এই মানবিক বিপর্যয় প্রতিরোধে এগিয়ে আসুন

2

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নাও

রাখাইন এখন মৃত্যুপুরী। রক্তাক্ত জনপদ। ধ্বংস ও বহ্নোৎসবের জনপদ। সাগরে ভাসছে লাশ। নাফ নদীর তীরে লাখো উদ্বাস্তুর ভিড়। ¯্রােতের মতো মানুষ আসছে। প্রাণ বাঁচাতে। নিরাপদ জীবনের সন্ধানে। এই বিপুল গৃহহীন, কপর্দকহীন পলাতক নর-নারী-শিশুর দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। তবুও জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার চরম মানবিক বিপর্যয়ের শিকার রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।
জাতিসংঘ বলছে ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর সংখ্যা ৩ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। তারপরও ¯্রােত অব্যাহত আছে। বাংলাদেশ প্রতিবেশী মিয়ানমারকে বলেছে, তাদের নাগরিকদের স্বদেশে ফিরিয়ে নেওয়া; তাদের নিরাপত্তা বিধান এবং সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নিতে। কিন্তু শান্তিতে নোবেল জয়ী সু চি’র সরকার এখনও আমাদের আহ্বানে সাড়া দেয়নি। উল্টো রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগের বিষয়টিকে মিথ্যা প্রচারণা বলে আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলোকে অভিযুক্ত করছে। বৌদ্ধ ধর্মমতের অনুসারী মিয়ানমার সরকারের কাছে বৌদ্ধের শান্তির বাণী, মানবিকতার শিক্ষা কোনো কাজেই লাগছে না।
রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্ঘদিনের। একবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে, আবার হঠাৎ করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। তখন নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গারা প্রাণ বাঁচাতে নিজেদের পিতৃ-পিতামহের ভিটা-মাটি ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। গত শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে এই ধারা চলছে। ১৯৭৮ সালে এবং স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে জিয়া-এরশাদের স্বৈরশাসনের আমলে, খালেদার শাসনামলে বার বার এটা ঘটেছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে এসে জননেত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমারের সাথে সৎ প্রতিবেশীসুলভ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। এই উদ্যোগের ফলে মিয়ানমারসহ বেশ কয়েকটি উপ-আঞ্চলিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক জোট গড়ে ওঠে। হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়। আশা করা গিয়েছিল অং সান সু চি কফি আনান কমিশনের সুপারিশ মেনে নিয়ে সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেবেন। কিন্তু তা তো হলোই না, আবার মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর এথনিক ক্লিনজিং অভিযানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় রাখাইনের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। চলছে মানবতার বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর অপরাধ (ঈৎরসব অমধরহংঃ ঐঁসধহরঃু)। কিন্তু কেন? রোহিঙ্গারা কী মিয়ানমারের নাগরিক না।
মিয়ানমার ভৌগোলিক আয়তনে বেশ বড় দেশ। নৃ-তাত্ত্বিক দিক থেকে দেশটি বৈচিত্র্যপূর্ণ। মিয়ানমারে মোট ১৩৫টি এথনিক জনগোষ্ঠী বাস করে। এর মধ্যে বামার নৃ-গোষ্ঠী হচ্ছে সর্ববৃহৎ। এ ছাড়াও প্রধান নৃ-জাতিগুলো হচ্ছে মন, শান, কাচিন, চিন, রাখাইন, কেয়াইন ও কায়াহ প্রভৃতি। রোহিঙ্গারা একটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ২ মিলিয়নের মতো। রাখাইন রাজ্যটিই হচ্ছে অতীতের আরাকান। আরাকানে প্রথম আরব বণিকরা আসে। আরব বণিক ও সুফি সাধকদের মাধ্যমে আরাকানে মুসলমানদের প্রতিপত্তি বাড়তে থাকে। সপ্তম-অষ্টম শতাব্দী থেকেই আরাকানে মুসলমানরা বসতি স্থাপন করতে থাকে। মধ্যযুগে একসময় চট্টগ্রাম পর্যন্ত আরাকান রাজ্য বিস্তৃত হলে চট্টগ্রাম থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলা ভাষাভাষী হিন্দু মুসলমান আরাকান বা আজকের রাখাইনে বসতি স্থাপন করে। আরাকানের রোসাঙ্গ রাজসভার একসময় বাঙালি কবি, সংগীতজ্ঞ প্রভৃতি জ্ঞানী-গুণীরা অমাত্য হিসেবে স্থান পায়। মহাকবি আলাওল, কবি দৌলত কাজী প্রমুখÑ মধ্যযুগের কবিদের সৃষ্টিকর্ম আরাকান রাজসভাকে আলোকিত করেছিল। ভারতে মুঘল শাসনাবসনের আগেই আরাকানে প্রায় ছয় বছর যাবত বসতি স্থাপনকারী জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গা নামে একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তায় রূপান্তরিত হয়। একসময় মিয়ানমারের বামার শাসকগোষ্ঠী আরাকান দখল করে নেয়। আর তখন থেকেই শুরু হয় রোহিঙ্গাদের উৎখাতের তৎপরতা। উনিশ শতকের তৃতীয় দশকে সমগ্র মিয়ানমার বা বার্মা ব্রিটিশ শাসনাধীন হয়। সাময়িকভাবে হলেও তখন রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধ হয়।
বস্তুত ষাটের দশক থেকে জেনারেল নে উইনের সামরিক শাসনামলে মিয়ানমারে জোরোশোরে নতুন করে রোহিঙ্গা নির্যাতন শুরু হয়। রোহিঙ্গাদের সাংবিধানিক অধিকার রহিত করে ‘বহিরাগত’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আরাকানের বৃহত্তম এথনিক জনগোষ্ঠী রাখাইনদের নামে যেমন প্রদেশটির নতুন নামকরণ করা হয়, তেমনি রাখাইনদের লেলিয়ে দেওয়া হয় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে। স্বাভাবিকভাবেই হিং¯্র আক্রমণের শিকার রোহিঙ্গা তরুণদের একটি অংশ আত্মরক্ষার্থে হাতিয়ার তুলে নেয়।
কিন্তু রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নির্যাতনের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের উদ্যোগ না নিয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের মধ্যে সশস্ত্র বিদ্রোহ উসকে তোলে। পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীÑ আইএসআই, এই কাজে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি রক্ষণশীল দেশ এ ব্যাপারে পাকিস্তানিদের মদদ জোগায়। এ সুযোগে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা আরও হিং¯্র হয়ে ওঠে। রোহিঙ্গারা তাদের আত্মরক্ষার সুযোগটুকুও পায় না। ফলে মিয়ানমার থেকে জমি-ভিটে-মাটি হারিয়ে হাজার হাজার বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। বাংলাদেশ ছাড়াও তারা আরও একাধিক দেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। প্রকৃতপক্ষে একটা গোটা জাতিগোষ্ঠী ‘রাষ্ট্রহীন’ উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়। বাংলাদেশে যার সংখ্যা ইতোমধ্যে প্রায় ৭ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর বিশেষ করে জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার সমস্যাটির শান্তিপূর্ণ স্থায়ী সমাধানের জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে দেশবাসীকে এ ব্যাপারেও সচেতন থাকতে হবে যে, অতীতে যারা রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র সংগঠন গড়ে তোলার উসকানি ও মদদ দিয়েছে, দেশের ভেতরে সেই বিএনপি-জামাত গোষ্ঠী এবং পাকিস্তানের আইএসআই ‘মুসলমানদের প্রতি দরদ’ দেখাতে গিয়ে এখনও চক্রান্ত অব্যাহত রেখেছে। ওরাও রোহিঙ্গা সংকটে ইন্ধন জুগিয়ে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়। বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতিকে ব্যাহত করতে চায়। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে সুপ্রতিবেশীসুলভ বন্ধুত্বপূর্ণ আস্থার সম্পর্ক বিকাশে অন্তরায় সৃষ্টি করতে চায়।
একইসঙ্গে এ কথাও ভুলে গেলে চলবে না, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো, বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশের জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীগুলো আরাকান এবং চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের অংশবিশেষ নিয়ে একটি তথাকথিত ‘মুসলিম রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার বহুমুখী চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। বাংলাদেশে জামাতে ইসলামি, বিএনপি এবং জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো যেমন এই তৎপরতায় মদদ দিচ্ছে। তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের এনজিও সংগঠনগুলোও এই তৎপরতায় যুক্ত রয়েছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মিয়ানমারের ভৌগোলিক-সামরিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে চীন, ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৃহৎ শক্তিগুলোর বহুমুখী স্বার্থ জড়িয়ে আছে, এ দেশটিকে কেন্দ্র করে। তারাও মিয়ানমারের প্রকৃত শাসক সেনাবাহিনীকে চটাতে চাইবে না। যত বড় ও ভালো প্রতিবেশীই হোক না কেন, চীন বা ভারত কেউই তাদের ‘স্বার্থ’ ক্ষুণœ না হলে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধে তাদের প্রভাব ব্যবহার করবে না। যদিও শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের অনেক দেশ রোহিঙ্গা নির্যাতনের ব্যাপারে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে।
বাংলাদেশ সমস্যাটিকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে না। এটা একটা মানবিক বিপর্যয়। দ্বিতীয়ত; সমস্যাটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান তাদেরই করতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন, আনান কমিশনের সুপারিশ ও জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণার আলোকে আমরা চাই রোহিঙ্গারা তাদের মাতৃভূমিতে ফিরে যাক। যত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীই হোক না কেন, তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ও জীবনধারার অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার (জাতিসংঘ সনদ) অনুযায়ী মিয়ানমারকে তাদের নাগরিকদের রক্ষা করতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে ক্ষুদ্র নৃ-জাতি গোষ্ঠীগুলোর অধিকারের স্বীকৃতি দিয়ে বিশ্বের সামনে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বাংলাদেশ ধর্ম, বর্ণ ও জাতি নির্বিশেষে কোনো বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করেনি।
আমরা বিশ্বের সকল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সকল দেশের জনগণ, সরকার এবং জাতিসংঘসহ সকল আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতি আহ্বান জানাই, অবিলম্বে মিয়ানমারে সংঘটিত হিংসা, রক্তপাত ও মানবিক বিপর্যয় প্রতিরোধে এগিয়ে আসুন। উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ও পুনর্বাসনের পরিবেশ সৃষ্টি করুন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের প্রস্তাব অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের জন্য মিয়ানমারের অভ্যন্তরে একটি নিরাপদ অঞ্চল গড়ে তুলুন। এটা কোনো ধর্মীয় সমস্যা হিসেবে নয়, জাতিগত সমস্যা হিসেবে শান্তিপূর্ণ স্থায়ী সমাধানের জন্য আপনাদের প্রভাব ও ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগান। আনান মিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত করুন।
মিয়ানমার সরকারের প্রতি আমাদের আহ্বান, আমাদের উভয় দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি এবং সীমান্তে শান্তি নিশ্চিত করার জন্য রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান করুন। আপনাদের নাগরিকদের আপনারা ফিরিয়ে নেন। জঙ্গিগোষ্ঠীর অপতৎপরতা প্রতিরোধের অজুহাতে একটি পুরো জাতিগোষ্ঠীর লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষকে হত্যা, সন্ত্রাস ও দেশ থেকে বিতরণের এই বর্বর প্রচেষ্টা, এই মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ থেকে বিরত থাকুন।

Category:

Leave a Reply