দলকে শক্তিশালী করতে নেতা-কর্মীদের শেখ হাসিনার নির্দেশ;নির্বাচন আসছে

উত্তরণ প্রতিবেদন : আগামী নির্বাচন সামনে রেখে দলকে তৃণমূল পর্যায় থেকে আরও শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশ দিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নির্বাচন আসছে। কাজেই দলকে আরও শক্তিশালী করে তোলার বিষয়ে আমাদের অধিক মনোযোগী হতে হবে। যে যা বলে বলুক, আমাদের নিজেদের আত্মবিশ্বাস আছে এবং আমরা সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই চলি, দেশসেবা করি। আর আওয়ামী লীগ সরকারে আছে বলেই দেশের উন্নতি হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারে আছে বলেই এই করোনা মোকাবেলা সম্ভব হয়েছে। আর আওয়ামী লীগ আছে বলেই মানুষ অন্তত সেবা পাচ্ছে, জীবন মানের উন্নয়ন ঘটছে।
গত ৯ সেপ্টেম্বর তার সরকারি বাসভবন গণভবনে প্রায় এক বছর পর অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে সূচনা বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপিসহ অর্ধশতাধিক নেতা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সূচনা বক্তব্যের পর শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন দলের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া। এরপর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকরা সাংগঠনিক রিপোর্ট উপস্থাপনসহ দলকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে সাংগঠনিক সফরসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে সূচনা বক্তব্যে বলেন, সব থেকে দুর্ভাগ্য হলো, আমি যখন সিদ্ধান্ত নিলাম প্রত্যেকটা গৃহহীন মানুষকে আমরা ঘর করে দিব। আমাদের দেশের কিছু মানুষ এত জঘন্য চরিত্রের, আমি কয়েকটা জায়গায় হঠাৎ দেখলাম যে ঘর ভেঙে পড়ছে! কোন জায়গায় ভাঙা ছবি ইত্যাদি দেখার পর পুরো সার্ভে করালাম কোথায় কি হচ্ছে। সেখানে আমরা প্রায় দেড় লাখের মতো ঘর তৈরি করে দিয়েছি।
আওয়ামী লীগ সভাপতি এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, ৩০০টা ঘর (ভেঙেছে)- বিভিন্ন এলাকায় কিছু মানুষ নিজে থেকে হাতুড়ি, শাবল দিয়ে সেগুলো ভেঙে ভেঙে তারপর মিডিয়ায় ছবি তুলে দিচ্ছে। তাদের নামধামগুলো একদম এনকোয়ারি (তদন্ত) করে সব বের করা হয়ে গেছে।
ঘর ভেঙে পড়ার পেছনের কারণ মিডিয়া অনুসন্ধান করেনি অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিডিয়া এগুলো ধারণ করে প্রচার করে, তারা কিন্তু এটা কীভাবে হলো সেটা কিন্তু সেটা খতিয়ে দেখে না। তদন্তে ৯টি জায়গায় দুর্নীতি পাওয়া গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, কয়েকটা জায়গায় গেছে, যেমন এক জায়গায় ৬০০ ঘর, সেখানে হয়তো ৩/৪টা ঘর, ওই যে প্রবল বৃষ্টি হলো, এ জন্য মাটি ধসে কয়েকটা ঘর নষ্ট হয়েছে। মাত্র ৯টা জায়গায় আমরা পেয়েছিলাম সেখানে কিছুটা দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে, মাত্র ৯টা জায়গায়।
আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের অধীনে ঘর নির্মাণে সবাই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, ‘আমি দেখেছি যে প্রত্যেকে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। তারা মনে করেছে যাদের অফিসারদের ওপর দায়িত্ব দিয়েছিলাম, আমাদের ডিসি-ইউএনও সমস্ত কর্মচারীরা ছিল, তারা কিন্তু অনেকে নিজেরা এগিয়ে এসেছে এই ঘরগুলো তৈরিতে সহযোগিতা করার জন্য।’
তিনি বলেন, যারা ইট তৈরি করে তারাও এগিয়ে এসেছে, অল্প পয়সায় তারা ইট দিয়েছে। এভাবে সবাই, সবার সহযোগিতা, আন্তরিকতাটাই বেশি। কিন্তু এর মধ্যে দুষ্টু বুদ্ধির কিছু, এটাই হচ্ছে সবচেয়ে কষ্টকর। যখন এটা গরিবের ঘর সেখানে হাত দেয় কীভাবে? নেতাকর্মীসহ সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, যাই হোক আমরা সেগুলো মোকাবেলা করেছি, তবে আমাদের নেতা-কর্মীদের এ ব্যাপারে আরও সতর্ক থাকা দরকার। এ ধরনের ঘটনা দেখা বা জানার পর স্থানীয় যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ সরেজমিনে গিয়ে নিজেরাও তদারকি করে ছবি পাঠাচ্ছেন এবং সেভাবে কাজ হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোয় দলের নেতাকর্মীদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, এবারের করোনাভাইরাসের সময় আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা যেভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, সেভাবে আর কোনো রাজনৈতিক দলকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে তিনি দেখেননি।
শেখ হাসিনা বলেন, মূলত কেউ দাঁড়ায়নি। এই ব্যাপারে অন্য দলগুলোর কোনো আগ্রহ ছিল না। তাদের কাজই ছিল প্রতিদিন টেলিভিশনে বক্তৃতা বা বিবৃতি দেওয়া এবং আওয়ামী লীগের একটু সমালোচনা করা। তাদের যেন একটাই কাজ আওয়ামী লীগকে দোষারোপ করতেই হবে। তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের সময় সরকারের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই খুব আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছে। তবে, কখনও সরকারের একার পক্ষে এই ধরনের পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব ছিল না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে একটাই কারণে যে, আমাদের একটা শক্তিশালী সংগঠন তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত আছে। আর সেটা আছে বলেই আমরা এটা মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছি। যেটা আমার বিশ্বাস। জানি এ-কথা কেউ হয়তো বলবেও না লিখবেও না; কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এককভাবে শুধু সরকারি লোক দিয়ে সবকিছু করা সম্ভব হয় না। তারাও করেছে খুব আন্তরিকতার সঙ্গে। আমাদের প্রশাসনে যে যেখানে ছিল বা পুলিশ বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, বিডিআর, আনসার প্রত্যেকে এবং বিশেষ করে স্বাস্থ্যকর্মীরা।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রথম দিকে একটু ভীতি ছিল; কিন্তু সরকারের প্রণোদনা এবং উৎসাহে তারা কাজ করতে পেরেছে। হাজার হাজার ডাক্তার এবং নার্স আমরা নিয়োগ দিয়ে চেষ্টা করেছি করোনা মোকাবেলা করার জন্য। আবার ভ্যাকসিন কেনার ব্যাপারে আমরা সবার আগে উদ্যোগ নিয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের বিপদ হয়ে গিয়েছিল ভারতে এত ব্যাপকহারে করোনা দেখা দিল যে, চুক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা ভ্যাকসিন সাপ্লাই দিতে পারছিল না। তারপরেও আমরা পৃথিবীর যেখান থেকে পেরেছি ভ্যাকসিন সংগ্রহ করেছি এবং এখন আর সমস্যা হবে না। আমরা নিয়মিত পাব এবং আমাদের দেশের মানুষকে আমরা দিতে পারব। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা মানুষের কোনো কাজের সুযোগ ছিল না, ঘরে বন্দী, খাবারের অভাব। সেই সময় আমাদের নেতাকর্মীরা প্রত্যেকে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছে।
এ সময় বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা করোনায় দলের বহু নেতাকর্মীর মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, কত মানুষকে যে আমরা হারালাম। এমন কোনো দিন নেই যে, মৃত্যু সংবাদ না আসত। আজকেও (৯ সেপ্টেম্বর) কিছুক্ষণ আগে খবর পেয়েছি ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ দক্ষিণের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফির স্ত্রী মারা গেছেন। তিনি তার রুহের মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারে আছে বলেই দেশের উন্নতি হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারে আছে বলেই এই করোনা মোকাবেলা সম্ভব হয়েছে। আর আওয়ামী লীগ আছে বলেই মানুষ অন্তত সেবা পাচ্ছে। কারণ অতীত অভিজ্ঞতা আছে এবং যারা আমাদের সমালোচনা করেন তাদের শুধু এতটুকু বলব যে, অতীতে আমাদের দেশে কি অবস্থা ছিল? ’৭৫-এর পর থেকে ’৯৬ পর্যন্ত কি অবস্থাটা ছিল, সেটা যেন তারা একটু উপলব্ধি করে। তবে, কিছু ভাড়াটে লোক রয়েছে সারাক্ষণ মাইক লাগিয়ে বলতেই থাকবে।
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, যে যাই বলে বলুক আমাদের আত্মবিশ্বাস আছে এবং আমরা সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই চলি। ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আমরা ঘোষণা দিয়েছিলাম ২০২১ সালে বাংলাদেশকে আমরা এই পর্যায়ে নিয়ে আসব। সেটা আমরা করতে পেরেছি বলেই আজকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ। তিনি বলেন, জাতিসংঘের যে কর্মসূচি সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি), সেটাও যেমন আমরা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি, সেই সঙ্গে আমাদের নিজেদের কর্মসূচি বাংলাদেশকে ঘিরে অর্থাৎ ২০৪১ সাল নাগাদ কেমন বাংলাদেশ আমরা দেখতে চাই, সেই পরিকল্পনাও আমরা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছি। সেই সঙ্গে ডেল্টা প্ল্যান করেছি। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং আশু করণীয় নির্ধারণ করে সেভাবে আমরা কাজ করেছি। যার সুফল এখন দেশের মানুষ পাচ্ছে। সভার শুরুতে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের উদ্দেশ্য করে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা আমাদের কার্যনির্বাহী সংসদের মিটিং সাধারণত চার মাস পরপরই করতাম বা দুই মাস পরপরই করতাম। ওই দুই মাস থেকে তিন মাসের মধ্যে সব সময় বসতাম, এটা নিয়মিত করতে পারতাম। কিন্তু এই করোনাভাইরাসের কারণে আমরা সময়মতো সভাটা করতে পারিনি এবং এটা করা বোধহয় সমীচীনও হতো না। এখন পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এবং টিকাদানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে যে আমাদের নির্বাচনও সামনে, তাই সংগঠনটাকেও আমাদের শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply