মেয়েদের শিক্ষা ও কাজ দিলে বাল্যবিবাহ কমবে

Posted on by 0 comment
57
57

বিবিসিকে প্রধানমন্ত্রী

উত্তরণ ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মেয়েদের যদি শিক্ষা ও কাজের সুযোগ দেওয়া হয়, তবে বাল্যবিবাহ কমানো সম্ভব। এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে অভিভাবকরা মনে করেন, বিয়ে একটি মেয়ের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। গত ১ জুলাই রাতে বিবিসি ওয়ার্ল্ড নিউজ টেলিভিশনে প্রচারিত সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন শেখ হাসিনা।
জাতিসংঘ ঘোষিত সহ¯্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) বিষয়ে ঢাকার কারওয়ান বাজার থেকে সরাসরি প্রচারিত একটি অনুষ্ঠানের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ প্রচার করা হয়। বিবিসির অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন মিশাল হুসেন। এতে বলা হয়, মাতৃ ও নবজাতক মৃত্যুর হার কমানো, শিশুদের স্কুলে ভর্তির হার বাড়ানোসহ কয়েকটি এমডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশ সফলতা দেখিয়েছে।
ওই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দুর্নীতি ও জঙ্গিবাদ দমন এবং ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনায় তার সরকার সফল হয়েছে। বিবিসি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া পুরো সাক্ষাৎকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিচে তুলে ধরা হলোÑ
এমডিজি অর্জন : বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার হার বাংলাদেশে সর্বোচ্চ। এতে বলা হয়, এ সমস্যা মোকাবিলায় সরকারের অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিবিসিকে বলেন, তাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হচ্ছে। বাল্যবিবাহ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইন করেই শুধু এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা যাবে না। মেয়েদের সক্ষম করে তুললেই এই প্রবণতা কমবে।
শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া সুযোগ-সুবিধার চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা স্কুলে বিনামূল্যে বই সরবরাহের ব্যবস্থা করেছি। এখন কোনো বাবা-মাকে সন্তানের বই কেনার বিষয়ে ভাবতে হয় না।
নারীশিক্ষা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, মাধ্যমিক পর্যায়ে কিছু ঝরে পড়া রয়েছে। কিন্তু আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য।
এমডিজি বাংলাদেশ কতটুকু অর্জন করতে পেরেছেÑ এ ব্যাপারে শেখ হাসিনার মূল্যায়ন জানতে চাইলে তিনি বিবিসিকে বলেন, এখন আমি বলতে পারি, আমরা ১ থেকে ৬টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পেরেছি। আমরা অনেক কিছু করেছি।
দুর্নীতি কমাতে পদক্ষেপ : টিআইয়ের দুর্নীতির সূচকে ১৭৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৫তমÑ এ কথা উল্লেখ করে প্রশ্ন করা হয়, যুক্তরাজ্যের করদাতারা কেন বাংলাদেশকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সামরিক শাসকরা বারবার এদেশ শাসন করেছে। এতে গণতন্ত্রের ধারা ব্যাহত হয়েছে। গণতন্ত্রের চর্চা হলে এবং দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠিত হলে দুর্নীতি কমে। আমরা দুর্নীতি কমাতে পারতাম। কিন্তু দুর্নীতি এখন সর্বব্যাপী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি কমিয়ে আনতে আমরা অনেক পদক্ষেপ নিয়েছি। আমাদের গণতন্ত্র কেবল বিকশিত হচ্ছে। ব্রিটেনে গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে ২০০-৩০০ বছর ধরে থেকে। বিবিসির সাংবাদিককে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনি কি আমাকে বলতে পারবেন, আপনাদের দেশে দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে?
বাংলাদেশ এখনও ধর্মনিরপেক্ষ : প্রধানমন্ত্রীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রতিষ্ঠিত করার কথা উল্লেখ করে প্রশ্ন করা হয়, বাংলাদেশ এখনও ধর্মনিরপেক্ষ আছে বলে তিনি মনে করেন কি-না। শেখ হাসিনা বলেন, অবশ্যই আছে। ১৯৭৫ সালে আমার বাবাকে হত্যার পর সামরিক শাসক দেশের ক্ষমতা নেয়। তারা সংবিধান সংশোধন করে এবং সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি বাদ দেয়। আমার দ্বিতীয় দফা শাসনামলে আবার ধর্মনিরপেক্ষতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করি।
জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে : তিন ব্লগারের ভয়াবহ হত্যাকা-ের প্রসঙ্গ তুলে প্রশ্ন করা হয়, সরকারের সঙ্গে জঙ্গি ইসলামপন্থিদের কোনো সমস্যা আছে কি-না। উত্তরে শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি জঙ্গিদের উৎসাহিত করেছে। আমাদের দুজন সাংসদকে হত্যা করা হয়েছে। আমিও আক্রান্ত হয়েছি। আমি সরকার গঠন করার পর থেকে সন্ত্রাসী বা উগ্রপন্থিদের ছাড় না দেওয়ার কথা ঘোষণা করি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জঙ্গিবাদ দমনের বিষয়টি অনেক কঠিন হলেও এখন তা নিয়ন্ত্রণে আছে।
এখন কী হচ্ছেÑ এর জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, একটি বা দুটি ঘটনা ঘটতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে কী হয়েছে? তা হলে আমরা কি ওই দেশটিকে কেবল সন্ত্রাসীদের দেশ বলব? মোটেও তা নয়।
জঙ্গিদের হত্যাকা-ের তালিকার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা তালিকার ব্যক্তিদের নিরাপত্তায় সব ব্যবস্থা নিয়েছি। এ ছাড়া, ওই তালিকা যারা বানিয়েছে, তাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। … সমালোচনাকারীরা যে কোনো কিছু বলতে পারে। তারা ভালো কিছু দেখে না। আমি আমার কাজ করছি। আমরা অবশ্যই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কাজ করছি।
মোদির মন্তব্য নিয়ে : বিবিসির প্রতিবেদক প্রশ্ন করেন, নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে এসে বললেন, আপনি একজন নারী হয়েও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এ নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেছেন। তার ওই বক্তব্যে আপনার মনে কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল? জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, আপনি জানেন, এই সমাজ পুরুষশাসিত। পুরুষরা সব সময়ই ভাবে, তারাই ভালো কাজ করতে পারে। কিন্তু এই উপমহাদেশেরই অনেক দেশ শাসন করছে নারীরা। আমাদের দেশে আমার সরকারের প্রথম মেয়াদে আমি তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে সুপ্রিমকোর্ট, হাইকোর্ট পর্যন্ত নারী নেতৃত্ব তৈরি করা শুরু করি। মোদির মন্তব্যে তিনি হতাশ হয়েছিলেন কি-না, প্রতিবেদক আবারও তা জানতে চাইলে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি হয়তো এমনই মনে… প্রশ্নটা বরং তাকেই (মোদি) করুন না।
একটু ঘুরিয়ে একই প্রশ্ন আবার করা হলে শেখ হাসিনা বলেন, দেখুন, আমি হতাশ নই। … কারণ অনেক সময় পুরুষরা অনেক কথাই বলে, তবে একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি হয়তো বলতে চেয়েছেন, আমি যে সাহস দেখিয়েছি, অনেক পুরুষও তা দেখাতে পারেনি। আমি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। তিনি হয়তো এরই প্রশংসা করতে চেয়েছেন।
ভাগনি টিউলিপ ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় কেমন লাগছে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি ওর জন্য গর্বিত। ও দারুণ করেছে। পার্লামেন্টে টিউলিপের ভাষণ শোনার বিষয়ে জানতে চাইলে শেখ হাসিনা ভাগনির প্রশংসা করে বলেন, ওর কণ্ঠস্বর আর কথা বলার ভঙ্গি অসাধারণ। ও একদিন বড় নেতা হবে।

শ্রেণী:

ডিজিটাল বাংলাদেশ একটা বিশাল ক্যানভাস : তরুণরাই এর কুশীলব

Posted on by 0 comment
25

ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী : বিশেষ সাক্ষাৎকারে ওবায়দুল কাদের

ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

22শত সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের পতাকাবাহী বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৬৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ৪ জানুয়ারি। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের এককালীন সভাপতি এবং বর্তমানে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের উত্তরণ-কে একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার প্রদান করেন। সাক্ষাৎকারটিতে ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগের ৬৭ বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভূমিকা, বর্তমান করণীয় এবং প্রত্যাশা সম্পর্কে খোলাখুলিভাবে তার মতামত তুলে ধরেছেন।

উত্তরণ : ছাত্রলীগের ধারাবাহিক-গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সম্পর্কে কিছু বলুন। বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৬৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশের ইতিহাস বিনির্মাণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ভূমিকার মূল্যায়ন কী?
ওবায়দুল কাদের : আওয়ামী লীগেরও আগে ছাত্রলীগের জন্ম। ছাত্রলীগ ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি এবং আওয়ামী লীগের জন্ম ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। তো বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেছিলেনÑ ছাত্রলীগের ইতিহাস বাঙালির ইতিহাস। ছাত্রলীগ আসলে যে পাকিস্তানি কলোনিয়াল শাসন-শোষণ, ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আজকের বাংলাদেশÑ পূর্ব বাংলা বলা হতোÑ এই পূর্ব বাংলার ছাত্রসমাজকে স্বাধীনতা ও মুক্তির লক্ষ্যে; স্বাধীনতা একটি শব্দ এবং মুক্তি আর একটি শব্দ। স্বাধীনতা ও মুক্তির লক্ষ্যÑ এটা বঙ্গবন্ধুর যে ভিশনারি লিডারশিপ। তিনি অনেক দূরের স্বপ্ন দেখেছেন। তিনি ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে ছিলেন একজন লড়াকু নেতা। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে যখন তিনি পড়তেন। তখনও ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে তার উত্থান। তখনকার হলওয়েল মুভমেন্টের বঙ্গবন্ধু একজন দুর্দান্ত সংগঠক। এবং মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা একে ফজলুল হক ও মওলানা ভাসানীর তিনি ছিলেন খুব কাছের মানুষ। তখনকার নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানি কাঠামোর মধ্যে বাঙালিদের অধিকার আন্দোলনের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু তিনি পৃথক দেশের চিন্তা করেন নি। এ চিন্তাটা ছিল মওলানা ভাসানীর। কিন্তু এটাকে বাস্তবের রূপ দেওয়ার মতো কোনো সংগঠন গড়ে তোলা বা সেরকম ম্যাজিক লিডারশিপ তিনি দিতে পারেন নি। এটা হলো বাস্তবতা। তার কমিটমেন্টেও কোনো ঘাটতি ছিল না। স্বপ্নের মধ্যে কোনো ত্রুটি ছিল না। স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন। স্বপ্ন অনেকেই দেখেন। কিন্তু সেই স্বপ্নকে সত্যি করা ভারি চ্যালেঞ্জিং। তখনকার কলোনিয়াল পিরিয়ডÑ এক উপনিবেশবাদ থেকে আরেক উপনিবেশবাদ। ব্রিটিশ থেকে পাকিস্তান। সে সময় ছাত্রলীগের মতো একটা সংগঠনের প্রতিষ্ঠাÑ এটা ছিল বঙ্গবন্ধুরই একটি লালিত স্বপ্নের সোনালি ফসল। এবং এই ছাত্রলীগই ১৯৪৮ সাল থেকে প্রথমেই বাংলা ভাষার দাবিতেÑ ৫৬ শতাংশ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। যখন শাসকদের মধ্য থেকে একেবারেই একটা বৈষম্যমূলক স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজের কথা বলা হলোÑ উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা। তখন এর প্রতিবাদে পাকিস্তান সৃষ্টির উষালগ্ন থেকে ভাষা আন্দোলনের সূচনা। এর পুরোভাগে ছিলÑ ভ্যানগার্ড ফোর্স ছিল ছাত্রলীগ। এবং এটা বঙ্গবন্ধুই নেতৃত্ব দিয়েছেন। কখনও জেলে থেকে। ভাষা আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধু ছিলেন জেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে তাকে জেলে যেতে হয়েছে। এমনকি তার ডিগ্রি পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে। কিছুদিন আগে এটা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা একটা কলঙ্ক মুক্তির জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ কাজটা করেছে। বিলম্বে হলেও একে আমি সাধুবাদ জানাই।
এরপর ছাত্রলীগের যে আন্দোলনÑ ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি তার পুরোভাগে ছাত্রলীগই ছিল। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও নাম না জানা অনেকে শহীদ হয়েছে। এদের রক্তের বিনিময়ে, অনেক ত্যাগের বিনিময়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলা স্বীকৃতি পায় উর্দুর পাশাপাশি। পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। এরকম একটি বিষয় বিজয় দিয়েই ছাত্রলীগের যাত্রা শুরু। সেখান থেকেই অঙ্কুরিত হয় স্বাধীনতার বীজ। সেখান থেকেই মূলত ’৫২ সালের ভাষা সংগ্রামের বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাঙালির স্বাধীনতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়।
এবং এই ভিত্তিপ্রস্তর থেকে এর পরের যাত্রা। ’৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনÑ সেখানেও ছাত্রলীগ একটি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। তারপর ’৫৮ সালের মার্শাল ল’Ñ এই মার্শাল ল’-বিরোধী আন্দোলনেও ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও সাহসী। ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলনÑ ছাত্রলীগ, তখন ছাত্র ইউনিয়নও ছিল। ’৬২ সাল থেকেই ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনিয়ন শিক্ষা আন্দোলনে একটা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। এবং ছাত্রলীগ ছিল পুরোভাগে। তারপরে ’৬৬-র ৬-দফা আন্দোলনÑ যখন আমাদের নেতারা কারাগারে বঙ্গবন্ধুসহ। বঙ্গবন্ধু তো এই জেল থেকে মুক্তি পেলে পরে আবার অন্য জেলে। এই করে তার যৌবনের প্রায় ১১ বছর তিনি জেলে কাটিয়েছেন। জেলেই তার আরেক বাড়ি ছিল। এটা হলো বাস্তবতা। তিনি বলেছেন, প্রিজন ইজ মাই এনাদার হোমÑজেল ইজ মাই এনাদার হোম।
এর পরের ধারাবাহিকতা ’৬৯-এর গণ-আন্দোলন। সেই গণ-আন্দোলনে তো নেতৃত্বে ছিল সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ। সেখানেও নেতৃত্বে ছিল ছাত্রলীগ। তারপর তো ’৭০-এর নির্বাচন বা ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। সেখানেও বঙ্গবন্ধুর ডাকেÑ এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। ২৬ মার্চ, ২৫ মার্চ রাত ১২টা ১ মিনিটে ইথারে ইথারে ভেসে গেল চট্টগ্রাম ইপিআরের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরীর কাছে স্বাধীনতার বার্তা। বঙ্গবন্ধুর যে ঘোষণা স্বাধীনতা। এবং সেখান থেকে সারাবাংলায় ছড়িয়ে পড়ে।
উত্তরণ : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হয় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা সম্পর্কে কিছু বলবেন কী?
ওবায়দুল কাদের : আসলে স্বাধীনতার ঘোষণাটা ৭ মার্চেই হয়ে গিয়েছিল। যেটি মরহুম জিয়াউর রহমান নিজেই বলেছেনÑ ৭ মার্চে উনি বিচিত্রায় একটা লেখায় লিখেছিলেন যেÑ ৭ মার্চেই আমরা বঙ্গবন্ধুর ভাষণ থেকে স্বাধীনতার গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে গিয়েছিলাম। এটাই হলো বাস্তবতা। আজকে বিএনপির নেতাকর্মীরা অনেক কথাই বলেন। জিয়াউর রহমান নিজে কোনোদিন বলেন নি তিনি স্বাধীনতার ঘোষক। কারণ তিনি জানেন তিনি ঘোষণাটি পাঠ করেছিলেন। তার কণ্ঠ এখনও আছে। এ কথাটা আমাদের এখনও কানে বাজে। জিয়ার কণ্ঠই আমরা শুনেছি। ‘আই মেজর জিয়া অন বিহাফ অব আওয়ার গ্রেড ন্যাশনাল লিডার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হিয়ার বাই ডিক্লেয়ার দি ইনডিপেন্ডেন্স অব বাংলাদেশ।’ সেই কণ্ঠ এখনও আছে। এ সত্যকে যারা চাপা দিতে চান। যারা ইতিহাস দখল করতে চান। যারা ইতিহাস নিয়ে কানামাছি খেলতে চানÑ তারা জানেন না যে ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতে চলে। যারা ইতিহাসকে বিকৃত করেন তারাই একদিন ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়ে যান। এবং অনেকেই আজ ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। আমি নাম বলতে চাই না।
এই সমুদয় সংগ্রামের সেন্ট্রিফিউগাল ফোর্স ছিলেন বঙ্গবন্ধু। একজন ব্যক্তিÑ কেন্দ্রাতিক শক্তি। সেখান থেকে স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের মোহনা। ’৭০-এর নির্বাচন তাকে সাংবিধানিকভাবে বৈধ নেতাÑ সারাদুনিয়ার কাছে তিনি জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা করেছিলেন। মেজরিটি পার্টির লিডার হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা করেছিলেন। এবং এই অধিকার একমাত্র তারই ছিল জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে এবং মেজরিটি পার্টির লিডার হিসেবে। আর কারও স্বাধীনতার ঘোষণার সেদিন বৈধ কোনো অধিকার ছিল না। এদিক থেকে এটাকে চ্যালেঞ্জ করার কোনো উপায় নেই। স্বাধীনতা সংগ্রামেও, মুক্তির সংগ্রামে ছাত্রলীগ নেতারাই আসলে মুজিব বাহিনীÑ এটা তো পুরোপুরি ছিল বিএলএফ। এটা ছিল ছাত্রলীগ এবং এর সঙ্গে কিছু কিছু ছাত্র ইউনিয়নের, তারাও অনেকে এর সঙ্গে ছিলেন। তবে মূলত ছাত্রলীগই এখানে মূল ভূমিকা নিয়েছিল। এ ছাড়াও মুক্তিবাহিনীÑ ফ্রিডম ফাইটার যেটা সেখানেও বিভিন্ন রকম ছিল তখন। মানে এটাকে সুবিধার জন্য দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছিল। একটি হলো ফ্রিডম ফাইটার, অন্যটি বিএলএফ। বেঙ্গল লিবারেশন ফোর্স। মানে মুজিব বাহিনী। এই বিএলএফটা মূলত ছাত্রলীগারদের দ্বারাইÑ এই যে তোফায়েল আহমেদ, সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মণি, আবদুর রাজ্জাকÑ এরা ছিলেন নেতা। এই চারজন নেতা ছিলেন। এর পরের লেয়ারে ছিলেনÑ আ স ম আবদুর রব, আবদুল কুদ্দুস মাখন, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ। এদের সবাই ছাত্রলীগার। ছাত্রলীগই আসলে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধের সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছে। তারাই কিন্তু এ দায়িত্ব সুচারুভাবে সম্পন্ন করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠন, ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আমাদের সাবেক নেতাদের একটি বিশাল ভূমিকা ছিল। যারা মুজিব বাহিনীর কমান্ডার তাদের।
উত্তরণ : বঙ্গবন্ধুর শাহাদাৎ বা সপরিবারে হত্যাÑ এসব ট্র্যাজিক পরিস্থিতিতে ছাত্রলীগ এবং সমসাময়িক পরিস্থিতি নিয়ে আপনার ব্যাখ্যা।
ওবায়দুল কাদের : স্বাধীন বাংলাদেশের সাড়ে তিন বছরে ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিল দেশ গড়ার সংগ্রামে। এর মধ্যে ছাত্রলীগের বিভক্তি আসে। সে বিভক্তিটা আসে এখানেÑ আসলে বিপ্লবের পরে একটা প্রতিবিপ্লব হয়ে গেল। তরুণ সমাজের একটা বিরাট অংশÑ সেদিন যারা এখান থেকে বিভক্ত হয় ছাত্রলীগের সম্মেলনেÑ স্বাধীনতার পর যে সম্মেলন হয় তাতে বিভক্তি আসে। এবং সিরাজুল আলম খান ও আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে আলাদা একটি ছাত্রলীগের জন্ম হয়। অপ্রিয় হলেও সত্যÑ তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তখন ওই যে ছাত্রলীগ জাসদÑ যেটা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগান দিয়ে যাদের জন্ম সেখানে চলে যায়। মূল সংগঠনের যারা তারা কিন্তু অপেক্ষাকৃতভাবে দুর্বল ছিল। আমি মূল সংগঠনেই ছিলাম। তখন বলত বৈজ্ঞানিক ছাত্রলীগ ওইদিকে আর এদিকে মুজিববাদী ছাত্রলীগ। তখন যে অবস্থাটা সেটা হচ্ছেÑ আমি একটা কথা নির্দ্বিধায় বলব, এটা আমার পার্সোনাল ওপেনিয়ন যে, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতার পর যদি ছাত্রলীগের এ বিভক্তিটি না আসত এবং জাসদ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের জন্ম না হতো তা হলে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আমাদের দুর্বলতার ওপরেই যে আঘাত এসেছিল সেদিন তা ঘটত না। সাংগঠনিকভাবে আমি মনে করি, যদিও সারা বাংলাদেশের জনগণ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে, জনগণ ’৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুকে ভোট দিয়েছে এবং ’৭৫-এ যদি কোনো ভোট থাকতÑ তখন তো দেশের অবস্থা স্বাভাবিক, এই যে জ্বালাও-পোড়াও, থানা লুট-ফাঁড়ি লুট, ঈদের জামাতে আমাদের এমপি হত্যা, এসব অনেক ঘটনা এবং গণবাহিনী সৃষ্টি করে জাসদ যে অবস্থার সৃষ্টি করেছিল তখন সারা বাংলাদেশেÑ প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও এ ধরনের ঘটনা ঘটত; নাশকতামূলক কার্যকলাপ চলত। তারা এটাকে রাজনীতি বললেও এটি আসলে নাশকতা-সহিংসতার কাজগুলো তখন গণবাহিনী করত। তাদের নেতারাও পরবর্তীতে স্বীকার করেছেÑ তাদের এ ধরনের বাহিনী গড়ে তোলা এবং বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা, এটা তাদের বড় ভুল ছিল। এটা মুক্তিযুদ্ধেরই ক্ষতি ডেকে এনেছিল।
’৭৫-এ যে প্রতিবিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল এবং যে স্প্রিন্টার বুফ সেদিন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল, সেদিন বিদেশি শক্তিরও ইন্ধন ছিল। এ ঘটনাটি কীভাবে ঘটত আমি জানি নাÑ তবে আমার মনে হয়, জাসদ-গণবাহিনী এবং ছাত্রলীগের যে বিভক্তি সেখান থেকেই তো মূলত গণবাহিনী-জাসদ তৈরি হয়। এই জাসদের সঙ্গে তো যারা পরাজিত শক্তি তাদেরও একটা অংশ যোগ দিয়েছিলÑ সাপোর্ট দিয়েছিল। তাদের নেতৃত্বে হয়তো মেজর জলিল, আ স ম রব ছিল। কিন্তু তাদের সাপোর্টার, জেলা পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী, তৃণমূল পর্যায়ে তখন পাকিস্তানের যারা হানাদার 25বাহিনীর যারা সাপোর্টার ছিল তাদের অনেকেই কিন্তু তাদের সাথে মিশে গিয়েছিল। এসব অনেক কারণে আমার মনে হয়, স্বাধীনতার পরে এই যে বিভক্তির রক্তক্ষরণÑ এটা ঘটতে ঘটতে পরিণতিটা আমাদের শত্রুদের সাহায্য করেছিল বঙ্গবন্ধুর মতো এক বিশাল ব্যক্তিত্বকে আঘাত করা। তারা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। তারা আমাদের মধ্যে থেকে যারা বেরিয়ে গেছে, যারা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, যারা আলাদা সংগঠন করে, আলাদা বাহিনী করে সেদিন বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে তারা প্রকাশ্যে অনেকটা যুদ্ধ ঘোষণার মতো একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। তরুণদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ তাদের সঙ্গে চলে গিয়েছিল। যে কারণে তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক একটা শক্তশালী অবস্থানও তাদের ছিল। এটা বাস্তবতা। সে সময় ছাত্রলীগের এর পরের যে ভূমিকাটাÑ ’৭৫-পরবর্তী। তখন কিন্তু ছাত্রলীগই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
উত্তরণ : আপনি তো সভাপতি ছিলেন ছাত্রলীগের এবং আপনার সমসাময়িক যে পরিস্থিতি ছিল সে সম্পর্কে বলুনÑ
ওবায়দুল কাদের : আমি জেল থেকেই সভাপতি হই। আমার সাথে চুন্নু ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। তখনই বঙ্গবন্ধু হত্যার সেন্টিমেন্ট এবং আবেগÑ এটাকে আমরা সারা বাংলাদেশে কাজে লাগিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রলীগের পরিস্থিতি ভালো করি। ’৭২-’৭৫ পর্যন্ত অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাসদ ছাত্রলীগ জয়লাভ করত। কিন্তু ’৭৫-এর পরে এটা ঘুরে গিয়েছে। শুধু ডাকসুতে একটু ভিন্ন হয়েছে। তাও ভিপি-জিএস; কিন্তু অন্যান্য পদে কিন্তু আমরা জিততাম। হলগুলোতে আমরা, অন্যান্য পদে আমরা, একবার তো ১৯টি পদের মধ্যে ১৬টি পদে আমরা জিতেছিলাম। কিন্তু ভিপি-জিএস আমরা জিততাম না। নানান ইকুয়েশন ছিল। বা যে কোনো কারণে আমরা হয়তো পাইনি। কিন্তু ছাত্রলীগ তখন অনেক স্ট্রং ছিল। সে জন্যই আজকে অনেক সময় ভাবতে কষ্ট লাগে যেÑ কি ছাত্রলীগ রেখে এলাম!
উত্তরণ : আপনি যখন সভাপতি ছিলেন তখনকার বিশেষ কোনো স্মৃতি যা আপনাকে প্রভাবিত করে?
ওবায়দুল কাদের : বিশেষ মুহূর্ত মানেÑ সব সময়ই আমরা চ্যালেঞ্জের মুখে ছিলাম। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম প্রতিবাদ তো আমরাই করেছিলাম। ২০ অক্টোবরÑ ১৫ আগস্টের পর। ছাত্র ইউনিয়নও ছিল। তখন করেছিলাম জাতীয় ছাত্রলীগÑ যেখানে ছাত্র ইউনিয়ন ছিল। লেনিন ভাই ছিল, মাহবুব জামান, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ইসমত কাদির গামা, রবিউল আলম চৌধুরী, মমতাজ হোসেন, সৈয়দ নুরুল ইসলাম। পরে সৈয়দ নুরুল ইসলাম কাদের সিদ্দিকীর সাথে কাদেরিয়া বাহিনীতে চলে যায়; কিন্তু যে কোনো কারণে একটি দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান।
উত্তরণ : নেত্রী ফিরে এলেন কখন?
ওবায়দুল কাদের : নেত্রী ফিরে এলেন ১৯৮১ সালের ১৭ মে। তখন আমি ছিলাম ছাত্রলীগের সভাপতি। এবং আমরাই প্রথম নেত্রীকেÑ মিজানুর রহমান চৌধুরী সংসদে বললেনÑ বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হোক। আর বাইরে থেকে আমিই প্রথম শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে স্বদেশে ফিরিয়ে আনা হোকÑ এ দাবি তুলেছিলাম ছাত্রলীগের ব্যানারে। আমরা স্টেটমেন্টও দিয়েছিলামÑ কাদের-চুন্নু যে ছাত্রলীগÑ ব্রাকেটেড ছিল। তারপর তো নেত্রী এলেন। নেত্রী আসার মাস তিন-চারেক পরেই আমি ছাত্রলীগের সম্মেলন করে দেই। তারপর আবার বিভক্তি। রাজ্জাক ভাই তখন বাকশাল করেন। এবং ছাত্রলীগের একটা ভালো অংশÑ তারুণ্যের একটা উজ্জ্বল অংশÑ তখন বাকশালে চলে যায়। এই যে বিভক্তি এর ভিতরে এদিকের নেতৃত্ব ত্যাগী কিন্তু একটু দুর্বল ছিলÑ মেইনস্ট্রিমের। জালাল-জাহাঙ্গীর ত্যাগী নেতৃত্ব। কিন্তু তারপরও আমার মনে হয়, রাজ্জাক ভাই যেহেতু বিষয়গুলো দেখতেন তাই তরুণদের বেশির ভাগ কোয়ালিটিফুল নেতৃত্ব ওদিকে চলে যায়। যেহেতু শেখ হাসিনা আমাদের, তাই এতে কোনো শূন্যতা সৃষ্টি হয়নি। তার প্রমাণ রাজ্জাক ভাই আবার বাকশাল থেকে আওয়ামী লীগে ফিরে আসেন। যার প্রমাণ হলোÑ শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেন নি; কিন্তু প্রথমেই একটা ধাক্কা দিয়ে চলে গেছেন। এ ধাক্কাটা আমাদের জন্য একটা হোঁচট ছিল। বিশেষ করে তারুণ্যেÑ ছাত্রলীগের রাজনীতিতে। সেই আঘাতের পর সেখানেই একটা রক্তক্ষরণ ঘটে গেছে। তারপরই সেই অবস্থাকে নেত্রীর নির্দেশে আমি অনেকদিন ছাত্রলীগ ছেড়ে দিয়েও দেখাশোনা করি এবং ছাত্রলীগকে মোটামুটি একটা অবস্থায় নিয়ে আসি। আমরা দু-তিনটা ইলেকশনও করিয়ে দেই। কিন্তু তারপরও দেখা যায় রুলিং পার্টিতে আসলে ছাত্রলীগ তার আগের সত্তাটা হারিয়ে ফেলে। রুলিং পার্টিতে এলেই ঐতিহ্যগত জায়গা থেকে একটু বিচ্যুতি ঘটে। এটা সবার ক্ষেত্রে না। ক্ষমতার সঙ্গে কিছু আবর্জনা পরগাছা ঢুকে পড়ে। এই আবর্জনাগুলো এখানে এসে নানান ঝামেলা করে। আর রাজনীতিতে কিছু কিছু দলীয় লোকÑ নির্বাচনী রাজনীতিতে অনেক প্রতিনিধি আসেন, যাদের কোনো পলিটিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড নেই। এসব লোক নানা জায়গায় ছাত্রলীগকে প্রভাবিত করেন। এবং স্থানীয়ভাবে প্রত্যেকে নিজ নিজÑ আর সরকার দল হলে প্রত্যেকেই নিজের আধিপত্য এবং ক্ষমতার প্রমোশনে একটা সিঁড়ি হিসেবে ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে। এই প্রবণতা ১৯৯৬-২০০১ ছাত্রলীগের ক্ষতি করেছে। এ সময়ও এই ধরনের প্রবণতা আছেÑ এই ধরনের ট্রাসেস-তলানি এসে ঢুকে পড়েছে।
উত্তরণ : আমি একটু অতীতে ফিরে যাচ্ছি। নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। সেখানেও ছাত্রলীগের একটা বিশেষ অবদান ছিল। আপনার সে সময়কার পর্যবেক্ষণ কী ছিল বা তাদের কন্ট্রিবিউশিন কী?
ওবায়দুল কাদের : না তখন ভালো ছিল। ডাকসুটা আমরা পেলাম। ভিপি ছিল আমাদের, জাসদের ছিল জিএস। সুলতানের সাথে জিএস ছিল মুস্তাক। মুস্তাক ছিল জাসদের। এরপরই তখনও ছাত্রলীগ একটা ভালো জায়গায় অবস্থান করছিল। তখনও ছাত্রলীগের মধ্যে এসব নৈতিক বিচ্যুতিÑ কিছু লোকের অপকর্ম, কিছু লোকের বেপরোয়া কর্মকা-, এই বেপরোয়া কর্মকা-গুলো এভাবে প্রসারিত হয়নি। যেটা এবার প্রথম থেকেই ফুটেছে। গতবার বিশেষ করে ওয়ান ইলেভেনের পর।
উত্তরণ : এখানে নিবিড় একটা পর্যবেক্ষণ বা…
ওবায়দুল কাদের : আমি মনে করি দু-তিনটা বিষয় দেখতে হবে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনটা মাস্ট। গত ২২ বছরে ৪৪ জন ভিপি-জিএস হতো। এরা কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দিত। এদের মধ্যে অনেকেইÑ ডাকসুর ভিপি-জিএস সবাই যে মূল ধারার রাজনীতিতে আছে তা ঠিক না। কিন্তু তারপরও লিডারশিপ। এই লিডারশিপের মধ্যে হয়তো ১০ জন বিচ্যুৎ হতে পারে। কিন্তু একটা ভালো নেতৃত্ব আসত জাতীয় পর্যায়ে। কলেজ সংসদ, বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি ইলেকশনগুলো যথারীতি হতো ’৭৫-এর পর। কিন্তু সেই ইলেকশনগুলো এখন বন্ধ হয়ে গেছে। সেই ইলেকশনগুলো না হওয়ার কারণে ছাত্র রাজনীতির ভিতরেও এই যে ইলেকশন না হওয়া এই যে অগণতান্ত্রিক, অসুস্থ প্রতিযোগিতা সেটা আরও বেড়ে গেছে। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা বেড়েছে, গণতান্ত্রিক পরিবেশের অনুপস্থিতিতে অসুস্থ ধারার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এই অসুস্থ ধারা আরও অসুস্থ হতে থাকে। আমি এটাই বলবÑ ছাত্র সংসদ নির্বাচন যদি ঠিকমতো হয়, যথারীতি, সময়মতো, তা হলে ছাত্রসমাজের মধ্যে নেতৃত্বে যারা থাকে বা যাদের নেতা হওয়ার শখ থাকে তারা ভাবে আমাকে আগামী বছর ইলেকশনে দাঁড়াতে হবে। কাজেই আমি ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে এমন কোনো কাজ করব যে কাজের কারণে আমি ভোট পাব না। আমি এ কথা বারবার বলেছি এখানে ইমেজের একটা ব্যাপার আছে। সেখানে ইমেজটা নিজে নিজেই ঠিক করত। এটাই হলো এক নম্বর ক্রাইটেরিয়া। আর দুই নম্বর বলি যে, ছাত্র রাজনীতিতে যেমন ছাত্রলীগ, আমার মনে হয় ছাত্র সংগঠনগুলোর কনফারেন্স-কাউন্সিল সময়মতো হওয়া দরকার। কিন্তু সময় কেউ রাখতে পারে না। সময়মতো হচ্ছে না। অনেক সময় দেশের প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য হয় না। কিন্তু এতে নেতৃত্বে ট্র্যাফিক জ্যাম হয়ে যায়। এবং অসুস্থ প্রতিযোগিতাও বেড়ে যায়। অপকর্মকারীরা প্রশ্রয় পায়। অবমূল্যায়ন হয়। অনেকে মনে করে আমার তো ছাত্রজীবনই শেষ হয়ে গেল। কিছু হতে পারলাম না। হতাশা থেকেও সে নানান অপকর্মে লিপ্ত হয়। এগুলোর বাস্তবতাও আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। তা হলে আমি মনে করি, নেক্সট হলো ছাত্র সংগঠনগুলোর কাউন্সিলগুলো যথারীতি যথাসময়ে হওয়া উচিত। তাতে ছাত্র সংগঠনের মধ্যে একটা গণতান্ত্রিক সুস্থ প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকে। নেতৃত্বে রেগুলার স্টোন থাকা। এটা একদম মাস্ট করতে হবে।
উত্তরণ : নেত্রী তো ছাত্রলীগের বয়স কমিয়ে দিলেনÑ
ওবায়দুল কাদের : আমি বলছি যে বয়স কমিয়ে ফেলেছেন। নেত্রী হয়তো ওপরের দুজন করেছেন। কিন্তু বাস্তবে হয়তো কেন্দ্রীয় কমিটিটা আছে। কিন্তু জেলা পর্যায়ে ধারাটা ঠিক রাখা হয়নি। অনেক সময় দেখা যায় যে সেন্ট্রালের চেয়ে অনেক জেলার প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারির বয়স বেশি। এতে কিন্তু ভারসাম্য রক্ষা হয় নি। এই যে সেন্ট্রালের সাথে নেত্রী যা করে দিয়েছেন, তার সাথে সঙ্গতি রেখে শাখা সংগঠনগুলো সেভাবে নতুন মডেলে রিক্যাশ করে উঠতে পারে নি। পারেনি বলেই এখানে একটা ইমব্যালেন্স সৃষ্টি হয়েছে। অথরিটির ইমব্যালেন্স, পাওয়ারের ইমব্যালেন্স। এবং এই সুযোগে অনেক কিছু ডিস্ট্যাবিলাইজ হয়ে গেছে। এটাই আমি বলতে চাই। কাজেই দু-তিনটা বিষয় দেখতে হবে। নিয়মিত ছাত্রদের দিয়ে নেতৃত্ব, তারপর রেগুলার কাউন্সিল করা। আর এক নম্বরে আমি যেটা বলছি ছাত্র সংসদ নির্বাচন।
উত্তরণ : ছাত্রলীগের কাছে আপনার প্রকৃত প্রত্যাশা কী?
ওবায়দুল কাদের : শোনেন আমি স্বাধীনতা মুক্তিযুদ্ধে যে ছাত্রলীগ, স্বাধীনতা-পরবর্তী ছাত্রলীগের রোল সেটি এক থাকবে না। ভূমিকা পাল্টাবে, সময়ের পরিবর্তনে ভূমিকা বদলাবে। তারপর ’৭৫-পরবর্তী যে ভূমিকা ছিল সেই ভূমিকা পাওয়ারে আসার পর বদলাবে। কারণ তখন পাওয়ার আসার পর আমাদের নেত্রীর একটা ভিশন আছে, সেই ভিশনকে সামনে রেখে কতগুলো বিষয় তিনি ছাত্রদের সামনে তুলে ধরেছিলেন যেমনÑ বোমার পরিবর্তে বই হাতে নাও, অস্ত্রের বদলে কলম হাতে তুলে নাও। এটা ঠিকমতো অনুসরণ করা গেলেÑ যেমন ছাত্র সংগঠনগুলো ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম করে। আমি অনেকবার শুরু করিয়েছিলাম। কিন্তু সেটি আর থাকে না। এই ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামটা ঢাকা থেকে একদম তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত থাকে এবং সেটা লোক দেখানো না। এটা বাস্তবেÑ এগুলো চর্চা করতে হবে। পড়াশোনা করতে হবে করাতে হবে।
উত্তরণ : ডিজিটাল বাংলাদেশের…
ওবায়দুল কাদের : ডিজিটাল বাংলাদেশ একটা বিশাল ক্যানভাস। এখানে ছাত্র সংগঠনের তরুণদের ভূমিকা থাকবে আগে। কারণ আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশটাকে উৎসর্গ করেছেন। তরুণরাই কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশের কুশীলব-কারিগর। এখানে সজীব ওয়াজেদ জয়Ñ কম্পিউটার সায়েন্টিস্ট। তার একটা বিশাল ভূমিকা আছে। তিনি কিন্তু নীরবে নিঃশব্দেÑ বাংলাদেশে কিন্তু একটা নীরব বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে। এবং সজীব ওয়াজেদ জয় এখানে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করছে। এবং আমার বিশ্বাস যে, ছাত্রলীগ এখন যদি এই প্রোগ্রামের দিকে, যে ভিশন নেত্রী দিয়েছেন সেটাকে সামনে রেখেÑ ২০২১ সালকে সামনে রেখে এই কাজগুলোতে নিজেদের ব্যাপৃত করে, অংশগ্রহণ করে এবং কমিটমেন্ট নিয়ে আচরণগত দিক থেকে নিজেদের সংশোধন করে, তা হলে আমি তাদের নিয়ে অনেক আশা আমরা করতে পারি।
উত্তরণ : এর জন্য কোনো পরিকল্পনা…
ওবায়দুল কাদের : আমি তো বলে দিলাম, এই বিষয়গুলো করতে হবে। ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামটা দরকার। ঠিকমতো কাউন্সিল করা দরকার। নিয়মিত ছাত্রদের হাতে তৃণমূল পর্যন্ত দায়িত্ব দেওয়া দরকার। ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলো করা দরকার। আর মূল সংগঠনে নেত্রী আমাদের অভিভাবক। তিনি ঠিক আছেন। বঙ্গবন্ধু আমাদের আদর্শের গুরু। তিনি আমাদের আদর্শের পিতা। এটুকু ঠিক রেখে আমাদের এই যে বিভিন্ন নেতার স্বার্থ সংরক্ষণের পাহারাদার হিসেবে ছাত্রলীগ ব্যবহৃত হয়Ñ এ প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। থ্যাংক ইউ!

