খুনি কাশেম ফাঁসির অপেক্ষায়

36

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতায় ছাত্রসংঘের বাছাই করা সদস্যদের নিয়ে গঠিত সশস্ত্র আলবদর বাহিনীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের কমান্ডার হিসেবে মীর কাশেম যেসব মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটান, তা উঠে এসেছে ট্রাইব্যুনাল ও আপিল বিভাগের রায়ে।
36উত্তরণ প্রতিবেদন: একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মৃত্যুদ-প্রাপ্ত বদর বাহিনীর কমান্ডার, চট্টগ্রামের বাঙালি খান, জামাতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাশেম আলীর ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ খারিজ করে দেন গত ৩০ আগস্ট।
আইনি লড়াইয়ে সর্বশেষ ধাপ পার হওয়ার ফলে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামাতে ইসলামীর এই নেতার মৃত্যুদ- কার্যকরে আর কোনো আইনি বাধা থাকল না। সামনে এখন ফাঁসির দড়ি। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ ৩০ আগস্ট এক শব্দের এই রায় ঘোষণা করেন। সকাল ৯টা ১ মিনিটে এজলাসে এসে প্রধান বিচারপতি শুধু বলেন, রিভিউ পিটিশন ইজ ডিসমিস। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেনÑ বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসাইন হায়দার ও বিচারপতি বজলুর রহমান। এই ঘোষণার সাথে সাথেই এজলাস কক্ষে উপস্থিত আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থী জনগণের সকল উদ্বেগের অবসান ঘটে। কারণ, বহাল রইল জামাত নেতা মীর কাশেম আলীর মৃত্যুদ-ের চূড়ান্ত রায়।
২০১৪ সালের ২ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া প্রাণদ-ের সাজাই তাতে বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। অবশেষে রিভিউয়ের রায়েও তা বহাল রাখা হয়েছে।
মীর কাশেমের মামলাটি চূড়ান্ত রায় হলো আপিল বিভাগের সপ্তম মামলা। ৬টি রায়ের মধ্যে ৫টিতে জামাতের দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লা ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, জামাতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী, জামাতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। আপিল বিভাগের আরেক রায়ে জামাতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদ- দেওয়া হয়েছে। সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হওয়ার পর দুই পক্ষেই রিভিউ আবেদন করেছে। শুনানি চলার মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধকালীন জামাত আমির গোলাম আযম ও বিএনপির সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীমের মৃত্যু হওয়ায় তাদের আপিলের নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।
যে অভিযোগে প্রাণদ- : অভিযোগ-১১ : ১৯৭১ সালে ঈদুল ফিতরের পরের যে কোনো একদিন মীর কাশেমের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা চট্টগ্রাম শহরের কোনো এক অজ্ঞাত স্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে অপহরণ করে আন্দরকিল্লার ডালিম হোটেলে নিয়ে যায়। তাকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত সেখানে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের ফলে জসিমের মৃত্যু হলে আরও পাঁচ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির লাশসহ তার মৃতদেহ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
বদর কমান্ডার থেকে শীর্ষ নেতা : আসামি মীর কাশেম আলী আলবদর বাহিনীর তৃতীয় প্রধান ছিলেন। ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মীর কাশেম ১৯৮৫ সাল থেকে জামাতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ অর্থাৎ মজলিসে শূরার সদস্য হিসেবে দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিলেন। এই মামলার শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ মীর কাশেমকে আখ্যায়িত করেছে পাকিস্তানের খান সেনাদের সাথে মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত হওয়া ‘বাঙালি খান’ হিসেবে, যিনি সে সময় জামাতের তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতায় ছাত্রসংঘের বাছাই করা সদস্যদের নিয়ে গঠিত সশস্ত্র আলবদর বাহিনীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের কমান্ডার হিসেবে মীর কাশেম যেসব মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটান, তা উঠে এসেছে ট্রাইব্যুনাল ও আপিল বিভাগের রায়ে।
সাবেক এমপি সাখাওয়াতের মৃত্যুদ-, ৭ জনের আমৃত্যু কারাদ-
মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিএনপি ও জামাতের সাবেক এমপি সাখাওয়াত হোসেনকে মৃত্যুদ- ও সাতজনকে আমৃত্যু কারাদ-ের আদেশ দিয়ে রায় ঘোষণা করেছেন ট্রাইব্যুনাল। গত ১১ আগস্ট বিচারপতি আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই রায় ঘোষণা করেন।
আমৃত্যু কারাদ- পাওয়া সাতজন হলেনÑ মো. বিল্লাল হোসেন বিশ্বাস, মো. ইব্রাহিম হোসাইন, শেখ মো. মজিবুর রহমান, এমএ আজিজ সরদার, আবদুল আজিজ সরদার, কাজী ওহিদুল ইসলাম ও মো. আবদুল খালেক মোড়ল। দ-িত আটজনের মধ্যে সাখাওয়াত হোসেন ও মো. বিল্লাল হোসেন বিশ্বাস গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। অন্যরা পলাতক। ১০ আগস্ট রায় ঘোষণার সময় কারাবন্দি দুজনকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। এই মামলার অভিযুক্ত আসামি ছিলেন মোট ৯ জন। এক আসামি লুৎফর রহমান মোড়ল গত মে মাসে কারাবন্দি অবস্থায় মারা যাওয়ায় তাকে মামলার কার্যক্রম থেকে বাদ দেন ট্রাইব্যুনাল।
ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, মৃত্যুদ-প্রাপ্ত সাখাওয়াত হোসেনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে বা গুলি করে মৃত্যুদ- কার্যকর করতে হবে। তবে কারাবন্দি আসামি সাখাওয়াত ও বিল্লাল ৩০ দিনের মধ্যে এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টে আপিল করতে পারবেন। পলাতকরা আপিল করতে চাইলে ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করতে হবে। পাশাপাশি পলাতকদের গ্রেফতারে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশ মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নিতেও বলা হয় রায়ে।
দ-প্রাপ্ত যশোরের কেশবপুরের ওই আট রাজাকারের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হত্যা, ধর্ষণ, আটক, অপহরণ, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের ৫টি অভিযোগের ওপর বিচার সম্পন্ন করেন ট্রাইব্যুনাল। মামলার অভিযোগ নম্বর-২-এ অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও হত্যার দায়ে সাখাওয়াতকে মৃত্যুদ- ও বাকি সাতজনকেই আমৃত্যু কারাদ- দেন ট্রাইব্যুনাল। রাষ্ট্রপক্ষে আনা অভিযোগ নম্বর-৪-এ অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগে সাখাওয়াতকে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রতিটি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় প্রত্যেক আসামি বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ-ের সাজা পেয়েছেন।
৭৬৮ পৃষ্ঠা রায়ের সারাংশ পড়ে শোনান ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ারুল হক ও বিচারপতি শাহিনুর ইসলাম।
যে অভিযোগে যত সাজা মৃত্যুদ- পাওয়া অভিযোগ : ২ ও ৪ নম্বর অভিযোগে সাখাওয়াতকে মৃত্যুদ- দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। ২ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, কেশবপুর উপজেলার চিংড়া গ্রামের চাঁদতুল্য গাজী ও তার ছেলে আতিয়ারকে অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও হত্যা করেন অভিযুক্ত আট রাজাকার। সাক্ষ্য প্রমাণে এই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আটজনকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয় রায়ে। এই অভিযোগে সাখাওয়াতকে মৃত্যুদ- ও অন্য সাত আসামিকে আমৃত্যু কারাদ- দেওয়া হয়।
৪ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, সাখাওয়াতের নেতৃত্বে কেশবপুরের হিজলডাঙার আ. মালেক সরদারকে অপহরণ করে নির্যাতন ও খুন করা হয়। সাখাওয়াত, মো. ইব্রাহিম, এমএ আজিজ সরদার, আবদুল আজিজ সরদার ও মো. আবদুল খালেক মোড়লের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। ফলে সাখাওয়াতকে মৃত্যুদ- ও বাকি চারজনকে অমৃত্যু কারাদ-ে দ-িত করা হয়।
বিভিন্ন মেয়াদে সাজা : এই আট রাজাকারের মধ্যে সাখাওয়াত হোসেন, মো. ইব্রাহিম হোসাইন, এমএ আজিজ সরদার ও আবদুল আজিজ সরদারের বিরুদ্ধে আনা ১ নম্বর অভিযোগ ছিল ধর্ষণের। অভিযোগে বলা হয়, যশোরের কেশবপুর উপজেলার বোগা গ্রামের এক নারীকে অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও ধর্ষণ করেন এই চার রাজাকার। বিচারে এই অভিযোগটি প্রমাণিত হওয়ায় চারজনকেই ২০ বছর করে কারাদ-ের আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
৩ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, কেশবপুরের চিংড়া গ্রামের মো. নুরুদ্দিন মোড়লকে অপহরণ, আটক, নির্যাতন করেন সাখাওয়াত হোসেন, শেখ মো. মজিবুর রহমান, মো. ইব্রাহিম হোসাইন ও মো. আবদুল খালেক মোড়ল। মো. ইব্রাহিম হোসাইনের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেন ট্রাইব্যুনাল। বাকি তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের ১০ বছর করে কারাদ-ে দ-িত করেন ট্রাইব্যুনাল। ৫ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, মুক্তিযোদ্ধাদের সোর্স কেশবপুরের মহাদেবপুর গ্রামের মিরন শেখকে অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও ওই গ্রামে অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠন করেন সাখাওয়াত হোসেন, মো. ইব্রাহিম হোসাইন, এমএ আজিজ সরদার, আবদুল আজিজ সরদার ও মো. আবদুল খালেক মোড়ল। এই অভিযোগ প্রমাণ করতে রাষ্ট্রপক্ষ সক্ষম হয়েছে বলে রায়ে পাঁচজনকেই ১৫ বছর করে কারাদ- দেওয়া হয়।
এক নজরে সাখাওয়াত : কেশবপুর থানার হিজলডাঙা গ্রামের মৃত ওমর আলী ও আনোয়ারা বেগমের ছেলে সাখাওয়াত হোসেন। এলাকায় তিনি মাওলানা সাখাওয়াত হিসেবেই অধিক পরিচিত। ১৯৫৪ সালে জন্ম নেওয়া সাখাওয়াত ১২ বছর বয়সেই যোগ দেন জামাতের তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘে। ১৯৬৯ সালে ফাজিল ও ১৯৭২ সালে কামিল ডিগ্রি নেন এই রাজাকার। ১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ থেকে এমএ পাস করার পর শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে। ১৯৮১ সালে অ্যাকাউনট্যান্ট জেনারেল (এজি) অফিসে চাকরি নেন সাখাওয়াত। পাঁচ বছর পর জামাতে ইসলামীর সদস্য হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামাতে ইসলামীর হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে যশোর-৬ আসন থেকে এমপি বনে যান এই রাজাকার নেতা। এরপর জামাত ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ১৯৯৬ সালেও এমপি হন। মাওলানা সাখাওয়াত নামে বেশি পরিচিত এই রাজনীতিবিদ বিভিন্ন সময় এলডিপি ও পিডিপির রাজনীতির সাথেও যুক্ত ছিলেন। ২০০৮ সালে সাখাওয়াত যোগ দেন জাতীয় পার্টিতে। ২০১৪ সালের নির্বাচনেও যশোর-৬ আসন থেকে তিনি জাতীয় পার্টির মনোনয়ন পেয়েছিলেন। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কেশবপুরে রাজাকারের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার সহাযোগী হিসেবে দ-িত সাত রাজাকার নানা অপকর্ম পরিচালনা করেন একাত্তরে।
গ্রন্থনা : রাজীব পারভেজ

শ্রেণী:

মীর কাসেমের মৃত্যু পরোয়ানা

Posted on by 0 comment
07

আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ
07উত্তরণ প্রতিবেদন: একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের অন্যতম আলবদর বাহিনীর কমান্ডার মীর কাসেম আলীর মৃত্যু পরোয়ানা গত ৬ জুন রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছানো হয়েছে। এবং ৭ জুন কাসিমপুর কারাগারে অবস্থানরত কাসেম আলীকে তা পড়ে শোনানো হয়। তার মৃত্যুদ- (ফাঁসি) বহাল রেখে আপিল আবেদনের পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি প্রকাশের পর বিচারিক আদালত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে এই মৃত্যু পরোয়ানা জারি করা হয়। এর আগে গত ৬ জুন দুপুরে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ পূর্ণাঙ্গ লিখিত রায়ে স্বাক্ষর করেন। বিকেলে ২৪৪ পৃষ্ঠার রায়টি সুপ্রিমকোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে প্রধান বিচারপতি ছাড়াও স্বাক্ষর করেছেন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মোহাম্মদ বজলুর রহমান। যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দ-িতদের মধ্যে এ নিয়ে মোট সাতজনের আপিলের নিষ্পত্তি শেষে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলো।
গত ৮ মার্চ চট্টগ্রামের আলবদর বাহিনীর কমান্ডার মীর কাসেমের আপিলের সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করেছিলেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিমউদ্দিন আহমেদসহ ছয়জনকে অপহরণের পর চট্টগ্রাম শহরের আন্দারকিল্লায় ডালিম হোটেলে নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যার দায়ে মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদ- বহাল রাখা হয়। বর্তমানে তিনি জামাতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ও দলটির অর্থের অন্যতম জোগানদাতা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে জামাতে ইসলামীও একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত। প্রায় তিন মাস পর মীর কাসেমের আপিল আবেদনের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হলো। এর ফলে যুদ্ধাপরাধী আলবদর কমান্ডার মীর কাসেম এখন ফাঁসির মঞ্চের কাছাকাছি। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হওয়ায় রিভিউ আবেদন করতে পারবেন তিনি।
ট্রাইব্যুনাল থেকে কারাগারে : ৬ জুন বিকেল সাড়ে ৩টায় সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয় থেকে পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি পুরনো হাইকোর্ট ভবনে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সব আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে বিচারপতি আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ সন্ধ্যা ৭টায় মীর কাসেমের মৃত্যু পরোয়ানায় স্বাক্ষর করেন। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য হলেনÑ বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলাম ও বিচারপতি মোহাম্মদ সোহরাওয়ার্দী। মৃত্যুদ- কার্যকরের জন্য এরপর আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করা হয়।
জার্মানিতে ৯৪ বছরের নাৎসি রক্ষীর জেল
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বন্দিশিবিরের রক্ষী ৯৪ বছর বয়সী রাইনহোল্ড হ্যানিংকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে কারাদ- দিয়েছেন জার্মানির একটি আদালত। বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে আউশভিৎস ক্যাম্পে অন্তত ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষকে হত্যায় সহযোগিতার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় তাকে পাঁচ বছরের কারাদ- দেওয়া হয়। গত বছরও ওই শিবিরের এক কর্মীকে কারাদ- দেওয়া হয়।
নাৎসি অধিকৃত পোল্যান্ডের আউশভিৎস-বারকেনাউ ক্যাম্পে ১৯৪০ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে ১০ লাখের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়, যাদের অধিকাংশই ইউরোপীয় ইহুদি। এ ছাড়া রোমা (জিপসি) প্রতিবন্ধী, সমকামী, ভিন্নমতাবলম্বীসহ পোলিশ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বন্দিদেরও হত্যা করা হয় এই ক্যাম্পে। আর ১৯৪২ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত এই বন্দিশিবিরে রক্ষীর দায়িত্বে ছিলেন হ্যানিং। সেখানে কী ঘটছিল তা জানতেন বলে স্বীকার করেছেন তিনি।
জার্মানির উত্তরাঞ্চলীয় ডেটমোল্ড শহরে গত ফেব্রুয়ারিতে হ্যানিংয়ের বিচার শুরু হয়। আর রায় ঘোষণা করা হয় ১৭ জুন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাইনহোল্ড হ্যানিং ১৯৪০ সালে ১৮ বছর বয়সে স্বেচ্ছায় নাৎসিদের এসএস বাহিনীতে যোগ দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে তিনি পূর্ব ইউরোপে লড়াইয়ে অংশ নেন। ১৯৪২ সালের জানুয়ারিতে তাকে আউশভিৎস বন্দিশিবিরে বদলি করা হয়। সেখানে ১৯৪৪ সালের জুন পর্যন্ত রক্ষী হিসেবে কাজ করেন তিনি। দখলকৃত পোল্যান্ড থেকে বন্দিদের নিয়ে আসার পর হ্যানিং তাদের গ্রহণ করতেন এবং অনেক বন্দিকে তিনি গ্যাস চেম্বারে পথ দেখিয়ে নিয়ে যান বলে। তবে হ্যানিংয়ের আইনজীবীরা আদালতে বলেন, তাদের মক্কেল ব্যক্তিগতভাবে কখনও কাউকে হত্যা বা নির্যাতন করেন নি। এই যুদ্ধাপরাধের বিচারে কারও বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণের জন্য আগে জার্মান প্রসিকিউটরদের আসামির সরাসরি হত্যাকা-ে সম্পৃক্ততার তথ্য-প্রমাণ আদালতে হাজির করতে হতো। তবে ২০১১ সালে জন ডেমিয়ানুকের বিরুদ্ধে রায়ে বিচারক বলেন, নাৎসি অধিকৃত পোল্যান্ডে বন্দিশিবিরের কর্মী হিসেবে তার তৎপরতাই গণহত্যায় সম্পৃক্ততার প্রমাণ দেয়।

শ্রেণী:

নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

Posted on by 0 comment
33

‘মানবতাবিরোধী গণহত্যার মতো অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত থাকার অপরাধে নিজামী দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তার আইনজীবী শুধু গলা বাঁচাতে দ- কমানোর আবেদন করেছিলেন।’

33

ফাঁসির রশিতে বদর প্রধান

উত্তরণ প্রতিবেদন: একাত্তরে মাতৃভূমির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার পরও যুদ্ধাপরাধী কুখ্যাত আলবদর বাহিনীর প্রধান মতিউর রহমান নিজামী স্বাধীন দেশে আলো-বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশেও তিনি মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর আমির হয়েছেন, জোট সরকারের মন্ত্রী হয়েছেন। সদর্পে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের কথা অস্বীকার করেছেন। সাড়ে চার দশক ধরে বুকভরা কষ্ট আর বেদনা নিয়ে সেই দর্প দেখেছে জাতির সূর্যসন্তান হাজারও মুক্তিযোদ্ধা, ন্যায়বিচার প্রত্যাশী স্বজন হারানো মানুষ ও নতুন প্রজন্মের তরুণরা। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটল, জাতি কলঙ্কমুক্ত হলো, শহীদ স্বজন হারানো মানুষ ন্যায়বিচারের আস্বাদ পেল, বুদ্ধিজীবী হত্যার কলঙ্ক থেকে দায়মুক্তি ঘটল। গত ১০ মে দিবাগত রাত ১২টা ১০ মিনিটে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে যুদ্ধাপরাধী নিজামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হলো। পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মিত স্থায়ী ফাঁসির মঞ্চে ণ্ড কার্যকর করে তাকে ২০ মিনিট ঝুলিয়ে রাখা হয়। ১২টা ৩০ মিনিটে ফাঁসির মঞ্চ থেকে নামানোর পর চিকিৎসক নিজামীর মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
রিভিউর পূর্ণাঙ্গ রায় : নিজামীর দোষ স্বীকার
মানবতাবিরোধী গণহত্যার মতো অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত থাকার অপরাধে নিজামী দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তার আইনজীবী শুধু গলা বাঁচাতে ণ্ড কমানোর আবেদন করেছিলেন। এতেই প্রমাণিত হয়, নিজামী পরোক্ষভাবে নিজের দোষ স্বীকার করে নিয়েছেন। সুতরাং, নিজামী এসব অপরাধে তার সম্পৃক্ততার দায় এড়াতে পারেন না। আপিলের রায়ে মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে করা একাত্তরে আলবদর বাহিনীর প্রধান যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামীর পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ করে পূর্ণাঙ্গ রায়ে এমন পর্যবেক্ষণই উঠে এসেছে। গত ৯ মে ২২ পৃষ্ঠার এই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়।
গত ৫ মে আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে করা পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) আবেদন খারিজ করে নিজামীর ফাঁসি বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের বেঞ্চ এই রায় দেন। বেঞ্চের অন্য তিন সদস্য হলেনÑ বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা, নিজ এলাকায় গণহত্যা এবং ধর্ষণের দায়ে তাকে মৃত্যুণ্ড দেওয়া হয়েছিল। বিচার ও দণ্ড কার্যকরের সময় তিনি জামাতে ইসলামীর প্রধান বা আমির পদে ছিলেন। এই প্রথম এমন এক যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি হতে যাচ্ছে, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘ডেথ স্কোয়াড’ হিসেবে কুখ্যাত আলবদর বাহিনীর প্রধান; কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের একটি রাজনৈতিক দলেরও প্রধান। অবশ্য সেই রাজনৈতিক দল জামাতে ইসলামীও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে চিহ্নিত। যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামান ও কাদের মোল্লার শাস্তি ফাঁসি কার্যকরের সময় জামায়াতে ইসলামীর যথাক্রমে সেক্রেটারি জেনারেল ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের পদে ছিলেন।
৯ মে আপিল বিভাগে রিভিউ খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, ‘আলবদর প্রধান হিসেবে ওই বাহিনীর সাথে মতিউর রহমান নিজামী নিজেই শুধু অংশগ্রহণ করেন নি; বরং দলের নেতা-কর্মীদের উৎসাহিত করেছেন। আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে রিভিউর নথি পর্যালোচনা করেছি। কিন্তু রিভিউ আবেদন গ্রহণ করার মতো কোনো আইনি যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি।’
মতিউর রহমান নিজামী যে ৩টি অপরাধে মৃত্যুদ-াদেশ পেয়েছিলেন, সেই ৩টি অভিযোগেই শুধু রিভিউ করেছেন এবং দ- কমানোর আবেদন করেছেন। কিন্তু রিভিউ আবেদন গ্রহণ করার মতো ব্যতিক্রমী কোনো যুক্তি পাওয়া যায়নি; বরং বুদ্ধিজীবী হত্যার সাথে তার সরাসরি অংশগ্রহণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ কারণে তাকে পূর্ণাঙ্গ রায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
রায়ে বলা হয়েছে, নিজামী এমন কোনো আইনি যুক্তি দিতে পারেন নি, যাতে রায়টি পুনর্বিবেচনায় আসতে পারে। এতে আরও বলা হয়, আপিল বিভাগ নিজামীকে ৫টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন ও সাজা বহাল রাখেন। এর মধ্যে নিজামীর আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ৩টি অভিযোগে (২, ৬ ও ১৬) আপিলের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন।
রিভিউ খারিজের রায়ে আরও বলা হয়েছে, ওই সময় পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি হিসেবে নিজামী আলবদর বাহিনী গঠন করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি নিজে ওই বাহিনীর নেতা ও কমান্ডার ছিলেন। নিজামী শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাই করেন নি, পাকিস্তান সেনাবাহিনীকেও সহায়তা করেছেন। তিনি আলবদর বাহিনীর কার্যক্রমের প্রশংসা করেছেন এবং তাদের উৎসাহিত করেছেন। এসব বিষয় ট্রাইব্যুনাল ও আপিলের রায়েও উঠে এসেছে।
তা ছাড়া নিজামীকে যেসব অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে, তার মধ্যে পাবনা জেলার দুটি থানার বেশ কয়েকটি গ্রামে গণহত্যার মতো ঘটনা রয়েছে। অন্য অভিযোগে রাজধানীর নাখালপাড়া এমপি হোস্টেলে বদি, রুমি, জুয়েল ও আজাদকে হত্যায় তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। কিন্তু এসবের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদনে কোনো যুক্তি দেখাতে পারেন নি বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই আদালত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, নিজামী গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে নিজের সম্পৃক্ততার কথা পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন। আমরা রিভিউ আবেদনের পক্ষে কোনো উপযুক্ত যুক্তি খুঁজে পাইনি। তাই আবেদনটি খারিজ করা হলো।
দুই সহোদরসহ ৪ রাজাকারের মৃত্যুদ-, আমৃত্যু কারাদ- ১
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, অপহরণ, নির্যাতনের, মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের সাত অভিযোগে কিশোরগঞ্জের দুই সহোদর অ্যাডভোকেট শামসুদ্দিন আহম্মেদ ও ক্যাপ্টেন (অব.) নাসির উদ্দিন আহম্মেদসহ চার রাজাকারকে মৃত্যুদ- ও এক রাজাকারকে আমৃত্যু কারাদ- প্রদান করেছেন ট্রাইব্যুনাল। চেয়ারম্যান বিচারপতি এম আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্য বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গত ৩ মে এই রায় ঘোষণা করেছেন। ট্রাইব্যুনাল বলেন, মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামিদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে অথবা গুলি করে (ফায়ারিং স্কোয়াড) দ- কার্যকর করা যাবে। পাশাপাশি পলাতকদের গ্রেফতারে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশ মহাপরিদর্শককে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নিতেও বলা হয়। প্রসিকিউশন পক্ষ জন্মদিনে শহীদ জননীকে উৎসর্গ করেছেন যুদ্ধাপরাধীর দ-ের রায়। পাঁচ যুদ্ধাপরাধীর মধ্যে ফাঁসির আসামি কিশোরগঞ্জের আইনজীবী শামসুদ্দিন আহম্মেদই কেবল রায়ের সময় কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। শামসুদ্দিনের ভাই সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন মো. নাসিরউদ্দিন আহমেদ, রাজাকার কমান্ডার গাজী আবদুল মান্নান, আজহারুল ইসলাম ও হাফিজউদ্দিন মামলার শুরু থেকেই পলাতক রয়েছেন। এদের মধ্যে পলাতক আজহারুলকে আমৃত্যু কারাদ- দিয়েছেন আদালত; বাকিদের দেওয়া হয়েছে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- অথবা গুলির মাধ্যমে মৃত্যুদ- কার্যকর করা। একাত্তরে এই পাঁচ আসামি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সহযোগিতায় গঠিত রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এটি ২৩তম রায়।
যত অভিযোগ : কিশোরগজ্ঞের পাঁচ রাজাকারের বিরুদ্ধে ৭টি অভিযোগ আনা হয়। সেগুলো হলোÑ
অভিযোগ-১ : ১৯৭১ সালের ১২ নভেম্বর দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ থানার বিদ্যানগর ও আয়লা গ্রামের মোট আটজনকে হত্যা ও একজনকে আহত করা।
অভিযোগ-২ : ১৩ নভেম্বর আয়লা গ্রামের মিয়া হোসেনকে হত্যা।
অভিযোগ-৩ : একই উপজেলার মো. আবদুল গফুরকে অপহরণ করে ২৬ সেপ্টেম্বর খুদির জঙ্গল ব্রিজে নিয়ে হত্যা।
অভিযোগ-৪ : ২৩ আগস্ট করিমগঞ্জ উপজেলা ডাকবাংলোতে শান্তি কমিটির কার্যালয়ে আতকাপাড়া গ্রামে মো. ফজলুর রহমান মাস্টারকে অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যা।
অভিযোগ-৫ : ৭ সেপ্টেম্বর রামনগর গ্রামের পরেশ চন্দ্র সরকারকে হত্যা।
অভিযোগ-৬ : ২৫ আগস্ট পূর্ব নবাইদ কালিপুর গ্রামে আবু বক্কর সিদ্দিক ও রুপালিকে অপহরণ করে নির্যাতন ও হত্যা।
অভিযোগ-৭ : ১৫ সেপ্টেম্বর আতকাপাড়া গ্রামে আক্রমণ করে ২০-২৫টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ।
মহিবুরের মৃত্যুদ-, মজিবুর ও রাজ্জাকের আমৃত্যু কারাদ-
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে হবিগঞ্জের মহিবুর রহমানকে (৬৫) মৃত্যুদ-াদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সাথে মহিবুরের সহোদর মজিবুর রহমান (৬০) এবং চাচাতো ভাই আবদুর রাজ্জাককে (৬৩) আমৃত্যু কারাদ-াদেশ দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল গত ১ জুন এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলাম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ারদী।
আসামির কাঠগড়ায় তিন আসামির উপস্থিতিতে রায় ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল। রায়ে বলা হয়, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা ৪টি অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম অভিযোগ একাত্তরে হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা আকল আলী ও রজব আলীকে হত্যা করে লাশ গুম করার দায়ে মহিবুরকে মৃত্যুদ-াদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। একই অপরাধে মজিবুর ও রাজ্জাককে আমৃত্যু কারাদ-াদেশ দেওয়া হয়।
বাকি ৩টি অভিযোগে তিন আসামিকে মোট ৩৭ বছরের কারাদ-াদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে দ্বিতীয় অভিযোগ ছিল, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মেজর জেনারেল এমএ রবের বাড়িতে হামলা চালিয়ে অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠন চালান আসামিরা। এই অভিযোগে তাদের ১০ বছরের সশ্রম কারাদ- দেন ট্রাইব্যুনাল।
তৃতীয় অভিযোগ ছিল, হবিগঞ্জের খাগাউড়ার উত্তরপাড়ায় আসামিদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনারা দুই নারীকে ধর্ষণ করে। এই অভিযোগে তিনজনকে ২০ বছরের সশ্রম কারাদ- দেন ট্রাইব্যুনাল। আনছার আলী নামের এক ব্যক্তিকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে রাজাকার ক্যাম্পে আটক রেখে নির্যাতনের চতুর্থ অভিযোগে তিন আসামিকে সাত বছর করে সশ্রম কারাদ- দেওয়া হয়।

শ্রেণী:

মীর কাসেমের ফাঁসির রায় বহাল নিজামীর মৃত্যু পরোয়ানা জারি

Posted on by 0 comment
33

33উত্তরণ প্রতিবেদন: মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামাতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা মীর কাসেম আলীর ফাঁসির রায় বহাল রেখেছেন সর্বোচ্চ আদালত। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ গত ৮ মার্চ ঐকমত্যের ভিত্তিতে আপিল নিষ্পত্তি করে সংক্ষিপ্ত চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেনÑ বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মোহাম্মদ বজলুর রহমান।
মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রামে আলবদরের কমান্ডার ছিলেন মীর কাসেম। সেখানে হত্যা, লুণ্ঠন, অপহরণ ও নির্যাতনের দায়ে ২০১৪ সালের নভেম্বরে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকরের রায় দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এই রায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেছিলেন।
সর্বোচ্চ আদালত রায় ঘোষণার সাথে সাথে আদালতের বাইরে ও শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চসহ দেশের অনেক স্থানে আনন্দ মিছিল করেছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। দ্রুত রায় কার্যকর করতে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। রায়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে ১৪ দল।
রায় ঘোষণার পর চট্টগ্রামে গণজাগরণ মঞ্চ ও মুক্তিযোদ্ধারা পৃথক আনন্দ মিছিল বের করেন। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট নাগরিকরা ও সেক্টরস কমান্ডারস ফোরাম।
বর্তমানে জামাতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য মীর কাসেম। দলের নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের পর মীর কাসেম ছিলেন আলবদরের তৃতীয় প্রধান। রায়ের পর বিবিসি, এএফপি, এপি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভিসহ বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যম এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে।
একাত্তরের নভেম্বরে ঈদুল ফিতরের পরদিন কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিমউদ্দিন আহমেদসহ ছয়জনকে অপহরণের পর চট্টগ্রাম শহরের আন্দরকিল্লায় ডালিম হোটেলে নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যার দায়ে মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদ- বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। আরও ছয় অভিযোগে ৫৮ বছরের কারাদ- বহাল রাখা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রামে হত্যা, লুণ্ঠন, অপহরণ ও নির্যাতনের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনা ১৪টি অভিযোগের মধ্যে ১০টিতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ১১ ও ১২ নম্বর অভিযোগে তাকে মৃত্যুদ- এবং বাকি ৮টি অভিযোগে সব মিলিয়ে ৭২ বছর কারাদ- দেওয়া হয়েছিল। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে অভিযোগ থেকে খালাস চান মীর কাসেম।
আপিল বিভাগ তার আবেদন আংশিক মঞ্জুর করে ১২ নম্বরসহ আরও দুটি অভিযোগ (৪ ও ৬) থেকে মীর কাসেমকে খালাস দেন। ১১ নম্বর অভিযোগে জসিমউদ্দিনসহ কয়েকজনকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদ- বহাল রাখা হয়। বাকি ৬টি অভিযোগের সাজা বহাল রাখা হয়।
যে অভিযোগে ফাঁসি বহাল : মীর কাসেমের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আনা অভিযোগের মধ্যে ১১ নম্বরটিতে বলা হয়েছে, কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিমউদ্দিনসহ মোট পাঁচজনকে হত্যার পর লাশ গুম করা হয়। ঈদের পরদিন জসিমকে অপহরণের পর ডালিম হোটেলে নির্যাতন করা হয়। এরপর তাকে হত্যা করে লাশ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই অভিযোগে মীর কাসেম আলীকে ফাঁসির আদেশ দেন। গত ৮ মার্চ আপিল বিভাগ ওই আদেশ বহাল রাখেন।
যে অভিযোগে খালাস : ১২ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, রঞ্জিত দাস লাতু ও টুন্টু সেন রাজুকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। এরপর হত্যার পর তাদের লাশ গুম করা হয়। এই অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে মীর কাসেমকে ফাঁসির আদেশ দেন। ৮ মার্চ আপিল বিভাগ ওই অভিযোগ থেকে আসামিকে খালাস দেন।
ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়ে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রামে ডালিম হোটেলে নির্যাতন কেন্দ্রের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব ছিল মীর কাসেম আলীর হাতে। ওই সময় তিনি চট্টগ্রাম শহর শাখা ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি, আলবদর বাহিনীর নেতা ও নির্দেশদাতা ছিলেন। ডালিম হোটেলে নির্যাতন ও নির্মমতার মাত্রা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, তাকে ‘বাংলার খান সাহেব’ হিসেবেও অনেকে উল্লেখ করেছেন। শহরের আন্দরকিল্লার ডালিম হোটেলকে ‘মৃত্যুঘর’ উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, আলবদর সদস্য ও পাকিস্তানি সেনারা শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার পক্ষের লোকদের ধরে এনে ডালিম হোটেলে আটক রাখত। সেখানে তাদের নির্যাতন চালানো হতো। ডালিম হোটেল সত্যিকার অর্থে একটি ‘ডেথ ফ্যাক্টরি’ ছিল।
একাত্তর সালে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, লুটপাট ও জোর করে দেশান্তরকরণের অসংখ্য ঘটনা ঘটে। এর অনেক ঘটনার সাথে মীর কাসেম নিজে জড়িত। প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ১৭ জুন মীর কাসেমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ওই দিন বিকেলে মতিঝিলে নয়াদিগন্ত কার্যালয়ের (দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশন) থেকে তাকে গ্রেফতার করে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। পরে তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। হত্যা, নির্যাতন, অপহরণ ও দেশান্তরের অভিযোগে পরের বছর ৫ সেপ্টেম্বর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় মীর কাসেমের বিচার। সেই থেকে তিনি কারাগারে আছেন।
মীর কাসেমের উত্থান : মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার চালা গ্রামের তৈয়ব আলীর দ্বিতীয় ছেলে মীর কাসেম আলীর জন্ম ১৯৫২ সালের ৩১ ডিসেম্বর। তার ডাকনাম পিয়ারু হলেও চট্টগ্রামের মানুষ তাকে চিনত মিন্টু নামে। বাবা ছিলেন চট্টগ্রাম টেলিগ্রাফ অফিসের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। নগরীর রহমতগঞ্জ এলাকার সিঅ্যান্ডবি কলোনিতে তারা থাকতেন। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে ১৯৬৯ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাসের পর সেখানেই ¯œাতক (সম্মান) শ্রেণিতে ভর্তি হন কাসেম। পরের বছর জামাতের তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের কলেজ শাখার সভাপতি হন। ’৭১-এর ৬ নভেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহর শাখা ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন মীর কাসেম। একই সাথে চট্টগ্রামে আলবদর বাহিনীর নেতা ছিলেন।
১৯৮০ সালে জামাতে যোগ দেন মীর কাসেম। তখন তিনি রাবেতা আলম আল-ইসলামী নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশের সমন্বয়ক ছিলেন। এরশাদের আমলে ১৯৮৩ সালে ইসলামী ব্যাংক গঠন হলে মীর কাসেম প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চেয়ারম্যান হন। ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মীর কাসেম ছিলেন ইবনে সিনা ট্রাস্টের অন্যতম সদস্য।

নিজামীর মৃত্যু পরোয়ানা জারি
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় একাত্তরের গুপ্তঘাতক আলবদর বাহিনীর নেতা ও জামাতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গত ১৫ মার্চ নিজামীর ফাঁসির রায় বহাল রেখে আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর এই মৃত্যু পরোয়ানা জারি করা হয়।
গত ১৫ মার্চ বিকেলে নিজামীর ফাঁসি বহালের পূর্ণাঙ্গ রায় সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়। এরপর সন্ধ্যায় তা পৌঁছায় ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে। এরপর প্রক্রিয়া শেষে নিজামীর মৃত্যু পরোয়ানায় সই করেন ট্রাইব্যুনালের তিন বিচারক।
রাতে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার শহীদুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, রাত সোয়া ৯টায় নিজামীর মৃত্যু পরোয়ানাসহ পূর্ণাঙ্গ রায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কার্যালয়গুলোতে পাঠানো হয়।
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে আবেদন করার জন্য ১৫ দিন সময় পাবেন নিজামী।
আপিল বিভাগের রায় ঘোষণার প্রায় আড়াই মাস পর ১৫ মার্চ বিকেলে নিজামীর মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। ১৫৩ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ এই রায় লিখেছেন আপিল বিভাগের বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা। এই রায়ের সাথে একমত হয়ে সই করেছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর নিজামীকে ফাঁসির আদেশ দিয়ে রায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বলেছিলেন, নিজামী যে ঘৃণ্য অপরাধ করেছেন, মৃত্যুদ- ছাড়া আর কোনো সাজা তার জন্য যথেষ্ট নয়। ট্রাইব্যুনালের ওই রায়ের বিরুদ্ধে নিজামী আপিল করেন। গত ৬ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালের দেওয়া সর্বোচ্চ দ- বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।

নিজামীর মৃত্যুদ- : আপিল বিভাগ রায়ে যা বলেছে
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত জামাত আমির মতিউর রহমান নিজামীর মামলায় সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিষ্ঠুর ও বর্বর অপরাধের সাথে জড়িত ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধকালীন আলবদর বাহিনীর নৃশংসতার দায় ওই বাহিনীর নেতা হিসেবে নিজামী এড়াতে পারেন না। সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে আদালত মনে করে, আলবদর বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ছিল নিজামীর হাতে। এ কারণে তিনি আলবদর বাহিনী দ্বারা সংঘটিত বুদ্ধিজীবী হত্যা, গণহত্যার মতো অপরাধের দায়ে দোষী এবং সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ই তার প্রাপ্য।
গত ১৫ মার্চ আপিল বিভাগ পূর্ণাঙ্গ এই রায় প্রকাশ করেন। প্রকাশিত রায়টি ১৫৩ পৃষ্ঠার। রায় লিখেছেন আপিল বিভাগের বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা। রায়ে একমত পোষণ করেছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
রায়ে বলা হয়েছে, প্রমাণিত সত্য যে আলবদর বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্যদের নিয়ে। প্রসিকিউশনের হাজির করা সাক্ষীদের জবানবন্দি, জেরা প্রমাণ করে নিজামী ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন। আলবদর বাহিনী প্রতিষ্ঠার পর থেকে তিনিই এই বাহিনীর প্রধান হিসেবে যুদ্ধাকালীন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনিই বদর বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে যেসব দালিলিক সাক্ষ্য ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়েছে তা প্রমাণ করে নিজামী একজন সক্রিয় ছাত্রনেতা ছিলেন। তিনি দেশের বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করে সভা-সমাবেশ করে ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা-কর্মী ও আলবদর বাহিনীর নেতা-কর্মীদের পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহায়তা করতে উজ্জীবিত করেন। স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের বিশ্বাসঘাতক হিসেবে অভিহিত করেন।
রায়ে বলা হয়, ৪২ বছর আগের সংঘটিত অপরাধের বিচার হওয়ায় এই মামলায় এত বছর পর ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী অনেক সাক্ষীর মৃত্যু হয়েছে। অনেকে বৃদ্ধ হয়েছেন। অনেকে সব কিছু মনে করতে পারেন নি। তারপরও প্রসিকিউশন সাক্ষ্য নিয়েছেন যা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। এ কারণে আসামি পক্ষ সাক্ষীদের বক্তব্যে কিছুটা অমিল খুঁজে পেয়েছে, যা সামান্য। আদালত মনে করে, এত বছর আগের ঘটনায় সাক্ষীদের বক্তব্যে যে অমিল পাওয়া যায় তা ধর্তব্য নয়। রাষ্ট্রপক্ষ নিজামীর বিরুদ্ধে সন্দেহাতীতভাবে অপরাধ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে।
রায়ে ১৯৭১ সালে জামাতে ইসলামী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকারদের ভূমিকা তুলে ধরে বলা হয়, ডা. আলীম চৌধুরীসহ বুদ্ধিজীবীরা অপহৃত হন এবং তাদেরসহ আরও বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে রায়েরবাজার ও মিরপুর বধ্যভূমিতে ফেলে দেওয়া হয়। আর এদের অপহরণ ও হত্যার সাথে আলবদর বাহিনী জড়িত ছিল বলে সাক্ষ্য-প্রমাণে পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া স্বাধীনতার মূল্যবান দলিলপত্রেও এ ধরনের প্রমাণ পাওয়া যায়।
রায়ে আরও বলা হয়, আলবদর বাহিনীর নীতি ও পরিকল্পনা ছিল স্বাধীনতাকামী নিরস্ত্র বাঙালি, জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবী ও হিন্দু সম্প্রদায়কে ধ্বংস করা। এদের আলবদর বাহিনী দুষ্কৃৃতকারী বলত। এই আলবদর বাহিনী ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ‘ডেথ স্কোয়াড’। তাদের কাজ ছিল সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, বুদ্ধিজীবী ধরে নিয়ে হত্যা করা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় আলবদর বাহিনী নিজামীর অধীনস্থ ছিল। জামাতে ইসলামী শুধু পাকিস্তানকে সহায়তাই করেনি, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করতেও এই আলবদর বাহিনী গঠন করে। ইসলামী ছাত্রসংঘ সাম্প্রদায়িক ও সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে কাজ করেছে।
রায়ে বলা হয়, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ যথা গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ ছিল নিষ্ঠুর, বর্বর ও হৃদয় বিদারক। আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল এসব অপরাধে মৃত্যুদ- প্রদান করেছে।
এসব এমন অপরাধ যে মৃত্যুদ- মওকুফ করে সাজা কমানোর কোনো সুযোগ নেই। নিজামী নিষ্ঠুর ও অমানবিক প্রকৃতির অপরাধের সাথে জড়িত থাকায় তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- দেওয়া হলো।

শ্রেণী:

নিজামীর ফাঁসির রায় বহাল : দুই রাজাকারের মৃত্যুদণ্ড

45

45উত্তরণ প্রতিবেদন: তিনি ছিলেন এক ভয়ঙ্কর খুনি বাহিনীর নেতা। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম যখন প্রায় নিশ্চিত, তখন তিনি তার খুনে আল-বদর বাহিনীকে লেলিয়ে দেন। তার নীলনকশা অনুসারে পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতায় আল-বদররা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের বেছে বেছে হত্যা করে।
২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর ফাঁসির আদেশ দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী সম্পর্কে এই কথাগুলোই বলেছিলেন। গত ৬ জানুয়ারি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়েও একই বক্তব্যের প্রতিফলন ঘটেছে। একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা এবং গণহত্যা, হত্যা ও ধর্ষণের দায়ে নিজামীর ফাঁসির সাজা বহাল রেখেছেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ।
একাত্তরের বর্বর ও নৃশংস বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের নকশাকার নিজামী কোনো দিন তার অপরাধের জন্য অনুশোচনা করেননি। বরং ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাকে পুনর্বাসিত করা হয়। ২০০০ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীর এদেশীয় শীর্ষ নেতা বা আমির হন। এমনকি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের কৃষি ও শিল্পমন্ত্রী ছিলেন তিনি। এ নিয়ে ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেছিলেন, নিজামীকে এদেশের মন্ত্রী করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ ও সম্ভ্রমহারা ২ লাখ নারীর গালে চড় মারা হয়েছে। এটা জাতির জন্য লজ্জা, অবমাননা।
তবে ৪৪ বছর পর হলেও ন্যায়বিচার পাওয়ায় সন্তুষ্টি জানিয়েছেন শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সন্তানরা।
নিজামী আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায়ও ফাঁসির সাজা পাওয়া আসামি। ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মহানগর দায়রা জজ আদালত দেশের সর্ববৃহৎ অস্ত্র চোরাচালানের এই ঘটনায় নিজামীকে ফাঁসির আদেশ দেন। এ মামলাটিও এখন হাইকোর্টে বিচারাধীন আছে।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এ নিয়ে জামায়াতের পাঁচজন শীর্ষস্থানীয় নেতার আপিলের রায় ঘোষণা করা হলো। এর আগে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং দুই সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লার মামলার রায় দিয়েছেন আপিল বিভাগ। এর মধ্যে শুধু সাঈদীর আমৃত্যু কারাদ- হয়েছে। বাকি তিনজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।
আপিল বিভাগের রায় : এ মামলায় নিজামীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ যে ১৬টি অভিযোগ আনে, ট্রাইব্যুনালে তার মধ্যে ৮টি প্রমাণিত হয়। এর মধ্যে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার বাউসগাড়ি ও ডেমরা গ্রামে ৪৫০ জনকে নির্বিচার হত্যা ও ধর্ষণ, করমজা গ্রামে ১০ জনকে হত্যা ও ৩ জনকে ধর্ষণ, ধুলাউড়ি গ্রামে ৫২ জনকে হত্যা এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনার দায়ে (২, ৪, ৬ ও ১৬ নম্বর অভিযোগ) নিজামীকে মৃত্যুদ- দেন ট্রাইব্যুনাল।
আপিল বিভাগ গত ৬ জানুয়ারি করমজা গ্রামে ১০ জনকে হত্যা ও ৩ জনকে ধর্ষণের দায় (৪ নম্বর অভিযোগ) থেকে নিজামীকে খালাস দেন। বাকি তিন অভিযোগে তার ফাঁসির দ- বহাল রাখেন।
এ ছাড়া একাত্তরে পাবনা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক কছিমুদ্দিনসহ তিনজনকে হত্যা, ঢাকার মোহাম্মদপুরের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রে নির্যাতন ও হত্যা, সোহরাব আলীকে হত্যা এবং গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা বদি, রুমি ও আজাদ এবং সুরকার আলতাফ মাহমুদকে হত্যার দায়ে (১, ৩, ৭ ও ৮ নম্বর অভিযোগ) নিজামীকে যাবজ্জীবন কারাদ- দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে কছিমুদ্দিনসহ তিনজনকে হত্যা এবং শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রে নির্যাতন ও হত্যার দায় (১ ও ৪ নম্বর অভিযোগ) থেকে নিজামীকে খালাস দিয়েছেন আপিল বিভাগ।
প্রতিক্রিয়া : এই রায়ে রাষ্ট্র ন্যায়বিচার পেয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। রায়ের পর নিজ কার্যালয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সবচেয়ে স্বস্তি অনুভব করছি যে, বুদ্ধিজীবী হত্যার ব্যাপারে নিজামীর যে ভূমিকা ছিল, তার দায় প্রতিষ্ঠিত হলো। নিজামীকে মৃত্যুদ-ে দ-িত করার পরিপ্রেক্ষিতে জাতি স্বস্তি অনুভব করছে। এই রায়ের মাধ্যমে বুদ্ধিজীবী পরিবারগুলো স্বস্তি অনুভব করছে। তিনি বলেন, বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের বিচারের দাবি দীর্ঘদিনের। মুজাহিদের রায়ের মাধ্যমে কিছুটা হলেও তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আল-বদরের সর্বোচ্চ নেতা নিজামীর দ- প্রদানের মাধ্যমে সেই বিচার পাওয়ার আশা পূরণ হলো।
বুদ্ধিজীবী হত্যার নকশাকার : নিজামীর বিরুদ্ধে মামলার পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল বলেছিলেন, আল-বদর বাহিনী যে বুদ্ধিজীবী হত্যাকা- চালিয়েছিল, তার ওপর নিজামীর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ছিল। রাষ্ট্রপক্ষের দাখিল করা বিভিন্ন নথি এবং মৌখিক সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করে ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণে বলেন, একাত্তরের মে মাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাঙালি নিধনযজ্ঞে যোগ দেয় জমিয়তে তলাবা (জামায়াতের তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ)। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিহত করার জন্য ছাত্রসংঘ দুটি আধাসামরিক জঙ্গিবাহিনী গঠন করে আল-বদর ও আল-শামস। এর মধ্যে আল-বদরে যোগ দেয় জমিয়তে তলাবার বিপুলসংখ্যক সদস্য। এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মতিউর রহমান নিজামী; কারণ, তিনি ছিলেন জমিয়তের নাজিম-এ-আলা (প্রধান)। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত নিজামী ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রসংঘের সভাপতি, এরপর তিনি নিখিল পাকিস্তান ছাত্রসংঘের সভাপতি হন। ১৯৭১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিজামী ছাত্রসংঘের প্রধান ছিলেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, ১৯৭১ সালের ১৪ নভেম্বর জামাতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম-এ নিজামীর লেখা ‘বদর দিবস : পাকিস্তান ও আল-বদর’ শীর্ষক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এতে নিজামী লেখেন, ‘…পাক সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় এ দেশের ইসলামপ্রিয় তরুণ ছাত্রসমাজ বদরযুদ্ধের স্মৃতিকে সামনে রেখে আল-বদর বাহিনী গঠন করেছে।…’ ওই লেখায় মুক্তিযোদ্ধাদের নিশ্চিহ্ন করে পাকিস্তানের পতাকা ওড়ানোর জন্য আল-বদরদের উৎসাহ দেওয়া হয়। নিজামী মহান আল্লাহর নাম এবং পবিত্র ধর্ম ইসলামকে জেনেশুনে ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে অপব্যবহার করেছিলেন বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন ও নির্মূল করার জন্য।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে করা এক মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন নিজামীকে গ্রেফতার করা হয়। একই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এখন তিনি কাশিমপুর কারাগারে আছেন।

সাঈদীর ফাঁসির রায় পুনর্বহাল চেয়ে আবেদন
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আমৃত্যু কারাদ-ের রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে আবেদন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। এই আবেদনে সাঈদীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ফাঁসির রায় পুনর্বহাল চাওয়া হয়েছে।
সুপ্রিমকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় গত ১২ জানুয়ারি এই আবেদন জমা দেয় রাষ্ট্রপক্ষ। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করল।
পুনর্বিবেচনার আবেদন জমা দেওয়ার পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বিষয়টি জানিয়ে বলেন, ইব্রাহিম কুট্টি ও বিসাবালীকে হত্যার দায়ে ট্রাইব্যুনাল সাঈদীকে ফাঁসি দিয়েছিলেন। কিন্তু আপিল বিভাগ সাঈদীর ফাঁসির সাজা কমিয়ে তাকে আমৃত্যু কারাদ- দেন। আমরা পুনর্বিবেচনার আবেদনে বলেছি, সাঈদীকে দেওয়া ট্রাইব্যুনালের সাজা পুনর্বহাল করা হোক। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে ৪টি অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া দ- পুনর্বহাল চেয়ে পুনর্বিবেচনার আবেদনটি করা হয়েছে। এতে ৫টি যুক্তি (গ্রাউন্ড) আনা হয়েছে।
ইব্রাহিম কুট্টি ও বিসাবালীকে হত্যার দায়ে ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীকে মৃত্যুদ-াদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। ওই রায়ের বিরুদ্ধে সাঈদী আপিল করেন। ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সাঈদীর ফাঁসির সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদ-ের আদেশ দেন। আপিল বিভাগের পাঁচ সদস্যের যে বেঞ্চে সাঈদীর আপিলের শুনানি হয়েছিল, ওই বেঞ্চের দুজন সদস্য ইতোমধ্যে অবসরে গেছেন। তারা হলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন ও আপিল বিভাগের বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী। তাদের মধ্যে বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন তার রায়ে সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদ-াদেশ দেন, আর বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী ফাঁসির আদেশ দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, পাঁচ সদস্যের বেঞ্চেই পুনর্বিবেচনার আবেদনের শুনানি হতে হবে। তবে বেঞ্চের অন্য সদস্যরা কে হবেনÑ তা প্রধান বিচারপতি নির্ধারণ করবেন।
সাঈদীর আপিল শুনানির বেঞ্চের অন্য তিন সদস্য ছিলেন বর্তমান প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। এই তিনজনের মধ্যে বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা তার রায়ে সাঈদীকে খালাস দিয়েছিলেন। বাকি দুজন আমৃত্যু কারাদ-ের পক্ষে মত দেন।

রাজাকার তাহের ও ননীর ফাঁসির রায়
একাত্তরে হত্যা, ধর্ষণের মতো যুদ্ধাপরাধের দায়ে নেত্রকোনার রাজাকার মো. ওবায়দুল হক ওরফে আবু তাহের ও আতাউর রহমান ননীকে মৃতুদ- দিয়েছেন আদালত। বিচারপতি আনোয়ারুল হক নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত ২ ফেব্রুয়ারি এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শাহিনুর ইসলাম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ারদী। রায়ে বলা হয়, আসামি তাহের ও ননীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা ৬টি অভিযোগের মধ্যে ৪টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে এই দুই যুদ্ধাপরাধীর দ- কার্যকর করতে বলেছে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাহের ছিলেন নেজামী ইসলামী পার্টির স্থানীয় নেতা। চার দশক পরে যুদ্ধাপরাধের দায়ে গ্রেফতার হওয়ার সময় বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন তিনি। তাহের ও ননী একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে সহযোগিতা করতে গঠিত রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেন। সে সময় নেত্রকোনা জেলা সদর ও বারহাট্টা থানাসহ বিভিন্ন এলাকায় তারা মানবতাবিরোধী কর্মকা-ের জন্য তারা ‘কুখ্যাত রাজাকার’ হিসেবে পরিচিতি পান বলে এই মামলার বিচারে উঠে এসেছে। এ পর্যন্ত রায় আসা ২২টি মামলার ২৬ আসামির মধ্যে তাহের ও ননীকে নিয়ে মোট ১৮ যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ সাজার আদেশ হলো।
নেত্রোকোনার মুক্তিযোদ্ধা আলী রেজা কাঞ্চন একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ২০১০ সালে ননী ও তাহেরসহ ১২ জনকে আসামি করে থানায় মামলা করলে পরে বিষয়টি ট্রাইব্যুনালে আসে। ২০১৩ সালের ৬ জুন এ দুই আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে প্রসিকিউশনের তদন্ত সংস্থা। এক বছর চার মাস ২৮ দিন তদন্তের পরে ২০১৪ সালের ৫ নভেম্বর দেওয়া হয় ৬৩ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন। প্রসিকিউশনের আবেদনে আদালত পরোয়ানা জারি করলে ওই বছর ১২ আগস্ট দুই আসামিকে গ্রেফতার করে নেত্রকোনার পুলিশ। পরদিন তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পাঠানো হয় কারাগারে। প্রসিকিউশন এই মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পর ২০১৪ সালের ১১ ডিসেম্বর দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।
এরপর গত বছর ২ মার্চ যুদ্ধাপরাধের ছয় ঘটনায় অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে তাহের ও ননীর যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয়।

ব্রিটিশ সরকারের প্রতিবেদনে মন্তব্য
মওদুদিবাদ থেকে ‘উগ্রবাদী’ ধারণা নেয় ব্রাদারহুড
ব্রিটিশ শাসিত ভারতীয় উপমহাদেশে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবুল আলা মওদুদি ও তার দলের তাকফিরি মতাদর্শ ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠায় ‘সহিংসতার ব্যবহারকে উৎসাহিত করে’। আর ইসলামপন্থি সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের আদর্শিক গুরু সাইয়িদ কুতুব তার কাছ থেকেই গ্রহণ করেন এ মতাদর্শ। মিসরের ইসলামপন্থি সংগঠন ব্রাদারহুডের রাজনীতি যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বার্থ ও মূল্যবোধের বিরোধী এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। ব্রাদারহুডের আদর্শ এবং দেশ-বিদেশে এর কার্যক্রম পর্যালোচনার ভিত্তিতে তৈরি করা ব্রিটিশ সরকারের এক প্রতিবেদনে এসব মন্তব্য করা হয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের নির্দেশে ব্রাদারহুডের বিষয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এর বেশির ভাগ অংশই গোপনীয় বিবেচনায় প্রকাশ করা হয়নি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তাত্ত্বিক গুরু মাওলানা আবুল আলা মওদুদি। ভারত ভাগের পর মাওলানা মওদুদি পাকিস্তান চলে যান এবং জামায়াতে ইসলামী, পাকিস্তান নামে দল গঠন করেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে ওই দলটি ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ, পরে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এবং সর্বশেষ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নামে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। গত ১৭ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন এ প্রতিবেদনের কিছু অংশ যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে প্রকাশ করেন। তিনি ব্রাদারহুডকে যুক্তরাজ্যে নিষিদ্ধ ঘোষণা না করলেও বলেছেন, এর সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তি ও সংগঠন ‘উগ্রবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত হবে এবং যুক্তরাজ্য এদের ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যান করবে।
প্রতিবেদনটিকে স্পর্শকাতর উল্লেখ করে ক্যামেরন আরও বলেন, যুক্তরাজ্যে ব্রাদারহুডের কার্যক্রম পর্যালোচনা অব্যাহত থাকবে। সেই সাথে দাতব্য সংগঠনগুলোর ওপর বাড়তি নজরদারি করা হবে। তবে প্রতিবেদনের প্রকাশিত অংশে জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে কোনো সুপারিশ নেই।
সৌদি আরবে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের সাবেক দূত স্যার জন জেনকিন্স এবং যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ দমন বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চার্লস ফার প্রতিবেদনটি তৈরি করেন। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে এটি প্রকাশের কথা ছিল। প্রকাশ বিলম্বিত হওয়ার কোনো কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মিসরকে একটি শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়তে হাসান আল বান্না ১৯২৮ সালে মুসলিম ব্রাদারহুড প্রতিষ্ঠা করেন। দলীয় ঐক্য আর কঠোর শৃঙ্খলাকে গুরুত্ব দিয়ে এর নেতাকর্মীরা গোপনে শিক্ষা প্রচার ও সদস্য সংগ্রহের মাধ্যমে নিজেদের আদর্শ প্রতিষ্ঠার কৌশল নেন। ধীরে ধীরে সংগঠনটির দৃষ্টি মিসরের বাইরে বিভিন্ন মুসলিম দেশের ওপর পড়ে। রাজনৈতিক সংঘাত বিদ্যমান এমন দেশগুলোর পরিস্থিতি মোকাবিলা করা নিয়ে দোটানায় পড়ে ব্রাদারহুড। সমাধান হিসেবে ১৯৪০-এর দশকে সংগঠনটির আদর্শিক গুরু সাইয়িদ কুতুব ভারতবর্ষে মাওলানা আবুল আলা মওদুদির প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামীর তাকফিরি মতাদর্শকে গ্রহণ করেন। তাকফিরি মতাদর্শ ব্যাখ্যা করে ব্রিটিশ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ‘এটি জামায়াত ছাড়া অন্য মুসলিমদের অবিশ্বাসী বা ধর্মত্যাগী বলে কলঙ্ক লেপন করে। বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অনৈসলামিক ঘোষণা করে এবং পছন্দের সমাজ গড়তে সংঘাতের আশ্রয় নেয়।’ এতে বলা হয়, তাকফিরি মতাদর্শ গ্রহণের পর বিভিন্ন সময়ে সংঘাত ও রাজনৈতিক হত্যাকা-ে ব্রাদারহুডের জড়িত হওয়ার নজির রয়েছে।
যুক্তরাজ্যে ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক অস্তিত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়, এর সহযোগী বিভিন্ন সংগঠন দক্ষিণ এশিয়ার সমমনা রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে; যারা মূলত আবুল আলা মওদুদির দর্শন প্রচার ও জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিত্ব করে। সংগঠনগুলো নিজেদের একটি একক ইসলামি আন্দোলন হিসেবে গণ্য করে। ব্রাদারহুডের সহযোগী বিভিন্ন সংগঠন ও জামায়াতে ইসলামী যুক্তরাজ্যে সক্রিয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউকে ইসলামিক মিশনের (ইউকেএমআই) অধীনে দেশটিতে প্রায় ৫০টি মসজিদ পরিচালনা করছে তারা। ইস্ট লন্ডন মসজিদ ও লন্ডন মুসলিম সেন্টারের ট্রাস্টিরা ইসলামিক ফোরাম অব ইউরোপের (আইএফই) সদস্য। স্থানীয় রাজনীতি, বিশেষত বাংলাদেশি-অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে সক্রিয় আইএফই। এসব সংগঠনের পাশাপাশি মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেন (এমসিবি), মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন অব ব্রিটেন (এমএবি) ও ইসলামিক সোসাইটি অব ব্রিটেনের (আইএসবি) মতো সংগঠনগুলোর শিকড় ব্রাদারহুডের সাথে যুক্ত।

শ্রেণী:

ভয়ঙ্কর যুদ্ধাপরাধী সাকা ও মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর

9

9উত্তরণ প্রতিবেদন: মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত জামাতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ ও বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর দ-াদেশ কার্যকর হয়েছে। রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর গত ২১ নভেম্বর দিবাগত রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের একই মঞ্চে পাশাপাশি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের রায় কার্যকর করা হয়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এর আগে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর জামাতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা ও ২০১৪ সালের ১১ এপ্রিল জামাতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও আলবদর কমান্ডার মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। এ নিয়ে চার যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দ- কার্যকর করা হলো। এর আগে ২১ নভেম্বর দুপুরে দুজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেন। পরে কারা কর্তৃপক্ষ আবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। এরপর আইন মন্ত্রণালয় হয়ে রাত ৯টায় আবেদনটি রাষ্ট্রপতির দফতরে পৌঁছায়। রাষ্ট্রপতি প্রাণভিক্ষার আবেদন নাচক করার পর ৯টা ৪০ মিনিটে বঙ্গভবন থেকে বের হয়ে আসেন আইন সচিব। সেখান থেকে তিনি সরাসরি চলে যান ধানমন্ডিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায়। রাত ১০টায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফাঁসির নির্বাহী আদেশের কপিতে স্বাক্ষর করেন। এরপর সেই কপি সরাসরি পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে।
মঞ্চ ঘিরে প্রস্তুতি ও ফাঁসি কার্যকর
কারা সূত্র জানায়, ফাঁসি কার্যকর করার আগে মঞ্চটিকে ঘিরে প্যান্ডেল টানানো হয়। রাত ৮টায় ফাঁসির মঞ্চে বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে কারাগারে প্রবেশ করেন ইলেকট্রিশিয়ানরা। রাত পৌনে ৯টায় ফাঁসির মঞ্চে অতিরিক্ত আলোর ব্যবস্থা করা হয়। লাল-সবুজের সামিয়ানা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় ফাঁসির মঞ্চ। ফাঁসির মঞ্চের পশ্চিম ও পূর্ব দিকের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ানো ছিল ১২ সশস্ত্র কারারক্ষী। কারাগারের আশপাশের উঁচু বাড়ির ছাদে আগে থেকেই ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্তক পাহারা। কারাগারের আশপাশ ঘিরে গড়ে তোলা হয় তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয়। তবে রাত ১০টার পর কারাগারের বাইরের দিকের লাইটগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কারা সূত্র জানায়, রাতেই আলী আহসান মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে গোসল করানো হয়। এরপর কারা মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা মনির হোসেন তাদের তওবা পড়ান। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাত ১২টা ৪০ মিনিটে দুজন করে চার কারারক্ষী ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যান সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও মুজাহিদকে। ৫ মিনিট পর ১২টা ৪৫ মিনিটে জল্লাদরা দুজনের ফাঁসি কাষ্টে ঝোলান। ১০ মিনিট তাদের ঝুলিয়ে রাখা হয়। রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে তাদের দেহ নামিয়ে আনলে সিভিল সার্জন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এই দুই অপরাধীর মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের স্লোগানে মুখর কারাফটক
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে জড়ো হয়ে নানা রকমের বিজয়ের স্লোগান দেন একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধারা। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদ-ের রায় কার্যকরের দাবিতে তাদের স্লোগানে মুখর হয়ে উঠেছে কারাগার এলাকা। ওই দিন রাত সাড়ে ৯টার পর থেকেই কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে উপস্থিত হতে থাকেন মুক্তিযোদ্ধারা। সময় গড়ানোর সাথে সাথে সেখানে বাড়তে থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতি। এ সমাবেশে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা বিচ্ছু জালাল। মুক্তিযোদ্ধারা বলছেন, এই দিনের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। এখন সেই মুহূর্ত আমাদের সামনে এসেছে। এ সময় অন্য যুদ্ধাপরাধীদেরও অবিলম্বে ফাঁসিতে ঝোলানোর দাবি জানান তারা।

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার : পাঁচ বছরে বিচার শেষ

সাকা চৌধুরী
১৬ ডিসেম্বর ২০১০ : সাকা চৌধুরী গ্রেফতার
১৪ নভেম্বর ২০১১ : অভিযোগ দাখিল
৪ এপ্রিল ২০১২ : ২৩ অভিযোগ গঠন
১ অক্টোবর ২০১৩ : ট্রাইব্যুনালে ফাঁসির রায়
২৯ জুলাই ২০১৫ : ফাঁসির রায় আপিলে বহাল
১৮ নভেম্বর ২০১৫ : পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ
২২ নভেম্বর ২০১৫ : ফাঁসি কার্যকর
কোন অভিযোগে কী সাজা
১. মধ্য গহিরা গণহত্যা ২০ বছর
২. নূতনচন্দ্র সিংহ হত্যা ফাঁসি
৩. জগৎমল্লপাড়া গণহত্যা ২০ বছর
৪. সুলতানপুর বণিকপাড়ায় গণহত্যা ফাঁসি
৫. ঊনসত্তরপাড়ায় গণহত্যা ফাঁসি
৬. মোজাফফর ও আলমগীরকে হত্যা ফাঁসি
৭. নিজামউদ্দিনকে নির্যাতন পাঁচ বছর
৮. সালেহউদ্দিনকে নির্যাতন পাঁচ বছর

মুজাহিদ
২৯ জুন ২০১০ : মুজাহিদ গ্রেফতার
১৬ জানুয়ারি ২০১২ : অভিযোগ দাখিল
২১ জুন ২০১২ : ৭ অভিযোগ গঠন
১৭ জুলাই ২০১৩ : ট্রাইব্যুনালের ফাঁসির রায়
১৬ জুন ২০১৫ : ফাঁসির রায় আপিলে বহাল
১৮ নভেম্বর ২০১৫ : পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ
২২ নভেম্বর ২০১৫ : ফাঁসি কার্যকর

কোন অভিযোগে কী সাজা
১. ফরিদপুরের রণজিৎ নাথকে নির্যাতন পাঁচ বছর
২. বদি, রুমীদের হত্যায় প্ররোচনা যাবজ্জীবন
৩. বুদ্ধিজীবী নিধনের ষড়যন্ত্র ও সহযোগিতা ফাঁসি
৪. ফরিদপুরের বাকচর গ্রামে হত্যা ও নিপীড়ন যাবজ্জীবন

রিভিউ আবেদন খারিজ, রায় বহাল
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির সাজা পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করেছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী ও জামাতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। গত ১৮ নভেম্বর সেই আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ।
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ ওই দিন বেলা ১১টা ৩৫ মিনিটে দুটি আবেদনই খারিজ করে আদেশ দেন। আদেশের সময় প্রধান বিচারপতি শুধু বলেন, ‘ডিসমিসড… ডিসমিসড।’ এই বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেনÑ বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। প্রায় পাঁচ বছরের দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আপিল বিভাগের এই আদেশের মধ্য দিয়ে শেষ হলো সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও মুজাহিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার কার্যক্রম।

প্রতারণা করে শেষ রক্ষার চেষ্টা সাকার
মুক্তিযুদ্ধকালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের প্রক্রিয়াকে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য শুরু থেকে নানা অপচেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী। গত ১৮ নভেম্বর বিচারিক প্রক্রিয়ার শেষ দিনেও সর্বোচ্চ আদালতের সাথে প্রতারণার চেষ্টা করেন তিনি।
ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে সাকা চৌধুরী যে আবেদন করেছিলেন, তার সাথে পাকিস্তানের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ‘সনদ’ ও ‘প্রশংসাপত্র’ জমা দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালে সাকা চৌধুরী যে পাকিস্তানের লাহোরে ছিলেন, তা প্রমাণ করতেই ওই নথি দেওয়া হয়েছিল। তবে পুনর্বিবেচনার আবেদন শুনানির সময়ই প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বেঞ্চ ওই ‘সনদ ও প্রশংসাপত্রের’ বিষয়ে গুরুতর সন্দেহ পোষণ করেন।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার সত্যায়িত করা পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সনদ’-এর প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি বলেন, সার্টিফিকেটে ১৯ সংখ্যাটি বড় আর ৭১ সংখ্যাটি ছোট। ট্রাইব্যুনালে এর আগে দেওয়া ডকুমেন্টের সাথে এগুলোর কোনো মিল নেই। একটা মিথ্যা ধামাচাপা দিতে শতটা মিথ্যা কথা বলছেন তিনি। প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, যখন এই বিচার শুরু হলো, তখন পাকিস্তান এই বিচারের বিরোধিতা করেছে। তারা এই বিচারের বিরুদ্ধে রেজল্যুশন (প্রস্তাব) পাস করেছে। সেখান থেকে যেসব নথি আসছে, প্রতিটিতে আমাদের সিরিয়াস ডাউট (গুরুতর সন্দেহ) আছে।
একপর্যায়ে খন্দকার মাহবুবের কাছে প্রধান বিচারপতি ৪টি প্রশ্ন তোলেন। প্রথমত, ট্রাইব্যুনাল ও আপিল বিভাগে নথিগুলো জাল প্রমাণিত হওয়ার পরও নতুন করে কেন নথি দেওয়া হয়েছে? দ্বিতীয়ত, লন্ডন-ওয়াশিংটন থেকে হলফনামা দেওয়া হয়েছে; কিন্তু পাঞ্জাব থেকে দেওয়া হয়নি কেন? তৃতীয়ত, কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্রেডিট ট্রান্সফার করে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন? চতুর্থত, ২০১২ সালের নথি এখন কেন দিচ্ছেন?
জবাবে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আপনাদের ডাউট হলে আমাদের বেনিফিট হবে। আপনারা তদন্ত করেন। রায় দিতে গেলে সন্দেহের ঊর্ধ্বে উঠে রায় দিতে হবে।
সাকা চৌধুরীর পক্ষ থেকে যে ‘সনদ ও প্রশংসাপত্র’ দেওয়া হয়েছে, তাতে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ধরনের লোগো ব্যবহার করা হয়েছে। ওই ডুপ্লিকেট সার্টিফিকেটে সেশন লেখা ১৯৭১, তবে প্রশংসাপত্রে সেশন ১৯৭০-৭১। সনদে ১৯৭১ লেখার মধ্যে ১৯ সংখ্যাটি অনেক বড়, ৭১ সংখ্যাটি খুব ছোট। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামেও পার্থক্য রয়েছে। সনদে লেখা ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব দ্য পাঞ্জাব’, প্রশংসাপত্রে লেখা ‘ইউনিভার্সিটি অব দ্য পাঞ্জাব’। আবার সনদ ও প্রশংসাপত্রে পাঞ্জাব বানান দুই ধরনের। এমনকি খোদ সাকা চৌধুরীর নামের বানান দুটিতে দুই ধরনের। সনদে নামের বানানে ‘এইচ’ থাকলেও প্রশংসাপত্রে ‘এইচ’ নেই।
পরে এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ডুপ্লিকেট সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে, এটা আদালত গোচরে আনেন নি। আমরাও বলেছি, এই কথিত সার্টিফিকেট গ্রহণ করা যাবে না। কারণ, এটা ২০১২ সালে ইস্যু করা। …কোনো বিদেশি কাগজ সেই দেশের নোটারি পাবলিকের সামনে সত্যায়িত করতে হয়। সেটা সাইন করেন সেখানে আমাদের দেশের রাষ্ট্রদূত বা অন্য কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি। পাকিস্তানে আমাদের হাইকমিশনার ওই নথিতে সই করেন নি। সুতরাং এটাকে কাউন্টার সাইন করার প্রশ্ন আসে না। আইনি প্রক্রিয়ায় এটা গ্রহণযোগ্য নয়।
অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাকা চৌধুরীর ভর্তি দেখানো হয়েছে ১৯৬৮ সনে, তারা (আসামিপক্ষ) বলেছেন তিনি ক্রেডিট ট্রান্সফার করেছেন। ওই সময় আমি নিজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগে (রাষ্ট্রবিজ্ঞান) পড়তাম। ওই সময় আমাদের কোনো সেমিস্টার সিস্টেম ছিল না। তাই ক্রেডিট ট্রান্সফারের কোনো নিয়ম ছিল না। সেমিস্টার সিস্টেম চালুর পর আমাদের দেশে ক্রেডিট ট্রান্সফারের বিষয়টি চালু হয়।
এর আগে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালান সাকা চৌধুরী। ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর তার ফাঁসির রায় ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল-১। ওই রায় ঘোষণার আগে রায়ের খসড়া ফাঁস হয়ে যায়। রায় ঘোষণার সময় ট্রাইব্যুনালে সাকা চৌধুরী বলেন, ওই রায় তো একদিন আগে পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় একটি মামলা এখনও বিচারাধীন, যার আসামি সাকা চৌধুরীর স্ত্রী, ছেলে ও আইনজীবী। আর বিচারের প্রক্রিয়াকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য বিচারক, রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি, এমনকি নিজের আইনজীবীর প্রসঙ্গে অশালীন বক্তব্য বা ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ করতে ছাড়েন নি তিনি।­

শ্রেণী:

স্থানীয় পর্যায়ের যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্তদেরও বিচার হচ্ছে

43

43আশরাফ সিদ্দিকী বিটু: আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচনী ওয়াদা অনুযায়ী আমাদের কলঙ্কমুক্ত করতে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তাদের বিচারের ব্যবস্থা করেছে। সেই প্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হচ্ছে। দেশের শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের কয়েকজনের বিচার সম্পন্ন হয়ে দুজনের রায় কার্যকর হয়েছে। বিচার সম্পন্ন হওয়ার আগে ও পরে কয়েকজন মৃত্যুবরণ করেছে, আরও কয়েকজনের রায় কার্যকর হওয়ার অপেক্ষায় আছে। শুধু শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীই নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় বা তৃণমূল পর্যায়ের ৮০ অভিযুক্তকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে, বিচারাধীন ১৬টি মামলায় এদের আসামি করা হয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে এদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযুক্তরা মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নানাভাবে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তা করাসহ নিজেরাও অনেক অপরাধ করেছে। পাশাপাশি ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দলের কাছে ৬৭৫টি অভিযোগ নিয়ে কাজ চলছে যেসব অভিযোগের সাথে জড়িত প্রায় সাড়ে ৩ হাজার অপরাধী। পর্যায়ক্রমে এদেরও বিচারের মুখোমুখি করা হবে। সরকার থেকে বিভিন্ন সময় বলা হয়েছে, সব পর্যায়ের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হবে, তারই অংশ হিসেবে এদেরও বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২১টি মামলার বিচার শেষ হয়েছে। এসব মামলার রায়ে ২৫ জনের বিভিন্ন মেয়াদে দ- হয়। দ-প্রাপ্তদের অধিকাংশই জামাতে ইসলামী ও বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ। বিচারের রায় কার্যকর করতে গিয়ে সরকারকে নানাবিধ চাপ ও ষড়যন্ত্রকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়তায় বিচারের রায় কার্যকর সম্ভব হয়েছে। বিচারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এখনও চলছে, রায় কার্যকর করার সময় ঘনিয়ে এলেই সহিংসতা শুরু করে জামাতে ইসলামী ও বিএনপি। তথাপি রায় কার্যকর হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে।
শুধু শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক বা ক্ষমতাধর ব্যক্তিই নয়, এখন তৃণমূল বা স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধীদেরও বিচার হবে। অপরাধী যে-ই হোক তাকে বিচারের আওতায় আনছেন ট্রাইব্যুনাল। তবে অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, তাদের বিচারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ’৭১ সালে যুদ্ধাপরাধী হয়ে পরবর্তীতে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন, তাদেরও বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে এবং তৃণমূলেও এমন যাদের পাওয়া যাবে তাদেরও বিচার করা হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৪ নভেম্বর একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজাকার কমান্ডার ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা মোবারক হোসেনের ফাঁসির আদেশ হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়েও যারা অপরাধী তাদেরও বিচার হচ্ছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ১৬টি মামলায় অভিযুক্তের সংখ্যা প্রায় ১০০।
নেত্রকোনার ৯ জন : মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দুটি মামলায় নেত্রকোনার ৯ জনের বিচার চলছে। এর মধ্যে আটক নেত্রকোনার ওবায়দুল হক তাহের ও আতাউর রহমান ননীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে এবং বিচার প্রায় শেষ পর্যায়ে। অন্য মামলায় ৭ আসামি রয়েছেন। এরা সবাই পূর্বধলা উপজেলার বাসিন্দা। আসামিদের মধ্যে আবদুর রহমান (৮০) ও আহম্মদ আলী (৭৮) গ্রেফতার হয়েছে।
মহেশখালীর ১৯ জন : কক্সবাজারের মহেশখালীর ১৯ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের জন্য ২৩ নভেম্বর দিন ধার্য রয়েছে। এই মামলায় অভিযুক্তরা হলেনÑ কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি ও এলডিপি নেতা সালামতউল্লাহ খান, বিএনপির সাবেক এমপি মোহাম্মদ রশিদ মিয়া বিএ, মৌলভী জাকারিয়া শিকদার, অলি আহমদ, মো. জালাল উদ্দিন, মৌলভী নূরুল ইসলাম, মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম সাবুল, মমতাজ আহম্মদ, হাবিবুর রহমান, মৌলভী আমজাদ আলী, আবদুল মজিদ, বাদশা মিয়া, ওসমান গণি, আবদুল শুক্কুর, শামসুদ্দোহা, মো. জাকারিয়া, মো. জিন্নাহ ওরফে জিন্নাত আলী, আবদুল আজিজ ও জালাল। আসামিদের বিরুদ্ধে ১৩টি ঘটনায় ৯৪ জনকে হত্যা, অসংখ্য ধর্ষণ, নির্যাতন, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ রয়েছে। এদের মধ্যে ৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শামসুদ্দোহার কারাগারেই মৃত্যু হয়েছে। বাকি ১২ আসামি পলাতক রয়েছেন।
যশোরের ৯ জন : যশোর-৬ আসনের বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য সাখাওয়াত হোসেনসহ ৯ আসামির বিরুদ্ধে একটি মামলা অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে রয়েছে। ৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। এই মামলায় মোট ১২ আসামি। এদের ৩ জনের সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় তাদের অব্যাহতি দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। সাখাওয়াত হোসেন ছাড়া অন্য ৮ আসামি হলেনÑ মো. বিল্লাল হোসেন, মো. ইব্রাহিম হোসেন, শেখ মোহাম্মদ মুজিবর রহমান, মো. আবদুল আজিজ সরদার, মো. আজিজ সরদার, কাজী ওয়াহেদুল ইসলাম, মো. লুৎফর মোড়ল এবং মো. আবদুল খালেক মোড়ল। তাদের মধ্যে সাখাওয়াত হোসেনসহ ৩ জন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন। গ্রেফতারকৃত বাকি দুজন হচ্ছেনÑ মো. বিল্লাল হোসেন ও মো. লুৎফর মোড়ল।
জামালপুরের ৮ জন : মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় আলবদর বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আশরাফ হোসাইনসহ জামালপুরের আটজনকে অভিযুক্ত করে বিচার শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আগামী ১৮ নভেম্বর তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণের কার্যক্রম শুরু হবে। বিচারপতি আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল এই আটজনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের ৫টি অভিযোগে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করার নির্দেশ দেন।
আদেশে ট্রাইব্যুনাল বলেন, অভিযুক্তরা ১৯৭১ সালে বিখ্যাত রাজাকার হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। তারা আলবদর, রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্য হিসেবে জামালপুর সাব-ডিভিশনে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার পক্ষের মানুষদের ওপর নারকীয়তা চালান। ১৯৭১ সালের দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী সেই বছর এপ্রিল মাসেই পাকিস্তান হানাদার বাহিনী জামালপুরে যাওয়ার পরপরই তখনকার ময়মনসিংহ জেলা ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি মুহাম্মদ আশরাফ হোসাইনের নেতৃত্বে আলবদর বাহিনী গঠিত হয়। আশরাফ এখন পলাতক। অভিযুক্ত ৮ জনের মধ্যে অ্যাডভোকেট শামসুল হক ও এসএম ইউসুফ আলী বন্দী আছেন। পলাতক অন্য আসামিরা হলেনÑ অধ্যাপক শরীফ আহমেদ ওরফে শরীফ হোসেন, মোহাম্মদ আবদুল মান্নান, মোহাম্মদ আবদুল বারী, মো. হারুন ও মোহাম্মদ আবুল হাসেম।
কিশোরগঞ্জের ৫ জন : একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আটক কিশোরগঞ্জ করিমগঞ্জের অ্যাডভোকেট শামসুদ্দিন আহমেদসহ ৫ আসামির বিচার চলছে। এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন ট্রাইব্যুনাল। মামলার অন্য ৪ পলাতক আসামি হলেনÑ গাজী মো. আবদুল মান্নান, নাসির উদ্দিন আহমেদ ওরফে ক্যাপ্টেন নাসির, মো. হাফিজ উদ্দিন এবং মো. আজহারুল ইসলাম। গত ১৩ মে এই ৫ জনের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, গণহত্যা, আটক, লুণ্ঠন, নির্যাতনের ৭টি অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।
হবিগঞ্জের তিন ভাই : মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার দুই ভাই মহিবুর রহমান বড় মিয়া ও মুজিবুর রহমান আঙ্গুর মিয়া এবং তাদের চাচাতো ভাই আবদুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে করা মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগসহ ৪টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। ১০ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালের গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলে ওই দিনই নবীগঞ্জ উপজেলার ইমামবাড়ী এলাকা থেকে খাগাউড়া ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান মহিবুর রহমান বড় মিয়া (৭০) ও তার ছোট ভাই বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান আঙ্গুর মিয়াকে (৬৫) গ্রেফতার করে পুলিশ। পরবর্তী সময়ে আবদুর রাজ্জাকও গ্রেফতার হন।
হবিগঞ্জে আওয়ামী লীগের এক নেতা : একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও মুড়াকরি ইউপি চেয়ারম্যান পলাতক লিয়াকত আলীর বিরুদ্ধে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা হয়েছে। এই মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে। নভেম্বরে তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দাখিল করা হতে পারে। লিয়াকতসহ আরও ৫-৬ জনের বিরুদ্ধে একাত্তরে হত্যা, গণহত্যা, নির্যাতন, অপহরণসহ বিভিন্ন অভিযোগ  রয়েছে।
হবিগঞ্জে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান নেজামে ইসলামী পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা মো. সফি উদ্দিনসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। হবিগঞ্জ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি দায়ের করেন মুক্তিযোদ্ধা মো. ইলিয়াস কামাল। আদালতের বিচারক মো. কাউসার আলম মামলাটি তদন্তের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত শাখার প্রধান সমন্বয়ক বরাবর প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন। অভিযুক্ত মাওলানা সফি উদ্দিন লাখাই উপজেলার মানপুর গ্রামের মতিউর রহমানের ছেলে। মামলার অন্য আসামিরা হলেনÑ একই উপজেলার মুড়িয়াউক গ্রামের মো. জাহিদ মিয়া ও মো. তাজুল ইসলাম ওরফে পোকন রাজাকার এবং জিরু-া গ্রামের মো. ছালেক মিয়া ওরফে ছায়েক মিয়া। মামলার বাদী মুক্তিযুদ্ধকালীন লাখাই উপজেলার কমান্ডার ও বিটিসিএলের সাবেক পরিচালক (অর্থ) ইলিয়াস কামাল অভিযোগ করেন, ১৯৭১ সালের ৩০ ও ৩১ অক্টোবর সফি উদ্দিনসহ তার সঙ্গীরা লাখাই উপজেলার মানপুর ও মুড়িয়াউক গ্রামে অভিযান চালিয়ে বাদীর বাবা ইদ্রিছ মিয়া ও সহযোদ্ধা শাহজাহানের বাবা আবদুল জব্বারকে ধরে নিয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে লাশ মানপুরের উজাদুর বিলে ফেলে দেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অভিযুক্ত রাজাকাররা কৃষ্ণপুর, গঙ্গানগরসহ আশপাশের গ্রামে লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, নৃশংস গণহত্যা চালান।
শরীয়তপুরের ২ জন : একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আটক শরীয়তপুরের সোলায়মান মোল্লা ওরফে সলেমান মৌলভী ও পলাতক ইদ্রিস আলীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। ১ নভেম্বর এই মামলার পরবর্তী শুনানি হয়। ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে ১৪ জুন রাতে শরীয়তপুর সদর উপজেলার আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের কাশিপুর গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে সলেমান মৌলভীকে গ্রেফতার করা হয়।
সাতক্ষীরা জামাতের সাবেক এমপির মামলা : একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আটক সাতক্ষীরা জেলা জামাত নেতা ও সাবেক এমপি মাওলানা আবদুল খালেক ম-লের বিরুদ্ধে আগামী ৯ ডিসেম্বরের মধ্যে তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এর আগে নাশকতার উদ্দেশে কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার খলিলনগর মহিলা মাদ্রাসায় গোপন বৈঠকের অভিযোগে নিজ বাড়ি থেকে ১৬ জুন ভোরে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে আবদুল খালেক ম-লের বিরুদ্ধে একাত্তরে মোস্তফা গাজী নামে একজনকে হত্যার অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।
হোসেন ও মোসলেম প্রধান : একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সৈয়দ মো. হুসাইন ওরফে হোসেন (৬৪) এবং গ্রেফতার কিশোরগঞ্জের মো. মোসলেম প্রধানের (৬৬) বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের জন্য আগামী ১৯ নভেম্বর দিন ঠিক করেছেন ট্রাইব্যুনাল। আসামি দুজনের বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, অপহরণ, আটক ও নির্যাতনসহ ৬টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।
ময়মনসিংহের এমপি হান্নানসহ ৪ জন : একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার ময়মনসিংহের এমপি জাতীয় পার্টির এমএ হান্নানসহ ৪ জনকে সেফ হোমে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। ২০ থেকে ২৩ অক্টোবর ধানমন্ডি সেফ হোমে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অন্য ৩ আসামি হলেনÑ এমপির ছেলে রফিক সাজ্জাদ এবং ডা. খন্দকার গোলাম সাব্বির ও মিজানুর রহমান মিন্টু। এই ৪ জনের বিরুদ্ধে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ১৭ নভেম্বর দিন ধার্য রয়েছে।
পটুয়াখালীর ৫ জন : পটুয়াখালী সদর থানার ইসাহাক শিকদার, আবদুল গনি হাওলাদার, আবদুল আওয়াল ওরফে মৌলভী আওয়াল, আবদুস সাত্তার প্যাদা ও সুলাইমান মৃধাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আটক দেখানো হয়েছে। এদের সবাই নাশকতার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় কারাগারে ছিলেন। এদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ১ ডিসেম্বর দিন ধার্য রয়েছে।
নোয়াখালীর ৫ জন : মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার নোয়াখালীর সুধারাম থানার ৫ আসামির বিরুদ্ধে ৩টি অভিযোগ আমলে নিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। অভিযোগ আমলে নিয়ে পরবর্তী শুনানির জন্য ২৪ নভেম্বর দিন ধার্য করা হয়েছে। তারা হলেনÑ আমীর আহম্মেদ ওরফে আমীর আলী, মো. ইউসুফ, মো. জয়নাল আবেদীন ও মো. আবদুল কুদ্দুস। এদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় নোয়াখালীর সুধারাম থানায় ১১১ জনকে গণহত্যাসহ ৩টি অভিযোগ রয়েছে।
মৌলভীবাজারের ৫ জন : মৌলভীবাজার, রাজনগর ও কলমগঞ্জ থানার ৫ জনের বিরুদ্ধে বিচার চলছে। তারা হলেনÑ শামছুল হোসেন তরফদার (৬৫), নেসার আলী (৭৫), ইউনুস আহমেদ (৭১), মো. উজের আহমেদ চৌধুরী (৬০) ও মোবারক মিয়া (৬৫)। এদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার পর ইউনুছ আহমদ ও উজায়ের আহমদ চৌধুরীকে রাজনগর থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ২ ডিসেম্বর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।
এ ছাড়াও শেখ মো. মজিদসহ অন্যরা, মো. আমজাদ আলীসহ অন্যরা, মো. আমীর আহমদ এবং অন্য ৪ জনের পৃথক ৩টি মামলায় ১৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ২১টি মামলার বিচার শেষ হয়েছে। এতদিন দুটি ট্রাইব্যুনালে বিচার কাজ চললেও গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে একটি ট্রাইব্যুনাল নিষ্ক্রিয় করা হয়। বর্তমানে বিচারপতি মো. আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের একটি ট্রাইব্যুনালে এসব মামলার বিচার চলছে। ট্রাইব্যুনাল অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে মামলা শেষ করতে কার্য পরিচালনা করছে।

লেখক : সহ-সম্পাদক, কেন্দ্রীয় উপ-কমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং পরিচালক, সিআরআই

শ্রেণী:

ভয়ঙ্কর খুনি সাকা ও মুজাহিদকে মৃত্যু পরোয়ানা শোনানো হয়েছে

Posted on by 0 comment
06

06উত্তরণ প্রতিবেদন: মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দ-প্রাপ্ত বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যু পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। দুই আসামির আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত ১ অক্টোবর এ পরোয়ানা জারি করেন। সেদিন দুপুরেই ট্রাইব্যুনালের বিশেষ বার্তাবাহক লাল খামে করে মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে যান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। কিছুক্ষণ পরই কারা কর্মকর্তারা গিয়ে মৃত্যু পরোয়ানা পড়ে শোনান আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে। অন্যদিকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যু পরোয়ানা রাতে নিয়ে যাওয়া হয় কাশিমপুর কারাগারে। নিয়ম অনুযায়ী সেখানে মৃত্যু পরোয়ানা পড়ে শোনানো হয় সাকা চৌধুরী নামে পরিচিত এই আসামিকে।  দুজনকেই জানানো হয় পরবর্তী কার্যক্রম হিসেবে ১৫ দিনের মধ্যে তারা সুপ্রিমকোর্টের অপিল বিভাগে রায় রিভিউর জন্য আবেদন করতে পারবেন। আইজি প্রিজন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন বলেন, মৃত্যু পরোয়ানা হাতে পাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই নিয়ম অনুযায়ী তাদের পড়ে শোনানো হয়েছে।
মুজাহিদ ও সাকা চৌধুরীর আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করা হয় সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ থেকে। সেই রাতেই রায়ের কপি পাঠানো হয় ট্রাইব্যুনালে। ১ অক্টোবর রায় দুটি ট্রাইব্যুনালের সামনে উপস্থাপন করা হয়। ট্রাইব্যুনালের তিন বিচারপতি মৃত্যু পরোয়ানা প্রস্তুত করে তাতে স্বাক্ষর করেন।
ফাঁসির দ-প্রাপ্ত সাবেক মন্ত্রী ও জামাত নেতা মুজাহিদকে রাখা হয়েছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেড সেলে। এই সেলের যে কক্ষটিতে কামারুজ্জামানকে রাখা হয়েছিল সেটিতে তাকেও রাখা হয়েছে। কক্ষটি ফাঁসির মঞ্চের কাছেই। কারা সূত্রমতে, আপিলের রায় ঘোষণার আগের দিন ১৫ জুন তাকে নারায়ণগঞ্জ কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়। রায়ের কপি কারাগার ছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানো হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর সাকা চৌধুরীর স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যরা তাদের প্রধান আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনের সাথে দেখা করে আইনি পরামর্শ করেছেন বলে জানা গেছে। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর গাজীপুরে কাশিমপুর কারাগার পার্ট-১-এ বন্দী রয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামাতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদ-ের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর। সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হওয়ায় এই দুই অপরাধীর ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পথে আর দুটি ধাপ বাকি থাকল। এ দুটি ধাপ হলো রিভিউ আবেদন ও রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন। আপিল বিভাগের এই রায় রিভিউ বা পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করতে আসামিরা ১৫ দিন সময় পাবেন। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ায় ৩০ সেপ্টেম্বর থেকেই রিভিউ আবেদনের দিন গণনা হবে। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, তারা রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর দিন গণনা শুরু হবে। এই দুই সাবেক মন্ত্রীর মৃত্যুদ- বহাল রেখে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ সর্বসম্মতভাবে আলাদা দিনে সংক্ষিপ্ত রায় দিলেও ৩০ সেপ্টেম্বর একই দিন পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। এই বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেনÑ বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। গত ১৬ জুন মুজাহিদের এবং ২৯ জুলাই সাকা চৌধুরীর মৃত্যুদ- বহাল রেখে সংক্ষিপ্ত রায় দিয়েছিলেন আপিল বিভাগ।
মুজাহিদের মামলায় ১৯১ পৃষ্ঠার এবং সাকা চৌধুরীর মামলায় ২১৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপিতে চার বিচারপতি সই করার পর ৩০ সেপ্টেম্বর বিকেলে তা সুপ্রিমকোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এই রায় প্রকাশের পর রিভিউ আবেদন করতে ১৫ দিন সময় পাচ্ছেন আসামিরা।
এ দুটি আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর জামাতের সিনিয়র নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলায় আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ অপেক্ষাধীন থাকল। নিয়মানুযায়ী রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি হওয়ার পর ফাঁসির দ- বহাল থাকলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে আবেদন করার সুযোগ পাবেন মুজাহিদ ও সাকা। মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ক্ষেত্রে রিভিউ আবেদন আপিল বিভাগ খারিজ করার পর রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে আবেদন করার জন্য সরকার বেশ কয়েক দিন সময় দিয়েছিল। তার ক্ষেত্রে আপিল বিভাগ গত ৬ এপ্রিল রিভিউ আবেদন খারিজ করেন। রিভিউয়ের রায় প্রকাশ করা হয় ৮ এপ্রিল। এরপর রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমার আবেদন করার জন্য সরকার তাকে সময় দেয়। ১০ এপ্রিল কামারুজ্জামান কারা সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দেন তিনি ক্ষমা চাইবেন না। এটি জানানোর পর সেদিন রাতেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের প্রাক্কালে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যাসহ ৩টি অপরাধের দায়ে ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই ট্রাইব্যুনাল এক রায়ে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে মৃত্যুদ- দেন। ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে আনা ৭টি অভিযোগের মধ্যে ৫টি অভিযোগে সাজা এবং দুটি অভিযোগ থেকে খালাস দেন ট্রাইব্যুনাল। প্রমাণিত হওয়া অভিযোগের মধ্যে ৩টিতে মৃত্যুদ-, একটিতে যাবজ্জীবন কারাদ- ও একটিতে পাঁচ বছরের কারাদ- দেওয়া হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে মুজাহিদ ওই বছরের ১১ আগস্ট আপিল করেন। ১৬ জুন আপিল বিভাগ মৃত্যুদ- বহাল রেখে রায় দেন। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন মুজাহিদকে গ্রেফতার করা হয়। একই বছর ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়। সেই থেকে তিনি কারাবন্দি।
একাত্তরে চট্টগ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করা এবং একের পর এক গণহত্যা, হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধের দায়ে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মৃত্যুদ- দিয়ে ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর রায় ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ২৩টি অভিযোগের মধ্যে ৯টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এসবের মধ্যে ৪টিতে মৃত্যুদ-, ৩টিতে ২০ বছর করে কারাদ- ও দুটিতে পাঁচ বছর করে কারাদ- দেওয়া হয়। বাকি ১৪টি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে সাকা ওই বছরের ২৯ অক্টোবর আপিল করেন। ২৯ জুলাই রায় দেন আপিল বিভাগ। ২০১০ সালের ২৬ জুন হরতালের আগের রাতে রাজধানীর মগবাজার এলাকায় গাড়ি ভাঙচুর ও গাড়ি পোড়ানোর একটি ঘটনায় একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর সাকা চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়। পরে ১৯ ডিসেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। ২০১১ সালের ১৪ নভেম্বর সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেওয়া হয় ট্রাইব্যুনালে।

শ্রেণী:

রক্তপিপাসু ভয়ঙ্কর যুদ্ধাপরাধী সাকার মৃত্যুদণ্ড বহাল

Posted on by 0 comment
06

06উত্তরণ প্রতিবেদন: সর্বোচ্চ আদালত যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া সাজা বহাল থাকায় মুক্তিযুদ্ধকালীন চট্টগ্রামের ত্রাস সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীকে ফাঁসিকাষ্ঠেই যেতে হবে। প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ গত ২৯ জুলাই এই রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অন্য তিন সদস্য ছিলেনÑ বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
চট্টগ্রামের রাউজানে কু-েশ্বরী ঔষধালয়ের মালিক নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যা, সুলতানপুর ও ঊনসত্তরপাড়ায় হিন্দু বসতিতে গণহত্যা এবং হাটহাজারীর এক আওয়ামী লীগ নেতা ও তার ছেলেকে অপহরণ করে খুনের চার অভিযোগে ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির রায় দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। এক বছর ৯ মাস পর আপিলের রায়ে ৩, ৫, ৬ ও ৮ নম্বর অভিযোগের সবগুলোতেই সর্বোচ্চ সাজা বহাল রাখা হয়েছে। ২ ও ৪ নম্বর অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ২০ বছরের কারাদ-ও বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। ট্রাইব্যুনালের দেওয়া পাঁচ বছর কারাদ-ের রায় বহাল রাখা হয়েছে ১৭ ও ১৮ নম্বর অভিযোগেও। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আদালতের ভেতরে-বাইরে উপস্থিতদের স্বস্তি প্রকাশ করতে দেখা যায়। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, এই রায়ে প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে।
জীবনভর বিভিন্ন কর্মকা- ও মন্তব্যের কারণে বিতর্কিত সাকা চৌধুরীই প্রথম বিএনপি নেতা, যাকে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসিতে ঝুলতে হচ্ছে। আর তিনি হচ্ছেন বাংলাদেশের মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করা দ্বিতীয় ব্যক্তি, এই অপরাধে চূড়ান্ত রায়েও যার সর্বোচ্চ সাজার রায় হলো। মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের (ফকা) চৌধুরীর ছেলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাকা চৌধুরী যে একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে হিন্দু ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থক নিধন এবং নির্যাতন শিবির চালিয়েছিলেন, এ মামলার বিচারে তা উঠে আসে।
২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধের বহু প্রতীক্ষিত বিচার শুরুর পর ট্রাইব্যুনালে দ-িতদের মধ্যে সাকা চৌধুরী হলেন পঞ্চম ব্যক্তি, আপিল বিভাগে যার মামলার নিষ্পত্তি হলো। পাঁচ বছর আগে বিজয় দিবসের ভোরে তখনকার সংসদ সদস্য সাকা চৌধুরীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ২৯ জুলাই যখন আপিলের রায় হলো তখন তিনি গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে।
নিয়ম অনুযায়ী, সুপ্রিমকোর্ট এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের পর তা ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হবে। সেটি হাতে পেলে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করবেন ট্রাইব্যুনাল। সেই মৃত্যু পরোয়ানা ফাঁসির আসামিকে পড়ে শোনাবে কারা কর্তৃপক্ষ। পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করতে পারবে আসামিপক্ষ। তবে রায়ের নির্ভরযোগ্যতায় ‘খাদ আছে’ বা ‘বিচার-বিভ্রাটের’ আশঙ্কা আছে বলে মনে করলেই আদালত তা পুনর্বিবেচনার জন্য গ্রহণ করবে। রিভিউ যে আপিলের সমকক্ষ হবে না, তা যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত জামাত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার ‘রিভিউ’ খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায়েই স্পষ্ট করা হয়েছে। রিভিউ আবেদনের নিষ্পত্তি হয়ে গেলে এবং তাতে মৃত্যুদ- বহাল থাকলে আসামিকে তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার সুযোগ দেওয়া হবে।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমার বিষয়টি ফয়সালা হয়ে গেলে সরকার কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে। দুই জামাত নেতা কাদের মোল্লা ও মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের রায় বাস্তবায়নের আগে পালিত প্রক্রিয়াগুলো এক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হিসেবে থাকছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর জন্ম ১৯৪৯ সালের ১৩ মার্চ চট্টগ্রামের রাউজান থানার গহিরা গ্রামে। তার বাবা মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরী একসময় পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকারও হয়েছিলেন। সালাউদ্দিন কাদেরের রাজনীতির শুরুও মুসলিম লীগ থেকে। পরে জাতীয় পার্টি ও এনডিপি হয়ে তিনি বিএনপিতে আসেন।
সাকা চৌধুরী বিগত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময় মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সংসদবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেন। এর আগে সামরিক শাসক এইচএম এরশাদের শাসনামলে ত্রাণ ও পুনর্বাসন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন সাকা চৌধুরী। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয় ১৯ ডিসেম্বর। ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে তার বিচার শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. নূরুল ইসলামসহ মোট ৪১ জন সাক্ষ্য দেন। তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া আরও চারজনের জবানবন্দি সাক্ষ্য হিসেবে প্রহণ করা হয়। অন্যদিকে সালাউদ্দিন কাদেরের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন তিনি নিজেসহ মোট চারজন। ২০১৩ সালের ২৯ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদ-ের রায় দিলে এর ২৮ দিনের মাথায় আপিল করেন সালাউদ্দিন কাদের। চলতি বছর ১৬ জুন থেকে মোট ১৩ দিন দুই পক্ষের যুক্তি শোনেন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ। শুনানি শেষে আদালত ২৯ জুলাই রায়ের দিন ধার্য করেন।
সাকা চৌধুরীর মামলাসহ চূড়ান্ত রায় এসেছে পাঁচ মামলায়। এর মধ্যে ২০১৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত রায়ে জামাতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির আদেশ হলে ওই বছর ১২ ডিসেম্বর দ- কার্যকর করা হয়। ঠিক এক বছর পর আপিলের দ্বিতীয় রায়ে জামাতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদ- দেন আপিল বিভাগ। তবে সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত না হওয়ায় রিভিউ নিষ্পত্তি হয়নি। ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর আপিল বিভাগ তৃতীয় রায়ে জামাতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে সর্বোচ্চ সাজা দিলে ২০১৪ সালের ১১ এপ্রিল তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। চলতি বছর ১৬ জুন জামাতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ফাঁসির রায়ই বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হলে তার দ- কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হবে। আপিল শুনানি চলাকালেই মৃত্যু হয়েছে জামাতের সাবেক আমির গোলাম আযম এবং বিএনপির সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীমের।

একাত্তরে হত্যা ও ধর্ষণের দায়ে ফোরকানের মৃত্যুদ-
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা ও ধর্ষণের দায়ে পটুয়াখালীর রাজাকার ফোরকান মল্লিককে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- প্রদান করেছেন ট্রাইব্যুনাল। চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শাহীনের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গত ১৬ জুলাই এই আদেশ প্রদান করেছেন। ট্রাইব্যুনালে অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলাম।
ফোরকান মল্লিকের বিরুদ্ধে আনীত ৫টি অভিযোগের মধ্যে ৩ ও ৫ নম্বর অভিযোগে ফাঁসির দ- দেওয়া হয়েছে। ৪ নম্বর অভিযোগে তাকে আমৃত্যু কারাদ- দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। অন্যদিকে ১ ও ২ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেওয়া হয়। মোট ৯৯ পৃষ্ঠা রায়ের মূল অংশ পাঠ করেন চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শাহিন। ট্রাইব্যুনালের আদেশের পর প্রসিকিউশন পক্ষ বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, ধর্ষণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে পটুয়াখালীর ফোরকান মল্লিকের সর্বোচ্চ সাজা ‘প্রত্যাশিতই ছিল’।
মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ফোরকান মল্লিকের রায়টি ২০তম রায়। এর মধ্যে ৯টি রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-১ এবং ১১টি রায় দেন ট্রাইব্যুনাল-২। এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ বাগেরহাটের তিন রাজাকার কসাই শেখ সিরাজুল ইসলাম ওরফে সিরাজ মাস্টার, আবদুল লতিফ তালুকদার ও খান আকরাম হোসেনের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায় ঘোষণার জন্য সিএভি রাখা হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফোরকান মল্লিকের মৃত্যুদ- প্রদান করায় প্রসিকিউশন পক্ষ সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। প্রসিকিউটর মোখলেছুর রহমান বাদল বলেন, আসামি ফোরকানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ৫টি ঘটনায় অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। তার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল ৩টি অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছেন। ৩ এবং ৫ নম্বর অভিযোগ দুটিতে মৃত্যুদ- এবং ৪ নম্বর অভিযোগে আমৃত্যু কারাদ- প্রদান করেছেন।
২০১৪ সালের ২৭ অক্টোবর ফোরকান মল্লিকের বিরুদ্ধে তদন্ত সংস্থা তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। ২৮ অক্টোবর এ প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে জমা দেওয়া হয়। ২০১৩ সালের ২৬ জুন থেকে শুরু করে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত মামলাটির তদন্ত করেন তদন্ত কর্মকর্তা সত্যরঞ্জন রায়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের দায়ে ২০০৯ সালের ২১ জুলাই ফোরকানের বিরুদ্ধে মির্জাগঞ্জ থানায় আবদুল হামিদ নামে এক ব্যক্তি মামলা দায়ের করেন।

শ্রেণী:

আলবদর মুজাহিদের ফাঁসির রায়

Posted on by 0 comment
31

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে

31আর ১০টা শিশুর মতো বাবার আদর-সোহাগ কিছুই পাইনি। বাবাকে এভাবে হারানোর যে শূন্যতা তা কখনও ভাষায় বোঝানো যায় না। যারা বাবাকে এভাবে হারিয়েছেন শুধু তারাই অনুভব করতে পারেন। জীবনের এমন কোনো দিক নেই যেখানে বাবাকে হারানোর প্রভাব পড়েনি। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও জাতীয় জীবনের সবক্ষেত্রেই প্রভাব পড়েছে। জীবনের প্রতিটা ক্ষণ একটি অদৃশ্য ব্যথা নিয়ে কাটছে। আজ সেই ব্যথা কিছুটা প্রশমিত হলো। জামাতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের রায়ের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলীম চৌধুরীর মেয়ে ডা. নূজহাত চৌধুরী। তিনি আরও লেখেনÑ খুব শৈশবে বাবাকে হারিয়েছি। বাবার ছায়াহীন এ জীবনে সুধীসমাজ, বুদ্ধিজীবী আর রাষ্ট্রের কাছ থেকে আঘাত পেয়েছি বারবার। বারবার মরেছি। সেই আঘাত বা মৃত্যু যত না কষ্টের ছিল, তার চেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছি যখন বাবার হত্যাকারীরা গাড়িতে দেশের পতাকা উড়িয়েছে। তাই আজ স্বস্তির সাথে দাবি একটাই, বিচার করে জামাতকে নিষিদ্ধ করা হোক।
সাংবাদিক আজাদুর রহমান চন্দন কালেরকণ্ঠডটকমে লিখেছেনÑ
বুদ্ধিজীবী ঘাতকের গাড়িতে উড়েছিল জাতীয় পতাকা পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আলবদর নেতাদের রাজনীতিতে আনতে জিয়া সরকার ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় (বিশেষ অধ্যাদেশ ৪ মে, ১৯৭৬ এবং বাংলাদেশ সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী, ২২ এপ্রিল, ১৯৭৭)। এভাবেই আবার জামাতের রাজনীতি শুরু হয়। ২০০১ সালে বিএনপি-জামাত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলে খালেদা জিয়ার সরকারে ঠাঁই হয় মুজাহিদের। তিনি হন সমাজ কল্যাণমন্ত্রী। তার গাড়িতে ওড়ে জাতীয় পতাকা।
ওয়েকআপ বাংলাদেশ নামক লাইক পেজে সাবেক ছাত্রনেতা আবদুল্লাহ আল মামুন ফেসবুকে লিখেছেনÑ
ফাঁসি দিয়ে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করুন।
ঢাকার মাধুরী সাহা তার ফেসবুক পেজে লিখেছেনÑ
পাপ ছাড়ে না বাপকেও!!
দৈনিক সংগ্রামের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, মুজাহিদ আলবদর বাহিনীর পূর্ব পাকিস্তান শাখার প্রধান ছিলেন। ১৯৭১ সালের নভেম্বরে এই বাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব পালন শুরু করেন তিনি। এই বাহিনীর গোটা পাকিস্তান শাখার প্রধান বা কমান্ডার ছিলেন জামাতের বর্তমান আমির ও মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দ-প্রাপ্ত মতিউর রহমান নিজামী। আলবদর ও আলশামস বাহিনী ছিল জামাতের তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা-কর্মীদের নিয়ে গঠিত। মুক্তিযুদ্ধের সময় সবচেয়ে বেশি নৃশংসতা চালানোর অভিযোগ আছে এ দুটি বাহিনীর বিরুদ্ধে।
আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সাব্বির খান বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকমে লিখেছেনÑ
আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন বলেছিলেন, ‘ইংল্যান্ডের সৈন্যরা, যারা আমাদের হাতে ধরা পড়েছে, তারা যুদ্ধবন্দী, যুদ্ধাপরাধী নয়। তারা ওপরওয়ালার নির্দেশে আমাদের দেশে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু এই দেশের মানুষ হয়ে যারা নিজের দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, নিজেদের মা-বাপ, ভাই-বোনকে হত্যা করেছে, তারা দেশদ্রোহী, তারা যুদ্ধাপরাধী। এদের অপরাধের ক্ষমা নেই।’
আমাদের একাত্তরের প্রসঙ্গে, আমরা কি যুদ্ধাপরাধের বিচারের গুরুত্বটি এভাবে উপলব্ধি করতে পারছি?
শহীদ বুদ্ধিজীবী সন্তান সাংবাদিক শাহিন রেজা নূর লিখেছেনÑ
আজকের রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। ৪২ বছর আগে যে জঘন্য অপরাধ সংগঠিত হয়েছিল, আমার বাবাকে যারা তুলে নিয়ে হত্যা করেছিল তাদের শাস্তি হয়েছে। আমার মা অনেকদিন বসে ছিল এ বিচার দেখার জন্য। আজ আমার মা নেই কিন্তু বিচার হয়েছে। ওরা এতদিন চিৎকার করে বলেছিল যুদ্ধাপরাধ হয়নি। এ বিচারের মাধ্যমে তাদের সেই দাম্ভিকতার পতন হয়েছে।
গ্রন্থনা : সরদার মাহামুদ হাসান রুবেল

শ্রেণী: