আষাঢ়-এর তৃতীয় দিন…

Posted on by 0 comment

ব্রাসেলসের বর্ষা-বিধৌত এই একটানা একঘেয়েমিতে। সকাল সকাল ভিনদেশের বর্ষণ-সংগীত শুনে প্রথম প্রতিক্রিয়া হলোÑ আরে, এ যে একেবারে আমাদের বর্ষার মতন! সেটা অবশ্যি বলেছি টাইমিংটা মিলে যাওয়াতে।

45মালেকা পারভীন: বাংলা বারো মাসের নাম এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলতে পারলেও জর্জিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে তা ঠিক কবে থেকে শুরু হয়, আমি নিশ্চিত, পহেলা বৈশাখ ছাড়া আর কোনোটাই আপনি সঠিকভাবে বলতে পারবেন না। বুকে হাত দিয়ে বলুন, পারবেন? তাও পারতেন না যদি চৌদ্দ আর পনের এপ্রিলের ঝামেলাটা অনেক ঝুট-ঝামেলার পর ওইভাবে না মিটিয়ে ফেলা হতো। মিটিয়ে ফেলাতে ভালোই হয়েছে। বাঙালিত্ব প্রমাণের ন্যূনতম ট্রিকটা আপনার হাতের মুঠোয় চলে এসেছে না বলে সোজা জিবের আগায় সদা প্রস্তুত আছে বলা যায়। অনায়াসে।
তবে আমি আপনার থেকে এক ধাপ এগিয়ে আছি। না, বলছি না যে আমি বলতে পারব ইংরেজি প্রতিমাসের মাঝামাঝি ঠিক কোন তারিখে (চৌদ্দ, পনের নাকি ষোল) বাংলা মাসগুলোর একেকটার প্রথম দিন শুরু হয়। অনেকবার খাতা-কলম ব্যবহার করে মুখে-মগজে মুখস্থ করতে চেয়েছি। সফলতা ধরা দেয়নি বুড়ো মস্তিষ্কের ‘গ্রে সেলগুলো’ তাদের কর্মদক্ষতা দেখাতে পারেনি বলে। তাই বলে হাল ছেড়ে দিইনি একেবারে। বাঙাল হয়ে জন্মেছি, অথচ বারোটা বাংলা মাসের দিনক্ষণ বলতে পারব নাÑ এটা কোনো কাজের কথা নয়, মশায়। নিজেকেই বলি। আর তার সামান্য চেষ্টা হিসেবে আমি আষাঢ়স্য প্রথম দিবসের জন্য নির্ধারিত জর্জিয়ান ক্যালেন্ডারের তারিখটা ভালো করে জেনে নিয়েছি। তাই আমার আশপাশের সবাই যখন জ্যৈষ্ঠের চাঁদিফাটা গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে বলতে থাকে, কবে যে বৃষ্টি নামবে, আর কেউ কেউ দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘায়িত করে এই ভেবে, কবে যে ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’ গানটা কেউ গুনগুনিয়ে উঠবে, আমি তখন খানিকটা ভাব দেখিয়ে বলি, ক্ষান্ত দিন, জনাবে আলা, জুনের পনের তারিখটা তো আগে আসতে দিন। তারপর না হয় ওইসব গান-ফান-বাজনা-বাদ্যির আসর-টাসর বসানো যাবে…
আজ আষাঢ়-এর তৃতীয় দিন এখানে এই ব্রাসেলসে। সকালে অফিসে আসার সময় দেখেছি, আবহাওয়া ভীষণ মনমরা। ডিজমাল ওয়েদার অ্যাট ইটস পিনাকল। এ অবশ্য এ শহরের জন্য নতুন কিছু না। পারলে সারাক্ষণই মুখ বেজার করে রাখে। ধনীর দুলালীর আদুরেপনা আর কি! একটা সময় এমন অবিরল ঝিরঝির ধারায় বৃষ্টি ঝরতে লাগলো যে সেই একহারা বৃষ্টি-ঝরা দেখতে অফিস-রুমের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে গেলাম। চুপচাপ, একা একা, শুধু নিজেকে নিয়ে। আর নির্নিমেষে এই বারি-পতন দেখতে দেখতে একসাথে একটার পর একটা কত যে কথা, কত রকমের স্মৃতি যে এই বেচারির মনে পড়ে গেলো! মনের জানালার আবছা ক্রুশ-কাটা পর্দায় ভেসে উঠলো কিছু মনে থাকাÑ বেশিরভাগ ভুলে যাওয়া মানুষের মুখ-নাম-পরিচয়, আর কত কত জায়গার ছবি আর দৃশ্যাবলি যেখানে আমি কখনও কোনো এক হারিয়ে ফেলা আর কখনও খুঁজে না পাওয়া সময়ের কাছে জমা রেখে এসেছি আমার লাজুক পায়ের নরম-কঠিন চিহ্ন সকল। সেই জায়গাগুলো আরও অনেক কিছুর সাথে মিশে গেছে রূপসা নদীর রুপালি ঢেউ হয়ে, সান্তাহার স্টেশনের ট্রেন লাইনের পাথর-বিছানো সমান্তরালে, কোনো এক সবুজ ধান ক্ষেতের সিঁথিকাটা আইল ধরে, আরেক নাম-না-জানা গোরস্তানের (গোরস্তানের কি বিশেষ কোনো নাম থাকে?) ভেতর গজিয়ে ওঠা রহস্যময়ী সূর্যমুখী গাছটার সবুজ পাতায় আর হলুদ পাপড়িদলে, বিটিভির নাটক দেখার আনন্দ-আয়োজনে আর এরকম অসংখ্য পরতে পরতে ‘মায়া-মমতায় জড়াজড়ি করি’ থাকা সাদাকালো ছবি-ভর্তি অ্যালবামের মাঝে থেকে যখন-তখন ইলেক্ট্রিসিটি চলে যাওয়ার ঘোর অন্ধকারে!
যাক, থাক ওসব মন-উচাটন আকুলি-বিকুলিপনা। বরং ফিরে আসি আজ আষাঢ়স্য তৃতীয় দিবসে। ব্রাসেলসের বর্ষা-বিধৌত এই একটানা একঘেয়েমিতে। সকাল সকাল ভিনদেশের বর্ষণ-সংগীত শুনে প্রথম প্রতিক্রিয়া হলোÑ আরে, এ যে একেবারে আমাদের বর্ষার মতন! সেটা অবশ্যি বলেছি টাইমিংটা মিলে যাওয়াতে। বলতেই হচ্ছে, স্থান-কাল ভেদে বৃষ্টি তার নিজস্ব চরিত্র ধারণ করে। আমি এমনটাই দেখেছি। আপনিও দেখেছেন। মনে করার চেষ্টা করে দেখুন। আচ্ছা, মনে করুন, লন্ডন-এর ছিঁদকাদুনে ছিপছিপে বৃষ্টির কথা। সেখানকার বৃষ্টির এমন বিশ্রী চেহারা যে কাব্য করা আর সাহিত্য সাধনা দূরে থাক, বিরক্তিতে রীতিমতো আপনার হাত কামড়াতে ইচ্ছে করবে আমার মতন। আমি জানি, কারণ আমার এমনটা হয়েছে। দু-একবার হাত নয় অবশ্য, আঙুল কামড়েছি, যারপরনাই বিরক্তিতে ত্যক্ত হয়ে… কিছু করার নাই, কোথাও যাওয়ার নাই… শুধু জানালার পাশে বসে নীরবে বৃষ্টির পতন দেখে যাওয়া আর অহেতুক আলসেমিতে ঢুলে পড়া অথচ হাতে জমে আছে কত কাজ… এমন যে তার কায়াশ্রী তাকে না যায় ধরা, না যায় ছোঁয়া। অথচ দেখুন, কেমন তার যন্ত্রণার মাত্রা! অসহ্য!
অথচ আমার একজন প্রিয় কলাম লেখক-সাংবাদিক ভাই বেশ আয়েশ করে বলেন, আমার এই ব্লিক অ্যান্ড বিষণœ ওয়েদারই ভালো লাগে ভীষণ। কেমন একটা মনমরা মগ্নতায় অবশ হয়ে থাকে চারপাশের সবকিছু। এরকমই ভালো লাগে আমার। সব সময়। আরও ভালো লাগে এমন অদ্ভুত মিসটেরিয়াস মেলানকলি মোমেন্টসে এক মাগ ধোঁয়া ওঠা গরম কফি হাতে নিয়ে জানালার পাশে রকিং চেয়ারটায় বসে বাইরে অন্ধকারে অপলক তাকিয়ে থাকতে। ব্যাপারটা একবার তোমার কল্পনার ক্যানভাসে তুলে নাও, দেখবে কেমন এক নামহীন ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে গেছে তোমার সারাটা মনোজগৎ! কেমন এক সুতীব্র বিহ্বলতায় আচ্ছন্ন আর অবশ হয়ে গেছে তোমার সমগ্র অস্তিত্বের চারপাশ!
আপনি এত সুন্দর ইংরেজি লেখেন, আর এখন দেখছি, না মানে শুনছি, বাংলাতেও কম যান না… আমার কথা শুনে তার বিদগ্ধ কপাল সামান্য কুঁচকে গেল। যদিও মুখের স্মিত হাসিটি অমলিন।
হুম, তুমি একবার ওই দৃশ্যপটটা ক্যানভাসে তুলে নাও, তোমার মনের ক্যানভাসে, ইজেলটা বাম হাতে শক্ত করে ধরে এবার আঁকতে থাকো, যা যা তোমার ভাবতে ইচ্ছে করে। প্রায় সময় এমন বৃষ্টি-ধোয়া মেঘলা দিনে আমার ভেতরে একরকম তোলপাড় হয়, আলোড়ন ওঠে… নীরব শব্দহীন সে তোলপাড়Ñ অথচ আমার ভেতরটা কেমন দুমড়ে-মুচড়ে যায়! আচ্ছা, বলতো, এটা কি আমার কোনো রোম্যান্টিক ভাবালুতা? তোমার ভাবীর এমন অভিযোগ প্রায় শুনতে হয় আমাকে। কিন্তু কি জানো, বৃষ্টি-ছোঁয়া একেকটা অন্ধকার দিন আমাকে যে কী ভীষণ ভালো লাগায় মোহমুগ্ধ করে রাখে! আমি তোমাকে ঠিক উপযুক্ত কোনো ভাষায় তা ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে বলতে পারব না। ইনফ্যাক্ট, যে এটার অনুভবের ভেতর দিয়ে না গেছে, তাকে ঠিক কথার মারপ্যাঁচে তা কখনোই বোঝানো সম্ভব না… আর সেরকম একটা কবি-মনও থাকতে হয়, কি বলো?
প্রশ্নের মতো কিছু একটা আমার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে সাংবাদিক ভাই কেমন এক ঘোরলাগা ভাবনায় চুপ মেরে গেলেন, সম্ভবত আরও কিছু বলার জন্য মনে মনে খানিকটা গুছিয়ে নিতে। আর আমি এটাও জানি, তিনি আমার কাছ থেকে কোনো উত্তর শুনতে চাননি। যেহেতু আমার মতো ধৈর্যশীল শ্রোতা সবসময় তার কাছে আসে না, তিনি তাই তার মনের আগলটাই আজ খুলে দিয়েছেন আমার সামনে। কেননা, কোনো এক কথার ফাঁকে তিনি একবার বলে উঠেছিলেন, সবাই তো কেবল নিজের কথা বলতে চায়। শোনার লোকের সংখ্যা হাতেগোনা। কেমন একটা প্যারাডক্স, দেখো! আমাদের দুটা কান আর একটা মুখ, অথচ এগুলোর ব্যবহার ঠিক বিপরীত সূত্র মেনে।
কিন্তু আমার ধৈর্যও একসময় বিদ্রোহ করতে চায়। মনে মনে বলিÑ আপনিও তো কম যাচ্ছেন না। যে বিষয়ের সমালোচনা করছেন, সেই একি দোষে আপনি নিজেও দুষ্ট। আমাদের সমস্যাটা তো এখানেই। আমার এই সত্যি কথাগুলো তাকে বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আমার বরাবরের যে চেপে যাওয়া স্বভাব, আমি চুপ করে থাকি। ব্যাপারটা তিনি খেয়াল করেন।
তুমি আমার কথায় বিরক্ত হচ্ছো না তো? স্যরি, এই বৃষ্টি-ভাবালুতায় এমনভাবে পেয়ে বসলো আর তোমার মতো এমন একজন মনোযোগী নীরব শ্রোতা পেয়ে গেলাম যে চারপাশের সবকিছুই যেন ভুলে গেলাম। আচ্ছা, বাদ দাও। এবার তোমার কথা বলো। তোমার টেক্সট করা ওই কবিতাটা কিন্তু আমার এখনও বেশ মনে আছে। মনে পড়ছে না? যেখানে তুমি এক ঘন বর্ষণের রাতে ট্র্যাফিক জ্যামে আটকা পড়ে গেলে আর ওই সময় তোমার অস্তিত্বটাকে তুলনা করতে চাইলে হঠাৎ গর্তে আটকা পড়ে যাওয়া একটা ইঁদুরের সাথে যে বের হওয়ার কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছে না। ফ্যান্টাস্টিক! অসাধারণ! তুমি কবিতাটা চালিয়ে যাও, ঠিক আছে?
তার কথা কিছুতেই শেষ হতে চায় না। আমাকে কিছু বলার জন্য বারবার বললেও আমি কিছুতেই তার কাছ থেকে সেই মওকা আদায় করতে পারি না। নিজেকে আমার সত্যি সত্যি তখন ওই ইঁদুরটার মতো অসহায় লাগে। আমি একটু পিটপিট করে তার দিকে তাকাইÑ আমাকে একটু বলার সুযোগ দিন আর না হলে বিদায় বলে যাই? অথচ আমারও বলার ছিল, আমি নিজেও বৃষ্টি-কাতর একজন মানুষ। আর বৃষ্টি বা বর্ষাকে রোমান্টিকতার চূড়ান্ত শিখরে নিয়ে গিয়েছেন যে কবিগুরু তার প্রতি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই আমি হঠাৎ করে অসহিষ্ণু হয়ে উঠি। যেন আমি ভীষণই বিরক্ত প্রয়োজনের অতিরিক্ত এই বর্ষা-বয়নে। চটজলদি হুমায়ূন আহমেদের কথাও আমার মনে পড়ে যায়। আরও অনেক কিছুই মনে পড়ে যায়। তেইশ বছর আগে কোনো এক বিভাগীয় শহরে ঝুম বৃষ্টি নামা জুন মাসের এক সিক্ত দুপুরের কথা। কলেজ-পোস্ট অফিসের এক চিলতে বারান্দায় গাদাগাদি করে দাঁড়ানো অনেক ছেলেমেয়ের ভিড়ে শুধু একজনকেই ভালো লেগে যাওয়া আর বৃষ্টি শেষ হওয়া মাত্র ভেজা বাতাসের সুরভির সাথে পলকে তার উধাও হয়ে যাওয়া। পেছনে ফেলে যাওয়া এক দীর্ঘশ্বাসের মেঘ-মল্লার। চিরদিনের জন্য।
যা হোক, বর্ষা-বন্দনায় সংক্রামিত আমার নিজেকে আমি সামলে নিলাম আর বরষণ-¯œাত বিষণœ আবহাওয়ার মাঝে সকল আনন্দ খুঁজে পাওয়া সাংবাদিক ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালাম। আমার পরিকল্পনা ব্যর্থ হলো। কারণ তিনি পরম মমতায় আমার সামনে বাড়িয়ে দিয়েছেন এক মাগ ধোঁয়া ওঠা গরম কফির সুচতুর প্রলোভন। অবিকল তার বর্ণনার মতন। নিজ হাতে কফি মেশিন থেকে বানানো সেই কফির মন এলোমেলো করা সুবাস আমার নাকে সুড়সুড়ি দিয়ে যায়। আর আমি কিছুতেই এই ট্যানটালাইজিং টেম্পটেশন থেকে নিজেকে রক্ষা করার সহজলভ্য কোনো উপায় খুঁজে পাই না আমার চারপাশে। নিজেকে এ সময় মমের ‘লাঞ্চন’ গল্পের সেই অমানানসই চরিত্রটির মতো মনে হয়, যাকে এক অজ্ঞাত কারণে কখনই আমার নায়িকা বলতে ইচ্ছে হয় না।
একবারে আমার কেবল এক মাগ কফিই ভালো লাগে… ভাই। এর সাথে আর অন্য কিছু না। না বিস্কুট, না বাদাম। আমার একটু ঢং করে বলতে সাধ হয় যখন দেখি সাংবাদিক ভাই উপুড় হয়ে টেবিলের ড্রয়ার খুলে তার ফুড স্টকে আমাকে অফার করার মতো কিছু আছে কি-না তা খোঁজার চেষ্টা করছেন। আমি মুখে যদিও কিছুই বলি না; কিন্তু তিনি আমার মনোভাব পড়ে ফেলেন এবং আবার সোজা হয়ে বসে তার লম্বা মাগটা টেবিল থেকে হাত বাড়িয়ে টেনে নেন।
দেখো, ওই মেঘ-মেদুরকাল-নীলাভ শান্ত আকাশটার দিকে তাকাও আর তোমার সম্পূর্ণ দৃষ্টিটা মেলে দিয়ে ভাবতে চেষ্টা করো ছোপ ছোপ কালি ছিটানো নীল রঙে ডোবানো মেঘগুলো একেকটা কিসব কবিতা বলে যায়… কীসব কবিতা… আহ্!
আহ্, মরি, মরি… সাংবাদিক ভাইয়ের অফিসে এসেছিলাম কুশলবিনিময়ের ছুতায় দুমাস আগে জমা দেওয়া আমার লেখাটার ব্যাপারে খোঁজ নিতে। এখন বৃষ্টি-শিকলে আটকা পড়ে কী করিÑ কোথায় পালাই অবস্থা। তিনি আমার মনের হাল বোঝার ধারেকাছেও যেতে চাইলেন না। তার মতো করে বলে যাচ্ছিলেন যা যা তার মনের রাস্তায় মিছিল করে আসছিল প্রজাপতি-রঙিন অথবা দাবার বোর্ডের সাদাকালো ছক আঁকা জ্যামিতিক রেখার ছাতা মাথায়…
আমি শুনছিলাম, আর শুনছিলাম, আর ভাবছিলাম দেবো নাকি একবার মনের পাখনাটা মেলে? ওই যে ব্রাসেলসের কর্মস্থলে কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে যেমন যেমন বৃষ্টি-ভাবনা এসে আমার মনের জানালায় ভিড় করে সেসব আনন্দের বর্ণমালা… কিছুটা শেয়ার করি তার সাথে, যদি সুযোগ পাই। হয়তো ভালোই লাগবে তার। হয়তো না। তারপরও বলি। এই মনোটোনাস মনোলগের মিজারি থেকে অ্যাট লিস্ট মুক্তি পাওয়া দরকার…
আমি এপাশ ফিরে দেয়ালের দিকে মুখ করে তাকাই আর আমার আচরণ যেন হঠাৎ কেমন এক অদ্ভুত চেহারা ধারণ করে! জানিনা কেন, ব্রাসেলসের বিরহী আকাশের সময়ে-অসময়ে মুখ কালো করে কান্না-ঝরানো বৃষ্টির ওপর একপ্রস্থ রাগ এসে জমা হয় আর আমি বলতে থাকি, হয়তো মনে মনে, অথচ দেখুন, আমাদের দেশের বৃষ্টি দেখুন… কেমন মনকাড়া ভঙ্গিমায় সমস্ত চরাচরজুড়ে মোহনীয় মায়া ছড়িয়ে ঝলমলে রিমঝিম করতে করতে ছলাত ছলাত করতে করতে কলকল টলমল করতে করতে তার রাজসিক আগমন। দু-কূল ছাপিয়ে নিজে তো নীপবনে নৃত্য করবেই, সাথে আপনাকেও নাচিয়ে ছাড়বে… সোনার চাঁদবদনী তুমি নাচো তো দেখি! সেই বৃষ্টিÑ সংগীতের মাঝে মাঝে যদি আবার গুরুগম্ভীর মেঘ-রাজ ডেকে ওঠেন, বাজিয়ে দেন বজ্রস্বরে তার তীক্ষè কণ্ঠÑ নিনাদ, তা হলে আপনার বর্ষা-উদযাপন সম্পূর্ণ হলো ষোল কলায়।
আর ইউরোপের বৃষ্টির এমন হাস্যকর একই সাথে বিরক্তি-উৎপাদক চেহারা যে আপনি তা দেখে নিজেই লজ্জা পেয়ে মুখ লুকাতে ব্যস্ত হয়ে যাবেন। যাবেন না, বলছেন? যখন বৃষ্টির বদলে আপনার মাথায় পাতা ছাতার ওপর একরাশ ঘ্যানঘ্যানানো অসহ্যপনা ঝরে পড়বে আর শরীরে এক ধরনের ব্যাখ্যাতীত চিটচিটে অনুভূতির অস্বস্তি টের পাবেন, তখনই বুঝতে পারবেন ইউরোপের বৃষ্টি-বেদন কতটা… যাহ্ আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। আর এমন যে এমন, কোনো শব্দ নেই, কোনো আওয়াজ নেই… শুধু ঝরছে আর ঝরছে আর ঝরছে। আপনি তাকে দিব্য চোখে দেখছেন, আপনার পরনের কাপড়ও অল্পস্বল্প ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে সে যে এসেছিল তার চিহ্নস্বরূপ, অথচ কুহেলি মরীচীকার মতো থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ কোনো বৃষ্টি হলো যদি তারে আপনার মতো করে কাছে না পেলাম? যদি তারে নাই পাইকো আপনার মতো করে, তাহলে কি কিছু পাওয়া হয়? ধ্যাৎ!
আজ অবশ্য ব্রাসেলস-এর বৃষ্টি সামান্য ভেল্কি দেখালো। না, ঠিক, দেখালো না, শোনালো। মুহূর্তের জন্য কিছু একটা শুনিয়ে দিলো… ওই ধরুন গিয়ে ইউরোপিয়ান মেঘের ডাক। খুবই ভদ্র কায়দায়, পাছে কেউ যাতে শুনে না ফেলে এমন ভাবে চুপিসারে! আমিও শুনতে পেতাম না যদি আমার কান অমন খাড়া না থাকত। আমি তো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে এই ইউরোপিয়ান বৃষ্টির ভেলকিবাজি দেখছিলাম একটু সতর্ক চোখ-কান মেলে-খুলে। দেখতে চেয়েছিলাম নতুন করে, আমাদের বর্ষার যাদুময় সৌন্দর্যের কাছে তা ঘেঁষতে পারে কিনা। পারবে না, কখনোই না। প্রশ্নই আসে না। তবে এর আগে আর একদিন ওই ডাক শুনেছিলাম বেশ ভয়ঙ্করভাবেই। এখানে আসার পর সেবারই প্রথম এমনটা হলো। বেশ চমকে উঠেছিলাম দফায় দফায় ওরকম গর্জন শুনে। আসলে এখানে এই ব্রাসেলসে বৃষ্টির একটানা নিরানন্দ নিঃশব্দ ধারাবাহিক পতন দেখে দেখে চোখ যতটা সয়ে গেছে, অমন হুঙ্কার শুনে তো এই বেচারা কানজোড়া অভ্যস্ত নয়। সে কারণেই ওরকম হতভম্ব দশা। শুধু আমার না, যাদের সাথেই বিষয়টা নিয়ে কথা বলেছি, যারা অর্থাৎ আমার আশেপাশে ঘুরঘুর করতে থাকা দেশি ভাই-ব্রাদার, প্রত্যেকেই একই কথা বলেছে। বুঝতে পারছেন তো, এই বৈদেশেও আমরা বৃষ্টি নিয়ে বিশদ আলোচনা করার অবকাশ পাই।
আর বৃষ্টি-বিলাসী আমার প্রিয় সাংবাদিক ভাই কোথায় গেলেন, জানেন? কফি খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে আমি তাকে বলতে চেয়েছিলাম কদিন আগে এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করা মমের অসাধারণ ‘রেইন’ গল্পটার কথা। কিছু তর্কবিতর্কের সুযোগ ছিল। সাবডিউড প্যাশন আর উচ্চকিত নৈতিকতা নিয়ে একটা দারুণ আড্ডার সূচনা হতে পারত। তারপর তা বেড়ে প্রসারিত হতো ই-মেইল আর টেক্সট মেসেজে… ইশ, এমন একটা জমজমাট সাহিত্যিক আসর শুরু করেও শেষ করতে পারলাম না। মনে হলো, মনে হলো এর জন্য ওই বেহায়া বৃষ্টিটাই দায়ী। কারণ তা আমাকে এমনভাবে ভিজিয়ে দিয়েছিল যে সাংবাদিক ভাইয়ের সামনে ভদ্র-সভ্যভাবে বসে থাকাই দায় হয়ে উঠেছিল। আমার ভীষণ আড়ষ্ট লাগছিল যে! আর তা ছাড়া মিস থম্পসনের মতো এত দুর্বিনীত দুঃসাহসের বর্ষণও আমার ওপর কখনও অকৃপণভাবে ঝরে পড়েনি। আমি যে আমার মধ্যে গুটিয়ে থাকা এক চিরকালের শুঁয়োপোকা যে কেবল একছিটে বৃষ্টির আলতো পরশেই মিইয়ে যায়, চুপসে যায় লজ্জাবতী লাজুকলতার সরলতায়… তা না হলে হয়তো…

Category:

Leave a Reply