আলবদর প্রধান নিজামীর ফাঁসির আদেশ রাজাকার শিরোমণি গোলাম আযমের মৃত্যু

3উত্তরণ প্রতিবেদন : একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় জামাতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীকে মৃত্যুদ- দিয়েছেন আদালত। গত ২৯ অক্টোবর বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই আদেশ দেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, নিজামীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের মধ্যে ২, ৪, ৬ ও ১৬ নম্বর প্রমাণিত হওয়ায় তাকে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১, ৩, ৭ ও ৮ নম্বর অভিযোগের জন্য তাকে যাবজ্জীবন কারাদ- দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। বাকি ৫, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪ ও ১৫ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় নিজামীকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
এর আগে ২৮ অক্টোবর নিজামীর রায় ঘোষণার জন্য ২৯ অক্টোবর দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। চলতি বছরের ২৪ জুন নিজামীর মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করা হলেও অসুস্থতার জন্য নিজামীকে আদালতে হাজির করতে না পারায় ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা তৃতীয় দফায় অপেক্ষমাণ রাখেন। একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ যুদ্ধাপরাধের ১৬ অভিযোগে বিচার হয়েছে নিজামীর। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ১৫টিই প্রমাণিত হয়েছে দাবি করে আদালতের কাছে সর্বোচ্চ শাস্তি কামনা করে রাষ্ট্রপক্ষ। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের দাবি নিজামীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ গণহত্যা, সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির অভিযোগসহ ১৯৭১ সালের কোনো অপরাধ প্রমাণ করতে পারেনি। অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাবেন বলে আশা করছে তারা। এদিকে, রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ সারাদেশে নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো।
২০১০ সালের ২৫ মার্চ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার পর ৯টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ৩টি ও ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে ৬টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। নিজামী বাদে এখন দুই ট্রাইব্যুনালে পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রইল। এ ছাড়া আপিল বিভাগে জামাত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের করা আপিলের রায়টি অপেক্ষমাণ রয়েছে।
দ্বিতীয় দফায় যুক্তিতর্ক শেষে গত ২৪ মার্চ নিজামীর মামলাটি রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল-১। এর আগে এই ট্রাইব্যুনাল সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর গত বছরের ১৩ নভেম্বর নিজামীর মামলার কার্যক্রম শেষে রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রেখেছিলেন। বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের চাকরির বয়সসীমা পূর্ণ হওয়ায় তিনি গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর অবসর নেন। সেই থেকে চেয়ারম্যানের পদটি শূন্য ছিল। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমকে। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ২৪ জুন রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন। কিন্তু ধার্য দিনে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ নিজামীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করেনি। পরে স্বাস্থ্যগত প্রতিবেদন চেয়ে নিজামীর মামলার রায় ঘোষণা আবারও অপেক্ষমাণ রাখেন  ট্রাইব্যুনাল। নিজামী সুস্থ এই মর্মে প্রতিবেদন আসার প্রায় চার মাস পর ২৯ অক্টোবর রায়ের জন্য দিন ধার্য করা হয়। ২০১২ সালের ২৮ মে নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৬টি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনাল-১ এ তার বিচার শুরু হয়। ওই বছরের ২৬ আগস্ট থেকে এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। তদন্ত কর্মকর্তা আবদুর রাজ্জাক খানসহ এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দেন মোট ২৬ জন। আর নিজামীর পক্ষে তার ছেলে মো. নাজিবুর রহমানসহ মোট চারজন সাফাই সাক্ষ্য দেন। মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, লুট, ধর্ষণ, উসকানি ও সহায়তা, পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার ১৬টি অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। যদিও রাষ্ট্রপক্ষ ১৫টি অভিযোগে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেছে  ট্রাইব্যুনালে।
রাজাকার শিরোমণি গোলাম আযমের মৃত্যু
বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী ও গণহত্যার মূল হোতা গোলাম আযম গত ২৩ অক্টোবর রাতে মারা যান। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাজা খাটা অবস্থায় মারা গেলেন তিনি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ গোলাম আযমকে ৯০ বছরের সাজা দেন। রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, তার অপরাধের মাত্রা ছিল মৃত্যুদ-যোগ্য। কিন্তু বয়স ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে তাকে এই সাজা দেওয়া হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। ২০১২ সালের ১১ জানুয়ারি গ্রেফতারের পর মাত্র কয়েক ঘণ্টা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন গোলাম আযম। ওইদিনই তাকে বিএসএমএমইউতে এনে কারা তত্ত্বাবধানে ভর্তি করা হয়। এরপর থেকে তিনি হাসপাতালেই ছিলেন। গত ২২ অক্টোবর আপিলের শুনানির জন্য আগামী ২ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। ১৯২২ সালের ৭ নভেম্বর গোলাম আযম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার বীরগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। এই মাটিতে জন্ম হলেও তিনি বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করেন। পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের আমির হিসেবে ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক টিক্কা খানের সঙ্গে বৈঠক করে গণহত্যার পরিকল্পনা করেন। দেশ স্বাধীন হলে তার নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। এরপর থেকে তিনি মূলত লন্ডনে বসবাস করে বাংলাদেশ-বিরোধী তৎপরতা চালিয়ে গেছেন। ১৯৭৮ সালে তিনি পাকিস্তানি পাসপোর্ট ও তিন মাসের ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে আসেন। পাকিস্তানি পাসপোর্টধারী গোলাম আযম বাংলাদেশে এসে আর ফিরে যাননি। গোটা আশির দশক ছিলেন জামাতের অঘোষিত আমির। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর প্রকাশ্য রাজনীতি শুরু করেন। ১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর গোলাম আযমকে প্রকাশ্যে আমির ঘোষণা করে জামাত। এর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ করেছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। ১৯৯২ সালে নাগরিক সমাজকে সঙ্গে নিয়ে গঠন করেন গণ-আদালত। সেই প্রতীকী গণ-আদালতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ১০টি অভিযোগ আনা হয়েছিল। অভিযোগের প্রতিটিরই শাস্তি ঘোষণা হয়েছিল মৃত্যুদ-। বাংলাদেশের আলো-বাতাসে থাকলেও গোলাম আযম তার একাত্তরের ভূমিকার জন্য এ দেশের মানুষের কাছে ক্ষমা চাননি। একাত্তর সালের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চায়নি তার দল জামাতে ইসলামীও। যে দেশ তিনি চাননি, সে দেশেই মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে তাকে। তবে তা একজন মানবতাবিরোধী অপরাধী হিসেবে। গোলাম আযম নাকি তার অছিয়তনামায় মৃত্যুর পর তার জানাজা পড়ানোর জন্য দ-প্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী অথবা মতিউর রহমান নিজামীর নাম বলে গেছেন। মৃত্যুর পরও যে তার অপরাধ প্রবণতা ও খাসলত বদলাবে না অছিয়তনামায় তারই প্রমাণ রেখেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, তার ওই অন্যায় দাবি যেমন সরকার মানে নি, তেমনি বায়তুল মোকাররমের অভ্যন্তরে তার জানাজা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জাতীয় প্রতিষ্ঠানের অবমাননারও সুযোগ দেওয়া হয়নি। জাতীয় মসজিদের খতিব অথবা দেশের কোনো প্রথিতযশা আলেম নয়, রাজাকার গোলাম আজমের জানাজার ইমামতি করেছেন তার পুত্র। বায়তুল মোকাররম মসজিদে তার ঠাঁই হয়নি, উত্তরের রাস্তায় তার জানাজা পড়াতে হয়েছে। বিক্ষুব্ধ জনতা জুতা নিক্ষেপ করেছে সেই দৃশ্যও গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অব্যাহত
গত ২১ অক্টোবর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জাতীয় পার্টির নেতা পলাতক ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের ১৪তম সাক্ষী মহেন্দ্র অধিকারী জবানবন্দি প্রদান করেন। ২০ অক্টোবর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত বাগেরহাটের তিন রাজাকার কসাই সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাস্টার, খান আকরাম হোসেন ও আবদুল লতিফ তালুকদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হবে কি হবে না সে বিষয়ে আদেশের জন্য ৫ নভেম্বর দিন নির্ধারণ করে ট্রাইব্যুনাল। অন্যদিকে একই মামলায় পিরোজপুরের পলাতক ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের ১৩ নম্বর সাক্ষী জনপ্রসাদ পাইক জবানবন্দিতে বলেছেন, জব্বারের নির্দেশে আমার চাচা শারদা কান্ত পাইককে পাকিস্তানি আর্মিরা গুলি করে হত্যা করে। জবানবন্দি শেষে ২১ অক্টোবর আসামিপক্ষকে জেরার জন্য দিন নির্ধারণ করা হয়। ১৯ অক্টোবর একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত বাগেরহাটের তিন রাজাকার আবদুল লতিফ তালুকদার, শেখ সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাস্টার ও খান আকরাম হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আসামিপক্ষের শুনানির দিন ২০ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়। অন্যদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত পিরোজপুর জেলার জাতীয় পার্টির নেতা পলাতক ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের ১৩তম সাক্ষী ২০ অক্টোবর সাক্ষ্য দেন। চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই দিন নির্ধারণ করেছেন। এর আগে বাগেরহাটের তিন রাজাকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের ওপর শুনানির দিন ছিল ১২ অক্টোবর। ট্রাইব্যুনাল স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তা ২০ অক্টোবর পুনর্নির্ধারণ করেছে। ১৪ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার অফিসে প্রসিকিউটর তিন আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ১৩ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে ব্যক্তিগত ব্লগে আপত্তিকর মন্তব্য করায় বিদেশি সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগের আদেশের জন্য আগামী ১ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

Category:

Leave a Reply