মে দিবসের চেতনা, আমাদের সংবিধান ও উন্নয়ন

Posted on by 0 comment
uttaran May Cover

uttaran May Coverস্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি তথা মে দিবসকে ‘ছুটি’ হিসেবে ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণা শ্রমজীবী মানুষের ন্যায়সংগত সংগ্রাম, অধিকার এবং শোষণ-বঞ্চনা থেকে তাদের মুক্তির অঙ্গীকারের প্রতি সংহতির নজির।
কেবল মে দিবসে রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণাই নয়, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সংবিধানে শ্রমিক-কৃষক-শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট নিশ্চয়তার কথা সংযোজিত করেন।
আমাদের সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে মেহনতি মানুষকে-কৃষক শ্রমিককে-জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি দান করা।” এরপর ১৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়, “রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায় :
ক. অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা;
খ. কর্মের অধিকার, অর্থাৎ কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসংগত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার;
গ. যুক্তিসংগত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার; এবং
ঘ. সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার…।
সংবিধানের উল্লিখিত দুটি অনুচ্ছেদ এবং দুই শতাব্দীব্যাপী শ্রমিক-শ্রেণি ও মেহনতি মানুষের সংগ্রামের দাবি, আকাক্সক্ষা এবং স্বপ্নের কোনো পার্থক্য নেই। বাংলাদেশের সংবিধানের মতো এমন সুস্পষ্ট ভাষায় তৃতীয় বিশ্বের অন্য কোনো দেশের সংবিধানে এসব অধিকার, অঙ্গীকার ও লক্ষ্যের কথা ঘোষণা করা হয়েছে কি না, আমাদের জানা নেই।
সংবিধান হচ্ছে একটি দেশের মৌলিক দলিল। এ কথা সত্য, সংবিধানে ঘোষিত অঙ্গীকার ও লক্ষ্যগুলি রাতারাতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। ১৫ অনুচ্ছেদে যে, ‘পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের’ কথা বলা হয়েছে, সেই বিকাশ, ‘বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন’ করতে না পারলে, ১৫ অনুচ্ছেদের ক, খ, গ ও ঘ ধারাগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়, এ কথা নিঃসন্দেহে সকলেরই বোধগম্য।
আমাদের দেশের স্বাধীনতার ৪৭ বছর এবং সংবিধান প্রণয়নের ৪৬ বছর ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে। এই ৪৬ বছরে সংবিধানে বর্ণিত অঙ্গীকারসমূহ ও লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে, স্বাভাবিকভাবেই এই জিজ্ঞাসা আমরা নিজেদেরই করতে পারি।
বাংলাদেশ এখন অনুন্নত বা পশ্চাৎপদ দরিদ্র দেশের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে এসেছে। আমাদের দেশ এখন ‘উন্নয়নশীল’ দেশের পঙ্ক্তিভুক্ত। আমাদের প্রবৃদ্ধির হার ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের মাথাপ্রতি আয় ১৬৬০ ডলারে উন্নীত। আমরা এখন মধ্যম আয়ের দেশের সোপানে পা রেখেছি। আমাদের দেশ খাদ্যে আত্মনির্ভরশীল। আমাদের গড় আয়ুষ্কাল উপমহাদেশে সবচেয়ে বেশি, ৭২ বছর। আমরা কৃষিনির্ভরতা থেকে শিক্ষা ও সেবানির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছি। নারীর ক্ষমতায়নে আমরা গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। আমাদের রয়েছে নির্ভরযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। আমরা নিজস্ব আয় দিয়ে পদ্মাসেতু নির্মাণ করছি। আমরা দারিদ্র্য ২২ শতাংশে কমিয়ে এনেছি। সবাই আমাদের বলে বিস্ময় অর্থনীতি বা মিরাক্যাল ইকোনমি।
এই যদি হয় উন্নতির, পরিকল্পিত বিকাশের ছবি, তাহলে স্বাভাবিকভাবে প্রত্যাশা করা যায় সংবিধানের ১৪ ও ১৫ অনুচ্ছেদে যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের সময় এসে গেছে।
আমাদের স্বীকার করতেই হবে ১৪ ও ১৫ অনুচ্ছেদের প্রতিটি অঙ্গীকার না হলেও অনেকগুলোই ইতোমধ্যে আংশিক বা ক্ষেত্রবিশেষে বহুলাংশে বাস্তবায়িত হয়েছে।
কিন্তু মনে রাখতে হবে, উন্নতির ফসল যতটা গরিব, খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের ঘরে যাওয়ার কথা ছিল, ততটা কিন্তু যায় নি। সমাজের যেমন সম্পদ বেড়েছে, তেমনি সম্পদের মালিকানা নিয়ে বৈষম্যও বেড়েছে। দারিদ্র্যের হার কমানো, নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য। কিন্তু সংবিধানে যা রয়েছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু যে কথা বলেছেন, সেই শোষণহীন, বৈষম্যমুক্ত সমাজ কিন্তু এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। উল্টো ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য বেড়েছে। ধন বৈষম্য এখন আকাশচুম্বী। সমাজতন্ত্রের স্বপ্নের কথা বাদ দিলাম, একটি ‘কল্যাণরাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও কিন্তু আমরা কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে (২০১৪) বলা হয়েছে, ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আসন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জয়লাভ করলে, দেশের উন্নয়নের ও বিকাশের গতিমুখ নিশ্চিতভাবে সেদিকেই যাবে। কিন্তু সাথে সাথে মানুষে মানুষে, শ্রেণিতে শ্রেণিতে ভেদ-বৈষম্য ও শোষণ-বঞ্চনা কমাতে না পারলে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য যেমন মুখ থুবড়ে পড়বে, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মে দিবসের চেতনা বাস্তবায়নও স্বপ্নই থেকে যাবে। আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে, তারা যা বলে তা তারা বাস্তবায়িত করতেও সক্ষম। এজন্য অপেক্ষার পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষকে আরও সুসংগঠিত হতে হবে। শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে হবে। মে দিবসে দেশের শ্রমজীবী ভাই-বোনদের শুভেচ্ছাÑ অভিনন্দন।

শ্রেণী:

বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ

Posted on by 0 comment
Uttoron Cover Aprl18 copy

Uttoron Cover Aprl18 copyআর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ একটা নতুন পর্যায়ে উন্নীত হলো। আমাদের জাতির কপালে যে দারিদ্র্য-লাঞ্ছিত চিহ্ন আঁকা ছিল সেটি এখন প্রায় মুছে গেছে। স্বল্পোন্নত দেশের তকমাটা ছিঁড়ে বাংলাদেশ এখন ‘উন্নয়নশীল’ দেশের স্তরে উন্নীত হয়েছে। ৪৮তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে জাতিসংঘের এই স্বীকৃতি আমাদের আনন্দ-গৌরবকে নতুন ব্যঞ্জনা দান করেছে। এই ঐতিহাসিক অনন্য অর্জনের জন্য উত্তরণ দেশবাসীকে উষ্ণ অভিনন্দন জানাচ্ছে। আমরা একইসঙ্গে অভিনন্দন জানাই বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাকে, যাঁর ডায়নামিক নেতৃত্বে বাঙালি জাতি দারিদ্র্যের লজ্জা ঘুচিয়ে উন্নয়নের এই গুরুত্বপূর্ণ সোপানে পা রাখতে সক্ষম হলো।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সাফল্যকে উৎসব-মুখরতায় উদযাপন করেছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগও নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই গৌরবোজ্জ্বল অর্জনকে বর্ণাঢ্য উৎসবে পরিণত করেছে। তবে কেউ কেউ, কোনো কোনো দল, এই আনন্দ-গৌরবে অংশগ্রহণ না করে সরকার ও আওয়ামী লীগকে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ করেছে। তারা মনে করেন, এত আদিখ্যেতার দরকার কী? অন্য দেশ তো এমন উৎসব ও হৈচৈ করছে না।
বলাবাহুল্য আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিপক্ষ দল বা সরকারের ভালো কাজের বা সাফল্যের প্রশংসা করার কোনো নজির নেই। উল্টো বরং ‘যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা’ ধরনের মনোভাবের কারণে সরকারের সাফল্যকেও ‘ব্যর্থতা’ হিসেবে চিত্রিত করার অপপ্রয়াস লক্ষ্যণীয়।
উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার বিষয়টিকে আমরা যে এত বড় করে দেখছি, তার পেছনে রয়েছে এক বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর এক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পান। ধ্বংস, রক্ত, সম্পদহীনতা এবং বৈরী আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দেশের পুনর্গঠনকে দুরূহ করে তোলে। চরম প্রতিকূলতার মধ্যে বঙ্গবন্ধু দেশকে যুদ্ধের পূর্বাবস্থায় এনে উন্নয়নের সড়কে টেনে তোলার জন্য সর্বতোভাবে চেষ্টা করেন। বঙ্গবন্ধুর শাসনকালের সাড়ে তিন বছরে আমাদের জিডিপি-র হার ৭ শতাংশের উপরে উঠে যায়। তা সত্ত্বেও ১৯৭৪ সালের মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষে হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। বন্যাজনিত কারণে ফসলহানি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য কূটনীতি এই দুর্ভিক্ষকে অনিবার্য করে তোলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবায় পাটের বস্তা রপ্তানির ‘অপরাধে’ বাংলাদেশকে ‘শাস্তি’ দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে প্রদেয় খাদ্য না দিয়ে এই দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি এবং হাজার হাজার মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। এতদসত্ত্বেও ১৯৭৪-এর শেষ দিকে পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে।
বাংলাদেশের তৎকালীন আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুঁড়ি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কিসিঞ্জারের ধারণা ছিল বাংলাদেশ একটি অকার্যকর দেশ। একই কথার প্রতিধ্বনি আমরা শুনতে পাই তৎকালীন বিশ্বব্যাংকের ঢাকাস্থ দুই কর্মকর্তার গবেষণা-মন্তব্য থেকে। জাস্ট ফা’ল্যান্ড এবং পার্কিনসন্স বলেছিলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন একটা টেস্ট কেস। তাদের ধারণা ছিল বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব হলে, পৃথিবীর অন্য যে কোনো দেশের উন্নয়নও সম্ভব হবে। এ কথার নির্গলিতার্থ হলো বাংলাদেশের উন্নয়নের আদৌ কোনো সম্ভাবনা নেই।
ঔপনিবেশিক আমল থেকে পরনির্ভরশীল, পশ্চাৎপদ এবং দারিদ্র্যলাঞ্ছিত বাংলাদেশ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে উন্নয়নের পথে পা বাড়ায়। আমাদের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বাংলাদেশের উন্নয়ন-দর্শন ও স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণ করা হয়। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘ভিক্ষুকের জাতির কোনো সম্মান থাকে না।’ তাই বাংলাদেশকে একটি আত্মনির্ভরশীল উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তিনি প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ই দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্প উপস্থাপন করেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন রূপকল্পেরও সমাধি ঘটে। জিয়া, এরশাদ ও খালেদার ২১ বছরের দুঃশাসন বাংলাদেশকে দারিদ্র্যের ফাঁদে আটকে রাখে। আমাদের জাতীয় জীবন থেকে ২১ + ৭ = ২৮টি (১৯৭৫-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৮) বছর অপচয় হয়ে যায়। আমরা স্বল্পোন্নত দেশের তকমা এঁটে ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে নিয়েই বিশ্বে মিসকিনের জাতি হিসেবে পরিচিতি অর্জন করি।
কিন্তু ১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বছর এবং ২০০৯ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত প্রায় ১০ বছর, অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার প্রায় ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ দারিদ্র্যের ফাঁদ ভেঙে বেরিয়ে এসেছে।
১৬ কোটি মানুষের দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখন খাদ্যে আত্মনির্ভরশীল। আমাদের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৬০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের একটা নির্ভরযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় গড়ে উঠেছে। মানবসম্পদের বিস্ময়কর উন্নতি হয়েছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে মানুষের সংখ্যা ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ১৭০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, গড় আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি প্রভৃতি সূচক এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির ফলে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের বৃত্ত ভেঙে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
এই অর্জনই বিশ্বে আমাদের নতুন মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। আর সে কারণেই আমাদের গৌরব ও আনন্দটা একটু বেশি। দারিদ্র্যের লজ্জা ঘুচিয়ে আমরা যে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারি, সেটি প্রমাণিত হওয়ায় আমাদের উৎসব পালন অত্যন্ত স্বাভাবিক। অন্যদিকে যারা দেশকে দারিদ্র্যের শৃঙ্খলে আটকে রাখতে চায়, যারা পরনির্ভরশীলতার দর্শনে ও রাজনীতিতে বিশ্বাসী, তারা বাঙালি জাতির এই সাফল্যে বেজার হবেনÑ এটাও স্বাভাবিক। তবে দেশবাসী এতে বিভ্রান্ত হবে না; বরং উন্নয়নবিরোধী ঐসব অপশক্তিকেই ধিক্কার জানাবে।

শ্রেণী:

মার্চ : গৌরব ও আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার মাস

Posted on by 0 comment
3-4-2018 7-16-48 PM

3-4-2018 7-16-48 PMমার্চ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের গৌরব ও আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার মাস। বাঙালি জাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শুভ জন্মদিন, এই মাসের ১৭ তারিখ। ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে নানা তাত্ত্বিক বিতর্ক রয়েছে। বলা হয়ে থাকে জনগণ হচ্ছে ইতিহাসের নির্মাতা। এ কথাটা যেমন সত্য, তেমনি ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির ভূমিকা হয়ে ওঠে ইতিহাস নির্মাণের অনুঘটক এবং নিয়ামক। বঙ্গবন্ধু ছিলেন তেমনি বাঙালির স্বাধীনতা ও জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার মহানায়ক। ১৭ মার্চ তাই আমাদের সৌভাগ্যের দিন, আনন্দের দিনÑ উৎসবের দিন। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ওই মহামানব আসে। দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে…। ১৭ তারিখ মহামানব শেখ মুজিবুর রহমানের আবির্ভাব দিবস হিসেবে আমাদের রোমাঞ্চিত করে, উদ্বেলিত করে। শুভ জন্মদিনে জাতির পিতার প্রতি আমাদের নমিত শ্রদ্ধা।
৭ মার্চ ও ২৬ মার্চ এক সুতোয় গাঁথা পরিপূরক দিন। আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দ যদি মুক্তিযুদ্ধকালে ‘৭ মার্চকে স্বাধীনতা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করতেন তাতে ইতিহাসের তেমন কোনো ব্যত্যয় ঘটত না। বিষয়টার তৎকালীন রাজনৈতিক তাৎপর্য এবং আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশনের কারণে ২৬ মার্চকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন দেশ হিসেবে ঘোষণা করেন এবং হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা দিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ৭ মার্চ-ই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সংগ্রামের লক্ষ্য ও চরিত্র নির্ধারণ করে দেন। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রামÑ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’Ñ এই ঘোষণার মধ্যেও কোনো দ্ব্যর্থবোধকতা ছিল না। তবে এটাকে টেকনিক্যালি ‘আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা’ বলা যায় নি; কারণ তখন তা করলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশকে, বঙ্গবন্ধুকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ পেত। দ্বিতীয়ত; ৭ মার্চের ভাষণ ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এক ধরনের আল্টিমেটাম। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই দাবি উত্থাপন করে বলেছিলেন, “আমার দাবি মানতে হবে প্রথম। সামরিক আইন, মার্শাল ল’ উইথড্র করতে হবে, সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে, যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের বিচার করতে হবে। এবং জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপর আমরা ভেবে দেখব এসেমব্লিতে বসতে পারি কি না।” সাদামাঠাভাবে কেউ বলতে পারেন, এই দাবি মেনে নেওয়া হলে, অর্থাৎ জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করলে তো, মেজরিটি পার্টি আওয়ামী লীগের কাছে পাকিস্তানের ক্ষমতা হস্তান্তরিত করতে হতো। তার মানে দাঁড়াত পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করত আওয়ামী লীগ। দৃশ্যত, এ রকম ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। তর্কের খাতিরে বলাও যায়, পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যদি এই দাবি মেনে নিত, তাহলে তো পাকিস্তান ঐ যাত্রায় টিকে যেত।
কিন্তু ইতিহাস এত সহজ-সরল পথে চলে না। বাস্তবতা হচ্ছে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কখনোই বাঙালিদের হাতে নিরঙ্কুশ রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারে না। বঙ্গবন্ধু এটা জেনে-বুঝেই ৭ মার্চের ভাষণে এসব পূর্বশর্ত দিয়েছিলেন। আইনের দৃষ্টিতে যা ন্যায়সংগত এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও যুক্তিসংগত ছিল। ৭ মার্চ সংগ্রামের লক্ষ্য স্বাধীনতা ঘোষিত হলেও, এই যে ‘আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটি’ বঙ্গবন্ধু দেন নি, এটি তার রাষ্ট্র নায়কোচিত দূরদর্শিতা এবং দেশবাসীকেও চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ দেওয়া। ৭ মার্চ স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলে, যুদ্ধ শুরুর জন্য প্রথম আক্রমণকারী হিসেবে বাংলাদেশকেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দায়ী করত। আর ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেওয়ার পথে আর কোনো রাজনৈতিক, নৈতিক, আইনগত এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য বাধা থাকে না। বস্তুত, ৭ মার্চেরই যৌক্তিক পরিণতি হচ্ছে ২৬ মার্চ, আমাদের প্রিয়তম স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ এখন সমগ্র মানব জাতির ঐতিহাসিক দালিলিক মর্যাদায় ভূষিত হয়েছে। এই অর্জনের পটভূমিকায় এবারের স্বাধীনতা দিবস নিঃসন্দেহে নবতর তাৎপর্য অর্জন করেছে। ৭ মার্চ ও ২৬ মার্চÑ স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে আমরা স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদানের স্মৃতি। শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই প্রিয় দেশবাসীকে।

শ্রেণী:

প্রধান বিচারপতি নিয়োগকে স্বাগত

00

00মহামান্য রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদের ৩নং দফা এবং ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গত ১ ফেব্রুয়ারি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করেছেন। বিচারপতি এসকে সিনহার পদত্যাগের ফলে দীর্ঘদিন প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য ছিল। প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য থাকায়, এ নিয়ে বিএনপিসহ বিভিন্ন মহল তীব্র সমালোচনার ঝড় তুলেছিল। তারা দেশবাসীকে এই বলে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে যে, প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হলে ‘অবিলম্বে শূন্যপদে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ দান করতে হবে।’
এখানে দুটি অসত্য তথ্য পরিবেশন করে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। প্রথমত; প্রধান বিচারপতির পদ কোনো কারণে শূন্য হলে উক্ত শূন্যপদে জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব অর্পণের কথা থাকলেও, নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগের কোনো সময় নির্ধারণ করে দেয়নি সংবিধান। সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদে শূন্যপদে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ব্যাপারে রাষ্ট্রপতিকে কোনো সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। পুরো বিষয়টি মহামান্য রাষ্ট্রপতির সন্তুষ্টি ও স্বাধীন ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। একজন ভারপ্রাপ্ত বিচারপতি কতদিন ‘ভারপ্রাপ্ত’ থাকবেন তারও কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। তবে বলা হয়েছে, নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগের পূর্ব পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত বিচারপতি তার দায়িত্ব পালন করবেন। অতএব, এখানে সময়সীমা কোনো সমস্যা নয়। দ্বিতীয়ত; সংবিধানের কোথাও লেখা নেই যে, জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকেই প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে। অথচ বিএনপি, একশ্রেণির আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী ও সংবাদপত্র ‘জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন’ করে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ঢালাও অভিযোগ করে রাষ্ট্রপতির মর্যাদাকেই ক্ষুণœ করেন নি, সরকারের ওপর অহেতুক দোষারোপ করে চলেছেন।
আমরা সংবিধানের আলোকে বিষয়টি পরিষ্কার করে বলতে চাই। আমাদের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মূলত নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধান; কিন্তু দুটি বিষয়ে রাষ্ট্রপতির রয়েছে একচ্ছত্র ক্ষমতা। রাষ্ট্রপতি কারও সাথে পরামর্শ না করে যেমন নির্ধারিত মানদ- অনুযায়ী দেশের প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করতে পারেন, তেমনি প্রধান বিচারপতি নিয়োগেও তিনি স্বাধীন এবং একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদে এ কথা লেখা নেই যে, আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্য থেকেই প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে। সংবিধানে আছে ন্যূনতম ১০ বছর সুপ্রিমকোর্টে অ্যাডভোকেট হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা আছে, অথবা বিচার বিভাগে ন্যূনতম ১০ বছর কাজ করেছেন, এমন যে কোনো ব্যক্তিকেই রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে পারেন। এর নিরগলিতার্থ দাঁড়ায় হয়, বিচার বিভাগে (সেটি হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্ট নাও হতে পারে) ১০ বছর কাজ করেছেন অথবা সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী হিসেবে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন যে কোনো ব্যক্তিকেই রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করার অধিকার রাখেন। এ ব্যাপারে যেমন কোনো প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই, তেমনি রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে কোনো আদালতের শরণাপন্ন হওয়ারও সুযোগ নেই।
আর একটি বিষয়ে সকলের পরিষ্কার ধারণা থাকা বাঞ্ছনীয়। আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি হোক বা অন্য কোনো বিচারপতিই হোন, প্রধান বিচারপতি পদে কারও নিয়োগই ‘পদোন্নতি’ বলা অসাংবিধানিক। কারণ হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের যখন আপিল বিভাগে নিয়োগ করা হয়, সেটি কার্যত এক ধরনের পদোন্নতি।
কিন্তু প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ কোনো পদোন্নতি নয়। যদি পদোন্নতিই হতো তা হলে জ্যেষ্ঠতম বাধ্যতামূলক হতো। অথবা সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে লেখা থাকত আপিল বিভাগের বিচারপতিদের পদোন্নতি সংক্রান্ত বিধান। সংবিধানে বিচারপতিদের পদোন্নতির কোনো বিধান নেই।
যেহেতু সংবিধানে এ ব্যাপারে কোনো বিধান নেই এবং জ্যেষ্ঠতার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, সে কারণে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের বিষয়টিকে পদোন্নতি ধরা যাবে না। বস্তুত, রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি অ্যাপয়েন্ট করেন। বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকেও পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। তাকে ফ্রেস অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা নতুন নিয়োগ দান করা হয়েছে। আমরা অবশ্য এটা লক্ষ করেছি অতীতের মতো রাষ্ট্রপতি আপিল বিভাগ থেকেই প্রধান বিচারপতি নিয়োগের যে কনভেনশন বা ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, সেটিই অনুসরণ করেছেন।
আমরা মহামান্য রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। আশা করি, নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগের পর বিএনপি ও স্বার্থান্বেষী মহল আর এটা নিয়ে পানি ঘোলা করার চেষ্টা করবেন না। সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সকল বিতর্কের অবসান ঘটাবেন।
আমরা নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে স্বাগত ও অভিনন্দন জানাই। আমরা আশা করি, তিনি সংবিধান, ন্যায়নীতি ও বিচার বিভাগকে সমুন্নত রেখে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে সফল হবেন।

শ্রেণী:

উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের অব্যাহত জয়যাত্রা

Posted on by 0 comment

নতুন বছরে বাংলাদেশের চেহারাটা কেমন হবে? কেমন যাবে আগামী বছরটি? প্রায় সবার মনেই এই প্রশ্ন। ২০১৮ নির্বাচনের বছর। সে কারণে আরও একটি বাড়তি প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম হবে তো আওয়ামী লীগ? কারও মনে যে কোনো শঙ্কা নেই, উদ্বেগ নেই, তা-ও নয়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার উসকানিতে দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিঘিœত হয় কি না অথবা অতীতের মতো কোনো রক্তাক্ত অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি ঘটে কি নাÑ এ নিয়েও মানুষের মনে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক।
কিন্তু আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, সকল আশঙ্কা, সন্দেহ-সংশয় এবং প্রশ্নের প্রকৃত মীমাংসা বাংলাদেশের জনগণই করে দেবে। ২০০৮ এবং ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ নিরঙ্কুশভাবে জননেত্রী শেখ হাসিনা এবং তার নেতৃত্বাধীন জোটকে নির্বাচিত করেছে। এই জোট শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে গত ৯ বছর খাদের কিনার থেকে দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে নিয়ে এসেছে। বিএনপি-জামাত জোট এবং গণজাগরণ মঞ্চকে কেন্দ্র করে হেফাজতে ইসলাম দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি এবং উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও শান্তির সড়ক থেকে বাংলাদেশকে রক্তগঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। মাঝে বেশ কিছু নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ২০১৭ সালটি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আকস্মিক ¯্রােত ছাড়া, দেশে মোটামুটি স্থিতিশীল শান্তিপূর্ণ পরিবেশ অক্ষুণœ ছিল।
আমাদের প্রত্যাশা, ২০১৮-তে বাংলাদেশ উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের বিজয় পতাকা উড্ডীন রেখেই উন্নতির নতুন সোপানে উন্নীত হবে।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের বর্বর সামরিক জান্তা সে দেশের বাংলাভাষী অধিবাসী রোহিঙ্গাদের জোর করে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে পাঠিয়েছে। লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গার ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তারা জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে। গ্রামের পর গ্রাম আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ভস্মীভূত হয়েছে। হাজার হাজার নারীর সম্ভ্রমহানি ঘটেছে। প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছে। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা সর্বোচ্চ মানবিকতা ও ঔদার্য প্রদর্শন করে ভাগ্যাহত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের মাটিতে কেবল আশ্রয়ই দেন নি, তিনি ঘোষণা করেছেন, আমরা একবেলা খেয়ে হলেও এই দুর্ভাগা মানুষগুলোর মুখে অন্ন জোগাব। তিনি যা বলেছেন, তা করেই প্রমাণ করেছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ জন্য তাকে মাদার অব হিউম্যানিটি অভিধায় আখ্যায়িত করেছে। বাঙালির মাথা আকাশ স্পর্শ করেছে।
শেখ হাসিনার আরেকটি ব্যক্তিগত সাফল্য আমাদের জাতিকে দুর্নীতির কলঙ্কমুক্তির পথ দেখাতে পেরেছে। পৃথিবীর ১৭০ জন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের মধ্যে শেখ হাসিনা সততার বিচারে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছেন। এটা আমাদের দেশের জন্য কেবল গৌরবের বিষয় নয়। শিক্ষারও বিষয়। ক্ষমতার শীর্ষে থেকে শেখ হাসিনা যদি নিজেকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে পারেন, তাহলে অন্যসব আমলা, কর্মচারী, এমপি, মন্ত্রী, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, শিক্ষক-পেশাজীবী এবং রাজনীতিবিদগণ কেন নিজেদের দুর্নীতিমুক্ত রাখতে পারবেন না? যারা শেখ হাসিনার কাছ থেকে দুর্নীতিমুক্ত থাকার শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবেন না, তাদের অন্তত নৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ করার অধিকার নেই। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ অভিন্ন। আমি স্তাবক নই, তাই অতিশয়োক্তি করিনি। সত্যি সত্যি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বাদ দিলে অথবা বাংলাদেশকে বাদ দিলে শেখ হাসিনার আলাদা অস্তিত্বের গুরুত্ব আছে কি? তা হলে শেখ হাসিনা যে নজির স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন, তার অনুসারীরা তা পারবে না কেন?
২০১৭ সালে জাতির পিতার ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য দলিলের মর্যাদা পেয়েছে। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম তাদের কাছে এর চেয়ে বড় কোনো পাওনা নেই। কেননা আমাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের দিক্-নির্দেশনা ও স্বাধীনতার ঘোষণা তো ছিল এই ভাষণটিই। সমগ্র জাতি আজ বিশ্বে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। ৭ মার্চের ভাষণ এখন সমগ্র বিশ্ববাসীর।
বড় ম্যাগা-প্রজেক্টগুলো এগিয়ে চলছে। পদ্মাসেতু এখন দৃশ্যমান। বাংলাদেশ পারমাণবিক যুগে প্রবেশ করেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল কাজের উদ্বোধন হয়েছে। মেট্রোরেলের কাজ এগিয়ে চলছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জিত হবেই। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ায় দেশ আরেক কদম এগিয়ে গেছে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং প্রতœতত্ত্ব, ইতিহাস ও ঐতিহ্যসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে। নতুন নতুন প্রতœক্ষেত্র আবিষ্কারের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে যুক্ত হচ্ছে নতুন অধ্যায়। আমাদের ইলিশ মাছ বা সিলেটের শীতল পাটি, আমাদের জামদানিÑ আজ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু বিশ্ব স্বীকৃতির ভেতর দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতি আন্তর্জাতিকভাবে আরও ঋদ্ধ হলো।
২০১৮-তে এই ধারা অব্যাহত থাকবে। উন্নয়নের পথ থেকে আমাদের কোনো অপশক্তিই বিচ্যুত করতে পারবে না। ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচন নিঃসন্দেহে আমাদের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা বিশ্বাস করি, জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এই চ্যালেঞ্জও সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে। সংবিধানের ভিত্তিতে সকল দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন করে বাংলাদেশ প্রমাণ করবেÑ গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই।
২০১৮ সালে আমরা প্রিয় দেশবাসীর প্রতি উষ্ণ অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমরা দেশবাসীর কল্যাণ ও সুখী সুন্দর শান্তিপূর্ণ সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের কামনা করছি। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে অব্যাহত অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবেÑ এটাই দেশবাসীর সাথে আমাদের প্রত্যাশা। আমাদের দৃঢ় প্রত্যয় বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী আদর্শে বাংলাদেশে একটি শোষণ-বঞ্চনামুক্ত ভেদ-বৈষম্যহীন মানবিক সমাজ গড়ে তোমার পথে এগিয়ে যাবে।

শ্রেণী:

পারমাণবিক যুগে বাংলাদেশ

2

2মানুষ স্বপ্নের চেয়ে বড়ো। কত বড়ো তা সাধারণের পক্ষে কল্পনা করাও সম্ভব নয়। পৃথিবীর পশ্চাৎপদ এবং দরিদ্রতম দেশগুলোর অন্যতম হিসেবে যে দেশটি ছিল পরনির্ভরশীলতা ও সাহায্য-নির্ভরতার প্রতীক; কেউ কি স্বপ্নেও ভেবেছে, বাংলাদেশ নামক সেই দেশটি এখন কেবল আত্মনির্ভরশীলতার গৌরবই অর্জন করছে না, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সর্বোচ্চ বিকাশের ব্যবহারও করতে চলেছে। পারমাণবিক যুগে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ।
না, মানব ও সভ্যতাবিনাশী পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতার পথে নয়, বাংলাদেশ পা বাড়িয়েছে উন্নত-সমৃদ্ধ সভ্যতা নির্মাণ এবং মানুষের জীবনকে আরও উচ্চতর মানের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আর এর অন্যতম পূর্বশর্তÑ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদনে পরমাণু শক্তিকে ব্যবহারের সক্ষমতা অর্জন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিজয়ের মাসের প্রথম দিন, ২০১৭ সালের ১ ডিসেম্বর পাবনার রূপপুরে নির্মীয়মাণ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল কাজের শুভ উদ্বোধন করেছেন।
অর্ধ শতাব্দীরও আগে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের আগে পাবনার রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বাস্তব কোনো পথ গ্রহণ না করে বাঙালিদের ধোঁকা দিয়ে বোকা বানানোর উদ্দেশে একটা মূলা ঝুলিয়ে রেখেছিল। অতঃপর স্বাধীনতার পর শুরু হয় নতুন করে চিন্তা-ভাবনা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা রচনার কালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিষয়কে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরকালে প্রেসিডেন্ট পোদগর্নি, প্রধানমন্ত্রী কোসিগিন এবং কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্রেঝনেভের সঙ্গেও বিষয়টি আলোচনা করেছিলেন। সোভিয়েত নেতৃত্ব আশ্বস্ত করেছিলেন উপযুক্ত সময়ে এ ব্যাপারে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু ১৯৭৫ সালে জাতির পিতাকে হত্যার ভেতর দিয়ে সেই সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটে। পঁচাত্তর-পরবর্তী কোনো শাসকগোষ্ঠীই ‘রূপপুর স্বপ্ন’ রূপায়ণের ব্যাপারে সামান্যতম উদ্যোগও গ্রহণ করেনি। সামরিক শাসকদের কথা বাদ দিলাম, এমন কীÑ দুই মেয়াদের ‘নির্বাচিত বিএনপি’ সরকারের প্রধান খালেদা জিয়াও এ ব্যাপারে পদক্ষেপ তো দূরের কথা, সামান্যতম চিন্তা-ভাবনাও গ্রহণ করেনি। নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ে। রাশিয়ান ফেডারেশন নামক নতুন রাষ্ট্রকে একটা সংকটকাল উত্তরণের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হতে হয়। ফলে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালের প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমাদের উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র নির্মাণের বিষয়ে খুব একটা অগ্রগতি হয়নি।
২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পরই বিজয়ী আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার জ্বালানি সংকট সমাধান ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকে তাদের ৫টি অগ্রাধিকারের অন্যতম হিসেবে কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করে। ২০২১ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রথমে ২০,০০০, পরে ২১,০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু একইসঙ্গে সরকার অব্যাহতভাবে এই লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে।
কেবল জ্বালানি তেল, জলবিদ্যুৎ অথবা কয়লা-নির্ভরতায় সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের ক্রমবর্দ্ধমান চাহিদা পূরণের কথা বিবেচনা করে পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার এবং সৌরশক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে কাক্সিক্ষত বিদ্যুৎ উৎপাদনের কৌশল গ্রহণ করা হয়। শুরু হয় রাশিয়ার সাথে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দীর্ঘ, জটিল ও বিপুল অর্থ ব্যয়সাপেক্ষ প্রকল্প গ্রহণের বিষয়ে সহযোগিতার সংলাপ। অবশেষে সংলাপেরও অবসান হয়। শুরু হয় বাস্তব নির্মাণকাজ।
২০১৪ সালে তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। শুরু হয় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রাথমিক কাজ। ইতোমধ্যে প্রাথমিক পর্যায়টিও অতিক্রান্ত হয়েছে। এবার বাস্তবে স্বপ্ন রূপায়নের কাজ। পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের লক্ষ্যে মূল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের কাজটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী। ১ ডিসেম্বর ২০১৭। পরিকল্পনামতো কাজ অগ্রসর হলে ২০২৩ সালে ১২৫০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটটি চালু হবে। দ্বিতীয় ইউনিট চালু হবে পরের বছর। এই মেগা প্রকল্পে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। তার মধ্যে রাশিয়ার প্রকল্প সাহায্যের পরিমাণ ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা। অবশিষ্ট অর্থ জোগাবে বাংলাদেশ।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাংলাদেশ নতুন নজির স্থাপন করতে যাচ্ছে। পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ এবং মানব কল্যাণে ব্যবহারে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে পরমাণু শক্তিধর (বোমা নয়) নতুন উন্নয়ন মডেল হয়ে থাকবে। আমরা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে এই দূরদর্শী কাজের জন্য গর্বিত বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাই। একইসঙ্গে বন্ধু-রাষ্ট্র রাশিয়াকে উদার সাহায্যের জন্য আমাদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছেÑ এটাই জাতি হিসেবে আমাদের জন্য নবতর মর্যাদা ও গৌরব এনে দেবে।

শ্রেণী:

৭ মার্চের ভাষণ : বিশ্বের কণ্ঠস্বর

যে  ভাষণটি বদলে দিয়েছিল একটা গোটা জাতির স্মৃতিসত্তা ভবিষ্যৎ, যেটি ছিল একান্তই একটি ভূখ-ের মানুষের ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ের ভাগ্য নির্ধারণের ইতিকর্তব্যের নির্দেশিকা, ৪৬ বছর পর সেই ভাষণটি হয়ে গেল সমগ্র বিশ্বের অভিন্ন ঐতিহ্য। মানব জাতির অভিন্ন সম্পদ। বলছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের কথা। জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো গত ৩১ অক্টোবর প্যারিসের সদর দফতরে অনুষ্ঠিত সভায় আরও ৭৬টি বিষয়ের সাথে বঙ্গবন্ধুর ভাষণকেও ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল হেরিটেজ রেজিস্টার’ ঘোষণা করেছে। এই বাক্যটির কেউ অনুবাদ করেছে ‘বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রামাণ্য দলিল’ হিসেবে, কেউ লিখেছে ‘বিশ্বের জাতিসমূহের স্মৃতিময় ঐতিহ্যের নিবন্ধন’। যে নামেই বলা হোক, ৭ মার্চের ভাষণ, এখন বিশ্ব ইতিহাসে মানব জাতির দালিলিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে গেল।
জাতির পিতার যে ভাষণটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের দিক-নির্দেশিকা হিসেবে একটা জাতি-রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের মূল প্রেরণা হয়েছিল, তাকে এভাবে জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃতি দান, বাঙালি জাতিকে, বাংলাদেশকে নবতর গৌরবের আসনেই কেবল অভিষিক্ত করেনি; এই ভাষণ এখন বিশ্ব ইতিহাসের অংশ হিসেবে অন্যান্য দেশ ও জাতির কাছে আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণকে বিরল স্বীকৃতি ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করার জন্য বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইউনেস্কোকে অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আমরাও প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দনের প্রতিধ্বনি করে ইউনেস্কোর সকল সদস্য রাষ্ট্রের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
জাতি হিসেবে আমরা নিঃসন্দেহে গর্বিত যে, বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদে ১৯৯৯ আমাদের ভাষা সংগ্রামের রক্ত¯œাত দিন ২১শে ফেব্রুয়ারি যেমন ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা’ দিবসের গৌরব অর্জন করেছিল, তেমনি তার তৃতীয় মেয়াদের শাসনামলে, ২০১৭ সালে বাঙালির গর্বিত মস্তকে আরেকটি গৌরবের পালক যুক্ত হলো।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ইতোমধ্যেই বিশ্ব ইতিহাসের ৫০টি সেরা ভাষণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু অন্য যেসব বিশ্বখ্যাত ভাষণের কথা বলা হয়, সেগুলো ছিল লিখিত ভাষণ। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এটি কোনো লিখিত ভাষণ নয়। মাত্র ১৮ মিনিট ৩১ সেকেন্ডের এই ভাষণটিতে শব্দচয়নে, বাক্যবিন্যাসে যেমন কোনো পুনরুক্তি নেই, তেমনি রেসকোর্স ময়দানে ১০ লাখ লোকের উদ্বেলিত জনসমুদ্রে ভাষণদাতা বঙ্গবন্ধুর দেহের ভাষা বা বডি লেঙ্গুয়েজ ও উচ্চারণে, কণ্ঠস্বরের উঠানামায় সর্বোপরি ধ্বনিব্যঞ্জনাÑ সবটাই ছিল অনবদ্য এবং প্রেরণাদায়ক।
৭ মার্চের ভাষণের প্রকৃত তাৎপর্যটিই এটিকে ঐতিহাসিক মর্যাদা দান করেছে। বস্তুত, এই ভাষণটিকে বলা যেতে পারে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ম্যাগনাকার্টা। অনন্য সাধারণ কুশলতার সঙ্গে এই ভাষণে যেমন বাংলাদেশের সংগ্রামমুখর জনগণের প্রকৃত আশা-আকাক্সক্ষাকে প্রতিধ্বনি করেন; তেমনি বিচ্ছিন্নতাবাদের অভিযোগ এড়ানোর জন্য স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিয়েও, দেশবাসীকে এই সংগ্রামের প্রকৃত লক্ষ্য কী তা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তিনি বুঝিয়ে দিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বঙ্গবন্ধুর এই অবিনাশী জলদগম্ভীর উচ্চারণই নির্ধারণ করে দিল ’৭১-এর গণসংগ্রামের চরিত্র ও লক্ষ্য। জনগণ এ কথা থেকেই বুঝে নিল এই সংগ্রামকে কোন পরিণতির দিকে এগিয়ে নিতে হবে। ভাষণের অন্য যে গুরুত্বপূর্ণ দিক তা হলো, ভবিষ্যতের দিক-নির্দেশিকা। বঙ্গবন্ধু সংগ্রামের শান্তিপূর্ণ ও সশস্ত্র দুটি পন্থাই খোলা রেখে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর কাছে সুনির্দিষ্ট সমাধান সূত্র তুলে ধরেন।
বঙ্গবন্ধু ভাষণে শর্ত দিয়ে বলেন, সামরিক আইনÑ মার্শাল ল’ প্রত্যাহার করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। আর তা যদি করা হয় তাহলেই ভেবে দেখব গোলটেবিল বৈঠকে যাব কি যাব না। সমস্যার এই শান্তিপূর্ণ সমাধানের অর্থ হলো, সাময়িক শাসনের অবসান ঘটিয়ে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত কুশলী নেতার মতো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এই বার্তাই দিতে চাইলেন যে বিচ্ছিন্নতা নয়, সংঘাত ও রক্তপাত নয় এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের অখ-তা রাখতে হলে এই লেজেটিমেট গণতান্ত্রিক দাবি মানলেই সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব। কিন্তু যেমন বঙ্গবন্ধু জানতেন, তেমনি ১৯৭১ সালে প্রতিটি বাঙালি জানতো পাকিস্তানি সামরিক জান্তার পক্ষে এই দাবি মেনে নেওয়া অর্থাৎ আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।
অতঃপর খোলা থাকে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ। বঙ্গবন্ধু এটা বুঝতে পেরেই একটা নিরস্ত্র জাতিকে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে সামরিক জাতিতে পরিণত করার লক্ষ্য স্থিল করলেন। তিনি শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খোলা রেখেও বাংলার জনগণকে সশস্ত্রযুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার দিক-নির্দেশনা দিলেন। তার ভাষণে তিনি তার গ্রেফতার হওয়ার বা মৃত্যুর ঝুঁকির কথা মনে রেখেই বললেন, “আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমাদের উপর/কাছে আমার নির্দেশ রইলো, তোমাদের যা কিছু আছে তা নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। … ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল।” ইত্যাদি…
বাঙালি জাতি বুঝে নিল তাদের কী করতে হবে। দেশবাসী ২৫ মার্চের হামলা বা ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার অপেক্ষা না করেই প্রকাশ্যে/গোপনে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করল। বঙ্গবন্ধুর এই সুস্পষ্ট নির্দেশনা ছিল বলেই, ১৯৭১ সালে তার অনুপস্থিতি সত্ত্বেও ইস্পাত দৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলে বাঙালি মরণপণ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনে প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা। একটি ভাষণের কী যাদুকরি ক্ষমতা, মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে তা প্রমাণ হয়ে যায়।
জাতিসংঘ ও ইউনেস্কো তাই সঠিক কাজটিই করেছে। মনে রাখতে হবে এটা কেবল একটি ঐতিহাসিক ভাষণের দালিলিক স্বীকৃতিমাত্র নয়, জাতিসংঘের এই স্বীকৃতির ভেতর দিয়ে বাংলাদেশে যারা মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করতে চায়, যারা বঙ্গবন্ধুকে হেয় করে ইতিহাস বিকৃত করতে চায়, যারা ‘স্বাধীনতার’ কৃত্রিম ঘোষক বানাতে চায়, তাদের সকল অপচেষ্টা আন্তর্জাতিকভাবে প্রত্যাখ্যাত হলো; ইতিহাসের মুক্তি ঘটল। হাত দিয়ে যে সূর্যকে আড়াল করা যায় না, সেই সত্যই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলো। বিশ্ব দরবারে বাঙালি জাতির মাথা শিখর স্পর্শ করল।

শ্রেণী:

রোহিঙ্গা সংকট : প্রধানমন্ত্রীর শান্তি উদ্যোগ

Posted on by 0 comment
2

2‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বি নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব’…। কবিগুরুর এই বেদনাবিধুর পর্যবেক্ষণ আজও প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের রক্তাক্ত (ইষড়ড়ফু ইরৎঃয) জন্মের পর আমরা চেয়েছিলাম আর যেন রক্তপাত না হয়। আর যেন মৃত্যুর মিছিল দেখতে না হয়। আর যেন কাউকে তার ঘর-ভিটে-মাটি ছেড়ে দেশান্তরী হতে না হয়। ধ্বংস, মৃত্যু, কান্না এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের যেন চির অবসান হয়। কিন্তু আমাদের সে প্রত্যাশা অপূর্ণই রয়ে গেল। দেশের অভ্যন্তরেও যেমন আমরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থের জন্য বিএনপি-জামাত চক্রের রক্তের হোলি খেলা দেখেছি, তেমনি দুনিয়ার দেশে দেশেও সেই উন্মত্ততা লক্ষ করেছি। দূরের দেশের কথা না হয় বাদই দিলাম। আমাদের ঘরের কাছের মিয়ানমারে অব্যাহত রয়েছে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ; ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং নিজেদের জন্ম জন্মান্তরের ভিটে-মাটি থেকে রোহিঙ্গা জাতি-গোষ্ঠীকে বিতাড়িত করার পাশবিক বর্বরতা। প্রাণ বাঁচাতে অসহায় লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিচ্ছে বাংলাদেশে। আর অভূতপূর্ব মানবিকতা এবং মায়ের দরদ নিয়ে ওই মানুষগুলোকে বুকে টেনে নিচ্ছে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ আর তাদের প্রাণপ্রিয় নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সারাবিশ্ব মিয়ানমার সরকারের নিন্দা জানিয়েছে। গণহত্যা বন্ধ এবং রোহিঙ্গাদের তাদের জন্মভূমিতে ফিরিয়ে নেওয়া, তাদের নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা দেওয়ার দাবি আজ বিশ্বজনীন। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর শান্তি উদ্যোগের প্রতি সমগ্র বিশ্ববাসী জানিয়েছে অকুণ্ঠ সমর্থন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তার বক্তৃতায় শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ৫-দফা প্রস্তাব করেছেন। অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ এই ৫-দফা শান্তি প্রস্তাবের সারমর্ম হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ, মিয়ানমার তার নাগরিকদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নিক, তাদের নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করুক, মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করুক এবং কফি আনান কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান করুক। রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলে প্রচারণা বন্ধ এবং অবিলম্বে এথনিক ক্লিনজিং বন্ধ করা হোক। ৫-দফায় রোহিঙ্গারা যতদিন বাংলাদেশে থাকবে ততদিন পর্যন্ত মানবিক সাহায্য প্রদানের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনার শান্তি উদ্যোগ সারাবিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, বিপন্ন রোহিঙ্গাদের আমরা মৃত্যুমুখে ঠেলে দেব না। আমরা ১৬ কোটি মানুষ, প্রয়োজন একবেলা করে খাব, তবু রোহিঙ্গাদের ক্ষুধায় খাদ্য জোগাব। আমরা ভাগ করে খাব। আমরা জানি না, বিশ্বের আর কোনো দেশ, আর কোনো রাষ্ট্রনেতা এ ধরনের মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন কি না।

বাঙালির ঔদার্য, বাঙালির মানবিকতা, বাঙালির পরার্থপরতার এই বিরল দৃষ্টান্ত বিশ্বে নতুন মহিমায় উদ্ভাসিত।

অস্ত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র, রক্তের বদলা রক্ত, হিংসার বিরুদ্ধে হিংসা, এই অমানবিক হিংসাবৃত্তির বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা নিয়েছেন পিস অফেনসিভ। অর্থাৎ অস্ত্রের বিরুদ্ধে শান্তি, রক্তের বিরুদ্ধে মানবিকতা এবং হিংসার বিরুদ্ধে অহিংসা। এই শান্তি উদ্যোগ, হিংসার বিরুদ্ধে শান্তির নিরস্ত্র আক্রমণ অধিকতর শক্তিশালী ‘অস্ত্র’ হিসেবে বিশ্বকে নতুন পথের নিশানা দেখিয়েছে।

এই ‘শান্তির অস্ত্র’ বা পিস অফেনসিভ যে বিফলে যায়নি, তার লক্ষণ ইতোমধ্যেই সুস্পষ্ট। যারা আরাকানে রোহিঙ্গা নির্যাতনের অভিযোগকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছিল, যারা অপপ্রচার বলে এই অভিযোগ সরকারিভাবে অস্বীকার করেছিল, সেই মিয়ানমার কিছুটা হলেও মাথা নোয়াতে বাধ্য হয়েছে। অং সান সু চি’র একজন মন্ত্রী টিন্ট সোয়ে গত ২ অক্টোবর বাংলাদেশে এসে এই সমস্যার অস্তিত্ব যেমন স্বীকার করেছে, তেমনি আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানকল্পে বাংলাদেশের সাথে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের অঙ্গীকার করতে বাধ্য হয়েছে।

আমরা অবশ্যই এতে বিগলিত হইনি। আমরা জানি অনেক দুরূহ পথ পাড়ি দিতে হবে। এই বৈঠকেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। তবে, ওরা (মিয়ানমার) যে বিশ্ব জনমতের চাপে, শেখ হাসিনার শান্তি উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে সমস্যাটির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে, সেটি যে আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতার প্রাথমিক সাফল্য তা মানতে হবে।

রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের ¯্রােত বন্ধ হয়নি। রাতারাতি এই সমস্যার সমাধান হবে না। কিন্তু অনন্তকাল এই বিপুল জনগোষ্ঠীর দায়-দায়িত্ব বাংলাদেশ বহন করবে না। মিয়ানমারের শাসকদের সুবৃদ্ধির উদয় হবে, তারা বিশ্ব জনমতের প্রতি, সর্বজনীন মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে এই সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসবেন, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। যত বড় পরাশক্তিই তাদের পাশে দাঁড়াক না কেন, শেষ বিচারে তাদেরও পিছু হটাতে হবে। কেননা শান্তিতে সকলেরই স্বার্থ আছে। হিংসা অব্যাহত থাকলে মিয়ানমার হিংসার আগুনেই পুড়ে মরবে। উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও শান্তি একটি অভিন্ন প্রক্রিয়া। কোনো পরাশক্তি এই বাস্তবতা থেকে বেশিদিন দূরে থাকতে পারবে না। এই শান্তি প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ একা না। সমগ্র বিশ্বের শান্তিকামী জনগণ আমাদের পাশে আছে।

শ্রেণী:

এই মানবিক বিপর্যয় প্রতিরোধে এগিয়ে আসুন

2
2

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নাও

রাখাইন এখন মৃত্যুপুরী। রক্তাক্ত জনপদ। ধ্বংস ও বহ্নোৎসবের জনপদ। সাগরে ভাসছে লাশ। নাফ নদীর তীরে লাখো উদ্বাস্তুর ভিড়। ¯্রােতের মতো মানুষ আসছে। প্রাণ বাঁচাতে। নিরাপদ জীবনের সন্ধানে। এই বিপুল গৃহহীন, কপর্দকহীন পলাতক নর-নারী-শিশুর দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। তবুও জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার চরম মানবিক বিপর্যয়ের শিকার রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।
জাতিসংঘ বলছে ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর সংখ্যা ৩ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। তারপরও ¯্রােত অব্যাহত আছে। বাংলাদেশ প্রতিবেশী মিয়ানমারকে বলেছে, তাদের নাগরিকদের স্বদেশে ফিরিয়ে নেওয়া; তাদের নিরাপত্তা বিধান এবং সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নিতে। কিন্তু শান্তিতে নোবেল জয়ী সু চি’র সরকার এখনও আমাদের আহ্বানে সাড়া দেয়নি। উল্টো রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগের বিষয়টিকে মিথ্যা প্রচারণা বলে আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলোকে অভিযুক্ত করছে। বৌদ্ধ ধর্মমতের অনুসারী মিয়ানমার সরকারের কাছে বৌদ্ধের শান্তির বাণী, মানবিকতার শিক্ষা কোনো কাজেই লাগছে না।
রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্ঘদিনের। একবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে, আবার হঠাৎ করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। তখন নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গারা প্রাণ বাঁচাতে নিজেদের পিতৃ-পিতামহের ভিটা-মাটি ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। গত শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে এই ধারা চলছে। ১৯৭৮ সালে এবং স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে জিয়া-এরশাদের স্বৈরশাসনের আমলে, খালেদার শাসনামলে বার বার এটা ঘটেছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে এসে জননেত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমারের সাথে সৎ প্রতিবেশীসুলভ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। এই উদ্যোগের ফলে মিয়ানমারসহ বেশ কয়েকটি উপ-আঞ্চলিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক জোট গড়ে ওঠে। হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়। আশা করা গিয়েছিল অং সান সু চি কফি আনান কমিশনের সুপারিশ মেনে নিয়ে সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেবেন। কিন্তু তা তো হলোই না, আবার মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর এথনিক ক্লিনজিং অভিযানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় রাখাইনের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। চলছে মানবতার বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর অপরাধ (ঈৎরসব অমধরহংঃ ঐঁসধহরঃু)। কিন্তু কেন? রোহিঙ্গারা কী মিয়ানমারের নাগরিক না।
মিয়ানমার ভৌগোলিক আয়তনে বেশ বড় দেশ। নৃ-তাত্ত্বিক দিক থেকে দেশটি বৈচিত্র্যপূর্ণ। মিয়ানমারে মোট ১৩৫টি এথনিক জনগোষ্ঠী বাস করে। এর মধ্যে বামার নৃ-গোষ্ঠী হচ্ছে সর্ববৃহৎ। এ ছাড়াও প্রধান নৃ-জাতিগুলো হচ্ছে মন, শান, কাচিন, চিন, রাখাইন, কেয়াইন ও কায়াহ প্রভৃতি। রোহিঙ্গারা একটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ২ মিলিয়নের মতো। রাখাইন রাজ্যটিই হচ্ছে অতীতের আরাকান। আরাকানে প্রথম আরব বণিকরা আসে। আরব বণিক ও সুফি সাধকদের মাধ্যমে আরাকানে মুসলমানদের প্রতিপত্তি বাড়তে থাকে। সপ্তম-অষ্টম শতাব্দী থেকেই আরাকানে মুসলমানরা বসতি স্থাপন করতে থাকে। মধ্যযুগে একসময় চট্টগ্রাম পর্যন্ত আরাকান রাজ্য বিস্তৃত হলে চট্টগ্রাম থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলা ভাষাভাষী হিন্দু মুসলমান আরাকান বা আজকের রাখাইনে বসতি স্থাপন করে। আরাকানের রোসাঙ্গ রাজসভার একসময় বাঙালি কবি, সংগীতজ্ঞ প্রভৃতি জ্ঞানী-গুণীরা অমাত্য হিসেবে স্থান পায়। মহাকবি আলাওল, কবি দৌলত কাজী প্রমুখÑ মধ্যযুগের কবিদের সৃষ্টিকর্ম আরাকান রাজসভাকে আলোকিত করেছিল। ভারতে মুঘল শাসনাবসনের আগেই আরাকানে প্রায় ছয় বছর যাবত বসতি স্থাপনকারী জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গা নামে একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তায় রূপান্তরিত হয়। একসময় মিয়ানমারের বামার শাসকগোষ্ঠী আরাকান দখল করে নেয়। আর তখন থেকেই শুরু হয় রোহিঙ্গাদের উৎখাতের তৎপরতা। উনিশ শতকের তৃতীয় দশকে সমগ্র মিয়ানমার বা বার্মা ব্রিটিশ শাসনাধীন হয়। সাময়িকভাবে হলেও তখন রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধ হয়।
বস্তুত ষাটের দশক থেকে জেনারেল নে উইনের সামরিক শাসনামলে মিয়ানমারে জোরোশোরে নতুন করে রোহিঙ্গা নির্যাতন শুরু হয়। রোহিঙ্গাদের সাংবিধানিক অধিকার রহিত করে ‘বহিরাগত’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আরাকানের বৃহত্তম এথনিক জনগোষ্ঠী রাখাইনদের নামে যেমন প্রদেশটির নতুন নামকরণ করা হয়, তেমনি রাখাইনদের লেলিয়ে দেওয়া হয় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে। স্বাভাবিকভাবেই হিং¯্র আক্রমণের শিকার রোহিঙ্গা তরুণদের একটি অংশ আত্মরক্ষার্থে হাতিয়ার তুলে নেয়।
কিন্তু রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নির্যাতনের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের উদ্যোগ না নিয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের মধ্যে সশস্ত্র বিদ্রোহ উসকে তোলে। পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীÑ আইএসআই, এই কাজে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি রক্ষণশীল দেশ এ ব্যাপারে পাকিস্তানিদের মদদ জোগায়। এ সুযোগে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা আরও হিং¯্র হয়ে ওঠে। রোহিঙ্গারা তাদের আত্মরক্ষার সুযোগটুকুও পায় না। ফলে মিয়ানমার থেকে জমি-ভিটে-মাটি হারিয়ে হাজার হাজার বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। বাংলাদেশ ছাড়াও তারা আরও একাধিক দেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। প্রকৃতপক্ষে একটা গোটা জাতিগোষ্ঠী ‘রাষ্ট্রহীন’ উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়। বাংলাদেশে যার সংখ্যা ইতোমধ্যে প্রায় ৭ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর বিশেষ করে জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার সমস্যাটির শান্তিপূর্ণ স্থায়ী সমাধানের জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে দেশবাসীকে এ ব্যাপারেও সচেতন থাকতে হবে যে, অতীতে যারা রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র সংগঠন গড়ে তোলার উসকানি ও মদদ দিয়েছে, দেশের ভেতরে সেই বিএনপি-জামাত গোষ্ঠী এবং পাকিস্তানের আইএসআই ‘মুসলমানদের প্রতি দরদ’ দেখাতে গিয়ে এখনও চক্রান্ত অব্যাহত রেখেছে। ওরাও রোহিঙ্গা সংকটে ইন্ধন জুগিয়ে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়। বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতিকে ব্যাহত করতে চায়। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে সুপ্রতিবেশীসুলভ বন্ধুত্বপূর্ণ আস্থার সম্পর্ক বিকাশে অন্তরায় সৃষ্টি করতে চায়।
একইসঙ্গে এ কথাও ভুলে গেলে চলবে না, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো, বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশের জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীগুলো আরাকান এবং চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের অংশবিশেষ নিয়ে একটি তথাকথিত ‘মুসলিম রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার বহুমুখী চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। বাংলাদেশে জামাতে ইসলামি, বিএনপি এবং জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো যেমন এই তৎপরতায় মদদ দিচ্ছে। তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের এনজিও সংগঠনগুলোও এই তৎপরতায় যুক্ত রয়েছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মিয়ানমারের ভৌগোলিক-সামরিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে চীন, ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৃহৎ শক্তিগুলোর বহুমুখী স্বার্থ জড়িয়ে আছে, এ দেশটিকে কেন্দ্র করে। তারাও মিয়ানমারের প্রকৃত শাসক সেনাবাহিনীকে চটাতে চাইবে না। যত বড় ও ভালো প্রতিবেশীই হোক না কেন, চীন বা ভারত কেউই তাদের ‘স্বার্থ’ ক্ষুণœ না হলে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধে তাদের প্রভাব ব্যবহার করবে না। যদিও শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের অনেক দেশ রোহিঙ্গা নির্যাতনের ব্যাপারে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে।
বাংলাদেশ সমস্যাটিকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে না। এটা একটা মানবিক বিপর্যয়। দ্বিতীয়ত; সমস্যাটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান তাদেরই করতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন, আনান কমিশনের সুপারিশ ও জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণার আলোকে আমরা চাই রোহিঙ্গারা তাদের মাতৃভূমিতে ফিরে যাক। যত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীই হোক না কেন, তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ও জীবনধারার অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার (জাতিসংঘ সনদ) অনুযায়ী মিয়ানমারকে তাদের নাগরিকদের রক্ষা করতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে ক্ষুদ্র নৃ-জাতি গোষ্ঠীগুলোর অধিকারের স্বীকৃতি দিয়ে বিশ্বের সামনে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বাংলাদেশ ধর্ম, বর্ণ ও জাতি নির্বিশেষে কোনো বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করেনি।
আমরা বিশ্বের সকল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সকল দেশের জনগণ, সরকার এবং জাতিসংঘসহ সকল আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতি আহ্বান জানাই, অবিলম্বে মিয়ানমারে সংঘটিত হিংসা, রক্তপাত ও মানবিক বিপর্যয় প্রতিরোধে এগিয়ে আসুন। উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ও পুনর্বাসনের পরিবেশ সৃষ্টি করুন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের প্রস্তাব অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের জন্য মিয়ানমারের অভ্যন্তরে একটি নিরাপদ অঞ্চল গড়ে তুলুন। এটা কোনো ধর্মীয় সমস্যা হিসেবে নয়, জাতিগত সমস্যা হিসেবে শান্তিপূর্ণ স্থায়ী সমাধানের জন্য আপনাদের প্রভাব ও ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগান। আনান মিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত করুন।
মিয়ানমার সরকারের প্রতি আমাদের আহ্বান, আমাদের উভয় দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি এবং সীমান্তে শান্তি নিশ্চিত করার জন্য রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান করুন। আপনাদের নাগরিকদের আপনারা ফিরিয়ে নেন। জঙ্গিগোষ্ঠীর অপতৎপরতা প্রতিরোধের অজুহাতে একটি পুরো জাতিগোষ্ঠীর লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষকে হত্যা, সন্ত্রাস ও দেশ থেকে বিতরণের এই বর্বর প্রচেষ্টা, এই মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ থেকে বিরত থাকুন।

শ্রেণী:

বঙ্গবন্ধু : স্বাধীনতা ও জাতিসত্তার প্রতীক

Posted on by 0 comment
8-1-2017 8-22-19 PM

8-1-2017 8-22-19 PMজাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইতিহাসে তার নিজের স্থানটি নিজেই নির্ধারণ করেছেন। কথাটা দুভাবেই সত্য। Sheikh Mujib is the Product of the History and he has Oreated the History.. বাংলাভাষী পূর্ব বাংলার মানুষ ভোট দিয়ে পাকিস্তান এনেছিল। পাকিস্তানের প্রতি তাদের মোহ ছিল। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পর থেকেই সেই মোহ ভাঙতে শুরু করে। তরুণ শেখ মুজিব পাকিস্তান আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি প্রথম জীবনে মুসলিম লীগের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন একজন খাঁটি মুসলমান।
কিন্তু এই মানুষটিই হয়ে উঠলেন ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে বাঙালির স্বতন্ত্র জাতিসত্তা নির্মাণের প্রাণপুরুষ। আঞ্চলিক বৈষম্য, মাতৃভাষার ওপর আঘাত, ফ্যাসিবাদী শাসন, গণতন্ত্রহীনতা সর্বোপরি বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর প্রতি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শ্বেতাঙ্গদের মতো বর্ণবাদী ঘৃণা ও জাতিগত নিপীড়ন পূর্ব বাংলার মানুষের পাকিস্তানের প্রতি মোহভঙ্গের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর নির্বাচন, পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি, ৬-দফা ও স্বাধিকারের চেতনা বাঙালিদের মনে একটি নতুন জাতিচেতনার জন্ম দেয়। পাকিস্তানের প্রতি মোহভঙ্গ হলেও তারা কিন্তু অতীতে ফিরে যেতে, অর্থাৎ অখ- বাংলা বা ভারতে ফিরে যেতে চায় নি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ভারতীয় বাঙালিরা এথনিক দিক থেকে বাঙালিত্বের গৌরব বহন করলেও, তাদের রাষ্ট্রচেতনায় আছে ‘ভারতীয়তা’। পক্ষান্তরে বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলার বাঙালিদের মনে প্রোথিত করেন একইসঙ্গে জাতিত্ব ও জাতিরাষ্ট্রের চেতনা।
৫৬ হাজার বর্গমাইল জুড়ে যে বাংলাভাষী মানুষ তারা একটা জাতি হতে চেয়েছিল। প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, “বাংলাদেশের মানুষ একটা জাতি, কারণ তারা জাতি হতে চায়, অন্য কিছু নয়।… যা আমাদের একত্রে ধরে, পরিণত করেছে এক জাতিতে, তা হচ্ছে আমাদের শুধু এই জাতি হিসেবে পরিচয় দেয়ার ঐকান্তিক কামনা।” বাঙালির এই ঐকান্তিক কামনা বা ইচ্ছেকে দেশপ্রেমের জারক রসে ভিজিয়ে ‘আত্মপরিচয়’ প্রতিষ্ঠার গৌরবে উজ্জীবিত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। প্রফেসর রাজ্জাক আরও বলেছেন, “পৃথিবীর সেই ছোট্ট অংশটির প্রেমে তিনি বিহ্বল ছিলেনÑ যার নাম হচ্ছে বাংলাদেশ। এ ধরনের ভালোবাসা বিপজ্জনক হতে পারে। বঙ্গবন্ধুই তার প্রমাণ। এ ধরনের আবিষ্ট বিহ্বল ভালোবাসা একজনকে অন্ধ করে তোলে, বিশেষ করে সেই ভালোবাসার প্রতিদান পাওয়ার সময়।” বস্তুত ১৯৭০-এর নির্বাচনে বাঙালি জাতির অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতৃত্বে বরিত হওয়ার পর ১৯৭১-এর মার্চের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে, ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর, গোটা মুক্তিযুদ্ধকালে বঙ্গবন্ধুই হয়ে ওঠেন সমগ্র বাঙালি জাতিসত্তার ঐক্যবদ্ধ আশা-আকাক্সক্ষা, লড়াই-সংগ্রাম, আত্মপরিচয় এবং স্বাধীনতার প্রতীক। তার শারীরিক অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তিনিই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা, জাতীয় ঐক্যের একমাত্র চৌম্বুকক্ষেত্র, ভাবাদর্শগত শিক্ষক এবং নতুন জাতিসত্তার আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার মহানায়ক।
বিশ্ব ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর মতো ‘প্রতীক’ হয়ে ওঠা আরও অনেক নেতা ছিলেন। তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক, ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় আন্দোলনের নেতা আহমেদ শোয়েকার্নো (সে দেশের মানুষ তাকে বাংকার্নো বা ভাই কার্নো হিসেবেও অভিহিত করত), কেনিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা জোমো কেনিয়াত্তা, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, পাকিস্তানের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং কঙ্গোর প্যাট্রিস লমুম্বা প্রমুখÑ প্রায় সবাই নিজ নিজ দেশবাসীর কাছে বিপুল জনপ্রিয় এবং জাতির আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। অন্যদের কথা বাদই দিয়ে জিন্নাহ ও গান্ধী প্রসঙ্গে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের মন্তব্য উল্লেখ করতে চাই। তিনি বলেছেন, “উভয়েরই (জিন্নাহ ও গান্ধী) কোটি কোটি ভক্ত। এসব জনতার কেউই গান্ধী বা জিন্নাহকে তাদের নিজেদের বলে ভাবতে পারত না। এটাই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জিন্নাহ বা গান্ধীর পার্থক্য। বঙ্গবন্ধু জাতি আর তার মধ্যে একটা অবিভাজ্য মেলবন্ধন গড়ে তুলেছিলেন।”
রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘আমি তোমাদেরই লোক’ হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর মধ্যেই অভিব্যক্ত হয়েছে বাঙালির ‘জাতি হওয়ার আকাক্সক্ষা’, অসাম্প্রদায়িক মানবিকবোধ, ঐতিহ্য-চেতনা, স্বদেশানুরাগ এবং বাঙালি জাতির প্রতি অন্ধ বিশ্বাস ও ভালোবাসা। এই অন্ধ ভালোবাসা ও বিশ্বাস যেমন তাকে মরণজয়ী সংগ্রামে জাতিকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম করেছে, আবার এই অন্ধ ভালোবাসা ও বিশ্বাসই তাকে তার নিরাপত্তা সম্পর্কে নির্লিপ্ত করেছে। এটা একটা আত্মঘাতী প্রবণতা। নিরাপত্তাহীন নিরস্ত্র বঙ্গবন্ধুকে ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যার সুযোগ করে দিয়েছে তার এই আত্মঘাতী অন্ধ দেশপ্রেম ও বাঙালির প্রতি প্রশ্নাতীত ভালোবাসা।
বাঙালির জাতি হয়ে ওঠার সাগ্নিক জনগণের ভেতর থেকে উত্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার বেহিসাবী ভালোবাসা, অতুলনীয় আত্মত্যাগ, সাহস, প্রজ্ঞা এবং বাঙালির প্রতি অন্ধ বিশ্বাস ও দেশপ্রেমের কারণে বরিত হয়েছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে। শোকাবহ আগস্টে এই অন্ধ প্রেমিক বঙ্গবন্ধুর প্রতি সমগ্র জাতির সাথে আমাদেরও নমিত শ্রদ্ধা। জয় বঙ্গবন্ধু।

শ্রেণী: