে ধরতে তিনি সদা সচেষ্ট থেকেছেন। তিনিই একজন নেতা যিনি এ বিষয়টিকে বিশ্ববাসীর সামনে বারংবার তুলে ধরেছেন যে, পরিবেশ দূষণকারী না হয়েও স্বল্পোন্নত ও দ্বীপ-রাষ্ট্রসমূহ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সবচেয়ে বড় হুমকির মধ্যে রয়েছে। কেবল বাগাড়ম্বর বা উচ্চবাচ্য না করে এ বিষয়টি তিনি কর্মপরিকল্পনার মধ্যে গ্রহণ করেছেন এবং বিষয়টি নিয়ে কীভাবে বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগুনো যায় তা নিজে তদারক ও কাজ করে চলেছেন। আজ সম্পদের স্বল্পতা ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা সংক্রান্ত দুটি ফান্ড গঠন করেছে। তাই সংগত কারণেই জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) তাকে চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ পুরস্কারে ভূষিত করেছে। কেননা পরিবেশ সুরক্ষার জন্য তিনিই বিশ্বের সিংহভাগ জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর; এবং পরিবেশ নীতিমালা গঠনের ক্ষেত্রে জোরাল ভূমিকা রেখেছেন। জলবায়ু ঝুঁকি ফোরাম (সিভিএফ) এবং জলবায়ু ঝুকিপ্রবণতা তদারকি (সিভিএম) গঠন করেছেন তিনিই। তার প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়েই জাতিংঘে ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিষয়ের দায়িত্ব বিষয়ক রাষ্ট্রদূত’ ফোরাম (Ambassadors with Responsibility to Climate Change-ARC) এবং ‘জলবায়ু পরিবর্তনের বন্ধু’ (Friends of Climate Change-FCC) গঠন করা হয়েছে, যারা জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ ঘোষণার পরই আমরা দেখতে পাই যে অন্যান্য বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এই জটিল ইস্যুতে এগিয়ে আসছেন।
যুদ্ধ-বিগ্রহ, ভয়াল বন্যা, অনাবৃষ্টি, ক্ষরা, নদীভাঙন ইত্যাদি নানা কারণে সাম্প্রতিককালে দেশে দেশে যে হারে মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে বা নিজ দেশে কাজ হারিয়ে দেশান্তরী হয়ে পড়ছে জীবিকার তাগিদে, কিংবা শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় খুঁজছে বিভিন্ন দেশে তখন সেই সব কঠিন সমস্যার কারণ খুঁজে আর কোনো মানুষ যেন শরণার্থী না হয়, বাস্তুচ্যুত না হয় তার ব্যবস্থা করার জন্য জোরাল দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ। সম্পদশালী দেশগুলো সম্পদের অপব্যবহারের মাধ্যমে আজ পৃথিবীর পরিবেশের এই দশা করেছে, যদিও তাদের অবিমৃষ্যকারিতার ফল পেতে হচ্ছে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে, যারা হয়তো কোনোভাবেই এই ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা জলবায়ু’র কারণে উদ্বাস্তু হওয়ার জন্য দায়ী নয়। অথচ তাদেরই সবচেয়ে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে। বাংলাদেশ মনে করে এই অবস্থা হতে উত্তরণের দায় এবং দায়িত্ব উভয়ই উন্নত বিশ্বকে নিতে হবে। হয় তাদের এসব নানান প্রক্রিয়ায় করা পরিবেশ দূষণ বন্ধ করতে হবে; অথবা তাদের এমন কাজ করতে হবে যাতে যুদ্ধ-বিগ্রহ না বাধে বা মানুষ নিজের দেশ ছাড়তে বাধ্য না হয়।
শেখ হাসিনা কথা নয়, কাজে বিশ্বাসী। লক্ষ্য অর্জনে তিনি পিছপা নয় এক কদমও। তার অক্লান্ত প্রয়াসের ফলে বাংলাদেশের কর্মজীবী জনসংখ্যার মাঝে আজ নারীর অংশগ্রহণ প্রায় ৩৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা পূর্বে ছিল মাত্র ৭ শতাংশ। আজ বাংলাদেশে সরকার প্রধান একজন নারী। জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং সংসদ উপনেতাও নারীÑ নারীর ক্ষমতায়নের এ এক অনবদ্য সংযোগ। শেখ হাসিনার বাংলাদেশ সেই গুটিকয়েক রাষ্ট্রের মধ্যে অন্যতম যেখানে বছরের শুরুতে দেশব্যাপী শিশুদের মধ্যে ৩২৬ মিলিয়ন বই বিতরণ করা হয় বিনামূল্যে। বাংলাদেশ সেই রাষ্ট্র যেখানে এনজিওরা উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সরকারের সাথে সমান তালে অংশগ্রহণ করে। তাই বাংলাদেশ আজ তার উদ্ভাবনী সুশাসন প্রক্রিয়া এবং যুক্তির নিরখে চলার জন্য বিশ্ব দরবারে সম্মানিত। সামগ্রিক এই প্রক্রিয়ায়, সন্দেহ বা বিস্ময়ের কোনো অবকাশই নেই যে, সেই বাংলাদেশের নেতা শেখ হাসিনা, আজ জাতিসংঘ তথা বিশ্ব পরিম-লে শান্তি ও ন্যায্যতার এক মূর্ত প্রতীক হিসেবে নিজের দেশ ও জনগণকে তুলে ধরেছেন সবার ওপরে।
জয়তু বিশ্বনেতা শেখ হাসিনা।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদান
* জনগণের ক্ষমতায়ন মডেল : অস্থিরতা, সহিংসতা, পরমত অসহিষ্ণুতা, বৈষম্য এবং ব্যাপক জন-অসন্তোষের ক্ষেত্রে এই মডেল বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
* কালচার অব পিস : বিগত সময়ে সরকারের থাকাকালীন বাংলাদেশ কর্তৃক জাতিসংঘে শান্তির সংস্কৃতির ধারণা প্রচলন করা হয়। জাতিসংঘের ভিতরে ও বাইরে এই ধারণা ব্যাপক সমর্থন লাভ করে; কেননা এতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। বিষয়টি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন, যা সমগ্র জাতিসংঘ ব্যবস্থার মাঝে অনুরণিত হয়।
* শান্তিরক্ষা কার্যক্রম (পিস কিপিং) : শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকা সর্বজনবিদিত ও স্বীকৃত। জাতীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিম-লে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বদ্ধপরিকর। তার গতিশীল নেতৃত্বে বিশ্বে আজ সর্বোচ্চ সংখ্যক শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে সমাদৃত বাংলাদেশ।
* শান্তি বিনির্মাণ (পিস বিল্ডিং) : তার সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ শান্তি বিনির্মাণের বিষয়টি বিশ্বব্যাপী গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছে। স্বল্পদিন হলো এ সংক্রান্ত কমিশন গঠিত হয়েছে, যা ইউএন পিস বিল্ডিং কমিশন নামে পরিচিত। বাংলাদেশ এর গুরুত্বপূর্ণ মিটিংসমূহে সভাপতিত্ব করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতার কারণে এ সংক্রান্ত সব কার্যক্রমের আলোচনায় বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে।
* বহুমাত্রিক নেতৃত্ব : নানামুখী জাতীয় ও বৈশ্বিক ইস্যুতে চ্যালেঞ্জ নিতে পিছপা নন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার অবিচল নেতৃত্বে বাংলাদেশে জাতিসংঘের বিভিন্ন কমিটি এবং অনেকগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থায় সভাপতি এবং সদস্য পদে নির্বাচিত হয়েছে। বিগত ছয় বছরে বাংলাদেশে কোনো একটি নির্বাচনেও পরাজিত হয়নি। সকল দেশ ও তাদের নেতাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ এবং তার নেতা শেখ হাসিনা।
* সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মডেল দেশ : জাতিসংঘ মহাসচিবের ভাষ্যমতে বাংলাদেশ এমডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কেবল স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যেই নয়, অনেকগুলো উন্নত দেশের চেয়েও বাংলাদেশের এমডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সাফল্য ব্যাপক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে এর সফল বাস্তবায়ন তদারক ও মূল্যায়ন করে থাকেন এবং প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা প্রদান করেন।
* ঝুঁকিপূর্ণ দেশসমূহের সুরক্ষা ও নেতৃত্ব দান : বর্তমানে বাংলাদেশ ৪৮টি স্বল্পোন্নত দেশের নেতা ও মুখপাত্র। তাই জাতিসংঘ তথা আন্তর্জাতিক ফোরামে এসব দেশের স্বার্থ রক্ষা এবং তাদের দাবি-দাওয়া আদায়ের নেতৃত্বও বাংলাদেশেরই। সর্বসম্মতভাবে বাংলাদেশ এই পদে নির্বাচিত হয়; বাংলাদেশের নেতা শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাই বাংলাদেশকে এই পদে আসীন করেছে। এলডিসি রাষ্ট্রসমূহের স্বার্থরক্ষায় তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
* ভিন্ন জীবনের মানুষের সমস্যাকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসা : বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণেই জাতিসংঘের সকল রাষ্ট্রের কাছে আজ অটিজমে আক্রান্ত শিশু ও অটিজম সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিবর্গের সমস্যাবলি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে। এ সংক্রান্ত বাংলাদেশের প্রস্তাব পৃথিবীর সব কটি রাষ্ট্রের অকুণ্ঠ সমর্থন লাভ করেছে। বিষয়টির প্রবক্তা হিসেবে বাংলাদেশের নাম আজ সব দেশ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।
* জলবায়ুর ঝুঁকি আক্রান্তদের সমস্যায় নেতৃত্ব : জাতিসংঘের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সক্রিয়ভাবে কাজ করে দেখিয়েছেন যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের দরিদ্র ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ঝুঁকি কতটা। এ সমস্যার কারণ খুঁজে আর কোনো মানুষ যেন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শরণার্থী না হয়, বাস্তুচ্যুত না হয় তার ব্যবস্থা করার জন্য জোরাল দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ। সম্পদশালী দেশগুলো সম্পদের অপব্যবহারের মাধ্যমে আজ পৃথিবীর পরিবেশের এই দশা করেছে, যদিও তাদের অবিমৃষ্যকারিতার ফল পেতে হচ্ছে স্বল্পোন্নত দেশগুলো, যারা হয়তো কোনোভাবে এই ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা জলবায়ু’র কারণে উদ্বাস্তু হওয়ার জন্য দায়ী নয়। অথচ তাদেরই সবচেয়ে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে। বাংলাদেশ মনে করে, এই অবস্থা হতে উত্তরণের দায় এবং দায়িত্ব উভয়ই উন্নত বিশ্বকে নিতে হবে। হয় তাদের এসব নানান প্রক্রিয়ায় করা পরিবেশ দূষণ বন্ধ করতে হবে; অথবা তাদের এমন কাজ করতে হবে যাতে যুদ্ধ-বিগ্রহ না বাধে বা মানুষ নিজের দেশ ছাড়তে বাধ্য না হয়। জলবায়ু ঝুঁকি ফোরাম (সিভিএফ) এবং জলবায়ু ঝুঁকিপ্রবণতা তদারকি (সিভিএম) গঠন করেছে বাংলাদেশ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এর প্রতিষ্ঠা করেন জাতিসংঘের ৬৭তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে।
* আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ আইনি সমাধান : শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অনন্য নজির স্থাপন করেছে। দীর্ঘদিন ধরে বিরোধপূর্ণ সমুদ্রসীমা নিয়ে প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের সাথে যে দ্বন্দ্ব চলে আসছিল সেই বিষয়ে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন সংক্রান্ত ট্রাইব্যুনালে (International Tribunal on the Law of the Seas-ITLOS) যাওয়ার যে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত তিনি গ্রহণ করেন, তারই ফলস্বরূপ বাংলাদেশ তার সমুদ্রসীমার ওপর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। অন্যদিকে প্রতিবেশী দুই রাষ্ট্র ভারত এবং মিয়ানমারও তাদের আইনগত ন্যায্য পাওনা পেয়েছে। কোনো সংঘাত বা যুদ্ধ ছাড়াই এহেন বিরোধ নিষ্পত্তির ঘটনা পৃথিবীতে বিরল।
* জাতিসংঘের মাধ্যমে অভিবাসীদের অধিকারের সুরক্ষা : অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষার জন্য নিরলস কাজ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সংক্রান্ত জাতিসংঘ কমিটিতে তিনি যথার্থভাবে তার বক্তব্য তুলে ধরেছেন এবং তার পক্ষে সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয়ছেন। অভিবাসী শ্রমিকের মানবাধিকার,  কাজের পরিবেশ, বেতন ও নিরাপত্তা এসব বিষয়ে নিশ্চিত করার জন্য সকল রাষ্ট্রের প্রতি তিনি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় এ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
* সাউথ-সাউথ অ্যান্ড ট্রায়াঙ্গুলার কো-অপারেশনের কণ্ঠস্বর : সাউথ-সাউথ সংক্রান্ত জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ের কমিটির সভাপতি বাংলাদেশ। আর সাউথ-সাউথের কণ্ঠস্বর হচ্ছেন শেখ হাসিনা। সম্প্রতি এই রাষ্ট্রসমূহের সাফল্য ব্যাপক, যার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দৃশ্যমান।
জাতিসংঘ সনদের মূল লক্ষ্যসমূহ বাস্তবায়ন
* প্রথমত : সহিষ্ণুতার চর্চা এবং ভালো প্রতিবেশী হিসেবে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান;
* দ্বিতীয়ত : আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার সাথে একতাবদ্ধ থাকা;
* তৃতীয়ত : এই নীতির প্রতি অবিচল থাকা যে শক্তি প্রয়োগ কোনোভাবে করা হবে না, একমাত্র সামষ্টিক স্বার্থ ছাড়া;
* চতুর্থত : বিশ্বের সকল মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক শক্তিসমূহকে কাজে লাগানো;
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সনদের এসব মূলনীতির আলোকে একটি সুন্দর, নিরাপদ ও শন্তিপূর্ণ পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছেন।

শ্রেণী:

৭ই মার্চের ভাষণ যুগ যুগ ধরে অনুপ্রেরণা দেবে

Posted on by 0 comment
36

মেমোরিয়াল ট্রাস্টের আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী

36উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ভয়াবহ অগ্নিসন্ত্রাস, মানুষ পুড়িয়ে হত্যা, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, নাশকতা, জঙ্গিবাদসহ অনেক প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করেই বাংলাদেশ আজ সারাবিশ্বের কাছে মর্যাদা পেয়েছে। বাঙালি জাতিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারেনি, পারবেও না ইনশাল্লাহ। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবেই।
গত ১২ মার্চ রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ উপলক্ষে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশের নতুন প্রজন্মকে উদ্দেশে করে বলেন, আজ নতুন প্রজন্মের মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আমরা বীরের জাতি। মুক্তিযুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছি। তাই আমরা প্রত্যেকে বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে চলব। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ আজও জাতিকে মাথা উঁচু করে চলার এবং যে কোনো পরিস্থিতিতে শত্রুকে মোকাবিলা করার অনুপ্রেরণা দেয়। যুগ যুগ ধরে তাই বঙ্গবন্ধুর এই যাদুকরি কালজয়ী ভাষণ জাতিকে অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছে।
মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সভাপতি শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে ‘বঙ্গবন্ধুর কালোত্তীর্ণ ভাষণ : প্রস্তুতি ও প্রভাব’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক আবুল মোমেন। আলোচনায় অংশ নেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের সভাপতি রামেন্দু মজুমদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মশিউর রহমান এবং ট্রাস্টের সদস্য সচিব শেখ হাফিজুর রহমান। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের প্রধান নির্বাহী মাসুরা হোসেন। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন দেশের খ্যাতনামা চিত্রশিল্পী হাশেম খান ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. শামসুজ্জামান খান। অনুষ্ঠানের শুরুতেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সেই বজ্রনির্ঘোষ ৭ই মার্চের ভাষণের রঙিন প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭ই মার্চের ভাষণ জাতিকে পথ দেখিয়ে গেছে। এই ভাষণের প্রত্যেকটি শব্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকেই আমাদের সেই চেতনাটা এনে দেয়। মাথা উঁচু করে পথ চলার মনোবল দেয়। যে কোনো অবস্থা মোকাবিলা করার, শত্রুকে দমন করার পথ শেখায়। তাই এই ভাষণের আবেদন কোনোদিন শেষ হবে না, শেষ হয়নি। ভাষণটি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর এই ভাষণের ওপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। তার কারণে একটি প্রজন্ম সত্য জানা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী কালজয়ী এই ঐতিহাসিক ভাষণের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ঐতিহাসিক এই ভাষণ মুক্তিযুদ্ধের পথের দিশারী, স্বাধীনতার মূলমন্ত্র। যুগ যুগ ধরে এই ভাষণ বাঙালি জাতিকে অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছে, যার আবেদন আজও বিন্দুমাত্র কমেনি। এই আবেদন কখনও শেষ হয় না, হবেও না। একটি মাত্র ভাষণে বঙ্গবন্ধু দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে স্বাধীনতার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন, যা সত্যিই এক বিরল ঘটনা। তিনি বলেন, পরাজিত পাকিস্তানের সাথে সংস্কৃতিসহ কোনো কিছুতেই এদেশের সাথে মিল ছিল না। তারা শুধু এদেশকে শোষণ, শাসন করছিল। তাই বঙ্গবন্ধু প্রথম থেকেই এদেশকে স্বাধীন করতে গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার সংগ্রাম করে গেছেন। আর ৭ই মার্চের একটি মাত্র ভাষণে স্বাধীনতার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। আর তার পথ বেয়েই আসে আমাদের স্বাধীনতা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের আগে পাকিস্তানিরা ভেবেছিল বঙ্গবন্ধু একটা কিছু বলবেন, যার সূত্র ধরে তারা এদেশে গণহত্যা চালাবেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর যাদুকরী এই ভাষণে পাকিস্তানিরাও ভিরমি খেয়ে যান। বঙ্গবন্ধু তার কালজয়ী ভাষণে একদিকে যেমন বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতাযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করলেন, অন্যদিকে শত্রুরা এ ব্যাপারে সবকিছু বুঝতেই পারল না। পৃথিবীর আর কোনো ভাষণ যুগ যুগ ধরে কোনো জাতিকে অনুপ্রেরণা বা নতুন করে উজ্জীবিত করতে পারেনি, যেটি এখনও করে যাচ্ছে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ।
বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ভাষণের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে তার মা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভাষণ দেওয়ার আগে থেকে দলের নেতাসহ অনেকে অনেক পয়েন্ট লিখে দিচ্ছে, বলছে এটি না বললে হবে না। বস্তায় বস্তায় কাগজ জমা পড়তে লাগল ৩২ নম্বরে। কিন্তু আমার মায়ের দূরদৃষ্টির কোনো তুলনা হয় না। যখনই কোনো বড় কিছু ঘটনা ঘটে, তার আগে আমার মা বঙ্গবন্ধুকে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে অনুপ্রেরণা দিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের আগেই এদেশের নাম বাংলাদেশ, লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা এবং জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ সবই নির্ধারণ করেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু।
বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা হিসেবে ওই সময় পাশে থেকে বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের পরামর্শ প্রদানের কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ৭ই মার্চের ভাষণ দেওয়ার আগে আমার মা পিতা বঙ্গবন্ধুকে কিছু সময়ের জন্য আলাদা করে নিয়ে ঘরে গেলেন। আমি তখন বঙ্গবন্ধুর মাথার কাছে বসা। মা বঙ্গবন্ধুকে বললেন, ‘তোমাকে অনেকেই অনেক কথা বলবে। সামনে লাখ লাখ মানুষ থাকবে। তাই কারোর কোনো কথা শোনার কোনো প্রয়োজন নেই। দেশের মানুষের জন্য তোমার যা মনের কথা সেটিই ভাষণে বলবে।’ তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু ঠিকই এক যাদুকরী ভাষণের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ এবং গেরিলাযুদ্ধের জন্য যা যা করার তারই সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশনা দিলেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধ করে ছিনিয়ে আনে আমাদের স্বাধীনতা।
বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা পরবর্তী ইতিহাস বিকৃতির মহোৎসবের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি যখন ’৮১ সালে দেশে ফিরে আসি তখন থেকেই বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বাজানো নিষিদ্ধ ছিল। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজাতে গিয়ে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীকে নির্যাতনসহ জীবন দিতে হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু বলে গেছেন, বাঙালি জাতিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না। বাঙালি জাতিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না ইনশাল্লাহ।
তিনি বলেন, পরাজিত শত্রুরা একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে। এরপর থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা হয়, চেতনাকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র চলে। বঙ্গবন্ধুর নাম-নিশানা মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র চলে। ওই সময় একটি প্রজন্ম জানতেই পারেনি মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস। একাত্তরের পরাজিত শত্রুদের পদলেহন করে স্বাধীনতার চেতনাকে ধ্বংস করার চেষ্টা দেশবাসী দেখেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের নতুন প্রজন্মের মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তারা দেশের সঠিক ইতিহাস জানতে পারছে। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে বিজয়ী বীরের জাতি। আমরা মাথা নত করে চলব না। সারাবিশ্বের সামনে মাথা উঁচু করে চলব। বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক সেই ভাষণে সেই পথই আমাদের দেখিয়ে গেছেন। আমার বিশ্বাস, দেশের নতুন প্রজন্ম বারবার জাতির জনকের সেই কালজয়ী ভাষণটি শুনে দেশপ্রেমে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশকে গড়ে তুলবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা আমরা গড়ে তুলবই।
মূল প্রবন্ধে লেখক-সাংবাদিক আবুল মোমেন বলেন, কালোত্তীর্ণ শিল্পকর্ম ছিল বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ। বঙ্গবন্ধুর অপূর্ব বাগ্মীতার এক অমর কীর্তি। এই ভাষণ আমাদের মুক্তির মন্ত্র, স্বাধীনতার প্রেরণা। একটিমাত্র ভাষণে বঙ্গবন্ধু চিরদিনের পদানত থাকা বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন, স্বাধীনতাকামী জনগণকে জাগ্রত করেছেন। তাই বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ আজও দেশের মানুষের কাছে সর্বজনীন প্রতীক। ভাষণটি শুনলে আজও দেশের মানুষ অনুপ্রাণিত হয়।

জাতির পিতার জন্মদিন শিশু দিবসে টুঙ্গিপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী
যতদূর পার শিক্ষা অর্জন কর
শিশু-কিশোরদের মন দিয়ে পড়াশোনা করা, মা-বাবা ও শিক্ষকদের কথা শোনা এবং বড়দের মান্য করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তোমরা যতদূর পারো শিক্ষা অর্জন করবে। শিক্ষা হবে তোমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই শিক্ষা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। তোমরা এই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে দেশ গড়ে তুলবে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলবে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, মেধা-জ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তিগত জ্ঞানÑ সব দিকেই তোমাদের মনোনিবেশ করতে হবে। তিনি বলেন, জাতির পিতাও চেয়েছিলেন এদেশের প্রতিটি শিশু শিক্ষিত হোক। আমরা সেই চেষ্টা করছি। প্রত্যেকটা শিশুর মাঝে সুপ্ত প্রতিভা রয়েছে, তা বিকাশের সুযোগ করে দিচ্ছি।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৭তম জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে গত ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত শিশু সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন শিশু রাফিয়া তুর জামান। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন শিশু ও মহিলাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি এমপি। স্বাগত বক্তব্য প্রদান করে শিশু ঋত্বিক জিদান। এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ভাই ছোট্ট শিশু শেখ রাসেলের স্মৃতিচারণ করে শেখ হাসিনা বলেন, মাত্র ৫৪ বছর বয়সে আমার বাবাকে হত্যা করা হয়েছে। রাসেলকে হত্যা করা হয়েছে ১০ বছর বয়সে। আজ তাদের ছবির দিকে তাকিয়ে ভাবি, বাবা বেঁচে থাকলে আজকে দেখতে কেমন হতেন। রাসেল বেঁচে থাকলে দেখতে কেমন হতো!
জাতির পিতার আদর্শ নিয়ে শিশুদের এগিয়ে চলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে আমরা উন্নত সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ে তুলব, বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াব। শিশু-কিশোররাই হবে সোনার বাংলা গড়ার প্রধান শক্তি।
শিশু সমাবেশ শেষে প্রধানমন্ত্রী হাতের লেখা ও ৭ই মার্চের ভাষণ প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন। পরে শিশু ও মহিলা অধিদফতরের উদ্যোগে টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়া উপজেলার দুস্থ নারীদের মাঝে সেলাই মেশিন বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
এরপর গোপালগঞ্জের শিশু শিল্পীরা ‘শুধু তোমার জন্য’ শীর্ষক কাব্য নৃত্য গীতি আলেখ্য পরিবেশন করে। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, সংসদ সদস্য, তিন বাহিনী প্রধান ও ঊর্ধ্বতন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা ছাড়াও বিপুল সংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও দর্শক এই অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী সমাধিসৌধ কমপ্লেক্সে জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র আয়োজিত দিনব্যাপী গ্রন্থ মেলার উদ্বোধন করেন।
বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা : বাঙালি জাতির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি জন্মদিনের শ্রদ্ধা জানাতে সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধি সৌধে আসেন। ১০টায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বঙ্গবন্ধুর সমাধি সৌধে পৌঁছলে প্রধানমন্ত্রী তাকে স্বাগত জানান। পরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ধীর পায়ে সমাধি সৌধের বেদীর দিকে এগিয়ে যান। সকাল ১০টা ২০ মিনিটে প্রথমে রাষ্ট্রপতি গোটা জাতির পক্ষ থেকে স্বাধীনতার রূপকার বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান বঙ্গবন্ধু-কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ বেদী পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকার পর পবিত্র ফাতেহা পাঠ করেন। তারা বঙ্গবন্ধুর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও মোনাজাত করেন।

শ্রেণী: