এগিয়ে যাবেই বাংলাদেশ

Posted on by 0 comment

17মুনতাসীর মামুন : ৪৪ বছরে পা দেওয়ার পর একটি রাষ্ট্রকে আর নতুন অভিধা না দেওয়াই বাঞ্ছনীয়। ইতিহাসের আলোকে বা কালের বিচারে ১০০-২০০ বছরের পুরনো রাষ্ট্রকে হয়তো নতুন রাষ্ট্র বলা যেতে পারে, বাস্তবে নয়। পাকিস্তান হওয়ার ২৫ বছরের মধ্যে কিন্তু বাঙালি বেরিয়ে এসেছিল পাকিস্তান থেকে।
স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ টিকবে কি-না এ প্রশ্ন অনেকেরই ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছিল আমেরিকার সাহায্যে ও আগ্রহে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বৈরী মনোভাব পোষণ করেছে আমেরিকা, চীন, আরব রাষ্ট্রসমূহ। সম্পূর্ণ যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ, স্বাধীন দেশে সক্রিয় স্বাধীনতা বিরোধীরা, প্রশাসনিক অস্থিরতা, তারপর দুর্ভিক্ষ, তাও আমেরিকার কারণে। আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিসিঞ্জার তো ঢাকায় এসেই শুনিয়ে গেলেন, বাংলাদেশ বটম লেস বাস্কেট। অবশ্য, চর্যাপদের সময় থেকেই বাঙালি বলেছে, হাঁড়িতে ভাত নেই।
১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাঙালির সব কাহিনির মূল কথাই ছিল হাঁড়িতে কিভাবে ভাত থাকবে। ১৯৭৫ পর্যন্ত সেই একই কথা প্রতিধ্বনিত হয়েছে। এরকম একটি অবস্থা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তখন স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনছেন। উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে তখনই তাকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। তারপর দীর্ঘদিন পাকিস্তানি বাঙালিরা শাসন করেছেন। এই সময় একটি মিথ গড়ে তোলা হয় যে, সোনার বাংলা শ্মশান থাকার কারণ আওয়ামী লীগ বা বঙ্গবন্ধুর শাসন। জিয়া-এরশাদ বা সামরিক শাসন বা সামরিক শাসনই দেশে গণতন্ত্র, শৃঙ্খলা, উৎপাদন বৃদ্ধি ফিরিয়ে এনেছে। মধ্যবিত্তের একটা বড় অংশ এই মিথে বিশ্বাসী। যে কারণে, শেখ হাসিনা কঠিন কোনো বাক্য উচ্চারণ করলে তাদের গায়ে লাগে। কিন্তু, খালেদা যখন বলেন ত্রিশ লক্ষ শহীদ হয় নি মুক্তিযুদ্ধে তখন তারা হে হে করে হাসেন। আশ্চর্য যে, এইসব হেঁ হেঁ ব্যক্তিরা সব আমলে কলাটা মুলোটা পেয়েছেন। এই প্রথমবার মুখোশধারী মান্না গ্রেফতার হওয়ার পর তারা ভয় পেয়েছেন। আমাকে একজন বললেন, তিনি সুশীল তকমাধারী কয়েকজনকে ফোন করেছেন, কেউ ধরছেন না।
বাংলাদেশ-বিরোধীরা এখন বর্তমান রাষ্ট্র ব্যবস্থা ভাঙার জন্য যে প্রবল চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সেটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। আর কিছুদিনের মধ্যেই তারা পর্যুদস্ত হবেন। এখন শুধু ধৈর্য ধরার পালা। তারপর, নতুন উদ্যমে আবার যাত্রা শুরু করা যাবে, নিরবচ্ছিন্নভাবে না হলেও, খানিকটা নির্বিঘেœ কারণ, বিএনপি-জামাত তাদের এজেন্ডা নিয়ে আর বেশি দূর এগুতে পারবে না।
আজ থেকে এক দশক আগেও বাংলাদেশের সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে বেরুতে সংকোচ হতো। আরও আগের তো কথাই নেই। অথচ, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়, তখন অধিকাংশ দেশে যেতে বাঙালির ভিসা লাগত না। বাঙালি তখন বীরের জাতি হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৫ সালের পর থেকে দৃশ্যপট বদলে গেল। কারণ, বাংলাদেশ তখন পরিচিত হয়ে উঠল হন্তারক দেশ হিসেবে। তারপর দুই জেনারেলের মিলিটারি শাসন। বাংলাদেশ পরিচিত হয়ে উঠল ডিকটেটরের দেশ হিসেবে। এরপর খালেদা-নিজামীর জঙ্গি মৌলবাদী শাসন। বাঙালি পরিচিত হয়ে উঠল জঙ্গি মৌলবাদী কোথাও বা মধ্যপন্থি ইসলামি দেশ হিসেবে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে ছিল সেক্যুলার দেশ হিসেবে। অথচ তিন যুগে বিভিন্নভাবে তার পরিচয় বদলেছে। সবাই এ দেশটিকে তখন ব্যর্থ হন্তারক একনায়কী জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করেছে। সুতরাং সবুজ পাসপোর্ট দেখলেই ইমিগ্রেশন কর্তাদের ভ্রু কুঁচকে যেত।
এই রাষ্ট্রের গায়ে আরেকটি তকমা ছিল। তলাবিহীন ঝুড়ি অর্থাৎ ভিক্ষুক রাষ্ট্র। সুতরাং বিদেশের দরজায় যাওয়ার উদ্দেশ্য ওই রাষ্ট্রের উন্নয়নে সহায়তা নয় বরং ভিক্ষা করা। আমার মনে আছে বছর ২৫ আগে যখন জাপান যাই, তাদেরই আমন্ত্রণে, তখন আমার সাথে কী রকম ব্যবহার করা হয়েছিল। ইমিগ্রেশনের লাইনে ছিলাম। আমার পাসপোর্ট দেখে আমাকে আলাদা করা হলো। সবাই বিদেয় হলে তারপর ১৫-২০ মিনিট পরীক্ষা করার পর আমার পাসপোর্টে সিল পড়ল। এর কারণ তখন বিভিন্ন রাষ্ট্রে বাঙালিরা যাচ্ছে ভাগ্য ফেরাবার আশায়। তারা এটি পছন্দ করছে না। কিন্তু, মজার ব্যাপার হচ্ছে, চীন কোরিয়া থেকে তখন আরও বেশি মানুষ যাচ্ছিল জাপান, এমনকি ইরান বা পাকিস্তান থেকেও, কিন্তু জাপানিরা তাদের সাথে খুব একটা খারাপ ব্যবহার করত না, চীন বা কোরিয়ানদের সাথে তো নয়ই। কারণ, আকারে, ক্ষমতায় সেগুলো ছিল শক্তিশালী। বাংলাদেশ তখন শুধু গোলমেলে রাষ্ট্রই নয়, দুস্থ রাষ্ট্রই বটে। ক্ষমতাবানদের কেউ সহজে ঘাটাতে চায় না।
এ থেকে আমাদের জেনারেশন একটি শিক্ষা নিয়েছিলাম। যে লক্ষ্য সামনে রেখে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল তা পূরণ হয় নি। এর জন্য ১৯৭২-৭৫ অবস্থা পটভূমি হিসেবে বিচার করলেও মূল দায় ১৯৭৫-এর পর জেনারেল জিয়ার কাঁধে। প্রথমে সংবিধান সংশোধন ও রাষ্ট্রের মূল নীতি পরিবর্তন যা তিনি করতে পারেন না কিন্তু বুকের দিকে বন্দুক উঁচিয়ে কাজটি তিনি করেছেন। আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচার করা যাবে না বলে ইনডেমনিটি আইন পাস করেছেন। যা তিনি পারেন না। জামায়াতে ইসলাম ও অন্যান্য নিষিদ্ধ দলকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন যা বঙ্গবন্ধু নিষিদ্ধ করেছিলেন। এই প্রথম বিশ্বে বিশ্বাসঘাতক ও খুনিদের ডেকে এনে রাষ্ট্র সমাজে পুনর্বাসন করা হয়েছিল। আরও প্রচুর অপকর্ম করেছেন। আজ এটি স্পষ্ট যে, মুক্তিযুদ্ধে তিনি গিয়েছিলেন বাধ্য হয়ে, আসলে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন পাকিস্তানবাদে। বাঙালির আত্মপরিচয় বদলে বাংলাদেশি করার মাধ্যমে তিনি এই বার্তা দিয়েছিলেন যে ১৯৭১ সাল একটি ব্যত্যয়, বাংলাদেশের মূল ধারা ১৯৪৭। লে. জে. জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের যত ক্ষতি করেছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কেউ তা করেন নি।
লে. জে. হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং খালেদা জিয়াও একই ধারা অনুসরণ করেছিলেন। ফলে গত তিন দশকে যেসব শিশুরা সাবালক হয়েছে তারা বেড়ে উঠেছে ভালোলেন্স, জঙ্গি মৌলবাদ, দায়হীন সংস্কৃতির মধ্যে। এ কারণে, আজ মানবতাবিরোধী অপরাধী ও তাদের দলের সমর্থক বেড়েছে, মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা, স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এমনকি বঙ্গবন্ধুকে ‘পাকবন্ধু’ বলতেও কেউ কেউ দ্বিধা করছে না। যে ব্যক্তি এ কথাটি উচ্চারণ করছেন সে ব্যক্তিকে জামাত-বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর পদে দেখতে চায়। জাতির জনক যদি ‘পাকবন্ধু’ হন তা হলে ইয়াহিয়া খানকে তারা জাতির জনক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এ রকম বিকৃতমনা ভয়ঙ্কর লোকসব যদি রাষ্ট্রক্ষমতায় যায়, তা হলে বাংলাদেশ ও নতুন প্রজন্মের অবস্থা কী হবে ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। তারা সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে দেশের বাইরে পা রাখতে পারবেন না।
১৯৪৭ সালের পর থেকে যদি বাংলাদেশের অবস্থা বিবেচনা করি তা হলে দেখব সেক্যুলার, জাতীয়তাবাদী, গণতন্ত্রীমান দল বা দলগুলো যদি একত্রিত হয়ে অপশক্তিকে প্রতিরোধ করে এবং ক্ষমতায় যায় তখন দেশে শান্তি ও স্থায়িত্ব ফিরে আসে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয় এবং সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়। কয়েকটি উদাহরণ দিই।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ছিল একেবারে বিধ্বস্ত। বঙ্গবন্ধুর পুরো সময়টাই কেটেছে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে ন্যূনতম অবকাঠামো গড়ে তোলা ও সাধারণ মানুষের খাদ্যের বন্দোবস্ত করার যেটি অন্তিমে যুক্তরাষ্ট্রের কারণে সম্ভব হয় নি। কিন্তু, মূল বিষয় হলো সংবিধান থেকে শুরু করে বাজেট সবকিছু নিবেদিত ছিল সাধারণ মানুষের জন্য। এমনকি বিশ্বব্যাংকের ডিকটাট মানতেও রাজি ছিল না বাংলাদেশ। শেখ মুজিব বলেছিলেন, ‘ফান্ডামেন্টালী আমরা একটা শোষণহীন সমাজ গড়তে চাই। আমরা একটা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি করতে চাই।’ দেশের পরিস্থিতি ১৯৭২ সালে কী দাঁড়িয়েছিল তার দু-একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ১৯৭১ সালে চাল ছিল প্রতিমণ ৩৪.৩৬, ১৯৭২ সালে ৯৩.৭৫, চিনি প্রতিসের ২.২৭, ১৯৭২ সালে ৯ টাকা। সরষের তেল ৫.২৭ প্রতিসের, ১৯৭২ সালে ৯৩.৭৫। এ অবস্থায় দেশের ভার গ্রহণ করেও তিনি চেষ্টা করেছিলেন শান্তি, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কারণে ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষ হলেও ১৯৭৫-এর দিকে শৃঙ্খলা ফিরে আসছিল। শেখ মুজিব ১৯৭৪ সালে ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ কর্মসূচি গ্রহণ করার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতার লক্ষণ ফুটে ওঠে। চালের দাম ৮ টাকা থেকে সাড়ে ৫ টাকায়, আলু ২.৭৫ থেকে ১.৫০ পয়সায় নেমে আসে। ঢাকা শহর মধ্যবিত্তের ব্যয় সূচক ৪৫৮.৫ (জানুয়ারি) থেকে ৪১৬.৯ (এপ্রিলে) এবং খাদ্যমূল্য সূচক একই সময়ে ৪৫৯.০ থেকে ৪৪৬.৩ হ্রাস পায়। আগস্ট মাসে অবস্থার আরও উন্নতি হয় ভালো আবহাওয়া ও ভালো ফসল হওয়ার কারণে। দ্রব্যমূল্য নামতে থাকে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা শুরু হওয়ার কথা কিন্তু তার আগেই ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হন শেখ মুজিব।
জিয়াউর রহমান ক্ষমতা সংহত করার জন্য যখন দল গঠন করেন তখন তার সমর্থকদের প্রচুর অবৈধ অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা দেন। বলা হয়ে থাকে, তার আমলে দুর্নীতি যে পর্যায়ে পৌঁছেছিল তার আগে এ ভূখ-ে তা দেখা যায় নি। বিভিন্ন শিল্প-কারখানা, ব্যবসার নামে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো জিয়া সমর্থকদের ঋণ দিতে থাকে। তারা তা গ্রহণ করে আর ফেরত দেয় নি [অধিকাংশ]। এভাবে বাংলাদেশ ‘ঋণখেলাপি’ নামে শক্তিশালী চক্রের সৃষ্টি হয়। বিএনপির রাজনৈতিক কর্মীরা ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সুবিধা লাভ করে। সেনাবাহিনীতে বিনা কারণে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করা হয়। ১৯৮১ সালে সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী দেশে জমা হয়েছিল ৫০০ কোটি কালো টাকা। কারণ ইতিহাসের সাম্প্রদায়িক ও ঔপনিবেশিক মতাদর্শ অক্ষুণœ রেখে যারা ক্ষমতায় আসেন তাদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় নিজের ঘনিষ্ঠ চক্র বা সমর্থকদের সন্তুষ্ট রাখা, সাধারণ মানুষকে নয়। সাধারণ মানুষের অবস্থা তখন কী দাঁড়ায় তারও দু-একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ১৪ আগস্ট ১৯৭৫ সালে যেখানে চাল প্রতিমণ ছিল ৬০ টাকা, ডাল ৩.৫০ প্রতিসের, ডিমের হালি ১.২৫, তরিতরকারি প্রতিসের গড়ে ২.১৭। ১৯৭৮ সালে তা গিয়ে দাঁড়ায় ১০০ টাকা, ৯ টাকা, ৪ টাকা ও ৪.০৬ পয়সা। আরও কিছু সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব দেওয়া যায়Ñ ১৯৬৯-৭০ এর তুলনায় ১৯৭৮-৭৯ সালে চালের ব্যবহার মাথাপিছু হ্রাস পায় ১৬২ কিলোগ্রাম থেকে ১৪০ কিলোগ্রাম। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশে ভূমিহীন সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৫১ শতাংশে। ১৯৬৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ২৯ শতাংশ। জিয়ার কৃষিমন্ত্রী পর্যন্ত জানান, ‘ভূমিহীন ও ভাগচাষিরা প্রকৃতপক্ষে সকল প্রকার নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। জমির মালিকদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক দাস প্রভু ও ক্রীতদাসের মতোই।’
১৯৭৯ সালে, জিয়া যখন ক্ষমতার শীর্ষে তখন বাংলাদেশে ‘কর্মদক্ষ জনসমষ্টির এক-তৃতীয়াংশ ছিল কর্মহীন।’ গ্রামের মানুষ ১৯৭৫-৭৬ সালে গ্রহণ করতেন ৮০৭ গ্রাম খাদ্যদ্রব্য। ১৯৮১-৮২ সালে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ৭৪৯ গ্রামে। ১৯৭৫-৭৬ সালে গড়পড়তা ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণ ছিল ২০৯৪-এ, ১৯৮১-৮২ সালে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ১৯৪৩-এ, যা নি¤œতমের চেয়ে ১৫ শতাংশ কম। ১৯৮১-৮২ সালে তিন-চতুর্থাংশ মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভুগেছেন। ১৯৭৭-৭৯ সালে উচ্চ শিক্ষার্থী ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা হ্রাস পায় ২১ শতাংশ। এ ধরনের ইতিহাসের ধারায় যারা ক্ষমতায় আসেন তারা কিভাবে মানুষজনের সাথে প্রতারণা করেন তা বোঝা যাবে একটি উদাহরণ দিলে। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে জিয়া প্রতিশ্রুত প্রকল্পসমূহের মূল্যায়নের জন্য একটি বৈঠক ডাকা হয় তাতে দেখা যায়, ‘বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে সড়ক ও জনপথ বিভাগে যে পরিমাণ টাকা বরাদ্দ করা হয় তা যদি অব্যাহত থাকে তা হলে প্রেসিডেন্টের প্রতিশ্রুত প্রজেক্ট বাস্তবায়নে ৬২ বছর সময় লাগবে।’
এমনকি ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমান পর্যন্ত এক বক্তৃতায় বলেন যে, উন্নয়নের জন্য সংরক্ষিত মোট সম্পদের ৪০ শতাংশ বিনষ্ট হচ্ছে দুর্নীতির এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য। অর্থনীতিবিদদের এক সম্মেলনে তিনি এ কথা স্বীকার করেছিলেন। এ পরিপ্রেক্ষিতেই বোধহয় ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ এর পরিচালক আবদুল মোমেন লিখেছিলেন-
“Coruption has been converted from a crime to a habit and the acknowledgment of this fact has led to a faster growth of corruption in the country. Following it has appeared political corruption which has taken upon itself the protection of other crimes.”
আগেই উল্লেখ করেছি জেনারেল এরশাদ, জিয়ার পথই অনুসরণ করেছিলেন। তার আমলের বৈশিষ্ট্য হলো রাষ্ট্রের ও নিজের এবং তল্পীবাহকদের সম্পদের মধ্যে পার্থক্য না করা। এরশাদ আমলে কয়েক হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছে তার পরিবার ও নতুন সমর্থকগণ। তার সময়ে ‘উন্নয়নের বাজেটের মধ্যেও মূল আঘাত গিয়ে পড়েছিল শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো সামাজিক অবকাঠামো খাতের ওপর।’ সাধারণ মানুষ এমন নিঃস্ব অবস্থায় পৌঁছে যে গণ-অভ্যুত্থানে অবশেষে এরশাদ বিদায় হন।
এখানে তার আমলের কয়েকটি সংখ্যাতত্ত্ব তুলে ধরেছি উদাহরণ হিসেবে। এক হিসাবে জানা যায়, মাত্র ২৫টি প্রকল্পে লোপাট হয়েছিল ১৩,৪৮৫ কোটি টাকা। লক্ষ্যণীয় যে এ সমস্ত প্রকল্পগুলো ঘুরে ফিরে স্বল্প কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীই লাভ করেছিল। এদের সাথে যুক্ত ছিলেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট, তার স্ত্রী, নিকট আত্মীয়-স্বজন, মন্ত্রীবর্গ, আমলাবৃন্দ। অর্থাৎ সরকারি যে কোনো প্রকল্প কেউ পেলে তাকে ১০ শতাংশ কমিশন দিতে হতো। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়Ñ ‘১৯৮৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত শিল্পঋণ সংস্থার মেয়াদোত্তীর্ণ অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। ওই টাকা আটকে ছিল ৩৮২টি প্রকল্পে। আর সেই ৩৮২টির মধ্যে মাত্র ২২টি প্রকল্পেই ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ। যার অর্থ হচ্ছে ২২ ব্যক্তি বা গ্রুপ শিল্পঋণের প্রায় অর্ধাংশ আত্মসাৎ করে বসে আছে।… ১৯৮৪ সালের জুনে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭০ কোটি টাকা, যা পাঁচ বছর পর ৭০০ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ এই পাঁচ বছরে যে সকল ব্যক্তি ঋণের সুযোগ গ্রহণ করেছেন তাদের বড় অংশই সুস্পষ্টভাবে জনগণের সম্পদকে কুক্ষিগত করেছে।’
অনার্জিত অর্থে ধনীগোষ্ঠীর সদস্যের সংখ্যা কিভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল তা বোঝা যাবে ১৯৯০ সালে মাশির হোসেনের রিপোর্টে। এই রিপোর্টের উপাত্তই স্পষ্ট করে দেয় বাংলাদেশের অর্থনীতি কিভাবে পণবন্দী হয়ে গিয়েছিল স্বৈরাচারী শাসকের হাতে। তাই দীর্ঘ হওয়া সত্ত্বেও রিপোর্টের কিছু অংশ উদ্ধৃত করেছিÑ
“৮৯ সালের জুন মাসের হিসেবে বাণিজ্যিক ব্যাংকে ৮৬৯টি কোটি টাকার একাউন্ট রয়েছে। আর এতে জমা আছে ২৩৮৭ কোটি টাকা। দেড় বছর আগে অর্থাৎ ’৮৮ সালের ডিসেম্বরে একই ব্যাংকে কোটি টাকার একাউন্টের সংখ্যা ছিল ৬৮৯টি। জমা ছিল ১৬৮৯ কোটি টাকা। একাউন্টের সংখ্যা দেড় বছরে বেড়েছে ১৮২টি। জুন ’৮৯-এ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে জমা টাকার পরিমাণ ছিল ১৮০৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি খাতে জমা হচ্ছে মাত্র ৪২৬৭ কোটি টাকা। বেসরকারি খাতে জমা ছিল ১৩৮২৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তিগত ও স্বনিয়োজিত ব্যক্তির শিরোনামে ছিল ৯৮১১ কোটি টাকা। ১৯৮৯ সালের জুন মাসের শেষে এক থেকে পাঁচ কোটি টাকার একাউন্ট সংখ্যা ছিল ৭৭৬টি। জমা টাকার পরিমাণ ছিল ৪৫৫ কোটি। ’৮৮ সালের ডিসেম্বরে কোটি টাকার একাউন্ট ছিল ৬৩৬টি। মোট জমা টাকার একাউন্ট সংখ্যা ছিল ’৮৯-এর জুনে ৬৯টি এবং জমার পরিমাণ ছিল ৪৮২ কোটি টাকা। ’৮৮ সালে এই ধরনের একাউন্ট ছিল ৩৩টি এবং জমা ছিল ২২৭ কোটি টাকা। ১০ কোটি ও তদূর্ধ্ব টাকার একাউন্ট ছিল ’৮৯-র জুনে ২৪টি, জমা টাকার পরিমাণ ছিল ৪৫০ কোটি ৮৭ লাখ। দেড় বছর আগে ছিল ১৮টি ও জমা টাকার পরিমাণ ছিল ২৬৫ কোটি টাকা। এখানে উল্লেখ্য যে, ’৮২ সালে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে জমা টাকার পরিমাণ ছিল ২৮০৬ কোটি টাকা। এ টাকার মধ্যে সরকারি খাতে জমা ছিল ৮৩০ কোটি টাকা এবং বেসরকারি খাতে জমা ছিল ১৪৩০ কোটি টাকা।”
এরশাদের আমলে সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হওয়া সম্ভব ছিল না সর্বগ্রাসী লুটপাটের জন্য। এবং তা হয়ও নি, যদিও সরকারি প্রচার মাধ্যমে অহরহ উন্নয়ন চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
এখানে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ১৯৮০-৮১ সালে উন্নয়ন বাজেটের ৩৫৪ শতাংশ আসত বৈদেশিক সাহায্য থেকে, ১৯৮৮-৮৯ সালে তা গিয়ে দাঁড়ায় ১২৬.৩ শতাংশে। ঋণ দ্বারা ব্যাপকভাবে লাভবান হয় উচ্চ মধ্যবিত্তরা, যার মধ্যে অন্তর্গত সামরিক-বেসামরিক আমলা ও রাজনীতিবিদরা। ১৯৭২-৮১ সালে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ২.৮৩, ১৯৮১-৮৯ সালে ২.৫৫ শতাংশ। ১৯৮৪-৮৫ সাল থেকে ১৯৮২-৮৯ সালে খাদ্য উৎপাদন বাড়েনি। ১৯৭২-৮১ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.৯৫ শতাংশ। ১৯৮১-৯০ সালে গিয়ে দাঁড়ায় তা ৩.১৯ শতাংশ। ব্যয় বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হয়েছিল সামরিক খাতে। অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ দেখিয়েছেনÑ ১৯৮২-৮৮ সালে সামরিক খাতে প্রকৃত মূল্যে ব্যয় বেড়েছে ৯.৪ শতাংশ। পুলিশ, আনসার ও বিডিআর খাতে ৫.৪ শতাংশ। কারণ সহজেই অনুমেয়। সামরিক বাহিনী ও অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনীকে যাবতীয় সুযোগ দিয়ে ক্ষমতার ভিত্তি মজবুত করা।
অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ এরশাদ আমলে আরও কিছু চিত্র তুলে ধরেছেন কিছু উপাত্ত করে যা প্রণিধানযোগ্যÑ
“সরকারি ব্যয় থেকে উপকার কারা পাচ্ছেন। দরিদ্র জনগোষ্ঠী সামাজিক খাতে ব্যয়ের মাত্র ২৪.৫ শতাংশ পেয়ে থাকেন, দরিদ্র নয় এমন জনগোষ্ঠী (৩০%) পেয়ে থাকেন ৬৫.৭ শতাংশ। অর্থনৈতিক খাতে রাজস্ব ব্যয়ের উপযোগিতা লাভের অনুপাত হলো ১৪.৬ ও ৭০.১ শতাংশ মাত্র। ভৌত অবকাঠামোতে এটি ১৬.৯ ও ৫৮.৬ ও প্রশাসন প্রতিরক্ষায় ১০.৬ ও ৭৩.০ শতাংশ মাত্র। উন্নয়ন ক্ষেত্রেও এ বৈষম্য লক্ষণীয়। সামাজিক খাতে ব্যয় থেকে দরিদ্রতম জনগোষ্ঠী ১০০ টাকার মাত্র ২০.৫ টাকা পরিমাণের উপকার পায়। দরিদ্র নয় এমন জনগোষ্ঠী পায় ৬৫ শতাংশ। অর্থনৈতিক খাতে এ অনুপাত হলো ১৩.০ ও ৭১.৬, ভৌত অবকাঠামো খাতে ১৭.৫ ও ৬৬.৬, প্রশাসনে ১৩.৬ ও ৭২.৯ এবং অন্যান্য খাতে ১৯.২ ও ৬৩.৯। সরকারি ব্যয়ের অভিঘাত থেকে উপকারের অভিঘাত যে বিষয় সেটি পরিষ্কার আর রাজস্ব আয়ের অভিঘাতও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রতিকূলে।”
অন্যভাবেও বিষয়টি দেখা যেতে পারে ১৯৭২ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত সরকারি খাতে চুরি হয়েছে ১৭৮৭৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এ তথ্য দিয়েছিলেন তৎকালীন (১৯৯৬) সরকারের দুর্নীতি দমন ব্যুরোর মহাপরিচালক।
দুর্নীতির কারণে চার্জশিট বেশি করা হয়েছে বেগম জিয়ার আমলে ৯২.৭৭ শতাংশ। মুজিব আমলে ৬৮.৫০ শতাংশ। তবে, মনে রাখার বিষয় মুজিব আমল ছিল তিন বছরের আর খালেদার আমল পাঁচ বছরের। সেদিক থেকে মুজিব আমলের পরিমাণ বেগম জিয়ার পরিমাণের প্রায় সমান সমান। আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য, বেগম জিয়ার আমলে চার্জশিটের একটি বড় পরিমাণ করা হয়েছে এরশাদ ও সাঙ্গপাঙ্গদের বিরুদ্ধে। নিজের দলের বিরুদ্ধে নয়। শেখ মুজিবের কিন্তু সেই রাজনৈতিক সুবিধা ছিল না।
কারও বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করাটাই বড় কথা নয়। চার্জশিটে আটোসাটো কিনা অর্থাৎ মামলায় টিকবে কি-না বা চার্জশিটের ফলে শাসিত হবে কি-না সেটাও প্রধান বিবেচ্য বিষয়। কারণ, চার্জশিটের কারণে যদি শাস্তিই না হয়, বা মামলাই না টেকে, তা হলে চার্জশিট করে কী লাভ? এবার তা হলে সে হিসাব দেখা যাক।
মুজিব আমলে চার্জশিটের পর সবচেয়ে বেশি শাস্তি হয়েছে, ৪৭.৯৩ শতাংশ। সবচেয়ে কম জেনারেল জিয়ার আমলে ১৬.৮২ শতাংশ, বেগম জিয়ার স্থান তার ওপরে ২২.৪৬ শতাংশ। এ হার জেনারেল এরশাদের শাসনামলের চেয়েও কম।
চার্জশিটের ফলে যে মামলা হয়েছে তাতেও দেখা যায় মুজিব আমলে শাস্তির পরিমাণ (অর্থাৎ হার) সবচেয়ে বেশি ৩২.৮৩ শতাংশ। সবচেয়ে কম জেনারেল জিয়ার আমলে ১০.৮২ শতাংশ, বেগম জিয়ার স্থান জেনারেল এরশাদেরও নিচে, তার স্বামীর ওপরে ২০.৮৪ শতাংশ।
এ উপাত্ত একটি বিষয়ই তুলে ধরে তা হলো, কলোনি ধারায় যারা শাসন করেছেন তারা জনস্বার্থে আগ্রহী নন যতটা আগ্রহী গোষ্ঠীস্বার্থে। জেনারেল জিয়া ও এরশাদ ছিলেন সামরিক গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ প্রতিনিধি, বেগম জিয়া ছিলেন পরোক্ষ।
বেগম জিয়ার প্রথম আমলের চিত্রও ওই একই রকম। বিপরীতে অসাম্প্রদায়িক বা উপনিবেশবিরোধী ধারায় ক্ষমতায় আসা শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ আমলের চিত্রটি দেখা যাকÑ
এ সময় পররাষ্ট্র থেকে সামাজিক নানা বিষয়ে উদ্যমী সাহসী সব পরিকল্পনা শুরু নেওয়া হয়, কার্যকরও করা হয়, যেমন পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিচুক্তি ও ভারতের সাথে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, মিয়ানমারের সাথে ভূমিচুক্তি, মিয়ানমারের সাথে ভূমিচুক্তি, সামাজিক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ও খাদ্য খাতের সম্প্রসারণ ও পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন।
১৯৯৬-২০০০ সালে, বাংলাদেশে খাদ্য শস্য উৎপাদনের পরিমাণ ১৯০ থেকে ২৭০ লাখ টনে উন্নীত হয়। কৃষিঋণ বিতরণ পরিমাণ ৩ গুণ বৃদ্ধি পায়। দেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ক্রমান্বয়ে বেড়ে বার্ষিক ৬.৬ শতাংশে উন্নীত হয়। মুদ্রাস্ফীতি পূর্ণাঙ্গভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখে দেশের সার্বিক সঞ্চয় (মোট জাতীয় উৎপাদনের ১৯ শতাংশ) ও বিনিয়োগ (মোট জাতীয় উৎপাদনের ২২ শতাংশ) বাড়ানো হয়। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসরত জনগণের সংখ্যা ৫৩ থেকে ৪৪ শতাংশে নেমে আসে।
মানুষের মাথাপিছু আয় ২৮০ থেকে ৩৮৬ ডলারে উন্নীত হয়। ১৯৯৫-৯৬ সালে মানব দারিদ্র্য সূচক ৪১.৬ থেকে ২০০১ সালে তা নেমে আসে ৩২ শতাংশে। মানুষের গড় আয়ু ৫৮.৭ থেকে ৬২ বছরে উন্নীত হয়। বিএনপি আমলে সাক্ষরতা হার ছিল যেখানে ৪৪ শতাংশ, শেখ হাসিনার সময় তা বৃদ্ধি পায় ৬৭ শতাংশে।
কৃষিক্ষেত্রে প্রবল উন্নতি প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষকে রক্ষার কৃতিত্ব দেখায় এই সরকার। নারীদের ক্ষমতায়নে সচেষ্ট থাকে। ১২টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যালয়ের কাজ শুরু করে বৈষম্যমূলক শত্রুসম্পত্তি আইন বাতিল করে এই প্রথমবারের মতো অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাতা ও মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় সম্মানে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। শুধু তাই নয়, প্রথমবারের মতো বয়স্ক ও বিধবা ভাতা ও গৃহহীনদের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি বিশ্বে মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
আওয়ামী লীগের পর জোট সরকার ক্ষমতায় এসেছে। ২০০১-০৪-এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িকতার নীতি ত্যাগ করা বৃদ্ধি পেয়েছে, আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকারের এত অবনতি আর কখনও হয় নি। খাদ্য শস্যের দাম প্রচ-ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। আমরা তো অনেক কথা ভুলে যাই। ২০০১ সালে খালেদা ক্ষমতায় এসে প্রথমেই তার পুত্র, ভ্রাতা ও সাইফুর রহমানের পুত্রের কয়েকশ কোটি টাকা ঋণ মকুব করে দিয়েছিলেন। এ প্রশ্ন কেউ ওঠায় নি বা আদালতেও ওঠায় নি, কোনো ব্যাংক যদি একজন ঋণগ্রহীতার ঋণ মকুব করে এবং অন্যদের না করে তা হলে তা বৈষম্যমূলক আচরণ হয় কি-না এবং একটি প্রতিধ্বনি তার গ্রাহকদের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ গ্রহণ করতে পারে কি-না।
২০০৯ সাল থেকে উদারনৈতিক শক্তির জোট আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশ শাসন করছে। সেই সময় থেকে বাংলাদেশ নানা ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে।
প্রথমে দেখা যাক, দায়হীনতার ক্ষেত্রে কী করা হয়েছে। আগে খুনিদের উপাধি দেওয়া হতো সূর্যসন্তান, তাদের পুরস্কৃত করা হতো রাষ্ট্রীয়ভাবে। শেখ হাসিনা প্রথম দফায় ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুর বিচার এবং দ্বিতীয় দফায় এসে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, জেল-হত্যা বিচার শুরু ও শেষ করায় আজ এ কথা প্রমাণিত হয়েছে যে, এ রাষ্ট্র আর দায়হীনতায় বিশ্বাসী নয়। এ কথা আজ প্রমাণিত। যে রাষ্ট্র পরিচিত ছিল তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে, এ আমলে সে রাষ্ট্র চাল রপ্তানি করছে, জঙ্গি মৌলবাদ দমনে নিরন্তর হওয়ায় এখন আর বাংলাদেশ মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত নয়। গার্মেন্ট রপ্তানিতে বিশ্বে এখন বাংলাদেশ দ্বিতীয়, মাছ উৎপাদনে চতুর্থ, ছাগলের মাংস উৎপাদনে পঞ্চমÑ এ রকম অনেক রেকর্ড এখন বাংলাদেশের দখলে। দারিদ্র্য হ্রাস ও স্বাস্থ্যসেবার দিকেও বাংলাদেশ এগিয়ে। মানুষের গড় আয়ু ৩৬ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭০। মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ ডলারে। রিজার্ভ বেড়েছে বহুগুণ।
এতে একটি কথাই প্রমাণিত হয়, অপরাজনীতিকে যদি প্রতিরোধ করা যায়, তা হলে বাঙালির রাষ্ট্রের সম্ভাবনা অফুরন্ত। যদি এ রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষতা বিরোধী, অপরাধী ও খুনি-জঙ্গি এবং পেট্রলবোমা মেরে হত্যার সাথে জড়িত এবং তাদের যদি প্রতিরোধ করতে পারে, তা হলে ভবিষ্যৎ বা বর্তমান প্রজন্ম সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে নির্বিবাদে বিশ্বের সর্বত্র ঘুরে বেড়াতে পারবে।
স্বাধীনতা অর্জনের দিনটি বিজয় দিবস হিসেবে কোনো রাষ্ট্রই ঘোষণা করেনি। বাঙালি করেছে। তাই, বাংলাদেশের জন্মদিনে, আমাদের এ কথাই মনে রাখতে হবে যে, আমরা বিজয়ী থাকব। এবং বিজয়ী থাকতে হলে ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অক্ষুণœ রাখা ছাড়া বিকল্প নেই। এবং সেক্ষেত্রে ঐতিহাসিকভাবে পরীক্ষিত আওয়ামী লীগই নেতৃত্ব দিতে পারে।

Category:

Leave a Reply