খুলনা ও গাজীপুরে নৌকার জোয়ার

Posted on by 0 comment

21রায়হান কবির: বৃষ্টিস্নাত নির্মল কোমল হাওয়া আর গণতন্ত্রের প্রাঞ্জল উদ্দীপনায় মেতে উঠেছে খুলনা ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। উৎসবমুখর পরিবেশে প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ততম সময় পার করছেন প্রার্থীরা। নগরীর অলিগলি, বাজার, রাস্তার পাশ ছেঁয়ে গেছে নির্বাচনী পোস্টারে। এলাকায় এলাকায় মাইকিং, হ্যান্ডবিল দিয়ে প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে সমর্থক ও কর্মীরা। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নির্মাণ করা হচ্ছে নির্বাচনী ক্যাম্প। আগামী ১৫ মে অনুষ্ঠিতব্য গাজীপুর ও খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করতে এলাকায় ঘরে ঘরে ঘুরে ভোটারদের কাছে ভোট চাইছেন, দোয়া চাইছেন প্রার্থীরা।
খুলনায় মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক এবং গাজীপুরে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম নৌকা প্রতীকে মেয়র পদে নির্বাচন করছেন। গাজীপুর ও খুলনা সিটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের সমর্থন জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ১৪-দলীয় জোট। ইতোমধ্যে উভয় সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। তালুকদার আবদুল খালেক বাগেরহাট-৩ আসন থেকে চারবারের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভারও সদস্য ছিলেন খালেক। আওয়ামী লীগের উন্নয়ন এবং সিটি কর্পোরেশনে গত পাঁচ বছরে বিএনপি সমর্থিত মেয়রদের চরম ব্যর্থতা বিবেচনায় নিয়ে নৌকা প্রতীকের পক্ষে যাচ্ছে ভোটারদের সমর্থন। এমনটিই মনে করছেন দুই সিটি কর্পোরেশনের সুধী সমাজ।
এদিকে পরাজয়ের ভয়ে ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলাচ্ছে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা। বিএনপি প্রার্থীরা একদিকে যেমন নির্বিঘœ পরিবেশে প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছে আবার অন্যদিকে একই সাথে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালিয়ে চাচ্ছে। খুলনায় বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুর নির্বাচন থেকে সরে যাওয়া আবার পরক্ষণেই ফিরে আসার নাটক ভোটের রাজনীতিতে বিএনপির দুর্বলতাকে আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
এমন কী বিএনপির মেয়রের ব্যর্থতার প্রশ্নটি এড়িয়ে যেতে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে ভোটারদের প্রশ্নে প্রার্থীদের সরাসরি জবাব ও জনগণের প্রত্যাশা জানতে ‘বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি’ আয়োজিত ‘জনগণের মুখোমুখি’ অনুষ্ঠানেও হাজির হননি মঞ্জু।
অন্যদিকে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী উদ্দিন সরকার প্রতিদিন নির্বিঘœ পরিবেশে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু গণমাধ্যমে নানা ধরনের শঙ্কার কথা বলে নির্বাচনকে প্রভাবিত করা এবং জনগণের সহানুভূতি অর্জনে বিএনপির প্রচলিত অপকৌশল অব্যাহত রেখেছেন। এক কথায় জিতলে আছি, হারলে নাইÑ অবস্থা বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের। পরাজয়ের শঙ্কায় ভোট বর্জনের হুমকিও দিচ্ছে আবার জনতার সহানুভূতি আদায় করে যদি জেতা যায় সে অপচেষ্টাও চালাচ্ছেন তারা।

খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন
খুলনায় মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক নৌকা প্রতীকে মেয়র পদে নির্বাচন করছেন। এছাড়া বাগেরহাট-৩ আসন থেকে চারবারের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভারও সদস্য ছিলেন আবদুল খালেক। ২০০৮ সালে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর খুলনা নগরীর ব্যাপক উন্নয়ন করেন। পরিকল্পিত ও উন্নত নগর গড়ে তুলতে বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তিনি। কিন্তু ২০১৩ সালে মেয়র নির্বাচিত হতে না পারায় মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। গত পাঁচ বছর বিএনপি দলীয় মেয়রের চরম ব্যর্থতার কারণে নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে খুলনা নগরী। যার ফলে খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোটারদের পছন্দ তালুকদার আবদুল খালেক।
ইতোপূর্বে পাঁচ বছর মেয়র হিসেবে দায়িত্বকালে সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা ও অনিয়ম-দুর্নীতি রোধ করতে তার গৃহীত পদক্ষেপও প্রশংসিত হয়েছিল। মেয়র পদে দায়িত্ব পালনকালে খালেক খুলনার উন্নয়নে এ যাবৎকালের সর্বাধিক এক হাজার কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দ আনতে পেরেছিলেন। তার সময়ের মধ্যে ৩০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছিল। পুনরায় মেয়র নির্বাচিত হলে আগের অসমাপ্ত কাজ শেষ করার পাশাপাশি নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া অঙ্গীকার অগ্রাধিকারভিত্তিতে বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
‘সিটি গভর্নমেন্ট ব্যবস্থা চালু, নগরীর সৌন্দর্যবর্ধন, দুর্নীতিমুক্ত সিটি কর্পোরেশন ও ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়নসহ ৩১-দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন খুলনায় আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক।
ইশতেহারে রয়েছেÑ পরিকল্পনা গ্রহণে পরামর্শক কমিটি, কেসিসি-কে দুর্নীতিমুক্ত করা, কেসিসি-তে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, ‘খুলনা ওয়াসা’কে সহযোগিতা করা, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, হোল্ডিং ট্যাক্স না বাড়িয়ে সেবার মান বৃদ্ধি, মাদকমুক্ত নগর, সিটি সেন্টার, নতুন আয়ের উৎস সৃষ্টি, পূর্ণাঙ্গ ‘আইটি ভিলেজ’ গড়ে তোলা, বিনামূল্যে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি, পার্ক-উদ্যান নির্মাণ ও বনায়ন সৃষ্টি, ক্রীড়াক্ষেত্রে উন্নয়ন, সোলার পার্ক আধুনিকায়ন, সড়ক উন্নয়ন, খালিশপুর ও রূপসা শিল্পাঞ্চলের উন্নয়ন, বধ্যভূমিগুলোর স্মৃতি সংরক্ষণ, টাউন সার্ভিস ও ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, নারী উন্নয়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা প্রদান, সুইমিংপুল স্থাপন, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের সহায়তা প্রদান, কবরস্থান ও শ্মশান ঘাটের উন্নয়ন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ, নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনে আরও উদ্যোগ গ্রহণ, আধুনিক কসাইখানা নির্মাণ ও খুলনা মহানগরীর সম্প্রসারণে উদ্যোগ গ্রহণ।
২১-দফা দাবি উত্থাপন ও সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে তালুকদার আবদুল খালেককে সমর্থন জানিয়েছে খুলনা মহানগর নাগরিক অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদ।
উল্লেখ্য, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে খুলনায় মেয়র পদে পাঁচ প্রার্থী ও কাউন্সিলর পদে ১৮৬ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ৩১টি নিয়ে গঠিত খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৪৫৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪৮ হাজার ৯৭৮ জন এবং নারী ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৪৪ হাজার ৪৭৬ জন। ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ২২৮।

