একাদশ জাতীয় সংসদের যাত্রারম্ভ : রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ঐক্যের আহ্বান

দেশের শান্তি, উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে স্থিতিশীল করতে হলে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। একাদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তার ভাষণে এ-কথা বলেন। প্রায় একই কথা বলেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনের একাধিক অনুষ্ঠানে। তারা উভয়েই দলমত নির্বিশেষে দেশবাসী, দেশের সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ও সিভিল সমাজের প্রতি এই জাতীয় ঐক্যের উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।
গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ও সময়োচিত এই ‘জাতীয় ঐক্যের আহ্বান’কে দেশের চিন্তাশীল মানুষ, শান্তিকামী সাধারণ নাগরিকগণ, উদ্যোক্তা শ্রেণি, ব্যবসায়ী এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ^াসী বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল স্বাগত জানিয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পটভূমিতে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। তবে যেমন মহামান্য রাষ্ট্রপতি তেমনি দূরদর্শী রাজনীতিবিদ হিসেবে শেখ হাসিনা সঠিকভাবেই উপলব্ধি করেছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মতদ্বৈধতা থাকবে, নির্বাচনে পক্ষ-বিপক্ষ থাকবে এবং মতবৈচিত্র্যও থাকবে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নেÑ কেউ কারও প্রতিপক্ষ হতে পারে না। বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ কে? বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে জাতীয় স্বার্থের অন্য কোনো অর্থ, লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য থাকতে পারে না।
তবে, আমাদের এই মন্তব্যকে অনেকে অতি সরলীকরণ মনে করতে পারেন। বিএনপি-জামাতের সহিংস কর্মকা-, ষড়যন্ত্র এবং পদে পদে বাধাদান সত্ত্বেও গত ১০ বছরে দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি থেমে থাকেনি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ বিএনপি-জামাত চক্রকেই কেবল নয়, তারা জাতিকে বিভক্ত করার যে ষড়যন্ত্রমূলক নেতিবাচক সহিংস রাজনীতি করেছে, তাকেও প্রত্যাখ্যান করেছে। বস্তুত, নির্বাচনের ফলাফলের ভেতর দিয়েই এক ধরনের জাতীয় ঐকমত্যের অভিপ্রকাশ ঘটেছে। দেশবাসী বিপুলভাবে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ও মহাজোটকে বিজয়ী করেছে। সংসদে এককভাবেই আওয়ামী লীগের দুই-তৃতীয়াংশের অধিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দৃশ্যত বিরোধী দল বিশেষত বিএনপি-জামাত চক্র ওয়াশআউট হয়ে গেছে।
তবুও ‘জাতীয় ঐক্যের’ আহ্বান কেন? ঐক্যের উপযোগিতা কোথায়? প্রথমত, ঐক্যের বিষয়টি সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে বিচার করা যায় না। ঐক্যের মূল প্রেরণা হচ্ছে দেশে দীর্ঘদিনের বিদ্যমান সংঘাতময় রাজনীতির (ঈড়হভষরপঃরহম চড়ষরঃরপং) অবসান ঘটানো। ঐক্য মানে এ-ও নয় যে, সকল বিষয়ে সকল দলকে একমত হতে হবে অথবা বিরোধী দল তার ভূমিকা ছেড়ে সরকারের আনুগত্য করবে। গণতন্ত্রে বিরোধী দলও সরকারের অংশ। অংশীদারিত্বটা নেতির নেতিকরণের অর্থাৎ সরকারের কোনো কাজ জনগণের বা দেশের স্বার্থের পরিপন্থী মনে হলে বিরোধী দল সেটা ধরিয়ে দেবে এবং ইতিবাচক সমালোচনার মাধ্যমে সরকার পক্ষকে সেই কাজ থেকে অর্থাৎ ভুল থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করবে। উভয় পক্ষকেই এখানে জাতীয় স্বার্থকে সমুন্নত রাখার জন্য একমত হতে হবে। আর যদি তারা একমত না হন, সেক্ষেত্রে নির্ধারক ভূমিকা পালন করবে জনগণ। ভুলের প্রশ্নে শেষাবধি রায় দেবে জনগণÑ এ জন্যই নির্বাচন ব্যবস্থা।
একাদশ জাতীয় সংসদ কিন্তু সে-রকম রায়ই দিয়েছে। বিরোধী দলের উচিতÑ জনগণের রায় মেনে নিয়ে দেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সর্বোপরি স্থিতিশীলতার জন্য পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত গঠনমূলক ভূমিকা পালন করা। সংসদে অংশগ্রহণ করা। কেবল সংখ্যা দিয়েই সংসদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখা যায় না। সত্য, ন্যায় ও শ্রেয়োবোধ দিয়ে সরকারকে তার ভুল ধরিয়ে দেওয়ার জন্য জাতীয় সংসদই হচ্ছে যথার্থ স্থান, যেখানে খোলা মনে আলোচনা-সমালোচনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি সংসদে ভূমিকা পালনের মাধ্যমে জনমত গড়ে তোলার সুযোগ নেওয়াও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ। দেশবাসী চায় শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক ধারায় বিরোধী যে সকল বিষয়ের সমাধানের একটা ঐতিহ্য গড়ে তোলায় ভূমিকা পালন করুক।
মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ঐক্যের যে আহ্বান জানিয়েছেন, তা বিরোধী দলগুলোর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই সুযোগ গ্রহণ করলে বাংলাদেশের রাজনীতির দৃশ্যপট বদলে যাবে। এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

শ্রেণী:

বিজয়ী বাংলাদেশ, বিজয়ী শেখ হাসিনা : প্রাণঢালা অভিনন্দন

নতুন ইতিহাস গড়লেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ তাকে চতুর্থবার বিজয়ের বরমাল্য পরাল। গত ৭ জানুয়ারি, চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিলেন তিনি এবং তার মন্ত্রিসভা। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে এটাই একমাত্র নজির। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে টানা তৃতীয়বার মন্ত্রিসভা গঠিত হলো। আমরা বঙ্গবন্ধু-কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের উষ্ণ অভিনন্দন জানাচ্ছি।
৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের ভেতর দিয়ে দেশে কার্যকর বিরোধী দল বলে কিছু আর রইল না। ঐক্যফ্রন্ট মুখ রক্ষার মতো সম্মানজনক ভোট ও আসন পেতে ব্যর্থ হয়েছে। বস্তুত বাংলাদেশের মানুষ বিএনপি-জামাত গোষ্ঠীকে প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও গণতন্ত্রের স্বার্থে ঐক্যফ্রন্ট যে কটি আসনে জয়লাভ করেছে, তা রক্ষা করা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিচায়ক হবে। ’৭৩-এর নির্বাচনেও এর বেশি আসন তৎকালীন বিরোধী দলের ছিল না। বিরোধী দলের ভূমিকা কেবল সংখ্যা দিয়ে বিচার না করে, যে ৭-৮ জন জয়লাভ করেছে পার্লামেন্টে দক্ষতার সাথে ভূমিকা রাখলে, তারাই জনগণের একাংশের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারেন। আমরা মনে করি, বিরোধী দলের নির্বাচিত সদস্যগণ অবিলম্বে শপথগ্রহণ করবেন এবং জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন জাতির আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। তার মধ্যেই সমগ্র বাঙালি জাতির সুখী সমৃদ্ধ উন্নত ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রত্যাশা মূর্ত হয়ে উঠেছে। শেখ হাসিনা ও নতুন সরকারের কাছে এখন জনপ্রত্যাশা পূরণের বিশাল চ্যালেঞ্জ। বিগত ১০ বছরের উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় একদিকে যেমন রয়ে গেছে বাস্তবায়নাধীন বিশাল সব মেগা প্রজেক্ট, অন্যদিকে নির্বাচনে প্রদত্ত অঙ্গীকারসমূহ বাস্তবায়নের কর্তব্য। অতীত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমরা দ্বিধাহীন চিত্তে বলতে পারি, জননেত্রী শেখ হাসিনা এসব কর্তব্য পালনে সক্ষম হবেন। তার প্রাজ্ঞ, দক্ষ ও যাদুকরি নেতৃত্ব অসম্ভবকে সম্ভব করে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল থেকে উন্নত দেশের সোপান অবধি এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে।
আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার শক্তির উৎস বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ। দেশবাসী নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে তাকে ও আওয়ামী লীগকে আগামী পাঁচ বছরের জন্য আবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার অর্পণ করেছে। জনগণের শক্তিতে বলীয়ান শেখ হাসিনা আজ তাই অপ্রতিরোধ্য এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় নেতৃত্বের আসনে সমাসীন। অতএব কোনো ষড়যন্ত্র, কোনো বাধাই তাকে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা থেকে বিরত রাখতে বা তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করতে পারবে না। এখন সর্বাগ্রে প্রয়োজন নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়ে বাংলাদেশে একটা নতুন ধারার জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা। ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি এবং বাম ধারার দলগুলোকে বুঝতে হবে গতানুগতিক নেতিবাচক রাজনীতি আর মাঠ গরমের কর্মসূচি দিয়ে তারা জনগণের মন জয় করতে পারবে না। সবাইকে তাই জাতিকে আর বিভক্ত না করে মৌলিক প্রশ্নে ঐকমত্য সৃষ্টির আন্তরিক চেষ্টা চালাতে হবে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অভিন্ন ভাষায় ধারণ করতে হবে। জাতির পিতাকে নিয়ে বিতর্কের চির অবসান ঘটাতে হবে। ইতিহাস বিকৃতির ফাঁদ থেকে বেরিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের এবং অন্যান্য গণতান্ত্রিক শক্তির ভূমিকাকে সমুজ্জ্বল করতে হবে। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার ও সাম্প্রদায়িকতাকে চিরদিনের জন্য পরিহার করতে হবে। যুদ্ধাপরাধী জামাতের সাথে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকল দলমতের মানুষের সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। বাংলার মাটিতে জামাতের যুদ্ধাপরাধেরও বিচার সম্পন্ন করতে হবে। বাংলাদেশের উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, ধন বৈষম্য হ্রাস, জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে যদি সকল দলমতের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলেই বাংলাদেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন সাধন সম্ভব হবে।
দুর্বল ও ছত্রভঙ্গ বিরোধী দল গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য কল্যাণকর নয়। বিরোধী দলের দুর্বল অবস্থার জন্য আওয়ামী লীগের দায়িত্ব ও কর্তব্য কার্যত শতভাগ বেড়ে গেছে। আওয়ামী লীগকেই উদ্যোগ নিয়ে একটা সহিষ্ণু গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এ দেশ স্বাধীন করেছে আওয়ামী লীগ। কাজেই দেশের প্রতি দায়িত্বও আওয়ামী লীগের বেশি। অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো আরেকটু শক্তিশালী হলে তাদের সাথে আওয়ামী লীগ এই জাতীয় কর্তব্যভার কিছুটা ভাগ করে নিতে পারত। আমরা আশা করব, জনগণের পর্বত প্রমাণ প্রত্যাশা পূরণের মধ্য দিয়েই ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী আমরা শেখ হাসিনার পৌরোহিত্যে পালন করতে পারব। আওয়ামী লীগের কাজের মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হবে, অতীতের মতো ২০১৮ সালেও বাংলাদেশের জনগণ রায় দিতে ভুল করেনি।

শ্রেণী:

নৌকার বিজয়ে ঐক্যবদ্ধ হোন

PM

PMএকাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। জননেত্রী শেখ হাসিনা জাতিকে একটি অংশগ্রহণমূূলক নির্বাচন উপহার দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। তিনি তার কথা রেখেছেন। নির্বাচনে নিবন্ধিত ৩৯টি দল ছাড়াও বিভিন্ন জোট ও দলের মার্কা নিয়ে আরও বিপুল সংখ্যক অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছে। এবারের নির্বাচনে মোট প্রার্থী ১ হাজার ৮৪১ জন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ১ হাজার ৭৪৫ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ৯৬ জন। প্রতিটি আসনে গড়ে ৬-এর অধিক প্রার্থী রয়েছে। ধরে নেওয়া যায় এবারের নির্বাচন হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগ ও ভূমিকা দেশবাসী এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রশংসার চোখে দেখছে। বলা যেতে পারে, এটা আওয়ামী লীগের এক বিরাট নৈতিক জয়।
নির্বাচন যতই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হোক, জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন নিয়ে এখন নৌকার বিজয় নিশ্চিত করতে হবে। গত ১০ বছরের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় দেশের যে অভাবনীয় উন্নয়ন হয়েছে, তার ধারা অব্যাহত রাখতে না পারলে দেশবাসীর জীবনে বিপর্যয় নেমে আসবে। আমরা তা হতে দিতে পারি না। যে কোনো মূল্যে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।
ইতোমধ্যে একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থার জনমত জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি এখন অপ্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় নেতা। তার কোনো বিকল্প নেই। প্রায় একই কথা আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। দেশের প্রাচীন এবং বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের চেয়ে জনপ্রিয়তায় এগিয়ে রয়েছে। দেশবাসী আরেকবার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রক্ষমতায় দেখতে চায়।
কিন্তু দেশবাসীর এই প্রত্যাশা আপনা-আপনি পূরণ হবে না। নির্বাচনে নিশ্চিত পরাজয় জেনে দেশি-বিদেশি নানা অপশক্তির ষড়যন্ত্রের কথা ভুলে গেলে চলবে না। নির্বাচন বানচাল করা, দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা এবং সহিংসতার উসকানিদাতার অভাব নেই। দেশবাসী এই ষড়যন্ত্র সফল হতে দেবে না। আর এজন্য আওয়ামী লীগ ও দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলগুলোকে জনগণকে সংগঠিত করতে হবে। অঙ্কুরেই সকল ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিতে হবে।
নির্বাচনে দলের অনেকেই মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। তাদের এই প্রত্যাশা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের যোগ্যতাও প্রশ্নাতীত। কিন্তু দলের নেত্রী ও পার্লামেন্টারি বোর্ড সবদিক বিবেচনা করে যাদের মনোনয়ন দিয়েছেন, তাদের বিজয়ী করে আনাই এখন আওয়ামী লীগ কর্মীদের সর্বোচ্চ দায়িত্ব। সকল ভুল বোঝাবুঝি, মান-অভিমান ও সংকীর্ণ উপদলীয় কোন্দল ভুলে আওয়ামী লীগের প্রতিটি নেতা-কর্মী-সমর্থককে জননেত্রী শেখ হাসিনার পেছনে, নৌকার বিজয়ের জন্য ইস্পাতদৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে, এগিয়ে নিতে হলে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। এই কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অবশ্যই আমাদের সফল হতে হবে। দলের ঐক্য, জোটের ঐক্য এবং জনগণের ঐক্যকে সুদৃঢ় করে একাদশ জাতীয় সংসদে নৌকার বিজয় সুনিশ্চিত করতে হবে। গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে সমুন্নত রাখা এবং একটি সুখী সুন্দর সমৃদ্ধশালী অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য আসুন, আমরা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে হলেও নৌকার বিজয় সুনিশ্চিত করি।

জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।

শ্রেণী:

রাজনৈতিক জোট-দলের সঙ্গে সংলাপ, রাজনীতিতে সুবাতাস

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া একটা নতুন পর্যায়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলগুলোর সাথে আলোচনায় সম্মতি জানিয়েছেন এবং ১ নভেম্বর ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ নেতাদের সঙ্গে আলোচনার সূচনাও করেছেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সংলাপের লিখিত প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী অবিলম্বে তাতে সম্মতি জানান। তিনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান ড. কামাল হোসেনকে জানান সংবিধানসম্মত যে কোনো বিষয়ে আলোচনার জন্য তার দ্বার সবসময় উন্মুক্ত। প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে ১ নভেম্বর আলোচনার জন্য গণভবনে আমন্ত্রণ জানান।
আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং অবাধ নিরপেক্ষ শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সদিচ্ছা থেকেই প্রধানমন্ত্রী সংলাপের প্রশ্নে ঔদার্য প্রদর্শন করেন। কেবল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক জোটকেও তিনি আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। অবশ্য ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পক্ষ থেকে আগেই সংলাপের আবেদন জানানো হয়। অন্যান্য জোটও সংলাপে অংশ নেওয়ার প্রশ্নে তাদের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন।
আমরা মনে করি, নির্বাচনকে সামনে রেখে এই সংলাপ অনুষ্ঠানই একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। দীর্ঘদিন যাবত দেশের রাজনীতিতে যে অনিশ্চয়তা এবং বিরোধী দলগুলোর সংবিধান লঙ্ঘন করে সরকার পতন বা এই সরকারের পদত্যাগসহ যেসব অযৌক্তিক দাবি নিয়ে দেশে অস্থিতিশীলতার পাঁয়তারা চলছিল, চলমান সংলাপ তার অবসান ঘটাবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সংলাপ হতে হবে সংবিধানের আওতায়। যে দাবিই করা হোক না কেন, তা যদি সংবিধানসম্মত না হয়, তাহলে সংলাপের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। বিএনপি নেতারা সংলাপের লিখিত প্রস্তাব দিয়ে ভেবেছিলেন, সরকার বা আওয়ামী লীগ তাতে তাৎক্ষণিক সাড়া দেবে না। তারা সংলাপের বিষয়টিকে ইস্যু করতে পারবেন এবং এই ইস্যুতে এজিটেশন চালাতে পারবেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সংলাপের প্রস্তাব গ্রহণ এবং আজকের সংলাপ তাদের সেই উদ্দেশ্য ব্যর্থ করে দেয়।
এবারের সংলাপ নানা কারণে বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যতিক্রমী। এবারই প্রথম কোনো তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা বা ভূমিকা ছাড়াই দুটি প্রধান প্রতিপক্ষের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সংলাপ হচ্ছে। অতীতে কমনওয়েলথ বা জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারির দূতিয়ালি এবং সর্বোচ্চ সাধারণ সম্পাদক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। ঐ সংলাপে কোনো সুফল বয়ে আনেনি। পক্ষান্তরে তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা ছাড়া সর্বোচ্চ পর্যায়ে সূচিত সংলাপ হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ২০ জন নেতা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে সংলাপে অংশগ্রহণ করেছেন। ১৪ দলের নেতৃবৃন্দসহ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ২৩ সদস্য বিশিষ্ট প্রতিনিধি দল আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।
উভয় পক্ষই বলেছে, আলোচনা অত্যন্ত খোলামেলা পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃবৃন্দ দীর্ঘ সময় নিয়ে বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। তারা অনেকেই একাধিকবার আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার একটানা আলোচনায় উভয় পক্ষ উভয় পক্ষের বক্তব্য খোলামেলাভাবে উপস্থাপন করেছেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সরকারের পদত্যাগ, পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া এবং নিরপেক্ষ সরকারের দাবির প্রশ্নে তার কিছু করার এখতিয়ার নেই। সংবিধানে এর কোনো সুযোগ নেই। সরকারপ্রধান হিসেবে সংবিধানের বাইরে তিনি যেতে পারেন না। নির্বাচন কমিশন সম্পর্কিত দাবিতেও সরকারের কিছু করণীয় নেই। নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থা। সরকারের এখানে হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। তবে বিরোধী দলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী সভা-সমাবেশের ওপর কোনো বাধা থাকবে না বলে তাদের আশ্বস্ত করেছেন। দ্বিতীয়ত; প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ভাষায় যাদের বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক মামলা’ রয়েছে তার তালিকা সরকারের কাছে প্রদানের কথা বলেছেন। এছাড়া নির্বাচনে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষণে কোনো বাধা থাকবে না বলে তিনি বিরোধী দলকে আশ্বস্ত করেছেন। ড. কামাল হোসেনের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দল চাইলে আরও ক্ষুদ্র পরিসরে আলোচনা করতে আওয়ামী লীগ প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন।
অবিশ্বাস, অনাস্থা এবং পরস্পরের ছায়া না মাড়ানোর এতদিনের অসহিষ্ণুতার রাজনীতির ফাঁদ থেকে বের হয়ে আসার পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পর ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্প ধারা ও যুক্তফ্রন্ট, জেনারেল এরশাদের জোট এবং বামজোটসহ দেশের সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ রাজনীতিতে সুবাতাসের সুস্পষ্ট আভাস। সকল দলের সঙ্গে আলোচনার প্রেক্ষিতে সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে ন্যূনতম কতক ইস্যুতে যদি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় যুক্ত হবে নতুন মাত্রা। আমরা আশা করি, সংলাপের প্রেক্ষিতে আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিটি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করবে। দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা ও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে সকল দল ও জোট এগিয়ে আসবে। আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টির অপচেষ্টা দেশবাসী চায় না। দেশবাসী চায় সংবিধান সমুন্নত রেখে সকল দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন। সংলাপের ভেতর দিয়ে সেই জন-আকাক্সক্ষা পূরণ হবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

শ্রেণী:

জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি ও বিদেশিদের কাছে ধর্না

Posted on by 0 comment

সম্পাদকের কথা: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে স্বাভাবিকভাবেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ক্রমেই সরগরম হয়ে উঠছে। একদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট যেমন তাদের গত ১০ বছরের সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার লক্ষ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে নানা কিসিমের বিরোধী দলগুলো জোটবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে ঐক্য প্রক্রিয়া এবং ড. কামাল হোসেনের উদ্যোগে ‘জাতীয় ঐক্য’ অভিন্ন মঞ্চে শামিল হয়েছে। সর্বশেষ এই জাতীয় ঐক্যের উদ্যোগের সঙ্গে শামিল হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলÑ বিএনপি। নিঃশর্তভাবে তারা ড. কামাল হোসেন ও ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্ব মেনে নিয়ে তাদের ভাষায় ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য’ গড়ে তোলার কথা বলছেন। যদিও কামাল হোসেন ও বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছেন জামাতকে নিয়ে তারা কোনো ঐক্য করবেন না; তবুও এর সম্ভাবনা বিএনপি কিন্তু উড়িয়ে দেয়নি। তারা কোনো-না-কোনো ফর্মে জামাতকে সাথে রাখার কথা মাথায় রেখেই বলেছে, জাতীয় ঐক্য হলে ২০-দলীয় জোটও তার অঙ্গীভূত হবে।
এর পাশাপাশি বামদলগুলোও বিশেষত সিপিবি-বাসদ এর সাথে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আরও কয়েকটি ‘বাম’দল ‘বিকল্প শক্তি’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। বামদলের নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’কে এক পাল্লায় মেপে সমদূরত্বের নীতি যেমন নিয়েছে তেমনি স্পষ্ট করেই বলেছে তারা বিএনপি বা আওয়ামী লীগ, কারও সাথেই জোটবদ্ধ হবে না। অথচ মজার বিষয়, সম্প্রতি ঢাকা মহানগর নাট্যমঞ্চে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় ঐক্যের’ আনুষ্ঠানিক সমাবেশে বামপন্থি জোটের জোনায়েদ সাকি ও প্রকৌশলী শহীদুল্লাহ কেবল উপস্থিত হননি, ঘোষণাও পাঠ করেছেন।
এই তিন মেরুকরণের বাইরেও আরও কিছু ছোট ছোট দল জোটবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে। এসব জোটবদ্ধতা নিয়ে গণতান্ত্রিক শক্তির তেমন উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। অন্ধ, কালা, কানা, ল্যাংড়া, খোঁড়া এবং  বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের ঐক্যের ডাক তাদের প্রতিবেশীদের কানেও পৌঁছায় না। গণভিত্তিহীন এসব নাম ও নেতাসর্বস্ব দল ঐক্যবদ্ধ হলেই বা কী, না হলেই বা কী! কিন্তু এ-কথা সত্য এই পঙ্ক্তিতে বিএনপি পড়ে না। নিঃসন্দেহে বিএনপি একটি বড় দল। যদিও এই দলটি ক্রমশ সংকোচিত হচ্ছে এবং তাদের গণধিকৃত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে আদালতের রায়ে শাস্তি ভোগ করছেন এবং বিএনপির বয়সে জুনিয়র কিন্তু পদাধিকারে সিনিয়র তারেক রহমান মানিলন্ডারিং-এর মামলায় দ-প্রাপ্ত হয়ে আদালতের ভাষায় পলাতক। খালেদা-তারেক তাদের পাপের শাস্তি ভোগ করছেন। শীঘ্রই আরও মামলার রায় বেরুলে তাদের পাপের বোঝা এতটাই ভারী হবে যে, অলৌকিক কিছু না ঘটলে তাদের রাজনৈতিক জীবনও বিপন্ন হয়ে পড়বে।
বিএনপি ও জামাতে ইসলামি রাজনীতির এই বাস্তবতা সম্যক উপলব্ধি করে। তাদের কাছে এটা পরিষ্কার যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে বিএনপি নেত্রী খালেদা ও তারেক শাস্তি এড়াতে পারবে না, আর যদি উচ্চ আদালতের এই রায় বহাল থাকে, তাহলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিক্রিয়ায় জামাত এখন অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। যে কোনো প্রকারে আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে (এমনকি দুনিয়া থেকেও) সরিয়ে দিতে পারলেই তারা তাদের ‘পুরনো স্বর্ণযুগ’ ফিরে পেতে পারে।
বিএনপি-জামাতের আন্তর্জাতিকভাবে ভাবাদর্শগত মিত্র ও প্রভু পাকিস্তান। পাকিস্তান সুযোগ পেলেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে যে অতীতে নানাভাবে হস্তক্ষেপ করেছে এটা আমাদের জানা আছে। আঞ্চলিক রাজনীতি তাদের অনুকূলে আনার জন্য বাংলাদেশে একটি পাকিস্তানপন্থি সরকার প্রতিষ্ঠা জরুরি। এজন্য লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানকে তারা, বিশেষত পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীÑ আইএসআই সর্বতোভাবে মদদ দিয়েছে। এখন বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখেও তারা সর্বাত্মক চেষ্টা করবে, যাতে আওয়ামী লীগকে হটিয়ে বিএনপি-জামাতকে পুনরায় ক্ষমতায় নেওয়া যায়। এজন্য বৈধ-অবৈধ কোনো পথই তারা বাদ দেবে না।
পাকিস্তানের নীলনকশায় বিএনপি, বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কামাল হোসেন গং-এর সাথে তথাকথিত বামদের একাংশকে মিলাবার জন্য দৃশ্যত জামাতকে আড়ালে রেখেই তথাকথিত জাতীয় ঐক্য গড়ার চেষ্টা করছে। এই ঐক্য যে একটা ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতা, তা বোঝার জন্য কারও পা-িত্যের প্রয়োজন পড়ে না। বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যের সংবিধানবিরোধী নির্বাচনকালীন সরকারের ফর্মুলা, শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার ঘোষণা এবং আল্টিমেটাম দিয়ে সরকার উৎখাতের হুঙ্কার প্রভৃতি কারণেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই ঐক্যকে ষড়যন্ত্রমূলক আখ্যা দিয়েছেন। সংবিধানবহির্ভূত কোনো দাবি বা ফর্মুলা যে সরকার মানবে না, এটা বুঝেও তারা জনগণকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে প্রচারণা চালাচ্ছে। তারা দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাইছে।
কেবল এসব করেই তারা ক্ষ্যান্ত থাকছে না। বিদেশে গিয়ে জাতিসংঘ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে ধর্না দিচ্ছেন। দেশের ভেতরে বিদেশি দূতাবাসের কর্মকর্তাদের দাওয়াত দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তাদের হস্তক্ষেপ করার জন্য অনুরোধ-উপরোধ ও আর্তনাদ করছেন। এটা যে আশি বা নব্বইয়ের দশকের মতো ‘শীতল যুদ্ধের যুগ নয়, বাংলাদেশের জনগণ যে অতীতের মতো এখন আর বিদেশিদের মুখাপেক্ষী নয়, সর্বোপরি বিশ্ব রাজনীতির ডায়নামিকস যে পরিবর্তন হয়ে গেছে, আত্মসম্মানবোধহীন বিএনপি নেতারা এই কা-জ্ঞানটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। কোনো বিদেশি শক্তি (পাকিস্তান ও দোসররা ছাড়া) যেমন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে আগ্রহী নয়, তেমনি তাদের কারও মাতব্বরী বাংলাদেশে জনগণ মেনে নেবে না।
বিএনপি-জামাত যে স্বপ্ন দেখছে, তা দুঃস্বপ্ন হয়েই থাকবে। বাংলাদেশের জনগণ অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ। কোনো ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত বাংলার মাটিতে কার্যকর হবে না। চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র বাদ দিয়ে সকল রাজনৈতিক দল-জোটের উচিত সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। সকল দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ নিরপেক্ষ শান্তিপূর্ণ নির্বাচনই পারে যে কোনো রাজনৈতিক সংকট এড়াতে। আমরা আশা করব, বিরোধী দলগুলোর শুভবুদ্ধির উদয় হবে। তারা যত খুশি জোট বা এলায়েন্স করুন, সেটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালীই করবে, যদি না ষড়যন্ত্র ও অসাংবিধানিক পথ পরিহার করা হয়। আমরা উৎসবমুখর পরিবেশে সবাইকে নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার আহ্বান জানাচ্ছি।

শ্রেণী:

গুজব সন্ত্রাস ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম

ভিত্তিহীন বা কল্পকাহিনিকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রচারের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। তবে পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়িয়ে বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের ইতিহাস খুব বেশিদিনের না। অরাজনৈতিক গুজব, যেমন- পীর দরবেশ, সাধু সন্ন্যাসীর অলৌকিক ক্ষমতা, মৃত ব্যক্তির জীবন লাভ, স্বপ্নাদেশ এবং নানারকমের কুসংস্কার প্রচারের কাহিনি অনেক পুরনো। কিন্তু উনিশ ও বিশ শতকে এই উপমহাদেশে ভয়ঙ্কর সব গুজব ছড়িয়ে হিন্দু-মুসলমানদের দাঙ্গা বাধানোর কথা খুব বেশি পুরনো নয়।
১৯৬৪ সালে উপমহাদেশে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। ভারতের কাশ্মীরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের ‘হযরত বাল’ মসজিদ থেকে হিন্দুরা নবী করিম হযরত মুহম্মদের ‘সংরক্ষিত চুল’ চুরি করে নিয়ে গেছে। স্বভাবত মুসলমানদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগে। লেগে যায় রক্তক্ষয়ী হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গাÑ যা ভারত ও পাকিস্তানে (পূর্ব বাংলাসহ) ছড়িয়ে পড়ে।
তবে অতীতে গুজব ছড়াত মানুষের মুখে মুখে। সেক্ষেত্রে গুজব ছড়িয়ে পড়তে কিছুটা সময় লাগত। অনেক সময় গুজবের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বা সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময় পাওয়া যেত।
কিন্তু রেডিও, টেলিভিশন, টেলিফোন এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সামাজিক গণযোগাযোগমাধ্যম শক্তিশালী এবং তাৎক্ষণিক জগৎজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার হাতিয়ার হয়ে ওঠার পর গুজব এখন বাতাসের গতির চেয়েও বেশি গতিতে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে।
গত এক দশকে ‘গুজব সন্ত্রাস’ ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। সাত-আট বছর আগে রামুতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে স্থানীয় উগ্রপন্থি কিছু লোক প্রচার করে যে, রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন হযরত মুহম্মদের এবং কোরআনের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়েছে। সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই ঐ মহলটি পরিকল্পিতভাবে রামুর সুদৃশ্য বৌদ্ধ মন্দিরে এবং বৌদ্ধদের বসতভিটায় আক্রমণ চালায়, অগ্নিসংযোগ করে সবকিছু ধুলোয় মিশিয়ে দেয়।
সাঈদীর বিচারের পর বগুড়া, গাইবান্ধা এলাকায় এবং ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের শাপলা চত্বরের সমাবেশকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়ানোর কথা সবাই জানেন।
সম্প্রতিকালে দুটি অরাজনৈতিক ছাত্র আন্দোলনকে বিপথগামী করা এবং আন্দোলনের সুযোগে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির অসৎ উদ্দেশ্যে গুজব সন্ত্রাসের সৃষ্টি করা হয়। প্রথমটি ঘটে কোটাবিরোধী আন্দোলনে। রাতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে প্রচার করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের বাসায় কয়েকজন ছাত্রকে আটক করা হয়েছে। তাদের লাশ পড়ে আছে। ইত্যাদি। এই উসকানিমূলক গুজব প্রচারিত হওয়ার পর আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের একটি অংশ উপাচার্যের বাসায় হামলা চালিয়ে নারকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
সর্বশেষ ঘটনা ঘটে গত ৪ ও ৫ আগস্ট। নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-কলেজের কোমলমতি ছাত্রদের একটি স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে বিভ্রান্তির পথে ঠেলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ঝিগাতলা মোড়ে একজন ছাত্রী উচ্চৈঃস্বরে প্রচার করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে কয়েকজন ছাত্রকে হত্যা করা হয়েছে এবং কয়েকজন ছাত্রীকে ধর্ষণ করে আটকে রাখা হয়েছে। এই গুজব সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক গণমাধ্যমে ‘লাইভ’ প্রচারে সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এমনকি শহিদুল আলম নামে দৃক গ্যালারির একজন বিতর্কিত আলোকচিত্রী আল-জাজিরায় সাক্ষাৎকার দিয়ে এই মিথ্যা কথা প্রচার করে। স্বভাবতই এই গুজব সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী এবং নাগরিকদের মধ্যে প্রচ- প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। সরকার অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে। ছাত্রলীগ সভাপতি সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে গিয়ে এবং তাদের সভানেত্রীর ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে ডেকে এনে কার্যালয় ঘুরিয়ে দেখালে উত্তেজনা প্রশমিত হয়। কিন্তু সারাদেশের কোথাও কোথাও অনাকাক্সিক্ষত অরাজকতা দেখা দেয়।
অভিজ্ঞতা বলছে, এসব গুজবের পেছনে একটি রাজনৈতিক শক্তি সুসংগঠিতভাবে এবং পরিকল্পিত উপায়ে কাজ করেছে। খুবই স্বাভাবিক যে, এর পেছনে জামাত-শিবির এবং বিএনপির মদত রয়েছে। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মস্তিষ্কপ্রসূত ছিল না এসব গুজব রটনা এবং নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা। এসব হিংসাত্মক গুজবকেই দেশবাসী ‘গুজব সন্ত্রাস’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই গুজব সন্ত্রাস ইতিবাচক কোনো আন্দোলন গড়ে তোলার পরিপন্থী। গুজব সন্ত্রাস রক্তপাত, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, হামলা ও সংঘাত সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমরা মনে করি, যারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে গুজব সন্ত্রাস সৃষ্টি করছে বা করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা যেমন গ্রহণ করতে হবে, তেমনি এ ব্যাপারে দেশবাসীকেও সচেতন সতর্ক করতে হবে। ভবিষ্যতে গুজব সন্ত্রাসের পুনরাবৃত্তি রোধে আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজে এগিয়ে আসার জন্য দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। গুজব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সচেতন হোন, গুজব সন্ত্রাস প্রতিরোধ করুন।

শ্রেণী:

প্রতিদিন ও প্রতিক্ষণ বঙ্গবন্ধু

Posted on by 0 comment

শোকের মাস আগস্ট। মাসব্যাপী নানা কর্মসূচির মাধ্যমে সমগ্র জাতি বঙ্গবন্ধুকে এবং ১৫ আগস্টের শহিদদের স্মৃতি স্মরণ করবে। ইতোমধ্যে এ মাসটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। একইভাবে জাতির পিতার জন্মদিন ১৭ মার্চও সর্বজনীন ‘শুভদিন’ আনন্দ-উৎসবের দিন হিসেবে পালিত হচ্ছে।
জাতীয় শোক দিবসের আনুষ্ঠানিকতা ব্যাপক-বিশাল। ১ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে যেমন, বিশেষ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনসমূহ জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করে। বঙ্গবন্ধু ও ১৫ আগস্টের পোস্টার, ছবি প্রকাশ ছাড়া অসংখ্য স্মরণিকা ও স্মারক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। বলা যেতে পারে, জন্ম ও মৃত্যুকে ঘিরে কবিতা, গান, গল্প, প্রবন্ধ মিলে বাংলা সাহিত্যের নতুন একটি শাখা-ই যেন গড়ে উঠেছে। ‘মুজিব সাহিত্য’। যেমন রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে ‘রবীন্দ্র সাহিত্য’। সাহিত্যের রচয়িতা কিন্তু শেখ মুজিব অথবা রবীন্দ্রনাথ নয়। এ সাহিত্যের নির্মাতা হলেন বাংলাদেশের মানুষ। বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে ইতোমধ্যেই যে পরিমাণ কবিতা, গান, প্রবন্ধ, নাটক, এমনকি ছোট গল্প রচিত হয়েছে এবং হচ্ছে নিঃসন্দেহে তা অতুলনীয়।
তারপরও কথা থেকে যায়। যাকে আমরা নানা অনুষ্ঠানে স্মরণ করি, এমনকি প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হই, তার জীবনাদর্শকে আমরা কতটুকু স্মরণ করি।
আমাদের দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাদের পূজনীয় দেবতা ও দেবীর বিগ্রহ গড়ে নানা বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে ধর্মীয় উৎসব পালন করেন। রবীন্দ্রনাথ এর বাহ্যিক আনন্দ-উৎসবের দিকটিকে ‘দুঃখপ্রবণ’ বাঙালিদের জীবনে ‘আনন্দ অবকাশ’ বলে স্বাগত জানিয়েছেন। কিন্তু তার একাধিক লেখায়, কবিতায় তিনি বিগ্রহ রূপী পাষাণ প্রতিমাকে ঘিরে বাঙালি হিন্দুর আনন্দকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি প্রশ্ন করেছেন, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনাচরণে তাদের দেবত্ব-মহত্ত্বকে কতটা অনুসরণ করি?
কথাটা ঘুরিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে অনুষ্ঠানের বিপুলত্ব এবং নিজেদের মুজিব অনুসারী হিসেবে বিজ্ঞাপিত করা নিয়েও প্রশ্ন করা যেতে পারে। যে মানুষটিকে ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ বলে আমরা গৌরব অনুভব করি, তার জীবনাদর্শকে আমরা কতটা অনুসরণ করি।
বঙ্গবন্ধু তার অসংখ্য বক্তৃতায়, অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং কারাগারের রোজনামচা’য় যেসব উপলব্ধির কথা বলেছেন, রাজনৈতিক কর্মীদের অনুসরণযোগ্য আচরণের কথা বলেছেন, যেসব নীতি-নৈতিকতাকে ‘মানুষ’ হওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তার কতটা আমরা অনুসরণ করি?
বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪-৭৫ সালে দ্বিতীয় বিপ্লবের ধারণা বা কনসেপ্ট প্রচার করার সময় আওয়ামী লীগ কর্মীদের উদ্দেশ্যে যেসব কথা বলেছিলেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক। কেবল সমকাল নয়, বঙ্গবন্ধুর এসব বাণী, উপদেশ এবং নির্দেশনা, প্রতিটি মুজিব আদর্শের অনুসারী কর্মীর কাছে প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে অবশ্য পালনীয় বলে আমরা মনে করি।
বঙ্গবন্ধু বলেছেন, যারা জনগণের সম্পদ চুরি করে, যারা আমার গরিবের মুখের গ্রাস কেড়ে নেয়, যারা দুর্নীতিবাজ, মজুতদার, চোরাকারবারী তারা ‘মানুষ’ না। যে মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করে সেই সাম্প্রদায়িক পশু মানুষ না। যে ক্ষমতার দম্ভে ধরাকে সরা জ্ঞান করে আমার দলে তাদের স্থান নেই।
বঙ্গবন্ধু একটা কথা বারবার বলেছেন, সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। আমরা যদি সোনার মানুষ না হই, আমরা যদি জনগণের আস্থাভাজন সেবক না হই, আমরা যদি জনগণের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অর্জন করতে না পারি তাহলে ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্তদান ব্যর্থ হয়ে যাবে। আমাদের স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে।
বঙ্গবন্ধু সংবিধান সংশোধন করে সমগ্র জাতিকে এক প্লাটফরমে এনে বাঙালির আর্থ-সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির দিক-নির্দেশনা দিতে গিয়ে ২৫ জানুয়ারি ১৯৭১, জাতীয় সংসদে প্রদত্ত ভাষণে বলেন, “… কিছু দুর্নীতিবাজ, কিছু ঘুষখোর, কিছু শোষক, কিছু ব্ল্যাক মার্কেটার্স বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করতে পারবো না, এ-কথা আমি বিশ্বাস করি না। যদি সকলে মিলে নতুন প্রাণ নতুন মন নিয়ে খোদাকে হাজির নাজের করে আত্মসমালোচনা করে, আত্মসংশোধন, আত্মশুদ্ধি করে, যদি ইনশাল্লাহ কাজে অগ্রসর হন, বাংলার জনগণকে আপনারা যা বলবেন, তারা তাই করবে। আপনাদের অগ্রসর হতে হবে।…”
বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা জাতির পিতার নির্দেশিত পথে সোনার বাংলা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই বিপুল সাফল্য অর্জন করেছেন। দেশ এখন উন্নয়নের সড়কে। কিন্তু জননেত্রী শেখ হাসিনার এই উন্নয়ন অভিযাত্রাকেও কিছু সংখ্যক ‘দুর্নীতিবাজ’, ‘শোষক’ এবং ‘ঘুষখোর’ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারী ব্যর্থ করে দেওয়া, মøান করে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করছে। জাতির পিতার উল্লিখিত কথাগুলো মনে রেখে আমাদের আত্মসমালোচনা, আত্মসংশোধন এবং আত্মশুদ্ধি করে এই দুর্নীতিবাজ, শোষক ও ঘুষখোরদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে হবে। কাজটা একমাস, একদিন বা একবছরের নয়। প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তেই আমাদের বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাশিত ‘সোনার মানুষ’ হওয়ার সাধনায়, কেবল কথায় নয় কাজেও ব্রতী হতে হবে। আসুন আমরা প্রত্যেকে নিজেরা দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে, এই মহৎ কাজে অন্যদেরও উৎসাহিত করি। আর তাহলেই জাতির পিতার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানো হবে।

শ্রেণী:

তৃণমূলের নেতাকর্মীরা দলের প্রাণস্পন্দন

Posted on by 0 comment

গত ২৩ জুন, দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নতুন অফিস উদ্বোধন এবং জেলার বিভিন্ন স্তরের আমন্ত্রিত ৬ সহস্রাধিক নেতাকর্মী এবং ৩০ জুন তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের বিভাগওয়ারি সমাবেশে সভাপতি শেখ হাসিনা যে দিক-নির্দেশনামূলক ভাষণ দিয়েছেন, তা আওয়ামী লীগের ধমনিতে রক্তপ্রবাহ যেমন বাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি বাড়িয়েছে দলের হৃদস্পন্দন। টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থেকেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন নি, জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা, তাদের মন-মানসিকতা যে ভুলে যান নি, এই দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্যে তা সুস্পষ্টভাবে অভিব্যক্ত হয়েছে।
তৃণমূলের নেতাকর্মীরা হচ্ছে দলের প্রাণ। বাংলাদেশের ৬৫ হাজার গ্রামে রয়েছে আওয়ামী লীগের শেকড়। গ্রাম-ওয়ার্ড-ইউনিয়ন হচ্ছে এক কথায় তৃণমূল। অবশিষ্ট স্তরগুলো হলো উপজেলা/শহর, জেলা/মহানগর এবং সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছে কেন্দ্র ও কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। এই বিভিন্ন স্তরের সাথে দেশবাসী বিশেষত, সাধারণ মানুষের সম্পর্কেরও রয়েছে তারতম্য। যে মানুষগুলো দুর্গম কোনো নিভৃত পল্লিতে অথবা বিচ্ছিন্ন কোনো ছোট্ট শহরের পাড়ায়-মহল্লায় বসবাস করে, কার্যত তারাই হচ্ছে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। এই সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের সাথেই মিলেমিশে থাকেন আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তারাই দলের কর্মসূচি বলুন, সভানেত্রী শেখ হাসিনার কথা বলুন এবং স্থানীয় উপজেলা/জেলা পর্যায়ের নেতাদের কথা বলুন, জনগণের মধ্যে প্রচার করেন। এই তৃণমূলের নেতা-কর্মীদেরই আবার সরকারের বিভিন্ন কর্মকা-ের জন্য সরাসরি মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। কেবল সরকারের কর্মকা- না, ইউনিয়ন, উপজেলা, এমপি, মন্ত্রী ও জেলা এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের কার্যকলাপ, আচার-ব্যবহার, ভালো-মন্দ, সুনীতি-দুর্নীতি, তারা দলের পক্ষে বা দলবিরোধীÑ দেশের স্বার্থবিরোধী যে কোনো কাজ করেন, তার জন্য এই তৃণমূলের নেতা-কর্মীদেরই সরাসরি সাধারণ মানুষের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। তাদের মতামত শুনতে হয়। তাদের চাওয়া-পাওয়া, আশা-আকাক্সক্ষার কথা শুনতে হয়। এমনকি দলের ওপর আঘাত এলে তাদেরকেই প্রথম রুখে দাঁড়াতে হয়। বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে তারা সাধারণ মানুষের সাথে একাত্ম হয়ে থাকেন। কার্যত তৃণমূলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা কোনো ভিন্ন জাতের মানুষ নন। তারা সাধারণ মানুষেরই অংশ। বলা যেতে পারে রাজনৈতিক সচেতন অংশ।
দীর্ঘ ৩৭ বছর একটানা দলের সভাপতি এবং তিন দফায় প্রায় ১৫ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার পালন করলেও জননেত্রী শেখ হাসিনা তৃণমূলের সাথে তার নিজের সম্পর্ক যেমন অটুট রেখেছেন, তেমনি তাদের শক্তি-দুর্বলতাগুলোও সম্যক অবহিত আছেন।
গত দুই দফায় টানা প্রায় ১০ বছর ক্ষমতায় থেকে বাংলাদেশের যে বিস্ময়কর উন্নয়ন হয়েছে, গরিব-মেহনতি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের ধারার সূচনা হয়েছে এবং বিশ্বে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল হয়ে উঠেছে, তার সুদূরপ্রসারী গভীর তাৎপর্য সম্পর্কে জনগণকে কিন্তু তেমনভাবে সচেতন-শিক্ষিত করা হয়নি। ফলে তথ্যের স্বল্পতা, উন্নয়নের আলটিমেট ফলাফল এবং বিরোধীপক্ষের অপপ্রচারের ফলে সৃষ্ট বিভ্রান্তির কারণে আওয়ামী লীগের সাথে ভোটারদের একাংশের সাথে কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এত বিশাল উন্নয়নের পরও কোথাও, স্থানীয় নির্বাচন হোক আর জাতীয় নির্বাচন হোক, আওয়ামী লীগ প্রার্থী যদি জয়লাভ করতে না পারে। সেজন্য কাকে দায়ী করবেন?
জননেত্রী শেখ হাসিনা তৃণমূল নেতাদের সে কথাটিই নানাভাবে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করেছেন। তৃণমূল নেতারা যেমন সাধারণ মানুষকে আওয়ামী লীগের পক্ষেÑ নৌকার পক্ষে সংগঠিত করবেন, তেমনি তৃণমূল নেতা-কর্মীদেরও সংগঠিত করার দায়িত্ব দলের উপজেলা ও জেলার নেতৃবৃন্দের। দেশকে কী দিতে পারলাম এবং ভবিষ্যতে কী কী দিতে পারব, সমস্বরে এই কথাগুলো যদি মানুষকে বলা না যায়, তার বদলে ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া, দলের অভ্যন্তরের দলাদলি, ভুল বুঝাবুঝি অথবা জনগণের পছন্দ নয়, এমনসব বিষয় নিয়েই যদি নেতাকর্মীরা ব্যস্ত থাকেন, তাহলে শত ভালো কাজ করেও জনগণের আস্থা অর্জন সম্ভব হবে না। সে জন্যই প্রধানমন্ত্রী কোনো রাখঢাক বা ভণিতা না করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ভর করবে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের ওপর। তিনি সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, নির্বাচনে সহজে বাজিমাত করা যাবে না। নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। প্রতিপক্ষকে দুর্বল ভাবা ঠিক না। দেশবাসীকে সরকারের বহুমুখী উন্নয়নের কথা, মানুষের কল্যাণে গৃহীত নানা ব্যবস্থা এবং তার সুফলসমূহ চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ অবিবেচক নয়। তবে তারা সহজে অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হতে পারে। অতএব, জনগণকে যাতে কেউ বিভ্রান্ত করতে না পারে, তারা যেন উন্নয়ন ও সাফল্যের কথাগুলো ভালোভাবে জানে এবং ক্ষমতায় আওয়ামী লীগের ধারাবাহিকতা না থাকলে দেশ যে আবার অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে পারে, সে কথাগুলো তৃণমূল পর্যায় থেকে সর্বস্তরে ব্যাপক প্রচার চালিয়ে দেশবাসীকে জানাতে হবে। তাদেরকে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সংগঠিত করতে হবে। একইসঙ্গে নিজেদের ভুল-ত্রুটিগুলি সংশোধন এবং দলে কোনো সুবিধাবাদী-অনুপ্রবেশকারী ভিন্ন আদর্শের লোক ঢুকে থাকলে তাদের কালো থাবা থেকে দলকে মুক্ত করতে হবে।
জননেত্রী শেখ হাসিনা দলের কর্মীদের পালস্ বুঝেছেন এবং হৃদস্পন্দন শুনতে পান। অতএব, নেত্রীর দিক-নির্দেশনা মনে রেখে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়–ন। তার কথা শুনুন। তার হাত শক্তিশালী করুন। বিজয় আমাদের অনিবার্য।

শ্রেণী:

দেশ ও তরুণ প্রজন্মকে বাঁচাতে মাদকবিরোধী অভিযান

Posted on by 0 comment

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে মাদক চোরাচালান, অবৈধ মাদক ব্যবসা এবং মাদকাসক্তি উদ্বেগজনক পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল। মাদকাসক্তি একটা জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের নগর-বন্দর-গ্রাম সর্বত্র মাদকের কালো থাবা বিস্তার লাভ করেছে। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে মাদক তিল তিল করে এক ধরনের ‘গণহত্যার’ শিকারে পরিণত করেছে। মাদকের ক্রমবর্ধমান সর্বনাশা নেশার জন্য কেবল তরুণ প্রজন্মই ধ্বংসের কবলে পড়েনি। সমগ্র জাতি আজ এই জন্য মূল্য দিচ্ছে।
সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মাদকের বিরুদ্ধে প্রকারান্তরে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, মাদকের প্রশ্নে কোনো ছাড় নেই। জিরো টলারেন্সের ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মাদক ব্যবসায়ী, চোরাচালানি চক্র ও সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বাত্মক অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছেন, আমরা আমাদের সন্তানদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারি না। সরকারের সুস্পষ্ট ঘোষণা রয়েছে, রাজনৈতিক দল ও মতামতের ঊর্ধ্বে মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ অভিযান চলবে।
গত ৩ মে র‌্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে মাদক নির্মূলে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দেওয়ার পর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে। মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাচালানি চক্রও বসে নেই। তারা মাদকবিরোধী অভিযানকালে, তাদের সাম্রাজ্য হারানোর ভয়ে মরিয়া হয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে। ফলে গত ৪ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত বন্দুকযুদ্ধে ১২৬ জন মাদক ব্যবসায়ী, চোরাচালানি নিহত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও অনেক সদস্য আহত হয়েছেন। উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ মাদক (ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন প্রভৃতি) এবং অবৈধ অস্ত্র। ইতোমধ্যে সারাদেশে পরিচালিত চিরুনি অভিযানে গ্রেফতার হয়েছে ১০ সহ¯্রাধিক মাদক ব্যবসায়ী।
সরকারের এই মাদকবিরোধী অভিযানকে দেশবাসী স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু আমাদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং ‘মানবাধিকারের সোল এজেন্ট’ হিসেবে পরিচিত কিছু এনজিও সংগঠন ও ‘বুদ্ধিমান’ ব্যক্তি তীব্র ভাষায় সমালোচনা করছেন। সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য, নিহত মাদক ব্যবসায়ী-সন্ত্রাসীদের জন্য তারা চোখের জলে-হাঁটুর জলে বুক চাপড়িয়ে গণমাধ্যমের পর্দা ও পৃষ্ঠা ভিজিয়ে ফেলছেন। অথচ এই মানবাধিকার কারবারীদেরই দেখেছি, জিয়াউর রহমান যখন ১৯৭৬-৭৭ সালে কারাগারে আটক বিমান বাহিনী, সেনাবাহিনীর অগণিত সদস্য (এক হিসাবে ৬০০ জন)-কে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের নামে কার্যত বিনাবিচারে ফাঁসিতে লটকিয়ে হত্যা করেছে, তখন কেউ ‘টুঁ’ শব্দটি পর্যন্ত করেনি। সামরিক শাসকের ভয়ে থরহরিকম্প মানবাধিকার কারবারীরা সেদিন নীরব ভূমিকা পালন করেছে। ২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত খালেদা জিয়ার সরকার সেনাবাহিনী নিয়োগ করে অপারেশন ক্লিনহার্ট অভিযান পরিচালনা করেছে। তখন প্রায় প্রতিদিনই ঘোষণা করা হয়েছে ধৃত ব্যক্তি নিরাপদ হেফাজতে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেছে। এভাবে সে যাত্রায় ৮৭ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার দুঃশাসনের সময়েই ১৪০০ মানুষকে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যা করা হয়েছিল।
মাদক একটা কালান্তক ব্যাধি। সমাজের উঁচু-নিচু কোনো স্তরের তরুণরাই এ সংক্রামক থেকে মুক্ত নয়। আমাদের স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে মাদকাসক্ত স্কুলছাত্রী ঐশীর কথা। ঐশী মাদকাসক্ত হয়ে তার পুলিশ কর্মকর্তা বাবা ও মাকে হত্যা করতে দ্বিধা করেনি। দেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রায়শই সংবাদপত্র-টেলিভিশন ও সামাজিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, মাদকের টাকা না পেয়ে ছেলে তার মাকে, বাবাকে হামলা করেছে, হত্যা করেছে। আমরা এ খবর দেখি ইয়াবা খেয়ে বাস চালানোর কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে কতজনের প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে। মাদকাসক্তির কারণে একটা মেধাবী প্রজন্মের তরুণ-তরুণী অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তার প্রভাব পড়ছে লেখাপড়ায়, ইভটিজিংয়ে, চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই প্রভৃতি অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধিতে। অতএব, এই মারাত্মক কালগ্রাস ব্যাধি থেকে, এই তিলতিল গণহত্যা থেকে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশÑ আমাদের তরুণ প্রজন্মকে যে-কোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি একসময় চীনের জনগণকে আফিম খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখার পরিকল্পিত চক্রান্ত করেছিল। জাগ্রত চীনের জনগণ সেই আফিমের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে পর্যন্ত নামতে বাধ্য হয়েছিল। মানবেতিহাসে চীনের ‘আফিম যুদ্ধ’ বা ‘অপিয়াম ওয়্যার’ হিসেবে খ্যাত সেই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। হাজার হাজার চীনা সৈনিক-জনযোদ্ধা তাদের প্রাণ দিয়ে কোটি কোটি চীনা জনগণ এবং চীনা জাতিকে আফিমের অভিশাপ থেকে রক্ষা করেছিল। আজকের বাংলাদেশেও আমাদের সেই আফিম যুদ্ধের মতোই মাদকবিরোধী যুদ্ধে জয়লাভ করতে হবে। এর জন্য কিছু প্রাণ যাবে না তা নয়। কিন্তু আজ যদি মাদকবিরোধী অভিযান ব্যর্থ হয়, তা হলে কোটি কোটি বাঙালি তিলতিল করে অনিবার্য মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে।
আমরা কেবল আইনি ব্যবস্থাকে একমাত্র নিদান মনে করছি না। আমরা মনে করি, মাদক ব্যবসায়ী চোরাচালানি চক্রকে উৎখাতের বর্তমান অভিযান একটা সীমিত অভিযান। কেননা, মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে, মাদক চোরাচালানিদের আন্তর্জাতিক চক্রকে সমূলে উৎখাত এবং এর পেছনের গডফাদারদের ধরে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে না পারলে একে নির্মূল করা যাবে না। সাময়িকভাবে হয়তো মাদক ব্যবসায় ভাটা পড়বে অথবা মাদকাসক্তির প্রকোপ কমবে। কিন্তু স্থায়ী ব্যবস্থা করতে না পারলে আবার এই সংক্রামক ব্যাধি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। অতএব, আমরা চলমান অভিযানের যেমন সাফল্য চাই, তেমনি সামাজিক প্রতিরোধ ও স্থায়ী প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ দেখতে চাই। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার প্রতি দেশবাসীর আস্থা আছে। কেবল তিনি একাই মাদকের করাল গ্রাস থেকে দেশকে রক্ষা করতে পারবেন না। দলমত নির্বিশেষে সমগ্র জাতিকে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

শ্রেণী:

মে দিবসের চেতনা, আমাদের সংবিধান ও উন্নয়ন

Posted on by 0 comment
uttaran May Cover

uttaran May Coverস্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি তথা মে দিবসকে ‘ছুটি’ হিসেবে ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণা শ্রমজীবী মানুষের ন্যায়সংগত সংগ্রাম, অধিকার এবং শোষণ-বঞ্চনা থেকে তাদের মুক্তির অঙ্গীকারের প্রতি সংহতির নজির।
কেবল মে দিবসে রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণাই নয়, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সংবিধানে শ্রমিক-কৃষক-শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট নিশ্চয়তার কথা সংযোজিত করেন।
আমাদের সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে মেহনতি মানুষকে-কৃষক শ্রমিককে-জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি দান করা।” এরপর ১৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়, “রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায় :
ক. অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা;
খ. কর্মের অধিকার, অর্থাৎ কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসংগত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার;
গ. যুক্তিসংগত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার; এবং
ঘ. সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার…।
সংবিধানের উল্লিখিত দুটি অনুচ্ছেদ এবং দুই শতাব্দীব্যাপী শ্রমিক-শ্রেণি ও মেহনতি মানুষের সংগ্রামের দাবি, আকাক্সক্ষা এবং স্বপ্নের কোনো পার্থক্য নেই। বাংলাদেশের সংবিধানের মতো এমন সুস্পষ্ট ভাষায় তৃতীয় বিশ্বের অন্য কোনো দেশের সংবিধানে এসব অধিকার, অঙ্গীকার ও লক্ষ্যের কথা ঘোষণা করা হয়েছে কি না, আমাদের জানা নেই।
সংবিধান হচ্ছে একটি দেশের মৌলিক দলিল। এ কথা সত্য, সংবিধানে ঘোষিত অঙ্গীকার ও লক্ষ্যগুলি রাতারাতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। ১৫ অনুচ্ছেদে যে, ‘পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের’ কথা বলা হয়েছে, সেই বিকাশ, ‘বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন’ করতে না পারলে, ১৫ অনুচ্ছেদের ক, খ, গ ও ঘ ধারাগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়, এ কথা নিঃসন্দেহে সকলেরই বোধগম্য।
আমাদের দেশের স্বাধীনতার ৪৭ বছর এবং সংবিধান প্রণয়নের ৪৬ বছর ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে। এই ৪৬ বছরে সংবিধানে বর্ণিত অঙ্গীকারসমূহ ও লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে, স্বাভাবিকভাবেই এই জিজ্ঞাসা আমরা নিজেদেরই করতে পারি।
বাংলাদেশ এখন অনুন্নত বা পশ্চাৎপদ দরিদ্র দেশের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে এসেছে। আমাদের দেশ এখন ‘উন্নয়নশীল’ দেশের পঙ্ক্তিভুক্ত। আমাদের প্রবৃদ্ধির হার ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের মাথাপ্রতি আয় ১৬৬০ ডলারে উন্নীত। আমরা এখন মধ্যম আয়ের দেশের সোপানে পা রেখেছি। আমাদের দেশ খাদ্যে আত্মনির্ভরশীল। আমাদের গড় আয়ুষ্কাল উপমহাদেশে সবচেয়ে বেশি, ৭২ বছর। আমরা কৃষিনির্ভরতা থেকে শিক্ষা ও সেবানির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছি। নারীর ক্ষমতায়নে আমরা গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। আমাদের রয়েছে নির্ভরযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। আমরা নিজস্ব আয় দিয়ে পদ্মাসেতু নির্মাণ করছি। আমরা দারিদ্র্য ২২ শতাংশে কমিয়ে এনেছি। সবাই আমাদের বলে বিস্ময় অর্থনীতি বা মিরাক্যাল ইকোনমি।
এই যদি হয় উন্নতির, পরিকল্পিত বিকাশের ছবি, তাহলে স্বাভাবিকভাবে প্রত্যাশা করা যায় সংবিধানের ১৪ ও ১৫ অনুচ্ছেদে যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের সময় এসে গেছে।
আমাদের স্বীকার করতেই হবে ১৪ ও ১৫ অনুচ্ছেদের প্রতিটি অঙ্গীকার না হলেও অনেকগুলোই ইতোমধ্যে আংশিক বা ক্ষেত্রবিশেষে বহুলাংশে বাস্তবায়িত হয়েছে।
কিন্তু মনে রাখতে হবে, উন্নতির ফসল যতটা গরিব, খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের ঘরে যাওয়ার কথা ছিল, ততটা কিন্তু যায় নি। সমাজের যেমন সম্পদ বেড়েছে, তেমনি সম্পদের মালিকানা নিয়ে বৈষম্যও বেড়েছে। দারিদ্র্যের হার কমানো, নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য। কিন্তু সংবিধানে যা রয়েছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু যে কথা বলেছেন, সেই শোষণহীন, বৈষম্যমুক্ত সমাজ কিন্তু এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। উল্টো ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য বেড়েছে। ধন বৈষম্য এখন আকাশচুম্বী। সমাজতন্ত্রের স্বপ্নের কথা বাদ দিলাম, একটি ‘কল্যাণরাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও কিন্তু আমরা কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে (২০১৪) বলা হয়েছে, ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আসন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জয়লাভ করলে, দেশের উন্নয়নের ও বিকাশের গতিমুখ নিশ্চিতভাবে সেদিকেই যাবে। কিন্তু সাথে সাথে মানুষে মানুষে, শ্রেণিতে শ্রেণিতে ভেদ-বৈষম্য ও শোষণ-বঞ্চনা কমাতে না পারলে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য যেমন মুখ থুবড়ে পড়বে, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মে দিবসের চেতনা বাস্তবায়নও স্বপ্নই থেকে যাবে। আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে, তারা যা বলে তা তারা বাস্তবায়িত করতেও সক্ষম। এজন্য অপেক্ষার পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষকে আরও সুসংগঠিত হতে হবে। শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে হবে। মে দিবসে দেশের শ্রমজীবী ভাই-বোনদের শুভেচ্ছাÑ অভিনন্দন।

শ্রেণী: