একাদশ জাতীয় সংসদের যাত্রারম্ভ : রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ঐক্যের আহ্বান

দেশের শান্তি, উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে স্থিতিশীল করতে হলে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। একাদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তার ভাষণে এ-কথা বলেন। প্রায় একই কথা বলেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনের একাধিক অনুষ্ঠানে। তারা উভয়েই দলমত নির্বিশেষে দেশবাসী, দেশের সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ও সিভিল সমাজের প্রতি এই জাতীয় ঐক্যের উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।
গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ও সময়োচিত এই ‘জাতীয় ঐক্যের আহ্বান’কে দেশের চিন্তাশীল মানুষ, শান্তিকামী সাধারণ নাগরিকগণ, উদ্যোক্তা শ্রেণি, ব্যবসায়ী এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ^াসী বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল স্বাগত জানিয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পটভূমিতে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। তবে যেমন মহামান্য রাষ্ট্রপতি তেমনি দূরদর্শী রাজনীতিবিদ হিসেবে শেখ হাসিনা সঠিকভাবেই উপলব্ধি করেছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মতদ্বৈধতা থাকবে, নির্বাচনে পক্ষ-বিপক্ষ থাকবে এবং মতবৈচিত্র্যও থাকবে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নেÑ কেউ কারও প্রতিপক্ষ হতে পারে না। বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ কে? বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে জাতীয় স্বার্থের অন্য কোনো অর্থ, লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য থাকতে পারে না।
তবে, আমাদের এই মন্তব্যকে অনেকে অতি সরলীকরণ মনে করতে পারেন। বিএনপি-জামাতের সহিংস কর্মকা-, ষড়যন্ত্র এবং পদে পদে বাধাদান সত্ত্বেও গত ১০ বছরে দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি থেমে থাকেনি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ বিএনপি-জামাত চক্রকেই কেবল নয়, তারা জাতিকে বিভক্ত করার যে ষড়যন্ত্রমূলক নেতিবাচক সহিংস রাজনীতি করেছে, তাকেও প্রত্যাখ্যান করেছে। বস্তুত, নির্বাচনের ফলাফলের ভেতর দিয়েই এক ধরনের জাতীয় ঐকমত্যের অভিপ্রকাশ ঘটেছে। দেশবাসী বিপুলভাবে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ও মহাজোটকে বিজয়ী করেছে। সংসদে এককভাবেই আওয়ামী লীগের দুই-তৃতীয়াংশের অধিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দৃশ্যত বিরোধী দল বিশেষত বিএনপি-জামাত চক্র ওয়াশআউট হয়ে গেছে।
তবুও ‘জাতীয় ঐক্যের’ আহ্বান কেন? ঐক্যের উপযোগিতা কোথায়? প্রথমত, ঐক্যের বিষয়টি সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে বিচার করা যায় না। ঐক্যের মূল প্রেরণা হচ্ছে দেশে দীর্ঘদিনের বিদ্যমান সংঘাতময় রাজনীতির (ঈড়হভষরপঃরহম চড়ষরঃরপং) অবসান ঘটানো। ঐক্য মানে এ-ও নয় যে, সকল বিষয়ে সকল দলকে একমত হতে হবে অথবা বিরোধী দল তার ভূমিকা ছেড়ে সরকারের আনুগত্য করবে। গণতন্ত্রে বিরোধী দলও সরকারের অংশ। অংশীদারিত্বটা নেতির নেতিকরণের অর্থাৎ সরকারের কোনো কাজ জনগণের বা দেশের স্বার্থের পরিপন্থী মনে হলে বিরোধী দল সেটা ধরিয়ে দেবে এবং ইতিবাচক সমালোচনার মাধ্যমে সরকার পক্ষকে সেই কাজ থেকে অর্থাৎ ভুল থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করবে। উভয় পক্ষকেই এখানে জাতীয় স্বার্থকে সমুন্নত রাখার জন্য একমত হতে হবে। আর যদি তারা একমত না হন, সেক্ষেত্রে নির্ধারক ভূমিকা পালন করবে জনগণ। ভুলের প্রশ্নে শেষাবধি রায় দেবে জনগণÑ এ জন্যই নির্বাচন ব্যবস্থা।
একাদশ জাতীয় সংসদ কিন্তু সে-রকম রায়ই দিয়েছে। বিরোধী দলের উচিতÑ জনগণের রায় মেনে নিয়ে দেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সর্বোপরি স্থিতিশীলতার জন্য পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত গঠনমূলক ভূমিকা পালন করা। সংসদে অংশগ্রহণ করা। কেবল সংখ্যা দিয়েই সংসদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখা যায় না। সত্য, ন্যায় ও শ্রেয়োবোধ দিয়ে সরকারকে তার ভুল ধরিয়ে দেওয়ার জন্য জাতীয় সংসদই হচ্ছে যথার্থ স্থান, যেখানে খোলা মনে আলোচনা-সমালোচনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি সংসদে ভূমিকা পালনের মাধ্যমে জনমত গড়ে তোলার সুযোগ নেওয়াও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ। দেশবাসী চায় শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক ধারায় বিরোধী যে সকল বিষয়ের সমাধানের একটা ঐতিহ্য গড়ে তোলায় ভূমিকা পালন করুক।
মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ঐক্যের যে আহ্বান জানিয়েছেন, তা বিরোধী দলগুলোর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই সুযোগ গ্রহণ করলে বাংলাদেশের রাজনীতির দৃশ্যপট বদলে যাবে। এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

Category:

Leave a Reply