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন
রাজধানী ঢাকার খুব কাছে ও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সিটি কর্পোরেশন গাজীপুর। আগামী ১৫ মে আসন্ন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে ৭ জন, সাধারণ আসনের কাউন্সিলর পদে ২৫৬ ও সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর পদে ৮৪ জনসহ মোট ৩৪৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম নৌকা প্রতীকে মেয়র পদে নির্বাচন করছেন। দানবীর হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীর আলম ২০০৯ সালে গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। সে সময় টঙ্গী এবং জয়দেবপুর থানার পুরো এলাকাবাসীর সঙ্গে সামাজিক-সাংস্কৃতিক-পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সুখে-দুঃখে তিনি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সময়ের সাথে সাথে তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন গঠনের পর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। শিল্প কল-কারখানার বৃদ্ধির সাথে সাথে শিল্পায়নের ব্যাপক বিকাশের ফলে এ এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি হলে তিনি এলাকার অসংখ্য বেকার যুবকদেরও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন। সরকারি অর্থ বরাদ্দ পেতে সহযোগিতার পাশাপাশি তিনি নিজের অর্থ দান করেছেন মসজিদ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে। কেউ তার কাছ থেকে খালি হাতে ফেরেন নি। ফলে অল্প সময়ে তিনি এলাকাবাসীর মন জয় করতে সমর্থ হয়েছেন। তাই সাধারণ ভোটাররা তাকেই মেয়র হিসেবে দেখতে চান।
মেয়র নির্বাচিত হলে গাজীপুরকে একটি আধুনিক উন্নত বাসযোগ্য সুন্দর নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণের অঙ্গীকার করেছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম।
যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ গাজীপুর সিটিকে একটি আধুনিক গ্রিন সিটিতে পরিণত করা, সুন্দর, পরিচ্ছন্ন এবং পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলা, গাজীপুরের ৫৭টি ওয়ার্ডকে ৮টি অর্থনৈতিক জোনে বিভক্ত করে উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া, সকল নাগরিকের জন্য সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু, নগরবাসীর জান-মালের নিরাপত্তার স্বার্থে সড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা স্থাপন, স্থানীয় গণমাধ্যম ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ওয়ার্ডভিত্তিক উন্নয়ন কমিটি গঠন করা, মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা, সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও সবুজায়ন করার লক্ষ্যে খালি জায়গায় বৃক্ষরোপণ, নগরীর যানজট ও জলাবদ্ধতা প্রধান সমস্যা সমাধানে ফুটপাতসহ সুষ্ঠু ড্রেনেজ নির্মাণ করে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন করা, শিক্ষা ও সায়েন্স সিটি গড়ে তোলা, ওয়ার্ডভিত্তিক গ্রন্থাগার স্থাপন, শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের মাধ্যমে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তা প্রদান, স্থানীয় সাংবাদিকদের জন্য স্বল্প মূল্যে আবাসন ও তাদের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা সহায়তা, কমিউনিটি ক্লিনিক সেবা আরও প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও স্বাস্থ্য বীমার সুবিধা, অর্থনৈতিক জোন ও শিল্প পার্ক স্থাপনের মধ্য দিয়ে ব্যাপক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।
উল্লেখ্য, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের আয়তন ৩২৯ দশমিক ৫৩ বর্গকিলোমিটার। ৫৭টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১১,৬৪,৪২৫। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৫ লাখ ৯১ হাজার ১০৭ জন এবং নারী ভোটার ৫ লাখ ৭৩ হাজার ৩১৮ জন। মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৩৯২। বিকাশমান শিল্প-কারখানাসমৃদ্ধ গাজীপুর মহানগর পূর্বের গাজীপুর ও টঙ্গী পৌরসভা এবং পূবাইল, বাসন, গাছা, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, কাউলতিয়ার ৫৭টি ওয়ার্ড নিয়ে যাত্রা শুরু করে ২০১৩ সালের ১৬ জানুয়ারি।

Category:

Leave a Reply