ঐতিহ্যবাহী আনন্দমুখর নৌকাবাইচ

PM2আরিফ সোহেল: “ছিপখান তিন-দাঁড়-/তিনজন মাল্লা/চৌপর দিন-ভোর/দেয় দূর-পাল্লা!…” মোহনীয় ছন্দে বাঁধা এই কবিতার সঙ্গে বাংলাদেশের নৌকা মাঝিদের দুঃখকথা গভীরভাবে জড়িত। আবার সেই নৌকাই বাঙালিদের বিপুল আনন্দ-বিনোদনের অন্য নাম। নদীমাতৃক বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, আনন্দ-উৎসব আয়োজনের সংস্করণের অন্যতম একটি নৌকাবাইচ। সেখানেও এই নৌকা। নৌকাবাইচ বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি অপরিচ্ছেদ্য অংশ।
লাল-সবুজের এই দেশে হাজার বছরের ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে আছে নৌকাবাইচ। যার আবেশ ছড়ায় ঢাকার হাতিরঝিল-বুড়িগঙ্গা থেকে শুরু নড়াইল-ফরিদপুরের মধুমতিতেও। ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন ছন্দায়িত নৌকাবাইচ আমুদে বাঙালিদের বিপুলভাবে উদ্বেলিত ও আনন্দিত করে।
বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা গেছেÑ পৃথিবীতে সর্বপ্রথম মেসোপটেমিয়ার লোকেরাই নৌকাবাইচের প্রচলন করেছিল। খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ২০০০ বছর আগে ওই অঞ্চলের লোকেরা ইউফ্রেটিস নদীতে এক ধরনের নৌকাবাইচের আয়োজন করত। এর কয়েক শতাব্দী পর মিসরের নীল নদে নৌকা চালনা প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এরপর ছড়িয়ে পড়তে থাকে এর প্রসার। অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতাটি এখনও ব্যাপক জনপ্রিয়। ১৯০০ সাল থেকে অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় নৌকাবাইচ অন্তর্ভুক্ত আছে। শুধু বাংলাদেশই নয়; বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে নৌকা ও নৌকাবাইচ মিশে রয়েছে।
নৌকার সঙ্গে বাইচ শব্দটির সর্ম্পক জুড়ে দিয়ে আমরা বিনোদনের খোরাক পেয়েছি। বাইচ শব্দটি ফার্সি; বাজি বিবর্তনে বাইচ শব্দের সৃষ্টি। এর অর্থ বাজি বা খেলা। এই অঞ্চলে নৌকাবাইচ শব্দটির বুৎপত্তি বিবেচনা করে ধারণা করা হয় মধ্যযুগের মুসলমান নবাব, সুবেদার, ভূস্বামীÑ যাদের নৌবাহিনী ছিল, তারা এই প্রতিযোগিতামূলক বিনোদনের সূচনা করেছিলেন। জনশ্রুতি আছেÑ জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রাকে কেন্দ্র করে মাঝিমাল্লারা নৌকাবাইচের সূচনা করে। অন্যদিকে অনেকেই মনে করেনÑ পীরগাজীকে কেন্দ্র করে নৌকাবাইচের যাত্রা শুরু। আঠারো শতকের শুরুর দিকে কোনো এক গাজীপীর মেঘনা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়েছিলেনÑ তার কৃপা পেতে অন্য পাড়ের ভক্তরা সারিসারি নৌকায় একে অন্যের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটে এসেছিল। এ থেকেই নৌকাবাইচের গোড়াপত্তন হয়েছিল। তবে ইতিহাসে সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে, মুসলিম শাসনামলে বিশেষ করে নবাব-বাদশাহদের রাজত্বকালে নিয়মিত হয়ে উঠেছিল নৌকাবাইচ। তাই অনেকে মনে করেন, নবাব-বাদশাহদের নৌবাহিনী থেকেই নৌকাবাইচের হাতেখড়ি।
বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের নৌকা দেখা যায়। বাইচের নৌকার গঠন কিছুটা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। প্রতিযোগিতার নৌকা হয় সরু ও লম্বাটে। কারণ সরু ও লম্বাটে হওয়ার নৌকা দ্রুত চলতে সক্ষম, যা প্রতিযোগিতার উপযোগী। বাইচের নৌকাটি রঙে-ঢংয়ে নন্দিতভাবে দর্শকের সামনে যথাসম্ভব আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করা হয়।
বাংলাদেশের অঞ্চল ভেদে বাইচের নৌকা সাধারণত আলাদাই হয়। বিশেষ করে কারুকার্য ও গঠনের দিক থেকে। ঢাকা, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ এ অঞ্চলগুলোতে বাইচের জন্য সাধারণত কোশা নৌকা ব্যবহৃত হয়। এর গঠন সরু এবং লম্বায় প্রায় ১৫০-২০০ ফুট পর্যন্ত হয়। টাঙ্গাইল ও পাবনায় নৌকাবাইচে সরু ও লম্বা ধরনের ছিপ জাতীয় দ্রুতগতিসম্পন্ন নৌকা ব্যবহৃত হয়। লম্বায় ১৫০-২০০ ফুট পর্যন্ত হয়। এর সামনের দিকটা পানির সাথে মিশে থাকে আর পেছনের অংশটি পানি থেকে প্রায় ৫ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আজমিরিগঞ্জ ও সিলেট অঞ্চলে বাইচের জন্য সারেঙ্গী নৌকা ব্যবহৃত হয়। এটিও সরু। লম্বায় ১৫০-২০০ ফুট। তবে এর প্রস্থ একটু বেশি ৫-৬ ফুট পর্যন্ত। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী জেলার নিম্নাঞ্চল ও সন্দ্বীপে বাইচের জন্য জাহাজের মতো দেখতে সাম্পান ব্যবহৃত হয়। এর দৈর্ঘ্যে প্রায় ১০০-১২৫ ফুট; মাঝখানে ৮-৯ ফুট প্রশস্ত। আর বাইচে বিভিন্ন নামের নৌকা ব্যবহত হয়। বাইচের নৌকাগুলোর নাম হচ্ছেÑ অগ্রদূত, ঝড়ের পাখি, পঙ্খিরাজ, ময়ূরপঙ্খী, সাইমুন, তুফান মেল, সোনার তরী, দ্বীপরাজ।
অঞ্চল ভেদে পোশাকের ভিন্নতা থাকলেও বাইচে ব্যবহৃত নৌকার মধ্যখানে থাকেন নৌকার নির্দেশক। ৭, ২৫, ৫০ বা ১০০ জন মাঝির প্রতিযোগিতায় শামিল হতে পারে এক একটি দলীয় নৌকা। মাঝিরা সার বেঁধে বৈঠা ঠেলে নৌকা চালান। মাঝিদের বৈঠা টানাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা এবং অনুপ্রাণিত করতে গলুইয়ে একজন পরিচালক থাকেনÑ যাকে বলা হয় গায়েন। তিনি গানছন্দে মাঝি-মাল্লাদের উদ্বীপ্ত করেন। সঙ্গে অনবরত বাজিয়ে চলেন কাঁসি। আগে যাওয়ার জন্য মাঝিদের উৎসাহিত করতে কখনও কখনও শব্দের মাত্রা বাড়িয়ে দেন। এছাড়া এই সময় দেহ ও মনের উত্তেজনার বশেই গানের মধ্যেÑ হৈ, হৈয়া এ-ধরনের শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। বৈঠার টানের সঙ্গে গানেও সমবেত সুর তোলেন মাঝিমাল্লারা। কোনো কোনো বাইচের সময় ঢোল-তবলারও ব্যবহার দেখা যায়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিভিন্ন ধরনের নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় দীর্ঘকাল থেকেই। এর মধ্যেÑ ড্রাগন বোট রেস, বোয়িং বোট রেস, সোয়ান বোট রেস, কাইয়াক ও কেনিয় বোট রেস খুবই জনপ্রিয়।
এক সময়ে বছরের নানা সময়ে কখনও পদ্মায়; কখনও যমুনা, কালীগঙ্গা, ধলেশ্বরী, ইছামতিতে নৌকাবাইচ প্রাচীন সংস্কৃতি জাগিয়ে তোলে। বাংলাদেশের বৃহত্তর ফরিদপুর, বরিশাল, খুলনা এলাকাতেই নৌকাবাইচের প্রচলন ও উপস্থিতিটা চোখে পড়ার মতো। দেখা যেত নদীর দু-ধারে হাজার হাজার জনতার বাঁধভাঙা আনন্দ-উচ্ছ্বাস। নৌকার সাইরদারের কণ্ঠে অবিরাম গান। প্রমত্তা নদীবক্ষে সংগীতের তাল-লয়ে মাঝিমাল্লাদের বৈঠার ছন্দময় প্রতিযোগিতায় আন্দোলিত হয়ে উঠত মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। আবেগ-উত্তেজনার নৌকাবাইচ হয়ে উঠত আপামর মানুষের নির্মল আনন্দের খোরাক। নদীমাতৃক বাংলাদেশে সেখানেই নৌকাবাইচ হয়ে উঠত প্রাণোচ্ছল ক্রীড়াসঙ্গী। ছিল বর্ষার দিগন্ত পানির রাজ্যে নৌকা দৌড় হাজার বছরের বাঙালির নদীমাতৃক সভ্যতার এক অনন্য লোকসংস্কৃতি। কিন্তু সেদিনের উৎসবমুখর নৌকাবাইচ আজ হুমকির মুখে।
নৌকা দৌড়ের উৎসব একটি অসাম্প্রদায়িক সার্বজনীন লোকজ উৎসব। হাওর অঞ্চলে এই উৎসবের উদ্ভব হলেও এর ব্যাপ্তি বাংলার সর্বত্রই ছিল। নগর সংস্কৃতির আগ্রাসনের কারণে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের লোকায়ত নৌকাবাইচের মতো গ্রামীণ ধ্রুপদী ক্রীড়া। এমন কী হারিয়ে যাওয়ার এই ধাবমান প্রক্রিয়াটি দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে।
নৌকাবাইচকে উৎসাহিত করতে ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখার লক্ষে প্রতিবছর জাতীয় নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে বাংলাদেশ রোয়িং ফেডারেশন। এই প্রতিযোগিতার দূরত্ব কম-বেশি ৬৫০ মিটার। অনুষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী মোগল-সুবেদারদের বুড়িগঙ্গায়। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের নৌকাবাইচকে কাঠামোর মধ্যে আনতে বাংলাদেশ বোয়িং ফেডারেশন গঠিত হয়। এছাড়া দেশে বিভিন্ন অঞ্চলে লোকায়িত ঐতিহ্যের নৌকাবাইচের পৃষ্ঠপোষকতায়ও এই ফেডারেশন সম্পৃক্ত থাকে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-প্রতিষ্ঠান থেকে নানা দিবসে নৌকাবাইচের আয়োজন করে বাঁচিয়ে রাখা অবিরাম চেষ্টা চলছে। ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানগুলোও নানা উৎসবকে মাতিয়ে তুলতে নৌকাবাইচের আয়োজন করছে। নাগরিক জীবনের প্রাণকেন্দ্র হাতিরঝিলেও বসছে নৌকাবাইচের উৎসব। উপচে পড়ছে দর্শক। আর তাতেই স্বপ্ন বেঁচে থাকছে অনন্তকাল।

Category:

Leave a Reply