কৃষকবান্ধব আওয়ামী লীগ

Posted on by 0 comment

PddMসরদার মাহামুদ হাসান রুবেল: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে কৃষক বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। তাই বাংলার গণমানুষের মনে অতি অল্প সময়ে স্থান করে নিয়েছিল। ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর ঘোষিত ঐতিহাসিক ২১-দফায় ৬টি দফাই ছিল বাংলার কৃষি ও কৃষকের উন্নতির জন্য। যার প্রধান লক্ষ ছিল খাজনাভোগী স্বার্থ বিলোপ, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পাট ব্যবসা জাতীয়করণ, বৈজ্ঞানিক উপায়ে কৃষিকে আধুনিক যুগোপযোগী করে খাদ্যে দেশকে স্বাবলম্বী করা হবে। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কৃষক, শ্রমিকসহ মেহনতি মানুষের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে। পঞ্চাশের দশকে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে কৃষকের পক্ষে কথা বলেছেন, ষাটের দশকে ৬-দফার আন্দোলনে তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে সোচ্চার হয়েছেন। আর স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবেও থেকেছেন সর্বক্ষণ কৃষক অন্তপ্রাণ মানুষ।
শোষণহীন সমাজ গঠনের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন বঙ্গবন্ধু। তার শোষণহীন সমাজ গঠনের স্বপ্নের জমিনের বড় অংশই জুড়ে ছিল বাংলাদেশের কৃষক। এ-কারণে দেশের দায়িত্ব গ্রহণের সাথে সাথে কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে ডাক দেন সবুজ বিপ্লবের (কৃষি বিপ্লবের)। এই পদাঙ্কানুসারে কৃষকদের বাঁচানোর রাজনৈতিক অঙ্গীকার দেখিয়েছেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা। পিতার কৃষকপ্রীতি মনে রেখেই তিনি কৃষকের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। খাদ্য ঘাটতির দিশেহারা এই দেশে হাতে নিয়েছেন কৃষি উন্নয়নের কাঠামোগত সংস্কার কর্মযজ্ঞ। তাই দেশে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণ ঘটেছে।
বঙ্গবন্ধু সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতেই কৃষিতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। প্রণীত পরিকল্পনায় কৃষি গবেষণা, শিক্ষায় মেধাবীদের আকর্ষণ করার লক্ষ্যে বৃত্তি বরাদ্দ বাড়ান এবং একক ও বহুমুখী কৃষিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন গতানুগতিক কৃষিব্যবস্থা দ্বারা দ্রুত ক্রমবর্ধমান বাঙালি জাতির খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য হাতে নিয়েছিলেন কৃষির ব্যাপক আধুনিকীকরণ। ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্থ-সামাজিক মর্যাদার স্বীকৃতিতে কৃষিবিদদের ঘোষণা দেন প্রথম শ্রেণির পদ মর্যাদা।
১৯৭২ সালেই জরুরিভিত্তিতে বিনামূল্যে ও কয়েকটি ক্ষেত্রে নামমাত্র মূল্যে অধিক কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য ১৬ হাজার ১২৫ টন ধান বীজ, ৪৫৪ টন পাট বীজ, ১ হাজার ৩৭ টন গম বীজ সরবরাহ করা হয়। মানসম্মত বীজ, সারের কারখানা প্রতিষ্ঠা, সেচ ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুকরণ, বালাইনাশক কারখানা তৈরি, বন্যা  প্রতিরোধে বাঁধ নির্মাণ, কৃষির আধুনিক যন্ত্রায়ণ করা হয়। সমন্বিত কৃষি বাস্তবায়ন, জমির প্রকৃতি বুঝে ফসল ফলানো, সময়মতো ফসল উৎপাদন সব কিছু কেবল জরিপ করেই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। রবি মৌসুমে বেশি করে ফসল ফলানোর তাগিদ, শহর ছেড়ে গ্রামমুখী হওয়া, কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলা হয়।
ধ্বংসপ্রাপ্ত কৃষি অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বাধিক উন্নয়নের জন্য বৈজ্ঞানিক তৎপরতা চালানো হয়। অধিক ফসল উৎপাদন এবং উৎপাদিত পণ্যের সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৭৩ সালের মধ্যে হ্রাসকৃত মূল্যে ৪০ হাজার শক্তিশালী লো-লিফট পাম্প, ২ হাজার ৯০০ গভীর নলকূপ ও ৩ হাজার অগভীর নলকূপের ব্যবস্থা করা হয়। দখলদার পাকিস্তানি শাসনকালে রুজু করা ১০ লাখ সার্টিফিকেট মামলা থেকে কৃষকদের মুক্তি দেওয়া হয়। ’৭৩-এ রাষ্ট্রপতির ৭নং অ্যাক্টের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা হয় কৃষি ব্যাংক। প্রবর্তন হয় সাশ্রয়ী সুদে কৃষি ঋণ-ব্যবস্থা।
ভূমি রাজস্বের চাপে নিষ্পিষ্ট কৃষককূলের ঋণভার লাঘবের জন্য ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা বিলোপ ও বকেয়া খাজনা মওকুফ করা হয়। ভূমিহীন কৃষকের নামে বিতরণ করা হয় খাসজমি। ধান, পাট, তামাক ও আখসহ গুরুত্বপূর্ণ কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির লক্ষে মূল্য বেঁধে দেওয়া হয়। গরিব কৃষকদের সুবিধাজনক রেশনসহ তাদের ছেলে-মেয়েদের বিনা খরচে লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা হয়।
কৃষি উন্নয়নে প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ২৯নং আদেশ অনুযায়ী ‘বঙ্গবন্ধু পুরস্কার’ চালু করা হয়। প্রাথমিকভাবে ২৫ লাখ টাকার একটি ট্রাস্ট তহবিল গঠন ও পরে সরকারি এবং বৈধ সংস্থাগুলোর চাঁদার সাহায্যে এই তহবিল সম্প্রসারিত হয়েছিল।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এদেশে কৃষি গবেষণাধর্মী কাজ পরিচালনার জন্য তেমন কোনো সমন্বয়ধর্মী প্রতিষ্ঠান ছিল না। ’৭৩-এ ১০নং অ্যাক্টের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। ধান ব্যতিরেকে বহুমুখী ফসল গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে। পুনর্গঠন করা হয় হর্টিকালচার বোর্ড, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, সীড সার্টিফিকেশন এজেন্সি, রাবার উন্নয়ন কার্যক্রম, কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানসহ গবেষণা সমন্বয়ের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল। সোনালি আঁশের সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করতে প্রতিষ্ঠা করা হয় পাট মন্ত্রণালয়।
শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, বিভিন্ন বক্তব্যে সামাজিকভাবেও সব সময় তিনি বাংলার কৃষক শ্রমিকদের সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে রাখতেন। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, “… আপনি চাকরি করেন, আপনার মাইনা দেয় ঐ গরীব কৃষক। আপনার মাইনা দেয় ঐ গরীব শ্রমিক। আপনার সংসার চলে ঐ টাকায়। আমরা গাড়ী চড়ি ঐ টাকায়। ওদের সম্মান করে কথা বলুন, ইজ্জত করে কথা বলুন। ওরাই মালিক ওদের দ্বারাই আপনার সংসার চলে। সরকারী কর্মচারীদের বলি, মনে রেখ এটা স্বাধীন দেশ। এটা বৃটিশের কলোনী নয়। পাকিস্তানের কলোনী নয়। যে লোককে দেখবে তার চেহারাটা তোমার বাবার মত, তোমার ভায়ের মত, ওরই পরিশ্রমের পয়সা, ওরাই সম্মান বেশী পাবে। কারণ ওরা নিজে কামাই করে খায়।” দেশের উন্নয়নে শিক্ষিত শ্রেণির চেয়ে কৃষকদের অবদান যে কোনো অংশে কম নয়, সে-কথা বলতে তিনি মোটেও দ্বিধা করতেন না। সে-কারণে তিনি জাতীয় সংসদে ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ বলতে পেরেছেন, “করাপশন আমার বাংলার কৃষকরা করে না। করাপশন আমার বাংলার মজদুর করে না। করাপশন করি আমরা শিক্ষিত সমাজ। যারা আজকে ওদের টাকা দিয়ে লেখাপড়া করেছি।”
১৯৭৫ সালে কৃষি অর্থনীতি শক্তিশালী করতে বঙ্গবন্ধু ব্যাপকভিত্তিক কৃষি সমবায়ের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূমিখ-ের মালিকানা দলিলে অক্ষুণœ রেখে সকল কৃষিভূমিকে সমবায়ের অধীনে একীভূত করে আধুনিক পদ্ধতিতে উন্নত চাষবাসের মাধ্যমে পাঁচ গুণ ফসল ফলানোর প্রত্যয় ঘোষণা করা হয়। যে ব্যবস্থাপনায় পণ্য উৎপাদনে সকল খরচ বহন করবে রাষ্ট্র এবং উৎপাদিত পণ্য তিন অংশে ভাগ হবে। উৎপাদনের এক অংশ পাবে জমির মালিক, এক অংশ শ্রম কৃষকরা এবং এক অংশ যাওয়ার কথা ছিল রাষ্ট্রের কোষাগারে। এভাবে ভূমিহীন খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্য বিনির্মাণ করতে চেয়েছিলেন নিশ্চিতভাবে ও দ্রুতগতিতে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে আর এই ব্যবস্থা আর সম্ভব হয়ে উঠেনি।
মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় এই মহামানবের হত্যাকা- দেশের সামগ্রিক চরিত্রের ওপর এক দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির প্রভাব ফেলে। পাকিস্তানি ভাবধারার সাংস্কৃতিক চর্চা বাঙালি জাতির জীবনাচারেও আনার অপচেষ্টা চলে। রীতিমতো স্বপ্নভঙ্গের ঘটনা ঘটতে থাকে একের পর এক। যার মাশুল আজও গুনতে হচ্ছে বাংলার মানুষকে।
কৃষকদের বাঁচানোর জন্য যে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের দরকার, তা বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা সরকারের রয়েছে। ’৯৬-এ সরকার গঠনের সাথে সাথে বঙ্গবন্ধুর মতো কৃষকের হাতে তুলে দিয়েছিলেন আধুনিক কৃষি উপকরণ। কৃষকদের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নানা পরিকল্পনা গ্রহণসহ কৃষি উন্নয়নের কাঠামোগত সংস্কার কর্মযজ্ঞ শুরু করেছিলেন। ফল হলো ১৯৯৮-এর শতাব্দীর দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ বন্যা মোকাবিলা করেও ১৯৯৯ সালে রেকর্ড পরিমাণ ২ কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদন। ঐতিহাসিক পানি চুক্তির মাধ্যমে পানি প্রাপ্যতায় চালু হয় জিকে সেচ প্রকল্প। ২৫ হাজার হেক্টর নতুন জমি আসে আবাদের আওতায়। গড়ে তোলা হয় আঞ্চলিক মৃত্তিকা গবেষণার ও ভ্রাম্যমাণ মৃত্তিকা পরীক্ষার সুযোগ। সমন্বিত বালাই ব্যস্থাপনা নীতি হিসেবে পাস হয়। কৃষক নিবেদিত জননেত্রীর কারিশমা, প্রযুক্তির প্রসার, কৃষকের ঘাম ঝরানো পরিশ্রম আর প্রকৃতির শুভেচ্ছায় সৃষ্টি হয় ফসল উৎপাদনে নতুন রেকর্ড। তাই দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণ ঘটেছিল।
ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে ভেঙে পড়ে গ্রামীণ অর্থনীতি। ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দেশ আবার পূর্বের খাদ্য ঘাটতি এবং আমদানিনির্ভর অবস্থায় ফিরে যায়। সুবিদিত সফলতাকে মানুষের দ্বারে নিয়ে যেতে অনেক সময় লাগলেও জামাত-বিএনপি সরকারের ব্যর্থতায় ফিরে যেতে খুব বেশি দেরি হয়নি।
দেশ সেবায় দ্বিতীয়বারের মতো সুযোগ পেয়ে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা দেখেছিলেন দেশ আবারও পড়েছে খাদ্য ঘাটতির অনিশ্চয়তার কবলে। অর্থ দিয়েও বিশ্বের কোথাও মিলছিল না খাদ্য। নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই দেশের কৃষি অর্থনীতিকে সমৃদ্ধিকরণে গ্রহণ করেছেন হরেকরকম নীতিমালা ও পরিকল্পনা।
২০০৯ সালেই ‘জাতীয় সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) নীতিমালা’ গ্রহণ করা হয়। পরিবেশকে দূষণমুক্ত রেখে প্রয়োজনে এক বা একাধিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ফসলের ক্ষতিকারক পোকা ও রোগবালাইকে অর্থনৈতিক ক্ষতি সীমার নিচে রাখা হয়, যাতে পরিবেশ দূষিত না হয়। বালাই নাশকের সময়োচিত ও যুক্তিসংগত ব্যবহারকে নিশ্চিত করা হয়। এ বছরেই ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০০৯’ গ্রহণ করা হয়। পুনরায় ২০১১ সালে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০০৯ এর সংশোধন’ মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকের কাছে সহজে সার বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়। যেন জামাত-বিএনপি আমলের মতো সারের জন্য কৃষককে আর গুলি খেয়ে রাস্তায় মরে পড়ে থাকতে না হয়।
বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তন আরেক মাত্রা যোগ করার কারণে বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হয়। এ-কারণে ২০১০ সালে ‘আগাম ও স্বল্পমেয়াদি ফসলের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন বিষয়ক নীতিমালা’ ও ২০১৮ সালে ‘খসড়া জাতীয় বীজ নীতি-২০১৮’ নীতিমালা গ্রহণ করা হয়। যার ফলে প্রতিকূল পরিবেশকে আয়ত্তে এনে ক্রমহ্রাসমান কৃষিজমি, ক্ষয়িষ্ণু প্রাকৃতিক সম্পদ ও বর্ধিষ্ণু জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য কৃষিতে নতুন নতুন প্রযুক্তি ও জাত উদ্ভাবন চলমান রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে প্রযুক্তি সম্প্রসারণে সরকারের সহায়ক এই নীতি আলোকবর্তিকার মতো কাজ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টায় বাংলাদেশের কৃষি অভিষিক্ত হয়েছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। বিশ্ব স্বীকৃতি মিলছেÑ ওয়ার্ল্ড হেরিটেজে ভাসমান সবজি উৎপাদন প্রযুক্তির গর্বিত স্বত্বাধিকারী বাংলাদেশ। বীজ কৃষির ভিত্তি, তাই এ-বছরেই ‘জাতীয় বীজ নীতি (এনএসপি)’ গ্রহণ করার ফলে ফসল উৎপাদনে বৈপ্লবিক উন্নয়ন সাধন হয়। সুনিদ্রিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে বীজকে পরবর্তী মৌসুম পর্যন্ত ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আধুনিক কৌশল অবলম্বন করে সংরক্ষণ করা শুরু হয়। নতুন এই নীতিমালার কারণে দেশের বীজ সেক্টর পেয়েছে গর্বিত শিল্পের মর্যাদা।
২০১৩ সালে শেখ হাসিনা সরকারের নিজেরই করা ১৯৯৯ সালের জাতীয় কৃষি নীতি পরিমার্জন ও সংশোধন করে ‘জাতীয় কৃষিনীতি-২০১৩’ গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে ‘জাতীয় কৃষিনীতি-২০১৮’ এবং এই সালে কৃষি কাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা-২০১৮ (খসড়া) গ্রহণ করা হয়। যার মাধ্যমে কৃষি খাতের পরিকল্পিত উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। এবং দরিদ্র জনগণের আত্ম-সামাজিক উন্নয়নে প্রত্যক্ষ অবদান রাখে।
২০১৫ সালে মোটরযান ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি অকেজো ঘোষণাকরণ নীতিমালা, জাতীয় কৃষি সম্প্রসারণ নীতি-২০১৫ (খসড়া), আউশে প্রণোদনা ২০১৫-১৬ : বাস্তবায়ন নীতিমালা ও নন-ইউরিয়া সার আমদানি, বিক্রয় এবং ভর্তুকি বিতরণ/প্রদান পদ্ধতি, এই চার নীতিমালা গ্রহণ করা হয়। যার মাধ্যমে খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা বিধান, বিশ্ববাজারের সাথে প্রতিযোগিতামূলক কৃষি পণ্য উৎপাদন, টেকসই কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষকের আয় বৃদ্ধি, গতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ট ব্যবহার ও সংরক্ষণ নিশ্চিত হয়।
মাটি উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য ২০১৬ সালে ‘জাতীয় জৈব কৃষিনীতি-২০১৬’ নীতিমালা গ্রহণ করা হয়। ফলে গ্রামীণ জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নে স্থায়ী অবদান রেখেছে। ২২ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখ ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি ট্রাস্ট আইন, ২০১৬’ পাস করা হয়। ১০টি বিষয়ে অবদানের জন্য এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। কৃষিক্ষেত্রে সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কৃষি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানকে কৃষি খাতে নতুন জ্ঞান অর্জন, কৃষি প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালনে উৎসাহিত করতে এই আইন করা হয়।
২০১৭ সালে ‘নীতি-১ শাখা : জাতীয় শস্য ও বন জীবপ্রযুক্তি নীতি-নির্দেশিকা-২০১২, নং-১২০, তারিখ : ২৫.১০.২০১৭’ ও ‘সমন্বিত ক্ষুদ্র সেচ নীতিমালা-২০১৭, কৃষি ফার্ম শ্রমিক নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা ২০১৭ সংক্রান্ত’ এই দুই নীতিমালা গ্রহণ করা হয়। যার ফলে দেশে ফার্ম শ্রমিক স্বার্থ রক্ষা নিশ্চিত হয়েছে এবং সেচ ব্যবস্থায় আধুনিকায়ন হয়েছে।
২০১৮ সালে কৃষি কর্মকর্তাদের মান উন্নয়নের জন্য ‘বিএআরসি-এর গভর্নিং বডি পুনর্গঠন’, বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (কর্মকর্তা ও কর্মচারী) চাকরি প্রবিধানমালা-২০১৬, প্রবিধানমালা-২০১৭ প্রণয়ন, মন্ত্রিসভা বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন কমিটিÑ এই চার নীতিমালা গ্রহণ করা হয়।
২০১৯ সালে দেশীয় জাত রক্ষার্থে ‘ইনব্রিড গমের জাত মূল্যায়ন এবং ছাড়করণ পদ্ধতি’ ও ‘ইনব্রিড ধানের জাত মূল্যায়ন এবং ছাড়করণ পদ্ধতি’ নীতিমালা গ্রহণ করা হয়।
শেখ হাসিনার ক্ষমতাকালীন সময়ে কৃষিতে ব্যাপক ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। ন্যায্য মূল্যে সরবরাহ করা হয় কৃষি উপকরণ। অগ্রাধিকারভিত্তিতে বোরো মৌসুমে সরবরাহ করা হয় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। কৃষিক্ষেত্রে উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার দিগন্ত প্রসারের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয় বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ ৬টি কৃষি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ব স্বীকৃতির মর্যাদাপূর্ণ ‘সেরেস’ পদক তিনি উৎসর্গ করেছেন কৃষি প্রধান বাংলার জনগণকে।
খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। নন-ইউরিয়া সারের দাম কমিয়ে কৃষকের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে এনে নিশ্চিত করা হয়েছে জমিতে সুষম সার ব্যবহার। কৃষকদের মাঝে কৃষি উপকরণ কার্ড বিতরণ করে উপকরণ প্রাপ্তিতে কৃষক হয়রানি স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনা সরকারের গবেষক, বিশেষজ্ঞ এবং সাধারণ কৃষকরা খরা, জলমগ্নতা, লবণাক্ততা সহিষ্ণু ফসল উৎপাদনে প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে বিরূপ জলবায়ুকে জয় করার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। লবণাক্ততার কারণে আগে দক্ষিণের জেলাগুলোয় বছরে একবার বোরো ধান চাষ হতো। লবণাক্ততা সহিষ্ণু ফসল উৎপাদনে দক্ষিণাঞ্চলে খাদ্য ব্যবস্থার জন্য এক নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে। শুধু তাই নয়, ফলদ বৃক্ষ ও উচ্চ ফলনশীল জাত শস্যবীজ উদ্ভাবন করায় খুলেছে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার। শেখ হাসিনার সচেতন দৃষ্টি নিবদ্ধতা প্রান্তিক চাষিদের যে মাত্রায় সুযোগ-সুবিধা আর প্রণোদনা দিয়ে যাচ্ছেন, তা শুধু হতদরিদ্র উৎপাদক শ্রেণির জীবনমানই বাড়িয়ে দিচ্ছে না, পাশাপাশি দেশকে স্বয়ংম্ভরতার দিকেও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে দিন দিন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের সফলতাও বাড়ছে। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) এরই মধ্যে পাট ও ক্ষতিকর ছত্রাকের জীবন রহস্য উন্মোচন করেছে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) বিজ্ঞানীরা মোট ১৩টি প্রতিকূল পরিবেশে সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন। এর মধ্যে লবণসহিষ্ণু ৯টি, খরাসহিষ্ণু দুটি ও বন্যাসহিষ্ণু ৪টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের কৃষি গবেষকরা বিশ্বে প্রথমবারের মতো জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের জাত উদ্ভাবন করেন। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে প্রতিকূল পরিবেশসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবনের দিক থেকেও বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ২০১৩ সালে সর্বপ্রথম জেনেটিকেলি মোডিফাইড ফসল বিটি বেগুনের ৪টি জাত অবমুক্ত করে। যার মধ্যে বেগুনের প্রধান শত্রু ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধী জিন প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং মাধ্যমে আলুর নাবি ধসা রোগের প্রতিরোধী জিন প্রতিস্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে।
মাত্র ১০ টাকায় কৃষকদের সুযোগ দেওয়া হয় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার এবং উপকরণ সহায়তার অর্থ সরাসরি কৃষকের অ্যাকাউন্টে প্রদান করা হয়। কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য যন্ত্রপাতির মূল্যের ২৫ শতাংশ অর্থ ভর্তুকি হিসেবে দেওয়া হয়। বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্রের বিদ্যুৎ বিলের ওপর দেওয়া হয় ২০ শতাংশ হারে রিবেট সুবিধা।
প্রধানমন্ত্রীর মহতী উদ্যোগ হতদরিদ্রের জন্য চালু হয়েছে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি। তা বাস্তবায়নে ১০ টাকা কেজিতে চাল দেওয়া হচ্ছে। বছরের পাঁচ মাস দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হতদরিদ্র ৫০ লাখ পরিবারকে প্রতিমাসে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়ার কার্যক্রম চালু করেছে সরকার। খাদ্য শস্যের পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপখাতকে বিকশিত করার লক্ষ্যে বাস্তবমুখী ও যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন চলছে।
কৃষিবিদদের মর্যাদা নতুন মাত্রায় উন্নীত করতে শেখ হাসিনা ঢাকার প্রাণকেন্দ্র ফার্মগেটে জমি বরাদ্দসহ দিক-নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। কৃষিবিদ ও কৃষকের মর্যাদার প্রতীক পেশাজীবী সংগঠনের প্রাণকেন্দ্র কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটশন বাংলাদেশ-এর নান্দনিক ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠাসহ গুরুত্বারোপ করেছেন দক্ষ কৃষিবিদ তৈরির। গ্রামীণ অর্থনীতির বুনিয়াদ গড়ে তুলে কৃষকদের স্বাবলম্বী করার দূরদর্শী লক্ষ্যে গোড়াপত্তন করেন ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প।
কৃষক-কৃষিবিদ-সহায়ক নীতি ও প্রণোদনায় ধান উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশ এখন চতুর্থ, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়; আলু উৎপাদনে অষ্টম; মৎস্য উৎপাদনে চতুর্থ। দেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান এখন ১৬ শতাংশ। প্রধানমন্ত্রীর ভিশন ২০২১ ও ২০৪১ সালের জন্য উন্নয়নের রূপকল্প ঘোষণা করেছেন। সেই সঙ্গে আগামী ২১০০ সাল পর্যন্ত ডেল্টা প্ল্যান তৈরিও সম্পন্ন করেছেন। নতুন সমুদ্রসীমা চুক্তির ফলে মৎস্যসহ সম্ভাবনাময় সম্পদ আহরণের অপরিসীম সম্ভাবনা ও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলার মাটিতে ফলানো ফল ও সবজি রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সাড়ে ৭ কোটি মানুষের খাদ্যের জোগান দেওয়া ছিল কষ্টসাধ্য ব্যাপার। যেখানে বর্তমানে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের খাদ্যের সংস্থান করেও বাংলাদেশ এখন খাদ্য উদ্বৃত্তের গর্বিত দেশ। কৃষিতে তাক লাগানো এই সাফল্যের নেপথ্যের প্রেরণা আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের মহানায়ক, শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু আজ বেঁচে থাকলে, বাংলাদেশ হয়তো বহু আগেই উন্নতিশীল দেশের কাতারে গিয়ে দাঁড়াতে পারত। তার প্রদর্শিত স্বপ্নের সোনার বাংলার বাস্তবায়নে বাংলার মানুষ এখন স্বপ্ন দেখে তারই কন্যা কৃষকরতœ শেখ হাসিনার চোখে।

Category:

Leave a Reply