সুদিন ফিরছে সোনালি আঁশের

রাজিয়া সুলতানা :
সোনালি আঁশ পাট বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক-বাহক। যদিও এই শিল্পে উত্থান-পতন নিয়ে গল্পের শেষ নেই। তবে এই শিল্পের সফলতার ইতিহাস আমাদের জাতিগত নিজস্বতা প্রকাশের বিশেষত্বের পরিচায়ক। সুদূর অতীত নয়; পাটের সোনালি আঁশ এখনও সারাবিশ্বে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। বাড়ছে পাটের বহুমুখী পণ্যের বিশ্বব্যাপী চাহিদা। আর পাট এখনও বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ভারী শিল্প। দেশের অর্থনীতিতে বহু বছর ধরে পাট স্বমহিমায় উজ্জ্বল। সব মিলিয়ে ক্রমাগত বাড়ছে পাট ও পাট জাতীয় পণ্যের চাহিদা- দেশে এবং বিদেশে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এই বছর সাড়ে ৮ লাখ হেক্টর জমিতে পাটের চাষ হয়েছে। ফলন কম-বেশি ৯০ লাখ বেল (১৮২ কেজিতে এক বেল)। বিঘাপ্রতি খরচ ৬ থেকে সাড়ে ৮ হাজার টাকা। বিঘাপ্রতি ফলন ১০-১১ মণ। ৩ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করলে বিঘাপ্রতি লাভ প্রায় ২৫-৩০ হাজার টাকা। ধানের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি লাভ। আবার স্বর্ণসূত্র নামের স্বার্থকতা খুঁজে পেল পাট। ফিরে পেল হারানো ঐতিহ্য। চাষিদের মুখে ফিরে এলো হাসি। পেল স্বস্তি। এই অবস্থা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। বাংলাদেশের আবহাওয়া পাট চাষের জন্য খুবই উপযোগী। তাই তো স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার অব্যাহতি পরে প্রথম যে সেক্টরে হাত দিয়েছিলেন তা হলো পাট। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বাবার সুযোগ্য কন্যা পাটের বিভিন্ন সেক্টরে হাত দিয়ে পাটের বাজারকে আজ এ অবস্থায় এনেছেন। কয়েক বছর আগেও পাট ছিল কৃষকের গলার ফাঁসি আর পাট এখন কৃষকের ভাগ্যোন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশকে পাট চাষ করা হতো ১২ লাখ হেক্টর জমিতে। মাঝে তা কমে হয়ে গিয়েছিল ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ হেক্টর। কিন্তু উত্তরোত্তর পাটের দাম বাড়ায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৬ লাখ ৭৯ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়। এভাবে চলতে থাকলে পাটের সুদিন ফিরে আসতে আর বেশি দিন লাগবে না।
স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবুর রহমান
ভৌগোলিক কারণে আদিকাল হতেই বাংলাদেশে উন্নতমানের পাট চাষ হয়। তথাপি ব্রিটিশ আমলে পূর্ব বাংলায় প্রথম পাটকল স্থাপিত হয়নি। হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের হুগলি নদীর তীরে কলকাতার কাছে বিশড়ায়। আঘাত পেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পরও অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের উৎপাদিত পাট ও পাটজাত সামগ্রী বিদেশে রপ্তানি করে তৎকালীন পাকিস্তান প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। কিন্তু বাংলাদেশ চাতক পাখির মতোই তাকিয়ে থাকত পশ্চিম পাকিস্তানের দিকে। অতঃপর অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। পাটকলগুলোকে রাষ্ট্রীয়করণ করা হলো। পাটকলগুলোর রক্ষাকবচ হিসেবে এবং ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের জন্য কৃষক-বন্ধু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পরের বছরই ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বিজেএমসি। আওতাধীন ছিল ৭০টিরও বেশি পাটকল। তখন পাটই ছিল সরকারের আয়ের প্রধান উৎস। সরকারি কৃষি তথ্য সার্ভিসের হিসাবে স্বাধীনতার পর দেড় যুগ পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পাটের অবদানই ছিল সবচেয়ে বেশি।

স্বপ্ন পূরণের রূপকার শেখ হাসিনা
২০২০ সালের ২ জুলাই সরকারের আওতাধীন ২৫টি পাটকল বন্ধ ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। লোকসানের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য এই পদক্ষেপ নিয়েছিল স্বপ্ন পূরণের রূপকার জননেত্রী শেখ হাসিনা। কারণ ২০১০-১১ অর্থবছরে বিজেএমসি সাড়ে ১৭ কোটি টাকা লাভের পর আবার লোকসানের মুখে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘এত হতাশ হওয়ার তো কিছু নেই। আর আমি লোকসান লোকসান করব না। এমন একটি পণ্য যার কিছুই ফেলা যায় না সেটা কেন লোকসান হবে। আমরা লোকসান শুনতে চাই না। লাভজনক কীভাবে করা যায়, কীভাবে করতে হবে সেটা দেখতে হবে।’ তাই তো পাটকল বন্ধের পূর্বেই তিনি ‘সোনালি পাটের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে পাট চাষের জমির পরিমাণ বৃদ্ধি, কৃষক কর্তৃক উৎপাদিত পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং দেশ-বিদেশে পাটের বাজার সম্প্রসারণ করার জন্য নিয়েছেন নানা পদক্ষেপ। তারই ধারাবাহিকতায় একটি প্রকল্প হলো ‘উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর পাট ও পাটবীজ উৎপাদন এবং সম্প্রসারণ প্রকল্প’। বাস্তবায়ন করছে পাট অধিদপ্তর ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত। মোট পাঁচ বছর। কাজ করছে দেশের ৪টি জেলার ২৩০টি উপজেলা নিয়ে। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যমাত্রা হলো জাতীয় চাহিদা পূরণের জন্য পাট ও পাটবীজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, নিম্নমানের পাটবীজের স্থলে উফশী পাটবীজের জোগান- বিশেষ করে তোষা পাট, দিচ্ছে নির্বাচিত চাষিদের প্রশিক্ষণ। নির্দিষ্ট চাষিদের প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া হচ্ছে বীজ ও সার। দেওয়া হচ্ছে প্রযুক্তিগত সহায়তা।
বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে অর্থাৎ পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন ও পলিথিন ব্যবহার বন্ধের ওপর জোর দিয়েছে আমাদের দূরদর্শী সরকার। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পাট খাতের উন্নয়নে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পাট শিল্পের পুনরুজ্জীবন ও আধুনিকায়নের ধারা বেগবান করার লক্ষ্যে ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন-২০১০’, ‘পণ্যে পাট পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার বিধিমালা-২০১৩’, ‘পাট আইন-২০১৭’, ‘জাতীয় পাটনীতি-২০১৮’ প্রণয়ন করেছে। এসব আইন ও নীতিমালা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। আওতাধীন পণ্যগুলো হলো- হলুদ, মরিচ, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ডাল ধনিয়া, আলু, ময়দা, আটা, তোষ, খুদ ও কুরা। এছাড়া পোল্ট্রি ও ফিস ফিড মোড়কীকরণ। ফলে দেশে প্রচুর পরিমাণে পাটের চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। দেশদরদি সরকার সোনালি আঁশ খ্যাত পাটের চাহিদা বৃদ্ধির জন্য নিয়েছেন আরও পদক্ষেপ। যেমন বই বিতরণের সময় পাটের তৈরি ব্যাগের ব্যবহার বাধ্যতামূলক, দাপ্তরিক কাজেও ব্যবহার করতে হবে পাটের তৈরি পণ্য। তাছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, বাংলাদেশ রেলওয়ে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং বিএডিসির সকল কাজে পাটের তৈরি বস্তা ব্যবহারের জন্য অনুরোধ করেছেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। উদ্যোগ নিয়েছেন পাটের বহুবিদ ব্যবহারের, যেমনÑ ভেষজ হিসেবে পাট পাতার ব্যবহার, পাটের চা, পাটের ডেনিম, পাটের নানা কাপড় ছাড়াও পলিথিনের বিকল্প পাটের পলিব্যাগ উদ্ভাবনসহ আরও অনেক কিছু। আবার জনদরদি সরকার বেসরকারি পাটকলগুলোকে সহজ শর্তে ঋণ দিচ্ছে এবং সহজ শর্তে বৈদেশিক ঋণগ্রহণের মাধ্যমে বিএমআরআই প্রকল্পের আওতায় আধুনিকায়নের পরিকল্পনাও নিয়েছেন। ইতোমধ্যে প্রায় ২২টি মিল বিএমআর-করণের জন্য বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন এবং চীনের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার পাটের বহুমুখী ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে পাট চাষির উন্নতি, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথা বলেছেন। তার সরকারের আমলেই ২০১০ সালে বাংলাদেশের একদল চৌকস বিজ্ঞানী পাটের জীবনরহস্য উদ্ভাবন করেছেন। বিজ্ঞানী মোবারক আহমেদ খান পাট থেকে পলিথিন আর ঢেউটিন তৈরির রাস্তা দেখিয়েছেন। এরপর সেই পাট থেকেই দেশের গবেষকরা পথ দেখালেন জীবন বাঁচানো অ্যান্টিবায়োটিক তৈরির। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ-রসায়ন ও অনুপ্রাণ বিভাগের অধ্যাপক হাসিনা খান, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম এবং জীন প্রকৌশল ও জৈব প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আফতাব উদ্দিনের নেতৃত্বে একদল গবেষক পাট থেকে অ্যান্টিবায়োটিক তৈরির এই গবেষণায় অংশ নেন।

পাট পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির নেপথ্য
চলছে করোনা অতিমারি। বিশ্ব যেন একটু বেশি সচেতন। জোর দিচ্ছে সবুজায়নে। নজর দিচ্ছে পরিবেশ রক্ষায়। চোখ জীববৈচিত্র্যে। সর্তকতা হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোসহ, আমেরিকা ও অন্যান্য দেশও পচনহীন পলিথিন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দৃষ্টি পচনশীল পাটপণ্যের দিকে। তাই তো পাটবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল জুট স্টাডি গ্রুপের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে বছরে ৫ হাজার কোটি পিস শপিং ব্যাগেরই চাহিদা রয়েছে। বিশাল সুযোগ পাট ও পাটজাত সামগ্রী রপ্তানির। কারণ পাট উৎপাদনে ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। বিন্দুমাত্র কালক্ষেপ না করে সুযোগ সন্ধানী সরকার পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি বাড়াতে নিয়েছে নানা পদক্ষেপ। পাট উৎপাদন থেকে শুরু করে বহুমুখী পণ্যের উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রম সরাসরি সরকার পরিচালনা করছে। বেসরকারি খাতকেও রপ্তানি বাজারে সহযোগিতা করছে। পাট চাষিদের পাট আবাদে উদ্বুদ্ধ করতে পাটের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ, পাট ক্রয়-বিক্রয় সহজীকরণের জন্য এসএমএসভিত্তিক পাট ক্রয়-বিক্রয় ব্যবস্থাকরণ, কাঁচা পাট ও বহুমুখী পাটজাত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি করা হচ্ছে। তাই তো বাংলার কৃষককূল আবার পাট চাষের দিকে ঝুঁকছে।

পরিবেশবান্ধব ফসল
পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। যেখানে কখনও বৃষ্টি হতো না সেখানে হচ্ছে অঝরে বৃষ্টি। যেখানে তাপমাত্রা থাকত মাইনাসে সেখানে গরমে মানুষ মারা যাচ্ছে। আবার কোথাও হচ্ছে দাবদাহ। অর্থাৎ বিরূপ পরিবেশ। সময় এখন পরিবেশ রক্ষার। সোনালি আঁশ খ্যাত পাট পরিবেশবান্ধব। ড. রহমান তার এক গবেষণায় দেখেছেন, প্রতি হেক্টর পাট গাছ তার জীবনচক্রে ৬ দশমিক ৫ টনের কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস বাতাস থেকে শোষণ করে এবং সমপরিমাণ অক্সিজেন গ্যাস ছেড়ে দেয়। পাট গাছের পাতা মাটিতে পড়ে ও পচে জৈবসারে পরিণত হয়। হেক্টরপ্রতি প্রায় ৮ টন জৈবসারের জোগান দেয়। পাট তুলনামূলকভাবে লম্বা মূলের ফসল। তাই তো মাটির গভীর থেকে খাবার সংগ্রহ করে। ফলে মাটির উপরিভাগের খাবার পরবর্তী ফসলের জন্য সংরক্ষিত থাকে। তাছাড়া পাটের তৈরি দ্রব্য মাটির সঙ্গে মিশে পচে জৈব পদার্থে পরিণত হয়। তাই তো বর্তমান প্রেক্ষাপটে পাটের ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই।

পাটের বহুমুখীকরণ ও বিশ্বায়ন
স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে হুমকি হওয়ায় কৃত্রিম তন্তুর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে বিশ্ব। ইতোমধ্যে টয়োটা, মিটসুবিসি ও জিএম মোটর্স-সহ মোটর গাড়ি কোম্পানিগুলো গাড়িতে পাটের আঁশ ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গাড়ি প্রতি পাটের আঁশ লাগবে ২০ কেজি। কৃষ্টি ও ঐতিহ্যগতভাবে পাট দিয়ে সুতা, দড়ি, বস্তা, প্যাকিং সরঞ্জাম, ব্যাগ বা থলে, হাতে বাছাই করা আঁশ, পাটজাত কাপড়, কার্পেট তৈরি হয়। তাছাড়া তৈরি হচ্ছে টব, খেলনা, জুট ডেনিম, জুয়েলারি, ম্যাটস, নারী-পুরুষের জুতা স্যান্ডেল, বাস্কেট, পাটের শাড়ি, পাঞ্জাবি ও গৃহস্থালি নানা সরঞ্জাম। পাট খড়ি দিয়ে ঘরের বেড়া, ছাউনি দেয়া হয়। জ্বালানি হিসেবে খড়ির ব্যবহার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। বাঁশ এবং কাঠের বিকল্প হিসেবে পার্টিকেল বোর্ড, কাগজের ম- ও কাগজ তৈরিতেও পাটখড়ি ব্যবহৃত হয়। সম্প্রতি পাট থেকে জুট পলিমার তৈরির পদ্ধতি আবিষ্কার করেন ড. মোবারক আহমেদ খান যা ‘সোনালি ব্যাগ’ নামে পরিচিত। বাংলাদেশের অনেক এলাকায় পাটের কচি পাতাকে শাক হিসেবে রান্না করে খাওয়া হয়। পাটের আঁশের বহুমুখী ব্যবহারের মধ্যে রয়েছে প্রসাধনী, ওষুধ, রং ইত্যাদি।

রপ্তানিমুখী লাভজনক পণ্য
পাট রপ্তানিতে বিশ্বে ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। অন্যভাবে বলতে গেলে ভারত বাংলাদেশ হতে পাট ক্রয় করে সেই পাট ও পাটজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, এক যুগের রেকর্ড ভেঙে ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি করে ১১৬.১৪ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা, যা টাকার অংকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। যদিও ২০২০ সালের ১ জুলাই থেকে সরকারের আওতাধীন পাটকল বন্ধ রয়েছে। অবাক হওয়ারই কথা, কারণ আগের বছরের তুলনায় গত বছর পাটজাত পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ৩১ শতাংশ। বিগত বছরের তুলনায় ২০২০-২১ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৩১ শতাংশ। যদিও তা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ০.৪৭ শতাংশ কম। ২০১৮ সালের পর এবারই পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে ১ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় হয়েছে। গত অর্থবছর অর্থাৎ ২০১৯-২০ অর্থবছরেই বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে চামড়াকে ছাড়িয়ে দ্বিতীয় স্থান দখল করে নিয়েছে পাট খাত। করোনা সংকটকালীন নিষ্প্রভ অর্থনীতির বড় হাতিয়ার এখন পাট শিল্প। বাংলাদেশ হতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাট রপ্তানি হয়। পাটজাত দ্রব্য প্রধানত আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশগুলোতে রপ্তানি হচ্ছে। আফ্রিকান দেশগুলো বস্তা ও পাটজাত দড়ি বেশি রপ্তানি হয়। পাটের আঁশের পাশাপাশি পাটখড়িরও একটি বড় বাজার তৈরি হয়েছে। এসব পণ্য দিয়ে পার্টিকেল বোর্ড, কম্পোজিট, সেলুলয়েডে ব্যবহার হয়। এখন সেই সঙ্গে পাটের তৈরি বৈচিত্র্যময় পণ্যের রপ্তানিও বেড়েছে।
বাংলাদেশের কৃষক তথা আপামর জনসাধারণ খুবই খুশি ক্ষেত্রবিশেষে কাঁচা পাট ৩-৪ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হওয়ায়। এর মূল কারণ চাহিদা বৃদ্ধি না হয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের দ্বারা কাঁচা পাটের কৃত্রিম সংকটও হতে পারে। বিষয়টি নজরে এসেছে সরকারের। তাই তো পাইকারী বাজারে পাঠানো হয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। কারণ সরকারকে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের স্বার্থই দেখতে হবে। অতিরিক্ত বেশি দামে কাঁচা পাট ক্রয় করলে বেসরকারি পাটকলগুলো লোকসানের মুখে পড়ে যাবে। অন্যদিকে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৭৫ লাখ বেল পাট উৎপাদন হয়। চলতি বছর করোনা, আম্পান ও বন্যার কারণে ৫৫ লাখ বেল পাট উৎপাদন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশে অভ্যন্তরীণ কারখানাগুলোয় এবং গৃহস্থালিতে ব্যবহারের জন্য কাঁচা পাটের মোট চাহিদা ৬৫ লাখ বেল। কাঁচা পাট রপ্তানি দ্রুতগতিতে বেড়ে চলছে। বিষয়টি আমলে নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। পরবর্তীতে চাহিদার সাথে সংগতি রেখে পাট আবাদের জমির পরিমাণ বাড়াতে হবে। তাছাড়া লবণাক্ততা সহনশীল জাতের পাট সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় চাষ করতে পারলে পাটের উৎপাদন অনেকগুণ বেড়ে যাবে। সরকার এ বিষয়টি নিয়ে খুব তোড়জোড়ে কাজ করছে।
অবশেষে পাট গবেষকবৃন্দ ড. মো. মুজিবুর রহমান, ড. মো. শাহজাহান, জাহিদ আল রফিক ও মমতাজ উদ্দিন আহমদের সাথে অভিন্ন সুরে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলতে চাই যে, ‘এমন একটি সময় ছিল যখন উৎপাদন ও ব্যবসায় আর্থিক লাভসহ পাট সামাজিক মর্যাদার ধারক ও বাহক হিসেবে কাজ করত। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধেও পাটের একটি বিশেষ ভূমিকা ছিল। বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক তন্তু তথা পাটের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আবারও পাটের সেই সুদিন ফিরে আসতে যাচ্ছে।’
পাট চাষ করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। বিশ্বসেরা পাট বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়, সেহেতু সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশের পাট নিয়ে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। পাট শিল্প বাংলাদেশের এক অন্যতম প্রাচীন উৎপাদন ক্ষেত্র। দেশের লাখ লাখ মানুষ পাট উৎপাদন ও শিল্পের সঙ্গে নানাভাবে জড়িয়ে আছে। তাই দিন দিন সোনালি আঁশের সুদিন ফিরে আসার সম্ভাবনা উজ্জ্বলতর হচ্ছে।

লেখক : শিক্ষক; পিএইচডি গবেষক, প্ল্যান্ট প্যাথলজি
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরে বাংলা নগর, ঢাকা
raziasultana.sau52@gmail.com

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply