টুসির ‘মীনালাপ’ এবার জিতল ‘ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ড’

11-6-2018 6-23-51 PM
11-6-2018 6-22-54 PM

তাজিকিস্তানে অষ্টম ডিডোর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব

উত্তরণ ডেস্ক: কাজাখস্তানে ১৪তম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘গ্রান্ডপিক্স অ্যাওয়ার্ড’ প্রাপ্তির পর এবার তাজিকিস্তানেও অনুষ্ঠিত অষ্টম ডিডোর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেছে বাংলাদেশি নির্মাতা সুবর্ণা সেঁজুতি টুসি’র স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মীনালাপ’। গত ১৬ থেকে ২০ অক্টোবর পাঁচ দিনব্যাপী তাজিকিস্তানের রাজধানী দুশাম্বে-তে অনুষ্ঠিত অষ্টম ডিডোর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব-২০১৮ আসরের সমাপণী দিনে এই অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়। পুরস্কারের Citation–এ এই পুরস্কার প্রদানের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, “For the cinematic reflection of the idea of humanism.”  ফিল্ম     এন্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া-র প্রযোজনায় চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্য এবং পরিচালনা করেছেন সুবর্ণা সেঁজুতি টুসি।
11-6-2018 6-23-51 PMপরিচালক সুবর্ণা সেঁজুতি জানান, ২৮ মিনিট দৈর্ঘ্যরে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মীনালাপ’ চলচ্চিত্রটির গল্প গড়ে উঠেছে বাঙালি এক দম্পতিকে ঘিরে এবং আশায় আবর্তিত শহুরে নিঃসঙ্গ জীবনের মুহূর্তগুলো নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে পুনে শহরে আসা গার্মেন্টসে কর্মরত একটি বাঙালি দম্পতির অনাগত সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগ-মুহূর্তগুলো চলচ্চিত্রটিতে উঠে এসেছে। ভাগ্যের অন্বেষণে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে পরিবারটি পুনে শহরে চলে যায়। সেখানে এক গার্মেন্ট কারখানায় এই দম্পতি কাজ নেয়। নতুন শহরে তাদের নতুন সংগ্রাম, নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন।
এর আগেও চলতি বছরের ৬ জুলাই কাজাখস্তানে অনুষ্ঠিত ১৪তম ইউরেশিয়া আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্বল্পদৈর্ঘ্য বিভাগে গ্রান্ডপিক্স পুরস্কার অর্জন করে ‘মীনালাপ’ চলচ্চিত্রটি। যা ছিল প্রথম এই উপমহাদেশের কোনো নির্মাতার চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হওয়া।
‘মীনালাপ’ চলচ্চিত্রের চিত্রগ্রহণ করেছেন অর্চনা গাঙ্গরেকর। শব্দগ্রহণে স্বরূপ ভাত্রা, শিল্প নির্দেশনায় হিমাংশী পাটওয়াল এবং সম্পাদনায় ছিলেন ক্ষমা পাডলকর। চলচ্চিত্রটি ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া’র প্রযোজনায় নির্মিত। ‘মীনালাপ’ চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিতাস দত্ত, প্রমিত দত্ত, বিবেক কুমার এবং দেভাস দীক্ষিত।
সুবর্ণা সেঁজুতি, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে টুসি নামেই বেশি পরিচিত। ছোটবেলা থেকে জড়িত ছিলেন মঞ্চ নাটকের সঙ্গে। সাংবাদিকতা করেছেন। টেলিভিশনের অনুষ্ঠান উপস্থাপনা আর গ্রন্থনার কাজ করেছেন। তিনি নাটক ও চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্টও লিখেছেন। বাংলাদেশে পড়াশোনা করেছেন অর্থনীতি বিষয়ে। ভারতে পুনে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া থেকে ফিল্ম ডিরেকশন ও স্ক্রিপ্ট রাইটিংয়ের ওপর পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা করেছেন। সুবর্ণা সেঁজুতি এর আগে আরও কয়েকটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরি করেছেন। ছবিগুলো হলোÑ জাদু মিয়া (২০১১), পারাপার (২০১৪) ও পুকুরপার (২০১৮)। তার নতুন ছবির নাম ‘মীনালাপ’।

শ্রেণী:

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার : আজীবন সম্মাননা পেলেন ববিতা ও ফারুক

Posted on by 0 comment

উত্তরণ ডেস্ক : গত ৮ জুলাই অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ২০১৬ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অনুষ্ঠান। জমকালো আয়োজনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে পদক তুলে দেওয়া হয়।
পুরস্কার অর্জনের দিক দিয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছে নাদের চৌধুরী পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘মেয়েটি এখন কোথায় যাবে’। সেরা গীতিকার, সেরা সুরকার ও সেরা সংগীত পরিচালকসহ ৪টি পুরস্কার জিতেছে এ ছবিটি। এবারের আসরে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতে নিয়েছে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রযোজিত ও তৌকীর আহমেদ পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘অজ্ঞাতনামা’। সেরা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ছবিটি সেরা কাহিনিকার ও সেরা খল-অভিনেতার পুরস্কারও জিতে নিয়েছে। এ আসরে গৌতম ঘোষের ‘শঙ্খচিল’ চলচ্চিত্রও পেয়েছে ৩টি পুরস্কার।
একনজরে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০১৬ : শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রÑ অজ্ঞাতনামা, শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রÑ ঘ্রাণ, শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রÑ জন্মসাথী, শ্রেষ্ঠ পরিচালকÑ অমিতাভ রেজা চৌধুরী (আয়নাবাজি), শ্রেষ্ঠ অভিনেতা (প্রধান চরিত্র)Ñ চঞ্চল চৌধুরী (আয়নাবাজি), শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী (প্রধান চরিত্র)Ñ যৌথভাবে আফরোজা ইমরোজ তিশা (অস্তিত্ব) ও কুসুম শিকদার (শঙ্খচিল), শ্রেষ্ঠ অভিনেতা (পার্শ্ব চরিত্র)Ñ যৌথভাবে আলীরাজ (পুড়ে যায় মন) ও ফজলুর রহমান বাবু (মেয়েটি এখন কোথায় যাবে)। আর সব ছাপিয়ে এবার আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন বাংলা চলচ্চিত্রের সবার প্রিয় অভিনেত্রী ববিতা এবং অভিনেতা ফারুক।

শ্রেণী:

জ্ঞানালোক পুরস্কার পেলেন অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ

Posted on by 0 comment
8-6-2018 7-22-34 PM

8-6-2018 7-22-34 PMমাসুদ পথিক: সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন বরাবরের মতো এবারও বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ‘জ্ঞানালোক পুরস্কার’ প্রদান করেছে। গত ৩১ জুলাই বিকেল ৫টায় জাতীয় জাদুঘর সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়।
চিকিৎসাসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াকে সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পথিকৃতের ভূমিকা রাখার জন্য ২০১৭ সালের ‘জ্ঞানালোক পুরস্কার’-এ ভূষিত হয়েছেন অধ্যাপক এ কে আজাদ খান। এই পুরস্কার তুলে দিয়েছেন অনুষ্ঠানের প্রধান জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। অধ্যাপক এ কে আজাদ খানকে ক্রেস্টসহ ১ লাখ টাকার চেক প্রদান করেন সংগঠনের সভাপতি রাজনীতিবিদ ও কবি নূহ-উল-আলম লেনিন। এছাড়াও প্রধান অতিথি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ও অধ্যাপক এ কে আজাদ খানকে বিক্রমপুরের প্রতœত্ত্বাতিক খননের চিত্র উপহার দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম এবং পুরস্কারপ্রাপ্ত ডা. এ কে আজাদ খানের সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ করেন সহ-সম্পাদক আবু হানিফ। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডা. রশিদী মাহবুব। মানপত্র পাঠ করেন নৃত্যশিল্পী লায়লা হাসান।
প্রধান অতিথি অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তার বক্তৃতায় বলেন, অধ্যাপক এ কে আজাদ খান নানা গুণ ও যোগ্যতার জন্য সমাদৃত। তিনি অত্যন্ত বিনয়ী ও সৌজন্যপরায়ণ মানুষ। তার জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানবতাবোধ ও দায়িত্ববোধ। বাংলাদেশের ডায়াবেটিক চিকিৎসাসেবায় তিনি একজন পথিকৃৎ। ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম ডায়াবেটিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে সাধারণ মানুষের সেবা করে গেছেন। আর এ কে আজাদ সেই কাজকে আরও বড় করে তুলেছেন।
অধ্যাপক এ কে আজাদ খান বলেন, সম্মাননা পেয়ে গর্বিত মনে করছি। একজন ডাক্তার হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা করাই আমার একমাত্র কাজ। আমি সেটাই করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমাকে যতটুকু সম্মানিত করা হয়েছে ততটুকুর যোগ্য আমি নই। তবে আমি যোগ্য হয়ে উঠতে চেষ্টা করে যাব। অনুষ্ঠানের শুরুতে রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করেন মোস্তাফিজুর রহমান তূর্য এবং নজরুল ইসলামের গান পরিবেশন করেন বুলবুল মহলানবীশ। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ছিলেন অধ্যাপক ঝর্ণা রহমান। সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি রাজনীতিবিদ ও কবি নূহ-উল-আলম লেনিন।

শ্রেণী:

সংবাদপত্রের সাহিত্য পাতা

Posted on by 0 comment
4-5-2018 7-25-46 PM

4-5-2018 7-25-46 PMইমদাদুল হক মিলন: আমার প্রথম লেখা ছাপা হয় ১৯৭৩ সালে। সেই সময়কার দৈনিক পত্রিকা ‘পূর্বদেশ’-এর ছোটদের পাতা চাঁদের হাটে। লেখা ডাকে পাঠিয়েছিলাম। পরের সপ্তাহেই ছাপা হয়েছিল। তখনও পর্যন্ত জানি না ‘চাঁদের হাট’ পাতা কে সম্পাদনা করেন, ওই পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক কে? এরপর থেকে যখন নিয়মিত লিখতে শুরু করলাম, ধীরে ধীরে যাতায়াত শুরু হলো বিভিন্ন পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকের কাছে। সেই সময়ে কয়েকজন সাহিত্য সম্পাদক লেখক-কবিদের খুবই সমীহের জায়গায় অবস্থান করছিলেন। যেমনÑ আহসান হাবীব, আবুল হাসনাত বা মাহমুদ আল জামান। আহসান হাবীব দৈনিক বাংলা-য় সাহিত্য পাতা সম্পাদনা করতেন। আর হাসনাত ভাই করতেন দৈনিক সংবাদ-এর সাহিত্য পাতা। দুজনই কবি। হাসনাত ভাই কবিতা লিখতেন মাহমুদ আল জামান নামে। এখনও এই নামেই লেখেন। দৈনিক ইত্তেফাক-এর সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাই। তিনি বিখ্যাত ছড়াকার এবং শিশু-কিশোর সংগঠন ‘কচি ও কাঁচা’র প্রতিষ্ঠাতা। সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে যতটা না খ্যাতিমান তার চেয়ে অনেক বেশি নাম ছিল তার কচি ও কাঁচার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে। ইত্তেফাকের ছোটদের পাতাটির নাম ‘কচি ও কাঁচা’। তিনি সেই পাতাটিও সম্পাদনা করতেন। ‘জনপদ’ নামে একটি দৈনিক পত্রিকা ছিল। এই পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন শিশুসাহিত্যিক এখলাস উদ্দিন আহমেদ। ওই পত্রিকায় ছোটদের পাতাটিও তিনি সম্পাদনা করতেন। পুরান ঢাকার বাংলাবাজার গার্লস হাই স্কুলে ঢোকার মুখে একটি পুরনো বাড়িতে ছিল অফিস। আমি তখন জগন্নাথ কলেজে পড়ি। আর দু-হাতে ছোটদের লেখা, বড়দের লেখাÑ যখন যা মনে আসছে লিখে যাচ্ছি। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই এখলাস ভাই আমার সেই সব কাঁচা লেখা অতি যতেœ সম্পাদনা করে ছাপতেন। ইত্তেফাকের সাহিত্য পাতায় বা কচি ও কাঁচা পাতায় দাদা ভাইয়ের হাত দিয়ে আমার কোনো লেখা কখনোই ছাপা হয়নি। বোধহয় শেষ দিকে, আটাত্তর-ঊনআশি সালে কোনো বিশেষ সংখ্যায় দাদা ভাই আমার একটা-দুটো লেখা চেয়ে নিয়ে ছাপিয়েছিলেন। ততদিনে লেখক হিসেবে আমার পায়ের তলার মাটি একটু একটু শক্ত হচ্ছিল। বাংলা একাডেমির পাক্ষিক পত্রিকা ‘উত্তরাধিকার’ সম্পাদনা করতেন কবি রফিক আজাদ। আমার প্রথম উপন্যাস ‘যাবতজীবন’ ধারাবাহিকভাবে ছেপে তিনি আমাকে কথাসাহিত্যের জায়গায় অনেকটাই দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। সেই কারণে পত্রিকায় সাহিত্য সম্পাদক এবং লেখক-কবিদের কাছে আমার কিছুটা কদর হয়েছে। বোধহয় সেই কারণেই দাদা ভাই আমার লেখা চেয়েছিলেন।
স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে বেশ অনেকগুলো বছর বাংলাদেশে তরুণ-কবিদের সবচাইতে আগ্রহের জায়গা ছিল দৈনিক বাংলার সাহিত্য পাতা। কবি আহসান হাবীব সম্পাদনা করেন। নতুন লেখকদের লেখা অতি যতেœ সম্পাদনা করে ছাপতেন। একটু সম্ভাবনা আছেÑ এমন নবীন লেখককে গুরুত্ব দিতেন। আর তখন এমন একটা অবস্থা তৈরি হয়েছিল, আহসান হাবীবের পাতায় লেখা ছাপা হওয়া মানে লেখক বা কবি হিসেবে আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। প্রতিষ্ঠিত লেখক-কবিরাও সমীহ করতেনÑ ও আচ্ছা, তোমার লেখা তাহলে হাবীব ভাই ছেপেছেন। খুব ভালো। এই তো লেখক হিসেবে দাঁড়িয়ে গেলে।
সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কবি আহসান হাবীবের ছিল এই মর্যাদা। আমার একটিমাত্র লেখা তিনি ছেপেছিলেন মনে আছে। সেই লেখা কোথায় হারিয়ে গেছে, লেখার নামও আজ আর মনে নেই। তবে তিনি আমার অনেক লেখা ছাপার অনুপযুক্ত বলে ফেরত দিয়েছেন। একসময় খুব অভিমান হলো। ঠিক আছে, আর লেখাই দেব না হাবীব ভাইয়ের পাতায়। তার কাছে আর যেতামও না। মৃত্যুর বছরখানেক আগে দৈনিক বাংলা ভবনে একদিন দেখা হয়েছিল। তিনি স্নিগ্ধ মুখে বললেন, ‘তুমি তো আর লেখা দাও না। তোমার অভিমানটা আমি টের পাই।’ মাথা নিচু করে বলেছিলাম, ‘লিখব হাবীব ভাই।’ কিন্তু লেখা হয়নি। তার মৃত্যুর পর বেশ কয়েকটি গল্প লিখেছিলাম দৈনিক বাংলায় সাহিত্য পাতায়। ‘কোন কাননের ফুল’ নামে একটি ধারাবাহিক উপন্যাস লিখেছিলাম। তখন পাতার সম্পাদক সালেহ চৌধুরী অথবা নাসির আহমেদ।
দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকদের মধ্যে আমাকে সবচাইতে বেশি প্রশ্রয় দিয়েছেন সংবাদের হাসনাত ভাই। এই পত্রিকায় সাহিত্য পাতাটিও তখন খুবই উঁচু স্তরের। অসামান্য সব লেখা ছাপা হতো। এই পাতাটির জন্য সাহিত্যপ্রেমীরা সারা সপ্তাহ অপেক্ষা করত। পাতাটি বেরোত বৃহস্পতিবার। আমার শিল্পী বন্ধু কাজী হাসান হাবিব পাতা মেকআপ করতেন, গল্প-কবিতায় ইলাস্ট্রেশনস করতেন। এও ছিল আরেক বাড়তি আকর্ষণ আমাদের। হাবিবের লেটারিং ছিল অসাধারণ। ইলাস্ট্রেশনস করতেন চোখে লেগে থাকার মতো। মঙ্গলবার বিকেলে সাহিত্য পাতায় মেকআপ ইত্যাদির কাজ করতেন হাবিব। আর আমরা চার বন্ধু গিয়ে বসে থাকতাম হাবিবের টেবিলের পাশে। গল্পকার সিরাজুল ইসলাম, মুহম্মদ জুবায়ের, ফিরোজ সারোয়ার আর আমি। চা আর ডালপুরি খাওয়া চলছে। সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন চারদিক। হাবিব মাথা নিচু করে লেটারিং করছেন, ইলাস্ট্রেশনস করছেন। আমরা গল্পগুজব, হাসি-ঠাট্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এক-দুবার হাসনাত ভাই এসে উঁকি দিয়ে গেলেন। তিনি গম্ভীর মানুষ। সহজে হাসেন না, কথাও বলেন নিম্নস্বরে। হাসনাত ভাইকে আমরা যেমন ভালোবাসি, গাম্ভীর্যের কারণে ভয়ও পাই কিছুটা। নিয়মিতই তিনি আমাদের লেখা ছাপছেন। লেখার ভালোমন্দ নিয়ে কথা বলছেন, পরামর্শ দিচ্ছেন। সংবাদের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ম্যাগাজিন সাইজের দুর্দান্ত একটি সংখ্যা প্রকাশ করলেন। একেবারেই তরুণ লেখকদের মধ্য থেকে আমার একটি গল্প ছাপলেন। গল্পের নাম ‘রাজা বদমাশ’। কত জ্বালা যে হাসনাত ভাইকে আমি জ্বালিয়েছি। লেখক হিসেবে আজ যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি, দুজন মানুষ ঠেলে ঠেলে আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন। একজন রফিক আজাদ, আরেকজন হাসনাত ভাই। এই দুজনের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার সীমা-পরিসীমা নেই।
স্বাধীনতার পর আমাদের সাহিত্যে শুরু হয়েছিল এক নতুন জোয়ার। একসঙ্গে অনেক তরুণ লিখতে শুরু করেছিলেন। লেখা প্রকাশের জায়গা ছিল কম। তিন-চারটি দৈনিক পত্রিকা, দু-একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা, একটি-দুটি মাসিক পত্রিকা। কিন্তু প্রতিটি পত্রিকারই একটি মানের জায়গা ছিল। যারা সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন তারা খুব মন দিয়ে নতুন লেখকদের লেখা পড়তেন। অতি যতেœ সম্পাদনা করতেন। অপছন্দের লেখা নির্দ্বিধায় ফেরত দিতেন। কারও মুখ চেয়ে লেখা ছাপাতেন না। অমুকের সঙ্গে আমার খাতির আছে বলে তার দুর্বল লেখাটি আমি ছেপে দেবÑ এই মনোভাব একজন সাহিত্য সম্পাদকেরও ছিল না। যে লেখক-কবির মধ্যে সম্ভাবনা দেখতেন তাদের ডাকতেন। লেখার ভালোমন্দ নিয়ে কথা বলতেন। লেখার দুর্বলতা ধরিয়ে দিতেন। একজন কবির কিংবা কথাসাহিত্যিকের সাহিত্যের পড়াশোনার জায়গাটি নিয়ে কথা বলতেন। এক লেখাই হয়তো লেখককে দিয়ে দু-তিনবার লেখাতেন। এ অবস্থাটি নব্বই দশকের শুরু পর্যন্ত ছিল। তারপর ধীরে ধীরে পত্রিকার সংখ্যা বাড়তে লাগল। শ্রদ্ধেয় সাহিত্য সম্পাদকরা বিদায় নিতে লাগলেন। নতুন নতুন মানুষ সাহিত্য সম্পাদক হলেন। একদিকে পত্র-পত্রিকার সংখ্যা হলো অগণিত, অন্যদিকে লেখক তৈরি হওয়া কমতে লাগল। উচ্চমানের লেখা সব সময় কম লেখা হয়। কিন্তু শুদ্ধ সুন্দর পরিশীলিত ভাষায় চলনসই লেখার পরিমাণও বিস্ময়করভাবে কমে গেল। ফলে সাহিত্য পাতা ভরানো খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়াল। এ অবস্থায় অনেক অলেখকেরও জায়গা হতে লাগল ভালো ভালো পত্রিকার সাহিত্য পাতায়। আসলে, সাহিত্য সম্পাদকদেরও এ অবস্থায় কিছু করার নেই। সব দেখেশুনে রফিক আজাদ একবার বললেন, ‘এখন আর সাহিত্য সম্পাদক সেই অর্থে নেই। যারা পত্রিকার ওই পাতাটিতে কাজ করেন তারা অসহায়। তাদের বিশেষ কিছু করার নেই। তারা আসলে সম্পাদক না, তারা সংগ্রাহক। লেখা সংগ্রহ করে ছেপে যাচ্ছেন।’
এখনও আসলে এ অবস্থাই চলছে। ‘আজকের কাগজ’ পত্রিকাটির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সংবাদপত্রের বাঁকবদল ঘটেছিল। আজকের বাংলাদেশে যে সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় এই আঙ্গিক তৈরি করে দিয়েছে আজকের কাগজ। দৈনিক পত্রিকার ভেতরে সাপ্তাহিক কাগজের চরিত্র এবং বিষয়, পাক্ষিক এবং মাসিক কাগজের চরিত্র এবং বিষয় সন্নিবেশিত করে চলছে এখন দৈনিক পত্রিকাগুলো। ফলে সাপ্তাহিকের কদর বাংলাদেশে আর নেই, পাক্ষিক এবং মাসিকের কদরও নেই। দৈনিক পত্রিকা একাই ধারণ করে আছে বহু পত্রিকার চরিত্র। হয়তো এই অবস্থারও বদল ঘটবে। হয়তো সংবাদপত্র অচিরেই বাঁক নেবে নতুন আরেক দিকে। সংবাদ পরিবেশন ভঙ্গিমায়, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-সংস্কৃতিতে ও সাহিত্যের পাতাগুলো ঢুকে যাবে নতুন ভাবনাচিন্তার জগতে। একটি আমূল পরিবর্তনের সম্ভাবনা টের পাওয়া যাচ্ছে। নতুন চিন্তা-চেতনার উন্মেষ টের পাওয়া যাচ্ছে।
আমি যেহেতু সাহিত্য এবং সংবাদপত্র দু-জায়গারই লোক, দু-জায়গা থেকেই নতুন সম্ভাবনার পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। আমাদের সংবাদপত্র ধীরে ধীরে নতুন স্তরে উন্নীত হচ্ছে, তার সঙ্গে সাহিত্যও চলছে নতুন স্তরের দিকে। নতুন মেধাবী লেখক-কবিরা এসে নতুন আঙ্গিকের সাহিত্য উপহার দেবেন, আর নতুন সাহিত্য সম্পাদকরা সেই সম্ভাবনায় রাখবেন তাদের মূল্যবান হাতের পরশ। সব মিলিয়ে আমাদের সংবাদপত্র এবং সাহিত্য আরও অনেক বড় জায়গায় গিয়ে দাঁড়াবে।

শ্রেণী:

গৌরবে উৎসবে আনন্দে মুখর বিজয় দিবস

Posted on by 0 comment
45

45উত্তরণ প্রতিবেদন: গত ১৬ ডিসেম্বর সকাল থেকেই যেন চিত্রশিল্পীর রঙিলা ক্যানভাস হয়ে ওঠে শহর ঢাকা। নগরের চারপাশে দেখা গেছে বর্ণময়তার দৃশ্যকাব্য। নগরবাসী পথিকের সূত্র ধরে পথে পথে বয়ে গেছে আনন্দের ফল্গুধারা। আর এমন আনন্দের উপলক্ষ্য ছিল মহান বিজয় দিবস। সেই সুবাদে বাঙালির জাতিসত্তা প্রকাশের দিনটিতে দারুণ সরব ছিল নগরের সংস্কৃতি ভুবন। সেসব আয়োজনে স্মরণ করা হয়েছে স্বাধীনতার জন্য প্রাণ সঁপে দেওয়া শহীদদের। ভালোবাসা জানানো হয়েছে পূর্ব দিগন্তে সূর্য ওঠানো নতুন দেশের স্বপ্ন আঁকা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। দিনভর উচ্চারিত হয়েছে জয় বাংলার গান আর বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। দিনটিতে যেন নতুন করে খোঁজা হয়েছে স্বাধীনতা শব্দটির তাৎপর্য। স্বদেশের প্রতি ভালোবাসায় বর্ণিল হয়েছে ঢাকার পথ-প্রান্তরসহ নানা মঞ্চ কিংবা মিলনায়তন। আর এসব আয়োজনে বিশিষ্টজনদের আলোচনা, নৃত্য, গীত ও কবিতার ছন্দে, নাটকের সংলাপে কিংবা শিল্পীর মনন আশ্রিত শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর মাধ্যমে জানানো হয়েছে জাতির সূর্য-সন্তানদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

সাংস্কৃতিক জোটের বিজয় উৎসব
বিজয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীর আট মঞ্চে সপ্তাহব্যাপী বিজয় উৎসবের আয়োজন করেছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। সে আয়োজনের অংশ হিসেবে ১৬ ডিসেম্বর সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে বের হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। এ শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘৭ মার্চ মুক্তি ও স্বাধীনতার ডাক বাংলার ঘরে ঘরে/৭ মার্চ সম্পদ আজ বিশ্ব-মানবের তরে’। শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম ও রামেন্দু মজুমদার।
শোভাযাত্রা-পূর্ব বক্তৃতায় জোট নেতৃবৃন্দ বলেন, আমরা স্বাধীন হয়েছি। কিন্তু এখনও পরাধীনতা ও সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত হইনি। অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকেও মুক্ত হয়নি। অসম্পূর্ণ যে কাজগুলো আছে তা আমাদের পূর্ণ করতে হবে। আমাদের নতুন প্রজন্ম মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন পূরণ করবে।
শোভাযাত্রায় দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে নেচে-গেয়ে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন জোটভুক্ত শতাধিক সংগঠনে কয়েক হাজার সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ মানুষ। সংস্কৃতিকর্মীদের অংশগ্রহণে স্বতঃস্ফূর্ত হয় শোভাযাত্রা। বিজয়ের আনন্দ ও চেতনা ছড়িয়ে দিতে নাটক, গান, আবৃত্তি ও নৃত্যাঙ্গনের সাথে সংশ্লিষ্টরা অংশ নেয় শোভাযাত্রায়। শোভাযাত্রা জুড়ে ছিল জাতীয় পতাকা ও একাত্তরের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পোস্টার। ছিল বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ থেকে ঐতিহাসিক ২৪টি বাণী সম্বলিত ফেস্টুন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে বের হয়ে শোভাযাত্রাটি শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে এসে শেষ হয়।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর
বিজয় দিবস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী উৎসবের শেষ দিন ছিল বিজয় দিবস। এদিন সকালে আগারগাঁওয়ের জাদুঘর প্রাঙ্গণে জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে শুরু হয় কার্যক্রম। এরপর অনুষ্ঠিত হয় শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।

শিল্পকলা একাডেমি
বিজয় দিবসের সন্ধ্যায় একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে ছিল আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রবীণ সাংবাদিক ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক কামাল লোহানী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন ড. আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। সাংস্কৃতিক পর্বে প্রখ্যাত শিল্পীদের পাশাপাশি প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীরা দেশের গান, নাচ ও আবৃত্তি পরিবেশন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা এক ব্যতিক্রমধর্মী অনুষ্ঠান আয়োজন করে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে যেভাবে আত্মসমর্পণ করেছিল ঠিক সেভাবেই প্রতীকী আত্মসমর্পণের আয়োজন করা হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতা অবলম্বনে একটি নাটক পরিবেশন করে যশোরের একটি নাট্য দল। অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধারা নতুন প্রজন্মের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দেন।

বাংলা একাডেমি
বিজয় দিবসের বিকেলে একাডেমির নজরুল মঞ্চে প্রবন্ধ পাঠ, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলা একাডেমি। এতে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক পটভূমি, বিজয় ও বিজয়ের মহানায়ক শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ। স্বাগত বক্তব্য দেন একাডেমির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন। আলোচনায় অংশ নেন রামেন্দু মজুমদার, খুশী কবির ও নাদীম কাদির। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।

শিশু একাডেমি
বিজয় দিবসের বিকেলে ‘আমার ভাবনায় ৭ মার্চ’ শীর্ষক শিশুদের আঁকা চিত্র প্রদর্শনী, আলোচনা, পুরস্কার বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে শিশু একাডেমি। এ অনুষ্ঠানে শেখ রাসেল আর্ট গ্যালারি উদ্বোধন করেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির চেয়ারম্যান কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন। স্বাগত বক্তব্য দেন একাডেমির পরিচালক আনজীর লিটন।
ছায়ানট
ছায়ানটের আয়োজনে বসেছিল দেশের গানের আসর। এর যৌথ আয়োজক ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ সবাই জাতীয় পতাকার লাল-সবুজের পোশাকে রাঙিয়ে তুলেছিল। সবাই একসাথে গেয়ে ওঠে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। শিল্পীরা আসেন লাল শাড়ি আর পাঞ্জাবি গায়ে। দর্শকরা এসেছিলেন সবুজ শাড়ি আর পাঞ্জাবি পরে। বেলা পৌনে ৪টায় অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান, ছায়ানটের সভাপতি সন্জীদা খাতুন ও দীপ্ত টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী জাহেদুল হাসান।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ছিল শিশু-কিশোরদের পরিবেশনায় বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে অংশ নেয় দেশবরেণ্য শিল্পীদের পাশাপাশি রাজধানীর কয়েকটি স্কুলের শিক্ষার্থী শিল্পীরা।

কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা
সেগুনবাগিচার কচি-কাঁচা মিলনায়তনে আলোচনা সভা ও আনন্দ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে কচি-কাঁচার মেলা। অনুষ্ঠানে শিশু-কিশোরদের মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা শোনান স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন। সভাপতিত্ব করেন মেলার ক্ষুদে সদস্য আদিবা কিবরিয়া।

বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম সোসাইটি
১৫ ডিসেম্বর বিকেলে শহীদ বুদ্ধিজীবী ও মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম সোসাইটি। রাজধানীর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে বাংলাদেশ ফিল্ম সেন্টার অডিটোরিয়ামে প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন ফোরামের উপদেষ্টা মনজারে হাসিন মুরাদ। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, যখনই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করা হয়েছে তখনই সংস্কৃতিকর্মীরা সিনেমাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিবাদ করেছে। পরে জাহিদুর রহিম অঞ্জন পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র মেঘমল্লার এবং তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ নির্মিত মুক্তির গান প্রদর্শিত হয়। বিজয় দিবসের দিনে দেখানো হয় ইয়াসমিন কবিরের স্বাধীনতা, নাসির উদ্দিন ইউসুফের গেরিলা এবং মানজারে হাসিন নির্মিত এখনও ’৭১।
বিজয়ের ৪৬ বছর উদযাপনে দিনটি রাজধানীর সংস্কৃতি অঙ্গন ছিল আনন্দমুখর। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, সাভারের স্মৃতিসৌধ অভিমুখে ছিল মানুষের স্রোত। শিশু-কিশোররা ছুটেছে আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। অনেকে ভিড় করেন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে। জাতীয় জাদুঘরের দ্বার ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। নগরীর মঞ্চে মঞ্চে ছিল একাত্তরের প্রেরণা সঞ্চারী সংগীত, দেশাত্মবোধক গান, নাচসহ নানা আয়োজন।

Ñ সরদার মাহামুদ হাসান রুবেল

শ্রেণী:

তথ্যচিত্র ও চলচ্চিত্রে বঙ্গবন্ধু

Posted on by 0 comment
8-1-2017 9-11-18 PM

বঙ্গবন্ধুর ওপর অসাধারণ একটি কাজ প্রামাণ্যচিত্র ‘রহমান, দ্য ফাদার অফ বেঙ্গল’। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের কারণে গোটা বিশ্বে বাংলাদেশ একটি আলোচিত নাম। আর এই সাফল্যের শিরোমণি আর কেউ নন, স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। বিশ্বের সর্বত্র আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু তিনি। বিখ্যাত জাপানি পরিচালক নাগাসি ওশিমা সে সুযোগ ছাড়বেন কেন? সময়কাল ১৯৭৩।

8-1-2017 9-11-18 PMতথ্যচিত্র ও চলচ্চিত্রে বঙ্গবন্ধু: সেই মধুমতি পাড়ের স্বপ্নময় এক কিশোর থেকে জাতির পিতা হয়ে ওঠা। হয়ে ওঠা ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন তো সিনেমার চেয়েও অনেক বেশি নাটকীয়। অথচ রাজনীতির এ মহানায়কের জীবনী নিয়ে আজও বাংলা ভাষায় কোনো পূর্ণাঙ্গ কাহিনিচিত্র নির্মিত হয়নি। বঙ্গবন্ধু বাংলা চলচ্চিত্রের উন্নতির প্রতি গুরুত্বারোপ করতেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা এফডিসি’র প্রতিষ্ঠাতাও তিনি। ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পমন্ত্রী ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তার হাত ধরেই এফডিসি (ইস্ট পাকিস্তান ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন) প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উন্নয়নের প্রতি গুরুত্ব দেন। পৃথিবীর দেশে দেশে জাতীয় নেতাকে নিয়ে চমৎকার চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। যেমনÑ মহাত্মা গান্ধী, লেনিন, চে-গুয়েভারা, আব্রাহাম লিংকনের মতো অনেককে নিয়ে বায়োপিক সিনেমা নির্মিত হয়েছে।
১৯৭১-এর আগে-পরে ছিল না এত টিভি চ্যানেল কিংবা উন্নত প্রযুক্তি। মোটের ওপর আশা ভরসা ছিল বিটিভি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আমরা ভিডিওর মাধ্যমে যতটুকু দেখতে পাই তার সবটাই মূলত সাক্ষাৎকারভিত্তিক কিংবা তার প্রাত্যহিক রাজনৈতিক কর্মকা-। তবে অল্প কিছু কাজ হয়েছে তাকে নিয়ে যেগুলোতে তার আদর্শ, অর্জন, স্বপ্ন ইত্যাদি ফুটে উঠেছে বেশ স্পষ্টভাবে।
রহমান, দ্য ফাদার অফ বেঙ্গল : বঙ্গবন্ধুর ওপর অসাধারণ একটি কাজ প্রামাণ্যচিত্র ‘রহমান, দ্য ফাদার অফ বেঙ্গল’। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের কারণে গোটা বিশ্বে বাংলাদেশ একটি আলোচিত নাম। আর এই সাফল্যের শিরোমণি আর কেউ নন, স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। বিশ্বের সর্বত্র আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু তিনি। বিখ্যাত জাপানি পরিচালক নাগাসি ওশিমা সে সুযোগ ছাড়বেন কেন? সময়কাল ১৯৭৩। চলে এলেন বাংলাদেশে। শুরু করলেন ডকুমেন্টারি নির্মাণের কাজ। অসাধারণ এ কর্মে ফুটে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত জীবন, তার প্রাত্যহিক কর্মকা-, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ বিবিধ বিষয়। প্রামাণ্যচিত্রটি মূলত ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর কেন্দ্রিক, যে সময় আমাদের মহান বিজয় দিবসের প্রথম বর্ষপূর্তি পালিত হচ্ছে। সেই সাথে এ দিনটি অন্য একটি কারণে মহিমান্বিত। আর তা হলো, এদিন বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকর করা হয়। শুরুর দিকে সেই নতুন সংবিধানের আলোকে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের দুর্লভ মুহূর্ত ধারণ করা হয়েছে। এই ডকুমেন্টারিতে একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ সন্তান শেখ রাসেলের উপস্থিতি। প্রায় সকল রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেই তার উপস্থিতির কারণে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর এক প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলছেন, ‘আমার ছোট ছেলে জন্মানোর পর থেকেই আমি বেশিরভাগ সময় জেলে কাটিয়েছি। সে আমাকে তেমন একটা কাছে পায় নি। ফলে সে সবসময় আমাকে হারানোর ভয়ে থাকে, তাই আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকার চেষ্টা করে।’ অবশ্য, ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের কালরাত থেকে রাসেলের আর বাবাকে হারানোর ভয় নেই। সে বাবার সাথেই আছে সেই সময় থেকে। এ ছাড়াও বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নাস্তা শেষ করে অফিসের উদ্দেশে যাত্রা, সংবিধান কার্যকর উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্মানে পার্টিতে যোগদান এবং বিকেলে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভার ফুটেজ সংযোজিত হয়েছে এই প্রামাণ্যচিত্রে। সেই সাথে প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন বিষয় যেমনÑ ১৯৭১-এ টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর গ্রামের বাড়ি পাকিস্তানি আর্মি কর্তৃক পুড়িয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গ, নতুন প্রণীত সংবিধানের বৈশিষ্ট্য, ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘জাতির জনক’ উপাধি, বাঙালি জাতির গর্বের বিষয়Ñ এসব বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন এ মহান ব্যক্তি। বঙ্গবন্ধুর বাবার স্বপ্ন ছিল তিনি গ্রামেই থাকবেন তার ছেলে ও নাতি-নাতনী নিয়ে, ঢাকায় আসবেন না। একদম শেষ অংশে ধারাভাষ্যকার সংশয় প্রকাশ করেন, তার বাবার এই স্বপ্ন কখনও পূরণ হবে না। কারণ এই ব্যক্তি তার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবকিছু উজাড় করে দিয়েছেন এ দেশের জন্য।
বাংলাদেশ! : ১৯৭২ সালে আরেকটি আলোচিত প্রামাণ্যচিত্র ‘বাংলাদেশ!’ যেটি প্রযোজনা করেছিলেন এবিসি টিভি। এটি সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে প্রচারিত হয়। এখানে বঙ্গবন্ধুর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ গড়ায় দৃঢ় প্রত্যয় ও সংকল্পের প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি অকুণ্ঠচিত্তে ঘোষণা দেন তার প্রথম লক্ষ্য এ দেশের মানুষের অন্ন সংস্থান করা, তাদের ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্স্থাপন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি। যুদ্ধকালীন বিজয় লাভের সন্ধিক্ষণে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে রাশিয়ার ভেটো প্রদানকে তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। একই সাথে তিনি অন্য দেশের সাথেও সম্পর্ক স্থাপনের মনোভাব ব্যক্ত করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেনÑ তার লক্ষ্য জোটনিরপেক্ষ, স্বাধীন, পররাষ্ট্রনীতি। মার্কিন সাংবাদিক হাওয়ার্ড টাকনার এবং পিটার জেনিংসের সাথে সাক্ষাৎকারে উঠে আসে তার এসব পরিকল্পনার কথা। এই প্রামাণ্যচিত্রের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, মাথা তুলে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা।
ডেভিড ফ্রস্ট প্রোগ্রাম ইন বাংলাদেশ : কিংবদন্তি ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট যুদ্ধের ঠিক পরপর ১৯৭২-এর জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুর একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন, যা ‘ডেভিড ফ্রস্ট প্রোগ্রাম ইন বাংলাদেশ’ নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এ সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের মুহূর্ত, পাকিস্তানের কারাগারে বন্দিদশা, বিচার প্রক্রিয়া, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণসহ যাবতীয় বর্বরতা ইত্যাদি প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল বেশ ভালোভাবেই। একই সাথে তার রাজনৈতিক জীবনে অসংখ্য কারাগারবাস, রাজনৈতিক আদর্শ, বিশ্বনেতাদের প্রসঙ্গ যাদের তিনি অনুপ্রেরণার উৎস মানেন, সেসব বিষয়ও আলোচিত হয়েছে। এ সাক্ষাৎকারেই প্রথম বঙ্গবন্ধু জানান যে, বাংলাদেশে গণহত্যার শিকার মানুষের সংখ্যা ৩০ লাখ। তিনি বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়াতে আহ্বান জানান এ আলাপচারিতায়।
দ্য স্পিচ : বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ এবং এর বিশ্লেষণ নিয়ে আরেকটি তথ্যবহুল প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য স্পিচ’। পরিচালনায় ছিলেন ফখরুল আরেফিন। এই ভাষণ বাঙালি জাতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যময়। কারণ এর মাধ্যমেই স্বাধীনতাযুদ্ধের দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই সময়ে সামরিক শাসন জারি ছিল। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একটি জাতির উদ্দেশ্যে এমন বিস্তৃত খোলামেলা ভাষণ দেওয়া দুরূহ ব্যাপার। আরও দুঃসাধ্য সেটি ভিডিও করা এবং যুদ্ধদিনে সংরক্ষণ। ‘দ্য স্পিচ’ প্রামাণ্যচিত্রে সেই ইতিহাসটা তুলে ধরা হয়েছে। সাক্ষাৎকারভিত্তিক এই প্রামাণ্যচিত্রে আমরা জানতে পারি কীভাবে শুরু হলো ভাষণ ভিডিও করার পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং কঠোর গোপনীয়তায় সংরক্ষণ, যা পরবর্তীতে আমাদের ইতিহাসভিত্তিক উপাদানে এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ যোগ করেছে। আর এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে ক্যামেরার সামনে হাজির করা হয়েছে তাদের ঐ সময়কার কর্মকা- সম্পর্কে জানতে। যেমনÑ মূল পরিকল্পনাকারী তৎকালীন এমএনএ (মেম্বার অফ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) আবুল খায়ের, ডিএফপি (ডিপার্টমেন্ট অফ ফিল্ম)-এর ক্যামেরাম্যান আবুল খায়ের এবং এমএ মোবিন।
তা ছাড়া আবদুুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’, তারেক মাসুদের গান, বিশ্বজিৎ সাহার ‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ’ প্রসংশিত। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক বৈরী পরিস্থিতির কারণে এবং ভালো পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ এবং ১৫ আগস্টের নির্মমতার ওপর কোনো সম্পূর্ণ সিনেমা নির্মিত হয়নি, যা হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। এখন বোধকরি সময় এসেছে ‘বঙ্গবন্ধু ও তার শহীদ পরিবার’-এর ওপর উন্নতমানের তথ্যচিত্র ও পূর্ণ দৈর্ঘ্য সিনেমা নির্মাণের। আশা করি তা আমরা অচিরেই দেখতে পাব।

শ্রেণী:

জমকালো কান চলচ্চিত্র উৎসব

Posted on by 0 comment
58

58আবু সুফিয়ান আজাদ: গত ২৭ মে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন কান চলচ্চিত্র উৎসব। কান চলচ্চিত্র উৎসব পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন এবং প্রভাবশালী চলচ্চিত্র উৎসব। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব এবং বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের সাথে কানকেও সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং মর্যাদাপূর্ণ সম্মান দেওয়া হয়। ১৯৪৬ সাল থেকে প্রতিবছর এই উৎসব পালিত হয়ে আসছে। দক্ষিণ ফ্রান্সের রিজোর্ট শহর কানে প্রতিবছর সাধারণত মে মাসে এটি পালিত হয়।
পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এবারের ১১ দিনের আসর শেষ হয়। ১৭ মে সাগরপাড়ের শহর কানে শুরু হয় ৭০তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের আসর। ২৭ মে ২০১৭ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তারকাদের অংশগ্রহণ ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। লালগালিচায় হেঁটেছেন হলিউড-বলিউড সুন্দরীরা। প্রতিবারের মতো এবারও কানের লালগালিচায় পা রেখেছেন বলিউডের চারজন নামকরা অভিনেত্রী। তারা হলেনÑ ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন, সোনম কাপুর, শ্রুতি হাসান ও দীপিকা পাড়–কোন। দেশ-বিদেশের অন্য তারকাদের সাথে তারাও মাতিয়েছেন কান চলচ্চিত্র উৎসব। বলিউডের মধ্যে ঐশ্বর্য ১৬তম বারের মতো কান উৎসবে অংশ নেন প্রসাধন ব্র্যান্ড লরিয়ালের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে।
১৭ মে উৎসবের সূচনা হয় ফ্রান্সের ছবি ‘ইসমাঈলস গোস্টস’ প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনার করেন ইতালিয়ান অভিনেত্রী মনিকা বেলুচি। এবারের আসরে প্রতিযোগিতা বিভাগের বিচারকদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ছিলেন পেদ্রো আলমোদোভার।
এ ছাড়াও জুরিবোর্ডে ছিলেন পার্ক চ্যান উক, মারান আডে, ফ্যান বিংবিং গ্যাব্রিয়েল ইয়াহেদ, উইল স্মিথ, আনিয়েস ঝাউয়ি, জেসিকা চেস্টেইন ও পাওলো সরেন্তিনো। এই আয়োজনের অফিসিয়াল পোস্টার সাজানো হয় কিংবদন্তি ইতালিয়ান অভিনেত্রী ক্লডিয়া কার্ডিনালের স্থিরচিত্র দিয়ে। হলিউড তারকাদের মধ্যে এবারের কান উৎসবের রেড কার্পেটে হেঁটেছেন নিকোল কিডম্যান, প্যারিস হিলটন, ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট, নাওমি ক্যাম্পবেল, লিলি রোজ, ডাউজেন ক্রোজ, ইভা লঙ্গোরিয়া, ইজাবেল গোউলার্ট, চার্লজ থ্যারন, ম্যারিয়ন কটিলার্ড, মিশচা বার্টুন, রিতা ওরা, রিহানা, স্টেসি মার্টিন, এলি ফেনিং, কোকো রোচা, এমা থম্পসনসহ আরও অনেক তারকা।
উৎসবের শেষ দিন ঘোষণা করা হয় পুরস্কার। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সবার নজর প্রতিযোগিতা বিভাগ পাম দ’র (স্বর্ণপাম) প্রতি। কারণ এ বিভাগের ছবির মধ্য থেকেই সম্মানজনক পাম ডি অর অ্যাওয়ার্ড ঘোষণা করা হয়। পাম ডি অর অ্যাওয়ার্ড লাভ করে পরিচালক রুবেন আস্টলান্ড-এর দ্য স্কয়ার চলচ্চিত্রটি (সুইডেন)।
এবার প্রতিযোগিতা বিভাগে লড়ছে মোট ১৯টি ছবি। এগুলো হলো হান্ড্রেড টোয়েন্টি ব্যাটমেন্টস পার মিনিট (ফ্রান্স, পরিচালক : রবিন ক্যাম্পিলো), ইন দ্য ফেড (ফ্রান্স, পরিচালক : ফাতি আকিন), দ্য ডে আফটার (ফ্রান্স, পরিচালক : হং স্যাং সু), গুড টাইম (ফ্রান্স, বেনি সাফদি ও জোশুয়া সাফদি), হ্যাপি অ্যান্ড (জার্মানি, পরিচালক : মাইকেল হানেকি), হিকারি (জাপান, পরিচালক : নাওমি কাওয়াসে), জুপিটার’র মুন (হাঙ্গেরি, পরিচালক : কর্নেল মুনদ্রুসো), দ্য ড্রেডেড (ফ্রান্স, পরিচালক : মিশেল হাজানভিসিয়ুস), দ্য বিগাইল্ড (যুক্তরাষ্ট্র, পরিচালক : সোফিয়া কপোলা), ওয়ান্ডারস্ট্রাক (যুক্তরাষ্ট্র, পরিচালক : টড হেইন্স), লাভলেস (ফ্রান্স, পরিচালক : আন্দ্রেই জিভিয়াজিন্তসেভ), দ্য কিলিং অব অ্যা স্যাক্রেড ডিয়াল (যুক্তরাষ্ট্র, পরিচালক : ইওর্গেস লানথিমস), ওকজা (যুক্তরাজ্য, পরিচালক : লিন রামসে), অ্যা জেন্টেল ক্রিয়েচার (ফ্রান্স, পরিচালক : সের্গেই লোজনিৎসা), দ্য ডাবল লাভার (ফ্রান্স, পরিচালক : ফ্রাঁসোয়া ওজোন), রদাঁ (ফ্রান্স, পরিচালক : জ্যাক দোয়াইও), দ্য মেয়ারোউইৎজ স্টোরিস (ফ্রান্স, পরিচালক : নোয়া বামব্যাচ) এবং দ্য স্কয়ার (সুইডেন, পরিচালক : রুবেন আস্টলান্ড)।
এবার ফ্রান্সের কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় বাংলাদেশের দাগ চলচ্চিত্রটি। উৎসবের স্বল্পদৈর্ঘ্য বিভাগের জন্য নির্বাচিত হয় চলচ্চিত্রটি। স্বাধীনতাযুদ্ধের পটভূমিতে ছবিটি নির্মাণ করেছেন জসীম আহমেদ। দাগ মুক্তিযুদ্ধের গল্প। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে স্বাধীনতা-বিরোধীদের পুনর্বাসনÑ সবই আছে সেখানে। দাগ চলচ্চিত্রটির কাহিনি ও পরিচালনা করেছেন জসীম আহমেদ, চিত্রনাট্য ও সংলাপ পান্থ শাহরিয়ার, সংগীত পরিচালনা করেছেন পার্থ বড়–য়া। অভিনয় করেছেন শতাব্দী ওয়াদুদ, শারমিন জোহা, শশী, বাকার বকুল প্রমুখ।
৭০তম আসরের পুরস্কার ঘোষণায় সেরা অভিনেতার পুরস্কার জিতেছেন জোয়াকিম ফিনিক্স। ‘ইউ অয়্যার রিয়েল হিয়ার’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য এই পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।
প্রথমে বুঝতে পারেন নি তাকেই ‘সেরা অভিনেতা’ ঘোষণা করা হয়েছে। উপস্থাপকের মুখে কিছু ফরাসি বাক্যের সাথে নিজের নাম উচ্চারিত হওয়ার পরও ওয়াকিন ফিনিক্স নিজের আসনেই বসে ছিলেন। অনেক পরে বুঝতে পারলেন, তিনি বিজয়ী। পুরস্কার নিতে গিয়ে নিজের জুতা জোড়া দেখিয়ে বলেন, ‘আবার ¯িœকার দেখে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন এই পুরস্কারের জন্য আসলেই আমি প্রস্তুত ছিলাম না।’
সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন ডায়ান ক্রগার। জার্মান ভাষার ‘ইন দ্য ফেড’-এ অভিনয়ের জন্য এই পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। সেরা পরিচালক সোফিয়া কপোলা ‘দ্য বিগাইল্ড’ ছবির জন্য। ১৯৭১ সালে একই নামে মুক্তি পাওয়া ছবির রিমেক ‘দ্য বিগাইল্ড’। যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের সময়কার এক আহত সৈনিক ও একদল স্কুলছাত্রী নিয়ে ছবির গল্প। ছবির জন্য সেরা পরিচালক হলেন সোফিয়া কপোলা। কান চলচ্চিত্র উৎসবে সোফিয়ার এটা প্রথম জয় হলেও এই উৎসবের সাথে তার সম্পর্কটা কিন্তু নতুন নয়। তার বাবা হলিউড নির্মাতা ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা দুবার জিতেছেন এই উৎসবের সবচেয়ে বড় সম্মান পাম দ’র (স্বর্ণপাম)। এ নিয়ে কানে দ্বিতীয়তার কোনো নারী ‘সেরা পরিচালক’ হলেন। পুরস্কার গ্রহণ করতে গিয়ে সোফিয়া বলেন, এই ছবি বানানোর সময় রোমাঞ্চিত ছিলাম। আর কানে এই সম্মান পাওয়ার মধ্য দিয়ে ছবির যাত্রাটা ভালোই হলো বলা চলে।

এক নজরে কান পুরস্কার
পাম দ’র : দ্য স্কয়ার (রুবেন অস্টলুন্ড, সুইডেন)
গ্র্যাঁ প্রিঁ : বিপিএম ১২০ বিটস পর মিনিট (রবিন ক্যাম্পিলো, ফ্রান্স)
জুরি প্রাইজ : লাভলেস (আন্দ্রেই জিয়াগিন্তসেভ, রাশিয়া)
সেরা অভিনেতা : জোয়াক্যু ফিনিক্স (ইউ ওয়্যার নেভার রিয়েলি হিয়ার, ব্রিটেন)
সেরা অভিনেত্রী : ডায়েন ক্রুজার (ইন দ্য ফেড, জার্মানি)
সেরা পরিচালক : সোফিয়া কপোলা (দ্য বিগাইল্ড)
সেরা চিত্রনাট্যকার (যৌথভাবে) : লিন রামসে (ইউ ওয়্যার নেভার রিয়েলি হিয়ার) এবং গ্রিসের ইওর্গস লানতিমস (দ্য কিলিং অব দ্য স্যাক্রেড ডিয়ার)
ক্যামেরা দ’র : লিওনর সেরাই (ইয়ং ওম্যান, ফ্রান্স)
সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র : অ্যা জেন্টেল নাইট (কিয়াই ইউ ইয়াং, চীন)
৭০তম বার্ষিকী পুরস্কার : নিকোল কিডম্যান।

শ্রেণী:

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য : যাত্রাপালা

Posted on by 0 comment
58

58আবু সুফিয়ান আজাদ: ‘যাত্রা’ এই শব্দটির সাথে বাঙালির দীর্ঘকাল ব্যাপ্ত শিকড় বিস্তারী সংস্কৃতির আনন্দ-বেদনার সম্পর্ক রয়েছে। বাঙালি জাতির হাজার বছরের শিল্প-ভাবনার পথ-পরিক্রমায় অযুত চিত্রকল্প হয়ে আজও টিকে আছে যাত্রা। বাঙালির বিনোদনের একটি প্রধান অনুষঙ্গ ছিল যাত্রাপালা। এর মধ্য দিয়ে শুধু বিনোদন নয় পুরাণ, ইতিহাস, লোকজ সাহিত্য সম্পর্কে শিক্ষাগ্রহণ চলত। এখন সিনেমা, টেলিভিশনের কল্যাণে বিনোদনের রূপ পাল্টেছে। কিন্তু যাত্রার আবেদন গ্রামের মানুষের কাছে এখনও রয়েছে। রাতের পর রাত জেগে যাত্রার কাহিনি, অভিনয়, গানের মাধ্যমে লোকজ নীতিবোধ, শুভ-অশুভের দ্বন্দ্ব সম্পর্কে শিক্ষা নেয় দর্শকরা। যাত্রা আমাদের লোকজ সংস্কৃতির মূল্যবান সম্পদ। রাতের পর রাত জেগে বাংলার সাধারণ মানুষ কৃষক, তাঁতি, কামার, কুমার, জেলে দেখেছে যাত্রায় কাহিনি আর মেতেছে পালাগানের সুরে। কখনও ভক্তি, কখনও ভালোবাসা, কখনও দেশপ্রেম তাকে কাঁদিয়েছে, হাসিয়েছে। আবার সামন্ত রাজা, জমিদার ও অভিজাত শ্রেণির মানুষও যাত্রা দেখেছে। জমিদার বাবু তো আর সাধারণ প্রজার সাথে যাত্রার আসরে গিয়ে বসবেন না। বরং তার প্রাসাদের নাটম-পেই বসবে যাত্রার আসর। জমিদার বাড়িতে থাকত বিশাল নাটম-প। সেখানেই যাত্রা, পালাগান, কীর্তনের আসর বসতো। চিক বা পর্দাঘেরা বারান্দায় বসতেন জমিদার গৃহিণী, রানিমা, পরিবারের নারী সদস্যরা। তারা চিকের আড়াল থেকেই দেখতেন যাত্রাপালা।
যাত্রাপালার ঐতিহ্য অত্যন্ত প্রাচীন। অষ্টম ও নবম শতকেও এ দেশে পালাগান ও পালার অভিনয় প্রচলিত ছিল। শ্রী চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের আগেও রাঢ়, বঙ্গ, সমতট, গৌড়, পু-্র, চন্দ্রদ্বীপ, হরিকেল, শ্রীহট্টসহ সমগ্র ভূখ-ে পালাগান ও কাহিনিকাব্যের অভিনয় প্রচলিত ছিল। ধর্মীয় বা কোনো উৎসবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার যে রীতি সেখান থেকেই যাত্রা শব্দটি এসেছে। এ দেশে শিবের গাজন, রামযাত্রা, কেষ্টযাত্রা, সীতার বারোমাসী, রাধার বারোমাসী প্রচলিত ছিল। সে সময় বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি অভিনয় করে দেখানো হতো। সেখান থেকেই যাত্রার উৎপত্তি। নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাবের পর কৃষ্ণযাত্রা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। কৃষ্ণযাত্রায় মূলত রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা, কৃষ্ণের বাল্যকাল, মা যশোদার সঙ্গে কৃষ্ণর বাল্যক্রীড়া, কৃষ্ণের কংসবধ, মথুরা জয় ইত্যাদি কাহিনি অভিনয় ও গানের মাধ্যমে দর্শকদের পরিবেশন করা হতো। দর্শকরা তা দেখে ভক্তিরসে সিক্ত হতেন। রক্ষিণী হরণ নামে একটি কৃষ্ণযাত্রায় চৈতন্যদেব নিজেই অভিনয় করতেন। তিনি রক্ষিণী সাজতেন।
অষ্টাদশ শতকে (১৭০০ সাল) যাত্রা বাংলা ভূখ-ের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় শিশুরাম, পরমানন্দ অধিকারী, সুবল দাস ছিলেন যাত্রার জগতে প্রসিদ্ধ। ঊনবিংশ শতকে পৌরাণিক কাহিনিভিত্তিক যাত্রা খুব জনপ্রিয়তা পায়। মতিলাল রায় ও নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়ের যাত্রাদল প্রসিদ্ধি পায়। সে সময় কৃষ্ণলীলা এবং রামায়ণ-মহাভারতের পৌরাণিক কাহিনির পাশাপাশি বিদ্যাসুন্দর, লাইলি মজনু, ইউসুফ জোলেখা, বেহুলা লখিন্দর, মা মনসা, লক্ষ্মীর মহিমা, কমলাবতী রানী ইত্যাদি প্রেমকাহিনি ও লোকজ কাহিনির অভিনয়ও প্রচলিত ছিল।
ঊনবিংশ শতকের শেষে এবং বিশ শতকের শুরুর দিকে যাত্রায় দেশপ্রেমমূলক কাহিনির অভিনয় শুরু হয়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মুকুন্দ দাশ। তার প্রকৃত নাম ছিল যজ্ঞেশ্বর। তিনি বিক্রমপুর থেকে বরিশাল গিয়ে দেশপ্রেমিক বিপ্লবী অশ্বিনী কুমারের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। মুকুন্দ দাশ যাত্রার মাধ্যমে দেশপ্রেম ও ব্রিটিশবিরোধী বক্তব্য প্রচার করেন। তিনি সমাজ সংস্কারমূলক বক্তব্য, পণপ্রথা, জাতিভেদে ইত্যাদির বিপক্ষেও বক্তব্য প্রচার কররেন। তিনি ‘স্বদেশী যাত্রা’র সূচনা করেন। সে কারণে তাকে কারাবন্দিও থাকতে হয়। মুকুন্দ দাশের প্রেরণায় আরও অনেক স্বদেশী যাত্রার দল গড়ে ওঠে। তারা গ্রামে গ্রামে যাত্রার প্রদর্শন করে দেশপ্রেমমূলক কাহিনি প্রচার করতে থাকে। সে সময় ঈশা খাঁ, প্রতাপচন্দ্র, বারো ভুঁইয়া, সোনাভান, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা, ক্ষুদিরাম ও অন্যান্য বিপ্লবীর নামেও কাহিনি অভিনয় হতে থাকে। স্বদেশী যাত্রা একসময় ইংরেজ শাসকদের রোষানলে পড়ে। মুকুন্দ দাসের আগে ঢাকায় কৃষ্ণকমল গোস্বামী নামে একজন পালাকার ‘স্বপ্নবিলাস’, ‘দিব্যোন্মাদ’, ‘বিচিত্রবিলাস’ পালা লিখে আলোড়ন তুলেছিলেন। ১৮৬০-৭৮ এর মধ্যে তার পালা গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায় এবং ঢাকাতেই প্রথম মঞ্চায়ন হয়। মনোমহন বসু নামেও আরেকজন পালাকার বেশ বিখ্যাত ছিলেন। নওগাঁ জেলার ধামুরহাট থানার শ্রামপুর গ্রামে নফরউদ্দিন নামে আরেকজন পালাকার প্রথমে রাজনীতিকেন্দ্রিক পালা লিখে বেশ খ্যাতি পান। পরে তিনি মধুমালা, সাগরভাসা, কাঞ্চনবতী, বিন্দুমতি, পুষ্পমালা ইত্যাদি রূপকাথাভিত্তিক পালা লেখেন। বিখ্যাত সাহিত্যিক মীর মোশাররফ হোসেনও পালা লিখেছেন। তিনি বেহুলা নিয়ে যাত্রাপালা লেখেন।
সে সময় গ্রামে-গঞ্জে বিষাদসিন্ধুর কাহিনি নিয়েও যাত্রা অভিনয় হতো। কারবালার কাহিনি নিয়ে যাত্রাপালা লেখা হতো। মানিকগঞ্জের ধানেশ্বরের আবদুল করিম, নরসিংদীর জালাল উদ্দিন, হিরেন্দ্র কৃষ্ণদাস, মুন্সিগঞ্জের আরশাদ আলী, ঢাকার কেরানীগঞ্জের রফিকুল, পটুয়াখালীর দুধল গ্রামের মাস্টার সেকেন্দার আলি, খুলনার ডুমুরিয়ার এমএ মজিদ (অগ্রদূত), ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইলের কফিল উদ্দিন ও মানিকগঞ্জ সদরের ডা. আবেদ আলীসহ অনেকেই সে সময় যাত্রাপালা লিখতেন। বিশ শতকে রূপবান, রহিম বাদশাহ, মালকা বানু, সয়ফুল মুলুক বদিউজ্জামাল, গুনাইবিবি, দুর্গামনি, কমলা রানীর বনবাস, কাজল রেখা, মলুয়া, ভেলুয়া সুন্দরী, সোনাভান, বীরাঙ্গনা সখিনা, গাজী কালু চম্পাবতী, বনবিবি ইত্যাদি পালা বেশ জনপ্রিয়তা পায়।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর অনেক পালাকার ও যাত্রাদল পূর্ববঙ্গ ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে যায়। পাকিস্তানি শাসকরা এ দেশের লোকজ সংস্কৃতিকে কখনও সুনজরে দেখেনি। যাত্রাপালা ধর্মবিরোধী কাজ এমন ফতোয়াও জারি হয়েছে কখনও কখনও। অনেক গ্রামে ধর্মান্ধ গোষ্ঠী একত্রিত হয়ে অভিনয় বন্ধ করে দিয়েছে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হলে অনেক যাত্রাদল নতুনভাবে গড়ে ওঠে। মাইকেল মধুসূদন, দেবদাস, রক্তাক্ত বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বিজয় এনেছি, মা মাটি মানুষ, সোনার বাংলা, সোজন বাদিয়ার ঘাট, লালন ফকির ইত্যাদি পালা বেশ জনপ্রিয়তা পায়। অমলেন্দু বিশাস, জ্যো¯œা বিশ্বাসসহ অনেক যাত্রাশিল্পী ছিলেন নামকরা। সত্তর দশকের শেষভাগ এবং বিশেষ করে আশির দশকে যাত্রাশিল্পে অবক্ষয় শুরু হয়। তখন যাত্রার নামে অশ্লীল নৃত্য পরিবেশিত হতে থাকে। আবহমানকাল ধরে চলে আসা এই শিল্প ধ্বংসের মুখোমুখি হয় যাত্রার আসরে জুয়া ও অশালীন নাচের কারণে। যাত্রার আসরে সখী নৃত্য একসময় প্রচলিত ছিল যা কিছুটা অসংস্কৃত হলেও তাকে ঠিক অশালীন বলা যেত না। কিন্তু পরবর্তীতে গ্রামগঞ্জে পর্নোগ্রাফির প্রভাবে প্রিন্সেসের নাচের নামে যাত্রার আসরে অশালীনতা ছড়িয়ে পড়ে। পরে যাত্রার প্রিন্সেস, সখীনৃত্য ইত্যাদির নামে চলে অশালীন নৃত্য।
আমাদের দেশের অতি প্রাচীন ও বলবান শিল্পমাধ্যম হলো এই যাত্রাশিল্প। এ মুহূর্তে যাত্রাশিল্প মৌলিক শিল্প মাধ্যমের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী। একবিংশ শতাব্দীর প্রত্যাশা ছিল এই যাত্রাশিল্প মাধ্যমটি আমাদের সংস্কৃতিচর্চার মধ্য দিয়ে সমাজে একটি নবজাগরণের সৃষ্টি করবে। কিন্তু এই শতাব্দীর শুরুতেই আমাদের লোকজ এই শক্তিশালী মাধ্যমটি মুখ থুবড়ে পড়ে। যাত্রাশিল্পকে নিয়ে আমাদের দেশের মৌলবাদীদের নানামুখী আগ্রাসন, অন্যদিকে এই যাত্রাশিল্পের আয়োজকদের অর্থলিপসার মোহে যাত্রামঞ্চে অশ্লীলতার অভিযোগে নানাভাবে এই লোকজ মাধ্যমটিকে কলুষিত করে তোলে। এদিকে এই সমস্যার গভীরে না গিয়ে দেশের প্রশাসনও পড়ে বিব্রতকর অবস্থায়, ফলে প্রশাসন ও যাত্রাশিল্পের মধ্যে বেড়ে যায় দূরত্ব। নানা প্রকার প্রজ্ঞাপন জারির ফলে যাত্রাশিল্পটি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদ দীর্ঘদিন যাবত লোকসংস্কৃতির শক্তিশালী মাধ্যমটি টিকিয়ে রাখার জন্য সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে, সুশীল সমাজের, সরকারের, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের, সাংস্কৃতিক সংগঠনের, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছে বহুবার ঘুরে ঘুরে আলোচনা ও সমস্যা সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা করে; কিন্তু খুব বেশি সহযোগিতা তারা পায় না।
যাত্রাকে অশালীনতা থেকে মুক্ত করতে এবং যাত্রা শিল্পকে বাঁচাতে সংস্কৃতিবান্ধব বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার প্রণয়ন করে যাত্রা নীতিমালা। ২০১২ সালে এই যাত্রা নীতিমালা গেজেটভুক্ত হয়। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৮৮টি যাত্রাদলকে নিবন্ধন করেছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। এখনকার নামকরা যাত্রাদলগুলো হলো যশোরের আনন্দ অপেরা, চ্যালেঞ্জার অপেরা, অগ্রগামী নাট্টসংস্থা, মাগুরার চৈতালি অপেরা, নারায়ণগঞ্জের ভোলানাথ যাত্রা সম্প্রদায়, কোহিনূর অপেরা, গাজীপুরের দিশারী অপেরা,  ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস যাত্রা ইউনিট, খুলনার স্বদেশ অপেরা, রাজমহল অপেরা, রঙমহল অপেরা, ফরিদপুরের মধুচ্ছন্দা যাত্রা ইউনিট, নাটোরের পদ্মযাত্রা ইউনিট, বাগেরহাটের সুন্দরবন অপেরা, লক্ষ্মীপুরের কেয়া যাত্রা ইউনিট ইত্যাদি। বর্তমান সরকার ৭টি বিভাগীয় শহরে শিল্পকলার মাধ্যমে এবং যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের সহযোগিতায় যাত্রা উৎসবের আয়োজন করে থাকে।

শ্রেণী:

চারুকলায় ‘জয়নুল উৎসব’

Posted on by 0 comment
22

22উত্তরণ প্রতিবেদন: শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ১০২তম জন্মদিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ আয়োজন করে ‘জয়নুল উৎসব’। ২৯ ডিসেম্বর সকালে উৎসবের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিল্পাচার্যের সহধর্মিণী জাহানারা আবেদিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, শিল্পী হাশেম খান, চারুকলা অনুষদের ডিন নিসার হোসেন ও ভারতের শিল্পী যোগেন চৌধুরী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগে শিল্পাচার্যের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বিভিন্ন বিভাগসহ চারুশিল্পীরা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘জয়নুল সম্মাননা’ দেওয়া হয় শিল্পী হাশেম খান ও ভারতের শিল্পী-অধ্যাপক যোগেন চৌধুরীকে। তারপর ‘জয়নুল শতবর্ষ প্রবন্ধাবলী’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন অতিথিরা। এই আসরে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। ভাস্কর তারক গড়াইয়ের নির্মিত জয়নুল আবেদিনের আবক্ষ মূর্তি উন্মোচন করেন শিল্পাচার্যের সহধর্মিণী জাহানারা আবেদিন। এরপর চারুকলা অনুষদ প্রাঙ্গণে শুরু হয় ‘জয়নুল মেলা’। বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ পণ্যের মেলা জমে ওঠে নানা বয়সী মানুষের আনাগোনায়।
১২ জানুয়ারি থেকে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব
রেইনবো চলচ্চিত্র সংসদের উদ্যোগে আগামী বছরের ১২ জানুয়ারি শুরু হতে যাচ্ছে পঞ্চদশ ঢাকা 23আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। চলবে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত। এখন চলছে এই আয়োজনের প্রস্তুতিপর্ব। পঞ্চদশ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশসহ প্রায় ৬৭টি দেশের ১৮৬টিরও বেশি ছবির প্রদর্শনী হবে। রাজধানীর জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তন, কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগারের শওকত ওসমান মিলনায়তন, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, স্টার সিনেপ্লেক্স এবং আমেরিকান সেন্টার মিলনায়তনে এগুলো দেখানো হবে। এশিয়ান কম্পিটিশন, রেট্রোস্পেকটিভ, সিনেমা অব দ্য ওয়ার্ল্ড, চিলড্রেনস ফিল্মস, স্পিরিচুয়াল ফিল্মস, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মস, নরডিক ফিল্ম সেশন এবং উইমেন্স ফিল্মমেকারস সেকশন-এ চলচ্চিত্রগুলো প্রদর্শিত হবে। এ ছাড়া বিশ্বের ৬৭টি দেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রকার-সমালোচক, সাংবাদিক, বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের কর্মকর্তা, রেইনবো চলচ্চিত্র সংসদ ও অন্যান্য চলচ্চিত্র সংসদের সদস্যসহ দেশের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব উৎসবে অংশ নিয়ে দর্শকদের সাথে তাদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করবেন। উৎসবের অংশ হিসেবে চলচ্চিত্রে নারীর ভূমিকা বিষয়ক ‘তৃতীয় ঢাকা আন্তর্জাতিক উইমেন ফিল্ম মেকারস্ কনফারেন্স’ অনুষ্ঠিত হবে। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ মিলনায়তনে এই সম্মেলন থাকবে আগামী ১৩ ও ১৪ জানুয়ারি। এতে বিভিন্ন দেশের নারী চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সাথে মতবিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের নারী নির্মাতারা অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
সৈয়দ শামসুল হকের ৮২তম জন্মদিন উদযাপিত
২৭ ডিসেম্বর ছিল সৈয়দ শামসুল হকের ৮২তম জন্মদিন। সদ্যপ্রয়াত এই লেখকের ৮২তম জন্মদিনে ছিল দুটি আয়োজন। ‘ফুলের গন্ধের মতো থেকে যাব তোমার রুমালে’ শিরোনামের আয়োজন ছিল শিল্পকলা একাডেমিতে। আর বাংলা একাডেমিতে জাতীয় কবিতা পরিষদ আয়োজন করে আলোচনা আর কবিতা পাঠের। ওইদিন শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আয়োজন করা হয় শিল্পকলা একাডেমির অনুষ্ঠান। যার শুরুতেই সৈয়দ হকের প্রতিকৃতিতে আলোক প্রজ্বলন ও পুষ্পস্তবক অর্পণের সাথে বেজে ওঠে শিল্পী মনিরুজ্জামানের বাঁশির সুর। এরপর নাট্যজন আতাউর রহমানের সঞ্চালনায় সূচনা বক্তব্য রাখেন নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার। সৈয়দ শামসুল হকের দুটি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এর মধ্যে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স থেকে কাব্যগ্রন্থ ‘কর্কটবৃক্ষের শব্দসবুজ শাখায়’ এবং অন্যপ্রকাশ থেকে অনুবাদ নাটকের বই ‘শেক্সপিয়রের হ্যামলেট’ প্রকাশিত হয়েছে। প্রধান অতিথি ছিলেন ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম। শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে ‘সৈয়দ শামসুল হক সৃজনের জাদুকর : নাট্য নির্দেশকের নিবেদন’ বিষয়ে নাট্যজন আতাউর রহমান, ‘চলচ্চিত্রে সৈয়দ শামসুল হক : বড় ভালো লোক ছিল’ বিষয়ে চলচ্চিত্র গবেষক অনুপম হায়াত, ‘জাদুবাস্তবতার পথিকৃৎ সৈয়দ শামসুল হক’ বিষয়ে কথাশিল্পী আনিসুল হক, ‘চিরজীবিত বিশ্ববাঙালি’ আলোচনা করেন কবি মুহাম্মদ নূরুল হুদা। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন কবিপতœী কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক। অনুষ্ঠানে সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা আবৃত্তি করেন হাসান আরিফ, গোলাম সারোয়ার ও আহকামউল্লাহ। নাট্যদল থিয়েটারের পরিবেশনায় সৈয়দ হক রচিত ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ এবং নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের পরিবেশনায় ‘ঈর্ষা’র অংশবিশেষ মঞ্চস্থ করে। সৈয়দ শামসুল হকের লেখা সংগীত পরিবেশন করেন এন্ড্রু কিশোর। সৈয়দ শামসুল হককে নিবেদন করে সমাপনী নৃত্য পরিবেশন করেন পূজা সেনগুপ্ত। সৈয়দ হকের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করে বিভিন্ন সংগঠন। এর আগে সকালে বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে জাতীয় কবিতা পরিষদ আয়োজন করে আলোচনা, স্মৃতিচারণ, নিবেদিত কবিতাপাঠ ও কবির কবিতা থেকে আবৃত্তি। সৈয়দ হককে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান, কবি মুহাম্মদ নূরুল হুদা, কবি রবিউল হুসাইন, কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ ও কবি সাজ্জাদ কাদির। জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি ড. মুহাম্মদ সামাদের সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তারিক সুজাত।
সাংস্কৃতিক জোটের সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠান
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট রাজধানীর ৫টি স্থানে সপ্তাহব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ‘বিজয় উৎসব-২০১৬’ শিরোনামে এ অনুষ্ঠান শুরু হয় ১৩ ডিসেম্বর এবং শেষ হয় ১৯ ডিসেম্বর। ১৩ ডিসেম্বর বিকেল ৪টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার মঞ্চে সপ্তাহব্যাপী এই উৎসবের উদ্বোধন করেন একুশের গানের অমর রচয়িতা ভাষাসৈনিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। উৎসবের এবারের স্লোগান ছিল ‘ঐক্য গড়ো বাংলাদেশ, সাম্প্রদায়িকতা হবে শেষ’। রাজধানীতে বিজয় উৎসব চলেÑ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার মঞ্চ, রবীন্দ্র সরোবর কবি রফিক আজাদ মঞ্চ, রায়ের বাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণ মঞ্চ, বর্ণমালা স্কুল অ্যান্ড কলেজ দনিয়া মঞ্চ ও খোন্দকার নূরুল আলম মঞ্চ মিরপুর। প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে ৫টি মঞ্চেই চলে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।
সাংস্কৃতিক বিনিময় উদ্যোগে
ভারত ও বাংলাদেশের দুটি প্রথমসারির বিশ্ববিদ্যালয় হাত মিলিয়ে এই প্রথম শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির এক উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। এর অংশ হিসেবেই ১৬ ও ১৭ ডিসেম্বর কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এই প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হলো দুদিনব্যাপী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উৎসব। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হবে এর পাল্টা রবীন্দ্রভারতী উৎসব। দুপক্ষের উদ্যোক্তারাই বলছেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যখন যোগাযোগের নানা নতুন দিগন্ত খুলে যাচ্ছে, তখন এই উদ্যোগ দুদেশের মধ্যে শিক্ষাগত বা সাংস্কৃতিক যোগাযোগের পথকে প্রশস্ত করবে।

শ্রেণী:

বৈসাবি উৎসব : ফুল ভাসিয়ে শুরু জলকেলি দিয়ে শেষ

Posted on by 0 comment
54

‘১২ এপ্রিল ভোরে চেঙ্গী, ফেনী ও মাইনী নদীতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে খাগড়াছড়িতে শুরু হয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী প্রধান সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব বৈসাবি’

54উত্তরণ ডেস্ক: রাজধানী ঢাকাসহ তিন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলায় নানা আচার-অনুষ্ঠান, হৈ-হুল্লোড়, র‌্যালি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর বর্ষবরণ উৎসব বিজু বা সাংগ্রাই বা বৈসাবি। তিন দিনের এই অনুষ্ঠান শুরু হয় জলে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে এবং শেষ হয় জলকেলি দিয়ে। এ উপলক্ষে ঢাকায় গত ১২ এপ্রিল সকালে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজন করে বৈসাবী উৎসবের। বৈসুক, সাংগ্রাই ও বিজু ৩টি অনুষ্ঠানের সমন্বয়ে পার্বত্য জেলাবাসীর এই উৎসবের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী।
পার্বত্য জনপদ মুখরিত হয়ে উঠেছিল বৈসাবি উৎসবে। তিন দিনের এই অনুষ্ঠানে আনন্দের কোনো কমতি ছিল না। ১২ এপ্রিল ভোরে চেঙ্গী, ফেনী ও মাইনী নদীতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে খাগড়াছড়িতে শুরু হয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী প্রধান সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব বৈসাবি। পাহাড়ের কিশোর-কিশোরী ও ছোট ছোট ছেলেমেয়ে কলাপাতায় করে ফুল তুলে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশে নদী-খালে ভাসিয়ে পুরনো বছরের গ্লানি মুছে নতুন বছরের শুভ কামনায় নিজেদের পবিত্রতা কামনা করে। বর্ষবরণ উৎসবকে চাকমারা বিজু, মারমারা সাংগ্রাই এবং ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী বৈসুক বলে আখ্যা দিলেও গোটা পার্বত্য এলাকায় তা বৈসাবি নামেই পরিচিত। বাংলা বছরের শেষ দুদিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিনÑ এই তিন দিন মিলেই মূলত বর্ষবরণ উৎসব পালিত হয়। চাকমা সম্প্রদায় ১৩ এপ্রিল মূল বিজু আর পহেলা বৈশাখ বা গজ্জাপয্যা পালন করে। ওই দিন ঘরে ঘরে চলে অতিথি আপ্যায়ন। সেই সাথে সব বয়সী মানুষ নদী, খাল অথবা ঝরনায় গঙ্গা দেবীর পূজা আরাধনা করেন।
উৎসবের প্রথম দিনে চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমা আদিবাসীরা ফুল দিয়ে ঘর সাজায়। এ উপলক্ষে সকালে পানখাইয়াপাড়ায় আয়োজন করা হয় মারমাদের ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা প্রতিযোগিতা। পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী প্রতিযোগিতা উদ্বোধন করেন। দুপুরে খাগড়াপুরে শুরু হয় ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী গরাইয়া নৃত্য উৎসব। ত্রিপুরা সম্প্রদায় হারিবৈসু, বিযুমা, বিসি কাতাল এবং মারমারা পেইংচোয়ে, আক্যে ও আদাদা এ উপলক্ষে ১৪ এপ্রিল মারমা সম্প্রদায় সাংগ্রাই উৎসবে ঐতিহ্যবাহী জলকেলি বা পানি উৎসব করে।
এদিকে কাপ্তাই হ্রদের জলে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে রাঙ্গামাটিতে তিন দিনব্যাপী বৈসাবি উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করে। ১২ এপ্রিল সকালে শহরের গর্জনতলী এলাকায় নানা বয়সের নারী-পুরুষকে নিয়ে রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা কাপ্তাই হ্রদের স্বচ্ছ জলে ফুল ভাসিয়ে তাদের রীতি অনুযায়ী প্রণাম করে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন। ভোর থেকেই বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ তাদের নিজস্ব পোশাকে সজ্জিত হয়ে ফুল ভাসাতে আসে কাপ্তাই হ্রদের পাড়ে। ফুল ভাসানোর অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য স্মৃতি বিকাশ ত্রিপুরা। এ ছাড়া রাজবাড়ী ঘাটে ফুল বিজু পালন করা হয়। ফুল ভাসানোর পর ত্রিপুরা কল্যাণ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বয়স্কদের মধ্যে কাপড় বিতরণ করা হয়। পরে সেখানে ত্রিপুরা সম্প্রদায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে। এ ছাড়াও সকাল থেকে পাহাড়ি গৃহিণীরা নিমপাতা ও রং-বেরঙের ফুল দিয়ে ঘর সাজান। দিনভর চলে নানা আনুষ্ঠানিকতা ও অতিথি আপ্যায়ন।
১৩ এপ্রিল পালিত হয় মূল বিজু। এদিন ঘরে ঘরে পাঁচন রান্না করা হয়। ঐতিহ্যবাহী এই পাঁচন (মিশ্রিত সবজি) সবার প্রিয় খাবার। এদিকে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পহেলা বৈশাখ উৎসব পালন করার জন্য ব্যাপক আয়োজন করে। উৎসবের মধ্যে ছিল আনন্দ র‌্যালি, পান্তা উৎসব ও ডিসি অফিস প্রাঙ্গণে মেলা ইত্যাদি।

শ্রেণী: