খালেদা বিদেশে বসে গুপ্তহত্যা চালাচ্ছেন

জেলহত্যা দিবসের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী

3উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশে রাজনীতিতে পরাজিত ও আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া বিদেশের মাটিতে বসে ষড়যন্ত্র করছেন। যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা ও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করতে বিদেশে অবস্থান করে নির্দেশ দিয়ে দেশে গুপ্তহত্যা শুরু করেছেন। দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রসহ গুপ্তহত্যাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, যারা গুপ্তহত্যা করছে তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। শুধু তাই নয়, এদের লিংক, মুরব্বি ও বড় ভাইদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবই দেব।
গত ২ নভেম্বর অপরাহ্নে জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় সভাপতির বক্তৃতাকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। হেমন্তের পড়ন্ত বিকেলে এই জনসভা লাখো জনতার উপস্থিতিতে এক জনসমুদ্রে রূপ নেয়। এ সময় হাজার হাজার মানুষ ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি ও তুমুল করতালি দিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানায়। প্রধানমন্ত্রী তার ৩০ মিনিটের ভাষণে সম্প্রতি সংঘটিত দুই বিদেশি নাগরিকের হত্যাকা-সহ মুক্তমনা লেখক, প্রকাশকদের হত্যাকা-ের বিষয় উল্লেখ করে এসব ঘটনার সাথে বিএনপি-জামাত জোটের সম্পৃক্ততার কথা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এবং ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিহত চার জাতীয় নেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও তার যোগ্য চার সহকর্মীর আত্মদান আমরা ব্যর্থ হতে দেই নি। বাংলার মাটিতে খুনিদের বিচার হয়েছে। আমরা তাদের আরাধ্য কাজÑ উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলছি। জাতির জীবন থেকে ২১টি বছর হারিয়ে গেলেও ইনশাআল্লাহ ২০২১ সালের মধ্যে দারিদ্র্যমুক্ত-ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলব। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।
দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো কোনো মহল বলছে, দেশে আইএস (ইসলামিক স্টেট) ও জঙ্গি-সন্ত্রাসী আছে, জেএমবি আছে। কিন্তু আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, এসব জঙ্গি-সন্ত্রাসী যা আছে তা বিএনপি-জামাতের মধ্যেই আছে। আমরা শক্তহাতে সন্ত্রাস-জঙ্গি দমন করছি। সন্ত্রাসী যে দলেই হোক, আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। বাংলাদেশের মাটিতে কোনো জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের স্থান হবে না, হতে দেব না। জয় দেশের জনগণেরই হবে, কোনো খুনি-সন্ত্রাসীর হবে না। তিনি বলেন, যখন আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছি, রায় কার্যকর হচ্ছে, তখন এই খুনিদের রক্ষার জন্যই এসব গুপ্তহত্যা চালানো হচ্ছে। শেখ হাসিনা দৃঢ়তার সাথে বলেন, আমরা যা বলি তা করি। এ দেশের মানুষ স্বাধীনচেতা। ষড়যন্ত্রকারীদের কাছে কখনোই মাথা নত করে না। গুপ্তহত্যা, খুন যা করা হোক না কেন এ দেশের মানুষকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না। দেশের অগ্রযাত্রা ও উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির সাধ্য কারও নেই। ষড়যন্ত্র-চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আপনারা যারা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেন, দেশের উন্নতি-শান্তি-প্রগতি চান তারা সকলেই গুপ্তহত্যাকারী খুনিদের খুঁজে বের করতে সরকারকে সহযোগিতা করুন। কোনো অপশক্তিই দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে পারবে না। আমরা তা করতে দেব না। দেশের উন্নয়নের পথে যারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে বাংলার জনগণ তাদের ক্ষমা করবে না।
বিদেশিসহ সব হত্যাকা-ের বিচারের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যখনই দেশ উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যায়, তখনই অস্থিরতা সৃষ্টি করা হয়। এখন গুপ্তহত্যা চালিয়ে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশে সন্ত্রাসের সৃষ্টি করেছে বিএনপি-জামাত। বাংলাদেশকে ধ্বংস করতে তারাই এখন গুপ্তহত্যা শুরু করেছে। এসব হত্যাকা-ের সাথে জড়িত যাকেই ধরা হয়, তারা শিবিরের অথবা ছাত্রদল-বিএনপির লোক। যখনই দেশের মানুষ স্বস্তিতে তখনই এই হত্যাকা-। তিনি বলেন, আমার লাখো শহীদের রক্তে রাঙা পতাকা তাদের (যুদ্ধাপরাধী) হাতে দিয়েছিল জিয়াউর রহমান ও তার স্ত্রী খালেদা জিয়া। যুদ্ধাপরাধী হিসেবে যারা সাজাপ্রাপ্ত তাদের কেবিনেটে বসিয়েছিল।
4প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে খালেদা জিয়ার মানুষ পুড়িয়ে হত্যার রাজনীতি প্রতিহত করেছে। ঘৃণাভরে মানুষ তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। উনি অবরোধ দিয়েছিলেন, এখনও তা প্রত্যাহার করেন নি। এখনও তার ডাকা অবরোধ বহাল রয়েছে। কিন্তু জনগণ তাতে সাড়া দেয়নি। তিনি বলেন, মানুষ হত্যা করেও কোনো কিছু করতে না পেরে নাকে খত দিয়ে খালেদা জিয়া আদালতে আত্মসমর্পণ করে ঘরে ফিরে গেছেন। এবারও উনি পরাজিত হবেন।
শেখ হাসিনা বলেন, এই উন্নয়নের পথে কেউ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে বাংলার জনগণ তাদের ক্ষমা করবে না। তাদের শাস্তি পেতেই হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এমপি, প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী এমপি, শহীদ জাতীয় নেতা ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর পুত্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপি, প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপি, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও শহীদ জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলামের পুত্র সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এমপি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক এমপি, নগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এমএ আজিজ, সাধারণ সম্পাদক এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এমপি, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম এমপি, যুব মহিলা লীগের অধ্যাপিকা অপু উকিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ, সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইন প্রমুখ। জনসভা পরিচালনা করেন দলের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এমপি ও উপ-প্রচার সম্পাদক অসীম কুমার উকিল।
জেলহত্যা দিবসে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার
প্রতি প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩ নভেম্বর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। নেতৃবৃন্দের স্মরণে তিনি সকালে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
শেখ হাসিনা প্রথমে সকাল প্রায় ৭টায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন এবং নেতৃবৃন্দের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে, দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে নিয়ে শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে আরেকটি পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় ক্যাপটেন মনসুর আলীর পুত্র স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপি, সৈয়দ নজরুল ইসলামের পুত্র জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এমপি, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী এমপি, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি, রেলমন্ত্রী মুবিজুল হক এমপি, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এমপি এবং পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এরপর মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, অঙ্গ ও সহযোগী এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে বনানী কবরস্থানে শহীদ জাতীয় নেতৃবৃন্দের কবরে  শ্রদ্ধাঞ্জলি ও তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার নেতার স্মৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি
জেলহত্যার সাথে খন্দকার মোশতাক ও জিয়াউর রহমান প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. নাসিম এমপি। জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ৩ নভেম্বর সকালে জাতীয় চার নেতার ম্যুরালে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও মিলাদ মাহফিল শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।
নাসিম বলেন, অতীতে জিয়া, এরশাদ ও খালেদা জিয়া একাধিকবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এলেও তারা কেউ এর বিচার করেনি। আইনের শাসনের কথা বলে সবাই পক্ষান্তরে খুনিদের লালন-পালন করেছে। খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদেশ থেকে ফিরে দলের হাল ধরেন ও ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জেলহত্যা মামলার বিচার করেন। এ জন্য আমি প্রধানমন্ত্রীর নিকট কৃতজ্ঞ।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সৈয়দ আশারাফুল ইসলাম এমপি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো. আছাদুজ্জামান খান কামাল এমপি, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

Category:

Leave a Reply