খেলা-পুরস্কার ছাপিয়ে স্পটলাইটে মমতাময়ী শেখ হাসিনা

Posted on by 0 comment

4-9-2019 7-11-16 PMঅনিন্দ্য আরিফ দিব্য: গত ৪ এপ্রিল। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম। আবেগঘন মুহূর্ত। সে এক বিরল দৃশ্য। বালিকাদের ফাইনালে হেরে কাঁদছে টেপুগাড়ি বিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছোট্ট মেয়েরা। থামছে না তাদের কষ্টের কান্না। ব্যর্থ সবাই। ট্রফি আনতে মঞ্চে গিয়েও গড়িয়ে পড়ছিল তাদের অশ্রু। আপ্লুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কী করবেন ভেবেÑ কান্না থামাতে তাদের মমতাময়ী মায়ের আদরে বুকে টেনে নিলেন প্রধানমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টের সমাপনী দিনে ফাইনাল ম্যাচের জম্পেশ উত্তেজনার মোহ-মুগ্ধতা ছাপিয়ে গেল এ ঘটনায়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে গিয়ে ছাত্রীরা পেল মায়ের স্নেহ। ভুলে গেল ট্রফি না পাওয়ার বেদনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের আদর ও ভালোবাসায় রাঙিয়ে দিলেন। মেয়েদের গলায় পদক পরিয়ে বুকে টেনে নিলেন। মুছে দিলেন চোখের পানি। বড় পর্দায় ভেসে এই আবেগঘন দৃশ্য পুরো স্টেডিয়ামকে উদ্বেলিত করল। প্রধানমন্ত্রী সান্ত¦না দিলেন; দিলেন এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণাও। এবার বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ স্কুল ফুটবল টুর্নামেন্টের শিরোপা জিতেছে যথাক্রমে সিলেটের হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ময়মনসিংহের পাঁচরুখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন দলকে ৩ লাখ, রানার্সআপ দলকে ২ লাখ ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলকে ১ লাখ টাকা করে প্রাইজমানি ও ট্রফি দেওয়া হয়। এ-সময় টুর্নামেন্টে ব্যক্তিগত সেরাদের হাতেও অর্থ ও ট্রফি তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।
বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ স্কুল টুর্নামেন্টের ফাইনালের দ্বিতীয়ার্ধের খেলা চলাকালে প্রধানমন্ত্রী স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন। এ-সময় বিপুল করতালী দিয়ে তাকে বরণ করে নেওয়া হয়। তিনি স্টেডিয়ামের ভিভিআইপি লাউঞ্জে বসে খেলা উপভোগ করেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অন্যদের মধ্যে উপস্থিতে ছিলেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন এমপি, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব মো. আকরাম আল হোসেন, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন প্রমুখ।
বালক বিভাগের ফাইনালে হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সালমান আহমেদের দেওয়া একমাত্র গোলে রংপুর বিভাগের নীলফামারীর দক্ষিণ কানিয়ালখাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে হারায়। অন্যদিকে জান্নাতুল মাওয়ার একমাত্র গোলে ময়মনসিংহের পাঁচরুখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় লালমনিরহাটের টেপুরগাড়ি বিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে হারিয়েছে।
পুরস্কারপর্ব শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিশুদের মাঝে নেতৃত্বের গুণাবলি সৃষ্টির পাশাপাশি তাদের মেধা-মননের যথার্থ বিকাশে লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক চর্চায় আগ্রহী করে তুলতে অভিভাবক-শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই, আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা ফুটবলসহ খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করবে এবং তাদের শরীর স্বাস্থ্য এবং মন ভালো থাকবে। তারা শৃঙ্খলা শিখবে এবং আগামী দিনে এই বাংলদেশকে তারা নেতৃত্ব দেবে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৯ সালে বাংলাদেশ সরকার গঠনের পর থেকেই আমরা এই টুর্নামেন্ট আয়োজন করে আসছি। যার ফলে এখন খেলাধুলায় আমাদের ছেলেমেয়েরা পারদর্শিতা দেখাচ্ছে। আমাদের নারী অনূর্ধ্ব-১৪, অনূর্ধ্ব-১৬, অনূর্ধ্ব-১৮ এবং জাতীয় দলের ৫০ খেলোয়াড়ের মধ্যে ৩৬ জন খেলোয়াড়ই বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিব গোল্ডকাপ আন্তঃবিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট থেকে এসেছে। তারা ধীরে ধীরে জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড় হিসেবে নিজেদের অবস্থান করে নিচ্ছে। এজন্য জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি ভুটানে অনূর্ধ্ব-১৫ এএফসি কাপে বাংলাদেশ মহিলা ফুটবল দল ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।
ফুটবল আমাদের দেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি খেলা উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, মাঠে-ঘাটে এবং গ্রাম পর্যায়েও এই খেলা চলে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এই ফুটবল দল গঠিত হয়। বিশেষ করে আমি এমন একটি পরিবার থেকে এসেছি যেখানে আমার দাদা ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন, আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবও ফুটবল খেলতেন। আমার ভাই শেখ কামাল এবং শেখ জামালও ফুটবল খেলত। এখন আমার নাতি-নাতনীরাও ফুটবল খেলছে। তিনি বলেন, আমার ছেলেমেয়ে জয় এবং পুতুলের ছেলেমেয়েরা এমনকি শেখ রেহানার ছেলে ববির সন্তানেরাও ফুটবল খেলার সঙ্গে জড়িত।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এত বিশাল সংখ্যায় টুর্নামেন্ট, এত খেলোয়াড় নিয়ে পৃথিবীর আর কোনো দেশ আর কখনও আয়োজন করতে পেরেছে কি না সন্দেহ। সেজন্য তিনি যারা এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত, তাদের সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, আজকে যারা খেলাধুলায় অত্যন্ত পারদর্শিতা দেখাচ্ছে, আগামীতে তারা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আরও সম্মান দেশের জন্য বয়ে আনবে। আমাদের দেশে জনপ্রিয় খেলা ফুটবলের যেন আরও উন্নতি হয় আমরা সেই ব্যবস্থা নিচ্ছি। তাই সারাদেশের প্রত্যেক উপজেলায় আমরা একটা করে মিনি স্টেডিয়াম তৈরি করে দিচ্ছি। ছেলেমেয়েরা যাতে সব সময় খেলাধুলাটা অনুশীলন করতে পারে, সেজন্য এই পদক্ষেপটা আমরা নিয়েছি। উল্লেখ্য, এবারের বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টে ৬৫ হাজার ৭৯৫টি বিদ্যালয়ের ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫১৫ ছাত্র এবং বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টে ৬৫ হাজার ৭০০টি বিদ্যালয়ের ১১ লাখ ১৬ হাজার ৯০০ ছাত্রী অংশ নিয়েছে। কোনো ফুটবল টুর্নামেন্টে এতগুলো দল ও খেলোয়াড়ের অংশগ্রহণ বিশ্বে নতুন ইতিহাস।
খেলাপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন এবং রাসার্সআপসহ যারা অংশগ্রহণ করেছেন, সকল শিক্ষার্থী-খেলোয়াড় এবং অবিভাবকÑ সকলকে আমি অভিনন্দন জানাই। আজকে একটি দল শিরোপা জিতেছে, আগামীতে হয়তো অন্য কেউ আসবে; কিন্তু এই প্রতিযোগিতা সুন্দরভাবে যেন চলতে পারে তার ব্যবস্থাটা নিতে হবে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাক এবং আজকের যারা শিশু তাদের একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ আমরা গড়ে তুলতে চাই। বাংলাদেশে তারা যেন সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে, সুন্দর জীবন পায় এবং জীবনের সাফল্য অর্জন করে।

Category:

Leave a Reply