সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস রুখে দাঁড়ান

সম্পাদকের কথা: সম্প্রতি দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক শক্তি ও উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর ন্যক্কারজনক হামলা বাঙালি জাতির সেকুলার ঐতিহ্যের মুখে কলঙ্ককালিমা লেপন করেছে। হিন্দুদের বাড়িঘর ও পূজাম-পে পবিত্র কোরআন শরিফ রেখে এসে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উসকানি প্রদান, জ্বালাও-পোড়াও প্রাণহানির যে ঘটনা ঘটেছে, তা আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এ-কথা সহজেই অনুমেয়, এদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যে শঙ্কার মনস্তত্ত্ব নিয়ে পূজা-পার্বণ করেন, তারা কোনোভাবে এ ধরনের অবিমৃশ্যকারী জঘন্যতম ঘটনা ঘটাতে পারেন না। ধর্মপ্রাণ সাধারণ মুসলমান জনগোষ্ঠীও এই হীন কাজ করতে পারে না। সাধারণ মুসলমানদের একটা ভালো অংশকে আমরা দেখেছি, শান্তিপূর্ণভাবে এবং উৎসবমুখর পরিবেশে যাতে পূজা অনুষ্ঠিত হতে পারে, সে-জন্য পূজা কমিটিকে আর্থিকভাবেও সহায়তা করে। দেশের বিভিন্ন স্থানে পূজা কমিটির উপদেষ্টা বা পৃষ্ঠপোষক হিসেবে এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিকে নির্বাচিত করা হয়। পূজাকালীন আনন্দ-উৎসবে কোথাও কোথাও হিন্দুদের চেয়ে মুসলমান সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করে, পূজারি হিসেবে নয়, উৎসবের অংশীদার হিসেবে। অতীতে যা হয়নি, বর্তমানে শেখ হাসিনার সরকার বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানÑ মসজিদ, মন্দির ও বৌদ্ধ মন্দিরের সংস্কার বা সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিপুল অর্থ সাহায্য করছে। সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার জন্য যথাসাধ্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। ফলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া এবং বিশে^ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
সেই সম্প্রীতির দেশে, শান্তির দেশে অশান্তি সৃষ্টি করছে কে? কার স্বার্থ আছে এতে? সহজ ও সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য উত্তর হচ্ছে, যারা বাংলাদেশকে আফগানিস্তানে পরিণত করতে চায়; যারা উগ্র ধর্মান্ধ। এরা শান্তির ধর্ম ইসলামের দুশমন। সাম্প্রদায়িক শক্তিকে মদত জোগায় যারা ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারে উৎসাহী। যাদের হাত বাংলাদেশ-বিরোধী এবং ধর্ম ব্যবসায়ী হাতে বাধা, সেই জামাতে ইসলামি ও অন্যান্য অপশক্তি।
সাম্প্রতিক ঘটনার জন্য গলা ফাটিয়ে সরকার ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করছে, সেই বিএনপিও উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য দায়ী। কারণ তারা এসব ঘটনায় ইন্ধন জোগায়, মানুষের পাশে ভাবাদর্শগতভাবে মানুষকে বিভক্ত করে। এরা তারা যারা সংবিধান কর্তন করে ধর্মনিরপেক্ষতা কেটে দিয়েছিল। এরা সেই বিএনপি রাজনীতিতে ধর্মীয় দল করার সুযোগ দিয়েছিল এবং জামাতসহ বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছিল। এরাই সেই বিএনপি যারা যুদ্ধাপরাধী জামাতকে নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করেছিল, জোট করেছিল। পরপর ৩টি নির্বাচনে পরাজিত হওয়া সত্ত্বেও জামাতের সাথে গাঁটছড়া ত্যাগ করেনি। ওদের মুখে অন্যের সমালোচনা শোভা পায় না।
আওয়ামী লীগের কর্মীদের এ ব্যাপারে আরও সতর্ক হতে হবে, যাতে বিএনপি-জামাত শিবিরের ক্যাডার বা দলের লোকজন ‘সাধু সেজে’ আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করতে না পারে। এ-কথা সত্য আওয়ামী লীগের মতো পপুলার গণভিত্তিক দলে কে যে কোন ফাঁকে ঢুকে পড়ে, দলীয় পদ দখল করে, নমিনেশনও পেয়ে যায়Ñ এ বিষয়টি যথাযথভাবে মনিটরিং করা সব সময় সম্ভব হয় না। তবে দলীয় নেতৃত্ব যথাযথভাবে জানতে পারলে এই অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কিন্তু যতক্ষণ তারা ধরা না পড়ছে, এর মধ্যেই দলের ভাবমূর্তি নস্যাতের সুযোগ পেলে ছাড়ে না। অতএব, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি, অপরাধী এবং এজেন্ট প্রভোকেটরদের কিছুতেই আওয়ামী লীগে ঢুকতে দেওয়া যাবে না।
আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার কাজে বদ্ধপরিকর। আমরা সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক হামলাকে কঠোর ভাষায় নিন্দা করি। আমরা কখনও বিস্মৃত হই না- হব না, হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানের মিলিত রক্তধারা এই বাংলাদেশ পেয়েছি। সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের মালিক এদেশের জনগণ। এককভাবে কোনো ধর্ম সম্প্রদায়, ব্যক্তি, গোষ্ঠীÑ রাষ্ট্রের মালিক নয়। বাঙালি জাতির হাজার বছরের ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং মাতৃভূমির জন্য গৌরববোধের ঐতিহ্য চির অমøান থাকবে। অন্ধকারের জীবদের প্রতি আমাদের ঘৃণা। যে কোনো মূল্যে এদের প্রতিরোধ করতে হবে। নির্মূল করতে হবে বাংলার মাটি থেকে।

Leave a Reply