শিক্ষা বিস্তারে বঙ্গবন্ধুর দর্শন ও অবদান

ড. মো. হাবিবুর রহমান: সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন কেটেছে সংগ্রামী জনতার নেতৃত্বে, সংগ্রামে এবং কারার অন্তরালে। শিক্ষা বিস্তারে তার চিন্তা-ভাবনার বিশালতা ও সুদূরপ্রসারি দিক-নির্দেশনা মেলে অসংখ্য ভাষণ, বক্তব্য, বিবৃতি, আলাপচারিতা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলার স্বল্পতম সময়ের দেশে পুনর্বাসন ও গঠনকালে। এসব তথ্য-উপাত্তে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি বাঙালিত্বকে সমৃদ্ধ করা এবং তার যথাযথ বিকাশের সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম হিসেবে শিক্ষাকেই বিবেচনা করতেন এবং শিক্ষাকেই মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ মনে করতেন। তাই তিনি স্বাধীন দেশে ফিরে ১০ জানুয়ারির ভাষণে বলেছিলেন, “আমার দেশে হয়তো তেমন প্রাকৃতিক সম্পদ নেই, খনি নেই, বিস্তৃত ভূমি নেই। কিন্তু রয়েছে বিপুল জনগোষ্ঠীÑ এই জনগোষ্ঠী নিয়েই আমরা আমাদের দেশকে গড়ে তুলব।” দেশের সকল শিক্ষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৫২ সালে যখন পাকিস্তানিরা আমাদের মাতৃভাষার ওপর আঘাত হানে, তখনও বঙ্গবন্ধু প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন রাষ্ট্রভাষা বাংলা ছাড়া এদেশে শিক্ষা-ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়বে। ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বরের এবং ১৯৬৩ সালের রবীন্দ্র চর্চা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর উদাত্ত সমর্থন তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
আমাদের জাতির জন্য শিক্ষাকে বঙ্গবন্ধু যে অগ্রাধিকার ও গুরুত্ব দিয়েছিলেন তা বোঝা যাবে তার নিম্নোক্ত বক্তব্য থেকে, যা তিনি ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনের পূর্বে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে প্রদান করেছিলেন : “সুষ্ঠু সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা খাতে পুঁজি বিনিয়োগের চাইতে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ আর কিছু হতে পারে না… আমাদের জনসংখ্যার শতকরা ৮৩ জন অক্ষরজ্ঞানহীন… জাতির অর্ধেকেরও বেশি শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। শতকরা মাত্র ১৮ জন বালক ও ৬ জন বালিকা প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করছে। জাতীয় উৎপাদনের শতকরা কমপক্ষে ৪ ভাগ সম্পদ শিক্ষা ব্যয় হওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। কলেজ ও স্কুলশিক্ষকদের, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। নিরক্ষরতা অবশ্যই দূর করতে হবে। পাঁচ বছর বয়স্ক বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষাদানের জন্য একটা ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ চালু করতে হবে। মাধ্যমিক শিক্ষার দ্বার সকল শ্রেণীর জন্য খোলা রাখতে হবে। দ্রুত মেডিকেল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়সহ নয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দারিদ্র্য যাতে উচ্চ শিক্ষার জন্য মেধাবী ছাত্রদের অভিশাপ হয়ে না দাঁড়ায় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।”
এ প্রসঙ্গে ১৯৭৩ সালের ১৯ আগস্ট সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ভাষণে দিক-নির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে : “বাবারা, একটু লেখাপড়া শিখো। যতোই জিন্দাবাদ আর মুর্দাবাদ করো, ঠিকমতো লেখাপড়া না শিখলে কোনো লাভ নেই। আর লেখাপড়া শিখে যে সময়টুকু থাকে বাপ-মাকে সাহায্য করো। প্যান্ট পরা শিখছো বলে বাবার সঙ্গে হাল ধরতে লজ্জা করো না। দুনিয়ার দিকে চেয়ে দেখো। কানাডায় দেখলাম ছাত্ররা ছুটির সময় লিফট চালায়। ছুটির সময় দু’পয়সা উপার্জন করতে চায়। আর আমাদের ছেলেরা বড় আরামে খান, আর তাস নিয়ে ফটাফট খেলতে বসে পড়েন। গ্রামে বাড়ির পাশে বেগুন গাছ লাগিও, ক’টা মরিচ গাছ লাগিও, ক’টা লাউ গাছ ও ক’টা নারিকেলের চারা লাগিও। বাপ-মারে একটু সাহায্য করো। ক’টা মুরগি পালো, ক’টা হাঁস পালো।
জাতীয় সম্পদ বাড়বে। তোমার খরচ তুমি বহন করতে পারবে। বাবার কাছ থেকে যদি এতোটুকু জমি নিয়ে ১০টি লাউ গাছ, ৫০টা মরিচ গাছ, ক’টা নারিকেলের চারা লাগিয়ে দাও দেখবে ২-৩’শ টাকা আয় হয়ে গেছে। তোমরা ওই টাকা দিয়ে বই কিনতে পারবে। কাজ করো, কঠোর পরিশ্রম করো, না হলে বাঁচতে পারবে না। শুধু ‘বিএ-এমএ’ পাস করে লাভ নেই। আমি চাই কৃষি কলেজ, কৃষি স্কুল, ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল, কলেজ ও স্কুল যাতে সত্যিকারের মানুষ পয়দা হয়। বুনিয়াদি শিক্ষা নিলে কাজ করে খেয়ে বাঁচতে পারবে।
কেরানি পয়দা করেই একবার ইংরেজ শেষ করে দিয়ে গেছে দেশটা। তোমাদের মানুষ হতে হবে ভাইরা আমার। আমি কিন্তু সোজা সোজা কথা কই, রাগ করতে পারবে না। রাগ করো, আর যা করো, আমার কথাগুলো শোনো। লেখাপড়া করো আর নিজেরা নকল বন্ধ করো। আর এই ঘুষ, দুর্নীতি, চুরি-ডাকাতির বিরুদ্ধে গ্রামে গ্রামে, থানায় থানায় সংঘবদ্ধ হয়ে আন্দোলন গড়ে তোলো। প্রশাসনকে ঠিকভাবে চালাতে সময় লাগবে। এর একেবারে পা থেকে মাথা পর্যন্ত গলদ আছে।”
১৯৭৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ভৈরবে বঙ্গবন্ধু এক ভাষণে বলেন, “ভিক্ষা নিয়ে কোনোদিন কেউ সম্মান নিয়ে বাস করতে পারে না। আমি আমার সাড়ে সাত কোটি লোককে সারাজীবনের জন্য ভিক্ষুকের জাত করতে চাই না। আমি চাই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ। একটি শোষণহীন দেশ, যে দেশে মানুষ খাবে, সুখে বাস করবে।”
দেশের অর্থনীতি তেমন সবল না হলেও বঙ্গবন্ধু ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে আবারও পুনর্ব্যক্ত করেছেন, “ভাইয়েরা বোনেরা আমার, গরিব কর্মচারীর বেতন যাতে হয়Ñ তাদের সংসার চলে না।… ওরা দুটা পয়সা বেশি পায়, তাই আমাদের বন্দোবস্ত করতে হয়েছে। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকরা বেতন কম পেতেন। তাদের জন্য আমাকে সরকারি স্কুল করে দিতে হচ্ছে।” অর্থাৎ বিদেশি প-িতরা যখন দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি আখ্যায়িত করছেন তখনই বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করেছেন এবং শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে তার মূল্যবান উপদেশ ছিল “আগামী প্রজন্মের ভাগ্য শিক্ষকদের উপর নির্ভর করছে। শিশুদের যথাযথ শিক্ষার ব্যত্যয় ঘটলে কষ্টার্জিত স্বাধীনতা অর্থহীন হবে।”
দেশের তখনকার বাস্তবতা এমনকি বর্তমান প্রেক্ষাপটেও বঙ্গবন্ধুর এই ভাবনা অত্যন্ত বাস্তব ও কল্যাণমুখী। এর যথার্থ প্রতিফলন পাওয়া যায় ১৯৭২-এ প্রণীত বাংলাদেশ সংবিধানের ১৭নং অনুচ্ছেদে। এই অনুচ্ছেদে সরকারের জন্য ৩টি সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিলÑ

  • একই পদ্ধতিতে গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য;
  • সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সংগতিপূর্ণ করার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছা প্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য এবং
  • আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের নির্দেশ, সর্বোপরি একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও অভিন্ন গণমুখী জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই ড. কুদরাত-এ-খুদার নেতৃত্বে শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। ২৪ সেপ্টেম্বর এই কমিশন উদ্বোধনকালে বঙ্গবন্ধু পুনর্গঠিত শিক্ষা-ব্যবস্থার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন : ‘জনগণের বাঞ্ছিত সমাজতান্ত্রিক সমাজ’। তিনি বাংলাদেশের সম্পদ সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনায় রেখে এমন এক দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা প্রণয়নের জন্যে শিক্ষা কমিশনকে আহ্বান জানান, যা শিক্ষাক্ষেত্রে ‘সার্থক ও সুদূরপ্রসারী সংস্কার সাধনে সাহায্য করবে’। বঙ্গবন্ধু প্রচলিত আমলাতন্ত্রের ঊর্ধ্বে উঠে একজন শিক্ষাবিদকে শিক্ষামন্ত্রী ও আরেকজনকে শিক্ষাসচিব হিসেবে নিয়োগ দেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, কমিশন রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা না করে তিনি অনেকগুলো জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। যেমনÑ
স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে তার সরকার কর্তৃক গণশিক্ষার প্রসারে আড়াই কোটি টাকা জরুরি বরাদ্দ প্রদান করা হয়। গঠন করা হয় পল্লি উন্নয়ন ব্রিগেড। ছয় মাসের মধ্যে এই অর্থ ব্যয় করে নিরক্ষরতার বিরুদ্ধে শুরু করা হয় কার্যক্রম।

  • মার্চ ’৭১ থেকে ডিসেম্বর ’৭১ পর্যন্ত সময়কালের ছাত্রদের সকল বকেয়া টিউশন ফি মওকুফ করেন;
  • শিক্ষকদের ৯ মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ করেন;
  • আর্থিক সংকট থাকা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে পুস্তক বিতরণ করেন এবং অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক ঘোষণা করেন, নারী শিক্ষা উন্নয়নে এটি একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ;
  • বঙ্গবন্ধুর যুগান্তকারী পদক্ষেপ হচ্ছে তিনি দেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করেন;
  • ৩৬ হাজার ১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭২৪ জন প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণ করেন;
  • বঙ্গবন্ধুর সরকার ৯০০ কলেজ ভবন ও ৪০০ হাই স্কুল পুনর্নির্মাণ করেন;
  • বঙ্গবন্ধুর আরেকটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হচ্ছে জাতীয় সংসদে ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস করার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যলয়সমূহের স্বায়ত্তশাসন প্রদান।

বঙ্গবন্ধু অফিস-আদালতে বাংলা প্রচলনের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। সেনাবাহিনীসহ সকল অফিসে বাংলা চালু করা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলা একাডেমিতে সাঁটলিপি, মুদ্রাক্ষর ও নথি লেখার প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হয় জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়ে তিনি বাংলা ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছিলেন।
১৯৭৪ সালের ৩০ মে শিক্ষা কমিশন চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করে, যেখানে প্রস্তাব করা হয়, কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের সারমর্ম : দেশের জনগণকে জাতীয় কর্মে ও উন্নয়নে গঠনমূলক ভূমিকা রাখার যোগ্য করে তোলার জন্য একটি সার্বজনীন শিক্ষা পদ্ধতি গড়ে তুলতে হবে।… এজন্য অন্তত আট বছরের বুনিয়াদি শিক্ষা প্রয়োজন। এ-কারণে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে প্রাথমিক শিক্ষারূপে গণ্য করে… প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত যে অবৈতনিক শিক্ষা চালু আছে, তাকে ১৯৮০ সালের মধ্যে বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং ১৯৮৩ সালের মধ্যে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এক অভিন্ন ধরনের অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রবর্তন করতে হবে। প্রয়োজনমতো দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের জন্য নৈশ্য স্কুল চালু করতে হবে… মাধ্যমিক স্তর প্রসঙ্গে কমিশনের প্রধান সুপারিশ হলো দেশের বাস্তব অবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের পরিবেশ ও জীবন পদ্ধতি বিবেচনা করে এই স্তরের শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির মধ্যে (১৪-১৭ বছর বয়সের) প্রায় সাড়ে ৪ লাখ শিক্ষার্থী প্রতি বছর পড়াশোনা ত্যাগ করে, কিন্তু জীবিকা অর্জনের সহায়ক কোনো শিক্ষা তারা পায় না। কাজেই মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাকে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জন্য উচ্চ শিক্ষার প্রস্তুতিপর্ব হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রারম্ভিক বৃত্তিমূলক শিক্ষা মোটামুটি একাদশ শ্রেণি পর্যন্ত এবং সাধারণ শিক্ষা দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এই উদ্দেশ্যে নবম শ্রেণি থেকে শিক্ষাক্রম মূলত দু-ভাগে বিভক্ত হবে : বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষা। উভয় ধারাতেই নবম ও দশম শ্রেণিতে কয়েকটি বিষয় অবশ্য পাঠ্য থাকবে। এছাড়া অন্য কতকগুলো বিষয় শিক্ষার্থীরা স্বনির্বাচিত ধারায় বেছে নেবে। বৃত্তিমূলক ধারায় মাধ্যমিক শিক্ষা হবে তিন বছরের, সাধারণ ধারায় হবে চার বছরের…
প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উৎসাহ, কমিশনের রিপোর্টকালীন সময়ে গৃহীত পদক্ষেপ ও নির্দেশনায় কমিশন পাঁচ বছরের মধ্যে ১১ থেকে ৪৫ বছর বয়সী সাড়ে ৩ কোটি নিরক্ষরকে অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন করার জন্য প্রস্তাব করে। মেধাবী দরিদ্র ছেলেমেয়েরা যাতে সরকারি বৃত্তি নিয়ে পড়ালেখা করতে পারে তার জন্য সুপারিশ করে। শিক্ষা কমিশন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করে বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর। মাধ্যমিক শিক্ষার স্তর নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণ মূলত জাতির পিতার নির্দেশনার ফল। এ স্তরে এসে বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য শাখায় বিভক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। উচ্চ শিক্ষা সম্পর্কে কুদরত-এ-খুদা কমিশন নিম্নে উল্লিখিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ চিহ্নিত করেছেন :

  • বিভিন্ন উচ্চতর কাজের জন্য সুনিপুণ, জ্ঞানদক্ষ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি সৃষ্টি করা;
  • এমন একটি শিক্ষিত গোষ্ঠী তৈরি করা যাদের কর্মানুরাগ, জ্ঞানস্পৃহা, চিন্তার স্বাধীনতা, ন্যায়বোধ ও মানবিক মূল্যবোধ সম্যক বিকশিত হয়েছে;
  • গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞানের নবদিগন্ত উন্মোচন করা এবং
  • সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাবলির বিশ্লেষণ ও সমাধানের পন্থা নির্দেশ করা।

উপরে উল্লিখিত উপস্থাপনায় এটি প্রতীয়মান হয় যে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আগ্রহ, ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও উদ্দীপনায় মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রচেষ্টায় শিক্ষার মাধ্যমে নাগরিকদের মানবিক জীবন নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষাকে সমাজবদলের হাতিয়ার হিসেবেও নির্ধারণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ সামগ্রিক অর্থে স্বাধীনতাকে মুক্তির পর্যায়ে উন্নীত করার সুস্পষ্ট পদক্ষেপ ছিল বঙ্গবন্ধুর সুদূরপ্রসারি শিক্ষা-ভাবনায়। এ জন্যই মনে হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ১৯৭১-এর ৭ মার্চ তার ভাষণে স্বাধীনতার আগে মুক্তির কথা উচ্চারণ করেছিলেন “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” অর্থাৎ স্বাধীনতার চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে বঙ্গবন্ধু বাঙালির সামগ্রিক মুক্তিকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন।
এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়, যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলায় বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় স্বল্প সময়ের মধ্যে সংবিধান প্রণয়ন, শরণার্থী পুনর্বাসন, অর্থনৈতিক পুনর্বাসন ও দেশ গঠন, প্রশাসনিক সংস্কার, প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৭৩-৭৮), বিদ্যুৎ, রাস্তা, রেলসহ সকল অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্য খাত উন্নয়ন, কৃষি ও সমবায়, শিল্প ও বহিঃবাণিজ্য, নারী উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক অঙ্গন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, জল ও স্থলসম্পদ রক্ষায় নীতিমালা, আইনের শাসন ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন; ইত্যাদি সবক্ষেত্রে যথোপযুক্ত উদ্যোগ গ্রহণ করেন। অর্থাৎ অন্যান্য সকল বিষয়ে এর ন্যায় শিক্ষা বিস্তারে গৃহীত পদক্ষেপসমূহের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার অভাবনীয় অগ্রযাত্রা সূচিত হয়েছিল, তাই অন্নদা শঙ্কর রায়ের সাথে সুর মিলিয়ে বলতে চাইÑ
“যতদিন রবে পদ্মা, মেঘনা গৌরী যমুনা বহমান
ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।”

লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply