দেবী দুর্গার পূজা : উপাখ্যান, তত্ত্ব ও তাৎপর্য

নিরঞ্জন অধিকারী : সনাতন ধর্মের প্রচলিত নাম হিন্দুধর্ম। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাও বিশ্বাস করে এক অনাদি ও অনন্ত সত্তায়। তার জন্ম নেই, মৃত্যু নেই। তার কোনো স্রষ্টা নেই। তিনি স্বয়ং সৃষ্ট বা স্বয়ম্ভু। হিন্দুধর্মতত্ত্বে তাকে অভিহিত করা হয়েছে ‘ব্রহ্ম’ নামে। তিনি এক এবং অদ্বিতীয়। এই ব্রহ্মকে সাংখ্যদর্শনে দ্বিধা-বিভক্ত রূপে দেখা হয়েছেÑ এক পুরুষ এবং দুই প্রকৃতি।
এই পুরুষ ও প্রকৃতির মাধ্যমে সৃষ্ট হয়েছে জীবন। জগতের স্রষ্টা ব্রহ্ম, আবার তিনিই পুরুষ ও প্রকৃতিতে দ্বিধাবিভক্ত। পুরুষ পুংশক্তি; প্রকৃতি নারী শক্তি। আর এই পরমা প্রকৃতিই পরমব্রহ্মের শক্তি। তিনিই আদ্যাশক্তি মহামায়া। শক্তির উৎস শক্তিমান ব্রহ্ম, আর শক্তি তারই একটি প্রকাশ। সেজন্য আদ্যা শক্তি বা পরমা প্রকৃতিকে বলা হয় ব্রহ্মারূপিণী।
আমরা জানি, ব্রহ্ম নিরাকার। কিন্তু তিনি প্রয়োজনে সাকার হতে পারেন। কেন পারবেন না? তিনি যে সর্বশক্তিমান। তার অসাধ্য কিছু নেই। এই হলো হিন্দুধর্মদর্শনের একটি প্রধান বিশ্বাস। ব্রহ্ম যখন ‘ঈশ’ অর্থাৎ প্রভুর বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করেন, তখন তাকে বলা হয় ঈশ্বর। ‘ঈশ্’ ধাতুর অর্থ প্রভুত্ব করা। ঈশ্বর জীবের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় বা বিনাশের কর্তা। অর্থাৎ ব্রহ্ম যে রূপে প্রভুত্ব করেন, তার নাম ঈশ্বর। আবার ব্রহ্ম যে রূপে জগৎ ও জীবকে কৃপা করে পালন করেন তার নাম ভগবান। আবার দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের জন্য ঈশ্বর যখন কোনো-না-কোনো রূপ ধরে পৃথিবীতে অবতরণ করেন বা নেমে আসেন, তখন তাকে বলা হয় অবতার। অবতরণ করেন বলেই তার এই নাম। যেমন ত্রেতা যুগে গঠিত ও অনাচারী রাবণকে দমন করার জন্য ঈশ্বর ‘রাম’ অবতার রূপে লীলা করেছিলেন। দ্বাপর যুগে শ্রীকৃষ্ণ রূপে লীলা করেছিলেন। আবার ঈশ্বরের কোনো গুণ বা শক্তিকে ঋষিরা ধ্যানযোগে প্রাপ্ত ‘রূপ’ বা আকার দিয়েছিলেন। তার নাম দেব বা দেবীÑ এক কথায় দেবতা। দেবতারা ঈশ্বর নন, ঈশ্বরের কোনো গুণ বা শক্তিকে যখন কোনো আকারে উপলব্ধি করেছেন ঋষিরা তাকে বলা হয়েছে দেবী। সুতরাং দেবতারা ঈশ্বরের কোনো গুণ শক্তির সাকার রূপ। আবার জীবের মধ্যে আত্মা রূপে ঈশ্বর বাস করেন। ঈশ্বর পরমাত্মা। তিনি যখন জীবের মধ্যে বাস করেন, তখন তাকে বলা হয় জীবাত্মা। সুতরাং জীবাত্মা পরমাত্মারই অংশ। তাহলে দেখা যাচ্ছে, ঈশ্বর, ভগবান, অবতার, দেব-দেবী এবং জীব একই ঈশ্বরের বিভিন্ন প্রকাশ। এ-কথা উপলব্ধি করে, স্বামী বিবেকানন্দ লিখেছিলেন :

বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি
কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর?
জীবে প্রেম করে যেই জন
সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।

আবার দেব-দেবী প্রসঙ্গে ফিরে আসি। ঈশ্বরের এক-একটি গুণ বা শক্তিকে যখন সাকার রূপে দেখেছেন কবিরা, তখন তাকেই তারা দেব বা দেবী নামে অভিহিত করেছেন। যেমন ঈশ্বরের সৃষ্টির ক্ষমতার নাম ‘ব্রহ্মা’। তিনি পালন করেন যে রূপে তার নাম বিষ্ণু। আবার তিনি যে রূপে ধ্বংস করে জীব ও জগতের লয় বা ভারসাম্য রক্ষা করেন, তার নাম শিব। ঈশ্বরের শক্তি যা আদ্যাশক্তির নাম মহামায়া বা যোগমায়া। যোগমায়ার মায়ার কারণেই জীব মায়ায় আচ্ছন্ন থাকে। ঈশ্বর শক্তি আদ্যাশক্তি বা পরমা প্রকৃতি বা যোগমায়া বা মহামায়া রূপে অভিহিত।
বিভিন্ন দেবী এই আদ্যাশক্তিরই বিভিন্ন রূপ। আদ্যাশক্তি মহামায়া যুগে যুগে নানা রূপে স্বর্গ ও মর্ত্যলোকের কল্যাণ সাধন করেছেন, অশুভ বা অকল্যাণকে ধ্বংস করে। অশুভই অসুর বা দৈত্য বা দানব।
আদ্যশক্তি একবার ‘দুর্গম’ নামক এক অসুরকে ধ্বংস করেছিলেন, তাই তার নাম হয় দুর্গা। পর্বতরাজ হিমালয়ের কন্যা রূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে তার নাম পার্বতী। এই পার্বতীর ডাকনাম উমা।
পৌরাণিক আখ্যানে দুর্গা বা পার্বতী বা উমা শিব বা মহাদেবের পতœী রূপে বর্ণিত। তিনিই আবার উদ্ভিদেরও দেবী। দুর্গাপূজার প্রতিমায় আমরা দেবতা গণেশের পাশে যে ‘কলা’ বউকে দেখি, তিনি গণেশের স্ত্রী বা পতœী নন। তিনি ‘নবপত্রিকা’Ñ ৯টি মিলিত রূপ। এই ৯টি বৃক্ষ ও লতা হচ্ছে : রম্ভা (কলা), কচু, হরিদ্রা (হলুদ), জয়ন্তী, বেল, দাড়িম্ব (ডালিম), অশোক, মানকচু ও ধান। কোনো রসিক পূজক বা পুরোহিত সবটা মিলিয়ে অবলুণ্ঠিত নারীর মতো বানিয়েছেন কাপড় পরিয়ে দিয়ে। আসলে এই নবপত্রিকা দেবী দুর্গার একটি রূপ। ৯টি উদ্ভিদ আবার ৯টি দেবীর প্রতীক। রম্ভা বা কলাগাছ দেবী ব্রহ্মণী, কচুগাছে দেবী কালিকা বা কালী, হরিদ্রায় দেবী উমাকে, জয়ন্তীতে দেবী কার্তিকীকে, বিল্বশাখে দেবী শিবাকে, দাড়িম্বে (ডালিমে) দেবী রক্তদন্তিকাকে, অশোক শাখায় দেবী শোক হারিণীকে, মানকচুতে দেবী চামু-াকে এবং ধান্যে মহালক্ষ্মীকে আহ্বান করে পূজা করা হয়, প্রার্থনা করা হয় বরাভয়, আয়ু, আরোগ্য, ধনধান্য সমৃদ্ধি প্রভৃতি।
দেবী দুর্গার যে রূপ শারদীয় দুর্গাপূজায় এবং বসন্তকালে বাসন্তী দুর্গাপূজায়, তা হলো মহিষ মর্দিনী দেবী দুর্গা। দেবী দুর্গার বাহন হচ্ছে সিংহ। সিংহও শক্তির প্রতীক। এই দেবী দুর্গা একবার মহিষাসুরকে বধ করে শান্তি ফিরিয়ে এনেছিলেন।
উপাখ্যানটি নিম্নরূপ : একবার দানব মহিষাসুর দেবতা ব্রহ্মার বরে দুর্জয় হয়ে উঠেছিলেন। যদি সাধনা করে মানব-দানব কোনো দেবতাকে তুষ্ট করতে পারে, তাহলে সেই দেবতা ভক্তকে বর প্রদান করেন। ‘বর’ মানে আশীর্বাদ এবং সাধক ভক্তের ইচ্ছে পূরণ। একবার মহিষাসুর দেবতা ব্রহ্মাকে কঠোর সাধনায় তুষ্ট করেছিলেন। ব্রহ্মা মহিষাসুরের সাধনা-স্থলে এসে তাকে বর চাইতে বললেন। মহিষাসুর অমরত্বের বর চাইলেন। অর্থাৎ তার যেন মৃত্যু না হয়। কিন্তু এক দেবতারা ছাড়া আর কেউ অমর হতে পারবেন না। এইটাই বিশ্ববিধাতৃর বিধান। তিনি মহিষাসুরকে অন্য যে কোনো বর প্রার্থনা করতে বললেন। মহিষাসুর চালাকি করে বর চাইলেন : কোনো পুরুষ যেন আমাকে বধ করতে না পারে। ব্রহ্মা ‘তথাস্তু’ মানে ‘তাই হোক’ বলে বর দিয়ে অন্তর্ধান করলেন।
মহিষাসুর মনে করলেন, তিনি প্রকারান্তরে অমর বর পেয়ে গেছেন। কারণ তিনি পুরুষের অবধ্য। কোনো নারীর এত শক্তি নেই যে মহিষাসুরকে বধ করে। ব্রহ্মার বরে বলীয়ান হয়ে মহিষাসুর দেবতাদের তাড়িয়ে দিলেন স্বর্গরাজ্য থেকে। দেবরাজ ইন্দ্রকে তাড়িয়ে দিয়ে তিনি দখল করে নিলেন স্বর্গরাজ্য। হয়ে উঠলেন স্বর্গ-মর্ত্য ও পাতালের একচ্ছত্র অধীশ্বর। তখন দেবতারা ব্রহ্মাকে অগ্রবর্তী করে গেলেন শিবের কাছে। শিব তাদের নিয়ে গেলেন বিষ্ণুর কাছে। বিষ্ণুদেব তাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে সম্মিলিত শক্তিতে মহিষাসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উপদেশ দিলেন। সকল দেবতার শক্তি ঐক্যবদ্ধ হলো। সেই ঐক্যবদ্ধ শক্তি থেকে সৃষ্ট হলো এক আলোর পুঞ্জ। সেই আলোকপুঞ্জ থেকে আবির্ভূত হলেন দেবী দুর্গা। তার ত্রিনয়ন, তিনি দশভূজা। তৃতীয় নয়ন হচ্ছেÑ জ্ঞান প্রজ্ঞা ও শক্তির প্রতীক। সেখান থেকে নির্গত হয় বহ্নিশিখা, যা শত্রুকে দগ্ধ করে। তার দশ ভূজ বা বাহু দশ দিক থেকে সমাহৃত শক্তির অর্থাৎ ঐক্যের প্রতীক। আমরা যখন ঐক্যবদ্ধ হব, তখন সম্মিলিত শক্তির আঘাতে শত্রুর বিনাশ ঘটবে। অন্যদিকে নারীকে পুরুষ কম জোর ভাবে। অবহেলা করে। কখনও-কখনও অবমাননাও করে। কিন্তু নারীর শক্তি আছে। সে অবহেলা বা অবমাননার পাত্রী নয়। সেও আঘাত হানতে জানে। একদিকে নারী কল্যাণদাত্রী, অন্যদিকে সে ভীষণা। দেবী দুর্গার ১০টি হাতের একটিতে তাই বরাভয় মুদ্রা। অর্থাৎ শিষ্টের কোনো ভয় নেই। তাই দেবী দুর্গা দেবতাদের দিলেন বরাভয় এবং ধ্বংস করলেন মহিষাসুরকে। আর এ যুদ্ধ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের। অত্যাচারীর বিরুদ্ধে ন্যায়ের শক্তির প্রতিঘাত।
মহিষাসুরের বধের প্রতীকে ন্যায়ের শক্তিতে অন্যায়কে ধ্বংসের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। মহিষাসুর ভেবেছিলেন কোনো পুরুষ তাকে বধ করতে পারবে না, নারীকে তো তিনি গণনাই করেন না। তাই নারীকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়। দেবী দুর্গার উপাখ্যানের মধ্য দিয়ে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধের বিষয়টিও প্রতিফলিত হয়েছে।
দেবী দুর্গার পূজা করার বিষয়টি কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়। এর মধ্য দিয়ে আমরা পাই ঐকবদ্ধ হওয়ার শিক্ষা। সম্মিলিত শক্তিতে মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের শিক্ষা। পাই নারীর প্রতি মর্যাদাবোধের শিক্ষা। যে শস্য আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে, আমাদের বৃক্ষলতার প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ এবং এদের সংরক্ষণ করার শিক্ষা দেয়Ñ যা বর্তমান পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
বিভক্তি নয় মিলন। অন্যায়কে প্রশ্রয় নয়, তার প্রতিবাদ। এই যে করোনাসুর বিশ্বব্যাপী ত্রাসের সৃষ্টি করেছে, তাকেও বিনাশ করতে হবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে। এ-ও এক যুদ্ধ।
সমগ্র দায়িকতা আমাদের বিভক্ত করে দেয়, সংকীর্ণতা আমাদের বিচ্ছিন্ন করে। এগুলোকে রুখতে হবে। কারণ এগুলোই এ যুগের অসুর। অসুরদের ধ্বংস না করলে যেমন শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না, তেমনি সাম্প্রদায়িকতা, সংকীর্ণতা শোষণ-নিপীড়নকে ধ্বংস না করলেও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে না। সুতরাং শান্তির জন্যও আমাদের অশান্তি ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে সকল প্রকার বৈষম্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। অশান্তি ও বৈষম্যের অসুরকেÑ অশুভ শক্তিকে নির্মূল করতে হবে। তবেই প্রতিষ্ঠিত হবে শান্তি ও কল্যাণ।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply