আমার গর্ব – আমার অহংকার

[মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে খোলা চিঠি]

PM2 সুপ্রিয় সহপাঠী বন্ধু হাসিনা,  বিশিষ্ট জননেত্রী এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নাম ধরে ডাকার আর তুমি করে সম্বোধন করার দুঃসাহস পেলাম শুধুমাত্র তুমি আমার কৈশোর-তরুণ জীবনের সহপাঠী বলে। তোমার হয়তো আমাকে মনে না রাখারই কথা। এক সমুদ্র শোক বুকে ধরে রেখে বাংলাদেশের কোটি জনতার সুখ-দুঃখের সমব্যথী হয়ে যে মানুষটার দিন কাটে, তার তো এতজনকে মনে রাখা সম্ভব হয় না। তবু তো প্রতিটি বিশেষ দিনের শুভেচ্ছা কার্ড আর প্রতি বছরে ইফতার পার্টিতে আমাদের আমন্ত্রণ জানাতে তোমার ভুল হয় না। এটাই আমাদের পরম পাওয়া। সেই ছিয়ানব্বই থেকে আজ অবধি যত কার্ড এসেছে, আমার নামে সব আমি সযতেœ রেখে দিয়েছি।
১৯৬৫ সালে এসএসসি পাস করার পর Govt. Intermediate Girl’s College
(বর্তমান বদরুননেসা কলেজ)-এ ভর্তি হলাম। তোমাকে প্রথম দেখলাম জুবাইদা গুলশান আরা আপার ক্লাসে; সাদা সালোয়ার-কামিজ-ওড়না পরা, লম্বা চুলের বিনুনী গাঁথা, উজ্জ্বল চোখের চাহনি ভরা মায়াবী মুখের একটি মেয়েকে। জানলাম মেয়েটি শেখ মুজিবুর রহমানের মেয়ে। এত বড় জননেতার মেয়ে; কিন্তু তার চাল-চলন, কথা-বার্তা, ব্যবহারে অহংকারের লেশমাত্র নেই। আজও এর কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান বটে, তুমি হাসিনা।
এরপর তোমার সাথে তেমন ঘনিষ্ঠতা না হলেও আর দশটা সহপাঠীর মতো মাঝে মধ্যে কথাবার্তা হতো। বন্ধুরা ক’জন ক’জন মিলে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে গেলাম। একসাথে বসতাম, একসাথে বেড়াতাম, তুমিও তোমার স্কুলের বন্ধুদের সাথে দলে ভিড়ে গেলে। তোমাকে আমার ভালো লাগত তোমার সাহসিকতার জন্য। পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে তুমি নির্ভীকচিত্তে প্রতিবাদ করতে তোমার বক্তব্যের মাধ্যমে। ধন্য তোমার সাহস, ধন্য তোমার মনোবল। এই সাহস আর মনোবল তোমাকে এতদূর এগিয়ে নিয়ে এসেছে। আমি, জেসমিন, জ্যোতি, কাজী রোজী, জাহানারা নিশি, শেলী, হাসি, আনু আরও অনেকে অবাক হয়ে তোমার বক্তব্য শুনতাম আর আমাদের মনেও ওদের প্রতি বিদ্বেষ জন্মাত।
সাতষট্টিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হলাম। শুনলাম তুমিও আমাদের Department-এ ভর্তি হয়েছো। পাকিস্তান থেকে বেবী মওদুদ এসে ভর্তি হলো। প্রথম দিন থেকে ওর মৃত্যুর দিন পর্যন্ত এই বন্ধুত্ব অটুট ছিল। একবার আমি কলকাতা গেলাম বেবীর সাথে ও ডাক্তার দেখাবে। আমরা পাঁচ দিন ছিলাম। সারারাত কত গল্প করেছি। বেবী ওর নিজের কথার চেয়ে হাসিনার গল্প করতে পছন্দ করত। কত যে কথা- আমি অবাক হয়ে শুনতাম।
কলেজ জীবনের একটি কথা মনে পড়ে গেলে। একদিনের ঘটনা, যা আমার কাছে চির স্মরণীয় হয়ে আছে। সেদিন ক্লাস শেষেÑ বাসায় ফিরব। ঢাকা মেডিকেলের গেটে দাঁড়িয়ে রিকশা খুঁজছি, তুমি কলেজ থেকে বেরিয়ে বাড়ির দিকে যাওয়ার পথে আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলে,
– বাসায় যাবি? বাসা কোথায়?
– মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডে।
– আয়, তোকে নামিয়ে দেব। আজকে গাড়ি আছে।
PM3আমি তোমার গাড়িতে উঠলাম। গাড়িতে বসে আমরা কি গল্প করেছিলাম আজ আর মনে নেই। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসার গেটে তুমি নেমে পড়লে। ড্রাইভারকে বললেÑ উনাকে উনার বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসেন। আমি আপত্তি করলাম তুমি শুনলে না। গেটটা বড় করে খোলা হয়েছিল, আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দেখলাম- বারান্দায় আমার প্রিয় নেতা, যার আদর্শকে আমি মনে-প্রাণে লালন করি, সেই শেখ মুজিবুর রহমান দাঁড়িয়ে আছেন- সাধারণ একটা সাদা পাঞ্জাবি গায়ে, পরনে চেক লুঙ্গি, চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা, হাতে চুরুট। আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। যাকে চাক্ষুষ দেখার জন্য অনেকদিন ধরে মনের যে আকাক্সক্ষাকে লালন করে আসছিলাম, আজ সেই মানুষটি আমার সামনে। খুব ইচ্ছে করছিল দৌড়ে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করি। কিন্তু ভয়মিশ্রিত একটা লজ্জা আমাকে নামতে দিল না। চোখে দেখেই আমার জীবন ধন্য হয়ে গেল। আজ ৫৩ বছর পরও চোখ বুজলে আমি এ দৃশ্য দেখি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে এত কাছে থেকে আমি আর কোনোদিনই দেখতে পাইনি।
বন্ধু হাসিনা, এতসব কথা তোমার মনে না থাকারই কথা। কিন্তু আমি যে এমন সব ছোট ছোট স্মৃতিকে মনের কোঠায় লুকিয়ে রেখেছি। আজ সেই স্মৃতির দুয়ার খুলে দিয়েছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছর। হঠাৎ করেই তোমার বিয়ে হলো। বঙ্গবন্ধু তখন কারাগারে। বিয়ের পর তুমি দেশের বাইরে চলে গেলে। আমরা তোমাকে চোখে হারাতাম। আমরা সাবসিডিয়ারি পরীক্ষা দিলাম। অনার্স ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা চলাকালীন সময় মুক্তির আন্দোলনে দেশ গর্জে উঠল। আমরা পরীক্ষা বয়কট করলাম। তারপরের ইতিহাস তো তোমার জানা। বাংলাদেশের এ ইতিহাস লিখতে গেলে হাজার পৃষ্ঠাতেও কুলাবে না। নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর লাখো শহিদের বুকের রক্ত আর মা-বোনদের মান-সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেলাম, নিজেদের পতাকা পেলাম আর পেলাম প্রাণের জাতীয় সংগীত- ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’ সারাবাংলা তখন শুধুই ধ্বংসস্তূপ। জাতির পিতা দেশে ফিরলেন। হানাদার বাহিনীর অত্যাচারে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তোলার সংগ্রামে নেমে পড়লেন। কিন্তু ঘরের শত্রু বিভীষণেরা তা হতে দিল না। জাতির পিতা যাদের এত বিশ্বাস করতেন, সেই বিশ্বাসঘাতকের দল গোপন ষড়যন্ত্র করে এমন ফেরেশতার মতো মানুষটিকে সপরিবারে এমনকি আত্মীয়-স্বজনসহ নিষ্ঠুরভাবে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিল। এমন জঘন্যতম অপরাধ বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বকে হতবাক করে দিল। এমন বর্বর ঘটনার জন্য পঁচাত্তরের কালরাতের সেই নরপিশাচরা পৃথিবীর বুকে যুগে যুগে নিকৃষ্ট-ঘৃণিত জীব হিসেবে পরিচিত হয়ে থাকবে।
যেদিন আমার মা মারা যান সেদিন আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল, আর সাথে সাথে তোমার কথা বেশি করে মনে পড়ছিল। আমার শুধু মা মারা গেছেন, তাই আমার এত কষ্ট হচ্ছে আর হাসিনা তো একই সাথে মা-বাবা-ভাই-ভাবীকে হারিয়েছে। এমন কী ছোট্ট ভাইটা, যে মার কাছে যেতে চেয়েছিল তাকেও নরপশুরা রেহাই দেয়নি। দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য তুমি কত বিরাট কষ্টকে বুকে চেপে রেখে হাসিমুখে বাংলাদেশের উন্নতির লক্ষ্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছ।
তুমি দেশে ফিরে এলে। নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে জীবন বাজি রেখে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করলে। জাতির পিতার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে ডুবে যাওয়া নৌকার হাল ধরলে। বাংলার মানুষ হাঁপ ছেড়ে বাঁচল।
আবার অনেকদিন পর তোমাকে দেখলাম বদরুননেসা কলেজের (আদি Intermediate Girl’s College) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে। কলেজে কি সাজসাজ রব। এই কলেজের ছাত্রী আজকে দেশের প্রধানমন্ত্রী, তার কলেজে এসেছেন প্রধান অতিথি হয়ে। আমাদের ব্যাচের মেয়েদের কি অহংকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের সহপাঠী বলে। সেইদিন খুব একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। প্রতিটি ছাত্রীর বুকে ব্যাজ লাগানো ছিল- তাতে তার নাম ও কোন বছরের ব্যাজ লিখা ছিল। তুমি সবার সাথে হাত মিলাচ্ছিলে, কাউকে জড়িয়ে ধরছিলেÑ যেন সেই পুরনো দিনে ফিরে গেছ। আমাকে দেখে আমার নাম ধরে ডেকে হাত ধরলে। আমি তো আনন্দে আত্মহারা। এত বছর পরÑ প্রধানমন্ত্রী হয়েও তুমি আমাকে চিনতে পেরেছ, আমার নামও মনে রেখেছ। পরে বুঝলাম ব্যাজের নাম দেখে দেখে তুমি সবার সাথে আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছ। অবশ্য কয়েকজন যারা তোমার ঘনিষ্ঠ ছিল, তাদের তুমি দেখেই চিনেছ। তোমার এ বিষয়টা প্রশংসনীয়। এ ঘটনা নিয়ে বান্ধবীরা আমাকে নিয়ে খুব মজা করেছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বহুদিন পর আমরা সতীর্থরা একত্রিত হলাম। ‘আহা! কি আনন্দ আকাশে-বাতাসে’- সারাটা দিন খুবই মজা আর আনন্দ হলো। এরপর থেকে আমরা মাসে-দু’মাসে একেকজনের বাসায় মিলিত হতে লাগলাম। তুমিও একদিন আমাদের আমন্ত্রণ জানালে। গণভবনে আমরা প্রায় সারাটা দিন কাটালাম। বেবী মওদুদ আর আমার ওপর দায়িত্ব পড়েছিল তোমার জন্য উপহার কেনার। বেবীর বুদ্ধিতে পিতলের পানের বাটা কেনা হলো। রাজু আর আমি তোমার হাতে উপহারটি তুলে দিলাম। নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হয়েছিল।
মাঝে বাংলাদেশে অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে গেল। অবশেষে বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা তোমাকে আবার তোমার জায়গায় ফিরিয়ে আনলো। তুমি তোমার সতীর্থদের আবার কাছে ডাকার সুযোগ পেলে। এমন প্রতি বছর রোজার সময় ইফতার পার্টিতে দাওয়াত করো। বছরের বিশেষ বিশেষ দিনের শুভেচ্ছা কার্ড পাঠাও। সতীর্থদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকো। শত ব্যস্ততার মাঝেও সতীর্থদের মনে রেখেছো। এই তো সেদিনও- গত বছরের ইফতার পার্টিতে পেয়ারু, আমি আর মমতাজমহল দাঁড়িয়ে ছিলাম। তুমি আমাদের দেখে খুশিতে ঝলমল করে উঠলে আর ক্যামেরাম্যানদের বললে আমাদের সাথে তোমার ছবি তুলতে।
যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান তুমি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ন্যায়-নীতি, আদর্শ ও মানুষের প্রতি মমত্ববোধ তোমার রক্তে মিশে আছে। বিচারের বাণী আজ আর নিভৃতে কাঁদে না। সন্ত্রাসবাদী আর দুর্নীতিবাজদের তুমি কঠোর হস্তে দমন করেছো। বাংলার মানুষ আজ শান্তিতে দু’মুঠো ভাত খেতে পারছে। তোমার নিরহংকার জীবন কল্যাণময় হোক। তোমার জন্মদিনে আল্লাহর কাছে এই প্রার্থনা করি, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন তোমাকে সুস্থ ও নীরোগ জীবন দান করেন এবং দীর্ঘজীবী করেন।

ইতি তোমার বন্ধু
কানিজ হায়দার (কণা)­

Category:

Leave a Reply