আপনার ৬ ডাক্তারকে চিনে রাখুন

61আলমগীর আলম: মানুষের শরীর একটি নিখুঁত যন্ত্র, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে সক্ষম। এর শক্তির উপাদানগুলো প্রকৃতি থেকে আহরণ করে। উপরোক্ত উপাদান গ্রহণে কোনো প্রকার ঘাটতি হয়ে থাকলে তখন শরীর পূর্ণমাত্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে প্রয়োজন হয় চিকিৎসার। উল্লিখিত ছয় ডাক্তার মানুষের শরীরকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে শক্তি জোগায় এবং স্বক্রিয় রাখে।
এই ছয় ডাক্তার কীভাবে আমাদের রক্ষা করে তা জেনে নিন।

সূর্যোদয়ের কিরণ
যা ভিটামিন ডি-এর আধার শুধুমাত্র রোদ থেকে আসে, খাদ্যের মাধ্যমে এই ভিটামিন যা পাওয়া যায় তা খুবই সামান্য। ভিটামিন ডি-এর অনুপস্থিতিতে শরীর ক্যালসিয়াম গ্রহণ করতে পারে না, রক্তে ক্যালসিয়ামের প্রয়োজনীয় মাত্রার লেবেল থেকে কমে গেলে হাড় ও দাঁত হতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্যালসিয়াম ছিনিয়ে নিয়ে শরীরে এর অভাব পূরণ করে। যার ফলে হাড় ক্ষয়, পাইরিয়া, রিকেট, মাংসপেশির দুর্বলতা এবং হাড় ক্ষয় হওয়া ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হতে হয়, আর অস্টিওপরোসিস রোগের চিকিৎসা খুবই ধীরালয় তা কি না রোগকে আপন করে নেওয়ার মতো অবস্থা। এছাড়া হাড় এবং দাঁত গঠন করতে সাহায্য করে ক্যালসিয়াম এবং ফসফরাস বিপাক হতে সাহায্য করে। প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ মিনিট মাথার পেছনের দিকে ভোরের সূর্যোদয়ের কিরণ লাগালে তা থেকে যে ডি ভিটামিন পাওয়া যাবে তা শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম গ্রহণ করার জন্য যথেষ্ট। সেই হিসাবে সূর্যোদয়ের কিরণকে ডাক্তার হিসেবে গণ্য করা যায়।
ভোরের উন্মুক্ত বাতাস
শরীরের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় উপাদান বিদ্যমান যা দিনের বেলার বাতাসে পাওয়া যাবে না, ভোরের বাতাসে নির্মলতা থাকে, তা ফুসফুসে পৌঁছে শরীরের সকল ¯œায়ুর সংযোগ ও মস্তিষ্কে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়িয়ে শরীরকে কর্মপোযোগী করে তোলে, যা আমাদের কোষগুলো সজীব হয়ে প্রাণচঞ্চলতা ফিরিয়ে দেয়, ফুসফুসে নির্মল বাতাস প্রবেশের মাধ্যমে শরীরে ল্যাকটিভ অ্যাসিড তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করে এবং নির্মল বাতাস শরীরে শ্বাসযন্ত্র বিরামহীন শ্বাস নেওয়ার মতো উপযুক্ত করে তোলে।
ঙীুমবহ (ঙ২) শরীরের জন্য প্রাণ, এটা ছাড়া কোনো প্রাণী বাঁচতে পারে না। প্রতিটি মুর্হূতে আমরা নিঃশ্বাসের সাথে যে বাতাস গ্রহণ করি, তার মধ্যে (ঙ২)-এর পরিমাণ মাত্র ২০ শতাংশ, যার দ্বারা প্রতিনিয়ত শরীরের টক্সিন ভরা রক্ত শোধন করে বর্জ হিসেবে ঈঙ২ কার্বন-ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করি। গবেষণায় দেখা গেছে, ভোরের ঠা-া বাতাসে (ঙ২)  ঘনতর হয়ে ঙ৩ (ঙুড়হব) ওজনে আকার ধারণ করে, যা রক্ত শোধন করার ক্ষমতা (ঙ২)  থেকে অনেক গুণ বেশি। অথচ সূর্যের কিরণ আসলেই এই ওজন ঙ৩ আবার ঙীুমবহ (ঙ২)-এ রূপান্তরিত হয়ে যায়। রক্ত শোধণ করার ডাক্তার ঙ৩ (ঙুড়হব) শুধুমাত্র ভোরে গাছপালা বেষ্টিত খোলা মাঠে দেখা যাবে। বিজ্ঞানীগণ গবেষণা করে দেখেছেন যে সূর্য উঠার আগ মুর্হূতে বাতাস সবচেয়ে নির্মল, এই সময় বাতাস ওজন স্তরে থাকে, যা শরীরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে, সেই সাথে গাছের সামনের বাতাস খুবই উপকারী, যা শরীরের যাবতীয় সমস্যা থেকে দূরে রাখতে কার্যকর। জেনে রাখা ভালো, মানুষের নিঃশ্বাস গাছের খাদ্য আর গাছের নিঃশ্বাস মানুষের খাদ্য। সেক্ষেত্রে নিমগাছ হচ্ছে উত্তম।
যারা ভোরে বিছানায় থাকবেন তারা ভোরের মৃদুমন্দ বাতাসরূপী ডাক্তারের সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন। এজন্য ভোরের উন্মুক্ত বাতাস আমাদের শরীরে একজন ডাক্তারের ন্যায় কাজ করে, যা অন্য কোনো খাদ্যে বা ওষুধে নেই।

বিশুদ্ধ পানি
মানব দেহের ওজনের ৭২ শতাংশ পানি, ৮ শতাংশ নানা রকম ভিটামিন এবং মিনারেল। বাকি ২০ শতাংশ হাড় এবং মাংসপেশি। দেহের অভ্যন্তরে সকল প্রকার রাসায়নিক ক্রিয়া-বিক্রিয়া, হজম, পুষ্টি গ্রহণ, বর্জ্য ও বিষ ত্যাগ প্রভৃতি পানি দ্বারা সংঘটিত হয়। অতএব, শরীরের পানির প্রভাব অপরিসীম। পানি যেমন রোগ বহন করতে পারে, তেমনি রোগ তাড়িয়েও দিতে পারে। তাই বলা হয়, পানির আরেক নাম জীবন।
প্রতিদিন আড়াই থেকে ৩ লিটার পানি পান করতে হবে অবিরামভাবে, শুধু ভোরবেলা প্রথম পানি পানে দু-তিন গ্লাস পানি পান ছাড়া সারাদিন অল্প অল্প করে প্রতি ঘণ্টায় পানি পান করতে হবে। যেভাবে গাড়িতে ফুয়েল যায় ঠিক সেভাবেই পানি পান করতে হবে, কখনোই কিডনির ওপর চাপ তৈরি করা যাবে না।
শরীরের সুস্থতা নির্ভর করে নির্ধারিত মাত্রায় নানারকম পানিতে দ্রব্যনীয় রাসায়নিক দ্রব্য সমৃদ্ধ তরল পদার্থের ওপর। এক্ষেত্রে পানি একটা বিরাট ভূমিকা পালন করে। সব সময়ের জন্য শরীর হাইড্রেট রাখতে নিয়মিত বিশুদ্ধ পানি পান করা সর্বোত্তম। শরীরের পরিপাক প্রক্রিয়া, হজম, চর্মের, সজীবতা রক্ষা, গর্ভবতী মায়ের সন্তানের প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগান ও নাক এবং চোখের আর্দ্রতা পানি নিশ্চিত করে।
নিয়মিত বিশুদ্ধ পানি পানে শরীর থাকবে সজীব এবং সতেজ শরীরে টিস্যুগুলো সক্রিয় হয়ে শরীরের তাপমাত্রা সঠিক রেখে পুষ্টির মাত্রা নিয়ন্ত্রণ, শরীরের সংযোগগুলোকে পরিচালনে সহায়তা প্রদান করে, যা একজন ডাক্তারের ন্যায় কাজ করবে। শরীরের টক্সিন ধুয়ে ফেলতে পানির মতো পারদর্শী আর কিছুই নেই।
বিশুদ্ধ পানি গ্রহণের জন্য বলার কারণ হচ্ছেÑ পানি হতে হবে প্রাকৃতিক, কোনোভাবেই ফ্রিজের ঠা-া কিংবা রঙিন নয়।

ব্যায়াম
আমরা প্রতিদিন যা খাই তা পরিপাকের জন্য এবং শরীরে যাতে কোনো মেদ না জমে শরীরের রক্ত কোনোভাবে যাতে জমাট না বাঁধে এবং রক্ত ও মাংসপেশির গতি মন্থর না হয় সেজন্য প্রতিদিন ব্যায়াম করা প্রয়োজন। ব্যায়ামের মধ্যে হাঁটা অতিউত্তম। তাছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী নানান কলাকৌশল করা যেতে পারে। নিয়মিত ব্যায়াম করলে শরীরের খারাপ কোলেস্ট্ররাল (এলডিএল) কমে, আর ভালো কোলেস্ট্ররাল (এইচডিএল) বাড়ে। তা শরীরের পিএইচ মাত্রা ঠিক রাখতে অত্যন্ত কার্যকর।
ব্যায়াম আমাদের লসিকা গ্রন্থিকে ফিল্টারে সাহায্য করে, যার দরুণ শরীরের রক্ত ধমনী দিয়ে সঠিক মাত্রায় রক্ত চলাচল করে এবং হার্টের পাম্প করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। নানান বিপাকীয় কাজে ব্যায়ামের গুরুত্ব অপরিসীম। তাছাড়া হাড়ের ভর ও ঘনত্ব বাড়াতে সাহায্য করে, যা অস্টিওপরোসিস রোগ প্রতিরোধে সহায়ক।
শরীরের স্থূলতা শরীরের ক্ষয় ও মন্থর করার প্রথম ধাপ আর ব্যায়াম শরীরের স্থূলতা রোধ করতে সাহায্য করে।

পরিমিত আহার
যে খাদ্য আমার শরীরকে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে এবং পথ্য হিসেবে শরীরে কাজ করতে পারেÑ এটাই পরিমিত আহার। আহারের প্রধানতম বিষয় হচ্ছে, দেহের শক্তি অক্ষুণœ রেখে শরীরকে গতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান গ্রহণ করা। শরীরের চাহিদানুযায়ী খাদ্য গ্রহণই পরিমিত আহার। প্রকৃতির নিয়ম হচ্ছে ক্ষুধা লাগলেই খাওয়া, নয় তো কোনো আহার নয়। আমরা প্রকৃতির এই নিয়মের মধ্যেই থাকি না,  যখন যা ভালো লাগে খেয়ে ফেলি। শরীর গ্রহণ করার উপযোগী থাকুক বা না থাকুক। তখন শরীরের কর্মপ্রক্রিয়ায় যথেষ্ট ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়, আর এই বিক্রিয়াই অসুখের সূচনা। তাই পরিমিত আহারই শরীরকে সুস্থ রাখার নিশ্চয়তা প্রদান করে। আহারের মধ্যে স্বাদ বহনকারী উপাদান মিষ্টি, টক, নোনতা, তিতা, কষা ও ঝালÑ সব স্বাদই প্রতিদিন গ্রহণ কার দরকার। সেই সাথে ভিটামিন মিনারেলগুলো পরিপূর্ণভাবে শরীরে গ্রহণের ব্যবস্থা করা। তাই পরিমিত আহার পথ্য হিসেবে গ্রহণ সুস্থতার নিশ্চয়তা।

ঘুম
আজকের ব্যস্ত সময়ে ঘুম এক দুষ্পাপ্য বিষয়, যখন ঘুম দরকার তখন ঘুমাতে পারি না আর যখন ঘুমতে যাব তখন ঘুম আসে না, সেই সময় ওষুধের নির্ভরতায় ঘুমের নানান উপায় জোগাড় করতে হয়। অথচ প্রাণীর সহজাত প্রবৃত্তি হলো ঘুমাবে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত যতক্ষণ না তার শরীরের ক্লান্তি দূর না হয়। ঘুম আমার শরীরে অতীব প্রয়োজনীয় বিষয়, কতক্ষণ ঘুম হবে, কোন সময় ঘুমানো দরকারÑ সব কিছুই প্রকৃতির একটা মাপকাঠি আছে, যা পালনে সুস্বাস্থ্য আর ব্যাঘাতে অসুস্থতা।
ঘুম শরীরের জন্য অত্যাবশ্যক বিশ্রাম। যেটা দৈনন্দিন কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে সারাদিন ঘুম ঘুম ভাব এবং ক্লান্তি অনুভূত হয়। ঘুম মানুষকে টেনশন মুক্ত করে মস্তিষ্ক ও শরীর শান্ত এবং সজীব রাখে। ঘুমের মাত্রা এবং সময় মানুষে মানুষে ভিন্ন হতে পারে, তবে প্রায় মানুষের ৬-৮ ঘণ্টা ঘুম স্বাভাবিকভাবে দেহ পরিচালনার জন্য যথেষ্ট।
যারা ক্রমাগত অনিদ্রায় ভোগে এবং ঘুমের পিল খায় তাদের দেহে প্রয়োজনীয় ভিটামিন (বি কমপ্লেক্স, সি এবং ডি ভিটামিন) এবং মিনারেল (ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, পটাসিয়াম এবং জিঙ্ক)-এর ঘাটতি দেখা দেয়, এবং ঘুম আসার ম্যাকানিজমের কার্যকারিতা হ্রাস পায়। ফলে দেহের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। ঘুম আমাদের শরীরের সকল টিস্যুকে মেরামত করে, নার্ভের ক্লান্তি দূর করে, খাদ্য হজমে সহয়তা করে, রক্ত চলাচলের মাত্রা ঠিক করে, মানসিক প্রশান্তি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে, চামড়াগুলোকে সতেজ করে, ঠা-া ও সংক্রামক কোনো কিছু থাকলে তা নির্মূল করে সর্বোপরি আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে পুনর্নির্মাণ করে। বয়স ভেদে মানুষের ঘুমের চাহিদা ভিন্ন থাকে, সেই সাথে ঘুম আসার আদর্শিক সময় হচ্ছে রাত ৮ থেকে ৯টার মধ্যে।
তাই ঘুমের জন্য সঠিক সময় এবং নিশ্চিন্তে ঘুম সুস্থতার আরেক দিক। ঘুম না এলেও প্রতিরাতে নির্ধারিত সময়ে ঘুমের পরিবেশ তৈরি করে বিছানায় যেতে হবে এবং ভোরে নির্ধারিত সময়ে বিছানা ছেড়ে উঠতে হবে। এটা করতে থাকলে কিছুদিনের মধ্যেই স্বাভাবিক ঘুম হবে। মনে রাখতে হবে, শেষ রাতের ৪ ঘণ্টা অপেক্ষা মধ্যরাতের পূর্বে ২ ঘণ্টা গভীর ঘুম দেহের জন্য                    অত্যন্ত উপকারী। প্রথম রাতে অফিসিয়াল কাজ কিংবা টিভি               দেখে মধ্যরাতের পরে ঘুমাতে যাওয়ায় যারা অভ্যস্ত তাদের                 দেহ সুস্থ থাকে না।
এই ছয় ডাক্তার প্রতিদিন অক্লান্তভাবে আমাদের রক্ষা করে চলছে, যার যে ডাক্তারের অভাব সে সেভাবে অসুস্থ।

Category:

Leave a Reply