খুনিদের রাজত্ব আর আসতে পারবে না

uttaran

জাতীয় শোক দিবসের আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, যারা কোমলমতি শিশুদের নিয়ে খেলতে চেয়েছিল, উসকানি দিয়েছিল এবং তাদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে চেয়েছিল, তারা দেশ ও জাতির শত্রু। আর যাই হোক, এরা কখনই দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি চায় না। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দিতে চায়, আলোর পথের যাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে চায়। কিন্তু দেশের জনগণের ভাগ্য নিয়ে আর কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেব না। খুনিদের রাজত্ব বাংলাদেশে আর আসতে পারবে না, দেশের জনগণ আসতে দেবে না।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের সঙ্গে জিয়াউর রহমান ও তার স্ত্রী খালেদা জিয়াও জড়িত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৫ আগস্ট হত্যাকা-ের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে শুরু থেকেই জড়িত ছিলেন জিয়াউর রহমান। সে পাকিস্তানের এজেন্ট হয়ে কাজ করেছে। জিয়া যদি বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িতই না থাকবে তবে ইউলিয়াম টমাসের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু হত্যা তদন্তে গঠিত কমিশনকে কেন দেশে আসতে ভিসা দেননি। জিয়াউর রহমানের মতো তার স্ত্রীও (খালেদা জিয়া) ভোট চুরি করে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিকে সংসদে বসিয়েছিলেন। তার মানে সেও (খালেদা জিয়া) বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত। খুনিরাই খুনিদের ঠাঁই দেয়, প্রশ্রয় দেয়। খুনিদের পুরস্কৃত ও প্রশ্রয় দেয়াও সমান অপরাধ। এরা দেশের ক্ষমতায় আসলে খুনিদেরই রাজত্ব হবে, দেশের কিছু হবে না।
রক্তাক্ত-শোকাবহ ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৩তম শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে গত ১৬ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি। আলোচনায় অংশ নেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এমপি, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপি, সভাপতিম-লীর সদস্য অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন এমপি, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়–য়া, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক এমপি, আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য সিমিন হোসেন রিমি এমপি ও আনোয়ার হোসেন। প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এমপি ও উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিনের পরিচালনায় আলোচনা সভার শুরুতেই বঙ্গবন্ধুসহ ১৫ আগস্টের সকল শহিদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
uttaran2বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের সঙ্গে জিয়াউর রহমান শুরু থেকেই জড়িত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর প্রতিমাসেই জিয়াউর রহমান তার স্ত্রীকে (খালেদা জিয়া) ঘন ঘন আমাদের বাড়িতে আসতেন। এটাও কী ১৫ আগস্টের ষড়যন্ত্রের অংশ? বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর অস্ত্র ঠেকিয়ে অসাংবিধানিকভাবে জিয়াউর রহমান নিজেকে নিজে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। খুনি মোশতাক জিয়াকে সেনাপ্রধান বানিয়ে পুরস্কৃত করেছিল। জিয়া শুরু থেকেই এ হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত ছিল এবং পাকিস্তানের এজেন্ট হয়ে কাজ করেছে।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর অনেকেই রয়েছেন তখন জিয়াকে বড় করে দেখাতে এবং গণতন্ত্রের প্রবক্তা হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করেছেন। যে মার্শাল ল’ জারি করে দেশ চালায়, সে গণতন্ত্র দেয় কীভাবে? যিনি অস্ত্র ঠেকিয়ে ক্ষমতা দখল করে অবৈধভাবে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে তিনি গণতন্ত্র দেয় কীভাবে? তিনি বলেন, দেশে একটা-দুইটা খুনি হলে সবাই বিচারের দাবি জানান। কিন্তু দেখুন, একদিনে আমি বাবা-মা-ভাইসহ পরিবারের সবাইকে হারিয়েছি। কিন্তু বিচার চাইতে পারিনি। আমরা দুবোন দেশে ফিরলে আওয়ামী লীগ মাথা তুলে দাঁড়াবেÑ এটা জেনেই জিয়া আমাদের দেশে ফিরতে পর্যন্ত দেয়নি।
প্রধানমন্ত্রী আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, বাবা-মাসহ পরিবারের সকল হত্যাকা-ের বিচার চেয়ে আমাকে ৩৫টি বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। অনেক সরকার এসেছে এবং গেছে; কিন্তু কেউ বিচার করেনি। ইনডেমনিটি দিয়ে বিচারের পথ বন্ধ করে রেখেছে। উল্টো খুনিদের পুরস্কৃত করেছে। ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ইনডেমনিটি বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছি এবং বিচারের রায়ও কার্যকর করেছি। আমি ক্ষমতায় না আসলে হয়তো কোনোদিনই বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হতো না। তিনি দেশবাসী ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, তারা ভোট দিয়ে আমাদের বিজয়ী করে দেশসেবার সুযোগ দিয়েছিল বলেই আমরা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করতে পেরেছি।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুকে বিতর্কিত করতে একাত্তরের পরাজিত শক্তিসহ মুক্তিযুদ্ধেরও পক্ষ কিছু শক্তির ষড়যন্ত্র প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তানের হানাদাররা একাত্তরের প্রতিশোধ নিতে এবং ওই সময় স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে কিছু আমাদের মানুষ আছে তারাও হাত মিলিয়ে ষড়যন্ত্র করেছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা হলো, ছাত্রলীগ ভেঙে জাসদ করা হলো। যার ফল রক্তাক্ত ১৫ আগস্ট। আমার প্রশ্নÑ বঙ্গবন্ধুকে সময় না দিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে যারা ওই সময় কথায় কথায় বঙ্গবন্ধুকে গালি দিতেন, বিতর্কিত করার চক্রান্তে লিপ্ত ছিলেনÑ তারা কী এতটুকু অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে তারা দেশ ও স্বাধীনতার কী সর্বনাশ ডেকে আনছেন? আমার মনে হয়, অনুধাবন করতে পারেন নি, পারলে বঙ্গবন্ধুকে আরও সময় দিতেন। জাতির জীবনে ১৫ আগস্ট না আসলে অনেক আগেই বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াত। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খুনিরা দেশের নামই পরিবর্তন করে পাকিস্তানি কায়দায় নাম রাখার চেষ্টা করেছিল। বিবিসি’তে সাক্ষাৎকার দিয়ে খুনি ফারুক-রশিদ বলেছে যে, বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা এতই বেশি ছিল যে, শত চেষ্টা করেও তা কমানো যায়নি। তাই তাকে হত্যা করা ছাড়া তাদের কাছে অন্য কোনো উপায় ছিল না। অথচ আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচার করতে আমাদের ৩৫টি বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।
খুনিদের রাজত্ব আর বাংলাদেশে আসবে না, আসতে দেয়া হবে না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর রক্ত কখনও বৃথা যেতে পারে না, আমরা বৃথা হতে দেব না। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। আজকের দিনে এটাই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা। আর বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেব না। কোনো অন্যায়কেও প্রশ্রয় দেয়া হবে না। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবেই। আর খুনিদের রাজত্ব বাংলাদেশে আর আসতে দেয়া হবে না, দেশের জনগণও আসতে দেবে না। বাংলাদেশকে আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলবই।

Category:

Leave a Reply