আলবদর কমান্ডার আজাহারের ফাঁসির আদেশ

Posted on by 0 comment

37উত্তরণ প্রতিবেদন : একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় জামাতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে ৫টি অভিযোগ প্রমাণ হওয়ায় তাকে ফাঁসির দ-াদেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। গত ৩০ ডিসেম্বর বেলা সোয়া ১২টায় জনাকীর্ণ আদালতে আসামির উপস্থিতিতে ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় দেন। ১৫৮ পৃষ্ঠার রায়ের সার-সংক্ষেপ পড়ে শোনান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেনÑ বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক। আজহারুলের বিরুদ্ধে আনিত ৬টি অভিযোগের মধ্যে ৫টি প্রমাণিত হয়। শুধু এক নম্বর অভিযোগটি প্রমাণিত হয়নি। এর আগে সকাল ৯টায় আজহারকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। এরপর ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় রাখা হয় তাকে। পরে সেখান থেকে তাকে ট্রাইব্যুনালে আসামির কাঠগড়ায় নেওয়া হয়।
গত বছরের ১২ নভেম্বর যুদ্ধাপরাধের ছয় ঘটনায় অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে আজহারের বিচার শুরু হয়। এর আগে ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল এটিএম আজহারের যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু হয়। ওই বছর ২২ আগস্ট মগবাজারের বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় তাকে। তদন্ত শেষে গত বছরের ১৮ জুলাই আজহারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। এরপর নভেম্বরে অভিযোগ গঠনের পর ২৬ ডিসেম্বর শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) এম ইদ্রিস আলীসহ রাষ্ট্রপক্ষে ১৯ জন সাক্ষ্য দেন। তবে সপ্তম সাক্ষী আমিনুল ইসলামকে বৈরী ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া আজহারের যুদ্ধাপরাধের একজন ‘ভিকটিম’ ১৪ নম্বর সাক্ষী হিসেবে ক্যামেরা ট্রায়ালে জবানবন্দি দেন। চলতি বছর ৩ ও ৪ আগস্ট আজহারের পক্ষে একমাত্র সাফাই সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন আনোয়ারুল হক। এরপর দুপক্ষ দীর্ঘ সময়ে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে ট্রাইব্যুনালে। আজহারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালে আজহার রংপুরের কারমাইকেল কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র এবং জামাতে ইসলামীর তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের রংপুর শাখার সভাপতি ছিলেন। জেলার আলবদর বাহিনীরও নেতৃত্বে ছিলেন তিনি।
প্রথম অভিযোগ : ২৪ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিলের মধ্যে দুর্গাদাস অধিকারী এবং অন্য সাতজনকে অপহরণ, আটক ও নির্যাতনের পর হত্যা।
দ্বিতীয় অভিযোগ : ১৬ এপ্রিল তার নিজ এলাকা রংপুরের বদরগঞ্জ থানার ধাপপাড়ায় ১৫ নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালিকে গুলি করে হত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ। এ ঘটনায় পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে আজহার অংশ নেন।
তৃতীয় অভিযোগ : ১৭ এপ্রিল রংপুরের বদরগঞ্জের ঝাড়–য়ারবিল এলাকায় ১ হাজার ২০০-র বেশি নিরীহ লোক ধরে নিয়ে গণহত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করা হয়, যাদের মধ্যে ৩৬৫ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে।
চতুর্থ অভিযোগ : ৩০ এপ্রিল রংপুর কারমাইকেল কলেজের শিক্ষক কালাচাঁন রায়, সুনীল বরণ চক্রবর্তী, রামকৃষ্ণ অধিকারী, চিত্তরঞ্জন রায় ও কালাচাঁন রায়ের স্ত্রী মঞ্জুশ্রী রায়কে বাসা থেকে অপহরণের পর দমদমা সেতুর কাছে নিয়ে হত্যা করা হয়।
পঞ্চম অভিযোগ : ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে রংপুর শহর ও বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মহিলাদের ধরে এনে টাউন হলে আটকে রেখে ধর্ষণসহ শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। এসব ঘটনার সঙ্গে আজহার জড়িত ছিলেন।
ষষ্ঠ অভিযোগ : নভেম্বরের মাঝামাঝি রংপুর শহরের গুপ্তপাড়ায় একজনকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। ১ ডিসেম্বর রংপুর শহরের বেতপট্টি থেকে আজহারের নেতৃত্বে একজনকে অপহরণ করে রংপুর কলেজের মুসলিম ছাত্রাবাসে নিয়ে আটক রেখে শারীরিক নির্যাতন ও গুরুতর জখম করা হয়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এটি পঞ্চদশ রায়।
ধর্ষণসহ ৭টি অভিযোগে যুদ্ধাপরাধী কায়সারের ফাঁসি
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জাতীয় পার্টির সাবেক কৃষি প্রতিমন্ত্রী কায়সার বাহিনীর প্রধান সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ-ের আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৬টি অভিযোগের মধ্যে হত্যা-গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, আটক, মুক্তিপণ আদায়, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠন এবং ষড়যন্ত্রের ১৪টি প্রমাণিত হয়। এর মধ্যে ৭টি অভিযোগে ফাঁসি, ৪টিতে আমৃত্যু কারাদ-, ৩টিতে ২২ বছরের কারাদ- ও ২টি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস দেওয়া হয়। গত ২৩ ডিসেম্বর জনাকীর্ণ আদালতে পিনপতন নীরবতার মধ্যে চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শাহীনের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ আদেশ প্রদান করেছেন। ট্রাইব্যুনালে অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলাম।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এই প্রথম ধর্ষণের অভিযোগে মৃত্যুদ- প্রদান করলেন ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনাল তার রায়ে অভিযোগ ৩, ৫, ৬, ৮, ১০, ১২ ও ১৬ এই ৭টি অভিযোগে ফাঁসি, অভিযোগ ১, ৯, ১৩, ১৪ এই ৪টিতে আমৃত্যু কারাদ-, অভিযোগ-২-এ ১০ বছর, অভিযোগ-৭-এ সাত বছর ও অভিযোগ-১১-তে পাঁচ বছর করে মোট ২২ বছরের কারাদ- প্রদান করা হয়। অভিযোগ ৪ ও ১৫ প্রমাণিত না হওয়ায় আসামিকে অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ-১১ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে পাঁচ বছরের কারাদ- দেওয়া হয়। এর আগের দিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ রায় ঘোষণার জন্য ২৩ ডিসেম্বর নির্ধারণ করেন। ১ হাজার ৬৬১ প্যারার ৪৮৪ পৃষ্ঠার রায়ের সংক্ষিপ্তসার পাঠ করেন ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান।
২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর এ পর্যন্ত ১৩টি মামলায় ১৪ জনের বিরুদ্ধে মৃত্যুদ-সহ বিভিন্ন দ- প্রদান করেছেন ট্রাইব্যুনাল। সৈয়দ কায়সারের মামলার রায়টি ট্রাইব্যুনালের ১৪তম রায়। আর ট্রাইব্যুনাল-২-এ এটি হবে অষ্টম রায়। ট্রাইব্যুনাল-১ এর আগে রায় প্রদান করেছেন ৬টি। বর্তমান দুটি ট্রাইব্যুনালে আরও ৩টি মামলা রায় ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজাহারুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির সাবেক নেতা আবদুল জব্বার ও জামাতে ইসলামীর নায়েবে আমির আবদুস সুবহান।
মাহিদুর ও চুটুর বিচার শুরু ১২ জানুয়ারি
গত ১১ ডিসেম্বর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাহিদুর রহমান ও আফসার হোসেন চুটুর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে ট্রাইব্যুনাল অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম শুরু করতে আগামী ১২ জানুয়ারি দিন ধার্য করেন। চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ অভিযোগ গঠন করে এ আদেশ দেন। অভিযুক্ত মাহিদুর রহমান ও আফসার হোসেন চুটুর বিরুদ্ধে গত ১৬ নভেম্বর অনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছে প্রসিকিউশন। এরপর গত ২৪ নভেম্বর তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউটর সাহিদুর রহমান এ অভিযোগ দাখিল করেন। মাহিদুর ও চুটুর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত হত্যা ও গণহত্যার সুনির্দিষ্ট ৩টি অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী রয়েছেন ২৪ জন। গত ২৭ অক্টোবর তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেন ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।
অপেক্ষমাণ সুবহানের ও জব্বারের মামলার রায়
মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার জামাতে ইসলামীর নায়েবে আমীর আবদুস সুবহানের মামলার রায় যে কোনোদিন ঘোষণা করা হবে। গত ৩ ডিসেম্বর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ মামলার রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রেখে দেন। সুবহানের বিরুদ্ধে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর হত্যা, গণহত্যা, আটক, নির্যাতন, লুণ্ঠনসহ ৯টি সুনির্দিষ্ট ঘটনার ভিত্তিতে অভিযোগ গঠন করা হয়। ট্রাইব্যুনালের আদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সুবহানকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর আগে গত ৩০ নভেম্বর আসামিপক্ষ তাদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন। গত ৫ নভেম্বর প্রসিকিউশন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেন। এরপর ১৭ নভেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন। আরেক এক যুদ্ধপরাধী রাজাকার কমান্ডার আবদুল জব্বারের বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়েছে। গত ৩ ডিসেম্বর তার বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায় ঘোষণার জন্য সিএভি রাখা হয়েছে। যে কোনোদিন এ মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্য বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ আদেশ প্রদান করেন। ট্রাইব্যুনালে অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক। জব্বারের মামলা নিয়ে বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২-এ মোট ৩টি মামলা সিএভি রাখা হলো।
ড. কামালের জামাতা বার্গম্যান আদালত অবমাননার দায়ে সাজা ভোগ করলেন
39ডেভিড বার্গম্যান মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের প্রক্রিয়া নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার দায়ে বাংলাদেশে বসবাসরত ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানকে কারাদ- দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। গত ২ ডিসেম্বর কার্যক্রম চলাকালীন তিনি কারাদ- হিসেবে এজলাসে এই সাজা ভোগ করেন। একই সঙ্গে বার্গম্যানকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে সাত দিনের কারাদ-াদেশ দেওয়া হয়। বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ এই আদেশ দেন। আদেশে বলা হয়, ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম চলা পর্যন্ত ডেভিড বার্গম্যান এই কারাদ- ভোগ করবেন। দুপুর সোয়া ১২টায় এই আদেশের কয়েক মিনিটের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শেষ হয়। ডেভিড বার্গম্যান ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ-এর বিশেষ প্রতিবেদনের সম্পাদক। তার বিরুদ্ধে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবুল কালাম আজাদ আদালত অবমাননার অভিযোগ আনেন। অভিযোগে বলা হয়, বার্গম্যানের নিজস্ব ব্লগে (বাংলাদেশ ওয়ারক্রাইমস ডট ব্লগস্পট ডট কম) ৩টি লেখায় মুক্তিযুদ্ধকালে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়েছে। লেখাগুলো হলোÑ ‘আযাদ জাজমেন্ট এনালাইসিস ১ : ইন অ্যাবসেন্সিয়া ট্রায়ালস অ্যান্ড ডিফেন্স ইনএডেকোয়েসি’, ‘আযাদ জাজমেন্ট এনালাইসিস ২ : ট্রাইব্যুনাল অ্যাসাম্পশন’ এবং ‘সাঈদী ইনডাইক্টমেন্ট : ১৯৭১ ডেথস’। আইনজীবী মিজান সাঈদ, মোকসেদুল ইসলাম ও এনামুল কবির এই আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন। বার্গম্যানের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান খান। দুই পক্ষে দীর্ঘ শুনানি হয়।  ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণে বলেন, জাতির গর্ব মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে বার্গম্যান যে ন্যায়ভ্রষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন, তা তার মানসিকতা পরীক্ষা করলেই বোঝা যায়। এ জন্য বার্গম্যানের অন্য একটি লেখা পরীক্ষা করেছেন ট্রাইব্যুনাল। ইন্টারন্যাশনাল জাস্টিস ট্রিবিউন সাময়িকীর ২০১২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় তার ‘আইসিটি : ক্যান ওয়ান সাইডেড ট্রায়ালস বি ফেয়ার?’ শিরোনামে ওই নিবন্ধে লেখা হয়েছে, ঢাকার ট্রাইব্যুনাল কাজ করছে একাত্তরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সেই সব ঘটনা নিয়ে, যখন সত্তরের নির্বাচনে জেতার পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তা প্রতিহত করতে বল প্রয়োগ করে। আওয়ামী লীগের সমর্থকরা ছিল পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমানে বাংলাদেশ) বসবাসকারী বাঙালি। পাকিস্তানি সেনা এবং আওয়ামী লীগের সমর্থক ও অন্যদের মধ্যে যুদ্ধ তখন শেষ হয়, যখন ভারতীয় সেনারা বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে এতে হস্তক্ষেপ করে। প্রথমত, লেখার শিরোনামে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে বার্গম্যান ‘একপক্ষীয় বিচার’ বলে উল্লেখ করেছেন। দ্বিতীয়ত, বাঙালির আত্মপরিচয়ের যুদ্ধ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে তিনি ‘পাকিস্তানি সেনা ও আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে যুদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ট্রাইব্যুনাল বলেন, আমরা বিস্মিত এই দেখে যে কীভাবে ও কিসের ভিত্তিতে বিদেশি নাগরিক ডেভিড বার্গম্যান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে এ ধরনের ন্যায়ভ্রষ্ট মানসিকতা নিয়ে বাংলাদেশে কাজ করছেন। এটা আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। তবে এটা আমাদের বিষয় নয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব বিষয়ের আইনগত দিক খতিয়ে দেখতে পারে। এর আগে ২০১১ সালের ১ অক্টোবর নিউ এজ-এ ‘অ্যা ক্রুসিয়াল পিরিয়ড ফর আইসিটি’ শিরোনামের মন্তব্য প্রতিবেদনের জন্য বার্গম্যান, পত্রিকাটির সম্পাদক নুরুল কবির ও প্রকাশক আ স ম শহীদুল্লাহ খানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে রুল দেন ট্রাইব্যুনাল-১। ২০১২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ওই রুল নিষ্পত্তি করে আদেশের সময় ট্রাইব্যুনাল বার্গম্যানকে ‘সর্বোচ্চ সর্তক’ করে বলেন, ওই প্রতিবেদনের একটি অংশ ‘অত্যন্ত অবমাননাকর।’ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের কন্যা ও বার্গম্যানের স্ত্রী সারা হোসেন বলেন, আমরা মনে করি, ট্রাইব্যুনালের এ রায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর চরম আঘাত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল মুক্তবুদ্ধি, মুক্তচিন্তা, বাকস্বাধীনতা ও ভিন্নমত পোষণের অধিকার। কিন্তু এ রায় বাকস্বাধীনতাকে সংরক্ষণ করে না, বরং রুদ্ধ করে। তিনি বলেন, বার্গম্যানের এদেশে বসবাস করা নিয়ে ট্রাইব্যুনাল যেসব মন্তব্য করেছেন, তা এখতিয়ারবহির্ভূত এবং আমরা এতে চরম আপত্তি জানাচ্ছি।

Category:

Leave a Reply