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : মাসুদ পথিক
বাণীবদ্ধ : মো. আরিফুল ইসলাম
অনুলিখন : মো. জাকির হোসেন

শ্রেণী:

মুক্তিযুদ্ধ : নতুন প্রজন্মের চোখে

50

50মহান বিজয় দিবস আসন্ন। ৪৩ বছর আগে এই দিনে ৩০ লাখ তাজা প্রাণের বিনিময়ে পৃথিবীর মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে রক্ত¯œাত লাল-সবুজ পতাকার আশ্রয়স্থল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। স্বাধীনতা-পরবর্তী আমাদের অর্জন যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে ব্যর্থতাও। এরপরও সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনাময় একটি দেশ এ কথা বারবার উচ্চারিত হয়ে এলেও আমরা সেই সম্ভাবনাটুকু কাজে লাগাতে পারিনি যথোপযুক্তভাবে। অশিক্ষা, দুর্নীতি, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, জঙ্গিবাদসহ নানা সমস্যার ফলে কাক্সিক্ষত উন্নতি হয়নি আমাদের প্রিয় এ মাতৃভূমির। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রচেষ্টা, নারীর অধিকার সংরক্ষণ, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ এবং দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাসহ সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশ ও প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করার মধ্য দিয়েই আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারব। দুর্নীতির মূলোৎপাটন করে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার সে পথে এগিয়েছে বহুদূর। তবে, এদেশে জঙ্গিবাদ তথা স্বাধীনতাবিরোধী চক্র প্রতিনিয়ত দেশবিরোধী কর্মকা-ে যুক্ত থাকলেও এদেশের শান্তিকামী জনগণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে তা প্রতিনিয়তই প্রতিহত করে আসছে। বিশ্বাস করি ২০২১ সালের মধ্য বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে মালয়েশিয়া যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনাম ২৫ বছর যুদ্ধ করে ঘুরে দাঁড়াল, জাপান আণবিক বোমায় বিধ্বস্ত হয়েও ঘুরে দাঁড়াল, আমরাও দীর্ঘদিন পর হলেও সে পথেই হাঁটছি। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যও এদেশের অর্থনীতির বিকাশ ক্রমবর্ধমান। গণতান্ত্রিক সরকার দেশ পরিচালনা করছে। রোগ-ব্যাধির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে মানুষের গড় আয়ু আরও বেড়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর পদাচারণা বৃদ্ধি পেয়েছে। সাক্ষরতার হার বেড়েছে, কমেছে দরিদ্রতা। স্থায়ী হয়েছে বহুদলীয় ব্যবস্থা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মাধ্যমে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ করা হয়েছে। বিজয় দিবস জাতিকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়, অত্যাচার ও শোষণের কালো হাত গুঁড়িয়ে দিতে, অধিকার আদায়ে আত্মসচেতন করে তোলে। বিজয় সংগ্রামের এ দিনটিতে উঁকি দেয় অসাম্প্রদায়িক, সন্ত্রাসমুক্ত শস্য শ্যামল ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়।
সানাউল হক সানী
সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি
মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির এক বড় প্রাপ্তি। মুক্তিযুদ্ধ না হলে আমরা স্বাধীনতা পেতাম না, পালন করতে পারতাম না ১৬ ডিসেম্বরকে বিজয় দিবস হিসেবে।
আমরা বর্তমান প্রজন্ম দেখিনি মুক্তিযুদ্ধ। তারপরও ’৭১-এর সেই ভয়াল দিনগুলোর কথা শুনলে রক্ত গরম হয়ে যায়। মনে হয় কেন ’৭১-এ জন্ম নিলাম না। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধে বহু ত্যাগের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের সূর্য ছিনিয়ে আনে বাঙালিরা। পাকবাহিনীর সেদিনের অবস্থা খুব দেখতে ইচ্ছা হয়।
বাঙালি জাতির বহু আকাক্সিক্ষত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ অনেক এগিয়েছে। ২০১৩ সালে বিজয়ের মাসে যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে ঝোলানো বাঙালি জাতির জন্য এক বড় প্রাপ্তি। এ বছর কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। আশা করব, এই বিজয়ের মাসে অন্তত একজন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায় কার্যকর করে বাংলাদেশ কলঙ্ক মোচনে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে। এটি শুধু বর্তমান সরকারের সাফল্য নয়, দেশবাসীর সাফল্য।
তবে বিজয় দিবসে আমি মনে করি, আমরা যা-ই করি না কেন তা যেন লোক দেখানো না হয়। বিজয় দিবসকে আমরা পালন করব অন্তর দিয়ে। শহীদদের প্রতি আমরা যখন ফুলেল শ্রদ্ধা জানাই, তখন যেন সে শ্রদ্ধা অন্তর থেকে আসে।
মো. শামীম রিজভী
তরুণ সাংবাদিক

তরুণ প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি হিসেবে বিজয়ের ৪৪তম দিবসে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার চার বছরের মাথায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে চক্রান্ত সক্রিয় হয়। সেই চক্রান্তের জাল ছিঁড়ে বর্তমানে আবারও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতায় আছে। এটাই আমার সৌভাগ্য। পঁচাত্তরের পরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রথমবার যখন ক্ষমতায় আসে তখন পর্যাপ্ত সময় না পাওয়ায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারে নি। এবার দীর্ঘমেয়াদে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের হাতে সেই সুযোগ এসেছে। আমার বিশ্বাস, এই বাংলার মাটিতে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি আর কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।
বিশেষ করে জননেত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে বাংলার ইতিহাস থেকে নতুন কলঙ্ক মোচন হওয়ার পথে। তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে চলেছে। এই অর্জনগুলো আমাদের ভবিষ্যতের পথ চলার পাথেয় হয়ে থাকবে।
দেশ স্বনির্ভর হয়ে উঠছে। বেকার যুবকরা চাকরি পাচ্ছে। কৃষি, স্বাস্থ্য, রাজনীতি, সংস্কৃতিসহ সবক্ষেত্রে নিজেরাই নিজেদের ছাড়িয়ে যাওয়ার পালা চলছে। এবারের বিজয় দিবস আমাদের সামনে নতুন তাৎপর্য নিয়ে হাজির হচ্ছে। ‘ভিশন-২০২১’ অনুযায়ী বাংলাদেশ শিগগিরই মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। এ প্রত্যয় আমাদের। সবাইকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা।
একেএম জিয়াউল হক জিয়া
শিক্ষার্থী
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পরিচালিত টানা দ্বিতীয়বারের সরকারের প্রথম বিজয় দিবস আসছে। বিষয়টা আমার কাছে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ যে স্বপ্নের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেই স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিরা দেশকে ভিন্ন পথে প্রবাহিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস তার সঠিক ধারায় ফিরে আসে। এটাই নিয়ম। তাই এবারের বিজয় দিবস ভিন্ন আমেজে উপলব্ধি করছি। বিশ্বের বুকে বাঙালি জাতি তার স্বকীয়তা ধরে রেখে এগিয়ে চলেছে যুগ যুগ ধরে। তবে, বাংলার বুকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারহীনতার সংস্কৃতি সেই স্বকীয়তায় কালিমা লেপন করেছিল চার দশকেরও বেশি সময়। লৌহমানবী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ওই কালিমা থেকেও রক্ষা করেছে আমাদের। শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারই শুধু হচ্ছে না, তা কার্যকরও হচ্ছে।
যুদ্ধাপরাধীরা ’৭১-এর যেমন চক্রান্ত করেছিল, তেমনি বিচার নিয়েও জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ষড়যন্ত্রে মেতে ছিল। সব বাধা উপেক্ষা করে এই বিচারকাজ চালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষেই সম্ভব ছিল, হয়েছেও তাই।
আমরা তরুণ প্রজন্ম বড় হয়েছি বদ্ধ রাজনৈতিক সময়ে। যখন যুদ্ধাপরাধীরা জাতীয় পতাকা নিয়ে সংসদে ঢুকেছে। বাংলার মাটি সেই রাজাকারদের দম্ভ সহ্য করেনি, করবেও না। নতুন প্রজন্ম একটি শুদ্ধ রাজনৈতিক পরিবেশে গড়ে উঠবেÑ এ প্রত্যাশা করছি বিজয় দিবসের প্রাক্কালে।
রাজিব বিশ্বাস
ব্যাংকার

বিজয় দিবসের আনন্দ অন্য কোনো আনন্দের সঙ্গে মেলানো যায় না। এই দিনে আমরা নতুন একটি দেশ পেয়েছি, পরিচয় পেয়েছি বিশ্বের বুকে। আমি যুদ্ধ দেখিনি, স্বাধীনতার আন্দোলন দেখিনি, মা-বোনদের লাঞ্ছিত হওয়া দেখিনি। কিন্তু অনুভব করি। কী অস্বাভাবিক সাহসিকতায় আমাদের বীর যোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করেছেন। বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে মাতৃভূমিকে পবিত্র রেখেছেন। তাদের সেই সাহসিকতার অনন্য অর্জন আমাকে শিহরিত করে। আমি আবেগ আপ্লুত হই। নিজের মধ্যে শক্তি খুঁজে পাই। আমরা সেই বীরের জাতি যারা দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ করে নিজের অধিকার আদায় করেছি। দেশকে শত্রুমুক্ত করেছি। এসবই সম্ভব হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনবদ্য অবদানের কারণে। তার রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজের হাল ধরেছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। আগত নতুন বিজয় দিবসের শপথ হোক গণতন্ত্রবিনাসী অপশক্তির বিরুদ্ধে আমরা আছি, থাকব।
হ্যাপি আক্তার
শিক্ষার্থী, ইডেন কলেজ

বিজয় দিবসের দিনে লাল-সবুজের পতাকাটা নতুনভাবে আমাকে ভাবায়। মনে হয় এই দিনে বুঝি পতাকাটা তার নতুন প্রাণ ফিরে পায়। পতপত করে বাতাসে উড়ে ঘোষণা দেয়, দেখÑ আজ আমার আনন্দের দিন। অন্য বছরের বিজয় দিবসের চেয়ে এবারের বিজয় দিবস নতুন বার্তা নিয়ে আসছে আমাদের মাঝে। আমার মতে, চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ একটি ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তা সারানোর উদ্যোগ নিয়েছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্নের মাধ্যমে। বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে, এগিয়ে যাবে। আমাদের উন্নয়নের এই ধারা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাক, বিজয় দিবসে এই প্রত্যাশা।
সুরভী খানম
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আমার সন্তানকে নিয়ে যখন শাহবাগে একত্রিত হয়েছিলাম লাখো মানুষের সমুদ্রে তখন নতুন জীবনের স্বাদ পেয়েছি। মনে হয়েছে, স্বাধীনতাবিরোধীদের যে দাপট দেখে আমরা বড় হয়েছি, আমার সন্তানকে অন্তত তা দেখতে হবে না। তারা জানতে পারবে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস।
তথ্যপ্রযুক্তির নতুন দুনিয়ায় অনেক কিছুই পরিবর্তন হচ্ছে কিন্তু মৌলিক অর্জনগুলো একই রকম থেকে যায়। তেমনি বিজয় দিবস আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। কৈশোর থেকে তরুণে রূপান্তরের বয়সে ইতিহাস বিকৃতির যে চিত্র আমরা দেখেছি তা বদলাতে শুরু করেছে। তরুণ প্রজন্ম প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারছে। এটা আমাদের জাতীয় জীবনে অনেক বড় পাওনা। যদিও ইতিহাস তার সত্য কক্ষপথ কখনও ত্যাগ করে না। এবারের বিজয় দিবস সবার মাঝে দেশ গড়ার নতুন উদ্দীপনা জাগাকÑ এই প্রত্যাশা করি।
লিপি আক্তার
গৃহিণী

১৯৭৫ থেকে শুরু করে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২১ বছর ধরে বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃতির এক মহাযজ্ঞ সাধিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূ-লুণ্ঠিত করা, গণতন্ত্রকে রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত করা, যুদ্ধাপরাধীদের এদেশে পুনর্বাসন করা সহ তাদের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত বানিয়ে সকল প্রকার অপকর্ম সাধন করা হয়। ’৭৫ সালে যখন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয় তখন বিশ্ববিবেক হতভম্ব হয়ে ধিক্কার দিয়েছিল এই বাঙালি জাতিকে।
এরপর বহু চড়াই-উৎরাই পার হয়ে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় এসে সরকার গঠন করে। কিন্তু এত কিছুর পরও খুনিরা তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করতে পারেনি। তরুণ প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস জেনেছিল। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারের কাজ শুরু করে আওয়ামী লীগ সরকার। বিভিন্ন দেশে পালিয়ে থাকা খুনিদের ইন্টারপোলের মাধ্যমে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করেছিলেন জাতির পিতার সুযোগ্য উত্তরসূরি দেশরতœ শেখ হাসিনা। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধীদের সাথে নিয়ে আবারও কুচক্রীমহল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে উড়তে থাকে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত পরপর পাঁচবার দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। হত্যা, খুন, ধর্ষণ, জঙ্গিবাদসহ সরকারের সকল স্তরে অপকর্ম চলতে থাকে।
এমতাবস্তায় ২০০৪ সালের নির্বাচনে প্রায় ২ কোটি তরুণ ভোটার যুদ্ধাপরাধীদের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় এনে তাদের বিচার করা। আর এই ইস্যুতে আওয়ামী লীগকে সবচেয়ে বেশি সমর্থন জানাই তরুণ প্রজন্ম। এরপর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ শুরু হয়।
যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্ল্যাকে যেদিন ফাঁসির আদেশ না দিয়ে আদালত যাবজ্জীবন কারাদ-ের আদেশ প্রদান করে সেদিন প্রথম ফুঁসে উঠেছিল তরুণ প্রজন্মই। শাহবাগের সেই উত্তাল দিনগুলোতে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিরাই সেদিন কসাই কাদেরের ফাঁসির দাবিতে সারাদেশকে একাট্টা করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে ধারণ করেই নিজেদের উজ্জীবিত করেছিল। কিছুদিন আগেই রাজাকার পুত্র, যুদ্ধাপরাধীদের এজেন্ট পিয়াস করিমের লাশ যখন শহীদ মিনারে নেওয়ার দাবি জানিয়েছিল তখন এই তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিরাই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। পবিত্র শহীদ মিনারকে অপবিত্র করার অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আগামীর বাংলাদেশ গড়ার রূপকল্পে তরুণ প্রজন্ম অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে একথা নিঃসন্দেহে বলা চলে।
জয়দেব নন্দী
কবি ও শিক্ষার্থী

প্রজন্মের চোখে মুক্তিযুদ্ধ, আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধ মানে ৭ মার্চের উত্তাল ময়দানে বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ। “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” নিরস্ত্র বাঙালির মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির জন্য রক্তদানের সাহস, পাকিস্তানের শোষণের প্রতিবাদে বাঙালির স্বাধিকারের আন্দোলন এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করে স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে আনা। না, আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। কারণ আমার জন্ম হয়েছিল ’৭১-এর প্রায় এক যুগ পরে। মুক্তিযুদ্ধকে যতটুকু জানি বই, চলচ্চিত্র, নাটক, কবিতার মাধ্যমে জেনেছি প্রিয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন বাজি রাখার ইতিহাস শুনে। মহান মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১, বীর বাঙালির এক অনন্য ইতিহাস। বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এক বীরত্বগাঁথা কাহিনি। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ত্রিশ লক্ষ প্রাণ নিবেদন করেছিল একটি স্বাধীন মানচিত্র বিশ্ব ভূ-খ-ে অঙ্কনের জন্য। দুই লক্ষ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়ে জন্ম দিয়েছিল এক নতুন দেশ। যার নাম বাংলাদেশ। স্বাধীনতার রক্তমিছিলে সেদিন যারা জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন আমাদের ধমনিতে তাদের রক্ত। সব শহীদের রক্তঋণ শোধাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে এই প্রজন্ম। ’৭১-এর নরপশু পাকিস্তানিদের সাথে যুক্ত হয়ে যারা সেদিন গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ করে বাঙালির পরিচয়কে মুছে ফেলতে চেয়েছিল তাদের বিচারের দাবিতে সোচ্ছার এই প্রজন্ম। ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের দামে যে স্বাধীন বাংলাদেশ আমরা পেয়েছি তাদের সন্তান হয়ে পবিত্র মাতৃভূমিকে কলঙ্কমুক্ত করার লড়াইয়ে রাজপথে অতন্ত প্রহরীর ন্যায় মহান ’৭১-এর চেতনা ধারণ করে লড়াই করে যাচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশের বিনিময়ে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে ভেজা বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে শিক্ষায়, প্রযুক্তিতে, স্বাস্থ্যে, শিল্পে, ব্যবসা-বাণিজ্যে এক অন্যন্য দৃষ্টান্ত রাখার লক্ষ্যে পূর্বসূরিদের সাথে কাজ করে যাচ্ছে প্রজন্মযোদ্ধারা। প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি হিসেবে বলতে চাইÑ গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদের ভিত্তির ওপর যে রাষ্ট্র কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে তাকে সমুন্নত রাখতে চাই সঠিক নেতৃত্ব। ’৭১-এর চেতনায় উদ্বুদ্ধ প্রতিটি বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধভাবে সেই লড়াইয়ে অংশ নিয়ে পবিত্র মুক্তিযুদ্ধকে স্বার্থক করে তুলতে হবে।
এফএম শাহিন
সংগঠক, গণজাগরণ মঞ্চ

53আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। বড়দের কাছ থেকে শুনেছি, বইপুস্তক পড়ে জেনেছি। শুনতে শুনতে, পড়তে পড়তে বিস্ময়ের সঙ্গে অনুধাবন করি, ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ নামক এই রাষ্ট্রের জন্মকাল কতই না বেদনার! কত রক্ত, কত অশ্রু, কত লাশ, কত গুম-খুন আর কত হাহাকার এই রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে জড়িত। একটি ভূখ-ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এমন বর্বরোচিত গণহত্যা, নারীদের প্রতি এমন পাশবিক নির্যাতনের ঘটনা পৃথিবীতে আর কোথায় ঘটেছে? পূর্বপুরুষরা এভাবেই রক্তনদী পাড়ি দিয়ে আমাদের একটি স্বাধীন ভূখ- উপহার দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ইতিহাস থেকে জেনে আমার কাছে যতটা মনে হয়, আমাদের যা কিছু প্রাপ্তি সবই মুক্তিযুদ্ধের কারণেই। এই যে আমি এখন একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে গর্ব করতে পারি, নির্ভয়ে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোভাসি’ গানটি গাইতে পারি, বৈশাখের প্রথম প্রহরে রমনার বটমূলে সমবেত হয়ে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নিতে পারি, বাংলা ভাষায় অবাধে সাহিত্য-সংস্কৃতি করতে পারি, গল্প-উপন্যাস লিখতে পারি, স্বাধীনভাবে পত্র-পত্রিকায় লিখে নিজের মত প্রকাশ করতে পারি, সম্মানের সঙ্গে একটা চাকরি করতে পারছিÑ সবই মুক্তিযুদ্ধের কারণেই। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করতে না পারলে আমরা থেকে যেতাম পাকিস্তান নামক একটি উদ্ভট রাষ্ট্রের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে। যে রাষ্ট্রধর্মের কারণে বিভাজিত, যে রাষ্ট্র আমার মায়ের ভাষা বাংলাকে অপমান করে রফিক-সালাম-বরকত-জব্বারের মতো দেশপ্রেমিককে হত্যা করেছে। যে রাষ্ট্রে মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মানিক, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণরা উপেক্ষিত। যে রাষ্ট্রের পরিচালকরা চর্যাপদ বোঝে না, রামায়ণ, মহাভারত, মঙ্গলকাব্য, গীতগোবিন্দ, রবীন্দ্রসংগীত, জারি-সারি-ভাটিয়ালি বোঝে না। তারা আমার আচরিত সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে খাটো করে দেখেছে, আমার হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে দমিয়ে রাখতে চেয়েছে।
আমার কাছে মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধ আসলে এক সাংস্কৃতিক বিপ্লব। আমার সংস্কৃতিই প্রমাণ করে আমি বাঙালি আর ওরা অবাঙালি। ওই অবাঙালিরা যখন বাঙালির সংস্কৃতিকে অপমান করতে শুরু করল তখনই বাঙালি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করল। সিদ্ধান্ত নিল, এই আধিপত্যবাদী, প্রতিহিংসাপরায়ণ, লুটেরা, নিপীড়ক অবাঙালিদের সঙ্গে আর যৌথ বসবাস নয়। ওদের শাসন মানা বাঙালিদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। শেষ পর্যন্ত বাঙালি বিদ্রোহ করল। অকুতোভয় বাঙালির এই গণবিদ্রোহের নেতৃত্ব দিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমি তাকে দেখিনি। কিন্তু টেলিভিশনের পর্দায় যতবারই তাকে দেখি ততবারই এক অহঙ্কারে বুকটা ফুলে ফুলে ওঠে। রেসকোর্সের মাঠে ৭ মার্চ তার সেই কালজয়ী ভাষণ যতবারই শুনি ততবারই বুকটা কেঁপে ওঠে। মনে হয়, কোনো মানুষ ভাষণ দিচ্ছে না, যেন এক বাঘের গর্জন। ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব’, ‘বাঙালিকে তোমরা দাবায়ে রাখতে পারবা না’Ñ কোন বাঙালি এমন হুঙ্কার ছেড়ে শত্রুকে সাবধান করে দিতে পেরেছে বঙ্গবন্ধু ছাড়া? শেখ মুজিবের সেই সাহসী কণ্ঠ আমাকে সর্বদাই অনুপ্রাণিত করে। আমার ‘হীরকডানা’ উপন্যাসটি উৎসর্গ করেছি বঙ্গবন্ধুকে।
স্বকৃত নোমান
কথাশিল্পী ও সহযোগী সম্পাদক, সাপ্তাহিক এই সময়

গ্রন্থনা : মাসুদ পথিক ও বাহরাম খান

শ্রেণী:

তৃণমূল মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ

49 48

শ্রেণী:

উত্তরণের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এমপি

21

জাতীয় স্বার্থ, আন্তঃরাষ্ট্র সহযোগিতা, উন্নয়ন ও বিশ্বশান্তি সমুন্নত রাখাই পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্য

21  উত্তরণ : বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির মৌলিক ভিত্তি সম্পর্কে আলোকপাত করুন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী : বাংলাদেশের জন্মলগ্নে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল প্রণীত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সুস্পষ্টভাবে জাতিসংঘ সনদের প্রতি বিশ্বস্ততা এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ভুক্ত একটি জাতি হিসেবে সব দায়-দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশের সংবিধানে পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতিগুলো সন্নিবেশিত হয়। সংবিধানের প্রস্তাবনায় “মানব জাতির প্রগতিশীল আশা-আকাক্সক্ষার সহিত সঙ্গতি রক্ষা করিয়া আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে পূর্ণ ভূমিকা পালন” করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়। এরই অনুসৃতিতে সংবিধানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অভিমুখ নি¤œরূপ নির্ধারণ করা হয়Ñ
১.     জাতীয় সমতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা,
২.     শক্তি প্রয়োগ পরিহার এবং সাধারণ ও সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ প্রয়াস,
৩.     নিজস্ব আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনে প্রত্যেক জাতির অধিকারের স্বীকৃতি,
৪.     বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামের সমর্থন।
স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির মৌলিক ভিত্তি হচ্ছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্দেশিত “সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো প্রতি বৈরিতা নয়” নীতি। বিগত মেয়াদসমূহের ন্যায় এবারও ৫ জানুয়ারি ২০১৪-তে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ অনুসরণক্রমে “সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো প্রতি বৈরিতা নয়” নীতির আলোকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধসমৃদ্ধ বলিষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতির অনুশীলন অব্যাহত রয়েছে। ফলে বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বকীয় ও গতিশীল প্রবাহ সংযোজিত হয়েছে। ‘রূপকল্প-২০২১’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এ মেয়াদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রতিবেশী দেশসহ বিশ্বের সকল দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভাবমূর্তি শক্তিশালী করা ও জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
উত্তরণ : বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির বৈশিষ্ট্যগুলো কী?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী : বিভিন্ন ধরনের বাস্তবতা ও পারিপার্শ্বিকতা একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির প্রণয়ন ও বাস্তবায়নকে প্রভাবিত করে। ভূ-রাজনীতি এমনই একটি বাস্তবতা, যা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক পরিম-লে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতি-প্রকৃতিও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ১০টি প্রধান দিক নি¤œরূপÑ
১.     প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ বিদেশের সঙ্গে ভারসাম্যমূলক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক,
২.     বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ,
৩.    বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্য ও সেবার শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিতকরণ ও সংরক্ষণ,
৪. বিদেশে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ এবং নতুন শ্রমবাজার সন্ধান,
৫.    প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থ সংরক্ষণ,
৬.    জাতিসংঘ ব্যবস্থায় সক্রিয় অংশগ্রহণ, আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রসার এবং ক্রমবিকাশমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি প্রণয়নে সক্রিয় অংশগ্রহণ,
৭.    বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারকরণ,
৮.    বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষা ও শান্তিপ্রতিষ্ঠা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ,
৯.    বিদেশে বাংলাদেশের সংস্কৃতির যথাযথ প্রদর্শনীর মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি উন্নয়ন এবং
১০. পর্যটন শিল্পের বিকাশে যথোপয্ক্তু পদক্ষেপ গ্রহণ।
উত্তরণ : সমুদ্র বিজয় (মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে) এর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক তাৎপর্য কী?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী : দেশের সামুদ্রিক সম্পদসমূহকে সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার দেশের উন্নতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর দেশের আইনসিদ্ধ সমুদ্রসীমার ওপর নিরঙ্কুশ অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সেটা করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক আইন-আদালতের সহায়তায় বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রসীমা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ অবশেষে সে অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নিশ্চিতকরণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক তাৎপর্য অসীম।
ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণী মামলার রায় ঘোষিত হওয়ার পর বঙ্গোপসাগরের সীমাহীন সম্পদসমূহের ওপর আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সাথে সাথে এই সীমাহীন সম্পদের টেকসই, কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার নিয়েও আমাদের নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। বঙ্গোপসাগর, মৎস্য ও খনিজ সম্পদসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদের আধার। সম্পদসমূহের যথাযথ ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। শুধু তাই নয়, সমুদ্রকেন্দ্রিক অভিনব ও সৃষ্টিশীল অর্থনৈতিক কর্মকা-ে বাংলাদেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব হবে।
স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গোপসাগর এবং এর সম্পদসমূহের তাৎপর্য অনুধাবন করে এই সম্পদের ওপর বাংলাদেশের জনগণের আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালে ‘The Territorial Waters and Maritime Zones Act’ শীর্ষক একটি পূর্ণাঙ্গ আইন জাতীয় সংসদে পাস করেন। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনাও শুরু করেন। ফলস্বরূপ ১৯৭৪ সালেই মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের ১২ নটিক্যাল মাইল Territorial Sea-এর সীমানা নির্ধারণী বিরোধের নিষ্পত্তি হয়। কিন্তু পরবর্তী সরকারগুলো বঙ্গোপসাগরে আমাদের অধিকার সুসংগত করতে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বাংলাদেশ ১৯৮২ সালেUnited Nations Convention on the Law of the Sea (UNCLOS) স্বাক্ষর করলেও কোনো সরকার অণুস্বাক্ষরের ব্যবস্থা নেয়নি। কনভেনশনটি স্বাক্ষরের ১৯ বছর পর ২০০১ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার অণুস্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অণুস্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশ কনভেনশনটির সদস্যপদ লাভ করে এবং এর সকল অধিকার এবং দায়িত্ব বাংলাদেশের ওপর বর্তায়। UNCLOS অণুস্বাক্ষরের ১০ বছরের মধ্যেই অর্থাৎ জুলাই ২০১১ সাল নাগাদ ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরে মহীসোপানের সম্পদের ওপর বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার দাবি জাতিসংঘে বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি তথ্য-উপাত্তসহ (সাইসমিক ও ব্যাথিমেট্রিক) পেশ করার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হয়।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে দ্রুতগতিতে অত্যাধুনিক সাইসমিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে ২০১১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরে মহীসোপানে সব সম্পদের ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্বলিত প্রয়োজনীয় সব তথ্য-উপাত্তসহ জাতিসংঘে পেশ করা হয়। ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণী সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তি হয়। জার্মানির হামবুর্গে অবস্থিত International Tribunal for the Law of the Sea (ITLOS)-এর ২৩ সদস্য বিশিষ্ট বিচারক পর্যদ মিয়ানমার কর্তৃক সমুদ্রসীমা নির্ধারণে প্রস্তাবিত সমদূরবর্তী পদ্ধতি প্রত্যাখ্যানপূর্বক ন্যায্যতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের অনুকূলে রায় দেয় এবং এতে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে অমীমাংসিত ২০০ নটিক্যাল মাইলের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল (Exclusive Economic Zone) এবং ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরে মহীসোপান (Continental Shelf) অঞ্চলে ন্যায্য হিস্যা লাভ করে। অন্যদিকে ২০১৪ সালের সালিশি ট্রাইব্যুনালের রায় ভারতের সঙ্গে আমাদের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করে দেয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সমুদ্র সম্পদের তাৎপর্য পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, রায়ের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরেও মহীসোপানে প্রাণীজ ও অপ্রাণীজ সম্পদের ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে প্রায় ৪৭৬ প্রজাতির মাছ রয়েছে। এখন বাংলাদেশের জেলেরা ২০০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে একচ্ছত্র অর্থনৈতিক এলাকায় এবং ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরে High Sea-তে অবাধে মাছ শিকার করতে পারবে। বর্তমানে প্রায় ৫৫ হাজারটি কাঠের তৈরি নৌকার মাধ্যমে উপকূলের ২০-৩০ কিমির মধ্যে জেলেরা মাছ শিকার করে। অন্যদিকে জেলেরা ১৫০-২০০টি ট্রলার ব্যবহার করে, যা উপকূল থেকে বড়জোর ৫০-৬০ কিমি সীমানার মধ্যে মাছ শিকার করে। এ ছাড়া শৈবাল চাষ, একুয়াকালচার, মেরিকালচারের মাধ্যমে বিপুল কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব। সমুদ্র পরিবহন এবং পর্যটনও অদূর ভবিষ্যতে আমাদের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ একসময় বাংলাদেশকে সমুদ্র পরিবহনের আঞ্চলিক কেন্দ্রে পরিণত করবে।
সমুদ্রসীমা নিশ্চিতকরণের ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ৪০ বছরের বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান হয়েছে। এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সমুদ্রসীমা বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান করেছে, যা শান্তিকামী দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। বঙ্গোপসাগরের ভূ-কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। তাই বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশকে জয়ী হতেই হবে।
উত্তরণ : ভূ-ম-লায়ন বা গ্লোবালাইজেশনের ফলে সাধারণভাবে স্বল্পোন্নত দেশগুলো লাভবান হয় নি এবং এসব দেশের ওপর বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার অসম শর্ত বা নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি রয়েছে বলে অভিযোগ আছে। বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব কতটুকু? আমরা লাভবান হচ্ছি না ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী : বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা হলো বহুপাক্ষিক বাণিজ্য আলোচনার বৈশ্বিক প্লাটফর্ম ও কাঠামো। বহুপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে বাণিজ্য সংস্থার বিভিন্ন Normative Decision-এ ফোরামে নেওয়া হয়। বিভিন্ন দেশ তাদের স্বীয় বাস্তবতায় সেসব Normative Decision-এর সুফল বিভিন্ন মাত্রায় ভোগ করে। এটি সত্যি যে ডব্লিউটিও-এর কাঠামোগত কিছু সমস্যা রয়েছে যেখানে অধিকতর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কিংবা সমতাভিত্তিক বাণিজ্য নিশ্চিত করার সুযোগ রয়েছে। এটি আশার বিষয় যে চলমান ‘২০১৫-পরবর্তী টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচি’ আলোচনায় জাতিসংঘের ওপেন ওয়ার্কিং গ্রুপ এ বিষয়ে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে তাদের সুপারিশ পেশ করেছে। তবে পাশাপাশি এটিও সত্য যে, বিদ্যমান কাঠামোর ভেতরে থেকেও যতটুকু সুবিধাদি আদায় করা যায়, স্বল্পোন্নত দেশসমূহ তাও করতে পারেনি। তা হয়নি মূলত দুটি কারণে। এক. এলডিসি দেশসমূহের নিজেদের মধ্যে ঐক্যের অভাব। দুই. আর সে কারণেই এলডিসি দেশসমূহের বাণিজ্য বিষয়ক সমন্বিত নেগোসিয়েশনের ক্ষেত্রে এ দুর্বলতা। একটি সমন্বিত অবস্থান না থাকার ফলে ডব্লিউটিও-এর ইতোপূর্বে গৃহীত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত যেমন Hong Kong Ministerial-G Duty Free Quota Free Access সংক্রান্ত গৃহীত সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ সুবিধা এলডিসি দেশসমূহ আদায় করতে পারছে না। অতি সম্প্রতি গৃহীত ‘বালি প্যাকেজ’-এর সিদ্ধান্তগুলো যেমন Service Waiver সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত থেকে সুবিধা আদায় করতে হলেও স্বল্পোন্নত দেশসমূহের মধ্যে নিবিড় আলোচনার মাধ্যমে 23একটি একক অবস্থান তৈরির বিষয়টি হবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসব ছাড়াও সামগ্রিক বিবেচনায় এই বাস্তবতা মনে রাখা প্রয়োজন যে ডব্লিউটিও-এর আওতায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে বা গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে উন্নত, উন্নয়নশীল এবং স্বল্পোন্নত দেশসমূহ সমমাত্রার শক্তি প্রয়োগ করে না বা করতে পারে না। সে বাস্তবতা মেনে নিয়েই স্বল্পোন্নত দেশসমূহকে নিজেদের সামর্থ্য বিনির্মাণের মাধ্যমে বাণিজ্য আলোচনায় দক্ষতার মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
উত্তরণ : বিশ্বব্যাংক আমাদের পদ্মা সেতুতে সাহায্য দেয় নি। একটি মহল এজন্য সরকারকেই দায়ী করছে। এমতাবস্থায় বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ অথবা অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ককে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী : বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু নির্মাণে বাংলাদেশ সরকারকে সাহায্য যে দেয় নি তার জন্য সরকারের কোনো দায় নেই। দেশের উন্নয়নে বিশ্বাস করে না এমন কুচক্রীমহলের ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দিয়ে বিশ্বব্যাংক অবিবেচকের মতো একতরফাভাবে এ দুর্ভাগ্যজনক সিদ্ধান্ত নেয়। দুদক দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত করেও এ বিষয়ে কোনো ধরনের দুর্নীতি খুঁজে পায় নি।
তথাকথিত দুর্নীতির অভিযোগে পদ্মা সেতু নির্মাণে বাংলাদেশ সরকারকে সাহায্য না দেওয়া যে ভুল হয়েছে তা বোধহয় বিশ্বব্যাংক এতদিনে বুঝতে পেরেছে। পদ্মা সেতু নির্মাণের বিষয়টি বাদ দিলে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বেশ ভালো। বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু নির্মাণে বাংলাদেশ সরকারকে সাহায্য না দেওয়ার ঘোষণার পরও অন্য কোনো প্রকল্প থেকে যেমন নিজেকে প্রত্যাহার করে নি তেমনই সবক্ষেত্রে আর্থিকসহ অন্য সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে।
আইএমএফসহ অন্যান্য উন্নয়ন আন্তর্জাতিক সহযোগী সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য।
উত্তরণ : প্রায়ই বৃহৎ শক্তির কোনো দেশ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে অযাচিত চাপ দেওয়ার চেষ্টা করে। বৃহৎ শক্তিধর দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ব্র্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কি কোনো টানাপড়েন চলছে?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী : বৃহৎ শক্তিধর দেশগুলো প্রায়ই বাংলাদেশের ওপর অযাচিত চাপ প্রয়োগ করে কথাটা এভাবে বলা ঠিক নয়। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। বৃহৎ শক্তিধর দেশ বা সংগঠন যেমনÑ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন আমাদের উন্নয়ন সহযোগী ও বাণিজ্য অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আমাদের নিবিড় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অন্যান্য বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে এসব দেশ বিভিন্নভাবে তাদের মতামত তুলে ধরে। ভালো কাজের এবং অর্জনের যেমন প্রশংসা করে তেমনি অন্যান্য বিষয়ে কখনও কখনও উদ্বেগ প্রকাশ করে। উদাহরণ স্বরূপ বিগত ১৬ জানুয়ারি ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে বাংলাদেশের ওপর যে রেজ্যুলেশন পাস হয় তাতে বাংলাদেশকে উন্নয়ন সহযোগী ও সম্পর্কের অংশীদারিত্ব স্বীকার করে নিয়েই তাদের মতামত তুলে ধরে এবং নির্বাচনকালীন সহিংসতার জন্য (acts of violence) নিন্দা জানায় এবং বিএনপিকে জামাতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানায়। তেমনিভাবে ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট যে রেজ্যুলিওশন গ্রহণ করে তাতেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন ও এমডিজি লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশের প্রশংসা করে। অনুরূপভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন বিভিন্ন সময়ে বিষয়ভিত্তিক মতামত প্রকাশ করে থাকে। যেহেতু এসব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক সার্বিক অংশীদারিত্বমূলক ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত, তাই এসব দেশের মতামত ও পরামর্শ বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে থাকে। এখানে চাপ প্রয়োগ করার কিছু নেই।
আমরা আমাদের সংবিধান নির্দেশিত পথে বিদেশি দেশের সঙ্গে আমাদের পররাষ্ট্র সম্পর্ক নির্মাণ ও অনুশীলন করে থাকি। সেখানে অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাই না; কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিম-লে আমরা সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিকতাবাদের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার থাকি, নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করি এবং জোট নিরপেক্ষ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখি।
সুতরাং, বৃহৎ দেশ বা অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কে বাংলাদেশের কোনো টানাপড়েন নেই। কোনো কোনো বিষয়ে তাদের সাথে অবস্থানগত অস্পষ্টতা বা পার্থক্য থাকতে পারে। বাংলাদেশ তার নীতিগত অবস্থান বিভিন্ন বহুপাক্ষিক ফোরামে জোরালোভাবে তুলে ধরে এবং যেসব বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দেয় সেসব বিষয়ে নিজস্ব যুক্তি তুলে ধরে বিতর্কে অংশ নেয়। এটিই পররাষ্ট্র সম্পর্ক নির্মাণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে এ প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে যাবে।
উত্তরণ : বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের সাথে আমাদের বেশ কিছু অমীমাংসিত সমস্যা রয়ে গেছে। অনেকেই বলেন, বাংলাদেশ উদারভাবে ভারতকে যতটা সম্ভব বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা দিচ্ছে, ভারত ততটা দিচ্ছে না। তিস্তা নদীর পানির হিস্যা, স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন, বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস এবং পারস্পরিক স্বার্থে যৌথ অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয় নি। আমাদের দুই দেশের দ্বি-পাক্ষিক বিষয়ে কিছু বলুন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী : বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি এবং বোঝাপড়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত। সরকারের পূর্বের এবং বর্তমান মেয়াদে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে অনেক উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির খসড়া এ সময়কালেই চূড়ান্ত হয়েছে। ১৯৭৪-এর স্থলসীমানা চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০১১-এর প্রটোকলটিও এ সময়েই স্বাক্ষরিত হয়েছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যার কারণে এগুলো চূড়ান্ত রূপ পায়নি। তবে ভারতের পূর্বের সরকার ও বর্তমান সরকারেরও এগুলো নিষ্পন্নের ব্যাপারে আন্তরিকতার কোনো কমতি নেই। তিস্তার ব্যাপারে ভারতের বর্তমান সরকার অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য গড়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। আর স্থলসীমানা চুক্তি ভারত কর্তৃক অণুুসমর্থনের বিষয়টি তাদের পার্লামেন্টারি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। ভারতের বর্তমান সরকার এ দুটি বিষয়ের গুরুত্ব সম্বন্ধে সম্যক অবহিত এবং তারা এগুলো সমাধানের ব্যাপারে আন্তরিক ও সক্রিয় প্রচেষ্টা চালাচ্ছে এবং আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসের জন্য আমরা বিদ্যমান নন ও প্যারা ট্যারিফ প্রতিবন্ধকতাসমূহ দূরীকরণে ভারতের সঙ্গে প্রচেষ্টা চালাচ্ছি এবং ইতোমধ্যে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা দূরও হয়েছে। তবে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে আমাদেরও অনেক কিছু করার আছে। আমাদের রপ্তানিজাত পণ্যের সংখ্যা বাড়াতে হবে। যৌথ অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ভারতের ৮০০ মিলিয়ন ডলারের সহজ ঋণে বাংলাদেশে বেশ কিছু অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে/হচ্ছে। এ ছাড়াও ছোট ছোট উন্নয়নমূলক প্রকল্পও ভারতের আর্থিক সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। ভারত থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুৎ আমাদের বিদ্যুৎ ঘাটতি হ্রাসে সহায়তা করছে। আরও বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে নীতিগত সম্মতি হয়েছে। ভারত থেকে জ্বালানি তেল আমদানির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এগুলো আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম নিয়ামক হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। এ ছাড়া মৎস্য, পাট ও বস্ত্র, স্বাস্থ্য, সুন্দরবন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ইত্যাদিসহ বেশ কয়েকটি নতুন নতুন ক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগিতার পথ উন্মোচিত হয়েছে। দুদেশের মধ্যে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নিষ্পত্তির মধ্য দিয়ে সাগর সম্পর্কিত অর্থনৈতিক কর্মকা-ের বিপুল সম্ভাবনার দ্বার খুলে গেছে। এসবই আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। দুদেশের সরকারের মধ্যে আস্থার ভিত আগের তুলনায় অনেক শক্ত হয়েছে। ভারতে সরকার পরিবর্তনের পরও তা অটুট আছে, যা একটি বড় অর্জন। এরূপ বন্ধুত্ব ও আস্থার সম্পর্ক থাকলে যে কোনো সমস্যারই সমাধান সময়ের ব্যাপার। কাজেই বর্তমান সরকারের পূর্ববর্তী ও বর্তমান আমলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না।
উত্তরণ : আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে অগ্রগতি ও সম্ভাবনা কতটুকু?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী : দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের Comparative advantage-কে কাজে লাগিয়ে এবং তা একত্রে সন্নিবেশ করে এই অঞ্চলের সব দেশের সামষ্টিক উন্নতির অপার সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা এ মতাদর্শে বিশ্বাসী ও তা বাস্তবায়নে অত্যন্ত আগ্রহী। এ কারণে আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ব্যাপারে আমরা দক্ষিণ এশিয়ায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছি। SAARC, BIMSTEC, BCIM-EC-এর সবগুলোতে রয়েছে আমাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। মূলত বাংলাদেশের একক প্রচেষ্টাতেই বাংলাদেশ, ভারত ও ভুটানকে নিয়ে জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও জলবিদ্যুৎ/বিদ্যুৎ এবং আন্তঃযোগাযোগ বিষয়ে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার আওতায় ত্রিপক্ষীয় কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ২০১৩-এর এপ্রিল মাসে এ বিষয়ে প্রথম রাউন্ডের ত্রি-পক্ষীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরবর্তী রাউন্ডের সভা শিগগিরই অনুষ্ঠিত হবে এবং তাতে এবার নেপালেরও শামিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই ত্রি-পক্ষীয়/চতুর্পক্ষীয় উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা বর্ণিত ক্ষেত্রসমূহে বিপুল সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে বলে আমরা আশাবাদী, যা এ দেশগুলোর সামষ্টিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
উত্তরণ : ঢাকায় বিমসটেক হেড কোয়ার্টার স্থাপনের বিশেষ গুরুত্ব কী?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী : ঢাকায় বিমসটেক সচিবালয় স্থাপনের গুরুত্ব বহুবিধ। উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ
১.    বিমসটেক সচিবালয় ঢাকায় স্থাপিত প্রথম কোনো আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধান কার্যালয় বা হেড কোয়ার্টার্স। ফলে বহির্বিশ্বে সরকার তথা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে।
২.    বিমসটেক সচিবালয় এতদঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার করবে।
৩.     বিমসটেক মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গঠনের প্রক্রিয়া অনেক দূর এগিয়েছে। আগামী বছরের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে বিমসটেক সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়।
৪.    বিমসটেক আন্তঃআঞ্চলিক কানেকটিভিটি কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর হবে। ফলে এ অঞ্চলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ছাড়াও পর্যটন, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও জ্বালানি ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
৫. বিমসটেক সচিবালয় স্থাপন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের জন্য বিশাল এক কূটনৈতিক সাফল্য।
