বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে মুজাহিদের ফাঁসি বহাল

Posted on by 0 comment
29

আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়

29উত্তরণ প্রতিবেদনঃ একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে মৃত্যুদ-াদেশপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি (মৃত্যুদ-) বহাল রেখে আপিল নিষ্পত্তি করেছেন সুপ্রিমকোর্ট। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ গত ১৬ জুন ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংক্ষিপ্ত এ চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করতে বুদ্ধিজীবী নিধনের পরিকল্পনা ও সহযোগিতার দায়ে মুজাহিদকে দোষী সাব্যস্ত করে সর্বোচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায়ে এই প্রথম কোনো সাবেক মন্ত্রীকে মৃত্যুদ- দেওয়া হলো। এর ফলে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে কুখ্যাত আলবদর বাহিনীর প্রধান মুজাহিদকে ফাঁসির মঞ্চে যেতেই হচ্ছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ দলে প্রভাবশালী নেতাদের মধ্যে অন্যতম। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে সরকারের সমাজ কল্যাণমন্ত্রী ছিলেন তিনি। ২০০৭ সালের ২৫ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে সংলাপে মুজাহিদ বলেছিলেন, বাংলাদেশে কোনো যুদ্ধাপরাধী নেই। অতীতেও কোনো যুদ্ধাপরাধী ছিল না। দম্ভোক্তি করা সেই নেতাকে যুদ্ধাপরাধের অপরাধেই দোষী সাব্যস্ত করেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। বিশ্লেষকরা মনে করেন, স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর বুদ্ধিজীবী হত্যার চূড়ান্ত বিচারে জাতির কলঙ্কমোচন হলো। এতে ইতিহাসের পথচলা আরেক ধাপ এগিয়ে গেল। মুজাহিদের সাজা বহাল রাখার প্রতিবাদে ও তার মুক্তির দাবিতে ১৭ জুন সারাদেশে হরতাল আহ্বান করেছে জামাতে ইসলামী। এই দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে।
মুজাহিদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা ৭টি অভিযোগের মধ্যে ৫টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়। ৪৪ বছর আগে স্বাধীনতার ঊষালগ্নে বুদ্ধিজীবী এবং ফরিদপুরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর বর্বর নির্যাতন ও গণহত্যার দায়ে ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মুজাহিদকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকর করার নির্দেশ দেন। এর বিরুদ্ধে আসামিপক্ষ আপিল করে। আদালত মুজাহিদের আপিল আংশিক মঞ্জুর করে ১৬ জুন রায় দেন।
৭ নম্বর অভিযোগে ফরিদপুরের বকচর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর বর্বর নির্যাতন ও গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদ- দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। আপিল বিভাগ রায়ে মুজাহিদের আপিল মঞ্জুর করে সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন দেন। পঞ্চম অভিযোগে সুরকার আলতাফ মাহমুদসহ কয়েকজনকে ঢাকার নাখালপাড়ায় পুরনো এমপি হোস্টেলে আটক রেখে নির্যাতন এবং হত্যার ঘটনায় মুজাহিদকে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়েছিল। আপিল বিভাগ সেই সাজা বহাল রেখেছেন।
যে অভিযোগে ফাঁসি : আপিল বিভাগে প্রমাণিত ৬ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ২৭ মার্চের পর ঢাকার মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে ক্যাম্প স্থাপন করে রাজাকার ও আলবদর বাহিনী সেখানে প্রশিক্ষণ গ্রহণসহ স্বাধীনতাবিরোধী নানা অপরাধের পরামর্শ, ষড়যন্ত্র ও অপরাধমূলক কার্যক্রম চালায়। এ ধরনের ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আসামি আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ১০ ডিসেম্বর থেকে বুদ্ধিজীবী নিধন, সারাদেশে গণহত্যাসহ বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন।

হাসান আলীর মৃত্যুদ- কার্যকর হবে
ফাঁসি অথবা গুলিতে
30মুক্তিযুদ্ধকালে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কিশোরগঞ্জের তাড়াইলের রাজাকার কমান্ডার সৈয়দ মো. হাসান আলীকে মৃত্যুদ-াদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। পলাতক এই আসামিকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে অথবা গুলি করে মৃত্যুদ- কার্যকরের আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ গত ৯ জুন এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। এ ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক। এ নিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৯টি মামলার রায় ঘোষণা করা হলো। এর মধ্যে ৯টি মামলার রায় ঘোষণা করলেন ট্রাইব্যুনাল-১। বাকি ১০টি মামলার রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-২।
৯ জুন হাসান আলীর বিরুদ্ধে মামলার রায়ে ট্রাইব্যুনাল-১ বলেন, আসামির বিরুদ্ধে গঠন করা ৬টি অভিযোগের মধ্যে ৫টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ অভিযোগ গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাঁকে মৃত্যুদ-াদেশ দেওয়া হয়। দ্বিতীয়, পঞ্চম ও ষষ্ঠ অভিযোগে তাকে আমৃত্যু কারাদ-াদেশ দেওয়া হয়। প্রমাণিত না হওয়ায় প্রথম অভিযোগ থেকে খালাস পান।
সাজা ঘোষণার সময় ট্রাইব্যুনাল বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনে মৃত্যুদ- কীভাবে কার্যকর করা হবে, এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু বলা নেই। ফৌজদারি কার্যবিধিতে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকরের কথা আছে। আর ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে বলা হয়েছে, ওই আইনের অধীনে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে অথবা গুলি করে মৃত্যুদ- কার্যকর করা যাবে। এ জন্য ট্রাইব্যুনাল মনে করেন, ফাঁসিতে ঝুলিয়ে বা গুলি করেÑ সরকার যেভাবে চাইবে, সেভাবে মৃত্যুদ- কার্যকর করতে পারবে।
মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আবদুল হান্নান খান বলেন, এর আগে শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় বিচারিক আদালত আসামিদের ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদ- কার্যকরের রায় দিয়েছিলেন। তবে উচ্চ আদালত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকরের আদেশ দেন।
গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদ- : তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর হাসান আলী, রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনারা তাড়াইল থানার শিমুলহাটি গ্রামের পালপাড়ার অক্রুর পালসহ ১২ জনকে হত্যা করে ঘরবাড়িতে আগুন দেন। চতুর্থ অভিযোগ অনুসারে, ২৭ সেপ্টেম্বর বড়গাঁও গ্রামের মরকান বিলে বেলংকা রোডে সতীশ ঘোষসহ আটজনকে হত্যা করে হাসান আলী ও সহযোগী রাজাকাররা। এ দুটি অভিযোগে হাসান আলীর বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন ও সহযোগিতার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদ- দেন।
তিন অভিযোগে আমৃত্যু কারাদ- : দ্বিতীয়, পঞ্চম ও ষষ্ঠ অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে হাসান আলীকে আমৃত্যু কারাদ- দেওয়া হয়। দ্বিতীয় অভিযোগ অনুসারে, একাত্তরের ২৩ আগস্ট হাসান আলী, রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনারা কোনাভাওয়াল গ্রামের তফাজ্জল হোসেন ভূঁইয়াকে হত্যা করে দুটি ঘর লুট ও দুজনকে অপহরণ করে। পঞ্চম অভিযোগ, ৮ অক্টোবর হাসান আলী, রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনারা আড়াইউড়া গ্রামের কামিনী কুমার ঘোষ ও জীবন ঠাকুরকে হত্যা করে ঘরবাড়ি লুট করে। ষষ্ঠ অভিযোগ, ১১ ডিসেম্বর হাসান আলী ৩০-৪০ রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনাদের সাথে নিয়ে সাচাইল গ্রামের শতাধিক ঘরে অগ্নিসংযোগ করে এবং গ্রামের আবদুর রশিদকে হত্যা করে।

শ্রেণী:

যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের পাঁচ বছর ১৭ মামলায় ১৪ জনের মৃত্যুদ-

Posted on by 0 comment
37

37উত্তরণ প্রতিবেদনঃ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পাঁচ বছর পূর্তি হয়েছে গত ২৫ মার্চ। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর পাঁচ বছরে দুটি ট্রাইব্যুনালে ১৭ মামলার রায়ে ১৪ জনকে মৃত্যুদ-সহ অন্যান্য দ- দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২ এ মোট ৯টি মামলায় ২৭ জনের বিরুদ্ধে বিচারকাজ চলছে। তদন্ত চলছে প্রায় ২২টি মামলার। তদন্ত সংস্থা আশা করছে, চলতি বছরে বেশ কিছু নতুন মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত তারকাখচিত আসামিদের বিচার হয়েছে। এখন ট্রাইব্যুনালে জেলা-উপজেলা থেকে মামলা আসছে।
২০১০ সালের ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর মামলার সংখ্যা বাড়ায় এবং দ্রুত তা নিষ্পত্তির জন্য ২০১২ সালের ২২ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ নামে আরও একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাত্র পাঁচ বছরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে তা বিশ্বে মডেল হিসেবে দেখা দিয়েছে। কম্বোডিয়াতে ট্রাইব্যুনাল গঠন হওয়ার পর প্রথম মামলা শুরু হয়েছিল পাঁচ বছর পর। আর বাংলাদেশে পাঁচ বছরে ১৭টি মামলার রায় ঘোষণা করেছে। শ্রীলংকায় যে যুদ্ধাপরাধ বিচার শুরু করার চিন্তা চলছে সেখানেও বাংলাদেশের মডেলটি গ্রহণ করার কথা ভাবছে। যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল ক্রিমিনাল জাস্টিস বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর-অ্যাট-লার্জ স্টিফেন জে র‌্যাপ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে সমালোচনা করলেও পরবর্তীতে তিনি এ বিচারকে ভূয়সী প্রশংসা করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারকাজ সব ধরনের চাপের মধ্যেও চাপমুক্ত ও নিরপেক্ষ থেকে বিচারকরা কাজ করে যাচ্ছেন। আমি স্যালুট করি বিচারপতিদের সেবা ও সম্মানকে। এ ছাড়া ইউরোপীয় পার্লামেন্ট, সুইডিশ পার্লামেন্টসহ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচও প্রশংসা করেছেন, তবে তারা মৃত্যুদ- প্রদানে বিরোধী।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ভুক্তভোগী নির্যাতিত নারী ও বধ্যভূমির বিষয়টিও উঠে এসেছে। দীর্ঘ ৪৩ বছর পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ভুক্তভোগী নারীগণ জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের ক্যামেরা ট্রায়ালে ট্রাইব্যুনাল জবানবন্দি গ্রহণ করেছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধে এই প্রথম সৈয়দ মুহাম্মদ কায়সারকে অন্য অপরাধের পাশাপাশি ধর্ষণের দায়ে ফাঁসির দ-াদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। সাঁওতাল নারী হীরামনি ও মাজেদা নামের অন্য নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ দুটি প্রমাণিত হয়েছে রায়ে। ওই দুই বীরাঙ্গনা নারী ও ধর্ষণের ফলে বীরাঙ্গনা মায়ের গর্ভে জন্ম নেওয়া যুদ্ধশিশু শামসুন্নাহার ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষ্যও দেন কায়সারের বিরুদ্ধে। রায়ে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত বীরাঙ্গনা নারী ও যুদ্ধশিশুদের ক্ষতিপূরণ স্কিম চালুর পাশাপাশি তালিকা করে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার জন্য রাষ্ট্রকে উদ্যোগ নিতে বলেছেন ট্রাইব্যুনাল। শামসুন্নাহার নামের ওই যুদ্ধশিশু দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রপক্ষের দশম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন কায়সারের যুদ্ধাপরাধ মামলায়। ৪২ বছর বয়সী নারী সাক্ষী শামসুন্নাহার কায়সারের ধর্ষণের শিকার হওয়া একজন বীরাঙ্গনা মায়ের গর্ভে জন্ম নিয়েছেন।
ট্রাইব্যুনালের পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক সানাউল হক বলেছেন, পাঁচ বছরে আমরা যে কাজ করেছি তাতে আমরা খুশি। স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি, সাংবাদিকসহ যারা সহযোগিতা করেছে তাদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। আমাদের যে সমস্যা ছিল, তা কেটে গেছে। তদন্ত সংস্থায় যে ছয় শতাধিক অভিযোগ আছে তা দ্রুতগতিতে তদন্তকাজ এগিয়ে যাচ্ছে।
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর রানাদাশ গুপ্ত বলেছেন, আমিসহ সমস্ত প্রসিকিউটরবৃন্দ নিষ্ঠা, সততা ও আন্তরিকতার সাথে কাজ করে যাচ্ছি। শতভাগ দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছি। সেখানে কোনো কার্পণ্যতা ছিল না। এখনও নেই। পাঁচ বছরে এ কথাই বলতে চাই আমরা সবটাই জানি সে স্পর্ধা করার অধিকার আমার নেই। তবে এটুকু বলতে চাই, ‘আমরা এগিয়েছি এবং দাঁড়িয়েছি’। আমাদের বিচারটা পৃথিবীতে একটি মডেল হিসেবে দেখা দিয়েছে। শ্রীলংকায় যে যুদ্ধাপরাধ বিচার শুরু করার চিন্তা চলছে সেখানেও বাংলাদেশের মডেলটি গ্রহণ করার কথা ভাবছে।
বিশ্বের অনেক দেশেই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে রুয়ান্ডা, সাবেক যুগোশ্লাভিয়া, কম্বোডিয়া, সিরিয়েলিয়ন, বসনিয়া, জার্মানি, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভেনিজুয়েলা, আর্জেন্টিনা, পেরু, উরুগুয়ে, চিলি, প্যারাগুয়ে, মেক্সিকো, কানাডা, লিবিয়া, ফ্রান্স, ইথিওপিয়া, সোমালিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা। এসব ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মতো কোনোভাবেই স্বাধীন নয়। এমনকি ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালেও আসামি পক্ষের কোনো আপিল করার সুযোগ ছিল না। সেদিক থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষ আপিলের সমান সুযোগ পাচ্ছেন। ইতোমধ্যে আসামি পক্ষ আপিল বিভাগ থেকে জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর বিচারে সুফল পেয়েছেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের ১৮টি মামলার বিচার শুরু হলেও রায় হয়েছে ১৭টি মামলার। এর মধ্যে রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা একেএম ইউসুফের বিচার শুরু হওয়ার পর তিনি অসুস্থ হয়ে মারা যান। পরে ট্রাইব্যুনাল তার বিচারকাজ না চালানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই ১৭টি মামলার মধ্যে ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ১৩ জনকে মৃত্যুদ- প্রদান, দুজনকে আমৃত্যু কারাদ-, একজনকে ৯০ বছরের কারাদ- ও একজনকে যাবজ্জীবন কারাদ- প্রদান করেন। এর মধ্যে পাঁচ আসামি পলাতক রয়েছেন। যাদের মধ্যে চার মৃত্যুদ- ও একজনের আমৃত্যু কারাদ- প্রদান করা হয়েছে। পলাতক থাকার কারণে এই পাঁচ আসামি আপিল করতে না পারায় ট্রাইব্যুনালের দেওয়া দ-ই বহাল রয়েছে। এদিকে, ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন ১৪ জন। এর মধ্যে কাদের মোল্লার আপিল নিষ্পত্তি হয়ে রায় কার্যকর হয়েছে। দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদ- কমিয়ে আপিল বিভাগ আমৃত্যু কারাদ- প্রদান করেছেন। মো. কামারুজ্জামানের আপিলের বিরুদ্ধে রিভিউ শুনানির জন্য ৮ এপ্রিল দিন ধার্য করা আছে। আমৃত্যু কারাদ-প্রাপ্ত আসামি আবদুল আলীম ও ৯০ বছরের কারাদ-প্রাপ্ত গোলাম আযম মৃত্যুবরণ করায় তাদের আপিল নিষ্পত্তি করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ১০টি মামলা আপিল নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই পাঁচ বছরের মধ্যে ২০১৩ সালে দিয়েছে ৮টি মামলার রায়। ২০১৪ সালে ৫টি আর চলতি বছরে দুটি মামলার রায় প্রদান করেছেন। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ রায় দিয়েছেন ৮টি আর ট্রাইব্যুনাল-২ দিয়েছেন ৯টি। এটিএম ইউসুফের মামলাটিও ট্রাইব্যুনাল-২-এ বিচারকাজ শুরু হয়েছিল।
যাদের দ- হয়েছে : সর্বপ্রথম ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি জামাতে ইসলামীর সাবেক রুকন বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। এরপর ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় রায়ে জামাতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদ-। ১৭ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ এ মামলার চূড়ান্ত রায়ে কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদ-ে দ-িত করে রায় প্রদান করা হয়। ওই বছরের ১২ ডিসেম্বর তার মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়েছে। তৃতীয় রায়ে ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের নায়েবে আমির দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ-ের রায় প্রদান করেছেন। আপিল বিভাগ ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর দ- কমিয়ে আমৃত্যু করাদ- প্রদান করা হয়। চতুর্থ রায়ে ২০১৩ সালের ৯ মে জামাতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদ- প্রদান করা হয়। আপিল বিভাগেও তার মৃত্যুদ- বহাল রাখা হয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউয়ের শুনানির জন্য চলতি বছরের ৮ এপ্রিল দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। পঞ্চম রায়ে ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই জামাতের সাবেক আমীর গোলাম আযমকে ৯০ বছরের কারাদ- প্রদান করা হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়। ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর তিনি মারা যান। মারা যাওয়ার কারণে আপিল বিভাগ মামলাটি অকার্যকর ঘোষণা করেন। ষষ্ঠ রায়ে ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই জামাতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকেও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদ- প্রদান করা হয়। ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালের সপ্তম রায়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও চট্টগ্রামের সাংসদ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির আদেশ প্রদান করা হয়। অষ্টম রায়ে ২০১৩ সালের ৯ অক্টোবর বিএনপি নেতা আবদুল আলীমকে আমৃত্যু কারাদ- প্রদান করা হয়। ২০১৪ সালের ৩০ আগস্ট অসুস্থ অবস্থায় মারা যাওয়ায় তার মামলাটিও আপিল বিভাগ অকার্যকর ঘোষণা করেন।
২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর নবম রায়ে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মুঈনুদ্দীনকে মৃত্যুদ- প্রদান করে রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া, ২৯ অক্টোবর ২০১৪ জামাতের বর্তমান আমির মতিউর রহমান নিজামীকে মৃত্যুদ- প্রদান করা হয়। ১১তম রায়ে জামাতের নির্বাহী কমিটির সদস্য মীর কাশেম আলীকে ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর মৃত্যুদ- প্রদান করা হয়। দ্বাদশ রায়ে বিএনপির নেতা নগরকান্দা পৌর মেয়র জাহিদ হোসেন ওরফে খোকন রাজাকারকে মৃত্যুদ- প্রদান করা হয়। ১৩তম রায়ে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত মো. মোবারক হোসেনকে ২০১৪ সালের ২৪ নভেম্বর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- প্রদান করে ট্রাইব্যুনাল। ১৫তম রায়ে জামাতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজারুল ইসলামকে ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- প্রদান করেন। ১৬তম রায়ে জাতীয় পার্টির সাবেক সাংসদ পলাতক আবদুল জব্বারকে ২০১৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি আমৃত্যু কারাদ- প্রদান করেন। একই বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে নায়েবে আমির আবদুস সুবহানকে মৃত্যুদ- প্রদান করা হয়।
যেগুলো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২-এ বর্তমানে ৯টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে বাগেরহাটের কসাই সিরাজুল হক সিরাজ মাস্টার, আবদুল লতিফ, আকরাম হোসেন খাঁন ও চাঁইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের দুই রাজাকার মাহিদুর রহমান, মো. আফসার হোসেন চুটুর বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তার জেরা চলছে। কিশোরগঞ্জের রাজাকার কমান্ডার হাসান আলীর বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার জবাবন্দির জন্য ৩০ মার্চ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। কক্সবাজার জেলার মহেশখালীর তিন রাজাকার সালামত উল্লাহ খান, মৌলভী জাকারিয়া সিকদার ও মোহাম্মদ রশিদ মিয়ার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য ১৯ এপ্রিল দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার রাজাকার কমান্ডার গাজী আবদুল মান্নান, মো. হাফিজ উদ্দিন ও মো. আজাহারুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন নাসির উদ্দিন আহম্মেদ ও আইনজীবী শামসুদ্দিন আহম্মেদের মামলার পরবর্তী দিন রয়েছে ৩০ মার্চ। হবিগঞ্জের দুই সহোদর রাজাকার কমান্ডার মহিবুর রহমান ওরফে বড় মিয়া ও মজিবুর রহমান ওরফে আঙ্গুর মিয়ার বিরুদ্ধে অগ্রগতি প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য প্রসিকিউশন পক্ষকে ১৬ এপ্রিল দিন দেওয়া হয়েছে। জামালপুর জেলার বদর বাহিনীর কমান্ডারসহ আট রাজাকার আলবদর কমান্ডার আশরাফ হোসেন, অধ্যাপক শরীফ আহাম্মেদ ওরফে শরীফ হোসেন, মো. আবদুল মান্নান, মো. আবদুল বারী, হারুন, মো. আবুল হাশেম, অ্যাডভোকেট মো. শামসুল হক ও এসএম ইউসুফ আলীর বিরুদ্ধে ৩০ মার্চ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। ২৪ মার্চ তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করেছে তদন্ত সংস্থা।
পটুয়াখালীর রাজাকার কমান্ডার ফোরকান মল্লিকের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। এ পর্যন্ত ১২ সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। নেত্রকোনার মুসলিম লীগ নেতা আতাউর রহমান ননি ও নেজামে ইসলামের ওবায়দুল হক তাহেরের বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, অপহরণ, বাড়িঘরে আগুন ও লুটপাটসহ ছয় ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্য প্রদানের জন্য ৫ এপ্রিল দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
যাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে : একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তদন্ত সংস্থায় ৩ হাজার ২২৯ জনের বিরুদ্ধে ৫৮৫টি অভিযোগ রয়েছে। তা থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলার তদন্ত করা হচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে রয়েছে ১১২টি অভিযোগ, চট্টগ্রামে ৮৫, রাজশাহীতে ৬৬টি, খুলনায় ১৮৩টি, সিলেট ৫১টি, বরিশালে ৫৮টি, রংপুরে ৩০টি অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, এসব অভিযোগ থেকে তদন্ত করা হচ্ছে। কাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হচ্ছে তা আগে ভাগে বললে আসামিরা পালিয়ে যেতে পারে।

এক নজরে ট্রাইব্যুনালের রায়

বাচ্চু রাজাকার (পলাতক) Ñ মৃত্যুদ-
আবদুল কাদের মোল্লা Ñ যাবজ্জীবন কারাদ- (আপিলে মৃত্যুদ- প্রদান)
দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী Ñ মৃত্যুদ- (আপিলে আমৃত্যু কারাদ-)
মো. কামারুজ্জামান Ñ মৃত্যুদ- (আপিলে মৃত্যুদ- বহাল, রিভিউ শুনানি ৮ এপ্রিল)
গোলাম আযম Ñ ৯০ বছরের কারাদ- (মারা যাওয়ার কারণে আপিল অকার্যকর)
আলী আহাসান মুহাম্মদ মুজাহিদ Ñ মৃত্যুদ- (আপিল দায়ের)
সাকা চৌধুরী Ñ মৃত্যুদ- (আপিল দায়ের)
আবদুল আলীম Ñ আমৃত্যু কারাদ- (মারা যাওয়ার কারণে আপিল অকার্যকর)
আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মুঈনুদ্দীন (পলাতক) Ñ মৃত্যুদ- (আপিল দায়ের)
মতিউর রহমান নিজামী Ñ মৃত্যুদ- (আপিল দায়ের)
মীর কাশেম আলী Ñ মৃত্যুদ- (আপিল দায়ের)
জাহিদ হোসেন খোকন (পলাতক) Ñ মৃত্যুদ-
মো. মোবারক হোসেন Ñ মৃত্যুদ- (আপিল দায়ের)
সৈয়দ মো. কায়সার Ñ মৃত্যুদ- (আপিল দায়ের)
এটিএম আজারুল ইসলাম Ñ মৃত্যুদ- (আপিল দায়ের)
আবদুল জব্বার (পলাতক) Ñ আমৃত্যু কারাদ-
আবদুস সুবহান Ñ মৃত্যুদ- (আপিল দায়ের)

শ্রেণী:

যুদ্ধাপরাধী সুবহানের ফাঁসির রায়

Posted on by 0 comment
22

22উত্তরণ ডেস্ক : মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামাতের নায়েবে আমির আবদুস সুবহানকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ-াদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাবনা জেলায় যুদ্ধাপরাধের হোতা সুবহানের বিরুদ্ধে আনা ৯টি মানবতাবিরোধী অভিযোগের মধ্যে গণহত্যা, হত্যা, অপহরণ, আটক, নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও ষড়যন্ত্রের ৬টিই প্রমাণিত হওয়ায় তাকে সর্বোচ্চ এ দ-াদেশ দেওয়া হয়েছে।
গণহত্যা, হত্যা, অপহরণ, আটক, নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও ষড়যন্ত্রসহ ৮ ধরনের ৯টি মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত হন পাবনা জেলা জামাতের প্রতিষ্ঠাতা আমির ও কেন্দ্রীয় সূরা সদস্য, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শান্তি কমিটির সম্পাদক ও পরবর্তীতে ভাইস চেয়ারম্যান, রাজাকার-আলবদর-আলশামস-মুজাহিদ বাহিনীর নেতা আবদুস সুবহান। পাবনায় যাবতীয় মানবতাবিরোধী অপরাধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, শান্তি কমিটি, রাজাকার-আলবদর বাহিনীর নেতৃত্ব দানকারী হিসেবে তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটিতেও। তার হাতে নির্যাতিত-ক্ষতিগ্রস্তদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণও দাবি করেছিলেন প্রসিকিউশন। তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত ১, ২, ৩, ৪, ৬ ও ৭ নম্বরে ৬টি অভিযোগের মধ্যে ১, ৪ ও ৬ নম্বর অর্থাৎ ৩টি অভিযোগে মৃত্যুদ-াদেশ, ২ ও ৭ নম্বর অর্থাৎ দুটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদ- এবং ৩ নম্বর অভিযোগে আরও পাঁচ বছরের কারাদ-াদেশ দেওয়া হয় তাকে। অন্যদিকে ৫, ৮ ও ৯ নম্বরে ৩টি অভিযোগ প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেননি বলে উল্লেখ করে এসব অভিযোগ থেকে সুবহানকে খালাস দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি  দুপুরে এ রায় ঘোষণা করেন চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, বিচারক প্যানেলের সদস্য বিচারপতি মো. মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি শাহীনুর ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল। বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে সুবহানের মামলার রায় ঘোষণা শুরু হয়ে বেলা ১১টা ৫ মিনিটে শেষ হয়। সংক্ষিপ্ত ভূমিকা শেষে ১৬৫ পৃষ্ঠার রায়ের সার-সংক্ষেপ পড়ে শোনান ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। এর আগে সকাল সাড়ে ১০টার পরে ট্রাইব্যুনালে এসে বেলা ১১টা ৩ মিনিটে এজলাসকক্ষে আসন নেন বিচারপতিরা। বেলা ১০টা ৫৮ মিনিটে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানা থেকে আসামির কাঠগড়ায় তোলা হয় সুবহানকে। সকাল ৮টা ৫৬ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে একটি মাইক্রোবাসে এনে সুবহানকে রাখা হয় হাজতখানায়। সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে কারাগার থেকে বের করে তাকে নিয়ে ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশে রওনা হয় মাইক্রোবাসটি। তার পরনে ছিল সাদা রঙের পায়জামা-পাঞ্জাবি ও হাফহাতা সোয়েটার। তাকে চিন্তাযুক্ত দেখাচ্ছিল। পাবনা শহরের পাথরতলা মহল্লার মৃত নঈমুদ্দিনের ছেলে আবুল বসর মোহাম্মদ আবদুস সুবহান মিয়া এলাকায় পরিচিত ‘মাওলানা সুবহান’ নামে। পাবনার সুজানগর উপজেলার মানিকহাটি ইউনিয়নের তৈলকু-ি  গ্রামে জন্ম নেওয়া সুবহান পাকিস্তান আমলে পাবনা জেলা জামাতের প্রতিষ্ঠাতা আমির এবং দলটির কেন্দ্রীয় সূরা সদস্য ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু হলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সাথে নিয়ে পাবনা জেলায় হত্যা, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট শুরু করেন আবদুস সুবহান। পরে তিনি পাবনা জেলা শান্তি কমিটির সম্পাদক এবং পরবর্তীতে ভাইস চেয়ারম্যান হন। তার নেতৃত্বে পাবনা জেলার বিভিন্ন শান্তি কমিটি, রাজাকার আলবদর, আলশামস ও মুজাহিদ বাহিনী গঠিত হয়।

23(1)কামারুজ্জামানের ফাঁসির চূড়ান্ত রায় প্রকাশ
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামাতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বে চার বিচারপতির বেঞ্চ কামারুজ্জামানের আপিল মামলার পূর্ণাঙ্গ এ রায় দিয়েছেন। বেঞ্চের অন্য তিন সদস্য হচ্ছেন বিচারপতি আবদুল ওহাব মিয়া, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১টা ৫৫ মিনিটে আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে ৫৭৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশ করা হয়। এর আগে বেলা সাড়ে ১২টায় চার বিচারপতি রায়ে স্বাক্ষর দেওয়া শেষ করেন। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের দিন থেকে রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করার জন্য ১৫ দিনের সময় পান আসামিপক্ষ। অভিযোগগুলোর মধ্যে সোহাগপুর গণহত্যার (৩ নম্বর) অভিযোগটিতে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের (৩:১) ভিত্তিতে ওই রায় বহাল রাখেন বিচারপতিরা। তাদের মধ্যে বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মৃত্যুদ-ের রায় বহাল রাখলেও বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহাব মিঞা যাবজ্জীবন কারাদ-াদেশ দেন। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফাকে হত্যার (৪ নম্বর অভিযোগ) দায়ে সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদ- দিয়েছেন আপিল বিভাগ। এ অভিযোগে কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদ- দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। অধ্যক্ষ আবদুল হান্নানকে নির্যাতন (২ নম্বর অভিযোগ) ও দারাসহ ছয় হত্যার (৭ নম্বর অভিযোগ) দায়ে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া যথাক্রমে ১০ বছর ও যাবজ্জীবন কারাদ-াদেশ বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। তবে মুক্তিযোদ্ধা বদিউজ্জামান হত্যার (১ নম্বর অভিযোগ) দায় থেকে আপিল বিভাগ তাকে খালাস দেন। এ অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল থেকে যাবজ্জীবন কারাদ- পেয়েছিলেন কামারুজ্জামান। এ ছাড়া, ৫ নম্বর (১০ জনকে হত্যা) ও ৬ নম্বর অভিযোগে (টুনু হত্যা ও জাহাঙ্গীরকে নির্যাতন) আপিল মামলার রায়েও খালাস পেয়েছেন কামারুজ্জামান। ট্রাইব্যুনাল থেকেও এ দুই অভিযোগে খালাস দেওয়া হয়েছিল তাকে। চূড়ান্ত রায়ে ৩ নম্বর অভিযোগে সোহাগপুরে গণহত্যার দায়ে ফাঁসির দ-াদেশ পেয়েছেন কামারুজ্জামান। প্রমাণিত এ অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের ২৫ জুলাই আলবদর ও রাজাকাররা পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে শেরপুরের সোহাগপুর গ্রামে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং নারীদের ধর্ষণ করে। এটি কামারুজ্জামানের পরামর্শে পরিকল্পিতভাবে করা হয়। সেদিন ওই গ্রামে নাম জানা ৪৪ জনসহ ১৬৪ পুরুষকে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনার দিন থেকে সোহাগপুর গ্রাম ‘বিধবাপল্লী’ নামে পরিচিত। এই অভিযোগেই ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।

23(2)জব্বারের আমৃত্যু কারাদ-
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য পিরোজপুরের পলাতক ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বারকে বয়স বিবেচনায় আমৃত্যু কারাদ- দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তার বিরুদ্ধে আনীত ৫টি অভিযোগের সব কটিই প্রমাণিত হয়েছে। সে অনুসারে ৮০ বছর বয়সী জব্বারের ফাঁসি হওয়ার কথা ছিল। তবে তার বয়স বিবেচনায় নিয়ে ১, ২, ৩ ও ৫নং অভিযোগে তাকে আমৃত্যু কারাদ-াদেশ দেওয়া হয়েছে। ৪নং অভিযোগে তাকে ২০ বছরের কারাদ- অনাদায়ে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যর বেঞ্চ এ আদেশ দেন। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য হলেনÑ বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক। মোট ১৪১ পৃষ্ঠার রায়ের প্রথমাংশ আদালতে পাঠ করেন বিচারপতি আনোয়ারুল হক, দ্বিতীয় অংশ বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন এবং রায়ের মূল অংশ চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম পাঠ করে শোনান। এটি ট্রাইব্যুনাল-১ এর অষ্টম রায়। ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধ মামলায় পলাতক অবস্থায় চতুর্থ রায় এটি। এর আগে পলাতক থাকা অবস্থায় আবুল কালাম আজাদ, চৌধুরী মঈনুদ্দিন-আশরাফুজ্জামান, খোকন রাজাকারের বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হয়েছে। রায়ে এদের প্রত্যেককেই ফাঁসির দ- দেওয়া হয়। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম, মোহাম্মদ আলী, তুরিন আফরোজ, জাহিদ ইমাম, রেজিয়া সুলতানা চমন উপস্থিত ছিলেন। জব্বারের পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল হাসান উপস্থিত ছিলেন। গত বছরের ৩ ডিসেম্বর উভয়পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর জাহিদ ইমাম যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন। জব্বারের পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আবুল হাসান যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। রাষ্ট্রপক্ষে শেষ ও ২৪তম সাক্ষী মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) হেলাল উদ্দিনকে আসামিপক্ষের জেরা শেষ করার মধ্য দিয়ে গত ১৭ নভেম্বর এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। জব্বারের বিরুদ্ধে গত ১৪ আগস্ট অভিযোগ গঠন করা হয়। ৭ সেপ্টেম্বর সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন শেষে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। এর আগে ৮ জুলাই ট্রাইব্যুনালের এক আদেশে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জব্বারকে গ্রেফতার করতে পারেনি। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরও হাজির হননি জব্বার। এ জন্য তাকে পলাতক ঘোষণা করা হলো। এরপর আইনজীবী আবুল হাসানকে জব্বারের পক্ষে আইনি লড়াইয়ের জন্য রাষ্ট্রনিযুক্ত (স্ট্যাট ডিফেন্স) আইনজীবী নিয়োগ করা হয়। গত বছরের ১২ মে জব্বারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনীত ৫টি অভিযোগ আমলে নিয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল।

শ্রেণী:

