ঐশ্বরিক আগুন : বিশ্ব নেতাদের দৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু

Posted on by 0 comment

8-1-2017 9-05-33 PMরাজীব পারভেজ: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এক ঐতিহাসিক ক্ষণজন্মা মহান পুরুষ। দেশি-বিদেশি ভক্ত, কট্টর সমালোচক, এমনকি শত্রুরাও উচ্চ প্রশংসা করেছেন তার ব্যক্তিত্ববোধ ও নেতৃত্বের। ৫৫ বছরের বর্ণাঢ্য ঐতিহাসিক রাজনৈতিক জীবনে দেশ ও দেশের বাইরে বিভিন্ন পর্যায়ের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দের সাথে মিলিত হয়ে কাজ করেছেন। বঙ্গবন্ধুকে একান্ত কাছে থেকে যারা দেখেছেন তাদের সকলেরই রয়েছে তার সম্পর্কে আলাদা একরকমের মূল্যায়ন ও অনুভূতি। বঙ্গবন্ধু জীবিতকালে এবং ১৫ আগস্ট ট্র্যাজেডির পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সারাবিশ্বের খ্যাতিমান ব্যক্তিরা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ বিভিন্ন সময়ে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তার কিছু অংশবিশেষ তুলে ধরতেই আজকের এই নিবন্ধে।
প্রয়াত ভারতীয় বিজ্ঞানী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি এ. পি. জে. আবদুল কালামের ভাষায় বঙ্গবন্ধু নিজেই ছিলেন ‘ঐশ্বরিক আগুন’ এবং তিনি নিজেই সে আগুনে ডানা যুক্ত করতে পেরেছিলেন। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব জে. এন. দীক্ষিত বলেন, ‘প্রথম সরকারপ্রধান জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান উপমহাদেশে বাংলাদেশের পৃথক জাতিসত্তায় গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন।’ তিনি লিখেছেন, ‘১৯৭০ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৭১ সালের মার্চের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে সংকট গভীর হওয়ায় মুজিব উপলব্ধি করেন, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ব্যাপক সমর্থনের ওপরই কেবল তার সংগ্রামের সাফল্য নির্ভরশীল নয়; বরং এক্ষেত্রে ভারতের রাজনৈতিক ও আনুষঙ্গিক সমর্থন প্রয়োজন।’ তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রথম সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ মুজিব এ উপমহাদেশে স্বতন্ত্র সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের পরিচয়ে তিনি গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।’
১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ সালে স্বদেশে ফেরার পথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে যাত্রাবিরতি করেন। তাকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি. ভি. গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে গিয়ে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান তার জনগণের নিকট স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং তিনি তাদের তা এনে দিয়েছেন। ভারত অঙ্গীকার করেছিল বাংলাদেশকে মুক্ত করবে, মুজিবকে মুক্ত করবে এবং সবশেষে শরণার্থীদের তাদের ভিটেমাটিতে পাঠিয়ে দেবে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিশ্রুতিও আমরা পালন করেছি।’
১৭ মার্চ, ১৯৭২ সালে ভারত বাংলাদেশ থেকে সৈন্য প্রত্যাহার শুরু করে। এ উপলক্ষে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এসেছিলেন ঢাকায়। ১৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসভায় তিনি বলেন, ‘আজকের দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ও সুখের দিন বটে। কারণ আজ শেখ মুজিবের জন্মদিন। তিনি হলেন এ দেশের মুক্তিদাতা। শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের বন্ধু।’
বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার খবর শুনে ইন্দিরা গান্ধী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ‘শেখ মুজিব নিহত হবার খবরে আমি মর্মাহত। তিনি একজন মহান নেতা ছিলেন। তার অনন্য সাধারণ সাহসিকতা এশিয়া ও আফ্রিকার জনগণের জন্য প্রেরণাদায়ক ছিল।’
বিগত বিংশ শতাব্দীর জীবন্ত কিংবদন্তি কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হিমালয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি হিমালয়কে দেখেনি, তবে শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসে এ মানুষটি ছিলেন হিমালয়ের সমান। সুতরাং, হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা আমি লাভ করেছি।’ প্রসঙ্গত, ১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ায় জোট-নিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর সাথে ক্যাস্ট্রোর সাক্ষাৎ হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার খবর শুনে কাস্ট্রো বলেন, ‘শেখ মুজিবের মৃত্যুতে বিশ্বের শোষিত মানুষ হারাল তাদের একজন মহান নেতাকে, আমি হারালাম একজন অকৃত্রিম বিশাল হৃদয়ের বন্ধুকে।’
বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়ার সংবাদ শুনে মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত এতটাই দুঃখ পেয়েছিলেন যে, তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘তোমরা আমারই দেওয়া ট্যাংক দিয়ে আমার বন্ধু মুজিবকে হত্যা করেছ! আমি নিজেই নিজেকে অভিশাপ দিচ্ছি।’
সেনেগালের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদু দিউফ বঙ্গবন্ধুকে অন্যতম মহান ও শ্রদ্ধাভাজন নেতা হিসেবে অভিহিত করেন। ১৯৯৯ সালে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে এ আফ্রিকান নেতা বলেছিলেন, ‘আপনি এমন এক মহান পরিবার থেকে এসেছেন, যে পরিবার বাংলাদেশকে অন্যতম মহান ও শ্রদ্ধাভাজন নেতা উপহার দিয়েছে। আপনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে আপনার দেশের জনগণ যথার্থই বাংলাদেশের মুক্তিদাতা হিসেবে বেছে নিয়েছিল’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জাতির জনকের ন্যায় নৃশংস হত্যার শিকার শ্রীলংকার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লক্ষণ কাদির গামা উপমহাদেশের এ মহান নেতা সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়া গত কয়েক শতকে বিশ্বকে অনেক শিক্ষক, দার্শনিক, দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক, রাজনৈতিক নেতা ও যোদ্ধা উপহার দিয়েছে। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান সবকিছুকে ছাপিয়ে যান, তার স্থান নির্ধারিত হয়ে আছে সর্বকালের সর্বোচ্চ আসনে।’ তিনি বলেন, ‘মুজিবুর রহমান রাজবংশের সন্তান নন, তিনি পাশ্চাত্যের বিলাসী উচ্চ শিক্ষাও গ্রহণ করেন নি। তিনি ছিলেন এক নিভৃত পল্লীর মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া সাধারণ মানুষ।’ জনাব গামা বলেন, ‘শেখ মুজিব বুদ্ধিজীবী ও শ্রমজীবী উভয় শ্রেণির মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পেরেছিলেন। বাংলার মানুষ তাদের ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমানের চেয়ে জ্ঞানী, গুণী, শিক্ষিত, বাগ্মী বা প্রাণবন্ত নেতার সাক্ষাৎ পেলেও তার মতো সফল নেতা কেউ ছিলেন না। তিনি বাঙালি জাতির স্বপ্নপূরণ করেছেন, তাদের একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন।’
তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুকে দেশদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করলেও ইতিহাসই তার প্রকৃত অবস্থান নিশ্চিত করেছে। ফলে তার এককালীন ঘোরতর শত্রু তাকে মহান দেশপ্রেমিক হিসেবে অভিহিত করতে বাধ্য হয়েছিলেন পরবর্তী সময়ে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাবেক পাকিস্তানি অফিসার মেজর জেনারেল তোজাম্মেল হোসেন মালিক পরে তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘পাকিস্তানে তাকে ব্যাপকভাবে এই অপবাদে চিত্রিত করা হলেও, বস্তুত মুজিব দেশদ্রোহী ছিলেন না। নিজ জনগণের জন্য তিনি ছিলেন এক মহান দেশপ্রেমিক।’ আরেকজন সেনা কর্মকর্তা তৎকালীন পাকিস্তানি জান্তার মুখপাত্র মেজর সিদ্দিক সালিক বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ৭ই মার্চের ভাষণের কথা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে তার ‘পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিল’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর ঘরমুখী মানুষের ঢল নামে। তাদের দেখে মনে হচ্ছিল আশাব্যঞ্জক বাণী শ্রবণ শেষে মসজিদ অথবা গির্জা থেকে তারা বেরিয়ে আসছেন।’
তথাকথিত রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে সামরিক আদালতে শেখ মুজিবের বিচার হবেÑ পাকিস্তানি সামরিক জান্তার এ ঘোষণার পর গোটা বিশ্ব প্রতিবাদ বিক্ষোভে ফেটে পড়লে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার অবস্থান স্পষ্ট হয়। তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব উ থান্ট এক বিবৃতিতে পাকিস্তানকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্য নিয়ে নতুন করে বাড়াবাড়ি করলে তার প্রতিক্রিয়া অনিবার্যভাবে পাকিস্তান সীমান্তের বাইরে ছড়িয়ে পড়বে।’
বিশ্বব্যাপী বঙ্গবন্ধুর এ জনপ্রিয়তার কারণে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার পর্যন্ত আশঙ্কা করেন ইয়াহিয়ার প্রতি সমর্থনের জন্য নিক্সন প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীর ক্ষোভ সৃষ্টি হবে। এ কারণে পাকিস্তানকে এই বলে হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয়, ‘শেখ মুজিবকে ফাঁসি অথবা দীর্ঘদিন কারাবন্দি করে রাখা হলে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন হারাবে।’ ১১ জন মার্কিন সিনেটর এক যৌথ বিবৃতিতে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি সহানুভূতিশীল হবে।’ হেনরি কিসিঞ্জার বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মতো তেজি এবং গতিশীল নেতা আগামী ২০ বছরের মধ্যে এশিয়া মহাদেশে আর পাওয়া যাবে না।’
১৯৭০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ঢাকায় নিযুক্ত কনসাল জেনারেল আর্থার কে ব্লাড পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পাঠানো এক গোপন নথিতে লিখেছিলেনÑ ‘মুজিব সারাজীবনই একজন রাজনীতিবিদ। ১৯৪৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১০ বছর তিনি কাটিয়েছেন পাকিস্তানি জেলে, যার চূড়ান্ত পরিচয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। মানুষ মুজিবকে ছাঁচে ফেলা কঠিন। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তিনি আত্মবিশ্বাসী, শান্ত, চমৎকার। বেশ ঘুরেছেন তিনি এবং শাহরিক। মঞ্চে তিনি জ্বালাময়ী বক্তা। মুষলধারায় বৃষ্টির মধ্যেও তার বক্তৃতা সাধারণকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতে পারে। দলীয় নেতা হিসেবে কঠিন এবং কর্তৃত্বপরায়ণ, অনেক সময় একগুঁয়ে। বাঙালিদের অভিযোগের কথা বলতে গেলে তিনি হয়ে পড়েন স্বতঃস্ফূর্ত এবং আবেগপ্রবণ।’
সাবেক ইরাকি প্রেসিডেন্ট প্রয়াত নেতা সাদ্দাম হোসেন বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রথম শহীদ। তাই তিনি অমর।’ ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বলেন, ‘আপসহীন সংগ্রামী নেতৃত্ব আর কুসুম কোমল হৃদয় ছিল মুজিব চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।’ নোবেল বিজয়ী উইলিবান্ট বলেন, ‘মুজিব হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না, যারা মুজিবকে হত্যা করেছে তারা যে কোনো জঘন্য কাজ করতে পারে।’

Category:

Leave a Reply