রাজনৈতিক জোট-দলের সঙ্গে সংলাপ, রাজনীতিতে সুবাতাস

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া একটা নতুন পর্যায়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলগুলোর সাথে আলোচনায় সম্মতি জানিয়েছেন এবং ১ নভেম্বর ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ নেতাদের সঙ্গে আলোচনার সূচনাও করেছেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সংলাপের লিখিত প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী অবিলম্বে তাতে সম্মতি জানান। তিনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান ড. কামাল হোসেনকে জানান সংবিধানসম্মত যে কোনো বিষয়ে আলোচনার জন্য তার দ্বার সবসময় উন্মুক্ত। প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে ১ নভেম্বর আলোচনার জন্য গণভবনে আমন্ত্রণ জানান।
আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং অবাধ নিরপেক্ষ শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সদিচ্ছা থেকেই প্রধানমন্ত্রী সংলাপের প্রশ্নে ঔদার্য প্রদর্শন করেন। কেবল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক জোটকেও তিনি আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। অবশ্য ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পক্ষ থেকে আগেই সংলাপের আবেদন জানানো হয়। অন্যান্য জোটও সংলাপে অংশ নেওয়ার প্রশ্নে তাদের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন।
আমরা মনে করি, নির্বাচনকে সামনে রেখে এই সংলাপ অনুষ্ঠানই একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। দীর্ঘদিন যাবত দেশের রাজনীতিতে যে অনিশ্চয়তা এবং বিরোধী দলগুলোর সংবিধান লঙ্ঘন করে সরকার পতন বা এই সরকারের পদত্যাগসহ যেসব অযৌক্তিক দাবি নিয়ে দেশে অস্থিতিশীলতার পাঁয়তারা চলছিল, চলমান সংলাপ তার অবসান ঘটাবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সংলাপ হতে হবে সংবিধানের আওতায়। যে দাবিই করা হোক না কেন, তা যদি সংবিধানসম্মত না হয়, তাহলে সংলাপের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। বিএনপি নেতারা সংলাপের লিখিত প্রস্তাব দিয়ে ভেবেছিলেন, সরকার বা আওয়ামী লীগ তাতে তাৎক্ষণিক সাড়া দেবে না। তারা সংলাপের বিষয়টিকে ইস্যু করতে পারবেন এবং এই ইস্যুতে এজিটেশন চালাতে পারবেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সংলাপের প্রস্তাব গ্রহণ এবং আজকের সংলাপ তাদের সেই উদ্দেশ্য ব্যর্থ করে দেয়।
এবারের সংলাপ নানা কারণে বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যতিক্রমী। এবারই প্রথম কোনো তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা বা ভূমিকা ছাড়াই দুটি প্রধান প্রতিপক্ষের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সংলাপ হচ্ছে। অতীতে কমনওয়েলথ বা জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারির দূতিয়ালি এবং সর্বোচ্চ সাধারণ সম্পাদক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। ঐ সংলাপে কোনো সুফল বয়ে আনেনি। পক্ষান্তরে তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা ছাড়া সর্বোচ্চ পর্যায়ে সূচিত সংলাপ হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ২০ জন নেতা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে সংলাপে অংশগ্রহণ করেছেন। ১৪ দলের নেতৃবৃন্দসহ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ২৩ সদস্য বিশিষ্ট প্রতিনিধি দল আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।
উভয় পক্ষই বলেছে, আলোচনা অত্যন্ত খোলামেলা পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃবৃন্দ দীর্ঘ সময় নিয়ে বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। তারা অনেকেই একাধিকবার আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার একটানা আলোচনায় উভয় পক্ষ উভয় পক্ষের বক্তব্য খোলামেলাভাবে উপস্থাপন করেছেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সরকারের পদত্যাগ, পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া এবং নিরপেক্ষ সরকারের দাবির প্রশ্নে তার কিছু করার এখতিয়ার নেই। সংবিধানে এর কোনো সুযোগ নেই। সরকারপ্রধান হিসেবে সংবিধানের বাইরে তিনি যেতে পারেন না। নির্বাচন কমিশন সম্পর্কিত দাবিতেও সরকারের কিছু করণীয় নেই। নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থা। সরকারের এখানে হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। তবে বিরোধী দলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী সভা-সমাবেশের ওপর কোনো বাধা থাকবে না বলে তাদের আশ্বস্ত করেছেন। দ্বিতীয়ত; প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ভাষায় যাদের বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক মামলা’ রয়েছে তার তালিকা সরকারের কাছে প্রদানের কথা বলেছেন। এছাড়া নির্বাচনে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষণে কোনো বাধা থাকবে না বলে তিনি বিরোধী দলকে আশ্বস্ত করেছেন। ড. কামাল হোসেনের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দল চাইলে আরও ক্ষুদ্র পরিসরে আলোচনা করতে আওয়ামী লীগ প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন।
অবিশ্বাস, অনাস্থা এবং পরস্পরের ছায়া না মাড়ানোর এতদিনের অসহিষ্ণুতার রাজনীতির ফাঁদ থেকে বের হয়ে আসার পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পর ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্প ধারা ও যুক্তফ্রন্ট, জেনারেল এরশাদের জোট এবং বামজোটসহ দেশের সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ রাজনীতিতে সুবাতাসের সুস্পষ্ট আভাস। সকল দলের সঙ্গে আলোচনার প্রেক্ষিতে সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে ন্যূনতম কতক ইস্যুতে যদি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় যুক্ত হবে নতুন মাত্রা। আমরা আশা করি, সংলাপের প্রেক্ষিতে আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিটি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করবে। দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা ও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে সকল দল ও জোট এগিয়ে আসবে। আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টির অপচেষ্টা দেশবাসী চায় না। দেশবাসী চায় সংবিধান সমুন্নত রেখে সকল দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন। সংলাপের ভেতর দিয়ে সেই জন-আকাক্সক্ষা পূরণ হবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

শ্রেণী:

জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি ও বিদেশিদের কাছে ধর্না

Posted on by 0 comment

সম্পাদকের কথা: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে স্বাভাবিকভাবেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ক্রমেই সরগরম হয়ে উঠছে। একদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট যেমন তাদের গত ১০ বছরের সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার লক্ষ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে নানা কিসিমের বিরোধী দলগুলো জোটবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে ঐক্য প্রক্রিয়া এবং ড. কামাল হোসেনের উদ্যোগে ‘জাতীয় ঐক্য’ অভিন্ন মঞ্চে শামিল হয়েছে। সর্বশেষ এই জাতীয় ঐক্যের উদ্যোগের সঙ্গে শামিল হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলÑ বিএনপি। নিঃশর্তভাবে তারা ড. কামাল হোসেন ও ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্ব মেনে নিয়ে তাদের ভাষায় ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য’ গড়ে তোলার কথা বলছেন। যদিও কামাল হোসেন ও বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছেন জামাতকে নিয়ে তারা কোনো ঐক্য করবেন না; তবুও এর সম্ভাবনা বিএনপি কিন্তু উড়িয়ে দেয়নি। তারা কোনো-না-কোনো ফর্মে জামাতকে সাথে রাখার কথা মাথায় রেখেই বলেছে, জাতীয় ঐক্য হলে ২০-দলীয় জোটও তার অঙ্গীভূত হবে।
এর পাশাপাশি বামদলগুলোও বিশেষত সিপিবি-বাসদ এর সাথে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আরও কয়েকটি ‘বাম’দল ‘বিকল্প শক্তি’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। বামদলের নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’কে এক পাল্লায় মেপে সমদূরত্বের নীতি যেমন নিয়েছে তেমনি স্পষ্ট করেই বলেছে তারা বিএনপি বা আওয়ামী লীগ, কারও সাথেই জোটবদ্ধ হবে না। অথচ মজার বিষয়, সম্প্রতি ঢাকা মহানগর নাট্যমঞ্চে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় ঐক্যের’ আনুষ্ঠানিক সমাবেশে বামপন্থি জোটের জোনায়েদ সাকি ও প্রকৌশলী শহীদুল্লাহ কেবল উপস্থিত হননি, ঘোষণাও পাঠ করেছেন।
এই তিন মেরুকরণের বাইরেও আরও কিছু ছোট ছোট দল জোটবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে। এসব জোটবদ্ধতা নিয়ে গণতান্ত্রিক শক্তির তেমন উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। অন্ধ, কালা, কানা, ল্যাংড়া, খোঁড়া এবং  বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের ঐক্যের ডাক তাদের প্রতিবেশীদের কানেও পৌঁছায় না। গণভিত্তিহীন এসব নাম ও নেতাসর্বস্ব দল ঐক্যবদ্ধ হলেই বা কী, না হলেই বা কী! কিন্তু এ-কথা সত্য এই পঙ্ক্তিতে বিএনপি পড়ে না। নিঃসন্দেহে বিএনপি একটি বড় দল। যদিও এই দলটি ক্রমশ সংকোচিত হচ্ছে এবং তাদের গণধিকৃত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে আদালতের রায়ে শাস্তি ভোগ করছেন এবং বিএনপির বয়সে জুনিয়র কিন্তু পদাধিকারে সিনিয়র তারেক রহমান মানিলন্ডারিং-এর মামলায় দ-প্রাপ্ত হয়ে আদালতের ভাষায় পলাতক। খালেদা-তারেক তাদের পাপের শাস্তি ভোগ করছেন। শীঘ্রই আরও মামলার রায় বেরুলে তাদের পাপের বোঝা এতটাই ভারী হবে যে, অলৌকিক কিছু না ঘটলে তাদের রাজনৈতিক জীবনও বিপন্ন হয়ে পড়বে।
বিএনপি ও জামাতে ইসলামি রাজনীতির এই বাস্তবতা সম্যক উপলব্ধি করে। তাদের কাছে এটা পরিষ্কার যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে বিএনপি নেত্রী খালেদা ও তারেক শাস্তি এড়াতে পারবে না, আর যদি উচ্চ আদালতের এই রায় বহাল থাকে, তাহলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিক্রিয়ায় জামাত এখন অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। যে কোনো প্রকারে আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে (এমনকি দুনিয়া থেকেও) সরিয়ে দিতে পারলেই তারা তাদের ‘পুরনো স্বর্ণযুগ’ ফিরে পেতে পারে।
বিএনপি-জামাতের আন্তর্জাতিকভাবে ভাবাদর্শগত মিত্র ও প্রভু পাকিস্তান। পাকিস্তান সুযোগ পেলেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে যে অতীতে নানাভাবে হস্তক্ষেপ করেছে এটা আমাদের জানা আছে। আঞ্চলিক রাজনীতি তাদের অনুকূলে আনার জন্য বাংলাদেশে একটি পাকিস্তানপন্থি সরকার প্রতিষ্ঠা জরুরি। এজন্য লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানকে তারা, বিশেষত পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীÑ আইএসআই সর্বতোভাবে মদদ দিয়েছে। এখন বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখেও তারা সর্বাত্মক চেষ্টা করবে, যাতে আওয়ামী লীগকে হটিয়ে বিএনপি-জামাতকে পুনরায় ক্ষমতায় নেওয়া যায়। এজন্য বৈধ-অবৈধ কোনো পথই তারা বাদ দেবে না।
পাকিস্তানের নীলনকশায় বিএনপি, বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কামাল হোসেন গং-এর সাথে তথাকথিত বামদের একাংশকে মিলাবার জন্য দৃশ্যত জামাতকে আড়ালে রেখেই তথাকথিত জাতীয় ঐক্য গড়ার চেষ্টা করছে। এই ঐক্য যে একটা ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতা, তা বোঝার জন্য কারও পা-িত্যের প্রয়োজন পড়ে না। বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যের সংবিধানবিরোধী নির্বাচনকালীন সরকারের ফর্মুলা, শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার ঘোষণা এবং আল্টিমেটাম দিয়ে সরকার উৎখাতের হুঙ্কার প্রভৃতি কারণেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই ঐক্যকে ষড়যন্ত্রমূলক আখ্যা দিয়েছেন। সংবিধানবহির্ভূত কোনো দাবি বা ফর্মুলা যে সরকার মানবে না, এটা বুঝেও তারা জনগণকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে প্রচারণা চালাচ্ছে। তারা দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাইছে।
কেবল এসব করেই তারা ক্ষ্যান্ত থাকছে না। বিদেশে গিয়ে জাতিসংঘ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে ধর্না দিচ্ছেন। দেশের ভেতরে বিদেশি দূতাবাসের কর্মকর্তাদের দাওয়াত দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তাদের হস্তক্ষেপ করার জন্য অনুরোধ-উপরোধ ও আর্তনাদ করছেন। এটা যে আশি বা নব্বইয়ের দশকের মতো ‘শীতল যুদ্ধের যুগ নয়, বাংলাদেশের জনগণ যে অতীতের মতো এখন আর বিদেশিদের মুখাপেক্ষী নয়, সর্বোপরি বিশ্ব রাজনীতির ডায়নামিকস যে পরিবর্তন হয়ে গেছে, আত্মসম্মানবোধহীন বিএনপি নেতারা এই কা-জ্ঞানটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। কোনো বিদেশি শক্তি (পাকিস্তান ও দোসররা ছাড়া) যেমন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে আগ্রহী নয়, তেমনি তাদের কারও মাতব্বরী বাংলাদেশে জনগণ মেনে নেবে না।
বিএনপি-জামাত যে স্বপ্ন দেখছে, তা দুঃস্বপ্ন হয়েই থাকবে। বাংলাদেশের জনগণ অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ। কোনো ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত বাংলার মাটিতে কার্যকর হবে না। চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র বাদ দিয়ে সকল রাজনৈতিক দল-জোটের উচিত সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। সকল দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ নিরপেক্ষ শান্তিপূর্ণ নির্বাচনই পারে যে কোনো রাজনৈতিক সংকট এড়াতে। আমরা আশা করব, বিরোধী দলগুলোর শুভবুদ্ধির উদয় হবে। তারা যত খুশি জোট বা এলায়েন্স করুন, সেটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালীই করবে, যদি না ষড়যন্ত্র ও অসাংবিধানিক পথ পরিহার করা হয়। আমরা উৎসবমুখর পরিবেশে সবাইকে নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার আহ্বান জানাচ্ছি।

শ্রেণী:

গুজব সন্ত্রাস ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম

ভিত্তিহীন বা কল্পকাহিনিকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রচারের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। তবে পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়িয়ে বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের ইতিহাস খুব বেশিদিনের না। অরাজনৈতিক গুজব, যেমন- পীর দরবেশ, সাধু সন্ন্যাসীর অলৌকিক ক্ষমতা, মৃত ব্যক্তির জীবন লাভ, স্বপ্নাদেশ এবং নানারকমের কুসংস্কার প্রচারের কাহিনি অনেক পুরনো। কিন্তু উনিশ ও বিশ শতকে এই উপমহাদেশে ভয়ঙ্কর সব গুজব ছড়িয়ে হিন্দু-মুসলমানদের দাঙ্গা বাধানোর কথা খুব বেশি পুরনো নয়।
১৯৬৪ সালে উপমহাদেশে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। ভারতের কাশ্মীরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের ‘হযরত বাল’ মসজিদ থেকে হিন্দুরা নবী করিম হযরত মুহম্মদের ‘সংরক্ষিত চুল’ চুরি করে নিয়ে গেছে। স্বভাবত মুসলমানদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগে। লেগে যায় রক্তক্ষয়ী হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গাÑ যা ভারত ও পাকিস্তানে (পূর্ব বাংলাসহ) ছড়িয়ে পড়ে।
তবে অতীতে গুজব ছড়াত মানুষের মুখে মুখে। সেক্ষেত্রে গুজব ছড়িয়ে পড়তে কিছুটা সময় লাগত। অনেক সময় গুজবের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বা সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময় পাওয়া যেত।
কিন্তু রেডিও, টেলিভিশন, টেলিফোন এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সামাজিক গণযোগাযোগমাধ্যম শক্তিশালী এবং তাৎক্ষণিক জগৎজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার হাতিয়ার হয়ে ওঠার পর গুজব এখন বাতাসের গতির চেয়েও বেশি গতিতে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে।
গত এক দশকে ‘গুজব সন্ত্রাস’ ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। সাত-আট বছর আগে রামুতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে স্থানীয় উগ্রপন্থি কিছু লোক প্রচার করে যে, রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন হযরত মুহম্মদের এবং কোরআনের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়েছে। সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই ঐ মহলটি পরিকল্পিতভাবে রামুর সুদৃশ্য বৌদ্ধ মন্দিরে এবং বৌদ্ধদের বসতভিটায় আক্রমণ চালায়, অগ্নিসংযোগ করে সবকিছু ধুলোয় মিশিয়ে দেয়।
সাঈদীর বিচারের পর বগুড়া, গাইবান্ধা এলাকায় এবং ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের শাপলা চত্বরের সমাবেশকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়ানোর কথা সবাই জানেন।
সম্প্রতিকালে দুটি অরাজনৈতিক ছাত্র আন্দোলনকে বিপথগামী করা এবং আন্দোলনের সুযোগে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির অসৎ উদ্দেশ্যে গুজব সন্ত্রাসের সৃষ্টি করা হয়। প্রথমটি ঘটে কোটাবিরোধী আন্দোলনে। রাতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে প্রচার করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের বাসায় কয়েকজন ছাত্রকে আটক করা হয়েছে। তাদের লাশ পড়ে আছে। ইত্যাদি। এই উসকানিমূলক গুজব প্রচারিত হওয়ার পর আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের একটি অংশ উপাচার্যের বাসায় হামলা চালিয়ে নারকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
সর্বশেষ ঘটনা ঘটে গত ৪ ও ৫ আগস্ট। নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-কলেজের কোমলমতি ছাত্রদের একটি স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে বিভ্রান্তির পথে ঠেলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ঝিগাতলা মোড়ে একজন ছাত্রী উচ্চৈঃস্বরে প্রচার করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে কয়েকজন ছাত্রকে হত্যা করা হয়েছে এবং কয়েকজন ছাত্রীকে ধর্ষণ করে আটকে রাখা হয়েছে। এই গুজব সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক গণমাধ্যমে ‘লাইভ’ প্রচারে সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এমনকি শহিদুল আলম নামে দৃক গ্যালারির একজন বিতর্কিত আলোকচিত্রী আল-জাজিরায় সাক্ষাৎকার দিয়ে এই মিথ্যা কথা প্রচার করে। স্বভাবতই এই গুজব সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী এবং নাগরিকদের মধ্যে প্রচ- প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। সরকার অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে। ছাত্রলীগ সভাপতি সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে গিয়ে এবং তাদের সভানেত্রীর ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে ডেকে এনে কার্যালয় ঘুরিয়ে দেখালে উত্তেজনা প্রশমিত হয়। কিন্তু সারাদেশের কোথাও কোথাও অনাকাক্সিক্ষত অরাজকতা দেখা দেয়।
অভিজ্ঞতা বলছে, এসব গুজবের পেছনে একটি রাজনৈতিক শক্তি সুসংগঠিতভাবে এবং পরিকল্পিত উপায়ে কাজ করেছে। খুবই স্বাভাবিক যে, এর পেছনে জামাত-শিবির এবং বিএনপির মদত রয়েছে। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মস্তিষ্কপ্রসূত ছিল না এসব গুজব রটনা এবং নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা। এসব হিংসাত্মক গুজবকেই দেশবাসী ‘গুজব সন্ত্রাস’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই গুজব সন্ত্রাস ইতিবাচক কোনো আন্দোলন গড়ে তোলার পরিপন্থী। গুজব সন্ত্রাস রক্তপাত, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, হামলা ও সংঘাত সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমরা মনে করি, যারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে গুজব সন্ত্রাস সৃষ্টি করছে বা করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা যেমন গ্রহণ করতে হবে, তেমনি এ ব্যাপারে দেশবাসীকেও সচেতন সতর্ক করতে হবে। ভবিষ্যতে গুজব সন্ত্রাসের পুনরাবৃত্তি রোধে আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজে এগিয়ে আসার জন্য দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। গুজব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সচেতন হোন, গুজব সন্ত্রাস প্রতিরোধ করুন।

শ্রেণী:

প্রতিদিন ও প্রতিক্ষণ বঙ্গবন্ধু

Posted on by 0 comment

শোকের মাস আগস্ট। মাসব্যাপী নানা কর্মসূচির মাধ্যমে সমগ্র জাতি বঙ্গবন্ধুকে এবং ১৫ আগস্টের শহিদদের স্মৃতি স্মরণ করবে। ইতোমধ্যে এ মাসটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। একইভাবে জাতির পিতার জন্মদিন ১৭ মার্চও সর্বজনীন ‘শুভদিন’ আনন্দ-উৎসবের দিন হিসেবে পালিত হচ্ছে।
জাতীয় শোক দিবসের আনুষ্ঠানিকতা ব্যাপক-বিশাল। ১ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে যেমন, বিশেষ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনসমূহ জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করে। বঙ্গবন্ধু ও ১৫ আগস্টের পোস্টার, ছবি প্রকাশ ছাড়া অসংখ্য স্মরণিকা ও স্মারক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। বলা যেতে পারে, জন্ম ও মৃত্যুকে ঘিরে কবিতা, গান, গল্প, প্রবন্ধ মিলে বাংলা সাহিত্যের নতুন একটি শাখা-ই যেন গড়ে উঠেছে। ‘মুজিব সাহিত্য’। যেমন রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে ‘রবীন্দ্র সাহিত্য’। সাহিত্যের রচয়িতা কিন্তু শেখ মুজিব অথবা রবীন্দ্রনাথ নয়। এ সাহিত্যের নির্মাতা হলেন বাংলাদেশের মানুষ। বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে ইতোমধ্যেই যে পরিমাণ কবিতা, গান, প্রবন্ধ, নাটক, এমনকি ছোট গল্প রচিত হয়েছে এবং হচ্ছে নিঃসন্দেহে তা অতুলনীয়।
তারপরও কথা থেকে যায়। যাকে আমরা নানা অনুষ্ঠানে স্মরণ করি, এমনকি প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হই, তার জীবনাদর্শকে আমরা কতটুকু স্মরণ করি।
আমাদের দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাদের পূজনীয় দেবতা ও দেবীর বিগ্রহ গড়ে নানা বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে ধর্মীয় উৎসব পালন করেন। রবীন্দ্রনাথ এর বাহ্যিক আনন্দ-উৎসবের দিকটিকে ‘দুঃখপ্রবণ’ বাঙালিদের জীবনে ‘আনন্দ অবকাশ’ বলে স্বাগত জানিয়েছেন। কিন্তু তার একাধিক লেখায়, কবিতায় তিনি বিগ্রহ রূপী পাষাণ প্রতিমাকে ঘিরে বাঙালি হিন্দুর আনন্দকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি প্রশ্ন করেছেন, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনাচরণে তাদের দেবত্ব-মহত্ত্বকে কতটা অনুসরণ করি?
কথাটা ঘুরিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে অনুষ্ঠানের বিপুলত্ব এবং নিজেদের মুজিব অনুসারী হিসেবে বিজ্ঞাপিত করা নিয়েও প্রশ্ন করা যেতে পারে। যে মানুষটিকে ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ বলে আমরা গৌরব অনুভব করি, তার জীবনাদর্শকে আমরা কতটা অনুসরণ করি।
বঙ্গবন্ধু তার অসংখ্য বক্তৃতায়, অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং কারাগারের রোজনামচা’য় যেসব উপলব্ধির কথা বলেছেন, রাজনৈতিক কর্মীদের অনুসরণযোগ্য আচরণের কথা বলেছেন, যেসব নীতি-নৈতিকতাকে ‘মানুষ’ হওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তার কতটা আমরা অনুসরণ করি?
বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪-৭৫ সালে দ্বিতীয় বিপ্লবের ধারণা বা কনসেপ্ট প্রচার করার সময় আওয়ামী লীগ কর্মীদের উদ্দেশ্যে যেসব কথা বলেছিলেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক। কেবল সমকাল নয়, বঙ্গবন্ধুর এসব বাণী, উপদেশ এবং নির্দেশনা, প্রতিটি মুজিব আদর্শের অনুসারী কর্মীর কাছে প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে অবশ্য পালনীয় বলে আমরা মনে করি।
বঙ্গবন্ধু বলেছেন, যারা জনগণের সম্পদ চুরি করে, যারা আমার গরিবের মুখের গ্রাস কেড়ে নেয়, যারা দুর্নীতিবাজ, মজুতদার, চোরাকারবারী তারা ‘মানুষ’ না। যে মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করে সেই সাম্প্রদায়িক পশু মানুষ না। যে ক্ষমতার দম্ভে ধরাকে সরা জ্ঞান করে আমার দলে তাদের স্থান নেই।
বঙ্গবন্ধু একটা কথা বারবার বলেছেন, সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। আমরা যদি সোনার মানুষ না হই, আমরা যদি জনগণের আস্থাভাজন সেবক না হই, আমরা যদি জনগণের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অর্জন করতে না পারি তাহলে ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্তদান ব্যর্থ হয়ে যাবে। আমাদের স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে।
বঙ্গবন্ধু সংবিধান সংশোধন করে সমগ্র জাতিকে এক প্লাটফরমে এনে বাঙালির আর্থ-সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির দিক-নির্দেশনা দিতে গিয়ে ২৫ জানুয়ারি ১৯৭১, জাতীয় সংসদে প্রদত্ত ভাষণে বলেন, “… কিছু দুর্নীতিবাজ, কিছু ঘুষখোর, কিছু শোষক, কিছু ব্ল্যাক মার্কেটার্স বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করতে পারবো না, এ-কথা আমি বিশ্বাস করি না। যদি সকলে মিলে নতুন প্রাণ নতুন মন নিয়ে খোদাকে হাজির নাজের করে আত্মসমালোচনা করে, আত্মসংশোধন, আত্মশুদ্ধি করে, যদি ইনশাল্লাহ কাজে অগ্রসর হন, বাংলার জনগণকে আপনারা যা বলবেন, তারা তাই করবে। আপনাদের অগ্রসর হতে হবে।…”
বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা জাতির পিতার নির্দেশিত পথে সোনার বাংলা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই বিপুল সাফল্য অর্জন করেছেন। দেশ এখন উন্নয়নের সড়কে। কিন্তু জননেত্রী শেখ হাসিনার এই উন্নয়ন অভিযাত্রাকেও কিছু সংখ্যক ‘দুর্নীতিবাজ’, ‘শোষক’ এবং ‘ঘুষখোর’ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারী ব্যর্থ করে দেওয়া, মøান করে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করছে। জাতির পিতার উল্লিখিত কথাগুলো মনে রেখে আমাদের আত্মসমালোচনা, আত্মসংশোধন এবং আত্মশুদ্ধি করে এই দুর্নীতিবাজ, শোষক ও ঘুষখোরদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে হবে। কাজটা একমাস, একদিন বা একবছরের নয়। প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তেই আমাদের বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাশিত ‘সোনার মানুষ’ হওয়ার সাধনায়, কেবল কথায় নয় কাজেও ব্রতী হতে হবে। আসুন আমরা প্রত্যেকে নিজেরা দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে, এই মহৎ কাজে অন্যদেরও উৎসাহিত করি। আর তাহলেই জাতির পিতার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানো হবে।

শ্রেণী:

তৃণমূলের নেতাকর্মীরা দলের প্রাণস্পন্দন

Posted on by 0 comment

গত ২৩ জুন, দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নতুন অফিস উদ্বোধন এবং জেলার বিভিন্ন স্তরের আমন্ত্রিত ৬ সহস্রাধিক নেতাকর্মী এবং ৩০ জুন তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের বিভাগওয়ারি সমাবেশে সভাপতি শেখ হাসিনা যে দিক-নির্দেশনামূলক ভাষণ দিয়েছেন, তা আওয়ামী লীগের ধমনিতে রক্তপ্রবাহ যেমন বাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি বাড়িয়েছে দলের হৃদস্পন্দন। টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থেকেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন নি, জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা, তাদের মন-মানসিকতা যে ভুলে যান নি, এই দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্যে তা সুস্পষ্টভাবে অভিব্যক্ত হয়েছে।
তৃণমূলের নেতাকর্মীরা হচ্ছে দলের প্রাণ। বাংলাদেশের ৬৫ হাজার গ্রামে রয়েছে আওয়ামী লীগের শেকড়। গ্রাম-ওয়ার্ড-ইউনিয়ন হচ্ছে এক কথায় তৃণমূল। অবশিষ্ট স্তরগুলো হলো উপজেলা/শহর, জেলা/মহানগর এবং সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছে কেন্দ্র ও কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। এই বিভিন্ন স্তরের সাথে দেশবাসী বিশেষত, সাধারণ মানুষের সম্পর্কেরও রয়েছে তারতম্য। যে মানুষগুলো দুর্গম কোনো নিভৃত পল্লিতে অথবা বিচ্ছিন্ন কোনো ছোট্ট শহরের পাড়ায়-মহল্লায় বসবাস করে, কার্যত তারাই হচ্ছে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। এই সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের সাথেই মিলেমিশে থাকেন আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তারাই দলের কর্মসূচি বলুন, সভানেত্রী শেখ হাসিনার কথা বলুন এবং স্থানীয় উপজেলা/জেলা পর্যায়ের নেতাদের কথা বলুন, জনগণের মধ্যে প্রচার করেন। এই তৃণমূলের নেতা-কর্মীদেরই আবার সরকারের বিভিন্ন কর্মকা-ের জন্য সরাসরি মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। কেবল সরকারের কর্মকা- না, ইউনিয়ন, উপজেলা, এমপি, মন্ত্রী ও জেলা এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের কার্যকলাপ, আচার-ব্যবহার, ভালো-মন্দ, সুনীতি-দুর্নীতি, তারা দলের পক্ষে বা দলবিরোধীÑ দেশের স্বার্থবিরোধী যে কোনো কাজ করেন, তার জন্য এই তৃণমূলের নেতা-কর্মীদেরই সরাসরি সাধারণ মানুষের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। তাদের মতামত শুনতে হয়। তাদের চাওয়া-পাওয়া, আশা-আকাক্সক্ষার কথা শুনতে হয়। এমনকি দলের ওপর আঘাত এলে তাদেরকেই প্রথম রুখে দাঁড়াতে হয়। বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে তারা সাধারণ মানুষের সাথে একাত্ম হয়ে থাকেন। কার্যত তৃণমূলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা কোনো ভিন্ন জাতের মানুষ নন। তারা সাধারণ মানুষেরই অংশ। বলা যেতে পারে রাজনৈতিক সচেতন অংশ।
দীর্ঘ ৩৭ বছর একটানা দলের সভাপতি এবং তিন দফায় প্রায় ১৫ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার পালন করলেও জননেত্রী শেখ হাসিনা তৃণমূলের সাথে তার নিজের সম্পর্ক যেমন অটুট রেখেছেন, তেমনি তাদের শক্তি-দুর্বলতাগুলোও সম্যক অবহিত আছেন।
গত দুই দফায় টানা প্রায় ১০ বছর ক্ষমতায় থেকে বাংলাদেশের যে বিস্ময়কর উন্নয়ন হয়েছে, গরিব-মেহনতি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের ধারার সূচনা হয়েছে এবং বিশ্বে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল হয়ে উঠেছে, তার সুদূরপ্রসারী গভীর তাৎপর্য সম্পর্কে জনগণকে কিন্তু তেমনভাবে সচেতন-শিক্ষিত করা হয়নি। ফলে তথ্যের স্বল্পতা, উন্নয়নের আলটিমেট ফলাফল এবং বিরোধীপক্ষের অপপ্রচারের ফলে সৃষ্ট বিভ্রান্তির কারণে আওয়ামী লীগের সাথে ভোটারদের একাংশের সাথে কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এত বিশাল উন্নয়নের পরও কোথাও, স্থানীয় নির্বাচন হোক আর জাতীয় নির্বাচন হোক, আওয়ামী লীগ প্রার্থী যদি জয়লাভ করতে না পারে। সেজন্য কাকে দায়ী করবেন?
জননেত্রী শেখ হাসিনা তৃণমূল নেতাদের সে কথাটিই নানাভাবে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করেছেন। তৃণমূল নেতারা যেমন সাধারণ মানুষকে আওয়ামী লীগের পক্ষেÑ নৌকার পক্ষে সংগঠিত করবেন, তেমনি তৃণমূল নেতা-কর্মীদেরও সংগঠিত করার দায়িত্ব দলের উপজেলা ও জেলার নেতৃবৃন্দের। দেশকে কী দিতে পারলাম এবং ভবিষ্যতে কী কী দিতে পারব, সমস্বরে এই কথাগুলো যদি মানুষকে বলা না যায়, তার বদলে ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া, দলের অভ্যন্তরের দলাদলি, ভুল বুঝাবুঝি অথবা জনগণের পছন্দ নয়, এমনসব বিষয় নিয়েই যদি নেতাকর্মীরা ব্যস্ত থাকেন, তাহলে শত ভালো কাজ করেও জনগণের আস্থা অর্জন সম্ভব হবে না। সে জন্যই প্রধানমন্ত্রী কোনো রাখঢাক বা ভণিতা না করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ভর করবে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের ওপর। তিনি সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, নির্বাচনে সহজে বাজিমাত করা যাবে না। নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। প্রতিপক্ষকে দুর্বল ভাবা ঠিক না। দেশবাসীকে সরকারের বহুমুখী উন্নয়নের কথা, মানুষের কল্যাণে গৃহীত নানা ব্যবস্থা এবং তার সুফলসমূহ চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ অবিবেচক নয়। তবে তারা সহজে অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হতে পারে। অতএব, জনগণকে যাতে কেউ বিভ্রান্ত করতে না পারে, তারা যেন উন্নয়ন ও সাফল্যের কথাগুলো ভালোভাবে জানে এবং ক্ষমতায় আওয়ামী লীগের ধারাবাহিকতা না থাকলে দেশ যে আবার অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে পারে, সে কথাগুলো তৃণমূল পর্যায় থেকে সর্বস্তরে ব্যাপক প্রচার চালিয়ে দেশবাসীকে জানাতে হবে। তাদেরকে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সংগঠিত করতে হবে। একইসঙ্গে নিজেদের ভুল-ত্রুটিগুলি সংশোধন এবং দলে কোনো সুবিধাবাদী-অনুপ্রবেশকারী ভিন্ন আদর্শের লোক ঢুকে থাকলে তাদের কালো থাবা থেকে দলকে মুক্ত করতে হবে।
জননেত্রী শেখ হাসিনা দলের কর্মীদের পালস্ বুঝেছেন এবং হৃদস্পন্দন শুনতে পান। অতএব, নেত্রীর দিক-নির্দেশনা মনে রেখে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়–ন। তার কথা শুনুন। তার হাত শক্তিশালী করুন। বিজয় আমাদের অনিবার্য।

শ্রেণী:

দেশ ও তরুণ প্রজন্মকে বাঁচাতে মাদকবিরোধী অভিযান

Posted on by 0 comment

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে মাদক চোরাচালান, অবৈধ মাদক ব্যবসা এবং মাদকাসক্তি উদ্বেগজনক পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল। মাদকাসক্তি একটা জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের নগর-বন্দর-গ্রাম সর্বত্র মাদকের কালো থাবা বিস্তার লাভ করেছে। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে মাদক তিল তিল করে এক ধরনের ‘গণহত্যার’ শিকারে পরিণত করেছে। মাদকের ক্রমবর্ধমান সর্বনাশা নেশার জন্য কেবল তরুণ প্রজন্মই ধ্বংসের কবলে পড়েনি। সমগ্র জাতি আজ এই জন্য মূল্য দিচ্ছে।
সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মাদকের বিরুদ্ধে প্রকারান্তরে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, মাদকের প্রশ্নে কোনো ছাড় নেই। জিরো টলারেন্সের ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মাদক ব্যবসায়ী, চোরাচালানি চক্র ও সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বাত্মক অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছেন, আমরা আমাদের সন্তানদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারি না। সরকারের সুস্পষ্ট ঘোষণা রয়েছে, রাজনৈতিক দল ও মতামতের ঊর্ধ্বে মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ অভিযান চলবে।
গত ৩ মে র‌্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে মাদক নির্মূলে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দেওয়ার পর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে। মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাচালানি চক্রও বসে নেই। তারা মাদকবিরোধী অভিযানকালে, তাদের সাম্রাজ্য হারানোর ভয়ে মরিয়া হয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে। ফলে গত ৪ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত বন্দুকযুদ্ধে ১২৬ জন মাদক ব্যবসায়ী, চোরাচালানি নিহত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও অনেক সদস্য আহত হয়েছেন। উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ মাদক (ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন প্রভৃতি) এবং অবৈধ অস্ত্র। ইতোমধ্যে সারাদেশে পরিচালিত চিরুনি অভিযানে গ্রেফতার হয়েছে ১০ সহ¯্রাধিক মাদক ব্যবসায়ী।
সরকারের এই মাদকবিরোধী অভিযানকে দেশবাসী স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু আমাদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং ‘মানবাধিকারের সোল এজেন্ট’ হিসেবে পরিচিত কিছু এনজিও সংগঠন ও ‘বুদ্ধিমান’ ব্যক্তি তীব্র ভাষায় সমালোচনা করছেন। সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য, নিহত মাদক ব্যবসায়ী-সন্ত্রাসীদের জন্য তারা চোখের জলে-হাঁটুর জলে বুক চাপড়িয়ে গণমাধ্যমের পর্দা ও পৃষ্ঠা ভিজিয়ে ফেলছেন। অথচ এই মানবাধিকার কারবারীদেরই দেখেছি, জিয়াউর রহমান যখন ১৯৭৬-৭৭ সালে কারাগারে আটক বিমান বাহিনী, সেনাবাহিনীর অগণিত সদস্য (এক হিসাবে ৬০০ জন)-কে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের নামে কার্যত বিনাবিচারে ফাঁসিতে লটকিয়ে হত্যা করেছে, তখন কেউ ‘টুঁ’ শব্দটি পর্যন্ত করেনি। সামরিক শাসকের ভয়ে থরহরিকম্প মানবাধিকার কারবারীরা সেদিন নীরব ভূমিকা পালন করেছে। ২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত খালেদা জিয়ার সরকার সেনাবাহিনী নিয়োগ করে অপারেশন ক্লিনহার্ট অভিযান পরিচালনা করেছে। তখন প্রায় প্রতিদিনই ঘোষণা করা হয়েছে ধৃত ব্যক্তি নিরাপদ হেফাজতে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেছে। এভাবে সে যাত্রায় ৮৭ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার দুঃশাসনের সময়েই ১৪০০ মানুষকে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যা করা হয়েছিল।
মাদক একটা কালান্তক ব্যাধি। সমাজের উঁচু-নিচু কোনো স্তরের তরুণরাই এ সংক্রামক থেকে মুক্ত নয়। আমাদের স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে মাদকাসক্ত স্কুলছাত্রী ঐশীর কথা। ঐশী মাদকাসক্ত হয়ে তার পুলিশ কর্মকর্তা বাবা ও মাকে হত্যা করতে দ্বিধা করেনি। দেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রায়শই সংবাদপত্র-টেলিভিশন ও সামাজিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, মাদকের টাকা না পেয়ে ছেলে তার মাকে, বাবাকে হামলা করেছে, হত্যা করেছে। আমরা এ খবর দেখি ইয়াবা খেয়ে বাস চালানোর কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে কতজনের প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে। মাদকাসক্তির কারণে একটা মেধাবী প্রজন্মের তরুণ-তরুণী অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তার প্রভাব পড়ছে লেখাপড়ায়, ইভটিজিংয়ে, চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই প্রভৃতি অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধিতে। অতএব, এই মারাত্মক কালগ্রাস ব্যাধি থেকে, এই তিলতিল গণহত্যা থেকে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশÑ আমাদের তরুণ প্রজন্মকে যে-কোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি একসময় চীনের জনগণকে আফিম খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখার পরিকল্পিত চক্রান্ত করেছিল। জাগ্রত চীনের জনগণ সেই আফিমের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে পর্যন্ত নামতে বাধ্য হয়েছিল। মানবেতিহাসে চীনের ‘আফিম যুদ্ধ’ বা ‘অপিয়াম ওয়্যার’ হিসেবে খ্যাত সেই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। হাজার হাজার চীনা সৈনিক-জনযোদ্ধা তাদের প্রাণ দিয়ে কোটি কোটি চীনা জনগণ এবং চীনা জাতিকে আফিমের অভিশাপ থেকে রক্ষা করেছিল। আজকের বাংলাদেশেও আমাদের সেই আফিম যুদ্ধের মতোই মাদকবিরোধী যুদ্ধে জয়লাভ করতে হবে। এর জন্য কিছু প্রাণ যাবে না তা নয়। কিন্তু আজ যদি মাদকবিরোধী অভিযান ব্যর্থ হয়, তা হলে কোটি কোটি বাঙালি তিলতিল করে অনিবার্য মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে।
আমরা কেবল আইনি ব্যবস্থাকে একমাত্র নিদান মনে করছি না। আমরা মনে করি, মাদক ব্যবসায়ী চোরাচালানি চক্রকে উৎখাতের বর্তমান অভিযান একটা সীমিত অভিযান। কেননা, মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে, মাদক চোরাচালানিদের আন্তর্জাতিক চক্রকে সমূলে উৎখাত এবং এর পেছনের গডফাদারদের ধরে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে না পারলে একে নির্মূল করা যাবে না। সাময়িকভাবে হয়তো মাদক ব্যবসায় ভাটা পড়বে অথবা মাদকাসক্তির প্রকোপ কমবে। কিন্তু স্থায়ী ব্যবস্থা করতে না পারলে আবার এই সংক্রামক ব্যাধি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। অতএব, আমরা চলমান অভিযানের যেমন সাফল্য চাই, তেমনি সামাজিক প্রতিরোধ ও স্থায়ী প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ দেখতে চাই। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার প্রতি দেশবাসীর আস্থা আছে। কেবল তিনি একাই মাদকের করাল গ্রাস থেকে দেশকে রক্ষা করতে পারবেন না। দলমত নির্বিশেষে সমগ্র জাতিকে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

শ্রেণী:

মে দিবসের চেতনা, আমাদের সংবিধান ও উন্নয়ন

Posted on by 0 comment
uttaran May Cover

uttaran May Coverস্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি তথা মে দিবসকে ‘ছুটি’ হিসেবে ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণা শ্রমজীবী মানুষের ন্যায়সংগত সংগ্রাম, অধিকার এবং শোষণ-বঞ্চনা থেকে তাদের মুক্তির অঙ্গীকারের প্রতি সংহতির নজির।
কেবল মে দিবসে রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণাই নয়, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সংবিধানে শ্রমিক-কৃষক-শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট নিশ্চয়তার কথা সংযোজিত করেন।
আমাদের সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে মেহনতি মানুষকে-কৃষক শ্রমিককে-জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি দান করা।” এরপর ১৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়, “রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায় :
ক. অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা;
খ. কর্মের অধিকার, অর্থাৎ কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসংগত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার;
গ. যুক্তিসংগত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার; এবং
ঘ. সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার…।
সংবিধানের উল্লিখিত দুটি অনুচ্ছেদ এবং দুই শতাব্দীব্যাপী শ্রমিক-শ্রেণি ও মেহনতি মানুষের সংগ্রামের দাবি, আকাক্সক্ষা এবং স্বপ্নের কোনো পার্থক্য নেই। বাংলাদেশের সংবিধানের মতো এমন সুস্পষ্ট ভাষায় তৃতীয় বিশ্বের অন্য কোনো দেশের সংবিধানে এসব অধিকার, অঙ্গীকার ও লক্ষ্যের কথা ঘোষণা করা হয়েছে কি না, আমাদের জানা নেই।
সংবিধান হচ্ছে একটি দেশের মৌলিক দলিল। এ কথা সত্য, সংবিধানে ঘোষিত অঙ্গীকার ও লক্ষ্যগুলি রাতারাতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। ১৫ অনুচ্ছেদে যে, ‘পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের’ কথা বলা হয়েছে, সেই বিকাশ, ‘বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন’ করতে না পারলে, ১৫ অনুচ্ছেদের ক, খ, গ ও ঘ ধারাগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়, এ কথা নিঃসন্দেহে সকলেরই বোধগম্য।
আমাদের দেশের স্বাধীনতার ৪৭ বছর এবং সংবিধান প্রণয়নের ৪৬ বছর ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে। এই ৪৬ বছরে সংবিধানে বর্ণিত অঙ্গীকারসমূহ ও লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে, স্বাভাবিকভাবেই এই জিজ্ঞাসা আমরা নিজেদেরই করতে পারি।
বাংলাদেশ এখন অনুন্নত বা পশ্চাৎপদ দরিদ্র দেশের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে এসেছে। আমাদের দেশ এখন ‘উন্নয়নশীল’ দেশের পঙ্ক্তিভুক্ত। আমাদের প্রবৃদ্ধির হার ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের মাথাপ্রতি আয় ১৬৬০ ডলারে উন্নীত। আমরা এখন মধ্যম আয়ের দেশের সোপানে পা রেখেছি। আমাদের দেশ খাদ্যে আত্মনির্ভরশীল। আমাদের গড় আয়ুষ্কাল উপমহাদেশে সবচেয়ে বেশি, ৭২ বছর। আমরা কৃষিনির্ভরতা থেকে শিক্ষা ও সেবানির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছি। নারীর ক্ষমতায়নে আমরা গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। আমাদের রয়েছে নির্ভরযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। আমরা নিজস্ব আয় দিয়ে পদ্মাসেতু নির্মাণ করছি। আমরা দারিদ্র্য ২২ শতাংশে কমিয়ে এনেছি। সবাই আমাদের বলে বিস্ময় অর্থনীতি বা মিরাক্যাল ইকোনমি।
এই যদি হয় উন্নতির, পরিকল্পিত বিকাশের ছবি, তাহলে স্বাভাবিকভাবে প্রত্যাশা করা যায় সংবিধানের ১৪ ও ১৫ অনুচ্ছেদে যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের সময় এসে গেছে।
আমাদের স্বীকার করতেই হবে ১৪ ও ১৫ অনুচ্ছেদের প্রতিটি অঙ্গীকার না হলেও অনেকগুলোই ইতোমধ্যে আংশিক বা ক্ষেত্রবিশেষে বহুলাংশে বাস্তবায়িত হয়েছে।
কিন্তু মনে রাখতে হবে, উন্নতির ফসল যতটা গরিব, খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের ঘরে যাওয়ার কথা ছিল, ততটা কিন্তু যায় নি। সমাজের যেমন সম্পদ বেড়েছে, তেমনি সম্পদের মালিকানা নিয়ে বৈষম্যও বেড়েছে। দারিদ্র্যের হার কমানো, নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য। কিন্তু সংবিধানে যা রয়েছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু যে কথা বলেছেন, সেই শোষণহীন, বৈষম্যমুক্ত সমাজ কিন্তু এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। উল্টো ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য বেড়েছে। ধন বৈষম্য এখন আকাশচুম্বী। সমাজতন্ত্রের স্বপ্নের কথা বাদ দিলাম, একটি ‘কল্যাণরাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও কিন্তু আমরা কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে (২০১৪) বলা হয়েছে, ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আসন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জয়লাভ করলে, দেশের উন্নয়নের ও বিকাশের গতিমুখ নিশ্চিতভাবে সেদিকেই যাবে। কিন্তু সাথে সাথে মানুষে মানুষে, শ্রেণিতে শ্রেণিতে ভেদ-বৈষম্য ও শোষণ-বঞ্চনা কমাতে না পারলে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য যেমন মুখ থুবড়ে পড়বে, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মে দিবসের চেতনা বাস্তবায়নও স্বপ্নই থেকে যাবে। আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে, তারা যা বলে তা তারা বাস্তবায়িত করতেও সক্ষম। এজন্য অপেক্ষার পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষকে আরও সুসংগঠিত হতে হবে। শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে হবে। মে দিবসে দেশের শ্রমজীবী ভাই-বোনদের শুভেচ্ছাÑ অভিনন্দন।

শ্রেণী:

বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ

Posted on by 0 comment
Uttoron Cover Aprl18 copy

Uttoron Cover Aprl18 copyআর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ একটা নতুন পর্যায়ে উন্নীত হলো। আমাদের জাতির কপালে যে দারিদ্র্য-লাঞ্ছিত চিহ্ন আঁকা ছিল সেটি এখন প্রায় মুছে গেছে। স্বল্পোন্নত দেশের তকমাটা ছিঁড়ে বাংলাদেশ এখন ‘উন্নয়নশীল’ দেশের স্তরে উন্নীত হয়েছে। ৪৮তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে জাতিসংঘের এই স্বীকৃতি আমাদের আনন্দ-গৌরবকে নতুন ব্যঞ্জনা দান করেছে। এই ঐতিহাসিক অনন্য অর্জনের জন্য উত্তরণ দেশবাসীকে উষ্ণ অভিনন্দন জানাচ্ছে। আমরা একইসঙ্গে অভিনন্দন জানাই বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাকে, যাঁর ডায়নামিক নেতৃত্বে বাঙালি জাতি দারিদ্র্যের লজ্জা ঘুচিয়ে উন্নয়নের এই গুরুত্বপূর্ণ সোপানে পা রাখতে সক্ষম হলো।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সাফল্যকে উৎসব-মুখরতায় উদযাপন করেছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগও নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই গৌরবোজ্জ্বল অর্জনকে বর্ণাঢ্য উৎসবে পরিণত করেছে। তবে কেউ কেউ, কোনো কোনো দল, এই আনন্দ-গৌরবে অংশগ্রহণ না করে সরকার ও আওয়ামী লীগকে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ করেছে। তারা মনে করেন, এত আদিখ্যেতার দরকার কী? অন্য দেশ তো এমন উৎসব ও হৈচৈ করছে না।
বলাবাহুল্য আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিপক্ষ দল বা সরকারের ভালো কাজের বা সাফল্যের প্রশংসা করার কোনো নজির নেই। উল্টো বরং ‘যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা’ ধরনের মনোভাবের কারণে সরকারের সাফল্যকেও ‘ব্যর্থতা’ হিসেবে চিত্রিত করার অপপ্রয়াস লক্ষ্যণীয়।
উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার বিষয়টিকে আমরা যে এত বড় করে দেখছি, তার পেছনে রয়েছে এক বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর এক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পান। ধ্বংস, রক্ত, সম্পদহীনতা এবং বৈরী আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দেশের পুনর্গঠনকে দুরূহ করে তোলে। চরম প্রতিকূলতার মধ্যে বঙ্গবন্ধু দেশকে যুদ্ধের পূর্বাবস্থায় এনে উন্নয়নের সড়কে টেনে তোলার জন্য সর্বতোভাবে চেষ্টা করেন। বঙ্গবন্ধুর শাসনকালের সাড়ে তিন বছরে আমাদের জিডিপি-র হার ৭ শতাংশের উপরে উঠে যায়। তা সত্ত্বেও ১৯৭৪ সালের মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষে হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। বন্যাজনিত কারণে ফসলহানি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য কূটনীতি এই দুর্ভিক্ষকে অনিবার্য করে তোলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবায় পাটের বস্তা রপ্তানির ‘অপরাধে’ বাংলাদেশকে ‘শাস্তি’ দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে প্রদেয় খাদ্য না দিয়ে এই দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি এবং হাজার হাজার মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। এতদসত্ত্বেও ১৯৭৪-এর শেষ দিকে পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে।
বাংলাদেশের তৎকালীন আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুঁড়ি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কিসিঞ্জারের ধারণা ছিল বাংলাদেশ একটি অকার্যকর দেশ। একই কথার প্রতিধ্বনি আমরা শুনতে পাই তৎকালীন বিশ্বব্যাংকের ঢাকাস্থ দুই কর্মকর্তার গবেষণা-মন্তব্য থেকে। জাস্ট ফা’ল্যান্ড এবং পার্কিনসন্স বলেছিলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন একটা টেস্ট কেস। তাদের ধারণা ছিল বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব হলে, পৃথিবীর অন্য যে কোনো দেশের উন্নয়নও সম্ভব হবে। এ কথার নির্গলিতার্থ হলো বাংলাদেশের উন্নয়নের আদৌ কোনো সম্ভাবনা নেই।
ঔপনিবেশিক আমল থেকে পরনির্ভরশীল, পশ্চাৎপদ এবং দারিদ্র্যলাঞ্ছিত বাংলাদেশ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে উন্নয়নের পথে পা বাড়ায়। আমাদের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বাংলাদেশের উন্নয়ন-দর্শন ও স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণ করা হয়। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘ভিক্ষুকের জাতির কোনো সম্মান থাকে না।’ তাই বাংলাদেশকে একটি আত্মনির্ভরশীল উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তিনি প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ই দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্প উপস্থাপন করেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন রূপকল্পেরও সমাধি ঘটে। জিয়া, এরশাদ ও খালেদার ২১ বছরের দুঃশাসন বাংলাদেশকে দারিদ্র্যের ফাঁদে আটকে রাখে। আমাদের জাতীয় জীবন থেকে ২১ + ৭ = ২৮টি (১৯৭৫-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৮) বছর অপচয় হয়ে যায়। আমরা স্বল্পোন্নত দেশের তকমা এঁটে ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে নিয়েই বিশ্বে মিসকিনের জাতি হিসেবে পরিচিতি অর্জন করি।
কিন্তু ১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বছর এবং ২০০৯ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত প্রায় ১০ বছর, অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার প্রায় ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ দারিদ্র্যের ফাঁদ ভেঙে বেরিয়ে এসেছে।
১৬ কোটি মানুষের দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখন খাদ্যে আত্মনির্ভরশীল। আমাদের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৬০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের একটা নির্ভরযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় গড়ে উঠেছে। মানবসম্পদের বিস্ময়কর উন্নতি হয়েছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে মানুষের সংখ্যা ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ১৭০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, গড় আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি প্রভৃতি সূচক এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির ফলে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের বৃত্ত ভেঙে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
এই অর্জনই বিশ্বে আমাদের নতুন মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। আর সে কারণেই আমাদের গৌরব ও আনন্দটা একটু বেশি। দারিদ্র্যের লজ্জা ঘুচিয়ে আমরা যে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারি, সেটি প্রমাণিত হওয়ায় আমাদের উৎসব পালন অত্যন্ত স্বাভাবিক। অন্যদিকে যারা দেশকে দারিদ্র্যের শৃঙ্খলে আটকে রাখতে চায়, যারা পরনির্ভরশীলতার দর্শনে ও রাজনীতিতে বিশ্বাসী, তারা বাঙালি জাতির এই সাফল্যে বেজার হবেনÑ এটাও স্বাভাবিক। তবে দেশবাসী এতে বিভ্রান্ত হবে না; বরং উন্নয়নবিরোধী ঐসব অপশক্তিকেই ধিক্কার জানাবে।

শ্রেণী:

মার্চ : গৌরব ও আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার মাস

Posted on by 0 comment
3-4-2018 7-16-48 PM

3-4-2018 7-16-48 PMমার্চ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের গৌরব ও আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার মাস। বাঙালি জাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শুভ জন্মদিন, এই মাসের ১৭ তারিখ। ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে নানা তাত্ত্বিক বিতর্ক রয়েছে। বলা হয়ে থাকে জনগণ হচ্ছে ইতিহাসের নির্মাতা। এ কথাটা যেমন সত্য, তেমনি ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির ভূমিকা হয়ে ওঠে ইতিহাস নির্মাণের অনুঘটক এবং নিয়ামক। বঙ্গবন্ধু ছিলেন তেমনি বাঙালির স্বাধীনতা ও জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার মহানায়ক। ১৭ মার্চ তাই আমাদের সৌভাগ্যের দিন, আনন্দের দিনÑ উৎসবের দিন। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ওই মহামানব আসে। দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে…। ১৭ তারিখ মহামানব শেখ মুজিবুর রহমানের আবির্ভাব দিবস হিসেবে আমাদের রোমাঞ্চিত করে, উদ্বেলিত করে। শুভ জন্মদিনে জাতির পিতার প্রতি আমাদের নমিত শ্রদ্ধা।
৭ মার্চ ও ২৬ মার্চ এক সুতোয় গাঁথা পরিপূরক দিন। আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দ যদি মুক্তিযুদ্ধকালে ‘৭ মার্চকে স্বাধীনতা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করতেন তাতে ইতিহাসের তেমন কোনো ব্যত্যয় ঘটত না। বিষয়টার তৎকালীন রাজনৈতিক তাৎপর্য এবং আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশনের কারণে ২৬ মার্চকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন দেশ হিসেবে ঘোষণা করেন এবং হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা দিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ৭ মার্চ-ই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সংগ্রামের লক্ষ্য ও চরিত্র নির্ধারণ করে দেন। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রামÑ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’Ñ এই ঘোষণার মধ্যেও কোনো দ্ব্যর্থবোধকতা ছিল না। তবে এটাকে টেকনিক্যালি ‘আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা’ বলা যায় নি; কারণ তখন তা করলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশকে, বঙ্গবন্ধুকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ পেত। দ্বিতীয়ত; ৭ মার্চের ভাষণ ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এক ধরনের আল্টিমেটাম। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই দাবি উত্থাপন করে বলেছিলেন, “আমার দাবি মানতে হবে প্রথম। সামরিক আইন, মার্শাল ল’ উইথড্র করতে হবে, সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে, যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের বিচার করতে হবে। এবং জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপর আমরা ভেবে দেখব এসেমব্লিতে বসতে পারি কি না।” সাদামাঠাভাবে কেউ বলতে পারেন, এই দাবি মেনে নেওয়া হলে, অর্থাৎ জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করলে তো, মেজরিটি পার্টি আওয়ামী লীগের কাছে পাকিস্তানের ক্ষমতা হস্তান্তরিত করতে হতো। তার মানে দাঁড়াত পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করত আওয়ামী লীগ। দৃশ্যত, এ রকম ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। তর্কের খাতিরে বলাও যায়, পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যদি এই দাবি মেনে নিত, তাহলে তো পাকিস্তান ঐ যাত্রায় টিকে যেত।
কিন্তু ইতিহাস এত সহজ-সরল পথে চলে না। বাস্তবতা হচ্ছে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কখনোই বাঙালিদের হাতে নিরঙ্কুশ রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারে না। বঙ্গবন্ধু এটা জেনে-বুঝেই ৭ মার্চের ভাষণে এসব পূর্বশর্ত দিয়েছিলেন। আইনের দৃষ্টিতে যা ন্যায়সংগত এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও যুক্তিসংগত ছিল। ৭ মার্চ সংগ্রামের লক্ষ্য স্বাধীনতা ঘোষিত হলেও, এই যে ‘আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটি’ বঙ্গবন্ধু দেন নি, এটি তার রাষ্ট্র নায়কোচিত দূরদর্শিতা এবং দেশবাসীকেও চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ দেওয়া। ৭ মার্চ স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলে, যুদ্ধ শুরুর জন্য প্রথম আক্রমণকারী হিসেবে বাংলাদেশকেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দায়ী করত। আর ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেওয়ার পথে আর কোনো রাজনৈতিক, নৈতিক, আইনগত এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য বাধা থাকে না। বস্তুত, ৭ মার্চেরই যৌক্তিক পরিণতি হচ্ছে ২৬ মার্চ, আমাদের প্রিয়তম স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ এখন সমগ্র মানব জাতির ঐতিহাসিক দালিলিক মর্যাদায় ভূষিত হয়েছে। এই অর্জনের পটভূমিকায় এবারের স্বাধীনতা দিবস নিঃসন্দেহে নবতর তাৎপর্য অর্জন করেছে। ৭ মার্চ ও ২৬ মার্চÑ স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে আমরা স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদানের স্মৃতি। শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই প্রিয় দেশবাসীকে।

শ্রেণী:

প্রধান বিচারপতি নিয়োগকে স্বাগত

00

00মহামান্য রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদের ৩নং দফা এবং ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গত ১ ফেব্রুয়ারি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করেছেন। বিচারপতি এসকে সিনহার পদত্যাগের ফলে দীর্ঘদিন প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য ছিল। প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য থাকায়, এ নিয়ে বিএনপিসহ বিভিন্ন মহল তীব্র সমালোচনার ঝড় তুলেছিল। তারা দেশবাসীকে এই বলে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে যে, প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হলে ‘অবিলম্বে শূন্যপদে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ দান করতে হবে।’
এখানে দুটি অসত্য তথ্য পরিবেশন করে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। প্রথমত; প্রধান বিচারপতির পদ কোনো কারণে শূন্য হলে উক্ত শূন্যপদে জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব অর্পণের কথা থাকলেও, নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগের কোনো সময় নির্ধারণ করে দেয়নি সংবিধান। সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদে শূন্যপদে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ব্যাপারে রাষ্ট্রপতিকে কোনো সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। পুরো বিষয়টি মহামান্য রাষ্ট্রপতির সন্তুষ্টি ও স্বাধীন ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। একজন ভারপ্রাপ্ত বিচারপতি কতদিন ‘ভারপ্রাপ্ত’ থাকবেন তারও কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। তবে বলা হয়েছে, নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগের পূর্ব পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত বিচারপতি তার দায়িত্ব পালন করবেন। অতএব, এখানে সময়সীমা কোনো সমস্যা নয়। দ্বিতীয়ত; সংবিধানের কোথাও লেখা নেই যে, জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকেই প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে। অথচ বিএনপি, একশ্রেণির আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী ও সংবাদপত্র ‘জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন’ করে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ঢালাও অভিযোগ করে রাষ্ট্রপতির মর্যাদাকেই ক্ষুণœ করেন নি, সরকারের ওপর অহেতুক দোষারোপ করে চলেছেন।
আমরা সংবিধানের আলোকে বিষয়টি পরিষ্কার করে বলতে চাই। আমাদের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মূলত নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধান; কিন্তু দুটি বিষয়ে রাষ্ট্রপতির রয়েছে একচ্ছত্র ক্ষমতা। রাষ্ট্রপতি কারও সাথে পরামর্শ না করে যেমন নির্ধারিত মানদ- অনুযায়ী দেশের প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করতে পারেন, তেমনি প্রধান বিচারপতি নিয়োগেও তিনি স্বাধীন এবং একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদে এ কথা লেখা নেই যে, আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্য থেকেই প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে। সংবিধানে আছে ন্যূনতম ১০ বছর সুপ্রিমকোর্টে অ্যাডভোকেট হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা আছে, অথবা বিচার বিভাগে ন্যূনতম ১০ বছর কাজ করেছেন, এমন যে কোনো ব্যক্তিকেই রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে পারেন। এর নিরগলিতার্থ দাঁড়ায় হয়, বিচার বিভাগে (সেটি হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্ট নাও হতে পারে) ১০ বছর কাজ করেছেন অথবা সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী হিসেবে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন যে কোনো ব্যক্তিকেই রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করার অধিকার রাখেন। এ ব্যাপারে যেমন কোনো প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই, তেমনি রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে কোনো আদালতের শরণাপন্ন হওয়ারও সুযোগ নেই।
আর একটি বিষয়ে সকলের পরিষ্কার ধারণা থাকা বাঞ্ছনীয়। আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি হোক বা অন্য কোনো বিচারপতিই হোন, প্রধান বিচারপতি পদে কারও নিয়োগই ‘পদোন্নতি’ বলা অসাংবিধানিক। কারণ হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের যখন আপিল বিভাগে নিয়োগ করা হয়, সেটি কার্যত এক ধরনের পদোন্নতি।
কিন্তু প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ কোনো পদোন্নতি নয়। যদি পদোন্নতিই হতো তা হলে জ্যেষ্ঠতম বাধ্যতামূলক হতো। অথবা সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে লেখা থাকত আপিল বিভাগের বিচারপতিদের পদোন্নতি সংক্রান্ত বিধান। সংবিধানে বিচারপতিদের পদোন্নতির কোনো বিধান নেই।
যেহেতু সংবিধানে এ ব্যাপারে কোনো বিধান নেই এবং জ্যেষ্ঠতার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, সে কারণে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের বিষয়টিকে পদোন্নতি ধরা যাবে না। বস্তুত, রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি অ্যাপয়েন্ট করেন। বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকেও পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। তাকে ফ্রেস অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা নতুন নিয়োগ দান করা হয়েছে। আমরা অবশ্য এটা লক্ষ করেছি অতীতের মতো রাষ্ট্রপতি আপিল বিভাগ থেকেই প্রধান বিচারপতি নিয়োগের যে কনভেনশন বা ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, সেটিই অনুসরণ করেছেন।
আমরা মহামান্য রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। আশা করি, নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগের পর বিএনপি ও স্বার্থান্বেষী মহল আর এটা নিয়ে পানি ঘোলা করার চেষ্টা করবেন না। সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সকল বিতর্কের অবসান ঘটাবেন।
আমরা নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে স্বাগত ও অভিনন্দন জানাই। আমরা আশা করি, তিনি সংবিধান, ন্যায়নীতি ও বিচার বিভাগকে সমুন্নত রেখে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে সফল হবেন।

শ্রেণী: