অলৌকিক ত্রিচক্রযান

Posted on by 0 comment

PMfঝর্ণা রহমান: তক্ষুনি একটা তক্ষক…
স্টেজে উঠে আমি কতক্ষণ বিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকি।
আমার মুখের সামনে রস্ট্রামে মাইক্রোফোন ঠিকঠাক করে দিয়েছে পিওন ইলিয়াস। অডিটোরিয়ামে উপস্থিত দর্শক শ্রোতার সংখ্যা ছাত্র-শিক্ষক মিলিয়ে দেড়শ থেকে বড়জোর দুশ হবে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষিকাই আছেন আড়াইশর মতো। ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় সাত হাজার।
আমি ইলিয়াসকে বলি, দেখো, বাইরে ছেলেমেয়েরা ঘোরাঘুরি করছে কি না, সবাইকে অডিটোরিয়ামে আসতে বলো। ইলিয়াস বকের মতো গলা উঁচু করে জানালা দিয়ে মাঠে চোখ ঘুরিয়ে আনে, বলে, ‘ম্যাডাম, ইস্টুডেন্ট স্যার ম্যাডাম কেউই আর নিচে নাই। য্যারা আইছে হ্যারা সবাই এইহানে আছে। বন্ধের দিন তো, কেউ আর কলেজে আইতে চায় না। বন্ধ তো বন্ধই। কলেজে আসতে হইলে তা আর ছুটি হইলো কেমনে তাই না ম্যাডাম?’
আমার যে কী হলো, আমি ইলিয়াসকে, যার টেকো মাথার তলায় ক্ষুদে ক্ষুদে ধূর্ত দুটি চোখে কুটকুটে আলো, নিকোটিনের কষে শুঁটকি মাছের মতো কালো হয়ে যাওয়া আমচুর-ঠোঁটে ছাঁৎলা পড়া এক ফালি হাসি, দাঁত খিঁচিয়ে বলি, ‘আচ্ছা, আজকের সরকারি ছুটিটা কী জন্য বলো তো!’
ইলিয়াস একটু ভড়কে যায়। আমার প্রশ্নের উত্তর দেবার আগে মঞ্চে ব্যাকড্রপের লেখাটা দেখার জন্য একটু ঘাড় ঘোরায়Ñ ‘ওই যে ম্যাডাম, আঙ্গুল উঁচাইয়া আছে, ওই বঙ্গবন্দুর জন্য। আজ তো জাতীয় শোক দিবস!’
ইলিয়াসের আঞ্চলিকতার জন্য শোক কথাটার উচ্চারণ হয় ‘শুক’ দিবস আর তা আমার কানে শোনায় ‘সুখ দিবস’। আমি আবার মূঢ়ের মতো ক্ষিপ্ত হয়ে বলি, ‘কী বললে স্টুপিড? সুখ দিবস?’
Ñ শ্যাখ হাচিনা তার বাবার জন্য আইজ সরকারি ছুটি…
ক্লারিফিকেশন দিতে যায় ইলিয়াস।
ঠিক তক্ষুনি একটা তক্ষকের মতো পুরনো কোনো গাছের কোটর থেকে আমার সামনে যেন পিছলে পড়ে বায়োলজির প্রভাষক নূরুল আমিন। ইলিয়াসের নাকের ডগায় নূরুল আমিন থাবা হানে।
Ñ ধেৎ গাড়ল, শুদ্ধু কইরা কথা বল গাধা। সুখ দিবস না শোক দিবস। এমনেই আমার এক কথায় ম্যাডামের মেজাজ গরম অইয়া আছে। ছরি ম্যাডাম, ছরি, আপা। ইলিয়াসের সুখ দিবস আর আমার গুল্লি দিবস এইসব কথা ভুইলা যান। আসলে গায়ের থেইকা এখনও ইন্ভার্সিটির গন্ধ যায় নাই তো, রক্ত গরম, তাই মাঝে মইধ্যে দুই একটা আউল ফাউল কথা বাইর অইয়া যায়, মানে বের হয়ে যায়। আপা, আপনি তো আবার অশুদ্ধ ভাষায় কথা শুনতে পারেন না, তবে ম্যাডাম, আমার মতে এডাই হইল গিয়া শুদ্দু ভাষা, মানে যেডা গণমানুষের ভাষা, আপনের অই বইয়ের ভাষায় কথা কইব, হইল গিয়া ইন্দুর আর বইপোকা মানে বুকওয়র্ম। মানে য্যারা বই খায়, বইয়ের ল্যাখা খায়। অই বঙ্গবন্দুতেও কিন্তু এই গণমানুষের ভাষাতেই কইতো, সাত কোটি মানুষরে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আর এখন কিন্তুক ম্যাডাম, ছরি আপা, সাত দুগুনে চৌদ্দ প্লাস দুই, ষোল্ল কোটি মানুষÑ তাগোও দাবায়ে রাখা যাবে না। তাদের ভাষা তাদের চাহিদা নিয়াই কিন্তুক আপনাদের চলতে হবে বুঝলেন তো ম্যাডাম। সরি, আপা, আবার আপনারে রাগায়া দিতাসি মনে হয়…।
নূরুল আমিন ফিঁচেল হাসিমাখা মুখে কথাগুলো বলতে থাকে।
মাইক্রোফোনটা স্ট্যান্ড থেকে খুলে হাতে নিয়ে ডাংগুলির ঘুঁটির মতো আঙ্গুলের প্যাঁচে খেলিয়ে একটা ডিগবাজি লুফে নেয়। মুখের সামনে যন্ত্রটা নিয়ে কী একটু পরখ করে। সে কি এখন মাইকে তার এসব ‘আউল ফাউল’ কথা বলা শুরু করবে? আমি দাঁড়িয়ে আছি ডায়াসের সামনে। আমাকে শুরু করতে হবে আজকের অনুষ্ঠান। আমার সামনে ছিল মাইক। এখন সেটা ছিনতাই হয়ে গেল নূরুল আমিনের হাতে!
নূরুল আমিন মাউথপিসটাতে প্রচ- একটা ফুঁ দেয়। থুতু ছিটানো একটা ঝোড়ো বাতাস যেন সারা অডিটোরিয়ামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। স্ট্যান্ডে আবার মাইকটি সেট করে দিয়ে সে আবার আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে আসে।
Ñ মাইক ও-কে। নেন ম্যাডাম।
ওর মুখ থেকে কাঁচা পেঁয়াজের গন্ধ বের হচ্ছে। সকালে কী খেয়ে এসেছে কে জানে!
Ñ শুরু করেন ম্যাডাম। অডিয়েন্স বাড়ার আর কোনো আশা নাই। আপনের আশার গুড়েবালি আপা। স্যার-ম্যাডামরা সবাই বাসায় নাকে ত্যাল দিয়া ঘুমাইতেছে নয়তো জি-বাংলায় সিরিয়াল দেখতাসে। আমরা কয়েকজন সিনসিয়ার মানুষই কেবল হাজির। আর পোলাপানে তো এইসব ইতিহাস শুনতে চায় না। তারা ফেসবুক টুইটার হোয়াটস অ্যাপ ভাইবার লইয়া বইসা আছে, নয়তো গুগুলে ইন্দুর চালান দিতাসে, মানে কম্পুটারে মাউস গুতাগুতি করতাসে। আজকালকার পোলাপান হইল বদের বদ, আসল বান্দরের স্পেসিস। এগুলারে কেমনে কী শিক্ষা দিবেন আপনে। আপনে তো ব্লগ ফেসবুক এইসব দ্যাখেন না। কি যে হাবিজাবি পোস্ট দেয়। কী সব ইনফো আর ছবি! যাক ওইসব না দেখাই ভালো। আপনের মাথা গরম হইয়া যাইবো।
নূরুল আমিনের খয়েরি চোখের ভেতরে দুটো বাতিশলা ইঁদুর কুটকুট করে ঘরের বেড়া কাটে। আবার পেঁয়াজের গন্ধ।
Ñ ম্যাডাম-আপা, ঘোষণা শুরু করেন, জনক কলাম রাইগা যাইতাসে। আর ম্যাডাম বলায় আপনি রাইগেন না। সব ম্যাডামরে ম্যাডাম বলি তো শুদু আপনেরে আপা বলতে গিয়া তাই আমার ভুল হইয়া যায়।
আশ্চর্য! আমার রাগ কোথায় গেল। আমি কি রূপকথার গল্পের মতো দুষ্ট জাদুর প্রভাবে পাথরে পরিণত হয়েছি! আমার প্রথম দায়িত্ব তো বেয়াদব-বেল্লিক বাচাল নূরুল আমিনের তামাটে দুই গালে প্রচ- থাবায় দুটি চড় বসিয়ে দেওয়া, তারপর ওর গোময়লিপ্ত মগজটিকে বত্রিশ নম্বরের সিঁড়িধোয়া পানি দিয়ে পরিশুদ্ধ করা। সেটা কীভাবে করব আমি! আমি স্থাণুদেহে চড়চড় করে মোচড় তুলি। পেছনে, ব্যাকড্রপে, আমার দৃষ্টিজুড়ে জনকের অগ্নিভ মুখ। বল্লমের মতো একটি উত্তোলিত হাত।
ব্যাকড্রপের ডিজাইনে রক্তস্নাত বাংলাদেশের মানচিত্রের রেখার ভেতরে আরও কতগুলো জ্বলন্ত রেখায় জমাট বেঁধে ওঠা মুখটি থেকে কি একটা আগুনের চাবুক হিসসস করে ওঠে! কম্পাসের বিশাল কাঁটার মতো নিশানা করা হাতের আঙ্গুল থেকে ছড়িয়ে পড়ে বৈদ্যুতিক কম্পন! আর যদি একটা গুলি চলে…
গুলি চলছে! গুলি চলছেই! কে কাকে হত্যা করছে এখন?
এখন কি আবার আয়ুব-ভুট্টো-ইয়াহিয়ার বন্দুক তাক করা হয়েছে এদেশের মানুষের ওপরে?
ছাত্রের ওপরে? জনতার ওপরে? ব্যারাকের বাঙালি সৈনিকের ওপরে?
গুলি ছুটছে? ছুটে যাচ্ছে অজস্র জ্বলন্ত আগ্নেয় শিলা?
আমি শুনতে পাই একাত্তুরের সাতই মার্চে রমনার ময়দান থেকে ইথারে ছড়িয়ে পড়া সেই অমোঘ বজ্রকণ্ঠÑ আর যদি একটা গুলি চলে… আর যদি আমার লোকদেরকে হত্যা করা হয়…।
তারপরেও ওরা গুলি চালিয়েছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষের ওপর। নারী শিশু বৃদ্ধের ওপর।
আর নয় মাসের যুদ্ধ শেষে ওই রমনার ময়দানেই ওদের গুলিভরা বন্দুকগুলো সমর্পণ করতে হয়েছিল।
কিন্তু তারপর? তারপর সেই অস্ত্রগুলোর কী হলো? হাতবদল হলো! আরও হাত! কালো বাদামি খয়েরি লোমশ হাতের থাবায় থাবায় বন্দুক। গুলি চলছে! আবার নূর-ডালিম-রশীদ-ফারুক-মোসলেমদের হাতের আগ্নেয়াস্ত্র ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে বাংলার মানচিত্র? বত্রিশের সিঁড়িতে গড়িয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর শুদ্ধতম গাঢ়তম লাল রক্ত! ঘাতকের গুলিতে উড়ে যাচ্ছে স্ত্রী পুত্র পরিজনের মাথার মগজ। কারাগারের তালাবদ্ধ কক্ষে বন্দী নেতাদের বক্ষ ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে কালো দানবের হাত। সেসব ইতিহাস লোমশ কম্বলের তলায় কেউ চাপা দিয়ে রাখছে। আবার তাতে কেরোসিন ঢেলে বহ্নি-উৎসব করার করতাল তালে উদ্বাহু নৃত্য করছে প্রেতের দল।
চলছে ইতিহাসে গুলি, সংবিধানে গুলি, ভাষা আর সংস্কৃতিতে গুলি, রাষ্ট্রতন্ত্রে গুলি।
গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে পাঠ্যপুস্তক, মেধাবী ছাত্র, বিদ্যাপীঠ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর স্মৃতিসৌধ…।
আমি লক্ষ করি মাইক্রোফোন বাহিত হয়ে আমার কথাগুলো অডিটোরিয়ামের পিলারে ধাক্কা খেয়ে মেঝেতে পড়ে কাতরাতে থাকে। দু-একজন ছাড়া কেউ আমার কথা শুনছে না। সবাই নিজেদের মধ্যে কথা বলছে।
এ প্রতিষ্ঠানের অডিটোরিয়ামটি নির্মাণের পরে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সাউন্ডপ্রুফ করার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত আর তা হয়নি। বাইরে তখন চারপাশে অন্তত চার দুগুনে আট জায়গা থেকে আকাশ ফাটানো তীব্রতায় মাইকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আর কোরআন তেলাওয়াত বাজানো হচ্ছে। আগে এ দিনটাতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান বাজানো হতো। এখন ‘সময়ের দাবি’ মেনে নিয়ে গভর্নমেন্ট তার পলিসিতে নানারকম ব্যালেন্স আনছে। মৃত্যু দিবসে মৃতের আত্মার মাগফিরাত কামনা তো আর গানবাজনা দিয়ে হয় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শোক দিবস উদযাপনের সরকারি প্রজ্ঞাপনে তাই আছে রচনা আলোচনা ইত্যাদির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে হামদ না’ত ক্বিরাত প্রতিযোগিতা আর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় দোয়া মাহফিল করার নির্দেশ। আমার মনে হচ্ছে, টুঙ্গিপাড়ার মৃত্তিকা গহ্বর থেকে ঝাঁঝরা বুকের ফোকরগুলো দুহাতে চেপে ধরে ওই মানুষটিকেই উঠে আসতে হবে তার মৃত্যু দিবসটিকে একটু শান্তিময় করে তোলার জন্য।
প্রচ- শব্দের তাড়নার মধ্যে আমার কথাগুলো সহকর্মীদের গল্পগাছা আর ছাত্র-ছাত্রীদের চেঁচামেচির ভেতরে পড়ে এখন জল বিনে মাছের মতো তড়পাতে শুরু করে।

গোলাঘরের ইঁদুরগুলো…
আর যদি একটা গুলি চলে… আর যদি আমার লোকদেরকে হত্যা করা হয়…
গুলি চলছে। একটু আগে নূরুল আমিন গুলিতে ফুটো করে দিয়ে গেছে জনকের শোক। তাকে আমি খুনি বলি। ঘাতক। সে দর্শকের আসনে বসে পাশের সঙ্গীর সাথে আমাকে মঞ্চের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে কিছু বলে। কথা বলে। হাসে। পা নাচায়। গালপাট্টা দাড়ি ঘচঘচ করে চুলকায়।
নূরুল আমিনের সহচর আমজাদ হোসেন। প্রায় একই বয়সী। ইসলামের ইতিহাসের শিক্ষক। ‘নন্দিত জীবন নিন্দিত মরণ’ নামে সে একটি বই লিখছে। কদিন আগে আমজাদ তার পা-ুলিপি এনে আমাকে দিয়ে অনুরোধ করল একটু শুভেচ্ছা বাণী লিখে দিতে। আমি সেই বই পড়তে গিয়ে দেখি নন্দিতজনের তালিকায় আছেন সক্রেটিস পিথাগোরাস এডলফ হিটলার ইমাম হাসান ইমাম হোসেন আবু হানিফা মনসুর হাল্লাজ।
হিটলার? নন্দিতজন?
আমজাদ মাথা ঝাঁকায়। অফ কোর্স। নাৎসী নেতা হিসেবে সে হয়তো সমালোচনার পাত্র। কিন্তু তার দেশে তো তিনি বীর। দিকবিজয়ের কী তীব্র বাসনা! এই বাসনা তাকে আমৃত্যু ছুটিয়ে মেরেছে। পরাজয় তাকে ছুঁতে পারেনি। এমন কি মৃত্যুও তার কাছে হার মেনেছে। তাকে কিন্তু এভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।
Ñ জার্মানির হিটলার গ্রিসের সক্রেটিস ইরানের হাল্লাজ আরবের হাসান হোসেন… কিন্তু বাংলাদেশের…
আমজাদ আমাকে কথা শেষ করতে দেয় না। মোরগের মতো মাথা ঝাঁকায়।
Ñ ইরানের মরমী সাধককবি মনসুর হাল্লাজের কথা ধরেন। কী অদ্ভুত আধ্যাত্মিক শক্তির একজন মানুষ! যে কি না নিজের কলবের ভেতর আল্লাহকে উপলব্ধি করে বলেন আনাল হক, আমিই খোদা, আমাতেই আল্লাহ! সেই সক্রেটিসের মতো Ñ নো দাইসেলফ। আর খলিফার আদেশে তাই তার হাত পা জিভ গলা টুকরো টুকরো করে কাটা হয়। কনুই-কাটা হাত দিয়ে নিজের রক্তে নিজে অজু করে নামাজ পড়তে পারে যে মানুষ তিনি কি সাধারণ মানুষ বলেন, হাল্লাজকে নিয়ে তার দর্শন আর কবিতা নিয়ে আমাদের অনেক চর্চা হওয়া দরকার।
জ্ঞানীগুণী মহান সব মানুষকে নিয়েই চর্চা হওয়া দরকার। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান? তাকে নিয়ে চর্চা হবে না? শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ পুরুষ, নন্দিত যে মানুষটির সমগ্র জীবন উৎসর্গিত ছিল দেশের মানুষের জন্য, যার করুণতম মৃত্যু গ্রিক ট্র্যাজেডিকেও হার মানায়Ñ তাকে ছাড়া এ তালিকার মূল্য কী। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা, মহাত্মা গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধী?  স্বদেশের, প্রতিবেশী দেশের এসব নন্দিতজনদের ট্র্যাজিক মৃত্যু আমজাদের কাছে নগণ্য বলে মনে হলো!
আমি পা-ুলিপিটি গোল করে মুড়িয়ে ফেলি। এ পা-ুলিপির জন্য আমার কোনো শুভেচ্ছা বাণী নেই। এটি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে করা। ‘নিন্দিত বাণী’ লিখে দিতে পারি।
আমজাদ চোখের ভেতর থেকেও সেদিন ইঁদুরের সুড়ঙ্গ বেরিয়ে এসেছিল। নাক ফুলিয়ে কথা বলেছিল আমজাদÑ
Ñ প্রতিবেশী দেশ হলে কী হবে। ওরা আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। কলকাতায় আমার পরিচিত এক কবি আছেন। আমাকে বলেছিলেন, তোমাদের দেশটা আমরা দখল করে নেব। তাহলে আর ভিসাটিসার ঝামেলা থাকবে না। আসলে একাত্তুরেই ওদের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে দেশ। তা নইলে এই দু হাজার চৌদ্দতে এসে হাসিনা ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারত না। তবে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু অবশ্যই ট্র্যাজিক। কিন্তু অনেকের কাছেই তিনি বিতর্কিত এটা মানতে হবে। তাই… তাছাড়া, হাসান হোসেন হানিফা হাল্লাজ এদের কথা তো আজকের প্রজন্ম তেমন করে জানে না। এদের ট্র্যাজেডিও গ্রিক ট্র্যাজেডির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
আমজাদ কি এদেশের নাগরিক?
তার পূর্বপুরুষ কি এদেশের জল হাওয়া মাটি শস্য নিয়ে জীবনযাপন করেছে?
বাংলা কি আমজাদের জিভের সচলতায় প্রতি মুহূর্তে ধ্বনিত?
যে জন বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সে জন কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।
আমজাদ কি কখনও এ লাইনগুলো শুনেছে?
চরম ক্রোধে নন্দিত জীবনের পা-ুলিপি আমি সিঁড়ির নিচে ছুড়ে দিয়েছিলাম। তাতে করে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল আমজাদ। শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মহানায়ক সম্পর্কে ওর মুখ থেকে বিকৃত ইতিহাস আর জঘন্য বানোয়াট মিথ্যা কাহিনি ছাগলের পায়ুপথের মলগুটির মতো ছররা গুলি ছুড়তে থাকে।

আগুনরঙা একটি শাটিন ব্যান্ড…
নূরুল আমিনকে আমজাদের সাথে তুমুল বেগে গল্প করতে দেখি আমি।
নূরুল আমিন কি সাড়ম্বড়ে আজ সকালে আমার সাথে তার বচসার কাহিনি আমজাদকে শোনাচ্ছে! আমার দিকে বারবার তার সতর্ক দৃষ্টিনিক্ষেপে সে-কথা বুঝতে মোটেও অসুবিধা হয় না।
জাতীয় শোক দিবস উদযাপন উপলক্ষে আজ সকাল আটটায় ছাত্র-শিক্ষক সবার কলেজে আসার নোটিস ছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৫ আগস্ট যথাযথ মর্যাদায় উদযাপনের জন্য সরকারি নির্দেশ আছে। কলেজের সাংস্কৃতিক বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে আমার ওপর দায়িত্ব বর্তায় এসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করার। সকালে ব্যস্ততার এক ফাঁকে মাঠের মাঝখানে আমার মুখোমুখি নূরুল আমিন।
মাথার  চুলে পা-ব ভঙ্গিতে হাতের থাবা ঘষতে ঘষতে আমাকে বলে, ‘কী ম্যাডাম-আপা, আপনার গুল্লি দিবসের আয়োজন কতদূর? জলদি-জলদি আমাগোরে ছাইরা দেন। ছুটিডারে মাডার কইরেন না। বাসায় যাইয়া খিচুরি গরুর মাংস খাইয়া ঘুম দিমু।’
Ñ গুল্লি দিবস মানে?
নূরুল আমিন হাতের পাঞ্জা দিয়ে দানবের মতো খাবলে ধরে নিজের মাথার চুলÑ ‘গুল্লি দিবস না? আইজকার দিনে তো বঙ্গবন্দুরে গুল্লি কইরাই মারছিল। তার বউপোলাপান আ-াবাচ্চা সবার জন্য গুল্লি! তাই গুল্লি দিবস। হে হে হে…।’
Ñ আপনি এ নিয়ে মজা করছেন? রসিকতা?
Ñ কী করমু? জনগণের নেতা, হে গুল্লি খাইয়া মইরা গিয়া জনগণের জন্য একটা ছুটির দিনের ব্যবস্থা কইরা গেল। আর আপনেরা সেই ছুটি আমগোরে ভোগ করতে দেন না। নিয়া আইলেন কলেজে।
Ñ আমি নিয়ে আসব কেন, এটি সবারই নৈতিক দায়িত্ব…
Ñ আরে রাখেন আপনের নৈতিক দায়িত্ব। নৈতিক দায়িত্বের মানে জানে কেউ? যে দ্যাশে পরধান মন্ত্রী থেইকা শুরু কইরা মন্ত্রীমিনিস্টার কারও নীতি বইলাই কোনো জিনিস নাই, সেখানে আর নৈতিক দায়িত্বের সুরা পইড়েন না তো আপা! জানেন, আসার সময়ে দেখলাম আমাগো গলির ভিতর থাইকা একটা ক্যাচড়া পোলাপানের মিছিল বাইরাইতাসে। গুল্লি দিবস গুল্লি দিবস জিন্দাবাদ বইলা হেরা সোলোগান দিতাসে। ম্যাডাম দেখেন, আমাগো ছাত্রমাত্র কিন্তু বেশি আসে নাই। তারা আবার তাদের গলিতে গুল্লি দিবস করতে গেল কি না…
নূরুল আমিন আবার দুষ্টু ছাত্রের আদলে একটি সারল্যমার্কা চতুর হাসি হাসে।
আমি স্থানকাল ভুলে একটা চিৎকার দিয়ে উঠেছিলাম। আপনি একটা রাজাকার। একাত্তরের চেয়েও জঘন্য রাজাকার। আপনার ফাঁসি হওয়া দরকার। আপনি আমার সামনে থেকে যান।
চাপাকণ্ঠে নূরুল আমিনও গর্জে উঠেছিলÑ
Ñ কীসের রাজাকার? কে রাজাকার? তাইলে আপনেরা আরও বড় রাজাকার। আপনাদের মতো ভক্তিমানেরা পঁচাত্তরে সেই গুল্লি মারার দিন সবাই যাইয়া গর্তে সান্দাইছিলেন। কেউ তো একটা পরতিবাদ করেন নাই। আপনেগো ভক্তি খালি গালভরা বক্তৃতায়।
আমার চেয়ে পঁচিশ বছরের জুনিয়ার নূরুল আমিন চূড়ান্ত গোঁয়ারের মতো আমার মুখের সামনে আঙ্গুল নাড়িয়ে কথা বলে। ক্লেদাক্ত সরীসৃপের মতো তার আঙ্গুল আমার নাকেমুখে কিলবিল করে বেয়ে উঠতে থাকে। আমার ক্রোধ জমাট বেঁধে কেলাসিত হয়। আমি স্থির চোখে তাকাই নূরুল আমিনের দিকে। তার ধূর্ত ইঁদুর চোখজোড়া লক্ষ করে ঠা-া গলায় বলি, ‘এই মুহূর্তে একটা পিস্তল আমার হাতে থাকলে একটা গুলি আপনার কপালে ফুটিয়ে দিয়ে আমি আর একটা গুল্লি দিবস বানাতাম।’
আমার কথা শুনে নূরুল আমিন মহাকৌতুকে বত্রিশ দাঁত বের করে ‘ওরে বাবা, খাইছে আমারে’ বলে দৌড়ে পালায়।
আমার মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে।
কপাল টনটন করে ওঠে।
রাজাকারের ফাঁসি চাই।
উত্তাল শাহবাগ-এর আগুনরঙা একটি শাটিন ব্যান্ড আমার মাথায় আগুনপটি। নব্য রাজাকারদের ফাঁসি চাই।
কেউ এসে আমাকে হ্যাঁচকা টান মেরে মাইকের সামনে থেকে সরিয়ে নেয়। এসব কী বলছেন? আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে! এটা কি রমনা না শাহবাগ? কী আবোল-তাবোল বলছেন?

খচমচে প্রেসক্রিপশন…
আমাদের কলেজের ডাক্তার খবিরুল হাসান আমার প্রেশার চেক করেছেন। পাল্স দেখেছেন। দ্রুত চলছে নাড়ি। স্নায়বিক উত্তেজনা, হতেই পারে। এ বয়সে এটা স্বাভাবিক।
Ñ আপা, শুনেন, ব্যক্তিভেদে রাজনৈতিক মতদ্বৈধতা থাকতেই পারে। তবে আপনাকে অনেক ধীরস্থির মাথার মানুষ বলেই জানতাম। আজকে এমন হয়ে গেল কেন…
ভাইস প্রিন্সিপাল টেবিলের কাচে পেপারওয়েটটি উল্টো করে চার আঙ্গুলের কারিশমায় লাটিমের মতো ঘোরাতে ঘোরাতে কথা বলেন।
Ñ ডাক্তার সাহেব, আপাকে ভালো একটা প্রেসক্রিপশান দেন। রিলাক্সিন জাতীয় কিছু। নার্ভাস স্ট্রং করে এমন কিছু। শুনেন আপা, কিছু কিছু জিনিস আছে যেসব নিয়ে বেশি মাতামাতি করতে নেই। জানেন তো কড়া পাকে দড়ি ছেঁড়ে। আমাদের কাজ ছাত্র পড়ানো। বইপুস্তকে যা আছে ক্লাসে তা পড়িয়ে দেবেন। বছর শেষে পরীক্ষাটা যাতে ভালো দেয়। বাপ-মা কিন্তু তার ছেলেমেয়ের ভালো রেজাল্টটাই চায়। কাজেই সব কিছুতে সিলেবাসের পড়াটুকু জানলেই এনাফ…
প্রেসক্রিপশান লেখা হয়ে যায়। আমার চক্ষু কর্ণ নাসিকা জিহ্বা ত্বক, আমার শাড়ির ভাঁজ, খোঁপার ফাঁস, ব্যাগের পকেটÑ সব কিছু প্রেসক্রিপশানে ভরে উঠতে থাকে।

একটি লেবুর ভ্যান…
রাস্তায় নেমে আমি উল্টোদিকের ফুটপাতের ধূলিধূসরিত কাঠচাঁপা গাছটির তলায় একজন বৃদ্ধ চালকসহ একটিমাত্র রিকশা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। রিকশাচালক কী কারণে যেন আমাকে বিনা দরদামেই তার বাহনে তুলে নেন। হয়তো আমার ক্লান্ত বিধ্বস্ত চেহারা তাকে আমার প্রতি মায়ার্ত করে তুলেছিল। আমারও বুড়ো মানুষটির প্রতি এক ধরনের সহানুভূতি জেগে ওঠে। যা ভাড়া চাইবে দিয়ে দেব। ব্যাগ খুলে আমি খুচরো টাকার পরিমাণটা দেখে নিই।
আমার ব্যাগের পকেটে, প্রতিটি চেম্বারে, মগজের কোষে, কানের ফুটোয় প্রেক্রিপশান খচমচ করতে থাকে।
রিকশা চলতে থাকে। চলুক।
আচমকা একটা বন্য সুবাস। তাজা লেবুর গন্ধের একটা ঝাপটা। গন্ধটা আমাকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরল, মনে হলো আমার শরীরই একটা আস্ত লেবুগাছের মতো ডালপালা মেলে দিয়েছে। এতক্ষণ যে বাওকুমটা ধুলোর ঘূর্ণি আমার শরীরের ভেতরটা ড্রিল মেশিনের মতো খুঁড়ে চলছিল সেখানে একটা আরাম আসে। সবুজ লেবুর গন্ধটাকে এখন আমি দিব্যি ভাবতে পারছি পতাকার রং। সেখান থেকে সতেজ হাওয়ার সুগন্ধী রসের গুঁড়া এসে আমার চোখে-মুখে চৈতন্যের ছিটা দিতে থাকে। শীতল সৌরভ রমজানের সন্ধ্যার শরবতের মতো আমাকে ভিজিয়ে দিতে থাকে। আমি ক্যাটক্যাট করে চোখ মেলি। যেন আমার চোখের সামনে এতক্ষণ কিছুই ছিল না। বা কিছু ছিল অসুস্থ, মøান, কুষ্ঠ রোগীর পচে যাওয়া গলিত আঙ্গুল নোখ নাড়িভুঁড়ি কাকচিল বারুদআগুন। আমি দম টেনে রঙিন গন্ধটা নিই। আমার ঠোঁট ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে লেবু-আস্বাদিত কথা।
Ñ ইস, কি দারুণ গন্ধ। খুব তাজা তো লেবুগুলো! মনে হচ্ছে এইমাত্র গাছ থেকে ছিঁড়ে আনা হয়েছে। এত তাজা লেবু আজকাল পাওয়া যায়!
Ñ হ, পাওয়া যায়। লেবু অহনও জাউরা হয় নাই। তাই লেবু ঠিক আছে।
আমার রিকশাওয়ালার মুখ থেকে বন্দুকের গুলির মতো আচমকা বেরিয়ে আসে কথা কটি। লেবুর সবুজ টিলা বসানো ভ্যান গাড়িটি ততক্ষণে আমাদের রিকশা ছাড়িয়ে অনেকটা সামনে এগিয়ে গেছে। আমি সেদিকে চেয়ে জারজ আর বৈধ লেবুর তারতম্য আবিষ্কারে চোখ দুটোকে উড়ন্ত হারপুনের মতো ছুড়ে মারি।
ওদিকে রিকশাওয়ালার স্বগতোক্তি ছটাছট বেরিয়ে বাতাসের পর্দাগুলোকে ফুটো করে দিতে থাকে।
Ñ দেখবেন বাজারে এহন কোনো মাছ আসল নাই। সব অইল চাষ। এরা সব জাউরা। এগো কারও কোনো রং-চেহারা বাপ-দাদার লাহান না, চরিত্র তো না-ই। খাইতে স্বাদ নাই। লাউ-কুমড়া-পটোল-আলুুু-কইডা-ফুলকফি-পাতাকফি সব জাউরা। এগো শইলডা বড়, রঙডা ঘোলা, স্বাদটা পাইনসা। খালি লেবুডা অহনও আসল আছে। তাই লেবুর গাড়ির থাইকা এমুন সুবাস ছড়াইয়া পড়ছে।
নাসারন্ধ্রে লেবুর সৌরভ মুহূর্তের জন্য আমাকে একটি সতেজ সবুজ বাগানে দাঁড় করিয়ে দিলেও বাতাস চিরে তখনও দশ দিকে ছড়িয়ে পড়ছে মাইকে বাজানো বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ। অদূরেই একটি খোলা মাঠে শোক দিবসের জনসভার আয়োজন চলছে। ডিজিটাল পোস্টারে ব্যানারে বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ দীপ্ত মুখের দৃপ্ত ভঙ্গিমার ছবি। ফুটপাতে বাদাম আমড়া ডালপুরি চা সিঙাড়ার অস্থায়ী দোকান। মানুষের ভিড়।
আমার রিকশাচালক সেদিকে চেয়ে আবার ছেড়ে দেওয়া কথার লেজটা ধরে ফেলেন।
Ñ ওই যে কত সব মানুষ। চাইরপাশে সব মানুষগুলা দ্যাহেন না? বাইরে নাকমোখ আছে তয় ভিতরটায় মানুষ নাই। খালি ঝুটা আছে। লেবুর লাহান তাজা আসল মানুষ আছিল একজনই। তারে সইজ্য অয় নাই। জাউরারা তারে মাইরা ফালাইল। জাতির পিতারে কুলাঙ্গার সন্তানেরা মাইরা ফালাইল। জাউরার আবার বাপের চিন্তা থাকে নি?
কী বলতে চান আমার চালক?
প্যাডেলে দ্রুত পা চালান তিনি। বাতাসে তার শুভ্র পাতলা চুল আর দাড়ি উড়তে থাকে।
আমাকে তিনি কোথায় নিয়ে যেতে চান? তিনি কি আস্তাকুঁড় থেকে নিকোনো প্রাঙ্গণের দিকে বোররাক ছুটিয়ে দেওয়া দেবদূত? সত্যের দিকে, ইতিহাসের দিকে, বেদনা আর রক্তময় জন্মমৃত্তিকার দিকে তার বাহনের সম্মুখচক্র তীব্র সেঁধিয়ে দিয়ে তার ধুলোমাখা নগ্ন পায়ের তলায় দৃঢ়ভাবে চেপে রাখবেন প্যাডেল?
বাতাসে আমার শাড়ির কুচি ফুলে ওঠে। আমার খোঁপার ফাঁস খুলে যায়। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশান উড়ে যায়।
আমি কাঙ্গালের মতো আমার শ্রবণ মেলে ধরি।
কী বলছিলে গো তুমি? ও ভাই? তোমার নাম কী ভাই? তোমার কথাগুলো বলো আমাকে।
তিনি কেমন উদাস চোখে আমাকে একবার ঘাড় ফিরিয়ে দেখেন। আমাকে যেন তার বলার কিছু নেই। আমি কে-ই বা। হয়তো বা আমাকেও তিনি ভেবে নিয়েছেন জারজগোত্রের একজন। আপনমনেই কথাগুলো তিনি শস্যের চারার মতো তার পায়ের গোড়ালি চেপে চেপে প্যাডেলের ওপরে বসিয়ে দিতে থাকেন।
Ñ আহহা রে! কেমনে এমুন মানুষটারে মারলো? যে মানুষটা দ্যাশের জনগণের জন্য সারাজীবন সংগ্রাম করলো, জীবন ভইরা জ্যাল খাটলো তারাই তার বোকে গুল্লি চালাইলো। ক্যামনে পারলো এমুন এ্যাকটা মানুষের বোকে গুল্লি চালাইতে! তার বোকটা তো আছিলো এই দ্যাশটার সমান বড়। হেই বোকটারে ঝাঁজরা কইরা দিল! এখন এত বছর বাদে তিন-চাইরজন বুইড়া মানুষরে ফাঁসি দিয়া কী অইল। বিষনাগের ছানাপোনায় তো দ্যাশ ভইরা গেছে। অহন দিনে রাইতে হাজারবার হাসিনায় তার বাপের ভাষণ শুনাইয়াও কোনো কামিয়াব অইতে পারবো না। কেমনে অইবো। তার চাইরোপাশে সব ধান্দাবাজ মানুষ। অমানুষ। সব ঘরের ইন্দুর গোলার ধান খাইয়া ফালায়। অই যে বঙ্গবন্দুতে কইতো আমি কম্বল আনলাম গরিবের জন্য আর চাটার দল সব খাইয়া ফালাইল…।
হয়তো বা একটা ক্ষোভের ষাঁড় তাড়াতে লেগেছেন তিনি। দ্রুত প্যাডেল।
আবার লেবুর ভ্যানটাকে ধরে ফেলেছেন তিনি। আবার বাতাসে লেবুর ঝাপটা। এবার তিনি চেতনপুরে।
Ñ খালা, লন গন্ধ লন। তাজা গন্ধ। দেহমন চনমন কইরা উঠবো। চাইরপাশে এত আবর্জনা আর দুর্গন্ধ। তার মাঝে এই লেবুর গন্ধটা য্যান সব কিছু ফ্রেশ কইরা তোলে। সারা দ্যাশে লাখ লাখ লেবুর ভ্যান ছাইরা দিলে ভালো অইতো, না-কি কন!
স্বজ্ঞান হাসিতে দার্শনিকের প্রজ্ঞায় আলোকিত তার মুখ। এক ঝলক আমার দিকে সেই মুখ নিয়ে তাকিয়ে আবার রাস্তা দেখে প্যাডেলে চাপ দেন। কী ভেবে আবার আমার দিকে ফিরে তাকান।
Ñ কিছু মনে কইরেন না খালা। মুখ্যুসুখ্যু মানুষ। মনের খেদে কতক্ষণ বকরবকর করলাম। আপনে আমার নাম জিগাইছিলেন। গরিব রিকশাওয়ালার নাম কেউ জিগায় না। জিগাইলেও তাগো নাম কেউ মনে রাখে না। আমার নাম জসীমউদ্দীন। তয় মজিব ভাই আমার নাম মনে রাখতো। কইতো কী রে জসীম, খবর কী। ভালো আছস না-কি? কত ভালোবাসতো আমারে।
Ñ মজিব ভাই? মানে বঙ্গবন্ধু?
Ñ হ, বঙ্গবন্ধু।
Ñ আপনি রাজনীতি করেন? আমার অজান্তেই তার প্রতি আমার সম্বোধন বদলে যায়।
মাথায় দৃঢ় একটা ঝাঁকুনি দিয়ে চালক মুখ ঘোরান আমার দিকে।
Ñ হ, করতাম, রাজনীতি করছি। আমি অইলাম বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। মজিব ভাইয়ের সাথে কত মিছিল করছি! কী একটা মানুষ আছিল মজিব ভাই। কথা কইত মোখ দিয়া না, য্যান কইলজাডা দিয়া। হের মাইয়া হাছিনা তো বাপের লাহান অইতে পারে নাই। বোকের হেই জোরডা-ই তো নাই।
Ñ আপনি কি শেখ হাসিনাকে দেখেছেন?
Ñ হ দেখছি। রাস্তায় যখন আন্দোলন করতো। জনসভায় বক্তৃতা দিতো। রিকশা থামাইয়া রিকশার উপরে খাড়ায়া তারে দেখতাম। মনে করতাম মজিব ভাইয়ের মেয়ে। আমাগো মাইয়া। বলতাম, হাসিনা তুমি এগিয়ে চলো আমরা আছি তোমার সাথে। সে তো তখন আছিল রাজপথেরই নেত্রী। তয় রাজপথ ছাইরা সংসদে গিয়া হে হইয়া গেছে সংসদ নেত্রী। তার চাইরপাশে  নানান কিছিমের মতলববাজ, স্বার্থপর আর চাটুকারের দল। এহন আর তাগোর কাছে আমার মতো গরিব রিকশাওয়ালা যাওয়ার সুযোগ নেই। তাগো দরগা ক্ষমতার গদি। আমাগো দরগা বত্রিশ নম্বর, আমাগো দরগা টুঙ্গিপাড়া। তহ আমাগো ভরসা বঙ্গবন্ধুর মাইয়া শেখ হাসিনা। হে সব বুঝে।
তীব্র স্বরে রিকশার বেল বাজে। সামনে নিশ্চয়ই কোনো বাধা। জসীম শক্ত হাতে রিকশার হ্যান্ডেল ধরে রাস্তার একটি খন্দক পেরিয়ে যান।

Category:

Leave a Reply