খুনি কাশেম ফাঁসির অপেক্ষায়

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতায় ছাত্রসংঘের বাছাই করা সদস্যদের নিয়ে গঠিত সশস্ত্র আলবদর বাহিনীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের কমান্ডার হিসেবে মীর কাশেম যেসব মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটান, তা উঠে এসেছে ট্রাইব্যুনাল ও আপিল বিভাগের রায়ে।
36উত্তরণ প্রতিবেদন: একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মৃত্যুদ-প্রাপ্ত বদর বাহিনীর কমান্ডার, চট্টগ্রামের বাঙালি খান, জামাতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাশেম আলীর ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ খারিজ করে দেন গত ৩০ আগস্ট।
আইনি লড়াইয়ে সর্বশেষ ধাপ পার হওয়ার ফলে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামাতে ইসলামীর এই নেতার মৃত্যুদ- কার্যকরে আর কোনো আইনি বাধা থাকল না। সামনে এখন ফাঁসির দড়ি। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ ৩০ আগস্ট এক শব্দের এই রায় ঘোষণা করেন। সকাল ৯টা ১ মিনিটে এজলাসে এসে প্রধান বিচারপতি শুধু বলেন, রিভিউ পিটিশন ইজ ডিসমিস। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেনÑ বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসাইন হায়দার ও বিচারপতি বজলুর রহমান। এই ঘোষণার সাথে সাথেই এজলাস কক্ষে উপস্থিত আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থী জনগণের সকল উদ্বেগের অবসান ঘটে। কারণ, বহাল রইল জামাত নেতা মীর কাশেম আলীর মৃত্যুদ-ের চূড়ান্ত রায়।
২০১৪ সালের ২ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া প্রাণদ-ের সাজাই তাতে বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। অবশেষে রিভিউয়ের রায়েও তা বহাল রাখা হয়েছে।
মীর কাশেমের মামলাটি চূড়ান্ত রায় হলো আপিল বিভাগের সপ্তম মামলা। ৬টি রায়ের মধ্যে ৫টিতে জামাতের দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লা ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, জামাতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী, জামাতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। আপিল বিভাগের আরেক রায়ে জামাতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদ- দেওয়া হয়েছে। সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হওয়ার পর দুই পক্ষেই রিভিউ আবেদন করেছে। শুনানি চলার মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধকালীন জামাত আমির গোলাম আযম ও বিএনপির সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীমের মৃত্যু হওয়ায় তাদের আপিলের নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।
যে অভিযোগে প্রাণদ- : অভিযোগ-১১ : ১৯৭১ সালে ঈদুল ফিতরের পরের যে কোনো একদিন মীর কাশেমের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা চট্টগ্রাম শহরের কোনো এক অজ্ঞাত স্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে অপহরণ করে আন্দরকিল্লার ডালিম হোটেলে নিয়ে যায়। তাকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত সেখানে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের ফলে জসিমের মৃত্যু হলে আরও পাঁচ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির লাশসহ তার মৃতদেহ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
বদর কমান্ডার থেকে শীর্ষ নেতা : আসামি মীর কাশেম আলী আলবদর বাহিনীর তৃতীয় প্রধান ছিলেন। ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মীর কাশেম ১৯৮৫ সাল থেকে জামাতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ অর্থাৎ মজলিসে শূরার সদস্য হিসেবে দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিলেন। এই মামলার শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ মীর কাশেমকে আখ্যায়িত করেছে পাকিস্তানের খান সেনাদের সাথে মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত হওয়া ‘বাঙালি খান’ হিসেবে, যিনি সে সময় জামাতের তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতায় ছাত্রসংঘের বাছাই করা সদস্যদের নিয়ে গঠিত সশস্ত্র আলবদর বাহিনীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের কমান্ডার হিসেবে মীর কাশেম যেসব মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটান, তা উঠে এসেছে ট্রাইব্যুনাল ও আপিল বিভাগের রায়ে।
সাবেক এমপি সাখাওয়াতের মৃত্যুদ-, ৭ জনের আমৃত্যু কারাদ-
মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিএনপি ও জামাতের সাবেক এমপি সাখাওয়াত হোসেনকে মৃত্যুদ- ও সাতজনকে আমৃত্যু কারাদ-ের আদেশ দিয়ে রায় ঘোষণা করেছেন ট্রাইব্যুনাল। গত ১১ আগস্ট বিচারপতি আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই রায় ঘোষণা করেন।
আমৃত্যু কারাদ- পাওয়া সাতজন হলেনÑ মো. বিল্লাল হোসেন বিশ্বাস, মো. ইব্রাহিম হোসাইন, শেখ মো. মজিবুর রহমান, এমএ আজিজ সরদার, আবদুল আজিজ সরদার, কাজী ওহিদুল ইসলাম ও মো. আবদুল খালেক মোড়ল। দ-িত আটজনের মধ্যে সাখাওয়াত হোসেন ও মো. বিল্লাল হোসেন বিশ্বাস গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। অন্যরা পলাতক। ১০ আগস্ট রায় ঘোষণার সময় কারাবন্দি দুজনকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। এই মামলার অভিযুক্ত আসামি ছিলেন মোট ৯ জন। এক আসামি লুৎফর রহমান মোড়ল গত মে মাসে কারাবন্দি অবস্থায় মারা যাওয়ায় তাকে মামলার কার্যক্রম থেকে বাদ দেন ট্রাইব্যুনাল।
ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, মৃত্যুদ-প্রাপ্ত সাখাওয়াত হোসেনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে বা গুলি করে মৃত্যুদ- কার্যকর করতে হবে। তবে কারাবন্দি আসামি সাখাওয়াত ও বিল্লাল ৩০ দিনের মধ্যে এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টে আপিল করতে পারবেন। পলাতকরা আপিল করতে চাইলে ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করতে হবে। পাশাপাশি পলাতকদের গ্রেফতারে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশ মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নিতেও বলা হয় রায়ে।
দ-প্রাপ্ত যশোরের কেশবপুরের ওই আট রাজাকারের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হত্যা, ধর্ষণ, আটক, অপহরণ, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের ৫টি অভিযোগের ওপর বিচার সম্পন্ন করেন ট্রাইব্যুনাল। মামলার অভিযোগ নম্বর-২-এ অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও হত্যার দায়ে সাখাওয়াতকে মৃত্যুদ- ও বাকি সাতজনকেই আমৃত্যু কারাদ- দেন ট্রাইব্যুনাল। রাষ্ট্রপক্ষে আনা অভিযোগ নম্বর-৪-এ অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগে সাখাওয়াতকে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রতিটি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় প্রত্যেক আসামি বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ-ের সাজা পেয়েছেন।
৭৬৮ পৃষ্ঠা রায়ের সারাংশ পড়ে শোনান ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ারুল হক ও বিচারপতি শাহিনুর ইসলাম।
যে অভিযোগে যত সাজা মৃত্যুদ- পাওয়া অভিযোগ : ২ ও ৪ নম্বর অভিযোগে সাখাওয়াতকে মৃত্যুদ- দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। ২ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, কেশবপুর উপজেলার চিংড়া গ্রামের চাঁদতুল্য গাজী ও তার ছেলে আতিয়ারকে অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও হত্যা করেন অভিযুক্ত আট রাজাকার। সাক্ষ্য প্রমাণে এই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আটজনকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয় রায়ে। এই অভিযোগে সাখাওয়াতকে মৃত্যুদ- ও অন্য সাত আসামিকে আমৃত্যু কারাদ- দেওয়া হয়।
৪ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, সাখাওয়াতের নেতৃত্বে কেশবপুরের হিজলডাঙার আ. মালেক সরদারকে অপহরণ করে নির্যাতন ও খুন করা হয়। সাখাওয়াত, মো. ইব্রাহিম, এমএ আজিজ সরদার, আবদুল আজিজ সরদার ও মো. আবদুল খালেক মোড়লের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। ফলে সাখাওয়াতকে মৃত্যুদ- ও বাকি চারজনকে অমৃত্যু কারাদ-ে দ-িত করা হয়।
বিভিন্ন মেয়াদে সাজা : এই আট রাজাকারের মধ্যে সাখাওয়াত হোসেন, মো. ইব্রাহিম হোসাইন, এমএ আজিজ সরদার ও আবদুল আজিজ সরদারের বিরুদ্ধে আনা ১ নম্বর অভিযোগ ছিল ধর্ষণের। অভিযোগে বলা হয়, যশোরের কেশবপুর উপজেলার বোগা গ্রামের এক নারীকে অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও ধর্ষণ করেন এই চার রাজাকার। বিচারে এই অভিযোগটি প্রমাণিত হওয়ায় চারজনকেই ২০ বছর করে কারাদ-ের আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
৩ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, কেশবপুরের চিংড়া গ্রামের মো. নুরুদ্দিন মোড়লকে অপহরণ, আটক, নির্যাতন করেন সাখাওয়াত হোসেন, শেখ মো. মজিবুর রহমান, মো. ইব্রাহিম হোসাইন ও মো. আবদুল খালেক মোড়ল। মো. ইব্রাহিম হোসাইনের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেন ট্রাইব্যুনাল। বাকি তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের ১০ বছর করে কারাদ-ে দ-িত করেন ট্রাইব্যুনাল। ৫ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, মুক্তিযোদ্ধাদের সোর্স কেশবপুরের মহাদেবপুর গ্রামের মিরন শেখকে অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও ওই গ্রামে অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠন করেন সাখাওয়াত হোসেন, মো. ইব্রাহিম হোসাইন, এমএ আজিজ সরদার, আবদুল আজিজ সরদার ও মো. আবদুল খালেক মোড়ল। এই অভিযোগ প্রমাণ করতে রাষ্ট্রপক্ষ সক্ষম হয়েছে বলে রায়ে পাঁচজনকেই ১৫ বছর করে কারাদ- দেওয়া হয়।
এক নজরে সাখাওয়াত : কেশবপুর থানার হিজলডাঙা গ্রামের মৃত ওমর আলী ও আনোয়ারা বেগমের ছেলে সাখাওয়াত হোসেন। এলাকায় তিনি মাওলানা সাখাওয়াত হিসেবেই অধিক পরিচিত। ১৯৫৪ সালে জন্ম নেওয়া সাখাওয়াত ১২ বছর বয়সেই যোগ দেন জামাতের তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘে। ১৯৬৯ সালে ফাজিল ও ১৯৭২ সালে কামিল ডিগ্রি নেন এই রাজাকার। ১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ থেকে এমএ পাস করার পর শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে। ১৯৮১ সালে অ্যাকাউনট্যান্ট জেনারেল (এজি) অফিসে চাকরি নেন সাখাওয়াত। পাঁচ বছর পর জামাতে ইসলামীর সদস্য হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামাতে ইসলামীর হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে যশোর-৬ আসন থেকে এমপি বনে যান এই রাজাকার নেতা। এরপর জামাত ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ১৯৯৬ সালেও এমপি হন। মাওলানা সাখাওয়াত নামে বেশি পরিচিত এই রাজনীতিবিদ বিভিন্ন সময় এলডিপি ও পিডিপির রাজনীতির সাথেও যুক্ত ছিলেন। ২০০৮ সালে সাখাওয়াত যোগ দেন জাতীয় পার্টিতে। ২০১৪ সালের নির্বাচনেও যশোর-৬ আসন থেকে তিনি জাতীয় পার্টির মনোনয়ন পেয়েছিলেন। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কেশবপুরে রাজাকারের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার সহাযোগী হিসেবে দ-িত সাত রাজাকার নানা অপকর্ম পরিচালনা করেন একাত্তরে।
গ্রন্থনা : রাজীব পারভেজ

Category:

Leave a Reply