গুডবাই পদার্থবিজ্ঞানের প্রবাদপুরুষ হকিং

Posted on by 0 comment

4-5-2018 7-25-46 PMঅনিন্দ্য আরিফ: একজন মানুষের কতটা জীবনীশক্তি-আত্মবিশ্বাস থাকলে একজন স্টিফেন হকিং হওয়া যাবেÑ সেই প্রশ্ন আগামীদিনের বিজ্ঞানীদের সামনে উঠবেই। দু-দুবার মৃত্যুদুয়ারের জমদূতকে ফাঁকি দিয়ে ফিরে আসা এক বিস্ময়কর কিংবদন্তির নাম হকিং। স্বাভাবিক চলার সুযোগ নেই, কথা বলার কণ্ঠ নেইÑ তারপরও তিনি এক বিজ্ঞানকথার প্রবাদপুরুষ। আধুনিক যুগের বিজ্ঞানীদের সংক্ষিপ্ত তালিকার শীর্ষবিজ্ঞানীÑ একজন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ, মহাবিশ্ববিদ, লেখক, বিরল মেধাসম্পন্ন বিজ্ঞানী।
শতাব্দীর অন্যতম সেরা এই মানুষের পুরো নাম স্টিফেন উইলিয়াম হকিং। জীবনের বেশিরভাগ সময় মোটর নিউরন রোগে আক্রান্ত হয়ে হুইলচেয়ারে কাটিয়েছেন। তীব্র নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বাকশক্তি হারিয়ে কথা বলেছেন যন্ত্রের সাহায্যে। তারপরও তার অর্জন আকাশসম উচ্চতা স্পর্শ করেছে। জন্ম ১৯৪২ সালের ৮ জানুয়ারিÑ গ্যালিলিও এর জন্মের ঠিক ৩০০তম মৃত্যুবার্ষিকীর দিন। আর সবাইকে বিদায় জানিয়েছেন আইনস্টাইনের জন্মবার্ষিকীতে ১৪ মার্চ ২০১৮।
হকিংয়ের বাবা ড. ফ্রাঙ্ক হকিং ছিলেন একজন জীববিজ্ঞান গবেষক। আর মা ইসোবেল হকিং রাজনৈতিক কর্মী। লন্ডনের হাইগেটের বাইরন হাউস স্কুলে হকিংয়ের শিক্ষাজীবন শুরু হয়। স্কুলজীবনেই ঘড়ির অংশবিশেষ, পুরনো টেলিফোনের সুইচবোর্ড ও অন্যান্য রিসাইকেল করার উপাদান দিয়ে কম্পিউটার তৈরি করে নজর কাড়েন। হকিং ১৯৫৯ সালের অক্টোবরে ১৭ বছর বয়সে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে পাঠগ্রহণ শুরু করেন। শুরুতে পড়াশোনার মনোযোগ ছিল না। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই  তিনি নিজেকে মেলে ধরেন। জনপ্রিয়, স্বতঃস্ফূর্ত ও বুদ্ধিদীপ্ত হিসেবে গড়ে তোলেন নিজেকে। এবং ধ্রুপদী সংগীত ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তবে ১৯৬৩ সালে ক্যামব্রিজে আসার পরপরই মাত্র ২১ বছর বয়সে মোটর নিউরন ডিজিজে আক্রান্ত হয়েছেন হকিং। রোগের প্রকোপ কিছুটা থামলে, হকিং তার সুপারভাইজার ডেনিশ উইলিয়াম শিয়ামার সাহায্য নিয়ে পিএইচডি অভিসন্দর্ভের কাজে এগিয়ে যান। ক্যামব্রিজে সহকর্মী রজার পেনরোজের সঙ্গে মিলে হকিং আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব থেকে একটি নতুন মডেল তৈরি করেন। সেই মডেল  ১৯৭০ সালে পেনরোজ-হকিং তত্ত্ব নামে জায়গা করে নেয়। আগে যেমনটি ভাবা হতো এককত্ব কেবল একটি গাণিতিক বিষয়। কিন্তু হকিং এককত্বের বীজ আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বেও আছে গবেষণায় প্রমাণ করেন। এভাবে একের পর এক গবেষণায় হকিং অন্যদের চেয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন।
নিজের অদম্য ইচ্ছে আর বুদ্ধিমত্তায় বারবার মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়ে বেঁচেছিলেন স্টিফেন হকিং। মোটর নিউরন রোগ এমন এক ভয়ানক রোগÑ এই রোগে আক্রান্ত রোগী মারা যান কয়েক বছরের মধ্যেই। ডাক্তাররা দুবছর বেঁধে দিয়েছিলেন তার আয়ুষ্কাল। তিনি বিস্ময়কর জীবনীশক্তির এই মানুষটি বেঁচে ছিলেন পরের ৪৫ বছর। কিন্তু প্রকৃতির চরম নিষ্ঠুরতায় ১৯৮৫ সালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন হকিং। লাইফ সাপোর্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। একসময় লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলারও বিষয়টি সামনে চলে আসে। হকিং ওই যাত্রায়ও বেঁচে গিয়েছেন। তবে ওই সময় তার শ্বাসনালী কেটে টিউব বসানো হয়। ফলে তিনি সম্পূর্ণরূপে বাকশক্তি হারান। ফলে পরের প্রায় ৩৩ বছর যন্ত্রের মাধ্যমে তিনি কথা বলেছেন। জীবদ্দশায় তিনি বেশ কিছু টেলিভিশন প্রোগ্রামে অংশ নিয়েছেন এবং তার কৃত্রিম কণ্ঠস্বরে কথা বলেছেন।
হকিংয়ের প্রলম্বিত কর্মজীবনে কৃষ্ণগহ্বর কীভাবে শক্তিক্ষয় করতে করতে শূন্যে মিলিয়ে যায় তা-ই তুলে ধরেন। গাণিতিক হিসাব এবং পরীক্ষা ছাড়া বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক বিষয় তুলে ধরার অসাধারণ ক্ষমতার কারণে তিনি বিশেষভাবে পরিচিতি পান। তার ‘থিওরি অফ এভরিথিং’ মানুষকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেÑ যাতে তিনি ধারণা দেন যে মহাবিশ্ব কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যেই বিবর্তিত হয়। ১৯৮৩ সালে জিম হার্টলের সাথে আবিষ্কার করেন মহাবিশ্বের আকার-আকৃতি সম্পর্কে অজানা তথ্য। ১৯৮৮ সালে ‘অ্য ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম’ বইয়ের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী বিখ্যাত হয়ে ওঠেন হকিং। বইটিতে তিনি মহাবিশ্বের সৃষ্টিরহস্য নিয়ে গবেষণালব্ধ তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। বেস্ট সেলার হিসেবে বইটির ১ কোটি কপি বিক্রি হয়। মহাবিশ্ব নিয়ে প্রকাশিত তার সর্বশেষ বই ‘দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন’। ২০০১ সালে তার দ্বিতীয় বইÑ ‘ইউনিভার্স ইন এ নাটশেল’ প্রকাশিত হয়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কোয়ান্টাম অভিকর্ষ নিয়ে কাজ করে গেছেন হকিং। তবে বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করতেই যেন এসেছিলেন তিনি। ২০০৭ সালে তিনি প্রথম চলৎশক্তিহীন ব্যক্তি হিসেবে একটি বিশেষ বিমানে ওজনশূন্যতার অভিজ্ঞতা নেন। মানুষকে মহাকাশ ভ্রমণে উৎসাহ দেওয়ার জন্যই তিনি এটি করেছেন বলে জানান। মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য ‘বিগ ব্যাং থিউরি’র প্রবক্তা স্টিফেন হকিং। মহাবিশ্বের সৃষ্টিরহস্যের তাত্ত্বিক উপখ্যানে কৃষ্ণবিবরের বিকিরণতত্ত্বের ব্যাখা দিয়েছেন হকিংÑ যা তাকে পদার্থবিজ্ঞানের বর্তমান সময়ের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীর মর্যাদার আসন এনে দিয়েছে।
আইনস্টাইনের পর হকিংকে বিখ্যাত পদার্থবিদ হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০০৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বীয় কসমোলজি কেন্দ্রে হকিংয়ের একটি মূর্তি স্থাপন করা হয়। ২০০৮ সালের মে মাসে হকিংয়ের আর একটি আবক্ষ মূর্তি উন্মোচন করা হয় দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে। এল সালভাদরের রাজধানী সান সালভাদরের বিজ্ঞান জাদুঘর হকিংয়ের নামে। তিনি তার কর্মক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অসংখ্য পদক ও পুরস্কার অর্জন করেছেন। ১৯৭৪ সালে ৩২ বছর বয়সেই তিনি রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন। ২০০৬ সালে পান সর্বোচ্চ সম্মাননা কোপলি মেডেল। ১৯৭৯ সালে তিনি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লুকাসিয়ান চেয়ার অব ন্যাচারাল ফিলোসফিতে বসার যোগ্যতা অর্জন করেন। স্যার আইজ্যাক নিউটনের পর ৩০০ বছরের মধ্যে তিনিই প্রথম বিজ্ঞানী যিনি এই সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। এছাড়া প্রিন্স অব অস্ট্রিয়ান্স পুরস্কার, জুলিয়াস এডগার লিলিয়েনফেল্ড পুরস্কার, উলফ পুরস্কার, কোপলি পদক, এডিংটন পদক, হিউ পদক, আলবার্ট আইনস্টাইন পদকসহ এক ডজনেরও বেশি ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।
লেখক : বিজ্ঞানবিষয়ক রচয়িতা

Category:

Leave a Reply