গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকুন

uttaran

আন্ডারপাস ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে গুজব ছড়ানো থেকে সবাইকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, আধুনিক প্রযুক্তির সুশিক্ষার জন্য ডিজিটাল বাংলাদেশ করেছি। অশ্লীল কথা, মিথ্যা কথা, গুজব ও অপপ্রচারের জন্য নয়। আর যাই হোক, প্রযুক্তি ব্যবহার করে গুজব ছড়ানো কখনও সহ্য করা যায় না। কাজেই সবাইকে বলব কেউ গুজবে কান দেবেন না। এগুলো থেকে বিরত থাকতে হবে।
গত ১২ আগস্ট ঢাকার শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ সংলগ্ন বিমানবন্দর সড়কে পথচারী আন্ডারপাস প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড এটি নির্মাণ করবে।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা বাঙালিরা একটু হুজুগে মাতি। সোশ্যাল মিডিয়া, ডিজিটাল বাংলাদেশ তো আমি করে দিয়েছি। সকলের হাতে এখন মোবাইল ফোন। আধুনিক প্রযুক্তি ফোরজি এসে গেছে। একটা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ফেসবুক করা যায়, ইউটিউব দেখা যায়, সেটা আমরা করে দিয়েছি। এই যে প্রযুক্তির ব্যবহার, এর মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে, গুজব ছড়িয়ে, একটা অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা; এমনকি অনেক বয়স্ক লোক, এমন এমন লোক আছেÑ যাদের ভালো কাজের জন্য একসময় পুরস্কার দিয়েছি, অথচ তারাই এখন এ ধরনের গুজব ছড়াতে শুরু করল। তাই কেউ চট করে গুজবে কান দিবেন না। আমার প্রশ্ন, গুজব ছড়ালেই তা বিশ্বাস করতে হবে কেন? কিছু শুনলে আগে বুদ্ধির প্রয়োগ করে তা বিচার-বিবেচনা করতে হবে।
রমিজ উদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর জন্য দায়ীদের বিচারে নিজের দৃঢ় অবস্থানের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা কোনোদিনই ক্ষমা করা যায় না, এটা ক্ষমার অযোগ্য। কারণ ওই বাস ড্রাইভার যেভাবে নিয়ম ভঙ্গ করে গাড়িটা চালাচ্ছিল, ছেলে-মেয়েদের ওপর দিয়ে চলে গেল। অনেক ছেলেমেয়ে আজ আহত। এদের আমরা কখনই ক্ষমা করব না। এ দুর্ঘটনায় যারা জড়িত তাদের উপযুক্ত শাস্তি অবশ্যই হবে, আমরা তা দেব।
শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে চোখে আঙুল দিয়ে অনেক অনিয়ম দেখিয়ে দেয়ায় তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিরাপদ সড়কের জন্য শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। তারপরও দেখছি, আমাদের কিছু লোক এখনও অন্ধ। আমরা সরকারে ফিরে দেখেছি, বিআরটিসি বাস বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা ছিল, আমরা চালু রেখেছি। ড্রাইভারদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছি। কিন্তু দুঃখজনক, ড্রাইভাররা ট্রেনিংও করে না, হেলপারের ওপর গাড়ি ছেড়ে দেয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষ সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করেছিল। ঘটনা ঘটার পর যেভাবে শিক্ষার্থীরা নেমে এসেছিল, তারা যে প্রতিবাদ করেছেÑ সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব, সবাইকে বলেছি ধৈর্য ধরতে। আমরা দেখেছি, তোমরা অস্থির হয়ে যাচ্ছ, তবুও ধৈর্য ধরতে বলেছি। আমাদের ছেলেমেয়েরা রাস্তায়, তাদের যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে। দুটি দিন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেয়ার অনেক চেষ্টা করেছি। যখন আমাদের (ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়) অফিস আক্রান্ত হলো, তখন সেখান থেকে ফোন আসছিল, বলা হচ্ছিলÑ আমরা তো টিকে থাকতে পারছি না, শুধু পাথর ছোড়া হচ্ছে। তখন বলেছি শুধু ধৈর্য ধরতে। আমার প্রশ্নÑ কারা করল এটা? সেসময় ব্যাপক গুজব ছড়ানো হয়েছে।
আন্দোলনের তৃতীয় দিন রাস্তায় স্কুল ড্রেস পরিবর্তনের দৃশ্য দেখা গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, যখন দেখলাম ব্যাগের ভেতর থেকে চাপাতি, চায়নিজ কুড়াল বের হচ্ছে, পাথর বের হচ্ছেÑ তখন আমরা চিন্তিত হয়ে গেলাম। আমি তখনই আহ্বান করলাম, তোমরা ঘরে ফিরে যাও। অভিভাবক-শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানালামÑ তৃতীয়পক্ষ ঢুকে পড়েছে, তাদের ঘরে ফিরিয়ে নেন। সময়মতো তারা শিক্ষাঙ্গনে ফিরে গেছে। তিনি বলেন, এই আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মার খেয়েছে, অপমানিত হয়েছে, তাদের মোটরসাইকেল পোড়ানো হয়েছে। কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীদের মুখের দিকে তাকিয়ে কেউ কিছু করেনি। কিন্তু দেখা গেলÑ এরা ছাত্র না, ছাত্র নামধারী কিছু লোক। দর্জির দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, প্রচুর পরিমাণে স্কুল ড্রেস তৈরি হচ্ছে।
শিক্ষার্থীসহ সবাইকে রাস্তা পারাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, রাস্তা পারাপার করার জন্য ডানে বা বামে তাকাতে হবে। রাস্তা পার হওয়ার জন্য যেসব জায়গা আছেÑ আন্ডারপাস, ওভারব্রিজ কিংবা যেখানে জেব্রা ক্রসিং সেখান দিয়ে রাস্তা পার হতে হবে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা রাস্তায় যখন গাড়ির কাগজপত্র পরীক্ষা করছিল, একাধিক মন্ত্রীর পথ আটকেছিল, তখন মন্ত্রীরা তাকে ফোন করে করণীয় জানতে চান। আর তিনি তাদের বলেন, ছাত্ররা যা বলছে, তাই যেন তারা করেন। আমি বলেছি, ওরা যাই বলে তাই শোনেন। মনে করেন আপনার সামনে আমাদের নাতিপুতি বলছে। নিজের নাতির কথা শুনেন না? নাতি-নাতনিদের কথা তো নানা-নানি, দাদা-দাদিরা শুনে থাকেন, যেটা বলে, সেটা শুনবেন। প্রত্যেকে কিন্তু শুনেছে।
বাস স্টপেজ ছাড়া কোথাও যাত্রী ওঠানামা করার বিষয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা সেটা করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, শাস্তি দিতে হবে এবং লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। আর ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলতে পারবে না। তিনি বলেন, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেশি মানুষের চলাফেরা যেখানেÑ প্রতিটি জায়গায় আন্ডারপাস, ফুটওভার ব্রিজ করে দিতে হবে। পর্যাপ্ত লাইট ও গোপনভাবে সিসি ক্যামেরা রাখতে হবে এবং তা মনিটরিং করতে হবে। ছোট্ট সোনামণিদের বলব, ট্রাফিক রুলস মেনে চলতে হবে, মন দিয়ে পড়ালেখা করতে হবে। এত কষ্ট করছি, তোমাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।
সরকারপ্রধান হিসেবে সমস্যাটি অবহিত হওয়ার পর মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে বিষয়টির সমাধান হয়ে গেল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই প্লানটা তৈরি করে বসে আছে। তাই সবার প্রতি অনুরোধ করবÑ আপনারা যদি কোনো সমস্যা সমাধান করতে না পারেন, আমি তো ২৪ ঘণ্টাই আছি। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হয়তো ৫-৬ ঘণ্টা আমার নিজের থাকে। বাকি সময় আমাকে পাবেন। যখনই চান, আমার মোবাইল ফোন আছে, ফোন দিলেও পাবেন। আপনারা যদি একটু খবর দেন বা বলেন যে, এই সমস্যা। তাহলে একটা সমস্যার সমাধান করে দিতে পারি। কিন্তু এই কাজগুলোর যেন কালক্ষেপণ না হয়। আজকে যদি এই কালক্ষেপণটা না হতো, তাহলে হয়তো এ দুর্ঘটনাটা হতো না। এভাবে দুইটা জীবন যেত না।
চালকদের লাইন দিয়ে বাস চালাতে হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোথাও যদি ওভারটেক করতে যায়, তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে নিতে হবে। পুলিশের এটা দায়িত্ব। আইজি সাহেব, এখানে উপস্থিত আছেন। সেভাবেই আপনাকে নির্দেশ দিতে হবে। প্রয়োজন হলে ডিজিটাল প্রযুক্তির ক্যামেরার মাধ্যমে রাস্তায় কেউ কোনোরকম অনিয়ম করছে কি না, সেটার দেখার ব্যবস্থা করে পদক্ষেপ নিতে হবে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা যেন নিরাপদে রাস্তা পারাপার হতে পারে সেজন্য শিক্ষক ও ট্রাফিকদের বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে বাবা-মা সন্তান হারিয়েছেন, তার ক্ষতিপূরণ দেয়া যায় না। কারণ আমি তো সব হারিয়েছি, আমি জানি হারাবার বেদনা কি? তবু আমি চেষ্টা করেছি। যারা এখনও আহত তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করছি।
সরকারি কর্মচারীদের তাদের দায়িত্ব আন্তরিকতার সঙ্গে প্রজন্মের আকাক্সক্ষানুযায়ী পালনের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের শিশুরা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে, বিবেককে জাগ্রত করেছে। তাই আমি আশা করব, জনগণ বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের আকাক্সক্ষানুযায়ী সকলেই তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করবেন। তিনি শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল ও কলেজের নিহত শিক্ষার্থী দিয়া খানম মীম এবং আব্দুল করিম রাজিবের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।
অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি ও সেনাবাহিনী-প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন।
শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের সামনের এই আন্ডারপাস ছাড়াও ঢাকায় আরও ৩টি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হবে বলে অনুষ্ঠানে জানান সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি। এর মধ্যে বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে ঢাকা বিমানবন্দর পর্যন্ত একটি এবং সংসদ সদস্য ভবন থেকে সংসদ ভবন পর্যন্ত অরেকটি আন্ডারপাস হবে। এছাড়া ঢাকা থেকে এলেঙ্গার পথে আরও ৫টি আন্ডারপাস নির্মাণ হচ্ছে বলে জানান তিনি।

Category:

Leave a Reply