আওয়ামী লীগবিরোধী প্রচারের ৬ দশক ‘ঢেউয়ের ওপর দিয়ে যেন পালের নৌকো’

Posted on by 0 comment

শেখর দত্ত:

[প্রথম পর্ব : পাকিস্তানি আমল]
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালেjune2018র ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে ভ্রƒণ সৃষ্টি হয়; তারই জাতক হচ্ছে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন সৃষ্ট আওয়ামী লীগ। এই দলটির জন্ম যেমন আকস্মিক ব্যাপার ছিল না; ঠিক তেমনি জনবিচ্ছিন্ন কোনো ষড়যন্ত্র-চক্রান্তেরও অংশ ছিল না। পাকিস্তান যেভাবে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের ‘ভাগ কর শাসন কর’ নীতি সুকৌশলে প্রয়োগের পরিণতিতে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে অবৈজ্ঞানিক ও যান্ত্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তারই পরিণতিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ক্রমবিকাশের সাথে দলটির জন্ম ও বিকাশ অবিসম্ভাবী হয়ে ওঠে।
প্রসঙ্গত, পাকিস্তানের শাসক দল মুসলিম লীগের দুই প্রধান নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ ও লিয়াকত আলী খানের কেউই যে দুই অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান গঠিত হয়েছে, সেই অঞ্চলে জন্মগ্রহণকারী বাসিন্দা বা নেতা ছিলেন না। দুই অঞ্চলের তৃণমূলের দলীয় নেতা-কর্মী ও জনগণের সাথে তাদের প্রত্যক্ষ কোনো যোগাযোগ ছিল না। মুসলিম লীগ দলীয় সংগঠনের তৃণমূল থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন এ দুজন। সর্বোপরি পাকিস্তানের দুই অংশের ৫টি জাতি (বাঙালি, পাঠান, বালুচ, সিন্ধি ও পাঞ্জাবি)-কে ধর্মের ভিত্তিতে একত্র করে শাসন ও শোষণের মৃগয়াক্ষেত্র তৈরির প্রয়োজন ছিল। উল্লিখিত দুই কারণে সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী শাসনপদ্ধতি প্রবর্তন এবং শাসন ক্ষমতা সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়াটাই ছিল স্বাভাবিক।
এটা সকলেরই জানা যে স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অনুষঙ্গ হচ্ছে, বিরোধী দল-মতকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য দমন-পীড়ন ও অপপ্রচার-মিথ্যাপ্রচার এক সাথে চালানো। আসলে একটা হচ্ছে আরেকটার পরিপূরক এবং একটা বাড়লে অপরটাও বাড়ে। তবে সাধারণত প্রচার চলে আগে আগে আর নির্যাতন নিপীড়ন আসে ঠিক পিছন পিছন। বিরোধীরা ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’, ‘পাকিস্তানের শত্রু’, ‘ভারতীয় এজেন্ট’, পাকিস্তানকে ‘ভেঙে ফেলতে’ চাইছে, বাঙালা ভাষা ও সংস্কৃতি ‘হিন্দুয়ানি’ প্রভৃতি প্রচার পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরদিন থেকেই পাকিস্তানের শাসক-শোষক গোষ্ঠীর প্রচারের প্রধান বিষয় হয়ে যায়। শিশুকে ঘুম পাড়ানোর জন্য যেমন চাঁদ মামা বা মাসী পিসিকে নিয়ে গান গাওয়া হয় কিংবা মনে ভয় জাগিয়ে তাকে বশ করার জন্য যেমন জুজুর ভয় দেখানো হয়, তেমনি ‘শিশু পাকিস্তান’-এর সামনে রাখা হয় পবিত্র ধর্মের জিগির কিংবা ভারতীয় জুজু।
এই জিগির ও জুজু সামনে রেখেই পাকিস্তান আন্দোলনের তিন নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে নতুন দেশটিতে স্থায়ীভাবে বসবাস ও রাজনীতি করার ক্ষেত্রে নানাভাবে বাধা প্রদান করা হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির আগে পাকিস্তান প্রস্তাব থেকে ‘স্টেটস’ শব্দ কেটে ‘স্টেট’ করার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হককে ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করার ক্ষেত্রে অসুবিধা সৃষ্টি করা হয় এবং নতুন দল গঠনের উদ্যোগকে গু-া লেলিয়ে বানচাল করা হয়। ভারত বিভক্তির আগে যুক্ত বাংলার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ‘সংখ্যালঘুদের প্রতি ন্যায়বিচার ও ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে অধিক সম্পর্ক’ স্থাপনের অনুরোধ করায় সোহরাওয়ার্দীকে করাচিতে আইন ব্যবসা করতে দেওয়া হয় না এবং গণপরিষদে তার আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়। মওলানা ভাসানী নিপীড়িত কৃষক-জনতার পক্ষে কথা বলায় টাঙ্গাইল আসনের উপনির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেও ওই নির্বাচন বাতিল করে দেওয়া হয়।
পাকিস্তান আন্দোলনের প্রথম প্রজন্মের বাংলার এই তিন নেতাকে প্রথম থেকেই ‘শিশু রাষ্ট্র পাকিস্তান’কে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তকারী, বিভেদ সৃষ্টিকারী, ভারতের দালাল হিসেবে চিত্রিত করার প্রচেষ্টা চলে। ইতোমধ্যে জুজুর ভয় দেখিয়ে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে এক রাখার জিগির তুলে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে প্রতিষ্ঠা করার তৎপরতা শুরু হয়ে যায়।
প্রসঙ্গত, পাকিস্তান সৃষ্টির পর সেই অর্থে কোনো বিরোধী দল ছিল না। কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি দল হিসেবে থাকলেও সেই দলগুলোর লক্ষ-উদ্দেশ্য সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণ, যারা পাকিস্তান আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেই জনগণের চিন্তা-চেতনার সাথে সংগতিপূর্ণ ছিল না। কংগ্রেসকে মনে করা হতো হিন্দুদের দল। তাই দেখা যায় যে, ১৯৪৮ সালে ২৫ ফেব্রুয়ারি কংগ্রেস সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যখন বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি কেন্দ্রীয় আইন সভায় উত্থাপন করেন, তখন প্রস্তাবের পক্ষে কোনো মুসলিম সদস্য অবস্থান গ্রহণ করেন নি। আর কমিউনিস্ট পার্টি এমনিতেই ছিল ‘আল্লাহ না মানা’ দল। এই দলটি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দিনগুলোতে পাকিস্তানকে সমর্থন করলেও ১৯৪৮ সালের শুরুতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সুর মিলিয়ে ‘ইয়া আজাদী ঝুটা হ্যায়..’ সেøাগান তুললে জনগণ থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
এ অবস্থায় জনগণের চেতনার সাথে সংগতিপূর্ণ একটি বিরোধী দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। চলে নানা প্রচেষ্টা। কিন্তু তা অগ্রসর হয় না। এই অবস্থায় এগিয়ে আসে পাকিস্তান আন্দোলনের দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতাদের বড় এক অংশ। মুসলিম লীগের সাথে থাকলেও এই অংশটির মধ্যে মুক্তবুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রভাব ছিল। এই অংশটি নিজেদের সংগঠিত ও শক্তি বৃদ্ধির জন্য সদস্য সংগ্রহের লক্ষ্যে সদস্য ফরম চাইলে পাকিস্তানের শাসক ও শোষক গোষ্ঠীর পক্ষের মুসলিম লীগ নেতারা তা দিতে অস্বীকার করে। উল্লিখিত স্বৈরাচারী পদক্ষেপ গ্রহণ এবং অপপ্রচার ও মিথ্যা প্রচার, বিশেষভাবে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার তৎপরতা দৃশ্যমান হলে মুসলিম লীগবিরোধী ক্ষোভ দানা বেঁধে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠিত হয়।
পর্যবেক্ষণে এটা সুস্পষ্ট যে, যারা এই ছাত্র সংগঠনটি গঠন করেছিলেন তারা মুসলিম লীগের মধ্যে থাকলেও মুক্তচিন্তা ও অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনায় প্রভাবিত ছিলেন। এমন প্রভাব অস্বাভাবিক ছিল না। বাংলায় সাম্প্রদায়িক ও সংকীর্ণ চিন্তা-চেতনার বিপরীতে আবহমান কাল থেকেই অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তচিন্তার যে ধারা বহমান ছিল, তারই ধারাবাহিকতায় বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এই চেতনা তখন মুসলিম শব্দ ধারণ না করে দানা বেঁধে ওঠা সম্ভব ছিল না। ওই ছাত্র সংগঠনে তখন বাম ও কমিউনিস্ট ছাত্র নেতারাও যুক্ত ছিলেন। ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার পর ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের প্রতিবাদে আন্দোলন তীব্র ও ব্যাপক হয়ে ওঠে।
যার পরিণতিতে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ প্রদেশব্যাপী হরতাল পালিত হয়। হরতালের পর সরকারের প্রেসনোট ছিল এ রকম : ‘… সাধারণ ধর্মঘটকে কার্যকর করার জন্য আজ ঢাকাতে কিছু সংখ্যক অন্তর্ঘাতক এবং একদল ছাত্র ধর্মঘট করার চেষ্টা করে। শহরে সমস্ত মুসলিম এলাকা এবং অধিকাংশ অমুসলিম এলাকাগুলোতে ধর্মঘট পালন করতে অসম্মত হয়। শুধু কিছু মাত্র হিন্দু দোকানপাট বন্ধ রাখে।… মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে হতবুদ্ধিতা সৃষ্টি করে পাকিস্তানকে খর্ব করার উদ্দেশ্যে একটি গভীর ষড়যন্ত্র চলছে।’ ‘অন্তর্ঘাত’, ‘হিন্দু’, ‘বিভেদ’, ‘ষড়যন্ত্র’ প্রভৃতি শব্দগুলো বিবেচনায় নিলেই সুস্পষ্ট হবে, ধর্মপ্রাণ জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য তীব্র সাম্প্রদায়িক ও ভারতবিরোধী প্রচার তখন কতটা তীব্র করা হয়।
এখানে উল্লেখ্য যে, যান্ত্রিকভাবে দেশ ভাগ করে পাকিস্তান সৃষ্টির পরের বেশ কিছু সময় মূলত পূর্ব অবস্থানের কারণে ঢাকার সাথে কলকাতাকে কেন্দ্র করেও পূর্ব বাংলার রাজনীতি চালু ছিল। দৈনিক ইত্তেহাদ তখনও প্রকাশিত হতো কলকাতা থেকে। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অবস্থানের কারণে মুসলিম লীগ সরকার পূর্ব বাংলায় দৈনিক ইত্তেহাদ প্রবেশ নিষিদ্ধ রাখে। এদিকে জুনের প্রথম দিকে মুসলিম লীগ সরকার সোহরাওয়ার্দীকে জননিরাপত্তা আইনে ৬ মাসের জন্য পূর্ব বাংলায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। এককথায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে প্রচার বন্ধ রেখে এবং অন্দোলনকে দমন করে মুসলিম লীগ সরকার একতরফাভাবে নতুনভাবে জেগে ওঠা গণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে কার্যত জিহাদ ঘোষণা করে।
এই দিনগুলোতে পাকিস্তান সরকার ভারত বিরোধিতার জিগির তুলে কলকাতার পাটকলগুলোতে পাট রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। ফলে যে কৃষকরা ছিল পাকিস্তান আন্দোলনের প্রাণ তাদের জীবনে চরম দুর্দশা নেমে আসে এবং পূর্ব বাংলার অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। দুই পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। ফলে গ্রাম বাংলায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং তাদের পক্ষে কথা বলায় মওলানা ভাসানী রাজনীতিতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এদিকে শ্রমিক ও কর্মচারীরাও দুর্ভাগ্যের শিকার হয়। এ অবস্থায় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ধর্মঘট শুরু হয়। সাথে সাথে চলে তীব্র দমন-পীড়ন এবং গণতান্ত্রিক ও কমিউনিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে তীব্র অপপ্রচার। এসব আন্দোলনের ভেতর দিয়ে ছাত্র নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে সামনের সারিতে চলে আসেন।
একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, পাকিস্তান সৃষ্টির প্রথম থেকেই পূর্ব বাংলার জাতীয় অধিকার ও শ্রমজীবী জনগণের আন্দোলন একই ধারায় অগ্রসর হয় এবং ক্রমে জাতীয় রাজনীতির মূলধারা হিসেবে অবস্থান নিতে থাকে। এই মূলধারাকে ধারণ, রক্ষণ ও বাহনের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি রাজনৈতিক দলের। এই প্রয়োজনীয়তা থেকে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পূর্ব বাংলার জনগণের চিন্তা-চেতনা ও ক্ষোভ ধারণ করে এবং আশা-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম আওয়ামী লীগ। এখানে জাতির জন্য যে বিষয়টি সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তা হলো, প্রথম থেকেই পাকিস্তান আন্দোলনের তরুণ নেতা ও পরবর্তীতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অপপ্রচার-নির্যাতন ও আন্দোলন-সংগ্রামে পোড় খেয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনের মধ্যমণি হিসেবে অবস্থান নিতে শুরু করেন।
সংক্ষেপে উল্লিখিতভাবে পাকিস্তানের প্রথম দিনগুলো তথা আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগের ইতিহাস তুলে ধরা হলো দেশের বৃহত্তম ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ইতিহাস রচনার জন্য নয়, দমন-পীড়নের মধ্যে কীভাবে আওয়ামী লীগ বিকশিত হয়েছে সেজন্যও নয়; আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দেশের ডান ও প্রতিক্রিয়াশীল এবং উগ্রবামপন্থি মহল কোন ধরনের মিথ্যা ও অপপ্রচার করে এখন পর্যন্ত অগ্রসর হচ্ছে, তার একটা সংক্ষিপ্ত রূপরেখা তুলে ধরার জন্য। প্রকৃত বিচারে আওয়ামী লীগের ইতিহাস নির্যাতন-নিপীড়ন ও অপপ্রচার-মিথ্যা প্রচার মোকাবিলা করার ইতিহাস। রাজনীতিতে একটা চিরসত্য কথা রয়েছে যে, অভিজ্ঞতাই চলার পথের পাথেয়। এ দিকটি বিবেচনা করেই পাকিস্তানি আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ইস্যু সামনে নিয়ে আওয়ামী লীগবিরোধী প্রচারের স্বরূপ উদঘাটন করা হলো।

প্রতিষ্ঠালগ্নের সময়কাল
আওয়ামী লীগ জন্মলগ্নেই গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনের দাবি সম্বলিত ১২-দফা দাবি তুলে ধরে। এই দাবিনামা পাকিস্তানের শাসক-শোষক গোষ্ঠীর চক্ষুশূল হয় এবং টনক নাড়িয়ে দেয়। ‘সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হবে জনগণ’ এই ঘোষণা এবং কেবল ‘প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক সম্পর্ক ও মুদ্রা’ কেন্দ্রের হাতে রেখে স্বায়ত্তশাসনের দাবি কোনো রাজনৈতিক দল দাবি হিসেবে তুলে ধরবে, এমনটা মেনে নেওয়ার মতো অবস্থা তাদের ছিল না। তাই এই নবোজাত দলের বিরুদ্ধে শুরু হয় অপপ্রচার ও মিথ্যাপ্রচার। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের সাথে সুর মিলিয়ে বাঙালি জাতির কলঙ্ক পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন ১৯৪৯ সালের ৮ জুলাই বলেন যে, ‘আমরা জেনে-শুনে বৃহৎ বাংলা আন্দোলনের নেতাদের ষড়যন্ত্র চালিয়ে যেতে দিতে পারি না। কঠোর হস্তে ষড়যন্ত্র দমন করা হবে। আমি একটি নতুন দলের নাম শুনছি আজকাল। তারা হালে পাকিস্তান দরদি হয়েছেÑ আমরা জানি তারা কারা।’
বাংলায় পাকিস্তান আন্দোলনের নেতা হিসেবে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ক্ষমতার প্রশ্নে সোহরাওয়ার্দীই ছিলেন ক্ষমতাসীন নেতাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, তাই তাকে উদ্দেশ্য করেই এমন প্রচারণা চালানো হয়েছিল। পাকিস্তানের তৃতীয় স্বাধীনতা দিবস পালন অনুষ্ঠানে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান বাঙালির এই নেতাকে ‘পাকিস্তান ধ্বংস করার জন্য ভারতের লেলায়িত কুকুর’ হিসেবে বিষোদগার করেন। মুসলিম লীগের নেতারা এবং এমনকি প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান পর্যন্ত প্রকাশ্যে হুঙ্কার দিতে থাকেন, ‘শির কুচল দেঙ্গে।’ এই অপপ্রচার ও মিথ্যা প্রচার ও হুমকি-ধমকির জবাবে একটি পত্রিকা বের করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ১৯৪৯ সালের ১৫ আগস্ট প্রকাশিত হয় দৈনিক ইত্তেফাক। প্রথম থেকেই এই দৈনিকটি গণতন্ত্র ও বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রধান প্রচারক হিসেবে অপপ্রচার ও মিথ্যা প্রচারের মুখোশ উন্মোচন করতে থাকে। দৈনিক পত্রিকা ইত্তেফাকের ভূমিকা তাই আওয়ামী লীগ ও দেশের ইতিহাসে অনন্য ও অসাধারণ। এখন দিন পাল্টিয়েছে, সংবাদপত্রের ভূমিকা কি হবে তা নিয়ে নানা মত রয়েছে সত্য; কিন্তু এটাই বাস্তব যে, এখন আওয়ামী লীগের কোনো দৈনিক পত্রিকা নেই।
প্রতিষ্ঠার দিনগুলোতে ডান ও প্রতিক্রিয়াশীলদের অপপ্রচার-মিথ্যাপ্রচারের মধ্যে বাম ও কমিউনিস্টদের আওয়ামী লীগ সম্পর্কে অবস্থান ও প্রচার কেমন ছিল তা নিয়ে আলোচনা খুবই আগ্রহোদ্দীপক। ‘ঢাকা জেলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের অতীত যুগ’ বইতে প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা জ্ঞান চক্রবর্তী বাম ও কমিউনিস্ট নেতা-কর্মীদের দুই বিপরীত ধরনের মত সম্পর্কে লিখেছেনÑ
প্রথম মত : কমিউনিস্টরা ‘আওয়ামী লীগের মত সংগঠনগুলোর জন্ম প্রভৃতির মত ঘটনাগুলিকে প্রতিক্রিয়াশীলদের কারসাজি বলিয়াই মনে করিত।… সহজে তাহাদের সহিত কাজ করিতে রাজী হইতেন না।’
দ্বিতীয় মত : ১৯৫১ সালে প্রাদেশিক কমিটির বর্ধিত সভায় ‘পার্টির অতীত কার্যাবলীর ভুলভ্রান্তি নিয়া আলোচনা হয় এবং গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর সাথে একযোগে কাজ করিবার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।’
প্রসঙ্গত, প্রথম মত ছিল প্রবীণদের আর দ্বিতীয় মত তরুণদের। তরুণদের কারণে উল্লিখিত বর্ধিত সভার সিদ্ধান্ত তৃণমূলে কার্যকর করা সম্ভব হয় নি। তিনি লিখেছেনÑ ‘ওই বর্ধিত সভার পরে আওয়ামী মুসলিম লীগের সহযোগিতায় কাজ করিবার বিষয়টি নিয়া যখন কমরেডদের সাথে আলোচনা করা হয়, তখন নতুন কমরেডরা প্রায় সকলেই ইহা বাতিল করিয়া দেয়। কাজেই ইহা আর কার্যকরী করা সম্ভব হয় না।’ একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, তখন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাম ও কমিউনিস্ট মহলে উল্লিখিত দুই মতেরই অবস্থান রয়েছে। একপর্যায়ে তা রুশ-চীন ভাগাভাগিতে পরিণত হয়। রুশপন্থি বাম ও কমিউনিস্টরা সাধারণভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষে এবং চীনপন্থিরা সাধারণভাবে বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রচার চালায়। এখনও বাম ও কমিউনিস্টরা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত থাকলেও আওয়ামী লীগ সম্পর্কে অবস্থান ও প্রচার উপরোক্ত দুই ধারায় একই রকম রয়েছে।

বাহান্ন-এর ভাষা আন্দোলন
বাহান্নর ভাষা আন্দোলনে আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং পেশাজীবী ও সামাজিক সংগঠনের মধ্যে অভূতপূর্ব ঐক্য গড়ে ওঠে। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি হন আওয়ামী মুসলিম লীগ সভাপতি মওলানা ভাসানী। জেলে থেকেও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আন্দোলনের ওই দিনগুলোতে মুসলিম লীগের প্রচার কোন ধরনের ছিল, তা বুঝা যাবে ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র মিছিলে গুলি ও ছাত্র হত্যার পর আইনসভায় মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের বক্তৃতা বিবেচনায় নিলে। তিনি বলেন, ‘পুলিশ ঠিকই করেছে। উচ্ছৃঙ্খলতা দমনের জন্য পুলিশ। এর পিছনে হিন্দু কমিউনিস্টদের উসকানি আছে। তাদের নির্মূল করবরই।’ তখন ‘হিন্দুদের ভাষা বাংলা’ এই প্রচার জোরদার করার সাথে সাথে ‘পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভারতীয় এজেন্টরা’ এসে পাকিস্তান ভাঙা ও মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ করার জন্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে বলে প্রচার জোরদার করা হয়। আন্দোলনকারীদের ‘এজেন্ট ও প্রভোকেটর’ ও ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ আখ্যায়িত করে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ ও গু-াদের লেলিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সবই যায় বিফলে। শহিদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে মাতৃভাষা বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, এই আন্দোলনের ভেতর দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তার ভ্রƒণ বাংলা মায়ের গর্ভে সুদৃঢ়ভাবে অবস্থান নেয়। এই বিজয় মুসলিম লীগকে পূর্ব বাংলার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার সাথে সাথে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিতকে নাড়িয়ে দেয় এবং ক্রমে জেগে ওঠা বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধান আস্থাভাজন দল হিসেবে সামনে এসে দাঁড়ায় আওয়ামী লীগ।

চুয়ান্ন সালের নির্বাচন
ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে পূর্ব বাংলার জনগণের মধ্যে ক্ষোভের যে বহিঃপ্রকাশ ঘটে, তাতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুসলিম লীগ সরকার পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। ১৯৫৪ সালের ওই নির্বাচনে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে জোট-যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। জনসমর্থন ও সংগঠন শক্তির দিক থেকে এই জোটের প্রধান দল ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। নির্বাচন সামনে রেখে পূর্ব বাংলার জনগণের মধ্যে এই জোটের পক্ষে জাগরণ সৃষ্টি হয়। ফলে ভীত হয়ে মুসলিম লীগ নির্বাচনী প্রচারে আরও মারমুখী হয়ে ওঠে। সরকারি দলের নেতারা প্রচার করতে থাকে, যুক্তফ্রন্টকে ভোট দিলে ইসলাম ধর্ম বিপন্ন হবে, পাকিস্তান ভেঙে যবে, পূর্ব বাংলা ভারতের অংশ হয়ে যাবে, যুক্তফ্রন্ট ভারতের অর্থে নির্বাচন করছে, ভারতীয় এজেন্টরা কর্মী হয়ে কাজ করছে, আন্দোলনের নামে অরাজকতা সৃষ্টি করে যুক্তফ্রন্ট হিন্দু ভাষা ও সংস্কৃতি আমদানি করতে চাইছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কর্মসূচি নয়, সাম্প্রদায়িক ও ভারত-বিরোধী প্রচারই ছিল মুসলিম লীগের প্রধান বিষয়।
অপরদিকে যুক্তফ্রন্টের প্রচারে মুসলিম লীগ সরকারের দুঃশাসন, স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি অবহেলা, ভাষা আন্দোলনে ছাত্র হত্যা, দুর্নীতি, লবণ সংকট, শাসনতন্ত্র প্রদানে অনিহা, পূর্ব বাংলার প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণ প্রভৃতি তুলে ধরে। সর্বোপরি মুসলিম লীগের অপপ্রচার ও মিথ্যা প্রচারের জবাব দেওয়ার সাথে সাথে ২১-দফা কর্মসূচি তুলে ধরা হয়। আওয়ামী লীগের পত্রিকা দৈনিক ইত্তেফাক এই প্রচারে মুখ্য ভূমিকা পালন করে এবং পত্রিকাটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
এই নির্বাচনে মুসলিম লীগের কবর রচিত হয়। যুক্তফ্রন্ট ‘ব্যালট বাক্সে বিপ্লব’ ঘটিয়ে জয়যুক্ত হয়। জনগণের রায়ে আওয়ামী লীগ প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে বের হয়ে আসে। মুসলিম লীগের প্রচার বুমেরাং হয়ে যায়। দ্বিজাতিতত্ত্ব মুসলিম লীগ ও পাকিস্তানের প্রতি পূর্ব বাংলার মানুষের মোহভঙ্গ হয়। অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির উত্থান ঘটে। জাতীয় অধিকার ও মানুষের অধিকারের বিষয়গুলো এই নির্বাচনের ভেতর দিয়ে সামনে চলে আসে। এই নির্বাচনের ফলাফলের ভেতর দিয়ে এটা দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, পূর্ব বাংলার জনগণের নির্বাচনী মার্কা হচ্ছে নৌকা।

যুক্তফ্রন্ট আমল
মুসলিম লীগবিরোধী এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার ক্রমউত্থানের প্রেক্ষিতে বিজয়ী যুক্তফ্রন্ট সরকারকে সহ্য করার মতো অবস্থা কেন্দ্রীয় সরকারের ছিল না। শুরু হয় প্রাসাদ যড়যন্ত্র। প্রথমেই বাঙালি-অবাঙালি দাঙ্গা বাধিয়ে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির দায় প্রাদেশিক সরকারের ওপর ফেলা হয় এবং পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন করার জন্য সরকারে থেকে ভারতীয় এজেন্টরা কাজ করছে বলে প্রচারণা চালানো হয়। এ অবস্থায় মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক চিকিৎসার জন্য কলকাতা গেলে সেখানকার সম্বর্ধনা সভার বক্তৃতা নিয়ে অপপ্রচার তুঙ্গে তোলা হয়। শেরেবাংলাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী, ভারতের দালাল ও বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিত্রিত করার প্রয়াস চলে। সরকারের সাথে তখন গলা মেলায় সাম্রাজ্যবাদী প্রচারযন্ত্র। নিউইয়র্ক টাইমস সাক্ষাৎকার প্রচার করে লিখে শেরে বাংলা বলেছেন, পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন করা হবে তার প্রধান কাজ।
এরই মধ্যে জেল গেটে স্বতঃস্ফূর্ত জনতার এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে শেখ মুজিবকে জেল গেট ভাঙার দায়ে অভিযুক্ত করা হয় এবং তাকে ‘ভয়ানক বিপজ্জনক ব্যক্তি’, ‘দাঙ্গাবাজ’ ও ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রচার চালানো হয়। ভারত ও কমিউনিস্টবিরোধী প্রচার তখন তীব্রতর করা হয়। এসব প্রচারণা চালিয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার দুই মাস না যেতেই কেন্দ্রীয় সরকার ৯২(ক) ধারা জারি করে। জরুরি অবস্থা ঘোষিত হয়। প্রাদেশিক সরকার ভেঙে দিয়ে মন্ত্রী-নেতাদের গ্রেফতার করে। শেখ মুজিবকে মারাত্মক অস্ত্রসহ দাঙ্গাকারী হিসেবে গ্রেফতার এবং তাকে টার্গেট করে প্রচার জোরদার করা হয়।
এ পর্যায়ে মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্টের প্রধান দুই দল আওয়ামী মুসলিম লীগ ও কৃষক শ্রমিক পার্টি এবং দুই নেতা এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে সকল কর্মতৎপরতা ও প্রচার কেন্দ্রীভূত করে। এতে কেন্দ্রীয় সরকার সফল হয়। চলতে থাকে পূর্ব বাংলার ক্ষমতায় পালাবদলের খেলা। এসব স্বৈরাচারী অপতৎপরতা ও অপপ্রচারের লক্ষ্য ছিল পূর্ব বাংলায় নিজেদের বশংবদ সরকার প্রতিষ্ঠা করা।
এ সময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, ১৯৫৫ সালের অক্টোবরে আওয়ামী মুসলিম লীগ সম্মেলনের ভেতর দিয়ে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেয়। পূর্ব বাংলার গণমানুষের চেতনার সাথে সংগতিপূর্ণ ও সর্ববৃহৎ গণ-আস্থাসম্পন্ন রাজনৈতিক দলের এই সিদ্ধান্ত ছিল দ্বিজাতিতত্ত্বকে পূর্ব বাংলার জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যানের নামান্তর আর তাই যুগান্ত সৃষ্টিকারী। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভয় পেয়ে যায় মুসলিম লীগ সরকার এবং মওলানা ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর মধ্যে বিভেদ তথা আওয়ামী লীগকে বিভক্ত করার চক্রান্ত জোরদার হয়। জনমনে ও দলের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সোহরাওয়ার্দীকে বিতর্কিত ও বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য সব ফন্দি আঁটা হয়।
এদিকে সামরিক জোট সিয়াটো গঠনের পর পাকিস্তানকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক শাসনের মধ্যে ফেলে সাম্রাজ্যবাদের লেজুরে পরিণত করার অভিপ্রায়ে সাম্রাজ্যবাদী মহলও এই ষড়যন্ত্র-চক্রান্তে যোগ দেয়। পাকিস্তান আমলে এই সময়টা ছিল আসলে পূর্ব বাংলা ও আওয়ামী লীগের জন্য একদিকে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক এবং অপরদিকে এ থেকে শিক্ষা নিয়ে দলটি আরও অভিজ্ঞ ও পোক্ত হয়। গণপরিষদে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র প্রণয়ন তখন ছিল প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু। এ অবস্থায় শাসনতন্ত্রে ‘এক লোক এক ভোট নীতি’ কার্যকর করা সম্ভব বিবেচনায় আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর সাথে সমঝোতা করেন। কেননা অবস্থা পর্যবেক্ষণে তিনি মনে করতেন, এই নীতি যদি শাসনতন্ত্রে কার্যকর করা যায়, তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় পূর্ব বাংলার হাতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা চলে আসবে। পূর্ব বাংলায় আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেতা না থাকায় পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চিন্তা অস্বাভাবিক ছিল না। আর প্রাদেশিক পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে বিধায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে প্রাদেশিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে বলে তিনি বিবেচনা করতেন।
এই চিন্তা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে তিনি প্রথমে কেন্দ্রীয় সরকারের আইনমন্ত্রী ও পরে প্রধানমন্ত্রী হন। ক্ষমতায় বসেই তিনি জাতীয় পরিষদে যুক্ত নির্বাচন প্রথার পক্ষে বিল উত্থাপন করে বলেন যে, ‘মুসলিম জাতি ও পাকিস্তানি জাতিÑ সম্পূর্ণ পৃথক। মুসলমান জাতির ব্যাপ্তি পাকিস্তানের সীমারেখা ছাড়িয়ে যায়। পাকিস্তানি জাতি ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে।’ ওই সময়ে পাকিস্তানের ক্ষমতার কেন্দ্রে দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরুদ্ধে এটা ছিল প্রথম প্রতিবাদ। মুসলিম লীগ ও কৃষক শ্রমিক পার্টি এই বিল নিয়ে তীব্র আওয়ামী লীগবিরোধী প্রচারে নামে। তবুও জাতীয় পরিষদের যুক্ত নির্বাচন বিল পাস হয়। এদিকে পূর্ব বাংলায় ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জনস্বার্থে বহু কাজ করার উদ্যোগ নেয় এবং যুক্ত নির্বাচন প্রথা, পাকিস্তানের দুই অংশের বৈষম্য দূরীকরণ ও বিমাতাসুলভ আচরণের প্রশ্নে যেসব বক্তব্য রাখে, তা ছিল জনগণের চেতনাকে জাগ্রত করার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যবহ।
এসব ঘটনার ভেতর দিয়ে পাকিস্তানে প্রথম শাসনতন্ত্র গৃহীত হয় এবং ১৯৫৯ সালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়া হয়। এতদসত্ত্বেও পাকিস্তানের শাসক-শোষকগোষ্ঠী সেই সময় যা চেয়েছিল সেটাই হয়। সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানী বিভেদ সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগ ভেঙে যায় এবং মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাপ প্রতিষ্ঠা পায়। পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও সাম্রাজ্যবাদ প্রশ্নে জনগণ ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ব্যাপক ও তীব্র বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগ তখন শাঁখের করাতের মধ্যে পড়ে। একদিকে পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতি বিনষ্ট করার জন্য মুসলিম লীগের প্রচার আর অন্যদিকে বাম কমিউনিস্টদের স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে এবং সাম্রাজ্যবাদের সাথে আপসের বিরুদ্ধে প্রচার। এ সময়ে বাম ও কমিউনিস্টরা এবং আওয়ামী লীগ পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রচারে নামে। পাকিস্তানি আমলে এর চেয়ে বেশি পরস্পরের মুখোমুখি দুই পক্ষ আগে বা পরে আর হয়নি।
তবে তখনকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে এটাই স্পষ্ট যে, বিরুদ্ধ সব প্রচার সত্ত্বেও কোণঠাসা বা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি আওয়ামী লীগ ও দলের প্রতীক নৌকা। তাই দেখা যায়, ১৯৫৭ সালের প্রদেশিক পরিষদের উপনির্বাচনে সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা ও রংপুরের ৭টি আসনের মধ্যে ৬টিতেই আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। এসব ঘটনা প্রবাহে পাকিস্তানের শাসক-শোষকগোষ্ঠী প্রমাদ গোনে। তাই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ১৩ মাসের মাথায় সোহরাওয়ার্দীকে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অপসারণ করা হয়।
পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভেদ ও বিভ্রান্তির সুযোগে বিয়োগান্তক ও অনভিপ্রেত নানা ঘটনার ভেতর দিয়ে আসে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন। এই সময়কালে ঘটনাবলী ও সামরিক শাসন পূর্ব বাংলার জনগণের ওপর চেপে বসার ঘটনা পর্যালোচনা করলে বলা যায়, ওই সময়ে পূর্ব বাংলার প্রতি পাকিস্তানের শাসক ও শোষকগোষ্ঠীর স্বৈরাচারী, ঔপনিবেশিক মনোভাব ও কার্যকলাপের মুখোশ আরও ভালোভাবে উন্মোচিত হয়ে পড়ে। অনেক মূল্য দিয়ে হলেও পাকিস্তানের প্রতি মোহমুক্তি ঘটার ক্ষেত্রে এ অভিজ্ঞতার প্রয়োজন ছিল।
সামরিক শাসন
উল্লিখিত শাসনতন্ত্রের ভিত্তিতে ১৯৫৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হবে এমনটাই সরকার ঘোষণা দিয়েছিল। তবে নির্বাচন হলে পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগ জয়লাভ করবে এটা সুনিশ্চিত ছিল। তাই ওই নির্বাচন বানচাল করার জন্য ক্যু করা ভিন্ন পাকিস্তানের শাসক ও শোষকগোষ্ঠীর কাছে বিকল্প ছিল না। সামরিক শাসন জারি করেই তাই শাসনতন্ত্র বাতিল, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইন সভা ও সরকার বাতিল, সকল রাজনৈতিক দলকে বে-আইনি ও রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সামরিক সরকারের পক্ষ থেকে প্রচারে বলা হতে থাকেÑ
১. দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ক্ষমতার জন্য দ্বন্দ্ব-সংঘাত, বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি প্রভৃতির জন্য রাজনৈতিক দল ও নেতারা দায়ী।
২. কিছু রাজনীতিবিদ রক্তাক্ত বিপ্লবের কথা বলছে, আর এক দল বিদেশের সাথে আঁতাত করতে চাইছে।
৩. যে দল দেশকে প্রায় ধ্বংসের শেষ সীমায় নিয়ে গেছে, সেই বিশ^াসঘাতকরাই তাদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য নির্বাচনে জালিয়াতি করে জিততে চাইছিল।
৪. শাসনতন্ত্রে কতক ত্রুটি রয়ে গেছে, যা দূর না করলে দেশ বিভক্ত হয়ে যাবে।
৫. মুসলমানদের জন্য উপযুক্ত শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করা হবে।

প্রচারের ধরন থেকেই অনুধাবন করা যায়, টার্গেট পূর্ব বাংলা এবং আওয়ামী লীগ ও কমিউনিস্টরা। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, দেশকে ধ্বংস ও বিভক্ত করা, সাম্প্রদায়িকতা, ভারত বিরোধিতা, সংসদীয় গণতন্ত্র ও যুক্ত নির্বাচন প্রথার বিরোধিতা প্রভৃতির সাথে সামরিক শাসনের মধ্যে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার প্রভৃতির অভিযোগ পূর্ব বাংলার রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে তোলা হয়। এই প্রচারের সাথে নির্যাতন, বেত্রদ-, মিথ্যা মামলা, নিষেধাজ্ঞা, গ্রেফতার ও নানাবিধ নিপীড়ন আইনের শাসন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করে নির্বিবাদে চলতে থাকে। ঘোষিত হয় ‘নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্যতা সংক্রান্ত আদেশ (এবডো)’-সহ বিভিন্ন নিবর্তনমূলক আইন। ঘোষণায় বলা হয়, এবডো ঘোষিত রাজনীতিকদের দুর্নীতির অভিযোগ স্বীকার করে রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণের ঘোষণা দিতে হবে। রাজনীতিকরা ‘জঞ্জাল’ বলে প্রচার জোরদার করা হয়।
পাকিস্তানি শাসক ও শোষকগোষ্ঠীর প্রধান টার্গেট আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দীসহ প্রায় অর্ধশতক রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে এবডো দেওয়া হয় এবং মওলানা ভাসানী ও রাজনীতির মধ্যমণি শেখ মুজিবসহ বহু রাজনীতিককে গ্রেফতার করা হয়। এদিকে সরকার-বিরোধী প্রচার বন্ধ করার জন্য ইত্তেফাক সম্পাদক মানিক মিয়াকেও গ্রেফতার করা হয়। অব্যাহতভাবে এই প্রচার ও জেল-জুলুমের সাথে ‘মুসলমানদের জন্য উপযুক্ত শাসনতন্ত্র’ চালুর জন্য আইয়ুব খান ‘হ্যাঁ’ ভোট ‘না’ ভোটের সংস্কৃতি এবং এক লোক এক ভোট নীতি বাতিল করে মৌলিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করে। এ ব্যবস্থা বিরাজনীতিকরণের জন্যই করা হয়। গণতন্ত্রের নামে তা ছিল স্বৈরশাসন। এভাবে সামরিক কর্তা আইয়ুব খান সামরিক বেসামরিক আমলা ও পদলেহনকারী পেশাজীবী বুদ্ধিজীবীদের হাতে দেশের শাসনভার অর্পণ করে। সাম্রাজ্যবাদীরা এই ব্যবস্থার পক্ষে সর্বতোভাবে প্রচারে নামে। এসব প্রচার ও ব্যবস্থা গ্রহণ ছিল প্রকৃত বিচারে পাকিস্তানের ভাগ্যে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ারই নামান্তর।
আগামী সংখ্যায় সমাপ্ত

Category:

Leave a Reply