Blog Archives

জমকালো কান চলচ্চিত্র উৎসব

Posted on by 0 comment

58আবু সুফিয়ান আজাদ: গত ২৭ মে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন কান চলচ্চিত্র উৎসব। কান চলচ্চিত্র উৎসব পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন এবং প্রভাবশালী চলচ্চিত্র উৎসব। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব এবং বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের সাথে কানকেও সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং মর্যাদাপূর্ণ সম্মান দেওয়া হয়। ১৯৪৬ সাল থেকে প্রতিবছর এই উৎসব পালিত হয়ে আসছে। দক্ষিণ ফ্রান্সের রিজোর্ট শহর কানে প্রতিবছর সাধারণত মে মাসে এটি পালিত হয়।
পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এবারের ১১ দিনের আসর শেষ হয়। ১৭ মে সাগরপাড়ের শহর কানে শুরু হয় ৭০তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের আসর। ২৭ মে ২০১৭ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তারকাদের অংশগ্রহণ ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। লালগালিচায় হেঁটেছেন হলিউড-বলিউড সুন্দরীরা। প্রতিবারের মতো এবারও কানের লালগালিচায় পা রেখেছেন বলিউডের চারজন নামকরা অভিনেত্রী। তারা হলেনÑ ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন, সোনম কাপুর, শ্রুতি হাসান ও দীপিকা পাড়–কোন। দেশ-বিদেশের অন্য তারকাদের সাথে তারাও মাতিয়েছেন কান চলচ্চিত্র উৎসব। বলিউডের মধ্যে ঐশ্বর্য ১৬তম বারের মতো কান উৎসবে অংশ নেন প্রসাধন ব্র্যান্ড লরিয়ালের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে।
১৭ মে উৎসবের সূচনা হয় ফ্রান্সের ছবি ‘ইসমাঈলস গোস্টস’ প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনার করেন ইতালিয়ান অভিনেত্রী মনিকা বেলুচি। এবারের আসরে প্রতিযোগিতা বিভাগের বিচারকদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ছিলেন পেদ্রো আলমোদোভার।
এ ছাড়াও জুরিবোর্ডে ছিলেন পার্ক চ্যান উক, মারান আডে, ফ্যান বিংবিং গ্যাব্রিয়েল ইয়াহেদ, উইল স্মিথ, আনিয়েস ঝাউয়ি, জেসিকা চেস্টেইন ও পাওলো সরেন্তিনো। এই আয়োজনের অফিসিয়াল পোস্টার সাজানো হয় কিংবদন্তি ইতালিয়ান অভিনেত্রী ক্লডিয়া কার্ডিনালের স্থিরচিত্র দিয়ে। হলিউড তারকাদের মধ্যে এবারের কান উৎসবের রেড কার্পেটে হেঁটেছেন নিকোল কিডম্যান, প্যারিস হিলটন, ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট, নাওমি ক্যাম্পবেল, লিলি রোজ, ডাউজেন ক্রোজ, ইভা লঙ্গোরিয়া, ইজাবেল গোউলার্ট, চার্লজ থ্যারন, ম্যারিয়ন কটিলার্ড, মিশচা বার্টুন, রিতা ওরা, রিহানা, স্টেসি মার্টিন, এলি ফেনিং, কোকো রোচা, এমা থম্পসনসহ আরও অনেক তারকা।
উৎসবের শেষ দিন ঘোষণা করা হয় পুরস্কার। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সবার নজর প্রতিযোগিতা বিভাগ পাম দ’র (স্বর্ণপাম) প্রতি। কারণ এ বিভাগের ছবির মধ্য থেকেই সম্মানজনক পাম ডি অর অ্যাওয়ার্ড ঘোষণা করা হয়। পাম ডি অর অ্যাওয়ার্ড লাভ করে পরিচালক রুবেন আস্টলান্ড-এর দ্য স্কয়ার চলচ্চিত্রটি (সুইডেন)।
এবার প্রতিযোগিতা বিভাগে লড়ছে মোট ১৯টি ছবি। এগুলো হলো হান্ড্রেড টোয়েন্টি ব্যাটমেন্টস পার মিনিট (ফ্রান্স, পরিচালক : রবিন ক্যাম্পিলো), ইন দ্য ফেড (ফ্রান্স, পরিচালক : ফাতি আকিন), দ্য ডে আফটার (ফ্রান্স, পরিচালক : হং স্যাং সু), গুড টাইম (ফ্রান্স, বেনি সাফদি ও জোশুয়া সাফদি), হ্যাপি অ্যান্ড (জার্মানি, পরিচালক : মাইকেল হানেকি), হিকারি (জাপান, পরিচালক : নাওমি কাওয়াসে), জুপিটার’র মুন (হাঙ্গেরি, পরিচালক : কর্নেল মুনদ্রুসো), দ্য ড্রেডেড (ফ্রান্স, পরিচালক : মিশেল হাজানভিসিয়ুস), দ্য বিগাইল্ড (যুক্তরাষ্ট্র, পরিচালক : সোফিয়া কপোলা), ওয়ান্ডারস্ট্রাক (যুক্তরাষ্ট্র, পরিচালক : টড হেইন্স), লাভলেস (ফ্রান্স, পরিচালক : আন্দ্রেই জিভিয়াজিন্তসেভ), দ্য কিলিং অব অ্যা স্যাক্রেড ডিয়াল (যুক্তরাষ্ট্র, পরিচালক : ইওর্গেস লানথিমস), ওকজা (যুক্তরাজ্য, পরিচালক : লিন রামসে), অ্যা জেন্টেল ক্রিয়েচার (ফ্রান্স, পরিচালক : সের্গেই লোজনিৎসা), দ্য ডাবল লাভার (ফ্রান্স, পরিচালক : ফ্রাঁসোয়া ওজোন), রদাঁ (ফ্রান্স, পরিচালক : জ্যাক দোয়াইও), দ্য মেয়ারোউইৎজ স্টোরিস (ফ্রান্স, পরিচালক : নোয়া বামব্যাচ) এবং দ্য স্কয়ার (সুইডেন, পরিচালক : রুবেন আস্টলান্ড)।
এবার ফ্রান্সের কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় বাংলাদেশের দাগ চলচ্চিত্রটি। উৎসবের স্বল্পদৈর্ঘ্য বিভাগের জন্য নির্বাচিত হয় চলচ্চিত্রটি। স্বাধীনতাযুদ্ধের পটভূমিতে ছবিটি নির্মাণ করেছেন জসীম আহমেদ। দাগ মুক্তিযুদ্ধের গল্প। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে স্বাধীনতা-বিরোধীদের পুনর্বাসনÑ সবই আছে সেখানে। দাগ চলচ্চিত্রটির কাহিনি ও পরিচালনা করেছেন জসীম আহমেদ, চিত্রনাট্য ও সংলাপ পান্থ শাহরিয়ার, সংগীত পরিচালনা করেছেন পার্থ বড়–য়া। অভিনয় করেছেন শতাব্দী ওয়াদুদ, শারমিন জোহা, শশী, বাকার বকুল প্রমুখ।
৭০তম আসরের পুরস্কার ঘোষণায় সেরা অভিনেতার পুরস্কার জিতেছেন জোয়াকিম ফিনিক্স। ‘ইউ অয়্যার রিয়েল হিয়ার’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য এই পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।
প্রথমে বুঝতে পারেন নি তাকেই ‘সেরা অভিনেতা’ ঘোষণা করা হয়েছে। উপস্থাপকের মুখে কিছু ফরাসি বাক্যের সাথে নিজের নাম উচ্চারিত হওয়ার পরও ওয়াকিন ফিনিক্স নিজের আসনেই বসে ছিলেন। অনেক পরে বুঝতে পারলেন, তিনি বিজয়ী। পুরস্কার নিতে গিয়ে নিজের জুতা জোড়া দেখিয়ে বলেন, ‘আবার ¯িœকার দেখে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন এই পুরস্কারের জন্য আসলেই আমি প্রস্তুত ছিলাম না।’
সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন ডায়ান ক্রগার। জার্মান ভাষার ‘ইন দ্য ফেড’-এ অভিনয়ের জন্য এই পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। সেরা পরিচালক সোফিয়া কপোলা ‘দ্য বিগাইল্ড’ ছবির জন্য। ১৯৭১ সালে একই নামে মুক্তি পাওয়া ছবির রিমেক ‘দ্য বিগাইল্ড’। যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের সময়কার এক আহত সৈনিক ও একদল স্কুলছাত্রী নিয়ে ছবির গল্প। ছবির জন্য সেরা পরিচালক হলেন সোফিয়া কপোলা। কান চলচ্চিত্র উৎসবে সোফিয়ার এটা প্রথম জয় হলেও এই উৎসবের সাথে তার সম্পর্কটা কিন্তু নতুন নয়। তার বাবা হলিউড নির্মাতা ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা দুবার জিতেছেন এই উৎসবের সবচেয়ে বড় সম্মান পাম দ’র (স্বর্ণপাম)। এ নিয়ে কানে দ্বিতীয়তার কোনো নারী ‘সেরা পরিচালক’ হলেন। পুরস্কার গ্রহণ করতে গিয়ে সোফিয়া বলেন, এই ছবি বানানোর সময় রোমাঞ্চিত ছিলাম। আর কানে এই সম্মান পাওয়ার মধ্য দিয়ে ছবির যাত্রাটা ভালোই হলো বলা চলে।

এক নজরে কান পুরস্কার
পাম দ’র : দ্য স্কয়ার (রুবেন অস্টলুন্ড, সুইডেন)
গ্র্যাঁ প্রিঁ : বিপিএম ১২০ বিটস পর মিনিট (রবিন ক্যাম্পিলো, ফ্রান্স)
জুরি প্রাইজ : লাভলেস (আন্দ্রেই জিয়াগিন্তসেভ, রাশিয়া)
সেরা অভিনেতা : জোয়াক্যু ফিনিক্স (ইউ ওয়্যার নেভার রিয়েলি হিয়ার, ব্রিটেন)
সেরা অভিনেত্রী : ডায়েন ক্রুজার (ইন দ্য ফেড, জার্মানি)
সেরা পরিচালক : সোফিয়া কপোলা (দ্য বিগাইল্ড)
সেরা চিত্রনাট্যকার (যৌথভাবে) : লিন রামসে (ইউ ওয়্যার নেভার রিয়েলি হিয়ার) এবং গ্রিসের ইওর্গস লানতিমস (দ্য কিলিং অব দ্য স্যাক্রেড ডিয়ার)
ক্যামেরা দ’র : লিওনর সেরাই (ইয়ং ওম্যান, ফ্রান্স)
সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র : অ্যা জেন্টেল নাইট (কিয়াই ইউ ইয়াং, চীন)
৭০তম বার্ষিকী পুরস্কার : নিকোল কিডম্যান।

Category:

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য : যাত্রাপালা

Posted on by 0 comment

58আবু সুফিয়ান আজাদ: ‘যাত্রা’ এই শব্দটির সাথে বাঙালির দীর্ঘকাল ব্যাপ্ত শিকড় বিস্তারী সংস্কৃতির আনন্দ-বেদনার সম্পর্ক রয়েছে। বাঙালি জাতির হাজার বছরের শিল্প-ভাবনার পথ-পরিক্রমায় অযুত চিত্রকল্প হয়ে আজও টিকে আছে যাত্রা। বাঙালির বিনোদনের একটি প্রধান অনুষঙ্গ ছিল যাত্রাপালা। এর মধ্য দিয়ে শুধু বিনোদন নয় পুরাণ, ইতিহাস, লোকজ সাহিত্য সম্পর্কে শিক্ষাগ্রহণ চলত। এখন সিনেমা, টেলিভিশনের কল্যাণে বিনোদনের রূপ পাল্টেছে। কিন্তু যাত্রার আবেদন গ্রামের মানুষের কাছে এখনও রয়েছে। রাতের পর রাত জেগে যাত্রার কাহিনি, অভিনয়, গানের মাধ্যমে লোকজ নীতিবোধ, শুভ-অশুভের দ্বন্দ্ব সম্পর্কে শিক্ষা নেয় দর্শকরা। যাত্রা আমাদের লোকজ সংস্কৃতির মূল্যবান সম্পদ। রাতের পর রাত জেগে বাংলার সাধারণ মানুষ কৃষক, তাঁতি, কামার, কুমার, জেলে দেখেছে যাত্রায় কাহিনি আর মেতেছে পালাগানের সুরে। কখনও ভক্তি, কখনও ভালোবাসা, কখনও দেশপ্রেম তাকে কাঁদিয়েছে, হাসিয়েছে। আবার সামন্ত রাজা, জমিদার ও অভিজাত শ্রেণির মানুষও যাত্রা দেখেছে। জমিদার বাবু তো আর সাধারণ প্রজার সাথে যাত্রার আসরে গিয়ে বসবেন না। বরং তার প্রাসাদের নাটম-পেই বসবে যাত্রার আসর। জমিদার বাড়িতে থাকত বিশাল নাটম-প। সেখানেই যাত্রা, পালাগান, কীর্তনের আসর বসতো। চিক বা পর্দাঘেরা বারান্দায় বসতেন জমিদার গৃহিণী, রানিমা, পরিবারের নারী সদস্যরা। তারা চিকের আড়াল থেকেই দেখতেন যাত্রাপালা।
যাত্রাপালার ঐতিহ্য অত্যন্ত প্রাচীন। অষ্টম ও নবম শতকেও এ দেশে পালাগান ও পালার অভিনয় প্রচলিত ছিল। শ্রী চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের আগেও রাঢ়, বঙ্গ, সমতট, গৌড়, পু-্র, চন্দ্রদ্বীপ, হরিকেল, শ্রীহট্টসহ সমগ্র ভূখ-ে পালাগান ও কাহিনিকাব্যের অভিনয় প্রচলিত ছিল। ধর্মীয় বা কোনো উৎসবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার যে রীতি সেখান থেকেই যাত্রা শব্দটি এসেছে। এ দেশে শিবের গাজন, রামযাত্রা, কেষ্টযাত্রা, সীতার বারোমাসী, রাধার বারোমাসী প্রচলিত ছিল। সে সময় বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি অভিনয় করে দেখানো হতো। সেখান থেকেই যাত্রার উৎপত্তি। নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাবের পর কৃষ্ণযাত্রা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। কৃষ্ণযাত্রায় মূলত রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা, কৃষ্ণের বাল্যকাল, মা যশোদার সঙ্গে কৃষ্ণর বাল্যক্রীড়া, কৃষ্ণের কংসবধ, মথুরা জয় ইত্যাদি কাহিনি অভিনয় ও গানের মাধ্যমে দর্শকদের পরিবেশন করা হতো। দর্শকরা তা দেখে ভক্তিরসে সিক্ত হতেন। রক্ষিণী হরণ নামে একটি কৃষ্ণযাত্রায় চৈতন্যদেব নিজেই অভিনয় করতেন। তিনি রক্ষিণী সাজতেন।
অষ্টাদশ শতকে (১৭০০ সাল) যাত্রা বাংলা ভূখ-ের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় শিশুরাম, পরমানন্দ অধিকারী, সুবল দাস ছিলেন যাত্রার জগতে প্রসিদ্ধ। ঊনবিংশ শতকে পৌরাণিক কাহিনিভিত্তিক যাত্রা খুব জনপ্রিয়তা পায়। মতিলাল রায় ও নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়ের যাত্রাদল প্রসিদ্ধি পায়। সে সময় কৃষ্ণলীলা এবং রামায়ণ-মহাভারতের পৌরাণিক কাহিনির পাশাপাশি বিদ্যাসুন্দর, লাইলি মজনু, ইউসুফ জোলেখা, বেহুলা লখিন্দর, মা মনসা, লক্ষ্মীর মহিমা, কমলাবতী রানী ইত্যাদি প্রেমকাহিনি ও লোকজ কাহিনির অভিনয়ও প্রচলিত ছিল।
ঊনবিংশ শতকের শেষে এবং বিশ শতকের শুরুর দিকে যাত্রায় দেশপ্রেমমূলক কাহিনির অভিনয় শুরু হয়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মুকুন্দ দাশ। তার প্রকৃত নাম ছিল যজ্ঞেশ্বর। তিনি বিক্রমপুর থেকে বরিশাল গিয়ে দেশপ্রেমিক বিপ্লবী অশ্বিনী কুমারের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। মুকুন্দ দাশ যাত্রার মাধ্যমে দেশপ্রেম ও ব্রিটিশবিরোধী বক্তব্য প্রচার করেন। তিনি সমাজ সংস্কারমূলক বক্তব্য, পণপ্রথা, জাতিভেদে ইত্যাদির বিপক্ষেও বক্তব্য প্রচার কররেন। তিনি ‘স্বদেশী যাত্রা’র সূচনা করেন। সে কারণে তাকে কারাবন্দিও থাকতে হয়। মুকুন্দ দাশের প্রেরণায় আরও অনেক স্বদেশী যাত্রার দল গড়ে ওঠে। তারা গ্রামে গ্রামে যাত্রার প্রদর্শন করে দেশপ্রেমমূলক কাহিনি প্রচার করতে থাকে। সে সময় ঈশা খাঁ, প্রতাপচন্দ্র, বারো ভুঁইয়া, সোনাভান, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা, ক্ষুদিরাম ও অন্যান্য বিপ্লবীর নামেও কাহিনি অভিনয় হতে থাকে। স্বদেশী যাত্রা একসময় ইংরেজ শাসকদের রোষানলে পড়ে। মুকুন্দ দাসের আগে ঢাকায় কৃষ্ণকমল গোস্বামী নামে একজন পালাকার ‘স্বপ্নবিলাস’, ‘দিব্যোন্মাদ’, ‘বিচিত্রবিলাস’ পালা লিখে আলোড়ন তুলেছিলেন। ১৮৬০-৭৮ এর মধ্যে তার পালা গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায় এবং ঢাকাতেই প্রথম মঞ্চায়ন হয়। মনোমহন বসু নামেও আরেকজন পালাকার বেশ বিখ্যাত ছিলেন। নওগাঁ জেলার ধামুরহাট থানার শ্রামপুর গ্রামে নফরউদ্দিন নামে আরেকজন পালাকার প্রথমে রাজনীতিকেন্দ্রিক পালা লিখে বেশ খ্যাতি পান। পরে তিনি মধুমালা, সাগরভাসা, কাঞ্চনবতী, বিন্দুমতি, পুষ্পমালা ইত্যাদি রূপকাথাভিত্তিক পালা লেখেন। বিখ্যাত সাহিত্যিক মীর মোশাররফ হোসেনও পালা লিখেছেন। তিনি বেহুলা নিয়ে যাত্রাপালা লেখেন।
সে সময় গ্রামে-গঞ্জে বিষাদসিন্ধুর কাহিনি নিয়েও যাত্রা অভিনয় হতো। কারবালার কাহিনি নিয়ে যাত্রাপালা লেখা হতো। মানিকগঞ্জের ধানেশ্বরের আবদুল করিম, নরসিংদীর জালাল উদ্দিন, হিরেন্দ্র কৃষ্ণদাস, মুন্সিগঞ্জের আরশাদ আলী, ঢাকার কেরানীগঞ্জের রফিকুল, পটুয়াখালীর দুধল গ্রামের মাস্টার সেকেন্দার আলি, খুলনার ডুমুরিয়ার এমএ মজিদ (অগ্রদূত), ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইলের কফিল উদ্দিন ও মানিকগঞ্জ সদরের ডা. আবেদ আলীসহ অনেকেই সে সময় যাত্রাপালা লিখতেন। বিশ শতকে রূপবান, রহিম বাদশাহ, মালকা বানু, সয়ফুল মুলুক বদিউজ্জামাল, গুনাইবিবি, দুর্গামনি, কমলা রানীর বনবাস, কাজল রেখা, মলুয়া, ভেলুয়া সুন্দরী, সোনাভান, বীরাঙ্গনা সখিনা, গাজী কালু চম্পাবতী, বনবিবি ইত্যাদি পালা বেশ জনপ্রিয়তা পায়।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর অনেক পালাকার ও যাত্রাদল পূর্ববঙ্গ ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে যায়। পাকিস্তানি শাসকরা এ দেশের লোকজ সংস্কৃতিকে কখনও সুনজরে দেখেনি। যাত্রাপালা ধর্মবিরোধী কাজ এমন ফতোয়াও জারি হয়েছে কখনও কখনও। অনেক গ্রামে ধর্মান্ধ গোষ্ঠী একত্রিত হয়ে অভিনয় বন্ধ করে দিয়েছে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হলে অনেক যাত্রাদল নতুনভাবে গড়ে ওঠে। মাইকেল মধুসূদন, দেবদাস, রক্তাক্ত বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বিজয় এনেছি, মা মাটি মানুষ, সোনার বাংলা, সোজন বাদিয়ার ঘাট, লালন ফকির ইত্যাদি পালা বেশ জনপ্রিয়তা পায়। অমলেন্দু বিশাস, জ্যো¯œা বিশ্বাসসহ অনেক যাত্রাশিল্পী ছিলেন নামকরা। সত্তর দশকের শেষভাগ এবং বিশেষ করে আশির দশকে যাত্রাশিল্পে অবক্ষয় শুরু হয়। তখন যাত্রার নামে অশ্লীল নৃত্য পরিবেশিত হতে থাকে। আবহমানকাল ধরে চলে আসা এই শিল্প ধ্বংসের মুখোমুখি হয় যাত্রার আসরে জুয়া ও অশালীন নাচের কারণে। যাত্রার আসরে সখী নৃত্য একসময় প্রচলিত ছিল যা কিছুটা অসংস্কৃত হলেও তাকে ঠিক অশালীন বলা যেত না। কিন্তু পরবর্তীতে গ্রামগঞ্জে পর্নোগ্রাফির প্রভাবে প্রিন্সেসের নাচের নামে যাত্রার আসরে অশালীনতা ছড়িয়ে পড়ে। পরে যাত্রার প্রিন্সেস, সখীনৃত্য ইত্যাদির নামে চলে অশালীন নৃত্য।
আমাদের দেশের অতি প্রাচীন ও বলবান শিল্পমাধ্যম হলো এই যাত্রাশিল্প। এ মুহূর্তে যাত্রাশিল্প মৌলিক শিল্প মাধ্যমের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী। একবিংশ শতাব্দীর প্রত্যাশা ছিল এই যাত্রাশিল্প মাধ্যমটি আমাদের সংস্কৃতিচর্চার মধ্য দিয়ে সমাজে একটি নবজাগরণের সৃষ্টি করবে। কিন্তু এই শতাব্দীর শুরুতেই আমাদের লোকজ এই শক্তিশালী মাধ্যমটি মুখ থুবড়ে পড়ে। যাত্রাশিল্পকে নিয়ে আমাদের দেশের মৌলবাদীদের নানামুখী আগ্রাসন, অন্যদিকে এই যাত্রাশিল্পের আয়োজকদের অর্থলিপসার মোহে যাত্রামঞ্চে অশ্লীলতার অভিযোগে নানাভাবে এই লোকজ মাধ্যমটিকে কলুষিত করে তোলে। এদিকে এই সমস্যার গভীরে না গিয়ে দেশের প্রশাসনও পড়ে বিব্রতকর অবস্থায়, ফলে প্রশাসন ও যাত্রাশিল্পের মধ্যে বেড়ে যায় দূরত্ব। নানা প্রকার প্রজ্ঞাপন জারির ফলে যাত্রাশিল্পটি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদ দীর্ঘদিন যাবত লোকসংস্কৃতির শক্তিশালী মাধ্যমটি টিকিয়ে রাখার জন্য সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে, সুশীল সমাজের, সরকারের, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের, সাংস্কৃতিক সংগঠনের, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছে বহুবার ঘুরে ঘুরে আলোচনা ও সমস্যা সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা করে; কিন্তু খুব বেশি সহযোগিতা তারা পায় না।
যাত্রাকে অশালীনতা থেকে মুক্ত করতে এবং যাত্রা শিল্পকে বাঁচাতে সংস্কৃতিবান্ধব বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার প্রণয়ন করে যাত্রা নীতিমালা। ২০১২ সালে এই যাত্রা নীতিমালা গেজেটভুক্ত হয়। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৮৮টি যাত্রাদলকে নিবন্ধন করেছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। এখনকার নামকরা যাত্রাদলগুলো হলো যশোরের আনন্দ অপেরা, চ্যালেঞ্জার অপেরা, অগ্রগামী নাট্টসংস্থা, মাগুরার চৈতালি অপেরা, নারায়ণগঞ্জের ভোলানাথ যাত্রা সম্প্রদায়, কোহিনূর অপেরা, গাজীপুরের দিশারী অপেরা,  ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস যাত্রা ইউনিট, খুলনার স্বদেশ অপেরা, রাজমহল অপেরা, রঙমহল অপেরা, ফরিদপুরের মধুচ্ছন্দা যাত্রা ইউনিট, নাটোরের পদ্মযাত্রা ইউনিট, বাগেরহাটের সুন্দরবন অপেরা, লক্ষ্মীপুরের কেয়া যাত্রা ইউনিট ইত্যাদি। বর্তমান সরকার ৭টি বিভাগীয় শহরে শিল্পকলার মাধ্যমে এবং যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের সহযোগিতায় যাত্রা উৎসবের আয়োজন করে থাকে।

Category:

চারুকলায় ‘জয়নুল উৎসব’

Posted on by 0 comment

22উত্তরণ প্রতিবেদন: শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ১০২তম জন্মদিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ আয়োজন করে ‘জয়নুল উৎসব’। ২৯ ডিসেম্বর সকালে উৎসবের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিল্পাচার্যের সহধর্মিণী জাহানারা আবেদিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, শিল্পী হাশেম খান, চারুকলা অনুষদের ডিন নিসার হোসেন ও ভারতের শিল্পী যোগেন চৌধুরী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগে শিল্পাচার্যের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বিভিন্ন বিভাগসহ চারুশিল্পীরা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘জয়নুল সম্মাননা’ দেওয়া হয় শিল্পী হাশেম খান ও ভারতের শিল্পী-অধ্যাপক যোগেন চৌধুরীকে। তারপর ‘জয়নুল শতবর্ষ প্রবন্ধাবলী’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন অতিথিরা। এই আসরে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। ভাস্কর তারক গড়াইয়ের নির্মিত জয়নুল আবেদিনের আবক্ষ মূর্তি উন্মোচন করেন শিল্পাচার্যের সহধর্মিণী জাহানারা আবেদিন। এরপর চারুকলা অনুষদ প্রাঙ্গণে শুরু হয় ‘জয়নুল মেলা’। বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ পণ্যের মেলা জমে ওঠে নানা বয়সী মানুষের আনাগোনায়।
১২ জানুয়ারি থেকে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব
রেইনবো চলচ্চিত্র সংসদের উদ্যোগে আগামী বছরের ১২ জানুয়ারি শুরু হতে যাচ্ছে পঞ্চদশ ঢাকা 23আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। চলবে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত। এখন চলছে এই আয়োজনের প্রস্তুতিপর্ব। পঞ্চদশ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশসহ প্রায় ৬৭টি দেশের ১৮৬টিরও বেশি ছবির প্রদর্শনী হবে। রাজধানীর জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তন, কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগারের শওকত ওসমান মিলনায়তন, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, স্টার সিনেপ্লেক্স এবং আমেরিকান সেন্টার মিলনায়তনে এগুলো দেখানো হবে। এশিয়ান কম্পিটিশন, রেট্রোস্পেকটিভ, সিনেমা অব দ্য ওয়ার্ল্ড, চিলড্রেনস ফিল্মস, স্পিরিচুয়াল ফিল্মস, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মস, নরডিক ফিল্ম সেশন এবং উইমেন্স ফিল্মমেকারস সেকশন-এ চলচ্চিত্রগুলো প্রদর্শিত হবে। এ ছাড়া বিশ্বের ৬৭টি দেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রকার-সমালোচক, সাংবাদিক, বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের কর্মকর্তা, রেইনবো চলচ্চিত্র সংসদ ও অন্যান্য চলচ্চিত্র সংসদের সদস্যসহ দেশের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব উৎসবে অংশ নিয়ে দর্শকদের সাথে তাদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করবেন। উৎসবের অংশ হিসেবে চলচ্চিত্রে নারীর ভূমিকা বিষয়ক ‘তৃতীয় ঢাকা আন্তর্জাতিক উইমেন ফিল্ম মেকারস্ কনফারেন্স’ অনুষ্ঠিত হবে। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ মিলনায়তনে এই সম্মেলন থাকবে আগামী ১৩ ও ১৪ জানুয়ারি। এতে বিভিন্ন দেশের নারী চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সাথে মতবিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের নারী নির্মাতারা অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
সৈয়দ শামসুল হকের ৮২তম জন্মদিন উদযাপিত
২৭ ডিসেম্বর ছিল সৈয়দ শামসুল হকের ৮২তম জন্মদিন। সদ্যপ্রয়াত এই লেখকের ৮২তম জন্মদিনে ছিল দুটি আয়োজন। ‘ফুলের গন্ধের মতো থেকে যাব তোমার রুমালে’ শিরোনামের আয়োজন ছিল শিল্পকলা একাডেমিতে। আর বাংলা একাডেমিতে জাতীয় কবিতা পরিষদ আয়োজন করে আলোচনা আর কবিতা পাঠের। ওইদিন শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আয়োজন করা হয় শিল্পকলা একাডেমির অনুষ্ঠান। যার শুরুতেই সৈয়দ হকের প্রতিকৃতিতে আলোক প্রজ্বলন ও পুষ্পস্তবক অর্পণের সাথে বেজে ওঠে শিল্পী মনিরুজ্জামানের বাঁশির সুর। এরপর নাট্যজন আতাউর রহমানের সঞ্চালনায় সূচনা বক্তব্য রাখেন নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার। সৈয়দ শামসুল হকের দুটি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এর মধ্যে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স থেকে কাব্যগ্রন্থ ‘কর্কটবৃক্ষের শব্দসবুজ শাখায়’ এবং অন্যপ্রকাশ থেকে অনুবাদ নাটকের বই ‘শেক্সপিয়রের হ্যামলেট’ প্রকাশিত হয়েছে। প্রধান অতিথি ছিলেন ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম। শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে ‘সৈয়দ শামসুল হক সৃজনের জাদুকর : নাট্য নির্দেশকের নিবেদন’ বিষয়ে নাট্যজন আতাউর রহমান, ‘চলচ্চিত্রে সৈয়দ শামসুল হক : বড় ভালো লোক ছিল’ বিষয়ে চলচ্চিত্র গবেষক অনুপম হায়াত, ‘জাদুবাস্তবতার পথিকৃৎ সৈয়দ শামসুল হক’ বিষয়ে কথাশিল্পী আনিসুল হক, ‘চিরজীবিত বিশ্ববাঙালি’ আলোচনা করেন কবি মুহাম্মদ নূরুল হুদা। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন কবিপতœী কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক। অনুষ্ঠানে সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা আবৃত্তি করেন হাসান আরিফ, গোলাম সারোয়ার ও আহকামউল্লাহ। নাট্যদল থিয়েটারের পরিবেশনায় সৈয়দ হক রচিত ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ এবং নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের পরিবেশনায় ‘ঈর্ষা’র অংশবিশেষ মঞ্চস্থ করে। সৈয়দ শামসুল হকের লেখা সংগীত পরিবেশন করেন এন্ড্রু কিশোর। সৈয়দ শামসুল হককে নিবেদন করে সমাপনী নৃত্য পরিবেশন করেন পূজা সেনগুপ্ত। সৈয়দ হকের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করে বিভিন্ন সংগঠন। এর আগে সকালে বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে জাতীয় কবিতা পরিষদ আয়োজন করে আলোচনা, স্মৃতিচারণ, নিবেদিত কবিতাপাঠ ও কবির কবিতা থেকে আবৃত্তি। সৈয়দ হককে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান, কবি মুহাম্মদ নূরুল হুদা, কবি রবিউল হুসাইন, কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ ও কবি সাজ্জাদ কাদির। জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি ড. মুহাম্মদ সামাদের সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তারিক সুজাত।
সাংস্কৃতিক জোটের সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠান
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট রাজধানীর ৫টি স্থানে সপ্তাহব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ‘বিজয় উৎসব-২০১৬’ শিরোনামে এ অনুষ্ঠান শুরু হয় ১৩ ডিসেম্বর এবং শেষ হয় ১৯ ডিসেম্বর। ১৩ ডিসেম্বর বিকেল ৪টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার মঞ্চে সপ্তাহব্যাপী এই উৎসবের উদ্বোধন করেন একুশের গানের অমর রচয়িতা ভাষাসৈনিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। উৎসবের এবারের স্লোগান ছিল ‘ঐক্য গড়ো বাংলাদেশ, সাম্প্রদায়িকতা হবে শেষ’। রাজধানীতে বিজয় উৎসব চলেÑ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার মঞ্চ, রবীন্দ্র সরোবর কবি রফিক আজাদ মঞ্চ, রায়ের বাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণ মঞ্চ, বর্ণমালা স্কুল অ্যান্ড কলেজ দনিয়া মঞ্চ ও খোন্দকার নূরুল আলম মঞ্চ মিরপুর। প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে ৫টি মঞ্চেই চলে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।
সাংস্কৃতিক বিনিময় উদ্যোগে
ভারত ও বাংলাদেশের দুটি প্রথমসারির বিশ্ববিদ্যালয় হাত মিলিয়ে এই প্রথম শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির এক উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। এর অংশ হিসেবেই ১৬ ও ১৭ ডিসেম্বর কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এই প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হলো দুদিনব্যাপী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উৎসব। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হবে এর পাল্টা রবীন্দ্রভারতী উৎসব। দুপক্ষের উদ্যোক্তারাই বলছেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যখন যোগাযোগের নানা নতুন দিগন্ত খুলে যাচ্ছে, তখন এই উদ্যোগ দুদেশের মধ্যে শিক্ষাগত বা সাংস্কৃতিক যোগাযোগের পথকে প্রশস্ত করবে।

Category:

বৈসাবি উৎসব : ফুল ভাসিয়ে শুরু জলকেলি দিয়ে শেষ

Posted on by 0 comment

‘১২ এপ্রিল ভোরে চেঙ্গী, ফেনী ও মাইনী নদীতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে খাগড়াছড়িতে শুরু হয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী প্রধান সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব বৈসাবি’

54উত্তরণ ডেস্ক: রাজধানী ঢাকাসহ তিন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলায় নানা আচার-অনুষ্ঠান, হৈ-হুল্লোড়, র‌্যালি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর বর্ষবরণ উৎসব বিজু বা সাংগ্রাই বা বৈসাবি। তিন দিনের এই অনুষ্ঠান শুরু হয় জলে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে এবং শেষ হয় জলকেলি দিয়ে। এ উপলক্ষে ঢাকায় গত ১২ এপ্রিল সকালে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজন করে বৈসাবী উৎসবের। বৈসুক, সাংগ্রাই ও বিজু ৩টি অনুষ্ঠানের সমন্বয়ে পার্বত্য জেলাবাসীর এই উৎসবের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী।
পার্বত্য জনপদ মুখরিত হয়ে উঠেছিল বৈসাবি উৎসবে। তিন দিনের এই অনুষ্ঠানে আনন্দের কোনো কমতি ছিল না। ১২ এপ্রিল ভোরে চেঙ্গী, ফেনী ও মাইনী নদীতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে খাগড়াছড়িতে শুরু হয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী প্রধান সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব বৈসাবি। পাহাড়ের কিশোর-কিশোরী ও ছোট ছোট ছেলেমেয়ে কলাপাতায় করে ফুল তুলে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশে নদী-খালে ভাসিয়ে পুরনো বছরের গ্লানি মুছে নতুন বছরের শুভ কামনায় নিজেদের পবিত্রতা কামনা করে। বর্ষবরণ উৎসবকে চাকমারা বিজু, মারমারা সাংগ্রাই এবং ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী বৈসুক বলে আখ্যা দিলেও গোটা পার্বত্য এলাকায় তা বৈসাবি নামেই পরিচিত। বাংলা বছরের শেষ দুদিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিনÑ এই তিন দিন মিলেই মূলত বর্ষবরণ উৎসব পালিত হয়। চাকমা সম্প্রদায় ১৩ এপ্রিল মূল বিজু আর পহেলা বৈশাখ বা গজ্জাপয্যা পালন করে। ওই দিন ঘরে ঘরে চলে অতিথি আপ্যায়ন। সেই সাথে সব বয়সী মানুষ নদী, খাল অথবা ঝরনায় গঙ্গা দেবীর পূজা আরাধনা করেন।
উৎসবের প্রথম দিনে চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমা আদিবাসীরা ফুল দিয়ে ঘর সাজায়। এ উপলক্ষে সকালে পানখাইয়াপাড়ায় আয়োজন করা হয় মারমাদের ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা প্রতিযোগিতা। পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী প্রতিযোগিতা উদ্বোধন করেন। দুপুরে খাগড়াপুরে শুরু হয় ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী গরাইয়া নৃত্য উৎসব। ত্রিপুরা সম্প্রদায় হারিবৈসু, বিযুমা, বিসি কাতাল এবং মারমারা পেইংচোয়ে, আক্যে ও আদাদা এ উপলক্ষে ১৪ এপ্রিল মারমা সম্প্রদায় সাংগ্রাই উৎসবে ঐতিহ্যবাহী জলকেলি বা পানি উৎসব করে।
এদিকে কাপ্তাই হ্রদের জলে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে রাঙ্গামাটিতে তিন দিনব্যাপী বৈসাবি উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করে। ১২ এপ্রিল সকালে শহরের গর্জনতলী এলাকায় নানা বয়সের নারী-পুরুষকে নিয়ে রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা কাপ্তাই হ্রদের স্বচ্ছ জলে ফুল ভাসিয়ে তাদের রীতি অনুযায়ী প্রণাম করে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন। ভোর থেকেই বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ তাদের নিজস্ব পোশাকে সজ্জিত হয়ে ফুল ভাসাতে আসে কাপ্তাই হ্রদের পাড়ে। ফুল ভাসানোর অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য স্মৃতি বিকাশ ত্রিপুরা। এ ছাড়া রাজবাড়ী ঘাটে ফুল বিজু পালন করা হয়। ফুল ভাসানোর পর ত্রিপুরা কল্যাণ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বয়স্কদের মধ্যে কাপড় বিতরণ করা হয়। পরে সেখানে ত্রিপুরা সম্প্রদায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে। এ ছাড়াও সকাল থেকে পাহাড়ি গৃহিণীরা নিমপাতা ও রং-বেরঙের ফুল দিয়ে ঘর সাজান। দিনভর চলে নানা আনুষ্ঠানিকতা ও অতিথি আপ্যায়ন।
১৩ এপ্রিল পালিত হয় মূল বিজু। এদিন ঘরে ঘরে পাঁচন রান্না করা হয়। ঐতিহ্যবাহী এই পাঁচন (মিশ্রিত সবজি) সবার প্রিয় খাবার। এদিকে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পহেলা বৈশাখ উৎসব পালন করার জন্য ব্যাপক আয়োজন করে। উৎসবের মধ্যে ছিল আনন্দ র‌্যালি, পান্তা উৎসব ও ডিসি অফিস প্রাঙ্গণে মেলা ইত্যাদি।

Category:

বইমেলায় শিশুদের আকর্ষণ ‘মুজিব’ গ্রাফিক নভেল

Posted on by 0 comment

57উত্তরণ প্রতিবেদন: বইমেলার বাংলা একাডেমি অংশে ঢুকে হাতের ডান দিকে একটু এগিয়ে গেলে ১০০ নম্বর স্টলটি শিশুরা সহজেই খুঁজে পেয়েছে। ওটা সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) স্টল। সেখানে শিশুদের জন্য সাজিয়ে রাখা ছিল কার্টুনের বই। কিন্তু এ তো আর যেনতেন কার্টুন ছিল না। এ যে স্বয়ং জাতির জনকের ওপর কার্টুন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কার্টুন। নাম ‘মুজিব’। আর এটি কিন্তু ¯্রফে কার্টুন বইও নয়। এটি একটি গ্রাফিক নভেল। এক কথায় চিত্রে চিত্রে তুলে ধরা একটি আস্ত উপন্যাস। যা প্রকাশিত হচ্ছে খ-ে খ-ে।
গত ২০ ফেব্রুয়ারি মেলায় পাওয়া গেছে কার্টুন বইটির প্রথম খ-। ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টা থেকে পাওয়া গেছে দ্বিতীয় খ-টিও। কারণ ওই দিনই দ্বিতীয় খ-টি প্রকাশিত হয়ে মেলায় প্রথম আসে। সামান্য দামে শিশুরা কিনেছে। জাতির জনক হলে কী হবে একসময় তিনিও ছিলেন শিশুদের মতো ছোট্ট খোকাটি। তারও ছিল দুরন্ত সময়। খেলাধুলার শখ। এ ছাড়াও আছে ছোট্ট মুজিবটি কীভাবে ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠার গল্প। আছে কীভাবে দেশ ও জাতিকে তার চেতনায় ধারণ করলেন। আর কী করেই বা তিনি জড়িয়ে গেলেন রাজনীতির সাথে সেসব নিয়ে ছবি আর কথা। ‘মুজিব’ যে একটি চেতনার নাম, তা শিশু বয়স থেকেই শিশুদের মাঝে প্রোথিত করে দিতে হবে। আর তার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠবে আগামী দিনের যোগ্য নাগরিক, আগামী দিনের নেতৃত্ব, এটাই মত সিআরআই’র কর্তাব্যক্তিদের।
‘বঙ্গবন্ধু গ্রামের একজন সাধারণ ছেলে থেকে একটি জাতির আশা ও স্বপ্নের ধারক বাহক হয়ে উঠেছিলেন, অবশেষে মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার পথপ্রদর্শক হয়েছিলেন। তার কাহিনি থেকে শিশুরা এটাই জানবে যে, কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ এবং সত্যের প্রতি বিশ্বাস থাকলে যে কোনো কিছু করা সম্ভব।’ এ কথাটি বলেছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতি এবং শেখ রেহানার পুত্র রাদওয়ান সিদ্দিক। তিনি হলেন গ্রাফিক নভেলের প্রকাশক।
প্রথম পর্বে রয়েছে, কীভাবে তরুণ মুজিব গ্রামে খেলাধুলা, পড়াশোনা, ডাক্তারের কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়ার মতো দুঃসাহসিক, দুরন্তপনার কিছু কাজের মাধ্যমে গ্রামের বালকের জীবনযাপন করার কথা। তার বিশ্বস্ততার প্রমাণ তরুণ বয়স থেকেই স্পষ্ট ছিল এবং তিনি নিজের বিশ্বাসের পক্ষে দাঁড়াতে কখনও কুণ্ঠাবোধ করেন নি। তিনি তার বাবার অনেক প্রিয়পাত্র ছিলেন। তার বাবা একজন ¯েœহশীল পিতার পাশাপাশি ছিলেন ন্যায়-অন্যায় বোধসম্পন্ন একজন মানুষ। এত দুরন্তপনার মাঝেও তরুণ মুজিব নিজের কাজের দায়িত্ব নেওয়ার ব্যাপারেও শিক্ষা লাভ করেছিলেন।
দ্বিতীয় পর্বে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক উত্থানের পাশাপাশি তার রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠার গল্প। আছে পিতা বনাম পুত্রের দলের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল ম্যাচের ঘটনাটিও।

‘শাহ আবদুল করিম সারাবিশ্বের’
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সিলেটের কবি নজরুল অডিটরিয়ামে শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ উদযাপন পর্ষদের উদ্যোগে ‘শাহ আবদুল করিম জন্মশতবর্ষ উৎসব’ পালিত হয়েছে। উৎসবের উদ্বোধন করেন ভারতের আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বিশিষ্ট লেখক তপোধীর ভট্টাচার্য। তিনি আলোচনা পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন।
উদযাপন পর্ষদের আহ্বায়ক কবি শুভেন্দু ইমামের সভাপতিত্বে আলোচনা পর্বে অংশ নেন সিলেট মেট্টোপলিটন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য মো. সালেহ উদ্দিন, কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক, ভারতের সাহিত্যিক স্বপ্না ভট্টাচার্য, কবি তুষার কর ও করিম-তনয় শাহ নূরজালাল। স্বাগত বক্তব্য দেন সুমনকুমার দাশ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালন করেন আবৃত্তিকার নাজমা পারভীন।
উদ্বোধনী বক্তৃতায় তপোধীর ভট্টাচার্য বলেন, শাহ আবদুল করিমের গান শুনে শুধু মাথা নাড়লেই চলবে না, গানের অনেক গভীরে গিয়ে প্রবেশ করতে হবে। করিম তার গানে সমষ্টির কথা বলেছেন। দেশ-কাল করিমের কথা না ভাবলেও করিম দেশ-কালের কথা বলে গিয়েছেন। আর করিমের সৃষ্টির সার্থকতাই এখানে। স্বপ্না ভট্টাচার্য বক্তৃতায় বলেন, করিমের গান আমাদের মনোজগতকে নাড়া দেয়, আলোড়িত করে। মানুষের সংকটে মানুষকে বাঁচিয়ে দেয় সংস্কৃতি। আর করিমের গান সেই সংকট উত্তরণের আলোকজ্জ্বল সিঁড়ি। বক্তৃতায় শাহ নূরজালাল বলেন, শাহ আবদুল করিম আর কেবল আমার পরিবারের নন, তিনি এখন সারাদেশের, সারাজাতির, সারাবিশ্বের।
শুভেন্দু ইমাম সভাপতির বক্তৃতায় বলেন, করিমের গানের শুদ্ধ পাঠ ও শুদ্ধ সুর ছড়িয়ে দিতে পারলেই কেবল করিমের শতবর্ষ পালনের সার্থকতা হবে। ইদানীং করিমের জন্ম তারিখ থেকে শুরু করে নানা বিষয় নিয়ে কিছু সুবিধাবাদীরা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, এর প্রতিবাদও করিম অনুরাগীদের করা উচিত।
আলোচনার পর সন্ধ্যায় ১০০টি মোমবাতি প্রজ্বলন করে প্রয়াত বাউলের জন্মশতবর্ষ উদযাপন করা হয়। এরপর শুরু হয় সাংস্কৃতিক পর্ব। শুরুতেই ছিল কলকাতার প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী মৌসুমী ভৌমিকের ‘গান ও গল্প’ শীর্ষক এক ঘণ্টার পরিবেশনা।

ঢাকায় মসলিন উৎসব
ঢাকায় চলছে মাসব্যাপী মসলিন প্রদর্শনী ও মসলিন পুনরুজ্জীবন উৎসব। গত ৫ ফেব্রুয়ারি জাদুঘরের নিচতলায় নলিনী কান্ত ভট্টশালী হলে উৎসবের উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি। এ উৎসব উপলক্ষে দুটি ডাকটিকিটও অবমুক্ত করেন মন্ত্রী। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি। স্বাগত বক্তব্য দেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব আকতারী মমতাজ। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, দৃক পিকচার লিমিটেড ও ব্র্যাক যৌথভাবে এ আয়োজন করে।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত প্রধান অতিথির উদ্বোধনী ভাষণে বলেন, প্রাচীন বস্ত্র মসলিন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প। বাংলার মসলিনের সাথে আমার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। স্মৃতিচারণে তিনি বলেন, তরুণ বয়সে বলধা গার্ডেনের জাদুঘরে ও ঢাকা জাদুঘরে মসলিন দেখেছি এবং তখন বনেদি পরিবারের বিয়েতে বরকে মসলিনের পাগড়ি পরানো হতো। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন, দৃক পিকচার লাইব্রেরি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী সাইফুল ইসলাম, লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যালবার্ট মিউজিয়ামের সিনিয়র কিউরেটর মিস রোজ মেরি ক্রিল, ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজের সিনিয়র পরিচালক তামারা আবেদ। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সভাপতি এম আজিজুর রহমান।
ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড এলবার্ট মিউজিয়ামের সিনিয়র কিউরেটর মসলিন বিশেষজ্ঞ রোজ মেরি ক্রিল মসলিন পুনরুজ্জীবনের এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন। সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি বলেন, এই মাস ভাষার মাস, এই মাসেই আমাদের মসলিনের হারানো গৌরব পুনরুজ্জীবনের জন্য এই মাসে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু কাজের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। মসলিনকে বাংলাদেশের জাতীয় গৌরব হিসেবে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পদক্ষেপ হিসেবে মসলিন প্রদর্শনী ও মসলিন পুনরুজ্জীবন উৎসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব আকতারী মমতাজ তার স্বাগত ভাষণে বলেন, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, দৃক ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে ঢাকাই মসলিনের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে তা আমাদের মসলিনকে বিশ্বের কাছে নতুন করে তুলে ধরবে। মসলিন পুনরুজ্জীবন কর্মসূচিতে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যা কিছু প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানে প্রস্তুত রয়েছে।
এদিকে ঐতিহাসিক স্থাপনা আহসান মঞ্জিলে ৫, ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় মসলিন প্রদর্শনী। আর এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবনে অনুষ্ঠিত হয় বর্ণিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ৬ ফেব্রুয়ারি শীতের রাতে শৈল্পিকভাবে তুলে ধরা হয়েছিল বিশেষ এই বস্ত্র শিল্পটির অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের কথা। মসলিন নাইট শীর্ষক হৃদয়গ্রাহী আয়োজনটি সাজানো হয় নৃত্যনাট্য ও ফ্যাশন শোর সম্মিলনে। আলো ও শব্দের প্রক্ষেপণে বর্ণিল অনুষ্ঠানটি যেন রূপ নেয় হারানো দিনের নতুন গল্পে। এতে অংশ নেন বাংলাদেশ, ভারত ও যুক্তরাজ্যের ১২ ডিজাইনার। মসলিনের নবজাগরণের প্রত্যাশায় অসাধারণ এই অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করে দৃক, জাতীয় জাদুঘর ও আড়ং। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন। আলোচনায় অংশ নেন দৃকের সিইও সাইফুল ইসলাম, ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজের জ্যেষ্ঠ পরিচালক তামারা আবেদ ও জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী। অনুষ্ঠানটি দর্শক সারিতে বসে উপভোগ করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপিসহ দেশি-বিদেশি অতিথিরা।

Category:

জাতির পিতা ও জাতীয় কবি

Posted on by 0 comment
43

২৭ আগস্ট নজরুল মৃত্যুবার্ষিকী

শাফিকুর রাহী: বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের দেশপ্রেম মানবপ্রেম আর ধর্মচেতনার নাক্ষত্রীয় আভায় উদ্ভাসিত মনোলোক ধারণ করেছিল বাঙালির মহিমান্বিত বীরত্বের বিরল অমরগাথা। তিনি কীভাবে বীর বাঙালির অকল্পনীয় অলোকসুন্দরের আরাধনায় বারবার উচ্চারণ করেছেন, বাঙালির মতো অমন বীরের জাতি দুনিয়াতে খুব একটা নেই। কেবলমাত্র বাঙালিই পারে সমগ্র বিশ্বকে বিস্মিত করে জয়ের বরমাল্য গলে পরতে। তিনি বাঙালির শৌর্যবীর্যের গৌরবগাথা তার মননে ধ্যানে জ্ঞানে লালন করে জানান দিলেন বাঙালির মুক্তি ও বিজয় অনিবার্য। বাঙালির আছে তাবৎ বিশ্বকে শাসন করার শক্তি সাহস এবং গর্বিত গরিমা। আমাদের কি নেই! জল-মাটি-বায়ু মুক্ত আকাশ-পাহাড়-পর্বত-সমুদ্র হাজারও নদ-নদী, খনিজ সম্পদে ভরপুর বাঙালির নৈসর্গিক অরণ্যভূমি। কালে কালে এ শ্যামল কোমল ভূমিতে জন্ম নিয়েছে কত ধ্যানী, মুনি, ঋষী, জ্ঞানীগুণী, প-িত আর বীরত্বের অগ্নিপুরুষ, সূর্য তাপস।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রবল প্রজ্ঞা পরম মানবিকতা মহত্তম উদারতার ফলে আজ বাংলাদেশের জাতীয় কবির সর্বোচ্চ সম্মানিত আসন অলঙ্কৃত করেছেন নজরুল। যা সমগ্র জাতির কাছে অতীব গৌরবের বিষয়। নজরুলের কবিতা আজ বাংলাদেশের রণসংগীত আর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা আমাদের জাতীয় সংগীত, এসবই হয়েছে বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেম আর মানবপ্রেমের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের শুভলগ্নেÑ সুনির্দিষ্ট নির্দেশে। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান কবিতায় যেভাবে মুগ্ধ হয়েছেন কবি কাজী নজরুল ইসলামের গান কবিতায়ও দারুণভাবে উজ্জীবিত অনুপ্রাণিত হয়েছেন বিধায় মহান মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীনতা অর্জনের সাথে সাথে অমন যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেননি। আমাদের বর্তমান প্রজন্ম কিংবা এর আগের অনেক লোকজনও এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখে না বলেই হয়তো কেউ জানতেও চায় না যে, জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলের চুরুলিয়ার মাটিতে জন্মগ্রহণ করেও বাংলাদেশের জাতীয় কবি হলেন কীভাবে; সত্যিকার অর্থেই এ তথ্য অনেকেরই না জানার কথা। কারণ পঁচাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার মূল ইতিহাসটাই বিকৃতির মাধ্যমে পাল্টে দেওয়া হয়েছে। শুধু কি তাই; বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানকেও এক ভয়ঙ্কর সামরিক হন্তারক তছনছ করে ফেলেছিল তার নিজের মসনদকে পাকাপোক্ত করার অশুভ অপপ্রয়াসে ভয়ঙ্কর মিথ্যাচারের অপকৌশলে।
এ জঘন্য অমার্জনীয় অপরাধটি করেছিল যা কিনা সমগ্র বাঙালি জাতির জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের এবং কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা করে। আজ সময় এসেছে দেশের স্বার্থে ও ইতিহাস ঐতিহ্যের সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমে আগামী প্রজন্মকে বাঙালি জাতির দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা সবার সামনে তুলে ধরার। আর সমগ্র জনগোষ্ঠীর কাছে বিশ্বাসঘাতকদের স্বরূপ উন্মোচন করার। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দীর্ঘ প্রায় ২৪ বছরের আন্দোলন সংগ্রাম আর ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসের সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে ত্রিশ লক্ষ প্রাণের আত্মদান আর দু’লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাঙালি জাতি অর্জন করে প্রিয় স্বাধীনতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার কিছুদিনের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে বড় বিনয়ের সাথে অনুরোধ করে বলেছিলেন, ‘মাইডিয়ার সিস্টার আপনার কাছে আমার একটি আবদার আছে আপনি যদি রাখেন তা হলে বলতে পারি।’ ‘নিশ্চয়ই বলবেনÑ আমি অবশ্যই তা রাখব।’ সাথে সাথে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘বিদ্রোহী কবিকে আমাকে দিতে হবে।’ শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীও সাথে সাথে বললেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই আপনি চাইলে তা-ই হবে, কবে কীভাবে আনতে চান সেভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর ওপর বিশ্বাস রেখে বঙ্গবন্ধু সেভাবেই বাংলাদেশ থেকে তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুস্তাফা সারওয়ারকে প্রধান করে একটি কমিটি ভারতে পাঠিয়ে দিলেন ১৯৭২ সালের মে মাসে।
ভারতে গিয়ে কমিটির লোকজন সরাসরি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে বিস্তারিত বলার পর ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে কবিকে বাংলাদেশে আনার প্রস্তুতি চলছেÑ ইতোমধ্যে ভারতের নজরুলভক্তরা বিষয়টি জানতে পেরে তাতে বাধা দিতে চাইল। বাংলাদেশে কবিকে নেওয়া যাবে না বলে তারা সেখানে মিটিং-মিছিল ও প্রতিবাদ শুরু করলে প্রেক্ষাপট পরিবর্তন করে সময়সূচিও বদলানো হলো, সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাতের বেলায় গোপনে বিমানবন্দরে নিয়ে আসা হয় কবিকে। সেই রাতেই ২৪ মে কবির ৭৩তম জন্মদিনে বাংলাদেশে এসে পৌঁছলে বঙ্গবন্ধু কবিকে জন্মদিনের ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে বরণ করে নিলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে কবির সম্মুখে অনেকক্ষণ বসেছিলেন। বাকরুদ্ধ কবির অসুস্থতা দেখে বঙ্গবন্ধুর অনেক খারাপ লেগেছিল। কবিও তখন দীর্ঘসময় ধরে অবাক দৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধুর দিকে তাকিয়েছিলেন। অনেক রাজনৈতিক নেতা, জ্ঞানী-গুণীরা বলে থাকেন বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাংলাদেশ কখনও এভাবে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারত না। আমার কথা হলো বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে এবং বঙ্গবন্ধু না থাকলে কবি নজরুল কখনও বাংলাদেশের জাতীয় কবি হতে পারতেন? না, অবশ্যই না। আজ সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো মহান স্বাধীনতার দীর্ঘ প্রায় ৪৪ বছর গত হতে চলল, অথচ আজও আমরা দল মত নির্বিশেষে জাতির পিতাকে যথাযথ তার প্রাপ্য সম্মান প্রদর্শন করতে শিখিনি।
যারা পঁচাত্তরের মধ্য আগস্টের নির্মম হত্যাকা- সংঘটিত করার মধ্য দিয়ে, জাতির মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল বিভাজনের বিষবাষ্প, সে কারণেই রাতারাতি বাঙালি জাতীয়তাবাদ মুছে ফেলে হয়ে যায় বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এসব ঘৃণ্য চক্রান্ত হয়েছিল পাক-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ গোষ্ঠীর দ্বারা। যা ছিল বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিজীবন রাজনৈতিক প্রবল প্রজ্ঞাকে অস্বীকার করার অশুভ অপকৌশল। স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিকদের মাঝে এমন সব জঘন্য মিথ্যাচারের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে বিভ্রান্তির শেষ সীমান্তে নিক্ষেপ করার কারণে আজও আমাদের জাতির পিতাকে খাটো করার, তার অমূল্য অবদানকে অস্বীকার করার দেশীয় আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারী গোষ্ঠী অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের সাহিত্য সংস্কৃতির জন্য বঙ্গবন্ধু যে অমূল্য অবদান রেখে গেছেন তা কেউ কোনোদিন ভুলতে পারবে না। অনন্তকাল বাঙালি জাতির ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এদেশের মাটি মানুষের গণদুশমনরা আজও ইতিহাস বিকৃতির ঘৃণ্য চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। যাদের কোনো অতীত ইতিহাস নেই, রাজনৈতিক আদর্শ নেই। যারা এদেশের কল্যাণ চায় না, এদেশের উন্নয়নে বিশ্বাস করে না। তারা শুধু ধ্বংস করে দেশকে পিছিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টায় সারাক্ষণ সংঘাত-সংঘর্ষে লিপ্ত থাকতে চায়। জাতির পিতা আর জাতীয় কবির সুদীর্ঘ অহিংস রক্তপাতহীন মানবিক আন্দোলন সংগ্রামের মূল সুরই ছিল অসাম্প্রদায়িক বৈষম্যহীন সাম্য-শান্তি আর প্রগতির চিন্তা-চেতনায় কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠন। এই আকাক্সক্ষায় সারাটি কাল অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মুক্তির লড়াইয়ে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন। গণমানুষের অধিকার আদায়ের কথা বলতে গিয়ে তারা অনেক নির্যাতিত হয়েছেন। তৎকালীন শাসকদের হাতে গ্রেফতার হয়ে দুজনই কিন্তু বহুবার কারাগারে বন্দী জীবন কাটিয়েছেন। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়াতে হয়েছে বহুবার। শারীরিক মানসিকভাবে অনেক নির্যাতন নিপীড়ন করেও তাদের কখনও দমাতে পারেনি কোনো স্বৈরশাসক গোষ্ঠী।
একজন হলেন বিদ্রোহী ও মানবতার কবি, আরেকজন হলেন দেশপ্রেমী ও রাজনীতির কবি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিদ্রোহী কবি নজরুলের সৃজনশীল মানসকে ধারণ করেছিলেন আর মনে-প্রাণে ভালোবেসেছিলেন বলেই তো আজ বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুল। কোনো সভ্য মানুষ কি কখনও অমন জঘন্য অপরাধ করতে পারে! যে তালকে স্বীকার করেন কিন্তু তালগাছকে অস্বীকার করেন! সারাবিশ্বে কোথাও এমন অমানবিক নজির আছে বলে আমার জানা নেই। এখানে একটি বিষয়কে সমগ্র জাতির কাছে স্পষ্ট করতে হবে যে, কখন কোথাও যদি বঙ্গবন্ধুর নাম আসে সেখানে নজরুলের নাম আসতে হবে তেমন কোনো কারণ নেই; কিন্তু জাতীয় কবি নজরুলের নাম এলে সেখানে বঙ্গবন্ধুর নাম অবশ্যই আসতে হবে। না হয় বিষয়টি হবে একেবারেই অসম্পূর্ণ এবং অগ্রহণযোগ্য। কারণ বঙ্গবন্ধুর বিশাল উদার দৃষ্টিভঙ্গি, প্রবল প্রজ্ঞা আর পরম মানবিক গুণাবলী ও মহতি উদ্যোগের ফলেই কবি নজরুল আজ বাংলাদেশের জাতীয় কবি। এ চরম সত্যকে যে বা যারা অস্বীকার করবে তারা একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশকেই অস্বীকার করবে। তাই রাষ্ট্রকেও অবশ্যই এসব অমীমাংসিত বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আপনি যে-ই হোন না কেন; যদি এ দেশের শ্যামল-কোমল এক সাগর রক্তে রাঙা পবিত্র মানচিত্রকে মানতে আপনার কষ্ট হয়, আপনি যদি এ পবিত্র ভূমিকে অস্বীকার করেন তবে এদেশে আপনার থাকা-খাওয়া আর মুক্ত জলবায়ু সেবনের অধিকার আপনার নেই। বঙ্গবন্ধুর বাংলায় ভিনদেশি দালাল, গুপ্তঘাতক ধ্বংসের অপচেষ্টাকারী ধর্মীয় জঙ্গিগোষ্ঠী গণদুশমনদের এদেশে কোনো স্থান নেই।

Category:

পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রেরণার ক্ষণ

Posted on by 0 comment

33(C)মাহবুব রেজাঃ বাংলা সনের প্রথম প্রবর্তক কে তা নিয়ে অনেক গবেষক ও ইতিহাসবেত্তাদের মধ্যেই মতান্তর রয়েছে। তবে সম্রাট আকবরই যে বাংলা সনের প্রবর্তক তার বহু নজির পাওয়া যায়। ঐতিহাসিকেরা এ নিয়ে নানা তত্ত্ব-তালাশ চালিয়ে এর পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণও হাজির করেছেন। গবেষকদের বিশ্লেষণ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই এ বিষয়টিকে আরও জোরালো করেছে। একেক দেশে একেক রকমভাবে বর্ষবরণ উদযাপিত হয় এবং তা নিয়েও রয়েছে মজার মজার ইতিহাস। লোকাচার। উৎসব।
লোক গবেষক, প্রাবন্ধিক শামসুজ্জামান খান তার এক লেখায় বাংলা নববর্ষের প্রচলন, সন-তারিখ ও পঞ্জিকা নিয়ে তার দীর্ঘ ৪৩ বছরের গবেষণায় লিখেছেনÑ ‘বাংলা অঞ্চলের নববর্ষের সঙ্গে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নববর্ষ এবং উৎসবের বিষয় ও ধরনকেও বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। তা হলে এই অঞ্চলের নববর্ষ উৎসবের মিল-অমিল এবং আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ও ইতিহাসের ঐক্যসূত্রও বোঝা সহজ হবে।
বাংলাদেশে বাংলা সন কে প্রবর্তন করেছিলেন, সে সম্পর্কেই এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত ফয়সালা হয়নি। ঐতিহাসিকেরা এ বিষয়ে খুব তথ্যনিষ্ঠ কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেন নি। ওডিশার আধুনিক ঐতিহাসিক কাশীপ্রসাদ জয়সোয়াল সে দেশের এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে প্রথমবারের মতো লেখেন, স¤্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তক। এই মতের সমর্থক হিসেবে আমরা পেয়েছি জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড. মেঘনাথ সাহা, প্রতœতত্ত্ববিদ অমিতাভ ভট্টাচার্য (দ্য বেঙ্গলি এরা ইন দি ইন্সক্রিপশনস অব লেটার মেডিয়েভল বেঙ্গল, খ- ১৩), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ভূতপূর্ব কারমাইকেল অধ্যাপক ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন প্রমুখকে। এতদসত্ত্বেও বিভিন্ন প-িত-ঐতিহাসিক-গবেষক বাংলা সনের প্রবর্তক হিসেবে নানা রাজা-বাদশাহ বা সুলতানের নাম হাজির করেছেন। কেউ বলেছেন, স¤্রাট শশাঙ্ক বাংলা সনের প্রবর্তক। কেউ বা বলেন হোসেন শাহ বা নেপালি স¤্রাট সন¯্রঙ। তবে খুঁটিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আকবর বা উপর্যুক্ত কারও নামই বাংলা সনের প্রবর্তক হিসেবে ঐতিহাসিক প্রমাণে চূড়ান্ত স্বীকৃতি লাভ করেনি। আনুষঙ্গিক তথ্যপ্রমাণ এবং ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের বিচার-বিবেচনা করে আমরা মোগল সুবেদার (পরবর্তীকালে নবাব) মুর্শিদ কুলি খানকেই বাংলা সনের প্রবর্তক বলে মনে করি। তবে তিনি আকবর-প্রবর্তিত ‘তারিখ-এ-এলাহি’র সূত্র অনুসরণ করেই বাংলা অঞ্চলের কৃষকের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সন প্রবর্তন করেছেনÑ এমনই ধারণা করি। যদি তা-ই হয়ে থাকে, তা হলে স¤্রাট আকবর পরোক্ষভাবে এই সনের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এমন মনে করা যেতে পারে।’
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, হাজার হাজার বছর ধরে বাংলার জীবনাচার ছিল কৃষিভিত্তিক। মূলত কৃষির ওপর নির্ভর করে এগিয়েছে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন। সংগ্রাম। এগিয়ে যাওয়া। দুঃখ-কষ্ট। মোগল সম্রাটরা সুবেদার মুর্শিদ কুলি খানের ওপর কর আদায়ের জন্য কঠোর নির্দেশ জারি করেন। কৃষির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বাংলায় মোগলদের নির্দেশিত ‘হিজরি সন’ কৃষকের কাছ থেকে খাজনা আদায়ে বেশ কষ্টকর ছিল। এর কারণ ছিল প্রতিবছর হিজরি সন সাড়ে ১০ বা ১১ দিন পিছিয়ে যায়। আর এর ফলে খাজনা বা কর আদায়ে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হতো। সুবেদার মুর্শিদ কুলি খান একটা বিবেচনায় রেখে সম্রাট আকবর প্রবর্তিত ‘এলাহি সনের’ আদলে বাংলায় হিজরি চান্দ্র এবং ভারতীয় সূর্য-সনের সম্মিলনে বাংলা সন চালু করেন। ঐতিহাসিকেরা অনুমান করছেন প্রাক-মধ্যযুগের মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহাসিক মুন্সি সলিমুল্লাহর ফার্সি ভাষায় লেখা। তারিখ-ই-বাঙলাহ (১৭৬৩) গ্রন্থে এর উল্লেখ আছে। ‘তারিখ-ই-বাঙলাহ’ গ্রন্থে বা হয় নবাব মুর্শিদ কুলি খান পহেলা বৈশাখে ‘পুণ্যাহ’ উৎসব চালু করেন। সে সময় ব্যবসা-বাণিজ্যে উন্নতির ছাপ সুস্পষ্ট থাকায় ‘পুণ্যাহ’ অনুষ্ঠানের আনুষঙ্গিক অনুষ্ঠান হিসেবে চালু করেন ‘হালখাতা’ উৎসব। হালখাতা উৎসবকে কেন্দ্র করে বাংলার মানুষের মধ্যে এক ধরনের প্রাণচাঞ্চল্যের প্রবাহ তৈরি হয়। ফসল কাটার সময় কৃষকের হাতে নগদ অর্থের সমাগম ঘটত আর তখনই সে সারাবছরের বাকি শোধ করত ব্যবসায়ীকে। বছরের প্রথম দিন ব্যবসায়ীরা হালখাতার উদ্বোধন করার মধ্য দিয়ে সারাবছর ব্যবসা-বাণিজ্যের লক্ষ্মী ধরে রাখতেন।
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে বাংলা নববর্ষ পালনের ক্ষেত্রে একদিনের তারতম্য পরিলক্ষিত হয়। কেন এই তারতম্য? জানা যায়, বাংলাদেশে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে মেঘনাদ সাহার বৈজ্ঞানিক সংস্কার পদ্ধতি অনুসরণ করে ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা সনের সংস্কার সাধন করেন। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর এই সংস্কারের পরে আরও পরিপূর্ণ সংস্কারের লক্ষ্যে বাংলা একাডেমি একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে। উল্লেখ্য, বাংলা দিনপঞ্জির সাথে হিজরি সন ও খ্রিস্টীয় সনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হলো হিজরি সন পরিচালিত হয় চাঁদের হিসাবে। অন্যদিকে খ্রিস্টীয় সাল ঘড়ির হিসাবে। এ কারণ হিজরি সনে নতুন তারিখ শুরু হয় সন্ধ্যায় চাঁদের উদয়ে। আর ইংরেজি দিন শুরু হয় মধ্যরাতে। পহেলা বৈশাখকে রাত ১২টা থেকে গণনা করা হবে না সূর্যোদয় থেকে গণনা করা হবে তা নিয়ে এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে অনেকের। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করে। আর এরই পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণত সূর্যোদয় থেকে পহেলা বৈশাখ গণনা করার রীতি বজায় থাকলেও বৃহত্তর স্বার্থে বাংলা একাডেমি ১৪০২ বঙ্গাব্দের ও বৈশাখ থেকে এই নিয়ম বাতিল করে।
সম্রাট আকবরের নির্দেশে বাংলা সনের বিভ্রান্তি নিরসনে এগিয়ে আসেন তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজী। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে শুরু হয় বাংলা সন গণনা। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন। পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে। আকবরের সময় থেকেই শুরু হয় পহেলা বৈশাখ উদযাপন। আকবরের সময় প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে খাজনা পরিশোধ করতে হতো। খাজনা পরিশোধ হলে প্রজাদের ভূমির মালিকরা নানারকম মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। আপ্যায়নের এই পর্বকে হালখাতা বলা হয়।
প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়াটা খুবই সঙ্গত যে, কবে থেকে আমাদের সমাজে প্রথম পহেলা বৈশাখ উদযাপনের বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়। ১৯১৭ সালে প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে পহেলা বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর থেকে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের এই রীতিটি চলতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতা অক্ষুণœ থাকে। ১৯৩৮ সালেও একই ধরনের উদযাপনের বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়। পহেলা বৈশাখ উদযাপনের এই ধারা কমবেশি চলতে থাকে। তখন পহেলা বৈশাখের চিরায়ত চেহারাটি সবখানে কম-বেশি প্রত্যক্ষ করা যায়।
এরপর নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলতে থাকে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের প্রক্রিয়া। দেশভাগের পর পাকিস্তানি শাসকদের বাধার মুখে পড়ে পহেলা বৈশাখ। পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালির এই সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। তারা পহেলা বৈশাখকে নিয়ে নানা বাধা-নিষেধ, উপেক্ষা, অবজ্ঞার মনোভাব প্রকাশ করতে থাকে। কিন্তু পূর্ব বাংলার বাঙালির প্রবল জাতীয়তাবাদী চেতনা ও দেশপ্রেমের সাথে যুক্ত হয়ে যাওয়ায় এ ব্যাপারে পাকিস্তানি শাসকদের কোনো বাধা উপেক্ষা কিংবা বিধি-নিষেধ ধোপে টেকেনি। উল্টো বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা আরও গভীর হতে থাকে। ১৯৬১ সালে ছায়ানট প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৬৬ সাল থেকে পহেলা বৈশাখ উদযাপন তথা বাংলা নববর্ষ বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়। ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ গানটি দিয়ে শুরু হয় বাঙালির প্রাণের উৎসব। রমনা পাকুড়মূলে নববর্ষ উদযাপনের জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ওই সাল থেকে। শুরু থেকে এই উৎসব বাঙালির চেতনায়, প্রাণে বোধে, মননে এক প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে যায় এবং এরপর থেকে এই অনুষ্ঠান রাজধানী ঢাকা থেকে ছড়িয়ে পড়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি, আত্ম-পরিচয়ের ধারকবাহক হয়ে ওঠে এই নববর্ষ উৎসব। সময়ের বিবর্তনে এই উৎসবে দেশের গ-ি পেরিয়ে বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, এই উৎসব আজ বাঙালির সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।
বাংলা নববর্ষের সাথে বিভিন্ন অঞ্চলের নববর্ষের তারতম্য লক্ষ্যণীয়। বিশেষ করে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের নববর্ষের অমিল পাওয়া যায়। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নববর্ষের উৎসব মধ্য এপ্রিলে অনুষ্ঠিত হয়। অঞ্চল ভেদে কখনো কখনো তা মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহে নববর্ষ উদযাপন করা হয়। ‘বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা’ এক সময়ে ঐতিহাসিক কারণে এই তিন অঞ্চলের নাম উচ্চারিত হতো একসাথে। এই তিন অঞ্চলে এখনো একই দিনে নববর্ষ উদযাপন করা হয়। এ থেকে সহজেই অনুমান করা যায়। এই অঞ্চলে বাংলার নবাবদের পরিপূর্ণ আধিপত্য ছিল। একই সাথে এসব অঞ্চলে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আবহ বিদ্যমান ছিল। এক অঞ্চলের সাথে আরেক অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বন্ধনও ছিল বেশ প্রগাঢ়। অন্যদিকে বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দুটি ভারতীয় রাজ মণিপুর ও আসামেও ১৪ এপ্রিলÑ সময় ভেদে কখনো কখনো ১৫ এপ্রিল নববর্ষ উদযাপিত হয়। নেপালেও একই দিনে উদযাপিত হয় মৈথিলি নববর্ষ। পাঞ্জাবের নানক শাহী শিখেরাও এ উৎসব পালন করে।
প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী মেঘনাথ সাহা ও তার প্রবর্তিত শকাব্দ সনের সংস্কারের কিছু সংস্কার সাধন করে ভারত সরকার পান্ডে কমিটির যে সংস্কার প্রস্তাবটি গ্রহণ করে তাকে বৈজ্ঞানিক রীতিনীতির আলোকে পরিষ্কারভাবে ১৪ এপ্রিলে নববর্ষ উযাপন করতে হবে তার নির্দেশ রয়েছে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মেঘনাথ সাহা ভারতের যে পঞ্জিকা সংস্কার করেন তাতে ২২ মার্চকে নতুন বছরের ভিত্তি ধরে ওই তারিখের অনুষঙ্গী চৈত্র মাসকেই শকাব্দ পঞ্জিকার নববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। জানা যায়, ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে মেঘনাথ সাহার নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে ভারত সরকার। এই কমিটির সুপারিশে চালু হয় ‘শকাব্দ’। এই প্রস্তাব তেমনভাবে গৃহীত হয়নি ভারতের মানুষের মধ্যে। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার বাংলা একাডেমিকে বাংলা ক্যালেন্ডারে সংস্কার করে লিপ-ইয়ারের বিষয়টি বিজ্ঞানসম্মত করার দায়িত্ব প্রদান করে। এই মর্মে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত কমিটির সুপারিশ গৃহীত হয় ১৯৮৭ সালে। এই সুপারিশে বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ৩১ দিনে। পরের সাত মাস ৩০ দিনে। যে বছর লিপ ইয়ার হবে সে বছর ফাল্গুন মাস একদিন বেড়ে ৩১ দিন হবে। এ কারণে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে নববর্ষ একদিন আগে-পিছে উদযাপিত হয়। নববর্ষ উদযাপনের উপমহাদেশের বিশেষ করে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ইরানের ‘নওরোজ’-এর প্রভাব রয়েছে। মোগলরাই ইরানি ঐতিহ্যের সূত্র ধরে ভারতে নববর্ষ চালু করে। ইরানের এই ‘নওরোজ’ উৎসবের প্রভাব মধ্য এশিয়ার কোনো কোনো অঞ্চলে আজও দেখা যায়। কাজাকিস্তান, উজবেকিস্তান, বেলুচিন্তান প্রভৃতি অঞ্চলে এখনো নববর্ষকে নওরোজ নামে চিহ্নিত করা হয়।
১৯৬৫ সালে ছায়ানটের নববর্ষ উদযাপন পরবর্তীতে দেশ স্বাধীনের পর অর্থাৎ ১৯৭২ সালে  (১৩৭৯ সন) সর্বসম্মতভাবে ‘পহেলা বৈশাখ’কে বাংলাদেশের জাতীয় পার্বন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর থেকে জাতীয় পর্যায়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হতে থাকে। গ্রাম থেকে নগর, নগর থেকে বহির্বিশ্বÑ সর্বত্রই এখন পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ধুন্দুমার কর্মযজ্ঞ। পহেলা বৈশাখ তার বিশালতায়, পরিধি দিয়ে বাঙালির আনন্দ-বেদনা, দুঃখ-কষ্টকে ভুলিয়ে দিয়ে নব আনন্দে জাগ্রত করে। উজ্জীবিত করে। উদ্দীপিত করে।
পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে গ্রাম-গঞ্জে নানা উৎসব-পার্বণ পালিত হয়। বৈশাখের এসব উৎসব-পার্বণ মানুষকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করে। একে অন্যের সাথে আত্মীয়তা তৈরি হয়। বন্ধনে আবদ্ধ হয়। এ ছাড়া নানা ধরনের গ্রামীণ মেলায় বাংলার লোকশিল্প পল্লবিত হয়। চোখ জুড়ানো রং-বেরঙের হাঁড়ি-পাতিল খেলনায় ভরে ওঠে মেলা-প্রাঙ্গণ। বৈশাখী মেলার প্রাঞ্জলতা মানুষের হৃদয়কে পরিপূর্ণ করে। এসব মেলাতে বসে কুটির শিল্পজাত সামগ্রীর জম্পেস নানা ধরনের পসরা। থাকে নানা রকম পিঠাপুলির আয়োজনও। অনেক জায়গায় ব্যবস্থা থাকে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার আয়োজন। নানা ধরনের খেলাধুলারও আয়োজন করা হয়ে থাকে বৈশাখকে সামনে রেখে। এসবের মধ্যে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা ও কুস্তি উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে এরকম কুস্তির সবচেয়ে বড় আসরটি বসে ১২ বৈশাখ, চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে। এটি জব্বারের বলি খেলা নামে বিশেষভাবে পরিচিত। এদিকে ঈশা খাঁর সোনারগাঁয়ে বসে এক ব্যতিক্রমী মেলা, যার নাম বউমেলা। জয়রামপুর গ্রামের মানুষের ধারণা, প্রায় ১০০ বছর ধরে পহেলা বৈশাখে এই মেলার আয়োজিত হয়ে আসছে। পাঁচ দিনব্যাপী এই মেলাটি বসে প্রাচীন একটি বটগাছের নিচে। যদিও হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সেখানে সমবেত হয় সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পূজা উপলক্ষে। বিশেষ করে কুমারী, নববধূ, এমনকি জননীরা পর্যন্ত তাদের মনষ্কামনা পূরণের আশায় এই মেলায় এসে পূজা-অর্চনা করে থাকেন। মিষ্টি ও ধান-দূর্বার সাথে মৌসুমি ফল নিবেদন করেন ভক্তরা। এ ছাড়া মেলাকে ঘিরে পাঁঠাবলির রেওয়াজও বেশ পুরনো। তবে কালের বিবর্তনে বদলে যাচ্ছে পুরনো অর্চনার পালা। এখন ভক্তরা কবুতর উড়িয়ে শান্তির বার্তা প্রার্থনা করেন দেবীর কাছে। অন্যদিকে সোনারগাঁ থানার পেরাব গ্রামের পাশে আয়োজন করা হয় ঘোড়ামেলার। এ মেলা নিয়ে লোকমুখে প্রচলিত আছে, যামিনী সাধক নামের এক ব্যক্তি ঘোড়ায় চড়ে নববর্ষের এই দিনে সবাইকে প্রসাদ দিতেন। তিনি মারা যাওয়ার পর ওই জায়গাতে বানানো হয় তার স্মৃতিস্তম্ভ। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে স্মৃতিস্তম্ভে হিন্দুরা একটি করে মাটির ঘোড়া রাখে এবং সেখানে আয়োজন করে মেলার। যার কারণে মেলাটির নাম হয়েছে ঘোড়ামেলা। এ মেলার অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে নৌকায় খিচুড়ি রান্না করা। এরপর সেই খিচুড়ি কলাপাতায় করে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাই খায়। একদিনের এই মেলাটি জমে ওঠে মূলত দুপুরের পর থেকে। মেলায় সবচেয়ে বেশি ভিড় লক্ষ করা যায় শিশু-কিশোরদের। মেলাতে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে রাখা হয় নাগরদোলা, পুতুলনাচ ও সার্কাসের। এ ছাড়া মেলার ক্লান্তি দূর করতে যোগ হয় কীর্তন গান। খোল-করতাল বাজিয়ে এ গানের আসর চলে অনেক রাত পর্যন্ত।
পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের মধ্যেও নানা আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয়ে থাকে। পাহাড়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে পহেলা বৈশাখ নিয়ে আসে ভিন্ন মাত্রা, ভিন্ন আহমেদ। পাহাড়ের ঢালে ঢালে উৎসব-পার্বণের সুর উচ্চারিত হয়। মানুষের মনের অনাবিল আনন্দ পাহাড় বেয়ে ছড়িয়ে পড়ে লোকালয়ে।
বর্ষবরণে চাকমারা তিন দিনব্যাপী উৎসবে মেতে ওঠে। ফুলবিজু হলো চাকমাদের বর্ষবরণ উৎসব। চৈত্র মাসের ৩০ তারিখ ফুলবিজু শুরুÑ ৩১ চৈত্র হলো তার মূল আয়োজন। মারমারা পালন করে সাংগ্রাই উৎসব। ই-গোষ্ঠী জীবনের কৃত্যমূলক আচারও এসব উৎসবে চলে আসে। বৈশাখী পূর্ণিমা উদযাপনও নৃ-গোষ্ঠীর ধর্মীয় কৃত্যের সাথে মিশে গেছে। বিজু ও সাংগ্রাই উৎসবে আদিবাসীদের মধ্যে পিঠা বানানোর ধূম পড়ে যায়। ঐতিহ্যবাহী পিঠা দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন, খেলাধুলার আয়োজন, বৌদ্ধ মন্দিরে বুদ্ধ প্রণাম, ধর্ম উপদেশ প্রার্থনাসহ নানা ধরনের কর্মযজ্ঞে মেতে ওঠে তারা। মারমাদের কাছে বৈশাখ নানা কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মারমারা বিশ্বাস করে, এই বৈশাখে মহামতি গৌতম বুদ্ধের জন্ম ও বুদ্ধত্বপ্রাপ্তি ঘটেছে। তাই বৈশাখী পূর্ণিমায় তাদের আনন্দ ও নিবেদনের সাড়া জাগে। চাকমা ও মারদের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামের ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠী পহেলা বৈশাখী উদযাপন করে। চৈত্র মাসের শেষ দুই দিন এবং বৈশাখের প্রথম দিন এই তিন দিন ত্রিপুরাবাসী বৈসুক উৎসব পালন করে। নতুন রঙিন জামা-কাপড় পরে ত্রিপুরার শিশু, যুবক-যুবতী, তরুণ-তরুণী, বৃদ্ধ সবাই উৎসবে মেতে ওঠে। ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী সাধারণত ৩টি পর্বে এই বৈসুক উৎসব পালন করে। এগুলো হলোÑ হারি বৈসুক, বুইসুক্তমা বা বিষুবা ও বিসিকাতাল। বৈসুক উৎসব চলাকালীন তিন দিন থেকে এক সপ্তাহ পর্যন্ত ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মহল্লায় মহল্লায় ঐতিহ্যবাহী গরাইয়া নৃত্যের আয়োজন করা হয়। সাঁওতাল, ওরাও, গারো, ম্রো, মোরাং, হাজংসহ নানান আদিবাসীরা তাদের নিজ নিজ সংস্কৃতি অনুযায়ী বৈশাখ উদযাপন করে থাকে।
মঙ্গল শোভাযাত্রাÑ বর্তমানে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। ১৯৮৯ সাল থেকে শুরু হওয়া এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখের আনন্দকে বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকাংশে। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী আয়োজন এই মঙ্গল শোভাযাত্রা। মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর জন্যই এই মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ঋদ্ধ বাংলার অগ্রসর মানুষের সমন্বয় ঘটেছে এই শোভাযাত্রায়। ঢাকার চারুকলার ছাত্র-শিক্ষকদের উদ্যোগে ১৯৮৯ সালে শুরু হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রা সময়ের ধারাবাহিকতায় এখন মানুষের মনে শক্ত ভিত করে নিয়েছে। কীভাবে শুরু হলো এ মঙ্গল শোভাযাত্রা?  প্রখ্যাত শিল্পী রফিকুন নবী (রণবী) এক সাক্ষাৎকারে মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে বলতে গিয়ে জানান, ‘১৯৮৬ সালে যশোরের চারুপীঠের শামীম ও হিরন্ময় চন্দের উদ্যোগে প্রথম পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে সাজগোজ করে শোভাযাত্রা বের করা হয়। চারুকলা ইনস্টিটিউটের ও চারুশিল্পী সংসদের উদ্যোগে আমরা ১৯৮৯ সালে ঢাকায় মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করি। তবে যশোরের চারুপীঠ সংসদের উদ্যোগে আমরা ১৯৮৯ সালে ঢাকায় মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করি। তবে যশোরের চারুপীঠ এক্ষেত্রে প্রশংসার দাবিদার। তাদের চেতনা থেকেই আমরা বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে শোভাযাত্রা শুরু করি।’
মঙ্গল শোভাযাত্রায় পাপেট, ঘোড়া, হাতি, বাঘ, ময়ূর, কুমিরসহ নানা ধরনের মুখোশ শোভা পায়। লোক গবেষকরা মনে করছেন, মঙ্গল শোভাযাত্রায় প্রদর্শিত এসব প্রতিমূর্তিগুলো নিছক পশুপাখির অরাব নয়। এসবের মধ্য দিয়ে হাজার বছরের বাঙালির রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। চলমান রাজনীতি থেকে শুরু করে নানা রকম সঙ্গতি-অসঙ্গতি ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ উঠে এসেছে এসব প্রতীকী মুখোশে। এসবের পাশাপাশি শোভা পায় লক্ষ্মীপেঁচা, সরযচিত্র, বাহারি রঙের নানা উপকরণ।
পহেলা বৈশাখ উদযাপন প্রক্রিয়ার বহুমাত্রিক বিচিত্রতা, আনুষ্ঠানিকতা বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে, অবস্থানরত বাঙালির আত্মপরিচয়ের অন্যতম অবলম্বন হয়ে উঠেছে। বাঙালির সারাবছরের আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্নাকে ধুয়ে মুছে দিতে পহেল বৈশাখ তার আপনরূপে উদ্ভাসিত হয়। আর এই উদ্ভাসে দেশের মানুষ নতুন প্রাণশক্তিতে জেগে ওঠে। নতুন দিনের প্রত্যাশায় বরণ করে নেয় বছরের প্রথম দিন। নববর্ষকে। পহেলা বৈশাখকে। তাই পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রেরণার দিনÑ এগিয়ে যাওয়ার শুভক্ষণ।

Category:

বিক্রমপুরে হাজার বছর পুরনো বৌদ্ধ নগরীর সন্ধান

Posted on by 0 comment

57উত্তরণ প্রতিবেদন : জেলার টঙ্গীবাড়ী উপজেলার আবদুল্লাপুর ইউনিয়নের নাটেশ্বর গ্রামে প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনসহ প্রায় এক হাজার বছরের প্রাচীন বৌদ্ধ নগরীর সন্ধান মিলেছে। চীন ও বাংলাদেশের যৌথ খনন কাজে মিলেছে এই প্রতœতাত্ত্বিক সম্পদ। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরে খননস্থলে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বিক্রমপুর অঞ্চলে প্রতœতাত্ত্বিক খনন ও গবেষণা প্রকল্পের পরিচালক নূহ-উল-আলম লেনিন এসব তথ্য জানান। প্রেস ব্রিফিংয়ে উল্লেখ করা হয়, গত দুমাসে যৌথ প্রতœতাত্ত্বিক খনন কাজে আবিষ্কৃত হয় অষ্টকোণাকৃতি স্তূপের বাহু, অভ্যন্তরীণ অষ্টকোণাকৃতি স্তূপ, প্রকোষ্ঠ ও ম-প প্রভৃতি।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী, চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিংকিং, প্রকল্পটির গবেষণা পরিচালক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতœতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান, চীনের হুনান প্রভেন্সিয়াল ইনস্টিটিউট অব কালচারাল রেলিকস অ্যান্ড আর্কেওলজির অধ্যাপক চাই হুয়াংবো এবং টঙ্গীবাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদ উপস্থিত ছিলেন।
ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, প্রায় ৪ মিটার প্রশস্ত সীমানা প্রাচীর বিশিষ্ট দুই জোড়া চতুস্তূপের সন্ধান মিলেছে। আর্দ্রতারোধক হিসেবে ভিত্তি দেয়ালে ঝামা ইটের ব্যবহার, ৪টি স্তূপের স্থানিক পরিমিতি, বর্গাকৃতি ভারসাম্য, দেয়ালের অপ্রচলিত নজিরবিহীন কাঠামো বাংলাদেশের প্রাচীন উন্নত স্থাপত্যের ইতিহাসের একটি নতুন সংযোজন। তিনি বলেন, প্রাচীন ইট নির্মিত দুটি পাকা রাস্তা তৎকালীন সড়ক নির্মাণ কৌশল, বসতি পরিকল্পনা ও বিন্যাসের অসাধারণ তথ্য দিচ্ছে। ইট নির্মিত ২ দশমিক ৭৫ মিটার প্রশস্ত আঁকাবাঁকা একটি বিশেষ দেয়াল দেখিয়ে তিনি বলেন, এটি বিস্ময়কর স্থাপত্যের আভাস দিচ্ছে। ৭ মিটার গভীরতায় পাওয়া প্রতœ-নিদর্শন বিক্রমপুরের সমৃদ্ধ সভ্যতার সাক্ষ্য বহন করে।
ড. গওহর রিজভী বলেন, মাটির নিচে যে সম্পদের সন্ধান মিলেছে তাতে বিক্রমপুর তথা বাংলাদেশের ইতিহাসে ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করবে। বাঙালির প্রসিদ্ধ ইতিহাস যে কত বেশি সমৃদ্ধ ছিল এগুলো তারই সাক্ষ্য বহন করছে।
58চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিংকিং জানান, শেকড়ের সন্ধানের এই খনন কাজে চীন অংশ নিতে পেরে গর্বিত বোধ করছে। এদিকে প্রায় ৩০ ফুট নিচে কালো সিমেন্টের মতো মাটি পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ এই মাটি পরীক্ষার জন্য মৃত্তিকা বিজ্ঞানীরাও কাজ করছেন। এ ছাড়া খননস্থলে বড় মাছের কাঁটা, মাটির পাত্রসহ নানা কিছু পাওয়া যাচ্ছে।
যৌথ খনন কাজে চীনের চারজন এবং দেশের ২০ গবেষক অংশ নিচ্ছেন। চলতি মাস পর্যন্ত চলবে খনন কাজ। আগামী নভেম্বরে পুনরায় খনন শুরু হবে। নাটেশ্বর গ্রামটির প্রায় ১০ একর বিশাল দেয়ালটির খনন শুরু হয়েছে ২০১২ সালে। অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় এবং ঐতিহ্য অন্বেষণের গবেষণা পরিচালনায় সরকারের অর্থায়নে এই খনন কাজ চলছে। সদর উপজেলার রঘুরামপুরে এক বছর আগে দলটি বৌদ্ধ বিহার আবিষ্কার করে।

সহিংসতার প্রতিবাদী উচ্চারণে পালিত হলো পহেলা ফাল্গুন
প্রকৃতি চলে তার আপন নিয়মে। সেই নিয়ম মেনেই শীতের কাতরতা ছাপিয়ে উষ্ণতার বার্তা নিয়ে আসে ঋতুরাজ বসন্ত। আর উৎসবপ্রিয় বাঙালি তাতে শামিল হয়েছে হৃদয়ের টানে। বোমাবাজের হামলার শঙ্কাকে উড়িয়ে শহরজুড়ে বয়ে গেল আনন্দের হিল্লোল। গানের সুরে, কবিতার ছন্দে, বক্তার কথায় কিংবা নৃত্যের মুদ্রায় ছিল সহিংসতার প্রতিবাদী উচ্চারণ। বসন্তের রঙিলা আবহে অপমৃত্যুর মিছিল থেকে মুক্ত হয়ে ব্যক্ত হলো শান্তির পুণ্যভূমি গড়ার প্রত্যয়। বর্ণিল বসন্তের কাছে যেন ধূসর হলো শঙ্কা আর সহিংসতা।
গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ছিল মনের অলিন্দে উত্তাপ ছড়ানো বসন্তের প্রথম দিন পহেলা ফাল্গুন। যান্ত্রিক শহর ঢাকায় সেদিন বিরাজ করেছে নাগরিকের মন উতলা করা ¯িœগ্ধ আবহ। অনেকেরই মনে মনে গুঞ্জরিত হয়েছে ‘ওরে ভাই ফাগুন এসেছে বনে বনে।’ শুধু বনে নয়, মানুষের মনেও লেগেছিল ফাগুনের ছোঁয়া। আর রূপময় এ ঋতু বরণে নিজের সুবিধামতো সময়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে রাজধানীবাসী। পোশাক ও মননে ছিল বসন্ত বরণের নয়নজুড়ানো দৃশ্য। বাসন্তী কিংবা হলুদ রঙের শাড়ির সঙ্গে খোঁপায় বেলিফুল অথবা মাথায় ফুলের টায়রা পরে ঘুরে বেড়িয়েছে নারীকূল। বাহারি রঙের পাঞ্জাবি বা ফতুয়া জড়িয়েছে পুরুষের শরীরে। শিশুদের পোশাকেও ছিল রঙের সমাহার। সব মিলিয়ে মন আর প্রাণের মমতায় উচ্চারিত হয়েছে বসন্তের জয়গান। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নগরের বিভিন্ন প্রান্তে ছিল বসন্ত বন্দনার নানা আয়োজন। আর সেসব আয়োজনে শামিল হয়ে নিজেদের প্রাণ প্রাচুর্যের প্রকাশ ঘটিয়েছেন শহরবাসী। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকাজুড়েই উদযাপনের মাত্রাটা ছিল চোখে পড়ার মতো। আর সবচেয়ে আকর্ষণীয় আয়োজনটি বসেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলায়। এখানে বসন্ত আবাহনের অনন্য আয়োজনটি করে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদ। সকাল থেকে রাত অবধি নাচ-গান ও কবিতায় মুখরিত ছিল শিল্পাচার্য জয়নুলের স্মৃতিধন্য এ আঙিনা। এর বাইরে বসন্তের ছোঁয়া লেগেছিল বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একুশের বইমেলায়। বসন্তের আনন্দ আবাহনের পাশাপাশি নতুন বইটি সংগ্রহের তাগিদে অনেকেই গিয়েছেন একুশে গ্রন্থমেলায়। বেড়েছে মেলার ঔজ্জ্বল্য। এর বাইরেও ঢাকাবাসীর অনেকেই কোনো আয়োজনে না গিয়েও বসন্তের উদাসী হাওয়া গায়ে মেখে ঘুরে বেড়িয়েছেন আপন খেয়ালে।

Category:

‘জাগো সম্ভাবনায়, জাগো কবিতায়’

জাতীয় কবিতা উৎসব
14উত্তরণ প্রতিবেদন : ‘জাগো সম্ভাবনায়, জাগো কবিতায়’ স্লোগানকে ধারণ করে দেশি-বিদেশি কবিদের অংশগ্রহণে শুরু হয়েছে ২৯তম জাতীয় কবিতা উৎসব-২০১৫। উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন কবি সৈয়দ শামসুল হক। গত ১ ফেব্রুয়ারি সকালে জাতীয় সংগীত, একুশের গান, উৎসব সংগীত পরিবেশন ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় কবিতা উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। এবারের কবিতা উৎসব উৎসর্গ করা হয়েছে প্রয়াত প্রফেসর জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ও শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীকে।
গত ১ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার সংলগ্ন হাকিম চত্বরে জাতীয় কবিতা পরিষদ আয়োজিত এই উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরিষদের সভাপতি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। শুরুতে উৎসবে আসা কবিরা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও শিল্পী কামরুল হাসানের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বাহান্নর ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে উৎসব প্রাঙ্গণে এসে জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা।
বক্তারা বলেন, হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে অগ্নিদগ্ধ অসহায় মানুষের করুণ মুখগুলো স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে হত্যাকারীর থাবা সর্বগ্রাসী হয়ে উঠছে। সভা-সমাবেশ-আদালত-জ্ঞানপীঠ থেকে শুরু করে কবিতার মঞ্চÑ কোনো জায়গাই আজ নিরাপদ নয়। ‘এই অশুভ শক্তির উৎসমুখ চিরতরে রুদ্ধ হোক’ পুনরায় এ আহ্বান জানাই। এ মুুহূর্তে সরকার যদি এই অসহায় মানুষের পাশে না দাঁড়ায়, তা হলে পরাস্ত হবে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের সকল প্রগতিশীল চেতনা।
উদ্বোধনী বক্তব্যে সম্প্রতি রাজনৈতিক সহিংসতার কথা উল্লেখ করে সৈয়দ শামসুল হক বলেন, দেশকে ধ্বংসের একটা বিপর্যয় চলছে। এ থেকে আমরা কী করে মুক্তি পেতে পারি তা ভাববার এখন সময় এসেছে। মানুষকে প্রতিরোধ রচনা করতে হবে। রাজনীতির নামে মানুষ পুড়িয়ে মারা এবং যে অগ্নিকা- আমরা দেখছি তা কেবল দেশকে হত্যা করার জন্য।
উৎসবে ঘোষণাপত্র পাঠ করেন পরিষদের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য মুহম্মদ নূরুল হুদা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর সভাতিত্বে আরও বক্তব্য রাখেনÑ সাধারণ সম্পাদক কবি আসলাম সানী, আহ্বায়কের বক্তব্য রাখেন মুহাম্মদ সামাদ। শোক প্রস্তাব পাঠ করেন কবি কাজী রোজী। উদ্বোধনী পর্বের পর শুরু হয় আমন্ত্রিত অতিথি কবিদের কবিতা পাঠ ও আলোচনা পর্ব। এ পর্বে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে কবিতা পাঠ করেন ভারতীয় কবি আশিস সান্যাল, মৃণাল বসু চৌধুরী, বীথি চট্টোপাধ্যায়, অমৃত মাইতি, সুবোধ সরকার, আলোচনা করেন সমালোচক শংকরলাল ভট্টাচার্য, গান শোনান ইন্দ্রানী ভট্টাচার্য। এ ছাড়া বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, সুইডেন থেকে আসা কবিরাও তাদের কবিতা পড়ে শোনান। এভাবে ৬টি পর্বে দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় কবিতা পাঠের প্রথম দিন।
দ্বিতীয় দিন সকাল ১০টায় বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীরের সভাপতিত্বে ‘নতুন কবিতা : যুগান্তের আহ্বান’ বিষয়ক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় পর্বে ছিল ‘বাংলাদেশের কবিতা : ভাবরূপের পালাবদল’ বিষয়ক সেমিনার। এ পর্বে সভাপতিত্ব করেন নূহ-উল-আলম লেনিন। এরপর ছিলÑ কবিতা পাঠ, ৫ম পর্ব, ৬ষ্ঠ পর্ব, ৭ম পর্ব ও পুরস্কার বিতরণ। এরপর কবিতা পাঠ ৮ম পর্ব, ৯ম পর্ব। রাতে কবিতা আর গানের মধ্য দিয়ে শেষ হয় জাতীয় কবিতা উৎসব-২০১৫। জাতীয় কবিতা উৎসবে কবি ড. আবদুস সামাদকে সভাপতি ও কবি তারিক সুজাতকে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটি গঠিত হয়।

Category:

হৃদয়স্নাত ভালোবাসায় শিল্পাচার্য জয়নুল জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন

Posted on by 0 comment

48উত্তরণ প্রতিবেদন : একদিকে এঁকেছেন স্বদেশ ও সমষ্টির জীবনচিত্র, অন্যদিকে গড়েছেন শিল্পের শিক্ষালয়। এভাবেই দেশের চিত্রশিল্পের জনক থেকে হয়েছেন চারুশিল্প চর্চার ভিত্তিভূমি রচনাকারী। সেই কিংবদন্তি শিল্পী শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের শততম জন্মবর্ষ ছিল গত ২৯ ডিসেম্বর। পৌষের হিমেল সকাল থেকেই পথিকৃৎ শিল্পীকে জানানো হয় শ্রদ্ধাঞ্জলি।
দিনভর নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে এবার জয়নুলের জন্মদিনটি হাজির হয়েছে অনেক বেশি আবেদন আর রংময়তায়। জন্মের শুভক্ষণের শততম বর্ষ পাড়ি দেওয়ার আনন্দ ধরা পড়েছে পরতে পরতে। জাতীয় পর্যায়ে তার জন্মশতবর্ষ উদযাপন যুক্ত করেছে নতুন মাত্রা। শিল্পাচার্যকে নিবেদন করে রাষ্ট্রীয়ভাবে নেওয়া হয়েছে বর্ষব্যাপী বহুমাত্রিক কর্মসূচি। জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনালয়ে শিল্পাচার্যের আঁকা ১০০ ছবি নিয়ে শুরু হলো প্রদর্শনী। অন্যদিকে এই শিল্প দিশারীর গড়া চারুশিক্ষা প্রতিষ্ঠান চারুকলা অনুষদ আয়োজিত জয়নুল মেলায় দিনভর চলেছে নানা আনুষ্ঠানিকতা কিংবা আয়োজন। সকাল থেকে রাত অবধি বর্তমান চারুশিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সাবেকদের জমজমাট আড্ডার সঙ্গে ছিল সংগীত পরিবেশনা, সেমিনারসহ মন মাতানো নানা আয়োজন। শিল্পপিপাসুদের অনেকেই ভিড় জমিয়েছিলেন ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে। এখানে চলছে জয়নুল আবেদিনের সংগ্রহ থেকে নির্বাচিত নকশিকাঁথার প্রদর্শনী। সন্ধ্যায় ছিল জয়নুলের শিল্পকর্ম উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর বিশেষ আয়োজন। ৩০ ডিসেম্বর থেকে ময়মনসিংহের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালায় শুরু হবে পাঁচদিনের অনুষ্ঠানমালা। আর আগামী ১১ জানুয়ারি থেকে অনুষ্ঠিতব্য সোনারগাঁয়ের লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরের মাসব্যাপী মেলাটি উৎসর্গ করা হয়েছে শিল্পাচার্যকে।
দিনের প্রথম প্রভাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন জয়নুলের সমাধিতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিবেদন করা হয় ফুলেল শ্রদ্ধাঞ্জলি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও সংস্কৃতি সচিব রণজিৎ কুমার বিশ্বাস। এ ছাড়া জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান, নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ইকরাম আহমেদ চৌধুরী এবং জাতীয় আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদফতরের পরিচালক ওদুদুল বারী চৌধুরীর নেতৃত্বে স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শিল্পাচার্যের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পাশাপাশি প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর, গণগ্রন্থাগার অধিদফতর, কপিরাইট অফিস, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও সোনারগাঁ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকেও জয়নুল আবেদিনের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।
জাতীয় পর্যায়ে শিল্পাচার্যের শততম জন্মবার্ষিকী উদযাপনে নেওয়া হয়েছে বছরব্যাপী কর্মসূচি। এ আয়োজনের অংশ হিসেবে জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনালয়ে শুরু হলো জয়নুল আবেদিনের আঁকা ১০০ ছবির প্রদর্শনী। জাদুঘরে সংগৃহীত জয়নুলের ৮০৭টি চিত্রকর্ম থেকে বাছাইকৃত ছবি নিয়ে সাজানো হয়েছে এ প্রদর্শনী। পরবর্তী এই শিল্পকর্মগুলো নিয়ে প্রকাশ করা পাঁচ খ-ের অ্যালবাম। ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে এ প্রদর্শনী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ আয়োজিত চার দিনের জয়নুল মেলার শেষ দিন ছিল ২৯ ডিসেম্বর। লোকজ আঙ্গিকে সজ্জিত মেলার সমাপনী দিনে প্রদান করা হয় জয়নুল সম্মাননা। শিল্পকলায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মাননা পেয়েছেন ভারতের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী অধ্যাপক গোলাম মোহাম্মদ শেখ ও বাংলাদেশের চিত্রশিল্পী অধ্যাপক সমরজিৎ রায় চৌধুরী। সকালে অনুষদের বকুলতলায় বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তাদের এই সম্মাননা দেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. অ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্পাচার্যের সহধর্মিণী জাহানারা আবেদিন।
এশীয় চারুকলা উৎসব
বাংলাদেশের সংস্কৃতির সঙ্গে বিশ্বসংস্কৃতির সম্পর্কের বন্ধন তৈরির প্রত্যয়ে শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে মাসব্যাপী ১৬তম এশীয় দ্বি-বার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনী বাংলাদেশ-২০১৪। একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে ১ ডিসেম্বর ২০১৪ সকালে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের স্মারক ডাকটিকিটের উন্মোচন করেন অর্থমন্ত্রী।
এতে বাংলাদেশসহ এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৩২টি দেশের শিল্পীদের রংতুলির ক্যানভাসে শিল্পসুষমায় শোভিত হয় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা প্লাজার প্রতিটি গ্যালারি। দেশ-বিদেশের ১০৪ শিল্পীর ২০৪টি শিল্পকর্মে অনিন্দ্য সৌন্দর্য্যে শিল্পময় হয়ে উঠেছিল একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা প্লাজা।
সদ্যপ্রয়াত দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় উদ্বোধনী আয়োজনের কার্যক্রম। সংস্কৃতি সচিব ড. রণজিৎ কুমার বিশ্বাসের সভাপতিত্বে প্রদর্শনীর উদ্বোধনীতে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। প্রদর্শনীর প্রতিবেদন প্রকাশ করেন জুরিবোর্ডের সভাপতি শিল্পী হাশেম খান। এতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী। প্রদর্শনীর গুরুত্ব তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, এশিয়ার সংস্কৃতির দর্পণ হিসেবে এই প্রদর্শনী ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। এই প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের এবং সংস্কৃতির সঙ্গে সংস্কৃতির বন্ধন তৈরি হবে।
এবার গ্র্যান্ড অ্যাওয়ার্ড ও সম্মানসূচক অ্যাওয়ার্ড এ দুই ক্যাটাগরিতে ৯ চিত্রশিল্পীকে পুরস্কার দেওয়া হয়। গ্র্যান্ড অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত শিল্পীরা হলেনÑ বাংলাদেশের গুলশান হোসেন, মোহাম্মদ আবদুল মোমেন মিল্টন ও কাতারের হেসা আহমেদ খল্লা। সম্মানসূচক অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্তরা হলেনÑ বাংলাদেশের নুরুল আমিন, কামরুজ্জামান স্বাধীন, মাইনুল ইসলাম, বিশ্বজিৎ গোস্বামী, ওমানের হামেদ আল জাবেরি ও ড. ফখরিয়া আল ইয়াহিয়া। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক 49অঙ্গনে কাইয়ুম চৌধুরীর অবদানের কথা তুলে ধরে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, কাইয়ুম চৌধুরী ছিলেন এদেশের সকল সংস্কৃতিকর্মীর অভিভাবক। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ দেশের সব আন্দোলন সংগ্রামে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর অগ্রণী ভূমিকা ছিল বলেও জানান সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর।
আফগানিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, বাহরাইন, ভুটান, ব্রুনাই, চীন, পূর্ব তিমুর, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ইরাক, জাপান, কুয়েত, কাজাখস্তান, লেবানন, মিয়ানমার, নেপাল, ওমান, পাকিস্তান, ফিলিস্তিন, ফিলিপাইন, কাতার, দক্ষিণ কোরিয়া, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, সিরিয়া, থাইল্যান্ড, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ৩২টি দেশ এই প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছে।
এশিয়ার সবচেয়ে বৃহৎ এই প্রদর্শনী উপলক্ষে ব্রোশিউর ও পোস্টার প্রকাশ করা হয়েছে। প্রদর্শনীটিকে উৎসবমুখর ও দৃষ্টিনন্দন করার জন্য জাতীয় প্রেসক্লাবের কদম ফোয়ারা থেকে শাহবাগ পর্যন্ত এবং ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানকে আকর্ষণীয়ভাবে সাজানো হয়।
প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী বিদেশি চারুশিল্পী, শিল্প সমালোচক ও জুরি কমিটির সদস্যরা জাতীয় স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার, লালবাগ কেল্লা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর পরিদর্শন করেন। প্রদর্শনীতে প্রতিদিন বিকেলে ছিল বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। ৩১ ডিসেম্বর প্রদর্শনী শেষ হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট শিল্পীদের অংশগ্রহণে এই প্রদর্শনী ১৯৮১ সালে যাত্রা শুরু করে।
মুক্তিযুদ্ধ চলচ্চিত্র উৎসব
বলাকা সিনেওয়ার্ল্ডে ঢুলি কমিউনিকেশনস আয়োজিত এবং ভার্সেটাইল মিডিয়া নিবেদিত ‘মুক্তিযুদ্ধ চলচ্চিত্র উৎসব-২০১৪’ গত ২৫ ডিসেম্বর শেষ হয়েছে। উৎসবের সমাপনী চলচ্চিত্র হিসেবে বলাকা সিনেওয়ার্ল্ডে দিনব্যাপী প্রদর্শিত হয় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র তারেক মাসুদ পরিচালিত ‘মাটির ময়না’।
১৯ ডিসেম্বর সকালে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই উৎসবের উদ্বোধন হয় বলাকা প্রেক্ষাগৃহে। উৎসব উদ্বোধন করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চার বীর যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাকে ঢুলি কমিউনিকেশনস এবং ভার্সেটাইল মিডিয়ার পক্ষ থেকে প্রদান করা হয় বিশেষ সম্মাননা। এদিকে উৎসবের উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসেবে ১৯ ডিসেম্বর প্রদর্শিত হয় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম চলচ্চিত্র চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিক ‘ওরা ১১ জন’।
এরপর যথাক্রমে ২০ ডিসেম্বর ‘আগুনের পরশমণি’, ২১ ডিসেম্বর ‘আমার বন্ধু রাশেদ’, ২২ ডিসেম্বর ‘জয়যাত্রা’, ২৩ ডিসেম্বর ‘গেরিলা’, ২৪ ডিসেম্বর ‘মেঘের পরে মেঘ’ চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। আর উৎসবের সমাপনী চলচ্চিত্র হিসেবে ২৫ ডিসেম্বর প্রদর্শিত হয় চলচ্চিত্র ‘মাটির ময়না’।
‘মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক বক্তৃতা প্রতিযোগিতা
বিজয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে জাতীয় জাদুঘরের আয়োজনে গত ৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হলো শিক্ষার্থীদের জন্য ‘মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক বক্তৃতা প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মাঝে ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসের দিন আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। দুই পর্বে অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতায় রাজধানীর বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেয়। প্রতিযোগিতায় বিচারক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক সাইফিন রুবাইয়াত, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের সিনিয়র শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান, আবৃত্তিকার সামিউল ইসলাম। প্রথম পর্বের বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সচিব মো. ফারুক হোসেন।
দ্বিতীয় পর্বেও প্রতিযোগিতায় বিচারক ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মনজুরুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুরমা জাকারিয়া চৌধুরী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু মো. দেলোয়ার হোসেন। সভাপতিত্ব করেন নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ইকরাম আহমেদ।
শুদ্ধ সংগীত উৎসবে রাতভর সুরের অনুরণন
গত ১৯ ডিসেম্বর শুরু হওয়া ছায়ানট আয়োজিত দুদিনব্যাপী শুদ্ধ সংগীত উৎসব শেষ হয় ১৯ ডিসেম্বর। পুরো দুদিনই ছিল দর্শক-শ্রোতাদের উপচেপড়া ভিড়। তাই সন্ধ্যা পেরুনো নিশি পার করে ভোর পর্যন্ত সংগীতপিপাসু শ্রোতায় পরিপূর্ণ ছিল মিলনায়তন। আর মিলনায়তনের বাইরে বড় পর্দায় দেখানো হয় ভেতরকার আয়োজনটি। এখানে বসেও সুরের আস্বাদন নিয়েছেন সমঝদার অনেক শ্রোতা। সমাপনী দিনে সকাল ৯টায় দ্বিতীয় অধিবেশনের সূচনা হয়। এ পর্বে কণ্ঠসংগীত পরিবেশন করে ঢাকার দুই শিল্পী সুমন চৌধুরী ও আমিন আখতার সাদমানী। কণ্ঠের চমৎকার কারুকার্যে শ্রোতার মন রাঙিয়ে তোলেন সিলেটের শিল্পী সুপ্রিয়া দাশ। বাঁশিতে সুর ছড়ান ঢাকার শিল্পী মর্তুজা কবীর মুরাদ। ছায়ানটের শিল্পীদের বৃন্দ সংগীত পরিবেশনার মাধ্যমে শেষ হয় দ্বিতীয় অধিবেশন।

Category: