ইতিহাসের ঘৃণ্য অধ্যায়

10

৩ নভেম্বর ১৯৭৫ : জেলহত্যা

অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন: ৩  নভেম্বর ঐতিহাসিক জেলহত্যা দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক ঘৃণ্য কলঙ্কিত দিন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যার মাত্র আড়াই মাসের মাথায় ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী অবস্থায় রাতের আঁধারে হত্যা করা হয় মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী ও জাতির পিতার ঘনিষ্ঠ সহচর, বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিসভার সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামারুজ্জামানকে। কারাগারের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা অবস্থায় এমন নৃশংস ও কাপুরুষোচিত হত্যাকা- পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাত্রিতে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাসভবনে সপরিবারে নিহত হন। এই বর্বর হত্যাকা-ের শিকার হন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী মহিয়সী বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবসহ পরিবারের সদস্যবৃন্দ। বঙ্গবন্ধুর ১০ বছরের শিশুপুত্র রাসেলকেও হত্যা করতে দ্বিধা করেনি ঘাতকরা। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা হত্যাকা-ের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বর্ণালী ইতিহাস কালো চাদরে ঢাকা পড়ে যায়। জাতির বুকে চেপে বসে সামরিক শাসন ও স্বৈরতন্ত্রের জগদ্দল পাথর। কায়েম হয় অন্ধকারের রাজত্ব। শুরু হয় হত্যা ও ষড়ন্ত্রের রাজনীতি।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে দীর্ঘ বছর বাংলাদেশ সামরিক স্বৈরশাসনের জাঁতাকলে নিষ্পিষ্ট হয়। খুনি মোশতাকের অপসারণের পর অস্ত্র হাতে জেনারেল জিয়া ক্ষমতা দখল করে। সংবিধান স্থগিত করে, পার্লামেন্ট বাতিল করে, সেনা আইন লঙ্ঘন করে অবৈধ পন্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে। নিজের ক্ষমতা নিষ্কণ্টক করতে জেনারেল জিয়া বিমানবাহিনীর ৫৬৫ জন অফিসার এবং সেনাবাহিনীর প্রায় দুই সহস্রাধিক অফিসার ও সৈনিককে হত্যা করে। আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার, নির্যাতন ও হত্যা করা হয়। পরবর্তীকালে জেনারেল এরশাদও জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে।
সামরিক শাসকরা মৌলিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দেয়। সামরিক ফরমানবলে সংবিধানকে সংশোধন করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক চরিত্র পাল্টে দেয়। স্বাধীনতা-বিরোধী, যুদ্ধাপরাধী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে পুনর্বাসিত করা হয়। হত্যা, ক্যু-পাল্টা ক্যু হয়ে দাঁড়ায় ক্ষমতা বদলের হাতিয়ার।
জিয়ার ক্ষমতা দখল, সামরিক শাসন ও সংবিধান সংশোধনকে ২০০৬ সালে উচ্চ আদালের রায়ে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
জেল হত্যাকা-ের ৪২ বছরের মাথায় এসে এটি এখন প্রমাণিত সত্য যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা নস্যাৎ অথবা স্বাধীন বাংলাদেশকে চিরতরে ধ্বংস করার অসৎ উদ্দেশ্য নিয়েই বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু হত্যার পরমুহূর্ত থেকেই অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশ বেতারকে পাকিস্তানি স্টাইলে ‘রেডিও বাংলাদেশ’ বলা শুরু হয়। ’৭১-এর রণধ্বনী ‘জয় বাংলা’র পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ উচ্চারণ করা হয়।
জিয়া, এরশাদ, খালেদা জিয়ার ২৫ বছরের শাসনামলে বঙ্গবন্ধু ও জেল হত্যাকা-ের বিচার বন্ধ, স্থগিত ও প্রলম্বিত করা হয়। ১৯৯৬ সালে দেশরতœ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু ও জেলহত্যা বিচারের উদ্যোগ নেয়। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার কার্যক্রম শেষ হয়েছে। বেশ কয়েকজন খুনির ফাঁসি হয়েছে। পলাতক খুনিদের ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ থেমে নেই। উচ্চ আদালতে জেল হত্যাকা-ের পূর্ণাঙ্গ রায় ইতোমধ্যে প্রকাশ হয়েছে। ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’-এর মতো জংলি আইনের জাঁতাকল থেকে বাঙালি আজ মুক্ত।
পূর্বাপর ঘটনা বিশ্লেষণে ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বর হত্যাকা-ের ষড়যন্ত্রকারীদের দেশবাসী চিনতে পারলেও আনুষ্ঠানিকভাবে হত্যার নেপথ্যের ষড়যন্ত্র এখনও উদ্ঘাটন করা হয়নি। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা হত্যার মূল নায়কদের চিহ্নিত করার জন্য তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি আজ উচ্চারিত হচ্ছে। হত্যাকা-ে মোশতাক ও জিয়ার ভূমিকা ছিল স্পষ্ট। তাদের কর্মকা-ে এটা আজ প্রমাণিত যে প্রত্যক্ষভাবে এই ঘটনায় তারা জড়িত ছিল এবং হত্যাকা-ের প্রত্যক্ষ বেনিফিশিয়ারিও তারা। তাই আজ দেশবাসীর দাবি, অনতিবিলম্বে বঙ্গবন্ধু এবং জেল হত্যাকা-ে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও ষড়যন্ত্রের বিষয়টি জাতির সামনে উন্মোচন করা হোক।
বঙ্গবন্ধু ও চার নেতা হত্যাকা-ের মাধ্যমে খুনিরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিল। হত্যা, খুন, ষড়যন্ত্রের রাজনীতির কারণে বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে বাংলাদেশের অগ্রগতি, উন্নয়ন, সমৃদ্ধির গতি থমকে গিয়েছিল। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দেশ সেবার সুযোগ পায়। দেশরতœ শেখ হাসিনার তৃতীয় মেয়াদের শাসনামলে বাংলাদেশ উন্নয়ন অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। দেশ আজ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। একসময়ের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বাংলাদেশ আজ বিশ্বের কাছে উন্নয়নের ‘রোল মডেল’। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতি হিসেবে বিশ্বসভায় আমাদের পরিচিতি দিয়েছেন। তারই যোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হবে এবং উন্নয়নের এই গতিধারা রাখতে পারলে আমাদের ২০৪১ সালের মধ্যে স্থান হবে উন্নত, সমৃদ্ধ, আধুনিক দেশের তালিকায়। ষড়যন্ত্র থেমে নেই। এ দেশে এখনও রক্তাক্ত পথে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা চলে। ২১ আগস্টের মতো গ্রেনেড হামলা করে গোটা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা করা হয়। নির্বাচন ঠেকানোর নামে সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়। দেশের মানুষ আজ শান্তিতে আছে। স্বস্তিতে আছে। উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারেÑ এমন কর্মকা- মানুষ বরদাসত করবে না। অপরাজনীতি আজ মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে। ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার মাধ্যমেই জাতীয় চার নেতার আত্মদানের প্রতি যথাযথ সম্মান জানানো সম্ভব।
লেখক : তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

Category:

Leave a Reply