৬. সর্বোপরি, ঢাকায় বিমসটেক সচিবালয় অবস্থিত হওয়ায় এখানে অনেক আন্তর্জাতিক সম্মেলন হবে, যা আন্তর্জাতিক পরিম-লে বাংলাদেশের পরিচিতি বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা যায়।
উত্তরণ : জলবায়ু ও পরিবেশ বিপর্যয়ে বাংলাদেশ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অন্যতম। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সম্ভাবনা কতটুকু?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী : জলবায়ু ও পরিবেশ বিপর্যয়ে বাংলাদেশ যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অন্যতম সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহই নেই। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যাগুলো বাংলাদেশের উন্নয়নকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে, যা নিকট ভবিষ্যতে নিশ্চিতভাবেই আরও প্রকট রূপ ধারণ করবে। বাংলাদেশ ক্রমাগতভাবে অভিযোজনের জন্য নতুন ও অতিরিক্ত বৈদেশিক সাহায্যের সংস্থান এবং সহজে প্রযুক্তি হস্তান্তরের দাবি জানিয়ে আসছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার দেশসমূহের অভিযোজন ও প্রশমন কর্মসূচি বাস্তবায়নে উন্নত দেশসমূহ থেকে সহায়তা প্রাপ্তির বিষয়ে বাংলাদেশ জোরাল দাবি জানিয়ে আসছে। যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বের সামগ্রিক টেকসই উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি, সে কারণে এই হুমকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা ক্লাইমেট চেঞ্জের ব্যাপারে নিবিড়ভাবে চলমান এই নেগোসিয়েশনের প্রধান কাঠামো UNFCCC-এর Conference of the Parties (COP)-এর মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য উন্নত দেশসমূহের কাছে পর্যাপ্ত অর্থায়ন প্রস্তাব করে আসছে। এটি আশ্বস্ত হওয়ার বিষয় যে UNFCCC-এর আওতায় Green Climate Fund (GCF)
এখন চালু হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য GCF থেকে দেশের জলবায়ু বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থাৎ অভিযোজন সম্পর্কিত প্রকল্পে অধিক ও অর্থায়ন দাবি ও প্রাপ্তির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। Copenhagen Commitment অনুযায়ী ২০২০ পরবর্তী প্রতিবছর ১০০ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিতকরণ প্রক্রিয়া এখনও Climate Negotiation-এর মাধ্যমে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ২০১৫-এর মধ্যে আইনি বাধ্যবাধকতা সম্পন্ন যে Climate Agreement হতে যাচ্ছে তাতে আশা করা যায় যে, উন্নয়নশীল দেশসমূহ প্রয়োজনীয় জলবায়ু অর্থায়নের নিশ্চয়তা পাবে। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য একটি অগ্রগতি হলো COP-19-G Warsaw International Mechanism for Loss and Damage  শীর্ষক একটি কাঠামো সৃষ্টি হয়েছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশসমূহের আর্থিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
উত্তরণ : আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশের অবদানÑ
পররাষ্ট্রমন্ত্রী : জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পর্কিত। ১৯৮৮ সালে ক্ষুদ্র পরিসরে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করে বর্তমানে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ সংখ্যক শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান সুসংহত করেছে। এ পর্যন্ত পৃথিবীর ৩৯টি দেশে ৫৪টি মিশনে চ্যালেঞ্জিং পরিবেশে বাংলাদেশের ১ লাখ ২৮ হাজার ১৩৩ সেনা ও পুলিশ শান্তিরক্ষী অত্যন্ত সুনাম ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে আমাদের জাতীয় পতাকার মর্যাদাকে সমুন্নত করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সংঘাতময় পরিস্থিতিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের ১১৯ শান্তিরক্ষী তাদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের ৮ হাজার ৪৫৫ শান্তিরক্ষী মোট ১০টি মিশনে নিয়োজিত আছেন। নারীর ক্ষমতায়নে আমাদের অর্জনের প্রতিভূ হিসেবে আমাদের নারী পুলিশ সদস্যরা সর্বোচ্চ সংখ্যায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত আছেন। সঙ্গত কারণেই জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন ২০১১ সালে বাংলাদেশ সফরকালে এই উক্তি করেছিলেন ‘No country has done more for global peace than you.’
গত ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪-তে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ অধিবেশনকালে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কিত শীর্ষপর্যায়ের এক বৈঠকে যৌথ সভাপতি হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আগামী দিনগুলোতে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে আরও জনবল, বিমান ও সামরিক সরঞ্জামাদি এবং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ের প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশের অবদানকে আরও বিস্তৃত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এ প্রসঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঢাকার অদূরে অবস্থিত Bangladesh Institute of Peace Support Operation Training (BIPSOT)-কে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বিশেষত নারী শান্তিরক্ষীদের প্রশিক্ষণের জন্য একটি Centre of Excellence-এ পরিণত করার আগ্রহ ব্যক্ত করেন। শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি বিভিন্ন সংঘাত-পরবর্তী পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের আওতায় শান্তি নির্মাণ (Peace Building) কার্যক্রমেও বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাত্রা ও পরিধি আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
উত্তরণ : বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে আমাদের উদ্যোগ প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করেনি বলে অনেকে অভিযোগ করেন। অন্যান্য কারণ ছাড়াও এ জন্য বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা ও দুর্নীতির কথা বলা হয়ে থাকে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী : বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের সার্বিক প্রচেষ্টার কথা সর্বজনবিদিত। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশ সরকার সব মিলিয়ে যে ধরনের সুবিধাদি দিয়ে থাকে তা দক্ষিণ এশিয়া তো বটে, বিশ্বের যে কোনো দেশেই বিরল। বিদেশি বিনিয়োগ সুরক্ষার জন্য দেশের বিদ্যমান আইনি কাঠামো যেমন অত্যন্ত কার্যকর তেমনই সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বিনিয়োগ সুরক্ষার জন্য দ্বিপাক্ষিক চুক্তিও সম্পন্ন করছে। সরকারের এসব ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ প্রতিবছরই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির এ গতি যে প্রত্যাশার চেয়ে কম তা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। প্রতিবেশী ভারত ও নিকটবর্তী অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আশাপ্রদ নয়। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও অবকাঠামোর অভাব, আমলাতন্ত্রের অদক্ষতা, কোথাও কোথাও দুর্নীতি এজন্য দায়ী। সরকার এসব বিষয়ে অবহিত আছে এবং এসব সমস্যা দূর করার জন্য সচেষ্ট রয়েছে।
উত্তরণ : আমাদের মধ্যপ্রাচ্য নীতি কতটা ফলপ্রসূ হয়েছে?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী : পররাষ্ট্রনীতির সফলতার সকল মাপকাঠিতেই বাংলাদেশের মধ্যপ্রাচ্য নীতি অত্যন্ত সফল। এক্ষেত্রে আমি কয়েকটি বিষয়ের দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্যণ করতে চাই।
ভিভিআইপি/ভিআইপি ভিজিট : বাংলাদেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান ২০০৯ এবং ২০১২ সালে সৌদি আরব এবং ২০১১ ও ২০১২ সালে কুয়েত সফর করেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০০৯ সালে সৌদি আরব এবং কাতার, ২০১০ সালে কুয়েত, ২০১১ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ২০১২ সালে কাতার ও ইরান সফর করেন। ২০১৩ সালে তিনি পুনরায় সৌদি আরব সফর করেন। রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান পর্যায়ের এ সফরগুলোর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিগত কয়েক বছরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরিবেশমন্ত্রী, কাতারের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক মন্ত্রী ও সহকারী মন্ত্রী, সৌদি আরবের প্রিন্স আল ওয়ালিদ বিন তালাল এবং প্রিন্সেস আমিরাহ, সৌদি মজলিস-এ সূরার স্পিকার, বাহরাইনের সংসদীয় প্রতিনিধি দল, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিষয়ক মন্ত্রীসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি দল সরকারি এবং বেসরকারিভাবে বাংলাদেশ সফর করেন। বাংলাদেশ থেকেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি দল বহুবার মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি প্রবাসীদের স্বার্থরক্ষাসহ ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ইত্যাদি দ্বি-পাক্ষিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো এসব সফরে আলোচিত হয়, যা সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে সম্পর্কের সার্বিক উন্নয়নে বহুমাত্রিক ভূমিকা রেখেছে।
জনশক্তি রপ্তানি : ২০০৯ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সৌদি আরব সফর এবং দুদেশের শীর্ষনেতাদের মধ্যে ঐতিহাসিক বৈঠকের ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি সৌদি সরকার সে দেশে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাধারণ ক্ষমা ও ইকামা পরিবর্তনের সুযোগ প্রদান করায় সে দেশে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশি উপকৃত হয়েছেন। বাহরাইন, কাতার ও ওমানে বিগত কয়েক বছরে জনশক্তি ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে জনশক্তি রপ্তানি সংশ্লিষ্ট কয়েকটি চুক্তি/সমঝোতা স্মারক সম্পাদনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন, যা সম্পন্ন হলে সেসব দেশে অধিক হারে জনশক্তি রপ্তানির পথ উন্মুক্ত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। গতানুগতিকভাবে জিসিসিভুক্ত দেশগুলোকে বাংলাদেশের শ্রমবাজার হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সরকারের সফল নীতির ফলে বিগত কয়েক বছরে জর্ডান, লেবানন ও ইরাকে লক্ষাধিক শ্রমিক প্রেরণ করা সম্ভব হয়েছে, যা সরকারের মধ্যপ্রাচ্য নীতির বিশেষ সফলতা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
অর্থনৈতিক/বাণিজ্যিক সম্পর্ক : বর্তমান সরকারের আমলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি/সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ ছাড়া বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আরও অনেকগুলো চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য প্রক্রিয়াধীন আছে। বিগত কয়েক বছরে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানের মধ্যকার যৌথ অর্থনৈতিক কমিশন, ইরানের সঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত কয়েক বছরে এসব দেশের সঙ্গে দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিনিয়োগ : মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছে। আগে শুধু জনশক্তি রপ্তানি বিষয়টিই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও দিক-নির্দেশনায় উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ, অবকাঠামো খাত, তৈল শোধনাগার, বিমানবন্দর, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ইত্যাদি খাতে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে। আশা করা যাচ্ছে, এসব দেশ অচিরেই বাংলাদেশে এসব খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিনিয়োগ করবে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা : মধ্যপ্রাচ্যে দেশসমূহের সাথে বাংলাদেশ  বিশ্বসভায় অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুসমূহে একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। সম্প্রতি গাজা সংকটে বাংলাদেশ ফিলিস্তিনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে জাতিসংঘ, ওআইসি, ন্যামসহ সকল ফোরামে জোরাল বক্তব্য রেখেছে, যা বিশ্বসভা বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। এ সংকটের শিকার বিপর্যস্ত ফিলিস্তিনিদের বাংলাদেশ মানবিক সহায়তা প্রদান করে এবং আরও সহায়তা প্রদানের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। ইরাক সংকট, সিরিয়া সংকট, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ইত্যাদি সংবেদনশীল ইস্যুতে আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘের প্রস্তাবাবলি, বাংলাদেশের সংবিধান ও পররাষ্ট্রনীতি এবং গণপ্রত্যাশার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সরকার অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে অবস্থান নিয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সমাদৃত হয়েছে এবং এতদঞ্চলে বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণে ভূমিকা রেখেছে।
নতুন কূটনৈতিক মিশন স্থাপন : মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের কূটনৈতিক উপস্থিতি বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণ ও প্রবাসীদের অধিকতর সেবার  লক্ষ্যে লেবাননের বৈরুতে দূতাবাস স্থাপন করেছে। বিভিন্ন দূতাবাসের জনশক্তি ও অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা হয়েছে। নিবিড় কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে ওমান সরকার বাংলাদেশে ২০১২ সালে পূর্ণ দূতাবাস স্থাপন করেছে এবং বাহরাইন নতুন দূতাবাস খোলার আশ্বাস দিয়েছে।
উত্তরণ : ধর্মীয় মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বিশ্ব শান্তির পক্ষে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে আমাদের দেশেও তার রক্তাক্ত উত্থান দেখেছি। জঙ্গিবাদ-আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় আমাদের সাফল্যকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের ধর্মীয় মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদবিরোধী কঠোর অবস্থান বিশ্বজুড়ে সর্বজনবিদিত ও প্রসংশিত। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি ধর্মীয় মৌলবাদ-জঙ্গিবাদের লীলাভূমিতে পরিণত হয়েছিল। মৌলবাদী-জঙ্গিবাদীদের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হতো। এ দেশের মাটি প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেওয়া হতো। বিশ্ববাসী এখন জানেন যে বাংলাদেশ সে দুরবস্থা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে এসেছে। ধর্মীয় মৌলবাদী-জঙ্গিবাদীদের এ দেশের মাটি থেকে সমূলে চিরতরে উৎখাত করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তার সাম্প্রতিক ভাষণেও দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন যে, বাংলাদেশের মাটি আর কখনও বিদেশিদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে না। ধর্মীয় মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদবিরোধী মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ অবস্থান বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছে।
উত্তরণ : দক্ষ মানবশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন আছে। আপনার ব্যাখ্যা কী?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী : অন্যান্য ক্ষেত্রের মতোই জনশক্তি রপ্তানি কোনো একপাক্ষিক প্রক্রিয়া নয়। দুটি পক্ষের চাহিদা ও সরবরাহের মেলবন্ধনের ফলেই জনশক্তির আমদানি রপ্তানি হয়। এটি সত্য যে, বিশ্বে নির্মাণ ও এই ধরনের কাজ যে গতিতে বেড়ে চলেছে, তাতে শ্রমিক প্রেরণকারী দেশসমূহ থেকে আধাদক্ষ শ্রমিকের চাহিদাই আসলে বেড়ে চলেছে। দক্ষ শ্রমিক বলতে আমরা যেসব পেশাজীবীদের বুঝে থাকি বিশ্ববাজারে তাদের চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টি এর সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশ থেকে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা যেমন বৃদ্ধি পায়Ñ বর্তমান সরকার সে লক্ষ্যে যথেষ্ট প্রস্তুতি ও সক্ষমতার জন্য বিভিন্ন নীতি ও আইন ইতোমধ্যেই প্রণয়ন করেছে ও করে যাচ্ছে। বৈদেশিক কর্মসংস্থান নীতি ২০০৬ হালনাগাদ করে বৈদেশিক কর্মসংস্থান নীতি ২০১৩-এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। Bureau of Manpower, Employment and Training (BMET) ৩৭টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে গুরুত্বারোপের ফলে নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির পরিবেশ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা যায়।
উত্তরণ : রেমিট্যান্স আমাদের জাতীয় আয়ের একটা সিংহভাগ। জনশক্তি রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স বৃদ্ধিকে সরকারের সাফল্যের একটা মানদ- বলা হয়ে থাকে। প্রশ্ন হচ্ছে, শ্রমশক্তি রপ্তানি এবং মেধা পাচারের সঙ্গে এই প্রপঞ্চটির সমীকরণ কীভাবে করবেন? বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নের জন্যই মেধা পাচার বা ব্রেনড্রেন বন্ধ হওয়া দরকার। এ ব্যাপারে আপনার কী মত?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী : এ কথা এখন সন্দেহাতীতভাবে সত্য যে আমাদের জাতীয় আয়ে রেমিট্যান্স খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। দেশের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অর্জনের পশ্চাতে এর রয়েছে ব্যাপক অবদান। জনশক্তি রপ্তানির ফলেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আজ এ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
25শ্রমশক্তি রপ্তানি বলতে মূলত বোঝায় অদক্ষ, আধাদক্ষ ও দক্ষ মানবসম্পদ সুনির্দিষ্ট চুক্তি (বেতন ও সময়কাল) এর মাধ্যমে নির্ধারিত দেশে প্রেরণ। এটি মোটামুটি সরকার নিয়ন্ত্রিত একটি ব্যবস্থাপনা বা প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় যারা বিদেশ যান তারা নির্ধারিত দেশে নির্ধারিত কর্মসম্পাদনের মাধ্যমে যা আয় করেন তা রেমিট্যান্স আকারে দেশে প্রেরণ করেন।
অন্যদিকে ব্রেনড্রেন বলতে বোঝায় উচ্চ শিক্ষিত ও প্রতিভাবান ব্যক্তিরা যখন নিজ দেশে প্রত্যাশিত কর্মসংস্থানের অভাবে বিদেশে গিয়ে চাকরি গ্রহণ করেন এবং সে দেশেই স্থায়ী হন। ফলে মাতৃভূমি তাদের মেধা তথা আয় থেকে বঞ্চিত হয়।
ব্রেনড্রেন ধারণাটি আগে যতটা নেতিবাচক ছিল এখন কিন্তু তা আর নেই। দেশের উচ্চ শিক্ষিত ও প্রতিভাবান সন্তানরা এখন বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা শেষে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন এবং একপর্যায়ে অর্জিত সম্পদ, মেধা ও দক্ষতা নিয়ে দেশে ফিরে এসে এসব কাজে লাগাচ্ছেন। এ কারণেই হয়তো ব্রেনড্রেন ধারণাটি এখন আর আগের মতো এতটা আলোচিত বিষয় নয়।
শ্রমশক্তি রপ্তানি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। দক্ষ শ্রমশক্তি রপ্তানি বহির্বিশ্বে একটি দেশের ভাবমূর্তি উন্নয়নে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। তাই আধাদক্ষ শ্রমিক রপ্তানির পাশাপাশি দক্ষ শ্রমিক রপ্তানিও একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বহির্বিশ্বে একটি দেশের ইতিবাচক ইমেজ তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি হস্তান্তরেও একটি দেশের ডায়াসপোরাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার সুযোগ রয়েছে। তাই শ্রমশক্তি রপ্তানি ও অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন বিষয় দুটিকে যে কোনো একটি দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা না করে সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণের সুযোগ রয়েছে। শ্রমশক্তি রপ্তানি, অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন ও ডায়াসপোরা ব্যবস্থাপনা এই ৩টির মধ্যে এক ধরনের কার্যকর ও যথাযথ ভারসাম্য বজায় রাখার মাধ্যমে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নয়ন এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদান নিশ্চিতকরণের বিষয়ে সরকার সচেষ্ট রয়েছে।
উত্তরণ : কতগুলো দেশের সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে? কতগুলো দেশে বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস আছে? নতুন কী পরিকল্পনা আছে?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী : বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়”-এর আলোকে শুধুমাত্র ইসরায়েল ছাড়া বিশ্বের প্রায় সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের ৫২টি দেশে বাংলাদেশের ৬৮টি মিশন রয়েছে, যার মধ্যে ৫১টি পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস, ২টি স্থায়ী মিশন, ৮টি কনস্যুলেটে জেনারেল, ৩টি ডেপুটি হাইকমিশন, দুটি সহকারী হাইকমিশন, একটি কনস্যুলেট এবং একটি ভিসা অফিস। এ ছাড়া আরও ৬৯টি দেশের সাথে সমবর্তী দায়িত্ব অর্পণের মাধ্যমে বিদেশস্থ আমাদের দূতাবাসগুলোর সাহায্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করা হয়। বাকি দেশগুলোর সঙ্গে অবৈতনিক কনসাল জেনারেল নিয়োগের মাধ্যমে কূটনৈতিক যোগাযোগ রাখা হয়। সম্প্রতি অস্ট্রিয়া, পোল্যান্ড ও ডেনমার্কে আরও ৩টি পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস স্থাপনের সব প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। চলতি বছরেই উক্ত ৩টি দূতাবাসের কার্যক্রম শুরু করা হবে। এ ছাড়াও, আফগানিস্তানের কাবুল, সুদানের খার্তুম ও সিয়েরা লিয়নের ফ্রিটাউনে ৩টি মিশন স্থাপনের বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সম্মতি প্রাপ্তির পর প্রস্তাবগুলো অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতির জন্য প্রক্রিয়াধীন আছে। তা ছাড়া রুমানিয়ার বুখারেস্ট (পুনঃস্থাপন), নাইজেরিয়ার আবুজা ও আলজেরিয়ার আলজিয়ার্সে পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস স্থাপন, ভারতের চেন্নাইয়ে উপ-হাইকমিশন ও গৌহাটিতে সহকারী হাইকমিশন স্থাপনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সম্মতি গ্রহণ করা হয়েছে।
29উত্তরণ : পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে আমাদের বর্তমান অগ্রাধিকার এবং আশু ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য কী?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী : মহান স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়” অনুসরণ করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানেও প্রতিবেশী রাষ্ট্রসহ সকল রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও জোরদারকরণের মাধ্যমে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের উজ্জ্বলতর উপস্থিতি দৃশ্যমান করার প্রচেষ্টা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যা সমাধানকে বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ভারতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক নদীসমূহের পানি বণ্টন চুক্তি বিশেষ করে তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়ন, সীমান্তে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সীমান্তে হত্যা বন্ধ, বাণিজ্য ঘাটতি দূরীকরণ, সড়ক ও নৌপথে যোগাযোগ আরও সহজতর করাসহ অন্য সব ইস্যুতে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা আদায় নিশ্চিতকরণ, মিয়ানমারের সঙ্গে শরণার্থী সমস্যা সমাধান, বঙ্গোপসাগরের মহীসোপানে আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, এশিয়ান হাইওয়েতে সংযুক্তির মাধ্যমে মিয়ানমারের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বৃদ্ধিকরণ এবং নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে অভিন্ন পানি ও জ্বালানি নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা আমাদের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার। বিদেশে বাংলাদেশি শ্রম ও পণ্যের নতুন বাজার সৃষ্টি এবং প্রতিষ্ঠিত বাজার সুসংহতকরণ, জনকূটনীতি (Public Diplomacy)-এর যথার্থ প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরা, প্রবাসী বাংলাদেশিদের উন্নততর কনস্যুলার সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়া, বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন আলোচিত ইস্যু, যেমনÑ জলবায়ু পরিবর্তন, Millinium Development Goals (MDG), Sustainable Development Goals (SDG), অভিবাসন কূটনীতি, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা ইত্যাদি আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রাধিকার। এক কথায়, সরকারের ‘রূপকল্প-২০২১’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখাই স্বল্পমেয়াদে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সব প্রয়াসের মূল লক্ষ্য।
সরকারের ‘রূপকল্প-২০৪১’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্টকরণ, MDG-এর বিভিন্ন লক্ষ্যে অর্জনে সরকারের সাফল্য তুলে ধরার পর SDG-এর অর্জনযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং তা বাস্তবায়নে সহায়তা করা, উন্নততর দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি স্থানান্তর বা Technology Transferএর চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে দেশকে প্রযুক্তিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বৃহৎ পরিসরে সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করার লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়া, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশ চীন ও জাপানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে শিল্প স্থাপনসহ নানা ধরনের অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, BCIM-EC এবং BIG-B-এর লক্ষ্য বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করার উদ্যোগে কার্যকরী ভূমিকা রাখা পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম উদ্দেশ্য। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় বাংলাদেশ সব সময়ই জোরাল ভূমিকা পালন করে আসছে। ভবিষ্যতে এসব সংস্থায় আরও দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিদেশস্থ বাংলাদেশ মিশনসমূহ দেশকে একটি অবদানক্ষম রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর বুকে পরিচিত করতে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদেও বাংলাদেশের পণ্য ও শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং প্রচলিত রপ্তানি পণ্যের পাশাপাশি নতুন নতুন রপ্তানি ক্ষেত্র সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ, মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর সকল দেশে অদক্ষ

শ্রেণী:

দিনবদলের সনদ বাস্তবায়নে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সাফল্যের সাথে এগিয়ে যাচ্ছে : ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী

Posted on by 0 comment
13

13উত্তরণ : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে যে ঐতিহাসিক নির্বাচনী ইশতেহার তথা দিনবদলের সনদ ঘোষণা করেছিলেন, তাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যা সমাধানে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত সার্বিক জ্বালানি নীতিমালা গ্রহণের কথা বলেছিলেন। সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতিমালা সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
তৌফিক-ই-এলাহী : ধন্যবাদ, আমাদের সরকারের পূর্ব মুহূর্তে যে সময়কাল এবং সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সার্বিকভাবে জাতির সামনে তুলে ধরা হয়েছেন। এবং সেখানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের একটা পরিকল্পনার রূপরেখাও তুলে ধরা হয়েছিল।
আপনারা জানেন, আমাদের দেশে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিদ্যুতের একটা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ চলছিল, শহরে যেসব জায়গায় বিদ্যুতায়িত খাতা-কলমে সেসব জায়গায়ও ৫-৭ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছিল। কৃষি উৎপাদন যেখানে সেচের জন্য বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল সেখানেও ব্যাহত হচ্ছিল। এটা সারা অর্থনৈতিক উন্নতিকে অনেকাংশে স্থবির করে রেখেছিল। এ প্রেক্ষাপটে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দিনবদলের সনদে যে লক্ষ্যমাত্রার কথা বলেন তা অনেকটা দুঃসাহসিক বলা যায়। সেদিন সেখানে উপস্থিত কিছু সাংবাদিক ও কিছু অ্যাকাডিমেশন সংশয় প্রকাশ করে বলেছেন, ২০১১ সালের মধ্যে ৫০০০ মেগাওয়াটে এবং ২০১৩ সালের মধ্যে ৭০০০ মেগাওয়াটে নিয়ে যাওয়ার যে অঙ্গীকার শেখ হাসিনা করলেন, তিনি কোথা থেকে এত টাকা পাবেন?
14  আমি বললাম, যারা দেশকে পরিচালনা করে, দেশকে নেতৃত্ব দেয় তারা দেশের স্বপ্ন লালন করে। তাদের স্বপ্ন জগতের সেই বাউন্ডারিÑ এগুলো সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে না। তবে এই অর্জনের পেছনে যা ছিল তা হলো, আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব। নেতৃত্ব হলো একটা লক্ষ্যকে বাস্তবায়নের জন্য একটা দুঃসাহসিক অভিযানে নামা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাই নিয়েছেন। তার নির্দেশ ছিল তোমরা যেভাবে পার উৎপাদন বাড়াও, করতে হবে। এর থেকে কোনো পিছপা হওয়া যাবে না।
উত্তরণ : এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে দীর্ঘমেয়াদি সময় লাগে; কিন্তু কীভাবে স্বল্প সময়ে তা সম্ভব হলো। এ সাফল্য কীভাবে অর্জন করলেন?
তৌফিক-ই-এলাহী : তিনি সেই সময় দেন নি। সুতরাং, তার ভিশন এবং নির্দেশ আমাদের ফোর্স করল। আমরা নতুন পথ খুঁজে বের করব। নতুন পথ আমরা ভালোভাবে জানিও না। কিন্তু পথ খুঁজতে হলে এটাই বলেনÑ নতুনত্ব সৃজনশীলতা। বড় মাপের নেতৃত্ব তারা কিছু পথকে খুঁজে বের করে।
একজন ফিনিশিয়ান জেনারেল ছিলেন, হ্যানিবেল। আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে। এই হ্যানিবেল রোম আক্রমণ করতে যে পথ দিয়ে যাবেন তখন সেই পথ দিয়ে তিনি যাবেন না। কারণ তার বাবা সেই পথে রোম আক্রমণ নিগৃত করে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি বললেন, আমি আল্পসের ওপর দিয়ে যাব। তখন তিনি যে হাতিটা নিয়ে যাচ্ছিলেন সৈন্য-সামন্তরা জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কীভাবে আল্পস ক্রস করবেন? তিনি বললেন, আমি পথ খুঁজে নেব, তা না হয় পথ বের করব। পথ is an either, when find on I make. পথ দেবে পথ। আমরা এভাবে ইন্সপায়ার হলাম। আমরা হয় পথ যদি থাকে তা হলে ওই পথে যাব, তা না হয় পথ বের করব। যখন দায়িত্বভার গ্রহণ করলাম সেই বের করার উদ্দেশ্যে তখন আমরা দেখলাম আমাদের গ্যাসের স্বল্পতা। ২০০৯ সালে পাওয়ার প্ল্যান্ট করার কোনো অবকাশ নেই। তা হলে কী করতে হবে। আমরা যদি কয়লা দিয়ে করতে চাই, তা হলে কয়লা আনতে অনেক সময় লাগবে। একমাত্র পথ হলো, আমরা আমদানি করে ফারনেস ওয়েল বা ডিজেল দিয়ে করতে পারব।
15কিন্তু আমাদের করতে হবে অনেক। সে জন্য ওই সাহসের কথাটায় আবার আসছি। প্রধানমন্ত্রী বললেন আপনারা করেন। একটা উদাহরণ দেই, কতখানি সাহসিকতা তার। আমরা কতগুলো পিকিং প্ল্যান্ট তখন ছোট ছোট সব মিলে ৮০০ মেগাওয়াট হবে। এজন্য অর্থের প্রয়োজন ১ বিলিয়ন ডলার, প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। কোনো প্ল্যানিং বইতে ছিল না। কিন্তু আমাদের সবার এটা জানা ছিল। এটা প্রয়োজন আছে। আমরা কোনো প্রকল্প করার আগে লোকেশন ঠিক করে নিলাম। আমরা টেন্ডারে চলে গেলাম আর প্রকল্প তৈরি হচ্ছিল। এটা আমাদের পাবলিক সেক্টর টেন্ডার করে যখন আমরা পৌঁছলাম, আমাদের পারচেজ কমিটি বললÑ ঠিক আছে এটা অনুমোদন করলাম। তোমরা পরিকল্পনা কমিশন থেকে অনুমোদন নিয়ে নাও। পরিকল্পনা কমিশনে যখন যাওয়া হলো সবাই জানেন তখন দেশের অবস্থা কেমন। পরিকল্পনা কমিশন অনুমোদন দিল। যেদিন অনুমোদন করল তার পরদিন আমরা ওয়ার্কআউট করলাম। এই আমরা লার্জ স্কেলে অর্ডার দিলাম। ছোট ছোট প্রকল্প বাংলাদেশজুড়ে। শেষ পর্যন্ত আমাদের ৬৫টা প্রকল্প হয়েছিল।
সেই লার্জ স্কেলে যখন অর্ডার দিলাম। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই অর্ডারগুলো পেল। তার সাথে যা দরকার তার চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি অর্ডার দিলাম। সে যদি ফেল করে যাতে আমাদের substrate (স্তর) করে। এবং আল্লাহর রহমতে আমাদের বেসরকারি খাত। আমি বলব যে যথেষ্ট ক্রিয়েটিভিটি দেখিয়েছে। তাদের কারণে মোস্টলি তারা প্রথমে লোকাল ব্যাংক থেকে লোন নেওয়া শুরু করল এবং আমি তো মনিটরিং করলাম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রেগুলার তদারকি করেছেন। আমার মনে আছে, চুক্তি শুরু হচ্ছে আমি প্রেসকে ডাকতাম। কনস্ট্রাকশন হচ্ছে তার ছবি দিয়ে প্রেসকে দেখাতাম, জাতিকে আশ্বস্ত করতাম। কিন্তু এরা সবসময় বলেছেÑ চুক্তি হচ্ছে এটা হবে না। কনস্ট্রাকশন হচ্ছে এটা শেষ হবে না। শেষ হলে বিদ্যুৎ হবে না। আর এ সময় কয়েকজন সিনিয়র জার্নালিস্ট আমাকে বলল, আপনারা যে বিভিন্ন জায়গায় অর্ডার দিচ্ছেন, আপনারা কি জানেন ওসব জায়গায় নিয়ে যাওয়া কত ডিফিকাল্ট। আপনারা সেই গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর জ্বালানি কীভাবে নেবেন, ফ্যাক্টরি, প্ল্যান্ট কীভাবে বসাবেন?
তারপর যখন একটা বড় পরীক্ষা এলো, আমাদের তেল আমদানি করতে হবে। তেল আমদানি করতে হলে অনেক টাকার প্রয়োজন। তখন আবার কিছু কিছু তথাকথিত বিজ্ঞ অর্থনীতিবিদরা বললেন, বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জে যাবে। আর দেশটা রসাতলে যাবে। এটা কুইক রেন্টাল তখন আপনি একটা প্রশ্নের উত্তর দিনÑ আমরা কেন অল্প সময়ের জন্য ঋণটা নিলাম। অল্প সময়ের জন্য ঋণটা নিলাম এই কারণে যে, আমরা ভাবলাম অল্প সময়ের জন্য ঋণ নিয়ে দেশি অন্য কোনো সল্যুউশন পাওয়া যায় কিনা। যদি না হয় প্ল্যান্টগুলো তো দেশে আছে। তা হলে আমরা এক্সচেঞ্জ করতে পারব। তা হলে আমি একেবারে বেশি দিলে তো পেছনে আসতে পারব না। সেই জন্য আমরা তিন বছর, পাঁচ বছর মেয়াদ দিয়ে দেখলাম যে অন্য অবস্থায় কোথায় আছে। সেই সময় যা বলা হলো ঠিকই আমাদের ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভ নেমে গেল। তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজের উদ্যোগেই রিজার্ভ রিপ্ল্যান্ট করার উদ্যোগ নিল। তখন আমরা ইসলামি ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সাহায্য নিলাম। দেশে কিন্তু তখন টাকার দাম বেড়ে গেল। এবং অনেক জায়গায় কথা শুরু হলো। এই বলছিলাম এখন দেশ। আমরা দেখলাম, অর্থনীতি চালু আছে। আমাদের যে উদ্দেশ্য ছিলÑ এগুলো করে অর্থনীতি যদি চালু থাকে, যদি শিল্প চালু থাকে, যদি কৃষিকে সমর্থন দিতে পারি। তা হলে এরাই আমাদের ফিডব্যাক দেবে। সাপ্লাই রেসপন্স এলো এবং সেই সাথে আমাদের রেমিট্যান্স। ইমপ্রুভ করা শুরু করল। সেই যে শুভ সংবাদ আসা শুরু হলো, ইতিবাচক, এরপর চলতেই থাকল সেটা এবং আমাদের অর্থনীতির ৬ শতাংশ প্লাস গ্রোথ রেট থাকল। আমাদের এক্সপোর্ট বাড়তে থাকল। আমাদের রিজার্ভ বাড়তে থাকল। টাকা আবার স্ট্রং হলো। সেই রিজার্ভ বাড়তে বাড়তে এখন ২০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হলো। টাকা সেখানে ৮০-তে চলে গেল আবার টাকা ডলারের বিপরীতে হয়ে ৭০-৭৫-৭৮ পর্যন্ত উঠে আসে। যদিও রপ্তানিকারকরা টাকা সাসটেইনেবল হওয়া পর্যন্ত করে না তাদের তা হলে আয় কমে যাবে বা এটা ব্যালেন্স রাখার বিষয়। সুতরাং, যতসব সন্দেহ করা হয়েছিল সব মিথ্যা প্রমাণিত হলো। অংকের বেলায়ও হলো আমরা যেখানে জাতির কাছে। প্রধানমন্ত্রী জাতির কাছে বলেছিলেন, ৫০০০ মেগাওয়াট ২০১১ সালে সেখানে আমরা ২০১১ সালে ৭০০০ মেগাওয়াটে নিয়ে গেলাম। আর যখন বলা হয়েছিল ২০১৩ সালে ৭০০০ মেগাওয়াট সেখানে আমরা ১০০০০ মেগাওয়াটে নিয়ে গেলাম। এই অর্জনের ধারাটা রাখায় এবং সাহস দেওয়ায়, নেতৃত্ব দেওয়ায়। এখানে আরেকটা কথা আপনার এই যে, ১০০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত যাওয়া হলো এখানে কিন্তু প্রায় ৮ মিলিয়ন ডলার, ৩টা পদ্মা ব্রিজের সমান ইনভেস্টমেন্ট মোবিলাইজড করা হলো। এতে বিশ্বব্যাংক, এডিবি এদের কন্ট্রিবিউশন ১ বিলিয়ন ডলার বেশি। বাকি কোথা থেকে এলো প্রসঙ্গেÑ আমরা কিছু লোকাল মার্কেট থেকে নিয়েছিলাম। এতে হলো কী বাইরের বিনিয়োগকারী যারা অর্থলগ্নী প্রতিষ্ঠান তারা উৎসাহিত হলো। সেখানে আমরা ইসিএ লোনটা আনার চেষ্টা করলাম। আল্লাহর রহমতে সেটা কার্যকর হলো এবং সেই ইসিএ, এক্সপোর্ট ট্রেডি এজেন্সি লোন। এই এক্সপোর্ট ট্রেডি এজেন্সি লোনটা আসা শুরু করল তখন বিনিয়োগ বাড়তে শুরু করল। প্রথমে দেশি অর্থের ওপর পরে বিদেশি লোন আসা শুরু হলো। এটা দিয়ে হলো কী একদিকে অর্থনীতির ধারা সচল থাকল। বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ল। বিদ্যুতে সে সুবিধাভোগী। আপনারা আগে সেখানে ছিল ৪০ শতাংশ, এখন তা ৬২ শতাংশ বাড়ল। শিল্প, কৃষি উৎপাদন হলো। ইমপ্লয়মেন্ট জেনারেশন হলো। এতে সরকারের বাজেটের আকার বাড়তে থাকল। কেননা, ইনকাম হলেই তো বাজেটের আকার বাড়তে থাকে। এটাকে আমরা বলি ভারচুয়াল সাইকেল। বিশাল সাইকেল নিচের দিকে চলে যাওয়া। আর কয়েল ব্যাক করল ওপরের দিকে ওঠা। এই আমাদের ওপরের দিক ওঠা শুরু করল এবং সেটা কয়েল ব্যাক করল ওপরের দিকে। এই জায়গায় কিন্তু আমরা থেমে থাকি নি। থেমে থাকি নি এই কারণে আমাদের প্রধানমন্ত্রী সবসময় তার ২০১৪ সালে অর্থাৎ নতুন সরকারের যে ইশতেহার দিল, ওই সময়ের ইশতেহারে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশ। এখানে এটা নিয়ে গেলেন ২০৪০ সালে উন্নত দেশ।
উত্তরণ : রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র নিয়ে দেশবাসীর বিপুল কৌতূহল রয়েছে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করুন।
তৌফিক-ই-এলাহী : ১৯৯৬ সালে যখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে তখন এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ ফেজ রূপপুরে করার জন্য আবার একটা উদ্যোগ নেওয়া হলো International Atomic Energy Associationহ-এর সাথে আলাপ শুরু হলো। তারপর আবার পরের সরকারে নিয়ে আর কোনো আলাপ হলো না। এবার ক্ষমতায় এসে আবার তিনি এটাকে পুনরুজ্জীবিত করলেন। রাশিয়ানদের সাথে যোগাযোগ করে তাদের সমর্থন নিয়ে আজকে এটা বাস্তবতার মুখ দেখতে যাচ্ছে। এবং সেই পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র করা যে কত বড় দুরদর্শিতা লাগে এবং এটা অনেক, এক সরকার যদি নিজের এক-দুই টার্মের কথা ভাবে তা হলে পরে এটা সম্ভব না। অনেক দূরের চেষ্টা থাকতে হবে, এবং এই দূরের চোখ কোথা থেকে আসে এটা আমি ব্যাখ্যাসুলভ যাচ্ছি। বারবার এক কথায় আসছি। যে একটা মেজর ডিফারেন্স আছে নেতৃত্বের মাঝে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিবর্তনও হয়েছে। আগের চেয়ে অনেক সাহসের সাথে এগিয়ে গেছেন। এবং যেটা বঙ্গবন্ধুর মধ্যে ছিল। জাতির পিতার মধ্যে ছিল দেশের মানুষের জন্য সহমর্মিতা, সেই সহমর্মিতা তার মধ্যে পুরোপুরি আছে। যে জন্য দূরের দিকে দৃষ্টি রাখা অর্থ হলোÑ বাংলাদেশের মানুষের জন্য কল্যাণ। আমরা গুটি কয়েকের জন্য কল্যাণ দেখলে তো হবে না, আমার বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণ দেখতে হবে। তা হলে আমাকে অনেক দূরে দৃষ্টি রাখতে হবে। এবং সেই পথে চলার জন্য সাহসের সাথে চলতে হবে। কোন সরকার থাকবে না থাকবে সেটা পরের কথা। এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে এটা এরকম একটা উদাহরণ। একদিকে দেশে ২০ বছর পরে কী হবে সেটাকে সামনে রেখে এখন কী করা দরকারÑ এগুলো বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে সময় লাগে এই ২০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে হতে আরও পাঁচ-সাত বছর লেগে যাবে। কারণ আমাদের ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট লাগবে, অনেক প্রস্তুতি আছে।
উত্তরণ : পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রথম পর্ব কবে উৎপাদনে আসবে?
তৌফিক-ই-এলাহী : এগুলো কাগজে বললে একরকম থাকতে পারে। আমি মনে করি ৭ থেকে ১০ বছর।
উত্তরণ : কয়লাকেন্দ্রিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পর্কে বিস্তারিত বলুন।
তৌফিক-ই-এলাহী : আমি এটাতে আসছিলাম। সেই সাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চিন্তা করলেন আমাদের একটা মাস্টার প্ল্যান করার। এই যে ২০২১-এর কথা বলছেন। তাতে দেখা গেল, আমাদের যদি গ্যাসও থাকে তাও ২০০০ মেগাওয়াট যদি আমাদের সিসটেম হয় ২১ সালের মধ্যে। ১০০০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক করতেই হবে। এর মধ্যে ৫০০০ মেগাওয়াট গ্যাসফিল্ড, ৩০০০ মেগাওয়াটের মতো লিকুয়িড ফুয়েল। কিছু ইমপোর্ট হবে, রূপপুরও তখন চলে আসবে, পারমাণবিক হবে, কিছু সৌরবিদ্যুৎ হবে।
যেহেতু গ্যাস শেষ হয়ে যায় নি। এবং গ্যাসের সম্ভাবনা সেটা সামনেই দেখতে পাই। কিন্তু আমাদের রিজার্ভ যা আছে সেটার ওপরে প্ল্যান করতে হবে। সেই জন্য তিনি সাহস দিলেন আপনারা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করেন, আর ইমপোর্টেড করেন আমি কেন ইমপোর্টেড কয়লা আগে বলে নি, পরে আমাদের দেশীয় কয়লার কথায় আসছি। ইমপোর্টেড কয়লা এই কারণে সে ১০০০০ এবং এখন যেটা হচ্ছে ২০১৪ সালে সেটা দিয়েছে ২০৪০ সাল। সেখানে প্রায় ধরে ৪০০০০ মেগাওয়াট সেখানে প্রায় ২০০০০ মেগাওয়াট কয়লাই লাগবে। তা হলে আমরা ২০০০০ মেগাওয়াট কয়লার কথা যদি ভাবি এবং ১০০০০ মেগাওয়াট সামনে, তা হলে কী প্রস্তুতি নেব। ইমপোর্ট ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। এখন সেই ইমপোর্ট করা আমদানি করা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করা, এটা কিন্তু বলা সহজ। এখানে তিনি সাইড লাইনে যেটা করছিলেন সেটা হলো আঞ্চলিক একটা সহযোগিতা সৃষ্টি করা। আঞ্চলিক সহযোগিতা অর্থনীতির সাথে সাথে স্পেসিফিক কতকগুলো জিনিস সেগুলো আমরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা করতে পারি, তা হলে আমাদেরও সুযোগের পরিধি বাড়ে এবং যখন দিল্লিতে প্রথম গেলেন ড. মনমোহন সিং এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেটা প্রথম শুরু করলেন। সেখানে বিদ্যুতের জন্য সাব-অরজিনাল কো-অপারেশন সেখানে বিদ্যুতের ব্যাপারে স্পেসিফিক হলো, আমরা ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করব, ঠিক হলো ৫০০ মেগাওয়াট আমরা আনব। এখানে দেখেন সাহসের কতখানি।
তিনি বললেন ঠিক আছে। আমাদের এখানে ২০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ লাগে স্টেশন টু স্টেশন। ওদিকে অত বেশি লাগে না। ২০০ মিলিয়ন ডলার আমরা ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, এডিবি আমাদের কাছে এসে তদবির শুরু করল। যে আমরা এটা করব। কারণ রিজিওনাল কো-অপারেশনে তারা যদি নাম লেখাতে পারে এটা তাদেরও ক্রেডিট। এই যে সাহস আমরা পেলাম, আমরা বললামÑ আমরা এখন শুরু করব। আমরা ডিজাইন শুরু করব। আমরা টেন্ডারিংয়ে যাব। ওদের নরমালি appraisal একটা লোন অ্যাপ্রুভাল হয়। তারপর আপনার কাজ শুরু হয়। আমরা বললাম আমরা এ কাজ আগে শুরু করব। এটা এমনি এমনি হয় না। তিনি এটা নেওয়ার পর আমরা প্রথম এলাম বিদ্যুতে ভারত থেকে ৫০০ মেগাওয়াট। তার সাথে রামপালে আমরা একটা যৌথ কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র সাহস করে নিলাম। এখন রামপাল নিয়ে কথা উঠলে বলবেন পরিবেশ, সুন্দরবন। আপনাদের জানা উচিত সুন্দরবন হলো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ। এটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আমলেই হয়েছে। তার উদ্যোগেই হয়েছে। যদি পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীল কিছু থাকে এটা আমাদের প্রধানমন্ত্রী এবং বারবার তার কাজের মধ্য দিয়ে বুঝিয়েছেন। তার কথার মধ্য দিয়ে বুঝিয়েছেন। সুতরাং আরও নির্দেশ ছিলÑ সুন্দরবন ও পরিবেশকে রক্ষা করে কীভাবে করা যায়। এবং এগুলোকে আমরা বেদবাক্য ধরেই রামপালকে নির্বাচন করেছি। তার প্রযুক্তি কী হবে তা নির্ধারণ করেছি। কোনোভাবে কোনোরকম ক্ষতি যাতে সুন্দরবনের না হয়। এসব বিবেচনা করে রামপালে আমরা মংলা থেকে সরে এখানে এসে আমরা যাতে মানুষেরও কোনো সমস্যা না হয় অনেক বড় এলাকা নিয়ে করছি তো। বাড়িঘর ছেড়ে দিতে হয় এবং আমরা ঠিক করলাম পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট প্রযুক্তি নেব। যেটা আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে ভালো কয়লা হয়। এবং সেই প্রযুক্তি আমরা নিচ্ছি। আমরা পোর্ট ট্রান্সপোর্টেশন, পুলিং পোর্ট সবচেয়ে ভালো কয়লা হয়। ট্রান্সপোর্টেশন সবচেয়ে উন্নতমানের হয়। নিরাপদ হয়। আমাদের যে owner engineer হয়। একটা ফিশনার বলে কোম্পানি। জার্মান কোম্পানি নির্বাচিত হয়েছে। আমরা তাদের বলেছিÑ দ্যাখ, তোমরা মনে করো না এটা বাংলাদেশের প্রযুক্তি আমরা এমন কয়লা প্রকল্প চাই, কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প যে, পৃথিবীর লোক এসে বলে যে বাংলাদেশের এই প্রকল্প সবচেয়ে ভালো। তুমি বাংলাদেশ মনে করো জোড়াতালির কথা। তা ভেব না। বারবার তাদের বলি, আমরা সবচেয়ে ভালো, যাতে পৃথিবীর মানুষ এসে বলে দেখে যাক। আপনারা ইন্টারনেট ব্রাউস করে দেখবেন পৃথিবীর বিভিন্ন কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র কোথায় আছে। শহরের মধ্যে কয়লা বিদ্যুৎ কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে। পার্কের মধ্যে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে না, কারণ হচ্ছে কী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেইন অবজেকশনটা হলো কার্বন-ডাই-অক্সাইড। উন্নত দেশে কার্বন হলে পরে পৃথিবীর যে গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কথা বলি। এটা CO2 দিয়ে গ্লোবাল ওয়ার্মিং করতে হয়। আমরা বাংলাদেশ তো পৃথিবীতে Co2 deviation করি না। সারা পৃথিবীতে আমাদের পার কেপিটা কার্বন নির্গমন .০২ টনস পার পারসেন্ট প্রতিবছর। এটা আমেরিকায় ২০ টন। আমরা তো কোনোরকম পরিবেশকে দূষণ করিনি। আমরা পরিবেশ দূষণের শিকার। তবুও কিন্তু আমরা বেশি ব্যয় করে আমরা বিদ্যুৎকেন্দ্র করছি। যেটা আমাদের পরিবেশবাদীরা হৈচৈ করে। তারা জানে না যে মেইন অবজেকটা হলো এটা Nox এবং Sox নির্গমন। নাইট্রাস অক্সাইড ও সালফার এটা থেকে নাইট্রিক এসিড ও সালফিউরিক এসিড দিয়েই পুরো ক্ষতি হয় পুরো পরিবেশের। মান বণ্টনের পর্যায়ে। আমেরিকায় যে প্রযুক্তি উন্নতি হয়েছে যখন তারা গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে চিন্তা করছিল অক্সাইড বলত। এসিড বৃষ্টির কথা যখন তারা ভাবছিল। তখন তারা নাইট্রাস অক্সাইড, সালফার নির্গমন কমানোর জন্য প্রযুক্তি আনে। ওই সময় আমেরিকায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ বেড়েছে আর Nox, Sox ডাইভারশন কমেছে। সেখানে আজকে Nox, Sox নিয়ে আমেরিকায় কোনো কথা ওঠে না। আমাদের এখানে নিয়ে কোনো কথা উঠত তা হলে Nox, Sox নিয়ে কথা উঠত। Nox, Sox সেটা তার সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি, আমেরিকায় সেটা কিছু প্রকল্প যা আমরা এখানে আনছি। সে জন্য আমি বিভিন্ন শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখেছি এবং বুঝাও যায় না। আপনি জাপানে যান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখানে ওখানে বসে খেয়ে চলে আসবেন একটু টেরও পাবেন না, এটা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এমন কী আমাদের এখানেও।
উত্তরণ : আমাদের এখানেও স্বল্প পর্যায়ে বড় পুকুরিয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্র হয়েছে। কিন্তু ওখানে তো পরিবেশের তেমন সমস্যা করেনি।
তৌফিক-ই-এলাহী : ওখানে তো অত উন্নতমানের প্রযুক্তি নেই। আমাদের কয়লা খুব ভালো তো। কয়লা ভালো হওয়ায় নাইট্রাস অক্সাইড এবং সালফার অক্সাইড কম এখানে। সেজন্য আপনার প্রযুক্তি অত ভালো না; কিন্তু Nox, Sox এত নেই। সুতরাং, এসিড বৃষ্টি হয় নি। তার চেয়ে অনেক ভালো প্রযুক্তি দিয়ে করেছি। পরিবেশবাদীরা আমার প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে বেশি সংবেদনশীল না। সুতরাং আমি খুব দুঃখিত, আমাদের যে বা যারা বিভিন্ন বিষয় কথা বলে তারা সেই বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে হবে, তা হলে তো সমাজে তারা কন্ট্রিবিউট করতে পারবে। তারা বলবে এ কয়লা উড়ে যাবে। আজ-কালকার কয়লা জাহাজ থেকে নামার পথে কয়লা পরিবহন পর্যন্ত কয়লার কোনো মুখও দেখবে না। কারণ কয়লা আপনি নিয়ে আসছেন তের সমুদ্রে উড়তে দেবেন না-কি।
আপনি বুঝতেও পারবেন না। সাথে সাথে কভারড হয়ে যাবে। তারপর আবার পানি দেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। পরিবেশের কোনোরকম ক্ষতি হবে না।
সুতরাং, আমাদের রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াট হবে। পরিবেশের কোনোরকম ক্ষতি হবে না ইনশাল্লাহ। কিন্তু আমরা যে বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল অর্থাৎ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল তারা অবহেলিত হয়েছে কিন্তু। সেই থেকে রামপাল থেকে আরো উত্তরে যখন যাব নতুন কর্মযজ্ঞ গড়ে উঠবে। মানুষের জীবনের মান উন্নত হবে। শিল্প এলাকা গড়ে উঠবে। সেই সাথে তারই ধারাবাহিকতা দেখেন আমাদের বড় বড় যে আমি বললাম ১০০০০ মেগাওয়াট করতে হবে আমরা সেজন্য কক্সবাজারের দক্ষিণে মহেশখালী, মাতারবাড়ি এসব জায়গা পছন্দ করলাম।
উত্তরণ : কক্সবাজারে কি দুটো প্ল্যান্ট হচ্ছে?
তৌফিক-ই-এলাহী : ওইখানে সর্বমোট ৮০০০ মেগাওয়াট করবে। সেখানে দেখেন আমাদের কর্মপরিকল্পনার ওপর কতখানি আস্থা জাপানের রয়েছে। জাপানিরা খুব কেয়ারফুল এবং ক্যালকুলেটিভ। সেই জাপান সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে, বর্তমান সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আপনারা দেখেন ওখানে প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার দিতে রাজি হয়েছে মাতারবাড়িতে। সেখানে ১৩২০ মেগাওয়াট একটা বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকবে। তারপর ১৩২০ মেগাওয়াটের আরেকটা বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকবে। co-yard হবে একটা বন্দর হবে। এই জায়গায় সমস্ত co-half হয়ে যাবে। আরেকটা আমরা পটুয়াখালীর ওদিকে পায়রা বন্দরের কাজে করব। ভিতরে ছোট ছোট কয়েকটা দেওয়া হয়েছে মুন্সিগঞ্জে। তারাও চেষ্টা করছে করার এবং এই পরিকল্পনা নেওয়ার কত রকম দেখেন কত রকম নোকন ইফেক্ট হয়। ধরেন মুন্সিগঞ্জে যদি হয় তা হলে আমার নদী সচল রাখতে হবে। ড্রেজিং করে চ্যানেল ঠিক রাখতে হবে। একদিকে যেমন জাপান এগিয়ে এসেছে। আমাদের এই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য। সাথে চীনও এগিয়ে এসেছে। এবং চীনের সাথে ইতোমধ্যে দুটো প্রকল্প ১৩২০ মেগাওয়াট ও ১৩২০ মেগাওয়াট আমরা করতে যাচ্ছি। একটা মাতারবাড়ি মহেশখালী, আমরা আরেকটা করব পায়রা বন্দরের ওখানে। মালয়েশিয়ার সাথে আমরা একটা সই করতে যাচ্ছি। এই ঘুরে-ফিরে আমি একটা কথাই বলছি, দুরদর্শিতার সাথে যে নেতৃত্ব থাকে তা যখন ফললো, একটা দেশের মধ্যে থাকে তখন এই যে বিনিয়োগগুলো আসছে। এক একটা বিনিয়োগ আমাদের সব মিলে এক একটা ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র। মানে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। এরকম ১-২-৩-৪-৫টা তো।
উত্তরণ : ব্লু ইকোনমি নিয়ে যদি একটু বলেন?
তৌফিক-ই-এলাহী : এটা আপনি জানেন যে মেরিটাইম বাউন্ডারি যেটা আমাদের সমুদ্রসীমা। এটা প্রথম আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু একটা আইন করে একটা সীমানা করেছে। ২০০ নটিক্যাল মাইল বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা। এবং বাংলাদেশ প্রথম সিকিউরিটি হয় International law of the see.
তারপর আর কেউ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। প্রধানমন্ত্রী এবার ঠিক করলেন গত টার্মের সময়ে যে আমাদের সাথে ভারত এবং মিয়ানমার সমুদ্রসীমা ঠিক করতে হবে। কারণ আমাকে যদি সমুদ্রসম্পদ আহরণ করতে হয় দুই প্রতিবেশীর সাথে আমার ঠিক করতে হবে। শান্তিপূর্ণভাবে আপনি এখনো পূর্ব এশিয়া আপনার আমি নাম বলতে চাই না অনেক দেশেই একটা উত্তপ্ততা রয়েছে। যেমন দুই কোরিয়া, ভিয়েতনাম, জাপান, চীন এগুলো মিলে উত্তপ্ততা। এখানে তিনি খুব সূক্ষ্ম কূটনৈতিক কৌশলে অগ্রসর হওয়ার কারণে আমরা প্রথমে মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা ঠিক হলো, তারপর ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা ঠিক হলো। এবং আমরা যে জলভাগ পেলাম বাংলাদেশের স্থলভাগের প্রায় ৮০ শতাংশ সমান। আমাদের ভারতের সাথে যে বিতর্কিত পার্টটা ছিল তা ছিল ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটার আমরা পেয়েছি। এখন আমাদের সমুদ্রসীমা ঠিক হয়ে যাওয়ার পর যেগুলো যে সম্ভাবনার দাগ যেটা ব্লু ইকোনমি বলে সেটা কতগুলো দিক আছে। একটা হলো যে আপনার কিছু সম্পদ রয়েছে সেগুলো আপনি আহরণ করবেন। তেল, গ্যাস, মৎস্য, সামুদ্রিক খনিজ। আর আরেকটা হলো আপনি ডেভেলপ করবেন। সেটা পর্যটন হতে পারে। মাছের কালচার হতে পারে, আপনার শিপ ব্রেকিং হতে পারে। বিভিন্ন জিনিস ডেভেলপ হতে পারে। আমরা এটা পাওয়ার পরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগ নিয়েছেন, একটা সমুন্নত কর্মসূচি নিতে হবে। এবং সেই সমুন্নত কর্মসূচির জন্য কাজ শুরু হয়েছে। যেটার উদ্দেশ্য হচ্ছে আমরা সম্পদকে আহরণ করব। ব্লু ইকোনমি যেটা বলে। আপনি গ্রিন ইকোনমি শুনেছেন, সেটা টেকসই অর্থনীতি জলভাগ, সমুদ্র যদি টেকসই অর্থনীতি যেটাকে ব্লু ইকোনমি বলে। স্থলভাগ হলো গ্রিন আর সমুদ্র হলো ব্লু। এখানে মাছ আহরণ করবেন, যেন মাছের সংখ্যা কমে না যায়। এখানে আপনি খনিজসম্পদ আহরণ করবেন যেন পরিবেশের ক্ষতি না হয়। এখানে আমরা তেল গ্যাস উত্তোলন করি, এমনভাবে করব যেন পরিবেশ পানি এগুলোর ক্ষতি না হয়। যাতে আমরা অন্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হই। এই ব্লু ইকোনমি যেটা এটার আমাদের প্রথম আমরা সত্যি কথা বলতে কি প্রথম আমাদের জেলাগুলো। যদিও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় করার সিদ্ধান্ত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিয়েছেন এবং আগেরবার তিনি মেরিন ইনস্টিটিউট করেছেন। ফিশারিজ ইনস্টিটিউট সবই সব সময় সমানতালে থাকতে পারেনি। সেটা স্বীকার করতে হবে সবাইকে আমি নিজে স্বীকার করি। এই এতদূর আমার পরে এখন আমাদের সবাই দৃষ্টি খুলেছে। তা হলে আমরা সবাই একসাথে সমুন্নত উপায়ে এটাকে আহরণ করা বা উন্নয়ন করা। যদি আপনি জানেন আমাদের একটা সার্ভে যান বিশেষ করে ফিশারিজের জন্য আমরা অতি সম্প্রতি ছয় মাসের মধ্যে কাজ শুরু করব। এই সার্ভে জাহাজগুলো যে সম্পদ এগুলো হলো মৎস্যসম্পদ আমাদের অন্যান্য খনিজসম্পদ বা তেল গ্যাস আহরণের জন্য আরম্ভ।
আরও যেসব ব্লক সেগুলোকে আমরা নতুন করে সাজাচ্ছি। সাজিয়ে দুভাবে অগ্রসর হব। একটা হলো যে, যেগুলো অন্য দেশের পাশে সেখানে আমাদের দূত Production share in contact দিতে হবে। কারণ অন্যান্য দেশ ওখানে সার্ভে শুরু করে আর আমরা যদি পিছে যাই তা হলে আমরা জানতেও পারব না যে, আমাদের এখানে আছে। তা হলে যদি প্রকৃতি তো একরকম পারে না প্রকৃতি আপনার হয়তো একটা গ্যাসফিল্ড হলো দুই দেশের মধ্যখানে। আমাকে তো জানতে হবে আগে কোথায় আছে। তারপর যাব Proccdure Unitization Procedure বলে যেগুলোর মাধ্যমে এটা ভাগ করতে হবে। সে জন্য আমরা যেভাবে যাচ্ছি কৌশলগত। যেগুলো পাশে আছে সেগুলো আমাদের প্রাধান্য বেশি। যেগুলো পাশে নাই সেগুলোকে আমরা চাচ্ছি আমরা নিজেরা আবার সার্ভে করব। ভূ-তাত্ত্বিক সার্ভে বলে। এই ভূ-তাত্ত্বিক সার্ভে করলে লাভটা হবে আমরা সম্ভাবনা জানলাম, সম্ভাবনা জেনে আমাদের প্রয়োজন অনুসারে কোনটাকে ঠিক করব। এখন করব না পরে করব কারণ আমাদের তো যে সম্পদ আছে এটাকে আমাদের জন্য আমাদের পরের প্রজন্মের জন্য তার পরের প্রজন্মের জন্য তো কিছু রেখে যেতে হবে। আমরা সবাই তো একেবারে শেষ করলে হবে না। সে জন্য ওটা কীভাবে ফ্লিডওয়াইজ করব সেটার আমরা পরিকল্পনা নেব।
উত্তরণ : ভারত থেকে ইতোমধ্যে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি হচ্ছে, আরও বিদ্যুৎ আমদানি এবং নেপাল, ভুটান, মিয়ানমারের সাথে যৌথ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন বা জলবিদ্যুৎ আমদানির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বলুন।
তৌফিক-ই-এলাহী : আমরা যে ভারতের সাথে যে একটা করলাম ৫০০ এমডাব্লিউর সাথে আবার কিন্তু পার্লাটোনাতে ত্রিপুরায় সেখানে আবার ১০০ এমডাব্লিউর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা সেটা প্রযুক্তিগত কীভাবে হবে সেটা করছি এবং সবচেয়ে বড় সেটা ব্রেক থ্রু হয়েছে নেপাল এবং ভুটানের সাথে জলবিদ্যুৎ। সেটা ভারত রাজি হয়েছে এবং ভারত বলেছে তাদের কোনো আপত্তি নেই। সে জন্য আমরা আলোচনা এখনও অগ্রসর হচ্ছি যে ভুটানে হয়তো একটু আগে আসতে পারে কিন্তু প্রকল্প থেকে কারণ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তো প্রায় ১০ বছরের মতো লেগে যায়। এবং নতুন করে করতে হবে যেগুলো আছে সেগুলো তো শেয়ার করা যাবে না। আমরা বলেছি যে দরকার হয় আমরা যেভাবে তোমরা চাই। আমরা সবাই একসাথে মিলে। বেসিক উদ্দেশ্য হলো আমরা সবাই একসাথে মিলেমিশে একটা পরিবারের মতো থাকি। একে অন্যের প্রতি মহানুভূতিশীল হই। সাহায্য করি তা হলে একটা। এটা একটা বড় সমাজ হিসেবে যদি দেখি সে জন্য আমরা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যেগুলো হাইড্রো পাহাড় আছে। আমরা তাদের বলছি চল আমরা একসাথে মিলে করি। মিলে করে সেখান থেকে আমাদের প্রয়োজন সেটাই তোমাদের তোমরা নও। মিয়ানমারের সাথে আমাদের আলোচনা শুরু হয়েছে। একটা জলবিদ্যুৎ নিয়ে আগে আলোচনা ছিল। এখন আমরা মিয়ানমারের কাছে বলতে চাই যে তোমরা আমাদের যদি গ্যাস দিতে পার তা হলে আমরা পাইপ লাইনের সাহায্যে আনতে পারব। এখানে বলে রাখা উচিত যে গ্যাসের কথা বলছি মিয়ানমারের সেমতুং বলে একটা গ্যাসফিল্ড। এখানে গত বিএনপি জোট সরকারের সময় মিয়ানমার রাজি হয়েছিল কিন্তু ভারত মিয়ানমার বাংলাদেশ যে চুক্তি হয়েছিল সে চুক্তিতে কিছু নিয়ে যাবে ভারত। আর কিছু আমরা নেব। সেটা মন্ত্রী পর্যায় ঠিক হয়ে গেছিল। কিন্তু এখানে তখন খালেদা জিয়া এখানের প্রধানমন্ত্রী তিনি এটা নাকচ করে দিল। সেই যে গ্যাস চলে যায় চিনের কুনমিংয়ে। এখন আমরা মিয়ানমারের সাথে কথা বলছি তারা শুনতে রাজি হয়েছে। সে ওইখান থেকে কিছু গ্যাস যদি আমাদের দাও তা হলে আমরা চিটাগাংয়ে নিয়ে আসব। আপনি জানেন চিটাগাংয়ে গ্যাসের দারুণ অভাব। সে অভাবটা আমরা মিটাতে পারি।
উত্তরণ : ইতোমধ্যেই দেশের ৬২ শতাংশ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় এসেছে, কবে নাগাদ দেশের শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎসেবার আওতাভুক্ত হবে?
তৌফিক-ই-এলাহী : দেশের স্কাউট, স্কুলের ছেলেমেয়ে এদের সবাইকে বলা হচ্ছে তোমরা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হও। এই একটা সামাজিক আন্দোলন শুরু হয়েছে। সেটা দিয়ে আমরা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হওয়ার চেষ্টা করতেছি। সেই সাথে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এটার ওপর আবার তিনি চলতেছে। উদাহরণস্বরূপ দেখেন নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমর্থন থাকার কারণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আজকে বাংলাদেশে প্রায় ৩০ লাখ বাড়িতে সোলার এবং পৃথিবীতে সবচেয়ে ফাস্টেড গ্রোইং সোলার হোম সিস্টেম হলো বাংলাদেশে। এটা দেখেন কত বড় সাফল্য। যে আমি সোলার হোম সিস্টেম ও যাতে এই বিকল্প বিভিন্ন রকম সুযোগ সৃষ্টির জন্য এটা এবং সেই সোলার হোম সিস্টেম করার সাথে গ্রাম-গঞ্জে ছোটখাটো মেরামতের কাজ এরা শিখছে। তারাও আয় উপার্জন করতে পারছেÑ এসব মিলে বাংলাদেশে যেখানে ৪০ শতাংশ লোক বিদ্যুৎ পেত আজকে ৬২ শতাংশ লোক বিদ্যুৎ পাচ্ছে। এবং আমাদের সরকারের একটা লক্ষ্য হলো ২০২১ সালের মধ্যে সবার কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাবে। শতভাগ মানুষ ২০২১ সালের মধ্যে বিদ্যুতের আওতায় চলে আসবে।
উত্তরণ : যেখানে বলা হচ্ছে দেশে কয়লা মজুদ ৫০ বছরের জন্য রিজার্ভ আছে, ওপেন পিট যে সিস্টেম আমরা কি সমালোচকদের ভয়ে কি ওপেন পিট বন্ধ রাখছি?
তৌফিক-ই-এলাহী : মোটেও না, এখনও আমরা বড়পুকুরিয়া একটি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, সেখানেও আমরা কয়লা গভীরে হয় underground mine-এ নিচে।underground mine-এ গিয়ে যদি আপনি দেখেন নিচে ফ্রিজ করা হয়, তার তুলনায় নিচে যে পরিমাণ পানিটা খালি ওপরে একুইফার আছে। যে পরিমাণ পানি আছে এবং পানি পাম্প প্রক্রিয়া পানি এবং মিথেন মিলে আমাদের underground mine, risks mile in the world আল্লাহর রহমতে এখনো কোনো দুর্যোগ ঘটে নি। ওই থেকে কিছু বাড়িয়ে আমরা আরও একটা প্রোডাক্টশন করে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
উত্তরণ : ওটা কী ওপেন পিট সিস্টেমই?
তৌফিক-ই-এলাহী : না ওই সিস্টেমই, সে সাথে আপনার বড়পুকুরিয়া উত্তরে যে ভাগ আছে সেখানে আমরা পাইলট বিসিস এ আমরা একটা কয়লাটা একটু ওপরে চলে আসছে, ওখানে একটা উন্মুক্ত কয়লা খনি করার পরিকল্পনা করার জন্য হাতে নিয়েছি। এখানে বলে রাখা দরকার, এইunderground mine যখন শুরু হয় তখন এটিতে বলা হয়নি যে কোনো রকম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ। ২০০৯ সালে দেখা গেল যে আপনার ভূমিধস শুরু হয়েছে এবং মানুষজন খুব সন্ত্রস্ত হয়ে পুরোপুরি বাড়ি ভেঙে যাচ্ছে, যেখানে পানি ছিল ক্ষেত ছিল আমরা গিয়ে যখন তাড়াতাড়ি সমীক্ষা করলাম তখন তারা যারা এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তারা বলল, যে স্যার নিচেunderground mine-এ ভূমিধস হবেই এবং আস্তে আস্তে এটাকে পরিত্যক্ত করতে হবে।
তা হলে দেখেন underground mine এটা নিরাপদ না কারণ ভূমিধস হচ্ছে, আবার নিচে থেকে আমরা miximum ২০-৩০ শতাংশ পরিমাণ কয়লা আহরণ করতে পারছি। তা হলে দেখেন শেষে প্রধানমন্ত্রী কিন্তু ওই যে বললাম সাধারণ মানুষের প্রতি সমাঝোতা করায় তিনি বললেন, তাদের নিয়ে আসেন আমরা বাসে করে ওখানকার বড়পুকুরিয়ার লোকজনকে নিয়ে এলাম, সংসদে তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বসে তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, তোমাদের যা ক্ষতি হয়েছে এটা আগের সরকার কোনো বরাদ্দ রাখেনি এটা আমরা বরাদ্দ রেখে তোমাদের দেব। তারপর আমরা বরাদ্দ রেখে যথেষ্ট পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিয়েছি। শুধু তাই না ওখানে যাদের কোনো ভিটা-মাটি-জমি ছিল না তারা কিন্তু কোনো ক্ষতি পূরণ পায় না এবং নেয় নি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বললেন যে না তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে তাদের প্রত্যেককে টাকা দিয়ে আশ্রয়নের অধীনে প্রকল্প বানিয়ে তাদের বাড়িঘর বানিয়ে দেওয়া 17হয়েছে। সুতরাং, আমাদের একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে যে,underground mine হলে একটা subsidence হবে। জমিটা চলে যাবে। পানি বিরাট একটা সমস্যা, সে জন্য আপনি বারবার শুনবেন যে, কয়লা খনির মধ্যে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিটা মোটামুটি ওপেন পিট মাইন করা যার গভীরতার ভিত্তিতে। কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে যে কয়লার ওপরে পানি রয়েছে। যেটাকে আমরা বলি (একুইফার্ম) সেই পানি হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগরে পানি প্রবাহ হচ্ছে এবং সেই পানি কিন্তু আমাদের জামির উর্বরতায় নদী সবকিছুই। শুধু এখানেই যদি কোনো ওপেন পিট মাইন হয়, তা হলে পানিটাকে আমাকে বাঁধের মতো করতে হবে, আটকিয়ে দিতে হবে, পানি বাধাগ্রস্ত হবে। আমরা হিসাব করে দেখছি ইমপোস্টেড কয়লা হলে বর্তমান দামে হলে আমাদের ৬ টাকার মতো পড়ে, সেই ইমপোস্টড কয়লা এখানে যদি কয়লাগুলো, তারপরও কিন্তু আমদানি করতে হবে কয়লা।
উত্তরণ : কুইক রেন্টাল তো একটা স্বল্পমেয়াদি ব্যাপার ছিল। প্রথমে যা বলা হয়েছিল যে পাঁচ বছর মেয়াদি কিন্তু ওই মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও আবার নতুন করে তাদের সাথে চুক্তি হচ্ছে আবার নতুন নতুন কুইক রেন্টাল চুক্তিও ২-৪টা করা হচ্ছে, এর পক্ষে যুক্তিটা কী?
তৌফিক-ই-এলাহী : এখন নতুন চুক্তি করব, প্রথমে যখন আমরা কুইক রেন্টাল করলাম যে এত এক্সপেনসিভ জ্বালানি আমরা দুই-তিন-পাঁচ বছর দেখি, আমাদের অন্য কোনো সাধারণ হয় কিনা যেমন একাধিক সমাধান আমরা ৫০০ মেগাওয়াট ভারত থেকে আনছি, অন্যদিকে যদি আনা যায় আমরা এককভাবে এটার মাঝে কমিটমেন্ট হতে চাইনি, এটা কুইকরেন্টাল এসব কিন্তু পার্থক্যটা হলো তেল। তেলের জন্য এটার দাম বেশি কিন্তু যেহেতু সরকারের সৎ উদ্দেশ্য সেই জন্য আমরা লাভবান হলাম কীভাবেÑ লাভবান হলাম, আমাদের যখন তিন বছর পাঁচ বছর শেষ হচ্ছে, আমরা দেখলাম আমাদের অন্য কোনো অপশন নেই। কিন্তু এখনো পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো বাংলাদেশেই আছে। আমি তাতে যদি নবায়ন করি তা হলে (negotiate) করে তার দাম কমাচ্ছি না। তা হলে কি আমি যদি নতুন করে টেন্ডার করতাম, যে দামে পেতাম তার চেয়ে কম দামে দিতাম। কারণ সে ইতোমধ্যে তারও ঠেকা আছে, সে কম দামে negotiate করত। আমাদের কাছে মানে সাপে বড় হয়েছি আমরা নিছি। সে জন্য সৎ উদ্দেশ্য থাকলে আল্লাহ মানুষকে সাহায্য করে এবং আমরা তিন, চার, পাঁচ বছর করছি।
উত্তরণ : মূলত কয়লা প্ল্যান্টগুলো চালু না হওয়া পর্যন্ত?
তৌফিক-ই-এলাহী : না, এটা ঠিক না, কারণ কয়লা প্ল্যান্টগুলো যখন চালু হবে, হিসাব করে দেখছি যদি ২০০০০ মেগাওয়াট হয় তখন আমাকে ৩-৪ মেগাওয়াট রাখতে হবে, কুইক রেন্টাল না লিকুইড বা ফুয়েল বেইজড রাখতে হয়, সুবিধা হচ্ছে আমি যদি আবার করি তাতে আবার কমে যাবে, কিন্তু এই জ্বালানি থেকে বের হওয়া যাবে না কিছু রাখতেই হবে। কিন্তু আমরা বলি জ্বালানিকে ব্যালেন্স করার জন্য দরকার।
20উত্তরণ : দেশের বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্র সম্পর্কে বিস্তারিত বলুন।
তৌফিক-ই-এলাহী : এটা প্লাস শেভরন সবচেয়ে বড় প্রাইভেট সেক্টরে প্রায় আমাদের অর্ধেক বিদ্যুৎ তারা ঠিকাদার হিসেবে আমাদের দিল, তাদের বলা হলো যে তোমরা গ্যাসের ক্ষেত্রকে কূপ না করে কতখানি বাড়াতে পার, তারা একটা পরিকল্পনা নিল গ্যাসকে বাড়ানো, আমাদের বাপেক্স থেকে পরিকল্পনা নেওয়া হলো যে আমাদের যেসব ক্ষেত্র আছে সেখানে কীভাবে বাড়ানো যায়। তারপর আমরা দেখলাম যে বাপেক্সের ৪টা রিড মিনিমাম চলতে পারে। কিন্তু আমাদের প্রয়োজন তাড়াতাড়ি, কিন্তু সেজন্য আমরা গ্যাস প্রমোর সাথে চুক্তি করলাম যে তোমরা আমাদের সাথে এসে কিছু উন্নয়ন কূপ বা সংস্কার কূপ গড়ে তোল এবং শেভরনকে বল তোমরা বাড়িয়ে দাও এই সুবাধে কিন্তু আমাদের ১৭৫০-এর মতো ছিল আগের টার্মের গ্যাস সেটা আজকে বেড়ে ২৩৫০-এর মতো হয়েছে। কিন্তু আপনি শুনবেন যে, গ্যাসের এখনও অভাবটা যেমন আমাকে পীড়া দেয়, সবাইকে পীড়া দেয় কারণ আমরা চাই শিল্পÑ গ্যাস সবাই ভালোভাবে পাক। শিল্প, বাণিজ্য, আবাসিক, সেখানে এত বেশি ডিমান্ড বেড়ে গেছে যে আমরা প্রায় ৫০০ এমএনসিএফটি বাড়িয়েছি। কিন্তু প্রয়োজনে মনে হয় যেন তুলনায় অপর্যাপ্ত এখনো ইনশাল্লাহ একটা বড় প্রকল্প হাতে নেওয়ায় আমরা শেভরন থেকে এই আগামী দু-এক মাসের মধ্যে আস্তে আস্তে ১০০ থেকে শুরু করে ৩০০ এমএনসিএফটি পর্যন্ত গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো হবে। ভোলায় আমাদের শাহবাজপুরে যে গ্যাসক্ষেত্র আছে সেখানে আমরা এতদিন কিছু করা সম্ভব হয়নি। সেখানে আমরা ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সাহায্য নিয়ে সেখানে একটা ২৫০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্ল্যান্টে বছরের শেষের দিকে বা আগামী বছরের শুরুর দিকে সেটা করব। সেখানে আমরা কিন্তু কূপ খনন করার জন্য, কেননা গ্যাস ওঠানো লাগবে সম্ভাবনার ক্ষেত্র আছে অন্বেষণ কূপ না ওটা ডিভেলপমেন্ট কূপ উন্নয়ন কূপ। দ্রুত একটা জায়গা আছে সেখান থেকে একটা, তিনটায় আরও দুটি কূপ বেশি আছে। কিন্তু সীমাবদ্ধতা মানে ওই যে কূপের মধ্যে ক্ষতি না করা স্টাকচারে সেটা দিয়ে আমরা ওখানে চালু হওয়া এবং আমরা ওই বিদ্যুৎ ভোলায় তো লাগবে না সেই বিদ্যুৎকে আমরা জাতীয় গ্রিডে নিয়ে আসব।
উত্তরণ : এলএনজি গ্যাস আমদানির কথা শোনা যায়, এ সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
তৌফিক-ই-এলাহী : এলএনজি গ্যাস আমদানির জন্য সমুদ্রে গ্যাস টার্মিনাল তৈরি করা হচ্ছে। প্রথমটা হচ্ছে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ভাসমান টার্মিনাল। এই গ্যাস কনডেন্সড ফর্মে থাকে। সমুদ্র পানির মাধ্যমে রিসাইকেল করে একে বায়বীয় করতে হয়। আরও ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ধারণ করার জন্য স্থায়ী টার্মিনাল নির্মিত হবে। এই টার্মিনাল চালু হলে আমরা এলএনজি গ্যাস আমদানি করতে পারব এবং এতে দেশের গ্যাসের অভাব অনেকটা পূরণ করা যাবে।
উত্তরণ : বিস্তারিতভাবে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও কয়লা খাত নিয়ে কথা বলার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
তৌফিক-ই-এলাহী : আপনার মাধ্যমে উত্তরণের পাঠকদেরও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : আনিস আহামেদ
ছবি : তপন দে
বাণীবদ্ধ : মো. আরিফুল ইসলাম

শ্রেণী: