ইয়েমেন কাঁদছে

PM2সাইদ আহমেদ বাবু: মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন বসতি আর আরব বিশ্বের সবচেয়ে গরিব দেশ ইয়েমেন। গৃহযুদ্ধে দেশটি পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ইয়েমেন সংকট সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাসীর মনে দাগ কেটেছে। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ বর্তমানে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এটি কেবল একটি যুদ্ধাহত দেশ নয়। বর্তমানে ইয়েমেন স্মরণকালের সর্বোচ্চ ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়েছে, যা থেকে নিস্তার পাওয়ার কোনো উপায়ই দেখা যাচ্ছে না। যতদিন যাচ্ছে ততই ইয়েমেন সংকট ঘনীভূত হচ্ছে।
ইয়েমেন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রাচীন বাণিজ্যকেন্দ্র এবং এই বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এক সমৃদ্ধশালী দেশ। লোহিত সাগরের বাব আল মানদাব প্রণালির মুখে অবস্থিত ইয়েমেন সৌদি আরবের জন্য বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। ১৯৩২ সালের সৌদ পরিবারের নামানুসারে গঠনের পর থেকেই ইয়েমেনের ওপর প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় ছিল সৌদি আরব। ১৯৩৪ সালে এই দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। তায়েফ চুক্তির মাধ্যমে এই যুদ্ধের অবসান হলেও সৌদি আরব নানা উপায়ে ইয়েমেনের ভেতর বিশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। সীমান্ত বিরোধ নিয়ে কখনও কখনও সামরিক অভিযানও পরিচালনা করেছে।
বাণিজ্য এবং কৌশলগত ভৌগোলিক কারণে এই অঞ্চলের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল পার্সিয়ান, অটোমান, ব্রিটিশ। ১৯৬৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর তথা ব্রিটিশ বাহিনী প্রত্যাহারের পরে দুটো নতুন রাষ্ট্র উত্তর ইয়েমেন (গণপ্রজাতন্ত্রী) এবং দক্ষিণ ইয়েমেন (কমিউনিস্ট) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইয়েমেনিদের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার গোড়া পত্তন ঘটে। জাতি হিসেবে এই বিভক্তি তাদের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ধর্মÑ সব কিছুকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। ১৯৯০ সালের ২২ মে ইয়েমেনের একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন দুই ইয়েমেন ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে একত্রিতভাবে একটি অভিন্ন রাষ্ট্র গঠন করে প্রাতিষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয় রিপাবলিক অব ইয়েমেন। দুই ইয়েমেন একত্রিত হলেও দেশটির রাজনৈতিক সংকট কখনোই দূরীভূত হয়নি।
আজকের ইয়েমেন সংকটের শুরু ২০০৪ সালে এবং তখন এই সংকটের পটভূমি ছিল শিয়া-সুন্নির মধ্যকার বৈষম্যের পরিপ্রেক্ষিতে শিয়াদের তরফ থেকে সুন্নি নিয়ন্ত্রিত সরকারের বৈষম্যের বিরুদ্ধে শিয়াদের সংগঠিত হওয়া। কিন্তু সৌদি আরবের পক্ষ থেকে এ তৎপরতা রোধে সৌদি আরব হুথিদের ওপর হামলার জন্য ইয়েমেনের সরকারকে তার ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ায় সংঘর্ষ নতুন মোড় নেয়। সৌদি আরব ইয়েমেন সীমান্তের জাবাল দোখান ঘাঁটিটি হুথিদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ইয়েমেনকে অনুমতি দেওয়ার পরপরই হুথিরা তা দখল করে নেয়। এরপর এই অজুহাতে সৌদি আরব হুথিদের ওপর সরাসরি হামলা শুরু করে।
উপরোক্ত অবস্থার আলোকে বর্তমান ইয়েমেন সংকট কেবল ইয়েমেন তথা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সংকটের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তারে ভূমিকা পালন করবে, তা-ই নয়। তার চেয়ে বড় আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে, এতদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে বহিঃশক্তির প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের নতুন সংস্করণ হচ্ছে তাদের পরোক্ষ মদতে বর্তমানে নিজেরাই এমন সংকটে জড়িয়ে পড়ছে, যা সমগ্র আরবের নিরাপত্তার প্রয়োজনে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপকে অনিবার্য করে তুলবে।
২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার শুরু। তা থেকে রেহাই পায়নি ইয়েমেনও। দেশটিতে তখন গণবিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। আরব বসন্তের প্রথম ধাক্কায় তিউনিসিয়ার পর দীর্ঘ ৩৩ বছর সময়ের একনায়ক আলী আবদুল্লাহ সালেহ সরকারের পতনের পর মনসুর হাদি নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হলেও পুরো দেশের সব জাতিগোষ্ঠীকে একত্র করে একটি জাতীয় সরকার পরিচালনার পরিবর্তে মূলত সৌদি আরবের এবং পশ্চিমা পরামর্শে রাষ্ট্র শাসনের ফলে আজকের এ অবস্থা। ২০১৫ সালের জন্য একটি সংবিধানের খসড়া তৈরি করা হয়। এতে বলা হয়, ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একটি পার্লামেন্ট গঠন করা হবে। এছাড়া খসড়া সংবিধানে ফেডারেল ব্যবস্থার সরকার গঠনের কথা বলা হয়। কিন্তু হুথি বিদ্রোহীরা প্রত্যাখ্যান করায় এ উদ্যোগ ভেস্তে যায়। ২০১৫ সালের শুরুতে আন্দোলনের মুখে মানসুর হাদির সরকার পদত্যাগ করে এবং হুথি নেতা আবদুল মালেক আল-হুথির নেতৃত্বে রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে চলে যায়। হুথি আন্দোলনের প্রতি সমর্থন দেন সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ। ফলে এই আন্দোলন আর শুধু হুথিদের আন্দোলন থাকল না। রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহর-বন্দরেরও নিয়ন্ত্রণ নেয় হুথি ও সালেহর সমর্থকরা। এরই মধ্যে সংসদ বাতিল করা হয় এবং বিপ্লবী কমিটি গঠনের মাধ্যমে মুহাম্মদ আলী আল-হুথিকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দিয়ে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। তাই হাদি প্রশাসন কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে। আর নতুন প্রেসিডেন্টের দুর্বলতার সুযোগে ইয়েমেনের যাইডি শিয়া মুসলিম নেতৃত্বের হুথি আন্দোলনের কর্মীরা সাডা প্রদেশ এবং আশপাশের এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এ-সময় অনেক সুন্নিরাও তাদের সমর্থন জোগায়। ২০১৪ সালে সর্বশেষ তিনি রাষ্ট্রক্ষমতা ছেড়ে তার মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে সৌদি আরবে পালিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করার নেপথ্যে সেদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর বহুধাবিভক্তিও অন্যতম কারণ। কিন্তু গণবিপ্লবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বিপ্লবী কমিটির কোনো কাজ ও ঘোষণা মেনে নিতে পারেনি সৌদি আরব ও তার সমর্থকরা। একই অবস্থানে চলে যায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জগৎ। নতুন সরকারের পক্ষে ২০১৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নতুন সাংবিধানিক ঘোষণাকে তারা অবৈধ বলে আখ্যায়িত করে। সৌদি আরব ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা ইয়েমেনের ‘নীরব গণবিপ্লব’কে হুথি শিয়াদের আন্দোলন বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। আর চিরাচরিত প্রথায় বিল্পবী শক্তির বিরোধিতা করে মাঠে নামে আমেরিকা। শুরু হয় হুথি নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী কমিটিকে ক্ষমতাচ্যুত করার কর্মকা-।
২০১৪ সালে হুথিরা দেশটির রাজধানী সানাসহ উত্তরাঞ্চল দখল করে নেয়। কিন্তু দক্ষিণের ৪টি সুন্নি প্রধান প্রদেশ হুথিদের কর্তৃত্ব মেনে নেয়নি। এমন অবস্থায় হাদি সানা থেকে পালিয়ে গিয়ে এডেনে অবস্থান নেন এবং পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে আবার নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন। এতে দেশটি আবার দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তরের নিয়ন্ত্রণ থাকল হুথিদের হাতে আর সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ দক্ষিণের নিয়ন্ত্রণ থাকল বৈধ প্রেসিডেন্ট হাদির হাতে। এখন হুথিরা চাচ্ছে দেশটিতে শিয়াদের আধিপত্য বিস্তার করতে আর সুন্নিরা চাচ্ছে হাদি সরকারকে। পলায়নরত ইয়েমেনের শাসক হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদিতার অভিযোগ এনে সৌদি আরবের সাহায্য চান। ২০১৫ সালের মার্চে তাকে আবারও ক্ষমতায় বসাতে হামলা শুরু করে সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোট। এর পরেই ইয়েমেনে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয়। দেশের দুই দলের কোন্দল যে গৃহযুদ্ধে রূপ নেবে এমনটা ভাবেনি কেউ।
ইয়েমেনের বর্তমান সংকটটি মধ্যপ্রাচ্যের ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শিয়া-সুন্নির বিরোধকে ছাপিয়ে বর্তমান ইয়েমেন সংকট বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। যেমন ইয়েমেনে দৃশ্যত সুন্নি সরকার ও হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে যুদ্ধ, পাশাপাশি দুটি ইসলামি জঙ্গিগোষ্ঠী সামরিক দিক থেকে সক্রিয় এবং তাদের স্বার্থ ভিন্ন। এর একটি হচ্ছে একাপ অর্থাৎ আল কায়দা ইন দা এরাবিয়ান পেনিনসুলা। অন্যটি হচ্ছে ইসলামি স্টেট, যে গোষ্ঠীটি ইরাক, সিরিয়ায় ব্যাপকভাবে তৎপর। ইয়েমেনের অস্থিতিশীল রাজনীতি এবং পশ্চাৎপদ অর্থনৈতিক সুযোগ নিয়ে আল-কায়দা থেকে শুরু করে বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী শক্তিশালী ভিত তৈরি করে আছে। ফলে এই সংকটে আইএস চাচ্ছে তাদের প্রভাব বৃদ্ধি করতে, অন্যদিকে একাপ চাচ্ছে তাদের প্রভাব বলয় সৃষ্টি করতে। হুথি বিদ্রোহীরা চাচ্ছে শিয়াদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে। অন্যদিকে সুন্নিগোষ্ঠী হাদী সরকারের অবস্থানকে চাচ্ছে আরও সুদৃঢ় করতে। আর লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব চাচ্ছে ইয়েমেনে তাদের ভূ-রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ বজায় রাখতে। ফলে দেখা যাচ্ছে, ইয়েমেন রাষ্ট্রটি গভীর থেকে গভীরতর সামরিক সংকটে নিপতিত হচ্ছে। যেখানে বহির্বিশ্বের বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব ক্রমাগত দৃশ্যমান। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। এই সংকট থেকে বের হওয়া একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। কয়েক বছর ধরেই ইয়েমেনের মানুষ ভালো নেই। একদিকে হুথিদের আক্রমণ, অন্যদিকে সৌদি আরবের বর্বরোচিত বিমান হামলা। এর সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে আল-কায়দার জঙ্গি তৎপরতা। আমেরিকা, রাশিয়া, ইরান, চীন ও সৌদি আরব নিজ নিজ স্বার্থ রক্ষার জন্য ইয়েমেনের সরকার, হুথি বিদ্রোহী, দক্ষিণের স্বাধীনতাকামী ও জঙ্গিদের সহায়তা দিচ্ছে। কিন্তু ইয়েমেনের জনসাধারণের কথা কেউ বিবেচনা করছে না। মার্কিন সহায়তাপুষ্ট সৌদি আরব শুধু সামরিক হামলা করেই ক্ষান্ত হয়নি; ইয়েমেনের জল ও আকাশসীমায় অবরোধও আরোপ করেছে। জাতিসংঘ মানবতার ভয়াবহ বিপর্যয় হচ্ছে বলে বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব পালন করছে। এভাবেই ইয়েমেনের সংকট জটিল থেকে জটিলতর হতে থাকে। এরপর ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আর অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ক্রমেই আঞ্চলিক লড়াই থেকে আন্তর্জাতিক আবহ লাভ করে। ইয়েমেন মূলত মার্কিন ও ইরানিদের যুদ্ধ চলছে। মার্কিনের পক্ষে প্রক্সি দিচ্ছে সৌদি আর হুথিদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে ইরান। মাঝ থেকে দুর্দশায় পড়েছে সিভিলিয়ানরা।
ইরানকে পেছন থেকে সমর্থন দিচ্ছে রাশিয়া ও চীন। চীনের লক্ষ যদি হয় বাণিজ্য, তবে রাশিয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য খর্ব করা। চীন এডেন বন্দরকে নিয়ন্ত্রণে নিতে চায় বাণিজ্যিক কারণে। ইরান ও রাশিয়ার উদ্দেশ্য সামরিক। অন্যদিকে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটকে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করছে আরবে ক্রমবর্ধমান রাশিয়া ও ইরানের প্রভাবকে প্রতিহত করতে। ইরানের প্রভাব বৃদ্ধি কেবল শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মাথাব্যথার কারণ না; একই সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তার বিষয়টিও যুক্তরাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হচ্ছে।
সবকিছু মিলে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে নানা দল লড়াই করছে। সৌদি সমর্থন পুষ্ট ইয়েমেনের সরকারকে ত্রিমুখী আক্রমণ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ইরানের সহায়তাপুষ্ট শিয়া হুথিগোষ্ঠী, দক্ষিণের স্বাধীনতাকামী ও ধর্মীয় জঙ্গিগোষ্ঠী। সরকারবিরোধী তিন পক্ষ আবার নিজেদের মধ্যে লড়াই করছে। হুথিদের ওপর সৌদি জোট যেমন হামলা করছে; আবার হুথি বিদ্রোহীরাও সৌদিকে লক্ষ্য করে মিসাইল ছুড়ছে। ইয়েমেনের বিপ্লবী যোদ্ধারা গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে সৌদি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বীরবিক্রমে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং প্রথম দিকে তারা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হলেও এখন তারা সৌদি আরবের অভ্যন্তরে আঘাত হানছে। মানবিক বিপর্যয় ঘটলেও হুথিরা দুর্বল হয়নি; বরং সৌদির সামরিক খরচ বাড়ছেই। শিয়া-সুন্নি বিভেদের রূপ দিয়ে সৌদি আরবে ইয়েমেন ইস্যুতে অন্যান্য সুন্নি দেশের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে।
আমেরিকা ও ইসরায়েলের সর্বাত্মক সাহায্য সমর্থন নিয়েও সৌদি আরব ইয়েমেন যুদ্ধে কোনো সাফল্যই অর্জন করতে পারেনি। ২০১৬ সালের ২৬ মার্চ যুদ্ধ শুরু করে সৌদি আরব ভেবেছিল, খুব সহজেই তারা জনপ্রিয় আনসারুল্লাহ বাহিনীকে পরাজিত করে ইয়েমেন দখল করে নেবে এবং পছন্দের সরকার বসাবে। কিন্তু যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি, ইয়েমেন যুদ্ধ সৌদি আরবের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ইয়েমেনের তেল এবং গ্যাসের ওপর মার্কিন নজরও রয়েছে।
সৌদি-ইয়েমেন সংঘর্ষের কারণটা আসলে শুধু ভূ-রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখানে কারণের পিছনের কারণ দেখা যাচ্ছে। মুসলিমদের অভ্যন্তরীণ বিভাজন। শিয়া-সুন্নির ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব। ইয়েমেনের যুদ্ধ বুঝতে হলে বুঝতে হবে ক্ষমতার কেন্দ্র। মধ্যপ্রাচ্যের শিয়া অধ্যুষিত দেশগুলোর শাসকগণ সুন্নি রাজ পরিবার বা নেতা আর খুব স্বাভাবিকভাবেই তারা কোনোদিন শিয়াদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে আগ্রহী নয়। শিয়াদের ক্ষমতার পালাবদল ঠেকিয়ে রাখতে দরকার সামরিক আগ্রাসন। বোমাবর্ষণ করে জয় সুনিশ্চিত করতে চাইছে সৌদি আরব। আরব দুনিয়ায় নিজের কর্তৃত্ব কায়েম করতে তৎপর সৌদি। ইয়েমেনের সরকার এবং হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যকার জনযুদ্ধে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে ১০ হাজার মানুষ, ইতোমধ্যে বাস্তুহারা হয়েছে ৩০ লাখ নিরীহ মানুষ আর অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে আর্থিক ক্ষতি হয়ে গেছে ১৪ বিলিয়ন ডলার। ইয়েমেনে এ মুহূর্তে চলছে পৃথিবীর সর্বাধিক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়।
গত আট বছরেও ইয়েমেন তার সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সৌদি আরবসহ মুসলিম বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ ইয়েমেনের বৈধ সরকারের পক্ষে। বিশ্বের বেশির ভাগ শক্তিশালী রাষ্ট্র যখন ইয়েমেনের বৈধ সরকারের পক্ষে তখন বিশ্বের অন্যতম দুই পরাশক্তি রাশিয়া ও চীন এক্ষেত্রে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে; যা পরোক্ষভাবে ইরানকেই সমর্থন করে। তাই সবদিক থেকে মনে হচ্ছে সুবিধাবাদী আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো ইয়েমেনের সমস্যার কোনো সমাধান করতে পারবে না। ইয়েমেনকে তার সমস্যা নিজে থেকেই সমাধান করতে হবে। তা না হলে এই অচলাবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হবে। দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে তাদের নিজে থেকে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমাধানে পৌঁছতে হবে। আর সেটি সম্ভব না হলে বিশ্ববাসী আরেকটি ধ্বংসযজ্ঞ দেখবে।

Category:

Leave a Reply