উত্তরণ-এর সূত্রে দু-কথা

‘আওয়ামী লীগের মতো দলের, নিজস্ব কর্মসূচি, সমকালীন ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার মুখপত্র দরকার হতে পারে। মাসিক ‘উত্তরণ’ সেই ভূমিকাই পালন করছে। ইতোমধ্যে পত্রিকাটি ৯ বছর অতিক্রম করে দশম বছরে পদার্পণ করেছে। দলের জন্য নিঃসন্দেহে এটা শ্লাঘার বিষয়। ‘উত্তরণ’ দলীয় এবং সরকারের নীতি, কর্মসূচি এবং নানা সাফল্য তুলে ধরছে। পাঠক সেগুলো আগ্রহভরে পড়বে বলেই আমার বিশ্বাস। সেভাবেই ‘উত্তরণ’-এর মতো পত্রিকার গুরুত্ব বিবেচনায় নিতে হবে।’

আবুল মোমেন: উপমহাদেশের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদদের অনেকেই পত্রিকা প্রকাশ করেছেন। সেসব পত্রিকায় খবর প্রকাশের চেয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনীতিকদের নানা বিষয়ে ভাষ্য তুলে ধরা হতো। সেদিক থেকে এগুলো যতটা নিউজ পেপার তার চেয়ে বেশি ভিউজ পেপার- মতামত প্রকাশের বাহন। তা থেকে এমন সিদ্ধান্তই টানা যায় যে সেকালে বিশিষ্ট রাজনীতিবিদগণ কেবল কর্মী মানুষ ছিলেন না, তারা সমাজ ও দেশের নানা বিষয়ে ভাবতেন এবং মানুষকে সেসব বিষয় সমাধান দিতে উৎসুক ছিলেন। কারণ তখনও রাজনীতি ঠিক ক্ষমতার কাজে ব্যবহৃত হতে শুরু হয়নি। ঔপনিবেশিক শক্তির শাসনদণ্ডের নিপীড়ন এবং শোষণের মাত্রা যেন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে না যায়, তার জন্য একদিকে সাহসের সাথে কলম ধরা হতো আর অন্যদিকে নিজের সমাজের ধর্মীয় ও সামাজিক কুসংস্কার, পশ্চাৎপদতা দূর করার জন্য কলমের যুদ্ধ চালানো হতো। রাজনীতি দুঃশাসন প্রতিরোধ এবং স্থবির সমাজে গতি সঞ্চারের হাতিয়ার ছিল আর তা প্রকাশের জন্য প্রয়োজন ছিল বলিষ্ঠ লেখা এবং সাহসী মুখপত্র। লেখার উপলক্ষের অভাব ছিল না, ভাবনার ক্ষেত্রও ছিল বিস্তর।
আমরা সেকালের বিশিষ্ট কয়েকজন রাজনীতিবিদ প্রকাশিত কয়েকটি পত্রিকার নামগুলো জেনে নিতে পারি। মহাত্মা গান্ধী প্রকাশ করতেন ‘হরিজন’- সমাজের নিচুতলার অচ্ছুৎ মানুষকে তিনি ভগবানের সন্তান আখ্যা দিয়ে পাশে টেনে নিয়েছিলেন এবং মূলধারার রাজনীতিতে স্থান করে দিয়েছিলেন। তাদের নাম দিয়েছিলেন হরিজন, পত্রিকার নামকরণে তারাই গুরুত্ব পেল। মৌলানা আবুল কালাম আজাদের উর্দু ভাষার পত্রিকার নাম ছিল ‘আল হেলাল’, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ প্রকাশ করেছেন ‘নারায়ণ’, যা সাহিত্য হয়েও সমাজের কথা বলেছে। চিত্তরঞ্জন নিজে কবিতাও লিখেছেন, ছিলেন সাহিত্যানুরাগী। শেরে বাংলা ফজলুল হক কাজী নজরুল ও কমরেড মুজফ্ফর আহমদকে নিয়ে প্রকাশ করেছিলেন ‘নবযুগ’ এবং পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন কাজী নজরুলের ‘ধূমকেতু’সহ আরও অনেক পত্রিকা। নেতাজী সুভাষ বসু প্রকাশ করেছেন ইংরেজিতে ‘ফরোয়ার্ড’। জিন্নাহ ‘ডন’ পত্রিকা প্রকাশে সহায়তা দিয়েছিলেন। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ‘সংবাদ’-সহ আরও পত্রিকার প্রকাশনায় সহযোগিতা দিয়েছেন। ‘ইত্তেফাক’ প্রকাশে ভাসানীর সহযোগিতা থাকলেও, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও দৈনিক ইত্তেফাক যেন একসময় একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল।
তবে সকল রাজনীতিকই নিজেরা লেখক ছিলেন না। শেরে বাংলা বা ভাসানীর কোনো লেখার সন্ধান পাই না, বঙ্গবন্ধু পত্রিকায় লেখেন নি; কিন্তু ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ডায়েরিতে নিজের মতামত লিখে রাখতেন। তা থেকে তার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়।
আজকের দিনে রাজনীতি প্রায় সম্পূর্ণভাবেই ক্ষমতার সাথে জড়িয়ে আছে। রাজনীতিতে ব্যবসায়ী এবং ভাগ্যান্বেষী উচ্চাভিলাষীদের ভিড় জমেছে। ভিড়ে যাচ্ছেন আমলা, সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ক্ষমতার ভাগ পাওয়া এবং তারপর অনেকেই চান এলাকার মানুষের উপকারে স্মরণীয় হয়ে থাকতে। তবে এখন রাজনীতিক সরাসরি তার মনের কথা প্রকাশ করতে চান না, ভোটার ও সমর্থকের মনোভাব বুঝে কৌশলি কথাবার্তাই বলতে চান। তার মধ্যেও অনেকেই লিখছেন; কিন্তু তাতে ব্যক্তিগত দর্শন, অঙ্গীকার এবং সে-অনুযায়ী জনমতকে প্রভাবিত করার প্রয়াস বিশেষ থাকে না।
এদেশের রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা অনন্য। তিনি মাঠ পর্যায়ের কর্মী থেকে জাতীয় নায়কে উন্নীত হয়েছিলেন। তার ভূমিকার ফলে বাঙালি মুসলমান ১৯৬০-এর দশকে সেকুলার গণতান্ত্রিক রাজনীতির দিকে ঝুঁকেছিল। সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার রাজনীতির বিরুদ্ধে বাঙালির চিরায়ত উদার মানবতার রাজনীতিকেই তার নেতৃত্ব এদেশের মূলধারার রাজনীতিতে রূপান্তর করেছিল। সেদিন তার রাজনীতির বাহক হয়ে ‘ইত্তেফাক’, ‘সংবাদ’, ‘পাকিস্তান অবজার্ভার’-এর মতো পত্রিকা উদীয়মান জাতিকে বলিষ্ঠ মতামতে জাগিয়ে তুলেছিল। গণতন্ত্র ও সমাজতান্ত্রিক চেতনার পক্ষে তখন দেশব্যাপী জোরালো রাজনৈতিক প্রবাহ তৈরি হয়েছিল। আর পাকিস্তানপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ গোষ্ঠী তখন কোণঠাসা হয়েছিল।
১৯৭৫ সালে এই গোষ্ঠীর চক্রান্তে বঙ্গবন্ধু নিহত হন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তাদেরই প্রতিভূর হাতে পুঞ্জিভূত হয়। অবৈধ ক্ষমতা দখল থেকে এদেশে শুরু হয় সরাসরি দখলদারির রাজনীতি। দখলদারি মানে জবরদস্তি, ফলে রাজনীতিতে অস্ত্র ও কালো টাকার আমদানি ঘটে, মাস্তান ও পেশিশক্তির স্থান তৈরি হয়। সেই থেকে আমাদের রাজনীতি কলুষিত হতে থাকে। আজও আমরা এ থেকে মুক্ত হতে পারিনি।
তবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু-কন্যা দ্বিতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে চেষ্টা করছেন রাজনীতিতে চিন্তা-ভাবনা, দূরদর্শী পরিকল্পনার গুরুত্ব দিতে। তিনি নিজেও নানা বিষয়ে লিখছেন, অনেকদিন পরে মূলধারার প্রধান একজন রাজনীতিক কলম ধরেছেন। তবে ইতোমধ্যে দেশ এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এত পরিবর্তন ঘটে গেছে যে সমাজচিন্তায় রীতিমতো জগাখিচুড়ি অবস্থা। এ-কথাও সত্য ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তি আগের তুলনায় এখন অনেক শক্তিশালী। আমরা আওয়ামী লীগের মধ্যে একটা ভারসাম্য রক্ষা ও সমঝোতা-আপসের প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি। বর্তমানে দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে তিনি লড়াই শুরু করেছেন। আজ দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যম তার পাশে আছে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও তার প্রতি অনুকূল। এ-যুগে মানুষ দলীয় পত্রিকায় আস্থা রাখে না, তাছাড়া মতামত প্রকাশের বিভিন্ন রকম মাধ্যমও তৈরি হয়েছে। এখন রাজনীতিবিদদের নিজস্ব পত্রিকা প্রকাশের প্রয়াস সফল হয় না। হয়তো দলের, আওয়ামী লীগের মতো দলের, নিজস্ব কর্মসূচি, সমকালীন ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার মুখপত্র দরকার হতে পারে। মাসিক ‘উত্তরণ’ সেই ভূমিকাই পালন করছে। ইতোমধ্যে পত্রিকাটি ৯ বছর অতিক্রম করে দশম বছরে পদার্পণ করেছে। দলের জন্য নিঃসন্দেহে এটা শ্লাঘার বিষয়। ‘উত্তরণ’ দলীয় এবং সরকারের নীতি, কর্মসূচি এবং নানা সাফল্য তুলে ধরছে। পাঠক সেগুলো আগ্রহভরে পড়বে বলেই আমার বিশ্বাস। সেভাবেই ‘উত্তরণ’-এর মতো পত্রিকার গুরুত্ব বিবেচনায় নিতে হবে।
লেখক : শিক্ষাবিদ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply