খালেদা জিয়ার দুর্নীতির মামলা ও রাজনীতিকরণ

Posted on by 0 comment

3-4-2018 8-03-03 PMএবিএম রিয়াজুল কবীর কাওছারঃ সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা দুর্নীতি দমন কমিশন দায়ের করে (মামলা নং-০৮), ৩ জুলাই ২০০৮, মোট ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের মামলা, এই মামলা মোট ২৬১ কার্যদিবসে সম্পন্ন হয়। এই মামলায় মূলত টাকা এসেছিল এতিমদের জন্য; কিন্তু কোনো এতিমখানাও প্রতিষ্ঠা করা হয়নি ও এতিমদের জন্য একটি টাকাও ব্যয় করা হয়নি। উপরন্তু ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তর করা হয়। এই মামলা করেছে দুদক ও পুরো সময়টাতে পরিচালনাও করেছে দুদক।
এই মামলা চলাকালীন সময়ে বেগম খালেদা জিয়া বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন আদেশের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ চেয়ে হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগে প্রায় ৮০ বার আবেদন করেন এবং আবেদনগুলো প্রত্যাহৃত হয়েছে। এই মামলা চলাকালে তিনবার অনাস্থার কারণে আদালত বদল হয়েছে। খালেদা জিয়া সময় চেয়েছেন ১০৯ কার্যদিবস, ১০ বছর মামলা চলাকালীন সময়ে খালেদা জিয়া সশরীরে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ৪৩ দিন।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি এই মামলার রায় প্রকাশিত হয় ঢাকার ৫নং বিশেষ জজ আদালতÑ ড. মো. আক্তারুজ্জামান জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদ- দেন। তারেক রহমানসহ মামলার অন্য পাঁচ আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে ১০ বছরের সশ্রম কারাদ- দেন। রায়ে খালেদা জিয়াসহ অন্য আসামিদের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা ৮০ পয়সা জরিমানাও করেন।
৬২৭ পৃষ্ঠব্যাপী এই রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, এই মামলার আসামিগণ পরস্পর যোগসাজশে সরকারি এতিম তহবিলের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা ৮০ পয়সা আত্মসাৎ করেছে। পরিমাণের দিক থেকে এই টাকা বর্তমান বাজার মূল্যে অধিক না হলেও প্রকৃত ঘটনার সময় এই টাকার বাজার মূল্য অনেক বেশি ছিল। আসামিগণের মধ্যে বেগম খালেদা জিয়া ওই সময় দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, আসামি কাজী সলিমুল হক ওরফে কাজী কামাল সংসদ সদস্য ছিলেন, আসামি ড. কামাল সিদ্দিকী সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। আসামি বেগম খালেদা জিয়াকে সরকারি এতিম তহবিলের ব্যাংক হিসাব খুলতে সহায়তা করা ও পরবর্তীতে ওই হিসাব থেকে দুটি প্রাইভেট ট্রাস্টের অনুকূলে সরকারি অর্থের চেক বে-আইনিভাবে প্রদান করায় বর্ণিত দুজন আসামিকে অপরাধ করতে সহায়তা করার শামিল। আসামি তারেক রহমান, মোমিনুর রহমান, শরফুদ্দিন আহমেদ কৌশল অবলম্বন করে সরকারি এতিম তহবিলের টাকা একে অপরের সহযোগিতায় আত্মসাৎ করতে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন। এর মাধ্যমে এই মামলার ছয়জন আসামি প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে লাভবান হয়েছেন বলে আদালত মনে করেন। আদালত মনে করেন তারা রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন। অর্থনৈতিক দুর্নীতি রাষ্ট্রের অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করে এবং এর বাজে প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরে সংক্রমিত হয়। রায়ে আদালত বলেন, আসামিগণের মধ্যে একজন ব্যতীত বাকি সবাই সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গ করে সরকারি এতিম তহবিলের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা ৮০ পয়সা আত্মসাৎ করে। দ-বিধির ৪০৯ ধারা মতে, সংঘটিত অপরাধের জন্য বিভিন্ন মেয়াদে সাজা, যেমন, যাবজ্জীবন বা যে কোনো মেয়াদে কারাদ-, যা ১০ বছর পরেও হতে পারে, এবং অর্থদ- দ-নীয় হওয়ার বিধান রয়েছে। আদালত বলেন, প্রসিকিউটরের উপস্থিত সাক্ষ্য-প্রমাণের দ্বারা আসামিদের বিরুদ্ধে দ-বিধির ৪০৯, ১০৯ এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারার অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আসামি বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, মোমিনুর রহমান, কাজী সলিমুল হক কামাল, শরফুদ্দিন আহমেদ ও ড. কামালউদ্দিন উভয়ে সচেষ্ট শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদ- বা যে কোনো মেয়াদে কারাদ-, যার মেয়াদ ১০ বছর পর্যন্ত হতে পারেÑ এই মর্মে উল্লেখ করা হয়।
আসামিগণ একে অপরের সহযোগিতায় অর্থনৈতিক অপরাধ করেছেন। সে কারণে তাদের সর্বোচ্চ সাজার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা প্রয়োজন। তবে আসামিদের বয়স, সামাজিক অবস্থান এবং আত্মসাৎকৃত টাকার পরিমাণ বিবেচনা করে তাদের যাবজ্জীবন কারাদ- প্রদান করা সমীচীন হবে নাÑ মনে করেন। এই আসামি তারেক রহমান, কামালউদ্দিন সিদ্দিকী, কাজী সলিমুল হক, শরফুদ্দিন আহমেদ ও মোমিনুর রহমানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রসিকিউশন পক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হওয়ায় তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে দ-বিধির ৪০৯, ১০৯ ধারার বিধান মোতাবেক ১০ বছরের সশ্রম কারাদ- এবং বর্ণিত সকল আসামিকে ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা অর্থদ-ে দ-িত করেন, আদালত বলে “এই অর্থদ-ের টাকা সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ কর্তৃক প্রত্যেককে সম-অঙ্কে প্রদান করতে হবে। আরোপিত অর্থদ-ের টাকা রাষ্ট্রের অনুকূলে আদায় করার নির্দেশ দেওয়া গেল।” আদেশে আদালত বলে “বর্ণিত আসামিদের মধ্যে বেগম খালেদা জিয়া এ দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন, এছাড়া তিনি একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান, তিনি একজন বয়স্ক মহিলা, তার সার্বিক অবস্থা বয়স ও সামাজিক অবস্থা বিবেচনাপূর্বক দ-বিধির ৪০৯ এবং ১০৯ ধারায় পাঁচ বছর সশ্রম কারাদ- প্রদান করা হলো।”
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ ছয় আসামিকে অর্থদ-ের ২ কোটি ১০ লাখ টাকা ৬০ দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। (৬৩২ পৃষ্ঠা-১১৭৪ পৃষ্ঠা) (১১৬২)
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ইউনাইটেড সৌদি কর্মাশিয়াল ব্যাংকের মাধ্যমে ১২ লাখ ৫৫ হাজার ডলারের ডিডি খালেদা জিয়ার সোনালী ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট নং-৫৪১৬ হিসাবে রাখা হয়। এবং ওই টাকা স্থায়ী আমানত করে রাখার ফলে টাকার ওপর খালেদা জিয়ার স্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই টাকা যখন দুই ভাগ করা হয়, তখন তার সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকীর মাধ্যমে বেসরকারি দুটি ট্রাস্টের অনুকূলে দেওয়া হয়, এর মাধ্যমে তিনি ফৌজদারি অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। কেননা, সরকারি এতিম তহবিলের টাকা দেশে প্রতিষ্ঠিত এতিমখানায় বিধিমোতাবেক ব্যয় করা উচিত ছিল; কিন্তু তিনি তা না করে সেই অর্থ নামসর্বস্ব জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের অনুকূলে স্থানান্তর করেন। আজ অবধি ওই নামে কোনো ট্রাস্টের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ট্রাস্টের ঠিকানা ৬ শহীদ মইনুল রোড, ঢাকা সেনানিবাস কিংবা বগুড়ার গাবতলী উপজেলার দাড়াইল মৌজার ট্রাস্টের কোনো অস্তিত্ব নেই। ১৯৯৩ সালে ১৭ দলিলের মাধ্যমে কেনা ২ একর ৭৯ শতাংশ জমি আজ অবধি ধানী জমি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এতে আইন লঙ্ঘিত হয়েছে, সে কারণে বেগম খালেদা জিয়া দ-বিধির ৪০৯ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।
ব্যয়ের পর্যালোচনায় আগে বলা হয়, আসামি পক্ষ দাবি করেছে যে, ট্রাস্টের সঞ্চিত অর্থ সুদে আসলে বেড়ে ৬ কোটি টাকার বেশি রয়েছে, কোনো টাকা খরচ হয়নি। ফলে সম্পদের অপব্যবহারও হয়নি; কিন্তু সরকারি অর্থ অনির্ধারিত সময় ধরে ব্যয় না করে আটক রাখা দ-বিধির ৪০৯ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তারেক রহমান ও মমিনুর রহমান সোনালী ব্যাংকের গুলশান নিউ নর্থ সার্কেল শাখার এসটিডি ৭নং হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন করে প্রাইম ব্যাংকের গুলশান শাখায় রাখেন। পরে প্রাইম ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী সলিমুল হক ক্ষমতার অপব্যবহার করে ওই টাকা নিউ ইস্কাটন শাখায় স্থানান্তর করেন এবং বিভিন্ন কৌশলে ওই টাকা আসামি শরফুদ্দিন আহমেদের ব্যক্তিগত হিসাবে জমা করেন। প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলে এই টাকা আসে ১৯৯১ সালে আর ট্রাস্ট গঠিত হয় ১৯৯৩ সালে, এতিম তহবিলের জিম্মাদার ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদ জিয়া, এর ফলে ওই অর্থেই তিনি ছিলেন কাস্টডিয়ান; কিন্তু তিনি সরকারি বিধিবিধান অনুযায়ী সেই টাকা ব্যয় করেন নি।
ব্যয়ের পর্যালোচনায় আরও বলা হয়, খালেদা জিয়া আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক বক্তব্য প্রদানের সময় নিজ জবানীতে স্বীকার করেছেন, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। ফলে দ-বিধির ৪০৯ ধারা ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় তাকে শাস্তি দিতে কোনো বাধা নেই। কারণ তিনি উক্ত এতিম তহবিলের জিম্মাদার ছিলেন, ওই অর্থের ওপর তার আধিপত্য ছিল। তিনি ওই সম্পত্তির কাস্টডিয়ান ছিলেন। তবে আসামিদের বিরুদ্ধে ৫(২) ধারার অপরাধ প্রমাণিত হলেও জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের ২৬ ধারার বিধান বিবেচনায় নিয়ে ৪০৯ ধারায় দ-িত করা হলো।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি দুর্নীতির মামলার বিচারকার্যও চলমান।
১) জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা, তেজগাঁও থানা মামলা নং-১৫, তারিখ-০৮.০৮.২০১১; টাকার পরিমাণ ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা।
২) নাইকো দুর্নীতি মামলা, তেজগাঁও থানা মামলা নং-১০, তারিখ-০৯.১২.২০০৭; রাষ্ট্রের ক্ষতি ১০ হাজার কোটি টাকা।
৩) বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি মামলা, শাহবাগ থানা মামলা নং-৫৩, তারিখ-২৬.০২.২০০৮।
৪) গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা, তেজগাঁও থানা মামলা নং-০৫, তারিখ-০২.০৯.২০০৭; দুর্নীতি ও প্রতারণার মাধ্যমে সরকারের মূল্যবান সম্পদ তথা আর্থিক ক্ষতি সাধনের অভিযোগ।
৫) সম্পদ বিবরণী দাখিলের মামলা, দুদুক তারিখ ১৭.০৭.২০০৭; ৩৪ লাখ টাকা জরিমানা দিয়ে কোটি টাকা সাদা করেছেন। খালেদা জিয়া ও তার পরিবারের সকল সদস্য কালো টাকা সাদা করেছেন।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় দ-াদেশ দেওয়ার পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পুরনো ভবনে অস্থায়ী জেলখানায় রাখা হয়। কিন্তু আমরা লক্ষ করে দেখলাম, এই রায়ের পর বিচার বিভাগ ও জেল কর্তৃপক্ষ নিয়ে নানাবিধ অপ্রাসঙ্গিক ও আইন বহির্ভূত বক্তব্য প্রদান করা হচ্ছে। বর্তমানে বিচার বিভাগ একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান এবং জেল কর্তৃপক্ষকে জেল কোড অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। যেখানে আইনগতভাবে অন্য কারও হস্তক্ষেপ করার কোনো সুযোগ নেই।

Category:

Leave a Reply