উন্নয়ন ও গণতন্ত্র অবিভাজ্য

Posted on by 0 comment

smসম্প্রতি দেশের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন এবং কেউ কেউ পরস্পর বিরোধী প্রপঞ্চ হিসেবে অপব্যাখ্যার চেষ্টা করেছেন। ভাবখানা এ রকম যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেহেতু দেশের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, অতএব তার কাছে গণতন্ত্র মূল্যহীন। বুঝে না বুঝে আওয়ামী লীগের পক্ষের কেউ কেউ এই বিকৃত ব্যাখ্যা ও অপপ্রচারের ফাঁদে পা দিচ্ছেন। তারা এবং কোনো কোনো মন্ত্রণালয়ের নির্বোধ অথবা ঘড়েল আমলারাও সরকারের সাফল্য তুলতে গিয়ে বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন এবং পোস্টারে শেখ হাসিনার উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে এমন ভাষায় প্রকাশ করছেন, যাতে মনে হতে পারে গণতন্ত্র নয় উন্নয়নই শেখ হাসিনার একমাত্র অভিষ্ট। বুদ্ধিজীবী, কলামিস্ট ও টকশোজীবীদেরও অনেকে বিএনপি-জামাত জোটের নেতাদের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে আর্তনাদ করে বলছেন, উন্নয়নের নামে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠিয়েছেন। প্রকারান্তরে সরকার উন্নয়নের কথা বলে গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করছে। আবার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দাবিদার অতি উৎসাহী অথবা না বুঝে কেউ কেউ দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এবং তাইওয়ানের দৃষ্টান্ত সামনে এনে বলছেন, এসব দেশ গণতন্ত্রকে স্থগিত রেখেই তত দ্রুত উন্নতি করতে সক্ষম হয়েছে। উন্নতির পর গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন করেছে। পুরো বিষয়টিকে একটা তাত্ত্বিক ছাঁচে ফেলে গণতন্ত্র ও উন্নয়ন একসাথে সম্ভব নয় বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা করছেন।
আমরা প্রথমেই বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও বিকাশের ক্ষেত্রে এই তত্ত্বকে নাকচ করছি। কেননা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশগুলোর বাস্তবতা আর আমাদের দেশের বাস্তবতা এক নয়। দ্বিতীয়ত ঠা-া লড়াইয়ের যুগের বিশ্ব পরিস্থিতিতে এই দেশগুলো ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বলয়ে। যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত কারণেই চীনের বিরুদ্ধে ও সমাজতন্ত্রের বিপরীতে এই দেশগুলোকে তার পক্ষপুটে রাখার জন্য, এসব দেশের সামরিক ও স্বৈরতন্ত্রী শাসকগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক মদত দিয়েছে। একই সঙ্গে এসব দেশে সামাজিক বিপ্লব ঠেকাতে দ্রুত পুঁজিবাদী বিকাশে অঢেল সহায়তা করেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও অধিকতর জনসংখ্যা অধ্যুষিত, কিন্তু মার্কিন প্রভাবিত ইন্দোনেশিয়া বা ফিলিপিনস কিন্তু কাক্সিক্ষত উন্নয়ন করতে পারেনি। অতএব এই তত্ত্ব ঠিক নয় যে, গণতন্ত্র না থাকলেই আমরা দ্রুত দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরের মতো দ্রুত উন্নতি করতে পারব। অব্যাহত গণতন্ত্রহীনতা ও স্বৈরতন্ত্রের নিশানবরদার পাকিস্তানকে অঢেল মার্কিন ও চীনা সাহায্য সত্ত্বেও দেশটিকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে, সেটা আমাদের বুঝতে হবে।
উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে জননেত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টিভঙ্গি এবং অবস্থানটিই যথার্থ। ১৯৮১ সালে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর এই দীর্ঘকালজুড়ে তিনি একটি স্লোগানকে সামনে রেখে অগ্রসর হয়েছেন। তিনি ‘ভোট ও ভাতের অধিকার’কে এক সুতায় গেঁথে যেমন লড়াই-সংগ্রামে দেশবাসীকে সংগঠিত এবং ঐক্যবদ্ধ করেছেন; তেমনি ক্ষমতায় গিয়েও তিনি জনগণের ভাতের অধিকার তথা উন্নয়ন এবং গণতন্ত্রকেও একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন। দেশবাসী এজন্যই তাকে ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা’ হিসেবে মনের মণিকোঠায় স্থান দিয়েছে। পক্ষান্তরে বিএনপি ও খালেদা জিয়া ‘উন্নয়ন ও গণতন্ত্র’ উভয়েরই প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
এ কথা পরিষ্কার করে বুঝতে হবে, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বাস্তবতায় উন্নয়ন ও গণতন্ত্র একটি অবিভাজ্য প্রক্রিয়া। গণতন্ত্রে কেবল ‘ভোট’ নয়, গণতন্ত্রের মর্মবাণী হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণ, নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন বা পরিবর্তন, মানুষের মৌলিক অধিকার সুনিশ্চিত করা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। তেমনি উন্নয়নের অর্থ কেবল প্রবৃদ্ধি বা সম্পদের পাহাড় গড়া নয়; উন্নয়নের মর্মবাণীও হচ্ছে সম্পদের ওপর জনগণের ন্যায্য অধিকার, জনগণের জীবনমানের ক্রমাগত উন্নতি এবং দারিদ্র্য ও শোষণ-বঞ্চনামুক্ত একটি উন্নত-সমৃদ্ধ সমাজ নির্মাণ। জনগণের অংশগ্রহণ (গণতন্ত্র) ছাড়া যেমন কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সম্ভব নয়, তেমনি সম্পদ সৃষ্টি ও সম্পদের ন্যায্য বণ্টন (উন্নয়ন) মানেই হচ্ছে গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণ। গত ১ এপ্রিল ঢাকায় অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন-আইপিইউ-র পাঁচ দিনব্যাপী সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে তার বক্তৃতায় সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘আমরা গণতন্ত্রকে শুধু একটা ব্যবস্থা হিসেবে দেখি না; বরং গণতন্ত্রকে মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাহন হিসেবে গণ্য করি।… আমি মনে করি, একমাত্র গণতন্ত্রই মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহ পূরণ করে উন্নত জীবন নিশ্চিত করতে পারে।’
শেখ হাসিনার উল্লিখিত মন্তব্য থেকেই সুস্পষ্ট যে, গণতন্ত্র ও উন্নয়ন হচ্ছে পরস্পরের পরিপূরক একটি অভিন্ন প্রক্রিয়া। আর এই প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার সারথি হচ্ছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা।

Category:

Leave a Reply