আওয়ামী লীগ চিরজীবী হোক

Posted on by 0 comment

৭০ বছর অতিক্রম করল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জুন আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ তৎকালীন পরপদানত পূর্ববাংলা তথা পাকিস্তানের রাজনীতির দৃশ্যপট বদলেরও সূচনালগ্ন হিসেবে চিহ্নিত। আওয়ামী লীগের জন্ম ছিল পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক ধরনের শাসন-শোষণ এবং মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক-স্বৈরতান্ত্রিক রাজনীতির অনিবার্য ফল। ১৯৪৬ সালে ভারত শাসন আইনের অধীনে অনুষ্ঠিত ব্রিটিশ ভারতের সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনে বাংলার মুসলমানদের ৯৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিল মুসলিম লীগ। মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র রাষ্ট্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জজবা যেমন মানুষকে সাময়িকভাবে হলেও সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শে আচ্ছন্ন করেছিল, তেমনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে বাঙালি মুসলমান এক ধরনের সামাজিক মুক্তি, উন্নত-জীবন ব্যবস্থা ও ক্ষমতায়নের স্বপ্ন দেখেছিল। বলাবাহুল্য, দেশভাগ কেবল বাংলার মুসলমানরাই চায়নি, বাঙালি উচ্চবর্ণের হিন্দু, জমিদার, মহাজন, অভিজাত, মধ্যবিত্তরাও দেশভাগ চেয়েছিল। তারা শরৎবসু-হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অখ- স্বাধীন বাংলার বিরোধিতা করেছে। বর্ণ, হিন্দু ও হিন্দু মহাসভা এবং জনসংঘের নেতা শ্যামা প্রসাদ মুখার্জীর নেতৃত্বে বেঙ্গল কংগ্রেসও বাংলায় মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভয়ে বাংলা ভাগের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব গ্রহণ করে।
বাঙালির নিজস্ব জাতি-রাষ্ট্রের ধারণাটি কী হিন্দু কী মুসলমান কারও মনেই দাগ কাটতে পারেনি। অনিবার্য হয় বাংলা ভাগ।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কিছুদিনের মধ্যেই পূর্ব বাংলার মুসলমান জনগোষ্ঠীর মোহমুক্তি ঘটতে শুরু করে। পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের এবার জাতিগত নিপীড়ন, বৈষম্য ও শোষণের মাত্রা এমন পর্যায়ে নিয়ে যায় যে, পূর্ব বাংলার মানুষ বুঝতে পারে তারা ইসলামের নামে, ধর্মের নামে নতুন এক ঔপনিবেশিক শাসনের ফাঁদে আটকা পড়েছে। রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার অস্বীকৃতি এবং বাঙালি জাতিসত্তার প্রতি, তাদের শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি ও জীবন ধারার প্রতি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ঘৃণা, বিদ্বেষ এবং বৈষম্যমূলক আচরণ বাংলার জনগণকে ক্রমশ সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শগত আচ্ছন্নতা কাটাতে সাহায্য করে।
কিন্তু এই কাজটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে হয়নি। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা বাঙালির জাতীয় জাগরণ এবং আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
ভাষা সংগ্রামের পথ বেয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়Ñ আওয়ামী লীগের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কীর্তি। বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন।
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় কেবল নয়, একটি আত্মমর্যাদাশীল অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক এবং উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই ছিল আওয়ামী লীগের অঙ্গীকার। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামান তাদের জীবন দিয়ে সেই অঙ্গীকারের মূল্য পরিশোধ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির প্রতিশোধ গ্রহণের সেই ষড়যন্ত্র ’৭৫-এর ট্র্যাজেডি সৃষ্টি করে। তা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতির পিতার অঙ্গীকার ও স্বপ্ন জয়ের পথে অকুতোভয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ৭০ বছরের মাথায় বাংলাদেশ আজ বহুলাংশে সেই স্বপ্ন জয় করে বাংলাদেশকে নতুন মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন মধ্য আয়ের দেশ। দারিদ্র্যের লজ্জা ঘুচিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের পথে পা বাড়িয়েছে। জাতির পিতার জন্মশতবর্ষে আওয়ামী লীগ ৭০ বছরের গৌরব ও সাফল্যের জয়গানে মুখরিত হবে। ইতিহাস প্রমাণ করেছে আওয়ামী লীগের জন্ম এবং সংগ্রাম ও নেতৃত্ব ছাড়া ‘বাংলাদেশ’ নামক রাষ্ট্রের অস্তিত্ব যেমন সম্ভব ছিল না, তেমনি এই অঞ্চলের মানুষের সুখী সুন্দর জীবনের স্বপ্নও কোনোদিন পূরণ হতো না। আওয়ামী লীগের ৭০ বছর পূর্তির এই দিনে আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা নেতৃবৃন্দের স্মৃতির প্রতি নিবেদন করছি শ্রদ্ধাঞ্জলি। অভিনন্দন জানাচ্ছি প্রিয় দেশবাসীকে। যাদের রক্তে, শ্রমে, ঘামে, আত্মত্যাগ ও অবদানের ফলে ছোট্ট চারাগাছ থেকে আওয়ামী লীগ আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে, আমরা সেই জানা-অজানা লাখ লাখ আওয়ামী লীগ কর্মী, নেতা, সংগঠক এবং সমর্থকদের জানাই আন্তরিক শ্রদ্ধা কৃতজ্ঞতা ও উষ্ণ অভিনন্দন। অভিনন্দন জানাই, গভীর সংকটকালে, নেতৃত্বের শূন্যতার বৈরী পরিবেশে জীবনকে বাজি রেখে যে নেত্রী ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন এবং আওয়ামী লীগকে জনসমর্থনপুষ্ট অপ্রতিদ্বন্দ্বী বৃহৎ দলে পরিণত করেছেন, সেই বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাকে। আওয়ামী লীগের ৭০ বছরের জীবনের ৩৫ বছরই জননেত্রী শেখ হাসিনা দলটির হাল ধরে থেকেছেন এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে, তার নেতৃত্বে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে বর্তমানে অনন্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। আজকের দিনে দেশবাসীর ঐকান্তিক কামনাÑ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের জয়যাত্রা অব্যাহত থাকুক। অপ্রতিরোধ্য আওয়ামী লীগ কেবল অতীত বর্তমান নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যতের নির্মাতা। আওয়ামী লীগ চিরজীবী হোক।

Category:

Leave a Reply