এইটা আমার নিজের গল্প

Posted on by 0 comment

বাবা-মা মারা যাওয়ার পর আমাদের সেই ঘোর বিপদের দিনে, দুঃসময়ে আমার বাবার ভাইরা মানে আমার বাবার রক্ত পানি করা টাকায় মানুষ হওয়া চাচারা ‘টিনের চশমা’ পরে দারুণ উদাস হয়ে গেলে আমার নানা আর আমার নানি, আমার চার খালা, আমার চার মামারা আমাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন।

33মাহবুব রেজা: আমার দু বছরের বড় ছিল রুমি।
কয়েকদিন ধরে ওকে খুব মনে পড়ছে আমার।
কত স্মৃতি আমাদের!
ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে বেড়ে উঠেছি আমি আর রুমি। একসঙ্গে খেলাধুলা। এক স্কুলে পড়াশোনা। স্কুলের নাম নারিন্দা গভ. হাই স্কুল।
বাবা-মা মারা যাওয়ার পর আমরা ছয় ভাই, এক বোন নানাবাড়ি চলে এলাম।
আজিমপুর কলোনি। দুই নম্বর বিল্ডিং। বি নম্বর ফ্ল্যাট। আমাদের বিল্ডিংয়ের পেছনে চায়না বিল্ডিং। আজিমপুর কলোনি থেকে আমি আর রুমি দুই ভাই একসঙ্গে বাসে চেপে ফুলবাড়িয়া নামতাম, তারপর সেখান থেকে হেঁটে হেঁটে নবাবপুর, টিপু সুলতান রোড, যোগিনগর, বনগ্রাম, রেঙ্কিন স্ট্রিট ঘুরে ঘুরে স্কুলে যেতাম।
দুই ভাই মিলে কত গল্প করতাম।
কত কথা যে বলত রুমি!
স্কুল ফাঁকি দিয়ে রুমি আমাকে প্রথম গুলিস্তান হলে বাংলা সিনেমা দেখিয়েছিল। সিনেমার নাম সঙ্গিনী। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর আমাদের সেই ঘোর বিপদের দিনে, দুঃসময়ে আমার বাবার ভাইরা মানে আমার বাবার রক্ত পানি করা টাকায় মানুষ হওয়া চাচারা ‘টিনের চশমা’ পরে দারুণ উদাস হয়ে গেলে আমার নানা আর আমার নানি, আমার চার খালা, আমার চার মামারা আমাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন।
আমাদের পাশে ছায়ার মতো লেগে রইলেন।
আমার খালারা, আমার মামারা নিজেরা কষ্ট করে, নিজেদের খাবার আমাদের মুখে তুলে দিয়েছিলেন। আমাদের নিদারুণ কষ্টের দিনে তারা আমাদের সব উজাড় করে দিয়েছিলেন।
নানার বড় সংসার।
তারপর আমরা একেক ভাই একেক আত্মীয়ের বাসায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রইলাম।
তখন আমাদের অনেক অভাব।
তখন আমাদের অনেক অনটন।
তখন আমাদের অনেক দুঃসময়।
আমরা ভাইরা একেক জায়গায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে আমাদের খুব একটা দেখা-সাক্ষাৎ হতো না। আমাদের তখন দেখা হতো কালে-ভদ্রে, ঈদ-টিদে।
সেই সব উৎসবে যখন আমাদের দেখা হতো তখন কেন যেন আমরা নিজেদের মধ্যে খুব একটা কথাবার্তা চালাচালি করতাম না। আমরা ভাইরা তখন কথা বলে সময় নষ্ট না করে একেকজন একেকজনের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতাম।
বড় ভাই পড়াশোনার চেয়ে টিউশনিতে বেশি ব্যস্ত থাকত। কীভাবে দুটো বাড়তি পয়সা আয় করে ছোট ভাইদের দাবি মেটানো যায়। মেজ ভাইও টুকটাক কন্ট্রাক্টরির কাজ করে বড় ভাইকে সাহায্য করতে সচেষ্ট।
আমাদের তখন দুর্দিন।
আমাদের তখন হাহাকার।
১৯৮৪ সাল।
রুমি তখন কলেজে।
কি ঝলমলে সুন্দর দেখতে ছিল আমার ভাইটা!
ঝাঁকড়া চুল। পাকা গমের মতো গায়ের রং।
আমার বাবা-মার খুব নাকি আদরের ছিল রুমি!
একদিন কাউকে কিছু না বলে, একা একা অভিমান করে আমার ভাইটা হুট করে মরে গেল। আমি তখন আমার বড় খালার বাসায় থাকি। এক সকালে আমার মেজ ভাই ফ্যাঁকাসে মুখ নিয়ে খালার বাড়ি এসে আমাকে রিকশায় তুলে নিয়ে সোজা চলে গেল ঢাকা মেডিকেলে। পুরোটা রাস্তাজুড়ে আমার মেজ ভাই আমার সঙ্গে কোনো কথা বলল না। শীতের সকাল। ঠা-া বাতাস শরীরে এসে বুঝিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল।
আমি কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এই সাতসকালে কেন মেডিকেলে?
জীবনে সেই আমার প্রথম আর শেষবারের মতো মর্গে যাওয়া।
ঠা-া মেঝেতে আমার বাবা-মার বড় আদরের সন্তান অবহেলায়-অযতেœ পড়ে আছে মর্গের ঠা-া মেঝেতে। রুমি শুয়ে কি আমাদের ওপর রাগ আর অভিমান করে এখানে এভাবে, এমন করে শুয়ে আছে? রুমির পাশে স্তূপ করে রাখা কয়েকটি দেব শিশু। ওদের শরীর কেমন নীল হয়ে আছে। আমি রুমিকে যত না দেখছিলাম তার চেয়ে বেশি বেশি চোখ আমার চলে যাচ্ছিল শিশুগুলোর দিকে। আমার মেজ ভাই পাগলের মতো কেঁদে যাচ্ছিল আর বলছিল, ‘রুমি রে তুই এইটা কি করলি? তুই এইটা কি করলি?’
আমার ঝাপসা দৃষ্টিতে রুমি আর দেব শিশুগুলো মিলেমিশে একাকার।
আহা রে!
আহা রে!
আহা রে!
আহা রে!
সেই সকালে আমি অভিশাপ দিয়েছিলাম নিজেকে।
আমাদের অভাবকে।
আমাদের দুঃসময়কে।
আমাদের দুর্দিনকে।
আমাদের হাহাকারকে।
আমাদের দীর্ঘ নিঃশ্বাসকে।
সেই সকালে আমি আরও অভিশাপ দিয়েছিলাম আমাদের এই রকমভাবে বেঁচে থাকাকে।
এভাবে বেঁচে থাকাকে কি কেউ বেঁচে থাকা বলে!

Category:

Leave a Reply