আলবদর কমান্ডার আজাহারের ফাঁসির আদেশ

Posted on by 0 comment
37

37উত্তরণ প্রতিবেদন : একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় জামাতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে ৫টি অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় তাকে ফাঁসির দ-াদেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। গত ৩০ ডিসেম্বর বেলা সোয়া ১২টায় জনাকীর্ণ আদালতে আসামির উপস্থিতিতে ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় দেন। ১৫৮ পৃষ্ঠার রায়ের সার-সংক্ষেপ পড়ে শোনান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেনÑ বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক। আজহারুলের বিরুদ্ধে আনিত ৬টি অভিযোগের মধ্যে ৫টি প্রমাণিত হয়। শুধু এক নম্বর অভিযোগটি প্রমাণিত হয়নি। এর আগে সকাল ৯টায় আজহারকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। এরপর ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় রাখা হয় তাকে। পরে সেখান থেকে তাকে ট্রাইব্যুনালে আসামির কাঠগড়ায় নেওয়া হয়।
গত বছরের ১২ নভেম্বর যুদ্ধাপরাধের ছয় ঘটনায় অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে আজহারের বিচার শুরু হয়। এর আগে ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল এটিএম আজহারের যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু হয়। ওই বছর ২২ আগস্ট মগবাজারের বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় তাকে। তদন্ত শেষে গত বছরের ১৮ জুলাই আজহারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। এরপর নভেম্বরে অভিযোগ গঠনের পর ২৬ ডিসেম্বর শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) এম ইদ্রিস আলীসহ রাষ্ট্রপক্ষে ১৯ জন সাক্ষ্য দেন। তবে সপ্তম সাক্ষী আমিনুল ইসলামকে বৈরী ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া আজহারের যুদ্ধাপরাধের একজন ‘ভিকটিম’ ১৪ নম্বর সাক্ষী হিসেবে ক্যামেরা ট্রায়ালে জবানবন্দি দেন। চলতি বছর ৩ ও ৪ আগস্ট আজহারের পক্ষে একমাত্র সাফাই সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন আনোয়ারুল হক। এরপর দুপক্ষ দীর্ঘ সময়ে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে ট্রাইব্যুনালে। আজহারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালে আজহার রংপুরের কারমাইকেল কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র এবং জামাতে ইসলামীর তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের রংপুর শাখার সভাপতি ছিলেন। জেলার আলবদর বাহিনীরও নেতৃত্বে ছিলেন তিনি।
প্রথম অভিযোগ : ২৪ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিলের মধ্যে দুর্গাদাস অধিকারী এবং অন্য সাতজনকে অপহরণ, আটক ও নির্যাতনের পর হত্যা।
দ্বিতীয় অভিযোগ : ১৬ এপ্রিল তার নিজ এলাকা রংপুরের বদরগঞ্জ থানার ধাপপাড়ায় ১৫ নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালিকে গুলি করে হত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ। এ ঘটনায় পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে আজহার অংশ নেন।
তৃতীয় অভিযোগ : ১৭ এপ্রিল রংপুরের বদরগঞ্জের ঝাড়–য়ারবিল এলাকায় ১ হাজার ২০০-র বেশি নিরীহ লোক ধরে নিয়ে গণহত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করা হয়, যাদের মধ্যে ৩৬৫ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে।
চতুর্থ অভিযোগ : ৩০ এপ্রিল রংপুর কারমাইকেল কলেজের শিক্ষক কালাচাঁন রায়, সুনীল বরণ চক্রবর্তী, রামকৃষ্ণ অধিকারী, চিত্তরঞ্জন রায় ও কালাচাঁন রায়ের স্ত্রী মঞ্জুশ্রী রায়কে বাসা থেকে অপহরণের পর দমদমা সেতুর কাছে নিয়ে হত্যা করা হয়।
পঞ্চম অভিযোগ : ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে রংপুর শহর ও বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মহিলাদের ধরে এনে টাউন হলে আটকে রেখে ধর্ষণসহ শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। এসব ঘটনার সঙ্গে আজহার জড়িত ছিলেন।
ষষ্ঠ অভিযোগ : নভেম্বরের মাঝামাঝি রংপুর শহরের গুপ্তপাড়ায় একজনকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। ১ ডিসেম্বর রংপুর শহরের বেতপট্টি থেকে আজহারের নেতৃত্বে একজনকে অপহরণ করে রংপুর কলেজের মুসলিম ছাত্রাবাসে নিয়ে আটক রেখে শারীরিক নির্যাতন ও গুরুতর জখম করা হয়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এটি পঞ্চদশ রায়।
ধর্ষণসহ ৭টি অভিযোগে যুদ্ধাপরাধী কায়সারের ফাঁসি
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জাতীয় পার্টির সাবেক কৃষি প্রতিমন্ত্রী কায়সার বাহিনীর প্রধান সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ-ের আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৬টি অভিযোগের মধ্যে হত্যা-গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, আটক, মুক্তিপণ আদায়, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠন এবং ষড়যন্ত্রের ১৪টি প্রমাণিত হয়। এর মধ্যে ৭টি অভিযোগে ফাঁসি, ৪টিতে আমৃত্যু কারাদ-, ৩টিতে ২২ বছরের কারাদ- ও ২টি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস দেওয়া হয়। গত ২৩ ডিসেম্বর জনাকীর্ণ আদালতে পিনপতন নীরবতার মধ্যে চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শাহীনের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ আদেশ প্রদান করেছেন। ট্রাইব্যুনালে অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলাম।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এই প্রথম ধর্ষণের অভিযোগে মৃত্যুদ- প্রদান করলেন ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনাল তার রায়ে অভিযোগ ৩, ৫, ৬, ৮, ১০, ১২ ও ১৬ এই ৭টি অভিযোগে ফাঁসি, অভিযোগ ১, ৯, ১৩, ১৪ এই ৪টিতে আমৃত্যু কারাদ-, অভিযোগ-২-এ ১০ বছর, অভিযোগ-৭-এ সাত বছর ও অভিযোগ-১১-তে পাঁচ বছর করে মোট ২২ বছরের কারাদ- প্রদান করা হয়। অভিযোগ ৪ ও ১৫ প্রমাণিত না হওয়ায় আসামিকে অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ-১১ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে পাঁচ বছরের কারাদ- দেওয়া হয়। এর আগের দিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ রায় ঘোষণার জন্য ২৩ ডিসেম্বর নির্ধারণ করেন। ১ হাজার ৬৬১ প্যারার ৪৮৪ পৃষ্ঠার রায়ের সংক্ষিপ্তসার পাঠ করেন ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান।
২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর এ পর্যন্ত ১৩টি মামলায় ১৪ জনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদ-সহ বিভিন্ন দ- প্রদান করেছেন ট্রাইব্যুনাল। সৈয়দ কায়সারের মামলার রায়টি ট্রাইব্যুনালের ১৪তম রায়। আর ট্রাইব্যুনাল-২-এ এটি হবে অষ্টম রায়। ট্রাইব্যুনাল-১ এর আগে রায় প্রদান করেছেন ৬টি। বর্তমান দুটি ট্রাইব্যুনালে আরও ৩টি মামলা রায় ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজাহারুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির সাবেক নেতা আবদুল জব্বার ও জামাতে ইসলামীর নায়েবে আমির আবদুস সুবহান।
মাহিদুর ও চুটুর বিচার শুরু ১২ জানুয়ারি
গত ১১ ডিসেম্বর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাহিদুর রহমান ও আফসার হোসেন চুটুর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে ট্রাইব্যুনাল অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম শুরু করতে আগামী ১২ জানুয়ারি দিন ধার্য করেন। চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ অভিযোগ গঠন করে এ আদেশ দেন। অভিযুক্ত মাহিদুর রহমান ও আফসার হোসেন চুটুর বিরুদ্ধে গত ১৬ নভেম্বর অনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছে প্রসিকিউশন। এরপর গত ২৪ নভেম্বর তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউটর সাহিদুর রহমান এ অভিযোগ দাখিল করেন। মাহিদুর ও চুটুর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত হত্যা ও গণহত্যার সুনির্দিষ্ট ৩টি অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী রয়েছেন ২৪ জন। গত ২৭ অক্টোবর তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেন ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।
অপেক্ষমাণ সুবহানের ও জব্বারের মামলার রায়
মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার জামাতে ইসলামীর নায়েবে আমীর আবদুস সুবহানের মামলার রায় যে কোনোদিন ঘোষণা করা হবে। গত ৩ ডিসেম্বর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ মামলার রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রেখে দেন। সুবহানের বিরুদ্ধে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর হত্যা, গণহত্যা, আটক, নির্যাতন, লুণ্ঠনসহ ৯টি সুনির্দিষ্ট ঘটনার ভিত্তিতে অভিযোগ গঠন করা হয়। ট্রাইব্যুনালের আদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সুবহানকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর আগে গত ৩০ নভেম্বর আসামিপক্ষ তাদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন। গত ৫ নভেম্বর প্রসিকিউশন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেন। এরপর ১৭ নভেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন। আরেক এক যুদ্ধপরাধী রাজাকার কমান্ডার আবদুল জব্বারের বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়েছে। গত ৩ ডিসেম্বর তার বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায় ঘোষণার জন্য সিএভি রাখা হয়েছে। যে কোনোদিন এ মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্য বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ আদেশ প্রদান করেন। ট্রাইব্যুনালে অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক। জব্বারের মামলা নিয়ে বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২-এ মোট ৩টি মামলা সিএভি রাখা হলো।
ড. কামালের জামাতা বার্গম্যান আদালত অবমাননার দায়ে সাজা ভোগ করলেন
39ডেভিড বার্গম্যান মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের প্রক্রিয়া নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার দায়ে বাংলাদেশে বসবাসরত ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানকে কারাদ- দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। গত ২ ডিসেম্বর কার্যক্রম চলাকালীন তিনি কারাদ- হিসেবে এজলাসে এই সাজা ভোগ করেন। একই সঙ্গে বার্গম্যানকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে সাত দিনের কারাদ-াদেশ দেওয়া হয়। বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ এই আদেশ দেন। আদেশে বলা হয়, ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম চলা পর্যন্ত ডেভিড বার্গম্যান এই কারাদ- ভোগ করবেন। দুপুর সোয়া ১২টায় এই আদেশের কয়েক মিনিটের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শেষ হয়। ডেভিড বার্গম্যান ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ-এর বিশেষ প্রতিবেদনের সম্পাদক। তার বিরুদ্ধে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবুল কালাম আজাদ আদালত অবমাননার অভিযোগ আনেন। অভিযোগে বলা হয়, বার্গম্যানের নিজস্ব ব্লগে (বাংলাদেশ ওয়ারক্রাইমস ডট ব্লগস্পট ডট কম) ৩টি লেখায় মুক্তিযুদ্ধকালে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়েছে। লেখাগুলো হলোÑ ‘আযাদ জাজমেন্ট এনালাইসিস ১ : ইন অ্যাবসেন্সিয়া ট্রায়ালস অ্যান্ড ডিফেন্স ইনএডেকোয়েসি’, ‘আযাদ জাজমেন্ট এনালাইসিস ২ : ট্রাইব্যুনাল অ্যাসাম্পশন’ এবং ‘সাঈদী ইনডাইক্টমেন্ট : ১৯৭১ ডেথস’। আইনজীবী মিজান সাঈদ, মোকসেদুল ইসলাম ও এনামুল কবির এই আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন। বার্গম্যানের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান খান। দুই পক্ষে দীর্ঘ শুনানি হয়।  ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণে বলেন, জাতির গর্ব মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে বার্গম্যান যে ন্যায়ভ্রষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন, তা তার মানসিকতা পরীক্ষা করলেই বোঝা যায়। এ জন্য বার্গম্যানের অন্য একটি লেখা পরীক্ষা করেছেন ট্রাইব্যুনাল। ইন্টারন্যাশনাল জাস্টিস ট্রিবিউন সাময়িকীর ২০১২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় তার ‘আইসিটি : ক্যান ওয়ান সাইডেড ট্রায়ালস বি ফেয়ার?’ শিরোনামে ওই নিবন্ধে লেখা হয়েছে, ঢাকার ট্রাইব্যুনাল কাজ করছে একাত্তরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সেই সব ঘটনা নিয়ে, যখন সত্তরের নির্বাচনে জেতার পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তা প্রতিহত করতে বল প্রয়োগ করে। আওয়ামী লীগের সমর্থকরা ছিল পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমানে বাংলাদেশ) বসবাসকারী বাঙালি। পাকিস্তানি সেনা এবং আওয়ামী লীগের সমর্থক ও অন্যদের মধ্যে যুদ্ধ তখন শেষ হয়, যখন ভারতীয় সেনারা বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে এতে হস্তক্ষেপ করে। প্রথমত, লেখার শিরোনামে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে বার্গম্যান ‘একপক্ষীয় বিচার’ বলে উল্লেখ করেছেন। দ্বিতীয়ত, বাঙালির আত্মপরিচয়ের যুদ্ধ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে তিনি ‘পাকিস্তানি সেনা ও আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে যুদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ট্রাইব্যুনাল বলেন, আমরা বিস্মিত এই দেখে যে কীভাবে ও কিসের ভিত্তিতে বিদেশি নাগরিক ডেভিড বার্গম্যান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে এ ধরনের ন্যায়ভ্রষ্ট মানসিকতা নিয়ে বাংলাদেশে কাজ করছেন। এটা আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। তবে এটা আমাদের বিষয় নয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব বিষয়ের আইনগত দিক খতিয়ে দেখতে পারে। এর আগে ২০১১ সালের ১ অক্টোবর নিউ এজ-এ ‘অ্যা ক্রুসিয়াল পিরিয়ড ফর আইসিটি’ শিরোনামের মন্তব্য প্রতিবেদনের জন্য বার্গম্যান, পত্রিকাটির সম্পাদক নুরুল কবির ও প্রকাশক আ স ম শহীদুল্লাহ খানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে রুল দেন ট্রাইব্যুনাল-১। ২০১২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ওই রুল নিষ্পত্তি করে আদেশের সময় ট্রাইব্যুনাল বার্গম্যানকে ‘সর্বোচ্চ সর্তক’ করে বলেন, ওই প্রতিবেদনের একটি অংশ ‘অত্যন্ত অবমাননাকর।’ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের কন্যা ও বার্গম্যানের স্ত্রী সারা হোসেন বলেন, আমরা মনে করি, ট্রাইব্যুনালের এ রায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর চরম আঘাত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল মুক্তবুদ্ধি, মুক্তচিন্তা, বাকস্বাধীনতা ও ভিন্নমত পোষণের অধিকার। কিন্তু এ রায় বাকস্বাধীনতাকে সংরক্ষণ করে না, বরং রুদ্ধ করে। তিনি বলেন, বার্গম্যানের এদেশে বসবাস করা নিয়ে ট্রাইব্যুনাল যেসব মন্তব্য করেছেন, তা এখতিয়ারবহির্ভূত এবং আমরা এতে চরম আপত্তি জানাচ্ছি।

শ্রেণী:

মীর কাশেম, রাজাকার খোকন ও মোবারকের ফাঁসির আদেশ

74

চূড়ান্ত রায়েও কামারুজ্জামানের ফাঁসি

74একাত্তরের গুপ্তঘাতক এবং আলবদর বাহিনীর প্রধান মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদ-াদেশ পাওয়া জামাতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের আপিলের চূড়ান্ত রায়েও ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ। আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ গত ৩ নভেম্বর সকাল ৯টা ৮ মিনিটে এই রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অন্য তিন বিচারপতি হলেনÑ বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী।
কামারুজ্জামানের মামলার অভিযোগে বলা হয়েছেÑ একাত্তরে কামারুজ্জামানের পরিকল্পনা ও পরামর্শে রাজাকার, আলবদরসহ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ি উপজেলার সোহাগপুর গ্রাম ঘিরে ফেলে। এরপর তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ১২০ পুরুষকে ধরে হত্যা করে। এ সময় ধর্ষণের শিকার হন গ্রামের নারীরা। অন্যদিকে গোলাম মোস্তফাকে হত্যার অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদ-াদেশ আপিলে কমিয়ে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে। চার বিচারপতি সর্বসম্মতিক্রমে এই দ- দেন। এ অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৩ আগস্ট মাগরিবের নামাজের সময় গোলাম মোস্তফা তালুকদারকে ধরে নিয়ে যায় আলবদর বাহিনীর সদস্যরা। কামারুজ্জামানের নির্দেশে তাকে সুরেন্দ্র্র মোহন সাহার বাড়িতে বসানো আলবদর ক্যাম্পে রাখা হয়। গত বছরের ৯ মে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামাতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মৃত্যুদ- দেওয়ার রায় ঘোষণা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। গত বছরের ৬ জুন আপিল করেন কামারুজ্জামান। সুপ্রিম কোর্টে আপিল দাখিলের পর এ বছরের ৫ জুন শুনানি শুরু হয়ে ১৭ সেপ্টেম্বর তা শেষ হয়।
কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ৭টি অভিযোগের মধ্যে ৫টি প্রমাণিত হয়। দুটি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় পঞ্চম ও ষষ্ঠ অভিযোগ থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তৃতীয় ও পঞ্চম অভিযোগে মৃত্যুদ-, প্রথম ও সপ্তম অভিযোগে যাবজ্জীবন এবং দ্বিতীয় অভিযোগে তাকে ১০ বছরের কারাদ- দেওয়া হয়েছে। ২০১০ সালের ১৩ জুলাই কামারুজ্জামানকে হাইকোর্ট এলাকা থেকে একটি মামলায় গ্রেফতার করা হয়। একই বছর ২ আগস্ট তাকে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়।
এদিকে, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে জামাতের কর্মপরিষদ সদস্য ও দিগন্ত মিডিয়া কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান আলবদর প্রধান মীর কাসেম আলীর ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-২। চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গত ২ নভেম্বর এই আদেশ দেন। তার বিরুদ্ধে আনীত ১৪ অভিযোগের মধ্যে ১০ অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে ১১ ও ১২ নম্বর অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়।
মীর কাসেম : মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ১১তম রায় এটি। মীর কাসেমের বিরুদ্ধে আনীত ১১ নম্বর অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের তিন বিচারপতি একমত হয়ে ফাঁসির আদেশ দেন। আর ১২ নম্বর অভিযোগে একমত না হতে পারলেও সংখ্যা গরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ফাঁসির আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। বাকি ৮টি অভিযোগের মধ্যে ২ নম্বর অভিযোগে ২০ বছর, ৩, ৪, ৬, ৭, ৯ ও ১০ নম্বর অভিযোগের প্রত্যেকটিতে সাত বছর করে কারাদ- এবং ১৪ নম্বর অভিযোগে ১০ বছরের কারাদ- দেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো হলোÑ ১. মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে আলবদর বাহিনী ১৯৭১ সালের ৮ নভেম্বর ওমরুল ইসলাম চৌধুরীকে চাকতাই ঘাট থেকে অপহরণ করে। তাকে কয়েক দফায় চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লার একটি চামড়ার গুদামে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। ২. তার নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ১৯ নভেম্বর চট্টগ্রামের চাকতাই থেকে লুৎফর রহমান ফারুককে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতন ও বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়। ৩. ২২ অথবা ২৩ নভেম্বর আসামির নেতৃত্বে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে তার কদমতলার বাসা থেকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেলে নির্যাতন করা হয়। ৪. ডবলমুরিং থানার সালাহউদ্দিন খানকে তার নিজ বাসা থেকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেলে আলবদর বাহিনী কর্তৃক নির্যাতন। ৫. ২৫ নভেম্বর আনোয়ারা থানার আবদুল জব্বারকে তার নিজ বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেলে মীর কাসেম আলীর সামনে হাজির করা হয়। এরপর তাকে নির্যাতন করে ছেড়ে দেওয়া হয়। ৬. চট্টগ্রাম শহরের একটি চায়ের দোকান থেকে হারুনুর রশিদ নামে একজনকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেল ও সালমা মঞ্জিলে নির্যাতন করা হয়। ৭. মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে ৭-৮ জন যুবক ডবলমুরিং থানা থেকে সানাউল্লাহ চৌধুরীসহ দুজনকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেলে নির্যাতন করা হয়। ৮. ২৯ নভেম্বর রাতে নুরুল কুদ্দুসসহ চারজনকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। ৯. ২৯ নভেম্বর  সৈয়দ মোহাম্মদ এমরানসহ ছয়জনকে অপহরণ ও নির্যাতন। ১০. আসামির নির্দেশে মোহাম্মদ যাকারিয়াসহ চারজনকে অপহরণ ও নির্যাতন। ১১. জসিম উদ্দিনসহ ছয়জনকে অপহণের পর নির্যাতন করা হয়। এতে জসিমসহ পাঁচজন নিহত হন এবং পরে লাশ গুম করা হয়। ১২. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীসহ তিনজনকে অপহরণ করে নির্যাতন করা হয়। এতে দুজন নিহত হন এবং তাদের লাশ গুম করা হয়। ১৩. সুনীল কান্তিকে অপহরণ ও নির্যাতন এবং ১৪. নাসির উদ্দিন চৌধুরীকে অপহরণ ও নির্যাতন। ২০১২ সালের ১৭ জুন একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে মীর কাসেমকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
রাজাকার খোকন : মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে ফরিদপুরের নগরকান্দা পৌরসভার মেয়র ও বিএনপি নেতা পলাতক জাহিদ হোসেন খোকনকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। খোকনের বিরুদ্ধে আনা ১১টি অভিযোগের মধ্যে ১০টি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল এই রায় দেন। এর মধ্যে ৬টি অভিযোগে মৃত্যুদ- ও ৪টি অভিযোগে ৪০ বছর কারাদ- প্রদান করা হয়। চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গত ১৩ নভেম্বর দুপুরে এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেনÑ বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক। উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গত ১৭ এপ্রিল মামলার রায় অপেক্ষমাণ রাখা হয়। এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ১২তম রায়। জাহিদ হোসেন খোকনের বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্মান্তরিতকরণসহ ১১টি অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে ৫, ৬, ৭, ৮, ৯ ও ১০ নম্বর অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া ২নং অভিযোগে পাঁচ বছর কারাদ-, ৩নং অভিযোগে ১০ বছর, ৪নং অভিযোগে ২০ ও ১১নং অভিযোগে পাঁচ বছর কারাদ- প্রদান করা হয়। তার বিরুদ্ধে আনা ১নং অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বর খোকনের বিরুদ্ধে মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ২০১৩ সালের ৯ অক্টোবর মানবতাবিরোধী অপরাধে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করা হয়। খোকনের বিরুদ্ধে ১৬ নারী ও শিশুসহ ৫০ জনকে হত্যা, তিনজনকে পুড়িয়ে হত্যা, ২ জনকে ধর্ষণ, ৯ জনকে ধর্মান্তরিত করা, দুটি মন্দিরসহ ১০টি গ্রামের বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ, সাত গ্রামবাসীকে সপরিবারে দেশান্তরে বাধ্য করা ও ২৫ জনকে নির্যাতনসহ সুনির্দিষ্ট ১১টি অভিযোগ আনা হয়। পালাতক খোকনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে ২০১৩ সালের ৩০ জুলাই দুটি জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। ২০১৩ সালের ২৩ জুন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দখিল করার পর ১৮ জুলাই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। ২০১২ সালের ১৬ এপ্রিল শুরু হয়ে ২০১৩ সালের ২৮ মে শেষ হয় তদন্ত কাজ। পরে ২৯ মে ১৩টি অভিযোগসহ তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে দাখিল করে তদন্ত সংস্থা। গত বছরের ৯ অক্টোবর ১১টি মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করে খোকনের বিচার শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল। বিচার শুরু থেকেই পলাতক রয়েছেন তিনি।
মোবারক : মুক্তিযুদ্ধকালে ৩৩ জনকে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মোগড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা মো. মোবারক হোসেনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকর করার আদেশ দিয়েছেন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গত ২৪ নভেম্বর এই রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। এই ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক।
গত ২ জুন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল-১। প্রায় ছয় মাস পর গত ২৪ নভেম্বর এ মামলার রায় ঘোষণা করা হলো। এটি হলো যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর ষষ্ঠ ও দুই ট্রাইব্যুনালের ত্রয়োদশ রায়। সবশেষ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল-১ এর রায়ে ফরিদপুরের নগরকান্দা পৌরসভার মেয়র ও বিএনপি নেতা পলাতক এমএ জাহিদ হোসেন ওরফে খোকন রাজাকারের ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়। বর্তমানে দুই ট্রাইব্যুনালে আরও দুটি মামলার রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রয়েছে। মোবারকের বিরুদ্ধে এক নম্বর অভিযোগে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এ অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ২২ আগস্ট মোবারক ও অন্য রাজাকাররা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া থানার টানমান্দাইল গ্রামের ২৬ জন ও জাঙ্গাইল গ্রামের সাতজনকে বাছাই করে তেরোঝুড়ি হাজতখানায় নিয়ে যান। ২৩ আগস্ট পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা ওই ৩৩ জনকে নিয়ে গঙ্গাসাগর দীঘির পশ্চিম পাড়ে গুলি করে হত্যা করে মাটিচাপা দেয়। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য ও তথ্যে এ অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল সর্বসম্মতিতে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকরের আদেশ দেন। তিন নম্বর অভিযোগে মোবারককে যাবজ্জীবন কারাদ- দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ১১ নভেম্বর রাত ৮-৯টায় মোবারক তার সশস্ত্র রাজাকার সহযোগীদের নিয়ে ছাতিয়ান গ্রামের আবদুল খালেককে গুলি ও বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। এ অভিযোগও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল সর্বসম্মতিতে যাবজ্জীবন কারাদ- দিয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষের আনা ২, ৪ ও ৫ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় মোবারককে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। গত বছরের ২৩ এপ্রিল মোবারকের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের ৫টি অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১২ জন সাক্ষ্য দেন। আসামিপক্ষে সাক্ষ্য দেন মোবারক ও তার ছেলে। পরে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে ২ জুন মামলার কার্যক্রম শেষ হয়।
Ñ অনিল সেন

শ্রেণী:

আলবদর প্রধান নিজামীর ফাঁসির আদেশ রাজাকার শিরোমণি গোলাম আযমের মৃত্যু

3

3উত্তরণ প্রতিবেদন : একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় জামাতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীকে মৃত্যুদ- দিয়েছেন আদালত। গত ২৯ অক্টোবর বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই আদেশ দেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, নিজামীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের মধ্যে ২, ৪, ৬ ও ১৬ নম্বর প্রমাণিত হওয়ায় তাকে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১, ৩, ৭ ও ৮ নম্বর অভিযোগের জন্য তাকে যাবজ্জীবন কারাদ- দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। বাকি ৫, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪ ও ১৫ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় নিজামীকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
এর আগে ২৮ অক্টোবর নিজামীর রায় ঘোষণার জন্য ২৯ অক্টোবর দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। চলতি বছরের ২৪ জুন নিজামীর মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করা হলেও অসুস্থতার জন্য নিজামীকে আদালতে হাজির করতে না পারায় ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা তৃতীয় দফায় অপেক্ষমাণ রাখেন। একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ যুদ্ধাপরাধের ১৬ অভিযোগে বিচার হয়েছে নিজামীর। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ১৫টিই প্রমাণিত হয়েছে দাবি করে আদালতের কাছে সর্বোচ্চ শাস্তি কামনা করে রাষ্ট্রপক্ষ। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের দাবি নিজামীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ গণহত্যা, সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির অভিযোগসহ ১৯৭১ সালের কোনো অপরাধ প্রমাণ করতে পারেনি। অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাবেন বলে আশা করছে তারা। এদিকে, রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ সারাদেশে নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো।
২০১০ সালের ২৫ মার্চ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার পর ৯টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ৩টি ও ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে ৬টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। নিজামী বাদে এখন দুই ট্রাইব্যুনালে পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রইল। এ ছাড়া আপিল বিভাগে জামাত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের করা আপিলের রায়টি অপেক্ষমাণ রয়েছে।
দ্বিতীয় দফায় যুক্তিতর্ক শেষে গত ২৪ মার্চ নিজামীর মামলাটি রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল-১। এর আগে এই ট্রাইব্যুনাল সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর গত বছরের ১৩ নভেম্বর নিজামীর মামলার কার্যক্রম শেষে রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রেখেছিলেন। বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের চাকরির বয়সসীমা পূর্ণ হওয়ায় তিনি গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর অবসর নেন। সেই থেকে চেয়ারম্যানের পদটি শূন্য ছিল। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমকে। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ২৪ জুন রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন। কিন্তু ধার্য দিনে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ নিজামীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করেনি। পরে স্বাস্থ্যগত প্রতিবেদন চেয়ে নিজামীর মামলার রায় ঘোষণা আবারও অপেক্ষমাণ রাখেন  ট্রাইব্যুনাল। নিজামী সুস্থ এই মর্মে প্রতিবেদন আসার প্রায় চার মাস পর ২৯ অক্টোবর রায়ের জন্য দিন ধার্য করা হয়। ২০১২ সালের ২৮ মে নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৬টি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনাল-১ এ তার বিচার শুরু হয়। ওই বছরের ২৬ আগস্ট থেকে এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। তদন্ত কর্মকর্তা আবদুর রাজ্জাক খানসহ এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দেন মোট ২৬ জন। আর নিজামীর পক্ষে তার ছেলে মো. নাজিবুর রহমানসহ মোট চারজন সাফাই সাক্ষ্য দেন। মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, লুট, ধর্ষণ, উসকানি ও সহায়তা, পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার ১৬টি অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। যদিও রাষ্ট্রপক্ষ ১৫টি অভিযোগে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেছে  ট্রাইব্যুনালে।
রাজাকার শিরোমণি গোলাম আযমের মৃত্যু
বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী ও গণহত্যার মূল হোতা গোলাম আযম গত ২৩ অক্টোবর রাতে মারা যান। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাজা খাটা অবস্থায় মারা গেলেন তিনি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গোলাম আযমকে ৯০ বছরের সাজা দেন। রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, তার অপরাধের মাত্রা ছিল মৃত্যুদ-যোগ্য। কিন্তু বয়স ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে তাকে এই সাজা দেওয়া হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। ২০১২ সালের ১১ জানুয়ারি গ্রেফতারের পর মাত্র কয়েক ঘণ্টা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন গোলাম আযম। ওইদিনই তাকে বিএসএমএমইউতে এনে কারা তত্ত্বাবধানে ভর্তি করা হয়। এরপর থেকে তিনি হাসপাতালেই ছিলেন। গত ২২ অক্টোবর আপিলের শুনানির জন্য আগামী ২ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। ১৯২২ সালের ৭ নভেম্বর গোলাম আযম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার বীরগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। এই মাটিতে জন্ম হলেও তিনি বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করেন। পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের আমির হিসেবে ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক টিক্কা খানের সঙ্গে বৈঠক করে গণহত্যার পরিকল্পনা করেন। দেশ স্বাধীন হলে তার নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। এরপর থেকে তিনি মূলত লন্ডনে বসবাস করে বাংলাদেশ-বিরোধী তৎপরতা চালিয়ে গেছেন। ১৯৭৮ সালে তিনি পাকিস্তানি পাসপোর্ট ও তিন মাসের ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে আসেন। পাকিস্তানি পাসপোর্টধারী গোলাম আযম বাংলাদেশে এসে আর ফিরে যাননি। গোটা আশির দশক ছিলেন জামাতের অঘোষিত আমির। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর প্রকাশ্য রাজনীতি শুরু করেন। ১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর গোলাম আযমকে প্রকাশ্যে আমির ঘোষণা করে জামাত। এর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ করেছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। ১৯৯২ সালে নাগরিক সমাজকে সঙ্গে নিয়ে গঠন করেন গণ-আদালত। সেই প্রতীকী গণ-আদালতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ১০টি অভিযোগ আনা হয়েছিল। অভিযোগের প্রতিটিরই শাস্তি ঘোষণা হয়েছিল মৃত্যুদ-। বাংলাদেশের আলো-বাতাসে থাকলেও গোলাম আযম তার একাত্তরের ভূমিকার জন্য এ দেশের মানুষের কাছে ক্ষমা চাননি। একাত্তর সালের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চায়নি তার দল জামাতে ইসলামীও। যে দেশ তিনি চাননি, সে দেশেই মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে তাকে। তবে তা একজন মানবতাবিরোধী অপরাধী হিসেবে। গোলাম আযম নাকি তার অছিয়তনামায় মৃত্যুর পর তার জানাজা পড়ানোর জন্য দ-প্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী অথবা মতিউর রহমান নিজামীর নাম বলে গেছেন। মৃত্যুর পরও যে তার অপরাধ প্রবণতা ও খাসলত বদলাবে না অছিয়তনামায় তারই প্রমাণ রেখেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, তার ওই অন্যায় দাবি যেমন সরকার মানে নি, তেমনি বায়তুল মোকাররমের অভ্যন্তরে তার জানাজা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জাতীয় প্রতিষ্ঠানের অবমাননারও সুযোগ দেওয়া হয়নি। জাতীয় মসজিদের খতিব অথবা দেশের কোনো প্রথিতযশা আলেম নয়, রাজাকার গোলাম আজমের জানাজার ইমামতি করেছেন তার পুত্র। বায়তুল মোকাররম মসজিদে তার ঠাঁই হয়নি, উত্তরের রাস্তায় তার জানাজা পড়াতে হয়েছে। বিক্ষুব্ধ জনতা জুতা নিক্ষেপ করেছে সেই দৃশ্যও গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অব্যাহত
গত ২১ অক্টোবর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জাতীয় পার্টির নেতা পলাতক ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের ১৪তম সাক্ষী মহেন্দ্র অধিকারী জবানবন্দি প্রদান করেন। ২০ অক্টোবর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত বাগেরহাটের তিন রাজাকার কসাই সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাস্টার, খান আকরাম হোসেন ও আবদুল লতিফ তালুকদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হবে কি হবে না সে বিষয়ে আদেশের জন্য ৫ নভেম্বর দিন নির্ধারণ করে ট্রাইব্যুনাল। অন্যদিকে একই মামলায় পিরোজপুরের পলাতক ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের ১৩ নম্বর সাক্ষী জনপ্রসাদ পাইক জবানবন্দিতে বলেছেন, জব্বারের নির্দেশে আমার চাচা শারদা কান্ত পাইককে পাকিস্তানি আর্মিরা গুলি করে হত্যা করে। জবানবন্দি শেষে ২১ অক্টোবর আসামিপক্ষকে জেরার জন্য দিন নির্ধারণ করা হয়। ১৯ অক্টোবর একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত বাগেরহাটের তিন রাজাকার আবদুল লতিফ তালুকদার, শেখ সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাস্টার ও খান আকরাম হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আসামিপক্ষের শুনানির দিন ২০ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়। অন্যদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত পিরোজপুর জেলার জাতীয় পার্টির নেতা পলাতক ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের ১৩তম সাক্ষী ২০ অক্টোবর সাক্ষ্য দেন। চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই দিন নির্ধারণ করেছেন। এর আগে বাগেরহাটের তিন রাজাকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের ওপর শুনানির দিন ছিল ১২ অক্টোবর। ট্রাইব্যুনাল স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তা ২০ অক্টোবর পুনর্নির্ধারণ করেছে। ১৪ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার অফিসে প্রসিকিউটর তিন আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ১৩ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে ব্যক্তিগত ব্লগে আপত্তিকর মন্তব্য করায় বিদেশি সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগের আদেশের জন্য আগামী ১ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

শ্রেণী:

সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ড

Posted on by 0 comment
45

কামারুজ্জামান ও আজাহারের রায় অপেক্ষমাণ

45যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদ-াদেশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর মৃত্যুদ-াদেশের রায়ের বিরুদ্ধে করা সাঈদীর আপিল মামলার চূড়ান্ত রায়ে সাজা কমিয়ে তাকে এ দ-াদেশ দেওয়া হয়। গত ১৭ সেপ্টেম্বর সকালে প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ সদস্যের আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে এ রায় দেন। অন্য চার বিচারপতি হচ্ছেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী। সাঈদীর বিরুদ্ধে আনা ২০টি অভিযোগের মধ্যে আপিল বিভাগের রায়ে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় ৫টি অভিযোগ। এর মধ্যে দুটিতে অর্থাৎ ১৬ ও ১৯ নম্বর অভিযোগে আমৃত্যু, একটিতে অর্থাৎ ১০ নম্বর অভিযোগে যাবজ্জীবন, একটিতে অর্থাৎ ৮ নম্বর অভিযোগে ১২ বছর ও একটিতে অর্থাৎ ৭ নম্বর অভিযোগে ১০ বছর কারাদ-াদেশ দেওয়া হয়েছে সাঈদীকে। এ ছাড়া ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত ৬, ১১ ও ১৪ নম্বর অভিযোগ আপিল বিভাগের রায়ে প্রমাণিত না হওয়ায় এসব অভিযোগ থেকে খালাস পান।
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীকে মৃত্যুদ- দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। সে রায়ে তার বিরুদ্ধে গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণের ৮টি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। এর মধ্যে দুটি অপরাধে অর্থাৎ ৮ ও ১০নং অভিযোগে সাঈদীকে মৃত্যুদ-াদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। প্রমাণিত অন্য ৬টি অর্থাৎ ৬, ৭, ১১, ১৪, ১৬ ও ১৯নং অভিযোগে আলাদাভাবে কোনো সাজা দেননি ট্রাইব্যুনাল। সাঈদীর বিরুদ্ধে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ৩ হাজারেরও বেশি নিরস্ত্র ব্যক্তিকে হত্যা বা হত্যায় সহযোগিতা, ৯ জনেরও বেশি নারীকে ধর্ষণ, বিভিন্ন বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট, ভাঙচুর এবং ১০০ থেকে ১৫০ হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরে বাধ্য করার মতো ২০টি ঘটনার অভিযোগ আনা হয়েছিল ট্রাইব্যুনালে। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে গত বছরের ২৮ মার্চ সাঈদী ও সরকারপক্ষ পৃথক দুটি আপিল দাখিল করে।
১৬ এপ্রিল আপিল মামলাটির শুনানি শেষ হওয়ায় রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখেন আপিল বিভাগ। এর পাঁচ মাসের মাথায় রায়টি দিলেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এর মধ্য দিয়ে ট্রাইব্যুনাল থেকে আপিল বিভাগে আসা মানবতাবিরোধী অপরাধের দ্বিতীয় মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষিত হয়। এর আগে জামাতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার আপিল মামলার রায়ে গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালের দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদ-াদেশ বাড়িয়ে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। ৫ ডিসেম্বর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর ১২ ডিসেম্বর রাতে কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়।
এদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর রায়ে ফাঁসির দ-াদেশপ্রাপ্ত জামাতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের আপিল মামলার রায় দেওয়া হবে যে কোনো দিন। আপিল শুনানি শেষ হওয়ায় ১৭ সেপ্টেম্বর মামলাটির রায় অপেক্ষমাণ রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখেন বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বিভাগ। বেঞ্চের অন্য তিন সদস্য হচ্ছেনÑ বিচারপতি আবদুল ওহাব মিয়া, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী। ফলে ট্রাইব্যুনাল থেকে আপিল বিভাগে যাওয়া মামলাগুলোর মধ্যে তৃতীয় এ মামলাটির চূড়ান্ত বিচার শেষ হলো। ৫ জুন থেকে শুরু হয় এ আপিল শুনানি। ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ও ১৬ সেপ্টেম্বর ১৫ কার্যদিবসে আসামিপক্ষে শুনানি করেন কামারুজ্জামানের প্রধান আইনজীবী খন্দকার মাহাবুব হোসেন, এসএম শাহজাহান ও অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম। অন্যদিকে ৯ সেপ্টেম্বর থেকে রাষ্ট্রপক্ষে চার কার্যদিবস শুনানি করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল। শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, কামারুজ্জামানের করা আপিলের ওপরে উভয়পক্ষের শুনানি শেষ হয়েছে। আশা করছি, ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল থাকবে। ১৯৭১ সালে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে একটি গ্রাম পুরুষশূন্য করার অভিযোগ রয়েছে। যেটা এখন ‘বিধবা পল্লী’ হিসেবে পরিচিত। ওই গ্রামের ভুক্তভোগী নারীরা এসে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামাতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামের মামলার রায় অপেক্ষমাণ রয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বর মামলাটির যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) উপস্থাপনের মাধ্যমে বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ায় রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ (সিএভি) রেখেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কের পাল্টা ও সমাপনী যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম ও ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ। প্রসিকিউটররা বলেন, আসামিপক্ষ এই মামলা ভুল প্রমাণ করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। এটিএম আজহারের বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন প্রসিকিউশন। রায় অপেক্ষমাণ (সিএভি) রেখে দেন চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল। মামলার ধারাবাহিক কার্যক্রম ২৭ আগস্ট থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ কার্যদিবসে আসামিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন আজহারের আইনজীবী আবদুস সুবহান তরফদার ও শিশির মোহাম্মদ মুনির। অন্যদিকে ১৮ থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত ও ১৮ সেপ্টেম্বর সাত কার্যদিবসে আজহারের বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম, ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ও তাপস কান্তি বল।
গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়ে ৬ জুলাই পর্যন্ত আজহারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) এম ইদ্রিস আলীসহ রাষ্ট্রপক্ষের ১৯ সাক্ষী। তাদের মধ্যে সপ্তম সাক্ষী আমিনুল ইসলামকে বৈরী ঘোষণা করেছেন রাষ্ট্রপক্ষ। বাকি ১৭ সাক্ষীর মধ্যে ঘটনার ১৪ সাক্ষী হলেনÑ ক্যামেরা ট্রায়ালে সাক্ষ্য দেওয়া একজন ভিকটিম, মুক্তিযোদ্ধা মো. মোস্তফা, শহীদপুত্র মোখলেসার রহমান সরকার ওরফে মোখলেস আলী, মো. মেছের উদ্দিন, আবদুর রহমান, মকবুল হোসেন, মো. মুজিবর রহমান মাস্টার, শোভা কর, রতন চন্দ্র দাস, সাখাওয়াত হোসেন রাঙ্গা, রফিকুল হাসান নান্নু রথিশ চন্দ্র ভৌমিক, এওয়াইএম মোয়াজ্জেম আলী এবং তপন কুমার অধিকারী।

শ্রেণী: